কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
এখনো যাদের আদিম অবস্থা
এখনো পৃথিবীর অনেক জায়গায় এমনো জাতি আছে, যারা কাপড় কি জিনিস তা এখনো চোখে দেখেনি, তীর-ধনুক নিয়ে পশু-পাখি শিকার করে খাবার জোগাতে হয় তাদের। এসব মানুষের কাছে তাদের গোত্র ছাড়া বাকি পৃথিবীটাই একটা ভিনগ্রহ। সহজ কথা হচ্ছে, পৃথিবীর সব জায়গায় একই গতিতে মানুষের দল সভ্য হয়নি। যেমনÑ
আমাজন অববাহিকায় বাস করেন যেসব প্রধান উপজাতি তাঁদের নামÑ (১) মুরা, (২) গুয়াত (৩) জিভারো এবং (৪) নামবিকওয়ারা। কঙ্গো অববাহিকার প্রধান প্রধান উপজাতি (১) পিগমি ও (২) বান্টু।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাস করেন মালয় উপদ্বীপে সাকাই ও সেমাং, বোর্নিওতে পুনান, ইবান ও দাসুন এবং অন্যত্র তোরজা, ডায়াক বা ডাকডাক প্রভৃতি অনেক উপজাতি।যাযাবর পশু শিকারিরা প্রধানত বাস করেন আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমিতে এবং অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে। কালাহারির অধিবাসীদের বুশম্যান বলা হয় অর্থাৎ ঝোপের মানুষ। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বিন্দিবু বলা হয়। এঁরা একরকম আদিম অবস্থাতেই পড়ে আছেন। যাযাবর পশুপালকরা এঁদের থেকে অনেক উন্নত। প্রধান প্রধান উপজাতি (১) সাহারা মরুভূমির তুয়ারেগ এবং (২) আরব মরুভূমির বেদুইন।
অধিকাংশ মহাদেশে কিছু না কিছু বিস্তৃত তৃণভূমি আছে। প্রধান প্রধান তৃণভূমি অঞ্চল
(১) এশিয়া ও ইউরোপের স্তেপ, (২) পূর্ব আফ্রিকার সাভানা (৩) উত্তর আমেরিকার প্রেইরি (৪) দক্ষিণ আমেরিকার পম্পাস (৫) দক্ষিণ আমেরিকার ভেল্ট (৬) উত্তর আমেরিকার সাভানা এবং (৭) অস্ট্রেলিয়ার ডাউনস।
এশিয়ার তৃণভূমিতে বেশকিছু যাযাবর পশুপালক আছেন। তাঁরা (১) কিরঘিজ, (২) কাজাখ (৩) কালমুখ ও (৪) মঙ্গোল।
আফ্রিকার সাভানা তৃণভূমিতে বাস করেন (১) মাসাই ও (২) কিকুয়ু উপজাতির মানুষ। দক্ষিণ আমেরিকার মেক্সিকোতে বাস করেন নেভাহো উপজাতি।
গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলভাগে, এশিয়া-ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার উত্তরাংশে কোনও কোনও উপজাতি বাস করেন। তাঁদের মধ্যে (১) গ্রিনল্যান্ডে এস্কিমো, (২) স্ক্যানডিনেভিয়া ও ফিনল্যান্ডে ল্যাপ এবং (৩) সাইবেরিয়ায় স্যামোয়েদ, ইয়াকুত ও চুকতি উপজাতি প্রধান।
ইউরোপীয়দের আগমনের পূর্বে উত্তর আমেরিকায় বহু উপজাতির মানুষ বাস করতেন। তাঁদের মধ্যেÑ (১) সর্ব উত্তরে বাস করতেন এস্কিমোরা (এস্কিমোদের কথা পরে বলা হয়েছে)। (২) ৪০০ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৫৫০ উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় বাস করতেন বহু উপজাতি।
তাঁদের মধ্যে প্রধান প্রধানরাÑ (ক) নুটকা, (খ) কোয়াকুটুল, (গ) হায়দা ও (ঘ) তলিংগিট। নুটকা ও কোয়াকুটুলরা একেবারে পুরাতন প্রস্তরযুগেই পড়েছিলেন। কৃষিকাজ আদৌ জানতেন না, লজ্জা নিবারণের জন্য কোমরে লতাপাতা জড়িয়ে রাখতেন। মাছ ধরাই ছিল প্রধান পেশা। মাছ ধরতেন কেবল পুরুষরাই। কেননা, নদীতে কুমির থাকত প্রচুর। কুমিরকে তাঁরা খেতেন। আর খেতেন নানা ধরনের মাছ ও কাছিম। মেয়েরাও বসে থাকতেন না। তাঁরা বন থেকে ফল, মূল, ফলের বীজ ইত্যাদি সংগ্রহ করতেন। এদের থেকে কিছুটা উন্নত ছিলেন হায়দা উপজাতির মানুষরা এবং তলিংগিট উপজাতির মানুষ। এঁরা পশুলোম সংগ্রহ করতেন এবং ওই লোম থেকে কম্বল প্রস্তুত করে গায়ে জড়াতেন। পশুশিকারই ছিল প্রধান উপজীবিকা। এঁদের মেয়েরাও বন থেকে ফলমূল সংগ্রহ করতেন এবং এক এক জায়গায় এক একটি দল বাস করতেন। দলবদ্ধভাবে শিকারে যেতেন এবং মেয়েরাও বনে যেতেন দলবেঁধে।
দক্ষিণাঞ্চলে রকি পর্বতমালার ঢালে এবং মিসিসিপি উপত্যকায় আরও বহু উপজাতি বাস করতেন। তাঁরা সবাই ছিলেন নুটকা প্রভৃতি উপজাতির মতোই পশুশিকারি ও ফলমূল সংগ্রহকারী। এসব অঞ্চলে সে সময় প্রচুর পরিমাণে বাইসন ও ক্যারিবু হরিণ বিচরণ করত। ওই দুটি প্রাণীকেই তাঁরা বেশি শিকার করতেন এবং শিকারের সরঞ্জাম ছিল প্রস্তরযুগের হাতিয়ারের মতো। এঁদের থেকে অনেক উন্নত এবং সুসভ্য জাতি বাস করতেন মেক্সিকো অঞ্চলে। এঁরা ছিলেন পুরোপুরি কৃষিজীবী। কৃষির মাধ্যমে সারা বছরের খাদ্য সংগ্রহ করতেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। উপজাতিগুলোর মধ্যে মায়া, আজটেক ও টিলটেকরা ছিলেন রীতিমতো সুসভ্য। কৃষিভিত্তিক নগর সভ্যতাও গড়ে তুলেছিলেন তারা। সারা মেক্সিকো অঞ্চলে ওঁদের সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ এখনও ছড়িয়ে আছে।
প¬াইস্পোসিন যুগের শেষ ভাগ থেকে ৩০০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ পর্যন্ত এশিয়া মহাদেশ থেকে আলাস্কার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অসংখ্য উপজাতির মানুষ প্রবেশ করেছিলেন। উপযুক্ত বাসস্থানের খোঁজে ক্রমে ক্রমে তাঁরা ছড়িয়ে পড়েছিলেন উত্তর আমেরিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকায়। যাঁরা দক্ষিণ আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন, তাঁদের বেশিরভাগ বেছে নিয়েছিলেন উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহকে। যেখানে খাদ্য সহজলভ্য, কৃষি কাজের উপযোগী ভূমি এবং নিরাপত্তা যেখানে অধিক, সেসব এলাকাকেই বেছে নিয়েছিলেন।
তাঁদের মধ্যে ইনকা নামক জাতিই ছিলেন প্রধান। এঁদের সভ্যতা উত্তর আমেরিকার মায়া এবং আজটেকদের সভ্যতা থেকেও উন্নত। ইনকারা এক সময় দক্ষিণ আমেরিকায় প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছিলেন। পর্তুগিজদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত ইনকারা কুইটো থেকে বলিভিয়া অবধি সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। এঁরাও লোহা ছাড়া অন্যান্য ধাতুর ব্যবহার জানতেন। পেরু অঞ্চলে এখনও তাঁরা বসবাস করছেন। খ্রিস্ট জন্মের ২৫০০ বছর পূর্ব থেকে ১০০০ বছর পূর্ব পর্যন্ত কিছু কিছু যাযাবর উপজাতি কৃষির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
ইনকারা শিকার ভালোবাসতেন না। একমাত্র কৃষিই ছিল তাদের উপজীবিকা। পশুপালন করতেন এবং চাষ করতেন ভুট্টা, যব ও আলু। গৃহপালিত পশুদের মধ্যে প্রধান ছিল লামা এবং আলপাকা। লামারা পাহাড়ে ওাা-নামায় ভারি দক্ষ। তাই তারা ভার বহনের কাজ করত। তাছাড়া ওই দুই পশুর কাছ থেকে পাওয়া যেত উন্নতমানের পশম, দুধ ও মাংস। পশম থেকে সুন্দর সুন্দর বস্ত্রও নির্মাণ করতেন ইনকারা এবং বস্ত্রবয়নের কাজে দক্ষ ছিলেন তাঁদের মেয়েরা। ইনকারা সোনা ও রুপার ব্যবহার জানতেন। গড়ে উঠেছিল অলঙ্কারশিল্প। নদী থেকে খাল খনন করে কৃষি ক্ষেত্রে নিয়ে আসতেন পানি সেচের জন্য। খাল বা নদী পারাপারের জন্য সেতুও নির্মাণ করতেন। তবে লিপি আবিষ্কার করতে পারেননি। অর্থাৎ মুখের ভাষার লিখিত রূপ দিতে পারেননি। ইনকাদের সভ্যতার সঙ্গে প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার অনেকটা মিল আছে। মিসরীয়দের মতো ইনকারা মৃতকে মমিতে পরিণত করে কবর দিতেন এবং কবরের উপর রচনা করতেন সুউচ্চ পিরামিড। পেরুতে শত শত পিরামিড আজও অতীতের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। পেরুর চোচুয়া পিরামিড পৃথিবীর বৃহত্তম পিরামিড।
পাশ্চাত্যের কাছে আমেরিকার অবগুণ্ঠন উন্মোচিত হওয়ার পর ইনকা সভ্যতাকে ধ্বংস করেছেন স্পেনীয়রা। দক্ষিণ আমেরিকার ইনকাসহ অন্যান্য উপজাতির মানুষ পাশ্চাত্যের উপনিবেশ স্থাপনকারীদের হাতে নিগৃহীত হলেও এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও এখনো বিভিন্ন উপজাতির মানুষের সংখ্যা বড় কম নয়। প্যারাগুয়েতে বাস করেন সেখানকার জনসংখ্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ, পেরু এবং বলিভিয়াতে ৩৭ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ, ইকুয়েডরে প্রায় ২৭ শতাংশ, চিলিতে ৭ শতাংশ এবং কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়েতে অত্যন্ত কমÑ ২ শতাংশের মতো।
আমেরিকায় অসংখ্য উপজাতির মানুষ বাস করেন এবং সবাই আমেরিকান ইন্ডিয়ান নামে পরিচিত। তাদের পোশাক, ঘরবাড়ি প্রভৃতির বৈশিষ্ট্য আছে। ঘরগুলো বেশ উঁচু এবং গম্বুজের মতো। এক জায়গায় অনেকগুলো ঘর থাকে। ঘরের উপরিভাগ শুকনো তৃণ দিয়ে ঢাকা থাকে। পোশাক অনেকের জমকালো। পুরুষেরা সর্বাঙ্গ ঢাকা দিয়ে রাখেন পোশাকে। অনেকে মাথায় পাখির পালকের টুপি পরেন।
কেউবা দু-একটা পালক মাথায় গুঁজে রাখেন। এক এক জায়গায় বাস করেন এক একটি দল। দলের একজন দলপতি থাকেন। দলপতির পোশাক ও টুপি অত্যন্ত জমকালো। আলু একমাত্র আমেরিকার কৃষিজীবী উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ চাষ করতেন। তাঁদের অন্যতম প্রধান খাদ্য ছিল আলু।
কোকো গাছের পাতার মাদকগুণও আমেরিকার আদিম বাসিন্দাদের আবিষ্কার। অপরদিকে কোকো ফলের বীচিকে ভেজে খোসা ছাড়ানোর পর পিষে কেকের মতো তৈরি করার বিদ্যাটা স্পেনীয়রা আমেরিকার আদিবাসীদের কাছ থেকেই রপ্ত করেছিলেন। ওই কেকের কিছু অংশ পানিতে গুলে এবং মশলাপাতি দিয়ে আদিম বাসিন্দারা এক ধরনের শরবত তৈরি করতেন। শরবত মৃদু উত্তেজক। স্পেনীয়রা কোকো বীজের শরবত খেয়েছিলেন এবং কেক থেকে প্রথম চকোলেট বানিয়ে ছিলেন। প্রায় ১০০ বছর চুটিয়ে চকোলেটের ব্যবসা করেছে স্পেন।
আমাজন অববাহিকার দুর্গম ও অস্বাস্থ্যকর এলাকায় সাধারণত তিন শ্রেণির উপজাতি বাস করেন। (১) পশু শিকারি ও ফলমূল সংগ্রহকারী, (২) মৎস্য শিকারি এবং (৩) যাযাবর পশু শিকারি। পশু শিকারিদের মধ্যে প্রধান নামবিক ওয়ারা এবং মাকিগোন উপজাতি। অরণ্যের পশু শিকারই এদের প্রধান উপজীবিকা। মুরা ও গুয়াত উপজাতির মানুষ নির্ভর করে নদীর মাছ, কাছিম, কুমির প্রভৃতির উপর। মাছ ধরার বিভিন্ন কায়দা ওঁরা রপ্ত করেছেন। তাছাড়া নদীতে প্রচুর মাছও পাওয়া যায়। কুমিরকে পাকড়াও করার ব্যাপারেও বেশ পটু তারা। দলবদ্ধভাবে পুরুষেরাই মাছ, কুমির প্রভৃতিকে ধরেন। যাঁরা নদ-নদী থেকে দূরে উচ্চভূমিতে বাস করেন, তাঁরা যাযাবর। পশু শিকার এবং বন থেকে ফলমূলাদি সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। যেহেতু এক জায়গায় কিছুকাল বাস করলে বন্যপশু এবং বনজ খাদ্যের ঘাটতি ঘটে, তাই তাঁরা এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গমন করতে বাধ্য হন। শিপিবো, শিরিয়ান, জিভারো প্রভৃতি সেখানকার প্রধান প্রধান উপজাতি।