কোন পৃষ্ঠায় কি আছে :
১। লেখকের কথা ২। ভূমিকা ৩। মহাবিশ্বের সৃষ্টি ৪। মহাবিশ্ব ও সৌরজগৎ ৫। মহাকাশ পরিচিতি ৬। আটটি গ্রহের পরিচয় ৭। পৃথিবীর জন্মের প্রথম অবস্থা ৮। এককোষি প্রাণী থেকে বহুকোষি প্রাণী ৯। উদ্ভিদের জন্ম ১০। মস্তিষ্ক ও শিরদাঁড়া ১১। উভচরদের জন্ম ১২। উভচর থেকে সরীসৃপ ১৩। ডাইনোসারদের যুগ ১৪। ডাইনোসরের বিবর্তিত প্রজাতি ১৫। পাখিদের পূর্বপুরুষ ১৬। স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৭। প্রাইমেটদের কথা ১৮। বিবর্তন কি ১৯। বিবর্তনের সাক্ষ্য ২০। জিরাফের লম্বা গলা কেনো? ২১। মধ্যবর্তী ফসিল নিয়ে টানাটানি ২২। মানুষ আর শিম্পাঞ্জি ২৩। আর্ডি নিয়ে এত হৈচৈ কেনো? ২৪। আমাদের পূর্বপুরুষ ২৫। আদিম মানুষ ২৬। হোমো সেপিয়েন্স ২৭। গূহামানব ২৮। বন্য থেকে সভ্য হওয়ার স্তরগুলো ২৯। প্রস্তর যুগ ৩০। কৃষি সভ্যতা ৩১। কাজের ভাগাভাগি ৩২। নারী-প্রধান সমাজ ৩৩। সে যুগে মায়েরা বড় ৩৪। ঘর তৈরী, কাপড় বোনা ৩৫। খাদ্য-সংগ্রহ থেকে খাদ্য-উৎপাদন ৩৬। আদিম মানুষের প্রজননের রহস্য ৩৭। লৌহ যুগ ৩৮। তামা ও লোহার হাতিয়ার ৩৯। হেনরী লুইস মর্গান ৪০। মিশরীয় সভ্যতা ৪১। সুমেরীয় সভ্যতা ৪২। ব্যবিলনীয় সভ্যতা ৪৩। পারস্য সভ্যতা ৪৪। হিব্রু সভ্যতা ৪৫। ফিনিশীয় সভ্যতা ৪৬। চীনা সভ্যতা ও সিল্ক রোড ৪৭। সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সমাজ ৪৮। গ্রীক সভ্যতা ৪৯। প্রচীন গ্রিস ও ভাস্কযৃ শিল্প ৫০। প্রাচীন গ্রিস ও জ্ঞান চর্চা ৫১। সক্রেটিস, প্লেটো এরিস্টটল ৫২। রোমান সভ্যতা ৫৩। মানব সমাজের অগ্রগতি ৫৪। চিত্রলিপি ৫৫। ভাব ব্যঞ্জক লিপি ৫৬। বর্ণমালার আবিস্কার ৫৭। ব্রাহ্মীলিপি থেকে বাংলা ৫৮। পৃথিবীর নানা জায়গার আদিবাসী ৫৯। এখনো যাদের আদিম অবস্থা ৬০। এস্কিমো ৬১। নিগ্রো ৬২। মাসাই ৬৩। পিগমি ৬৪। বুশম্যান ৬৫। সাহারার তুয়ারেগ ৬৬। আরবের বেদুইন ৬৭। মধ্য এশিয়ার কিরঘিজ ৬৮। মঙ্গোল ৬৯। ল্যাপ ৭০। মালয় ৭১। ওশিয়ানিয়া মহাদেশের আদিম বাসিন্দা ৭২। নাগা ৭৩। খাসিয়া ৭৪। গারো ও চাকমা ৭৫। সাঁওতাল ৭৬। আদিম মানুষের ধর্ম ও ঈশ্বরের আইন ৭৭। ধর্মচেতনার বিকাশ ৭৮। স্রষ্টার জন্য লড়াই শুরু ৭৯। সভ্যতার বিকাশ ও ধর্ম ৮০। ইশ্বর ও ধর্ম ৮১। ধর্ম যেভাবে সৃষ্টি হয় ৮২। ব্রাহ্মণ্যবাদ ৮৩। আর্য দ্রাবিড় মিশ্র সংস্কৃতি ৮৪। বাংলার প্রাচীনতম জাতি ৮৫। তেত্রিশ কোটি দেবদেবী ৮৬। লোকায়ত দর্শন ও সহজিয়া সম্প্রদায় ৮৭। বামাচার / কামাচার ৮৮। হিন্দু ধর্ম, শাক্ত ধর্ম ৮৯। বৈষ্ণব ধর্ম ৯০। শৈব ধর্ম ৯১। দ্বৈতবাদ ৯২। ব্রাহ্ম সমাজ নতুন একটি ধর্ম ৯৩। হিন্দু ধর্মের প্রধান গ্রন্থাবলী ৯৪। হিন্দুধর্মে দেব-দেবী ৯৫। বৌদ্ধ ধর্ম ৯৬। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তি ৯৭। জৈন ধর্ম ৯৮। জরাথুস্ট্রবাদ ৯৯। ইহুদি ধর্ম ১০০। খ্রিস্টান ধর্ম ১০১। ইসলাম ধর্ম ১০২। উত্তাল গৃহযুদ্ধে মুসলিমরা ১০৩। যেভাবে ইসলামের স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১০৪। ইসলামের স্বর্ণযুগ. ছয় শতাব্দী জুড়ে ১০৫। অটোমান সাম্রাজ্য ১০৬। ভাররবর্ষে ইসলামী শাসন, অশোক ও আকবর ১০৭। রাজা গোবিন্দ ও হযরত শাহ জালাল ও ইবনে বতুতা ১০৮। বাঙালিরা যেভাবে মুসলমান হল! ১০৯। চিতোরের রানা প্রতাপ ১১০। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ব্রিটিশ শাসন ১১১। টিপু সুলতান ১১২। স্তনকর ১১৩। তেভাগা আন্দোলন ১১৪। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলার জমিদার ১১৫। মুসলমানদের পিছিয়ে যাওয়া ১১৬। দূর্গা পুজায় বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ১১৭। কারা বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করলো, দুই বাংলার পার্থক্য ১১৮। যেভাবে পাকিস্তান ধারণার জন্ম নিল- ১১৯। যেভাবে ভারত ভাগ হলো ১২০। পাকিস্তানে ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি ১২১। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ১২২। শিয়া মতবাদ ১২৩। আহমদীয়া সম্প্রদায় ১২৪। ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ১২৫। সুফীবাদ ১২৬। বিশুদ্ধ ইসলাম মতবাদ ১২৭। সালাফি মতবাদ ওহাবীবাদ ১২৮। মুতাজিলা মতবাদ ১২৯। দ্রুজ ধর্ম-২৬৫১৩০। ইয়াজিদি ধর্ম ১৩১। লৌকিক দর্শন ১৩২। আধ্যাত্মবাদ ১৩৩। সাবমিশন ইসলাম ১৩৪। বাহাই ধর্ম ১৩৫। আলাওয়িবাদ ১৩৬। জায়েদিবাদ ১৩৭। কাদারবাদ ১৩৮। মায়াবাদ ১৩৯। বাউল দর্শন-২৮০ ১৪০। শিখ ধর্ম ১৪১। তাও ধর্ম ১৪২। কনফুসীয় ধর্ম ১৪৩। কাও দাই ধর্ম ১৪৪। শিন্তৌ ধর্ম ১৪৫। পুঁজিবাদ ১৪৬। মৌলবাদ ১৪৭। প্রগতিবাদ ১৪৮। মানবতাবাদ ১৪৯। অজ্ঞেয়বাদ ১৫০। বিবর্তনবাদ ১৫১। নাস্তিক্যবাদ ১৫২। চার্বাক দর্শন ১৫৩। কমিউনিজম ১৫৪। নগ্নতাবাদ ১৫৫। নারীবাদ ১৫৬। নারী নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ১৫৭। নারী পুরুষের যৌনতার পার্থক্য ১৫৮। নারীর পোশাক ১৫৯। নারী নির্যাতন ১৬০। পারফেক্ট হওয়ার চাপে নারীরা ১৬১। বিবর্তনে মূল্য দিতে হয়েছে নারীকেই ১৬২। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতি ১৬৩। নারী-পুরুষের বহুগামিতা ১৬৪। বাংলা সংস্কৃতির পোষাক ১৬৫। রোহিঙ্গা ও আরকাম রাজ্য ১৬৬। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ১৬৭। কৌম সমাজ ১৬৮। কিছু মাতৃপ্রধান সমাজের পরিচিতি ১৬৯। বিটগেনস্টাইন-এর যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ ১৭০। ফুকোর প্রেম ও যৌনতার ডিসকোর্স ১৭১। বৈশিক কলা ১৭২। অর্থ জমানোর প্রতিযোগিতা ১৭৩। বুদ্ধিমান রোবট সাইবোর্গ ১৭৪। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ১৭৫। কার্বন ন্যানোটিউব ১৭৬। অমরত্বের খোঁজে ১৭৭। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ১৭৮। মস্তিষ্কের ডাটা ট্রান্সপার ১৭৯। ডিএনএ এবং জিন প্রযুক্তি ১৮০। এ আই প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের হাইব্রিড মানুষ? ১৮১। আমাদের সমাজ ও মিডিয়া
তামা এবং লোহার হাতিয়ার
প্রায় একশ’ বছর আগের ঘটনা। অন্যান্য বছরের তুলনায় ইউরোপে সেবার একটু বেশি গরম পড়েছে। খরার তাপে নদীনালা, পুকুর-পুষ্করিণীর পানি শুকিয়ে যেতে লাগল। ইউরোপের উত্তরে ছোট্ট দেশ সুইট্জারল্যান্ড, দেশটি ছোট-বড় অজস্র হ্রদে ভর্তি। পানি শুকিয়ে যেতেই হ্রদের ঢালু গা যত উপরে উঠে আসতে লাগল, ততই একটা আশ্চর্য জিনিস সবার নজরে এলো। হ্রদের গায়ে ছড়ানো, এমন সব পুরনো জিনিসপত্র দেখতে পাওয়া গেল, যেগুলোকে মানুষ কোনো এক সময়ে তার রোজকার কাজে ব্যবহার করেছিল। কাঠের-বাঁট-লাগানো পাথরের কুড়াল, জিনিস রাখবার ঝাঁকা, এমনকি খাবার তৈরি করা হতো যা দিয়ে সেই গমের দানা পর্যন্ত রকমারি জিনিসপত্র এবং হাতিয়ার এই হ্রদগুলোর গা থেকে পাওয়া গেল। বহুকাল আগে এখানে যে মানুষের বসতি ছিল, তা বোঝা গেল।
শুধু সুইট্জারল্যান্ডের হ্রদের গায়েই শুধু নয়। তারও কিছুদিন আগে থেকে পৃথিবীর নানা অঞ্চলে আরো অনেক জিনিসপত্র পাওয়া যাচ্ছিল, যেগুলো কোনো না কোনো সময়ে মানুষই ব্যবহার করত। এই সমস্ত জিনিসপত্র এবং হাতিয়ারগুলো প্রধানত তিনটি উপাদান দিয়ে তৈরি : পাথর, তামা বা ব্রোঞ্জ এবং লোহা। পৃথিবীর বুকে আবির্ভাবের পর মানুষ প্রথমে পাথর, তারপর তামা ও ব্রোঞ্জ এবং সবচেয়ে শেষে লোহার তৈরি হাতিয়ার এবং জিনিসপত্র ব্যবহার করে এসেছে। প্রাচীন গ্রিস ও রোমের মানুষরা এ খবরটি জানলেও, মানুষের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে এই ধারণাটির সত্যিকারের বিজ্ঞানসস্মতভাবে প্রতিষ্ঠা হলো ১৮৩৬ সালে। জাভা এবং চিনের পিকিং-এ সবচেয়ে আদিম যে মানুষের অস্তিত্ব আজ পর্যন্ত জানা গিয়েছে, তারাও হাতিয়ার ব্যবহার করত। যে কোনো একটি সাময়িক প্রয়োজনে তখনকার মতো কাজে লাগে এমন একটি পাথরের টুকরোই পিকিং-এর এই মানুষেরা ব্যবহার করত। বারবার ব্যবহার করার জন্যে সেটাকে যত্ন করে রেখে দেবার কথা তারা ভাবত না, পরবর্তী প্রয়োজনের সময় অন্য আর একটি পাথরের টুকরো ব্যবহার করা হতো।
হাতিয়ারগুলোর ধরন থেকে বোঝা যায় যে, একটা পাথরের উপর হাতের পাথরটাকে ঘা মেরে, তা থেকে পরতের পর পরত তুলে সেটাকে কিংবা সেই তুলে ফেলা পরতগুলো দিয়ে মনমতো হাতিয়ার তৈরি করা হতো। অতিকায় হাতি প্রভৃতি বন্যপশু আরো ভালোভাবে শিকার করা, তাদের মাংস কাটা, চামড়া বেছে তোলা-ইত্যাদি কাজের জন্যেই হাতিয়ারগুলোর মধ্যে এক-একটি নির্দিষ্ট ব্যবহারের ধরন এসে গেল। ছুরি হিসেবে, অথবা বল্লমের আগায় লাগিয়ে অতিকায় এই জন্তুগুলোকে গভীরভাবে আঘাত করার জন্যে দেখা দিলো দু’পাশ ধারালো ছুঁচালো তিনকোনা হাতিয়ার। আবার, শিকার করা জন্তুগুলোকে মাংস কেটেসুটে ছাল ছাড়িয়ে খাবারের উপযুক্ত করে তোলবার জন্যে তৈরি হলো চ্যাপ্টা আরেক রকম হাতিয়ার। এ যুগের প্রাচীন এই দু-রকম হাতিয়ারের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলে মনে হয় যে, মানুষের সমাজে তখন পুরুষ ও নারীর কাজের ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছিল। ক্রমশ মানুষ পাথর দিয়ে হাতিয়ার তৈরির কাজে আরো বেশি দক্ষ আরো বেশি নিপুণ হয়ে উঠল। অতিকায় হাতি প্রভৃতি শিকার একজন দু’জনের পক্ষে করা কিছুতেই সম্ভব ছিল না। ‘প্যালিওলিথিক’ বা পাথরের এই পুরনো যুগে, শিকার এবং খাদ্য সংগ্রহের উপর নির্ভরশীল মানুষের সমাজে ছিল পুরোপুরি সাম্য সমাজ।
হাতিয়ারের ইতিহাসে এর পরের যে যুগ তাকে বলা হয় ‘নিওলিথিক’ বা পাথরের নতুন যুগ। নতুন পাথরের যুগে মগজ খাটিয়ে, নতুন হাতিয়ার তৈরি করে মানুষ খাবার যোগাড়ের বিষয়ে একটা যুগান্তকারী বিপ্লব সৃষ্টি করল। মাটি খুঁড়ে শস্যের বীজ বোনার জন্যে এবং আগাছা পরিষ্কার করার জন্য মাটি খোঁড়ার নতুন হাতিয়ার তৈরি হলো। লম্বা লাঠির মুখ ঘষে-ঘষে ছুঁচালো করা, পাথরের একটা টুকরো বসিয়ে, কিংবা কোদালের মতো দেখতে বা হরিণের স্বাভাবিক শিং ব্যবহার করেই গোড়াতে এই কাজগুলো করা হতো। মাটি খুঁড়ে বীজ বোনবার পর যে ফসল হলো তা কেটেকুটে ঘরে তোলবার জন্যে তৈরি হলো কাস্তের মতো এক রকম আদিম হাতিয়ার। একটা লাঠি কিংবা পাথরের টুকরোর উপর খাঁজ কেটে, পরে এমনকি মৃত পশুর চোয়াল ব্যবহার করেও ফসল কাটবার কাজ সারা হতো।
নতুন পাথরের যুগে উপযুক্ত হাতিয়ার নিয়ে চাষবাষ করতে শিখে মানুষ তার খাবারের সমস্যার সুরাহা করে ফেলল। ঠিক এই সময়েই মানুষ আবার বন্যপশুর মধ্যে বেশ কয়েকটিকে গৃহপালিত করে তোলার কৌশলও শিখেছিল। এই প্রথম তাদের জীবনে খানিকটা সত্যিকারের স্বাচ্ছন্দ্য এলো। খাবার যোগাড়ের বিষয়ে সংগ্রহ এবং শিকারের পর্যায় থেকে চাষবাসের পর্যায়ে ধারাবাহিক পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে প্যালেস্টাইনের কারমেল পাহাড়ের ওয়াদি-এল নাটুক নামে জায়গাটি থেকে। জায়গাটির নাম থেকেই এখানকার সেই প্রাচীন অধিবাসীদের নাটুফিয়ান বলে অভিহিত করা হয়। যিশু খ্রিস্টের জন্মের অন্তত সাড়ে চার হাজার পাঁচ হাজার বছর আগে নাটুফিয়ানরা শিকার এবং সংগ্রহ করেই মোটামুটি খাবারের সংস্থান করত।
কবে কোথায় ও কিভাবে প্রথম কৃষি উৎপাদন হয়েছিল, তা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে মনে করা হয় যে, মহিলাদের হাতেই কৃষির উৎপত্তি হয়েছিল। পুরুষরা শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ করতে সবসময় ব্যস্ত থাকত। ফলে, ফসল উৎপাদনের দিকে নজর দেয়ার অবসর ছিল না। পক্ষান্তরে মহিলারা গৃহস্থালির কাজ এবং কিছু কিছু ফলমূল ও জ্বালানি সংগ্রহ করত। ফলমূলের সাথে সংগ্রহ করে আনা যব (বার্লি) বা গমের বীজ আর্দ্র জায়গায় পড়ে ক্রমে সেখানে চারা অঙ্কুরিত হতে দেখে এবং ঐ চারাগুলি থেকে প্রচুর ফল উৎপাদিত হতে দেখে মহিলারা বাসস্থানের আশেপাশে কিছু বীজ ছড়িয়ে চারা জন্মাবার ব্যবস্থা করায় প্রথম ‘কৃষি বিপ্লবের’ সূত্রপাত হয়েছিল। কৃষির মধ্যে গম ও বার্লির চাষ প্রাচীনতম। পোটামিক মতবাদ অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের ‘উর্বর অর্ধচন্দ্রাকৃতি’এলাকায় কৃষির সূত্রপাত হয়েছিল। যতদূর জানা যায় ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে কৃষিই ইউরোপের রূপ বদলে দিতে শুরু করেছিল। এটা নিশ্চিত মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে অনেক পরে ইউরোপে কৃষি কাজ শুরু হয়েছিল। ইংল্যান্ডে ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অর্থাৎ, মধ্যপ্রাচ্যে কৃষি উদ্ভবের প্রায় ৪০০০বছর পর কৃষি কাজ শুরু হয়েছিল।
পূর্ব ¯েপনে ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কৃষি পৌঁছায়। মধ্য প্রস্তর যুগেই কুকুরকে পোষ মানানো হয়। শিকারের পরিত্যক্ত খাবার খেয়ে সে ক্ষুধা নিবারণ করে। স্বীকার করতে গিয়ে দু’ একটি দুর্বল পশু শাবক শিকারের হাতে জীবিত ধরা পড়তো। এইসব নিরীহ পশু শাবক যেমন- গরু, ছাগ ভেড়কে মানুষ কাজে লাগাত,পশু শাবকগুলো বড় হয়ে খাদ্যোপযোগী হয়ে উঠলেও এগুলোকে হত্যা না করে গৃহপালিত পশুতে পরিণত করা হতো। এই নিরীহ পশুগুলো কালক্রমে নতুন শাবকের জন্ম দিলে পশুর বংশবৃদ্ধি ঘটতো। পোষ মানানোর পর তাদের থেকে মাংস, দুধ,চামড় লোম পাওয়া যেতো। তার গোবর থেকে সার পাওয়া যেতো। অনেক অঞ্চলে জমি চাষাবাদের উপযোগী না হওয়ায় অনেক কৃষিজীবীও পশুপালনেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা দীর্ঘকাল এক স্থানে বাস করত, চারণভূমি নষ্ট হয়ে গেলেই কেবল তারা অন্যত্র গিয়ে বাসস্থান স্থাপন করত। মেসোপটেমিয়া, মিশর ও পাকিস্তানের পাঞ্জাবে পশুপালনের সূত্রপাত। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের আগে বুনো পশুকে পোষ মানিয়ে ভারবহন ও যাতায়াতের কাজে ব্যবহার শুরু হয়। ব্যাবিলন ও এশিয়া মাইনরে খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের দিকে বোঝা বহন ও যাতায়াতের কাজে গাধার যথেষ্ট ব্যবহার হতো।
বহুপতি প্রথা পৃথিবীর খুব কম সমাজে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বহু পত্নী প্রথা বহু অঞ্চলে প্রচলিত। রাষ্ট্র গড়ে ওঠার পেছনে কৃষির ভূমিকা ছিল বেশি। কৃষিনির্ভর সমাজের জমি নিয়ে সংঘাত, উর্বর জমির দখল নিয়ে বিবাদ, জমির মালিকানা নিয়ে বিবাদ এবং এগুলোর মীমাংসার জন্য কিছু সামাজিক নিয়ম-কানুনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। উদ্ধৃত্ত জিনিস ও পণ্য ক্রয়-বিক্রয়, বিনিময় ব্যবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও কিছু আইনের প্রয়োজন হয়। যাযাবর পশুপালক সমাজ বিভিন্ন ‘কৃষি গ্রামের’ সমৃদ্ধি অবস্থা দেখে আকৃষ্ট হয়ে গ্রাম আক্রমণ করতে শুরু করে এবং সুযোগ পেলেই গ্রামের স¤পদ লুট করতে চেষ্টা করে। এসব ভবঘুরে পশুপালকদের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ঘন ঘন যুদ্ধ আর বহিঃশত্রুর কাজ থেকে আত্মরক্ষার জন্য দলপতি নিযুক্ত করা হয়। দলপতিদের হাতে অস্ত্র ও গ্রাম রক্ষার ভার থাকায় ক্রমেই তারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সমাজে তারা কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য বিস্তার করে এবং তাদের বংশধররাও যাতে দলপতি হয় সে ব্যবস্থা করে যায়। এভাবেই বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রে উদ্ভব। পরাজিত শত্রুকে আগের মত খাদ্যের জন্য মেরে ফেলার চেয়ে কাজে লাগানো অনেক লাভজনক দেখে বিজিতদের তাদের দাস হিসেবে বাঁচিয়ে রাখে। পরাজিতরা শারীরিক নির্যাতন বা মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে শ্রম দিতে বাধ্য হয়।
প্রস্তর যুগে ভাষার বিকাশ ঘটে। কৃষিজমির সন্ধানে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের ভাবের আদান-প্রদান ঘটে। যদিও লিখন পদ্ধতি তখনও আবিষ্কৃত হয়নি।
অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা, প্লাবন, মড়ক, কীট-পতঙ্গ ফসলের ক্ষতি করতো। মানুষের হাতে এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার পথ জানা ছিল না। ফলে প্রাকৃতিক অশুভ শক্তিগুলোর প্রতি তার মনে অজানা ভীতির সঞ্চার হয় এবং ভীতিকর অতিপ্রাকৃত শক্তির ধারণা জন্মে। নিরুপায় মানুষ ‘অতিপ্রাকৃতকে খুশি রেখে দুর্যোগের হাত থেকে মুক্তি পেতে’ তাদের তুষ্ট করতে নানা মনগড়া আচার-অনুষ্ঠান পালন করেছে। তখন মানুষ অশুভ শক্তিকে তুষ্ট করার জন্য প্রচুর আচার-অনুষ্ঠান পালন করত। অদৃশ্য শক্তির আশীর্বাদ পাওয়ার আশায় ভজন, উপাসনা ও মিনতি করা হতো। এগুলো করতে গিয়ে নানান কুসংস্কারের আচ্ছন্ন হয়ে পড়ত। এর পাশাপাশি বিপদ থেকে রক্ষা পেতে যাদুবিদ্যায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বিবাহ,রোগ, মৃত্যু বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে ওঝা বা যাদুকরের শরণাপন্ন হতো। সাধারণ লোকদের ধারণা দেয়া হতো যাদুকররা দেবতাদের বংশধর। পূজা-পার্বণ, আচার-অনুষ্ঠান বেড়ে যাওয়ায় এগুলো ঠিকভাবে পালন ও পরিচালনার জন্য একশ্রেণীর ধর্মযাজকের আবির্ভাব হয়। নানা দূর্যোগের দোহাই দিয়ে তারাও জাদুকরদের মত তাদের উপর মানুষের নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে তোলে। নতুন নতুন দেবতা, উপাসনালয় গড়ে তোলে। অচিরেই তারা শক্তিশালী, বিত্তবান শ্রেণিতে পরিণত হয়