কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ
ষোড়শ শতকে কায়রো, বাগদাদ, জেরুজালেম, দামেস্ক ছিল ওসমানিয়া খলিফার অধীনে আরব নগরী। শাসন করতেন ইস্তাম্বুল নিযুক্ত প্রদেশ পাল। মক্কা ও মদিনা নগরী সরাসরি ওসমানিয়া খলিফার অধীনে ছিল। এসময় জলপথের ব্যাপক ব্যবহারে উষ্ট্রবাহী প্রাচীন স্থল বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। এতে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থা গোত্রীয় অর্থনীতিতে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়। তাদের একমাত্র আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়ায় হজ্বব্রত পালনে আগতদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা। হজ্বের সময় শেষ হয়ে গেলে আয়ের পথও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গোত্রগুলোর মধ্যে শুরু হয়ে যায় সংঘাত। খলিফার নিয়ন্ত্রণ শিথিলতার সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নেয় প্রত্যেকটি গোত্র, চালু করে তাদের নিজস্ব আইন-কানুন। এই পটভূমিতে আজকের সৌদি আরবের নেজাদ প্রদেশের মরুদ্যান শহর ইউয়ানায় ১৭০৩ সালে জন্ম হয় মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের। যিনি বিশুদ্ধ ইসলামি মতবাদ প্রতিষ্ঠার প্রবর্তক। তৎকালীন আরবের অর্থনৈতিক অবস্থা, যা বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে প্রায়শই সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাখে, তা ইবনে ওয়াহাবের উগ্রবাদী মতবাদ প্রচারে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
পিতার খেজুর বাগান পরিচর্যা ও গৃহপালিত পশু চরানোর মতো বিরক্তিকর কাজ একপর্যায়ে ছেড়ে দিয়ে তিনি নেমে পড়েন ইসলামি উগ্রবাদী মতবাদ প্রচারের কাজে। তিনি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নতের বিরোধিতা করেন, ওলি-দরবেশদের গোরস্থানে প্রার্থনা করার নিন্দা করেন, কবরে খুঁটি স্থাপনের সমালোচনা করেন এবং সুন্নি মতালম্বী নয়, এমন কী কিছু কিছু গ্রুপকে (ইস্তাম্বুলের সুলতান-খলিফাসহ) সঙ্গে নিয়ে ভিন্ন মতাবলম্বীদেরকে মুনাফেক ঘোষণা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করার জন্য এক চরম গোঁড়া ধর্মীয় সম্প্রদায় সৃষ্টি করলেন। জেহাদের ঘোষণা দিলেন শিয়া মতাবলম্বী ও ওসমানিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। ইসলামি শাস্তির ব্যবস্থা প্রচলনের পক্ষে জোরদার প্রচারণা শুরু করলেন। যেমনÑ বেত্রাঘাত, ব্যাভিচারের জন্য পাথর ছুড়ে হত্যা, চৌর্যবৃত্তিতে লিপ্ত ব্যক্তির হস্ত কর্তন এবং অপরাধীদের জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। ১৭৪০ সালে তার এই প্রচারণা আরব অঞ্চলে প্রকট সমস্যা সৃষ্টি করে। আঞ্চলিক ধর্মীয় নেতারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা তাকে বহিষ্কার করেন।
পরবর্তী চার বছর তিনি পুরো অঞ্চলে ঘুরে বেড়ালেন। গেলেন বসরা, দামেস্কে। দেখতে পান ওসমানিয়া শাসকদের কারণে এসব অঞ্চলের মানুষ ইসলাম আইন-কানুন মেনে চলার ব্যাপারে অতিশয় ঢিলেঢালা ও অসংযমী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু তিনি নিরাশ হলেন না, সবখানেই তার মতানুসারী কিছু কিছু মোল্লা পেয়ে গেলেন। তারাও তার মতো বিশুদ্ধ ইসলাম চর্চা ও প্রতিষ্ঠা চান। এই ভ্রমণ তার নিজের ও তার অনুসারীদের জন্য সাহসের উৎস হয়ে ওঠে। ইসলামের বিশুদ্ধতাকে পুনরুদ্ধারে তারা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হন।
১৭৪০ সালে নেজাদের মরুদ্যান শহর দিরেইয়াতে ফিরে আসেন ইবনে ওয়াহাব। এখানকার মাটি উর্বর কিন্তু বাসিন্দারা দরিদ্র। ফল ও খেজুর বাগানের জন্য শহরটির নাম এ অঞ্চলে প্রায় সবারই জানা। আরেকটি কারণে এ শহরটি বিশেষ পরিচিতি লাভ করে, সেটা এর শাসকের জন্য। এখানকার আমির কুখ্যাত দস্যু মুহাম্মদ ইবনে সউদ। তিনি সাদরে এই গোঁড়া ধর্মপ্রচারককে গ্রহণ করলেন। কারণটি যত না ধর্মীয় তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাশালী আমিররা তাদের শাসনাধীন অঞ্চল থেকে তাকে বহিষ্কার করেছে, এটাই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ইবনে সউদের কাছে। ইবনে ওয়াহাব তার ধর্মতত্ত্বের সারকথা তুলে ধরলেন আমিরের কাছে। বোঝালেন, ইস্তাম্বুলের খলিফাকে পাশ কাটিয়ে প্রতিবেশী মুসলিম বসতি ও শহরগুলোতে হামলা চালিয়ে ধর্মীয় অনুশাসন জারির মাধ্যমে প্রতিবেশী গোত্রগুলোর ওপর আমিরের শাসন চালু করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে।
ইবনে সউদ এই ধর্মগুরুর সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদিত করলেন তার এক কন্যাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে। সালটা ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দ। এই বন্ধন সমগ্র আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক মানচিত্রের দৃশ্য পাল্টে দিল। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে ধর্মান্ধতা মিলনে আজকের সৌদি আরবে এক নতুন রাজতন্ত্র আসার পদধ্বনি শোনা গেল। ইতিমধ্যে ইবনে সউদ একজন ধনী আমির বনে গেছেন। তার নিজস্ব সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়ে যায় ২০০০ তাগড়া আরবি ঘোড়া, অজস্র উট ও ভেড়া। পুত্রের বিয়েতে তিনি যে ভোজ দেন তাতে ৪০০ উট ও ৮০০ ভেড়া জবেহ করা হয়। এই ধনী আমির ১৭৯২ সালে নিজস্ব ওয়াহাবি বাহিনী নিয়ে প্রতিবেশী রিয়াদ, খারাজ ও কাশিমের ওপর হামলা চালিয়ে সেখানকার আমিরদের দমন করে নিজেদের আধিপত্য কায়েম করেন। এসব অভিযানের কোনো কোনোটিতে অংশ নেন ইবনে সউদের পুত্র আবদুল আযীয সউদ, যিনি আজকের সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা।
ওয়াহাবি বাহিনী ১৮০১ সালে শিয়াদের পবিত্র শহর কারবালা আক্রমণ করে, এখানকার পাঁচ হাজার বাসিন্দাকে হত্যা করে, বাড়িঘর ও তীর্থস্থান লুট করে এবং বিজয়ী বেশে স্বদেশে ফিরে আসে। কারবালায় যে হত্যাকাণ্ড ও লুটপাট চালানো হয়, তার পেছনের কথা হচ্ছেÑ ইবনে ওয়াহাবের মতে শিয়ারা মুসলমান নয়, মুনাফেক।
১৮০২ সালে ওয়াহাবি বাহিনী তায়েফ দখল করে এবং সেখানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালায়। ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে ওহাবিরা আবারো মক্কা দখল করে। ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে মদিনা শহরটিকেও দখল করে নেয়। ওসমানী সাম্রাজ্য সে সময় হেজাজ, ইয়েমেন, মিশর, ফিলিস্তিন, সিরিয়া এবং ইরাকের মতো মুসলিম ভূখণ্ডজুড়ে বিস্তৃত ছিলো। ওসমানী বাদশা তাই মিশরের গভর্নরকে আদেশ দিলেন ওহাবিদের দমন করার জন্যে। মিশরের গভর্নর মুহাম্মাদ আলি পাশা ওসমানী সরকারের পক্ষ থেকে যুদ্ধ করে ওহাবিদেরকে পরাজিত করে মক্কা, মদিনা এবং তায়েফকে মুক্ত করতে সমর্থ হয়। ইব্রাহিম পাশা নজদের দিরইয়া শহরটিকে অবরুদ্ধ করে। দিরইয়া ছিলো ওহাবিদের তৎকালীন মূল কেন্দ্র। আব্দুল ইবনে সাউদকে গ্রেফতার করে এবং ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে। ওসমানী সম্রাট নজদ এবং হেজাজ ভূখণ্ডের শাসনের ভার মিশরের গভর্নর মুহাম্মাদ আলী পাশার ওপর অর্পণ করেন। এভাবেই ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে ওহাবি মতবাদের বিলুপ্তি ঘটে।
এ ঘটনার ৮৪ বছর পর ১৯০২ সালে ইবনে সউদের পুত্র আবদুল আযীয ইবনে সউদ মাত্র ২২ বছর বয়সে তাদের আল সউদ গোত্রীয় রাজধানী রিয়াদ দখল করেন প্রতিদ্বন্দ্বী আল রশীদ গোত্রকে পরাজিত করেন। আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদ পনেরো বছর বয়সে বিয়ে করার পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ২২টা বিয়ে করেন । তার ছেলে-মেয়ে কত জন তিনি তাও জানতেন না। কোনো হিসাবে তার ৩৭টা ছেলে আর কোনো হিসাবে ৪৫টা ছেলে তিনি জন্ম দেন এসব মহিলাদের মাধ্যমে। তার বয়স যখন ১৮ তখন তার প্রথম সন্তান তুর্কি জন্মগ্রহণ করেন।
ওসমানিয় খলিফার আধিপত্য অবসানের লক্ষ্যে ব্রিটিশ যাবতীয় সামরিক সাহায্য দেয় আবদুল আযীয ইবনে সউদকে। ১৯১৩ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে আল হাসা, আল কাতিফসহ নেজদের সবটাই তার দখলে এসে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর ব্রিটিশ সহায়তায় শরীফ হোসেনকে সরিয়ে (মহানবীর বংশধর হাশেমী বংশের শাসনের অবসান ঘটে চিরতরে) আবদুল আযীযের বাহিনী দখল করে নেয় মক্কা ও মদিনা। তারি পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে ওহাবি আকিদার ভিত্তিতের সৌদি বাদশাহীর ভিত রচিত হয়। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল আযিযের মৃত্যুর পর তার ওসিয়্যত অনুযায়ী তার সন্তানদের হাতে থাকবে হুকুমাতের দায়িত্ব। আব্দুল আযিযের রেখে যাওয়া ৩৯ জন পুত্রসন্তান তাই ওসিয়্যত অনুসারে বয়সানুক্রমিক ধারায় সৌদি আরবের হুকুমাতের মসনদে আসীন হয়েছে।
এই একই সময় বালুকাময় ভূমির তলদেশে তেলের বিশাল সাগর প্রাপ্তির সম্ভাবনা দিনে দিনে প্রবল হয়ে ওঠে। এতে মরুচারী আরবদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা যুক্তরাষ্ট্রকে সজাগ করে তোলে। এই অমূল্য সম্পদের ওপর ব্রিটিশের একক মালিকানা কীভাবে মেনে নেয় যুক্তরাষ্ট্র? ১৯৩৩ সালে ব্রিটিশ তেল কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ৫০ হাজার পাউন্ডের সমপরিমাণের সোনা দেয় বাদশাহকে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে মার্কিনিরা। স্ট্যান্ডার্ড অয়েল এককভাবে সুবিধা লুটবে, তা কী করে হয়? মার্কিনি কোম্পানিগুলোকে তার সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে? সে সুযোগ তাকে দেয়া যাবে না। অতএব, প্রতিযোগিতাবিহীন বাজার করার জন্য স্ট্যান্ডার্ড অয়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের এসসো, টেকসাকো ও মবিলের সাথে একীভূত করা হলো। গঠিত হলো অ্যারাবিয়ান-আমেরিকান অয়েল কোম্পানি (আরামকো) এবং তেল উত্তোলন শুরু হলো ১৯৩৮ সালে। পরে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে এই বন্ধুতার বন্ধন আরো শক্ত করা হয় দাহরানে মার্কিন বিমান ঘাঁটি করে। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার দেয়া হলো সৌদি আরবকে উন্নয়নের জন্য। ব্রিটেন বা ফ্রান্সের দাঁড়াবার স্থান রাখলো না যুক্তরাষ্ট্র।
উগ্রপন্থার একটি ভয়াবহ রূপ তাকফীর
‘সালাফি’ ছাড়াও ইসলামী উগ্রপন্থার আর একটি ভয়াবহ রূপ হচ্ছে তাকফীর। নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যায় যে কোনো মুসলমানকে কাফির সাব্যস্ত করে তাকে ধর্মত্যাগী ঘোষণা ও হত্যা করা তাদের মিশন। এই তাকফিরী গোষ্ঠীর দর্শনে প্ররোচিত হয়ে লিবিয়া, সিরিয়া, মিসর, ইরাকসহ নানা জায়গায় মুসলমানরা আইএস নাম দিয়ে সরল মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করছে। আমাদের দেশেও জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস হাওয়া পাচ্ছে উগ্রপন্থা ও চিন্তার সন্ত্রাস থেকে।