কুমড়ার বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচার গল্প

​আজকের সুস্বাদু ও মিষ্টি কুমড়ার সূচনা কিন্তু মোটেও মিষ্টি ছিল না। লক্ষ লক্ষ বছর আগে বন্য স্কোয়াশ বা প্রাচীন কুমড়ার স্বাদ ছিল প্রচণ্ড তিক্ত।

​পাহাড়সম প্রাণীদের প্রিয় খাদ্য

বন্য কুমড়ায় উপস্থিত ছিল 'কুকুরবিটাসিন' (Cucurbitacin) নামের এক ধরনের বিষাক্ত ও অত্যন্ত তিতা রাসায়নিক যৌগ। ছোট ছোট প্রাণী কিংবা স্তন্যপায়ী জীবের পক্ষে এই ফল খাওয়া ছিল অসম্ভব ও বিপজ্জনক। কিন্তু বিশালাকৃতির মেগাফওনা (Megafauna)—যেমন উলি ম্যামথ, গ্যাংট স্লথ (দৈত্যাকার স্লথ) ও প্রাচীন মাস্টোডনদের বিশাল শরীরের সামনে এই তিতকুটে স্বাদ কোনো বাধা হতে পারেনি। তারা অনায়াসে আস্ত কুমড়া চিবিয়ে খেয়ে ফেলত। তাদের পরিপাকতন্ত্রে তিতা যৌগটির কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ত না, বরং বীজগুলো না হজম হয়ে মলের সাথে দূর-দূরান্তে অক্ষত অবস্থায় ছড়িয়ে পড়ত। এভাবে বিশালকায় প্রাণীদের মাধ্যমেই বন্য কুমড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বংশবৃদ্ধি করত।

​প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও বীজ ছড়ানোর মাধ্যম বিনাশ

প্রায় ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ বছর আগে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে উত্তর আমেরিকার পরিবেশ দ্রুত বদলাতে শুরু করে। মানুষের শিকার বৃদ্ধি ও আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে ম্যামথ ও দৈত্যাকার স্লথের মতো মেগাফওনা প্রাণীগুলো পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বড় তৃণভোজী প্রাণীরা হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে প্রাচীন বন্য স্কোয়াশের প্রাকৃতিক বীজ ছড়ানোর প্রধান মাধ্যমটি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ফলে মিষ্টি কুমড়ার পূর্বপুরুষেরা ধীরে ধীরে সংখ্যায় কমতে থাকে এবং প্রাকৃতিক নিয়মে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।

​মানুষের হাত ধরে বেঁচে ফেরা

প্রকৃতির এই চরম সংকটের মুখে উদ্ধারকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় মানুষ। প্রাচীন উত্তর আমেরিকার আদিবাসীরা খেয়াল করে যে এসব তিতা ফলের শক্ত খোসা শুকিয়ে চমৎকার পাত্র, জপযন্ত্র ও পানির পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। প্রথমে ব্যবহারের সুবিধার জন্য মানুষ বন্য স্কোয়াশ সংগ্রহ ও রোপণ করা শুরু করে।

​পরবর্তীতে কৃত্রিম প্রজনন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাষিরা এমন কিছু কুমড়ার প্রজাতি বেছে নিতে থাকে, যেগুলোতে তিতা রাসায়নিক 'কুকুরবিটাসিন'-এর পরিমাণ কম ছিল। কয়েক শতাব্দী ধরে ধাপে ধাপে চাষাবাদ করার ফলে তিতকুটে বন্য স্কোয়াশ বদলে গিয়ে তৈরি হয় আজকের মিষ্টি, পুষ্টিকর ও সুস্বাদু কুমড়া। বিশালকায় ম্যামথেরা প্রজাতিটিকে অতীতে বাঁচিয়ে রাখলেও, শেষ পর্যন্ত মানুষের চাষাবাদের ফলেই কুমড়া আজও টিকে রয়েছে।

​কুমড়ার এই ইতিহাস ও মেগাফওনা প্রাণীদের সাথে এর অদ্ভুত সম্পর্ক নিয়ে আপনার আর কোনো নির্দিষ্ট তথ্য জানার আছে কি?—



সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব ইতিহাসে এক অসাধারণ “মানবসম্পদ স্থানান্তর” ঘটেছিল, যার প্রভাব আজও প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনে দেখা যায়। বিশেষ করে সোভিয়েত ইহুদি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানিতে চলে যায়। কিন্তু বিষয়টি শুধু অভিবাসনের নয়; এটি ছিল বহু দশক ধরে গড়ে ওঠা উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত মানবসম্পদের স্থানান্তর।

সোভিয়েত ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যায় ইহুদিদের অংশ ছিল এক শতাংশেরও কম। অথচ ১৯৭০-এর দশকে বৈজ্ঞানিক পেশায় তাদের অংশ ছিল প্রায় ৫–৬ শতাংশ, আর উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রিধারীদের মধ্যে এই হার প্রায় ৯ শতাংশে পৌঁছেছিল। অর্থাৎ জনসংখ্যার অনুপাতে তারা বিজ্ঞান ও গবেষণায় বহু গুণ বেশি প্রতিনিধিত্ব করতেন। পদার্থবিদ্যা, গণিত, প্রকৌশল, চিকিৎসা ও কম্পিউটিং ছিল তাদের শক্তিশালী ক্ষেত্রগুলোর অন্যতম।

এটিকে কেবল কোনো “জাতিগত বৈশিষ্ট্য” হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এর পেছনে ছিল কয়েকটি ঐতিহাসিক কারণ—শহরকেন্দ্রিক জীবন, পরিবারে শিক্ষার প্রতি বিনিয়োগ, সোভিয়েত শিক্ষা ব্যবস্থার কঠোর গণিত ও বিজ্ঞান প্রশিক্ষণ, এবং একই সঙ্গে বৈষম্যের কারণে প্রশাসন, রাজনীতি বা কূটনীতির তুলনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে তুলনামূলক নিরাপদ পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া।

১৯৮৯ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে সাবেক সোভিয়েত অঞ্চল থেকে প্রায় ১৬ লাখ ইহুদি ও তাদের পরিবারের সদস্য দেশত্যাগ করেন। এর মধ্যে প্রায় ৯.৮ লাখ ইসরায়েলে, ৩.২৫ লাখ যুক্তরাষ্ট্রে এবং ২.১৯ লাখ জার্মানিতে যান।

ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ছিল বিস্ময়কর। কয়েক বছরের মধ্যে দেশটি প্রায় ৫৭ হাজার প্রকৌশলী ও ১২ হাজার চিকিৎসক পায়। অথচ অভিবাসনের আগে পুরো ইসরায়েলে প্রকৌশলীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০ হাজার। অর্থাৎ নতুন আগত প্রকৌশলীর সংখ্যা আগের মোট প্রকৌশলীর প্রায় দ্বিগুণ! একই সময়ে প্রায় ১৩ হাজার বিজ্ঞানীও দেশটিতে পৌঁছান।

কিন্তু শুধু বিজ্ঞানী থাকা যথেষ্ট নয়। ইসরায়েল তাদের জন্য তৈরি করেছিল প্রযুক্তি ইনকিউবেটর, গবেষণা সহায়তা, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ। ১৯৯৩ সালে “Yozma” কর্মসূচি চালু করে সরকার ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তি বিনিয়োগে বেসরকারি পুঁজিকে উৎসাহিত করে।

ফলে সোভিয়েত থেকে আসা বৈজ্ঞানিক দক্ষতা, ইসরায়েলের সামরিক প্রযুক্তি, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল একসঙ্গে মিলে একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম তৈরি করে। বর্তমানে ইজরায়েল যে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে তার পিছনে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পাওয়া মানব সম্পদ বিরাট পালন রেখেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রেও একই মানবসম্পদ বিশাল প্রভাব ফেলে। Sergey Brin-এর পরিবার সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে পরবর্তীতে Google প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের অংশ হয়। Max Levchin PayPal-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা হন। Jan Koum তৈরি করেন WhatsApp। Alexei Abrikosov পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। Vladimir Drinfeld ও Yakov Sinai আধুনিক গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে গভীর প্রভাব রাখেন।

এই ইতিহাস আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়: প্রতিভা একা পৃথিবী বদলায় না। প্রতিভার সঙ্গে দরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাধীনতা, গবেষণার পরিবেশ, পুঁজি, বাজার এবং উদ্ভাবনের সুযোগ।

সোভিয়েত ইউনিয়ন তৈরি করেছিল বিজ্ঞানী; ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের জন্য তৈরি করেছিল এমন পরিবেশ, যেখানে সেই জ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব থেকে বেরিয়ে প্রযুক্তি, কোম্পানি ও বৈশ্বিক উদ্ভাবনে রূপ নিতে পেরেছিল।

একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়—মানুষের মেধা। আর সঠিক প্রতিষ্ঠান সেই মেধাকে ইতিহাস বদলে দেওয়ার শক্তিতে পরিণত করতে পারে।

@ Yeanur Rahman



রাশিয়া এত বড় কেন?

প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ। ইউরোপের এক প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে দেশটি উত্তর এশিয়া পেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল ভূখণ্ডের খুব সামান্য অংশই ছিল রাশিয়ার প্রাথমিক কেন্দ্র।

আজকের রাশিয়াকে যদি কয়েক শতাব্দী পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়, দেখা যাবে—একটি তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্র ধীরে ধীরে প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তারপর ইউরাল পর্বতমালা পেরিয়ে গোটা সাইবেরিয়া অতিক্রম করেছে, পৌঁছে গেছে প্রশান্ত মহাসাগরে। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ও পশ্চিমেও বিস্তার ঘটিয়ে গড়ে উঠেছে রুশ সাম্রাজ্য।

এর শুরু হয়েছিল বর্তমান রাশিয়ার পশ্চিমাংশে অবস্থিত তুলনামূলক ছোট একটি রাষ্ট্র মস্কোভি বা মস্কোর গ্র্যান্ড ডাচিকে কেন্দ্র করে।

রাশিয়ার আদি দেশ কোনটি?

রাশিয়ার ইতিহাসের আরও পুরোনো শিকড় রয়েছে কিয়েভান রুসে। নবম শতক থেকে পূর্ব ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা এই রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল কিয়েভ। বর্তমান রাশিয়া, ইউক্রেন ও বেলারুশ—তিন দেশের ইতিহাসের সঙ্গেই কিয়েভান রুসের সম্পর্ক রয়েছে।

১৩শ শতকে মঙ্গোল আক্রমণের পর কিয়েভান রুস ভেঙে বিভিন্ন রুশ রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। এগুলোর মধ্যে মস্কোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা 'মস্কোভি' ধীরে ধীরে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

তাই আধুনিক রাশিয়ার সরাসরি রাজনৈতিক পূর্বসূরি হিসেবে মস্কোভিকে ধরা হয়। তবে এটিও আজকের রাশিয়ার তুলনায় ছিল অত্যন্ত ছোট।

১৫শ শতকের মাঝামাঝি মস্কোভির বাইরে বর্তমান রাশিয়ার অনেক অঞ্চল ছিল অন্য রুশ রাজ্য, তাতার খানাত, বিভিন্ন স্থানীয় রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীর অধীনে।

প্রথমে নিজের আশপাশের অঞ্চল দখল:

১৪৬২ সালে ইভান তৃতীয় মস্কোর শাসক হওয়ার পর মস্কোভির সম্প্রসারণ দ্রুত হয়। তার প্রধান লক্ষ্য ছিল আশপাশের স্বাধীন রুশ রাজ্যগুলোকে মস্কোর অধীনে আনা।

এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিকার ছিল নভগোরোদ প্রজাতন্ত্র। উত্তর-পশ্চিম রাশিয়ার এই সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক রাষ্ট্র দীর্ঘদিন মস্কোর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। ১৪৭৮ সালে মস্কো নভগোরোদ দখল করে।

এরপর তভেরসহ অন্যান্য রুশ রাজ্যও মস্কোর অধীনে আসে।

এই সময় মস্কোকে এখনও গোল্ডেন হোর্ডের প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছিল। মঙ্গোল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী গোল্ডেন হোর্ড একসময় রুশ রাজ্যগুলোর ওপর কর্তৃত্ব করত এবং তাদের কাছ থেকে কর আদায় করত। কিন্তু ১৫শ শতকে হোর্ড দুর্বল হয়ে পড়ে।

১৪৮০ সালের উগ্রা নদীর ঘটনা মস্কোর ওপর গোল্ডেন হোর্ডের দীর্ঘ কর্তৃত্বের কার্যত অবসানের প্রতীক হয়ে ওঠে। এরপর মস্কো স্বাধীনভাবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে থাকে।

ভলগা অঞ্চলে রাশিয়ার প্রবেশ:

পরবর্তী বড় ধাপ ছিল মঙ্গোল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী খানাতগুলো দখল করা। ১৫৫২ সালে ইভান চতুর্থ বা ইভান দ্য টেরিবলের শাসনামলে মস্কো কাজান খানাত দখল করে। চার বছর পর, ১৫৫৬ সালে, আস্ত্রাখান খানাতও রাশিয়ার অধীনে আসে।

এই দুটি বিজয় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ফলে রাশিয়া ভলগা নদীর বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ পায় এবং কাস্পিয়ান সাগরের দিকে যাওয়ার পথ খুলে যায়। কিন্তু এর চেয়েও বড় দরজা তখন রাশিয়ার সামনে—সাইবেরিয়া।

সাইবেরিয়া: রাশিয়া এত বড় হওয়ার মূল কারণ

১৫৮০-এর দশকে রুশ কসাকরা উরাল পর্বতমালা পেরিয়ে সাইবেরিয়ায় প্রবেশ শুরু করে। এরমাক তিমোফেয়েভিচের নেতৃত্বাধীন অভিযান পশ্চিম সাইবেরিয়ার সাইবেরীয় খানাতের বিরুদ্ধে বড় সাফল্য পায়।

সাইবেরিয়া তখন কোনো একক বিশাল রাষ্ট্র ছিল না। পশ্চিম অংশে ছিল সাইবেরীয় খানাত, আর আরও পূর্বে ছিল বিভিন্ন তুর্কি, মঙ্গোলীয় ও অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং ছোট রাজনৈতিক সত্তা।

রুশদের জন্য সাইবেরিয়ার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল মূল্যবান পশম। পশমের ব্যবসা থেকে বিপুল অর্থ পাওয়া যেত। তাই ব্যবসায়ী, শিকারি ও কসাকরা ক্রমেই পূর্বদিকে এগিয়ে যেতে থাকে। তাদের পেছনে রুশ সরকার দুর্গ, শহর ও প্রশাসনিক কেন্দ্র তৈরি করে।

সাইবেরিয়ার বিশাল নদীগুলোও এই অগ্রযাত্রাকে সহজ করে দেয়। ফলে উরাল পেরোনোর কয়েক দশকের মধ্যেই রুশরা গোটা উত্তর এশিয়া অতিক্রম করে।

১৬৩৯ সালের মধ্যে রুশ অভিযাত্রীরা প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ মাত্র প্রায় ৬০ বছরের মধ্যে রাশিয়া ইউরাল থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু সব ভূখণ্ডই কি তখন কোনো দেশের ছিল?

না। এটাই রাশিয়ার সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

বর্তমান রাশিয়ার ইউরোপীয় অংশে মস্কোর আগে ছিল নভগোরোদ, তভের, রিয়াজানসহ বিভিন্ন রুশ রাজ্য। ভলগা অঞ্চলে ছিল কাজান ও আস্ত্রাখান খানাত। দক্ষিণে ছিল ক্রিমিয়ান খানাত, যা অটোমান সাম্রাজ্যের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও অধীনস্থ ছিল।

সাইবেরিয়ার পশ্চিমাংশে ছিল সাইবেরীয় খানাত, কিন্তু পূর্ব সাইবেরিয়ার বিশাল এলাকায় কোনো একক রাষ্ট্র ছিল না। সেখানে অসংখ্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের ভূখণ্ডে বসবাস করত।

আর পূর্বদিকে এগিয়ে রাশিয়া শেষ পর্যন্ত কিং বা Qing সাম্রাজ্যের সঙ্গেও সীমান্তে পৌঁছে যায়। ১৬৮৯ সালের নেরচিনস্ক চুক্তির মাধ্যমে দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে সীমান্ত নির্ধারিত হয়।

এরপর আরও দক্ষিণ ও পশ্চিমে:

সাইবেরিয়া জয় করেই রাশিয়ার সম্প্রসারণ শেষ হয় নি। ১৮শ ও ১৯শ শতকে রুশ সাম্রাজ্য আরও দক্ষিণ ও পশ্চিমে বিস্তৃত হয়। ক্রিমিয়ান খানাত ও অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে রাশিয়া কৃষ্ণসাগরের উত্তরাঞ্চল ও শেষ পর্যন্ত ক্রিমিয়া দখল করে।

ককেশাসে রাশিয়া জর্জিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজানসহ বিভিন্ন অঞ্চলকে নিজের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে।

মধ্য এশিয়ায় এগিয়ে গিয়ে রাশিয়া খিভা, বুখারা ও কোকান্দের মতো খানাত ও রাষ্ট্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

অন্যদিকে পশ্চিমে পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথের দুর্বলতার সুযোগে বর্তমান ইউক্রেন, বেলারুশ ও পোল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চল রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।

এভাবে মস্কোভির ছোট্ট ভূখণ্ড ধীরে ধীরে একটি বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।

সংক্ষেপে: ছোট মস্কোভি থেকে বিশ্বের বৃহত্তম দেশ

রাশিয়ার বিশাল আয়তন তাই কোনো প্রাকৃতিক বিষয় নয়। একই সাথে সুপ্রাচীন উত্তরাধিকার নয়, আবার রাতারাতিও এতো বড় হয় নি। এর পেছনে রয়েছে প্রায় পাঁচ শতাব্দীর ধারাবাহিক সম্প্রসারণ।

প্রথমে মস্কোভি আশপাশের রুশ রাজ্যগুলোকে একত্র করে। এরপর গোল্ডেন হোর্ডের পতনের সুযোগে ভলগার খানাতগুলো দখল করে। তারপর উরাল পেরিয়ে সাইবেরিয়ার বিশাল ভূখণ্ড জয় করে মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছে যায়। পরবর্তী সময়ে ককেশাস, মধ্য এশিয়া, কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল ও পূর্ব ইউরোপে আরও বিস্তার ঘটে। এক সময় আলাস্কা পর্যন্ত এর বিস্তৃতি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলাস্কা বিক্রি না করে দিলে দেশটি আরও বড় থাকত।

এই পুরো ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়টি হলো সাইবেরিয়া—যে ভূখণ্ড আজ রাশিয়ার আয়তনের বিশাল অংশ দখল করে আছে, সেটি একসময় রাশিয়ার ছিলই না; রুশরা কয়েক দশকের অভিযানে ইউরাল থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত সেটি নিজেদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিল। @ boikal


4

নেগেটিভিটি বায়াস। 

মনোবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় নেগেটিভিটি বায়াস। বহু যুগ আগে আমাদের পূর্বপুরুষদের বেঁচে থাকার জন্য বিপদ আগেভাগে চিনে নেওয়াটা জরুরি ছিল। সেই পুরনো অভ্যাসের রেশ আজও রয়ে গেছে—

আমাদের মন ইতিবাচক খবরের চেয়ে নেতিবাচক খবরকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়।

হেবের সূত্র ও একুশ দিনের গোপন নিয়ম

বিজ্ঞানী ডোনাল্ড হেবের একটি সহজ কিন্তু গভীর তত্ত্ব আছে— যে নিউরনগুলো বারবার একসঙ্গে সক্রিয় হয়, তারা

পরস্পরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত হয়ে যায়। ধারাবাহিক একুশ দিন একই নেতিবাচক চিন্তা করলে মস্তিষ্ক সেই পথটিকে স্থায়ী রাস্তায় পরিণত করে ফেলে— অনেকটা কাঁচা মাটিতে বারবার হাঁটার ফলে যেমন একটি স্পষ্ট পথ তৈরি হয়ে যায়, ঠিক তেমনই।

উদাহরণ

দিয়েই বোঝা যায় বিষয়টা— প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের খুঁত খোঁজার অভ্যাসে সে অজান্তেই তার মনে  হীনম্মন্যতার একটি স্থায়ী রাস্তা তৈরি করে ফেলেছে।

কেন নেতিবাচক চিন্তা সহজেই জিতে যায়

একটি প্রশংসার চেয়ে একটিমাত্র সমালোচনা আমাদের মনে অনেক বেশিদিন গেঁথে থাকে। এটা কারও ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়— এটি

মস্তিষ্কের বহু পুরনো এক সেটিং, যা বদলানো সম্ভব সচেতন চেষ্টায়।

সমাধানের পথ

প্রথমত, নেতিবাচক চিন্তা মাথায় এলেই মনে মনে বা জোরে বলুন— "থামো।"

দ্বিতীয়ত, প্রতিদিন অন্তত তিনটি ভালো মুহূর্ত

খাতায় লিখে রাখুন; লিখতে

না পারলে সুনির্দিষ্টভাবে মনে মনে সেগুলো নিয়ে ভাবুন।

তৃতীয়ত, নতুন কিছু শেখা বা নতুন পথে হাঁটার

অভ্যাস গড়ে তুলুন, কারণ

নতুন অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ুপথ তৈরি করে।

নিজেকে একুশ দিন সময় দিন— পুরনো পথ মুছে নতুন পথ গড়ার জন্য। জল যেমন ধীরে ধীরে পাথর ক্ষয় করে, তেমনই আপনার ছোট্ট সচেতন প্রচেষ্টাও একদিন পুরনো নেতিবাচক অভ্যাসকে মুছে দেবে।  @ পার্থ প্রতিম রায়


4


একবার সিজার মানেই কি সবসময় সিজার? ৫টি VBAC তথ্য যা মায়েদের জানা দরকার

......

বিকেল ৫টা। গাইনোকোলজিস্টের চেম্বারের বাইরে অপেক্ষমাণ আপনি। এটি আপনার দ্বিতীয় প্রেগন্যান্সি। প্রথমবার নানা জটিলতায় সিজার করতে হয়েছিল। এবার আপনার ভীষণ ইচ্ছে স্বাভাবিকভাবে (নরমাল ডেলিভারি) সন্তান জন্ম দেওয়ার। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে আশেপাশের মানুষ, আত্মীয়স্বজন এমনকি পাড়ার ভাবিরাও আপনাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, "প্রথমবার যেহেতু পেট কাটা হয়েছে, এবার তো সিজার ছাড়া কোনো উপায়ই নেই! নরমাল ট্রাই করলে তো আগের সেলাই ফেটে বাচ্চা মারা যাবে!" এই কথাগুলো শুনে আপনার বুকের ভেতরটা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। আপনার মনে হয়, আপনার নিজের শরীরের ওপর আপনার কি কোনোই অধিকার বা নিয়ন্ত্রণ নেই?

আমাদের সমাজে একটি অত্যন্ত প্রচলিত প্রবাদ আছে—"একবার সিজার মানেই সবসময় সিজার"। এই একটি ভয়ংকর অবৈজ্ঞানিক ধারণার কারণে হাজারো মা তাদের দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় স্বাভাবিক ডেলিভারির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কিডোরা স্মার্ট প্যারেন্টিং-এর আজকের এই ইন-ডেপ্থ এবং মনস্তাত্ত্বিক আর্টিকেলে আমরা জানবো, একবার সিজার হওয়ার পরও দ্বিতীয়বার নরমাল ডেলিভারি বা VBAC (Vaginal Birth After Cesarean) কতটা সম্ভব, এর পেছনের আধুনিক বিজ্ঞান কী এবং এই সম্পর্কে এমন ৫টি তথ্য যা প্রতিটি মায়ের জানা উচিত।

বিজ্ঞান কী বলছে:  

চিকিৎসা বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রসূতিবিদ্যা বলছে, প্রথমবার সিজার হওয়ার মানে এই নয় যে মায়ের শরীর চিরতরে তার স্বাভাবিক জন্মদানের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

সফলতার হার (High Success Rate):

আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, যেসব মা প্রথমবার সিজারের পর দ্বিতীয়বার নরমাল ডেলিভারির (VBAC) চেষ্টা করেন, তাদের মধ্যে ৬০% থেকে ৮০% মা সফলভাবে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম দিতে পারেন। এটি কোনো জাদুকরী বা বিরল ঘটনা নয়, এটি একটি প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য।

ইউটেরাইন রাপচার বা সেলাই ফেটে যাওয়ার ভয় (Uterine Rupture):

মায়েদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো নরমাল ট্রাই করলে আগের সিজারের সেলাই ফেটে যাবে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, যদি আপনার আগের সিজারে 'লো ট্রান্সভার্স ইনসিশন' (পেটের নিচের দিকে আড়াআড়ি কাটা) হয়ে থাকে, তবে নরমাল ডেলিভারির সময় সেই সেলাই ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি ১%-এর চেয়েও কম (০.২ থেকে ০.৯%)! অর্থাৎ, ৯৯% ক্ষেত্রেই এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ।

প্যারাডাইম শিফট: মিথ বনাম বাস্তবতার চরম সত্য

মিথ: প্রথমবার সিজার হলে দ্বিতীয়বার নরমাল ডেলিভারি করা ১০০% অসম্ভব এবং বেআইনি।

বাস্তবতা: আমেরিকান কলেজ অফ অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস (ACOG)-এর গাইডলাইন অনুযায়ী, একবার সিজার হওয়া বেশিরভাগ মায়ের জন্যই VBAC একটি অত্যন্ত নিরাপদ এবং উপযুক্ত অপশন। এটি মোটেও অসম্ভব কিছু নয়।

মিথ: নরমাল ট্রাই করার চেয়ে আরেকবার সিজার করে ফেলা মা ও বাচ্চা উভয়ের জন্যই বেশি নিরাপদ।

বাস্তবতা: বারবার সিজার করলে মায়ের শরীরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, ইনফেকশন এবং ভবিষ্যতে প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল জরায়ুর সাথে আটকে যাওয়ার (Placenta Accreta) মতো ভয়ংকর ঝুঁকি তৈরি হয়। একটি সফল VBAC এসব ঝুঁকি থেকে মাকে বাঁচায়।

মিথ: আগের সিজারের ব্যথা এবং নতুন ডেলিভারির ব্যথা মিলে মায়ের শরীর নষ্ট হয়ে যায়।

বাস্তবতা: VBAC-এর পর মায়ের শরীর রিকভার করতে বা সুস্থ হতে সিজারের চেয়ে অনেক গুণ কম সময় লাগে। মা খুব দ্রুতই স্বাভাবিক জীবনে এবং বাচ্চার পূর্ণ যত্নে ফিরে যেতে পারেন।

অ্যাকশন ব্লুপ্রিন্ট: সফল VBAC-এর প্রস্তুতি ও স্মার্ট গাইড

"সবাই তো মানা করছে, আমি একা কীভাবে পারবো?"—এই অসহায়ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে নিজের শরীরের অধিকার ফিরে পেতে আজ থেকেই এই ব্লুপ্রিন্টটি অনুসরণ করুন:

ধাপ ১: VBAC-বান্ধব ডাক্তার ও হাসপাতাল নির্বাচন করুন

কী করবেন: এমন একজন গাইনোকোলজিস্ট খুঁজে বের করুন যিনি শুধু মুখে নয়, বাস্তবেও VBAC প্র্যাকটিস করেন এবং উৎসাহ দেন।

কীভাবে করবেন: ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করুন, "আপনার VBAC সফলতার হার কেমন?" এবং নিশ্চিত হোন যে ওই হাসপাতালে ইমার্জেন্সি সিজার করার জন্য ওটি (OT) এবং অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত থাকেন কি না।

ধাপ ২: আগের সিজারের কারণ এবং সেলাইয়ের ধরন জানুন

কী করবেন: আপনার প্রথম সিজারের অপারেশনের নোট (Surgical Notes) বা ডিসচার্জ পেপার সংগ্রহ করুন।

কীভাবে করবেন: কাগজটি পড়ে বা ডাক্তারকে দেখিয়ে নিশ্চিত হোন যে আপনার আগের সিজারটি 'Low Transverse' বা বিকিনি লাইনে হয়েছিল কি না। আগের সিজার যদি বাচ্চার উল্টো পজিশন বা সাময়িক কোনো কারণে হয়ে থাকে (যা এই প্রেগন্যান্সিতে নেই), তবে আপনার VBAC হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

ধাপ ৩: মানসিক প্রস্তুতি এবং পেলভিক ফ্লোর ব্যায়াম (Pelvic Floor Exercise)

কী করবেন: চারপাশের নেতিবাচক কথা থেকে কান বন্ধ রেখে নিজের শরীর ও মনকে ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত করুন।

কীভাবে করবেন: প্রেগন্যান্সিতে যদি কোনো জটিলতা না থাকে, তবে ডাক্তারের পরামর্শে নিয়মিত হাঁটাচলা করুন, পেলভিক ফ্লোর মাসল শক্তিশালী করার জন্য কেগেল (Kegel) এক্সারসাইজ এবং ব্রিদিং টেকনিক প্র্যাকটিস করুন। এগুলো আপনার ব্রেনকে রিলাক্সড রাখবে এবং নরমাল ডেলিভারির পথ সহজ করবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: 'বাণিজ্যিক সিজার' এবং মুরুব্বিদের ভয়

আমাদের দেশে সিজারিয়ান ডেলিভারির হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এর পেছনে যেমন কিছু অসাধু ক্লিনিকের 'বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য' জড়িত, তেমনি জড়িত আমাদের সমাজের অমূলক ভয়।

বাংলাদেশে একজন মা যখন দ্বিতীয়বার নরমাল ডেলিভারি করতে চান, তখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান খোদ পরিবারের মুরুব্বিরা। তারা বলেন, "কী দরকার এত রিস্ক নেওয়ার? প্রথমবার তো পেট কাটিয়েছিসই, এবারও কেটে ফেল!" অনেক সময় ডাক্তাররাও সময় বাঁচানোর জন্য বা ইমার্জেন্সির রিস্ক না নেওয়ার জন্য মাকে সিজারের দিকে ঠেলে দেন। ফলে মায়েরা ভাবতে বাধ্য হন যে তাদের শরীর বোধহয় আর কখনোই স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবে না। নিজের শরীর সম্পর্কে এই অজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব আমাদের মায়েদের আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু করে দিচ্ছে।

প্রিয় বাবা এবং মা,

প্রথমবার সিজার হয়েছে বলে আপনার শরীর কোনোভাবেই 'নষ্ট' বা 'অকেজো' হয়ে যায়নি। এবং দ্বিতীয়বার নরমাল ডেলিভারির স্বপ্ন দেখাটা কোনোভাবেই আপনার স্বার্থপরতা বা পাগলামি নয়। এটি আপনার শরীর, আপনার সন্তান এবং আপনার জন্মদানের অভিজ্ঞতা। চারপাশের অমূলক ভয় আর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নিয়মের কাছে নিজের আত্মবিশ্বাসকে হেরে যেতে দেবেন না। সঠিক তথ্য জানুন, সঠিক ডাক্তার নির্বাচন করুন এবং নিজের শরীরের প্রাকৃতিক ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখুন। সঠিক গাইডলাইন এবং প্রস্তুতির মাধ্যমে আপনিও পারেন সেই ৬০-৮০% বিজয়ী মায়েদের দলে নাম লেখাতে, যারা সফলভাবে একটি সুন্দর VBAC-এর মাধ্যমে নিজের মাতৃত্বকে উদযাপন করেছেন!

@ কিডোরা স্মার্ট কমিউনিটি:

রেফারেন্স বা সোর্স (References):

* ACOG (American College of Obstetricians and Gynecologists): Clinical practice guidelines on Vaginal Birth After Cesarean (VBAC).

* WHO (World Health Organization): Recommendations on non-clinical interventions to reduce unnecessary caesarean sections.


5


আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য। সময়ের অভাবে, সুবিধার খাতিরে, আর বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে আমরা প্রতিদিন গ্রহণ করছি এমন সব খাবার, যা দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই স্বাদেও অতুলনীয়। কিন্তু এই খাবারগুলোর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক নির্মম সত্য—এগুলো ধীরে ধীরে আমাদের শরীরকে বিষাক্ত করে তুলছে, অথচ আমরা তা বুঝতেও পারছি না।

প্যাকেটের ভেতর যে খাবারটি রাখা, তার জন্ম কারখানার ল্যাবে। কাঁচামাল থেকে শুরু করে শেষ পণ্য—প্রতিটি ধাপে রাসায়নিক হাত পড়ে। চিনি পরিশোধিত হয় অ্যাসিড দিয়ে, তেল ডিওডোরাইজ করা হয় উচ্চ তাপমাত্রায়, আটা ব্লিচ করা হয় ক্লোরিন গ্যাস দিয়ে। স্বাদ বাড়াতে যোগ হয় মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট, শেলফ লাইফ বাড়াতে বিএইচটি ও বিএইচএ, আর রং ধরে রাখতে টার্ট্রাজিন ও সানসেট ইয়েলো।

এই সংযোজনগুলোর প্রতিটি পৃথকভাবে 'সীমিত মাত্রায় নিরাপদ' বলে বিবেচিত। কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষ একবারে একটি নয়—একসঙ্গে কয়েক ডজন রাসায়নিক গ্রহণ করে। তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা নেই। অথচ প্রতিদিন, প্রতিবেলায় এই ককটেল প্রবেশ করছে আমাদের রক্তপ্রবাহে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত পঞ্চাশ বছরে বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগী বেড়েছে ৪ গুণ, স্থূলতার হার বেড়েছে ৩ গুণ, আর অটোইমিউন রোগ বেড়েছে শতকরা ৩০০ ভাগেরও বেশি। এই সময়ের মধ্যেই প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বৈশ্বিক বাজার বেড়েছে ১৫ গুণ। সম্পর্কটি এতটাই সরল যে তা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।

আমাদের দেহ হাজার হাজার বছর ধরে অভ্যস্ত পুরো শস্য, তাজা ফল, কাঁচা শাক, আর প্রাকৃতিক প্রোটিনে। কিন্তু গত মাত্র একশো বছরে খাদ্যশিল্প এই ধারাকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে। মাইক্রোওয়েভে গরম করার জন্য তৈরি রেডিমেড খাবার, বছরখানেক টেকানো পাস্তুরাইজড দুধ, আর পাঁচ মিনিটে তৈরি হওয়া ইনস্ট্যান্ট নুডলস—এগুলোর সঙ্গে আমাদের পাচনতন্ত্রের সামঞ্জস্য নেই।

আরও ভয়াবহ হলো এই খাদ্যগুলো আসক্তি তৈরি করে। চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়, ঠিক যেমনটা করে কিছু নেশাজাতীয় দ্রব্য। বিজ্ঞাপন শিল্প এই সত্যটি খুব ভালো জানে—তাই তারা খাবারকে নয়, বরং আবেগকে বিক্রি করে। প্যাকেটের সামনে লেখা 'প্রাকৃতিক', 'স্বাস্থ্যকর', 'অর্গানিক'—এসব শব্দ অনেক সময় আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে মাত্র।

লেবেল পড়তে জানলে দেখা যায়, 'কোনো কৃত্রিম রং নেই' মানে প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরিত রং, যা একইভাবে অ্যালার্জি তৈরি করতে পারে। 'চিনি নেই' মানে কৃত্রিম মিষ্টি আছে, যা অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে। 'লো ফ্যাট' মানে বাড়তি চিনি বা সোডিয়াম যোগ করা হয়েছে স্বাদ ফিরিয়ে আনতে। এই কৌশলগুলো এতটাই নিখুঁত যে গড় ক্রেতা সেগুলো চিনতেই পারে না।

শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হলো মুনাফা। কাঁচামাল থেকে তৈরি খাবার নষ্ট হয় দ্রুত, লাভ কম, পরিবহন ব্যয় বেশি। অথচ প্রক্রিয়াজাত খাবার বছরের পর বছর ঠিক থাকে, সংরক্ষণে খরচ কম, আর মার্জিন অনেক বেশি। এই অর্থনৈতিক সমীকরণই আজকের খাদ্যবাজার নির্মাণ করেছে—ভোক্তার পুষ্টি নয়, বরং শেয়ারহোল্ডারের রিটার্নকে প্রাধান্য দিয়ে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, লিভারের ফ্যাটি পরিবর্তন, এবং অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের অবক্ষয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ক্যান্সার গবেষণার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বারবার উঠে আসছে, নাইট্রাইট ও নাইট্রেট সংরক্ষকসমৃদ্ধ প্রক্রিয়াজাত মাংস কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের জন্য 'প্রমাণিত ঝুঁকি' হিসেবে চিহ্নিত।

আমরা প্রতিদিন সকালে যে সিরিয়াল খাচ্ছি, শিশুর হাতে যে জুসের প্যাকেট দিচ্ছি, অফিসে বিরতিতে যে বিস্কুট খাচ্ছি—এসব প্রতিটি ঘটনা একেকটি ডোজ। ছোট ছোট ডোজ, যার প্রভাব পড়ে বছরের পর বছর পরে। তখন আমরা অভিযোগ করি জিনেটিক্সকে, বয়সকে, পরিবেশকে—কিন্তু প্যাকেটের ভেতরের তালিকাটা কখনো প্রশ্ন করি না।

উৎপাদনকারীরা জানে, ভোক্তা যদি পুরো সত্য জানত, বিক্রি অর্ধেক হয়ে যেত। তাই তারা তথ্যকে এতটাই জটিল ভাষায় এবং এতই ক্ষুদ্র অক্ষরে মুদ্রণ করে যে পড়াও সম্ভব নয়। অথচ প্রতিটি প্যাকেটের পেছনে লেখা থাকে সেই সত্যটি—শুধু পাঠোদ্ধার করতে হয়।

এই খাদ্যবিন্যাস বদলাতে হবে—এমন কথা বলা সহজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সিস্টেমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষিনীতি, বাণিজ্য চুক্তি, বিজ্ঞাপনী সাম্রাজ্য, আর ভোক্তার অভ্যাস—একটি শক্ত জাল। এই জালের বাইরে বেরোনো মানে শুধু খাবার বদলানো নয়, বরং পুরো জীবনযাপন পদ্ধতি পাল্টে ফেলা।

প্রশ্ন হলো, যখন বিষটি এত মৃদু, যখন তা এত সুস্বাদু, যখন তা এত সহজলভ্য—তখন কে থামবে? আর কীভাবে?

~Nafij



6


নারীর যেসব আচরণ পুরুষরা একদম পছন্দ করেন না

নারী-পুরুষের সম্পর্ক ভালোবাসা, সম্মান, বিশ্বাস ও বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তবে কিছু আচরণ ধীরে ধীরে সেই সম্পর্কের স্বাভাবিক উষ্ণতা নষ্ট করে দিতে পারে। এখানে “নারীর আচরণ” বলতে সব নারীকে বোঝানো হচ্ছে না, বরং এমন কিছু আচরণকে বোঝানো হচ্ছে, যা অনেক পুরুষের কাছে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। গবেষণাতেও দেখা যায়, সঙ্গীর আচরণে চাপ, দোষারোপ, অবহেলা কিংবা যোগাযোগ এড়িয়ে চলার মতো বিষয় সম্পর্কের মান খারাপ করতে পারে। ১৯৯৯ সালে ডেভিড এল. ভোগেল, স্টিফেন আর. ওয়েস্টার ও মার্টিন হিসাকার ১০৮ জন ডেটিং-সম্পর্কে থাকা ব্যক্তিকে নিয়ে গবেষণা করেন এবং কঠিন বিষয়ে আলোচনার সময় demand-withdraw বা একজনের চাপ দেওয়া ও অন্যজনের সরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে দেখেন। গবেষণাটি Sex Roles জার্নালে প্রকাশিত হয়।

১. অতিরিক্ত সন্দেহ ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা: একজন পুরুষ সাধারণত চান তার সঙ্গী তাকে বিশ্বাস করুক এবং নিজের মতো কিছু ব্যক্তিগত জায়গা দিক। কোথায় গেলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন, কেন ফোন ধরতে দেরি হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাকে অনুসরণ করেন, এসব নিয়ে প্রতিনিয়ত জেরা করা সম্পর্কের মধ্যে চাপ তৈরি করতে পারে। অবশ্যই বিশ্বাসের নামে সত্য গোপন করা বা প্রতারণাকে মেনে নেওয়া যায় না, কিন্তু প্রতিটি বিষয়কে সন্দেহের চোখে দেখাও স্বাস্থ্যকর নয়। ২০১০ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির সারাহ আর. হলি, ভার্জিনিয়া ই. স্টার্ম ও রবার্ট ডব্লিউ. লেভেনসনের গবেষণায় ৬৩টি দম্পতির দ্বন্দ্বপূর্ণ যোগাযোগ বিশ্লেষণ করা হয় এবং দেখা যায়, একজনের চাপ প্রয়োগের সঙ্গে অন্যজনের সরে যাওয়ার আচরণ জড়িয়ে যেতে পারে। গবেষণাটি Journal of Homosexuality-এ প্রকাশিত হয়।

২. বারবার তুলনা করা ও ছোট করা: “অমুকের স্বামী এমন”, “ওই মানুষটা তোমার চেয়ে ভালো”, “তুমি কিছুই পারো না” ধরনের কথা সম্পর্কের ভেতরে গভীর আঘাত তৈরি করতে পারে। রাগের সময় বলা একটি ছোট বাক্যও কখনো কখনো দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়। বিশেষ করে অন্য পুরুষের সঙ্গে সঙ্গীর তুলনা করা অনেক পুরুষের কাছে অপমানজনক মনে হতে পারে। একইভাবে পুরুষের আয়, চেহারা, চাকরি, পরিবার বা সক্ষমতাকে নিয়ে নিয়মিত ঠাট্টা করাও সম্পর্কের সম্মান কমিয়ে দেয়। ২০২১ সালে ডেভ ক্রাস্টা, রোনাল্ড ডি. রগ, মাইকেল আর. মানিয়াচি ও হ্যারি টি. রেইসের গবেষণায় সঙ্গীর responsiveness বা বোঝা, গুরুত্ব দেওয়া ও যত্নশীল হওয়ার অনুভূতিকে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত পাওয়া যায়; গবেষণাটি Psychological Assessment জার্নালে প্রকাশিত হয়।

৩. কথা না বলে অভিমান জমিয়ে রাখা: অনেক নারী কষ্ট পেলে সরাসরি সমস্যাটি না বলে চুপ হয়ে যান, ইঙ্গিত দেন বা চান সঙ্গী নিজে থেকেই বুঝে নিক। কিন্তু মানুষ মনের কথা সব সময় অনুমান করতে পারে না। ফলে একটি ছোট সমস্যা বড় ভুল বোঝাবুঝিতে পরিণত হতে পারে। আবার কেউ যদি প্রতিটি মতবিরোধে কথা বন্ধ করে দেন, তাহলে অপর পক্ষও ধীরে ধীরে যোগাযোগের আগ্রহ হারাতে পারেন। ২০১৫ সালে ব্রায়ান আর. বকম ও তাঁর সহকর্মীরা Journal of Family Psychology-তে প্রকাশিত গবেষণায় demand-withdraw আচরণকে সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর যোগাযোগের একটি চক্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে একজন সমস্যা নিয়ে চাপ দেন আর অন্যজন আলোচনা এড়িয়ে যান। ২০২৪ সালের রায়ান বি. সিডালের গবেষণাতেও ৬৩টি দম্পতির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একজনের demand আচরণের সঙ্গে অন্যজনের withdraw আচরণ সম্পর্কিত হতে পারে।

৪. ভালোবাসার বদলে শুধু প্রত্যাশা, অভিযোগ ও হিসাব: সম্পর্ক মানে শুধু “তুমি আমার জন্য কী করলে” নয়, বরং “আমরা একে অপরের জন্য কী করছি” সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সারাক্ষণ উপহার, টাকা, সময়, ঘোরাঘুরি কিংবা বিশেষ সুবিধার হিসাব কষলে ভালোবাসার জায়গায় লেনদেনের অনুভূতি চলে আসতে পারে। একইভাবে ছোটখাটো ভুলকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া, পুরোনো বিষয় টেনে আনা এবং প্রতিটি কথায় অভিযোগ করা পুরুষের কাছে মানসিকভাবে ক্লান্তিকর হতে পারে। ২০২৬ সালে মালয়েশিয়ায় মনাশ ইউনিভার্সিটির প্রিসিলা এম. ডি নেট্টো ও সহকর্মীরা ১,৮৫১ জন বিবাহিত ও অবিবাহিত ব্যক্তির ওপর গবেষণা করেন এবং দেখেন, সঙ্গীর সহায়তা, গঠনমূলক আচরণ ও responsiveness সম্পর্কের গুণমান ও সন্তুষ্টির সঙ্গে ইতিবাচকভাবে যুক্ত। গবেষণাটি Family Relations জার্নালে প্রকাশিত হয়।

৫. অসম্মান, অপমান ও ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ করা: একটি সম্পর্কের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো পারস্পরিক সম্মান। সঙ্গীর ব্যক্তিগত কথা বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়দের কাছে বলে দেওয়া, তার দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা কিংবা অন্যের সামনে তাকে অপমান করা অনেক পুরুষের কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক হতে পারে। একই কথা পুরুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, কারণ সম্মান কোনো এক পক্ষের জন্য নির্ধারিত বিষয় নয়। ২০১৩ সালে সারা আর. হলি ও সহকর্মীরা ১২৭টি দীর্ঘদিনের বিবাহিত দম্পতিকে ১৩ বছর ধরে তিনটি সময়ে পর্যবেক্ষণ করেন এবং দ্বন্দ্বের সময় blame, pressure, withdrawal ও avoidance-এর মতো আচরণ বিশ্লেষণ করেন। গবেষণাটি Journal of Social and Personal Relationships জার্নালে প্রকাশিত হয় এবং দেখায়, দীর্ঘ সম্পর্কেও যোগাযোগের নেতিবাচক ধরন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে।

একজন ভালো নারী যেমন ভালোবাসা দেন, তেমনি একজন ভালো পুরুষও সম্মান, যত্ন ও দায়িত্ব দিতে জানেন। তাই “পুরুষরা নারীর কোন আচরণ পছন্দ করেন না” প্রশ্নটির উত্তর শুধু নারীর দিকে আঙুল তোলার বিষয় নয়; বরং দুজনের আচরণ কীভাবে সম্পর্ককে সুন্দর বা কঠিন করে তোলে, সেটিই আসল বিষয়। সন্দেহের বদলে বিশ্বাস, অপমানের বদলে সম্মান, নীরব অভিমানের বদলে খোলামেলা কথা এবং অভিযোগের বদলে সহযোগিতা সম্পর্ককে অনেক বেশি শক্ত করে। গবেষণাগুলোও দেখায়, সম্পর্কের সুস্থতা অনেকটাই নির্ভর করে দুজন মানুষ একে অপরকে কতটা বোঝেন, গুরুত্ব দেন এবং দ্বন্দ্বের সময় কীভাবে কথা বলেন তার ওপর। @ SAM Motivation

তথ্যসূত্র

Vogel, D. L., Wester, S. R., & Heesacker, M. (1999). Dating Relationships and the Demand/Withdraw Pattern of Communication. Sex Roles, 41, 297–306.

Holley, S. R., Sturm, V. E., & Levenson, R. W. (2010). Exploring the Basis for Gender Differences in the Demand-Withdraw Pattern. Journal of Homosexuality, 57(5), 666–684.


7


জীবন সবসময় আপনার মনের মতো হবে না—তবুও সুখে শান্তিতে থাকার পথ পাওয়া যাবে।

জীবনে এমন অনেক কিছু ঘটবে, যা আপনি কখনোই চাননি।

কিছু মানুষ বদলে যাবে, কিছু সম্পর্ক দূরে সরে যাবে, কিছু স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যাবে।

কখনো অনেক চেষ্টা করেও ফল মিলবে না, আবার কখনো কোনো কারণ ছাড়াই মনটা ভেঙে যাবে।

কিন্তু মনে রাখবেন—

শান্তি মানে জীবনে কোনো সমস্যা না থাকা নয়।

শান্তি হলো সমস্যার মাঝেও নিজেকে হারিয়ে না ফেলা।

সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবেন না।

যা বদলাতে পারবেন, তার জন্য চেষ্টা করুন।

আর যা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেটাকে মেনে নিয়ে ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে শিখুন।

সব প্রশ্নের উত্তর আজই পাওয়া জরুরি নয়।

সব মানুষকে ধরে রাখাও জরুরি নয়।

সব স্বপ্ন একই সময়ে পূরণ হওয়াও জরুরি নয়।

কখনো কখনো একটু থামা, গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া, নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো—এগুলোও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জীবন আপনার পরিকল্পনা অনুযায়ী না চললেও, আপনি কীভাবে সেই জীবনকে গ্রহণ করবেন—সেটা অনেকটাই আপনার হাতে।

তাই নিজেকে বলুন—

“সবকিছু ঠিকঠাক না থাকলেও, আমি ধীরে ধীরে ঠিক থাকার চেষ্টা করব।”

আজ যা হারিয়েছেন, তার জন্য সারাজীবন কাঁদবেন না।

হয়তো সামনে এমন কিছু অপেক্ষা করছে, যার জন্য আজকের এই অধ্যায়টি শেষ হওয়া প্রয়োজন।

নিজেকে সময় দিন।

জীবনকে একটু সহজভাবে নিন।

শান্তি খুঁজুন—সবকিছুর মধ্যে নয়, নিজের ভেতরে।

@ Edu Quest




সবকিছু পারফেক্ট করার চেষ্টা বাদ দিন—অসম্পূর্ণ জীবনেও শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়।

আমরা অনেক সময় শান্তি হারিয়ে ফেলি জীবনের সমস্যার কারণে নয়, বরং সবকিছু নিখুঁত করার চাপে।

কাজটা একদম পারফেক্ট হতে হবে।

সম্পর্কে কোনো ভুল থাকা যাবে না।

সবাইকে খুশি রাখতে হবে।

নিজেকেও সবসময় শক্ত থাকতে হবে।

কিন্তু সত্যিটা হলো—জীবন কখনোই পুরোপুরি পারফেক্ট হবে না। আর এই অসম্পূর্ণতাই জীবনের স্বাভাবিক অংশ।

পারফেকশনিজম কেন মানসিক চাপ বাড়াতে পারে?

সবকিছু নিজের প্রত্যাশামতো না হলে হতাশা, অপরাধবোধ ও আত্ম-সমালোচনা বাড়তে পারে। ছোট ভুলকেও বড় ব্যর্থতা মনে হতে পারে। ফলে অর্জন করেও মনে হয়, “আরও ভালো করা দরকার ছিল।”

তাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে কিছু বিষয় মেনে নিতে শিখুন।

ভুল হলে নিজেকে ক্ষমা করুন।

সব মানুষকে খুশি করার দায়িত্ব নিজের ওপর নেবেন না।

আপনার সামর্থ্যের মধ্যে যতটা সম্ভব, ততটাই করুন।

অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করা কমান।

প্রতিদিনের ছোট ভালো মুহূর্তগুলো উপভোগ করুন।

নিজের সঙ্গে কথা বলার সময় বন্ধুর মতো কোমল হোন।

মনে রাখবেন, আপনার জীবনকে মূল্যবান হতে হলে সেটাকে নিখুঁত হতে হবে না।

কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন থাকবে, কিছু ভুল সিদ্ধান্ত থাকবে, কিছু সম্পর্ক অসম্পূর্ণ থাকবে—তবুও আপনি ভালো থাকতে পারেন, নতুন করে শুরু করতে পারেন।

শান্তি আসে সবকিছু ঠিক হয়ে গেলে নয়; অনেক সময় শান্তি আসে সবকিছু ঠিক না থাকলেও জীবনকে গ্রহণ করতে শেখার পর।

আজ নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন—

“আমি কি সত্যিই সুখী হতে চাই, নাকি শুধু সবকিছু পারফেক্ট দেখতে চাই?”

আপনার উত্তরটাই হয়তো বদলে দিতে পারে আপনার জীবন দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।

@ Edu Quest



নিয়ানডার্থালরা আমাদের অনেক আগেই ইউরোপ আর লেভান্ট অঞ্চলে বসবাস করত। ধারণা করা হয় আজ থেকে প্রায় ১ লাখ বছর আগে কিছু হোমো সেপিয়েন্স প্রথম আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে লেভান্ট অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে, সেই আদেন উপসাগর বা বাব এল মন্দাব পেরিয়ে। তারা দীর্ঘকাল নিয়ানডার্থালদের কাছাকাছি থেকেছে। তারপর একদিন হারিয়ে গেছে। আবার যখন প্রায় ৬৫ হাজার বছর আগে মানুষ লেভান্ট অঞ্চলে পারি জমাল তার পর সে ইউরোপে পৌঁছল প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে। দেখা যায় একই গুহায় বিভিন্ন সময়ে নিয়ানডার্থাল ও সেপিয়েন্স বাস করেছে। ক্রোয়েশিয়াতে পাওয়া গেছে সম্ভবত এই দুই প্রাণীর মধ্যে বাণিজ্যের উদাহরণ। ফ্রান্সেও দেখা গেছে একই সাথে দুইয়ের বানানো জিনিসপত্র, যা দুই প্রাণীর বাণিজ্যের নির্দেশ বহন করে। আজ থেকে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে মানুষ প্রচণ্ড ভাবে দ্যোতক ব্যবহার শুরু করে। ঠিক এই সময়েই লরেশীয় মিথের প্রথম প্রচলন ঘটে বলে ধারণা। এই সময়েই নতুন শিকারের পদ্ধতি আবিষ্কারের নমুনা মেলে। কিন্তু এর আগেই মানুষের মধ্যে ধর্ম ছিল। এমনকি ছিল নিয়ানডার্থালদের মধ্যেও। উত্তর ইরাকে তাদের কবর পাওয়া গেছে। মৃত্যুর পরে দেহের গায়ে গিরিমাটি রং দিয়ে দিত। মানুষ ইউরোপে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় নিয়ানডার্থালরা অবলুপ্ত হতে শুরু করে। তবে তার পরেও প্রায় ২০ হাজার বছর তারা বেঁচে ছিল। মানুষেরই সাথে।

সমুদ্র সৈকত ধরে মানুষ আফ্রিকা থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছিল বটে কিন্তু এছাড়াও আরেকটি পথ যে তারা ধরেছিল তার প্রমাণ মেলে। নর্মদা উপত্যকা। সেই ভীমবেটকা গুহা। এমনও জায়গা আছে যেখানে নর্মদা উপত্যকা আর গাঙ্গেয় উপত্যকার মধ্যেকার পার্থক্য খুবই কম। তাহলে কি তারা গাঙ্গেয় উপত্যকায় পৌছতে পেরেছিল?

তথ্যসূত্র: ই যে মাইকেল উইৎজেলের লেখা The Origins of the World's Mythologies (অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনী) 



১০


যখন আপনি মোটা সন্তান বড় করেন, আপনি তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেন। তারা প্রাপ্তবয়স্ক হলে নিচের সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়:

* শুক্রাণুর নিম্নমান

* মাইক্রোপেনিস (ক্ষুদ্র লিঙ্গ) এবং ইরেকটাইল ফেইলিওর (উত্থানজনিত সমস্যা)

* PCOS (নারীদের বন্ধ্যাত্ব)

* শ্বাসকষ্টজনিত অ্যালার্জি (যেমন: হাঁপানি)

* মানসিক বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তাজনিত ব্যাধি (অ্যাংজাইটি)

ছেলেদের স্থূলতার পরিণতি

ভবিষ্যতে একটি মোটা ছেলে ভুগবে:

* কম আত্মসম্মানবোধে

* দীর্ঘস্থায়ী মেটাবলিক (বিপাকীয়) রোগে

* মানসিক রোগে (যেমন: বাইপোলার ডিজঅর্ডার)

* ক্যান্সারে

* অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোগে (যেমন: কিডনির রোগ)

* প্রজনন অক্ষমতায় (যেমন: বন্ধ্যাত্ব)

একজন ছেলে এবং একজন কিশোরী মেয়ের মধ্যে পার্থক্য করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। শিশুদের স্থূলতা তাদের পরবর্তী প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। স্থূলতা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, বিপাকীয় অক্ষমতা এবং প্রজনন ব্যর্থতার দিকে নিয়ে যায়।

* তারা ওজন কমাতে গিয়ে সংগ্রাম করবে।

* তারা লিঙ্গোত্থান জনিত সমস্যা, মাইক্রোপেনিস এবং যৌন অক্ষমতার মুখোমুখি হবে।

* তারা বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভুগবে। মেয়েরা PCOS এবং গর্ভাবস্থা সংক্রান্ত অন্যান্য জটিলতায় ভুগবে।

* তারা মানসিক অসুস্থতা এবং মেজাজ পরিবর্তনের (মুড ডিজঅর্ডার) সমস্যায় ভুগবে।

* তাদের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী অসংক্রামক ব্যাধি যেমন—ক্যান্সার এবং অটোইমিউন রোগ দেখা দেবে।

আপনার সন্তানরা জিনের (বংশগত কারণে) জন্য মোটা নয়। তারা মোটা কারণ আপনি তাদের যে জাঙ্ক ফুড (অস্বাস্থ্যকর খাবার) খাওয়াচ্ছেন। সুস্থ সন্তান গড়ে তুলুন।

মোটা হওয়া আপনাকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের দিকে ঠেলে দেয়, যার মধ্যে ইরিটেবল বাওয়েল ডিজিজ (আইবিডি) ও অর্শ (পাইলস) এর মতো পেটের রোগ এবং অস্টিওআর্থ্রাইটিস (হাড়ের জোড়ার রোগ) অন্তর্ভুক্ত। মোটা হওয়া আপনার স্বাস্থ্য কেড়ে নেয়।

* পুরুষদের জন্য: এটি আপনার টেস্টোস্টেরন, পুরুষত্ব, উর্বরতা, শুক্রাণুর সংখ্যা এবং যৌন সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

* নারীদের জন্য: এটি আপনাকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েডের সমস্যা, অস্টিওআর্থ্রাইটিস, PCOS এবং বন্ধ্যাত্বের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের দিকে ধাবিত করে।

* শিশুদের জন্য: এটি তাদের মনোযোগের অভাব (ADHD), অটিজম, দেরিতে বেড়ে ওঠা (বিলম্বিত বিকাশ), দীর্ঘস্থায়ী ফ্যাটি লিভার রোগ এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

* ছেলেরা ম্যানবুবস (মেয়েদের মতো স্তন) এবং মেয়েদের মতো কোমরের অধিকারী হবে।

* মেয়েদের অল্প বয়সেই ঋতুস্রাব (পিরিয়ড) শুরু হবে এবং পরবর্তীতে হরমোনের চক্র অনিয়মিত হয়ে যাবে, যা ফলস্বরূপ তাদের সন্তান ধারণ ক্ষমতা নষ্ট করবে।

এছাড়া, মোটা মানুষরা রাগী, বিশৃঙ্খল, নাটকীয় এবং আবেগপ্রবণ প্রকৃতির হয়, কারণ তাদের আত্মসম্মানবোধ কম থাকে এবং তারা নিজেদের প্রতি ঘৃণা নিয়ে বেঁচে থাকে। আপনি জিনের কারণে মোটা নন, আপনি মোটা আপনার মুখ এবং আপনি যা খাচ্ছেন তার কারণে।

এখন থেকেই শৃঙ্খলা তৈরি করা শুরু করুন এবং নিজেকে, আপনার সন্তানদের ও আপনার পরিবারকে সংশোধন করুন; অন্যথায় আপনারা সবাই ধ্বংসের দিকে (পচে মরার দিকে) এগিয়ে যাবেন। @ Health Tips Pro


১১


চতুর্দশ শতকে (১৩৫১-১৩৮৮) দিল্লীর সুলতান ছিলেন ফিরোজ শাহ। খুবই নরম স্বভাবের শাসক ছিলেন। অত্যন্ত সাধারণ, আড়ম্বরহীন জীবন যাপন করতেন। খাওয়া দাওয়া করতেন সাদামাটা। কাউকে শাস্তি টাস্তি দিতেন না। মন্ত্রী, সভাসদ, আমির উমরা, কর্মচারী কাউকেই না। এই সুযোগে শুরু হয় চরম লেভেলের দুর্নীতি। তৎকালীন  ঐতিহাসিক শামস-ই-সিরাজ আফিফ তাঁর ‘তারিখ-ই-ফিরোজ শাহী’ ব‌ইয়ে তা তুলে ধরেছেন।

সুলতান ফিরোজ শাহ নিয়ম করেন, প্রতি বছর সৈন্যদের ঘোড়াগুলো রাজকীয় পরিদর্শকদের সাম‌নে হাজির করে মান যাচাই করাতে হবে, এগুলো যুদ্ধের উপযোগী কী না। তখন পরিদর্শকরা শুরু করল ঘুষ খাওয়া। দুর্বল, মরা ঘোড়াকে সবল বলে সার্টিফিকেট দিত।

সুলতান একদিন দেখলেন, এক সাধারণ সৈন্য অত্যন্ত নিম্নমানের ঘোড়া নিয়ে পরিদর্শনের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু পরিদর্শককে ঘুষ দেওয়ার মত টাকা ছিল না ওই সৈন্যের। সৈন্যটির অসহায়ত্ব দেখে সুলতান ফিরোজ শাহ তাকে ডেকে নেন। পরিদর্শককে শাস্তি দেওয়ার বদলে সুলতান নিজের পকেট থেকে একটি স্বর্ণমুদ্রা সৈন্যটিকে দেন এবং বলেন: "যাও, এটি দিয়ে পরিদর্শককে সন্তুষ্ট করো, যাতে সে তোমার ঘোড়াটি পাস করে দেয়।"

@ পাঠশালা



১২


১৯৭৯ সাল। পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন পাকিস্তানের বিজ্ঞানী অধ্যাপক আবদুস সালাম। বিশ্বজুড়ে তখন তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বাস। কিন্তু সাফল্যের সেই সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে পড়ল বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া এক মানুষের কথা—লাহোরে ছাত্রজীবনের প্রিয় বাঙালি গণিত শিক্ষক অধ্যাপক অনিলেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়।

অবিভক্ত ভারতের লাহোরে উচ্চশিক্ষার সময় অনিলেন্দ্রনাথের কাছে গণিত শিখেছিলেন সালাম। তিনি ছিলেন লাহোরের সনাতন ধর্ম কলেজের অধ্যাপক। তখন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের অভাব থাকায় বিভিন্ন কলেজের যোগ্য অধ্যাপকেরা স্নাতকোত্তর স্তরের কিছু ক্লাস নিতেন। সেই সূত্রেই অনিলেন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছিলেন সালামের শিক্ষক। তাঁর পাঠদান তরুণ সালামের মনে এমন গভীর ছাপ ফেলেছিল যে, সময়ের ব্যবধান কিংবা দেশের সীমানা—কিছুই সেই স্মৃতি মুছে দিতে পারেনি।

তারপর এল দেশভাগ। শিক্ষক ফিরে এলেন ভারতে, ছাত্র চলে গেলেন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথে বিদেশে। একসময় তাঁদের সমস্ত যোগাযোগ হারিয়ে গেল। কে কোথায় আছেন, বেঁচে আছেন কি না—সালামের কাছে তারও কোনো খবর ছিল না।

কিন্তু নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর সালামের মনে হলো, এই বিরাট স্বীকৃতির আনন্দ তাঁর শিক্ষকের কাছে না পৌঁছালে তা যেন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তিনি ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুরোধ করলেন—যেভাবেই হোক, তাঁর সেই প্রিয় শিক্ষককে খুঁজে দিতে হবে।

শুরু হলো অনুসন্ধান। প্রায় দুই বছরের চেষ্টার পর ১৯৮০ সালের শেষ দিকে জানা গেল, অধ্যাপক অনিলেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় তখন দক্ষিণ কলকাতায় তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, অসুস্থ এবং শয্যাশায়ী। যাঁর জ্ঞানের আলো একদিন এক মেধাবী ছাত্রকে পথ দেখিয়েছিল, তিনি তখন কলকাতায় প্রায় বিস্মৃত একটি জীবন কাটাচ্ছেন।

খবর পেয়েই সালাম কলকাতায় এলেন। ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি উপস্থিত হলেন দক্ষিণ কলকাতার সাউথ চক্রবেড়িয়া রোডের সেই বাড়িতে। দীর্ঘদিন পর শিক্ষক ও ছাত্র মুখোমুখি হলেন—একজন অসুস্থ বৃদ্ধ শিক্ষক, অন্যজন বিশ্ববন্দিত নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী। কিন্তু সেই ঘরে নোবেলজয়ী ও সাধারণ শিক্ষকের কোনো ব্যবধান ছিল না; সেখানে ছিলেন শুধু এক কৃতজ্ঞ ছাত্র এবং তাঁর প্রিয় শিক্ষক।

সেই সময় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আবদুস সালামকে সম্মানজনক ‘স্যার দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারী স্বর্ণপদক’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সালাম জানতে পারলেন, তাঁর অসাধারণ শিক্ষক সারাজীবন নিষ্ঠার সঙ্গে পড়িয়েও কোনো উল্লেখযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান পাননি। কথাটি তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করল।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে জানালেন—যে শহরে তাঁর প্রিয় শিক্ষক কোনো স্বীকৃতি পাননি, সেই শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া সম্মান তাঁর একার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয় সিদ্ধান্ত নিল, সেই স্বর্ণপদক দেওয়া হবে অধ্যাপক অনিলেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে। কিন্তু অসুস্থ শিক্ষকের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই ১৯৮১ সালের ২১ জানুয়ারি তাঁর বাড়িতেই আয়োজন করা হলো বিশেষ অনুষ্ঠানের।

সেদিন নোবেলজয়ী আবদুস সালাম নিজের হাতে তাঁর বৃদ্ধ শিক্ষকের গলায় স্বর্ণপদক পরিয়ে দিলেন। তারপর বিনম্র কণ্ঠে বললেন—

“আপনার কাছে যে গণিত শিক্ষা পেয়েছি, তা আমাকে আজ এই পদক দিয়েছে। এই স্বীকৃতি প্রকৃতপক্ষে আপনার।”

ভাবা যায়! পৃথিবীর সর্বোচ্চ সম্মানপ্রাপ্ত একজন বিজ্ঞানী তাঁর সাফল্যের আলো নিজের মধ্যে আটকে রাখলেন না। সেই আলো তিনি ফিরিয়ে দিলেন সেই মানুষটির কাছে, যিনি বহু বছর আগে তাঁর মনে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন।

এই ঘটনা শুধু একজন ছাত্রের গুরুদক্ষিণা নয়; এটি কৃতজ্ঞতা, বিনয় ও শিক্ষকতার মহত্ত্বের এক অসাধারণ ইতিহাস। দেশভাগ দুই মানুষকে দুই দেশের নাগরিক করেছিল, সময় তাঁদের বহু দূরে সরিয়ে দিয়েছিল—কিন্তু ছাত্রের হৃদয় থেকে শিক্ষকের আসন কেড়ে নিতে পারেনি।

আমরা অনেক সময় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পেছনে ফিরে তাকাতে ভুলে যাই। ভুলে যাই সেই শিক্ষকদের, যাঁরা নীরবে আমাদের ভিত তৈরি করেন। আবদুস সালাম ভুলে যাননি। তাই তিনি শুধু একজন মহান বিজ্ঞানী নন, একজন মহান ছাত্রও।

প্রকৃত শিক্ষক হয়তো পুরস্কারের প্রত্যাশায় পড়ান না। কিন্তু কোনো ছাত্র যখন জীবনের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে বলে—“আমার এই সাফল্য আসলে আপনার”—তখন তার চেয়ে বড় সম্মান একজন শিক্ষকের জীবনে আর কী হতে পারে?

প্রণাম সেই সমস্ত শিক্ষককে, যাঁদের নীরব অবদানেই তৈরি হয় আগামী দিনের বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ এবং আলোকিত মানুষ।

ভূপতি চক্রবর্তীর লেখা ‘নোবেলজয়ী আবদুস সালামের বাঙালি গণিত শিক্ষক’ প্রবন্ধ অবলম্বনে।



13



আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগের ঘটনা। লন্ডনে শুরু হলো ভয়াবহ কলেরা, মারা গেল হাজার হাজার মানুষ। ওই সময়ের ডাক্তাররা মনে করতেন, দূষিত বাতাস বা বলা চলে অশুভ বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এই কলেরা। কিন্তু জন স্নো নামের এক ডাক্তার এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। 

কিছুদিন খেয়াল করার পর তিনি দেখলেন, কলেরা রোগটা শহরের দরিদ্র ও অপরিচ্ছন্ন এলাকাগুলোতেই বেশি ছড়ায়। ১৮৩২ সালের পরেও পরপর কয়েক বার কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিল। ১৮৫৪ সালে লন্ডনে শুরু হলো রীতিমত ভয়াবহ অবস্থা। এবার স্নো একটি দারুণ কাজ করলেন। তিনি লন্ডন শহরের বিভিন্ন এলাকার মানচিত্র জোগাড় করে প্রতিটি মৃত ব্যক্তির বাড়ির অবস্থান চিহ্নিত করতে শুরু করলেন। প্রথম দিকে এই মৃত্যুগুলোকে একদমই এলোমেলো ঘটনা বলে মনে হচ্ছিল। কোনো প্রকার দৃশ্যমান সম্পর্ক ছাড়াই আক্রান্ত হচ্ছিল একের পর এক পরিবার।

কিন্তু মানচিত্রে আরও অনেক মৃত ব্যাক্তির তথ্য যোগ করতে থাকলে কিছুদিন পর একটি স্পষ্ট বিন্যাস ফুটে উঠল। দেখা গেল, অধিকাংশ মৃত ব্যক্তিই আসলে বসবাস করতেন ব্রড স্ট্রিটের একটি নির্দিষ্ট পানির পাম্পের কাছাকাছি। ব্যতিক্রমী কিছু ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ কিছু সূত্র দিয়েছিল। কাছের একটি বিয়ার কারখানার শ্রমিকেরা সাধারণত ওই পাম্পের পানি না খেয়ে বিয়ার পান করতেন। তাঁদের মধ্যে কলেরার প্রকোপ ছিল খুবই কম। অন্যদিকে, ব্রড স্ট্রিট থেকে অনেক দূরে বসবাসকারী এক নারী মারা গিয়েছিলেন। পরে জানা যায়, তিনি ওই নির্দিষ্ট পাম্পের পানি পছন্দ করতেন এবং সেখান থেকে তাঁর বাড়িতে পানি নিয়ে যাওয়া হতো। অর্থাৎ পানির কারণেই যে রোগটা ছড়ায়, তার একটা মোটামুটি আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। জন স্নো আসলে চেয়েছিলেন এই মৃত্যুগুলোর মধ্য থেকে কোনো প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যায় কিনা তা বুঝতে। আরও কিছু গবেষণার পর অবশেষে প্রমাণিত হলো যে—কলেরা আসলে পানির মাধ্যমেই ছড়ায়। @ হিমাংশু কর



14



মানব সভ্যতার বিকাশ একদিনে হয়নি, এটা প্রায় ৪-৫ টা বড়  বড় ধাপে হয়েছে।

*১. শিকারি থেকে মানুষ - প্রায় ৩ লাখ বছর আগে*

প্রথমে আমরা সবাই ছিলাম যাযাবর শিকারি-সংগ্রাহক। দল বেঁধে থাকা, আগুন ব্যবহার করা, আর ভাষা তৈরি করাই ছিল আমাদের সুপারপাওয়ার। এতে জ্ঞান এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যেতে শুরু করলো।

*২. কৃষি বিপ্লব - প্রায় ১২,০০০ বছর আগে*

এটাই সব বদলে দিল। মানুষ বুঝলো বীজ থেকে গাছ হয়। শিকার না করে ফসল ফলানো শুরু হলো।

এর ফলে কি হলো?

- এক জায়গায় স্থায়ী গ্রাম তৈরি হলো

- খাবার জমতে শুরু করলো, তাই জনসংখ্যা বাড়লো

- সবাইকে আর কৃষিকাজ করতে হলো না। কেউ কুমোর, কেউ তাঁতি, কেউ পুরোহিত হলো

*৩. গ্রাম থেকে শহর ও রাষ্ট্র - প্রায় ৫,০০০ বছর আগে*

উর্বর জমি যেখানে ছিল, যেমন মেসোপটেমিয়া, মিশরের নীল নদ, সিন্ধু সভ্যতা - সেখানে প্রথম শহর তৈরি হলো।

শহর মানেই নতুন সমস্যা। সেই সমস্যা মেটাতেই তিনটে জিনিস আবিষ্কার হলো:

- *লেখা:* হিসাব রাখার জন্য

- *আইন ও রাজা:* ঝগড়া মেটানো আর শহর চালানোর জন্য

- *ধর্ম ও সংস্কৃতি:* সবাইকে একসাথে বেঁধে রাখার জন্য

*৪. বিজ্ঞান ও শিল্প বিপ্লব - গত ৫০০ বছর*

ছাপাখানা, বিজ্ঞান-চিন্তা, তারপর স্টিম ইঞ্জিন। মানুষ প্রকৃতির উপর নির্ভর না করে প্রকৃতিকে নিজের মতো করে বদলাতে শিখলো। জ্ঞান আর শক্তি দুটোই হাজার গুণ বেড়ে গেল।

@ Md Julfikar Ali


মুখের ৩২টি দাঁতই বলে দেবে আপনার কী খাওয়া উচিত! | Human Teeth & Ideal Diet Science!

বিশ্বখ্যাত গ্যাস্ট্রো সার্জন ড. হিরোমি শিনিয়ার 'দ্য এনজাইম ফ্যাক্টর' বইয়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী মানুষের ৩২টি দাঁতের গঠনই বলে দেয় আমাদের কী খাওয়া উচিত। মাংস ছেঁড়ার দাঁত ১ জোড়া আর উদ্ভিজ্জ খাবার পেষার দাঁত ৭ জোড়া—এই ৭:১ অনুপাত অনুযায়ী আপনার প্লেটের কত শতাংশ শস্য, সবজি ও প্রাণিজ খাবার হওয়া উচিত,



15



যা খেলে ডায়াবেটিস আপনাকে ছুঁতে পারবে না

ডায়াবেটিসকে অনেকেই শুধু মিষ্টি খাওয়ার রোগ মনে করেন, কিন্তু বিষয়টি তার চেয়ে অনেক বড়। বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং জীবনযাপনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তবে কোনো একটি খাবার খেলেই ডায়াবেটিসকে শতভাগ ঠেকানো যায়, এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়; বরং প্রতিদিনের খাবারের ধরন ঠিক রাখলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের তালিকায় কিছু উপকারী খাবার নিয়মিত রাখা এবং চিনি, অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করা ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো ডায়াবেটিস প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

১ম প্যারা: ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে প্রথমেই গুরুত্ব দিতে হবে পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবারকে। লাল চাল, আটার রুটি, ওটস, বার্লি এবং অন্যান্য পূর্ণ শস্যে খাদ্য আঁশ বেশি থাকে, যা খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বাড়তে বাধা দিতে সাহায্য করে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি systematic review ও dose-response meta-analysis-এ গবেষকেরা ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকাশিত গবেষণা বিশ্লেষণ করে পূর্ণ শস্যের সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক পরীক্ষা করেছেন। গবেষণাটি Nutrition Journal-এ প্রকাশিত হয় এবং এতে prospective cohort study ও randomized controlled trial উভয় ধরনের প্রমাণ বিবেচনা করা হয়। তাই সাদা ভাত বা ময়দার খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে লাল চাল, আটার রুটি বা ওটসের মতো খাবার বেছে নেওয়া ভালো অভ্যাস।

২য় প্যারা: শাকসবজি, ডাল, ছোলা, মসুর ডাল, শিম, বরবটি এবং অন্যান্য আঁশযুক্ত উদ্ভিজ্জ খাবারও ডায়াবেটিস প্রতিরোধের খাদ্যতালিকায় থাকা উচিত। ডালজাতীয় খাবারে আঁশ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন থাকে, ফলে পেট ভরা থাকে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে। ফল খাওয়াও উপকারী, তবে ফলের রসের বদলে গোটা ফল খাওয়া ভালো, কারণ গোটা ফলে আঁশ থাকে এবং একসঙ্গে বেশি চিনি গ্রহণের ঝুঁকি কমে। ২০১৭ সালের একটি systematic review ও meta-analysis-এ ১২টি প্রধান খাদ্যগোষ্ঠীর সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পূর্ণ শস্য ও ফলের বেশি গ্রহণ কম ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, আর চিনি-মেশানো পানীয়, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও অতিরিক্ত লাল মাংস বেশি ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত ছিল।

৩য় প্যারা: বাদাম, চিনাবাদাম, বীজ এবং পরিমিত পরিমাণে মাছও ভালো খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। বাদামে স্বাস্থ্যকর চর্বি, আঁশ ও বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে, তবে ক্যালরি বেশি হওয়ায় পরিমাণ বুঝে খেতে হবে। মিষ্টি, কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, অতিরিক্ত মিষ্টান্ন, বিস্কুট, কেক, মিষ্টি চা এবং অতিরিক্ত পরিশোধিত শস্য নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস কমানো জরুরি। ২০১৯ সালে The BMJ-তে প্রকাশিত একটি umbrella review-তে ১১,৪১৩টি প্রকাশনা থেকে ৫৩টি meta-analysis বিশ্লেষণ করা হয়েছিল এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, Mediterranean diet, DASH diet, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, ফল ও সবজিসহ বিভিন্ন খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়।

৪র্থ প্যারা: শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে পুরো খাদ্যাভ্যাস বদলানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে The Journal of Nutrition-এ প্রকাশিত একটি umbrella review-তে ৫,০৭৪টি গবেষণার প্রাথমিক তালিকা থেকে ৬৭টি প্রাসঙ্গিক গবেষণা ও meta-analysis অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেখানে প্রায় অর্ধ মিলিয়ন মানুষের তথ্য নিয়ে বিভিন্ন খাদ্যগোষ্ঠী ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই গবেষণাগুলোর সামগ্রিক শিক্ষা হলো, খাবারে পূর্ণ শস্য, শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম ও বীজের মতো খাবারের জায়গা বাড়ানো এবং চিনি-মেশানো পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত পরিশোধিত খাবারের জায়গা কমানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৫ম প্যারা: খাবারের সঙ্গে শরীরচর্চার সম্পর্কও ভুলে গেলে চলবে না। যুক্তরাষ্ট্রের National Institutes of Health-এর অর্থায়নে পরিচালিত Diabetes Prevention Program-এ William C. Knowler ও সহকর্মীরা ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে ৩,২৩৪ জন উচ্চঝুঁকির মানুষকে নিয়ে গবেষণা করেন এবং গড়ে ২.৮ বছর তাদের অনুসরণ করেন। New England Journal of Medicine-এ ২০০২ সালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, ওজন কমানো ও সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট শারীরিক কার্যক্রমসহ জীবনযাপন পরিবর্তন করলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রকোপ ৫৮ শতাংশ কমেছিল। একইভাবে Finnish Diabetes Prevention Study-তেও জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে উচ্চঝুঁকির মানুষের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ৫৮ শতাংশ কমার প্রমাণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়, কতটা খাচ্ছেন এবং কতটা সক্রিয় থাকছেন সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তাই “যা খেলে ডায়াবেটিস আপনাকে ছুঁতে পারবে না” কথাটিকে কোনো জাদুকরি খাবারের প্রতিশ্রুতি হিসেবে না দেখে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের বার্তা হিসেবে দেখা উচিত। লাল চাল বা পূর্ণ শস্য, শাকসবজি, ডাল, গোটা ফল, বাদাম, বীজ ও পরিমিত মাছের মতো খাবার নিয়মিত রাখা এবং মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত চিনি, পরিশোধিত শস্য ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো দীর্ঘমেয়াদে ভালো সিদ্ধান্ত। ২০২৬ সালের American Diabetes Association-এর Standards of Care in Diabetes-এও পূর্ণ ফল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজকে গুরুত্ব দেওয়া এবং চিনি-মেশানো পানীয়, মিষ্টি, পরিশোধিত শস্য ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে, পারিবারিক ইতিহাস বা অন্য ঝুঁকি থাকলে শুধু খাবার দিয়ে নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না; নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর ওজন, পর্যাপ্ত হাঁটা বা ব্যায়াম এবং চিকিৎসকের পরামর্শও জরুরি।

তথ্যসূত্র:

Knowler WC, Barrett-Connor E, Fowler SE, et al. Diabetes Prevention Program Research Group. “Reduction in the Incidence of Type 2 Diabetes with Lifestyle Intervention or Metformin.” New England Journal of Medicine. 2002;346(6):393–403.

Tuomilehto J, Lindström J, Eriksson JG, et al. “Prevention of Type 2 Diabetes Mellitus by Changes in Lifestyle among Subjects with Impaired Glucose Tolerance.” New England Journal of Medicine. 2001;344:1343–1350.



16



ছোটবেলা থেকে যদি কোনো বাচ্চা বাবা-মায়ের ঝগড়া, মানসিক অস্থিরতা বা সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখে বড় হয়, তাহলে তার ভেতরে একটি আবেগীয় নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে। পরবর্তীতে বড় হওয়ার সময় এই অভিজ্ঞতার প্রভাব বিভিন্ন মানসিক ও আচরণগত সমস্যার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

এ ধরনের ব্যক্তির মধ্যে অতিরিক্ত রাগ, ভেতরে ভেতরে ভয় বা অস্থিরতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা এবং সবকিছুর প্রতি নেতিবাচক চিন্তার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় ছোট বিষয়েও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো, সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করা এবং অন্যদের উপর সহজে বিশ্বাস না করতে পারার মতো সমস্যা তৈরি হয়।

তবে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। প্রথমত, নিজের অনুভূতিগুলোকে বোঝা এবং সেগুলোকে অস্বীকার না করে গ্রহণ করা খুব জরুরি। অতীত অভিজ্ঞতা যে, বর্তমানকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করে না,এই বিষয়টি ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে তৈরি করতে হবে।

প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। পাশাপাশি শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, ধ্যান এবং মনোযোগ চর্চা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। নিজের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কথা বলা, ছোট ছোট লক্ষ্য পূরণ করা এবং ধীরে ধীরে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।

Written by- Marina Elezabeth Baroi




17



বাইরে সবার প্রিয় মানুষ, ঘরে ফিরে বিস্ফোরণ

সবচেয়ে নিরাপদ মানুষটাই কেন লক্ষ্যবস্তু

গত পর্বে আপনারা লিখেছেন, “আমার ঘরেও ঠিক এমনটাই হয়।” আজ আসল প্রশ্নটায় আসি।

রাগটা তৈরি হয়েছিল অফিসে। তাহলে সেটা ঘরে এসে ফাটল কেন?

উত্তরটা তিনটা স্তরে।

প্রথম স্তর: আত্মনিয়ন্ত্রণ সীমাহীন নয়।

সারাদিন নিজের প্রতিক্রিয়া চেপে রাখার কাজটা করে আপনার মস্তিষ্কের সামনের অংশ — প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। এটাই থামায়, ভাবায়, ভদ্র ভাষা বেছে দেয়।

কিন্তু এই অংশটা টানা কাজ করলে কর্মক্ষমতা হারায়। বিশেষ করে ঘুম কম হলে, খাওয়া অনিয়মিত হলে, চাপ দীর্ঘদিনের হলে।

আর প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ক্লান্ত হলে অ্যামিগডালার ওপর থেকে হাত সরে যায়। অ্যামিগডালা হলো মস্তিষ্কের বিপদঘণ্টা — সে ভাবে না, শুধু প্রতিক্রিয়া দেখায়।

তাই সকাল দশটায় যে কথাটা আপনাকে স্পর্শও করত না, রাত নয়টায় সেটাই বিস্ফোরণ ঘটায়। কথাটা বদলায়নি — আপনার ব্রেক ক্ষয়ে গেছে।

দ্বিতীয় স্তর: রাগ ঠিকানা বদলায়।

মনোবিজ্ঞানে একে বলে ডিসপ্লেসড অ্যাগ্রেশন (displaced aggression) — স্থানান্তরিত আক্রমণ।

আপনার মস্তিষ্ক অবচেতনভাবে হিসাব করে: বসের ওপর ফাটলে চাকরি যেতে পারে। সহকর্মীর ওপর ফাটলে সম্মান যেতে পারে।

আর ঘরে? ঘরে ফাটলে… তেমন কিছু হয় না।

অন্তত মস্তিষ্ক সেটাই ধরে নেয়।

তৃতীয় স্তর — আর এটাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর।

আপনি যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করেন, তার ওপরেই সবচেয়ে বেশি ভাঙেন।

কারণ ভেতরে ভেতরে আপনার মন জানে — এই মানুষটা চলে যাবে না। এই ভালোবাসা শর্তহীন। এখানে অভিনয় না করলেও চলবে।

অর্থাৎ আপনার সবচেয়ে খারাপ ব্যবহারটা পান সেই মানুষটাই, যাকে আপনি সবচেয়ে নিরাপদ মনে করেন।

এটা ভালোবাসার প্রমাণ নয়। এটা ভালোবাসার অপব্যবহার।

আর এখানে একটা বিপদ আছে, যেটা বেশিরভাগ মানুষ দেরিতে বোঝেন।

শর্তহীন ভালোবাসারও ক্ষয় হয়। একদিন-দুদিন নয়, বছরের পর বছর একই ঘটনা ঘটতে থাকলে সঙ্গী ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেন। ঝগড়া করেন না, অভিযোগও করেন না — শুধু দূরে সরে যান।

তখন ঘরটা শান্ত মনে হয়। কিন্তু সেই শান্তি সমাধান নয়, সেটা পিছু হটা।

এই সপ্তাহের কাজ: পরেরবার ঘরে রাগ উঠলে থামুন।

নিজেকে একটাই প্রশ্ন করুন — “এই রাগটা কি সত্যিই এই ঘটনার জন্য, নাকি আজ দুপুরের সেই ঘটনার জন্য?”

উত্তরটা প্রায়ই আপনাকে চমকে দেবে।

আজ যে বিষয়ে রাগ করেছেন, সেটা যদি সকালে ঘটত — একই প্রতিক্রিয়া হতো কি? কমেন্টে লিখুন।

@ Soul Wellness


18


ঠিক আছে — সুকুমার বড়ুয়া

অসময়ে মেহমান

ঘরে ঢুকে বসে যান

বোঝালাম ঝামেলার যতগুলো দিক আছে

তিনি হেসে বললেন

ঠিক আছে ঠিক আছে। [1]

রেশনের পচা চাল

টলটলে বাসি ডাল

থালাটাও ভাঙা-চোরা বাটিটাও লিক আছে

খেতে বসে জানালেন

ঠিক আছে ঠিক আছে। [1]

মেঘ দেখে মেহমান

চাইলেন ছাতাখান

দেখালাম ছাতাটার শুধু কটা শিক আছে

তবু তিনি বললেন

ঠিক আছে ঠিক আছে। [1]


19


আরাকান কীভাবে স্বাধীন রাজ্য থেকে আজকের মিয়ানমারের অংশ হলো

বঙ্গোপসাগরের পূর্ব তীরে যে ভূখণ্ডকে আমরা আজ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য বলে চিনি, একসময় সেখানে ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য—আরাকান। পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী, পূর্বে দুর্গম আরাকান পর্বতমালা; পাহাড়ের ওপারে ছিল বার্মার মূল ভূখণ্ড। মাঝখানে সরু উপকূলীয় সমভূমি, নদী আর জঙ্গল। প্রকৃতি যেন নিজেই আরাকানকে একটি আলাদা পৃথিবী করে রেখেছিল।

প্রায় সাড়ে তিনশ বছর সেই পৃথিবীর রাজধানী ছিল ম্রাউক-উ।

১৪৩০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত ম্রাউক-উ রাজ্য ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। এর শাসকেরা ছিলেন স্বাধীন আরাকানের রাজা, বার্মার কোনো প্রাদেশিক শাসক নন। রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ, কিন্তু তাঁদের দরবারে ইসলামি সংস্কৃতির গভীর প্রভাব ছিল। রাজাদের মুদ্রায় আরবি-ফারসি লিপি দেখা যেত, মুসলিম কর্মকর্তারা প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, আর বাংলা ভাষার কবি-সাহিত্যিকেরা রাজদরবারে আশ্রয় পেতেন।

আরাকানের সীমানা কোথায় ছিল?

আরাকানের মূল ভূখণ্ড মোটামুটি আজকের রাখাইন রাজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু শক্তিশালী সময়গুলোতে তার ক্ষমতা বর্তমান সীমারেখার অনেক বাইরে পৌঁছেছিল।

১৬শ ও ১৭শ শতকে আরাকান শক্তিশালী নৌরাজ্যে পরিণত হলে বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে বাংলার উপকূল পর্যন্ত তার প্রভাব বিস্তৃত হয়। চট্টগ্রাম দীর্ঘ সময় ম্রাউক-উ রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৬৬৬ সালে মুঘলদের কাছে চট্টগ্রাম হারানোর পর আরাকানের পশ্চিম সীমা আবার সংকুচিত হয়।

তবে এই বিস্তৃতিকে আধুনিক রাষ্ট্রের স্থায়ী সীমানা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। নদী, পাহাড়, বন্দর ও সামরিক ঘাঁটির ওপর নির্ভর করে ক্ষমতার সীমা বদলাত। আরাকান পর্বতমালাই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সীমারেখা—পশ্চিমে সমুদ্র, পূর্বে পাহাড় আর তার ওপারে বার্মার সমতলভূমি।

কারা বাস করত সেখানে?

আরাকানকে কোনো একক জাতির দেশ হিসেবে বোঝা কঠিন।

জনসংখ্যার বড় অংশ ছিল আরাকানিজ বা রাখাইন বৌদ্ধ। কিন্তু তাদের পাশাপাশি বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম জনগোষ্ঠীও সেখানে বসবাস করত। বাংলার সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে বঙ্গ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিবাসীদের আরাকানে যাতায়াত ছিল। পাশাপাশি ছিল অন্যান্য ভারতীয় উৎসের মানুষ। কেউ এসেছিল বাণিজ্যের কারণে, কেউ রাজদরবারে কাজ করতে, আবার কেউ যুদ্ধবন্দি বা জোরপূর্বক স্থানান্তরের মাধ্যমে।

ম্রাউক-উ ছিল বহু ধর্ম ও সংস্কৃতির মিলনস্থল। বৌদ্ধ মন্দিরের পাশাপাশি মসজিদ ছিল; আরবি-ফারসি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বাংলা সাহিত্য, বৌদ্ধ স্থাপত্য এবং ইউরোপীয় বণিক—সবকিছু একই রাজ্যের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছিল।

সে সময় আরাকানের মুসলিম সমাজ কোনো একক জনগোষ্ঠী ছিল না। স্থানীয় মুসলিম, বঙ্গ ও চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন সময়ে আগত মানুষ, আরব ব্যবসায়ী এবং নানা ঐতিহাসিক উৎসের জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ সহাবস্থান ও পারস্পরিক মিশ্রণের মধ্য দিয়ে পরবর্তী সময়ে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর পরিচয় বিকশিত হয়—যারা আজ নিজেদের রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচয় দেন। তাই তাদের ইতিহাসে বঙ্গীয় প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিন্তু রোহিঙ্গাদের কেবল বাঙালি অভিবাসী হিসেবেও দেখলে তাদের স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক পরিচয়কে অস্বীকার করা হয়।

যে রাজদরবারে বাংলা সাহিত্যও রচিত হতো:

আরাকানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি ছিল তার রাজদরবার।

বৌদ্ধ রাজারা মুসলিম উপাধি ব্যবহার করতেন, আর তাঁদের দরবারে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচিত হতো। দৌলত কাজী ও সৈয়দ আলাওলের মতো কবিরা এই দরবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসও ম্রাউক-উয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়।

কিন্তু এই সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির নিচে ছিল যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতা। আরাকানের নৌশক্তি তাকে বাণিজ্যের সুযোগ দিয়েছিল, আবার জলদস্যুতা ও দাসব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত করেছিল। পর্তুগিজদের সাথে মিলে জলদস্যুতায় আরাকান যোদ্ধা ও বণিকেরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। বাংলার উপকূলে পর্তুগিজ-আরাকানি অভিযান জনপদের মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করেছিল। ইতিহাসে যা "মগের মুল্লুক" নামে স্মরনীয় হয়ে আছে। সেটা পরে আলোচনা করব।

তারপর পশ্চিমে এল মুঘলরা:

১৬৬৬ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম জয় করেন। আরাকানের পশ্চিমমুখী বিস্তারে সেখানেই বড় আঘাত আসে।

এরপর রাজ্যটি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি অস্থির হয়ে ওঠে, রাজদরবারে ষড়যন্ত্র বাড়ে এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ক্ষয় হতে থাকে।

পূর্বদিকে তখন আরেক শক্তি বেড়ে উঠছিল—বার্মার কনবাউং রাজবংশ।

শেষ দিন:

১৭৮৪ সালে কনবাউং রাজ্যের রাজা বোদাওপায়া আরাকান আক্রমণ করেন।

যে আরাকান পর্বতমালা শতাব্দীর পর শতাব্দী আরাকানকে বার্মার সমতলভূমি থেকে আলাদা করে রেখেছিল, এবার সেই পাহাড় পেরিয়েই এল বার্মিজ বাহিনী।

ম্রাউক-উ পতনের সঙ্গে শেষ হলো স্বাধীন আরাকান রাজ্যের ইতিহাস। ১৭৮৪ সালের শেষ দিকে শহরটি দখল করা হয় এবং আরাকান বার্মার শাসনের অধীনে চলে যায়। রাজপরিবার, অভিজাত ও সাধারণ মানুষের অনেকে বন্দি হয়ে বার্মার অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। পরবর্তী বছরগুলোতে নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রম ও সংঘাতের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ আরাকান ছেড়ে বাংলার দিকে পালিয়ে যায়।

একটি স্বাধীন রাজ্য তখন আর স্বাধীন ছিল না। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হয়নি।

প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের পর ১৮২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইয়ান্দাবু চুক্তির মাধ্যমে বার্মা আরাকান ব্রিটিশদের হাতে ছেড়ে দেয়। অর্থাৎ স্বাধীনতা হারানোর মাত্র কয়েক দশক পর আরাকানের শাসক আবার বদলে গেল।

আজ যে ভূখণ্ডকে আমরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য নামে চিনি, ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় সেটি মিয়ানমারের অধীনে ছিল না। আরাকানের সুদীর্ঘ ইতিহাসে মিয়ানমারের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্ক আসলে ইতিহাসের তুলনায় অনেকটাই আধুনিক।

@ boikal



20



*অনিদ্রার ভয়াবহ সত্য:বহেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক! *ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের নীরব ধ্বংসযজ্ঞ: বিজ্ঞান কী বলছে?

ঘুম কম হলে মস্তিষ্ক নিজেই নিজেকে "খেয়ে" ফেলছে! মস্তিষ্কের ভেতরের নীরব ধ্বংসযজ্ঞ

আপনি কি জানেন, রাতের পর রাত ঠিকমতো না ঘুমালে আপনার মস্তিষ্ক আক্ষরিক অর্থেই নিজের অংশ ভেঙে খেতে শুরু করে? ইতালির মার্কি পলিটেকনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণায় এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

অ্যাস্ট্রোসাইট আসলে কী

মস্তিষ্কে নিউরনের পাশাপাশি থাকে গ্লিয়াল কোষ, যাদের বলা হয় স্নায়ুতন্ত্রের "আঠা"। এর মধ্যে অ্যাস্ট্রোসাইটের কাজ হলো মস্তিষ্কের পুরনো বা অপ্রয়োজনীয় সিন্যাপস (স্নায়ু-সংযোগ) ছেঁটে ফেলা, যাতে মস্তিষ্ক নতুন করে সাজতে পারে। এটি স্বাভাবিক অবস্থায় একটি উপকারী প্রক্রিয়া।

ঘুমের অভাবে বিপর্যয়

গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুম কম হলে এই অ্যাস্ট্রোসাইটগুলো মাত্রাতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। দীর্ঘমেয়াদি ঘুম-বঞ্চিত ইঁদুরের মস্তিষ্কে স্বাভাবিক ঘুমের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেশি সিন্যাপস ভেঙে ফেলার প্রমাণ মিলেছে, বিশেষত সবচেয়ে পুরনো ও বেশি ব্যবহৃত সংযোগগুলোই এর শিকার হয়েছে বেশি।

চিন্তার বিষয় কোথায়

একইসঙ্গে মস্তিষ্কের আরেক পরিষ্কারক কোষ মাইক্রোগ্লিয়াও দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রায় অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে পড়ে, যা আলঝেইমার্সের মতো স্নায়বিক রোগের সঙ্গে যুক্ত বলে আগেই জানা গেছে। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি শুধু ক্লান্তি নয়, মস্তিষ্কের গঠনকেই ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

কী করা উচিত

তাই আজ রাত থেকেই ফোন সরিয়ে রাখুন, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান এবং অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন। ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মস্তিষ্কের বেঁচে থাকার প্রয়োজন।

@ পার্থ প্রতিম রায় 




21



সিলোন থেকে শ্রীলঙ্কা: নাম বদলের ইতিহাস

সার্কভুক্ত সুপরিচিতি এক দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কা। ছোট্ট এই দেশটি আয়তনে ছোট হলেও ইতিহাসে এর পরিচিতি বেশ বৈচিত্র্যময়। হাজার বছরের ইতিহাসে দ্বীপটি বিভিন্ন সভ্যতা ও ভাষার মানুষের কাছে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। লঙ্কা, তাম্রপর্ণী, ট্যাপ্রোবান, সেরিনদিপ, সিলোন—সবশেষে আজকের শ্রীলঙ্কা।

কিছু কিছু বইয়ে বা অনলাইন পোস্টেও দেখবেন বিলুপ্ত দেশের তালিকায় 'সিলোন' নামে একটি দেশ। আসলে দেশটি বিলুপ্ত হয় নি, শুধু নাম পাল্টেছে, দেশ ঠিকই আছে। আমরা আজ দেশটির নাম বদলের ইতিহাস দেখব।

দ্বীপটির সবচেয়ে প্রাচীন ও পরিচিত নামগুলোর একটি হলো লঙ্কা। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে দ্বীপটির নাম লঙ্কা হিসেবে পাওয়া যায়। তবে লঙ্কাই যে দ্বীপটির একমাত্র প্রাচীন নাম ছিল, তা নয়। বিভিন্ন সময় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন ভাষায় দ্বীপটির জন্য 'তাম্রপর্ণী'সহ একাধিক নাম ব্যবহৃত হয়েছে।

প্রাচীন গ্রিক ও রোমান লেখকদের কাছে দ্বীপটি পরিচিত ছিল Taprobane নামে। খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দে আরব ও ফারসি ভ্রমণকারী ও ভূগোলবিদদের লেখায় আবার পাওয়া যায় Serendib বা সেরিনদিপ নামটি। এই নামটি এসেছে প্রাচীন নামের আরবি-ফারসি রূপান্তর থেকে। এই নামটি থেকে ইংরেজি 'Serendipity' শব্দটি তৈরি হয়েছে, সেটা আলাদা ঘটনা।

তবে দ্বীপটির নামের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে ইউরোপীয়দের আগমনের পর। ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা দ্বীপটির নাম লিখত Ceilão। ডাচদের ব্যবহারে তা হয়ে যায় Ceylan। পরে ব্রিটিশরা এই নামের ইংরেজি রূপ Ceylon ব্যবহার করে। ধীরে ধীরে Ceylon-ই আন্তর্জাতিকভাবে দ্বীপটির সবচেয়ে পরিচিত নাম হয়ে ওঠে।

১৭৯৬ সালের পর ব্রিটিশরা দ্বীপের উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং ১৮১৫ সালে ক্যান্ডি রাজ্য দখলের মাধ্যমে পুরো দ্বীপের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ব্রিটিশ শাসনামলে সরকারি ও আন্তর্জাতিক ব্যবহারে সিলোন নামটি আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। চা, রাবার ও দারুচিনির মতো পণ্যের সঙ্গে সিলোন নামটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠে। আজও Ceylon Tea সেই পুরোনো নামের স্মৃতি বহন করছে।

কিন্তু ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পরও দেশটির নাম বদলায় নি। নতুন রাষ্ট্রটির নাম ছিল Dominion of Ceylon। দেশটি স্বশাসিত হলেও তখনও ব্রিটিশ কমনওয়েলথের কাঠামোর মধ্যে ছিল এবং ব্রিটিশ রাজাকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে স্বীকার করত।

পরিবর্তন আসে ২২ মে ১৯৭২ সালে। নতুন সংবিধান কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে সিলোন একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয় এবং দেশের সরকারি নাম করা হয় Republic of Sri Lanka। একই সঙ্গে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সঙ্গে অবশিষ্ট সাংবিধানিক সম্পর্কও শেষ হয়।

Lanka নামটির ঐতিহাসিক শিকড় বহু পুরোনো; তার সঙ্গে সম্মানসূচক Sri যুক্ত হয়ে গড়ে উঠেছে Sri Lanka নামটি। অর্থাৎ ১৯৭২ সালের পরিবর্তন ছিল মূলত ঔপনিবেশিক যুগে প্রতিষ্ঠিত Ceylon নামের পরিবর্তে একটি স্থানীয় ঐতিহাসিক নামকে রাষ্ট্রের সরকারি পরিচয় হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

১৯৭৮ সালে নতুন সংবিধানের মাধ্যমে দেশের পূর্ণ সরকারি নাম করা হয় Democratic Socialist Republic of Sri Lanka। তবে ডাক নাম হিসেবে শ্রীলঙ্কা-ই রয়ে যায়।

লঙ্কা থেকে সেরিনদিপ, তারপর সিলোন, আর শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা—প্রতিটি নামের পেছনে লুকিয়ে আছে দ্বীপটির সঙ্গে যোগাযোগকারী ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা, ভাষা ও রাজনৈতিক যুগের ইতিহাস। @ boikal




22


১ সেপ্টেম্বর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু যেভাবে

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটের ঠিক আগে। ডানজিগ বন্দরে নোঙর করে থাকা জার্মান প্রশিক্ষণ যুদ্ধজাহাজ Schleswig-Holstein হঠাৎ তার কামানের নল ঘুরিয়ে তাক করল ওয়েস্টারপ্লাটের দিকে। কয়েক দিন আগেই জাহাজটি সেখানে এসেছিল ‘সৌজন্য সফরে’। এবার তার প্রধান কামান থেকে গোলা ছুটতে শুরু করল পোলিশ মিলিটারি ট্রানজিট ডিপোর দিকে।

প্রায় একই সময়ে জার্মান বোমারু বিমান পোল্যান্ডের ছোট শহর ভিয়েলুনে হামলা চালায়। ঘুমন্ত বেসামরিক মানুষের ওপর নেমে আসে বোমা। সীমান্তের বিভিন্ন জায়গা দিয়ে জার্মান ট্যাংক ও সাঁজোয়া বাহিনী ঢুকে পড়ে। শুরু হয়ে যায় পোল্যান্ড আক্রমণ— ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা!

ওয়েস্টারপ্লাটের ঘাঁটিতে ছিলেন মাত্র প্রায় ২০০ জন পোলিশ সেনা। নেতৃত্বে ছিলেন মেজর হেনরিক সুশারস্কি। তাদের প্রতিরক্ষা ছিল খুবই সীমিত—কংক্রিটের কয়েকটি পাহারাঘর, পরিখা ও অল্প কিছু কামান। নির্দেশ ছিল, যতক্ষণ সম্ভব অবস্থান ধরে রাখতে হবে, যাতে মূল ভূখণ্ড থেকে সাহায্য আসতে পারে।

জার্মানরা অবশ্য ধরে নিয়েছিল, ঘাঁটিটি কয়েক ঘণ্টার বেশি টিকবে না। Schleswig-Holstein-এর ভারী কামানের গোলায় প্রতিরক্ষা ভেঙে ফেলার পর জার্মান পদাতিক ও সামরিক প্রকৌশলীরা আক্রমণ চালাবে- এটাই ছিল পরিকল্পনা।

কিন্তু প্রথম আক্রমণেই হিসাব বদলে গেল। জার্মান সেনারা এগিয়ে আসতেই পোলিশ সৈন্যদের রাইফেল ও মেশিনগানের গুলি তাদের থামিয়ে দেয়। অল্প কিছু কামান দিয়ে পোলিশরা যুদ্ধজাহাজের গোলাবর্ষণেরও জবাব দেয়। পাইনগাছের জঙ্গল আর নিচু ইটের ভবনগুলো ধোঁয়া ও ধুলায় ঢেকে যায়। দুপুরের মধ্যেই জার্মান বাহিনী ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে পিছিয়ে গিয়ে নতুন করে প্রস্তুতি নেয়। বিকেলেও একই দৃশ্য—গোলাবর্ষণ, আক্রমণ, পোলিশ প্রতিরোধ, তারপর জার্মানদের পিছু হটা।

অন্যদিকে পোল্যান্ডের পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠছিল। জার্মান ট্যাংক সীমান্ত প্রতিরক্ষা ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছিল, স্টুকা ডুব-বোমারু বিমান সড়কে চলা সেনা ও যানবাহনে হামলা চালাচ্ছিল। উত্তরে জার্মান বাহিনী পোল্যান্ডের সমুদ্রপথ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছিল, আর দক্ষিণে তারা ক্রাকোভের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। আক্রমণ ছিল দ্রুত, সমন্বিত এবং বিপুল সামরিক শক্তিনির্ভর।

তবু রাত নামার সময়ও ওয়েস্টারপ্লাটে পোলিশ পতাকা উড়ছিল।

পরবর্তী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। গোলাবারুদ কমতে থাকে, আহত সৈন্যরা আশ্রয় নেয় ভূগর্ভস্থ কক্ষে। জার্মানরা আরও কাছে কামান এনে নতুন নতুন দিক থেকে আক্রমণ চালায়। কিন্তু ঘাঁটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভেঙে পড়েনি। বরং তাদের প্রতিরোধ পোল্যান্ডের জন্য হয়ে ওঠে যুদ্ধের প্রথম দিকের অন্যতম গৌরবের প্রতীক।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বদলে যাচ্ছিল। ব্রিটেন ও ফ্রান্স পোল্যান্ডের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। দুই দিনের মধ্যেই তারা জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। পরে বার্লিন ও মস্কোর সমঝোতা অনুযায়ী পোল্যান্ড ভাগ হয়ে যাবে।

কিন্তু ওয়েস্টারপ্লাটের সৈন্যরা তখন এসব কিছু জানতেন না। তারা জানতেন শুধু পরবর্তী আক্রমণ ঠেকাতে হবে, অস্ত্র সচল রাখতে হবে এবং যতটা সম্ভব সময় কিনতে হবে।

তাদের মূল নির্দেশ ছিল মাত্র ১২ ঘণ্টা অবস্থান ধরে রাখা। কিন্তু প্রায় ২০০ জন সৈন্য সেই অবস্থান ধরে রেখেছিলেন সাত দিন। @ boikal


23


হাওয়াই: আমেরিকার ভেতর বিলুপ্ত হওয়া আরেকটি স্বাধীন দেশ

প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা আগ্নেয় দ্বীপমালা—আজকের পর্যটনস্বর্গ—একসময় ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বীকৃত স্বাধীন দেশ। সেই দেশের নাম হাওয়াই।

স্বাধীন দেশের ইতিহাস:

হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে মানুষের বসতি স্থাপন শুরু হয় বহু শতাব্দী আগে, পলিনেশীয় নাবিকদের মাধ্যমে। তারা ছোট ছোট গোত্রশাসন (chiefdom) গড়ে তোলে। কিন্তু ১৮শ শতকের শেষদিকে ইতিহাসে আবির্ভূত হন এক শক্তিশালী নেতা- প্রথম  কামেহামেহা।

তিনি সামরিক দক্ষতা, কৌশল এবং ইউরোপীয় অস্ত্রের ব্যবহার করে ১৭৯৫ থেকে ১৮১০ সালের মধ্যে পুরো দ্বীপপুঞ্জকে একত্র করেন। এর ফলে গড়ে ওঠে একটি ঐক্যবদ্ধ ও কেন্দ্রীয় শাসিত রাষ্ট্র- হাওয়াই রাজ্য। এটি ছিল একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে পশ্চিমা প্রভাব ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, বিশেষ করে বাণিজ্য ও ধর্মপ্রচার কার্যক্রমের মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক:

১৯শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে হাওয়াই শুধু একটি ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র।

১৮৪৩ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে হাওয়াইয়ের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয় (Anglo-Franco Proclamation)। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর মধ্যে ছিল: আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান।

হাওয়াই ও আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ১৮২৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর পরষ্পরকে স্বীকৃতি দেয়।

হাওয়াই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, দূতাবাস বিনিময়, এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখত। রাজধানী হনোলুলু হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, বিশেষ করে চিনি (sugar) ও কৃষিপণ্য রপ্তানির জন্য।

স্বাধীনতার সময়কাল:

হাওয়াই রাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭৯৫ সালে গঠিত হয় এবং ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে ছিল। প্রায় ৯৮ বছর ধরে এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে বিদ্যমান ছিল।

স্বাধীনকালে রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব:

১৯শ শতকের শেষভাগে হাওয়াইয়ের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে আমেরিকান ও ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের উপর, বিশেষ করে চিনি শিল্পে। এই ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে রাজনীতিতেও প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

হাওয়াইয়ের পতন হয়েছিল ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

১. চিনির বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ: ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকান ব্যবসায়ীরা হাওয়াইয়ে বড় বড় আখের বাগান (Sugar Plantations) গড়ে তোলেন। তারা চেয়েছিলেন হাওয়াইয়ের চিনি যেন বিনা শুল্কে আমেরিকায় রপ্তানি করা যায়। এই বেনিয়া গোষ্ঠীই পরবর্তীতে ক্ষমতা দখলের মূল কারিগর ছিল।

২. বেয়োনেট সংবিধান (১৮৮৭): ১৮৮৭ সালে আমেরিকান ব্যবসায়ীদের একটি সশস্ত্র গ্রুপ (Hawaiian League) তৎকালীন রাজা কালাকাউয়া-কে অস্ত্রের মুখে একটি সংবিধানে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে। এটি 'বেয়োনেট কনস্টিটিউশন' নামে পরিচিত। এর ফলে রাজার ক্ষমতা কমে যায় এবং সাধারণ আদিবাসীদের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে কেবল ধনী আমেরিকান ও ইউরোপীয়দের ক্ষমতা বাড়ানো হয়।

৩. রাণী লিলিুওকালানি-র প্রতিরোধ: ১৮৯১ সালে রাণী লিলিুওকালানি ক্ষমতায় এসে আদিবাসীদের ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে একটি নতুন সংবিধান চালুর চেষ্টা করেন। এতে আমেরিকান ব্যবসায়ীরা ক্ষিপ্ত হয়।

ক্ষমতা দখল ও চূড়ান্ত অন্তর্ভুক্তি (১৮৯৩-১৮৯৮):

* অভ্যুত্থান (১৮৯৩): লরিন থার্স্টনের নেতৃত্বে একটি 'কমিটি অফ সেফটি' গঠন করা হয়। ১৮৯৩ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন এল. স্টিভেন্স-এর সহায়তায় এবং মার্কিন নৌবাহিনীর (USS Boston) শক্তির ভয় দেখিয়ে তারা রাণীকে ক্ষমতাচ্যুত করে। রক্তপাত এড়াতে রাণী সাময়িকভাবে ক্ষমতা ত্যাগ করেন।

* প্রজাতন্ত্র ঘোষণা: বাগান মালিকদের নেতা সানফোর্ড বি. ডোল (Sanford B. Dole) একজন বিদেশী হয়েও নিজেকে 'রিপাবলিক অফ হাওয়াই'-এর প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন এবং আমেরিকার সাথে একীভূত হওয়ার প্রস্তাব দেন।

* যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্তি (১৮৯৮): যদিও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড এই দখলদারিত্বের বিরোধী ছিলেন। কিন্তু ১৮৯৭ সালে সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের অধিকারী উইলিয়াম ম্যাককিনলি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের সময় হাওয়াইকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার অজুহাতে ১৮৯৮ সালে আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে একে নিজের ভূখণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।

এরপর হাওয়াই একটি মার্কিন 'টেরিটরিতে' পরিণত হয়, এবং অবশেষে ১৯৫৯ সালে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ৫০তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত করা হয়।

বর্তমান অধিবাসী (২০২৬):

২০২৬ সালের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, হাওয়াইয়ের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪,৫৫,৬৬০ (১৪.৫ লক্ষের বেশি)। এর মধ্যে রাজধানী হনলুলুতেই বসবাস করেন ১০ লাখের বেশি মানুষ। হাওয়াই একটি বহুসাংস্কৃতিক অঞ্চল, যেখানে এশীয় (প্রায় ৩৭%), শ্বেতাঙ্গ (২১%) এবং আদিবাসী হাওয়াইয়ান বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের মানুষ (প্রায় ১০%) একসাথে বসবাস করেন। কিন্তু স্বাধীনকালে স্থানীয় হাওয়াইয়ানরাই ছিল সংখ্যায় বেশি।

প্রায় এক শতাব্দী স্বাধীন থাকার পর, শক্তিশালী বিদেশি স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়ে হাওয়াই তার সার্বভৌমত্ব হারায়। আজ এটি যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হলেও, তার স্বাধীন অতীত এখনো ইতিহাসের একটি কেস স্টাডি।@ boikal



24


বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে জীবন-সত্যগুলো মেনে নিতে হয়

ছোটবেলায় মনে হতো, বড় হলেই জীবনটা সহজ হয়ে যাবে। নিজের মতো করে বাঁচব, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেব।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে হয়—বড় হওয়া মানে শুধু স্বাধীনতা পাওয়া নয়, কিছু কঠিন সত্য মেনে নেওয়াও।

১. সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয়

আপনি যত ভালোই হোন, কারও না কারও কাছে আপনি ভুল হবেন। তাই সবার স্বীকৃতির পেছনে ছুটে নিজের শান্তি নষ্ট করার কোনো মানে নেই।

২. কিছু সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যায়

যাদের একসময় প্রতিদিন প্রয়োজন হতো, তাদের সঙ্গেও একদিন দূরত্ব তৈরি হতে পারে। সব সম্পর্ক ধরে রাখা যায় না—কিছু সম্পর্ককে শুধু সুন্দর স্মৃতি হিসেবে রেখে দিতে হয়।

৩. সব পরিশ্রমের ফল সঙ্গে সঙ্গে আসে না

জীবনে অনেক সময় আপনি চেষ্টা করবেন, অপেক্ষা করবেন, তবুও ফল আসবে দেরিতে। তখন ধৈর্যই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শক্তি।

৪. নিজের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নিজেকেই নিতে হয়

মানুষ পাশে থাকবে, সাহায্য করবে—কিন্তু আপনার জীবনটা আপনার হয়ে কেউ বাঁচবে না। তাই নিজের সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়।

৫. ‘না’ বলতে শেখা জরুরি

সব অনুরোধ রাখা, সব জায়গায় উপস্থিত থাকা কিংবা নিজের প্রয়োজনকে সবসময় পিছিয়ে দেওয়া—এগুলো ভালো মানুষ হওয়ার প্রমাণ নয়। নিজের সীমারেখাকেও সম্মান করতে হয়।

৬. সময় ফিরে আসে না

টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়, কিন্তু চলে যাওয়া সময় আর ফিরে পাওয়া যায় না। তাই প্রিয় মানুষ, নিজের স্বপ্ন আর জীবনের ছোট আনন্দগুলোকে অবহেলা করবেন না।

৭. একাকিত্ব সবসময় খারাপ নয়

কখনো কখনো একা থাকাই মানুষকে নিজের সঙ্গে পরিচিত হতে শেখায়। সবাইকে পাশে পাওয়ার চেয়ে নিজের পাশে নিজে দাঁড়াতে পারাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৮. শান্তি অনেক সময় সাফল্যের চেয়েও মূল্যবান

বড় বাড়ি, বেশি টাকা কিংবা মানুষের প্রশংসা—সবকিছু থাকার পরও যদি মনে শান্তি না থাকে, তাহলে কোথাও একটা অপূর্ণতা থেকেই যায়।

বড় হওয়ার সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা হয়তো এটাই—

সবকিছু নিজের ইচ্ছেমতো হবে না।

সবাই আপনার সঙ্গে থাকবে না।

সব স্বপ্ন সময়মতো পূরণ হবে না।

তবুও জীবন থেমে থাকবে না।

কিছু মানুষকে ছেড়ে, কিছু প্রত্যাশা কমিয়ে, কিছু বাস্তবতা মেনে নিয়েই একদিন আমরা বুঝতে শিখি—শান্তিতে বেঁচে থাকাটাই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।



25



দুজন মানুষ একই কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লেও তাদের মধ্যে একজন ভেঙে পড়ে, আর আরেকজন সেই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে? পার্থক্যটা মেধায় নয়, শক্তিতেও নয়—পার্থক্যটা একটি মনস্তাত্ত্বিক ধারণায়, যাকে বলা হয় "লোকাস অব কন্ট্রোল" (Locus of Control)।

১৯৫৪ সালে মনোবিজ্ঞানী জুলিয়ান রটার এই তত্ত্ব দেন। তাঁর মতে, মানুষ মূলত দুই ধরনের হয়:

যাদের "ইন্টারনাল লোকাস অব কন্ট্রোল" আছে, তারা বিশ্বাস করেন—তাদের জীবনের ফলাফল মূলত তাদের নিজের সিদ্ধান্ত, পরিশ্রম আর পছন্দের ফল। ব্যর্থতা এলে তারা প্রশ্ন করেন, "আমি কী করতে পারতাম?"

আর যাদের "এক্সটার্নাল লোকাস অব কন্ট্রোল" আছে, তারা মনে করেন—ভাগ্য, পরিস্থিতি বা অন্য মানুষই তাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যর্থতা এলে তারা বলেন, "আমার কপালটাই খারাপ।"

গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ইন্টারনাল লোকাস অব কন্ট্রোল বেশি, তারা সাধারণত বেশি আত্মবিশ্বাসী, কম উদ্বিগ্ন এবং কাজে বেশি সফল হন। কারণ তারা নিজেকে পরিস্থিতির শিকার নয়, বরং পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখেন।

এখানেই আসল "পাওয়ার" লুকিয়ে আছে।

মনোবিজ্ঞানী মার্টিন সেলিগম্যানের বিখ্যাত "লার্নড হেল্পলেসনেস" পরীক্ষায় দেখা যায়—যখন কাউকে বারবার এমন পরিস্থিতিতে ফেলা হয় যেখানে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তখন সে ধীরে ধীরে চেষ্টা করাই ছেড়ে দেয়। এমনকি পরে যখন পরিস্থিতি বদলে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আসে, তখনও সে চেষ্টা করে না—কারণ মস্তিষ্ক ততদিনে "নিয়ন্ত্রণ নেই" এই বিশ্বাসটাই শিখে ফেলেছে।

উল্টোদিকে, যখন কেউ ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া শুরু করে—এমনকি সামান্য বিষয়েও—তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ে, স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল কমে, আর আত্মবিশ্বাস তৈরি হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াটাকেই বলা যায় ভেতর থেকে "পাওয়ারফুল" হয়ে ওঠা।

তাহলে বাস্তবে করণীয় কী?

প্রতিদিন এমন অন্তত একটি সিদ্ধান্ত নিন, যেখানে দায় সম্পূর্ণ আপনার—ছোট হোক বা বড়। কোনো সমস্যায় পড়লে নিজেকে প্রশ্ন করুন, "পরিস্থিতি বদলাতে পারি না, কিন্তু আমার প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা আমি ঠিক করতে পারি কি না?" এই ছোট্ট মানসিক অভ্যাসই ধীরে ধীরে আপনাকে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক বানিয়ে তোলে, শিকার নয়।

মনে রাখবেন—সত্যিকারের ক্ষমতা বাইরের পরিস্থিতিতে নয়, লুকিয়ে থাকে আপনার নিজের প্রতিক্রিয়া বেছে নেওয়ার স্বাধীনতায়।

Psychology & Sceince

World Vision (বিশ্ব দর্শন)


২৬


একজন মানুষের নামে একটি দেশের নাম, ভাবতেই কেমন লাগে! মানুষের নামে গ্রামের নাম, শহরের নাম, জেলার নাম আছে লক্ষ লক্ষ, কিন্তু দেশের নাম একটু আনইউজুয়াল। একজন ব্যক্তি একটা রাজনৈতিক জাতির পরিচয় হয়ে উঠতে পারে কীভাবে? পৃথিবীতে বর্তমানে এমন দেশ আছে প্রায় ৯টি, যেগুলোর নামকরণ করা হয়েছে নির্দিষ্ট কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি বা শাসকের নাম অনুসারে। দেশেগুলো হল:

১. ফিলিপাইন (Philippines)

স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের (King Philip II) নামানুসারে এই দেশটির নামকরণ করা হয়েছে। ১৫৪২ সালে স্পেনীয় অভিযাত্রীরা এই দ্বীপপুঞ্জটির নাম দেন 'লাস ইসলাস ফিলিপিনাস'।

২. সৌদি আরব (Saudi Arabia)

এই দেশটির নাম এসেছে আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ বিন সৌদ (Ibn Saud) বা 'সৌদ' বংশের নাম থেকে। ১৯৩২ সালে এই নামকরণ করা হয়।

৩. মোজাম্বিক (Mozambique)

বর্তমান মোজাম্বিকের সীমানায় একটি দ্বীপে নাম ছিল মুসা বিন বিকি। মুসা বিন বিকি এই দ্বীপে প্রথম আগমন করেন, এবং পরে সেখানে বাস করেন। ভাস্কো দা গামা সেখানে পৌঁছানোর সময়ও মুসা বিন বিক সেখানে ছিলেন এবং তিনি সে সময় দ্বীপটির সুলতান ছিলেন।

ভাস্কো দা গামার নাবিকেরা যখন ১৪৯৮ সালে দ্বীপটিতে পৌঁছান, তখন তাঁরা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত নামটিরই একটি পর্তুগিজ রূপ তৈরি করল। পর্তুগিজ ভাষায় নামটি লেখা হতে থাকে Moçambique।

এরপর দ্বীপের নামটি মূল ভূখণ্ডে বিস্তার করে। পর্তুগিজরা পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে থাকলে মূল ভূখণ্ডের নামও “Moçambique” হয়ে গেল।

৪. বলিভিয়া (Bolivia)

দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটির নাম রাখা হয়েছে বিখ্যাত বিপ্লবী নেতা সাইমন বলিভারের (Simon Bolivar) সম্মানে, যিনি দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কিছু দেশকে স্পেনীয় শাসন থেকে মুক্ত করতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

৫. কলম্বিয়া (Colombia)

ভাগ্যান্বেষী ইতালিয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের (Christopher Columbus) নামানুসারে এই দেশটির নামকরণ করা হয়েছে।

৬. মরিশাস (Mauritius)

১৫৯৮ সালে ওলন্দাজরা  দ্বীপটি দখল করে এবং রাজপুত্র মরিটস অফ অরেঞ্জ (Maurice of Orange)-এর নামানুসারে এই দ্বীপরাষ্ট্রটির নাম রাখে 'মরিশাস'।

৭. সিশেলস (Seychelles)

ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্রটির নাম ফ্রান্সের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জ্যঁ মরো দ্য সেশেল (Jean Moreau de Séchelles)-এর নামানুসারে রাখা হয়েছে।

৮. মার্শাল আইল্যান্ডস (Marshall Islands)

ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন জন মার্শালের নামানুসারে এই দ্বীপরাষ্ট্রের নামকরণ করা হয়, যিনি ১৭৮৮ সালে এই দ্বীপগুলো পরিদর্শন করেছিলেন।

৯. সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস (Saint Kitts and Nevis)

Saint Kitts অংশটি এসেছে “Saint Christopher” থেকে, অর্থাৎ Saint Christopher-এর নামে।

“Kitts” হলো “Christopher”-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

Nevis এসেছে স্প্যানিশ শব্দ “Nuestra Señora de las Nieves” থেকে, যার অর্থ "Virgin Mary of the Snows”।

১০. কিরিবাস (Kiribati)

প্রশান্ত মহাসাগরের এই দেশটির নাম আগে ছিল গিলবার্ট আইল্যান্ডস। এই নামটি দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ নাবিক Thomas Gilbert-এর নামে, যিনি ১৮শ শতকে এই দ্বীপপুঞ্জে আসেন। গিলবার্টকে স্থানীয়রা উচ্চারণ করত " কিরিবাস" যা ইংরেজি বানানে Kiribati. গিলবার্ট আইল্যান্ডস যখন স্বাধীন হয় তখন স্থানীয় উচ্চারণে নাম পাল্টে রাখে।

১১. আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র (USA)

এটা শুধু একটা দেশের নাম না, দুটো মহাদেশের নাম।  আমেরিকা মহাদেশের নামকরণ করা হয়েছে ইতালীয় অভিযাত্রী এবং মানচিত্রকর আমেরিগো ভেসপুচি (Amerigo Vespucci)-এর নামানুসারে।

​১৫শ শতাব্দীর শেষভাগে যখন ক্রিস্টোফার কলম্বাস বর্তমান আমেরিকা অঞ্চলে পৌঁছান, তিনি ধারণা করেছিলেন যে তিনি এশিয়ার কোনো অংশে (ইন্ডিজ) পৌঁছেছেন। কিন্তু আমেরিগো ভেসপুচিই প্রথম ব্যক্তি যিনি যুক্তি দেন যে, এটি এশিয়া নয় বরং একটি সম্পূর্ণ 'নতুন বিশ্ব' বা নতুন মহাদেশ।

১৫০৭ সালে জার্মান মানচিত্রকর মার্টিন ওয়াল্ডসিমুলার (Martin Waldseemüller) একটি বিশ্ব মানচিত্র তৈরি করেন। তিনি ভেসপুচির এই নতুন আবিষ্কারের প্রতি সম্মান জানাতে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের নাম দেন 'আমেরিকা' (Amerigo-এর স্ত্রীলিঙ্গ রূপ)।

প্রথমে এটি ছিল শুধু দক্ষিণ আমেরিকার নাম, পরো পুরো দুটো মহাদেশের নাম হয় আমেরিকা, উত্তর ও দক্ষিণ। দুটো মহাদেশের সবগুলো দেশকে একত্রে বলা হয় "আমেরিকাস", আর স্বাধীনতার পর দেশটির নাম রাখা হয় ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা।

১২. সান মারিনো (San Marino)

সান মারিনো ইতালির ভেতরে একটা ছোট রাষ্ট্র। খ্রিস্টান সন্ত 'মারিনাস'-এর নাম অনুসারে এর রাজধানী শহরের পত্তন হয়েছিল। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন প্রজাতন্ত্র। মাউন্ট টিটানোর ওপর অবস্থিত এই প্রধান শহরের নামেই পুরো রাষ্ট্রের নাম রাখা হয়েছে।

১৩. সেইন্ট লুসিয়া (St. Lusia)

ক্যারিবিয়ান দ্বীপ দেশটির নাম রাখা হয়েছে সিসিলির সেইন্ট লুসির নামে। দ্বীপটির উপকূলে একটি ফরাসি জাহাজ ভেঙে পড়ে, নাবিকরা এই নাম রাখে। দিনটি ছিল সেইন্ট লুসির বরবের দিন।

১৪. ডোমিনিকান রিপাবলিক

কাস্তিলিয়ান সেইন্ট ডোমিনিকের নামে নামকরণ। তবে আরেকটি দেশ ডোমিনিকার নামকরণের কারণ ভিন্ন।

১৫. সেইন্ট ভিনসেন্ট এন্ড গ্রানাডাইনস

কলম্বাস দ্বীপটিকে দেখার পর স্পেনের জারাগোজার সেইন্ট ভিনসেন্টের নামে নাম রাখেন।

১৬. পেরু (Peru)

ধারণা করা হয় ষোড়শ শতকের স্থানীয় শাসক বিরু'র নামে নামকরণ হয়।

অতীতে:

উপনিবেশিক আমলে ইউরোপিয় বেনিয়া সেসিল রোডসের নামে আফ্রিকার দুটো পরাধীন দেশের নাম রাখা হয়েছিল। দেশ দুটো হল- উত্তর রোডেশিয়া (১৯১১-১৯৬৪) ও দক্ষিন রোডেশিয়া (১৯২৩-৬৫ ও ১৯৭৯-৮০); যা বর্তমানে যথাক্রমে জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে। @ বইকাল



২৭


সকালের নাস্তা  

মানব ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়জুড়ে, খাবার খাওয়ার সময় নির্ধারিত হতো ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা, ঋতুভেদে খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং শারীরিক শ্রমের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে। 

মধ্যযুগীয় এবং প্রারম্ভিক আধুনিক যুগের ইউরোপীয়রা সাধারণত দিনে দুটি প্রধান খাবার খেতো — দুপুরে একটি ভারী খাবার (ডিনার) এবং শেষ বিকেলে রাতের খাবার (সাপার)। ইংরেজি 'ব্রেকফাস্ট' শব্দটি (আক্ষরিক অর্থে: ঘুম থেকে জেগে উপবাস ভাঙা) পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে ব্যবহৃত হলেও, এটি এমন একটি পরিমিত খাবারকে বোঝাতো যা সর্বজনীনভাবে খাওয়া হতো না বা সাংস্কৃতিকভাবে অগ্রাধিকার পেত না। যে কৃষক ভোরের আগে ঘুম থেকে উঠতেন এবং সকালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই কয়েক ঘণ্টা শারীরিক পরিশ্রম শেষ করতেন, তিনি তার ভারী খাবারটি খেতেন দুপুরে, সূর্যোদয়ের সময় নয়।

অষ্টাদশ শতাব্দীর অনেক উচ্চবিত্ত ইউরোপীয় পরিবারে, দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার ফ্যাশনের কারণে দুপুরের আগে সকালের কোনো খাবারই খাওয়া হতো না। পশ্চিমা সংস্কৃতিতেও একটি স্বতন্ত্র, সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সকালের নাস্তার বিকাশ ঘটেছে তুলনামূলকভাবে বেশ দেরিতে।

শিকারী-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী — যাদের খাদ্যাভ্যাসকে বেশিরভাগ বিবর্তনীয় পুষ্টির যুক্তিতে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয় — তারা কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে খেতেন না। খাবার পাওয়া গেলেই তারা খেতেন। রাত এবং সকালের উপবাস সহ বিভিন্ন সময়ের উপবাস ছিল আদিম মানুষের খাদ্যাভ্যাসের একটি স্বাভাবিক এবং নিয়মিত বৈশিষ্ট্য।

খাবারের সময় নিয়মিতকরণের বিষয়টি অনেকাংশেই শিল্প পুঁজিবাদের ফসল। কারখানার কাজে সময়ানুবর্তিতা প্রয়োজন ছিল এবং নির্দিষ্ট বিরতির সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল — একজন শিল্প শ্রমিককে কারখানায় পৌঁছানোর আগেই খেয়ে নিতে হতো, আর সুশৃঙ্খল কর্মদিবসই একটি সুশৃঙ্খল আহারের সময়সূচি তৈরি করেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের পূর্ববর্তী কোনো পুষ্টি ঐতিহ্যে — সকালের নাস্তাই যে দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার, এমন সুনির্দিষ্ট দাবির কোনো অস্তিত্ব ছিল না।  


**দুর্ঘটনাবশত সিরিয়াল উদ্ভাবন

১৮৯৪ সালে, কেলগ এবং তার ছোট ভাই উইলিয়াম কিথ দুর্ঘটনাবশত গমের ফ্লেক্স তৈরির একটি প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন — গমের খামির রান্না করে, ধাতব রোলারের মাধ্যমে বেলে এবং শুকিয়ে গমের ফ্লেক্সে পরিণত করে যা রান্না না করেই খাওয়া যেত। গ্র্যানোজ (Granose) নামের এই আদি পণ্যটি স্যানিটারিয়ামের রোগীদের ভিক্টোরিয়ান যুগের ভারী মাংস-ডিমের নাস্তার একটি সহজে হজমযোগ্য, অনুত্তেজক বিকল্প হিসেবে পরিবেশন করা হতো। এটি মিষ্টি ছিল না, স্বাদযুক্ত ছিল না এবং বিশেষ মুখরোচকও ছিল না। এটি ছিল ঔষধস্বরূপ খাবার।

কেলগ পরবর্তীতে ভুট্টার ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করেন, তৈরি করেন কর্ন ফ্লেক্স। স্যানিটারিয়ামটি ডাকযোগে প্রাক্তন রোগীদের কাছে এগুলো বিক্রি করতে শুরু করে এবং পণ্যটি অপ্রত্যাশিতভাবে জনপ্রিয় প্রমাণিত হয়।

**ভাই, চিনি এবং তিক্ত বিচ্ছেদ

এখান থেকেই গল্পটি বাণিজ্যিক রূপ নেয় — এবং খাদ্যের ইতিহাসে অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়।

ডব্লিউ. কে. কেলগ এমন কিছু বুঝতে পেরেছিলেন যা তার ভাই মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন: জন হার্ভে প্রণীত কর্ন ফ্লেক্স বিশেষভাবে আকর্ষণীয় ছিল না। ব্যাপক বাণিজ্যিক আবেদন পেতে এর মিষ্টি হওয়া প্রয়োজন ছিল। জন হার্ভে এর ঘোর বিরোধী ছিলেন। খাবারে যে ধরনের আনন্দদায়ক গুণ থাকা উচিত নয় বলে তিনি বিশ্বাস করতেন, মিষ্টি ঠিক তেমনই একটি ব্যাপার। তার শস্যের খাবারগুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই ছিল অনাড়ম্বর — এটাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

ডব্লিউ. কে. তা সত্ত্বেও কর্ন ফ্লেক্সে চিনি মেশান। পণ্যটি নাটকীয়ভাবে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভাইদের মধ্যে তিক্ত এবং স্থায়ী কলহের সৃষ্টি হয়। ১৯০৬ সালে, ডব্লিউ. কে. 'ব্যাটল ক্রিক টোস্টেড কর্ন ফ্লেক কোম্পানি' — পরবর্তীতে যার নামকরণ করা হয় 'কেলগ কোম্পানি' — প্রতিষ্ঠা করেন এবং মিষ্টি কর্ন ফ্লেক্সের ব্যাপক উৎপাদন শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যেই এটি আমেরিকার অন্যতম সফল খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।


## কীভাবে একটি বিজ্ঞাপনী স্লোগান পুষ্টিগত মতবাদে পরিণত হলো

খাদ্য শিল্পে জাতীয় বিজ্ঞাপনের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ব্যবহারকারীদের একজন ছিলেন ডব্লিউ. কে. কেলগ। তিনি কোম্পানির প্রাথমিক আয়ের এক বিপুল অংশ ম্যাগাজিন এবং সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনে ব্যয় করেছিলেন — এক পর্যায়ে তিনি কোম্পানির মোট লাভের চেয়েও বেশি অর্থ বিপণনে ব্যয় করতেন। এই কৌশলটি পুরোপুরি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দাবির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। কর্ন ফ্লেক্সকে খাবার হিসেবে নয়, ঔষধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বৈজ্ঞানিকভাবে অনুমোদিত সকালের পুষ্টি হিসেবে। আধুনিক ব্যস্ত মানুষের চিকিৎসাগতভাবে প্রস্তাবিত প্রয়োজনীয় সকালের নাস্তা হিসেবে।

"দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার" — বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকে মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সিরিয়ালের বিজ্ঞাপনে বিভিন্ন রূপে উপস্থিত এই সুনির্দিষ্ট বাক্যটি সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে প্রসারিত হয়, যখন পুরো প্রাতঃরাশের সিরিয়াল শিল্প এই ধারণাটিতে বিনিয়োগ করে যে, সকালের নাস্তা না খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং সঠিক নাস্তা মানেই সিরিয়াল।

শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, জেনারেল মিলস (হুইটিস, চেরিওস) এবং পোস্ট (গ্রেপ-নাটস, রেইজিন ব্র্যান) বাজারে যোগ দেয়, এবং তিনটি কোম্পানিই নাস্তার গুরুত্বকে সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রচুর বিনিয়োগ করে। হুইটিস স্পোর্টস মার্কেটিং — যা ১৯৩৪ সালে 'ব্রেকফাস্ট অফ চ্যাম্পিয়ন্স' স্লোগান এবং অ্যাথলেটদের এনডোর্সমেন্টের মাধ্যমে শুরু হয় — সিরিয়াল এবং মানবদেহের সর্বোচ্চ কার্যক্ষমতার মধ্যে সংযোগকে স্পষ্ট এবং কাঙ্ক্ষিত করে তোলে। এর পরোক্ষ অর্থ ছিল সরাসরি: চ্যাম্পিয়নরা নাস্তায় সিরিয়াল খায়, তাই সিরিয়াল না খাওয়ার অর্থ হলো আপনি আপনার সম্ভাবনায় পিছিয়ে পড়ছেন।

যুদ্ধোত্তর যুগে সবচেয়ে নাটকীয় ত্বরণ দেখা যায়। ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে ইতিহাসের সবচেয়ে আক্রমণাত্মকভাবে শিশুদের লক্ষ্য করে খাদ্য বিপণন তৈরি হয়েছিল। ফ্রস্টেড ফ্লেক্স, ফ্রুট লুপস, সুগার পপস, সুগার স্ম্যাকস — শনিবার সকালে কার্টুন টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিশুদের সরাসরি তীব্র মিষ্টি সিরিয়াল বাজারজাত করা হয়। প্রতিটি পণ্যকে একই সাথে মজাদার, সাংস্কৃতিকভাবে কাঙ্ক্ষিত এবং শিশুদের প্রয়োজনীয় সঠিক ও গুরুত্বপূর্ণ সকালের পুষ্টি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সিরিয়াল একই সাথে বিনোদন, পুষ্টি, আত্মপরিচয় এবং ঐতিহ্য হয়ে ওঠে।

যখন অত্যন্ত প্রক্রিয়াজাত, উচ্চ শর্করাযুক্ত সিরিয়ালগুলোর পুষ্টিগত পর্যাপ্ততা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন শিল্পটি ফর্টিফিকেশন (পুষ্টি সমৃদ্ধকরণ) গ্রহণ করে — প্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক পুষ্টির ক্ষতিপূরণ করতে পণ্যে কৃত্রিম ভিটামিন এবং খনিজ যোগ করা হয়। এরপর এক বাটি পুষ্টি-সমৃদ্ধ চিনিযুক্ত সিরিয়ালকে আপনার প্রাত্যহিক প্রস্তাবিত ভিটামিনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহকারী হিসেবে বাজারজাত করা সম্ভব হয়। পুষ্টিহীন পণ্যগুলোকে কৃত্রিম মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট দিয়ে ফর্টিফাই করাই হয়ে ওঠে এই ক্রমবর্ধমান অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রধান আত্মরক্ষা যে, প্রাতঃরাশের সিরিয়ালগুলো আসলে স্বাস্থ্যকর খাবার নয়।

সকালের নাস্তা দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার — এই দাবি সিরিয়ালের বাক্সে, সিরিয়াল কোম্পানি দ্বারা স্পনসর করা শিক্ষামূলক উপকরণে, পুষ্টির পাঠ্যবইয়ে এবং জনস্বাস্থ্যের বার্তায় আবির্ভূত হয়। এটি এত বেশি উৎস থেকে এতবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছিল যে খাদ্য শিল্পের বিপণন থেকে এর উৎপত্তি সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়। এটি সাধারণ জ্ঞানের মর্যাদা লাভ করে — যাকে প্রাচীন প্রজ্ঞা বলে ধরে নেওয়া হয়, কারণ এটি যে স্রেফ সত্য ছিল না এমন কোনো সময়ের কথা কারও মনে ছিল না।

**সকালের নাস্তা এবং শিশু — যেখানে প্রমাণ সত্যিই দৃঢ়


২৮

Brain Fog

কখনও কি মনে হয়—মাথার ভেতর যেন কুয়াশা জমেছে? পরিচিত শব্দ মনে করতে সময় লাগছে, মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন না, কী করতে যাচ্ছিলেন সেটাই ভুলে যাচ্ছেন, কিংবা সাধারণ সিদ্ধান্ত নিতেও অস্বাভাবিক সময় লাগছে?

এই অবস্থাকে সাধারণভাবে বলা হয় Brain Fog।

Brain Fog কোনো আলাদা রোগের নাম নয়। এটি এমন কিছু cognitive বা মানসিক উপসর্গের সমষ্টি, যেখানে attention, memory, processing speed এবং mental clarity সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে।

Brain Fog হলে কী কী অনুভূতি হতে পারে?

কথা বলতে গিয়ে পরিচিত শব্দ মনে না পড়া

সদ্য বলা বা পড়া বিষয় ভুলে যাওয়া

কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা

একই জিনিস বারবার পড়তে হওয়া

সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগা

মাথা ভার বা “blank” লাগা

কাজ শুরু করতে বা শেষ করতে কষ্ট হওয়া

একসঙ্গে অনেক তথ্য সামলাতে সমস্যা

সারাদিন mentally exhausted অনুভব করা

অনেকে বলেন—

“সবকিছু জানি, কিন্তু ঠিক সময়ে মাথায় আসছে না।”

এটাই Brain Fog-এর খুব পরিচিত অনুভূতি।

Stress ও Overthinking কীভাবে Brain Fog তৈরি করতে পারে?

দীর্ঘদিনের stress-এর সময় মস্তিষ্কের attention system বারবার threat বা চিন্তার দিকে চলে যায়।

আপনার মাথায় যদি সারাক্ষণ চলতে থাকে—

“এরপর কী হবে?”

“আমি কি ভুল করছি?”

“ও কেন এমন বলল?”

“যদি খারাপ কিছু ঘটে?”

তাহলে working memory-এর একটি বড় অংশ ওই চিন্তাগুলো সামলাতেই ব্যস্ত থাকে। ফলে দৈনন্দিন কাজের জন্য cognitive capacity কম উপলব্ধ থাকে।

তখন মনে হতে পারে—“আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।” কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাটি memory storage-এর চেয়ে attention overload-এর সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত হতে পারে।

ঘুমের সমস্যা Brain Fog-এর বড় কারণ

ঘুমের সময় মস্তিষ্ক শুধু বিশ্রাম নেয় না; memory consolidation, emotional regulation এবং cognitive recovery-তেও ঘুম গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুম কম হলে বা ঘুমের quality খারাপ হলে—

concentration কমতে পারে

reaction time ধীর হতে পারে

working memory দুর্বল হতে পারে

irritability বাড়তে পারে

mental clarity কমতে পারে

তাই আপনি ৭–৮ ঘণ্টা বিছানায় থাকলেও যদি বারবার ঘুম ভাঙে বা গভীর ঘুম না হয়, সকালে Brain Fog অনুভূত হতে পারে।

Anxiety-তে মাথা “Blank” হয়ে যায় কেন?

Anxiety-এর সময় brain-এর attention অনেকটাই সম্ভাব্য বিপদের দিকে চলে যায়।

যেমন interview বা exam-এর আগে সব পড়া থাকলেও হঠাৎ মনে হলো—

“কিছুই মনে পড়ছে না!”

এটি সবসময় জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া নয়। অনেক সময় high arousal-এর কারণে information retrieve করতে সাময়িক অসুবিধা হয়।

অর্থাৎ—

Brain জানে, কিন্তু stress-এর মুহূর্তে access করতে পারছে না।

Depression-এর সঙ্গেও Brain Fog থাকতে পারে

Depression মানেই শুধু কান্না নয়।

অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়—

চিন্তার গতি ধীর

concentration কম

সিদ্ধান্ত নিতে কষ্ট

motivation কম

স্মৃতি দুর্বল মনে হওয়া

mental fatigue

ফলে ব্যক্তি মনে করতে পারেন—

“আমি আগের মতো intelligent নেই।” কিন্তু এই cognitive difficulty অনেক সময় mood disturbance-এর অংশ হতে পারে।

Burnout-এ Brain কেন “Slow” হয়ে যায়?

দীর্ঘদিন কাজ, দায়িত্ব, family pressure, emotional stress এবং বিশ্রামের অভাব চলতে থাকলে nervous system recovery-এর সুযোগ কম পায়।

তখন দেখা দিতে পারে—

কাজ করতে ইচ্ছে না করা

একই ভুল বারবার হওয়া

ছোট কাজেও overwhelmed লাগা

creativity কমে যাওয়া

concentration ভেঙে যাওয়া

Brain Fog

এখানে শুধু “আরও motivation দরকার” নয়—অনেক সময় দরকার recovery।

Brain Fog-এর শারীরিক কারণও থাকতে পারে

সব Brain Fog-কে psychological problem ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

কিছু সম্ভাব্য শারীরিক কারণ হতে পারে—

Anemia বা iron deficiency

Vitamin B12-এর ঘাটতি

Thyroid-এর সমস্যা

Blood sugar-এর ওঠানামা

dehydration

দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা

কিছু medication-এর side effect

hormonal changes

sleep apnea

কিছু viral illness-এর পরবর্তী সময়

তাই দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে medical evaluation গুরুত্বপূর্ণ।

Brain Fog কমাতে কী করতে পারেন?

এক সময়ে একটি কাজ করুন

Multitasking কমিয়ে single-tasking করুন।

Brain Dump করুন

মাথায় সব কাজ ধরে রাখার বদলে লিখে ফেলুন।

Sleep routine ঠিক করুন

প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমানো ও ওঠার চেষ্টা করুন।

Regular movement রাখুন

হাঁটা বা শরীরচর্চা cognitive alertness ও mood-এর জন্য উপকারী হতে পারে।

পর্যাপ্ত জল ও পুষ্টিকর খাবার নিন

Screen overload কমান

একটার পর একটা short video, notification এবং information-switching attention-কে fragmented করতে পারে।

কাজকে ছোট অংশে ভাগ করুন

“সব করতে হবে”—এর বদলে

“পরবর্তী ১৫ মিনিটে শুধু এটুকু করব।”

Mental rest নিন

শুধু শুয়ে থাকা নয়—কিছু সময় notification, conversation এবং কাজের চাপ থেকেও বিরতি দিন।

একটি সহজ Psychological Exercise

যখন মনে হবে মাথা কাজ করছে না, তখন নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—

আমি কি সত্যিই ভুলে যাচ্ছি, নাকি আমি এতটাই stressed যে মনোযোগই ঠিকমতো দিতে পারছি না? এই দুটি বিষয় এক নয়।

কখন গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

Brain Fog যদি—

কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে

ক্রমশ বাড়তে থাকে

দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করে

সঙ্গে খুব বেশি দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অন্য শারীরিক উপসর্গ থাকে

হঠাৎ confusion, কথা জড়িয়ে যাওয়া, শরীরের একপাশ দুর্বল হওয়া বা অস্বাভাবিক neurological symptom দেখা দেয়

তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মনে রাখবেন—

Brain Fog মানেই আপনার মস্তিষ্ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—এমন নয়। অনেক সময় আপনার brain বলছে—

“আমার আরও চাপ নয়, একটু recovery দরকার।”


২৯


উন্নত বিশ্বসহ সারাবিশ্বে বয়স্ক ব্যক্তিরা প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ১০টি ওষুধ সেবন করে থাকেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না, একাধিক রোগের জন্য একসাথে এতগুলো ওষুধ সেবন করা—যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় 'পলিফার্মেসি' (Polypharmacy) বলা হয়—রোগীকে সুস্থ করার বদলে অকাল মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি এবং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় এটি একটি ভয়াবহ কিন্তু চরমভাবে উপেক্ষিত সংকট।

### পলিফার্মেসি কী এবং কেন এটি ঘটছে?

সাধারণত একসাথে ৫টি বা তার বেশি ওষুধ সেবন করাকে পলিফার্মেসি বলা হয়। সব ওষুধ ক্ষতিকর না হলেও অপ্রয়োজনীয় বা অতিরিক্ত ওষুধের বোঝাই এই সংকটের মূল কারণ। এর পেছনে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কিছু কাঠামোগত ত্রুটি দায়ী:

১. নির্দেশিকার সীমাবদ্ধতা: চিকিৎসাবিজ্ঞানের গাইডলাইনগুলো মূলত একটি নির্দিষ্ট রোগের জন্য তৈরি হয়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হার্টের সমস্যায় ভোগা একজন রোগীকে ৫-৬টি গাইডলাইন মেনে ১৫টি ওষুধ দেওয়া হতে পারে, যার সম্মিলিত প্রভাব কেউ বিবেচনা করেন না।

২. বিশেষজ্ঞদের খণ্ডিত চিকিৎসা: হার্ট, ডায়াবেটিস বা কিডনির জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থাকেন। প্রত্যেকে নিজ নিজ রোগের ওষুধ দেন, কিন্তু সামগ্রিক ওষুধের তালিকাটি কেউ মিলিয়ে দেখেন না।

৩. ওষুধের দুষ্টচক্র (Prescribing cascade): একটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে নতুন রোগ ভেবে আরেকটি ওষুধ দেওয়া হয়। যেমন, ব্যথার ওষুধের কারণে প্রেশার বাড়লে প্রেশারের ওষুধ দেওয়া হয়, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পা ফুললে আবার ডাইইউরেটিক বা পানির ট্যাবলেট দেওয়া হয়।

৪. বয়স্ক শরীরে ওষুধের ভিন্ন প্রভাব: বয়স বাড়ার সাথে সাথে লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায়। ফলে সাধারণ ডোজের ওষুধও বয়স্কদের শরীরে বিষাক্ত মাত্রায় জমে থাকে।


### শরীরে অতিরিক্ত ওষুধের ভয়াবহ পরিণতি

১. হাসপাতালে ভর্তি: ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে বয়স্কদের হাসপাতালে ভর্তির হার প্রায় ১০-৩০%, যার বেশিরভাগই প্রতিরোধযোগ্য।

২. মারাত্মক ড্রাগ ইন্টারঅ্যাকশন: একসাথে একাধিক ওষুধ খেলে লিভারে এনজাইমের জটিলতা তৈরি হয়। রক্তচাপের ওষুধ, ব্যথার ওষুধ (NSAID) এবং ডাইইউরেটিক—এই তিনটি একসাথে খেলে কিডনি পুরোপুরি বিকল হতে পারে (যাকে Triple Whammy বলা হয়)।

৩. স্মৃতিভ্রম ও ডিমেনশিয়া: ঘুমের ওষুধ (বেনজোডায়াজেপাইনস, জেড-ড্রাগস), অ্যালার্জির ওষুধ বা অ্যান্টিকোলিনার্জিক জাতীয় ওষুধের দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৪. পড়ে যাওয়া ও হাড় ভাঙা: ঘুমের বা প্রেশারের ওষুধের কারণে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে হিপ ফ্র্যাকচার বা মৃত্যুর ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ে। একাধিক ওষুধ এই ঝুঁকিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৫. পুষ্টিহীনতা ও ক্ষুধামন্দা: ওষুধ শরীর থেকে অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি শুষে নেয়। যেমন: স্ট্যাটিন (CoQ10 কমায়), মেটফরমিন (B12 কমায়), গ্যাস্ট্রিকের পিপিআই বা পানির ট্যাবলেট (ম্যাগনেসিয়াম, জিংক কমায়)। ফলে তীব্র ক্লান্তি ও পেশীক্ষয় দেখা দেয়।


### ক্ষতিকর ওষুধ চিহ্নিত করার উপায়

বয়স্কদের জন্য অনুপযুক্ত ওষুধ চিহ্নিত করতে চিকিৎসকরা 'বিয়ার্স ক্রাইটেরিয়া' (Beers Criteria) এবং 'স্টপ/স্টার্ট' (STOP/START) প্রোটোকল ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায় কোন ওষুধগুলো বয়স্কদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোনগুলোর 'অ্যান্টিকোলিনার্জিক বোঝা' (মস্তিষ্কের ক্ষতি করার ক্ষমতা) বেশি।


### সমাধান: 'ডিপ্রেসক্রাইবিং' বা ওষুধ কমানোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি**

ক্ষতিকর বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়মতান্ত্রিকভাবে কমিয়ে আনা বা বন্ধ করাকে 'ডিপ্রেসক্রাইবিং' বলে।

* ধীরে ধীরে কমানো (Tapering): ঘুমের ওষুধ, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট বা স্টেরয়েড হঠাৎ বন্ধ করা মারাত্মক বিপজ্জনক (যেমন: খিঁচুনি বা উইথড্রয়াল হতে পারে)। চিকিৎসকের পরামর্শে কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে এগুলো ধীরে ধীরে কমাতে হয়।

* গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ (PPI): গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করলে উল্টো এসিডিটি বেড়ে যায় (এসিড রিবাউন্ড)। তাই এটিও ধাপে ধাপে কমাতে হয়।

* প্রতিরোধমূলক ওষুধ: খুব বয়স্ক বা আয়ুষ্কাল কম থাকা দুর্বল রোগীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমানোর ওষুধ (যেমন- স্ট্যাটিন বা অতিরিক্ত প্রেশার কমানোর ওষুধ) উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতি করে। এগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।


### রোগী ও পরিবারের করণীয়

* ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টে রোগীর সেবন করা সব ধরনের ওষুধের (ভিটামিন ও হারবালসহ) তালিকা নিয়ে যান।

* চিকিৎসককে স্পষ্ট জিজ্ঞেস করুন, "আমার কি এই সবগুলো ওষুধ এখনও প্রয়োজন আছে? আমার বর্তমান উপসর্গগুলো কি কোনো ওষুধের কারণে হতে পারে? এগুলোর কোনো নিরাপদ বিকল্প আছে কি?"

* প্রয়োজনে একজন 'ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট' বা 'জেরিয়াট্রিশিয়ান' (বার্ধক্যবিদ্যা বিশেষজ্ঞ)-এর মাধ্যমে পুরো ওষুধের তালিকা পর্যালোচনা (Medication Review) করিয়ে নিন।

* ওষুধের কারণে হওয়া পুষ্টির ঘাটতি পূরণে চিকিৎসকের পরামর্শে বি১২, ম্যাগনেসিয়াম, ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট এবং প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন।

প্রমাণ-ভিত্তিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা হলো এই পলিফার্মেসি। একটি নতুন ওষুধ শুরু করার মতোই অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বন্ধ করাও চিকিৎসার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ওষুধের একটি সঠিক পর্যালোচনা একজন বয়স্ক মানুষকে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারে, তার স্মৃতিশক্তি ফিরিয়ে আনতে পারে এবং ওষুধের বোঝায় হারিয়ে যাওয়া জীবনযাত্রার মান বহুগুণ উন্নত করতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মাঝে মাঝে সবচেয়ে সেরা প্রেসক্রিপশন হলো সেই ওষুধটি, যা সযত্নে বন্ধ করে দেওয়া হয়।


পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত গাছের সন্ধান পাওয়া গেছে অস্ট্রেলিয়ায়, যার নাম 'Gimpy gimpy'। এই গাছটি ‘আত্মঘাতী গাছ’ নামেও পরিচিত। এটির স্পর্শে শরীরে অসহ্য ব্যথা এবং ঝলসে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়। ব্যথার তীব্রতা এত বেশি যে, অনেক সময় মানুষ অসহনীয় যন্ত্রণার কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। এর বিষ শরীরে ৩-৬ মাস পর্যন্ত থাকে। তাই এটিকে ‘দ্য সুইসাইড প্ল্যান্ট’ও বলা হয়। 


৩০


চোখে দেখা বিজ্ঞান | ভিড়ের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি একা মানুষটা

রাস্তায় একজন মানুষ পড়ে গেছে, বা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। চারপাশে চল্লিশ-পঞ্চাশ জন জড়ো হয়ে গেছে। কেউ ভিডিও করছে, কেউ ফিসফিস করছে "কী হলো রে", কিন্তু এগিয়ে গিয়ে সাহায্য করছে কজন?

অথচ যদি রাস্তায় শুধু একজন মানুষ থাকত, সেই একজনই হয়তো দৌড়ে গিয়ে সাহায্য করত।

এই অদ্ভুত ব্যাপারটা — মানুষ বেশি থাকলে সাহায্য কমে যাওয়া — নিয়ে মনোবিজ্ঞানে একটা বিখ্যাত গবেষণা আছে। ১৯৬৪ সালে আমেরিকায় কিটি জেনোভিস নামের এক নারীকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করা হয়, আর জানা যায় আশেপাশের অনেকেই ঘটনাটা টের পেয়েছিলেন, কিন্তু তেমন কেউ এগিয়ে আসেননি। এই ঘটনা দুই মনোবিজ্ঞানী জন ডার্লি আর বিব লাটানেকে ভাবায়।

তারা ১৯৬৮ সালে পরীক্ষা করে দেখান, মানুষ একা থাকলে জরুরি অবস্থায় সাহায্য করার সম্ভাবনা অনেক বেশি, কিন্তু আশেপাশে যত বেশি মানুষ থাকে, সাহায্য করার সম্ভাবনা তত কমে যায়। এর একটা কারণ, যেটাকে তারা বলেন "diffusion of responsibility" বা দায়িত্বের বিভাজন — প্রত্যেকে মনে করে "আমি না করলে অন্য কেউ তো করবে," ফলে শেষমেশ কেউই করে না। দায়িত্বটা এতজনের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় যে কারো কাঁধেই আর সেটা যথেষ্ট ভারী লাগে না।

আরেকটা কারণ, আশেপাশের মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে নিজের প্রতিক্রিয়া ঠিক করা — কেউ যদি না নড়ে, তাহলে মনে হয় "হয়তো এটা তেমন জরুরি কিছু না," যদিও ভেতরে ভেতরে সবাই উদ্বিগ্ন।

এই তত্ত্বটা আজকের যুগে আরও প্রাসঙ্গিক, কারণ এখন হাতে হাতে ফোন আছে। ভিড় শুধু "কেউ একজন সাহায্য করবে" ভাবে না, এখন ভাবে "কেউ একজন ভিডিও করবে, সেটাই যথেষ্ট।" মোবাইল ক্যামেরা দায়িত্ব বিভাজনের এই পুরনো প্রবণতাটাকে যেন আরও সহজ একটা অজুহাত দিয়ে দিয়েছে — "আমি তো ভিডিওটা তুলে রাখলাম, প্রমাণ থাকবে।"

তাহলে করণীয় কী? গবেষণা বলছে, ভিড়ের মধ্যে সাহায্য দরকার হলে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো একজন নির্দিষ্ট মানুষকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া — "আপনি, নীল শার্ট পরা, আপনি অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন।" এতে দায়িত্বটা আর ভাগ হয়ে থাকে না, একজনের ওপর নির্দিষ্টভাবে বর্তায়।

পরের বার ভিড়ের মধ্যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি দেখলে, নিজেকে প্রশ্ন করা যায় — আমি কি সাহায্য না করার একটা যুক্তি খুঁজছি, নাকি সত্যিই সাহায্য করার চেষ্টা করছি?

তথ্যসূত্র: Darley, J. M., & Latané, B. (1968). Bystander intervention in emergencies: Diffusion of responsibility. Journal of Personality and Social Psychology, 8(4), 377–383.

@ বিজ্ঞানকথা



31



ঘুম থেকে ওঠার পর, প্রথমেই আপনার এক গ্লাস পানি পান করা উচিত। ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস বা ঘামের মাধ্যমে আমাদের শরীর পানি হারায়। একে বলা হয় INSENSIBLE WATER LOSS (অদৃশ্য পানি হ্রাস)। তাই ২ গ্লাস পানি পান করুন:

• আপনার মস্তিষ্ক ও ত্বককে পুনরায় আর্দ্র করতে।

• আপনার পরিপাকতন্ত্রকে সক্রিয় করতে।

এছাড়াও, খাওয়ার ১ ঘণ্টা আগে বা পরে পানি পান করুন। খাওয়ার কাছাকাছি সময়ে পানি পান করলে:

• পাকস্থলীর এসিড নিঃসরণ ধীর হয়ে যায়।

• হজমকারী এনজাইমের নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটে।

• মস্তিষ্ক ও পরিপাকতন্ত্রের ভারসাম্যপূর্ণ সংযোগ বিঘ্নিত হয়।

• বমি বমি ভাব, বমি এবং অরুচি তৈরি হতে পারে।

মনে রাখবেন, কম সোডিয়াম বা হাইপোনাট্রেমিয়ার (Hyponatremia) কারণে হতে পারে:

* পেশিতে টান ধরা বা খিঁচুনি।

* বমি বমি ভাব এবং অরুচি।

* বুক জ্বালাপোড়া (বিষয়টি বেশ আকর্ষণীয়, তাই না?)।

* মাথাব্যথা এবং ব্রেইন ইডিমা (মস্তিষ্কে পানি জমে ফুলে যাওয়া)।

এর অর্থ হলো,

• ব্যায়ামের আগে বা পরে স্যালাইন পানি (এক চিমটি লবণযুক্ত পানি) পান করুন।

• প্রচুর ঘামার পর এক চিমটি লবণ মেশানো পানি পান করুন।

নিয়মিত আপনার খাওয়ার পানিতে এক চিমটি প্রাকৃতিক লবণ যোগ করুন।

**বি:দ্র:** আপনি যদি এখনো মনে করেন লবণ উচ্চ রক্তচাপের কারণ, তবে আপনি এখনো পুরানো ধারণার দাস হয়ে আছেন। এই মানসিক বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসুন।

@ Health Tips Pro



32


পারফেক্ট হতে হবে ভেবে শুরুই না করা আমাদের সবচেয়ে বড় জড়তা। ছোট থেকে শুরু করুন — একটা প্যারাগ্রাফ, ৫ মিনিট স্ট্রেচিং। ব্যস, এতটুকুই যথেষ্ট।

ঝুঁকি মানে ভয় না, ঝুঁকি মানে সুযোগ। স্টিভ জবস আর ইলন মাস্ক যদি নিরাপদ পথ বেছে নিতেন, আজ Apple বা Tesla থাকতোই না।

শুধু "To-Do List" না, একটা "Don't-Do List"-ও বানান। কোন কাজ এড়িয়ে চলবেন — এটা জানাটাও সমান জরুরি।

সব কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ না। Front Burner vs Back Burner — বুঝে নিন কোনটা এখনই দরকার, কোনটা পরে করলেও চলবে।

শরীরের নিজস্ব এনার্জি সাইকেল (Ultradian Rhythm) বুঝে কাজ সাজান। সবচেয়ে কঠিন কাজটা করুন যখন এনার্জি সবচেয়ে বেশি।

জীবন বদলাতে বিশাল পরিকল্পনার দরকার নেই। শুধু আজকেই একটা ছোট্ট পদক্ষেপ নিন।

আপনার জন্য কোনটা সবচেয়ে বেশি রিলেট করলো? কমেন্টে জানান

======= সামান্য ব্যাখ্যা সহ : 

১. পারফেকশনিজম ও জড়তা কাটানো কোনো কাজ শুরু করতে না পারার মূল কারণ হলো নিখুঁত হওয়ার চাপ। এর সমাধান হলো নিজের মানদণ্ড সাময়িকভাবে নামিয়ে ছোট থেকে শুরু করা — যেমন পুরো রিপোর্ট নয়, শুধু প্রথম প্যারাগ্রাফ লেখা, বা পুরো ওয়ার্কআউট নয়, মাত্র ৫ মিনিট স্ট্রেচিং।

২. অ্যাকশন আগে, মোটিভেশন পরে সাধারণ ধারণার উল্টো — মোটিভেশনের অপেক্ষায় না থেকে আগে ছোট একটা পদক্ষেপ নিলে মোটিভেশন নিজে থেকেই তৈরি হয়। কাজ শুরু করলে আত্মসন্দেহ কমে, নিজের সম্পর্কে নতুন ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়, এবং এটা একটা চক্রের মতো কাজ করে — ছোট ফলাফল → আত্মবিশ্বাস → আরও অনুপ্রেরণা।

৩. ঝুঁকি নেওয়া ঝুঁকিকে ভয় হিসেবে না দেখে সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। বুঝে-শুনে হিসেব করে ঝুঁকি নিলে ব্যর্থতার সম্ভাবনা কমে ও মানসিক দৃঢ়তা বাড়ে। স্টিভ জবস ও ইলন মাস্কের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে যে বড় সাফল্যের পেছনে সবসময় ঝুঁকি থাকে।

৪. "ডোন্ট ডু" লিস্ট শুধু টু-ডু লিস্ট যথেষ্ট নয় — কোন কাজগুলো এড়িয়ে চলতে হবে (যেমন সকালে অহেতুক সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং, অপ্রয়োজনীয় মিটিং) তার একটা তালিকা রাখলে মনোযোগ ও প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে। এটি পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবন — দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর।

এই অংশে আরও তিনটি নতুন পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে:

৫. ব্যাক বার্নার লিস্ট কাজগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা — ফ্রন্ট বার্নার (সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকারের, তাৎক্ষণিক মনোযোগ দরকার এমন কাজ) আর ব্যাক বার্নার (গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনই মনোযোগ দরকার নেই এমন কাজ)। রান্নার চুলার উপমা দিয়ে বোঝানো হয়েছে — যে পাত্রটা বারবার নাড়তে হয় সেটাই ফ্রন্ট বার্নার, বাকিগুলো ব্যাক বার্নার। এতে মাল্টিটাস্কিং কমে, সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়, আর সময়ের সাথে অগ্রাধিকার পাল্টালে লিস্টটা নিয়মিত রিভিউ করতে হয় (সাপ্তাহিক/মাসিক)।

৬. সুপারস্ট্রাকচার ডিসিশন মডেল ওভার-অ্যানালাইসিস আর ডিসিশন প্যারালাইসিস এড়াতে আগে থেকে ঠিক করা একটা সিদ্ধান্ত-নেওয়ার সিস্টেম তৈরি করা। তিনটি ধাপ:

ছোট, পুনরাবৃত্ত সিদ্ধান্তগুলো অটোমেট করে ফেলা (যেমন জাকারবার্গের একই পোশাক পরা, নির্দিষ্ট দিনে জিমে যাওয়া নির্ধারণ করা)

বড় সিদ্ধান্তের জন্য আগে থেকে কিছু মানদণ্ড/প্রশ্ন ঠিক করে রাখা (এটা কি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের সাথে মেলে? সময়-শক্তি সঠিক ব্যবহার হবে? সবচেয়ে খারাপ কী হতে পারে?)

আগের সিদ্ধান্ত থেকে শেখা — ভুল বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে এড়ানো

এতে মানসিক স্বচ্ছতা বাড়ে, স্ট্রেস কমে, আর ছোটখাট বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ফোকাস করা যায়।

৭. আল্ট্রাডিয়ান রিদম (শক্তির স্বাভাবিক চক্র) শরীর ৯০-১২০ মিনিটের চক্রে কাজ করে — এনার্জি বাড়ে-কমে। এই ছন্দ বুঝে কাজের পরিকল্পনা করলে প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে:

নিজের এনার্জি প্যাটার্ন এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করে সবচেয়ে ফোকাসড সময় চিহ্নিত করা

সেই পিক টাইমে সবচেয়ে কঠিন/গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা (যেমন লেখালেখি, স্ট্র্যাটেজি)

এনার্জি কম থাকা সময়ে হালকা কাজ করা (ইমেইল, ফোন কল, মিটিং)

মাঝে মাঝে ছোট বিরতি (২০-৩০ মিনিট) নিয়ে বার্নআউট এড়ানো

এটা টাইম ম্যানেজমেন্ট নয়, বরং এনার্জি ম্যানেজমেন্ট — কম পরিশ্রমে বেশি ফলাফল পাওয়ার কৌশল।

@ আব্দুল্লাহ আজাদ 



33


Shitsuke' — জাপানি শৃঙ্খলার দর্শন: বকা না দিয়ে শিশুকে নিয়মানুবর্তী করার কৌশল।

......

সন্ধ্যা ৬টা। আপনি অফিস বা রান্নাঘরের কাজ শেষে প্রচণ্ড ক্লান্তি নিয়ে ড্রয়িংরুমে এলেন। দেখলেন পুরো ঘরজুড়ে বাচ্চার খেলনা ছড়ানো। আপনি শান্ত গলায় বললেন, "বাবা, খেলনাগুলো একটু গুছিয়ে রাখো।" বাচ্চা কোনো পাত্তাই দিল না। দ্বিতীয়বার বলার পরও সে যখন টিভি দেখা চালিয়ে গেল, তখন আপনার মাথার রগ দপদপ করে উঠল। আপনি চিৎকার করে উঠলেন, "তোকে না হাজার বার বলেছি খেলার পর জিনিস গুছিয়ে রাখতে? আর একদিন যদি খেলনা ফ্লোরে দেখি, সব ডাস্টবিনে ফেলে দেব!" ধমক খেয়ে বাচ্চাটা ভয় পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে খেলনা গোছাতে শুরু করলো।

আপনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, "যাক, কাজ তো হলো! বাচ্চাদের সাথে চিৎকার না করলে এরা কথা শুনতেই চায় না।" কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবেছেন, জাপানের স্কুলগুলোতে বাচ্চারা কীভাবে সম্পূর্ণ একা নিজেদের ক্লাসরুম এবং টয়লেট পরিষ্কার করে? সাবওয়েতে বা রেস্টুরেন্টে জাপানি বাচ্চারা কীভাবে এত শান্ত হয়ে বসে থাকে? তাদের বাবা-মা তো তাদের ওপর জনসমক্ষে চিৎকার করেন না!

এর রহস্য লুকিয়ে আছে জাপানিদের প্যারেন্টিংয়ের একটি বিশেষ দর্শনে, যাকে বলা হয় 'শিতসুকে' (Shitsuke)। কিডোরা স্মার্ট প্যারেন্টিং-এর আজকের এই ইন-ডেপ্থ এবং মনস্তাত্ত্বিক আর্টিকেলে আমরা জানবো, জাপানিদের এই অসাধারণ 'শিতসুকে' দর্শন আসলে কী, এটি কীভাবে বাচ্চার ব্রেনে কাজ করে এবং বকা না দিয়েও সন্তানকে কীভাবে একজন আত্ম-নিয়ন্ত্রিত (Self-disciplined) মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন।

বিজ্ঞান কী বলছে: 'ইন্টারনাল মোটিভেশন' এবং ব্রেনের মিরর নিউরন

'শিতসুকে' (Shitsuke) শব্দটির জাপানি অর্থ হলো 'বীজ বপন করা' বা 'অভ্যস্ত করা'। এটি শাস্তি দেওয়া নয়, বরং ভালো অভ্যাসের বীজ বুনে দেওয়া। আধুনিক চাইল্ড নিউরোসায়েন্স ঠিক এই কথাটিই বলে:

ব্রেনের মিরর নিউরন (Mirror Neurons):

জাপানিরা বিশ্বাস করে বাচ্চারা কথা শুনে শেখে না, তারা দেখে শেখে। বাচ্চার ব্রেনে 'মিরর নিউরন' থাকে, যা বাবা-মায়ের কাজগুলোকে স্ক্যান করে কপি বা নকল করতে সাহায্য করে। আপনি যখন চিৎকার করেন, বাচ্চার ব্রেনও চিৎকার করতে শেখে। আর আপনি যখন শান্তভাবে কাজ করেন, তার ব্রেনও শান্ত থাকতে শেখে।

ইন্টারনাল বনাম এক্সটারনাল মোটিভেশন:

আপনি যখন ধমক দিয়ে খেলনা গোছাতে বলেন, তখন বাচ্চার ব্রেনের 'অ্যামিগডালা' (ভয়ের কেন্দ্র) সক্রিয় হয়। সে ভয়ে কাজ করে (External Motivation)। কিন্তু আপনি না থাকলে সে আর ওই কাজ করবে না। 'শিতসুকে' বাচ্চার 'প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স' (যুক্তি বোঝার অংশ)-কে ব্যবহার করে তাকে ভেতর থেকে উপলব্ধি করতে শেখায় (Internal Motivation) যে কাজটি কেন করা উচিত।

প্যারাডাইম শিফট: মিথ বনাম বাস্তবতার চরম সত্য

মিথ: বকা বা মারধর ছাড়া বাচ্চাদের কন্ট্রোল বা শাসন করা সম্ভব নয়।

বাস্তবতা: বকা দিলে সাময়িকভাবে কাজ হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাচ্চার ব্রেন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং সে মিথ্যা বলতে শেখে। 'মডেলিং' বা নিজে করে দেখানোর মাধ্যমে বাচ্চাকে সবচেয়ে ভালো শাসন করা যায়।

মিথ: শৃঙ্খলার অর্থ হলো বাবা-মায়ের সব কমান্ড বা নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা।

বাস্তবতা: শৃঙ্খলার আসল অর্থ অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং 'স্ব-নিয়ন্ত্রণ' বা সেলফ-ডিসিপ্লিন শেখা। বাচ্চা যেন নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে পারে এবং বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেটাই শৃঙ্খলার আসল উদ্দেশ্য।

মিথ: বারবার বলে বলে কান ঝালাপালা না করলে বাচ্চারা নিয়ম শেখে না।

বাস্তবতা: বারবার লেকচার দিলে বাচ্চার ব্রেনে 'হ্যাবিচুয়েশন' (Habituation) বা অভ্যস্ততা তৈরি হয়। তখন বাচ্চা বাবা-মায়ের কথাগুলোকে ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ হিসেবে ইগনোর বা ফিল্টার আউট করতে শেখে।

অ্যাকশন ব্লুপ্রিন্ট: বকা না দিয়ে 'শিতসুকে' চর্চার স্মার্ট গাইড

চিৎকার করে শাসন করার এই বিষাক্ত চক্র থেকে বেরিয়ে এসে বাচ্চার মধ্যে স্ব-নিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে আজ থেকেই এই ব্লুপ্রিন্টটি অনুসরণ করুন:

ধাপ ১: 'শো, ডোন্ট টেল' (Show, Don't Tell)

কী করবেন: মুখ দিয়ে নির্দেশ না দিয়ে নিজের কাজের মাধ্যমে বাচ্চার সামনে উদাহরণ তৈরি করুন।

কীভাবে করবেন: বাচ্চাকে "খেলনা গুছিয়ে রাখো" বলে চিৎকার করার বদলে, নিজে খেলনার বাক্সের কাছে বসে শান্ত গলায় বলুন, "চলো, আমরা দুজনে মিলে লাল খেলনাগুলো আগে বক্সে রাখি, তারপর নীলগুলো রাখবো।" মিরর নিউরনের প্রভাবে বাচ্চাও আপনার সাথে নিজে থেকেই হাত মেলাবে।

ধাপ ২: নিয়মের পেছনের 'কেন' বা লজিক বুঝিয়ে বলুন

কী করবেন: শুধু "না" না বলে, কেন না বলছেন তার কারণ বাচ্চার লজিক্যাল ব্রেন বা প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সকে বুঝিয়ে দিন।

কীভাবে করবেন: "দেয়ালে রং করবি না বলছি!"—এমন ধমক না দিয়ে বাচ্চার চোখের লেভেলে বসে বলুন, "দেয়ালে রং করলে তো দেয়ালটা নষ্ট হয়ে যায়, দেখতে খারাপ লাগে। তোমার রং করার জন্য এই যে সুন্দর খাতা, তুমি চাইলে এখানে ইচ্ছামতো আঁকতে পারো।"

ধাপ ৩: 'রুটিন' এবং 'কন্সিস্টেন্সি' বজায় রাখুন

কী করবেন: জাপানি শিশুদের মতো শৃঙ্খলার বীজ বুনতে একটি নির্দিষ্ট রুটিনের চর্চা করুন, যা প্রতিদিন একই রকম থাকবে।

কীভাবে করবেন: ঘুমানো, খাওয়া বা খেলার জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক রাখুন। আপনি আজ মুড ভালো থাকলে খেলনা ফ্লোরে পড়ে থাকলেও কিছু বললেন না, আবার কাল মুড খারাপ থাকলে প্রচণ্ড বকা দিলেন—এমনটা করবেন না। প্রতিদিন একই নিয়ম (Consistency) বাচ্চার ব্রেনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শৃঙ্খলার সাথে অভ্যস্ত করে তোলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: 'কড়া শাসন' বনাম 'আদর দিয়ে মাথায় তোলা'

আমাদের দেশের প্যারেন্টিং সাধারণত দুটি এক্সট্রিম বা চরম পন্থায় বিভক্ত। একদল বাবা-মা আছেন যারা মনে করেন, "বাপের এক ধমকেই ছেলে সোজা হয়ে থাকবে, এটাই আসল শাসন!" তারা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেন। অন্যদিকে আরেকদল বাবা-মা আছেন যারা বাচ্চার অতিরিক্ত মায়ায় পড়ে তাকে কোনো কাজই করতে দেন না। বাচ্চার প্লেটটা পর্যন্ত নিজে হাতে ধুয়ে দেন এবং বলেন, "বড় হলে ঠিকই শিখবে।"

জাপানিদের 'শিতসুকে' ঠিক এই দুই চরমপন্থার মাঝখানের একটি চমৎকার ব্যালেন্স। তারা বাচ্চাকে মারে না বা ধমক দেয় না, আবার বাচ্চার কাজগুলো নিজেরাও করে দেয় না। তারা শুধু বাচ্চার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে গাইড করে। আমাদের সমাজের এই 'ভয় দেখিয়ে শাসন করা' অথবা 'সব কাজ নিজে করে দেওয়ার' মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে, আমরা কখনোই আমাদের সন্তানদের স্বাধীন এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়তে পারবো না।

প্রিয় বাবা এবং মা,

শাসন করা বা ডিসিপ্লিন শেখানো মানে বাচ্চাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শাস্তি দেওয়া নয়। 'ডিসিপ্লিন' শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ 'ডিসিপ্লিনা' থেকে, যার অর্থ হলো শিক্ষা দেওয়া বা গাইড করা। আপনার বাচ্চা কোনো রোবট নয় যে আপনি সুইচ চাপলেই সে সব কাজ নিখুঁতভাবে করে ফেলবে। সে শিখছে, সে ভুল করছে এবং এই ভুল করার অধিকার তার আছে। আপনি যখন সারাদিনের ক্লান্তির পর তার ওপর চিৎকার করে ফেলেন, তখন নিজেকে দোষারোপ করে হতাশ হবেন না। আমরা সবাই মানুষ। কিন্তু পরের দিন থেকে তাকে আর ধমক না দিয়ে, তার হাতটা ধরে তাকে কাজটা শিখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন। বিশ্বাস করুন, আপনার বকার আওয়াজ তার ব্রেনে যতটা না প্রভাব ফেলবে, আপনার এই শান্ত গাইডেন্স তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে তার সারাজীবনের সঙ্গী হবে। আপনার ভালোবাসাময় এই ছোট ছোট শিক্ষাই তাকে একদিন একজন দারুণ শৃঙ্খলাপরায়ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে!

@ কিডোরা স্মার্ট কমিউনিটি:


34


উত্তর ইতালির ট্রেন্টো শহরে প্রতি বছর এক অদ্ভুত ও মজার শাস্তির মুখোমুখি হন স্থানীয় প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিত্ব।

'লা তোঙ্কা' (La Tonca) নামের এই ঐতিহাসিক প্রথাটি উদযাপিত হয় শহরের বিখ্যাত 'ফেস্তে ভিজিলিয়ানে' উৎসবের সময়।

একটি প্রতীকী "শাস্তির আদালত" এমন একজন ব্যক্তিকে বেছে নেয়, যিনি বিগত বছরে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত বা হাস্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

আর তাদের শাস্তি?

আদিগে নদীতে খাঁচাসহ ঝুলিয়ে দেওয়া!

তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা গুঞ্জনের বিপরীতে, কোনো আসল রাজনীতিবিদ বা সেলিব্রিটিকে সত্যিই নদীর ঠান্ডা জলে চুবিয়ে দেওয়া হয় না। আধুনিক এই আয়োজনে ব্যঙ্গাত্মক ও উপভোগ্য পরিবেশনা হিসেবে একজন ডামি বা প্রতিনিধি ব্যবহার করা হয়।

এই প্রথার শেকড় লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার অতীতে, যখন অপরাধীদের খাঁচায় বন্দি করে নদীতে চুবানোর মতো বাস্তব ও কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো।

আজকের দিনে কাউকেই আর শারীরিকভাবে শাস্তি দেওয়া হয় না।

তবুও, ট্রেন্টোর মানুষ মজার ছলে হলেও ভুল সিদ্ধান্তগুলোকে ঠিকই সবার চোখের সামনে মনে করিয়ে দেয়!




35




ইতালির ভেনিস নগরী বৃষ্টির পানির উপর নির্ভরশীল ছিল। ভেনিসকে ঘিরে যে উপহ্রদটি আছে তার পানি লবণাক্ত। তাই ভেনিসের প্রাচীন অধিবাসীরা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের একটি সিস্টেম বানায়। বৃষ্টি হলে এটাতে বিশেষভাবে তৈরী পাথরের পৃষ্ঠ দিয়ে চুইয়ে পানি পড়ত। তারপর তা বালির একটি স্তরের মাধ্যমে ছাঁকা হয়ে কূপে জমা হত।

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। এটা নতুন কিছু নয়।

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করে রাখাকে বর্তমানে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং বলা হয়।

বিশ্বব্যাপী রেইনওয়াটার হারভেস্টিংয়ের জনপ্রিয়তা এখন বাড়ছে। থাইল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ইসরায়েল এবং আফ্রিকার কিছু দেশ রেইনওয়াটার হারভেস্টিং প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে।

রেইন হারভেস্টিং দ্বারা বিশাল পরিমাণে পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা সম্ভব। সিস্টেমটি সঠিকভাবে পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করলে দীর্ঘসময় ধরে সংরক্ষিত পানি ব্যবহারোপযোগী রাখা যায়।

থাইল্যান্ডে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেইন হারভেস্টিং করা হয়। সেদেশের সরকার ৮০’র দশক থেকেই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করতে উদ্যোগ নিয়েছিল। তামিলনাড়ুতে ২০০১ সালে প্রতিটি বিল্ডিংয়ে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেখানকার সব পল্লি অঞ্চলে রেইন হারভেস্টিং কাজে লাগানো হয়। সমগ্র তামিলনাড়ুতে পোস্টারিংয়ের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংগ্রহে মানুষকে সচেতন করা হয়।

বৃষ্টির পানি হলো আল্লাহর নিয়ামত যা কারেন্ট, জ্বালানি, বিল ইত্যাদি খরচ ছাড়াই পাওয়া যায়। সঠিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা গেলে এটিই সবচেয়ে নিরাপদ বিশুদ্ধ পানির উৎস। খাওয়া, ধোয়ামোছা, রান্নাবান্না, গোসল, গাছপালা ও পশুপাখিকে সরবরাহ ইত্যাদি কাজে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করা যায়। 

বাংলাদেশেও রেইন হারভেস্টিং অত্যন্ত উপযোগী ও কার্যকর। বাংলাদেশের অনেক শহুরে এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। রেইন হারভেস্টিং এর মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হলে ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমানো যাবে।

বর্তমানে সিঙ্গাপুর, টোকিও, সিডনি এইসব শহরে নতুন ভবন নির্মাণ করলে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম ইন্সটল করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

বাড়িওয়ালারা রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের জন্য যে টাকা ইনভেস্ট করবে তা দুই-তিন বছরের মধ্যে উঠে আসবে। এককালীন খরচের মাধ্যমে একটি রেইন হারভেস্টিং প্ল্যান্ট স্থাপন করলে বছরের পর বছর এর সুফল ভোগ করা যায়।

একটি সাধারণ বাড়ির জন্য রেইন হারভেস্টিং সিস্টেম তৈরি করলে কী পরিমাণ পানি রিজার্ভ করা যাবে এবং সেটি কতদিন চলবে তা নির্ভর করে বাড়ির ছাদের আকার, এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং পরিবারের দৈনন্দিন পানির চাহিদার উপর।

সাধারণত,

রেইন হারভেস্টিং প্ল্যান্টের ৩ টি অংশ থাকে:

১। ক্যাচমেন্ট এরিয়া: যে পৃষ্ঠে সরাসরি বৃষ্টিপাত হয় তাকে ক্যাচমেন্ট এরিয়া বলে। এটা আপনার বাড়ির ছাদ, উঠান কিংবা ভূপৃষ্ঠও হতে পারে। ক্যাচমেন্ট এরিয়া আপনার হার্ভেস্টিং সিস্টেমের জন্য রেইন ওয়াটার কালেক্ট করে। রুফটপ হার্ভেস্টিংয়ে ক্যাচমেন্ট এরিয়া হলো ছাদ।

২। স্টোরেজ: সংগ্রহ করা বৃষ্টির পানি স্টোরেজ ট্যাঙ্কে ডাইভার্ট করা হয়।

৩। ফিল্টারিং সিস্টেম: বৃষ্টির পানি সাধারণত বিশুদ্ধ। কিন্তু উন্মুক্ত ক্যাচমেন্ট এরিয়া থেকে এই পানিতে ধুলাবালি, ময়লা, লতাপাতা ইত্যাদি মিশে। তাই এই পানি খাওয়ার আগে ফিল্টার করা জরুরী।

কিছু রেইন হারভেস্টিং মডেল:

১। রেইন ব্যারেল: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো ‘রেইন ব্যারেল’। এই সিস্টেমের জন্য অতিরিক্ত জায়গা ও রক্ষণাবেক্ষণ কোনোটিই প্রয়োজন নেই। কেবল বাজার থেকে একটি ব্যারেল কিনে ছাদ থেকে পানি নামার পাইপের নীচে স্থাপন করলেই হলো। রেইনওয়াটার হারভেস্টিং শুরু হয় বাড়ির ছাদ থেকে। তাই ছাদ পরিষ্কার রাখা প্রথম কাজ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এর ক্যাপাসিটি খুব কম, মাত্র ২০০-৩০০ লিটার। আর এটাতে ফিল্টারিং সিস্টেম থাকেনা।

২। রুফটপ রেইন হারভেস্টিং: রুফটপ রেইন হারভেস্টিং হচ্ছে সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি, যার মাধ্যমে বাড়ির ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ছাদে পড়া বৃষ্টির পানি পাইপের মাধ্যমে একটি স্টোরেজ ট্যাঙ্কে জমা করা হয়। DIY হলে এটায় জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে না। কিছু সাধারণ উপকরণ এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেই কম খরচে বানাতে পারবেন। পরে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজও করতে পারবেন।

৩। সোলার+রেইন হার্ভেস্টিং: বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সৌর প্যানেল স্থাপন করা হলে একটা বিশাল এরিয়া ঢাকা পড়ে যায়। এক্ষেত্রে সোলার প্যানেলকে ওয়াটার ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় রুপান্তর করা যেতে পারে। তখন বৃষ্টির সময় সৌর প্যানেলের পৃষ্ঠ থেকে পানি আহরণ করা যাবে।

৪। রেইন সসার: রেইন সসার একটি উল্টানো ছাতা সদৃশ জিনিস যা দিয়ে বৃষ্টির সময় পানি আহরণ করা যায়। এই পদ্ধতিটি পানি দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা কমায় কারণ ছাদ কিংবা অন্যান্য খোলা পৃষ্ঠে ধুলা-ময়লা থাকে। রেইন সসার দিয়ে সংগ্রহকৃত পানি সরাসরি পান করা যেতে পারে।

রেইন হারভেস্টিং সিস্টেম তৈরিতে খরচের পরিসর:

১) ছোট সিস্টেম: ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা। এর মধ্যে একটি ছোট ট্যাঙ্ক (৫০০-১০০০ লিটার), পাইপলাইন এবং ফিল্টারিং সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত।

২) মাঝারি সিস্টেম: ৫০,০০০ থেকে ১০০,০০০ টাকা। ২০০০-৫০০০ লিটারের ট্যাঙ্ক, পাইপলাইন এবং ফিল্টারিং সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত।

৩) বৃহৎ সিস্টেম (বাণিজ্যিক বা কৃষিকাজের জন্য): ১০০,০০০ থেকে ৫০০,০০০ টাকা বা আরও বেশি। বড় ট্যাঙ্ক (১০,০০০ লিটার বা তার বেশি), পাইপলাইন এবং ফিল্টারিং সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত।

রেইন হারভেস্টিং থেকে পানি সংগ্রহের পরিমাণ নির্ভর করে যে কয়টি বিষয়ের উপর:

১) বৃষ্টিপাতের পরিমাণ: বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২০০০-৩০০০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে অধিক পরিমাণ পানি সংগ্রহ সম্ভব। একটি ছোট বাড়ির ছাদে (৫০ বর্গমিটার) সঠিক ব্যবস্থাপনায় প্রতি বর্ষাকালে ৭৫,০০০-৮০,০০০ লিটার পানি সংগ্রহ করা সম্ভব।

২) ক্যাচমেন্ট এরিয়ার সাইজ: আপনার বাড়ির ছাদ বা সংগ্রহের পৃষ্ঠতলের আকার অনুসারে পানির পরিমাণ নির্ধারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি ১০০ বর্গমিটার ছাদ থাকে এবং বছরে ২০০০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়, তবে আপনি প্রতি বছর প্রায় ২০০,০০০ লিটার পানি সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে বাস্তবে আপনি এই পানির মোটামুটি ৭০-৮০% সংগ্রহ করতে পারবেন। বাকিটা বৃষ্টির শুরুতে ছাদ পরিষ্কারের জন্য এবং পরে নানাভাবে লস যাবে।

এক বছরে পানির পরিমাণ হিসাবের ফর্মুলা:

পানির পরিমাণ (লিটার) = ক্যাচমেন্ট এরিয়ার আকার (বর্গমিটার) × বৃষ্টিপাতের পরিমাণ (মিমি) × সংগ্রহের দক্ষতা (৭০-৮০%)

উদাহরণ: ১০০ বর্গমিটার ছাদ × ২০০০ মিমি বৃষ্টি × ৭৫% (সংগ্রহের দক্ষতা) = ১৫০,০০০ লিটার পানি (প্রতি বছর)

পানি কতদিন ধরে সংরক্ষণ করা যায়?

রেইন হারভেস্টিং সিস্টেমে সাধারণত পরিষ্কার ও ফিল্টার করা পানি ৬ মাস পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য থাকে। যদি স্টোরেজ ট্যাঙ্ক ভালোভাবে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখা হয় তাহলে পানি ১ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব।

সংগৃহীত পানি কতদিন চলবে?

সংগ্রহ করা পানি কতদিন চলবে তা নির্ভর করে দৈনিক পানির চাহিদার উপর। সাধারণত একটি পরিবারের দৈনিক পানি খরচের জায়গাগুলো হচ্ছে- খাওয়া ও রান্নার পানি, গোসল ও শৌচকার্য, কাপড় ও বাসনপত্র ধোয়া, বাগান পরিচর্যা ইত্যাদি। বাংলাদেশে একটি সাধারণ পরিবারে (৪-৫ জনের) দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ৩০০-৫০০ লিটার হতে পারে।

@ Captain Green 


36


১৯৭২ সালের এক বিভীষিকাময় দিন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহ বোমার গর্জন আর ধোঁয়ার মধ্যে হারিয়ে যায় এক হাসিখুশি পরিবার। স্বজন হারানোর চরম শোক আর মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে বাবা হো ভ্যান থান তাঁর মাত্র দুই বছরের শিশুসন্তান হো ভ্যান লাংকে বুকে জড়িয়ে ছুটে যান গহীন অরণ্যের দিকে। কে জানত, লোকালয় ছেড়ে পালানোর সেই যাত্রাই এক একাকী ও বিচিত্র অধ্যায়ের সূচনা করবে!

​জঙ্গলের অন্ধকারই হয়ে ওঠে তাঁদের নতুন আশ্রয়। সময় গড়ায়, কিন্তু সভ্যতার কোনো ছায়া তাঁদের ছোঁয়নি। পৃথিবীর মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে কেটে যায় দীর্ঘ ৪১টি বছর। গাছের ছাল-বাকল আর পাতা দিয়ে শরীর ঢেকে, বুনো ফলমূল আর শিকার করা পশুপাখি খেয়ে তারা টিকে থাকেন প্রকৃতির কঠিন নিয়মে। লাং বড় হতে থাকেন আধুনিক জীবনের আলো, চোখধাঁধানো প্রযুক্তি কিংবা সামাজিক নিয়মকানুন ছাড়াই। প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এই মানুষের কাছে নারী জাতির অস্তিত্বও ছিল সম্পূর্ণ অজানা এক বিস্ময়।

​অবশেষে ২০১৩ সালে, যখন এই বাবা-ছেলেকে জঙ্গল থেকে লোকালয়ে ফিরিয়ে আনা হয়, তখন পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে দেখে এক জীবন্ত অলৌকিক গল্প। পৃথিবীর মানুষ তাঁকে নাম দেয় 'বাস্তবের টারজান'। ইট-কাঠের এই দ্রুতগতির আধুনিক যুগে এসে লাং যেন এক আলাদা সময়ের যাত্রী, যিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরণীর আদিম বুকে বেঁচে থাকার এক অনন্য ইতিহাস গড়ে গেছেন।



37


ইসলামী স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক, রসায়নবিদ ও দার্শনিক আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাযী (৮৬৫–৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ) জ্ঞানচর্চায় অন্ধ অনুকরণ বা ‘তাকলিদ’-এর তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি বুদ্ধিবৃত্তি, যুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে সত্য অনুসন্ধানের সর্বোচ্চ মাধ্যম মনে করতেন। 

আল-রাযীর এই অবস্থান, তাঁর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. অন্ধ অনুকরণ (তাকলিদ) বনাম যুক্তি ও বিজ্ঞান:

আল-রাযী বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর মানুষকে 'আকল' বা বুদ্ধি দিয়েছেন যাতে মানুষ ভালো-মন্দ এবং সত্য-মিথ্যা বিচার করতে পারে।

বুদ্ধির শ্রেষ্ঠত্ব:

তাঁর মতে, বিজ্ঞান ও দর্শনের অগ্রগতি কেবল তখনই সম্ভব যখন মানুষ পূর্বসূরিদের অন্ধ অনুকরণ না করে নিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যুক্তিপ্রয়োগ করে।

তাকলিদের বিরোধিতা:

তিনি মনে করতেন, ধর্মীয় ক্ষেত্রে অন্ধ অনুকরণ মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং সমাজে অসহিষ্ণুতার জন্ম দেয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফি ফিলসাফাত আল-মুতাফালসিফীন' (দার্শনিকদের দর্শন) এবং অন্যান্য লেখায় তিনি মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেই মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

২. কোরআনের সাহিত্যিক মোজেজা (ই’জায):

তাঁর বিতর্কিত গ্রন্থ (যেমন: 'মাখারিফুল আম্বিয়া' বা নবীদের ছলচাতুরী—যার অস্তিত্ব এখন মূলত সমালোচকদের উদ্ধৃতিতে পাওয়া যায়) অনুযায়ী তাঁর যুক্তিগুলো ছিল নিম্নরূপ:

আপেক্ষিকতার যুক্তি:

আল-রাযী দাবি করেন যে, কোনো গ্রন্থের সাহিত্যিক মান অনন্য বা চমৎকার হতেই পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তা অলৌকিক বা ডিভাইন (ঐশ্বরিক)।

বিকল্প রচনার সম্ভাবনা:

তিনি যুক্তি দেন যে, আরবের কবি ও সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম, কিংবা ইউক্লিডের জ্যামিতির বই, অথবা টলেমির জ্যোতির্বিদ্যার বইগুলোও নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনন্য। যদি কোরআনকে এর সাহিত্যিক মানের জন্য মোজেজা বলা হয়, তবে বিজ্ঞানের এসব আকর গ্রন্থকেও মোজেজা বলা উচিত।

সাংস্কৃতিক প্রভাব:

তিনি মনে করতেন, মানুষ যে ভাষায় বা সংস্কৃতিতে বড় হয়, তার প্রতি তার এক ধরণের অন্ধ মোহ তৈরি হয়। তাই আরবদের কাছে কোরআনের ভাষা অলৌকিক মনে হলেও অন্য ভাষার মানুষের কাছে তা সাধারণ মনে হতে পারে।

৩. সমালোচনা:

আল-রাযী কেবল কোরআনের সাহিত্যিক মোজেজাকেই চ্যালেঞ্জ করেননি, বরং তিনি 'নবুয়ত' বা ঐশ্বরিক বাণীর ধারণার ওপরও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর মূল আপত্তিগুলো ছিল:

মানব সমতা:

ঈশ্বর সব মানুষকে সমান বুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বিশেষ বার্তা দিয়ে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।

জ্ঞানের উৎস:

মানুষের জন্য বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তিই যথেষ্ট। আধ্যাত্মিক বাণীর চেয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান মানবজাতির বেশি কল্যাণ বয়ে আনে।

৪. মুসলিম বিশ্বে প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা:

আল-রাযীর এই চরম যুক্তিবাদী এবং অপ্রথাবিরোধী অবস্থানের কারণে সমসাময়িক ও পরবর্তীকালের মুসলিম স্কলার এবং দার্শনিকদের দ্বারা তিনি তীব্রভাবে সমালোচিত হন।

আবু হাতিম আল-রাযী:

ইসমাইলি ঘরানার এই চিন্তাবিদ আল-রাযীর সাথে সরাসরি বিতর্কে লিপ্ত হন এবং তাঁর ‘কিতাব আলাম আল-নুবুওয়াহ’ গ্রন্থে আল-রাযীর যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করেন।

আল-বিরুনী ও ইবনে সিনা:

আল-রাযীর বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করলেও, তাঁর ধর্মীয় ও নবুয়ত সংক্রান্ত দর্শনকে তারা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন।

বই নিষিদ্ধকরণ:

আল-রাযীর ধর্মতাত্ত্বিক ও দর্শন বিষয়ক বইগুলো এতটাই বিতর্কিত ছিল যে, রক্ষণশীল সমাজ ও শাসকদের কোপানলে পড়ে সেগুলোর সিংহভাগই ধ্বংস হয়ে যায়। আজ আমরা তাঁর এই চ্যালেঞ্জগুলোর কথা মূলত তাঁর সমালোচকদের বইয়ে দেওয়া উদ্ধৃতি থেকেই জানতে পারি।

সারসংক্ষেপ:

আল-রাযীর কাছে বিজ্ঞান ও যুক্তি ছিল পরম সত্য। তিনি মনে করতেন, মোজেজা বা অলৌকিকতার দাবি মানুষকে অন্ধ বিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেয়, যা বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার পরিপন্থী। 



38


কাঁচা ডিমের ভয়ানক ব্যাকটেরিয়া থেকে বাঁচতে এবং শতভাগ পুষ্টি পেতে ডিম খাওয়ার সঠিক বৈজ্ঞানিক নিয়ম

পেশি মজবুত করার আশায় অনেকেই প্রতিদিন সকালে কাঁচা বা আধা সেদ্ধ ডিম খেয়ে নিজেদের শরীরকে ভয়ংকর বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। কাঁচা ডিমে থাকা সালমোনেলা নামক প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রে প্রবেশ করে ভয়াবহ ফুড পয়জনিং এবং ডায়রিয়া তৈরি করে। না জেনে এই ভুল পদ্ধতিতে ডিম খাওয়ার কারণে শরীরের প্রোটিনের ঘাটতি তো পূরণ হয়ই না, উল্টো লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হয়।

আমেরিকান ডায়েটেটিক অ্যাসোসিয়েশনের পুষ্টিবিজ্ঞানীদের একটি আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে পূর্ণাঙ্গ সেদ্ধ ডিমের প্রোটিন মানুষের পরিপাকতন্ত্র সবচেয়ে দ্রুত শোষণ করতে পারে। গবেষকরা জানিয়েছেন ফুটন্ত পানিতে ডিম সেদ্ধ করার ফলে এর ক্ষতিকর জীবাণু মারা যায় এবং অ্যামিনো এসিডগুলোর গঠন এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যা পেশি গঠনে সরাসরি কাজ করে। কাঁচা ডিমের তুলনায় সেদ্ধ ডিম থেকে শরীর প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ কার্যকর প্রোটিন গ্রহণ করতে সক্ষম হয়।

ডিমের সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগুণ পেতে একটি পাত্রে পানি ফুটিয়ে তাতে ডিমগুলো অন্তত বারো থেকে পনেরো মিনিট ভালোভাবে সেদ্ধ করে নিন। কুসুম সম্পূর্ণ শক্ত হয়ে যাওয়ার পর খোসা ছাড়িয়ে সামান্য গোলমরিচের গুঁড়ো ছিটিয়ে প্রতিদিন সকালের নাস্তায় খাওয়ার অভ্যাস করুন। বাজার থেকে কাঁচা ডিম কিনে আনার পর তা খুব ভালোভাবে ধুয়ে ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হবে যেন বাইরের জীবাণু ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।

কাঁচা ডিম খাওয়ার ভয়ংকর ঝুঁকি থেকে নিজেকে বাঁচাতে আজ থেকেই সঠিক নিয়মে ডিম সেদ্ধ করে খাওয়ার পদ্ধতিটি আপন করে নিন। সঠিক খাদ্যাভ্যাসের এই ছোট একটি পরিবর্তন আপনার শরীরকে পুষ্টিহীনতা থেকে বাঁচিয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলবে। @ স্বাস্থ্য পরামর্শ


39


দশটা লোককে একই কাজ করতে দেখলে আপনার মনে হতে পারে যে, তারা বুঝি সবাই কমবেশি একই ধরনের মানুষ। কিন্তু একই কাজ একেকজন মানুষ করে একেক চিন্তা মাথায় নিয়ে। রেনেসাঁর সময় ইউরোপের অনেক মানুষ নিজেদের বাড়ির একটি ঘর কিংবা বড় আলমারিতে বিভিন্ন দুর্লভ জিনিস সাজিয়ে রাখতেন। এইসব সগ্রহের মধ্যে থাকত বিভিন্ন অজানা প্রাণীর হাড় ও জীবাশ্ম, বিরল প্রজাতির ঝিনুক, খনিজ পাথর, সংরক্ষিত প্রাণীর দেহ ও অজানা প্রজাতির উদ্ভিদ, দূরদেশ থেকে আনা শিল্পকর্ম ও প্রত্নবস্তু। এইসব কালেকশনকে বল হতো ক্যাবিনেট অব কিউরিওসিটিস। একটা পর্যায়ে লন্ডন, প্যারিস ও বার্লিনের ক্যাবিনেট অব কিউরিওসিটিসগুলো অদ্ভুত সব প্রাণীর নমুনা দিয়ে ভরে উঠছিল। এগুলো পরবর্তীতে জীববিজ্ঞানের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। 

কিন্তু এই কালেকশন একেকজন মানুষ করত একেক কারণে। কেউ এগুলো সংগ্রহ করত কৌতূহল থেকে। তিনি হয়ত অদ্ভুত সব জীবাশ্ম, প্রাণীর হাড়, শামুকের খোলস বা বিরল পাথর দেখে প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা করতেন। কেউ কেউ এই একই কাজ করত নিজের সম্পদ ও মর্যাদা দেখাতে। তাদের কাছে এটা ছিল তার সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। আবার অনেকেই এই কাজটা করত গবেষণার জন্য। কেউ কেউ কাজটা করতেন স্রেফ দূরদেশ সম্পর্কে জানার জন্য। আবার এই একই কাজ অনেকে করতেন সবাইকে অবাক করে দেওয়ার জন্য।

কিন্তু সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে এই কাজটা খুবই অদ্ভুত। মানুষ কেন অদুভত প্রাণীর হাড় দাম দিয়ে কিনে নিজের বাড়িতে সাজিয়ে রাখবে? কিন্তু আপনার আমার কাছে অদ্ভুত মনে হলেও পৃথিবীতে এইসব অদুভত কাজ করার মানুষের সত্যি অভাব নেই। পৃথিবীর সবাই আসলে আপনার আমার মত করে ভাবে না। আসলে, আজকাল রোজগার করা ছাড়া বাকি সব কাজকেই আমরা উদ্ভট ও অপ্রয়োজনীয় মনে করি। @ হিমাংশু কর


40



Solomon’s Paradox...

আপনি অন্যকে যতটা ভালো পরামর্শ দিতে পারেন, নিজেকে ততটা ভালো ভাবে গাইড করতে পারেন না। এটাই আসল কথা।

আমার ছোট্ট বন্ধুরা চলো তোমাদেরকে এক দেশের এক রাজার গল্প শোনাই বলছিলাম, রাজা সলোমনের কথা, তিনি ছিলেন যুগের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ। সারা দেশ থেকে লোকজন তাঁর কাছে এসে সমস্যার সমাধান জানত। কিন্তু নিজের জীবনে? তিনি অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজ্যও ভেঙে যায়। মনোবিজ্ঞানীরা এই ঘটনা থেকেই নাম দিয়েছেন Solomon’s Paradox.

সহজ ভাষায় বলতে গেলে: 

আমরা অন্যের সমস্যা দেখে খুব সহজেই বুঝতে পারি তার আসলে কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়। কিন্তু যখন সেই একই সমস্যা আমাদের নিজের হয়, তখন আবেগ, অহং আর ভয় আমাদের চোখ ঢেকে দেয়। ফলে তখন আমরা সেই একই বুদ্ধি আর যুক্তি ব্যবহার করতে পারি না।

উদাহরণস্বরুপ:

আপনার বন্ধু টক্সিক রিলেশনশিপে আটকে আছে। আপনি তাঁকে খুব পরিষ্কার করে বললেন' 'ভাই, এখান থেকে তুই বেরিয়ে আই। কারণ, এই সম্পর্ক তোকে শুধু কষ্ট দিচ্ছে।' কিন্তু যখন আপনি নিজেও একই অবস্থা কিংবা পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। তখন মনে হয়: আর একটু সময় দিই… হয়তো বদলাবে… আমিই হয়তো ভুল বুঝছি… এভাবেই বাকি সময়টা পার করে দেন কিছুই করতে পারেন না।

আচ্ছা বুঝেছি আপনার সাথে মিলে গেছে, তো আপনি কি এখান থেকে বের হতে চান..? আচ্ছা তাহলে শুনুন; এই প্যারাডক্স থেকে বেরোনোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো Self Distancing. অর্থাৎ নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে, তৃতীয় ব্যক্তির চোখ দিয়ে নিজের সমস্যাটা দেখা। নিজেকে জিজ্ঞেসও করতে পারেন। যদি এই সমস্যাটা আমার বন্ধুর হতো, তাহলে আমি তাঁকে কী পরামর্শ দিতাম? অদ্ভুতভাবে, এই ছোট্ট ট্রিকসটাই অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

তাই পরেরবার যখন নিজেও কোনো জটিল সমস্যায় আটকে যাবেন, তখন নিজেকে বলুন; আমি যদি অন্য কেউ হতাম, তাহলে কী করতাম? হয়তো তখনই সলোমনের সেই হারানো জ্ঞানটা ফিরে আসবে।

Philosopher In Town:



41


মস্তিষ্ক আসলে শেখে কীভাবে? গবেষণা বলছে, একবার কিছু চাওয়া বা ভাবা মস্তিষ্কে তেমন কোনো স্থায়ী ছাপ ফেলে না। বরং যা বারবার করা হয়, একই পরিস্থিতিতে একই আচরণ যতবার ঘটে, ততবার মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে সংযোগ আরও দৃঢ় হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সিন্যাপ্টিক শক্তিশালীকরণ, যেখানে বারবার ব্যবহৃত স্নায়ুপথ ধীরে ধীরে এমন মসৃণ হয়ে ওঠে যে একসময় সচেতন চেষ্টা ছাড়াই আচরণটি ঘটে যায়। প্রথমবার সাইকেল চালানো শেখার কথা ভাবুন, প্রতিটি প্যাডেল ঘোরানো তখন সচেতন প্রচেষ্টা দাবি করে। কিন্তু কয়েকশো বার অনুশীলনের পর সেই একই কাজ হয়ে ওঠে স্বয়ংক্রিয়, শরীর নিজেই জেনে যায় কী করতে হবে।

এই নীতিটি শুধু আচরণেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তথ্যের ক্ষেত্রেও একইভাবে কাজ করে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ইলিউশরি ট্রুথ ইফেক্ট, অর্থাৎ মিথ্যা তথ্যকৃত্রিম সত্যতার বিভ্রম। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি বিবৃতি যতবার শোনা যায়, মস্তিষ্কের কাছে সেটি ততই পরিচিত মনে হতে থাকে, আর এই পরিচিতিকেই মস্তিষ্ক প্রায়ই ভুল করে বিশ্বাসযোগ্যতা বলে ধরে নেয়। এমনকি সম্পূর্ণ ভুল তথ্যও যদি বারবার শোনা যায়, তাহলে তা ধীরে ধীরে সত্যের মতো অনুভূত হতে শুরু করে। এখানেই লুকিয়ে আছে এক বিপজ্জনক সত্য, আমাদের মস্তিষ্ক সত্য যাচাই করে না, বরং পরিচিতি যাচাই করে।

তাহলে আমাদের ইচ্ছার কি তবে কোনো মূল্যই নেই? আসলে ইচ্ছা এখনও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কী অনুশীলন করা হবে তা প্রথমে ইচ্ছাই ঠিক করে দেয়। কিন্তু একবার ব্যায়াম করার ইচ্ছা কখনো অভ্যাস তৈরি করে না, বরং বারবার ব্যায়াম করাটাই অভ্যাস গড়ে তোলে। একইভাবে কিছু শেখার আকাঙ্ক্ষা কখনো দক্ষতা তৈরি করে না, বারবার অনুশীলনই দক্ষতার জন্ম দেয়। ইচ্ছা এখানে দরজা খুলে দেয় মাত্র, ভেতরে ঢোকার কাজটা করে পুনরাবৃত্তি।

এই সত্যটি মেনে নিলে জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যায়। প্রতিদিন যা আপনি নিজেকে বলেন, যা দেখেন, যা পড়েন এবং যা অনুশীলন করেন, তার প্রতিটিই ধীরে ধীরে আপনার মনের গঠন পাল্টে দিচ্ছে। নেতিবাচক চিন্তা যদি বারবার মনে আনা হয়, সেটিও একসময় মনের কাছে স্বাভাবিক ও সত্য মনে হতে শুরু করে, ঠিক যেমন মিথ্যা তথ্য বারবার শুনলে সত্যের মতো লাগে। বিপরীতভাবে ইতিবাচক অভ্যাস, নতুন দক্ষতা কিংবা গভীর মনোযোগও একইভাবে গড়ে ওঠে, শুধু সঠিক জিনিস বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে।

আমাদের প্রতিদিনের জীবনের বেশিরভাগ অংশই আসলে এমন সব আচরণ ও চিন্তার সমষ্টি, যা আমরা এতবার অনুশীলন করেছি যে এখন আর সেগুলো লক্ষ্যই করি না। সকালে দাঁত মাজা থেকে শুরু করে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে নিজের মতামত গঠন, সবকিছুর পেছনেই আছে এই একই নীতি, পুনরাবৃত্তি।

তাহলে প্রশ্ন হলো, আপনি প্রতিদিন কী পুনরাবৃত্তি করছেন? আপনার মনোযোগ কোথায় বারবার ফিরে যাচ্ছে? মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত শিখছে আপনার পুনরাবৃত্তি থেকেই, তাই প্রশ্নটা কখনোই এই নয় যে আপনি কী চান, বরং প্রশ্নটা হলো আপনি কী বারবার করছেন। কারণ শেষ পর্যন্ত আপনার জীবন গড়ে ওঠে আপনার অভিপ্রায় দিয়ে নয়, গড়ে ওঠে আপনার পুনরাবৃত্তি দিয়েই।  @Md-Al Mamun Riton



42



ভয় জন্মগত নয়, ভয় হয় সামাজিক।

একটা শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, সে কোনো ভয় নিয়ে আসে না। সে আ'গুন দেখে হাত বাড়িয়ে দেয়, উঁচু জায়গা থেকে ঝাঁপ দিতে চায়, অচেনা মানুষের সামনে নির্ভয়ে হাসে। তার চোখে পৃথিবীটা একটা বিশাল খেলার মাঠ। কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা তাকে শেখাই; এটা করিস না, পড়ে যাবি, অচেনা লোকের সাথে কথা বলিস না, ফেল করলে কী হবে?, সমাজ কী বলবে?

এভাবেই তার মধ্যে ভয়ের বীজ বপন করা হয়। 

ভয় আমাদের জিনে নেই, ভয় আছে সমাজের গল্পে। আমরা যেসব গল্প শুনি, যেসব সতর্কবাণী শুনি, যেসব ব্যর্থতার উদাহরণ দেখি, সেগুলোই আমাদের ভয়কে তৈরি করে। কেউ ভয় পায় ব্যর্থতার, কেউ সমালোচনার, কেউ প্রত্যাখ্যানের, কেউ আবার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার। এই ভয়গুলো আমাদের জন্মের সাথে আসেনি, এগুলো আমাদের চারপাশ থেকে সংগ্রহ করা।

বাস্তবে দেখুন: যে শিশুটি একদিন সাইকেল চড়তে ভয় পেত না, সে বড় হয়ে জীবনের অনেক সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায়। যে মেয়েটি ছোটবেলায় মঞ্চে নাচতে চাইত, সে বড় হয়ে লোকে কী বলবে ভেবে স্বপ্নকে চেপে রাখে। 

কিন্তু সুসংবাদ হলো: যে ভয় শেখা যায়, সে ভয় ভাঙাও যায়।

আপনি যদি আজ নিজেকে প্রশ্ন করেন.? এই ভয়টা আসলে আমার নিজের, নাকি সমাজ আমাকে শিখিয়েছে? তাহলেই আপনি মুক্তির প্রথম ধাপে পা রাখবেন। তাই ছোট ছোট সাহসের অনুশীলন করুন। যেকোনো একটা ভয়কে চ্যালেঞ্জ করুন। একবার যখন আপনি দেখবেন যে যা ভয় পাচ্ছিলেন, তা আসলে এতটা ভয়ংকর নয়, তখন আপনার ভেতরের শিশুটা আবার জেগে উঠবে।

কিছু ভয়কে ভয় করুন, কিন্তু তাকে আপনার জীবনের চালক হতে দেবেন না। শুধু এতটুকু মনে রাখবেন, আপনার ভয়ের অনেকটাই আপনার নিজের নয়, এটা সমাজের ধার করা।

সেই ধার ফেরত দিয়ে, নিজের স্বপ্নকে আবার উড়তে দিন। আপনার জন্য শুভকামনা।

Philosopher In Town:



43



"সে খুব আত্মকেন্দ্রিক" — এই কথাটা বলার আগে

লোকটার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আপনি খেয়াল করেছেন, আলোচনাটা যেভাবেই শুরু হোক, শেষ হয় তার নিজের গল্পে এসে। আপনার বাবার অসুখের কথা বলছিলেন, দশ মিনিট পর জানলেন তার এক চাচার আরও কঠিন অসুখ হয়েছিল, এবং সেটা তিনি কীভাবে সামলেছিলেন।

আপনি বিরক্ত হয়ে ভাবলেন — মানুষটা ভীষণ নার্সিসিস্ট।

ক্রেইগ ম্যালকিন তাঁর বইয়ে ঠিক এই জায়গাটাতেই থামান। কারণ শব্দটা এখন এত বেশি ব্যবহার হচ্ছে যে এর মানেটাই হারিয়ে যাচ্ছে। যাঁর সঙ্গে আমাদের বনছে না, তাঁকেই আমরা নার্সিসিস্ট বলে ফেলছি।

ম্যালকিনের মূল দাবিটা প্রচলিত ধারণার উল্টো —

নার্সিসিজম রোগ নয়, একটা মাত্রা। আর এই মাত্রায় শূন্যে থাকাটাও সমস্যা।

তিনি একে বলেন নিজেকে একটু বিশেষ ভাবার স্বাভাবিক প্রবণতা। ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু বাড়তি আশা, নিজের সম্পর্কে একটু উজ্জ্বল ধারণা — গবেষণা বলছে, এই সামান্য ইতিবাচক পক্ষপাতটা মানসিকভাবে সুস্থ মানুষের বৈশিষ্ট্য। যাঁদের এটা একেবারেই নেই, তাঁদের অবস্থা ভালো নয়।

০ থেকে ১০ পর্যন্ত একটা রেখা কল্পনা করুন।

মাঝখানে (৪–৬) যাঁরা, তাঁরা স্বপ্ন দেখতে পারেন, নিজের প্রাপ্যটা চাইতে পারেন, আবার অন্যের অনুভূতিও দেখতে পান। এটাই সুস্থ অবস্থান।

একেবারে ডান দিকে (৯–১০) যাঁরা, তাঁরাই আমাদের চেনা নার্সিসিস্ট — নিজেকে বিশেষ প্রমাণ করা ছাড়া যাঁরা টিকতে পারেন না।

কিন্তু বাঁ দিকের প্রান্তটা (০–১)? ম্যালকিন এদের বলেন "ইকোইস্ট" — গ্রিক পুরাণের সেই ইকোর নামে, যে শুধু অন্যের কথা প্রতিধ্বনি করতে পারত, নিজের কিছু বলতে পারত না। এঁরা কখনও নিজের কথা বলেন না, কোনো দাবি করেন না, প্রশংসা পেলে অস্বস্তিতে পড়েন। বাইরে থেকে মনে হয় অসাধারণ ভালো মানুষ। ভেতরে তাঁরা ক্লান্ত, অদৃশ্য এবং প্রায়ই নার্সিসিস্টদের সবচেয়ে সহজ শিকার।

আরেকটা ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। সব নার্সিসিস্ট হম্বিতম্বি করে না। ম্যালকিন দুই ধরনের কথা বলেন — একদল প্রকাশ্যে নিজেকে বড় করেন, আরেকদল নিঃশব্দে। দ্বিতীয় দলটা অভিমান, নীরবতা আর ভুক্তভোগীর ভঙ্গি দিয়ে কেন্দ্রে থাকেন। "আমাকে তো কেউ বোঝেই না" — এই বাক্যটাও সবাইকে ঘুরে দাঁড়ানোর একটা উপায় হতে পারে।

তাহলে চরম প্রান্তে যায় কেন?

ম্যালকিনের ব্যাখ্যাটা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে চরম নার্সিসিজমের ভেতরে থাকে ভাঙা সংযুক্তি — এমন শৈশব, যেখানে ভালোবাসা শর্তসাপেক্ষ ছিল। ভালো করলে গ্রহণ, না করলে অদৃশ্য। শিশুটা তখন শেখে, "আমি বিশেষ, তাই আমি মূল্যবান" — মানুষ হিসেবে নয়, পারফরম্যান্স হিসেবে। বড় হয়ে সেই বিশেষত্বটা টিকিয়ে রাখাই হয়ে দাঁড়ায় বেঁচে থাকার শর্ত।

এই ব্যাখ্যাটা তাঁদের আচরণকে বৈধতা দেয় না। কিন্তু আপনাকে একটা জিনিস বোঝায় — আপনি তর্ক করে তাঁর মত বদলাতে পারবেন না, কারণ তর্কটা মতের নয়, অস্তিত্বের।

এবার আপনার জন্য কী?

"নার্সিসিস্ট" শব্দটা রায় হিসেবে ব্যবহার করবেন না।একবার কাউকে এই লেবেল দিয়ে দিলে আপনি তাকে আর দেখেন না, শুধু লেবেলটাকেই দেখেন।

নিজের অবস্থানটা দেখুন। আপনি রেখার কোন দিকে? যদি নিজের চাওয়া বলতে গেলে অপরাধবোধ হয়, প্রশংসা এলে বিষয় বদলে ফেলেন, নিজের সমস্যা কাউকে বলতে সংকোচ হয় — তাহলে আপনার কাজ সহানুভূতি বাড়ানো নয়, নিজের জায়গাটা নেওয়া শেখা।

অভিযোগ নয়, অনুভূতি বলুন। ম্যালকিন বলেন, "তুমি স্বার্থপর" বললে দেয়াল ওঠে; "আমি একা লাগছি, তোমাকে দরকার" বললে দরজা খোলার সম্ভাবনা থাকে। কারণ এতে তাঁর গুরুত্বও স্বীকৃত হয়।

তারপরও সীমা রাখুন। নরম ভাষা মানে সব মেনে নেওয়া নয়। বারবার বলার পরও যদি কিছুই না বদলায়, তখন প্রশ্নটা তাঁকে নিয়ে নয় — আপনি আর কতদিন থাকবেন, সেটা নিয়ে।

সবশেষে বইটার সবচেয়ে সুন্দর কথাটা এই: নিজেকে একটু বিশেষ ভাবাটা অপরাধ নয়। অপরাধ শুরু হয় তখন, যখন নিজেকে বিশেষ ভাবতে গিয়ে অন্যকে ছোট করতে হয়।

আপনি রেখার কোন দিকে দাঁড়িয়ে আছেন — নিজের কথা বলতে গিয়ে অস্বস্তি হয়, নাকি নিজের কথা থামাতে?



44


ব্যারিষ্টার থেকে কায়েদে আযম

একসময় যাকে উপমহাদেশের রাজনীতিতে বলা হতো 'হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত' সময়ের প্রয়োজনে তিনিই দ্বি-জাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করলেন পাকিস্তান রাষ্ট্র। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ'র একজন কট্টর পশ্চিমা ভাবধারার বিলাসী ব্যরিস্টার থেকে কোটি কোটি মুসলিমের ‘কায়েদে আজম’ হয়ে ওঠার গল্পটি বেশ ইন্টারেস্টিং। চলুন কায়েদে আযম সম্পর্কে হালকা করে জেনে নিই।

১৮৯৬ সালে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লিংকনস ইন (Lincoln's Inn) থেকে মাত্র ১৯ বছর বয়সে, সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় হিসেবে বার-অ্যাট-ল (ব্যারিষ্টার) সম্পন্ন করেন জিন্নাহ। তারপর করাচীতে কিছুদিন আইন প্র্যাকটিস করে বোম্বে হাইকোর্টে স্থায়ীভাবে আইন ব্যবসা শুরু করেন।১৯৩০ সালের দিকে জিন্নাহ শুধুমাত্র ওকালতি করেই মাসে ৩৫/৪০ হাজার টাকার মতো ইনকাম করতেন। ৩০/৩৫ বছর বয়সেই তিনি কোটিপতি হয়ে ওঠেন। এমনটাই ছিলো জিন্নাহ'র ব্যক্তিত্ব।

লন্ডনে পড়াকালীন সময় থেকে তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবন জুড়েই, পশ্চিমা ফ্যাশন ও বিলাসী অভিজাত্য স্পষ্টভাবে বজায় ছিল। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এতোবেশি আভিজাত্যপূর্ণ ছিলেন যে, তিনি লণ্ডনের বিখ্যাত 'স্যাভিল সারি' থেকে তৈরি দামী স্যুট, সিল্কের টাই এবং একনয়না চশমা (Monocle) পরতেন। বলা হয়ে থাকে, জিন্নাহ কখনো একই টাই দুইবার পরতেন না। এছাড়া তাঁর কালেকশনে ছিলো শত শত জোড়া জুতা ও প্রায় ২০০ টি বানানো স্যুট। তিনি জীবনের বড় একটি সময়, সম্পূর্ণ পশ্চিমা আদলে জীবনযাপন করেছিলেন। শেষ বয়সে রাজনৈতিক প্রয়োজনে শেরওয়ানি ও কারাকুল টুপি পরতেন। যা পরবর্তীতে 'জিন্নাহ টুপি' নামে পরিচিতি পায়।

কায়েদে আজমের দৈনন্দিন চলাফেরা ও বিভিন্ন কাজের জন্য সেসময়ই ব্যবহার করতেন Rolls-Royce Silver Ghost, Cadillac Series 75 Limousine, Packard, Rolls-Royce Silver Wraith ( রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ জিন্নাহকে এই বিলাসবহুল গাড়িটি উপহার দেন) এর মতো মূল্যবান অসংখ্য গাড়ি। বর্তমানে সাধারণ কোটিপতিরাও যেখানে রোলস রয়েস কিনতে হিমশিম খান, সেখানে ১৯৩০/৪০ এর দশকে জিন্নাহ এইসব হাই ফাই গাড়িতে রেগুলার যাতায়াত করতেন। এমনই বিলাসিতাপূর্ণ ছিলো জিন্নাহর জীবনযাপন।

তবে জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবন ছিলো গভীর অনুরাগের পাশাপাশি বিষাদময় ঘটনাবলীতে পূর্ণ। ​১৯১৮ সালে ৪২ বছর বয়সী জিন্নাহ বোম্বাইয়ের পার্সি ধনকুবের স্যার দিনশ পেটিটের কন্যা রত্তনবাই 'রুট্টি' পেটিটকে বিয়ে করেন। এই আন্তঃধর্মীয় প্রেম ও বিয়ে তৎকালীন বোম্বাইয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলো। অবশ্য পরে মিসেস জিন্নাহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মরিয়ম নাম গ্রহণ করেন। তবে ১১ বছরের এই সংসার বিষাদে রূপ নেয় ১৯২৯ সালে। মাত্র ২৯ বছর বয়সে মিসেস জিন্নাহ মারা যান।

মরিয়মের মৃত্যু জিন্নাহকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। জিন্নাহ ও মরিয়ম জুটির একমাত্র কন্যা ছিলেন দিনা জিন্নাহ। জিন্নাহ যেভাবে পার্সি পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন, দিনাও নেভিল ওয়াদিয়া নামের এক পার্সি ব্যবসায়ীকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। জিন্নাহ এই বিয়ে মেনে নেননি ফলে, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কন্যার সাথে তাঁর যোগাযোগ প্রায় বন্ধই ছিল। প্রিয়তমা স্ত্রীর বিয়োগ এবং পরবর্তীতে কণ্যা বিয়োগের ব্যথা জিন্নাহ আজীবন ভুগেছেন। জিন্নাহর শেষ জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন তাঁর ছোট বোন ফাতেমা জিন্নাহ।

রাজনীতির শুরুর দিকে জিন্নাহ ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা। কংগ্রেস নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলে জিন্নাহ'র ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাব দেখে তাঁকে 'হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সেরা দূত' আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯২০-এর দশকে মহাত্মা গান্ধীর উত্থান এবং পরবর্তীতে কংগ্রেস রাজনীতির হিন্দু মেরুকরণের ফলে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে আসেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবের মানুষ হয়েও, তিনি ভারতীয় মুসলমানদের দূর্দশা অনুভব করে একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের একচ্ছত্র দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই সময়েই উপমহাদেশের মুসলমানদের দুঃখ দুর্দশা লাঘবে তিনি হয়ে উঠলেন আস্থার প্রতিক 'কায়েদে আজম'।

​১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েই জিন্নাহ মারাত্মক যক্ষ্মা (Tuberculosis) ও ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তৎকালীন সময়ে এই রোগের কোনো চিকিৎসা ছিলো না। ​জিন্নাহ এবং তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. জাল রতনজি প্যাটেল এবং রেডিওলজিস্ট ডা. জাল ধায়ভো-কু এই প্রাণঘাতী রোগের কথা সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিলেন।

​ইতিহাসবিদ ল্যারি কলিন্স ও ডমিনিক লাপিয়ের তাঁদের 'ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট' বইয়ে উল্লেখ করেছেন, লর্ড মাউন্টব্যাটেন বা কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ যদি জানত জিন্নাহর হাতে আর মাত্র কয়েক মাস সময় আছে, তবে তারা হয়তো ১৯৪৭ সালের আগস্টে তড়িঘড়ি করে ভারত ভাগ না করে বরং জিন্নাহর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করত।

এমন ভয়াবহ শারীরিক বিপর্যয় স্বত্বেও জিন্নাহ তাঁর জীর্ণ শরীর নিয়ে চিকিৎসকের নিষেধ উপেক্ষা করে, কেবল অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি নিশ্চিত করেন। কিন্তু স্বপ্নের পাকিস্তানের সুদিন তিনি দেখে যেতে পারেননি। দেশভাগের মাত্র ১৩ মাসের মাথায় ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

মোহাম্মদ আলী আকবর 


45