কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
স্তন্যপায়ী প্রাণী
আজ থেকে প্রায় ১৫ কোটি বছর আগে ট্রিয়াসিক উপযুগে একদল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী গর্ভধারণ ও বাচ্চা প্রসব করতে শুরু করে। এই সময়টা ছিল স্তন্যপায়ী জীবের আবির্ভাবকাল। স্তন্যপায়ী জীবেরা প্রকৃতি থেকে দুটি সুবিধা পেয়েছিল। প্রথমত তাদের রক্ত ছিল উষ্ণ, দ্বিতীয়ত তাদের মধ্যে সন্তানবাৎসল্য ছিল, যা অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। উষ্ণ রক্তের অধিকারী হওয়ায় স্তন্যপায়ী জীবেরা প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের অধিক খাপ খাওয়াতে পেরেছিল। সরীসৃপ পর্যন্ত সমস্ত প্রাণীই ডিম পাড়ত। স্তন্যপায়ীরা ডিমের পরিবর্তে বাচ্চা পাড়বার পর তাদের বাচ্চার জন্যে খাবার সংগ্রহ করার হাঙ্গামাটাও রইলো না। কেননা বাচ্চারা তাদের মা-র বুক থেকে দুধ খাবে। আসলে, বাচ্চাদের পক্ষে এইভাবে দুধ খাবার ব্যবস্থা থেকেই এদের নাম হয়েছে স্তন্যপায়ী।
স্তন্যপায়ীদের শাখা-প্রশাখা
আজ থেকে প্রায় ৭ কোটি বছর আগের এয়োসেন উপযুগে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিভিন্ন শাখা ভূপৃষ্ঠের অধিকাংশ অঞ্চলজুড়ে বসবাস শুরু করেছে। বর্তমান যুগের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তুলনায় সে যুগের স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ছিল আকৃতিতে ছোট। যেমনÑ বর্তমান যুগের হাতি, গণ্ডার, ঘোড়া, শূকর ইত্যাদি প্রাণীদের আদিপুরুষ ছিল ফেনাডোকাস নামে একটি স্তন্যপায়ী জীব। এরা আকৃতিতে শেয়ালের চেয়ে বড় ছিল না। স্তন্যপায়ী অন্য একটি শাখার নাম ছিল ক্রিয়োডোন্ট। এরা ছিল হিংস্র ও মাংসাশী প্রাণী। কালের পরিক্রমায় এরা আবার দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এদের একদলের চেহারা ছিল কুকুরের মতো। এই দলের ক্রমবিবর্তনে নেকড়ে ভালুক, কুকুর ইত্যাদি প্রাণীর জন্ম হয়েছে। অন্যদলের চেহারা ছিল বিড়াল আকৃতির। এদের ক্রমবিবর্তনে বাঘ, সিংহ, বিড়াল ইত্যাদি প্রাণীর আবির্ভাব হয়েছে। যেসব চতুষ্পদ জন্তু খাবার গ্রহণের জন্য থাবা ব্যবহার করে না, তাদের মুখমণ্ডল হয় লম্বাটে। যথাÑ শিয়াল, কুকুর, গরু, ঘোড়া ইত্যাদি। আর যেসব প্রাণী খাবার গ্রহণের জন্য থাবা ব্যবহার করে তাদের মুখমণ্ডল হয় প্রায় গোলাকৃতির। যথাÑ বাঘ, সিংহ, বিড়াল ইত্যাদি। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এক প্রকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী ছিল। এরা গাছে চড়তে পারত ও ডালে ডালে বিচরণ করত। ঐ যুগের সব স্তন্যপায়ী প্রাণী আজ আর বেঁচে নেই। এদের কোনো কোনো দল বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, আবার কোনো কোনো নতুন দলের আবির্ভাব হয়েছে। এরা বর্তমান পর্যায়ে আসতে ৭ কোটি বছর লেগেছে।
জীবদেহে পরিবর্তন কেন হয়?
এই যে একদল বিলুপ্ত হয়েছে আবার কোনো নতুন দলের আবির্ভাব হয়েছে। এই পরিবর্তন কেন হয়? কেন এক জাতের প্রাণী বদলাতে বদলাতে অন্য জাতের প্রাণী হয়ে যায়? এই প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করলেন একজন ফরাসি বৈজ্ঞানিক। তাঁর নাম লামার্ক। লামার্ক বললেন, এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে শরীরের অঙ্গের ব্যবহার আর অ-ব্যবহার। কোনো একদল প্রাণী যদি তাদের শরীরের কোনো একটি অঙ্গ বেশি ব্যবহার করে, তাহলে ওই অঙ্গের বৃদ্ধি পেয়ে চলবে এবং এইভাবে একটি অঙ্গ বৃদ্ধি পেতে পেতে শেষ পর্যন্ত তাদের শরীরের চেহারাটাই সম্পূর্ণ বদলে যাবে। অপরপক্ষে তারা যদি শরীরের কোনো একটি অঙ্গের ব্যবহার না করে, তাহলে তাদের বংশধরদের শরীর থেকে ওই অঙ্গটি একেবারে মুছে যাবে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। পাখিদের পূর্বপুরুষরা সামনের পা-জোড়াকে ক্রমাগতই উড়বার চেষ্টায় ব্যবহার করতে শুরু করেছিল আর শেষ পর্যন্ত তাই এই পা-জোড়া বদলে গিয়ে পাখির ডানা হয়ে গেল।
সাপের পূর্বপুরুষরা তাদের পাগুলোকে ব্যবহার করার চেষ্টা বন্ধ করল আর তাই শেষ পর্যন্ত সাপদের শরীর থেকে মুছে গেল পায়ের চিহ্ন। জিরাফের গলাটা অমন প্রকাণ্ড লম্বা হলো কেন? কেননা, তাদের পূর্বপুরুষরা ক্রমাগতই গাছের উঁচু ডালের কচি পাতা খাবার লোভে গলাটা এগিয়ে দেবার চেষ্টা করে চলেছিল।
পায়ের ব্যায়াম করলে পা বলিষ্ঠ হয়, হাতের ব্যায়াম করলে হাত সবল হয়Ñ এ ধরনের ঘটনা তো আমরা হামেশাই দেখছি। লামার্কও তা দেখেছিলেন। এইভাবে ব্যায়াম বা ব্যবহারের ফলে একজনের অঙ্গে যে পরিবর্তন দেখা দিলো, সে পরিবর্তন কি তার সন্তানদের মধ্যেও আপনা-আপনিই সঞ্চারিত হবে? আমি ব্যায়াম করে বুকের পাটা বিয়াল্লিশ ইঞ্চি করে ফেললাম; কিন্তু তার মানে কি এই, যে আমার ছেলেরও বুকের পাটা বিয়াল্লিশ ইঞ্চি হবে। আসলে, প্রাণীর দেহে দু-রকম লক্ষণ আছে। এক জন্মগত। দুই অর্জিত। জন্মগত লক্ষণগুলো বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হয়। তাই মানুষের ছেলেপুলেরা মানুষের মতো দেখতে, হাতির বাচ্চারা হাতির মতো দেখতে।
ব্যবহার আর অব্যবহারের ফলে প্রাণীর অঙ্গে যে পরিবর্তন দেখা দেয় তা জন্মগত নয়, এই পরিবর্তনের চিহ্ন নিয়েই প্রাণীর সন্তানেরা জন্মগ্রহণ করবে আর তারপর তাদের নিজেদের ব্যবহার-অব্যবহারের ফলে পরিবর্তনটাকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। তারপর? তারপর তাদের যে সন্তানেরা জন্মাবে তারা জন্মাবে এই মোট দু-ধাপ পরিবর্তনের চিহ্ন নিয়েই এবং নিজেদের চেষ্টায় তারা পরিবর্তনটাকে যেন আরো একধাপ বাড়িয়ে দেবে। আবার তাদের সন্তানরা জন্মাবে এই তিন-ধাপ পরিবর্তন নিয়ে; তারপর নিজেদের চেষ্টায় তারা যেন পরিবর্তনটিকে চতুর্থ ধাপে পৌঁছে দিবে। এইভাবে বদল চলতে-চলতে শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে,পূর্বপুরুষদের অঙ্গটি একেবারে বদলে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অঙ্গ দেখা দিলো।
চার্লস ডারউইন ইংরেজ বৈজ্ঞানিক। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হলো তাঁর যুগান্তকারী বই; ‘দি অরিজিন্ অব্ স্পিসিস্ বাই ন্যাচারাল সিলেক্শন্’। এই বইতে ডারউইন প্রাণিজগতে ক্রমবিকাশের একটা ব্যাখ্যা দিলেন। ব্যাখ্যাটি দেবার জন্যে ডারউইন একটানা আটাশ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। নানা দেশ, নানা দ্বীপ ঘুরে তিনি রাশি রাশি তথ্য যোগাড় করেছিলেন, আর অত্যন্ত কঠোর নিষ্ঠার সঙ্গে এত তথ্যকে বোঝাবার, গোছাবার, ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। ডারউইন তাঁর মতটির নাম দিয়েছিলেন, ন্যাচারাল্ সিলেক্শন, বাংলা করলে দাঁড়ায় প্রাকৃতিক নির্বাচন। মতটির আলোচনায় একে একে কয়েকটি কথা ভালো করে বোঝা দরকার।
এক : জীবজন্তুর যতগুলো বাচ্চা শেষ পর্যন্ত বাঁচে তার চেয়ে ঢের ঢের বেশি বাচ্চার জন্ম হয়। একজোড়া ব্যাঙ যতগুলো ডিম সে পাড়লো তার সবগুলো ফুটে যদি ব্যাঙাচি বেরুতো, আর প্রতিটি ব্যাঙাচিই যদি বড় হতে পারত, আর বড় হয়ে যদি প্রত্যেকেই নতুন বংশের ব্যাঙদের জন্ম দিতে পারত, তাহলে পাঁচ পুরুষ পরে ওই একজোড়া ব্যাঙের বংশধরদের মোট সংখ্যা হতো ৫২০০০০০০০০০০০০! পৃথিবীতে কত জোড়া ব্যাঙ আছে? তাদের সবারই যদি এই হারে বংশ বেড়ে যায়, তাহলে কি এক হাজার বছরের মধ্যে পৃথিবীতে শুধু ব্যাঙ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর পক্ষে থাকার জায়গা হবে? ব্যাঙদের বেলাতে যে কথা, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর বেলাতে সেই কথা। কোনো কোনো মাছের বেলায় দেখা যায়, একটি মাছ একসঙ্গে লক্ষ লক্ষ ডিম পাড়ছে। সমস্ত ডিম ফুটেই যদি বাচ্চা বেরুতো আর সব বাচ্চাই যদি বেঁচে থাকতো, আর ওই হারে বংশবৃদ্ধি করতো, তাহলে কিছু বছরের মধ্যেই ওই মাছের বংশ ছাড়া সমুদ্রের মধ্যে আর তিল ধারণের জায়গা থাকতো না! প্রত্যেক প্রাণীর বেলাতেই দেখা যায়, যতগুলি সন্তান বাঁচতে পারবে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি সন্তানের জন্ম হচ্ছে।
দুই : বাঁচবার জন্যে সংগ্রামের প্রয়োজন। একটি প্রাণীর যত বাচ্চা হলো তার মধ্যে বেশিরভাগই মরে যায়, বেঁচে থাকে মাত্র সামান্য কয়েকটি। এমন কেন হয়? তার কারণ, বাঁচতে পারাটা খুব সহজ ব্যাপার নয়। বাঁচতে গেলে খাদ্য চাই, বায়ু চাই, আলো চাই, উপযুক্ত উত্তাপ চাই, শক্রর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারা চাই, অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টির মতো নানারকম প্রাকৃতিক দুর্ঘটনার সঙ্গে লড়তে পারা চাই। অর্থাৎ বাঁচতে গেলে প্রতিপদেই সংগ্রাম করতে হবে।
ডারউইনের তৃতীয় কথা, প্রার্থক্যের কথা। একই প্রাণীর বিভিন্ন সন্তানদের মধ্যে পার্থক্য থাকে। ধরা যাক, একটা কুকুরের পাঁচটা বাচ্চা হলো। এই পাঁচটি বাচ্চাই কি একেবারে হুবহু এক রকমের হবে? নিশ্চয়ই নয়। এমনকি, দুটি বাচ্চাই একেবারে হুবহু এক রকমের নয়। একই জাতের অনেকগুলো গাছকে আমরা যদি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করি তাহলে দেখবো প্রত্যেকটিরই স্বাতন্ত্র্য আছে; একই জাতের অনেক জানোয়ারকে আমরা যদি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করি, তাহলে দেখবো প্রতিটিই অন্যগুলো থেকে কোনো না কোনো দিক থেকে স্বতন্ত্র। এই পার্থক্যের পরিচয় হয়তো সাধারণত আমাদের চোখে পড়তে চায় না। কিন্তুু আমরা যদি ডারউইনের মতো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে রাজি হই, তাহলে তা নিশ্চয়ই আমাদেরও চোখে পড়বে।
ডারউইনের চতুর্থ কথা হলো, সমস্ত প্রাণীই পারিপার্শি¦কের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াবার চেষ্টা করে। তুষার অঞ্চলের গাছ-গাছড়া আর জীবজন্তু ক্রমাগতই চেষ্টা করে চলেছে হিমশীতল অবস্থার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে, জলাভূমির জীবেরা ক্রমাগতই চেষ্টা করে চলেছে ওই জলা-জায়গার কম-বেশি পানির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে, রুক্ষ মরুভূমির জীবেরাও চেষ্টা করে চলেছে সেই অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে। আশপাশের অবস্থার সঙ্গে এই খাপ খাইয়ে নেবার চেষ্টা হচ্ছে জীবন-সংগ্রামেরই একটা দিক। এইবার, ডারউইনের সবকটি কথা একসঙ্গে মিলিয়ে ভাবতে পারলে আমরা একটি প্রশ্নের জবাব পাবো। যত প্রাণীর জন্ম হয় তার মধ্যে মাত্র মুষ্টিমেয় বাঁচতে পারে, বাকি সকলেই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, যারা বাঁচে তারা কী করে বাঁচে? যারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তারা কেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়? যারা জীবন-সংগ্রামে জয়ী হয়, শুধু তারাই বাঁচে; যারা হেরে যায় তারা নিশ্চিহ্ন হয়। কিন্তু, কারা জয়ী হয়? যারা আশপাশের অবস্থার সঙ্গে নিজেদের ঠিকমতো খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তারই জয়ী হয়; যারা পারে না, তারা বাঁচে না।স্তন্যপায়ী প্রাণী
আজ থেকে প্রায় ১৫ কোটি বছর আগে ট্রিয়াসিক উপযুগে একদল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী গর্ভধারণ ও বাচ্চা প্রসব করতে শুরু করে। এই সময়টা ছিল স্তন্যপায়ী জীবের আবির্ভাবকাল। স্তন্যপায়ী জীবেরা প্রকৃতি থেকে দুটি সুবিধা পেয়েছিল। প্রথমত তাদের রক্ত ছিল উষ্ণ, দ্বিতীয়ত তাদের মধ্যে সন্তানবাৎসল্য ছিল, যা অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। উষ্ণ রক্তের অধিকারী হওয়ায় স্তন্যপায়ী জীবেরা প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের অধিক খাপ খাওয়াতে পেরেছিল। সরীসৃপ পর্যন্ত সমস্ত প্রাণীই ডিম পাড়ত। স্তন্যপায়ীরা ডিমের পরিবর্তে বাচ্চা পাড়বার পর তাদের বাচ্চার জন্যে খাবার সংগ্রহ করার হাঙ্গামাটাও রইলো না। কেননা বাচ্চারা তাদের মা-র বুক থেকে দুধ খাবে। আসলে, বাচ্চাদের পক্ষে এইভাবে দুধ খাবার ব্যবস্থা থেকেই এদের নাম হয়েছে স্তন্যপায়ী।
স্তন্যপায়ীদের শাখা-প্রশাখা
আজ থেকে প্রায় ৭ কোটি বছর আগের এয়োসেন উপযুগে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিভিন্ন শাখা ভূপৃষ্ঠের অধিকাংশ অঞ্চলজুড়ে বসবাস শুরু করেছে। বর্তমান যুগের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তুলনায় সে যুগের স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ছিল আকৃতিতে ছোট। যেমনÑ বর্তমান যুগের হাতি, গণ্ডার, ঘোড়া, শূকর ইত্যাদি প্রাণীদের আদিপুরুষ ছিল ফেনাডোকাস নামে একটি স্তন্যপায়ী জীব। এরা আকৃতিতে শেয়ালের চেয়ে বড় ছিল না। স্তন্যপায়ী অন্য একটি শাখার নাম ছিল ক্রিয়োডোন্ট। এরা ছিল হিংস্র ও মাংসাশী প্রাণী। কালের পরিক্রমায় এরা আবার দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এদের একদলের চেহারা ছিল কুকুরের মতো। এই দলের ক্রমবিবর্তনে নেকড়ে ভালুক, কুকুর ইত্যাদি প্রাণীর জন্ম হয়েছে। অন্যদলের চেহারা ছিল বিড়াল আকৃতির। এদের ক্রমবিবর্তনে বাঘ, সিংহ, বিড়াল ইত্যাদি প্রাণীর আবির্ভাব হয়েছে। যেসব চতুষ্পদ জন্তু খাবার গ্রহণের জন্য থাবা ব্যবহার করে না, তাদের মুখমণ্ডল হয় লম্বাটে। যথাÑ শিয়াল, কুকুর, গরু, ঘোড়া ইত্যাদি। আর যেসব প্রাণী খাবার গ্রহণের জন্য থাবা ব্যবহার করে তাদের মুখমণ্ডল হয় প্রায় গোলাকৃতির। যথাÑ বাঘ, সিংহ, বিড়াল ইত্যাদি। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এক প্রকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাণী ছিল। এরা গাছে চড়তে পারত ও ডালে ডালে বিচরণ করত। ঐ যুগের সব স্তন্যপায়ী প্রাণী আজ আর বেঁচে নেই। এদের কোনো কোনো দল বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, আবার কোনো কোনো নতুন দলের আবির্ভাব হয়েছে। এরা বর্তমান পর্যায়ে আসতে ৭ কোটি বছর লেগেছে।
জীবদেহে পরিবর্তন কেন হয়?
এই যে একদল বিলুপ্ত হয়েছে আবার কোনো নতুন দলের আবির্ভাব হয়েছে। এই পরিবর্তন কেন হয়? কেন এক জাতের প্রাণী বদলাতে বদলাতে অন্য জাতের প্রাণী হয়ে যায়? এই প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করলেন একজন ফরাসি বৈজ্ঞানিক। তাঁর নাম লামার্ক। লামার্ক বললেন, এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে শরীরের অঙ্গের ব্যবহার আর অ-ব্যবহার। কোনো একদল প্রাণী যদি তাদের শরীরের কোনো একটি অঙ্গ বেশি ব্যবহার করে, তাহলে ওই অঙ্গের বৃদ্ধি পেয়ে চলবে এবং এইভাবে একটি অঙ্গ বৃদ্ধি পেতে পেতে শেষ পর্যন্ত তাদের শরীরের চেহারাটাই সম্পূর্ণ বদলে যাবে। অপরপক্ষে তারা যদি শরীরের কোনো একটি অঙ্গের ব্যবহার না করে, তাহলে তাদের বংশধরদের শরীর থেকে ওই অঙ্গটি একেবারে মুছে যাবে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। পাখিদের পূর্বপুরুষরা সামনের পা-জোড়াকে ক্রমাগতই উড়বার চেষ্টায় ব্যবহার করতে শুরু করেছিল আর শেষ পর্যন্ত তাই এই পা-জোড়া বদলে গিয়ে পাখির ডানা হয়ে গেল।
সাপের পূর্বপুরুষরা তাদের পাগুলোকে ব্যবহার করার চেষ্টা বন্ধ করল আর তাই শেষ পর্যন্ত সাপদের শরীর থেকে মুছে গেল পায়ের চিহ্ন। জিরাফের গলাটা অমন প্রকাণ্ড লম্বা হলো কেন? কেননা, তাদের পূর্বপুরুষরা ক্রমাগতই গাছের উঁচু ডালের কচি পাতা খাবার লোভে গলাটা এগিয়ে দেবার চেষ্টা করে চলেছিল।
পায়ের ব্যায়াম করলে পা বলিষ্ঠ হয়, হাতের ব্যায়াম করলে হাত সবল হয়Ñ এ ধরনের ঘটনা তো আমরা হামেশাই দেখছি। লামার্কও তা দেখেছিলেন। এইভাবে ব্যায়াম বা ব্যবহারের ফলে একজনের অঙ্গে যে পরিবর্তন দেখা দিলো, সে পরিবর্তন কি তার সন্তানদের মধ্যেও আপনা-আপনিই সঞ্চারিত হবে? আমি ব্যায়াম করে বুকের পাটা বিয়াল্লিশ ইঞ্চি করে ফেললাম; কিন্তু তার মানে কি এই, যে আমার ছেলেরও বুকের পাটা বিয়াল্লিশ ইঞ্চি হবে। আসলে, প্রাণীর দেহে দু-রকম লক্ষণ আছে। এক জন্মগত। দুই অর্জিত। জন্মগত লক্ষণগুলো বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হয়। তাই মানুষের ছেলেপুলেরা মানুষের মতো দেখতে, হাতির বাচ্চারা হাতির মতো দেখতে।
ব্যবহার আর অব্যবহারের ফলে প্রাণীর অঙ্গে যে পরিবর্তন দেখা দেয় তা জন্মগত নয়, এই পরিবর্তনের চিহ্ন নিয়েই প্রাণীর সন্তানেরা জন্মগ্রহণ করবে আর তারপর তাদের নিজেদের ব্যবহার-অব্যবহারের ফলে পরিবর্তনটাকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। তারপর? তারপর তাদের যে সন্তানেরা জন্মাবে তারা জন্মাবে এই মোট দু-ধাপ পরিবর্তনের চিহ্ন নিয়েই এবং নিজেদের চেষ্টায় তারা পরিবর্তনটাকে যেন আরো একধাপ বাড়িয়ে দেবে। আবার তাদের সন্তানরা জন্মাবে এই তিন-ধাপ পরিবর্তন নিয়ে; তারপর নিজেদের চেষ্টায় তারা যেন পরিবর্তনটিকে চতুর্থ ধাপে পৌঁছে দিবে। এইভাবে বদল চলতে-চলতে শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে,পূর্বপুরুষদের অঙ্গটি একেবারে বদলে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের অঙ্গ দেখা দিলো।
চার্লস ডারউইন ইংরেজ বৈজ্ঞানিক। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হলো তাঁর যুগান্তকারী বই; ‘দি অরিজিন্ অব্ স্পিসিস্ বাই ন্যাচারাল সিলেক্শন্’। এই বইতে ডারউইন প্রাণিজগতে ক্রমবিকাশের একটা ব্যাখ্যা দিলেন। ব্যাখ্যাটি দেবার জন্যে ডারউইন একটানা আটাশ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। নানা দেশ, নানা দ্বীপ ঘুরে তিনি রাশি রাশি তথ্য যোগাড় করেছিলেন, আর অত্যন্ত কঠোর নিষ্ঠার সঙ্গে এত তথ্যকে বোঝাবার, গোছাবার, ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। ডারউইন তাঁর মতটির নাম দিয়েছিলেন, ন্যাচারাল্ সিলেক্শন, বাংলা করলে দাঁড়ায় প্রাকৃতিক নির্বাচন। মতটির আলোচনায় একে একে কয়েকটি কথা ভালো করে বোঝা দরকার।
এক : জীবজন্তুর যতগুলো বাচ্চা শেষ পর্যন্ত বাঁচে তার চেয়ে ঢের ঢের বেশি বাচ্চার জন্ম হয়। একজোড়া ব্যাঙ যতগুলো ডিম সে পাড়লো তার সবগুলো ফুটে যদি ব্যাঙাচি বেরুতো, আর প্রতিটি ব্যাঙাচিই যদি বড় হতে পারত, আর বড় হয়ে যদি প্রত্যেকেই নতুন বংশের ব্যাঙদের জন্ম দিতে পারত, তাহলে পাঁচ পুরুষ পরে ওই একজোড়া ব্যাঙের বংশধরদের মোট সংখ্যা হতো ৫২০০০০০০০০০০০০! পৃথিবীতে কত জোড়া ব্যাঙ আছে? তাদের সবারই যদি এই হারে বংশ বেড়ে যায়, তাহলে কি এক হাজার বছরের মধ্যে পৃথিবীতে শুধু ব্যাঙ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর পক্ষে থাকার জায়গা হবে? ব্যাঙদের বেলাতে যে কথা, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর বেলাতে সেই কথা। কোনো কোনো মাছের বেলায় দেখা যায়, একটি মাছ একসঙ্গে লক্ষ লক্ষ ডিম পাড়ছে। সমস্ত ডিম ফুটেই যদি বাচ্চা বেরুতো আর সব বাচ্চাই যদি বেঁচে থাকতো, আর ওই হারে বংশবৃদ্ধি করতো, তাহলে কিছু বছরের মধ্যেই ওই মাছের বংশ ছাড়া সমুদ্রের মধ্যে আর তিল ধারণের জায়গা থাকতো না! প্রত্যেক প্রাণীর বেলাতেই দেখা যায়, যতগুলি সন্তান বাঁচতে পারবে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি সন্তানের জন্ম হচ্ছে।
দুই : বাঁচবার জন্যে সংগ্রামের প্রয়োজন। একটি প্রাণীর যত বাচ্চা হলো তার মধ্যে বেশিরভাগই মরে যায়, বেঁচে থাকে মাত্র সামান্য কয়েকটি। এমন কেন হয়? তার কারণ, বাঁচতে পারাটা খুব সহজ ব্যাপার নয়। বাঁচতে গেলে খাদ্য চাই, বায়ু চাই, আলো চাই, উপযুক্ত উত্তাপ চাই, শক্রর হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারা চাই, অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টির মতো নানারকম প্রাকৃতিক দুর্ঘটনার সঙ্গে লড়তে পারা চাই। অর্থাৎ বাঁচতে গেলে প্রতিপদেই সংগ্রাম করতে হবে।
ডারউইনের তৃতীয় কথা, প্রার্থক্যের কথা। একই প্রাণীর বিভিন্ন সন্তানদের মধ্যে পার্থক্য থাকে। ধরা যাক, একটা কুকুরের পাঁচটা বাচ্চা হলো। এই পাঁচটি বাচ্চাই কি একেবারে হুবহু এক রকমের হবে? নিশ্চয়ই নয়। এমনকি, দুটি বাচ্চাই একেবারে হুবহু এক রকমের নয়। একই জাতের অনেকগুলো গাছকে আমরা যদি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করি তাহলে দেখবো প্রত্যেকটিরই স্বাতন্ত্র্য আছে; একই জাতের অনেক জানোয়ারকে আমরা যদি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করি, তাহলে দেখবো প্রতিটিই অন্যগুলো থেকে কোনো না কোনো দিক থেকে স্বতন্ত্র। এই পার্থক্যের পরিচয় হয়তো সাধারণত আমাদের চোখে পড়তে চায় না। কিন্তুু আমরা যদি ডারউইনের মতো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে রাজি হই, তাহলে তা নিশ্চয়ই আমাদেরও চোখে পড়বে।
ডারউইনের চতুর্থ কথা হলো, সমস্ত প্রাণীই পারিপার্শি¦কের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াবার চেষ্টা করে। তুষার অঞ্চলের গাছ-গাছড়া আর জীবজন্তু ক্রমাগতই চেষ্টা করে চলেছে হিমশীতল অবস্থার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে, জলাভূমির জীবেরা ক্রমাগতই চেষ্টা করে চলেছে ওই জলা-জায়গার কম-বেশি পানির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে, রুক্ষ মরুভূমির জীবেরাও চেষ্টা করে চলেছে সেই অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে। আশপাশের অবস্থার সঙ্গে এই খাপ খাইয়ে নেবার চেষ্টা হচ্ছে জীবন-সংগ্রামেরই একটা দিক। এইবার, ডারউইনের সবকটি কথা একসঙ্গে মিলিয়ে ভাবতে পারলে আমরা একটি প্রশ্নের জবাব পাবো। যত প্রাণীর জন্ম হয় তার মধ্যে মাত্র মুষ্টিমেয় বাঁচতে পারে, বাকি সকলেই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, যারা বাঁচে তারা কী করে বাঁচে? যারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তারা কেন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়? যারা জীবন-সংগ্রামে জয়ী হয়, শুধু তারাই বাঁচে; যারা হেরে যায় তারা নিশ্চিহ্ন হয়। কিন্তু, কারা জয়ী হয়? যারা আশপাশের অবস্থার সঙ্গে নিজেদের ঠিকমতো খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তারই জয়ী হয়; যারা পারে না, তারা বাঁচে না।