কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
গ্রিক সভ্যতা ও সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল, আলেকজান্ডার
গ্রিসের মূল সভ্যতা হেলেনীয় সভ্যতা নামে পরিচিত। প্রাচীন গ্রিকরা নিজেদের মনে করত দেবতা ডিয়োকেলিয়নের পুত্র হেলেনের বংশধর। তাই তারা নিজেদের হেলেনীয় বলত। এ কারণে তাদের গড়া সভ্যতা হেলেনীয় সভ্যতা নামেও পরিচিত হয়। এক সময় গ্রিসের মূল ভূখণ্ড ছাড়াও অনেক অঞ্চল গ্রিকরা দখল করে নেয়। তাই গ্রিকদের প্রভাবে থাকা অঞ্চলগুলোকে একত্রে বলা হতো হেলেনীর বিশ্ব।
এথেন্সে গণতন্ত্র বিকাশের যুগে অভিজাত বংশের বেশ কয়েকজন উদার মনের মানুষ সাধারণ মানুষের পক্ষে সংস্কার করেছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে গৌরবের ভূমিকা রেখেছিলেন পেরিক্লিস (৪৯৫-৪২৯ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ)। ৪৬০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে তিনি এথেন্সের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেন। পেরিক্লিসের যুগে শিল্পকলার ক্ষেত্রে এথেন্স সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছিল। বিশ্ব জগৎ যখন সভ্যতার দিকে হাঁটতে শুরু করেছিল, গ্রিক জাতি তখন জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়ে চারদিক আলোকিত করছিল। মহাকবি হোমার, বিখ্যাত বীর আলেকজান্ডার, দার্শনিক সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো, প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ হেরডেটাস, বিজ্ঞানী পিথাগোরাস, আর্কিমিডিস, ইউক্লিড হিপোক্রেটস, এপেলেসের মতো গ্রিসের আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এখনো বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতি, সভ্যতা ও ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। প্রাচীন গ্রিসের সূচনা ধরা হয় ৭৭৬ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে অলি¤িপক গেমস-এর আয়োজনের মধ্য দিয়ে, আর পরিসমাপ্তি ধরা হয় ৩২৩ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে মহামতি আলেকজেন্ডরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের নিয়মতান্ত্রিক চিন্তাধারার পথে প্রথম এগিয়েছিল প্রাচীন গ্রিকরা। সক্রেটিস ছিলেন এক দরিদ্র নিরক্ষর ব্যক্তি, যিনি বাস করতেন গ্রিসের অ্যাথেন্সে। তিনি ছিলেন এক ভালো যোদ্ধা, যিনি জিমনেশিয়ামে লড়তেন; কিন্তু তিনি জানতেন যে, তিনি বুদ্ধিজীবী নন। তাই গ্রিসের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তির কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করতে চেয়েছিলেন বলেই তিনি গ্রিকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী কে? তা খুঁজতে তিনি গিয়েছিলেন ডেলফির বিখ্যাত পুরোহিতের কাছে। পুরোহিত ডেলফির গুহায় তাঁর আসনে বসে সক্রেটিসের প্রশ্ন শুনলেন। অতঃপর তাঁর উত্তর ছিল, ‘গ্রিকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হচ্ছে সক্রেটিস তুমি নিজে।’
‘কিন্তু, এটা অসম্ভব!’ তোতলিয়ে সক্রেটিস বললেন, ‘আমি এক মূর্খ’। পুরোহিত বললেন, যে ব্যক্তি নিজেকে মূর্খ বলে জানে এবং জ্ঞানের সন্ধান করে, সে হচ্ছে জ্ঞানী। কিন্তু সক্রেটিস এই কথায় সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি তাঁর নিজ নগরী অ্যাথেন্সে ঘুরে, যেখানে যত লোক জ্ঞানী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁদের সবাইকে একই প্রশ্ন করতে লাগলেন। ঘটনাটি ছিল যিশু ও মুহাম্মদ (স.)-এর জন্মেরও শত শত বছর আগে। গ্রিকরা তখন বহু দেব-দেবীতে বিশ্বাস করত এবং তাদের সকলেই বলিদান দিত। সক্রেটিসও ধার্মিক হতে চেয়েছিলেন, তাই তিনি আর এক বিখ্যাত পুরোহিতের কাছে গেলেন। ‘ধর্মপরায়ণতা কী?’ জিজ্ঞেস করলেন সক্রেটিস।
‘এটি হচ্ছে দেবতাদের সম্মান করা এবং তাঁদের ইচ্ছা তামিল করা’। পুরোহিত উত্তর দিলেন। সক্রেটিস পুনরায় বিভ্রান্ত হলেন। বললেনÑ ‘কিন্তু গ্রিসে দেবতারা সংখ্যায় অনেক। আমাদের দৈব-কাহিনিতে প্রায়ই তাঁরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করেন। আমি কীভাবে জানবো কখন একজন দেবতাকে সমর্থন করতে হবে এবং কখন অন্য জনকে অনুসরণ করতে হবে?’
প্রশ্ন শুনে পুরোহিত বিব্রত হলেন এবং সক্রেটিসের জন্যে কোনো উত্তর ছিল না তাঁর। এরপর সক্রেটিসের ধারালো প্রশ্নমালার উত্তর খুঁজতে অনেক জনসমাবেশ হতে থাকল। জিমনিশিয়ামে অনেক তরুণ সক্রেটিসকে জ্ঞান বিষয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করল। এই তরুণদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ্য দেব-দেবীর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে লাগল। সক্রেটিস তখন এথেন্সের বাজারে এলোমেলোভাবে ঘোরাফেরা করতেন, যেদিকে যেতেন যেন হেমিলনের বাঁশিওয়ালা, পেছনে যুবকদের সারি। শেষ পর্যন্ত অ্যাথেন্সের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে বিষয়টি অসহ্য ঠেকল। তারা সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অধর্ম, দেবনিন্দা, দেবতাদের প্রশ্নবিদ্ধ করা দিয়ে তরুণদের নষ্ট করার অভিযোগ এনে তাঁকে বিচারের সম্মুখীন করলেন।
সক্রেটিস অভিযোগসমূহ অস্বীকার করলেন এই বলে যে, তাঁর প্রশ্নগুলো ছিল দেবতাদের সম্মান করার জন্য। তাঁর অভিযোগকারীগণ যখন জিজ্ঞেস করলেন তিনি দেব-দেবীদের বিশ্বাস করতে পারেন কিনা, তখন সক্রেটিস এর সম্ভাব্যতা অস্বীকার করলেন। তখন তারা তাঁকে অভিযুক্ত করল তরুণদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রষ্ট করার, তারা জোর করতে থাকলেন এই বলে যে, সমাজের ওপর তাঁর মন্দ প্রভাব পড়ছে এবং তাঁর প্রশ্ন দিয়ে সমাজে আরও গোল বাঁধাবার পূর্বেই তাঁর মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত।
সক্রেটিসকে তাঁর বন্ধুরা মিনতি করলেন প্রশ্ন করা বন্ধ করতে, কিন্তু তিনি বললেনÑ এর অর্থ হবে দেব-দেবীকে স্বীকার করা। ফলে মৃতুদণ্ড দেয়া হলো সক্রেটিসকে। এই সক্রেটিসের ছাত্র প্লেটো কিন্তু ধর্ম বিশ্বাসকে একটি গুহার রূপকের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন।
‘তুমি কিছু বন্ধীদের কথা চিন্তা করো, যারা তাদের সমগ্র জীবন শিকলে আটকা পড়ে আছে। কোন পাহাড়ের নির্জন গুহার অন্ধকার দিকে ওদেরকে বন্দি করে রাখা হয় অজস্র বছর ধরে। ঠিক যখন ওরা অনেক ছোট ছিল সেই সময়টা থেকে। ওদের হাত পেছন দিক থেকে শিকলে দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।’
আর তাই ওরা দেখতে পাচ্ছে না, ওদের পেছনের প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ড (যা ওদের সামনের গুহার দেয়ালটিতে আলো ফেলেছে) আর তার ঠিক সামনের দিকে আছে গুহায় প্রবেশ ও বাহিরের আঁকাবাঁকা একটি রাস্তা। প্রতিদিন গুহার দেয়ালের আলোতে দুর্বোধ্য আওয়াজ তুলতে তুলতে ওরা কিছু ছায়াকে চলে যেতে দেখে।
আসলে প্রতিদিন গ্রামের লোকেরা এই পথ দিয়েই কাজকর্মের শেষে নিজেদের কথাবর্তা বলতে বলতে ঘরে ফেরে। এখন যদি হঠাৎ একদিন কোনো আগন্তুক এসে ঐ বন্দিদের মধ্য থেকে একজনকে টেনে-হিঁচড়ে গুহার বাইরে এনে তাকে বাস্তব জগৎ দেখাতে নিয়ে যায়, তবে কেমন হবে? কিছুক্ষণ পর বন্দিটি যখন বাহিরের জগত সম্পর্কে একটা বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা লাভ করবে, সে যখন বুঝতে পারবে যে, ছায়া এবং প্রতিধ্বনিগুলো আসলে কি ছিল, তখন সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাবে। এবার সে নিশ্চয়ই এই নতুন আবিষ্কারটি স¤পর্কে জানাতে তার পুরাতন বন্ধুদের কাছে ফিরে যাবে? কিন্তু গুহার অন্য বন্দিরা তাদের এই পুরাতন সাথীটির কথা বিশ্বাস করবে কি? কারণ, তাদের কাছে বিশাল বিশাল ছায়াগুলো হচ্ছে-দৈত্য আর ঈশ্বর। বন্দিদের কাছে ছায়া এবং দুর্বোধ্য প্রতিধ্বনিই বাস্তব। জন্ম থেকে যা দেখে আসছে, যা শুনে আসছে, যা কল্পনা করে আসছে, ওদের কাছে তা-ই সত্য।
আর পুরো ঘটনায় হঠাৎ মুক্তি পাওয়া মানুষটির এখন কি হবে? সে যেহেতু অন্যদের মুক্ত করতে অক্ষম, তার জানা সত্যটা নিয়ে সে একা একা সারা জীবন কটিয়ে দেয় এবং সে চাইলেও তার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে না। ভিডিও লিংক-মড়ড়.মষ/ুত৬উিঐ এরকম দার্শনিক চিন্তক ছিলেন প্লেটো। এই প্লেটোর ছাত্র ছিলেন এরিস্টটল। তবে এরিস্টটল গুরুর সব কথার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। পিথাগোরাসের মতোই প্লেটো পৃথিবীকে নোংরা মনে করতেন। কিন্তু এরিস্টটল পর্যবেক্ষণে বিশ্বাস করতেন। পর্যবেক্ষণ করে তিনি বুঝতে পারলেন পৃথিবী একটা গোলক। তিনি সম্ভবত খেয়াল করেছিলেন জাহাজ যখন বন্দর ছেড়ে যেতে থাকে তখন তার পালের আগা সবার পরে অদৃশ্য হয়। এরিস্টটলের সুযোগ্য ছাত্র আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট।
৩৩২ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার যখন মিসর দখল করেন। তখন মিসরের ঐশ্বর্যে মুগ্ধ হয়ে আলেকজান্ডার ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ উপকূলে একটা শহর তৈরি করেন, শহরটার নাম হয় আলেকজান্দ্রিয়া। তার মৃত্যুর পর তার সেনাপতি টলেমি আলেকজান্দ্রিয়ায় থেকে মিসর শাসন করতে থাকে। টলেমি রাজবংশের শাসনামলে প্রায় ৩০০ বছর আলেকজান্দ্রিয়া গোটা পৃথিবীর বুদ্ধিবৃত্তিক রাজধানী ছিল। মজার ব্যাপার হলোÑ এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্বের প্রথম গ্রন্থাগার। এই গ্রন্থাগারে আজকের মতো বই ছিল না। তখন লেখা হতো প্যাপিরাস পাতায়, প্যাপিরাসের স্ক্রলগুলো গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত থাকত। অনেকে বলেন, প্রায় ১০ লক্ষ প্যাপিরাস স্ক্রল ছিল এই গ্রন্থাগারে যার সবগুলোই আজ হারিয়ে গেছে। এই গ্রন্থাগারেরই একটা অবিস্মরণীয় বই ছিল, যার লেখক আয়োনিয়ার সামোস দ্বীপের এরিস্টার্কাস। ফিলোলাউসের চেয়ে একধাপ এগিয়ে তিনি বলেছিলেন, সূর্যই মহাবিশ্বের কেন্দ্রে আর পৃথিবীসহ সব জ্যোতিষ্ক তাকে কেন্দ্র করে আবর্তন করছে। সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক বড়। আর একটা বড় বস্তু কেন একটা ছোট বস্তুর চারদিকে আবর্তন করবে তা তার মাথায় ঢুকছিল না। তিনি এটাও বুঝতে পেরেছিলেন যে অন্যান্য তারাগুলো আমাদের থেকে অনেক অনেক দূরে।
এক সময় আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের গ্রন্থাগারিক ছিলেন এরাটোস্থেনিস। তিনি গ্রন্থাগারের একটা বইয়ে হঠাৎ পড়েন, মিসরের সায়িন নামক স্থানে বছরের দীর্ঘতম দিনের ঠিক ভরদুপুরে কোনো বস্তুর ছায়া পড়ে না। তিনি আরও অবাক হলেন এই দেখে যে, সেই দিনের ঠিক একই সময়ে আলেকজান্দ্রিয়াতে ছায়া পড়ে। এই পর্যবেক্ষণ থেকে এবং আলেকজান্দ্রিয়া থেকে সায়িনের দূরত্ব পরিমাপের মাধ্যমে তিনি পুরো পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করে ফেলেন। তিনি পরিধি পেয়েছিলেন ৪০,০০০ কিলোমিটার যা আসল মানের খুবই কাছাকাছি। এছাড়া এরাটোস্থেনিসকে ভূগোলের জনক বলা হয়।
তিনি পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব নির্ণয়ের চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি পৃথিবী যে অক্ষের চারদিকে ঘুরে তার নতির পরিমাণ নির্ণয়ের চেষ্টাও করেছিলেন। আলেকজান্দ্রিয়ার এই গ্রন্থাগার কেবল গ্রন্থাগারই ছিল না, এখানে স্থাপিত হয়েছিল পৃথিবীর প্রথম বৈজ্ঞানিক ও গাণিতিক গবেষণাগার। এখানে কাজ করতেন ‘হিপ্পার্কাস’ যাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা জ্যোতিষ্ক পর্যবেক্ষক বলা হয়। তিনিই আকাশের তারাগুলোকে আপাত উজ্জ্বলতার উপর ভিত্তি করে তিনি বিভিন্ন মান দেন। ত্রিকোণমিতির উন্নতি সাধন করেন, জ্যোতির্বিদ্যার হিসাব-নিকাশে ত্রিকোণমিতিক ছক ব্যবহার করেন। সূর্য গ্রহণের প্রথম নির্ভরযোগ্য ভবিষ্যদ্বাণী করেন। ইউরোপের প্রথম পরিপূর্ণ তারা তালিকা প্রণয়ন করেন। এছাড়া তিনি পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের অগ্রগমন আবিষ্কার করেছিলেন। দুঃখের কথা হলো- রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার আলেকজান্দ্রিয়া দখল নেয়ার জন্য শহর জ্বালিয়ে দেন যে আগুনে গ্রন্থাগারটিও পুড়ে যায়।
যিশু খ্রিষ্টের জন্মের ৯০ বছর পর। টলেমি একটা বিখ্যাত বই লিখেন, যা জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী বইগুলোর একটি, নাম আলমাজেস্ট। এই বইয়ে এরিস্টার্কাসের বদলে এরিস্টটলের ভূকেন্দ্রিক মতবাদ পূর্ণতা পায়। এই টলেমির কারণে ‘পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র’ এই কথাটা অনেকটা ধ্রুব সত্যে পরিণত হয়। তিনি মহাবিশ্বের একটা বিস্তৃত ভূকেন্দ্রিক মডেল তৈরি করেন। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব তিনি বলেছিলেন পৃথিবীর ব্যাসের ১২১০ গুণ, আর তারাদের দূরত্ব ২০ হাজার গুণ।
খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসীরা প্লেটো, এরিস্টটল এবং টলেমির মতবাদ পুরোপুরি গ্রহণ করে। এই তিনজন পরিণত হন খ্রিস্টান চার্চ শাসিত পশ্চিমা বিশ্বের তিন পথপ্রদর্শকে। কিন্তু এতে করে বিজ্ঞান পিছিয়ে যায় ১৫০০ বছর। তখন ইউরোপ অন্ধকার যুগে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে। এরিস্টটলের পরবর্তী সময়কে বলা হয় জ্ঞানের জন্য অন্ধকার যুগ। এরিস্টটল এতই বড় হয়ে উঠেছিলেন যে, তার সমালোচনা বা তার চাইতে অধিক জ্ঞান অর্জনকে ধর্মবিরোধী বা বিজ্ঞানবিরোধী বলা শুরু হয়ে গেল। যার ফলে পৃথিবী আর আগাল না, থমকে গেল জ্ঞান-বিজ্ঞান। এরিস্টটলকে এবং এরিস্টটলের তত্ত্ব নিয়েই সব জ্ঞানী ভাবতে লাগলেন বছরের পর বছর ধরে, নতুন কোনো জ্ঞান আসলো না, নতুন কোনো চিন্তা আসলো না। যখনই নতুন কোনো চিন্তা আসল, সবাই এরিস্টটলের তত্ত্বের সঙ্গে তা মেলে কিনা হিসাব করতে বসে গেল। মিলে গেলে ভালো কথা, কিন্তু যখনই এরিস্টটলের তত্ত্বে¡র সঙ্গে কোনো তত্ত্ব¡ বিন্দুমাত্র দ্বিমত পোষণ করল, তার আর রক্ষা নাই, তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেয়া হলো বা পুড়িয়ে মারা হলো। যেমনÑ কোপানির্কাস, গ্যালিলিও, ব্রনো আরো অনেকে।
এভাবে প্রায় দেড় হাজার বছর এরিস্টটলের ভূত মানুষের মাথায় ভর করেছিল। যার জন্য মানব সভ্যতার দেড় হাজার বছর জ্ঞান বিজ্ঞানে কোনো উন্নতি হয়নি। মানুষের বিশাল সম্ভাবনা নষ্ট হলো শুধু একজন বিশাল মাপের পণ্ডিতের জন্য। তাই অনেকেই মনে করেন, এরিস্টটল না জন্মালেই হয়তো জ্ঞান-বিজ্ঞানে মানুষ আরও অনেক এগিয়ে যেত।
আমাদের বর্তমান বিশ্বের ধর্মগুলোর প্রচারকগণ নতুন ধর্ম নিয়ে এসে পৃথিবীকে বদলে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার মূর্খ অনুসারীরা তার বক্তব্য বলবত রাখতে পরবর্তী চিন্তাবিদদের হত্যা করছে, যারা আরও ভালো জ্ঞান, বক্তব্য, চিন্তা দিতে চেয়েছিলÑ সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিল। যেমনÑ ষোড়শ শতকে সুইজারল্যান্ডের বেলেস বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ফিলিপ্রাস প্যারাসেলসাস ঘোষণা করলেনÑ মানুষের অসুস্থতার কারণ কোনো পাপ বা অশুভশক্তি নয়, রোগের কারণ হলো জীবাণু। এই জীবাণু মারতে পারলেই মানুষটি সুস্থ হয়ে যাবে। এই কথা শুনে খ্রিস্টানরা ক্ষেপে উঠল। প্যারাসেলসাসকে বিচারের মুখোমুখি করে মৃতুদণ্ড দিল। প্রাণ বাঁচাতে প্যারাসেলসাসকে মাতৃভূমি ছেড়ে পালাতে হলো। মুসলিমরাও কম নয়। ইবনে খালিদ, জিরহাম, আল দিমিস্কি, ওমর খৈয়াম, ইবনে সিনা, ইবনে বাজা, আল কিন্দি, আল রাজি, কিংবা ইবনে রুশদের মতো দার্শনিকদের সবাই মুসলিম মৌলবাদীদের হাতে নির্যাতিত বা নিহত হয়েছিলেন। যার কারণে সভ্যতা স্থবির হয়ে গেল, জ্ঞান-বিজ্ঞান মুখ থুবড়ে পড়েছিল।