কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
আধ্যাত্মবাদ
আত্মা কি? পরমাত্মা (ঈশ্বর) কি? এই দুইয়ের মাঝে সম্বন্ধ কি? এই বিষয়ের নাম আধ্যাত্মবাদ। আমাদের মত প্রাচীন মানুষও ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখত। স্বপ্ন দেখত হয়ত এমন সব লোকজনকে, যারা তাদের থেকে দূরে কোথাও রয়েছে। অথবা এমন কাউকে দেখত, যে মারা গেছে। ঘুম এবং স্বপ্নের কারণ না জানা থাকায়, তারা যুক্তি খাঁড়া করে কল্পনা করেছিল যে, দেহের ভিতরে থাকে আত্মা। ঘুমের সময় সেই আত্মা বেড়িয়ে গিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সেই আত্মাগুলো অন্যদের আত্মার সাথে যোগাযোগ করে, দেখা সাক্ষাৎ হয় ইত্যাদি। আর ভাবত, কেউ মারা গেলে, তার আত্মা তার দেহ ছেড়ে বেড়িয়ে যায় এবং ঘুরে বেড়ায়। তবে তারা এটাও ভাবত যে, আত্মা দুই ধরণের। একটা ভাল, আরেকটা মন্দ। তখনকার মানুষেরা মনে করতে শুরু করেছিল যে, শিকারের সময়, ভাল বা মন্দ আত্মাই শিকারের ভাল মন্দ স্থির করে। আবার মানুষকে রোগাক্রান্তও করে, সেই মন্দ আত্মারাই। এই ধরনের কাল্পনিক ধারণা থেকেই মানব সমাজে চালু হয়েছিল রোগীকে ঘিরে নানা রকমের অদ্ভুত কাজকর্ম। কোথাও রোগীকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে চিৎকার করত। কোথাও লাঠিসোটা নিয়ে রোগীকে ভয় দেখাতো। কোথাও বা ধোঁয়া দিয়ে একাকার করে ফেলত। অনেক সময় চেঁচামেচি করত। এই ভাবেই ঝাড়ফুঁকের সৃষ্টি হয়েছে, যা এখনো সমাজে বিদ্যমান। সৃষ্টি হয়েছে নানা রকমের আচার আচরণ অনুষ্ঠান ইত্যাদির।
আত্মা কি.......তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিশে-øষণ হলো- একটা গরুকে জবাই করার পর যখন এর মাংসগুলোকে টুকরো করা হয়, তখন খণ্ডিত টুকরোগুলোকে আমরা লাফাতে দেখি। অথবা সাপ, কেঁচো, টিকটিকি ইত্যাদির লেজ কেটে বা ছিঁড়ে ফেললে, ঐ ছিঁড়া অংশকেও আমরা কিছুক্ষণ লাফাতে দেখি, তার মানে সেখানে প্রাণ আছে। তাহলে শরীর টুকরো করার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণও কি টুকরো হতে থাকে? প্রতিটা জীবকোষেই কি তাহলে প্রাণ থাকে? কিংবা কোনো গাছের একটা থেকে দশটি শাখা কেটে রোপণ করলে তা থেকে পৃথক পৃথক দশটি জীবিত গাছ উৎপত্তি হয়। এই দশটি গাছের যে দশটি জীবন, এটা কোথা থেকে আসে? স্বর্গ থেকে, না আগের গাছ থেকে? মানুষ কল্পনা করে তার শরীর সক্রিয় রাখে যে শক্তি সেটাই প্রাণ। শরীর যখন মরে যায় বা দেহ পচে যায়, তখন এই শক্তি বা প্রাণ মরে না, আত্মা হয়ে অনন্তকাল টিকে থাকে। এটাই মানুষের কল্পিত আত্মা। ‘আত্মা অবিনশ্বর’ এই কথাটা সব ধর্মেই বলা আছে। আসলে আত্মার ধারণা অনেক পুরনো।
যখন থেকে মানুষ নিজের জীবন ও মৃত্যু নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে, তখন থেকে আত্মার ধারণা এসেছে। আদিকাল থেকেই মানুষ ইট, পাথর বা অন্যান্য জড় পদার্থের যে জীবনীশক্তি নেই, তা বুঝতে পারার পর অবাক বিস্ময়ে সে ভেবেছেÑ জীব-জগতের যে চলেফিরে বেড়াবার ক্ষমতাটি রয়েছে, তা কোথা থেকে আসে কোথায় বা যায়। আত্মা নামক কল্পনাটি তার চিন্তার সে শূন্যস্থানটি পূরণ করেছে, তারা রাতারাতি পেয়ে গেছে জীবন-মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করার খুব সহজ একটা সমাধান। আত্মা নিয়ে জীবন মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা প্রথম শুরু হয়েছিল নিয়ান্ডার্থাল আমলে, নিয়ান্ডার্থালরা প্রিয়জন মারা গেলে তার আত্মার উদ্দেশ্যে ফুল নিবেদন করত। এমনকি তারা মৃতদেহ কবর দেয়ার সময় এর সঙ্গে খাদ্যদ্রব্য, অস্ত্র সামগ্রী এমনকি মাদুলীসহ সবকিছুই রেখে দিত, যাতে তাদের আত্মা শান্তিতে থাকতে পারে আর সঙ্গে থাকা জিনিসগুলো ব্যবহার করতে পারে। অনেক গবেষক (যেমন নিলসন গেসছিটি, রবার্ট হার্টস প্রমুখ) মনে করেন, মৃতদেহ নিয়ে আদি মানুষের পারলৌকিক কল্পনার ফলশ্রুতিতেই মানব সমাজে ধীরে ধীরে আত্মার উদ্ভব ঘটেছে। নিয়ানডার্থাল মানুষের আগে এ ধরনের ধর্মাচরণের কোনো নিদর্শন পাওয়া যায়নি।
অনেক সময় ঘুমন্ত মানুষের অস্বাভাবিক স্বপ্ন দেখাকেও আত্মার অস্তিত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন প্রাচীন মানুষেরা। এখনো জাপানিরা বিশ্বাস করে যে, একজন মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন তার ভেতরের আত্মা খুব ছোট পিণ্ডের আকার ধারণ করে তার মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়। তারপর যখন ওই আত্মা আবার দেহের ভেতরে প্রবেশ করে তখনই ওই মানুষটি ঘুম থেকে জেগে ওঠে।
আফ্রিকার কালো মানুষদের মতে সব মানুষের আত্মার রং কালো রঙের। আবার মালয়ের বহু মানুষের ধারণা, আত্মার রং রক্তের মতোই লাল। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের অনেকের ধারণা আত্মা আসলে তরল। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা আবার মনে করে আত্মা থাকে বুকের ভেতরে।
খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতক পর্যন্ত হিব্রু, ব্যাবলনীয়, গ্রিক এবং রোমানদের মধ্যে মৃত্যু-পরবর্তী আত্মার কোনো স্বচ্ছ ধারণা গড়ে ওঠেনি। জরথ্রুস্ট ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যার আত্মা সংক্রান্ত চিন্তা-ভাবনা ছিল আধুনিক মানুষের অনেকটা কাছাকাছি। জরথ্রুস্ট ছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ বছর আগেকার একজন পারশিয়ান। তার মতানুযায়ী, প্রতিটি মানুষ তৈরি হয় দেহ এবং আত্মার সমন্বয়ে। জরথ্রুস্টবাদীদের মতে, প্রতিটি মানুষই নিজের ইচ্ছানুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজকর্ম করার অধিকারী এবং সে অনুযায়ী তার ভালো কাজ কিংবা মন্দ কাজের উপর ভিত্তি করে তার আত্মাকে পুরস্কৃত করা হবে কিংবা শাস্তি প্রদান করা হবে।
জরথ্রুস্টের দেওয়া আত্মার ধারণাই পরবর্তীকালে গ্রিক এথেনীয় দার্শনিকরা তাদের দর্শনের অঙ্গীভূত করে নেয়। এই দর্শনের তিন পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন সক্রেটিস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটল। প্লেটোর বক্তব্য ছিল যে, প্রাণী বা উদ্ভিদ কেউ জীবিত নয়, কেবলমাত্র যখন আত্মা প্রাণী বা উদ্ভিদদেহে প্রবেশ করে তখনই তাতে জীবনের লক্ষণ পরিস্ফুট হয়। প্লেটোর এই ভাববাদী তত্ত্ব অ্যারিস্টটলের দর্শনের রূপ নিয়ে পরবর্তীতে হাজার খানেক বছর রাজত্ব করে।
পিরামিড-মমি আর আমাদের রাখাইন জমিদারদের সমাধি স্তম্ভ সবই হচ্ছে আত্মা বিশ্বাসের স্বাক্ষর। আত্মা সংক্রান্ত কুসংস্কার শেষ পর্যন্ত এভাবেই মানব সমাজে ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসে।
জরথ্রুস্টের মৃত্যুর প্রায় এক হাজার বছর পর অত্যন্ত প্রভাবশালী ধর্মবেত্তা সেন্ট অগাস্টিন (খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার আগ পর্যন্ত নয় বছর অগাস্টিন ম্যানিকিন (গধহপযবধহ) গোত্রভুক্ত ছিলেন, যারা জরন্তুস্ট্রবাদ চর্চা করত।) খ্রিস্টধর্মের ভিত্তি হিসেবে একই ধরনের (মানুষ = দেহ + আত্মা) যুক্তির অবতারণা করেন। এর সঙ্গে যোগ হয় পাপ-পুণ্য এবং পরকালে আত্মার স্বর্গবাস বা নরকবাসের হরেক রকমের গালগল্প। এগুলোই পরে ডালপালায় পল্লবিত হয়ে ইসলাম ধর্মেও স্থান করে নেয়।
আত্মা নিয়ে বর্তমান বৈজ্ঞানিক সমাজের কৌতূহলও পিছিয়ে থাকেনি। তাই বিভিন্ন সময় ইউরোপ-আমেরিকায় বিভিন্ন দেশে গঠিত হয়েছিল ‘আত্মা অনুসন্ধান কমিটি’। ১৮৮২ সালে লন্ডনে যে আত্মা নিয়ে সমিতি গঠিত হয়েছিল, তার সভাপতি ছিলেন কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত প্রফেসর হেনরি সি জুইক, তার সহকারীদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আর্থার ব্যালফুর। যতদূর জানা যায় বাংলাদেশে ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ‘আত্মা অনুসন্ধান সমিতি’ গঠিত হয়, এর প্রসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. এ্যান্ড্রু অলক দেওয়ারী।
সে যাই হোক, ভারতীয় আর্যরা আত্মা সম্বন্ধে ব্যাপক আলোচনা করেছে কিন্তু তা পাশ্চাত্যের মতো বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নয়, আধ্যাত্মিক চিন্তার মধ্যেই ভারতীয়রা তাদের চিন্তা সীমাবদ্ধ রেখেছিল। বিবর্তনের আধুনিক তত্ত্ব না জানা সত্ত্বেও প্রাচীন ভারতের যুক্তিবাদী চার্বাকেরা সেই খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে তাদের সময়কার অর্জিত জ্ঞানের সাহায্যে আত্মার অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছিলেন। আত্মা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে করতে শেষ পর্যন্ত ঠোঁট কাটা চার্বাকেরা ঈশ্বর-আত্মা-পরলোক- জাতিভেদ-জন্মান্তর সবকিছুকেই নাকচ করে দিয়েছিলে। তারাই প্রথম বলেছিলেন বেদ ‘অপৌরুষেয়’ নয়, এটা একদল স্বার্থান্বেষী মানুষেরই রচিত। জনমানুষের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া সেই সব স্বার্থান্বেষী ব্রাহ্মণদেরকে ভণ্ড, ধূর্ত, চোর, নিশাচর বলে অভিহিত করেছিলেন চার্বাকেরা, তারা বাতিল করে দিয়েছিলেন আত্মার অস্তিত্ব। চার্বাকেরা একটি চমৎকার উপমা দিয়ে ব্যাপারটি বুঝিয়ে ছিলেন। বলেছিলেন, আঙুর এবং মদ তৈরির অন্যান্য উপাদানগুলোতে আলাদা করে কোনো মদশক্তি নেই। কিন্তু সেই উপকরণগুলোই এক ধরনের বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো পাত্রে মিলিত করার পরে এর একটি নতুন গুণ পাওয়া যাচ্ছে, যাকে আমরা বলছি মদ। আত্মার চৈতন্যও তেমনি।
নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক পরিষ্কার করেই বলেছেন : আমার ‘আমিত্ব’, আমার উচ্ছ্বাস, বেদনা, স্মৃতি, আকাক্সক্ষা, সংবেদনশীলতা এবং আমার মুক্তবুদ্ধি এগুলো আসলে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ থেকে উদ্ভুত অণুগুলোর বিবিধ ব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়। স্নায়ুকোষ অণুগুলোর এই ব্যবহারই হচ্ছে ‘মন’। আসলে মস্তিষ্ক স্নায়ুকোষের মৃত্যু মানেই কিন্তু ‘মন’-এর মৃত্যু, সেই সঙ্গে মৃত্যু তথাকথিত আত্মার।
অনেক সময় দেখা যায় দেহের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিকমত কর্মক্ষম আছে, কিন্তু মস্তিষ্কের কার্যকারিতা হারিয়ে গেছে। এ ধরনের অবস্থাকে বলে কোমা। মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা হারানোর ফলে জীবিত দেহ তখন অনেকটা জড়পদার্থের মতো থাকে। তাহলে জীবন ও মৃত্যুর যোগসূত্রটি রক্ষা করছে কে? আত্মা, নাকি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের সঠিক কর্মক্ষমতা? একবার কেউ কোমায় চলে গেলে তাকে পুনরায় জীবনে ফেরৎ আনা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু যারা চেতনা ফিরে পান, তারা সাধারণতঃ ২/১ দিনের মধ্যেই তা ফিরে পান, আবার একমাস পরও কোমা থেকে ফিরে আসার নজির রয়েছে।
ব্রাইন শ্রি¤প (নৎরহব ংযৎরসঢ়), গোলকৃমি বা নেমাটোড, কিংবা টার্ডিগ্রেডের মতো কিছু প্রাণী আছে যারা মৃত্যুকে লুকিয়ে রাখতে পারে। যেমন, ব্রাইন শ্রিম্পগুলো লবণাক্ত পানিতে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে, কিন্তু পানি যখন শুকিয়ে যায়, তখন তারা ডিম্বাণু উৎপাদন, এমনকি নিজেদের দেহের বৃদ্ধি কিংবা মেটাবলিজম পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। শ্রি¤পগুলোকে দেখতে তখন মৃত মনে হলেও এরা আসলে মৃত নয়, বরং এদের এই মরণাপন্ন অবস্থাটিকেই বলে ‘ক্রিপ্টোবায়টিক স্টেট’। আবার কখনো তারা পানি খুঁজে পেলে তখন নতুন করে ‘নবজীবনপ্রাপ্ত’ হয়। এর আর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ আফ্রিকার লাং ফিস। এদের অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপার অনেকটা ভাইরাসের মতো। ভাইরাস জীবাণু ও জড়ের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে। ভাইরাসকে কেউ জড় বলতে পারেন, আবার কেউ জীবিত। এমনিতে ভাইরাস ‘মৃত’, (‘ক্রিপ্টোবায়টিক স্টেট’-এ থাকে) তবে তারা ‘বেঁচে’ ওঠে অন্য জীবিত কোষকে আশ্রয় করে। ভাইরাসে থাকে প্রোটিনবাহী নিউক্লিয়িক এসিড। এই এসিডই ভাইরাসের যাবতীয় বৈশিষ্ট্যের আধার। তারা উপযুক্ত দেহ কোষ বিভাজনের মাধ্যমে জীবিত হয়ে ওঠে।
আসলে মানব দেহের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রয়েছেÑ মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, আর ফুসফুস। যে কোনো একটির বা সবগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট হলে মৃত্যু হতে পারে। যেমনÑ মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বন্ধ হলে কোমা হয়, হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতা বন্ধ হওয়াকে বলে সিনকোপ, আর ফুসফুসের কার্যকারিতা বন্ধ হওয়াকে বলে আসফিক্সিয়া। আগেকার যুগের (বর্তমানেও) মানুষেরা মৃত্যুর এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানত না বা জানে না বলেই কল্পনার ফানুস উড়িয়ে ভাবতো বা ভাবে, ঈশ্বরের নির্দেশে যমদূত এসে প্রাণ হরণ করলেই কেবল একটি মানুষ মারা যায়। আর তখন তার দেহস্থিত আত্মা পাড়ি জমায় পরলোকে। তারা আত্মা বলতে বাতাসের মতো কোনো নির্দিষ্ট অদৃশ্য শক্তি কল্পনা করে, যা শরীরের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করে। এই শক্তি শরীর থেকে বেরিয়ে গেলেই কেউ মারা যায় বলে ধারণা করে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলোÑ মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, আর ফুসফুস এর যে কোনো একটির বা সবগুলোর কার্যকারিতা বন্ধ হলে মৃত্যু হয়। শরীরের কোষ বেঁচে থাকে তৎক্ষণই, যতক্ষণ এর মধ্যে শক্তির যোগান থাকে। শক্তি উৎপন্ন বন্ধ হলে কোষেরও মৃত্যু হয়।