জনতার মঞ্চ (People's Platform)
জনতার মঞ্চ (People's Platform)
সহায়ক পুস্তকঃ বক্তৃতার চর্চা, পিডিএফ লিংক -
https://drive.google.com/file/d/1qlV2n3KSFIjiwVwPzKOydOmi8-dTf5FC/view?pli=1
কথা বলার জড়তা কাটাতে করনীয়
মঞ্চে কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে অনেক মানুষের মাঝে কথা বলতে গিয়ে হাঁটু কাঁপতেই পারে। হাত ঘামা, বুক ধড়ফড়, গলা কাঁপা, কথা আটকে যাওয়া ইত্যাদিসহ আরও নানান অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতে হয় প্রথমবার কয়েকবার। কারও আবার গলার আওয়াজ পাল্টে যায়। বিজ্ঞানও বলে এসময় শরীর বাড়তি চাপ অনুভব করে যার কারণে স্বরতন্ত্র প্রভাবিত হয়।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে সচরাচর শ্বাস-প্রশ্বাস ও গলার স্বরে পরিবর্তন দেখা যায়। মানুষের শরীরের গঠনও এখানে অনেকটা দায়ী।
‘ভোকাল ফোল্ডস’ নামক এক ধরনের ত্বক-কোষ আমাদের বায়ুনালী পরিবেষ্টিত রাখে। যার কাজ হল এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা।
যেমন শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা, বাতাসে চাপ, মানসিক চাপ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে পানি নিয়ে নেওয়া থেকে সুরক্ষা দেয় এই ‘ভোকাল ফোল্ড’।
জনসমাগমে কিছু বলতে গিয়ে যখন প্রচণ্ড চাপ অনুভব করলে স্বরতন্ত্রী সক্রিয় হয়। ‘ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স’ অর্থা ‘মার কিংবা মর’ এই ধরনের পরিস্থিতিতে স্বরতন্ত্রীর চারপাশের পেশি সঙ্কুচিত হয়ে, হয় খুলে যেতে কিংবা বন্ধ হতে চাপ প্রয়োগ করে। ফলে কথা বলা ও গলার স্বর প্রভাবিত হয়। যে কারণে কথা আটকে যায়, বলতে কষ্ট হয়, যা আরও মানসিক চাপ বাড়ায়।
এই কারণে শরীর কাঁপে, ঘামতে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘স্প্যাজমোডিক ডিসফোনিয়া’।
গলা কাঁপার কারণেও কথা বলায় সমস্যা দেখা দেয়। যে কারণে মানুষের আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং মানসিক অস্বস্তিজনীত সমস্যাগুলোও অনুভূত হতে শুরু করে। কারও ক্ষেত্রে এই সমস্যা অত্যন্ত গুরুতর হয়, কথা আটকে যেতে পারে প্রতিটি শব্দে। এই সমস্যাগুলো পুরোপুরি মানসিক নয়।
করণীয়
যে কোনো এক হাতের তর্জনী মুখের কয়েক ইঞ্চি দুরে ধরে রাখতে হবে। এবার একটি লম্বা দম টানতে হবে। দম যখন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইবে তখন দম ছাড়ার সময় পাঁচ থেকে ১০ সেকেন্ড সময় ধরে ‘উহ হু’ শব্দটি করতে হবে।
সাধারণ সময় ছাড়াও জনসম্মুখে দাঁড়ানোর আগে তিন থেকে চার বার এই অনুশীলন করতে পারেন।
অনুশীলনটির বর্ণণা শুনতে খামখেয়ালি মনে হলেও এর মাধ্যমে স্বরতন্ত্রী খুলে যাবে। আর লম্বা শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে ‘ভোকাল ফোল্ড’ শিথিল হবে। কথার বলার জড়তা কমবে, বায়ু চলাচল সুগম হবে, কণ্ঠ হবে বলিষ্ঠ। কথা বলার সময় জড়তা দেখা দিলে সেখানেও লম্বা দম নেওয়া উপকারী হবে। এতে হৃদস্পন্দন মন্থর হবে।
কথা বলার সময় কারো কারো উচ্চারণে সমস্যা হয়। এমনিতে হয়তো ঠিকই আছে তবে দ্রুত কথা বলতে গেলে আটকে যান কেউ কেউ। কারো আবার নির্দিষ্ট কোন কোন শব্দ উচ্চরণে সমস্যা হয়। এটি খুব জটিল কোনো সমস্যা নয়। একটু সচেতন হলেই এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন কিছু ব্যায়ামের। ব্যায়ামগুলো মুখের। কীভাবে করবেন? চলুন জেনে নেয়া যাক-
জিহ্বার ব্যায়াম:
১. একটি পরিষ্কার কাঠপেন্সিল মুখে নিন। দুই পাটির দাঁত দিয়ে সমান্তরালভাবে কামড়ে ধরে পড়া শুরু করুন, যতক্ষণ আপনার ভালো লাগে।
২. জিহ্বাকে সামনের দিকে টান টান করবেন, যতটা পারা যায়।
৩. ভেতরের দিকে টেনে নিয়ে যান, যতটা সম্ভব।
৪. মুখ হা করে জিহ্বাকে টান টান করে চারিদিকে ঘুরাতে থাকুন। প্রথমে ঘড়ির কাটার দিকে কিছুক্ষণ। পরে ঘড়ির কাটার বিপরীতে কিছুক্ষণ।
৫. মুখ বন্ধ করে চারিদিকে জিহ্বাকে ঘুরাতে থাকুন। প্রথমে ঘড়ির কাটার দিকে কিছুক্ষণ। পরে ঘড়ির কাটার বিপরীতে কিছুক্ষণ।
৬. জিহ্বাকে চুইংগাম-এর মত চিবোতে থাকুন। ডানে বায়ে ঘুড়িয়ে। যতক্ষণ ভাললাগে।
৭. জিহ্বাকে মুখের বাইরে তড়িৎ গতিতে ছুড়ে মারুন। এভাবে করতে থাকবেন কিছুক্ষণ।
৮. মুখ হা করুন, যত বড় করা যায়।
৯. মুখ গোল করে ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুরান। এভাবে প্রতিদিন কয়েকবার করে করবেন।
বক্তৃতার স্কেল :
অনেকে বক্তৃতা দেওয়ার সময় প্রারম্ভেই হাই-স্কেলে (উচ্চকণ্ঠে) কথা বলা শুরু করে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই স্কেলটা বজায় রাখে। কিন্তু, না। গানের যেমন তাল, লয় আছে, ঠিক তেমনি বক্তৃতারও তাল, লয় আছে। অতএব, সেই তাল, লয় ঠিক রেখে বক্তৃতা করতে হবে। অর্থাৎ বক্তৃতার প্রারম্ভে স্বাভাবিকভাবে খানিকটা শান্ত নমিত কণ্ঠে বক্তৃতা শুরু করতে হবে। তারপর যেখানে জোর দিয়ে কথা বলার মতো, সেখানে একটু উচ্চ রবে কথা বলবে।বক্তৃতার অন্তিম মুহূর্তে এসে সমস্ত বক্তব্যের মূলভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করবে। কিছুটা আবেগ মিশিয়ে কথাগুলো বলবে। আর সমাপ্তি বাক্যগুলো খুব মনোহর ও আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করবে। কেননা বক্তৃতার শেষ লগ্নের কথাগুলোই শ্রোতাদের মনে বেশি দাগ কাটে। বক্তৃতার সময় শ্রোতাদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কথা বলবে।
বিভিন্ন ওয়ায-মাহফিল, জনসভা অথবা সেমিনারের মঞ্চে ওঠার আগে প্রথম প্রথম বক্তৃতা শেখার একটি চমকপ্রদ শৈলী হলো, কোনো নির্জন প্রান্তরে, প্রভাতে বাড়ির ছাদে, পুকুর বা নদীর ধারে, রাত্রিবেলা বাড়ির সামনের উঠোনে অথবা পড়ন্ত বিকেলে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মন খুলে বক্তৃতা অনুশীলন করা।
স্বর-প্রক্ষেপণ:
প্রতিটি শব্দের উচ্চারণে আনতে হবে স্পষ্টতা। উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী প্রতিটি বর্ণের উচ্চারণ করতে হবে। এবং এটি কোন দ্রুততম সময়ে সম্ভব নয়। বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে নির্ভূল উচ্চারনের নান্দনিক প্রকাশ কবিতা শিল্প হয়ে উঠে। শুদ্ধ উচ্চারণ, স্বর প্রক্ষেপণের যাদুকারিতা এর সাথে স্বর বৈশিষ্ট্যও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। যাকে আমরা সুরের মাদকতা বলেও ভাবতে পারি।
সাধারণত প্রক্ষেপণ অনুযায়ী স্বরকে কে পাঁচভাগে ভাগ করা হয়।
১)অ্যাবডোমেন বা নাভি থেকে প্রক্ষেপণ।
২)লিপটাং বা মুখ গহ্বর থেকে প্রক্ষেপণ।
৩) হুইসপারিং বা ফিসফিস করে প্রক্ষেপণ।
৪)ন্যাজাল বা নাকের সংস্পর্শে প্রক্ষেপণ।
৫) হেড রেজিস্টার বা মস্তিষ্ক ছুঁয়ে নাক-মুখ জিহ্বা দিয়ে প্রক্ষেপণ।
কোন গভীর স্বরে কথা বা গম্ভীর হয়ে বলা কিংবা দীর্ঘনিঃশ্বাস এর সাথে ভেতর থেকে উচ্চারিত কথা আসে নাভি থেকে স্বরক্ষেপণ এর মাধ্যমে। স্বাভাবিক কথাবার্তা বলার সময় মুখগহ্বর থেকেই স্বর প্রক্ষিপ্ত হয়।একজন অভিনেতা বা আবৃত্তিকার সাধারণত যে স্বরে কথা বলেন সেটি তার ক্ষেত্রে লিপটাং থেকে উদ্ভূত।যখন কোন কথা গোপনে বা আবেগে বুঝে আসা গলায় ব্যবহৃত হয় তখন ফিসফিস করে বলা হয়।দূরের কাউকে ডাকার সময় আমরা একটু নাকঘেঁষা স্বর প্রক্ষেপণ করে থাকি। যাকে ন্যাজাল বলি। আবদারের অভিব্যক্তি বোঝাতে এই স্বরক্ষেপণ প্রয়োজনীয়।যন্ত্রণা বা আর্তি, অসহ্য ক্রোধ বোঝাতে যে ধরনের স্বরক্ষেপণ করা হয় তা যেন আমাদের নাক,মুখ সব স্থান দিয়ে বেরোতে থাকে।আবার মস্তিষ্কের সঙ্গে তার যেন একটা সরাসরি যোগ থাকে। এইরকম মস্তিষ্ক ছুঁয়ে নাক-মুখ জিহ্বা দিয়ে সর প্রক্ষেপণ কে বলে হেড রেজিস্টার।এই যে পাঁচটি প্রক্ষেপণ স্থান নির্দেশিত হলো তা সম্পূর্ণ ভাবেই বিজ্ঞান প্রদর্শিত স্বরস্থান।
জিভের সঠিক ব্যবহার:
উচ্চারিত শব্দ বা বাক্যকে কন্ঠ দিয়ে মানুষের কানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য জিভের একটা বড় ভূমিকা আছে। মুখের মধ্যে জিভ এর ঠিকঠাক নড়াচড়া এবং কণ্ঠকে সহায়তা করার জন্য জিভের ও কিছু কিছু অনুশীলন করা যেতে পারে-
১) মুখ থেকে জিভ থেকে বের করে যতদূর সম্ভব প্রসারিত করার চেষ্টা করা।
২) জিভটিকে একেবারে ভাসিয়ে রাখা। তা যেন ওষ্ঠ বা অধরে স্পর্শ না করে।
৩) জিভকেদুটি গালের ভেতরের দিকের অংশে স্পর্শ করানো। ৪)দাঁতের ভেতর দিকের অংশকে বাঁ দিক থেকে ডান দিকে জিভ দিয়ে স্পর্শ করা। এক্ষেত্রে ওপরের এবং নিচের দাঁতের মাড়িতে স্পর্শ করতে হবে।
৫) দাঁতের ঠিক নিচে ভেতর দিকে মাড়ির যে অংশ তা জিভ দিয়ে স্পর্শ করতে হবে।
৬) জিভকে সম্পূর্ণ উল্টে আলজিভের দিকে যতদূর নিয়ে যাওয়া যায় তার চেষ্টা করা।
৭)উপরের যে তালু রয়েছে যাকে আমরা টাকরা বলি তাকে জিভ দিয়ে চাটার মত করে বোলানোর চেষ্টা।
নাকের সঠিক ব্যবহার:
কন্ঠকে সঠিক রাখার জন্য নাক সব সময় খোলা থাকা প্রয়োজন। আমরা বলতে পারি,নাক যদি না খোলা থাকে তাহলে 'ন'উচ্চারণ সব সময় 'ল'শোনায়। তাই নাকি এর কোনো জটিলতা বা অসুস্থতা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ঠোঁট, দাঁত, মূর্ধার সঠিক ব্যবহার:
কন্ঠের অনুরণন এর জন্য এগুলি রেসোনেটারের এর কাজ করে।তাই যদি কারো দাঁতের সমস্যা থাকে অথবা তার দাঁতগুলো যদি বানানো হয় সে ক্ষেত্রে কণ্ঠস্বরে তা ধরা পড়ে।আবার কারো যদি ঠোঁটে কোন সমস্যা থাকে জন্মগতভাবে সে যদি ঠোঁট কাটা হয় স্বরক্ষেপণ এ অবশ্যই তার প্রভাব পড়বে।
কিভাবে ব্যায়ামটি করতে হবে:-
সোজা হয়ে বসুন, আপনার হাত দুটি থাইয়ের ওপর রাখুন
মুখ খুলে যতটা সম্ভব বাতাস টেনে নিন
ঠোঁট চেপে রাখুন
যতক্ষণ সম্ভব ততক্ষণ শ্বাসটা শরীরের মধ্যে রেখে দিন।
আপনি কতক্ষণ ধরে এটি আটকে রাখতে পারেন তার ওপর আপনার ফুসফুসের সুস্বাস্থ্যের দিকটি নিশ্চিত হয়।
যে কেউ এটি প্রথমে ঘন্টা খানেক ধরে পরে আরো বেশি সময় ধরে এই ব্যায়াক করতে পারেন। যাঁরা ২৫ সেকেন্ড শ্বাস আটকে রাখতে পারেন তাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে খুব জোর করে এই ব্যায়াম করবেন না।
পিঠের মেরুদণ্ড টানটান করে প্রথমে মুখ দিয়ে শ্বাস ছেড়ে ফুসফুসের সব বাতাস বার করে দিতে হবে। আবার গভীর শ্বাস নিয়ে যতটা সম্ভব ফুসফুসে বাতাস ভরে নিতে হবে। এর পর যতক্ষণ সম্ভব শ্বাস আটকে রাখুন। আবার সব বাতাস বার করে দিন। এই প্র্যাকটিস দিনে অন্তত দু’বার করা যেতে পারে। এতে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। লম্বা শ্বাস নিয়ে কমপক্ষে ১০ সেকেন্ড ধরে রাখার চেষ্টা করুন। প্রথমেই ১০ সেকেন্ড সম্ভব না হলে সাধ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে শ্বাসবায়ু ধরে রাখার সময় বাড়াতে হবে।