কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
ঘর-তৈরি, কাপড়-বোনা
কৃষিকাজ আবিষ্কার হবার দরুণ আদিম মানুুষের বুনো আধা-জানোয়ারের মতো অবস্থা পিছনে ফেলে সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাবার যে সব পরিচয় দিতে লাগলো, তার মধ্যে কয়েকটি হলো ঘট-তৈরি, ঘর তৈরি, কাপড়-বোনা ইত্যাদি। সমস্ত শিল্পই শুরুতে ছিলে কুটিরশিল্প আর কুটিরের সমস্ত কাজই ছিলো মেয়েদের কাজ। আজকের দিনেও পিছিয়ে-পড়া মানুষদের মধ্যে এ কাজের দায়িত্ব কাদের উপর রয়েছে তা চেয়ে দেখো। এইভাবে পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের দিকে চেয়ে দেখলে আমরা জানতে পারি চামড়ার স্থূল জামা-কাপড় তৈরি করা থেকে শুরু করে সূক্ষ্ম সুতো কেটে রঙ-বেরঙের নকশাওয়ালা মিহি আর শৌখিন কাপড় বোনা পর্যন্ত সমস্ত কাজই শুধু মেয়েদের। তেমনি, আজকের দিনের পিছিয়ে-পড়া মানুষদের দিকে চেয়ে দেখলে দেখতে পাই কুমোরের কাজটাও সর্বত্রই মেয়েদের কাজ, যদিও পরের যুগে এই কাজ মেয়েদের হাত থেকে পুরুষদের হাতেই এসে পড়েছে। এইখানে একটা কথা আবার বলেনি। পৃথিবীতে সব মানুষের উন্নতি একসঙ্গে সমানতালে হয়নি। তাই, এগিয়ে-যাওয়া মানুষদের পাশাপাশিই পিছিয়ে-পড়ে থাকা মানুষদের পরিচয় পাওয়া যায়। আর এই এগিয়ে-যাওয়া মানুষদের অতীতটাকে জানবার ব্যাপারে পিছিয়ে পড়ে-থাকা মানুষদের সম্বন্ধে জ্ঞানটা খুব কাজে লাগে। কেননা, যারা আজ এগিয়ে গিয়েছে তারাও এককালে অনুন্নত দশাই পার হয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলো, যে দশায় আজকের দিনেও ওই পিছিয়ে পড়ে -থাকা মানুষেরা আটকে রয়েছে। খাসিয়াদের সমাজের কথা কিছুটা বলবো। খাসিয়াদের কাছে জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন বলতে চাষের কাজ। কিন্তু‘ অঞ্চলের বেশিরভাগ জায়গাতেই এখনো হাল-বলদের চল হয়নি। অর্থাৎ কিনা, এই জাতির মানুষেরা এখনো মোটের ওপর চাষবাসের প্রথম দিককার অবস্থাতেই আটকে রয়েছে। কৃষিকাজের ওইরকম একটা শুরুর দিকের পর্যায়ে আটকে থেকেছে বলেই ওদের মধ্য থেকে মা-বড়ো বা নারীপ্রধান সমাজের রূপটি আজো লুপ্ত হয়নি, তাই কৃষিকাজের আদিপূর্বে যে সমাজ তাতে মেয়েদের উপর দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি। এ সমাজ তাই মাতৃপ্রধান বা-নারীপ্রধান।
আমাদের আজকালকার সমাজের সঙ্গে খাসিয়াদের সমাজের তফাৎগুলো ভালো করে বুঝবার চেষ্টা করা যাক। আমাদের বেলায় পরিবরের প্রধান বলতে কে? বাবা, বা ওই রকমের কেউÑযিনি কিনা একজন পুরুষমানুষ, পরিবারের সকলেই তাঁর আদেশ মেনে চলেনÑতাঁর আদেশ মেনে চলতে সকলেই বাধ্য। কিন্তু‘ খাসিয়াদের বেলায় উলটো রকম। পরিবারের প্রধান বলতে মাÑমা-র আদেশটাই সকলের কাছে চূড়ান্ত এককথায়, কর্তৃত্বটা পুরুষদের নয়, মেয়েদের। শুধু তাই নয়; সম্পত্তি বলতে যা-কিছু তার উপর পুরুষদের কোনো অধিকারই নেইÑঅধিকার শুধুমাত্র মেয়েদের। আমাদের বেলায় বাপের সম্পত্তি ছেলেরা পায়, খাসিয়াদের বেলায় মায়ের সম্পত্তি মেয়েরা পায়,Ñ অর্থাৎ সম্পত্তির উত্তরাধিকার চলে মায়ের সূত্রেই।
আমাদের বেলায় বাপের পরিচয়েই ছেলের পরিচয়, ছেলেরা বাপের গোষ্ঠীর অন্তর্গত হয়। খাসিয়াদের বেলায় কিন্তু‘ ঠিক এর উলটো ব্যবস্থা; বাবার পরিচয়ে ছেলে-মেয়েদের পরিচয় নয়, বাবার গোত্রের সঙ্গে ছেলে-মেয়েদের গোত্রের কোনো সম্পর্ক নেইÑছেলে-মেয়েরা বাবার গোষ্ঠীর কেউ নয়। তাদের কাছে বাবা অনেকটাই যেন বাইরের মানুষ, বাবার আত্মীয়-স্বজনেরা তাদের কাছে প্রায় অনাত্মীয় মানুষদের মতোই। মাতৃপ্রধান সমাজ ভেঙে পিতৃপ্রধান সমাজ গড়ে উঠবার পথে এরপর যে-রকম উত্তরাধিকার-ব্যবস্থা চালু হলো তার পরিচয় পাওয়া যায় সেকালের রোমান রাজ-রাজড়াদের ইতিহাসে। কী রকম ব্যবস্থা? ব্যাপারটা হলো, শ্বশুরের সম্পত্তি জামাই পাবে। পুরোপুরি মাতৃপ্রধান সমাজে কীরকম? মায়ের সম্পত্তি মেয়ে পাবে। তাই সে ব্যবস্থায় সম্পত্তিতে পুরুষদের কোনো অধিকারই নেই। কিন্তু‘ রোমান রাজ-রাজড়াদের বেলায় দেখা যাচ্ছে, শ্বশুরের সম্পত্তি জামাই পাচ্ছে। অর্থাৎ কিনা সম্পত্তিটা থাকছে পুরুষদের হাতেই। ব্যবস্থাটাকে তাই মাতৃপ্রধান সমাজের ব্যবস্থা বলা চলে না। কেননা, পুরোপুরি পিতৃপ্রধান তো বাপের সম্পত্তি ছেলে পাবে। অথচ রোমানদের বেলায় দেখা যাচ্ছে ‘ক’-রাজার সম্পত্তি ‘ক’-রাজার ছেলে পেলো নাÑতার বদলে ‘ক’-রাজার জামাই পেলো।
আমরা বলছি, এইভাবে ছেলের বদলে জামাইয়ের পক্ষে সম্পত্তি পাবার ব্যবস্থায় মাতৃপ্রধান সমাজের একটা রেশ পাওয়া যায়। তাই ব্যবস্থাটাকে মাতৃপ্রধান সমাজ ছেড়ে পিতৃপ্রধান সমাজের দিকে এগুবার মাঝপথের কোনো ব্যবস্থা বলে বুঝতে হবে। মাতৃপ্রধান সমাজ থেকে পিতৃপ্রধান সমাজÑমেয়েদের হাত থেকে সম্পত্তি আসবে পুরুষদের হাতে। আমরা শুরুতে দেখেছি, অনেক লক্ষ বছর ধরে আধা-জানোয়রের মতোই অসহায় অবস্থায় দিন কাটাবার পর মানুষ চাষাবাস করতে শিখলো, আর এই চাষবাস করতে শেখার দরুণই মানুষ হঠাৎ যেন হুড়হুড় করে এগুতে শুরু করলোÑমাত্র কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই গড়ে তুললো প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্রগুলি। তাই, শুধু রোমানদের কথাই নয়। রোমানদের চেয়েও ঢের আগেই যারা পৃথিবীতে সভ্যতা গড়ে তুলতে শুরু করেছিলো তাদের আস্তানাগুলি খোঁজ করলে আমরা মাতৃপ্রধান সমাজের নানানরকম টুকরো-টাকরা চিহ্ন খুঁজে পাবো।
চীন থেকে শুরু করা যাক। খুব সম্প্রতিকাল পর্যন্ত চীন দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে এমন কয়েকটি জাতির বাস ছিলো যাদের মধ্যে শাসনের ক্ষমতা পুরুষদের হাতে নয়, মেয়েদের হাতে। এহেন একটি জাতির নাম সু-মুÑসংখ্যায় তারা প্রায় পঁয়ত্রিশ লক্ষ মানুষ। তাদের মধ্যে শাসন ব্যাপারে সবচেয়ে চূড়ান্ত ক্ষমতা তাদের রানীর হাতে। আর একটি জাতির নাম নুয়ে-কুন্Ñতাদের বেলাতেও একই ব্যবস্থা: রানীর বংশের মেয়েরাই রানী হবে। তার মানে, এই সব জাতিদের মধ্যে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ওই মা-বড়ো যুগটি বেশ স্পষ্টভাবেই টিকে থেকেছে। প্রাচীন যুগে চীনদেশে পুরোপুরি মাতৃপ্রধান সমাজ ছিলোÑমায়ের বংশ অনুসারেই ছিলো সন্তানদের বংশ-পরিচয়। আর স্বামীদের অবস্থা? ঘর-সংসার থেকে শুরু করে দেশ-শাসন পর্যন্তÑসর্বত্রই মেয়েদের প্রতিপত্তি।
চীন থেকে তিব্বতের দিকে এগুনো যাক। সেকালে তিব্বতের উত্তর অঞ্চলকে চীনেরা কী নাম দিয়েছিলো জানো? নূ-কূয়ো। ওদের ভাষায় এই নামটির মানে হলো “মেয়েদের রাজ্য”। নুই-সূ আর তাং-সু নামে সেকালের দুজন চীনা পরিব্রাজক তিব্বতের এই উত্তর অঞ্চলটির কীরকম বর্ণনা দিচ্ছেন দেখো।
এই নূ-কূয়ো বা “মেয়েদের রাজ্য”-টি কতো বড়ো? তার পূর্ব থেকে পশ্চিম সীমানা পর্যন্ত ন’ দিনের পথ, উত্তর থেকে দক্ষিণ সীমানা পর্যন্ত বিশ দিনের পথ। সে রাজ্যে ৮০টি নগর, ৪০,০০০ পরিবারের বাস, ১০০০০ সৈন্য। এ দেশের চূড়ান্ত আধিপত্য একটি মেয়ের। রানীর শাসন। এই রানীর স্বামী কিন্তু‘ রাজা নয়Ñদেশের শাসন ব্যাপারে তার কোনো হাত নেই। এই দেশে প্রভূত পরিমাণে তামা, সিঁদুর, মৃগনাভি নুন আর তিব্বতী গরু হয়; তাই নিয়ে ওরা ভারতবর্ষে সওদাগরি করতে যায়Ñসওদাগরিতে প্রচুর লাভ।ওদের মধ্যে মায়ের বংশ অনুসারেই সন্তানদের বংশপরিচয়। পুরুষ চাকরেরা ধনী মেয়েদের সেবায় নিযুক্ত থাকেÑএই পুরুষ চাকরেরাই মনিবানীদের চুল আঁচড়ে দেয়, মুখে রঙ মাখিয়ে দেয়। রানীর কয়েক শো অনুচর থাকে। প্রতি পাঁচ দিনে একবার করে রানীর দরবার বসে; সে দরবারে পুরুষদের নানারকম বাইরের কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু‘ সে-সব দায়িত্ব পালন করবার সময় পুরুষেরা নেহাতই মেয়েদের প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করে।
কয়েক শো বছর আগে পর্যন্ত উত্তর-তিব্বতে ওই রকম মেয়েদের রাজত্ব; তিব্বত থেকে আফ্রিকার যাওয়া যাক। অগোন্না, লটুটকা, ইউবেম্বা প্রভৃতি বিশেষ করে পিছিয়ে-পড়া মানুষদের মধ্যে দেখা যায় রাজা বলে কেউ নেই। তাদের মধ্যেও আজো রানীর শাসন। রানীর শাসন ভেঙে রাজার শাসন ফুটে উঠবার মাঝামাঝি অবস্থাটা কীরকম? তারও পরিচয় পাওয়া যায় আফ্রিকার অন্যান্য কোনো কোনো অঞ্চলে। তাদের মধ্যে দেখা যায় রাজার হাতে শাসনক্ষমতা আসছে, কিন্তু‘ তবুও রানীর শাসনের বেশ খনিকটা রেশ থেকে গিয়েছে। যেমন ধরা যায় বগণ্ডাদের কথা। তাদের মধ্যে অবশ্য রাজাই সর্বেসর্বা হর্তকর্তাবিধাতা। কিন্তু‘ তবুও, যেটা খুবই বিস্ময়ের কথা, এই রাজা দুটি মেয়ের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য। একজন হলো রানী। আর একজন হলো রাজার মা। দুজনকেই রানী বলা হয়। দুজনেরই নিজস্ব রাজদরবার আছে আর এমনকি নিজস্ব লোক-লস্কর কর্মচারী প্রভৃতি আছে। রানীমার দৈনিক কর্তব্যের মধ্যে একটি হলো রাজাকে খেতে দেওয়া। ওদের ধারণায়, এই রানীমার কৃত্য রাজার পক্ষে সাংঘাতিক সর্বনাশের ব্যাপারÑতাঁর উপর নির্ভর করতে না পারলে রাজা বাঁচবেন কী করে? তাই, রানীমা যদি হঠাৎ মারা যান তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁরই বংশ থেকে অপর কোনো মেয়েকে রানীমার পদে অভিষেক করে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
মাতৃপ্রাধান্য ভাঙছে, তবুও মাতৃপ্রাধান্যের রেশ টিকে থাকছেÑ এই অবস্থারই আরো একটি আশ্চর্য পরিচয় আমরা ওই বগণ্ডাদের মধ্যেই দেখতে পাই। কীরকম পরিচয়? তাহলে, রানীমার কথা ছেড়ে এবার খোদ রানীটির কথা ভেবে দেখা যাক। রাজদরবারে রাজার সঙ্গে তার সমান সম্মান, দুজনে বসবে একই সিংহাসনের উপর। কিন্তু‘ তার চেয়েও আশ্চর্য ব্যবস্থা হলো এই যে, খোদ রানী আবার রাজার খোদ বোনÑরানীমা রাজার বোনদের মধ্যে থেকে একজনকে বেছে রাজার সঙ্গে বিয়ে দেবে, আর এইভাবেই রাজার এক বোন রানী হয়ে যাবে। প্রাচীন মিশরে রাজাদের বেলায় রাজা-রানীর সম্বন্ধটা ভাই-বোনের সম্বন্ধও। শুধুমাত্র রানীর ছেলেমেয়েরাই ছিলো রাজবংশের মানুষ; রাজার ছেলে যাতে রাজত্ব পায় এই ব্যবস্থা করার জন্যে রাজার পক্ষে প্রয়োজন ছিলো এইরকম রাজবংশেরই কাউকেÑঅতএব রানীমারই কোনো মেয়েকেÑ বিয়ে করা, কিংবা, রানীমার কোনো বোনের মেয়েকে বিয়ে করা। প্রাচীন মিশরের রাজবংশে তাই ওই অদ্ভুত ব্যাপার দেখতে পাওয়া যায়Ñভাইয়ের সঙ্গে বোনের বিয়ে! এই ব্যবস্থাটির মধ্যে মাতৃপ্রধান সমাজেরই ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। মাতৃপ্রধান সমাজ হলে রাজবংশের উত্তরাধিকারী হতো রাজবংশের মেয়েরাই; প্রাচীন মিশরে দেখা যাচ্ছে রাজবংশের মেয়ের স্বামী হিসেবে। এদিক থেকে তাই মিশরের ব্যবস্থায় মাতৃ-প্রধান্যের চিহ্ন রয়েছেÑমেয়েদের সূত্রে রাজত্বের উত্তরাধিকার হচ্ছে। রানীর মেয়ে রানী হবেÑএই পুরোনো ব্যবস্থাটি বদলাবার প্রথম ধাপ হিসেবে ওরা ব্যবস্থা করলো রানীর ছেলে-মেয়ে দুজনেরই রাজত্বে অধিকার থাকবে আর দুজনে যাতে আলাদা হয়ে না যায় তাই জন্যে দুজনের মধ্যে বিয়ে দেওয়া হবে। তখনো ওদের মধ্যে মাতৃপ্রধান সম্পর্কের রেশটা খুব জোরই হয়ে রয়েছে, কিন্তু‘ তারই মধ্যে সম্পত্তিতে পুরুষের অধিকার মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।
প্রাচীন মিশর ছেড়ে এবার প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার দিকে এগুবার চেষ্টা করা যাক। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় যে-সব সভ্যতার কেন্দ্র গড়ে উঠেছিলো সেগুলিকে পরীক্ষা করে কি আমরা মাতৃপ্রাধান্যের ভাঙাচোরা চিহ্ন উদ্ধার করতে পারি? দু-একটা নমুনা দেখা যাক।
প্রাচীন সুমেরিয়ার নগরগুলিতে শাসক বলতে দুরকম লোক: পুরোহিত আর রাজাÑওদের ভাষায় পটেসি আর লুগাল। সুমের ইতিহাসের একেবারে প্রথম যুগে লগালন্ভা। কিন্তু‘ তার চেয়ে তার স্ত্রী বরনম্টররা-র নাম কম বিখ্যাত নয়। কেননা এই স্ত্রীটি তার স্বামীর সঙ্গে মিলে যুক্তভাবে নগর শাসন করতো। স্বামীর যেরকম নিজের দরবার ছিলো, স্ত্রীরও তেমনি নিজের আলাদা দরবার ছিলো, তার নাম নারী-সভা।
উরুকাগ্নিয় বলে আর এক পুরোহিত-শাসকের স্ত্রীর নাম ছিলো শগ্ শগ্Ñতারও প্রভাব-প্রতিপত্তি আর শাসনক্ষমতা খুব কম ছিলো না। এই স্ত্রীটির উপাধি ছিলো ‘দেবী বাউ’। লুগান্ভার প্রধানমন্ত্রীকে বলা হতো নারী-সভার কেরানী। উরুকাগ্নিয়র প্রধানমন্ত্রীকে বলা হতো ‘দেবী বাউ’-এর কেরানী। এর থেকে মনে হয়, এই অবস্থায় পুরোপুরিভাবে পুরুষ-পুরোহিতদের হাতে এসে পড়েনি। আসল ক্ষমতা মেয়েদেরই হাতে এবং এ অবস্থায় স্বামীরা অনেকাংশেরই স্ত্রীদের অনুচরের মতো।
প্রাচীন গ্রীসের বেলায় কীরকম? গ্রীক ইতিহাসেরও পিছনের পর্যায়ে মাতৃপ্রধান সমাজ যে সত্যিই ছিলো, এ কথা অধ্যাপক জর্জ টমসন বলে একজন মস্ত বড় আধুনিক পণ্ডিত খুব দীর্ঘভাবেই প্রমাণ করেছেন।
পৃথিবীর এইসব নানান জায়গা পরীক্ষা করে এবার এসো আমাদের নিজের দেশে ফিরে আসা যাক। ভারতবর্ষে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরোনো সভ্যতার যে চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, তার নাম সিন্ধু সভ্যতা। হরপ্পা আর মোহেনজোদারো বলে দুটি আশ্চর্য নগরের ধ্বংসাবশেষের কিছু কিছু কথা “যুগের পর যুগ” গ্রন্থমালার আগের বইতে বলেছি। এখানে আমরা প্রশ্ন তুলবো, ভারতার্ষের এই যে প্রাচীন সভ্যতার ঘাঁটি, এখানেও কি ওই মা-বড়ো যুগের কোনো পরিচয় খুঁজে পাওয়া গিয়েছে? সিন্দু সভ্যতার ধ্বংসস্তুূপ থেকে অনেক পোড়ামাটির মূর্তি আবিষ্কার হয়েছে। তার মধ্যে অনেকগুলি হলো নারীমূর্তি। ওগুলি কিসের মূর্তি? দেবীমূর্তি! বসুমাতা- দেবীদের মূর্তি থেকেই প্রমাণ যে অন্যান্য প্রাচীন সভ্যতার মতোই সিন্ধু সভ্যতার নিচেও একটা মা-বড়ো যুগের পরিচয় চাপা রয়েছে। স্যার জন মার্সাল বলে একজন প্রত্নত্তবিদ্ এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
ভারতীয় সভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো সাহিত্যের নাম বেদ। অনেকদিন পর্যন্ত পণ্ডিতদের মত ছিলো, যাঁরা এই বেদ রচনা করেছিলেন তাঁরাই বুনো আর অসভ্য ভারতবাসীদের সভ্য করে তুলেছিলেন। কিন্তু‘ সিন্ধু সভ্যতার চিহ্নগুলি আবিষ্কার হবার পর খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা গেলো যে আগেকার ওই ধারণাগুলি নেহাতই ভুল। কেননা, বেদ রচনা হবার অন্তত কয়েক হাজার বছর আগেই এ দেশের মানুষ হরপ্পা আর মোহেনজোদারোর মতো নগর-সভ্যতা গড়ে তুলেছিলো। তাই, যাঁরা বেদ রচনা করেছিলেন ভারতীয় সভ্যতা বলতে সবটুকুই যে তাঁদের অবদান এ কথা মনে করার কারণ নেই।