কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
বৌদ্ধ ধর্ম
শ্রীলঙ্কা, ভারত, ভুটান, নেপাল, লাওস, কম্বোডিয়া, মায়ানমার, চীন, জাপান, মঙ্গোলিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও কোরিয়াসহ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে এ ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী রয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে সিদ্ধার্থ গৌতম খ্রিস্ট-পূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ভারতের মগধের সম্রাট বিম্বিসারের রাজত্বকালে শিক্ষাপ্রদান ও সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন ও অজাতশত্রুর রাজত্বকালের প্রথমদিকে মৃত্যুবরণ করেন, অর্থাৎ তিনি জৈনধর্মের শিক্ষক মহাবীরের পরবর্তী সময়ের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর জীবনকালে বৈদিক ব্রাহ্মণবাদ ছাড়াও আজীবিক, চার্বাক, জৈন প্রভৃতি প্রভাবশালী মতবাদগুলো প্রচলিত ছিল। সিদ্ধার্থের পিতা ছিলেন শাক্য বংশীয় রাজা শুদ্ধোদন। মাতা মায়াদেবী কপিলাবস্তু থেকে পিতার রাজ্যে যাবার পথে লুম্বিনি গ্রামে (নেপালের অন্তর্গত) সিদ্ধার্থের জন্ম হয়। তাঁর জন্মের সপ্তম দিনে মায়াদেবী মারা যান। পরে তিনি বিমাতা গৌতমী কর্তৃক লালিত হন। ধারণা করা হয় তাঁর নামের ‘গৌতম’ অংশটি বিমাতার নাম থেকেই এসেছে। সিদ্ধার্থ গৌতমের বিবাহ সম্বন্ধে দু’ধরনের মত আছে। প্রথম মত অনুসারে ১৬ বছর বয়সে তিনি একটি প্রতিযোগিতায় তাঁর স্ত্রীকে লাভ করেন। অতঃপর পুত্র রাহুল জন্মগ্রহণ করে। আর একটি মত অনুসারে ২৮ বছর বয়সে তাঁকে সংসারের প্রতি মনোযোগী করার জন্য তাঁর পিতা-মাতা তাঁকে রাজকন্যা যশোধরার সঙ্গে বিবাহ দেন। পরবর্তী বছরে জন্ম নেয় পুত্র রাহুল।
কথিত আছে, একদিন রাজকুমার সিদ্ধার্থ বেড়াতে বের হলে চারজন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। প্রথমে তিনি একজন বৃদ্ধ মানুষ, অতঃপর একজন অসুস্থ মানুষ এবং শেষে একজন মৃত মানুষকে দেখতে পান। তিনি তাঁর সহিস চন্নকে এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে, চন্ন তাঁকে বুঝিয়ে বলেন যে এটিই সকল মানুষের নিয়তি। আবার একদিন (কারও কারও মতে সেদিনই) তিনি চন্নকে নিয়ে বের হলেন।
এবারে তিনি দেখা পেলেন একজন সাধুর, যিনি মুণ্ডিত মস্তক এবং পীতবর্ণের জীর্ণ বাস পরিহিত। চন্নকে এঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে, তিনি বলেন উনি একজন সন্ন্যাসী, যিনি নিজ জীবন ত্যাগ করেছেন মানুষের দুঃখের জন্য। রাজকুমার সিদ্ধার্থ সেই রাত্রেই ঘুমন্ত স্ত্রী, পুত্র, পরিবারকে নিঃশব্দ বিদায় জানিয়ে তিনি প্রাসাদ ত্যাগ করেন। সঙ্গে নিলেন চন্নকে। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে বনের শেষ প্রান্তে পৌঁছিয়ে তিনি থামলেন। তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেললেন তার লম্বা চুল। অতঃপর চন্নকে বিদায় জানিয়ে যাত্রা শুরু করলেন জ্ঞানান্বেষণে, মাত্র ২৯ বছর বয়সে। সিদ্ধার্থের এই যাত্রাকেই বলা হয় মহানিষ্ক্রমণ।
দুঃখ ও দুঃখের কারণ সম্বন্ধে জানতে সিদ্ধার্থ বিভিন্ন সন্ন্যাসীদের কাছে যান। তাঁদের উত্তরে সন্তুষ্ট হতে না পেরে তপস্যায় বসেন। ছয় বছর তপস্যা সাধনের পর গয়াতে বুদ্ধত্ব অর্থাৎ জ্ঞানপ্রাপ্ত হন। এবং এর পরপরই তিনি প্রজাসাধারণের ওপর কল্পিত ঈশ্বরের নাম করে। রাজার চিরকালীন প্রভুত্ববাদ ব্রহ্মবাদ ও পূর্বজন্মবাদ নামক বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরুদ্ধে মনুষ্যত্ব আর মানবতাবোধে সিক্ত এক উদার মতবাদ ছড়িয়ে দেয়ার ব্রত নিয়ে পথে নামেন। কিন্তু ইতিমধ্যে বেদ-নির্ভর শ্রম ডাকাতদের অর্থাৎ ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণের ক্ষমতার পাল্লাটা ধীরে ধীরে ব্রাহ্মণের দিকে ঝুঁকে যায় এবং এ সময় ক্ষত্রিয় রাজারা ব্রাহ্মণের হাতের ক্রীড়নক হয়ে যান। রাজা হয়ে পড়েন ব্রাহ্মণের কৃপাপ্রার্থী।
‘সত্ত্বাধিগুণ ও কর্মের বিভাগ অনুসারে আমি ব্রাহ্মণাদি চারিবর্ণের সৃষ্টি করিয়াছি।’ গৌতম বুদ্ধের কাছে গীতার এই শ্লোক ছিল মনুষ্যত্বের চরম অবমাননা। বুদ্ধ সমস্ত বর্ণের মানুষের জন্য তার মতবাদের দরজা খুলে দেন। তিনি বললেন, যজ্ঞে নয়Ñ আধ্যাত্মিকতাতেও নয়, সুখ হচ্ছে নির্বাণে।
নির্বান কী? এর ব্যাখ্যায় ড. দীনেশচন্দ্র সেন ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণকে উদ্ধৃত করেছেন। সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ বলেছেন: যে অবস্থায় সুখও নাই, দুঃখও নাই, যাহার কোনো প্রকার পরিবর্তন ঘটে না; যাহাতে উৎপত্তি ও নিরোধ তুল্যভাবে নি®পন্ন হয়, এবং যদ্দারা একত্ব ও বহুত্বের ভেদ নিরস্ত হয়Ñ সেই ভাবাভাবি-বিনির্মুক্ত অবস্থাকে নির্ব্বাণ বলে।
এ ব্যাখ্যা অনুসারে স্পষ্টতই বোধগম্য যে, বৌদ্ধধর্মে আধ্যাত্যবাদের কোনো স্থান নেই। নাকচ করলেন তিনি অলৌকিকত্ব ও দেব-দেবী মহিমা। বললেন, আত্মা, ঈশ্বর ইত্যাদি নিত্যবস্তু পৃথিবীতে নেই, সব বস্তুই উৎপন্ন হয় এবং অচিরেই বিলীন হয়ে যায়। সংসার কতকগুলো বস্তুর প্রবাহ বরং ঘটনাবলির স্রোত। বললেন, ঈশ্বরকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে ধরে নিলে মানুষের সব কাজ ও উদ্যম অর্থহীন হয়ে পড়ে।
সৃষ্টিকর্তার অস্তিতে বিশ্বাস না করে স¤পূর্ণই নিজের বুদ্ধির ওপর নির্ভর করে নির্বাণ লাভের চেষ্টা করতে হবে। আরো যে কাজটি করলেন বুদ্ধ তা হলো, তার মতবাদে অভিজাতদের ভাষা সংস্কৃতকে অপসারিত করে সাধারণ মানুষের ভাষা পালিকে করলেন ধর্ম ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যম। বুদ্ধ যেহেতু তার মতবাদকে যৌক্তিকতার ভিত দেয়ায় সচেষ্ট ছিলেন সেহেতু দেব-দেবীর অস্তিত্বকে স্বীকার করেননি তেমনি কখনোই নিজেকে দেবতা বা অবতার হিসেবে জাহির করেননি। তিনি ঘোষণা করতে পেরেছিলেন :
# শুধু জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে কোনো কিছু বিশ্বাস কোরো না।
# কোনো একটি ঐতিহ্যকে শুধু প্রাচীন হওয়ার কারণে এবং বংশপর¤পরায় প্রচলিত হয়ে আসছে বলে বিশ্বাস কোরো না।
# লোকে কোনো বিষয়ে খুব বেশি বলাবলি করে বলেই ঐ বিষয়ে বিশ্বাস কোরো না।
# শুধু প্রাচীন কোনো বিজ্ঞ লোকের লিখিত প্রমাণ হিসেবে প্রদর্শিত হয়েছে বলেই কোনো কিছুকে বিশ্বাস কোরো না।
# তুমি কেবল সেটিকেই সত্য বলে এবং জীবনের পথ প্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করবে যা নিখুঁতভাবে অনুসন্ধানের পর তোমার যুক্তি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলবে এবং যা তোমার নিজের এবং সব প্রাণীর মঙ্গলের জন্য সহায়ক হবে।
গৌতমের এই ভাষ্য এসেছে পালি ভাষায় লিখিত নিকায়ে গ্রন্থে। আসলে এ হচ্ছে যে কোনো অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিদ্রোহ। বেদের বর্ণভেদ ও পুনর্জন্মবাদের নামে সাধারণ মানুষের শ্রম-ডাকাতির বিরুদ্ধে। ব্রাহ্মণ্যধর্মের মূল ভিত্তি হচ্ছে অন্ধবিশ্বাস এবং সে বিশ্বাসের যিনি ধারক তিনি ব্রাহ্মণ। চলছিল ব্রাহ্মণের ভোগ-বিলাস আর রাজশক্তির ওপর আধিপত্য। গৌতম বুদ্ধ সেখানেই অর্থাৎ মূল শেকড়ে ঢুকিয়ে ছিলেন তীক্ষè ছুরির ফলা। আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল বুদ্ধের আরেকটি উক্তি। তা সরাসরি আঘাত করল ব্রাহ্মণের জন্মসত্তায়।
‘জন্মের দ্বারা কেহ ব্রাহ্মণ হয় না।’ এবার বুদ্ধের বিরুদ্ধে দানবিক রোষে ফেটে পড়লো ব্রাহ্মণ্যবাদ। আর এই ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতীক মনুর যোগ্য উত্তরসূরি শংকরাচার্য। বুদ্ধকে অভিহিত করলেন মানুষের শত্রু বলে।
গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবকালীন সময়ে ভারত ষোলটি স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির পর নিজের মতবাদ প্রচারে গৌতমকে কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। মগধ অধিপতি বিম্বিসার (রাজত্বকাল ৫৪৫-৪৯২ খ্রিস্ট-পূর্ব) ছিলেন বুদ্ধের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত। বিম্বিসারের পৃষ্ঠপোষতায় উত্তর ভারতে বৌদ্ধধর্মের বিস্তার লাভ সম্ভবপর হয়। সাঁইত্রিশ বছর রাজত্ব করেন বিম্বিসার। এই দীর্ঘ সময় তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রসারে সচেষ্ট থাকেন।
তার পুত্র অজাতশত্রু পিতা বিম্বিসারকে হত্যা করে মগধের সিংহাসনে (খ্রিস্ট-পূর্ব ৪৯৩-৪৬২) বসেন। অজাতশত্রু-ব্রাহ্মণাচার্য দেবদত্তের অনুগামী ছিলেন বলে পিতা বর্তমান থাকাকালে ঘোর বৌদ্ধ ধর্মবিরোধী ছিলেন। কিন্তু পিতাকে হত্যা করায় তিনি অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকেন প্রচণ্ডভাবে। তাই চিত্তের শান্তি লাভের আশায় তিনি বুদ্ধের অনুগামী হন। গৌতম বুদ্ধের বয়স তখন বাহাত্তর।
অজাতশত্রু পিতার পথ অনুসরণ করে বৌদ্ধধর্মের প্রসারে প্রয়াস নেন। তিনি বুদ্ধের এতই অনুরাগী ছিলেন যে, বুদ্ধের মৃত্যু সংবাদ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাকে দেয়া হয়। কারণ, তার পক্ষে এই দুঃসংবাদ সহ্য করা কঠিন ছিল। অজাতশত্রুু রাজত্ব করেন বত্রিশ বছর। রাজত্বের অষ্টম বর্ষে বুদ্ধ মারা যান। তিনি বুদ্ধের দেহাবশেষের কিছু অংশ রাজগৃহে এনে একাধিক ধাতুচৈত্য নির্মাণ করান। এছাড়া তিনি ৮০টি বিহার সংস্কার করেন। বুদ্ধের সমসাময়িক পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে মগধের পরই কোশলের স্থান। কোশল রাজ মহাকোশলের পুত্র প্রসেনজিত তার সময়ে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল কোশলের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। প্রসেনজিতের পত্নীদের মধ্যে মল্লিকা ছিলেন একজন। তার পরামর্শে বৌদ্ধ সংঘকে বিপুল অর্থ দান করতেন প্রসেনজিত। কংসের রাজা উদয়ন বা উদেন ছিলেন বুদ্ধের আর এক ভক্ত। তার মতবাদ প্রচারে রাজা উদয়ন নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। এভাবে রাজ-আনুকূল্যে গৌতম বুদ্ধের মতবাদ তৎকালীন ভারতভূমির ষোলটি রাজ্যের কয়েকটি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে মৌর্য আমলে। খ্রিস্ট-পূর্ব চতুর্থ শতকে মৌর্যরা মগধের অধিকর্তা হন।
চন্দ্রগুপ্ত মোর্য (খ্রিস্ট-পূর্ব ৩২৪-৩০০) নন্দবংশকে উচ্ছেদ করে মগধের সিংহাসন দখল করেন। তিনি বৌদ্ধধর্মী ছিলেন, এমন প্রমাণ মেলে না। তবে তার চব্বিশ বছর রাজত্বকালে মগধে বৌদ্ধধর্মের প্রসার অব্যাহত থাকে। তার পুত্র বিন্দুসারের রাজত্বকাল ছিল পঁচিশ বছর। তার সময়ে বৌদ্ধধর্ম প্রসার তেমন বাধার মুখোমুখি হয়নি। তবে সম্রাট অশোকের সময়কালকে বৌদ্ধধর্ম প্রসারের স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে। গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর দু’শত আঠারো বছর পর অশোক মগধের সিংহাসনে বসেন।
ইতিহাসবিদদের মতে মৌর্য বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ নৃপতি ছিলেন বিন্দুসারের পুত্র অশোক (খ্রিস্ট-পূর্ব ২৭৩-২৩২)। বিশাল রাজ্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। তার রাজ্যসীমা বিস্তৃত ছিল পশ্চিমে সিরিয়ার সীমান্ত হতে পূর্বে ব্রাহ্মপুত্র উপত্যকা এবং উত্তরে কাশ্মীর হতে পেন্নার নদ পর্যন্ত। রাজধানী ছিল পাটলিপুত্র।
সিংহাসনে আরোহণের পর নয় বছরের মাথায় তিনি কলিঙ্ক জয় করেন। যুদ্ধে বিপুল রক্তক্ষয় অশোককে মানসিক পীড়নে দগ্ধ করতে থাকে অহর্নিশ। ফলে তিনি ভিক্ষু উপগুপ্তের কাছে দীক্ষা নেন, বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। বৌদ্ধধর্মী হওয়ার আড়াই বছর পর তিনি বৌদ্ধধর্ম প্রচারে গিরিগাত্র, স্তম্ভ ও পর্বত গুহার অভ্যন্তরে গাত্র খচিত করে ব্রাহ্মী ও খপেষ্ঠী ভাষায় রচিত ধর্মবাণী উৎকীর্ণ করেন।
এসব লিপি বা লেখ অশোক লিপি নামে ইতিহাসে মান্য। বলা হয়, অশোক বুদ্ধের দেহভষ্মের ওপর ৮৪,০০০ স্তূপ নির্মাণ করিয়েছিলেন। বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য সিংহলে (শ্রীলংকা) পাঠিয়েছিলেন নিজ পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রাকে। বৌদ্ধধর্মকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে দেয়ায় তার অবদান সবচেয়ে বেশি।
অশোকের কাল থেকে প্রায় দেড়শ’ বছর পর কনিষ্ক ও হর্ষবর্ধনের কাল। এই সময়কালে ব্রাহ্মণ্যবাদ শক্তি সঞ্চয় করে উন্মুক্ত করপাল নাচিয়ে দানবিক মূর্তি ধারণ করে। মগধ রাজাদের যে কাজটি ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ভয়ানক ক্ষুব্ধ করে সেটি হচ্ছে, রাজ-কর্মচারী নিয়োগে তারা জাত-ধর্ম বিচার করতেন না। তাদের সময়ে উচ্চপদে আসীন ছিল যেমন শূদ্র তেমনি ব্রাহ্মণও। শূদ্র আর ব্রাহ্মণ পাশাপাশি বসবে রাজদরবারে এবং রাজার নির্দেশে শূদ্রের আদেশ অনুসারে কাজ করবে ব্রাহ্মণ এ তো ব্রাহ্মণ্যধর্মের চূড়ান্ত অবমাননা। শূদ্র নির্দেশকে ব্রাহ্মণ মেনে নেয় কীভাবে? সুতরাং ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত হতে থাকে। মৌর্য বংশের শেষ রাজা ছিলেন বৃহদ্রথ। সেনাপতি ছিলেন শুঙ্গ বংশীয় ক্ষত্রিয় পুষ্যমিত্র শুঙ্গ। বৌদ্ধধর্মের বিস্তার ও ব্রাহ্মণ্য প্রভাবের অবনতি এই সেনাপতির জন্য ছিল বড়ই মর্মযাতনাকর। সুতরাং ব্রাহ্মণ অভিসন্ধি কার্যকরে সক্রিয় হয়ে ওঠেন পুষ্যমিত্র শুঙ্গ। রাজাকে হত্যা পরিকল্পনার সমস্ত ষড়যন্ত্র পোক্ত করলেন। সেনাবাহিনীর গার্ড অব অনার নেয়ার ছলনায় আগে থেকে প্রস্তুত রাখা লক্ষ্যভেদী তীরন্দাজের শরে রাজাকে হত্যা করা হলো এবং মগদের সিংহাসনে বসলো পুষ্যমিত্র শুঙ্গ। এ ঘটনা ঘটলো খ্রিস্ট-পূর্ব ১৮৫ সালে। বৃহদ্রথের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সমাপ্তি ঘটল মৌর্য রাজত্বের এবং বিজয়কেতন উড্ডীন হলো ব্রাহ্মণ্যবাদের। পুষ্যমিত্র শুঙ্গের হত্যার শিকার হয়েছিলেন বৌদ্ধধর্মীরা। ধ্বংস করেন অশোকের ৮৪ হাজার ধর্মরাজিকা। হিমালয় হতে কন্যা কুমারিকা (চেন্নাই), আফগানিস্তান থেকে আজকের পাকিস্তানের বেলুচিস্তান এবং সেখান থেকে বঙ্গদেশ ও আসাম পর্যন্ত হাজার হাজার শিলালিপি স্থাপন করেছিলেন অশোক। এসব শিলালিপিতে সমস্ত মানুষের সমঅধিকার, বিচার-সাম্যের কথা বলা হয়। চণ্ডাল আর ব্রাহ্মণের বিচার একই ন্যায়ালয়ে হবে! অতএব, ব্রাহ্মণ তো ক্ষিপ্ত হবেই।
ক্ষিপ্ততায় অগ্নিশলাকা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে গেছে মনু সংহিতা। ইতিমধ্যে মনু সংহিতা গ্রন্থের দ্বাদশ অধ্যায়ে লেখা হয়ে গেছে- ব্রাহ্মণ অবমাননার শাস্তি একটাইÑ তা হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। গলা থেকে মাথা ছিন্ন হলো হাজার হাজার বৌদ্ধধর্মীর। পাথর ও স্তম্ভ গাত্র থেকে অশোকলিপি তুলেই ফেলা হলো। পুষ্যমিত্র শুঙ্গ ঘোষণা করেন, একজন বৌদ্ধ শ্রমনের মস্তকের পুরস্কার হিসেবে দেয়া হবে একশত স্বর্ণমুদ্রা। শাকল অঞ্চলের শ্রমনদের একজনকেও তিনি জীবিত রাখেননি। মধ্যপ্রদেশ হতে জলন্ধর পর্যন্ত বহু বিহার ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন। শত শত পণ্ডিত ভিক্ষু তার হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়।
বৌদ্ধধর্মে পশু হত্যা নিষেধ করা হয়। এর অর্থ দাঁড়ায় যজ্ঞ বিলোপ। ব্রাহ্মণ্যের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হয় যে অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে তার বিলুপ্তি ব্রাহ্মণ সহ্য করে কীভাবে! পুষ্যমিত্র শুঙ্গ আবার যজ্ঞকুণ্ড প্রজ্বলিত করলেন অশ্বমেধ-যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে। পুত্র অগ্নিমিত্র বিদর্ভ রাজ্য জয় করে এসে পিতা পুষ্যমিত্র শুঙ্গকে সার্বভৌম নৃপতির গৌরমালা পরাবার জন্য অনুষ্ঠান করলেন যজ্ঞের। এ সময়েই ঋষি বাল্মীকি ‘রামায়ণ’ রচনায় হাত দিলেন। অগ্নিমিত্র শুঙ্গের এই যজ্ঞ অনুষ্ঠানের পর পুষ্যমিত্র শুঙ্গ পরিচালিত হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া হাজার হাজার বৌদ্ধধর্মী মগধ ছেড়ে পালিয়ে যান। পুষ্যমিত্র শুঙ্গের পর বৌদ্ধ নিপীড়ক হিসেবে যার নাম করতে হয় তিনি কাশ্মীরের দুর্ধর্ষ হুন রাজা মিহিরকুল। তার নিষ্ঠুরতা এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে সমসাময়িককালের লেখক কলহন তার রাজতরঙ্গি’তে তাকে মৃত্যু দেবতা যম-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি আমৃত্যু অভিযান চালিয়ে অসংখ্য বৌদ্ধ উপাসক ও বৌদ্ধধর্মীকে হত্যা করেন। ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রারম্ভে আরেক হুন রাজা পরিচালিত হত্যাকাণ্ড থেকে প্রাণ বাঁচাতে বিপুলসংখ্যক বৌদ্ধধর্মী চীন দেশে গিয়ে আশ্রয় নেন। আরেক কাশ্মীর রাজা ক্ষেমগুপ্তও ছিলেন বৌদ্ধ হন্তা।
পুষ্যমিত্রের কাল থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম শতক পর্যন্ত বৌদ্ধধর্মীদের জন্য ছিল দুর্যোগকাল। ব্রাহ্মণ্যবাদী নৃপতিদের ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় তারা। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বিহার, সংঘারাম। যখন বৌদ্ধধর্মীদের সামনে কেবলই অন্ধকার তখন যেন আশার প্রদীপ নিয়ে খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে হাজির হন কনিষ্ক। এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন তিনি। কাশ্মীর, কাবুল, গান্ধার, পূর্ব ভারতে গাজীপুর, গোরক্ষপুর, পশ্চিমে পাথিয়া, চীনের কাশগড়, মধ্য এশিয়ার ইয়ারখন্দ এবং উত্তর ভারতে পাঞ্জাব ও সিন্ধুকে তার রাজ্যভুক্ত করেন। মগধের রাজধানী পাটলিপুত্র ও পুষ্যমিত্র শুঙ্গের রাজধানী সাকেতও দখল করেন। তিনি বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন। তার সময়েই অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর চারশ’ বছর পর সর্বপ্রথম বুদ্ধমূর্তি নির্মিত হয়। তার রাজসভায় বৌদ্ধধর্ম গ্রন্থ রচয়িতারা বিশেষ মর্যাদাবান ছিলেন।
কনিষ্কের মৃত্যুর কয়েক শতক পর আরেক নৃপতি বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ইতিহাস বরেণ্য হয়েছেন। তিনি হর্ষবর্ধন। কনৌজের সিংহাসনে বসেন সপ্তম শতকের গোড়ার দিকে। কাশ্মীর, নেপাল, পূর্ব পাঞ্জাব, উত্তর প্রদেশ, মগধ, উড়িষ্যা ও কম্বোজ (উত্তর-পশ্চিম ভারত) নিয়ে ছিল তার বিশাল রাজ্য। তার পিতা ছিলেন শিবের উপাসক, ভগ্নী ছিলেন বৌদ্ধধর্মী। ভগ্নীর প্রভাবে তিনি বৌদ্ধধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ হর্ষবর্ধনের সময় বৌদ্ধধর্ম গ্রন্থ সংগ্রহের জন্য ভারতে আসেন সে সময় তিনি একশ’টি সংঘারাম দেখেছিলেন। তাতে দশ হাজার ভিক্ষু বাস করতেন। তিনি নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সে যুগে নালন্দা ছিল বৌদ্ধ শাস্ত্র অধ্যয়নের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। হর্ষবর্ধন ৬৪৬ মতান্তরে ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। তার অনুপ্রেরণায় বৌদ্ধধর্মের যে প্রসার ঘটেছিল তাতে তিনি বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।
হর্ষবর্ধনের সময় উত্তর ভারতে বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটলেও পূর্ব ভারতে অর্থাৎ গৌড়বঙ্গে চলছিল বৌদ্ধ নিধনযজ্ঞ। এ হত্যাযজ্ঞের হোতা ছিলেন গৌড় অধিপতি শশাংক। সপ্তম শতকে অর্থাৎ হর্ষবর্ধনের সময়কাল তিনি বিহার থেকে সৈন্যসামন্ত ও আত্মীয়-পরিজন পরিবৃত হয়ে বঙ্গদেশের মুর্শিদাবাদের কাছে কানশোনা বা কর্ণসুবর্ণে আসেন। পরে এখান থেকে গৌড় দখল করেন। চরম বৌদ্ধবিদ্বেষী ছিলেন এই রাজা। কুশীনগরের সমস্ত বৌদ্ধধর্মীদের তিনি হত্যা করেন। গয়ায় গৌতম বুদ্ধ যে বৃক্ষের তলায় বুদ্ধত্ব লাভ করেন সেই বৃক্ষ তিনি উৎপাটিত করে গঙ্গায় নিক্ষেপ এবং বৃক্ষটির বাকি অংশ পুড়িয়ে ছাই করেন। শশাংক একটি বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করে সেই স্থানে শিবমূর্তি স্থাপন করেন।
গৌড়াধিপতি শশাংক ছিলেন হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক। তার সময়ে হিউয়েন সাঙ বঙ্গদেশে আসেন। যান সমতট রাজ্যে-যার রাজধানী ছিল কামতানগর (বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার কামতা)। তিনি তার ভ্রমণ বৃত্তান্তে বলেছেন, কামতানগরের কিছু উত্তরে যে সংঘারাম ছিল তাকে বলা হতো বিহারমণ্ডল। বড় কামতা গ্রামের কিছু উত্তরে। ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধধর্মীদের প্রতি এতটাই ঘৃণার বীজ বপন করে যে, বিহার মণ্ডল বা বৌদ্ধবিহার শব্দটি উচ্চারিত হলে হিন্দুরা কানে আঙুল দিত। তাদের কাছে ওই শব্দটি ছিল পাপের প্রতীক। সকালে কামতা গ্রামের নাম কেউ মুখে আনতো না। কারণ, সাতসকালে কামতা শব্দটি উচ্চারণে দিনটিই যেত অশূচি হয়ে।
শশাংকের পর এক অন্ধকার সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে বঙ্গদেশ। প্রায় অরাজকময় পরিস্থিতির অবসান হয় অষ্টম শতকের মাঝামাঝিকালে পাল রাজাদের রাজত্বকাল শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে। প্রথম পাল রাজা গোপাল গৌড়ের সিংহাসনে বসেন ৭৪০ খ্রিস্টাব্দে। তিনি প্রাকৃতজনের ভোটে নির্বাচিত রাজা। মারা যান ৭৯০ খ্রিস্টাব্দে। গোপালের পর ধর্মপাল, দেবপাল প্রমুখ রাজারা ১১৩৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মোট চারশ’ বছর বঙ্গদেশ শাসন করেন। পাল রাজারা বৌদ্ধধর্মী ছিলেন। তাদের সময় বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটে প্রভূত। নতুন নতুন বিহার নির্মিত হয়। বস্তুত পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের সর্বশেষ পৃষ্ঠপোষক বা শেষ রাজকীয় আশ্রয়। পাল বংশের শেষ রাজা যক্ষপালের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় পাল বংশের রাজত্বকাল। শুরু হয় সেন-বর্মন যুগ।
গোঁড়া ব্রাহ্মণ সেন-বর্মনরা দাক্ষিণাত্যের কর্নাটক রাজ্য থেকে বঙ্গদেশে আসেন। চরম বৌদ্ধবিদ্বেষী ছিলেন এই সেন-বর্মন রাজারা। বর্মার সৈন্যরা সোমপুরী বিহারে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। যে কারণে এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। বল্লাল সেন বৌদ্ধধর্মীদের ওপর ভয়ঙ্কর নিপীড়ন ও নির্বিচার হত্যালীলা চালান। তিনি মারা যান ১১৬৮ মতান্তরে ১১৬১ খ্রিস্টাব্দে। ইতিমধ্যে ভারতভূমিতে মুসলমানদের আগমন ঘটে গেছে। বৌদ্ধ নির্যাতক বল্লাল সেনের মৃত্যুর পর গৌড়বঙ্গের অধিপতি হন লক্ষণ সেন। তার সময়েই গৌড়বঙ্গে মুসলিম আধিপত্য কায়েম হয়। দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেকের তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজিই সেই ব্যক্তি যিনি লক্ষণ সেনের রাজধানী গৌড় দখল করেন।
ব্রাহ্মণ্য নিপীড়নে বিপর্যস্ত বৌদ্ধভিক্ষুরা মুসলমান আক্রমণের বিরোধিতা করেননি। এ কারণেই বৌদ্ধরা মুসলমানদের আনুকূল্য পায়। তবে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে বৌদ্ধরা ইসলাম গ্রহণ করে। কারণ সম্পর্কের অবনতির সুযোগ নিয়ে গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণরা নিরীহ বৌদ্ধদের ওপর চড়াও হতো। বৌদ্ধদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ শুরু হয় সেন রাজত্বকালে। যদিও গৌড়বঙ্গে মুসলমানদের শাসন তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি তথাপি মুসলমান সুফি-দরবেশরা ইসলাম প্রচারে বিভিন্ন স্থানে আস্তানা গাড়েন। এই সুফি-দরবেশদের আস্তানায় হামলা চালাতে সাহসী হননি সেন রাজারা। কারণ, ততদিনে উত্তর ভারতে মুসলিম আধিপত্য কায়েম হয়ে গেছে। গজনীর সুলতান মাহমুদ ও শিহাবুদ্দিন মুহাম্মদ ঘোরির ভয়ঙ্কর অভিযানের খবর তাদের শ্রুতিতে এসে গেছে। তাই ব্রাহ্মণবাদী সেন রাজাদের ভয়াবহ আক্রমণ থেকে প্রাণ বাঁচাতে সুফি-দরবেশদের আস্তানায় গিয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নেন বৌদ্ধরা।
খ্রিস্টপূর্বকাল ১৮৫ সাল থেকে ভারতভূমিতে যে বৌদ্ধ নিধনযজ্ঞ শুরু করেন পুষ্যমিত্র শুঙ্গ, তা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে কয়েক শতাব্দী ধরে, মুসলমানরা শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত। প্রায় সাতশ’ বছর ভারতভূমি শাসন করে মুসলমানরা। যেহেতু মুসলমান শাসকদের মধ্যে দু’একজন বাদে আর সবাই ছিলেন ধর্মীয় ক্ষেত্রে উদার দৃষ্টিভঙ্গিস¤পন্ন ও পরমতসহিষ্ণু, সেহেতু ব্রাহ্মণ্যবাদ মাথাচাড়া দিতে পারেনি। ধর্মবিষয়ে মোগল সম্রাটদের উদারতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশই নেই। শুরুটা হয় মোগল শাসনের প্রতিষ্ঠাতা বাবরকে দিয়েই। মোল্লাদের চরম বিরোধী ছিলেন তিনি।