কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
সে যুগে মায়েরা বড়
আজ থেকে প্রায় আড়াইশো হাজার বছর আগে মোটামুটি মানুষের মতো এক জীবকে পৃথিবীর ওপরে ঘুরতে দেখা গিয়েছিলো। বহু হাজার বছর ধরে একঘেঁয়ে আধবুনো অবস্থায় কাটাবার পর মানুষ যেন হঠাৎ হুড়মুড় করে এগিয়ে চলতে শুরু করলোÑআগেকার মন্থরতার তুলনায় অবিশ্বাস্য রকমের তাড়াতাড়ি বদলে দিতে লাগলো পৃথিবীর চেহারাটা।
এমন অদ্ভুত ব্যাপার সম্ভব হলো কী করে? মানুষ কি হঠাৎ খুঁজে পেয়েছিল কোনো এক আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ? তার নাম কৃষিকাজ। তার নাম চাষাবাদ। সে আবিষ্কার হলো মাটির বুকে ফসল ফলাতে শেখা। কিন্তু‘ কৃষিকাজ বা চাষবাস আবিষ্কার এমন আশ্চর্য ব্যাপার হলো কেন? সেই কথাটিই তো খুলে বলতে বসেছি। সে কথা শুরু করবার আগে আবার বলে রাখি, পৃথিবীর বুকের ওপরে মানুষের পুরো ইতিহাসের তুলনায় এ আবিষ্কার খুব বেশিদিন আগেরকার নয়। কৃষিকাজ আবিষ্কার মানুষের জীবনে যে কতো বড়ো এক বিপ্লব তা একটি কথা থেকেই ঠাহর করতে পারা যাবে: এই আবিষ্কারের দরুণ পৃথিবীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটাই একেবারে বদলে গেলো, অন্য রকমের হয়ে গেলো।
মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর বুকের ওপর টিকে থাকতে গেলে, মানুষের পক্ষে সর্বপ্রথম দরকার হলো খাবারের। না খেলে মানুষ বাঁচবে কি করে? কিন্তু‘ মানুষের জন্যে এই যে খাবার, এ তো আর মঙ্গলগ্রহ থেকে আসবে না; পৃথিবীর কাছ থেকেই তা যোগাড় করতে হবে। কিন্তু‘ এই যোগাড় করবার ব্যবস্থাটা দু-রকমের হতে পারে। এক রকমের নাম, খাদ্য আহরণ। আর এক রকমের নাম, খাদ্য উৎপাদন।
কৃষি আবিষ্কার হবার আগে পর্যন্ত কী রকম? মানুষের অবস্থাটা পরগাছার মতো, পরজীবীর মতো। পৃথিবীতে যা রয়েছে তারই উপর নির্ভর করে, কোনোমতে তাই-ই সংগ্রহ করে বা আহরণ করে, মানুষ বাঁচবার চেষ্টা করছে, হয়তো নদীর ধারে ধারে শামুক-গুগলি, কাঁকড়া আর মাছ খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে, আরো কিছুকাল পরে হয়তো বা শিখেছে বনের পশুপাখি শিকার করতে। অর্থাৎ কিনা, এককথায়, পৃথিবীতে যা রয়েছে তাই-ই যোগাড় করবার চেষ্টা, তাই-ই যোগাড় করে কোনোমতে নিজেদের প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টা। অন্য জানোয়ারদের তুলনায় মানুষের পক্ষে এই যোগাড় করবার কায়দা-কনুন নিশ্চয় অনেক উন্নত হয়েছিলো; কৃষিকাজ আবিষ্কার করতে পারবার পর থেকে কিন্তু‘ একেবারে অন্যরকম। মানুষ আর পরগাছার মতো বা পরজীবীর মতো পৃথিবীর আর পঁাঁচটা তৈরি জিনিসের ওপর নির্ভর করে বাঁচবার চেষ্টা করছে না; তার বদলে পৃথিবীকে বদলে দিচ্ছে, পৃথিবীতে যা ছিলো না তাই সৃষ্টি করছে, পৃথিবীকে আনছে নিজের আয়ত্তে। কেন না, এখন থেকে সে পৃথিবীর বুকের ওপরে ফসল ফলাতে শুরু করেছে, সৃষ্টি করতে শুরু করেছে নিজের দরকারমতো খাবারটুকু।
খাদ্য আহরণ ছেড়ে খাদ্য উৎপাদনÑ আর তারই দরুণ পৃথিবীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা বদলে গেলো: পৃথিবী আসতে লাগলো মানুষের আয়ত্তে মধ্যে, মানুষ আর পৃথিবীর মুখ চেয়ে বাঁচতে বাধ্য নয়। মানুষ আগে চাষবাস শিখেছিলো? না, আগে পশুপালন করতে শিখেছিলো? আগে কৃষিকাজ, পরে পশুপালনÑপশুপালনের চেয়ে কৃষিকাজ অনেক পুরোনো আবিষ্কার। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে আজো যে-সব মানুষের দল পিছিয়ে-পড়া অবস্থায় আটকা রয়েছে তাদের কারুর কারুর বেলায় দেখা যায় শুধুমাত্র কৃষিকাজের উপর নির্ভর করেই বাঁচবার চেষ্টা চলেছেÑ তাদের জীবনে পশুপালনের পরিচয় নেই। চাষবাস শিখতে পারার দরুণ পশুপালন করবার সুযোগ সত্যিই বেড়ে গেলো! কেননা, চাষবাস শিখতে পারলে খড়-ভূষির যোগান পাওয়া যায়, আর এই খড়-ভূষি খাইয়েই গৃহপালিত পশুদের বাঁচিয়ে রাখা অনেক সহজ। তাই দেখা যায়, কৃষিজীবীরা ক্রমশই পশুপালনও করছেÑক্রমশই তারা গৃহপালিত পশুদেরও নিযুক্ত করছে চাষবাসের কাজে; হালে বলদ জুতে চাষ করলে অনেক বড়ো ক্ষেতে চষা যায়, অনেক ভালো করে চাষবাস করা যায়। কিন্তু শুরুতেই মানুষ এইভাবে হালে বলদ দিয়ে চাষ করতে শিখেনি; তার বদলে নিড়েনি দিয়ে ছোটো ছোটো ক্ষেত কুপিয়ে চাষ করতো। তাই, কৃষিকাজ শিখবার দরুণ যেমন পশুপালন করবার সুবিধে হলো, তেমনিই আবার পশুপালন শিখবার দরুণ শেষ পর্যন্ত কৃষিকাজও অনেক উন্নত হলো। এই কৃষিকাজ আবিষ্কারের দরুণই মানুষ পর্যন্ত সভ্য হয়ে উঠতে পারলো। খাদ্য আহরণ ছেড়ে খাদ্য উৎপাদন করতে শেখার দরুণ মানষ যে কতোখানি মুক্তি পেলো প্রথমে এই কথাটি ভালো করে বোঝা দরকার। কেননা, এইভাবে মুক্তি না পেলে মানুষ বন্য দশা ছেড়ে ক্রমশ সভ্যতার দিকে এগুতেই পারতো না।
খাদ্য আহরণ সারা বছরের কাজ, বছরের প্রতিটি দিনের কাজÑ ছুটি নেই, বিশ্রাম নেই, অবসর নেই, অবকাশ নেই। ফলমূল যোগাড় করাই বলো আর শিকার করাই বলোÑমানুষের দিন-আনি-দিন-খাই অবস্থ। কেননা, এইভাবে আহরণ করে আনা খবারের পরিমাণ এমন কিছু বেশি হতে পারে না যে মাসের পর মাস ধরে তাই খেয়ে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। কৃষিকাজের বেলায় কিন্তু‘ একেবারে অন্য কথা। সারাটা বছর ধরেই চাষবাস করবার দরকার নেই; শুধুমাত্র বছরের একটা বাঁধাধরা সময়েই চাষবাস করতে হবে। বীজ বোনা থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত এই সময়টুকু অবশ্য বিশ্রাম নেই, অবসর নেই। কিন্তু‘ তারপর সুদীর্ঘ অবকাশ। পুরো বছরের মতো ফসল গোলায় তুলতে পারলে আগামী বছর ফসলের সময়টুকু পর্যন্ত তারই ওপর নির্ভর করে বাঁচা যাবেÑতাই অবকাশ, অবসর, ছুটি।
এই অবকাশের কথাটা কিন্তু‘ খুবই জরুরি। কেননা, সারাটা বছরই যদি খাবারের জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়, তাহলে মানুষের পক্ষে খাবার যোগাড় করা ছাড়া আর কোনোদিকেই মন দেবার প্রশ্ন ওঠে না। কৃষিকাজ আবিষ্কার হবার পর মানুষ বছরের বেশিরভাগ সময়টা ধরেই মুক্তি পেলো, মুক্তি পেলো শুধুমাত্র খাবারের আশায় ঘুরে বেড়ানোর বাধ্যতা থেকে। তা ছাড়া আরো কথা আছে। প্রথমত, কৃষিকাজ শিখবার পর থেকেই মানুষের পক্ষে একটা বাঁধাধরা আস্তানা গড়ে তুলবার চেষ্টা দেখা দেওয়া স্বভাবিক: ফলমূল বা শিকারের আশায় হন্যে হয়ে ঘুরবার সময় মানুষের পক্ষে কোনো এক জায়গায় থিতিয়ে বসবার কথা ওঠে না। কিন্তু‘ চাষবাস শিখবার পর চাষের জমির আশপাশেই স্থায়ী আস্তানা গাড়তে হয়।
কৃষিকাজ শিখবার দরুণ শুধুই যে আরো কয়েকরকম কাজ শিখবার অবকাশ পাওয়া গেলো তাই নয়, আরো পাঁচ রকম কাজ শিখবার দরকারও পড়লো। প্রথমত, ক্ষেতের কাজটা ভালো করে করবার জন্যেই, মানুষের আরো কয়েকরকম বিদ্যা ভালো করে শিখতে হলো: জমিকে উর্বরা করবার কৌশল, বর্ষার আর বন্যার সময় গোনবার কৌশল, ভালো বীজ বাছবার আর তা সযত্নে জমিয়ে রাখবার কৌশল Ñএই রকম আরো অনেক কিছুই।
এইসব নানান কারণে, কৃষিকাজ আবিষ্কার হবার দরুণই মানুষের অগ্রগতি শুরু হলো আগের তুলনায় প্রায় অবিশ্বাস্য জোর গতিতে। মানুষ মন দিতে পারলো নানানরকম কাজে। কৃষিকাজ আবিষ্কারই যে সভ্যতার ভিত্তি ছিলো তা আমরা পুরোনো পৃথিবীর দিকে চেয়ে দেখলে বুঝতে পারবো: মিশর, মেসোপটেমিয়া, মোহেনজোদারোÑ প্রাচীন পৃথিবীর এই বিস্ময়কর আর অপরূপ চিহ্নগুলি নদীর কিনারায় কেন? নদীর পলি-পড়া উর্বর জমিই ছিলো কৃষিকাজের পক্ষে সবচেয়ে প্রশস্ত। আর মানুষ যে ওই কেন্দ্রগুলিতে অমন অপরূপ চিহ্ন গড়ে তুলতে পেরেছিলো তার আসল কারণ হলো ওই অঞ্চলগুলিতে সোনার ফসল ফলতোÑ সেই ফসলই ছিলো ওই সব আশ্চর্য কীর্তির মূলে আসল সম্পদ। শিকার করতে শিখবার আগে পর্যন্ত মানুষের দলের মধ্যে কাজের ভাগাভাগি বলে কিছু ছিলো না: সকলে মিলেই একসঙ্গে বীজ, ফল আর ছোটো ছোটো জানোয়ার যোগাড় করবার জন্যে ঘুরতো। কিন্তু‘ বল্লম তৈরি করতে শিখবার পর অন্যরকম: বল্লম হাতে বনে-জঙ্গলে শিকার করে বেড়ানোটা হলো পুরুষদের কাজ। মেয়েরা এই কাজে পুরুষদের সঙ্গে সমানে-সমান হয়ে বনে-জঙ্গলে শিকার করে বেড়াতে পারতো না। তার কারণ, মেয়েদের ওপর অন্য একটা দায়িত্ব ছিলো, সে দায়িত্ব পালন করতে গেলে বনে-জঙ্গলে শিকার করে বেড়ানো চলে না। কিসের দায়িত্ব? শিশুপালন। কচিকচি দুগ্ধপোষ্য শিশুদের নিয়ে মেয়েরা কি বনে-জঙ্গলে শিকার করে বেড়াবে?
তাহলে, বল্লম আবিষ্কারের পর থেকেই মানুষের দলের মধ্যে একরকম কাজের ভাগাভাগি দেখা গেলো: দলের পুরুষেরা বনে-জঙ্গলে বর্শা-বল্লম হাতে শিকার করে বেড়াবে, আর দলের মেয়েরা আগের মতোই বস্তির আশেপাশে ফলমূল আহরণের চেষ্টা করবে। এইভাবে ফলমূল আহরণের চেষ্টা থেকেই শেষ পর্যন্ত মেয়েরা কৃষিকাজ আবিষ্কার করেছিলো। কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার। আর সেই শুরুর যুগে চাষবাস ছিলো নেহাতই মেয়েলি ব্যাপারÑশুধুমাত্র মেয়েরাই চাষবাস করতো, চাষবাসের সঙ্গে পুরুষদের সম্পর্ক ছিলো না। প্রথম দিকে ধারালো পাথরের নিড়েনি দিয়ে বস্তির আশপাশের ছোটোখাটো জমি কুপিয়ে ছোটোখাটো ক্ষেত রচনা করা হতো! এ অবস্থায় চাক্ষাসকে ইংরেজিতে বলে গার্ডেনটিলেজÑ বাংলা করে আমরা বলতে পারি বাগান-ক্ষেত রচনার কাজ। হালে লাঙল জুতে বড়ো বড়ো ক্ষেতে চাষ করবার অবস্থায় মানুষ যখন পৌঁছলো তখন কিন্তু‘ আর চাষের কাজ মেয়েদের এক্তিয়ারে রইলো না; সে-কাজ মেয়েদের হাত থেকে পুরুষদের হাতে এলো। আফ্রিকার কোনো কোনো অঞ্চলে মানুষ নিড়েনি দিয়ে ছোটো ক্ষেত কুপিয়ে চাষ করবার বদলে হালে বলদ জুতে বড়ো ক্ষেতে চাষ করবার ব্যবস্থা শিখছে। ক্ষেতের কাজে বলদ বা অন্য কোনো গৃহপালিত পশু ব্যবহার হবার দরুণ কৃষিকাজের দায়িত্বটাম মেয়েদের হাত থেকে পুরুষদের হাতে চলে আসে কেন? এ প্রশ্নের জবাবটা বুঝতে হলে পশুপালন আবিষ্কারের কথাটা আগে বোঝা দরকার।
পশুপালন শুরু হলো কী করে? শিকার থেকে। শিকার করতে বেরিয়ে নিরীহ ধরণের পশুর বাচ্চাগুলোকে মেরে না ফেলে ঘরে ধরে এনে পোষ মানাবার চেষ্টা থেকেই পশুপালন আবিষ্কার। কথা হলো, শিকারের দায়টা কাদের ওপর ছিলো? পুরুষদের ওপরে, না মেয়েদের ওপরে? আমরা আগেই দেখেছি, এ দায়িত্ব মেয়েদের ছিলো না; বল্লম আবিষ্কার হবার পর থেকে শিকারের দায়িত্বটা বরাবরই পুরুষদের। শিকার থেকেই যদি পশুপালন শুরু হয়ে থাকে, তাহলে শিকার করাটা যাদের কাজ ছিলো পশুপালনও তাদেরই কাজ হবে না কি? তাই-ই। আর তাই, পশুপালন সর্বত্রই হলো পুরুষদের কাজ। আর সেই জন্যেই, চাষের কাজেও যখন থেকে গৃহপালিত পশুর ব্যবহার শুরু হলো, তখন থেকে চাষের কাজ আর মেয়েদের এক্তিয়ারে রইলো না।