কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞানচর্চা
দি গ্রিক উপজাতিটি মাইসেনিয়ান নামে পরিচিত। এরা খ্রিস্ট-পূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের শেষভাগে এবং দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথমার্ধে গ্রিসে মূল ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন করে। মাইসেনিয়ান উপজাতি যখন ওই অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করেছিল, তখন এখানে একাধিক অ-গ্রিকভাষী ও দেশীয় আদি-গ্রিক উপজাতিগুলো বাস করত। এরা খ্রিস্ট-পূর্ব সপ্তম সহস্রাব্দ থেকে ওই অঞ্চলে কৃষিকাজ করে আসছিল।
মাইসেনিয়ানরা ছিল যোদ্ধা, তাঁরা কবরে মৃতদেহের সঙ্গে যুদ্ধের সরঞ্জাম সমাহিত করত। ১১০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে মাইসেনিয়ান সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। মাইসেনিয়ান সভ্যতার পতনের পর গ্রিক অনেকটা সাময়িক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করে। এই অন্ধকার যুগকে হোমেরিক যুগও (মহাকবি হোমারের নামে নামকরণ করা হয়েছে) বলা হয়। এই সময় ট্রয় থেকে গাজা শহর পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এই ধ্বংসের পরে ছোট-খাট বসতিতে খরা দেখা দেয় এবং জনসংখ্যা কমতে শুরু করে। এ অন্ধকার যুগ টিকে ছিল ৮০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে গ্রিকে নগর রাষ্ট্র উদ্ভবের আগ পর্যন্ত।
অন্ধকার যুগের সঙ্গে সঙ্গে মাইসেনিয়ান যুগের জ্ঞান এবং বর্ণমালাও হারিয়ে ফেলেছিল গ্রিসরা। কিন্তু ৮০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের দিকে নবজাগরিত গ্রিসরা ফোনেসিয়ান বর্ণমালা সংস্কার করে গ্রিক বর্ণমালার আবির্ভাব ঘটায়। তখন গ্রিক ছিল ছোট ছোট নগর রাষ্ট্রে বিভক্ত। এই নগর রাষ্ট্রকে বলা হতো পলিস, পলিটিকস শব্দটার জন্ম এই পলিস থেকেই যার অর্থ পলিসের চর্চা। এই নগর হিসেবে প্রত্যেকে ছিল সার্বভৌম। তবে যখন বাইরের কারো সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রয়োজন হতো, তখন রাষ্ট্রগুলো যুথবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ করত।
প্রাচীন গ্রিসের সূচনা ধরা হয় ৭৭৬ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে অলিম্পিক গেমস-এর আয়োজনের মধ্য দিয়ে। প্রাচীন গ্রিসের পরিসমাপ্তি ধরা হয় ৩২৩ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে মহামতি আলেকজান্ডারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। এই প্রাচীন গ্রিসকেই আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার ভিত্তিভূমি বলা হয়। সেই যুগে গ্রিস তাঁর ভাণ্ডারে প্রচুর জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, পুরাণে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। খ্রিস্ট-পূর্ব ১৪৬-তে করিন্থের যুদ্ধের পর রোমান শাসনের অধীনে আসে গ্রিস। তখন গ্রিক সংস্কৃতি প্রচণ্ড রকম প্রভাব ফেলে রোমান সভ্যতার উপর, যা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। যার ফলে আধুনিক পৃথিবীর ভাষা, রাজনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা, দর্শন, শিল্পকলা এবং স্থাপত্যের উপর প্রাচীন গ্রিকের প্রভাব বেড়ে যায়।
গ্রিকদের সম্পর্কে কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসবে থেলিসের নাম, যাকে বলা হয় বিজ্ঞানের জনক। অনেকে আবার তাকে গণিত ও জ্যামিতির জনকও বলেন। মোট কথা তিনিই প্রথম পৌরাণিক গল্পের স্রোতে গা ভাসিয়ে না দিয়ে, বিশুদ্ধ চিন্তা ও গাণিতিক হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে স্বর্গের কাহিনী বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। যেমন- তারা (নক্ষত্র) পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি সমুদ্রে জাহাজের দূরত্ব নির্ণয় করার পদ্ধতি বের করেছিলেন। ওদিকে গণিতকে প্রথমবারের মতো একটা বিপ্লবে রূপ দিতে পেরেছিলেন পিথাগোরাস। তবে বিপ্লব বোধহয় একটু বেশিই করে ফেলেছিলেন তিনি। তার গণিত হয়ে গিয়েছিল একটা অন্ধ ধর্ম, আর তিনি হয়ে পড়েছিলেন একজন ধর্মীয় সাধু।
পিথাগোরাসের এক শিষ্য ছিল ফিলোলাউস। এই ফিলোলাউস-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে বিদায় করেন। কিন্তু তিনি ভেবে বসেছিলেন মহাবিশ্বের কেন্দ্রে সূর্য নয় বরং একটা কিছু আছে, যাকে কেন্দ্র করে পৃথিবী, সূর্য এবং সব জ্যোতিষ্ক আবর্তন করছে। তিনি মনে করতেন সূর্যের কোনো আলো নেই। দেবতা অলিম্পাস থেকেই সূর্য আলো পায়। পিথাগোরাসের মৃত্যুর ৪২৪ অব্দ পর প্লেটোর জন্ম হয়, কিন্তু চিন্তা-চেতনায় তিনি পিথাগোরাসের খুব কাছাকাছি ছিলেন। প্লেটোর ছাত্র ছিলেন এরিস্টটল। এরিস্টটল কিন্তু গুরুর সব কথার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। তবে এরিস্টটলই প্রথম পর্যবেক্ষণ করেন এবং বুঝতে পারেন পৃথিবী একটা গোলক। তিনি সম্ভবত খেয়াল করেছিলেন জাহাজ যখন বন্দর ছেড়ে যেতে থাকে, তখন তার পালের আগা সবার পরে অদৃশ্য হয়। এই এরিস্টটলই ছাত্র ছিলেন আলেকজান্ডারের। ৩৩২ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার মিসর দখল করেন।
আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তার সাম্রাজ্য তিন সৈন্যাধ্যক্ষের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। সাম্রাজ্যের আফ্রিকান অংশ মিশর,Ñতার অধিকর্তা হন সেনাধ্যক্ষ টলেমি। এই টলেমি বংশের রাজারা, যারা ইতিহাস ফারাও (রাজা) নামে অভিহিত, তাদের অধীনেই থাকে জেরুজালেম। রোমানরা জেরুজালেম দখল করে খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ সালে। ইহুদিরা রোমান শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে। বছরব্যাপি যুদ্ধে রোমানরা ইহুদি প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেয়। ৭০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট ডেসপাসিয়ানের সৈন্যরা জেরুজালেম নগর ও এর মন্দির ধ্বংস করে। প্রাকারের প্রায় সবটাই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।
মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ দাঁড়িয়ে থাকে। নগর প্রাকারের এই ভগ্নাংশ ডধরষষরহম ডধষষ বা বিলাপ প্রাচীর নামে অভিহিত। এই প্রাচীর এখনো বিদ্যমান। গোঁড়া ইহুদিরা একটি বিশেষ দিনে এই প্রাচীরের সামনে এসে প্রার্থনা করে।
প্রথমদিকে রোমে বসবাসরত খ্রিস্টানরা তাদের ধর্মীয় সভা করতো অত্যন্ত গোপনে। রোম নগরী নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় পাথর কেটে আনা হয় শহরতলী এলাকার শিলা পাহাড় থেকে। পাথর কেটে আনায় শিলা পাহাড় গাত্রে যে বিরাট বিরাট গর্ত সৃষ্টি হয় সেগুলো ইহুদিদের মতো খ্রিস্টানরাও কবরস্থান বানায়। সম্রাট ডমিটিয়ান খ্রিস্টান নিধন শুরু করলে প্রাণে বেঁচে যাওয়া খ্রিস্টানরা এইসব কবরস্থানে এসে আত্মগোপন করে। পরে সুযোগমতো গ্রামাঞ্চলে পালিয়ে যায়।
খ্রিস্টমতবাদ দরিদ্র রোমান বিশেষ করে দাসদের মধ্যে ব্যাপক আবেদন সৃষ্টি করে এবং দলে দলে তারা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নিতে থাকে। এই ব্যাপক সাড়ায় সম্রাট ডায়োক্লিটিয়ান (২৮৪-৩০৫ খ্রিস্টাব্দে) শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর প্রসার রোধে তিনি যে হত্যাকাণ্ড চালান, খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ। কিন্তু‘ এই নিধন খ্রিস্টমতবাদকে নির্জীব করতে পারে না। ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কনস্টানটাইন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন।
খ্রিস্টধর্মে রাজধর্মে পরিণত হওয়ায় যাজকরা হয়ে ওঠে পরাক্রান্ত। পরধর্ম বা মতবাদের প্রতি চরম অসিহিষ্ণুতা যেনো খ্রিস্টধর্মের একটি অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়া ইহুদিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। চালায় তাদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন, নিপীড়ন। চালায় হত্যাযজ্ঞ।
এ প্রক্রিয়া থাকে আরবীয় মুসলিমদের আগমন পর্যন্ত। মুসলমানদের আগমন জেরুজালেমের ইহুদিদের জীবনে আনে স্বস্তি। প্রাণে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা মেলে। ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম বাহিনী জেরুজালেম দখল করে। এ সময় মুসলিম জাহানের খলিফা খলিফা উমর সাম্রাজ্যের সীমানা আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু‘ তার পরবর্তী খলিফারা বিশেষ করে উমাইয়া ও আব্বাসীয়রা আরব সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটালেন। উমাইয়াদের রাজধানী ছিলো সিরিয়ার দামেশক। আব্বাসীয় রাজধানী সরিয়ে আনেন বাগদাদে। আব্বাসীয়দের শেষদিককার খলিফাদের এই বিশাল সাম্রাজ্য-সিরিয়া, মিশর, ইরাক, পারস্য, স্পেন, তুরস্ক ও খোরাসানসহ মধ্য এশিয়ার বিশাল অঞ্চল শাসনের যোগ্যতা ছিলো না। ফলে দশম শতকে আরো দুটো খেলাফতের সৃষ্টি হয়-একটি স্পেনের কর্ডোভা এবং অপরটি মিশরের কায়রোয়।
মিশরের ফাতেমী শাসকরা বাগদাদের খলিফার প্রতি নামকাওয়াস্তে আনুগত্য দেখালেও কার্যত স্বাধীন ছিলো। ফাতেমী শাসকরা নিজেদের হযরত মুহাম্মদের কন্যা বিবি ফাতিমার বংশধর বলে দাবি করতো। ফাতেমী শাসকদের সময় শান্তি, সম্প্রীতি ও সোহার্দ্যমূলক পরিবেশ ছিলো বিরাজমান। খ্রিস্টানদের প্রতি সেলজুক সুলতানের বিদ্বেষমূলক আচরণ ডেকে আনে ক্রুসেড। এইরকম একটি সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো ইউরোপের বিভিন্ন দেশের খ্রিস্টনরপতি ও ধর্মাচার্যরা। তারা ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে ধর্মান্ধতার রক্তবীজ ছড়িয়ে। মিশরের সেলজুক শাসকের প্রতিনিধিরা জেরুজালেমের খ্রিস্টধর্মাচার্যকে নগরীর রাজপথে চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে জেলে দেয় এবং মোটা অংকের মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়। এই ঘটনায় জেরুজালেমে তীর্থ করতে আসা খ্রিস্টধর্মীরা নানা রঙ চড়ায় এবং তা ছড়িয়ে দেয় সারা ইউরোপে। তীর্থে আসা পূণ্যার্থীদের মধ্যে ছিলেন ফ্রান্সের অ্যামেইনসের সন্তু পিটার। খ্রিস্টধর্মীদের মাঝে তার উন্মাদনা সৃষ্টিকারী জ্বালাময়ী বক্তৃতা প্রথম ক্রুসেডের সুত্রপাত করে।
১০৯৬ সাল থেকে জেরুজালেম দখলের যুদ্ধে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ সংঘটিত হয় আটটি। খ্রিস্টান ধর্মান্ধদের এই ক্রুসেড নামক অপরাধের জন্য নয় শত বছর পর ভ্যাটিকানের পোপ মুসলমান ও ইহুদিদের কাছে ক্ষমা চান। ক্রুসেডের মূল শক্তি ছিল ফ্রাঙ্করা (জার্মান জাতির একটি অংশ; এরাই গল বা আজকের ফ্রান্স দখল করে)।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত তুরস্কের ওসমানিয়া সাম্রাজ্য ভেঙে টুকরো টুকরো করে যখন নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা নেয় ব্রিটেন ও ফ্রান্স, সেই সময় তাদের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা মৌলবাদী বিষাক্ত সাপটি ফণা তোলে। ভাগাভাগিতে ফ্রান্স পায় সিরিয়া। সিরিয়ার শক্তি খর্ব করার জন্য সাম্রাজ্যবাদীরা এর একটি অংশ কেটে সৃষ্টি করে লেবানন। ফরাসি শব্দ লেভান্ত, যার অর্থ পূর্ব, এই শব্দ থেকে এসেছে লেবানন। তিউনিসিয়া, মরক্কোয় ফ্রান্সের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এ দুটি দেশ ফ্রান্সের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয়। আলজিরিয়ায় সরাসরি ফ্রান্সের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। লিবিয়া ব্রিটেনের আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এরপর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার ব্যালফোরের ইহুদি রাষ্ট্র সৃষ্টির ঘোষণায় ভাগাভাগি হয়ে যায় আরব জাহান। ভাগাভাগিতে ব্রিটিশের তাঁবেদারিতে আসে সারা আরব উপদ্বীপ, ইরাক, মিশর ও প্যালেস্টাইন। ব্রিটিশ, ফ্রান্স ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে জেরুজালেমের মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইহুদিরা। এই ইহুদিরাই এতোবছর মুসলমানদের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছে ক্রুসেডার খ্রিস্টধর্মীদের বিরুদ্ধে। এইভাবে যে ভূখণ্ডের জনসংখ্যা তখন ত্রিশ লাখ খাঁটি আরব; সেখানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে ইহুদি বসতি।
ইহুদি বিজ্ঞানী কাইম ভাইজমান ইহুদি নেতৃত্বকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন: প্যালেস্টাইন রোডেশিয়া নয় এবং লক্ষ লক্ষ আরব সেখানে বাস করেন, সেটা তাদের নিজস্ব ভূমি... সেখানে বলপ্রয়োগ ছাড়া ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আর বল প্রয়োগ করলেও শতশত বছরেও সংঘাত কমবে না। ইহুদি নেতারা বলপ্রয়োগের জন্য পেছনে শক্তি পেল ব্রিটেন, ফ্রান্স ও পরবর্তীতে আমেরিকাকে।
আফলাক (১৯১০-১৯৮৯) ছিলেন খ্রিস্টান। লেখাপড়া করেছেন প্যারিসের সোরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে কমিউনিস্ট চেতনার দীপ্তি নিয়ে এবং স্থানীয় কমিউনিস্টদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িত করেন। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাথ পার্টি। শুরুটা হয় সিরিয়ায়। তারপর ছড়িয়ে যায় লেবাননে। পরে ইরাকে। এই অঞ্চলে খ্রিস্টান তথা অমুসলিম জনসংখ্যা রীতিমতো বেশি। তথাপি আফলাকের মতবাদ নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। সিরিয়া, ইরাক বা লেবাননের মুসলিম ও খ্রিস্টান জনগণের জীবনযাপন প্রণালীতে তেমন একটা প্রভেদ নেই কেবলমাত্র ধর্মবিশ্বাস ছাড়া। তাই আরব জাতীয়তাবাদীদের বা মিশেল আফলাকের মতবাদ সাংঘর্ষিক ছিলো না। এই যে আরব জাতীয়তাবাদের গলা টিপে ধরার ব্যবস্থা করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ভবিষ্যতের আরব জাতীয়তাবাদীরা যাতে শির তুলতে না পারে।