১
জীবন্ত কাউকে কবর দেয়া যে উৎসবের প্রথা
জীবন্ত মানুষকে কবর দেয়ার এই রীতি প্রচলিত রয়েছে কিউবার রাজধানী হাভানা থেকে ১২ মাইল দূরে সান্তিয়াগো দে লাস ভেগাস নামক গ্রামে। ‘বারিয়াল অব প্যাচেন্দো’ নামের এক বিচিত্র উৎসবের অংশ হিসেবেই এই অনুষ্ঠানটি করা হয়। এই অনুষ্ঠানের অন্যসব ধরনের প্রথার একটি অংশ হিসেবে কবর দেওয়া হয় কোন একজন জীবন্ত মানুষকে। এর পূর্বে জীবন্ত মানুষটিকে কফিন বন্দি করে রাখা হয়। তারপর ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সেই কফিনকে শুইয়ে দেওয়া হয় কবরে। এই অনুষ্ঠানে যে কয়জন ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন তাদের সবাই তখন থাকেন নেশায় উন্মত্ত।
যদি কেউ বিষয়টি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা না থাকলে তার আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, কোন খাঁটি খ্রিস্টানের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান চলছে। চার জনের কাঁধে বাহিত হয়ে এগিয়ে চলেছে একটি কফিন। কফিনের ঢাকনা বন্ধ, শুধু এক দিকের উন্মুক্ত একটি অংশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে কফিনের ভিতরে শায়িত মানুষটির মাথা। চোখ বোজা অবস্থায় নিথর হয়ে রয়েছে সেই মাথা। কফিনের পিছন পিছন চলেছেন কিছু মানুষ। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন রয়েছে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা গোছের। তারা কিছুক্ষণ পরপর বুক চাপড়ে হাহাকার করে কাঁদছেন। কেউ কেউ আবার সান্ত্বনা দেয়ার জন্য এগিয়ে আসছেন।
মৃত মানুষটির শোকেই সবাই থাকে আকুল। কিন্তু আর পাঁচটি অন্তিমযাত্রার সঙ্গে এই শোভাযাত্রার কিছু ভয়াবহ পার্থক্যও রয়েছে। শোভাযাত্রার এই অংশটি সকলের কাছে কমন মনে হলেও একটু গভীরভাবে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, কফিনের পেছনে ক্রন্দনরত বৃদ্ধাদের সহযাত্রী হিসেবে রয়েছেন আরও কিছু মানুষ, যাদের চোখে মুখে শোকের লেশমাত্রও নেই। বরং সেসব ব্যক্তি মদের বোতল হাতে নেশায় থাকে মত্ত। দল বেঁধে টলমলায়মান অবস্থায় হর্ষধ্বনি আর হাততালির মধ্য দিয়ে তারা সকলকে উজ্জীবিত করতে থাকে। একে অন্যকে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিতে থাকে। আর তার থেকেও ভয়াবহ তথ্য যেটি, সেটি হল এই যে, কফিনের ভিতরে যিনি শুয়ে রয়েছেন, তিনি আদৌ মৃত নন, বরং জলজ্যান্ত একটি মানুষ।
১৯৮৪ সাল থেকে এই প্রথার আনুষ্ঠিনকতা প্রবর্তিত হয়। পরবর্তীতে প্রতি বছর ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে পালিত হয়ে আসছে এই উৎসব। বছরের শুরুর দিকে গ্রামের একজন লোককে বাছাই করা হয় ‘প্যাচেন্দো’ হিসেবে, অর্থাৎ উৎসবের দিনে যাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হবে। তারপর নির্দিষ্ট দিনে কফিনের মধ্যে তাকে শোওয়ানো হয়। শুরু হয় ‘শোকযাত্রা’।
‘শোকযাত্রা’-য় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ মানুষই থাকেন নেশার উন্মত্ত। সেই শোকযাত্রায় কেউ কেউ হাততালি দিয়ে উল্লাস করতে থাকে। কেউ কেউ গান-বাজনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের অন্যরকম মাদকতা দেয়। কিন্তু এই অন্তিমযাত্রায় অংশ নেওয়া সকলেই তো আর আনন্দে মেতে থাকতে পারেন না! তাই শোভাযাত্রায় রেখে দেওয়া হয় কিছু মহিলাকেও, যাদের দায়িত্ব ওই ‘প্যাচেন্দো’র বিধবা স্ত্রী হিসেবে শোকবিহ্বলতার অভিনয় করা। সত্যিই অদ্ভুত নিয়ম!
শোকযাত্রা সহ জীবন্ত কফিনটি পৌঁছায় উৎসবের জন্যই আলাদাভাবে তৈরি করা রাখা কবরস্থানে। খোঁড়া হয় ছ’ফুট গভীর একটি কবর। উপস্থিত থাকেন ধর্মযাজকও। যথাবিহিত রীতি মেনে মানুষ সমেত কফিনটিকে শোওয়ানো হয় মাটির গভীরে। তারপর কি কফিনের ওপর মাটি দেয়া হয়, তা কিন্তু না। কবরে কফিন শোয়ানো পর্যন্তই এই অনুষ্ঠান সীমাবদ্ধ। ভূগর্ভে শায়িত কফিনকে ঘিরে কিছুক্ষণ হইহুল্লোড়ের পরেই আবার জীবন্ত মানুষটি সমেত কফিনটিকে তুলে আনা হয় উপরে।
কিন্তু আপনার মনে এই প্রশ্ন জাগতেই পারে এই বিচিত্র উৎসবের কারণ কী? কি-ই বা এর তাৎপর্য? কে-ই বা এই “প্যাচেন্দো”? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে একটু পিছনে ফিরতে হবে। ১৯৮৪ সালে সান্তিয়াগো গ্রামবাসীরা একটি স্থানীয় কার্নিভালের আয়োজনের চিন্তা ভাবনা শুরু করে। ৫ ফেব্রুয়ারিতে এই বার্ষিক অনুষ্ঠান করার জন্য আকস্মিক এক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথমে কয়েকজন গ্রামবাসীদের মধ্যে মৃদু আপত্তি দেখা দিলেও পরবর্তীতে এই কার্নিভাল করার ব্যাপারে সবাই সম্মত হয়। সকল গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে অন্তসূচক একটি অনুষ্ঠান পালন করবে বলে স্থির করে। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়, একটি ছদ্ম-অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করা হবে।
এখন প্রশ্ন জাগতেই পারে, কার্নিভালে ‘বারিয়াল অব প্যাচেন্দো’ অনুষ্ঠানটি কেন বেছে নেয়া হলো। এর পিছনের ইতিহাসও বেশ মজার। ১৯৮৪ সালের দিকে শহরে একটি নাটক বেশ জনপ্রিয় হয় যার প্রভাব ফেলে হাভানার গ্রামগুলোতেও। সেই নাটকটির নাম ছিল ‘বারিয়াল অব প্যাচেন্দো’। ৫ ফেব্রুয়ারিকে যে এই বার্ষিক কার্নিভালের জন্য স্থির করা হয়, ঠিক সেইরকম এই অনুষ্ঠানটিও আকস্মিক সিদ্ধান্তেরই ফল। এই প্যাচেন্দো কারা হন কিংবা কী যোগ্যতার কারণে তাদের নির্বাচিত করা হয়, এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা অ্যালভেরো হার্নান্দেজের মুখ থেকে। তিনি জানান যে,
“প্যাচেন্দো একেবারেই কল্পিত একটি চরিত্র। এর জন্য কোন যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। বছরের শুরুর দিকে গ্রামবাসীরা মিলে ঠিক করেন কে হবেন এই প্যাচেন্দো। প্রতি বছর চেষ্টা করা হয় নতুন কোন ব্যক্তিকে প্যাচেন্দো হিসেবে নেয়ার। তবে তার ব্যতিক্রমও আছে।”
গ্রামবাসীর মাঝে একজন ডিভাল্ডো অ্যাগুইয়ার, তিনি বিগত তিরিশ বছরে বেশ কয়েকবার এই অনুষ্ঠানে ‘প্যাচেন্দো’ হয়েছেন। ‘প্যাচেন্দো’ হওয়ার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তিনি জানান,
“আসলে এটা কোনো শোকানুষ্ঠানই নয়, বরং জীবনকে ভালবাসার, জীবনকে উপলব্ধি করার উৎসব। কবর থেকে যখন উঠে আসি, তখন যেন নবজন্ম হয়, নতুন করে নিজেকে ফিরে পাই, নতুন করে অনুধাবন করতে পারি জীবনের মূল্য। এই ‘প্যাচেন্দো’র মধ্য দিয়ে জীবনের মূল্য উপলব্ধি করেন প্রত্যেক গ্রামবাসীও।”
পৃথিবী এক বৈচিত্র্যময় স্থান। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন এলাকায় আয়োজিত হওয়া নানা উৎসবের খবরাখবর আমরা কম-বেশি সবাই জানি। কিন্তু জীবন্ত মানুষ কবরস্থ করার মত ভয়াবহ কাজও কি উৎসব হতে পারে! আর সে উৎসবের খবর আমরা ক’জনই বা রাখি! কিন্তু উৎসবের তাৎপর্য জানলে উৎসবটি আর খারাপ লাগার কথা না। মানব জীবনের সার্থকতা উপলব্ধি করার জন্য, নিজের অস্স্তিত্বকে ফিরে পাওয়ার জন্য এই উৎসব। উৎসবে অতিরঞ্জিত কিছু হলেও তা একপাশে সরিয়ে রেখে এই উৎসবের তাৎপর্য সবাই অনুধাবন করতে পারলেই এই অনুষ্ঠানের পরিপূর্ণতা। আর তাই গ্রামবাসীদের মধ্যে ‘ব্যুরিয়াল অব প্যাচেন্দো’ উৎসবটি শুধুমাত্র শোক নয়, বরং জীবন্ত ‘প্যাচেন্দো’কে কবর দিয়ে জীবনেরই জয়গান গেয়ে যান হাভার অতি ছোট্ট একটি গ্রাম সান্তিয়াগো দে লাস ভেগাস গ্রামের অধিবাসীগণ। @ Papiya Debi Asru
২
সুস্থ থাকতে এবং দীর্ঘকাল তারুণ্য ধরে রাখতে 'হ্যাসলার'দের এড়িয়ে চলুন
১. 'হ্যাসলার' (Hasslers) কারা?
গবেষকরা সেই সব মানুষকে 'হ্যাসলার' বলছেন যারা আপনার জীবনে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ বা ঝামেলার সৃষ্টি করে। এরা হতে পারে আপনার কোনো আত্মীয়, বন্ধু বা সহকর্মী যারা আপনার জীবনকে কঠিন করে তোলে।
২. দ্রুত বার্ধক্য বা বুড়িয়ে যাওয়া:
গবেষণায় দেখা গেছে, আপনার জীবনে যত বেশি এ ধরণের বিরক্তিকর মানুষ থাকবে, আপনার শরীর তত দ্রুত বুড়িয়ে যাবে। গড়ে প্রতি একজন এমন 'হ্যাসলার' বা ঝামেলার মানুষের কারণে আপনার জৈবিক বয়স স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১.৫% দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
৩. পরিবারের সদস্যদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি:
আর্টিকেলটিতে বলা হয়েছে, যদি এই বিরক্তিকর মানুষটি আপনার পরিবারের কোনো সদস্য হন, তবে তার প্রভাব আপনার শরীরের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। কারণ পরিবারের সদস্যদের এড়িয়ে চলা কঠিন এবং তাদের সাথে মানসিক টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হয়।
৪. স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব:
এই অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে শরীরের ভেতরে প্রদাহ (Inflammation) বাড়ে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে হৃদরোগ, স্মৃতিভ্রম (Dementia) বা ক্যান্সারের মতো রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজনের অতিরিক্ত হ্যাসলারের উপস্থিতিতে একজন মানুষ ক্যালেন্ডারের এক বছরে প্রায় ১.০১৫ বছর সমপরিমাণ জৈবিক বার্ধক্যের শিকার হন।
৫. ব্যতিক্রম:
মজার ব্যাপার হলো, গবেষণায় দেখা গেছে যে জীবনসঙ্গী বা স্বামী/স্ত্রীর সাথে ঝামেলা থাকলেও তা বার্ধক্যের ওপর অতটা প্রভাব ফেলে না, যতটা পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা বাইরের মানুষের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। এর কারণ হতে পারে দাম্পত্য সম্পর্কের গভীরতা এবং সেখান থেকে পাওয়া সমর্থন।
সুস্থ থাকতে এবং দীর্ঘকাল তারুণ্য ধরে রাখতে কেবল ভালো খাবার বা ব্যায়ামই যথেষ্ট নয়; বরং আপনার চারপাশের বিষাক্ত বা নেতিবাচক মানুষদের (Toxic People) থেকে দূরে থাকা অথবা তাদের সাথে মানসিক দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সহজ কথায়—আপনার জীবন থেকে যত বেশি ঝামেলাপূর্ণ মানুষ কমাতে পারবেন, আপনার শরীর তত কম বুড়িয়ে যাবে! সূত্র: টেলিগ্রাফ
৩
মস্তিষ্কের শক্তি ক্ষয়কারী ৭টি অভ্যাস থেকে মুক্তির উপায়
সিএমসি ভেলোর (CMC Vellore) ও অ্যাপোলো হায়দ্রাবাদের প্রখ্যাত নিউরোলজিস্ট ডাঃ সুধীর কুমার মস্তিষ্কের শক্তি ক্ষয়কারী ৭টি অভ্যাস এবং সেগুলো থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এই আর্টিকেলে সেগুলো তুলে ধরা হলো-
১. অতিরিক্ত ডিজিটাল স্টিমুলেশন (ফোনের নোটিফিকেশন):
বারবার ফোনের নোটিফিকেশন চেক করলে আমাদের গভীর মনোযোগ নষ্ট হয়। একবার মনোযোগ ভাঙলে আবার আগের অবস্থায় ফিরতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। এর ফলে মস্তিষ্কের শক্তি দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
সমাধান: খুব জরুরি না হলে ফোন ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোডে রাখুন। ইমেইল বা মেসেজ চেক করার জন্য দিনে নির্দিষ্ট ৩টি সময় বেছে নিন।
২. তথ্যের অতিরিক্ত চাপ (Information Overload):
আমরা প্রতিদিন প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে প্রচুর তথ্য গ্রহণ করি। সোশ্যাল মিডিয়া বা খবরের ভিড়ে মস্তিষ্ক যখন জরুরি আর অদরকারি তথ্যের পার্থক্য করতে হিমশিম খায়, তখন চিন্তা করার ক্ষমতা কমে যায়।
সমাধান: আপনার সোশ্যাল মিডিয়া ফিড পরিষ্কার রাখুন। দিনে মাত্র ১৫ মিনিট নির্দিষ্ট কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে খবর পড়ুন।
৩. ঘুমের নিম্নমান:
গভীর ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক টক্সিন বা বর্জ্য পরিষ্কার করে। দেরিতে ঘুমানো বা ঘুমানোর আগে মোবাইল স্ক্রিনের নীল আলো এই প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়।
সমাধান: ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস বন্ধ করে দিন (Digital Sunset)। ঘর অন্ধকার ও ঠান্ডা রাখুন।
৪. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ (Chronic Stress):
সব সময় কাজের চাপে থাকা বা রাত ৯টায় অফিসের মেইল চেক করা শরীরকে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ মোডে রাখে। এতে কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায় যা স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে।
সমাধান: প্রতিদিন ৫ মিনিট গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম (৪-৭-৮ টেকনিক) করুন। যেসব অপ্রয়োজনীয় কাজ আপনাকে মানসিক চাপ দেয়, সেগুলো বাদ দিন।
৫. শারীরিক পরিশ্রমের অভাব:
সারাদিন বসে থাকলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায় এবং স্ট্রেস হরমোন শরীরে আটকা পড়ে।
সমাধান: জিম করতে না পারলেও দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন। প্রতি এক ঘণ্টা বসে থাকার পর একটু স্ট্রেচিং বা শরীর নাড়াচাড়া করুন।
৬. অন্যদের সাথে তুলনা করা:
সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের সাজানো জীবনের সাথে নিজের জীবনের তুলনা করলে মনের আনন্দ নষ্ট হয় এবং মানসিক ক্লান্তি বাড়ে।
সমাধান: মনে রাখবেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ কেবল তাদের জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোই দেখায়। আপনাকে অনুপ্রাণিত করে এমন মানুষদের ফলো করুন।
৭. সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকা (অবসর সময়ের অভাব):
আমরা এখন সামান্য খালি সময় পেলেই ফোন বের করি। অথচ মস্তিষ্ক যখন অলস বা শান্ত থাকে, তখনই নতুন নতুন আইডিয়া বা সৃজনশীলতা জন্ম নেয়।
সমাধান: মাঝে মাঝে কোনো কাজ ছাড়াই চুপচাপ বসে থাকুন বা হাঁটাহাঁটি করুন। মস্তিষ্ককে অলস হওয়ার সুযোগ দিন, এতে চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়বে। এই অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করতে পারলে আপনার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা এবং প্রোডাক্টিভিটি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বব মার্লির এই কথাটা সমাজের সবচেয়ে বিরক্তিকর কিন্তু সত্য বাস্তবতা তুলে ধরে মানুষ সত্য পছন্দ করে না, মিষ্টি মিথ্যা পছন্দ করে। যখন কেউ সত্য বলে, সরাসরি কথা বলে, ভুল ধরিয়ে দেয় তাকে "রূঢ়", "নেগেটিভ", "অহংকারী" বলা হয়। কিন্তু যে মানুষ সবার সামনে তেলবাজি করে, পেছনে ছুরি মারে, মুখে একটা মনে আরেকটা সেই "ভদ্র", "মিশুক", "ভালো মানুষ"। কারণ মানুষ চায় শুনতে যা ভালো লাগে, সত্য নয়। যে বলবে "তুমি ঠিক আছো", সে প্রিয়; আর যে বলবে "তোমার এখানে সমস্যা আছে, ঠিক করো", সে শত্রু।
বাস্তবতা হলো, এই কারণেই অনেক সত্যবাদী মানুষ একা হয়ে যান, আর ভণ্ডরা জনপ্রিয় হয়। কিন্তু যারা সত্য বলার সাহস রাখেন, তাদের বিবেক পরিষ্কার থাকে এবং তাদের আশেপাশে থাকে কয়েকজন সত্যিকারের মানুষ যারা মূল্যবান। তাই আপনি যদি সত্যবাদী হন এবং মানুষ আপনাকে পছন্দ না করে, তাতে দুঃখিত হবেন না। মনে রাখবেন, ভিড়ের ভালোবাসা পাওয়ার চেয়ে নিজের আয়নায় নিজেকে সম্মান করতে পারা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সত্য বলুন, সৎ থাকুন যারা আসল, তারা থেকে যাবে।
৪
ফার্মেন্টেড রাইস বা পান্তাভাত কিভাবে খেতে হয়?
বাংলা ছাড়াও ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন, ইন্দোনেশিয়াতে ফার্মেন্টেড রাইস খাওয়া হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভাত প্রধান খাবার এসব এলাকায় গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ভাত বেশিক্ষণ ভালো থাকেনা। মূলত রাতে রান্না করা বাড়তি ভাত সংরক্ষণের পদ্ধতি হিসেবেই পান্তা ভাতের ঐতিহ্য শুরু হয়েছিল। যা সেইসাথে স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও সহায়তা করতো। ভাতে পানি দিয়ে রাখলে গাঁজনকারী জীবাণু ভাতের শর্করা ভেঙ্গে ইথানল ও ল্যাকটিক এসিড তৈরি করে। পিএইচ কমে অম্লত্ব বেড়ে যাওয়ায় পঁচনকারী ও ক্ষতিকারক ব্যাক্টেরিয়া ও ছত্রাক ভাত নষ্ট করতে পারে না।
পান্তাভাত কারা খেতে পারবেন?
- সুস্থ সবল মানুষ
- যারা গ্রীষ্মে হাইড্রেশন ও শক্তি চান
- হজমে কোনো সমস্যা নেই এমন ব্যক্তি
- প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবারে অভ্যস্ত ব্যক্তি
.
পান্তাভাতের উপকারিতা সমূহ–
- পান্তা ভাত মাইক্রোফ্লোরা সমৃদ্ধ। পান্তায় ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া রয়েছে যা সাধারণত দই-এর মধ্যেও থাকে। ভাতের ফার্মেন্টেশনে ল্যাকটোব্যাসিলাস ও বিফিডোব্যাকটেরিয়াম জাতীয় ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পায়। এগুলো প্রোবায়োটিক হিসেবে কাজ করে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম সুস্থ রাখে। পান্তা হজমশক্তি বাড়ায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং IBS এর মতো সমস্যায় সাহায্য করে।
ঘনঘন এবং অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে যা ঘটে তা হলো খাদ্যকে হজম করার জন্য বিভিন্ন ধরণের এনজাইম ও বিশেষ করে হাইড্রোক্লোরিক এ্যাসিড যতটুকু দরকার সেটা পাকস্থলী উৎপাদন করে সারতে পারে না। ফলে খাবারের সাথে থাকা বাজে জীবানু ধ্বংস হয়না। এগুলো স্মল ইন্টেসটাইনে গিয়ে খাবারকে ফার্মেন্ট করে গ্যাস উৎপন্ন করে। তখন পেট ফাঁপা দেয়, মুখ দিয়ে ঢেকুর আসে, বুক জ্বালা পোড়া সৃষ্টি করে। গ্যাসের ঔষধ, এন্টিবায়োটিক ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে এসব সমস্যা মোকাবিলা করতে হলে প্রোবায়োটিক খাবারের উপর জোর দিতে হবে। প্রোবায়োটিক খাবার মন্দ ব্যাকটেরিয়ার গ্রোথ রুখে দিয়ে ও ভালো ব্যাকটেরিয়ার গ্রোথ প্রমোট করে ডাইজেস্টিভ সিস্টেমকে ভালো রাখে। আর এরকমই এক গাট-ফ্রেন্ডলি ও প্রোবায়োটিক্স সমৃদ্ধ খাবার হলো বাংলার ঐতিহ্যবাহী পান্তাভাত।
- ভিটামিন বি ঘাটতি পূরণে পান্তা হতে পারে সবচেয়ে সহজ পথ্য। পান্তাভাতে ভিটামিন বি থাকে, বিশেষ করে বি১, বি৬, বি৯ এবং সামান্য বি১২। পান্তার প্রোবায়োটিক এবং ফার্মেন্টেশনে উৎপন্ন বি ভিটামিন ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে।
লালচাল দিয়ে সঠিকভাবে ফারমেন্ট করে পান্তাভাত করলে ভিটামিন বি-এর উপকার বেশি পাওয়া যায়। কাঁচা লালচালে থায়ামিন (বি১), নিয়াসিন (বি৩), প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড (বি৫) এবং পাইরিডক্সিন (বি৬) থাকে। ফারমেনটেশনের সময় ল্যাকটোব্যাসিলাস, পেডিওকোকাস এবং স্যাকারোমাইসিস জাতীয় জীবাণু ভাতের স্টার্চ ও অন্যান্য উপাদান ভেঙে ভিটামিন বি সংশ্লেষণ করে।
বি৯ ও বি১২ রক্ত স্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক। বি৬ ও বি১২ স্নায়ুস্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পান্তা ভাত ভিটামিন বি-এর প্রধান উৎস নয়। তবে ফারমেনটেশনের কারণে এমনি ভাতের চেয়ে পরিমাণ ও শোষণক্ষমতা বেশি হয়। নির্দিষ্ট ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া ফারমেনটেড খাবারে অল্প পরিমাণে বি১২ তৈরি করতে পারে, যা পান্তাভাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
- এমনি ভাতে আয়রন থাকে কিন্তু পান্তা ভাতে এর পরিমাণ বেড়ে যায়। একইভাবে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও জিংকের পরিমাণও অনেক বেড়ে যায়। ভাতের মধ্যে ফাইটেটের মতো যে এন্টি-নিউট্রিশনাল ফ্যাক্টর আছে সেটা আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও জিংকের মতো পুষ্টিকে বেঁধে রাখে। ফারমেন্টেশনের কারণে পান্তা ভাতের ফাইটেট দুর্বল হয়ে পুষ্টিকর পদার্থগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়লে শরীর সেগুলো গ্রহণ করে।
দেশের মানুষ অনুপুষ্টি সাধারণত ক্যালসিয়াম ও আয়রনের ঘাটতির মধ্যে থাকে। পান্তা ভাত এই সমস্যা দূর করতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে, অল্পবয়সী মেয়েদের যে আয়রনের অভাব হয় পান্তা ভাত সেই অভাব পূরণে সহায়তা করতে পারে। ফার্মেন্টেড ভাতে আয়রনের শোষণ সাধারণ ভাতের তুলনায় ২০–৩০% বেশি হতে পারে।
পান্তাভাত তৈরির পদ্ধতি–
ভাতের মধ্যে পানি ঢেলে দিলেই পান্তা হয়ে যায়না। ভাতে গাঁজন প্রক্রিয়া সংঘটিত হলেই কেবল সত্যিকার স্বাদ ও পুষ্টির পান্তাভাত তৈরি হয়। আর লাল চালে প্রাকৃতিকভাবে বি ভিটামিন বেশি থাকে, তাই পান্তা তৈরিতে ব্যবহার করলে সবচেয়ে উত্তম। তবে সাদা চালও ব্যবহার করা যায়।
পান্তা ভাতের ঐতিহ্যবাহী আদি স্বাদ ও উপকারীতা পেতে মাটির পাত্রে দেশি ধানের লালচালের ভাতে পানি ঢেলে ঢেকে রেখে দিন ১২-১৪ ঘণ্টা। গ্রীষ্মে ১০/১২ ঘণ্টা এবং শীতে বেশি সময় লাগে।
পানির নিচে থাকা ভাত অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসতে পারে না, এতে ভাতের এনারোবিক ফারমেন্টেশন ঘটে গিয়ে ভাতের কার্বোহাইড্রেট ভেঙে যায়, ভাতের মধ্যে ফাইটেটের মতো যেসব এন্টি-নিউট্রিশনাল ফ্যাক্টর থাকে সেগুলোর ক্ষয় হয় এবং ভাত হাইড্রেট হয়ে যায়।
এভাবে সারা রাত বা ১২ ঘণ্টা পর ঢাকনা উঠালে দেখবেন পান্তা ভাত হয়ে গেছে। এবার পেঁয়াজ, মরিচ, লবণ দিয়ে মাখিয়ে খেয়ে নিন।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সমূহ–
- সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু পান্তাভাতের জন্য দেশি ধানের লালচাল কিংবা ঢেঁকিছাঁটা চাল ব্যবহার করতে হবে।
- মাটির পাত্রে ঠাণ্ডা আলোবাতাসপূর্ণ স্থানে পান্তা তৈরি হতে দিলে সবচেয়ে উত্তম হবে। প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহার করবেন না।
- কখনোই গরম ভাত কিংবা গরম পানি ব্যবহার করা যাবেনা। পান্তার জন্য গরম ভাতে পানি মেশাবেন না, ভাতে গরম পানি দিবেন না।
- পান্তাভাত করার জন্য রাতের বেঁচে যাওয়া ভাত কাজে লাগাতে পারেন। এতে পান্তাভাতে সকালের হেলদি ব্রেকফাস্টটা করে নিতে পারবেন।
- ভাতের ফারমেন্টেশন টাইম ওভার হলে অ্যালকোহলের উপাদান তৈরি হয়। সেই পান্তা খাওয়ার পর শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে ও ঘুম পেতে পারে।
- দুধ বা দইয়ের সঙ্গে না পান্তা খাওয়াই ভাল। পেটে অস্বস্তি করতে পারে।
- পান্তাভাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খেয়ে ফেলুন। বেশি সময় রাখলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা মাইকোটক্সিন তৈরি হতে পারে।
- পান্তা ভাত খাওয়ার আগে অবশ্যই ভালোমতো পরীক্ষা করে নিবেন ভাল আছে না নষ্ট হয়ে গেছে।
কখন, কীভাবে, কি পরিমাণ খাবেন?
পান্তা সকালে খালি পেটে খেলে এর প্রোবায়োটিক অন্ত্রে ভালোভাবে কাজ করে এবং শক্তি ও হাইড্রেশনের উপকার সবচেয়ে উত্তমভাবে পাওয়া যায়। তবে রাতে খাওয়া এড়িয়ে চলুন, কারণ রাতে হজম ধীরে হয় এবং অ্যাসিডিটির ঝুঁকি বাড়ে।
পান্তায় সামান্য লবণ যোগ করলে স্বাদ বাড়ে ও সোডিয়ামের ভারসাম্য হয়। পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ বা লেবু নিলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস ও ভিটামিন সি পাওয়া যায়। কিছুটা তেলযুক্ত ভর্তা বা আচার নিলে ফ্যাটে দ্রবণীয় ভিটামিন (এ, ডি, ই) শোষণে সাহায্য করে। পান্তাভাতের পানি ইলেকট্রোলাইট ড্রিংক হিসেবে কাজ করে।
চাইলে গরমকালে সপ্তাহে ২-৩ দিন সকালে পান্তা খেতে পারেন। শরীরের সাড়া বুঝে পান্তা খান। নিয়মিত খেলে শরীরে কোনো অস্বস্তি হলে পরিমাণ কমান বা বন্ধ করুন।
কাদের জন্য পান্তাভাত নয়?
- দুর্বল ইমিউন সিস্টেম যাদের। যাদের ইমিউনিটি কম, তাদের জন্য পান্তা ফুড পয়জনিং বা ইনফেকশনের কারণ হতে পারে। যেমন- এইচআইভি রোগী, ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তি, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের রোগী ইত্যাদি।
- গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিড রিফ্লাক্স আছে যাদের। ফার্মেন্টেশনে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হয়, যা পাকস্থলীতে অ্যাসিডিটি বাড়াতে পারে। যদিও পান্তা ভাত খেলে হজমের উপকার হয় কিন্তু অতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিড রিফ্লাক্স রোগীদের অস্বস্তি, বুক জ্বালাপোড়া, পেটফাঁপা, গ্যাস্ট্রাইটিস বা GERD এর সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে পান্তা ভাত।
- যাদের আইবিএসডি (Diarrheapredominant IBS) বা ক্রনস ডিজিজ আছে তারা পান্তা এড়াবেন। অনেক ক্ষেত্রে আইবিএস রোগীদের পান্তা অনেক ভালো খাবার কিন্তু সেটা প্রাথমিক অবস্থায় থাকলে উপকার পাবেন। @ Captain Green
মানুষের অযথা দুশ্চিন্তা বা অতিরিক্ত চিন্তা (overthinking) মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যখন মানুষ একই বিষয় নিয়ে বারবার নেতিবাচকভাবে চিন্তা করে, তখন শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল (Cortisol) বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চলতে থাকলে উদ্বেগ, অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ এবং মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের American Psychological Association (APA) এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করতে পারে এবং হৃদরোগসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
৬
আপনার কি কখনও এমন হয়, হঠাৎ করেই কাউকে খুব কাছের মনে হয়, আবার আচমকা সেই মানুষটিকে একদম সহ্যই করা যায় না? শুনতে আচরণগত খামখেয়ালি মনে হলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে এটি অনেক সময় বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (BPD)-এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। আবেগের ঢেউ এখানে এত দ্রুত ওঠানামা করে যে সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত, এমনকি নিজের পরিচয়বোধও স্থির থাকে না। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি চরিত্রের দুর্বলতা নয়, বরং গভীর আবেগগত অস্থিরতার চিকিৎসাযোগ্য মানসিক অবস্থা।
BPD-তে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত দুই প্রান্তে দুলে চলেন: কাউকে একদিন অতিরিক্ত মূল্যায়ন, পরদিনই তীব্র অবমূল্যায়ন। সামান্য ভুল বোঝাবুঝিতেই তারা মনে করেন সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে, ফলে ভিতরে জন্মায় তীব্র ভয়, রাগ কিংবা শূন্যতা। এমন আচরণ কর্মস্থল, পরিবার ও প্রেম সব সম্পর্কেই স্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শৈশবের কষ্ট, পারিবারিক অবহেলা, দীর্ঘস্থায়ী অস্থির পরিবেশ অথবা জেনেটিক সংবেদনশীলতা– এসব কারণ BPD-এর ঝুঁকি বাড়ায়। তবে আশার কথা হলো, সঠিক চিকিৎসা পেলে এই অবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। Dialectical behavior therapy (DBT), যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সম্পর্ক রক্ষণাবেক্ষণ এবং আত্ম-স্থিরতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। এছাড়াও রয়েছে Cognitive behavioral therapy (CBT), যা মানুষের ভুল ধারণা থেকে সৃষ্ট নেতিবাচক বিশ্বাস ও আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে এবং মেজাজের ওঠানামা, উদ্বেগ ও আত্মঘাতী প্রবণতা কমাতে সাহায্য করে।
বিশেষজ্ঞদের আহ্বান, এমন আচরণকে “অদ্ভুত” বা “নাটকীয়” বলে উড়িয়ে না দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। কারণ সময়মতো চিকিৎসা না পেলে BPD আক্রান্ত ব্যক্তি নীরব সংগ্রামের মধ্যেই ডুবে থাকেন। আর চিকিৎসা পেলে তার জীবন আবার নতুন করে গড়ে উঠতে পারে। @ Sumaiya Jannat
৭
অনেকেই বলেন, হাসি নাকি সবচেয়ে ভালো ওষুধ। এই কথার মধ্যে যথেষ্ট সত্যতা আছে। কোনো অস্বস্তিকর বা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে যদি আপনি মজার দিকটা খুঁজে নিতে পারেন, তাহলে সেই পরিস্থিতির কষ্ট বা খোঁচাটা অনেকটাই কমে যায়। অনেক সময় নিজের ভুল-ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতাকে হালকা হাসির চোখে দেখলে সেগুলো আর ততটা ভয়ের বা লজ্জার মনে হয় না।
যদি আপনি নিজেকে একজন মূল্যবান মানুষ হিসেবে মেনে নিতে পারেন এবং স্বীকার করেন যে মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই কিছু না কিছু অপূর্ণতা আছে, তাহলে নিজেকে এতটা গম্ভীরভাবে নেবেন না যে নিজের ওপরই আর হাসতে পারবেন না। একটু ভেবে দেখুন—যে মানুষরা কোনো রসিকতা সহ্য করতে পারেন না, তারা সাধারণত নিজেরা এবং নিজেদের কাজকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখেন।
অতিরিক্ত গম্ভীর হয়ে থাকা আসলে একটু দুঃখজনকও বটে। কারণ তখন আপনার মনে হয়, আপনার জীবনে যা কিছু ঘটে বা আপনি যা কিছু করেন, তার মধ্যে সামান্য ত্রুটি থাকলেও সেটি আপনার নিজের সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণাকে গভীরভাবে ও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে।
কিন্তু যদি আপনি নিজের ভুল বা ছোটখাটো বোকামিকে নিয়েও একটু হাসতে পারেন, তাহলে জীবনকে অনেক বেশি হালকা মনে হবে। এতে করে জীবন এবং আপনার ব্যক্তিগত সম্পর্ক—দুটোই অনেক বেশি আনন্দের হয়ে উঠবে। @লিনুস রোজারিও
৮
সমুদ্রের গভীরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্তন্যপায়ী নীলতিমি কেবল আকারেই বিশাল নয়, এর যোগাযোগ করার ক্ষমতাও চমৎকার। এরা অত্যন্ত নিম্ন-কম্পাঙ্কের শব্দ ব্যবহার করে শত শত কিলোমিটার দূর পর্যন্ত একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে, যা তাদের নেভিগেশন, দূরত্ব বজায় রাখা এবং সঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই লক্ষ্য করেছেন, এই তিমিদের গান হঠাৎই কমে যাচ্ছে। California Current Ecosystem অঞ্চলে ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সমুদ্রের নিচে স্থাপিত দীর্ঘমেয়াদি শ্রবণযন্ত্র দিয়ে গবেষণা করে দেখা যায়, তিমির গানের পরিমাণ কিছু বছরে বড় ধরনের ওঠানামা করেছে। সবচেয়ে বড় পতন দেখা যায় প্রশান্ত মহাসাগরের ভয়াবহ সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ The Blob এর পরবর্তী সময়ে। এই তাপপ্রবাহ সমুদ্রের খাদ্যজালকে বদলে দেয়; কারণ নীল তিমির প্রধান খাদ্য ঘন ঝাঁকে থাকা ক্ষুদ্র ক্রিল। যখন ক্রিল কমে যায়, তখন তিমিদের বেশি সময় ব্যয় করতে হয় খাদ্য খুঁজে বেড়াতে। সেই অতিরিক্ত শক্তি খরচের চাপে তারা অনেক সময় গান গাওয়ার মতো শক্ত আচরণ কমিয়ে দেয়। তাছাড়া আরেকটি সমস্যা হলো মানুষের তৈরি শব্দ দূষণ -জাহাজ চলাচল ও শিল্পকারখানার আওয়াজ তিমিদের স্বাভাবিক যোগাযোগকে ব্যাহত করছে। ফলে নীল তিমির গানের হঠাৎ কমে যাওয়া শুধু একটি আচরণগত পরিবর্তন নয় ; বরং এটি সমুদ্রের পরিবেশগত ভারসাম্য পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত।
আর্কটিকের গভীরে বাস করে এক দৈত্য, যার দীর্ঘায়ু হওয়ার রহস্য আছে, বোহেড তিমি। এই তিমিগুলির মধ্যে কিছু তিমি ১৮০০ সালের পুরনো হারপুনের ডগা বহন করে পাওয়া গেছে, যার অর্থ তারা আঘাত পাওয়ার পর এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বেঁচে ছিল। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে বোহেড তিমি ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকতে পারে, যা তাদেরকে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবী স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে একটি করে তুলেছে।
তাদের অসাধারণ জেনেটিক্স তাদেরকে রোগ প্রতিরোধ করতে, ডিএনএ মেরামত করতে এবং বার্ধক্য প্রক্রিয়া ধীর করতে সাহায্য করে, যা তাদেরকে গ্রহের সবচেয়ে কঠোর জলরাশিতে শতাব্দী ধরে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। ঘন ব্লাবার, ধীর বিপাক এবং অনন্য কোষীয় মেরামত ব্যবস্থা - এই সবই তাদের অসাধারণ আয়ুষ্কালে অবদান রাখে।
আর্কটিকের এই প্রাচীন দৈত্যদের অধ্যয়ন করে, গবেষকরা জৈবিক সূত্রগুলি উন্মোচন করার আশা করছেন যা একদিন মানুষকে সুস্থ, দীর্ঘ জীবন এবং বার্ধক্যের বিজ্ঞানকে আরও ভালভাবে বুঝতে সাহায্য করতে পারে। তথ্য: বিজ্ঞানবর্ণালী
৯
জীবিকার কারণে বা এমনিই অনেকেই রাত্রে অনেক দেরি করে ঘুমায়….এরফলে মানুষের শরীরে কি প্রভাব পড়ে?
প্রাগৈতিহাসিক কারণে ও জৈবিক ভাবেই মানুষ একটি “দিবাচর” প্রাণি - Diurnal (বিপরীতে প্যাঁচা যেমন পূর্ণ নিশাচর প্রাণি)
বিবর্তনের ইতিহাস, বিশেষ জৈবিক অভিযোজন এবং দিনের আলোয় আমাদের বেঁচে থাকার জন্য সুক্ষ অভিযোজনের কারণে মানুষ দিনের আলোয় সক্রিয় থাকে।
যদিও স্তন্যপায়ীদের প্রাথমিক পূর্বপুরুষরা ডাইনোসর এড়াতে নিশাচর ছিল, মানুষ ও আজকের বেশিরভাগ প্রাইমেটদের সাধারণ পূর্বপুরুষরা কয়েক মিলিয়ন বছর আগে দিনের আলোর জীবনযাত্রায় অভিযোজিত হয়েছিল, (অর্থাৎ দিবাচররা প্রাকৃতিক নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিল)।
আদিম যুগে রাতের অন্ধকারে শিকারি প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে এবং নিরাপদ পরিবেশে বিশ্রাম নিতে মানুষেরা রাতে ঘুমাতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
মানুষের দিবাচর হওয়ার প্রধান কারণ হল আমাদের পূর্বপুরুষ প্রাইমেটদের চোখ দিনের আলোর জন্য অত্যন্ত ভালোভাবে অভিযোজিত, দিনের আলোতে আমাদের উচ্চ ঘনত্বের ত্রিবর্ণ দৃষ্টি এবং তীক্ষ্ণ স্থানিক দৃষ্টি বা Stereoscopic Vision বাঁচার জন্য খুব সহায়ক হয়। এরফলে দিনের আলোতে আমরা সাধারণত ১০ লক্ষ থেকে ১ কোটি পর্যন্ত বিভিন্ন রঙের শেড আলাদা করতে পারি, যেমন পাকা ফল আর কাঁচা ফলের পার্থক্য করতে পারি, বিষাক্ত বা নষ্ট খাবার চিনতে যেটা সরাসরি বাঁচার সঙ্গে যুক্ত। মানুষের মুখের হালকা রঙ পরিবর্তন বোঝা যায় (লজ্জা, অসুস্থতা, রাগ), যা সামাজিক যোগাযোগে সাহায্য করে, জঙ্গল বা প্রকৃতিতে শিকার ও শিকারি চেনাতে সাহায্য করে।
দ্বিতীয় কারণটি হল মানুষের শরীরে দক্ষ তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, মানুষের ত্বকে ঘামগ্রন্থি থাকার ফলে আমরা দিনের অতিরিক্ত তাপেও অনেক বেশি সক্রিয় থাকতে পারি, যেখানে অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীকে অতিরিক্ত গরম এড়াতে দিনের বেলা নিষ্ক্রিয় থাকতে বাধ্য হয়।
অতীতে দিনের বেলায় সক্রিয়তার জন্য আমাদের অভ্যন্তরীণ সিস্টেমগুলি "টাইম স্ট্যাম্পড" হয়ে বিবর্তিত হয়ে গেছে এরফলে দিনের বেলায় আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি শক্তিশালী হয়।
আবার এই ত্রিবর্ণ দৃষ্টির অসুবিধা হল কম আলোতে আমরা ভালো দেখতে পাইনা, রাতের অন্ধকারে আমরা রঙহীন বা একবর্ণীয় দৃশ্য দেখি। আমাদের মস্তিষ্ক তিন ধরণের রঙের সংকেত ব্যবহার করে কোটি কোটি রঙের অনুভূতি তৈরি করে, যা মূলত এক ধরণের 'ডেটা কমপ্রেশন', রাতে বা কম আলোতে এর কারণে “মেটামেরিজম” নামক বিভ্রান্তি তৈরি হয়, যারফলে দুটি ভিন্ন রঙের বস্তুকেও নির্দিষ্ট আলোতে একই রঙের মনে হয়, এরফলে আমরা রাতে বিপদে পড়ি।
আবার মানুষ দিবাচর হওয়ার ফলে মানুষের ভিটামিন-ডি উৎপাদন প্রক্রিয়া সূর্যের অতিবেগুনি আলো নির্ভর হয়ে পড়ে।
এইসব বিবর্তনগত কারণেই মানুষ রাতে ঘুমাতে অভ্যস্ত, আমাদের শরীর সার্কাডিয়ান রিদম বা ২৪ ঘণ্টার জৈবিক ঘড়ির পৃথিবীর দিন-রাত্রির চক্রে সেট হয়ে গেছে।
সূর্য অস্ত গেলে, পরিবেশ অন্ধকার হলে আমাদের মস্তিষ্ক থেকে মেলাটোনিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা ঘুম আনে। আমাদের মস্তিষ্কের সুপ্রাকিয়াসমেটিক নিউক্লিয়াস একটি মাস্টার পেসমেকার হিসাবে কাজ করে, এটি দিনের বেলায় মেলাটোনিন (ঘুমের হরমোন) নিঃসরণ বন্ধ করার জন্য রেটিনা থেকে আলোর সংকেত ব্যবহার করে এবং রাতে এর নিঃসরণ শুরু করে, ফলে রাতই আমাদের ঘুমের সময়।
মেলাটোনিন কীভাবে কাজ করে -
আমাদের চোখে আলো পড়লে সেই তথ্য মস্তিষ্কের একটি ছোট অংশে যায়, যাকে বলে Suprachiasmatic Nucleus (SCN)।
আলো থাকলে SCN পিনিয়াল গ্রন্থিকে মেলাটোনিন কম করতে উদ্দীপনা দেয়, বিপরীতে অন্ধকারে SCN মেলাটোনিন তৈরি বাড়াতে উদ্দীপনা দেয়।
মেলাটোনিন বাড়লে শরীরের তাপমাত্রা একটু কমে যায়, শরীরে ঘুম ঘুম ভাব আসে, জাগ্রত অবস্থায় দরকারী মস্তিষ্কের কিছু কার্যকলাপ ধীর হয়ে যায়, এগুলো শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে।
সকালে আবার চোখে আলো পড়লে মেলাটোনিন দ্রুত কমে যায়, তখন শরীর দীর্ঘ জাগ্রত অবস্থার সেটিংয়ে চলে আসে।
রাতে ঘুমের মধ্যে শরীর ও মস্তিষ্কের কোশগুলো বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করে এবং নিজেদের পুনর্গঠন করে, যা দিনের চেয়ে রাতের গভীর ঘুমে বেশি কার্যকর হয়, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দূর করে শরীরকে কাজের জন্য প্রস্তুত করতে রাতের এই দীর্ঘ বিরতি প্রয়োজন।
সংক্ষেপে, রাতের ঘুম আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
রাত্রে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে শরীরের ওপর কি প্রভাব পড়ে?
রাতে না ঘুমিয়ে দিনে ঘুমালে আমাদের শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক চক্র বা সার্কাডিয়ান রিদম ব্যাহত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন:
পর্যাপ্ত রাতের ঘুমের অভাবে মেজাজ খিটখিটে হওয়া, উদ্বেগ (Anxiety), বিষণ্নতা (Depression) এবং নেতিবাচক চিন্তা বা আবেগের প্রবণতা প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
রাতে না ঘুমালে মেলাটোনিন ও কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বাধাগ্রস্ত হয়, এটি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমিয়ে ডায়াবেটিস ও স্থূলতার (Obesity) ঝুঁকি বাড়ায়।
ঘুমের অভাবে শরীরের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে ঘনঘন ইনফেকশন বা সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
নিয়মিত রাতে না ঘুমানো উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি তৈরি করে।
দিনের ঘুম রাতের মতো গভীর বা কার্যকর হয় না, এর ফলে মনোযোগের অভাব, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়।
সারারাত জেগে থাকলে শরীরে বিপাকীয় পরিবর্তন ঘটে, যা বদহজম, পেটে গ্যাস এবং ক্ষুধার নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে ওজন বাড়িয়ে দেয়।
চোখের নিচে কালো দাগ (Dark Circles), চোখের ফোলা ভাব এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়ার মতো বাহ্যিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
এটা হল বায়োলজি, কিন্ত বর্তমান মানব সভ্যতায় অনেক মানুষকেই রাতে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালন করতে হয়, আত্মত্যাগ করতেই হয়, নাহলে বাকি মানবসভ্যতা রাতে নিশ্চিত হয়ে ঘুমাতে পারবেনা।
রাতে চাকরি বা নাইট শিফটের কারণে ঘুমাতে না পারলে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:
বাড়ি ফেরার সময় রোদ চশমা বা কালো চশমা ব্যবহার করুন এবং শোবার ঘর সম্পূর্ণ অন্ধকার রাখুন। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিণ দেখা বন্ধ করুন (টিভি, ফোন, কম্পিউটার ইত্যাদি)। কফি বা চা বর্জন: শিফট শেষ হওয়ার অন্তত ৪-৬ ঘণ্টা আগে চা বা কফি খাওয়া বন্ধ করুন, ঘুমানোর আগে ভারী বা মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে সহজপাচ্য খাবার খান, কাজের সময় হাইড্রেটেড থাকুন, তবে ঘুমানোর ঠিক আগে বেশি জল খাবেন না যাতে ঘুমের মাঝখানে বাথরুম যাওয়ার জন্য উঠতে হয়, কাজের ফাঁকে সুযোগ থাকলে ১৫-২০ মিনিটের ছোট ঘুম বা ন্যাপ নিতে পারেন, যা ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে, কাজ শেষে হালকা ব্যায়াম বা একটু হাঁটাহাঁটি করলে ঘুম ভালো আসতে পারে, সহজে ঘুম না আসলে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা মাসল রিলাক্সেশন পদ্ধতি ট্রাই করতে পারেন।
Google NotebookLM এর সাহায্য নিয়ে সংক্ষেপিত @ Alok Śrabak
১০
ইন্ট্রোভার্ট, এক্সট্রোভার্ট এবং অ্যাম্বিভার্ট এর বৈশিষ্ট্য —
ইন্ট্রোভার্ট :
- নিজেকে গুটিয়ে রাখতে ভালবাসে।
- চুপচাপ, লাজুক ও স্বল্পভাষী স্বভাবের হয়।
- বন্ধু বান্ধবের সংখ্যা খুব কম হয়, কিন্তু যাদেরকে বন্ধু বানায়
তাদের সাথে শেষ পর্যন্ত থাকে।
- একা থাকতে ভালবাসে, নিজের পছন্দের কাজ নিয়ে নিজের মতোন ব্যস্ত থাকতে পারে দিনের পর দিন।
- ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে অল্প সময়ের জন্য বাইরে থাকা উপভোগ করে।
- কোনো কাজ করার আগে বেশ চিন্তা ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেয়।
- সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলতে ভালবাসে।
- সহজে কারও সাথে নিজের ব্যাপারে কথা বলে না, তবে
মন মতোন কাউকে পেলে তার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারে।
- অন্যদের কথা শুনতে বেশী ভালবাসে, ভাল শ্রোতা।
এক্সট্রোভার্ট :
-মিশুক স্বভাবের হয়, সবার সাথে মিশে যায় খুব সহজেই।
-চিন্তা করে কাজ করে না, হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় যার কারণে অনেক সময় বেশ ঝামেলাতেও পড়ে।
-একা থাকতে পারে না, কোথাও একা যেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। সব সময় সঙ্গী হিসেবে কাউকে লাগে।
-কথা বলতে পছন্দ করে; অন্যদেরটা শোনে কম, নিজে বলে বেশী।
-নেতৃত্ব গুণ থাকে ভাল।
-কথা গোপন রাখতে পারে না, নিজের মনে যা থাকে সব গড়গড় করে বলে দেয়। সহজেই মানুষকে বিশ্বাস করে বিপদে পড়ে।
-আড্ডা দিতে, ঘুরে বেরাতে ভালবাসে।
-বিভিন্ন এক্সট্রা কারিকুলার বিষয়ে দক্ষ হয়।
অ্যাম্বিভার্ট
-ইন্ট্রোভার্ট আর এক্সট্রোভার্টের সংমিশ্রণ হচ্ছে এরা।
-নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হয় সহজেই, তবে কাউকে ঘনিষ্ঠ বানায় না সহজে।
-আগ্রহের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে বেশি পছন্দ করে, অনাগ্রহের বিষয়ে সময় দেয় না; বোরিং অনুভব করে।
- আড্ডা দিতে, ঘুরতে ভালবাসে তবে শুধুমাত্র পছন্দের মানুষদের সাথে।
-সবার ব্যক্তিগত বিষয় মনযোগ দিয়ে শুনলেও নিজের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে সহজে কারও সাথে কথা বলে না।
- সবার সাথে মিশলেও ঘনিষ্ঠ বানায় হাতে গোনা কিছু মানুষকে; তাদের জন্য সব উজাড় করে দিতে কার্পণ্য করে না।
-একটি পার্টিতে বা ফ্রেন্ড সার্কেলে সহজেই সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।
-যেকোনো বিষয়ে যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।
-ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যতোই আড্ডা দিক, দিন শেষে নিজের একার জন্য সময় লাগে, নিজেকে সময় দিতে ভালবাসে।
-পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ভাল হয়।
-সবাইকে সহজেই নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়ে মুগ্ধ করতে পারে। @ Silentsoul Saad
১১
ভারতীয় প্রাচীন সমাজের নিয়োগ প্রথা
নিয়োগ প্রথা (Niyoga) । এই প্রথা অনুযায়ী, কোনো পুরুষ যদি সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হতেন বা মারা যেতেন, তাহলে তার স্ত্রীকে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে যৌ/*-নসম্পর্ক স্থাপন করে সন্তান উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হতো, যাতে বংশের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে । প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ও সাহিত্যে এর উল্লেখ থাকলেও আধুনিক সমাজে এই প্রথাকে অত্যন্ত বিতর্কিত, অমানবিক এবং নারীর মর্যাদার পরিপন্থী হিসেবে দেখা হয় ।
প্রথমত, নিয়োগ প্রথা মূলত নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে অবমূল্যায়ন করত । এই প্রথায় নারীকে একজন স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে নয়, একটি “বংশ রক্ষার মাধ্যম” হিসেবে বিবেচনা করা হতো । স্বামীর মৃত্যুর পরে বা স্বামীর অক্ষমতার ক্ষেত্রে নারীর ব্যক্তিগত ইচ্ছা, মানসিক অবস্থা কিংবা সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকত । পরিবারের বংশধারা রক্ষা করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য । ফলে নারীর শরীরকে পারিবারিক সম্পত্তি বা সামাজিক কর্তব্যের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হতো । আধুনিক মানবাধিকার ও নারীসমতার ধারণা থেকে বিচার করলে এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে বৈষম্যমূলক ও অমানবিক ।
দ্বিতীয়ত, নিয়োগ প্রথা সমাজে নানা নৈতিক ও সামাজিক জটিলতা সৃষ্টি করত । এই প্রথায় যে পুরুষকে “নিযুক্ত” করা হতো, তিনি প্রকৃত স্বামী না হলেও সন্তানের জৈবিক পিতা হয়ে উঠতেন । এর ফলে পারিবারিক সম্পর্ক, উত্তরাধিকার এবং সামাজিক পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল । সন্তান কার প্রকৃত উত্তরাধিকারী, তার সামাজিক পরিচয় কী, এই ধরনের প্রশ্ন সমাজে জটিলতা তৈরি করত । অনেক ক্ষেত্রে এটি পারিবারিক বিরোধ ও সামাজিক কলহের কারণও হয়ে উঠতে পারত ।
তৃতীয়ত, এই প্রথার মধ্যে নারীর প্রতি একধরনের সামাজিক চাপও কাজ করত । বিধবা নারীরা অনেক সময় পারিবারিক বা সামাজিক চাপে নিয়োগ প্রথা মেনে নিতে বাধ্য হতেন । তাদের ব্যক্তিগত মতামত বা সম্মতি প্রকৃত অর্থে কতটা গুরুত্ব পেত, তা নিয়ে ঐতিহাসিক গবেষকদের মধ্যে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে । ফলে এই প্রথা নারীর ওপর একধরনের মানসিক ও সামাজিক নিপীড়নের পরিবেশ সৃষ্টি করত । আধুনিক সমাজে যেখানে নারীর স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে এই ধরনের রীতি স্পষ্টতই মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী ।
চতুর্থত, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও নিয়োগ প্রথা সর্বদা সমর্থন পায়নি । কিছু প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে এর উল্লেখ থাকলেও পরবর্তীকালে অনেক ধর্মশাস্ত্রকার এই প্রথাকে অনৈতিক বা নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছেন । বিশেষ করে মনুস্মৃতি এবং অন্যান্য ধর্মশাস্ত্রে কলিযুগে এই প্রথাকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে । অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় সমাজব্যবস্থার মধ্যেই এই রীতির বিরুদ্ধে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল । এর ফলে বোঝা যায় যে, প্রাচীন সমাজের ভেতরেও এই প্রথা নিয়ে বিতর্ক ও দ্বিমত ছিল ।
পঞ্চমত, আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিতে নিয়োগ প্রথা প্রাচীন সমাজের একটি পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতিফলন । সেই সময়ে বংশধারা, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের গুরুত্ব এতটাই বেশি ছিল যে নারীর ব্যক্তিসত্তা অনেক ক্ষেত্রে গৌণ হয়ে পড়ত । নিয়োগ প্রথা সেই পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতারই একটি প্রকাশ, যেখানে পরিবার ও বংশ রক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি ।
এছাড়া এই প্রথার মধ্যে একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্নও রয়েছে । বিবাহিত সম্পর্ক সাধারণত পারস্পরিক আস্থা ও একনিষ্ঠতার ওপর প্রতিষ্ঠিত । নিয়োগ প্রথা সেই ধারণাকে দুর্বল করে দেয়, কারণ এতে সামাজিক অনুমোদনের মাধ্যমে বিবাহের বাইরের যৌ/*-নসম্পর্ককে বৈধতা দেওয়া হয় । যদিও এর উদ্দেশ্য ছিল বংশ রক্ষা, কিন্তু নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে । এই কারণেই পরবর্তী যুগে সমাজ ক্রমশ এই প্রথা থেকে দূরে সরে আসে ।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সমাজেও বড় ধরনের সামাজিক ও নৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে । নারীশিক্ষার প্রসার, মানবাধিকার চেতনার বিকাশ এবং আধুনিক আইনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা, এই সবকিছুই প্রাচীন অনেক রীতিকে অচল করে দিয়েছে । নিয়োগ প্রথাও তার ব্যতিক্রম নয় । আজকের সমাজে এটি সম্পূর্ণ অপ্রচলিত এবং সামাজিকভাবে নিন্দিত একটি রীতি হিসেবে বিবেচিত হয় ।
নিয়োগ প্রথা প্রাচীন সমাজের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক বাস্তবতার ফল হলেও আধুনিক মূল্যবোধের আলোকে এটি স্পষ্টতই সমস্যাপূর্ণ ও সমালোচনাযোগ্য । এই প্রথা নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছে, পারিবারিক সম্পর্ককে জটিল করেছে এবং পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে । তাই ইতিহাসের আলোচনায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও সমকালীন সমাজে এর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই । @ Sufal Sarkar
সাইবেরিয়ান একটি কথা আছে—
যুদ্ধ হলে রাজনীতিবিদরা অস্ত্র দেয়,
ধনীরা রুটি দেয়,
আর গরিবরা দেয় তাদের সন্তান।
যুদ্ধ শেষ হলে রাজনীতিবিদরা দেশ চালায়,
ধনীরা রুটির দাম বাড়ায়,
আর গরিবরা খোঁজে তাদের সন্তানদের কবর।
১২
আইরিশ কবি ও নাট্যকার অস্কার ওয়াইল্ড
(১৮৫৪–১৯০০) এর এই বিখ্যাত উক্তিটি মূলত মানুষের স্বকীয়তা এবং সত্যিকারের রূপ (Authenticity) ফুটিয়ে তোলার একটি শক্তিশালী আহ্বান।
তিনি কেন এটি বলেছিলেন, তার মূল কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
অনুকরণ নিরর্থক:
ওয়াইল্ড মনে করতেন, অন্য কাউকে হুবহু নকল করার চেষ্টা করা সময়ের অপচয়। কারণ সেই ব্যক্তির ভূমিকা পালন করার জন্য তিনি নিজেই আছেন। আপনি যখন অন্য কারো মতো হওয়ার চেষ্টা করেন, তখন আপনি নিজের ভেতরের অনন্য প্রতিভা ও সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলেন।
স্বকীয়তার উদযাপন:
প্রতিটি মানুষই আলাদা। সমাজ বা লোকলজ্জার ভয়ে আমরা প্রায়ই নিজেদের আসল রূপ লুকিয়ে রাখি। ওয়াইল্ডের মতে, আপনার নিজস্বতা বা 'ইউনিকনেস'-ই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই নিজেকে গ্রহণ করার মাধ্যমেই জীবনের পূর্ণতা পাওয়া সম্ভব।
সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ:
ভিক্টোরিয়ান যুগের কঠোর সামাজিক নিয়মের মধ্যে অস্কার ওয়াইল্ড ছিলেন একজন মুক্তমনা ও বিদ্রোহী ব্যক্তিত্ব। তিনি মানুষকে এই উক্তির মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, সমাজের চাপিয়ে দেওয়া ছাঁচে নিজেকে না গড়ে বরং নিজের মতো হয়ে ওঠাই প্রকৃত সাহস।
সততা ও আত্মবিশ্বাস:
যখন কেউ নিজের ভুল, গুণ বা বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে লজ্জিত না হয়ে তা স্বীকার করে নেয়, তখনই সে সত্যিকারের আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। অন্য কারো 'কার্বন কপি' হওয়ার চেয়ে নিজের একটি 'সৎ সংস্করণ' হওয়া অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ।
সহজ কথায়:
অস্কার ওয়াইল্ড এই উক্তির মাধ্যমে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, মহাবিশ্বের এই বিশাল ভিড়ে আপনার জায়গাটি কেবল আপনার জন্যই সংরক্ষিত; অন্য কেউ সেটি দখল করতে পারবে না, আর আপনিও অন্য কারো জায়গা নিতে পারবেন না।
অস্কার ওয়াইল্ডের সংক্ষিপ্ত জীবনী:
(১৮৫৪–১৯০০) ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত আইরিশ নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, কবি এবং প্রাবন্ধিক। ভিক্টোরিয়ান যুগের লন্ডনের অন্যতম সফল এই সাহিত্যিক তার অসাধারণ রসবোধ, চাতুর্যময় কথোপকথন এবং নান্দনিক জীবনধারার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
অস্কার ওয়াইল্ডের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
জন্ম ও পরিবার:
১৮৫৪ সালের ১৬ অক্টোবর আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে একটি শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী পরিবারে তার জন্ম হয়। তার পুরো নাম ছিল অস্কার ফিঙ্গাল ও'ফ্লাহার্টি উইলস ওয়াইল্ড।
শিক্ষা:
তিনি ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন, যেখানে তিনি একজন মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সাহিত্যকর্ম:
উপন্যাস: তার একমাত্র উপন্যাস 'দ্য পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে' (The Picture of Dorian Gray) বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি।
নাটক:
তার জনপ্রিয় নাটকগুলোর মধ্যে 'দ্য ইমপোর্টেন্স অফ বিয়িং আর্নেস্ট' (The Importance of Being Earnest), 'অ্যান আইডিয়াল হাজব্যান্ড' এবং 'লেডি উইন্ডারমেয়ার্স ফ্যান' উল্লেখযোগ্য।
ছোটগল্প:
শিশুদের জন্য লেখা তার 'দ্য সেলফিশ জায়ান্ট' (The Selfish Giant) বা স্বার্থপর দৈত্য এবং 'দ্য হ্যাপি প্রিন্স' গল্পগুলো আজও অত্যন্ত জনপ্রিয়।
নন্দনতত্ত্ব (Aestheticism):
তিনি 'শিল্পের জন্য শিল্প' (Art for Art's Sake) মতবাদের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা ছিলেন, যা সৌন্দর্যকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করে।
ব্যক্তিগত জীবন ও কারাবাস:
জীবনের শেষ দিকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জেরে তিনি এক আইনি বিবাদে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৮৯৫ সালে 'অশ্লীলতার' অভিযোগে তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেয়।
ওয়াইল্ডের পারিবারিক পরিচিতি:
অস্কার ওয়াইল্ড (১৮৫৪-১৯০০) আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনের একটি অত্যন্ত শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী অ্যাংলো-আইরিশ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা স্যার উইলিয়াম ওয়াইল্ড ছিলেন একজন বিখ্যাত চক্ষু ও কর্ণ সার্জন এবং মা জেন এলজি ছিলেন জাতীয়তাবাদী কবি (ছদ্মনাম 'স্পেরানজা')। ১৮৮৪ সালে তিনি কনস্ট্যান্স লয়েডকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের দুই ছেলে, সিরিল ও ভিভিয়ান ছিল।
পারিবারিক পরিচিতি:
বাবা (স্যার উইলিয়াম ওয়াইল্ড):
তিনি ডাবলিনের একজন স্বনামধন্য সার্জন ছিলেন, যিনি আইরিশ লোককাহিনি এবং প্রত্নতত্ত্ব নিয়েও কাজ করেছেন।
মা (জেন ফ্রান্সেস্কা ওয়াইল্ড):
'স্পেরানজা' ছদ্মনামে পরিচিত, তিনি একজন কবি এবং লোককাহিনি বিশেষজ্ঞ ছিলেন, যিনি ওয়াইল্ডের মধ্যে সাহিত্যপ্রীতি জাগিয়ে তুলেছিলেন Encyclopedia Britannica।
ভাই (উইলি ওয়াইল্ড):
অস্কার ওয়াইল্ডের বড় ভাই, পেশায় একজন সাংবাদিক ছিলেন।
বোন (আইসোলা ওয়াইল্ড):
অস্কারের ছোট বোন, যিনি মাত্র ১০ বছর বয়সে জ্বরে মারা যান।
স্ত্রী ও সন্তান:
১৮৮৪ সালে কনস্ট্যান্স লয়েডকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই পুত্র ছিল: সিরিল (Cyril) এবং ভিভিয়ান (Vyvyan)।
পারিবারিক সংকটের পর:
অস্কার ওয়াইল্ডের কারাদণ্ডের পর, তাঁর স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে সুইজারল্যান্ডে চলে যান এবং নিজেদের বংশনাম পরিবর্তন করে 'হল্যান্ড' (Holland) রাখেন EPIC The Irish Emigration Museum।
ওয়াইল্ডের পরিবার আয়ারল্যান্ডের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বেশ সুপরিচিত ছিল।
মৃত্যু:
কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি নিঃস্ব অবস্থায় ফ্রান্সে চলে যান এবং ১৯০০ সালের ৩০ নভেম্বর প্যারিসে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।
@ মৃণাল নন্দী
১৩
হাজারটা রিজেকশন আর ব্যর্থতার পর যখন মনে হয় "আমাকে দিয়ে আর কিচ্ছু হবে না"
জীবনের এক একটা পরীক্ষা যখন শুধু ব্যর্থতার সংবাদ বয়ে আনে, আর যখন বারবার প্রত্যাখানের বার্তা জমা হয়, তখন বুকের ভেতরটা শূন্য হয়ে যায়। মনে হয়, আপনার সব চেষ্টা, সব রাত জাগা পরিশ্রম বুঝি একেবারেই বৃথা যাচ্ছে। চারপাশের সবাই যখন সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে, আর আপনি একই জায়গায় আটকে আছেন, তখন নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ জাগাটা খুব স্বাভাবিক।
বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর যখন মনে হয় "আমাকে দিয়ে আর কিচ্ছু হবে না", ঠিক তখনই হতাশা আপনাকে গিলে খেতে চায়। আপনি যখন চারপাশের সবার সফলতার গল্প শোনেন, আর নিজেকে আস্ত একটা ব্যর্থ মানুষ বলে ধরে নেন, তখন আপনার আত্মবিশ্বাস ধুলোয় মিশে যায়। এই সময়টায় মানুষ বড্ড একা হয়ে পড়ে, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় তাকে কুড়ে কুড়ে খায়।
কিন্তু একটা কথা সবসময় মনে রাখবেন, সৃষ্টিকর্তা সবার জন্য একই ঘড়ি তৈরি করেননি। কেউ পঁচিশ বছর বয়সে সফলতা পেয়েও জীবনের কাছে হেরে যায়, আবার কেউ ত্রিশ বছর বয়সে শূন্য থেকে শুরু করে ইতিহাস রচনা করে। অন্যের সফলতার সাথে নিজের যাত্রার তুলনা করাটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোকামি। কারণ আপনার গল্পটা আর তার গল্পটা কখনোই এক নয়।
সমাজ বা আত্মীয়স্বজন শুধু আপনার বর্তমান অবস্থাটা দেখবে, আপনার ভেতরের লড়াইটা তারা কোনোদিন বুঝবে না। তাদের বাঁকা কথায় কষ্ট পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার কোনো মানে হয় না। বরং তাদের অবজ্ঞাকে নিজের জেদ হিসেবে গ্রহণ করুন। যে ফলটা পাকতে সময় বেশি লাগে, মনে রাখবেন সেই ফলের মিষ্টতাও অনেক বেশি হয়।
হতাশ হওয়ার আগে এই ৩টি কথা মনে গেঁথে নিন:
১. প্রত্যাখান মানে আপনার অক্ষমতা নয়, বরং বড় কিছুর শুরু
প্রতিটি প্রত্যাখানের বার্তা আপনাকে বলে দিচ্ছে যে, আপনি যে পথটা খুঁজছেন, তা ভুল। আপনি যে দরজাটা খোলার চেষ্টা করছেন, তার ওপারে আপনার জন্য বড় কিছু অপেক্ষা করছে। ব্যর্থতা আপনাকে শুধু সঠিক পথটা দেখানোর জন্য প্রস্তুত করছে। এই প্রত্যাখ্যানগুলো আপনার সফলতার স্তম্ভ।
২. সফলতার গল্পে ব্যর্থতার অধ্যায় থাকেই
আপনি আজ যাদের সফল দেখছেন, তাদের জীবনী পড়ে দেখুন। তাদের সফলতার পেছনেও হাজারটা ব্যর্থতার গল্প লুকিয়ে আছে। তারা যদি প্রথম ব্যর্থতায় হাল ছেড়ে দিতেন, তবে আজ পৃথিবী তাদের চিনত না। ব্যর্থতাই সফলতার সবচেয়ে বড় শিক্ষক।
৩. আপনি বাতিল নন, আপনি শুধু নিখুঁত হচ্ছেন
সৃষ্টিকর্তা আপনাকে বড় কিছুর জন্য প্রস্তুত করছেন বলেই আপনার পরীক্ষাটা এত কঠিন। এই যন্ত্রণাই একদিন আপনার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হবে। লোহাকে আগুনে পুড়িয়ে যেমন শক্তিশালী করা হয়, ব্যর্থতা আপনাকে তেমনই মজবুত করছে। আপনার সকালটাও খুব শিগগিরই আসবে।
শেষ কথা
বয়স বা শূন্য পকেট দিয়ে নিজেকে বিচার করবেন না। ব্যর্থতার পর যখন মনে হয় কিছু হবে না, ঠিক তখনই নতুন করে শুরু করার শক্তি সঞ্চয় করুন। সূর্য ডোবার পর অন্ধকার তো নামেই, কিন্তু তারপরই আসে নতুন ভোর। হাল ছেড়ে দেবেন না।
নিজেকে বলুন—
"আমি ব্যর্থ নই, আমি সফলতার পথে এগিয়ে যাচ্ছি।" @ Motivational Quotes Bangla
১৪
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত ‘মানুষ’ কবিতায় (সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থ) অন্ধ ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা এবং ভণ্ডামির তীব্র সমালোচনা করতে এই উক্তিটি করেছিলেন। মানুষকে ঘৃণা করে যারা ধর্মের কিতাবকে বড় করে দেখে, তাদের ভণ্ডামি ও অমানবিকতার প্রতিবাদে তিনি মানুষকে গ্রন্থ বা ধর্মের চেয়ে বড় ও শ্রেষ্ঠ স্থান দিয়েছেন।
মূল কারণসমূহ:
মানবতা ধর্মের চেয়ে বড়:
নজরুল বিশ্বাস করতেন মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, ধর্ম বা গ্রন্থ মানুষের কল্যাণেই সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু মানুষ গ্রন্থ সৃষ্টি করেনি।
ধর্মের ভণ্ডামির প্রতিবাদ:
অনেকে কোরাণ, বেদ বা বাইবেল চুম্বন করে, কিন্তু আসল মানুষ বা ক্ষুধার্ত মানুষকে সাহায্য করে না-এই ভণ্ডামির প্রতিবাদ করেছেন তিনি।
মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা:
যারা গ্রন্থ বা কেতাব সৃষ্টি করেছে, সেই 'মানুষ'কে হত্যা করে বা ঘৃণা করে বইয়ের পূজা করা বোকামি বা "ভণ্ডামি"।
সংক্ষেপে:
নজরুল গ্রন্থ বা ধর্মের চেয়ে মানবতাকে সর্বাগ্রে স্থান দিতেই এই কঠোর উচ্চারণ করেছিলেন।
আরো বিস্তারিত:
তিনি মূলত তথাকথিত ধর্মব্যবসায়ী এবং ভণ্ডদের মুখোশ খুলে দিতেই এই চাবুক মারা উক্তিটি করেছেন।
নজরুল এটি কেন বলেছেন তার মূল কারণগুলো হলো:
মানবতার শ্রেষ্ঠত্ব:
নজরুল বিশ্বাস করতেন মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই। তাঁর মতে, ধর্মগ্রন্থগুলো মানুষের কল্যাণের জন্য মানুষই (আল্লাহর বার্তাবাহক বা ঋষিদের মাধ্যমে) পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে। তাই গ্রন্থের দোহাই দিয়ে মানুষকে ঘৃণা করা বা ছোট করা চরম মূর্খতা।
ভণ্ডামির প্রতিবাদ:
অনেক সময় ধর্মগুরু বা পুরোহিত মোল্লারা ধর্মগ্রন্থের দোহাই দিয়ে অসহায় মানুষকে শোষণ করে। মন্দির বা মসজিদের দুয়ার বন্ধ করে দেওয়া বা ক্ষুধার্তকে অন্ন না দিয়ে শাস্ত্রের বুলি আওড়ানোকে নজরুল ‘ভণ্ডামি’ বলে মনে করতেন।
চেতনা জাগ্রত করা:
যারা অন্ধভাবে কিতাব বা গ্রন্থ পুঁজি করে (মুখস্থ করে বা আঁকড়ে ধরে) কিন্তু হৃদয়ে মানুষের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করে না, তাদের নজরুল ‘মূর্খ’ বলেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষ না থাকলে কোনো ধর্মেরই সার্থকতা থাকত না।
সহজ কথায়:
নজরুলের কাছে সবার উপরে মানুষ সত্য-গ্রন্থ মানুষের প্রয়োজনে এসেছে, মানুষকে সেবা করার জন্য, মানুষকে শাসন বা শোষণ করার জন্য নয়।
@মৃণাল নন্দী
রবীন্দ্রনাথের 'বিসর্জন' থেকে নজরুলের 'মানুষ'—সবখানেই ফুটে উঠেছে এক চরম সত্য: মানবতাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। অথচ আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আমরা সেই আদিম যুগের কুসংস্কার আর ধর্মের নামে কাটাকাটিতে লিপ্ত! পূজা নয়, বরং মানুষের সেবা আর যুক্তিই হোক আমাদের পথ চলা। যারা ধর্মের নামে ব্যবসা ফাঁদে, তাদের মুখোশ টেনে খুলে ফেলার সময় এসেছে। "মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!" ধর্মের নামে বিভেদ ছড়ানো বন্ধ হোক। জয় হোক মানবতার,!
১৫
ট্রিনিটি: পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির গ্রাফিক ইতিহাস
ত্রিশের দশকের শেষ দিকে ইউরোপে একটা ভয়াবহ গুজব ছড়িয়ে পড়ে। নাৎসি জার্মানি নাকি এমন একটা ভয়ঙ্কর অস্ত্র বানানোর চেষ্টা করছে, যার শক্তি যেকোনো বোমার চেয়েও হাজারগুণ বেশি! এই গুজব শুনে রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি বিজ্ঞানীদেরও রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। কারণ, হিটলারের মতো লোক যদি এমন কোনো বোমা হাতে পায়, তাহলে পৃথিবীর জন্য ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে। বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় ছিলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে একটি চিঠি লিখেন তিনি। আইনস্টাইন নিজে কখনোই বোমা বানাতে চাননি, কিন্তু তার ভয় ছিল হিটলার যদি আগেই বোমাটা বানিয়ে ফেলে তাহলে সর্বনাশ! এই চিঠির পরই অ্যামেরিকা পারমাণবিক বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়।
তিন বছর চেষ্টার পর ১৯৪৫ সালে গবেষণা সফল হয়। নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে ঘটানো হয় পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ। এই পরীক্ষাটির নাম ছিল 'ট্রিনিটি টেস্ট'। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই
জাপানের হিরোশিমা আর নাগাসাকি শহরে ফেলা হয় দুইটি পারমাণবিক বোমা। মুহূর্তের মধ্যে বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল সবকিছু গলে গিয়ে শহর দুইটি প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের বহু বছর পরেও এই অঞ্চলে বহু বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নেয় তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে অ্যামেরিকা পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল আমাদের কাছে এখন এমন একটি অস্ত্র রয়েছে যা দিয়ে আমরা একটি শহরকে মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারি। এই শক্তি প্রদর্শন ছিল ভবিষ্যতের পাওয়ার পলিটিক্সের সূচনা। তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতি বুঝতে হলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ইতিহাস বোঝাটা খুবই জরুরি।
১৬
প্রাচীন এই সার্বভৌম ক্ষমতার প্রধান ও সবথেকে শক্তিক্ষম প্রতীক ছিল তলোয়ার। সেই যুগে ক্ষমতা বলতে বোঝানো হত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কিছু কেড়ে নেওয়া বা আদায় করা। ক্ষমতা তখন কাজ করত মানুষের কাছ থেকে তাদের উৎপাদিত সম্পদ, শস্যের ভাগ, শ্রম, ও প্রয়োজনে তাদের রক্ত ও জীবন কেড়ে নেবার মাধ্যমে। রাজার ক্ষমতা দৃশ্যমান হত জনসমক্ষে গিলোটিনে চড়িয়ে বা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবার ভয়াবহ নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে। ক্ষমতা তখন ছিল মূলত কেড়ে নেবার কৌশল, যার চূড়ান্ত ও চরম রূপ ছিল মানুষের অস্তিত্বকে মুছে ফেলা বা জীবনকে দমন করা।
সপ্তদশ শতকের শেষভাগ থেকে পাশ্চাত্য জগৎ এই ক্ষমতার রূপরেখায় এক গভীর ও কাঠামোগত রূপান্তর দেখতে শুরু করে। ফুকো দেখান যে, সমাজ যত বিকশিত হতে থাকে, ক্ষমতা আর কেবল কেড়ে নেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারল না। ক্ষমতা কেবল তরবারির ভয়ে সমাজকে শাসন করবার প্রাচীন পদ্ধতি থেকে সরে আসতে শুরু করল। এর বদলে ক্ষমতা হয়ে উঠল মানুষের জীবনকে উৎসাহিত করবার, বৃদ্ধি করবার, জীবনকে সুচারুভাবে নিয়ন্ত্রণ করবার এবং সামগ্রিক মানবজীবনকে সংগঠিত করবার এক বিশাল ও অদৃশ্য সরঞ্জাম। ফুকো বলেছেন, প্রাচীন ও সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল হত্যা করবার বা বাঁচতে দেবার ক্ষমতা। আর আধুনিক এই নতুন ক্ষমতার রূপ হল ঠিক তার বিপরীত, অর্থাৎ বাঁচতে বাধ্য করা বা মরতে দেবার ক্ষমতা। আর এর পেছনে ছিল সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক কারণ।
অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে এবং মহামারী ও দুর্ভিক্ষের প্রকোপ ধীরে ধীরে কমে আসতে শুরু করে। ফরাসি বিপ্লবের আগেই ইউরোপে প্লেগ ও দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা অনেকটাই কমে গিয়েছিল, যা আগের শতকগুলিতে বছর বছর জনসংখ্যার বিশাল একটা অংশকে নিশ্চিহ্ন করে দিত। মানুষ বুঝতে শিখল যে, মৃত্যু আর আগের মতো সর্বগ্রাসী রূপে সরাসরি জীবনকে গ্রাস করতে পারছে না। বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা ও কৃষির অভাবনীয় উন্নতির ফলে মানুষ তার নিজের জীবনকাল, স্বাস্থ্য, প্রজনন ও বাসযোগ্য পরিবেশের ওপর তুলনামূলক অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হল। ঠিক এই ঐতিহাসিক সুযোগটিকেই অত্যন্ত সুকৌশলে কাজে লাগাল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। রাষ্ট্র বুঝতে পারল, কেবল মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবার চেয়ে মানুষের জীবন প্রক্রিয়াগুলির দায়িত্ব নেওয়াই হল শাসনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ফুকোর মতে, যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানেই প্রতিরোধ আছে। উনিশ শতকের দিকে এই নতুন এবং সর্বব্যাপী জৈব-ক্ষমতার বিরুদ্ধে সমাজের নানা স্তর থেকে যে প্রতিরোধ বা সংগ্রামগুলি গড়ে উঠেছিল, তার ভাষাও ক্ষমতার রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে আমূল বদলে গিয়েছিল। আধুনিক যুগে এই রাজনৈতিক সংগ্রামগুলির মূল লক্ষ্য ও অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল 'জীবন' নিজেই। যেহেতু রাষ্ট্র মানুষের জীবনের প্রতিটি অংশকে অর্থাৎ তার স্বাস্থ্য, তার শিক্ষা, তার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছিল, মানুষও সেই 'জীবন'কেই তাদের দাবি আদায়ের প্রধান অস্ত্র বানাল। মানুষ দাবি তুলল জীবনের অধিকারের, নিজের শরীরের ওপর নিজের সম্পূর্ণ অধিকারের, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবার অধিকারের, সুখের অধিকারের এবং নিজের জৈবিক ও মানসিক প্রয়োজন মেটাবার অধিকারের। ফুকো দেখান যে, আধুনিক যুগে ক্ষমতা কোনো অদৃশ্য দানব বা স্বৈরাচারী রাজার মতো ওপর থেকে আমাদের ওপর লাঠি ঘোরায় না। বরং ক্ষমতা আজ ছড়িয়ে আছে সবখানে। ক্ষমতা জালের মতো আমাদের ঘিরে রেখেছে।
১৭
আমাদের পৃথিবী কি ভয়েডের মধ্যে ভাসছে?
আমাদের পৃথিবী এবং পুরো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি আসলে এমন এক বিশাল, নিঃশব্দ আর জমাট বাঁধা শূন্যতার একেবারে প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যার বিশালতা কল্পনারও বাইরে!
মহাবিশ্বের এই বিশাল মানচিত্রে আমাদের অবস্থান ঠিক কোথায়? শত শত বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ভেবেছেন, মহাবিশ্বের সব জায়গায় গ্যালাক্সিগুলো সমানভাবে ছড়ানো আছে। কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এক ভয়ংকর সুন্দর সত্যকে সামনে এনেছে।
আমরা কি কোনো সুপার ভয়েডের ভেতরে আছি? এই প্রশ্নটিই আজ বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ভাবুন তো, এক অসীম অন্ধকার মহাসাগর, যেখানে দ্বীপের সংখ্যা খুব কম, আর আমরা এমন এক ভাসমান দ্বীপে আছি, যার চারপাশে শুধুই কোটি কোটি আলোকবর্ষের হাহাকার।
মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো আসলে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে নেই। তারা তৈরি করেছে এক বিশাল মহাজাগতিক জাল, যাকে বলা হয় Cosmic Web। এই জালের ফিলামেন্ট বা সুতোগুলোতে গ্যালাক্সিগুলো জড়ো হয়েছে, আর মাঝখানে তৈরি হয়েছে বিশাল শূন্য বুদবুদের মতো অঞ্চল। আমাদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে অবস্থিত লানিয়াকিয়া নামক এক বিশাল গ্যালাক্সি সমষ্টি বা সুপারক্লাস্টারের মধ্যে। হাওয়াইয়ান ভাষায় লানিয়াকিয়া শব্দের অর্থ বিশাল স্বর্গ। কিন্তু এই স্বর্গের ঠিক সীমানাতেই ঘাপটি মেরে আছে এক দানবীয় শূন্যস্থান। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন লোকাল ভয়েড।
এই শূন্য অঞ্চলে গ্যালাক্সির সংখ্যা এতটাই কম যে, এটি আশেপাশের গ্যালাক্সিগুলোকে আকর্ষণ করার বদলে যেন দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের কাছের বহু গ্যালাক্সি এই শূন্য অঞ্চল থেকে পালিয়ে গিয়ে জালের মতো কাঠামোতে জমা হয়েছে। এমনকি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি এবং এর আশেপাশের গ্যালাক্সিগুলোর গতিবিধির ওপর এই বিশাল শূন্যতার নীরব এক প্রভাব রয়েছে।
কিন্তু রহস্যের এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞানীরা যখন মহাবিশ্বের একদম শুরুর দিকের প্রাচীন আলো কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বা CMB বিশ্লেষণ করেন, তখন আকাশের একটি নির্দিষ্ট দিকে তারা এক অদ্ভুত অসামঞ্জস্যতা খুঁজে পান। এর নাম দেওয়া হয়েছে সিএমবি কোল্ড স্পট। এর সম্ভাব্য কারণ কী?
তাত্ত্বিক পদার্থবিদরা বলছেন, আকাশের ওই দিকে হয়তো এমন এক অতিকায় সুপার ভয়েড লুকিয়ে আছে, যার ভেতর দিয়ে আলো পার হওয়ার সময় নিজের বিপুল পরিমাণ শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে মহাজাগতিক ব্যাকগ্রাউন্ডে ওই অঞ্চলটিকে অস্বাভাবিক রকমের ঠান্ডা বা কম উজ্জ্বল দেখায়। এই ধারণাটি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের যে গতিবিধি আমরা পৃথিবী থেকে মাপছি, তা কি আমাদের আশেপাশের এই বিশাল শূন্যতার কারণে প্রভাবিত হচ্ছে? আমরা কি সত্যিই একটি বিশাল কসমিক বুদবুদের ভেতর বসে মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করছি?
যদি শূন্যতার বিশালতা আপনাকে অবাক করে, তবে এবার শুনুন মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর শূন্যতার কথা। এর নাম Bootes Void। এটি মহাবিশ্বের এমন এক দানবীয় সুপার ভয়েড, যার ব্যাস প্রায় ৩৩ কোটি আলোকবর্ষ! এই অঞ্চলটি এতটাই বিশাল যে এর ভেতর হাজার হাজার গ্যালাক্সি এঁটে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেখানে গ্যালাক্সির সংখ্যা হাতে গোনা। বিজ্ঞানীরা বলেন, যদি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি এই বুটেস ভয়েডের ঠিক মাঝখানে থাকত, তবে ১৯৬০-এর দশকে শক্তিশালী টেলিস্কোপ আবিষ্কার হওয়ার আগে পর্যন্ত আমরা জানতেই পারতাম না যে মহাবিশ্বে অন্য কোনো গ্যালাক্সি অস্তিত্ব রাখে! চারপাশের এই ঘুটঘুটে অন্ধকার আমাদের এই ভেবে বোকা বানাতো যে, পুরো মহাবিশ্বে কেবল আমরাই একা।
তাহলে আমরা কি সত্যিই কোনো সুপার ভয়েডের একেবারে গভীরে আছি?
আমরা হয়তো সরাসরি কোনো ভয়েডের কেন্দ্রে নেই, তবে একটি সত্য দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আমরা গ্যালাক্সির এমন এক দ্বীপে বাস করছি, যার চারপাশ ঘিরে আছে অসীম, অনন্ত আর নিঃশব্দ শূন্যতা। রাতের আকাশে যে হাজারো তারার মেলা আপনি দেখেন, তা মহাবিশ্বের মূল ছবি নয়। মহাবিশ্বের আসল রূপটি হলো এক বিশাল, হিমশীতল শূন্যতা, যার বুক চিরে মাঝে মাঝে জ্বলে ওঠে গ্যালাক্সির মতো কিছু মহাজাগতিক জোনাকি। আর সেই অসীম শূন্যতার গভীরে, একটি অতি ক্ষুদ্র নীল বিন্দুর ওপর দাঁড়িয়ে, আমরা মহাবিশ্বের এই নিঃশব্দ রহস্যকে বোঝার চেষ্টা করে চলেছি। @আল মামুন রিটন
১৮
রোমান সাম্রাজ্য ও জুলিয়াস সিজার
ভিনি, ভিডি, ভিসি (Veni, Vidi, Vici) বর্তমানে এই উক্তিটি যে কোনো দ্রুত এবং অভাবনীয় বিজয় বোঝাতে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়।
৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এশিয়া মাইনরের (বর্তমান তুরস্ক) জিলা নামক স্থানে পন্টাসের রাজা দ্বিতীয় ফারনাসিসের বিরুদ্ধে এক বিধ্বংসী যুদ্ধের পর জুলিয়াস সিজার এই বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন। যুদ্ধটি এতই দ্রুত শেষ হয়েছিল যে, সিজার তার এই বিজয়ের খবর রোমান সিনেটকে জানাতে মাত্র এই তিনটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।
জুলিয়াস সিজার ছিলেন প্রাচীন রোমের একজন কিংবদন্তি সেনাপতি, রাষ্ট্রনায়ক এবং প্রভাবশালী একনায়ক। তিনি রোমান প্রজাতন্ত্রকে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যে রূপান্তর করতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাতে জুলিয়াস সিজারকে নিয়ে তেমন কোন বইপত্র নেই। আমাদের দেশের শিক্ষা কার্যক্রমে রোমান ইতিহাস নেই। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা জানে না জুলিয়াস সিজার কে ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি জুলিয়াস সিজার সম্পর্কে বিশেষভাবে পরিচিত হই লন্ডন বাসের সময় ব্রিটিশ লাইব্রেরির বিভিন্ন বইয়ের পাতা উল্টিয়ে।
জওহরলাল নেহরুর বিশ্ব ইতিহাস প্রসঙ্গ বইয়ে পড়েছিলাম, নেহেরু স্কুলেই পড়েছিলেন জুলিয়াস সিজার লিখিত আত্মজীবনী তাও আবার গ্রিক ভাষাতে।
অবাক হয়ে ভেবেছিলাম নেহেরু কোন স্কুলে পড়েছেন। পরে জেনেছি তিনি পড়েছেন পশ্চিম লন্ডনের বিখ্যাত হ্যারো স্কুলে।
পরে আরও জেনেছি ঐতিহ্যবাহী হ্যারো স্কুলে পড়েছেন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ সময়ের বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরু। কবি লর্ড বায়রনও ছিলেন হ্যারো স্কুলের ছাত্র। শুনেছি কমনওয়েলথ এর নানা দেশের বারজন রাষ্ট্র প্রধান এবং সাতজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বেরিয়েছেন এই স্কুল থেকে।
জুলিয়াস সিজার বিশ্বইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিত্বের অন্যতম একজন। রাশিয়ার জার্, জার্মানির কাইজার দুইটি নামই এসেছে সিজার থেকে।
এবার আসি মূল প্রসঙ্গে আসি। জুলিয়াস সিজারকে জানা কেন এত জরুরি আমাদের। তার আগে বলে নেই, রোমের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজও কিছু মানুষ সিজারকে ভক্তি ভরে আরাধনা করেন, তারা মনে করেন সিজার একজন দেবতা বা ডেমি গড।
যেমন, জিউস এবং অ্যালকমিনের পুত্র হারকিউলিস এর বংশধর। দেবতা বা ডেমি গড সাধারণত অতিমানবীয় শক্তি বা ক্ষমতার অধিকারী কিন্তু নশ্বরই থাকে।
সিজার দাবি করেছিলেন যে তার পরিবার, জেনস জুলিয়া, ট্রোজান বীর এনিয়াসের পুত্র আইউলাস (আস্কানিয়াস) এর সরাসরি বংশধর। কিংবদন্তি অনুসারে, এনিয়াস ছিলেন দেবী ভেনাসের পুত্র। সিজার তার শাসনের অধিকার এবং তার অসাধারণ সামরিক সাফল্যকে ন্যায্যতা দিয়েছিলেন।
সিজার হত্যার পর, রোমান সিনেট তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেবতা ঘোষণা করে। এর ফলে তিনি প্রথম রোমান ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেবতা হিসেবে উপাধি লাভ করেন এবং তার দত্তক পুত্র অগাস্টাস "ঈশ্বরের পুত্র" (ডিভি ফিলিয়াস) উপাধি গ্রহণ করেন।
জুলিয়াস সীজার হত্যাকান্ডটি ছিল রোমান সাম্রাজ্যের গোড়া পত্তনে সবচে তাৎপর্যময় ঘটনা।
১৫ মার্চ হল রোমান ভাষায় "আইদস অব মার্চ"। ৪৪ খ্রি পু এই দিনে যড়যন্ত্রকারীরা সিনেট ভবনে জুলিয়াস সিজারের উপর ঝাঁপিয়ে পরে ধারালো ছুরি নিয়ে। ২৩ বার সীজারকে আঘাত করা হয়। সিনেট ভবনেই মৃত্যুবরণ করে জুলিয়াস সিজার।
মূল ঘটনাটি কয়েকজন রোমান সিনেটরের ষড়যন্ত্রের ফসল। গ্যালিক যুদ্ধ শেষ হলে সিনেট সীজারকে আদেশ দেয় সামরিক কমান্ড ছেড়ে রোমে ফিরে আসতে। সীজার সিনেটের সেই আদেশ প্রত্যাখ্যান করে। সীজার মনে করে, সামরিক বাহিনী ছাড়া রোমে প্রবেশ করলে তাকে হত্যা করা হবে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯, রুবিকন নদী পার হয়ে সৈন্য সহ রোমে ফিরে আসে জুলিয়াস সীজার। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।
৯ অগাস্ট ৪৫ খ্রি পূ। ফারশালাও যুদ্ধে সিনেট সেনাপতি পম্পেই দ্য গ্রেটকে হারিয়ে নিজেকে রোমের স্বল্প মেয়াদের একনায়ক ঘোষণা করে জুলিয়াস সীজার। সেই সঙ্গে রোমান সংবিধানকে মুলতুবি ঘোষণা করে। সেই সময় রোমে সিনেটরদের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ ছিল চরমে, তার সঙ্গে সিনেটরদের অযোগ্যতা, লোভ, সীমাহীন দুর্নীতির কারণে সীজার খুব অল্প সময়েই হয়ে ওঠে জনপ্রিয় একনায়ক। সুযোগ বুঝে সীজার নিজেকে সারা জীবনের জন্য একনায়ক ঘোষণা করে।
পুরো বিষয়টি কিছু সম্ভ্রান্ত সিনেটরকে ভীত-সন্ত্রস্থ করে তোলে, যাদের অন্যতম দু'জন ব্রুটাস ও ক্যাসিয়াস। রিপাবলিককে চিরতরে বিলুপ্ত করে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা রোধে বদ্ধ পরিকর হলেও তারা ছিল অক্ষম। শুরু হয় ষড়যন্ত্র।
সীজার হত্যাকান্ডটির মধ্য দিয়েই রোমে শুরু হয়ে যায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ। হত্যাকান্ডের দুইদিন পর, রোমান সেনাপিত মার্ক এন্থনীকে সিনেট তলব করে এবং তার উপস্থিতিতেই সর্বসম্মতি ক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, সীজারের হত্যাকারীদের যে কোন দন্ড প্রদান করা যাবে না। এর কারণ হিসাবে বলা হয়, হত্যাকারীরা রোমান রিপাবলিকের মুক্তিদাতা। সুতরাং তারা থাকবে বিচারের আওতার বাইরে। কিন্তু সীজারের পূর্ববর্তী সরকারী সকল নিয়োগ বৈধ থাকবে। মার্ক এন্থনীর কনসোল অব রোম পদটি এক বছরের জন্য বৈধ থেকে যায়। যার কারণে পশ্চিমা ইতিহাস বদলে যায় চিরকালের তরে।
সেই সময় রোমে সামাজিক মর্যাদানুসারে তিন শ্রেণীর মানুষ ছিল। প্যাট্রিসিয়ান অর্থাৎ সবচে সম্ভ্রান্ত, প্লেবিয়ান অর্থাৎ কর্মচারী বা যোদ্ধা এবং স্লেভ বা দাস। স্লেভদের গৃহপালিত পশুর মর্যাদায় দেখা হত। রিপাব্লিকের সদস্য বা সিনেটর হওয়ার যোগ্য ছিল শুধু প্যাট্রিসিয়ানদের, প্লেবসদের ভোটাধিকার ছিল। রোমের বড় বড় ব্যবসা থেকে শুরু করে বিস্তীর্ন জমি ও মূল্যবান ধন-সম্পদের মালিক ছিল প্যাট্রিসিয়ানরা। প্লেবরা ছিল যোদ্ধা ও অন্যান্য পেশাদারি কাজে নিয়োজিত এবং তাদের আয় ছিল সীমিত।
প্লেবদের কাছে সীজার ছিল অসম্ভব জনপ্রিয়। মার্ক এন্থনী সেই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। তার মূল লক্ষ্য হয়ে যায় সমগ্র রোমের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা। কিন্তু মূল চমক থাকে সীজারের অছিয়ত নামায়, যেখানে সীজার তার প্রপৌত্র (ভাগ্নির ছেলে) গায়াস অক্টাভিয়াসকে তার একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসাবে ঘোষণা দিয়ে যায়। আর সে কারণেই অক্টাভিয়াস নিজেকে গায়াস জুলিয়াস অক্টাভিয়ান সীজার বা সীজারের পুত্র ঘোষণা করবার অধিকার পেয়ে যায়। তখন অক্টাভিয়ানের বয়স মাত্র ১৭।
সিজারের উত্তরাধিকারী অক্টাভিয়ান পরবর্তী সময়ে "দেবতা অগাস্টাস" এর সাথে মিলিয়ে অগাস্টাস সীজার নাম নিয়ে একক শক্তিতে পরিণত হয়। এরপর শুরু হয় "মাইটি অগাস্টাস যুগ" । মাইটি অগাস্টাস যুগ ‘রোমান সাম্রাজ্যের’ বুনিয়াদ গড়ে দেয় আর সেই সঙ্গে গোড়াপত্তন করে দেয় আজকের পশ্চিমা সভ্যতার।
বিশিষ্ট ঐতিহাসিক স্যার রোনাল্ড সাইম লিখেছেন যে ‘রোমান সাম্রাজ্যের’ (Roman Empire) গোডাপত্তন হয় আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব 27 সালে। যীশুখ্রীষ্টের আরেক নাম ছিল আমিন (Rev.iii.14) এবং এই সময়ই আমিনতাসের রাজ্য অগাষ্টাস বলপূর্বক গ্রাস করেন । তিনি দাবী করেন যে আমিনতাস উইল করে তাঁর রাজ্য রোমান সাম্রাজ্যকে দান করেছেন। ষ্ট্রাবো পরিষ্কার ভাষায় লিখেছেন যে অগাষ্টাসের উইলটি জাল। ধারণা করা যায় ‘রোমান সাম্রাজ্যের’ গোড়াপত্তন হয় যীশুখ্রীষ্টের রক্তাক্ত দেহের উপরে।
বিষয়টি বড়ই স্পর্শকাতর। এটা খুবই আশ্চর্যের যে বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যীশুখ্রীষ্টের কোন প্রত্নচিহ্ন প্যালেষ্টাইন অথবা অন্য কোনখানে নির্দিষ্ট করা যায় নি। এর অর্থ একথা হতে পারে না যে যীশুখ্রীষ্ট ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন না। কিন্তু শুধু যীশুখ্রীষ্ট নয়, তাঁর বহু শিষ্যের মধ্যে সেন্ট পল, সেন্ট টমাস, সেন্ট মার্ক বা অন্য কারোরই কোন প্রত্নচিহ্ন কোনখানে পাওয়া যায় নি। এই মহাপ্রমাদের এক মাত্র কারণ হতে পারে ভ্রান্ত কালপঞ্জি।
বিশিষ্ট ঐতিহাসিক A. T. Olmstead লিখেছেন যে যীশুখ্রীষ্টের জন্ম হয়তো হয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব 20 সালে । Robin Lane Fox এর মতে New Testament লেখকেরা যীশুখ্রীষ্টের জন্মবৃত্তান্ত সম্বন্ধে কিছুই জানতেন না। রোমান সাম্রাজ্যের বুনিয়াদের জন্য প্রয়োজন ছিল নতুন একটি ধর্মের।
নতুন এই ধর্মকে সবচেয়ে সার্থকভাবে ব্যবহার করতে পেরেছিল কনস্টান্টাইন দ্য গ্রেট।
চতুর্থ শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্য ভেঙে চার টুকরা হয়ে যায়, ভেঙে পড়ে কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা। পার্সিয়ান ও গোথ এর আক্রমণে শক্তিশালী রোম ক্রমেই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে উঠছে। প্যাগান টেম্পল নানাধারায় বিভক্ত। তাদের মধ্যে চলছিল তখন ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।
৩০৬ খ্রিস্টাব্দে পিতার মৃত্যুর পর কনস্টান্টিন সম্রাট হন। বুদ্ধিমান কন্সট্যান্টাইন ভর করলেন খ্রিস্ট ধর্মের উপর। “ওয়ান গড ওয়ান টেম্পল ওয়ান ইম্পেরর ” - মেসেজটি ছড়িয়ে দেয়া হয় সৈনিকদের ভেতর, যা সৈনিকদের মধ্যে হয়ে তুমুল জনপ্রিয় ওঠে।
ক্রিশ্চিয়ানিটি রোমান সাম্রাজ্যের রাজ্ ধর্মে পরিণত হয়। চালু হয় কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থ। ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে রোমান সাম্রাজ্য, টিকে যায় কয়েক শত বছর।
অষ্টদশ শতাব্দীতে "ওয়ান গড ওয়ান টেম্পল ওয়ান ইম্পেরর ” মতবাদের উপর ভর করে জিহাদপন্থী সালাফি মতবাদ গড়ে ওঠে। “এক নেতা, এক শাসক, এক মসজিদ” মতবাদকে শাসনের তিন স্তম্ভ হিসাবে গ্রহণ করা হয়। ©রাজিক হাসান
১৯
আমরা সবাই সুখের পেছনে দৌড়াচ্ছি। কিন্তু সেটা কি সত্যিই সুখ? নাকি শুধুই সাময়িক উত্তেজনা?
কেন আমাদের এই অবিরাম ছুটে চলা আমাদের খুশি করতে পারছে না:
১. ডোপামিন (Dopamine) কোনো সুখের হরমোন নয়!
আমরা ভাবি, সোশ্যাল মিডিয়ার লাইক, পছন্দের জাঙ্ক ফুড, বা ক্রাশের একটা রিপ্লাই আমাদের যে আনন্দ দেয়, সেটাই সুখ। বিজ্ঞান একে বলে ডোপামিন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ডোপামিন কোনো 'সুখের কেমিক্যাল' নয়, এটি হলো 'চাওয়ার কেমিক্যাল' (Wanting Chemical)। এটি আপনাকে কোনো কিছুর প্রতি আসক্ত করে তোলে, কিন্তু মন ভরাতে পারে না।
২. হেডোনিক ট্রেডমিল (The Hedonic Treadmill): এক অন্তহীন দৌড়
সমাজ আমাদের শিখিয়েছে— অনেক টাকা, দামি গাড়ি, বা আরামদায়ক জীবন মানেই সুখ। এই ভুল ধারণার কারণে আমরা এক অদ্ভুত ট্রেডমিলে দৌড়াচ্ছি। ট্রেডমিলে মানুষ যেমন দৌড়ালেও কোথাও পৌঁছায় না, ঠিক তেমনি কেবল জাগতিক জিনিসের পেছনে ছুটলে আমাদের পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে, কিন্তু প্রাপ্তির আনন্দ মেলে না।
৩. আসক্তি ও বিষাক্ত সম্পর্কের (Toxic Relationship) মূল কারণ:
অতিরিক্ত প্লেজার বা সাময়িক আনন্দের পেছনে ছুটলে আমাদের মস্তিষ্কের 'চাওয়া' এবং 'পাওয়া'-এর সিস্টেম আলাদা হয়ে যায়। তখন আমরা এমন জিনিসের পেছনেও ছুটি, যা আমাদের আর আনন্দ দেয় না, বরং কষ্ট দেয়।
সারাদিন উদ্দেশ্যহীনভাবে ফোন use করা, বা একটা কষ্টদায়ক সম্পর্কের (Toxic Relationship) মায়ায় আটকে থাকাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আমরা জানি এটা আমাদের ক্ষতি করছে, তবুও আমরা ছাড়তে পারি না।
৪. সত্যিকারের সুখ লুকিয়ে আছে 'সেরোটোনিন' (Serotonin)-এ
প্রকৃত সুখ কোনো সাময়িক উত্তেজনা নয়। সত্যিকারের সুখ হলো— শান্তি, স্থায়িত্ব এবং তৃপ্তি। আর এটি আসে মস্তিষ্কের অন্য একটি কেমিক্যাল থেকে, যার নাম 'সেরোটোনিন'। ডোপামিনের মতো এটি হঠাৎ করে বাড়ে না, বরং ধীরে ধীরে তৈরি হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়।
৫. কিভাবে পাবেন এই সত্যিকারের সুখ?
সত্যিকারের সুখ কোনো দামি দোকানে বিক্রি হয় না। এটি তৈরি হয় ৩টি সাধারণ জিনিসের মাধ্যমে:
নিরাপদ সম্পর্ক (Secure Relationships): পরিবার, প্রিয়জন এবং সত্যিকারের বন্ধুদের সাথে কাটানো সুন্দর সময়।
অর্থবহ কাজ (Meaningful Purpose): এমন কোনো কাজ করা, যা অন্যের উপকারে আসে বা আপনার জীবনে একটি উদ্দেশ্য তৈরি করে।
পরিশ্রম ও প্রকৃতি (Movement & Nature): শারীরিক পরিশ্রম করা এবং প্রকৃতির আলো-হাওয়ায় থাকা। (এজন্যই গবেষণায় দেখা যায়, এসি রুমে বসে থাকা কর্পোরেট বসের চেয়ে, খোলা আকাশের নিচে কাজ করা একজন সাধারণ কর্মী অনেক বেশি সুখী!)
শেষ কথা
'প্লেজার' বা সাময়িক উত্তেজনার দাসত্ব করা বন্ধ করুন। স্ক্রিনের ক্ষণিকের মোহের পেছনে না ছুটে, জীবনের সত্যিকারের শান্তির পেছনে সময় দিন।
"একবার যখন আপনি এই সিস্টেমটি বুঝে যাবেন, তখন পৃথিবীটাকে দেখার আপনার দৃষ্টিভঙ্গিটাই বদলে যাবে!"
এমনই সব পাওয়ারফুল টিপস এবং প্র্যাকটিক্যাল জীবন দর্শন পেতে আমাদের পেজটি 'ফলো' করে রাখুন। ইন্টারনেটে ভালো কনটেন্টের ভিড়ে এই ধরণের ‘Real & Practical’ তথ্য পাওয়া সত্যিই বিরল। হারিয়ে যাওয়ার আগেই যুক্ত হোন আমাদের সাথে! @ Rohit Baagdii
২০
মানুষ যখন হতাশা, চাপ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তখন মানুষের সহনশীলতা কমে যায়।
কিছু সমাজ আছে যেখানে মতভেদ মানেই আলোচনা। আবার কিছু সমাজ আছে যেখানে মতভেদ মানেই যুদ্ধ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সমাজে অনেক সময় দ্বিতীয় ছবিটাই বেশি চোখে পড়ে।
একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায়—কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে প্রতিদিনই হট্টগোল তৈরি হয়। আজ একটি ইস্যু, কাল আরেকটি, পরশু নতুন আরেকটি। যেনো বিতর্ক না থাকলে জীবন থেমে যাবে। যেনো গলা ফাটিয়ে চিৎকার, অপমান, হুমকি—এসবই দেশপ্রেমের প্রমাণ।
কিন্তু সভ্য সমাজে মতভেদ মানে আলাপ। যুক্তি দিয়ে কথা বলা, ভিন্ন মত শুনে নেওয়া, তর্ক করা—এগুলোই সভ্যতার লক্ষণ। অথচ আমাদের বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় উত্তেজনা।
শহরের রাস্তায় তাকালেই বোঝা যায় এই মানসিকতার ছাপ কত গভীরে। রিকশাওয়ালা আর যাত্রীর ঝগড়া, গাড়িচালক আর পথচারীর তর্ক, দোকানি আর ক্রেতার উত্তেজনা—সবখানেই যেনো এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করে। পোশাক আলাদা, আয় আলাদা, শিক্ষা আলাদা—কিন্তু আচরণের তাপমাত্রা প্রায় একই।
কখনো হাসপাতালের করিডোরে রোগীর স্বজনের সঙ্গে কর্মচারীর ধাক্কাধাক্কি, কখনো রেস্টুরেন্টে সামান্য কথায় উত্তেজনা, কখনো ফুটপাথে হাঁটার জায়গা নিয়ে তর্ক। মনে হয় যেনো আমরা সবাই এক অদৃশ্য রাগ নিয়ে বেঁচে আছি।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, যখন একটি সমাজ দীর্ঘদিন হতাশা, চাপ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে, তখন মানুষের সহনশীলতা কমে যায়। তখন মানুষ খুব সহজে উত্তেজিত হয়। ছোট ঘটনাও বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।
২১
মানব ইতিহাসের ১৪টি অদ্ভুত চিকিৎসার কাহিনী
চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির ফলে স্বাস্থ্যসেবার দিক দিয়ে চমৎকার একটি সময় পার করছে মানবজাতি। নিয়মিত বিরতিতে নানা ওষুধ ও যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন, উন্নততর নানা গবেষণা মানুষকে দেখাচ্ছে আরো কিছুটা বেশি সময় সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। তবে আজ থেকে কয়েকশ কিংবা কয়েক হাজার বছর আগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিস্থিতি কিন্তু এর ধারেকাছেও ছিলো না। তখনকার দিনের নানা চিকিৎসা পদ্ধতির কথা শুনলে এখন হয়তো হাসতে হাসতে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে অনেকের, প্রবল বিস্ময়ে হাঁ হয়ে যাবে গোটা মুখটিই! অতীতের সেসব কিছু বিচিত্র চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের পুরো লেখা।
১। ত্যাগকৃত বায়ু
জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বায়ু ত্যাগের মতো ব্যাপারের মধ্য দিয়ে যেতে হয় প্রতিটি মানুষকেই। চিরন্তন সত্য এ বিষয়টি অবশ্য জনসমক্ষে ঘটলে এর শব্দ ও গন্ধের কারণে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায় সবাই। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এককালে চিকিৎসকেরা দুর্গন্ধযুক্ত এ বায়ুকেই চিকিৎসার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতেন!
মধ্যযুগে ব্ল্যাক ডেথের মতো মহামারীর সম্মুখীন হয়ে চিকিৎসকেরা ভেবেছিলেন, এটা বুঝি কোনো খারাপ বাতাসের প্রভাবে হচ্ছে। তাই ‘বিষে বিষক্ষয়’ নীতির দ্বারস্থ হয়ে সেই খারাপ বাতাসকে তারা মানবদেহ থেকে ত্যাগকৃত বায়ুর মতো আরেক খারাপ বাতাস দিয়ে প্রতিরোধের চিন্তা করেছিলেন। তারা সাধারণ মানুষকে সেই ত্যাগকৃত বায়ু কোনো জারে সংরক্ষণের পরামর্শ দিতেন! পার্শ্ববর্তী কোথাও আক্রমণের খবর পেলেই মানুষজনকে সেই জার খুলে তার গন্ধ শোঁকার পরামর্শই দিয়েছিলেন তখনকার চিকিৎসকেরা। অবশ্য ত্যাগকৃত বায়ুর গন্ধ যে প্লেগকে তাড়াতে পারে নি তা বোধ হয় না বললেও চলে।
২। অন্ডকোষ
গত শতকের শুরুর দিকে আমেরিকার বেশ পরিচিত এক ডাক্তার ছিলেন জন রিচার্ড ব্রিঙ্কলে। তাকে অবশ্য ডাক্তার না বলে হাতুড়ে ডাক্তার বলাই ভালো। কারণ চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিলো খুবই সীমিত। তবুও তিনি এ ‘ডাক্তার’ নাম ভাঙিয়ে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছিলেন।
সক্ষমতা বাড়ানো, সন্তান ধারণে অক্ষমতা কিংবা এ ধরণের আরো নানা যৌন রোগের চিকিৎসা করতেন তিনি এক অদ্ভুত উপায়ে। সব ক্ষেত্রেই পাঁঠার অন্ডকোষ কেটে নিয়ে তা তিনি একজন অক্ষম পুরুষের অন্ডকোষের জায়গায় প্রতিস্থাপন করে দিতেন! তার এ অপচিকিৎসার শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছিলো অনেককেই।
৩। গ্ল্যাডিয়েটরের রক্ত
প্রাচীন রোমে নগরবাসীর বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিলো গ্ল্যাডিয়েটরদের যুদ্ধ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দাস ও বন্দীদের মাঝে আমরণ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলো খুব উপভোগ করতো তারা। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এসব যুদ্ধ থেকে মানসিক আনন্দ লাভের পাশাপাশি সেসব যোদ্ধাদের রক্তকেও বৃথা যেতে দিতো না তারা। শেষ যুদ্ধটি শেষ হবার সাথে সাথেই মানুষজন ছুটে যেতো একেবারে যুদ্ধের জায়গায়। সেখানে মৃত গ্ল্যাডিয়েটরের রক্ত কে আগে খাবে তা নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যেতো তাদের মাঝে! এ থেকে বাদ যেতো না মৃত যোদ্ধার যকৃতও। তারা মনে করতো, এভাবে মৃত গ্ল্যাডিয়েটরের রক্ত পান করলে মৃগী রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব!
৪। রক্ত
একসময় ধারণা করা হতো, মানুষের বিভিন্ন অসুস্থতার কারণ হলো ‘দূষিত রক্ত’। আর তাই এ রক্তকে শরীর থেকে বের করে দেয়াই ছিলো বিভিন্ন অসুস্থতার চিকিৎসা। প্রাচীন গ্রীস ও রোমে এমনটা দেখতে পাওয়া যায়। তখন কোনো রোগে আক্রান্ত হলে একজন চিকিৎসক তার রোগীর একটি শিরা কেটে কিছুটা রক্ত একটি পাত্রে জমা করে রাখতেন। এমনকি শরীর থেকে রক্ত বের করতে সরাসরি জোঁকও ব্যবহার করা হতো। মধ্যযুগীয় চিকিৎসকেরা গলা ব্যথা থেকে শুরু করে প্লেগ পর্যন্ত সবকিছুতেই শরীর থেকে রক্ত বের করার পথ বেছে নিতেন। এমনকি কিছু কিছু নাপিতও তাদের স্বাভাবিক চুল কাটা ও দাড়ি ছাঁটার পাশাপাশি এ দূষিত রক্ত বের করে দেয়াকে পার্শ্বব্যবসা হিসেবে বেছে নিয়েছিলো। এখনো কিছু কিছু রোগের চিকিৎসার জন্য এ পদ্ধতির সাহায্য নেয়া হয়।
৫। খুলিতে ছিদ্র
চিকিৎসা পদ্ধতির নামটা পড়েই তো ভয়ে কেমন যেন গা ছমছম করে ওঠে! এর প্রচলন ছিলো আজ থেকে প্রায় ৭,০০০ বছর আগে। তখন খুলিতে ছিদ্র করেই রোগমুক্তির পথ খোঁজা হতো। তবে সময়টা অনেক আগেকার বলে গবেষকেরা এর কারণ কিংবা প্রকৃত কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে কেবল অনুমান করতেই পারেন।
সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো- খুলিতে ছিদ্র করার এ ব্যাপারটি সম্ভবত কোনো ধর্মীয় আচারের অংশ যেখানে একজন শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিকে খারাপ আত্মার হাত থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করা হতো। অনেকের মতে এ পদ্ধতিটি মৃগী রোগ, মাথা ব্যথা, ফোঁড়া এবং রক্ত জমাট বাঁধার মতো সমস্যার সমাধানে ব্যবহৃত হতো। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, এমন ভয়াবহ এক অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যাবার পরও তখনকার সময়ে রোগী বেঁচে যাওয়ার প্রমাণ আছে!
৬। মানুষের চর্বি
শুরুর দিককার ইউরোপিয়ান ওষুধ প্রস্তুতকারকেরা দাঁতব্যথা, হাড়ে ব্যথা ও গেটেবাঁতের চিকিৎসার জন্য প্রস্তুতকৃত মলমে সরাসরি মানুষের চর্বিই ব্যবহার করতেন। একে অনেকটা সর্বরোগের ওষুধ হিসেবেই ধরা হতো।
৭। মায়ের দুধ
মায়ের বুকের দুধ একটি শিশুর জন্য কতটা দরকারি তা নিশ্চয়ই কারো অজানা নয়। তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মধ্যযুগীয় বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতিতেও একে ব্যবহার করা হতো।
চোখে দেখতে অথবা কানে শুনতে সমস্যা হচ্ছে? তাহলে লতাগুল্ম বা মধুর সাথে মায়ের বুকের দুধ মিশিয়ে তা চোখে-কানে ছিটিয়ে দেয়ার মাধ্যমেই খোঁজা হতো রোগমুক্তির পথ। ইংরেজরা তো ছিলো আরো এগিয়ে। ফ্লু, আলসার, ইনফেকশন, জন্ডিস, এমনকি পাগলামির প্রতিকারেও তারা দ্বারস্থ হতো এ মাতৃদুগ্ধের কাছে!
৮। মমীচূর্ণ
প্রাচীন মিশরীয়দের সময় থেকে শুরু করে আঠারো শতক পর্যন্ত গেঁটেবাত, টিউমারসহ বিভিন্ন রোগ নিরাময়ে মমীচূর্ণ ব্যবহার করা হতো। এমনকি একে কামোদ্দীপক বস্তু হিসেবে ব্যবহারের কথাও জানা যায়।
৯। মানুষের মল
মানবদেহ থেকে বলপূর্বক (!) বের হওয়া দুর্গন্ধযুক্ত, হলুদাভ এ জিনিসটি থেকে মুক্তি চায় সবাই। কিন্তু প্রাচীনকালে চীনে ওষুধ হিসেবে এর ব্যবহার ছিলো খুবই সাধারণ এক ঘটনা। চতুর্থ শতকের দিকে সরাসরি পানি কিংবা মাছ, মাংস, তরকারি সিদ্ধ করা পানিতে সামান্য মল মিশিয়ে তা রোগীকে খাওয়ানো হতো পেটের বিভিন্ন রোগ সারানোর উদ্দেশ্যে! মিশরীয়রাও একে সর্বরোগের মহৌষধ মনে করে ব্যবহার করতো!
১০। ক্লাইস্টার
কোষ্ঠকাঠিন্যের জ্বালা কেমন তা এ সমস্যার ভেতর দিয়ে যাওয়া ব্যক্তিই ভালোভাবে বোঝেন। এ সমস্যা কাটাতে অধিকাংশ সময়ই আমরা খাদ্য তালিকায় কিছুটা পরিবর্তন এনে থাকি। এতেও কাজ না হলে দ্বারস্থ হতে হয় চিকিৎসকের। সতের থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত এ সমস্যার সমাধানে ক্লাইস্টার ছিলো বেশ জনপ্রিয়। এটি মলদ্বারের ভেতর সিরিঞ্জের সাহায্যে তরল পদার্থ ঢোকাতে ব্যবহার করা হতো। এর মূল ব্যবহারকারী ছিলো সমাজের উঁচু শ্রেণীর মানুষেরা। পানির সাথে লবণ, বেকিং সোডা কিংবা সাবান মিশিয়ে তৈরি করা হতো এ তরল দ্রবণটি। কোনো কোনো চিকিৎসক আবার সেই তরলে কফি, ভুষি, গুল্ম, মধু ইত্যাদি ব্যবহার করতেন।
কথিত আছে, ফ্রান্সের সম্রাট চতুর্দশ লুঁই নাকি তার জীবদ্দশায় ২,০০০ বারেরও অধিক সময় এ ক্লাইস্টারের দ্বারস্থ হয়েছিলেন!
১১। কুমিরের মল
জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমানে কী কী পদ্ধতি প্রচলিত আছে তা বোধহয় আধুনিক মিডিয়ার কল্যাণে সন্তান জন্ম প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞ শিশুটিও জানে! কিন্তু প্রাচীনকালে তো পরিস্থিতি এখনকার মতো ছিলো না। এখনকার মতো হরেক রকম পদ্ধতির অনুপস্থিতি তখনকার সময়ের ব্যাপারটিকে করে তুলেছিলো বেশ জটিল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মারাত্মক অস্বাস্থ্যকরও।
এই যেমন কুমিরের মলের কথাই ধরা যাক। প্রাচীন মিশরের স্ত্রীর সাথে মিলিত হবার আগে একজন স্বামী জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে স্ত্রীর যোনিপথে কুমিরের শুকনো মল লাগিয়ে নিতেন! তাদের কথা ছিলো- শরীরের উত্তাপে ভেতরে থাকা সেই মল ভিজে গিয়ে বীর্যের জন্য এক চমৎকার বাধা হিসেবে কাজ করে নিয়ন্ত্রণ করবে সন্তানের সংখ্যা! একই কাজে আরো ব্যবহার করা হতো গাছের প্রাণরস, লেবুর অর্ধাংশ, তুলা, উল কিংবা হাতির মল।
১২। জিহ্বার কর্তন
আঠারো-উনিশ শতকের দিকে তোতলানোর চিকিৎসা হিসেবে চিকিৎসকেরা রোগীর জিহ্বার অর্ধেকই কেটে ফেলতেন।
১৩। ভেড়ার যকৃত
আদি যুগে তো এখনকার মতো রোগ নির্ণয়ের জন্য এতসব যন্ত্রপাতি ছিলো না, তাহলে তারা কীভাবে রোগ নির্ণয় করতো? এতক্ষণ ধরে উল্লেখ করা বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে জেনে অন্তত এটকু বুঝে যাবার কথা যে তখনকার দিনে ছিলো মূলত কুসংস্কারের রাজত্ব। রোগ নির্ণয়ও এর বাইরে ছিলো না।
এই যেমন মেসোপটেমিয়ার কথাই ধরা যাক। সেখানে একজন চিকিৎসক তার রোগীর কী রোগ হয়েছে তা বুঝতে সরাসরি রোগীকে পরীক্ষা না করে বরং পরীক্ষা করতেন সেই রোগীর পক্ষ থেকে উৎসর্গ দেয়া ভেড়ার যকৃত!
১৪। মৃত ইঁদুরের মিশ্রণ
দাঁতের ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে আমরা সাধারণত কুসুম গরম পানিতে কিছুটা লবণ মিশিয়ে কুলি করে থাকি। তাতে স্থায়ী সমাধান না মিললেও অন্তত সাময়িক স্বস্তি ঠিকই মেলে। কিন্তু প্রাচীন মিশরীয়দের বোধহয় এটা জানা ছিলো না। তাই দাঁতের ব্যথায় তারা মুখে মরা ইঁদুর নিয়ে ঘুরতো! অনেকে আবার ইঁদুর চটকে সেটি অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশিয়ে তারপর ব্যথার স্থানে লাগাতো ব্যথা থেকে মুক্তির অভিপ্রায়ে।
শুধু মিশর কেন, বর্তমানে অনেকের কাছেই ‘সভ্য’ জাতির রোল মডেল ইংরেজরাও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। রাণী প্রথম এলিজাবেথের সময়কালে আঁচিল থেকে মুক্তি পেতে অর্ধেক করে কাটা ইঁদুর আক্রান্ত জায়গায় লাগিয়ে রাখা হতো। সেই সাথে হাম, হুপিং কাশি, স্মলপক্স কিংবা ঘুমের ঘোরে প্রস্রাব করে বিছানা ভেজানোর মতো উটকো ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতেও এককালে ইংরেজরা ইঁদুর ব্যবহার করতো। @ Muhaiminul Islam Antik
২২
সিলেটের করিমগঞ্জ যেভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলো
শের দেশভাগ উপমহাদেশের এক ঐতিহাসিক বিতর্কিত বিষয়। বিতর্কিত এই দেশভাগে কত মানুষ তার পৈত্রিক সম্পত্তি হারিয়েছে, কত মানুষকে তার সহায়-সম্বল সবকিছু ফেলে পাড়ি জমাতে হয়েছে ভিনদেশে, কিংবা কত মানুষ জন্মভূমি ছেড়েছে আর পেছনে রেখে গেছে তার শৈশবের সোনালী স্মৃতি তার কোনো হিসাব নেই। দু’চোখের জল ফেলে যখন বাপদাদার ভিটা ছাড়তে হয়েছে তখন তাদের মনের “কী অপরাধ করেছি আমরা?” এমন প্রশ্নের উদয় হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো আজও কারো জানা নেই।
দেশভাগের সময় বেশ কিছু বিতর্কিত অঞ্চলের মধ্যে করিমগঞ্জ অন্যতম। করিমগঞ্জ বর্তমান ভারতের আসাম রাজ্যের একটি জেলা। ১৭৮৫ সালে যখন সুবা বাংলার দেওয়ানি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোস্পানির হস্তগত হয় তখন করিমগঞ্জ সিলেটের অংশ হওয়ায় ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়। কিন্তু সমগ্র সুবা বাংলা ব্রিটিশদের অধীনে আসলেও করিমগঞ্জে ব্রিটিশরা এক বছর পর্যন্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
সেসময় দক্ষিণ করিমগঞ্জের রাধারাম নামক এক জমিদার করিমগঞ্জের বিশাল একটি অংশ নিজের অধীনে রাখতে সক্ষম হন। এই স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য তৎকালে জমিদার রাধারামকে অনেকেই ‘নবাব রাধারাম’ বলতে শুরু করেন। ব্রিটিশদের সাথে প্রথমবার যুদ্ধে জয়লাভ করে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও পরেরবার তিনি পরাজিত হন এবং ব্রিটিশদের হাতে বন্দী হন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যরা রাধারামকে যখন সিলেটে নিয়ে যায় তখন তিনি আত্মহত্যা করেন। ফলে ১৭৮৬ সাল থেকে সমগ্র করিমগঞ্জের উপর ব্রিটিশরা তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
১৮৭৮ সালে যখন সিলেট পৌরসভা গঠন করা হয় তখন ব্রিটিশ সরকার করিমগঞ্জকে মহকুমা করে সিলেটের সাথে জুড়ে দেন। সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণে কুশিয়ারা নদীর পাড়েই করিমগঞ্জ শহর অবস্থিত। করিমগঞ্জের আয়তন ১,৮০৯ বর্গ কিলোমিটার, যা মোটামুটি গাজীপুর জেলার থেকেও বড়। এ জেলার উত্তর-পূর্বে আসামের কাছাড় জেলা, পূর্বে হাইলাকান্দি জেলা, দক্ষিণ-পশ্চিমে ত্রিপুরা রাজ্য এবং উত্তর ও পশ্চিমে বাংলাদেশ দ্বারা বেষ্টিত। আসামের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে এর দূরত্ব ৩৩০ কিলোমিটার, অপরদিকে সিলেট শহর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৫০ কিলোমিটার।
এ জেলায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮৭ ভাগ মানুষ বাংলাভাষী, অন্যদিকে হিন্দিভাষী জনগোষ্ঠী মাত্র ৫.৭ ভাগ। এছাড়া জেলায় বসবাসকারী প্রায় ১৩ লক্ষ জনগণের মধ্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী রয়েছে প্রায় ৫৭ ভাগ, অপরদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ৪২ শতাংশ। দেশভাগের সময় অবশ্য মুসলিম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা আরো বেশি ছিল। আমাদের আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক সৈয়দ মুজতবা আলী জন্মেছিলেন এই জেলাতেই। কিন্তু কথা হলো, এই অঞ্চলটি কীভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলো?
বাংলাভাষী সিলেট অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবেই পূর্ববঙ্গের সাথে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ১৮৭৪ সালে যখন আসাম রাজ্য গঠিত হয় তখন ব্রিটিশ সরকার সিলেট অঞ্চলকে নবগঠিত আসাম রাজ্যের সঙ্গে জুড়ে দেয়। যদিও ওই অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ পূর্ববঙ্গের সঙ্গেই থাকতে চেয়েছিল। সিলেটকে আসামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার ফলে ওই অঞ্চল শিল্পসমৃদ্ধ হয় এবং স্থিতিশীল একটি রাজ্য হিসেবে আসাম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেসময় সিলেট ছিল শিক্ষাদীক্ষা এবং শিল্পায়নে অগ্রসর। অপরদিকে আসাম ছিল তুলনামূলক অনুন্নত। তাই সমৃদ্ধ রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সিলেটকে আসামের সাথে জুড়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল ব্রিটিশ সরকার।
প্রায় তিন দশক সিলেটের প্রশাসনিক অবস্থান এরকমই ছিল। ১৯০৫ সালে যখন বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হয় তখন আসামকে পূর্ববাংলার সাথে জুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে সিলেট পুনরায় বাংলার অংশ হয়ে ওঠে। এর স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ৬ বছর। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলে আবারও সিলেটের সাথে বাংলার বিচ্ছেদ ঘটে। সিলেট হয়ে ওঠে আসাম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রশাসনিক অঞ্চল।
১৯৪৭ সালের ৩রা জুন ভারতবর্ষের শেষ গভর্নর লর্ড মাউন্টব্যাটেন মুসলিম লীগ, কংগ্রেস এবং শিখদের সাথে বৈঠক শেষে ঘোষণা দেন ধর্মের ভিত্তিতেই দেশ ভাগ করা হবে। সুতরাং পাঞ্জাবের মতো বাংলাকেও ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। ফলে বাংলার কিংবদন্তি নেতা এ. কে. ফজলুল হকের অখণ্ড বাংলার স্বপ্ন মাটিতে পরিণত হয়।
ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বিভাজনের যে রূপরেখা প্রণয়ন করা হয় তাতে আসাম রাজ্যটি যাবে ভারতের অধীনে। তবে আসামের মাত্র একটি জেলা সিলেট নিয়ে বিভেদ দেখা দেয়। যদিও তখন সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাবলম্বী ছিল মুসলিম। অবশেষে ৩রা জুলাই ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ঘোষণা দিলেন- আসামের গভর্নর জেনারেলের তত্ত্বাবধায়নে সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ফলে সিলেটের মানুষ কোন দেশের সাথে থাকতে চায় সেই সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেওয়ার সুযোগ পাবে।
১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই ভোটগ্রহণ চলে। ব্যালট পেপারে জন্য দুটি প্রতীক নির্ধারণ করা হয়। একটি হলো কুড়াল, অপরটি কুঁড়েঘর। কুড়াল মার্কায় ভোট দেওয়ার অর্থ হচ্ছে পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে চাই, এবং কুঁড়েঘরে ভোট দেয়ার অর্থ হচ্ছে ভারতের সঙ্গে থাকতে চাই। সমগ্র সিলেট জুড়ে তখন মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৫,৪৬,৮১৫ জন। কুড়াল মার্কার পক্ষে মুসলিম লীগ ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে থাকে, অন্যদিকে কুঁড়েঘর মার্কা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সর্বভারতীয় কংগ্রেস।
সিলেটের সুনামগঞ্জ, করিমগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জ মিলে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষ অংশগ্রহণ করে। ৫৬.৫৬% ভোট পেয়ে কুড়াল মার্কা বিজয় অর্জন করে। ফলে সিলেটের পূর্ব পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তিতে আর কোনো বাধা থাকল না। ঠিক এই প্রক্রিয়াতেই সিলেটসহ হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ এবং করিমগঞ্জ মহকুমা বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল। তাহলে কীভাবে করিমগঞ্জ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলো?
করিমগঞ্জ যেভাবে ভারতের হলো
ব্রিটিশরা যখন সিদ্ধান্ত নিল যে, ধর্মের ভিত্তিতে ভারত এবং পাকিস্তান নামক দুটি দেশকে স্বাধীনতা দিয়ে তারা বিদায় নেবে, তখন এই দুই দেশের সীমানা নির্ধারণের দায়ভার দেওয়া হয় স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের হাতে। স্যার র্যাডক্লিফ ছিলেন ভারতবর্ষে একেবারেই নতুন। উপমহাদেশে কোনো কাজের অভিজ্ঞতা তার ছিল না। তার নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন সিলেটের গণভোটের পর থেকেই সীমানা নির্ধারণের কাজে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেয়।
অনেক সমীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর ১২ আগস্ট যখন ‘র্যাডক্লিফ লাইন’ প্রকাশিত হয়, তখন হতাশ ও বিক্ষুদ্ধ হয় মুসলিম লীগ, বিক্ষুদ্ধ হয় পূর্ব বাংলার নেতৃবৃন্দ। কেননা র্যাডক্লিফ লাইনে করিমগঞ্জসহ সিলেটের সাড়ে তিন থানাকে ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গণভোটে নিরঙ্কুশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সত্ত্বেও করিমগঞ্জ কেন ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলো তা আজও বিতর্কিত বিষয়। এটা ঘটেছিল র্যাডক্লিফের বদৌলতে অথবা কারসাজিতে। ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে ষড়যন্ত্রে এ কারসাজি করেন র্যাডক্লিফ- এমন ধারণাও প্রচলিত রয়েছে।
এরপর মুসলিম লীগের নেতারা অনেক দৌড়ঝাঁপ করেও কোনো ফায়দা হলো না। বিতর্কিত র্যাডক্লিফ লাইন অনুযায়ীই ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত নামে দুটি দেশ স্বাধীনতা লাভ করল। সেই সময় করিমগঞ্জ মহকুমার এসডিপিও ছিলেন এম এ হক, যিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এম এ হক দেশভাগের পর এক সপ্তাহ পর্যন্ত করিমগঞ্জকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৪ আগস্ট থেকে নিয়ম মেনে প্রতিদিন তিনি করিমগঞ্জ মহকুমা পুলিশ কার্যালয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করতেন এবং সিলেটে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ঘন ঘন তারবার্তা পাঠাতে থাকেন সামরিক সাহায্য পাঠানোর জন্য।
এম এ হক বলেন, প্রতিদিন আমি অপেক্ষায় থাকি, এই এলো বুঝি ফোর্স। না, আসে না। এভাবে একদিন/দুদিন করে সাত দিন কেটে গেল। এ দিকে ভারতীয় বাহিনী চলে এলো করিমগঞ্জ শহরে। আমি তখন নিরুপায়। আর কী-ই বা করতে পারি। মহকুমা পুলিশ কার্যালয় থেকে পাকিস্তানের পতাকাটা নামিয়ে গুটিয়ে নিলাম। তারপর চলে এলাম এপারে অর্থাৎ পাকিস্তানে। এভাবেই অবসান ঘটল এই অধ্যায়ের।
সেই থেকেই করিমগঞ্জ, রাতাবাড়ি, পাথরকান্দিসহ সিলেটের সাড়ে তিন থানা হয়ে গেল ভারতের। কিন্তু সেসময় সিলেটের ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ নবাব আলী কেন এম এ হকের তারবার্তায় সাড়া দিলেন না বা ফোর্স পাঠালেন না তা আজও অজানা। এম এ হকও এ ব্যাপারে কখনো কোনো মন্তব্য করেননি। @ Shakil Ahmed
২৩
পেঁয়াজের ইতিহাস: মানব সভ্যতায় পেঁয়াজের গুরুত্ব
পেঁয়াজ বর্তমান পৃথিবীতে রান্নায় ব্যবহৃত অন্যতম জনপ্রিয় একটি মসলা। নানা মজাদার রান্নায় ব্যবহারের পাশাপাশি পেঁয়াজের রয়েছে নানা ঔষধি গুণ। তাই পৃথিবীর প্রায় সব স্থানেই রয়েছে পেঁয়াজের আলাদা কদর। আমাদের দেশেও পেঁয়াজের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এই তো ক’দিন আগেও আমাদের দেশে পেঁয়াজ ছিল উচ্চমূল্য। অনেকেই সেসময় পেঁয়াজের সাথে অর্থের তুলনা কিংবা উপহার হিসেবে পেঁয়াজ দেওয়া ইত্যাদি নিয়ে মজা করেছিলেন। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন কিন্তু এই পেঁয়াজ সত্যই অর্থের বিকল্প ও লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মানুষ নানা উপলক্ষে একে অন্যকে উপহার দিত পেঁয়াজ! কী? বিশ্বাস হচ্ছে না? চলুন আজকে জেনে নেই পেঁয়াজের এই অদ্ভুত ইতিহাস সম্পর্কে।
পেঁয়াজ ছিলতে গিয়ে অনেকের চোখের জল নাকের জল এক হলেও পেঁয়াজের উপকারী গুণ ও আরোগ্য ক্ষমতা কিন্তু অবিশ্বাস্য! আর মসলা হিসাবে পেঁয়াজের গুরুত্ব তো বলাই বাহুল্য। পেঁয়াজ প্রাচীন মসলা। সেই প্রাচীন রোমের এক বিখ্যাত খাদ্যরসিক এপিসিয়াসের লেখাতে সর্বপ্রথম পেঁয়াজের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। প্রাচীন মিশরের বিখ্যাত পিরামিডের নির্মাণকাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের রান্নার মেনুতেও ছিল পেঁয়াজ। শুধু তাই নয়, পৃথিবীতে যখন কৃষি কাজের প্রচলন হয়নি সেই সময়েও খাদ্য হিসেবে পেঁয়াজের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে ঠিক কবে থেকে এই পেঁয়াজের চাষাবাদ শুরু হয়েছিল কিংবা ঠিক কবে থেকে রান্নায় পেঁয়াজের ব্যবহারের প্রচলন ঘটে তা সঠিক জানা যায়নি। মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার প্রায় সাত সহস্রাব্দ আগের ব্রোঞ্জ যুগের কিছু মানববসতিতে সবজি হিসাবে পেঁয়াজের ব্যবহারের কিছু নমুনা পাওয়া গিয়েছে। আরেক দল গবেষকের মতে, ইরান ও পশ্চিম পাকিস্তানে সর্বপ্রথম পেঁয়াজের চাষ করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন ইতিহাসের গোড়ার দিকে চাষ হওয়া কিছু ফসলের মধ্যে পেঁয়াজ অন্যতম। সহজেই নানা জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া, ধীর পচনশীলতা ও সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় প্রাচীন মানুষের কাছে পেঁয়াজ ছিল প্রয়োজনীয় একটি খাদ্য। আমেরিকান পেঁয়াজ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, প্রাচীন মানুষের তৃষ্ণাও মেটাতো পেঁয়াজ। যখন সব পুষ্টিকর খাদ্য ফুরিয়ে যেত সেসময় খাওয়ার জন্য আগে মানুষ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতো।
এসব কারণে পেঁয়াজ যে খুবই জনপ্রিয় একটি খাদ্য ছিল তা কিন্তু বলাই যায়। সেই সুদূর পূর্ব থেকে প্রাচীন মিশর অব্দি, পৃথিবীর বহু দেশে বহু সংস্কৃতিতে পেঁয়াজের ব্যবহারের বহু দলিল ইতিহাস ঘাটলেই পাওয়া যায়। সেই সাথে মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীর বহু স্থানে এই পেঁয়াজকেই অনন্ত জীবনের প্রতীক হিসাবে দেখা হতো। পেঁয়াজের গোলাকার আকৃতি ও এর সমকেন্দ্রিক একটির উপর আরেকটি চক্রাকার রিং থেকে এই ধারণার জন্ম বলে মনে করা হয়।
শুধু তাই নয়, প্রাচীনকালে মানুষের কাছে পেঁয়াজের ছিল বিশেষ গুরুত্ব। প্রাচীন মিশরীয়দের কাছে পেঁয়াজ ছিল পূজনীয় বস্তু। তারা মনে করতো মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য পেঁয়াজ অতি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তাদের সমাধির মধ্যে তারা পেঁয়াজ রাখতো। এই ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রমাণ পাওয়া যায় রাজা চতুর্থ রামেসিসের সমাধিতে। এই সমাধি আবিষ্কৃত হওয়ার পর দেখা যায় রাজা চতুর্থ রামেসিসের মমির দুই চক্ষু কোটরে ভরে রাখা হয়েছে পেঁয়াজ! এছাড়াও মৃতদেহের শরীরের নানা অংশে পেঁয়াজ রাখা হতো। বুকে পেঁয়াজের ফুল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হতো। মমির কান, পায়ের পাতা ইত্যাদি স্থানে পেঁয়াজ দিয়ে সাজানো হতো। বহু মিসরীয় পিরামিডের ভিতরের নানা চিত্রকর্মে পেঁয়াজের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বহু মিশরীয় যাজকদেরকেও ছবিতে পেঁয়াজ হাতে দেখা গিয়েছে।
পেঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধ কি আপনার অপছন্দ? তবে জেনে রাখুন, কিছু মিশরীয়দের ধারণা ছিল পেঁয়াজের এই ঝাঁঝালো গন্ধ ও তার জাদুকরী ক্ষমতায় মৃত মানুষ আবার নিঃশ্বাস নেওয়া শুরু করে। গবেষকদের মতে, এমন ধারণার পিছে কারণ হলো, পেঁয়াজের ঔষধি গুণ। পেঁয়াজের ঔষধি গুণের কারণে নানা অসুখ ভালো হতো। ফলে মিশরীয়রা পেঁয়াজকে জাদুকরী বস্তু মনে করতো।
তবে প্রাচীন মিশরীয়দের তুলনায় প্রাচীন গ্রিকরা পেঁয়াজের ব্যবহারে ছিল কয়েক ধাপ এগিয়ে। তারা পেঁয়াজের বহু স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে অবগত ছিল। ফলে প্রাচীন গ্রিসের ক্রীড়াবিদরা প্রচুর পরিমাণে পেঁয়াজ খেতো। এছাড়াও নিজেদের পেশী আরো মজবুত ও শক্তিশালী করতে রোমান গ্লাডিয়েটররা তাদের শরীরে পেঁয়াজ মালিশ করতো। রোমানরাও পেঁয়াজের নানা উপকারী দিক সম্পর্কে জানতো। তারা দাঁতের ব্যথা কিংবা অনিদ্রা দূর করতে পেঁয়াজ খেতো। প্রাচীন রোমে যে ব্যাপক আকারে পেঁয়াজের চাষ হতো তার প্রমাণ পাওয়া যায় অগ্নুৎপাতে চাপা পড়ে যাওয়া পম্পেই নগরীতে। সেখানেও প্রত্নতত্ত্ববিদরা খুঁজে পেয়েছেন পেঁয়াজ চাষের প্রমাণ। বাইবেলেও ইসরাইলীদের পেঁয়াজ খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়।
মধ্যযুগে পেঁয়াজকে দেখে হতো ‘সুপার-ফুড’ হিসাবে। সেসময় মানুষ ঠিক মুদ্রার মতো পেঁয়াজ ব্যবহার করতো। নানা কাজের পারিশ্রমিক হিসাবে কিংবা ভাড়া পরিশোধ করার ক্ষেত্রেও পেঁয়াজের প্রচলন ছিল। এছাড়াও বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান যেমন বিয়েতে মানুষ বর-কনেকে পেঁয়াজ উপহার দিতো। মধ্যযুগে ইউরোপীয় রান্নার প্রধান তিন উপাদান ছিল শিম, পেঁয়াজ ও বাঁধাকপি। ধনী গরীব নির্বিশেষে সবাই খাবারে পেঁয়াজ ব্যবহার করতো।
ইতিহাসে ওষুধ হিসাবেও পেঁয়াজের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে ষোড়শ শতাব্দীতে ওষুধ হিসাবে পেঁয়াজের কিছু অদ্ভুত ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। যেসব মহিলার সন্তান জন্ম দিতে সমস্যা দেখা যেত কিংবা যাদের কোনো ছেলেমেয়ে হতো না তাদেরকে বিশেষভাবে পেঁয়াজ খেতে দেওয়া হতো। মাথাব্যথা উপশমের জন্য পেঁয়াজের ব্যবহার ছিল বহু প্রচলিত। এছাড়া সাপের কামড় ও চুল পড়া রোধে পেঁয়াজ ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হতো।
ষোড়শ শতাব্দীতে মানুষ যখন আটলান্টিকের অন্য পাশের উন্নত জীবন ও জীবিকার আশায় পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধে পাড়ি জমালো, তখন তারা তাদের সাথে করে কিছু পেঁয়াজ নিয়ে আসতে ভোলেনি। তাদের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে জানা যায়, আমেরিকায় সেই ঔপনিবেশিকদের মাধ্যমেই প্রথম পেঁয়াজের চাষ শুরু হয়। উত্তর আমেরিকায় পাড়ি জমানো প্রথম ঔপনিবেশিকদের প্রথম চাষ করা ফসল ছিল পেঁয়াজ। তবে, ইউরোপীয়দের আগমনের আগেই আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে পেঁয়াজের ব্যবহার চালু ছিল। তারা নানা সিরাপ, রঙ ও ওষুধ প্রস্তুত করার জন্য পেঁয়াজ ব্যবহার করতো। কাঁচা কিংবা রান্না করে এবং বিভিন্ন রান্নার মশলা হিসাবেও তারা ব্যবহার করতো পেঁয়াজ।
ভারতে ষষ্ঠ শতাব্দীতে পেঁয়াজের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ্যার গ্রন্থ চক্র সংহিতাতেও ওষুধ হিসাবে পেঁয়াজের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে পেঁয়াজকে মূত্রবর্ধক, হজমে সহায়ক, হৃদপিন্ড ও চোখের জন্য উপকারী হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আর প্রাচীনকালের এসব বর্ণনার সত্যতা মিলছে বর্তমানের আধুনিক নানা গবেষণায়। বর্তমানে পেঁয়াজের নানা ওষধি গুণ কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। পেঁয়াজ থেকে নানা ওষুধও তৈরি হয় এখন।
তাই পেঁয়াজ যদি আপনার অপছন্দের তালিকায় থেকে থাকে কিংবা পেঁয়াজকে যদি আপনার তুচ্ছ কোনো মশলা বলে মনে হয়, তবে আশা করা যায় আজকের এই লেখা পড়ার পর আপনার ধারনা হয়তো কিছুটা হলেও বদলাবে। @ Tawfiqur Rahman
২৪
শাড়ি: ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ধারক ও বাহক
বাঙালি নারীর জীবনে শাড়ি চিরকালই একটা আলাদা ভূমিকা রেখে এসেছে। বাঙালিয়ানার সাথে নারীর পোশাক হিসেবে শাড়ি আর পুরুষের পোশাক হিসেবে লুঙ্গি উভয়ই ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকলেও কালের বিবর্তনে লুঙ্গি যতটা ব্রাত্যজনের পোশাকে পরিণত হয়েছে, সে তুলনায় শাড়ি তার আভিজাত্য, মর্যাদা, গাম্ভীর্য, আবেদন তীব্রভাবে ধরে রেখেছে। পোশাকের সাথে অনুভূতির এতটা সুগভীর মেলবন্ধন সচরাচর দেখা যায় না। শাড়ির ইতিহাস খেয়াল করলেও দেখা যাবে, তার রয়েছে এক অসম্ভব সমৃদ্ধ পথচলা; যা কিনা নকশার বৈচিত্র্যে, কাপড়ের বুননে, আবহাওয়ার তারতম্যে, কারিগরির নৈপুণ্যে টইটুম্বুর।
ধারণা করা হয়ে থাকে, বাংলা ‘শাড়ি’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘শাটী’ থেকে। তবে ইতিহাসবিদরা শব্দের এ আগমন নিয়ে একেবারে নিশ্চিত নন। কেননা, এর বিপরীতে মতবাদ প্রচলিত যে, ‘শাটী’ শব্দটি নিজেও সংস্কৃত ভাষার মৌলিক সম্পদ নয়। ভারতবর্ষে আর্যদের আগমনের আগেও সম্ভবত ‘শাটী’ শব্দের প্রচলন ছিল। আর মধ্যভারতীয় আর্য ভাষায় শাড়ির সমার্থক হিসেবে ‘সাটক’ বা ‘সাটিকা’ ইত্যাদি শব্দের প্রমাণ মেলে। মহাভারতে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের যে ঘটনা উল্লিখিত, সেটি শাড়ি বলেই সবক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয়।
ঋগ্বেদের দিকে নজর দিলে বলতে হয়, তাতে পোশাক হিসেবে শাড়ির উল্লেখ ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ বছরের দিকে। ঋগ্বেদানুসারে, বিভিন্ন ভারতীয় মূর্তির গায়ে পোশাক হিসেবে শাড়ি জড়ানো ছিল। তখনকার সময়ে শাড়ি তার আক্ষরিক অর্থেই পরিধেয় বস্ত্র ছিল। অর্থাৎ এক টুকরো দীঘল কাপড়, যা নারীরা তাদের সর্বাঙ্গে জড়িয়ে নিত। ভারতবর্ষের আবহাওয়া এবং রক্ষণশীল পরিমণ্ডলে হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েই নারীর পোশাক হিসেবে শাড়ি বহুকাল ধরে এক বিশেষ অবস্থান দখল করে এসেছে।
গুপ্ত যুগের (আনুমানিক ৩০০ থেকে ৫০০ সাল পর্যন্ত) কবি কালিদাসের এক অনবদ্য রচনা ‘কুমারসম্ভব’, যেখানে শাড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। গুপ্ত আমলেরই ইলোরা অজন্তা গুহার প্রাচীন চিত্রাবলী থেকে শাড়ির অস্তিত্বের নিদর্শন মেলে। আবার পাহাড়পুর ও ময়নামতির পোড়ামাটির ফলক থেকে তথ্য মেলে, শাড়ির প্রচলন পূর্ববঙ্গেও ছিল। তবে যখনকার কথা বলা হচ্ছে, সেই প্রাচীনামলে শাড়ি এখনকার মতো করে পরা হতো না। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, পূর্ব-দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে মূলত এক খণ্ড কাপড় গায়ে জড়িয়ে নিয়ে নিজেকে আবৃত করাই চল ছিল। এ কাপড় পুরুষের গায়ে ধুতি, আর নারীর গায়ে শাড়ি নামে পরিচিত ছিল।
বাঙালি সমাজে দীর্ঘদিন পর্যন্ত শাড়ি পরা হতো শুধু শাড়ি হিসেবেই। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবী যখন ইংরেজদের ক্লাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গেলেন, তখন ব্রিটিশরা বাদ সেঁধে বসল। উন্মুক্ত বক্ষ নিয়ে কোনো নারীকে তারা পার্টিতে প্রবেশ করতে অসম্মতি জানায়। তখন থেকেই জ্ঞানদানন্দিনী দেবী অন্তর্বাস এবং ব্লাউজ পরা শুরু করেন এবং তারই হাত ধরে বাঙালি নারীর পোশাকের ইতিহাস আমূল বদলে যায়। মজার বিষয় হচ্ছে, ব্লাউজ ও পেটিকোট দু’টি শব্দ ইংরেজি হলেও এগুলো ভারতীয় ইতিহাসের প্রায় নিজস্ব সম্পদ বনে যায় ভ্যাটিকান আমলে।
ভারতীয় সংস্কৃতিকে মোটা দাগে তিন ভাগ করা যায়। হিন্দুস্তানি (বর্তমান পাকিস্তান ও উত্তর ভারত), কর্ণাটী (দক্ষিণ ভারত) এবং পূর্বভারতীয় (বাংলা, আসাম, উড়িষ্যা)। এর মাঝে পূর্বভারতীয় সংস্কৃতি প্রকৃতপক্ষে হিন্দুস্তান (আর্য) এবং কর্ণাটী (অনার্য) সংস্কৃতির মিশেলে গড়ে ওঠা। এসব কারণেই ভারতীয় নারীদের একটা সুবিশাল অংশ তাদের প্রধানতম পোশাক হিসেবে শাড়ি পরলেও পরনের শৈলীর ক্ষেত্রে আকাশ-পাতাল তারতম্য সুস্পষ্ট। বাঙালি নারীদের কেউ এক প্যাঁচে শাড়ি পরেন, আবার কেউ পরেন আঁচল দিয়ে। মারাঠিদের মাঝে শাড়িকে ধুতির আদলে পরার চল বিদ্যমান, রাজপুতানীরা শাড়িকেই ঘাগড়ার মতো করে পরে থাকেন আর কেরালার নারীরা শাড়ি পরার ক্ষেত্রে কখনও কোমরের বিছা, আবার কখনও শাড়ির আঁচলকে বিশেষ ঢঙে শরীরের সামনের দিকে গুঁজে থাকেন।
‘শাড়িস অভ ইন্ডিয়া: ট্র্যাডিশন অ্যান্ড বিয়োন্ড’ বইয়ের লেখক কাপুর চিশতীর গবেষণামতে, ভারতবর্ষে শাড়ি পরার শতাধিক উপায় আছে। অঞ্চল, কাপড়ের ধরন, বুনন শৈলী, শাড়ির দৈর্ঘ্য ইত্যাদির উপর নির্ভর করে নারীরা এই ভিন্ন ভিন্ন উপায় অবলম্বন করে শাড়ি পরেন। তিনি শাড়ি পরার এসব উপায়ের উপর একটি সিরিজ নির্মাণ করেছেন।
শাড়ির রকমফেরের কথা বলতে গেলে সে গল্প শেষ হওয়ার নয়। গঙ্গা নদীর পাশেই অবস্থিত বানারস শহরের মৌলিক সৃষ্টি বেনারসি শাড়ি। বেনারসি সিল্ক এই শাড়িগুলো সাধারণত খুব উজ্জ্বল রঙের হয় এবং বিভিন্ন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরা হয়ে থাকে। কেরালার নারীরা সাধারণত যেসব শাড়ি পরেন, সেগুলো ঊনিশ শতকের আগে, অর্থাৎ শিল্পায়ন পূর্ববর্তী ঐতিহ্যকে ধারণ করে চলেছে। আবার পশ্চিমবঙ্গে বালুচরি শাড়ি অসম্ভব জনপ্রিয়। শাড়ি, তা সে যে অঞ্চলেরই হোক না কেন, রঙে, ঢঙে, নকশায়, বুননের কারুকার্যে সবসময়ই একটা সময়ের গল্প বলে, যেটি অন্যান্য পোশাকের ক্ষেত্রে সম্ভবত একেবারেই দুর্লভ।
সেলাই বা সিয়ান শিল্পের বহুল প্রসার শাড়ি পরিধানের চলকে আমূল বদলে দেয়। সিয়ান শিল্প আসার আগে অর্থাৎ শাড়ি যখন আক্ষরিক অর্থেই সেলাইবিহীন একটি পোশাক ছিল, তখন শরীর আবৃত করার পর অবশিষ্ট অংশটুকু নারীদের গায়ের সামনে বা পেছন দিকে ঝুলে থাকত। সেলাইয়ের বদৌলতে ব্লাউজ, সায়া ইত্যাদি যখন শাড়ির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেল, তখন শাড়ির অত্যন্ত জনপ্রিয় ধারা ছিল ‘এক প্যাঁচে’ পরা। ব্লাউজ, পেটিকোট সহযোগে এক প্যাঁচে শাড়ি পরার মাধ্যমে নারীদের পর্দা রক্ষার কাজটি বেশ সুবিধার হয়ে এসেছিল। সাংসারিক কাজেও নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন এভাবে শাড়ি পরে।
একটা সময় পর এক প্যাঁচে শাড়ি পরার ধরনেও এল পরিবর্তন। নারীরা কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরতে আরম্ভ করলেন। এভাবে শাড়ি পরলে বাম কাঁধের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া আঁচল দিয়ে নারীদের অবগুণ্ঠনের কাজটি দিব্যি হয়ে যেত। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরার ধারণা এসেছিল মূলত অবাঙালিদের কাছ থেকে। ঘাগড়ার ঘেরাও কুঁচিই সামান্য পরিবর্তিত হয়ে ভারতীয় নারীর শাড়িতে স্থান করে নিয়েছে।
পোশাক হিসেবে শাড়ি যখন বাঙালিদের পাশাপাশি অবাঙালিদের মাঝেও জনপ্রিয়তা অর্জন করল, তখন তারা তাদের ঘাগড়া পরার ধরনকে নতুন উপায়ে উপস্থাপন করলেন শাড়িতেও। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরতে শুরু করলেন অনেকেই আর কালক্রমে এটিই মূলধারা হয়ে যায়। কুঁচি দিয়ে শাড়ি পরার আগে শাড়ি আক্ষরিক অর্থেই একটি ঢিলেঢালা পোশাক হিসেবে প্রচলিত ছিল, তবে কুঁচির প্রবর্তনের মাধ্যমেই শাড়িকে গায়ে জড়ানো শুরু হলো একেবারে টানটান করে। শাড়ির ঢিলেঢালা কায়দাটি ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যেতে লাগল, আর নারীরা শাড়িকে পরতে শুরু করলেন একেবারে গায়ের সাথে টেনে; কোমর, বুক, পিঠ সর্বাঙ্গে শাড়ি আগের চেয়ে হয়ে উঠল অনেক বেশি সুবিন্যস্ত ও পরিপাটি। Rashid Taqui Sakib
২৫
জমিদার বাড়ির দুর্গা পূজা যেভাবে সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হলো
১৭৫৭ সাল। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হারানোর জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে হাত মেলায় বাংলার কয়েকজন প্রভাবশালী হিন্দু জমিদার। তারা যুদ্ধে ইংরেজদেরকে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ ও আর্থিক সাহায্য প্রদান করে। যুদ্ধে সিরাজের পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন জাঁকিয়ে বসে। বাংলার শাসন ক্ষমতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় কোলকাতা হয়ে ওঠে পূর্ব ভারতের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
যুদ্ধে সহায়তার কারণে সেসব জমিদারের অনেকেই কোম্পানির সাথে নানা ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে এবং তারা সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে। ফলে সমাজে হিন্দু জমিদারদের অনেকেরই প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। এছাড়া সমাজের এক শ্রেণির মানুষ ইংরেজদের সাথে বিভিন্ন রকম ব্যবসা-বাণিজ্য করে প্রভূত ধনসম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠে।
ইংরেজদের সাথে সুসম্পর্ক বজার রাখতে, তাদের কৃপাদৃষ্টি অক্ষুণ্ন রাখতে এবং সমাজে নিজেদের বিত্তবৈভব প্রদর্শনের জন্য সেসব ধনিক শ্রেণির লোকেদের কাছে দুর্গা পূজা হয়ে ওঠে প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ধনীর সংখ্যা যত বাড়তে থাকে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে দুর্গা পূজার সংখ্যাও। এই পূজাকে ঘিরে তাদের মধ্যে শুরু হয় খরচ করার একধরনের অশুভ প্রতিযোগিতা। @ Papiya Debi Asru
২৬
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে গ্রাম বাংলায় নব্য ধনিক শ্রেণির উদ্ভব
কোলকাতা প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় শহরের আশেপাশের জেলাগুলোতেও তার ঢেউ লাগে। আবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে গ্রামাঞ্চলে এক শ্রেণির নব্য জমিদার গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। নব্য জমিদারদের উদ্যোগে এই পূজা তখন শহর ছাড়িয়ে আশেপাশের জেলা এবং বাংলার গ্রামাঞ্চলগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে। শহরের দেখাদেখি এসব গ্রামাঞ্চলের নব্য জমিদাররাও পূজায় নানা আমোদ প্রমোদে গা ভাসালেন।
এই উৎসবকে ঘিরে সাহেবদের জন্য থাকতো বিলাস-ব্যসনের এলাহি ব্যবস্থা। কোথাও কোথাও চলতো নাচ গানের উন্মত্ততা, কোথাও চলতো বাইজীদের নাচ, কোথাও এলাহি খাবার-দাবারের ব্যবস্থা, কোথাও বসতো পানীয়র আসর। সবকিছুর মূলে থাকতো পূজায় আসা অভ্যার্থদের সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা।
১৭৬৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন কর্মকর্তা জে জেড হোলওয়েল এই দুর্গা পূজা সম্পর্কে তার এক লেখায় জানান যে,
“পূজায় সাধারণত কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সকল ইউরোপীয়দের আমন্ত্রণ জানানো হতো। অভ্যাগতদেরকে ফুল দিয়ে সমাদর জানানো হতো। তাদের জন্য ফলসহ বিপুল খাবার-দাবারের ব্যবস্থা থাকতো। প্রতি সন্ধ্যায় আগত অতিথিদের বিনোদনের জন্য বাইজী নাচ ও গানের জলসার আয়োজন করা হতো।”
১৭৭১ সালে দুর্গা পূজার এই জৌলুস দেখে এক ইংরেজ সাহেব এই পূজাকে বাংলার সবচেয়ে জমকালো উৎসব হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, বিত্তশালীদের এই পূজায় সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। কেবলমাত্র সমাজের গণ্যমান্য অতিথিরাই নিমন্ত্রিত হিসেবে এ পূজায় আসতেন। অতিথি ছাড়া সাধারণ জনগণের পূজায় শরিক হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।
তবে এর মধ্যেও ব্যতিক্রম ছিলেন রানী রাসমণি। তিনি তার জানবাজারের বাড়িতে যে দুর্গা পূজার আয়োজন করতেন, সেখানে ইংরেজ অতিথিদের বিনোদনের পরিবর্তে তার প্রজাদের বিনোদনের জন্য যাত্রাপালা এবং কবিয়াল গানের আসর বসাতেন। এই পূজাতে তার প্রজাদের অবাধ যাতায়াত ছিল।
বারোয়ারি পূজার আবির্ভাব
সময়ের সাথে সাথে বিত্তশালী জমিদার এবং বাবুদের প্রভাব প্রতিপত্তি আস্তে আস্তে ফিকে হতে থাকে। ১৭৯০ সালে ভারতের পশ্চিমবাংলার হুগলি জেলার বলাগড় থানার গুপ্তিপাড়ার (অনেকের মতে, জায়গাটির আসল নাম গুপ্তবৃন্দবন পাড়া) এক পূজা অর্থাভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। তখন পাড়ার বারোজন বন্ধু মিলে সেই দুর্গা পূজা নতুনভাবে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। উর্দু ভাষায় বন্ধুকে বলা হয় ‘ইয়ার’। আর সেই বারো জন ইয়ার মিলে যে দুর্গা পূজার শুরু করেন, তাকে বারোইয়ারী পূজা বা বারোয়ারি পূজা বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
ইতিহাসে এই পূজাকে প্রথম ‘সার্বজনীন’ দুর্গোৎসব বলা হলেও তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এটি এমন এক পদক্ষেপ ছিল, যা শুধুমাত্র উৎসবই ছিল না, ছিল সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে একরকম বিদ্রোহ। শোনা যায়, এ পূজার পৌরহিত্য না করার জন্য ব্রাহ্মণদের চাপ দেয়া হয়েছিল। তখন এ পূজা সম্পন্ন করার জন্য এক নবীন ব্রাহ্মণ এগিয়ে এসেছিলেন। এই বারোয়ারি পূজার মধ্যে দিয়ে দুর্গা পূজা জমিদারদের প্রাসাদ থেকে বের হয়ে এসে আমজনতার উৎসব হিসেবে প্রথম পরিচিতি পেতে শুরু করে। দেবী হয়ে ওঠেন সার্বজনীন।
এভাবে একক উদ্যোগের পূজা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হলো একাধিক জনের পূজাতে। বিত্তবানদের বাড়ি ছেড়ে দুর্গা পূজা সর্বসাধারণের হয়ে উঠতে শুরু করলো। গুপ্তিপাড়ার পূজা অনুসরণ করে মফস্বল এলাকাগুলোয়, এমনকি গ্রামে-গঞ্জে এই বারোয়ারি পূজা জনপ্রিয় হতে থাকে। তবে শহর এলাকায় এই পূজার চল আসতে একশো বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। বারোয়ারি পূজা বেশ একটা গণতান্ত্রিক কায়দায় শুরু হলেও তা সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ছেড়ে বেরিয়ে আসতেও সময় লেগেছে আরো বহুদিন।
আঠারো শতকের শেষের দিকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ধনাঢ্য বাড়ির পূজার সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। তখনও পূজায় ধনী গরিবের ব্যবধান ছিল চোখে পড়ার মতো। উনিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলায় হিন্দু সমাজে নব জাগরণ ঘটতে থাকে। এসময় রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, ঈশ্বচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিদের হাত ধরে বাংলায় নানা সামাজিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। চারদিকে লেগে যায় সমাজ সংস্কারের ঢেউ। অনেক যুবক ইংরেজি ও পাশ্চাত্য ধারার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজের নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।
অনেক সাধারণ পরিবারের সন্তানেরা শিক্ষিত হওয়ায় সমাজ সংস্কারে তারা অগ্রণী ভূমিকা নিতে থাকে, তেমনি তাদের মধ্যে স্বাধীনতা চেতনারও বিকাশ ঘটতে থাকে। ইংরেজদের অপশাসনের বিরুদ্ধে এসব শিক্ষিত সমাজের ক্ষোভ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ঘটতে থাকে ছোটখাটো বিদ্রোহ আর প্রতিবাদী আন্দোলন। এই সময়টায় স্বদেশী আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলা। এসব আন্দোলন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে দূরত্ব কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। এসময় ব্যাপক হারে শিক্ষার প্রসার ঘটায় ধনী-দরিদ্রের সামাজিক বিভাজনও অনেকটাই কমতে থাকে।
বারোয়ারি পূজা সার্বজনীন দুর্গা পূজায় রূপ পেল যেভাবে
নতুন ধ্যান-ধারণা নিয়ে ১৮৩২ সালে কোলকাতায় সর্বপ্রথম বৃহৎপরিসরে বারোয়ারি দুর্গা পূজার আয়োজন করা হয়। এই পূজার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন কাশিমবাজারের রাজা হরিনাথ। ১৯১০ সালে এই বারোয়ারি পূজা ‘সার্বজনীন দুর্গা পূজা’র রূপ নেয়। এক্ষেত্রে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর অঞ্চলে আদিগঙ্গার তীরবর্তী বলরাম বসু ঘাট রোডের বাসিন্দারা প্রথম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
এখানকার কতিপয় যুবক ও ব্যবসায়ী মিলিত হয়ে ‘ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। সমিতির সদস্যেরা সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে সার্বজনীন দুর্গো পূজা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। এই সমিতির উদ্যোগে ১৯১০ সালে সার্বজনীন দুর্গা পূজা শুরু হয়। কোলকাতা শহরের এই বারোয়ারি পূজা প্রথম সার্বজনীন দুর্গো পূজা হিসেবে পরিচিতি পায়।
১৯১৩ সালে সিকদার বাগান নামক স্থানে এবং ১৯১৯ সালে নেবু বাগানে স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে সার্বজনীন দুর্গো পূজার আয়োজন করা হয়। এভাবে সারা বাংলায় সার্বজনীন দুর্গা পূজার চল শুরু হয়। আর সার্বজনীন এই পূজা সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিতে খুব একটা দেরি হয়নি। দুর্গা পূজার এই সার্বজনীন আয়োজন সমাজের নানা স্তরে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। পরবর্তীকালে ‘সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব’ হিসেবে তা বাংলার সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
একচালার দুর্গা পরিবারকে পাঁচচালায় আনার কাহিনী
শুরুর দিকে বাড়ির পূজাগুলোতে একটি কাঠামোয় দুর্গা প্রতিমা নির্মাণের প্রচলন ছিল। এই এক কাঠামো দুর্গা ঠাকুরকে একচালা দুর্গা ঠাকুর বলা হতো। যৌথ পরিবারের নির্দশন ছিল এই একচালার ঠাকুর। বেশ কয়েক দশক আগে অবধি দেবীর অবস্থান ছিল একচালায়। মাঝে দেবী দুর্গা। তার দু’পাশে লক্ষ্মী সরস্বতী এক পা সামান্য বাঁকিয়ে পদ্মের বা বাহনের উপর দাঁড়ানো। ঠিক নিচেই গণেশ ও কার্তিক। বেলুড় মঠ সহ বেশ কয়েকটি প্রাচীন মন্দিরে এখনো এই ধারাটি বজায় রয়েছে।
কিন্তু পরবর্তীকালে দুর্গার একচালা ভেঙে পাঁচচালার প্রচলন করেন গোপেশ্বর পাল নামের একজন প্রতিমা শিল্পী। ১৯৩৩ সালে কুমারটুলি অঞ্চলের এক সর্বজনীন দুর্গা পূজায় তিনি প্রথম একচালা কাঠামো ভেঙে পাঁচচালার দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করেন। এই পাঁচচালা কাঠামোর এক-একটি কাঠামোতে দুর্গা ঠাকুর ও তার পরিবারের সদস্যদের আলাদাভাবে স্থান দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
বারোয়ারি পূজা এবং পরবর্তী সময়ে সার্বজনীন দুর্গাপূজার প্রচলন হওয়ার কিছু সময় পরে একচালার ঐতিহ্য আস্তে আস্তে শেষ হতে থাকে। দেবী দুর্গার প্রতিমা একটু বড় রেখে অন্যান্য দেব-দেবীর সমান উচ্চতার প্রতিমা নির্মাণ হতে থাকায় এত বিশাল প্রতিমা আর এক চালে স্থান দেয়া সম্ভব ছিল না। পাঁচচালা দুর্গা প্রতিমা দুই বাংলায় জনপ্রিয় হতে থাকে। বর্তমান সময়ের থিম পূজার আধিক্যের কারণে দুর্গা প্রতিমার সেই সাবেকি ঢঙও এখন প্রায় অদৃশ্য।
২৭
ফোন রিসিভের পর কেন আমরা হ্যালো বলি?
ফোনে কোন কল আসলে আমরা প্রায় সবাই রিসিভ করেই যে কথাটা সর্বপ্রথম বলি তা হলো ‘হ্যালো’। বর্তমানে বিশ্বের মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে বর্তমানে ৯৮% ব্যক্তিই প্রথমে হ্যালো দিয়ে কথা বলা শুরু করেন। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি কেন আমরা ‘হ্যালো’ বলে কথোপকথন শুরু করি? আর কীভাবেই বা এই ‘হ্যালো’ শব্দের সূচনা হলো? আসুন আজ এ সম্পর্কে জানা যাক।
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের প্রেমিকার নাম ছিল হ্যালো?
চলুন, প্রথমেই আমরা এই ‘হ্যালো’ সম্পর্কে যে ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে সে সম্পর্কে জানি। সর্বপ্রথম টেলিফোন আবিষ্কার করেছিলেন আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল। বলা হয়ে থাকে, আমরা সবাই ‘হ্যালো’ শব্দটিকে সম্ভাষণ হিসেবে ব্যবহার করে থাকি কারণ গ্রাহাম বেলের প্রেমিকার নাম ছিল হ্যালো! এবং পরবর্তীতে বেল তাকে বিয়ে করেছিলেন। সে হিসেবে তার স্ত্রীর নাম হওয়া উচিত হ্যালো বেল।
আবার অনেকে বলে থাকে, গ্রাহাম বেলের প্রেমিকার নাম ছিল মার্গারেট হ্যালো। টেলিফোন কলের উত্তর দেয়ার জন্য একটি মানসম্মত শব্দ ব্যবহার করতে গিয়ে বেল তার প্রেমিকার নাম-ই ব্যবহার করেছিলেন। প্রেমিকার প্রতি নিজের ভালবাসা প্রকাশের নিদর্শন স্বরূপ তিনি ‘হ্যালো’ শব্দটি ব্যবহার করেন যাতে পরবর্তীতে সবাই তার ভালোবাসার কথা মনে রাখে।
যদিও প্রচলিত এই ধারণাগুলো সত্যি হলেই বরং ভাল লাগতো, তবুও সত্যিকার অর্থে এগুলো পুরোপুরি ভ্রান্ত কাহিনী। প্রথমত, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল যাকে বিয়ে করেছিলেন তার নাম ম্যাবেল গার্ডিনার হুবার্ড। বিয়ের পর তার নাম হয় ম্যাবেল বেল। এছাড়াও এ পর্যন্ত কোনো সত্যিকারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বেলের তথাকথিত প্রেমিকা মার্গারেট হ্যালো সম্পর্কে। বিয়ের আগে অন্য কোনো নারীর সাথে বেলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এমন কোনো দলিলও ইতিহাসের কোথাও পাওয়া যায় না।
তবে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের ভালবাসার সত্যিকারের একটি নিদর্শন আসলেই পাওয়া গিয়েছে তার ছাত্রী ম্যাবেলকে বিয়ে করার মাধ্যমে। কারণ ম্যাবেল হুবার্ড কানে শুনতে পেতেন না। তার প্রতি বেলের মনে জন্মেছিল অপরিসীম মায়া এবং ভালবাসা। সে থেকেই তিনি পরে এই মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বধির হয়ে যাওয়া মেয়েটিকে বিয়ে করেন। তাই গ্রাহাম বেলের প্রেমিকার নাম থেকে যে হ্যালো শব্দটি সম্ভাষণ স্বরূপ এসেছে তা পুরোটাই ভ্রান্ত ধারণা।
তাহলে টেলিফোনে বলা প্রথম শব্দ কী ছিল?
এখন যদি আপনার মনে প্রশ্ন জেগে থাকে যে, যদি ‘হ্যালো’ মানুষের বলা টেলিফোনে বলা সর্বপ্রথম কথা না হয়ে থাকে তবে সেটা কী ছিল? এর উত্তর শুনে আপনি কিছুটা আশাহতও হতে পারেন। টেলিফোন আবিষ্কারের পর ১৮৭৬ সালের ১০ মার্চ আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল সর্বপ্রথম তার পাশের ঘরে থাকা সহকারীকে ফোন দিয়েছিলেন। টেলিফোনের মাধ্যমে যে কথাটি তিনি বলেছিলেন তা ‘হ্যালো’র মতো কোনো সম্ভাষণও ছিল না। কথাটি হচ্ছে, “Mr. Watson, come here. I want to see you.” যার বাংলা করলে দাঁড়ায় এমন, “জনাব ওয়াটসন, এখানে আসুন। আপনাকে আমার দরকার আছে।”
তাহলে ‘হ্যালো’র উৎপত্তি কীভাবে হলো?
মজার ব্যাপার হলো আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোন আবিষ্কার করলেও ‘হ্যালো’ সম্ভাষণটি বলার প্রচলন তৈরি করেছিলেন অন্য এক প্রতিভাবান ব্যক্তি। তিনি হলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী এডিসন। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, ইনিই হলেন বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক সেই থমাস আলভা এডিসন।
প্রথমত যে টেলিফোন আবিষ্কার করা হয়েছিল সেখানে মূলত কোনো রিং বাজার ব্যবস্থা ছিল না। টেলিফোন ব্যবহার করাই হতো ব্যবসায়িক কাজে, যেখানে একপাশের টেলিফোন লাইনের সাথে অপর পাশের লাইন মূলত সবসময় উম্মুক্ত হিসেবে থাকতো। তাই কখনো কথা বলার প্রয়োজন পড়লে একপাশের ব্যক্তিকে অপরপাশের ব্যক্তিকে নিজের কথা বলার প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করতে কিছু একটা বলে ডাকা বা সম্ভাষণ করার প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন উপলব্ধি করে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল ‘অ্যাহয়‘ (ahoy) শব্দটি প্রচলন করার আহবান জানান। কিছু সময় ধরে ‘অ্যাহয়’ কে টেলিফোনের সম্ভাষণ হিসেবে ব্যবহার করাও হয়। ১৮৭৭ সালের ১৮ জুলাই থমাস আলভা এডিসন ‘প্রিন্সিপাল অব রেকর্ডেড সাউন্ড’ আবিষ্কার করেন। সেসময়ে তার পরীক্ষানিরীক্ষার কাজে তিনি যে শব্দটি বারবার উচ্চস্বরে ব্যবহার করেছিলেন তা হলো ‘Halloo’। আর এই শব্দটিই তিনি প্রথম তার উদ্ভাবিত ‘পেপার সিলিন্ডার ফনোগ্রাফ’ যন্ত্রে রেকর্ড করেছিলেন। এই শব্দটি সেসময়ে ব্যবহৃত হতো মূলত কোন পোষা কুকুরকে শিকারের সময় উৎফুল্ল ও উত্তেজিত করতে এবং কোনো নির্দেশ প্রদানের ক্ষেত্রে। পাশাপাশি কোনো ব্যক্তির মনোযোগ আকর্ষণ করার ক্ষেত্রেও শব্দটির ব্যবহার প্রচলিত ছিল। বলা হয়ে থাকে যে, শব্দটির বারংবার ব্যবহারের ফলে একসময় তা বিকৃত এবং পরিবর্তিত হয়ে ‘হ্যালো’ তে পরিণত হয়। অনেকে আবার বলে থাকেন শব্দটির মূল আবিষ্কারক ছিলেন এডিসন নিজেই। কিন্তু ১৮৭৭ সালের অনেক আগে থেকেই ‘হ্যালো’ শব্দটির প্রচলন ছিল।
অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি অনুযায়ী, সর্বপ্রথম ‘হ্যালো’ শব্দটির ব্যবহার লিপিবদ্ধ হয় ১৮২৭ সালে যা এখন থেকে প্রায় ২০০ বছরের কিছুটা কম সময় আগেই। তখন এই শব্দটি দু’ভাবে ব্যবহার করা হতো কিন্তু যার কোনোটাই সম্ভাষণ হিসেবে ছিল না। প্রথমত কোন কিছুতে অবাক হয়ে গেলে তা প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘হ্যালো’ ব্যবহৃত হতো। যেমন; “Hello, what do we have here?” দ্বিতীয়ত, হুট করে কারো দৃষ্টি এবং মনোযোগ আকর্ষণ করার ক্ষেত্রেও শব্দটির ব্যবহার হতো। যেমন, “Hello, what do you think you’re doing?” আবার ১৮৬০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ক্লাসিক ইংরেজি সাহিত্যেও দেখা গিয়েছে বিভিন্ন চরিত্র নিজেদের ভেতর সম্ভাষণের ক্ষেত্রে “hullo” অথবা “hallo” ব্যবহার করছেন। বেশ দূরে থাকা কাউকে ডাকার ক্ষেত্রেও শব্দগুলোর ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে। তবে এটা সঠিক যে থমাস আলভা এডিসনের সেই ‘হ্যালো’ শব্দটির রেকর্ড করার মাধ্যমেই সকল ক্ষেত্রে টেলিফোনে সম্ভাষণ স্বরূপ এটির প্রচলন শুরু হয়ে যায়।
‘হ্যালো’র সফলতার কারণ
এখন অনেকেই ভাবতে পারেন টেলিফোনের আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের নিজের প্রস্তাবিত ‘অ্যাহয়’ এর পরিবর্তে এডিসনের ‘হ্যালো’ কেন পরিচিতি এবং সফলতা পেলো? প্রথম প্রথম ‘অ্যাহয়’ কে সম্ভাষণ হিসেবে ব্যবহার করা হলেও পরবর্তীতে এডিসনের প্রস্তাবিত ‘হ্যালো’র সাথে তুলনা করে দেখা গেল ‘অ্যাহয়’ শব্দটা অনেকটাই কর্কষ, বন্য এবং হাস্যকর হিসেবে শোনায়। অন্যদিকে ‘হ্যালো’ বেশ সহজ এবং একটা উৎফুল্ল ভাব আছে এতে।
পাশাপাশি ১৮৭৮ সালে নিউ হেভেন, কানেকটিকাটের ডিস্ট্রিক্ট টেলিফোন কোম্পানি সর্বপ্রথম একটি ফোনবুক বের করে। সেসময় তাদের মোট ৫০ জন টেলিফোন গ্রাহক ছিল। তাদের প্রকাশিত সেই ফোনবুকে সকলের ফোন নাম্বারের পাশাপাশি ফোন ব্যবহার করার কিছু নির্দেশনাও দিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তারা সেখানে তাদের গ্রাহকদের কোনো ফোনকল শুরু করার প্রথমে ‘hulloa’ এর মতো নরম এবং স্ফূর্তিযুক্ত শব্দ দিয়ে কথা বলা শুরু করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। শেষের ‘a’ ছিল অনুচ্চারিত। ফোনবুকে কথা শেষ হলে কি বলে শেষ করতে হবে সে সম্পর্কেও বলা হয়েছিলো। এক্ষেত্রে ‘That is all’ বলে কথা শেষ করার পরামর্শও দেয়া হয়েছিলো। যদিও ‘That is all’ সেভাবে সফলতার মুখ না দেখলেও ‘হ্যালো’ সবকিছুর বাধা পেরিয়ে আজ সবখানে প্রচলিত হয়ে গিয়েছে। @ Fuad Hasan Shishir
২৮
সোমপুর বিহার: ভুলে যাওয়া এক সভ্যতার কাহিনী
সোমপুর বিহার, খুঁজে পাওয়া শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে পুরোনাম শ্রী সোমপুর-শ্রী- ধার্মপালদেব-মহাবিহার-ভিক্ষু সঙ্ঘ। অনেক পন্ডিতের মনে করেন এটিই পৃথিবীর বৃহত্তম বৌদ্ধবিহার। বাংলাদেশে অবস্থিত তিনটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মধ্যে এই বিহারটি অন্যতম। বাকি দুটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হলো বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন।
এক নজরে পাহাড়পুরের ইতিহাস
সোমপুর বিহারের অবস্থান বাংলাদেশের উত্তরে অবস্থিত নওগাঁ জেলার, বদলগাছি উপজেলার, পাহাড়পুর ইউনিয়নে। তাই অনেকের কাছেই পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নামে বেশি পরিচিত সোমপুর বিহার। বৌদ্ধধর্মাবলম্বী প্রাচীন বঙ্গ জনপদে সুদীর্ঘ চার শতক রাজত্ব করেছিল পাল বংশ। মূলত বাংলা ও বিহার কেন্দ্রিক পাল রাজ্য, সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে উত্তর পশ্চিমে পাকিস্তানের খায়বার-পাখতুনখওয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পাল বংশের রাজারা ছিলেন নিষ্টাবান বৌদ্ধ। ধারণা করা হয় পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপালের সময়ই নির্মিত হয়েছিল সোমপুর বৌদ্ধবিহার। তবে অনেকে এও ধারণা করেন ধর্মপাল নন তার পুত্র রাজা দেবপাল ছিলেন এই বিহারের নির্মাতা কারণ, বিখ্যাত তিব্বতীয় ইতিহাস গ্রন্থ “পাগ সাম জোন ঝাং” এর লেখক অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ধর্মপালের পুত্র দেবপাল (৮১০-৮৫০) কর্তৃক সোমপুরে নির্মিত বিশাল বিহার ও সুউচ্চ মন্দিরের উল্লেখ করেছেন। তবে যার সময়ই নির্মাণ হোক না কেন সোমপুর বিহার স্থাপত্য শিল্পে অনন্য এবং আকারে সুবৃহৎ।
মাটির ঢিবির নিচে দীর্ঘকাল চাপা পড়ে থাকা এই প্রকান্ড স্থাপনা দূর থেকে দেখলে পাহাড়ের মতই মনে হতো। পাহাড়পুর ইউনিয়নের নামকরণ কিন্তু সেই থেকেই। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও সুদূর চীন, তিব্বত, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধরা এখানে ধর্মচর্চা ও ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে বৌদ্ধরা আসতেন এখানে। খ্রিস্টীয় দশম শতকে বিহারের আচার্য ছিলে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। মহাপন্ডিত অতীশের জ্ঞানের সুখ্যাতি বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল সুদূর তিব্বতে। প্রচলিত আছে তিব্বতে গিয়ে তিনি সেখানকার পানির সমস্যা সমাধান করে এসেছিলেন। এই মহান পণ্ডিতের বাড়ি ছিল ঢাকার অদূরে বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে।
এক সময়ে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্ম সাধকদের জ্ঞানতীর্থ, এই বিহার মাটির নিচে চাপা পড়েছিল সুদীর্ঘকাল। মোটামুটি ছয়’শ বছর স্মৃতির অতলে হারিয়ে থাকার পর পুনরায় এর হদিস মেলে ইংরেজ আমলে ভূমি জরিপের সময় ১৮০৭-১৮১২ সালের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে । তারপর স্যার আলেকজান্ডার ক্যানিমহাম ১৮৭৯ দিকে এবং ব্রিটিশ ভারতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯২০ এর দশকে আংশিক খনন কাজ চালায়। অবশেষ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮০ র দশকে এর খনন কাজ পুরোদমে শুরু হয় এবং ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে ঘোষণা করে।
জেনে নিই পাহাড়পুরের স্থাপত্য শিল্পের হিসাব নিকাশ
প্রায় ২৭ একর জায়গা জুড়ে বিহারটি বিস্তৃত। এতে রয়েছে ১৭৭ টি কক্ষ। মাঝখানে প্রকাণ্ড মন্দিরটিকেই মূলত দূর থেকে পাহাড়ের মত দেখায়। এ মন্দিরের বেইসমেন্ট ক্রুশাকার। প্রতিটি ক্রুশবাহুর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ১০৮.৩ মি ও ৯৫.৪৫মি। মধ্যবর্তী স্থানে আরও কয়েকটি অতিরিক্ত দেয়াল কৌণিকভাবে যুক্ত এবং কেন্দ্রে দরজা-জানালা বিহীন একটি শূন্যগর্ভ চতুষ্কোণাকার প্রকোষ্ঠ আছে। এই প্রকোষ্ঠটি মন্দিরের তলদেশ থেকে চূড়া পর্যন্ত বিস্তৃত। মূলতঃ এ শূন্যগর্ভ প্রকোষ্ঠটিকে কেন্দ্র করেই সুবিশাল এ মন্দিরের কাঠামো নির্মিত। মন্দিরের বর্তমান উচ্চতা ২১ মিটারের মত। তবে ধারণা করা হয় একসময় হয়ত ৩০ মিটারের বেশি ছিল এই মন্দিরের উচ্চতা। অবশ্য নওগাঁ এলাকার স্থানীয়দের মতে দিন দিন ডেবে যাচ্ছে মূল মন্দিরটা, আশির দশকে খনন কাজ শুরু সময়কার উচ্চতা নাকি এখনকার চেয়েও বেশি ছিল। মূল মন্দিরের দেয়ালে টেরাকোটার কাজ দেখতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন রকমের মূর্তির আদলে টেরাকোটাগুলো তৈরি করা হয়েছে।
মন্দিরটিকে ঘিরে চারিদিকে ছিল কক্ষগুলো। ধারণা করা হতো দূর দূরান্ত থেকে আগত তান্ত্রিক সাধক ও শিক্ষার্থী ভিক্ষুরা অবস্থান করতেন এই ঘরগুলোতে। কক্ষগুলোর দৈর্ঘ্য মোটামুটি ৪.২৬ মিটার এবং প্রস্থ ৪.১১ মিটার। মূল মন্দিরকে বর্গ ক্ষেত্রের মতো বেষ্টন করে আছে কক্ষগুলো। উত্তরদিকে এক সারিতে ৪৫টি এবং বাকি তিনদিকে রয়েছে ৪৪টি করে। শুধু সোমনাথবিহার নয় পাল আমলে বাংলা ও বিহারে অনেকগুলো বৌদ্ধবিহার গড়ে উঠেছিল। তিব্বতীয় বর্ণনা অনুসারে সে আমলে পাঁচটি বড় বড় বিহার যাদের মধ্যে সোমপুর একটি বাকি চারটি হল বিক্রমশীলা, নালন্দা, ওদান্তপুত্র এবং রাজশাহীর জগদ্দলবিহার। এই বিহারগুলোর পরস্পরের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং অনেকটা এখানাকার দিনের মতো আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় কো-লেবোরেশনের মতো।
বিহারটি আকস্মিক ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কোন হদিস পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হয় বাংলায় ক্ষীয়মাণ বৌদ্ধ শাসন, হিন্দুপ্রধান সেনবংশের উত্থান এবং সর্বোপরি তাদের হারিয়ে বাংলায় মুসলিম বিজয়ের পর নব্য রাজনৈতিক পটভুমিকায় আস্তে আস্তে বিহারটি লোকশুন্য হতে হতে একসময় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। সেটা প্রায় আজ থেকে আটশ বছর আগের কথা।
প্রায় বার’শ বছর আগের তৈরি করা সোমনাথ বিহারের এই ধ্বংসাবশেষ আপনাকে ক্ষণিকের জন্য নিয়ে যাবে সুদূর অতীত। শেষ বিকেলে প্রতিটি ইটের লালাভ উজ্জ্বলতা হয়ত আপনাকে মনে করিয়ে দিতে থাকবে মাটি চাপা পড়া এক সভ্যতার কথা। হয়ত মূল মন্দিরের গা ঘেঁষে উঠতে উঠতে আপনি কল্পনা করতে থাকবেন এককালের কর্মচঞ্চল এই প্রাঙ্গণের প্রতিচ্ছবি। আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে মহাকালের কাছে নশ্বর মানুষ কত ক্ষুদ্র!
যেভাবে যাবেন পাহাড়পুরে
অসাধারণ এই ঐতিহাসিক পুরাকীর্তির কথা শুনে নিশ্চয়ই ভাবছেন কীভাবে যাওয়া যায় পাহাড়পুরে? সেটাই বলছি এবার, ঢাকা থেকে প্রথমেই আপনাকে যেতে হবে সোজা নওগাঁ শহরে। ঢাকা থেকে নওগাঁর দূরত্ব ২৬০ কিমি। বাসে যেতে সময় লাগবে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। ঢাকার আব্দুল্লাহপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর কিংবা গাবতলী বাস স্ট্যান্ড থেকে মোটামুটি যেকোন সময়ই নওগাঁ গামী বাস পাওয়া যায়। নন এসি বাসের ভাড়া ৩৫০-৪৫০ টাকার মতো। এসি বাসের ভাড়া মোটামুটি আটশ টাকার কাছাকাছি। তবে সময় ও সার্ভিস অনুসারে ভাড়ার তারতম্য হতে পারে।
হানিফ, শ্যামলী, এসআর, ডিপজল সহ আরও অনেক বাস সার্ভিস চালু আছে এই রোডে। ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল, যমুনা সেতু, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া হয়ে বাস পৌঁছে যাবে নওগাঁ শহরে। যারা ট্রেনে যাতায়ত করতে ভালবাসেন তাদের জন্যও রয়েছে নওগাঁ যাওয়ার সুব্যবস্থা। নওগাঁ শহরের অদূরেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহত্তম রেলজশন শান্তাহার রেলজংশন অবস্থিত। চাইলে বাংলাদেশের মোটামুটি যেকোন প্রান্ত থেকেই শান্তাহারগামী ট্রেনে চড়ে সোজা চলে আসতে পারেন নওগাঁ শহরে। শান্তাহার থেকে নওগাঁ যেতে আধ ঘণ্টার বেশি লাগেনা। ছোট যমুনার কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা নওগাঁ শহর হিসাবে অত্যন্ত ছিমছাম ও নিরিবিলি। শহরে থেকে খুব সহজেই পাহাড়পুর যাওয়া যায়। দল বেঁধে গেলে মাইক্রবাস ভাড়া করে যেতে পারেন সময় লাগবে মোটামুটি ১ ঘণ্টার মত। ভাড়া নেবে ১৫০০-২০০০ এর মত। শহর থেকে পাহাড়পুরের দূরত্ব মোটামুটি ৩২ কিলোমিটারের মতো। আসে পাশের খাবার দাবারের ব্যবস্থা খুব একটা ভাল নেই। তাই নওগাঁ থেকেই খাবার নিয়ে গেলে ভাল হয়। দূর থেকে সোমপুর বিহার দেখতে অনেকটা টিলার মত। সাইটে ঢোকার সময় প্রথম দর্শনে এটাকে আপনার ঠিক টিলাই মনে হবে।@ Shakib Mustavee
২৯
নকশালবাড়ি আন্দোলনের ইতিকথা
নকশালবাদ নামটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়ি গ্রাম থেকে উদ্ভূত যা ষাটের দশকে স্থানীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে একটি উপজাতি কৃষক বিদ্রোহের কেন্দ্র ছিল। পরবর্তীতে এই বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। শীঘ্রই উগ্রবাদী কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে নকশালবাড়ি নামটি মিশে যায়।
১৯৬৭ সালের গ্রীষ্মে, হিমালয়ের পাদদেশের এই ছোট্ট গ্রামটি কৃষকেরাই শিরোনাম করেছিল। নকশালবাড়ির কৃষকেরা মূলত চা বাগান এবং বড় বড় এস্টেটে কাজ করত। বহু শতাব্দী ধরে তারা ভূমি মালিকশ্রেণী এবং মহাজন দ্বারা শোষিত হয়ে আসছিল।
১৯৬৭ সালের ২৪ মার্চ, গ্রামের একজন অংশীদারি কৃষক, যাকে অবৈধভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, তার জমি চাষ করার চেষ্টা করে। এ কারণে ভূমি মালিকশ্রেণী তার জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে নির্মমভাবে মারধর করে। এতে সে মারা যায়। জমিদারদের শোষণে ক্ষুব্ধ হয়ে সারা গ্রামের কৃষকেরা একত্রিত হয়ে বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়ে। পরদিন সাঁওতাল একদল আদিবাসীকে সঙ্গে নিয়ে একটি পুলিশ দলকে আক্রমণ করে যারা কৃষক হত্যার তদন্ত করতে এসেছিল। নকশালবাড়ির পুলিশ কনভয়ের উপর ধনুক ও তীর নিয়ে হামলায় একজন সাব-ইন্সপেক্টর নিহত হন।
অবশ্য ১৯৬৭ এর দু’বছর পূর্ব থেকেই, নকশালবাড়িতে বিদ্রোহের বীজ রোপন করছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-মার্কসবাদী (সিপিআই-এম) এর কর্মীরা, যা সিপিআই এর একটি বিভক্ত গোষ্ঠী। সিপিআই-এম এর অনুগতরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিল যে যখন শ্রমিক এবং কৃষকরা বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করবে তখনই প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব হবে। ২৫ মার্চ নকশালবাড়ির ঘটনার পরে তারা ভেবেছিল, সেই মুহুর্তটি এসে গেছে। সিপিআই-এম এর অন্যতম নেতা চারু মজুমদারের মতে, “সকল ক্লাসিক্যাল বার্তা নিয়ে দেশে একটি চমৎকার বৈপ্লবিক পরিস্থিতি বিদ্যমান ছিল।” ওই বছরেই তিনি অন্যতম দুই প্রধান কমরেড কানু সান্যাল ও জঙ্গল সাঁওতালের সাথে নকশালবাড়িতে কৃষক বিদ্রোহ শুরু করেন। চারু মজুমদার ছিলেন প্রথমদিকের নকশাল নেতাদের অন্যতম অনুপ্রেরণা।
এদিকে চারু মজুমদার নিজে চীনের মাও সে তুংয়ের সাফল্য ও কর্মকৌশল দ্বারা অনুপ্রাণিত হন। মাও ক্ষমতাসীন অভিজাতদের উৎখাত করে চীনের সাধারণ ও শোষিত জনগণকে সংগঠিত এবং নেতৃত্ব দেবার ক্ষেত্রে চমৎকার দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। চারু মজুমদার পশ্চিম বাংলার প্রেক্ষাপটে মাও-এর মতবাদ প্রচার করেন। তিনি ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার সাথে মানানসই কৌশল প্রণয়ন করেন। তার ঐতিহাসিক ‘আট নথি’ নকশাল মতাদর্শ উৎসাহিত করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক বিদ্রোহীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সেসব বড় জমিদারদের কাছ থেকে জমি ছিনিয়ে নেওয়া এবং কৃষক ও ভূমিহীন শ্রমিকদের মধ্যে তা বিতরণ করা। এরই প্রেক্ষিতে নক্সালবাদের জন্ম হয়।
নকশালবাড়ী বিদ্রোহের পরের দিনগুলোতে অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীকাকুলামেও একই ধরনের বিদ্রোহ হয়। ১৯৬৭ সালের অক্টোবরে শ্রীকাকুলামের বিদ্রোহ নকশালবাড়ী থেকে অনুপ্রাণিত বলে জানা যায়। কমিউনিস্টদের সাথে যুক্ত দুজন পুরুষ কোরান্না ও মঙ্গান্নাকে স্থানীয় জমিদাররা হত্যা করে। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য গ্রামের আদিবাসী জনগণ অস্ত্র নিয়ে জমিদারদের শস্য ও জমি লুট করে নিয়ে যায়।
১৯৬৮ সালে এই আন্দোলন আরও বেড়ে যায় যখন কৃষকদের একদল পুলিশ অফিসারদের আক্রমণ করার জন্য গেরিলা স্কোয়াডে নিজেদের সংগঠিত করে। নকশাল আন্দোলনের শিকড় জড়িয়ে ছিল তেলেঙ্গানা সংগ্রাম এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সাথে। ১৯৪৮ সালের জুলাইয়ের মধ্যে দক্ষিণ ভারতের ২,৫০০টি গ্রাম মিলে কৃষক আন্দোলনের অংশ হিসাবে ‘কম্যুন’ গঠন করা হয়, যা তেলেঙ্গানা সংগ্রাম নামে পরিচিতি লাভ করে। বিখ্যাত অন্ধ্র থিসিসও এর একটি অংশ।
চারু মজুমদারের নেতৃত্বে বিদ্রোহী ক্যাডাররা নকশালবাড়িতে কৃষক বিদ্রোহ এগিয়ে নিয়ে যান। তারা আদিবাসীদের সাহায্য করেন ভূ-মালিকদের প্রতি প্রতিশোধ নিয়ে জোর করে তাদের জমি দখল করতে। সিপিআই (এম) নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট সরকার গণজাগরণের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় এবং কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার এই অভিযানকে সমর্থন করে। এই ঘটনা সারা ভারত জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয় এবং নকশালবাদের উত্থান ঘটে।
যদিও এই বিদ্রোহ খুব দ্রুতই দমন করা হয়, তবু এটি বেশ কিছু কমিউনিস্ট-নেতৃত্বাধীন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে যা প্রাথমিকভাবে উত্তর-পূর্ব ভারতে এবং পরবর্তীতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমে এটি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের রূপ নেয়। এই আন্দোলন দ্রুত রাজ্য সরকারের ক্ষোভের মুখোমুখি হয় এবং পুলিশ নির্মমভাবে বিদ্রোহীদের দমন করতে শুরু করে। তা সত্ত্বেও, আগামী দশকগুলোতে নকশালবাড়ি বিদ্রোহ ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবের প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয়। ভারতের জাতীয় ও রাজ্য সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে নকশাল গোষ্ঠীগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত করেছে এবং এদের অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী গেরিলা আক্রমণ মোকাবেলা এবং বিদ্রোহীদের তাদের অভয়ারণ্য থেকে বের করে দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। যদিও এই অভিযানগুলোর সাফল্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
পাঁচ দশক পর ও এই আন্দোলন মূলত ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা এবং অন্ধ্র প্রদেশের কিছু অংশে চলমান রয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমলে জরুরি অবস্থার সময়ে এটি কঠোরভাবে মোকাবেলা করা হয়। পরবর্তী দশকগুলোতে, ভারতীয় পুলিশের কড়া নজরদারি সত্ত্বেও, আন্দোলন টিকে থাকতে সক্ষম হয় পরিবর্তিত আকারে। ভারত সরকার নকশালবাদ ও মাওবাদকে বামপন্থী চরমপন্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পৃথক বিভাগ দ্বারা এটি মোকাবেলা করা হয়। ২০১০ এর এপ্রিলে ছত্তিশগড়ের দান্তেওয়াড়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হামলা চালানো হয়, যেখানে ৭২ জন সিআরপিএফ এবং একজন পুলিশ জওয়ান নিহত হযন।
নকশালবাদী দলগুলো সাধারণত ভারতীয় সমাজের দরিদ্রতম এবং সামাজিকভাবে প্রান্তিক সদস্যদের, বিশেষ করে উপজাতি জনগোষ্ঠী এবং দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। কয়েক দশক ধরে এখনও তারা ভূ-স্বামী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মতো লক্ষ্যবস্তুদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে আসছে। নকশালবাদী গোষ্ঠীগুলো পূর্ব ভারতের বেশিরভাগ রাজ্যে, বিশেষ করে অন্ধ্র প্রদেশ, বিহার, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল এবং তাদের প্রভাব এই অঞ্চল ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত আকারে পুরো ভারতেই ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমান সময়ে নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রকৃতি এবং উদ্দেশ্য উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ষাটের দশকের শেষের দিকে এবং সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে নকশালবাড়ি বিদ্রোহ শহুরে তরুণ এবং গ্রামীণ জনগণের হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়েছিল। পরের কয়েকমাসে, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্র পর্যন্ত পুরো ওড়িশার কিছু অংশে বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে একই রকম বিদ্রোহ সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠল।
ইতিহাসবিদ সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে প্রথমবারের মতো এই আন্দোলন দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের দাবিকে এমনভাবে জোর দিয়েছিল যে তৎকালীন অত্যাচারী ভারতীয় রাজনৈতিক দৃশ্যে নাড়া দিয়েছে।” এই আন্দোলন শহুরে তরুণদের, বিশেষ করে দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের যে প্রবলভাবে আন্দোলিত করেছে তা উল্লেখযোগ্য।
নকশাল বিদ্রোহের পর পরই ভারতের শহুরে তরুণরা, যাদের অনেকেই সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীর অংশ, বিপ্লবে উল্লেখযোগ্যভাবে অনুপ্রাণিত হয়। কলকাতা ও দিল্লির কলেজের দেয়ালে দেয়ালে নকশালবাড়ির পোস্টার টাঙানো অস্বাভাবিক কিছু নয়। নকশালবাদে যোগদানের জন্য অনেক ছাত্র কলেজ পর্যন্ত ছেড়েছিল। চারু মজুমদার ছাত্রদের নকশাল আন্দোলনে যোগ দিতে প্রলুব্ধ করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, এই বিপ্লব শুধুমাত্র গ্রামীণ জনগণের জন্য নয়, বরং যারা ‘শ্রেণী শত্রু’ তাদের বিরুদ্ধে লড়াই। এই শ্রেণী শত্রুর তালিকায় পড়বে সরকার থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পুলিশ এবং আরো অনেকে। নকশালপন্থীরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করে নেয়। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স নকশাল কার্যকলাপের জন্য অন্যতম ঘাটি হয়ে ওঠে।
নকশাল আন্দোলনের পেছনের কারণ হিসেবে অনেক পর্যবেক্ষক অসম্পূর্ণ কৃষি সংস্কারকে চিহ্নিত করেন। চরম দারিদ্র্য, ভূমিহীন চাষীদের শোষণ, যাদের অধিকাংশই দলিত ও উপজাতি সম্প্রদায়ের অংশ, এবং প্রশাসনের কর্তৃক সামাজিক ন্যায়বিচারের বঞ্চনা জনসাধারণ এবং বামপন্থী নেতাদের মধ্যে চরম অসন্তোষের জন্ম দেয়। স্বাধীনতার পরে সরকার কৃষি সংস্কারের অংশ হিসেবে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করে। তবে কিছু দলের প্রতিবাদের কারণে জমি পুনঃবিতরণ করা সম্ভব হয়নি।
ইতোমধ্যে কৃষি উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যহত ছিল, যার ফলে খামারগুলো থেকে আরও ভাল আয় হচ্ছিল। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি এবং কৃষিতে উন্নততর পদ্ধতির সম্মিলিত প্রভাবের ফলে অনেক নব্য-ধনী কৃষক শ্রেণীর জন্ম হয়। কিন্তু তারা ভূমিহীন কৃষক ও মজুরদের সাথে তাদের লাভ ভাগ করে নিতে প্রস্তুত ছিল না। ফলে জমির মালিকরা দ্রুত সাফল্য লাভ করলেও ভূমিহীনদের খাদ্যের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হলো। বেশ কিছু কৃষিনির্ভর এলাকায় দারিদ্রের মাত্রা ৯৫ শতাংশের বেশি ছিল বলে জানা গেছে। অসন্তোষ বাড়তে থাকে। নকশালবাড়ি শুধুমাত্র আর্থ-সামাজিক ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে।
নকশালবাড়ি আন্দোলন বছরখানেকের মধ্যে অনেকটা স্তিমিত হয়ে এলেও অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, আজ পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পরও সেই আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা এবং তাৎপর্য বিন্দুমাত্র হারিয়ে যায়নি। এটি স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকে আমূলভাবে বদলে দিয়েছে। নকশাল আন্দোলের নিয়ে অনেক গল্প-উপন্যাস-গান-কবিতা লেখা হয়েছে। সমরেশ মজুদারের ‘উত্তরাধিকার’-এর চার প্রধান চরিত্র নকশালবাদ থেকে অনুপ্রাণিত হয়। বুকার পুরষ্কারজয়ী লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’-এর একটি চরিত্র নকশাল আন্দোলনে যোগ দেয়। মহেশ্বেতা দেবী তার ‘হাজার চুরাশির মা’ এই আন্দোলনের পটভূমিতেই লেখেন। পরে একই নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ঝুম্পা লাহিড়ী, অনুরাগ মিশ্র, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ আরো অনেকের লেখনীতে নকশাল আন্দোলন বারবার উঠে এসেছে। @ sabyasachi karmaker
৩০
ভিয়েতনামবাসী কিণ বা ভিয়েত সৃষ্টি কথা॥
ভিয়েতনামের বাসিন্দাদের পরিস্কার ভাবে কয়েকটি আলাদা ভাষিক জাতিগোষ্ঠীতে চিহ্নিত করা যায়। এই সব ভাগের মধ্যে কিন্তু দেশটার ৮৬% লোকই হল কিণ বা ভিয়েত। তা ছাড়া আছে আরো ষোলটি জাতিগোষ্ঠী। ভিয়েতনাম সহ গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে প্রধান ভাষা গুলোর মধ্যে আছে অস্ট্রোএশিয়াটিক, অস্ট্রোনেশিয়ান, মং-মিয়েন, তাই-কাদাই, আর চীনা-তিব্বতি।
ভিয়েতনামে অবশ্য ৫৪টি জাতির মধ্যে কথ্য ভাষার সংখ্যা ১০৯টি। তবে সবকটা ভাষাকেই মোটামুটি ঐ পাঁচটি প্রধান ভাষার মধ্যেই রাখা যায়। অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষীদের গোটা ভিয়েতনামেই পাওয়া যাবে। উত্তর ভিয়েতনামে তাই-কাদাই, মং-মিয়েন আর চীনা-তিব্বতি ভাষীদের দেখা মিলবে। অস্ট্রোনেশিয়ান ভাষীদের দেখা মিলবে মধ্য ভিয়েতনামে। আর অস্ট্রোএশিয়াটিক ভাষীদের ধরা হয় তারা সব জায়গাতেই আছে এবং থাকবে। সম্ভবত একেবারে প্রথমের হোমো-স্যাপিয়েন্স, যারা এখন বিলুপ্তই, তাদের পরে আসা এবং এখনো টিকে থাকা প্রথম জাতি গোষ্ঠী হয়ত এই অস্ট্রোএশিয়াটিকরা।
অনুমান করা হয় অস্ট্রোএশিয়াটিকরা প্রথম কৃষিকাজ শুরু করে। ধান এবং মিলেট। কিন্তু তারা কোথা থেকে এসেছিল সে নিয়ে ঘোরতর মতবিরোধ আছে।
তারবদলে সহজেই বলা যায় অস্ট্রোনেশিয়ানরা ছিল তাইওয়ানের আদিম জনগোষ্ঠীর লোক। এবং তারা এসেছিল ৪হাজার বৎসর আগে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুলভূমিতে এবং প্রধানত ভিয়েতনামে, অস্ট্রোনেশিয়ানদের এখন পরিচয় হয়েছে চাম,চ্রু, রাগ্লাই, গিরারি, এডে এই সব নামে।
তাই-কাদাই, মং-মিয়েন ভাষার উৎপত্তি তো দক্ষিণ চিনে। সেখান থেকে থাইল্যান্ড হয়ে ভিয়েতনামে এসেছে এরা।
একাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক ও জেনেটিক অনুসন্ধানের ফলে এখন আন্দাজ করা হচ্ছে এই সব পূর্ব-এশিয়রা আগেকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুল ভূমিখন্ডের শিকারি-সংগ্রাহক ও হোয়াবিনহাই সংস্কৃতির স্রষ্টাদের সাথে মিলিত হয়েছিল নব্যপ্রস্তরযুগে ও ব্রোঞ্জ যুগেই।
তবে ৫.৯হাজার বৎসর আগেই চিনা-তিব্বতি ভাষা থেকে আলাদা হয়ে গেলেও তাই কাদাই, মং-মিয়েন, এসব ভাষা ভিয়েতনামে প্রবেশ করেছে মাত্র ৫০০ শত থেকে ১.৫ হাজার বৎসর আগে।
উপরেই লিখেছি ভিয়েতনামের বর্তমান জনগোষ্ঠীর ৮৫ শতাংশই (2019) হল কিণ বা ভিয়েত। তাদের ভাষা ভিয়েত। এই ভিয়েত ভাষার ভিত কিন্তু অস্ট্রোএশিয়াটিক।
ভিয়েতদের কিণ নাম এলো প্রাচীন চীনা ভাষা থেকে। উত্তর ভিয়েতনামকে চীনারা কিউ নাম দিয়েছিল।
ভিয়েত শব্দটাও এসেছে চীনাদের থেকে। ১২০০ সাধারণ পূর্বাব্দে চীনা লোগোগ্রাফে যা বোঝাতো কুড়াল সেটাই নানা ভাবে বদলে বদলে হয়ে গেল উত্তর ভিয়েতনামের বাসিন্দা।
কিণ শব্দটার পেছনে কিন্তু বেশ ভালো গল্প আছে। খুব বেশি আগে না আন্দাজ হাজার বৎসর আগে হং নদীর অববাহিকায় হ্যানয় কে ঘিরে একদল লোক নিজেদের শহুরে বাসিন্দা বলে পরিচয় দিতে শুরু করে। এখন এই হ্যানয়ের হান শব্দের অক্ষর ম্যান্ডারিনে উচ্চারণ হয় জিং। আবার জিং স্থানীয় ভিয়েতনামি উচ্চারণে হবে কিণ। তাই তো তারা সবাই কিণ হয়ে গেল।
ওটা গল্পের শুরু ছিল।
আসল গল্প হল পঞ্চদশ শতাব্দীতে লেখা হং ব্যাং থি ট্রুইয়েন বা হং ব্যাং গোষ্ঠী উপাখ্যান। এটা পঞ্চদশ শতাব্দীতে লেখা হলেও এটা কিন্তু ভিয়েতনামীদের প্রাগঐতিহাসিক কাহিনি। এই কাহিনীতে তাদের সৃষ্টি কথা বলা হয়েছে।
ড্রাগন বংশে জন্ম নেন হংব্যাং বংশের রাজা ল্যাক লন কুয়ান (বা ল্যাকের ড্রাগন রাজা) অন্য নামে সুং লাম। এই কুয়ানের পিতা হলেন ডুওঙ ভুওঙ মাতা লং মাউ থান লং। লং মাউ থান লং হলেন আকাশ আর সমুদ্রের শাসক ড্রাগনদেবী।
ড্রাগন পুত্র ল্যাক লন কুয়ান বিয়ে করলেন পাহাড়ি সাম্রাজ্যের রাজা দে লাই এর কন্যা সুন্দরী অওকু-কে। এই পাহাড়ি দেবী প্রসব করেন একশত ডিমের একটি থলি। এই ডিম থেকেই হবে ভিয়েতনামি জনগনের সৃষ্টি।
একদিন ল্যাক লন কুয়ান তাঁর স্ত্রী অও কু-কে বলেন আমি মহান শক্তিধর ড্রাগনের বংশে জন্ম নিয়েছি। আর তুমি হলে মরনশীল মানুষ। তোমার আমার মিল হবার কথা না। তোমার আমার সম্পর্ক হল জল আর আগুনের মত। তাই তোমার আমার মধ্যে কখনও বনিবনা হবার না। ..... অতএব ব্রেকআপ। ডিভোর্স। বিবাহ বিচ্ছেদ।
বিচ্ছেদ তো হল। একশটা বাচ্চার দায় কে বইবে?
দুইজনই রাজপরিবারের। অতএব অ্যালিমনি নিয়ে খুচরো ঝামেলায় কেউ গেল না। পঞ্চাশ টি করে সন্তান দুই ভাগ করে দুই জন নিলেন।
পঞ্চাশটি শিশু মাকে অনুসরন করে উত্তরের পাহাড়ের দিকে চলে গেল। আর পঞ্চাশটি শিশু বাবাকে অনুসরণ করে দক্ষিণে চলে এলো।
এই শিশুদের থেকেই সব ভিয়েতনামিদের জন্ম। মা কে অনুসরণ করা সবার বড় ভাই পরে চলে গেল ফং চাও বা ফু থো তে। এই বড় ভাইই কালক্রমে বাবার পরে হবেন রাজা, হুংকিং।
ভিয়েতনামের প্রায় সব শহরে ল্যাক লন কুয়ান আর অও-কু এর নামে রাস্তা থাকে। আর রাস্তাগুলো সব সময়ই ৯০ডিগ্রি কোন করে পরস্পরকে কেটে যায়।
দাও মো। ভিয়েতনামি ধর্মীয় বিশ্বাস।
ধরত্রীর দেবতা আর বনের দেবতা মিলিত হয়ে জন্ম দিলেন এক কন্যার। নাম শেননঙ।
জলের আর ঝড়ের দেবতার সন্তান ড্রাগনদেবকে বিয়ে করলেন শেননঙ।
কিন্তু দুই পরিবারে ছিল প্রবল বিরোধ তাই এই বিয়েতে তারা রাজী ছিলেন না এবং বিয়ে ভন্ডুল করার জন্য নানা ভাবে চেষ্টা করতে থাকলেন।
বনের দেবতা ভুতুড়ে গাছ পাঠাতে থাকলেন একের পর এক। কিন্তু প্রতিটি গেছোভুতকেই কেটে ফেললেন শেননঙ।
সেই গেছোভুতের প্রানহীন কাঠ দিয়ে ড্রাগন বানিয়ে ফেললো এক বাড়ি। ঝড়ের দেবতার পাঠালেন ঝড়। বাড়ি উপড়ে গেল। ড্রাগন আগের চেয়েও মজবুত বাড়ি বানালেন। আবার ঝড়ের তোড়ে সে বাড়ি গেল। আবার নতুন করে আরো বেশি মজবুত বাড়ি বানানো হল। আবার ঝড়... এমনি চলতে থাকলো। যতবার ঝড়ের দেবতা বাড়ি ভেঙ্গে দেন ততবার তারই পুত্র ড্রাগন সে বাড়ি আরো মজবুত করে বানায়।
বহুবার বহুবার এই ভাঙ্গা আর গড়ার রণে একসময় ক্ষান্ত দিলেন ঝড়ের দেবতা। নিজের পুত্রের ক্ষমতার কাছে হার স্বীকার করলেন।
বিজয়ী ড্রাগন এবার একটি অসাধারণ মজবুত বাড়ি বানিয়ে তার নাম দিলেন ⁼বাতাস⁼। কারণ ঐ মজবুত বাড়ির কাছে সব ঝড়ই হবে সাধারন বাতাস মাত্র।
কিছুকাল পরে ড্রাগনের স্ত্রী শেননঙ প্রসব করলেন একশত ডিম। সেই ডিম ফুটে একশত শিশুর জন্ম হল। ড্রাগনপিতা তার শিশুদের যত্ন নিতেন খুব। কিন্তু কিছু কাল। কিছুকাল পরে ড্রাগনের মন উতলা। তার মনে পড়ে গেল তার ছোটবেলার দেশ। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ লহর। ড্রাগন বিদায় চাইলেন স্ত্রীর কাছে। একা বিষণ্ণ শেননঙ পাহাড়ের উপর থেকে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আশা, কোনদিন হয়ত ড্রাগন ফিরে আসবে তার নিজের হাতে বানানো এই ঘরে। সে আসে না। সময় বয়ে যায়।
শিশুরা বড় হয়। তারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দেশের দুই দিকে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের কোনায় কোনায় তাদের বসতি গড়ে। তারা কিন্তু পরস্পরকে মনে রেখেছে। পরস্পরকে সব সময় মনে রাখে, সাহায্য করে। ©তুষারমুখার্জি
তথ্যসুচীঃ-
1. The paternal and Maternal genetic history of Vietnamese people. : Enrico Macholdt, Leonardo Arias, Nguyen Thuny Duong, Nguyen Dang Ton, Nguyen Van Phong, Roland Schroder, Brigitte Pakendorf, Nong Van Hai, Mark Stoneking,: Published in BioRxiv, 31 July 2019.
2. Wikipedia,
3. Co-pilot.
৩১
॥ব্রহ্মপুত্র নদ॥
ব্রহ্মপুত্র, ব্রহ্মের পুত্র, একমাত্র পুংলিঙ্গ নদ। অন্য সব হল স্ত্রীলিঙ্গ, নদী।
প্রশ্নঃ
ব্রহ্মপুত্রের নদ এর নাম ব্রহ্মপুত্র হল কেন? প্রাচীন নাম কী ছিল? আগেকার নাম বদলে গেছে? কেন বদলে গেল?
প্রায় প্রতিটি মানব সভ্যতার জন্ম হয়েছে নদীর পাড়ে। কাজেই প্রাথমিক ভাবে কল্পনা করাই যেতে পারে এই ব্রহ্মপুত্রের পাড়েও প্রাচীন লোক বসতি ছিল। এবার মানচিত্রে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ দেখা যাবে নদটি নানা ভৌগোলিক বৈচিত্রে ভরা এলাকা দিয়ে প্রবাহিত। ফলে স্বভাবতই নদটির পাড়েও বসতি ছিল নানা জাতি উপজাতির। আর প্রতিটি জাতি উপজাতি তাদের নিজস্ব ভাষায় নদীর নামাকরণ করবে। এবার বাস্তবিকে হয়ত সবার নাম আলাদা হবে না। ভাষাগুলোর নৈকট্য থাকলে অন্যের দেওয়া নাম গ্রহন করে নেবে।
নিখাদ সত্য হল ব্রহ্মপুত্রেরও একাধিক নাম ছিল এবং আছে। না গোটা নদের নাম নয়। বিশাল নদের গতিপথে যে জাতি বসবাস করেছে তারা যে নাম রেখেছে সেই নাম। সেইরকম নামও অনেক।
দক্ষিণ-পশ্চিম তিব্বতের, ৫,৩০০ মিটার উচ্চতায় রাকে কাংগেন তসো হ্রদের দক্ষিণে কৈলাশ পর্বতমালার, আগেকার জানা মতে সিমায়াঙ দাঙ হিমবাহ, আর সর্বশেষ উপগ্রহ চিত্র থেকে দেখে বলা হচ্ছে, আঙসি হিমবাহ থেকে ব্রহ্মপুত্রের যাত্রা শুরু। উৎসের কাছাকাছি এটি মুতসুং সাংপো, তারপর মোঘুং সাংপো তারও পরে শুধু সাংপো নামে পরিচিত। তবে চীনা মানচিত্রে এটিকে ইয়ারলুং সাংপো নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর চেয়েও প্রাচীন নামের খোঁজ পাওয়া গেছে।
তিব্বতি ভাষায় যে সব নাম আগে ছিলঃ নারিচু সাংপু, তানজু খাম্পা, এরেচুম্বা, তাম্যক কোম্বো, মার্তসাঙ্গি-চু, কোবেইচু, সাংচেন, সাংপো-চিম্বো।
উপরে বলা সব নামই নদী তিব্বতে থাকার সময়।
তিব্বত থেকে নদীটি ঢুকবে ভারতের অরুনাচলে।
তখন নাম হবে সাংপো সিয়াং। বেশ খানিক নামার পরে আবার নাম বদল হবে। সেমা বা সেংলাই নামে পরিচিত হবে এবার। (এরই কাছের আরেকটি নদীর নাম ছিল সেয়েম। অনেকের গোলমাল হয় বলে উল্লেখ করে রাখা হল।)
সেংলা খানিক বয়ে প্রৈয় সমতলে যাবার পরে আবার নাম বদলে হবে।
নতুন নাম হবে দিহাং।
খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন সিয়াং, সেংলাই থেকে দিহাং নামটা অনেকটাই আলাদা। ঠিকই আলাদাই। আগেরগুলো ছিল তিব্বতি নাম। লোকালয় ছিল উঁচু পাহাড়ি তিব্বতি। আর দিহাং হল তিব্বতি-বর্মি নাম। অসমের বোড়ো জাতির দেওয়া নাম। নদী তখন প্রায় সমতলে।
এই অরুনাচলেই দিহাং নদের সাথে যোগ হবে দিবাং নদী। এই নামও তিব্বতি বর্মি নাম বোড়োদের দেওয়া। বোড়োরা গোটা ব্রহ্মপুত্রেরও একটা নাম দিয়েছিল বুরলুং-বুথুর। বোড়ো জাতির ক্ষমতা অবসানের সাথে সেই নামও লুপ্ত হয়ে গেছে।
এবার আরেকটি নদী যোগ হবে দিহাংএর সাথে।
লোহিত নদী। এখানে অসমের সমতল শুরু হল।
লোহিত নদী যোগ হবার পরেই দিহাং নাম বদলে সংস্কৃত নাম নেবে। দিহাং হয়ে গেল লৌহিত্য। স্থানীয় অসমিয়া ভালোবাসার ডাক নাম লুইত। ভুপেন হাজারিকার গানে—লুইত, বুড়া লুইত... তুমি বইছা কিয়?
সংস্কৃত নাম এলো অথচ সেই নামকে গ্রহনযোগ্য করার জন্য তার সাথে পুরাণ কথা থাকবে না এমনটি সাধারনত উত্তর-পূর্ব ভারতে ঘটে নি।
শোনা যাক সেই কাহিনী।
দুটো কথা আগে বলে নি। প্রথমত ব্রহ্মপুত্র হল ব্রহ্মার মানসপুত্র, দ্বিতীয়ত কাহিনীর প্রধান উৎস কালিকা পূরাণ তার সাথে কিছু লৌকিক উপাখ্যান।
পিতা ঋষি জমদগ্নির কথামত পরশুরাম তাঁর মাতা রেনুকাকে বধ করেন। তারপর মাতৃহত্যাজনিত পাপক্ষালনের জন্য বের হন তীর্থ ভ্রমনে। কিছু ঋষির পরামর্শে তিনি আসেন অরুনাচলের একটি বিশেষ কুণ্ডে। গোটা ভ্রমনকালে পরশুরামের হাতে আটকে ছিল সেই রক্তমাখা অভিশপ্ত কুঠারটি। যখন সেই কুঠারের রক্ত ধুয়ে যাবে, যখন সেই কুঠার হাত থেকে আলগা হয়ে যাবে, কেবল তখনই বোঝা যাবে তাঁর মাতৃহত্যাজনিত পাপক্ষালন হয়েছে।
ভ্রমন করতে করতে তিনি উপস্থিত হলেন অরুনাচলের গভীর বনের মাঝে এক কুণ্ডে। না তখন এখানকার নাম অরুনাচল ছিল না। কি নাম ছিল জানা নেই। এই কুণ্ডের সৃষ্টি কাহিনী ভিন্ন স্বাদের।
প্রথমে এই কুণ্ড ছিল এক শুন্য শুস্ক গহ্বর মাত্র। ব্রহ্মা কোন এক কালে মনস্থ করলেন তিনি এই গহ্বর জলপূর্ণ করবেন। সেই ইচ্ছা পুরণের জন্য দরকার জাগতিক পদার্থ, জল। তাই ব্রহ্মা মুনি শান্তনুর ভার্যা অমোঘার গর্ভে এক মানসপুত্রের জন্ম দিলেন। সে পুত্র আদতে একটি জলময় অস্তিত্ব কেবল। সেই জলময় পুত্রের ঠাঁই হল সেই শুস্ক গহ্বরে। সৃষ্টি হল এক পবিত্র জলপূর্ণ কুণ্ডের।
পরশুরাম সেখানে এলেন। ঝোপ জঙ্গলের বাধা পরিস্কার করে সেই কুণ্ডে এসে হাতের কুঠার ধুতেই সেই কুণ্ডের জল রক্তবর্ণ হয়ে গেল। তারই সাথে পরশুরামের কুঠার পরিস্কার হয়ে গেল। তাঁর হাত থেকে মাতৃহত্যার অভিশপ্ত কুঠারটি আলগা হয়ে গেল। পরশুরাম মাতৃহত্যা জনিত পাপমুক্ত হলেন। কুণ্ডটির নাম তখন থেকেই পরশুরাম কুণ্ড।
পরশুরাম সেই কুণ্ড থেকে জলমগ্ন ব্রহ্মার মানসপুত্রকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন কামরূপে।
কুণ্ড থেকে দিহাং নদী অবধি সমগ্র পথ হয়ে গেল রক্তবর্ণ এক নদী কারণ সে নদী রক্তবর্ণ কুণ্ডের জলে থেকে সৃষ্ট, তাই সেই নদীর নাম হল লোহিত নদী। কিন্তু এটা নেহাতই কাহিনী।
লোহিত নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। তার তিব্বতি নাম জায়ু। নদীর জল লাল। কারণ নদীর গতিপথের মাটিতে লোহা আর অ্যালুমিনিয়াম আকরিকের উপস্থিতি। আর পরশুরাম কুণ্ড এই নদীরই নীচের দিকে। তবে আগের কুণ্ডটি ১৯৫০ এর ভুমিকম্পে পাথরের আড়ালে চলে গিয়ে নতুন আর একটি কুণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। এই কুণ্ডে পৌষ সংক্রান্তিতে বিশাল উৎসব হয়।
অরুনাচলেরই মিশমি পাহাড় থেকে বের হয়ে আরেকটি নদী দিবাং বয়ে গেছে অরুনাচলের মধ্যে দিয়ে। এটিও ব্রহ্মপুত্র নদীর সাথেই মিশেছে।
দিবাং নদী আর লৌহিত নদী দুটোই মুল দিহাং নদীর সাথে মিশেছে। দিহাং তখন লৌহিত্য নদী। তেজপুরের কাছে সদিয়াতে দুটি শাখা নদীর সাথে নিয়ে পথ চলা শুরু ব্রহ্মপুত্র নদের।
কেন ব্রহ্মপুত্র নাম। তার পেছনে ঐ পরশুরামকুণ্ডের জলাশয় যা কিনা ব্রহ্মার মানসপুত্র তার এবং যেহেতু সেই নদীর জলরাশির উৎসই ব্রহ্মার মানসপুত্র, তাই নদের নাম হল ব্রহ্মপুত্র।
সম্ভবত এই নামাকরণের সময় ভাবা হত, বা বলা হত, লোহিত নদীর উৎস পরশুরামকুণ্ড, এবং সেটাই আসলে ব্রহ্মপুত্র নদ। মুল নদী দিহাং কে শাখা নদী ভাবা হত। আর দিবাং তো শাখা নদীই। সেই লোহিত নদীর সুত্রেই দিহাং নদীকে লৌহিত্য নদী বলা হত শুরুতে। পরে ব্রহ্মপুত্র নামটি ব্যবহার হতে থাকে।
বোড়োদের দেওয়া নাম বুরলুং-বুথুর বদলে হল ব্রহ্মপুত্র। বোড়োরা বুরলুং-বুথুর নাম দিয়েছিল কারন এই নদীর স্রোতে গড়ড়গুড় গড়ড়গুড়ড় শব্দ হতে থাকে। শব্দের উৎস নদীর তলদেশে থাকা বড় বড় পাথরের সাথে জলের ক্রমাগত ধাক্কা।
অসমের পরে ধুবড়ির কাছে ব্রহ্মপুত্র ঢুকবে বাংলাদেশে। সেখানেও তার নাম বদলে যাবে। নাম হবে যমুনা। নদ এবার নদী হয়ে গেল। যমুনা গঙ্গার সাথে মিলে হবে পদ্মা। তারপরে আবার পদ্মাকে ছেড়ে নিজের পথে চলে সাগরে মেশার আগে মেঘনা নাম নেবে।
১৭৮৭ তে প্রবল ভুমিকম্পে ব্রহ্মপুত্রের নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় গোটা অসমে বন্যার প্রকোপ বহুগুন বেড়ে যায়। তারই সাথে বাংলাদেশে এর গতিপথও বদলে যায়। আগে এটি ময়মনসিংহের মধ্যে দিয়ে আড়াআড়ি বয়ে যেত।
সুদুর অতীতের বোড়োদের একটি কবিতায় পাওয়া যায় তারা দেখেছিল লাল রঙের সমুদ্র। অনুমান করা হয় তিব্বতের পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দা বোড়োদের চোখে ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্রের লালচে ঘোলাজলে বন্যপ্লাবিত বিশাল এলাকা দেখে তারা সেটাকে লাল সমুদ্র বলেই ভেবেছিল।
গোটা অসমে ব্রহ্মপুত্র বয়ে গেছে চুলের বিনুনির মত পাক দিয়ে দিয়ে।
এমনি এক পাক দেবার ফলে অসমের লক্ষীপুর জেলায় নদী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে চলেছে প্রায় ১০০ কিলোমিটার। প্রধান স্রোত ব্রহ্মপুত্র আর অন্যটি খেরকুটিয়া নামে।
এরই ফলে সুষ্টি হয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম নদী দ্বীপ মাজুলি। মাজুলি এতটাই বড় যে প্রশাসনিক ভাবে সেটি একটি জেলা।
তবে যেমন বৃহত্তম দ্বীপের জন্ম দিয়েছে ব্রহ্মপুত্র তেমনি দিয়েছে ক্ষুদ্রতম দ্বীপও। গুয়াহাটির কাছে এই দ্বীপ উমাচল পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় আছে মন্দির।
ব্রহ্মপুত্রের অনেক শাখা নদী। তার মধ্যে কয়েকটি বেশ বিখ্যাত। সুবনসিরি, ধানসিরি, জিয়াভরলি, বুরহি দিহিং, দিসাং, কপিলি, মানস, সঙ্কোশ জলঢাকা, তিস্তা।
২৮৫০ কিমি লম্বা এই নদীটি পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীর একটা। এই নদীর গতিপথেই আছে গভীরতম গিরিখাত। অনেকেই বলেন ভৌগোলিক ভাবে এই নদী হিমালয় পর্বত সৃষ্টিরও আগে থেকেই ছিল। ব্রহ্মপুত্রের নদীখাতের গভীরতা ৩৮ মিটার থেকে ১২০ মিটার। আর প্রস্থে অনেক জায়গায় ২০ কিলোমিটার অবধি চওড়া।
এই নদীর উপর আছে ভারতের দীর্ঘতম সেতু ৯.৪ কিমি লম্বা। ঢোলা-সদীয়ার কাছে।
আর আছে সরাইঘাট সেতু, নতুন সরাইঘাট সেতু, কলিয়া ভোমরা সেতু, ঢোলা সদীয়া সেতু, বগিবীবল সেতু। শেষ হতে সামান্য বাকী উত্তর ও দক্ষিণ গুয়াহাটি সংযোগকারী সেতু। ধুবড়ী-ফুলবাড়ি সেতু, আছে নরনারায়ন সেতু, যমুনা সেতু।
এই নদীর উপরেই চীন বানাচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাঁধ।
ইতিমধ্যে চীন বানিয়েছে ছয়টি বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।
ভারত বানিয়েছে দুইটি বাঁধ জলবিদ্যুত প্রকল্প। আরো দুইটির কাজ নানা কারনে এখন স্থগিত আছে। এছাড়া আরো দুটি পরিকল্পনার স্তরে আছে।
©তুষারমুখার্জি
তথ্যসুচীঃ-
1. The Brahmaputra : by Arup Kumar Dutta. Via Times of India. Nov.4 , 2001
2. Wikipedia (English)
৩২
চীনা-তিব্বতি ও তিব্বতি-বর্মি ভাষা পরিবারের কথা॥
কয়েকদিন আগে চিনা-তিব্বতি ভাষা পরিবারের জেনেটিক তথ্য নিয়ে লিখেছিলাম। আজ চিনা-তিব্বতি-বর্মি ভাষা নিয়ে আলোচনা হবে।
সাধারনত আমরা উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রায় সমস্ত ভাষাকেই চিনা-তিব্বতি ভাষা অথবা কখনো চিনা-বর্মি ভাষা কখনো তিব্বতি-বর্মি ভাষা বলি। বেশির ভাগ সময়ে আগে পড়া কোন বই থেকে অথবা নিজেই ভেবে ঠিক করে ফেলি কোনটা তিব্বতি-চিনা আর কোনটা তিব্বতি-বর্মি অথবা চিনা-বর্মি। এই ভাষা চিহ্নিত করণে কোন বিশেষ জোরালো যুক্তি না থাকলেও আমরা সম্ভবত সেটা গ্রাহ্য করি না। যুক্তি গ্রাহ্য করি না বলার চেয়ে হয়ত বলা ভালো এড়িয়ে যাই।
আসলে সমস্যা হল, আমরা সাধারন লোকেরা তিব্বতি, বর্মি বা চিনা ভাষা জানি না। তাই কোন ভাষার সাথে কোন ভাষা জুড়ে আছে সেটা সরাসরি বুঝে ওঠার সুযোগ আমাদের নেই। যদি কেউ তিব্বতি বা বর্মি অথবা চিনা ভাষা জানেনও, তাহলেও খুব কিছু সুবিধা হবে না। কারণ আধুনিক ভাষার সাথে প্রাচীন ভাষার বিশাল তফাত। আর কোন ভাষার সাথে কোন ভাষার লেজুড় জুড়ে আছে সেটা অতীতে গিয়েই জানতে হয়।
তবে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবে চিনা-বর্মি বলে কোন ভাষা পরিবার নেই। এটুকু খেয়াল রাখলে ভুল হবার সম্ভাবনা প্রায় নেই হয়ে গেল।
এই চিনা-তিব্বতি আর তিব্বতি-বর্মি ভাষাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কিন্তু জটিল নয়। খুবই সরল। খানিকটা অবিশ্বাস্য রকমের সরল। এই সম্পর্কের চেহারা সহজেই বোঝা যাবে সাথে ছবিটি দেখলে।
তবে সবার আগে একটা কথা বলা দরকার এই লেখায় আগেকার ভাষাবিদদের বক্তব্যের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলতে হচ্ছে য়ে হয়ত তাঁদের অনেক কথার সাথো মিল থাকবে না। কারণ আগেকার ধারনা পাল্টে গেছে। সম্ভবত গত পঞ্চাশ ষাট বৎসর আগে থেকে নতুন ভাবনার শুরু। তবে আমি যেহেতু ভাষাবিদ নই তাই ঠিক কোথায় কোথায় বদল হল তা বলতে পারবো না।
সবার প্রথমে আমাদের যেতে হবে অনেক পেছনে। ভাষাগুলোর সম্ভাব্য উৎপত্তি কালে। এই ভাষা পরিবারের সম্ভাব্য প্রাচীনতম রূপ হল প্রোটো চিনা-তিব্বতি ভাষা।
যদিও প্রোটো-চৈনিক-তিব্বতিদের সাধারণত দুটি ভিন্ন ভাষার সরাসরি বংশধর বলে মনে করা হয়, এক প্রোটো-চৈনিক এবং অপরটি প্রোটো-তিব্বতি নয় প্রোটো তিব্বতি-বর্মি। কিন্তু তবু গোটা ব্যাপারটা অতটা সরল না।
প্রথমে আমাদের প্রোটো-চৈনিক-তিব্বতি ভাষা পরিবারেরভাষাগত পুনর্গঠন করতে হবে। দেখতে হবে অতীতে এই ভাষা পরিবারের সদস্য কারা ছিল। একটি ধারনায় বলা হচ্ছে এর মধ্যে রাখতে হবে চৈনিক, তিব্বতি, ই, বাই, বার্মিজ, কারেন, টাঙ্গুত এবং নাগা সহ সমস্ত ভাষার সাধারণ পূর্বপুরুষ।
পল কে. বেনেডিক্ট (১৯৭২) এর মতে প্রোটো-চৈনিক-তিব্বতি ভাষায় থাকবে প্রাচীন চীনা, ধ্রুপদী তিব্বতি, জিংফো, বার্মিজ, গারো এবং মিজো ভাষা। বিশাল পরিবার।
ইদানীং আবার কিছু ভাষাবিদ অন্য পথে ভেবে বলছেন প্রোটো চৈনিক এর সাথে প্রোটো তি়ব্বতি-বর্মি জুড়েই প্রোটো চৈনিক-তিব্বতি ভাষার জন্ম এমন ধারনা সর্বাংশে ঠিক না। প্রোটো হলেও চৈনিক-তিব্বতি আলাদা আর তিব্বতি-বর্মি আলাদা করেই ভাবা দরকার।
অতীতের ভাষার জন্মের পেছনে অবদান ছিল এদেরঃ-
১. চৈনিক ভাষা
প্রাচিন চিনের বহুল ব্যবহৃত ভাষা, যা বহু আঞ্চলিক উচ্চারণ বৈশিষ্ট্যে বিভক্ত এক সমৃদ্ধ ভাষাপরিবারের কথা বলে। চৈনিক আঞ্চলিক ভাষাগুলোর মধ্যে পড়বে ম্যান্ডারিন, ক্যান্টনি, উ, মিন, চিন, হাক্কা, সিয়াং কান, হুইয়েচৌ, ফিংহুয়া, তুনকান। এখানে অবশ্য ভাষাবিদদের কিছু মতভেদ আছে। অনেকের মতে চিনা ভাষাগুলো শুধুই উচ্চারণ বৈশিষ্ট্যে বিভক্ত ভাষার সমাহার না, এগুলো আসলেই স্বতন্ত্র ভাষা। তারা জুড়ে গেছে কেবল মাত্র চৈনিক লিপিতে। একই লিপি ব্যবহারের ফলে তারা এক পরিবারের সদস্য বলে বিবচিত হয়ে এসেছে।
২. তিব্বতি ভাষা
শুরু তিব্বতের ইয়ালুং ভ্যালীতে। এই ইয়ালুং ভ্যালী হল ইয়ারলুং সাংপো বা ইয়ারলুং ঝাংপো নদীর অববাহিকায়। এই ইয়ারলুং নদী যা ভারতে ব্রহ্মপুত্র নদী।
এমন সহজে বলে দেওয়া গেলে ভালোই হত। কিন্তু তিব্বতি ভাষাও প্রাচীন ভাষা। কাজেই এরও একটা প্রোটো পর্যায় থাকবেই। আর শুধু একটা উপত্যকা থেকে একটা প্রাচীন ভাষার উদ্ভব সম্ভব হলেও সেটা ঠিকঠাক খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। যেখানে চিনা ভাষার বেলা আমরা দেখতে পাই অনেকগুলো ভিন্ন ভাষার সমন্বয়, তিব্বতি ভাষাতেও সেটা না হলেই অবাক হবার কথা।
তিব্বতি ভাষাকে হিমালয়ি ভাষা বলতে পারি। হিমালয়ের পূর্ব আর পশ্চিম পাড়ে অসংখ্য জাতি উপজাতির ভাষাই প্রকৃতপক্ষে তিব্বতি ভাষা। আপাত ভাবে আমাদের মত সাধারনের কাছে তারা ভিন্ন শোনালেও ভাষাবিদরা কিছু বৈশিষ্ট্য খেয়াল করে তিব্বতি ভাষা পরিবারকে সনাক্ত করেন। তাঁরা প্রোটো তিব্বতি-বর্মি ভাষার কয়েকটি গোষ্ঠীকে "ট্রান্স-হিমালয়" নাম দিয়ে আলাদা করে নিয়েছেন।
এই ট্র্যান্স হিমালয়ান ভাষা গোষ্ঠী কিন্তু সত্যিই বিশাল। শুধু পূর্ব-হিমালয়ান গোষ্ঠীতে আছে ৪২টি ভাষার নাম। তার মধ্যে আবার কয়েকটি ভাষা একাই একশ। মানে তাদের মধ্যে গুচ্ছের ভাষা ঢুকে আছে।
এই হিমালয়ান ভাষার মধ্যে আছে বাল্টি, লাডাকি, লাহুল, জান্সকার, ছাড়াও মধ্য তিব্বতি সহ একাধিক তিব্বতি ভাষা।
ভুটান সিকিম, নেপাল এইসব এলাকায় মুলত ট্র্যান্স হিমালয়ান ভাষা তথা তিব্বতি ভাষা গোষ্ঠীর ভাষার মধ্যেই পড়ে। ভুটানে আছে ব্ল্যাক মাউন্টেন মনপা ভাষাগুচ্ছ। যার মধ্যে আছে ওলেখা, রিতি, জাংবি, ওয়াংলিং। দক্ষিণ মধ্য ভুটানে গুংডক।
মধ্য নেপালে আছে চেপাং, ভুজেলি। নেপালে ও ভুটানে যুগপৎ চলে টোটো, ধিমাল।
বোডিয় ভাষা আরেকটি ট্র্যান্স হিমালয়ান তিব্বতি ভাষা। তিব্বতের বড অঞ্চলের ভাষা। তবে তার মধ্যে ঢুকে আছে এক গুচ্ছ তিব্বতের নানা অঞ্চলের ব্যবহত ভাষা।
বোড ভাষা পরিবারে আছে, বাল্টি, লাডাক, লাহুল, জান্সকার, কাগাতে, মুসতাং, লিমিরং মুগু, জোংখা, লাখা, খেং চালি, ডাকফা, -- এই সব আরো অনেক।
এই বোডিয় ভাষাটির নামের বা উচ্চারণের মিলের জন্য বর্তমান অসমের বোড়ো জাতির ভাষা মনে হলেও আসলে তা না। মুলত নামের মিল ধরেই অসমের কিছু ইতিহাসবিদ এমন দাবীও করেন যে অসমের বোড়ো জাতি তিব্বতের বোড এলাকা থেকে এসেছে। কিন্তু ব্যবহৃত ভাষা বলে ভিন্ন কথা। বোড়ো ভাষা কিন্তু তিব্বতি-বর্মি ভাষা। যা এখন নিজগুনে ব্রহ্মপুত্রিয়ান ভাষা গ্রুপে ঢুকেছে। ব্রহ্মপুত্রীয় ভাষাকে কামরুপীয় ভাষাও বলা হয়।
ব্রহ্মপুত্রিয়ান বা কামরূপীয় ভাষা কোন একক ভাষা না। ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় যে ভাষাগুলো ব্যবহার হয় সেগুলোকে একটা ছাতার তলায় আনার জন্যই এমন নাম দেওয়া হয়েছে।
ব্রহ্মপুত্রিয়ান ভাষা। নামেই বোঝা যাবে ব্রহ্মপুত্র নদী অববাহিকার বহু ভাষার সমাহার এটি। সব নাম লেখা সম্ভব না, তবু শুধু প্রাথমিক কৌতুহল মেটাতে কয়েকটি চেনা ভাষার নাম লিথলাম।
বোড়ো-কোচ, চুতীয়া বা সুতীয়া, ককবোরোক, তিওয়া, ডিমাসা, বোড়ো, কছাড়ি, মেচ, গারো, আতং, পানি-কোচ, রুবা রাভা, টাঙ্গসা, নকটে ওয়ানচু, কুওয়া, হাইমি, কনিয়াক, পনিও ফম,
এছাড়া কয়েকটি বহুল পরিচিত তিব্বতি-বর্মি ভাষার নাম হল লেপচা, তানি, আও, তাংখুল, কার্বি, মৈতেই, কুকি, ম্রু, পিউ। কিন্তু এখানেও প্রায় প্রতিটি ভাষার নাম আসলে এক গুচ্ছ ভাষার সমাহারের নাম।
এদের মধ্যে কুকি নামের ভাষাটির মধ্যে ঢুকে আছে আরো খান কুড়ি আলাদা ভাষা। এদেরকে কুকি ভাষারই সহোদর ভাষা বলা যেতে পারে। তেমনি তানি ভাষা অরুনাচলের একগুচ্ছ ভাষার নাম। এর সহোদর ভাষা খান তেইশ।
আর বর্মি ভাষা যে সব ভাষার জন্ম বর্মার এলাকাতেই এমন বলতে পারলে ভালোই হত। কিন্তু ঘটনা আদৌ তা না। তিব্বতি-ভাষা আর বর্মি ভাষা বহুকালের বহু জাতির নিরন্তর ব্যবহারে এতটাই মিশে আছে যে সরাসরি ভাগ করা বেশ কঠিন।
বর্মি ভাষার মধ্যে প্রধান হল পিউ, কারেন, কাচিন, নানগিস, ম্রু, লোলো-বর্মি, এবং এখানেও প্রতিটি ভাষার নামের সাথে পড়ে নিতে হবে আট দশটি করে সহোদর ভাষা। ©তুষারমুখার্জি
তথ্যসুত্রঃ-
1. Trans Himalayan : by George Van Driem. University of Bern. January 2024.
2. Genetic Structure of Sino-Tibetan population revealed by forensic STR loci By Hong-Bing-Yao et al.
3. Wikipedia
4. Co-pilot.
৩৩
মারমা,চাকমা,টিপরা জেনেটিক্স
॥ চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকার তিব্বেতো-বর্মি ভাষীদের কথা॥
03-05-2025©তুষারমুখার্জি
(একটি কথাঃ এই লেখায় "ভারত বা ভারতীয়" বলতে জেনেটিক অর্থে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া বোঝানো হয়েছে।)
বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকার তিব্বতি-বর্মি ভাষা পরিবারের সদস্য তিনটি আদিবাসি উপজাতি, মারমা-টিপরা-চাকমা, এদের নিয়ে একটি জেনেটিক গবেষণা হয় বার বৎসর আগে। গবেষণায় বাংলাদেশের ভারতের ও এস্তোনিয়ার বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানগুলো সংযুক্ত ছিল।
এই গবেষমার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি এ খাগড়াছরি এলাকা থেকে ৫এমএল পরিমান রক্ত সংগৃহীত হয়েছিল, ডিএনএ সংগৃহের উদ্দেশ্যে। নমুনা সংগ্রহের সময় সবার নাম, বংশ পরিচয়, জাতি পরিচয়, অতীত ইতিহাস (মৌখিক) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। একই বংশের বা অতি নিকট সম্পর্কের লোকের নমুনা নেওয়া হয় নি। নমুনা সংগ্রহের কাজ হয়েছিল ইনস্টিটিউশনাল এথিকেল কমিটি দি সেন্টার ফর অ্যাডভান্স রিসার্চ ইন সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতিক্রমে।
নমুনা সংগৃহীত হয়েছিল নিম্ম লিখিতদের থেকেঃ-
চাকমা-১০৮জন
মারমা-৯৭জন
টিপরা-৯৭জন
গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল এই তিনটি উপজাতির পরিযান, অভিবাসন, বিবর্তন ও ভাষিক বিবর্তন অনুসন্ধান করা। একই সাথে তাদের নিজেদের মধ্যেকার সম্পর্ক ও প্রতিবেশি জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ককেও বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাদেশে নথীবদ্ধ ৩২টি উপজাতি জনগোষ্ঠী দেশের মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ১ শতাংশ। (এখন থেকে এখন থেকে বার বৎসরের কিছু বেশি আগের তথ্য।) পার্বত্য অঞ্চল ও সমুদ্রতটবর্তী এলাকার এই বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর অভিবাসন বিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব থাকাটা অবাঞ্চনীয়। তাই এই বিষয়ে শিক্ষাক্ষেত্রিয় জ্ঞানচর্চার অভাব দুরীকরনে এই গবেষণা।
এই উপজাতিদের মধ্যে বেছে নিয়ে যাদের ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছিল তাদের অবস্থানগত পরিচয় বিষয়ে গবেষকরা বলেনঃ গবেষণাকালে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন নমুনা দাতারা ভৌগোলিক ভাবে বাংলাদেশের এই তিনটি তিব্বতি-বর্মি ভাষী প্রাচীন উপজাতিয় জনগোষ্ঠীর সদস্য হিসাবেই সুদীর্ঘকালীন স্থায়ী বাসিন্দা
তিব্বতি-বর্মি ভাষা পরিবার বিশ্বের সম্ভবত দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা পরিবার। চিনের হুয়াংহে নদী (ইয়ালো রিভার) উপত্যকা থেকে এই ভাষা বিস্তার লাভ করে হিমালয়ের নেপাল ভুটান সহ উত্তর-পূর্ব ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের একাংশে বৃস্তিত, এমনকি পাকিস্তানের কারাকোরাম পার্বত্য এলাকার বাল্টিক এলাকাতেও আছে। তবে এ ভাষা নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা খুবই সামান্য হয়েছে। কারণ এরা ভিন্ন ভিন্ন জাতি উপজাতিতে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে আছে এক অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকায়।
অতীতে ভারতীয়দের সাথে এদের জিন বিনিময় ঘটেছে। তবে এই জিন বিনিময়, যা আসলে তাদের মাতৃজিন গ্রহন, সে ব্যাপারে সবার থেকে এগিয়ে আছে মারমা', তারপর দ্বিতীয় স্থানে টিপারা', তুলনামুলক ভাবে চাকমারা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন থেকেছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের তিব্বতি-বর্মি ভাষা গোষ্ঠীর মধ্যে যে হারে ভারতীয় জিন দেখা গেছে, তার সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশের এই তিন জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক বেশি হারে ভারতীয় জিন পাওয়া যায়।
পারস্পরিক জিন বিনিময়ে আরেকটি লক্ষণীয় ঘটনা হল দক্ষিণ-এশিয় সমস্ত আদিবাসি জনগোষ্ঠীই সাধারনত নিজেদের মধ্যেই বৈবাহিক সম্পর্ক সীমিত রাখে। কিন্তু আলোচ্য তিনটি জনগোষ্ঠীই পরস্পরের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক রাখার ফলে তাদের মধ্যে জিন বিনিময় সহজ হয়েছে। তবে এক্ষেত্রেও চাকমারা তুলনামুলক ভাবে রক্ষণীল।
জেনেটিক হ্যাপলোগ্রুপ বৈচিত্রে সবচেয়ে উপরে আছে মারমা', তারপরে আসবে টিপরা' আর সবার শেষে চাকমা।
এই তিনটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুটি বিশেষ পৈত্রিক জিনের বাহুল্য দেখা যায়ঃ
O2a এবং O3a3c
এই দুটি পিতৃ-হ্যাপ্লোগ্রুপই জনগোষ্ঠীগঠন পর্যায়ে এসেছিল প্রায় সমসায়িক কালে। ১৮ হাজার ও ১৪ হাজার বৎসর আগে। ফলে এটা আমাদের কাছে সহজবোধ্য যে ভাষাগত ঐক্যের আগেই তাদের জিনগত নৈকট্য গড়ে উঠেছিল।
মাতৃজিন-এর দিক থেকে, চাকমাদের সাথে তুলনা করলে, মারমা ও টিপারাদের মধ্যে পূর্ব-এশীয় জিনের বদলে ভারতীয় জিনের আধিক্য আছে। তবে এই তিনটি জনগোষ্ঠী ছাড়াও গোটা উত্তরপূর্ব ভারতেই যে পূর্ব-এশিয় মাতৃজিন সর্বাধিক তা হল হ্যাপ্লোগ্রুপ-এফ১(F1) .
উত্তর-পূর্ব ভারতের তুলনামুলক বদ্ধ সমাজের বদলে চট্টগ্রামের মুক্ত সমাজে বাইরের মাতৃজিন অনেক সহজে প্রবেশ করেছে। দেখা গেছে এই এলাকায় পূর্ব-এশিয় মাতৃজিন এর তুলনায় ভারতীয় মাতৃজিনের বৈচিত্রও বেশি। এর একটি অর্থ হল ভারতীয় মাতৃজিন এই এলাকায় প্রাচীনতম এবং পূর্ব-এশিয় জিন পরে প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশে ভারতীয় মাতৃজিন ও পূর্বএশিয় এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয় মাতৃজিনকে দুটো গোষ্ঠীতে ভাগ করলে দেখা যাবে বাংলাদেশি তিব্বতি-বর্মি জনগোষ্ঠীর ঝোঁক পূর্বএশিয় দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দিকে। এটাই স্বাভাবিক। কারন তিব্বতি-বর্মি ভাষীরা ভারতীয় মাতৃজিন কিছু পরিমানে গ্রহন করলেও তারা মুলত অ-ভারতীয়।
আমরা দক্ষিণ এশিয়াবাসী প্রায় সকলেই মাতৃজিনের বদলে পিতৃজিনকে বেশি গুরুত্ব দেই। ফলে উপরে বলা মাতৃজিন কথা অনেকেই পুরোটা পড়বেনও না সম্ভবত।
এবার আসি পিতৃজিন কথায়।
পিতৃজিন পরীক্ষার জন্য চাকমা-৮৯জন, মারমা-৬০জন, টিপারা-৮৮জন এর নমুনা নিয়ে কাজ হয়েছে।
প্রথমেই বলা দরকার নমুনার ৬০ শতাংশের বেশি লোকের পিতৃজিন পূর্ব-এশিয়। প্রধানত O2, এবং O3 হ্যাপ্লোগ্রুপ। সবার মধ্যে কম বা বেশি হারে আছে C, D, O2a1, O3a2c1, N1, NO, P1, R2 এইসব হ্যাপ্লোগ্রুপ।
বালি থেকে তিব্বত প্রায় সব জায়গায় ভারতের প্রস্তরযুগীয় হ্যাপ্লোগ্রুপ-এইচ(H) ছিল। অথচ আশ্চর্যজনক ভাবে সেটা চট্টগ্রামে একেবারেই নেই। যার সরলার্থ চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকায় প্রস্তরযুগীয় ভারতীয়রা ছিলো না। কিন্তু এটা প্রকৃত পরিস্থিতির অতি সরলীকরণ হয়ে যাবে। কারণ এই এলাকায় প্রস্তরযুগীয় ভারতীয় মাতৃজিন থাকলে পিতৃজিনও থাকার কথা।
পিতৃ হ্যাপ্লোগ্রুপ-P1, N1a, NO এগুলো নিয়ে গবেষকরা তেমন কোন আলোচনা করেন নি। আমারও বিশদ জানা নেই।
আরেকটি ব্যতিক্রমি তথ্য মনে হল, চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে আছে পিতৃ হ্যাপ্লোগ্রুপ-এল(L) জে২ (J2)
হ্যাপ্লোগ্রুপ-এল এবং জে২ মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভুত এবং দক্ষিণ ভারতে এর প্রাধান্য সর্বাধিক। সরলার্থ হল চট্টগ্রামের তিব্বতি-বর্মি ভাষীদের সাথে দ্রাবিড় লোকেদের জিন বিনিময় হয়েছিল।
একজন তেলুগু-র মধ্যে হ্যাপ্লোগ্রুপ-NO পাওয়া গেছে, সেই সুত্রে এটাও দক্ষিণ ভারতীয় বলতে পারি।
সময়ের সাথে জিনে বৈচিত্র বাড়ে। এই বৈচিত্রের বৃদ্ধির সুত্র ধরে এখানকার তিব্বতি-বর্মি ভাষী এই তিনটি জনগোষ্ঠীর প্রাচীনতা অনেকটা বোঝা সম্ভব। দেখা গেছে পিতৃজিন হ্যাপ্লোগ্রুপ O2a1 অন্য হ্যাপল্গোগ্রুপ O3a2c1, N1a, NO, তুলনায় প্রাচীনতর। এবং লক্ষ্য করা গেছে যে আলোচ্য তিনটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমারা প্রাচীনতর।
বাংলাদেশের তিব্বতি-বর্মি ভাষীদের পিতৃজিনে O2a1এর গোষ্ঠী বৈশিষ্ট্য বলে তাদের সাথে সম্পর্ক রয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতের অস্ট্রোএশিয়াটিক খাসি জাতির। এই জিন বিনিময় কবেকার? গবেষকদের মতে খুব প্রাচীন নয়। সম্ভবত প্রায় আধুনিক কালে।
প্রচলিত ধারনার কিছুটা বিপরীতে বাংলাদেশের তিব্বতি-বর্মি ভাষী হ্যাপ্লোগ্রুপ O3a2c1 বাহকদের ঘণিষ্ঠতর জেনেটিক সম্পর্ক কিন্তু দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ার সাথে নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের O3a2c1 বাহকদের সাথেই। এই তথ্যের গুরুত্ব মুল পরিযান ব্যাখ্যায় লাগবে।
এই তিব্বতি-বর্মি ভাষাপরিবারের সব জনগোষ্ঠীই পূর্বদিক থেকে এসেছিল সেটা নিশ্চিত। এই গবেষণার মাধ্যমে চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকায় এই পূর্বদিক থেকে ঘটা প্রাথমিক প্রস্তরযুগীয় থেকে পরবর্তী নব্যপ্রস্তরযুগীয় পরিযানের পথদিশার খোঁজ করাই ছিল গবেষণার অন্যতম প্রধানলক্ষ্য। তার সাথে দেখা জনগোষ্ঠীগুলোর জেনেটিক তারতম্যের সাথে ভাষাগত তারতম্যের কোন বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল কি না।
মুল পরিযান ব্যাখ্যা হিসাবে বাংলাদেশে একটি প্রচলিত ধারনা ছিল আনুমানিক সর্বাধিক ৪হাজার বৎসর আগে তিব্বতি-বর্মিভাষীদের পুরুষপ্রধান পরিযান ঘটে এই এলাকায়। কিন্তু এই জেনেটিক গবেষণার ফলাফল বলছে, না এটি পুরুষ প্রধান নয়, নারী পুরুষ উভয়েরই যুক্ত পরিযান ঘটেছিল।
এবার বড় প্রশ্ন কবে?
অবশ্যই সঠিক সময় বলা সম্ভব নয়। যদিও এই দুটি প্রধান পিতৃজিনের উদ্ভবকাল ১৪-১৮ হাজার বৎসর। তবু তারা দক্ষিণ চিন থেকে কবে পাড়ি জমায় এদিকে সেটার কোন প্রত্নপ্রমান নেই। তবে ওয়াই ডিএনএ O2a1 এর ব্যাপকতর বৈচিত্র বলে সেটি আগে এসেছিল এই পার্বত্য চট্টগ্রামে। তারপরে আসে O3a2c1.
আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চেয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের O3a2c1 এর সাথে বেশি ঘণিষ্ঠ পার্বত্য চট্টগ্রাম।
এর অর্থ দাঁড়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথমে O2a1 বাহকরা আসে তারপরে আসে O3a2c1 বাহকরা। এবং এই দুইই এসেছে পূর্বদিক থেকে। বা সরাসরি দক্ষিণ চিন থেকে।
দুই মিলিয়ে ধরা যেতে পারে উত্তর-পূর্ব ভারতে ও দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ায় তিব্বতি-বর্মি পরিযানের চেয়ে চট্টগ্রামের পরিযান প্রাচীনতর হবার সম্ভবনা খুবই বেশি।
আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হল উত্তর-পূর্ব ভারতের তিব্বত-বর্মি ভাষীদের থেকে চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে অনেক বেশি হারে ভারতীয় পূর্বপুরুষীয় জিন পাওয়া গেছে। যা বলে এরা যখন এখানে বসতি গড়তে আসে তখন এই এলাকায় প্রাচীন ভারতীয়রা ছিল। সেটাও এদের প্রাচীনত্বেরই কথা বলে।
মাতৃজিন মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ হ্যাপ্লোগ্রুপ
চাকমা-১০৮জন, A, A10, D4,D5,F1, G2a, G3, M, M12, M13, M18, M2, M20,
মারমা- ৯৭জন A, B4,C1, F1, G2a, G3, M, M10, M13, M20,
টিপরা- ৯৭জন A, E, F1, G2a, G3, M, M10, M13, M18, M20,
পিতৃজিন ওয়াই-ক্রমোজম ডিএনএ হ্যাপ্লোগ্রুপ
চাকমা-৮৯জন, C, D, F, J2, N1a, O, O2a, O3a3c, P, R1, R1a1,R2
মারমা- ৬০জন C, D, K, L, NO, O, O2a, O3a3c, P, ,R2
টিপরা- ৮৮জন C, D, F, J2, K, L, N1a, O2a, O3a3c, P, R1,R2
৩৪
গম ও বার্লির পূর্বমখী পরিযান॥
মানুষের পরিযান নিয়ে নিত্য নতুন তথ্য জানার পরে আগেকার ধারনা বদলে যাচ্ছে। মানব পরিযান বিষয়টি এখন এতই জটিল যে এর সাথে মানুষদের সঙ্গে করে স্থানান্তরিত করা জীবজন্তুর বা গাছপালার খোঁজ রাখবার চেষ্টাটা দুর্ঘট হয়ে পড়েছে।
আজকের বিষয়ঃ মানব পরিযানের বদলে, মানুষের প্রধান খাদ্য শষ্যের পরিযান। মুলত গম আর বার্লি নিয়ে। তারমধ্যেও প্রধান হবে বার্লি। এখন রোগীর খাদ্য মনে হলেও অতীতে বার্লিই ছিল প্রধান খাদ্যশষ্য।
একেবারে শুরুতে গম-বার্লি যে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশে প্রাকৃতিক ভাবেই জন্মেত শুরু করে ধান তারচেয়ে সামান্য একটু আলাদা এলাকায় জন্মাতে শুরু করে। তার কারন ছিল প্রাকৃতিক তাপমাত্রা ও আদ্রতার ফারাক।
প্রধান মানব সভ্যতাগুলোও গড়ে উঠেছিল ঐ বিশেষ অক্ষাংশ আর দ্রাঘিমাংশে। কারন সভ্যতার বিস্তারের প্রথম শর্তই ছিল উদ্বৃত্য খাদ্য শষ্যের উৎপাদন।
অঢেল খাদ্য বর্ধিত জনসংখ্যার ক্ষুধা নিবারণে সহায়ক। তাই জনসংখ্যা বাড়তে থাকলো। বাড়তে থাকা জনসংখ্যার জন্য দরকার হল আরো বেশি খাদ্য শষ্য। ক্রমবর্ধমান খাদ্যশষ্যের চাহিদা মেটাতে ফসল উৎপাদনে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা আর অভিজ্ঞতার প্রয়োগ শুরু হল। মানুষ শিখে গেল ফসলের ক্ষেতে জল সেচ ব্যবস্থা। আর তার সাথে উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার করা।
পরীক্ষানিরীক্ষা পর্যায়ে য়ে সব বীজে উচ্চ ফলন দেয় তা বাছাই করে সেকটি জাতের বীজের ক্রমাগত ব্যবহার হতে থাকে।
ফসলের গাছ গোড়া থেকে কেটে এনে শষ্যদানা আলাদা করার পদ্ধতি হল মাড়াই। গোড়াতে মাড়াই করে সহজে দানা আলাদা কঠিন ছিল। মাড়াই বেশি করলে দানা গুঁড়ো হয়ে যায়। অবশেষে কয়েকটি এলাকায় বারবার একই বীজ বপনের ফলে দেখা গেল দানা আলাদা করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। সেই বীজের ব্যবহার বাড়ল। পরবর্তী ধাপে একই পদ্ধতিতে ফসলের দানা তার খোলস থেকেও সহজে বের করা সম্ভব হল। পরিশ্রম কমল। বীজ চিহ্নিত হল। সেই বীজের ব্যবহার ছড়িয়ে পড়তে থাকলো। এখন কৃষকরা বাছাই করা সামান্য কয়েকটি জাতের বীজই ব্যবহার করছে।
বছর পাঁচ ছয় আগের ধারণা গম-বার্লির প্রাকৃতিক ভাবে জন্ম জাগ্রোস পার্বত্য এলাকা ও তুরস্কের আনাতোলিয়া এলাকায়। ফলে সেখানেই কৃষিকাজের জন্ম হয়। এবং সেখান থেকেই গম ও বার্লির বীজের পশ্চিমুখী পরিযান শুরু হয়।
পরিযানের প্রথমধাপে কৃষিকাজ ছড়ায় মেসোপটেমিয়াতে। অঢেল ফসলে সমৃদ্ধ কৃষকরা জন্ম দেয় প্রথম মানব সভ্যতার।
দ্বিতীয় ধাপে সেই বীজ আসে হরপ্পা সভ্যতার এলাকায়। জন্ম দেয় হরপ্পা সভ্যতার।
তৃতীয় ধাপে আনোতলিয়ার কৃষকরাই গম-বার্লির বীজ নিয়ে যায় ইয়োরোপে। গড়ে উঠতে তাকে ইয়োরোপীয় সভ্যতা।
সহজ সরল পরিযান পথ ও ধারনা।
এবার একদল বিজ্ঞানী প্রশ্ন তোলেনঃ সমতুল আবহাওয়ায় সমসাময়িক কালে অন্য এলাকাতেও প্রাকৃতিক ভাবে গম-বার্লির জন্ম হবার কথা। যদি তা হয়েই থাকে তবে শুধুই আনাতোলিয়ার লোক আর বীজই কৃষিকাজের হেতু এমন ধারনা ঠিক হল কি?
এই প্রশ্নের সমর্থনেই ফরাসি প্রত্নবিদ জারিজের মেহেরগড় প্রত্ন খননে জানা গেল মেহেরগড়ে প্রাকৃতিক ভাবেই জন্মাত বুনো গম ও বুনো বার্লি।
২০১৯
রাখিগড়ির জিন গবেষণার ফলের জন্য বিখ্যাত বসন্ত সিন্ধে, নিরজ রাই, ডেভিড রাইখদের গবেষণাপত্রে লেখা হল, ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের কৃষকরা নিজেরাই কৃষিকাজ শুরু করেছিল স্থানীয় গম আর বার্লির বীজ ব্যবহার করে। তাদের কৃষিকাজে আনাতোলিয়ার কৃষকদের অবদান ছিলো না।
বাড়তি জনসংখ্যার জন্য উচ্চ ফলনশীল ও সহজে মাড়াই করা যায় এমন বীজই কৃষিকাজ সহজসাধ্য করে তোলে এবং মানব সভ্যতার উত্থানের সহায়ক হয়। কারন সমৃদ্ধ কৃষকই কেবল পারবে জনসমস্টির এক অংশকে কৃষিকাজের বোঝা থেকে মুক্ত করতে। এই কৃষিকাজ থেকে মুক্তরাই সৃষ্টি করবে নানা বিচিত্র উৎপাদন। কৃষকরা বাড়তি ফসল বিক্রি করছে বলেই শহরের কয়েক হাজার লোক কৃষিকাজ না করেও দুই বেলা খেতে পাচ্ছে।
এটা সহজবোধ্য যে হরপ্পা সভ্যতার শহরগুলো গড়ে ওঠার আগেই হরপ্পা সভ্যতার এলাকার কৃষকরা উচ্চ ফলনশীল এবং সহজে মাড়াই করা যায় এমন বীজ ব্যবহার করছিল। এবং যেহেতু বহু ব্যবহারেই কেবল বীজের এমন প্রকৃতিগত পরিবর্তন ঘটে, তাই বলাই যায় এই বীজ এসেছিল সেই আনাতোলিয়া থেকেই।
ডেভিড রাইখ তাঁর জেনেটিক ফর্মেশন অফ সেন্ট্রাল অ্যান্ড সাউথ এশিয়া গবেষণাপত্রে ইশারা করেছেন, আনুমানিক সাড়ে চার হাজার বৎসর আগে উচ্চ ফলনশীল বীজ এসেছিল, তবে মানব সীমিত মানব পরিযানের মারফত। অর্থাৎ উন্নত গম-বার্লির বীজের পশ্চিমমুখী পরিযানের এই পর্বে আনাতোলিয়া থেকে ইয়োরোপের মত বিশাল সংখ্যার কৃষক পরিযান ছিল না।
ওডোন্টোলোজিস্ট জন লুকাস ও হেমফিল তাদের গবেষণাপত্রে বলেছিলেন, ৬৫০০ বৎসর আগে মেহেরগড়ের প্রথম পর্যায়ের লোকদের হটিয়ে সেখানে বসতি গড়েছিল এক নতুন জনগোষ্ঠী।
গত বৎসর প্রিয়া মুরজানি অন্য আমেরিকান গবেষকদলের সহ-গবেষক হিসাবে ঘোষণা করেন উত্তর-পশ্চিম ভারতে নতুন এক জনগোষ্ঠী প্রবেশ করেছিল সাড়ে ছয় হাজার বৎসর আগে। এবং এই জনগোষ্ঠীই বর্তমানের গোটা ভারতের সবার পূর্বপুরুষ।
এই নবাগত জনগোষ্ঠীর উৎসঃ সর্বোচ্চ তিন হাজার লোকের শহর সারাজম। তাজিকিস্তানের একটি ব্রোঞ্জযুগীয় বানিজ্যপ্রধান শহর। তুর্কমেনিস্তান থেকে কিছু লোক এসে তাজিকিস্তানে সারাজম শহরের পত্তন ঘটায়। এটা ঘটে হরপ্পা সভ্যতার শহর গঠন প্রক্রিয়া শুরুর আগে।
সময় রেখার হিসাবে অনুযায়ী, যদি সারাজমের লোকেরা আনাতোলিয়ার উচ্চ ফলনশীল বীজ এনে থাকে, তবে তাদের আগমনের পরেই উত্তর-পশ্চিম ভারতের কৃষিকাজে উন্নতির উল্লম্ফন ঘটে। এবং হরপ্পা সভ্যতার শহরগুলো গড়া সম্ভব হয়।
অর্থাৎ গম-বার্লির পশ্চিমমুখী পরিযানের দ্বিতীয় পর্বে ভারতের উত্তর-পশ্চিমে এসে হরপ্পা সভ্যতা গঠনে অবদান রেখেছিল।
তাজিকিস্তান, কিরঘিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান সব জায়গাতেই গম-বার্লির বীজ চলে গিয়েছিল আনাতোলিয়া থেকে। তাই সবচেয়ে ভারতে বীজ আসার সম্ভাবনাময় পথ তাজিকিস্তান পামির হয়ে।
আমার হাতে যে গবেষণাপত্র আছে সেই গবেষকরা একটি অন্য কোন থেকে এই বিষয়ে নজর দিয়েছেন। তাঁদের কাজ সীমিত ছিল কেবল বার্লির বয়স বের করায়।
তাঁরা দেখেছেন ৮ হাজার বৎসর আগে আনাতোলিয়া আর ছয় হাজার বৎসর আগে মেসোপটেমিয়ায় বার্লিচাষ হত শীতকালে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বর)। ক্রমে মেসোপটেমিয়াতে দোফসলি চাষ শুরু হলে (শীতে, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বর) ছাড়াও (গ্রীষ্মে মার্চ-এপ্রিল-মে)
তারপরে ৬ থেকে ৩ হাজার বৎসর আগে তুর্কমেনিস্তানে যায় বার্লি। আর প্রায় একই সময়ে অর্থাৎ ৬ থেকে ৩ হাজার বৎসর সময়ে উত্তর-পশ্চিম ভারতে হরপ্পা সভ্যতা এলাকায় বার্লির চাষ শুরু হয়।
এবার এই বিশেষ ধরনের বার্লির আরেক পরিযান। সেটা পূর্বমুখী পরিযান।
ভারত থেকে বার্লি যাবে চিনে। দুর্গম পথ হলেও একটাই পথ। হিমালয় পার হয়ে।গোটা তিব্বতে, এবং ক্রমে গোটা চিনে বার্লির চাষ শুরু হয়। শিবালিক পার্বত্য এলাকা ধরে নানা গিরিপথ পেরিয়ে এবং হয়ত বা পামির মালভুমি হয়েও গেছে সেই বীজ। একবার একটি এলাকায় গেলেই তারপরে ছড়াবে স্থানীয় কৃষকদের হাতে হাতে।
একটা কথা বলা ভালো। আমাদের এখনকার খাদ্যভ্যাসে গমের প্রাধান্য থাকলেও আগে কিন্তু বার্লির প্রাধান্য ছিল।
এবার শেষ করার আগে বার্লির বর্তমানে ব্যবহৃত জাতের কয়েকটি কার্বন ডেটিং ফল। সব সময়ের হিসেব ১৯৫০ থেকে।এই কার্বনডেটিংএর ফল অনেক সময়ই যুক্তিবুদ্ধির বাইরে দেখা যাচ্ছে। যেমন হরপ্পার সময় বলা হয়েছে ৩৪৪৩ বৎসর আগে। অথচ এই সময়ে হরপ্পায় লোক বসতি থাকলেও তা হরপ্পা সভ্যতার না। আবার দেখাচ্ছে হরপ্পার চেয়ে প্রাচীন হল রাজস্থান হরিয়ানা এমনকি উত্তর প্রদেশের লাহুরদেওয়া। আর উত্তর প্রদেশের দমদমা দেখাচ্ছে ভারতের প্রাচীনতম বার্লি চাষের কেন্দ্র।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে চিনে বার্লি গেছে ভারত থেকে হিমালয় পার হয়ে তিব্বত হয়ে। অথচ কার্বন ডেটিং বলছে তিব্বতেরও আগে দক্ষিণ চিনের গানসুতে বার্লি চাষ হয়েছে। ©তুষারমুখার্জি
৩৫
॥ব্যাবিলন শহর॥
12-04-2025©তুষারমুখার্জি
বর্তমান ইরাকের রাজধানী বাগদাদের প্রায় ৮৮ কিলোমিটার দক্ষিণে, আল-হিল্লা শহরের কাছে ইউফ্রেটিস নদীর পাড়ের ব্যাবিলন প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত শহর। তিন হাজার বৎসর আগে এই শহরে বসবাস করত দুইলক্ষ লোক। এই ব্যাবিলন শহরের নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্যাবিলন সাম্র্রাজ্য।
ব্যাবিলনের প্রতিষ্ঠা কিন্তু খুব সাধারন।
৪৩০০ বৎসর আগে ব্যাবিলন গড়ে ওঠে আক্কাদদের একটি ছোট শহর হিসাবে। তারপরে সুমু-আবুম নামে একজন অ্যামোরাইট দলপতি ছোট্ট জনপদ ব্যাবিলন সহ খানিকটা জমি কিনে নেন আরেক অ্যামোরাইট রাজার কাজাল্লু নামের নগর-রাষ্ট্রের থেকে।
সব মিলিয়েও সেটা এতই ছোট যে সুমু-আবুম দুই প্রজন্ম পরেও রাজ্য বলার পর্যায়ে আসেনি। সুমু-আবুমের তৃতীয় বংশধর সিন-মুবাল্লিত অবশেষে নিজেকে রাজা বলে ঘোষনা করে। উল্লেখ পাওয়া গেছে মাত্র একটি কিউনিফর্ম লিপির ট্যাবলেটে।
এই বংশের ষষ্ঠ বংশধর হাম্মুরাবি (সাধারন পূর্বাব্দ ১৭৯২ থেকে ১৭৫০)।
এই হাম্মুরাবির আমলেই জন্ম হল ব্যাবিলন সাম্রাজ্যের।
আমার চোখে এই শহরের গড়নে বিশেষতঃ হল ব্যাবিলনের পশ্চিম দিকে ছিল প্রায় সব বড় বড় জিগুরাত মন্দির আর প্রাসাদ। আর শহরের পূর্বাংশে ছোট ছোট ঘরে বসবাস সাধারণ লোকেদের।
আপনাদের মনে পড়ে যাবার কথা এই শহর গঠন নক্সা ছিল হরপ্পা সভ্যতার শহরগুলোরও। পশ্চিমদিক মাটি ফেলে উঁচু করে বড় বড় ঘরবাড়ি, আর নিচু পূর্বদিকে সাধারণ লোকের ঘরবাড়ি।
না মাথা চুলকাবার কোন দরকার নেই। সময় সারণী দেখলেই বোঝা যাবে কেউ কারুর থেকে নকল করে নি। নেহাতই কাকতালীয়।
যদিও শহরের পশ্চিম দিকে বড়বড় বাড়ি প্রাসাদ জিগুরাত মন্দির সব ছিল তবু পূর্বদিকেও মন্দির ছিল। সংখ্যায় পূর্বদিকেই বেশি মন্দির। সব ছোট ছোট অলিতে গলিতে বানানো মন্দির।
এর কারণ ছিল সুমেদের ধর্মবিশ্বাসের সামাজিক রূপায়নে। সুমেরদেবকুলের প্রধানদেবতারা সকলেই কোন না কোন শহরের পৃষ্ঠপোষক দেবতা এবং তারই সাথে তাঁরা অভিজাতবংশীয়দেরও দেবতা। কে কোন দেবতার ভক্ত সেই দেবতার মহিমা কতটা প্রভাবশালী তার উপরে নির্ভর করত সেই নগররাজ্যের মান সম্মান এবং একই ভাবে অভিজাত ব্যক্তির মান সম্মান ও প্রভাব।
সাধারণ লোকেদের জন্য ছিল অসংখ্য সাধারণ দেবতা। একটা সংখ্যায় দেবতারা ৩৬হাজার। কিন্তু যেহেতু ৩৬হাজার সংখ্যাটা সুমেরদের হিসাবের বেস সংখ্যা ৬০ কে ৬০০ দিয়ে গুন করে মিলে যায় তাই ধরেই নেওয়া যায় ওটা তাদের কাল্পনিক গানিতিক সংখ্যা ছিল।
এই ছোটখাট দেবতারা সাধারণত ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক দেবতা ছিলেন। এরই মধ্যে কোন পরিবার বিত্তশালী হয়ে উঠলে তার আরাধ্য দেবতার একটা মন্দির বানিয়ে দিত। এই গোটা প্রথা আমরা ভারতীয় হিন্দুরা খুব সহজেই বুঝতে পারবো। তবে পশ্চিমের প্রত্নবিজ্ঞানীদের কাছে অলিতে গলিতে এত মন্দির এখনো একটা ধাঁধা।
ব্যাবিলনের সাধারন বাসিন্দাদের বাড়ি হত কাদা মাটির ইঁটের কম করেও তিনফুট মোটা দেওয়াল বানিয়ে। ইঁটের উপরে কাদামাটির পুরো প্রলেপ লাগানো হত। ঘরে জানলার বালাই বিশেষ থাকতো না। চল্লিশ ডিগ্রী গরমের দেশে জানলা বানানোটা মুর্খের কাজ। ছাদ হত কাঠের, সাধারনত খেজুর গাছের অর্ধেকটা দিয়ে বানানো বিমের উপর লতাপাতা ঝোপঝাড় বিছিয়ে তার উপর কাদা মাটির প্রলেপ।
বোঝাই যাচ্ছে প্রায় প্রতিবৎসরই এইসব ঘর বাড়ি সারাই করতে হত। সব ঘরের দরজা মাঝখানের উঠানের দিকে মুখ করে। এই রকম বাড়ি আমাদের গ্রামেও বানানো হয়।
উঠানের একদিকে গৃহকর্তা আর তার পরিবার। উল্টোদিকে দাস দাসিদের ঘরের সারি। পরিবার পিছু তিন চারজন দাস দাসি থাকবেই।
দাসরা বেশির ভাগ মাঠে চাষের কাজে চলে যেত। দাসিরা ঘর গেরেস্তালির কাজে লাগত। তবে তরুনী যুবতী দাসিদের আরেকটা বড় কাজ ছিল, গৃহকর্তা ও তার পুত্রদের যৌনসেবা দান। পুত্রদের বিয়ে দেবার দায় পিতার। কন্যার জন্য মোটা অঙ্কের কন্যাপণ দিতে হত। যতদিন সেটা সম্ভব না হচ্ছে ততদিন দাসি তো থাকলোই।
কোন দাসি গৃহকর্তার সন্তানের জন্ম দিলে গৃহকর্তার বৈধ স্ত্রী যদি নিঃসন্তান হয় তবে দাসির সন্তানই উত্তরাধিকার হবে। তবু সেক্ষেত্রেও দাসি কিন্তু দাসি হয়েই থাকবে। বা গৃহকর্তার ইচ্ছা হলে যে কোন দাসিপুত্রকে নিজের দত্তক সন্তান বলে আইনগত স্বীকৃতি দিতে পারে।
তবে কোন বিবাহিত দাস দাসিকে তার নিজস্ব পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা চলবে না। আবার কোন দাস দাসি গৃহকর্তার দেওয়া কাজ শেষ করেও অতিরিক্ত পরিশ্রম করে অতিরিক্ত টাকা আয় করে যদি নিজের ক্রয়মুল্য শোধ করে দিতে পারে, তবে সে স্বাধীন বলে বিবেচিত হবে। আর তা যদি না পারে সপরিবারে দাস হয়েই থাকে, তবে তাদের সন্তানরাও দাস বলেই বিবেচিত হবে।
যে কোন সাধারণ লোক অনেক টাকা ধার করে শোধ করতে না পারলে নিজেকে দাস বা দাসি হিসাবে বিক্রি করতে পারে।
প্রতি বাড়িতে সবাই খুব সকালে উঠে যাবে। রাত্রেও তাড়াতাড়িই শোয়ার পর্ব। কারণ আলো বলতে উঠানে আলকাতরার মশাল, আর ঘরে তেলের প্রদীপ। তবে সবাই শুয়ে পড়লেও কোন না কোন একটা কিছু জ্বালানো থাকত। না ভুতের ভয়ে না। আগুন রক্ষার জন্য। তখন তো দেশলাই ছিলো না, আর চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালানো সহজ না, তাছাড়া তাদের দেশে মোটেই কোন পাথর নেই, চকমকি পাথর কোথায় পাবে। তাই একবার কোনমতে আগুন জ্বালালে সেটা কোন না কোন ভাবে জ্বালিয়েই রাখতে হত। চাইলে অন্যের থেকে একটু আগুন পাওয়াই যেতে পারে, কিন্তু সর্বকালের সর্বদেশের পড়শিরা একই রকম। বলবে হুঁঃ নিস্কর্মাঃ একটু আগুন ধরে রাখতে শেখায়নি মা বাবা।
খাবার মুলত বার্লির গুঁড়ো বা গমের গুঁড়ো জলে গুলে সিদ্ধ করে তার উপরে কিছু খেজুর ছড়িয়ে দেওয়া। সাথে নানা রকম তরকারি আলাদা। মাছ মাংসও থাকত। মাংস ছাগল ভেড়া। অভাবনীয় বড়লোক হলে মুরগি।
ঘরের বাইরে রাস্তায় ময়লার পাহাড়। সবার ঘরের ময়লা রাস্তাতেই ফেলা হয়। ময়লা ফেলতে ফেলতে ঘরের দরজা আটকে গেলে দরজা উঁচু করতে হয়।
সামাজিক অনুষ্ঠান বলতে খেলাধুলা তখনও ছিল। কুস্তি খুব জনপ্রিয় খেলা। আর খুব কম হলেও কখনো কখনো বড় মন্দিরের অনুষ্ঠানে যাওয়া। সেখানে প্রাচীন কাব্যগ্রন্থ কাহিনিগুলো পাঠাভিনয় করে শোনায় পুরোহিতরা।
লেখাপড়ার জন্য ছিল স্কুল। সব স্কুলই প্রাইভেট স্কুল। ছাত্রদের বেতন থেকে শিক্ষকের বেতন হতো। মোটামুটি সাত আট বৎসর বয়স থেকে স্কুল শুরু চলত টানা আট বৎসর।
স্কুল জীবন বেশ কঠিন ছিল। কয়েকশ রকমের অক্ষর চেনা, লিখতে শেখা, তারপরে তিন চার রকমের ভাষার সমস্যা। বিশেষ করে সুমের ভাষা কেউ ব্যবহার করে না, অথচ শিখতে হয়। সিলেবাসে ছিল চিঠি লেখা, দলিল লেখা, কেনা বেচার রসিদ লেখা, গল্প লেখা, কবিতা লেখা। অন্য লেখা দেখে কপি করা, তারপরে কানে শুনে লেখা। তারপরে আছে অঙ্ক, জ্যামিতি। অঙ্ক বেশ কঠিন ছিল। প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যলকুলাস অবধি ছিল।
তবে প্রথম প্রথম তো হাতের লেখা অভ্যাস করতেই জান কয়লা। না পারলেই মাস্টারদের হাতের লাঠি সপাং।
এত কিছু শেখার জন্য স্কুল ফী দিতে হত বেশ চড়া হারে। ফলে সাধারন পরিবারের ছেলেরা স্কুলে পড়তেই পারতো না। স্কুলে পড়ত সাধারনত বিত্তবান আর অভিজাত পরিবারের ছেলেরা। মেয়েরা সাধারনত স্কুলে যেত না। এ পর্যন্ত মাত্র একটি ছাত্রীর নাম পাওয়া গেছে।
না মেসোপটেমিয়ার বিখ্যাত রাজা সম্রাটদের প্রায় কেউই লেখাপড়া জানতেন না। ব্যাতিক্রম ছিল সুমের রাজা সালগি আর আসুর রাজা আসুরবানিপাল। এনারা রীতিমত স্কুলে পড়ে লেখা পড়া শিখেছেন।
লেখাপড়া সমাজের আরেক শ্রেণীতে প্রচলিত শুধু নয় বাধ্যতামুলক ছিল। পুরোহিত। লেখাপড়া না জানলে পুরোহিত হওয়া যেত না।
কবি বা গল্পকার মুখে বলে যেতেন আর একজন লিপিকার লিখে যেতেন।
এই ভাবেই লেখা হয়েছে গিলগামেশের মহাকাব্য।
স্কুল জীবন শেষে চাকরী পাওয়া যেত নানা সরকারী তথা রাজকীয় দপ্তরে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। আর যারা চাকরী পেত না তাদের জন্য ছিল স্বাধীন পেশা। প্রতিদিন হাজার হাজার রসিদ দলিল চিঠি লেখা হত। সবারই দরকার। কারণ বিচার বিভাগ বেশ কড়া। মামলা মোকদ্দমা লেগেই থাকত। স্কুল পড়ুয়া লিপিকাররা জিগুরাতের সামনে বা শহরের প্রবেশ পথের সামনে লাইন দিয়ে বসে থাকত। নগদ টাকার বিনিময়ে লিখে দিত লিপিকাররা।
ব্যাবিলন শহরের সবচেয়ে বড় উৎসব ছিল মার্চ মাসের বসন্ত বিষুব উৎসব। বৎসরের প্রথম মাস নিসান-এ চারদিনের আকিতু উৎসব। ব্যাবিলনে এই উৎসব চলে টানা বারদিন ধরে। এই উৎসব দেবি ইনান্না ও তাঁর স্বামী দুমুজিদের পবিত্র বৈবাহিক মিলনের পুনরাভিনয়।
প্রধান উৎসব অবশ্য উরুক শহরে হত। কিন্তু জাঁকজমক ছিল ব্যবিলনে। আর ব্যাবিলনের উৎসবে ব্যবিলনের দেবতা মারদুকই হবেন প্রধান দেবতা। সেই ধারনা প্রতিষ্ঠার জন্য এই উৎসবে পুরোহিতরা পাঠ করবে সৃষ্টি কথাঃ এনুমা এলিশ। এই এনুমা এলিশ সৃষ্টিকথায় দেখানো হয়েছে মারদুকই সকল সুমের দেবতার মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
ব্যাবিলনের সেই উৎসবে যে বিশাল জনসমাবেশ আর উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যেত কোন কোন বিজ্ঞানী তার তুলনা করেন পুরীর জগন্নাথের রথ যাত্রার সাথে।
একটু সংযুক্তিঃ ইরাকের আসিরীয়রা এখনো এই আকিতু উৎসব পালন করেন Nisanu নিসানু মাস বা এপ্রিল মাসে।
ঐ ধরে নিতে পারেন আমাদের নববর্ষের উৎসবই।
তথ্যসূচীঃ-
1, Babylon _ Encyclopedia Britannica
2. Everyday Life in Babylonia and Assyria: by H W F Saggs.
3. Wikipedia
৩৬
জাপানের টোকিওতে একটি কুকুরের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও প্রতীক্ষার ঐতিহাসিক ঘটনা হাচিকো। ১৯২৫ সালে তার মালিক, প্রফেসর হেইসাবুরো উয়েনো, কর্মক্ষেত্রে হঠাৎ মারা গেলেও, হাচিকো দীর্ঘ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন টোকিওর শিবুয়া স্টেশনে বিকেলবেলা তার মালিকের জন্য অপেক্ষা করত। বিশ্বস্ততার এই অনন্য উদাহরণ আজও বিশ্বজুড়ে মানুষকে মুগ্ধ করে।
হাচিকো আর তাঁর মালিক প্রফেসর হিবুরো উয়েনোর ঘটনাটা গল্পের মত মনে হলেও এইটি একটি সত্য এবং বাস্তব, ভালোবাসার এক অমর নিদর্শন। জাপানের শিবুয়া স্টেশনে টানা ৯ বছর ৯ মাস ১৫ দিন হাচিকোর সেই অপেক্ষা আজও মানুষকে আবেগপ্রবণ করে তোলে।
এই ঘটনার কিছু হৃদয়স্পর্শী দিক:
নিশর্ত আনুগত্য:
১৯২৫ সালে প্রফেসর উয়েনোর মৃত্যুর পরও হাচিকো প্রতিদিন ঠিক সময়ে স্টেশনে চলে আসত, এই আশায় যে তার প্রিয় মানুষটি ট্রেন থেকে নামবেন।
হাচিকোর অপেক্ষার কাহিনীর মূল দিকগুলো:
দৈনন্দিন অভ্যাস:
হাচিকো ছিল একটি আকিতা জাতের কুকুর। সে প্রতিদিন সকালে মালিককে শিবুয়া স্টেশনে এগিয়ে দিত এবং বিকেলে মালিক ফেরার সময় স্টেশনে অপেক্ষা করত।
প্রতীক্ষা:
১৯২৫ সালের মে মাসে প্রফেসর উয়েনো মারা যাওয়ার পর, হাচিকোকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলেও সে প্রতিদিন বিকেলে স্টেশনে ফিরে আসত।
দীর্ঘ প্রতীক্ষা:
মৃত্যুর দিন পর্যন্ত (১৯৩৫ সালের ৮ মার্চ) হাচিকো প্রায় এক দশক ধরে প্রতিদিন সেই একই স্টেশনে তার মালিকের প্রতীক্ষা করেছে।
জাতীয় বীর:
হাচিকোর এই একনিষ্ঠতা দেখে জাপানিরা তাকে 'চুকেন হাচিকো' (বিশ্বস্ত হাচিকো) উপাধি দেয়। এমনকি তার জীবিত থাকাকালীনই ১৯৩৪ সালে সেই স্টেশনে তার একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি স্থাপন করা হয়।
শেষ বিদায়:
১৯৩৫ সালে হাচিকো যখন মারা যায়, তখন তাকে তার মালিকের কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়, যেন পরপারে তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে।
অপেক্ষার এমন গভীরতা কোনো মানুষের পক্ষেও দেখানো কঠিন, যা হাচিকো পরম মমতায় শিখিয়ে গেছে।
স্মারক:
হাচিকোর এই অসামান্য বিশ্বস্ততার জন্য শিবুয়া স্টেশনের বাইরে তার একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে, যা এখন একটি জনপ্রিয় মিলনস্থল।
হাচিকোর এই কাহিনী "অপেক্ষা" যে ভালোবাসার কত গভীর বহিঃপ্রকাশ হতে পারে, তার এক জীবন্ত উদাহরণ। @মৃণাল নন্দী
৩৭
টেলিস্কোপ কিভাবে কাজ করে?
ধরুন আপনি দূরের একটি পাহাড়ের দিকে খালি চোখে তাকালেন। পাহাড়টি দেখা যায়, কিন্তু খুব ছোট যেমন ওই পাহাড়ের গাছ, পাথর বা খাঁজগুলো স্পষ্ট বোঝা যায় না। কিন্তু যদি একটি দূরবীন বা টেলিস্কোপ দিয়ে তাকান, তখন হঠাৎই সেই দূরের পাহাড় যেন আপনার চোখের সামনে চলে আসে। তার গাছগুলো আলাদা করে দেখা যায়, পাথরের আকার বোঝা যায়। ঠিক এই সহজ ধারণার উপরই কাজ করে টেলিস্কোপ। দূরের অতি ক্ষীণ আলোকে সংগ্রহ করে তাকে স্পষ্ট ও বড় করে দেখানোই যার কাজ।
মানুষের কৌতূহলের সীমা নেই। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ভেবেছে ওই তারাগুলোর ভেতরে কী আছে? ওই ক্ষুদ্র আলোকবিন্দুগুলো কি সত্যিই সূর্যের মতো নক্ষত্র? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই জন্ম নেয় টেলিস্কোপ নামের এক অসাধারণ যন্ত্র। টেলিস্কোপ মূলত এমন একটি অপটিক্যাল ডিভাইস, যা দূরবর্তী বস্তুর খুব অল্প আলো সংগ্রহ করে তাকে ফোকাস করে এবং তারপর সেই ছবিকে বড় করে আমাদের চোখে দেখায়।
টেলিস্কোপের কাজ শুরু হয় আলো সংগ্রহের মাধ্যমে। মহাকাশের দূরবর্তী নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে যে আলো আসে তা অত্যন্ত ক্ষীণ। আমাদের চোখের পুতলি খুব ছোট হওয়ায় সেই আলো খুব কমই ধরা পড়ে। কিন্তু একটি টেলিস্কোপের বড় লেন্স বা মিরর অনেক বেশি আলো সংগ্রহ করতে পারে। এই আলো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে ফোকাস করা হয়, যেখানে একটি বাস্তব ছবি তৈরি হয়। এরপর আইপিস নামের আরেকটি ছোট লেন্স সেই ছবিকে বড় করে আমাদের চোখে পৌঁছে দেয়।
টেলিস্কোপের বড় করার ক্ষমতাকে বলা হয় ম্যাগনিফিকেশন। এটি নির্ভর করে দুটি জিনিসের উপর- অবজেকটিভের ফোকাল লেংথ এবং আইপিসের ফোকাল লেংথ। সহজভাবে বলতে গেলে, অবজেকটিভের ফোকাল লেংথ যত বেশি এবং আইপিসের ফোকাল লেংথ যত কম, ম্যাগনিফিকেশন তত বেশি হয়।
টেলিস্কোপ সাধারণত তিন ধরনের হয় ১| রিফ্র্যাকটিং, ২| রিফ্লেকটিং এবং ৩| ক্যাটাডায়োপট্রিক। রিফ্র্যাকটিং টেলিস্কোপে প্রধানত লেন্স ব্যবহার করা হয়। দূরের বস্তুর আলো একটি বড় কনভেক্স লেন্স দিয়ে প্রবেশ করে এবং প্রতিসরণের মাধ্যমে একটি উল্টো ছবি তৈরি করে। পরে আইপিস লেন্স সেই ছবিকে বড় করে দেখায়। ইতিহাসে প্রথম কার্যকর টেলিস্কোপ তৈরি করেছিলেন Galileo Galilei। এই টেলিস্কোপ দিয়েই তিনি চাঁদের পাহাড়, শুক্রগ্রহের পর্যায় এবং বৃহস্পতির চারটি বড় উপগ্রহ দেখতে সক্ষম হন। তবে লেন্সভিত্তিক টেলিস্কোপে একটি সমস্যাও আছে। ক্রোম্যাটিক অ্যাবারেশন, যেখানে বিভিন্ন রঙের আলো ভিন্নভাবে প্রতিসরিত হওয়ায় ছবিতে রঙের বিকৃতি দেখা যায়।
এই সমস্যার সমাধান আসে রিফ্লেকটিং টেলিস্কোপে। এখানে লেন্সের বদলে মিরর ব্যবহার করা হয়। একটি বড় অবতল মিরর দূরবর্তী আলোকে প্রতিফলিত করে একটি ফোকাল পয়েন্টে জমা করে। তারপর একটি ছোট সেকেন্ডারি মিরর সেই আলোকে আইপিসের দিকে পাঠায়। এই ধরনের টেলিস্কোপের ধারণা প্রথম দেন Isaac Newton। যেহেতু প্রতিফলনের ক্ষেত্রে সব রঙের আলো একইভাবে আচরণ করে, তাই এখানে ক্রোম্যাটিক অ্যাবারেশন হয় না। এ কারণে আজকের অধিকাংশ বড় টেলিস্কোপই রিফ্লেকটিং ডিজাইনের।
আরেকটি উন্নত ধরনের টেলিস্কোপ হলো ক্যাটাডায়োপট্রিক টেলিস্কোপ। এতে লেন্স এবং মিরর দুটোই ব্যবহৃত হয়। আলো প্রথমে একটি সংশোধনকারী লেন্স দিয়ে প্রবেশ করে, তারপর মিররে প্রতিফলিত হয়ে আবার ফোকাস হয়ে আইপিসে পৌঁছায়। এই ডিজাইন খুব কমপ্যাক্ট এবং অপটিক্যাল ত্রুটি কম হওয়ায় আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে বেশ জনপ্রিয়।
আধুনিক যুগে টেলিস্কোপ শুধু দৃশ্যমান আলোতেই সীমাবদ্ধ নেই। মহাবিশ্ব নানা ধরনের তরঙ্গ বিকিরণ করে, যেমন রেডিও তরঙ্গ, ইনফ্রারেড, এক্স-রে ইত্যাদি। তাই তৈরি হয়েছে রেডিও টেলিস্কোপ, যা দৃশ্যমান আলো নয়, বরং রেডিও তরঙ্গ সংগ্রহ করে মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অনেক সময় আলোকে বিকৃত করে, তাই বিজ্ঞানীরা টেলিস্কোপকে মহাকাশে পাঠিয়েছেন। যেমন বিখ্যাত Hubble Space Telescope এবং অত্যাধুনিক James Webb Space Telescope, যেগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে থেকে মহাবিশ্বের আরও পরিষ্কার ছবি পাঠাচ্ছে।
আজ টেলিস্কোপের সাহায্যেই আমরা জানতে পেরেছি দূরবর্তী গ্যালাক্সির অস্তিত্ব, ব্ল্যাক হোলের উপস্থিতি এবং মহাবিশ্ব যে ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে সেই সত্য। এক অর্থে টেলিস্কোপ মানুষের চোখকে শুধু বড়ই করেনি, সে মানুষের কল্পনাকেও অসীমের দিকে খুলে দিয়েছে। দূরের ক্ষীণ আলোকে ধরে এনে এটি আমাদের সামনে তুলে ধরেছে মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্য। তাই বলা যায়, টেলিস্কোপ আসলে শুধু একটি যন্ত্র নয়, এটি মানব কৌতূহলের দীর্ঘ যাত্রার একটি জানালা, যার মাধ্যমে আমরা অন্ধকার মহাকাশে আলো খুঁজে পাই। @ বিজ্ঞান তথ্য
৩৮
মহাবিশ্ব
রাতের আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় যেন পুরো মহাবিশ্বই আমাদের চোখের সামনে ছড়িয়ে আছে, অসংখ্য নক্ষত্র, দূরের গ্যালাক্সির ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু, আর অন্ধকারের গভীরে লুকিয়ে থাকা অজানা বিস্ময়। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। আমরা আসলে পুরো মহাবিশ্ব দেখি না, আমরা দেখি কেবল সেই অংশটুকু, যার আলো আমাদের কাছে শেষপর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে। অর্থাৎ মহাবিশ্বকে আমরা সরাসরি চোখ দিয়ে দেখি না, আমরা মহাবিশ্বকে দেখি আলোর মাধ্যমে। আকাশে যে আলো ঝলমল করে, তা আসলে মহাবিশ্বের দূর অতীত থেকে আসা এক ধরনের বার্তা। মানে মহাবিশ্বের অতীত দেখি এবং সেটাই আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব।
এই পর্যবেক্ষণের প্রথম সীমাটি তৈরি করে আলোর গতি। মহাবিশ্বে তথ্য বহনের সর্বোচ্চ গতি হলো আলো, যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলে। ফলে যখন আমরা কোনো দূরের নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির দিকে তাকাই, তখন আমরা তার বর্তমান অবস্থা দেখি না, আমরা দেখি তার সেই বহু পুরোনো অতীত। কয়েক হাজার, কয়েক মিলিয়ন, এমনকি কয়েক বিলিয়ন বছর আগে যে আলো যাত্রা শুরু করেছিল, সেই আলোই আজ এসে আমাদের চোখে ধরা দেয়। অর্থাৎ রাতের আকাশ আসলে এক ধরনের মহাজাগতিক ইতিহাসের আর্কাইভ, যেখানে প্রতিটি আলো একেকটি সময়ের স্মৃতি।
এই বাস্তবতাকে বোঝার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মহাবিশ্বের বয়স। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ধারণা অনুযায়ী মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে। সেই সময় থেকেই আলো মহাশূন্যে ভ্রমণ শুরু করেছে। ফলে আমরা সর্বোচ্চ সেই দূরত্ব পর্যন্তই দেখতে পারি, যেখান থেকে আলো এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমাদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে। অর্থাৎ আমাদের দৃষ্টিরও একটি সময়সীমা আছে। আমরা যত দূরে দেখি, তত বেশি মহাবিশ্বের অতীতে ফিরে যাই।
আবার মহাবিশ্ব স্থির নয়; এটি ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। দূরের গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। এর মানে হলো মহাবিশ্বের এমন অনেক অঞ্চল আছে, যেগুলো এত দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে যে সেখান থেকে নির্গত আলো কখনোই আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। যেন মহাবিশ্বের বিশাল সমুদ্রে কিছু দ্বীপ আছে, যেগুলো আমাদের দৃষ্টির সীমানার বাইরেই চিরকাল থেকে যাবে। আমরা দেখতেও পারবো না, জানতেও পারবো না যে সত্যিই সেগুলো আছে।
এই সীমাগুলো মিলিয়েই তৈরি হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা যাকে বলে "পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্ব"। অর্থাৎ মহাবিশ্বের সেই অংশ, যেখান থেকে আলো ইতিমধ্যে আমাদের কাছে পৌঁছেছে এবং যাকে আমরা দেখতে বা মাপতে পারি। কিন্তু এখানেও একটি বিস্ময়কর সত্য লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আমরা যে মহাবিশ্ব দেখি তার বেশিরভাগই দৃশ্যমান পদার্থ দিয়ে তৈরি নয়। বরং এর বড় অংশই অদৃশ্য উপাদানে ভরা, যার মধ্যে রয়েছে রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি। আমরা সেগুলোকে সরাসরি দেখতে পারি না, কিন্তু তাদের প্রভাব গ্যালাক্সির গতিবিধি ও মহাবিশ্বের প্রসারণে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
আর শেষ পর্যন্ত আমাদের দেখা মহাবিশ্ব অনেকটাই নির্ভর করে আমাদের প্রযুক্তির উপর। যত উন্নত হয় টেলিস্কোপ, তত গভীরে পৌঁছায় আমাদের দৃষ্টি। আধুনিক মহাকাশ টেলিস্কোপগুলো আজ এমন সব প্রাচীন আলো শনাক্ত করছে, যেগুলো জন্ম হয়েছিল গ্যালাক্সির একেবারে প্রারম্ভিক যুগে। ফলে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে এক গভীর সত্য, আর সেটা হলো- আমরা মহাবিশ্বকে যেমন দেখি, তা আসলে মহাবিশ্বের সম্পূর্ণ বাস্তবতা নয়। এটি আলোর ইতিহাস, সময়ের সীমা এবং মহাজাগতিক প্রসারণের ভেতর দিয়ে দেখা এক বিশাল কিন্তু সীমাবদ্ধ জানালা। আর সেই জানালার ওপারে হয়তো এখনও লুকিয়ে আছে অসংখ্য অদেখা মহাজাগতিক গল্প, যাদের আলো এখনো আমাদের পথে যাত্রা শুরুই করেনি। @ আল মামুন রিটন
৩৯
ধরা যাক একটি জনপ্রিয় বাদ্যযন্ত্র গিটারের কথা। একটি গিটারে কয়েকটি তার থাকে, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—একই তারে আপনি টোকা দিলেও টোকার ধরন এবং সেই তারের কম্পনের উপর নির্ভর করে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন শব্দ সৃষ্টি হয়। কখনও সুর নরম, কখনও তীক্ষ্ণ, কখনও গভীর। অর্থাৎ তারটি একটিই, কিন্তু তার কম্পনের ধরন বদলালেই তৈরি হয় অসংখ্য ভিন্ন সুর। আপনি যদি তারটিকে একটু জোরে টোকা দেন, একরকম শব্দ হালকা ছুঁয়ে দিলে আবার আরেকরকম শব্দ। কিন্তু আঙুল দিয়ে তারের দৈর্ঘ্য কমিয়ে দিলে সুর হঠাৎ করেই আরও তীক্ষ্ণ হয়ে যায়।
আমরা প্রতিদিন সংগীতে এই বিষয়টি দেখি বলেই এটি খুব সাধারণ মনে হয়, কিন্তু এর ভিতরে লুকিয়ে আছে একটি গভীর বৈজ্ঞানিক ধারণা। একটি মাত্র বস্তু, কিন্তু তার কম্পনের ধরন বদলালেই তৈরি হয় অসংখ্য ভিন্ন ফলাফল।
এবার ঠিক এই সাধারণ ধারণাটিকে ব্যবহার চলুন আজ সহজ করে মহাবিশ্বের এক গভীর রহস্য বোঝার চেষ্টা করা যাক।
আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি উচ্চাভিলাষী ধারণা বলছে: আমরা যে কণাগুলোর কথা বলি, যেমন Electron, Quark বা Photon এগুলো হয়ত সত্যিকার অর্থে আলাদা আলাদা বস্তু নয়। বরং এগুলো হতে পারে একই মৌলিক জিনিসের ভিন্ন ভিন্ন আচরণ বা কম্পনের রূপ। অর্থাৎ যেমন একটি গিটারের তার বিভিন্নভাবে কাঁপলে বিভিন্ন সুর তৈরি হয়, তেমনি মহাবিশ্বের মৌলিক স্তরে যদি অতি ক্ষুদ্র কোনো স্ট্রিং বা সূতার মতো কিছু থাকে, তাহলে তার কম্পনের ভিন্ন ভিন্ন ধরন থেকেই সৃষ্টি হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন কণা। কিছুক্ষণ গিটারের উদাহরণকে মনে রেখে এবং চোখ বন্ধ করে কণার জগতে চলে যান। আমি নিশ্চিত আমি বিষয়টি অনুভব করতে পারছেন। মজার এবং উদ্ভুত এক ধারণা, তাই না?
এই ধারণাটিকেই বলা হয় String Theory। এই তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বের মৌলিক কণাগুলো বিন্দু নয়, বরং অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষুদ্র কম্পনশীল স্ট্রিং। এই স্ট্রিং এতটাই ছোট যে এর দৈর্ঘ্য প্রায় Planck Length মাত্রার কাছাকাছি।
একটি তুলনা করলে বিষয়টি বোঝা যায়: একটি পরমাণুর আকার যদি পৃথিবীর সমান বড়ো করে ধরা হয়, তবুও সেই স্কেলে স্ট্রিং হবে একটি ক্ষুদ্র বালুকণার থেকেও অনেক ছোট। তাই আমাদের বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে এই স্ট্রিং সরাসরি দেখা প্রায় অসম্ভব। এখন অসম্ভব বলে ছেড়ে না দিয়ে আরও গভীরে প্রবেশ করি।
এবার আরেকটি উদাহরণ ভাবুন। একটি বেহালা বা সেতারের তার যখন কম্পিত হয়, তখন সেই কম্পনের নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি থেকেই জন্ম নেয় একটি নির্দিষ্ট সুর। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় বলছে: প্রতিটি কম্পনের একটি নির্দিষ্ট শক্তি ও বৈশিষ্ট্য থাকে।
স্ট্রিং থিওরি ঠিক এই ধারণাটিকেই মহাবিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্র স্তরে প্রয়োগ করে। এখানে বলা হয়, একটি স্ট্রিং যদি একভাবে কম্পিত হয় তাহলে সেটি প্রকাশ পায় একটি Electron হিসেবে, আরেকভাবে কম্পিত হলে সেটি হতে পারে একটি Photon, আবার অন্য কোনো কম্পনে সেটি প্রকাশ পেতে পারে অন্য কোনো ভিন্ন কণা হিসেবে। অর্থাৎ কণাগুলোর পার্থক্য তাদের মৌলিক উপাদানে নয় বরং তাদের কম্পনের ধরনে।
এখানেই বিষয়টি আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে। কারণ স্ট্রিং থিওরি শুধু কণার ব্যাখ্যা দেয় না, এটি চেষ্টা করে প্রকৃতির চারটি মৌলিক শক্তিকে একই কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করতে। যেমন Gravity, Electromagnetism, Strong Nuclear Force এবং Weak Nuclear Force। দীর্ঘদিন ধরে পদার্থবিজ্ঞানে এই চারটি শক্তিকে একত্রে বোঝানোর চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে Albert Einstein জীবনের শেষ সময়ে একটি “Unified Field Theory” খুঁজছিলেন। এটা একটি তত্ত্ব যা মহাবিশ্বের সব শক্তি ও কণাকে এক সূত্রে ব্যাখ্যা করতে পারবে। এবং সেটা যদি কখনও সম্ভব হয় তো তখন আর মহাবিশ্বের সৃষ্টির রহস্য অধরা না ধরা হয়ে যাবে।
অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, স্ট্রিং থিওরি সেই স্বপ্নের একটি সম্ভাব্য রূপ।
স্ট্রিং থিওরির আরেকটি আশ্চর্য ধারণা হলো আমাদের মহাবিশ্ব হয়ত কেবল তিনটি স্থানিক মাত্রা এবং একটি সময় মাত্রা নিয়ে গঠিত নয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বে মোট ১০ বা ১১টি মাত্রা থাকতে পারে। এই ধারণাটি প্রায়ই M-Theory এর সাথে যুক্ত করা হয়। কিন্তু আমরা সেই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো দেখতে পাই না, কারণ সেগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র স্কেলে ভাঁজ হয়ে রয়েছে যেন একটি কাগজ দূর থেকে সরল রেখা মনে হলেও কাছে গেলে দেখা যায় সেটি ভাঁজ করা। আবার আরেকটি উদাহরণ খেয়াল করুন- দূর থেকে নদীকে শান্ত মনে হলেও নদীর কাছে গেলেই আপনি দেখতে পান নদী পুরোপুরি শান্ত না, সেও ছোট ছোট ঢেউ তুলে তার অস্তিত্বের গভীর তরঙ্গকে ধরে রেখেছে।
এবার কল্পনা করুন একটি পিঁপড়ে একটি তারের উপর হাঁটছে। দূর থেকে সেই তারটি আমাদের কাছে শুধু একটি সরল রেখা মনে হয়। কিন্তু পিঁপড়েটি যদি খুব কাছ থেকে দেখে, তাহলে সে দেখতে পাবে তারটির চারপাশে ঘুরে বেড়ানোর মতো একটি অতিরিক্ত মাত্রা রয়েছে। স্ট্রিং থিওরি বলে, আমাদের মহাবিশ্বেও হয়তো এমন লুকানো মাত্রা রয়েছে যেগুলো এত ক্ষুদ্র যে আমরা সরাসরি অনুভব করতে পারি না।
এই তত্ত্বের সৌন্দর্য এখানেই যে এটি মহাবিশ্বকে একটি বিশাল সংগীতের মতো কল্পনা করে। এখানে কণা হলো সুর, শক্তি হলো কম্পন, আর স্ট্রিং হলো সেই অদৃশ্য তার যেগুলোর সূক্ষ্ম কম্পন থেকে জন্ম নিচ্ছে নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, আলো, পদার্থ, এমনকি আমাদের অস্তিত্বও। যেন পুরো মহাবিশ্বই একটি মহাজাগতিক সিম্ফনি, যেখানে অদৃশ্য সূতাগুলোর কম্পন মিলিয়ে তৈরি করছে বাস্তবতার সুর।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে, এই স্ট্রিং থিওরি এখনো পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণিত নয়। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী গাণিতিক কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু এর ভবিষ্যদ্বাণীগুলো যাচাই করার মতো প্রযুক্তি আমাদের হাতে এখনো নেই। তাই কেউ কেউ এটিকে ভবিষ্যতের পদার্থবিজ্ঞানের সম্ভাব্য ভিত্তি মনে করেন, আবার কেউ কেউ এটিকে এখনো অতিরিক্ত তাত্ত্বিক বলেও সমালোচনা করেন।
তবুও একটি প্রশ্ন থেকে যায়ঃ যদি সত্যিই মহাবিশ্বের গভীরে কোনো অদৃশ্য সূতার কম্পন লুকিয়ে থাকে, তাহলে কি আমাদের বাস্তবতা আসলে একটি মহাজাগতিক সুরের প্রকাশ?
যদি তা হয়, তবে আমরা, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি সবকিছুই হয়ত একই মহাজাগতিক সংগীতের ভিন্ন ভিন্ন সুর। আর সেই রহস্যময় সংগীতের নামই—স্ট্রিং থিওরি।
আমরা সাধারণত মনে করি মহাবিশ্বের তিনটি স্থানিক মাত্রা আছে— দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা। এর সাথে যুক্ত হয় সময়, যা আমাদের বাস্তবতাকে চার মাত্রিক করে তোলে। এই ধারণাটিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল Albert Einstein-এর বিখ্যাত General Relativity তত্ত্বে, যেখানে বলা হয় মহাবিশ্ব আসলে একটি চারমাত্রিক কাঠামো, বা স্পেসটাইম। কিন্তু যখন পদার্থবিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম স্তরে প্রকৃতির আচরণ বোঝার চেষ্টা করতে গেলেন, তখন দেখা গেল এই চার মাত্রা যথেষ্ট নয়।
এখানেই প্রবেশ করে String Theory, একটি আলোচিত তত্ত্ব যা বলছে মহাবিশ্বের মৌলিক কণাগুলো বিন্দু নয়, বরং অবিশ্বাস্যভাবে ক্ষুদ্র কম্পনশীল স্ট্রিং বা সূতা। ঠিক যেমন একটি গিটারের তার ভিন্নভাবে কম্পিত হলে ভিন্ন সুর তৈরি হয়, তেমনি এই স্ট্রিংগুলোর ভিন্ন কম্পন থেকেই সৃষ্টি হতে পারে বিভিন্ন কণা যেমন Electron বা Photon। কিন্তু এই তত্ত্বের গাণিতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পদার্থবিদরা একটি অদ্ভুত সমস্যার মুখোমুখি হন। সমীকরণগুলো ঠিকভাবে কাজ করতে হলে মহাবিশ্বে কেবল তিনটি নয়, বরং আরও অনেক মাত্রা থাকতে হয়।
প্রথম দিকের স্ট্রিং থিওরির মডেলগুলো দেখায় যে মহাবিশ্বে মোট ১০টি মাত্রা থাকা দরকার। পরে এই ধারণা আরও বিস্তৃত হয়ে পৌঁছায় M-Theory-এ, যেখানে বলা হয় মহাবিশ্বে মোট ১১টি মাত্রা থাকতে পারে। প্রশ্ন উঠতেই পারে: "যদি সত্যিই এতগুলো মাত্রা থাকে, তাহলে আমরা সেগুলো দেখি না কেন?"
এখানেই আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা “কমপ্যাক্টিফিকেশন”। ধারণাটি হলো, এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো এতটাই ক্ষুদ্র এবং ভাঁজ হয়ে আছে যে আমরা দৈনন্দিন জীবনে সেগুলো অনুভব করতে পারি না।
উদাহরণ হিসেবে একটি কাগজের পাতাকে কল্পনা করুন। দূর থেকে দেখলে এটি একটি সরল রেখার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় এর প্রস্থও আছে। ঠিক তেমনি মহাবিশ্বের অতিরিক্ত মাত্রাগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র স্কেলে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে রয়েছে যার আকার প্রায় Planck Length মাত্রার কাছাকাছি।
আরেকটি উদাহরণ ভাবুন। একটি বাগানের পাইপ দূর থেকে দেখলে আপনাকে একটি সরল রেখা মনে হবে। কিন্তু যদি আপনি খুব কাছ থেকে তাকান, দেখবেন পাইপের চারপাশে একটি গোলাকার দিক রয়েছে। ছোট কোনো পোকা সেই পাইপের চারপাশে ঘুরে বেড়াতে পারে, যদিও দূর থেকে আমরা সেই মাত্রাটি দেখতে পাই না। স্ট্রিং থিওরি বলছে, আমাদের মহাবিশ্বেও হয়তো ঠিক এমন লুকানো মাত্রা রয়েছে যেগুলো এত ক্ষুদ্র যে আমরা কেবল তাদের প্রভাব অনুভব করতে পারি, সরাসরি দেখতে পারি না।
এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো শুধু একটি গাণিতিক কৌতূহল নয়; এগুলো মহাবিশ্বের গভীর রহস্যের সাথে যুক্ত। অনেক পদার্থবিদ মনে করেন, প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তি এবং কণার বৈশিষ্ট্য আসলে নির্ধারিত হয় এই লুকানো মাত্রাগুলোর জ্যামিতির মাধ্যমে। অর্থাৎ অতিরিক্ত মাত্রাগুলো কীভাবে ভাঁজ হয়ে আছে, তার উপর নির্ভর করতে পারে কোন কণা কীভাবে আচরণ করবে, কিংবা কোন শক্তি কতটা শক্তিশালী হবে।
এই ধারণাটি এক আশ্চর্য দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। আমরা যে মহাবিশ্ব দেখি যেমন নক্ষত্র, গ্যালাক্সি, আলো এবং পদার্থে ভরা এগুলো সম্ভবত এটি সম্পূর্ণ বাস্তবতার কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশ। এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে আরও বহু মাত্রার এক বিশাল কাঠামো, যেখানে আমাদের চোখে অদৃশ্য জ্যামিতি নির্ধারণ করছে পুরো কসমসের নিয়ম।
তবে একটি সত্য এখনো রয়ে গেছে, এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলো এখনো সরাসরি প্রমাণিত হয়নি। এগুলো স্ট্রিং থিওরির গাণিতিক কাঠামো থেকে উঠে আসা একটি সম্ভাবনা। কিন্তু যদি ভবিষ্যতে কোনোভাবে প্রমাণ পাওয়া যায় যে মহাবিশ্ব সত্যিই ১১ মাত্রার, তাহলে আমাদের বাস্তবতার ধারণা সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। তখন আমরা হয়তো আবিষ্কার করব আমাদের পরিচিত তিন মাত্রার জগত আসলে এক বিশাল বহুমাত্রিক মহাবিশ্বের একটি ক্ষুদ্র জানালা মাত্র।
হয়ত সেই অদৃশ্য মাত্রাগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য, যে রহস্য এখনো আমাদের চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য।
উল্লেখ: লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার (LHC) এর মতো শক্তিশালী যন্ত্রে অতি-উচ্চ শক্তিতে কণা সংঘর্ষ ঘটিয়ে এই লুকানো মাত্রাগুলোর অস্তিত্ব খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। রিলেটেড দুটি এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে ভিডিও আছে দেখতে পারেন। @ ● আল মামুন রিটন
৪০
উপগ্রহ গ্যালাক্সি কোন গ্যালাক্সিগুলোকে বলা হয়?
উপগ্রহ গ্যালাক্সি হলো সেইসব ছোটো আকারের গ্যালাক্সি, যা একটি বড় গ্যালাক্সির মহাকর্ষীয় প্রভাবে তার চারপাশে ঘোরে। এটি অনেকটা আমাদের সৌরজগতে যেমন ছোটো ছোটো গ্রহরা সূর্যের চারপাশে ঘোরে, তেমনই মহাবিশ্বে একটি বড় গ্যালাক্সির মহাকর্ষীয় টানের কারণে কিছু ছোট গ্যালাক্সি তার চারপাশে প্রদক্ষিণ করে।
উদাহরণ হিসেবে, আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি আকাশগঙ্গার দুটি প্রধান উপগ্রহ গ্যালাক্সি হলো বড়ো ম্যাগেলানিক ক্লাউড (Large Magellanic Cloud) এবং ছোটো ম্যাগেলানিক ক্লাউড (Small Magellanic Cloud)। এদেরকে খালি চোখেই দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে দেখা যায়। এছাড়াও অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির কিছু ছোট উপগ্রহ গ্যালাক্সি আছে, যা তার চারপাশে ঘুরছে।
এই ছবিতে আমাদের লোকাল গ্রুপ (Local Group) দেখানো হয়েছে। এটি হলো গ্যালাক্সিদের একটি দল, যেখানে আমাদের গ্যালাক্সি আকাশগঙ্গা (Milky Way) এবং তার আশেপাশের কিছু গ্যালাক্সি অবস্থান করে।
Milky Way (আকাশগঙ্গা): এই ছবির সবচেয়ে বড় গ্যালাক্সিটি হলো আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি। এটি একটি সর্পিলাকার গ্যালাক্সি, যেখানে সূর্য এবং আমাদের সৌরজগত অবস্থান করে। ছবিতে 'The Sun' লেখাটি দিয়ে আমাদের সূর্যের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।
Milky Way (আকাশগঙ্গা): এই ছবির সবচেয়ে বড় গ্যালাক্সিটি হলো আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি। এটি একটি সর্পিলাকার গ্যালাক্সি, যেখানে সূর্য এবং আমাদের সৌরজগত অবস্থান করে। ছবিতে 'The Sun' লেখাটি দিয়ে আমাদের সূর্যের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।
Andromeda (অ্যান্ড্রোমিডা): এটি আমাদের সবচেয়ে কাছের বড় গ্যালাক্সি। এটিও একটি সর্পিলাকার গ্যালাক্সি এবং আমাদের থেকে প্রায় ২.৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।
Triangulum (ট্রায়াঙ্গুলাম): এই গ্যালাক্সিটি আমাদের লোকাল গ্রুপের তৃতীয় বৃহত্তম সদস্য। এটি অ্যান্ড্রোমিডার কাছেই অবস্থিত এবং আমাদের থেকে প্রায় ৩.২ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে।
Satellite Galaxies (উপগ্রহ গ্যালাক্সিসমূহ): ছবিতে অনেক ছোট ছোট গ্যালাক্সি দেখতে পাচ্ছেন, যেমন M 110 এবং M 32। এগুলো অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির উপগ্রহ। একইভাবে, Large Magellanic Cloud এবং Small Magellanic Cloud হলো আমাদের আকাশগঙ্গার উপগ্রহ গ্যালাক্সি।
এই ছোট গ্যালাক্সিগুলো তাদের বড় প্রতিবেশী গ্যালাক্সিগুলোর মহাকর্ষীয় টানে তাদের চারপাশে ঘুরছে। আর একারণেই এদেরকে উপগ্রহ গ্যালাক্সি বলে ডাকা হয়। @ আল মামুন রিটন
৪১
জ্ঞান বৃদ্ধি পায় ভিন্নমতের সংঘর্ষে
মানব সভ্যতার ইতিহাস জুড়ে ভিন্ন মত দমনের প্রবণতা দেখা গেছে। প্রাচীন গ্রিসে সক্রেটিসকে বিষপানে হত্যা করা হয়েছিল তাঁর দার্শনিক মতের জন্য, গ্যালিলিওকে গৃহবন্দী রাখা হয়েছিল পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে বলার অপরাধে, এবং আজও সামাজিক মাধ্যমে ভিন্নমত পোষণকারীরা হেনস্তার শিকার হন। কেন আমরা ভিন্ন মতকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারি না? কেন বিপরীত ধারণা আমাদের মনে আঘাত হানে? বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই প্রশ্নের কিছু মর্মান্তিক উত্তর দেয়।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের এফএমআরআই স্ক্যানারের নিচে শোয়ানো হয়। যখন তাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের বিপরীত তথ্য দেখেন, তখন তাঁদের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা, যে অংশ শারীরিক বিপদের মুহূর্তে সক্রিয় হয়, জ্বলে ওঠে। ভিন্ন মত শোনার সময় আমাদের মস্তিষ্ক ঠিক সেভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখায়, যেমনটি কোনো শিকারির সামনে পড়লে দেখাত। এই আবিষ্কার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ : আমরা ভিন্ন মতকে আক্ষরিক অর্থেই হুমকি হিসেবে অনুভব করি, নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক দ্বিমত হিসেবে না।
হার্ভার্ডের স্নায়ুবিজ্ঞানী ড. রবার্ট স্যাপলস্কির মতে, বিবর্তনের লক্ষ লক্ষ বছরে মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে দলীয় ঐক্য বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। প্রাগৈতিহাসিক যুগে গোত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানেই মৃত্যু। তাই মস্তিষ্ক এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করেছে যা দলের মতের সাথে মিল না রাখাকে বিপদ সংকেত হিসেবে চিহ্নিত করে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, মানুষ নিজের মতের বিপরীত তথ্য পড়ার সময় তা খণ্ডন করার জন্য অধিক সময় ব্যয় করে, বোঝার চেষ্টা করার জন্য নয়। এই ঘটনা 'নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত' নামে পরিচিত, আমরা নিজের বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্য অনায়াসে গ্রহণ করি, কিন্তু বিপরীত তথ্য এলে তা নিয়ে অতিরিক্ত সমালোচনামূলক হয়ে যাই।
এই পক্ষপাত এতটাই শক্তিশালী যে ক্যালটেকের গবেষকরা দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের বিপরীত তথ্য পড়ার সময় মস্তিষ্কের যুক্তি ও বিচার বিশ্লেষণের অংশগুলো কম সক্রিয় হয়, বরং আবেগ ও আত্মরক্ষামূলক অংশগুলো বেশি সক্রিয় হয়। আমরা তখন যুক্তি খোঁজার চেয়ে নিজের মত রক্ষার কৌশল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
নিজের মতামত শুধু কিছু ধারণা নয়, তা আমাদের পরিচয়ের অংশ। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যান কাহনেম্যানের মতে, যখন কেউ আমাদের মতের বিরোধিতা করে, তখন আমাদের মস্তিষ্ক তা আত্মসম্মানের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করে। ভিন্ন মত শোনার অর্থ দাঁড়ায় "আমি যা ভাবি তা ভুল হতে পারে, যা আমার অস্তিত্বের ভিত নাড়িয়ে দেয়।"
প্রিন্সটনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে সকল ব্যক্তি নিজেদের মতকে পরিচয়ের অংশ বানিয়ে ফেলেন, তারা ভিন্ন মতের মুখোমুখি হলে শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করেন, রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। এই শারীরিক প্রতিক্রিয়াই আমাদের ভিন্ন মতকে দমনে উদ্বুদ্ধ করে।
ভিন্ন মত দমন করলে গ্রুপথিঙ্ক নামক এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে দলের সবাই একমত হওয়াকে সঠিক সিদ্ধান্ত ভেবে বসে। নাসার চ্যালেঞ্জার দুর্ঘটনার তদন্তে দেখা গেছে, ইঞ্জিনিয়াররা ও-রিং নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট ভিন্ন মতকে দমন করেন। ফলাফল? সাত নভোচারীর মৃত্যু।
বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ইতিহাস দেখায়, প্রতিটি বড়ো আবিষ্কারই প্রথমে দমনের শিকার হয়েছে। কোপার্নিকাসের হেলিওসেন্ট্রিক মডেল চার্চের মতের বিপরীতে যাওয়ায় নিষিদ্ধ হয়েছিল। লুই পাস্তরের জীবাণু তত্ত্ব চিকিৎসক সম্প্রদায় উপহাস করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভিন্নমতের কারণেই।
তাহলে কি আমরা এই বিবর্তনীয় প্রবণতার কাছে আত্মসমর্পণ করব? বৈজ্ঞানিক গবেষণা আশার আলো দেখায়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যালিসন গোপনিক দেখিয়েছেন, শিশুরা ভিন্নমত নিয়ে কৌতূহলী হয়, তারা দ্বিমতকে শেখার সুযোগ হিসেবে নেয়। এই শিশুসুলভ কৌতূহল আমাদেরও ফিরে পেতে হবে।
ভিন্ন মত শোনার সময় সচেতনভাবে নিজেকে প্রশ্ন করা যায় "এতে কি আমি নতুন কিছু শিখতে পারি? আমার মত কি সত্যিই অকাট্য? অন্য কোণ থেকে বিষয়টি দেখলে কি নতুন মাত্রা খুলে যায়?"
মনোবিজ্ঞানী কার্ল রজার্স বলেছিলেন, "যখন আমি কাউকে শুনি, তখন আমি নিজেকে বদলাতে দিই, আর সেই পরিবর্তনই হল শেখার মূল কথা।" ভিন্ন মত শোনা মানে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করা নয়, বরং নিজেকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ নেওয়া। মস্তিষ্কের সেই প্রাচীন অ্যামিগডালাকে একটু পিছিয়ে দিয়ে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সক্রিয় করতে হবে, যুক্তি ও বিচারকে সামনে আনতে হবে।
বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, জ্ঞান বৃদ্ধি পায় ভিন্নমতের সংঘর্ষে। আজ আমরা বিদ্যুৎ ব্যবহার করি কারণ থমাস এডিসন ও নিকোলা টেসলা ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। আমরা আধুনিক চিকিৎসা পেয়েছি কারণ কেউ কেউ গ্যালেনের ভুল তত্ত্বের বিরোধিতা করেছিলেন। ভিন্নমত দমন করে আমরা নিজেদেরই বিকাশের পথ রুদ্ধ করি। প্রকৃতি বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, আর মানব মতের বৈচিত্র্যও সেই বৈচিত্র্যেরই অংশ।
৪২
আমাদের জীবনসচল রাখতে প্রয়োজন হয় মাত্র ২৫টি মৌল
মহাবিশ্বের জন্মলগ্ন থেকে তৈরি হওয়া বিভিন্ন মৌল বা এলিমেন্ট দিয়েই তৈরি হয়েছে আমাদের এই শরীর। পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত ১১৮টি মৌল আবিষ্কৃত হয়েছে, কিন্তু এর সবগুলোই কি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন?
না! আমাদের জীবনের এই অসাধারণ কারখানাকে সচল রাখতে আমাদের প্রয়োজন হয় মাত্র ২৫টি মৌল। চলুন আজ জেনে নিই, আমাদের জীবনের সেই গোপন রেসিপিসম্পর্কে!
আমাদের শরীরের মোট ভরের প্রায় ৯৮ শতাংশই তৈরি হয়েছে মাত্র ৬টি মৌল দিয়ে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এদের বলা হয় CHNOPS। এদের সাথে ছোট করে পরিচিত হই।
■ কার্বন: কার্বন হলো জীবনের মূল ভিত্তি বা বস। আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষ, শর্করা, প্রোটিন বা চর্বি—সবকিছুর মূল কাঠামো এই কার্বন দিয়েই তৈরি।
■ হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন: এই দুটি মৌল মিলে তৈরি করে পানি। আর আমরা জানি, পানির অপর নাম জীবন। আমাদের শরীরের প্রায় ৬৫ শতাংশই হলো অক্সিজেন। শসন বা শক্তি উৎপাদনের জন্য অক্সিজেন অপরিহার্য।
■ নাইট্রোজেন: আপনি যে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খান, তার মূল উপাদান নাইট্রোজেন। আমাদের পেশি গঠন এবং DNA-এর মূল কোড তৈরিতে নাইট্রোজেন ছাড়া চলা অসম্ভব।
■ ফসফরাস: আমাদের হাড় এবং দাঁত মজবুত রাখতে এর জুড়ি নেই। এছাড়া শরীরের ভেতরের শক্তির একক বা 'ATP' তৈরি করে ফসফরাস।
■ সালফার: এটি আমাদের চুল, নখ এবং ত্বকের গঠন মজবুত করে। প্রোটিনের নির্দিষ্ট আকার ধরে রাখতে সালফার আঠার মতো কাজ করে।
এই ৬টি প্রধান মৌলের বাইরে আমাদের শরীরের কিছু খনিজ পদার্থ প্রয়োজন, যা শরীরের বিভিন্ন ফাংশন বা কাজ পরিচালনা করে। এদের বলা হয় ম্যাক্রো-মিনারেলস।
যেমন ধরুন, ক্যালসিয়াম। শুধু হাড় নয়, পেশির সংকোচন এবং রক্ত জমাট বাঁধতে এটি অপরিহার্য। এরপর আসে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম। এই দুটি মৌল আমাদের স্নায়ুর সংকেত বা ইলেকট্রিক সিগন্যাল আদানপ্রদান করে। আপনি যে এই ভিডিওটি দেখছেন এবং আপনার মস্তিষ্ক তা বুঝতে পারছে—এটি সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের কারসাজি!
এছাড়া রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম ও ক্লোরিন, যা আমাদের হজম প্রক্রিয়া এবং শরীরের পানির ভারসাম্য ঠিক রাখে। মজার ব্যাপার হলো, উদ্ভিদের খাদ্য তৈরির মূল উপাদান ক্লোরোফিল তৈরি করতেও ম্যাগনেসিয়াম লাগে!
সবশেষে আসি এমন কিছু মৌলের কথায়, যা আমাদের শরীরে একদমই সামান্য পরিমাণে লাগে, যা কয়েক মিলিগ্রাম বা মাইক্রোগ্রাম। কিন্তু এগুলো না থাকলে আমাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব। এদের বলা হয় ট্রেস এলিমেন্ট।
এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো আয়রন বা লৌহ। আয়রন আমাদের রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরি করে, যা পুরো শরীরে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। আর রয়েছে জিংক, যা আমাদের শরীরের ডিফেন্স সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্ষত সারাতে সাহায্য করে।
এছাড়া রয়েছে আয়োডিন যা আমাদের গলার থাইরয়েড গ্রন্থিকে সুস্থ রাখে। আয়োডিনের অভাবেই কিন্তু গলগণ্ড রোগ হয়। এছাড়াও সামান্য পরিমাণে তামা, ম্যাঙ্গানিজ, ফ্লোরিন আমাদের সুস্থতার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
একটু ভেবে দেখুন তো! মহাবিশ্বের মৃত নক্ষত্রদের বিস্ফোরণ থেকে ছড়িয়ে পড়া কার্বন, অক্সিজেন, লোহা আর নাইট্রোজেনের মতো নিষ্প্রাণ মৌলগুলোই এক অসাধারণ জ্যামিতিক নিয়মে যুক্ত হয়ে তৈরি করেছে আপনাকে, আমাকে, আর এই পৃথিবীর সমস্ত প্রাণকে। আমাদের শরীর যেন এক নিখুঁত রাসায়নিক কারখানা, আর আমরা প্রত্যেকেই এই মহাবিশ্বের এক জীবন্ত টুকরো। @ আল মামুন রিটন
৪৩
কান্না
আবেগজনিত অশ্রুপাত একটি অনন্য মানবিক বৈশিষ্ট্য। নবজাতকের কান্না মূলত শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া হলেও, প্রাপ্তবয়স্কদের কান্না জটিল মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। কান্নার এই বিবর্তনীয় শেকড় রয়েছে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিচ্ছেদজনিত আর্তনাদে, যা সামাজিক বন্ধন ও সহায়তা আহ্বানের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
পরিসংখ্যানগত তথ্য বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে নারীরা মাসে গড়ে ৫.৩ বার কাঁদেন, যেখানে পুরুষরা কাঁদেন মাত্র ১.৩ বার। পুরুষদের কান্নার সময়কালও কম, সাধারণত ২-৪ মিনিট, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৬ মিনিট স্থায়ী হয়। এই পার্থক্য শুধু সামাজিক শিক্ষার ফল নয়; এর পেছনে গভীর নিউরোবায়োলজিক্যাল কারণ কাজ করে।
যাইহোক, পুরুষের কম কান্না একটি বহুমাত্রিক নিউরোবায়োলজিক্যাল ঘটনা। এটি শুধু সামাজিক রীতিনীতির ফল নয়, বরং টেস্টোস্টেরনের প্রতিরোধমূলক প্রভাব, মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল নিয়ন্ত্রণ সার্কিটের সম্ভাব্য অধিক সক্রিয়তা, মু-ওপিওয়েড সিস্টেমের মাধ্যমে আবেগের নীরবীকরণ এবং স্বায়ত্তশাসিত স্নায়ুতন্ত্রের ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার সমন্বিত ফল। নারীদের ক্ষেত্রে প্রোল্যাকটিন যেমন কান্নাকে উৎসাহিত করে, তেমনি পুরুষদের নিউরোকেমিস্ট্রি কান্নাকে একটি উচ্চশক্তি সম্পন্ন, নিয়ন্ত্রিত এবং প্রয়োজনের তাগিদে ব্যবহৃত শেষ অস্ত্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, প্যাথলজিক্যাল ক্ষেত্রে যেমন মোটর নিউরন ডিজিজে মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ পথ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরুষদের মধ্যেও অনিয়ন্ত্রিত কান্না দেখা দিতে পারে, যা প্রমাণ করে এই আচরণের মূল উৎস স্নায়বিক কাঠামোতে নিহিত।
৪৪
সোশ্যাল নেটওয়ার্ক
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি ইন্টারনেটের প্রসার ঘটতে শুরু করলে, সামাজিক যোগাযোগের জন্য কিছু প্রাথমিক প্রচেষ্টাও দেখা যায়। এগুলোকে সরাসরি সোশ্যাল নেটওয়ার্ক না বললেও, ভবিষ্যতের প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য এরা পথিকৃতের কাজ করেছে।
১. Classmates (১৯৯৫): র্যান্ডি কনরাডস প্রতিষ্ঠিত এই সাইটটির মূল লক্ষ্য ছিল প্রাক্তন সহপাঠীদের ডিজিটাল বিশ্বে খুঁজে বের করা। ব্যবহারকারীরা নিজেদের স্কুলের নাম দিয়ে নিবন্ধন করে সেখানে পুরনো বন্ধুদের সন্ধান পেতেন। কিন্তু এখানে পূর্ণাঙ্গ প্রোফাইল বা নিজস্ব বন্ধু তালিকা তৈরির সুযোগ ছিল না। এটি ছিল মূলত একটি ডিরেক্টরি, যা সামাজিক সংযোগের ধারণাটিকেই প্রাধান্য দিয়েছিল।
২. Theglobe (১৯৯৫): এটি ছিল একটি অনলাইন সম্প্রদায়, যেখানে ব্যবহারকারীরা নিজস্ব কন্টেন্ট প্রকাশ করতে পারতেন এবং অন্যদের সাথে মতবিনিময় করতে পারতেন। ১৯৯৮ সালে আইপিওর মাধ্যমে এটি বিপুল সাফল্য পেলেও, এর গঠন ও বৈশিষ্ট্য পরবর্তী সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোর মতো সুনির্দিষ্ট ছিল না।
৩. ICQ (১৯৯৬) এবং AOL Instant Messenger (১৯৯৭): এই দুটি ছিল তাৎক্ষণিক বার্তা প্রেরণের প্ল্যাটফর্ম। ICQ-ই প্রথম বাডি লিস্ট বা বন্ধু তালিকার ধারণা চালু করে, যা বর্তমান ফ্রেন্ড লিস্টের প্রাথমিক রূপ। কিন্তু এগুলো ছিল মূলত একান্তে বার্তালাপের মাধ্যম; এখানে কেউ অপরের প্রোফাইল ব্রাউজ করতে পারতেন না বা কোনো নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারতেন না।
১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অ্যান্ড্রু ওয়েনরিচ একটি নতুন ওয়েবসাইট চালু করেন, যা ইতিহাসে প্রথম সত্যিকারের সোশ্যাল নেটওয়ার্ক হিসেবে স্বীকৃত। এর নাম ছিল SixDegrees.
"Six Degrees of Separation" তত্ত্বটি ছিল এই সাইটের ভিত্তি। ১৯২৯ সালে হাঙ্গেরীয় লেখক ফ্রিগিয়েস কারিন্থি প্রথম এই ধারণা দেন যে, পৃথিবীর যেকোনো দুটি মানুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে সর্বোচ্চ ছয়টি সংযোগের প্রয়োজন হয়। এই তত্ত্বের আলোকে, সাইটটির লক্ষ্য ছিল ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষকে এক সূত্রে বাঁধা।
SixDegrees-এ প্রথমবারের মতো একটি আধুনিক সোশ্যাল নেটওয়ার্কের প্রায় সব উপাদান একত্রিত হয়েছিল:
· ব্যবহারকারীরা নিজেদের বিস্তারিত প্রোফাইল তৈরি করতে পারতেন।
· অন্যদের সাথে যুক্ত হয়ে নিজস্ব ফ্রেন্ড লিস্ট তৈরি করার সুযোগ ছিল।
· বন্ধুদের তালিকা ব্রাউজ করা যেত।
· ১৯৯৮ সালের পর থেকে এখানে বুলেটিন বোর্ড চালু করা হয়, যেখানে ব্যবহারকারীরা সবার জন্য বার্তা পোস্ট করতে পারতেন, যা পরবর্তী সোশ্যাল মিডিয়ার 'ওয়াল' বা 'টাইমলাইন' এর ধারণার কাছাকাছি ছিল।
সাইটটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ২০০০ সালের মধ্যে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩.৫ মিলিয়নে পৌঁছায়। একই বছর এটি YouthStream Media Networks-এর কাছে ১২৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। কিন্তু মাত্র এক বছর পর, ২০০১ সালে, সাইটটির পর্দা নামিয়ে দেওয়া হয়।
প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রু ওয়েনরিচ পরবর্তীকালে সাইটটি বন্ধ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, "আমরা সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলাম।" ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে মানুষের অনলাইন বন্ধুর সংখ্যা ছিল খুবই কম। SixDegrees-এ ফ্রেন্ড লিস্ট তৈরি করার পর অধিকাংশ ব্যবহারকারীর কাছেই যোগাযোগের মতো তেমন বন্ধু ছিল না। ফলে নেটওয়ার্কটি স্তব্ধ হয়ে যায়। সংযোগ থাকলেও সংযোগের অর্থ ছিল না, কারণ সেই সংযোগগুলো বাস্তব জীবনের সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি।
SixDegreesএর পতনের পরও সামাজিক যোগাযোগের এই ডিজিটাল রূপটির সম্ভাবনা প্রমাণিত হয়েছিল। ২০০০-এর দশকের শুরুতেই নতুন প্রজন্মের সোশ্যাল নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যারা SixDegrees-এর শিক্ষা ও ব্যর্থতা থেকে অনেক কিছু শিখেছিল।
১. Friendster (২০০২): ছয় স্তরের তত্ত্বের ভিত্তিতে তৈরি, Friendster ব্যবহারকারীদের শুধু বন্ধু নয়, বন্ধুদের বন্ধুদের সাথেও সংযোগের সুযোগ দেয়। এটি গেমিং এবং প্রোফাইল ব্রাউজিং-এ জোর দেয় এবং ফিলিপিন্স-সহ এশিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু দ্রুত ব্যবহারকারী বাড়ায় সার্ভারের চাপ সামলাতে না পারা এবং নানা নীতিগত জটিলতায় এটি পিছিয়ে পড়ে।
২. LinkedIn (২০০৩): রিড হফম্যান ও অন্যান্যরা পেশাদার নেটওয়ার্কিংয়ের জন্য LinkedIn চালু করেন। এখানে ব্যবহারকারীরা নিজেদের পেশাগত জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরে চাকরি বা ব্যবসায়িক সংযোগ তৈরি করতে পারেন। এটি আজও একটি শক্তিশালী এবং টিকে থাকা প্ল্যাটফর্ম।
৩. MySpace (২০০৩): এটি একটি বিপ্লবী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়। ব্যবহারকারীরা নিজেদের প্রোফাইল সম্পূর্ণ কাস্টমাইজ করতে পারতেন, যা তরুণদের কাছে ব্যাপক আকর্ষণ তৈরি করে। বিশেষ করে সঙ্গীতশিল্পীরা এখানে নিজেদের গান শেয়ার করে ভক্ত তৈরির সুযোগ পেতেন। এক সময় এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোশ্যাল নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।
৪. Facebook (২০০৪): বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস থেকে "The Facebook" নামে একটি সাইট চালু করেন, যা ছিল শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য। এটি ধীরে ধীরে আইভি লীগ কলেজ, তারপর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২০০৬ সালে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বাস্তব পরিচয়, বন্ধুদের সাথে সহজ সংযোগ এবং পরিষ্কার ইন্টারফেস এটিকে ধীরে ধীরে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে।
বিশ্বের প্রথম সোশ্যাল নেটওয়ার্ক SixDegreesএর জীবনকাল ছিল মাত্র চার বছর (১৯৯৭-২০০১)। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের পথচলাও প্রমাণ করেছিল যে ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষের সামাজিক সংযোগের জন্য একটি গভীর চাহিদা রয়েছে। এর পতন সত্ত্বেও, এটি আধুনিক সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোর মূল কাঠামো তৈরি করে দিয়েছিল—প্রোফাইল, ফ্রেন্ড লিস্ট, বার্তা প্রেরণ।
পরবর্তীতে Friendster, MySpace এবং বিশেষ করে Facebook সেই ফাঁকা জায়গাটি পূরণ করে যখন ইন্টারনেটের প্রসার ও মানুষের অনলাইন উপস্থিতি বেড়ে যায়। SixDegrees ছিল সেই বীজ, যা থেকে আজকের বিশাল সামাজিক মাধ্যমের বটবৃক্ষের জন্ম। ইতিহাসের পাতায় এর নাম তেমন উজ্জ্বল না থাকলেও, প্রতিটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট প্রতিটি লাইক বা শেয়ার-এর মূলে রয়েছে সেই নীরব বিপ্লবের স্পন্দন, যা শুরু করেছিলেন অ্যান্ড্রু ওয়েনরিচ তার SixDegreesএর মাধ্যমে।
৪৫
আমাদের মস্তিষ্ক
আমাদের মাথার খুলির ভেতরে, মাত্র দেড় কেজি ওজনের একটি অঙ্গ বসবাস করে, যা সমগ্র মানব সভ্যতা, ভালোবাসা, যুদ্ধ, কবিতা এবং বিজ্ঞানকে সম্ভব করেছে। এই ধূসর-গোলাপী বর্ণের স্পঞ্জের মতো টিস্যুটি আসলে মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল বস্তুগুলোর একটি। নিউরোসায়েন্সের সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলো আমাদের এই অঙ্গটি সম্পর্কে ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। চলুন, মস্তিষ্কের সেই অন্দরমহলে ডুব দিয়ে কিছু সত্যিই রোমাঞ্চকর তথ্য জেনে নেওয়া যাক।
মস্তিষ্কের ভেতরে ৮৬ বিলিয়নেরও বেশি নিউরন (স্নায়ুকোষ) একটিমাত্র লক্ষ্যে কাজ করে: তথ্য আদান-প্রদান। এই যোগাযোগ ব্যবস্থা এতই দ্রুত যে, একটি নিউরন থেকে অপর নিউরনে সংকেত পৌঁছানোর গতি ঘণ্টায় ৪৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর অর্থ হলো, আপনি যখন আপনার বুড়ো আঙুল নাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন মস্তিষ্ক থেকে সেই বার্তা মেরুদণ্ড দিয়ে পায়ের আঙুলে পৌঁছাতে সময় নেয় মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ড।
এই নিরবচ্ছিন্ন কাজ চালানোর জন্য মস্তিষ্ক প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। শরীরের মোট ওজনের মাত্র ২ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও, এটি মোট অক্সিজেন ও শর্করার ২০ শতাংশ খরচ করে। এই বিপুল শক্তি দিয়ে একটি কম-পাওয়ার এলইডি বাতি জ্বালানো সম্ভব। আর এই শক্তি ও বিপুল সংখ্যক নিউরনের সমন্বয়ে গঠিত মস্তিষ্কের তথ্য ধারণক্ষমতা পেটাবাইটেরও বেশি, যা পুরো ইন্টারনেটের তথ্যভাণ্ডারের কাছাকাছি বলে অনুমান করা হয়।
বহুকাল ধরে মনে করা হতো, শৈশবের পর মস্তিষ্ক স্থির হয়ে যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর কখনো ঠিক হয় না। আধুনিক নিউরোসায়েন্স এই ধারণা ভুল প্রমাণিত করে "নিউরোপ্লাস্টিসিটি" ধারণা দিয়েছে। এটি হলো মস্তিষ্কের সেই অসাধারণ ক্ষমতা, যার মাধ্যমে এটি সারা জীবন ধরে পরিবর্তিত হতে পারে, নতুন সংযোগ তৈরি করতে পারে এবং পুরনো সংযোগ পুনর্বিন্যস্ত করতে পারে।
অন্ধদের কিন্তু অসাধারণ ক্ষমতা থাকে। জন্মান্ধ বা অল্প বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারানো ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের যে অংশ normally চোখের দৃষ্টির তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য নির্ধারিত, সেটি কখনো অকেজো পড়ে থাকে না। বরং, সেই অংশটি "পুনরায় কাজে লাগানো" হয়। ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ার সময় তারা আসলে তাদের আঙুলের স্পর্শ অনুভব করেন দৃষ্টির কর্টেক্স দিয়ে! তাদের মস্তিষ্ক স্পর্শের অনুভূতি প্রক্রিয়াকরণের জন্য দৃষ্টির এলাকাটিকে ব্যবহার করতে শিখে যায়।
এবার জানব ফ্যান্টম লিম্বের রহস্য। পা বা হাত কেটে ফেলার পরও অনেক রোগী সেই অনুপস্থিত অঙ্গে ব্যাথা বা চুলকানি অনুভব করেন। এটি ঘটে কারণ মস্তিষ্কে অঙ্গটির জন্য নির্ধারিত মানচিত্র এখনও সক্রিয় থাকে এবং শরীর থেকে আর সংকেত না পেয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা এখন আয়নার বাক্স ব্যবহার করে মস্তিষ্ককে "বোকা" বানিয়ে এই যন্ত্রণা লাঘবের কৌশল বের করেছেন।
আমাদের মস্তিষ্ক কি ব্যথা পায়? নিউরোসার্জনরা রোগীকে জাগিয়ে রাখেন এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে হালকা বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিয়ে পরীক্ষা করেন। আশ্চর্যজনকভাবে, রোগী কোনো ব্যথা অনুভব করেন না। কারণ মস্তিষ্কের টিস্যুতে নিজস্ব কোনো ব্যথা গ্রহীতা নেই। মাথার ব্যাথা আসলে মস্তিষ্ককে ঘিরে থাকা রক্তনালী, আবরণী এবং পেশিতে সমস্যার কারণে হয়।
একাকীত্বের আঘাতটা জানি এবার, সামাজিকভাবে বর্জিত হওয়ার অনুভূতি বা তীব্র একাকীত্ব মস্তিষ্কের সেই একই এলাকাকে সক্রিয় করে, যা শারীরিকভাবে পুড়ে যাওয়া বা আঘাত পাওয়ার সময় সক্রিয় হয়। অর্থাৎ, একাকীত্ব আসলেই একটি বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা।
১৯৯০এর দশকে ইতালীয় গবেষকদের একটি আবিষ্কার সহমর্মিতার রহস্য উদঘাটনে সাহায্য করে। তারা দেখতে পান, বানর যখন নিজে একটি কাজ করে এবং যখন অন্য বানরকে কাজটি করতে দেখে, তখন তার মস্তিষ্কের একই নিউরন সক্রিয় হয়। এই "মিরর নিউরন"গুলোর কারণেই আমরা অন্যের কষ্টে কষ্ট পাই, সিনেমার নায়কের আনন্দে হাসি, এবং হাই তোলা দেখলে আমরাও হাই তুলি। এটাই আমাদের সামাজিক বন্ধনের মূল ভিত্তি।
ঘুমকে আমরা বিশ্রামের সময় বললেও, মস্তিষ্কের কাছে এটি অত্যন্ত ব্যস্ত একটি সময়। ঘুমের সময়, বিশেষ করে গভীর ঘুমে (NREM) দিনের বেলার অপ্রয়োজনীয় স্মৃতিগুলো মুছে ফেলা হয় এবং আরইএম (REM) ঘুমের সময় গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলো দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিভাণ্ডারে স্থানান্তরিত ও সংহত হয়। পরীক্ষার আগে রাতে ভালো ঘুম না হলে মুখস্থ করা বিষয় মনে না থাকার এটাই মূল কারণ। আসলে, আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক প্রায় জাগ্রত অবস্থার মতোই সক্রিয় থাকে, কিন্তু দেহকে নিশ্চল রাখার জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়।
আমাদের মস্তিষ্কই আমাদের আমিত্বের আসল ঠিকানা। প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি আবেগ, প্রতিটি স্মৃতি সবকিছুই এই বিস্ময়কর অঙ্গের ভেতরের রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফসল। নিউরোসায়েন্স এখনও তার পথপরিক্রমার শুরুতেই আছে। প্রতিদিন নতুন নতুন গবেষণা আমাদের জানাচ্ছে যে এই তিন পাউন্ডের বিস্ময় কত গভীর, কত জটিল এবং কত অসাধারণ। হয়তো একদিন আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারব, সচেতনতা বা চেতনা নামক এই অনুভূতিটি আসলে কীভাবে এই স্নায়ুকোষের জাল থেকে জেগে ওঠে। @ আল মামুন রিটন
৪৬
৭টি প্রভাবশালী জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক্সপেরিমেন্ট, যা আধুনিক মহাবিশ্ববিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
১. গ্যালিলিওর ঝুলন্ত বলের পরীক্ষা ১৬১০ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলি প্রমাণ করেন যে, বিভিন্ন ওজনের বস্তু একই সময়ে পতিত হয় যদি বায়ুর প্রতিরোধ না থাকে। তিনি পিসায়ের একটি টাওয়ার থেকে দুটি বল নিচে ফেলে দেখান যে, ভারী বল এবং হালকা বল একই সময়ে পড়ে। এটি ইউক্লিডীয় ধারণার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল এবং নিউটনের গতি সূত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
২. কেপলার এর গ্রহের কক্ষপথের নিয়ম ১৬০৯ সালে জোহানেস কেপলার গ্রহগুলির সূর্যের চারপাশে চলাচলের নিয়মাবলী আবিষ্কার করেন। তার তিনটি নিয়ম গ্রহের কক্ষপথের আকার, গতি এবং দূরত্বের মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে। কেপলারের এই নিয়মগুলি পরে নিউটনের মহাকর্ষীয় তত্ত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩. নিউটনের প্রিজম পরীক্ষা আইজ্যাক নিউটন ১৬৬৬ সালে প্রিজমের মাধ্যমে আলোকরশ্মি বিশ্লেষণ করেন এবং প্রমাণ করেন যে, সাদা আলো বিভিন্ন রঙের আলোর সংমিশ্রণ। তিনি আলোর বিচ্ছুরণ এবং পুনরায় সংমিশ্রণের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করেন, যা আধুনিক অপটিক্স বিজ্ঞানের ভিত্তি।
৪. হাবলের মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের আবিষ্কার ১৯২৯ সালে এডউইন হাবল দেখান যে, দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তার এই পর্যবেক্ষণ আধুনিক মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং বিগ ব্যাং তত্ত্বের প্রাথমিক ভিত্তি গঠন করে।
৫. মাইকেলসনের ইন্টারফেরোমেটার পরীক্ষা ১৮৮৭ সালে মাইকেলসন এবং মোরলি একটি পরীক্ষা করেন যার মাধ্যমে তারা 'এথার' নামে একটি প্রত্যাশিত মাধ্যমের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যা আলো পরিবহন করে। তাদের পরীক্ষায় আলোয়ের গতি পরিবর্তিত হয়নি, যা পরবর্তীতে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বের পথ প্রশস্ত করে।
৬. পেনজিয়াস ও উইলসন এর মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন আবিষ্কার ১৯৬৫ সালে আরন পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন মহাবিশ্বের প্রাচীন উষ্ণতার অবশিষ্ট রেডিয়েশন আবিষ্কার করেন। এই 'ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন' বিগ ব্যাং তত্ত্বের শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
৭. গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং পরীক্ষা আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাকর্ষ শক্তি আলোকে বক্ররেখায় প্রবাহিত করতে পারে। ১৯৭৯ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে গ্রাভিটেশনাল লেন্সিং প্রমাণিত হয়েছে, যা দূরবর্তী নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির আলো ভাঁজ হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছায়। এটি মহাকর্ষীয় তত্ত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষণ।
এই সাতটি এক্সপেরিমেন্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী প্রভাব ফেলেছে এবং আমাদের মহাবিশ্বের রহস্য সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। আধুনিক মহাবিশ্ববিজ্ঞান এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করতে এই গবেষণাগুলো অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের জ্ঞানের আলোকে ধরে রাকিব এই অদম্য যাত্রা যদিও সহজ ছিল না তবুও এরকম এক্সপেরিমেন্টগুলোর ইতিহাস আমাদের জানা উচিত। হয়ত অনেকের পছন্দ হবে না তবে এটাও ঠিক সুবিভোগ কিন্তু ঠিকই থাকবে। @ সারমিন জাহান
৪৭
৪০ বছর বয়স মানেই কি মানুষ হঠাৎ বুড়ো হয়ে যায়?
না। বাস্তবে বার্ধক্য হঠাৎ আসে না—এটি ধীরে ধীরে তৈরি হয় আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমে।
আমরা কী খাই, আমরা কতটা নড়াচড়া করি, আমরা কতটা ঘুমাই, আমরা কতটা স্ট্রেসে থাকি এবং আমরা কীভাবে নিজেদের শরীর ও মনকে যত্ন করি
এই সবকিছু মিলেই ঠিক করে একজন মানুষ ৪০-এর পর শক্তিশালী থাকবেন, নাকি দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়বেন।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই বয়সটিকে বলা যায় Recalibration Age —
অর্থাৎ জীবনের এমন একটি সময় যখন মানুষ চাইলে নিজের শরীর, মন এবং জীবনযাপনকে নতুনভাবে সাজাতে পারে।
গবেষণা বলছে, সুস্থ ও দীর্ঘদিন তরুণ থাকতে ৬টি lifestyle factor সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
তারুণ্যের ভিত শরীরের ভেতর থেকেই তৈরি হয়
অনেকেই মনে করেন তরুণ থাকতে হলে কম খেতে হবে।
কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি কম খাওয়া নয়—
বরং সঠিকভাবে খাওয়া।
বিশেষ করে গবেষণায় বারবার দেখা গেছে Mediterranean-style diet সবচেয়ে উপকারী।
এতে থাকে
ফল
সবজি
ডাল
বাদাম
মাছ
whole grain
healthy oil
এই ধরনের খাবার শরীরের inflammation কমাতে সাহায্য করে, যা ageing ধীর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
Emotional Eating – একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। আমরা শুধু ক্ষুধায় খাই না।
অনেক সময় আমরা খাই—
স্ট্রেসে
মন খারাপ হলে
একা লাগলে
reward হিসেবে
বা “আজ অনেক কষ্ট করেছি” ভাবনা থেকে
একে বলা হয় Emotional Eating।
৪০-এর পর metabolism কিছুটা ধীর হওয়ায় এই অভ্যাস দ্রুত ওজন বৃদ্ধি, ক্লান্তি, guilt এবং self-criticism তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্যকর খাবার কেন আত্মমর্যাদার সঙ্গে যুক্ত
যখন একজন মানুষ নিজের শরীরকে ভালো খাবার দেন, তখন অবচেতন মনে একটি বার্তা যায়—
“আমি নিজের যত্ন নেওয়ার যোগ্য।”
এই self-care ধীরে ধীরে self-respect ও self-discipline তৈরি করে।
৪০-এর পর কার্যকর খাদ্যনীতি
প্লেটের অর্ধেক সবজি
পর্যাপ্ত protein
refined carbohydrate কমানো
healthy fat
সচেতন meal timing
নিয়মিত শরীরচর্চা
শরীর চললে মনও চলে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সুপারিশ করে—
সপ্তাহে ১৫০–৩০০ মিনিট physical activity
সপ্তাহে অন্তত ২ দিন strength training
কারণ শরীরচর্চা শুধু হার্ট ভালো রাখে না, এটি উন্নত করে—
mood
sleep
metabolism
brain function
Inactivity Cycle
যখন শরীর কম নড়ে—
রক্তসঞ্চালন কমে
পেশি দুর্বল হয়
energy কমে যায়
ফলে মানুষ আরও ক্লান্ত বোধ করে এবং আরও কম নড়াচড়া করে। এভাবে তৈরি হয় Inactivity Cycle।
Exercise – একটি Anti-aging Engine
গবেষণা বলছে exercise
muscle mass বজায় রাখে
metabolism উন্নত করে
mood-regulating neurotransmitter বাড়ায়
stress কমায়
brain function উন্নত করে
Exercise এর মনস্তত্ত্ব
যারা exercise-কে শুধু weight loss হিসেবে দেখেন তারা অনেক সময় থেমে যান।
কিন্তু যারা এটিকে identity বানান—
“আমি এমন একজন মানুষ, যে নিজের শরীরকে সচল রাখে”—
তারা দীর্ঘদিন এটি বজায় রাখতে পারেন।
কিছু সহজ exercise habit
brisk walking
light strength training
stretching
balance exercise
ধূমপানমুক্ত জীবন
তারুণ্য ধরে রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
ধূমপান শুধু ফুসফুসের ক্ষতি করে না। এটি প্রভাব ফেলে—
হৃদযন্ত্র
রক্তনালী
ত্বক
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
hormonal balance
WHO বলছে tobacco একটি বড় জনস্বাস্থ্যঝুঁকি।
Smoking এবং Premature Aging
ধূমপানের কারণে—
ত্বকের elasticity কমে
অক্সিজেন সরবরাহ কমে
কোষের ক্ষয় বাড়ে
ফলে শরীরে accelerated aging দেখা দিতে পারে।
Smoking এর মনস্তত্ত্ব
অনেক smoker মনে করেন—
“সিগারেট আমাকে calm করে।”
কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় এটি Nicotine withdrawal cycle।
nicotine কমে → irritability বাড়ে → cigarette → সাময়িক relief → আবার dependence।
Smoking ছাড়ার কৌশল
trigger identify করা
replacement behaviour
identity shift
lapse আর relapse আলাদা বোঝা
social support নেওয়া
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
ওজন শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়।
অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে যুক্ত—
inflammation
diabetes risk
heart disease
hormonal imbalance
Body Image Psychology
৪০-এর পর অনেকেই শরীরের সামান্য পরিবর্তনকে নেতিবাচকভাবে দেখেন।
ফলে তৈরি হয়
self-criticism
আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া
সামাজিক অস্বস্তি
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা মানে নিজের শরীরকে সম্মান করা।
ভালো ঘুম
ঘুম শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ repair system।
ঘুমের সময়—
কোষ মেরামত হয়
স্মৃতি সংরক্ষণ হয়
মস্তিষ্কের টক্সিন পরিষ্কার হয়
হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে
ঘুম কম হলে কী হয়
irritability
concentration কমে
weight gain
stress বাড়ে
Sleep Hygiene
নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম
ঘুমের আগে স্ক্রিন কমানো
শান্ত পরিবেশ
সন্ধ্যার পর caffeine কমানো
শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক
মানুষ প্রকৃতিগতভাবে social being।
গবেষণা বলছে শক্তিশালী সম্পর্ক মানুষের মধ্যে বাড়ায়—
মানসিক নিরাপত্তা
জীবনের প্রতি আগ্রহ
emotional resilience
সম্পর্কের মানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বন্ধুর সংখ্যা নয়—
বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো সম্পর্কের গুণগত মান।
যদি একজন মানুষের জীবনে কয়েকজন এমন মানুষ থাকে—
যাদের সাথে কথা বলা যায়
যারা বোঝার চেষ্টা করে
যারা পাশে থাকে
তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য অনেক ভালো থাকে।
৪০ পেরোলেও তরুণ থাকা কোনো জাদু নয়।
এটি তৈরি হয় কয়েকটি সচেতন অভ্যাস থেকে—
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
নিয়মিত শরীরচর্চা
ধূমপানমুক্ত জীবন
স্বাস্থ্যকর ওজন
ভালো ঘুম
শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক
তারুণ্য আসলে বয়সের বিষয় নয়।
তারুণ্য হলো—
শরীরের যত্ন
মনের স্থিরতা
সম্পর্কের উষ্ণতা
৪৮
কেন পরিষ্কার পরিবেশ মানুষকে বেশি শান্ত ও সফল করে?
আপনি কি কখনো খেয়াল করেছেন—
যখন ঘর এলোমেলো থাকে, তখন মনটাও যেন অদ্ভুতভাবে অস্থির হয়ে যায়?
কখনো মনে হয়
কিছুতেই কাজে মন বসছে না…
অকারণে বিরক্ত লাগছে…
মাথা যেন ভারী হয়ে আছে।
অদ্ভুত বিষয় হলো — অনেক সময় সমস্যাটা আমাদের মন নয়, আমাদের পরিবেশ।
মনোবিজ্ঞান (Psychology) বলছে,
আমাদের চারপাশের পরিবেশ শুধু চোখে দেখার বিষয় নয় — এটি সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের কাজ করার পদ্ধতি, আবেগ এবং আচরণকে প্রভাবিত করে।
মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি যে এটি সবসময় পরিবেশ থেকে অসংখ্য তথ্য সংগ্রহ করে। যখন পরিবেশ অগোছালো থাকে, তখন মস্তিষ্ককে একই সাথে অনেক বেশি visual stimuli (দৃশ্যগত তথ্য) প্রসেস করতে হয়।
এর ফলে তৈরি হয় cognitive overload — অর্থাৎ মস্তিষ্ক অতিরিক্ত তথ্যের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
এই অবস্থায় মানুষ সাধারণত —
সহজেই বিরক্ত হয়ে যায়
মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না
ছোট কাজেও ক্লান্ত লাগে
সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে
মনের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়
অন্যদিকে একটি পরিষ্কার ও গুছানো পরিবেশ মস্তিষ্ককে অপ্রয়োজনীয় তথ্য থেকে মুক্ত করে। ফলে মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়, চিন্তা পরিষ্কার হয় এবং কাজের প্রতি আগ্রহও বাড়তে শুরু করে।
এই কারণেই মনোবিজ্ঞানীরা বলেন —
“Clean space, clear mind.”
মনের স্বচ্ছতা বাড়ায় (Mental Clarity)
যখন একটি ঘর বা কর্মস্থল অগোছালো থাকে, তখন আমাদের চোখের সামনে অনেক বস্তু একসাথে উপস্থিত থাকে। প্রতিটি বস্তুই মস্তিষ্কের কাছে একটি আলাদা ভিজ্যুয়াল সিগন্যাল পাঠায়।
মস্তিষ্ক এই সিগন্যালগুলোকে আলাদা করে বিশ্লেষণ করতে থাকে। এতে attention system ক্রমাগত বিভ্রান্ত হয় এবং চিন্তার স্বচ্ছতা কমে যায়।
একটি পরিষ্কার ও গুছানো পরিবেশ মস্তিষ্ককে কম তথ্য দেয়। ফলে prefrontal cortex (যা চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দায়ী) আরো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
ফলে —
চিন্তা পরিষ্কার হয়
মনোযোগ বৃদ্ধি পায়
সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া যায়
মানসিক বিভ্রান্তি কমে
পরিকল্পনা করা সহজ হয়
সমস্যা বিশ্লেষণ করা সহজ হয়
লক্ষ্য নির্ধারণ পরিষ্কার হয়
চিন্তার প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে
মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমায় (Reduces Stress & Anxiety)
অগোছালো পরিবেশ অনেক সময় অবচেতনভাবে আমাদের মস্তিষ্কে হুমকির সংকেত (threat signal) তৈরি করে।
মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তনগতভাবে এমনভাবে তৈরি যে এটি বিশৃঙ্খল বা অনিশ্চিত পরিবেশকে সম্ভাব্য বিপদের সাথে যুক্ত করে।
এই অবস্থায় শরীরে Cortisol (stress hormone) বৃদ্ধি পায়। কর্টিসল বাড়লে মানুষ বেশি উদ্বিগ্ন, অস্থির এবং মানসিকভাবে ক্লান্ত অনুভব করে।
কিন্তু একটি পরিষ্কার পরিবেশ মস্তিষ্ককে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি দেয়। এটাকে মনোবিজ্ঞানে sense of environmental control বলা হয়।
ফলে —
উদ্বেগ কমে
মানসিক চাপ কমে
আবেগ স্থিতিশীল হয়
অস্থিরতা কমে
মনের শান্তি বাড়ে
শরীর দ্রুত রিল্যাক্স করে
মানসিক নিরাপত্তা তৈরি হয়
আবেগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়
কাজের দক্ষতা ও মনোযোগ বাড়ায় (Boosts Productivity & Focus)
যখন পরিবেশ গুছানো থাকে, তখন আমাদের মস্তিষ্ককে অপ্রয়োজনীয় উদ্দীপনার (distraction) সাথে লড়াই করতে হয় না।
মনোবিজ্ঞানে এটাকে বলা হয় Reduced Cognitive Load। অর্থাৎ মস্তিষ্কের উপর অতিরিক্ত তথ্যের চাপ কমে যায়। ফলে মস্তিষ্ক তার শক্তি মূল কাজের উপর ব্যবহার করতে পারে। এতে মনোযোগ গভীর হয় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ে।
এছাড়া একটি সংগঠিত পরিবেশ task initiation সহজ করে — অর্থাৎ কাজ শুরু করার মানসিক বাধা কমে যায়।
ফলে —
কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়
মনোযোগ গভীর হয়
সময় ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়
কাজের ভুল কমে
সৃজনশীল চিন্তা বাড়ে
সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ে
কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে
লক্ষ্য পূরণের সম্ভাবনা বাড়ে
মুড ও মানসিক শক্তি বাড়ায় (Improves Mood)
পরিবেশ মানুষের আবেগকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরিষ্কার পরিবেশ মস্তিষ্কে ইতিবাচক আবেগের সাথে যুক্ত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে একটি পরিষ্কার ও সুন্দর পরিবেশ dopamine এবং serotonin এর মতো ভালো লাগার নিউরোকেমিক্যালের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে। এর ফলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বেশি আনন্দিত ও উৎসাহী অনুভব করে।
ফলে —
মুড ভালো হয়
ইতিবাচক চিন্তা বাড়ে
মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পায়
কাজ করার উৎসাহ বাড়ে
অলসতা কমে
জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি বাড়ে
আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়
দিন শুরু করার মোটিভেশন বাড়ে
আত্মনিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বাড়ায় (Self Discipline)
প্রতিদিন নিজের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস।
এই অভ্যাসটি মস্তিষ্কে habit formation প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে। যখন আমরা নিয়মিত একটি কাজ করি, তখন মস্তিষ্কের basal ganglia অংশ সেই অভ্যাসকে স্থায়ী করে ফেলে।
ফলে ধীরে ধীরে মানুষ আরো সংগঠিত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ছোট শৃঙ্খলা জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে।
ফলে —
সময় ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়
দায়িত্ববোধ বাড়ে
আত্মনিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়
কাজের ধারাবাহিকতা বাড়ে
ধৈর্য বাড়ে
সচেতনতা বৃদ্ধি পায়
লক্ষ্য অর্জনের ক্ষমতা বাড়ে
জীবন সংগঠিত হয়
ভালো ঘুমে সাহায্য করে (Better Sleep)
ঘুমের ক্ষেত্রে পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অগোছালো পরিবেশ মস্তিষ্ককে সবসময় সক্রিয় রাখে কারণ সেখানে অনেক ভিজ্যুয়াল উদ্দীপনা থাকে।
কিন্তু একটি পরিষ্কার ও শান্ত পরিবেশ মস্তিষ্ককে relaxation signal পাঠায়।
এই অবস্থায় parasympathetic nervous system সক্রিয় হয় — যা শরীরকে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করে।
ফলে —
দ্রুত ঘুম আসে
গভীর ঘুম হয়
রাতের ঘুমের মান ভালো হয়
শরীর দ্রুত রিল্যাক্স করে
সকালে সতেজ অনুভূতি হয়
ক্লান্তি কমে
মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায়
আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায় (Self Respect & Confidence)
নিজের পরিবেশের যত্ন নেওয়া আসলে নিজের প্রতি যত্ন নেওয়ার একটি প্রতীক।
মনোবিজ্ঞানে এটাকে বলা হয় Self-care behaviour।
যখন আমরা নিজের পরিবেশ সুন্দর রাখি তখন অবচেতনভাবে আমাদের মধ্যে একটি বার্তা তৈরি হয় —
“আমি নিজের জীবনের প্রতি যত্নবান।”
এই অনুভূতি ধীরে ধীরে আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
ফলে —
আত্মসম্মান বৃদ্ধি পায়
আত্মবিশ্বাস বাড়ে
নিজের প্রতি ভালোবাসা বাড়ে
ইতিবাচক আত্মধারণা তৈরি হয়
জীবনের প্রতি আশাবাদ বাড়ে
নিজের মূল্য উপলব্ধি হয়
একটি গুছানো পরিবেশ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়। এটি আমাদের মস্তিষ্কের কাজ করার পদ্ধতি, আবেগ এবং জীবনের মানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
প্রতিদিন ছোট ছোট অভ্যাস গড়ে তুলুন —
ঘর গুছিয়ে রাখা
অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরানো
কর্মস্থল পরিষ্কার রাখা
নিজের পরিবেশকে শান্ত ও সুন্দর রাখা
এই ছোট অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে আপনার মন, চিন্তা এবং জীবনকে আরো শান্ত ও সংগঠিত করে তুলবে।
৪৯
সারারাত ঘুম হয় না কেন? অতিরিক্ত চিন্তা ও মস্তিষ্কের অস্থিরতার মনস্তত্ত্ব
“সারারাত ঘুম হয় না, কিন্তু সকাল হলে একটু ঘুম আসে।” -রাতে বিছানায় শুয়ে থাকলেও ঘুম আসে না। মাথার ভেতর একের পর এক চিন্তা ঘুরতে থাকে।
কখনো অতীতের কোনো ঘটনা, কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা, আবার কখনো ছোট একটি বিষয়ও বড় হয়ে মনে ঘুরতে থাকে। ধীরে ধীরে সেই চিন্তাগুলো এতটাই বাড়তে থাকে যে মস্তিষ্ক আর বিশ্রাম নিতে পারে না।
মনোবিজ্ঞান বলছে, এই সমস্যার পেছনে একটি বড় কারণ হলো অতিরিক্ত চিন্তা বা Overthinking। যখন মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে একই বিষয় নিয়ে ভাবতে থাকে, তখন মস্তিষ্কের উত্তেজনা কমে না। ফলে ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় শিথিল অবস্থা তৈরি হয় না।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুম শুধু শরীরের বিশ্রাম নয়—এটি মস্তিষ্কের পুনর্গঠন এবং মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন অতিরিক্ত চিন্তা, মানসিক চাপ বা উদ্বেগ বাড়তে থাকে, তখন ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়ে যায়।
এই কারণে অনেক মানুষ রাতে জেগে থাকেন, আর শরীর ও মস্তিষ্ক অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লে ভোর বা সকালের দিকে একটু ঘুম আসে।
এই লেখায় আমরা বুঝতে চেষ্টা করব—
অতিরিক্ত চিন্তা কীভাবে ঘুমের উপর প্রভাব ফেলে, ঘুম না হলে মস্তিষ্ক ও শরীরে কী পরিবর্তন ঘটে, এবং কীভাবে এই সমস্যার থেকে ধীরে ধীরে বের হওয়া সম্ভব।
Overthinking কী?
Overthinking মানে শুধু বেশি চিন্তা করা নয়।
এটি এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ একই বিষয় নিয়ে বারবার চিন্তা করতে থাকে।
মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয়—
Rumination (রুমিনেশন)
এই অবস্থায় মানুষ সমস্যার সমাধান খোঁজার বদলে সেই সমস্যা নিয়ে ঘুরপাক খায়।
ফলে মস্তিষ্ক বিশ্রাম নিতে পারে না।
Overthinking এর সাধারণ লক্ষণ
একই চিন্তা বারবার মাথায় ঘোরা
অতীতের ভুল নিয়ে অনুশোচনা
ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত ভয়
ছোট বিষয়কে বড় সমস্যা মনে হওয়া
“যদি এমন হতো” ধরনের চিন্তা
সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা
আত্মসমালোচনা
নেতিবাচক চিন্তার পুনরাবৃত্তি
মনোযোগ কমে যাওয়া
মানসিক ক্লান্তি
কেন Overthinking রাতে বেশি হয়
দিনের সময় আমরা কাজ, কথা, সামাজিক যোগাযোগ এবং পরিবেশের মধ্যে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু রাতের নীরব সময়ে মস্তিষ্ক নিজের ভেতরের চিন্তাগুলো সামনে নিয়ে আসে।
এই সময় মস্তিষ্কের একটি বিশেষ নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়—
Default Mode Network (DMN)
এটি আত্মবিশ্লেষণ এবং স্মৃতির সাথে যুক্ত।
ফলে মানুষ অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করে।
রাতে Overthinking বাড়ার কারণ
দিনের চাপ
একাকীত্ব
ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
অসম্পূর্ণ কাজ
সম্পর্কের সমস্যা
আত্মবিশ্লেষণ
সামাজিক তুলনা
অনিশ্চয়তা
মানসিক চাপ
দীর্ঘ সময় একা থাকা
ঘুমের গুরুত্ব: কেন ঘুম মানুষের জন্য এত জরুরি?
ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়।
ঘুম মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীরের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া।
ঘুমের সময় মস্তিষ্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।
বিশেষ করে—
Memory consolidation
Neural repair
Emotional regulation
এই সময় মস্তিষ্কের কোষগুলো নতুন করে শক্তি পায়।
ঘুমের প্রধান কাজ
স্মৃতি সংরক্ষণ (Memory consolidation)
মস্তিষ্কের কোষ পুনর্গঠন
হরমোন নিয়ন্ত্রণ
আবেগ নিয়ন্ত্রণ
মনোযোগ বৃদ্ধি
শেখার ক্ষমতা বাড়ানো
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
শরীরের শক্তি পুনরুদ্ধার
মানসিক স্থিতি বজায় রাখা
মস্তিষ্কের বিষাক্ত পদার্থ পরিষ্কার করা
ঘুম না হলে মস্তিষ্কে কী হয়
দীর্ঘদিন ঘুম না হলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায়।
বিশেষ করে মস্তিষ্কের দুইটি অংশ প্রভাবিত হয়—
Amygdala (আবেগ নিয়ন্ত্রণ)
Prefrontal Cortex (যুক্তি ও সিদ্ধান্ত)
ঘুম কম হলে Amygdala অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে যায়।
ফলে মানুষ বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে।
ঘুম না হলে যে সমস্যাগুলো হয়
মনোযোগ কমে যায়
স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়
আবেগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়
উদ্বেগ বাড়ে
ডিপ্রেশন বাড়তে পারে
সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়
শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়
হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়
মানসিক ক্লান্তি বৃদ্ধি পায়
কেন সারারাত ঘুম হয় না, সকাল হলে ঘুম আসে
অনেক মানুষ বলেন—
“রাতে ঘুম হয় না, কিন্তু সকাল হলে একটু ঘুমিয়ে পড়ি।”
এর পেছনে একটি জৈবিক কারণ আছে।
মানুষের শরীরে একটি ঘুমের ছন্দ থাকে।
এটিকে বলা হয়—
Circadian Rhythm
যখন এই ছন্দ নষ্ট হয়ে যায় তখন ঘুমের সময়ও বদলে যায়।
এর কারণ
দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস
মোবাইল ব্যবহার
রাতের অতিরিক্ত চিন্তা
অনিয়মিত ঘুমের সময়
দিনের ঘুম
মানসিক চাপ
হরমোন পরিবর্তন
Cortisol বৃদ্ধি
মস্তিষ্কের অতিরিক্ত উত্তেজনা
ঘুমের ছন্দ বিঘ্নিত হওয়া
Overthinking এবং ঘুমের সম্পর্ক
Overthinking এবং ঘুমের মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক আছে। অতিরিক্ত চিন্তা মস্তিষ্ককে সবসময় সতর্ক অবস্থায় রাখে।
এই অবস্থাকে বলা হয়—
Hyperarousal
এতে শরীর মনে করে এখনও বিপদ আছে।
ফলে মস্তিষ্ক ঘুমাতে চায় না।
এর ফলাফল
ঘুম আসতে দেরি হয়
বারবার ঘুম ভেঙে যায়
গভীর ঘুম কম হয়
সকালে ক্লান্ত লাগে
মাথা ভার লাগে
মনোযোগ কমে যায়
মুড খারাপ হয়
উদ্বেগ বাড়ে
শক্তি কমে যায়
মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়
কীভাবে এই সমস্যা থেকে বের হওয়া যায়?
সুখবর হলো—Overthinking এবং ঘুমের সমস্যা থেকে ধীরে ধীরে বের হওয়া সম্ভব। এটি একদিনে ঠিক না হলেও, কিছু ছোট ছোট অভ্যাস বদলালে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র (nervous system) আবার ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করে।
মনোবিজ্ঞানে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক প্রক্রিয়াকে বলা যায়—
Cognitive Behavioral Regulation
অর্থাৎ, নিজের চিন্তা (thought), আচরণ (behavior) এবং দৈনন্দিন অভ্যাস (daily routine) এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে মন ও শরীর দুটোই নিরাপদ সংকেত পায় এবং ঘুম স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
কার্যকর উপায়গুলো হলো—
নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমালে শরীরের জৈব ঘড়ি (body clock) ধীরে ধীরে ঠিক হতে শুরু করে।
ঘুমের আগে মোবাইল ব্যবহার কমানো
মোবাইলের আলো ও অতিরিক্ত তথ্য মস্তিষ্ককে আরও সক্রিয় করে তোলে, ফলে ঘুম আসতে দেরি হয়।
শ্বাস-ব্যায়াম করা
ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিলে শরীরের ভেতরের উত্তেজনা কমে এবং মন শান্ত হয়।
ধ্যান (Meditation) করা
ধ্যান মনকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনে, ফলে অপ্রয়োজনীয় চিন্তার চাপ কিছুটা কমে।
নিয়মিত ব্যায়াম করা
হালকা হাঁটা, স্ট্রেচিং বা শরীরচর্চা মানসিক চাপ কমাতে এবং রাতে ভালো ঘুম আনতে সাহায্য করে।
চিন্তাগুলো লিখে রাখা
মাথার ভেতরে ঘুরতে থাকা চিন্তা কাগজে লিখে ফেললে মনের চাপ কিছুটা হালকা হয়।
কফি বা ক্যাফেইন কম খাওয়া
বিশেষ করে বিকেল বা রাতের দিকে কফি খেলে ঘুমের সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।
দিনের আলোতে কিছু সময় থাকা
সকালের বা দিনের প্রাকৃতিক আলো মস্তিষ্ককে বুঝতে সাহায্য করে কখন জাগতে হবে, কখন ঘুমাতে হবে।
প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো
গাছপালা, খোলা আকাশ, হাওয়া—এসব মনের উত্তেজনা কমিয়ে ভিতরের অস্থিরতা কিছুটা শান্ত করে।
প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নেওয়া
যদি সমস্যা দীর্ঘদিন থাকে, তাহলে একজন মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া খুবই কার্যকর হতে পারে।
মনে রাখবেন:
Overthinking কমাতে শুধু “ভাববো না” বললেই হয় না। বরং এমন অভ্যাস তৈরি করতে হয়, যা আপনার মস্তিষ্ককে বারবার এই বার্তা দেয়—
“আমি এখন নিরাপদ, আমি বিশ্রাম নিতে পারি।”
অতিরিক্ত চিন্তা এবং ঘুমের সমস্যা আজকের সময়ে খুব সাধারণ একটি সমস্যা।
কিন্তু এটিকে অবহেলা করলে ধীরে ধীরে এটি মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
মনে রাখতে হবে—
ভালো ঘুম মানেই ভালো মানসিক স্বাস্থ্য।
আর চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়।
৫০
মিউজিক থেরাপি
কখনো কি লক্ষ্য করেছেন — মন খুব খারাপ থাকলে প্রিয় একটি গান শুনলেই ভিতরের অস্থিরতা একটু শান্ত হয়ে যায়?
মনোবিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে রয়েছে মস্তিষ্কের গভীর স্নায়বিক (Neural) পরিবর্তন।
একজন শিশু যখন জন্ম নেয়, তখন সে প্রথম যে শব্দগুলোর সাথে পরিচিত হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো মায়ের কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠের মধ্যেই থাকে এক ধরনের ছন্দ, সুর এবং আবেগ।
এই কারণেই মানুষের মস্তিষ্ক ছোটবেলা থেকেই ছন্দ ও সুরের প্রতি স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিতে শেখে। জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তে আমরা লক্ষ্য করি—মানুষ যখন খুব আনন্দে থাকে তখন গান শোনে। আবার যখন গভীর কষ্টে থাকে তখনও অনেকেই একা বসে প্রিয় কোনো গান চালিয়ে দেয়।
অনেকেই বলেন—
“গান শুনলে মনটা একটু হালকা লাগে।”
এই অনুভূতিটি কেবল আবেগ নয়। এর পেছনে রয়েছে গভীর বৈজ্ঞানিক কারণ। মনোবিজ্ঞান (Psychology), স্নায়ুবিজ্ঞান (Neuroscience) এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে—সঙ্গীত মানুষের মস্তিষ্কে এমনভাবে কাজ করে যা অনেক সময় মানসিক প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
এই কারণেই বর্তমান সময়ে সঙ্গীতকে একটি বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাকে বলা হয় সঙ্গীতভিত্তিক থেরাপি (Music Therapy)।
আজ পৃথিবীর অনেক দেশে—
💟হাসপাতাল
💟মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র
💟পুনর্বাসন কেন্দ্র
💟স্কুল
💟কাউন্সেলিং সেশন
এসব জায়গায় সঙ্গীতকে মানসিক সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সঙ্গীতভিত্তিক থেরাপি (Music Therapy) কী?
সঙ্গীতভিত্তিক থেরাপি (Music Therapy) হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যেখানে সঙ্গীত ব্যবহার করে মানুষের মানসিক ও আবেগগত ভারসাম্য উন্নত করার চেষ্টা করা হয়।
অনেকে মনে করেন এটি শুধু গান শোনা। কিন্তু বাস্তবে এই থেরাপিতে সঙ্গীতকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়। যেমন—
💟প্রিয় গান শোনা
নিজের অনুভূতির সাথে মিল থাকা গান নির্বাচন করা
💟গান গাওয়া
💟বাদ্যযন্ত্র বাজানো
💟তাল ও ছন্দের সাথে শরীরকে সক্রিয় করা
এই কার্যক্রমগুলো মানুষের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশকে একসাথে সক্রিয় করে। ফলে ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।
যেমন—
💟মানসিক চাপ (Stress) কমে
💟আবেগ (Emotion) প্রকাশ সহজ হয়
💟মন শান্ত হয়
💟আত্মবিশ্বাস বাড়ে
এই কারণেই অনেক মনোবিজ্ঞানী বলেন—
“সঙ্গীত হলো মনের নীরব ভাষা।”
কারণ অনেক সময় মানুষ নিজের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু একটি গান সেই অনুভূতিকে প্রকাশ করতে সাহায্য করে।
মস্তিষ্কে সঙ্গীত কীভাবে কাজ করে?
সঙ্গীত মানুষের মস্তিষ্কে একসাথে অনেকগুলো অংশকে সক্রিয় করে। এটি এমন একটি অভিজ্ঞতা যেখানে শব্দ, আবেগ (Emotion), স্মৃতি (Memory) এবং শরীরের প্রতিক্রিয়া একসাথে কাজ করে।
এই প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা প্রয়োজন।
আনন্দের রাসায়নিক নিঃসরণ — ডোপামিন (Dopamine)
যখন আমরা আমাদের খুব প্রিয় কোনো গান শুনি, তখন মস্তিষ্কে একটি রাসায়নিক নিঃসৃত হয় যার নাম ডোপামিন (Dopamine)। এটিকে বলা হয় আনন্দের রাসায়নিক (Feel-good chemical)।
ডোপামিন বাড়লে মানুষের মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়—
💟আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়
💟উদ্যম বাড়ে
💟কাজ করার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়
💟মন ভালো হয়ে যায়
এই কারণেই অনেক সময় মানুষ বলে—
“প্রিয় গান শুনলে মনটা যেন সতেজ হয়ে যায়।”
এটি আসলে মস্তিষ্কের রাসায়নিক পরিবর্তনের ফল।
ভয় ও উদ্বেগ (Anxiety) কমে — অ্যামিগডালা (Amygdala) শান্ত হয়
আমাদের মস্তিষ্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে যার নাম অ্যামিগডালা (Amygdala)।
এই অংশটি নিয়ন্ত্রণ করে—
💟ভয় (Fear)
💟দুশ্চিন্তা (Worry)
💟তীব্র আবেগীয় প্রতিক্রিয়া
যখন মানুষ দীর্ঘদিন মানসিক চাপ (Stress) বা উদ্বেগে (Anxiety) থাকে তখন অ্যামিগডালা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে যায়।
ফলে দেখা দেয়—
💟অস্থিরতা
💟উদ্বেগ (Anxiety)
💟অকারণ ভয়
গবেষণায় দেখা গেছে শান্ত সঙ্গীত শুনলে অ্যামিগডালা ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করে।
ফলে শরীরে কিছু পরিবর্তন ঘটে—
💟হৃদস্পন্দন কমে
💟পেশী শিথিল হয়
💟শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হয়
এর ফলে মানুষ ধীরে ধীরে মানসিকভাবে শান্ত অনুভব করতে শুরু করে।
মানসিক চাপ (Stress) কমে — কর্টিসল (Cortisol) হ্রাস পায়
মানুষ যখন দীর্ঘদিন মানসিক চাপ (Stress) এর মধ্যে থাকে তখন শরীরে একটি হরমোন বেড়ে যায় যার নাম কর্টিসল (Cortisol)।
এই হরমোন দীর্ঘদিন বেশি থাকলে মানুষের মধ্যে দেখা যায়—
💟মানসিক ক্লান্তি
💟বিরক্তি
💟ঘুমের সমস্যা
💟বিষণ্নতা (Depression)
গবেষণায় দেখা গেছে শান্ত সঙ্গীত শুনলে শরীরে কর্টিসল কমতে শুরু করে।
ফলে শরীর ধীরে ধীরে চাপের অবস্থা (Stress Mode) থেকে বেরিয়ে আসে এবং মন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে শুরু করে।
এই কারণেই অনেক হাসপাতাল, থেরাপি সেন্টার এবং ধ্যানচর্চার জায়গায় সঙ্গীত ব্যবহার করা হয়।
স্মৃতি কেন্দ্র সক্রিয় হয় — হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus)
সঙ্গীত মস্তিষ্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে সক্রিয় করে যার নাম হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus)।
এই অংশটি নিয়ন্ত্রণ করে—
💟স্মৃতি (Memory)
💟শেখার ক্ষমতা (Learning)
আবেগ (Emotion) ও স্মৃতির সংযোগ
এই কারণেই কোনো পুরনো গান শুনলে মানুষ হঠাৎ করে অতীতের স্মৃতিতে ফিরে যায়।
একটি গান অনেক সময়—
💟শৈশবের স্মৃতি
💟পুরনো সম্পর্ক
💟জীবনের বিশেষ মুহূর্ত
💟সবকিছু একসাথে মনে করিয়ে দিতে পারে।
আবেগ (Emotion) প্রকাশে সঙ্গীতের ভূমিকা
অনেক মানুষ নিজের আবেগ (Emotion) সহজে প্রকাশ করতে পারে না। কেউ হয়তো কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু সে সেই কষ্ট কাউকে বলতে পারছে না।
কেউ হয়তো একাকীত্ব (Loneliness) অনুভব করছে, কিন্তু নিজের ভেতরের অনুভূতির ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না।
এই জায়গায় সঙ্গীত একটি নিরাপদ আবেগীয় মাধ্যম তৈরি করে।
অনেক সময় মানুষ এমন একটি গান শোনে যার কথাগুলো তার নিজের জীবনের সাথে মিলে যায়। তখন তার মনে হয়—
“এই গানটা যেন আমার মনের কথাই বলছে।”
এই অনুভূতি মানুষকে নিজের আবেগের সাথে সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে।
মনোবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয়
💟আবেগীয় মুক্তি (Emotional Catharsis)।
অনেক সময় মানুষ গান শুনে কাঁদে। তারপর ধীরে ধীরে তার মন হালকা হয়ে যায়।
এই প্রক্রিয়াটি মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিষণ্নতা (Depression) ও সঙ্গীতের সম্পর্ক
বিষণ্নতার (Depression) সময় মানুষের মধ্যে কয়েকটি লক্ষণ দেখা যায়।
যেমন—
💟আনন্দের অনুভূতি কমে যায়
💟আগ্রহ হারিয়ে যায়
💟জীবনের প্রতি উদ্যম কমে যায়
💟এই সময় মানুষের মস্তিষ্কে সাধারণত ডোপামিন (Dopamine) এবং সেরোটোনিন (Serotonin) কমে যায়। সঙ্গীত ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে আবেগের প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
💟সঙ্গীতভিত্তিক থেরাপিতে অনেক সময় মানুষকে বলা হয়— নিজের অনুভূতির সাথে মিল থাকা গান নির্বাচন করতে
💟প্রিয় গান শুনতে
💟কখনো গান গাইতে
এর ফলে মানুষের আবেগ প্রকাশের পথ খুলে যায় এবং ধীরে ধীরে মানসিক চাপ কমতে শুরু করে।
উদ্বেগ (Anxiety) কমাতে সঙ্গীত
উদ্বেগের (Anxiety) সময় মানুষের শরীর সবসময় সতর্ক অবস্থায় থাকে। মস্তিষ্ক মনে করে— “কোনো বিপদ আসতে পারে।”
এই কারণে দেখা যায়—
💟হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়
💟শ্বাস দ্রুত হয়
💟শরীর অস্থির হয়ে যায়
শান্ত সঙ্গীত শুনলে ধীরে ধীরে শরীরের স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয়।
ফলে—
💟হৃদস্পন্দন কমে
💟শ্বাস ধীর হয়
💟মন স্থির হয়
এই কারণেই ধ্যানচর্চা (Meditation), যোগব্যায়াম (Yoga) এবং শিথিলকরণ অনুশীলনে সঙ্গীত ব্যবহার করা হয়।
শিশুদের মানসিক বিকাশে সঙ্গীতের ভূমিকা
গবেষণায় দেখা গেছে যে যেসব শিশু ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের সাথে পরিচিত হয় তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ও সুসংগঠিত হয়।
শিশুর মস্তিষ্ক জন্মের পর খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। এই সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ুকোষ (Neurons) একে অপরের সাথে সংযোগ তৈরি করতে থাকে। এই সংযোগগুলোই পরে মানুষের চিন্তা, ভাষা, স্মৃতি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি তৈরি করে।
সঙ্গীত এই সংযোগ তৈরির প্রক্রিয়াকে অনেক সময় দ্রুত করতে সাহায্য করে।
যেসব শিশু ছোটবেলা থেকেই গান শুনে বা গান শেখে তাদের মধ্যে সাধারণত কিছু ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
যেমন—
💟ভাষা শেখার ক্ষমতা বেশি হয়
💟সৃজনশীলতা (Creativity) বৃদ্ধি পায়
💟আবেগ নিয়ন্ত্রণ (Emotional Regulation) ভালো হয়
💟সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত হয়
কারণ সঙ্গীত শোনার সময় মস্তিষ্কের একাধিক অংশ একসাথে সক্রিয় হয়। ফলে শিশুদের মস্তিষ্কে সমন্বিত বিকাশ ঘটে।
এই কারণেই অনেক দেশে শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সঙ্গীতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
বয়স্ক মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে সঙ্গীত
মানুষ যখন বয়সে বড় হয় তখন অনেক সময় তার জীবনে কিছু মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যেমন—
💟একাকীত্ব (Loneliness)
💟স্মৃতিভ্রংশ (Memory Loss)
💟বিষণ্নতা (Depression)
💟জীবনের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া
এই সময় সঙ্গীত অনেক ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী মানসিক সহায়তা হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে যারা আলঝাইমার (Alzheimer’s Disease) বা স্মৃতিভ্রংশে ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে—পুরনো গান শুনলে তারা অনেক সময় সেই গান গাইতে পারেন, এমনকি সেই সময়ের স্মৃতিও মনে করতে পারেন। এর কারণ হলো সঙ্গীতের সাথে স্মৃতির সংযোগ মস্তিষ্কে অনেক গভীরভাবে সংরক্ষিত থাকে।
সঙ্গীত বয়স্ক মানুষের মধ্যে—
💟আবেগ (Emotion) সক্রিয় করে
💟স্মৃতি জাগিয়ে তোলে
💟একাকীত্ব কমায়
💟জীবনের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়
এই কারণে অনেক পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং বৃদ্ধাশ্রমে সঙ্গীতভিত্তিক থেরাপি (Music Therapy) ব্যবহার করা হয়।
কোন ধরনের সঙ্গীত সবচেয়ে উপকারী?
অনেকে মনে করেন যে যেকোনো গান মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কিন্তু বাস্তবে সব ধরনের সঙ্গীত একইভাবে কাজ করে না।
সঙ্গীতের ধরণ, তাল, শব্দের তীব্রতা এবং আবেগীয় গঠন মানুষের মস্তিষ্কে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব সৃষ্টি করে।
শান্ত সঙ্গীত (Relaxing Music)
যেমন—
💟যন্ত্রসংগীত
💟প্রকৃতির শব্দ
💟ধীর গতির শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
এই ধরনের সঙ্গীত সাধারণত মানসিক চাপ (Stress) কমাতে সাহায্য করে। কারণ এগুলো মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রকে ধীরে ধীরে শান্ত অবস্থায় নিয়ে আসে।
উদ্দীপনামূলক সঙ্গীত (Energizing Music)
যখন মানুষের শক্তি বা কাজের আগ্রহ কমে যায় তখন দ্রুত তালযুক্ত সঙ্গীত মানুষের মধ্যে উদ্যম তৈরি করতে পারে।
এই ধরনের সঙ্গীত—
💟উদ্যম বাড়ায়
💟শারীরিক শক্তি বাড়ায়
💟কাজ করার আগ্রহ বৃদ্ধি করে
এই কারণেই অনেক মানুষ ব্যায়াম করার সময় দ্রুত তালযুক্ত গান শুনতে পছন্দ করেন।
আবেগ স্পর্শকারী সঙ্গীত
কিছু গান মানুষের আবেগকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
এই ধরনের সঙ্গীত শুনলে অনেক সময় মানুষ—
কাঁদে
💟পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে
💟জমে থাকা কষ্ট বের হয়ে আসে
মনোবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় আবেগীয় মুক্তি (Emotional Catharsis)।
এই প্রক্রিয়া মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দৈনন্দিন জীবনে সঙ্গীতকে থেরাপি হিসেবে ব্যবহার
সঙ্গীতভিত্তিক থেরাপি সবসময় থেরাপিস্টের কাছে বসে করতে হয় না। আমরা চাইলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও সঙ্গীতকে মানসিক সুস্থতার একটি সহজ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।
সকালে হালকা সঙ্গীত দিয়ে দিন শুরু
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে বিশ্রামের অবস্থা থেকে সক্রিয় অবস্থায় আসে।
এই সময় হালকা সঙ্গীত শুনলে মস্তিষ্ক সতেজ হয় এবং দিনের শুরু ইতিবাচকভাবে হয়।
কাজের মাঝে ছোট সঙ্গীত বিরতি
দীর্ঘ সময় কাজ করলে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে যায়।
১০ মিনিট সঙ্গীত শুনলে মস্তিষ্কের সতেজতা ফিরে আসে এবং কাজের প্রতি মনোযোগ (Focus) বাড়ে।
হাঁটার সাথে সঙ্গীত
হাঁটা নিজেই একটি শক্তিশালী মানসিক থেরাপি।
যদি হাঁটার সাথে সঙ্গীত যুক্ত করা হয় তাহলে শরীরে ডোপামিন (Dopamine) নিঃসরণ বাড়ে এবং মন ভালো হয়।
রাগ নিয়ন্ত্রণে সঙ্গীত
রাগের সময় মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র অ্যামিগডালা (Amygdala) অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে যায়।
এই সময় শান্ত সঙ্গীত শুনলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে শান্ত হয় এবং হঠাৎ প্রতিক্রিয়া কমে যায়।
ঘুমের আগে সঙ্গীত
ঘুমানোর আগে ধীর সুরের সঙ্গীত শুনলে মস্তিষ্ক বিশ্রামের অবস্থায় চলে যায়।
ফলে—
💟ঘুমের মান (Sleep Quality) উন্নত হয়
💟দ্রুত ঘুম আসে
💟রাতের অস্থিরতা কমে
পড়াশোনার সময় সঙ্গীত
হালকা যন্ত্রসংগীত অনেক সময় মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।
এটি মস্তিষ্কে আলফা তরঙ্গ (Alpha Brain Waves) তৈরি করে যা মনকে শান্ত ও মনোযোগী করে।
আত্মবিশ্লেষণে সঙ্গীত
অনেক সময় শান্ত সঙ্গীত শুনতে শুনতে মানুষ নিজের জীবনের বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে।
এই সময় ডায়েরি লেখা বা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা মানসিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
পারিবারিক সম্পর্ক উন্নত করতে সঙ্গীত
সঙ্গীত শুধু ব্যক্তিগত আনন্দ নয়, এটি মানুষের সম্পর্কও শক্তিশালী করতে পারে।
যদি পরিবারের সবাই একসাথে গান শোনে বা গায় তাহলে পারিবারিক যোগাযোগ ও আবেগীয় বন্ধন বাড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে একসাথে গান গাওয়ার সময় মানুষের শরীরে অক্সিটোসিন (Oxytocin) নামের একটি হরমোন বাড়ে যা মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ও ভালোবাসা তৈরি করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক সত্য সঙ্গীতের শক্তি শুধু শব্দে নয়। এর আসল শক্তি হলো—এটি সরাসরি মানুষের লিম্বিক সিস্টেম (Limbic System) স্পর্শ করে।
এই অংশটি মানুষের—
আবেগ (Emotion), স্মৃতি (Memory) , প্রেরণা (Motivation) নিয়ন্ত্রণ করে।
এই কারণেই—
একটি গান মানুষকে কাঁদাতে পারে। একটি সুর পুরনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারে। আবার একটি গান মানুষকে নতুন করে শক্তি দিতে পারে।
সঙ্গীত মানুষের জীবনে শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি মানুষের মন, মস্তিষ্ক এবং আবেগের সাথে গভীরভাবে যুক্ত একটি শক্তিশালী মানসিক প্রভাবক।
সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সঙ্গীত হতে পারে—
💟️মানসিক চাপ (Stress) কমানোর উপায়
️💟বিষণ্নতা (Depression) মোকাবেলার সহায়ক মাধ্যম
️💟উদ্বেগ (Anxiety) নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি
️💟মনোযোগ বৃদ্ধি করার উপায়
💟ঘুমের সহায়ক থেরাপি
অর্থাৎ সঙ্গীত মানুষের মানসিক সুস্থতা রক্ষার একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী উপায়।
এই কারণেই অনেক মনোবিজ্ঞানী বলেন— “সঠিক সঙ্গীত কখনো কখনো মনের জন্য ওষুধের মতো কাজ করতে পারে।”