কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
নারীর পৃথিবী ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি
লিঙ্গ নির্মাণ বিধাতার খেয়ালখুশি অনুসারে হয় না। প্রকৃতির রাজ্যে সবকিছুই ভারসাম্যের নিরিখে হিসাব করা, তেমনি লিঙ্গ নির্মাণেও সেই একই ভারসাম্যের অঙ্ক। হিসেবে কাটাকুটি করে দেখা যায়, নারী-পুরুষের জন্মহার প্রায় সমান সমান। এই ভারসাম্য ক্রমাগত নষ্ট করে চলেছে পুরুষ গর্ভে অঙ্কুরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কন্যা ভ্রুণ হত্যা করে। ভ্রুণ হত্যা এবং জন্মের পর থেকে ক্রমাগত অবহেলা, অনাদর ও নিগ্রহের ফলে এ পর্যন্ত কয়েক কোটি কন্যা শিশু সাবাড় হয়ে গেছে। প্রাণীতত্ত্বে স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে প্রতি ১০০ পুরুষ শিশুপিছু ৯৫টি কন্যা শিশু জন্মাবার কথা, যেহেতু কন্যা শিশুর মৃত্যু হার পুরুষ শিশুর চেয়ে একটু বেশি, তাতে বিবাহযোগ্য বয়সে পুরুষ ও নারীর অনুপাত প্রায় সমান সমানই দাঁড়ায়।
গত শতকে মেয়েরা ছিল বাঙালি সমাজে সর্বাধিক অনাদৃত ও অত্যন্ত অবহেলিত। মেয়ে হয়ে জন্মগ্রহণ করাই ছিল দুর্ভাগ্যের সূচক। ছেলের জন্ম হলে ছেলের মাকে বলা হত ‘হীরা বিউনি’ বাড়িতে শুরু হতো আনন্দ উৎসব। কিন্তু মেয়ে জন্মালে ঠিক এর ‘বিপরীত ছবিও চোখে পড়ত।’ পুরুষই শুধু কন্যা সন্তানকে অবাঞ্ছিত বলে মনে করেনি। নারীই সবচেয়ে বেশি করে কন্যাকে অশুভ ও অবাঞ্ছিত বলে মনে করেছে। প্রসূতি স্বয়ং মেয়ে হয়েছে শুনলে এত মুষড়ে পড়ত যে, মানসিকভাবে উজ্জীবিত রাখার জন্য তাকে সাময়িক সান্ত¦না দিয়ে বলা হতো যে ছেলে হয়েছে। প্রসূতির আত্মীয়রা আল্লাহ বা দেব-দেবীর কাছে প্রার্থনা করতÑ একটি ছেলে হোক। কিন্তু কি আশ্চর্য যে, কেউ কখনো ভুলেও বলেন না ‘মেয়ে অর্থাৎ কন্যা সন্তান’ হউক।
এমন বহু কৃতী ছেলেকে পাওয়া যাবে, যারা বড় হয়ে, কৃতী হয়ে মা-বাবার খোঁজ-খবর রাখে না। এমন বহু ছেলেকে পাবেন তারা কেউ কেউ বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে বিলেতে বা আমেরিকায় পড়তে গিয়ে আর ফেরেনি। তার বিধবা মা কিংবা বৃদ্ধ বিপত্নীক বাবা বহুবার দূতাবাসে যোগাযোগ করেও তাদের ঠিকানা জানতে পারেননি, তারা আজও নিরুদ্দেশের পথিক। জন্মনিয়ন্ত্রণের এই যুগে এখন নারীর ইচ্ছায় যখন গর্ভধারণ, তখন একটি বাচ্চা নেওয়াই হাল ফ্যাশন। কিন্তু প্রথম সন্তান মেয়ে হলে, তখন অনেক দম্পতি একটি ছেলের জন্য আবার গর্ভধারণ করেন কিন্তু ছেলে হলে নেড়ার আর বেলতলায় যাবার দরকার হয় না। তবে একটি কন্যা সন্তানে সুখী অনেক আধুনিক পরিবারকেও দেখেছি। তাঁরাই বলেন, মেয়ে আমার ছেলের চেয়ে অনেক ভালো। কারণ, মেয়েরা নিজের বাবা-মাকে কখনো ছাড়তে চায় না এবং ছেড়ে যায় না। নিজের বাবা-মার দিকে তার মনের সমস্ত আবেগ আটকে থাকে। এটা নারী চরিত্রের বড় একটা দিক।
মেয়ের বদলে ছেলের প্রতি মানুষের পছন্দের অগ্রাধিকারের উৎস কিন্তু সেই আদিম যুগে। ছেলে কেন? কারণ, ছেলে হলে সে বড় হয়ে বাবার সঙ্গে শিকারের সহযাত্রী হতে পারবে। তারপরে যখন কৃষিভিত্তিক সভ্যতার পত্তন হলো, তখনও আবার প্রার্থনা ছেলের। কেন? কারণ, ছেলে হলে বাবাকে কৃষিকাজে সাহায্য করবে। কৃষিভিত্তিক সভ্যতার নিট ফসলই ছিল নারীকে ফালতু বলে গণ্য করা। বাবা চান না তার মৃত্যুর পর জমির মালিকানা মেয়ে জামাইয়ের হাতে যাক। কারণ তাহলে তো সেটা অন্য পরিবারে চলে যাবে। জামাই তো উড়ে এসে জুড়ে বসা অন্য পুরুষ। প্রবাদ আছে ‘যম-জামাই-ভাগনা কেউ নয় আপনা’। জামাই ও ভাগনা দুজনেই যেহেতু অন্যের সন্তান, তাই আগেকার দিনের জমিদার রাজা-মহারাজারা ছেলে দত্তক নিতেন। রাজা দশরথের চার ছেলে ছিল কিন্তু তাঁর যে একটি মেয়েও ছিল রামায়ণে তার উল্লেখ তেমন নেই। মহাভারত তো শুধু শতপুত্র আর পঞ্চ পাণ্ডবদের কথায় ভর্তি। সবই পুরুষ চরিত্র। সব নারী চরিত্রই পুরুষের অধীনস্থা।
আমরা পুরুষেরা নারীর রূপটা দেখি, টিভিতে সিনেমায়, নাটকে নানা ধরনের শো বিজনেস তার যৌনতাকে উপভোগ করি, তাকে আমাদের প্রেয়সী করি, কিন্তু তার আড়ালের মানবীকে দেখি না। আমাদের বিবাহ-পূর্ব জীবনে সখা, বিবাহিত জীবনে আজ্ঞাবহ পরিচারিকা ও যৌনসঙ্গিনী ও বার্ধক্যে বিনা বেতনের সেবিকা। সেই ট্র্যাডিশন থেকে পুরুষ কিন্তু আজও সরে আসেনি। আসলে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে কোনো পরিবর্তন সফল হতে পারে না।
নারীর পরম শত্রু আরেকজন নারী। এর কারণও কিন্তু নারীর যৌনতা। নারীর সঙ্গে নারীর লড়াই সম্পত্তির অধিকার নিয়ে নয়, পুরুষের ওপর অধিকার নিয়ে। কখনও সে নিজেকে সম্রাজ্ঞী ভাবে, কখনও পুরুষের আশ্রিতা দাসী। পুরুষকে সে হর্তা এবং কর্তা বলে মনে করে। বিশ্বের ৬৫ শতাংশ পুরুষ নাকি এখনও বউ পেটায়। তা সত্ত্বেও কটা নারী পুরুষকে ছেড়ে চলে আসে? কারণ স্বামীই তো নারীর কাছে আজও ঈশ্বর। বিবাহিত স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি। স্বামীর ঘর ছেড়ে কোথাই বা সে যাবে? একদা স্বামী বাইজির বাড়ি রাত কাটিয়ে সকালে বাড়ি ফিরলে বউ তার ময়লা জামা-কাপড় কাচতে যেত। স্বামীর গোসলের বন্দোবস্ত করে দিত। খাওয়ার সময় পাশে বসে পাখায় বাতাস করত আর রোজই রাতে সেজে-গুজে বসে থাকত স্বামীদেবতা যদি আজ রাতে বাইজি বাড়িতে না গিয়ে অন্তত ভুল করেও তার কাছে আসেন। এখনও হাজার হাজার মেয়ে যথেষ্ট যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি করতে চায় না। সন্তান ও স্বামী পালনের জন্য গৃহবধূই থাকতে চায়, ভালো থাকতে চায়। পুরুষ বহু বিবাহ করলেও নারীর বহু পতি গ্রহণের অধিকার ছিল না। এখনও তো পুরুষ একাধিক স্ত্রী রাখছে। এক বাড়িতে যেমন রাখছে, তেমনি দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্ত্রীর জন্য ভিন্ন ফ্লাট ঘর ভাড়া করছে। এমন পুরুষের অর্থ হয়ে গেলে সে সম্পত্তিতে লগ্নি করে। নারী তো আজও পুরুষের সম্পত্তি।
আমাদের ইতিহাস হলো লুটপাট ও নারীর ওপর বলাৎকারের ইতিহাস। এটি হলো দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচারের ইতিহাস। নারী শারীরিকভাবে দুর্বল। তদুপরি সে স্বাধীন নয়, পরজীবী। স্বামীর কাছে সে হয় রত্ন, না হয় একটি আসবাবপত্র। তাই ডাকাত লুটেরা ও আক্রমণকারীরা যখন বিজিত রাজ্যে ঢুকে লুটপাট করছে, তখন নারীকেও লুট করে নিয়ে গেছে। পুরুষ তাকে ধর্ষণ করে চলে গেছে। ধর্ষণের সন্তান বহন করেছে লক্ষ লক্ষ নারী। কখনও তাকে জোর করে সতীদাহ করা হয়েছে। ডাইনি অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। পরিবার বিত্তের মধ্যে দেখবেন নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু কিন্তু পুরুষ নয়, নারী। যে নারী একটু ক্ষমতায়িত হয়েছে, অমনি সে দুর্বল নারী বা পুরুষকে নিপীড়ন করছে। যেমন অনেক সংসারে পুত্রবধূর বড় শত্রু তার শাশুড়ি অথবা ননদ। তার স্বামী ততটা নয়। আবার শাশুড়ির বড় শত্রু তার পুত্রবধূ।
অনেক ধর্ম তো স্বর্গ থেকে বিদায়ের জন্য নারীকেই দায়ী করেছেন। প্রচলিত লোক প্রবাদ মুরগি যেমন পাখি নয়। মেয়েরা তেমন মানুষই নয়। ইংল্যান্ডে মেয়েরা পুরুষের মুখে মুখে কথা বললে তাদের মুখে ঘোড়ার লাগাম পরিয়ে দেওয়া হতো। রাশিয়ায় বিয়ের সময় মেয়ের বাবা জামাইর হাতে একটি চাবুক তুলে দিতেন। বলতেন আমার মেয়ে অবাধ্য হলে এটা ব্যবহার করতে তুমি দ্বিধা করবে না। ওই চাবুক বৈঠকখানায় ঝোলানো থাকত। গরু ও জরুকে (নারী) মারার অধিকার মধ্যযুগে সবদেশের স্বামীরই ছিল। যা ধর্মের আবরণে এখনো আছে। কথিত আছে, জাহেলিয়াতের যুগে (ইসলাম-পূর্ব) আরব নারীদের অধিকার বলতে কিছুই ছিল না।
ইসলামে চারজন নারীকে একসঙ্গে স্ত্রী হিসেবে বৈধ অধিকার দিয়েছে। অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ মনে করেনÑ আরবে তখনকার সমাজব্যবস্থায় বহুভোগ্যা পুরুষদের বহু নারীকে অবৈধভাবে ভোগ করার প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রিত এবং বিবাহ-অনুষ্ঠানকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্যেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, গরমের দেশ আরবের জন্য চারটি বিবাহ সঠিক। কারণ এখনো আরবে ৬০ থেকে ৭০% মেয়ে অবিবাহিত থেকে যায়।
বাল্যবিবাহের রীতি উনিশ শতকে কত ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিখ্যাত লোকদের জীবনী থেকে। রবীন্দ্রনাথের দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন পনেরো বছর বয়সে। চিন্তার দিক দিয়ে তিনি সে যুগের তুলনায় খুব আধুনিক হলেও তার পুত্র অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বাবা দেবেন্দ্রনাথের বিয়ে দিয়েছিলেন সতেরো বছর বয়সে, আর রবীন্দ্রনাথের মায়ের বা পাত্রীর বয়স ছিল এগারো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কেশবচন্দ্র সেন, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, রমেশচন্দ্র দত্তÑ সেকালের বিখ্যাত এই ব্যক্তিরা সবাই বিয়ে করেছিলেন তাদের বয়স সতেরো হবার মধ্যেই। তাদের পাত্রীদের বয়স ছিল আরও অনেক কম। বঙ্কিমচন্দ্র যাকে বিয়ে করেছিলেন, তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। দেবেন্দ্রনাথ এবং বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর স্ত্রীর বয়স ছিল ছয় বছর। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রীর বয়স ছিল সাত বছর, বিদ্যাসাগরের আট, কেশব সেন এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নয়, শিবনাথ শাস্ত্রীর দশ আর রাজনারায়ণ বসুর স্ত্রীর বয়স ছিল এগারো বছর। এসব বিচারে বলতে হয়, আদর্শ পাত্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ২৩ বছর বয়সে অভিভাবকদের ইচ্ছায় একটি নিরর ও মাত্র এগারো বছর বয়সের মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল।
আদতে ইংরেজ আমলে ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে প্রায় সব বাঙালি মেয়ের বিয়ে হতো সাত-আট থেকে ১০ বছরের মধ্যে। যেসব পরিবারের অভিভাবকদের কিছুটা কাণ্ডজ্ঞান ছিল, তাঁরা রজঃবতী না হওয়া পর্যন্ত পুত্রবধূকে শাশুড়ি, দাদিশাশুড়ি বা বিধবা পিসির কাছে শুতে দিতেন। তবে কাণ্ডজ্ঞান ও বিবেচনাসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বাঙালি সমাজে চিরকালই বিরল। প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের সুখ-শান্তির কথা চিন্তা করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নববধূকে ছেলের ঘরে ঠেলে দিত। ঐ বাল্য বধূর আর্তনাদ আকাশ পর্যন্ত পৌঁছালেও শ্বশুর-শাশুড়ি রাখতেন কানে তুলা গুঁজে।
একদিন এরকম একটি ঘটনা ঘটে কলকাতার এক গলির মধ্যে। এক হৃষ্টপুষ্ট যুবক বছর আটেকের এক শিশুকে ধুমধাম করে বিয়ে করে আনে। নির্মম অভিভাবকেরা তাকে বাসরঘরে ঠেলে দেন। কিছুক্ষণ পর মেয়েটির আর্ত চিৎকারে মধ্যরাতেই পাড়া-পড়শিরা সে বাড়ির সামনে এসে ভিড় করে। নিরুপায় হয়ে বাড়ির লোকজন বালিকাটিকে নিয়ে যায় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। পরদিন হতভাগিনী শেষ-নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। খবরটি কাগজে আসে। পত্রিকায় খবরটি ফলাও করে আসায় ইংরেজ কর্মকর্তাদের তাতে দৃষ্টি পড়ে। ফলে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, ঋতুমতী হওয়ার আগে মেয়েদের বিয়ে নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করা হবে। এই নির্মম ঘোষণা বাঙালি পুরুষেরা মানবেন কেন? তাঁরা তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন এবং প্রতিবাদে ফেটে পড়েন।
ষোড়শী শব্দটি কয়েকশ’ বছর ধরে বাঙালি কবিদের ছিল খুবই প্রিয়। আমাদের জাতীয় কবিও তাঁর সেরা সৃৃষ্টিতে বলেছেন : ‘আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি।’ আসলে মেয়েদের ১৬ বয়সটির প্রতি শুধু কামাতুর বাঙালি পুরুষদেরই লোভ, তা নয়। ইংরেজরাও কম যায় না। তারা ষোড়শী না বলে, বলে সুইট সিক্সটিন-মিষ্টি ষোলো।