কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
‘ইসলাম’ ধর্ম
কৈফিয়ত: অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ইসলামের তথ্যসমূহ বারবার বিবেচনাপূর্বক এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। সবার জানা অতি সাধারণ বিষয়সমূহ এবং বিতর্ক তৈরি হয় এমন শব্দ, বাক্য ও তথ্য অতি সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি ভাষায় মরুভূমিকে ‘অরবত’ বলা হয়। এই অরবত শব্দ থেকেই আরব শব্দটি এসেছে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রে ৫৭০ খিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব তাঁর জন্মের প্রায় ছয় মাস পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন ভারত-সম্রাট হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে ‘কহতান’ এবং ইহুদি-বংশীয় লোকজনও কিছু সংখ্যায় মক্কায় বাস করত। তৎকালীন আরবের রীতি ছিল যে ‘মরুভূমির মুক্ত আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠার জন্য’ শিশুদেরকে দুধ পান করানোর কাজে নিয়োজিত বেদুইন মহিলাদের কাছে দিয়ে দিতেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর আবার ফেরত নিতেন। সাদ বংশের হালিমা নামে এক বেদুইন স্ত্রীলোক মক্কায় সেই সময় এসেছিল। প্রতিপালনের জন্য হালিমা শিশু মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে তার ডেরায় চলে যায়। এভাবে শিশু মুহাম্মদ (সা.) চার বছর বয়সকাল পর্যন্ত বেদুইনগৃহে পালিত হন। তারপর আবার তিনি তার স্নেহময়ী জননীর কোলে ফিরে আসেন। ছয় বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তিনি মায়ের সঙ্গে কাটান। তাঁর মা আমিনা আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মদিনায় পিতৃগৃহে যাত্রা করেন, সঙ্গে শিশুপুত্র মুহাম্মদ (সা.)ও ছিলেন। মদিনা থেকে ফেরার সময় ‘আরওয়া’ নামক স্থানে এসে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই মারা যান।
নোট: আরবে ধাত্রী মা অথবা দুধ মা রাখার প্রথা কেনো তৈরি হয়েছিল? কেনো চাচা হামজা, চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ এবং নবী মুহাম্মদকে দুধমাতার কাছে পাঠানো হয়েছে? আবার কেনো কিছু শিশুকে দুধ মাতার কাছে পাঠানো হতো না? যেমন- নবীর পুত্র সন্তান কাশেমকে বা হযরত আলীকে দুধ মাতার কাছে পাঠানো হয়নি? গবেষকদের মতে, এর সঠিক মূল কারণটি ছিল তৎকালীন আরবের ‘টয়লেট ব্যবস্থা’। অর্থাৎ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ছিল শিশুদেরকে বেদুইনদের কাছে প্রতিপালনের জন্য দেওয়ার প্রধান কারণ। তখন পুরো আরবের বেদুইন বা মক্কার বসবাসকারী লোকদের মধ্যে টয়লেটের ব্যবস্থা ছিল না। খোলা মাঠে বা পাহাড়ের পাদদেশে বা বালিতে লাঠি দিয়ে গর্ত করে সেখানে প্রাকৃতিক কাজ সারা হত। মক্কার জন্য এই বিষয়টি বিশাল এক জটিলতা সৃষ্টি করেছিল। মাঝে মাঝে দু’এক বছর পরপর বিষয়টি খুবই জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতো।
নারীরা সকালে অথবা সন্ধ্যায় দলবেঁধে পাহাড়ের পাদদেশে অথবা খোলা স্থানে প্রয়োজন মিটাতেন। যেহেতু তাঁদের মূল খাদ্য ছিল রুটি এবং তারা ছিল পরিশ্রমী, সেহেতু বাংলাদেশীদের মত তাঁরা বেশি মলত্যাগ করত না। রাতের বেলা জরুরি প্রয়োজনে ঘরে রাখা মাটির পাত্রে তাঁরা মুত্র ত্যাগ করতেন। দাস-দাসীরা সেটি ভোরবেলায় বাইরে ফেলে দিতেন। তবে সমস্যা জটিল হতো তখন, যখন কোনো শিশু বা বয়স্ক মানুষ পেটের রোগে ভুগতেন। এমন অবস্থায় পরিস্থিতি এতো জটিল হয়ে দাঁড়াতো যে, রোগ থেকে মুক্তি কঠিন হয়ে পড়তো। তখনকার আরবের চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল খুবই দুর্বল। ইসলামে যে ১৩ ধরনের শহীদি মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে সাত ধরনের মৃত্যু হচ্ছে রোগ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের অপ্রতুলতাজনিত। অর্থাৎ আরবরা চিকিৎসা ব্যবস্থায় এত দূর্বল ছিলেন যে, বিভিন্ন রোগে মৃত্যুকে শহীদি মর্যাদা দিয়ে শান্তনা নিতে বাধ্য হয়েছিল।
শহরের এতগুলো মানুষ নিয়মিত প্রাকৃতিক কাজ পাহাড়ের পাদদেশে সারছে, একবার ভাবুন তো, যদি বৃষ্টি বা বন্যা হয়, তাহলে কি অবস্থা দাঁড়াচ্ছে। উদারাময় পেটের পীড়া তখন মহামারী। এবার আর একটু ভাবুন তো, উদারাময় বা পেটের পীড়া হলে কারা বেশি মারা যাবে? যুবক, মহিলা না শিশু?
মক্কায় প্রায় দু’এক বছর পর পর গরম আসার সময় প্রচুর বৃষ্টি হতো। অনেক সময় পবিত্র কাবা ডুবে যাবার মত বন্যাও হত। সামর্থ্যবান মক্কাবাসীরা এমন বছরে জন্ম নেওয়া শিশুদেরকে মক্কার বাইরে পাঠিয়ে দিতেন। সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। যে বছর আবহাওয়া ভালো থাকতো, সে বছর দুধ মার কাছে পাঠানো শিশুর পরিমাণ ছিল কম। যে বছর নবী মুহাম্মদ(স:)কে মা হালিমা নিয়ে যান, সেই বছর প্রবল খরার পর বৃষ্টির বছর ছিল।
পুত্র এবং পুত্রবধূর বিয়োগ ব্যথায় কাতর পিতামহ আবদুল মোতালেব হৃদয়ের সমস্ত বাৎসল্য সঞ্চিত করে পৌত্রের লালন-পালনের ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন। কিন্তু বালক মুহাম্মদ (সা.)-এর আট বছর বয়সে তাঁর পিতামহেরও দেহাবসান হয়। এরপর হযরত মুহাম্মদ (সা.) পিতৃব্য আবু তালিবের স্নেহময় অভিভাবকত্বে বড় হয়ে উঠতে থাকেন। বালক বয়সে তিনি কখনো বকরি (মেষপাল) চরাতে নিয়ে যেতেন, কখনোবা সমবয়স্ক সঙ্গীদের সঙ্গে খেলাধুলাতে মেতে থাকতেন। সাধারণত তিনি যে বকরিগুলো চরাতেন, সেগুলো ছিল বনি সা’দ গোত্রের। কয়েক কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তিনি মক্কায় বসবাসরত বিভিন্ন ব্যক্তির বকরিও চরাতেন।
বালক মুহাম্মদ (সা.)-এর যখন বারো বছর বয়স তখন তাঁর চাচা আবু তালিব ব্যবসায়ের কাজে বাইরে যাচ্ছিলেন, এইসময় তিনি বালক মুহম্মদ (সা.)কে সঙ্গে নেন। তিনি বাণিজ্য যাত্রাপথে বসরা পৌঁছার পর কাফেলাসহ তাঁবু ফেললেন। সে সময় রোম অধিকৃত বসরা শহরটিতে জারজিস নামক এক খ্রিস্টান পাদ্রি ছিলেন, যিনি বুহাইরা বা বহিরা নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি তার গির্জা হতে বাইরে এসে কাফেলার মুসাফিরদের মেহমানদারি করতেন। এই যাত্রাকালে বালক মুহাম্মদ (সা.) খ্রিস্টের তপস্যাধন্য পাদ্রি ‘বহিরা’ প্রথমবার দর্শন করেন।
ফিজারের যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন মহা নবীর বয়স ১৫ বছর। যুদ্ধের নির্মমতায় তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন। কিন্তু তাঁর কিছুই করার ছিল না। সে সময় থেকেই তিনি কিছু একটি করার চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। তার উত্তম চরিত্র ও সদাচরণের কারণে পরিচিত মহলের সবাই তাকে ‘আল-আমিন’, অর্থ : ‘বিশ্বস্ত, বিশ্বাসযোগ্য, আস্থাভাজন’ ‘আল-সিদ্দিক’ (অর্থ : ‘সত্যবাদী’) বলে সম্বোধন করতেন। এসময় আরবদের মধ্যে বিদ্যমান হিংস্রতা, খেয়ানতপ্রবণতা এবং প্রতিশোধ¯পৃহা দমনের জন্যই ‘হিলফুল ফুজুল’ নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। মুহাম্মদ (সা.) এতে যোগদান করেন এবং এই সংঘকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বিরাট ভূমিকা রাখেন।
এরপর মুহাম্মদ (সা.) অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া, বসরা, বাহরাইন এবং ইয়েমেনে বেশ কয়েকবার সফর করেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর সুখ্যাতি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন খাদিজা বিনতে খোওয়াইলিদ তা অবহিত হয়েই তাকে নিজের ব্যবসার জন্য সফরে যাবার অনুরোধ জানান। মুহাম্মদ (সা.) এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং খাদিজার পণ্য নিয়ে সিরিয়ার অন্তর্গত বসরা পর্যন্ত যান। খাদিজা(র.) ছিলেন নবী মুহাম্মদ(সা.) -এর দুর স¤পর্কের ফুফু, তার দু’বার বিবাহ হয়েছিল, কয়েকটি সন্তানও ছিল। দ্বিতীয় স্বামী মৃত্যুকালে অগাধ ধন-স¤পত্তি রেখে গিয়েছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর খদিজা(র.) স্বামীর বিস্তৃৃত বাণিজ্যের হাল ধরেন। কর্মচারীর মাধ্যমে তিনি নানা দেশে বাণিজ্য পরিচালনা করতেন এবং নিজেই সমস্ত বিষয়ের তত্ত্বাবধান করতেন। মুহম্মদ(সা.) ২০ বৎসর বয়সে খাদিজার(র.)সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মুহাম্মদ (সা.)-এর সততা ও ন্যায়পরায়ণতায় মুগ্ধ হন খাদিজা(র.)। এছাড়া ব্যবসায়ের সফলতা দেখে তিনি তাঁর যোগ্যতা সম্বন্ধেও অবহিত হন। একপর্যায়ে তিনি মুহাম্মদকে(সা.) বিবাহ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনব্বিহরের কাছে বিয়ের ব্যাপারে তার মনের কথা ব্যক্ত করেন। নাফিসার কাছে বিয়ের প্রস্তাব শুনে মুহাম্মদ (সা.) তাঁর চাচাদের সঙ্গে কথা বলে বিয়ের সম্মতি জ্ঞাপন করেন। মুহম্মদ(সা.)-এর পক্ষে তার চাচা আবু তালিব এবং খাদিজার(র.) পক্ষে তার চাচা আমর বিন আসাদ অভিভাবকত্ব করলেন। বিবি খাদিজার(র.) পিতা খোওয়াইলিদ ফিজার যুদ্ধের পূর্বেই মারা গিয়েছিলেন। বিয়ের সময় বিবি খাদিজার (আ.) বয়স চল্লিশ বছর বলে অনেক স্থানে উল্লেখ থাকলেও গবেষকদের মতে প্রকৃত বয়স ছিল ২৭বছর, নিচে নোট দেখুন। এসময় মুহাম্মদ(সা.)-এর বয়স ছিল ২৫। খাদিজার(র.) জীবদ্দশায় তিনি আর কোনো বিয়ে করেননি। খাদিজার(র.) গর্ভে মুহাম্মদ(সা.)-এর ছয়জন সন্তান জন্মগ্রহণ করে, যার মধ্যে চারজন মেয়ে এবং দুই জন ছেলে। তাদের নাম যথাক্রমে কাসিম, জয়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা এবং আবদুল্লাহ। ছেলে সন্তান দুজনই শৈশবে মারা যায়। মেয়েদের মধ্যে একমাত্র ফাতিমা ব্যতীত সবাই নবীর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করেন।
নোট: আরবে নারীদের মাসিক চক্র সাধারণত ৯ থেকে ১০ বছর বয়সে শুরু হয়, সমস্ত চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে মেয়েদের বয়স ৪৫ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে তার মাসিক চক্র বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রতিটি নারীর ৩৫ বছরের পর সন্তান জন্ম দেওয়ার সক্ষমতাও কমে যায়। ৪০ এর পর খদিজা(র.) নিয়মিত বিরতিতে জন্ম দিয়েছেন ৬ টি সন্তান। বিষয়টি ভাবুন তো?
নবুয়তের পঞ্চম বছরে নবী মুহাম্মদ(সা.)-এর ঔরসে জন্ম নেওয়া সন্তান আব্দুল্লাহ এক বছর বয়সে মারা যান, তখন নবীর বিরোধীপক্ষ মক্কার লোকেরা নবীকে লেজকাটা নির্বংশ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন, যার কারণে সূরা কাউসার নাযিল হয়। এই শিশু আব্দুল্লাহর বয়স যদি এক বছর হয়, তাহলে এই শিশুটি খদিজার(র.) পেটে ছিল আরো এক বছর, এবার বিয়ের সময় খাদিজার বয়স ৪০ বছর ধরে হিসাব করলে দাঁড়ায় ৪০ + নবী হবার ১৫ বছর +শিশুর গর্ভ ও জীবনকাল বয়স দুই বছর। তাহলে মোট দাঁড়ায় ৫৭ বছর; যা কিনা নারীদের মাসিক চক্র শেষ হবার সময়সীমা থেকে অনেক বেশি।
এবার আমাদেরকে জানতে হবে কোথায় আছে এই ৪০ বছরের গল্প? পবিত্র কোরআনে নেই, হাদীসে নেই, ইবনে শাকীর রচনায় নেই। এমনকি নবী মৃত্যুর ২১০ বছরের কোনো রচনায় এটি নেই, এটি আছে নবীর মৃত্যুর ২৮০ বছর পরের রচনা তাবারিতে। জরির আল-তাবারি তার সময়ে কেবলমাত্র প্রচলিত কাহিনীর সংকলিত করে রেখেছেন। তিনি এই তথ্যটির সূত্র উল্লেখ করেছেনÑ হাকিম ইবনে হাশিম-এর কাছ থেকে, যিনি ছিলেন খদিজার(র.) ভাতিজা। হাকিম ইবনে হাশিম-এর থেকে এই বর্ণনাটি চারজন রাবির হাত ঘুরে এসেছে ইবনে সাদ-এর কাছে। হাকিম ইবনে হাসিম মারা গেছেন ৫৪ হিজরিতে। তারপর এটি এসেছে আবি হাবিবা নামে এক দাসের বয়ান থেকে, আবি হাবিবা থেকে এটি শুনেছেন মুসা ইবনে উকবা, মুসা ইবনে উকবা মারা গেছেন ১৪১ হিজরিতে। তিনিও দাস ছিলেন। এরপরে বর্ণনাটি মুসা ইবনে আকবরের কাছ থেকে শুনেছেন আল মনজুর বিন আব্দুল্লাহ। আল মনজুর ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে ওয়াকিদি শুনেছেন বলে দাবি করেছেন ইবনে সাদ। ওয়াকিদি মারা গেছেন ২০৭ হিজরিতে, আর ইবনে সাদ জন্মেছেন ১৬৮ হিজরিতে।
ইবনে কাসীর নবী মোহাম্মদ(সা.)-এর বিয়ের সময় খাদিজার(র.) ৪০ বছর বয়স নিয়ে বহু গবেষণা করেছেন। তিনি দেখেছেন খাদিজা(র.) মারা গেছেন ৬৫ বছরে বলা হলেও সঠিক হচ্ছে ৫০ বছর বয়সে। বিয়ের বয়স ৪০ ধরে নিলে ইসলামের ইতিহাসে খাদিজা(র.) ছাড়া এমন কোনো মেয়ে পাওয়া যাবে না, যিনি ৪০ বছর বয়সের পর ধারাবাহিকভাবে ৬ সন্তান জন্ম দিয়েছেন। এই কারণেই ইবনে সাদ শেষ পর্যন্ত নতুন করে বর্ণনা করেছেন, বিয়ের সময় হাদিজার বয়স ছিল ২৮ বছর। ইবনে হিজাব থেকে ইবনে সাদ পর্যন্ত তথ্যটি আসতে আসতে কোথাও কিছুটা বিকৃতি হয়েছে। এর বড় কারণ হতে পারে শিয়ারা। কারণ, তারা ফাতেমা(র.) ব্যতিত আর কোনো সন্তানকে মহনবীর ঔরসজাত সন্তান বলে মনে করে না।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) বাণিজ্যের প্রয়োজনে দেশ-বিদেশে যাত্রা করতেন এবং তখন অনেক সাধু মহাত্মার দর্শন পেয়েছিলেন যারা ছিলেন একেশ্বরবাদী, মূর্তি পূজার বিরোধী। তাছাড়া গৃহে স্ত্রী খাদিজা (আ:) এবং তাঁর ভাই নৌফল মূর্তি পূজার বিরোধী ইহুদি ধর্মের অনুগামী ছিলেন। যাতে প্রভাবিত হয়ে হযরত মুহাম্মদ (সা.) মূর্তিপূজা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। তিনি খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের মতো অনেকবার হেরা পর্বতের গুহাতে একান্ত সাধনা এবং ঈশ্বর দর্শনের জন্য গিয়েছিলেন।
হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর সময়ে আরব দেশে মূর্তি পূজার বহুল প্রচলন ছিল। সে সময়ে খ্রিস্টান ভিক্ষুরা মিশর, তুরস্ক, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন ও আরবের সড়ক পথের ধারে আশ্রম গড়ে তুলেছিল। তারা দরিদ্র, রোগী ও এতিম নারী শিশুদের পরিচর্যায় জীবন উৎসর্গ করেছিল। রাত্রিকালে ক্লান্ত বাণিজ্য-কাফেলা ও পর্যটকরা এসব সৈন্ন্যাসী মঠগুলোতে যাত্রা বিরতি করত। ইতিহাসবিদ বেঞ্জামিন ওয়াকার লিখেছেন, ঐ সময় মক্কায় কাবার আঙিনায় বাণিজ্য ডিপো স্থাপনকারী দুটি খ্রিস্টান গোত্র ‘ইজল’ ও ‘জুহরা’ চুক্তিবদ্ধ ছিল ‘সাহম’ কোরাইশ গোত্রের সঙ্গে। এই দুটি খ্রিস্টান গোত্রের মানুষরা এসেছিল আবিসিনিয়া, সিরিয়া, ইরাক ও প্যালেস্টাইন থেকে। তারা শিল্পী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, রাজমিস্ত্রি ও খোদাইয়ের কাজ করত। এছাড়া মক্কার তলোয়ার প্রস্তুতকারক ‘জাবরা’ নামক আর এক খ্রিস্টান ছিলেন, যিনি মোহাম্মদ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠজন ছিলেন, তিনি যিশুর শিক্ষা ও তাওরাত সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন। মোহাম্মদ (সা.)-এর বন্ধু কাইস গোত্রের কাইস ছিলেন আর একজন খ্রিস্টান, যার বাড়িতে রাতে ধর্মীয় আসর বসত। এই আসরে জনৈক তামিম দারী নামে এক খ্রিস্টান কিয়ামত ও পুনরুজ্জীবন ব্যাখ্যা করত।
মুহাম্মদ (সা.) বুঝতে পারেন যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাকে পুরো আরব সমাজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াতে হবে; কারণ তৎকালীন নেতৃত্বের ভীত ধ্বংস করা ব্যতীত ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার অন্য কোনো উপায় ছিল না। তাই প্রথমে তিনি নিজ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের মাঝে গোপনে ইসলামের বাণী প্রচার শুরু করেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর আহ্বানে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন তার সহধর্মিণী খাদিজা(র.), এরপর মুসলিম হন মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচাতো ভাই এবং তাঁর ঘরেই প্রতিপালিত কিশোর আলি, ইসলাম গ্রহণের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। ইসলামের বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য নবী ‘নিজ বংশীয়’ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভা করেন; এই সভায় কেউই তাঁর আদর্শ মেনে নেয়নি। ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় ব্যক্তি ছিল নবীর অন্তরঙ্গ বন্ধু আবু বকর। এভাবেই প্রথম পর্যায়ে তিনি ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন এবং এই প্রচার কাজ চলতে থাকে সম্পূর্ণ গোপনে।
তিন বছর গোপনে দাওয়াত দেওয়ার পর মুহাম্মদ (সা.) প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচার শুরু করেন। এ ধরনের প্রচারের সূচনাটা বেশ নাটকীয় ছিল। মুহাম্মদ (সা.) সাফা পর্বতের উপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে সবাইকে সমবেত করেন। এরপর প্রকাশ্যে বলেন যে, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রভু নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল’। কিন্তু এতে সবাই তাঁর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড খেপে যায়। মক্কাবাসীদের কাছে আপন ধর্ম প্রচার করার সময় কাবার পুরোহিত সম্প্রদায়ের অন্যতম কুরাইশীয়রা হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে নানা ধরনের কষ্ট দিয়েছিল। এমনকি তারা মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাণনাশের চেষ্টা করেছিল, তখন বাধ্য হয়ে হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা ত্যাগ করে মদিনাকে তাঁর নিবাস স্থল হিসেবে বেছে নেন। এই প্রবাসের তিথি থেকেই মুসলমানদের হিজরি সনের আরম্ভ হয়। সেই সময় মদিনা নগরে প্রচুর সংখ্যায় ইহুদিদের বাস ছিল এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে তাদের চাতুর্যের কারণে তারা বেশ বিত্তবান এবং প্রভাবশালী ছিল। মদিনার কোনো কোনো অঞ্চলে খ্রিস্টানদের বসতিও ছিল। হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই দুই ধর্মের এমন কিছু লোকের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে মূর্তি পূজার প্রতি কোনো শ্রদ্ধা রাখত না। এদের মধ্যে সায়দা-পুত্র কায়েস, হজশ-পুত্র আবদুল্লাহ, হবরিস-পুত্র ওসমান এবং অমরু-পুত্র জৈদ প্রসিদ্ধ।
নোট: আরবেরা তাদের ১০ পুরুষের নাম মনে রাখতেন, তাদেরকে সম্মান করতেন। এমন কি তারা তাদের নামের শেষে বাবা, দাদা এবং পূর্বপুরুষদের নাম নামের অংশ যোগ করতেন এবং এখনো করেন। যেমন মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ।
মুর্তি পূজাই ছিল তখনকার আরব দেশে প্রচলিত ধর্ম। লাত, উযযা, মানাত ও হুবল ছিল তাদের প্রসিদ্ধ উপাস্যগুলোর অন্যতম। তবে ইসলাম পূর্ব যুগেও প্যাগান আরবরা আল্লাহকে ডাকত। উদারহরন স্বরূপ- মোহাম্মদ(সা.)এর পিতার নাম ছিল আব্দুল্লাহ, আবদ+আল্লাহ= আব্দুল্লাহ। আরবী আবদ অর্থ- দাস, অর্থাৎ আল্লাহর দাস। তবে সৃষ্টিকর্তার প্রকৃত নাম হচ্ছে ‘লা’। আল শব্দটি হল সন্মানসূচক বিশেষণ। ইংরেজি ‘দি’-এর মতো। আল কোরান, আল হাদিস, আল আমিন। ইংরেজিতে- দি সান, দি আর্থ। বাংলায় হিন্দরা ব্যবহার করেন ‘শ্রী’।
আবু তালিব ইসলাম গ্রহণ করেনি, কারন মোহাম্মদ(সা.) আল্লাহকে স্বীকার করলেও বাকী দেব-দেবীকে অস্বীকার করেছিলেন। অন্যদিকে ইহুদি ও খৃস্টানরা মোহাম্মদ(সা.) কথিত আল্লাহকে গ্রহন করেনি; কারন ইশ্বরের এ নাম তাদের তৌরাত ও ইঞ্জিল কিতাবে উল্লেখ নেই; তাছাড়া মোহাম্মদ(সা.) কাবা ঘর পৌত্তলিকদের মত প্রদক্ষিণ করতেন, কাবার ভিতরের কালো পাথরকে চুমু খেতেন, যা ছিল ইহুদী-খৃস্টানদের ধর্ম ও ঐতিহ্য বিরোধী। একারনে মোহম্মদ(সা.) পৌত্তলিক কুরাইশ ও ইহুদী-খৃস্টান দু’পক্ষের কাছেই অগ্রহণীয় হয়ে যান।
ইসলামের বহু আগে গোটা আরব ভূমির লোকজন চন্দ্র দেবতার উপসনা করত, যার বহু প্রত্নতত্ত্বিক নজীর পৃথিবীর বিভিন্ন যাদুঘরে বিদ্যমান। এমনকি চন্দ্র দেবতার অনেক মন্দিরও আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রাক ইসলামী যুগে যেসব উপসণালয় আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে চন্দ্র দেবতা ও বাঁকা চাঁদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। এ চন্দ্র দেবতাকে আরবরা হাবুল বলেও সম্বোধন করত।
কাবা ঘর আরব পৌত্তলিকদের জন্য একটা পবিত্র ঘর ছিল আর তাই তারা প্রতি বছর একটা নির্দিষ্ট সময়ে এখানে জড় হতো, দেব-দেবীদের পূজা করত, দেবতাদের উদ্দেশ্যে পশু বলি দিত। কাবা ঘরকে প্রদক্ষিণ করত, হযরে আসওয়াদ বা কালো পাথরকে চুমু খেত। তবে মক্কা বা মদিনায় বসবাসকারী ইহুদি ও খৃস্টানরা পৌত্তলিকদের কাবা ঘরকে অসম্মান করত না। কারন কাবা ঘরের সামনে বৎসরে একটা নির্দিষ্ট সময় আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পৌত্তলিকরা এসে জড় হতো, এর ফলে সেখানে ব্যবসা বানিজ্য করার সুযোগ ছিল, আর ইহুদী খৃস্টানরা সে সুযোগ গ্রহণ করত।
ইবনে হিশামের মতে, মেসোপটেমিয়া হতে সর্বপ্রথম আরবে দেবমূর্তির আগমন ঘটান আমর ইবনে লুহাই নামের এক ব্যক্তি। মক্কার উপাসনালয়ের সর্বপ্রথম মূর্তির নাম ছিল হোবল। ভবিষ্যত গণনার জন্য এ মূর্তির চারপাশে তীর রাখা হত। আল উজ্জাহ, আল লাত ও আল মানাহ ছিল আরবের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেবী। এই তিন দেবীকে তারা ঈশ্বরের কন্যা মনে করত। মানাহ ছিল ভাগ্যের দেবী। মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী কুবেদ নামক স্থানে মানাহ দেবীর আলাদা মন্দির ছিল। তায়েফের নিকটবর্তী স্থানে ছিল লাত দেবীর মন্দির। মক্কা ও অন্যান্য অঞ্চলের লোকরা সেখানে গিয়ে পূজা করে আসতো। আর উজ্জাহ দেবীর মন্দির ছিল মক্কার পূর্বদিকে নাকলা নামক জায়গায়। কুরাইশরা উজ্জাহকে বিশেষ শ্রদ্ধা করত।
মক্কাবাসীরা মদ্যপান, জুয়া ও সঙ্গীতের প্রতি গভীরভাবে আসক্ত ছিল। যে সকল দাসী-রমনী নৃত্যগীত করত তাদেরকে কীয়ান বলা হত। বড় বড় দলপতিরা তাদের প্রতি প্রণয় নিবেদন করত। বহুবিবাহ ও দাসীদের সাথে যৌনতার প্রথা অবাধে অনুশীলন হত। আর একটা বিষয় ছিল, ছোট অবস্থায় মেয়েদের বিয়ে (বাল্য বিবাহ) দেয়া ছিল তৎকালীন আরবের রেওয়াজ, তবে দাম্পত্য জীবন শুরু হতো মেয়েদের মাসিক শুরু হবার পর। এভাবে মোহাম্মদ(সা.) নিজে যেমন আয়েশা(র.)কে বিয়ে করেছেন, তেমনি নিজের মেয়েদেরকেও বিয়ে দিয়েছেন।
হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় অবস্থানের ছয় মাসের মধ্যে তাঁর নিজ সম্প্রদায়ের জন্য একটা বাসস্থান গড়ে তুলেন এবং সেখানকার গোত্রগুলোর সঙ্গে একটি চুক্তি করেন, যা ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত।
মক্কাবাসীদের সঙ্গে বদর যুদ্ধের অবিশ্বাস্য বিজয়ের পর মুহাম্মদ (সা.)-এর যোদ্ধাদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তারা (মুসলিম বাহিনী) পরপর আরও তিনটি মক্কার কাফেলার উপর হামলা চালায়। ফলে মক্কার কুরাইশরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ৬২৫ সালের ২৩শে মার্চ আবু সুফিয়ান ৩০০০ লোকের এক যোদ্ধা বাহিনী নিয়ে মক্কা থেকে রওয়ানা দেন। তারা মদিনার কাছে ওহুদ নামক স্থানে মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বাধীন ৭০০ যোদ্ধার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে মুসলিম বাহিনীর বিপর্যয় হলেও ৬২৬ সালের এপ্রিল মাসে আবার মক্কার কাফেলার উপর আক্রমণ চালায়। এ সময় আশপাশের কিছু অমুসলিম গোত্রও মুহাম্মদ (সা.)-এর বাহিনীতে যোগ দেন।
মক্কার আবু সফিয়ান মুহাম্মদ (সা.)-এর হুমকি চিরতরে শেষ করার জন্য ৬২৭ সালের এপ্রিল মাসে প্রায় ১০,০০০ যোদ্ধার একটা বিশাল বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমণের জন্য রওয়ানা হন। সে সময় সালমান নামে মুহাম্মদ (সা.)-এর পারস্যের এক শিষ্য মদিনায় মুসলিম বাসস্থানের চারদিকে খন্দক বা পরিখা খননের পরামর্শ দেন। মুহাম্মদ (সা.) এই ধারণাটা লুফে নিয়ে বাসস্থানের চারদিকে পরিখা খনন করে মুসলিম যুদ্ধাদের খন্দকের ভেতর একত্রিত করেন। এই রণকৌশল কোরাইশদের কাছে অপরিচিত হওয়ায় তারা খন্দকটি পার হতে ব্যর্থ হয়। আক্রমণকারী কোরাইশরা ২০ দিন (মতান্তরে ৩০ দিন) অবরোধ করে হতাশ হয়ে ফিরে যান। কুরাইশরা অবরোধ তুলে নেবার পরপরই মুহাম্মদ (সা.) মদিনার ইহুদী গোত্র বানু কুরাইজা’কে আক্রমণ করেন কুরাইশদেরকে সহযোগিতা করার অভিযোগে। খন্দকের যুদ্ধের এক বছর পর ৬২৮ সালের মার্চ মাসে মুহাম্মদ(সা.) ১,৫২৫ জনের একটি শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হন। কোরাইশরা মুহাম্মদ(সা.)-এর আগমনের খবর পেয়ে তাঁর মক্কা প্রবেশ রুখতে শপথ নেন। কোরাইশদের এই প্রতিজ্ঞার খবর পেয়ে নবী সামনে অগ্রসর না হয়ে হুদায়বিয়া নামক স্থানে তাঁবু গাড়েন। তিনি মক্কায় বার্তা পাঠান এই বলে যে, তিনি কেবল শান্তিপূর্ণ ওমরা করতে এসেছেন, তা করার পর মদিনায় ফিরে যাবেন। সংঘর্ষের ফলাফল বিবেচনা করে কোরাইশরা সংঘর্ষ এড়াতে আপোষের সিদ্ধান্ত নেন। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, যা ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত। এতে উল্লেখ থাকে যে, উভয় পক্ষের মধ্যে ১০ বছরের জন্য হানাহানি বন্ধ থাকবে। সন্ধির শর্ত মতে, মুহাম্মদ(সা.) ও তার দল এবারের জন্য কাবা দর্শন না করেই মদিনায় ফিরে যাবে কিন্তু পরবর্তী বছর থেকে তিনদিন কাবায় ওমরা করতে পারবে। হুদায়বিয়ার সন্ধির দুই বছর পর মুসলিম বাহিনী কুরাইশদের পরাজিত করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেন। ইতিহাসবিদ ড্যানিয়েল পাইপস দাবি করেন, হুদায়বিয়ার সন্ধিটি মূলত কোরাইশরাই ভঙ্গ করেছিল। ফলে ৬৩০ সালের জানুয়ারি মাসে ১০০০০ যোদ্ধার একটি শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে মুহাম্মদ(সা.) মক্কা আক্রমণ করেন। আবু সুফিয়ান নিশ্চিত পরাজয় জেনে জনগণকে যুদ্ধ না করার উপদেশ দেন। মুসলিম বাহিনী মক্কায় প্রবেশ করে কাবাঘরে রক্ষিত সমস্ত মূর্তি ধ্বংস করেন। মক্কা বিজয়ের দিন অনেক পৌত্তলিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
মোহাম্মদ(সা.)-এর মক্কা দখলের পর ওমান, বাহরাইন, মিসরসহ অনেক রাজাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে দূত মারফত চিঠি পাঠান। কেউ ইসলাম গ্রহণ না করলেও মিসরের রোমান গভর্নর মোহাম্মদ(সা.)-এর কাছে তাঁর পত্রের বন্ধুত্বপূর্ণ উত্তর পাঠান। পরবর্তীতে যেসব খ্রিস্টান শাসক ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করেননি, তাদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধাভিযান চালান। কিন্তু কখনো মিসর আক্রমণ করেননি। তাঁর মৃত্যুর পর মুসলিম শাসকরা মিসর আক্রমণ করে।
৬৩০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মোহাম্মদ(সা.) আমর বিন আ’স-এর নেতৃত্বে ওমানের খ্রিস্টান শাসকদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বাহিনী পাঠান। তারা ইসলাম গ্রহণ করেন। ৬৩০ সালের অক্টোবর মাসে মোহাম্মদ(সা.) সিরিয়ার বাইজেন্টাইন সীমান্তের তাঁবুকে ৩০,০০০ জিহাদিদের সমবেত করেন। সেখানে তাঁবু গেড়ে ২০ দিন অবস্থান করে আশপাশের কয়েকটি সম্প্রদায়কে বশীভূত করেন। ৬৩২ সালে নবী প্যালেস্টাইন সীমান্তে একটা অভিযানের প্রস্তুতিকালে হঠাৎ অন্তিম রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মোহাম্মদ(সা.)-এর জীবনের শেষ দশ বছরে অনেক যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এর মধ্যে ১৭ থেকে ২৯টিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
মোহাম্মদ(সা.)-এর মৃত্যুর পর তাঁর শ্বশুর আবু বকর(রা:) ইসলামি রাষ্ট্রের প্রথম খলিফা হন। তার নেতৃত্বে ইসলামের আওতা সম্প্রসারণে জিহাদি যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। ৬৩৩ সালে ওমান, হাদ্রামাউত, কাজিমা, ওয়ালাজা, উলেইস ও আনবারের যুদ্ধ এবং ৬৩৪ সালে বসরা, দামেস্ক ও আজনাইনের যুদ্ধ পরিচালনার পর হযরত আবু বকর(রা.) মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর নবীর আরেক শ্বশুর হযরত ওমর(রা.) দ্বিতীয় খলিফা হন। তাঁর পরিচালনাধীনে ইসলামের আওতা সম্প্রসারণ আরো জোরদার হয়ে ওঠে। ৬৩৪ সালে নামারক ও সাকাতিয়ার যুদ্ধ, ৬৩৫ সালে বুয়াইব, দামাস্কাস ও ফাহলের যুদ্ধ, ৬৩৬ সালে ইয়ারমুক, কাদিসিয়া ও মাদাইনের যুদ্ধ, ৬৩৭ সালে জালুলার যুদ্ধ, ৬৩৮ সালে জেরুজালেম ও জাজিরা বিজয়, ৬৩৯ সালে খুজইজিস্থান ও মিসর আক্রমণ, ৬৪১ সালে নিহাওদ্দার যুদ্ধ, ৬৪২ সালে পারস্যের রেই যুদ্ধ, ৬৪৩ সালে আজারবাইজান এবং ৬৪৪ সালে ফারস ও খারান বিজয়। হযরত ওমর(রা.) ইসলামের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, ৬৪৪ সালে তিনি খুন হলে নবীর জামাতা হযরত ওসমান(রা.)পরবর্তী খলিফা হন এবং ইসলামের বিস্তার অব্যাহত থাকে। ৬৪৭ সালে সাইপ্রাস বিজয়, ৬৪৮ সালে বাইজেস্টাইন এবং ৬৫৪ সালে উত্তর আফ্রিকা ইসলামের পতাকাতলে আসে।
খলিফা ওসমান খুন হন ৬৫৬ সালে। নবীর কন্যা ফাতিমা(রা.)-র স্বামী হযরত আলী(রা.) পরবর্তী খলিফা হন। হযরত আলীর(রা.) অধীনে মাত্র দুটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ৬৫৮ সালে নাহ্রাওনের যুদ্ধ, ৬৫৯ সালে মিসর বিজয়। এ সময় অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও দ্বন্দ্বে নিজেদের মধ্যে দলাদলি শুরু হয়। ৬৬১ সালে হযরত আলী(রা.) খুন হন। এরপর মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে উমাইয়া বংশ ক্ষমতায় আসে এবং ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তার পুনরায় চাঙা হয়ে ওঠে।