আপনার সুখ শান্তি ও উন্নতির জন্য মাত্র ৩টি শর্ত পূরণ করা দরকার

আপনি কোনো কিছু চুজ করে নাই, আপনার নাম, আপনার ভাষা,আপনার কল্চার কোনো কিছু আপনি নিজে চুজ করেননি, এমনকি আপনি যেভাবে বড় হয়েছেন, যে আচার-আচরণ করেন, তার কোনো কিছুই নিজের চয়ে্জে না, দিয়ে দেয়া হয়েছে আপনাকে। ইয়েস, কথাটা বাস্তব। আমরা জন্ম থেকেই একটা পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক খাঁচায় বন্দী হয়ে বেড়ে উঠি; সে অর্থে আমরা কেউই কখনো ফ্রি না। Free না ক্যানো? কারণ আমারা নিজেদের পছন্দমত রুটিন করে বেড়ে উঠি না। আমাদে্র সারা জীবনই নিজ পরিবারের সামর্থ, মূল্যবোধ আর সামাজিক নিয়ম-কানুনের কারাগারের মধ্যে বাস করি। ব্যাপারটা আরো পরিষ্কারভাবে বুঝার জন্য আমরা চমৎকার একটা উদাহরণ দিতে পারি। সেটা হল, কুয়ার ব্যাং কখনো সাগর চিনে না।

কুয়ার মধ্যে কিছু ব্যাং বসবাস করত। তারা দেখতো কুয়ার মধ্যে পানি,আর উপরে এক খন্ড আকাশ,  বাইরে থেকে কিছু পোকামাকড় ভুলে কুয়ায় পড়তো আর ব্যাঙগুলো তা খেয়ে জীবন যাপন করতো। কুয়ার মধ্যে জন্ম নেওয়া তাদের বাচ্চারাও একইভাবে বেড়ে উঠতো। কুয়ার বাইরে যে একটা বিশাল জগত আছে, তা তারা কখনোই জানতো না, জানতে চাইত না। একদিন একটি সাগরের কাসিম হাটতে হাঁটতে কুয়ার কিনারাতে এসে ব্যাংদের দেখতে পেল এবং বলল- ওমা তোমরা এই ছোট্ট কুয়োর মধ্যে বন্দি হয়ে আছো? চলো আমার সাথে সাগরের পাড়ে, সেখানে বিশাল জলরাশি আর অসংখ্য খাবার, ফ্রি লাইফ। ব্যাঙের সরদার ও নেতারা বলল-তুমি আমাদের স্বজাতি বা স্বধর্মের কেউ নও, তোমার কথা শুনলে আমরা সবকিছু হারাবো। আমরা এখানেই বেশ আছি, নিজেদের মধ্যে মারামারি বা অসভ্যতা যাই করি। সাগরের কাসিম এবার বলল, তোমরা যে এই কুয়ার বাইরে বেরোতে পারছ না, বন্দী হয়ে আছো এটার জন্য তোমরা দায়ী না। যদি এই কুয়াটা না থাকতো তাহলে তোমরাও হেঁটে হেঁটে বন-জঙ্গল কিংবা সাগরে বেড়াতে পারতে। তোমাদের আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা, কথা-বার্তা সবকিছুর জন্য দায়ী এই কুয়ো।

অর্থাৎ একজন মানুষ যে কথাবার্তা বলে, আচার-আচরণ করে, গালি দেয়, খারাপ আচরণ করে। তার জন্য সে দায়ী না, দায়ী তার শিক্ষা, পরিবার্‌, নিম্নমানের সমাজ ও  অর্থনৈতিক অবস্থা। অর্থাৎ বাপ-দাদার থেকে পাওয়া কুয়ার পরিবেশ। আপনি আমি সবাই এই বন্দী দশা থেকে মুক্ত হতে পারি মাত্র চারটা বিষয়ে চর্চা করে। তার মধ্যে প্রথমটি হল- কোনো কিছুই পার্সোনালি নেবেন না। দেখুন, দেখুন রাস্তায় যদি কোনো পাগল কাউকে বা আপনাকে গালাগালি করতে করতে যায়, তাহলে কি আপনি তাকে মারধর বা আহত করবেন?  না,কোনভাবেই না। ঠিক তেমনি, কাউকে তার নেতিবাচক আচরণ বা খারাপ ব্যবহারের বিপরীতে আপনি তার সাথে অতি সর্বোত্তম ব্যবহার করুন। মেজাজ হারিয়ে কোনভাবেই তার কুয়াতে পড়ে যাবেন না। সব সময় মনে রাখবেন, সে কুয়ার ব্যাং, তার এই খারাপ ব্যবহারের জন্য সে দায়ী নয়, দায়ী তার কুয়ায় বন্দী জীবন। কেউ গালি দিল বা হাত তুলল, কেউ অহংকার দেখালো, কেউ আপনাকে পাত্তাই দিল না, এটি আসলে তার নিজস্ব পারিবারিক আচরণ, তাই এগুলিকে আপনি পার্সোনালি নিবেন না। ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি দিয়ে গ্রহণ করে তার প্রতি সদয় হবেন, ভালো আচরণ করবেন।

 দ্বিতীয়টি হল-  মাউথ ম্যাজিক। কিন্তু মুখের কথা ম্যাজিক হয় কি করে? বাংলায় একটা প্রবাদ আছে- “কথায় লোকে হাতি পায়, আবার কথায় লোকে হাতির পায়”।  আপনার তিন ইঞ্চির জিহ্বা ব্যবহার করে সহজে ছয় ফুট একজন বা একাধীক মানুষকে হত্যা করতে পারেন। একে বলে মুখের ব্লাক মেজিক বা কালো জাদু। আবার এই একই জিহ্বা ব্যবহার করে আপনি অতি সহজে সবার সেরা পছন্দের মানুষ হিসেবে সব জায়গায় সম্মানিত হতে পারেন। একে বলে হোয়াইট ম্যাজিক বা আসল জাদু। প্রতিটা শব্দ হচ্ছে এক একটা ম্যাজিক এখন আপনি শব্দ ম্যাজিকগুলো কতটা চিন্তা যুক্ত করে ব্যবহার করছেন তার ওপর মূল ম্যাজিকটা নির্ভর করে। কোন কথা চিন্তা না করে সহজে মুখ দিয়ে বের করবেন না। আপনার কথা যেন অন্যকে (এমনকি নিজেকেও) কোনভাবেই আহত না করে বা ব্ল্যাক ম্যাজিকে পরিণত না হয়। এই কথার ম্যাজিক হল একটা কঠিন আর্ট, যেটা সহজে আয়ত্ত করা যায় না; দীর্ঘদিন চর্চা করতে হয়। যদি আপনি আয়ত্ত করতে পারেন তাহলে আপনাকে নিয়ে সবাই খুশি থাকবে এবং আপনি সবার সেরা হয়ে সুখে থাকতে পারবেন। 

তৃতীয়টা হল- কোন কিছু আশা না করা। যখন কারো সাথে ভালো সম্পর্ক থাকে তখন আমরা আশা করে বসে থাকি, সে আমার জন্য এটা-ওটা করবে, সে আমাকে সবকিছু বলব্‌ কোনো কিছু লুকাবে না ইত্যাদি কত কিছু । কিন্তু এমন যেন না হয় তার কাছ থেকে আপনি কি চান, তা সে জানে না অথবা সে আপনার কাছে কি চায়, আপনি তা জানেন না। এতে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মধ্যে দেয়াল তৈরি হয়ে, সম্পর্ক দেয়ালের মধ্যে আটকে যাবে। অর্থাৎ মনে মনে কোন কিছু প্রত্যাশা করে বসে থাকবেন না। হয় স্পষ্টভাবে তাকে প্রকাশ করবেন নতুবা কোন কিছু প্রত্যাশা করবেন না।




  মানুষ ঠিক কীভাবে আপনাকে পছন্দ করবেন 

গবেষণা বলে যে, আপনি সাধারণত তিনটা কারণে আপনার আশপাশের মানুষজনদেরকে পছন্দ করবেন। প্রথম যে কারণটা, সেটা হচ্ছে যে, আপনি আপনার আশপাশের মানুষজনদেরকে পছন্দ করবেন, তারা দেখতে attractive। যেই মানুষটা দেখতে সুন্দর, আপনি তাকে পছন্দ করবেন। এজন্য দেখবেন মার্কেটিং এ বা বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ডে সেই সমস্ত মানুষদের ছবি ছাপানো হয় , যারা দেখতে attractive।  অর্থাৎ প্রথমে দর্শনধারী তারপর গুণবিচারী । দ্বিতীয় যে কারণটা এটা হচ্ছে যে, আপনার সাথে যখন কারও কোনো মতামতের যেকোনও কিছু যখন মিল থাকবে; ব্যক্তিত্ব বলি, পছন্দ-অপছন্দ বলি, পোশাক আশাক বলি, ভাষা বলি, জাতি বলি, যেকোনও কিছু যখন মিলে যাবে, তখন আপনি ওই মানুষটাকে পছন্দ করবেন। যেমন ধরুন কেউ একজন চট্টগ্রামের ভাষায় কথা বলে। আপনিও চট্টগ্রামে্র। দেখবেন আপনাদের দুজনের মধ্যে একটা টান চলে আসবে, যে কোন একটা মিল থাকলি হবে। আমি কালো টি শার্ট পরি সবসময় । এখন আমি একজনকে দেখলাম, যে কালো টি শার্ট পরে, সবসময় । তার প্রতি আমার একটা পছন্দ কাজ করবে। আর তৃতীয় যে কারণটা, সেটা হচ্ছে, ওই মানুষটা আমাদেরকে পছন্দ করে। অর্থাৎ কেউ একজন কেবল আমাদেরকে পছন্দ করে, এটা যখন আমরা বুঝতে পারব, তখন আমরাও ফিরতি তাকে পছন্দ করা শুরু করব বা তাকে support দিয়ে যাব। যে দোকানদার আমার সাথে সুন্দর করে কথা বলে, হেসে কথা বলে, আমি তার দোকানে যাব বারবার। তার কাছ থেকেই জিনিসপত্র কিনব। এই যে কেউ আমাদেরকে পছন্দ করলে আমরাও তাকে ফিরতি পছন্দ করি বা তার কথাবার্তা শুনি, তার কাছ থেকে জিনিসপত্র কিনি বা তাকে একটু সুনজরে দেখি, এই ব্যাপারটাকে বলা হয় liking bias । আপনি যদি আপনার customerকে বিশ্বাস করাতে পারেন যে আপনি তাকে সত্যিই পছন্দ করেন এবং আপনি তার প্রতি caring, তাহলে এটার চেয়ে বড় অস্ত্র আর কিছু নেই। আপনার ওই customer সবসময় আপনার কাছ থেকেই কিনবে। like you. এ যে আমি আপনাকে পছন্দ করি এই বাক্যটা পৃথিবীর সবচেয়ে  শক্তিশালী একটা বাক্য।  



রুটি আর বারবিকিউ

রুটি আর বারবিকিউ পছন্দ করে না এমন মানুষ খুবই কম। কিন্তু অতিরিক্ত বারবিকিউ আর পোড়া রুটি খেলে মানুষের ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। রুটির ক্ষেত্রে কি হয় ডাইরেক্ট অনেকে আগুনে ছেঁকে। সেই সময় রুটির কিছু কিছু অংশ কালো হয়ে পুড়ে যায়। সেই কালো পোড়া অংশগুলোতে অ্যাক্রিলামাইট নামে একটা ক্যান্সারাস কেমিক্যাল তৈরি হয়। যা আমাদের শরীরে গেলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এটা শুধু রুটির ক্ষেত্রে নয় কিন্তু যেকোনো কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবার যেমন পাউরুটি টোস্ট,আলু ভাজি,চিপস এগুলো যদি পুড়ে যায় সেগুলোতে অ্যাক্রিলামাইড ফর্ম হয়। আর বারবিকিউ করার সময় বাইরের অংশগুলো কিন্তু পুড়ে যায়। আর মাংস আর মাছের মধ্যে কিন্তু ফ্যাট থাকে। আর পরার সময় সে ফ্যাটগুলো থেকে যখন তেলটা নিচে আগুনে পুড়ে যায়,আর সেই তেলটা পুড়ে গিয়ে ধোঁয়াটা আবার সে বারবিকিউতে লেগে যায়। আর মানুষে তো মেইনলি সে বারবিকিউর বাইরের পড়া অংশগুলোকেই পছন্দ করে। এই পড়া অংশগুলোতে দুটো ক্যান্সারাস কেমিক্যাল ফর্ম হয়। একটা হচ্ছে হিটারো সাইক্লিক অ্যামিনস আরেকটা হচ্ছে পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন।এ দুটোই ক্যান্সারাস কেমিক্যাল আলরেডি ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন আর সাইন্টিস্ট এর দ্বারা প্রুভ করে বলা হয়েছে। তাই রুটি ডাইরেক্ট আগুনে না ছেঁকে তাওয়াতে শেখা উচিত। আর মাংসের বাইরে পড়া অংশগুলো ফেলে দিয়ে তবে বারবিকিউ তা খাওয়া উচিত।




গুড়,মধু,চিনি

মধুর চেয়ে গুড়ে বেশি সুগার থাকে। কিন্তু তারপরও গুড়ের চাইতে মধুই আমাদের শরীরকে বেশি ক্ষতি করে। এক কেজি মধুতে সাড়ে সাতশো থেকে আটশো গ্রামের মতো সুগার থাকে আর এক কেজি গুড়ে সাড়ে আটশো থেকে নয়শো গ্রামের মতো সুগার থাকে। আর এক কেজি চিনিতে এক কেজি সুগার থাকে। তাই চিনির কথায় তো বাদ দিলাম। তাহলে মধুতে যেহেতু গুড়ের তুলনায় কম সুগার আছে, গুড়ের চাইতে মধুই তো বেশি ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু ব্যাপারটা আমাদের দেখতে হবে, মধুর ভিতরে সুগারটা কি ফর্মে বা কি ধরনে আছে আর গুড়ে কিভাবে আছে মধুতে সুগারটা ফ্রি ফ্রুক্তোজ আর ফ্রি গ্লুকোজ হিসেবে থাকে। যেগুলো আমাদের পাকস্থলীতে গেলে হজম করা লাগে না। আমাদের শরীর ডিরেক্টলি শোষণ করে নেয়। যার কারণে আমাদের ব্লাড এ সুগারের পরিমাণ তাড়াতাড়ি বেড়ে যায় আর ইনসুলিন তাড়াতাড়ি স্পাইক হয় কিন্তু গুড়ের ক্ষেত্রে সুগারটা এই ফ্রুক্তোজ আর গ্লুকোজগুলো যুক্ত হয়ে সুক্রোজ হিসেবে থাকে। আর সেটা যখন পাকস্থলীতে যায় হজমের দ্বারা সেই সুক্রোজকে ভাঙতে হয়। গ্লুকোজ আর ফ্রুকটোজ এ।তারপর আমাদের শরীর শোষণ করতে পারে। আর এই প্রসেস গুলো হতে টাইম লাগে। যার কারণে ধীরে ধীরে ব্লাডে সুগারটা যায়। আর ইনসুলিন টা তাড়াতাড়ি স্পাইকস হয় না। তাছাড়া মধুতে তুলনামূলকভাবে ফ্রুকটোজের পরিমাণটা গ্লুকোজের চাইতে আর গুড়ের চাইতে বেশি থাকে। আর ফ্রুকটোজ হচ্ছে এমন একটা সুগার। যেটা সরাসরি আমাদের লিভার কে এফেক্ট করে। কিন্তু গুড়ের ক্ষেত্রে ফ্রুকটোজ টা তুলনামূলকভাবে একটু কম আছে। যার কারণে গুড় মধুর চাইতে একটু কম ক্ষতিকর। শরীরের জন্য স্বাস্থ্যকর কিন্তু গুড়ও নয়,মধুও নয়,চিনিও নয়।চিনি হচ্ছে সব চাইতে বেশি ক্ষতিকর। তার চাইতে কম ক্ষতিকর মধু আর তার চাইতে কম ক্ষতিকর হচ্ছে গুড়। তাই মিষ্টি যদি খেতেই হয় গুড়ের অপশন টা বেছে নেওয়া বেটার।




অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ তৈরি হওয়ার আপনি ঘুরে ফিরে তিনটা মৌলিক কারণ খুঁজে পাবেন 

প্রথম কারণ আমরা বনাম,ওরা। এটা একটা ট্রাইবাল মনস্তত্ত্ব। এটা কেমন মানুষ সবসময় কি চায়? নিরাপত্তা। আর এই নিরাপত্তার জন্য তারা বিভিন্ন দল গঠন করে অথবা দলভুক্ত হয়। এই দল গঠন করা বা দলভুক্ত হওয়া কিন্তু খারাপ না। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে এটা কাম্য। এটা হওয়া উচিত। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে দলভুক্ত হবার পর পরেই যদি একটা মানুষ ফিল করা শুরু করেন যে তিনি সবসময় ঠিক তাহলে ওরা বেঠিক বা ওরা ভুল এরকম একটা মাইন্ডসেট তৈরি হয়ে যায়। আর তখন ধর্মটা বেসিক্যালি ধর্ম থাকে না। এটা হয়ে যায় একটা আইডেন্টিটি ব্যাচ। যে ব্যাচ থাকলে ধারণা করা হয় অন্যকে আঘাত করাটা সহজ। কারণ সে ভাবতে শুরু করে, আমি তো পবিত্র পক্ষের লোক। কিন্তু ধর্ম কি কখনো পবিত্রতার নামে ঘৃণা শেখায়? না তো। বরং ধর্ম শেখায় সংযম, ন্যায় আর মমতা। 

দ্বিতীয় কারণ মোরাল লাইসেন্সিং এটা কেমন? কিছু মানুষ ভাবে যে আমি তো খুব শক্তপোক্তভাবে ধর্ম পালন করি। কাজেই রাগ আমার জন্য জায়েজ। আমি তো ধার্মিক। তাই মোটামুটিভাবে আমার জন্য স্বর্গ কনফার্ম। আর এ কারণে অন্যকে একটু আধটু অপমান করতেই পারি। কেউ কেউ ভাবে পণ্যধর্মের মানুষ তো নরকেই যাবে। ওদের সাথে আলাদা করে ভালো ব্যবহার না করলেও কোন সমস্যা নেই। আমি ক্ষমা পেয়ে যাবো। এই যে মাইন্ডসেট, এই মাইন্ডসেটটাই তাদের মধ্যে একটা মোরাল লাইসেন্সিং তৈরি করে দেয়। ফলে কি হয় আমি ধার্মিক। এই বিষয়টায় একটা অহংকার হয়ে সামনে চলে আসে। এটা কিন্তু ভীষণ রকম ক্ষতিকর দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ ধর্ম মানুষকে পরিশুদ্ধ করে। তার ভেতর থেকে অহংকার নিঃশেষ করে দেয়। ধর্ম কিন্তু মোরাল লাইসেন্সিং দিয়ে একটা অপরাধকে জায়েজ করে না।

তৃতীয় কারণ, ধর্মের ভাষা হারিয়ে ফেলা। ধর্মের ভাষা কি? ধর্মের ভাষা হচ্ছে ক্ষমা,মমতা, ন্যায়, সত্য, সংযম। আর ঘৃণার ভাষা কী? ঘৃণার ভাষা হচ্ছে অপমান, দলাদলি, গালাগালি, শত্রুতা তৈরি, অহংকার ইত্যাদি। তো যেদিন এই ধর্মের ভাষা চলে যায় সেদিন ধর্মের নামে শুধু কিছু শব্দ থাকে। যে শব্দ আর যাই হোক কোন সুবাতাস দিতে পারে না। আর ধর্ম তখনই চলে যায় যখন নিজের ভেতরের আমিটা দূষিত হয়ে যায়। তো ঘুরে ফিরে দেখা গেছে এই তিনটি কারণেই ধর্মের নামে আমাদের সমাজে অন্ধকার নেমে আসে।




বয়স যত বাড়বে, সেই সাথে বাড়বে হাড় ভাঙ্গার ঝুঁকি

বয়োবৃদ্ধদের জন্য বোন ডেনসিটি (bone density) পরীক্ষা করিয়ে কোনো লাভ নেই। কারণ তাদের অস্টিওপোরোসিস (osteoporosis) থাকবেই, আর বয়স যত বাড়বে, এর মাত্রাও বাড়তে থাকবে, সেই সাথে বাড়বে হাড় ভাঙ্গার ঝুঁকি।

বেশি বয়সী যত লোক পড়ে গিয়ে ব্যাথা পায় তাদের প্রায় সবারই মধ্যে মারা যাওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায় । পড়ে গিয়ে সবসময় হাড় না ভাঙ্গলেও পতনের দৈহিক ও মানসিক ঝাঁকুনি শরীর-মনকে ভীষণ পর্যুদস্ত করে দেয়, যার ধকল সামলাতে না পেরে রোগী মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়। যাদের বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে তাদের হাড় ভাঙ্গা ঠেকানোর সবচেয়ে বড় উপায় হলো পড়ে গিয়ে ব্যাথা পাওয়া রোধ করা।

কীভাবে করবেন?

কোনো কিছু ধরা বা পাড়ার জন্য কখ্খনো চেয়ার বা টুলজাতীয় কিছুর ওপর উঠে দাঁড়াবেন না।

 বৃষ্টির দিনে বাইরে হাঁটতে যাবেন না।

 এই বয়সে কোমরের হাড় ভাঙ্গার এক নম্বর কারণ হলো বাথরুমে পা পিছলে পড়ে যাওয়া। তাই গোসল করার সময় বা বাথরুম ব্যবহারের সময় অতরিক্তি সতর্ক থাকুন।

বিশেষ করে বেশি বয়সী নারীরা, বাথরুমে দাঁড়িয়ে কাপড় বদলাবেন না। গোসল  শেষে তোয়ালে বা শাড়ি পেঁচিয়ে বেরিয়ে আসুন এবং ধীরে সুস্থে চেয়ারে বা বিছানায় বসে কাপড় পরুন।

বাথরুমে ঢোকার আগে ভালো করে দেখুন মেঝে ভেজা কিনা। ভেজা মেঝেতে হাঁটবেন না।

কমোড ব্যবহারের চেষ্টা করুন। হাঁটু ভাঁজ করে বসলে উঠতে অনেক বেগ পেতে হতে পারে এবং পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

সম্ভব হলে কমোড থেকে উঠার সময় হাতে টান দিয়ে ধরার মতো কোনো হাতল দেওয়ালে লাগিয়ে নিন।

গোসল  করার সময়ও বসার জন্য টুল ব্যবহার করুন। চোখ বন্ধ করে মাথায় পানি দিবেন না।

৪) রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দেখে নিন ঘরের মেঝেতে কিছু পড়ে আছে কিনা, যাতে পা লেগে হোঁচট খেতে পারেন। মেঝে যেনো অবশ্যই ভেজা না থাকে সে ব্যাপারে অতিরিক্ত সকর্ক থাকুন।

৫) রাতে ঘুম ভাঙ্গলে বিছানা ছাড়ার সময় আগে ২-৩ মিনিট বিছানার পাশে বসুন, বাতি জ্বালান, তারপর উঠে দাঁড়ান।

৬) অন্তত রাতের বেলায় (এবং সম্ভব হলে দিনেও) বাথরুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করবেন না। সম্ভব হলে বাথরুমের ভেতরে একটি এলার্ম লাগিয়ে নিন যাতে করে জরুরি মুহূর্তে বেল বাজিয়ে কারো সাহায্য চাইতে পারেন।

৭) বেশি বয়েসে কখনো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাপড় বদলাবেন না। চেয়ারে বা বিছানায় বসে নিন।

৮) সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় রেলিংয়ে একটা হাত রাখুন। দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে কখনো সিঁড়িতে পা রাখবেন না।

৯) যদি কখনো পড়েই যেতে থাকেন, চেষ্টা করুন হাত প্রসারিত করে মাটি বা মেঝে ধরে ফেলতে – তাতে হাত ভেঙ্গে গেলেও সেটা কোমর ভাঙ্গার চেয়ে অনেক বেশি ভালো।

১০) সারাদিন শুয়ে বসে থাকবেন না। অন্তত কিছু মিনিট করে হাঁটুন – যতটা সম্ভব।

১১) বিশেষ করে মহিলারা, ওজন কম রাখার ব্যাপারে অতিরিক্ত যত্নবান হোন। পরিমিত খাবার খাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বেঁচে যাওয়া খাবার নষ্ট না করে খেয়ে ফেলার প্রবণতা কাজ করে অনেকের মাঝে। ভুলেও এটি করবেন না। কখনো ভরপেট খাবেন না – যত মজার আর যত ভালো খাবারই হোক, সবসময় পেট ভরার আগে খাওয়া শেষ করবেন।

১২) সম্ভব হলে বাইরে রোদে কোনো কাজ করুন কিছুক্ষণ। তাতে ভিটামিন ডি-র প্রভাবে হাড় কিছুটা শক্ত হবে।

একবার পড়ে গিয়ে বড় ধরনের ব্যাথা পেলে গড়ে দশ বছর আয়ু কমে যায়। বৃদ্ধ বয়সে কোনো অপারেশন ভালো কাজে আসে না, আর ওষুধ খেয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে চিকিৎসা মানে কেবল মৃত্যুর দিন গোনা। তাই সাবধান থাকার কোনো বিকল্প নেই।




গোসলখানায় স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক কেনো বেশি হয়?

বাড়িতে সংঘটিত স্ট্রোকগুলোর একটি বড় অংশ বাথরুম বা গোসলখানায় ঘটে থাকে। এটি কেন হয় ?

১. তাপমাত্রার আকস্মিক পরিবর্তন (Thermoregulation)

আমরা যখন হঠাৎ করে মাথায় খুব ঠান্ডা বা খুব গরম পানি ঢালি, তখন শরীরের তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখতে রক্তনালীগুলো দ্রুত সংকুচিত বা প্রসারিত হয়। একে বলা হয় Vasoconstriction বা Vasodilation। হঠাৎ ঠান্ডা পানি মাথায় পড়লে রক্তচাপ (Blood Pressure) দ্রুত বেড়ে যেতে পারে, যা মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালী ছিঁড়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করে (Hemorrhagic Stroke)। অধিকাংশ মানুষ গোসল শুরু করার সময় প্রথমেই মাথায় পানি ঢালেন। এটি ভুল পদ্ধতি। শরীরের নিচের অংশ থেকে পানি না ঢেলে সরাসরি মাথায় পানি দিলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনের চাপ হঠাৎ বৃদ্ধি পায়, যা স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ।

২. কনস্টিপেশন বা কোষ্ঠকাঠিন্য (Valsalva Maneuver)

বাথরুমে স্ট্রোকের একটি বড় কারণ হলো টয়লেটে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে Valsalva Maneuver বলা হয়। এর ফলে:বুকের ভেতরের চাপ বৃদ্ধি পায়।

হৃৎপিণ্ডে রক্ত প্রবাহ সাময়িকভাবে কমে যায় এবং পরবর্তীতে হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

৩. প্যারা-সিম্প্যাথেটিক অ্যাক্টিভিটি

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরের রক্তচাপ এমনিতেই কিছুটা ওঠানামা করে। এই সময়ে গোসল করা বা টয়লেটে যাওয়ার সময় স্নায়ুতন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, যা দুর্বল হার্ট বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শীতকালে বাথরুমে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এবং স্ট্রোকের হার গ্রীষ্মকালের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি। এর প্রধান কারণ হিসেবে তাপমাত্রা ও রক্তচাপের দ্রুত পরিবর্তনকে দায়ী করা হয়েছে। Courtesy: Natural wellness and cancer ca



আপনার মুড বদলে দিতে ৫টি "আনকমন" ট্রিকস


মনে হচ্ছে সব কিছু যেন ঠিক আপনার বিপরীতে যাচ্ছে? অস্থির হবেন না। নিজেকে চাঙ্গা করার জন্য দামী ট্রিপ বা বিশাল শপিংয়ের দরকার নেই; দরকার শুধু দৃষ্টিভঙ্গির একটু পরিবর্তন।

​নিচে দেওয়া হলো ৫টি "আনকমন" ট্রিকস যা আপনার মুড বদলে দিতে জাদুর মতো কাজ করবে:

​১. "ডিজিটাল ডিটক্স" নয়, বরং "ফেভারিট মেমোরি লেন"

​আমরা মন খারাপ থাকলে অন্যের সুখী জীবন দেখে আরও বিষণ্ণ হই। এবার উল্টোটা করুন। ফোনের গ্যালারিতে ঢুকে অন্তত দুই বছর আগের কোনো হাসিখুশি ভিডিও বা ছবি দেখুন। সেই মুহূর্তের অনুভূতিটা মনে করার চেষ্টা করুন। বিজ্ঞান বলছে, নস্টালজিয়া মূহুর্তেই মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়।

​২. পাঁচ মিনিটের "কাইন্ডনেস থেরাপি"

​নিজে ভালো থাকতে চাইলে অন্য কাউকে একটু ভালো অনুভব করান। খুব কঠিন কিছু না—পুরানো কোনো বন্ধু বা শিক্ষককে টেক্সট করে ধন্যবাদ জানান, কিংবা বাসার নিচে কোনো বিড়াল বা কুকুরকে কিছু খেতে দিন। অন্যের হাসির কারণ হতে পারাটা নিজের বিষণ্ণতা কাটানোর সবচেয়ে দ্রুততম উপায়।

​৩. "৮০-২০" নিয়ম প্রয়োগ করুন

​আপনার মনের ৮০ শতাংশ দখল করে আছে মাত্র ২০ শতাংশ সমস্যা। একটা কাগজে লিখে ফেলুন ঠিক কী কারণে আপনার মন খারাপ। যখন দেখবেন সমস্যাটা মাত্র কয়েকটা লাইনের, তখন মনের ওপর থেকে পাহাড়সম বোঝাটা নেমে যাবে। যা নিয়ন্ত্রণ করা আপনার হাতে নেই, তা নিয়ে ভাবা ছেড়ে দিন।

​৪. ঘ্রাণ বা সুগন্ধের জাদু (Aroma Magic)

​মানুষের ঘ্রাণশক্তি সরাসরি স্মৃতির সাথে যুক্ত। মন খারাপ থাকলে প্রিয় কোনো পারফিউম মাখুন, বা এক কাপ কড়া কফি/এলাচ চা বানান। ল্যাভেন্ডার বা লেবুর ঘ্রাণ স্নায়ুকে শান্ত করতে বিস্ময়কর কাজ করে।

​৫. "নোটিফিকেশন অফ, মিউজিক অন"

​দুনিয়ার সব যুক্তি একপাশে রেখে কানের হেডফোনটা তুলে নিন। তবে স্যাড গান নয়! এমন কোনো গান শুনুন যা শুনলে আপনার অজান্তেই পা নাচে। মাত্র ৫ মিনিটের নাচ বা একটু জোরে হাঁটা আপনার শরীরের 'কোর্টিসল' বা স্ট্রেস হরমোন কমিয়ে দেবে নিমেষেই।

​প্রো-টিপ: মনে রাখবেন, আকাশ সারাক্ষণ পরিষ্কার থাকে না, মাঝে মাঝে বৃষ্টি হওয়াটাও জরুরি। আপনার আজকের এই মন খারাপটা একটা সাময়িক বিরতি মাত্র, শেষ গন্তব্য নয়। @Edu Ques



 আলো–অন্ধকারের খেলা

মানবদেহ একটি স্বাভাবিক জৈবিক সময়চক্র মেনে চলে, যা আলো–অন্ধকারের সাথে তাল মিলিয়ে ঘুম, হরমোন নিঃসরণ, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং কোষ মেরামতের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। যখন এই ছন্দ নিয়মিতভাবে ব্যাহত হয়—যেমন রাতের শিফটে কাজ করা বা এলোমেলো ঘুমের অভ্যাসের কারণে—তখন শরীরের ভেতরের ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং আগে থেকে টিউমার থাকলে তার বৃদ্ধিকেও ত্বরান্বিত করতে পারে।

এই জৈবিক ছন্দ ভেঙে গেলে ইমিউন সিস্টেম আগের মতো কার্যকর থাকে না। ফলে শরীর অস্বাভাবিক কোষ দ্রুত শনাক্ত ও ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়। বিশেষভাবে LILRB4 নামের একটি প্রোটিন তখন বেশি সক্রিয় হয়ে ইমিউন কোষগুলোর প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যা টিউমারকে বেড়ে ওঠা ও ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দেয়।

অনিয়মিত ঘুম কোষ বিভাজন ও ডিএনএ মেরামতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেও ব্যাঘাত ঘটায়, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কোষ টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। তবে গবেষণায় আশার দিকও রয়েছে—LILRB4-কে লক্ষ্য করে চিকিৎসা দিলে টিউমারের বৃদ্ধি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। তাই ক্যান্সার প্রতিরোধে শুধু রোগ নয়, শরীরের অভ্যন্তরীণ সময়চক্র ও ইমিউন স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াও অত্যন্ত (দি স্টোরি অব সায়েন্স)


নিজের সাথেই নিজের লড়াই 

আমরা প্রায়ই ভাবি জীবন মানে বোধহয় অন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা, অন্যদের হারিয়ে উপরে ওঠা। কিন্তু সত্যটা হলো, জীবনের আসল যুদ্ধটা বাইরের কারো সাথে নয়; বরং এই লড়াইটা প্রতিমুহূর্তে নিজের সাথেই নিজের।

​কেন এই যুদ্ধ নিজের সাথে?

​প্রতিটি মানুষ তার ভেতরে দুটি সত্তা নিয়ে বাস করে। একটি সত্তা চায় আলস্য, আরাম আর অজুহাতে ডুবে থাকতে; অন্যটি চায় স্বপ্ন পূরণ করতে, পরিশ্রমী হতে এবং নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে। এই দুই সত্তার মধ্যকার দ্বন্দ্বই হলো জীবনের আসল যুদ্ধ।

​ভয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: আমাদের মনে যে 'পারবো না' বা 'লোকে কী বলবে'—এই ভয়গুলো আছে, তাদের পরাজিত করাই বড় জয়।

​অতীতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: গতকালের ব্যর্থতা যেন আজকের সম্ভাবনাকে গ্রাস না করে, সেই মানসিক লড়াই চালানো।

​অভ্যাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: নিজের খারাপ অভ্যাসগুলোকে বদলে ফেলে আরও উন্নত একটি সংস্করণ (Version) তৈরি করা।

​"আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু অন্য কেউ নয়, বরং আপনার নিজের ভেতরের সেই কণ্ঠস্বর যা আপনাকে থামিয়ে দিতে চায়।"

​প্রতিদিনের জয়ই আসল সাফল্য

​এই যুদ্ধে কোনো মেডেল নেই, কোনো দর্শক নেই। আছে শুধু দিনশেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারা—"আজ আমি গতকালের চেয়ে একটু ভালো মানুষ হতে পেরেছি।" আপনি যখন নিজের আলস্যকে হারিয়ে জিমে যান, যখন নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করেন, কিংবা যখন হতাশার মাঝেও হাসিমুখে কাজ শুরু করেন—তখনই আপনি এই যুদ্ধে জিতছেন। অন্যের গড়া মাপকাঠিতে নিজেকে বিচার করা বন্ধ করুন। আপনি কেবল তখনই সফল, যখন আপনি নিজের সীমাবদ্ধতাগুলোকে জয় করতে শিখবেন।

​জীবন মানে এক অবিরাম যুদ্ধের নাম। এই লড়াই ক্লান্তিকর হতে পারে, কিন্তু এটাই আপনাকে শক্তিশালী করে তোলে। মনে রাখবেন, বাইরের পৃথিবী জেতার আগে নিজের মনকে জয় করা জরুরি। নিজের সীমাবদ্ধতা, অজুহাত আর নেতিবাচকতাকে হারিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নামই জীবন।

​লড়াইটা চালিয়ে যান, কারণ দিনশেষে আপনার শ্রেষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বী আপনি নিজেই!


১০

মানুষের মন পড়া দক্ষতা


মানুষের মন পড়া কোনো জাদুকরী বিদ্যা নয় এটি একটি দক্ষতা। আমরা যখন কারো সাথে কথা বলি, তখন তার অজান্তেই তার শরীরের ভাষা, চোখের চাহনি এবং আচরণ তার মনের গোপন কথাগুলো প্রকাশ করে দেয়।

মনস্তত্ত্ব বা সাইকোলজি ব্যবহার করে কীভাবে খুব সহজে সামনের মানুষটিকে বুঝে নিতে পারবেন, তার ৫টি কার্যকর কৌশল নিচে দেওয়া হলো

মুখোশের আড়ালে আসল মানুষটিকে চিনতে চান? তবে খেয়াল করুন:

১. অনবরত কথা বলা: ইনসিকিউরিটির লক্ষণ

অনেকেই আছেন যারা এক মুহূর্ত চুপ থাকতে পারেন না অনবরত নিজের কথা বলে যান। সাইকোলজি বলে, অতিরিক্ত কথা বলা অনেক সময় মানসিক অনিরাপত্তার (Insecurity) লক্ষণ হতে পারে। তারা চায় সবাই তাকে গুরুত্ব দিক এবং তার কথা মন দিয়ে শুনুক।

বিপরীত দিক:

যারা সত্যিই আত্মবিশ্বাসী ও মানসিকভাবে শক্তিশালী, তারা কম কথা বলে এবং বেশি পর্যবেক্ষণ করে (Observe)। তারা শোনার মাধ্যমে মানুষকে বোঝে।

২. চোখের ভাষা: সত্য বনাম মিথ্যে

কথায় আছে মুখ মিথ্যে বললেও চোখ অনেক সময় সত্য প্রকাশ করে দেয়। কথা বলার সময় কেউ যদি বারবার চোখ সরিয়ে নেয় বা সরাসরি চোখে চোখ রাখতে না পারে, তাহলে বুঝবেন সে অস্বস্তিতে আছে।

সম্ভাব্য কারণ:

কোনো সত্য লুকানো

মানসিক চাপ

আত্মবিশ্বাসের অভাব

অথবা সরাসরি মিথ্যে বলা

একজন স্বচ্ছ ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আই কনট্যাক্ট বজায় রাখে।

৩. পোশাকের ধরণ: মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা

পোশাক মানুষের রুচি ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়। যারা সবসময় অতিরিক্ত উজ্জ্বল বা খুব বেশি ‘ফ্ল্যাশি’ পোশাক পরে সবার নজর কাড়তে চায়, তারা অনেক সময় ‘Attention Seeker’ হতে পারে।

অভ্যন্তরীণ দিক:

তাদের ভেতরে একধরণের একাকীত্ব বা স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে, যা তারা বাহ্যিক জৌলুস দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করে। সামান্য প্রশংসাই তাদের খুব দ্রুত ইমপ্রেস করতে পারে।

৪. ধীরস্থির বাচনভঙ্গি: উচ্চ বুদ্ধিমত্তার পরিচয়

যারা শান্তভাবে, ভেবে এবং প্রতিটি শব্দ মেপে কথা বলে তারা সাধারণত বেশি চিন্তাশীল হয়। তারা হুটহাট সিদ্ধান্ত নেয় না এবং বলার আগে ভাবতে পছন্দ করে।

প্রভাব:

ধীরে ও স্পষ্টভাবে কথা বলা মানুষকে বেশি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে এবং সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।

৫. অতিরিক্ত হাসি-ঠাট্টা: ভেতরের কষ্টের আড়াল

আপনার আশেপাশে কি এমন কেউ আছে, যে সবসময় সবাইকে হাসিয়ে রাখে? সবকিছু নিয়ে মজা করে?

মনস্তত্ত্ব বলে, অনেক সময় অতিরিক্ত কৌতুক করা একটি ‘ডিফেন্স মেকানিজম’ হতে পারে। ভেতরের কষ্ট, একাকীত্ব বা ভাঙা অনুভূতিকে ঢাকতেই সে হাসির মুখোশ পরে থাকে।

পর্যবেক্ষণই আসল শক্তি

কাউকে বিচার করার আগে এই ছোট ছোট বিষয়গুলো খেয়াল করুন। মনে রাখবেন সাইকোলজি মানুষকে বিচার করার জন্য নয়, বরং সহমর্মিতার সাথে বোঝার জন্য।

পরের বার যখন কারো সাথে কথা বলবেন, এই ৫টি পয়েন্ট মিলিয়ে দেখুন। আপনি কি আপনার পরিচিত কারো মধ্যে এসব লক্ষণ খুঁজে পাচ্ছেন?


১১


ইকিগাই ফর্মুলা এবং আমাদের জীবনদর্শনঃ সার্থক ও দীর্ঘায়ু জীবনের জাপানি রহস্য

মানুষ পৃথিবীতে কেন আসে?

আমাদের প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার উদ্দেশ্য কী? কেন কেউ হাজারো প্রতিকূলতার মাঝেও হাসিমুখে কাজ করে যায়, আর কেউ সব পেয়েও অবসাদে ভোগে? এই চিরন্তন প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকিয়ে আছে জাপানি এক প্রাচীন জীবনদর্শনে, যার নাম— 'ইকিগাই' (Ikigai)।

জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপের মানুষেরা বিশ্বের দীর্ঘতম এবং সুখী জীবন অতিবাহিত করেন। তাঁদের এই দীর্ঘায়ুর রহস্য কেবল স্বাস্থ্যকর খাবার নয়, বরং তাঁদের জীবনদর্শন।

'ইকি' শব্দের অর্থ 'জীবন' এবং 'গাই' শব্দের অর্থ 'মূল্য' বা 'সার্থকতা'। সহজ ভাষায়, ইকিগাই হলো সেই কারণ, যার জন্য আমরা বেঁচে থাকতে চাই।

ইকিগাই ফর্মুলা: চারটি বৃত্তের মেলবন্ধন

ইকিগাই কেবল একটি দার্শনিক তত্ত্ব নয়, এটি একটি গাণিতিক বা যৌক্তিক ফর্মুলা যা চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। এই চারটি ক্ষেত্রের সঠিক সমন্বয়ই হলো একজন মানুষের জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য।

১. আপনি যা ভালোবাসেন (What you love):

এটি আপনার প্যাশন বা ভালো লাগার জায়গা। কোন কাজটি করতে বসলে আপনি সময়ের হিসাব ভুলে যান? কোন কাজটির প্রতি আপনার সহজাত টান রয়েছে? এটি গান গাওয়া হতে পারে, ছবি আঁকা হতে পারে কিংবা অন্যকে সাহায্য করা হতে পারে।

২. আপনি যে কাজে দক্ষ (What you are good at):

প্রত্যেক মানুষেরই কিছু বিশেষ প্রতিভা থাকে। হতে পারে আপনি খুব ভালো রান্না করতে পারেন, চমৎকার কোডিং করতে পারেন অথবা মানুষের সমস্যা সমাধানে পটু। আপনি যে কাজে আপনার দক্ষতা অর্জন করেছেন বা করতে চান, এটি সেই বৃত্ত।

৩. পৃথিবীর যা প্রয়োজন (What the world needs):

আমরা সমাজের অংশ। তাই আমাদের কর্মের মাধ্যমে সমাজ বা পৃথিবীর কোনো না কোনো অভাব পূরণ হতে হয়। আপনি যদি এমন কিছু করেন যা মানুষের জীবনকে সহজ করে বা সুন্দর করে, তবেই আপনার কাজের একটি বৃহত্তর সার্থকতা তৈরি হয়।

৪. যে কাজের জন্য আপনি পারিশ্রমিক পাবেন (What you can be paid for):

জীবনধারণের জন্য অর্থের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আপনার কাজ যদি আপনার জীবিকার সংস্থান না করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সেই কাজ চালিয়ে নেওয়া কঠিন।

ইকিগাই-এর ভারসাম্য ও জীবনের অসংগতি

এই চারটি বৃত্ত যখন একে অপরের ওপর উপরিপাতিত (Overlap) হয়, তখন কিছু নতুন উপাদানের জন্ম দেয়। আর ইকিগাই থাকে ঠিক এই সবকিছুর কেন্দ্রে।

যদি আপনার কাজে ভালোবাসা এবং দক্ষতা থাকে, তবে তা হলো আপনার প্যাশন (Passion)। কিন্তু এখান থেকে যদি অর্থ না আসে, তবে আপনি আনন্দ পাবেন কিন্তু দরিদ্র থেকে যাবেন।

যদি দক্ষতা এবং পারিশ্রমিক থাকে, তবে তা আপনার পেশা (Profession)। কিন্তু এখানে যদি ভালোবাসা না থাকে, তবে আপনার জীবন একঘেয়ে ও যান্ত্রিক মনে হবে।

যদি পারিশ্রমিক এবং পৃথিবীর প্রয়োজন মিলে যায়, তবে তাকে বলে ভকেশন (Vocation)। কিন্তু এতে যদি আপনার দক্ষতা না থাকে, তবে আপনি সবসময় অস্থিরতায় ভুগবেন।

যদি ভালোবাসা এবং পৃথিবীর প্রয়োজন মিলে যায়, তবে তা হলো আপনার মিশন (Mission)। কিন্তু এতে অর্থ না থাকলে জীবন চালানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে।

ইকিগাই হলো সেই ভারসাম্যপূর্ণ বিন্দু, যেখানে আপনার ভালোবাসা, দক্ষতা, চাহিদা এবং উপার্জনকে এক সুতোয় গাঁথা যায়।

আমাদের জীবনদর্শনে ইকিগাই-এর গুরুত্ব

বর্তমানে আমরা এক চরম অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ইঁদুর দৌড়ের এই যুগে আমরা হয় অর্থের পেছনে ছুটছি, নয়তো কেবল বিনোদনের খোঁজে সময় নষ্ট করছি। আমাদের বর্তমান জীবনদর্শনে ইকিগাই কেন জরুরি, তার কিছু কারণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মানসিক প্রশান্তি ও ফ্লো (Flow)

ইকিগাই আমাদের শেখায় 'ফ্লো' বা নিমগ্নতার গুরুত্ব। যখন আমরা এমন কাজ করি যা আমাদের ইকিগাই-এর সাথে মিলে যায়, তখন আমরা বর্তমান মুহূর্তে বাস করতে শিখি। এতে দুশ্চিন্তা কমে এবং কাজের মান বৃদ্ধি পায়। মিখাইল সিকজেন্টমিহালির মতে, 'ফ্লো' বা গভীর নিমগ্নতা হলো সুখের অন্যতম চাবিকাঠি।

২. বার্ধক্য ও অবসরের ধারণার পরিবর্তন

জাপানি সংস্কৃতিতে 'রিটায়ারমেন্ট' বা অবসর বলতে কিছু নেই। তারা মনে করেন, শরীর ও মন সুস্থ থাকা পর্যন্ত মানুষের তার ইকিগাই অনুযায়ী কাজ করে যাওয়া উচিত। আমাদের সমাজে অবসর নেওয়ার পর মানুষ দ্রুত অসুস্থ ও বিষণ্ণ হয়ে পড়ে কারণ তারা জীবনের উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে। ইকিগাই আমাদের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবন যাপনের প্রেরণা দেয়।

৩. কমিউনিটি বা মোয়াই (Moai)

ওকিনাওয়ার মানুষরা কেবল নিজেদের নিয়ে ভাবেন না। তারা 'মোয়াই' নামক সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে একে অপরের পাশে দাঁড়ান। ইকিগাই দর্শনে সামাজিক বন্ধন খুব গুরুত্বপূর্ণ। একা ভালো থাকা যায় না, বরং সমষ্টিগত উন্নয়নই জীবনের প্রকৃত আনন্দ।

৪. ছোট পদক্ষেপে বড় পরিবর্তন

জাপানিরা 'কাইজেন' (Kaizen) নীতিতে বিশ্বাসী, যার অর্থ হলো নিরন্তর ছোট ছোট উন্নতি। আপনার ইকিগাই খুঁজে পাওয়া মানে এই নয় যে আপনাকে রাতারাতি জীবন বদলে ফেলতে হবে। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

কীভাবে নিজের ইকিগাই খুঁজে পাবেন?

ইকিগাই খুঁজে পাওয়া কোনো একদিনের কাজ নয়, এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা। এর জন্য প্রয়োজন গভীর আত্মদর্শন। নিজেকে প্রশ্ন করুন:

কোন কাজগুলো আমাকে আনন্দ দেয়?

আমি কোন কাজগুলোতে অন্যদের চেয়ে ভালো?

আমার চারপাশের মানুষ বা পৃথিবী আমার কাছে কী আশা করে?

বর্তমানে আমি যা করছি, তা কি আমার মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম?

এই চারটি প্রশ্নের উত্তরের সাধারণ যোগসূত্রটিই আপনার ইকিগাই। এটি হতে পারে একজন শিক্ষক হওয়া, একজন পরিবেশবাদী হওয়া, একজন উদ্যোক্তা হওয়া বা একজন যত্নশীল অভিভাবক হওয়া। ছোট ছোট বিষয়ের মধ্যেও ইকিগাই থাকতে পারে—যেমন প্রতিদিন ভোরে বাগানের পরিচর্যা করা বা শিশুদের গল্প শোনানো।

ইকিগাই এবং ‘ওয়াবি-সাবি’ (Wabi-sabi)

ইকিগাই-এর সাথে জাপানি আরেকটি দর্শন 'ওয়াবি-সাবি' নিবিড়ভাবে জড়িত। ওয়াবি-সাবি আমাদের শেখায় অসম্পূর্ণতার মাঝে সৌন্দর্য খুঁজতে। আমাদের জীবন নিখুঁত হবে না, আমাদের ইকিগাই খুঁজে পাওয়ার পথে বাধা আসবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ত্রুটিপূর্ণ জীবনকে গ্রহণ করে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সার্থকতা।

ইকিগাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন কেবল খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার নাম নয়। জীবন হলো অর্থবহ হওয়ার নাম। আমরা যদি কেবল অর্থের পেছনে ছুটি, তবে আমাদের আত্মা ক্ষুধার্ত থেকে যাবে। আবার যদি কেবল ভাববিলাসী হয়ে ঘুরি, তবে বাস্তব পৃথিবী আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

ইকিগাই ফর্মুলা আমাদের একটি সুষম জীবনের পথ দেখায়। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে পেশাকে নেশায় এবং নেশাকে জনকল্যাণে রূপান্তর করা যায়। জীবনের অপরাহ্ণে এসে যেন আমাদের আক্ষেপ করতে না হয় যে আমরা ভুল পথে চলেছি, তার জন্য আজই নিজের ইকিগাই অনুসন্ধান করা জরুরি।

সবশেষে বলা যায়, আপনার ইকিগাই আপনার ভেতরেই আছে। দরকার শুধু একটু ধৈর্য এবং নিজের মনের গভীরে তাকানোর সাহস। যখন আপনি আপনার ইকিগাই খুঁজে পাবেন, তখন প্রতিটি সকাল হবে আপনার কাছে এক নতুন সম্ভাবনার নাম, আর জীবন হবে এক অনন্ত উৎসব। ওকিনাওয়ার সেই বৃদ্ধ মানুষটির মতো আপনিও তখন হাসিমুখে বলতে পারবেন— "আমি জানি, আমি কেন আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেছি।" @ মিজানুর রহমান লাবু

১২


  আপনার ভিতরের মানুষটাকে গড়্ব তুলতে  ‘Managing Oneself’ 

একটা আয়নার সামনে দাঁড়ালে আমরা নিজের মুখ দেখি, কিন্তু ভিতরের মানুষটা? তাকেও দেখা দরকার। Peter F. Drucker-এর ‘Managing Oneself’ বইটা আমাদের শেখায় কীভাবে —নিজের শক্তি, দুর্বলতা, স্বপ্ন, সম্পর্ক, আর সময়কে  

১. নিজের শক্তি চেনো

সামিয়ার গল্প দিয়ে শুরু করি। স্কুলে সে ছিল বেশ চুপচাপ। ক্লাসে কখনো প্রথম হতে পারত না, কিন্তু যখন দেয়াল পত্রিকার কাজ হতো, তখন তার আঁকা পোস্টার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিত। একবার একজন শিক্ষক বলেছিলেন, “তুমি হয়তো ম্যাথে সেরা না, কিন্তু তোমার তুলিতে ভবিষ্যত আছে।” তখনও সামিয়া বুঝতে পারেনি, ওর শক্তিটা কোথায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সে একবার একটা পোস্টার ডিজাইন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। প্রথম পুরস্কার! সেই দিনটা তার জীবনের বাঁকবদল। আজ সে একজন গ্রাফিক ডিজাইনার, আন্তর্জাতিক কোম্পানিতে কাজ করে।

Drucker বলছেন, নিজের শক্তিকে চেনা মানেই নিজেকে প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ। কোনো কাজ যখন করতে গিয়ে সময় উড়ে যায়, মনে হয় ‘এটাই আমার জায়গা’—সেখানেই তুমি আলাদা। নিজেকে জানতে শেখো, কারণ শক্তির ভিতরেই ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে।

২. নিজের মূল্যবোধ বোঝো

তানভীর বরাবরই ভালো ছাত্র। বড় হওয়ার স্বপ্নে যখন চাকরির অফার এল এক বহুজাতিক কোম্পানি থেকে, সে লাফিয়ে নিলো। কিন্তু ছয় মাসের মাথায় সে বুঝলো, অফিসের পরিবেশ তার মানসিকতার সঙ্গে যায় না। চটজলদি মিথ্যা, ফাঁকা প্রতিশ্রুতি—এসবের মধ্যে তানভীর হাঁসফাঁস করছিল।

একদিন সে বাবার কথা মনে করল, “তুই যদি রাত জেগে আয় করিস, কিন্তু শান্তিতে ঘুমোতে না পারিস, তবে সেই আয়ের মানে নেই।” তানভীর চাকরি ছেড়ে দেয়, এবং যোগ দেয় এক এনজিও-তে। আজ সে কম আয় করলেও শান্তিতে থাকে।

মূল্যবোধ মানে নিজের ভিতরের কম্পাস। পয়সা, খ্যাতি সব এলেও যদি সেটা তোমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায়, তবে নিজেকে হারিয়ে ফেলো। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করো, “এই কাজটা আমার আত্মাকে শান্তি দেবে তো?”

৩. শেখার নিজস্ব ধরন চেনা

আয়ান ক্লাসে ভালো ছাত্র ছিল না। বই খুললেই চোখে ঘুম আসত। শিক্ষকরা ভাবতেন সে অলস। কিন্তু একদিন তার হাতে একটা যান্ত্রিক খেলনা পড়ে। সে সেটা খুলে আবার জোড়া লাগাল—কেউ শিখায়নি, নিজে নিজেই করল।

আজ আয়ান একজন স্বনামধন্য ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ার। সে শিখেছিল হাত দিয়ে, অভিজ্ঞতায়।

তুমি কীভাবে শিখো—শুনে, পড়ে, না কি করে? এটা জানলে শেখা হবে সহজ আর ফলপ্রসূ। নিজের ভিতরের শিক্ষার্থীটাকে জানো, বুঝো, আর সেইভাবে পথ সাজাও।

৪. নিজের উন্নয়নের দায়িত্ব নিজেই নাও

রিফাত ঢাকা শহরের এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছে। সে ছোটবেলা থেকেই বই পড়তে ভালোবাসত। কিন্তু পরিবারে বই কেনার সামর্থ্য ছিল না।

তবু সে থামেনি। লাইব্রেরি ঘেঁটে, পুরনো বই জোগাড় করে সে জ্ঞানের খিদে মেটাত। একসময় সে নিজের ইউটিউব চ্যানেল খুলে বই রিভিউ করা শুরু করে। আজ তার লক্ষাধিক সাবস্ক্রাইবার।

জীবনে উন্নতির জন্য কেউ আসবে না, দরজা খুলে বলবে না—“এই নাও সুযোগ।” নিজের জন্য নিজেই সেই দরজাটা বানাতে হয়।

৫. স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করো

জারা স্বপ্ন দেখত অভিনেত্রী হওয়ার। কিন্তু স্বপ্নটাই তো যথেষ্ট নয়। সে নিজের জন্য এক বছরের লক্ষ্য তৈরি করল—অভিনয় কোর্স শেষ করা, শহরের নাট্যদলে যুক্ত হওয়া, বছরে অন্তত একটি নাটকে অভিনয় করা।

ধাপে ধাপে এগিয়ে সে নিজের স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেলল। আজ সে দেশের খ্যাতনামা এক থিয়েটার দলের সদস্য।

Drucker বলেছিলেন, লক্ষ্য ছাড়া জীবন নৌকা ছাড়া মাঝির মতো। গন্তব্য ঠিক না থাকলে যেকোনো ঢেউ তোমাকে ভুল দিকে নিয়ে যাবে। সুতরাং, স্বপ্ন থাকুক, তবে তাতে সময় আর রূপ দাও—তবেই সে বাস্তব হবে।

৬. প্রতিফলনে অভ্যস্ত হও

তামান্না প্রতিদিন রাতে একটা ডায়েরি লিখে। দিনশেষে সে ভাবে—আজ কী শিখলাম? কোথায় ভুল করলাম? কাকে কষ্ট দিলাম?

এই অভ্যাস তাকে বদলে দিয়েছে। আগে সে দ্রুত রেগে যেত, এখন ধৈর্য ধরে শোনে। আগে সে নিজের কাজ নিয়ে হতাশ হতো, এখন সে বোঝে—ভুল মানেই শিখার সুযোগ।

প্রতিফলন মানে নিজের সঙ্গে কথোপকথন। এটা নিয়মিত করতে পারলে তুমি নিজেকে চিনতে শিখবে গভীরভাবে।

৭. গঠনমূলক মতামত গ্রহণ করো

রোহানের প্রথম কবিতা পড়ে বন্ধুরা মুখ টিপে হাসে। সে ভীষণ কষ্ট পায়। কিন্তু একজন শিক্ষক বলেছিলেন, “হাসির পেছনেও শিক্ষা আছে। কিন্তু শোনার জন্য চাই খোলা মন।”

রোহান সেই পরামর্শ কানে নেয়। বন্ধুদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নেয়, নিজের লেখা শান দেয়। বছরখানেক পরে তার কবিতা একটি সাহিত্য ম্যাগাজিনে ছাপা হয়।

সমালোচনা মানে সবসময় অপমান নয়। কারো চোখে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখা মানে নিজের সীমা বোঝা।

৮. পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াও

নাহিদা একজন শিক্ষিকা। করোনা মহামারির সময় স্কুল বন্ধ হয়ে গেলে সে অনলাইন শেখার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। প্রথমে ভয় লাগত—“আমি কি পারব?” কিন্তু ধীরে ধীরে সে শিখল ভিডিও বানানো, গুগল ক্লাসরুম চালানো।

আজ সে তার স্কুলে ডিজিটাল শিক্ষার পথিকৃত।

পরিবর্তনকে ভয় নয়, বরং সম্ভাবনা ভাবলে, পথ খুলে যায়। বদলের ঢেউ ঠেকাও না—বরং নিজেকে প্রস্তুত করো সে ঢেউয়ে ভেসে উঠতে।

৯. সম্পর্ক গড়ো, খাঁটি বন্ধন তৈরি করো

নাভিলা নিজের পড়াশোনায় এত মগ্ন ছিল যে বন্ধুত্বে বিশ্বাস করত না। কিন্তু হঠাৎ তার মা অসুস্থ হয়ে পড়ে, আর তখন তার পাশে এসে দাঁড়ায় সহপাঠী ফারহানা। খাবার আনা, ক্লাস নোট দিয়ে সাহায্য—সব করেছে নির্দ্বিধায়।

নাভিলা বুঝেছিল, জীবনে কেবল নিজের শক্তি নয়, চারপাশের মানুষের ভালোবাসাও দরকার। আজ সে নিজেও অন্যদের পাশে দাঁড়ায়—কারণ সে জানে সম্পর্ক মানে নির্ভরতার বন্ধন।

১০. সময়ের মর্যাদা দাও

ইশতিয়াক দিনের পর দিন “কাল থেকে পড়ব” বলেই সময় নষ্ট করত। পরীক্ষার আগে যখন ভীষণ চাপ পড়ে, তখন সে বুঝেছিল সময় আসলে হাতের মুঠোয় ধরা দেয় না। পরের সেমিস্টার থেকে সে নিজের রুটিন তৈরি করল—ঘুম, খাওয়া, পড়া, বিশ্রাম সব ঠিকঠাক ভাগ করে। ফলাফল? সে শুধু পাশ নয়, ভালো ফল করেছে। সময় হলো জীবনের মুদ্রা। যেভাবে খরচ করো, সেভাবেই ফল পাবে। অযথা অপচয় নয়—সময়কে আপন করে তোলো।

‘Managing Oneself’ বইটা আমাদের হাতে একটি দর্পণ তুলে দেয়। এই আয়নাতে চোখ মেললেই আমরা দেখতে পাই, আমরা কে, কী হতে পারি, আর কীভাবে সেই পথে হাঁটব। এই শিক্ষা শুধু ক্যারিয়ারের জন্য নয়, জীবনের জন্য।

জীবনের প্রতিটি অধ্যায়, প্রতিটি প্রশ্ন, প্রতিটি বাঁক—সব কিছুতে যদি আমরা নিজের দিকে তাকিয়ে নিতে পারি, তবে হয়তো পথ হারালেও কখনো নিজেকে হারাবো না।

তাই বলি, নিজের যাত্রার হাল ধরো নিজেই। নিজের ভিতরের শিল্পীকে ডাকো, নিজের আয়নাকে পরিষ্কার করো—আর প্রতিদিন একটু একটু করে হয়ে উঠো তুমি নিজেই তোমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।


১৩

সিলিকন ভ্যালির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় Fraud।

মাত্র ১৯ বছর বয়সে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি ছেড়ে তিনি Theranos প্রতিষ্ঠা করেন। তার ভিশন ছিল তিনি Blood Testing এর জগতকে বদলে দেবেন। সাধারণত রক্ত পরীক্ষার জন্য সিরিঞ্জ দিয়ে কয়েক ভায়াল রক্ত নিতে হয় যা অনেকের কাছেই ভয়ের কারণ।

এলিজাবেথ দাবি করলেন যে তার তৈরি করা টেকনোলজি "Edison Machine" দিয়ে আঙুলের ডগা থেকে নেওয়া মাত্র এক ফোঁটা রক্ত দিয়েই ২০০টিরও বেশি রোগের পরীক্ষা করা সম্ভব।

ক্যান্সার থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস, সবকিছু নাকি চোখের পলকে ধরা পড়বে। তার এই জাদুকরী আইডিয়া শুনে পুরো বিশ্ব মুগ্ধ হয়ে গেল।

তিনি নিজেকে নারী স্টিভ জবস হিসেবে উপস্থাপন করতেন। সবসময় কালো টার্টল-নেক সোয়েটার পরতেন চোখের পাতা ফেলতেন না এবং কৃত্রিমভাবে নিজের গলার স্বর ভারী করে কথা বলতেন।

তার এই সম্মোহনী শক্তিতে বাঘা বাঘা সব মানুষ কুপোকাত হয়ে গেলেন। ওরাকলের ল্যারি এলিসন এবং মিডিয়া টাইকুন রুপার্ট মারডকের মতো Investor রা তার কোম্পানিতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঢাললেন।

এমনকি হেনরি কিসিঞ্জারের মতো ঝানু কূটনীতিকরাও তার বোর্ডের সদস্য হলেন। সবার চোখে তিনি ছিলেন এক Genius।

২০১৪ সালে Theranos এর Valuation পৌঁছাল $9 Billion Dollar এ। এলিজাবেথ হোমস হয়ে উঠলেন বিশ্বের কনিষ্ঠতম বিলিয়নিয়ার।

কিন্তু পর্দার আড়ালে ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের সেই বিখ্যাত "Edison" মেশিনটি আসলে কাজই করত না।

মেশিনটি ভুলভাল রেজাল্ট দিত যা রোগীদের জীবনের জন্য ছিল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। কাউকে হয়তো ভুল করে বলা হতো তার ক্যান্সার হয়েছে আবার কাউকে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থাকলেও নরমাল রিপোর্ট দেওয়া হতো।

Theranos গোপনে সিমেন্সের কমার্শিয়াল মেশিন কিনে এনে তাতে পরীক্ষা চালাত এবং কাস্টমারদের মিথ্যা বলত যে এটি তাদের নিজস্ব টেকনোলজি।

কোম্পানির ভেতরে কেউ প্রশ্ন তুললেই তাকে চাকরিচ্যুত করা হতো এবং আইনি হুমকি দেওয়া হতো। একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে রাখা হয়েছিল।

অবশেষে জন ক্যারিরু নামের এক সাহসী সাংবাদিক এবং কোম্পানির কিছু Whistleblower এর মাধ্যমে এই বিশাল জালিয়াতি ফাঁস হয়ে যায়।

তদন্তে বেরিয়ে আসে যে এলিজাবেথ হোমস জেনেশুনে ইনভেস্টর ডাক্তার এবং রোগীদের সাথে প্রতারণা করেছেন।

যেই কোম্পানিটির মূল্য ছিল ৯ বিলিয়ন ডলার রাতারাতি তা শূন্যে নেমে এল। এলিজাবেথ হোমস দেউলিয়া হলেন এবং তার বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল মামলা হলো।

২০২২ সালে বিচারে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

Elizabeth Holmes এর গল্প আমাদের শেখায় যে মিথ্যা দিয়ে আপনি শেষ পর্যন্ত সত্যকে প্রতিষ্ঠিতা করতে পারবেন না।

১৪

উদ্ভিদ নয়, প্রাণী ও নয় স্বতন্ত্র একটি জীব

প্রোটোট্যাক্সাইটিস ১৯ শতকে আবিষ্কৃত হয়। এর আকৃতি ছিল দীর্ঘ স্তম্ভের মতো, ফলে প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানীরা একে বিশাল কোনো প্রাচীন গাছের কাণ্ড বলে মনে করেছিলেন। তবে মাইক্রোস্কোপ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এর কোষগঠন ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো উদ্ভিদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এতে ভাসকুলার টিস্যু অনুপস্থিত। ফলে উদ্ভিদ হিসেবে এর পরিচয় বাতিল করা হয়।

পরবর্তীতে গবেষকেরা এর ভেতরে ছত্রাকের হাইফার মতো সুতা সদৃশ গঠন লক্ষ্য করেন। কার্বন আইসোটোপ বিশ্লেষণ থেকেও ধারণা পাওয়া যায় যে এটি স্বপোষী ছিল না, অর্থাৎ নিজে খাদ্য প্রস্তুত করত না। এ সব প্রমাণের ভিত্তিতে বহু বছর ধরে, একে পৃথিবীর ইতিহাসের বৃহত্তম ছত্রাক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, এবং এখনো অনেক বিজ্ঞানী এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করেন।

তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় এর রাসায়নিক গঠন ও কোষের বিন্যাস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর কিছু বৈশিষ্ট্য আধুনিক ছত্রাকের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। একই সঙ্গে এটি কোনো পরিচিত উদ্ভিদ বা প্রাণী গোষ্ঠীর সঙ্গেও সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই কিছু গবেষক মনে করেন, এটি সম্ভবত সম্পূর্ণ বিলুপ্ত একটি স্বতন্ত্র জীবগোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিল।  

, প্রায় ৩৯ থেকে ৪২ কোটি বছর আগে ডেভোনিয়ান যুগে এ জীবটির অস্তিত্ব ছিল। সে সময় স্থলভাগে বৃহৎ উদ্ভিদ খুব সীমিত ছিল। ফলে প্রোটোট্যাক্সাইটিস সম্ভবত তখনকার স্থলজ পরিবেশের অন্যতম উচ্চতম জীব ছিল। এটি কীভাবে পুষ্টি সংগ্রহ করত তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, তবে অধিকাংশ গবেষকের মতে এটি মৃত জৈব পদার্থ ভেঙে পুষ্টি গ্রহণ করত। @ তাইয়েবুন নেছা..


১৫

 রাগ কি শরীরের ক্ষতি করে?


সোজাসুজি উত্তর হল হ্যাঁ, রাগ করা, দীর্ঘ সময় ধরে রেগে থাকা, ঝগড়া করা….শরীরের ক্ষতি করে। আর এই ক্ষতির কারণ হল - অনিয়ন্ত্রিত রাগের সময় কর্টিসল হরমোন ক্ষরিত হয়, কর্টিসল (Cortisol) শরীরের বিপাক নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, রক্তচাপ ও শর্করার মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে, মানসিক বা শারীরিক চাপের সময় এই হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা  রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে অকার্যকর করে দেয়। মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি হ্রাস করে, হজমের সমস্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ব্যথার সৃষ্টি করতে পারে। ফলে, রাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তা কেবল মানসিক অশান্তি নয়, বরং অকাল মৃত্যু ও বহুমুখী দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


 রাগ কেবল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং আরও সরল জীবদের মধ্যেও লক্ষ করা যায়। রাগ-এর বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়:


১. আদিম ভিত্তি (প্রাক-প্রাইমেট পর্যায়):

আদিম স্তন্যপায়ী প্রাণীদের টিকে থাকার তাগিদের মধ্যে, তারা মূলত আত্মরক্ষা এবং খাদ্য সংগ্রহের জন্য আগ্রাসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, শুরুর দিকের মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে রাগ মূলত "থ্রেট ডিসপ্লে" বা ভীতিকর প্রদর্শনী হিসেবে কাজ করত, এটি সরাসরি শারীরিক যুদ্ধে না জড়িয়ে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখিয়ে খাদ্য বা সঙ্গী দখল করতে সাহায্য করত, যা প্রাণীর শারীরিক শক্তি সাশ্রয় করত।


২. প্রাইমেট ও সামাজিক বিবর্তন:

• আদিম প্রাইমেট পূর্বপুরুষরা যখন গাছে বসবাস এবং সামাজিক গোষ্ঠী তৈরি করতে শুরু করে, তখন সংঘাত নিরসনের জন্য রাগ একটি প্রয়োজনীয় কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।

• রাগে চিৎকার করার মতো আচরণগুলো সরাসরি আঘাত না করেই প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর একটি কৌশল ।

• কোনো দলে নিজের মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাগ সাহায্য করে । উচ্চ মর্যাদার প্রাণীরা এর ফলে উন্নত মানের খাবার এবং প্রজনন সঙ্গী পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় ।


১৬


আইসবার্গ তত্ত্ব কী?

আইসবার্গ তত্ত্ব হল-উপরিভাগে যা থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি লুকিয়ে থাকে তার নিচে। মনস্তত্ত্বের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানুষের মনকে আইসবার্গের সাথে তুলনা করেছেন।

একটি আইসবার্গের মাত্র ১০ শতাংশ পানির উপরে থাকে, আর বাকি ৯০ শতাংশ থাকে পানির নিচে অদৃশ্য অবস্থায়। ফ্রয়েডের মতে, আমাদের মনের সচেতন অংশ (Conscious Mind) হলো সেই ১০ শতাংশ। আর অবচেতন (Subconscious) এবং অচেতন (Unconscious) মন হলো নিচের সেই বিশাল ৯০ শতাংশ।

আমাদের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, স্মৃতি এবং আদিম প্রবৃত্তিগুলো এই অদৃশ্য গভীরতাতেই লুকিয়ে থাকে।

আইসবার্গ তত্ত্ব অনুযায়ী মনকে তিনটি প্রধান স্তরে ভাগ করা যায়:

১. চেতন মন (Conscious Mind): এটি মনের সেই অংশ যা নিয়ে আমরা বর্তমানে ভাবছি। যুক্তি, তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত এবং বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ এই স্তরে ঘটে।

২. প্রাক-চেতন মন (Pre-conscious): এটি সচেতন মনের ঠিক নিচেই থাকে। এখানকার তথ্যগুলো বর্তমানে আমাদের মাথায় নেই, কিন্তু একটু চেষ্টা করলেই মনে করা যায় (যেমন: পুরনো কোনো বন্ধুর নাম বা গতকালের দুপুরের খাবার)।

৩. অচেতন মন (Unconscious Mind): এটিই আইসবার্গের সেই বিশাল নিমজ্জিত অংশ। এখানে লুকিয়ে থাকে আমাদের শৈশবের ট্রমা, অবদমিত ইচ্ছা, ঘৃণা, ভয় এবং সহজাত প্রবৃত্তি। আমরা যা করি বা বলি, তার অধিকাংশের চালিকাশক্তি আসে এখান থেকেই, যা আমরা নিজেরাও অনেক সময় বুঝতে পারি না।

মনের নিয়ন্ত্রণ কেন প্রয়োজন?

আমাদের জীবনের অধিকাংশ দুঃখ, ক্ষোভ বা অস্থিরতার উৎস হলো এই অবচেতন মন। যখন এ মনে কোনো নেতিবাচক আবেগ জমা হয়, তখন তা আমাদের সচেতন আচরণকে প্রভাবিত করে।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো কারণে আপনি হয়তো অকারণে রেগে যাচ্ছেন। আপনি সচেতনভাবে রাগ কমাতে চাইলেও পারছেন না, কারণ রাগের প্রকৃত কারণটি লুকিয়ে আছে আপনার মনের সেই ৯০ শতাংশের গভীরে।

মনকে নিয়ন্ত্রণ করার অর্থ হলো—সেই গভীরতার সাথে সচেতন মনের একটি সংযোগ স্থাপন করা।

মনের নিয়ন্ত্রণের কৌশল

আইসবার্গ তত্ত্বের আলোকে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার কিছু কার্যকরী উপায় নিচে আলোচনা করা হলো:

১. আত্ম-সচেতনতা (Self-Awareness)

যখনই কোনো তীব্র প্রতিক্রিয়া অনুভব করবেন, নিজেকে প্রশ্ন করুন— "আমি কেন এমন অনুভব করছি?" নিজের ছায়া বা অন্ধকার দিকগুলোকে (Shadow Self) স্বীকার করাই হলো নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ।

২. মেডিটেশন বা ধ্যান

মেডিটেশন বা নিয়মিত ধ্যান করলে সচেতন মন শক্তিশালী হয় এবং অবচেতনের অস্থিরতাগুলো শান্ত হতে শুরু করে। এটি আপনাকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে ভেবেচিন্তে সাড়া দিতে সাহায্য করে।

৩. অবদমন নয়, অনুধাবন

আমরা প্রায়ই আমাদের কষ্ট বা রাগগুলোকে জোর করে মনের গহীনে চেপে রাখি। আইসবার্গ তত্ত্বে একে বলা হয় 'রিপ্রেশন'। কিন্তু এই চেপে রাখা আবেগগুলো নিচে জমা হয়ে বরফের আকার বড় করে এবং একদিন তা বিস্ফোরণ ঘটায়। মন নিয়ন্ত্রণের উপায় হলো নেতিবাচক আবেগকে স্বীকার করা এবং তা গঠনমূলক উপায়ে প্রকাশ করা।

৪. অভ্যাস পরিবর্তন ও অবচেতনকে প্রোগ্রাম করা

আমাদের অভ্যাসগুলো অবচেতন মনে গেঁথে থাকে। মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পুরনো ক্ষতিকর অভ্যাস বদলে নতুন ইতিবাচক অভ্যাস গড়ে তুলতে হয়। প্রতিদিন ইতিবাচক কথা (Affirmations) বলা এবং ভিজ্যুয়ালাইজেশন করা অবচেতন মনকে নতুন করে সাজাতে সাহায্য করে।

আপনি যদি বিশ্বাস করেন আপনি শান্ত এবং আত্মবিশ্বাসী, তবে সময়ের সাথে সাথে আপনার মনের গভীর অংশটি সেই বিশ্বাসকেই সত্য বলে গ্রহণ করবে।

৫. জার্নাল লেখা

প্রতিদিন নিজের চিন্তাগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখা সচেতন ও অবচেতন মনের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। মনের ভেতর যে অগোছালো চিন্তাগুলো আইসবার্গের নিচে লুকিয়ে থাকে, লেখার মাধ্যমে তা উপরিভাগে উঠে আসে। এতে মনের ভার লাঘব হয় এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।

আইসবার্গ তত্ত্ব ও মানবিক সম্পর্ক

আইসবার্গ তত্ত্ব আমাদের অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। আমরা যখন কারও সাথে কথা বলি, আমরা কেবল তাদের আইসবার্গের উপরিভাগ (আচরণ) দেখি। কিন্তু সেই মানুষটির গভীরে কী ধরনের যুদ্ধ চলছে, কী পরিমাণ দুঃখ বা ভয় জমে আছে, তা আমরা জানি না। এই সত্যটি অনুধাবন করলে মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। অন্যের প্রতি সহনশীল হওয়া আসলে নিজের মনকে শান্ত রাখারই একটি অংশ।

আইসবার্গ তত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা যা দেখি বা অনুভব করি, তার চেয়েও অনেক বড় আমাদের সত্তা। মনের নিয়ন্ত্রণ মানে নিজের ভেতরের সেই অদৃশ্য ৯ শতাংশের সাথে সন্ধি করা।

১৭

মোতাহের হোসেন চৌধুরী

বিশিষ্ট বাঙালি প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদ মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬) তাঁর সুপ্রসিদ্ধ উক্তি "ধর্ম সাধারণ লোকের সংস্কৃতি, আর সংস্কৃতি শিক্ষিত মার্জিত লোকের ধর্ম" (মূলত: কালচার বা সংস্কৃতি) এর মাধ্যমে ধর্ম ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক এবং মানুষের আত্মিক বিকাশের এক গভীর ও মানবতাবাদী দর্শন তুলে ধরেছেন। এই উক্তিটি তাঁর ‘সংস্কৃতির কথা’ (১৯৫৮) প্রবন্ধগ্রন্থের মূল ভাবনা, যা 'প্রথম আলো' তে আলোচিত হয়েছে।

উক্তিটির বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ:

ধর্ম সাধারণ লোকের সংস্কৃতি: মোতাহের হোসেন চৌধুরীর মতে, সাধারণ মানুষ ধর্মের আনুষ্ঠানিকতা, আচার-অনুষ্ঠান, ভয় ও ভক্তির মাধ্যমে তাদের জীবনের সংস্কৃতি বা 'কালচার' খুঁজে পায়। তাদের কাছে ধর্মই জীবনযাত্রার প্রধান পথনির্দেশক।

সংস্কৃতি শিক্ষিত মার্জিত লোকের ধর্ম:

অন্যদিকে, শিক্ষিত ও মার্জিত মানুষের কাছে 'সংস্কৃতি' বা উন্নত জীবনবোধই হলো প্রকৃত ধর্ম। এখানে সংস্কৃতি বলতে সৌন্দর্য, আনন্দ, প্রেম, এবং মানুষের আত্মিক ও মননশীল বিকাশের সাধনাকে বোঝানো হয়েছে।

দৃষ্টিভঙ্গি:

তিনি ধর্মের চেয়ে ‘কালচার’ বা সংস্কৃতিকে বেশি বড় ও মহৎ মনে করতেন, কারণ তাঁর দৃষ্টিতে ধর্ম অনেক সময় ব্যক্তির পূর্ণ বিকাশে বাধা দেয়, যা সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে অর্জন সম্ভব।

উদ্দেশ্য:

মানুষের ভেতরের মহৎ গুণগুলোর বিকাশ এবং একটি সুন্দর, পরিশীলিত জীবনযাপনই ছিল তাঁর এই দর্শনের মূল লক্ষ্য।

মোতাহের হোসেন চৌধুরী বিশ্বাস করতেন, শুধু পুঁথিগত বিদ্যা বা আনুষ্ঠানিক ধার্মিকতা নয়, বরং রুচিবোধ ও সংস্কৃতির চর্চাই মানুষকে প্রকৃত ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলে।

জীবনী:

মোতাহের হোসেন চৌধুরী

(১৯০৩-১৯৫৬) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট বাঙালি প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি মূলত রেনেসাঁস, মানবতাবাদ এবং সংস্কৃতিমনস্কতা নিয়ে মননশীল প্রবন্ধ রচনার জন্য পরিচিত। তাঁর প্রধান সাহিত্যকর্ম 'সংস্কৃতি কথা' (১৯৫৮), 'সুখ' এবং 'সভ্যতা'। তিনি ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

মোতাহের হোসেন চৌধুরী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যাদি:

জন্ম ও শৈশব: তিনি ১৯০৩ সালের ১ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমানে বাংলাদেশ) নোয়াখালী জেলার কাঞ্চনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষাজীবন:

কুমিল্লা ইউসুফ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আইএ ও বিএ পাস করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে বাংলা সাহিত্যে এমএ পাস করেন।

কর্মজীবন:

কর্মজীবনের শুরুতে কুমিল্লা ইউসুফ হাইস্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে এবং ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর চট্টগ্রাম কলেজে যোগ দেন এবং আমৃত্যু সেখানে অধ্যাপনা করেন।

সাহিত্য ও চিন্তা:

তিনি "মুসলিম সাহিত্য সমাজ" এর সাথে যুক্ত ছিলেন এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চা ও মানবতাবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর গদ্যশৈলী প্রমথ চৌধুরীর দ্বারা প্রভাবিত ছিল, যা 'বুদ্ধির দীপ্তিতে পরিচ্ছন্ন এবং স্মিতরসে স্নিগ্ধ' হিসেবে পরিচিত।

প্রধান গ্রন্থসমূহ:

সংস্কৃতি কথা (প্রবন্ধগ্রন্থ, ১৯৫৮)।

সুখ (বার্ট্রান্ড রাসেলের 'Conquest of Happiness' এর অনুবাদ)।

সভ্যতা (ক্লাইভ বেলের 'Civilization' এর ভাবানুবাদ)।

মৃত্যু:

১৯৫৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর রচনাবলী আজও বাঙালি পাঠককে সত্য, সুন্দর ও মননশীল চিন্তার খোরাক জোগায়।

তথ্য সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী


১৮

হীনম্মন্যতায় ভোগেন ৫টি অভ্যাসে

আমরা অনেক সময় বুঝতেও পারি না যে আমাদের প্রতিদিনের কিছু সাধারণ কাজ আমাদের মানসিক শক্তিকে ভেতর থেকে খোকলা করে দিচ্ছে। আপনি যদি নিজেকে নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগেন, তবে মিলিয়ে দেখুন এই ৫টি অভ্যাস আপনার মাঝে আছে কি না:

১. অন্যের সাথে নিজের 'বিহাইন্ড দ্য সিন' তুলনা করা

আমরা ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে অন্যের সাজানো গোছানো জীবন দেখি আর নিজের অগোছালো জীবনের সাথে তুলনা করি। মনে রাখবেন, আপনি অন্যের 'এডিট করা হাইলাইট রিল' এর সাথে নিজের 'রিয়েল লাইফ' তুলনা করছেন। এই অসম প্রতিযোগিতা আপনার আত্মবিশ্বাসকে জিরোতে নামিয়ে আনে।

২. 'না' বলতে না পারা (People Pleasing)

সবাইকে খুশি করতে গিয়ে নিজের ইচ্ছা বা প্রয়োজনকে বিসর্জন দেওয়া একটি বড় মানসিক ফাঁদ। যখন আপনি কাউকে না বলতে পারেন না, তখন অবচেতন মনে আপনি নিজেকে এই বার্তা দেন যে—আপনার নিজের সময়ের বা সিদ্ধান্তের কোনো মূল্য নেই। এটি ধীরে ধীরে আপনার ব্যক্তিত্ত্বকে ম্লান করে দেয়।

৩. নেতিবাচক আত্ম-সমালোচনা (Negative Self-Talk)

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে কী বলেন? "আমাকে দিয়ে হবে না", "আমি দেখতে ভালো না" বা "আমি সব ভুল করি"—এই কথাগুলো আপনার মস্তিষ্কে গেঁথে যায়। আপনি নিজের সম্পর্কে যা বিশ্বাস করেন, পৃথিবী আপনাকে সেভাবেই দেখে। নিজেকে তুচ্ছ করা বন্ধ না করলে আত্মবিশ্বাস কক্ষনো ফিরবে না।

৪. ভুল করার ভয়ে কাজ শুরু না করা (Perfectionism)

সবকিছু একদম নিখুঁত হতে হবে—এই চিন্তা মানুষকে অলস এবং ভীরু করে তোলে। পারফেকশনিজম আসলে ব্যর্থতার ভয়ের একটি সুন্দর নাম। যারা ভুল করার সাহস রাখে না, তারা নতুন কিছু শেখেও না। আর প্রবৃদ্ধি (Growth) না থাকলে আত্মবিশ্বাস টিকে থাকে না।

৫. অতীত নিয়ে পড়ে থাকা

পুরানো ব্যর্থতা বা যন্ত্রণাকে আঁকড়ে ধরে রাখা মানে হলো নিজের পায়ে নিজে শিকল বাঁধা। অতীত থেকে শিক্ষা নিন, কিন্তু তাকে বর্তমানের ওপর ভর করতে দেবেন না। পেছনের দিকে তাকিয়ে হাঁটলে সামনে হোঁচট খাওয়াটাই স্বাভাবিক।

মনে রাখবেন: আত্মবিশ্বাস কোনো জাদুকরী বিষয় নয়; এটি একটি অভ্যাস। আজই এই পাঁচটি অভ্যাস ত্যাগ করার শপথ নিন। আপনি যতটা ভাবছেন, তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী আপনি! @Edu Ques


১৯

৭টি বিশেষ অভ্যাস,  


​১. দোষ অন্যের ওপর না চাপিয়ে নিজের দায়িত্ব স্বীকার করা:

​মানুষ যখন ভুল করে এবং কেউ তা দেখছে না, তখন সেটির দায় স্বীকার করা অনেক বড় গুণের পরিচয়। একজন নীতিবান ব্যক্তি অজুহাত না দেখিয়ে নিজের ভুল মেনে নেন এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করেন।

​২. পরিস্থিতি যেমনই হোক, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা:

​অজুহাত দেওয়া খুব সহজ—যেমন ট্রাফিক জ্যাম, ক্লান্তি বা ব্যস্ততা। কিন্তু সততা মানে হলো প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের কথা রাখা। ক্লান্ত বা অসুবিধে থাকলেও একজন সৎ ব্যক্তি তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন।

​৩. নীরবতা যখন নিরাপদ, তখন সত্য বলা:

​অন্যায় হতে দেখলে চুপ থাকা অনেক সময় নিরাপদ মনে হতে পারে। কিন্তু একজন সৎ ব্যক্তি নিজের ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন। যখন কথা বলাটা অস্বস্তিকর, তখনও তিনি সত্যের পক্ষে দাঁড়ান।

​৪. সাফল্যের কৃতিত্ব অন্যদের সাথে ভাগ করে নেওয়া:

​অনেকে অন্যের আইডিয়া বা কঠোর পরিশ্রমের ক্রেডিট নিজে নিতে চায়। কিন্তু একজন সত্যিকারের সৎ মানুষ সবসময় সেই ব্যক্তিকে কৃতিত্ব দেন যিনি আসলে এটি পাওয়ার যোগ্য। তিনি অন্যদের কাজকে বড় করে দেখেন এবং সবার সামনে তাদের প্রশংসা করেন।

​৫. সহানুভূতি থাকলেও নিজের সীমারেখা বা নিয়ম বজায় রাখা:

​এটি সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। অনেক সময় সততা মানে হলো আবেগের বশবর্তী না হয়ে নীতিতে অটল থাকা। কাউকে সাহায্য করতে ইচ্ছে হলেও যদি তা আপনার আগের কোনো প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধে যায়, তবে 'না' বলতে শেখাও সততার অংশ।

​৬. না জানলে তা বিনয়ের সাথে স্বীকার করা:

​সবজান্তা ভাব ধরার চেয়ে "আমি জানি না" বলা অনেক বেশি সাহসের কাজ। পেশাগত বা ব্যক্তিগত জীবনে ভুল তথ্য দিয়ে কাউকে বিভ্রান্ত না করে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করাটা সততার একটি বড় লক্ষণ।

​৭. কারও গোপন কথা আমানত হিসেবে রাখা:

​তথ্য হলো এক ধরনের ক্ষমতা। কারও গোপন কথা অন্যের কাছে বলে দেওয়াটা খুব সহজ, কিন্তু একজন সৎ ব্যক্তি অন্যের দেওয়া বিশ্বাসের মর্যাদা দেন। তিনি কখনোই গোপন তথ্য নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন না


২০

Smart work মানে কী?

১. Prioritization:

সব কাজ একসাথে দরকারি না।

যে কাজটা আপনাকে বেশি result দিচ্ছে, আগে ওটাতে ফোকাস করুন।

Pareto Principle বলছে: ৮০% result আসে মাত্র ২০% কাজ থেকে।

২. Learn faster, execute better:

যেকোনো নতুন স্কিল শিখুন এমনভাবে, যাতে আপনি একই সময়ে অন্যদের থেকে ২গুণ output দিতে পারেন।

৩. System বানান:

যে কাজটা আপনি বারবার করেন, সেটা manual না করে system বানিয়ে রাখুন।

Automation মানেই smartness।

৪. Energy Management:

সবচেয়ে productive সময় কখন?

সকাল না রাত? ওই টাইমে deep কাজ রাখুন - যেটাতে আপনাকে fully মনোযোগ দিতে হয়।

৫. Feedback নিন, Improve করুন:

Hard worker বারবার একই ভুল করে।

Smart worker শেখে, evolve করে, তারপর optimize করে।


২১


সুখী জীবন কাটানোর ৭টি উপায়  

​১. মনে রাখুন, মানুষ আপনাকে নিয়ে অত ভাবছে না:

আমরা অনেক সময় ভাবি সবাই বুঝি আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে বা আমাদের ভুলগুলো ধরছে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘স্পটলাইট ইফেক্ট’। আসলে বাস্তবে সবাই নিজের জীবন আর সমস্যা নিয়ে এতই ব্যস্ত যে, আপনার ছোটখাটো ভুল বা পোশাক নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তাদের নেই।

​২. মানুষের সমর্থন খোঁজা একটি হেরে যাওয়া খেলা:

সবাইকে খুশি করা অসম্ভব। একজনের কাছে যা ভালো, অন্যজনের কাছে তা খারাপ মনে হতে পারে। তাই অন্যের কাছ থেকে বাহবা পাওয়ার আশায় বসে থাকলে নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট হয়। মানুষের পছন্দের ওপর নির্ভর করা মানে নিজের সুখের চাবিকাঠি অন্যের হাতে দিয়ে দেওয়া।

​৩. নিজের মূল্যবোধ (Values) ঠিক করুন:

আপনি জীবনে কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন (যেমন: সততা, সৃজনশীলতা বা স্বাধীনতা), তা লিখে ফেলুন। কোনো কাজ করার আগে ভাবুন, "এটি কি আমার আদর্শের সাথে মেলে?" অন্যের কাছে কেমন লাগবে—এই চিন্তা না করে নিজের আদর্শ অনুযায়ী কাজ করুন।

​৪. ইচ্ছে করে মানুষকে হতাশ করার অভ্যাস করুন:

এটি শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও কার্যকর। ছোট ছোট বিষয়ে 'না' বলতে শিখুন। যেমন—যে দাওয়াতে যেতে ইচ্ছে করছে না সেখানে যাবেন না। এতে আপনার অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং আপনি মানসিকভাবে শক্ত হবেন।

​৫. সঠিক মানুষের সঙ্গ বেছে নিন:

সবার মতামত সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনার কাছের বন্ধু বা প্রিয়জন যারা আপনার ভালো চায়, কেবল তাদের গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করুন। অপরিচিত বা সাধারণ মানুষের মন্তব্যকে কেবল 'শব্দ' বা নয়েজ হিসেবে গণ্য করুন।

​৬. নিজের ভুল বা অসম্পূর্ণতাকে মেনে নিন:

কেউই নিখুঁত নয়। নিজের ভুলগুলো লুকিয়ে না রেখে বরং সেগুলো স্বীকার করতে শিখুন। যখন আপনি নিজের দুর্বলতাগুলো নিজে গ্রহণ করবেন, তখন অন্য কেউ সেগুলো দিয়ে আপনাকে আঘাত করতে পারবে না।

​৭. মানুষের প্রশংসা নয়, নিজের কাজের দিকে নজর দিন:

"তারা কি আমাকে পছন্দ করছে?"—এই চিন্তা বাদ দিয়ে ভাবুন "আমি কীভাবে অন্যের উপকারে আসতে পারি?" যখন আপনি মানুষের বাহবা পাওয়ার বদলে কাজের মাধ্যমে ভালো কিছু করার চেষ্টা করবেন, তখন জীবন অনেক বেশি অর্থবহ হয়ে উঠবে।


২২

পৃথিবীর ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য দশ গণবিলুপ্তি

কোনো একটি প্রজাতির সর্বশেষ বেঁচে থাকা জীব বা প্রাণীটি মারা গেলে ওই প্রজাতিকে বিলুপ্ত হিসেবে ধরা হয়। আর ব্যাপক পরিসরে ঘটা বিলুপ্তির নাম দেওয়া হয়েছে গণবিলুপ্তি। পৃথিবীর ৪৫০ কোটি বছরের ইতিহাসে এই পর্যন্ত বহু প্রজাতির প্রাণী পৃথিবীর বুক চষে বেড়ালেও, বর্তমানে অনেক প্রজাতিই পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আর কারণ হচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে ঘটা গণবিলুপ্তি। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দশ বৃহৎ গণবিলুপ্তি :

অক্সিজেনের মহাসংকট

সময়: ২৩০ কোটি বছর পূর্বে

তখন ব্যাকটেরিয়া সূর্যরশ্মিকে ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে ভেঙে শক্তি অবমুক্তির মাধ্যমে সালোকসংশ্লেষণের ক্ষমতা অর্জনে সক্ষম হয়। দুর্ভাগ্যবশত, এই সালোকসংশ্লেষণের মুখ্য একটি উপজাত হলো অক্সিজেন, যা কিছু জীবের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ৩৫০কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়া সে প্রাণীগুলো অক্সিজেনের উপস্থিতিতে বেঁচে থাকতে পারত না। বর্তমানেও এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া পৃথিবীতে বিদ্যমান, যা অক্সিজেনের উপস্থিতিতে মারা যায়। বিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সালোকসংশ্লেষণের ক্ষমতা অর্জনের ২০ কোটি বছর পর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যথেষ্ট পরিমাণে অক্সিজেন জমা হয়। ফলে, অক্সিজেনের উপস্থিতি সহ্য করতে না পারা জীবগুলোর গণবিলুপ্তি ঘটে।

তুষার গোলকের পৃথিবী

সময়: ৭০০ মিলিয়ন বছর পূর্বে

আজ থেকে প্রায় ৭০০-৬৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবীর প্রতিটি ইঞ্চি বরফের শুভ্র চাদরে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। তুষার গোলকে পরিণত হওয়া পৃথিবী থেকে ওই সময় সালোকসংশ্লেষী বহু প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। তখন মেরু অঞ্চলে এত পরিমাণ বরফের চাঁই জমা হয়েছিল যে, সূর্যের আলো তাতে প্রতিফলিত হয়ে আবার মহাশূন্যে ফেরত চলে যেত। এর ফলে পৃথিবীর উষ্ণতা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। শীতল আবহাওয়া ও পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যের আলো না থাকায় তখন সালোকসংশ্লেষণও সম্ভব হচ্ছিল না। ফলশ্রুতিতে, খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে গিয়ে বহু জীবের বিলুপ্তি ঘটে।  

এন্ড-এডিয়াকারান গণবিলুপ্তি

সময়: ৫৪২ মিলিয়ন বছর পূর্বে

ভূতাত্ত্বিক সময়রেখা অনুযায়ী, এডিয়াকারান এবং ক্যামব্রিয়ান সময়ের মধ্যবর্তী সীমায়, প্রায় ৫৪২ মিলিয়ন বছর পূর্বে ঘটে যায় এন্ড-এডিয়াকারান গণবিলুপ্তি। এরপরই সূচনা ঘটে ক্যামব্রিয়ান যুগের, যেখানে জীব বৈচিত্র‍্যের বিকাশ ঘটেছিল অতিদ্রুত। এন্ড-এডিয়াকারান যুগের পর সামুদ্রিক পরিবেশে জটিল বহুকোষী জীবের উদ্ভব ঘটে। এই গণবিলুপ্তির যাঁতাকলে পিষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বহু এরিকাডান প্রাণী, যারা পৃথিবীর জটিল, বহুকোষী জীবের পূর্বপুরুষ।

ক্যামব্রিয়ান-অরডোভিসিয়ান গণবিলুপ্তি

সময়: ৪৮৮ মিলিয়ন বছর পূর্বে

আদিম পৃথিবীতে ক্যামব্রিয়ান-অরডোভিসিয়ান গণবিলুপ্তির ধারা কয়েক মিলিয়ন বছর পর্যন্ত বজায় ছিল। এই গণবিলুপ্তির পদরেখা অনুসরণ করেই ক্যামব্রিয়ান যুগের অবসান এবং অরডোভিসিয়ান যুগের সূচনা ঘটে। এই সময়ে, অগণিত প্রজাতির সামুদ্রিক জীবপ্রজাতি, যেমন- ট্রিলোবাইট, ব্রাকিউপড, গ্র‍্যাপটোলাইট, কনোডন্ট ইত্যাদি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। সংখ্যার হিসেবে, ৬০% অমেরুদণ্ডী প্রজাতি, এবং ৮৫% সামুদ্রিক প্রজাতি ওই সময় বিলুপ্তির ফাঁদে পড়ে দুনিয়া থেকে হারিয়ে যায়। সেসময় পৃথিবীর তাপমাত্রা হঠাৎ নিচে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি সমুদ্রে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। ফলশ্রুতিতে আরেক গণবিলুপ্তির সম্মুখীন হয় পৃথিবী। আরেক থিওরিতে বলা হয়েছে, একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে মহাজাগতিক বিকিরণ মাত্রা অধিকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সামুদ্রিক জীবের ব্যাপক বিলুপ্তি ঘটে।

অরডোভিসিয়ান গণবিলুপ্তি

সময়: ৪৪৭-৪৪৩ মিলিয়ন বছর পূর্বে

প্যালিয়োজয়িক যুগে ঘটা অরডোভিসিয়ান গণবিলুপ্তি মূলত দুটি পৃথক বিলুপ্তির সমন্বয়ে গঠিত। একটি ঘটেছিল ৪৪৭ মিলিয়ন বছর পূর্বে, এবং অন্যটি ৪৪৩ মিলিয়ন বছর পূর্বে। তখন বিশ্বের সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণীর সংখ্যা এক ধাক্কায় একেবারে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছিল। এদের মধ্যে ব্র্যাকিওপড, বাইভালভ এবং প্রবাল উল্লেখযোগ্য। অর্ডোভিসিয়ান বিলুপ্তির কারণ এখনও বিজ্ঞান মহলে একটি রহস্যের ধোঁয়া সৃষ্টি করে রেখেছে। এজন্য পৃথিবীর কাছাকাছি একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণকে দায়ী করা হয়, যা পৃথিবীতে ক্ষতিকারক গামা রশ্মি নিয়ে এসেছিল বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। সমুদ্রতল থেকে বিষাক্ত ধাতু নির্গত হওয়াকেও এই গণবিলুপ্তির অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হয়।

ডেভোনিয়ান গণবিলুপ্তি

সময়: ৩৭৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে

অরডোভিসিয়ান গণবিলুপ্তির পর ডেভোনিয়ান গণবিলুপ্তি ছিল প্যালেয়োজয়িক মহাযুগের দ্বিতীয় বিপর্যয়। একসাথে প্যালেওজয়িক যুগের দুই গণবিলুপ্তি পৃথিবী থেকে প্রায় ৮০ ভাগ জলজ ও স্থলজ প্রাণী নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। ডেভোনিয়ান গণবিলুপ্তি দুই ধাপে সম্পন্ন হয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। প্রথম ধাপে, সমুদ্রের পরিবেশ হঠাৎ বিষাক্ত হয়ে উঠতে শুরু করে। ফলে, সামুদ্রিক উদ্ভিদের বিশাল এক অংশ স্থলভাগে অভিযোজন করে নেয়। সমুদ্রে তখন অক্সিজেন উৎপাদনকারী না থাকায় দেখা দেয় প্রকট অক্সিজেন সংকট। ফলে অধিকাংশ সামুদ্রিক ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে।

আবার, স্থলভাগে উদ্ভিদের সংখ্যা প্রাণীর সংখ্যার চেয়ে অতি দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় পৃথিবীর আবহাওয়া এবং জলবায়ুতে আসে সমূহ পরিবর্তন। দ্রুত হ্রাস পায় কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ। গ্রিনহাউজ গ্যাস হ্রাস পাওয়ার আগেই দ্রুত নেমে যায় পৃথিবীর তাপমাত্রা। ফলে আবহাওয়া হয়ে ওঠে চরম প্রতিকূল, মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয় অধিকাংশ জীবপ্রজাতিকে। এটা ছিল প্রথম ধাপের বিবরণী। দ্বিতীয় ধাপের জন্য দায়ী করা হয় বড় ধরনের আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা উল্কাপিণ্ডকে।

পারমিয়ান গণবিলুপ্তি

সময়: ২৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে

প্যালিওজয়িক মহাযুগ জীবজগতের ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। কারণ, প্রাণীকুল তিন-তিনটি গণবিলুপ্তির সম্মুখীন হয়েছে এই মহাযুগে। প্যালিওজয়িক যুগের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়ে পরিসমাপ্তি সম্পন্ন করে পারমিয়ান গণবিলুপ্তি। এই পারমিয়ান গণবিলুপ্তিকে সকল গণবিলুপ্তির ‘মাতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আনুমানিক ২৫০ মিলিয়ন বছর পূর্বে ঘটা এই বিলুপ্তিতে ৯৫% সামুদ্রিক এবং ৭০% স্থলজ প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটে। এই মহাবিলুপ্তি এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে, পৃথিবীতে জীবপ্রজাতি মোটামুটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে প্রায় ১০ মিলিয়ন বছর লেগে যায়।

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এবং বড় উল্কাপতনের ফলেই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায় প্রায় ৯৬% প্রজাতি। অগ্ন্যুৎপাত আর উল্কাপতন সম্মিলিত ভাবেই ঘটিয়েছিল এই মহাবিপর্যয়। ওই সময় বায়ুতে অত্যধিক হারে মিথেনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় আবহাওয়া-জলবায়ুতে নেমে আসে দারুণ নেতিবাচক প্রভাব। তাপমাত্রা প্রতিকূলতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া পৃথিবী হয়ে উঠেছিল পুরোপুরি জীবন বসবাসের অনুপযুক্ত। মুষ্টিমেয় কিছু প্রাণী বাদে সকলকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।  

ট্রায়াসিক-জুরাসিক গণবিলুপ্তি

সময়: ২০০ মিলিয়ন বছর পূর্বে

প্রায় ২০০ মিলিয়ন বছর পূর্বে ঘটা ট্রায়াসিক-জুরাসিক গণবিলুপ্তি মূলত একাধিক ছোট ছোট গণবিলুপ্তিকে একত্রে বুঝিয়ে থাকে। এর সময়কাল স্থায়ী হয় দীর্ঘ ১৮ মিলিয়ন বছর জুড়ে, এবং এই সময়ের মাঝে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ানো প্রায় ৫০% প্রজাতি চিরতরে হারিয়ে যায়। এই গণবিলুপ্তির কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতকে দায়ী করে থাকেন। তখন আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার স্রোতে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যেতে হয় বহু জীবপ্রজাতিকে। প্রচুর পরিমাণ অগ্ন্যুৎপাত বাতাসে মিথেনের পরিমাণ অত্যধিক হারে বাড়িয়ে দেয়, জলবায়ু হয়ে ওঠে পুরোপুরি জীব বসবাসের অযোগ্য। প্রকৃতির এই নির্মম ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে নিশ্চিহ্ন হবার যাত্রায় সামিল হয় বহু স্থলজ উভচর, আর্কোসোর্স এবং থেরাপসিডস।

ক্রিটেসিয়াস-টারশিয়ারি গণবিলুপ্তি

সময়: ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে

থিবীতে সর্বশেষ ঘটা গণবিলুপ্তি হলো ক্রিটেসিয়াস-টারশিয়ারি গণবিলুপ্তি। ট্রায়াসিক-জুরাসিক গণবিলুপ্তির ধাক্কা সামলে ডাইনোসরের কিছু প্রজাতি অবশিষ্ট থাকলেও ক্রিটেসিয়াস-টারশিয়ারি গণবিলুপ্তি থেকে তারা নিজেদের আর রক্ষা করতে পারেনি।এই গণবিলুপ্তির সূত্রপাত ঘটায় বিশাল এক উল্কাপাত বা গ্রহাণু। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সাথে ঘর্ষণে পুরোপুরি জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের রূপ ধারণ করা উল্কা বা গ্রহাণুগুলো পৃথিবীর বুকে সজোরে আঘাত হেনেছিল।   কী স্থলজ, কী জলজ, সকলেই সামিল হয় বিলুপ্তির মহাযাত্রায়। বিস্ফোরণের কাছাকাছি থাকা প্রাণীরা তো নিজেদের বাঁচাতেই পারেইনি, উল্টো পুরো বায়ুমণ্ডল পরিপূর্ণ হয়ে যায় ধূলিকণা আর বিষাক্ত গ্যাসে। ফলে, পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায় তখনকার জীবজগতের ৭৫% প্রজাতি।

মানবঘটিত গণবিলুপ্তি

মানুষও যে কতক প্রাণীকূলকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। লোমশ ম্যামথ, লম্বা দাঁতওয়ালা বাঘ, দৈত্যাকৃতির ওমব্যাট, বিভার পৃথিবী থেকে হারিয়েছে শুধুমাত্র মানুষের কারণেই।

আজ থেকে প্রায় ৪৫ হাজার বছর পূর্বে অস্ট্রেলিয়ায় উপনিবেশ স্থাপন করে হোমো স্যাপিয়েন্সরা। তৎকালীন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে হরহামেশাই দেখা মিলত দু’শ কেজি ওজনের ক্যাঙ্গারুর, যারা লম্বায় ছিল প্রায় দুই মিটার। ওই মহাদেশ দাপিয়ে বেড়াতো মারসুপিয়াল সিংহ, যারা ছিল তখনকার সর্ববৃহৎ শিকারি প্রাণী। উড়তে অক্ষম উটপাখির দ্বিগুণ আকারের একদল পাখির ধুমধাম পদশব্দে মুহূর্তেই ভেঙে যেত প্রকৃতির সকল নিস্তব্ধতা। বনে-জঙ্গলে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াত দানবাকৃতির প্রাণী ডাইপ্রোটোডন। তাদের একেকটির গড় ওজন ছিল প্রায় আড়াই টনের কাছাকাছি। স্যাপিয়েন্সরা অস্ট্রেলিয়ায় বসতি গড়ার কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই বিলুপ্তির খাতায় নাম উঠে যায় প্রায় সবগুলো দৈত্যাকৃতির প্রাণীর।

অস্ট্রেলিয়াতে তখন পঞ্চাশ কেজির বেশি ওজনের চব্বিশ প্রজাতির প্রাণী বাস করত, যার মধ্যে তেইশটি প্রজাতিই বিলুপ্ত হয়ে যায়। অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির অসংখ্য প্রজাতিও বিলুপ্তির এই ঘূর্ণিপাকে অস্ট্রেলিয়া থেকে বিলীন হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে ওঠা অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের বাস্তুসংস্থানের খোলস কয়েকশত বছরের মধ্যেই ভেঙে যায়। এভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বহু দৈত্যাকৃতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে মানুষের কারণে। @ Mohasin Alam Roni


২৩


আটা, ময়দা মেখে ফ্রিজে রাখলে কালো হয়ে যায়? 'এই' একটি কাজেই থাকবে একেবারে ফ্রেশ, রুটিও হবে তুলতুলে নরম

গমের আটায় 'টাইরোসিনেজ' নামক একটি এনজাইম থাকে। যখন ময়দা জলের সঙ্গে মেশে, তখন তা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারপর, যখন এটি বাতাসের (অক্সিজেন) সংস্পর্শে আসে, তখন রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে এবং 'মেলানিন' নামক একটি পদার্থ তৈরি হয়।  ফ্রিজে তাপমাত্রা কম থাকলেও, বাতাস ক্রমাগত সঞ্চালিত হয়। ফলে ময়দার আর্দ্রতা দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে যায়। ফলস্বরূপ, উপরের স্তরটি শুকিয়ে যায় এবং শক্ত হয়ে যায়, যার ফলে কালো রঙ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।  *ময়দার রঙ পরিবর্তন হওয়া রোধ করতে, তেল মাখিয়ে রাখতে পারেন। ময়দা বা আটা মাখার পরে উপরে সামান্য তেল বা ঘি লাগান। এটি একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর হিসাবে কাজ করে এবং সরাসরি ময়দার সঙ্গে বাতাসের স্পর্শ রোধ করে।  *বায়ুরোধী পাত্র: সাধারণ বাটি বা প্লেটে ময়দা সংরক্ষণ করবেন না। এয়ারটাইট কন্টেনারে মাখা আটা সংরক্ষণ করুন। *ক্লিং ফিল্ম ব্যবহার করুন: পাত্রে রাখার আগে ময়দা শক্ত করে ক্লিং ফিল্ম (প্লাস্টিকের মোড়ক) দিয়ে ঢেকে রাখুন, জারণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে।  *অতিরিক্ত টিপস: ময়দা বা আটার সঙ্গে গরম জল বা সামান্য দুধ যোগ করলে কেবল রুটি নরম হবে না, বরং ময়দা দ্রুত বিবর্ণ হওয়াও রোধ করবে।  



২৪

পেঁপে সকলের জন্য নয়...কারা দূরে থাকবেন?

পেঁপে একটি স্বাস্থ্যকর ফল, তবে এটি কিছু লোকের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। গর্ভবতী মহিলাদের (কাঁচা বা কম পাকা পেঁপে), যাদের ল্যাটেক্স অ্যালার্জি আছে, থাইরয়েড রোগী, যারা রক্ত ​​পাতলা করার ওষুধ গ্রহণ করেন এবং কিডনিতে পাথর আছে তাদের সাবধানতার সাথে এটি খাওয়া উচিত। এটি বেশি পরিমাণে খেলে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা এবং পেট ফাঁপা হতে পারে। গর্ভাবস্থায় সম্পূর্ণ পাকা পেঁপে সীমিত পরিমাণে নিরাপদ এবং উপকারী বলে মনে করা হয়। তবে, কাঁচা বা আধা পাকা পেঁপে একেবারেই এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এতে উপস্থিত ল্যাটেক্স এবং প্যাপেইন গর্ভপাত বা অকাল প্রসবের কারণ হতে পারে। পেঁপে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, কিন্তু অতিরিক্ত সেবন রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি করতে পারে। অতএব, প্রতিদিন আধা কাপ (১০০-১৫০ গ্রাম) অথবা একটি ছোট বাটিতে পেঁপে খাওয়ার পরিমাণ সীমিত করুন। তাছাড়া, যেকোনো শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া পেঁপে খাওয়া উচিত নয়। পেঁপে হজমের জন্য খুবই উপকারী, কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে অথবা দুধ, দই, লেবু জাতীয় ফল এবং উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবারের মতো নির্দিষ্ট খাবারের সাথে মিশিয়ে খেলে হজমের সমস্যা হতে পারে। এর ফলে ডায়রিয়া, পেট ফাঁপা, পেট ফাঁপা, গ্যাস এবং অ্যাসিডিটির মতো সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত পেঁপে খাওয়ার ফলে গুরুতর রক্তের ব্যাধি হতে পারে। এটি রক্তকে অত্যধিক পাতলা করে দিতে পারে, যার ফলে রক্তপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়, বিশেষ করে যারা ওয়ারফারিনের মতো রক্ত ​​পাতলা করার ওষুধ গ্রহণ করেন তাদের ক্ষেত্রে। তাছাড়া, পেঁপে রক্তনালীর আস্তরণকেও প্রভাবিত করতে পারে। পেঁপে বেশিরভাগ রোগের জন্য উপকারী, তবে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এটি এড়ানো উচিত। তাছাড়া, অতিরিক্ত পেঁপে সেবনের ফলে স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অতএব, এটি সর্বদা ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করার পরেই খাওয়া উচিত। 


২৫


শুধু পানি দিয়ে ধোয়া যথেষ্ট নয়, কীভাবে আঙুর পরিষ্কার করবেন

পোকামাকড় থেকে রক্ষা করতে আঙুর চাষে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। কখনও কখনও এই রাসায়নিকগুলি আঙুরের গায়ে লেগে থাকে। কেবল সাধারণ জল দিয়ে ধুয়ে নেওয়া তাই যথেষ্ট নয়। যদি রাসায়নিকগুলি শরীরে প্রবেশ করে, তাহলে অ্যালার্জি, পেট ব্যথা বা দীর্ঘমেয়াদী গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই, আঙুর ভালভাবে পরিষ্কার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আঙুর পরিষ্কার করার সবচেয়ে সহজ উপায় হল লবণ জল ব্যবহার করা। একটি বড় পাত্রে জল নিয়ে তাতে এক চা চামচ লবণ দিতে হবে। আঙুরগুলোকে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে। লবণ জলের ব্যাকটেরিয়া এবং জীবাণু মেরে ফেলতে সাহায্য করে। তারপর আবার পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। আঙুর থেকে রাসায়নিক পদার্থ অপসারণে বেকিং সোডাও কার্যকর বলে মনে করা হয়। এক লিটার জলে আধা চা চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে এই দ্রবণে আঙুর ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে যে বেকিং সোডা কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ কমাতে সাহায্য করে। পরে জল দিয়ে ভাল করে ধুয়ে ফেলতে হবে। 

সাদা ভিনিগারও আঙুর পরিষ্কার করার একটি ভাল জিনিস- এক ভাগ ভিনিগার এবং তিন ভাগ জলের দ্রবণে আঙুর ১০ থেকে ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। ভিনিগার জীবাণু মেরে ফেলতে সাহায্য করে এবং পৃষ্ঠে আটকে থাকা যে কোনও অবশিষ্টাংশ আলগা করে। সবশেষে, পরিষ্কার জল দিয়ে ভালভাবে ফলগুলো ধুয়ে ফেলা দরকার। যে কোনও দ্রবণেই ভিজিয়ে রাখার পর আঙুরগুলো কমপক্ষে এক থেকে দুই মিনিটের জন্য কলের জলের নীচে রেখে ধুতে হবে। এতে রাসায়নিক এবং অবশিষ্টাংশ দূর হবে। আঙুরগুলো আলতো করে ঘষা যায়। ডাঁটি ছাড়ানোর আগেই ধুয়ে ফেলা ভাল হবে। ধোয়ার পর আঙুরগুলো পরিষ্কার সুতির কাপড় বা টিস্যুতে শুকানোর জন্য ছড়িয়ে দিতে হবে। ভেজা আঙুর ফ্রিজে রাখলে ছত্রাক দেখা দেবে। আঙুরগুলো সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ার পরই তাই ফ্রিজে তোলা ভাল। সঠিকভাবে পরিষ্কার করা এবং শুকানো আঙুর দীর্ঘ সময় ধরে তাজা থাকে, স্বাদ আরও ভাল হয়।  



২৬

খাওয়ার পর পরই মলত্যাগের জন্য ছুটতে হয় টয়লেটে? এটা কি কোনও রোগ? কী করলে বন্ধ হবে এই অভ্যাস? 

মার্কিন গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ডঃ জোসেফ সালহাবের মতে, খাওয়ার পরপরই মলত্যাগের তাগিদ প্রায়শই গ্যাস্ট্রোকোলিক রিফ্লেক্সের কারণে হয়। এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া যা খাবার পাকস্থলীতে পৌঁছালে সক্রিয় হয়। ফলস্বরূপ, কোলন সংকুচিত হয় এবং পরিপাকতন্ত্রে নতুন স্থান তৈরি করার চেষ্টা করে। কিছু লোকের ক্ষেত্রে, এই প্রতিফলন আরও তীব্র হয়, যার ফলে খাওয়ার পরপরই মলত্যাগের তাগিদ হয়। 

কিছু সাধারণ কারণ এই সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। ভারী বা উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, বেশি খাবার, কফি বা ক্যাফেইন, অতিরিক্ত ঠান্ডা পানীয়, মশলাদার খাবার, কৃত্রিম মিষ্টি, ধূমপান, মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ অন্ত্রের চলাচলকে দ্রুততর করতে পারে। স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকলাপ বৃদ্ধি, বিশেষ করে চাপ এবং উদ্বেগের সময়, হঠাৎ মলত্যাগের তাড়নাও সৃষ্টি করতে পারে। 

যদি এই সমস্যা ঘন ঘন দেখা দেয়, ব্যথার সঙ্গে থাকে, রাতে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়, ওজন হ্রাসের সাথে থাকে, বা মলে রক্ত থাকে, তাহলে আপনার অবিলম্বে একজন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, খাওয়ার পরে মলত্যাগের তাড়না একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া, অস্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়া নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শের মাধ্যমে এটি কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যেতে পারে। 

কিছু ব্যবহারিক ব্যবস্থা এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। বড় খাবারের পরিবর্তে ছোট, আরও ঘন ঘন খাবার খান। উচ্চ চর্বিযুক্ত এবং ভাজা খাবার সীমিত করুন। ধীরে ধীরে খান এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিবিয়ে খান। দ্রবণীয় ফাইবার, যেমন সাইলিয়াম, চিয়া বীজ, বা তিসির বীজ, নিয়মিত এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য মলত্যাগ বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। আপনার ব্যক্তিগত ট্রিগার খাবারগুলি সনাক্ত করা এবং হ্রাস করাও গুরুত্বপূর্ণ। 


২৭

প্রেশার কুকারে রান্না করা খাবার কি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নাকি চরম ক্ষতিকর? 

প্রেশার কুকারে রান্নার সময় কম হওয়ার কারণে, এর পুষ্টিগুণ এবং জলে দ্রবণীয় ভিটামিন যেমন ভিটামিন বি এবং সি সংরক্ষণ করা হয়। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রেশার কুকিং অনেক ক্ষেত্রেই পুষ্টিগুণ সংরক্ষণ করতে পারে, খোলা প্যানে দীর্ঘক্ষণ ফোটানো বা রান্না করার তুলনায়। প্রেশার কুকারে খাবার দ্রুত রান্না হয়, যা গ্যাস এবং বিদ্যুতের খরচ কমায়। এটি কেবল অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক নয়, পরিবেশের জন্যও ভাল। কম সময়ে রান্না করলে খাবারের গঠন এবং স্বাদও বজায় রাখা যায়। বিশেষ করে মুসুর ডাল এবং রাজমার মতো শক্ত শস্য প্রেশার কুকারে সহজেই নরম হয়ে যায়। তাই, প্রেশার কুকারে রান্না করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে বিবেচিত হতে পারে। 



২৮

বাতকর্ম ও ঢেকুর কেন হয়? কখন, কেন পেটে গ্যাস তৈরি হয়? পেট থেকে গ্যাস বার না হলে কী হবে?

পেট এবং অন্ত্রে গ্যাস মূলত দুটি কারণে হয়। প্রথমটি হল বাতাস গিলে ফেলা। যখন আমরা দ্রুত খাই, খাওয়ার সময় বাতাস পেটে প্রবেশ করে। এই বাতাস প্রায়ই ঢেকুরের মতো বেরিয়ে আসে। দ্বিতীয়টি হল অন্ত্রের গাঁজন। বৃহৎ অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া নির্দিষ্ট কার্বোহাইড্রেট এবং ফাইবার সম্পূর্ণরূপে হজম করতে পারে না। এই পদার্থগুলি হাইড্রোজেন, মিথেন এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্যাস তৈরি করে এবং তৈরি করে। এই গ্যাসটি ফার্টিং হিসাবে বেরিয়ে আসে। যখন অন্ত্রের গতিশীলতা ধীর হয় বা কোষ্ঠকাঠিন্য হয়, তখন গ্যাস আটকে যায়। 


গ্যাস নিজেই কোনও রোগ নয়, বরং হজমের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ।  ঘন ঘন গ্যাস হওয়াকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। যখন গ্যাস বের করা যায় না, তখন এটি অন্ত্রের দেয়ালের উপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে পেট ফুলে যায় এবং পেটে বেলুনের মতো অনুভূতি হয়।  কিছু লোক বমি বমি ভাব, বমি, বুকে টানটান ভাব বা মাথাব্যথাও অনুভব করতে পারে। দীর্ঘক্ষণ গ্যাস ধরে রাখার ফলে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য ব্যাহত হতে পারে, যার ফলে IBS, ফাংশনাল ডিসপেপসিয়া বা দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং খারাপ জীবনযাত্রা গ্যাস তৈরির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। মশলাদার এবং ভাজা খাবার, কার্বনেটেড পানীয়, মটরশুটি, বাঁধাকপি, ব্রকলি এবং কিছু দুগ্ধজাত পণ্য গ্যাস বাড়াতে পারে। বিশেষ করে যদি আপনার ল্যাকটোজ অসহিষ্ণুতা থাকে, তাহলে দুগ্ধজাত পণ্য এই সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকাও হজমের উপর প্রভাব ফেলে। কিছু চিকিৎসাগত অবস্থা, যেমন কোষ্ঠকাঠিন্য, হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি সংক্রমণ, সিলিয়াক রোগ, বা SIBO, গ্যাস তৈরির প্রবণতা বাড়িয়ে তুলতে পারে। যদি গ্যাসের সঙ্গে পেটে ক্রমাগত ব্যথা, ওজন হ্রাস, রক্তাক্ত মল, ঘন ঘন বমি, অথবা গিলতে অসুবিধা হয়, তাহলে আপনার অবিলম্বে একজন ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। 

গ্যাস এড়াতে ধীরে ধীরে খান এবং খাবার ভাল করে চিবিয়ে খান। একবারে খুব বেশি খাওয়া এড়িয়ে চলুন। ধীরে ধীরে ফাইবার গ্রহণ বৃদ্ধি করুন এবং পর্যাপ্ত জল পান করুন। নিয়মিত ব্যায়াম এবং যোগব্যায়াম হজম উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। ঘরোয়া প্রতিকারের মধ্যে রয়েছে সেলারি, মৌরি, আদা চা, অথবা হালকা গরম জল।  


২৯

ডাবের পানি নাকি আখের রস? কোনটা বেশি উপকারী?

 নারিকেল জলে প্রাকৃতিকভাবে পটাসিয়াম, সোডিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম থাকে, যা ঘামের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ইলেক্ট্রোলাইটগুলি পূরণ করতে কার্যকর। আখের রসে কিছু খনিজ থাকে তবে একই সুষম ইলেক্ট্রোলাইট প্রোফাইলের অভাব থাকে, যা ওয়ার্কআউট-পরবর্তী হাইড্রেশন এবং পুনরুদ্ধারের জন্য নারিকেল জলকে একটি উপযোগী করে তোলে। 

আখের রসে স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে, যা দ্রুত শক্তি সরবরাহ করে কিন্তু রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়াতে পারে। নারকেল জলেও প্রাকৃতিক চিনি থাকে, যদিও সাধারণত কম পরিমাণে, যা ক্যালোরি বা চিনি গ্রহণের দিকে নজর রাখছেন তাদের জন্য এটি একটি হালকা বিকল্প। 

এক গ্লাস আখের রসে সাধারণত বেশি ক্যালোরি থাকে কারণ এতে ঘনীভূত প্রাকৃতিক শর্করা থাকে। নারকেল জলে ক্যালোরির পরিমাণ কম থাকে, যা এটিকে নিয়মিত হাইড্রেশনের জন্য উপযুক্ত করে তোলে, 

নারকেল জল শরীরের প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা এটিকে দক্ষতার সাথে হাইড্রেট করতে সাহায্য করে। আখের রস সতেজ এবং শক্তি যোগায় তবে বিশেষ করে তীব্র শারীরিক পরিশ্রমের পরে, একটি নির্দিষ্ট হাইড্রেশন পানীয়ের চেয়ে শক্তি বৃদ্ধিকারী হিসাবে বেশি কাজ করে। আখের রস অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অল্প পরিমাণে আয়রন এবং ক্যালসিয়াম সরবরাহ করে। নারিকেল জলে পটাসিয়াম এবং পেশী এবং স্নায়ুর কার্যকারিতার জন্য উপকারী অন্যান্য প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ থাকে। উভয়ই পুষ্টির অবদান রাখে, তবে নারিকেল জলের খনিজ ঘনত্ব হাইড্রেশন-সম্পর্কিত চাহিদাগুলিকে আরও ভালভাবে সমর্থন করে। 

চিনির ঘনত্বের কারণে আখের রস ভারী বোধ করতে পারে, যা অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে পেট ফাঁপা হতে পারে। নারকেল জল পেটের জন্য হালকা এবং কোমল, প্রায়শই হালকা জলশূন্যতা, হজমের অস্বস্তি বা তাপের ক্লান্তির সময় এটি সুপারিশ করা হয়। 

তাজা আখের রস প্রায়শই তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তুত করা হয় এবং সুরক্ষার জন্য তা দ্রুত পান করা উচিত। তাজা বা প্যাকেজ করা নারকেল জল, দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা হাইড্রেশন সুবিধার সাথে উল্লেখযোগ্যভাবে আপস না করেই সুবিধা প্রদান করে। 

ওয়ার্কআউট, অসুস্থতা, অথবা গরমের পরে রিহাইড্রেশনের জন্য নারকেল জল বেছে নিন। তাৎক্ষণিক শক্তি বৃদ্ধি বা সতেজ খাবারের প্রয়োজন হলে আখের রস বেছে নিন। বিশুদ্ধ হাইড্রেশনের জন্য, নারকেল জল সাধারণত আরও কার্যকর বিকল্প। 


৩০


অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম কি দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দেয়? নীল আলো আপনার চোখকে কীভাবে প্রভাবিত করে?

 দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের ক্ষতি হতে পারে। যদিও এতে দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি থাকে না, তবে দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে ডিজিটাল চোখের চাপ, রেটিনার ক্ষতি এবং মায়োপিয়া হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

 স্ক্রিনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে ডিজিটাল আই স্ট্রেন বা কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম হতে পারে, যা শুষ্কতা, জ্বালা, ঝাপসা দৃষ্টি এবং মাথাব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। স্ক্রিন টাইম চোখের পেশীগুলিকে ক্লান্ত করে তোলে, দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে রেটিনারও ক্ষতি হতে পারে। 

 স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো কেবল চোখের জন্যই নয়, পুরো শরীরের জন্যও ক্ষতিকর। এই আলো চোখের কর্নিয়া এবং লেন্স দ্বারা সম্পূর্ণরূপে ফিল্টার করা হয় না এবং সরাসরি রেটিনায় পৌঁছায়। নীল আলোর দীর্ঘক্ষণ সংস্পর্শে থাকলে রেটিনার কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একে আলোক-রাসায়নিক ক্ষতি বলা হয়। অতিরিক্ত নীল আলো বয়স-সম্পর্কিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (AMD) প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে, যা বৃদ্ধ বয়সে কেন্দ্রীয় দৃষ্টিশক্তি দুর্বল করে দিতে পারে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে আজকাল শিশুরা ক্রমশ চশমা পরছে, যার একটি প্রধান কারণ হল স্ক্রিন টাইম। ছোট বাচ্চাদের চোখ বড়দের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল এবং তাদের চোখের মণি আলো ভালোভাবে শোষণ করে। স্ক্রিনে মনোযোগ দেওয়ার ফলে শিশুদের পলক পড়ার প্রবণতা কম হয়, যা চোখের তৈলাক্তকরণ হ্রাস করে। দীর্ঘক্ষণ কাছের বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়া হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, যা তাদের দৃষ্টিশক্তির জন্য উদ্বেগজনক। 

নীল আলো কেবল আমাদের চোখকেই নয়, আমাদের মস্তিষ্ককেও প্রভাবিত করে। রাতে স্ক্রিন ব্যবহার করলে শরীরে মেলাটোনিনের উৎপাদন ব্যাহত হয়, যা ঘুমের জন্য দায়ী হরমোন। মেলাটোনিন কম উৎপাদিত হলে, ঘুম চক্র ব্যাহত হয়। ঘুমের অভাব কেবল অন্ধকার বৃত্ত এবং ক্লান্তি সৃষ্টি করে না, বরং এটি চোখের পুনরুদ্ধার ক্ষমতাও হ্রাস করে, যার ফলে তারা পরের দিন সকালের চাপের জন্য অপ্রস্তুত থাকে। 

ডিজিটাল বিপদ থেকে চোখ রক্ষা করার জন্য, আপনার ২০-২০-২০ নিয়মটি অনুসরণ করা উচিত। প্রতি ২০ মিনিট কাজ করার পর, ২০ ফুট দূরের কোনও বস্তুর দিকে ২০ সেকেন্ডের জন্য তাকান। এছাড়াও, ঘরের উজ্জ্বলতার সাথে মিল রেখে স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা সামঞ্জস্য করুন এবং নীল আলো ফিল্টার বা নাইট মোড ব্যবহার করুন। কাজ করার সময় ঘন ঘন চোখের পলক ফেলুন এবং চোখকে হাইড্রেটেড রাখতে প্রচুর জল পান করুন।  



৩১


মুঘল সিংহাসনের রক্তাক্ত লড়াই: আওরঙ্গজেব এবং তাঁর ভাইদের ইতিহাস


১৬৫৮ সালের ৩১শে জুলাই, মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের চার পুত্রের মধ্যে সিংহাসন দখলের যে তীব্র লড়াই শুরু হয়েছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে এই দিনে। আওরঙ্গজেব রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দিল্লির মসনদে বসে নিজেকে 'আলমগীর' উপাধিতে ভূষিত করেন, যার অর্থ 'বিশ্ব বিজয়ী'।

এই ক্ষমতার লড়াইয়ের মূল কারণ ছিল শাহজাহানের অসুস্থতা। ১৬৫৭ সালে তার গুরুতর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লে সাম্রাজ্যের মধ্যে এক রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। শাহজাহানের চার পুত্র— দারাশুকোহ, শাহ শুজা, মুরাদ বখ্‌শ এবং আওরঙ্গজেব— প্রত্যেকেই নিজেদের সিংহাসনের যোগ্য দাবিদার মনে করতে শুরু করেন।

* দারাশুকোহ: শাহজাহানের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং তার প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন উদার, জ্ঞানী এবং সুফিবাদের অনুসারী। শাহজাহান তাকে উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রস্তুত করছিলেন, যা অন্য ভাইদের ঈর্ষার কারণ হয়।

* শাহ শুজা: তিনি বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার সুবাদার ছিলেন। শাহজাহানের অসুস্থতার খবর শুনে তিনি নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে আগ্রার দিকে যাত্রা করেন।

* মুরাদ বখ্‌শ: গুজরাটের সুবাদার ছিলেন। তিনি আওরঙ্গজেবের সঙ্গে জোট বাঁধেন সিংহাসন দখলের জন্য।

* আওরঙ্গজেব: ছিলেন অত্যন্ত কঠোর, কৌশলী এবং ধর্মপ্রাণ। তিনি দাক্ষিণাত্যের সুবাদার হিসেবে তার সামরিক ও রাজনৈতিক দক্ষতা প্রমাণ করেন।

এই ক্ষমতার লড়াইয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়:

১. ধর্মতীর যুদ্ধ (১৫ এপ্রিল, ১৬৫৮): আওরঙ্গজেব এবং মুরাদ বখ্‌শের সম্মিলিত বাহিনী দারাশুকোহের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে।

২. সামুগড়ের যুদ্ধ (২৯ মে, ১৬৫৮): এই যুদ্ধে আওরঙ্গজেব ও মুরাদের বাহিনী দারাশুকোহের বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। এই পরাজয়ের পর দারাশুকোহ আগ্রা ছেড়ে পালিয়ে যান।

সামুগড়ের যুদ্ধের পর শাহজাহানকে আগ্রা দুর্গে গৃহবন্দী করা হয়। আওরঙ্গজেব প্রথমে মুরাদ বখ্‌শকে হত্যা করেন এবং পরে দারাশুকোহকে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেন। শাহ শুজা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আরাকানে পালিয়ে যান, যেখানে তার জীবনাবসান হয়।

এই রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের পর, আওরঙ্গজেব ১৬৫৮ সালের ৩১শে জুলাই দিল্লির মসনদে আরোহণ করেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে চলা তার দীর্ঘ শাসনকালে মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল, কিন্তু তার কঠোর ধর্মীয় নীতি, বিশেষ করে হিন্দুদের উপর জিজিয়া কর আরোপ এবং মন্দির ধ্বংসের অভিযোগে তিনি ইতিহাসে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত হন। এই দিনটি তাই শুধু এক সিংহাসন আরোহণের দিন নয়, বরং এক যুগান্তরের সূচনা যা মুঘল সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ পথকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছিল। © Mahmudul Hasan Jahid. 



৩২


মগ জাতি ও বাংলার 'মগের মুল্লুক': এক অন্ধকার ইতিহাস


'মগের মুল্লুক'— এই প্রবাদটি বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় যেখানে কোনো আইন-কানুন নেই, শুধু বিশৃঙ্খলা ও যার যা খুশি তাই করার স্বাধীনতা। কিন্তু এর ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রোথিত রয়েছে মধ্যযুগে বাংলা অঞ্চলে মগ দস্যুদের অবাধ লুণ্ঠন ও অত্যাচারের মধ্যে।


মগ জাতির পরিচয়

 উৎপত্তি: মগরা ছিল মূলত আরাকান রাজ্যের (বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ) অধিবাসী। তারা ছিল আরাকানি রাজাদের অনুগত এবং বাঙালি সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ।


 ধর্ম ও সংস্কৃতি: জাতিগতভাবে এরা ছিল মূলত চীনা-তিব্বতীয় বা বার্মিজ-তিব্বতীয় ভাষাভাষী এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।


 আরাকানি সংযোগ: ১৬শ থেকে ১৭শ শতকে আরাকান রাজ্য একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। এই সময় মগরা আরাকানি রাজাদের পক্ষে বাংলায় সামরিক ও দস্যু কার্যক্রমে অংশ নিত।


মগের মুল্লুক সৃষ্টির কারণ: পর্তুগিজ দস্যুদের সঙ্গে জোট

মগদের দস্যুবৃত্তির প্রধান কারণ ছিল পর্তুগিজ জলদস্যুদের (বাংলায় যারা 'ফিরিঙ্গি' নামে পরিচিত ছিল) সঙ্গে তাদের কৌশলগত জোট। এই জোট বাংলার জন্য মারাত্মক অভিশাপ হয়ে উঠেছিল।


 ফিরিঙ্গিদের প্রভাব: ১৬শ শতকের মাঝামাঝি থেকে পর্তুগিজরা চট্টগ্রাম ও হুগলিতে ঘাঁটি গেড়েছিল। তারা সামরিক শক্তিতে উন্নত ছিল এবং তাদের যুদ্ধজাহাজগুলি ছিল শক্তিশালী।


 জোটের কৌশল: আরাকানের রাজা, মগ এবং পর্তুগিজ দস্যুদের কাজে লাগাতেন। মগরা স্থানীয় ভূগোল জানত এবং পর্তুগিজরা নৌ-যুদ্ধের কৌশল ও অস্ত্র সরবরাহ করত। এই সম্মিলিত শক্তি নদীমাতৃক বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলে এক অপ্রতিরোধ্য দস্যু চক্র তৈরি করে।


 ভয়ঙ্কর লুণ্ঠনক্ষেত্র: দস্যুরা মূলত মেঘনা নদীর মোহনা থেকে সুন্দরবনের উপকূল পর্যন্ত অঞ্চলে তৎপর ছিল। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ, নোয়াখালী এবং ঢাকার কিছু অংশ তাদের প্রধান লুণ্ঠনক্ষেত্র ছিল।


মগ দস্যুদের অত্যাচার ও বাংলার প্রভাব

মগ ও ফিরিঙ্গি দস্যুদের অত্যাচার বাংলার ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায়।


 অবাধ লুণ্ঠন: তারা অতর্কিতে গ্রামে প্রবেশ করে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিত, সম্পদ লুণ্ঠন করত এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাত। মোগলদের দুর্বল শাসন বা প্রশাসনিক ব্যর্থতা এই দস্যুবৃত্তিকে উৎসাহিত করত।


 মানব পাচার (দাস ব্যবসা): মগ দস্যুদের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে একটি ছিল মানুষ ধরে নিয়ে যাওয়া। তারা হাজার হাজার বাঙালিকে অপহরণ করে আরাকান এবং অন্যান্য জায়গায় দাস হিসেবে বিক্রি করত। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষকে দাস বাজারে বিক্রি করা হতো।


 ঐতিহাসিক তথ্য: কথিত আছে, আরাকানে একটি পৃথক দাস বাজার ছিল, যেখানে বাংলার উপকূল থেকে ধরে আনা লোকদের বিক্রি করা হতো।


 জনশূন্যতা: ক্রমাগত আক্রমণ ও অপহরণের ভয়ে বাংলার বহু উর্বর উপকূলীয় অঞ্চল জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। মানুষ নিরাপত্তার জন্য অভ্যন্তরভাগে চলে যেতে বাধ্য হয়। এই অরাজকতাই বাংলায় 'মগের মুল্লুক' প্রবাদটিকে স্থায়ী রূপ দেয়।


দস্যুবৃত্তির অবসান

মোগল সুবাদারদের কঠোর হস্তক্ষেপে এই অরাজকতার অবসান ঘটে।

 শায়েস্তা খানের ভূমিকা: মোগল সুবাদার শায়েস্তা খান (১৬৬৪-১৬৮৮) বাংলার গভর্নর হিসেবে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে মগ দস্যুদের দমনে decisive পদক্ষেপ নেন।

 চট্টগ্রাম জয় (১৬৬৬): শায়েস্তা খান এক বিশাল নৌ-বহর তৈরি করে এবং পর্তুগিজদের প্রলুব্ধ করে তাদের জোট থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি সামরিক অভিযান চালিয়ে আরাকানিদের হাত থেকে চট্টগ্রাম দখল করেন, যার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ইসলামাবাদ।

 শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা: চট্টগ্রাম জয়ের পর মগ ও ফিরিঙ্গি দস্যুদের ঘাঁটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং বাংলায় তাদের দৌরাত্ম্য বহুলাংশে কমে আসে। ধীরে ধীরে উপকূলীয় অঞ্চলে শান্তি ও মোগল শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।


মগদের সেই ভয়াবহ অত্যাচার বাংলার লোকস্মৃতিতে 'মগের মুল্লুক' রূপে আজও রয়ে গেছে, যা আইনহীন চরম অরাজকতার প্রতীক। © Mahmudul Hasan Jahid.


 'জাহাঙ্গীরনগর'  থেকে 'ঢাকা' নামের উৎপত্তি


১৬১০ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের ফরমান অনুযায়ী সুবেদার ইসলাম খান চিশতি বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি এই শহরের নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। প্রশাসনিকভাবে এই নাম ব্যবহৃত হলেও, সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর এর ব্যবহার ধীরে ধীরে কমে আসে এবং সাধারণ মানুষের কাছে 'ঢাকা' নামটিই জনপ্রিয় থাকে।

 মোগল-পূর্ববর্তী নাম (ধারণা):

মোগলদের আগমনের আগেও এই অঞ্চলটি বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল বলে অনুমান করা হয়:

 ডবাক: কেউ কেউ মনে করেন, প্রাচীন রাজতরঙ্গিনী বা এলাহাবাদ শিলালিপিতে উল্লেখিত 'ডবাক' শব্দটিই ঢাকার আদি নাম, যা কালক্রমে ঢাকাতে পরিণত হয়েছে।

 বঙ্গ বা সমতট: খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক থেকে শুরু করে মোগল-পূর্ব যুগে বর্তমান ঢাকা জেলা অঞ্চলটি বৃহত্তর 'বঙ্গ' নামে পরিচিত প্রশাসনিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ছিল, কখনও কখনও এর অংশ 'সমতট' বা 'হরিকেল' নামেও পরিচিত ছিল।

সুতরাং, যদিও মোগল আমলে সরকারিভাবে 'জাহাঙ্গীরনগর' নামটিই ছিল, 'ঢাকা' নামের উৎপত্তি তারও আগে থেকে লোকমুখে প্রচলিত ছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিক ও লোককথার ভিত্তিতে ধারণা করা হয়।

৩৪

ঢাকা নামকরণের পেছনের ইতিহাস (ঐতিহাসিক মতবাদ)

'ঢাকা' নামটি কীভাবে এলো, তা নিয়ে প্রধানত চারটি জনপ্রিয় মতবাদ প্রচলিত আছে।

ক. ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে উৎপত্তি:

এই মতবাদটি সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বহুল প্রচলিত।

* ঘটনা: সেন বংশের অন্যতম রাজা বল্লাল সেন (অন্য মতে একাদশ শতাব্দীর রাজা বিজয় সেন) বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী জঙ্গলে ভ্রমণের সময় দেবী দুর্গার একটি বিগ্রহ খুঁজে পান, যা গুপ্ত বা 'ঢাকা' অবস্থায় ছিল।

* নামকরণ: দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ রাজা বল্লাল সেন ঐ স্থানে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং দেবীর গুপ্ত বা ঢাকা অবস্থায় প্রাপ্তি থেকে মন্দিরটির নাম রাখেন 'ঢাকেশ্বরী মন্দির'।

* সিদ্ধান্ত: ধারণা করা হয়, এই ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নাম থেকেই কালক্রমে অঞ্চলটির নাম ঢাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

খ. ঢাক বাজানোর ঘটনা:

মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি যখন ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন আনন্দের বহিঃপ্রকাশস্বরূপ তিনি শহরে 'ঢাক' (বাদ্যযন্ত্র) বাজানোর নির্দেশ দেন। এই ঢাক বাজানোর ঘটনা লোকমুখে প্রচলিত হয়ে যায় এবং তা থেকেই শহরের নাম ঢাকা হয়ে যায়।

গ. 'ঢাক' বৃক্ষ থেকে উৎপত্তি:

অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, একসময় এই অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে 'ঢাক গাছ' (বুটয়া মনোস্পার্মা বা পলাশ গাছ) পাওয়া যেত। সেই 'ঢাক' বৃক্ষের প্রাচুর্য থেকেই স্থানটির নামকরণ হয়েছে ঢাকা।

ঘ. ঢাক্কা/ঢাকা ভাষা:

* কিছু পণ্ডিত মনে করেন, 'ঢাকাভাষা' নামে একটি প্রাকৃত ভাষা এই অঞ্চলে প্রচলিত ছিল, যা থেকে শহরের নামকরণ হয়েছে।


 আবার অনেকে মনে করেন, সংস্কৃত শব্দ 'ঢাক্কা' (যার অর্থ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা সীমান্ত ঘাঁটি) থেকে এই নামের উৎপত্তি, কারণ সামরিকভাবে ঢাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল।


মোগল সুবেদার ইসলাম খান শহরটিকে 'জাহাঙ্গীরনগর' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেও, সাধারণ মানুষ ও বিদেশি পর্যটকদের কাছে 'ঢাকা' নামটিই বহাল থাকে। লোকমুখে প্রচলিত ঢাকেশ্বরী মন্দির-এর কিংবদন্তি অথবা ঢাক বৃক্ষের উপস্থিতি — যে কারণেই হোক না কেন, এই নামটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে, প্রশাসনিক পরিবর্তনের পরেও এটিই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এভাবেই হাজার বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঢাকা তার বর্তমান নাম, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে টিকে আছে।  © Mahmudul Hasan Jahid.



৩৫



 ঢাকা শহরে রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা এবং এর ঐতিহাসিক প্রভাব।


উনিশ শতকের শেষার্ধে ঢাকা শহরে রেলের আগমন ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পূর্ববঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক বিশাল মাইলফলক। এটি কেবল যাত্রী বা পণ্য পরিবহনের একটি মাধ্যম ছিল না, বরং ঢাকা শহরের অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং নাগরিক জীবনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিশ্বজুড়ে পাটের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং প্রশাসনিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে ব্রিটিশ সরকার এই রেললাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেয়।


১৮৮৫ সালে প্রথম ঢাকা শহরে রেললাইন স্থাপন করা হয়।

এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছিল ঢাকা স্টেট রেলওয়ে কোম্পানি (Dhaka State Railway Company) কর্তৃক।


প্রথম রেলপথ ও বিস্তার:

 নির্মিত রেলপথটি ছিল মিটারগেজ (১,০০০ মিমি) এবং এটি ময়মনসিংহ থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, যার মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার।


 এই লাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুরোনো শহর ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত প্রথমে খুলে দেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জ ছিল বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত প্রধান নদী বন্দর ও পাটের বাণিজ্য কেন্দ্র।


 প্রথম ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনটি ১৮৯৫ সালে বর্তমান পুরান ঢাকার দক্ষিণ সীমানায় ফুলবাড়িয়া নামক স্থানে নির্মাণ সম্পন্ন হয়, যা মূলত 'ঢাকা স্টেশন' নামে পরিচিত ছিল। ফুলবাড়িয়া তখন ছিল এই অঞ্চলের প্রধান রেলওয়ে হাব।


উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব

ঢাকা স্টেট রেলওয়ে প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্যিক ও কৌশলগত।


 বাণিজ্যিক স্বার্থ: প্রধান পাট উৎপাদনকারী এলাকা ঢাকা ও ময়মনসিংহ থেকে কাঁচা পাট দ্রুত ও নিরাপদে নদীপথে কলকাতা বন্দরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই রেলপথ অপরিহার্য ছিল। এর ফলে পাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা সহজ হয়।


 যোগাযোগের উন্নতি: এটি কলকাতার সঙ্গে ঢাকার দ্রুত ও সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করে, যা প্রশাসন পরিচালনা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে সহায়ক হয়েছিল।


 শহরের বিকাশ: রেললাইনের পথ ধরেই পুরান ঢাকার বাইরে বিশেষ করে ফুলবাড়িয়া অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নতুন জনবসতি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠতে শুরু করে, যা ঢাকা শহরের আধুনিকায়নের প্রথম ধাপ হিসেবে চিহ্নিত।


১৮৮৫ সালে ঢাকা স্টেট রেলওয়ে কর্তৃক স্থাপিত এই রেলপথ ঢাকা শহরের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এই রেল যোগাযোগ ঢাকার নাগরিক জীবনে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনে এবং এটিকে পূর্ববঙ্গের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। © Mahmudul Hasan Jahid.


৩৬


নবাব আলীবর্দী খাঁ: মসনদের মোহ এবং মারাঠা ঝঞ্ঝা


নবাব সুজাউদ্দিন-এর প্রধান উপদেষ্টার পদে আসীন থাকা অবস্থাতেই বিচক্ষণ আলীবর্দী খাঁ (মির্জা মুহম্মদ আলী) বাংলার মসনদের প্রতি এক দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করেন। তাঁর প্রতিটি পরামর্শ যখন মুলুকের গতিপথ নির্ধারণ করে, তখন এই প্রশ্ন তাঁর মনে জাগা স্বাভাবিক ছিল—কেন তিনি স্বয়ং নবাব হবেন না? উড়িষ্যা ও বিহারের শাসনভার সামলানোর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আলীবর্দী খাঁর কাছে বাংলা ছিল স্বপ্নরাজ্য।


বাংলার মসনদ লাভ ও প্রতিকূলতা

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, ১৭৪০ সালের মে মাসে আলীবর্দী খাঁ কূটনীতি এবং সামরিক দক্ষতার মাধ্যমে বাংলার নবাবী অর্জন করেন। মোগল সম্রাট মুহম্মদ শাহের কাছ থেকে নভেম্বরে আনুষ্ঠানিক সনদ লাভ করে তিনি বাংলার পূর্ণ শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

নবাবী লাভের পর, আলীবর্দী খাঁ বাংলার শাসনব্যবস্থায় তাঁর পূর্বসূরি মুর্শিদকুলি খান-এর স্থিতিশীল মডেল ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন। কিন্তু তাঁর মসনদ-প্রাপ্তির আনন্দ ক্ষণস্থায়ী ছিল। বাংলার চারপাশ থেকে দ্রুতই তাঁকে যুদ্ধ ও বিদ্রোহের করাল গ্রাস গ্রাস করে ফেলে।

তাঁর ষোল বছরের নবাবী জীবনের প্রায় দশ বছর কেটেছে একটানা সংঘর্ষে। দেশীয় বিদ্রোহী, ক্ষমতাচ্যুত আফগানদের উৎশৃঙ্খলতা এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর—মারাঠা আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে তাঁকে নিরন্তর লড়তে হয়েছে। তিনি তাঁর পছন্দের ফৌজদারদের বিভিন্ন অঞ্চলে নিযুক্ত করেও নিশ্চিন্ত হতে পারেননি; বরং বারবার তাঁকে স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে নামতে হয়েছে।


বর্গীর হাঙ্গামা: এক নৃশংস অধ্যায়

১৭৪২ সাল থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত, প্রায় এক দশক ধরে, মারাঠারা বাংলায় মোট ছয়বার বিধ্বংসী অভিযান চালায়।

মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শিবাজী-র নেতৃত্বাধীন অভিযানগুলি মূলত দক্ষিণ ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরিদের আমলে বাংলায় যারা হামলাকারী রূপে এসেছিল, তারা ছিল নীতি-নৈতিকতাহীন এক নৃশংস বাহিনী। এরা ছিল মারাঠা শক্তির বেতনভুক্ত স্থায়ী হামলাকারী দুর্বৃত্ত। এদের অস্ত্র, ঘোড়ার খরচ এবং নিয়মিত বেতন সরকারিভাবে বহন করা হতো।


 ঐতিহাসিক লঘুকরণ: এই ভয়াবহ ও নৃশংস হামলাকে ইতিহাসে প্রায়শই 'বর্গীর হাঙ্গামা' নামে অভিহিত করে এর গুরুত্ব এবং ব্যাপকতা লঘু করে দেখা হয়েছে, ঠিক যেমনভাবে পরবর্তীকালে সাঁওতাল বিদ্রোহকে কতিপয় 'হাঙ্গামা' বা 'ডাকাতি' বলে ছোট করে দেখানোর প্রবণতা ছিল। সমসাময়িক বাংলার কথাকারদের লেখায় এই বর্গীদের অত্যাচারের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে, যা সেই সময়ের মানুষের যন্ত্রণার জীবন্ত দলিল।


শিলাদার: ঠিকে হামলাকারী

বর্গী ছাড়াও মারাঠা বাহিনীতে আরও এক ধরনের ভাড়াটে হামলাকারী ছিল, যাদের শিলাদার বলা হতো। এরা ছিল 'ঠিকে হামলাকারী'র মতো।

 নিজস্ব রসদ: শিলাদাররা নিজস্ব অস্ত্রশস্ত্র, খোরাকি (খাবার) এবং ঘোড়া নিয়ে আসত।

 নিয়োগের ভিত্তি: অস্ত্র ও অশ্ব চালনায় দক্ষতা থাকলেই তারা নিযুক্ত হতে পারত।

 উদ্দেশ্য: নগদ অর্থের বিনিময়ে যুদ্ধে অংশ নিলেও, হামলার মূল লক্ষ্য থাকত সম্পূর্ণ ধ্বংসসাধন এবং লুণ্ঠন।

প্রথম আক্রমণ: ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে (১৭৪২)

১৭৪২ সালের এপ্রিল মাসে, মারাঠা নেতা রঘুজী ভোঁসলে-এর প্রধানমন্ত্রী ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী প্রথমবার বাংলা আক্রমণ করে। এদের প্রধান কাজ ছিল সমগ্র দক্ষিণ বাংলা জুড়ে ব্যাপক লুটপাট চালানো।

আলীবর্দী খান উড়িষ্যায় কয়েক মাস ধরে বর্গীদের পিছু ধাওয়া করার পর মুর্শিদাবাদের দিকে ফিরছিলেন। সেই সময় মেদিনীপুরের রাজস্ব-সংগ্রাহকের কাছ থেকে খবর আসে যে মারাঠারা জয় গড়ের দিকে অগ্রসর হয়েছে। নবাব প্রথমে এই খবরকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি এবং ধীরেসুস্থে ফিরছিলেন।

কিন্তু যখন তিনি শাক্রা ও মোবারক মঞ্জিল-এ পৌঁছালেন, তখন তাঁর কাছে আরও নিশ্চিত খবর এল যে মারাঠারা পাচেত পেরিয়ে বর্ধমান আক্রমণ করতে চলেছে। সময় নষ্ট না করে, আলীবর্দী খাঁ দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়ে ১৭৪২ সালের ১৫ এপ্রিল বর্ধমানে পৌঁছান।

বর্ধমানে নবাবের অকস্মাৎ বিপন্নতা

নবাব শহরের বাইরে রানীসায়র দিঘির পাড়ে তাঁর শিবির স্থাপন করেন। উড়িষ্যা উদ্ধারের পর বেশিরভাগ সৈন্যকে সাওলাত জংয়ের তত্ত্বাবধানে মুর্শিদাবাদে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। তাই তাঁর সঙ্গে তখন ছিল মাত্র তিন থেকে চার হাজার অশ্বারোহী এবং চার থেকে পাঁচ হাজার বন্দুকধারী সিপাহী।

সেদিন রাতে নবাব আলীবর্দী খান হতবাক হয়ে যান যখন গভীর রাতে মারাঠারা তাঁর শিবির সম্পূর্ণভাবে ঘিরে ফেলে। সেই সঙ্কটময় মুহূর্তে, নবাবের সঙ্গে ছিলেন তাঁর প্রিয় দশ বছর বয়সী দৌহিত্র সিরাজদ্দৌলা, যিনি এই ভয়াবহ আক্রমণের নীরব সাক্ষী ছিলেন। © Mahmudul Hasan Jahid.


৩৭

 পিজিন ভাষা, ক্রিওল ভাষা ও উর্দু ভাষা

তেরো এবং আঠারো শতকে ক্যারিবিয়ান দ্বীপ হাইতি ছিল ফরাসি উপনিবেশ। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তখন এখানে হাজার হাজার দাস নিয়ে আসা হয়। এই আফ্রিকান দাসরা কথা বলত বেশ কয়েকটি আলাদা ভাষায়, আর শাসক গোষ্ঠীর ভাষা ছিল ফরাসি। ফলে এই লোকগুলোর জন্য যোগাযোগ করাটা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু একসাথে কাজ করতে হলে তো নিজেদের মধ্যে কথা বলতেই হবে। তাই এই মানুষগুলো প্রত্যেকের নিজেদের ভাষা থেকে কিছু কিছু শব্দ নিয়ে একটা অদ্ভুত নতুন ভাষা তৈরি করে। প্রত্যেক ভাষার সহজ শব্দগুলো সহজেই অন্যরা শিখে নিতে পারে। ফলে এক প্রজন্মের মধ্যেই একটা জগাখিচুরি মার্কা অদ্ভুত ভাষা তৈরি হয়। এই ভাষাতে তেমন কোনো গ্রামারের বালাই থাকে না। এই ধরণের ভাষাকে বলা হয় পিজিন ভাষা। কিন্তু আশ্চর্য একটা ঘটনা ঘটে দ্বিতীয় প্রজন্মে এসে। এই পিজিন ভাষা বলা লোকগুলোর বাচ্চারা যখন বড় হয়, তখন তারা নিজেদের অজান্তেই সেই ভাষাতে সঠিক গ্রামার তৈরি করে ফেলে। বাচ্চারা হয়ত জানেও না যে তারা একটা ভাষার ব্যাকরন তৈরি করে ফেলছে। নতুন প্রজন্মের এই ব্যাকরন যুক্ত ভাষাকে বলা হয় ক্রিওল ভাষা।  অ্যামেরিকার লুইসিয়ানা প্রদেশের আফ্রিকান বংশদ্ভুদ মানুষরা প্রায় আড়াইশত বছর ধরে ফ্রেন্স এবং স্প্যানিশ ভাষার মিশ্রনে তৈরি করা একটা ক্রিওল ভাষা ব্যবহার করে আসছে।  

দিল্লি ও মিরাটের আশেপাশে যে স্থানীয় ভাষা  এর নাম দেয়া হয় খাড়িবুলি, মুসলিম শাসকেরা সাধারণ জনগণের সাথে যোগাযোগের জন্য এই ভাষাই ব্যবহার করতেন । মুগল সম্রাট শাহজাহানের (১৬২৮-১৬৫৮) সেনানিবাসের নাম ছিল উর্দু-এ-মুআল্লা। ‘উর্দু’ একটি তুর্কি শব্দ, যার অর্থ সৈন্য। এখানে বিভিন্ন এলাকার সৈন্যরা খাড়িবুলি তথা হিন্দুস্থানিতেই কথা বলত। শাহজাহান তাঁর সেনানিবাসের নামে এ ভাষার নামকরণ করেন ‘উর্দু’ ফলে বহিরাগত এবং ধর্মান্তরিত ভূমিপুত্র মুসলিমদের, সেই সাথে সুফীদের খানকাহে লেখাপড়ার সুযোগপ্রাপ্ত নিম্নবর্গের হিন্দু জনগোষ্ঠীর লেখাপড়ার মাধ্যমও হয়ে ওঠে এই উর্দু। অর্থাৎ উত্তর ভারতে সমগ্র মুসলিম ও নিম্নহিন্দুর কথ্য ও লেখ্য ভাষা হয়ে ওঠে উর্দু। ১৬শ-১৯শ শতক পর্যায়ে উর্দু ভাষার উর্দুর বিকাশ ঘটেছিল দিল্লি, হরিয়ানার একাংশ,।১৪শ-১৬শ শতাব্দী পর্যন্ত দাক্ষিণাত্যে বাহামনি শাসনকালে বিশেষত মহারাষ্ট্র, কর্নাটক এবং বর্তমান তেলেঙ্গানায় উর্দু প্রভাব বিস্তার করতে থাকে এবং অনেকেই স্থানীয় শব্দ সহযোগে উর্দু ভাষা ব্যবহার করতে থাকেন। হায়দারাবাদে আজও বিশেষ টাইপ উর্দু উপভাষা চালু আছে। ব্রিটিশ আমলের গোড়ার দিকে মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যম ছিলো উর্দু, কারণ তখন হাদীস, ফিকাহ, তাফসির প্রভৃতি প্রধানত উর্দু ভাষায় লেখা হতো। পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববাংলার শহর ও গ্রাম-গঞ্জে উর্দু ভাষা প্রসারের প্রধান কারণ ছিলো মাদ্রাসার এ ধর্মীয় শিক্ষা। বাংলাদেশের মুসলিম অভিজাত শ্রেণির প্রায় সবাই উর্দু বলতে সক্ষম ছিলেন। উর্দু সাহিত্যের চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে দিল্লি, লখনৌ ও লাহোর কেন্দ্রের ন্যায় এক সময় বাংলার কলকাতা ও ঢাকা কেন্দ্রও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফার্সির দাপট কমাতে ও সাংস্কৃতিকভাবে মুসলিমদের পরাজিত করতে ১৮৩৭ সালে বিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিভিন্ন প্রদেশে ফারসির বদলে স্থানীয় ভাষার ব্যবহার শুরু করে। ফার্সিকে রিপ্লেস করতে তারা ১৮৫০ সালে ইংরেজি ও উর্দুকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত দেয়া হয়।

স্কুল, দপ্তর, আদালত, সরকারি প্রতিষ্ঠানে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সবার যোগাযোগের মাধ্যমে ছিল উর্দু। ১৮৬৪ সালে উর্দু ইন্ডিয়ান আর্মির ভাষা হিসেবে নির্ধারিত হয়, ১৮৩৫ সালে দিল্লিতে উর্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে দিল্লি কলেজ নামে পরিচিতি পায়। এই কলেজের লেখাপড়ার মাধ্যম ছিল উর্দু। এ ছাড়াও ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় উত্তর ভারতের লখনৌ, হায়দরাবাদ, গুজরাট প্রভৃতি অঞ্চলে উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের অগ্রগতি সাধিত হয়। ইংরেজরা ভারতের মাটি থেকে ফার্সি ভাষাকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল।  কাশ্মীর, তেলেঙ্গানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে উর্দু সরকারি ভাষা। 

আরবি ভাষায় 'প' বর্ণটি নেই। তারা 'পেপসি' কে বলতো 'বেবসি'। উর্দুতে 'প' হরফ যোগ করা হয়। উর্দু ভাষার ব্যাকরণ মূলত ফারসি ব্যাকরণের অনুরূপ।  ১৮৫০ সালে ইংরেজি ও উর্দুকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত দেয়া হয়। স্কুল, দপ্তর, আদালত, সরকারি প্রতিষ্ঠানে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সবার যোগাযোগের মাধ্যমে ছিল উর্দু। ১৮৬৪ সালে উর্দু ইন্ডিয়ান আর্মির ভাষা হিসেবে নির্ধারিত হয় 


দিল্লি ও মিরাটের আশেপাশের খাড়িবোলি উপভাষা থেকে এর উৎপত্তি, যেখানে ফারসি ও আরবি শব্দের ব্যাপক মিশ্রণ ঘটেছেবিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ কোটির বেশি মানুষের কথ্য ভাষা এটি, যা হিন্দি ভাষার সাথে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ । ফার্সি-আরবি নাস্তালিক লিপিতে ডান থেকে বামে লেখা হয়কথ্য স্তরে উর্দু ও হিন্দি প্রায় একই, যা একসঙ্গে হিন্দুস্তানি ভাষা নামেও পরিচিত, তবে তাদের লেখার লিপি ও শব্দভাণ্ডারে ভিন্নতা রয়েছেউর্দু সাহিত্য, বিশেষ করে শায়রি (কবিতা), গজল ও নজমের জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত [ 


১৮৬৭ সালে উত্তর প্রদেশ ও আওধ এর হিন্দু প্রতিনিধিরা উর্দুর পরিবর্তে হিন্দিকে সরকারি ভাষা করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে দাবি জানায়। বেনারসের বাবু শিবপ্রসাদ ছিলেন দেবনাগরি লিপিতে হিন্দি লেখার অন্যতম প্রস্তাবক (উইকিপিডিয়া)। উনিশ ও বিশ শতকে বেশ কিছু হিন্দি আন্দোলন সংঘটিত হয়। যেমন ১৮৯৩ সালের বেনারসের নাগরি প্রচারণী সভা, ১৯১০ সালে এলাহাবাদের হিন্দি সাহিত্য সম্মোলন ও ১৯১৮ সালের দক্ষিণা ভারত হিন্দি প্রচার সভা। ১৮৮০ সালকে হিন্দি ভাষার জন্মসাল হিসেবে ধরা হয়। ১৮৮১ সালে ফারসি হরফে উর্দুর পরিবর্তে দেবনাগরি লিপিতে হিন্দিকে বিহারের সরকারি ভাষা হিসেবে নির্ধারণ করা হয় (উইকিপিডিয়া)। মুসলিমরা দেবনাগরি লিপিতে হিন্দুস্তানি ভাষার সরকারি ব্যবহারের বিরোধিতা করতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার হিন্দি-উর্দু বিতর্ককে হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিভাজন হিসেবে দেখতে থাকতে।  ১৮৫০ এর পরবর্তীতেই ভারতীয় হিন্দুরা তাদের নিজেদের জন্য একটি সাধারণ ভাষার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে এবং দেবনাগরি লিপিতে লিখিত হিন্দুস্তানি ভাষার নামকরণ করা হয় হিন্দি। হিন্দুস্তানি ভাষা ফারসি প্রভাবিত আরবি হরফে লিখলে তা উর্দু। আর হিন্দুস্তানি ভাষা দেবনাগরি লিপিতে লিখলে তা হিন্দি। উর্দু ভাষা আরবি-ফারসি শব্দবহুল আর হিন্দি ভাষা সংস্কৃত শব্দ বহুল। 


৩৮

প্রেম কি উবে যায়?

মানবশরীর প্রতি মুহূর্তে বদলে যায়। বিশেষ করে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। বিজ্ঞানীরা কার্বন-১৪ ডেটিং প্রযুক্তিতে প্রমাণ পেয়েছেন, মানবশরীরে বেশির কোষের বয়স ৭ থেকে ১০ বছর হয়। যার নির্যাস, প্রতি ৭ থেকে ১০ বছরে শরীর প্রায় নতুন হয়ে যায়।  পুরনো কোষ মরে যায়, নতুন কোষের জন্ম হয় প্রতি নিয়ত। কার্বন-14 আইসোটোপ ব্যবহার করে গবেষণায় করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ৭ থেকে ১০ বছরের মধ্যে একটি মানবশরীর সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে নতুন হয়ে যায়। তবে শরীরের কিছু অংশের বদল ঘটে না। যেমন, চোখের রেটিনার কোষ, মগজের কোষ। সবকিছু পরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও, কিছু কোষ সারা জীবন একই থাকে। এই প্রশ্নটি প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক প্লুটার্কের 'শিপ অফ থিসিয়াস' প্যারাডক্সের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি জিজ্ঞাসা করেন, একটি জাহাজের সমস্ত অংশ প্রতিস্থাপন করা হলে কি একই থাকে? একইভাবে, আপনার সঙ্গী প্রতি মুহূর্তে একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে, কিন্তু ভালোবাসা আসে স্মৃতি, আবেগ এবং তাদের 'সারাংশ' থেকে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভালোবাসা কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ ও বিভিন্ন হরমোনের কার্যকলাপের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।  বিশেষ করে অক্সিটোসিন, যাকে ‘সংলগ্নতার হরমোন’ বলা হয়, এবং ডোপামিন, যা ‘সুখের হরমোন’ নামে পরিচিত, এই দুই রাসায়নিক উপাদান ভালোবাসার অনুভূতিকে শক্তিশালী করে। 



মাঝরাতে পাড়ার কুকুর কাঁদে কেন?

মানুষের বিশ্বাস, কুকুর অশরীরী আত্মা দেখতে পায়, রাতে কোনও প্রেতাত্মা দেখতে পেলে আতর্নাদ করে ওঠে। কিন্তু এই সব মানুষের ভ্রান্ত ধরাণা। এগুলো শুধুই কুসংস্কার,বিজ্ঞান বলছে, মানুষের মনোযোগ কাড়তে কুকুর রাতে কেঁদে ওঠে।   গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যখন কুকুরের মন খারাপ থাকে। তখন দুঃখ থেকেই রাতে কুকুর কেঁদে ওঠে।  কোনও দুর্ঘটনায় আঘাত পেলে বা শরীর খারাপ থাকলে কুকুর রাতে কেঁদে ওঠে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুকুরের নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে থাকে। সেই ভয় থেকেও অনেক সময় কুকুর মাঝরাতে কাঁদে।   



৩৯

পরিচ্ছন্নতার সংক্ষিপ্ততম ইতিহাস - ভারত ও ইংল্যান্ড

পাঁচশ বছর আগে ইংল্যান্ড-এ গ্রামের চাষিবাসী বরফ বা বৃষ্টির সময়ে একটা ঘরের মধ্যে শুয়োর, মুরগি নিয়ে সংসার যাত্রা নির্বাহ করতেন। সেই ঘরেই থাকত তাদের শিশু ও অপরিণত বয়সের সন্তান। সেখানে আবার রান্নাবান্না ও খাওয়াদাওয়াও হত। শহর ছিল পূতিগন্ধময়। স্নানের বালাই শীতের দেশের মানুষের কয়েকশ বছর আগেও বিশেষ ছিল না—প্রাক-বিজলী যুগে শীতে গরম জল পাওয়া ছিল এক বিলাসিতা। এমনকী আজ থেকে একশ বছর আগের সময়কাল নিয়ে তৈরি করা সেদিনের ফিল্ম My Fair Lady-র কথা মনে করা যেতে পারে। মনে আছে তো, প্রায় জোর করে এলাইজ ডু'লিটলকে প্রফেসর হেনরি হিগিন্স-এর বাড়িতে স্নান করানো হয়েছিল? স্নান ছিল গরিব মানুষের পক্ষে বিলাসিতা।

তবে হাত-মুখ সামান্য জলে পরিষ্কার করা হত। আর গ্রীষ্মের সময়ে এক আধবার স্নানের কথা তাদের মনে হত। মনে রাখা দরকার, মূল ও মূত্র ত্যাগের পরে ধৌত করবার কোনো পদ্ধতি তাদের ছিল না, এখনও নেই। অধিকাংশ মানুষের একটার বেশি জামা থাকতো না। স্বাভাবিকভাবেই, তাদের গায়ে থাকত দুর্গন্ধ। বড়ো মানুষেরা অবশ্য ঘটা করে প্রচুর সুগন্ধি মাখতেন। গায়ে, মাথায় খোসপাঁচড়া। প্লেগ, কুষ্ঠ, কলেরা ইত্যাদি মহামারি হত হামেশা। আর তাতে গাঁ কে গাঁ উজার হত।

শীতের দেশের মানুষের নিয়মিত স্নান একেবারেই আধুনিক কালের ঘটনা। আজকের একবিংশ শতকের শহুরে স্বাচ্ছন্দ্যের মাপকাঠিতে সে জীবন ছিল মলিন ও অপরিচ্ছন্ন।

আসলে, স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সেই সময়ে জনমানুষের ধারণা ছিল সীমিত। লন্ডন শহরে ১৭৩০ থেকে খোলা ড্রেনে ঢাকনা দেওয়া শুরু হল। আর গড়ে উঠল নিষ্কাশন ব্যবস্থা। ১৮৩০, ১৮৪০, ১৮৫০ সালের কলেরা মহামারি লন্ডন শহরে বর্জ্য নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে বাধ্য করল। মেট্রোপলিটন বোর্ড অফ ওয়ার্কস সমস্যা সমাধানের জন্য জোসেফ বাজালগেটকে নিয়োগ করেছিল। বাজালগেটের প্রকল্পটি অবশেষে ১৮৭৫ সালে সম্পন্ন হয়েছিল। তার নর্দমাগুলি শতাব্দী ধরে রাজধানীতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

এদিকে নদীমাতৃক ভারতবর্ষে ঘাটে বসে জল ঘাটবার ও স্নান করবার কোনো বিরাম কোনোদিনই ছিল না। দুধ, মাখনের জন্য ভারতবর্ষে চিরদিন মূল গৃহপালিত পশু ছিল গরু। গ্রামদেশে ছিল অফুরন্ত খড়। ছিল বাঁশ। তাই গরুকে আলাদা করে রাখবার জন্য চিরদিন এখানে ছিল গরুর ঘর। এইদেশে শুয়োর ও মুরগি খাওয়ার রেওয়াজ ৫০ বছর আগেও বিশেষ ছিল না। বোঝা যায়, অন্তত একটা সময় পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধিতে আমরাই এগিয়ে ছিলাম।

অবশ্য আজকের ভারতবর্ষ দেখলে এই ছোট্ট সুখ, গোপন আনন্দ পালিয়ে যায়। বর্ষার সময়ে শহর ডুবে থাকে হাঁটু ভেজা জলে, তাতেই ফেলছি থুতু, কফ। শহর খুঁজে পরিচ্ছন্ন শৌচস্থান পাওয়া যাবে না। অধিকাংশ দোকানদার ময়লা ফেলার জন্য একটা বালতি দোকানের সামনে রাখেন না। বড়ো বড়ো দোকান থেকে ছুড়ে মারছে প্লাস্টিক, কাগজের কাপ ইত্যাদি। আসবে তো ঝাড়ুদার দিনের শেষে ঝাড়ু দিতে।

একদিকে জনবিস্ফোরণ, আরেক দিকে পরিচ্ছন্নতাবোধের অভাব।

একদিকে বিশাল বিশাল মল, মাল্টিস্পেসালিটি হাসপাতাল, আর্কটিক থেকে এন্টার্টিকার খাবার দোকান, প্রতি রাস্তায় তিনটে বিরিয়ানির হাঁড়ি, দুটো চপ শিল্পের দোকান, একটা ফুচকা, আর ঝিমিয়ে থাকা ময়রার কাঁচে ঢাকা বারকোশ। খাচ্ছি (রাস্তায় দাঁড়িয়ে), ফেলছি (অবশ্যই রাস্তায়), বাড়ি ফিরছি মুখ মুছে।

অথচ এই দেশের শহরে পৃথিবীর প্রথম বাঁধানো নিষ্কাশন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, সে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে — সমগ্র উত্তর-পশ্চিম, উত্তর ও পশ্চিম ভারতে। আমি হরপ্পীয় সভ্যতার কথা বলছি।

‘বাড়িটাতে হাওয়া খেলে না, বারান্দাটাতে বসিলে হয়তো একটু পাওয়া যায়, কিন্তু একটু দূরেই ঝাঁজরি ড্রেন, সেখানে সারা বাসার তরকারীর খোসা,মাছের আঁশ,আবর্জনা, বাসি ভাত-তরকারী পচিতেছে।’ — অপরাজিত Madhusree Bandyopadhyay


৪০

জাভার বিখ্যাত ছায়া পুতুলের নাটক 

অনেক শত বছর আগে জাভা দ্বীপের এক ছোট গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই এক অদ্ভুত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত। গ্রামের মাঝখানে একটি বড় সাদা পর্দা টাঙানো হতো। পর্দার পেছনে জ্বালানো হতো একটি তেলের বাতি। আর সেই আলোর সামনে শুরু হতো চামড়া দিয়ে তৈরি পুতুলের নাচ।

গ্রামের মানুষ দলে দলে এসে বসত। শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ—সবাই। কেউ মাটিতে বসে, কেউ আবার শিশুকে কোলে নিয়ে। কারণ আজ রাতে আবার শুরু হবে জাভার বিখ্যাত ছায়া পুতুলের নাটক Wayang Kulit।

এই নাটকে চামড়া দিয়ে তৈরি পুতুল একটি সাদা পর্দার পেছনে নড়ানো হয়। সামনে বসে থাকা মানুষ সেই পুতুলের ছায়া দেখে গল্প উপভোগ করে। একজন গল্পকার পুরো নাটকের সব চরিত্রের সংলাপ নিজেই বলেন এবং পুতুলগুলো নড়ান। শত শত বছর ধরে জাভা অঞ্চলে এটি ছিল মানুষের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদন।

সেই সময় জাভা দ্বীপের মানুষ মূলত হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়েছিল। রামায়ণ ও মহাভারতের গল্প তাদের জীবনের অংশ ছিল। তাই মানুষ সেই পরিচিত গল্প শুনতেই পুতুল নাচ দেখতে আসত।

কিন্তু ধীরে ধীরে সেই গল্পের ভেতরে নতুন কিছু কথা ঢুকতে শুরু করল।

এক চরিত্র বলছে—সব মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার থাকা উচিত।

আরেক চরিত্র বলছে—মানুষকে দান করতে হবে, দরিদ্রকে সাহায্য করতে হবে।

আর কোথাও বলা হচ্ছে—এক সৃষ্টিকর্তার কাছে সবাই সমান।

মানুষ গল্প শুনছিল, কিন্তু অজান্তেই তারা নতুন চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিল।

এই পরিবর্তনের পেছনে ছিলেন Wali Songo নামে পরিচিত ৯ জন সুফি ইসলাম প্রচারক। তারা ১৪শ থেকে ১৬শ শতকের মধ্যে জাভা অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত একজন ছিলেন Sunan Kalijaga।

তিনি খুব ভালোভাবে বুঝেছিলেন যে জাভার মানুষ সরাসরি ধর্ম পরিবর্তনের কথা সহজে গ্রহণ করবে না। কারণ তারা শত শত বছর ধরে হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।

তাই তিনি একটি ভিন্ন পথ বেছে নেন।

তিনি মানুষের সবচেয়ে প্রিয় বিনোদন—Wayang Kulit—কেই দাওয়াহর মাধ্যম বানালেন। আগের গল্পই রাখা হলো, কিন্তু তার ভেতরে ধীরে ধীরে ইসলামের নৈতিক শিক্ষা যোগ করা হলো। যেমন—এক আল্লাহর ধারণা, ন্যায়বিচার, মানুষের প্রতি দয়া, দান-সদকা, নম্রতা এবং সৎ জীবনযাপনের কথা।

এই পুতুল নাচ শুধু ছোট অনুষ্ঠান ছিল না। অনেক সময় একটি শো পুরো রাত ধরে চলত। একটি বড় অনুষ্ঠানে প্রায় ২০০০ থেকে ৫০০০ মানুষ একসাথে বসে এই নাটক দেখত। জাভা দ্বীপের অসংখ্য গ্রামে নিয়মিত এমন অনুষ্ঠান হতো।

ফলে হাজার হাজার মানুষের সামনে বারবার গল্পের মাধ্যমে ইসলামের মূল্যবোধ তুলে ধরা হতো।

ইতিহাসবিদদের ধারণা অনুযায়ী, ১৫শ শতকের দিকে জাভা অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় ৪০,০০,০০০ থেকে ৫০,০০,০০০ (৪–৫ মিলিয়ন) মানুষের মধ্যে ছিল। তখনও বড় একটি অংশ হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্ম অনুসরণ করত।

কিন্তু পরবর্তী ১০০ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। স্থানীয় অনেক রাজা ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইসলাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

এই দীর্ঘ সময় ধরে সাংস্কৃতিক দাওয়াহ—বিশেষ করে পাপেট শো—মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসে গভীর প্রভাব ফেলে।

ধীরে ধীরে জাভা এবং আশেপাশের অঞ্চলে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। এই পরিবর্তন হঠাৎ করে হয়নি। বরং গল্প, সংস্কৃতি, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং সুফি প্রচারের মাধ্যমে সমাজে ধীরে ধীরে একটি বড় পরিবর্তন আসে।

আজকের ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। বর্তমানে দেশটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৮০,০০০,০০০ (২৮ কোটি)। এর মধ্যে প্রায় ২৩০,০০০,০০০ (২৩ কোটি) মানুষ মুসলিম।

ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই বিশাল মুসলিম সমাজ গড়ে ওঠার পেছনে শুধু রাজনীতি বা শক্তি কাজ করেনি। অনেক সময় মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর জন্য সংস্কৃতি ও গল্পের শক্তিই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

এই কারণেই Wayang Kulit শুধু একটি পুতুল নাচ নয়।

এটি এমন একটি সাংস্কৃতিক মাধ্যম, যার মাধ্যমে গল্প আর নাটকের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছেছিল ইসলামের বার্তা। @ Ariful Islam Adil




৪১

এই '৪' পদ্ধতিতে বাড়িতে চাল রেখে দেখুন, বছরভর থাকলেও একটাও পোকা ধারেকাছে ঘেঁষবে না

*এয়ারটাইট পাত্রে সংরক্ষণ করুন: চাল সর্বদা একটি পরিষ্কার, সম্পূর্ণ শুষ্ক, বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করা উচিত। যদি এটি প্লাস্টিক বা স্টিলের পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে ঢাকনাটি শক্তভাবে বন্ধ রাখুন। এটি পাত্রে আর্দ্রতা প্রবেশ করতে বাধা দেবে এবং পোকামাকড় আক্রমনের সম্ভাবনা হ্রাস করবে। তবে, পাত্রে চাল যোগ করার সময়, নিশ্চিত করুন পাত্রটি সম্পূর্ণ শুষ্ক। 

*নিম পাতা পাত্রে রাখুন: নিম পাতা চালের পাত্রে রাখতে পারেন। নিমপাতার তীব্র গন্ধ পোকামাকড় দূরে রাখে, দীর্ঘ সময়ের জন্য চাল, ডাল নিরাপদে রাখে।  

*চাল সূর্যের আলোয় রাখুন: চাল মাঝেমধ্যে সূর্যের আলোয় রাখতে হবে। যদি চাল সামান্য ভেজা থাকে, তাহলে সংরক্ষণের আগে কয়েক ঘণ্টা সূর্যের আলোয় রাখুন। সূর্যের আলো আর্দ্রতা দূর করে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণের ঝুঁকি কমায়। পর্যায়ক্রমে চাল সূর্যের আলোয় রাখলে পোকার সমস্যাও প্রতিরোধ করা যায়। চাল সূর্যের আলোতে রাখলে পোকামাকড় মারা যায়। 

*লবঙ্গ বা গোলমরিচ যোগ করুন: চাল সংরক্ষণের জন্য, আপনি পাত্রে ৮-১০টি লবঙ্গ বা কয়েকটি গোলমরিচ যোগ করতে পারেন। তার তীব্র গন্ধ পোকামাকড় এবং অন্যান্য পোকামাকড়ের বংশবৃদ্ধি রোধ করে। দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য এই পদ্ধতিটি বিশেষভাবে কার্যকর। 

৪২


ওমর খৈয়াম—এক বিখ্যাত গণিতবিদ

আজ পারসিক গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক ও কবি ওমর খৈয়াম ১৮ মে, ১০৪৮ সালে ইরানের খোরাসান অঞ্চলে তৎকালীন বিখ্যাত শহর নিশাপুরে এক তাঁবু ব্যবসায়ীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খোরাসান প্রদেশের অন্যতম বিখ্যাত পণ্ডিত শেখ মোহাম্মদ মানসুরির কাছ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি প্রথমে সমরখন্দ ও পরে বুখারায় চলে যান জ্ঞানার্জন ও কর্মোপলক্ষে।

খৈয়াম নিশাপুর থেকে তিন মাস যাত্রা করে উজবেকিস্তানের শহর সমরকন্দে যাওয়ার জন্য কাফেলার একটি দলে যোগ দেন। তখন সমরকন্দ ছিল বিদ্যার কেন্দ্র, এবং খৈয়াম সম্ভবত ১০৬৮ সালে, মাত্র ২০ বছর বয়সে সেখানে পৌঁছান। সমরকন্দে তিনি তার বাবার পুরানো বন্ধু আবু তাহিরের সাথে যোগাযোগ করেন, যিনি শহরের গভর্নর এবং প্রধান বিচারক ছিলেন। তাহির, খৈয়ামের সংখ্যার অসাধারণ প্রতিভা লক্ষ্য করে তাঁকে চাকরি দেন। খৈয়াম তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন বীজগণিত এবং জ্যামিতি শিক্ষক হিসেবে। বীজগণিতের ক্ষেত্রে খৈয়াম যখন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেন, তখন তাঁকে রাজার কোষাগারে চাকরি দেওয়া হয়।

বিভিন্ন বিষয়ে পণ্ডিত, খৈয়াম, সারাজীবন চেষ্টা করে গেছেন রকমারি কাজের মধ্যে সেতু বন্ধন করতে। দিনের বেলা বীজগণিত ও জ্যামিতি পড়ানো, বিকালবেলা সেলজুক রাজা মালিক শাহ-এর দরবারে উপদেষ্টার কর্ম সম্পাদন, আর রাতে জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা—এই ছিল তাঁর প্রাত্যহিক জীবন। ১০৭০ সালে তাঁর লেখা গ্রন্থে, 'Treatise on Demonstration of Problems of Algebra and Balancing, এতে তিনি বীজগণিতের কিছু মৌলিক সূত্র লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের বিভিন্ন পদ্ধতি এই বইয়ে বর্ণনা করেন।

এই গ্রন্থে তিনি দুঃখ করেছেন বীজগণিতে অধিক মনোযোগ ও সময় না দেবার জন্য।

I was unable to devote myself to the learning of this algebra and the continued concentration upon it, because of obstacles in the vagaries of time which hindered me.

এর সঙ্গে আবার তিনি জ্যোতির্বিদ্যা সারণী সংকলন করেন এবং ক্যালেন্ডার সংস্কারে অবদান রাখেন।

মালিক শাহ যখন ক্যালেন্ডার সংস্কার করার জন্য সংকল্পবদ্ধ হলেন, ওমর ছিলেন তখনকার আটজন পণ্ডিতের একজন যাদের এটি করার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল। ঐতিহাসিক গিবন বলেছেন, ‘এর ফলে জালালি যুগের (যাকে জালাল-উদ-দিন বলা হয়)’ গণনার পদ্ধতি জুলিয়ান ক্যালেন্ডারকে ছাড়িয়ে গেছে এবং গ্রেগরিয়ান স্টাইলের নির্ভুলতার কাছে পৌঁছেছে।’ [অনুবাদ লেখকের]

সে ছিল এক যুগ যখন ইসলামিক পণ্ডিতরা জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় পৃথিবীতে টক্কর দিয়েছেন ও নাম রেখে গেছেন।

অবশ্য, যুগে যুগে যা হয়েছে, খৈয়ামও গোঁড়া মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হন, তাঁরা মনে করেন যে খৈয়ামের প্রশ্ন করার যে মনোভাব তা বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। 

আমরা কবি, প্রেমিক ওমর খৈয়ামকে মনে রেখেছি। ভুলে গেছি গণিতবিদ ওমর খৈয়ামকে। অথচ জীবৎকালে তিনি বিখ্যাত ছিলেন গণিতবিদ হিসেবে।

এখনও কি গণিতবিদ খৈয়ামকে নিয়ে চর্চা করবার সময় হয়নি? আসুন আজকে শ্রদ্ধা জানাই পারসিক গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিদ, দার্শনিক ও কবি ওমর খৈয়ামকে। আর আশা করি তাঁর অসমাপ্ত কাজের ধারা আবারও এগিয়ে নিয়ে যাবে আজকের বিজ্ঞান অনিসন্ধিৎসু মানুষ।

তথ্যসূত্র-

১) B A Rosenfeld, A P Youschkevitch, Biography in Dictionary of Scientific Biography (New York 1970-1990).

২) Biography in Encyclopaedia Britannica. http://www.britannica.com/biography/Omar-Khayyam


৪৩


‘আধুনিক মানুষ’-এর ‘মহাপরিযান’ (আউট অফ আফ্রিকা মাইগ্রেশন)

ভূতাত্ত্বিক আবহাওয়ার গ্রাফ থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, আজ থেকে প্রায় ৭১ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে নেমেছিল অতি শীতল যুগ। তদুপরি ওই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে ভয়ঙ্করতম আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ, যাকে তোবা বিস্ফোরণ বলা হয়, পৃথিবীর তাপমাত্রাকে আরও কমিয়ে দেয়। তখন পৃথিবী হিমেল ঠাণ্ডা, অতিমাত্রায় শুকনো। মেরু অঞ্চলের তুষার-টুপি সমুদ্রের জল টেনে নিয়ে স্ফীতকায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ ক্রমশ নীচে নেমে যাচ্ছে, নতুন ভূতল জেগে উঠেছে। তাপমাত্রা কমে গেছে অন্তত ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস, সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রায় ১০০ মিটার নীচে নেমে গেছে। পূর্ব আফ্রিকার গ্রেট রিফ্ট ভ্যালি মানুষের থাকার অনুপযুক্ত হয়ে যায়। পূর্ব আফ্রিকা ভয়াবহ খরার কবলে পড়ে; মালাউই লেকের জলের পরিমাণ কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ কমে গেছিল।

সেই সময়ে, সমুদ্র শুকিয়ে ছোটো হয়ে যাবার ফলে ইথিওপিয়া ও আরবভূমি স্থলপথে নিজেদের প্রায় ছুঁয়েছে। মধ্যে কেবল সামান্য কয়েক মাইল অগভীর সাগর। রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যবর্তী বেরিং প্রণালী তখন বরফে আচ্ছাদিত; পায়ে-চলা পথে সংযুক্ত করেছে দুই মহাদেশকে, তাকে বলে বেরিঙ্গিয়া বা বেরিং ব্রীজ। যুক্ত হয়ে গেছিল মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া ভূখণ্ড (যাকে সুন্দাল্যান্ড বলে); সেই ভূখণ্ড বড়ো হতে হতে প্রায় অস্ট্রেলিয়াকে ছুঁয়েছিল (চিত্র ১ দেখুন)।

এই ক্রান্তিকালে মানব জনসংখ্যা একেবারে তলানিতে। বৈজ্ঞানিকদের অনুমান পৃথিবীতে অর্থাৎ আফ্রিকাতে তখন টিঁকে আছে সামান্য কিছু ‘হোমো সেপিয়েন্স’, মাত্র হাজার দশেক হবে। পূর্ব আফ্রিকার ওই গুটিকয় মানুষের টিঁকে থাকার সম্ভাবনা কমে আসছিল দ্রুত। তখন ‘হোমো সেপিয়েন্স’ লুপ্ত হবার সামনে দাঁড়িয়ে। সেই সময়, তাদের এক দল বেঁচে থাকার প্রয়োজনে হাঁটতে শুরু করে। নিজেদের রক্ষা করতে অল্প কিছু মানুষ ঠাণ্ডায় বন্ধ্যা ভূখণ্ড ছেড়ে শুরু করে এক নিরুদ্দেশ যাত্রা।

গতকালের আমার পোস্ট-এর পরে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এমনও হতে পারে সেই সময়ে মানুষ নৌকা করে সমুদ্র পারাপার করেছে। আসলে সেই সময়ে মানুষের প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছিল খুবই কম। তারা এমনকী তখনও সুচও তৈরি করেনি। তখনও পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো প্রাণী কোনো যানবাহন তৈরি করে ব্যবহার করেছে এমন প্রমাণ নেই। এর প্রায় ২০ হাজার বছর পরে, হোমো সেপিয়েন্স ভেলা তৈরি করে। আর সেই ভেলা ব্যবহার করা হয়েছে খুবই সামান্য দূরত্ব যেতে। তারা ভেলাতে করে টিমোর সমুদ্র পার হয়ে অস্ট্রেলিয়াতে পৌঁছেছে। মহাসাগর পারাপার করবার প্রযুক্তি এসেছে ইতিহাসের কালে।

যাহোক, যা বলছিলাম, তারা আফ্রিকার এরিট্রিয়া, জিবুটি থেকে বাব-এল-মান্দেব প্রণালী অতিক্রম করে চলে যায় ইয়েমেন। কয়েক মাইল অগভীর সমুদ্র পথ পেরিয়ে তারা চলে আসে এশিয়াতে (চিত্র ১)। আরবভূমিতে তখন জলবায়ু ছিল মনুষ্যবাসের অনুকূল। অপেক্ষাকৃত সহায়ক পরিবেশে জনসংখ্যার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অনিবার্যভাবে আবার বড়ো দলগুলি থেকে ছোটো আরেক গোষ্ঠী পশ্চিম এশিয়া থেকে ইরান, আফগানিস্তান হয়ে সিন্ধু নদ পেরিয়ে ভারতভূমিতে চলে গেছে।

মূলত সমুদ্রতীর ধরে দীর্ঘ এই পথ তারা পাড়ি দিয়েছে। হাতে ছিল সূচ্যগ্র ফলকযুক্ত পাথরের বল্লম ও কুঠার। তারা আগুনে পুড়িয়ে রান্না করে খাবার খেয়েছে। এই বঙ্গের নদী-নালা অতিক্রম করে তাদের একদল মায়ানমারের দিকে হেঁটে গেছে। পৌঁছে গেছে সুন্দাল্যান্ড-এ। তখন সুন্দাল্যান্ড স্ফীত হয়ে অস্ট্রেলিয়ার কাছে চলে গেছিল। জাভা দ্বীপের পূর্বে টিমোর দ্বীপে অবস্থিত জেরিমালাই শেল্টার পর্যন্ত তখন ভয়াল, নিঝুম বালু ও প্রবাল দ্বীপপথে চলে যাওয়া যেত (চিত্র ১)। তবে পূর্ব টিমোরের পরে এমনকী সেই সময়েও ছিল সমুদ্র। এই অংশ ডিঙি করে পারাপার হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

মহাপরিযানের একটা দল থেকে গেছিল আরবভূমিতে, ইজরায়েল-এ। বেশ কিছু কাল পরে সেখান থেকে এক জনগোষ্ঠী চলে যায় ইউরোপের দিকে। তারা ইউরোপ পৌঁছে যায় আজ থেকে অন্ততপক্ষে ৪৬ হাজার বছর আগে। যে শাখাটি ইয়েমেন থেকে ভারতের দিকে এসেছিল, তাদের একটি উপশাখা আবার ভারতে প্রবেশ না করে চীন ও সাইবেরিয়ার দিকে চলে যায়। অবশেষে সাইবেরিয়া থেকে একটা অংশ চলে আসে আমেরিকাতে।

৭২-৭০ হাজার বছর আগে এক দল ‘আধুনিক মানুষ’ সফলভাবে আফ্রিকা ছেড়েছিল। এই মহাপরিযান সফল হয়। এই দেশান্তরগমনকে ‘মহাপরিযান’ বলেছি কারণ ওই সময়ে আফ্রিকা থেকে যারা বেরিয়ে এসেছিল, আফ্রিকার বাইরে আজকের সব ‘আধুনিক মানুষ’ তাদেরই বংশধর। তাই আমাদের অনুসন্ধান ও মনোযোগ মূলত এই মহাপরিযান নিয়ে। একে ইংরেজিতে বলা হয় ‘আউট অফ আফ্রিকা’ পরিযান।

তথ্যসূত্র

· Stephen Oppenheimer, “Out-of-Africa, the peopling of continents and islands: tracing uniparental gene trees across the map,” Phil. Trans. R. Soc, B367, (2012):770–784.

· Amanuel Beyin, “Upper Pleistocene Human Dispersals out of Africa: A Review of the Current State of the Debate,” Int J Evol Biol., 615094 (2011).


৪৪


থাইল্যান্ড-এ সুপারি চিবানোর ছোট্ট ইতিহাস

চার হাজার বছরের পুরানো এক সমাধিস্থল থেকে গবেষকরা একজন নারীর দাঁতে আটকে থাকা আঠালো বস্তু (প্ল্যাক) বিশ্লেষণ করে বলেছেন, তাঁরা ওই নারীর সুপারি ব্যবহারের প্রমাণ পেয়েছেন। সম্ভবত অত আগেও মানুষ সুপারি চিবাতো।

চার হাজার বছর আগে ভারতবর্ষে হরপ্পীয় সভ্যতার ঐতিহ্যের সময়। অনেকে দাবি করেন ওই অঞ্চলেও সুপারির ব্যবহার ছিল, তবে এই বিষয়ে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত বিশাল এলাকাতে মানুষ সুপারি চিবিয়ে খায়। সুপারি খেলে দাঁতে দাগ পড়ে। এখনো বাংলাতে সাধারণত পান পাতার ভেতরে চুন দিয়ে সুপারি চিবিয়ে খাওয়া হয়—এর কিন্তু জটিল শারীরিক ও মানসিক প্রভাব আছে। সুপারি খেলে একটা চনমনে ভাব আসে, উদ্দীপনা ও উচ্ছ্বাসের অনুভূতি হয়। এখন অবশ্য ডাক্তারেরা সুপারি খেতে নিষেধ করেন, এর ফলে ক্যান্সার হতে পারে।

যাহোক, থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নৃতত্ত্ববিদ পিয়াউইত মুনখাম, বলেছেন ইতিহাসের দীর্ঘ সময়কাল ধরে সুপারি চিবানো হয়েছে—সম্ভবত মানসিক চাপ উপশম এবং মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য ছিল এর ব্যবহার।

সুপারি খাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য, গবেষকরা থাইল্যান্ডের নং রাচাওয়াত সমাধিস্থলে ছয় ব্যক্তির দাঁতের থেকে ৩টি নমুনা বিশ্লেষণ করেছেন। দাঁতের এই প্ল্যাক প্রত্নতাত্ত্বিক টাইম ক্যাপসুলের মতো, এর ক্ষয় হয় না; একজন ব্যক্তি তার জীবনে কী খাবার খেয়েছেন, কী ধরনের নেশা করেছেন তা তার প্ল্যাক-এ থেকে যায় আর তার মাইক্রোস্কোপিক প্রমাণ পরেও পাওয়া যায়।

নেশা ছাড়বেন কিনা ভেবে দেখতে পারেন। কয়েক'শ বছর পরে কিন্তু উত্তর প্রজন্ম জেনে যাবে নেশার কথা।

সূত্র

1. 4,000-year-old teeth record the earliest traces of people chewing psychoactive betel nuts, frontier,  


৪৫


ইলা মিত্র ফুচিকের বোন

১৯৪০-এর দশকে, আত্মরক্ষামূলক নারী সংগঠন ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ গঠিত হয়। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এই সংগঠনের জন্ম। এই সংগঠনে যুক্ত ছিলেন রানী মিত্র দাশগুপ্ত, রেণু চক্রবর্তী, কমলা মুখোপাধ্যায়, ইলা মিত্র, গীতা মল্লিক, মণিকুন্তলা সেন ও আরও অনেকে । দুর্ভিক্ষের সময় 'মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি'র সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা অন্যান্য মহিলারা গ্রামীণ মহিলাদের এই আন্দোলনে আনতে চেয়েছিলেন। যদিও পুরুষ কৃষকরা সন্দেহপ্রবণ ছিলেন, তবুও তারা গ্রামীণ মহিলাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। নাজিমুন্নেসা আহমেদ, রাবেয়া বেগম, মাকসুদা বেগম, লাইলা আহমেদ, তাসমিনা খাতুনের মতো মুসলমান নারীরাও এতে যোগদান করেন। বাংলার মহিলারা এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তারা কখনো পুরুষের ধান কাটায় পাহারা দিয়েছেন, কখনো বা শত্রুদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন, আবার কখনো তির-বল্লম হাতে তুলে নিয়েছেন।

ইলা মিত্রের বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীন বাংলার একাউন্টেন্ট জেনারেল। ইলা সেন যখন বেথুন কলেজে বাংলা সাহিত্যে ছাত্র তখন থেকেই তাঁর সঙ্গে রাজনীতির পরিচয় ঘটে। সময়টা ছিল ১৯৪৩ সাল, ইলা সেন কলকাতা মহিলা সমিতির সদস্য হলেন। হিন্দু কোড বিলের বিরুদ্ধে মহিলা সমিতির সক্রিয় সদস্য হিসেবে এই আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কলকাতা থেকে লেখাপাড়া শেষ করবার পরে ১৯৪৫ সালে ইলা সেনের বিয়ে হয় বিশিষ্ট দেশকর্মী রমেন্দ্র নাথ মিত্রের সঙ্গে। রমেন্দ্র নাথ মিত্র রামচন্দ্রপুর হাটের জমিদার মহিমচন্দ্র ও বিশ্বমায়া মিত্রের ছোটো ছেলে।

জমিদারি বাড়িতে তিনি যেন হাঁপিয়ে উঠলেন। সেই সময়ে রমেন্দ্র নাথ মিত্রের বন্ধু আলতাফ মিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়ির কাছেই কৃষ্ণগোবিন্দপুর হাটে, (রামচন্দ্রপুর হাট'-এর কাছে অবস্থিত এলাকা) মেয়েদের জন্য একটি স্কুল খোলা হল। গ্রামের মানুষের নিরক্ষর মেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার দায়িত্ব নিতে এগিয়ে এলেন ইলা মিত্র। বৃহত্তর সমাজ সেবার কাজের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন এলাকার রানীমা।

উল্লেখ করা দরকার জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য রমেন্দ্র নাথ মিত্র নিজের পারিবারিক ঐতিহ্য ত্যাগ করে কৃষকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। স্বামী রমেন্দ্র নাথ মিত্রের কাছে জমিদার ও জোতদারের হাতে বাংলার কৃষকদের নিদারুণ বঞ্চনার কাহিনী শুনে স্বামীর সঙ্গে জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তিনি কৃষকের পাশে এসে দাঁড়ালেন।

১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্ব ছিলেন ইলা মিত্র। নাচোল হল এই রাজশাহীর একটি অংশ।

ছিলেন অসীম সাহসী। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লিগ দাঙ্গা শুরু করলে কমিউনিস্ট পার্টি দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকায় সেবা ও পুনর্বাসনের কাজ করতে এগিয়ে আসে। এই সময় ইলা মিত্র নোয়াখালীর দাঙ্গা বিধ্বস্ত হাসনাবাদে পুনর্বাসনের কাজে চলে যান।

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের বহু হিন্দু পরিবার ভারতে চলে যায়। কিন্তু ইলা মিত্রের শাশুড়ি রাজশাহীতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন—ইলা মিত্র ও রমেন মিত্র সেখানে রয়ে গেলেন। পাকিস্তান হবার পরও তেভাগা আন্দোলন অব্যাহত থাকে। ১৯৪৯ সালে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে সমগ্র নাচোলে তেভাগা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। নাচোলের কৃষকরা বিশেষ করে জনজাতি সাঁওতালরা ছিলেন এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি।

মুসলিম লিগ সরকার পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন হয়ে কঠোর হাতে এই আন্দোলন দমন করে। কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারের এই দমননীতির ফলে কমিউনিস্ট ও কৃষক আন্দোলনের নেতারা আত্মগোপন করে কাজ করতে থাকেন। ইলা মিত্র এবং রমেন মিত্রও নাচোলের চণ্ডীপুর গ্রামে আত্মগোপন করে থাকেন।

১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রোহনপুরে পুলিশের হাতে ইলা মিত্র গ্রেফতার হলেন। তারপরে তাঁর উপরে পুলিশের বর্বর অত্যাচার ভয়াবহ মধ্যযুগীয় নির্যাতনের কথা মনে পড়িয়ে দেয় । রাজশাহী আদালতে ইলা মিত্র ইংরেজিতে লিখিত যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তা থেকে তাঁর ওপর যে নির্মম অত্যাচার হয়েছিল সে বিষয়ে জানা যায়। ইলা মিত্র কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নির্যাতনের যে বিবৃতি দিয়েছেন, তার একটি ছোটো অংশ তুলে দিলাম—

‘সেলের মধ্যে আবার এসআই সিপাইদেরকে গরম সিদ্ধ ডিম আনতে হুকুম দিল এবং বললো ‘এবার সে কথা বলবে’। তারপর চার পাঁচজন সিপাই আমাকে জোরপূর্বক ধরে চিৎ করে শুইয়ে রাখল। একজন আমার যৌনাঙ্গের মধ্যে একটি গরম সিদ্ধ ডিম ঢুকিয়ে দিল। আমার মনে হচ্ছিলো আমি যেন পুড়ে যাচ্ছিলাম। এরপর আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি।

৯/১/৫০ তারিখে সকালে আমার জ্ঞান ফিরে এল, তখন উপরোক্ত এসআই এবং কয়েকজন সিপাই আমার সেলে এসে তাদের বুট দিয়ে আমার পেটে লাথি মারতে শুরু করল। এরপর আমার ডান পায়ের গোড়ালিতে একটি পেরেক ফুটিয়ে দেওয়া

হল। সে সময় আধা-চেতন অবস্থায় পড়ে থেকে আমি এসআইকে বলতে শুনলাম, ‘আমরা আবার রাত্রিতে আসছি এবং তুমি যদি স্বীকার না কর তাহলে সিপাইরা একে একে তোমাকে ধর্ষণ করবে। গভীর রাত্রিতে এসআই এবং পুলিশেরা ফিরে এল এবং তারা আমাকে সেই হুমকি দিল। কিন্তু আমি যেহেতু তখনও কাউকে কিছু বলতে রাজি হলাম না, তাদের মধ্যে তিন-চারজন আমাকে ধরে রাখল এবং একজন সিপাই সত্য সত্যই ধর্ষণ করতে শুরু করল। এরপর আমি আবার অজ্ঞান হয়ে পড়লাম।

পরদিন ১০/১/৫০ তারিখে যখন জ্ঞান ফিরে এলো তখন আমি দেখলাম, আমার দেহ থেকে দারুণভাবে রক্ত ঝরছে, আর আমার কাপড়-চোপড় রক্তে সম্পূর্ণ ভিজে গিয়েছে। সেই অবস্থায় আমাকে নাচোল থেকে নবাবগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নবাবগঞ্জের জেল গেটের সিপাইরা জোরে ঘুষি মেরে আমাকে অভ্যর্থনা জানাল।’

কবি গোলাম কুদ্দুস তাঁকে নিয়ে দীর্ঘ কবিতায় লেখেন-

ইলা মিত্র ফুচিকের বোন।

সূত্র:

ড. নিবেদিতা দাশ পুরকায়স্থ, মুক্তিমঞ্চে নারী, প্রিপ ট্রাস্ট, ১৯৯৯, ঢাকা

মিনতি সেন, শুভাশীষ গুপ্ত, উত্তর বাংলার জেলাগুলির কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস, প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড



৪৬



রয়েল সোসাইটি অফ লন্ডন

রয়েল সোসাইটি অফ লন্ডন (Royal Society of London ) হল বিশ্বের প্রাচীনতম বৈজ্ঞানিক সমিতি। ব্রিটেনে বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রচারের জন্য ২৮ নভেম্বর ১৬৬০ সাধারণ অব্দে বিজ্ঞানের জগতের শীর্ষস্থানীয় এই সংস্থা তৈরি হয়েছিল। ওই বছর ১২ জন বিজ্ঞানী মিলে 'ফিজিকো-ম্যাথমেটিক্যাল এক্সপেরিমেন্টাল লার্নিং’ (College for the Promoting of Physico-Mathematical Experimental Learning') বিজ্ঞান প্রচারের উদ্দেশ্যে একটি কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওই বৈঠকে সেদিন উপস্থিত ছিলেন রবার্ট বয়েল। রবার্ট বয়েল-এর (বয়েলস' ল্য) নামের সঙ্গে এখন তো স্কুলের নিচু ক্লাসের ছাত্ররাও পরিচিত। এর প্রাথমিক সদস্যদের মধ্যে রবার্ট হুক, ক্রিস্টোফার রেন, আইজ্যাক নিউটন এবং এডমন্ড হ্যালি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। রাজা চার্লস ২ এর কাছ থেকে এরা একটি রয়্যাল চার্টার এবং একটি অফিসিয়াল নাম পেয়েছে: প্রাকৃতিক জ্ঞানের উন্নতির জন্য লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি। এই সমিতির সহকর্মীরা (ফেলো) ১৭১০ সাল পর্যন্ত ‘বিশপস গেট’-এর গ্রেশাম কলেজের একটি ঘরে তাদের সাপ্তাহিক মিটিং করতেন; শুধুমাত্র ১৬৬৬ সালে লন্ডনের গ্রেট ফায়ার-এর জন্য বৈঠক হয়নি। ৩৬৪ বছর ধরে একনাগাড়ে এই সংস্থা বিজ্ঞানের আলোচনা ও প্রবন্ধ প্রকাশে উৎসাহ দান করছে।

রয়েল সোসাইটির সেক্রেটারি হেনরি ওল্ডেনবার্গ বিশ্বের প্রথম বিজ্ঞান জার্নাল-এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশ করেন। তা এখনো চলছে (The Philosophycal Transactions)। এটি বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত বিজ্ঞান জার্নাল। রয়্যাল সোসাইটি রবার্ট হুকের মাইক্রোগ্রাফিয়া প্রকাশ করে, যেখানে একটি অণুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে মাছি সহ অন্যান্য ল্যান্ডমার্ক ছবি আঁকা রয়েছে। বইটি একটি জৈবিক পরিভাষা হিসাবে কোষ বা কোশ শব্দটি তৈরি করেছে।

রয়্যাল সোসাইটি স্যার আইজ্যাক নিউটন-এর বিখ্যাত 'প্রিনকিপিয়া ম্যাথমেটিকা' (মহাকর্ষের ক্রিয়া বর্ণনা) এডমন্ড হ্যালির সহায়তায় ১৬৭৭ সালে প্রকাশ করেছে। এটি সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী বইগুলির মধ্যে একটি। ১৭৬৯ সালে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন রয়্যাল সোসাইটির কাছে একটি চিঠিতে একটি ঘুড়ি এবং একটি চাবি ব্যবহার করে বজ্রপাতের বৈদ্যুতিক প্রকৃতি বর্ণনা করেছেন। এটি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগুলির মধ্যে একটি। ১৮৩৯ সাল থেকে চার্লস ডারউইন রয়েল সোসাইটির নির্বাচিত ফেলো। বিবর্তন নিয়ে কাজের জন্য তাঁর নামে ডারউইন মেডেল চালু করে। প্রথম এই মেডেল পেয়েছিলেন আলফ্রেড ওয়ালাস। তবে ১৮৫৯ সালে ‘অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস’ বিতর্কিতভাবে উদ্ধৃতি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

এই সংস্থা প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানের প্রসার করেছে। তবে তার সাথে রক্ষণশীলতার তকমা এদের গায়ে সবসময়েই এঁটে ছিল। জেমস কুককে তাহিতি দ্বীপে যাত্রার খরচ এরাই দিয়েছে। সেই যাত্রার ফলেই অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ব্রিটিশ কলোনি হয়ে ওঠে। এটি ব্রিটেনের প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান আবার বিভিন্ন ধরণের রয়্যালটির সাথেও দিব্বি মিলেমিশে সুখী পরিবারের মত এরা দিন কাটিয়েছে। বর্তমানে এই সংস্থায় প্রিন্স এন্ড্রু সদস্য নির্বাচিত হলে কিছু সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এখানে প্রথম মহিলা পূর্ণ সদস্য হতে পেরেছেন মাত্র ১৯৪৫ সালে। তবে মনে রাখতে হবে বিংশ শতকের আগে ইংল্যান্ড-এ নারী শিক্ষার ব্যাপ্তিও বিশেষ ছিল না। ওই সদস্যের নাম Kathleen Lonsdale। ১৯৫৫ সাল থেকে বিদেশীদেরও সদস্য করা হচ্ছে।

১৭০৩ -১৭২৭ সাল পর্যন্ত স্যার আইজ্যাক নিউটন এই সংস্থার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সংস্থার প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত হতে হয়। আরও কয়েকজন বিখ্যাত প্রেসিডেন্টের নাম উল্লেখ করছি; ১৮৮৩-১৮৮৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন জীববিজ্ঞানী টমাস হাক্সলি, ১৮৯০-১৮৯৫ পর্যন্ত পদার্থবিদ লর্ড কেলভিন। হ্যাঁ ঠিকই ভেবেছেন, তাঁর নামেই অ্যাবসলিউট তাপমাত্রার কেলভিন স্কেলের নামকরণ করা হয়েছে। আছেন জর্জ স্টোকস (Navier–Stokes equations মনে করুন), লর্ড রালে, আর্নেস্ট রাদারফোর্ড ইত্যাদি বিজ্ঞানের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা।

এই সংস্থায় দ্বিতীয় ভারতীয় সদস্য ছিলেন অংকের অবিশ্বাস্য প্রতিভার অধিকারী শ্রীনিবাস রামানুজন। প্রথম সদস্য ছিলেন পার্সি ইঞ্জিনিয়ার আর্দাশিয়া কার্সিটি (Ardaseer Cursetjee)। জগদীশ চন্দ্র বোস এই সমিতির নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। সি ভি রমন ছিলেন চতুর্থ ভারতীয় সদস্য।

সাম্প্রতিককালে কয়েকজন ভারতীয় বর্তমানে রয়েল সোসাইটির সদস্য ছিলেন মন্জুল ভার্গব, গগনদীপ কাং (প্রথম ভারতীয় মহিলা সদস্য) এবং ইউসুফ হামেইড (ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি সিপলার চেয়ারম্যান)। এহেন রক্ষণশীল সংস্থায় ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী ভেঙ্কটরামান রামকৃষ্ণন (২০১৫-২০২০। প্রেসিডেন্টের লিস্টে খুঁজে পেতে আর কোন অশ্বেতকায়কে পেলাম না। বর্তমান প্রেসিডেন্ট স্যার আড্রিয়ান স্মিথ।

তথ্যসূত্র

1) The Royal society (https://royalsociety.org/about-us/history/)

2) ENCYCLOPÆDIA BRITANNICA (https://www.britannica.com/topic/Royal-Society)রয়েল সোসাইটি অফ লন্ডন

Madhusree Bandyopadhyay

৪৭


জীবনে একজন মেন্টর লাগে। একজন কোচ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা চাকরি জীবনে হোক, ছাত্রাবস্থায় হোক আর বেকার জীবনেই হোক।

জীবনে কাজ করবেন একজন মেধাবী বসের অধীন। জাঁদরেল বসের অধীন। তাহলে আপনি নিজেও একসময় জাঁদরেল হতে পারবেন। জাঁদরেল মানে হলো আধুনিক, ব্রিলিয়ান্ট, স্ট্রেটেজিক ও চ‍্যালেঞ্জ নেয়ার মতো সাহসী।

আফ্রিকান এক প্রবাদ আছে—An army of sheep lead by a lion can defeat an army of lion lead by a sheep; নেতৃত্ব যদি সিংহের মতো হয়, তাহলে আপনি ভেড়ার মতো হলেও অনেক কিছু জয় করতে পারবেন। কিন্তু নেতৃত্ব যদি ভেড়া হয়, আপনি সিংহ হয়ে তেমন কোন লাভ হবে না। এটা সমাজের সবর্ত্রই সত‍্য। জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ‍্য।

স্টুপিডের পদলেহন করে আপনি হয়তো সাময়িকভাবে দৃশ‍্যত উপরে উঠতে পারবেন—তাতে তৃপ্তি থাকবে না। এবং আপনি জানবেনও না কি করে অর্জন ধরে রাখতে হয়। পতনও হবে দ্রুত। সুতরাং পতনের সময় আপনি শূণ‍্যহস্তে কাতরাবেন।

জীবনকে যেহেতু আমরা যুদ্ধক্ষেত্র বলি, সুতরাং সেই যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু রেজাল্ট, সনদ, অর্থ এগুলোই যথেষ্ট নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে স্ট্রেটেজিক হতে হয়। স্ট্রেটেজি না জানলে প্রচুর সৈন‍্য ও গোলাবারুদ নিয়েও যুদ্ধ হেরেছে অনেক বীর। দুঃখজনক হলো, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুধু বলে মেধাবী হতে। ভালো রেজাল্ট করতে। ভালো চাকরি পেতে। কিন্তু স্ট্রেটেজিক হতে শেখায় না। জীবন তো ভালো রেজাল্টের চেয়ে অনেক বড়ো। অনেক কঠিন। অনেক কন্টকাকীর্ণ।

“দ‍্যা আর্ট অব ওয়ার” নামক বিখ‍্যাত বইয়ের লেখক Sun Tzu লিখেছেন—Strategy without tactics is the slowest route to victory. Tactics without strategy is the noise before defeat. তিনি হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রের জন‍্য বুঝিয়েছেন। কিন্তু এটা জীবন যুদ্ধের জন‍্যও খাটে। জীবনেরও কিছু “সেটস অব রুল” আছে। সেগুলোর প্রয়োগ, অপপ্রয়োগ, ভুল প্রয়োগে জীবন বহুদিকে বাঁক নেয়।

তরুণরা, শুধু ভালো রেজাল্টের পিছু দৌঁড়ে নিঃস্ব হয়ো না। বলছি না, ভালো রেজাল্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়। বলছি, শুধু সেটার জন‍্য জীবনের দারুণ সময় শেষ করলে হবে না। You have to learn strategy to win the life, to enjoy the every bit of life. You have to learn how to push the boundary without hurting yourself!

আর এজন‍্যই প্রয়োজন একজন মেন্টর। একজন গুরু। একজন শিক্ষক। একজন গাইড। সেটি হতে পারে বাবা কিংবা মা। হতে পারে শিক্ষক। হতে পারে বস। @ RAUFUL ALAM




৪৮


ফার্মি প্যারাডক্স: মহাবিশ্বে আমরা কি একা?

রাতের আকাশের দিকে কখনো অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখেছেন?গ্রামের দিকে গেলে এই অভিজ্ঞতাটা সবচেয়ে ভালো হয়। শহরের মতো আলোদূষণ নেই, কোলাহল নেই। শুধু অন্ধকার আকাশ আর অসংখ্য তারা।মাঝে মাঝে কি মনে হয় না, আমরা কি এই বিশাল মহাজাগতিক সমুদ্রে একদম একা? মনে হয়ে থাকলে আপনি একা না। ১৯৫০ সালের এক মধ্যাহ্নভোজ এ এক বিজ্ঞানী ঠিক এই প্রশ্ন টাই করেছিলেন। তিনি নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি।প্রশ্নটা ছিল মাত্র তিনটা শব্দের "Where is everybody?"সেই তিন শব্দ আজ পর্যন্ত কেউ ঠিকমতো উত্তর দিতে পারেনি।

আমাদের গ্যালাক্সিতেই নক্ষত্র আছে প্রায় ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন।বিলিয়ন মানে একশো কোটি। আর এরকম গ্যালাক্সি মহাবিশ্বে আছে আরও কয়েকশো বিলিয়ন। এই তারাগুলোর বেশিরভাগের চারপাশে ঘুরছে গ্রহ। সেই গ্রহগুলোর কতগুলো পৃথিবীর মতো? বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোটি কোটি।তাহলে হিসাব অনুযায়ী মহাবিশ্বে প্রাণ থাকার কথা গিজগিজ করে। এলিয়েনদের রেডিও অনুষ্ঠান আমাদের টিভিতে ধরা পড়ার কথা। মাঝেমধ্যে দু চারটা UFO এসে ঢাকার আকাশে একটু চক্কর দিয়ে যাওয়ার কথা।এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে ট্যুর প্ল্যান করার কথা।কিন্তু আমরা যখন টেলিস্কোপ নিয়ে আকাশ এর দিকে তাকাই, আমরা কী দেখি?বিশাল নিস্তব্ধতা। ঘুটঘুটে অন্ধকার।কোনো সিগন্যাল নেই।কোনো UFO নেই। এই যে বিশাল পরিসংখ্যান আর বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে অমিল একেই বলে ফার্মি প্যারাডক্স।

তাহলে সবাই গেল কোথায়?বিজ্ঞানীরা বেশ কয়েকটা থিওরি দিয়েছেন। একটার নাম গ্রেট ফিল্টার। মানে, একটা বিশাল ছাঁকনি। একটা সভ্যতা যখন খুব উন্নত হয় তখন তাকে এমন কিছু বাধার সম্মুখীন হতে হয় যা তাকে ধ্বংস করে দেয়। হতে পারে সেটা পারমাণবিক যুদ্ধ, কোনো মরণঘাতী ভাইরাস কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন। হতে পারে মহাবিশ্বের নিয়মই এমন যে কেউ খুব বেশি বুদ্ধিমান হয়ে গেলেই সে নিজের ধ্বংস নিজে ডেকে আনে।আবার এমনও হতে পারে আমরা আসলে একটা চিড়িয়াখানায় আছি! একে বলে Zoo Hypothesis। হয়তো এলিয়ানরা আমাদের অস্তিত্ব জানে, আমাদের দেখছে, কিন্তু আমাদের বিরক্ত করছে না। যেভাবে আমরা চিড়িয়াখানায় বাঘের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে বাঘকে দেখি কিন্তু বাঘের সাথে আড্ডা দেওয়ার চেষ্টা করি না।তবে আরেকটা সম্ভাবনা আছে, যেটা শুনলে বেশি ভয় লাগে। সেটা হলো Early Birds। হয়তো মহাবিশ্ব যখন তৈরি হয়েছিল, তখন প্রাণ ধারণের পরিবেশ ছিল না। কোটি কোটি বছর পর পৃথিবীই প্রথম সেই জায়গা যেখানে বুদ্ধিমান প্রাণ জন্মানোর সুযোগ পেয়েছে। তার মানে এই পুরো মহাবিশ্বে আমরাই প্রথম! আমাদের আগে কেউ নেই।

১৯৬০ সাল থেকে বিজ্ঞানীরা SETI প্রজেক্টের মাধ্যমে মহাকাশে কান পেতে আছেন। হাজার হাজার তারার দিকে রেডিও টেলিস্কোপ তাক করে বসে আছেন। ১৯৭৭ সালে একবার একটা অদ্ভুত সংকেত ধরা পড়েছিল। বিজ্ঞানী এত্ত খুশি হয়েছিলেন যে প্রিন্টআউটের পাশে লিখে রেখেছিলেন "Wow!" সেই থেকে সেটার নাম হয়ে গেছে Wow! Signal।কিন্তু সেই সংকেত আর কখনো আসেনি।

আজকের দিনে আমরা হাজার হাজার গ্রহ খুঁজে পাচ্ছি, বিলিয়ন ডলার খরচ করছি মহাজাগতিক সিগন্যাল ধরতে। কিন্তু উত্তর সেই একটাই নিস্তব্ধতা,অন্ধকার। হয়তো পৃথিবী সত্যিই মহাবিশ্বের এক অতি বিরল রত্ন। সঠিক দূরত্বে সূর্য, সঠিক টানে চাঁদ, আর আমাদের পাহারা দেওয়ার জন্য বৃহস্পতির মতো দানব গ্রহ এই সবকিছুর কম্বিনেশন হয়তো কোটি কোটি বছরে একবারই ঘটে।



৪৯


নেগেটিভ চিন্তা শরীরে বিষের মতো কাজ করে

নেগেটিভ চিন্তা করা তোমার শরীরের জন্য স্রেফ একটি বাজে অভ্যাস নয়, এটি আসলে বি*ষের মতো কাজ করে! আমাদের মস্তিষ্ক বাস্তব কোনো বিপদ আর কল্পিত কোনো বিপদের চিন্তার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তাই তুমি যখন সারাক্ষণ নেতিবাচক কিছু ভাবো, তোমার মস্তিষ্ক ধরে নেয় তুমি কোনো বিপদে আছো। তখন তোমার শরীরে অনবরত স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হতে থাকে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং শরীরের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ করে দেয়। এটি কয়েক মিনিটের বিষয় নয়, বছরের পর বছর ধরে এমনটা চললে শরীর দ্রুত বুড়িয়ে যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বাসা বাঁধে।

সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, নেতিবাচকতা কেবল স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না, এটি তোমার দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দেয়। তোমার মস্তিষ্ক তখন এমনভাবে তৈরি হয়ে যায় যে, সে সবসময় শুধু ভুলগুলো খুঁজে বের করে। এমনকি কোনো ভালো কিছু ঘটলেও তোমার মন সেখানে কোনো না কোনো খুঁত বের করার চেষ্টা করবে। এভাবে চলতে থাকলে নেতিবাচকতা এক সময় তোমার ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে তুমি যখন ইতিবাচক চিন্তা করো, তখন শরীরে কী ঘটে জানো? তোমার স্ট্রেস হরমোন কমে যায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এবং মস্তিষ্ক এমন কিছু কেমিক্যাল নিঃসরণ করে যা তোমাকে আরও সৃজনশীল আর মনোযোগী হতে সাহায্য করে। তখন তুমি জীবনকে ভয়ের চশমা দিয়ে না দেখে সম্ভাবনার চোখে দেখতে শুরু করো। জীবন একই থাকে, কিন্তু তোমার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ বদলে যায়।

দুনিয়াতে নানা সময় নানা লোক তোমাকে সবসময় সন্দেহ করতে শেখাবে, কিন্তু দয়া করে তুমি নিজের শত্রু হয়ো না। তোমার সাথে ভালো কিছু ঘটা সম্ভব এবং তুমি সেটা বিশ্বাস করার যোগ্য। @ Red Pill 2


৫০

পুরনো 'কোড' আপডেট করার দায়িত্ব এখন তোমার নিজের

শৈশবে তোমার মাথায় যে 'প্রোগ্রামিং' সেট করা হয়েছে, তার জন্য তুমি দায়ী নও। তখন তুমি কেবল শিখছিলে। কিন্তু এখন তুমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং সেই পুরনো 'কোড' আপডেট করার ১০০% দায়িত্ব এখন তোমার নিজের। এটা কোনো অপরাধবোধ বা জোর করে করার বিষয় নয়; বরং সচেতনতা, মমতা আর নিজের ভেতরের শক্তির সাহায্যে এই পরিবর্তন আনতে হবে।

যখন তুমি অন্যকে দোষ দিতে থাকো, তখন তোমার স্নায়ুতন্ত্র বা নার্ভাস সিস্টেম আসলে অতীতেই আটকে থাকে। কিন্তু যখন তুমি নিজের জীবনের ভার নিজে গ্রহণ করো, ঠিক তখন থেকেই তোমার মস্তিষ্ক নিজেকে নতুন করে সাজাতে শুরু করে।

তোমার মন কোনো ফিক্সড মেশিন নয়। তাই নিউরোপ্লাস্টিসিটি কোনো কাল্পনিক শব্দ নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক সত্য। তোমার মন কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়া নয় এবং তোমার পরিচয় চিরস্থায়ী কিছু নয়। তুমি কোথাও আটকে নেই। তোমার বেছে নেওয়া প্রতিটি নতুন চিন্তা মস্তিষ্কে নতুন পথ (Neural Pathways) তৈরি করে। তোমার প্রতিটি শান্ত আর নিয়ন্ত্রিত শ্বাস তোমার শরীরকে জানিয়ে দেয় যে, তুমি নিরাপদ এবং এখন তোমার বেড়ে ওঠার সময় হয়েছে।

তুমি এখানে পুরনো স্ক্রিপ্ট বা অতীতের গল্প রিপিট করার জন্য আসোনি। তুমি এসেছো সেই স্ক্রিপ্টগুলো নতুন করে লেখার জন্য। যেই মুহূর্তে তুমি মনে-প্রাণে বলবে, "আমি আমার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে ফিরিয়ে নিচ্ছি।" ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই তোমার শরীর আর জৈবিক প্রক্রিয়াগুলো সাড়া দিতে শুরু করবে।

এর ফলে নতুন সুযোগ তোমার দরজায় কড়া নাড়বে। তোমার চিন্তার ধরন বদলে যাবে। তুমি নতুন উদ্যমে জীবনকে অনুভব করবে। তুমি নিজের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শিখবে।

তোমার আসল শক্তি লুকিয়ে আছে ঠিক এই বর্তমান মুহূর্তে—যখন তুমি অতীতের সব নেগেটিভিটি মুছে ফেলে পজিটিভিটিকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নাও। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখো, পরিবর্তনটা তোমার হাত ধরেই শুরু হবে। @ Red Pill 2