১
পেট নয়, মাথা বাড়াও
থায় বলে হিন্দুদের বাড়ি মুসলমানদের ভুড়ি। অর্থাৎ হিন্দুরা অর্থ রোজগার করে বাড়ি তৈরি করার জন্য, আর মুসলমানরা রোজগার করে রসনা নিবৃত করার অর্থাৎ খাওয়ার জন্য। আর ইহুদীরা যা কিছুই করুক না কেন তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য যে জ্ঞানার্জন করা ।
তারা নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী। আর জ্ঞানই নেতৃত্বে আসীন করে। বিভিন্ন তথ্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রমাণিত হয়েছে আমেরিকা নেতৃত্বের নেপথ্যে ইহুদীরাই পরিচালনা করে। যদিও জ্ঞানার্জনের উত্তরাধিকার মুসলমানেরা, কিন্তু তারা এখন ভুড়ি নিয়েই ব্যস্ত, জ্ঞানার্জনের সময় কোথায়!
ফেসবুকে পোস্ট আর লাইক দেখলে বুঝা যায়। দেখা যাক লেখাপড়া তথা জ্ঞানার্জনের একটা তুলনা: জনসংখ্যা: ইহুদী- এক কোটি চল্লিশ লাখ। মুসলমান- ১৬০ কোটি, একজন ইহুদীর বিপরীতে প্রায় ১১৪ জন মুসলমান।
গত ১০৫ বছর ধরে ১ কোটি ৪০ লাখ ইহুদী ১৮০টি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছে। আর একশত কোটি মুসলমান জিতেছে মাত্র ৩টি নোবেল। সাধারণত খ্রিস্টানদের স্কুল-কলেজেই ইহুদী লেখাপড়া করে থাকে।
৫৭টি মুসলিম দেশে বিশ্ববিদ্যালয় আছে মাত্র ৫০০টির মতো। আর একমাত্র আমেরিকাতেই আছে ৫৭৫৮টি বিশ্ববিদ্যালয়। পুরো ভারত জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৭০০ টির মতো। দুনিয়াজুড়ে ইহুদী-খ্রিস্টানদের শিক্ষার হার ৯০%, আর মুসলমানদের শিক্ষার হার মাত্র ৪০%।
বেশিরভাগ আবিষ্কারগুলি করেছে ইহুদীরা। প্রভাবশালী ব্যবসায়ীও তারা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও তারাই। আমরা ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে মত্ত থাকি। নিজেদের মাঝে হিংসা- বিদ্বেষ ছড়াই। সামান্য একজোড়া জুতা কিনে তার ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছি, তাতে লাইক দিচ্ছি শত শত।
যে কারণে খালাতো-মামাতো ভাই-বোনদের বিয়ে ঠিক নয়!
নিকটাত্মীয় অর্থ্যাৎ চাচাতো, মামাতো, খালাতো ও ফুফাতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিয়ে বিয়ের পরিণামে যে সন্তান হয়, তার মধ্যে জন্মগত ত্রুটি জেনেটিক সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বেশি। দ্য ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, এই অস্বাভাবিকতার মধ্যে নবজাতকের অতিরিক্ত আঙুল গজানোর মতো সমস্যা থেকে শুরু করে হৃৎপিণ্ডে বা মস্তিষ্কের গঠন-প্রক্রিয়ায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে।
২
“The Secret”
বিশ্বজুড়ে এমন কিছু বই আছে যা প্রকাশের পর মানুষের চিন্তার ধরণ বদলে দিয়েছে। রোন্ডা বায়র্নের লেখা “The Secret” তেমনই একটি বই। ২০০৬ সালে প্রকাশিত এই বইটি খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার হয়ে ওঠে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে একটি প্রশ্ন ভাবতে বাধ্য করে—
আমাদের চিন্তাই কি আমাদের বাস্তবতা তৈরি করে?
বইটির মূল ধারণা হলো “Law of Attraction” বা আকর্ষণের সূত্র। রোন্ডা বায়র্ন দাবি করেন, মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাস একটি অদৃশ্য শক্তির মতো কাজ করে। আপনি যদি ইতিবাচকভাবে ভাবেন, সাফল্য, সম্পদ বা সুখের কথা কল্পনা করেন, তাহলে সেই শক্তি আপনার জীবনে একই ধরনের বাস্তবতা টেনে আনতে পারে।
এই ধারণাটি নতুন নয়। লেখক বলেন, ইতিহাসের বহু চিন্তাবিদ—প্লেটো, আইনস্টাইন, শেক্সপিয়ার—সবাই নাকি বিভিন্নভাবে এই চিন্তার কথা বলেছেন। মানুষের মন নাকি এক ধরনের চুম্বকের মতো কাজ করে; আপনি যা নিয়ে ভাববেন, জীবন ধীরে ধীরে সেই দিকেই এগোবে।
বইটি পাঠকদের তিনটি সহজ ধাপ শেখায়—
Ask, Believe, Receive।
অর্থাৎ প্রথমে আপনি কী চান তা স্পষ্টভাবে ভাবুন, তারপর বিশ্বাস করুন যে তা সম্ভব, এবং শেষে নিজেকে প্রস্তুত করুন সেই ফল গ্রহণ করার জন্য।
তবে The Secret শুধু প্রশংসাই পায়নি; এটি অনেক বিতর্কও তৈরি করেছে। সমালোচকেরা বলেন, শুধুমাত্র ইতিবাচক চিন্তা দিয়ে বাস্তব জীবনের সব সমস্যা সমাধান করা যায় না। সাফল্যের জন্য পরিশ্রম, বাস্তব পরিকল্পনা এবং সামাজিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবুও বইটি জনপ্রিয় হয়েছে কারণ এটি মানুষের একটি গভীর আকাঙ্ক্ষাকে স্পর্শ করে—আশা। মানুষ বিশ্বাস করতে চায় যে তার চিন্তা ও স্বপ্নের মধ্যেই ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার শক্তি আছে।
হয়তো সত্যটা মাঝামাঝি কোথাও। শুধু কল্পনা করলেই সব বদলে যায় না, কিন্তু মানুষের চিন্তা তার আচরণ, সিদ্ধান্ত এবং সাহসকে অবশ্যই প্রভাবিত করে।
সম্ভবত The Secret আমাদের সবচেয়ে বড় যে কথাটি মনে করিয়ে দেয় তা হলো—
মানুষের জীবন অনেক সময় শুরু হয় একটি চিন্তা থেকে।
৩
জীবনকে সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে ২৫টি সফট স্কিল
জীবনের অনেক ক্ষেত্রে আসল পার্থক্য গড়ে দেয় কিছু মানবিক ও আচরণগত দক্ষতা—যাকে বলা হয় সফট স্কিল। সম্পর্ক গড়ে তোলা, অন্যের অনুভূতি বোঝা, মতভেদ সামলানো বা নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা, এসব গুণ ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবন দুটিকেই প্রভাবিত করে।
এই দক্ষতাগুলি কোনো নির্দিষ্ট পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার, বন্ধুত্ব ও কর্মক্ষেত্র সব জায়গায় এগুলি মানুষকে আরও পরিণত, স্থির ও সফল হতে সাহায্য করে। এই লেখায় তেমনই ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ সফট স্কিলের কথা বলা হয়েছে।
১. উন্মুক্ত মানসিকতা
ভাবুন এমন একটি পৃথিবীর কথা, যেখানে কেউ নতুন ধারণা শুনতে বা গ্রহণ করতে চায় না। সেখানে মুক্ত মত প্রকাশও থাকত না, উদ্ভাবনও থেমে যেত। সব মতের সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয়, কিন্তু ভিন্ন চিন্তা ও বিশ্বাসকে মেনে নেওয়া জরুরি। যারা অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি মন দিয়ে শোনে, মানুষ তাদের সঙ্গেই বেশি স্বস্তি বোধ করে।
২. প্রতিক্রিয়া দেওয়া ও গ্রহণ করা
আমরা অনেকেই নিজের মতামত দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, কিন্তু অন্যের গঠনমূলক সমালোচনা সহজভাবে নিতে পারি না। অথচ উন্নতির জন্য প্রতিক্রিয়া দেওয়া ও গ্রহণ করা—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক মনে হলেও সেটিকে ব্যক্তিগত আঘাত হিসাবে না দেখে শেখার সুযোগ হিসাবে নেওয়া দরকার।
৩. উপলব্ধিশক্তি
অনেক সময় কেউ স্পষ্টভাবে কিছু না বললেও আমরা যদি পরিস্থিতি বুঝতে পারি, তাহলে যোগাযোগ সহজ হয় এবং ভুল বোঝাবুঝি কমে।
এই দক্ষতা বাড়াতে মনোযোগ দিয়ে শোনা, পর্যবেক্ষণ করা এবং বলার আগে বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
৪. যোগাযোগ দক্ষতা
কথা বলার বা বার্তা পাঠানোর আগে একটু ভেবে নেওয়া দরকার—যা বলতে চান, তা পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে কিনা। অস্পষ্ট যোগাযোগ সম্পর্ককে দুর্বল করে এবং কাজের গতি কমায়। তাই মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভেবে কথা বলা এবং প্রয়োজনে নিজের বক্তব্য গুছিয়ে নেওয়া এসব অভ্যাস চর্চার মাধ্যমে যোগাযোগ দক্ষতা ধীরে ধীরে উন্নত করা যায়।
৫. নেটওয়ার্কিং
নেটওয়ার্কিং মানে হল নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং সম্পর্ক তৈরি করা। মানুষের সঙ্গে কথা বলা, একে অপরকে জানা ও যোগাযোগ বজায় রাখা—এসবই এর অংশ।
এই পরিচয় থেকেই অনেক সময় বন্ধুত্ব, নতুন সুযোগ বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়।
৬. উদ্দীপনা
উদ্দীপনা হল কাজ বা জীবনের প্রতি আগ্রহ ও ইতিবাচক মনোভাব রাখা। যখন কেউ আনন্দ ও মনোযোগ দিয়ে কোনো কাজ করে, সেই শক্তি আশেপাশের মানুষও অনুভব করতে পারে।
যারা নতুন কিছু শেখার আগ্রহ রাখে এবং পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে দেখার চেষ্টা করে, মানুষ সাধারণত তাদের সঙ্গেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।
৭. ধৈর্য
সবকিছু সব সময় দ্রুত হয় না—এটাই স্বাভাবিক। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ সময় নিয়ে বোঝে। কোনো কাজ করতে বা কাউকে বোঝাতে গিয়ে অপেক্ষা করতে হলে ধৈর্য ধরে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।
ধৈর্য মানুষকে স্থির থাকতে শেখায় এবং লক্ষ্য অর্জনের পথে হাল না ছাড়ার শক্তি দেয়।
৮. সহানুভূতি
সহানুভূতি মানে অন্য মানুষের অনুভূতি বোঝা এবং নিজেকে তার জায়গায় কল্পনা করতে পারা। এতে আমরা শুধু কথা নয়, মানুষের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিও উপলব্ধি করার চেষ্টা করি।
নিজের অবস্থান থেকে একটু সরে অন্যের দিকটি ভাবলে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
৯. সক্রিয়ভাবে শোনা
সক্রিয়ভাবে শোনা মানে শুধু শব্দ শোনা নয়, মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা বোঝার চেষ্টা করা। কেউ কথা বলার সময় বিভ্রান্ত না হয়ে শোনা, প্রয়োজনে প্রশ্ন করা এবং তার দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দেওয়াই এই দক্ষতার মূল।
অনেক সময় আমরা কথোপকথনে থাকি, কিন্তু সত্যিকারে শুনি না—শুধু নিজের বলার পালার অপেক্ষা করি। অথচ মন দিয়ে শুনলে মানুষকে ভালভাবে বোঝা যায় এবং সম্পর্কও আরও অর্থপূর্ণ হয়।
১০. সহযোগিতা করার মানসিকতা
অনেকেই একা কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, যা স্বাভাবিক। তবে জীবনের অনেক কাজই এমন, যেখানে একাধিক মানুষের চিন্তা ও সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। একসঙ্গে কাজ করলে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জানা যায়, নতুন সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হয় এবং বড় লক্ষ্য অর্জনও দ্রুত সম্ভব হয়।
১১. দ্বন্দ্ব সমাধান
মানুষ যেখানে আছে, মতভেদও সেখানে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। পরিবার, কর্মক্ষেত্র বা বন্ধুত্ব—যেকোনো সম্পর্কেই ভুল বোঝাবুঝি বা মতের অমিল দেখা দিতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হল, সেই পরিস্থিতিকে কীভাবে সামলানো হচ্ছে।
শান্তভাবে অন্যের কথা শোনা, সম্মানের সঙ্গে নিজের মত প্রকাশ করা এবং এমন সমাধান খোঁজা যাতে সবাই কিছুটা স্বস্তি পায়—এটাই দ্বন্দ্ব সমাধানের মূল।
১২. বন্ধুসুলভ আচরণ
অন্যদের সঙ্গে আমাদের আচরণই ব্যক্তিত্বের পরিচয় তুলে ধরে। আন্তরিকভাবে কথা বলা, হাসিমুখে অভিবাদন জানানো বা অন্যকে সম্মান দেওয়ার মত ছোট ছোট বিষয় মানুষকে সহজেই কাছে টানে।
বন্ধুসুলভ আচরণ মানে বড় কিছু করা নয়, বরং এমন ব্যবহার, যেখানে অন্য মানুষ আপনার কাছে স্বস্তি ও গুরুত্ব অনুভব করে। এই গুণ সম্পর্ককে উষ্ণ ও ইতিবাচক করে তোলে এবং সামাজিক যোগাযোগকে আরও সহজ করে।
১৩. আত্মবিশ্বাস
নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস রাখা জীবনের অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়। যখন কেউ নিজের দায়িত্ব নিতে পারে এবং প্রয়োজনে সামনে এগিয়ে আসে, তখন অন্যরাও তার ওপর আস্থা রাখতে শুরু করে।
আত্মবিশ্বাস মানে ভয় বা সন্দেহ না থাকা নয়, বরং সেই অনুভূতির মধ্যেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। ধীরে ধীরে এই মানসিকতা মানুষকে আরও দৃঢ়, পরিণত ও সিদ্ধান্তে স্থির হতে সাহায্য করে।
১৪. সময়নিষ্ঠা
সময়মত উপস্থিত থাকা অন্যদের প্রতি সম্মান দেখানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। ব্যস্ততার মধ্যেও নির্ধারিত সময়কে গুরুত্ব দিলে কাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা প্রকাশ পায়।
যারা নিয়মিত সময় মেনে চলে, তাদের ওপর অন্যরা সহজেই ভরসা করতে পারে। এই ছোট অভ্যাস মানুষকে ধীরে ধীরে আরও বিশ্বাসযোগ্য, সংগঠিত ও পেশাদার হিসাবে গড়ে তোলে।
১৫. আত্মসচেতনতা
আত্মসচেতনতা মানে নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণকে বুঝতে শেখা। আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাই বা আমাদের আচরণ অন্যদের ওপর কী প্রভাব ফেলে—এসব বিষয়ে সচেতন হওয়াই এর শুরু।
যখন একজন মানুষ নিজের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা চিনতে পারে, তখন সে ভুল থেকে শেখে এবং নিজের ভাল দিকগুলি আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে।
১৬. সমস্যা সমাধানের দক্ষতা
জীবনে ছোট-বড় সমস্যা আসবেই। গুরুত্বপূর্ণ হল, আমরা সেগুলির সামনে কীভাবে দাঁড়াই। কেউ হতাশ হয়ে থেমে যায়, আবার কেউ শান্তভাবে পরিস্থিতি বুঝে সমাধানের পথ খোঁজে।
সমস্যা সমাধানের দক্ষতা মানুষকে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে, কারণ বিশ্লেষণ করতে এবং ধীরে ধীরে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। যারা সমস্যাকে শুধু বাধা নয়, শেখার সুযোগ হিসেবে দেখে, তারা জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে।
১৭. সৃজনশীল চিন্তা
সব সমস্যার সমাধান একভাবে হয় না। অনেক সময় পরিচিত পদ্ধতি কাজ না করলে নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজন হয়। সৃজনশীল চিন্তা মানুষকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয় দেখতে এবং নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
এই মানসিকতা প্রশ্ন করতে শেখায়, নতুন ধারণা তৈরি করতে উৎসাহ দেয় এবং সাধারণ বিষয়ের মধ্যেও নতুন পথ খুঁজে নিতে সাহায্য করে। ফলে কাজের মান উন্নত হয় এবং সমস্যা সমাধানও আরও কার্যকর হয়।
১৮. অধ্যবসায়
জীবনের পথে বাধা আসা স্বাভাবিক। অনেক সময় পরিকল্পনা ভেঙে যায় বা মনে হয় এগোনো কঠিন। কিন্তু যারা ধীরে হলেও চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার শুরু করে, তারাই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যায়।
অধ্যবসায় মানুষকে শেখায় যে সাময়িক বাধা মানেই শেষ নয়। বরং সেই অভিজ্ঞতাই সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
১৯. চাপ নিয়ন্ত্রণ
জীবনে নানা কারণে চাপ আসতে পারে—কাজের দায়িত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন বা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। এগুলি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়, তবে সেগুলি সামলানোর দক্ষতা গড়ে তোলা জরুরি।
নিজের মন ও শরীরের যত্ন নেওয়া, প্রয়োজনে বিরতি নেওয়া, হাঁটাহাঁটি করা বা চিন্তাগুলি গুছিয়ে নেওয়ার মত ছোট অভ্যাস চাপ কমাতে সাহায্য করে। চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মানুষ ভেতর থেকে আরও স্থির থাকে এবং পরিষ্কারভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
২০. অন্যের প্রতি বিবেচনা
আমরা সবাই চাই অন্যরা আমাদের সম্মান করুক এবং আমাদের অনুভূতির মূল্য দিক। ঠিক তেমনভাবেই অন্য মানুষের প্রতিও সেই মনোভাব দেখানোই হল বিবেচনাশীলতা। ছোট ছোট বিষয়—কারও কথা মন দিয়ে শোনা, তার অসুবিধা বোঝার চেষ্টা করা বা আচরণে একটু যত্নশীল হওয়া—সম্পর্ককে আরও সুন্দর করে তোলে। যখন কেউ শুধু নিজের নয়, অন্যের দিকটিও গুরুত্ব দেয়, তখন তার উপস্থিতি অন্যদের কাছে আরও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২১. আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা
মানুষের জীবন শুধু যুক্তি দিয়ে নয়, অনুভূতি দিয়েও পরিচালিত হয়। নিজের আবেগ বুঝতে পারা, সেগুলি নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষমতাই হল আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা।
এই দক্ষতা মানুষকে পরিস্থিতি অনুযায়ী সংযতভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে সাহায্য করে, ভুল বোঝাবুঝি কমায় এবং সম্পর্ককে আরও স্থিতিশীল করে। ফলে ব্যক্তিগত জীবন থেকে নেতৃত্ব—সব ক্ষেত্রেই আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২২. দায়িত্ব বণ্টন
সব কাজ একা করা সব সময় সম্ভব নয়, আবার প্রয়োজনও হয় না। অনেক সময় লক্ষ্য অর্জনের জন্য অন্যদের ওপর ভরসা করা এবং কাজ ভাগ করে দেওয়া জরুরি। দায়িত্ব বণ্টন মানে বুঝে-শুনে কাজ ভাগ করা, যাতে প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখতে পারে। এতে কাজ সহজ হয়, সময় বাঁচে এবং দলের মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়।
২৩. সততা ও নৈতিকতা
দীর্ঘদিন ভাল সম্পর্ক বজায় রাখার অন্যতম ভিত্তি হল সততা ও নৈতিকতা। কথাবার্তা ও কাজে সৎ থাকলে অন্যদের জন্য আপনার ওপর ভরসা করা সহজ হয়। সৎ ও নীতিবান আচরণ অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ ও ভুল বোঝাবুঝি কমায়। এতে সম্পর্ক আরও স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল হয় এবং কাজ বা ব্যক্তিগত জীবনে এগিয়ে যাওয়াও সহজ হয়ে ওঠে।
২৪. ভদ্রতা
ভদ্রতা ছোট একটি বিষয় মনে হলেও এর প্রভাব বড়। সম্মানজনকভাবে কথা বলা, ধন্যবাদ জানানো বা প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়ার মত আচরণ সম্পর্ককে সুন্দর ও স্বস্তিদায়ক করে। ভদ্রতা মানে শুধু ভাল ব্যবহার নয়, বরং অন্যকে মানুষ হিসেবে মূল্য দেওয়া। এই গুণ সামাজিক যোগাযোগকে সহজ করে এবং আশেপাশের মানুষের কাছে আপনাকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
২৫. আত্মনিয়ন্ত্রণ
আত্মনিয়ন্ত্রণ হল নিজের আবেগ ও আচরণকে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে পারার ক্ষমতা। হঠাৎ রাগ, হতাশা বা তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সময় সমস্যার কারণ হয়।
যারা নিজেকে সামলে চিন্তা করে কাজ করতে পারে, তারা সম্পর্ক, কাজ ও জীবনের বড় চ্যালেঞ্জগুলি আরও ভালভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়। আত্মনিয়ন্ত্রণ তাই ব্যক্তিগত স্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি সফলতার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।
এই সফট স্কিলগুলি এমন কিছু গুণ, যা ধীরে ধীরে একজন মানুষের জীবনকে আরও সহজ, ভারসাম্যপূর্ণ ও অর্থপূর্ণ করে তোলে। এগুলি রাতারাতি তৈরি হয় না, সচেতন চর্চা ও অভ্যাসের মধ্য দিয়ে সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে।
যখন এই দক্ষতাগুলি আমাদের আচরণ, চিন্তা ও সম্পর্কের ভেতরে জায়গা করে নিতে শুরু করে, তখন ছোট ছোট পরিবর্তনই বড় পার্থক্য তৈরি করে। ফলে মানুষ শুধু কাজের ক্ষেত্রে নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও আরও পরিণত, আত্মবিশ্বাসী ও স্থির হয়ে উঠতে পারে। City Alo
৪
“Antifragile”। তাঁর মতে পৃথিবীতে তিন ধরনের ব্যবস্থা আছে—
কিছু জিনিস চাপ বা ধাক্কায় ভেঙে যায়, কিছু টিকে থাকে, আর কিছু আছে যেগুলো ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা থেকে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তালেব এই তৃতীয় অবস্থাকেই বলেছিলেন “অ্যান্টিফ্র্যাজাইল”।
মানুষ, সমাজ বা প্রতিষ্ঠান যদি এমনভাবে তৈরি হয় যে ধাক্কা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও শক্তিশালী হয়, তখনই তারা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে।
তালেব আরেকটি তীব্র সমালোচনাও করেন—অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী বিশেষজ্ঞদের। তাঁর মতে অনেক অর্থনীতিবিদ বা বিশ্লেষক এমনভাবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন যেন পৃথিবী পুরোপুরি হিসাবের মধ্যে বন্দী। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবী অনেক বেশি জটিল ও অনিশ্চিত।
তালেব আমাদের শেখান একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধি—
পৃথিবীকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা না করে বরং এমন জীবন ও ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত, যা অনিশ্চয়তার মাঝেও টিকে থাকতে পারে।
আজকের পৃথিবীতে যেখানে অর্থনীতি, রাজনীতি ও প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত অপ্রত্যাশিতভাবে বদলে যাচ্ছে, তালেবের দর্শন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—
সবচেয়ে বড় বুদ্ধি কখনো কখনো ভবিষ্যৎ জানার মধ্যে নয়, বরং অনিশ্চয়তার জন্য প্রস্তুত থাকার মধ্যে।
৫
কুর্দি জনগোষ্ঠী: ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার বিস্তারিত পরিচয়
ভৌগোলিক বিস্তার
কুর্দিরা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন জাতিগোষ্ঠী, যারা প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশের পার্বত্য অঞ্চলজুড়ে বসবাস করে। এই অঞ্চলটি সাধারণভাবে 'কুর্দিস্তান' নামে পরিচিত। দেশগুলো হলো:
তুরস্ক: এখানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কুর্দি জনগোষ্ঠীর বসবাস।
ইরাক: এখানে 'ইরাকি কুর্দিস্তান' নামে তাদের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল রয়েছে।
ইরান: দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় কুর্দিরা বাস করে।
সিরিয়া: উত্তরাঞ্চলের রোজাভা এলাকায় তাদের বসতি রয়েছে।
ভাষা ও পরিচয়
কুর্দি ভাষা ইন্দো-ইরানীয় ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তাদের প্রধান তিনটি উপভাষা হলো কুরমানজি, সোরানি এবং পেহলেভানি। তাদের সমৃদ্ধ সাহিত্য ও লোকগাথায় এই ভাষার গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো
কুর্দি সমাজ মূলত পরিবারকেন্দ্রিক এবং সেখানে বড় বা যৌথ পরিবার ব্যবস্থা এখনো প্রচলিত।
মর্যাদা ও সম্মান: কুর্দি সমাজে পরিবারের সুনাম রক্ষা করা এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মূল্যবোধ।
অতিথি আপ্যায়ন: অতিথিদের চা, রুটি ও স্থানীয় খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করাকে তারা সামাজিক দায়িত্ব বলে মনে করে।
বিবাহের রীতিনীতি
কুর্দি সংস্কৃতিতে বিবাহ একটি বড় উৎসবের মতো। বিয়ের অনুষ্ঠানে তারা 'গোভেন্দ' নামক ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য পরিবেশন করে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই এসময় উজ্জ্বল ও রঙিন পোশাক পরিধান করেন।
উৎসব: নওরোজ
কুর্দিদের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো 'নওরোজ', যা প্রতি বছর ২১ মার্চ বসন্তের আগমন উপলক্ষে পালিত হয়। পাহাড়ে আগুন জ্বালানো, দলবদ্ধ নাচ এবং লোকসংগীত এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা তাদের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক।
ধর্ম ও সংস্কৃতি
কুর্দিদের অধিকাংশই সুন্নি মুসলমান হলেও তাদের মধ্যে ধর্মীয় বৈচিত্র্য রয়েছে। এছাড়া ইয়াজিদি, আলেভি এবং খ্রিস্টান কুর্দি সম্প্রদায়ের মানুষও সেখানে বসবাস করে। তাদের সংগীতে 'দেংবেজ' নামক এক ধরনের লোকগাথা প্রচলিত, যার মাধ্যমে তারা ইতিহাস ও বীরত্বের গল্প তুলে ধরে।
পোশাক ও খাদ্য
পোশাক: পুরুষরা সাধারণত ঢিলেঢালা প্যান্ট, লম্বা জামা ও কোমরে কাপড়ের বেল্ট পরেন। নারীরা পরেন নকশা করা লম্বা পোশাক ও অলংকার।
খাবার: তাদের প্রধান খাবারের তালিকায় রয়েছে ডলমা, কাবাব, পিলাফ (ভাত) এবং বিভিন্ন ধরনের রুটি ও দই।
সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
কুর্দিদের রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘ সংগ্রামের। বর্তমানে তারা আধুনিক শিক্ষা ও ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে কিছু অঞ্চলে এখনো রক্ত প্রতিশোধ বা বাল্যবিবাহের মতো কিছু প্রাচীন সামাজিক সমস্যা রয়ে গেছে, যা আধুনিকতার ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে কমে আসছে।
৬
চাঁদ কেন ১৪ দিনে পরিপূর্ণ হয়?
চাঁদ আসলে নিজের আলো দেয় না, এটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। তাই আমরা চাঁদের আকার পরিবর্তন (Moon Phases) দেখি।
চাঁদের পর্যায়
চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে, প্রায় ২৭.৩ দিনের কক্ষপথ আছে।
যখন চাঁদ সূর্যের পাশে থাকে → আমরা চাঁদ দেখতে পাই না → New Moon।
চাঁদ আস্তে আস্তে আমাদের দিকে বেশি আলো দেখায় → Waxing Phases।
প্রায় ১৪ দিনে চাঁদ পূর্ণ আলো দেখায় → Full Moon।
এরপর আলো আবার কমতে থাকে → Waning Phases, এবং পরবর্তী ১৪ দিনে আবার নতুন চাঁদ আসে।
কেন ১৪ দিন?
চাঁদের কক্ষপথ এবং সূর্যের অবস্থানের কারণে আলোয় পরিবর্তন আমরা ১৪ দিনে দেখি পূর্ণ → অর্ধ → আবার নতুন।
তাই প্রতি মাসে দুইটা গুরুত্বপূর্ণ চাঁদ থাকে: New Moon এবং Full Moon।
মজার তথ্য: চাঁদ পুরোপুরি পূর্ণ হওয়া এবং Horizon-এ বড় দেখার সময় মানুষ প্রায়ই “Supermoon” মনে করে।
৭
প্রি-ডায়াবেটিস কী? এটি কীভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব?
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের আগের পর্যায় হলো প্রি-ডায়াবেটিস। একটু সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে, প্রি-ডায়াবেটিস এর অর্থ হলো আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, কিন্তু ওই মাত্রা টাইপ-২ ডায়াবেটিস হিসেবে গণ্য হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়।
'ডায়াবেটিস ইউকে' নামক যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল অ্যাডভাইজার এস্থার ওয়ালডেন এই বিষয়ে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য ব্যাখ্যা করেছেন।
তার কথায়, "জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে বিশেষত খাদ্যাভ্যাসে বদল এনে আপনি শুধু টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধই করতে পারবেন না, প্রি-ডায়াবেটিস থেকেও পুরোপুরি মুক্তিও পেতে পারেন।"
এস্থার ওয়ালডেন ব্যাখ্যা করেছেন, "কোনো কোনো ব্যক্তি যখন জানতে পারেন, তারা প্রি-ডায়াবেটিস পর্যায়ে রয়েছেন, তখন তারা ভাবতে শুরু করেন এইবার টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়া অবধারিত। তবে অনেকেই এই ঝুঁকি কিন্তু কমানো সম্ভব।"
"শতকরা ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে সঠিক সাহায্য পেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা বা এড়ানো যায়। স্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি করা এবং যদি আপনার ওজন বেশি হয়ে থাকে, তাহলে তা কমানোর মাধ্যমে এমনটা করা সম্ভব।"
প্রি-ডায়াবেটিস সম্পর্কে কীভাবে জানবেন?
প্রায়শই প্রি-ডায়াবেটিসের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তাই আপনি সেই পর্যায়ে রয়েছেন কি না, সে সম্পর্কে নাও জানতে পারেন।
ইউনিভার্সিটি অফ নটিংহ্যাম-এর 'নিউট্রিশান অ্যান্ড ডায়েটেটিক্স'-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. অ্যামান্ডা অ্যাভেরি বলেন, "দুর্ভাগ্যবশত, বেশিরভাগ মানুষ তাদের প্রি-ডায়াবেটিসের বিষয়ে জানতে পারেন যখন রুটিন চেক-আপের সময় যখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, এথনেসিটি বা নৃতাত্বিক পরিচয়, বয়স, ডায়েট ও ওজনের মতো অনেক কারণে প্রি-ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এই বিষয়গুলোর সবকটাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে মনে করেন তারা।
ড. অ্যামান্ডা অ্যাভেরি ব্যাখ্যা করেন, "ইনসুলিন এমন এক প্রকার হরমোন যা অগ্ন্যাশয়ে উৎপাদিত হয় এবং এটা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাকে স্বাভাবিক স্তরে রাখতে সহায়তা করে। যদি কোনো ব্যক্তির ওজন বেশি হয়, বিশেষত পেটের চারপাশে মেদ থাকে তাহলে, ইনসুলিনের পক্ষে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।"
"আসলে, যখন শরীরের চর্বি বৃদ্ধি পায় তখন কোষগুলো ইনসুলিনের প্রভাবের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শরীর আরও ইনসুলিন তৈরির চেষ্টা করে। তবে এই প্রচেষ্টা সবসময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না।"
তাই বিশেষজ্ঞদের মতে লাইফস্টাইল ও খাদ্যাভ্যাসের কারণে শরীরের মেদ বাড়তে পারে যা প্রি-ডায়াবেটিসের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ডায়েটে বদল
এস্থার ওয়ালডেন বলেছেন, "প্রত্যেক মানুষ আলাদা, তাই প্রি-ডায়বেটিস পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের সবার জন্য কোনো নির্দিষ্ট এক ধরনের ডায়েট থাকা সম্ভব নয়।"
"তবে কিছু ডায়েট যেমন বেশি পরিমাণে চর্বিযুক্ত খাবার, উচ্চ জিআই (গ্লাইসেমিক ইনডেক্স) রয়েছে এবং কম ফাইবারযুক্ত খাবার টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।"
গবেষণা বলছে, এখানে চারটে বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায়।
ওজন কমানোর বিষয়ে ভাবনা চিন্তার আগে সবসময় ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিৎ। চিকিৎসকের কাছে জানতে চাওয়া উচিৎ আপনার ওজন বাড়ার সঙ্গে প্রি-ডায়াবেটিসের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না। পাশাপাশি শারীরিক পরিস্থিতি, মেডিক্যাল হিস্ট্রি ইত্যাদির কথা মাথায় রেখে চিকিৎসকদের কাছ থেকে জানা উচিৎ যে কিছুটা পরিমাণ ওজন হ্রাস করা আপনার স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল কি না।
'লাইফ উইদাউট ডায়াবেটিস' বইয়ের লেখক এবং চিকিৎসক, গবেষক অধ্যাপক রয় টেইলর ২০১১ সালে তার গবেষণায় প্রথমবার প্রমাণ করেন যে টাইপ-২ ডায়াবেটিস 'রিভার্স' করা সম্ভব।
তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, "বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে, তাদের বর্তমান ওজনের মাত্র ১০% হ্রাস করলে এই সমস্যার সমাধান মিলতে পারে, কারণ এতে লিভারে জমা চর্বিও কমবে।"
"দশ বছর আগে পর্যন্ত এই পন্থাকেই কোনো জাদুর চেয়ে কম বলে মনে করা হতো না। কারণ এর পরে, ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হতে পারে, যদি না আবার ওজন বেড়ে যায়।"
কত ওজন কমল তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কোনো ব্যক্তির মোট ওজনের কতটা কমল।
ডা. রয় টেইলর বলেন, "স্থূলতার সংজ্ঞা এখানে ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেউ যখন তার দেহের পার্সোনাল ফ্যাট থ্রেশহোল্ড অতিক্রম করে ফেলেন, তখন প্রি-ডায়াবেটিস হতে পারে এবং এই থ্রেশহোল্ড যে কোনও ওজনেই হতে পারে।"
পার্সোনাল ফ্যাট থ্রেশহোল্ড ইঙ্গিত করে যে লিভার এবং অগ্ন্যাশয়ের মতো অঙ্গে জমা হওয়ার আগে প্রত্যেক ব্যক্তির দেহ অ্যাডিপোজ টিস্যুতে (চর্বি কোষ) কতটা চর্বি নিরাপদে সংরক্ষণ করতে পারে। এর একটা সীমা রয়েছে।
ডা. টেইলরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই থ্রেশহোল্ড প্রত্যেক মানুষের জন্য আলাদা। তাই যে সমস্ত মানুষ স্থূলতার আওতায় পড়েন না, তাদেরও প্রি-ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকতে পারে।
যদিও বিশেষজ্ঞরা সাধারণত দ্রুত ওজন কমানোর ডায়েট এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়ে থাকেন, কিন্তু ডা. টেইলরের মতে, এটা প্রি-ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে উপকারী বলে প্রমাণিত হতে পারে।
তার কথায়, "প্রত্যেক মানুষই আলাদা, কিন্তু মনে রাখবেন দ্রুত ওজন কমানো (যেমন দিনে মাত্র ৮০০ ক্যালরি ইনটেক করা) বারবার প্রমাণ করেছে যে সেটা টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে পারে।"
তবে এই সময়ে শরীর যাতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে থাকে তা লক্ষ্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জোর দিয়েছেন তিনি।
২. ওজন কমলে তা বজায় রাখা
কেউ কেউ খুব কম ক্যালরিযুক্ত খাবার খেয়ে দ্রুত অনেকটা ওজন কমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এমন ডায়েট দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই দীর্ঘ সময়ের জন্য যাতে ওজন কম রাখার সম্ভব হয়, তেমন উপায় খুঁজে বের করা দরকার।
'ডায়াবেটিস ইউকে'-র তথ্য বলছে, নিরামিষ খাবার খাওয়া, ভিগান ডায়েট এবং খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমানো টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে। শুধু তাই নয়, এই জাতীয় ডায়েট অন্য কড়া ডায়েট মেনে চলার চেয়ে সহজ।
এই ধরনের খাবার উচ্চ ফাইবারযুক্ত এবং সেখানে গ্লাইসেমিক সূচকও (লো-জিআই) কম থাকে, তাই সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য তা উপকারী।
৩. যে খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলা উচিৎ
গবেষণা বলছে কিছু খাবারের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় সেই সমস্ত খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিলে, উপকার মিলবে।
এস্থার ওয়ালডেন ব্যাখ্যা করেছেন, এই খাবারের তালিকায় আছে:
সুগারযুক্ত পানীয়
এই জাতীয় পানীয়তে বেশি পরিমাণে ক্যালোরি থাকে কিন্তু খেলে পেট ভরে না। পাশাপাশি এগুলো রক্তে সুগারের পরিমাণ দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, যা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। এই কারণে শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সমস্যা বাড়তে পারে।
অ্যাডেড সুগারযুক্ত পানীয় এই তালিকায় রয়েছে।
রেড মিট এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, অতিরিক্ত পরিমাণে রেড মিট বা প্রক্রিয়াজাত মাংস খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, "বেশি স্টার্চ, কম ফাইবারযুক্ত খাবার টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।" এই সমস্ত খাবারের তালিকায় রয়েছে হোয়াইট ব্রেড, ময়দা দিয়ে তৈরি স্ন্যাক্স, মিষ্টিযুক্ত স্ন্যাক্স যেমন পেস্ট্রি, ক্যান্ডিসহ আরো অনেক খাবার।
পরিশোধিত কার্বসে প্রায়শই এটা পাওয়া যায়। কারণ তৈরির সময় এই সমস্ত খাবার থেকে ফাইবার সরিয়ে ফেলা হয়, এতে সেখানে স্টার্চের অনুপাত বেড়ে যায়।
আলু (বিশেষত ফ্রেঞ্চ ফ্রাই)
ডায়াবেটিস ইউকে জানিয়েছে ঘন ঘন আলু খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এমনটা ভাবার কারণ এক্ষেত্রে উচ্চ জিআই (গ্লাইসেমিক সূচক) রয়েছে। একটা সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে "আলুর পরিবর্তে যারা গোটা শস্য খান তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কম।"
৪. যে সমস্ত খাবার খাওয়া যেতে পারে
"গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে নির্দিষ্ট কিছু খাবারের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক রয়েছে," এস্থার ওয়ালডেন বলেছেন। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে:
ফল এবং সব্জি
২০১২ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, টাইপ -২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে মূলযুক্ত শাক-সব্জি এবং সবুজ শাক-সব্জির যোগ রয়েছে। ২০১৩ সালের এক অন্য এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে কয়েকটা নির্দিষ্ট ফল ওই ঝুঁকি কমাতে পারে। এই তালিকায় শীর্ষে আছে ব্লুবেরি, আঙ্গুর এবং আপেল।
গোটা শস্য
অনেক গবেষণা বলছে, ডায়েটে গোটা শস্যজাতীয় খাবারের পরিমাণ বাড়ালে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে। ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে তিন ধরনের গোটা শস্য (প্রায় ৪৫ গ্রাম) খেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ২০% কমে যেতে পারে।
দই এবং পনির
দেখা গেছে যে যারা প্রতিদিন দুগ্ধজাত খাবার খান, তারা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ৫% কমাতে পারেন। যদি তারা কম চর্বিযুক্ত দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খান, তাহলে ওই ঝুঁকি ১০% হ্রাস করা যেতে পারে। ২০১৬ সালের এক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নিয়মিত দই খেলে ওই ঝুঁকি ১৪% কমে যায়।
মিষ্টি ছাড়া চা এবং কফি
একটা সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যারা নিয়মিত কফি পান করেন (ক্যাফিনেটেড বা ডিক্যাফ), তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কম।
অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন চা পান করেন (ব্ল্যাক টি বা গ্রিন টি), তাদেরও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কম।
আতঙ্কিত হবেন না
আপনি প্রি-ডায়াবেটিস-এ আক্রান্ত এমনটা জানলে ভয়ের কোনো কারণ নেই। ডা. আমান্ডা অ্যাভেরি বিষয়টাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, এটা আপনার স্বাস্থ্যের উন্নতি করার এবং সম্ভবত টাইপ-২ ডায়াবেটিসের বিকাশ রোধ করার একটা সুযোগ।
যদি আপনি আপনার ডায়েট সম্পূর্ণভাবে বদলে ফেলা সম্ভব নয় বলে মনে করেন, তবে ডা. অ্যাভেরি ছোট এবং সহজ পদক্ষেপ দিয়ে এই কাজ শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন।
তার কথায়, "ডায়েটের ক্ষেত্রে একেবারে ছোটখাটো পরিবর্তনগুলোও কিন্তু অনেক বড় পার্থক্য আনতে পারে, বিশেষত যদি এটা কাউকে কিছুটা স্বাস্থ্যকর জায়গায় নিয়ে যেতে পারে।"
৮
মূত্রথলির আকার এক হলেও নারীরা কেন পুরুষদের তুলনায় বেশিবার প্রস্রাব করে?
পুরুষ ও নারী উভয়ের মূত্রথলি বা মূত্রাশয় ৪০০ থেকে ৬০০ মিলিলিটার প্রস্রাব ধরে রাখতে পারে
নারীরা ঘনঘন বাথরুমে যাওয়ার তাগিদ বা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারে ঠিকই। কিন্তু নারী আর পুরুষের মূত্রথলির আকারে প্রকৃত অর্থে খুব বেশি তফাৎ নেই। আমাদের মূত্রথলি অনেকটা পেশিবহুল ফোলানো বেলুনের মতো, যা প্রসারিত হতে পারে। এর দু'টো গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে। এক, ডিট্রুজার মাসল। দুই, ট্রানজিশনাল এপিথেলিয়াম।
ডিট্রুজার হলো মূত্রথলির দেয়ালে থাকা মসৃণ পেশি। এর বিশেষ এক ইলাস্টিক ক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ, এটি অনেক বেশি সম্প্রসারিত হতে পারে। তাই, থলিতে মূত্র জমে গেলেও এটি সহজে মস্তিষ্কে এই সংকেত দেয় না যে "থলি ভর্তি" হয়ে গেছে।
যখন থলিতে অনেক বেশি মূত্র জমে যায়, তখন মাসল সংকুচিত হয়ে মূত্র বের করে দেয়।
মূত্রথলির ভেতরে যে আস্তরণ থাকে, তার নাম ট্রানজিশনাল এপিথেলিয়াম, যা অনেকটা ভাঁজের মতো। মূত্র জমা হলে এটি নিজের আকৃতি বদলায়। কখনো প্রসারিত হয়, কখনো লম্বা হয়ে যায়, যাতে করে মূত্রথলি বেশি করতে প্রস্রাব ধরতে পারে।
এই আস্তরণটি আবার প্রস্রাবে থাকা বিষাক্ত উপাদান থেকে ভেতরের টিস্যুগুলোকে রক্ষা করে।
মূত্রথলির এই ডিজাইনের জন্য মূত্রথলি কোনো প্রকার না ফেটে বা ঢিলেঢালা না হয়ে এবং অহেতুক প্রস্রাবের চাপ অনুভব না করিয়ে জীবনভর প্রসারিত ও সংকুচিত হতে পারে।
নারী ও পুরুষের মূত্রথলির মধ্যে পার্থক্য কী
গাঠনিকভাবে পুরুষ ও নারীর মূত্রথলির মাঝে ভিন্নতার চেয়ে মিল-ই বেশি। উভয়েরই মূত্রথলি অনায়াসে ৪০০ থেকে ৬০০ মিলিলিটার প্রস্রাব ধারণ করতে পারে।
তবে মূত্রথলির চারপাশে যেসব অঙ্গ থাকে, তা প্রস্রাব লাগার অনুভূতিতে পার্থক্য তৈরি করে। আর এখান থেকেই নারী ও পুরুষের মূত্রথলির পার্থক্যের শুরু।
পুরুষদের ক্ষেত্রে মূত্রথলি প্রোস্টেটের ওপরে এবং রেকটামের (মলদ্বারের) সামনে থাকে।
অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে এটি একটি অপেক্ষাকৃত সংকীর্ণ পেলভিক অঞ্চলে থাকে। সেখানে সে জরায়ু ও যোনির সাথে স্থান ভাগাভাগি করে নেয়।
নারীদের গর্ভাবস্থায় বড় হতে থাকা জরায়ু মূত্রথলিকে চেপে ধরে। এই কারণেই শেষ ত্রৈমাসিকে নারীদের প্রায় প্রতি ২০ মিনিট পরপর বাথরুমে যেতে হয়।
যদি গর্ভাবস্থা না-ও থাকে, তারপরও স্থান স্বল্পতার কারণে মূত্রথলিতে তুলনামূলক সামান্য পরিমাণ প্রস্রাব জমলেই নারীরা প্রস্রাবের 'প্রেসার' বা 'বেগ' অনুভব করাতে পারে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা তুলনামূলকভাবে কম প্রস্রাব জমলেই 'পূর্ণ ব্লাডার' বা মূত্রথলি ভর্তি হওয়ার অনুভব পেতে পারেন। এর কারণ হতে পারে হরমোনের প্রভাব, সংবেদনশীলতার তারতম্য বা পেলভিক ফ্লোর ও ব্লাডারের প্রসারণের মধ্যকার জটিল সম্পর্ক।
পেলভিক ফ্লোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশিগুচ্ছ যা মূত্রথলি, জরায়ু ও অন্ত্রকে সমর্থন দেয়।
নারীদের ক্ষেত্রে প্রসব, হরমোন পরিবর্তন বা বয়সের সাথে সাথে এই পেশিগুলো দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তখন নারীদের মূত্রথলির 'ধরে রাখা' ও 'ছাড়ার' মধ্যকার নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
এই নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নির্ভর করে "এক্সটারনাল ইউরেথ্রাল স্পিঙ্কটার" নামক পেশির ওপর, যা মূত্রনালীর শেষপ্রান্তে একটি 'গেটকিপার' বা দ্বাররক্ষীর মতো ভূমিকা পালন করে।
এই পেশিটিই সামাজিকভাবে উপযুক্ত সময় পর্যন্ত প্রস্রাব আটকে রাখতে সাহায্য করে।
এই স্পিঙ্কটার নামের পেশিটি পেলভিক ফ্লোরের অংশ এবং অন্যান্য পেশির মতোই এটি তার শক্তি হারাতে পারে বা নতুনভাবে এটিকে প্রশিক্ষিতও করা যেতে পারে।
এছাড়া, নারীদের ক্ষেত্রে মূত্রনালী ছোট হওয়ায় ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা ইউটিআই-এর ঝুঁকি বেশি থাকে। এই সংক্রমণ মূত্রথলিকে অতিমাত্রায় সংবেদনশীল করে তুলতে পারে, যার ফলে সংক্রমণ সেরে গেলেও বারবার প্রস্রাবের অনুভূতি হতে পারে।
ছবির উ
বাথরুমের অভ্যাস সংস্কৃতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই অনেক মেয়েকেই শেখানো হয়, 'আগেই বাথরুমে যাও' বা, পাবলিক টয়লেট এড়িয়ে চলো।
দীর্ঘদিনের এই অভ্যাসের ফলে তারা প্রয়োজনের আগেই প্রস্রাব করে ফেলতে শেখে, যার কারণে তাদের ব্লাডার বা মূত্রথলি পুরোপুরি প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পায় না।
পুরুষদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। তাদের অপেক্ষা করতে বা ধৈর্য ধরতে উৎসাহ দেওয়া হয়।
আর, যারা কখনো সন্তর্পণে পাবলিক টয়লেটের সিট ব্যবহার করেছেন, তারা জানেন যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে দুশ্চিন্তা আমাদের আচরণে ঠিক কতখানি প্রভাব ফেলে।
এদিকে, মূত্রথলি বা ব্লাডারের আকার পরিবর্তন করা না গেলেও, এর সহ্যক্ষমতা বাড়ানো যায়।
এই পদ্ধতিকে বলে মূত্রথলি প্রশিক্ষণ। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইসএস) ও ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জনস এই প্রশিক্ষণকে উৎসাহ দেয়।
এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বাথরুমে যাওয়ার সময়ের ব্যবধান বাড়ানো হয়।
এর ফলে মস্তিষ্ক ও মূত্রথলির মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ আবার গড়ে ওঠে। এতে একদিকে যেমন মূত্রথলির ধারণক্ষমতা বাড়ে, অপরদিকে প্রস্রাব করার তাগিদও কমে যায়।
এই পদ্ধতির সঙ্গে পেলভিক ফ্লোর এক্সারসাইজ যুক্ত করলে আরও কার্যকর হয়। বিশেষ করে, যাদের হঠাৎ হাঁচি-কাশিতে বা চাপে প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়ার সমস্যা আছে, তাদের জন্য এটি একটি সহজ ও অস্ত্রোপচারবিহীন সমাধান।
অর্থাৎ, মহিলাদের মূত্রথলি আকারের দিক থেকে ছোট না হলেও শারীরিক গঠন এবং সামাজিক কারণে তাদের টয়লেট ব্যবহারে একটু বেশি অসুবিধা হয়।
তাই, কেউ যদি টয়লেটে যাওয়ার কথা শুনে বিরক্ত হয়, তাকে বোঝান যে এটি কোনো ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা বা ছোট মূত্রথলির ব্যাপার না। এটি শরীরের গঠন, অভ্যাস আর হরমোনের প্রভাব। BBC
৯
ক্ষুধা লাগলে মেজাজ খারাপ লাগে কেন?
ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমাদের মধ্যে ক্লান্তি, বিভ্রান্তি বা রাগের মতো আবেগগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আর এসব কিছুর জন্য দায়ী হলো চিনি– বিশেষত গ্লুকোজ– যা আমাদের রক্তে সঞ্চালিত হয়।
যখন এর মাত্রা কমে যায়, তখন আমাদের শরীর তা পুনরুদ্ধারে ধারাবাহিক কিছু প্রতিক্রিয়া দেখায়।
দুর্বল ও খিটখিটে বোধ করা, মাথা ঘোরা এবং মনোযোগে অসুবিধার মতো বিষয়গুলো দিয়ে বোঝা যায় যে মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্লুকোজ পাচ্ছে না। ক্ষুধার্ত অবস্থায় রক্তে কর্টিসলের উপস্থিতি মস্তিষ্কের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে, এই সম্মিলিত প্রভাবের ফলেই ক্ষুধার্ত থাকা অবস্থায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিরক্ত বা রাগ লাগে। কেবল মানুষের ক্ষেত্রেই এমন হয় না। ক্ষুধার্ত বোধ করলে এই প্রাণীরাও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
মাথা ন্যাড়া করলে কি গরম কমে?
ছোটবেলায় গরমের ছুটিতে বাচ্চাদের মাথার চুল কামিয়ে ন্যাড়া করে দেয়ার স্মৃতি আছে হয়তো অনেকের। “চুল ছোট থাকলে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়। তবে, এর বাড়তি কোনো হেলথ বেনিফিট (স্বাস্থ্যগত সুবিধা) নেই।” তবে, মাথায় সরাসরি সূর্যালোক যাতে না পড়ে, সেজন্য রোদে বের হলে ক্যাপ বা ছাতা ব্যবহার করতে হবে, বলেন তিনি।
১০
‘সুপার ফুড’ সজিনার ভালোমন্দ
একইসঙ্গে পুষ্টিগুণ ও ঔষধিগুণ থাকায় সজিনাকে ‘অত্যাশ্চার্য বৃক্ষ’ ও ‘পুষ্টির ডিনামাইট’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। সবজির চেয়ে এর পাতার গুণাগুণ আরও বেশি। সজিনা পাতায় নয় ধরনের অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো এসিডসহ ৩৮ শতাংশ আমিষ বিদ্যমান।
এছাড়াও এতে আছে আয়রন, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন এ, বি এবং সি।
সজিনার বীজে থাকে প্রোটিন এবং ওমেগা -৩ ফ্যাটি অ্যাসিড।সজিনায় প্রচুর পরিমাণে এন্টি অক্সিডেন্ট এবং অ্যামিনো এসিড থাকায় এটি ত্বকের এবং চুলের জন্য খুব উপকারী। সজিনা গাছের শুকনো পাতায় কমলালেবুর সাত গুণ ভিটামিন সি, দইয়ের চেয়ে নয় গুণ বেশি প্রোটিন, গাঁজরের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ভিটামিন এ এবং কলার চেয়ে ১৫ গুণ বেশি পটাসিয়াম থাকে।
এছাড়াও এতে দুধের চেয়ে ১৭ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম এবং পালং শাকের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি আয়রন থাকার ধারনা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
১১
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর আটটি উপায়
আপনি কি কখনও এমন অবস্থায় পড়েছেন যেখানে আপনি কারও নাম বা কোনও জায়গার নাম মনে করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছে না? অনেকেই বলে থাকেন যে বয়সের সাথে সাথে আমাদের স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। এমনকি যুক্তি দেয়ার সক্ষমতাও কমে আসে।
তবে আশার কথা হচ্ছে, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ফিরিয়ে আনা যায়।
নিচের কিছু মানসিক চর্চা আর কৌশলের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে আবার শানিয়ে নেয়া সম্ভব।
১. ব্যায়াম
এটা আসলেই সত্যি আমরা শরীর চর্চা বা ব্যায়াম করলে আমাদের মস্তিষ্কের উন্নতি ঘটে।
ব্যায়ামের কারণে মস্তিষ্কের সাইন্যাপসিস বা যে অংশে দু'টি কোষের নিউরনের মধ্যে স্নায়বিক বৈদ্যুতিক স্পন্দন আদান-প্রদান ঘটে তা বেড়ে যায়। ফলে মস্তিষ্কে আরও বেশি যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং অতিরিক্ত কোষ গঠিত হয়।
হৃদযন্ত্র সুস্থ থাকার মানে হচ্ছে আপনি আরও বেশি অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারবেন এবং শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতে পারবেন।
আর আপনি যদি বাসার বাইরে বা খোলা যায়গায় শরীর চর্চা করেন তাহলে সেটি আরও বেশি ভালো। কারণ এতে করে আপনি বেশি পরিমাণে ভিটামিন ডি শোষণ করতে পারবেন।
ব্যায়াম করার সময় নতুন কোনও পরিবেশ ঘুরে দেখুন। এতে অন্য মানুষের সাথে মতামত বিনিময় করা কিংবা তাদের কাছ থেকে নতুন কিছু শেখার সুযোগ হয়। এর মাধ্যমে নতুন কোষগুলোর জন্য আপনি একটি সার্কিট তৈরি করতে পারবেন।
যেমন, আপনি যদি বাগান করতে পছন্দ করেন, তাহলে একা বাগান না করে কোনও একটি গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে বাগান করতে শুরু করুন কিংবা আপনার যে শখটি আছে তা একা একা না করে একই শখ রয়েছে এমন একটি গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে যান। এতে নতুন বন্ধু তৈরি হবে।
শুধু মনে রাখবেন, আপনাকে একটি ভালো সময় কাটাতে হবে। কোন কিছু শেয়ার করার ইচ্ছা বা ভাগাভাগি করার ইচ্ছা মস্তিষ্কে সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া ও ব্যায়ামের উপকারিতা বাড়িয়ে দেয়।
২. চলতি পথে মুখস্থ করা
চলতি পথে মুখস্থ করার অভ্যাস বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত এবং অভিনেতারা এই বিষয়টির চর্চা করেন।
বলা হয় যে, আপনি চলার পথে যদি নতুন কোনও শব্দ বা নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেন তাহলে সেটি বেশি মনে থাকে।
ভবিষ্যতে যদি আপনাকে কোনও প্রেজেন্টেশন বা কোনও বক্তব্য দিতে হয় তাহলে আপনি হাঁটতে হাঁটতে সেটি পড়ে দেখতে পারেন। এমনকি মস্তিষ্ককে মনে রাখতে সাহায্য করতে নাচানাচিও করে দেখতে পারেন।
৩. সঠিক খাবার খান
আপনি যে পরিমাণ শক্তি ও গ্লুকোজ গ্রহণ করেন তার ২০ শতাংশ সরাসরি আপনার মস্তিষ্কে যায়। এ কারণে আপনার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা নির্ভর করে দেহের গ্লুকোজের পরিমাণের উপর।
আপনার দেহের গ্লুকোজের মাত্রা যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে তাহলে আপনার মন ও মস্তিষ্ক অনেকটাই কুয়াশাচ্ছন্ন বা ঝাপসা মনে হতে পারে। আমরা যখন পছন্দের খাবার খাই তখন আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামে এক ধরনের রাসায়নিক নির্গত হয়। এর কারণে আমরা খাওয়ার সময় শান্তি অনুভব করি। কিন্তু শুধু মস্তিষ্কের ক্ষুধা মেটালেই চলে না, পেটের ক্ষুধাও মেটানো দরকার।
মানুষের পরিপাকতন্ত্রে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন অণুজীব থাকে। এরা স্নায়ু ব্যবস্থার মাধ্যমে মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত থাকে। আর তাই মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে হলে এসব অণুজীবের একটা ভারসাম্য রাখতে হয়।
পেটকে বলা যায় ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’। স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার এসব অণুজীবের মাত্রা ঠিক রাখে এবং মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখে।
মস্তিষ্কের কোষ চর্বি দিয়ে গঠিত। তাই খাবার থেকে চর্বি একেবারে বাদ দেয়াটা ঠিক নয়। বিভিন্ন রকমের বাদাম, বীজ, অ্যাভোকাডো, মাছ, রোজমেরি ও হলুদ থেকে প্রাপ্ত ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের জন্য ভালো।
একই সাথে একা একা না খেয়ে অনেকের সাথে মিলে খাওয়ার চেষ্টা করুন। সামাজিকীকরণ আপনার মস্তিষ্কে স্বাস্থ্যকর খাবারের সুফল বাড়িয়ে দেয়।
৪. বিরতি নিন
কিছু চাপ বা স্ট্রেস থাকাটা সবসময়ই দরকার কারণ এটি আমাদের জরুরি অবস্থায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে সহায়তা করে। এটি কর্টিসল নামে এক ধরনের হরমোনের নিঃসরণকে সহায়তা করে যা সাময়িকভাবে আমাদেরকে উজ্জীবিত করে এবং কোনও কিছুর উপর মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা এবং অতিমাত্রায় অস্বস্তিকর চাপ আমাদের মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর।
আর এ কারণেই সময় মতো বিরতি নেয়া এবং আমাদের মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়াটা জরুরি।
তাই সবকিছু থেকে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিরতি নেয়ার অর্থ হচ্ছে, আপনি আপনার মস্তিষ্কের ভিন্ন একটি অংশ ব্যবহার করছেন।
আমাদের মস্তিষ্কে স্বাভাবিকভাবে একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক থাকে যার কাজ হচ্ছে মানুষকে কল্পনা করার ক্ষমতা বা দিবাস্বপ্ন দেখার সক্ষমতা দেয়া। স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিরতি নেয়ার মাধ্যমে আমরা আমাদের মস্তিষ্কের এই অংশকে সক্রিয় করি এবং সেটিকে কাজ করার সুযোগ করে দেই।
যদি আপনার সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং মস্তিষ্ককে শান্ত করাটা কঠিন মনে হয়, তাহলে ধ্যান করার মতো কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে দেখতে পারেন। ধ্যান স্ট্রেস হরমোনের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে।
৫. নতুন চ্যালেঞ্জ নিন
মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ানোর একটি ভালো উপায় হচ্ছে একে কোনও একটা চ্যালেঞ্জ দেয়া, যেমন, নতুন কিছু শেখা।
আর্ট ক্লাসে অংশ নেয়া কিংবা নতুন কোনও ভাষা শেখার মতো কাজ আপনার মস্তিষ্কের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়।
এর অংশ হিসেবে আপনি আপনার পরিবার কিংবা বন্ধুদের সাথে মিলে কোনও একটি অনলাইন গেম শুরু করতে পারেন। এটা শুধু আপনার জন্য একটা চ্যালেঞ্জই হবে না; অন্যদের সাথে প্রতিযোগিতার মানে হচ্ছে আপনার সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া বাড়বে। আর সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করাটা মস্তিষ্কের সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
৬. গান শুনুন
সঙ্গীত মস্তিষ্ককে অসাধারণ উপায়ে উদ্দীপিত করে।
আপনি যদি গান শোনার সময় কিংবা বাদ্য যন্ত্র বাজানোর সময় কারও মস্তিষ্কের চিত্র দেখেন তাহলে দেখবেন যে তার মস্তিষ্কের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
গান সাধারণ বোধশক্তি ও স্মৃতিকে শক্তিশালী করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত রোগীরাও সবার শেষে যা ভুলে যায় তা হচ্ছে গান। তাই নিজে গান করুন বা গান শুনুন।
৭. পড়া এবং ঘুম
আপনি যদি দিনের বেলায় নতুন পড়েন তাহলে, আপনার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে এক ধরনের সংযোগ স্থাপিত হয়।
আর আপনি যখন ঘুমিয়ে যান তখন ওই সংযোগ শক্তিশালী হয় এবং আপনি যা শিখেছেন তা স্মৃতিতে পরিণত হয়।
এ কারণে স্মৃতির জন্য ঘুম খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এ কারণে আপনি যদি কাউকে ঘুমানের আগে কোনো কিছু মুখস্থ করতে দেন তাহলে কারা পরের দিন সকালেও সেটি আরো ভালভাবে মনে করতে পারবেন। কিন্তু কাউকে যদি আপনি সকালে কোনো কিছু মুখস্থ করতে দেন এবং সন্ধ্যায় সেটি মনে করতে বলেন তাহলে তারা সেটি তেমন ভালোভাবে মনে করতে পারবে না।
তাই আপনি যদি কোন পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকেন তাহলে ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রশ্নের উত্তরগুলো মাথায় একবার ঝালিয়ে নিন।
আর আপনি যদি কোন বেদনাদায়ক ঘটনার শিকার হয়ে থাকেন তাহলে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সেটি মনে করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ তাহলে এটি আপনার ওই স্মৃতিকে শক্তিশালী করতে পারে এবং এ সম্পর্কিত নেতিবাচক আবেগ বাড়তে পারে।
একই কারণে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভয়ঙ্কর মুভি কিংবা গল্প শোনা থেকে বিরত থাকুন। এর পরিবর্তে দিনের বেলায় আপনি যেসব ভাল বা সুখকর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন সেগুলো মনে করার চেষ্টা করুন। যাতে করে আপনার মস্তিষ্ক ওই ভাল স্মৃতিতে আটকে থাকে।
৮. ভালোভাবে জেগে উঠুন
ঘুম যেমন স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেমনি আপনি কীভাবে ঘুম থেকে জেগে উঠছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আপনি দিনের বেলায় কতটা সচেতন ও চাঙ্গা থাকবেন তা নির্ভর করবে আপনি কীভাবে ঘুম থেকে জেগে উঠছেন তার উপর।
সাধারণত অন্ধকার ঘরে ঘুমানো উচিত এবং আলো বাড়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে জেগে উঠা উচিত। সাধারণত ভোর বেলা এ ধরণের পরিস্থিতি থাকে।
সূর্যের আলো বন্ধ চোখের পাতার ভেতর দিয়ে গিয়ে মস্তিষ্ককে প্রস্তুত করে জেগে উঠার জন্য। যাতে করে কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ পর্যাপ্ত হয়।
কারণ আপনার দেহে এই হরমোনের মাত্রাই ঠিক করে যে আপনার মস্তিষ্ক সারাদিন কতটা কার্যক্ষম থাকবে।
এক্ষেত্রে আপনি এমন একটি অ্যালার্ম সিস্টেম কিনতে পারেন যেটি ভোর হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে বা ধীরে ধীরে আলো বাড়ায় এবং আপনি স্বাভাবিকভাবেই জেগে উঠতে পারেন।
আর যাদের ঘুম অনেক গভীর হয় তারা এই আলোর সাথে যাতে শব্দ থাকে সেটিও খেয়াল রাখুন।
১২
জেন্ডার আইডেন্টিটি এবং সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন
সাধারণত পুরুষরা নারীর প্রতি এবং নারীরা পুরুষের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন। এই যৌন অভিমুখিতাকে স্ট্রেইট বা বাংলায় বিপরীতকামিতা বলা হয়। অর্থাৎ বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ।
আবার সমকামী অর্থাৎ লেসবিয়ান (নারীর প্রতি নারীর আকর্ষণ), গে (পুরুষের প্রতি পুরুষের আকর্ষণ), বাইসেক্সুয়াল বা উভকামী (নারী পুরুষ উভয়ের প্রতি যৌন আকর্ষণ) ইত্যাদিও বিভিন্ন ধরনের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন।
কেউ যদি জন্মসূত্রে যে লিঙ্গ পেয়েছে তার পরিচয় না দিয়ে ভিন্ন পরিচয় দেয় তাহলে তাকে ট্রান্সজেন্ডার বলা হয়।
যেমন- ট্রান্সজেন্ডার নারী এমন একজন যিনি বর্তমানে নিজেকে নারী হিসাবে পরিচয় দিলেও তিনি জন্মেছেন পুরুষ লিঙ্গ নিয়ে।
তার মুখে দাড়ি, কণ্ঠ মোটা এং শারীরিক গড়ন পুরুষের মতো হলেও তিনি নিজেকে নারী পরিচয় দিয়ে থাকেন। কারণ পুরুষের লিঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য থাকলেও তিনি নিজেকে পুরুষ মনে করেন না। তারা নারীদের মতো বেশ ধরেন, আচার-আচরণ মেয়েলি হয়। এক কথায় পুরুষের কোনো বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে পাওয়া যায় না।
নন বাইনারির মধ্যে বেশ কয়েকটি জেন্ডার পরিচয় রয়েছে। যেমন: জেন্ডার নিউট্রাল, জেন্ডার ফ্লুইড, জেন্ডার কুয়ের, জেন্ডার ডাইভার্স, এজেন্ডার, বাইজেন্ডার, প্যানজেন্ডার, জেন্ডার ফ্লাক্স, ওমনি জেন্ডার, ডেমি জেন্ডার ইত্যাদি।
তবে একটি দল হিসেবে তারা নিজেদের সাধারণত নন বাইনারি বলে উল্লেখ করে থাকে।
যদি কোনো ব্যক্তি মনে করেন যে তিনি পুরুষ কিংবা নারী কোনোটাই নয়, তখন তিনি নন-বাইনারি বা জেন্ডার নিউট্রাল হিসেবে পরিচিত হবেন।
১৩
যার আমলে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেতো
এই কথাটা এতবার শোনা হয়েছে, চিন্তার আগেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে- শায়েস্তা খাঁ! এবং বিপরীতক্রমে, শায়েস্তা খাঁর নাম শুনলে আমার মাথায় এমন একটা চিত্র আসে- বুড়িগঙ্গার তীরে বস্তার পর বস্তা চাল রাখা আছে, আর লোকেরা পকেট থেকে ফটাস করে একটা টাকা ফেলে আটটা করে বস্তা নিয়ে যাচ্ছে।
যদিও প্রকৃত অবস্থাটা এমন ছিল না। প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে এক টাকার মূল্য যথেষ্টই ছিল, সবার পকেটে তো না-ই, অনেকের ঘরেও একটা টাকা থাকতো না। এবং তখনও আধপেটে খাওয়া হাড্ডিসার মানুষ রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াতো। দুর্ভিক্ষ হত, ওরা মরে যেত। ওরা তো রাজা ছিল না, ওদের মৃত্যুর হিসেবও কোথাও থাকে না।
তবে রাজারা কী করেছিল, তার কিছু কিছু হিসাব পাওয়া যায় বটে! এবং শায়েস্তা খাঁর কথা যদি ধরি, তাঁকে সম্ভবত বাংলার সফলতম সুবাদারই বলতে হবে। যদিও তাঁকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছিল ‘শাস্তি’ হিসেবে।
শুনতে অদ্ভুত লাগছে না? তিনশো বছর আগে ঢাকা খানিকটা জঙ্গলই ছিল বলতে হবে, এখানে বদলি হওয়াটা হয়তো দুর্ভাগ্য হিসেবেই দেখা হত। শায়েস্তা খাঁর দুর্ভাগ্যের কারণ ধরা হয় তাঁর এক রাতের অসতর্ক মুহূর্তকে। তিনি যখন পুনের দায়িত্বে ছিলেন, গভীর রাতে বরযাত্রীর ছদ্মবেশে এক দল ডাকাত হই হই করে পুনেতে ঢুকে পড়ে। তাদের সাথে যুদ্ধে নেমে শায়েস্তা খাঁ একটা আঙুল হারান, আর তাঁর ছেলে হয় নিহত।
এতে অবশ্য মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ক্রুদ্ধ হওয়া এড়ানো যায়নি। তিনি দ্রুত শায়েস্তা খাঁকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। বলতে খুব ইচ্ছে করছে, শায়েস্তা খাঁ সম্পর্কে আওরঙ্গজেবের মামা হতেন, অর্থাৎ শায়েস্তা খাঁর বোন হলেন মমতাজ মহল, যার সমাধি ‘তাজমহল’ নামে ভুবনখ্যাত।
শায়েস্তা খাঁ ঢাকার সুবাদার হয়ে আসেন ১৬৬৪ সালে। মাঝখানে দু’বছর বাদ দিয়ে ১৬৮৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা শাসন করে গেছেন। এই সময়টাকে মোটামুটি বাংলার স্বর্ণযুগ ধরা হয়। তবু শায়েস্তা খাঁর মতো অদ্ভুত চরিত্র বাংলার ইতিহাসে খুব বেশি নেই। কিংবা কে জানে, রাজামাত্রই হয়তো অদ্ভুত হয়ে থাকে। ফলে লোকে বলে, জীবনের শেষদিকে এসে শায়েস্তা খাঁ বিষণ্ন হয়ে পড়েন, ঢাকা শাসনের ওপর থেকে তাঁর মন উঠে যায়।
কিন্তু এর পূর্ব পর্যন্ত শায়েস্তা খাঁ প্রবল বিক্রমে বাংলা শাসন করে গেছেন। তিনি যে সময়টায় বাংলায় আসেন, তখন এ অঞ্চলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা খুব একটা শক্তিশালী ছিল না। প্রায়ই আরাকান থেকে দস্যুরা এসে আক্রমণ চালাতো। এই দস্যুদের থেকে বাংলাকে রক্ষা করতে শায়েস্তা খাঁ যেই ব্যবস্থা নেন সেটা শুনতে খুবই উদ্ভট শোনাবে, কিন্তু কাজে দিয়েছিল। বঙ্গোপসাগরে যেসব জলদস্যু ঘুরে বেড়াতো, তাদেরকে ধরে শায়েস্তা খাঁ সরাসরি মোঘল সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়ে দেন, বেশি বেতনের লোভ দেখিয়ে। ফলে মোঘল সেনাবাহিনীর শক্তি অনেকখানি বেড়ে যায়, এবং দীর্ঘ কোনো যুদ্ধ ছাড়াই বাংলাকে মোটামুটি দস্যুদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ করে ফেলা যায়।
শায়েস্তা খাঁকে হয়তো ঐতিহাসিকরা সামরিক দক্ষতার কারণেই বেশি সম্মান দেবেন। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষেরা যেটা সহজে দেখতে আর বুঝতে পারি সেটা হচ্ছে- সেই আমলের স্থাপত্য। ঢাকায় মোঘল আমলের যে স্থাপনাগুলো দেখা যায়, সেটার একটা বড় অংশ শায়েস্তা খাঁর সময়ে তৈরি। এই রীতিটা বর্তমানে “শায়েস্তা খাঁর স্থাপত্যরীতি” নামেই পরিচিতি পেয়েছে। যেমন- পুরান ঢাকার ছোট কাটরা! যদিও এটার অস্তিত্ব এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন। চারদিকে দোকানপাট-ঘরবাড়ি এমনভাবে ঘিরে ধরেছে যে, এর ভেতরে যে “কিছু একটা” আছে—সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। অথচ ১৯৪০ সালেরও একটা ফটোগ্রাফ পাওয়া যায়, যেখানে ছোট কাটরা রীতিমত রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।
আর আছে মোহাম্মাদপুরের সাত গম্বুজ মসজিদ। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করায় এই মসজিদ অবশ্য বেশ ভালো দশাতেই আছে। কেবল এটাই আশ্চর্য লাগে যে, শায়েস্তা খাঁর আমলে এই মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল বুড়িগঙ্গার ধার ঘেঁষে। এই তথ্য জানার পর কারো আগ্রহ থাকলে সাত গম্বুজ মসজিদ দেখে বুড়িগঙ্গার দিকে হাঁটা দিতে পারে- সেটা একটা অভিজ্ঞতা হবে বটে!
তবে স্থাপত্যের কথাই যদি বলতে হয়, সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করতে হবে লালবাগ দুর্গের নাম, যেটা মোটামুটি ঢাকা শহরের আইকন ছবিগুলোর মধ্যে একটা। এই দুর্গের সাথে শায়েস্তা খাঁর নাম রীতিমত সিল মেরে লাগিয়ে দেয়া আছে। যদিও লালবাগ দুর্গের কাজ তিনি শুরু করেননি। এবং এই দুর্গের কাজ তিনি শেষও করেননি, বস্তুত কেউই, কখনই লালবাগ দুর্গের কাজ শেষ করেনি, তিনশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এটা একটা অসমাপ্ত দুর্গ হিসেবে পড়ে আছে।
মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছেলে শাহজাদা আজম শখের বশে এই দুর্গটা নির্মাণ করতে শুরু করেন। কিন্তু মাঝপথেই তাকে ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে হয়, এবং চলে যাওয়ার আগে তিনি শায়েস্তা খাঁকে অনুরোধ করে যান যেন দুর্গটার কাজ শায়েস্তা শেষ করেন। লোকশ্রুতি আছে, এই শাহজাদা আজমের সাথে শায়েস্তা খাঁর মেয়ের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। শাহজাদা আজম চলে যাওয়ার কিছুকাল পরেই শায়েস্তা খাঁর মেয়ে মারা যায়, এবং এই ঘটনায় শায়েস্তা বড় ধরনের ধাক্কা খান। লালবাগ দুর্গের ভেতর তিনি মেয়ের সমাধি নির্মাণ করেন, কিন্তু দুর্গের কাজ শেষ করার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। দুর্গের ভেতর সেই সমাধিটা এখন পরী বিবির সমাধি নামে পরিচিত।
একটা গল্প দিয়ে শেষ করি। মিটফোর্ড হাসপাতালের (এখন যেটা স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ) পেছনদিকে একটা মসজিদ আছে, যেটার নাম শায়েস্তা খাঁর মসজিদ। অনেক পুরনো স্থাপত্য, দেখলে বিশ্বাস হয় এটা শায়েস্তা খাঁর আমলের হতে পারে। একদিন মসজিদের ওখানে হাঁটতে গিয়ে আমি রীতিমত ধাক্কা খেলাম। দেখি একটা দরজার ওপরে সাইনবোর্ড ঝুলছে- “শায়েস্তা খাঁ মসজিদ ও কবরস্থান”। দরজার ওপাশে জঙ্গলমতো জায়গা, খানিক অন্ধকার। চিন্তিত হয়ে ভাবছিলাম, শায়েস্তা খাঁর কবর যে ঢাকাতেই আছে, আর এমন অযত্নে পড়ে আছে- এই কথা তো কোথাও শুনিনি? আমাকে দেখে পাশে বসে থাকা এক ফলওয়ালা বললেন, যাও ভেতরে, কবর আছে। আমি চোখ কপালে তুলে ভেতরে গিয়ে দেখি, ঝোপঝাড়ের ওপাশে আরেকটা ছোট দরজা, ওটাও বন্ধ।
– ফিরে এসে ফলওয়ালা মামাকে বললাম, দরজার ওপাশেই কি শায়েস্তা খাঁর কবর?
– তিনি বললেন, হ্যাঁ!
– আমি বললাম, কিন্তু কবরের দরজা তো বন্ধ!
– তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, নক করো, ভেতর থেকে খুলে দিবে।
এই শুনে আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে গিয়েছিল! পরে সাহস করে নকও করেছিলাম অবশ্য, দরজা খুলে দাড়িওয়ালা এক ভদ্রলোক বেরিয়েও এসেছিলেন, যিনি অবশ্যই শায়েস্তা খাঁ নন। তবে তিনি যেখান থেকে বেরিয়েছিলেন, তার সামনে দুটো কবর ছিল। ভদ্রলোক দাবি করলেন, এর কোনোটাই শায়েস্তা খাঁর না। কবরের পাশেই একটা ছোট বাসা-বাচ্চাকাচ্চা-জামাকাপড় দেখে মনে হলো ওখানে পরিবার নিয়ে মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিন সাহেবরা থাকেন, ফলে ভদ্রতার খাতিরেই ভেতরে ঢুকে দেখতে পারিনি কবরের গায়ে কিছু লেখা আছে কি না।
মনের মধ্যে খুব খচখচ করছিল। শেষে বইপত্র ঘেঁটে জানলাম, শায়েস্তা খাঁ মারা যাবার বেশ কয়েক বছর আগেই ঢাকা ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় আগ্রায়। @ Hasan Nahiyan Nobel
১৪
বাদশাহ বাবর: হিন্দুস্তানের পথে
বাদশাহ বাবর সবসময়ই হিন্দুস্তানের প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করতেন। ১৫০৪ সালে কাবুল জয়ের পর তিনি হিন্দুস্তানের নাম এতবার শোনেন যে, তিনি হিন্দুস্তান জয়ের বিশেষ ইচ্ছা পোষণ করতে থাকেন। কাবুলেই এসে তিনি জানতে পারেন, তাঁর পূর্বপুরুষ তাইমূরও এক সময় হিন্দুস্তান অধিকার করেছিলেন। হিন্দুস্তান জয়ের এই অদম্য ইচ্ছা বাবরকে অস্থির করে তুলতে থাকে। তিনি অবশেষে হিন্দুস্তানে অভিযান চালানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। তবে তখনো তাঁর হিন্দুস্তানে অভিযান চালানোর মতো উপযুক্ত কোনো সেনাবাহিনী ছিলো না, না ছিলো উপযুক্ত অস্ত্রশস্ত্র। এমনকি তখন পর্যন্ত তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে হিন্দুস্তানের দিকে যাওয়ার মতো নিরাপদ কোনো পথের কথাও জানতেন না। কিন্তু ১৫০৫ সালে তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে হিন্দুস্তানের দিকে বেরিয়ে পড়েন। এসময় তাঁর প্রস্তুতি কিংবা অভিযানের ধরন দেখে মনে হয় না তিনি আসলেই সে সময়ে হিন্দুস্তান জয়ের ব্যাপারে আশান্বিত ছিলেন। তাঁর অভিযানের ধরন দেখে বরং মনে হয় তিনি হিন্দুস্তান জয়ের সম্ভাবনা যাচাই করতে চাইছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনীকে সেকথা জানতে দেননি।
১
১৫০৫ সালে বাদশাহ বাবর সর্বপ্রথম তাঁর হিন্দুস্তান অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় তিনি কাবুল থেকে রওয়ানা দিয়ে বাদাম চাশমা আর জগদলিক হয়ে আদিনাপুরে পৌছান। আদিনাপুর থেকে কাবুল আর হিন্দুস্তানের সীমান্ত এলাকা নিংগনহরে পৌঁছান বাবর। এই এলাকাতে এসেই তিনি তাঁর জীবনের প্রথম কোনো হিন্দুস্তানী এলাকা দেখেন। তাঁর কাছে হিন্দুস্তান একটি নতুন আর ভিন্ন কোনো পৃথিবীর মতো মনে হচ্ছিলো। তিনি তাঁর আত্মজীবনী ‘বাবরনামা’-তে লিখেন,
‘লোকেদের (হিন্দুস্তানী) রীতি-রেওয়াজ আমার কাছে নতুন ছিলো। উপজাতিদের, যাযাবর শ্রেণির লোকদের দলগুলোর জীবনযাত্রার ঢং সম্পূর্ণ অন্যরকম ছিলো। প্রতি পদে পদে আমাকে বিস্মিত হতে হচ্ছিলো। প্রকৃত সত্য তো এই যে, ওখানকার ভূমিই ছিলো বিস্ময়কর।’
কাবুল থেকে রওয়ানা দেয়ার পূর্বেই বাবর তাঁর সৎ ভাই নাসির মির্জার নেতৃত্বে একটি অগ্রবর্তী বাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এই অগ্রবর্তী বাহিনীর সাথে বাবরের আদিনাপুরে দেখা হলো। তিনি পুরো বাহিনী নিয়ে জুলশহল হয়ে কুশগম্বুজের পাহাড়ি উপত্যকায় পৌছান। একই সালে, অর্থাৎ ১৫০৫ সালেই বাবর খায়বার পার হয়ে জাম পাহাড় পাড়ি দেন। জাম পাহাড় পাড়ি দেয়ার পর বাবরের বাহিনীর সামনে যে স্থান পরে, তার নাম হলো বিলগ্রাম। হিন্দুস্তান আক্রমণের জন্য এই স্থান থেকেই সিন্ধু নদ পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু বাবরের কাছে সিন্ধু নদ পাড়ি দেয়ার মতো উপযুক্ত প্রস্তুতি ছিলো না। তাই তিনি সিন্ধু নদ এড়িয়ে হিন্দুস্তানের মূল ভূখন্ডে যাওয়ার অন্য উপায় খুঁজছিলেন। তখন বাবরেই এক সেনাপতি জানালেন সিন্ধু এড়িয়ে হিন্দুস্তানে যাওয়ার রাস্তা তিনি জানেন। বাবরের এই সেনাপতির নাম ছিলো বকী ছগানিয়ানী। বকী ছগানিয়ানীর পথ অনুসরণ করতে হলে বাবরকে কোহাত হয়ে যেতে হবে।
বাবর কোহাতে প্রবেশ করতে চাইলে তাঁকে বাঁধা দেয়া হলো। কোহাতের অধিবাসীরা এক্ষেত্রে এক ব্যতিক্রমধর্মী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলো। তারা বাবরের সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রার পথে অসংখ্য গবাদিপশু ছেড়ে দিয়েছিলো। বাবরের সেনাবাহিনী এবং কোহাতবাসী- দু’পক্ষই জানতো এই বাঁধা নিতান্তই মামুলী। সামান্য কিছুক্ষণের মাঝেই বাঁধাদানকারীদের বন্দী করা হলো। এর পরের ঘটনা ‘বাবরনামা’ থেকেই জেনে নেয়া যাক।
‘তাদের সবাইকে একত্রিত করা হলো (বন্দী করার পর)। তারা প্রাণভয়ে কাঁপছিল। আমি আমার প্রতি তাদের বিশ্বাস জন্মানোর জন্য বললাম, আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কোনো ক্ষতি করা হবে না। তাদের বিশ্বাস অর্জনের পর তারা আমার অধীনতা স্বীকার করে নিলো। আমি তাদের সবাইকে মুক্ত করে দিলাম।’
কোহাতে বাদশাহ বাবর দু’দিন অবস্থান করেছিলেন। কোহাতবাসী পরবর্তীতে বাবরের প্রতি তাদের বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করেছিলো। কিন্তু যে কারণে বাবরের কোহাত জয় করা হলো, সেই উদ্দেশ্য পূরণ হলো না। কোহাত থেকে সিন্ধু নদ এড়িয়ে হিন্দুস্তানের মূল ভূখন্ডে যাওয়ার কোনো রাস্তা খুঁজে পাওয়া গেলো না।
পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় বাবর তাঁর সেনাপতিদের জন্য সাথে আলোচনায় বসলেন পরবর্তীতে কী করণীয় তা নির্ধারণ করতে। আলোচনা সভায় বংগাশ আফগান নয়তো বননু আক্রমণের প্রস্তাব উঠলো। এসব অঞ্চল তখনো বাবরের আনুগত্য স্বীকার করে নি। বাবর ইয়ার হুসাইনের নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনীকে সিন্ধু এড়িয়ে হিন্দুস্তানে যাওয়ার নিরাপদ রাস্তা খোঁজার দায়িত্ব দিয়ে মূল সেনাবাহিনী নিয়ে বংগাশের দিকে অগ্রযাত্রা করলেন।
২
বাবর কোহাত আর হংগুর পাহাড়ি উপত্যকার উঁচু পাহাড় ঘেড়া রাস্তা দিয়ে বংগাশের দিকে চলতে লাগলেন। পথে স্থানীয় আফগানরা বাবরের চলাচলের রাস্তায় বাঁধা সৃষ্টি করতে চাইলে খুব সহজেই তাদের দমন করা হয়। তবে কিছু উদ্ধত স্থানীয় উপজাতির লোকেরা হিংস্র হয়ে বাবরের সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করলে এখানে কিছু আফগানদের হত্যা করা হয়। এরপরই সব শান্ত হয়ে যায়। তবে আফগানরা বাবরের প্রতি এমনভাবে আনুগত্য স্বীকার করলো, যার জন্য তিনি নিজেও প্রস্তুত ছিলেন না। চলুন বাবরের জবানীতেই জেনে নেয়া যাক,
‘তারপর এক বিস্ময়কর দৃশ্য সামনে এলো। এ দৃশ্য বিস্ময়কর হওয়ার সাথে সাথে কৌতুহলজনকও ছিলো। তা ছিলো সমস্ত আফগানের দল পঙ্গপালের মতো মাটিতে শুয়ে পড়লো। তারা তাদের মুখ ঘাসের সাথে রগড়াচ্ছিলো আর কিছু ঘাস দাঁত দিয়ে কেটে কেটে খাচ্ছিলো।’
বাবর এই এলাকায় তাঁর পথপ্রদর্শক মালিক বুদাশকে তাদের এমন কাজ করার কারণ জানতে চাইলে মালি বুদাশ উত্তর দেন, এটাই আফগান উপজাতিদের ঐতিহ্যবাহী রীতি। তারা যদি কারো বিরোধীতা ত্যাগের ব্যাপারে একমত হয়, তখন এভাবে মুখ দিয়ে ঘাস কেটে খেয়ে আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের ঘোষণা দেয়। এর প্রতিকী অর্থ হলো, তারা আজ থেকে আপনার গরু। আপনি তাদের সামনে যেমন ইচ্ছা তেমন আচরণ করতে পারবেন! বাবর আফগান উপজাতির লোকেদের এমন রীতিতে বেশ অবাক হয়েছিলেন।
এরপর মালিক বুদাশের পরামর্শে নিহত আফগানদের কাঁটা মাথা দিয়ে ছোট স্তম্ভ তৈরি করা হয়। পাহাড়ি রীতিনীতির সাথে অভ্যস্ত মালিক বুদাশ জানতেন, এর ফলে বাবরের এই স্থান ত্যাগের পরেও তারা বাবরের অনুগত হয়ে থাকবে।
৩
বাবর দ্রুতই এই এলাকা ত্যাগ করে সামনে এগোতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু স্থানীয় আফগানদের প্রতিরোধের কারণে তা অসম্ভব হয়ে উঠছিলো। বাবর মনেপ্রাণে চাইছিলেন কোনো প্রকার রক্তপাত এড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে। কিন্তু স্থানীয় প্রতিরোধের কারণে তা সম্ভব হচ্ছিলো না। বাবরের হংগু যাওয়ার পথে বাবরের সেনাবাহিনীকে বাঁধা দিতে যেয়ে আরো ১৫০/২০০ স্থানীয় আফগান সৈনিক নিহত হলো। তাদের কাটা মাথা দিয়ে এখানেও একটি ছোট্ট স্তুপ তৈরি করা হয়। এর পরপরই বিদ্রোহীরা বাবরের আনুগত্য স্বীকার করে।
হংগুতে পৌছে বাবর এক রাত সেখানে অবস্থান করেন। এরপর তিনি থাই হয়ে বংগাশের দিকে এগুতে লাগলেন। বাবরের সেনাবাহিনীর চলাচলের রাস্তা মোটেও মসৃণ ছিলো। যাত্রাপথের প্রায় পুরোটাই এবড়ো থেবড়ো পাহাড় আর উপত্যকা পাড়ি দিতে হয়েছিলো তাঁকে।
বাবরের বাহিনী বননুর পাহাড়ি এলাকা পাড়ি দেয়ার সময় আবারো স্থানীয় বিদ্রোহীদের মুখোমুখি হন। তাদের দমন করতে বাবর জাহাঙ্গীর মির্জার নেতৃত্বে একটি বাহিনী সামনে পাঠিয়ে দেন। বিদ্রোহীরা খুব সহজেই ঠান্ডা হয়ে যায়। এখানেও ছিন্ন মস্তকের একটি স্তুপ তৈরি করা হয়। ছিন্ন মস্তকের স্তুপের কথা শুনে একটু নির্মম মনে হলেও সেই প্রেক্ষাপটে আর কিছুই করার ছিলো না। পাহাড়ি উপজাতির দুর্ধর্ষ যোদ্ধারা শুধুমাত্র এভাবেই ঠান্ডা হতো তখন।
বাবর বননুর এলাকা ত্যাগ করে যখন আবার সামনে অগ্রযাত্রা শুরু করলেন তখন তাঁর সাথে একটি হিন্দুস্তান থেকে আগত আফগান ব্যবসায়ীর দলের সাথে দেখা হলো। এই কাফেলার সরদার খ্বাজা খিজির সুহন্দ বাদশাহ বাবরের পূর্বপরিচিত ছিলেন। বাবর তার কাছে সিন্ধু এড়িয়ে হিন্দুস্তানে যাওয়ার পথ জানতে চাইলে তিনি জবাব দেন এই সময় তা সম্ভব না। ‘বাবরনামা’-র বর্ননানুসারে,
‘তাঁর হিঁদুস্তান (হিন্দুস্তান) যাত্রার বিবরণ থেকে যে তথ্য আমি জানলাম তা হলো, তিনি সঠিক সময়ে হিঁদুস্তান থেকে ফিরে এসেছেন এবং আমি ভুল মৌসুমে সে পথে যাত্রা করেছি। তাঁর দেওয়া তথ্যানুসারে নদী না পেরিয়ে এখন হিঁদুস্তানে যাওয়া অসম্ভব। তিনি যখন এসেছিলেন, তখন নদী শুকনো ছিলো। আর আমি যখন যাবো তখন আমাকে বিক্ষুব্ধ নদী পাড়ি দিতে হবে।’
খ্বাজা সুহন্দের তথ্য যাচাইয়ের পর বাবর বুঝতে পারলেন এবারের মতো তাঁকে হিন্দুস্তান অভিযানের পরিকল্পনা ত্যাগ করতে হবে। তিনি কাবুল ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
৪
বাবরের কাবুলে ফিরে আসার পর বেশ কিছু ঘটনা ঘটলো। বাবর তাঁর কাছে পরাজিত সেই বিদ্রোহী পাহাড়ি উপজাতি সরদারদের উচ্চ মর্যাদা প্রদান করে তাদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন। এতে তাদের আবার বিদ্রোহ করার কোনো ন্যূনতম সুযোগও তিনি আর রাখলেন না।
১৫০৬ সালের জুন মাসের দিকে বাবর হেরাতের শাসক বাইকারা বংশের হুসাইন মির্জার সাথে একটি চুক্তি করে একত্রে উজবেক শাসক শায়বানী খানের উপর আক্রমণ চালানোর জন্য কাবুল ত্যাগ করেন। কিন্তু কাবুল ত্যাগের কয়েকদিন পরেই তিনি হুসাইন মির্জার মৃত্যুসংবাদ শুনতে পান। হুসাইন মির্জার মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র যৌথভাবে পিতার সিংহাসনের উত্তরাধীকারী হন। কিন্তু তারা তাদের পিতার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন না। কাজেই বাবরের শায়বানী খানের উপর আক্রমণ চালানোর ইচ্ছা পরিপূর্ণ হলো না। তিনি কাবুল ফিরে আসেন।
এর কিছুদিন পরেই হেরাতে শায়বানী খান আক্রমণ চালান। এই আক্রমণে হুসাইন মির্জার দুই পুত্রই মৃত্যুবরণ করেন।
৫
১৫০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস। এই সময়ে বাবর আবারো হিন্দুস্তানের দিকে নিজের মনোযোগ দেন। তিনি কাবুল থেকে সড়কপথে সুর্খ-রবাত হয়ে কুরসাল এলাকায় গিয়ে পৌছান। কাবুল থেকে লাঘমানের এলাকায় যাওয়ার সময়ে বাবর আবারো পাহাড়ি উপজাতির লোকদের দ্বারা বাধাগ্রস্থ হলেন। এসব পাহাড়ি উপজাতির লোকেরা এই এলাকা দিয়ে যাতায়াতকারী পথিক বা বাণিজ্যিক কাফেলার উপর আক্রমণ চালিয়ে লুন্ঠন আর হত্যাকান্ড চালাতো। বাবর তাই শুধু তাদের দমন করেই ছেড়ে দিলেন না, বরং তাদের উচ্ছেদ করে এলাকাগুলো পর্যন্ত খালি করার আদেশ দিলেন। তাদের উচ্ছেদের পর তারা যেন পুনরায় এখানে ফিরে আসতে না পারে, সেকারণে তিনি কয়েকদিন এই এলাকায় অবস্থান করলেন।
লাঘমানের এলাকায় বাবরের কাজের সমাপ্তির পর তিনি মিল কাফির এলাকায় এসে পৌঁছানোর পর বাবর কাবুল থেকে তাঁর গুপ্তচরদের মাধ্যমে কিছু খবর পান। বাবরের কাবুলে অনুপস্থিতির সুযোগে শায়বানী খান সেখানে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছিলেন। বাবর আর দেরি না করে দ্বিতীয়বারের মতো হিন্দুস্তান অভিযানের পরিকল্পনা বাতিল করে কাবুলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পাশাগড়ের মোল্লা বাবার নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর বড় একটা অংশকে কাবুলে পাঠিয়ে দেন। আর নিজের সাথে থাকা সেনাবাহিনীর অপর অংশ নিয়ে মন্দখার, শেলাব আর অতার এলাকার দিকে রওয়ানা দেন। এসব অঞ্চল থেকে ছোটখাট কিছু বিদ্রোহের খবর পাওয়া যাচ্ছিলো। কাবুলে যদি সত্যিই সমস্যা জট পাকাতে থাকে, তাহলে সব দিক থেকেই বাবরকে নিরাপদ অবস্থানে যেতে হবে। তিনি পেছনে কোনো বিদ্রোহের সম্ভাবনা রেখে যেতে চান না।
৬
১৫০৯ সালের ডিসেম্বর মাস। বাবর মির্জা খান বেগের নিকট থেকে একটি পত্র পেলেন। তাতে স্পষ্ট করে লেখা ছিলো, পারস্যের শাহ ইসমাইলের নিকট যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বাবরের চিরশত্রু শায়বানী খান মারা গিয়েছেন! এই পত্রের আগেও বাবরের কাছে আরেকটি পত্র এসেছিলো, তাতে লেখা ছিলো পরাজয়ের পর শায়বানী খানের মাথা শাহ ইসমাইল ধড় থেকে আলাদা করে ফেলেছে। শায়বানী খানের মৃত্যুতে বাবর খুশি হয়েছিলেন নিশ্চয়ই। কিন্তু সেই সাথে তিনি কিছুটা হতাশও হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে নিজের আত্মজীবনী ‘বাবরনামা’-তে তিনি লিখেছেন,
‘খবর নিঃসন্দেহে অপুষ্ট ছিলো, তবে তা আমার আকাঙ্ক্ষার অপূর্ণকারী ছিলো। আমি নিজে বহুকাল ধরে শায়বানীর সঙ্গে সামনা-সামনি মোকাবিলার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে আসছিলাম। যদি শাহ ইসমাইলের হাতে শায়বানীর মৃত্যু হয়, তাহলে আমার অংশে বদলা নেয়ার জায়গাটা আর কোথায় অবশিষ্ট রইলো?’
মির্জা খান বেগের পাঠানো পত্রে আরো কিছু ব্যাপার উল্লেখ করা ছিলো। ‘বাবরনামা’ থেকে সরাসরিই তা উল্লেখ করা যাক,
‘উজবেকদের মধ্যে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেছে। তারা সবাই আমু এলাকা সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করে চলে গেছে। আমু-র, তা সে উজবেক নেতা হোক কিংবা সাধারণ মানুষ হোক, তারা আমুর সাথে সাথে কুন্দুজ ছেড়েও পালিয়ে যাচ্ছে। প্রায় ২০,০০০ সৈন্য মরগুয়া থেকে কুন্দুজ এলাকা পর্যন্ত উজবেক শূন্য করে তুলছে।’
মির্জা খান বেগের পরবর্তী পত্রটি ছিলো আরো চমকপ্রদ। পারস্যের শাহ ইসমাইল বাবরকে তাঁর সাথে দেখা করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন! শাহ ইসমাইল আরো জানিয়েছেন, তিনি বাবরকে নিজের পূর্বপুরুষের ভূমি পুনরুদ্ধার করার জন্য সামরিক সহযোগীতা প্রদান করবেন।
বাবর দ্রুত কুন্দুজ পৌঁছে যান। কুন্দুজ পৌছে তিনি তাঁর চাচা মাহমুদ মির্জার পরাজয়ের খবর পান। মাহমুদ মির্জা খোরাসানে আত্মগোপন করে ছিলেন তখন। শাহ ইসমাইলের সাথে লড়াইয়ের পূর্বে কোনো এক যুদ্ধে শায়বানী খান তাকে অকশায় পরাজিত করেছিলো। এইসময় বাবর তাঁর বেশ কিছু সৈন্যের খবর পান যারা বিভিন্ন যুদ্ধে শায়বানী খানের হাতে বন্দী হয়েছিলো। শায়বানীর মৃত্যুর পর এসব যোদ্ধারা মুক্তি লাভ করেন। সংখ্যার দিক দিয়ে তারা প্রায় ২০,০০০ জন!
বাবর মাত্র ৫,০০০ যোদ্ধা নিয়ে কুন্দুজ এলাকায় গিয়েছিলেন। এই ২০,০০০ যোদ্ধা তাঁর বাহিনীতে পুনরায় যোগ দেয়ায় কুন্দুজে বাবরের সৈন্য সংখ্যা ২৫,০০০ এ গিয়ে দাঁড়ায়! বাবর দ্রুত কুন্দুজ অতিক্রম করে হিসারে পৌঁছানোর জন্য যাত্রা করলেন। এই এলাকা তখনও উজবেক সুলতান মেহেদি ও হামজার অধীনে ছিলো। বাবরের হিসার যাত্রার খবর শুনেই তারা যা বোঝার বুঝে নিলেন। তারা হিসার থেকে বাইরে এসে বাবরের আনুগত্য স্বীকার করে নিলেন। হিসার দখলের কিছুদিন পরেই বাবর বুখারা দখল করে নেন।
৭
পারস্যের শাহ ইসমাইল বাবরকে সামরিক সহায়তার কথা বলেছিলেন। তবে সেটা অবশ্য শুধু মুখের কথাই না। তিনি আক্ষরিক অর্থেই বাবরকে সামরিক সাহায্য দিয়েছিলেন। এই সাহায্য যে তিনি বাবরের প্রতি ভালোবাসার কারণে বিনাস্বার্থে দিয়েছেন তা কিন্তু না। আসলে সেই সময় শিয়া মতালম্বী পারস্যের সাথে উসমানী খিলাফতের (অটোমান সাম্রাজ্য) অবিরাম যুদ্ধ চলছিলো। যুদ্ধে শিয়াদের অবস্থান ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছিলো। তাই শিয়া শাহ ইসমাইল চাচ্ছিলেন মধ্য এশিয়ায় তাঁর স্থায়ী একজন মিত্র তৈরি করে নিতে, যাতে বিপদের সময় তিনি সহযোগীতা পেতে পারেন। অন্তত এই অবস্থার উদ্ভব যেন না হয় যে, উসমানী খলিফা নিজেই বাবরের সাথে সম্পোর্কোন্নয়ন করে ফেলেন। এতে পারস্য দু’দিক থেকে চাপে পড়ে যাবে। শাহ ইসমাইল আসলে এক দূরদর্শী চাল দিয়েছিলেন। বাবর হয়তো শাহ ইসমাইলের পরিকল্পনা বোঝেন নি, নয়তো তিনি সমরকন্দের স্বপ্নে আক্ষরিক অর্থেই বিভোর ছিলেন। কারণ ১৫১১ সালে তিনি পারস্যের বাহিনীর সহায়তায় আবারো সমরকন্দের দখল করে নেন। কিন্তু সমরকন্দবাসী এবার আর বাবরকে ভালো চোখে দেখেননি। সমরকন্দবাসী তাদের শত্রুর প্রতিও আনুগত্য স্বীকার করতে পারে, কিন্তু শিয়াদের প্রতি আনুগত্য! অসম্ভব!
বাদশাহ বাবর অবশ্যই শিয়া মতালম্বী ছিলেন না। তিনি ইসলামের বিশুদ্ধ চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু যেহেতু তিনি শিয়াদের সহায়তা নিয়েছেন, কাজেই পারস্যের শাহ অবশ্যই শিয়া মত সমরকন্দে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করবেন, এই ভয়েই সমরকন্দবাসী বাবরকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো। সমরকন্দবাসীর এই ভয় অমূলক ছিলো না।
পারস্যের শাহের সহায়তা নেয়া যে বাবরের জন্য বিরাট এক ভুল ছিলো, বাবর তৃতীয়বার সমরকন্দ দখলের দুই বছর পর তা হাড়ে হাড়ে টের পান। ১৫১৩ সালের এপ্রিল মে মাসের দিকে উবাইদ খাঁ বা উবাইদুল্লাহ নামক একজন উজবেক নেতার কাছে তাকে পরাজয় বরণ করতে হয়। এ যুদ্ধে বাবরের পরাজয় প্রসঙ্গে খ্বান্দ আমীয় উল্লেখ করেছেন, এ যুদ্ধে বাবরের সেনাসংখ্যা ছিলো প্রায় ৪০,০০০ আর উবাইদ খাঁ-র বাহিনীতে মাত্র ৩,০০০ সৈন্য ছিলো। কিন্তু মুহাম্মদ মজিদ তুরখান এ যুদ্ধে বাবরের সৈন্যসংখ্যা মাত্র ৫০০ জন উল্লেখ করেছেন। আর এই দ্বিতীয় মতটিই বেশি গ্রহণযোগ্য।
বাবর হয়তো মাত্র ৫০০ সৈন্য দিয়ে একটি বীরোচিত জয় অর্জন করে সমরকন্দবাসীদের এটা বলে আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন যে, পারস্যের সহায়তা শুধুমাত্র শহরটিকে দখল করার জন্য প্রয়োজন ছিলো। এখন আর সমরকন্দে পারস্য বাহিনী বা পারস্যের সহায়তার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু তিনি সেই সুযোগও পেলেন না। সমরকন্দবাসী তাকে চিরদিনের জন্য প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা যুদ্ধে বাবরকে কোনো সহায়তাই করে নি।
এ পরাজয়ের পর বাবর বেশ ভালোই বুঝতে পারেন, সমরকন্দের দরজা তাঁর জন্য চিরজীবনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি সমরকন্দ ত্যাগ করে হিসারের দিকে অগ্রযাত্রা করলেন। বাবরের সমরকন্দ ত্যাগের কিছুদিন পরেই সমরকন্দবাসী উজবেকদের আনুগত্য স্বীকার করে। বাবরের আবেগের সাথে জড়িত সমরকন্দ আজও আধুনিক উজবেকিস্তানের একটি অংশ হিসেবে টিকে আছে!
হিসার আর কুন্দুজে কিছুদিন অবস্থান করে বাবর অবশেষে ১৫১৪ সালের শেষের দিকে কাবুলে ফিরে আসতে সক্ষম হন। ১৫১৯ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে বাবর আবারো হিন্দুস্তানের দিকে তাঁর সমস্ত মনোযোগ নিবন্ধ করেন। @ Masud Ferdous Eshan
১৫
মুঘল সম্রাট বাবরের মৃত্যু: মুঘল সাম্রাজ্য এবং হিন্দুস্তানের উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের পতন
১
বিশাল কক্ষটি ঠিক মাঝখানে বড় আর উঁচু একটি বিছানা পাতা। কক্ষটির ছাদ বেশ উঁচু। অবশ্য দুর্গের কক্ষগুলো এমনিতেই বেশ উঁচু হয়। কক্ষের ভেতরে সুগন্ধীর গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। খুব বেশি তীব্র না, আবার তেমন হালকাও না। কক্ষের ভেতরে কোথাও উজ্জ্বল আলো জ্বলে নেই। কিছুটা চাপা আলো পুরো হালকা কক্ষটিকে আলোকিত করে রেখেছে। রাজকীয় বিছানার উপরে একজন ব্যক্তি শুয়ে আছেন। কক্ষের ভেতরটা নির্জন হলেও বাইরের দিকটা তেমন নির্জন না। বাইরে বেশ কিছু চিকিৎসক আর বিছানায় শুয়ে থাকা ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনের উদ্বিগ্ন চেহারা চোখে পড়ছে। কেউ কেউ বিছানার উপরে তাকিয়ে আছেন, কেউ তাকিয়ে আছেন বিছানার চারপাশে। অবশ্য দূর থেকেও দেখে বোঝা যাচ্ছে বিছানার উপরে থাকা ব্যক্তিটি বেশ অসুস্থ। প্রায় অচেতনের মতো অবস্থায় পড়ে আছেন তিনি। কিছুক্ষণ আগেও গায়ে প্রচন্ড জ্বর ছিলো। আর তাই বেশ কয়েকটি ভারী কাপড় গায়ে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। খুব ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছেন তিনি। তবে হঠাৎ করে তার দিকে তাকালে তিনি জীবিত না মৃত, তা ঠিক বোঝা যায় না।
মধ্যরাত। হঠাৎ ধীরে ধীরে চোখ মেললেন তিনি। গায়ের উপরের ভারি কাপড়গুলো সরানোর চেষ্টা করছেন। তিনি দেখলেন কিনা তা ঠিক বোঝা গেলো না, তবে প্রায় অচেতন লোকটির শয্যার চারপাশে অন্য আরেকজন লোক বিড়বিড় করতে করতে পাক খাচ্ছেন। তার কথা দূর থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো না, তবে খুব মনোযোগ দিয়ে চেহারার দিকে তাকালে লোকটির মনের তীব্র আকুতি বেশ ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছিলো। তিনি বিড়বিড় করতে করতে বলছিলেন,
“হে আল্লাহ, যদি একজনের প্রাণ নিয়ে আরেকজনের প্রাণ ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হয়, তাহলে পুত্রের প্রাণের বিনিময়ে আমার নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে আমি প্রস্তুত।”
২
১৫২৯ সালে ঘাঘরার যুদ্ধে আফগানদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় মুঘল সাম্রাজ্যকে হিন্দুস্তানে পাকাপোক্ত একটি অবস্থান গড়ে দিলো। যদিও খানুয়ার যুদ্ধে রাজপুতদের পরাজয়ের পর মুঘল সাম্রাজ্যের সমস্ত শত্রু শক্তিই মাটিতে মিশে গিয়েছিলো, কিন্তু তারপরেও হিন্দুস্তানের পূর্বাঞ্চলে আফগানরা বেশ শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছিলো। অবশেষে নতুন আফগান অধিপতি ইব্রাহীম লোদির ভাই সুলতান মাহমুদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য শেষ এই হুমকিটিও নির্মূল হয়ে গেলো। মুঘল সাম্রাজ্য এখন সবদিক থেকেই নিরাপদ।
ঘাঘড়ার যুদ্ধের বেশ কয়েকমাস আগেই, ১৫২৭ সালের ১৬ মার্চ খানুয়ার যুদ্ধে রাজপুতদের পরাজিত করে সম্রাট বাবর নিজের পরিবারের জন্য হিন্দুস্তানকে নিরাপদ ভাবতে শুরু করেন। তিনি কাবুল দুর্গে অবস্থানরত তার পরিবারকে আগ্রা আসার অনুমতি প্রদান করেন। এর কিছুদিন পরেই সম্রাট বাবরের পুরো পরিবার আগ্রা দুর্গে চলে আসেন। নিজের স্ত্রী ও পরিবারবর্গ নিয়ে বাবর বেশ কিছুদিন শান্তিতেই সময় কাটাতে লাগলেন।
সাম্রাজ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে বাবরকে কাজ করতে হচ্ছিলো, তবে এই সময়টুকু তিনি নিজের মতো করে তার পরিবারের সাথে অতিবাহিত করলেন। এই সময় তিনি তার প্রিয় স্ত্রী মাহাম বেগমকে নিয়ে ধোলপুর থেকেও একবার ঘুরে আসেন। কিন্তু এর ৩ মাস পরেই মুঘল পরিবারে পারিবারিক একটি সমস্যার উদ্ভব হয়। প্রচন্ড পেটে ব্যথার কারণে সম্রাটের এক পুত্র অসুস্থ হয়ে হঠাৎ করেই মারা যান। সম্রাট বাবর ও দিলদার বেগমের এই পুত্রের নাম ছিলো আলোয়ার মির্জা। ঘটনার আকস্মিকতায় পুরো মুঘল পরিবার হতভম্ব হয়ে যায়। মুঘল রাজদরবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। পুত্রশোকে দিলদার বেগম পাগলপ্রায় হয়ে যান।
শোকের প্রাথমিক ধাক্কা কাটতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। কিছুদিন পর এরকম থমথমে অবস্থা কাটাতে সম্রাট বাবর আবারো তার স্ত্রীদের নিয়ে ধোলপুরের দিকে যাত্রা করলেন। এমন শোকের সময় স্থান বদল করলে হয়তো শোকের তীব্রতা কমে আসবে, এটাই ছিলো পরিবারের প্রধান হিসেবে মুঘল সম্রাট বাবরের একমাত্র আশা।
তবে ধোলপুর যেয়েও বাবর তেমন একটা স্বস্তি পেলেন না। কারণ দিল্লি থেকে মাওলানা মুহাম্মদ ফারঘালি বাবরের জন্য একটি পত্র পাঠালেন। পত্রে মাওলানা ফারঘালি দিল্লিতে বাবরের প্রিয়পুত্র হুমায়ুনের অসুস্থতার খবর জানালেন।
এই পত্র পেয়ে বাবর দ্রুত হুমায়ুনকে দিল্লি থেকে রাজধানী আগ্রা নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়ে আগ্রার দিকে ছুটতে লাগলেন। বাবরের সাথে তখন হুমায়ুনের মা মাহাম বেগম ছিলেন। পুত্রের অসুস্থতার কথা শুনে তিনি ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকবার জ্ঞান হারিয়েছিলেন। যা-ই হোক, পুত্র হুমায়ুনের সাথে মাহাম বেগমের মথুরার কাছাকাছি এসে দেখা হলো। পুত্রকে দেখে মাহাম বেগম নিজের আবেগ সামলে রাখতে পারলেন না। পুত্রের এরুপ অসুস্থতায় তিনি উদ্ভ্রান্তের মতো আচরণ করতে লাগলেন। এর অবশ্য কারণও ছিলো। হুমায়ুন কখনোই এরকম মারাত্মক অসুস্থতায় ভোগেনি। বাবরের এক পুত্র আলোয়ার মির্জা কিছুদিন আগেই মারা গেছেন। কাজেই মাহাম বেগমের মাথায় সবচেয়ে খারাপ চিন্তাটাই আগে ভর করলো। উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত শাহজাদা হুমায়ুনকে দ্রুত নৌকাযোগে রাজধানী আগ্রা নিয়ে নিয়ে আসা হলো। সম্রাট বাবরের আত্মজীবনী ‘বাবরনামা’-তে পাওয়া শাহজাদা হুমায়ুনের একটি মিনিয়েচার ছবি; Source: Wikimedia Commons
৩
আগ্রার রাজপ্রাসাদে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকেরা হুমায়ুনের চিকিৎসা শুরু করলেন। বাবরের মনে তখন আর কোনো শান্তি ছিলো না। হুমায়ুনকে তিনি তার অন্য যেকোনো পুত্র থেকে বেশি ভালোবাসতেন। গোটা হিন্দুস্তান অভিযানের সময় বাবরকে সঙ্গ দিয়েছিলেন তার এই পুত্র। তাই বাবর আর হুমায়ুনের মাঝে একটি বিশেষ আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছিলো, যা বাবরের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বজায় ছিলো। বাবর পুত্রের অসুস্থতায় অস্থির হয়ে ঘন ঘন পুত্রের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। হুমায়ুন প্রায় অচেতনের মতো বিছানায় শুয়ে ছিলেন। তবে পিতাকে দেখে তিনি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। হুমায়ুন সম্রাট বাবরকে আক্ষরিক অর্থেই প্রচন্ড ভালোবাসতেন আর শ্রদ্ধা করতেন।
হুমায়ুনের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিলো। মাহাম বেগমের মাতৃআবেগ ধীরে ধীরে লাগামছাড়া হয়ে যাচ্ছিলো। একদিন তিনি সম্রাট বাবরকে পুত্রের জন্য বিচলিত হতে দেখে বলে বসলেন,
‘আমার ছেলের জন্য আপনার আর কতটুকু দুশ্চিন্তা আছে?আপনার আরো ছেলে আছে, কিন্তু আমার ছেলে তো মাত্র একটিই ছেলে।‘
কিন্তু মাহাম বেগম হয়তো কখনোই ধারণা করতে পারেন নি, বাবর তার এই পুত্রটির জন্য তার মনে কতোটা ভালোবাসা সঞ্চয় করে রেখেছিলেন। সম্রাট বাবর নিজে জানতেন হুমায়ুনকে তিনি কতটা ভালোবাসতেন। আর তাই পুত্রের রোগশয্যার পাশে বসে পুত্রের জন্য একমনে তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন তিনি। তারপরও চিকিৎসা কিংবা প্রার্থনা- হুমায়ুনের জন্য এর কোনোটিই কাজ করছিলো না। সুস্থতার কোনো লক্ষণই হুমায়ুনের মাঝে দেখা যাচ্ছিলো না।
এ সময় বাবরের দরবারের বেশ কয়েকজন পরামর্শ দিলো, বাবর যদি তার নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি উৎসর্গ করে দেন, তাহলে হয়তো আল্লাহ তার পুত্র হুমায়ুনের জীবন ভিক্ষা দিতে পারেন।
এই কথা শোনামাত্র বাবর ভাবতে লাগলেন এমন কী আছে যা তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। হঠাৎ বাবরের মাথায় আসলো প্রতিটি মানুষই তার নিজের জীবনকে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে। আর তাই বাবর তার পুত্র হুমায়ুনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ, একজন পিতা হিসেবে বাবর তার পুত্র হুমায়ুনকে তার জীবন থেকেও বেশি ভালোবাসতেন। বাবর চাইছিলেন নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও পুত্র হুমায়ুনের জীবন যেন রক্ষা পায়।
এরপরেই একরাতে তিনি পুত্রের শয্যার পাশে চক্রাকারে ঘুড়তে লাগলেন, আর বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন,
‘হে আল্লাহ, যদি একজনের প্রাণ নিয়ে আরেকজনের প্রাণ ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হয়, তাহলে পুত্রের প্রাণের বিনিময়ে আমার নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে আমি প্রস্তুত।’
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এর কিছুদিন পরেই হুমায়ুন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলেন। আর সম্রাট বাবর ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে শুরু করলেন। তবে হুমায়ুনের সুস্থ হয়ে ওঠা আর সম্রাট বাবরের অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরে যাওয়ার মাঝে কয়েক মাসের ব্যবধান ছিলো।
৪
সুস্থ হয়ে ওঠার পরও পুরোপুরি আরোগ্য লাভের জন্য শাহজাদা হুমায়ুন ২/৩ মাস বিশ্রাম নেন। এই সময়ে ধীরে ধীরে সম্রাট বাবরের ভেতরে অসুস্থতার লক্ষণ ফুটে উঠতে শুরু করে। এই অসুস্থতার ভেতরেই বাবর হুমায়ুনকে রাজকীয় কাজে কালিঞ্জর যেতে নির্দেশ দেন। পিতার এই অসুস্থতায় হুমায়ুন কালিঞ্জর যেতে একটু দ্বিধান্বিত ছিলেন। কিন্তু সম্রাটের আদেশ সবসময়ই আদেশ। তাই তিনি তার পিতা ও সম্রাটের আদেশ মেনে নিয়ে কালিঞ্জর চলে যান। পিতার এই অসুস্থতার মাঝে শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন হয়তো কালিঞ্জর যেতে রাজি হতেন না, কিন্তু শেষমেশ কী মনে করে যেন কালিঞ্জর চলে যান। হুমায়ুন ভেবেছিলেন তার পিতার অসুস্থতা হয়তো তেমন গুরুতর কিছু না। কিন্তু কালিঞ্জর যাওয়ার কিছুদিনের ভেতরের বাবরের মারাত্মক অসুস্থতার খবর তাকে জানানো হলে তিনি দ্রুত আগ্রায় ফিরে আসেন।
হুমায়ুন ফিরে এসে পিতাকে খুবই অসুস্থ অবস্থায় পেলেন। তিনি পিতাকে এমন গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দেখতে পেয়ে সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মহান বাদশাহর শরীর এতোটা খারাপ হলো কেমন করে?’ কিন্তু কেউই হুমায়ুনের এই প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারলো না। তিনি আবারো সবাইকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করলেন, ‘আমি তো পিতাকে অনেকটা ভালো দেখে গিয়েছিলাম। হঠাৎ এতোটা খারাপ হওয়ার কারণ কী? এবারো উপস্থিত সবাই চুপচাপ থাকলেন।
রাজকীয় দুর্গে বাবরের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু তারপরও ধীরে ধীরে বাবরের রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকলো। বাবর এ সময় প্রায়ই অচেতন হয়ে যেতেন। কিছুটা চেতনা ফিরে পেলেই তিনি বারবার হিন্দালের কথা জিজ্ঞাসা করতেন। বাবর দীর্ঘদিন তার এই ছোটপুত্রকে দেখেন নি। তিনি বারবার একই কথা পুনরাবৃত্তি করছিলেন, ‘হিন্দাল কোথায়? হিন্দালকে দেখছি না কেন?’
পরিণত বয়সে যুবরাজ মির্জা হিন্দাল। তবে ছবিটি আসলেই মির্জা হিন্দালের নাকি, সেটা নিশ্চিত না। এমনকি উইকিমিডিয়া কমন্সে ছবিটির শিরোনামেও একটি প্রশ্নবোধক (?) চিহ্ন দেয়া আছে। হিন্দালকে দ্রুত পিতার অসুস্থতার খবর দেয়া হলো। হিন্দাল ঝড়ের বেগে কাবুল থেকে আগ্রার পথে ছুটতে লাগলেন।
৫
অসুস্থ অবস্থাতেই বাবরের মাথায় আরেকটি বিচিত্র শখ ভর করলো। তিনি জীবিত থাকতেই তার এবং দিলদার বেগমের দুই কন্যা গুলরঙ বেগম আর গুলচেহারা বেগমের বিয়ে দিতে দিলদার বেগমকে আদেশ করলেন। বাবর তার এই দুই কন্যার জন্য নিজের পছন্দ অনুযায়ী পাত্রও ঠিক করে দিলেন। বাবরের আদেশ অনুযায়ী তার এই অসুস্থতার ভেতরেও রাজকীয় মুঘল প্রসাদে বিয়ের আয়োজন করা হলো। বাবরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গুলরঙকে ইশান তৈমুর সুলতান এবং গুলচেহারা বেগমকে তুঘতা বুঘা সুলতানের হাতে তুলে দেয়া হলো। সম্পর্কের দিক দিয়ে এই দুজন বাবরের মামা আলুনাদ খানের পুত্র ছিলেন।
এই বিয়ের কিছুদিন পরেই সম্রাট বাবর অসুস্থতার কারণে আরো দুর্বল হয়ে যেতে লাগলেন। এমনকি হাঁটাচলা কিংবা বিছানা থেকে উঠে বসার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেললেন তিনি। তার মুখমন্ডল ফ্যাকাশে হয়ে যেতে লাগলো। হিন্দুস্তানের মহান অধিপতি সম্রাট বাবর বুঝতে পারলেন পৃথিবীতে তার সময় শেষ হয়ে আসছে। নিজের যা কাজ ছিলো পৃথিবীতে, তা তিনি শেষ করে ফেলেছেন। তবে তখনো একটা কাজ বাকী ছিলো। তিনি সেই কাজটি সম্পাদনের জন্য তার দরবারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের রাজদরবারে ডাকলেন।
৬
২২ ডিসেম্বর, ১৫৩০ সাল। আগ্রার পুরাতন দুর্গ। নিজের শারীরিক দুর্বল অবস্থা নিয়েই সম্রাট বাবর রাজদরবারে তার সিংহাসনে গিয়ে বসলেন। পরিবার আর সভাসদের সবাই অনুরোধ করছিলেন যা বলার তা নিজের ব্যক্তিগত কক্ষ থেকেই ঘোষণা করতে। কিন্তু সম্রাট বাবর চাইছিলেন যা বলার তা এই সিংহাসন থেকেই বলবেন। অসুস্থ সম্রাট সিংহাসনে বসে আছেন। দরবার আর পরিবারের লোকেরা উৎসুক দৃষ্টিতে সম্রাটের দিকে চেয়ে আছেন।
সম্রাট বাবর হঠাৎ কিছু বলতে শুরু করলেন। তবে তার কন্ঠ শুনে বোঝা যাচ্ছিলো কথা বলতে সম্রাটের বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। তারপরও তিনি বলতে লাগলেন,
‘আল্লাহর কৃপায় ও আপনাদের সমর্থনে আমি আমার জীবনে সব কিছুই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। পৃথিবীতে আমার সব ইচ্ছাই পূরণ হয়েছে। তবে আমি সুস্থ অবস্থায় নিজের সব কাজ সম্পন্ন করতে পারলাম না। আজ আপনাদের সামনে আমি নিজের শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করছি। আমার পরে আমি মুঘল সিংহাসনে হুমায়ুনকে বসিয়ে যেতে চাই। আমি আশা করবো, আমার প্রতি আপনারা যেমন অনুগত ছিলেন, বাদশাহ হিসেবে আপনারা হুমায়ুনের প্রতিও ঠিক তেমনই অনুগত থাকবেন। তার সকল কাজকে সমর্থন জানাবেন। আমি আশা করছি, মহান আল্লাহর দয়ায় হুমায়ুন সফলভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে।’
দরবারে উপস্থিত বাবরের সভাসদরা কান্নাভেজা চোখে তাদের প্রিয় সম্রাটের সামনে শপথ করলেন, তারা নিজেদের জীবন দিয়ে হলেও তাদের সম্রাটের শেষ ইচ্ছা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন। এরপর সম্রাট বাবর হুমায়ুনের দিকে তাকিয়ে দুর্বল কন্ঠে বললেন, ‘হুমায়ুন আমি তোমাকে, তোমার ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন ও তোমার প্রজাদের আল্লাহর হাতে সমর্পণ করে যাচ্ছি।’
৭
সম্রাট বাবর চাইলেই পারতেন নিজের ব্যক্তিগত কক্ষে সবাইকে ডেকে নিজের শেষ ইচ্ছার কথা বলে যেতে। কিন্তু তিনি ষড়যন্ত্রকারীদের কোনো সুযোগ দিতে রাজী ছিলেন না। তিনি জানতেন, তার মৃত্যুর পর হুমায়ুনকে সিংহাসনে বসতে বাঁধা দেয়া হবে। তাই জীবিত থাকতেই সবার সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি হুমায়ুনকে সিংহাসনের বৈধ দাবীদার স্বীকৃতি দিয়ে দিলেন। তিনি বেশ ভালো করেই জানতেন, ৪ বছর পূর্বে ইব্রাহীম লোদির মায়ের দেয়া বিষের ফলে তিনি যখন শয্যাশায়ী ছিলেন, তখন এই দরবারের একাংশ হুমায়ুনের পরিবর্তে তার ভগ্নিপতি মেহেদি খ্বাজাকে সিংহাসনে প্রায় বসিয়ে ফেলার আয়োজন করে ফেলেছিলো। সম্রাট বাবর হয়তো এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটি জানতেনই না, কিন্তু মেহেদি খ্বাজার বোকামীতে বিষয়টি ধরা পড়ে যায়।
মুকিম হারাভির পুত্র নিজাম উদ্দিন আহমেদ রচিত ‘তাবাকাত-ই-আকবরী’ গ্রন্থে প্রত্যক্ষদর্শী মুকিম হারাভির সূত্রে ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে,
‘মহান বাদশাহ (বাবর) তখনো জীবিত। একদিন মুকিম হারাভি মেহেদি খ্বাজার শিবিরে প্রধান উজিরের সাথে সাক্ষাৎ করেন। বাবরের দরবার থেকে ডাক পড়ায় মুকিম হারাভি প্রধান উজিরের সাথে বেশিক্ষণ কথা বলতে পারেন নি। মেহেদি খ্বাজা প্রধান উজিরকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসেন। প্রধান উজির কানে কিছুটা কম শুনতেন। মেহেদি খ্বাজা আশেপাশে আর অন্য কেউ আছে কিনা তা খেয়াল না করেই হঠাৎ আপন মনে বলে উঠলেন, আল্লাহর ইচ্ছায় বাদশাহ হতে পারলে আমার প্রথম কাজ হবে তোমার আর অন্যান্য গাদ্দারদের চামড়া ছিলে ফেলা। এই কথা বলেই তিনি তার পেছনে মুকিম হারাভির উপস্থিতি টের পান। সাথে সাথেই তিনি মুকিম হারাভির কান টেনে ধরে গালি দিয়ে বলতে থাকেন, যা শুনেছো, যদি বুদ্ধিমান হও তাহলে তা প্রকাশ করবে না। তা না হলে তোমাকে পরপারে পাঠানো হবে।’
এই কথার পর মুকিম হারাভি মেহেদি খ্বাজার কথা মেনে নেন। এরপর দ্রুত বিদায় নিয়েই তিনি প্রধান উজিরের কাছে গিয়ে সব কথা বিস্তারিত খুলে বলেন। উজির কানে কম শুনলেও বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি দ্রুত হুমায়ুনকে ডেকে পাঠিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। হুমায়ুনের পরামর্শে মেহেদি খ্বাজাকে নিজের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। একইসাথে তার জন্য দরবারের কারো সাথে সাক্ষাৎ কিংবা বাবরের দরবারে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে এই ঘটনা সম্রাট বাবর জানতে পেরেছিলেন।
তবে সম্রাট বাবর যে হুমায়ুনকেই তার প্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি ঘোষণা করবেন, তা বহু আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিলো। তিনি তার এই পুত্রটিকে খুব বেশি ভালোবাসতেন। হুমায়ুনের অসুস্থতার সময়ে বাবর কী কী করেছিলেন, তা সবাই দেখেছে। তাছাড়া, গুলবদন বেগম রচিত ‘হুমায়ুননামা’-তে একটি ঘটনার উল্লেখ আছে, যা থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, সম্রাট বাবর হুমায়ুনকেই তার পরবর্তী সম্রাট ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। ঘটনাটি হুমায়ুননামা থেকে সরাসরি উল্লেখ করা হলো,
‘এর কিছুদিন পর (কাবুল থেকে বাবরের পরিবার হিন্দুস্তানে আসার পর) বাদশাহ বাবুর ‘বাগ-ই-জার-আফসান’ বা, স্বর্ণখচিত বাগিচা পরিদর্শনে এলেন। এখানে অজু করার একটি চৌবাচ্চা তৈরি করা হয়েছিলো। বাদশাহ বাগান দেখে অভিভূত হলেন। আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন, আমার বাদশাহি ও রাজত্ব করার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে। এখন আমার ইচ্ছে এ বাগানের নির্জনে বাকী জীবন অতিবাহিত করি। আমার সেবার জন্য খানসামা তাহেরই যথেষ্ট। বাদশাহির দায়িত্ব আমি হুমায়ুনের হাতেই ছেড়ে দিবো।
সম্রাটের এ কথায় যেন কোন অশুভ ইঙ্গিত ছিলো। আমার মা ও সাথে থাকা অন্যান্যরা বাদশাহ-এর এ কথা শুনে কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন। তারা বলতে লাগলেন, মহান বাদশাহ আরো অনেক বছর বেঁচে থেকে নিজের সাম্রাজ্য পরিচালনা করবেন। তার সন্তান-সন্ততিও বাদশাহর সামনেই বেড়ে উঠবে এবং বার্ধক্যে পৌছাবেন।’
এই বর্ণনা থেকে মৃত্যুর অনেক পূর্বেই সম্রাট বাবরের হুমায়ুনের হাতে মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনভার ছেড়ে দেয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিলো।
৮
২৬ ডিসেম্বর, ১৫৩০ সাল। আগ্রার পুরাতন দুর্গ। হুমায়ুনকে মুঘল সাম্রাজ্যের পরবর্তী সম্রাট ঘোষণা দেয়ার তিনদিন পরে হিন্দুস্তান ও মহান মুঘল সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট জহির উদ-দিন বাবর এই নশ্বর পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে মহান আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। পেছনে রেখে গেলেন নিজের জীবনের বিশাল এক কীর্তি আর বীরত্বপূর্ণ এক অসমাপ্ত অধ্যায়।
সম্রাটের মৃত্যুর পর এই সংবাদটি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কারণ মুঘল সাম্রাজ্যের এই শোকময় অবস্থায় শত্রুরা অবশ্যই এর সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করবে। তাছাড়া বাবরের সামনে দরবারের সবাই হুমায়ুনকে নতুন সম্রাট হিসেবে মেনে নিলেও দরবারে এমন অনেক আমিরই আছেন, যারা হুমায়ুনকে বৈধ সম্রাট হিসেবে বিবেচনা করতেন না। সম্রাটের মৃত্যু এই মূহুর্তে প্রকাশ পেলে তার ঝামেলা করার চেষ্টা করবেই।
কিন্তু বাধ সাধলেন বাবরের এক হিন্দুস্তানীয় আমির। তিনি এই সংবাদ চেপে না গিয়ে ভিন্নভাবে পরিবেশন করার পরামর্শ দিলেন। তিনি বললেন, এভাবে অসুস্থ সম্রাটের কোনো খবরই জনগণের সামনে না প্রকাশ করলে তাতে বিভ্রান্তি আরো বাড়বে। আর সম্রাটের মৃত্যু গুজব হিসেবে ঠিকই ছড়িয়ে যাবে। তাতে গোটা সাম্রাজ্যে লুটপাট শুরু হয়ে যাবে। তিনি অনুরোধ করলেন, এই শোকের সময় মুঘল পরিবারের সামান্য ভুলও হিন্দুস্তানের পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। তার পরামর্শেই ঘোষকের দল গোটা রাজ্যে ঘোষণা করলো, সম্রাট অসুস্থ থাকায় স্বেচ্ছায় রাজকার্য থেকে অব্যহতি নিয়ে নিজের পুত্র হুমায়ুনকে মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসিয়েছেন।
এই ঘোষণা শোনার পর জনগন আশ্বস্ত হলো যে তাদের সম্রাট জীবিত আছেন, এবং নিজ পুত্রের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে অবসর গ্রহন করেছেন।
সম্রাটের মৃত্যুর পর তাৎক্ষণিক হুমকির মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ করে পরবর্তীতে সম্রাটের মৃত্যু সংবাদ সাম্রাজ্যে প্রকাশ করা হয়।
৯
সম্রাট বাবর মৃত্যুর পূর্বেই তাকে কাবুলে সমাহিত করার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন। তার ইচ্ছানুযায়ীই মৃত্যুর পর মুঘল এই বীরকে যমুনার আড়াই কিলোমিটার পূর্বে আরামবাগের চারবাগে সমাহিত করা হয়। এখানেই একটি বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। যমুনার পূর্বদিকে তৎকালীন সময়ে প্রচুর বাগান ছিলো, যা হিন্দুস্তানের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য থেকে বেশ ব্যতিক্রম ছিলো। ঠিক এ কারণেই হিন্দুস্তানের অধিবাসীরা তখন এই স্থানটিকে কাবুল বলতো। বাবর তার ইচ্ছাতে এই কাবুলের কথাই বলেছেন। আর সম্রাট হুমায়ুনও পিতার ইচ্ছাটির কথা জানতেন। তাই সম্রাট বাবরকে যমুনার পূর্ব তীরেই সমাহিত করা হয়েছিলো। কিন্তু ৯ বছর পর, ১৫৩৯ সালের ২৬ জুন শের শাহ সূরীর নিকট পরাজিত হয়ে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন হিন্দুস্তানের কর্তৃত্ব হারান। হিন্দুস্তানে সাময়িক ছেদ পড়ে মুঘল শাসনামলের। আর এই শের শাহ-এর শাসনামলে বাবরেরই এক স্ত্রী বেগা বেগম বাবরের দেহাবশেষ আফগানিস্তানের কাবুলে বাবরের আরেক সৃষ্টি ‘বাগ-ই-বাবরে’ স্থানান্তর করেন। বেগা বেগমের এই সিদ্ধান্তের কারণ আজও অস্পষ্ট!
কাবুলের ‘বাগ-ই-বাবুর’। বাদশাহ বাবরের আদেশে ১৫২৮ সালে কাবুলে এই বাগানটি নির্মাণ করা হয়। মুঘলদের সবসময়ই বাগানের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিলো। মুঘলরা যেখানেই সীমানা বিস্তার করতে পেরেছিলেন, এখানেই তৈরি করেছেন বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর বাগান; কিন্তু এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, হুমায়ুন তখন ক্ষমতায় থাকলে নিজের পিতার সমধি কখনোই আফগানিস্তানের কাবুলে স্থানান্তর করা হতো না। বাবর সারাজীবন তার ভালোবাসার হিন্দুস্তানের মাটিতেই শুয়ে থাকতে পারতেন।
১০
শারীরিক দিক থেকে সম্রাট বাবর ভীষণ শক্তপোক্ত গড়নের মানুষ ছিলেন। কথিত আছে, তিনি তার দুই কাঁধে দুজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ নিয়ে দৌড়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যেতে পারতেন। এছাড়া, একটানা ৩০ ঘন্টা সাঁতার কাটতে পারতেন তিনি। কিন্তু হিন্দুস্তানের একের পর এক যুদ্ধে তিনি বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তার স্বাস্থ্য দ্রুতই ভেঙ্গে পড়ছিলো। তাছাড়া দিল্লি আর আগ্রা অধিকার করার পর পরই ইব্রাহিম লোদি মা বাবরের খাবারে বিষ প্রয়োগ করে বাবরকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সেইবার বাবর বেঁচে গেলেও বিষের প্রভাব তার শরীরে রয়ে গিয়েছিলো। খুব ধীরে ধীরে হলেও বিষাক্রান্তের ফলে শরীরের ভেতর থেকে দুর্বল হচ্ছিলেন তিনি।
এই ঘটনার পর পরই তাকে বেশ বড় এবং সিদ্ধান্তমূলক দুটি যুদ্ধে নামতে হয়। সব মিলিয়ে তার শরীরের অবস্থা বেশ খারাপই যাচ্ছিলো। এছাড়া তার পুত্র আলোয়ার মির্জার মৃত্যু আর তার কিছুদিন পরেই প্রিয় পুত্র হুমায়ুনের অসুস্থতা পিতা হিসেবে বাবরকে মানসিকভাবে বেশ দুর্বল করে দিয়েছিলো। হিন্দুস্তানের আবহাওয়াও বাবরকে কম ভোগায়নি। সব মিলিয়ে হিন্দুস্তানে আসার পর থেকেই বাবর বিভিন্ন মানসিক আর শারিরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
কাবুলে নিজেরই তৈরি ‘বাগ-ই-বাবুর’-এ সাদামাটা এই কবরে শুয়ে আছেন হিন্দুস্তানের মহান এই সম্রাট। হিন্দুস্তানের মাটিকে আপন করে নেয়া এ সম্রাটের ইচ্ছা ছিলো হিন্দুস্তানের মাটিতেই নিজের শেষ ঠিকানা করে নেয়া। কিন্তু পরবর্তীতে তার কথার ভুল ব্যাখ্যা করে তাকে হিন্দুস্তান থেকে দূরে কাবুলে সমাহিত করা হয়
হিন্দুস্তান বাবরের নিকট অপছন্দীয় হলেও তিনি নিজের ভাগ্য মেনে নিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, তার ভবিষ্যৎ বংশধররা ঠিকই একদিন হিন্দুস্তানকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিবে। আর তারা হিন্দুস্তানকে মন থেকেই আপন করে নিবে। বাবরের ধারণা কোনো অংশেই ভুল প্রমাণিত হয়নি। বাবরের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ঠিকই হিন্দুস্তানকে ভালোবেসে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিলেন। নিজেদের মন মতো নানা রঙ্গে তারা হিন্দুস্তানকে সাজিয়ে তুলেছিলেন। আজও হিন্দুস্তানের পথে প্রান্তরে তাদের ভালোবাসার সেসবের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। @ Masud Ferdous Eshan
১৬
মানুষ হিসেবে যেমন ছিলেন সম্রাট হুমায়ুন
১
একজন শাসক হিসেবে সম্রাট হুমায়ুন ঠিক যতটা ব্যর্থ ছিলেন, মানুষ হিসেবে ঠিক ততটাই সফল ছিলেন। ঐতিহাসিক নিজামউদ্দিন আহমেদ সম্রাটকে ফেরেশতাদের গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কথাটি অতিরঞ্জিত সন্দেহ নেই, তবে সমস্ত মুঘল সম্রাটের মাঝে তাকেই সবচেয়ে ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ হিসেবে ধরা হয়। একাধারে তিনি একজন ধার্মিক, বীর, দয়ালু ও শিক্ষিত মানুষ ছিলেন।
স্বভাবগত দিক থেকে তিনি ছিলেন যথেষ্ট ভদ্র। কখনো কাউকে কটু কথা বলেননি। কারো উপর বিরক্ত হলে বা রাগ প্রকাশ করতে শুধু ‘মূর্খ’ শব্দটি ব্যবহার করতেন।
মানুষ হিসেবে তিনি যথেষ্ট স্নেহ পরায়ণ ছিলেন। নিজ আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি তার ছিল অগাধ ভালোবাসা। তার আপনজনেরা বিশেষ করে ভাইয়েরা বারবার তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার পরও যখনই তারা ক্ষমা চাইতো, তিনি ক্ষমা করে দিতেন। এই বিষয়টিকে অবশ্য সম্রাটের দুর্বলতা হিসেবেও ধরা যায়। গুলবদন বেগম তার লেখাতে ভাই-বোন, আত্মীয়দের প্রতি সম্রাটের ভালোবাসার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।
২
পারিবারিক জীবনে সম্রাট হুমায়ুনের ৮ জন স্ত্রীর কথা জানা যায়। এদের মাঝে বেগা বেগম, হামিদা বানু আর মাহ চুচক বেগম বিশেষ গুরুত্ব বহন করতেন। বেগা বেগমকে তিনি সম্রাট বাবরের জীবদ্দশাতেই বিয়ে করেছিলেন। সম্রাটের বাংলা অভিযানের সময় তিনি সম্রাটের সাথেই ছিলেন এবং শের শাহের হাতে বন্দী হন। শের শাহ বেগা বেগমকে বিন্দুমাত্র অসম্মান না করে মুঘল দরবারে ফেরত পাঠিয়ে দেন।
হামিদা বানুকে সম্রাট হুমায়ুন অদ্ভুত এক পরিস্থিতিতে পছন্দ করে বিয়ে করেছিলেন। তাকে সম্রাট যখন বিয়ে করেন, তখন হিন্দুস্তানের এক ইঞ্চি জমিও তার দখলে ছিল না। পথের ফকির এই সম্রাটকে বিয়ে করতে হামিদা বানুও তেমন আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু সম্রাটের ইচ্ছা বলে কথা, হোক না তিনি নির্বাসিত।
সম্রাটের এই স্ত্রীর গর্ভেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন আকবর। যিনি ভবিষ্যতে মুঘল মসনদে বসবেন এবং তার হাতেই পূর্ণতা পাবে মুঘল সালতানাত।
মাহ চুচক বেগমের সাথে সম্রাটের বিয়ে হয় ১৫৪৬ সালে। তার গর্ভে হুমায়ুনের দুই পুত্র ও চার কন্যার জন্ম হয়েছিল। সম্রাটের মৃত্যু ও আকবরের মসনদ আরোহণের পর তিনি কাবুলে বসবাস শুরু করেন।
হুমায়ুনের অন্যান্য স্ত্রীরা হচ্ছেন- গুণবার বেগম, চাঁদ বিবি, শাদ বিবি, গুলবর্গ বেগম বারলাস এবং মেওয়াজান। এদের মাঝে চাঁদ বিবি ও শাদ বিবি চৌসার যুদ্ধের পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রেই তারা মারা যান, নয়তো পালানোর সময় পানিতে ডুবে মারা যান। একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, সম্রাটের কোনো স্ত্রীই রাজনীতির সাথে তেমন সম্পৃক্ত ছিলেন না।
৩
পড়াশোনার প্রতি সম্রাট হুমায়ুনের এক বিচিত্র ঝোঁক ছিল। তিনি একাধারে আরবী, ফারসি ও তুর্কী ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। চুগতাই তুর্কী ছিল মূলত মুঘলদের মাতৃভাষা। দিল্লি সালতানাতের সময় হিন্দুস্তানের রাজভাষা হিসেবে ফারসি ভাষা ব্যবহৃত হতো। মুঘলরা এসে ফারসিকেই রাজভাষা হিসেবে বহাল রাখেন। সম্রাটের ফারসি ভাষার দক্ষতা তার পারস্যবাসের সময় শাহের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেশ ফলপ্রসু হয়েছিল। সমসাময়িক সময়ে কবি হিসেবেও তার যথেষ্ট সুখ্যাতি ছিল। ফারসি ভাষায় তিনি কবিতাও লিখেছেন। অটোমান অ্যাডমিরাল সাইয়িদি আলি রইস সম্রাটের কাব্য প্রতিভার বেশ প্রশংসা করেছিলেন।
সম্রাট হুমায়ুন নিয়মিত কোরআন পাঠ করতেন। কোরআনের বেশ কিছুটা অংশ তার মুখস্তও ছিল এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে উপযুক্ত আয়াত পাঠ করতে পারতেন। ইসলাম, দর্শন, তুর্কী আর ফারসি সাহিত্যে তার অসাধারণ দখল ছিল। এছাড়া ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিতসহ বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় তার আকর্ষণ ছিল দুর্নিবার। বিশেষত জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি সম্রাটের বিশেষ আগ্রহ ছিল। আকবরের সভাসদ আবুল ফলজের বর্ণনামতে, সম্রাট একটি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। এজন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও সংগ্রহ করা হয়েছিল।
তার দরবারে বেশ কয়েকজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ছিলেন। এদের মাঝে শাহ তাহির দক্ষিণী ও মাওলানা ইলিয়াস উল্লেখযোগ্য। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক বেশিরভাগ জ্ঞানই লাভ করেছেন মাওলানা ইলিয়াসের কাছ থেকে। এছাড়া, ঐতিহাসিকদের মাঝে বায়েজিদ, খন্দমীর আর জওহর সম্রাটের দরবার অলঙ্কৃত করেছিলেন।
তার শাসনামলের লিখিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো ‘জওয়াহিরুল উলুম’ বা ‘বিজ্ঞানের রত্ন’। মাওলানা মুহাম্মদ কর্তৃক ফারসি ভাষায় রচিত এ গ্রন্থটিতে দর্শন, ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্রসহ প্রায় ১২০টি বিষয়ের উপর বিপুল তথ্য ছিল। এটি ছিল অনেকটা এ যুগের বিশ্বকোষ ঘরানার বইয়ের মতো। এছাড়া, সম্রাট জ্ঞানী পণ্ডিতদের সাথে বিজ্ঞান, ধর্ম, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা করতেন।
৪
সম্রাট জ্ঞানী গুণিদের সাথে আলোচনাই যে শুধু করতেন তা না, তিনি সবসময়ই বিদ্বান ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বিদ্বানদের প্রতি তার এই উদারতার সংবাদ শুনে বুখারা, সমরকন্দ থেকে শুরু করে তুর্কীস্তান আর পারস্যের জ্ঞানী-গুণি ও কবিরা সম্রাটের দরবারে ভিড় জমাতেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন বুখারার জাহী আজমান, মা ওয়ারা উন্নাহারের হায়রাতী, তুর্কীস্তানের মাওলানা আবদুল বাকী সদর, বুখারার মীর আবদুল হাই, মাওলানা বজমী, খাজা হিজরি জামী, মোল্লা জান মুহাম্মদ ও মোল্লা মুহাম্মদ সালীহ। উল্লেখিত সবাই সম্রাটের হিন্দুস্তান পুনরুদ্ধার অভিযানের সময় সম্রাটের সাথে যোগ দেন।
সম্রাট হুমায়ুন বইপ্রেমী ছিলেন। কি যুদ্ধ কি শান্তি, সবসময় তার কাছে বই থাকতো। যুদ্ধের সময়ও সাথে করে পুরো একটি গ্রন্থাগার নিয়ে তিনি ঘুরতেন। তালিকান যুদ্ধে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। পরাজয়ের সংবাদ পাওয়ার পর তার প্রথম প্রশ্ন ছিল- বইগুলোর কী অবস্থা?
কিপচাকের যুদ্ধে তার কিছু বই হারিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে বইগুলো তিনি ফেরত পেয়েছিলেন। বইগুলো ফেরত পাওয়ার পর সম্রাটের খুশি দেখে মনে হচ্ছিল কোনো শিশু তার হারিয়ে যাওয়া খেলনা খুঁজে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছে! বইপ্রেমী এই সম্রাট কিন্তু মারাও গিয়েছিলেন তার গ্রন্থাগারের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে।
৫
সম্পদের প্রতি প্রায় সবারই আকর্ষণ থাকে। সম্রাট হুমায়ুন এর ব্যতিক্রম ছিলেন। সম্পদের প্রতি তার তেমন মোহ ছিল না। নিজের জন্য আলাদা করে সম্পদ জমানোরও কোনো চেষ্টা করেননি। দান-সাদাকাহে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। বদায়ূনী লিখেছেন, তিনি এত বেশি দান করতেন যে, মাঝে মাঝে মনে হতো পুরো হিন্দুস্তানের কোষাগারও তার দানের জন্য যথেষ্ট না।
যা-ই হোক, অতিথি আপ্যায়নেও তিনি কোনো কমতি করতেন না। অতিথিদের প্রচুর খাওয়াতেন। সেই সাথে উপহারও দিতেন। ২৮তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে সম্রাট তার সমান ভরের স্বর্ণ দান করেন। পরিমাণে তা ছিল প্রায় ১৫ হাজার স্বর্ণমুদ্রা।
এই হাতখোলা স্বভাবের জন্য তার নিজস্ব ধনসম্পদ তেমন ছিল না। তার এই স্বভাবের খারাপ দিকটা বুঝতে পারেন নির্বাসনের সময়। এ সময় তার হাত একেবারেই খালি হয়ে গিয়েছিল। সৈন্যদের বেতন দিতে না পারায় তাদের ছাটাই করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিশেষ প্রয়োজনে তারই অধীনস্ত এক আমিরের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়েছিলেন।
৬
সম্রাটের চরিত্রের সবচেয়ে বাজে দিকটি ছিল তার অলসতা আর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা। এ দুটি বৈশিষ্টের কারণে তাকে জীবনে বহু কষ্ট করতে হয়েছে। তিনি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চাইতেন না। বাস্তবতা থেকে সবসময় পালিয়ে বেড়াতে চাইতেন।
এসব বৈশিষ্ট্য তাকে ঝামেলায় ফেলে দিতো। যেমন গুজরাট অভিযানের সময় যাত্রাপথে লম্বা বিরতি, আসকারি মির্জা গুজরাটের বিদ্রোহ সামলাতে অপারগ হলে তার সাহায্যের জন্য এগিয়ে না যাওয়া, গুজরাট হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর আগ্রায় ফিরে দ্রুত পদক্ষেপ না নিয়ে উৎসবে মেতে থাকা, বাংলা বিজয়ের পর দীর্ঘ সময় বাংলায় নিষ্ক্রিয় থেকে বাংলার সৌন্দর্য্য উপভোগ করা, চৌসা ও কনৌজের যুদ্ধে শত্রুর শক্তিমত্তা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করতে না পারা, এমনকি যুদ্ধের কৌশলে ভুল করা- এত কিছুর মূলে সম্রাটের বদ অভ্যাসগুলোই দায়ী।
তবে, তার চরিত্র বেশ আকর্ষণীয় ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আকর্ষণীয় হলেও তিনি তার এই চরিত্র দিয়ে মানুষকে বেশিক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখতে পারতেন না, যা একজন সম্রাটের থাকা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। তাছাড়া, সম্রাট হুমায়ুন দৃঢ়চেতা ছিলেন না, সবসময় সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতেন। আবার যখন দ্রুত সিদ্ধান্ত দেয়া উচিত, তখনও যথাসময়ে উত্তম সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন না।
৭
তিনি নিয়মিত কুরআন পাঠ করতেন। সবসময় অজুর মাধ্যমে পবিত্র থাকতেন। এমনকি অযু ছাড়া তিনি কখনোই আল্লাহ বা মুহাম্মদ (সা.) এর নাম মুখে নিতেন না। ইসলামে এমন করার বাধ্যবাধকতা নেই, তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই নিয়মটি খুব কঠোরভাবে মানতেন। এমনকি কারো নামের কোন অংশে যদি আল্লাহ বা মুহাম্মদ (সা.) এর নাম থাকতো, তিনি আল্লাহ ও মুহাম্মদ (সা.) এর নামটি বাদ দিয়ে বাকি অংশে ডাকতেন। তিনি ভাগ্য বা তাকদীরে বিশ্বাস করতেন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামী নিয়ম-কানুন মানার চেষ্টা করতেন।
তবে, ধার্মিক হওয়া স্বত্বেও তিনি ধর্মান্ধ ছিলেন না। তার দরবারে যেমন সুন্নি আমির ছিল, তেমনই শিয়া আমিরও ছিল। তার দরবারে শাহ আবুল মালির মতো সুন্নীরাও প্রভাবশালী ছিল, আবার বৈরাম খানের মতো শিয়ারাও প্রভাবশালী ছিল। তবে সম্রাট হুমায়ুন হয়তো কখনোই কল্পনা করতে পারেননি, যে একসময় এই সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্বে পড়েই মুঘল সাম্রাজ্য ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে যাবে।
সম্রাট হুমায়ুন সুন্নি মুসলিম ছিলেন আগেই বলা হয়েছে। তবে শিয়া শাসিত পারস্যে যাওয়ার পর কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে, যার কারণে সম্রাট শিয়া মত গ্রহণে বাধ্য হয়েছিলেন। পারস্যে যাওয়ার পর শাহ তাকে শিয়া মত গ্রহণ করার জন্য উপর্যুপুরি চাপ দিতে থাকেন, এবং বলেন শিয়া মতবাদ গ্রহণ করলে তাকে হিন্দুস্তানের অভিযান চালানোর জন্য সেনাবাহিনী দেওয়া হবে। সম্রাট এই প্রশ্নের পরিষ্কার জবাব দেন যে রাজত্ব করার ইচ্ছা তার শেষ। এখন তিনি মক্কায় গিয়ে শান্তিতে দিন কাটাতে চান।
শাহ এর উত্তর আরও ভয়ানকভাবে দেন। তিনি জানান শীঘ্রই তিনি সুন্নিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় তার হাতে বন্দী একজন ধর্মপ্রাণ সুন্নি শাসক তাকে নানাভাবে কূটনৈতিক সুবিধা দিবে। এমনকি একপর্যায়ে শিয়া মত গ্রহণ না করলে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হবে, এমন হুমকিও দিয়ে বসেন।
পরবর্তীতে অনেক ঘটনাপ্রবাহের পর সম্রাট শিয়া মত গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, অন্তত পারস্যে অবস্থানের সাময়িক সময়টুকুতে। এ সময়টুকুতে সম্রাট শিয়াদের মতো করে চুল কেটেছিলেন, টুপি পরেছিলেন, খুতবায় ১২ ইমামের নাম পর্যন্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে মজার বিষয় হলো, পারস্য ত্যাগের পরই সম্রাট হুমায়ুন শিয়াদের সমস্ত চিহ্ন নিজের বিশ্বাস থেকে ঝেড়ে ফেলে দেন।
সম্রাট হুমায়ুন হয়তো শিয়া মত মন থেকে গ্রহণ করেননি, তবে তার পারস্য যাত্রা শিয়াদের জন্য হিন্দুস্তানের দরজা আজীবনের জন্য খুলে দিল। পরবর্তীতে শিয়ারা দলে দলে মুঘল হিন্দুস্তানে আসতে শুরু করলো। মুঘল সম্রাটদের ধর্মীয় উদারতার ফলে তারা দরবারের উঁচু উঁচু পদ দখল করতে শুরু করে দিলো। তবে, যতদিন সম্রাটরা নিজেরা শক্তিশালী ছিলেন, ততদিন তারা দলাদলির সুযোগ পায়নি। পরবর্তী দুর্বল মুঘল শাসকদের যুগে এই শিয়াদের কারণে মুঘল দরবারে সুন্নি-শিয়া ধর্মীয় বিভাজন শুরু হয়, যা মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য কোনোদিক দিয়েই সুফল বয়ে আনেনি।
নিজে মুসলিম হলেও অন্যান্য মুসলিম এবং মুঘল সম্রাটদের মতো সম্রাট হুমায়ুন কখনো কোনো হিন্দুকে অত্যাচার করেননি কিংবা তাদের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধও ঘোষণা করেননি। নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার হুমায়ুনের রাজত্বে হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মালম্বীদের ছিল।
হিন্দুদের প্রতি তার উদারতার ফল তিনি হাতেনাতে পেয়েছিলেন। বিভিন্ন যুদ্ধে রাজপুতদের সহযোগীতা পেয়েছিলেন তিনি। চৌসার যুদ্ধের পরাজয়ের পর রাজা বীরভান তাকে যথাসাধ্য সাহায্য সহযোগীতা করেন। আবার শের শাহের ধাওয়া খেয়ে হিন্দুস্তান ত্যাগের পর যোধপুরের রাজা মালদেব তাকে আন্তরিকভাবেই সহযোগীতা করতে চেয়েছিলেন।
৮
সম্রাটের পারস্য যাত্রার আরেকটি ফল হলো মুঘল চিত্রকলার বিকাশ। ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে মুসলিম হিন্দুস্তানের প্রাচীন শিল্পকলা ধীরে ধীরে মুখ থুবড়ে পড়ছিল। কিন্তু, হিন্দুস্তানের পাশেই পারস্যে চিত্রকলা বলতে গেলে নব একটি যুগ লাভ করে। পারস্যে অবস্থানের সময় এই পারসিক চিত্রকলার দ্বারা সম্রাট বিপুল উৎসাহিত হন, যা পরবর্তীতে মুঘল চিত্রকলার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।
তাবরিজে অবস্থানকালে সম্রাটের সাথে মীর সৈয়দ আলী ও আবদুস সামাদ নামে দুই চিত্রশিল্পীর সাথে পরিচয় হয়। পারস্য থেকে ফিরে সম্রাট হিন্দুস্তান অভিযান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যান। পরবর্তীতে কাবুল বিজয়ের পর ১৫৫০ সালে এই দুই চিত্রশিল্পী সম্রাট হুমায়ুনের দরবারে চলে আসেন। সম্রাট তাদের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন। হুমায়ুনের নির্দেশে তারা ফারসি ‘দাস্তানে আমীর হামজা’ গ্রন্থের চিত্রণ কাজে মনোনিবেশ করেন। ১২ খণ্ডে মোট ১২০০টি চিত্র অঙ্কনের জন্য ঠিক করা হয়। পরবর্তী ৭ বছরে তারা ৪টি খণ্ড সমাপ্ত করেন। সম্রাট হুমায়ুন হুট করে মারা যাওয়ার পরও এই কাজ চলতে থাকে। আকবরের শাসনামলে এই কাজ শেষ হয়।
৯
দিনশেষে সম্রাট হুমায়ুন একজন মানুষ ছিলেন। তার চরিত্রে দুর্লভ কিছু গুণের সমাহার যেমন ঘটেছিল, তেমনই কিছু ত্রুটিও তার চরিত্রে ছিল। তবে মানুষ হিসেবে যে তিনি অসাধারণ ছিলেন, তা যে কেউই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তিনি জন্মেছিলেন একটি রাজবংশে, বেড়ে উঠেছিলেন একটি রাজবংশে, আর তার নিয়তিই তাকে শাসকের পদে বসিয়ে দেয়। তবে, তাইমুরি বংশের তেজ তার ভেতরে কখনোই দেখা যায়নি। তার ভাগ্যই ছিল এমন যে, ভবিষ্যতে একজন মানুষ হিসেবে মূল্যায়িত হওয়ার চেয়ে একজন শাসক হিসেবে তার মূল্যায়নটা মূখ্য হয়ে উঠবে। আর এই দিকটিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন।
পিতার কাছ থেকে বিশাল এক সাম্রাজ্য পেয়েছিলেন তিনি। তবে যে কারণেই হোক, তা তিনি ধরে রাখতে পারেননি। তবে ভাগ্যের বিষয় হলো, পিতার রেখে যাওয়া সাম্রাজ্য তিনি পুনরুদ্ধার করে রেখে যেতে পেরেছিলেন। একজন শাসক হিসেবে এটাই তার সফলতা। @ Masud Ferdous Eshan
১৭
সম্রাট হুমায়ুনের ঘটনাবহুল শাসনামল
৯৩৭ হিজরির জমাদিউল আউয়াল মাসের ১০ তারিখ অনুযায়ী, ১৫৩০ সালের ৩০ ডিসেম্বরে হিন্দুস্তানের মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন সদ্য প্রয়াত সম্রাট বাবরের জ্যেষ্ঠপুত্র নাসিরুদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন। সিংহাসনে আরোহণ করে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব নিজ হাতে বুঝে পাওয়ার জন্য হুমায়ুনের কিছুটা সময় প্রয়োজন ছিল। তাই এই সময়টুকুতে তিনি তার পরিবার কিংবা আত্মীয়স্বজন কারো সাথেই দেখা করতে পারেননি। সিংহাসন নিজ অধিকারে পাওয়ার কয়েকদিন পর তিনি তার পরিবারের সাথে দেখা করেন। শুধু সম্রাট নয়, বরং পরিবারের কর্তা হিসেবে তিনি সবার খোঁজখবর নেন এবং সদ্য প্রয়াত সম্রাট বাবরের জন্য শোক প্রকাশ করে সবাইকে সান্ত্বনা দেন।
একই দিনে হুমায়ুনের সৎ ছোটভাই হিন্দাল মির্জা কাবুল থেকে দিল্লি এসে পৌঁছান। কাবুলে অবস্থানকালে বাদশাহ বাবরের অসুস্থতার সংবাদ তার কাছে পাঠানো হয়েছিল। সংবাদ শুনেই তিনি আগ্রার পথে ছুটতে থাকেন। কিন্তু পিতার শেষ সময়ে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি। অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় শুয়ে বারবার হিন্দাল মির্জার খোঁজ করেছিলেন বাবর। কিন্তু পিতাকে শেষবারের মতো দেখার সৌভাগ্য হয়নি। দেখে সম্রাট হুমায়ুন হিন্দালকে বুকে টেনে নেন। পিতার নিকট থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ তাকে দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
সম্রাট বাবরের মৃত্যুর পর হুমায়ুনের প্রধান কাজ ছিল নিজের প্রশাসন গুছিয়ে নেওয়া। এসময় বাবরের শাসনামলের অনেক কর্মীই আশংকা করছিল তাদের পূর্বের দায়িত্ব কিংবা সুযোগ সুবিধা বহাল থাকবে কিনা। কিন্তু হুমায়ুন সবাইকে আশ্বস্ত করে নিজেদের পূর্বের পদমর্যাদা কিংবা অন্যান্য রাজকীয় সুযোগ সুবিধা বহাল রাখার নির্দেশ দেন। মুঘল সম্রাট হিসেবে হুমায়ুনের এ ঘোষণায় সবাই আশ্বস্ত হন।
হুমায়ুন যখন মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন, তখন দেখতে পান রাজকোষ অনেকটাই ফাঁকা। সম্রাট বাবরের কোমল হৃদয় আর প্রজাদের প্রতি অতিরিক্ত বদান্যতার ফল ছিল এটি। তিনি দিল্লি আর আগ্রা অধিকার করেই প্রজাদের মাঝে বিপুল অর্থ বিতরণ করেন। তাছাড়া প্রজাদের মন জয় করার জন্য সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে শুরু করেন, যা হুট করে সাম্রাজ্যের রাজকোষে চাপ প্রদান করে। গুলবদন বেগম তার ‘হুমায়ুননামা’ গ্রন্থে এই অবস্থার আরেকটি কারণ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন,
“যুদ্ধ জয়ের পর (পানিপথের যুদ্ধ) আমার পিতা মহান বাদশাহ পাঁচজন রাজার ধনসম্পদ নিজ অধিকারে নিয়ে নেন এবং সকল অর্থ সৈন্য ও সহযোগীদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এ প্রথাটি হিন্দুস্তানি আমিরদের পছন্দ হয়নি। তারা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। তাদের কাছে এভাবে অর্থের অপচয় সঠিক মনে হয়নি। তারা আমার পিতাকে বোঝাতে চেষ্টা করেন এভাবে অর্থভাণ্ডার নিঃশেষ করা ঠিক হবে না। আগে নতুন বিজেতারা এসে বরং যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে পাওয়া অর্থের আরো বৃদ্ধি ঘটাতেন। কিন্তু আমার পিতা এসব আলোচনাকে আমলে নেননি। তিনি তার অভিপ্রায় ও নিজ সংস্কৃতিকেই বহাল রাখলেন। বণ্টন করে দিলেন সকল সম্পদ।”
তাছাড়া, পরবর্তীতে প্রজাদের বিভিন্ন প্রকার কর মওকুফ করার কারণেও রাজকোষ কিছুটা সংকুচিত অবস্থাতে ছিল।
হুমায়ুনের সিংহাসন প্রাপ্তিতে বাবরের সময়কার অনেক সেনাপতিই নাখোশ ছিলেন। তারা শুরুর দিকে হুমায়ুনের আদেশ তেমনভাবে মানতেন না। এছাড়া সিংহাসনের প্রশ্নে শুরুতেই তাকে বিভিন্ন বিদ্রোহের মোকাবেলা করতে হয়, যা দমন করতে বেশ ভালো পরিমাণ সম্পদের প্রয়োজন পড়ে। তাই সিংহাসন প্রাপ্তির পর রাজকোষের এই অবস্থা প্রাথমিকভাবে হুমায়ুনকে কিছুটা চাপের মুখে ফেলেছিল।
প্রথম মুঘল সম্রাট বাবর যখন অসুস্থ ছিলেন, হুমায়ুন তখন কালিঞ্জরের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভিযানে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু বাবরের অসুস্থতার কারণে আগ্রায় ফিরে আসায় কালিঞ্জর অবরোধ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। সিংহাসনে বসার পর ১৫৩১ সালে হুমায়ুন আবারো কালিঞ্জর অবরোধের দিকে মনোযোগ দিলেন। কালিঞ্জর দুর্গটি বুন্দেলখন্ডের শেষ প্রান্তে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,২০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত খুবই সুরক্ষিত ও শক্তিশালী একটি দুর্গ। এটি জয় করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। কারণ, ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত হওয়ায় এখানে অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব ছিল। পূর্বে এই দুর্গটি দখল করার চেষ্টা করেছিলেন কুতুব উদ্দিন আইবেক, শামসুদ্দিন ইলতুৎমিশ আর নাসিরুদ্দিন মাহমুদের মতো দিল্লির সুলতানশাহী শাসনামলের শাসকরা। কিন্তু দুর্গমতার জন্য কেউই দুর্গটি দখল করতে পারেননি।
হুমায়ুন যখন পুনরায় কালিঞ্জর অবরোধ করে বসে আছেন, সে সময়েই একটি দুঃসংবাদ এসে পৌছায়। দিল্লির লোদি সালতানাতের শেষ সুলতান ইব্রাহীম লোদির ভাই মাহমুদ লোদি আবারো মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য শক্তি সঞ্চয় করছে। সংবাদটি সত্যিই বিপজ্জনক। হুমায়ুন আফগানদের সক্ষমতা সম্পর্কে বেশ ভালো জানতেন। তিনি জানেন সংগঠিত হবার মতো প্রয়োজনীয় সুযোগ পেলে তারা মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই তিনি দ্রুত কালিঞ্জর অবরোধ শেষ করতে চাইলেন। অনেক আলাপ আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত প্রায় ১২ মণ স্বর্ণ আর হুমায়ুনের অধীনে সামন্ত রাজা হিসেবে থাকার চুক্তিতে রাজপুত এই রাজ্যটি থেকে তিনি অবরোধ তুলে নিয়ে আফগানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন।
সামরিক কিংবা রাজনৈতিক, যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হোক না কেন, এই সিদ্ধান্তটি হুমায়ুনের জন্য বিরাট ভুল ছিল। কারণ কালিঞ্জর প্রায় তার হাতের মুঠোতেই ছিল। তাড়াহুড়া করে অবরোধ তুলে না নিলে তিনি ধীরেসুস্থেই কালিঞ্জর জয় করে আফগানদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হতে পারতেন।
এদিকে সত্যিকার অর্থেই মাহমুদ লোদির নেতৃত্বে আফগানরা মুঘলদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হচ্ছিল। মাহমুদ লোদির প্রধান দুই সেনাপতি বিবন খান জালওয়ানী আর শেখ বায়েজীদ কারমালি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ যোদ্ধা ছিলেন। সেইসাথে নিজেদের সাহসিকতা আর বীরত্বের জন্য আফগানদের নিকট তারা বেশ সমাদৃতও ছিলেন। মাহমুদ লোদির নেতৃত্বে আফগানরা তাদের প্রথম আঘাতটি হানে জৈনপুরে। জৈনপুরে মুঘল প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন মুঘল সেনাবাহিনীর দক্ষ জেনারেল জুনায়েদ বারলাস। কিন্তু আফগানদের এই আক্রমণ থেকে তিনি জৈনপুরকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলেন।
জৈনপুরে মুঘলদের বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত সহজ এই বিজয়ে আফগানরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। বিজয়ের পর তারা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। এদিকে হুমায়ুন যে তাদের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে, এই খবর তাদের ছিল না। ফলাফল, খুব সহজেই দৌরার যুদ্ধে আফগানরা পরাজিত হয়ে পিছু হটে। ছত্রভঙ্গ আফগান বাহিনীর একটি বিশাল অংশ শের খানের নেতৃত্বে চুনার দুর্গে আশ্রয় নেয়। দুর্গটি বারানসীর দক্ষিণ-পশ্চিম দিক বরাবর গঙ্গার তীরে অবস্থিত।
চুনার দুর্গে আফগান সেনাদের বিরাট একটি অংশ আশ্রয় নেয়ায় হুমায়ুন সেখানে অবরোধ করেন। কিন্তু দুর্গ অবরোধকালে তিনি সংবাদ পেলেন গুজরাটের বাহাদুর শাহ আগ্রাতে হুমায়ুনের অনুপস্থিতির সুযোগে আগ্রা অভিমুখে অভিযান চালানোর জন্য অগ্রসর হচ্ছে। হুমায়ুন পড়ে গেলেন উভয় সংকটে। তিনি জানেন, তার অনেক সেনাপতি কিংবা সভাসদ এখনো তাকে মন থেকে মেনে নেয়নি। বাহাদুর শাহের অভিযান শুরু হলে তারা দল বদল করতে সময় নেবে না। ফলে দ্রুতই আগ্রার পতন ঘটবে।
কিন্তু এদিকে আফগানদের সুরাহা না করে পিছু হটা মানে শত্রুকে পেছনে মুক্ত করে দিয়ে আসা। অনেক চিন্তাভাবনা করে হুমায়ুন শেষ পর্যন্ত আগ্রা রক্ষাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে শের খানের সাথে একটি চুক্তিতে সাক্ষর করে তিনি চুনার দুর্গ অবরোধ তুলে নিয়ে আগ্রার দিকে অগ্রসর হন। চুক্তির শর্তানুসারে শের খান হুমায়ুনের অধীনস্থ সামন্ত রাজা হিসেবে চুনার দুর্গ নিজের অধিকারে রাখবেন এবং বার্ষিক কর প্রদান করবেন।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে হুমায়ুন যে অনেকটাই অপরিপক্ব ছিলেন, তা তার এই সিদ্ধান্ত থেকেই বোঝা যায়। তিনি শের খানকে বিশ্বাস করে চুনার দুর্গ শাসনের অধিকার দিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি শের খানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা শক্তি সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখেননি। তার উপর তিনি শের খানকে তার বাহিনী গুছিয়ে নেয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিয়ে এসেছেন।
হুমায়ুন তার শাসক জীবনে অসংখ্য ভুল করেছেন। সেসবের মাশুল কড়ায় গণ্ডায় দিতে হয়েছিল পথে পথে ভিখিরির মতো ঘুরে ঘুরে। যে সময় তার বিরুদ্ধে আফগান মাহমুদ লোদি, গুজরাটের বাহাদুর শাহ কিংবা শের খানের মতো শক্তি একের পর এক মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিল, তখন তিনি আগ্রা ফিরে নিজেকে আমোদ প্রমোদে ব্যস্ত রাখলেন। যে সময় তার বিরুদ্ধে নিজের আত্মীয়রাই একের পর এক ষড়যন্ত্র করছিল, তখন তাদের লঘু শাস্তি দিয়ে ছাড় দিচ্ছিলেন। অথচ, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এসব অপরাধের শাস্তি হতে পারতো মৃত্যুদণ্ড।
তিনি তার বিপদের সময় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়ে উৎসবে মেতে রইলেন। গুলবদন বেগম রচিত ‘হুমায়ুননামা’ গ্রন্থের বর্ণনা থেকেই তা স্পষ্ট হবে।
‘এসময় বাদশাহ হুমায়ুন চুনার যুদ্ধ শেষে নিরাপদে আগ্রায় ফিরে আসেন। এ উপলক্ষ্যে আমার মা বিশাল ভোজের আয়োজন করলেন। সমস্ত নগর আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হলো। তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সৈন্যদের প্রতি নির্দেশ জারি করলেন তারাও যেন নিজেদের আবাসিক এলাকা সুসজ্জিত করেন। এদিন থেকে হিন্দুস্তানে উৎসবে আলোকসজ্জা করা রেওয়াজে পরিণত হলো।
মঞ্চে (ভোজ অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে) একটি চারধাপ বিশিষ্ট সিংহাসন স্থাপন করা হলো। সিংহাসনটি বহুমূল্যবান মণিমাণিক্যে খচিত ছিল। এর ওপর রাখা হয়েছিল তাকিয়া ও বালিশ। এগুলো স্বর্ণের সুতোয় নকশা শোভিত ছিল। দর্শক আসনের ওপর যে বিশাল শামিয়ানা টানানো হয়েছিল তার ভেতরের দিকটায় ব্যবহার করা হয়েছিল ইউরোপীয় ব্রোকেড আর বাইরের দিকটায় ব্যবহার করা হয়েছিল পর্তুগীজ কাপড়। শামিয়ানার খুঁটিগুলোতেও স্বর্ণের কারুকাজ করা হয়েছিল। সবকিছুই হয়েছিল চমৎকার অলঙ্করণ সমৃদ্ধ।
আমার মায়ের শিবিরও সুসজ্জিত করা হয়েছিল। দরজার সামনে ঝোলানো হয়েছিল স্বর্ণের কারুকাজখচিত গুজরাটি কাপড়ের পর্দা। ভেতরে রাখা হয়েছিল বহু মূল্যবান গোলাপজলদানি, মোমবাতিদানি আর পানি খাওয়ার গ্লাস। সকল কিছুই মণিমাণিক্য আর স্বর্ণ নিয়ে সজ্জিত ছিল।
এ ঐশ্বর্যপূর্ণ ভোজ উৎসবে আমার মা আমন্ত্রিতদের মধ্যে বারো সারি উট, বারো সারি খচ্চর, সত্তরটি সওয়ারি ঘোড়া এবং একশোটি সাধারণ ঘোড়া বিতরণ করেন। এছাড়াও তিনি সাত হাজার জনকে রাষ্ট্রীয় খেলাত দান করেন। এ উৎসব সাত দিনব্যাপী উদযাপিত হয়েছিল।’
যে সময় সাম্রাজ্যের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আরো সুসংহত করে শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেয়ার কথা ছিল, সেসময় তিনি অযথা আমোদ প্রমোদ করে মূল্যবান সময় নষ্ট করছিলেন।
১৫৩৩ সালের ৮ মে, আগ্রায় হুমায়ুনের মা মাহাম বেগম ইন্তেকাল করেন। বাবরের মৃত্যুর পর মাহাম বেগমের এই আকস্মিক মৃত্যু মুঘল পরিবারের জন্য বিরাট এক ধাক্কা ছিল। বাবরের বেশ কয়েকজন স্ত্রী থাকলেও মাহাম বেগম সবচেয়ে বেশি মর্যাদা পেতেন এবং একমাত্র তারই অধিকার ছিল রাজদরবারে সম্রাটের পাশে বসার। মাহাম বেগমের এই মৃত্যুতে হুমায়ুন কিছুটা ভেঙ্গে পড়েন। হুমায়ুনের এই দুঃসময়ে হুমায়ুনের পাশে থেকে সবসময় তাকে সান্ত্বনা আর সাহস যোগাতেন হুমায়ুনের ফুপু খানজাদা বেগম। কার্যত মাহাম বেগমের মৃত্যুর পর খানজাদা বেগমের কাছেই দায়িত্ব এসে পড়ে মুঘল পরিবারের অভ্যন্তরীন বিভিন্ন বিষয় সামলানোর।
মায়ের মৃত্যু শোক সামলে নিয়ে প্রায় ৪০ দিন পর জুলাই মাসে হুমায়ুন দিল্লিতে যান। তিনি দিল্লিতে একটি নতুন রাজধানী তৈরির স্বপ্ন দেখতে থাকেন। তার ইচ্ছাতেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ঐতিহাসিক ‘দ্বীন-পানাহ’ নগরী বা ‘ঈমানদারদের আশ্রয়স্থল’-এর। মুঘল স্থাপত্যবিদদের দক্ষতায় খুব দ্রুত এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ‘দ্বীন-পানাহ’-এর নির্মাণ শেষ করে প্রায় ১ বছর পর হুমায়ুন আবারো আগ্রা ফিরে যান।
আগ্রা ফিরে গিয়ে ‘দ্বীন-পানাহ’-এর নির্মাণ কাজের সমাপ্তি ও ভাই হিন্দাল মির্জার বিয়ে উপলক্ষ্যে বেশ কয়েকটি রাজকীয় ভোজের আয়োজন করা হয়। হিন্দাল মির্জার বিয়ে ঠিক করা হয়েছিল বিদ্রোহী জামান মির্জার বোন সুলতানা বেগমের সাথে। হিন্দাল মির্জার সাথে সুলতানা বেগমের এই বিয়ে জীবিত থাকতে মাহাম বেগমই ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু তার অসুস্থতার কারণে তখন আর বিয়েটি হয়নি। মাহাম বেগমের মৃত্যুর পর খানজাদা বেগমই নিজ আগ্রহ আর দায়িত্ব নিয়ে বিয়েটি সম্পন্ন করেন। এই বিয়ের রাজনৈতিক আর কূটনৈতিক গুরুত্ব ছিল অনেক। জামান মির্জা হুমায়ুনের সিংহাসনে আরোহণের সময় বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে জামান মির্জা ও হুমায়ুনের মধ্য একধরনের শত্রুতার সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এই বিয়ের ফলে হুমায়ুনের সাথে জামান মির্জার সমস্ত অতীত তিক্ততা মুছে যায়।
হুমায়ুন মূলত জামান মির্জাকে ক্ষমা করেছিলেন, কারণ তিনি তার সৎ বড় বোন মাসুমা বেগমের স্বামী ছিলেন। এদিকে হিন্দাল মির্জা তার কন্যাকে বিয়ে করায় সম্পর্কের দিক দিয়ে তিনি হিন্দাল মির্জার শ্বশুরও হয়ে যান। এছাড়া জামান মির্জা তৈমুরের বংশধরও ছিলেন।
হিন্দাল মির্জার সাথে জামান মির্জার কন্যার বিয়ের পর হুমায়ুন জামান মির্জাকে বিহারের গভর্নরের দায়িত্ব দিয়ে বিহার পাঠিয়ে দেন। হুমায়ুন আশাবাদী ছিলেন এর ফলে জামান মির্জার মন থেকেও সমস্ত শত্রুতা মুছে যাবে। মুঘল পরিবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমৃদ্ধ হিন্দুস্তান গড়ার কাজে হাত দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হুমায়ুনের আশা আর পূরণ হয়নি। বিহারে সুযোগ পেয়েই জামান মির্জা আবারো বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন।
জামান মির্জার বিদ্রোহের প্রস্তুতির খবর গুপ্তচরের মাধ্যমে ঠিকই হুমায়ুনের কানে পৌঁছে গেল। জামান মির্জাকে দ্রুত গ্রেফতার করা হলো। এসময় বিদ্রোহের সহযোগী হিসেবে সুলতান মুহাম্মদ মির্জা ও ওয়ালি খাব সুলতানকে (ঐতিহাসিকগণ তাকে ‘নাই খাব সুলতান’ নামেও উল্লেখ করেছেন) আটক করা হয়। সুলতান মুহাম্মদ মির্জা ছিলেন জামান মির্জার মামাতো ভাই। হুমায়ুন তার মামা ও শ্বশুর ইয়াদগার বেগ তাগাইর হেফাজতে তাদের আটক করে রাখার নির্দেশ দিলেন। হুমায়ুনের পক্ষ থেকে আরেকটি নির্দেশনাও ছিল। বিশ্বাসঘাতকতা ও বিদ্রোহের অপরাধে জামান মির্জা, সুলতান মুহাম্মদ মির্জা ও ওয়ালি খাব সুলতানকে যেন অন্ধ করে দেয়া হয়।
সেই সময় রাজকীয় পরিবারের সাথে সম্পর্কযুক্ত কাউকে বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা বিদ্রোহের অপরাধে প্রথমেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো না। বরং, অভিযুক্ত ব্যক্তি যেন আবার বিদ্রোহ কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা করার সুযোগ না পায়, সেজন্য অন্ধ করে দেওয়া হতো। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও আছে। পুরো বিষয়টি নির্ভর করতো সম্রাটে ব্যক্তিগত ইচ্ছা আর অভিযুক্ত ব্যক্তি বংশ কিংবা পদমর্যাদার উপর।
সম্রাটের এই নির্দেশে ওয়ালি খাব সুলতান নিজের দৃষ্টিশক্তি হারালেন। কিন্তু সুলতান মুহাম্মদ মির্জা তার দুই পুত্র উলুঘ মির্জা ও শাহ মির্জাকে নিয়ে পালাতে সক্ষম হলেন। এরপর দীর্ঘদিন তারা হিন্দুস্তানে হুমায়ুনকে নানাভাবে উৎপাত করে যন্ত্রণা দিয়েছেন।
আর জামান মির্জার কী হলো? জামান মির্জা যেভাবেই হোক ইয়াদগার বেগ তাগাইর মন জয় করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভাগিনা ও জামাতা হুমায়ুনের সরাসরি আদেশ লঙ্ঘন করে তিনি জামান মির্জাকে অন্ধ না করে কারাগারে আটক করে রেখেছিলেন। কিন্তু ধুরন্ধর জামান মির্জা শেষ পর্যন্ত কারাগার থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পালিয়ে গিয়ে তিনি আশ্রয় নেন হুমায়ুনেরই শত্রু গুজরাটের বাহাদুর শাহের দরবারে।
পালিয়ে বাহাদুর শাহের কাছে আশ্রয় নেয়ার সময় অপরিণামদর্শী জামান মির্জা কি ভেবেছিলেন তিনি মুঘল সাম্রাজ্যকে আবারো একটি দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের মুখে ফেলতে যাচ্ছেন? এদিকে জামান মির্জা পালিয়ে যাওয়ায় ইয়াদগার বেগ তাগাই ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি হুমায়ুনের ক্রোধের ভয় পাচ্ছিলেন। উপায় না দেখে তিনিও জামান মির্জার পথ ধরে গুজরাট গেলেন। তিনি চাইছিলেন, যে করেই হোক জামান মির্জাকে আবারো ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু তার সেই প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো।
বাহাদুর শাহের সাথে এমনিতে হুমায়ুনের তিক্ত কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবে বাহাদুর শাহ আলাউদ্দিন আলম খানের পুত্র তাতার খানের প্ররোচনায় মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময়েই জামান মির্জার গুজরাটের দরবারে আগমন ঘটে।
মুঘল সম্রাট হুমায়ুন জামান মির্জাকে ফিরিয়ে দিতে বাহাদুর শাহের দরবারে দূত প্রেরণ করেন। জবাবে বাহাদুর শাহ উদ্ধত আচরণ করেন। এর ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের সাথে গুজরাটের সংঘর্ষ একরকম নিশ্চিতই হয়ে যায়। এরপর মুঘল সেনাবাহিনী এবং গুজরাটের সেনাবাহিনী- উভয়ই একে অপরকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। @ Masud Ferdous Eshan
১৮
সম্রাট হুমায়ুনের হিন্দুস্তান পুনরুদ্ধার:
১
১৫৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে নির্বাসিত মুঘল সম্রাট নাসিরুদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন পারস্যের সিস্তান ত্যাগ করে কান্দাহারের মাটিতে পা রাখলেন। সম্রাটের সাথে সেখানে পা রাখে পারস্যের শাহের দেওয়া ১২ হাজার সৈন্যের মাঝারি আকারের সেনাবাহিনীটিও।
এ সময় আসকারি মির্জা কামরান মির্জার অধীনে থেকে কান্দাহার শাসন করছিলেন। হুমায়ুন যখন কান্দাহারের সীমান্তে এসে পৌঁছান, আসকারি মির্জা তখন কান্দাহারেই ছিলেন। আর কামরান মির্জা ছিলেন কাবুলে। সম্রাট হুমায়ুন এবার আর কূটনৈতিক তৎপরতায় কোনো সময়ক্ষেপণ না করেই সোজা বুস্ত দুর্গ অবরোধ করে বসলেন। কামরানের যোদ্ধারা দুর্গ ধরে রাখতে না পেরে আত্মসমর্পণ করলো। সম্রাট এরপর গেলেন গরমশিরের দিকে। দুর্গপতি মীর আবদুল হাই গরমশিরের দুর্গটি সম্রাটের নিকট সমর্পণ করে দিলেন।
এদিকে হুমায়ুনের পারস্যের সাহায্যপ্রাপ্তির কথা কামরান মির্জা ও আসকারি মির্জা জানতেন। তারা মোটামুটি সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু টানা দুটি দুর্গের পতনে আসকারি মির্জা বেশ ঘাবড়ে গেলেন। তাই তিনি কান্দাহার থেকে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। নিজের সাথে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাজকোষ একত্রিত করলেন। কিন্তু প্রচণ্ড শীত আর বরফঢাকা পথের দুর্গমতার জন্য কাবুলের উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা করা সম্ভব হচ্ছিলো না।
এদিকে আসকারি মির্জার পলায়নের তৎপরতার সংবাদ শোনা মাত্র সম্রাট ৫ হাজার পারস্য যোদ্ধাকে পাঠিয়ে দিলেন তাকে আটক করার জন্য। এই সেনাবাহিনীটি কান্দাহার দুর্গের কাছাকাছি পৌঁছালে তিনি কামরান মির্জার কাছে জরুরি ভিত্তিতে সামরিক সহায়তা চেয়ে বার্তা পাঠালেন। কামরান মির্জাও তাৎক্ষণিক সাড়া দিয়ে সম্রাটের বাহিনীকে বাঁধা দিতে কাসিম হুসেনের নেতৃত্বে একটি ছোট সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিলেন।
একইসাথে কুরবান করাকল বেগীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল পাঠানো হলো সম্রাট পুত্র আকবরকে কান্দাহার থেকে কাবুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আসকারি প্রথমে আকবরকে সম্রাটের হাতে তুলে দিতে চাইছিলেন, কিন্তু সব ভেবে তাকে কাবুলে পাঠানোই ভালো মনে করলেন। পথের দুর্গমতা সত্ত্বেও দ্রুত তাকে কাবুলের উদ্দেশ্যে পাঠানো হলো। এ সময় আকবরের সাথে গেলেন তার দুই দুধ মা মাহম আগা আর জীজী আগা। সাথে আরো ছিলেন এটকা খানসহ কিছু আমীর।
আকবরকে নিয়ে কামরান মির্জার পরিকল্পনা খুবই সহজ ছিল। কোনোভাবেই বিপদ এড়ানো না গেলে আকবরকে নিয়ে দর কষাকষি করা হবে!
এদিকে কাবুল থেকে কামরান মির্জার পাঠানো যোদ্ধাদের নিয়ে হুমায়ুনের মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিলেন আসকারি মির্জা। ফলস্বরুপ সম্রাট হুমায়ুনকে আসকারি মির্জার সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামতে হলো।
১৫৪৫ সালের মার্চ মাসের শুরুর দিকে দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো। প্রচণ্ড লড়াই হলো। পারস্যের সেনাবাহিনী নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিলো এ যুদ্ধে। আসকারি মির্জাকে বাধ্য হয়ে পিছু হটতে হলো। দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সেনাবাহিনী নিয়ে পিছু হটে তিনি কান্দাহারের দুর্গে আশ্রয় নিলেন। তার আশা ছিলো কান্দাহার দুর্গের শক্তিমত্তা আর দুর্গমতার জন্য হুমায়ুন কান্দাহারকে এড়িয়ে অন্যান্য অঞ্চল দখলে মনোনিবেশ করবেন। কিন্তু আসকারির সব ধারণা উড়িয়ে দিয়ে ২১ মার্চ সম্রাট হুমায়ুন কান্দাহার দুর্গ অবরোধ করে বসলেন।
সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এই দুর্গটি ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতো। এটি কান্দাহার আর পারস্যের মধ্যকার একটি সংযোগ সেতু হিসেবে ভূমিকা পালন করতো। কাজেই এই দুর্গটি এড়িয়ে যাওয়া কোনো বিচক্ষণ জেনারেলের কাজের মাঝে পড়ে না। তাছাড়া সম্রাট শাহকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন যে কান্দাহার তিনি শাহকে দিয়ে দেবেন। কাজেই দুর্গটি দখল করা সম্রাটের জন্য আবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছিল।
এদিকে কান্দাহার দুর্গের শক্তিমত্তার কথা সম্রাট জানতেন। তাই তিনি অযথা আক্রমণ করে নিজের শক্তিক্ষয় না করে আলাপ-আলোচনার জন্য দূত হিসেবে বৈরাম খানকে কাবুলে পাঠালেন।
২
বৈরাম খানের এই কূটনৈতিক মিশন শুধু যে কামরান মির্জার সাথে আলাপ আলোচনার জন্যই ছিল তা না। বরং বৈরাম খানকে আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু দায়িত্ব দিয়ে কাবুলে পাঠিয়েছিলেন সম্রাট।
বৈরাম খানের কাবুল যাত্রার অন্যতম একটি উদ্দেশ্য ছিল হিন্দাল মির্জাসহ অন্যান্য মুঘল আমীরদের সাথে সাক্ষাৎ করা। একইসাথে সম্রাটের প্রতি তাদের সমর্থন আদায় করে সম্ভব হলে সামরিক সহায়তার ব্যবস্থা করা।
এই কূটনৈতিক মিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল কামরানের দরবার ও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অবস্থা যাচাই করা। তাছাড়া আকবরের অবস্থাও জানা প্রয়োজন ছিল।
বৈরাম খান দ্রুতই কাবুলে পৌঁছে গেলেন। কামরানের পক্ষ থেকে তাকে স্বাগত জানালো হলো বটে, তবে তার উপর নজরদারী করার জন্য কিছু গুপ্তচরও নিয়োগ করা হলো। গুপ্তচররা বৈরাম খানের প্রতিটি পদক্ষেপের খবর কামরান মির্জাকে জানাবে।
কাবুলে পা রাখার তিনদিন পর কামরান ও বৈরাম খানের সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করা হয়। তাদের মাঝে ঠিক কী আলোচনা হয়েছিল, তা জানা যায়নি। তবে কামরানের সাথে সাক্ষাৎ শেষ করে বৈরাম খান হিন্দাল মির্জা ও সুলেমান মির্জার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা মূলত কামরানের বন্দী হিসেবে কাবুলে অবস্থান করছিলেন।
বৈরাম খান এরপর ইয়াদগার নাসির মির্জাসহ অন্যান্য মুঘল আমিরদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সব শেষে সাক্ষাৎ করলেন শিশু রাজপুত্র আকবরের সাথে। এরপর খালি হাতে সোজা কান্দাহারে সম্রাটের নিকট ফিরে গেলেন।
৩
বৈরাম খানের কূটনৈতিক মিশন ঠিক কতটা সফল হয়েছিল তা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও পরে বোঝা যায় মিশন সম্পূর্ণ সফল হয়েছিল।
বৈরাম খান কান্দাহারে আসার পরই কামরান হিন্দালকে মুক্তি দিয়ে খানজাদা বেগমকে সন্ধির আলাপ আলোচনার জন্য কান্দাহারে প্রেরণ করলেন। সুলেমান মির্জাকেও মুক্তি দেওয়া হলো। তিনি ফিরে গেলেন বাদাখশানে। সুলেমান মির্জার সাথে বাদাখশান গেলেন ইয়াদগার নাসির মির্জা।
আর অন্যদিকে মুক্তি পেয়েই হিন্দাল মির্জা যে পরিমাণ আমির একত্রিত করতে পেরেছিলেন, তাদের নিয়েই কান্দাহারের সম্রাটে সাথে মিলিত হলেন। আমিরদের মাঝে উলুগ মির্জা, কাসিম হুসেন সুলতান উল্লেখযোগ্য ছিলেন।
কামরান খানজাদা বেগমকে আলোচনার জন্য তো প্রেরণ করলেন, কিন্তু একইসাথে কান্দাহার দুর্গে গোপন বার্তা প্রেরণ করলেন। বার্তায় তিনি আসকারিকে জানালেন, আলোচনার নাম করে তিনি আসলে সময়ক্ষেপণ করছেন। শীঘ্রই তিনি কান্দাহারে আসবেন। ততদিন পর্যন্ত আসকারি যেন দুর্গ ধরে রাখে।
এদিকে বৈরাম খান ফিরে আসার সাথে সাথে হুমায়ুন কান্দাহার অবরোধ আরো শক্ত করলেন। অবস্থা সঙ্গিন দেখে আসকারি মির্জা বুঝলেন এভাবে চলতে থাকলে কামরান আসার আগেই দুর্গের পতন ঘটে যাবে। কাজেই বাধ্য হয়ে আসকারি মির্জা সম্রাট হুমায়ুনের নিকট যুদ্ধবিরতির প্রার্থনা জানিয়ে বার্তা পাঠালেন।
সম্রাট হুমায়ুন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে পাত্তা না দিয়ে আরো শক্ত করলেন অবরোধ। পরিস্থিতি ঘোলাটে দেখে আসকারির বাহিনীতে দলত্যাগের ঘটনা বাড়তে লাগলো। উপায় না পেয়ে আসকারি মির্জা সম্রাট হুমায়ুনের সাথে সন্ধি করতে চাইলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, তাকে কাবুল যেতে দিলে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন। কিন্তু সম্রাট হুমায়ুন তার এই শর্ত মানলেন না।
অনেকটা বাধ্য হয়েই বিনা শর্তে আসকারি মির্জাকে সম্রাটের নিকট আত্মসমর্পণ করতে হলো। অবশেষে দীর্ঘ ৫ মাস অবরোধের পর ১৫৪৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সম্রাট হুমায়ুন কান্দাহার দুর্গের দখল বুঝে নিলেন।
আসকারি মির্জা ইতোপূর্বে হুমায়ুনের সাথে যে আচরণ করেছিলেন তার পরিণামস্বরূপ ভবিষ্যতে তার উপর কী হতে যাচ্ছে, তা তিনি ভালোই বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু আসকারির এ দুঃসময়ে তার জন্য এগিয়ে এলেন সম্রাট বাবরের অতি আদরের ছোটবোন খানজাদা বেগম। তিনি আসকারির জন্য সম্রাট হুমায়ুনের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
ফুপুর এ অনুরোধ সাম্রাজ্যহারা সম্রাট হুমায়ুন অগ্রাহ্য করতে পারলেন না। আসকারিকে ক্ষমা করে দেওয়া হলো। তবে তাকে পরবর্তী কিছুদিন বন্দী করে রাখা হয়েছিল।
শাহের সাথে পূর্বে করা প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সম্রাট হুমায়ুন কান্দাহার দুর্গ শাহের পুত্র শাহজাদা মুরাদের নিকট সমর্পণ করেন। শাহজাদা মুরাদ নাবালক হওয়ায় তার পক্ষে দুর্গ রক্ষার ভার গ্রহণ করলেন বুদাগ খান। কান্দাহার থেকে প্রাপ্ত অর্থ সম্রাট শাহের জন্য পারস্যে পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে চারবাগ চলে যান।
শাহের নিকট যখন এ রাজকোষ গিয়ে পৌঁছাল, তখন সম্রাট হুমায়ুনের প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়টিতে অভিভূত হয়ে যান। তিনি সম্রাটকে উপহার হিসেবে রাজকীয় খেলাত আর একটি দ্রুতগামী খচ্চর প্রেরণ করলেন।
৪
এদিকে পারস্যের সেনাবাহিনীর দুর্গের দখল বুঝে পাওয়ার পর বাধে আরেক বিপত্তি। মুঘলদের সাহায্য করায় বুদাগ খান নিজেদের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ভেবে অদ্ভুত এক আত্মগরিমায় ভুগতে লাগলেন। নিজের এ নির্লজ্জ মনোভাব প্রকাশ করলেন খুবই বিচিত্র আর অদ্ভুত এক দাবির মাধ্যমে।
বুদাগ খান স্বয়ং সম্রাটকে ধনরত্নসহ শাহের নিকট উপস্থিত হওয়ার এবং আসকারিকে শাহের নিকট বন্দী হিসেবে পারস্যে প্রেরণ করার দাবি করে বসলেন। সম্রাট হুমায়ুন তার এ দাবি শুনে রীতিমতো অবাক হয়ে গেলেন।
প্রথমত, তাদের দাবি মোতাবেক শাহের নিকট উপস্থিত হওয়াটা সম্রাটের জন্য রীতিমতো অসম্মানজনক এবং এটা কোনো যুক্তিতেই বাস্তবসম্মত নয়। দ্বিতীয়ত, আসকারি মির্জা যতই অন্যায় করুক না কেন, তিনি স্বয়ং সম্রাটের ভাই। এভাবে বন্দী হিসেবে আসকারি মির্জাকে অন্য সাম্রাজ্যের অধিপতির নিকট প্রেরণ করাটা স্বয়ং সম্রাটের জন্যই অপমানের বিষয়।
কিন্তু বুদাগ খানও নাছোড়বান্দার মতো ক্রমাগত একই দাবি জানাতে লাগলেন। সম্রাট হুমায়ুন বুগাদ খানের এ ধরনের স্পর্ধায় বিরক্তবোধ করতে লাগলেন। তিনি দ্রুত সেনাবাহিনীর সবগুলো কামান আর পঞ্চাশজন অশ্বারোহীকে সম্রাটের শিবিরের পাশে অবস্থান নিতে বললেন। অবস্থা বেগতিক দেখে বুদাগ খান শুধুমাত্র ধনরত্ন নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হলো।
ঘটনাটা এভাবেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু শেষ হলো না। এই ঘটনার কিছুদিন পরের কথা। সম্রাট দুর্গের অভ্যন্তরের সুন্নীদের থেকে বেশ কিছু বার্তা পান। বার্তায় তাকে জানানো হয়, দুর্গের দখল বুঝে পাওয়ার পর দুর্গে অবস্থানরত সুন্নীদের উপর পারস্যের শিয়ারা অবর্ণনীয় অত্যাচার নির্যাতন চালানো শুরু করে।
এ বিষয়টি পুরো ব্যাপারটিকে আরো খারাপের দিকে ঠেলে দেয়। এদিকে পারস্যের সৈন্যরা ভেবেছিল সম্রাট হুমায়ুন হিন্দুস্তানে মাটিতে পা রাখলেই খুব সহজে হিন্দুস্তান দখল করে নিতে পারবেন। আর তারাও দ্রুত নিজেদের সাম্রাজ্যে ফিরে যেতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তারা কান্দাহারেই হুমায়ুনের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিরোধ দেখে কিছুটা দমে গেল। ফলশ্রুতিতে, কান্দাহার দখলের পর যোদ্ধারা আর কান্দাহার থেকে অগ্রসর হয়ে হুমায়ুনকে সঙ্গ দিতে ইচ্ছুক ছিল না।
ইতোমধ্যেই কান্দাহার দুর্গ থেকেই পারস্যের যোদ্ধাদের পলায়নের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছিল। যদিও সম্রাটের সাথে শাহের চুক্তি হয়েছিল যে, শাহের দেওয়া এ বাহিনীটি সম্রাট কাবুল দখল করা পর্যন্ত তাকে সাহায্য করবে।
এরই মাঝে ঘটে আরেক বিপত্তি। সম্রাট হুমায়ুন তখন কাবুল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় কান্দাহার দুর্গের অধিপতি শিশু শাহজাদা মুরাদ হঠাৎ করেই মারা গেলেন। কাবুল অভিযানের প্রস্তুতি নিতে নিতেই প্রচণ্ড শীত পড়ে গিয়েছিল। এই শীতে সম্রাট হুমায়ুনের বাহিনীর পক্ষে চারবাগের খোলা মাঠে অবস্থান করা সম্ভব হচ্ছিল না। তারপরও শীত উপেক্ষা করে পুরুষরা না হয় কোনোভাবে টিকে থাকবে, কিন্তু নারীদের কী হবে? উপায় না পেয়ে সম্রাট বুদাগ খানের নিকট দুর্গের অভ্যন্তরে নারীদের জন্য নিরাপদ স্থান আর প্রয়োজনীয় রসদ সামগ্রীর সহায়তা চান। বুদাগ খান সম্রাটের এ দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিলেন।
পার্সিয়ানদের এ ধরনের অসহযোগীতা আর ঔদ্ধত্য দেখে সম্রাটের কিছু আমির সম্রাটকে পুনরায় কান্দাহার দুর্গ দখলের পরামর্শ দিতে লাগলেন। সম্রাটও ভেবে দেখলেন, পার্সিয়ানদের কাছ থেকে যেহেতু আন্তরিক কোনো সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না, কাজেই দুর্গ পুনরায় দখল করে নিতে অসুবিধা কোথায়?
এদিকে সম্রাট এতদিনে কিছুটা স্বাবলম্বী হতে শুরু করেছেন। পুরনো মুঘল যোদ্ধারা সম্রাটের বাহিনীতে এসে যোগ দিয়েছে। আরো নতুন সৈন্য ভর্তি করা হচ্ছে। এ বাহিনী নিয়ে কাবুল দখল করতে চাইলে আগে অন্তত শীতটা টিকে থাকতে হবে। কিন্তু নিরাপদ কোনো আশ্রয় ছাড়া এ বাহিনী টিকবে কীভাবে?
সব ভেবেচিন্তে শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন দুর্গ দখলের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিছুদিন পরে হাজী মুহাম্মদ কোকার নেতৃত্বে রাতের এক ঝটিকা হামলার মাধ্যমে সম্রাট অনায়াসে কান্দাহার দুর্গ দখল করে নিলেন। অপ্রস্তুত অবস্থায় জাপটে ধরায় পার্সিয়ানরা কোনো বাঁধাই দিতে পারেনি। বুদাগ বেগ তার বাহিনী নিয়ে দ্রুত দুর্গ ত্যাগ করে পারস্যের দিকে চলে গেলেন।
দুর্গ দখলের পর প্রথমেই সম্রাট বৈরাম খানকে দুর্গের অধিপতি হিসেবে ঘোষণা দিলেন। এরপর শাহের কাছে পত্র লিখলেন,
বুদাগের ব্যবহার ঠিক ছিল না। আর শাহজাদা মুরাদ মারা যাওয়ায় বৈরাম খানকে কান্দাহার জায়গীর হিসেবে দেয়া হলো।
বৈরাম খান শিয়া মতাবলম্বী হওয়ায় শাহ সম্রাটের সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। কান্দাহার বিজয়ের পর কান্দাহারকে বিভিন্ন জায়গীরে ভাগ করে সম্রাট তার আমিরদের মাঝে বন্টন করে দিলেন। এরপর সম্রাট দ্রুত কাবুলে অভিযান চালানোর জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলেন।
৫
সম্রাট হুমায়ুন এ সময় বেশ অর্থসংকটে ছিলেন। কান্দাহার দুর্গের রাজকোষ আগেই শাহের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কাজেই নিরুপায় হয়ে কাবুলের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধারে বিপুল সংখ্যক ঘোড়া কিনলেন। চুক্তি হলো হিন্দুস্তান বিজয়ের পর সম্রাট তাদের অর্থ শোধ করে দেবেন। এ ঘটনা থেকেই সম্রাটের প্রতি জনগণের ভালোবাসার পরিমাণ টের পাওয়া যায়।
যতটা সম্ভব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে মাত্র ২ হাজার সৈন্য নিয়ে সম্রাট কিছুদিনের মাঝেই দুর্গম পথে কাবুলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন।
গুপ্তচরদের মাধ্যমে কামরান হুমায়ুনে এ অভিযানের সংবাদ পেয়ে দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা নিলেন। কাবুল রক্ষায় তিনি তার সেনাবাহিনী একত্রিত করলেন। একইসাথে কাসিম বারলাসের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠালেন। এই বাহিনীটি সম্রাটকে খিমার গিরিপথের প্রবেশ মুখে বাঁধা দেবে। এই বাহিনীর সাথে কামরান মীর আতিশ কাসিম মুখলিস তুরবাতীর নেতৃত্বে একটি গোলন্দাজ বাহিনীও প্রেরণ করলেন।
কামরানের পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্রাট হুমায়ুনের খুব সহজেই পরাজিত হয়ে পিছু হটার কথা ছিল। কিন্তু খ্বাজা মুয়াজ্জম বেগ, হাজী মুহাম্মদ কোকা, তোলক তোরচী আর শের আফগানের মতো জেনারেলদের দক্ষতায় খিমার গিরিপথ থেকে কামরানের বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এরপর সম্রাট সেই গিরিপথ থেকে বেরিয়ে এলেন।
এদিকে ক্রমাগত অগ্রগতি আর সফলতা দেখে সম্রাট হুমায়ুনের দলে লোকসংখ্যা বাড়তে থাকল। এর মাঝে সাধারণ সৈন্য থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের আমির পর্যন্ত ছিলেন। কামরানের অনুগত কর্মকর্তারাও দলে দলে সম্রাটের আনুগত্য স্বীকার করছিল। এ দলে স্বয়ং কামরানের প্রধানমন্ত্রী বাবুস বেগ থেকে শুরু করে মীর আতিশ কাসিম মুখলিস তুরবাতী আর মীর আরজ সাইয়্যিদ আব্বাসও ছিলেন।
এদিকে সম্রাটের অনুগতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় কামরান গেলেন ভড়কে। তিনি সম্রাটের নিকট সন্ধির প্রস্তাব দিলেন। সম্রাট শর্ত দিলেন কামরানকে নিজে এসে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। কামরান হুমায়ুনের এই বার্তার কোনো উত্তর না দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
এক রাতে নিজের স্ত্রী, পুত্র মির্জা ইব্রাহীম আর অনুগত সেনাবাহিনী নিয়ে কামরান গজনীর দিকে পালিয়ে গেলেন। তাকে ধাওয়া করার জন্য সম্রাট মির্জা হিন্দালকে নির্দেশ দিলেন। হিন্দাল কামরানের পেছন পেছন ছুটলে লাগলেন। এদিকে কামরান হাজারা জেলা হয়ে সিন্ধুতে গিয়ে থিতু হলেন। পূর্বে করা সন্ধি অনুযায়ী সিন্ধুর শাসক শাহ হুসেন আরগুনের কন্যাকে বিয়ে করলেন।
কামরান কাবুল থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর খুব সহজেই কাবুল বিজয় করা হয়। ১৫৪৫ সালের ১৭ নভেম্বর সম্রাট কাবুলে প্রবেশ করলেন। সেখানে তিনি ব্যাপক অভ্যর্থনা পেলেন।
এরপর সম্রাট দ্রুত নিজের প্রশাসন গোছাতে শুরু করলেন। বাবুস বেগকে নগর রক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলেন। হিন্দাল মির্জাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো গজনীর। আর উলুগ মির্জা পেলেন জমীনদাওয়ার আর তীরনীর দায়িত্ব।
সম্রাট হুমায়ুন কিন্তু চৌসা আর কনৌজের যুদ্ধে মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য জীবন দেওয়া যোদ্ধাদের কথা ভুলে যাননি। সুযোগ আর সামর্থ্য হওয়া মাত্রই কাবুলে সম্রাট হুমায়ুন সেসব নিহত বীর যোদ্ধাদের পরিবারকে যথাসম্ভব আর্থিক সহায়তা দিলেন।
সম্রাটের কাবুল বিজয়ের পর আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। বাদাখশান থেকে ইয়াদগার নাসির মির্জা সম্রাটের নিকট ফিরে আসেন। হুমায়ুনের কাছে তিনি তার পূর্বের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চান। হুমায়ুন তাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু কিছুদিন পরই আবার তিনি তার স্বভাবমতো সম্রাটের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এবার তাকে বন্দী করা হয়।
কিছুদিন পরেই তিনি কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টা করেন। এতে সম্রাট চূড়ান্ত বিরক্ত হলেন। তাকে আর ক্ষমা না করে তার কৃতকর্মের তালিকা প্রস্তুত করা হলে দেখা যায় তিনি মোট ৩০টি অপকর্মের জন্য দায়ী। বিচারে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর সাথে সাথে পতন ঘটে সম্রাটের সাথে বার বার বিশ্বাসঘাতকতা করা ইয়াদগার নাসির মির্জার।
৬
এদিকে সুলেমান মির্জা তার পূর্বপুরুষদের ভূখণ্ড বাদাখশানে গিয়ে খুব সহজেই তা দখল করতে সক্ষম হন। বাদাখশান দখলের পর খুব দ্রুতই খুস্ত, আন্দরাব আর কুন্দুজ বিজয় করে নেন। নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথেই তার ভেতরে সার্বভৌমত্বের চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সম্রাট হুমায়ুনের বিরুদ্ধে তিনি সামরিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। কারণ তিনি জানেন, শীঘ্রই সম্রাট বাদাখশানে আসবেন।
এদিকে সম্রাট সুলেমান মির্জার বিদ্রোহের ব্যাপারটি আঁচ করতে পেরে তাকে কাবুলে উপস্থিত হওয়ার জন্য রাজকীয় ফরমান পাঠান। সুলেমান মির্জা রাজকীয় ফরমানের জবাবে বললেন, কামরান মির্জার সাথে আমার চুক্তি হয়েছে বিনা যুদ্ধে যেন আমি আপনার কাছে ধরা না দিই। আমি এই চুক্তি রক্ষা করব।
সম্রাট হুমায়ুন বুঝলেন যুদ্ধ আসন্ন। ১৫৪৬ সালে বাদাখশান দখলের উদ্দেশ্যে তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন। কাবুল অধিকারের পর পরই সম্রাটকে শুভেচ্ছা জানাতে পারস্যের দূত হুমায়ুনের দরবারে এসেছিলেন। এই অভিযানে পারস্যের দূত আর কিছু পারসিক সৈন্য হুমায়ুনের সাথে অভিযানে অংশগ্রহণ করলেন। পারস্যের এই ক্ষুদ্র বাহিনীটির চরম রণদক্ষতায় সম্রাটের বাদাখশান অভিযান খুব সহজেই সফল হয়েছিল।
হুমায়ুনকে বাঁধা দিতে সুলেমান মির্জা তীরগরানে নিজের সৈন্য মোতায়েন করলেন। এখানেই মুঘল সেনাবাহিনী সুলেমান মির্জার বাহিনীর মুখোমুখি হয়। সুলেমান মির্জা বেশ বীরত্ব দেখালেও দীর্ঘদিন ঠোকর খেয়ে খেয়ে পরিণত হওয়া মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলেন না। অল্পতেই তিনি পরাজিত হয়ে খুস্ত থেকে কুলাবে চলে যান। সম্রাট হুমায়ুন আরো অগ্রসর হয়ে খুস্ত বিজয় করলে তিনি কলাগান হয়ে দ্রুত কিশমে পালিয়ে যান।
সুলেমান মির্জার শোচনীয় পরাজয়ের ফলে তার বাহিনীর বড় একটি অংশ সম্রাটের সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। তাছাড়া বাদাখশান দরবারের প্রভাবশালীরাও সম্রাটের আনুগত্য স্বীকার করে নেয়।
যুদ্ধের পরপরই অধিকৃত ভূখণ্ড তার আমিরদের মাঝে বন্টন করে দিলেন সম্রাট। বন্টন প্রক্রিয়ায় হিন্দাল পেলেন কুন্দুজ, মুনিম খা খুস্ত আর বাবুস পেলেন তালিকান।
এরপর শীতকালটা সম্রাট কিল্লা-এ-জাফরে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু দুর্গে যাওয়ার পথে ১৫৪৬ সালের ১৫ নভেম্বর শাখদান নামক স্থানে তিনি হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে গেলে পুনরায় রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। এই অসুস্থতায় সম্রাট প্রায় চারদিন অজ্ঞান ছিলেন। এই সুযোগে গুজব রটিয়ে দেওয়া হয় যে সম্রাট মারা গেছেন।
সম্রাটের মৃত্যু গুজবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হলেন সুলেমান মির্জা। সুলেমান মির্জার শুভাকাঙ্ক্ষীরা সম্রাটের মৃত্যুগুজবে পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে লাগলো।
সম্রাটের অসুস্থাবস্থায় চরম আনুগত্য প্রকাশ করলেন করাচা বেগ। তিনি দ্রুত সম্রাটের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। তার অসুস্থতার সুযোগে কেউ যেন কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক ফায়দা লুটতে না পারে তা নিশ্চিত করলেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে তিনি ভোলেননি। কাবুলে আসকারিকে রেখে আসলে তিনি সেখানে ঝামেলা পাকাতে পারেন, এই আশঙ্কায় সম্রাট তাকে সাথে করে বাদাখশান নিয়ে এসেছিলেন। সম্রাটের অসুস্থতার সুযোগে তিনি যেন পালিয়ে যেতে না পারেন, করাচা বেগ তা নিশ্চিত করেছিলেন।
চারদিন অজ্ঞান থাকার পর পঞ্চম দিনে সম্রাট জ্ঞান ফিরে পেলেন। কিছুটা সুস্থ হয়েই তিনি দ্রুত তার অসুস্থতাজনিত ক্ষয়ক্ষতি সামলানোর চেষ্টা করলেন। দ্রুত ফজিল বেগকে কাবুলে পাঠিয়ে দিলেন যাতে সেখানে কোনো গুজব ছড়িয়ে না পড়ে। কিন্তু তিনি সেখানে গিয়ে যা দেখলেন, তা নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সম্রাটকে তিনি কী জানাবেন?
৭
সম্রাটের অসুস্থতায় সবচেয়ে বেশি লাভ ঘরে তুললেন কামরান মির্জা। সম্রাট কাবুল অধিকার করলে কামরান মির্জা পালিয়ে সিন্ধুতে চলে যান। সেখানে তিনি শাহ হুসেন আরগুনের সাথে সম্রাটের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সামরিক চুক্তি করেন।
সম্রাটের মৃত্যু গুজব শুনে সেই চুক্তি অনুযায়ী শাহ হুসেন আরগুনের থেকে ১ হাজার অশ্বারোহী যোদ্ধা নিয়ে দ্রুত গজনী চলে আসেন। গজনী আসার পথে আফগান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল সংখ্যক ঘোড়া লুট করে নিজের শক্তি আরো বাড়িয়ে নেন। গোটা রাস্তাটাই তিনি লুটপাট চালাতে চালাতে গজনী উপস্থিত হলেন। এ সময় গজনী ছিল হিন্দাল মির্জার শাসনাধীন এলাকা।
হিন্দাল মির্জা গজনী না থাকায় তার পক্ষে গজনী শাসন করছিলেন জাহিদ বেগ। হঠাৎ আক্রমণে জাহিদ বেগ কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেন না। জাহিদ বেগকে ধরা পড়লেন। তাকে হত্যা করা হলো। কামরান খুব সহজেই গজনী হাতে পেয়ে গেলেন।
দৌলত সুলতানকে গজনীর প্রশাসক নিযুক্ত করে কামরান কাবুলের দিকে রওনা হলেন। কামরান যখন কাবুলে প্রবেশ করেন, তখন কেউই তাকে বাঁধা দেওয়ার সাহস করেনি। কারণ গুজবের কারণে সবাই জানে সম্রাট হুমায়ুন মৃত। কাবুলের অধিবাসীরা কিংবা সেনাবাহিনী কামরানকে বাঁধা দেবে কার জন্য?
কামরান বিনা বাঁধায় কাবুলে প্রবেশ করলেন। কাবুলের হাকিম মুহাম্মদ তগাই এ সময় গোসল করছিলেন। তাকে সেখান থেকে টেনেহিচড়ে বের করে সবার সামনেই হত্যা করা হলো। কামরান মির্জা খুব সহজেই কাবুল দখল করে নিলেন। আর দ্বিতীয়বারের মতো শাহজাদা আকবর আবারো কামরান মির্জার হাতে চলে গেলেন। কামরান মির্জার সুসময় আবারো ফিরে এলো। এবার শুধু বিশ্বাসঘাতকদের উপর প্রতিশোধ নেবার পালা! @ Masud Ferdous Eshan
১৯
সম্রাট হুমায়ুনের বাংলা বিজয়: বাংলা থেকে শের খানের পশ্চাদপসরণ
১
১৫৩৮ সালের মাঝামাঝির দিকে শের খান সালতানাত-ই-বাঙ্গালার রাজধানী গৌড় দখল করে নিতে সক্ষম হলেন। গৌড় দখল শের খানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার ছিলো। কারণ তার অত্যন্ত শক্তিশালী একটি দুর্গ চুনার ততদিনে মুঘল অবরোধের মুখে প্রায় নতি স্বীকার করতে যাচ্ছিলো।
সুতরাং, বাংলা বিজয় ছিলো শের খানের জন্য ভাগ্য নির্ধারণকারী একটি লড়াই। তবে শেষপর্যন্ত শের খান এই লড়াইয়ে বেশ ভালোভাবেই নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হলেন।
এদিকে শের খানের আফগান বাহিনীর হাতে বাংলার রাজধানী গৌড়ের পতনের পর বাংলার সেনাবাহিনী সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস হয়ে গেলো। বাংলার হোসেন শাহী রাজবংশের সর্বশেষ সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহ আহত হয়ে ভাটার দিকে পালিয়ে গেলেন। আর তার পুত্ররা ধরা পরলো শের খানের বাহিনীর হাতে।
সম্রাট হুমায়ুন কখনোই শের খানকে মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু শের খান ১৫৩৭ সালের শুরুতে যখন বাংলার রাজধানী গৌড়ের দিকে সেনা অভিযান প্রেরণ করলেন, তখন সম্রাটের ঘুম ভাংলো। তিনি বুঝতে পারলেন, শের খান ধীরে ধীরে মুঘল সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছেন, এবং তাকে এখনই বাঁধা দেয়া প্রয়োজন।
২
শের খানের বাংলা আক্রমণের প্রেক্ষাপটে সম্রাট হুমায়ুনও একই সালের ২৭ জুলাই বাংলা ও বিহার দখলের জন্য রাজধানী আগ্রা ত্যাগ করেন। সম্রাট হুমায়ুনের নেতৃত্বাধীন মুঘল সেনাবাহিনী প্রথমে চুনার অবরোধ করে। চুনার দুর্গটি তখন শের খানের অন্যতম একটি শক্তিস্তম্ভ ছিলো। চুনার খুব সহজেই মুঘল সেনাবাহিনীর কাছে নতি স্বীকার করার কথা ছিলো। কিন্তু হিসেব শেষপর্যন্ত মেলেনি।
চুনার দুর্গটি দখল করতে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সময় লেগে গেলো। ফলে সম্রাট হুমায়ুন বাংলায় পৌঁছানোর পূর্বেই শের খান বাংলা দখল করে নিলেন। এ সময় শের খান তখন বহরকুণ্ড থেকে তার সেনাবাহিনীকে পরিচালনা করছিলেন। হুমায়ুন দ্রুত বহরকুণ্ডের দিকে ধেয়ে যেতে শুরু করলেন।
এরকম পরিস্থিতিতে বহরকুণ্ডের দিকে ধেয়ে গিয়ে শের খানকে বিতাড়িত করাই ছিলো যেকোনো সম্রাটের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিচিত্র মনের খেয়ালী এই সম্রাট হুমায়ুন কী মনে করে কে জানে, কবুল হুসেন তুর্কমানকে শের খানের দরবারে প্রেরণ করলেন। কবুল হুসেন তুর্কমান শের খানকে জানালেন মুঘল সম্রাট সন্ধি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
হুমায়ুনের পক্ষ থেকে শের খানকে সন্ধির জন্য বেশ কিছু শর্ত দেয়া হলো। শের খান সম্রাটের সব শর্ত মেনে নিয়ে হুমায়ুনকে বার্তা পাঠালেন,
‘আমি গৌড় অধিকার করে নিয়েছি। আমার পেছনে বিশাল এক আফগান সেনাবাহিনী আছে। এখন সম্রাট যদি বাংলা আক্রমণ থেকে বিরত থাকেন, তাহলে আমিও সম্রাটের নিকট বিহার অর্পণ করে দিতে রাজি আছি। তিনি যাকেই বিহারের ক্ষমতায় বসান না কেন, আমি তার হাতেই বিহার ছেড়ে দিবো। সুলতান সিকান্দারের শাসনামলের বাংলার সীমানা মেনে চলবো আমি। বাংলা থেকে নিয়মিত বার্ষিক ১০ লাখ মুদ্রাও কর দিবো আমি। তবে শর্ত শুধু একটিই। সম্রাটকে বাংলা অভিযান পরিত্যাগ করে আগ্রা ফিরে যেতে হবে।’
শের খান সম্রাটকে বাংলা থেকে প্রাপ্ত রাজকীয় সিলমোহরও পাঠিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি করেছিলেন, বিনিময়ে শের খানের শর্ত ছিলো একটিই। সম্রাট অবশ্যই সেনাবাহিনীসহ আগ্রা ফিরে যেতে হবে।
আসলে শের খান তখনো মুঘল সাম্রাজ্যের সাথে সরাসরি যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত ছিলেন না, এবং তিনি সম্রাট হুমায়ুনকে বেশ শ্রদ্ধা করতেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই সম্রাটের সাথে সমস্ত বিভেদ মিটিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালাতে লাগলেন।
৩
এদিকে, সম্রাট হুমায়ুন আর শের খানের মাঝে যখন দূত চালাচালির ঘটনা ঘটছে, তখনই আরেকটা ঘটনা ঘটলো যা ইতিহাসের গতিই চিরদিনের জন্য পরিবর্তন করে দিলো। বাংলার পরাজিত সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহ এ সময় চুনারের কাছাকাছি দরবেশপুর নামক স্থানে সম্রাট হুমায়ুনের সাথে সাক্ষাৎ করলেন।
তিনি সম্রাটকে বোঝাতে সক্ষম হলেন যে, শের খান শুধুমাত্র গৌড়ই দখল করতে পেরেছেন এবং তখনো বাংলার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড তার অধীনেই আছে। তিনি বাংলার রাজধানী পুনরুদ্ধার করতে চাইলে বাংলার জনগণ তাকে অকাতরে সহায়তা করবে।
গিয়াস উদ্দিন মুহাম্মদ শাহ সম্রাটকে এটাও বোঝালেন, বাংলায় সম্রাটের বাহিনীর রসদের কোনো অভাব হবে না।
বাংলার সুলতান মুঘল সম্রাটকে এসকল তথ্য দিলেন বটে, তবে বাস্তবতা সত্যিকার অর্থে অন্যরকম ছিলো।
এদিকে সম্রাট বাংলার সুলতানের কথা শুনে তার প্রতি বেশ সহানুভূতিশীল হয়ে পড়লেন। তিনি সুলতানকে সাহায্য করাকে নিজের দায়িত্ব মনে করলেন। শেষপর্যন্ত, তিনি বাংলায় অভিযান চালিয়ে বাংলার মসনদে গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা সিদ্ধান্ত নিলেন।
সম্রাটের উদ্দেশ্য খারাপ ছিলো না, তবে সম্রাট এক্ষেত্রে একটি ভুল করে ফেললেন। তিনি সুলতান গিয়াস উদ্দিন মুহাম্মদ শাহের তথ্য যাচাই করেও দেখলেন না। আর মুঘল গোয়েন্দারাও সম্রাটকে সঠিক তথ্য সরবরাহে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন।
শের খানের সাথে সম্পূর্ণ নিশ্চিত একটি সন্ধি আলোচনা বন্ধ করে সম্রাট হুমায়ুন বাংলা আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন।
৪
শের খান যখন শুনলেন সম্রাট বাংলায় অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন সম্রাটের উপর থেকে তার বিশ্বাস একেবারেই উঠে গেলো। সমস্ত আফগানরা ধরে নিলো, মুঘল সম্রাটের কথার কোনো মূল্য নেই।
সম্রাট হুমায়ুনের এই সিদ্ধান্ত সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যকে একটি হাস্যরসের বস্তু হিসেবে পরিণত করলো। উল্লেখ্য, সম্রাট হুমায়ুন ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, একই রকম আচরণ করেছিলেন মাণ্ডুতে। বাহাদুর শাহের সাথে চুক্তি করার পরও তিনি মাণ্ডুতে অভিযান চালিয়ে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলেন।
গুজরাটিরা এরপর থেকে মুঘল সাম্রাজ্যকে আর কখনোই বিশ্বাস করেনি। তারা মুঘলদের ঘৃণা করতো। এমনকি পরবর্তীতে গুজরাট থেকে মুঘলদের লেজ গুটিয়ে পালানোর পেছনে সম্রাটের সেই মাণ্ডুর সিদ্ধান্তের অনেক প্রভাব ছিলো।
শের শাহের সাথে প্রায় নিশ্চিত সন্ধির কথাবার্তা চলার পরও সম্রাট কেন হুট করে সন্ধি আলোচনা ভেস্তে দিয়ে বাংলায় অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন, তা বেশ রহস্যময় একটি ব্যাপার।
এই ঘটনার পেছনে সম্রাট হুমায়ুনের ব্যক্তিগত বিচক্ষণতার অভাব যেমন ছিলো, তেমনই কিছুটা দোষ ছিলো শের খানেরও। সন্ধির শর্ত পালনের ব্যাপারে শের খানকে তেমন আন্তরিক মনে হয়নি। এমনকি মুঘল যোদ্ধারা যখন রোহতাস দুর্গের দখল বুঝে নিতে গিয়েছিলেন, তাদের সেখান থেকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিলো।
তাছাড়া, সম্রাট দেরিতে হলেও শের খানের উচ্চাকাঙ্ক্ষা টের পেয়েছিলেন। তিনি নিজ ইচ্ছায় শের খানকে কোনো সুযোগই দিতে রাজি ছিলেন না।
এখন যেহেতু স্বয়ং বাংলার সুলতান তার কাছে সাহায্য চাইছে, সেক্ষেত্রে সম্রাটের বাংলা অভিযানের জন্য যথাযথ একটি কারণ হাতে চলে এসেছে। সম্রাট হুমায়ুন এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছিলেন না।
আসলে মূল কথা হলো, সম্রাট হুমায়ুন শের খানকে বিশ্বাস করতেন না। তিনি জানতেন শের খান তাকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করছে। শের খান ভীষণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী একজন শাসক ছিলেন, যার চোখ সবসময়ই হিন্দুস্তানের মসনদের দিকে ছিলো। তাছাড়া, সম্রাট বাবরের হিন্দুস্তান বিজয়ের পর থেকেই আফগানরা পদে পদে মুঘলদের বিরোধীতা করে যাচ্ছিলো।
বার বার তাদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া হচ্ছিলো, কিন্তু সামান্য যোগ্য নেতৃত্ব পেলেই তারা আবারও সংঘটিত হয়ে যাচ্ছিলো। এমন একটি শক্তি, যাদের মূল লক্ষ্যই হিন্দুস্তান থেকে মুঘলদের বিতাড়িত করা, তাদের কোনো সুযোগ দেয়াই সম্রাটের কাছে যুক্তিসংগত মনে হলো না।
আর সম্রাটের এ সিদ্ধান্তের পর আফগানরাও বুঝে গেলো, মুঘলরা স্বেচ্ছায় তাদের এক ইঞ্চি জমিও দিতে রাজি না। মুঘলদের সাথে প্রতিযোগীতা করে টিকে থাকার একমাত্র উপায় হচ্ছে যুদ্ধ!
তবে এ ঘটনার পেছনে যত যুক্তিই দাঁড় করানো হোক না কেন, সন্ধি আলোচনা শুরু করার পর কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই তা ভেস্তে দেয়া সম্রাট হুমায়ুনের মতো একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের জন্য কোনোমতেই উচিত কাজ হয়নি। তার এই সিদ্ধান্তের ফলে তিনি আফগানদের কাছে মিথ্যুক বলে প্রমাণিত হলেন।
আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, তখন পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের মতো অজেয় একটি সাম্রাজ্যের সম্রাটকে কেন শুরুতে সন্ধিবার্তা পাঠাতে হলো? তা-ও সম্পূর্ণ বিনা কারণে! সম্রাট চাইলেই শের খানকে দৌড়ের উপর রাখতে পারতেন। সম্রাট হুমায়ুনের এসকল খেয়ালী সিদ্ধান্তের জন্য গোটা মুঘল সাম্রাজ্যকে দীর্ঘদিন অবর্ণনীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল।
৫
১৫৩৮ সালের মে মাসের শুরুতে সম্রাট হুমায়ুন তার বাংলা অভিযান শুরু করলেন। তিনি মুঘল সেনাবাহিনীকে দুটি ভাগে ভাগ করলেন। তরদী বেগ, ইব্রাহীম বায়েজিদের পুত্র জাহাঙ্গীর কুলি বেগ আর মুঈদ বেগের নেতৃত্বে প্রায় ৩০,০০০ অশ্বারোহীর একটি শক্তিশালী বাহিনী মূল বাহিনীর আগেই প্রেরণ করে দিলেন। মূল সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সম্রাট হুমায়ুন স্বয়ং।
গঙ্গার তীর ধরে মুঘল সেনাবাহিনী পাটনা পর্যন্ত পৌছলো। কাশিম হুসেন সুলতানকে পাটনার গভর্নর নিয়োগ দিয়ে মুঘল সেনাবাহিনী মুঙ্গেরের পথ ধরলো। ঘটনাক্রমে শের খান এসময় পাটনার নিকটবর্তী একটি গ্রামে হাতে গোনা কয়েকজন আফগানকে নিয়ে অবস্থান করছিলেন। ইতোমধ্যেই তিনি তার মূল বাহিনী রোহতাস দুর্গে পাঠিয়ে দিয়েছেন। মুঘল গোয়েন্দারা এ তথ্য জানালে পরের দিন শের খানকে ধাওয়া করে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করা হয়। শের খানকে ধাওয়ার সংবাদ পেয়ে সইফ খান শের খানকে পালানোর সুযোগ করে দিতে গুরগড় নামক স্থানে অবস্থান করলেন।
শের খানকে আফগানরা তাদের জাতীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। নিজেদের জীবনের বিনিময়ে হলেও তারা তাদের নেতার জীবন রক্ষা করবে।
গুরগড়ে মুঘল যোদ্ধারা সইফ খানের বাহিনীর মুখোমুখি হলেন। সইফ খান প্রচণ্ড সাহস আর বীরত্বের সাথে মুঘল যোদ্ধাদের মুকাবিলা করলেন। থেমে থেমে দুপুর পর্যন্ত সংঘর্ষ হলো। এ সংঘর্ষে সইফ খানের প্রায় ৩০০ জন যোদ্ধা নিহত হলেন। তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে সইফ খানের আত্মীয় ছিলেন। সইফ খান নিজেও মারাত্মক আহত হয়েছিলেন। সইফ খান যখন মুঘল যোদ্ধাদের হাতে বন্দী হলেন, তখন বোঝা যাচ্ছিলো না তিনি জীবিত না মৃত। তবে খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, তার শ্বাস-প্রশ্বাস তখনও চলছিলো।
৬
বন্দী করে সইফ খানকে মুঈদ খানের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হলো। ইতোমধ্যে সইফ খানের বীরত্বের কথা গোটা সেনাবাহিনীতে রটে গিয়েছিলো। স্বয়ং সম্রাট হুমায়ুন তার বীরত্ব আর সাহসের কথা শুনলেন। তিনি সইফ খানকে নিজের চোখে দেখতে চাইলেন। সইফ খানকে সম্রাটের সামনে উপস্থিত করা হলো। সম্রাট আবারও তার বীরত্বের কাহিনী শুনলেন। সম্রাট এরপর উচ্চস্বরে ঘোষণা দিলেন, প্রত্যেক সৈনিকেরই সইফ খানের মতো হওয়া প্রয়োজন। সম্রাট সইফ খানের বীরত্বে সত্যিই বেশ মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি সইফ খানকে বললেন, আমি তোমাকে মুক্তি দিলাম। তোমার যেখানে ইচ্ছা সেখানে চলে যেতে পারো। আহত সইফ খান দুর্বল কিন্তু স্পষ্ট কন্ঠে জানালেন, আমার পরিবারবর্গ শের খানের কাছে আছে। আমি আমার প্রভুর কাছে ফেরত যেতে চাই। সম্রাট হুমায়ুন বললেন, যেমনটা বলেছি, আমি তোমাকে মুক্তি দিয়ে দিয়েছি। তুমি যেখানে ইচ্ছা সেখানেই যেতে পারো।
৭
মুঘল সেনাবাহিনী আবারও যাত্রা শুরু করলো। পাটনা থেকে মুঙ্গের হয়ে মুঘল সেনাবাহিনী ভাগলপুর পৌঁছালো। ভাগলপুর থেকে মুঘল সেনাবাহিনী কহলগাঁও পৌঁছলো। কহলগাঁও থেকে জাহাঙ্গীর কুলি বেগ আর বৈরাম খান প্রায় ৬,০০০ অশ্বারোহী নিয়ে মূল সেনাবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। তারা মূল সেনাবাহিনীর অগ্রগামী বাহিনী হিসেবে যাত্রা শুরু করলেন।
মুঘল সেনাবাহিনী আবারও যাত্রা শুরু করলো। এবার লক্ষ্য তেলিয়াগড়ি।
শের খান যখন সম্রাট হুমায়ুনের বাংলায় অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তের সংবাদ পেয়েছিলেন, তখনই তার পুত্র জালাল খানের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বাহিনীকে তেলিয়াগড়িতে মোতায়েন করে দেন। তেলিয়াগড়ির গিরিপথ বিহার আর বাংলার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। মুঘল সেনাবাহিনীকে যদি বাংলায় প্রবেশ করতে হয়, তা হলে এই পথই পাড়ি দিয়ে যেতে হবে।
আফগানরা সত্যিই তেলিয়াগড়িতে ছিলো। শের খানের পুত্র জালাল খানের নেতৃত্বে প্রায় ১৩,০০০ দক্ষ অশ্বারোহী তেলিয়াগড়িতে মুঘলদের বাঁধা দিতে অবস্থান করছিলো। জালাল খানের উপর সরাসরি নির্দেশ দেয়া আছে। কোনোভাবেই মুঘলরা যেন তেলিয়াগড়ি পার হতে না পারে।
গৌড়ের রাজকোষ তখনো নিরাপদে সরিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। এই রাজকোষ রোহতাস দুর্গে না পৌঁছানো পর্যন্ত যেভাবেই হোক, মুঘলদের ঠেকাতে হবে। শের খান নিজের পুত্রকে সহায়তা করতে মুসাহিব খানকে প্রেরণ করলেন।
জালাল খান কিছুটা চিন্তিত। তিনি নিশ্চিত তেলিয়াগড়িয়ে বেশ ভালো রক্তপাত হতে যাচ্ছে।
জালাল খান তার সেনাবাহিনীকে রক্ষণাত্মক সাজে সাজিয়ে ফেললেন। বাংলায় যেতে হলে মুঘলদের অবশ্যই এই গিরিপথ পাড়ি দিতে হবে। জালাল খান গিড়িপথের আশেপাশের পাহাড়ের উপর কামান মোতায়েন করে দিলেন। মুঘল গোয়েন্দারা জালাল খানের এই রক্ষণাত্মক বুহ্যের খবর জানাতে সক্ষম হলেন। মুঘল সেনাবাহিনী সতর্ক হয়ে গেলো।
৮
তেলিয়াগড়ি থেকে কিছুটা দূরে সম্রাট হুমায়ুন তার রাজকীয় শিবির ফেললেন। সম্রাট হুমায়ুন জাহাঙ্গীর বেগকে দায়িত্ব দিলেন তেলিয়াগড়ির গিরিপথ পরিষ্কার করতে। জাহাঙ্গীর বেগ গিরিপথের দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে তাবু ফেললেন। জাহাঙ্গীর বেগের নেতৃত্বাধীন মুঘল সেনাবাহিনী কয়েকদিন শিবিরে অবস্থান করলো। এসময় দূর থেকে আফগান আর মুঘল যোদ্ধারা একে অন্যকে ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করতে লাগল।
এদিকে জালাল খান আক্রমণের জন্য তোড়জোড় করতে লাগলেন। তার উপর শের খানের কঠোর নির্দেশ ছিলো যেন আগে আক্রমণ পরিচালনা না করেন। কিন্তু পাল্টাপাল্টি ব্যাঙ্গ বিদ্রুপের একপর্যায়ে তিনি ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললেন। শের খানের নির্দেশ ভুলে ৬,০০০ সৈন্য নিয়ে হঠাৎ করেই মুঘল শিবিরে আক্রমণ করে বসলেন। এই ঘটনা ১৫৩৮ সালের জুলাই মাসের ঘটনা।
বৈরাম খান জালাল খানের এই তীব্র আক্রমণের মুকাবিলা করলেন। তিনি চরম ধৈর্য্য, প্রচণ্ড সাহস আর বীরত্ব প্রদর্শন করলেন। তবে মুঘল সেনাবাহিনীর পরাজয় ঠেকাতে পারলেন না। জালাল খান তার বাহিনী নিয়ে বিধ্বস্ত হলেন বটে, তবে মুঘল সেনাবাহিনীরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেলো এই যুদ্ধে। জাহাঙ্গীর বেগ এ যুদ্ধে মারাত্মক আহত হলেন।
হুমায়ুনকে এই পরাজয়ের খবর দেয়া হলো। কিন্তু তিনি তাৎক্ষণিক কোনো পাল্টা অভিযান চালাতে পারলেন না। আবহাওয়া খারাপ থাকায় সম্রাট হুমায়ুনকে কিছুদিন ধৈর্য্যধারণ করতে হলো।
এদিকে, জালাল খান গৌড়ের পথরোধ করে শক্ত অবস্থান নিয়ে বসে রইলেন। আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হলে সম্রাট হুমায়ুন স্বয়ং মূল সেনাবাহিনী নিয়ে গিরিপথের দিকে অগ্রসর হলেন। জালাল খান বুঝলেন, এবার আর গিরিপথ আগলে রাখা যাবে না। তিনি জঙ্গলে পালিয়ে গেলেন।
ইতোমধ্যেই শের খান বাংলার রাজকোষ ঝাড়খণ্ড হয়ে রোহতাস দুর্গে সরিয়ে নিলেন। জালাল খান রোহতাস দুর্গের দিকে চলে গেলেন।
৯
মুঘল সেনাবাহিনী এরপর কহলগাঁওতে যাত্রাবিরতি করলো। কহলগাঁওতে একটি দুঃসংবাদ এসে পৌছলো।
শের খানের আফগান বাহিনী বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহের দুই পুত্রকে হত্যা করে ফেলেছে। গৌড় পরাজয়ের সময় সুলতানের এই দুই পুত্র শের খানের হাতে ধরা পরেছিলো।
বাংলার মসনদ হারিয়ে সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহ এমনিতেই মানসিক দিক দিয়ে দুর্বল হয়ে পরেছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নের সময় তিনি ছিলেন প্রচন্ড আহত। মানসিক এবং শারিরীকভাবে আহত হয়েও সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহ প্রবল আশায় বুক বেঁধে বেঁচে ছিলেন। কিন্তু এবার আর একই সাথে দুই পুত্র হারানোর শোক সামলাতে পারলেন না তিনি। মুঘল শিবিরে মৃত্যুবরণ করলেন বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন মাহমুদ শাহ।
সুলতানকে সাদুল্লাপুরে পূর্ণ মর্যাদার সাথে সমাহিত করা হলো। এরপর সম্রাট হুমায়ুন আবার গৌড় অভিমুখে যাত্রা করলেন। তিনি প্রায় বিনা বাঁধাতেই গৌড়ের অধিকার বুঝে নিলেন।
অবশেষে ১৫৩৮ সালের জুলাই মাসের শেষের দিকে বাবরপুত্র দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট নাসির উদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন তার বাংলা জয় সম্পন্ন করলেন। বাংলা তো জয় হলো, এটা সত্য। কিন্তু সম্রাট নিজেও বুঝতে পারলেন না তিনি কিছুদিনের মাঝেই ভয়ানক এক ফাঁদে পড়তে যাচ্ছেন! সে আলোচনা যথাসময়ে করা হবে। @ Masud Ferdous Eshan
২০
চৌসার যুদ্ধে বিজয়: বিজয়ী শের খান হলেন ‘শের শাহ’
১৫৩৯ সালের ২৬ জুন। ভোরের আলো ফোটার কিছুক্ষণ পূর্বে শের শাহের চালানো ঝটিকা আক্রমণে শোচনীয় পরাজয় স্বীকার করেন তৎকালীন অজেয় শক্তি মুঘল সম্রাট হুমায়ুন। কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বীরপুরে এসে পৌঁছান। ঝটিকা আক্রমণ থেকে যারা নিজেদের জীবন বাঁচাতে পেরেছিলেন, তারা সম্রাটের সাথে মিলিত হতে লাগলেন ধীরে ধীরে।
বীরপুর থেকে সম্রাট দ্রুত চুনারে এলেন। পেছনে রেখে এলেন প্রায় ৮ হাজার মুঘল যোদ্ধার মৃতদেহ। দীর্ঘ এই মৃত্যুর মিছিলে নাম লিখিয়েছিলেন সম্রাটের হেরেমের অনেক নারীও। সম্রাটের স্ত্রী বেগা বেগম বন্দী হয়েছিলেন শের খানের হাতে।
সম্রাট হুমায়ুনের জীবনীকার গুলবদন বেগমের বর্ণনা অনুসারে, সম্রাট চুনারে মোট তিনদিন অবস্থান করলেন। এরপর বর্তমান ভারত রাষ্ট্রের এলাহাবাদের আরাইলে এসে পৌঁছালেন। সম্রাটের সাথে এখানে সাক্ষাত করলেন গহোরের রাজা বীরভান। রাজা বীরভান নিজের আনুগত্যের চূড়ান্তটা দেখালেন। তিনি সম্রাট আর তার সঙ্গীদের প্রয়োজনীয় খাদ্যসহ অন্যান্য রসদ সরবরাহের ব্যবস্থা করলেন।
সম্রাট হুমায়ুন আরাইলে ৫/৬ দিন অবস্থান করলেন। এর ভেতরেই একদিন শুনতে পারলেন শের খানের সৈন্যরা সম্রাটকে তন্নতন্ন করে খুঁজছে। যেকোন মুহূর্তে তারা আরাইলেও চলে আসতে পারে। সম্রাট দ্রুত আরাইল ত্যাগ করলেন। এদিকে সত্যি সত্যিই শের খানের আফগান সৈন্যরা আরাইলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। রাজা বীরভান প্রায় ৬ হাজার সৈন্য নিয়ে আফগানদের পথরোধ করে দাঁড়ালেন। ফলে হুমায়ুন দ্রত আফগানদের থেকে দূরত্ব তৈরির সুযোগ পেয়ে গেলেন।
আরাইল থেকে সম্রাট হুমায়ুন কড়া এবং কড়া থেকে কালপি হয়ে দীর্ঘ কষ্টকর যাত্রা শেষ করে আগ্রা পৌঁছালেন। মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সুরক্ষিত ব্যাক্তিটিকেও জীবন হাতে নিয়ে পালিয়ে আগ্রা এসে পৌঁছাতে হল। সম্ভবত একেই বলে নিয়তি! হুমায়ুন যখন আগ্রায় আসেন, তখন মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানীতে মঞ্চায়িত হতে থাকে আরেক কাহিনী। সে আলোচনা যথাসময়ে করা হবে। আপাতত আমরা দৃষ্টি ফেরাই শের খানের দিকে। চৌসায় এ অকল্পনীয় এবং সহজে বিজয় লাভের পর তিনি কী করছেন?
পরাক্রমশালী অজেয় মুঘল সালতানাতের বিরুদ্ধে এরকম বিশাল জয় যেকোনো সেনাবাহিনীকেই আত্মবিশ্বাসের চূড়ান্ত অবস্থানে পৌঁছে দেবে। আফগানদের ক্ষেত্রেও তা-ই হল। খানুয়ার যুদ্ধে মুঘলদের কাছে পরাজিত হওয়ার পর এই প্রথম আফগানরা তাদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল। তবে শের খান চৌসায় বিজয়লাভ করেই বসে রইলেন না। তিনি জানেন সামান্য একটু সময় পেলেই শক্তিশালী মুঘল সাম্রাজ্য এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়ে নেবে। তাই তিনি তার বিজয় ধরে রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন।
চৌসায় নাটকীয় বিজয় লাভের পর প্রথমেই শের খান নতুন উপাধী নিলেন। তার নতুন উপাধী হল ‘হজরত আলী’। শের শাহের জীবনীকার আব্বাস সারওয়ানীর তথ্যানুসারে, নিজের অভিষেক সম্পন্ন হওয়ার পর শের শাহ ‘শাহ আলম’ উপাধীও নিয়েছিলেন। তবে এই বিষয়টি প্রমাণিত নয়। মসনদে অভিষেকের পর শের শাহ তার বিজয় সংবাদ দূত মারফত বিভিন্ন রাজদরবারে প্রেরণ করার নির্দেশ দিলেন। তবে প্রথম বার্তাটি লিখে দিতে অনুরোধ করলেন মসনদ আলী ঈশা খানকে। তিনি বললেন,
আপনি শায়খ মলহির বংশধর। আমাকে মসনদে বসতে, নিজের নামে মুদ্রা প্রচলন করতে আর খুতবা পাঠ করাতে আপনিই আমাকে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন। তাই আমার বিজয়ের প্রথম বার্তাটি আপনি নিজ হাতে লিখে দিন। বাকিগুলো আমার পত্রলেখকরা লিখে দেবে।
মসনদ আলী ঈশা খান শের খানের ইচ্ছা পূরণ করলেন। তিনি শের শাহের প্রথম বিজয়বার্তাটি নিজ হাতে লিখে দিলেন। শের শাহের পত্রলেখকরা এরপর ব্যস্ত হয়ে গেল। শের শাহের অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রভাবশালী বিভিন্ন আফগান নেতা। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন, খান-ই-আজম উমর খানের পুত্র মসনদ আলী ঈশা খান, মুঘল বিদ্বেষী আফগান নেতা আজম হুমায়ুন সরওয়ানী প্রমুখ।
শের খানের অভিষেক অনুষ্ঠান মোট ৭ দিন ধরে চলে। এ সময় আফগানরা তাদের নিজস্ব রীতিতে আনন্দ-উৎসবে মেতে থাকে। অভিষেকের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে শের খান আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত সামরিক তৎপরতা শুরু করলেন। শের খান জানেন, চৌসার যুদ্ধে যদিও মুঘল সম্রাট হুমায়ুন পরাজিত হয়েছেন, কিন্তু এখনো তিনিই হিন্দুস্তানের সম্রাট। আর হিন্দুস্তানের বেশিরভাগ ভূখণ্ড এখনো তারই পদানত। কাজেই এখন যদি শের খান দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম না হন, তাহলে তার অতীতের সাফল্য খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে পড়বে।
চৌসার যুদ্ধে চেরুহ জমিদারদের মিথ্যা আক্রমণের সংবাদ দ্বারা মুঘল সেনাবাহিনীকে বিভ্রান্ত করলেও সত্যিই এই জমিদাররা বিদ্রোহ করেছিল। তাই চৌসার যুদ্ধের পর প্রথমেই শের খান খাওয়াস খানকে চেরুহের দিকে পাঠিয়ে দিলেন তাদের দমন করার জন্য। বিদ্রোহীদের আর সুযোগ দেয়া উচিত হবে না। এরপর তিনি হাজী খাঁ বটনী আর জালাল খাঁ বিন জালুকে পাঠালেন বাংলার রাজধানী গৌড় অধিকার করে আবারও বাংলা পদানত করতে।
আর শের খান স্বয়ং নিজে গেলেন হুমায়ুনকে তাড়া করতে। কনৌজ পর্যন্ত হুমায়ুনকে ধাওয়া করে তিনি আর সামনে না এগিয়ে বরমজীদ গৌড়কে হুমায়ুনের পেছনে পাঠিয়ে দিলেন। এর ভেতরে সম্রাট হুমায়ুনকে তাড়া করতে করতেই দখল করে নিলেন কাল্পী আর কনৌজ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এক ভূখণ্ড।
এদিকে গৌড়ে শের খান তৈরি করলেন বিশ্বাসঘাতকতার আরেক নির্মম উপাখ্যান। সম্রাট হুমায়ুন বাংলা ত্যাগ করার আগে জাহাঙ্গীর কুলি বেগকে বাংলার রাজধানী গৌড় ধরে রাখার নির্দেশ দিয়ে আসেন। জাহাঙ্গীর কুলি বেগের কাছে তখন মাত্র ৫ হাজার সৈন্য ছিল। চৌসার যুদ্ধে বিজয়লাভের পর শের খানের নির্দেশে হাজী খাঁ বটনী আর জালাল খাঁ বিন জালু গৌড় অবরোধ করে।
জাহাঙ্গীর কুলি বেগ তার মাত্র ৫ হাজার সৈন্য নিয়ে তীব্র অবরোধ গড়ে তুললেও তিনি বেশ ভালোই জানতেন আগ্রা থেকে সহায়তা না পেলে গৌড় দখলে রাখা যাবে না। শেষ পর্যন্ত তাকে সৈন্যসহ নিরাপদে আগ্রা যাওয়ার সুযোগ দেয়া হবে, এই শর্তে তিনি গৌড় আফগানদের হাতে তুলে দিতে চুক্তিবদ্ধ হন। এদিকে শের খানও ইতোমধ্যে গৌড়ে চলে এসেছেন।
তিনি এসেই জাহাঙ্গীর কুলি বেগের সাথে সম্পাদিত চুক্তির বরখেলাপ করে ৫ হাজার সৈন্যসহ জাহাঙ্গীর কুলি বেগকে নির্মমভাবে হত্যা করার নির্দেশ দেন। বাংলার মাটিতে ঘটে গেল আরেকটি নির্মম গণহত্যা। শেষ পর্যন্ত আফগানরাও তাদের চুক্তির মর্যাদা দিতে পারল না। গৌড় পুনরুদ্ধার করে শের খান আবারো তার উপাধী পরিবর্তন করলেন। তার নতুন উপাধী হল ‘শের শাহ’। শের খান হয়ে গেলেন শের শাহ। এ নামেই পরবর্তীতে তিনি ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হলেন।
শের শাহ জানতেন সম্রাট হুমায়ুন অবশ্যই চৌসায় পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এগিয়ে আসবেন। তাই তিনিও সেভাবেই নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলেন। তার বার্তা নিয়ে গুজরাট আর মাণ্ডুর দিকে ছুটে গেলেন খান-ই-আযম উমর খানের পুত্র মসনদ আলী ঈশা খান। মাণ্ডু, উজ্জয়নী আর সারংপুরের রাজা ছিলেন তখন কাদির শাহ। ভূপত শাহের শিশুপুত্র রাজা পরাবতের রাজপ্রতিনিধি হিসেবে রাইসিন আর চান্দেরী শাসন করছিলেন পূরণ মল। সিকান্দার খান মিয়ানা ছিলেন সিওয়াসের মসনদে। অন্যদিকে তখন ভূপালের মসনদে ছিলেন মহেশ্বর নামক এক ব্যাক্তি। শের খান এসব রাজাদের উদ্দেশ্য করে লিখলেন,
আমি কয়েকদিনের মাঝেই আমার পুত্রকে আপনাদের অঞ্চলে পাঠাচ্ছি। সম্রাট হুমায়ুন যদি কনৌজের দিকে এগিয়ে আসার জন্য তৎপরতা দেখান, তবে আমার পুত্রের নেতৃত্বে আগ্রা আর দিল্লি আক্রমণের সময় আপনাদের সহায়তা প্রয়োজন হবে।
মুঘল বিদ্বেষী এসব রাজারা জোটবদ্ধ হয়ে জানালেন, আগ্রা আর দিল্লি আক্রমণের সময় শের শাহকে তারা তাদের সর্বচ্চটুকু দিয়ে সহায়তা করবে। এদিকে এই মসনদ আলী ঈশা খানের পরামর্শে শের শাহ মুঙ্গেরে বন্দী খান-ই-খানান ইউসুফ খইলকে নির্মমভাবে হত্যা করলেন।
মালব অঞ্চলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজারা শের শাহকে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের বিরুদ্ধে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলে শের শাহ তার পুত্র কুতুব খানকে মাণ্ডুর দিকে প্রেরণ করলেন। কুতুব খানের উপর শের শাহের নির্দেশ স্পষ্ট। সম্রাট হুমায়ুন যদি শের শাহকে বাঁধা দিতে কনৌজের দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে কুতুব খানের প্রধান কাজ হবে মালবের রাজাদের সহযোগীতা নিয়ে দিল্লি আর আগ্রায় চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। এতে সম্রাট উভয় দিক থেকেই চাপে পড়ে যাবেন।
কুতুব খান প্রথমেই এটোয়া আর কালপির দখল বুঝে নিতে অগ্রসর হলেন। জবাবে সম্রাট হুমায়ুন হুসেন সুলতান, কামরান মির্জার এক আমির ইস্কান্দার সুলতান আর ইয়াদগার নাসির মির্জাকে পাঠালেন আফগান বাহিনীকে বাঁধা দিতে।
কালপির নিকট উভয়পক্ষ রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত মুঘল সেনাবাহিনী বিজয় ছিনিয়ে আনে। যুদ্ধে নিহত হয় শের শাহের পুত্র কুতুব খান।
মালবের রাজাদের মুঘলদের বিরুদ্ধে শের শাহকে সাহায্য করার কথা থাকলেও সম্রাট হুমায়ুনের ভয়ে তারা শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান থেকে পিছিয়ে আসে। হুমায়ুন মালবের রাজাদের এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ব্যাপারটি মনে রাখলেন।
এদিকে আগ্রায় মুঘল পরিবারের মাঝে ঘটে চলছে যুদ্ধক্লান্ত সম্রাট হুমায়ুনের নিজ পরিবারের পুনর্মিলন, ভাইদের সাথে মানসিক টানাপোড়ন, ক্ষমতার দ্বন্দ্বসহ টানটান উত্তেজনাপূর্ন নানা ঘটনা। হিন্দুস্তানের মাটিতে আবারও বেজে উঠতে যাচ্ছে যুদ্ধের দামামা। শীঘ্রই অতীতের শিহরণ জাগানো সেই ঘটনাগুলো আলোচনা করা হবে। @ Masud Ferdous Eshan
২১
সম্রাট আকবরের বাংলা বিজয়
১
বঙ্গদেশের বাদশাহ দাউদ শাহ মুঘল সাম্রাজ্যের সাথে সংঘর্ষে জড়ানোর উদ্দেশ্যে মুঘল সীমান্তে উষ্কানীমূলক আচরণ করতে লাগলেন এবং জামানিয়া দুর্গটি দখল করে নিলেন। মুঘল সম্রাট আকবর তখন গুজরাটে ব্যস্ত ছিলেন। দাউদ শাহকে ঠেকিয়ে বাংলা সীমান্তের ভেতরে ঠেলে দেওয়ার জন্য আকবর তাই জৈনপুরের মুঘল গভর্নর খান-ই-খানান মুনিম খানকে প্রেরণ করলেন।
দাউদ শাহকে দমনের দায়িত্ব পেয়ে মুনিম খান প্রথমে একটি ছোট অগ্রগামী সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। দাউদ শাহও এই বাহিনীটিকে প্রতিরোধ করতে তার দুর্ধর্ষ জেনারেল ও বঙ্গের প্রধান আমির লোদি খান আফগানকে প্রেরণ করলেন। ছোট ছোট বেশ কয়েকটি সংঘর্ষ হলো। কিন্তু কোনো পক্ষই তেমন সুবিধা করতে পারলো না। এদিকে একসময়ের জাঁদরেল জেনারেল মুনিম খান ততদিনে বয়সে ভারাক্রান্ত একজন মানুষ, তিনি হাল ছেড়ে দিলেন এবং বঙ্গের সাথে চুক্তি করে মুঘল সীমান্তে সড়ে আসলেন।
কিন্তু এ চুক্তি মুঘল সম্রাট আকবর বা বঙ্গের বাদশাহ দাউদ শাহ কেউই মেনে নিলেন না। মুনিম খানের শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতার বিষয়টি উপলব্ধি করে আকবর বাংলা আর বিহার ফ্রন্টের দায়িত্ব দিলেন রাজা টোডর মলকে। এদিকে বাংলার দরবারে তখন ঘটছিলো অন্য ঘটনা। কোনো একটি ব্যাপারে দাউদ শাহের সাথে লোদি খানের মনোমালিন্য হওয়ায় লোদি খান মুনিম খানের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের আনুগত্য করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এই বিষয়টি জেনে যান কতলু খান নামক অন্য একজন আফগান। তিনি বিষয়টি বাদশাহ দাউদ শাহকে জানিয়ে দিলেন। দাউদ শাহ লোদি খানকে ডেকে এনে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে হত্যা করলেন। দাউদ শাহ বঞ্চিত হলেন বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ, দুর্দান্ত আর দুর্ধর্ষ সাহসী একজন মানুষের থেকে। এদিকে মুনিম খান ব্যর্থ হওয়ায় আকবর স্বয়ং নিজেই উপস্থিত হলেন বাংলা সীমান্তে।
বাদশাহ দাউদ শাহও তার সেনাবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসতে বাধ্য হলেন। বিহার ও অযোধ্যা সীমান্তে সন, স্রন আর গঙ্গা নদীর মিলনস্থলে এই দুই বাহিনী এক তীব্র নৌ সংঘর্ষে জড়িয়ে পরলো। এই নৌ যুদ্ধে মুঘলরা বিজয়ী হলো। বাদশাহ দাউদ শাহ পরাজিত হয়ে পাটনার দিকে পিছু হটলেন। আকবর দ্রুত মুনিম খানকে নির্দেশ দিলেন পাটনা দখলের।
২
বাংলা সেনাবাহিনীর প্রতিরোধে বৃদ্ধ মুনিম খান পাটনা দখল করতেও ব্যর্থ হলেন। আকবর বাধ্য হলেন মুনিম খানকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসতে। যেহেতু তৎকালীন সময়ে গোটা হিন্দুস্তানে মুঘল সাম্রাজ্যের পর সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যটি ছিলো বঙ্গ, আর মুঘল সাম্রাজ্য এবার সেই বঙ্গের সাথেই লড়তে যাচ্ছে, কাজেই রাজধানী ত্যাগের পূর্বে রাজধানীর নিরাপত্তায় আকবর বিশেষ দৃষ্টি দিলেন। বঙ্গ নিয়ে ইতোমধ্যেই মুঘলদের একটি বাজে অভিজ্ঞতা আছে। এই বঙ্গের মায়াতেই আটকে গিয়ে নিজের রাজধানী খুইয়ে বসেছিলেন মরহুম সম্রাট হুমায়ুন। আকবর সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চান না।
যা-ই হোক, আকবর রাজধানী ত্যাগ করলেন ১৫৭৪ সালের ১৫ জুন। নৌপথের এ যাত্রায় আকবরের সাথে ছিলেন মানসিংহ, ভগবন্দ দাস, শাহবাজ খান, বীরবল আর মীর বহর কাসিম খানসহ সাম্রাজ্যের বেশ কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আকবর বেনারস হয়ে গঙ্গা আর গোমতী নদীর মিলনস্থল সৈয়দপুরে নোঙ্গর করেন। ইতোমধ্যে মূল সেনাবাহিনীও স্থলপথে আকবরের সাথে মিলিত হয়। এদিকে বঙ্গে তখন ভরা বর্ষা, মুঘল সেনাবাহিনীর জন্য এমন আবহাওয়া প্রচন্ড প্রতিকূলের। তারপরেও আকবর অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে নিরাপত্তার জন্য মহিলা আর শিশুদের জৈনপুরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। এরপর আকবর অগ্রসর হলেন সেই বিখ্যাত চৌসা ফেরিঘাট বরাবর।
১৫৭৪ সাল, ৩ আগস্ট। আকবর পাটনার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছলেন। মুনিম খান তখনও পাটনা অবরোধ করে বসে ছিলেন। পাটনা দুর্গে এ সময় অবস্থান করছিলেন বাদশাহ দাউদ শাহ ও তার বিশ্বস্ত জেনারেল আয়েশ খান নিয়াজী। আয়েশ খান নিয়াজী বুঝতে পেরেছিলেন যে তারা ফাঁদে পড়ে গিয়েছেন। তাই এই অবরোধ ভেঙে বের হয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি মুঘল সেনাবাহিনীর উপর হামলা চালালেন। তবে তার এই চেষ্টা ব্যর্থ হলো। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই মৃত্যুবরণ করলেন।
অবরোধ ভাংতে ব্যর্থ হয়ে দাউদ শাহের অবশিষ্ট সৈন্যরা দুর্গ আরও শক্ত করে আগলে ধরলেন। দুর্গের প্রতিরক্ষা বৃদ্ধি করা হলো। তবে রসদ সরবরাহ ছাড়া অবরোধের সময় বেশিদিন দুর্গ ধরে রাখা যাবে না। তাই গঙ্গার বিপরীতে থাকা হাজীপুর (বর্তমান ভারতের বিহার প্রদেশের ত্রিহুত বিভাগের একটি শহর) থেকে গোপন রসদের চালানের ব্যবস্থা করা হলো।
এভাবে একটা মাত্র দুর্গ নিয়ে পড়ে থাকতে আকবর মোটেও রাজি ছিলেন না। তাই তিনি শুরুতে হাজীপুরকেই দখলের সিদ্ধান্ত নিলেন। এদিকে মুঘল সেনাবাহিনীর জন্য বাধা ছিলো মূলত দুটি। প্রথমটি বর্ষা, আর দ্বিতীয়টি বঙ্গ বাহিনীর সামরিক সক্ষমতা।
৩
হাজীপুর দখলের দায়িত্ব দেয়া হলো চালমাহ বেগকে। সাথে দেয়া হলো তিন হাজার দক্ষ অশ্বারোহী। চালমাহ বেগ হাজীপুর দুর্গ আক্রমণ করলেন। দুর্গের দায়িত্বে ছিলেন ফতেহ খান বারহা। মুঘল আক্রমণের মুখে তিনি পরাজিত হলেন। হাজীপুর মুঘল নিয়ন্ত্রণে চলে আসলো।
হাজীপুর দখলের পর আকবর পূর্ণ মনোযোগ দিলেন পাটনার প্রতি। পাটনায় মোতায়েন থাকা বঙ্গের সৈন্য সংখ্যা ছিলো ২০ হাজারের কাছাকাছি, সাথে ছিলো বিপুল পরিমাণ রণহস্তি আর কামান। তবে কী মনে করে কে জানে, বাদশাহ দাউদ শাহ খানিকটা ভড়কে গিয়ে ইতোমধ্যেই এই দুই সাম্রাজ্যের ভেতরে যা ঘটে গিয়েছে তার জন্য ক্ষমা চেয়ে দূত পাঠালেন আকবরের কাছে।
আকবর এর জবাবে বাদশাহকে চারটি বিকল্প থেকে যেকোনো একটি বেছে নিতে বললেন। এক, বাদশাহ নিজে আকবরের সামনে এসে ক্ষমা চাইবেন। দুই, বাদশাহ এবং আকবর একটি একক দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লড়বেন। তিন, বাদশাহ চাইলে নিজে না এসে তার কোনো আমিরকে পাঠাতে পারেন। সেক্ষেত্রে আকবরও তার কোন একজন আমিরকে দিয়ে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ লড়বেন। চার, বাদশাহের যেকোনো একটি রণহস্তি এবং মুঘল সেনাবাহিনীর একটি রণহস্তি লড়াই করবে। প্রতি ক্ষেত্রেই যে পক্ষ জিতবে, মূল যুদ্ধের ফলাফল তার পক্ষে যাবে।
কিন্তু বাদশাহ দাউদ শাহ কোনোটিই বেছে না নিয়ে রাতে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিলেন। পাটনা ত্যাগ করে সোজা বঙ্গের মূল ভূখন্ডের দিকে অগ্রসর হলেন তিনি। পাটনা অরক্ষিত হয়ে পড়লো। মুঘল সেনাবাহিনী প্রায় বিনা বাধাতেই পাটনা বুঝে নিলো। রাত হয়ে যাওয়ায় আকবর আর এই বাহিনীটিকে ধাওয়া করেননি। ভোর হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করলেন, এরপর শুরু করলেন ধাওয়া। বঙ্গের মূল সেনাবাহিনীর নাগাল না পেলেও বিপুল পরিমাণ গনিমত আর প্রায় ৪০০টি রণহস্তী তার দখলে চলে আসলো।
বর্ষাকালে বঙ্গে ঢুকে বঙ্গের সেনাবাহিনীকে হারিয়ে দেওয়া এককথায় অসম্ভবেরও কাছাকাছি। মুঘল সেনাবাহিনী সেই অসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছে। তবে এখন যে প্রশ্নটি আকবরের কাছে পেশ করা হলো তা হলো, বর্ষার মাঝেই কি অভিযানের বাকি অংশ পরিচালিত হবে নাকি শীত পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে?
দুই ধরনেরই মত আসলো, তবে আকবর অভিযান চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন। মুনিম খানের ব্যক্তিগত কমান্ডে অতিরিক্ত ১০ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী মোতায়েন করা হয়। একই সাথে রাজা টোডর মলসহ মুঘল সেনাবাহিনীর অন্যান্য ইউনিটগুলোকেও তার অধীনে মোতায়েন রাখা হয়। এরপর অভিযান চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে আকবর দিল্লিতে ফেরত গেলেন।
৪
প্রথমদিকে সম্রাটকে আশাহত করলেও এবার মুনিম খান আশার তুলনায়ও অনেক বেশি সফলতা পাচ্ছিলেন। মুঘল অভিযানে মুঙ্গের, ভাগলপুর, কোলগাঁও আর তেলিয়াগড়ের পতন ঘটে। দুর্ভেদ্য এই তেলিয়াগড়কেই মূলত বঙ্গের প্রবেশদ্বার বলা হতো। তেলিয়াগড় দখল করেই মুঘল সৈন্যরা দ্রুত বঙ্গের রাজধানী তাণ্ডা (বর্তমান মালদা জেলায়) অভিমুখে যাত্রা করলেন। বাদশাহ দাউদ শাহ সাতগাঁও হয়ে উড়িষ্যার দিকে সড়ে গেলেন। তান্ডার পতন ঘটলো। তান্ডা থেকে বিপুল পরিমাণ আফগান বঙ্গের আরও গভীরে প্রবেশ করে। মুঘল সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার প্রশ্নে এই আফগানরা সত্যিই হুমকি ছিলো। দীর্ঘদিন ধরে তারা মুঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যাচ্ছিলো। কাজেই মুঘল সেনাবাহিনী আফগানদের ধাওয়া করার সিদ্ধান্ত নিলো। তান্ডার উত্তরে ঘোড়াঘাট, পূর্বে সোনারগাঁও, দক্ষিণ পূর্বে ফাতেহাবাদ (বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর) আর দক্ষিণে সাতগাঁও বরাবর মুঘল সৈন্যরা ছড়িয়ে পড়লো।
এদিকে বাদশাহ দাউদ শাহ পালিয়ে শক্তি বৃদ্ধি করতে করতে উড়িষ্যার দিকে সরে যাচ্ছিলেন। তাকে ধাওয়া করার দায়িত্ব এসে পরলো রাজা টোডর মলের উপর। বনের দুর্গম রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। কিন্তু সমস্যা হলো, এমন পরিবেশে এগিয়ে যাওয়া সত্যিই দুঃসাধ্য ব্যাপার। রাস্তা দুর্গম ও অপরিচিত হওয়ায় অ্যামবুশের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ছিলো অনেক। সেক্ষেত্রে বঙ্গ বাহিনীর হাতে কচুকাটা হওয়া ছাড়া করার আর কিছুই থাকবে না। তারপরও এই পথেই সেনাবাহিনী যাত্রা অব্যহত রাখলো।
ঝুকিপূর্ণ এই পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার খেসারতও দিতে হলো হাতে হাতে। বাদশাহ দাউদ শাহের পুত্র জুনায়েদ খান পথে দুবার মুঘল সেনাবাহিনীর পথ অবরোধ করে দাঁড়ালেন। দুবারই মুঘলরা পরাজিত হলো। টানা দুটি পরাজয়ে সেনাবাহিনী এবার বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। তারা সরাসরি আকবরের নির্দেশ ছাড়া এই ঝুকিপূর্ণ পথ ধরে এগোবে না বলে সিদ্ধান্ত নিলো।
অবস্থা বেগতিক দেখে এবার মুনিম খানকে হস্তক্ষেপ করতে তান্ডা থেকে এগিয়ে আসতে হলো। মুনিম খান নিজে উড়িষ্যায় এসে সেনাবাহিনীকে আশ্বস্ত করলেন। এরপর তুলনামূলক সহজ রাস্তা ধরে মুঘল সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন। শেষ পর্যন্ত সব বাঁধা পেড়িয়ে মুঘল বাহিনী উড়িষ্যা পর্যন্ত পৌঁছে গেলো।
১৫৭৫ সালের ৩ মার্চ সুবর্ণরেখা নদীর তীরের তুকারোই গ্রামে হিন্দুস্তানের পরাশক্তি এই দুই সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনী মুখোমুখি হলো।
৫
মুখোমুখি হয়েই দুই বাহিনী সেনাবিন্যাস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। খান-ই-খানান মুনিম খান মূল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করলেন কিয়া খানকে, মূল বাহিনীর ডানপাশে থাকলেন শাহাম খান জলাইর, পাইন্দা মুহাম্মদ খান মুঘল, মুহাম্মদ আলী খান তুকবাই। বামপাশে থাকলেন রাজা টোডর মল, আশরাফ খান মীর মুন্সি, মুজাফফর খান মুঘল, লস্কর খান। সম্মুখ বাহিনীর নেতৃত্বে থাকলেন চালমাহ বেগ। মুনিম খান মূল সেনাবাহিনীর পেছনে রিজার্ভ বাহিনীর কমান্ড নিজের হাতে রাখলেন।
অন্যদিকে বাদশাহ দাউদ শাহের বাহিনীর বিন্যাসও অনেকটা একই রকম ছিলো। সামনে গুজরা খানকে রেখে মূল বাহিনী নিয়ে তিনি কিছুটা পেছনে অবস্থান করছিলেন। অন্যদিকে ডান বাহিনীর কমান্ড ছিলো উড়িষ্যার গভর্নর খান জামানের কাছে। আর বামবাহুর নেতৃত্ব দিলেন ইসমাইল খান আবদার।
যুদ্ধ শুরু হলো। আফগান সৈন্যরা, তথা বাংলার সেনাবাহিনী সামনে এগোতে শুরু করলেই মুঘল সেনাবাহিনীর সামনে রাখা হালকা কামানগুলো গোলাবর্ষণ শুরু করলো। তবে তাতে খুব একটা কাজ হলো না। বঙ্গ সৈন্যদের অগ্রযাত্রা অব্যহত থাকলো। এরপর দুই বাহিনীই সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লো। গুজরা খান তীব্র আক্রমণ চালালেন চালমাহ বেগের উপর। তার এই তীব্র আক্রমণে মুঘল সৈন্যদের দিশেহারা হওয়ার অবস্থা হলো। প্রচন্ড সংঘর্ষের পর এই বাহিনীর মুঘল সৈন্যরা হাল ছেড়ে দিয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। এই সংঘর্ষে স্বয়ং চালমাহ বেগ নিহত হলেন।
এদিকে সিকান্দার খান আক্রমণ করলেন রাজা টোডর মলকে, আর ইসমাইল খান আক্রমণ করলেন শাহাম খানকে। দুই জায়গাতেই তীব্র লড়াই চললো। অন্যদিকে, স্বয়ং বাদশাহ দাউদ শাহ বাংলার মূল সেনাবাহিনী নিয়ে মুঘল সেনাবাহিনীর কেন্দ্রকে আক্রমণ করে নড়বড়ে করে দিলেন। যুদ্ধ এবার এগিয়ে গেলো মুনিম খানের দিকে। মুনিম খানের ডানপাশ চেপে ধরলেন দাউদ শাহ, অন্যদিকে গুজার খান চেপে ধরলেন বামপাশকে। মুনিম খানের অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে গেলো যে মনে হচ্ছিলো মুঘল সেনাবাহিনীর পরাজয় এখন শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার। গুজার খান একাই পাহাড়ের মতো দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে মুঘলদের উপর ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে লাগলেন।
কিন্তু, হঠাৎ ছুটে আসা একটি তীর সব হিসেব এলোমেলো করে দিলো। তীরটি এসে সোজা বিদ্ধ হলো গুজার খানের চোখে। মারা গেলেন বাংলার দুর্ধর্ষ এই জেনারেল। গুজার খান নিহত হলে তার অনুপস্থিতিতে তার বাহিনী নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। অন্যদিকে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে মুঘলরাও এতক্ষণে নিজেদের কিছুটা গুছিয়ে নিয়েছে। এরপর মুঘল সেনাবাহিনীর কেন্দ্র আর রিজার্ভ ফোর্স একযোগে আক্রমণ চালালো বাদশাহ দাউদ শাহের উপরে। মুঘলদের এই তীব্র আক্রমণ এবার আর সামলাতে পারলেন না তিনি। পরাজয় স্বীকার করে পিছু হটলেন বাংলার বাদশাহ দাউদ শাহ।
৬
এদিকে যুদ্ধ শেষে বাদশাহ দাউদ শাহকে ধাওয়ার উপরে রাখা হলো। তিনিও কিছুদিন এদিক সেদিক পালিয়ে বেড়ালেন। তবে শেষপর্যন্ত হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন। এরপর মুঘল সাম্রাজ্যের আনুগত্য করার সীদ্ধান্ত নিলেন। একই সালের ১২ এপ্রিল তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করতে আসেন। খান-ই-খানা মুনিম খান দাউদ শাহকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। দাউদ শাহ তার তরবারি মুনিম খানের কাছে অর্পণ করলেন, অর্থাৎ তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের কাছে নতি স্বীকার করলেন। মুনিম খান দাউদ শাহকে একটি মুঘল তরবারি ও রাজকীয় খিলাত উপহার দিলেন। এরপর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ চুক্তি স্বাক্ষর করা হলো।
এই চুক্তির আওতায় উড়িষ্যা দাউদ শাহের কাছে ছেড়ে দেওয়া হলো। আর দাউদ শাহ বাংলা, বিহার মুঘল সাম্রাজ্যের হাতে ছেড়ে দিলেন। একইসাথে আমৃত্যু মুঘল সাম্রাজ্যের আনুগত্য করার প্রতিজ্ঞা করলেন। বাংলায় মুঘলদের আপাত জয় হলো। কিন্তু কথায় আছে, বেশিরভাগ প্রতিজ্ঞা করাই হয় তা ভাঙার জন্য। তবে দাউদ শাহ ছাড়াও মুঘলদের জন্য আরেকটি বড় বিপর্যয় সামনেই অপেক্ষা করছিল। @ Masud Ferdous Eshan
২২
সম্রাট আকবরের ধর্মীয় বিশ্বাসের বৈচিত্র
১
ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে সম্রাট আকবরের ব্যক্তিজীবন বেশ মজার এবং যে কারও কৌতূহল জাগানোর জন্য যথেষ্ট। তিনি জন্মেছিলেন একটি মুসলিম রাজপরিবারে, বেড়ে উঠেছিলেন একটি মুসলিম রাজপরিবারে। তার পিতা সম্রাট হুমায়ুন নিজেও ব্যক্তিজীবনে প্রচন্ড ধার্মিক একজন মানুষ ছিলেন। এমনকি সম্রাট হুমায়ুন ইন্তেকালও করেন সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মাগরিবের আজান শুনে বসে পড়তে গিয়ে। সেই হিসেবে আকবরেরও একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম হওয়ার কথা ছিলো। সাধারণত তা-ই হয়।
প্রাথমিক জীবনে সম্রাট আকবর একজন নিষ্ঠাবান মুসলিমই ছিলেন। এসময় তিনি নিয়মিত ধর্মীয় প্রার্থনা করতেন, ধর্মীয় বিধি-নিষেধ, আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলতেন। মুসলিম ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সাথে আকবরের সম্পর্ক খুবই ভালো ছিলো। আকবর তাদের প্রচন্ড সম্মান করতেন। এমনকি মাঝে মাঝে মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্বও পালন করতেন তিনি। ১৫৭০ সালের দিকে তিনি সূফিবাদের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। সম্রাটের জীবন থেকে মূলধারার ইসলামের প্রভাব ক্ষীয়মাণ হওয়ার সূত্রপাত এখান থেকেই।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, সম্রাট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর ইসলামের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের ব্যপারেও তার আগ্রহ বেশ লক্ষ্যণীয়। নিঃসন্দেহে বিষয়টা দোষণীয় কিছু নয়। তবে একটা পর্যায়ে গিয়ে আকবর সম্রাট হিসেবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিজের হাতে রাখতে চাইলেন। এক্ষেত্রে সম্রাটের পথের বাধা হয়ে রইলেন সাম্রাজ্যের মুসলিম স্কলাররা। একটি মুসলিম নেতৃত্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রভাবশালী ইসলামী ব্যক্তিত্বরা ও ধর্মীয় নেতারা রাষ্ট্রের নানা বিষয়েই হস্তক্ষেপ করতেন। বিষয়টি আকবর পছন্দ একেবারেই করেননি। তাই তিনি আলেমদের ক্ষমতা হ্রাসের সিদ্ধান্ত নিলেন।
অতীত অভিজ্ঞতা থেকে আকবর শিক্ষা নিতে চাচ্ছিলেন। বৈরাম খানের পরবর্তীতে আকবরকে কেন্দ্র করে প্রসাদ ষড়যন্ত্র ডালপালা মেলেছিলো। আকবরকে হাতে রাখতে আকবরের দুধ মা মাহাম আগা, আকবরের দুধ ভাই আদম খান থেকে শুরু করে আকবরের অনেক আত্মীয়ই এসব ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আকবর একে একে সব ষড়যন্ত্রকারীদের পরাজিত করে সাম্রাজ্যের সার্বভৌম ক্ষমতা নিজ হাতে নিতে সক্ষম হন। আকবরের জন্য সমস্যা হলো, সাম্রাজ্যের আলেমরাও সাম্রাজ্যে বেশ বড় ধরনের প্রভাব রাখতেন। আকবর তাই কোনো ঝুঁকি নিতে চাননি।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৫৭৯ সালে তিনি ফতেহপুর সিক্রির মসজিদ থেকে একটি নির্দেশ জারি করে বসেন যে, এখন থেকে মুঘল সাম্রাজ্যের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে স্বীকৃত হবেন একমাত্র সম্রাট আকবর! এই মজহরনামা মোতাবেক আকবরকে ‘ইমাম-ই-আদিল’ ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ, সাম্রাজ্যের প্রধান বিচারপতির ভূমিকাও আকবর পালন করবেন।
২
ধর্মের প্রতি জানার আগ্রহ থেকেই ১৫৭৫ সালে গুজরাট অভিযান থেকে ফিরে আকবর ফতেহপুর সিক্রিতে ‘ইবাদতখানা’ নামে একটি ধর্মীয় ও দর্শনের আলোচনা করার স্থান প্রতিষ্ঠা করেন। আকবরের চরিত্রের একটি ভালো দিক হলো তিনি চিন্তাশীল ছিলেন, যেকোনো বিষয় নিয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে ভাবতে পছন্দ করতেন। বেশিরভাগ মানুষই চিন্তা-ভাবনা করে না।
শুরুতে এই ইবাদতখানায় শুধুমাত্র মুসলিম স্কলারদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। ইবাদতখানায় তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিলো। প্রতি বৃহস্পতিবার মাগরিবের পর আলোচনা শুরু হয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত চলতো। কখনো কখনো আলোচনা এত দীর্ঘায়িত হতো যে পরের দিন জুম্মার সালাতের পূর্ব পর্যন্ত আলোচনা চলত। আলেমগণ এখানে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সম্রাটের সাথে আলাপ-আলোচনা করতেন। সম্রাটও খুব মনোযোগের সাথে তাদের আলোচনা শুনতেন, আলোচনায় অংশ নিতেন।
১৫৭৮ সালে প্রথমবারের মতো ইবাদতখানায় হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জরাথ্রুস্টসহ অন্যান্য ধর্মের পন্ডিতদের আমন্ত্রণ জানানো হতে থাকে। তারাও নিজেদের ধর্ম নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। বিভিন্ন ধর্মের বিশেষজ্ঞদের আলোচনা শুনতে শুনতেই সবগুলো ধর্মের মূল কথা নিয়ে একটি সমন্বিত ধর্ম প্রচলনের বিষয়টি আকবরের মাথায় চলে আসে। শেষপর্যন্ত ১৫৮২ সালে সম্রাট আকবর জন্ম দেন নতুন একটি ধর্মের। যথাসময়ে সেই বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
৩
বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকেই আদর্শের প্রশ্নে ইসলাম অনমনীয়। ইসলাম একত্ববাদে বিশ্বাসী একটি জীবনব্যবস্থা, যা সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহর দেওয়া পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআন এবং হযরত মুহাম্মদ (স) এর সুন্নাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। অন্যদিকে হিন্দুস্তানের পরিচিত অন্যান্য ধর্মগুলো বহু ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী, যা একেবারে ইসলামের মূল শিক্ষার সাথেই সাংঘর্ষিক।
কাজেই ধর্মীয় মতাদর্শভিত্তিক আকবরের এ পরীক্ষা-নীরিক্ষায় মুসলিম স্কলাররা তেমন খুশি হলেন না। এদিকে সম্রাটের দিক থেকে চিন্তা করলে, সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্তগুলোতে স্কলারদের অংশগ্রহণ করার বিষয়টি তার কখনোই ভালো লাগতো না। তিনি এ থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলেন, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ছিলো ১৫৭৯ সালের অধ্যাদেশটি। এই আদেশের মাধ্যমে আকবর নিজেকে সাম্রাজ্যের আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে ঘোষণা করলেন। মূলত এই ঘোষণার মাধ্যমেই আকবর রাষ্ট্র থেকে ইসলামের প্রভাবকে ক্ষুণ্ন করেন। আলেম সমাজে ক্ষোভ বাড়লো। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হলো বিদ্রোহের মাধ্যমে। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রাদেশিক শাসক আর আলেমরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। আকবর কিছুটা চাপে পড়ে গেলেন।
আকবরের ধর্মীয় মতবাদের বিরোধীতা পোষণকারী আলেমদের সাথে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে গেলেও আকবর অবশ্য সরাসরি ইসলামের উপর আঘাত হানেননি। ইসলামের কিছু প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠান আকবর বন্ধ করেছিলেন বটে, কিন্তু মসজিদ, মাদ্রাসার দিকে হাত বাড়িয়ে দেননি, বা ইসলামের মূল আদর্শের বিরুদ্ধেও কখনো কোনো পদক্ষেপ নেননি। এমনকি ইসলাম প্রচারকদের কোথাও তেমন কোনো বাঁধা দেওয়া হয়নি।
৪
ব্যক্তিগত জীবনে হিন্দু ধর্মালম্বীদের প্রতি আকবরের উদারতা বেশ লক্ষ্যণীয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার ফলে সাম্রাজ্য পরিচালনায় আকবর হিন্দুদের পাশে পেতে চেয়েছিলেন। অবশ্য শুধু হিন্দুই না, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ আর সুষম অধিকারের ভিত্তিতে শক্তিশালী একটি সাম্রাজ্য তৈরি করতে চেয়েছিলেন আকবর।
হিন্দুদের মন জয় করতে আকবর হিন্দুদের উপর জিজিয়া ও তীর্থ কর উঠিয়ে নেন। জিজিয়া মূলত সাম্রাজ্যের নিরাপত্তায় বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যহতি দেওয়ার বিনিময়ে নেওয়া হতো। করের পরিমাণও খুবই সামান্য ছিলো।
হিন্দুদের প্রতি নিজের আন্তরিকতার প্রকাশের জন্য আকবর রাজপুত নারীদের সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। এমনকি বেশ কয়েকজন রাজপুত দরবারের উচ্চপদও পেয়েছিলেন। এই বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্র ধরে আকবর একেবারে সামনে থেকে হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস আর রীতিনীতির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান। এর ফলে হিন্দু ধর্মের প্রতি তার আগ্রহ বাড়ে। হিন্দু স্ত্রীদের সুবিধার্থে প্রথমবারের মুঘল প্রাসাদে পূজা-অর্চণার অনুমতি দেওয়া হয়।
ইন্দ্র, বিষ্ণু, মহাদেবের প্রতি আকবর বেশ শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। হিন্দু ধর্ম বিষয়ে জানার সময় তাদের বিভিন্ন উৎসবের সাথেও আকবরের পরিচিতি ঘটে। রাখীবন্ধন, বসন্তোৎসব, দীপাবলী, দশহারার মতো উৎসবগুলোকে আকবর অংশ নিতেন। হিন্দুদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে হিন্দু পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানাতেন। এমনকি আকবরের আগ্রহে যোগ, বলিষ্ঠ, রামায়ণ, মহাভারত, অথর্ব বেদ প্রভৃতি হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলো অনুবাদের ব্যবস্থা করা হয়।
বিভিন্ন সময়ে আকবর হিন্দুরীতিতে পোষাক পরতেন, সকালে সূর্যের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রপাঠ করতেন। এছাড়াও আকবর হিন্দুদের মতোই গঙ্গা জলকে পবিত্র ভাবতেন। গরু হিন্দু ধর্মালম্বীদের কাছে পবিত্র হওয়ায় গরু জবাই করাকেও আকবর নিরুৎসাহিত করতেন। হিন্দু ধর্মের প্রতি আকবরের এত আগ্রহ দেখে অনেক পণ্ডিতই আকবরকে রাম-কৃষ্ণের অবতার বলতেন।
হিন্দু ধর্মের অনেক রীতিনীতি পছন্দ করলেও সতিদাহ প্রথা আকবর খুবই অপছন্দ করতেন। ইচ্ছার বিরুদ্ধে সদ্যবিধবা স্ত্রীকে দাহ করা থেকে বিরত রাখতে আকবর শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। বেঁচে যাওয়া বিধবা হিন্দু মহিলাদের পুনরায় বিবাহের জন্য আকবর সবসময় উৎসাহ দিতেন। হিন্দু ধর্মের বর্ণপ্রথাকে আকবর বৈষম্যমূলক আচরণ মনে করতেন এবং অপছন্দ করতে।
৫
খ্রিস্টান ধর্মের সাথে আকবরের সরাসরি পরিচয় ঘটে গুজরাট আক্রমণের সময়। খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে জানার জন্য গোয়াতে অবস্থানগ্রহণকারী পর্তুগীজদের আকবর এসময় অনুরোধ করেছিলেন দরবারে কয়েকজন খ্রিস্টান পাদ্রী পাঠাতে। খ্রিস্টানরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে সম্রাটের এই আহ্বানে সাড়া দেন।
এনরিকেজ, রিদলজেন একোয়াভিভ আর এস্টোনিভ মনসারেতকে নিয়ে প্রথম দলটি ১৫৮০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারীতে মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানীতে পা ফেলে। প্রায় ২ বছর দরবারে অবস্থা করে ১৫৮২ সালের এপ্রিল মাসে দলটি রাজধানী ত্যাগ করে। এডওয়ার্ড লিউটন আর ক্রিস্টোফার দ্য ভেগার নেতৃত্বাধীন আরেকটি দল ১৫৯১ থেকে ১৫৯২ সাল পর্যন্ত আকবরকে সঙ্গ দিয়েছিলো। ফাদার জেরোম জেভিয়ার, বেনেডিক্ট দ্য গোয়োস আর ইমানুয়েল পিনহিরোর নেত্তৃত্বাধীন দলটি লাহোরে ১৫৯৫ সালে আকবরের দরবারে হাজির হন। ১৬০৫ সালে আকবরের মৃত্যু পর্যন্ত এই মিশনটি মুঘল রাজদরবারে অবস্থান করেছিলো।
জেসুইট এসব পাদ্রীদের সাথে আকবরের সম্পর্ককে অবশ্য অন্য একটি দিক থেকে বিবেচনা করা যায়। গুজরাট দখলের পদ প্রথমবারের মতো মুঘলরা সমুদ্রের দেখা পায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সমুদ্র ছিলো পর্তুগীজদের নিয়ন্ত্রণে। বাণিজ্যের সুবাদে উপকূলে এসে তারা রীতিমতো সামরিক ঘাটি বানিয়ে উপকূল নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে দেয়। জাহাজে স্থাপিত কামান তাদের সমুদ্রে অদ্বিতীয় করে তুলে। পর্তুগীজদের মতো উন্নত প্রযুক্তি মুঘলদের হাতে না থাকায় সম্রাট অনেকটা অসহায় বোধ করেন। অসহায়ত্বের মাত্রা বোঝা যায় যখন হজ্ব করার জন্য সমুদ্র যাত্রা অনুমতিও এই তস্কর শ্রেণীর থেকে নিতে হতো! এই অসভ্য দখলদাররা রাজপরিবারের নারীদেরও সম্মান জানাতো না। সম্রাটের স্ত্রীর হজ্ব যাত্রার সময় তারা ১ বছর তাকে গোয়া বন্দরে অপেক্ষা করায়।
কাজেই বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে আকবরের আগ্রহ এমনিতে তো ছিলোই, কিন্তু খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে আকবরের এই আগ্রহের পেছনে একটা রাজনৈতিক কারণ ছিলো এমনটাও বলা যায়। আবার পর্তুগীজরাও মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে নানান ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত থাকা এবং ইসলাম ও রাসুল (স) এর ব্যাপারে কুৎসা রটনা করলেও আকবর সহনশীলতার পরিচয় দেন। এদিকে মুঘল দরবারে পর্তুগিজদের ঘন ঘন আনাগোনা দেখে ব্রিটিশরা আতঙ্কিত হয়ে মুঘল দরবারে সাথে সম্পোর্কন্নোয়নের চেষ্টা চালায়। রানী এলিজাবেথের পক্ষ থেকেও আকবরের কাছে পত্র প্রেরণ করা হয়। সেই সূত্র ধরে পরবর্তীতে ব্রিটিশরা মুঘল সাম্রাজ্যে বাণিজ্যের অনুমতি পায়। কিন্তু ব্রিটিশদের এই দেশে ঘাটি গাড়তে দেওয়া যে মোটেও ভালো কোনো ফল বয়ে নিয়ে আসেনি, তা তো ইতিহাসের পাতা থেকে স্পষ্টই। যাক, সে অন্য আলোচনা।
৬
পারস্যের প্রাচীন জরথুস্ত্র ধর্মের দ্বারাও আকবর বেশ প্রাভাবিত ছিলেন। এ ধর্মটির অগ্নি উপাসনার রীতিটি আকবরের সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো। এই কারণেই ধর্মটির প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। তাই তিনি জরথুস্ত্র ধর্মগুরু দস্তর মাইরজী রাণাকে দরবারে আহ্বান জানান। দস্তর মাইরজী রাণা আকবরকে অগ্নি উপাসনার পদ্ধতিসহ জরথুস্ত্র ধর্মের বিভিন্ন প্রার্থনার নিয়ম শেখান। তারই উৎসাহে আকবর প্রকাশ্যে অগ্নি উপাসনা শুরু করেন। এমনকি এসময়ে দরবারে অগ্নি শিখা প্রজ্জলিত করা হতো, এবং দরবার শুরুর সময় সবাইকে দাঁড়িয়ে অগ্নি শিখাকে সম্মান জানাতে হতো। ধারনা করা হয় অগ্নিপূজারি রাজা বীরবলের প্রভাবেই আকবর জরথুস্ত্র ধর্মের প্রতি ঝুঁকে পরেন।
এছাড়াও অন্যান্য ধর্মের পাশাপাশি আকবর জৈন ধর্মের প্রতিও বেশ আগ্রহী ছিলেন। জৈন ধর্মের জীব প্রেমের দর্শনটি আকবরের ভালো লেগে যায়। জৈন ধর্মের বেশ কয়েকজন গুরুর মুঘল রাজদরবারে আনাগোনা ছিলো। জৈন ধর্মের প্রতি আকবরের পরিচয় হয় মূলত রাজস্থান থেকে। রাজস্থান ছিলো জৈনদের বেশ শক্তিশালী ঘাটি। আর রাজপুতদের সাথে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার ফলে আকবর জৈনদের সাথেও ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন।
১৫৮২ সালে জৈন ধর্মগুরু হীরা বিজয় সুরি মুঘল দরবারে এসে প্রায় ২ বছর অবস্থান করেন। এই ২ বছরে তিনি নানাভাবে আকবরকে প্রাভাবিত করার চেষ্টা করেন। তার প্রচেষ্টাতেই আকবর আমিষ তথা মাংস খাওয়া প্রায় ছেড়ে দেন। হীরা বিজয় সুরি ছাড়াও পরবর্তীতে গুরু শান্তিচন্দ্র, ভানুচন্দ্র, জিন চন্দ্র সুরি মুঘল দরবারে অবস্থান করেছিলেন। তারাও বিভিন্নভাবে আকবরকে জৈন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করেন।
এছাড়াও শিখ ধর্মের প্রতিও আকবরের আকর্ষণ বিশেষ লক্ষ্যণীয়। শিখ ধর্মগুরু অমরদাস, রামদাস আকবরের দরবারে এসেছিলেন এবং নানাভাবে আকবর তাদের দ্বারা প্রাভাবিত হয়েছিলেন। রামদাসকে আকবর একটি জায়গীর প্রদান করেন। রামদাস সেই জায়গীরে একটি পুকুর খনন করে নাম দেন অমৃতসর। পরবর্তীতে এই অমৃতসরই শিখ ধর্মালম্বীদের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। শিখদের প্রতি আকবরের কৃতজ্ঞতা স্মরণ করে শিখ ধর্মগ্রন্থ গ্রন্থসাহেবে আকবরকে বেশ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়েছে।
৭
আকবরের ধর্মীয় বিশ্বাস যে বেশ বিচিত্র ছিলো, তা তো স্পষ্ট। যখন যে ধর্মের যে বিষয়গুলো আকবরের ভালো লেগেছে, তিনি তা-ই মনে-প্রাণে পালন করেছেন। রাষ্ট্রীয় কাজে মুসলিম স্কলারদের অংশগ্রহণের বিষয়টি ছাড়াও, বিভিন্ন তুচ্ছ কারণে স্কলারদের নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কলহে আকবর বেশ বিরক্ত ছিলেন। বহু-ঈশ্বরবাদী ধর্মগুলোর বিভিন্ন রীতিনীতি পালন করায় আকবরের প্রতিও মুসলিম স্কলাররা সন্তুষ্ট ছিলেন না। প্রায়ই তাদের এই অসন্তুষ্টির বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে যেত, যা আকবর ও মুসলিম স্কলারদের মাঝে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছিলো।
অন্যদিকে অন্যান্য ধর্মের প্রতি আকবরের গভীর আগ্রহ দেখে অনেকেই সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। যেমন- খ্রিস্টান মিশনারীরা শুরুর দিকে খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি আকবরের টান দেখে ভেবেছিলেন আকবরকে খ্রিস্টান বানানো সম্ভব হবে। তারা বেশ কয়েকবার সেই চেষ্টাও করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই বুঝে যান খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি আকবরের এই আগ্রহ অন্যান্য ধর্মের প্রতি আকবরের আগ্রহের মতোই। পরে তারা হাল ছেড়ে দেয়।
চারিত্রিক দিক থেকে সম্রাট আকবর ছিলেন কৌতূহলী, তিনি যেকোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে পছন্দ করতেন। বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, আদর্শিক আর বাহ্যিক রীতিনীতি দেখে আকবর ধর্মগুলো সম্পর্কে কৌতুহলী হয়েছিলেন। এসবের মধ্যে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য এবং নিজের খামখেয়ালীপনা থেকে যা পছন্দ হয়েছে, তা-ই তিনি গ্রহন করেছে, পালন করেছেন। বিভিন্ন ধর্মের প্রভাবই পরবর্তীতে তাকে উব্ধুদ্ধ করে নতুন একটি ধর্ম প্রচলনের জন্য। @ Masud Ferdous Eshan
২৩
পাপুয়া নিউ গিনির মানুষদের কথা॥
পাপুয়া, ১৮৮৪ থেকে ছিল বৃটিশ শাসনাধীন। ঐ ১৮৮৪তেই খানিকটা অংশে ছিল জার্মানির শাসন। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে গোটাটাই চলে যায় অস্ট্রেলিয়ার শাসনে। অস্ট্রেলিয়া পাপুয়াকে দুই ভাগে ভাগ করে। পাপুয়া আর পাপুয়া নিউগিনি।
অবশেষে ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা পায় পাপুয়া নিউ গিনি। একটা ছোট্ট দেশ। জনসংখ্যা ১৭-১৮ লক্ষ। জনঘণত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৫ জন।
দেশ জোড়া ছোট ছোট জনবসতি। এক একটি জনবসতিতে মোটামুটি ১হাজারের মত লোক থাকে। তবে দেশের অর্ধেক লোকই আরো ছোট বসতিতে বাস করে। সেগুলোতে গড়ে ৭৫ থেকে ৩০০ লোকের বসবাস। তবে একেবারে একটি পরিবার বাস করে এমনও বসতি আছে।
আকারে, জনসংখ্যায়, ছোট্ট দেশ হলে কি হবে, তাদের কথ্য ভাষার সংখ্যা কিন্তু ৮৪০টি। ফলে সহজেই বোঝা যাবে এক একটি ভাষায় কথা বলা লোকের সংখ্যা খুবই কম। মোটা হিসাবে এক একটি ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা গড়ে ৭ হাজার জনের মত হবে।
সরকারি কাজকর্মের জন্য অবশ্য চারটি ভাষাকে কাজের ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া আছে। তার মধ্যে একটা হল ইংরেজী। ইংরেজী আর তোক পিসিন এইদুটো ভাষাই তাদের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। সরকার স্বীকৃত হিরিমোতো আর সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ও খানিক হলেও ব্যবহার হয়।
২০২৩এর তথ্য অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ১৪শতাংশ মাত্র শহরে বাস করে। ধর্মের দিক থেকে এখন ৯৬ শতাংশের মত লোক খৃষ্টান।
খাদ্যাভ্যাসে তাদের প্রধান খাদ্য মিষ্টি আলু। তাছাড়া সাবু (সাগো পাম)ও খাবার হিসাবে ব্যবহার হয়।
ব্যবসা বানিজ্যের প্রধান উপাদান সমুদ্রের পাড়ে পাওয়া ঝিনুক, দেশের ভেতরের দিকে তৈরী পাথরের কুড়াল, নোনতা জলের জলপ্রপাত থেকে তৈরী লবন এইসব।
উপরের সব কথাই পাপুয়া নিউগিনির মোটামুটি আধুনিক ইতিহাসের কথা। তার আগে?
এই ছোট্ট দেশে যেমন কথ্য ভাষা আছে ৮৪০টি তেমনি অতগুলো ভিন্ন জাতিও তো থাকবে। একদম আলাদা না হোক কিছু তো আলাদাই। আসলেই দেশটাতে এত বিচিত্র চেহারার লোক দেখা যায় যে মাঝে মাঝে মনে হয় গোটা পৃথিবীতেও অত শারীরিক বৈচিত্র নেই। যদিও বাস্তবে সেটা সত্যি না। আমাদের অনভ্যস্ত চোখে ওরকম লাগে। বিশেষত তাদের পোশাকের বৈচিত্রই আমাদের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। পোশাকের বৈচিত্র এসেছে তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র থেকে।
শারীরিক ভাবে বৈচিত্র কম হলেও নেহাৎ কম না। তার সাথে ঐ ৮৪০টি ভাষা। ঐটুকু ছোট একটা দেশে এত বৈচিত্র সম্ভব হল কি করে?
আমাদের মাথায় পৃথিবী ব্যাপি বিভিন্ন জাতি ও ভাষার সৃষ্টি নিয়ে যে প্রশ্ন ধাঁদার মত কিলবিল করে তার উত্তর এই ছোট্ট দেশেই রয়েছে।
ঘণ বনে কম লোকসংখ্যার দেশে এক একটি বসতির লোকের পক্ষে তার প্রতিবেশি বসতির লোকেদের দেখতে পাওয়াটাই বিশাল ব্যাপার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে যেত কোন প্রতিবেশিকে দেখার আগে। এই যে পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্নতা তা থেকেই সৃষ্টি ভিন্ন ভিন্ন ভাষার। কারন পাশের বসতির লোকদের সাথে যোগাযোগ থাকলে তবেই না তাদের ভাষা রপ্ত করার সম্ভাবনা জাগবে। দুই ভাষার লোকেদের যোগাযোগেই দুটো ভাষা মিলে নতুন কিচুড়ি ভাষার জন্ম হবে। সেটা ওখানে সম্ভব হয়নি।
আর যে প্রতিবেশিদের সাথে দেখাই হচ্ছে না তাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কেরও প্রশ্ন নেই। কাজেই শারীরিক গঠনও ভিন্ন হতেই থাকবে। কালক্রমে ভাষায় চেহারায় সংস্কৃতিতে তারা একদম আলাদা হয়ে যাবে। এবং হয়ে গেছে। একেবারে হাতে গরম প্রমান এই পাপুয়া নিউগিনি।
এই পাপুয়া নিউ গিনির বহুলোকের চেহারায় সাব-সাহারান আফ্রিকানদের ছাপ একেবারে সুস্পষ্ট। আফ্রিকা থেকে আধুনিক স্যাপিয়েন্সদের থেকে যে প্রধান পরিযান হয়েছিল এশিয়াতে, ধরুন ৫০-৬০ হাজার বৎসর আগে, অনেকের ধারনা তারও বেশ কয়েক হাজার বৎসর আগে আরেকটি পরিযানে কিছু আফ্রিকান এসেছিল। এবং তাদেরই এখন দেখা যাচ্ছে পাপুয়া নিউ গিনিতে। এই ধারনা কিছুদিন আগেও ছিল। কাজেই নানা বই আর লেখালেখিতে সেই সম্ভাবনার কথাই লেখা থাকবে।
এই নিয়ে সদ্য একটি গবেষণা হয়। পাপুয়ানদের পূর্বপুরুষীয় জিন সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য দেওয়া হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে। সে সব হিসেব কষে সব বিবেচনা করে জানিয়াছে, না পাপুয়ানদের পূর্বপুরুত্বের মধ্যে কোন প্রাচীনতর আফ্রিকান জিন নেই। পৃথিবীজোড়া বাকি মানুষদের যেমন তেমনি পাপুয়ানদেরও অ্যান্সেস্ট্রি। পাপুয়ানরা এশিয়া মহাদেশের লোকেদেরই অংশ।
তাহলে এই আফ্রিকান চেহারা?
তাদের এই চেহারায় প্রাচীনত্ব টিকে থাকার রহস্য লুকিয়ে আছে অন্য ঘটনায়। পাপুয়া নিউগিনির জনসংখ্যা একসময় ভীষণ কমে যায়। ফলে তাদের জেনেটিক বৈচিত্রের হারও কমে যায় বিপুল ভাবে। সামান্য কিছু টিকে থাকা আফ্রিকান জিনের উপর ভিত্তি করেই আবার তাদের জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু ঐ ঘটনার ফলে তাদের মধ্যে কিছু আফ্রিকান দৈহিক বৈশিষ্ট্যের হার বেশি হয়ে যায়।
(অন্য এসিয়া বাসীদের তুলনায়)। তার সাথে যোগ করুন তাদের পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা। তাহলেই বৈচিত্রের ধাঁধার সমাধান হয়ে যাবে।
এর সাথে একটু টপআপ।
পাপুয়াতে ডেনিসোভান জিনের হার পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বছর চারেক আগের একটি গবেষণা বলছে মাত্র ১৫ হাজার বৎসর আগেও ডেনিসোভানরা পাপুয়াতে ছিল। @ ©তুষারমুখার্জি
২৪
খিলজির তিব্বত অভিযান ও কামরুপ রাজা পৃথুর সাথে যুদ্ধ।
ইতিহাসের একটি জনপ্রিয় ঘটনার বর্ণনা । আমি অনেকগুলো লেখা পড়ে দেখলাম। সমস্যা হল বেশিরভাগ লেখাতেই তথ্যের চেয়ে আবেগে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সমস্যার উৎস হল ম্যাপ না দেখে যুদ্ধ আক্রমণ অভিযান এসব বিষয়ে শুধু আবেগে ভর করে লিখলে যা দাঁড়ায় তাই হয়েছে। বেশিরভাগ লেখাই ম্যাপ না দেখে লেখা হয়েছ । ফলে হয়েছে একটি জগাখিচুড়ি কাহিনী। একটি লেখায় তো ব্রহ্মপুত্র নদীকে ভুটানে বলা হয় গেছে।
এই কাহিনির সুত্র একটিই। মিনহাজ এর লেখা তাবাকাত ই নাসিরি। মিনহাজ আবার লিখেছেন ঘটনার ৪০ বছর পরে দুজন লোকের মুখে গল্প শুনে। ফলে গোটা কাহিনী আসলে গল্পের সমাহার।
তারই মধ্যে মিনহাজের লেখা থেকে তথ্য নিয়ে ভূগোলের সাথে মিলিয়ে ঘটনার একটা বিবরণ আমি দাঁড় করাবার চেষ্টা করছি।
এই লেখায় আমি বহু লেখকের বিশেষ করে ই এ গেটসের লেখাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।
ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজী স্বদেশ আফগানিস্তানে অর্থ উপার্জনে বিশেষ সুবিধা করতে না পেরে ভাগ্য সন্ধানে ভারতে এসে ঝটপট দুটো গ্রামের জায়গীর জোগাড় করে ফেললেন। সেই জায়গীরের আয়ের টাকায় স্বজাতীয় কিছু খিলজী যুবককে নিজের কাছে ঠাঁই দিয়ে সূচনা করলে নিজস্ব বাহিনীর।
ছন্নছাড়া মগধ তথা বিহার তখন আচমকা হানাদারির উপযুক্ত ভূমি। ফলে অপেক্ষাকৃত সহজেই খিলজী এখানকার মুঙ্গের জেলা থেকে যথেষ্ট সম্পদ সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেন। কয়েক বছরের মধ্যেই এইভাবে সম্পদ সংগ্রহ করতে করতে তিনি গড়ে ফেললেন ২০০ অশ্বারোহীর রীতিমতো এক বাহিনী।
এবার তিনি দিল্লির সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবক এর সাথে দেখা করলে প্রচুর প্রশংসা পেলেন। প্রশংসা বাক্য শোনার দরকার ছিল নিজেকে উচ্চতার ক্ষমতার উপযুক্ত ভাবার জন্য। এবার নতুন উদ্দীপনায় নতুন লক্ষ্যে তিনি ঠিক করলেন সেন রাজাদের বাংলা আক্রমণ ও দখল করবেন। তিনি সজাগ ছিলেন সেন রাজাদের সাথে সরাসরি যুদ্ধে তিনি সফল হবেন না।
তাই এক ঝটিকা আক্রমনে ১২০৩-১২০৪ এ নদীয়া দখল করলেন। সেখান থেকে ক্রমে ক্ষমতার বিস্তারে দখলে এলো গৌড়ের লক্ষণাবতি বা লখনৌতি। খিলজির রাজধানী হল লখনৌতি। নদীয়া ছেড়ে লখনৌতিতে কেন? সম্ভবত সেন রাজাদের প্রতি আক্রমণের এড়াতে।
এবার তার দৃষ্টি গেল পূর্বে।
গৌড়ের উত্তরবঙ্গ ও কামরূপের সীমানা হলো করতোয়া নদী। লখনৌতিতে তিব্বত উত্তরবঙ্গ বাণিজ্যের সমৃদ্ধি তাকে আকৃষ্ট করেছিল। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ঘোড়ার সরবরাহ। খিলজি শুনলেন প্রতিদিন পনেরশ ঘোড়া বিক্রির জন্য আসে। আংশিক সত্য হলেও সংখ্যাটা বিশাল। তিব্বত দখলে নিতে পারলে সব ঘোড়া এমনিই পাওয়া যাবে। কিনতে হবে না। কাজেই তিব্বত তার চাই। ঘোড়া ছাড়াও বাণিজ্য পথের কর থেকে আয় তো আছেই।
তিনি বখতিয়ার উদ্দিন খিলজী ইতিমধ্যে বিনা বাধায় অনেক এলাকায় সফল হানা দিয়েছেন বহু সম্পদ সংগ্রহ করেছেন। অতএব তিব্বত তিনি অবশ্যই জয় করতে পারবেন। এই আত্মবিশ্বাস তার আছে।
প্রস্তুতি পর্বে উত্তরবঙ্গের মেচ উপজাতির এক সর্দারকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করলেন। ধর্মান্তরিত আলি মেচ তার তিব্বত অভিযানের পথপ্রদর্শক হবে। গৌড় দখলের পরে সম্পদের অভাব নেই। ঝটতি জোগাড় হল দশ হাজার অশ্বারোহী ও কুড়ি হাজার পদাতিকের বাহিনী।
পথপ্রদর্শক আলী মেচ তার বাহিনীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল মর্দানকোট বা বর্ধনকুট বা বরধন কোট, সম্ভবত করতোয়া নদীর পাড়ের কোন বসতি। খিলজী জানতেন কামরূপের রাজ্য শক্তিশালী তাই বিরোধিতার পথে না গিয়ে কামরূপ রাজা পৃথুর কাছে দুত পাঠালেন।
তার রাজ্যের মধ্যে দিয়ে অভিযানের অনুমতির জন্য।
কামরূপ রাজা পৃথু খিলজীর দুতকে জানালেন তিনি নিজেও ভাবছেন দক্ষিণ তিব্বত অভিযানে চালাবেন। বাণিজ্যপথের অধিকার পেতে। তবে কয়েকদিন পরেই বর্ষা নামবে তাই এখন না আগামী বছর চালানো হবে যৌথ অভিযান। এখন অভিযান স্থগিত রেখে খিলজি ফিরে যান।
খিলজী নিজেই তিব্বত জয় করতে চান তিনি যৌথ অভিযানে উৎসাহী নয়। তাছাড়া বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে তিনি ইতিমধ্যে বহু দূরে এগিয়ে এসেছেন। এখন আর অভিযান স্থগিত রেখে ফিরে যাবার প্রশ্নই ওঠে না।
আত্মবিশ্বাসের ভরপুর খিলজি বাহিনী নিয়ে অভিযান শুরু করলেন। মিনহাজ এর বর্ণনা অনুযায়ী পথে খিলজি দেখতে পেলেন গঙ্গার চেয়ে তিনগুণ বড় এক বিশাল নদী।
এই তিব্বত অভিযান নিয়ে যারা লিখেছেন তারা অনেকেই এই নদীকে করোতোয়া অথবা তিস্তা বলে অনুমান করে নিয়েছেন। কিন্তু এই দুটো নদী কখনোই গঙ্গার চেয়ে তিনগুণ বড় হতে পারে না । গঙ্গার চেয়ে তিনগুণ বড় নদী হতে পারে কেবলমাত্র ব্রহ্মপুত্র।
কল্পনায় ভর না করে মিনহাজকে ভরসা করে পথ চললে যা দাঁড়ায়, তা হলো খিলজি বাহিনী কামরূপের মধ্যে দিয়ে বহু দূরে গিয়ে প্রায় বর্তমানের দরং জেলার কাছের এখনকার বরনদী অভয়ারণ্য দিয়ে তিব্বতের পথ ধরেন।
এই পথে যেতে হলে মিনহাজের তাবাকাত ই নাসিরির বর্ণনা অনুযায়ী আমরা পাব একটি পাথরের সাঁকো শিলাহাক বা শিলহাঁকো বা শিলা সাঁকো। আমরা যে সঠিক পথে তার প্রমাণ এই প্রাচীন পাথরের সেতু।
হাজোর কাছে ভুটানের পাহাড় থেকে বয়ে আসা ব্রহ্মপুত্রে মিশে যাওয়া বরনদীর উপরের এই পাথরের সেতু এখনো আছে তবে বরনদীর গতিপথ বদলে যাওয়ায় সেই সেতু এখন একটি হ্রদের এপাড় ওপাড় যাতায়াতের কাজ করছে মাত্র।
তিব্বত অভিযানের পথে পাথরের সেতুটি পার হবার পরে সেতুর রক্ষার জন্য খিলজি একদল সেনা রেখে দিলেন। দায়িত্ব দিলেন দুই জাতির দুইজন সেনা অধ্যক্ষকে। একজন খিলজী জাতির অপরজন তুর্কি জাতির। সাবধানের মার নেই।
দশ দিন হেঁটে খিলজি বাহিনী দক্ষিণ তিব্বতের একাধিক সমৃদ্ধ গ্রাম ও মনেস্ট্রির দেখা পেলেন এবং যথারীতি দ্রুততার সাথে লুটতরাজে নেমে পড়ল গোটা বাহিনী। ফল হল মারাত্মক। সমতলের গ্রামবাসীদের মত এই পাহাড়ি গ্রামবাসীরা ভয়ে পালালো না । তারা জঙ্গলের আড়ালে থেকে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকলো । তাদের সাথে যোগ দিল কাছাকাছি এক দুর্গ রক্ষাকারী সেনা দল । তাদের অস্ত্র বলতে শুধুই বাঁশের বল্লম আর তীর।
জঙ্গলের আড়ালে অদৃশ্য শত্রুর ছোঁড়া, সেই সব অস্ত্রে খিলজি বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করল। তার সাথে যোগ হলো পাহাড়ি এলাকার দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আর অজানা রোগের আক্রমণ। খিলজী প্রমাদ গুনলেন।
এরই মধ্যে বন্দী করা স্থানীয়দের মুখে শুনলেন খুব তাড়াতাড়ি সাড়ে তিন লক্ষ অশ্বারোহীর এক সেনাদল আসছে। অবশ্যই পুরোটা সত্যি নয় অনুমান করলেন খিলজি। তবে সাড়ে তিন লক্ষের ভগ্নাংশ হলেও তিনি সামলাতে পারবেন না।
খিলজি মনস্থির করলেন যথেষ্ট হয়েছে আর নয়। এবার ফিরে চলো। আসছে বছর আবার হবে।
কিন্তু ফেরাটা কতটা ভয়ানক হবে সেটা তিনি তখনও কল্পনাই করেননি।
ফেরার পথে পাহাড় থেকে নেমে দেখেন কামরূপ রাজ্যের প্রতিটি জনপদ জনশূন্য। কোথাও খাদ্য নেই পানীয় নেই লোকজন নেই এমনকি জ্বালানির জন্য এক টুকরো কাঠও নেই। তারই ফাঁকে যেখানে জঙ্গল বন আছে সেখানেই জঙ্গলের আড়াল থেকে তীর আর বল্লম ছুটে আসছে।
বহুকষ্টে সেই পাথরের সেতুর কাছে এসে চমকে গেলেন খিলজি। সেতু ভেঙে দিয়েছে। ফেরার রাস্তা বন্ধ।
খিলজি খুব সহজেই বুঝলেন এটা কামরূপ রাজার কাজ। বিনা অনুমতিতে তার রাজ্যের মধ্যে দিয়ে সেনাবাহিনী নিয়ে পররাজ্যে সামরিক অভিযান চালনা করার শাস্তি।
হতক্লান্ত বিধ্বস্ত খিলজি অবশেষে প্রবল বৃষ্টিতে মাথা গোজার জন্য আশ্রয় নিলেন এক মন্দিরে। মন্দির ঘিরে বিশাল এলাকা তখন কাদা আর আঠালো পাকে ভরা। চারদিকে ঝোপঝাড় জঙ্গল । তাই জুড়ে ছাউনি পড়ল খিলজির অবশিষ্ট ক্লান্ত ক্ষুধার্ত সেনাদের।
এই সেনা ছাউনি ঘিরে রাতের অন্ধকারে চারপাশের অসংখ্য গ্রামের নানা উপজাতির লোকেরা পৃথূর সেনাদের সাথে হাত মিলিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে এক অদ্ভুত যুদ্ধের জন্য।
হাজার হাজার টুকরো বাঁশের মাথা ছুঁচুলো করে পোতা হতে থাকলো কাদা মাটির মধ্যে খিলজির সেনা ছাউনি ঘিরে। ঘনবদ্ধ সেই বাঁশের ফলাগুলো জোড়া হতে থাকলো লতা আর বেতে পরস্পরের সাথে কাদার আড়ালে। একটি ফলাও একক ভাবে ওপড়ানো যাবে না।
খিলজির বাহিনী দিনের আলোতে আবিষ্কার করল তারা বন্দী হয়ে আছে এক উন্মুক্ত কারাগারে। চারদিকে কাদার মধ্যে উঁকি দেওয়া তীক্ষ্ণধার বাঁশের মধ্যে দিয়ে হাঁটাই অসম্ভব। ঘোড়া চালানো আরও অসম্ভব। যারাই এই অদৃশ্য প্রাচীর পার হওয়ার চেষ্টা করছে তাদের বিদ্ধ করছে জঙ্গলের আড়ালে থাকা শত্রুর বল্লম আর তির।
দিনে রাতে কোন ফারাক নেই। খাবারের অভাবে তারা এখন নিজেদের ঘোড়া কেটে খেতে শুরু করেছে। আর কতদিন এভাবে?
অবশেষে আবিষ্কার হল এক ফালি ফাঁকা পথ আছে নদীর দিকে যাওয়ার
সেই পথে সকলে এগোলেন নদীর দিকেই। নদীর পাড়ে সারিবদ্ধ পৃথুর সেনাবাহিনী। নদীর জল খরস্রোতা। ঘোড়া ভেসে যায়। বরনদীর জল লাল হয়ে গেল।
বহু কষ্টে বক্তিয়ার খিলজি মাত্র কয়েকশ সেনাসহ নদী পার হয়ে গৌড়ে ফিরতে পেরেছিলেন।
অসুস্থ শ্রান্ত ক্লান্ত বখতিয়ার খিলজি আর কখনো স্বাভাবিকতার মুখ দেখেননি। বেশি দিন বাঁচেনওনি। সম্ভবত তার মৃত্যুও স্বাভাবিক ছিল না।
খিলজির বাহিনীর কিছু লোক পৃথুর সেনাদের হাতে বন্দি হয়েছিল।
এদের মোটামুটি ভাবে স্বাধীন জীবনযাত্রায় কোনো নিষেধাজ্ঞ ছিল না। তবে একটি নিষেধাজ্ঞা ছিল, নির্দিষ্ট লোকালয়ের বাইরে তারা যেতে পারবে না। ক্রমে এই বন্দিরা স্থানীয় মহিলাদের বিয়ে করে সেইখানেই সংসার পাতেন ।
এদের বর্তমান পরিচয় হলো গৌড়ীয় মুসলমান। অসমের প্রথম মুসলমান সম্প্রদায়। @ ©তুষারমুখার্জি
২৫
অটিজ্ম একটি মানসিক বিকাশগত সমস্যা, যা সাধারণতঃ জন্মের পর প্রথম তিন বছরের মধ্যে হয়ে থাকে। এই সমস্যার দরুণ মস্তিস্কের সামাজিক বিকাশ ও সামাজিক যোগাযোগ- যেমন কথা বলা, ভাব বিনিময় করার ক্ষমতার বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়।
• অটিজ্ম এর কারণ :
অটিজ্ম মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বায়োলজি ও কেমিস্ট্রি-র ফলে সৃষ্ট একটি রোগ। এখন পর্যন্ত এই সমস্যার কোনো সরাসরি কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সারা পৃথিবীতেই এই সমস্যার কারণ জানার জন্য গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। তবে মোটামুটিভাবে কিছু বিষয়ের সমন্বয়ে অটিজ্ম ঘটে থাকে বলে, বিজ্ঞানীরা ধারণা করে থাকেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- জেনেটিক ফ্যাক্টর। অনেক সময়ই দেখা গেছে, অটিজ্ম-এর ইতিহাস যে পরিবারের আছে, সেই পরিবারের আরও অনেকরই কথা বলতে সমস্যা, অন্যান্য জেনেটিক্যাল সমস্যা ইত্যাদি পাওয়া যায়। এছাড়াও আরও কিছু বিষয়কে সন্দেহ করা হয় অটিজ্ম-এর জন্য। এগুলি হলো : গর্ভাবস্থায় খাদ্যাভ্যাস, বাচ্চার অন্ত্রের পরিবর্তনগত সমস্যা, মার্কারির (পারদ) বিষক্রিয়া, বাচ্চার ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ পরিপাক করতে না পারা, টীকা-র প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি।
• টীকা দান ও অটিজ্ম :
উন্নত বিশ্বে অনেক বাবা-মাই আশংকা প্রকাশ করেন যে, বাচ্চাদের প্রদেয় বিভিন্ন টীকাগুলি হয়তো নিরাপদ নয়। অনেক সময়ই তাঁরা তাঁদের ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে তাঁদের এই আশংকা ব্যক্ত করেন, এমনকি তাঁরা বাচ্চাকে টীকা দিতে অস্বীকৃতিও জানান। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, মাল্টি-ডোজ টীকার মধ্যে প্রিজারভেটিভ হিসাবে যে সামান্য পরিমাণ মার্কারি (থাইমেরোজাল) ব্যবহার করা হয়, তার থেকে অটিজ্ম হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এই বিশ্বাসের পিছনে কোনো গবেষণা-লব্ধ ফলাফল-এর পূর্ণ সমর্থন পাওয়া যায়নি। ‘আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিইয়াট্রিক্স’ এবং ‘ইন্সিটিউট অব মেডিসিন’ এর মতে টীকাসমূহ সামগ্রিকভাবে যে উপকার সাধন করে, তার তুলনায় এ ধরণের ঝুঁকি নিতান্তই তুচ্ছ। এখন অবশ্য সবরকম মাল্টি-ডোজ টীকারই একক-ডোজ বাজারে পাওয়া যায়, যাতে কোনো মার্কারি মেশানোর প্রয়োজন পড়ে না।
• কত সংখ্যক বাচ্চা অটিজ্ম-এ আক্রান্ত ?
আমাদের দেশে এধরণের কোনো সার্ভে বা গবেষণা আছে বলে জানা নেই। তবে এখন আমাদের আশেপাশে অনেক বাচ্চাই আমরা দেখতে পাই, যাদের অটিজ্ম রয়েছে। তবে এই বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিও হয়তো এই সমস্যা বেশি চোখে পড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। আজ থেকে ১০/১৫ বছর আগেও হয়তো এধরণের সমস্যার অধিকারী বাচ্চাদের হাবাগোবা বা এধরণের কিছু একটা বলা হতো। অনেককে পড়াশুনায় ‘চরম অমনোযোগী’ আখ্যা দিয়ে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে বিভিন্ন কাজে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু এখন তাদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হবার জন্য, তাদের এই হতভাগ্য জীবন থেকে মুক্তি দেবার একটি প্রচেষ্টা সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আমাদের সমাজে চালু হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী উন্নয়ন।
• অটিজ্ম-এর লক্ষণসমূহ :
সাধারণতঃ ১৮ মাস থেকে ২ বছর বয়স-এর মধ্যে মা-বাবা, বাচ্চার আচরণে অস্বাভাবিকতা বা সাধারণের চেয়ে ভিন্ন বলে ধরতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে, অন্য একই বয়সের বাচ্চাদের চেয়ে খেলার আগ্রহে ভিন্নতা, সামাজিক মেলামেশা, যেমন কথাবার্তা বলা বা আকার ইংগিতের মাধ্যমে ভাবপ্রকাশ করার ভিন্নতা ইত্যাদি। কিছু কিছু বাচ্চা আবার ১ থেকে ২ বছর বয়স পর্যন্ত খেলাধূলা, কথাবার্তা সবই ঠিক থাকে, কিন্তু হঠাৎ করে কথাবার্তা ও সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করে দেয়। এটাকে বলা হয় ‘রিগ্রেসিভ অটিজ্ম’।
অটিজ্ম-এ আক্রান্ত বাচ্চাদের কেউ কেউ বেশির ভাগ সময় শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ ইত্যাদিতে বেশি সংবেদনশীল থাকে। অটিস্টিক বাচ্চারা তাদের রুটিনমাফিক কাজে ব্যত্যয় ঘটলে রেগে যায়। তাদের বিভিন্ন জিনিসের প্রতি অতি-দুর্বলতা দেখা যায়। অনেক সময় তারা একই শারীরিক ভঙ্গি বা অঙ্গ সঞ্চালন বার বার করতে থাকে।
ভাব বিনিময় বা যোগাযোগের সমস্যাগুলির মধ্যে রয়েছে- কাউকে দেখলে তাদের সাথে কথাবার্তা শুরু করতে সমস্যা। অনেক সময় তারা কথা বলার পরিবর্তে, আকার ইঙ্গিতে বোঝাতে চায়। অনেকেই অনেক দেরি করে কথা বলে, আবার অনেকে একেবারেই কথা বলতে পারে না। অন্যরা যেদিকে তাকিয়ে থাকে, সেও সেই দিকে তাদের দেখাদেখি তাকায় না, অনেক সময় আঙ্গুল দিয়ে কোনো দিকে নির্দেশ করলেও, সেদিকে তাকায় না। যারা কথা বলতে পারে, তারা অনেক সময় একই কথা, শব্দ, পছন্দের টিভি বিজ্ঞাপনের কথা বা গান বারবার বলতে থাকে।
সামাজিক সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রেও দেখা যায় ভিন্নতা। অটিস্টিক বাচ্চারা অনেক সময় বন্ধুত্ব তৈরি করে না, একসাথে খেলতে হয়, এমন কোনো খেলা খেলতে আগ্রহী হয় না, অনেক সময় নিজেকে গুটিয়ে রাখে, মানুষের সাথে কথা বলার সময় চোখে চোখ রেখে কথা বলে না, একা একা সময় কাটাতে চায়। অনেক সময় অটিস্টিক বাচ্চারা অন্য বাচ্চা বা ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতিশীলতা প্রদর্শন করে না। অনেক সময় যে কাজ সে করছে, তাতেই আটকে যায়, বার বার করতে থাকে। অনেক অটিস্টিক বাচ্চা সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি চঞ্চলতা প্রদর্শন করে। আবার অনেকে এতটাই নিঃস্পৃহ যে, তাদের কোনো কিছুই করতে ভালো লাগে না।
• সাইন ও টেস্ট :
সকল অটিস্টিক বাচ্চাকেই উচিৎ নিয়মিত বিরতিতে পেডিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ, নিউরো রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ, অথবা অকুপেশনাল থেরাপিস্ট-কে দেখানো, যাতে বাচ্চার যে বয়সে যা যা করা উচিত, সেই বয়সে তাই করছে কিনা, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে কোনো সমস্যা আছে কিনা, তা জানা যায়। যদি দেখেন, আপনার বাচ্চা নিচের কাজগুলি করছে না, তাহলে আপনার উচিত হবে, বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা করে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া।
- বারো মাস বয়সের মধ্যে মুখ দিয়ে বিভিন্ন শব্দ- যেমন বা বা, মা মা ইত্যাদি শব্দ করা,
- বারো মাস বয়সের মধ্যে হাত দিয়ে বিভিন্ন দিকে নির্দেশ করা, টা-টা করা ইত্যাদি,
- ষোলো মাস বয়সের মধ্যে অন্ততঃ একটি করে অর্থবোধক শব্দ বলা,
- চব্বিশ মাস বয়সের মধ্যে অন্ততঃ দুটি অর্থবোধক শব্দ একসাথে বলা,
- এছাড়া যে কোনো বয়সে যদি বাচ্চা কথা বলা বা সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করে দেয়, তাহলে সাথে সাথে বাচ্চাকে বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
বাচ্চা অটিস্টিক কিনা, তা যাচাই এর জন্য কোনো পাথলজিক্যাল টেস্ট নেই। তবে এই বিষয়ে যাঁরা পারদর্শী, তাঁরা বাচ্চার আচার আচরণ, পারিবারিক ইতিহাস ইত্যাদি বিবেচনা করে, বাচ্চাটি অটিস্টিক কিনা, তা বলতে পারেন।
• চিকিৎসা :
অনেক ক্ষেত্রে অটিস্টিক বাচ্চাদের চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া যায়, যদি তা যত দ্রুত সম্ভব, নির্ণয় করা যায়। এই রোগের চিকিৎসা হচ্ছে- একটি সমন্বিত চিকিৎসা, যা পেডিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ, নিউরো রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট এবং ক্ষেত্র বিশেষে ফিজিওথেরাপিস্ট-এর সহযোগিতায় প্রতিটি অটিস্টিক বাচ্চার জন্য আলাদা আলাদা ভাবে ডিজাইন করা হয়। এই ধরণের বাচ্চাদের জন্য এখন এদেশেই প্রচুর বিশেষায়িত স্কুল আছে, যেখানে তাদের জন্য বিশেষভাবে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়। তবে এটা নির্ভর করবে তার অকুপেশনাল থেরাপিস্ট-এর পরামর্শের উপর। তিনি বাচ্চার সক্ষমতা বুঝে সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেবেন যে, কোন্ ধরণের বিশেষ স্কুল তার জন্য ভাল হবে।
অনেক অটিস্টিক বাচ্চার কিছু মানসিক সমস্যা- যেমন অতি-চঞ্চলতা, অতিরিক্ত ভীতি, মনোযোগের সমস্যা, ঘন ঘন মনের অবস্থা পরিবর্তন হওয়া, বিষণ্ণতা, ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি থাকে। এই সব ক্ষেত্রে অনেক সময় সাইকিয়াট্রিস্টগণ ঔষধের ব্যবহার করে থাকেন।
অনেকের মতে- গ্লুটিন ও ক্যাফেইন ফ্রী খাবার খেলে অটিস্টিক বাচ্চাদের অতি-চঞ্চলতা কম থাকে। তবে এর স্বপক্ষে জোরালো কোনো গবেষণা নেই।
মনে রাখবেন, অটিস্টিক বাচ্চাদের কোনো ‘মিরাক্ল চিকিৎসা’ নেই। পরিবার, আত্মীয়পরিজন, সমাজ, শিক্ষক-শিক্ষিকা, চিকিৎসক সহ সকলের সমন্বিত সাহায্য সহযোগিতায় একটি অটিস্টিক শিশুর জীবন হয়ে উঠতে পারে আনন্দময় ও অর্থবহুল। @ Kantilal Som
২৬
ইউরোপ আলোকিত হওয়া সহজ ছিলো না
অনেকেই মনে করেন ইউরোপে এমনিতেই বুঝি চার্চের হাত থেকে বিজ্ঞান মুক্তি পেয়ে আলো ছড়িয়েছে। চার্চ দানবিকভাবেই চেষ্টা করেছে বিজ্ঞানের উত্থানকে স্তব্ধ করতে। তারা হত্যাসহ সব ধরনের নিপীড়নের পথই বেছে নিয়েছিলো।
মধ্যযুগের শেষভাগ ও রেনেসাঁ যুগে ইউরোপে অনেক বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদকে চার্চের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল। কারণ তখন জ্ঞান, শিক্ষা ও সত্য নির্ধারণের বড় কর্তৃত্ব ছিল খ্রিস্টান চার্চের হাতে—বিশেষ করে রোমান ক্যাথলিক চার্চের হাতে। চার্চ মনে করত ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যার বাইরে কোনো নতুন বৈজ্ঞানিক ধারণা বিশ্বাসের জন্য হুমকি হতে পারে। ফলে বিজ্ঞান বা নতুন চিন্তাকেই তারা সহ্য করতো না। তবুও গোপনে এবং অতি সতর্কতার সাথেই বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও লেখকগণ জ্ঞানচর্চা চালিয়ে যান।
প্রথম বড়ো সংঘাতটা আসে মহাবিশ্বের ধারণা নিয়ে। মধ্যযুগে চার্চ সমর্থিত ধারণা ছিল যে পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র, যা মূলত গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমির তত্ত্ব থেকে এসেছে।
কিন্তু ১৬শ শতকে পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস বলেন সূর্য কেন্দ্র এবং পৃথিবীসহ গ্রহগুলো সূর্যের চারদিকে ঘোরে। এই ধারণা চার্চের প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যার সাথে সাংঘর্ষিক ছিল। কোপার্নিকাস গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বইটি প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশের পরপরই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ফলে বইটি নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি।
জিওর্দানো ব্রুনো যখন বইটি চার্চে খুজে পান এবং এর মর্মার্থ উপলব্ধি করেন তখন তিনি মহাবিশ্ব নিয়ে আরও ভাবতে থাকেন এবং প্রকৃত সত্যটা বুঝতে সক্ষম হন। তাই কঠোর ঘটনা ঘটে ইতালীয় দার্শনিক ব্রুনোর ক্ষেত্রে। ব্রুনো বলেছিলেন, মহাবিশ্ব অসীম, অসংখ্য নক্ষত্র ও পৃথিবীর মতো গ্রহ থাকতে পারে। এই ধারণা চার্চের ধর্মতাত্ত্বিক ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তাকে ধর্মদ্রোহী ঘোষণা করা হয় এবং ১৬০০ সালে তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
সবচেয়ে বিখ্যাত সংঘর্ষ ঘটে ইতালীয় বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর সাথে। তিনি টেলিস্কোপ ব্যবহার করে দেখান যে গ্রহগুলো সূর্যের চারদিকে ঘোরে। তিনি কোপার্নিকাসের তত্ত্বকে সমর্থন করেন। চার্চ যাতে তাকে হত্যা না করে তার জন্য চার্চের বিরাগভাজন না হওয়ার সব চেষ্টাই করেন। কিন্তু তবুও চার্চের কর্তৃত্ব এবং ধর্মের অস্তিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে যায় তার আবিষ্কারে। ১৬৩৩ সালে চার্চের আদালত রোমান ইনকুইজিশনে গ্যালিলিওর বিচার করা হয়। তাকে তার মতামত প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয় এবং তারপরেও জীবনের শেষ সময় গৃহবন্দী থাকতে হয়।
জ্ঞানের উপর চার্চের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মধ্যযুগে চার্চ অনেক বই নিষিদ্ধ করেছিল। যেসব বই চার্চের মতের বিরুদ্ধে মনে হতো সেগুলো পড়া বা ছাপানো নিষিদ্ধ ছিল।
কিন্তু বিজ্ঞানী, লেখক, দার্শনিক, চিকিৎসক তথা বুদ্ধিজীবীরা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকেন। গোপনে তারা মিলিত হতে থাকেন এবং শলাপরামর্শ করার জন্য বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখেন। যেমন তাদের গতিবিধি যেনো সন্দেহজনক না হয়, তাদের মিলিত হওয়া সম্পর্কে যেনো কেউ না জানে ইত্যাদি। তাতেই ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন আসতে থাকে।
১৭শ শতক থেকে ইউরোপে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব শুরু হয়। এই সময়ের বড় বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলেন কেপলার ও নিউটন। তাদের কাজের মাধ্যমে প্রাকৃতিক নিয়ম ব্যাখ্যা করার নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হয়। ধীরে ধীরে চার্চের বৌদ্ধিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায় এবং আধুনিক বিজ্ঞান বিকশিত হতে থাকে।
মধ্যযুগের শেষভাগে ইউরোপে বিজ্ঞানীদের সংগ্রাম ছিল মূলত নতুন বৈজ্ঞানিক সত্য বনাম ধর্মীয় কর্তৃত্বের সংঘাত। যদিও শুরুতে চার্চ অনেক বৈজ্ঞানিক ধারণাকে দমন করেছিল, শেষ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক জ্ঞানই আধুনিক যুগে প্রাধান্য লাভ করে। গত দুইশত বছরের ইতিহাস আমরা দেখতে পারি।
গত প্রায় ২০০ বছরে ইউরোপ ও আমেরিকায় চার্চের প্রভাব ও সামাজিক ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই পতন ধীরে ধীরে হয়েছে—বিশেষ করে ১৯শ শতকের পর থেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিস্তারের ফলে।
মধ্যযুগে ইউরোপে চার্চ ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে রোমান ক্যাথলিক চার্চ অনেক দেশের রাজনীতি, আইন, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ওপর সরাসরি প্রভাব রাখত। কিন্তু ১৮–১৯ শতকে বড় পরিবর্তন হয়। মূল পরিবর্তনগুলো আসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হারানোর মাধ্যমে। এরমধ্যে রয়েছে: রাষ্ট্র ও ধর্ম আলাদা করা, ধর্মীয় আদালত ও আইন বাতিল এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে চার্চের হাত থেকে সরানো। ফ্রান্সে ১৯০৫ সালে রাষ্ট্র ও চার্চ আলাদা করা হয়। এরপরই জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশে রাষ্ট্রীয় নীতিতে চার্চের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে চার্চের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। আজ যেমন ইরান ও আফগানিস্তানে ধর্ম ও রাষ্ট্র একাকার হয়ে রয়েছে ফলে সার্বিকভাবে ওখানে জ্ঞানচর্চা বা মুক্তচিন্তা অসম্ভব। এটা ভাংতে না পারলে পরিবর্তন আসবে না।
গত ৫০–১০০ বছরে পশ্চিমা সমাজে চার্চে যাওয়ার হার দ্রুত কমেছে। যেমন ফ্রান্সে ক্যাথলিকদের সাপ্তাহিক মিসা (রবিবারের ধর্মীয় উপাসনা যেখানে বাইবেল পাঠ, ধর্মীয় বয়ান শোনা, প্রার্থনায় অংশ নেওয়া ও কিছু খাবার খাওয়া) অংশগ্রহণ ১৯৮০-এর দশকে ১৫% থেকে কমে ২০২০-এ প্রায় ৫% এ ঠেকেছে। স্পেনে ২০০০ সালে ২০% থেকে কমে ২০২১-এ ৯% এ নেমেছে। আয়ারল্যান্ডে ১৯৯০ সালে ৬০% থেকে কমে ২০১৬-এ ২৯%-এ নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে চার্চের সদস্যপদ ১৯৯৯ সালে ৭০% থেকে কমে ২০২০-এ ৪৭%-এ নেমেছে। এখন অনেক দেশে এখন নিয়মিত চার্চে যায় ২–১০% মানুষ। ফলে লোকের অভাবে বহু চার্চই বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কারণ এখন বহু দেশেই মানুষ জ্ঞান চর্চাই করেন এবং ধর্মকে বুঝেন। ফলে পাশ্চাত্যে বিশেষ করে ইউরোপে ধর্মহীন মানুষের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। যেমন স্ক্যান্ডেনেভিয়া অঞ্চলের ৮৫% মানুষ নিজেকে ধর্মহীন বা নাস্তিক মনে করে। জার্মানির মতো দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৭% মানুষ নিজেকে ধর্মহীন বলে—যা খ্রিস্টানদের চেয়েও বেশি। আবার অনেক দেশে এখন ধর্মীয় তথা সাংস্কৃতিকভাবে মানুষ খ্রিস্টান হলেও ধর্ম পালন করে না।
চার্চে পুরোহিত বা ধর্মযাজকের সংখ্যাও এখন কমে গেছে। মানুষ এ পেশায় এখন অর্থ ও সম্মান পাচ্ছে না। ফ্রান্সের মতো দেশে ১৯৬০ সালে প্রায় ৬৫,০০০ পুরোহিত ছিল, এখন প্রায় ১২,০০০ অর্থাৎ ৮০% কমে গিয়েছে! এর ফলে অনেক চার্চ বন্ধ হয়ে গিয়েছে বা একাধিক চার্চ একসাথে পরিচালনা করতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক আয় কমে যাওয়া তাদের ওপর বড়ো আঘাত হিসেবে এসেছে। চার্চের আয়ের প্রধান উৎস হলো দান, সদস্যপদ ফি, চার্চ ট্যাক্স (কিছু দেশে) আর সম্পত্তি। এখনও ভ্যাটিকান সিটির বিপুল সম্পদ রয়েছে যা বহু পূর্ব থেকেই ছিলো। তারা বিশ্বজুড়ে রিয়েল এস্টেট, শেয়ার, প্রত্নসম্পদ এবং বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের মালিক। যার বাজার মূল্য ৩/৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এখন প্রতি বছরই তাদের দান বাবদ আয় কমছে আর বাড়ছে ব্যয়। ফলে এখন তাদের সম্পদ আর বাড়ছে না। মাঝে কিছু আর্থিক কেলেঙ্কারিতে সম্পদ কমেছে। আর সাধারণ চার্চগুলোর সদস্য কমে যাওয়ায় আয়ও কমছে দ্রুত। জার্মানির চার্চ ট্যাক্স থেকে এখনো বছরে বিলিয়ন ইউরো আয় হয়, কিন্তু সদস্য দ্রুত কমায় আয়ও দীর্ঘমেয়াদে কমার আশঙ্কা বাড়ছে। আয় বাড়াতে অনেক ইউরোপীয় চার্চ এখন ভবন বিক্রি করছে বা কমিউনিটি সেন্টারে রূপান্তর করছে।
তবে এর চেয়েও মারাত্মক ঘটনা হলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব কমে যাওয়া। আগে চার্চ ঠিক করত: বিবাহ ও পরিবার নীতি, শিক্ষা, নৈতিকতা এবং রাজনীতির অনেক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখন পশ্চিমা সমাজে বিবাহবিচ্ছেদ, সমলিঙ্গ বিবাহ, জন্মনিয়ন্ত্রণ, গর্ভপাত ইত্যাদি হাজারো বিষয়ে রাষ্ট্র চার্চের মতামত মানে না।
বিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষার বিস্তার এতোটাই ঘটেছে যে, চার্চ-এর বিষয়গুলো নতুন প্রজন্মের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়েছে। আধুনিক তরুণদের কাছে ধর্মের কোনো গুরুত্ব নেই, আগ্রহও নেই। এছাড়া চার্চের (আর্থিক ও যৌন) কেলেঙ্কারি ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি করেছে।ফলে পশ্চিমা সমাজে চার্চ এখন আর রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার কেন্দ্র নয়—বরং একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমিত ভূমিকা পালন করছে।
পৃথিবীতে ৪২০০-৪৩০০টি ধর্ম রয়েছে। তবে খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, ইহুদি ধর্ম, শিখ ধর্ম, তাওবাদ ও শিন্তোধর্মকে বাদ দিলে অন্য ধর্মের লোক খুবই কম। তবুও যেকোনো ধর্মকেই উপরের আলোচনার সাথে মিলিয়ে দেখুন—একই দিকে যাত্রা করছে। আগাতে হলে জ্ঞান চর্চার বিকল্প নেই এবং জ্ঞান চর্চা করতে গেলেই মানুষ সত্যটা বুঝে ফেলে। ফলে চার্চদশায় সবাইকেই পড়তে হবে। @ Mojib Rahman
২৭
প্রথম নারী শাসক লুগাল কুবাবা॥
কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা সুমের রাজাদের তালিকায় একজনই নারীর উপস্থিতি আছে। তিনি কুবাবা। কিশের লুগাল কুবাবা। এখন যদিও তিনটি সুমের রাজার তালিকা পাওয়া গেছে, তবু এটাও ঠিক তিনটি তালিকাই এক নয়। খানিক অদলবদল আছে। তারচেয়েও বড় কথা ঐ তালিকার প্রথম দিকের রাজাদের অতী দীর্ঘকালীন (৩০হাজার বৎসর) রাজত্বের কথায় তার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকবেই।
তবে একটা কথা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে সুমের হিসাব অনুযায়ী দুই লক্ষ বৎসর আগের কোন রাজার রাজত্বকাল গননা করার মত লোকও তখন ছিলো না। তাই সেগুলো অবশ্যই কাল্পনিক।
কিন্তু রাজার নামের তালিকায় দেখা যাবে পরের দিকে যত আধুনিক কালের দিকে এগুচ্ছে বিশেষ করে মহাপ্লাবনের পরেকার রাজাদের রাজত্বকাল ততই বাস্তব সম্মত হয়ে এসেছে।
এই রাজার তালিকায় কুবাবার রাজত্বকাল খুব বেশি বাড়ানো হয় নি। একশ বৎসর বলা হয়েছে। এই একশ বৎসর আমরা ঠিক বলেও ধরতে পারি। কারণ তখন বৎসর কতদিনে বা কতমাসে গোনা হত তা আমাদের অজানা।
এই রাজতালিকার পরাক্রমশালী কুবাবার কাহিনি হল চরম দারিদ্র থেকে রাজ সিংহাসনে আসীন হবার স্বপ্নে কথা।
তৃতীয় সহস্রাব্দে কিশ নগর রাজ্যের রাজা হবার আগে আগে তিনি ছিলেন বিয়ার তৈরীতে, বিক্রিতে ও পরিবেশনে বিখ্যাত। তাঁর প্রথম জীবনকাল নিয়ে নানা কথাই চালু আছে। যেমন ২৪০০ পূর্বাব্দ নাগাদ তিনি ছিলেন সরাইখানার পরিচারিকা, এবং মালিক। তিনি ছিলেন বিয়ার প্রস্তুত কারক-পরিবেশক। সেি সুত্রেই এমনও বলা হয় যে তিনি ছিলেন গনিকালয়ের মালিক তথা নিজেও গণিকা। সম্ভবত এটি বলা হত পুরুষ রাজাদের মধ্যে একমাত্র নারীকে কিছুটা হলেও হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে। মোট কথা বংশ বা পারিবারিক পরিচিতিতে তাঁর জীবন ছিল সমাজের নিম্মতম স্তরে।
কিন্তু আজ যেগুলো আমাদের চোখে বেশ নিম্ম স্তরের অবস্থান বলে মনে হয় সুমের সমাজে হয়ত তার ব্যাখ্যা ছিল খানিক আলাদা। মনে করতে পারি জনপ্রিয়তম দেবী ইনান্নার প্রধান ভক্তকুলের একাংশের পেশাই ছিল গনিকাবৃত্তি।
আর বিয়ার ছিল সুমেরদের নিত্য দিনের স্বাভাবিক পানীয়। প্রকৃতপক্ষে মন্দিরের পুরোহিতরা রীতিমত রেশন করে উৎপদনের পরিমান হিসেব করে প্রতিটি পরিবারের জন্য বরাদ্দ করতেন বিয়ার।
বিয়ার পান করে হাল্কা নেশা করা, গণিকাবৃত্তি, এই সব যৌন উত্তেজক কার্যকলাপ তাদের সমাজের মানব জন্ম হার বৃদ্ধির জন্য অতিপ্রয়োজনীয় ছিল বলে তারা মনে করত। আমাদের চোখে সমাজের নিম্মতম স্তর থেকে উঠে আসা নারী কুবাবা কিশের সিংহাসন দখল করে কিন্তু নিজেকে রাণী বলে ঘোষণা করেন নি। নিজেকে ঘোষণা করেন "লুগাল" বা রাজা বলে। তিনি স্বক্ষমতায় সিংহাসনে আরোহন করেছেন। কোন রাজার বিবাহিত স্ত্রী হয়ে ঘুরপথে না।
এখন প্রশ্ন উঠবে তিনি ক্ষমতা দখল করলেন কি ভাবে। এ নিয়ে খুব পরিস্কার তথ্য নেই। নানা সুত্রে একত্র করা কিছু তথ্যের জোরে কয়েকটি সম্ভাবনার কথা ভাবা হয়।
প্রথমত ভাবা হয় তিনি দক্ষ ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসায়ে তাঁর দক্ষতা তাঁকে বিত্তবান করে তোলে। বিত্তবলেই কিশের উচ্চ স্তরের সমাজের সমীহ আদায় করতে সক্ষম হন। সেখান থেকে রাজ সিংহাসন খুব দুরে থাকার কথা না।
আরেকটি ধারনা হল তিনি সশস্ত্র বিদ্রোহ সংগঠিত করে হিংসাত্মক পথেই সিংহাসন দখল করেন। এই ধারনার সম্ভবনা একটু বেশিই ভাবা যেতে পারে। কারণ সিংহাসনে বসার পরে তিনি প্রজাদের প্রতি দয়ালু মনোভাবের প্রকাশে কোন কার্পন্য না করলেও, একই সময়ে সামরিক ব্যাপারেও যথেষ্ট প্রজ্ঞা ও সাহসিকতা দেখিয়েছেন বারেবারে। এমনকি তিনি পাশের রাজ্যগুলোতে হানা দিয়ে নিজ রাজ্যের সীমানা বাড়াতেও সক্ষম হন। তাঁকে দক্ষ ধনুর্ধর বলে একাধিক সুমের সাহিত্যে উল্লেখও করা হয়েছে।
আরেকটি সম্ভাবনা সুমের সাহিত্যে বহুল আলোচিত। দেবতার সহায়ে সিংহাসন লাভ।
কিশের আগেকার রাজা ব্যাবিলনের পৃষ্ঠপোষক দেবতা মারদুককে যথাবিহিত নিত্য তাজা মাছ নৈবিদ্য দিতে হেলাফেলা করেন। ফলত মারদুক সেই রাজার উপর বিরক্ত হন। একই সময়ে সরাইখানার মালিক কুবাবা জেলেদের বিনামুল্যে বিতরণ করতে থাকেন রুটি আর জল। এখানে একটা জিনিস খেয়াল করা যেতে পারে, রুটি মানে বার্লি। বার্লি আর জল এই দুটোই বিয়ার তৈরীর প্রধান উপকরণ। তাই তিনি জেলেদের শুধুই রুটি দিলে তারই সাথে জলের উল্লেখ ইশারা করে এটা বিয়ার তৈরীর প্রাথমিক উপাদানও হতে পারে।অথবা একেবারে সরাসরি বিয়ার।
যাইহোক, কুবাবা জল-রুটি বিনামুল্যে দিলেও বিনাশর্তে দেননি। শর্ত ছিল জেলেরা তাদের ধরা তাজা মাছের একাংশ ব্যবিলন দেবতা মারদুককে নিয়মিত নৈবিদ্য হিসাবে দেবে। স্বভাবতই এই নৈবিদ্য পেয়ে মারদুক তৃপ্ত হলেন, এবং সরাইখানার মালকিন কুবাবাকে রাজ্য শাসনের সনদ দিলেন। মারদুক কুবাবাকে "সমগ্র পূথিবী শাসনের অধিকার বিষয়ক পূর্ণ স্বাধীন ক্ষমতা দিলেন।"
এখানে আমরা আরেকটু অন্যভাবে ঘটনাকে দেখতে পারি।
সম্ভবত জেলেদের থেকে করের কিছু অংশ নিয়ে ব্যবিলনের রাজার সাথে কিশের রাজার গোলমাল পাকায়। ব্যবসায়ী কুবাবা সে খবর রাখতেন। তিনি জেলেদের কিছু সাহায্য করলেন। বা হয়ত স্রেফ নিত্য বিয়ার পানে খুশি করলেন। এবং কিশের রাজাকে দেয় করের অংশ ব্যাবিলনের রাজাকে পাঠাতে শুরু করলেন। না সরাসরি রাজাকে পাঠাবার দরকার হয় না। মারদুকের মন্দির এসাগেলাতে নৈবিদ্য গোটা ব্যাবিলনবাসীর সম্পদ। ফলে ব্যবিলনের সহায়তায় কিশের আগের রাজাকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে কুবাবার সিংহাসনে বসাটা ঘটে গেল।
সুমের নগর রাজ্যের প্রতিটি নগরীতেই একজন রাজা থাকে কিন্তু সুমের বিশ্বাসে সুমেরদের শাসনের অধিকার বা শাসন-সনদ আকাশলোক (সুমেোরদের স্বর্গলোক ছিলো না) থেকে দেবতারা পাঠান কোন একজন রাজাকে। তখন তিনিই প্রকৃত রাজা। কুবাবা যখন সিংহাসনে আসীন হন তার আগের একশ বৎসরের কিছু বেশি সময় ধরে শাসন-সনদ ছিল মারি নগরীর রাজার কাছে।
কুবাবার কালে সে শাসন সনদ এল কুবাবার হাতে। কুবাবার পরে তা আবার চলে গেল আকসাক নগরে। কিন্তু বেশিদিন না। কুবাবার পুত্র পুজের-সুনেন-এর অধিকারে ফিরে আসে সেই শাসন-সনদ। তারপরে কিশের রাজা হন কুবাবার পৌত্র উর-জাবাবা।
সম্ভবত এই উর-জাবাবার আমলেই আক্কাদ সারগন ক্ষমতা দখল করেন। শুরু হয় আক্কাদ সাম্রাজ্যের।
জীবনাবসানের বহুকাল বাদে কুবাবা আবার দেখা দেন সুমের দেবী হিসাবে।
ইউফ্রেটিস নদীর পাড়ের চার্চেমেস শহরের পৃষ্ঠপোষক কুবাবাদেবীর আরাধনা হত। এখানে অনির্দিষ্ট লিঙ্গের নারী শিশুকে বিশেষ অর্থবহ লক্ষণ যুক্ত বলে ধরা হত। ভবিষ্যতে কুবাবার মতই নারী হয়েও দক্ষ ধনুর্ধর ও কৌশলি রাজনীতিবিদ হবার সম্ভবনা দেখতে পেত সেই শিশুর মধ্যে। সোজা কথায় শিশুটি নারী হলেও, তারও রাজা হবার সম্ভবনা আছে এমনটাই ধরা হত।
কিন্তু রাজা কুবাবার দেবীত্ব লাভের কথায় সকল বিজ্ঞজন একমত নন। কারণ এমনিতেই কু শব্দের সুমের অর্থ পবিত্র আর বাবা শব্দে সুমের দেবতা। তাই রাজা কুবাবাই যে চার্চেমেসর দেবতা কুবাবা তা নাও হতে পারে, এমন একটা সম্ভবনাও থাকছে।
তথ্যসূত্রঃ-
1. Queen Kubaba: The Tavern keeper who became the first female Ruler in history. By Cody Cottier. : Discover Magazine. Feb 23 2021
2. Who was the first female ruler? : by Julia Carpenter.
২৮
মালয়েশিয়ার প্রাচীনতম মানুষের কঙ্কালঃ পেরাক ম্যান॥
মালয়েশিয়ার প্রত্ন ইতিহাস তেমন একটা প্রাচীন বা সমৃদ্ধ নয়। এমন নয় যে সেখানে সুদুর অতীতে লোকবসতিই ছিল না। ছিল। দেড় লক্ষ বৎসর আগেও মানবপ্রজাতির লোকজন সেখানে ছিল।
আসলে গভীর বনে ঢাকা দেশটিতে প্রাগঐতিহাসিক লোকবসতি সম্ভবত কমই ছিল। যাও বা কিছু ছিল তার কোন প্রমান খুঁজে বেরকরার জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্ন অনুসন্ধান বিশেষ কিছুই হয়নি।
প্রকৃত পক্ষে মালয়েশিয়ার উল্লেখযোগ্য প্রত্নক্ষেত্র বলতে সারাওয়াকের নিয়াহ্ কেভ। সেখানে ৪০ হাজার বৎসরের নারীর কয়েক টুকরোতে ভাঙ্গা প্রাচীন করোটি পাওয়া গেছে। সেটা নিয়ে আগেই লিখেছি।
তারপরে আসবে বুজাং ভ্যালী। বুজাংভ্যালীকে বলা হয় মালয়েশিয়ার আধুনিক সভ্যতার আঁতুড়ঘর। সেটা নিয়েও আগেই লিখেছি।
আজকের লেখায় থাকছে পেরাক কেভার একটি পুরুষের কঙ্কালের কথা। একেবারে আধুনিক কালের মধ্যে প্রাচীনতম মানুষের কঙ্কাল। এই কঙ্কালের পুরুষটির বয়স ১০ হাজার বৎসর, ইউনেস্কো ডোসিয়ার অনুযায়ী। যদিও অন্যন্য পত্রপত্রিকায় ১১ হাজার বৎসর বলেই উল্লিখিত।)। সময়টাকে নব্যপ্রস্তরযুগের শেষ ভাগ বলা যেত, কিন্তু এই সব পুরাতাত্ত্বিক যুগগুলো সব জায়গায় একই সময়ে আসে না। তাই যুগের উল্লেখ না করাই ভালো। যদিও মালয় পত্রপত্রিকায় প্রস্তরযুগই বলছে।
১৯৯১তে পাওয়া পেরাক গুহার কঙ্কালটির নাম রাখা হয় পেরাক ম্যান। কঙ্কালটি খুঁজে বের করেন জুরাইনি মাজিদ (Ms Zurini Majid) ও তার সাথীরা, মালয়েশিয়ার সেইন্স বিশ্ববিদ্যালয়(Sains University) থেকে।
মালয়েশিয়ার পেরাক প্রদেশের ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট বলে স্বীকৃতি লেংগঙ্গ ভ্যালী। এখানেই ১৮.৩ লক্ষ বৎসর আগে একটি বড়সড় উল্কা পড়ে বিরাট গহ্বরের সৃষ্টি হয়েছিল। এই এলাকায় ১৯৮০-৯০এর দশকে ১১জন মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। সবাই ব্রোঞ্জযুগের মানুষ। সমস্ত প্রত্ন সামগ্রী আর দেহাবশেষ সবই মিউজিয়ামে চলে গেছে। এখন সব ফাঁকা জায়গা সাইনোবর্ড সম্বল। তবে তাতে কি। আজকের আলোচনা তাদের নিয়ে না।
লেংগঙ্গ ভ্যালীর চারটি ভিন্ন ভিন্ন প্রত্নএলাকার একটির নাম গুয়া হরিমাউ (বাঘের গুহা) প্রত্নক্ষেত্র। এই এলাকাদিয়ে বয়ে যাচ্ছে পেরাক নদী। এই নদীর অববাহিকা ও তার লাগোয়া পাহাড়ের গুহাগুলোতে মানব বসতি চলছিল প্রাচীন প্রস্তরযুগ থেকে একেবারে আধুনিক ১৭০০ বৎসর আগের ব্রোঞ্জযুগ অবধি।
গুয়া হরিমাউ এর কাছেই আরেকটি পাহাড়। চুনা পাথরের পাহাড় বুকিত কেপালা গজ (হাতির মাথা পর্বত)। পাহাড়ের বহু গুহার একটি গুয়া গুনাং রন্টুহ্ (ভগ্ন পর্বতের গুহা)। এখানে প্রায় গায়ে গাযে আরো চারটি গুহা আছে। গয়া কাজাং গুয়া অসর, গুয়া নাগুম(লেপার্ড গুহা) আর গুয়া পুতেরি(রাজকুমারী গুহা)।
তারমধ্যে এই গুয়া গুনাং রন্টুহ্ গুহাতেই পাওয়া গেছে প্রস্তর যুগের একটি কবরে শায়িত দেহাবশেষটি। মোটামুটি অনেকটাই ভালো অবস্থায় ছিল দেহাবশেষ। শুধু তাই নয় বলা চলে মালয়েশিয়াতে পাওয়া প্রাচীন দেহাবশেষের মধ্যে একমাত্র এটিই পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল। কবরে তাকে রাখা হয়েছিল গর্ভাবস্থায় যে ভাবে শিশু থাকে সেই ভাবে। দুই হাঁটু দুই কনুই বুকের কাছে জড় করা। এখানে মানুষটিকে কিন্তু খুবই যত্ন সহকারেই কবর দেওয়া হয়েছে। এতটাই যত্ন নেওয়া হয়েছিল যে বিজ্ঞানীর মনে করছেন মানুষটি একজন প্রচন্ড প্রভাবশালী মানুষ ছিলেন। সম্ভবত বিশেষ ওঝা বা গুনিন ধরনের কেউ। এই প্রভাবশালী মানুনষটি কিন্তু উচ্চতায় খাটোই। উচ্চতা ৫ফুট দুই ইঞ্চি। তারপরেও সে বিকৃতাঙ্গ। তার বাম হাত, ও হাতের পাতা ডান হাতের চেয়ে বেশ খানিকটা ছোট। এই অঙ্গবিকৃতি একটি বিশেষ জেনেটিক রোগের কারনে হয়। রোগটির নাম ব্র্যাকাইমেসোফালাঞ্জি, টাইপ-এ।
এখানে আমাদের ভাবার জন্য কিছু আছে। ভাবতে হয় লোকটির এমন কি গুন ছিল যে ছোটখাট উচ্চতায় বিকৃতাঙ্গ নিয়েও সে প্রভাবশালী হয়েছিল? মনে রাখতে হবে সেই যুগ ছিল শিকারি-সংগ্রাহকের যুগ। অ্রর্থাৎ শারীরিক সক্ষমতার অভাব থাকলে টিকে থাকাই কঠিন। অথচ বিকৃতাঙ্গ নিয়ে সে শিকারি হিসাবে সাফল্য পাবে না। তার দীর্ঘ পঞ্চাশ বৎসর অবধি বেঁচে থাকাটা, শুধু সেই কালে কেন এই কালেও প্রায় পূর্ণ বয়স অবধি জীবন উপভোগ করা। যদি ধরে নেই তার সমাজের অভাবনীয় মমতা মানবিকতাই এতে সাহায্য করেছে। তবুও, তারপরেও, তার কবরে দানসামগ্রীর প্রাচুর্য বলে শুধু মায়া মমতা কারুণ্য নয় শ্রদ্ধাও অর্জন করেছিল মানুযটি। কোন জাদুতে? মন্ত্রতন্ত্র? জাদুকরী প্রকাশ ভঙ্গীমা? বাকচাতুর্য? অথবা এই সব গুনের সমাহারই তাকে তার বিকলাঙ্গতার বাধাকে জয় করতে সাহায্য করেছিল। মায়া মমতা ছাপিয়ে সে শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল।
এই সুযোগে আমরাও আমাদের একটু শ্রদ্ধা জানাই ১০হাজার বৎসরের প্রাচীন দেহের জেনেটিক রোগনির্য়কারী বিশেষজ্ঞকে। এটাও এক জাদুকরী বিদ্যা মনে হতেই পারে।
এখানে আমাদের মনে আরেকটি প্রশ্ন আসবেই। গায়ে গায়ে অতগুলো গুহা। কেন আর কোথাও একটিও দেহাবশেষ পাওয়া গেল না? বিজ্ঞানীরাও সে কথাও ভেবেছেন। সব দিক দেখে তাঁরা যে ব্যখ্যা দিয়েছেন তা হল, এই গুহাগুলো ঐ জনগোষ্ঠীর বাসস্থান ছিলো না। এই গুহাগুলো ছিল তাদের বিশ্রামের জায়গা মাত্র। নীচে শিকার করে ক্লান্ত শরীরকে বিশ্রাম দেবার জন্য এখানে আসতো।
এখন সেই গুহাটি থেকে কঙ্কাল সহ সব প্রত্নসামগ্রীই সরিয়ে নিয়ে য়াওয়া হয়েছে সংগ্রহালয়ে। গুহাতে যে হলে আগে মেইল করে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। সাধারনত আবেদন ব্যর্থ হয় না। সপ্তাহের কোন এক কাজের দিনে নির্দিষ্ট করে দেওয়া সময়ে যেতে হবে সেখানে। গুহার কাছে প্রস্তুত থাকবে গাইড আর কয়েকজন সহকরী। তারা দড়িদড়া বেঁধে টেনে তুলে দেবে গুহার প্রবেশ মুখে। ©তুষারমুখার্জি
তথ্যসূত্রঃ-
1. Tracking Back Malaysia’s Stone Age man in Lenggong. : Brunei Times: Kuala Lumpur, 17 March 2017. Archive. Wayback Machine.
2. Asia’s Secret World Heritage Site. : Marco Ferrarese: BBC : 25 Feb. 2022
3. Archaeological Heritage of Lenggong Valley : Vol-I Dossier for inscription on the UNESCO WORLD HERITAGE LIST: MALYSIA. January 2011
২৯
এশিয়ার কৃষিজীবী ও শিকারী-সংগ্রাহক সমাজ॥
শিকারী-সংগ্রাহক মানুষ বলতেই আমাদের মনে পড়বে কিছু আঁকা ছবি,
১. সারিবদ্ধ নারী-পুরুষ হেঁটে চলেছে বনের মধ্যে দিয়ে।
২. দলবদ্ধ কিছু পুরুষ পশু হত্যা করছে। একটু দুরে মেয়েরা গাছের তলা থেকে ফল কুডিয়ে জড়ো করছে।
৩. এবং নারী-পুরুষ ও শিশু গোল হয়ে আগুনের সামনে বসে পশুর হাড় থেকে মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে।
এই এসব দৃশ্যে তাদের সমাজবদ্ধ মানুষ ভাবতে অসুবিধা হতেই পারে। কিন্তু এই সব খন্ডচিত্র প্রস্তর যুগের। পরবর্তী কালে তাদের জীবনযাত্রার ধরন ধারন বদলেছে।
সেই সব মানুষরা কালে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। মুল শিকারি-সংগ্রাহক দল থেকে বের হয়ে এল একদল, তারা কৃষিজীবী। কারা শিকারী-সংগ্রাহক? কারা কৃষিজীবি?
১. শিকারী-সংগ্রাহকঃ মুলত বনাঞ্চলবাসী। জীবন ধারনের ন্যুনতম প্রাথমিক প্রয়োজনে কৃষি নির্ভর না।
কৃষিজীবীঃ জীবন ধারনের ন্যুনতম প্রাথমিক প্রয়োজন পুরণে কৃষি নির্ভর।
॥শিকারি-সংগ্রাহক সমাজ॥
নজরে থাকবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। কারন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আর দক্ষিণ এশিয়াতে এখনো বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রধান জীবিকা শিকার-সংগ্রহ।
তবে আধুনিক কালে শিকার কমে সংগ্রহই প্রধান জীবিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে সংগ্রহ বলতে শুধুই গাছের তলার ফল ও মাটির তলার কন্দমুল সংগ্রহে সীমিত না। কৃষিকাজ শুরু হবার আগে থেকেই বনের গাছ ঘরের বাগানে লাগাতে তারা জেনে গেছে।
বর্তমানে তাদের সংগ্রহ হলো মুলত মধু, বিড়ি পাতা, মহুয়া, নানা ভেষজ গাছ, বেত, বাঁশ, কাঠ ইত্যাদি বনজ উৎপাদন, এবং নানা খনিজ সম্পদ।
ব্যতিক্রমিঃ সুন্দরবনের মধুসংগ্রাহকরা কিন্তু শিকারী-সংগ্রাহক নয়, তারা কৃষিজীবি।
শিকারী-সংগ্রাহকরা খাদ্যের জন্য শিকার করবে, এবং ফল ও কন্দজাতীয় মুল কুড়িয়ে খাবে। এই কাজের জন্য তাদের গভীর বনাঞ্চলে বা পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করার কথা। কারন বনে শিকার সহজলভ্য। না সেটা ভুল ধারণা।
গভীর বনে থাকে আকারে বড় ও হিংস্র পশু। শিকারী সংগ্রাহকদের পাথরের অস্ত্র দিয়ে সেই রকম পশু শিকার প্রায় অসম্ভব তার সাথে বিপদজনকও। তাদের শিকার সহজলভ্য গবাদিপশু হরিন শুয়োর খরগোশ বেজী মুরগি এইসব।
১২ হাজার বৎসর আগে থেকেই যেহেতু শিকারিরা এই সব পশুদের গৃহপালিত ফেলেছিল। তাই তাদের প্রতিদিন শিকারে না গেলেও চলত। ঐ
১২ হাজার বৎসর আগে থেকে তারা সবজি ও ফলের চাষও শুরু করায় অনেক কিছুই তাদের ঘরের আশপাশে কিছুটা সহজলভ্য হয়ে গেছে। (স্পিরিট কেভ–থাইল্যন্ড)।
ফলে তারা প্রস্তরযুগের সদা চলমান জনগোষ্ঠীর বদলে খানিক থিতু জীবন ধারায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এবং তাদের ঘণিষ্ঠ পরিচিতের গোষ্ঠী ভিত্তিক সমাজ গঠনও শুরু হয়ে গেছে।
শিকার ও দৈনন্দিন জীবন ধারনের নানা প্রয়োজনের প্রস্তরায়ুধের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল শক্ত পাথরের টুকরো। নদীতে বয়ে আসা সহজলভ্য নুড়ি পাথর সে প্রয়োজনে লেগে গেল। গোটা দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বভাগ, চিনের দক্ষিণ অংশ জুড়ে নুড়ি পাথরের একদিক ধার করে হাতিয়ার বানানোর প্রথাটি হোয়াবিনহাই সংস্কৃতির হাতিয়ার বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই পাথরের প্রয়োজনে অনেক সময় তাদের বসতি পাথরের উৎসস্থল পাহাড়ি নদীর মাঝ বরাবর থেকে নীচের দিকেই হয়।
পাহাড়ের উপরের দিকে কঠিন পাথর থাকলেও তা ভেঙ্গে সংগ্রহ করা পরিশ্রম সাপেক্ষ। তাছাড়া সহজ শিকার গবাদিপশু তো নীচের দিকেই থাকে। নীচে পাওয়া যাবে মাছ, গেঁড়ি-গুগলি। ফলের গাছের আধিক্যও পাহাড়ের নীচের দিকেই থাকবে। ফলে ভৌগোলিক সুবিধা ভোগের প্রয়োজনে শিকারী-সংগ্রাহকরা পাহাড়ের নিচের অংশেই বসতি গড়বে।
কৃষিকাজ শুরু হয় প্রকৃতপক্ষে এই শিকারি-সংগ্রাহক জীবনেই। ফলের গাছের চাষ দিয়েকৃষিকাজে হাতে খড়ি।
তারপরে আসবে বার্লি-গম-ধান-জোয়ার-বাজরার মত বিভিন্ন দানা শষ্য। দানাশষ্যের বিশেষতঃ হল দানা শষ্যের জন্য চাই সমতল ভুমি।
একদল এই দানা শষ্যকেই ব্যাপক হারে চাষ করতে শুরু করে বিবর্তিত হয়ে যায় কৃষিজীবি জনগোষ্ঠীতে। ফলে কৃষকরা সমতল ভূমিতেই বসবাস করতে শুরু করে।
যারা ব্যাপক হারে দানা শষ্যের চাষ না করে আগেকার জীবনধারাই বহাল রাখলো তারাই শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী।
॥কেন তখনকার সমাজ দুটো পৃথক জীবনধারা বেছে নিয়েছিল॥
দুটো প্রধান কারনে। ভৌগোলিক কারনে একটি হল দানা শষ্যের বীজ না পাওয়া। অন্যটি হল পরিশ্রম।
বীজ পাওয়ার পরে কৃষিকাজ।
কৃষকদের ফসল উৎপাদনের কাজে সব সময় অধিকতর উৎপাদনের তাগিদ। তাদের বেশি থেকে আরো বেশি উৎপাদন করতে হবে। কারন তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত হারে।
ফসলের উৎপাদন বেড়েছে বলেই জনসংখ্যা বেড়েছে, না জনসংখ্যা বেড়েছে বলেই ফসলের উৎপাদন বেড়েছে সেটা ভাবার বিষয়। তবে তার সাথে আরেকটা সত্যও খেয়াল রাখতে হবে। কৃষিকাজে প্রচুর লোক লাগে। কাজেই জনসংখ্যা বাড়লে তবেই বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারবে। কিন্তু তারসাথে সেই বাড়তি জনসংখ্যার জন্যও বাড়তি উৎপাদন চাই।
কৃষিকাজের গোড়াতে নিজের পরিবারের প্রয়োজন মেটাবার মত ফসল পেলেই চলে যেত। কিন্তু আনুসাঙ্গিক বিলাসিতা শখ-শৌখিনতার বিনিময় মুল্য হিসাবে বেশি উৎপাদন করতে বাধ্য হচ্ছিল তারা।
এই কৃষকের বিনিময় করা ফসল বহুলোককে সরাসরি কৃষিকাজ থেকে রেহাই দিলো। সেই বাড়তি লোক আরো বেশি মুল্যবান বিলাস-দ্রব্যের উৎপাদন বাড়ালো। এবার কৃষককে আরো বেশি ফসল উৎপাদন করতেই হবে সেই নব নব বর্ধিত মুল্যের বিলাস-দ্রব্য সংগ্রহের জন্য।
ক্রমে কৃষক সংমাজ শ্রম বিভাজন ভিত্তিক সমাজ গড়বে। শ্রমিক-উৎপাদক-ব্যবসায়ী-অভিজাত-রাজা ও সেনাবাহিনীর সৃষ্টি হবে।
উপরে বলা সব শ্রেণীর মধ্যে শুধু কৃষক ছাড়া কেউ নিজেরা খাদ্য ফসল উৎপাদন করে না। এবার তাদের খাদ্যের প্রয়োজন মেটাবার জন্য কৃষককে আরো বেশি উৎপাদন করতেই হবে।
আবার সে যতই বেশি উৎপাদন করুক না কেন তার ক্রমবর্দ্ধিত উৎপাদনের একটা অংশ ক্রমবর্দ্ধিত হারেই রাজা ও অভিজাত শ্রেণী নিয়ে নিচ্ছে, বিনিময় মুল্য বাদেই। রাজাকে বাধ্যতামুলক দেয় কর।
ফলে যা দাঁড়াল তা হল কৃষক যা উৎপাদন করবে তার থেকে সবার আগে সমাজে যারা কৃষিকাজ করে না তাদের খাদ্য জোগান দিতে হবে তার সাথে রাজা বলে একজনকে তার উৎপাদনের একটা অংশ দিয়ে দিতে হবে, অকারণে।
কৃষিকাজের সুবিধার জন্য স্থায়ী গ্রামের সৃষ্টি হল। ক্রমে শহর তৈরী হল। লোকবসতির ঘণত্ব ও বর্জের আধিক্য পরিবেশকে দুষিত করে ফেলল। এর ফলে নানা রোগের প্রকোপ বাড়তে থাকল। বিশেষ করে দাঁত আর অস্থি সন্ধির ক্ষয় রোগ নিয়ে সমস্যা বাড়ল।
সব মিলিয়ে কৃষকদের জীবনে পরিশ্রম বাড়ল, রোগবালাই বাড়ল, আর দৌড় ঝাঁপ হয়রানিও বাড়ল।
অন্যদিকে যারা সমভুমিতে কৃষিকাজে এলো না, তারা কিন্তু তুলনামুলক ভাবে কম পরিশ্রম করেই জীবন ধারন করতে পারছে। কারন তাদের জনসংখ্যা কম, তাদের বিলাসদ্রব্যের প্রয়োজন নেই। এবং অধিকাংশ সময়ে তাদের রাজাকে করও দিতে হয় না। তাদের কাছে সমাজের খাদ্য উৎপাদন যারা করে না তাদের খিদে মেটাবার কোন বাধ্যতামুলক সামাজিক দায় নেই।
॥শিকারি-সংগ্রাহকদের বাসস্থান দূর্গম এলাকায়॥
অবশ্যই শিকারি সংগ্রাহকদের এই আপাত সুখের মুল্য তাদের চোকাতে হয়েছে অন্য ভাবে।
ভৌগোলিক ভাবে বসবাসের অনুপযুক্ত এলাকায় সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। লোক সংখ্যা কম থাকায় তারা প্রতিরোধ না গড়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। সমতলের উর্বর জমি কৃষিজীবিদের হাতে ছেড়ে অনুর্বর, শুস্ক, অথবা পাথুরে অনাবাদি এলাকা বা পাহাড়ি জঙ্গল ঘেরা এলাকায় বাস করতে বাধ্য করা হয়েছে।
নতুন পরিস্থিতিতে তাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে।
তাদের প্রস্তরায়ুধের জন্য পাথর সংগ্রহ করা পাথরের বিনিময় থেকে শুরু হয়েছিল প্রথমদিককার বিনিময় বানিজ্য। নতুন পরিস্থিতিতে তারা এই বানিজ্যে মনযোগী হল। বিনিময়ের জন্য বনজ উৎপাদন হিসাবে পাতা, কাঠ, নানা আকারের ও রঙের পাথর, পশুর চামড়া ও হাড়, মধু, ভেষজ ঔষধ। এবং নানাবিধ খনিজ পদার্থ
॥হরপ্পা সভ্যতা ও শিকারি-সংগ্রাহক॥
মেহেরগড়ে শুরুতে ছিল শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী। ক্রমে সেখানে দানা শষ্যের চাষ শুরু হল। মেহেরগড়ের বাসিন্দারা এখন কৃষিজীবী। কিন্তু বনজ সম্পদের ব্যবহার তো লুপ্ত হয় নি। তাই আগেকার শিকারি-সংগ্রাহকরা সরে গিয়ে নতুনদের জায়গা করে দিল বা দিতে বাধ্য হল।
হরপ্পা সভ্যতার আধুনিক কর্মকান্ডের জন্য ব্যবহার হত বিপুল হারে নানা রকমের পাথরের হাতিয়ার সরঞ্জাম।
হরপ্পা সভ্যতার শহরগুলোতে এই হাতিয়ারগুলো সরবরাহ হত নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকা ছোটছোট প্রস্তরায়ুধ তৈরীর বসতিগুলোতে। উপযুক্ত পাথর থাকলে তবেই এমন হাতিয়ার বানানো সম্ভব। যথারীতি জায়গাগুলো বেশিরভাগই সিন্ধু নদের অববাহিকায় না ভৌগোলিক কারনেই পাহাড়ের তলদেশে ছিল।
হরপ্পা সভ্যতার সমৃদ্ধির হাতিয়ার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা লোক বসবাস করত শহর থেকে বহুদুরে পাহাড়ে জঙ্গলে। তারা শিকারি-সংগ্রাহক। এখন মুলত সংগ্রাহক ব্যবসায়ী।
এদের থেকে নানা রকমের হাতিয়ার না পেলে হরপ্পা সভ্যতার যে শিল্পকর্মের এ নামডাক তার অনেক কিছুই হয়ত পাওয়া যেত না।
হরপ্পা সভ্যতার প্রধান ধাতু তামা। হ্যাঁ এখন এটা প্রমানিত যে হরপ্পা সভ্যতার প্রায় সব তামাই আসত আরাবল্লীর তামাচুল্লী থেকে। তামার খনি থেকে খনিজ না। তামার চুল্লি থেকে তামার তাল।
একটা সত্য খেয়াল রাখতে হবে, পলি সমৃদ্ধ উর্বর নদী অববাহিকায় কোন খনিজ থাকে না। খনিজ থাকে পাহাড়ি এলাকায়। সেই পাহাড়ি এলাকায় যেখানে বাস করে শিকারি-সংগ্রাহরা। কাজেই সভ্যতা গঠনের পেছনে সমতলবাসীদের অবদান আছে ঠিকই, কিন্তু সভ্যতার উন্নতির পেছনে আছে পাহাড়িদের অবদান।
আধুনিক ভারতেও সেই কাহিনীর কোন বদল ঘটেনি। কয়েক কোটি বনবাসি আদিবাসী উৎখাত করে তবেই খনিজপদার্থ পাওয়া যাচ্ছে। কয়েক কোটি পাহাড়ি বনবাসি আদিবাসিকে উৎখাত করে তবেই সেচের জলাধার তৈরী হয়। ©তুষারমুখার্জি
তথ্যসূচীঃ-
Historicizing Foraging in South Asia: Power History, and Ecology of Holocene Hunting and gathering. : By Kathleen D Morrison.
৩০
ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও একজন বাঙালি
কাজী আজিজুল হক শুধু একজন বাঙালি পুলিশ অফিসারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অসাধারণ গণিতবিদ, যার মেধা আজ বিশ্বের ফিঙ্গারপ্রিন্ট শনাক্তকরণ পদ্ধতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। চলুন তার জীবন ও অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
১৮৭২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের খুলনার ফুলতলা উপজেলার পাইগ্রাম কসবা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে কাজী আজিজুল হকের জন্ম । তার শৈশব ছিল সংগ্রামী। খুব অল্প বয়সেই তিনি তার পিতামাতাকে হারান। এক ঘটনায় বড় ভাইয়ের বকুনি খেয়ে মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি কলকাতায় চলে যান ।
সেখানে এক ধনী হিন্দু জমিদারের বাড়িতে কাজ নেন। জমিদারের বাড়ির শিক্ষকের কাছে লেখাপড়ার সুযোগ পান এবং অঙ্ক কষার অসাধারণ ক্ষমতা দেখিয়ে সবার নজর কাড়েন । পরে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন এবং গণিত ও বিজ্ঞানে অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেন ।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট গবেষণায় যোগদান
১৮৯২ সালে, তৎকালীন বেঙ্গল পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল স্যার এডওয়ার্ড রিচার্ড হেনরি প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষের কাছে একজন মেধাবী পরিসংখ্যানবিদ ছাত্রের সুপারিশ চান। অধ্যক্ষ কাজী আজিজুল হকের নাম প্রস্তাব করেন । এরপরই আজিজুল হক এবং হেমচন্দ্র বসু পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে যোগ দেন এবং হেনরির ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রকল্পে কাজ শুরু করেন ।
গাণিতিক ভিত্তি ও প্রধান অবদান
আজিজুল হকের প্রধান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল ফিঙ্গারপ্রিন্ট শ্রেণিবিন্যাসের জন্য একটি গাণিতিক সূত্র তৈরি করা ।
· গাণিতিক সূত্রায়ন: ফ্রান্সিস গালটনের প্রাথমিক কাজের ওপর ভিত্তি করে, আজিজুল হক একটি গাণিতিক কাঠামো দাঁড় করান। তার এই ফর্মুলা ব্যবহার করে হাজার হাজার ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেকর্ডকে সহজেই কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে ভাগ করা সম্ভব হয় ।
· ১০২৪ ভাগে বিভাজন: তিনি আঙুলের ছাপের নকশা (প্যাটার্ন) যেমন—লুপ, ঘূর্ণি ও খিলানের ওপর ভিত্তি করে ৩২টি সারি ও ৩২টি কলামে সাজিয়ে মোট ১০২৪টি খোপ (Pigeonholes) তৈরি করেন। এর ফলে লাখ লাখ ছাপের ফাইল থেকেও মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে যে কারো ছাপ খুঁজে বের করা সম্ভব হয়, যেখানে আগের প্রচলিত অ্যানথ্রোপোমেট্রি পদ্ধতিতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগত ।
· দক্ষতা ও নির্ভুলতা: তার পদ্ধতি শেখা সহজ ছিল এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম ছিল। ব্রিটিশ সরকার গঠিত একটি কমিটি ১৮৯৭ সালে তার পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখে যে এটি সরলতা, খরচ, দ্রুততা ও নির্ভুলতার দিক থেকে অ্যানথ্রোপোমেট্রি পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
দুঃখজনক হলেও সত্য, এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পুরো কৃতিত্ব নিয়ে নেন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্যার এডওয়ার্ড হেনরি। তার নামেই এই পদ্ধতি "হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম" নামে পরিচিতি পায় ।
কিন্তু ইতিহাস সব সত্যকে ধরে রাখে। আজিজুল হকের অবদান বিভিন্ন সময়ে স্বীকৃতি পেয়েছে:
· স্যার হেনরির স্বীকৃতি: অনেক বছর পর, আজিজুল হকের আবেদনের প্রেক্ষিতে, স্যার হেনরি নিজেই একটি চিঠিতে লিখেন, "আমি স্পষ্ট করতে চাই যে, তিনি (হক) আমার স্টাফের অন্য যেকোনো সদস্যের চেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন এবং বিশ্বব্যাপী গৃহীত এই শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতিকে নিখুঁত করতে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন" ।
· ব্রিটিশ সরকারের সম্মাননা: তার অবদানের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে ১৯১৩ সালে খান সাহেব এবং ১৯২৪ সালে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়াও তিনি ৫,০০০ টাকা সম্মাননা ও বিহারের মোতিহারীতে জমিদারি লাভ করেন ।
· আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: বর্তমানে যুক্তরাজ্যের "দ্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট সোসাইটি" আজিজুল হক ও হেমচন্দ্র বসুর নামে একটি গবেষণা পুরস্কার চালু করেছে । গবেষক জি এস সোঢি ও জসজিত কৌর "হেনরি-হক-বোস সিস্টেম" নামে পদ্ধতির নামকরণের প্রস্তাব দিয়েছেন ।
শেষ জীবন
১৯৩৫ সালে বিহারের মোতিহারীতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দেশভাগের পর তার পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশ, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েন । @ আব্দুল মুকছিত চৌধুরী
৩১
চা খাওয়া ভালো নাকি কফি? বিরাট বিতর্ক এবং স্পর্শকাতর বিষয় বটে!
সম্প্রতি ইউকে বায়োব্যাংকের (UK Biobank) এক বিশাল গবেষণায় ১লাখেরও বেশি মানুষের তথ্যের ভিত্তিতে চা ও কফির সাথে মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগের (Neurodegenerative diseases) সম্পর্ক নিয়ে দারুণ কিছু তথ্য উঠে এসেছে।
চলুন জেনে নিই গবেষণার মূল বিষয়গুলো সহজভাবে:
কফি প্রেমীদের সাবধানতা: অতিরিক্ত কফি পান করা (দিনে ৪ থেকে ৬ কাপের বেশি) মস্তিষ্কের রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে যারা পরিমিত পরিমাণে কফি পান করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি কম।
চায়ের দারুণ উপকারিতা: প্রতিদিন অন্তত আধাকাপ থেকে ৩ কাপ চা পান করলে স্মৃতিভ্রষ্টতা (Dementia) এবং আলঝেইমারের মতো রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
চা ও কফির মেলবন্ধন: গবেষণায় দেখা গেছে, যারা পরিমিত পরিমাণে চা এবং কফি—উভয়ই পান করেন, তাদের মস্তিষ্কের রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে কম থাকে।
আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
* উচ্চ রক্তচাপ থাকলে অতিরিক্ত কফি পান করা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
* ইনস্ট্যান্ট কফির তুলনায় গ্রাউন্ড কফি (Ground Coffee) পান করা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য বেশি ভালো।
এই গবেষণার বাইরে অন্যান্য আরও গবেষণা থেকে জানা যায়, চা ও কফি উভয়েই পলিফেনল যৌগ থাকে যেগুলো স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে দুধ যোগ করলে এই যৌগের কার্যকারীতা কমে যায়।
মোদ্দাকথা হচ্ছে, এই গবেষণা অনুসারে অতিরিক্ত কফি ঝুকিপূর্ণ তবে চা বেশি খেলেও ক্ষতি নেই বরং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো!
ব্যক্তিগতভাবে আমি সকালে ১কাপ কফি, দুপুরে ১ কাপ রং চা এবং বিকালে ১ কাপ দুধ চা পান করি। আপনাদের কি অভ্যাস?
পূর্ণাঙ্গ গবেষণাপত্রটির লিংক পেতে কমেন্টে "tea" অথবা "coffee" লিখুন। @ ডা. মো: মারুফুর রহমান
৩২
একজন অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের কথা।
হঠাৎ একদিন ছেলেটির বাবা তার স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ভবিষ্যতে তার ছোট ছেলেটির কোন পেশা বেছে নেয়া উচিত? শিক্ষক জবাব দিয়েছিলেন একটি মাত্র বাক্যে, “যে পেশাই হোক, তাতে কিছু এসে যায় না, কারণ কোনোটিতেই ও কিছু করতে পারবে না।” এমন অকাট্য উত্তর সেদিনের সেই প্রধান শিক্ষকের! শুধু তাই নয় একবার স্কুল থেকে “Your presence in the class is disrupting and affects the other students” বলে ক্লাসের শিক্ষক তাকে তিরস্কার করেন।
সেই ছেলেই বড় হয়ে এমন অসাধ্য সাধন করলেন, বিজ্ঞান জগতে মহাবিপ্লব বললেও অত্যুক্তি হয় না। বিশ্ব ও জগত সম্পর্কে নিউটনের ধারণাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়ে আবিষ্কার করলেন ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটি’- আপেক্ষিকতাবাদ। তিনি বলেন, এই যে চোখের সামনে আমরা বস্তুর গতি ও শক্তি, ‘টাইম’ ও ‘স্পেস’ অর্থাৎ সময় ও স্থানকে দেখছি, কোনোটাই ‘অ্যাবসলিউট’ বা অপরিবর্তনীয় নয়, ধ্রুব নয়, সবই আপেক্ষিক। বস্তুর গতি আর তার সাথে পর্যবেক্ষকের অবস্থানের পরিবর্তনে বদলে যায় সবকিছু। শুধু বদলায় না আলোর গতিবেগ।
‘কিছুই হবে না’ বলে ঘোষণা করে দেওয়া মাস্টার মশাইয়ের সেই ছাত্রটি আর কেউ নন, তিনি মহাবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন!
১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ জার্মানির মফস্বল শহরে উলম-এ এক ইহুদি পরিবারে আইনস্টাইনের জন্ম। বাবা হেরম্যান আইনস্টাইন ছিলেন ছোট ব্যবসায়ী। উলমে ব্যবসা ভালো চলছিল না বলে অ্যালবার্টের জন্মের এক বছর পরেই হেরম্যান মিউনিখে গিয়ে তার ভাই জ্যাকবের সঙ্গে নতুন করে ব্যবসা শুরু করেন।
অ্যালবার্টের ছেলেবেলা কেটেছিল মিউনিখেই। খুব ছোট থেকেই ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন। কথা বলতে শুরু করেন সাধারণ শিশুদের চেয়ে তুলনায় একটু বেশি বয়সে। আর পড়তে শেখেন সাত বছর বয়সে। চার বছর পর্যন্ত যখন তিনি কথা বলছিলেন না, তখন তার মা-বাবা বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। একদিন হঠাৎ খাবার টেবিলে চুপচাপ থাকা আইনস্টাইন বলে উঠলেন, “স্যুপটা খুবই গরম!” তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, “এতদিন কেন কথা বলোনি?” উত্তর এলো “এতদিন তো সব কিছুই ঠিকঠাক চলছিল“, আইনস্টাইন তার জীবনের দ্বিতীয় বাক্যটি বললেন।
আলবার্ট ও মাজা দুজনের স্মৃতিকথাতেই আছে শিশু আলবার্ট অনেক দিন পর্যন্ত কথা বলেনি। এই স্মৃতিটা সম্ভবত সত্যি নয়, কারণ তাঁর দাদুর চিঠিতে দু’বছর বয়সী আলবার্টের দাদু-দিদিমার সঙ্গে কথা বলার উল্লেখ পাওয়া যায়। পারিবারিক স্মৃতিতেই আছে বোন মাজার জন্মের পরে আলবার্টকে যখন বলা হয়েছিল যে তার একটা নতুন খেলনা এসেছে, তখন সে প্রশ্ন করেছিল, ‘চাকা নেই, তাহলে খেলব কেমন করে?’ তখন তার বয়স আড়াই বছর। তবে সাত বছর বয়স পর্যন্ত আলবার্টের অভ্যাস ছিল কোনও কথা বলার আগে পুরো বাক্যটা নিজের মনে একবার বলে নেওয়া, সেই কারণেই হয়তো তাঁকে বোকা মনে হত। কোনও কথা লেখা বা বলার আগে চিন্তা করে নেওয়া, আইনস্টাইনের এই ট্রেডমার্ক অভ্যাস সারা জীবন বজায় ছিল। ফলে তাঁর চিন্তাভাবনাগুলো সবসময়েই স্পষ্ট ফুটে উঠত।
তিন বছরের ছোট বোন মাজা’র স্মৃতিচারণায় জানা গেছে , ছ’-সাত বছর বয়সেই কখনও কখনও খুব রেগে যেতেন অ্যালবার্ট। হাতের জিনিস ছুঁড়ে ফেলে দিতেন। একবার তো রাগের চোটে বাগানের নিড়ানি দেবার যন্ত্র দিয়ে বোনের মাথায় এক ঘা বসিয়ে দিয়েছিলেন। এরকম দু’একটি ঘটনা ছাড়া সাধারণভাবে শিশু অ্যালবার্ট স্বভাবে ছিলেন শান্তই।
অ্যালবার্টকে প্রথম স্কুলে পাঠানো হয় পাঁচ বছর বয়সে। ১০ বছর বয়সে ভর্তি হন হাই স্কুল লুটিগোল্ড জিমনেশিয়ামে। স্কুলের ধরা-বাঁধা পড়াশুনা তার কখনোই ভালো লাগেনি। স্কুলের পড়াশুনায় খুব একটা ভালো ছিলেন না। ক্যাথলিক স্কুলের অতিরিক্ত কড়াকড়িও তার ভীষণ অপছন্দ ছিল। ইউরোপে সে যুগে গ্রিক ও ল্যাটিন পাঠক্রমের অন্তর্গত ছিল। মাজার স্মৃতিতে আছে যে জিমন্যাসিয়ামে আলবার্টের গ্রিক শিক্ষক একবার বলেছিলেন যে তাঁর দ্বারা কিচ্ছু হবে না। আইনস্টাইনও প্রায় একই গল্প পরে বলেছেন, খালি তাঁর স্মৃতিতে এসেছে ল্যাটিন শিক্ষকের কথা। একাধিক জীবনীতে এই গল্পটা অন্যভাবে পড়েছি; আইনস্টাইনের বাবা হেরম্যান যখন হেডমাস্টারমশাইকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ছাত্র কোন পেশার উপযুক্ত, তখন তিনি নাকি বলেন যে আপনার ছেলে জীবনে কোনও কিছু করতে পারবে না। কথাটা মেনে নেওয়া খুব শক্ত, কারণ সেই স্কুলে আলবার্ট অঙ্কে ও বিজ্ঞানে সবসময়েই প্রথম হতেন, এমনকি গ্রিক বা ল্যাটিনেও উপর দিকেই থাকতেন! হতে পারে যে কোনও এক বিশেষ পরিস্থিতিতে এক শিক্ষক এই কথা বলেছিলেন। ভাষাশিক্ষার বিষয়ে আইনস্টাইনের অনীহা ছিল, ইহুদিদের হিব্রু শেখার মতো সাধারণ অভ্যাসকেও আইনস্টাইন এড়িয়ে গিয়েছিলেন। সেই অনীহাও তাঁর শিক্ষকের বিরক্তির কারণ হয়ে থাকতে পারে।
তবে ভালো রেজাল্ট করা সত্ত্বেও আলবার্ট স্কুলকে প্রচণ্ড অপছন্দ করতেন। স্কুলের মুখস্থবিদ্যার উপর জোর বা জবরদস্তি করে চাপিয়ে দেওয়া শৃঙ্খলা তাঁর সহ্য হত না। যে আইনস্টাইন সারা জীবন বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত সত্যকে প্রশ্ন করে আমাদের সামনে নতুন জগৎ খুলে দিয়েছেন, সেই বিদ্রোহী কালাপাহাড়ের জন্ম হয়তো এই সময়েই। পরবর্তীকালে তিনি সেই বিতৃষ্ণা থেকেই তাঁর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের সৈন্যবাহিনীর সার্জেন্ট এবং জিমন্যাসিয়ামের শিক্ষকদের লেফটেন্যান্টদের সঙ্গে তুলনা করেছেন! আসলে কোনো ব্যাপারে কর্তৃত্বের বাড়াবাড়ি তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না।
অ্যালবার্ট বরাবরই স্বাধীনচেতা ছিলেন। এই গুণটি তিনি পান পারিবারিক সূত্রে। মাত্র চার বছর বয়সে মিউনিখের পথে ঘাটে অবাধ ঘুরে বেড়ানোর ছাড়পত্র পেয়েছিলেন মায়ের কাছ থেকেই। আবার ১৫ বছর বয়সে ব্যবসার খাতিরেই মিউনিখের পাট চুকিয়ে বাবা যখন ইতালিতে চলে গেলেন, তখন হাই স্কুলের পড়া শেষ করার জন্য তাকে রেখে যাওয়া হলো মিউনিখের এক হোস্টেলে। বাবা-মা’র ইচ্ছে ছিল ছেলে তাড়াতাড়ি স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক। এ বিষয়ে মা পলিনের ছিল কড়া নজর।
স্কুল জীবনে আইনস্টাইনের প্রতিভার কোনো প্রতিফলনই দেখা যায় নি। প্রথাগত লেখাপড়ায় তার মন ছিল না বলেই হয়তো এমনটা হয়েছিলো। ছ’বছর বয়সে একরকম জোর করেই মা তাকে বেহালা শেখানোর ব্যবস্থা করেন। নেহাত অনিচ্ছার সাথে শুরু করলেও একসময় এই বাজনাটার প্রতি আইনস্টাইন আকৃষ্ট হন। আর এই বেহালাই হয়ে ওঠে তার আজীবনের সঙ্গী।
শৈশবে আরেকটি ছোট ঘটনা আইনস্টাইনের জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। বছর পাঁচেক বয়স তখন। অসুস্থ হয়ে তিনি একেবারেই শয্যাশায়ী। বাবা এনে দিলেন একটি ছোট্ট কম্পাস। শিশু অ্যালবার্ট সেটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যত দেখে, ততই অবাক হয়ে যায়। যন্ত্রটি যে দিকেই ঘোরানো হোক না কেন, কম্পাসের কাঁটা ঠিক উত্তরমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। শিশুটি ভাবে - কোনো অজানা রহস্যময় শক্তিই হয়তো এর কারণ। অ্যালবার্ট ভাবে, স্কুলের পড়ায় এই মজা নেই কেন? এ ধরনের প্রশ্নের মধ্যেই হয়তো সুপ্ত ছিল ভবিষ্যতের আপেক্ষিক তত্ত্ব চিন্তার বীজ।
বাবার দেয়া সেই কম্পাসই আইনস্টাইনের চিন্তার জগৎকে নাড়িয়ে দেয়। কৈশোর থেকেই গণিতের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল আইনস্টাইনের। বীজগণিতে তার আগ্রহ জাগিয়ে তোলেন কাকা জ্যাকব। মজা করে তিনি বলতেন, “আমরা এমন একটি ছোট্ট জন্তু শিকারে বেরিয়েছি, যার নাম জানা নেই। তাই তার নাম দেওয়া হল ‘×’; এবার তাকে ধরো, তারপর ঠিক নামটি দিয়ে দাও।”
কাকা জ্যাকবের মজাদার পাঠদানে আইনস্টাইনের বীজগণিতের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া বালক আইনস্টাইনের জিজ্ঞাসু মনে বিজ্ঞান বিষয়ে কৌতুহল সৃষ্টির পেছনে ছিল আরও দুজন মানুষের বিশেষ অবদান। একজন হলো তার নিজের মামা সিজার কচ্। অন্যজন হলো এক ডাক্তারির ছাত্র, আইনস্টাইনের টিউটর নাম ম্যাক্স তালমুদ (পরে তালমে)। তালমুদ প্রতি বৃহস্পতিবার তাদের বাড়িতে সান্ধ্য ভোজে যোগ দিতেন। ১২ বছরের অ্যালবার্টকে তিনি একটি জ্যামিতির বই উপহার দিয়েছিলেন। এই বইটিই যে তার বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সে কথা আইনস্টাইন একাধিকবার উল্লেখ করেছেন।
সম্ভবত এই সময়েই ম্যাক্স তালমুদ তাঁকে একটি উচ্চতর জ্যামিতির বই পড়তে দেন। ম্যাক্স দেখেছিলেন যে বিজ্ঞান ও অঙ্কে তাঁর ছাত্র সমবয়সীদের থেকে অনেক এগিয়ে। তার আগেই আলবার্ট জ্যামিতি শিখেছিলেন, কিন্তু এর পরে তিনি গণিতের দিকে আলাদা করে মন দেন। কিশোর অ্যালবার্টের সাথে তালমুদ বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে আলোচনা করতেন। তালমুদ লিখেছেন, “জ্যামিতির বইটি কয়েক মাসের মধ্যেই মধ্যেই আয়ত্ত করে ফেলেছিল অ্যালবার্ট। এরপর উচ্চতর গণিত নিয়েও পড়াশোনা শুরু করে, সেসব বইয়ের হদিস আমিই তাকে দিয়েছিলাম।” বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে আইনস্টাইনকে আগ্রহী করে তোলেন ম্যাক্স তালমুদ।
বারো থেকে ষোল বছর বয়সের মধ্যে বই পড়েই তিনি ক্যালকুলাস শিখে ফেলেন। ম্যাক্স ছিলেন ডাক্তারির ছাত্র এবং আইনস্টাইনের থেকে এগারো বছরের বড়। কিন্তু তিনিও আর ছাত্রের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিলেন না। তিনি আলবার্টকে ইম্যানুয়েল কান্টের দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট করেন। তেরো বছর বয়সী আলবার্ট কান্টের দর্শন অনেকটাই আত্মস্থ করতে পেরেছিল। দর্শনের প্রতি আগ্রহ আইনস্টাইনের সারাজীবন ছিল। বিশেষত আপেক্ষিকতাবাদ নিয়ে গবেষণার সময় তাঁকে আর্নস্ট মাখ-এর ‘দৃষ্টবাদ'(Positivism) বিশেষ প্রভাবিত করেছিল। পরে অবশ্য তিনি মাখের মতকে ভুল বলেছিলেন।
হাই স্কুলের পড়া শেষ না করেই অ্যালবার্ট চলে যান ইতালিতে বাবা-মা’র কাছে। হেরম্যান চেয়েছিলেন ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতক হয়ে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দিক। তাই অ্যালবার্টকে জুরিখের টেকনিক্যাল স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় তিনি অকৃতকার্য হন। বিজ্ঞান ও গণিতে ভালো নম্বর পেলেও ভাষা ও ইতিহাসে উৎরোতে পারেননি। পরের বার অবশ্য একটি স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে সরাসরি ভর্তি হয়ে যান। কিন্তু স্নাতক স্তরেও পাঠক্রমের বাঁধা-ধরা পড়ায় তার মন ছিল না। নিজের খেয়াল খুশিতে চলতেন। বাইরের ভারী ভারী বই পড়তেন আর ভাবতেন।
পরীক্ষার ফল মোটেই ভাল হলো না, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। যা হোক, একটা চাকরি চাই। এ সময়েই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সুপারিশে সুইজারল্যান্ডের বার্নে পেটেন্ট অফিসে আইনস্টাইন একটি চাকরি পান। তার প্রধান কাজ ছিল পেটেন্ট সংক্রান্ত আবেদনগুলি পরীক্ষা করা। আইনস্টাইন সুইস পেটেন্ট অফিসে ছিলেন ১৯০২ সাল থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত। চাকরি পাওয়ার পরই ১৯০৩ সালে তিনি বিয়ে করেন টেকনিক্যাল স্কুলের সহপাঠিনী মাভিয়া ম্যারিককে।
বার্নেই সংসার পাতেন তারা দুজনে। মাভিয়ার গর্ভে জন্ম নেয় আইনস্টাইনের দুই সন্তান হ্যান্স আলবার্ট আইনস্টাইন ও এডওয়ার্ড আইনস্টাইন। কিন্তু এই বিয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পাঁচ বছর পরে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯১৯ সালে আইনস্টাইন আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তার খুড়তুতো বোন এলসা আইনস্টাইনের সাথে।
এসময় কয়েকজন বুদ্ধিজীবী বন্ধু মিলে একটি গোষ্ঠীও গড়ে তোলেন, যেখানে পদার্থবিদ্যার সাম্প্রতিক গবেষণা ও আবিষ্কার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হত। ঘনিষ্ঠতম বন্ধু ছিলেন মাইকেলেঞ্জেলো বেসো, যিনি মজা করে ঐ গোষ্ঠীর নাম দিয়েছিলেন ‘অলিম্পিয়া অ্যাকাডেমি’। এই পর্বেই আইনস্টাইনের বিজ্ঞান ভাবনা ও গবেষণা উৎকর্ষের শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছায়।
আইনস্টাইনের পরিবার প্রায়ই আর্থিক সংকটে পড়ত, ফলে হেরম্যান জীবিকা নির্বাহের জন্য ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। আইনস্টাইনের বয়স যখন পনেরো, তখন তাঁর পরিবার ইতালিতে মিলান শহরে যান। মিউনিখে থেকে পড়া শেষ করার কথা ছিল আইনস্টাইনের, কিন্তু তিনি অল্প দিন পরেই স্কুল ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে যোগ দেন। তিনি এক ডাক্তারের সার্টিফিকেট জোগাড় করেছিলেন, কিন্তু সম্ভবত স্কুল সেই সার্টিফিকেট না নিয়ে তাঁকে বহিষ্কার করে। স্কুলের ডিসিপ্লিনের বিরুদ্ধে বারবার তাঁর বিদ্রোহ হয়তো কর্তৃপক্ষের পছন্দ হয়নি। এক শিক্ষক একবার তাঁকে ক্লাসে আসতে বারণ করেছিলেন, কারণ - “তুমি পড়াতে মন না দিয়ে ক্লাসের পিছনের বেঞ্চে হাসিহাসি মুখে বসে থাকো, এতে একজন শিক্ষক, ক্লাসের কাছে যিনি শ্রদ্ধা আশা করেন, তার ব্যাঘাত ঘটছে।” স্কুল ও ছাত্র কেউ কাউকে পছন্দ করেনি, ঘটনাচক্রে মিউনিখের সেই স্কুলের নাম এখন 'আলবার্ট আইনস্টাইন জিমন্যাসিয়াম'।
ফিরে আসি আইনস্টাইনের পড়াশোনার কথায়। স্কুলের ডিপ্লোমা না থাকার ফলে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার দরজা তাঁর কাছে খোলা ছিল না। তিনি ঠিক করলেন সুইজারল্যান্ডে জুরিখ পলিটেকনিকে ভর্তি হবেন, সেখানে স্কুলের সার্টিফিকেট লাগে না। প্রথমবার ভর্তির পরীক্ষাতে তিনি পাস করেননি, সে কথা সব জীবনীতেই দেখি। কিন্তু খুব কম জায়গায় লেখা আছে যে আইনস্টাইন যখন পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তখন তাঁর বয়স ষোল, পলিটেকনিকে ভর্তির সাধারণ বয়সের থেকে দু’ বছর কম। শুধু তাই নয়, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের স্কুলের পাঠক্রম এক ছিল না, ফলে বেশ কিছু বিষয় তাঁর কাছে একেবারে নতুন ছিল। তিনি ভর্তির পরীক্ষাতে খুব খারাপ করেছিলেন ফরাসিতে, যে ভাষাটা তিনি মাত্র ছ’মাস পড়েছিলেন।
তবে পলিটেকনিকের প্রিন্সিপাল নিঃসন্দেহে আইনস্টাইনের মধ্যে কিছু দেখেছিলেন, তাই কুড়ি মাইল দূরের আরাউ শহরে এক বছর পড়াশোনার পরামর্শ দেন তিনি। এই একটি স্কুলে আলবার্ট যে স্বাধীনতা পেয়েছিলেন, শেষ জীবন পর্যন্ত সেই কথা মনে রেখেছিলেন। এক বছর পরে আইনস্টাইন স্কুলের শেষ পরীক্ষাতে পাস করেন ও জুরিখ পলিটেকনিকে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হন। আঠারো বছর বয়সী আইনস্টাইনের জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হল।
মাজা ও ম্যাক্স দুজনেই বলেছেন আইনস্টাইন একা কাজ করতে ভালোবাসতেন, যা পরেও দেখা গেছে। খেলাধূলা বিশেষ করতেন না, পড়াশোনার ব্যাপারে ছিলেন খুবই সিরিয়াস। সারা জীবনই আইনস্টাইনের মনোযোগের ক্ষমতা ছিল অসাধারণ, তাও দুই স্মৃতিকথাতে আছে।
কিশোর আইনস্টাইনই কি তাঁর ভবিষ্যৎ পথ স্থির করে নিয়েছিলেন? আরাউতে পড়ার সময় আইনস্টাইনের লেখা একটা কাগজ পাওয়া গেছে, যেখানে তিনি তত্ত্ব বিজ্ঞান ও অঙ্ককে ভবিষ্যৎ পেশা হিসাবে বেছে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। হেরম্যানের ইচ্ছা ছিল ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হোক, কিন্তু আলবার্ট তা আগেই নাকচ করে দেন। আইনস্টাইন তাঁর ছোটবেলার দুটি বিস্ময়ের কথা লিখেছেন। প্রথমটি তাঁর চার বা পাঁচ বছর বয়সের এক ঘটনা, এক কম্পাসের চুম্বকশলাকার সারাক্ষণ উত্তর-দক্ষিণ হয়ে থাকা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। সেই হয়তো চৌম্বক ও তড়িৎ বিষয়ে আইনস্টাইনের আগ্রহের সূত্রপাত। ষোল বছর বয়সী আলবার্ট তাঁর কাকাকে পাঠানো এক প্রবন্ধে ইথার মাধ্যম ও চুম্বক বিষয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণার কথা লিখেছিলেন। ঠিক দশ বছর পরে ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্রের তত্ত্ব থেকে আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে পৌঁছেছিলেন, এবং আপেক্ষিকতাই বিজ্ঞানের জগৎ থেকে ইথার মাধ্যমকে বিদায় করে। দ্বিতীয় বিস্ময়টি হল বারো বছর বয়সে ইউক্লিডের জ্যামিতির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ। পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিই, আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা হল জ্যামিতির তত্ত্ব, এমন জ্যামিতি যা দেখিয়েছিল যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ইউক্লিডের নিয়ম মেনে চলে না।
তিনি বিজ্ঞান ভাবনায় এতই মগ্ন থাকতেন যে, কথিত আছে, বাইরে বেরিয়ে কখনও কখনও বাড়ি ফেরার পথও হারিয়ে ফেলতেন তিনি। এ হেন বিস্ময় বিজ্ঞানীর এমন কিছু স্বভাব ছিল, যেগুলো অনেকের কাছে মোটেই স্বাভাবিক ছিল না। তাঁর মতো একজন বিজ্ঞানী যে এগুলো করতে পারেন, তা কল্পনাও করতে পারতেন না অনেকেই। আবার অনেকের মতে, এই স্বভাবগুলোই আইস্টাইনের মস্তিষ্ককে আরও তীক্ষ্ণ করে তুলেছিল। রোজ অন্তত ১০ ঘণ্টা ঘুমোতেন তিনি। যেখানে বর্তমানে মানুষের ঘুমের গড় হিসাব ৬-৮ ঘণ্টা। এই ঘুমের মধ্যেই অনেক বিজ্ঞানী নাকি কঠিন সমস্যার সমাধান করে ফেলেছিলেন। যেমন বিজ্ঞানী ওয়াটসন ডিএনএ-র গঠন বুঝে ফেলেছিলেন বা আইনস্টাইন আপেক্ষিকতাবাদের সূত্র। প্রিন্সটনে কাজ করার সময় আইনস্টাইন রোজ প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ হেঁটে কর্মক্ষেত্রে যেতেন। কারণ আইনস্টাইন মনে করতেন এতে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়।
ভায়োলিন বাজাতে খুব পছন্দ করতেন আইনস্টাইন। মস্তিষ্কের সঙ্গে হাত আর চোখের সমন্বয় ঘটে। তাই প্রায়ই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভায়োলিন বাজাতেন তিনি। তিনি বলতেন, ক্ল্যাসিকাল মিউজিক কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমিয়ে মনকে চাপমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। স্প্যাগেটি খেতে দারুণ ভালবাসতেন তিনি। শুধু ভাললাগার জন্যই যে স্প্যাগেটি খেতেন তা-ই কিন্তু নয়। সারা শরীরের ২০ শতাংশ এনার্জি প্রয়োজন ব্রেনের। আর আইনস্টাইনের মতে, স্প্যাগেটির কার্বোহাইড্রেট ব্রেনের জন্য খুব ভাল এনার্জির উৎস। আইনস্টাইনের একটা বদভ্যাস ছিল ধূমপান। তাঁর মুখে সারাক্ষণই পাইপ থাকত আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী তাঁকে ঘিরে থাকত সর্বক্ষণ। জানা যায়, শেষ জীবনে আইনস্টাইন নিরামিষাশী হয়ে গিয়েছিলেন. তিনি ১৯৫৩ সালে বন্ধু ম্যাক্স ক্যারিয়েলকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমি যখনই প্রাণীর মাংস খেতাম, ভিতরে ভিতরে একটা অপরাধবোধ জাগত।” আইনস্টাইন কখনও মোজা পরতেন না। ছোট থেকেই এই অভ্যাস তৈরি হয়েছিল তাঁর। তিনি বিশ্বাস করতেন, যেটা আরামদায়ক হবে সেটাই পরা উচিত। মোজা তাঁর কাছে একেবারেই তেমনটা ছিল না। আইনস্টাইন কখনও সাঁতার শেখেননি। এ দিকে তাঁর ইচ্ছা ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলে ভেসে থাকা। ফলে নৌকা তাঁর সেই ইচ্ছাপূরণ ঘটিয়েছিল।
মজার কথা হলো, আইনস্টাইন ল্যাবরেটরিতে প্রথাগত গবেষণা কখনই করেননি। মস্তিষ্কই ছিল তার ল্যাবরেটরি। আর যন্ত্রপাতি বলতে ছিল পেন্সিল আর কলম। তার পরীক্ষা সব ছিল চিন্তার জগতে, যাকে বলা হয় ‘থট এক্সপেরিমেন্ট’।
এ সময়েই, পর পর আইনস্টাইনের কয়েকটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ছিল ডক্টরেট ডিগ্রীর জন্য থিসিস, ‘ফটো ইলেকট্রিক এফেক্ট’ অর্থাৎ আলোক তড়িৎ প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ এবং ‘স্পেশাল থিওরি অফ রিলেটিভিটি’ বা বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডক্টরেট পেয়ে যান সহজেই।
১৯২১ সালে ফটো ইলেকট্রিক ইফেক্টের কাজের জন্যেই নোবেল পুরস্কার পান। তবে ১৯০৫ সালে তার প্রকাশিত বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ বিজ্ঞানী মহলে তাকে খ্যাতি এনে দেয়। এ সমস্ত গবেষণাপত্র অতি উচ্চ গণিতের ভাষায় লেখা, গণিতের বিশেষ জ্ঞান ছাড়া যা বোঝা সম্ভব নয়। তবে বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মূল কথাটি কঠিন নয়। যার সার কথা হলো- আলোর গতিবেগই চরম এবং ধ্রুব। আলোর উৎস বা পর্যবেক্ষকের অবস্থান ও গতিবেগ বদলালেও আলোর বেগ একই থাকে।
বস্তুর গতিবেগ যতই বাড়ে, ততই তার দৈর্ঘ্য কমে আর ভর বাড়তে থাকে, কমতে থাকে সময়ের চলন। গতিশীল বস্তুর সাথে জুড়ে দেওয়া ঘড়ি ক্রমশ ‘ধীরে’ চলবে। অতি বেগবান কোনো মহাকাশযানের যাত্রীরা কয়েক বছর ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে এসে দেখবেন তাদের আত্মীয় স্বজনেরা কেউ আর বেঁচে নেই। অথচ তাদের নিজেদের বয়স তেমন কিছুই বাড়েনি। এই তত্ত্বেই আছে বস্তু ও শক্তির সম্পর্ক নির্ণায়ক বিখ্যাত সমীকরণ E=mc^2, যেখানে E হলো বস্তুর মধ্যে নিহিত শক্তি, m বস্তুর ভর এবং c আলোর গতিবেগ।
১৯১৬ সালে আইনস্টাইন আবিষ্কার করলেন আরেকটি যুগান্তকারী আবষ্কার, ‘জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি’ বা সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব। তাতে তিনি মহাকর্ষের সম্পূর্ণ নতুন সংজ্ঞা দিয়েছেন। বলেছেন, মহাকর্ষ বা অভিকর্ষ হলো ‘স্পেস টাইম’ অর্থাৎ সময় ও স্থান মিলিয়ে এক বিশেষ ক্ষেত্রের বিকৃতি থেকে উদ্ভূত টান।
যেকোনও খ্যাতনামা ব্যক্তির মতো তাঁর সম্পর্কেও অনেক গল্প প্রচলিত আছে, আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আরও বেশ নতুন কয়েকটা জানতে পেরেছি। তাদের কয়েকটা সত্যি হতেও পারে, কিন্তু অনেকগুলিই সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। আইনস্টাইনের পক্ষে কোন স্টেশনে নামতে হবে তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়া বা নিজের বাড়ির ঠিকানা ভুলে যাওয়া সম্ভব হতেও পারে। কিন্তু আইনস্টাইনের বদলে তাঁর ড্রাইভারের বক্তৃতা দেওয়া নিতান্তই অসম্ভব, তা হলে ধরে নিতে হয় শ্রোতারা পৃথিবীর সব থেকে বিখ্যাত বিজ্ঞানীকে চিনতেন না। এমনকি ইহুদি আইনস্টাইনের মেয়ের বিয়ে চার্চে হওয়ার গল্পও চালু আছে। স্কুলে আইনস্টাইন অঙ্কে ফেল করেছিলেন, এমন কথাও আইনস্টাইনের এক জীবনীতে পড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে।
আইনস্টাইনকে নিয়ে নানা গল্পের পিছনে আছে তাঁর চরিত্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য যা তাঁকে অধিকাংশ মানুষের থেকে আলাদা করে রেখেছে। যে সমস্ত কাহিনি তাঁকে ঘিরে প্রচলিত আছে, তার পুরোটা সত্য না হলেও অনেকের মধ্যেই হয়তো সত্যের বীজ লুকিয়ে আছে, প্রায় সব মিথের ভিতরেই যা থাকে। এই লেখার স্বল্প পরিসরে আমরা শুধু তাঁর জীবনের প্রথম আঠারো বছরের কথা শুনব এবং কৈশোর ও প্রাক যৌবনের ঘটনাগুলির মধ্যে তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলির উৎস খুঁজব।
আইনস্টাইনের জীবনীকারেরা সকলেই তাঁর জীবনের প্রথম পর্ব নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। ব্যক্তিগত বিষয়ে আইনস্টাইনের স্মৃতিশক্তি সত্যিই দুর্বল ছিল, যে কারণে সাতষট্টি বছর বয়সে লেখা তাঁর স্মৃতিকথা খুব নির্ভরযোগ্য নয় বলে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। আইনস্টাইনের বোন মারিয়া (বা মাজা) ছাড়া আত্মীয়রা কেউই তাঁর ছোটবেলা সম্পর্কে কিছু লেখেননি। মাজাও লিখেছেন ১৯২৪ সালে, যখন আইনস্টাইনের বয়স পঁয়তাল্লিশ। ম্যাক্স তালমুদ ছিলেন আইনস্টাইনের টিউটর, বেশ কয়েক বছর একসঙ্গে কাটিয়েও আপেক্ষিকতা বিষয়ে তাঁর লেখা একটি বইতে তিনি আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় সম্পর্কে মাত্র কয়েকটি পৃষ্ঠা ব্যয় করেছিলেন। তবে আইনস্টাইনের জীবনীকাররা হাল ছেড়ে দেননি, তাঁরা নানা তথ্য খুঁজে বার করেছেন। সেসব তথ্যের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা আছে, কিন্তু সমস্ত মিলিয়ে একটা ছবি ফুটে ওঠে। সেই ছবি এক বিদ্রোহী তরুণের যে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ; যে সমস্ত বিষয়ে সে আগ্রহী সেখানে তার তুলনা মেলা শক্ত, কিন্তু জোর করে কোনও কিছু তার উপরে চাপানো প্রায় অসম্ভব।
একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। আইনস্টাইনের ঈশ্বরবিশ্বাস নিয়ে অনেক কথাই শোনা যায়, বিশেষ করে মনে আসে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি, “ঈশ্বর পাশা খেলেন না।” এই ঈশ্বর কে? তিনি নিজে বলেছিলেন, “আমি (বারুচ) স্পিনোজার ঈশ্বরে বিশ্বাসী, মানুষের কাজ বা ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ঈশ্বরের মাথাব্যথা নেই, সৃষ্টির সুশৃঙ্খল ঐকতানের মধ্যে যাকে খুঁজে পাওয়া যাবে।” বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই ঐকতান ছিল আইনস্টাইনের ঈশ্বর। তিনি নিজেকে আস্তিক বলতেন, কিন্তু তাঁর আস্তিকতাকে সাধারণ মানুষের বিচারে নাস্তিকতার থেকে আলাদা করা শক্ত। তিনি মৃত্যুর পরে আত্মা বা কোনও দেবতার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। আইনস্টাইনের পরিবার ছিল ইহুদি, কিন্তু তাঁরা বাড়িতে ধর্মীয় অনুশাসন সেভাবে মেনে চলতেন না। পরবর্তীকালের আইনস্টাইন ইহুদি সংস্কৃতি বিষয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল হলেও ইহুদি ধর্ম বিষয়ে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন না। ‘অন্য সব ধর্মমতের থেকে বেশি ক্ষতি করেনি,’ এই ছিল ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে তাঁর সংক্ষিপ্ত অভিমত। কিশোর আইনস্টাইন কিন্তু অল্প সময়ের জন্য হলেও ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর নিজের ভাষায় - প্রতিটি মানুষেরই একসময় জীবনকে অর্থহীন মনে হয়, তার থেকে উদ্ধার পাওয়ার প্রথম পথ হল ধর্ম, যা আমাদের পরম্পরাগত যান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিটি শিশুর মনে প্রোথিত করে দিয়েছে। কিন্তু বারো বছর বয়সে হঠাৎ সেই দশার সমাপ্তি ঘটে। বিজ্ঞানের জনপ্রিয় বই পড়ে তিনি বুঝতে পারেন যে বাইবেলের অনেক কথাই সত্যি হতে পারে না। (মনে রাখতে হবে, বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট ইহুদিদেরও পবিত্র ধর্মগ্রন্থের মধ্যেও পড়ে)
এই সময় আইনস্টাইন জার্মান নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। হেরম্যান প্রথমে রাজি হননি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলের জেদের কাছে হার মানেন। জার্মান, বা আরও বিশেষভাবে বললে প্রাশিয়ান সমাজের মিলিটারিসুলভ নিয়মানুবর্তিতা আলবার্টের কাছে অসহ্য ছিল। তাছাড়া সেই সময়ে জার্মান নাগরিকদের সৈন্যদলে দু’বছর কাজ ছিল বাধ্যতামূলক, তিনি তার থেকেও মুক্তি চেয়েছিলেন। পাঁচ বছর পরে তিনি সুইস নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। পরে দীর্ঘদিন জার্মানিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছেন, যেখানে জার্মান নাগরিকত্ব ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু আইনস্টাইন রাজি হননি, এবং কর্তৃপক্ষও বিষয়টা নিয়ে চোখ বুজে ছিলেন। আইনস্টাইন তাঁর নোবেল পুরস্কার নিতে যাননি, অনুষ্ঠানটির সময় তিনি সুইস পাসপোর্ট নিয়ে জাপানে। তাঁর হয়ে জার্মানি না সুইজারল্যান্ড কোন দেশের রাষ্ট্রদূত পুরস্কারটি নেবে, তাই নিয়েও সমস্যা হয়েছিল।
হেরম্যান আগে পরে অনেক ঘটনাতেই বুঝেছিলেন ছেলের মত সহজে পরিবর্তন হয় না। পরবর্তীকালেও আমরা দেখেছি যে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের মধ্যে একমাত্র আইনস্টাইনই তখনও মনে করতেন যে সেটি শেষ সত্য নয়। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর আলোচনার কথা হয়তো অনেকেই পড়েছেন। একে একগুঁয়েমিই বলতেই পারি। প্রসঙ্গত বলে রাখি, জার্মান নাগরিকত্ব ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ইহুদি ধর্মও ত্যাগ করেছিলেন।
গুরুগম্ভীর অফিসের সংকীর্ণ গণ্ডি ছেড়ে বিভিন্ন সময়ে নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকেছেন আইনস্টাইন। ১৯৩৩ সালে হিটলার জার্মানিতে ক্ষমতায় আসার সময় তিনি বার্লিন একাডেমি অব সায়েন্সের অধ্যাপক ছিলেন। ইহুদী হওয়ার কারণে আইনস্টাইন সে সময় দেশ ত্যাগ করে আমিরেকায় চলে আসেন এবং আর জার্মানিতে ফিরে যাননি। এ সময় পদার্থবিজ্ঞানী বন্ধু লিও শিলার্ড ও ইউজিন উইগনার আইনস্টাইনকে জানান যে, হিটলারের অধীনস্ত বিজ্ঞানীরা ইউরোনিয়াম নিয়ে গবেষণা করছে। ফলে জার্মানিতে পারমাণবিক বোমা তৈরির বিরাট সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তার আগেই যেন আমেরিকা এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয় সেজন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে বিজ্ঞানীদের তরফ থেকে চিঠি পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য তারা আইনস্টাইনকে অনুরোধ জানান।
ঐ সময়েই এ বিষয়ে একটা খসড়া তৈরি করা হয় এবং আইনস্টাইনের স্বাক্ষরে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নিকট পাঠানো হয়। এর ফলশ্রতিতে ম্যানহাটন প্রজেক্ট নামে নিউক্লিয়ার বোমা তৈরির একটা বৃহৎ কর্মসূচি শুরু করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।
এই চিঠি কাহিনীর উদ্যোক্তা আইনস্টাইন নন, মূল হলেন হাঙ্গেরীয় পদার্থবিজ্ঞানী লিও শিলার্ড। আইনস্টাইন প্রথমে এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত থাকতে চাননি। তিনি বিশ্বাসই করতেন না তার E=mc^2 সূত্রটি পরীক্ষাগারে প্রমাণ করা সম্ভব, আর সেটা দিয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব হবে।
ওপেনহাইমার তাকে পুরো প্রক্রিয়াটা বোঝালেন। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে পারমাণবিক বোমার ভয়াবহতা নিয়ে তিনি আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। তিনি এই প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও জামার্নিকে রুখে দেওয়ার তাগিদ থেকে প্রকল্পের সাথে যুক্ত হন, যেটাকে পরে তিনি তার জীবনের বড় ভুল হিসেবে অভিহিত করেন। তবে এ প্রকল্পের সাথে সরাসরি কখনো যুক্ত ছিলেন না বলে বিভিন্ন সময়ে তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
১৯৪০ সালে আমেরিকার নাগরিকত্ব পান আইনস্টাইন। মাত্র ৪০ বছর বয়সে চুল সাদা হয়ে যাওয়া মানুষটি এক সময় শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান মণীষী হিসেবে স্বীকৃত হন সারা বিশ্বে। বাকি জীবন তিনি আমেরিকাতেই কাটান। ১৯৫৫ সালে প্রয়াত হওয়ার আগে পর্যন্ত তার ৫০টিরও অধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়। ১৯৯৯ সালে টাইম পত্রিকা আইনস্টাইনকে ‘শতাব্দীর সেরা ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করে। @Partha Sarathi Chandra
৩৩
প্রশ্ন নেই তো বিজ্ঞান নেই, প্রগতি নেই।
মানুষ বিজ্ঞান পড়ে এবং বোঝে—দিন–রাত কেন হয়, গ্রহণ কেন লাগে, তারারও জন্ম হয় এবং এক সময় তাদেরও মৃত্যু হয়।
ইতিহাস পড়লে জানা যায় মানুষ কীভাবে প্রস্তর যুগ থেকে আধুনিক যুগে পৌঁছেছে। শুরুতে মানুষ প্রকৃতিকে ভয় পেত। বজ্রপাত, ঝড়, ভূমিকম্প—এসব দেখে মনে করত কোনো অদৃশ্য শক্তি আছে। এই ভয় এবং অজ্ঞতা থেকেই দেবতার ধারণার জন্ম হয়।
সমাজের প্রাথমিক পর্যায়ে জমি, ধন-সম্পত্তির স্পষ্ট কোনো বিভাজন ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু চালাক ও বুদ্ধিমান মানুষ সমাজের কাঠামো নিজেদের স্বার্থে গড়ে তুলতে শুরু করে। তারা জমি ও সম্পদ নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করে এবং মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ধর্মকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।
তারপর তৈরি হলো জাতপাত, কর্মবিভাগ এবং সামাজিক স্তরবিন্যাসের ব্যবস্থা, যাতে ক্ষমতা ও সম্পদ একই গোষ্ঠীর মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিরাপদ থাকে। এভাবেই এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বংশানুক্রমিক হয়ে উঠল।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—পড়াশোনা করা মানুষও কেন অনেক সময় এই ব্যবস্থার বাইরে বেরোতে পারে না?
ধর্ম কখনো কখনো এমন এক ধরনের বিশ্বাস বা মানসিক আফিম দেয়, যাতে মানুষ প্রশ্ন শুনতেই চায় না। আর যারা প্রশ্ন করে, তাদের সমাজদ্রোহী বা ধর্মবিরোধী বলে চুপ করানোর চেষ্টা করা হয়—কখনো সামাজিক বয়কট, কখনো ভয় দেখিয়ে, কখনো ক্ষমতার দমন দিয়ে।
কিন্তু সত্য হলো—প্রশ্নই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
যদি আইজ্যাক নিউটন ভাবতেন যে আপেল পড়া “ঈশ্বরের লীলা”, তাহলে মহাকর্ষের সূত্র আবিষ্কার হতো না।
যদি জেমস ওয়াট মনে করতেন বাষ্পের শক্তি শুধু “ঈশ্বরের ইচ্ছা”, তাহলে শিল্পবিপ্লবও হয়তো হতো না।
অর্থাৎ প্রগতির প্রতিটি ধাপ শুরু হয় প্রশ্ন থেকে।
ইতিহাস এটাও বলে—যখন কোনো সমাজ অন্ধবিশ্বাস ও অন্ধ আস্থায় ডুবে যায়, তখন সেই সমাজ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন বাইরের শক্তি এসে সহজেই তাকে শোষণ করে, লুট করে এবং শাসন করে।
আজও অনেক সময় শাসকশ্রেণী নিজেদের সুবিধার জন্য সমাজকে ধর্ম, জাতি বা পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত করে রাখে। আর যারা প্রশ্ন তোলে, তাদের কখনো জেলে পাঠানো হয়, কখনো বদনাম করা হয়, কখনো সামাজিক চাপে চুপ করানো হয়।
কিন্তু যদি প্রশ্নই না থাকে, তাহলে বিজ্ঞানও থাকবে না।বিজ্ঞান না থাকলে প্রগতিও হবে না।
তখন আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করতে হবে—
শুধু অন্ধ আস্থার উপর ভর করে কি কোনো সমাজ সত্যিই এগিয়ে যেতে পারে?
আর যদি আমরা সবকিছুই “ঈশ্বরের ইচ্ছা” বলে মেনে নিই, তাহলে কি সত্যিই আমরা বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারি?
সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে আস্থার পাশাপাশি যুক্তি, বিজ্ঞান এবং প্রশ্ন করার সাহস দরকার।
কারণ ইতিহাস সাক্ষী—যে সমাজ প্রশ্ন করে, সেই সমাজই এগিয়ে যায়; আর যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, সে থেমে যায়।
আহ্বান:
আসুন, জাতপাত, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার ও কুশিক্ষার এই নেশা থেকে বেরিয়ে আসি। ভাবি, পড়ি এবং প্রশ্ন করার সাহস গড়ে তুলি—কারণ প্রশ্নই মানুষ ও সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। @ Manindranath Sil
৩৪
আবিষ্কর্তা ভেবেছিলেন শিশুদের খেলনা‚ কিন্তু দেখা দিল যুগান্তকারী যন্ত্র রূপে!
এক সন্ধ্যায় খাওয়া দাওয়ার পর থমাস আলভা এডিসন এবং তাঁর সহযোগীরা গল্পগুজব করে চলেছেন। সে সময় টেলিগ্রাফের উন্নতি নিয়ে কাজ করছেন তাঁরা । টেলিগ্রাফ মেসেজ কীভাবে রেকর্ড করা যায়, সে নিয়ে পুরোদস্তুর পরীক্ষা চলছে । তখনই মাথায় আসে. টেলিফোনের মাউথপিসে কথা বললে, সেটা কি রেকর্ড করা যায় না ? এডিসনের সহযোগীরা অনেকেই মাথা নাড়লেন । অনেকেই না বুঝেই সম্মতি জানালেন । এডিসনের পরামর্শে সে কাজে লেগে পড়লেন কয়েকজন ।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সাফল্য এল । একজন টেলিফোনের মাউথ পিসে বললেন, ‘Mary had a little lamb’। সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা রেকর্ড হল - ‘অ্যারি অ্যাড এল অ্যাম’। সকলেই উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়লেন। তবে উচ্ছ্বাসে ভেসে গেলেন না। রাতভর তাঁরা কাজ করলেন। আবিষ্কার হল নতুন রেকর্ডিং মেশিনের।
কিন্তু কী হবে এই নয়া মেশিনের নাম ? তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়ে গেল। কেউ বলল ‘অমফ্লেগ্রাফ’ (Omphlegraph), কেউ বলল ‘অ্যান্টিফোন’(Antiphone), আবার কেউ বলল ‘ডিডাসকো ফোন’ (Didaskophone)। তবে শেষ পর্যন্ত এই নতুন যন্ত্রের নাম হল ফোনোগ্রাফ । এই তথ্য পাওয়া যায়, এডিসনের ল্যাবোরেটরি থেকে উদ্ধার হওয়া লগ বুক থেকে। ১৮৭৭ সালের জুলাইয়ে এই লগ বুকে কে বা কারা লিখে গিয়েছেন এই তথ্য।
জুলাইয়ে আবিষ্কার হলেও ফোনোগ্রাফের পেটেন্ট পেতে সময় লেগে যায় পরের বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ১৯ ফেব্রুয়ারি থমাস আলভা এডিসন ফোনোগ্রাফের পেটেন্ট পান। আমেরিকার মানুষের কাছে এডিসনের পরিচিতি হয় ‘দ্য উইজার্ড অফ মেনলো পার্ক’। নিউ জার্সির মেনলো পার্কে বসেই ফোনোগ্রাফ আবিষ্কার করেছিলেন এডিসন।
তবে ফোনোগ্রাফ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে কিন্তু স্পষ্ট ধারণা ছিল না এডিসনের। তিনি সব সময় বলতেন, “Anything that won’t sell, I don’t want to invent.” বিশ্বাসও করতেন। কিন্তু ফোনোগ্রাফের ব্যবহার নিয়ে সুস্পষ্ট ধারনা করতে পারেননি। তাই ফোনোগ্রাফের প্রাথমিক ব্যবসায়িক স্লোগান কী হওয়া উচিত, তা তিনি ঠাওর করতে পারেননি।
ফোনোগ্রাফ বিক্রির জন্য একটি কোম্পানি তৈরি করেন এডিসন। কোম্পানির নাম এডিসন স্পিকিং ফোনোগ্রাফ কোম্পানি। সেই কোম্পানি তার বিজ্ঞাপনে জানায়, শ্রুতিলিপি বা ডিকটেশন নেওয়ার জন্য আদর্শ এই মেশিন। শিশুদের ভাল খেলনা তৈরিতে (কোনও পুতুলকে কাঁদাতে বা কথা বলাতে) কিংবা পরিবারের সকল সদস্যদের গলার স্বর রেকর্ড করে রাখার জন্য একটা দারুণ যন্ত্র।
তবে কিছুদিনের মধ্যেই এ যে কী যন্ত্র, তা বোঝা গেল। বুঝতে পারলেন এডিসন নিজেও। এই যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে আমেরিকায় রেকর্ডিং একটা শিল্প হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে এই যন্ত্রের ওপর ভর করেই কাজ শুরু করলেন আরও অনেকে। তৈরি হল আরও আধুনিক ফোনোগ্রাফ। ফোনোগ্রাফে শুরু হল গান রেকর্ডিং-ও।
লেখার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে একটি কথা না উল্লেখ করলেই নয় - প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এডিসনের কোম্পানি ফোনোগ্রাফের একটি স্পেশাল মডেল তৈরি করে। সেই ফোনোগ্রাফের দাম ধার্য হয় ৬০ ডলার। অনেক সেনা দলই সেই ফোনোগ্রাফ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলেন। সেখানে গান শুনেই অবসর সময় কাটাতেন সেনারা।
আর শেষে আরেকটা কথা না বললেই নয়। এডিসন যদি ফোনোগ্রাফ না তৈরি করতেন, তাহলে হয়তো লতা মঙ্গেশকরের কিন্নর কণ্ঠ পৌঁছে যেত না ঘরে ঘরে। তৈরি হতেন না রফি, লতা, কিশোর, রাহুল দেব বর্মণ @Partha Sarathi Chandra
৩৫
জগদীশ চন্দ্র বসু - ভারতীয় উপমহাদেশে বিজ্ঞান চর্চ্চার জনক।
বৈজ্ঞানিক জগদীশ চন্দ্র বসুর অবদান মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তিনি একাধারে পদার্থবিজ্ঞান এবং উদ্ভিদবিদ্যায় অসামান্য অবদান রেখে নিজের নাম শুধু বাঙালির ইতিহাসে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও স্বর্ণাক্ষরে লিখে গিয়েছেন।
বিজ্ঞানের একজন অমর প্রতিভা জগদীশ চন্দ্র বসু প্রথম মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির ওপর সফল গবেষণা করেন যার ফলশ্রুতিতে আবিষ্কৃত হয় রেডিও।
তাঁর উল্লেখযেযাগ্য আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে মাইক্রোওয়েভ রিসিভার ও ট্রান্সমিটারের উন্নয়ন, এবং ক্রেসকোগ্রাফ যন্ত্র যা দিয়ে গাছের বৃদ্ধি নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা যায়। উদ্ভিদের জীবনচক্র তিনি প্রমাণ করেছিলেন।
গাছের প্রাণ আছে, একথা সারা বিশ্বকে জানিয়েছিলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। আমাদের গ্রহের একমাত্র উপগ্রহ কোনটি? চাঁদ তো? সেই চাঁদের গায়ে একটি গর্তের নাম রাখা হয়েছে জগদীশ বোসের নামে। তাঁর স্মরণে সেই গর্তের নাম রাখা হয়েছে 'বোস'। একথা কি এতদিন জানতেন?
জগদীশ চন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর শহরে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে বিক্রমপুরের রাঢ়িখালে। তাঁর পিতার নাম ভগবান চন্দ্র বসু মাতা বামা সুন্দরী দেবী। পিতা ভগবান চন্দ্র বসু ছিলেন তৎকালীন ব্রাহ্ম সমাজের একজন বিশিষ্ট সদস্য। চাকরি করতেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের এবং একইসাথে ছিলেন ফরিদপুর, বর্ধমানসহ কয়েকটি এলাকার সহকারী কমিশনার। পিতার চাকরির সুবাদে জগদীশ চন্দ্র বসু ছেলেবেলার বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করেন ফরিদপুরে।
পড়াশুনার হাতেখড়িও হয় ফরিদপুরের এক জেলা স্কুলে। স্কুল বন্ধ থাকাকালীন সময় জগদীশ চন্দ্র বসু ছুটে আসতেন গ্রামের বাড়ি বিক্রমপুর শ্রীনগরের রাঢ়িখালে। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা প্রমত্ব পদ্মার ঢেউ তার মনকে স্পর্শ করত। সময় সুযোগ পেলেই ছুটে যেতেন পদ্মার তীরে। জলরাশির ঢেউ, নদীর বিশালতা তার উপরে ভেসে থাকা নৌকা, জাহাজ তার সহজ সরল মনে প্রশ্ন তারিয়ে বেড়াত সবসময়।
এরপর ১১ বছর বয়সে তিনি কোলকাতা চলে যান। ১৮৬৯ সালে জগদীশ চন্দ্র বসু কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ভর্তি হন। ১৬ বছর বয়সে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উর্ত্তীন হন সর্বোচ্চ মেধা তালিকায় বৃত্তি নিয়ে। ১৮৭৭ সালে এফ.এ. পাশ করেন। সেখানে তখন বিজ্ঞান নিয়ে ভারতবাসীকে জাগানোর চেষ্টা করছেন ফাদার ইউজিন ল্যাকো। বিজ্ঞানেই মুক্তি, এই ছিল তাঁর যুক্তি। জগদীশ হয়ে উঠলেন তাঁর ভক্ত।
পিতা ভগবান চন্দ্র বসুর ইচ্ছে ছিল ছেলেকে চিকিত্সক বানাবেন। কিন্তু বাদ সাধলেন তাঁর মা। কারণ, তার কিছুদিন আগে মাত্র ১০ বছর বয়সে জগদীশের ছোট ভাই মারা যায়। মায়ের মন অবশিষ্ট সন্তান সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে লন্ডন যাক, এটি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। অন্যদিকে, ভগবান চন্দ্র বসু অসুস্থ হয়ে পড়ায় বলতে গেলে ঘরবসা। আধা মাইনেতে সংসার চলে। যেসব উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন গ্রামের মানুষদের জন্য তার বেশির ভাগই ব্যর্থ হওয়ায় তিনি অনেক ঋণে জর্জরিত। মন খারাপ করে জগদীশ দেশেই থাকবেন বলে যখন সিদ্ধান্ত নেন তখন আবার মায়ের মন পরিবর্তন হয়। বনসুন্দরী দেবী নিজের গয়না বিক্রি করে ও তাঁর সঞ্চিত অর্থ দিয়ে, স্বপ্ন পূরন করার লক্ষে ১৮৮০ সালে ডাক্তারি পড়ার জন্য জগদীশ চন্দ্র বসুকে বিদেশে পাঠান। ছেলেকে ডাক্তারি পড়ার জন্য বিলেতে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে জগদীশ আক্রান্ত হলেন জ্বরে, শরীর হয়ে গেল দুর্বল। বোঝা গেল ডাক্তারি পড়াটা কঠিন হয়ে যাবে।
বিজ্ঞানের স্নাতক হন তিনি ১৮৭৯ সালে। ১৮৮১ সালে শিক্ষা বৃত্তি নিয়ে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই সময় জগদীশের স্ত্রীর ভাই বাংলার প্রথম রাংলার, আনন্দ মোহন বসু জগদীশকে কেমব্রিজে ভর্তি হতে সহায়তা করেন। আনন্দ মোহন বসু ১৮৭৪ সালে প্রথম ভারতীয় হিসেবে গণিতে ট্রাইপস পান। কেমব্রিজে আর লন্ডনে জগদীশের শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন লর্ড রেইলি, মাইকেল ফস্টার, সিডনি ভাইন, ফ্রান্সিস ডারউইনের মতো বিজ্ঞানীরা। ১৮৮৪ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৃতি বিজ্ঞানে বি.এ. এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এস.সি. ডিগ্রি অর্জন করে জগদীশ চন্দ্র বসু ভারত ফিরে আসেন।
জগদীশচন্দ্র যখন কেমব্রিজের ছাত্র, ঠিক সেই সময়ে বাংলার আরেক তরুণ প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এডিনবার্গের ছাত্র। তিনি সেখানে তখন রসায়নবিদ্যার পাঠ নিচ্ছেন। লন্ডনে থাকাকালীন তাদের দুজনের বন্ধুত্ব হয়।
কেম্ব্রিজ কলেজের অধ্যাপক লর্ড র্যালে ছাত্র জগদীশের ভিতর বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর সন্ধান পান। তার অনুপ্রেরনায় প্রকৃত বিজ্ঞানে অনুপ্রানিত হন। ১৮৮৫ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে ভৌত বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে জগদীশ চন্দ্র বসু নিযুক্ত হন। ১৮৮৭ সালে ২৭শে ফেব্রয়ারি জগদীশ চন্দ্র বসু অবলা বসুকে বিয়ে করেন। অবলা বসু ছিলেন সে সময়ের হিন্দু সমাজের বিখ্যাত সংস্কারক দূর্গা মোহন দাসের কন্যা ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ভাইঝি।
‘ভারতীয়রা পড়াতে পারে না’ - এই অজুহাতে কলেজের সেই সময়কার অধ্যক্ষ চার্লস টাউনি এবং বাংলার পাবলিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্যার আলফ্রেড ক্রফট প্রবল বিরোধিতা করলে জগদীশ চন্দ্র বসু ভারতের ভাইসরয় লর্ড রিপনের শরণাপন্ন হন। শেষমেশ, ভাইসরয়ের হস্তক্ষেপে তিনি শিক্ষক হলেও চার্লস টাউনি এবং স্যার আলফ্রেড ক্রফট তাঁকে ‘অস্থায়ীভাবে’ নিয়োগ দেন। এমনকি তাঁর বেতন নির্ধারণ করা হয় একই পদে আসীন ব্রিটিশ অধ্যাপকদের অর্ধেক। এমনকি তাঁকে গবেষণাগারে একটা কাজ করারও সুযোগ দেওয়া হতো না। সাহসী জগদীশ অর্ধেক বেতনের নিয়োগপত্র অগ্রাহ্য করে কলেজে যোগ দেন এবং একনাগাড়ে তিন বছর বেতন নিতে অস্বীকার করেন। এই সময়কালে নিজের মেধা ও পাণ্ডিত্য দিয়ে তিনি প্রায় সবার মন জয় করেন। অন্যদিকে নিজের বাড়িতেও একটি গবেষণাগার গড়ে তোলেন। তিন বছর পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে সসম্মানে, পূর্ণবেতনে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়। আর এই নিয়োগ দেওয়া হয় ভূতাপেক্ষা, অর্থাৎ তিন বছর আগে থেকে। তাঁর তিন বছরের বকেয়া বেতনও পরিশোধ করা হয়। সেই টাকা দিয়ে জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর বাবার ঋণ শোধ করেন।
প্রেসিডেন্সি কলেজে তখন সেভাবে গবেষণার কোনও সুযোগ নেই। একদিন তিনি স্থানীয় একজন ঝালাই মিস্ত্রিকে ডেকে নিয়ে এলেন কলেজে আর তাকে দিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় যন্ত্র তৈরি করিয়ে গড়ে তুললেন নিজের খরচে গবেষণাগার। আর ক্লাস শেষে সেখানেই নিভৃতে ‘বিজ্ঞানচর্চা’ করতে শুরু করলেন। জগদীশ একমনে নিজের মত করে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। একদিন হঠাৎ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে জগদীশের সহকর্মী হিসেবে হাজির হলেন প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। দেশে ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজে জগদীশচন্দ্রের পর 'দ্বিতীয় ভারতীয় বিজ্ঞানের অধ্যাপক' হিসেবে যোগ দিলেন প্রফুল্ল চন্দ্র রায়।
সেই সময়ে জগদীশ চন্দ্র বসুর গবেষণার আগ্রহের বিষয়বস্তু ছিল ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ, যা 'মাইক্রোওয়েভ' নামে পরিচিত। সে সময় তিনি ‘কোহেরার’ নামে একটি ধারণাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে দেখেন সেটিকে মাইক্রোতরঙ্গের গ্রাহক যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
প্রফুল্লচন্দ্র জগদীশচন্দ্রের কাজে উৎসাহ ও পরামর্শ দিতেন। একদিন জগদীশচন্দ্র কলেজের ল্যাবরেটরিতে তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকে ডেকে একটি আবিষ্কার দেখালেন। অধ্যাপক প্রফুল্লচন্দ্রের ঘরে রাখা হল একটি ‘প্রেরক যন্ত্র’। আর ‘আলেকজান্ডার পেডলার’ নামে কলেজের আর একজন অধ্যাপকের ঘরে রাখা হল ‘গ্রাহক যন্ত্র’। দুটি ঘরের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৭০ ফুট আর তার মাঝখানে মোটা দেওয়াল বিদ্যমান। 'প্রেরক যন্ত্র’ থেকে অদৃশ্য বিদ্যুৎ তরঙ্গ গিয়ে অন্য ঘরের 'গ্রাহক যন্ত্রে'র মাধ্যমে একটি পিস্তলে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিল। আর তা দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল।প্রফুল্লচন্দ্র জড়িয়ে ধরলেন জগদীশকে।
বৈদ্যুতিক তরঙ্গের ওপর তাঁর গবেষণার কাজ তিনি শুরু করেন ১৮৯৪ সালে। এর ফলশ্রুতিতে ১৮৯৬ সালে লণ্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে 'ডক্টর অফ সায়েন্স' উপাধি পান।
১৮৯৪ সালে তিনি কলকাতায় প্রথম বিনা তারে বার্তা প্রেরণ এবং তা গ্রহণ করার একটি কৌশল দেখিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। বড়লাটের হস্তক্ষেপে তাঁর এই আবিষ্কার ইংল্যান্ডে দেখানোর জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে সহায়তা করলে তিনি লন্ডনে গিয়ে সেটি প্রদর্শন করেন। ১৮৯৬ সালের ২৪ জুলাই লন্ডনে রয়্যাল সায়েন্স সোসাইটিতে তিনি তাঁর আবিষ্কার সব বিজ্ঞানীর সামনে তুলে ধরেন। এমনকি তিনি তাঁর পরীক্ষার খুঁটিনাটি এত বিশদভাবে তুলে ধরেন যে তা থেকে যে কেউ পরীক্ষাটি পুনরাবৃত্তি করতে পারবেন।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে কলকাতার সেই বিনা তারে বার্তা প্রেরণের ঘটনাটিই প্রথম। পরে লন্ডনেও তিনি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি তাঁর উদ্ভাবনের কোনো ‘পেটেন্ট’ বা ‘স্বত্ব’ করেননি। কারণ, কর্ণ ছিল তাঁর আদর্শ। তাঁর সব কাজকর্ম হবে মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য, পিছিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। বলা যায়, জগদীশ চন্দ্র বসু হচ্ছেন পৃথিবীর প্রথম মুক্ত দর্শনের অধিকারী বিজ্ঞানী।
উদ্ভিদও যে তাপ, শীত, আলো, শব্দ ও অন্যান্য অনেক বাহ্যিক উদ্দীপনায় সাড়া প্রদান করতে পারে সেই কথা জগদীশ চন্দ্র বসুই প্রমাণ করে দেখালেন। আর এই প্রমাণের জন্য নিজেই তৈরি করলেন 'ক্রিস্কোগ্রাফ' নামক একটি যন্ত্র। আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানি সহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে বক্তৃতা দিয়ে সস্ত্রীক জগদীশ দেশে ফিরলেন, স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতায় ফেরার ঠিক দু’মাস পরে। আশ্চর্যের বিষয় বসু দম্পতিকে অভ্যর্থনা জানাতে কয়েকজন আত্মীয় ছাড়া আর কেউ রেল ষ্টেশনে উপস্থিত ছিল না। তবে হ্যাঁ পরিবারের লোকজনবাদে একজন এসেছিলেন, ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার। ষ্টেশনেই মহেন্দ্রলাল জড়িয়ে ধরলেন জগদীশকে। তাঁর দুচোখে জল। এগিয়ে গিয়ে অবলাকে বললেন, "তুই ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়েছিলি বলে তোকে আমি একদিন বকুনি দিয়েছিলুম, মনে আছে?’’ অবলা’ বললেন, "হ্যাঁ মনে আছে।" মহেন্দ্রলাল বলেলেন, "তুই ঠিক করেছিলি সেদিন মা, ডাক্তারনী হলে কি আর এমন স্বামী পেতিস! তুই ওকে থামতে দিস না। এই তো সবে শুরু, জগদীশ আমাদের নিউটন, গ্যালিলিও হবে।"
জগদীশ চন্দ্র বসুকে বলা হয় ভারতীয় উপমহাদেশে বিজ্ঞান চর্চ্চার জনক। বাংলাদেশের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা মনে করেন বেতার যন্ত্রের প্রথম উদ্ভাবক হিসাবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। যদিও বেতারের আবিষ্কারক হিসাবে বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন মার্কনি, কারণ জগদীশ বসু এটার আবিষ্কারকে নিজের নামে পেটেন্ট করেননি। এ কারণেই এই আবিষ্কারের জন্য তাঁর দাবি স্বীকৃত হয়নি।
বেতার কাজ করে বৈদ্যুতিক চুম্বক তরঙ্গের ভিত্তিতে, যে তরঙ্গ নিয়ে জগদীশ বসু গবেষণা করেছিলেন। যদিও তাঁর আগে এবং তাঁর সময়ে এই তরঙ্গ নিয়ে গবেষণার কাজ করছিলেন মার্কনি সহ বিভিন্ন দেশে একাধিক বিজ্ঞানী। কিন্তু কলকাতার বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান বসু বিজ্ঞান মন্দিরের গবেষক ড. দিবাকর সেনের মতে, জগদীশ বসুই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ।
"মাইক্রোওয়েভ আবিষ্কারের ব্যাপারটা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আজকের দিনে মহাকাশ বিজ্ঞানে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে, টেলিভিশন সম্প্রচারে এবং বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে মাইক্রোওয়েভ কাজে লাগে। কম্যুনিকেশনের (যোগাযোগ) ক্ষেত্রে আরও বিশেষ করে এই তরঙ্গ কাজে লাগে।"
"দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যখন সাবমেরিন এলো, রাডার এলো, তখন মানুষ বুঝতে পারল এই মাইক্রোওয়েভের গুরুত্ব কতখানি। তিনি যখন এই আবিষ্কার করেছিলেন, তখন তার কোন ব্যবহারিক প্রয়োগ ছিল না। মার্কনি এবং তদানীন্তন বিজ্ঞানীরা যোগাযোগের জন্য যে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ ব্যবহার করেছিলেন তা তারা করেছিলেন লঙ্গার ওয়েভ (দীর্ঘ তরঙ্গ) ব্যবহার করে - মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে নয়।"
অর্থাৎ জগদীশ বসুর আবিষ্কার ছিল অতি ক্ষুদ্র বেতার তরঙ্গ, যার থেকে তৈরি হয়েছে আজকের মাইক্রোওয়েভ, যা পরবর্তীতে 'সলিড স্টেট ফিজিক্স'-এর বিকাশে সাহায্য করেছিল। পরে তিনি পদার্থ বিজ্ঞানের আরও গুরুত্বপূর্ণ নানা আবিষ্কার করেন যেমন 'ডিটেক্টর', 'রিসিভার' ইত্যাদি।
"চৌকো মুখ ফানেল আকৃতির একটি হর্ন অ্যান্টেনা তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, যা আজ বিশ্বে যুদ্ধকালীন যোগাযোগ, বা রাডার যোগাযোগের জন্য অপরিহার্য। এছাড়াও অনেক ধরনের রিসিভার উনি তৈরি করেছিলেন যা আজও বহুল ব্যবহৃত," বলেছেন ড. দিবাকর সেন।
আধুনিক পদার্থ বিজ্ঞানের অত্যন্ত দুরূহ বিষয়ে তাঁর আবিষ্কার নিয়ে ইংল্যাণ্ডে বক্তৃতা দিয়ে বিশ্ব-খ্যাত বহু বিজ্ঞানীকে চমকে দিয়েছিলেন জগদীশ চন্দ্র বসু। লণ্ডনের একটি দৈনিক পত্রিকা 'ডেইলি এক্সপ্রেস' তাঁকে গ্যালিলিও-নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানীর স্বীকৃতি দিয়েছিল।
লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর পদার্থবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে কাজ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। এর অন্যতম কারণ হলো, তিনি তখন ‘ধাতব বস্তুর’ প্রাণ আছে কি না তা ভাবতে থাকেন। তবে তাঁর এই ভাবনাটা ক্রমেই উদ্ভিদের দিকেই চলে যায়।
ফলে মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে বিনা তারে বার্তা প্রেরণের জগদীশের সাফল্য অনেকে ভুলে যান। অন্যদিকে উদ্ভিদের জীবনের বহিঃপ্রকাশের কারণে তিনি সেই দিকে বেশি কার্যকরী হন।
বর্তমানে, বিশ্বের তাবত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুকেই বিনা তারে বার্তা প্রেরণের জনক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে জগদীশ চন্দ্র বসু কাজ করেছেন মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে এবং রেডিও যন্ত্রের উদ্ভাবক মার্কনি কাজ করেছেন বেতারতরঙ্গ নিয়ে।
অনেকেরই ধারণা, জগদীশ চন্দ্র যদি মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে তাঁর কোহেরারকে আরও এগিয়ে নিতেন, তাহলে ১৯০১ সালের প্রথম নোবেল পুরস্কারটি একজন বাঙালি পেলেও পেতে পারতেন। যে কলেজ তাঁকে নিয়োগ দিতে চায়নি, সে কলেজই তাঁকে অবসরের পরও অতিরিক্ত দুই বছর জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক হিসেবে বেতন দিয়েছে। ১৯১৫ সালে অবসরের পর তাঁকে প্রফেসর ইমেরিটাস মর্যাদা দিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার ১৯০৩ সালে তাঁকে 'কমান্ডার অব ইন্ডিয়ান এম্পায়ার' উপাধি দেয়। ১৯২৮ সালে তিনি 'রয়্যাল সোসাইটি'র ফেলো নির্বাচিত হন।
কিন্তু পদার্থ বিজ্ঞানে এমন অসাধারণ অবদান সত্ত্বেও জগদীশ চন্দ্র বসু সারা বিশ্বে খ্যাতিলাভ করেছিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসাবে।
ড. দিবাকর সেন বলেন, জগদীশ বসু আদৌ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ছিলেন না। কিন্তু ওয়্যারলেস রিসিভিং ইন্সট্রুমেন্ট (তার-বিহীন গ্রাহক যন্ত্র) নিয়ে কাজ করতে করতে তিনি একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলেন।
"তিনি দেখলেন একটা টিনের তারকে মোচড় দিলে তার ভেতরে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাত্রায় যেমন বিদ্যুত তরঙ্গ তৈরি হয়, তেমনই আঘাত করলে গাছের ভেতরেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, একই ঘটনা ঘটে প্রাণী দেহেও। উনি তখন প্রশ্ন তুললেন তাহলে জীবনের সংজ্ঞা কী হবে? এবং এখান থেকেই জন্ম নিল আধুনিক জৈব-পদার্থ বিজ্ঞান।"
জনপ্রিয় ধারণা হল তিনি সবার আগে আবিষ্কার করেছিলেন গাছপালার প্রাণ আছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা বলেছেন অতি প্রাচীন কাল থেকে ভারতবর্ষের মানুষ বিশ্বাস করতো গাছ একটা জীবন্ত স্বত্ত্বা। একই বিশ্বাস ছিল অ্যারিস্টটলেরও। তাহলে জগদীশ বসুর আবিষ্কারে নতুনত্ব কোথায় ছিল?
"গাছের যে প্রাণ আছে তার কিছু স্থূল লক্ষ্মণ সম্পর্কে মানুষ জানত, যেমন গাছ জন্ম নেয়, বড় হয়, একদিন মরেও যায়। কিন্তু বাইরের কোন উদ্দীপক বস্তু ব্যবহার করলে বা গাছকে আঘাত করলে গাছ কীভাবে সাড়া দেয়, সেটা জগদীশ বসু যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করে দেখান, যা উদ্ভিদ বিজ্ঞানের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা আবিষ্কার," বলেন ড. শর্মা।
মে ১০, ১৯০১। লন্ডনের রাজকীয় বিজ্ঞান সমিতির কেন্দ্রীয় মিলনায়তন। দীর্ঘদিন এখানে এত লোকের ভিড়ে কোনো বিজ্ঞানী বক্তব্য দেননি। এই বিজ্ঞানী আবার এসেছেন সাত সাগরের ওপার অর্থাৎ ভারত থেকে। দর্শকদের মধ্যে রয়েছেন লর্ড রেইলির মতো বিজ্ঞানকুল শিরোমণি। দর্শকেরা অবশ্য খুব বেশি চমৎকৃত হলেন না পরীক্ষার বন্দোবস্ত দেখে। একটি গাছের মূল একটি বোতলের জলের মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা, গাছ থেকে কী সব তারটার টেনে এটা কিম্ভূতদর্শন যন্ত্রের সঙ্গে লাগানো।
দর্শকদের জ্ঞাতার্থে বিজ্ঞানী জানালেন, বোতলের ভেতরের তরল পদার্থটি জল নয়, এটি ব্রোমাইড সলিউশন। উপস্থিত বিজ্ঞানের লোকেরা বুঝলেন অচিরেই গাছটি মরবে। কারণ, হাইড্রোব্রোমিক অ্যাসিডের এই লবণের দ্রবণ সহ্য করার ক্ষমতা গাছের নেই। তাতে অবশ্য তাঁদের ভ্রুক্ষেপ নেই। তাঁদের লক্ষ্য কিম্ভূত যন্ত্রটি।
বিজ্ঞানী গাছের মূলকে সলিউশনে দিয়ে দিলেন আর চালু করে দিলেন তাঁর যন্ত্র। চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি কাগজের ওপর মানুষের হৃদযন্ত্রের ওঠা-নামার মতো গ্রাফ আঁকতে শুরু করল। তবে সেটিতে তেমন কোনো চাঞ্চল্য নেই। পেন্ডুলামের মতো একই নিয়মের ওঠা-নামা। কিন্তু একটু পরই যন্ত্রের গ্রাফে ব্যাপক চাঞ্চল্য দেখা দিল। গ্রাফ বেশ দ্রুত ওঠা-নামা শুরু করল। মনে হচ্ছে কার সঙ্গে যেন লড়ছে গাছটি। তবে একসময় সব চাঞ্চল্য থেমে গেল।
উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা দেখলেন, গাছটি মরে গেছে!
উপস্থিত বিজ্ঞানী ও দর্শকেরা সবাই চমৎকৃত হলেন ভারতীয় বাঙালি বিজ্ঞানীর এই যন্ত্রে। লর্ড রেইলি উঠে গিয়ে দর্শক সারিতে বসা বিজ্ঞানীর স্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে এলেন।
উদ্ভিদেরও প্রাণীদের মতো প্রাণ আছে, এই ধারণা কিন্তু নতুন নয়। কারণ, সবাই দেখেছে বীজ থেকে চারা হয়, সেটি মহিরুহ হয় এবং একসময় মরে যায়। কিন্তু উদ্দীপনায় উদ্ভিদও প্রাণীর মতো প্রতিক্রিয়া করে, জোর করে মেরে ফেলা হলে আর্তচিৎকার করে - এমনটা কেউ এর আগে ভাবেননি। ভেবেছেন ওই বাঙালি বিজ্ঞানী।
গাছ যে বাইরের আঘাতে বা তাকে উত্তেজিত করলে তাতে সাড়া দেয় সেটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করার জন্য জগদীশ বসু সূক্ষ্ম সব যন্ত্র্র সাধারণ কারিগর দিয়ে তৈরি করেছিলেন যেগুলি কলকাতার বসু বিজ্ঞান মন্দিরে সংরক্ষিত রয়েছে।
এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন তিনি যা দিয়ে দেখিয়েছিলেন একটা গাছ এক সেকেণ্ডে কতটা বাড়ে। তাঁর আবিষ্কৃত 'ক্রেসকোগ্রাফ' যন্ত্র উদ্ভিদদেহের সামান্য সাড়াকে লক্ষগুণ বৃদ্ধি করে প্রদর্শনের ক্ষমতা রাখত।
তাঁর গবেষণা জড় ও জীব জগত সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিয়েছিল।
"তিনি বলেছিলেন জড় এবং জীব জগতের মধ্যে পার্থক্য খুবই সামান্য। এতই সামান্য যেখানে জড় পদার্থ জীবের মত আবার জীব জড় পদার্থের মত ব্যবহার করে," বলেছেন ড. দ্বিজেন শর্মা।
জগদীশ বসু ১৮৯৯ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত জীব ও জড় বস্তুর প্রতিক্রিয়ার ওপর গবেষণার কাজ করেছিলেন।
জগদীশ চন্দ্র বসু ভারতে বিজ্ঞান চর্চ্চা ও গবেষণার প্রসার ঘটাতে কলকাতায় ১৯১৭ সালে যে 'বসু বিজ্ঞান মন্দির' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটি সম্ভবত ভারতের অন্যতম সবচেয়ে প্রাচীন বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এটিকে তিনি একটি ‘মন্দির’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই কেন্দ্র ভারতের বহু নামকরা বিজ্ঞানীকে গবেষণার কাজে অনুপ্রাণিত করেছিল যেমন সি. ভি. রমন, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বোস, প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রমুখ।
ড. দ্বিজেন শর্মা বলেন, জগদীশ চন্দ্র বসু সবার আগে বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলায় লিখেছিলেন, যা এখনও বাংলা ভাষায় লেখা আদর্শ বিজ্ঞান বিষয়ক বই হিসাবে বিবেচিত। তাঁর 'অব্যক্ত' গ্রন্থের লেখাগুলো "বিজ্ঞান এবং সাহিত্যের একটি অপূর্ব সংশ্লেষ। আমার ধারণায় বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় গ্রন্থ তাঁর এই বই।"
আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বন্ধু। রবীন্দ্রনাথ ও জগদীশ চন্দ্র বসুর বন্ধুত্ব ছিল আমৃত্যু। একজনের হাতে বিকশিত হয়েছে বাংলায় সাহিত্য আর একজন করেছেন বাংলায় বিজ্ঞান রেনেসাঁর সূচনা।
স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু একটি চমৎকার কথা বলতেন। তিনি বলতেন, সে-ই প্রকৃত বিজ্ঞানী যে তার ল্যাবরেটরির সঙ্গে ঝগড়া করে না। অর্থাৎ, প্রকৃতিবিজ্ঞানী সব সময় নিজের ল্যাবরেটরি তৈরি করে নেন, অন্যকে দোষারোপ করেন না।
বিজ্ঞানও যে একটা সংস্কৃতি সেটা প্রমাণ করে গেছেন জগদীশ চন্দ্র বসু, বলেছেন ড. দ্বিজেন শর্মা, "তিনি আমাদের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানে তাঁর অবদান সেই অর্থে একটা বিরাট মূল্যবান সাংস্কৃতিক অবদান।"
জগদীশ চন্দ্র বসু প্রয়াত হন কলকাতায়, ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর।
অন্ধকার কুসংস্কারে আবৃত পৃথিবীর সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ধারায় এক অতুলনীয় আলোকবর্তিকা জ্বেলে গেছেন আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম মহামানব স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু। তার আবিস্কৃত ডায়োড, ট্রায়োড, ট্রানজিষ্টর থেকে যে ইলেকট্রনিক যন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা আজ কম্পিউটার পর্যন্ত বিস্তৃত। আজ থেকে প্রায় সোয়া-শো বছর আগে একটি পিছিয়ে পড়া দেশ থেকে জগদীশ চন্দ্র বসু মানবসভ্যতাকে একটি বড় ঝাঁকুনি দিয়েছেন। সেই মাত্রায় না হলেও যদি আমরা তাঁর মতো বিজ্ঞানকে ভালোবেসে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি, তাহলেই কেবল এই বিজ্ঞানীর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারব।
★ তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার :- বিবিসি বাংলা, আনন্দবাজার পত্রিকা, দেশ পত্রিকা, আনন্দ পাবলিশার্স, আনন্দমেলা, মুনির হাসান - কিশোর আলো, ডেইলি হান্ট, অনিরুদ্ধ সরকার - এশিয়ানেট নিউজ বাংলা, উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ব্লগ।
৩৬
জানা-অজানায় বিদ্যাসাগর
(১) বিদ্যাসাগর সামান্য তোতলা ছিলেন। কিন্তু সাধারণ লোকে তা সহজে ধরতে পারতো না। তা সত্ত্বেও নাকি, উনি বক্তৃতা দিতে বললে এড়িয়ে যেতেন।
(২) বিদ্যাসাগর মহাশয় মাথার সামনের দিকের খানিকটা চুল উড়িয়াদের মতো করে কামিয়ে রাখতেন।
(৩) বিদ্যাসাগর মহাশয় থানের ধুতি, মোটা চাদর ও তালতলার শুঁড়তোলা চটি পরতেন। সেই পোশাকেই সর্বত্র যেতেন, এমনটি লাটভবন, মানে বড় লাটের ভবন পর্যন্ত। একদম যাকে বলে মনে প্রাণে বাঙালী। এই বৈশিষ্ট্য পরবর্তীতে বাঙালীকে 'Simple living, high thinking'-এর দিকে উদ্বুদ্ধ করে।
(৪) উনি ব্রাহ্মণ পন্ডিত হয়েও তক্তপোশে, ফরাসে বা তাকিয়াতে ঠেসান দিয়ে বসতেন না। উনি চেয়ারে বসতেন। চৈতন্যদেব যেমন 'বহিঃ রাধা অন্তঃ কৃষ্ণ' ছিলেন, বিদ্যাসাগর মহাশয়ও তেমনি বাইরে বাঙালি ব্রাহ্মণ কিন্তু অন্তরে ছিলেন একদম খাঁটি ইউরোপিয়ান।
(৫) সবচেয়ে আশ্চর্যের কি, আমরা যখন চলচ্চিত্রে নির্মিত বিদ্যাসাগর মহাশয়কে দেখেছি, উনি তাঁর মাকে 'আপনি' বা 'তুমি' সম্বোধন করছেন। খুব স্বাভাবিক এটা। কিন্তু বাস্তব জীবনে বিদ্যাসাগর তাঁর আপন মাকে শেষ দিন পর্যন্ত 'তুই' বলে সম্বোধন করতেন। তাঁর ছাত্রদেরও 'তুই' বলতেন। সেইসব ছাত্র প্রৌঢ়-বয়স্ক ও কৃতবিদ্য হলেও তাদের পূর্বের ন্যায় 'তুই' বলেই ডাকতেন, 'তুমি' বলতেন না।
(৬) পিতামাতার প্রতি তাঁর ভক্তি প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়েছে। তিনি তাঁদেরকেই সাক্ষাৎ দেবতা-দেবী জ্ঞান করতেন। অন্যান্য ঈশ্বর বিশ্বাস তাঁর তেমন ছিল না।
(৭) বিদ্যাসাগর মহাশয় ছিলেন অত্যন্ত রসিক ও মজলিশি পুরুষ। হাসি-ঠাট্টায় ও সরস কথাবার্তায় তিনি ঘন্টার পর ঘন্টা আসর জমিয়ে রাখতে পারতেন। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাঁর বাক্যালাপ শুনতেন। সময় যে কোথা দিয়ে বয়ে যেতো কেউ বুঝতে পারতেন না।
(৮) যে বিদ্যাসাগর মহাশয় লেখবার সময় সাধু-ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা ব্যবহার করতেন না, সেই বিদ্যাসাগরই কিন্তু কথাবার্তায় সংস্কৃত শব্দ আদৌ ব্যবহার করতেন না, সংস্কৃতের ধার দিয়েও যেতেন না, এমনকি অশিষ্ট বাংলা শব্দ পর্যন্তও ব্যবহার করতে কুন্ঠিত বোধ করতেন না!
(৯) বিদ্যাসাগর মহাশয়ের হাঁটবার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। কলকাতা থেকে বীরসিংহ গ্রাম ৪০ মাইল পথ তিনি অনায়াসে পদব্রজে - খালি পায়ে কিংবা চটি জুতো পায়ে দিয়ে যাতায়াত করতেন। একবার ১৮৪৫ সালে কলকাতা থেকে কালনা ৬০ মাইল পথ একদিনে হেঁটে শ্রী তারানাথ তর্কবাচস্পতির কাছে থেকে সংস্কৃত কলেজের ব্যাকরণের অধ্যাপকের পদের জন্য দরখাস্ত নিয়ে পরের দিনেই, কলকাতাতে পায়ে হেঁটে ফিরে আসেন!
আরো একটি মজার ঘটনা থেকে জানা যায়, একবার ওনার উদরপীড়া মানে পেটের ব্যাথা দারুণ আকার ধারণ করায় চিকিৎসকেরা তাঁকে সকাল-সন্ধ্যা হাঁটার পরামর্শ দেন। তখন বিদ্যাসাগর মহাশয় চিকিৎসককে জিজ্ঞাসা করেন, 'কতক্ষণ হাঁটবো'? ডাক্তারবাবু বলেন , 'যতক্ষণ না আপনি ক্লান্ত হচ্ছেন।' সেই শুনে বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেন, "সমস্ত দিন ও রাত হাঁটলেও আমার ক্লান্তি আসবে না।' ভাবা যায়!!!
(১০) বিদ্যাসাগর অনেক দূরে কোথাও গেলে ঘোড়ার গাড়ি বা গোরুর গাড়ি চড়ে যেতেন না। পাল্কিই পছন্দ করতেন। পথে পীড়িত বা চলতে অক্ষম লোককে দেখলেই তাকে পাল্কিতে তুলে দিয়ে নিজে পাল্কির পাশে পাশে হেঁটে যেতেন, এমন উদাহরণও আছে !
(১১) বিদ্যাসাগর ছিলেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির গোঁড়া সমর্থক। তাঁরই পরামর্শে বাংলা দেশে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রবর্তক বউবাজারের দত্ত বংশের বাবু রাজেন্দ্রনাথ দত্ত ডাক্তার বেরিনির থেকে শিখে হোমিওপ্যাথি মতে চিকিৎসা শুরু করেন। আবার বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথাতেই অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকার (যিনি শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের চিকিৎসক ছিলেন) চিরতরে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা ত্যাগ করে, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতি অবলম্বন করেন এবং ভারতের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
(১২) বিদ্যাসাগর মহাশয় 'থ্যাকার স্পিংক' কোম্পানির মারফত বিদেশ থেকে প্রতি মাসে অনেক টাকার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার বই ক্রয় করতেন, শেষের দিকে ডাক্তার লালবিহারী মিত্রের ডিসপেনসারি থেকে বই কিনতেন। সেই বইগুলোকে ভালো করে পড়ে রোগীদের চিকিৎসা নিজেই করতেন। এবং শেষপর্যন্ত তিনি একজন বিচক্ষণ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হয়ে উঠেছিলেন। রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ দিতেন। কর্মাটরে সাঁওতালকে চিকিৎসা করলে তাদের কাছে যে বিপুল শাকসবজি ফল পেতেন, তা আবার কায়দা করে তাদের মধ্যেই ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দিতেন। তাঁর বাড়ীর গ্রন্থাগারে হোমিওপ্যাথি পুস্তকের উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ ছিলো। তাঁরই বংশধর পি ব্যানার্জি (মিহিজাম) এক প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হন। ওনার পরিবারের কাছে বিদ্যাসাগরের হোমিওপ্যাথি বিষয়ে লেখা ডায়েরি রক্ষিত আছে।
(১৩) বিদ্যাসাগর মহাশয় অত্যন্ত বন্ধুবৎসল ছিলেন। তাঁর অনেক বন্ধু ছিলো। বিত্তবান রাজা মহারাজা থেকে আরম্ভ করে দরিদ্রতম ব্যক্তি পর্যন্ত তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। এখানে কয়েকটি নাম উল্লেখ করছি :- কালীকৃষ্ণ মিত্র, ডাক্তার নবীনকৃষ্ণ মিত্র, প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারী, ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায়, অন্নদাপ্রসাদ বন্দোপাধ্যায়, জজ দ্বারকানাথ মিত্র, জজ রমেশচন্দ্র মিত্র, শ্যামাচরণ দে, রাজনারায়ণ বসু, আনন্দকৃষ্ণ বসু, রাজেন্দ্রনাথ দত্ত, ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার, দীনবন্ধু মিত্র, কৃষ্ণদাস পাল, মাইকেল মধুসূদন, হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, মহারাজা যতীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ...।
(১৪) বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অনুরাগী ও ভক্তের সংখ্যা ছিলো অগণিত। তাঁদের মধ্যে কয়েকটি মাত্র নাম উল্লেখ করছি :- পাইকপাড়ার রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহ ও ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ, কালীপ্রসন্ন সিংহ, কাশিমবাজারের রাজা কৃষ্ণনাথ নন্দী, মহারাণী স্বর্ণময়ী, রাণী কাত্যায়নী, গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, ব্যারিস্টার মাইকেল মধুসূদনের প্রধান কর্মচারী কৈলাস চন্দ্র বসু, কবি নবীন চন্দ্র সেন, নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, শিবনাথ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, অমৃতলাল বসু, ডাক্তার লোকনাথ মৈত্র প্রমুখ।
এখানে উল্লেখযোগ্য বাংলা দেশের অধিকাংশ রাজা ও জমিদার বিদ্যাসাগর মহাশয়ের কথায় উঠতেন এবং বসতেন! ভারতবর্ষে এমন শিক্ষিত লোক খুব কমই আছেন যাঁরা বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নাম শোনেননি, বা তাঁকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করেননি।
(১৫) অপরপক্ষে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে বিদ্যাসাগর মহাশয় সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেছিলেন! আবার এমন কয়েকজন ব্যাক্তি ছিলেন যাঁদের প্রতি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মনোভাব প্রসন্ন ছিলো না। তাঁদের মধ্যে যে নামগুলি পাওয়া যায় তাঁরা হলেন - রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায়, শিশিরকুমার ঘোষ, এবং সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
শেষে একজনের কথা বলবো, যিনি তাঁর অশেষ গুণগ্রাহী - ভক্তই বলা চলে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এনার শত পাগলামি, উচ্ছৃখলতা, হঠকারিতা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর বহুকাল ধরে তাঁর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রেখেছিলেন। আশ্চর্য দূরদর্শী বিদ্যাসাগর বুঝতে পেরেছিলেন, মাইকেলের মধ্যে কবিপ্রতিভা আছে এবং কবিরা প্রায়শই এমন প্রকৃতিরই হন। তাই মাইকেলের সাতখুন মাফ ছিল। মাইকেল কবি হলেন। একসময় বাংলার সেরা কবিই হলেন। আর লিখলেন বিদ্যাসাগর সম্বন্ধে সেই অমোঘ প্রাণ-মথিত করা বাক্য :-
“The genius and wisdom of an ancient sage, the energy of an Englishman, and the heart of a Bengali mother” - Michael Madhusudan Dutt.
★ তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার :- 'কলিকাতা দর্পণ' (২য় ভাগ) - শ্রী রাধারমণ মিত্র, বিশ্বজিৎ মিত্র (লেখক, অভেদা ফাউন্ডেশন) ও সৌগত বসু (প্রখ্যাত কাহিনীকার ও চিত্রনাট্য লেখক)।
৩৭
এ পি জে আবদুল কালাম : এক চিরকালীন স্বপ্নদ্রষ্টা।
"The earth is His, to Him belong to those vast and boundless skies; Both seas within him rest, and yet in that small pool He lies." - 'অথর্ববেদ' - এর এই লাইনটির দ্বারা এ. পি. জে. আবদুল কালাম ওরফে আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন আব্দুল কালাম তাঁর আত্মজীবনী 'উইংস অফ ফায়ার'-এর প্রথম অংশ 'ওরিয়েন্টেশন' শুরু করেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ হয়েও তিনি কীভাবে বেদের তথ্য নিজের জীবনীতে লিখেছিলেন, তা সবাইকে বিস্মিত করে। কিন্তু তিনি কোনো সম্প্রদায় নয়, সর্বশক্তিমান ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন। তাঁর কাছে সাম্যতা বজায় রাখার প্রধান অস্ত্র শিক্ষা এবং শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ দারিদ্র্যকে জয় করতে পারে। দারিদ্র্য কোনো সমস্যা নয়, বরং জয়ী হওয়ার সুযোগ। তাঁর ভক্তি, চেষ্টা ও উৎসাহ তাঁকে এই উপমহাদেশের একজন অন্যতম দার্শনিক, লেখক, চিন্তাবিদ এবং সমাজবিদ হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
এপিজে আবদুল কালাম ভারতের একাদশতম রাষ্ট্রপতি। ২০০২ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন কালাম। তবে তাঁর পরিচয়ের ব্যপ্তি আরও বিশাল। কালাম তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন একজন বিজ্ঞানী হিসেবে। তাঁর হাত ধরেই ভারত পরমাণু অস্ত্রধর দেশ হিসেবে বিশ্বসভায় স্থান পায়। তিনি ভারতের 'মিসাইল ম্যান'। তিনি দেশের অন্যতম সফল সন্তান।
তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম তাঁর। যেখান থেকে ভারতের রাষ্ট্রপতি হওয়ার কথা শত কোটি আলোকবর্ষ দূরের কল্পনাতেও কেউ ভাবে না। কারণ, যেখানে সরকারি কর্মকর্তা হওয়াও আশ্চর্যের ব্যাপার! প্রত্যন্ত সেই গ্রামে তাঁর পরিবার ছিল আরো দরিদ্র। রামেশ্বরম ও ধনুষ্কোটির মধ্যে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের নৌকায় পারাপার করাতেন তার বাবা। এক বেলা আধপেটা হয়ে দিন চলতো তাদের। সকালে কাজ করে স্কুলে যেতেন, বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে ফের নৌকায় জুটতেন। কিন্তু এতোকিছুর পরও পড়াশোনায় ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী। অল্প বয়স থেকেই পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কাজ শুরু করতে হয়েছিল আবদুল কালামকে। কলেজে ভর্তির পর তাকে পত্রিকায় লেখালেখির কাজও শুরু করতে হয়েছিল।
আবদুল কালামের বাবা জয়নুল-আবেদিন এবং মা আশিয়াম্মা, ধোনুষ্কোটি রামেশ্বরমে থাকতেন। তাঁদের আক্ষরিক শিক্ষা বা অর্থ কোনটাই খুব বেশি ছিল না, কিন্তু জ্ঞান এবং আত্মার উদারতা ছিল। ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন পরিবারের পঞ্চম সন্তান এবং চতুর্থ ছেলে কালাম। আবদুল কালামের পূর্বপুরুষেরা ধনী বণিক এবং জমিদার ছিলেন। ছিল বহু জমি এবং বিশাল জমি। তারা মূল ভূখণ্ড এবং দ্বীপের মধ্যে এবং শ্রীলঙ্কা থেকে ব্যবসা করতেন এবং মূল ভূখণ্ড থেকে পাম্বান দ্বীপে তীর্থযাত্রীদের জন্য নৌকায় চেপে বেড়াতেন। সুতরাং, তাঁর পরিবার 'মারাম কালাম আইয়াক্কিভার' (কাঠের নৌকা চালক) এবং পরে 'মারাাকিয়ার' নামে পরিচিতি লাভ করে।
তাঁর বাবা তাঁকে শিখিয়েছিলেন প্রার্থনা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, একমাত্র প্রার্থনাই পারে সর্বোপকারী ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে। প্রার্থনা শরীর ও মনকে পরিশুদ্ধ করে। বাবাই তাঁকে শিখিয়েছিলেন, "প্রত্যেককেই জীবনে লড়াই করতে হয়, সুখী হও, জীবনের সমস্যা, জটিলতা নিয়ে ভয় পেয়ে লাভ নেই।" তাঁর জীবনে আরো একজন বড় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন তাঁর জামাইবাবু, আহমেদ জালালউদ্দিন, যিনি কালামকে ইংরেজি বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে বলেছিলেন। আরও একজন তাঁকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন, তাঁর খুড়তুতো ভাই শামসুদ্দিন, যিনি খবরের কাগজ বিলি করতেন। তিনি তাঁর এই চাকরিটা কালামকে দিয়েছিলেন এবং খবরের কাগজের মাধ্যমেই বিভিন্ন খবর পড়তেন এবং জানতে পারতেন কালাম। চাকরি করতে করতেই বিভিন্ন খবরের কাগজ পড়ে হিটলার, মহাত্মা গান্ধী, জিন্নার সম্বন্ধে জানতে পেরেছিলেন।
রামেশ্বরম এলিমেন্টারি স্কুলে পড়ার সময়ে গোঁড়া ব্রাহ্মণ হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী রামানন্দ শাস্ত্রী, অরবিন্দন ও শিবপ্রকাশনের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল। তাঁর জীবনে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ১৯৫০ সালে সেন্ট জোসেফ কলেজে পড়াশোনা করতে যান। সেখানে বিজ্ঞান এবং সাহিত্য পড়ার সময়ে বিষয় দুটির মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে পান। আত্মজীবনীতে তিনি লিখছেন, "আমি জানিনা মানুষ কিভাবে বিজ্ঞানের পথ ও ঈশ্বরের পথকে আলাদা করে দেখে, আমার কাছে বিজ্ঞান মানুষকে আত্মোপলব্ধি ও আত্মার সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যায়।" জন মিল্টনের 'প্যারাডাইস লস্ট' পড়ে পৃথিবীর শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হন, এবং সাহিত্যের প্রতি একটা অমোঘ ভালবাসা তৈরি হয় তাঁর। 'মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি'-তে ম্যাথমেটিক্স ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন, যেখানে অ্যারোনটিক্স বিষয়ে তাঁর আগ্রহ জন্মায়। বিজ্ঞানের গতি, স্থিতি, ঘূর্ণন, গাঠনিক বৈশিষ্ট্য, এরোপ্লেনের বিভিন্ন দিক নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। শেষ বছরে প্রজেক্ট ও অ্যাসাইনমেন্টের কাজে কালামকে অ্যারোডায়নামিক ডিজাইন বানাতে বলা হয়েছিল, খুব একটা ভালো হয়নি ডিজাইনটা। নির্ধারিত সময়ে তিনি তা শেষও করতে পারছিলেন না। তাঁর শিক্ষক তাঁকে বলেছিলেন নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারলে তাঁর স্কলারশিপ বন্ধ হয়ে যাবে। এই সতর্কবার্তাই কালামের কর্মক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি সফল ভাবে কাজটি জমা দেন।
কলেজে সফল হবার পর, 'আনন্দ বিকাতন' নামের সাপ্তাহিক পত্রিকার একটি প্রতিযোগিতায় একটা আর্টিকেল লিখলেন, 'Let us make our own aircraft', যা প্রথম পুরস্কার পায়। এই আর্টিকেলটাই কালামের দৃষ্টিকে 'মিসাইল ম্যান' হওয়ার পথে চালিত করে। হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড-এ অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ট্রেনী হিসেবে যোগ দিলেন। তারপর 'এয়ারফোর্স অফিসার এবং ডাইরেক্টোরেট অফ টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট এন্ড প্রোডাকশন' পদে আবেদন করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। ব্যর্থ হওয়ার পর হৃষীকেশে চলে যান এবং গঙ্গাস্নান করেন। সেখানে স্বামী শিবানন্দজীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। স্বামীজী তাঁকে বোঝান, "নিয়তিকে মেনে নাও এবং জীবনে এগিয়ে যাও। তুমি পাইলট হওয়ার জন্য জন্মাওনি। এটা স্থির হয়ে আছে যে তোমার জীবনে কী হবে। ব্যর্থতা ভুলে যাও, যেহেতু এটাই তোমাকে নিয়তির পথে নিয়ে যাবে। বরং নিজের অস্তিত্বের আসল উদ্দেশ্যটা খুঁজে নাও। নিজেকে বিশ্বাস করো, ঈশ্বরের ইচ্ছের কাছে নিজেকে সমর্পণ করো।"
স্বামীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সফলভাবে ১৯৫৮ সালে নিউ দিল্লীর 'ডাইরেক্টোরেট অফ টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাণ্ড প্রোডাকশনের সিনিয়র সায়েন্টিফিক'-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে যোগ দেন। ওখান থেকে কানপুরের 'এয়ারক্র্যাফ্ট এন্ড আর্মামেন্ট টেস্টিং ইউনিটে গ্রাউন্ড ইকুইপমেন্ট মেশিন' অর্থাৎ হোভারক্র্যাফ্ট নিয়ে গবেষণা এবং হোভারক্র্যাফ্ট তৈরীর কাজে সফল হন। কালাম এবং তাঁর টিম প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভি কে কৃষ্ণ মেননের উৎসাহে 'অ্যারোনেটিক্যাল ডেভলপমেন্ট এস্টাব্লিশমেন্ট সেন্টারে' ভারতীয় হভারক্র্যাফ্ট 'নন্দী' তৈরী করেন। কালামের কাছে হোভারক্র্যাফ্টের জন্য সীমানা ছিল আকাশছোঁয়া। তারপর প্রফেসর মেনন তাঁকে মুম্বাইয়ে 'ইন্ডিয়ান কমিটি ফর স্পেস রিসার্চ' -এ রকেট ইঞ্জিনিয়ার পদের ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য ডেকেছিলেন। ডঃ বিক্রম সারাভাই তাঁর ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন এবং ১৯৬২ সালে রকেট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর ৬ মাসের ট্রেনিংয়ের জন্য NASA-তে যান। তিনি প্রমাণ করলেন কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। যে ছেলেটা খবরের কাগজ বিলি করতো, সে পৌঁছে গেল NASA।
১৯৬৩-৭০ সাল তাঁর জীবনের অন্যতম মূল্যবান
সময়। ভার্জিনিয়া হ্যাম্পটনের ল্যাঙ্গলি রিসার্চ সেন্টারে ট্রেনিং শেষ করলেন। নাসায় গিয়ে টিপু সুলতানের যুদ্ধের ছবি দেখে কালাম অবাক হয়েছিলেন এবং গর্ব অনুভব করেছিলেন এই বিষয়ে যে নাসাতেও ভারতীয় আদর্শ ও টিপু সুলতানের গৌরবান্বিত কাহিনীর চর্চা হয়। নাসা থেকে ফিরে এসে ভারতের প্রথম রকেট Nike- Apache এর কাজ শুরু করেন এবং সফলভাবে সেটা যাত্রাও করে। ডঃ বিক্রম সারাভাই তাঁকে অভিবাদন জানান এবং Satellite Launch Vehicle তৈরি নিয়ে আলোচনায় বসেন এবং আবার সেটি সফল হয়। আকাশের পথে তাঁর জয়যাত্রা এভাবেই সফল হতে থাকে। ১৯৮১ সালে ডেভিল মিসাইল SLV-3 তৈরীর পর পদ্মভূষণ পুরস্কারে সম্মানিত হন। ISRO-এর সফলতম টেকনোক্র্যাট হয়ে উঠলেন তিনি। ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, ভারতের সেরা মিসাইল কেন্দ্র, DRDL (Defense Research and Development Laboratory) এর ডিরেক্টর পদে যোগ দেন। জীবনে তিনি নিজেকে দার্শনিক, সেরা এবং স্নেহময় প্রশাসক হিসেবে প্রমাণ করেছেন।
১৯৮৩ সালে আবদুল কালাম, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডঃ ভেঙ্কটরমন এবং ডঃ অরুণাচলমের উদ্যোগে পরপর বেশ কয়েকটি মিসাইল জয়যাত্রা করেছিল, 'পৃথ্বী', 'ত্রিশূল', 'আকাশ', 'নাগ', 'অগ্নি', 'আর্যভট্ট' এবং 'ভাস্কর'। বিজ্ঞানী হিসেবে এটা তাঁর বড় প্রাপ্তি। এরপরই তাঁর নামকরণ হল 'মিসাইল ম্যান'। কালামের নাম বাতাসে সুগন্ধির মতো ছড়িয়ে পড়ল। ভারতবাসী তাঁর এই অদম্য প্রচেষ্টায় মুগ্ধ হল। পোখরানে ডঃ কালাম ও ডঃ ব্রহ্ম প্রকাশের সাহায্যে ভারত নিউক্লিয় পরীক্ষার পরিচালনা করল। প্রজেক্টটির নাম দেওয়া হল 'And Budhha Smiled'। এর পরপরই প্রফেসর ধাওয়ান, ডঃ ব্রহ্ম প্রকাশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন কালাম। ১৯৯০ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে ডঃ অরুণাচলমের সাথে 'পদ্মবিভূষণ' পুরস্কারে সম্মানিত হন। এই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, "আমার বাবা-মা, শিক্ষক, সহযোগী বন্ধুরা ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। তাদের সাহায্য ছাড়া এই কাজ কোনদিন সম্ভব হত না।" ১৯৯১ সালে কালাম 'ডক্টরেট অফ সায়েন্স' সম্মান পেলেন। তাঁর মতে, এখনকার বেশিরভাগ তরুণ প্রজন্ম তুচ্ছ ব্যাপারে মনোসংযোগ করছে, বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা এবং সহযোগিতা সন্তানদের উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।
তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি বলেছিলেন ছোটবেলার কথা, 'যখন আমি ছোট ছিলাম, আমার মা আমাদের জন্য রান্না করতেন। তিনি সারাদিন প্রচুর পরিশ্রম করার পর রাতের খাবার তৈরি করতেন। এক রাতে তিনি বাবাকে এক প্লেট সবজি আর একেবারে পুড়ে যাওয়া রুটি খেতে দিলেন। আমি অপেক্ষা করছিলাম বাবার প্রতিক্রিয়া কেমন হয় সেটা দেখার জন্য। কিন্তু বাবা চুপচাপ রুটিটা খেয়ে নিলেন এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন স্কুলে আমার আজকের দিনটা কেমন গেছে। আমার মনে নেই বাবাকে সেদিন আমি কী উত্তর দিয়েছিলাম কিন্তু এটা মনে আছে যে, মা পোড়া রুটি খেতে দেয়ার জন্য বাবার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। এর উত্তরে বাবা মা'কে যা বলেছিলেন সেটা আমি কোনদিন ভুলবো না। বাবা বললেন, 'প্রিয়তমা, পোড়া রুটিই আমার পছন্দ'। পরবর্তীতে সেদিন রাতে আমি যখন বাবাকে শুভরাত্রি বলে চুমু খেতে গিয়েছিলাম তখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে তিনি কি আসলেই পোড়া রুটিটা পছন্দ করেছিলেন কিনা। বাবা আমাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, 'তোমার মা আজ সারাদিন অনেক পরিশ্রম করেছেন এবং তিনি অনেক ক্লান্ত ছিলেন। তাছাড়া একটা পোড়া রুটি খেয়ে মানুষ কষ্ট পায় না বরং মানুষ কষ্ট পায় কর্কশ ও নিষ্ঠুর কথায়।'
নিজের মায়ের সম্পর্কে আরেকটি লেখায় এ পি জে আবদুল কালাম লিখেছিলেন, 'আমাদের বাড়িতে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যা সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত কেরোসিনের কুপি বাতি জ্বলতো, সেই আলোতে আমরা পড়তাম। তবে মা আমার পড়ার আগ্রহ দেখে আমাকে শোয়ার ঘরের কেরোসিনের বাতি দিতেন যেন আমি অন্তত রাত ১১টা পর্যন্ত পড়তে পারি। এখনো পূর্ণিমা দেখলে আমার মায়ের মুখটাই সর্বপ্রথম যেন দেখতে পাই।
আরেক লেখায় এ পি জে আবদুল কালাম লিখেছিলেন, 'দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কথা। প্রতিদিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে অঙ্ক কষতে চলে যেতাম শিক্ষকের কাছে। সেই শিক্ষক পাঁচ জনকে অঙ্ক শেখাতেন তার মধ্যে আমি ছিলাম। দেড় ঘণ্টা অঙ্ক কষে সকাল সাড়ে পাঁচটায় ছুটি পেয়ে তিন কিলো দৌড়ে যেতাম কেবল দৈনিক পত্রিকা আনতে। যুদ্ধের কারণে স্টেশনে ট্রেন থামতো না, আর তাই চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলা সেই পত্রিকা আমি বিলি করতাম সারা শহরে।'
এ পি জে আবদুল কালামের পছন্দের বিষয় ছিল পদার্থবিদ্যা এবং গণিতশাস্ত্র। তবে অধ্যয়ন শেষে আব্দুল কালামের কাছে আসে দুইটি চাকরিতে আবেদনের সুযোগ। একটি বিমান বাহিনীতে এবং আরেকটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। তবে, আব্দুল কালামের স্বপ্ন ছিল একজন ফাইটার পাইলট হওয়া। আত্মজীবনীতে লিখেছেন, 'বছরের পর বছর ধরে আমি স্বপ্ন দেখতাম একটি উড়ন্ত যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্ট্রাটোস্ফিয়ারের স্তরে চষে বেড়াচ্ছি যা উড়তে থাকবে সেই সর্ব্বোচ্চ সীমানায়।' নিজের স্বপ্ন সম্পর্কে তিনি এভাবে লেখেছিলেন। তাই তিনি প্রথমে ডিটিডিপি'র ইন্টারভিউ দিয়ে যান দেরাদুন বিমান বাহিনীর ইন্টারভিউ দিতে। তিনি দেখলেন ইন্টারভিউতে বিমানবাহিনীতে শিক্ষা এবং দক্ষতার পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতাকেও অগ্রাধিকার দেয়। তিনি ছিলেন একটু রোগা-পাতলা ও লম্বায় অনেকটাই ছোটো। ফলে ৯ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ৮ জনই নির্বাচিত হয়, শুধুমাত্র তিনি বাদে!
বাদ পড়ার খবরটা পাওয়ার পর তিনি একটি নদীর ধারে চলে গেলেন। সেখানে এক সাধু তাকে নদীর পাড়ে বসে থাকতে দেখে বললো, খোকা তুমি নদীর পাড়ে বসে আছ কেন? তোমার মন খারাপ? উত্তরে তিনি বললেন, আমার জীবনের কোনো অর্থ নেই। আমি পাইলট হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছি। এই জীবনের কোনো অর্থ পাচ্ছি না। সাধু হেসে বললেন, 'বাবা তুমি পরীক্ষায় ফেল করেছো। এটারও কোনো অর্থ আছে। ভাগ্য হয়তো তোমাকে অন্য কিছুর জন্য তৈরি করেছে। খুঁজে দেখো, এই পথ তোমার জন্য নয়।'
এরপর তিনি বিমান প্রযুক্তি বিষয়ে পড়লেন। মজার বিষয় হলো সে যে প্রথমে পদার্থবিদ্যা পড়েছিলেন সে চার বছরকে জীবনের সময় নষ্ট হয়েছে বলে মনে করতেন তিনি।
একসময় তিনি ভারতের অসামরিক মহাকাশ কর্মসূচি ও সামরিক সুসংহত নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশযানবাহী রকেট উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ভারতের মহাকাশ যাত্রার সূচনাকারী বলা হয় তাকে। অন্যদিকে তার অবদানের জন্য তাকে বিশ্বজুড়ে ডাকা হয় 'মিসাইল ম্যান অফ ইন্ডিয়া'।
জীবনে বারবার হেরেছেন কিন্তু জিতেছেন তার পরেরবারই! কোট টাই পরাও ধরেছেন রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর। দুর্নীতি যার পিছু আসলেও টলাতে পারেনি একবিন্দুর জন্য। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে তিনি যেদিন বের হয়েছিলেন সেদিন তার সঙ্গে ছিল তার ব্যক্তিগত কাপড়চোপড় আর বই।
আবদুল কালামকে নিয়ে তাঁর প্রাক্তন সচিব অবসরপ্রাপ্ত আইএএস কর্মকর্তা পি এম নায়ারের একটি সাক্ষাৎকার দূরদর্শনের তামিলভাষী আঞ্চলিক চ্যানেল ডিডি পোধিগাই প্রচার করেছিল। সেখানে তিনি বলেছিলেন, 'এ পি জে আবদুল কালাম যখনই বিদেশ যেতেন, তখনই দামি উপঢৌকন নিতে তিনি বাধ্য ছিলেন। এর কারণ, এটাই রাষ্ট্রাচার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ ও জাতিরাষ্ট্রের কাছ থেকে সফররত বিদেশি রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানদের এ ধরনের উপঢৌকন নেওয়া একটি বিশ্বব্যাপী প্রথা হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। এই উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করা হলে তা কোনো জাতির প্রতি একটা উপহাস এবং ভারতের জন্য তা বিব্রতকর। সুতরাং, তিনি বিনা বাক্যব্যয়ে এসব উপঢৌকন নিতেন। কিন্তু তিনি ফিরে আসার পরে তার নির্দেশ থাকতো, সব উপহারসামগ্রীর আলোকচিত্র তুলতে হবে। এর ক্যাটালগ করতে হবে। এরপর তা রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারে দিতে হবে। এরপরে তাকে আর কখনও উপহারসামগ্রীর দিকে ফিরে তাকাতেও দেখা যায়নি। তিনি যখন রাষ্ট্রপতি ভবন ত্যাগ করেছিলেন, তাকে এমনকি একটি পেনসিলও নিয়ে যেতে দেখা যায়নি।'
২০০২ সালে এ পি জে আবদুল কালাম যখন রাষ্ট্রপতির পদ নিয়েছিলেন, তখন রমজান মাস। ভারতীয় রাষ্ট্রপতির জন্য এটা একটা নিয়মিত রেওয়াজ যে তিনি একটি ইফতার পার্টির আয়োজন করবেন। একদিন আবদুল কালাম তার সচিব পি এম নায়ারকে বললেন, 'কেন তিনি একটি পার্টির আয়োজন করবেন? কারণ, এমন পার্টির অতিথিরা সর্বদা ভালো খাবার খেয়ে অভ্যস্ত। তিনি পি এম নায়ারের কাছে জানতে চাইলেন, একটি ইফতার পার্টির আয়োজনে কত খরচ পড়ে?' পি এম নায়ার তাকে বললেন, 'প্রায় ২২ লাখ টাকা খরচ হয়।' এ পি জে আবদুল কালাম তাকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, 'কয়েকটা নির্দিষ্ট অনাথ আশ্রমে এই অর্থ, খাদ্য, পোশাক ও কম্বল কিনে দান করতে হবে।'
রাষ্ট্রপতি ভবনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম অনাথ আশ্রম বাছাইয়ের দায়িত্ব পেয়েছিল। মজার বিষয় হলো এ ক্ষেত্রে এ পি জে আবদুল কালাম কোনো ভূমিকাই পালন করেননি। অনাথ আশ্রমগুলো বাছাইয়ের পরে এ পি জে আবদুল কালাম পিএম নায়ারকে তার কক্ষে ডেকে তার হাতে এক লাখ টাকার একটি চেক দিয়ে বললেন, তিনি তার ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে কিছু অর্থ দান করছেন। কিন্তু এ তথ্য কারও কাছে প্রকাশ করা যাবে না।
পি এম নায়ার বলেছিলেন, আমি এতোটাই অবাক হয়েছিলাম যে আমি তৎক্ষণাৎ বললাম, 'স্যার, আমি এখনই বাইরে যাব এবং সবাইকে বলব। কারণ, মানুষের জানা উচিত, এখানে এমন একজন মানুষ রয়েছেন, যে অর্থ তার খরচ করা উচিত, শুধু সেটাই তিনি দান করেননি, তিনি সেই সঙ্গে নিজের অর্থও বিলিয়েছেন।'
এ পি জে আবদুল কালাম কখনোই জু হুজুর, ইয়েস স্যার ধরনের লোক পছন্দ করতেন না। একবার যখন ভারতের প্রধান বিচারপতি তার সঙ্গে সাক্ষাতে এলেন এবং কোনো একটি পর্যায়ে এ পি জে আবদুল কালাম তার সচিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আপনি কি আমার এ কথার সঙ্গে একমত?' পি এম নায়ার ভাবলেশহীনভাবে বললেন, 'না স্যার, আমি আপনার সঙ্গে একমত নই।' অবাক হয়ে গেলেন প্রধান বিচারপতি। তিনি নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। একজন সিভিল সার্ভেন্টের পক্ষে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দ্বিমত করা এবং এতোটা প্রকাশ্যে করা, তা ভাবাও যায়নি। পি এম নায়ার প্রধান বিচারপতিকে বলেন, রাষ্ট্রপতি পরে তাকে প্রশ্ন করবেন, জানতে চাইবেন, কেন তিনি তার সঙ্গে একমত হতে পারেননি। এবং যদি পি এম নায়ারের যুক্তি ৯৯ শতাংশ সংগত হয়, তাহলে তিনি তার মন পরিবর্তন করবেন।
এ পি জে আবদুল কালাম কতোটা সৎ ছিলেন তা অবর্ণনীয়। একটা ঘটনার কথা বলি। একবার এ পি জে আবদুল কালাম কালাম তার আত্মীয়দের দিল্লিতে তার কাছে বেড়ানোর আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তারা সবাই রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকবেন এটাই নিয়ম। তো তার স্বজনেরা দিল্লি শহর ঘুরে দেখবেন। যা স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রীয় খরচেই হয়। কারণ রাষ্ট্রপতির অতিথিদের জন্য সবসময় গাড়ি বরাদ্দ থাকে। কিন্তু তার ধার ধারলেন না এ পি জে আবদুল কালাম! বাস ভাড়া করা হলো তাদের জন্য। সে খরচ নিজের পকেট থেকে দিয়েছিলেন তিনি! সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এ পি জে আবদুল কালামের নির্দেশে তার আত্মীয় স্বজনদের থাকা-খাওয়ার খরচের হিসেবও করতে হয়েছিল। যার হিসেব দাঁড়িয়েছিল ২ লাখ টাকারও বেশি। যা সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছিলেন এ পি জে আবদুল কালা! ভারতীয় ইতিহাসে আর কোনো রাষ্ট্রপতি এমনটি করেছেন বলে জানা যায়নি!
এখানেই শেষ নয়। এ পি জে আবদুল কালাম একবার চাইলেন তার সঙ্গে তার বড় ভাই পুরো এক সপ্তাহ যাতে সময় কাটান। তাই হলো। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পরে তার রুম ভাড়া বাবদ তিনি অর্থ পরিশোধ করতে চাইলেন। কল্পনা করুন, একটি দেশের রাষ্ট্রপতি এমন একটি কক্ষের জন্য ভাড়া পরিশোধ করতে চাইছেন, যা শুধুমাত্র তাঁর নিজের জন্যই বরাদ্দ। এবারে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা পূরণ হলো না। রাষ্ট্রপতি ভাবনের ব্যক্তিগত স্টাফরা ভেবেছিলেন, এতোখানি সততা যিনি মেনে চলেন, তাদের মতো ক্ষুদ্র মানুষদের পক্ষে তাঁকে সামাল দেওয়া কঠিন।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হয়ে এলে রাষ্ট্রপতি ভবন ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন এ পি জে আবদুল কালাম। তখন সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার সঙ্গে দেখা করে বিদায়ী শ্রদ্ধা জানান। পি এম নায়ার তার স্ত্রী অসুস্থ থাকায় স্ত্রীকে নিয়ে বিদায়ী অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি। এ পি জে আবদুল কালাম জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনি কেন আপনার স্ত্রীকে আনেননি?' পি এম নায়ার বললেন, 'স্যার আমার স্ত্রী পা ভেঙেছে এক্সিডেন্টে। তাই ওকে আনতে পারিনি।'
পি এম নায়ার বললেন, পরদিন সকালে আমি দেখি আমার ঘরের চারপাশে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী ছেয়ে ফেলেছে। নিরাপত্তারক্ষীদের জিজ্ঞাসা করতেই তারা বললো, রাষ্ট্রপতি আপনার বাড়িতে আসছেন। রাষ্ট্রপতি ঘরে ঢুকে পি এম নায়ারের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন। এরপর চলে গেলেন। আপনি ভেবে দেখুন, কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট একজন সিভিল সার্ভেন্টের ঘরে এভাবে যাবেনই না। কেবল তিনি এ পি জে আবদুল কালাম বলেই এসেছেন।'
রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে এ পি জে আবদুল কালামের পক্ষে নাকি সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সম্মতি দেয়া। তার কোমল হৃদয়ের দেখা মিলে সে ভাষ্যে। তিনি লিখেছিলেন 'রাষ্ট্রপতি হিসেবে আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ে সম্মতি দেওয়া। আমি মনে করি পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে মানুষ অপরাধ করে। অপরাধের জন্য দায়ী সমাজ বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। কিন্তু সেই ব্যবস্থাকে আমরা শাস্তি দিতে পারি না। শাস্তি দিই ব্যবস্থার শিকার মানুষদের।'
যে বিজেপি শাসনকালে তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল, সেই বিজেপির অন্যায়ের বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছিলেন এ পি জে আবদুল কালাম। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবের সরকারকে সরিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি শাসন সংক্রান্ত বিল ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
কখনোই কাজ থেকে ছুটি নেননি এ পি জে আবদুল কালাম। ২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পূর্ণ করার পর সারা ভারতবর্ষ জুড়ে চষে বেড়িয়েছেন শিশু কিশোর তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্বুব্ধ করার কাজে, স্বপ্ন দেখিয়েছেন বারে বারে।
এ পি জে আবদুল কালাম নিজে যেমন স্বপ্ন দেখেছেন আজীবন, স্বপ্নের পিছু ছুটেছেন ঠিক তেমনি স্বপ্ন দেখিয়েছেন প্রজন্মকে। বলতেন 'স্বপ্ন, স্বপ্ন, স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখে যেতে হবে। স্বপ্ন না দেখলে কাজ করা যায় না।' মাঝে মাঝে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলতেন, 'কখনো যদি নিজেকে একা মনে হয় তবে আকাশের দিকে তাকাবে। আমরা একা নই। পৃথিবীটা আমাদের বন্ধু। যারা কাজ করে ও স্বপ্ন দেখে প্রকৃতিও তাদের সাহায্য করে।'
আজীবন লোভ করেননি অর্থের, জনপ্রিয়তার পিছু হাঁটেননি। চলেছেন নিজের স্বপ্নের পথে। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ তিনি যেন স্বপ্নমানবের মতো হেঁটে গেছেন। বারবার স্মরণ করে বলতেন, 'আমরা যদি উন্নত ও নিরাপদ ভারত রেখে যেতে পারি তাহলেই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের স্মরণ করবে।'
এ পি জে আবদুল কালামের ছোট ভাই কাসিম মোহাম্মদ তামিলনাড়ুতে একটি ছাতা মেরামতের দোকান চালান। এ পি জে আবদুল কালামের শবযাত্রায় তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পি এম নায়ার গিয়েছিলেন তামিলনাড়ুতে। তিনি কাসিম মোহাম্মদের পা ধরে বললেন, 'এটি আপনার ভাইয়ের জন্য আমার শ্রদ্ধা। যে পরিবারে তার জন্ম, সে পরিবারে তার সহোদরের পদস্পর্শ করা আমার জন্য পরম ভাগ্যের বিষয়।
এ পি জে আবদুল কালাম নিজে দারুণ কবিতা লিখতেন, সঙ্গীতের প্রতি ছিল তার গভীর অনুরাগ। বিশেষ করে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। কবিতা লেখা নিয়ে তিনি বলেছিলেন তার আত্মকথায়, 'গভীর দুঃখে কিংবা প্রচণ্ড আনন্দেই মানুষ কেবল কবিতা লেখে।'
তাঁর লেখা, তাঁর ভাষ্যে অনুলিখনে লেখা উইংস অব ফায়ার, ইগনাইটেড মাইন্ডস, ইনডমিটেবেল স্পিরিট, ইউ আর বর্ন টু ব্লোসম, ফোর্জ ইউর ফিউচার, টার্ণিং পয়েন্টের মতো বইগুলো পড়লে বোঝা যায় কতটা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়েও মানুষ চাইলে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে গিয়েও কী করে গভীরতর নিষ্ঠা আর দায়িত্ববোধে মগ্ন থেকে ভারতের মতো একটি রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দিতে পারেন। এ পি জে আবদুল কালাম বারেবারে যেন হাতেকলমে শেখান অধ্যবসায়, নিষ্ঠা, শ্রম, দায়িত্ব আর কর্তব্যবোধ থাকলে মানুষ জয় করতে পারে অসাধ্যকেও।
আর তাই নিজের মৃত্যুদিনের কথা ভেবে তিনি লিখেছিলেন, 'আমার মৃত্যুতে ছুটি ঘোষণা করবেন না। যদি আমাকে ভালোবেসে থাকেন তবে সেদিন মন দিয়ে কাজ করবেন।' কিন্তু সেই শোক কি আর বাধা মানে সে অপেক্ষায়! ২০০২ সালের ১৮ই জুলাই রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োজিত হলেন। তিনি শিল্প, প্রযুক্তি এবং আইনি-ব্যবস্থা এই সকল বিষয়ে উন্নতির ত্রিমাত্রিক পরিকল্পনা করছিলেন। ভারতকে উন্নত প্রযুক্তির বাজারে বিশ্বের প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে স্থান করে নিতে হবে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে ৮% GDP (Gross Domestic Product) বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি সবাইকে ধর্মীয় বিভেদ এবং সাম্প্রদায়িকতাকে এড়িয়ে নিজেদের পথ প্রশস্ত করতে বলতেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল তিনি তাঁর কাজের মধ্যে দিয়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন। এবং তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়। ২০১৫ সালের ২৭ শে জুলাই শিলং-এ ছাত্রদের সামনে বক্তৃতা দিতে দিতেই মহানির্বাণ লাভ করেন। বাস্তব এবং শূন্যগর্ভ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে নিজের পরিচয় তৈরি করেছিলেন তিনি। বলা বাহুল্য কালাম স্যার যে কোনো মানুষের জীবনে পথ চলার আদর্শ ও অনুপ্রেরণা। আজ ভারতরত্ন জয়ী ভারতের জনসাধারণের রাষ্ট্রপতি, লেখক, বিজ্ঞানী, স্বপ্নমানব আবুল পাকির জয়নুল আবেদিন আবদুল কালামের প্রয়াণ দিবস। বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি তাঁকে।
★ তথ্যসূত্র :-
(১) উইংস অব ফায়ার - এ পি জে আব্দুল কালাম।
(২) The boy from Rameswaram who became President - Sumita Vaid Dixit.
৩৮
মানব সেবার অগ্রদূত ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল।
"কেউ নন, এমন কি একজন ডাক্তারও একজন নার্সের সংজ্ঞা দিতে পারবেন না। বড়জোর বলতে পারবেন - উৎসর্গীকৃত ও অনুগত। এটা আরও বেশি কিছু।" - উক্তিটি 'দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প' খ্যাত ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ছিলেন অন্ধকারের আলোকবর্তিকা, আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত, রয়্যাল রেডক্রস প্রাপ্তা এক অনন্যা প্রিয়দর্শিনী। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল তার কর্মে জানিয়ে দিয়েছিলেন - নার্সিং একটি পেশা নয়, এটি মূলত সেবা।
আজ এ মহিয়সী সেবিকার শুভ জন্মদিন। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল ১৮২০ সালের ১২ মে অভিজাত ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্রিটিশ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে জন্মগ্রহণ করায় তার বাবা কন্যার নাম রাখেন ফ্লেরেন্স । আর সঙ্গে বাবার নাইটিঙ্গেল নামটি জুড়ে তার নাম হয় ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল।
ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন নারীরা শিক্ষা কী তাই বুঝত না। তবু বাবার আগ্রহে তিনি সে সময় একজন মানবতাবাদী লেখক এবং পরিসংখ্যানবিদ হয়েছিলেন।
মানব সেবায় নিবেদিত ফ্লোরেন্সের এই চরিত্রটি ছোটবেলা থেকেই ফুটে উঠেছিল। কেউ অসুস্থ হলে ফ্লোরেন্স সেখানে সেবা করতে ছুটে যেতেন। ডার্বিশায়ার থেকে যখন তিনি লন্ডনে আসেন তার বয়স তখন ১৭। সে সময় লন্ডনের হাসপাতালগুলোর অবস্থা ছিল খুবই করুণ। এর অন্যতম কারণ সে সময়ে কেউ সেবিকার কাজে এগিয়ে আসতেন না।
এ পেশাকে তখন খুব ছোট করে দেখা হতো। সামাজিক ভাবে এ পেশা তখনও পূর্ণ মর্যাদা পায়নি। অথচ ধনী, উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়েও ফ্লোরেন্স তখন নিজেকে একজন সেবিকা রূপে তৈরি করেন।
মাত্র ১৭ বছর বয়সেই নাইটিঙ্গেল বিশ্বাস করতেন স্রষ্টা তাকে সেবিকা হওয়ার জন্যই পাঠিয়েছেন। প্রথমে এ কাজে আগ্রহ প্রকাশ করলে মা-বাবা রাজি হননি এই ভেবে, একজন শিক্ষিত মেয়ে হিসেবে তার যে কোনো ভালো পেশায় যাওয়া উচিত।
আশা ছাড়েননি ফ্লোরেন্স। অবশেষে বাবা-মায়ের অনুমতি মিললে তিনি ১৮৫১ সালে নার্সের প্রশিক্ষণ নিতে জার্মানিতে পাড়ি দেন। ১৮৫৫ সালে তিনি নার্স প্রশিক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৯ সালে তিনি নাইটিঙ্গেল ফান্ডের জন্য সংগ্রহ করেন প্রায় ৪৫ হাজার পাউন্ড।
১৮৫৯ সালে তিনি রয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটির প্রথম সারির সদস্য নির্বাচিত হন। লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নার্সিংকে সম্পূর্ণ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৮৬০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল’ যার বর্তমান নাম ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্কুল অব নার্সিং।
ডা. এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ১৮৬৭ সালে নিউইয়র্কে চালু করেন ‘উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ’। ১৮৫৩ সালে শুরু হয় ক্রিমীয়ার যুদ্ধ। এ যুদ্ধে বহু সৈনিক আহত হয়। সে সময় যুদ্ধাহতদের সেবায় ফ্লোরেন্স আত্মনিবেদন করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
নাইটিঙ্গেল 'নোটস অন নার্সিং' নামক বই লেখেন। এই বই নাইটিংগেল স্কুল সহ অন্যান্য নার্সিং স্কুলে পাঠ্যসূচীর ভিত্তি হিসেবে কাজ করে যদিও এটা বাড়িতে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য লেখা হয়েছিল। নাইটিঙ্গেল লেখেন, "প্রতিদিন পরিষ্কার থাকার জ্ঞান, অথবা নার্সিং এর জ্ঞান অন্য কথায় কিছু নিয়মাবলী যা নিয়ে যাবে রোগমুক্ত অবস্থায় অথবা রোগ থেকে মুক্ত করবে, আরও ভাল করবে, এটা সার্বজনীন জ্ঞান যা সবার থাকা উচিত, চিকিৎসা শাস্ত্র থেকে কিছুটা আলাদা যেটি নির্দিষ্ট পেশার মানুষে সীমাবদ্ধ।"
ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নেও তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৮৫৯ সালে তিনি ‘রয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটির’ প্রথম সারির সদস্য নির্বাচিত হন। লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নার্সিংকে সম্পূর্ণ পেশারূপে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৮৬০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাইটিঙ্গেল ট্রেনিং স্কুল’ যার বর্তমান নাম ‘ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল স্কুল অব নার্সিং। ডা. এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েলের সাথে যৌথভাবে ১৮৬৭ সালে নিউইয়র্কে চালু করেন ‘উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ’। এ ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময় নার্সিংয়ের উপর বইও লিখেছেন।
তিনি অসংখ্য পদক আর উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ১৮৮৩ সালে রাণী ভিক্টোরিয়া তাকে ‘রয়েল রেডক্রস’ পদক প্রদান করেন। প্রথম নারী হিসাবে ‘অর্ডার অব মেরিট’ খেতাব লাভ করেন ১৯০৭ সালে। ১৯০৮ সালে লাভ করেন লন্ডন নগরীর ‘অনারারি ফ্রিডম’ উপাধি।
নার্সিং বা শুশ্রূষার জগতে তাঁর অবদানের কথা মনে রেখে আজও নার্সরা কাজে যোগ দেওয়ার আগে 'নাইটিংগেল অঙ্গীকার' নেন। নার্সিংয়ে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক পুরস্কারও তাঁরই নামে, 'ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল পদক'। তাঁর সম্মানেই ১৯৬৫ সাল থেকে আজকের দিনটি 'আন্তর্জাতিক নার্স দিবস' হিসেবে পালন করা শুরু হয়। যার মধ্যেমে সম্মান জানানো হয় এক নারীকে যিনি তাঁর কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন - নার্সিং একটি পেশা নয় সেবা।
আহত সৈন্যদের সেবার মাধ্যমে নার্সিংকে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। হ্যারিকেন নিয়ে রাতের আঁধারে তিনি ছুটে গেছেন আহতদের দ্বারে দ্বারে। এরপর থেকেই বিশ্ব তাকে ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ ডাকতে শুরু করে। যুদ্ধের পর ফ্লোরেন্স বহু দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
বহু মনীষী ফ্লোরেন্সকে ঈশ্বরের দূত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এখন যারা এ পেশায় নতুন আসেন তারা ‘নাইটিঙ্গেল প্লেজ’ নামে একটি শপথ গ্রহণ করে তার প্রতি সম্মান জানান। তার সম্মানেই ১৯৭৪ সাল থেকে তার জন্মদিন ১২ মে পালিত হয়ে আসছে ‘ইন্টারন্যাশনাল নার্সেস ডে’।
ব্রিটিশ লাইব্রেরি সাউন্ড আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে ফ্লোরেন্সের কণ্ঠস্বর, যেখানে তিনি বলেছেন :- "যখন আমি থাকব না, সেই সময় আমার এই কণ্ঠস্বর আমার মহান কীর্তিগুলোকে মানুষের কাছে মনে করিয়ে দেবে এবং এসব কাজের জন্য উৎসাহ জোগাবে।" তার জীবনী নিয়ে ১৯১২, ১৯১৫, ১৯৩৬ ও ১৯৫১ সালে চারটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় ।
আধুনিক নার্সিংবিদ্যার জননী বলা হয় ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলকে। ব্রিটিশ সমাজসংস্কারক ফ্লোরেন্স সারা পৃথিবীর কাছে প্রথম পরিচিত হয়েছিলেন ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহত সৈনিকদের সেবার বন্দোবস্ত করার জন্য। রাতের অন্ধকারে লন্ঠন হাতে ঘুরে-ঘুরে সৈনিকদের শুশ্রূষার কাজ তদারকি করার কারণে তাঁর নামই হয়ে যায় 'দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প'।
এই নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা মতপার্থক্য দেখা দিলেও নার্সিং বা শুশ্রূষার কাজকে আধুনিক করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের ব্যাপারে সকলেই একমত। পরবর্তী সময়ে পেশাদারি নার্সিংয়ে মহিলাদের যোগদানে উৎসাহ দিতে লন্ডনে নিজস্ব নার্সিং বিদ্যালয়ও খোলেন তিনি।
১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট ৯০ বছর বয়সে এই মহীয়সী নারী পৃথিবী ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান। আজকের দিনে ২০৫ বছর পূর্ণ করলেন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল।
★ তথ্যসূত্র :- আনন্দবাজার পত্রিকা, নিউজলাইন বিডি ডট কম, যুগান্তর, উইকিপিডিয়া, ইন্টারনেট।
৩৯
ড. বি আর আম্বেদকর : নিম্নবর্ণের অস্পৃশ্য ছেলেটির বেড়ে ওঠা
বোম্বের এলফিনস্টন হাই স্কুল, শিক্ষক পড়াচ্ছেন ক্লাসে। উদাহরণের একটি সমস্যা সমাধানের জন্য ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসা একজন ছাত্রকে ডাকলেন তিনি। ভীমরাও নামের ছাত্রটি উঠে আসছিলো ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে। মুহূর্তের মধ্যে যেন পুরো ক্লাসে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল। অন্যান্য ছাত্ররা তাদের টিফিন বক্স রাখতো ব্ল্যাকবোর্ডের পেছনে। ভীমরাও ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে আসার আগেই সবাই তাড়াহুড়ো করে নিজেদের টিফিন বক্স সরাতে লাগলো। কারণ ভীমরাও কাছাকাছি আসলে যে, তাদের খাবার অপবিত্র হয়ে যাবে।
কী প্রচণ্ড ঘৃণা! কেন? কারণ ভীমরাও যে জন্মেছেন নিন্মবর্ণের পরিবারে। মহর পরিবারে জন্ম নেয়া একজন দলিত তিনি। যে জাতিকে তৎকালীন ভারতের অস্পৃশ্য হিসাবে মানা হত। তার কাছাকাছি আসলে কি খাবারের পবিত্রতা থাকবে? উচ্চবর্ণের মানুষদের তার সাথে মেশা শোভা পায়? ভীমরাওয়ের জন্য অবশ্য এসব নতুন কিছু না। সেই ছোটবেলা থেকে সয়ে আসছেন তিনি। বোম্বের এই স্কুলে তো তা-ও ক্লাসের বেঞ্চে বসার জায়গা মিলেছে। হোক না তা এককোণে। একদম শেষের সারির বেঞ্চে।
অনেক ধর্না দেয়ার পর দাপোলিতে তিনি প্রথম স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তখন গোটা স্কুলে তারা কেবল ছয়জন দলিত ছিলেন। তাদের জন্য আলাদা একটি কক্ষের বন্দোবস্ত ছিল। হিন্দু শিক্ষকরা সেই কক্ষে কখনো প্রবেশ করতেন না। দরজার বাইরে থেকে মাঝেমধ্যে খোঁজ খবর নিয়ে যেতেন। শিক্ষকদের কোনো প্রশ্ন করার অধিকার ছিলো না তাদের। কোনো কিছু না বুঝলেও চলে আসতে হতো সেভাবেই। সেই ছয়জন থেকে ভীমরাও একাই প্রাথমিক স্কুলের বেশী পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
পরবর্তীতে তার পরিবার দাপোলি থেকে সাতারে চলে আসে। এখানে অবশ্য তিনি ক্লাসের ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু বেঞ্চিতে বসতে পারতেন না। ক্লাসের এক কোনে নিজের নিয়ে আসা পাটের বস্তাটি বিছিয়ে বসে পড়তেন। দিনশেষে আবার সেটি নিয়ে যেতেন সঙ্গে করে। কারণ স্কুল পরিষ্কার করা কর্মচারীও সেটি স্পর্শ করতেন না।
স্কুলের ট্যাপ খুলে বা মগ থেকে তার জল খাবার অনুমতি ছিলো না। কারণ তার ছোঁয়ায় এসব অপবিত্র হয়ে যাবে। কেবল যখন উচ্চ বর্ণের কেউ ট্যাপ খুলে দিত বা মগ থেকে জল ফেলে দিত, তখনই তার তৃষ্ণা মেটাবার সুযোগ মিলত। এ ‘নিচু’ কাজটার দায়ভার সাধারণত স্কুলের পিয়নের কাঁধেই পড়তো। সে গ থেকে জগ ঢালত ভীমরাওয়ের জন্য। অন্য কেউতো কাছেই ঘেঁষতো না তেমন। যেদিন পিয়ন থাকতো না, সেদিন তাকে তৃষ্ণার্ত হয়েই কাটাতে হতো।
এতক্ষণ যার কথা বলেছি তার পুরো নাম ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। দলিতরা যাকে ভালোবেসে ‘বাবা সাহেব’ বলে ডাকেন। পরবর্তীকালে যিনি হয়ে উঠেছিলেন তুখোড় অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক। তিনি হয়েছিলেন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী, ভারতীয় সংবিধানের মুখ্য স্থপতি। তবে সবচেয়ে আগে তার যে পরিচয়টি দেয়া দরকার তা হলো, বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। ১৯৯০ সালে ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক উপাধি ‘ভারতরত্ন’-তে ভূষিত করা হয় তাঁকে।
বি আর আম্বেদকর জন্মেছিলেন ১৮৯১ সালে, ১৪ এপ্রিল। বর্তমান ভারতের মধ্যপ্রদেশের মোহ অঞ্চলে। রামজি মালোজি শাকপাল ও ভীমাবাই এর চতুর্দশ সন্তান ছিলেন তিনি। তার পূর্বপুরুষদের অধিকাংশই ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তার পিতা রামজি সকপাল একজন সুবেদার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। মূলত পিতার ইচ্ছাতেই তার স্কুলের পাঠ শুরু হয়। সেখানে দলিত হওয়ার কারণে তিনি শৈশবেই যে তীব্র বিদ্ধেষের মুখোমুখি হয়েছেন তা উপরের ঘটনাগুলো থেকে কিছুটা টের পাওয়া যায়। আম্বেদকরের আসল পদবি ছিল 'সকপাল', তাঁর পিতা সেটি পাল্টে রাখেন 'আম্বাদাভেকর', যার অর্থ হল তিনি তাঁর গ্রাম 'আম্বাদাভে' থেকে এসেছেন। পরবর্তীকালে তাঁর ব্রাহ্মণ স্কুল শিক্ষক কৃষ্ণ কেশব আম্বেদকর তাঁর পদবি পরিবর্তন করে নিজের পদবি তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে দেন। পিতার উৎসাহে ছোট থেকেই তিনি পড়াশোনায় যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন। ছোট থেকেই তিনি তাঁর সন্তানদের হিন্দু সংস্কৃতি পড়তে উদ্বুদ্ধ করতেন।
আম্বেদকর প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতি থেকে মারাঠি এবং ইংরেজিতে ডিগ্রী লাভ করেছিলেন। তবে দলিত হওয়ার কারণে শৈশবে প্রাথমিক স্কুল থেকেই তাঁকে তীব্র জাতিবিদ্বেষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেক ধর্না দেওয়ার পর দাপোলিতে তিনি প্রথম স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর পরিবার দাপোলি থেকে সাতারে চলে আসে। সাতারে আসার অল্পদিনের মধ্যেই আম্বেদকরের মা মারা যান। এরপর মাসির কাছে কষ্টকর পরিবেশে বড় হয়ে ওঠেন আম্বেদকর।
তবে এ বিদ্ধেষ যে শুধু স্কুলেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়। স্কুলের বাইরেও এ হেনস্থা তার পিছু ছাড়েনি। একবারের একটি ঘটনা তার মনে ভীষণ দাগ কেটে যায়। তার বয়স তখন নয়-দশ বছরের মতো। তারা ভাই-বোনরা মিলে সতর থেকে তার পিতার কর্মস্থল কোরগাঁও বেড়াতে যাচ্ছিলেন। সেদিন রেলস্টেশন থেকে তাকে তার বাবার এসে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি তাদের যাওয়ার খবর পাননি।
রেলস্টেশন এসে ভীমরাওরা বেশ বিপাকে পড়লেন। তারা বাচ্চা কয়েকটি ছেলেমেয়ে, বড়সড় সব ব্যাগ সাথে, তার ওপর এখানে কিছুই চেনেন না তারা। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও কেউ এলো না। স্টেশন মাস্টার এগিয়ে আসলেন কী হয়েছে জানতে। তারা সব বৃত্তান্ত বললেন তাকে। তিনি সব দেখেশুনে বেশ আগ্রহের সাথে তাদের সাহায্য করতে চাইলেন। তাদের নতুন জামাকাপড় দেখে তিনি তাদের ব্রাহ্মণসন্তানই ভেবেছিলেন। একসময় তিনি কথায় কথায় তাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। তারা দ্বিতীয়বার না ভেবেই বলে দিলেন যে, তারা 'মহর' গোত্রের।
তারা দলিত শুনে স্টেশন মাস্টার যেন বড়সড় ধাক্কা খেলেন। তিনি পিছু হটে নিজের কামরায় চলে গেলেন। অবশ্য আধাঘন্টা পর ফের এলেন। চেষ্টা করলেন তাদের একটি গাড়িতে উঠিয়ে দিতে। কিন্তু কোনো গাড়ির চালক তাদের গাড়িতে উঠতে দিতে চায়নি। কারণ দলিতদের সাথে একই গাড়িতে চালক বসবেন কীভাবে? তাছাড়া গাড়িও অপবিত্র হয়ে যাবে। অবশেষে ভীমরাও নিজে সেদিন গাড়ি চালিয়েছিলেন, পাশে চালক হেঁটে গিয়েছেন। আর তাকে ভাড়াও দিতে হয়েছে দ্বিগুণ।
সে রাতে তাদের সাথে যথেষ্ট খাবার থাকা সত্ত্বেও তাদের অভুক্ত থাকতে হয়েছিল। কারণ তারা পানি জোটাতে পারেন নি। অস্পৃশ্যকে জল দেবে কে? এসব তো কেবল খন্ডচিত্র। তারা যে পাড়ায় থাকতেন যেখানে অধিকাংশই উচ্চবর্ণের হিন্দু ছিল। সেখানে কোনো নাপিত তাদের চুল কেটে দিতো না, কোনো ধোপা তাদের কাপড় কেঁচে দিতো না। তার বড় বোনকেই তার ও তার ভাইদের চুল কেটে দিতে হতো।
আর এ বৈষম্য যে শুধু উচ্চবর্ণের হিন্দুরাই করতো তা নয়। তার স্মৃতিকথা থেকে এর একটি প্রমাণ পাওয়া যায়। তার যুবক বয়সের কথা। একবার তারা কয়েকজন দলিত আওরঙ্গবাদ হয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের যাত্রাপথেই পড়ছিল বিখ্যাত দৌলতাবাদ শহর। এখান দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো পর্যটক ঐতিহাসিক দৌলতাবাদ দুর্গে না ঘুরে যান না। আম্বেদকর ও তার সঙ্গীরাও দৌলতাবাদ দুর্গ ঘুরে যাবেন বলে ঠিক করলেন।
সে এলাকাটি ছিল মুসলিমপ্রধান এলাকা। আর তখন মুসলমানদের পবিত্র রমজান মাস। দৌলতদিয়া দুর্গের সামনে পানিতে পরিপূর্ণ একটি কূপ ছিল। যেখানে মুসলমানরা অজু করতেন। আম্বেদকররা যখন সেখানে গেলেন তখন ধুলাবালিতে তাদের সারা শরীর আচ্ছন্ন হয়ে আছে। তারা কূপের পানি দিয়ে হাত মূখ ধুয়ে নিলেন। তারপর এগিয়ে গেলেন দুর্গের দিকে। হঠাত পেছন থেকে একজন বৃদ্ধ মুসলমান বলে উঠলেন, “এই অচ্ছুতেরা কূপের জলকে অপবিত্র করে দিয়েছে।”
তার কথা শেষ হওয়ার পর আরো কয়েকজন চেঁচিয়ে উঠলেন, “অচ্ছুতের বড় বাড় বেড়েছে, এদের একটা শিক্ষা দেয়া উচিৎ” মুহূর্তের মধ্যে যেন পুরো লড়াই বাঁধার উপক্রম। অবস্থা গুরুতর দেখে আম্বেদকররা সহ বোঝাতে লাগলেন যে, তারা বাইরে থেকে এসেছেন। এখানের স্থানীয় রীতিনীতি সম্পর্কে তাদের জানা নেই। কিন্তু মুসলিমরা থামছিলেন না। তারা ওখানের স্থানীয় দলিতদের ওপর চড়াও হলেন, তারা কেন এদের জানায় নি। আম্বেদকর দেখলেন যে, এভাবে চলতে থাকলে দাঙ্গা বাঁধাও অসম্ভব নয়।
তিনি মুসলমানদের বোঝাতে লাগলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। পেছন থেকে এক তরুণ মুসলিম বলে উঠলেন, “সবার নিজেদের ধর্ম মেনে চলা উচিৎ। নিজেদের সীমার মধ্যে থাকা উচিৎ।” এ কথা শুনে আম্বেদকর আর রাগ ধরে রাখতে পারলেন না। ক্ষিপ্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার ধর্ম কী তোমাকে এই শিক্ষা দেয়? যদি এই অস্পৃশ্যরা মুসলমান হয়ে যায়, তবেও কী তুমি তাদের এই কূপের জল স্পর্শ করা থেকে বাঁধা দেবে?” তার প্রশ্নগুলো শুনে উপস্থিত মুসলমানরা যেন কিছুটা থমকে গেল।
সেদিন তিনি বুঝেছিলেন, কেবল উচ্চবর্ণের হিন্দুদের কাছেই তারা অস্পৃশ্য বা ঘৃণিত নন। ভারতের একটা বড় মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছেও তারা ঘৃণিত। তিনি তার জীবনের প্রতিটি পদে পদে দেখেছেন কীভাবে এক অদ্ভুত প্রথার কারণে তীব্র ঘৃণার বান ছুঁড়ে দেয়া হচ্ছে এক বিশাল জনগোষ্ঠীর দিকে। কীভাবে টেনে হিঁচড়ে সমাজের নিচু স্তরে দমিয়ে রাখা হচ্ছে তাদের। এসব ঘটনা তীব্রভাবে আহত করে তাকে। সমাজের কাঠামো নিয়ে প্রচন্ড হতাশ হয়ে পড়েন তিনি।
তীব্র হতাশা থেকেই জন্ম হয় সমাজ সংস্কারকদের, বিপ্লবীদের। কেননা এ হতাশাই এনে দেয় সমাজ বদলানোর জেদ। যা বি আর আম্বেদকরের মনেও তীব্রভাবে জেগেছিল। তিনি তার জীবনের মিশন হিসেবে নিয়েছিলেন বর্ণবৈষম্য দূরীকরণকে। দলিতদের মুখপাত্র হয়ে উঠেছিলেন গোটা ভারতে। তাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এক সুন্দর ভবিষ্যতের। আর এসব কারণেই তিনি দলিতদের কাছে হয়ে উঠেছিলেন ভালোবাসার ‘বাবা সাহেব’।
আম্বেদকর তাঁদের জাতি ‘মহর’ থেকে প্রথম মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করতে সক্ষম হন। ১৯১২ সালে তিনি বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানে ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি বরোদায় সরকারি চাকরি গ্রহণ করেন। ১৯১৩ সালে পিতার মৃত্যুর পর তিনি আমেরিকার নিউইয়র্ক এর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ছাত্র হিসেবে যোগ দেন। তিনি এই পড়াশোনার জন্য বরোদা সরকারের বৃত্তি পান। ১৯১৫ সালে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স-এ ১৯১৬ সালে ভর্তি হন তবে ১৯১৭ সালের জুন মাসে বরোদা বৃত্তি শেষ হয়ে গেলে তিনি ভারতে ফিরে যেতে বাধ্য হন । ১৯২১ সালে তিনি আবার লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স-এ ফিরে যাওয়ার সুযোগ পান এবং সেখানে অর্থনীতিতে মাস্টার্স ডিগ্রী পান, ১৯২৩ সালে ডি.এসসি. ডিগ্রী লাভ করেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯২৭ সালে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন।
আইন চর্চার শুরুর দিকে আম্বেদকর কিছু ব্রাহ্মণ এবং অব্রাহ্মণ নেতাদের অভ্যন্তরীণ মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯২৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি বিজয়ী হন। বোম্বে হাইকোর্টের আইনজীবী থাকাকালীন আম্বেদকর অস্পৃশ্যদের শিক্ষিত করে তুলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। ১৯২৭ সালে তিনি অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি গণ আন্দোলন শুরু করেন এবং ‘সুপেয় জল পানের অধিকার’ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনের জন্য ১৯৩২ সালে লন্ডনে দ্বিতীয় গোল টেবিল বৈঠকে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের তাঁর সাথে একমত হন এবং পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ঘোষণা করেন। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী ও তাঁর অনুগামীদের প্রবল চাপের মুখে আম্বেদকর পৃথক নির্বাচন মণ্ডলী বাতিল করতে বাধ্য হন। ইতিহাসে এটি ‘পুনেচুক্তি’ নামে পরিচিত। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক আসন অস্পৃশ্যদের জন্য সংরক্ষিত হয়। এই চুক্তিতে যাকে বলা হয় ‘অস্পৃশ্য সম্প্রদায়’।১৯৩৫ সালে তিনি মুম্বাইয়ের সরকারি আইন মহাবিদ্যালয় এর অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হন। এসময় তিনি একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। এই একই বছরে তাঁর প্রথম স্ত্রী রামাবাই মারা যান। ১৯৩৬ সালে আম্বেদকর স্বনির্ভর শ্রমিকদল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৭ সালে তাঁর বই ‘দ্য অ্যানিহিলেশন অফ কাস্ট’ প্রকাশ করেন। তিনি অস্পৃশ্য ও বর্ণ প্রথার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন।
রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যোগ দেওয়ার আগে তিনি পুরোদস্তুর অর্থনীতিবিদ ছিলেন এবং বেশ কিছু বইও রচনা করেছিলেন। 'ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক' বা 'আরবিআই'-এর রূপরেখা ও নীতি নির্দেশিকা 'হিল্টন ইয়ং কমিশনে' তাঁর দেওয়া প্রস্তাবনা থেকেই তৈরি হয়।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে এবং নতুন সরকারের প্রথম আইন মন্ত্রী হন আম্বেদকর। ২৯ শে আগস্ট আম্বেদকরকে সংবিধান খসড়া সমিতির সভাপতি করা হয় ১৯৪৯ সালের ২৬শে নভেম্বর গণপরিষদ করতে সংবিধান গৃহীত হয়। তিনি আর্টিকেল ৩৭০ এর বিরোধিতা করেছিলেন এবং ইউনিফর্ম সিভিল অ্যাক্ট প্রচলনের পক্ষপাতী ছিলেন। ১৯৫১ সালে তাঁর প্রস্তাবিত ‘হিন্দু কোড বিল’ খসড়াটি সংসদে স্থগিত রাখার কারণে তিনি মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। এই বিলটিতে পৈতৃক সম্পত্তি ও বিবাহ আইনের আওতায় লিঙ্গসমতার প্রস্তাব করা হয়েছিল। ১৯৫২ সালের লোকসভা নির্বাচনে নির্দলপ্রার্থী হিসেবে লড়াই করেন ও পরাজিত হন। পরে তিনি ১৯৫২ সালের মার্চ মাসে রাজ্যসভার উচ্চপদস্থ সাংসদ নির্বাচিত হন ও আমৃত্যু এইপদে আসীন ছিলেন।
তিনি ১৯৫১ সালে 'ফিনান্স কমিশন অফ ইন্ডিয়া' তৈরি করেন। তিনি ভূমিসংস্কার ও করব্যবস্থার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। তিনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য জন্ম নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দেন। কৃষিকাজ ও শিল্পের উন্নতির জন্য তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। বর্ণপ্রথার জন্য শ্রমিকের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কারণে অর্থনৈতিক উন্নতি ব্যাঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে বলেও তিনিও মনে করতেন।
বৌদ্ধ ধর্ম ও গৌতম বুদ্ধের জীবনী দ্বারা আম্বেদকর বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। প্রথমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা তিনি ‘বোধিসত্ত্ব’ উপাধিতে সম্মানিত হয়েছিলেন। নৃতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আম্বেদকার জেনেছিলেন আসলে ‘মাহার’রা প্রাচীন ভারতীয় বৌদ্ধ। এই ব্যাপারে তিনি তাঁর পান্ডিত্যপূর্ণ বই, ‘Who were the Shudras’ -তে বর্ণনা দেন। তিনি ‘ভারতীয় বৌদ্ধ মহাসভা’ গঠন করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি তাঁর সর্বশেষ বই ‘The Buddha and His Dharma’- এর কাজ শেষ করেন। বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে তিনি অনেকগুলি রচনা ও গ্রন্থ প্রকাশ করেন যা গৌতম বুদ্ধের জীবনী ও তাঁর ধর্মকে বুঝতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৪ সালে নেপালের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা 'জাগতিক বৌদ্ধ ধর্ম পরিষদে' বাবা সাহেব আম্বেদকরকে 'বোধিসত্ত্ব' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। উল্লেখ্য, আম্বেদকরই প্রথম জীবিত থাকাকালীন 'বোধিসত্ত্ব' উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
দিনটা ঠিল ১৯৫৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর। সাংবিধানিক সংশোধনী নিয়ে রাজ্যসভায় বিতর্ক চলছিল। বাবা সাহেব রাজ্যপালের ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে অনড় ছিলেন। সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায়ও তিনি ছিলেন অনড়। এই বিতর্কের সময়, বাবা সাহেব বলেছিলেন, "নিম্নশ্রেণীর মানুষজন সবসময় এটা ভেবে ভয়ে ভয়ে থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠরা তাদের ক্ষতি করতে পারে। আমরা বন্ধুরা আমায় বলেছিল বলে সংবিধান তৈরি করেছি আমি। আমি হব আবার সেই প্রথম ব্যক্তি যে এই সংবিধান পোড়াব। এটা কারও জন্য ভালো নয়। সংখ্যাগুরুদের কখনই বলার অধিকার নেই সংখ্যালঘুদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়। তাহলে আসলে গণতন্ত্রের ক্ষতি হবে।" আম্বেদকরের বক্তব্য নিয়ে বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়।
এই বিতর্কের ঠিক দুই বছর পরে, ১৯ মার্চ ১৯৫৫-এ এই বিষয়টি আবার রাজ্যসভায় উত্থাপিত। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী সংক্রান্ত বিল নিয়ে আলোচনা চলছে তখন। পাঞ্জাবের সাংসদ ডঃ অনুপ সিং, যিনি হাউসে আলোচনায় অংশ নিতে এসেছিলেন, তিনি বাবা সাহেবকে প্রশ্ন করেন, কেন তিনি আগেরবার সংবিধান পোড়ানোর কথা বলেছিলেন। সে প্রশ্নের উত্তরে বাবা সাহেবের জবাব ছিল, "শেষবার তিনি তাড়াহুড়ো করে সম্পূর্ণ উত্তর দিতে সক্ষম হননি। আমি খুব ভেবেচিন্তে বলেছিলাম যে আমি সংবিধান পোড়াতে চাই।" ডাঃ আম্বেদকরের কথায়, "আমরা মন্দির তৈরি করি যাতে ঈশ্বর এসে সেখানে বাস করতে পারেন। যদি অসুররা এসে ভগবানের সামনে থাকতে শুরু করে, তাহলে মন্দির ধ্বংস করা ছাড়া আর কি উপায় থাকবে। কেউ মন্দির তৈরি করে না এই ভেবে যে সেখানে রাক্ষস বাস করতে শুরু করবে। সবাই চায় মন্দিরে দেবতারা বাস করুক। এ কারণেই সংবিধান পোড়ানোর কথা উঠেছিল।"
ডাঃ বাবাসাহেব ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। স্বাধীন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী। ভারতীয় সংবিধানের প্রণেতা। জীবন্দ কিংবদন্তী। বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর (১৮৯১-১৯৫৬) এক অবিশ্বাস্য প্রতিভা, যার তল পাওয়া দুষ্কর। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘ম্যান অফ মেনি পার্টস’ বা নীরদ সি চৌধুরীর ভাষায় ‘স্কলার এক্সট্রাঅর্ডিনারী’, বাবাসাহেব ছিলেন ঠিক তা-ই। ৬৫ বছরের জীবনে এমন কোনও বিষয় বা আঙ্গিক নেই, যা তিনি ছুঁয়ে দেখেননি। যে বিষয় হাতে নিয়েছেন, সোনা ফলিয়েছেন৷ একদিকে তিনি রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক, জুরি সদস্য, সমাজসেবী, অন্যদিকে দলিত অন্ত্যজ ও নিম্নবর্গের অধিকার আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ, সুলেখক, প্রাবন্ধিক, বৌদ্ধশাস্ত্রজ্ঞ, নারী শিক্ষা ও জাগরণের হোতা, ভোজনরসিক, সুবক্তা, আইনজ্ঞ, নির্ভেজাল বইপোকা…এ তালিকা সহজে ফুরোবার নয়৷ তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হল, তিনি ভারতীয় সংবিধানের জনক। স্বাধীনতা সংগ্রামে অনন্য এক সেনানী, যিনি বন্দুকের চেয়েও বই ও কলমের শক্তিতে বিশ্বাস রাখতেন বেশি। তাঁর আঁকা অসংখ্য ছবি তাঁর নিবিড় শিল্পীমনের পরিচায়ক। মজার বিষয়, আদ্যোপান্ত মজলিশি স্বভাবের মানুষটির একটি বিশেষ পরিচয় আজও বহুজনের অজানা। সেটি হল শাস্ত্রীয় ও লোকসঙ্গীতের প্রতি আকণ্ঠ অনুরাগ৷ খুব কম মানুষই জানেন যে বাবাসাহেব একজন সুগায়ক ছিলেন। ছিলেন তালবাদ্যে পারঙ্গম। চমৎকার ‘ডাফলি’ বাজাতেন ও শেষ জীবনে নিষ্ঠাভরে শিখেছেন বেহালা। প্রৌঢ়ত্বে এসে সেই নিভৃত সঙ্গীতসাধনা তাঁকে দিয়েছিল অপার শান্তির সন্ধান। বিশিষ্ট আম্বেদকর-অনুরাগী, মরাঠি লেখক এবং জীবনীকার ভগবানরাও চন্দেও খড়মোরে ১২ খণ্ডে লিখেছিলেন বাবাসাহেবের পূর্ণাঙ্গ জীবনী। তা থেকে জানা যায়, বাবাসাহেব তাঁর শৈশব থেকেই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। মেধাবী পড়ুয়া হওয়ার পাশাপাশি খেলাধূলায় ছিল তাঁর উৎসাহ। এর মধ্যে ক্রিকেট ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়। ক্লাস এইট থেকে টেন পর্যন্ত বম্বের এলফিনস্টোন হাইস্কুলে পড়ার সময় স্কুল ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন। ভাল ব্যাটসম্যান ছিলেন। আর এই সময় থেকেই সঙ্গীতের প্রতি একটু একটু করে অনুরক্ত হতে শুরু করেন ভীমরাও। অবশ্য এর পিছনে ছিল তাঁর বাবার বিশেষ অবদান। বাবাসাহেব তাঁর পাহাড় প্রমান কাজের মধ্যে সুযোগ পেলেই বসে যেতেন বেহালা নিয়ে। সবিতা আম্বেদকর জানিয়েছেন, বেহালার ছড় হাতে তুলে নিলে নাওয়া খাওয়া ভুলে যেতেন আম্বেদকর। শারীরিক কষ্টের জন্য বেশিক্ষণ বাজাতে পারতেন না। তখন ফিরে যেতেন আঁকায়। কষ্ট কম হলে আবার তুলে নিতেন বেহালা।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী রমা বাঈয়ের প্রয়াণের (সাল ১৯৩৫) পর ভেঙে পড়েছিলেন আম্বেদকর। দীর্ঘ ২৯ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক তাঁদের। ১৯০৬ সালে যখন রমাবাঈকে বিয়ে করেন ভীমরাও, তখন তাঁর বয়স ১৫, রমাবাঈ মাত্র ৯। পাঁচ সন্তানের জননী, আম্বেদকরের প্রিয় মানুষ ‘রামু’ আজীবন তাঁর স্বামীর পাশে ছিলেন। আম্বেদকর নিজে বলেছিলেন, “রমাবাঈ না থাকলে আম্বেদকর কখনই আম্বেদকর হয়ে উঠতে পারত না।” রমাবাঈয়ের শোক ভুলতে নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে দেন আম্বেদকর। ফলে নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় তাঁর। হাই ডায়বেটিস, হৃদরোগজনিত সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ইত্যাদিতে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে থাকতেন ভীমরাও। এই সময় বম্বের ভিলে পার্লেতে ডাঃ এস এম রাও-এর কাছে চেক আপের জন্য যেতেন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় সারদা কবীরের। সারদা নিজে দলিত পরিবারের মেয়ে, অত্যন্ত মেধাবী ও পেশায় চিকিৎসক। চেক আপের সময় তাঁরা কাছাকাছি আসেন। বাবাসাহেবের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন সারদা। সারদার মধ্যে রমাবাঈয়ের প্রচ্ছন্ন ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন আম্বেদকর। এর পর ধীরে ধীরে তাঁরা ঘনিষ্ঠ হন ও ১৯৪৮ এর ১৫ এপ্রিল বিবাহ করেন। তার একমাস আগে ১৬ মার্চ দাদাসাহেব গাইকোয়াড়কে লেখা চিঠিতে ভীমরাও বলেন, “রমার চলে যাওয়ার পর দ্বিতীয় বিবাহের কথা স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু সারদাকে দেখে সেই সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হলাম। সারদার মধ্যেই রমাকে খুঁজে পেলাম নতুন করে।” বিয়ের পর মরাঠি রীতি মেনে সারদার নতুন নাম দেন 'সবিতা'। অনুরাগীরা শ্রদ্ধায়, ভালবাসায় নাম রেখেছিলেন ‘মাঈসাহেব’ বা ‘মাঈ’। সস্ত্রীক ভীমরাওকে দেখতে প্রতিদিনই দিল্লির পৃথ্বীরাজ রোডের বাড়িতে উপচে পড়তো ভিড়। আম্বেদকর ফেরাতেন না কাউকেই। যথাসাধ্য বাড়িয়ে দিতেন সাহায্যের, সহমর্মিতার হাত।
১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর। দিল্লির আলিপুর রোডের বাড়ি। দিন আগেই শেষ করেছেন “দ্য বুদ্ধা অ্যান্ড হিজ ধর্মা”র ফাইনাল ম্যানুস্ক্রিপ্ট। চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ, রক্তে শর্করার হার মারাত্মক, রয়েছে বিকল হয়ে আসা হৃদযন্ত্রের সমস্যা। ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী তিনি। সবাই বুঝতে পেরেছিলেন শেষ সময় আগত৷ ৫ ডিসেম্বর রাতে সামান্য খেয়ে স্ত্রী সবিতাকে ইশারা করে কিছু বলেন। স্বামী কী চাইছেন, তা বুঝতে পেরেছিলেন সবিতা। প্রাণাধিক প্রিয় বেহালাটিকে বাবাসাহেবের পাশে রেখে দেন তিনি। বেহালাটি আলতো করে ছুঁয়ে ঘুমিয়ে পড়েন বাবাসাহেব। সেই ঘুম আর ভাঙেনি তাঁর।
ভাবতে অবাক লাগে আজ স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব পার করেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আস্ফালনে বিপন্ন সংবিধান গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত। চারিদিকে মেরুকরণের দামামা। মানুষের মানুষের বিভাজন বৈষম্য। সবকিছুতেই ঢুকে গেছে ভেদাভেদের রাজনীতি। সংবিধানের শপথ নিয়ে নেতা-মন্ত্রীরা গণতন্ত্রকে পদদলিত করছেন। ভেবে শিউরে উঠি, বিজ্ঞান প্রযুক্তির যুগে মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সুকৌশলে ধর্মীয় বিভাজনের জালে মানুষে মানুষে শুরু হয়েছে অস্থিরতা অবিশ্বাস অসহিষ্ণুতা বাতাবরণ। বিশেষ করে বিজেপি শাসিত ভারতবর্ষে প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘুদের অধিকার, ভারতবর্ষের বৈচিত্র ঐতিহ্য সনাতন সংস্কৃতি সর্বধর্ম সমন্বয়ের শাশ্বত ভাবনা আদর্শ ভেঙে পড়ছে।
সংবিধানের লঙ্ঘন করে গণতন্ত্রকে ভূলুণ্ঠিত করে চলছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আস্ফালন। বর্তমান সঙ্কটের মুহূর্তে ভারতের বহুত্ব সনাতন ঘরাণার সাম্প্রদায়িক, সম্প্রীতি, অখন্ডতা, সংহতি, সর্বোপরি গণতন্ত্রকে বিকশিত ও সর্বজনীন করে তুলতে বি আর আম্বেদকরের জীবন দর্শন স্মরণ পালন ও প্রাত্যহিক চর্চা একান্ত জরুরী।
আজ তাঁর ১৩৩তম জন্মদিবসে ভারতমাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, মহাপুরুষ আম্বেদকরকে জানাই শ্রদ্ধা ও অন্তঃস্থ ভলোবাসা। তার অমৃতবাণী, পথ চলা, জীবন সংগ্রাম প্রতিটি ভারতীয়দের সংকটমোচন, উৎসাহ প্রদান ও অনুপ্রেরণায় চির বার্তাবাহক। আম্বেদকরের অনুপ্রেরণায় এখনো দলিতরা তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার। তার গোটা জীবনই যেন এক প্রেরণার বাতিঘর। সেই ক্লাসে পাটের বস্তা বিছিয়ে বসা ছেলেটির বিশ্বব্যাপী সমাদৃত জ্ঞানী হয়ে ওঠা, দলিতদের নিয়ে তার আন্দোলন গড়ে তোলা, এরপর তার সংবিধানের স্থপতি ও ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী হওয়া - পুরো জীবন যেন অনন্য এক সংগ্রামী সফর। তার জীবনের অন্য কোনো দিক নিয়ে অন্য কোনো লেখায় আলোচনা করা যাবে। আজ এ পর্যন্তই থাক।
★ তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার :- Last Few Years of Dr. Ambedkar - Nanak Chand Rattu, Amrit Publishing House, Little Known Facets of Dr. Ambedkar - Nanak Chand Rattu, Amrit Publishing House, Maharashtra Times, Times of India, The Hindu, Prabuddha Bharat, Lokmat Times & Dr. Ambedkar Foundation, New Delhi, সব বাংলায়, প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত - বাংলা লাইভ ডট কম, সাময়িকী ডট কম, রোর মিডিয়া,
৪০
মহিয়সী বেগম রোকেয়া
মাতৃভাষার অধিকারের সঙ্গে আত্মসম্মানের প্রশ্নটা এক করে যাঁরা দেখেছেন যে সব মহিয়সী নারী সেই সব ভাষাকন্যাদের স্মৃতিচারণগুলো পড়তে পড়তে আমার বার বার মনে হয় তাঁদের পুরোধা সুফিয়া কামালের কৈশোর-যৌবনে গোপনে মাতৃভাষায় লেখনীচর্চার কথা, আর সেই সূত্রে অবধারিত ভাবে সুফিয়ার পূর্বসূরি বেগম রোকেয়ার কথা। ১৯২০-এর দশকের শুরুতেও আশরাফ বা সম্ভ্রান্ত পাঠান/মোগল বংশোদ্ভূত সুফিয়াকে লুকিয়ে বাংলা পড়তে হত, কারণ বাংলায় লেখাপড়া ছিল তাঁর পরিবারের পক্ষে খুবই বেইজ্জতির ব্যাপার। বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা উর্দু না বাংলা, এ প্রশ্ন তখন বড় করে দেখা দিয়েছে। সুফিয়া ও তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের মেয়েরা যে ’৫০-এর দশকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পক্ষ নিয়েছিলেন, আমাদের মনে রাখা দরকার যে তার জন্য যাঁর অবদান সর্বাধিক, তিনি হলেন বেগম রোকেয়া। আমরা তাঁকে এক জন কালোত্তীর্ণা লেখিকা, সমাজসংস্কারক এবং নারীশিক্ষার পথিকৃৎ বলে জানি। কিন্তু যেটা আমরা সচরাচর স্মরণ করি না, সেটা হল শিক্ষায়তনে বাঙালি মুসলমান মেয়েদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের অধিকার প্রায় তাঁর একার সংগ্রামে অর্জিত হয়েছিল। বিশ শতকের তৃতীয় দশকেও তিনি তাঁর লেখায় আক্ষেপ করেছেন যে, বাঙালি মুসলমান মাতৃহীন কারণ তাঁর কোনও মাতৃভাষা নেই।
রোকেয়া নিজে বাংলা শিখেছিলেন তাঁর দিদি করিমুন্নেসার কাছে সংগোপনে। ১৯১১-য় রোকেয়ার নিজের স্কুল সাখাওয়াত মেমোরিয়ালের গোড়াপত্তনের সময় থেকে তিনি অবরোধবাসিনীদের শিক্ষার জন্য প্রাণপাত করেছিলেন তো বটেই। তা ছাড়া বাঙালি মেয়েদের জন্য তাঁর স্কুলে বাংলা ভাষা শিক্ষা চালু করতে তাঁকে পাহাড়প্রমাণ বাধা ডিঙোতে হয়। প্রায় ষোলো বছরের চেষ্টায় ১৯২৭ সালে তিনি উর্দু মাধ্যমের পাশাপাশি বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা পুরোপুরি চালু করতে সক্ষম হন, এবং এর পরের দু’দশকে ছাত্রীদের মধ্যে ভাষিক জাতীয়তাবোধ চারিয়ে দিতে এই স্কুলটি বিরাট ভূমিকা নেয়। বাঙালি সমাজ যখন ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা আর সামাজিক কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল, সেই সময় বেগম রোকেয়া বাংলার মুসলিম নারী সমাজে শিক্ষার আলো নিয়ে এসেছিলেন। বাঙালি মুসলমান নারী জাগরণের তিনি ছিলেন অন্যতম একজন পথিকৃৎ।
তখনও কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরবার ঢালাও চল হয়নি এ দেশে। ঠাকুরবাড়ির হাত ধরে সবে সবে শুরু। বিদ্যাসাগর বিধবা-বিবাহ আইন আর মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছেন বটে, কিন্তু বাংলাদেশে তার পরিপূর্ণ সুফল ভোগ করার মতো অনুকূল সামাজিক অবস্থা তৈরি হয়নি। কুলীন ব্রাহ্মণের ঘরে তখনও অবাধে চলছে গৌরিদান। অকালবৈধব্যের যন্ত্রণা সইতে না-পেরে উপোসী নিপীড়িত মেয়েদের দল নাম লেখাতে বাধ্য হচ্ছে গণিকাবৃত্তিতে। মেয়েদের মানুষ বলে গণ্য করারই দায় বোধ করছেন না সমাজের অধিকাংশ পুরুষ, এমনকি নারীও। কাজেই নারীবাদ বলে কোনও মতবাদ যে দূরতম দিগন্তেও ছিল না, সে কথা বোধ করি না বললেও চলে।
বিশ শতকের সূচনালগ্নে নারীর এহেন চূড়ান্ত অবমাননাকর অবস্থা বড় বেজেছিল এক নারীর বুকে। শপথ করেছিলেন, নারীদের উন্নতিকল্পে আমৃত্যু কাজ করে যাবেন। সেই শপথের মান রাখতে গিয়ে চোখে ঠুলি পরা সমাজের হাজার বাধা, লক্ষ কুসংস্কার, অযুত শেকল তাঁর পা টেনে ধরেছে। তাঁকে রক্তাক্ত করেছে বারবার। তিনি ছিলেন মুসলমানের মেয়ে। তাই ধর্মান্ধতার জিগির তুলে তাঁর পথরোধ করার অজস্র চেষ্টা করেছে অন্ধ মোড়লের দল। কিন্তু থামাতে পারেনি তাঁর স্পর্ধিত জয়যাত্রা, তাঁর অনমনীয় কর্মধারা। বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হুসেন যেমন গতিতে কলম চালিয়েছেন, তেমনই দুর্বার গতিতে চলেছে তাঁর সমাজ-সংস্কার, শিক্ষার প্রসার, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড।
"সোনার পিঞ্জরে ধরে রেখো না আমায়,আমারে উড়িতে দাও দূর নীলিমায়।" - এই উদ্ধৃতিটি বেগম রোকেয়ার। পুরো নাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশ) রংপুর শহর থেকে সাত মাইল দক্ষিণে মিঠাপুকুর থানার অন্তর্বর্তী পায়রাবন্দ গ্রামের জমিদার পরিবারে রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর। রাজা রামমোহন রায় ও পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যসাগরের হাত ধরে যে নবজাগরণের আলো আমাদের দেশে পৌঁছেছিল তাঁদেরই যোগ্য উত্তরসূরি রোকেয়া। ওই দুই মহান সমাজ সংস্কারকের মতো তিনিও প্রচলিত কুসংস্কার, অন্যায় অবিচার মেনে নিতে পারেননি। প্রতিবাদের ভাষায় তিনি সরব ছিলেন।
পিতা জহিরুদ্দিন আবু আলি হায়দার সাবের এবং মাতা রাহাতুন্নেসা চৌধুরানি। রোকেয়ার নিজের দুই ভাই ও দুই বোন ছিল। দুই ভাই আবুল আসাদ মোহাম্মেদ ইব্রাহিম সাবের ও খলিলুর রহমান আবু জায়গাম সাবের দুই বোন - করিমুন্নেসা ও হোমায়রা।রোকেয়ার পিতা বিদ্যানুরাগী ছিলেন। তিনি কুসংস্কার মুক্ত ছিলেন না। রক্ষণশীল ছিলেন বলেই তাঁর পরিবারে কঠোর পর্দা প্রথার প্রচলন ছিল। কেবল পুরুষদের সামনে নয়, অনাত্মীয়া মহিলাদের সামনেও পরিবারের মেয়েদের পর্দা মেনে চলতে হতো। তা থেকে শিশুরাও রেহাই পেত না। এ সম্পর্কে রোকেয়া বলেছেন, "সবে মাত্র পাঁচ বৎসর বয়স হইতে আমাকে স্ত্রীলোকদের হইতেও পর্দা করিতে হইত। ছাই কিছুই বুঝিতাম না যে, কোনও কাহারও সম্মুখে যাইতে নাই অথচ পর্দা করিতে হইতো।"
সময় ও কালের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর লেখা থেকেই তাঁর বাড়ির পরিবেশের কথা তুলে ধরছি - "আমাদের এ অরণ্যবেষ্টিত বাড়ীর তুলনা কোথায়? সাড়ে তিনশত বিঘা লাখেরাজ জমির মাঝখানে কেবল আমাদের এই সুবৃহৎ বাটি। বাড়ীর চতুর্দিকে ঘোর বন, তাহাতে বাঘ, শূকর, শৃগাল - সবই আছে। আমাদের এখানে ঘড়ি নাই, সেজন্য আমাদের কোন কাজ আটকায় না। প্রভাতে আমরা ঘুঘু, বউ কথা কও, ও খুকি ও খুকি, চোখ গেল, প্রভৃতি পাখীর আলাপে শয্যা ত্যাগ করি। সন্ধ্যাকালে শৃগালের ‘হুয়া হুয়া ক্যা হুয়া’ শব্দ শুনিয়া বুঝিতে পারি, মাগরিবের নামাজের সময় হইয়াছে। রাত্রিকালে কুরুয়া পাখীর কা-আক কা-আক-কু’ ডাক শুনিয়া বুঝিতে পারি, এখন রাত্রি তিনটা। আমাদের শৈশব জীবন পল্লীগ্রামের নিবিড় অরণ্যের পরম সুখে অতিবাহিত হইয়াছে।"
মুসলমান পরিবারের কোন মেয়ের পক্ষে তখন পর্দা ভেঙ্গে বিদ্যালয়ে যাবার প্রশ্ন ছিল অবান্তর। এই পর্দাপ্রথা কত কঠোর ছিল বেগম রোকেয়ার নিজের কথা থেকেই তার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁদের বাড়িতে কোন স্বল্প পরিচিত মহিলা বেড়াতে এলেও, পাঁচ বছরের বেগম রোকেয়াকে পর্দার আড়ালে থাকতে হত। বাইরের মহিলারা বেড়াতে এলে ক’দিন প্রাণপণ প্রায় অনাহারে কখনো চিলেকোঠায়, কখনো সিঁড়ির নিচে, কখনো দরজার আড়ালে লুকিয়ে থেকেছেন তিনি। প্রায় সমবয়সী দু’বছরের হালিম কখনও যদি তাঁকে একটু দুধ এনে দিতেন, তাহলে সেটাই হত তাঁর একমাত্র খাদ্য। মুসলমান মেয়েদের লেখাপড়ায় আর একটা মস্ত বড় বাধা ছিল এই যে, তখনো তাদের লেখাপড়ার কোন স্কুল ছিল না।
শিশু রোকেয়ার জীবনকাল কেটেছে কঠোর অবরোধের মধ্যে। লেখাপড়ার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও পিতার কাছ থেকে কোনও সাহায্য পাননি। কোনও বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাননি। বাড়িতে দিনের বেলায় লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। দিনের শেষে রাত্রিতে গভীর অন্ধকারে মোমবাতি জ্বেলে বড় ভাই ইব্রাহিম সাবেরের কাছে পাঠগ্রহণ করতেন। তাঁর কাছে শিখলেন ইংরেজি ভাষা আর বড়বোনের কাছে শিখলেন বাংলা ভাষা। দুই অগ্রজ ভাইবোনের স্নেহছায়ায় ছোট্ট রোকেয়া ধীরে ধীরে জ্ঞানের জগতে কৈশোরে পৌঁছে গেলেন।
রোকেয়ার যখন ষোল বছর বয়স, ১৮৯৬ সালে খান বাহাদুর সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ভাগলপুরের অধিবাসী সাখাওয়াত ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ১৮৭৮ সালে হুগলী কলেজ থেকে বি. এ. পাশ করেন। তারপর কৃষিশিক্ষার বৃত্তি নিয়ে ইংল্যাান্ডে যান। তিনি ছিলেন তেজস্বী সৎ মানুষ। তিনি বিপত্নীক ছিলেন। প্রথম স্ত্রী একটি কন্যা রেখে অল্প বয়সে মারা যান। প্রৌঢ়ত্বের সীমায় পৌঁছানো অবাঙালি সাখাওয়াতকে পাত্র হিসাবে মনোনয়ন করেন রোকেয়ার বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের।
রূপ, যৌবন, জাগতিক গুণাবলীকে প্রাধান্য না দিয়ে প্রাণাধিক প্রিয় বোন যাতে ভবিষ্যৎ জীবনে বিদ্যাচর্চা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায় সেই দিকে লক্ষ্য রেখেই তিনি কুসংস্কারমুক্ত, উদার, শিক্ষানুরাগী, ধীর স্থির সাখাওয়াত হোসেনকে অনিন্দ্যসুন্দর লাবণ্যময়ী রোকেয়া জীবনসঙ্গী হিসাবে নির্বাচন করেন অবশ্য বোনের সঙ্গে আলোচনা করেই। পরমপ্রিয় বড় ভাইয়ের মনের বাসনা ব্যর্থ হয়নি। বিবাহিত জীবনে রোকেয়া বিদ্যাশিক্ষা ও সাহিত্যশিক্ষার জন্য স্বামীর কাছ থেকে সকল প্রকার সহযোগিতা লাভ করেছিলেন। দাদার কাছ থেকে যে ইংরেজি শিক্ষার হাতেখড়ি হয়, স্বামীর কাছে তা পূর্ণতা পায়। স্বামীর প্রচেষ্টায় তিনি উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন। মাতৃভাষা বাংলা ছাড়া এই দুই ভাষাতে লিখতে পড়তে শিখেছিলেন। স্বামীর নির্দেশে ইংরেজি চিঠিপত্রের উত্তর লিখে দিতেন। বিয়ের পর ভাগলপুরে স্বামীগৃহ এবং স্বামীর মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই কাটান। এই সময়ে রোকেয়ার লেখা 'নবনূর', 'মহিলা', 'নবপ্রভা' প্রভৃতি পত্রিকায় কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাঁর একমাত্র উপন্যাস 'পদ্মরাগ' এই সময়েই রচনা করেন। মাদ্রাজের কমলিয়া নাথান ও সরোজিনী নাইডু সম্পাদিত 'Indian Ladies Magazine'-এ তাঁর 'Sultana’s Dream' নামক অনবদ্য কাল্পনিক কাহিনিও প্রকাশিত হয়।
এরপর রোকেয়ার জীবনে এল চরম দুর্যোগ। দুরারোগ্য বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হলেন সাখাওয়াত হোসেন। চোখ দুটি নষ্ট হয়। অসুস্থ স্বামীর পরিচর্যাতে দিন কাটে। চিকিৎসার জন্য স্বামীকে কলকাতায় আনা হলো। কোনও লাভ হলো না। ১৯০৯ সালের ৩ মে তিনি প্রিয়তমাকে নিঃসঙ্গ করে চলে গেলেন।
তাঁদের দাম্পত্য জীবনের সময়কাল মাত্র তেরো বছর। রোকেয়া দুটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, কেউ বাঁচেনি। স্বামীর মৃত্যুর পর সৎকন্যা ও জামাতার নিগ্রহ শুরু হলো সম্পত্তির কারণে। মাত্র ২৯ বছর বয়সে সুখী জীবনের স্রোতে চলতে হলো তাঁকে। সম্পূর্ণ ভিন জীবনের পথ চলা শুরু হলো - অচেনা নতুন জগতে দৃঢ় চিত্তে এগিয়ে চললেন রোকেয়া।ভাগলপুরের তদানীন্তন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাহ আবদুল মালেকের সরকারি বাসভবন গোলকুঠিতে ১৯১০ সালের ১ অক্টোবর রোকেয়া স্বামীর নামে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে। তার মধ্যে চারজনই মালেক সাহেবের কন্যা। মিতব্যয়ী সাখাওয়াত হোসেন মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য রোকেয়াকে দশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। স্বামীর ইচ্ছা পূরণ করতে এবং নিজের বাসনাকে বাস্তবায়িত করতে নতুন জীবন শুরু। ভাগলপুরের বাস ছাড়তে হলো শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের কারণে। ১৯১০ সালের ৩ ডিসেম্বর ভাগলপুর ত্যাগ করে কলকাতায় মালেক সাহেবের ছোট ভাই সৈয়দ আবদুস মালেকের বাড়িতে আশ্রয় নেন।
১৯১১ সালের ১৬ মার্চ কলকাতার ১৩নং ওয়ালিউল্লাহ লেনে বাড়ি ভাড়া করেন। সেই বাড়িতে ৮ জন ছাত্রী নিয়ে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে তিনিও থাকতেন। ৯ মে ১৩নং ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনে স্কুলটি স্থানান্তরিত হয়। ১৯১৫ সালে ডিসেম্বরে পঞ্চম শ্রেণি শুরু হয়। উচ্চ প্রাইমারি স্কুলে উন্নীত হয়। ১৯১৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৮৬/এ লোয়ার সার্কুলার রোডে স্থানান্তরিত হলো ছাত্রী সংখ্যা বেড়ে হ’ল ৮৪ জন। ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে ছাত্রী সংখ্যা ১০৫ জন। ১৯২৭ সালে ছাত্রীর সংখ্যা দাঁড়ালো ১৩৩। ১৯৩২ সালে ১৬২নং লোয়ার সার্কুলার রোডে স্কুলটির স্থান বদল হলো। ১৯৩৫ সালে ১৯ ডিসেম্বর সরকারি আদেশ অনুসারে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল সরকারি বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পায়। স্কুলটির নাম হয় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়। স্কুলটি আজ পশ্চিমবাংলার খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানগুলির অন্যতম।
দীর্ঘদিনের প্রথাবদ্ধ সংস্কার, অন্ধত্ব জড়তার বিরুদ্ধে রোকেয়া একাই লড়াই করেছেন। ১৯০৪ সাল থেকে লেখা শুরু করেন, আমৃত্যু তিনি সাহসের সঙ্গে লিখেছেন। তাঁর রচনার মূল কেন্দ্র ছিল নারী। ধর্মীয় গোঁড়ামি অন্ধ কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে মানুষ হিসাবে নারীকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন সমাজের রক্ত চক্ষুকে অগ্রাহ্য করেই। রোকেয়ার প্রকাশিত গ্রন্থ পাঁচটি - মতিচূড় (প্রথম খণ্ড, ১৯০৪) Sultana’s Dream (সুলতানার স্বপ্ন - ১৯০৮), মতিচূড় (দ্বিতীয় খণ্ড, ১৯২২) পদ্মরাগ (১৯২৪) এবং অবরোধ বাসিনী (১৯৩১)। রোকেয়ার লেখা গ্রন্থগুলি পড়লে তার মধ্যে প্রতিবাদী মানসিকতার পরিচয় পাই - যা আজও মনকে নাড়া দেয়। আজকের সময়ের চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-বেদনা, আনন্দের সঙ্গে কিভাবে মিশে যায় আজ থেকে একশো তেতাল্লিশ বছর আগেকার রমণীর চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা - ভাবলে অবাক হতে হয়।
কিন্তু ১৯০৫ সালে ইংরেজি ভাষায় যে বইটি রচনা করলেন রোকেয়া, তার তুল্য চমকপ্রদ গদ্য সে যুগ তো বটেই, এ যুগেও খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। বইয়ের নাম, ‘সুলতানা’জ ড্রিম’। প্রথম প্রকাশিত হয় ‘ইন্ডিয়ান লেডিজ ম্যাগাজিন’ পত্রিকায়। পরে বই আকারে বেরোয়। গল্পের মুখ্য চরিত্র সুলতানার স্বপ্নের মাধ্যমে রোকেয়া রচনা করেন এক নারীতান্ত্রিক ইউটোপিয়ান সমাজ, যার নাম ‘লেডিল্যান্ড।’ সেখানে পুরুষেরা পর্দানশীন। নারীরা মুক্ত, স্বাধীন। গল্পের ছত্রে ছত্রে অত্যুন্নত, সেকালে প্রায় অকল্পনীয় সব প্রযুক্তির অনুপুঙ্খ বর্ণনা রচনাটিকে বাংলার প্রথম কল্পবিজ্ঞান-উপন্যাসের মর্যাদা এনে দিতে পারত অনায়াসেই। কিন্তু আত্মবিস্মৃত বাঙালি সে কথা মনে রাখতেও ভুলে গেল। কবীর সুমন অপরূপ এক গানে তাঁকে শ্রদ্ধ্যার্ঘ জানালেও বাঙালির মরমে তো দূর কর্ণেও পশিল না সে সুর। তারা ভুলে গেল, ১৯০৫ সালে ভাগলপুরে বসে এক নারী লিখে চলেছেন সৌর-শক্তির কথা, উড়ন্ত গাড়ির কথা, আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্রের কথা, কায়িক শ্রমহীন কৃষিকাজের কথা। ভুলে গেল সেই অসামান্য কৌতুকপ্রিয় হাস্যোজ্জ্বল লেখনীকে, যিনি বিশ শতকের গোড়ায় দাঁড়িয়ে অনায়াসে লিখতে পেরেছিলেন, পুরুষের মস্তিষ্ক নারীর চেয়ে বড় বলেই যদি তারা বেশি বুদ্ধিমান হয়, তাহলে হস্তি নিশ্চয় পুরুষের চেয়েও বুদ্ধিমান, কারণ তার মস্তিষ্ক পুরুষের চেয়েও অনেক বড়! কিন্তু তবু তো সে হস্তিনীকে পর্দানশীন করে রাখে না, তাকে পদানত করে না!
রোকেয়ার এই সুঠাম গদ্য, স্পর্ধিত রূপকের ব্যবহারে তাক-লাগানো বক্তব্য অবশ্যই অগণিত কটাক্ষের লক্ষ্য হয়েছিল। কিন্তু তাঁকে দমিয়ে রাখতে রাখতে পারেনি। কলম নামিয়ে রাখেননি রোকেয়া। সওগাত, মহম্মদি, নবপ্রভা, মহিলা, ভারতমহিলা, আল-এসলাম, নওরোজ, মাহে নাও, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার মতো অজস্র পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হতে লাগল তাঁর লেখা। ১৯০৯ সালে স্বামীকে হারালেন। আত্মীয়-পরিজনেরা তাঁকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার জন্য উঠে পড়ে লাগল। একের পর এক ব্যক্তিগত আক্রমণেও অদম্য রোকেয়া ভাগলপুরেই মাত্র পাঁচটি ছাত্রী নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন স্বামীর নামাঙ্কিত মেয়েদের স্কুল - শাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল। ২৪ বছর স্বাধীন ভাবে সেই স্কুল চালিয়েছেন রোকেয়া স্বয়ং। একের পর এক বাসা বদল করে আজ তার স্থায়ী ঠিকানা লর্ড সিনহা রোড। অনেক কটাক্ষ, অনেক লড়াই, অনেক নিন্দার সাক্ষী রোকেয়ার এই স্বপ্নের বিদ্যা নিকেতন আজও সযত্নে লালন করে চলেছে তাঁর স্বপ্নকে।
স্কুল চালানোর পাশাপাশি অবশ্য নিরন্তর কলমও চালিয়ে গিয়েছেন রোকেয়া। কারণ মেয়েদের শিক্ষার পথ যে কুসংস্কার, পর্দাপ্রথা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামিতে আকীর্ণ, তাকে নির্মূল করতে হলে কলমকেই যে তলোয়ার করতে হবে, সে কথা রোকেয়া বিলক্ষণ বুঝেছিলেন। তাই গল্পে, প্রবন্ধে, উপন্যাসে, ব্যঙ্গরচনায় তীব্র কষাঘাত করে গিয়েছেন তদানীন্তন সমাজকে, তার অন্ধত্বকে, পুরুষের প্রতি তার অন্যায় পক্ষপাতকে। ‘মানসিক দাসত্ব’ - এই শব্দবন্ধ সৃষ্টি করে নারীর উপর নিরন্তর ঘটে চলা শোষণ-নিপীড়ন-অত্যাচারের সরাসরি মোকাবিলা করতে চেয়েছেন আজীবন। ১৯১৬ সালে নারীর অধিকার, বিশেষত মুসলমান নারীর অধিকরা নিয়ে সরব হওয়ার উদ্দেশে স্থাপনা করলেন আঞ্জুমান-এ-খাওয়াতিন-এ–ইসলাম। মুসলমান নারী সমাজের কল্যাণ সাধনই ছিল এই সংগঠনের লক্ষ্য। পশ্চাৎপদ নারী সমাজকে সচেতন করতে এবং অসহায় নারীদের সাহায্যার্থে এই সংস্থা গড়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন সাধারণ সম্পাদিকা। সভানেত্রী ছিলেন আয়েষা খাতুন। সমাজের দুর্দশাগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্য নিয়ে ‘নারীতীর্থ’ প্রতিষ্ঠা করেন ডাঃ লুৎফার রহমান - রোকেয়াকে এই প্রতিষ্ঠানের সভানেত্রী নিয়োগ করেন।
১৯২৬-এ বেঙ্গল উইমেন্স এডুকেশনাল কনফারেন্সের চেয়ারপার্সন মনোনীত হলেন। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়েই নির্ভীক কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন তাঁর, তথা সমগ্র বাংলাদেশের নারী-জীবনের সারসত্য। বললেন, “আজ এই মঞ্চে আমাকে আহ্বান করে যে সম্মান আপনারা দেখিয়েছেন, তার জন্য আমি যারপরনাই কৃতজ্ঞ। কিন্তু তৎসত্ত্বেও এ কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি যে আপনাদের মনোনয়নে গলদ রয়েছে। আমি সমাজের সেই অংশের প্রতিভূ, যারা জীবনের অধিকাংশ সময়ই শোষণের কালকুঠরিতে বন্দি থাকে। পর্দা দিয়ে যাদের আড়াল করে সরিয়ে রাখা হয় মূলস্রোত থেকে। স্বীকার করতে লজ্জা নেই যে জীবনের বিরাট একটা সময় আমি কোনও মানুষের সঙ্গে না-মিশে, কথা না-বলে কাটিয়েছি। তাই আজ চেয়ারপার্সন নিযুক্ত হয়ে কী করতে হবে, সে বিষয়ে আমার কোনও স্পষ্ট ধারণাই তৈরি হয়নি। আজ আমি হাসব না কাঁদব, তা-ই বুঝতে পারছি না।”
এই আত্মবীক্ষণের মধ্যে দিয়ে সমাজচেতনার উন্মেষ, নিজেকে উপলক্ষ্য করে সামাজিক গোঁড়ামি ও জুলুমের প্রতি শাণিত ব্যঙ্গ, সংখ্যালঘুর পাশাপাশি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও এই একই রকম সহজ অনায়াস প্রকাশভঙ্গিমা, রোকেয়াকে করে তোলে চির-অনন্যা, অপরিচিতা, অদ্বিতীয়া! ১৯৩২ সালে মৃত্যুকালেও ‘নারীর অধিকার’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনায় মগ্ন ছিলেন তিনি। বাংলায় তথা ভারতে নারীবাদের পথিকৃৎ হিসেবে রোকেয়ার নাম যে পাথরে খোদাই করা শিলালিপির মতো অটুট তা নিয়ে বোধহয় বিতর্কের খুব একটা অবকাশ নেই। কেবল প্রশ্ন একটাই। রোকেয়া এবং তাঁর উত্তরসূরীদের অনিঃশেষ আত্মত্যাগের একশো বছর পরেও কেন নির্ভয়া আর প্রিয়াঙ্কাদের জন্য মোমবাতি হাতে পথে নামতে হয় আমাদের? অর্চনাদের পাশেই কেন আয়েষারা থাকতে পারে না? সুলতানার স্বপ্ন কেন এতটা অবাস্তব আজও?
কন্যা সন্তান ও পুত্র সন্তানের প্রতি লিঙ্গ বৈষম্য আজও সমাজে চলছে। এই বৈষম্যের কথা রোকেয়া রূপক কাহিনি ‘মুক্ত ফল’-এ লিখেছেন। সেখানে কাঙালিনী তাঁর কন্যা সন্তানদের উপেক্ষা করে স্নেহমমতা পুত্র সন্তানদের উজাড় করে দিলেও মৃত্যু শয্যায় পুত্র সন্তানরা মুক্ত ফল আনতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত দুই কন্যা সন্তান মাতার আরোগ্য বিধানের জন্য সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ভাইদের সঙ্গে মুক্ত ফল আনতে সক্ষম হয়। কাঙালিনীর সুদীর্ঘ নিরাশ যামিনীর অবসান হলো। রোকেয়া বলতে চেয়েছেন নারীরা সমাজে উপেক্ষিত। নারীপুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়। নারীকে বঞ্চিত করলে চলবে না তাকেও পুরুষের সমান সুযোগ দিতে হবে। তা না হলে কীভাবে নারীপুরুষের সমান হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে? "স্ত্রী জাতির অবনতি’" প্রবন্ধে তিনি পথের সন্ধান দিয়েছেন - ‘‘যদি স্বাধীনভাবে উপার্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডি কেরানি হইতে আরম্ভ করিয়া লেডি ব্যারিস্টার, লেডি জজ - সবই হইব। পঞ্চাশ বৎসর পর লেডি ভাইসরয় হইয়া এ দেশের সমস্ত নারীকে রানি করিয়া ফেলিব। উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই? পা নাই? নাকি বুদ্ধি নাই? যে পরিশ্রম আমার স্বামীর গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা স্বাধীন ব্যবসা করিতে পারি না?’’
সমাজে নারীর স্বাধীন পদচারণার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও আর্থিক স্বনির্ভরতা। নারীশিক্ষার প্রসার ঘটাতে চেয়েছিলেন। উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, সমাজের অর্ধাংশকে পঙ্গু করে অগ্রসর হওয়া যায় না। বিবাহ একমাত্র নারীদের জীবনের লক্ষ্য নয়, নারীকে স্বাবলম্বী হতে হবে। সে নিজের পথ নিজেই স্থির করবে। নিজের শক্তি সম্পর্কে আত্মপ্রত্যয় অর্জন করতে হবে। পরনির্ভর জীবন অবমাননাকর। এটাই পদ্মরাগ উপন্যাসের মূল কথা। রোকেয়ার ব্যতিক্রমী চরিত্রের বিশেষত্ব এখানে।
রোকেয়ার জীবনের স্বকীয়তা সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় তাঁর স্বদেশপ্রেম। তিনি ভারতবর্ষ নামক দেশকে ভালোবেসেছিলেন। দেশবাসীকে ভালোবাসতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। দেশের সব মা’কে বলেছিলেন তাঁরা যেন সন্তানকে শেখায় তারা প্রথমে ভারতবাসী - তারপর হিন্দু-মুসলমান খ্রিস্টান প্রভৃতি। রোকেয়া পদ্মরাগ’ উপন্যাসে ‘তারিণী ভবন’-কে ভারতবর্ষের ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসাবে দেখিয়েছেন। সকল ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে সান্তিতে বসবাস করে - এটা যেন রোকেয়ার স্বপ্নের ভারত।
রোকেয়া চেয়েছিলেন হিন্দু-মুসলিমদের ঐক্য দেশের সামগ্রিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন। বিদ্বেষ, ঘৃণা ত্যাগ করে উভয় সম্প্রদায়ের মিলন - এটা তিনি আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন।অনেকে ভেবেছিলেন যে, রোকেয়া মুসলমান সমাজের কল্যাণেই তাঁর জীবনের কর্মপন্থা স্থির করেছিলেন। এটা ভ্রান্ত ধারণা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন হিন্দুর তুলনায় মুসলমান সমাজ অনগ্রসর। দেশের উন্নতিকল্পেই পশ্চাৎপদ মুসলমান সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন।
রোকেয়ার জীবনের আদর্শ ছিল মানবকল্যাণ। সেই লক্ষ্যে পথের বাধাগুলিকে অতিক্রম করেছেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন। নির্ভীক কণ্ঠে নিজের প্রত্যয়কে বাস্তবায়িত করেছেন।রোকেয়াকে ‘নারীবাদী’ বলা হয় - এটা সঠিক নয়। তিনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরোধিতা করেছিলেন - সকল পুরুষের বিরুদ্ধে সমাজে প্রচলিত অন্যায় রীতিনীতি, বিধিনিধান ও আচার-আচরণকে সমালোচনা করেছেন। চিন্তার জগতে তিনি এক আত্মপ্রতিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব।
মৃত্যুর কিছুদিন আগ তিনি তাঁর কোন প্রিয়তমা ছাত্রীকে বড় করুণভাবে বলেছিলেন - "মা, সময় বুঝি হইয়া আসিল। মরণের বোধহয় আর বেশি দেরী নাই। আল্লাহর রহমতে জীবনের সকল আশা-আকাঙক্ষা পূর্ণ হইয়াছে। এইবার ছুটি নিতে হয়। সত্য সত্যই জীবনের কুন্দকুসুম যেদিন ঝরিয়া পড়িবে সেদিন আমার শেষ বিশ্রাম স্থান রচনা করিও আমার প্রাণের এই তাজমহলের একপাশে। কবরে শুইয়া শুইয়াও যেন আমি আমার মেয়েদের কলকোলাহল শুনতে পাই।"
১৯৩২ সালের ৮ ডিসেম্বরের রাতে তিনি রচনা করেছিলেন ‘‘নারীর অধিকার’’ নামক প্রবন্ধটি। অসমাপ্ত থেকে গেল অনেক কাজ। ৯ ডিসেম্বর ভোরে শরীরে একটু যন্ত্রণা, তারপরে সব শেষ। সংগ্রামী জীবনের অবসান। অসংখ্য মানুষের অন্দরে-অন্তরে সেদিন বেজেছিল বেদনাবীণা। সেদিনটি ছিল বাঙালি জাতির অপূরণীয় ক্ষতির দিন। কারও সেবা নিতে হয়নি, আত্মনির্ভরশীল রোকেয়া নিজের ওপর নির্ভর করে বেঁচেছিলেন, চলেও গেলেন সেইভাবে। রোকেয়ার সমাধি হলো কলকাতার উপকণ্ঠে সোদপুরের পানিহাটিতে তাঁর আত্মীয়বর্গের পুরাতন গোরস্থানে।
বেগম রোকেয়াকে নারী শিক্ষায় অবদান রাখার জন্যে বেশী উল্লেখ করা হয়, কিন্তু রোকেয়া রচনাবলী পড়লে তার চিন্তার ব্যাপকতা বোঝা যায়। কি কি বিষয় নিয়ে না ভেবেছেন তিনি! আরও যেটা বোঝা দরকার সেটা হচ্ছে তাঁর চিন্তা ও কাজ একত্রে ছিল। তিনি শুধু লিখে বসে না থেকে যতোটুকু পেরেছেন স্কুল চালিয়েছেন, নারীদের কর্মসংস্থানের চিন্তা করেছেন। নিরাশ্রীতাদের আশ্রয় দিয়েছেন। আবার সম্ভাবনার দ্বার যেখানে খোলা ছিল সেগুলো সবই করেছেন। নারী সংগঠন করে দলীয় কোন রাজনীতির বাইরে গিয়ে কী করে নারীদের সংগঠন গড়ে তুলতে হয় তাও দেখিয়েছেন। আজ যখন দলীয় রাজনীতির মধ্যে নারীমুক্তির কথা শুনি তখন দুঃখ হয়। রাজনীতিতে এগিয়ে গিয়ে নারী আন্দোলনে পিছিয়ে গেছি। রোকেয়া পাঠ করলে আমাদের আর বিদেশ থেকে ধার করে নারীমুক্তি শিখতে হয় না। তবে হ্যাঁ, বেগম রোকেয়া এটাও দেখিয়েছেন যে অন্য দেশের নারীরা এবং অন্য দেশের লেখিকারা কী ভাবছেন তার সাথেও পরিচিত হতে হবে। শামুকের মতো গুটিয়ে থাকা যাবে না। যেমন সে যুগেই তিনি নারীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে পাশ্চাত্যের অন্যতম প্রধান নারী-মুক্তির দার্শনিক মেরী ওলস্টোনক্রাফট (Mary Wollstonecraft, ১৭৫৯ - ১৭৯৯) এর লেখা 'A Vindication of the Rights of Woman' গ্রন্থ পড়েছিলেন। শুধু মেরী ওলস্টোনক্রাফট নয়, রোকেয়া জন স্টুয়ার্ট মিল-এর যুগান্তকারী গ্রন্থ 'The Subjection of Women' (১৮৬৯) ও পড়েছিলেন এবং তাঁর নিজের চিন্তাকে প্রসারিত করতে ব্যবহার করেছিলেন। নিজের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে, অনুকরণ করে নয়। জন স্টুয়ার্ট মিলে'র গ্রন্থটি কিছু ঐতিহাসিক সাফল্যের দাবীদার, যেমন বৃটেনের নারীরা পুরুষের সমান ভিত্তিতে ভোটাধিকার লাভ করেছিলেন।
মেরীর চিন্তা রোকেয়াকে অদ্ভুতভাবে প্রভাবিত করেছিল তাই সেই সময় তিনি নারীর তথাকথিত প্রাকৃতিক দুর্বলতা, ‘কমনীয়তা’ রূপচর্চা ইত্যাদী থেকে বেরিয়ে বুঝিয়েছিলেন পুরুষের মতো যোগ্যতা অর্জন না করলে শুধু নারীর সমান অধিকার দাবী করলেই নারী মুক্তি আসবে না। আমার কাছে বেগম রোকেয়ার এই দিকটি অত্যন্ত মূল্যবান অবদান মনে হয়। শুধু নারীর অধিকার দাবী করলে করুণা পাওয়া যাবে, পিঠ চাপড়ানিও কম হবে না, কিন্তু নারী তার প্রাকৃতিক গন্ডি পার হয়ে সামাজিকভাবে মানুষ বা ব্যাক্তি হয়ে উঠতে পারবে না। তাই এখনও যখন খবরে বলা হয় যে, 'সড়ক দুর্ঘটনায় ২ জন নারী সহ ৫ জন নিহত’ তখন বুঝতে পারি এই ২ নারী ও ৩ পুরুষ এক নয়। তিন ‘জন’ পুরুষ সমাজের মধ্যে আছেন, আর নারী ‘আলাদা কিছু। মনে হয়ে এই বাসে বা গাড়িতে তার থাকার কথা ছিল না। এরা বাড়তি কেউ। অথচ এখন দূর পাল্লার হোক বা শহরের ভেতরের বাস হোক এমন কোন বাস দেখানো যাবে না যেখানে নারী যাত্রী নেই। তাহলে তারা যাত্রী নয় কেন? বেগম রোকেয়া যে কাজ করে গেছেন তাতে নারী যাত্রী হয়ে একা বাসে উঠতে পেরেছেন আর দশজন পুরুষের মতো, কিন্তু বর্তমান নারী আন্দোলন তাদের ব্যাক্তি বানাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্যর্থতার দায় আমরা বেগম রোকেয়ার ওপর চাপাতে পারিনা। এর দায় আমাদেরই নিতে হবে।
প্রতি বছর ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া অনুরাগী নরনারী রোকেয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে সমবেত হন। বেদনার কথা কলকাতা শহরে কর্মময় জীবনের অনেকটাই রোকেয়া অতিবাহিত করেছেন। সেখানে একটা স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হলো না, যেখানে আমরা আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে পারি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে আবেদন জানাই, মহীয়সী নারীর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার জন্য। এই উদ্দেশে সকল গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল জনগণকে উদ্যোগ গ্রহণে অগ্রসর হতে হবে।
মানবতার প্রতীক ওয়ালডেমার হফকাইন (Haffkine), জন্ম রাশিয়ায়। উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার স্থান ফ্রান্স। কলেরা ও বিউবোনিক প্লেগ রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের একজন অন্যতম পথিকৃৎ। কলেরার স্ট্রেন তিনি পরীক্ষামূলকভাবে নিজের উপর প্রয়োগ করেছিলেন, সাফল্যও পেয়েছিলেন। এরপর চলে আসেন ভারতে। কোলকাতাকে বেছে নেন কলেরা মুক্ত করার জন্য। ব্রিটিশ মেডিক্যাল অফিসারদের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তিনি কোলকাতায় ৪৫,০০০ মানুষকে তাঁর আবিষ্কৃত টিকা দিয়ে কলেরায় মৃত্যুর হার অনেক কমিয়ে দেন । তাঁর এই কাজের জন্য যোশেফ লিস্টার তাঁকে 'a savior of humanity' নামে অভিহিত করেন।
৪১
বিশ্বের প্রথম ভ্যাকসিন
একসময় গুটি বসন্তে (Smallpox) পৃথিবীতে মারা যেত লাখ লাখ মানুষ। মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৩০% আর বেঁচে যাঁরা যেতেন, তাঁদের মুখ পর্যন্ত বিকৃত হয়ে যেত। ঠিক তখনই ১৭৯৬ সালে Edward Jenner এমন একটা কাজ করলেন যা আজকের দিনে হলে হয়তো কেউ বিশ্বাসই করত না । তিনি কাউপক্সে আক্রান্ত দুধওয়ালাদের দেখে ধারণা করলেন, এ রোগটা মানুষকে গুটি বসন্ত থেকে রক্ষা করে! এটা প্রমাণ করার জন্য তিনি পরীক্ষা করলেন একজন ছোট ছেলের ওপর! নিজের ক্যারিয়ার, সুনাম সবকিছু বাজি রেখে। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় বিশ্বের প্রথম ভ্যাকসিন।
এরপর ইতিহাস বদলে যেতে লাগল Louis Pasteur র্যাবিস ও অ্যানথ্রাক্স ভ্যাকসিন আবিষ্কার করলেন, ২০শ শতকের মাঝামাঝি Jonas Salk তৈরি করলেন পোলিও ভ্যাকসিন, যা লাখো শিশুকে পঙ্গুত্ব থেকে বাঁচিয়েছে। মিজেলস, হেপাটাইটিস, ডিফথেরিয়া, HPV একের পর এক রোগ থেকে মানবজাতি মুক্তি পেতে শুরু করে।
ভ্যাকসিন শুধু জীবন বাঁচায় না মহামারি থামায়, গ্লোবাল মৃত্যু কমায়, সমাজ ও অর্থনীতি রক্ষা করে। আজকের ভ্যাকসিন রিসার্চ আরও উন্নত জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, mRNA টেকনোলজি, ন্যানো–ভ্যাকসিন সব মিলিয়ে ভ্যাকসিনের ভবিষ্যৎ একদম নতুন পথে হাঁটছে। COVID-19 মহামারি বিশ্বকে দেখিয়েছে, বিজ্ঞানীরা রাত–দিন লড়ে গেলে এক বছরেরও কম সময়ে ভ্যাকসিন তৈরি করা সম্ভব।
কিন্তু এক সত্য অনেকেই জানেন না একটি ভ্যাকসিন তৈরি করতে সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগে! কারণ প্রতিটি ভ্যাকসিনকে তিন ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ পেরোতে হয়।
৪২
মানুষের জিনোমে নিয়ান্ডারথালের চিহ্ন
প্রায় ৪০–৫০ হাজার বছর আগে আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে আসা আধুনিক মানুষ 'Homo sapiens' ইউরেশিয়া অঞ্চলে এসে মুখোমুখি হয় আরেক মানবপ্রজাতি 'Neanderthal'-এর। প্রত্নতাত্ত্বিক ও জিনগত গবেষণায় এখন নিশ্চিতভাবে জানা গেছে যে এই দুই মানবগোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত মাত্রায় interbreeding বা আন্তঃপ্রজনন ঘটেছিল। সেই কারণেই আজ ইউরোপ ও এশিয়ার বহু মানুষের জিনোমে গড়ে প্রায় ১–২ শতাংশ নিয়ান্ডারথাল DNA পাওয়া যায়।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেছেন মানুষের জিনোমে নিয়ান্ডারথালের কিছু DNA থাকলেও X chromosome-এ তা প্রায় অনুপস্থিত।
সাম্প্রতিক জিনগত গবেষণায় একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। গবেষকদের মতে, এই আন্তঃপ্রজননটি সম্ভবত ছিল sex-biased, অর্থাৎ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিলন হয়েছিল নিয়ান্ডারথাল পুরুষ এবং আধুনিক মানব নারীর মধ্যে। মানুষের ক্ষেত্রে নারী বহন করে দুটি X chromosome (XX) এবং পুরুষ বহন করে একটি X ও একটি Y (XY)। যদি কোনো নিয়ান্ডারথাল পুরুষ ও মানব নারীর সন্তান জন্মায়, তাহলে ছেলে সন্তান বাবার কাছ থেকে Y এবং মায়ের কাছ থেকে X পায়। ফলে তার X chromosome পুরোপুরি মানবজাতিরই হয়।
মেয়ে সন্তান বাবার কাছ থেকে একটি নিয়ান্ডারথাল X পেলেও পরবর্তী প্রজন্মে আধুনিক মানুষের সঙ্গে প্রজননের ফলে সেই নিয়ান্ডারথাল X ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। এর সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ X chromosome-এর অনেক জিন প্রজনন ও ভ্রূণের বিকাশের সঙ্গে জড়িত। নিয়ান্ডারথাল থেকে আসা কিছু জিন যদি মানুষের শরীরে অসামঞ্জস্য তৈরি করে, তাহলে Natural selection ধীরে ধীরে সেগুলোকে মানব জনসংখ্যা থেকে বাদ করে দিতে পারে।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিসিস্ট Joshua Akey-এর মতে, এই ধারণাটি একটি আকর্ষণীয় বৈজ্ঞানিক অনুমান, যা মানব বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। ফলে আজকের মানুষের জিনোমে নিয়ান্ডারথালের কিছু চিহ্ন থাকলেও মানুষের X chromosome প্রায় সম্পূর্ণভাবেই আধুনিক মানুষের বৈশিষ্ট্য বহন করে। © অভিষেক_দে
ইএল ক্যাপিটান: বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং দ্রুত গতির সুপারকম্পিউটার হিসেবে নিজের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ‘ইএল ক্যাপিটান’ (El Capitan)। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত Top500 এর সর্বশেষ ৬৬তম সুপারকম্পিউটার র্যাংকিং-এ এটিকে প্রথম স্থানে রাখা হয়। এটি মূলত এক্সাস্কেল সক্ষমতার একটি শক্তিশালী সুপারকম্পিউটিং সিস্টেম। Top500 এর সর্বশেষ ৬৬তম তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে এক্সাস্কেল সক্ষমতার ইএল ক্যাপিটান (১.৮০৯ EF) সুপারকম্পিউটার। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রন্টিয়ার (১.৩৫৩ EF), তৃতীয় স্থানে অরোরা (১.০১২ EF) এবং চতুর্থ স্থানে জার্মানির জুপিটার বুস্টার (১.০০ EF) অবস্থান করছে। এছাড়া, জাপানের নতুন প্রজন্মের সুপারকম্পিউটার ‘ফুগাকু’ রয়েছে সপ্তম স্থানে।
৪৩
পাই এর π স্মরণে।।
' π' তোমাকে পাই গণিতে, তোমাকে পাই বিজ্ঞানে , তোমাকে পাই প্রকৌশল বিদ্যায়। তুমি বাঁধা আছো গণনার কত সূত্রে! কিন্তু তবু পাইনা তোমায় পূর্ণ মানে, তুমি যে অপূর্ণ (সংখ্যা)। অনেক হিসাবের মূলেতো তুমিই, তবু তুমি 'অমূলদ'। তুমি 'বৃত্তীয় ধ্রুবক', তুমি 'আর্কিমিডিসের ধ্রুবক', তুমি 'রূডলফের সাংখ্য মান'। অথচ তোমার পরিচয় কত সহজে পাওয়া যায়-প্রত্যেক বৃত্তের পরিধি তার ব্যাসের যতগুণ তাই হলে 'π' তুমি। কিন্তু সঠিকভাবে তো তোমাকে প্রকাশ করা যায়না- খণ্ড বা অখণ্ড কোন সংখ্যা দিয়েই নয়। উইলিয়াম, অয়লার, নিউটন, রামানুজন আরো কত গণিতবিদ ডেসিমেলের পর তোমার শেষের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কই? চার হাজার বছর ধরে চেষ্টা চলছে তোমার শেষ (দশমিকের পর) দেখতে। সুপার কম্পিউটারও লক্ষকোটি পর্যন্ত গিয়ে আর এগুতে পারেনি। তোমার বিচিত্র এমন মানের কারণে কম্পাস আর স্কেল দিয়ে বৃত্তের সমান ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট বর্গক্ষেত্র আঁকা সহজ কাজ নয়।
আবার ২২ শে জুলাই হবে তোমার দিবস(২২/৭) সেই দিনও তোমাকে সম্মান জানাবো ।
আজ ইংরেজি বছরের ৩ য় মাস(মার্চ),তারিখ ১৪,বেলা ১টা বেজে ৫৯ মিনিট ২৬সেকেণ্ডে।
কারণ তোমার মোটামুটি মান ৩•১৪,১,৫৯,২৬ ,।আজ আবার আইনস্টাইনের জন্মদিন এবং স্টিফেন হকিং এর প্রয়াণ দিন।
আবার কেউ কেউ দু পাই মানে 6•28, জুন মাসের (6) 28 তারিখে, বলা হয় দু'পাই বা তাউ দিবস।
আবার অনেকে তোমাকে স্মরণ করে 10 ই নভেম্বর। কারণ সাধারণভাবে ওটি হোল বছরের 314তম দিন যেহেতু তোমার মান 3•14.
আচ্ছা আমরা বাঙালিরা আষাঢ় মাসের ১৪ তারিখে (৩•১৪) বা কার্তিক মাসের ২২ তারিখে(২২/৭) তোমাকে স্মরণ করতে পারি?
দরকার নেই গণ্ডগোল পাকিয়ে, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলাই ভালো। আরো লক্ষ লক্ষ মানুষতো তোমাকে রোজই স্মরণ করে, সেই ১৭০৬ সালে তোমার জন্ম থেকে।
যাক তুমি তোমার এই অসম্পূর্ণ মান নিয়েই থাকো। গণিতকে আরো সমৃদ্ধ করো -এগিয়ে চলো π। সাথে আছি। ২০২৬ সালে( ১৪ মার্চ )তোমার থিম হলো "গণিত এবং আশা" (Mathematics and Hope) । @ -অর্ধেন্দু সরকার। ।
৪৪
“ভূত” আছে আমাদের মাথায়!
মানবসভ্যতায় ভূত একটি কেন্দ্রীয় বিষয়, “ভূত” শব্দটি জানেনা এমন মানুষ বোধহয় নেই, ভূত নিয়ে গল্প, সাহিত্য, সিনেমা বা ডকুমেন্টারির অভাব নেই।
আমাদের শৈশবে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ব্যাপক প্রসার ছিলনা (৯০’s), মেট্টো শহরগুলোতেও সবার ঘরে টিভি ছিলনা, তাই আমরা পড়তাম গাদা গাদা বই, অবসর সময়ে গল্পের বই, আর গল্পের মধ্যে কম বয়সে ভূতের গল্পই ছিল প্রধান আকর্ষণ, বাংলায় বিখ্যাত ভূতের গল্প লেখকদের কয়েকজন হলেন - হেমেন্দ্রকুমার রায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, পরশুরাম এবং আরো অনেকে। আর সেইযুগে গ্রাম ও ছোট শহরে রাত্রে নিয়মিত লোডশেডিং হত, কয়েক ঘন্টা বিদ্যুতের আলো ছাড়াই থাকতে হত, তখন ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছোট-বড় সবাইকে চেপে ধরত ভূতের ভয়, আড্ডাতেও বিতর্ক চলত - ভূত আছে কি নেই! অনেক ভাই-বোন, মামা-মাসি-পিসি, আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব ভূতের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল, অনেকেই দাবি করত যে সে ভূত দেখেছে! এবং সেই জায়গাতে গেলে এমনকি দুপুরবেলাতেও ভূত দেখা যাবে! আর আমাদের মত কিছু ছেলেমেয়ে যারা তখন পর্যন্ত কিছু ভূত বিরোধী তত্ত্ব শুনেছিলাম বা পড়েছিলাম, তারা ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে কনফিউজড ছিলাম, কারণ তখন এত সহজে এতকিছু জানার সুযোগ ছিলনা।
ইন্টারনেট আসার পর অনেক কিছু জানা সহজ হয়ে গেলে, গুগল সার্চ করলেই ব্যাখা হাজির। এখন স্পষ্টই বুঝতে পারছি যে, ভূত বাস করে আসলে মানুষের মাথায়!! কিভাবে!!
আসলে আমাদের মস্তিষ্ক সরাসরি বাইরের জগতকে 'দেখে' না, বরং এটি বাইরের জগৎ থেকে ইন্দ্রিয়গুলোর পাঠানো সংকেত বিশ্লেষণ করে একটি কাল্পনিক মানচিত্র তৈরি করে, একে 'পারসেপচুয়াল কনস্ট্রাকশন' বলা হয়। আমরা অনেকেই জানি যে আকৃতি, আলো, রঙ, শব্দ, স্বাদ, গন্ধ ইত্যাদি অনুভূতি আমাদের মস্তিষ্ক বাইরের জগতের কিছু উদ্দীপনা থেকে নির্মাণ বা কন্সট্রাক্ট করে নেয়, যেমন আলো আসলে ফোটন কণার স্রোত, শব্দ হল মেকানিক্যাল কম্পন, রঙ আসলে তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের বিভিন্ন কম্পাঙ্ক, গন্ধ হল রাসায়নিক মৌল বা যৌগের আলাদা আলাদা ইন্টারপ্রিটেশন।
পারসেপচুয়াল কনস্ট্রাকশন বা ইন্দ্রিয়গত নির্মাণের প্রক্রিয়াটি মূলত এই ৩টি ধাপে ঘটে:-
১. সংকেত গ্রহণ (Transduction): আমাদের চোখ, কান বা ত্বক বাইরের আলো, শব্দ বা চাপকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পাঠায়।
২. অনুমান ও ফিল্টারিং (Bayesian Inference): জগত থেকে আসা সব তথ্য মস্তিষ্ক গ্রহণ করে না, বরং আগের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে মস্তিষ্ক আগে থেকেই অনুমান করে নেয় সে কী দেখতে বা শুনতে যাচ্ছে, অসম্পূর্ণ তথ্যের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক নিজের মতো করে শূন্যস্থান পূরণ করে দেয় (যেমন: বিভ্রম, অপটিক্যাল ইলিউশন)।
৩. সংশ্লেষণ (Synthesis and Integration): মস্তিষ্ক বিভিন্ন ইন্দ্রিয় থেকে আসা তথ্যগুলোকে জোড়া লাগিয়ে একটি সামগ্রিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, যখন আপনি একটি আপেল দেখেন, মস্তিষ্ক সেটির রঙ, আকার, গন্ধ এবং আপনার স্মৃতিতে থাকা 'আপেল' শব্দটিকে মিলিয়ে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি করে।
সহজ কথায়, আমরা জগতকে যেমন আছে তেমন দেখি না, বরং আমাদের মস্তিষ্ক যেভাবে ব্যাখ্যা (Interpret) করতে পারে, সেভাবেই দেখি।
তাই কেউ যদি সৎ ও দৃঢ়ভাবে দাবি করে যে সে নিজের চোখে “ভূত” বা “কিছু একটা”দেখেছে, তাহলে সে আসলে মিথ্যা বলছেনা! বিজ্ঞানসন্মত ভাবেই তার মস্তিষ্ক একটি 'পারসেপচুয়াল কনস্ট্রাকশন” করেছে বা মানুষটি বিভ্রম বা হ্যালুসিনেশনের শিকার হয়েছে।
আবার একদল মানুষ একসাথে কোন "ভূত" দেখলে, বিজ্ঞানসম্মতভাবে তারা আসলে পরিবেশগত বা বায়াসড মনস্তাত্ত্বিক কারণে সৃষ্ট একটি সামূহিক হ্যালুসিনেশন (Shared Hallucination) শিকার হয়েছে।
অনেকেই আত্মার প্রসঙ্গ তুলবেন, কিন্তু বিজ্ঞানে তো বটেই, আধুনিক ফিলোসফিতেও “আত্মা” একটি অপ্রয়োজনীয় বিষয়, বাস্তবে জীবন থেকেই জীবন অস্তিত্বে আসছে, ঠিক যেমন একটি জ্বলন্ত মোমবাতি শেষ হয়ে নিভে যাওয়ার আগেই অন্য একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে নেওয়া।
আধুনিক ফিলোসফির প্যানসাইকিজম (Panpsychism) তত্ত্বটি প্রচলিত ধর্মীয় বা দ্বৈতবাদী (Dualism) দর্শনে, যেখানে আত্মাকে শরীরের বাইরের একটি পৃথক, অমর এবং আধ্যাত্মিক সত্তা মনে করা হয় - তা খন্ডন করে। প্যানসাইকিজম অনুযায়ী, চেতনা বা 'মন' শরীরের বাইরের কোনো রহস্যময় শক্তি নয়, বরং এটি পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণার একটি মৌলিক গুণ, ফলে শরীরের মৃত্যুর পর আলাদা কোনো সত্তা বা 'আত্মা' বেরিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। প্রথাগত আত্মাবাদ মনে করে শরীর (জড়) এবং আত্মা (চেতন) দুটি আলাদা বস্তু, কিন্তু প্যানসাইকিজম এই পার্থক্যটি মুছে দেয়। এটি দাবি করে যে মহাবিশ্বের সব কিছুই কোন না কোন মাত্রায় সচেতন, তাই দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো 'বিশেষ' আধ্যাত্মিক সত্তার প্রয়োজন নেই, প্যানসাইকিজম চেতনাকে একটি প্রাকৃতিক বা ভৌত ধর্মের মতো ব্যাখ্যা করে, যা পদার্থবিজ্ঞানের কাঠামোর মধ্যেই অবস্থান করে।
প্রচলিত আত্মার তত্ত্বে মনে করা হয় 'আমি' বা ব্যক্তির সত্তা এক এবং অবিভাজ্য, কিন্তু প্যানসাইকিজমের 'কনস্টিটিউটিভ' (Constitutive) মতবাদ অনুযায়ী, মানুষের চেতনা আসলে কোটি কোটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সচেতন কণার সমন্বয়ে তৈরি একটি জটিল রূপ মাত্র, যখন শরীর ভেঙে যায়, তখন এই কণাগুলো আলাদা হয়ে যায়, ফলে একক কোনো স্থায়ী 'আত্মা'র অস্তিত্ব থাকে না।
সহজ কথায়, প্যানসাইকিজম বলে যে চেতনা সর্বত্র আছে, কিন্তু তা কোনো রহস্যময় অমর 'আত্মা' হিসেবে নয়, বরং পদার্থের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে।
তাই “ভূত” আসলে মনস্তাত্ত্বিক, স্নায়বিক এবং পরিবেশগত উদ্দীপনাগুলির সংমিশ্রণের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে মানুষের মস্তিষ্কে তৈরি হয়, যা মস্তিষ্কের অস্পষ্ট উদ্দীপনা ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টা হিসাবে পরিগণিত হয়। বৈজ্ঞানিক এবং মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে ভূত দেখা হল বিভ্রম (হ্যালুসিনেশন) যা প্রায়শই মানসিক উত্তেজনা, ভয়, মানসিক চাপ, শোক বা পরিবেশগত অবস্থার কারণে ইন্দ্রিয়গত ভাবে নির্মিত হয়।
মস্তিষ্কে কিছু মনস্তাত্ত্বিক এবং জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া যা আমাদের দৃশ্য, শ্রাব্য ও সমস্ত অনুভূতিমূলক জগৎ তৈরি করে -
• প্যারেডোলিয়া: বড় প্রাণিদের মস্তিষ্ক মুখ সনাক্ত করার জন্য কঠোরভাবে তৈরি। এটি হল একটি স্বাভাবিক মানসিক প্রবণতা (কোনো রোগ নয়, বরং মানুষের মস্তিষ্কের কাজ করার একটি ধরন), যেখানে মানুষ এলোমেলো, অস্পষ্ট বা সাধারণ কোনো বস্তু বা আলো-ছায়ার মধ্যে পরিচিত কোনো প্যাটার্ন, মুখ বা অর্থপূর্ণ অবয়ব খুঁজে পায়, এটি মানুষের মস্তিষ্কের অসম্পর্কিত তথ্যের মধ্যে সংযোগ খোঁজার (অ্যাপোফেনিয়া) একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যেখানে অস্পষ্ট দৃশ্য বা শব্দকে মস্তিষ্ক অর্থপূর্ণ প্যাটার্ন হিসাবে ভুল বোঝে, জঙ্গলজীবনে দ্রুত পরিস্থিতি বুঝতে এই দক্ষতা বেঁচে থাকার জন্য খুব সহায়ক ছিল, প্যারেডোলিয়া সাধারণত চাক্ষুষ (visual) হলেও, মাঝে মাঝে শব্দের ক্ষেত্রেও হয় (যেমন- গুঞ্জনের মধ্যে নিজের নাম শোনা)।
এছাড়াও চরম শোক কোন মানুষকে "উপস্থিতির হ্যালুসিনেশন" তৈরি করতে পারে, যার ফলে শোকাহত ব্যক্তি অনুভব করতে পারে যে মৃত ব্যক্তি এখনও তাদের সাথে আছেন, যখন কোনও প্রিয়জন মারা যায়, তখন মস্তিষ্ক চরম ক্ষতির সাথে মোকাবিলা করার জন্য এই "উপস্থিতির হ্যালুসিনেশন"কে তৈরি করে, ফলে শোকাহত ব্যক্তি শোকে অসুস্থ হওয়া বা আত্মহত্যার মত সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।
• স্লিপ প্যারালিসিস বা ঘুমন্ত অবস্থায় অস্থায়ী পক্ষাঘাত: এটি ঘুমের REM পর্যায়ে ঘটে থাকে (চপল চোখের ঘুম), ঘুম চক্রের একটি "গ্লিচ" বলতে পারেন, যেখানে মানুষ জেগে ওঠে, কিন্তু নড়াচড়া করতে অক্ষম হয়। এই অবস্থায়, মস্তিষ্ক মূলত জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্ন দেখে, যার ফলে প্রাণবন্ত, ভয়ঙ্কর হ্যালুসিনেশন দেখা যায়, যেমন একটি ছায়াময় চিত্র দেখা (যাকে আক্রান্ত মানুষটি প্রায়শই "ভূত" বা "দানব" হিসাবে ব্যাখা করে)।
• টেম্পোরোপ্যারিয়েটাল জংশন নিষ্ক্রিয়তা (Temporoparietal junction (TPJ) dysfunction): মস্তিষ্কের এমন একটি এলাকা যা পরিবেশ ও শরীরের তথ্য সমন্বয় করে, এখানে ত্রুটির ফলে “অন্য ব্যক্তির উপস্থিতি ও দেহের বাইরে নিজের অস্তিত্ব অনুভব হয় ( আউট-অফ-বডি অভিজ্ঞতা)। এছাড়াও উচ্চ বাতাসের চাপ, ঘুমের চরম অভাব, বা উচ্চ তাপমাত্রা এইরকম প্রাণবন্ত হ্যালুসিনেশনের কারণ হতে পারে।
পদার্থ জগতের কিছু ঘটনাও “ভূত” দর্শন করাতে পারে -
• ইনফ্রাসাউন্ড: মানুষের শ্রবণশক্তির সীমার নীচের শব্দ তরঙ্গ (প্রায় 19 হার্টজ) মানুষের চোখের অক্ষিগোলকে সূক্ষ্ম কম্পন সৃষ্টি করতে পারে, যা দৃষ্টি বিভ্রম সৃষ্টি করে। ইনফ্রাসাউন্ড অস্বস্তি, ভয় এবং "ঠান্ডা" লাগার অনুভূতি তৈরি করতে পারে বলে বোঝা গেছে।
• তড়িৎ চৌম্বক ক্ষেত্র (EMF): পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের ব্যাঘাত, তড়িৎচৌম্বকীয় আবেশ, কখনও কখনও বৈদ্যুতিক তারের কারণে সৃষ্ট চৌম্বকক্ষেত্র মস্তিষ্কের সংকেতগুলিকে প্রভাবিত করতে পারে এবং হ্যালুসিনেশন বা “কোনকিছুর” অস্তিত্বের অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে। এবিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণাও রয়েছে। টেম্পোরাল লোবে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি চৌম্বকীয় প্রভাব পড়লে মানুষের মনে হতে পারে আশেপাশে কেউ আছে, বাস্তবে “ভূত শিকারীরা এই অভিজ্ঞতার কথাই বলে, তবে তারা ব্যাখাটা উল্টো দেয়, তারা বলে যে ভূত তড়িৎ চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে, আসলে তড়িৎ চৌম্বক ক্ষেত্রের উপস্থিতির ফলেই “কেউ” আছে বলে মনে হয়। গড হেলমেট (God Helmet) পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা "অশরীরী কিছুর উপস্থিতি" অনুভব করার কথা জানিয়েছিলেন।
• কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া: অপর্যাপ্ত বায়ুচলাচলযুক্ত স্থানে কার্বন মনোক্সাইড জমে থাকতে পারে, যা দৃষ্টি এবং শ্রবণের বিভ্রম সৃষ্টি করে বলে জানা যায়।
তাই “ভূত” বা” আত্মা” কোন বাহ্যিক সত্তা নয় বরং মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ অভিক্ষেপ (হ্যালুসিনেশন) যা অস্বাভাবিক পরিবেশগত বা অভ্যন্তরীণ চাপকে প্রক্রিয়াকরণ করার জন্য বা প্রতিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট একটি “পারসেপচুয়াল কনস্ট্রাকশন” বা ইন্দ্রিয়গত নির্মাণ। @ Alok Śrabak
৪৫
সূর্যের ৭ রং ও কুসুম গাছের লাল পাতা
গাছের পাতা সাধারণত সবুজ হয়ে থাকে। তবে কিছু কিছু গাছের পাতা অল্প কয়েকদিনের জন্য লাল হয়ে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে কুসুম গাছ। বসন্তের শুরুতে কুসুম গাছে টকটকে লাল কচি পাতা গজায়। তবে এই লাল রং বেশি দিন থাকে না। দুই-তিন দিন থাকে। তখন কুসুম গাছে এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা হয়। এটা মূলত পোকামাকড় ও বিভিন্ন পতঙ্গদের সাথে আলোক তরঙ্গের এক ধরনের ধোঁকা বাজির খেলা। এই বিষয়টা ব্যাখ্যা করতে হলে Optics বা আলোক বিজ্ঞানের কিছু সাধারণ বিষয় আলোচনা করতে হবে।
সূর্যের আলোতে ৭ টি রং আছে। এই রং ৭ টি হচ্ছে
বেগুনি, নীল, আসমানী, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল । প্রত্যেক রংয়ের প্রথম অক্ষর নিয়ে সাজালে হয় বে-নী-আ-স-হ-ক-লা। গাছের পাতা সবুজ। কারণ পাতায় ক্লোরোফিল থাকে। এই ক্লোরোফিল সূর্য থেকে আসা ৬ টি আলো শোষণ করতে পারে, কিন্তু সবুজ আলোটা শোষণ করতে পারে না, সেটি প্রতিফলন করে আমাদের চোখে ফিরিয়ে দেয়। তাই গাছের পাতাকে আমরা সবুজ দেখি। লাল গোলাপ সূর্যের ৬ টি আলো শোষণ করে নেয়, শুধু ১ টি আলো শোষণ করতে পারে না, আর সেটি হচ্ছে লাল। এই লালটা আমাদের চোখে ফিরিয়ে দেয়। তাই লাল গোলাপকে আমরা লাল দেখি। গাদা ফুল কমলা, সে সূর্যের ৬ টা আলো শোষণ করে, শুধু কমলাটা পারে না, আমাদের চোখে ফিরিয়ে দেয়। তাই গাদা ফুল কমলা দেখি। অপরাজিতা ফুল নীল, সে সূর্যের ৬ টা আলো শোষণ করে, শুধু নীলটা পারে না, আমাদের চোখে ফিরিয়ে দেয়।তাই অপরাজিতা ফুলকে আমরা নীল দেখি। আসলে পৃথিবীতে রং বলে কিছু নেই। যেই বস্তুটা আলোর যেই রং শোষণ করতে পারে না, আমাদের চোখে ফিরিয়ে দেয়, সেটিই হচ্ছে সেই বস্তুর রং।
সূর্য থেকে আসা এই ৭ টি আলোর একেকটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য একেক রকম। বেগুনি (380-400 nm), নীল (400-450 nm), আসমানী (450-500 nm), সবুজ (500-570 nm), হলুদ (570-620 nm), কমলা ( 610-690 nm), লাল (690-780 nm) (nm দিয়ে বুঝায় ন্যানোমিটার)। সবচেয়ে কম তরঙ্গদৈর্ঘ্য হচ্ছে বেগুনি আলোর (380-400 nm)। আর সবচেয়ে বেশি তরঙ্গদৈর্ঘ্য হচ্ছে লাল আলোর (690-780 nm)। বাম দিক থেকে যতো ডানে যেতে থাকবো, তরঙ্গদৈর্ঘ্য ততো বাড়তে থাকবে। আমাদের চোখ (বেগুনি) 380 nm থেকে সর্বোচ্চ (লাল) 780 nm পর্যন্ত আলো দেখতে পারে। বেগুনি আলোর বামে রয়েছে অতিবেগুনি (Ultraviolet) বা UV রশ্নি। এটা আমাদের চোখে দৃশ্যমান নয় (আমরা দেখতে পারিনা)। কিন্তু পোকা মাকড় খুব স্পষ্ট দেখতে পায়। তাই কীটতত্ত্ববিদরা পোকামাকড় ধরতে আলট্রাভায়োলেট বা UV রশ্নি ব্যবহার করে। UV রশ্নি ফেললে পোকামাকড়রা হুরমুরিয়ে সব বের হয়ে আসে। কিন্তু অধিকাংশ পোকামাকড়রা অতিবেগুনি, বেগুনি, নীল, আসমানি, ও সবুজ পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পারে। এর পরে হলুদ কোনোরকম ঝাপসা দেখে, কমলা দেখতে পারে না বললেই চলে, আর লাল তো একেবারেই দেখতে পারে না।
গাছের পাতার কোষ বিভাজনের সময় কোষে বেশ কিছু রাসায়নিক পদার্থ সক্রিয় থাকে। এই রাসায়নিক পদার্থগুলো কোষকে বিভাজনের সংকেত দেয়, DNA replication বা প্রতিলিপি করায়, নতুন কোষ তৈরি করতে সাহায্য করে। পাতায় বিদ্যমান এই রাসায়নিক পদার্থগুলো যে কোনো পোকামাকড়ের জন্য উৎকৃষ্ট খাবার।
পোকামাকড়ের হাত থেকে কচি পাতা রক্ষা করতেই কুসুম গাছ কয়েক দিনের জন্য তার পাতায় সবুজ ক্লোরোফিল উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। তার পরিবর্তে তৈরি করে লাল রংয়ের অ্যান্থোসায়ানিন। কুসুম পাতা লাল হওয়ার প্রধান কারণ হলো এই অ্যান্থোসায়ানিন নামক রাসায়নিক পদার্থ। এই অ্যান্থোসায়ানিন সূর্যের ৬ টি আলো শোষণ করে নেয়, কিন্তু লাল আলো শোষণ করতে পারে না, প্রতিফলন করে আমাদের চোখে ফিরিয়ে দেয়।তাই কুসুম গাছের পাতা আমাদের চোখে লাল দেখায়। কিন্তু বেশিরভাগ পোকামাকড় এই লাল রং একেবারেই দেখতে পারে না। তাই গাছের পাতা আক্রমণ করতে পারে না। পাতা থাকে নিরাপদ।
একেক গাছের পাতার কোষ একেক গতিতে বিভাজিত হয়।কুসুমের সদ্য গজানো কচি পাতার কোষ বিভাজন সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগে। পাতা ২-৩ দিনের মধ্যে পরিপক্ক (mature) হয়ে পুরোপুরি গঠিত হয়ে গেলে কোষ বিভাজন বন্ধ হয়ে যায়। তখন গাছ আবার ক্লোরোফিল উৎপাদন করে পাতাকে সবুজ করে ফেলে। এতে লাল পাতা আবার সবুজ হয়ে যায়।অর্থাৎ যতদিন না কচি পাতার কোষ বিভাজন সম্পন্ন হবে, ততোদিন পোকামাকড়ের হাত থেকে আড়াল করে রাখার জন্য কুসুম গাছ পাতাকে লাল করে রাখে।এটা গাছের একটা আত্মরক্ষার কৌশল। উদ্ভিদের খাদ্য তৈরি হয় পাতায়। পাতা থেকে তৈরি খাদ্য গাছের সব অংশে যায়। তাই কচি পাতা আক্রান্ত হলে গাছ খাদ্য তৈরি করতে পারবে না।
৪৬
উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন ফসফরাস
'সাহারা' মরুভূমির ওপর অনেকটাই নির্ভর করে পৃথিবীর স্থলভাগের ফুসফুসখ্যাত 'আমাজন বন'। NASA-র স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সাহারা মরুভূমি থেকে প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন টন বালি বাতাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমাজন বনে পৌঁছায়।
মরুভূমির বালিতে ফসফরাস থাকে। উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য ফসফরাস প্রয়োজন। আমাজনের উদ্ভিদ, উড়ে আসা বালি থেকে প্রয়োজনীয় ফসফরাস গ্রহণ করে থাকে। ভাবতে অবাক লাগে এই রুক্ষ মরুভূমিটি টিকিয়ে রেখেছে পৃথিবীর বৃহত্তম রেইন-ফরেস্ট আমাজনকে!
আটলান্টিক পাড়ি দেবার সময় কিছু বালি সমুদ্রে পড়ে একেবারে তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সমুদ্রের তলদেশেও রয়েছে গাছপালা। তাদেরও ফসফরাস প্রয়োজন। তারাও সাহারার বালি থেকে ফসফরাসের চাহিদা পূরণ করে টিকে আছে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন বছর!
৪৭
বরফ তৈরির প্রাচীন পদ্ধতি:-
আধুনিক রেফ্রিজারেশন এবং বিদ্যুতের আবির্ভাবের আগে, উত্তর প্রদেশের (পূর্বে উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ এবং অযোধ্যা রাজ্যের অংশ) গরম গ্রীষ্মে বরফ তৈরি করা হত একটি উদ্ভাবনী, প্রাক-শিল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে যাকে বলা হত নিশাচর বিকিরণ শীতলকরণ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত এই প্রক্রিয়াটি, পরিবেশের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের উপরে থাকলেও পাতলা বরফের চাদর তৈরির অনুমতি দেয়।
প্রাচীন উত্তর প্রদেশে (বিশেষ করে এলাহাবাদ/প্রয়াগরাজের মতো শহরে) কীভাবে বরফ তৈরি এবং সংরক্ষণ করা হত তা এখানে দেওয়া হল:
বরফ তৈরির প্রক্রিয়া (শীতের রাত)
গ্রীষ্মকালে বরফ ব্যবহার করা হলেও, এটি আসলে পরিষ্কার, শুষ্ক শীতের রাতে (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) তৈরি হত।
গর্ত তৈরি: খোলা, উঁচু জমিতে প্রায় 30 ফুট বর্গক্ষেত্র এবং দুই ফুট গভীর অগভীর গর্ত খনন করা হয়েছিল।
অন্তরণ: এই গর্তগুলির নীচের অংশটি শুকনো খড়, আখের ডাল, অথবা ধানের খড়ের পুরু স্তর (প্রায় এক ফুট গভীর) দিয়ে ঢেকে দেওয়া হত।
জলের পাত্র: এই শুকনো খড়ের স্তরের উপর সারিবদ্ধভাবে ছোট, ছিদ্রযুক্ত, গ্লাসবিহীন মাটির পাত্র (মাটির কাপ) স্থাপন করা হয়েছিল।
রাতের শীতলকরণ: সন্ধ্যার সময়, এই পাতলা মাটির পাত্রগুলি ফুটন্ত, অগভীর জলে ভরা হত।
তাপ বিকিরণ: রাতের বেলায়, জল তার তাপ ঠান্ডা, পরিষ্কার, শুষ্ক আকাশের দিকে উপরের দিকে বিকিরণ করত—একটি প্রক্রিয়া যা বিকিরণকারী শীতলতা নামে পরিচিত। কাদামাটির ছিদ্রযুক্ত প্রকৃতি বাষ্পীভবনের সুযোগ করে দেয়, যা শীতলতা প্রক্রিয়াটিকে আরও ত্বরান্বিত করে।
বরফের গঠন: যদি আকাশ পরিষ্কার থাকত এবং বাতাস স্থির থাকত, তাহলে ভোরের দিকে জল জমে যেত, যার ফলে পাতলা বরফের আস্তরণ তৈরি হত।
সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ
সংগ্রহ: সূর্যোদয়ের আগে, শ্রমিকরা ("বরফ-সাজ" বা বরফ প্রস্তুতকারক) প্যান থেকে পাতলা বরফের চাদর সংগ্রহ করত এবং ঝুড়িতে রাখত।
"বরফখানা" (বরফের গর্তে) সংরক্ষণ: সংগৃহীত বরফ বিশেষায়িত, গভীর, ভূগর্ভস্থ, অথবা ভারীভাবে অন্তরকযুক্ত বরফখানায় স্থানান্তরিত করা হত যাকে বরফখানাবলা হত । বরফ আরও খড় দিয়ে প্যাক করা হত এবং শক্ত হওয়ার জন্য নীচে নামানো হত।
অন্তরণ: এই গর্তগুলিতে খড় এবং ভারী কম্বল দিয়ে আস্তরণ দেওয়া হয়েছিল যাতে গলে না যায়। এই জমে থাকা বরফ গরম গ্রীষ্মের মাসগুলিতেও টিকে থাকতে পারে। Source- WIKIPEDIA
লাইবেরিয়ার মানুষ সাদা বক খায় না—কারণ তারা বিশ্বাস করে সাদা বকের ভিতর স্রষ্টার আত্মা বাস করে৷ একটি সাপ বা শেয়াল কিন্তু কপ্পাৎ করে সাদা বক খেয়ে ফেলছে৷ সেই সাপ বা শেয়াল আবার খায় লাইব্রেরিয়ানরা৷ তারা আবার গাছের ফল খায় না—তারা মনে করে ওগুলো পাখির খাবার—মানুষের নয়৷
আচ্ছা সাদা বক কি জানে তার মধ্যে স্রষ্টার আত্মা আছে? আমরা অনুমান করি বক, সাপ বা শেয়ালরা ঈশ্বর বুঝতে পারে না৷ তারা সবকিছুর মধ্যে একটা অর্থ খুঁজে বেড়ায় না৷ তারা নিজেদের জীবন নিয়ে কষ্টে বা হতাশায় ভোগে না৷ শেয়াল বা সাপ কি সাদা বকের জীবন নিয়ে ভাবে? বাস্তবিক একটা সাদা বক অন্য সাদা বকের জীবন নিয়েও ভাবে না বা ভাবতে পারে না৷ তারা কোনো গল্প বানায় না৷ বক চেষ্টা করতে থাকে ছোটো মাছ বা ব্যাঙ খেতে, সাপ চেষ্টা করে ব্যাঙ বা বক খেতে, শেয়াল চেষ্টা করে সাপ বা বক খেতে৷ তারা ছোটো মগজে বিবর্তিত নির্দিষ্ট কাজগুলোই করে যায়৷ মানুষের বাড়তি আছে কল্পনা শক্তি৷ তা থেকেই এসেছে মীথ, গল্প-কাব্য, ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান!
৪৮
উকুন
উকুন হলো ডানাহীন এক প্রকার বহিঃপরজীবী। এরা সাধারণত তিন মিলিমিটারের বেশি বড় হয় না—ঠিক যেন একটা তিলের দানা। এদের ডানা নেই, তাই এরা উড়তে পারে না, আবার পাগুলো লাফানোর উপযোগী নয় বলে এরা ফড়িংয়ের মতো লাফাতেও পারে না। তবে এদের ছয়টি পা এমনভাবে তৈরি যে এরা খুব শক্তভাবে চুল বা লোম আঁকড়ে ধরে দ্রুত যাতায়াত করতে পারে। মূলত রক্তই এদের প্রধান খাদ্য।
।।মানুষের দেহে উকুনের আনাগোনা। ।
মানুষের দেহে তিন ধরণের উকুন দেখা যায়: মাথার উকুন, শরীরের উকুন এবং যৌনাঙ্গের উকুন। এর মধ্যে মাথার উকুনের উপদ্রবই সবচেয়ে বেশি। স্কুলপড়ুয়া শিশু বা ভিড়ের মধ্যে ঘোরাঘুরি করা ব্যক্তিদের মধ্যে এটি দ্রুত ছড়ায়। একজনের মাথা থেকে অন্যজনের মাথায় এটি সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে বা চিরুনি, টুপি ও গামছা, তোয়ালে, মাথার ক্লিপ ব্যবহারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এখন স্কুল, কলেজে , আড্ডায় , পিকনিকে একজনের হেডফোন (যা এখনকার ছেলেমেয়েদের অবশ্যসাথী) আরেকজন ব্যাবহারেও এর ছড়িয়ে পড়া বেশ স্বাভাবিক।
মানুষের শরীরে উকুন ঢুকলেই প্রথম কাজ শুরু হয়—চুলকানি অভিযান। মাথায়, শরীরে বা গোপন স্থানে উকুন হলে— চুলকাতে চুলকাতে পড়া আর কাজ দুটোই ভুলে যাওয়া আর চামড়ায় লাল লাল দাগ ও ঘা তৈরি হওয়া খুব স্বাভাবিক।
উকুন যখন রক্ত চোষে, তখন তাদের লালা আমাদের ত্বকে এক ধরণের চুলকানি তৈরি করে। নিয়মিত পরিষ্কার না করলে এদের বংশবৃদ্ধি এতটাই দ্রুত হয় যে কয়েক সপ্তাহেই মাথা উকুনের ডিম ও উকুনে ভরে ওঠে।
এবার আমরা উকুনের জীবনচক্র একটু জেনে নিতেই পারি।
একটি উকুন সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫দিন বেঁচে থাকতে পারে। এদের জীবনচক্রে তিনটি প্রধান ধাপ ।
১. ডিম বা নিকি (Nits):
স্ত্রী উকুন চুলের গোড়ার ঠিক ওপরে এক ধরণের আঠালো পদার্থের মাধ্যমে ডিম পেড়ে আটকে দেয়। দেখতে সাদা বা হলদেটে রঙের এবং অনেকটা খুশকির মতো মনে হতে পারে, কিন্তু খুশকির মতো সহজে ঝরানো যায় না। ডিম পাড়ার প্রায় ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এগুলো ফুটে বাচ্চা উকুন বের হয়।
২. লার্ভা বা নিম্ফ (Nymph):
ডিম ফুটে বের হওয়া বাচ্চা উকুনকে 'নিম্ফ' বলা হয়। এটি দেখতে বড় উকুনের মতোই, তবে আকারে অনেক ছোট (প্রায় একটি আলপিনের মাথার সমান)। এরাও বেঁচে থাকার জন্য মানুষের রক্ত খায় এবং প্রায় ৯ থেকে ১২ দিন পর এটি পূর্ণবয়স্ক উকুনে পরিণত হয়।
৩. পূর্ণবয়স্ক উকুন
পূর্ণবয়স্ক উকুন লম্বায় প্রায় ২-৩ মিলিমিটার (একটি তিলের দানার মতো) হয়। এদের রং সাধারণত ধূসর বা বাদামী। একটি স্ত্রী উকুন দিনে প্রায় ৫ থেকে ১০টি পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে। মাথা বা শরীরের সংস্পর্শ ছাড়া এরা সাধারণত ১-২ দিনের বেশি বেঁচে থাকতে পারে না কারণ এদের নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয়।
পশুপাখির জগতে উকুন
মানুষের মতো অন্যান্য প্রাণীদের দেহেও উকুনের আক্রমণ হয়, তবে এখানে একটি খুব মজার এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে।
উকুনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এরা 'Host Specific' বা 'নির্দিষ্ট প্রজাতি-নির্ভর'। অর্থাৎ, মানুষের উকুন যেমন অন্য প্রাণীর শরীরে বাঁচে না, তেমনি অন্য প্রাণীর উকুনও মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে পারে না।
প্রায় প্রতিটি স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখির নিজস্ব প্রজাতির উকুন থাকে। যেমন:
গরু-ছাগল: গবাদি পশুর শরীরে নির্দিষ্ট প্রজাতির উকুন হয় যা তাদের চামড়া খসখসে করে দেয় এবং চুলকানি তৈরি করে।
কুকুর ও বিড়াল: এদের শরীরেও উকুন হতে পারে (যেমন: Trichodectes canis কুকুরের জন্য)। তবে গৃহপালিত পশুর ক্ষেত্রে উকুনের চেয়ে টিক (Tick) বা ফ্লি (Flea)-এর উপদ্রব বেশি দেখা যায়।
পাখি: পাখিদের পালকের নিচে এক ধরণের 'চিবানো উকুন' (Chewing Lice) থাকে যারা রক্ত খাওয়ার বদলে পালকের অংশ বা চামড়ার মরা কোষ খেয়ে বেঁচে থাকে।
অনেকেই ভয় পান যে বাড়িতে পোষা কুকুর বা বিড়ালের থেকে বাড়িতে উকুন ছড়িয়ে পড়বে কি না। কিন্তু সঠিক কথা হোল আমাদের পোষা বিড়াল বা কুকুরের শরীর থেকে আমাদের মাথায় বা শরীরে উকুন আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। একইভাবে, মানুষের মাথা থেকে উকুন কুকুর-বিড়ালের শরীরে গিয়ে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। এদের রক্ত এবং শরীরের তাপমাত্রা আলাদা হওয়ায় উকুন তার নির্দিষ্ট হোস্ট ছাড়া অন্য কোথাও টিকতে পারে না।
।।এবার দেখি উকুন কি কি ঝামেলা পাকাতে পারে।।
প্রচুর চুলকানোর ফলে সংক্রমণ হতে পারে।
দীর্ঘদিন থাকলে চুল পড়ে যেতে পারে।
মানসিক কষ্টও কম নয়, মানে উকুন থাকলে শুধু শরীর নয়, মনও চুলকায়।
লজ্জায় কারও পাশে বসতে ইচ্ছে করে না
বাচ্চাদের পড়াশোনায় মন বসে না ,বারবার মনে হয়—“কেউ বুঝি দেখে ফেলল!”
এক কথায়, উকুন আমাদের আত্মবিশ্বাসেরও বারোটা বাজিয়ে দেয়।
উকুন শুধু মানুষের ঘাড়ে চেপে বসে না, পশু-পাখির দিকেও তার নজর সমান। গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল বা মুরগির শরীরে উকুন হলে— সারাদিন চুলকাতে চুলকাতে পশু দুর্বল হয়ে পড়ে। দুধ কমে যায়, ডিম দেওয়া কমে,পাখিদের পালক নষ্ট হয়ে যায়। ছোট পশু-পাখির ক্ষেত্রে রক্তশূন্যতাও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ উকুন মানেই উৎপাদন কম, ঝামেলা বেশি।
উকুন কেবল চুলকানি বা অস্বস্তির কারণ নয়, বিশেষ করে এরা কিছু মারাত্মক রোগের বাহক হতে পারে। তবে মাথার উকুন সাধারণত রোগ ছড়ায় না, বরং অন্যান্য শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করে।
শরীরের উকুন (Body Lice) ঐতিহাসিক ভাবে বেশ কিছু বিপজ্জনক রোগের কারণ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বা যুদ্ধবিগ্রহের সময় যখন মানুষ দীর্ঘদিন কাপড় বদলাতে পারে না, তখন এই রোগগুলো দেখা দেয়:
এপিডেমিক টাইফাস ঃ এটি 'রিকেটসিয়া প্রাওয়াজেকি' (Rickettsia prowazekii) নামক ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ছড়ায়। উকুন এর বাহক। শরীরের উকুন কামড়ানোর পর সেখানে মলত্যাগ করলে এবং মানুষ চুলকানোর সময় সেই মল ক্ষতস্থানে ঘষে ফেললে এই ব্যাক্টেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে রোগ সৃষ্টি করে। এতে প্রচণ্ড জ্বর, মাথাব্যথা এবং গায়ে র্যাশ দেখা দেয়। ঠিকমত চিকিৎসা না হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
ট্রেঞ্চ ফিভার (Trench Fever): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি মহামারী দেখা গেছিল।আসলে যে সব সৈনিক যুদ্ধের সময় ট্রেঞ্চের মধ্যে দিনের পর দিন একসাথে থাকতেন তাদের দেহে এই সংক্রমণ দেখা যেত। তাই এই নাম। এটিও উকুনের মলের মাধ্যমে ছড়ায়। এখানে ব্যাক্টেরিয়াটি হল বারতোনেল্লা কুইন্টানা ( Batonella Quintana) ,এতে হাড়ের জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যথা ও জ্বর হয়।
রিল্যাপসিং ফিভার (Relapsing Fever): এটি এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ যা বারবার প্রচন্ড জ্বর আসা সাথে মাথাব্যাথা, পেশীতে ব্যাথা এসব লক্ষণ তৈরি করে। আর মাথার উকুন সরাসরি রক্তে কোনো রোগ ছড়ায় না ঠিকই, কিন্তু পরোক্ষভাবে বেশ কিছু সমস্যা তৈরি করে:
সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন : উকুনের কামড়ে মাথায় প্রচণ্ড চুলকানি হয়। ক্রমাগত নখ দিয়ে চুলকানোর ফলে মাথার ত্বকে ছোট ছোট ক্ষত বা ঘা তৈরি হয়। এই ক্ষতস্থানে যখন বাইরের স্ট্যাফাইলোকক্কাস গোত্রের ব্যাকটেরিয়া ঢুকে পড়ে, তখন সেখানে পুঁজ হওয়া বা ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া: মাথায় বেশি ইনফেকশন হলে ঘাড়ের পেছনের বা কানের পাশের লিম্ফ গ্ল্যান্ড বা গ্রন্থিগুলো ফুলে যেতে পারে এবং ব্যথা হতে পারে। অনিদ্রা ও বিরক্তি: উকুন সাধারণত অন্ধকারে বা রাতে বেশি সক্রিয় থাকে। এদের চলাফেরা এবং কামড়ের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, যা থেকে ক্লান্তি ও খিটখিটে মেজাজ তৈরি হয়।
সামাজিক ও মানসিক প্রভাব:
আমাদের সমাজে উকুনের সমস্যাটিকে অনেক সময় লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ফলে
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: স্কুলে বা খেলার মাঠে কোনো শিশুর মাথায় উকুন থাকলে তাকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়, যা তার মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করতে পারে।
মানসিক চাপ: মাথায় উকুন থাকলে সবসময় মনে হয় কিছু একটা নড়ছে, এই অস্বস্তি থেকে একাগ্রতা নষ্ট হয় এবং মানসিক চাপ বাড়ে।
ত্বকের সমস্যা--- দীর্ঘদিন উকুন থাকলে কামড়ানোর জায়গায় চামড়া শক্ত হয়ে যাওয়া বা কালো ছোপ পড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। পিউবিক উকুনের ক্ষেত্রে কামড়ের জায়গায় ছোট ছোট নীলচে দাগ (Maculae ceruleae) দেখা দিতে পারে।
।।উকুন তাড়ানোর সহজ বুদ্ধি।।
উকুনের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো—পরিচ্ছন্নতা।
মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত চুল ধোয়া এবং ভেজা চুলে সরু দাঁতের চিরুনি দিয়ে আঁচড়ানো একটি ভাল কাজ। শরীরের উকুনের ক্ষেত্রে নিয়মিত গরম জলে স্নান ও জামাকাপড় কাচা একান্ত জরুরি। চিরুনি, তোয়ালে, বালিশ আলাদা রাখা। স্কুল কলেজের ছাত্র- ছাত্রীদের সচেতন করা। উকুন লম্বা চুল বলে মেয়েদের মাথায় বেশী দেখা যায়।
চিকিৎসা: এখন উকুন নাশক বিভিন্ন লোশন ও শ্যাম্পু পাওয়া যায়। বিশেষ করে 'পারমেথ্রিন' যুক্ত ওষুধ খুব ভালো কাজ করে। তবে একবার ব্যবহারের ঠিক সাত থেকে দশ দিন পর পুনরায় ব্যবহার করা উচিত, যাতে প্রথমবার বেঁচে যাওয়া ডিম থেকে বের হওয়া নতুন উকুনগুলোও নির্মূল হয়।
আমাদের বাংলার ঘরোয়া টোটকায় নিমের তেল বা নিমের জল ব্যবহার উকুনের ওষুধ হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও-ট্রি অয়েলের ব্যবহার বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু এর চিকিৎসা শাস্ত্র জনিত ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই ।
পশু-পাখির ক্ষেত্রে
খোঁয়াড় ও খাঁচা পরিষ্কার রাখা। নিয়মিত জীনানুনাশক শ্যাম্পু ব্যবহার।নিয়মিত পশু-পাখির গা পরীক্ষা করা আর প্রয়োজনে পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
শেষে মনে রাখতে হবে উকুন দেখতে ছোট হলেও তার কীর্তি কিন্তু বিশাল। সে মানুষের ঘুম কেড়ে নেয়, পশুর শক্তি কমিয়ে দেয় আর রোগের রাস্তা খুলে দেয়। তাই উকুনকে হালকাভাবে নিলে চলবে না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতা ও সময়মতো ব্যবস্থা নিলেই এই ক্ষুদ্র কিন্তু দুষ্ট শত্রুকে সহজেই বিদায় জানানো যায়। উকুন থাকবে না—চুলকানিও থাকবে না, মনও থাকবে ফুরফুরে। @ Himadri Paul
৪৯
মহাপ্লাবন কথার আলোচনা॥
মহাপ্লাবনের কথা ইয়োরোপ এবং আরবরা তাদের ধর্মপুস্তক থেকে জেনেছে। যার মুল উৎস ইহুদীদের লেখা। তাদের এই জানাটা ধাক্কা খেল ১৮৬২ ডিসেম্বরের ৩ তারিখ সন্ধ্যায় লন্ডন মিউজিয়ামের এক কর্মী জর্জ স্মিথ যখন প্রধানমন্ত্রীসহ উপস্থিত থাকা লোকজনদের সভায় জানালেন- সুমেরীয় সভ্যতার মাটির ফলকে লেখা গিলগামেশর কাহিনিতে রয়েছে "জেনেসিস বর্ণিত মহাপ্লাবনের কথা"।
লেখা আছে "সুমের দেবতা এনলিল" পাপে ভরা পৃথিবী থেকে মানুষদের বরাবরের মত বিলুপ্ত করতে মহাপ্লাবন ঘটাবেন। দেবতা এনকি যিনি মানুষদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তাঁর ভক্ত শুরুপ্পাক নগরের উতানাপিশতিমকে পরামর্শ দিলেন, দ্রুত এক বিশাল নৌকা বানাও। নৌকায় তোমার পরিবার নারী পুরুষ নানা পেশায় দক্ষ কর্মী, জীব জন্তু ও শষ্যবীজ ভরে আলকাতরা দিয়ে, জিগুরাত আকারের নৌকাকে জলনিরোধক করে নাও।
উতানাপিশতিম এনকিদেবের কথা মত ঝড়ের আগে নৌকায় উঠে সব দরজা বন্ধ করে দিলেন। নৌকার চালক দক্ষ নাবিক পুজুর-আমুররি। ছয়দিন ছয় রাত উদ্দাম ঝড় আর প্রবল জলোচ্ছাস ভীত কম্পিত আরোহীদের দিন কাটল। সপ্তমদিনে ঝড় থামল। পানিআর বাড়ছে না। উতানাপিশতিম চোখের জলে ঝাপসা দেখলেন চারদিকে কাদামাটি মাখা মানুষরাও কাদামাটি হয়ে আছে। কোথাও কোন প্রানের লক্ষণ নেই। গোটা ভুমি যেন এক অন্তহীন সমুদ্র। শুধু দুর দুরান্তে দুই একটি পাহাড়ের চুড়া দেখা যায়। উতানাপিশতিম নৌকা থেকে মাটিতে পা রাখতে চান, কিন্তু পানিশুন্য মাটিই তো নেই। তিনি পরপর দুটি পায়রা ওড়ালেন, তারা কোথাও বসার জায়গা না পেয়ে নৌকায় ফিরে এল। তারপরে আবার পাঠালেন একটি কাক। সেটি আর ফিরলো না। উতানাপিশতিম বুঝলেন কাক মাটির দেখা পেয়েছে।
তখন দেবতাদের উদ্যেশ্যে কৃতজ্ঞতাসূচক নৈবিদ্য নিবেদন করলেন। দেবতারা এলেন এবং উতানাপিশতমকে মানজাতি রক্ষার পুরস্কার স্বরূপ অমরত্ব দান করলেন। কিন্তু মানুষের তো অমর হবার অধিকার নেই। তাই উতানাপিশতিমকে লোকালয় থেকে বহু দুরে নিঃসঙ্গ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে হল।
গিলগামেশ অমরত্বের খোঁজে এসে উতানাপিশতিমের থেকে এই কাহুনি শোনেন। তারই সাথে শেখেন জীবনের মুল কথা। অমরত্ব শুধুই দেবতাদের জন্য। মানুষ মরণশীল।
এই কাহিনিই সামান্য অদলবদল করে স্থান পেয়েছে খৃষ্টান ও ইসলামি ধর্মপুস্তকে।
গিলগামেশের কাহিনিতে লেখা মহাপ্লাবনের কাহিনি ছিল ব্যবিলনীয় ভাষায়। ১৯০০তে পাওয়া আর ১৯১৪তে অনুবাদ করা সুমের ভাষার মহাপ্লাবনের কাহিনি পাওয়া গেল নিপ্পুর নগরে।
তথ্যসূত্রঃ-
1. Reflections on the Mesopotamian flood, The Cuneiform data New and Old. : by Samuel Noah Kramer.
৫০
প্রফেট জ়োনা বা নবী জ়োনা॥
বর্তমানের ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো অতি আগ্রাসী এবং ততোধিক উগ্র। ধর্মের ভক্তির বদলে এখন হিংসারই প্রাধান্য। কাহিনির নায়ক প্রফেট জ়োনা, জুডাইজমে খৃষ্ট ধর্মে আর ইসলাম ধর্মে স্থান পেয়েছে তাঁর কাহিনি। তবে ইসলাম ধর্মপুস্তকে তিনি নবী ইউনুস। আর সব ধর্মকাহিনির মত এই কাহিনিতেও আছে অলৌকিক ঘটনা ও নীতিবাক্য এবং অবশ্যই ঈশ্বরের ক্ষমতা প্রদশর্নের কথা।
বাইবেলের কাহিনিতে গড বা ইশ্বর দেখলেন অ্যাসিরিয়দের শহর নিনেভে পাপীতে ভরে গেছে। গড সেখানে জ়োনাকে পাঠালেন তাঁদের নীতিকথা কথা শুনিয়ে পাপের বোঝা কমাতে। কিন্তু জ়োনা করলেন উল্টো। সম্ভবত ভাবছিলেন পাপীদের তো সাজা পাওয়াই উচিত। তাদের কেন উদ্ধার করবো?
জ়োনা নিনেভে না গিয়ে গেলেন জ়াফো। সেখান থেকে উঠলেন জাহাজে। চলে যাবেন তর্শিশে। কিন্তু ঈশ্বরের নির্দেশ অমান্য করে তো কেউ রেহাই পায়নি। ঈশ্বর তুলে দিলেন প্রবল ঝড়। ঝড়ে উথালপাথাল সমুদ্রে নাবিকরা জাহাজের মালপত্র জলে ফেলে জাহাজের ওজন কমাবার চেষ্টায় ফল পেল না। তখন জাহাজে থাকা ওঝার জাদুকরী বিদ্যা বলে দিল জ়োনাই অপরাধী। জোনা অপরাধ স্বীকার করেন এবং বলেন তাঁকে জাহাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেই ঝড় থেমে যাবে। নাবিকরা প্রথমে সেটা করতে দ্বিধা করলেও শেষ অবধি নিরুপায় হয়েই জ়োনাকে ফেলে দেওয়া হল উত্তাল সমুদ্রে এবং ঝড় থেমে গেল। ইতিমধ্যে সমুদ্রে ডুবতে থাকা জ়োনাকে গিলে ফেলে এক তিমিমাছ। জ়োনা তিনদিন সেই তিমির পেটে আবদ্ধ থাকাকালীন ঈশ্বরের কাছে অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন তিনি ঈশ্বরের প্রীতি উৎপাদনে যথাযথ বলিদান করবেন। করণাময় ঈশ্বর জোনাকে ক্ষমা করে দিলেন। তিমি মাছটি বমি করে উগরে দেয় জ়োনাকে। এবার ঈশ্বরের আদেশ দিলেন যাও নিনেভে। আমার আদেশ পালন করো।
ঈশ্বরের আদেশ পালনে জ়োনা এগিয়ে চলেন নিনেভে শহরের দিকে। তিনি নিনেভেবাসীদের বলবেন- তোমরা তোমাদের পাপ স্বীকার কর, প্রভুর শরণাগত হও।
প্রফেট জ়োনা নিনেভে গিয়ে শোনালেন ইশ্বরের ভবিষ্যবানী। ৪০দিনের মধ্যে নিনেভে শহর ধ্বংস হবে। সব ছারখার হয়ে যাবে। তোমরা তোমাদের পাপ স্বীকার কর। প্রভু ঈশ্বরের শরণ নাও। শহরবাসী জ়োনার কথা বিশ্বাস করলো। রাজা সমস্ত বিলাসব্যসন ত্যাগ করে কটিবস্ত্রপরিহিত হয়ে অনাহারে ছাইগাদায় উপবেশন করে ঈশ্বরের প্রাথর্নায় পাপ ক্লেদ মন্ডিত দিনযাপনের তীব্র অনুশোচনা করতে লাগলেন। সমগ্র শহরবাসীও রাজাকে অনুকরণ করছিল। ঈশ্বর তাঁদের আন্তরিক প্রার্থনায় ও অনুশোচনায় তৃপ্ত হলেন। নিনেভে শহর রক্ষা পেল।
জ়োনা এই ঘটনাক্রম বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বিশ্বাস করতে পারছিলেন না কেন ঈশ্বর এই পাপীদের শহর রক্ষা করবেন। চুড়ান্ত ফলাফল স্বচক্ষে দেখার জন্য তিনি শহর থেকে দুরে একটি কুঁড়ে ঘর বানিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
দয়ালু ইশ্বর জ়োনার অপেক্ষাকালকে সহনীয় করতে কুঁড়েঘরকে ঘিরে ছায়াময় এক লতাগাছের সৃষ্টি করলেন। জ়োনা আরামে স্বস্তির শ্বাস ফেললেন। কিন্তু কয়েকদিন পরে ঈশ্বর একটি পোকাও পাঠালেন। সে পোকা গাছের গোড়া খেয়ে নিলে গাছের সব পাতা শুকিয়ে গেল।
তীব্রতাপে প্রায় জ্ঞানহীন জ়োনা ভাবছেন এটা কেন হল?
তখন ইশ্বর জ়োনাকে প্রশ্ন করলেনঃ জ়োনা গাছটা পোকায় খেয়ে ফেলাতে রাগ করেছ?
জ়োনাঃ হ্যাঁ রাগ করেছি। এর চেয়ে আমি মরে গেলেই তো ভালো হত।
ইশ্বরঃ দেখো এই গাছের বাঁচা মরার সাথে তুমি সম্পর্কহীন। তুমি গাছটির মৃত্যু নিয়ে উদ্বিগ্ন, ক্রুদ্ধ। অথচ এই গাছ তুমি লাগাওনি, বা কেটেও ফেলনি। এদিকে তুমিই ভাবছ নিনেভের ১লক্ষ ২০ হাজার বাসিন্দাকে আমি কেন দয়া প্রদর্শন করবো।
এবার এই কাহিনিরই ইসলামি সংস্করণ।
ইসলামে এই কাহিনি পবিত্র কোরানে ও হাদিসে আছে। হিব্রু বাইবেলের বারজন ছোটখাট নবীর মধ্যে এই একজনেরই নাম আছে কোরানে। কোরানে তিনি নবী ইউনুস। তবে কোরানেই তাঁকে যুন নুন বা মাছের অধিপতি বলা হয়েছে। পবিত্র কোরানে যেটুকু আছে সেটুকু উইকিপিডিয়া থেকে টুকে দিলাম
(১) হযরত ইউনুস আল্লার আদেশ অমান্য করে বোঝাই জাহাজে উঠে পালিয়ে যান।
(২) জাহাজের যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য তাঁকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
(৩) সমুদ্রে একটি তিমিমাছ তাঁকে গিলে ফেলে। তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারেন।
(৪) তিনি আন্তরিকভাবে অপরাধ স্বীকার করেন ও আল্লার প্রশংসা সুচক বন্দনা করেন।
(৫)আল্লা তাঁকে ক্ষমা করে দেন এবং তিনি তিমির পেট থেকে অসুস্থ অবস্থায় ছিটকে বের হয়ে আসেন।
(৬) আল্লা তাঁর উপরে একটি লতাগাছ জন্মাতে আদেশ দেন যা তাঁকে ছায়া ও পুষ্টি দেবে।
(৭)আল্লা তাঁকে আবার এক লক্ষের বেশি লোকের কাছে পাঠান।
(৮) সেই সব মানুষেরা তাঁর কথায় বিশ্বাস করে, ফলে আল্লা তাদের কিছু সময়ের জন্য আরাম আয়েসে বাঁচার সুযোগ দেন।
হাদীসে কিছু টুকরোটাকরা উল্লেখ আছে।
নবী হযরত মুহাম্মদ স. একজন আঙুর পরিবেশনকারি দাসের সাথে কথা বলার সময়ে শোনেন দাসটি নিনেভে শহরের বাসিন্দা। হযরত মুহাম্মদ স. অবাক হয়ে বলেনঃ সে তো ন্যায়পরায়ন ইউনুস ইবনে মাত্তাইয়ের শহর। দাসটি অবাক হয়। তার ধারনা মুর্তিপুজারক আরবদের নবী ইউনুস সম্পর্কে এনার তো এত কিছু জানার কথা না। একটু দ্বিধা করে জিজ্ঞেস করেঃ আপনি ওনার সম্পর্কে কি করে জানলেন? নবী উত্তর দিলেনঃ আমার ভাই। ইউনুস আল্লার নবী, আমিও আল্লার নবী।
ইমাম বুখারীর হাদিস সঙ্কলনে আছেঃ নবী হযরত মুহাম্মদ স. বলেছেনঃ যদি তিনি আল্লার কাছে প্রার্থনা না করতেন, তবে শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত তিনি মাছের পেটেই থেকে যেতেন।
এবার নবম শতাব্দীর ইতিহাসবিদ আল তাবারী বলছেনঃ মাছের পেটে থাকার সময় নবী ইউনুসের কোন হাড় বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আঘাত লাগেনি।
আল্লা মাছটিকে স্বচ্ছ করে দিয়েছিলেন যাতে নবী ইউনুস মাছের পেটে থেকেও সমুদ্রের বিস্ময়কর দৃশ্য দেখতে পান, তার সাথে বাকি সব মাছেরা কেমন করে আল্লার স্তুতি বন্দনা করছে তাও শুনতে পান।
আলোচনাঃ-
প্রফেট জ়োনা বলে সত্যি কি কেউ ছিল? যদিও তিনটি ধর্মপুস্তকেই কাহিনিটি প্রায় অবিকৃত তাই বিশ্বাসযোগ্যতা খানিক বাড়ছে।
অক্সফোর্ডের অধ্যাপক পুসে জানালেন তিনি নিশ্চিত যে প্রফেট জোনার কাহিনির লেখক প্রফেট জ়োনা নিজেই। তিনি মাছের পেটে ছিলেন। সেই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই তিনি লিখেছেন। বেশ। "বুক অফ জ়োনা"তে কোন জাতের তিমি মাছ বলা ছিল? না। মরিয়া অধ্যাপক পুসে লিখেন- জ়োনার বইতে তিমি মাছ বলা ছিল না, শুধু বলা ছিল বিশাল মাছ। তিমি মাছ আধুনিক মানুষদের কল্পনা।
এবার ঘটনা হল, তিমি মাছ বিশাল হলেও একটি গোটা মানুষ গেলার মত তার শারীরিক ক্ষমতা নেই। সব চেয়ে বড় তিমি ব্লু হোয়েল খায় তো প্ল্যাঙ্কটন। তাই তার গলার খাদ্য নালী বেশ সরু। শার্ক হোয়েল এর খাদ্যনালী মাত্র চার ইঞ্চি মোটা। স্পার্ম হোয়েল-এর পেটে আবার চারটি পাকস্থলী। তবে বড় প্রশ্ন অক্সিজেন হীন পাকস্থলীতে মানুষের আয়ু কতক্ষণের?
তার আগের প্রশ্ন, প্রফেট জ়োনা গিয়েছিলেন নিনেভে। নিনেভের ধারে কাছে যে সমুদ্র নেই। ডোনাল্ড জে ওয়াইজম্যান এক প্রস্তাব রেখেছেন তাঁর প্রবন্ধ জোনাস নিনেভে তে। সেখানে তিনি বলছেন মাছ আসলে মাছ নয় ওটি রূপক। ঐ মাছ হল আসলে ব্যবিলন শহর। জ়োনা বন্দী ছিলেন ব্যবিলন শহরে।
ইহুদীদের ব্যবিলন শহরে বন্দী থাকাটাই মাছের পেটে থাকা। আর রাজা দেশে মুক্ত হয়ে স্বদেশে ফিরে আসাটা মাছের উগরে দেওয়া। @ তুষার ব্যানার্জি