কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতে হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
প্রাচীন মিশর (মিশরীয় সভ্যতা)
৫০০০বছর আগে নিকট প্রাচ্যে নগর বিপ্লবের সূচনা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের পূর্বেই নগর বিপ্লব সংঘটিত হয়। প্রায় ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস লিখেছেন, “ যে ব্যক্তি মিশর দেখেছেন, সে অবশ্যই উপলব্ধি করেছে যে, এটি একটি স্বোপার্জিত দেশ, নীলনদের দান।” ঐতিহাসিক মাইয়ার্স মনে করেন, পৃথিবীতে নীল নদের সমকক্ষ কোনো নদী নেই। বাস্তবে নীলনদ মিশরকে প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম উৎপত্তি স্থানে পরিণত করেছে। নীলনদের উৎপত্তি হয়েছে দক্ষিণে সুদূর আবিসিনিয়ার পাহাড়ে (মধ্য আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় পর্বতমালা থেকে)। নীলনদ আধুনিক সুদানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গতিপথ ছোট-খাট পাহাড় পড়ায় মাঝে মাঝে তার বুকে অনেকগুলো জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়েছে। ইংরেজিতে এই জলপ্রপাতগুলোকে ক্যাটারাক্ট বলে। ক্যাটারাক্টগুলো যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বাকি পথটুকু প্রায় ৫০০মাইল পথ অতিক্রম করে নীলনদ প্রবাহিত হয়ে গিয়ে পড়েছে ভূমধ্যসাগরে। জলপ্রপাত বা ক্যাটারাক্ট অঞ্চল থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত এলাকার উপত্যকা ও ব-দ্বীপ অঞ্চলেই অবস্থিত ছিল প্রাচীন মিশর। আর প্রথম ক্যাটারাক্টের কাছেই সেই প্রাচীনকালে যে শহরটি গড়ে উঠেছিল তার নাম ‘আসোয়ান’ ,
মিসরীয় ভাষায় যার মানে হল ‘বাজার’। মরুভূমি অঞ্চলের বেদুইনদের সঙ্গে প্রাচীন মিশরীয়দের জিনিসপত্র লেনদেন বা ব্যবসা-বাণিজ্যের জায়গা হিসেবেই মিশরের দক্ষিণ প্রান্তের এই শহরটি গড়ে উঠেছিল।
প্রাচীন মিশর লম্বায় প্রায় ৫০০ মাইল এবং সবচেয়ে বেশি চওড়া যেখানে, সেখানে মাত্র ১০ মাইলেরও কিছু কম। আফ্রিকার মধ্য অঞ্চলে গ্রীষ্মকালের শুরুতে অর্থাৎ জুন মাস থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। ফলে নীল নদের পানি ক্রমশঃই বাড়তে থাকে। এর উপর ইথিওপীয় মালভূমির বরফ গলা পানি পাহাড়ী মাটি ক্ষয় করে নীলনদে গিয়ে মিশে। এই উভয় কারণে নীল নদের পানি এত দ্রুত বেড়ে যায় যে, দু’কূল ছাপিয়ে যায় তার জলধারা এবং তখন নীলনদে ভয়ানক বন্যা দেখা দেয়। প্লাবন শেষে নভেম্বর মাসে পলি পড়তে শুরু করে নীলনদ তীরবর্তী প্রায় ১২৫০০ বর্গমাইল এলাকায়।
পলি মাটির এই নতুন আস্তর পড়ায় উর্বর এই মাটিতে প্রাচীন মিশরীয়রা অধিক ফসল ফলাত এবং তাদের সমৃদ্ধি আসত। মিশরীয় সভ্যতার সাথে সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতার তুলনা করলে দেখা যায় যে, মেসোপটেমিয়ার উন্মুক্ত ও উর্বর অঞ্চল যুগ যুগ ধরে বহিঃ শত্রু দ্বারা আক্রান্ত ও বিধ্বস্ত হয়। এর ফলে রাজবংশের উত্থান ও পতন হয়। অর্থাৎ, কোনো একটি বিশেষ রাজবংশ মেসোপটেমিয়ায় দীর্ঘকাল যাবৎ শাসন করতে পারেনি। কিন্তু মিশরের উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিমে সাগর ও মরুভূমি থাকায় বহিঃশত্রুর আক্রমণ ছিল তুলনামূলকভাবে কম। মিশরীয়রা খর্বাকার, কৃষ্ণবর্ণ, লম্বা মাথা, সোজা ও কালো চুল, গভীর চোখ এবং দীর্ঘ নাসিকাযুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে নিগ্রো ও লিবীয় চেহারার মানুষও দেখা যায়। এর থেকে মনে হয়,পশ্চিম এশিয়ার মানুষের রক্তের মিশ্রণ তাদের মধ্যে ঘটেছে। প্রথম দিকে তারা ছিল যাযাবর প্রকৃতির। তারা নীল বিধৌত উর্বর অঞ্চলে কৃষিকার্জের সূচনা করে বন্য জীবজন্তকে পোষ মানায়, নদীর পানি দিয়ে সেচকার্য করে, ঘর বাড়ি নির্মাণ এবং সমাজ সংস্কৃতি ও সভ্যতার বীজ বপন করে।
মিশরের সমাজ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, ১. এক ফারাও, রাজ দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তি,পুরোহিত ও ভূমির মালিক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা উচ্চ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন.২.বণিক কারিগর ও অন্যান্য শ্রম শিল্পীরা মধ্যম শ্রেণিভুক্ত ছিল। ৩.ভূমিদাস, সেবা দাস এবং ক্রিতদাসরা নিম্ন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরাই ছিল জনগনের বৃহত্তম অংশ। ফারাওরা ছিলেন একাধারে দেবতা, প্রশাসনিক প্রধান, বিচারক, প্রধান সেনাপতি প্রধান ধর্মীয় নেতা। প্রাচীন মিশরীয় সমাজব্যবস্থায় ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান ছিল। সমাজে সবচেয়ে খারাপভাবে জীবন যাপন করত দরিদ্র কৃষক এবং দাস শ্রেণি। দাস শ্রেণিকে সব স্বাধীন মানুষ এমনকি দরিদ্র কৃষকরা ঘৃণাও ঘৃণা করতো। যুদ্ধবন্দি ছাড়াও দরিদ্র কৃষক ঋণগ্রস্থদেরও নানা অজুহাতে দাস বানানোর প্রথা চালু ছিল। দাসদেরকে সাধারণত রাস্তাঘাট নির্মাণ, খাল কাটা, বাধ নির্মাণ, চাষাবাদ, খনির কাজে নিয়োগ করা হতো। পিরামিড নির্মাণের শ্রমদানে দাসদের বাধ্য করা হতো। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যে দাস শ্রমিক শ্রেণি মিশরীয় সভ্যতাকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করেছিল, বেঁেচ থাকার সামান্য খাদ্য ও পানীয় পাবার নিশ্চয়তা ছিল তাদের কাছে অকল্পনীয়।
রাজবংশের যুগে পূর্বের সব কিছুর পরিবর্তে মৃতের সাথে ‘প্যাপিরাস পত্রে লেখা’ সমাধিতে জমা দেওয়া হতো, এটি ‘বুক অফ ডেথ’ নামে পরিচিত। এই ‘বুক অফ ডেথ’ থেকেও মিশরীয় ধর্ম স¤পর্কে জানা যায়। প্রাগৈতিহাসিক সময়কাল থেকেই মিশরীয় ধর্ম ছিল বহু ঈশ্বরবাদী। প্রাচীন মিশরীয়রা প্রথম থেকেই যেসব প্রাকৃতিক শক্তি ও পশু-পাখির উপাসনা করতো তা হলো- সূর্য, চাঁদ, বজ্র, ঝড়, বন্যা, বায়ু, বাঘ, সিংহ, সাপ, কুম্রি, বাজপখী, হরিণ, ষাড়, বাঁদর, বিড়াল প্রভৃতি। এর মধ্যে সূর্যকে শ্রেষ্ঠ দেবতা মনে করে প্রাচীন মিশরীয়রা তার পূজা করতো। ঐতিহাসিকদের মতে, মিশরে এ জাতীয় উপাস্য দেব-দেবীর সংখ্যা ছিল ২০০০ টিরও বেশি। মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো যে, পুরোহিতরা স্বয়ং দেব-দেবীর সাক্ষাৎ পায়, দেবতারা পুরোহিতদের মাধ্যমে জনগণকে তাদের নির্দেশ দান করতে পারে। এ কারণে পুরোহিতদের দেবতাদের কথা বলে মনে করা হতো। মন্দিরের ধন স¤পত্তির তত্ত্বাবধানের ভার পাওয়ায় পুরোহিতরা দাসদাসী, জমিজমা ও সোনাদানার অধিকারী হয়ে সবচেয়ে বিত্তশালী ব্যক্তি হয়ে দাঁড়ায়। তবে পুরোহিতদের হাতেই শেষ পর্যন্ত মিশরে একটি ধর্ম সংস্কার বিপ্লবের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। এর প্রবক্তা ছিলেন ফারাও চতুর্থ আমেন হোটেপ (খিস্টপূর্ব১৩৭৫-১৩৫৮)। তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম ‘ইখনাটন’(যার উপর এটন সন্তুষ্ট) উপাধি ধারণ করেন। তিনি মন্দির থেকে সমস্ত পুরোহিতদের বহিষ্কার করেন। অতঃপর তিনি মন্দিরের দেওয়াল থেকে পুরাতন সব দেব-দেবীর নাম ও চিত্র মুছে ফেলে সব দেবতার উপাসনা বন্ধ করে শুধুমাত্র নতুন দেবতা বা ঈশ্বর সূর্যদেবতা ‘এটন’কে উপাসনা করার নির্দেশ দেন। এভাবে ধর্ম বিপ্লবের মাধ্যদিয়ে ইতিহাসে সর্বপ্রথম একেশ্বরবাদী ধারণার জন্ম দেন। স্বার্থলোভী পুরোহিতরা মিশরের জনগণের মধ্যে ইখনাটনের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা শুরু করে এবং এর ফলে
জনগণ বিভিন্ন স্থানে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ইখনাটনের মৃত্যুর সাথে সাথে তার ধর্মমতেরও মৃত্যু ঘটে এবং পুরোহিততন্ত্র এবং কুসংস্কার সমগ্র মিশরে পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ইখনাটনের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারী জামাতা বিখ্যাত ফারাও টুটেনখামেন দুর্নীতিপরায়ণ পুরোহিতদের অধিকার ফিরিয়ে দেন। এর ফলে সমগ্র মিশরীয় সমাজে কুসংস্কার ও ধর্মীয় নৈরাজ্য আবার বিস্তার করে। এইসময় মিসরীয়রা ‘বা’ এবং ‘কা’ এই দুই ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে পড়ে। তারা বিশ্বাস করতো যে, জীবিত মানুষের দেহের মধ্যে একটা ‘বা’ এবং একটা ‘কা’ আছে। ‘বা’ হল আত্মা এবং ‘কা’ হলো দ্বিতীয় সত্তা। মৃত্যুর পর ‘বা’পাখির আকৃতিতে উড়ে যায় এবং ‘কা’ অন্য কোথাও চলে যায়। আর তখন দেহ ঘুমের মধ্যে পড়ে থাকে। কিছুদিন পরে ‘বা’ এবং ‘কা’ ফিরে এসে আবার মৃতদেহের মধ্যে প্রবেশ করে যদি দেহ অবিকৃত থাকে। এই বিশ্বাস থেকেই মিশরীয়রা দেহকে ধরে রাখার জন্য মমি তৈরি করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। মিশরীয়দের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে মৃত্যুর পুনরুজ্জীবিত ব্যক্তিকে তার পাপ-পুণ্যের বিচারের জন্য দেবতা ওসিরিসের সামনে হাজির করা হবে। পৃথিবীর প্রত্যেক ব্যক্তির কৃতকর্মের হিসাব প্রদান করতে হবে এবং ভাল- মন্দের বিচারে তারা পুরষ্কার বা শাস্তি লাভ করবে।
মিশরীয়রাই প্রথম লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। সূর্য লিখতে হলে তারা প্রথমে একটি গোল বৃত্ত এঁকে তার মাঝখানে একটা বিন্দু বসিয়ে দিত। একটি হ্রদকে লিখতে হলে পানির ঢেউ এঁকে রাখত। নৌবিহার বুঝাতে গিয়ে একটি নৌকা এঁকে রাখত। যোদ্ধা লিখতে গিয়ে একটা মানুষ এঁকে তার হাতে তীর-ধনুক দিয়ে দিত। এটাকে ঠিক লিপি বলা চলে না বরং এটা হলো আসলে স্মৃতি সহায়ক লিপি। ছবি বা চিত্রের দ্বারা মিশরীয় এই লিখন পদ্ধতি হায়ারোগ্লিফিক নামে পরিচিত। চূড়ান্তভাবে খ্রিস্ট পূর্ব ৩০০০অব্দের দিকে প্রাচীন রাজবংশের যুগে মিশরীয়রা মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য ২৪টি হায়ারোপ্লিফিক চিহ্ন বা বর্ণমালা ব্যবহার শুরু করে। এই ২৪টি চিহ্নের প্রত্যেকটিতে মানুষের স্বরের এক একটি ব্যঞ্জনধ্বনি প্রকাশ করতো। হায়ারোগ্লিফিক লিপি সাধারণত ডান থেকে বায়ে লেখা হতো। প্রাচীন মিশরীয়রা খোদাই করে লেখার জন্য পাথর, হাড়, কাঠ, দেওয়াল-প্রাচীর, চামড়া, কাদামাটি প্রভৃতি লেখার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতো। দৈনন্দিন কাজকর্ম, প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক প্রভৃতি কাজের জন্য লেখার পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। এই সমস্যা সমাধানে তারা ধীরে ধীরে নল খাগড়া জাতীয় উদ্ভিদ থেকে তৈরি করে লেখার উপকরণ। এই গাছের নাম ছিল প্যাপিরাস। প্যাপিরাসের পাতা থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি উপকরণ থেকেই পেপার(কাগজ) শব্দটির উৎপত্তি।
নীল নদের বন্যার সময় হলে জমি,খাল এবং বাঁধ ইত্যাদি স¤পর্কে কৃষকদের বিশেষভাবে নজর দিতে হতো। মিশরীয়রা লক্ষ করেছিল যে, প্রতি বছর বন্যার পূর্বে আকাশের তারকারাজি একটি নির্দিষ্ট স্থানে সব সময় অবস্থান করে। এই পর্যবেক্ষণের ফলেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রথম উদ্ভব হয়েছিল। খ্রিস্ট পূর্ব ৪২৪১ অব্দের প্রাক রাজকীয় যুগে মিসরীয়রা লুব্ধক নক্ষত্রের আবির্ভাব কাল পর্যবেক্ষণ করে ৩৬৫ দিনের সৌর বৎসরের প্রবর্তন করে একটি সৌর পঞ্জিকা তৈরি করে। এই পঞ্জিকায় ১২ মাসে এক বছর এবং ৩০ দিনে এক মাস ধরা হয়। এই হিসেবে বছর শেষে ৫ দিন অবশিষ্ট থেকে যেত এবং তার সমাধানে মিশরীয়রা প্রতি বছর শেষ হলে তার সাথে ৫ দিন যোগ করে দিত। সাধারণত এই ৫ দিন আনন্দ উৎসবের দিন হিসেবে ধার্য করা হতো। প্রকৃত সৌর বছরের দৈর্ঘ্য ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা ৯ মিনিট ৯.৫ সেকেন্ড। এই হিসেবে মিশরীয় সৌর বছর ছিল প্রকৃত বছরের চেয়ে প্রায় সিকি চার ভাগের এক ভাগ দিন কম। প্রতি বছর চার ভাগের এক ভাগ দিন কম ধরলে প্রতি চার বছরে ১ দিন। তাই তারা প্রতি চার বছর অন্তর ৩৬৫ দিনের পরিবর্তে ৩৬৬ দিনে বছর গণনা করে নীলনদের বন্যার সাথে অর্থাৎ ঋতুর সাথে বছরের হিসেবে সামঞ্জস্য রক্ষা করতো। এ অর্থে বলতে গেলে আধুনিককালে আমরা যাকে ‘লিপ ইয়ার’ বলি তা প্রাচীন মিশরীয়রাই আবিষ্কার করে। জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা করতে গিয়ে প্রাচীন মিশরীয়রা এমনকি সূর্যের আলোয় ছায়া মেপে দিনের সময় নিরূপনের যন্ত্র আবিষ্কার করেছিল। এটাকে বলা হত ছায়া ঘড়ি বা সূর্য ঘড়ি। কিন্তু ছায়া ঘড়ি ছিল রাতে অচল। তাই প্রাচীন মিশরীয়রা সময় মাপার জন্য অন্য আরেকটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছিল যার নাম ছিল পানিঘড়ি বা জল ঘড়ি। গ্রীকরা এ পানি ঘড়ির নাম দিয়েছিল ক্লেপসিড্রা। পিরামিড শব্দটিও প্রাচীন গ্রিকদের দেওয়া নাম। পিরামিড প্রাচীন মিশরীয়দের এক অনন্য আশ্চর্য কীর্তি। গড়পড়তায় এক একটি পাথরের ওজন প্রায় ৬৮মন এবং কোন কোনটির ওজন ৮৪০০ মনেরও বেশি ছিল। এই আকাশচুম্বী পিরামিড তৈরির উদ্দেশ্য ছিল যাতে প্রভাতের সূর্যের আলো সর্বপ্রথম পিরামিডের গায়ে পড়ে। কারণ সূর্য ছিল মিশরীদের প্রধান উপাস্য দেবতা।