কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
বৈশিক কলা
আমরা সবাই জানি প্রাগৈতিহাসিক কালে মানুষ খাদ্য উৎপাদন না করে খাদ্য সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। এই সময় মেয়েরা খাদ্য (ফলমূল) সংগ্রহ করত এবং পুরুষরা শিকার করত। এই শিকারের কাজে অনেক সময় পুরুষকে অনেক দূরে যেতে হতো যাতে তাদের দুই-চার বা সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগত ফিরে আসতে। এই সময় পুরুষ হয়তো শিকার করতে করতে অন্য একটি গোত্রের কাছে চলে যেত। এই সময় পুরুষের যদি কোনো নারী সঙ্গ দরকার হতো তখন ঐ গোত্রের নারীর সঙ্গে সে যৌনতা করতে পারত। তবে এই যৌনতার বিনিময়ে তাকে শিকারের কিছু অংশ দিতে হতো।
নৃবিজ্ঞানীদের মতে এখন থেকেই পতিতা বৃত্তির শুরু। নৃবিজ্ঞানীই মনে করেন প্রাগৈতিহাসিককালে বিবাহ প্রথা ছিল না। এই সময় মানুষ যৌন স্বাধীনতা ভোগ করত। প্রাচীন ব্যাবিলন, ভারতবর্ষ, গ্রিস, রোমসহ সকল প্রাচীন সভ্যতায়ই এই বৃত্তি নানাভাবে প্রচলিত ছিল। প্রাচীন ব্যাবিলনে পতিতাবৃত্তিকে পুণ্যের কাজ মনে করা হতো। আর এই কারণে প্রত্যেক বাড়ি থেকেই প্রত্যেক নারীকে জীবনে অন্তত একবার টাকার বিনিময়ে যৌনতা করতে হতো। ঐতিহাসিক হেরোডেটাস তার বর্ণনায় লিখেছেনÑ “মাইলিত্তা (ব্যাবিলনীয়দের রতিদেবী (গুষরঃঃধ) দেবীর মন্দিরে প্রত্যেক নারীকেই বছরে অন্তত একবার যেতে হতো। তারা মন্দিরে লাইন ধরে বসে থাকত। এই মন্দিরে যে সকল পুরুষ আসত তারা নিজেদের পছন্দ মতো নারীকে রৌপ্যমুদ্রা নিক্ষেপ করত এবং বলত তোমার উপর মাইলিত্তার আশীর্বাদ বর্ষিত হয়েছে। এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে উক্ত নারী মুদ্রা নিক্ষেপকারী পুরুষের সঙ্গে কোনো নির্জন স্থানে গিয়ে যৌনতা করত।” এই বিষয়টিকে ব্যাবিলনীয়রা ধর্মানুষ্ঠান মনে করত বলে কত টাকা দেয়া হলো সেটা বিচার করা হতো না। এখানে বিষয় হলো সুন্দর নারীরা খুব সহজেই নিজের খদ্দের পেয়ে যেত কিন্তু কুৎসিত নারীরা সহজে পেত না। তাদের অনেক সময় দুই-তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। আর যতদিন পুরুষের সঙ্গে মিলিত হতে না পারত ততদিন ঘরে ফেরার নিয়ম ছিল না। হাম্বুবারীর আইনেই পতিতাদের কথা উল্লেখ আছে, তাদের অধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে এই আইনে।
গ্রিক দেবী ভেনাস ও আফ্রোদিতিকে পতিতাদের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই দুই জনের মূর্তি প্রকাশ্যে পূজা করা হতো। আর এই পূজার ব্যয়ভার বহন করা হতো মন্দিরের পতিতাদের আয়ের টাকা থেকে। প্রাতি মাসের চতুর্থ দিনে এই পূজা করা হতো। কোরিন্থ (ঈড়ৎরহঃয) মন্দির হাজারের উপর পতিতা থাকত। কারণ বাবা-মা এই সকল নারীদের মন্দিরের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছেন এবং পুণ্য লাভের আশায়ই এই পতিতাবৃত্তি করত।
গ্রিক দার্শনিক সলোন (ঝড়ষড়হ) আইন প্রণয়ন করেন যে, পতিতারা রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এদের আয়ের টাকা দিয়ে আফ্রোদিতির মন্দির নির্মাণ ও সংস্কার করা হবে। সলোনের সময় গ্রিসের নারীরা স্বেচ্ছায় মন্দিরে আসত না, বিজিত অঞ্চলের সকল নারীকেই জোর করে মন্দিরে রাখা হতো পতিতাবৃত্তির জন্য। খদ্দেরকে আকৃষ্ট করার জন্য তারা রাস্তার পাশে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। হেতায়ারা (ঐবঃধরৎধ) নামে এক শ্রেণির উঁচু দরের পতিতা ছিল গ্রিসে। এরা ছিল গ্রিসের কবি, দার্শনিক, সেনাপতি, রাজপুরুষের ভোগের সামগ্রী। যেহেতু এরা প্রভাবশালী মানুষের মনোরঞ্জন করত তাই তাদের শিক্ষিত ও শৈল্পিক মনের অধিকারী হতে হতো। এর বাসগৃহ ছিল বেশভূষা ও চাকচিক্যময়।
প্রাচীন রোমের পতিতাদের অধিকাংশই ছিল বিজিত অঞ্চলের নারী। রোমান সাম্রাজ্যের চরম উন্নতির সময় নারী-পুরুষ একত্রে উলঙ্গ অবস্থায় গোসল করার প্রথা চালু হয়। এর ফলে সমগ্র ইতালি জুড়ে অনেক হাম্মামখানা চালু হয়। এই হাম্মামখানাগুলো হয়ে উঠে যৌনাচারণের কেন্দ্র। রোমে পতিতাবৃত্তি এতই প্রসার হয়েছিল যে সার্কাস, থিয়েটার, মেলা, তীর্থস্থানগুলোতে গণিকাতে পরিপূর্ণ থাকত। তারা স্বাধীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। সকলেই বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে হাম্মামখানা ও বারাঙ্গনা ভবনগুলোকেই বুঝত। এই সময় এই হাম্মামখানা ও বারাঙ্গনা ভবনগুলোতে অনেক বিবাহিত পুরুষ নিজের স্ত্রীকে বিক্রি করে দিত। বড় বড় সম্রাটের স্ত্রীরাও নির্জন স্থানে বাড়ি ভাড়া করে সম্রাটের অজ্ঞাতে পতিতাবৃত্তি করত। সম্রাট ক্লাডিয়াসের স্ত্রী মোনালিসা এই অপরাধে সম্রাটের আদেশে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন।
মধ্যযুগে (৫০০-১৫০০ খ্রি.) সময়ে পৃথিবীর সর্বত্রই পতিতাবৃত্তির প্রসার লক্ষণীয়। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আমেরিকা, জাপান প্রভৃতি দেশ শিল্পে উন্নত হয়। সৈন্যদলের উপভোগের জন্যও একদল ভ্রাম্যমাণ পতিতা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল। মধ্যযুগে ইংল্যান্ডের পতিতালয়সমূহ সরকারি স্নানাগারসমূহে কেন্দ্রীভূত হয়। এই সময় ১৫৪৬ সালে রাজা অষ্টম হেনরী আইন করে পতিতা ব্যবসা বন্ধ করেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে পতিতারা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। ১৬৫০ সালে আইন করে আরো কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করলেও গোপনে পতিতাবৃত্তি চলতে থাকে।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের অধিবাসীদের সঙ্গে ইংল্যান্ডের অধিবাসীদের মেলামেশার কারণে ফরাসি রীতিনীতি ইংল্যান্ডের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায় এবং ফরাসিদের অবাধ যৌনাচারণের প্রভাব ইংল্যান্ডেও পড়তে থাকে। লন্ডনের ঋৎবহপয ছঁধৎঃবৎ এ পতিতাদের অড্ডা খানায় পরিণত হয়। এছাড়াও সমুদ্র বন্দরগুলোতেও পতিতাদের ভিড় লক্ষ্য করার মতো ছিল। এই সময় নাবিক ও সৈনিকদের মধ্যে যৌনজনিত রোগ ভয়াবহ আকারে দেখা দিলে ১৮৬৪ সালে আইন করে পতিতাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
প্রাচীন ভারতে পুরোহিতরা অনেক সময় নিজেকে দেবতার সঙ্গে তুলনা করতেন। পুরোহিতদের স¤পর্কে এমনও বল হয় যে- কোনো নব-বিবাহিতা নারীর স্বামীর সঙ্গে রাত কাটানোর পূর্বে পুরোহিতের সঙ্গে রাত কাটাতে হতো। এছাড়াও পুরোহিতরা মনে করতÑ স্বর্গের দেবতা ইন্দ্রসহ অন্যান্য দেবতাদের চিত্তবিনোদনের জন্য অপ্সরা, মেনেকা, রম্ভা গণিকারা আছে, তাই পৃথিবীতেও থাকা দরকার। আর এই ধারণা থেকেই বড় বড় মন্দির, তীর্থস্থানগুলোতে দেবদাসী রাখা হতো। পুরোহিতরা মনে করতÑ এরা দেবতার সেবা করবে, আর দেবতার কাছে সেবা পৌঁছে দেবার পথ হলো পুরোহিতকে সেবা করা। এসব দেবদাসীরা অনিন্দ্য সৌন্দর্যের অধিকারী হতো। অনেক সময় এলাকার সুন্দরী নারীকে ধরে এনে দেবদাসী বানানো হতো। এসব দেবদাসীদের সঙ্গে পুরোহিতদের যৌনতা চলত। অনেক সময় পুরোহিতরা মন্দিরের অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের সঙ্গেও সঙ্গমের অনুমতি দিত। এখনো গোপনে ভারতের অনেক মন্দিরে দেবদাসী প্রথা চালু আছে। এছাড়া ‘উত্তর ভারতে জিপসি সম্প্রদায়ের মধ্যে মেয়ে শিশুকে পতিতা বানানোর এক ধরনের প্রথা ছিল। বিহার ও উত্তর প্রদেশে ছিল নায়েক, পশ্চিম ভারতের গুজরাটে দেহে ও বর্ণের পতিতা এবং দাক্ষিণাত্যে ছিল মোহর নামক উপজাতীয় পতিতা।’ [তথ্যসূত্র : দৈনিক আজাদি ৪ মে- ২০১৩]
ভারতবর্ষে ইসলাম আসার পূর্বে নিম্নবর্ণের হিন্দু যুবতী মেয়েদেরকে বিয়ের আগে মন্দিরে সেবাদাসী হিসেবে কাজ করতে হতো। ব্রাহ্মণ পুরাহিতরা এই মেয়েদের সাথে প্রতিদিন বিভিন্ন ভঙ্গিমায় শারীরিক স¤পর্ক করতো। এই মেয়েরা বিয়ের পর আর মন্দিরে যেতো না। ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা এই শারীরিক স¤পর্কের ক্রিয়াকৌশলগুলি লিখে কামসূত্র নামে একটি বইটি তৈরি করে।
উমাইয়া খিলাফতের সময়ে মুহম্মদ বিন কাসিম যখন রাজা দাহিরকে পরাজিত করে পাকিস্তানের সিন্ধু জয় করেন, তখন তিনি এই সেবাদাসী প্রথাটা বন্ধ করেন। নিম্নবর্ণের হিন্দু মেয়েরা তখন কৃতজ্ঞাতায় মুহম্মদ বিন কাসিমের মূর্তি বানিয়ে পূজা শুরু করে দিয়েছিলো। [ তথ্যসূত্র: আল-বেরুনীর ভারত তত্ত্ব] এই জন্যই স্বামী বিবেকানন্দ দাস বলেছিলেন- “ইসলাম তো ভারতবর্ষের নিপীড়িত জনগণের জন্য ঈশ্বরের আশীর্বাদ হয়ে এসেছিলো।” চিন্তা করে দেখুন ইসলাম যদি এই ভারতবর্ষে না আসতো তাইলে আমরা এখনো ব্রাহ্মণদের দাস হিসেবেই থাকতাম।
প্রথম মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের (খ্রিস্ট-পূর্ব ৩২১ থেকে খ্রিস্ট-পূর্ব ২৯৭) কৌটিল্যের (কৌটিল্যর আরেক নাম ছিল চাণক্য) অর্থশাস্ত্র থেকে পতিতা ও পতিতাবৃত্তি সংক্রান্ত ভারতবর্ষের যে চিত্র পাওয়া যায় তা হলো এ সময় দেহব্যবসা শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়, যে শিল্পের নাম ছিল বৈশিককলা। ঐ সময় দেহব্যবসা ছিল সম্মানিত পেশা। [তথ্যসূত্র : কৌটিল্য : প্রেম ও নৈতিকতা, ড. প্রতাপ চন্দ্র, কলকাতা, ২০০০] কোনো গণিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁর সঙ্গে বা তাঁর অবিবাহিতা মেয়ের সঙ্গে বলপূর্বক দেহমিলনের চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ আর্থিক সাজা হতো।
ব্রিটিশ আমলের পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৮৫৩ তে কলকাতা শহরে ৪০৪৯টি বেশ্যাগৃহ ছিল যাতে বাস করছিলেন ১২,৪১৯ জন যৌনকর্মী। ১৮৬৭ তে ছিল ৩০,০০০ জন। ১৯২১ সালের আদম শুমারিতে অনুযায়ী ১০,৮১৪ জন যৌনকর্মী ছিল কলকাতায়। [তথ্যসূত্র : দেবাশিস বসু, ‘কলকাতার যৌনপল্লী]’ ‘কলকাতায় খুবই রমরমা ছিল বেশ্যাদের জগৎ। গৃহস্থের বাড়ির পাশে বেশ্যা, ছেলেদের পাঠশালার পাশে বেশ্যা, চিকিৎসালয়ের পাশে বেশ্যা, মন্দিরের পাশে বেশ্যা। [তথ্যসূত্র : বিনয় ঘোষ, কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত, পৃ. ৩০২-০৩]’
হিন্দুরা মনে করে, বেশ্যারা এই সমাজকে নির্মল রাখে। আর সেই কারণেই দুর্গা পূজার সময় বেশ্যার দরজার মাটি অপরিহার্য। আসলে বেশ্যাবাজি ছিল বাবু সমাজের সাধারণ ঘটনা। নারী আন্দোলনের ভারত পথিক রাজা রামমোহন রায়েরও একাধিক রক্ষিতা ছিল। এমনকি এক রক্ষিতার গর্ভে তাঁর একটি পুত্রও জন্মেছিল। সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন নিয়মিত বেশ্যা পাড়ায় যেতেন তা তিনি নিজেই তার ডাইরিতে লিখে গেছেন। মরমি কবি হাসন রাজা, কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিয়মিত পতিতালয়ে যেতেন। [তথ্যসূত্র : অবিদ্যার অন্তঃপুরে, ড. আবুল আহসান চৌধুরী : শোভা প্রকাশ]
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পতিতালয়ে যেতেন। নিষিদ্ধ পল্লীতে গমনের ফলে রবীন্দ্রনাথের সিফিলিস আক্রান্ত হওয়ার খবর তার জীবদ্দশাতেই বসুমতী পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশের যশোর শহরে পতিতাবৃত্তির ইতিহাস রয়েছে ৫শ’ বছরের। মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনামল থেকেই যশোর শহরে চলে আসছে পতিতাবৃত্তি। বর্তমান আমাদের দেশে চার ধরনের যৌনকর্মী রয়েছে। ক) যৌনপল্লী বেইজ খ) রেসিডেন্স বেইজ গ) হোটেল বেইজ ঘ) অনলাইন বেইজ।