কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা
মহানবী হযরত মুহাম্মাদ(সা.) পরলোকগমনের ২৫ বছর পর ভয়ংকর এক পরিস্থিতিতে পড়ে মুসলিম বিশ্ব; সে অবস্থাতেই খলিফার দায়িত্ব পান হযরত আলী(রা.)। অনেকেরই ধারণা ছিল প্রথম খলিফাই হয়ত আলী(রা.) হবেন যেহেতু তিনি নবীজীর সরাসরি আত্মীয়, চাচাতো ভাই। কিন্তু যোগ্যতর হিসেবে আবু বকর(রা.), উমার(রা.) ও উসমান(রা.) প্রথম তিন খলিফার দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে আলী(রা.)-যখন দায়িত্ব পেল, তখন কেন হয়েছিল নবীর ভাই আলী(রা.) আর নবীজীর স্ত্রী আইশা(রা.) এর মাঝে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ? কী হয়েছিল মুসলিম ইতিহাসের রক্তাক্ততম গৃহযুদ্ধ ‘সিফফিনের যুদ্ধে’ যেখানে হযরত আলী (রা.) তাঁর বাহিনী নিয়ে মুখোমুখি হন মুয়াবিয়া (রা.)এর বিশাল বাহিনীর? অথচ দুজনেই কম-বেশি ছিলেন নবীর প্রিয়পাত্র!
চলুন তবে ডুবে যাওয়া যাক সেই অস্থির সময়ে, এখন যে পেছনের ঘটনাটার কথা বলব সেটি ইসলামি ইতিহাসে ‘নেকলেসের ঘটনা’ নামে পরিচিত। ঘটনাটি বুখারি শরীফে লিপিবদ্ধ রয়েছে। নবী(সা.) বিভিন্ন অভিযানের সময় একজন স্ত্রীকে নিয়ে যেতেন লটারি করে বাঁছাই করে। মুস্তালিক অভিযানের সময় উঠে স্ত্রী আইশা (রা.) এর নাম। আইশা (রা.)-কে যে উটে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তার পিঠে ছিল একটি হাওদা (পর্দা ঘেরা জায়গা যার ভেতরে তিনি বসতেন)। ফিরে আসার সময় মদিনার কাছাকাছি এক জায়গায় কাফেলা থামার পর প্রাকৃতিক ডাকে আইশা(রা.) কাছের ঝোঁপে গেলেন। যখন তিনি ফিরে এলেন, তখন দেখলেন তাঁর গলায় নবীজীর উপহার দেওয়া ইয়েমেনি নেকলেসটি নেই! তিনি আবার খুঁজতে গেলেন, গিয়ে পেয়ে গেলেন নেকলেসটা। কিন্তু কাফেলার জায়গায় ফিরে আসতেই তিনি দেখলেন কাফেলা নেই! তাঁকে না নিয়েই চলে গেছে! (তিনি খুব হালকা হওয়ায় কেউ বুঝতে পারেনি তিনি যে নেই উটের পিঠে। কেউ খেয়ালও করেনি ।
পেছনে পেছনে সাফওয়ান নামের এক সাহাবী আসছিলেন কাফেলা কিছু ফেলে গেল কিনা দেখার জন্য। তিনি আবিষ্কার করলেন স্বয়ং আইশা (রা.)-কে! তিনি তাঁকে তাঁর উটে উঠতে বলেন এবং বাকি পথ তাঁকে নিয়ে চলেন হেঁটে। কিন্তু গুজব রটিয়ে দেওয়া হলো যে, দীর্ঘ পথ নবীপত্নী আইশা (রা.) এক অনাত্মীয়ের সাথে; তাতে অনেক কিছু হওয়া সম্ভব ! নবী (সা.) এর কানে এ গুজব পৌঁছালে তিনি বিশ্বাস না করলেও কষ্ট পেয়েছিলেন।
এ পর্যায়ে ইবনে হিশাম রচিত নবী(সা.) এর জীবনীগ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, আলী(রা.) তখন নবীজীকে এসব অপবাদ-এর ব্যাপারে নেতিবাচক পরামর্শ দেন। অবশ্য আলী(রা.) আইশা(রা.)-এর প্রতি কিছুটা বিরূপ ধারণা রাখবারও হালকা কারণ ছিল। নবীপত্নী তরুণী আইশা(রা.) নবীর(সা.) প্রয়াত স্ত্রী খাদিজা (রা.) স¤পর্কে ঈর্ষা পোষণ করতেন। এ ব্যাপারটা আলী(রা.) হয়তো ঠিক মতো মেনে নিতে পারেননি। কারণ দুর্ভিক্ষের সময় মুহাম্মাদ(সা.) শিশু আলী(রা.)-কে নিজের পরিবারে নিয়ে মানুষ করেছিলেন, তখন খাদিজা(রা.) তাঁর কাছে মায়ের মতোই ছিলেন। শিয়া মতবাদে এই হালকা বিরূপতাকে সরাসরি ‘শত্রুতা’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়।
উসমান(রা.)যেদিন খলিফা হন সেদিন ছিল ৬৪৪ সালের ৬ নভেম্বর। এ শাসনকাল চলেছিল ৬৫৬ সালের ১৭ জুন পর্যন্ত। মোটামুটি প্রথম ছয় বছর তাঁর শাসনের ব্যাপারে কারো অভিযোগ ছিল না। কিন্তু পরের ছয় বছরে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। মূলত, ইসলামি প্রদেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে আত্মীয়দের বসানোর মাধ্যমে অনেককে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা ছিল মূল কারণ। সাহাবী মুয়াবিয়া এ ব্যাপারটা টের পেয়ে উসমান(রা.)-কে পরামর্শ দিলেন সিরিয়া ভ্রমণ করতে, যেন দুজনের সাক্ষাৎ হয়। (উসমান(রা.)-এর চাচাতো ভাই মুয়াবিয়া সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন) । উসমান(রা.)-এর শাসনামলে মুয়াবিয়া বিশাল এক মুসলিম নৌবাহিনী গড়ে তোলেন এবং সেই বাহিনীতে মুসলিম ছাড়াও মিসরীয় ও সিরীয় খ্রিস্টানরা যোগদান করেন। এই যুগান্তকারী নৌবাহিনী ৬৫৫ সালে দুর্দান্ত রোমান বাইজান্টিন নৌবাহিনীকে ভূমধ্যসাগরে পরাস্ত করে। এতে মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রসারে নতুন এক পালক যুক্ত হয়। উসমান(রা.)মুয়াবিয়ার এ পরামর্শ কানে তুললেন না। তিনি বললেন তিনি নবীর শহর (মদিনা) ত্যাগ করবেন না। উসমান (রা.)-এর নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন মুয়াবিয়া পরামর্শ দিলেন এবার। তিনি তাঁকে পাহারা দেবার জন্য সিরিয়া থেকে শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী দেবেন কিনা। উসমান(রা.) না করলেন, বললেন সিরিয়ান সেনা দেখলে মানুষ ক্ষেপে যেতে পারে। পরে গৃহযুদ্ধ হয়ে যাবে।
মিসরের গভর্নরের সীমাহীন দুর্নীতির জন্য মিসর থেকে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ এসেছিল বিদ্রোহী হয়ে। এমনকি আইশা(রা.) পর্যন্ত রাগে কথা শুনিয়েছিলেন উসমান(রা.)-কে। আর এই উসমান(রা.)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বয়ং আবু বকর (রা.)-এর পুত্র মুহাম্মাদ বিন আবু বকর(রা.)। {মুহাম্মাদ বিন আবু বকর(রা.) কেবল যে আবু বকর(রা.)-এর সন্তান ছিলেন তা-ই নয়, পাশাপাশি তিনি আলী (রা.)-এর সৎপুত্রও ছিলেন। কারণ আলী(রা.) বিয়ে করেছিলেন আবু বকর(রা.)-এর বিধবা স্ত্রী আসমা(রা.)-কে। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মুহাম্মাদ বিন আবু বকর(রা.) ছিলেন নবীপত্নী আইশা (রা.)-এর ভাই। পরবর্তীতে আলী(রা.)-এর বিশ্বস্ত জেনারেল।}
মিসর থেকে প্রায় ১০০০ বিদ্রোহী মদিনায় এসে হাজির হলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিল উসমান(রা.)-কে খুন করে সরকার উৎখাত করা। দেখা গেলো ইরাকের কুফা ও বসরা থেকেও বিদ্রোহী এলো মদিনাতে। আলী(রা.) তাদের বুঝিয়ে সুজিয়ে নিজেদের প্রদেশে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। তারা যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন মদিনা থেকে পাঠানো এক পত্রবাহককে বিদ্রোহীরা আটক করে। পত্রে গভর্নরকে লেখা ছিল, পৌঁছা মাত্রই বিদ্রোহীদের নেতাদেরকে শাস্তি দিতে। পত্রে খলিফার সীল ছিল। তারা এ চিঠি দেখে ক্ষেপে আবার মদিনা ফেরত আসলো। উসমান(রা.) চিঠির ব্যাপারে কিছু জানতেন না বলে জানালেন। কিন্তু এবার আর বিদ্রোহীদের শান্ত করার কোনো উপায় থাকলো না। কিছু কিছু ইতিহাসবিদ ধারণা করেন, চিঠিটি (উসমান(রা.)-এর সেক্রেটারি মারওয়ান লিখে পাঠিয়েছিলেন। ।
ফলে উসমান(রা.) গৃহবন্দী হয়ে পড়লেন। ঘরের চারপাশে বিদ্রোহীরা। যত দিন যেতে লাগলো, তত বিদ্রোহী জড়ো হতে লাগলো বাহিরে। মদিনা থেকে অনেক স্থানীয় মানুষ মক্কায় হজ্ব করতে গিয়েছে আগেই। বিদ্রোহীরা বুঝতে পারলো, হজ্ব শেষ হয়ে গেলেই পুরো সাম্রাজ্য থেকে আসা হাজিরা উসমান(রা.) এর পক্ষে মদিনায় ছুটে আসবে, এর আগেই যা করবার তা করতে হবে। আক্রমণের আশংকা বেড়ে গেলে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর(রা.) এবং আলী(রা.)-এর দুই পুত্র হাসান(রা.) ও হুসাইন(রা.) গেট বন্ধ করে পাহারা দিতে লাগলেন।
৬৫৬ সালের ১৭ জুন। মিসরীয় বিদ্রোহীরা প্রতিবেশীর বাড়ির দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে ভেতরে নেমে পড়ল। গেটের পাহারা দেয়া সাহাবীরা জানলেনও না কী হলো। বিদ্রোহীরা উসমান(রা.)-এর কক্ষে চুপে চুপে ঢুকে পড়ল। তখন উসমান(রা.) কুরআন শরীফ পড়ছিলেন। বিদ্রোহীরা সজোরে তাঁর মাথায় আঘাত করল। উসমান(রা.)-এর স্ত্রী নাইলা উসমান(রা.)-কে রক্ষা করতে গিয়ে আঙুলগুলো কেটে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। টানা তিনদিন উসমান(রা.) এর লাশ পড়েছিল বাসায়। আলী(রা.), হাসান(রা.), হুসাইন(রা.) ও অন্যরা রাতের আঁধারে মদিনার জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে পৌঁছানোর পর দেখা গেলো বিদ্রোহীরা টের পেয়ে সেখানে হাজির। নিরুপায় হয়ে তাঁকে দাফন করা হলো পেছনের ইহুদী কবরস্থানে। [পরবর্তীতে উমাইয়া খলিফারা এই দুই কবরস্থানের প্রাচীর ভেঙে দুই কবরস্থান এক করে ফেলেন, যেন উসমান (রা.) মুসলিম কবরস্থানে শায়িত হতে পারেন।]
উসমান(রা.) শহীদ হবার পর নিহত উসমান(রা.)-এর রক্তমাখা জামা আর স্ত্রী নাইলার কাটা আঙুলগুলো নিয়ে নুমান বিন বশির মদিনা ত্যাগ করেন। তিনি সিরিয়ার গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া(রা.)-এর নিকট উপস্থিত করেন ওগুলো। মুয়াবিয়া তখন সেগুলো সবাইকে দেখাতে মিম্বরে স্থাপন করলেন। সে জামা আর আঙুলগুলো দেখে কান্নাকাটি আর প্রতিশোধের আগুন জেগে ওঠে। পুরো এক বছর ধরে ‘স্ত্রীশয্যায় যাবেন না প্রতিশোধ না নিয়ে’- এরকম শপথ করে সেনারা।
এদিকে খলিফা হবার পর হযরত আলী(রা.)-কে সাহাবীরা এসে অনুরোধ করলেন খুনিদের মৃত্যুদণ্ড দেবার। কিন্তু আলী(রা.) সেটা করতে অস্বীকৃতি জানালেন, বললেন সন্ত্রাসীদের সাঙ্গপাঙ্গ আছে, আছে তাদের সহায়তাকারী। আপাতত তিনি এটা করতে পারবেন না।
বিদ্রোহী খারেজি নেতাদের পরামর্শে আলী(রা.) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কেই সিরিয়ার গভর্নর করার কথা বললেন মুয়াবিয়াকে সরিয়ে। মুয়াবিয়া(রা.)-এর দূত যখন আলি(রা.)-এর দরবারে এসে সিরিয়ার মানুষের প্রতিশোধ পিপাসার কথা জানালেন, তখন বিদ্রোহীরা মুয়াবিয়ার দূতকে খুন করে ফেলতে চাইলো। অনেক কষ্ট করে সেই দূত পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। আলী(রা.) তখন সিরিয়াবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার চিন্তা করলেন, না করলে মুসলিম বিশ্ব দু’ভাগে ভাগ হয়ে থাকবে। তিনি সেজন্য মিসর আর কুফা থেকে সেনা চাইলেন। পুত্র হাসান(রা.) এসে তাঁর কাছে বললেন, “বাবা! এ পরিকল্পনা বাদ দিন। এতে মুসলিমদের মাঝে রক্তপাত হবে। মতভেদ হবে।” আলী(রা.) তাঁর কথা শুনলেন না।
ওদিকে আইশা(রা.), তালহা(রা.), জুবাইর(রা.) প্রমুখ সকলেই আলী (রা.)-কে বোঝাতে রওনা দিয়ে দেন। তবে যুদ্ধ করার কোনো ইচ্ছা তখনো ছিল না, কিন্তু তাদের অবস্থান যে আলী(রা.)-এর বিরুদ্ধে সেটা পরিষ্কার ছিল।
আলী(রা.) ২০ হাজার সেনা নিয়ে বসরা আসলেন. আইশা(রা.) রাজি হলেন আলোচনা করে পরিস্থিতি মেটাতে, তালহা(রা.) ও জুবাইর(রা.)-ও চাননি যুদ্ধ হোক। কিন্তু এতে বিদ্রোহীরা রেগে যায়, কারণ সালিশ হলে কিংবা শান্তিপূর্ণ উপায়ে ঘটনা মিটে গেলে তাদের ভয়াবহ শাস্তি পেতে হবে।
শান্তি প্রস্তাবের রাতে এই খারেজি বিদ্রোহীরা লুকিয়ে আলী(রা.)-এর শিবির থেকে এসে আইশা(রা.) -এর শিবিরের তাঁবুগুলো পুড়িয়ে দেন। সবাই বুঝে নিলো যে, আলী(রা.) বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন। তারাও পাল্টা আক্রমণ চালালেন। আলী(রা.) চেষ্টা করেও তাঁর নিজের মানুষদের থামাতে পারলেন না প্রতিপক্ষের রক্ত ঝরাতে। কিন্তু যুদ্ধ তো শুরু হয়ে গেলো।
তালহা(রা.) ও জুবাইর(রা.) দুজনেই যুদ্ধে মারা গেলে একমাত্র আইশা(রা.) বাকি থাকেন নেতৃত্ব দেবার জন্য। আইশা(রা.) উটের পিঠের ভেতর হাওদা থেকে যুদ্ধ চালাতে থাকেন। তাঁর উটের হাল ধরে ছিলেন অনেক সাহাবী। একে একে সবার হাত কেটে ফেলতে থাকে প্রতিপক্ষ আলীর(রা.)-র সেনারা; প্রায় ৭০ জনের এ অবস্থা হয় আইশা(রা.)-এর উটের হাল ধরতে গিয়ে। এরপর সকল তীরন্দাজ’ উটের উপরের হাওদা লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ে মারতে থাকেন, কারণ হাওদার পতন হলেই যুদ্ধ শেষ হবে। এত তীর সেখানে গিয়ে লাগলো যে মনে হচ্ছিল উটের পিঠে সজারু।
শেষ নাগাদ আলী(রা.)-এর সেনারা উটের কাছে এগুতে লাগলেন, কিন্তু লাশের স্তূপের কারণে পারছিলেন না। উট উপুড় হয়ে পড়ে গেলে আইশা(রা.)-এর ভাই মুহাম্মাদ বিন আবু বকর(রা.) আলী(রা.)-এর পক্ষ থেকে গিয়ে তাঁকে হাওদা থেকে বের করে আনলেন। এই মর্মান্তিক যুদ্ধটা হয়েছিল ৬৫৬ সালের ৭ নভেম্বর। একে বসরা যুদ্ধও বলা হয়। এ
এদিকে সিরিয়াতে সকলে খুবই সন্তুষ্ট ছিল মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনে। আর হত্যাকারীদের জায়গা দেওয়াতে অনেকেই আলী(রা.)-এর শিবির ত্যাগ করে উসমান(রা.) এর রক্তের বদলা নিতে সিরিয়া ভীড় করেছিল আর আনুগত্য স্বীকার করেছিল মুয়াবিয়া(রা.)-র।
তো, এবার ফিরে যাই সিফফিনের যুদ্ধের পটভূমিতে। আলী(রা.) মুয়াবিয়া(রা.)-কে বাইয়াত (আনুগত্য) নেবার আহ্বান জানালেন। কিন্তু মুয়াবিয়া(রা.) দূত মারফত জানালেন, তিনি বাইয়াত নেবেন না। তিনি আত্মীয় উসমান(রা.) এর হত্যার বিচার চান। আলী তখন তাঁর বাহিনীকে উত্তর দিকে নিয়ে গেলেন এবং আলী ও মুয়াবিয়া(রা.)-এর বাহিনী মিলিত হলো সিফফিন নামক জায়গায়। তবে তারা সাথে সাথে যুদ্ধ করলেন না।
মুয়াবিয়া(রা.)-এর বাহিনী সুপেয় পানির উৎসের কাছে ক্যা¤প করায় আলী(রা.) এর বাহিনী পানি পাচ্ছিল না। তারা আক্রমণ করে হটিয়ে দেয় মুয়াবিয়া(রা.)-এর বাহিনীকে এবং পানির উৎসের দখল করে নেয়। পরে উভয় বাহিনী পানি নিয়ে সমঝোতায় আসে যে, সবাই পানি পায়। এরপর মাসের পর মাস ধরে চিঠি চালাচালি চলল দু’পক্ষের মাঝে। অনেক দীর্ঘ সময় ধরে তারা সেই জায়গায় ছিলো। তাদের মাঝে মোট ৮৫ বার কথা চালাচালি হয়েছিল দূত মারফত।
জিলহজ্ব মাস পর্যন্ত যাবার পর শুরু হলো আসল যুদ্ধ, ৬৫৭ সালে। একেকদিন আলী (রা.) একেকজন সেনাপতি নিযুক্ত করতেন। কোনো কোনো দিন দু’বারও যুদ্ধ হতো। এমনও দেখা গিয়েছিল, দু’পক্ষের দু’জন মুখোমুখি হলো, অথচ তারা একই মায়ের পেটের ভাই। মূলত দ্বন্দ্বযুদ্ধের মাধ্যমে মীমাংসা করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। আপোসে কাজ না হওয়ার পর মূল যুদ্ধটা চলেছিল টানা সাতদিন। প্রথম ছয়দিন চলল সমানে সমান। কিন্তু সপ্তম দিন এমন যুদ্ধ হলো যে সেটা মুসলিম ইতিহাসের রক্তক্ষয়ীতম দিন নামে পরিচিত হলো।
ফজরের পর আলী(রা.) স্বয়ং যুদ্ধে নামলেন এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই থাকলেন। তাঁর হাতে মারা গেলো পাঁচশ জনের। মুয়াবিয়া (রা.) আলী(রা.) এর সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে নামতে অস্বীকার করলেন, কারণ তিনি জানতেন আলী (রা.)-এর সাথে যুদ্ধে কেউ কোনোদিন পারবে না। সিরিয়া বাহিনীর প্রচুর রক্তক্ষয় হচ্ছে ও হেরে যাচ্ছে দেখে মুয়াবিয়া(রা.) এর পক্ষের সাহাবী আমর ইবনুল আস(রা.) একটা বুদ্ধি দিলেন। আমর(রা.)-এর বুদ্ধিতে সিরিয়ার বাহিনী তাদের অস্ত্রের সাথে কুরআনের কপি তুলে ধরে কুরআনের দিকে আহবান করল। ইরাকি সেনারা কুরআনের আহ্বান দেখে না করতে পারেনি। ফলে আলী(রা.) ও মুয়াবিয়া(রা.) উভয়ে মেনে নিলেন যে, দু’পক্ষের একজন করে বিচারক নিযুক্ত হবেন, যাদের বিচার মেনে নেওয়া হবে। আলী(রা.) এর পক্ষ থেকে আবু মুসা(রা.)-কে নিযুক্ত করা হলো। আর মুয়াবিয়া (রা.) এর পক্ষে আমর(রা.)।
সাত মাস পর এ দুজন মিলিত হলেন বর্তমান জর্ডানে, সেটা ছিল ৬৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। আমর(রা.)-এর যুক্তিতে আবু মুসা(রা.) রাজি হলেন যে, আলী(রা.) ও মুয়াবিয়া(রা.) দুজনেরই উচিৎ ক্ষমতা ত্যাগ করা এবং পরে শুরার পরামর্শে নতুন খলিফা নির্বাচিত হবেন। কিন্তু যেদিন জনগণের সামনে রায় দেওয়া হবে, সেদিন প্রথমে আবু মুসা(রা.) উঠলেন এবং বললেন, আলী(রা.) খেলাফতের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করছেন এবং মুয়াবিয়া (রা.)-ও খলিফা হবার দাবিদার নয়। এখন দুজনেই যদি না থাকেন তবে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হবে নেতৃত্বে, যেটা এ পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক। তাই তিনি বললেন, আলী(রা.) এখন আর ক্ষমতার দাবিদার নয়,আমি মুয়াবিয়া (রা.)-কে খলিফা ঘোষণা করছি কারণ তিনি উসমান(রা.)-এর হত্যার বিচারপ্রার্থী এবং এ পদের জন্য যোগ্য।
কথিত আছে, আমর (রা.) মুয়াবিয়া (রা.)-কে খেলাফতের মুকুট পরিয়ে দেন। আবু মুসা(রা.) লজ্জায় মক্কায় চলে গেলেন। আলী(রা.) এ বিচার মেনে নিলেন না। ফলে পরের বছরগুলোতে ক্রমান্বয়ে মুয়াবিয়া(রা.) -এর বাহিনী অবস্থান নিতে লাগল ইরাকি শহরগুলোতে।
এদিকে খারেজীরা ইসলামি সাম্রাজ্য জুড়ে তাণ্ডব শুরু করে দেয়। এদের দমন করতে ৬৫৯ সালে নাহরাওয়ানে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে আলী(রা.) খারেজীদের পরাজিত করেন। কিন্তু বেঁচে যাওয়া খারেজীরা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকে। তারা যথাক্রমে আলী(রা.), মুয়াবিয়া (রা.) ও আমর(রা.)-কে হত্যার দায়িত্ব নিল। ঠিক হলো, একই দিনে একই সময়ে (ফজরের ওয়াক্তে) তারা তাদের লক্ষ্য পূরণ করবে। আলী(রা.) থাকতেন কুফাতে। সেখানে পৌঁছাল ইবনে মুলজিম। কুফাতে কিছু খারেজীও বসবাস করত। তাদের সাথে বৈঠক হয়।
১৭ রমজান শুক্রবার। লোকদের জাগাতে আলী (রা.) “নামাজ নামাজ” বলে আহ্বান করতে করতে মসজিদে যেতেন। মসজিদে ঢুকবার সময় ইবনে আবু মুলজিম আলী(রা.)-এর মাথার উপর আঘাত করে। আলী(রা.) চিৎকার করার পর লোকজন তাদের ধরে ফেলে। একজন সহযোগী পালিয়ে যায়, একজনকে হত্যা করা হয়। আলী (রা.)-কে তাঁর ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। তাঁর দুই ছেলে তাঁকে গোসল দেন, হাসান(রা.) জানাজাতে ইমামতি করেন।
কুফার রাজপ্রাসাদে ৬৩ বছর বয়সী আলী (রা.)-কে দাফন করা হয়, কারণ আশঙ্কা ছিল বাইরে দাফন করলে খারেজীরা লাশ তুলে ফেলবে’।
নোট: আলী(রা.) ও ফাতিমা(রা.)-এর পুত্র হাসান (রা.) ও হুসাইন(রা.)-এর বংশধরদের বলা হয় সায়িদ/সৈয়দ (পুরুষ) ও সায়িদা/সৈয়দা (নারী)। তবে বর্তমান যুগে হাসান(রা.) এর বংশধরদের শরিফ আর হুসাইন(রা.)-এর বংশধরদের বলা হয় সৈয়দ। আলী(রা.)-এর অন্য স্ত্রী এর মাধ্যমে বংশধরদের আলভী/শাহ ইত্যাদি বলা হয়।
ওদিকে মুয়াবিয়া(রা.) হযরত আলীকে অস্বীকার করার মত ইমাম হাসানকেও খলিফা বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেন। ইমাম হাসান মুআবিয়ার(রা.) বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে বের হন। কিন্তু মুআবিয়া(রা.) অর্থ-স¤পদ ও পদমর্যাদার প্রলোভন দেখিয়ে ইমাম হাসান(রা.)-এর সৈন্যদের কিনে নেন। এমনকি ইমাম হাসান(রা.)-এর প্রধান সেনাপতি ওবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাসও রাতের অন্ধকারে নিজের দ্বীন বিক্রি করে মুআবিয়ার(রা.) দলে যোগ দেন। ফলে ইমাম হাসান(রা.) মুআবিয়ার সাথে সন্ধি করেন। সন্ধির অন্যতম শর্ত ছিল মুআবিয়ার মৃত্যুর পর খেলাফত ইমাম হাসান (রা.)-এর কাছে আসবে। আর তিনি জীবিত না থাকলে তা ইমাম হুসাইন (রা.)-এর কাছে আসবে।
কিন্তু মুআবিয়া(রা.) মৃত্যুর পূর্বেই সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে তাঁর পুত্র ইয়াযীদকে খলিফা মনোনীত করেন। ফলে মুআবিয়া(রা.)র মৃত্যুর পর ইয়াযীদ খলিফা হয়। নোট: এখানে উল্লেখ্য ইমাম হাসানকে হত্যা করা হয় ইয়াযীদ ক্ষমতায় বসার অনেক আগে অর্থাৎ তার পিতা মুআবিয়া(রা.) ক্ষমতায় থাকাকালে। ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয়, হাসানকে মুআবিয়া(রা.) কৌশলে হত্যা করে।
ইয়াযীদ ক্ষমতায় বসেই মদিনার গর্ভনকে চাপ সৃষ্ঠি করে ইমাম হুসাইন(রা.) কর্তৃক তাকে স্বীকৃতি দেবার জন্য। কিন্তু ইমাম হুসাইন(রা.) ইয়াযীদের বিরোদ্ধে দ্বীনি আন্দোলন শুরু করেন। তিনি পবিত্র মক্কা নগরীতে চলে যান। সেখানে অবস্থানকালে তাঁকে কুফায় গিয়ে নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে কুফা থেকে জনগণ চিঠি প্রেরণ করেন। অন্যদিকে হজ্বের সময় তাঁকে গুপ্তঘাতক দ্বারা হত্যা করা হবে জানতে পেরে তিনি হজ্ব অসমাপ্ত রেখেই কুফার দিকে রওয়ানা হন।
পথিমধ্যে তিনি কুফার মরুপথ অতিক্রম করার সময় সংবাদ পেলেন যে, ইয়াযীদ কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ তাঁর পক্ষের লোকদের হত্যা করে চলেছে । এতে তিনি বিব্রত হলেন, কিন্তু সফরে বিরত হতে পারলেন না। দুর্দশার মুখে বেদুইনরাও ভয়ে হুসাইন(রা.)র দল ত্যাগ করল। অগত্যা তিনি ক্ষুদ্র দলসহ কুফা ডান দিকে রেখে, ফোরাত নদীর পশ্চিম শাখার তীর বেয়ে চললেন। কিন্তু কুফার গভর্নর ওবায়দুল্লাহ হুসাইন(রা.) ও তার দলকে শহরের আশপাশে বিচরণ করতে দেওয়া সঙ্গত মনে করলেন না। তিনি কয়েক হাজার অশ্বারোহীসহ ওমর-বিন-সা’দকে প্রেরণ করলেন।
মহররমের প্রথম দিন অবরুদ্ধ হুসাইন কুফার ২৫ মাইল উত্তরে ফোরাত তীরবর্তী কারবালা প্রান্তরে তাঁবু ফেললেন। এ সময়ে ওবায়দুল্লাহ হুসাইন(রা.)কে বিনাশর্তে আত্মসমর্পণের দাবি জানালেন এবং তাকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার উপায় হিসেবে ওমর-বিন-সা’দকে ফোরাত নদীর তীর অবরোধ করার আদেশ দিলেন।
হুসাইন(রা.) শত্রুতা ও রক্তক্ষয় এড়ানোর জন্য প্রথমে আপস প্রস্তাব দিয়ে বললেন, ‘আমি যে স্থান থেকে এসেছি আমাকে সেখানে যেতে দাও’ তা না হলে আমাকে ইয়াজিদের কাছে দামেশকে নিয়ে গিয়ে তার হস্তে আমার হস্ত স্থাপন করতে দাও, যেন আমরা মুখোমুখি আলোচনা করতে পারি। আর এ প্রস্তাবেও রাজি না হলে আমাকে দূরে কোথাও যুদ্ধের ময়দানে যেতে দাও, যেখানে আমি ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি। কিন্তু তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলো। বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ না করলে ওবায়দুল্লাহ অবিলম্বে হুসাইনকে মৃত অথবা জীবিতাবস্থায় কুফায় নিয়ে যেতে সৈন্যদের আদেশ দেয়। অতঃপর হুসাইনের শিবির অবরুদ্ধ হলো।
৯ মহররম। শত্রু পক্ষ নদীপথ বন্ধ করলে পানির অভাবে শিবিরে হাহাকার উঠল। হুসাইন (রা.) অসহায় শিশু এবং মহিলাদের প্রতি সদয় হতে অনুরোধ জানালেন। কিন্তু শত্রুপক্ষ এ মানবিক আবেদনে এতটুকু বিচলিত হলো না। যুদ্ধ ছাড়া হুসাইন(রা.) কোনো গত্যন্তর দেখলেন না। হুসাইন(রা.) তার পরিবার-পরিজনকে মক্কায় পাঠিয়ে দিতে চাইলেন; কিন্তু কেউ তার সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইলেন না। নারী ও শিশুদের হাহাকার এবং ভীতির মধ্যে একটি বিভীষিকাময় রাত অতিবাহিত হলো। ১০ মহররম। ভোরে দুই অসম সেনাদলের যুদ্ধ শুরু হলো। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর হুসাইন(রা.)-এর ভ্রাতু®পুত্র কাসিম সর্বপ্রথম দুশমনদের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন।
এরপর শত্রুসৈন্যের বর্শা হুসাইন (রা.)-র বুকে বিদ্ধ হলো। রক্তপাতে দুর্বল হয়ে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। শত্রুসৈন্যের তাঁর মস্তক ছেদন করে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইমাম হুসাইনের একমাত্র জীবিত পুত্র ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) ও ইমাম হুসাইনের বোন হযরত যায়নাবসহ সকলকে বন্দি করা হয়। তাঁদের হাতে-পায়ে শিকল পরিয়ে প্রতিটি জনপদ ও বাজারে ঘুরিয়ে প্রথমে কুফায় উবায়দুল্লাহর দরবারে ও পরে দামেশকে ইয়াযীদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুদিন বন্দি অবস্থায় রাখার পর ইমাম হুসাইনের পরিবার-পরিজনকে মদীনায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর উমাইয়া বংশের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ৬৮৭ সালে কুফার যুদ্ধ, ৬৯১ সালে দ্বার-উল-জালিক-এর যুদ্ধ, ৭০০ সালে উত্তর আফ্রিকা অভিযান, ৭০২ সালে দ্বার-উল-জামিরার যুদ্ধ, ৭১১ সালে স্পেন বিজয়, ৭১২ সালে সিন্ধু বিজয়, ৭১৩ সালে মুলতান বিজয়, ৭৩২ সালে ফ্রান্সের টুর বিজয়, ৭৪০ সালে নোবল-এর বিজয়, ৭৪৪ সালে অইন আল জুর-এর যুদ্ধ, ৭৪৬ সালে রূপার ঠুঠার যুদ্ধ, ৭৪৮ সালে রেই-এর যুদ্ধ, ৭৪৯ সালে ইস্পাহান যুদ্ধ, ৭৫০ সালে জাব-এর যুদ্ধ, ৭৭২ সালে উত্তর আফ্রিকার জানবী’র যুদ্ধ, ৭৭৭ সালে স্পেনের সারাগোসার যুদ্ধ সংগঠিত হয়।