কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
মুতাজিলা মতবাদ
উগ্রপন্থার বিপরীতে আছে মুতাজিলা। এরা ইসলামি ধর্মতত্ত্বের একটি শাখা গোষ্টি। জীবন-যাপনের সবকিছু এরা যুক্তি আলোচনার উপর প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বসরা শহরে অষ্টম শতাব্দীতে মোতাজিলা মতবাদের সূচনা হয়। মুসলমানদের পাপ ও শাস্তি নিয়ে ইমাম হাসান আল বসরির সাথে তার ছাত্র ওয়াসিল ইবনে আতারের মতবিরোধ হয়। ওয়াসিল ও তার অনুসারীরা আল হাসানের শিক্ষায়তন পরিত্যাগ করে বলেই তাঁরা মোতাজিলি নামে অভিহিত হন। মোতাজিলি শব্দের অর্থ হচ্ছে পরিত্যাগ করা। ৮ম থেকে ১০ শতাব্দীতে বসরা ও বাগদাদে মুতাজিলা মতবাদের প্রাধান্য ছিল। আব্বাসীয় যুগে এই মতবাদ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
মোতাজিলারা ছিলেন মূলত দার্শনিক। মুতাজিলারা শূণ্য থেকে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন। তারা আরব দার্শনিক বলে পরিচিত আল কিন্দির তথ্য ‘শূন্য থেকে সৃষ্টি’ তত্ত্বটি সত্য বলে বিশ্বাস করেন। আরবিতে গ্রিক দর্শন অনুবাদে আল কিন্দির বড় ভুমিকা ছিল। আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন মোতাজিলা মতবাদ গ্রহণ করেন। মোতাজিলাদের মতো খলিফাও বিশ্বাস করেন যে, কোরান শরীফ আসলে সৃষ্টি এবং এতে কিছু যুদ্ধের কাহিনী আছে মাত্র। এই বিশ্বাসে তিনি তার মতবাদকে সরকারী নীতি হিসাবে জনসাধারণকে গ্রহণ করতে বাধ্য করেন। অনেকে এই মতবাদ গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। এর ফলে অসংখ্য মানুষ কারারুদ্ধ হন; শাস্তি ভোগ করেন। অনেকে প্রাণ হারান। এই ঘটনা মুসলিম ইনকুইজিশন মিনহা বলে পরিচিত। জনসাধারণের বিরোধিতার মুখে খলিফা আল মুতাওয়াকিলের রাজত্বকালে মিনহা বন্ধ করে দেয়া হয়।
মুতাজিলা দার্শনিকেরা প্রাচীন গ্রিক যুক্তিবাদী দর্শন, বিশেষ করে অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ধর্মবিশ্বাসকে কীভাবে যুক্তির সঙ্গে সমন্বিত করা যায়, এই চিরন্তন প্রশ্নটির উত্তর অনুসন্ধান ছিলো তাঁদের লক্ষ্য। কিন্তু‘ ইসলামের গোঁড়া সমর্থকদের তীব্র বিরোধিতার মুখে চিন্তার ক্ষেত্রে এই দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা সফল হতে পারেনি। তা সত্ত্বেও এই ধারা একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, উনিশ শতকের উদারনৈতিক পরিবেশে এই যুক্তিবাদী ধারাটি যেনো পরিপূর্ণতা লাভ করেছিলো। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে যখন পাশ্চাত্য সভ্যতার উদার যুক্তিবাদী ধারার উন্মেষ ঘটেছিলো, সেই যুগে ১৭৮৫ সালে উত্তর ভারতের গোরাখপুর শহরে এক তাঁতি পরিবারে জন্ম হয় আবদুল রহীমের। তিনি লক্ষেèৗ ও দিল্লির প্রখ্যাত মাদ্রাসায় শিক্ষালাভ করে আরবি এবং ফারসি ভাষায় অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী হন। আবদুল রহীম ধর্মের গোঁড়ামি পরিহার করে একজন মুক্তমনা যুক্তিবাদী মানুষে পরিণত হন। ফলে মুতাজিলা দার্শনিকদের যুক্তিবাদী চিন্তার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। ১৮১০ সাল নাগাদ আবদুল রহীম কলকাতায় এসে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেন এবং এখানে ১৮৫৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। কলকাতার মুক্ত পরিবেশে আবদুল রহীমকে কেন্দ্র করে এক বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী গড়ে ওঠে।
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মুতাজিলার সমর্থক হিসেবে আমরা উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮) ও বাংলার সৈয়দ আমির আলীকে (১৮৪৯-১৯২৮) দেখতে পাই। তাঁরা উভয়ই সমকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে এবং যুগের প্রয়োজনে ইসলামকে পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। আরেকজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন দেলওয়ার হোসেন আহমদ (১৮৪০-১৯১৫), তাঁর নিবাস ছিলো হুগলি জেলায়। তিনি ১৮৬১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে বিএ পাস করেন। খুব সম্ভব তিনিই উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট। দেলওয়ার হোসেনের চিন্তাধারা ছিল তাঁর সমসাময়িক অন্য মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগামী। দেলওয়ার হোসেনই খুব সম্ভব আধুনিক যুগের প্রথম মুসলমান বুদ্ধিজীবী, যিনি বলিষ্ঠ ও পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে মুসলমানদের জাগতিক আইনকে ইসলামি ধর্মীয় বিধান থেকে স¤পূর্ণ পৃথক করাই হলো মুসলমান সমাজের অগ্রগতির পূর্বশর্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন, পরিবর্তনশীল সমাজের চাহিদা অপরিবর্তনশীল ধর্মীয় আইন বা বিধান দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে আবুল হোসেন (১৮৯৬-১৯৩৮), কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭৬), মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩) প্রমুখ কতিপয় বাঙালি মুসলিম বুদ্ধিজীবীর উদ্যোগে ঢাকা শহরে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তাঁদের মূলমন্ত্র ছিলো ‘বুদ্ধির মুক্তি’। বুদ্ধির ও যুক্তির আলোকে এবং সমকালীন যুগের প্রয়োজনের তাগিদে ইসলামের পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্ব্যাখ্যা করাই ছিলো এর প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু‘ তখনকার ঢাকার মুসলমান সমাজের ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর প্রবল প্রতিরোধের মুখে এই আন্দোলন তেমন অগ্রসর হতে পারেনি। তবে এর রেশ একেবারে মিলিয়ে যায়নি। পরবর্তীকালে বেশ কিছুসংখ্যক বুদ্ধিজীবী এটিকে লালন করেছেন এবং আমাদের সময়কালে বাঙালি মুসলিম রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণে এঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
খলিফা আল মামুন-এ শাসনামলে মুতাজিলা মতবাদ চিন্তাশীল ও সংস্কৃতিমনা লোকদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়েছিল। অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে যুক্তি ও বাস্তবতার ভিত্তিতে মানুষের ইচ্ছার পাশাপাশি মানুষের বুদ্ধির পক্ষেও প্রচার চালিয়েছিলেন মুতাজিলায়।
মতবাদটি ইউরোপের স্কলাশটিসিজিম দর্শনের সঙ্গে অনেকেই তুলনা করেছেন। রাজনৈতিকভাবে এই মতবাদের পতন হলেও মুসলমানদের ধর্মতত্ত্ব এবং দর্শনচর্চায় মুতাজিলাদের প্রভাব আজ পর্যন্ত মুছে যায়নি। ধর্মান্ধরা এই মতবাদকে ধর্মদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অনেক প্রসিদ্ধ ইসলামী চিন্তাবিদ বলেছেন, এই মতবাদে এমন কিছু নেই যে, মুতাজিলা মতবাদ ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে যায়। মুতাজিলা মতবাদের পক্ষে স্যার সৈয়দ আমীর আলী তাঁর বিখ্যাত ঞযব ঝঢ়রৎরঃ ড়ভ ওংষধস গ্রন্থে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।
উমাইয়া যুগে মুতাযিলা অনুসারীরা এতটাই অগ্রসর হয়েছিলেন যে, আল কোরআনকে গ্রিক দার্শনিক ঢ়ষধঃড় ও ধৎরংঃড়ঃষব-এর মতাদর্শের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করার প্রয়াস চালিয়েছিলেন। কিন্তু ঈমাম আল গাযযালি ছিলেন একজন সুফি শাস্ত্রজ্ঞ। তাঁর নেতৃত্বেই মুসলিম রক্ষণশীলতার পুনর্জাগরণ ঘটে। মুসলমানরা অলৌকিকভাবে প্রকাশিত বিষয়কে যুক্তির উপরে এবং নিয়তিবাদকে মুক্তচিন্তার উপরে স্থান দেয়। তারা গণিত শাস্ত্রকে ইসলামবিরোধী বলে চিহ্নিত করে, মুতাযিলা অনুসারীদের সঙ্গে আল-গাযযালির মূল দ্বন্দ্বের জায়গাটা ছিল, যা তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শরীয়তই ইসলামের মেরুদণ্ড, যার বিধান অলক্সঘনীয়। ফলে ইমাম আল-গাজ্জালীর প্রভাবে প্রতিক্রিয়াশীল প্রগতিবিমুখ অবস্থার সৃষ্টি হয়, তা আজ ঐতিহাসিকভাবেই সত্য।
অন্যদিকে আর এক সুফি সাধক জালাল উদ্দিন রুমি ছিলেন উদার পন্থী। তিনি ছিলেন ত্রয়োদশ শতকের একজন ফার্সি কবি, ধর্মতাত্ত্বিক এবং সুফি দর্শনের শিক্ষক। তাঁর পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদকে সমসাময়িক বিদ্বানরা ‘পণ্ডিতদের সুলতান’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। ফার্সি সাহিত্যের অন্য মরমী কবিদের মতো রুমিও তার রচনায় একত্ববাদ বা ‘তাওহীদ’বাদকে তুলে ধরেছেন। তার বিশ্বাস সংগীত ও কবিতার মধ্যেও স্রষ্টার মাহাত্ম্য উপলব্ধি করা সম্ভব। বহু ভাষাতেই তার সাহিত্যকর্ম অনূদিত হয়েছে। আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে জালাল উদ্দিন রুমির কবিতার বই ইউরোপ ও আমেরিকায় ব্যাপক সমাদৃত ও জনপ্রিয়, এমন কী তাঁর বই একাধিক বার বেস্ট সেইল তালিকাতেও রয়েছে ইউরোপে।
জ্ঞানচর্চায় ধারাবাহিকতা থাকতে হয়। অন্যথায় অজ্ঞতা দ্রতই দখল করে জ্ঞানের স্থান। একটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। মুসলিমরা যখন সমরখন্দ জয় করে (৭১২ সাল), তখন চাইনিজদের কাছ থেকে তারা কাগজ বানানোর কৌশল শিখেছিলো। এ কৌশল ব্যবহার করে বাগদাদে স্থাপন করা হয়েছিলো কাগজ কারখানা (৭৯৪ সাল)। কে করেছিলো? খলিফা হারুনের উজিরের ছেলে আল-ফজল । এই কাগজ বানানোর কৌশল মুসলিমরা ধীরে ধীরে স্পেন, সিসিলি, ইতালি, ও ফ্রান্সে ছড়ায়। তার আগে ইউরোপে কাগজ ছিলো না। বই বলতে এখন আমরা যা বুঝি, তা মুসলিমরা যাওয়ার আগে ওখানে ছিলো না। অর্থাৎ কাগজ প্রচলন চীনে তা শুরু হয়েছিলো ১০৫ সালে, মক্কায় ৭০৭ সালে, মিশরে ৮০০ সালে, স্পেনে ৯৫০ সালে, সিসিলিতে ১১০২ সালে, ইতালিতে ১১৫৪ সালে, জার্মানিতে ১২২৮ সালে, এবং ইংল্যান্ডে মাত্র ১৩০৯ সালে।
৮৯০-৯৫ সালের দিকে, বাগদাদে একশোর বেশি বইয়ের দোকান ছিলো। তখন হাতে লিখে বই কপি করা হতো, এটা ছিলো খুব জনপ্রিয় পেশা। অধিকাংশ ছাত্ররা এ কাজ করতো। এতে হতো কী, বই কপি করার সময় বইটাও পড়া হয়ে যেতো। ধনী মুসলিমদের প্রধান শখই ছিলো বই সংগ্রহ করা। মোঙ্গলরা যখন বাগদাদ আক্রমণ করে, তখন সেখানে ৩৬টির মতো গণগ্রন্থাগার ছিলো। ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিলো অসংখ্য। এক ধনী আরেক ধনীর সাথে বই সংগ্রহের প্রতিযোগিতা করতো। মসজিদগুলো যতোটা না নামাজের স্থান ছিলো, তার চেয়ে বেশি ছিলো বিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। মসজিদে ঢুকলেই কোনো না কোনো এলাকার ভূগোলবিদ, চিকিৎসক, কবি, ইতিহাসবিদ -এর দেখা মিলতো। দার্শনিক বিতর্ক ছিলো খুবই জনপ্রিয়। কেউ ধনী, কিন্তু শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করেনি, এমনটি মুসলিম সমাজে দেখা যেতো না।