কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতে হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
ভূমিকা:
প্রাচীন মানুষ ঝড় বন্যা বা কঠিন অসুখ-বিসুখে খুবই বিচলিত হয়ে পড়ত। তখন মানুষের গড় আয়ু ছিল আঠার বছর। অকাল মৃত্যুর কারণ খুঁজে খুঁজে হয়রান হতে হত তাদের। অসুখ-বিসুখ স¤পর্কে তাদের তখনো কোন ধারণা গড়ে উঠা দূরে থাক, তাদের জীব জগৎ স¤পর্কেও কোন ¯পষ্ট ধারণা তখন গড়ে উঠেনি। তারা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে দিশাহারা হয়ে পড়ত। ঝড় বন্যা বৃষ্টি বজ্রপাত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত আর অন্য সব প্রাকৃতিক দুর্বিপাকের কারণ তারা বুঝতো না। বলা হচ্ছে ‘হোমো স্যাপিয়েনস’ মানুষদের কথা, যারা আমাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন। এমন মানুষ আজও আছে পৃথিবীতে কোথাও কোথাও আছে, যারা এখনো অনুসরণ করে প্রাচীন মানুষের জীবন যাত্রার ধরণ। হোমো স্যাপিয়েনসরা প্রকৃতির ক্ষমতা জানতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক রহস্যের কার্য-কারণ স¤পর্ক তারা বুঝতো না বলে, প্রাকৃতিক ঘটনাকে তারা ব্যাখ্যা করতো, তাদের জ্ঞান, বুদ্ধি আর ধারণা অনুসারে। তারা ঐ সময়ে ধরে নিয়েছিল, ওই সব ঘটনা ঘটছে, অজ্ঞাত কোন গুপ্ত অলৌকিক শক্তির ফলে। তখন তারা এই সমস্ত গুপ্ত অলৌকিক শক্তিকে পুজা করতে শুরু করে। দলবদ্ধ হয়ে এই কাজ করতে করতে, ধীরে ধীরে তা প্রথা হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। এই প্রথার বশবর্তি হয়েই তারা ডালপালা, কাঠ বা বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে কাল্পনিক অলৌকিক দেবতা বানাতো। এইসব কল্পিত দেবতাদের কাছে, করুণা ভিক্ষা করতো। করুণা আদায়ের উদ্যেশ্যে তারা নতজানু হয়ে ভূমিতে মাথা ঠেকিয়ে সিজদা করতে লাগলো। দেবতাদের মূর্তির সামনে বিভিন্ন ধরণের ফলমুল রাখতো তাকে তুষ্ট করার জন্যে। এই উপহার সামগ্রিকে আমরা বলে থাকি নৈবদ্য। সমস্ত ধরণের ফলমূল থেকে শুরু করে পশু-পাখীও হয়ে উঠলো এই নৈবদ্য। এত করেও যখন কিছু কিছু বিপদ থেকে রেহাই মিলছিলো না, তখনই এই নৈবদ্যে মানুষও যুক্ত হয়ে গেলো। পশু বলি থেকে নর বলি। প্রাচীন মানুষ ভাবত মৃতের আত্মা আবার মৃতদেহে ফিরে আসতে পারে। এইসব আদি কালের ধ্যান-ধারণা সমাজে এখনো রয়ে গেছে। ধার্মিক মানুষ আজও মৃত মানুষের উদ্দেশ্যে পিন্ড দান করে।
আদিম মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে পশু শিকার করেছে, মাছ ধরেছে, ফলমূল আহরণ করেছে। অস্তিত্ব রক্ষা ও সমৃদ্ধির প্রয়োজনে মানুষকে প্রকৃতির নানা উপাদান নিয়ে চিরকাল কাজ করতে হয়েছে, পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়েছে। পূর্ববর্তী জেনারেশন পরবর্তী জেনারেশনকে জানিয়ে যায় তার অভিজ্ঞতা আর শিক্ষা। আর পরবর্তী জেনারেশন পূর্ববর্তী জেনারেশন থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত করে নূতন নূতন অভিজ্ঞতা আর শিক্ষা। যুক্ত করে তার নিজের নতুন অর্জিত জ্ঞান। এইভাবেই সমৃদ্ধ হয়ে চলছে মানবজাতির সার্বিক জ্ঞানভান্ডার।
শিকার, পশুপালন ও কৃষি জীবন ভিত্তিক সমাজ বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে, জীবিকা এবং জীবন সংগ্রাম ছিল অত্যন্ত কঠোর ও শ্রম সাপেক্ষ। কৃষির উন্নতির পর্যায়ে, কিছু লোক কঠোর শারীরিক শ্রম থেকে নিজেদের মুক্ত করতে সমর্থ হয়। তারা চিন্তামূলক ও ব্যবস্থাপনামূলক কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে শুরু করে। ঠিক তখনই সমাজ বিভক্ত হয়ে যায় শ্রমজীবী ও বুদ্ধিজীবীতে। বুদ্ধিজীবীদের সৃজনশীল নতুন নতুন ব্যবস্থাপনার ফলে জীবনযাত্রার পদ্ধতিতে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়ে যায় বিভিন্ন ধরণের বিশ্বাসও।
আমরা দেখি যে, সূর্য পূর্বদিকে উঠে পশ্চিমে অস্ত যায়। আর তার ফলেই দিন-রাত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে অনবরত ঘুরছে। এই সত্যটা জানতেই শতসহস্র বছর মানব সমাজকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। কোপার্নিকাস আর গ্যালিলিওর অক্লান্ত পরিশ্রমে তা সম্ভব হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এর পিছনে ছিল মানবজাতির জ্ঞান আহরণের ধারাবাহিকতা। তিলে তিলে সমাজের জ্ঞান ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়। এর উপর নির্ভর করেই নূতন নূতন আবিস্কার সম্ভব হয়।
খ্রিস্টজন্মের পাঁচশ বছর আগে পিথাগোরাস, এনাকু সিমন্ডের মত অনুসন্ধিৎসু দার্শনিকেরা জানিয়েছিলেন পৃথিবী সূর্যের একটি গ্রহ মাত্র, সূর্যকে ঘিরে অন্য সকল গ্রহের মত পৃথিবীও ঘুরছে। ধর্মবিরোধী এই মতামত প্রকাশের জন্য এদের অনেককেই সে সময় সইতে হয়েছিল নির্যাতন। এই ‘কুফরি’ মতবাদকে দুই হাজার বছর পরে পুস্তকাকারে তুলে ধরেছিলেন পোল্যান্ডের নিকোলাস কোপার্নিকাস। বাইবেল বিরোধী এই সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব প্রচারের জন্য কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও আর ব্রুনোকে কিরকমভাবে অত্যাচারের স্টিমরোলার চালানো হয়েছিল সে এক ইতিহাস। ব্রুনোকে তো পুড়িয়েই মারলো ঈশ্বরের সুপুত্ররা। শুধু ব্রুনোই নন, তার সমসাময়িক লুচিলি ভানিনি, টমাস কিড, ফ্রান্সিস কেট, বার্থৌলোমিউ লিগেট সহ অনেককেই ধর্মান্ধদের হাতে নিগৃহীত এবং নির্যাতিত হয়ে নিহত হতে হয়। খ্রিস্টের জন্মের চারশ পঞ্চাশ বছর আগে এনাক্সোগোরাস বলেছিলেন চন্দ্রের নিজের কোন আলো নেই। সেই সঙ্গে সঠিকভাবে অনুসন্ধান করেছিলেন চন্দ্রের হ্রাস বৃদ্ধি আর চন্দ্রগ্রহণের কারণ। এনাক্সোগোরাসের প্রতিটি আবিস্কারই ছিল ধর্মবাদীদের চোখে জঘন্য রকমের অসত্য। ঈশ্বর বিরোধিতা, ধর্ম বিরোধিতা আর অসত্য প্রচারের অপরাধে দীর্ঘ নিষ্ঠুর নির্যাতনের পর তাঁকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়। ষোড়শ শতকে সুইজারল্যান্ডের বেসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন শাস্ত্র এবং ভেষজবিদ্যার অধ্যাপক ফিলিপ্রাস প্যারাসেলসাস ঘোষনা করলেন- মানুষের অসুস্থতার কারণ কোন পাপের ফল কিংবা অশুভ শক্তি নয়, রোগের কারণ হল জীবাণু। ওষুধ প্রয়োগে জীবাণু নাশ করতে পারলেই রোগ ভাল হয়ে যাবে। প্যারাসেলসাসের এই ‘উদ্ভট’ তত্ত্ব শুনে ধর্মের ধ্বজাধারীরা হা রে রে করে উঠলেন। সমাজের পক্ষে ক্ষতিকারক ধর্মবিরোধী মতবাদ প্রচারের জন্য প্যারাসেলসাসকে হাজির করা হয়েছিল ‘বিচার’ নামক এক প্রহসনের মুখোমুখি। ধর্মান্ধ বিচারকেরা ব্রুনোর মতই প্যারসেলসাসকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেছিলো। প্যারাসেলসাসকে সেদিন জীবন বাঁচাতে মাতৃভূমি ছেড়ে পালাতে হয়েছিলো।
অত্যাচার আর নির্যাতন শুধু খ্রিস্টানদের একচেটিয়া ভেবে নিলে ভুল হবে - আজকে মুসলিমরা ইবনে খালিদ, যিরহাম, আল দিমিস্কি, ওমর খৈয়াম, ইবনে সিনা, ইবনে বাজা, আল কিন্দী, আল রাজি কিংবা ইবনে রুশদের মত দার্শিনিকদের জন্য গর্ববোধ করে, কিন্তু সে সব দার্শনিকদের সবাই তাদের সময়ে বৈজ্ঞানিক সত্য কিংবা মুক্তমত প্রকাশের কারণে মৌলবাদীদের হাতে নিগৃহীত, নির্যাতিত কিংবা নিহত হয়েছিলেন।
বিজ্ঞানের অবদান কি কেবল বড় বড় যন্ত্রপাতি বানিয়ে মানুষের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য বয়ে আনা? আমাদের স্কুল কলেজে যেভাবে বিজ্ঞান পড়ানো হয় তাতে এমনটিই মনে হওয়া স্বাভাবিক। ব্যপারটা কিন্তু আসলে ঠিক তেমনটি নয়। বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে মানুষ বড় বড় যন্ত্রপাতি বানায় বটে; তবে সেগুলো স্রেফ প্রযুক্তিবিদ্যা আর প্রকৌশলবিদ্যার আওতাধীন; বিজ্ঞানলব্ধ জ্ঞানের অভিযোজন মাত্র। আসলে বিজ্ঞানের একটি মহান কাজ হচ্ছে প্রকৃতিকে বোঝা, প্রকৃতিতে ঘটনলীর ব্যাখ্যা খুঁজে বের করা। আগের দিনে মানুষেরা বাড়ি থেকে একটু দূরে থাকা পুকুরের অপর পাড়ে রাতের অন্ধকারে হঠাৎ আগুন জ্বলতে দেখে ভাবতো সেটা বুঝি কোনো ভুত-জ্বিন-পরীর কাজ। বিজ্ঞান এসে আমাদের জানালো মিথেন গ্যাসের কথা। এখন আর কেউ পুকুর পাড়ে আগুন জ্বলতে দেখলে ভয় পায় না, তারা জানে এটা স¤পূর্ন প্রাকৃতিক ব্যাপার। বিজ্ঞান হলো যুক্তি এবং কারিগরী জ্ঞানের প্রয়োগ আর ধর্ম হলো বিশ্বাস। এ দুয়ের অবস্থান স¤পূর্ণ আলাদা বলয়ে।
পৃথিবীর যাবতীয় ধর্মের মধ্যে একমাত্র জৈন ধর্মই মুক্তমনস্ক হওয়ার শিক্ষা দেয়। নিজের মত বা বিশ্বাসের বিপরীতে অন্য সকল মতাদর্শ বিবেচনায় নেয়া ও বিভিন্ন বিশ্বাসের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা জৈন ধর্মের অঙ্গ। এই ধর্ম তার অনুসারীদের বিপরীত ও বিরুদ্ধ মতবাদগুলিকে গ্রহণ করার শিক্ষা দেয়। অনেকান্তবাদ তথা একাধিক মতবাদের সহাবস্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। সেই সঙ্গে যে-কোন বিষয়কে, প্রশ্নকে বিভিন্ন ও বৈচিত্রপূর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে উৎসাহিত করে। জৈন ধর্মের আর একটা ভাল দিক হচ্ছে ‘অপরিগ্রহ’। যাতে নির্লোভ হওয়া, অপরের দ্রব্য না নেওয়া, অন্যকে না ঠকানো ও জাগতিক কামনাবাসনা থেকে দূরে থাকাকে বোঝায়। জৈনরা যতটুকু প্রয়োজনীয়, তার চেয়ে বেশি নেওয়ার পক্ষপাতী নন। তারা আসক্তিশূন্যতার শিক্ষা পায় ধর্ম থেকেই। অপ্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ না করা এবং যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা’ই হল জৈন ধর্মের মূল শিক্ষা। তেমনিভাবে প্রতিটা ধর্মের কিছু কিছু ভাল দিক আছে। এই বইটিতে পৃথিবীর প্রচলিত প্রধান ধর্মগুলি সম্পর্কে তথ্য আছে; ধর্মগুলির ইতিবাচক দিকগুলি ব্যাক্তি জীবনে চর্চা করা যায়। এই বইটি আপনার চিন্তার জগতকে প্রভাবিত করে আপনাকে নতুন এক বিজ্ঞ মানবে পরিণত করবে। নতুন আদর্শ ও নতুন এক উচ্চতায় আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবে।
বইটা কেন?
বাঙালির কোনো দর্শন নেই। বাঙালির দর্শনের এই ফাঁকা জায়গাটা দখল করে আছেÑ প্রাচীন ও মধ্য যুগীয় অন্ধবিশ্বাস, আর মনগড়া কল্পনা। তার উপর বাঙালির নতুন প্রজন্ম হচ্ছে সবজান্তা অল রাউন্ডার। কোনো কিছুতেই আগ্রহ তাদের নেই, এক মোবাইল ছাড়া। ভাবটা এমন যে, সে আইনস্টাইনের ব্রেন ডাউনলোড করে জন্মেছে। এমতাবস্থায় তাদের কাছে বৈজ্ঞানিক যুক্তি-ব্যাখ্যা অতি সহজভাবে তুলে ধরা দরকার। কারণ, জ্ঞানের প্রথম ধাপ হচ্ছে নিজেকে জানা। আমাদের সন্তানরা যদি এই পৃথিবীকে এবং নিজেকে সঠিকভাবে না জানে, তাহলে মিথ্যার উপর তার জীবনটা তৈরি হবে।
মানুষ তার পরিবার ও চারপাশের পরিবেশের উপর বেড়ে ওঠে। আমাদের জ্ঞান হচ্ছে আমরা যাদের সঙ্গে চলাফেরা করি এবং বইপত্র বা নেট-টিভির মাধ্যমে যা কিছুতে প্রভাবিত হই, তার সমষ্টি মাত্র। সুতরাং যত বেশি উন্নত মেধার সংযোগ আপনার থাকবে, এবং তা হতে যত বেশি উপাত্ত আত্মস্থ করে সৃজনশীল চিন্তা সৃষ্টি করতে পারবেন, আপনি তত বেশি মেধাবী। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই মেধাবীদের সংখ্যা খুবই কম। এর কারণ দুটি।
এক. মেধাবীদের সন্তান সংখ্যা একেবারেই কম (বিয়ে, সন্তান এসব তাদের অতি নিয়ন্ত্রিত), পক্ষান্তরে মেধাহীন সাধারণ মানুষের সন্তান হয় চক্রবৃদ্ধি হারে। কিন্তু বংশধারা, রক্তধারা বলে একটা কথা আছে। গাধার পেটে কখনো ঘোড়া হয় না। এই বংশগতি তত্ত্বের নাম জেনেটিক্স বা জিনতত্ত্ব। এই জেনেটিক্সের তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা ঊনবিংশ শতাব্দীতে শুরু হয়ে থাকলেও ‘বংশগতি’ বলে কিছু যে হয়, তা আদিম যুগ থেকেই মানুষ পর্যবেক্ষণ করে এসেছে। বাবা-মায়েরা নিজের ছেলেমেয়ের মধ্যে নিজেদের বৈশিষ্ট্য খুঁজে বেড়াতেন তখনো। তবে তার প্রয়োগ ছিল মূলত পশুপালন আর কৃষি কাজে। যে গরু বেশি দুধ দেয় তার বাচ্চাও যে বেশি দুধ দিতে পারে বা যে গাছের ফল বড় বড় হয় তার একই বীজ থেকে জন্মানো গাছের ফলও বড় হবে। কিন্তু কি কারণে বাবা-মায়ের গুণ ছেলেমেয়ে পায়? তা নিয়ে নিশ্চয় জল্পনা আদিম যুগেও ছিল। তবে, এই ধারণাকে প্রথম তত্ত্বের আকার দেবার চেষ্টা করে গ্রিকরা। হিপোক্রিটাস এক তত্ত্বের উদ্ভাবন করেন যার নাম প্যাঞ্জেনেসিস। তার দাবি ছিল, যৌন মিলনের সময় শরীরের বিভিন্ন অংশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ কোনো না কোনোভাবে বংশগতি বয়ে নিয়ে যায়।
জেনেটিক্স বা জিনতত্ত্ব আবিষ্কার পর ইউরোপ-আমেরিকায় একটা বিপ্লব শুরু হয়ে যায়। বিজ্ঞানী বললেন, ‘দুর্বলকে সাহায্য করা ভালো, কিন্তু এটাও মনে রাখা উচিত যে দুর্বল যদি বেঁচে থেকে বংশ বৃদ্ধি করতে থাকে তাহলে সমাজে দুর্বলের সংখ্যা বেড়ে যায়। এর একটিই প্রতিরোধের উপায়। সমাজের শারীরিক বা মানসিকভাবে দুর্বলদের বিবাহ নিয়ন্ত্রণ করা।
শিল্পায়নের পর থেকেই ইউরোপে সমাজে গরিব-বড়লোক বিভেদ স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছিল। এক শ্রেণির মানুষ ছিল গরিব, বস্তিবাসী, অশিক্ষিতÑ যাদের মনে করা হতো তারা রাষ্ট্রের কল্যাণে বেঁচে আছে। আরেকদল শিক্ষিত, ভদ্র, মিতভাষী আর নিজের উন্নতিতে সচেষ্ট। অথচ, সমাজে গরিবদেরই বেশি সন্তান-সন্ততি, ঠিক যেমন এখনো হয়। কিন্তু সন্তানদের মধ্যে যেহেতু পিতা-মাতার জিন আসে, তাই সমাজের নিচুতলায় বেশি করে সন্তান উৎপাদন হলে সমগ্র সমাজে আস্তে আস্তে ‘খারাপ জিন’-ওয়ালা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলবে। এভাবে চললে সমাজের অবনতি অনিবার্য। ১৮৮৩ সালে গাল্টন এক সামাজিক বিপ্লবের ডাক দেন। একটা নতুন টার্ম ব্যবহার করেন তিনিÑ ইউজেনিক্স (ঊঁমবহরপং)। যার মানেÑ ‘ক্ষণজন্মা’ (‘এড়ড়ফ রহ নরৎঃয’)। সমাজের প্রগতির একমাত্র উপায় হলো প্রতিভাবানদের বেশি সন্তান উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করা, আর ‘খারাপ’দের নিরুৎসাহিত করা। এভাবেই সমাজ থেকে খারাপ জিন দূর করা সম্ভবÑ প্রগতিও আনা সম্ভব।
ইউরোপে যে সময়ে গাল্টনের মত মেনে সবাই প্রতিভাবান বা উঁচুতলার মানুষরা বেশি করে সন্তান নিতে ব্যস্তÍ, সেই একই সময়ে আমেরিকা সমাজের নিচুতলার মানুষদের সন্তান উৎপাদন কমানোর দিকে নজর দেয়। ড্যাভেনপোর্ট নিজেও ইউজেনিক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। উনি বিশ্বাস করতেন মেয়েদের পর্যবেক্ষণ আর সামাজিক বিদ্যা ছেলেদের চেয়ে ভালোÑ তাই উনি এই কাজে শুধু মেয়েদেরই নিযুক্ত করতেন। ১৯১১ সালে প্রকাশিত ‘হরিডিটি ইন রিলেশন টু ইউজেনিক্স’ বইতে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেন যে সমস্ত দক্ষতাই পরিবারভিত্তিকÑ সেটা গানবাজনা থেকে শুরু করে নৌকা-বানানো পর্যন্ত যে কোনো দক্ষতার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এদিকে ইউজেনিক্স কিন্তু আমেরিকায় ক্রমাগত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। স্থানীয় ইউজেনিক সোসাইটি তৈরি হয়Ñ যারা ‘উন্নত পরিবার’দের পুরস্কৃত করত, উৎসাহ দিত আরো বেশি করে সন্তান উৎপাদনে। অপর পাশে ছিল ‘অনুন্নত’দের জোর করে জন্ম-নিয়ন্ত্রণ। ১৯০৭ সালে ইন্ডিয়ানা স্টেটে প্রথম পাশ করা হয় বন্ধ্যাত্বকরণ আইন, যার ফলে অপরাধী, জড়বুদ্ধি, ধর্ষক বা চূড়ান্ত বোকাদের সমাজের স্বার্থে বন্ধ্যাত্বকরণ করানো বাধ্যতামূলক করা হলো। এই আইনের বিরুদ্ধে কোর্টে কেসও উঠল, কিন্তু ১৯২৭ সালে সুপ্রিমকোর্টের রায়ে ব্যাপারটা পাকা হয়ে যায়Ñ ‘সমাজের যারা বোঝা, তাদের বাচ্চারাও সমাজের বোঝাই হবে। সুতরাং তাদের পৃথিবীতে না আসার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য’। ১৯৪১ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় এরকম ষাট হাজার বন্ধ্যাত্বকরণ করানো হয়েছিল। এই ঢেউ গিয়ে লাগে নাৎসি জার্মানি ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোতেও। সেখানেও চলে আইন করে নিচুতলার ওপর অত্যাচারÑ বলপূর্বক বন্ধ্যাত্বকরণ।
এরপরে ইউজেনিক্সের সঙ্গে আরো একটি মাত্রা যোগ করলেন আইনজীবী ম্যাডিসন গ্রান্ট। ১৯১৬ সালে প্রকাশিত ‘দ্য পাসিং অব গ্রেট রেস’ বইতে তিনি দাবি জানালেন নর্ডিকরা জাতিগতভাবে শ্রেষ্ঠ, নিগ্রো, এশিয়ান, এমনকি বাকি ইউরোপিয়ানদের চেয়েও। উনি এর ভিত্তিতে নর্ডিক নয় যারা, তাদের আমেরিকায় অভিবাসনের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করলেন। গ্রান্টের বই পাঠক মহলে খ্যাতি পেতে সময় নেয়নি। ১৯৩৭ সালের মধ্যে বইটির ১,৩৭,০০০ কপি বিক্রি হয়। ১৯২৫ সালে জার্মান ভাষায় অনূদিত হয় বইটি আর এটা প্রভাবিত করে হিটলারকে। হিটলার নিজে গ্রান্টকে ব্যক্তিগত চিঠিতে পরিষ্কার লেখেনÑ ‘এই বইই হলো আমার বাইবেল’।
১৯৩৩ সালে ক্ষমতায় আসার পরেই হিটলার আমেরিকানদের অনুকরণে আইন প্রবর্তন করলেন ‘জিনগত ক্রুটি নির্মূল’ করার জন্য। মাত্র তিন বছরের মধ্যেই ২,২৫,০০০ মানুষের বন্ধ্যাত্বকরণ করানো হলো। এই বিষয়ে শুরু হলো এক বিশেষ ধরনের কোর্টÑ হেরিডিটি কোর্ট। এর সঙ্গে ছিল সমাজের ‘ভাল’দের আরো বেশি করে সন্তান নিতে উৎসাহী করে তোলা। ১৯৩৬ সালে আইন করে তাদের সন্তানসম্ভবা স্ত্রীদের জন্য ভালো থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। ইহুদিরা নর্ডিক ছিল না, তাই তাদের সঙ্গে মূল জার্মানদের বৈবাহিক স¤পর্ক নিষিদ্ধ করা হলোÑ যাতে জার্মান জিন ইহুদিদের সঙ্গে মিশে অনুন্নত সন্তানের জন্ম না দিতে পারে। নাৎসিদের রাজত্বের শেষদিকে দেখা গেল মোট ৪ লক্ষ মানুষের বন্ধ্যাত্বকরণ করা হয়েছে আর স্থাপিত হয়েছে ২০০ হেরিডিটি কোর্ট।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে দেখা গেল এভাবে একটা বড় দল তৈরি হয়ে গেছে যাদের বন্ধ্যাত্বকরণ করা হয়েছে অথচ তারা কারাগারে রাষ্ট্রের পয়সায় খেয়ে চলেছে। তাই নাৎসিরা যাদের বন্ধ্যাত্বকরণ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে পরীক্ষা নেবার জন্য কিছু প্রশ্নপত্র বিলি করেন। পরীক্ষায় ৭৫,০০০ লোক পাস করতে পারল না। তাদের চিহ্নিত করা হলো ‘খাদ্য ধ্বংসকারী’ বা ‘বেঁচে থাকার অনুপযুক্ত’ বলে। কিছুদিনের মধ্যেই নাৎসীরা এর পরিধি বিস্তৃত করে সমস্ত ইহুদি আর জিপসীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করলেন। আর এদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে তৈরি হলো গ্যাস চেম্বারÑ গণহত্যার মারণাস্ত্র। জার্মান জাতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ বানানোর জন্য দেশের মধ্যের ‘অনুন্নত’দের সরিয়ে দেবার এই মৃত্যুছকই ইউজেনিক্সের শেষ ‘অবদান’।
দুই. মেধাবীদের সংখ্যা কম হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, পরিবেশ নেই। আমাদের শিশুপাঠ্য থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি পর্যন্ত কোথাও বিজ্ঞানবাদিতার প্রতিফলন নেই; যা আছে তা হচ্ছেÑ অন্ধবিশ্বাস, কল্পনা আর সমসাময়িক বিষয়ের মিশেল এক ককটেল; যা সর্বক্ষণ বিস্ফোরণের ঝুঁকি নিয়েই বিরাজমান। ফলে আমরা হয়ে গেছি টবের গাছে মতো, বেঁচে আছি কিন্তু বাড়ছি না। কিন্তু একটা কলি তখনই ফুল হয়ে ফুটে, যখন সে উপযুক্ত আলো, বাতাস, মাটি, সার, পানি ইত্যাদি প্রয়োজনীয় উপদান পায়। একবার ভাবুন তো, বিজ্ঞানী হকিংস যদি আমাদের বান্দরবনে বেড়ে উঠতেন, তাহলে কি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী হতে পারতেন? কাজেই সেরা মেধা গড়ার জন্য যে প্লাটফরম দরকার, তার নাম পরিবেশ; যা তৈরিতে আমাদের গরজ নেই।
প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ছেলে-মেয়ে স্কুল-কলেজ পাস করে শিক্ষিতের তালিকা লম্বা করছে, কিন্তু বইয়ের পাঠক কমছে। তারা মোবাইল নিয়ে ফেসবুকে ব্যস্ত, তাদের কোনো দর্শন নেই। ফলে পাড়ার অলিতে-গলিতে পান-সিগারেটের দোকান বাড়ছে ব্যাঙের ছাতার মতো, কমছে পাঠাগার, বই-পত্রিকার স্টল। জ্ঞান চর্চা সবার হয়তো দরকার নেই, কিন্তু মেধাবীদের দরকার; তাদের জন্যই তৈরি করতে হবে উপযুক্ত পরিবেশ। এই পরিবেশ তৈরির জন্যই আমরা গড়ে তুলেছি বিজ্ঞসমাজ। মূলত এই বইটা বিজ্ঞ সমাজের সিলেবাসভুক্ত প্রথম বই। বিজ্ঞসমাজ সম্পর্কিত তথ্য এ বইয়ের শেষে পাবেন।
জন্মসূত্র :
বাঙালিকে কটাক্ষ করে বলা হয়Ñ ‘ছা পোষা বাঙালি’। বাঙালি নিজের বাচ্চাদের জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করে, তার নজির পৃথিবীর আর কোথাও নেই। নিজের জন্য নয়, শুধু বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ তৈরির জন্যই সে বেঁচে থাকে। এটা একদিকে যেমন কল্যাণকর, অন্যদিকে ক্ষতিকরও বটে। দেখুন, আপনার থেকে বের হওয়া লক্ষ কোটি শুক্রকিটের একটি হচ্ছে আপনার সন্তান। আপনার বাকি লক্ষ কোটি শুক্রকিট বাঁচার জায়গা না পেয়ে মরে গেছে। বেঁচে থাকা এই শুক্রকিটটি শুধু আপনার সন্তান নন, একই সঙ্গে মানব প্রজাতিরও সন্তান। কারো ইচ্ছায় হউক, অনিচ্ছায় হোক এরকম শত শত কোটি মানব সন্তান জন্ম নিয়েছে পৃথিবীতে। আমার আপনার মতো কারো সহযোগিতায় পৃথিবীতে আসা এ মানব সন্তানগুলো জন্মের সময় জন্মস্থান এবং জন্মদাতা বেছে নেবার সুযোগ কি পেয়েছিল? যারা জন্ম নিয়েছে পৃথিবীর দুর্বল জন্মস্থান ও জন্মদাতার অধীনে, তারা অন্য সবল মানবের নিষ্ঠুরতার স্বীকার হয়ে করুণ জীবন-যাপন করছে। কেউ চুরি করছে, কেউ দাসত্ব করছে, কেউ কট্টরপন্থী সঠিক শিক্ষা পাননি কিংবা কেউ সাধারণ শ্রমিক; এরা সবাই সুবিধাবঞ্চিত মানব সন্তান। আমরা শুধু আমাদের ঔরসজাতদের (নিজ থেকে বের হওয়া শুক্রকিটের) সুবিধার কথা ভেবেছি আর অন্যদের বঞ্চিত করে চলেছি। এটা মানবিকতা নয়। মানবতা হলো, সুবিধাবঞ্চিতদের প্রতি আপনার দায়িত্ব ও মমত্ববোধ। আমেরিকায় সন্তানের বয়স আঠারো হতেই বাবা-মা ঘর থেকে বের করে দেন, যাও নিজে করে খাও। তখনও যারা ঘর ছাড়তে পারে না, তারা বাবা-মাকে টাকা দিয়ে কিছুকাল থাকে; নইলে আত্মসম্মান থাকে না। মনে করা হয়, একে দিয়ে আর কিছু হবে না। ওদিকে পড়ালেখার খরচও এতো বেশি যে নিজের আয়ে থাকা-খাওয়া চালিয়ে দীর্ঘসময় পড়ালেখায় মোটিভেটেড থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। হাজার হাজার ডলার লোনের ধাক্কা। তাই অনেকেই ঐ পথে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে না। বরং যে কোনো একটি কাজে ঢুকে গিয়ে পার্টনার জুটিয়ে নেয়, কর্ম ও সেক্সজীবন শুরু করে দেয়। আবার যারা লোন নিয়ে পড়াশুনা করছে, তাদের রেজাল্ট বি বা সি এর নিচে গেলেই বৃত্তি এবং লোন বাতিল হয়ে যায়। বি মানে প্রতি বিষয়ে ৮৫-৯০ আর সি মানে ৮০-৮৪। ওখানে পড়ালেখার গতি চলে ঝড়ের বেগে। এরা সন্তানদেরকে আমাদের মতো সারা জীবন আগলে রাখে না। আর ‘সন্তানের জন্যই সবকিছ’ু এমন মনোভাব পোষন করেন না। আমাদের স্বল্প শিক্ষিত অথচ বিত্তবান বাবা-মাকে সন্তানের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে হবে। বিত্তের মেেধ্য ঐশ্যর্যের মধ্যে প্রতিভা-সৃজনশীলতার বিকাশ হয় না, আবার অতি অভাবও মেধা বিকাশে অন্তরায়। সন্তান যাতে নিজেই নিজের জগৎ, ক্যারিয়ার তৈরি করতে পারে, শুধু তাতে সহযোগিতা করতে হবে। আমাদের বিধবা বা স্বামী পরিত্যাক্তা মেয়েরা সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে আর বিয়ে থা করেন না, একা নিরামিশ জীবন পার করে দেয়। এটা চরম অমানবিক। এ বিষয়টা আজকালকার ছেলেমেযেরা বুঝে বলেই তারা বয়স্ক বাবা-মার জন্য সঙ্গী খুঁেজ দেয়।
উন্নত সভ্য মানবরা তাদের আয়কে তিনটি ভাগে ভাগ করেন। একটি অংশ নিজের ও পরিবারের জন্য, দ্বিতীয় অংশটি ব্যবসার পুঁজি বা ভবিষ্যতের সঞ্চয় আর তৃতীয় অংশটি ব্যয় করেন সুবিধাবঞ্চিতদের কল্যাণে। দেশে-বিদেশে এত এনজিও সে তো সভ্য মানুষদের দানকৃত টাকা। ভেবে দেখুন আপনি-আমি নিজেও কিন্তু অন্য অনেকের তুলনায় সুবিধাবঞ্চিত। সঠিক লিংক বা নেটওয়ার্ক অথবা সহযোগিতা না পাওয়ায় কাক্সিক্ষত লক্ষে পৌঁছাতে পারিনি। তাই আমি সাধারণ মানুষদের খুবই সম্মান করি এবং সাধ্যমত সহযোগিতার চেষ্টা করি। কারণ তারা সবাই সুবিধাবঞ্চিত। তারা কোনো ভুল করলে, অন্যায় করলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখি। শুধু নিজের কিট নয়, সুবিধাবঞ্চিতদের সকল মানবের প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়েই তৈরি হয় একজন বিজ্ঞ মানুষ।
আপনি যেই হোন, যে কোনো মুহূর্তে পৃথিবী থেকে আপনাকে বিদায় নিতে হবে এবং এ পৃথিবীতে আপনি আর আসতে পারবেন না। ফলে অজস্র টাকা আর মরীচিকার পিছনে ছুটে জীবন শেষ করে বোকারাই, জ্ঞানীরা অন্যের সঙ্গে শেয়ার করে জীবন উপভোগ করে; অন্যকে ভালো রাখার মাধ্যমে নিজে ভালো থাকার চেষ্টা করে। স্বার্থপররা শুধু নিজে পেতে চায়, নিজের স্বার্থ, পরিবার-পরিজনের বাইরে সে কিছুই বুঝে না, স্বার্থপরদের মধ্যে আবার কিছু চরমপন্থী আছে, যারা নিজের মেয়েদেরও বঞ্চিত করে ছেলেদের পেট বাড়ায়।
আমরা জন্মসূত্রে তিনটি উপাদান পাই, একটা হচ্ছে নাম, দ্বিতীয়ট ধর্ম আর তৃতীয়টা বেড়ে ওঠার পরিবেশ। নাম আপনাকে চিহ্নিতকরণ, ধর্ম হচ্ছে আপনার পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস এবং শিক্ষা, কর্ম, সম্পর্ক আর নিয়ম-কানুন নিয়েই আমাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ। আপনি যত উন্নত ও অনুকূল পরিবেশ পরিবার তথা সমাজে সৃজন করতে পারবেন, তত উন্নতভাবে গড়ে উঠবে আপনার প্রজন্ম। যারা ভালোবাসা, পরিচর্যা এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, তারা আত্মনির্ভরশীল এবং দায়িত্বশীল হয়ে ওঠেন। যারা অবহেলার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে, মানসিক পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের মনে বিরাজ করে বিষণ্নতা, দ্বিধাবিভক্তি মানসিকতা, একাকী কোনো পরিস্থিতি সামাল দিতে অসহায়বোধ এবং নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। কাজেই আমাদের দরকার বেড়ে ওঠার উন্নত ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা।