কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
যেভাবে ভারত ভাগ হলো
১৯৪০ সালে ২৩ মার্চ, লাহোর প্রস্তাবে জিন্না বললো, "ভারতবর্ষের সমস্যা সম্প্রদায়গত নয়, বরং জাতিগত। এটা খুবই দুঃখের যে হিন্দুরা, ইসলাম ও হিন্দুত্বের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে পারছেন না। ইসলাম এবং হিন্দুত্ব শুধুমাত্র আলাদা ধর্ম নয়, স¤পূর্ণ বিপরীত দুই জাতিসত্ত্বা। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, হিন্দু ও মুসলমানরা দুটি পৃথক ইতিহাস থেকে প্রেরণা পায়। এদের একজনের মহাপুরুষ, অন্যজনের শত্রু। মুসলমানরা সংখ্যালঘু নয়। মুসলমান একটা আলাদা জাতি। জাতি গঠনের সমস্ত প্রয়োজনীয় উপাদান তাদের আছে। তাই তাদের অবশ্যই নিজের বাসভূমির অধিকার আছে।" (ভিপি মেনন, ট্রান্সফার অব পাওয়ার, পৃষ্ঠা-৮২)
ঠিক এর ১০ দিন পর, ১৯৪০ সালের ৬ এপ্রিল, গান্ধী, মুসলিম লীগের দাবিকে সমর্থন করে হরিজন পত্রিকায় লিখলো, "দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো মুসলমানদেরও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আছে। বর্তমানে আমরা একটা যৌথ পরিবারের মতোই বসবাস করছি। তাই এর কোনো এক শরিক ভিন্ন হতে চাইতেই পারে।"
জিন্না দেখলো, তার দাবীর তেমন কোনো বিরোধিতা হিন্দুদের মধ্যে নেই, বরং হিন্দুদের প্রধান নেতা গান্ধীর, তার দাবীর ব্যাপারে যথেষ্ট অনুমোদনও রয়েছে। এরপর ১৯৪৪ সালে জিন্নার সাথে গান্ধীর বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়। গান্ধী, জিন্নাহকে বলে, "আমি আপনার বা ইসলামের শত্রু নই। আমি আপনাদের দীন সেবক মাত্র।" গান্ধীর এই অসহায় আত্মসমর্পনে উৎফুল্ল জিন্না পাকিস্তান আদায়ের প্ল্যান তৈরি করে ফেলে। তাই ১৯৪৬ সালের ২৮ জুলাই বোম্বেতে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের জাতীয় সভায়, ১৬ আগস্টকে জিন্না, "ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে" বা "প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস" হিসেবে ঘোষণা করে। এই সভায় জিন্না বলে, "পাকিস্তান বাদ দিয়ে অন্য কিছুর সাথেই মুসলমান জাতি কোনো প্রকার আপোষ করবে না। এখন সময় হয়েছে, সেই দাবী আদায়ে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার।
১৯৪৬ সালে সমগ্র বাংলায় মুসলমান ছিলো ৫৫%, হিন্দু ৪৫%। তাই খুব সহজে কংগ্রেসকে হারিয়ে প্রাদেশিক নির্বাচনে জিতে বাংলার ক্ষমতা দখল করে মুসলিম লীগ। সোহরাওয়ার্দী হয় মুসলিম সরকারের মূখ্যমন্ত্রী; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ছিলো তার হাতে। জিন্নার ডাইরেক্ট এ্যকশন ডে বাংলায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়ে সোহরাওয়ার্দীর উপর।
কলকাতার মেয়র ওসমান খান, উর্দুতে একটি প্রচার পত্র বিলি করে এবং কর্পোরেশনের কিছু লরি মুসলিম লীগের নেতাদের ব্যবহারের জন্য দিয়ে দিয়েছিলো। ই¯পাহানি মির্জাপুর চা কো¤পানির মালিক ই¯পাহানি ছিলো সেই সময় সোহরাওয়ার্দী সরকারের চাউল সরবরাহকারী। ই¯পাহানি নিজের সব লরি মুসলিম লীগের লোকজনদেরকে ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে-এর সময় ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলো।
১৫ আগস্ট ১৯৪৬ তারিখে, মুসলিম লীগ ১৬ আগস্টে বাংলা বন্ধের ডাক দেয়, আর সোহরাওয়ার্দী ঐ দিন ঘোষণা করে সরকারী ছুটির। মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে বলা হলো, ১৬ আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রামের দিন মুসলিম লীগের নেতা কর্মীরা এখানে সেখানে মিছিল মিটিং করে পাকিস্তানের পক্ষে জনমত গঠন করবে, এককথায় প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস হবে শান্তিপূর্ণ!
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হিন্দু মহাসভা জায়গায় জায়গায় প্রতিবাদ কর্মসূচী চালায়, কিন্তু কংগ্রেসের মতো ব্যাপক জনসমর্থন না থাকায় লোকজনের মাঝে তা বেশি প্রভাব ফেলতে পারেনি। প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস, শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা হবে, জিন্না ও মুসলিম লীগের এই আশ্বাসে গান্ধী চুপ করে থাকে। আর নেহেরু বললেন, যারা বন্ধ সমর্থন করে না, তারা যেন প্রতিদিনের মতোই হাট, বাজার, অফিস করে।
মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম নিয়ে সবচেয়ে ভাল স্ট্যান্ড নেয় কমিউনিস্ট পার্টি। ১৩ আগস্ট, ১৯৪৬ এ পার্টির নেতা জ্যোতিবসু এক প্রচার বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, "মূলত আমাদের পার্টির চেষ্টা হবে মুসলিম লীগের ডাকা বাংলা বন্ধের দিন রাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা। তাই যেখানে প্রয়োজন আমরা বন্ধ সমর্থন করবো, আর যেখানে প্রয়োজন নয়, সেখানে বিরত থাকবো।"
১৯৪৬ সালে বাংলার মূখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর মেয়েকে গান শেখাতেন হরেন ঘোষ নামের এক বৃদ্ধ। ১৬ আগস্টের সরকারী আইনশৃংখলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ছক সোহরাওয়ার্দীর বাড়িতেই তৈরি হয়। পরে দেখা যায়, এই পরিকল্পনার কিছু কিছু বিষয় আগেই ফাঁস হয়ে গিয়েছিলো। সোহরাওয়ার্দীর সন্দেহ হয় হরেন ঘোষকে, কিন্তু সোহরাওয়ার্দী সন্দেহের বিষয়টি চেপে যায়। ঘটনাক্রমে পুরো প্ল্যান একদিন হাতে পড়ে যায় হরেন ঘোষের। তারপরই, তিনি দ্রুত পুরো প্রশাসনিক এই পরিকল্পনাটি হিন্দু মহাসভা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে, ফলে বিরাট এক ধ্বংসযজ্ঞের কবলে পডে কোলকাতা।
একটা কথা প্রচলিত আছে যে, হিন্দুরা পড়তে জানে কিন্তু লড়তে জানে না। কিন্তু প্রবাদটি পালটে দেয় হিন্দু যুবকরা। একজন কসাই, নাম গোপাল, পাঁঠার মাংস বিক্রি করতো বলে যার নাম হয়েছিলো গোপাল পাঁঠা, সেই গোপাল পাঁঠা ১ দিনের মধ্যে ৮০০ হিন্দু ও শিখ যুবককে সাথে নিয়ে গড়ে তোলে এক বিশাল কিলিং বাহিনী এবং মুসলমানদের হত্যা করতে শুরু করে। শুরু হয় দুপক্ষের হত্যাযজ্ঞ। কলকাতার দাঙ্গা বন্ধ না হতেই আবার দাঙ্গা শুরু হলো নোয়াখালীতে। মুসলমানরা সেখানে হিন্দুদের বাড়িঘর লুট করলো এবং আগুন ধরিয়ে দিল। ঢাকায় তো দাঙ্গা লেগেই আছে। এই ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ এ হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়, লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু ও সর্বস্বান্ত হয়; জমি জমা, বাড়িঘর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। আর এসব গণহত্যাসহ হাজার হাজার পরিবারের উদ্বাস্তু হওয়ার পেছনে ছিল ব্রিটিশদের ক্ষমতা হস্তান্তরের জটিলতা। সে সময়ে ৬০ লক্ষ মানুষের কলকাতা শহরে মাত্র ১২০০ সদস্যের একটি পুলিশ বাহিনী ছিল, যে-বাহিনীতে মাত্র ৬৩ জন ছিলেন ধর্মে মুসলমান। আর অফিসারদের মধ্যে একজন ডেপুটি কমিশনার ও একজন ওসি ছাড়া সকলেই ছিলেন হিন্দু। সুরঞ্জন দাশসহ ছেচল্লিশের দাঙ্গা নিয়ে গবেষণা– আছে এমন সব ইতিহাসবিদই একটি বিষয়ে মোটামুটি একমত। তা হল এই দাঙ্গায় মুসলমানদের মধ্যে মৃতের সংখ্যা হিন্দুদের তুলনায় ঢের বেশি।
জয়া চ্যাটার্জী শিলিগুড়ির মেয়ে। সেখান থেকে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা, তারপর অক্সফোর্ডে পিএইচডি, অবশেষে লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স-এ অধ্যাপক। তাঁর সাড়া জাগানো বইয়ের নাম হচ্ছে ‘বেঙ্গল ডিভাইডেড।’ এই বইয়ে জয়া চ্যাটার্জির বাংলা ভাগের জন্য মুসলিম লীগ বা জিন্নাহকে দায়ী করেন নাই, দায়ী করেছেন বাংলার “হিন্দু ভদ্রলোক এলিট” শ্রেণিকে।
কলকাতার দাঙ্গার প্রতিক্রিয়ায় যখন বিহারে শুরু হলো ভয়াবহ দাঙ্গা। তখন আলোচনার পর ১৯৪৭ সালের জুন মাসে ভারতবর্ষ ভাগ করার ঘোষণা এলো। কংগ্রেস ভারত ভাগ করতে রাজি হয়েছে এই জন্য যে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ হবে। আসামের সিলেট জেলা ছাড়া আর কিছুই পাকিস্তানে আসবে না। কলকাতা ও তার আশপাশের জেলাগুলি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হবে। মাওলানা আকরম খাঁ এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতারা এর তীব্র প্রতিবাদ করলেন।
ভারতবর্ষ ভাগের এই ফর্মুলা নিয়ে শেখ মুজিব নিজেও বেশ হতাশ হয়েছিলেন। এ বিষয়টি তার আত্মজীবনীতেও ফুটে উঠে।
শেখ মুজিব লিখেছেন, "কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা নেতারা বাংলাদেশ ভাগ করতে হবে বলে জনমত সৃষ্টি করতে শুরু করলো। আমরাও বাংলাদেশ ভাগ হতে দেব না, এর জন্য সভা করতে শুরু করলাম। আমরা কর্মীরা কি জানতাম যে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস ও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ মেনে নিয়েছে এ ভাগের ফর্মুলা? বাংলাদেশ যে ভাগ হবে, বাংলাদেশের নেতারা তা জানতেন না।"
এই অঞ্চলের নেতাদের ধারণা ছিল সমগ্র বাংলা ও আসাম পাকিস্তানে আসবে। আর মুসলিম লীগের নেতাদের পাশে বসিয়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেন তাঁর ভারত ভাগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তখন শেখ মুজিব সহ অন্যরা জানতে পারলেন, আসামের একটি জেলা, যেটি বর্তমানে সিলেট, পাকিস্তানের আওতায় আসবে যদি তারা সেটা গণভোটে জিততে পারে।
শেখ মুজিব লিখেছেন, "গোপনে গোপনে কলকাতার মুসলমানরা প্রস্তুত ছিল, যা হয় হবে, কলকাতা ছাড়া যাবে না। শহীদ সাহেবের (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী) পক্ষ থেকে বাংলা সরকারের অর্থমন্ত্রী জনাব মোহাম্মদ আলী ঘোষণা করেছিলেন, কলকাতা আমাদের রাজধানী থাকবে। কিন্তু মুসলিম লীগ নেতারা দিল্লি বসে অনেক পূর্বেই যে কলকাতাকে ছেড়ে দিয়েছেন, একথা তো আমরা জানতাম না।"
এ সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম মুসলিম লীগের তরফ থেকে এবং শরৎ বসু ও কিরণ শংকর রায় কংগ্রেসের তরফ থেকে এক আলোচনা সভা করেন। তাঁদের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় যে, বাংলাদেশ ভাগ না করে অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করা যায় কি-না? বাংলাদেশের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতারা একটা ফর্মুলা ঠিক করেন। ঐ ফর্মুলায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ হবে স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র। জনসাধারণের ভোটে একটা গণপরিষদ হবে। শেখ মুজিবের বর্ণনা অনুযায়ী, ঐ গণপরিষদ ঠিক করবে বাংলাদেশ হিন্দুস্তান না পাকিস্তানে যোগদান করবে, নাকি স্বাধীন থাকবে।
এ ফর্মুলা নিয়ে শরৎ বসু গান্ধীর সাথে এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে দেখা করতে যান। শরৎ বসুকে উদ্ধৃত করে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, এ ফর্মুলা নিয়ে মি. জিন্নাহর কোন আপত্তি ছিল না, যদি কংগ্রেস রাজি হয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার বলে দিয়েছিল, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একমত না হলে তারা নতুন কোন ফর্মুলা মানতে পারবে না। ঐ ফর্মুলা নিয়ে শরৎ বসু কংগ্রেস নেতাদের সাথে দেখা করতে গিয়ে অপমানিত হয়ে ফেরত এসেছিলেন বলে উল্লেখ করেন শেখ মুজিবুর রহমান।
কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল বলেছিলেন, "শরৎ বাবু পাগলামি ছাড়েন, কলকাতা আমাদের চাই।" কলকাতা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ না হওয়ায় গভীর হতাশা তৈরি হয়েছিল শেখ মুজিবের মনে। এজন্য তিনি তখনকার মুসলিম লীগ নেতৃত্বের একটি অংশকে দায়ী করেন। শেখ মুজিব লিখেছেন, পাকিস্তান সৃষ্টির সাথে সাথেই ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে না পারেন, সেজন্য তাঁর বিরুদ্ধ এক ধরণের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন শেখ মুজিবুর রহমান।
শেখ মুজিবের বর্ণনা ছিল এ রকম, "বাংলাদেশ ভাগ হলেও আমরা যতটুকু পাই, তাতেই সিন্ধু, পাঞ্জাব, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানের মিলিত লোকসংখ্যার চেয়ে পূর্ব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা বেশি। সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ রাজনৈতিক জ্ঞান, বিচক্ষণতা ও কর্মক্ষমতা অনেককেই বিচলিত করে তুলেছিল। কারণ, ভবিষ্যতে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চাইবেন এবং বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কারও থাকবে না।"
এক পর্যায়ে খাজা নাজিমুদ্দিন নেতা নির্বাচিত হলেন। নেতা হয়ে তিনি ঘোষণা করেন যে ঢাকা রাজধানী হবে। মি. নাজিমুদ্দিন দলবলসহ তখন ঢাকায় চলে আসেন। মি. নাজিমুদ্দিনের ঢাকায় চলে আসার সাথে সাথে কলকাতার উপর থেকে পাকিস্তানের দাবি আর থাকল না বলে উল্লেখ করেন শেখ মুজিব।
লর্ড মাউন্টব্যাটেনের বই 'মিশন উইথ মাউন্টব্যাটেন' উদ্ধৃত করে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, "ইংরেজরা তখনো ঠিক করে নাই কলকাতা পাকিস্তানে আসবে, না হিন্দুস্তানে থাকবে। আর যদি কোনো উপায় না থাকে তবে একে 'ফ্রি শহর' করা যায় কি-না? কারণ, কলকাতার হিন্দু মুসলমান লড়বার জন্য প্রস্তুত। যে কোন সময় দাঙ্গাহাঙ্গামা ভীষণ রূপ নিতে পারে। কলকাতা হিন্দুস্তানে পড়লেও শিয়ালদহ স্টেশন পর্যন্ত পাকিস্তানে আসার সম্ভাবনা ছিল। হিন্দুরা কলকাতা পাবার জন্য আরো অনেক কিছু ছেড়ে দিতে বাধ্য হত।"
শেখ মুজিব লিখেছেন, যখন গোলমালের কোন সম্ভাবনা থাকল না, তখন লর্ড মাউন্টব্যাটেন সে সুযোগে যশোর জেলায় সংখ্যাগুরু মুসলমান অধ্যুষিত বনগাঁ জংশন অঞ্চল কেটে দিলেন। নদীয়ায় মুসলমান বেশি ছিল। কিন্তু তারপরেও কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট জংশন ভারতকে দেয়া হলো।
তিনি আরও লিখেছেন, মুর্শিদাবাদে মুসলমান বেশি হলেও সেটা ভারতের অংশে দেয়া হলো। মালদহ জেলায় মুসলমান ও হিন্দু সমান হওয়ায় তার আধা অংশ কেটে দেয়া হলো। দিনাজপুরে মুসলমান বেশি ছিল। বালুরঘাট মহকুমা কেটে দেয়া হলো, যাতে জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং ভারতের অংশ হয়।
শেখ মুজিব মনে করেন, এ জায়গাগুলো কিছুতেই পাকিস্তানে না এসে পারতো না। "সোহরাওয়ার্দী নেতা হলে তাদের অসুবিধা হত, তাই তারা পিছনের দরজা দিয়ে কাজ হাসিল করতে চাইল। কলকাতা পাকিস্তানে থাকলে পাকিস্তানের রাজধানী কলকাতায় করতে বাধ্য হত, কারণ পূর্ব বাংলার লোকেরা দাবী করত পাকিস্তানের জনসংখ্যায়ও তারা বেশি, আর শহর হিসেবে তদানীন্তন ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ শহর কলকাতা।" কলকাতা 'হাতছাড়া' হওয়ার কারণে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, "নেতারা যদি নেতৃত্ব দিতে ভুল করে, জনগণকে তার খেসারত দিতে হয়।"
ভারত-পাকিস্তান দুটি পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা লাভের পাশাপাশি কাশ্মির, পাঞ্জাব ও বাংলা ভাগ হওয়ায় এ অঞ্চলের ডেমোগ্রাফিতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বিশেষত গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’র ঘটনায়- হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে অনাস্থা, অবিশ্বাস ও বৈরিতা চরম আকার ধারণ করায় বড় ধরনের মাইগ্রেশন সৃষ্টি হয়। আজকের স্বাধীন বাংলাদেশও সেই মাইগ্রেশনের বোঝা বহন করে চলেছে। এখান থেকে যেসব হিন্দু জমি-জিরাত বিক্রি করে বা পরিত্যাগ করে ভারতে চলে গিয়েছিল, অপির্ত স¤পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের মাধ্যমে সেসব ফেরত অথবা মালিকানা পুনঃনির্ধারণের ব্যবস্থা করা হলেও পাকিস্তান আন্দোলনে জড়িত যেসব উর্দুভাষি বিহারি মুসলমান সবকিছু ছেড়ে এই বাংলায় আশ্রয় নিয়েছিল তারা এখনো এখানে আটকে পড়া পাকিস্তানী হিসেবেই অভিহিত হচ্ছে। যদিও এদের বড় অংশ ইন্ডিয়ান অরিজিন উর্দু ¯িপকিং মাইনরিটি।