আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু নিরপেক্ষ সত্য খুঁজে পাওয়াটা এখন হিমালয় জয়ের মতোই কঠিন। কারণ সত্য প্রায়ই হয় অমীমাংসিত, কঠিন এবং প্রচণ্ড অস্বস্তিকর। অন্যদিকে, এআইএর তৈরি করা "সাজানো উত্তরগুলো" আমাদের মানসিক স্বস্তি দেয়।

​প্রযুক্তি আমাদের উত্তর দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমরা কী খুঁজছি সেটাই নির্ধারণ করে দিচ্ছে আমরা শেষ পর্যন্ত কী পাচ্ছি। আমরা কি কেবল একটি স্বস্তিদায়ক মিথ্যার ভেতরেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি?

আজকের দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি প্রযুক্তিগত নয়, বরং একান্তই মানবিক। আমরা কি সত্যের সেই তীব্র অস্বস্তি সহ্য করতে প্রস্তুত? নাকি আমরা অ্যালগরিদমের তৈরি করা এক মায়ার জগতে নিজেদের হারিয়ে ফেলছি যেখানে প্রতিটি উত্তর আমাদের পছন্দমতো সাজানো?

আমার মতে,​ এআই আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সঙ্গী হতে পারে, তথ্যের সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সত্যকে চেনার দায়ভার একান্তই আমাদের। সেই সত্য যেটাই হোক।


1

“কিছুক্ষণও বসে থাকতে পারে না।” “দুই মিনিট পড়ল, তারপরই উঠে গেল।” এই ধরনের অভিযোগ প্রায় সব বাবা–মার কাছেই শোনা যায়। তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়—বাচ্চার মনোযোগের সমস্যা আছে, সে ঠিকভাবে concentrate করতে পারে না। কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যেটা অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না।

সব কম সময় মনোযোগ থাকা মানেই সমস্যা নয়। অনেক সময় এটা সম্পূর্ণভাবে বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক এবং মস্তিষ্কের বিকাশের (Brain Development) অংশ। অর্থাৎ, আপনি যেটাকে সমস্যা ভাবছেন, সেটা অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।

Attention Span আসলে কী?

মনোযোগের স্থায়িত্ব বা Attention Span বলতে বোঝায়—একজন মানুষ কতক্ষণ ধরে একটানা কোনো একটি কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। এটা কোনো স্থির বিষয় না, বরং সময়ের সাথে পরিবর্তন হয় এবং বয়স, আগ্রহ ও মস্তিষ্কের বিকাশের ওপর নির্ভর করে।

সহজভাবে বলতে গেলে, ছোটদের ক্ষেত্রে মনোযোগ কম সময় থাকে, আর বড় হওয়ার সাথে সাথে সেটা ধীরে ধীরে বাড়ে। তাই সবার জন্য একই expectation রাখা বাস্তবসম্মত নয়।

সহজভাবে বুঝুন

মনোযোগ সময়ের সাথে বাড়ে

সব বয়সে একই থাকে না

আগ্রহ থাকলে বেশি সময় থাকে

জোর করলে কমে যায়

বয়স অনুযায়ী মনোযোগের সময় (Age-based Attention Span)

বাচ্চাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে বিকশিত হয়, তাই ছোট বাচ্চাদের কাছ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ আশা করা ঠিক না। একটি সহজ নিয়ম হলো—বাচ্চার বয়সকে ২–৩ দিয়ে গুণ করলে প্রায় তার মনোযোগ ধরে রাখার সময় পাওয়া যায়।

যেমন, ৫ বছরের বাচ্চা সাধারণত ১০–১৫ মিনিট মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। এর বেশি আশা করলে সে অস্বস্তি বোধ করবে এবং মনোযোগ ভেঙে যাবে।

এর মানে

ছোট বাচ্চারা বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারবে না

তাদের বারবার বিরতি প্রয়োজন

বেশি চাপ দিলে উল্টো বিরক্তি বাড়বে

বিরক্তি (Boredom) না মনোযোগের সমস্যা?

অনেক সময় আমরা মনে করি বাচ্চার মনোযোগের সমস্যা আছে, কিন্তু আসলে সে বিরক্ত হয়ে গেছে। যখন কোনো কাজ তার কাছে আকর্ষণীয় লাগে না, তখন মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই সেই কাজ থেকে সরে আসে।

যদি আপনি লক্ষ্য করেন যে বাচ্চা পছন্দের কাজে অনেকক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, কিন্তু অপছন্দের কাজে পারে না—তাহলে সেটা মনোযোগের সমস্যা নয়, বরং আগ্রহের বিষয়।

লক্ষণগুলো লক্ষ্য করুন

পছন্দের কাজে দীর্ঘ সময় থাকে

অপছন্দের কাজে দ্রুত উঠে যায়

নতুন কিছু পেলে আবার মনোযোগ ফিরে আসে

বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা (Realistic Expectation) না থাকলে সমস্যা বাড়ে

অনেক সময় অভিভাবকরা বাচ্চার কাছ থেকে এমন কিছু আশা করেন, যেটা তার বয়স অনুযায়ী সম্ভব নয়। যেমন, খুব ছোট বাচ্চাকে দীর্ঘ সময় ধরে পড়তে বসানো।

এতে বাচ্চা বারবার ব্যর্থ হয়, আর সেই ব্যর্থতা থেকে হতাশা তৈরি হয়। একই সঙ্গে অভিভাবকের রাগ এবং বাচ্চার বিরক্তি—দু’টোই বাড়তে থাকে।

এর প্রভাব

বাচ্চার আত্মবিশ্বাস কমে যায়

পড়াশোনার প্রতি ভয় বা অনাগ্রহ তৈরি হয়

অভিভাবক–সন্তান সম্পর্কের মধ্যে চাপ তৈরি হয়

অতিরিক্ত স্ক্রিন (Digital Overload) মনোযোগ কমিয়ে দেয়

বর্তমানে মোবাইল, ভিডিও এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল কনটেন্ট বাচ্চাদের মস্তিষ্ককে খুব দ্রুত উত্তেজিত করে। ফলে তারা ধীর গতির কাজ, যেমন পড়াশোনা বা লেখা, এগুলোকে বিরক্তিকর মনে করে।

এর ফলে তাদের মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যায় এবং তারা দ্রুত distract হয়ে পড়ে।

এর প্রভাব

ধৈর্য কমে যায়

দ্রুত মনোযোগ ভেঙে যায়

গভীর মনোযোগ (deep focus) তৈরি হয় না

মনোযোগ বাড়ানোর ২০টি সহজ উপায় ঠিক আছে—এই অংশটা আরও বিস্তারিত, প্র্যাকটিক্যাল এবং ব্যবহারযোগ্য করে বড় করে দিলাম, আপনার স্টাইল অনুযায়ী

আগে প্যারাগ্রাফ

তারপর বড় লিস্ট

কীভাবে মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করবেন?

মনোযোগ বাড়ানো কোনো একদিনে সম্ভব না। এটা ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটি দক্ষতা (skill), যেটা নিয়মিত অভ্যাস, সঠিক পরিবেশ এবং ধৈর্যের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। অনেক সময় আমরা সরাসরি বাচ্চাকে বলি—“মনোযোগ দাও”, কিন্তু কীভাবে মনোযোগ দিতে হয় সেটা শেখাই না।

বাস্তবে মনোযোগ বাড়ানোর জন্য দরকার—

ছোট ছোট ধাপে ট্রেনিং

পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ

এবং সঠিক communication

যদি আপনি নিয়মিত কিছু সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাহলে বাচ্চার মনোযোগ ধীরে ধীরে উন্নত হতে শুরু করবে।

কী করবেন (বিস্তারিত)

ছোট সময় দিয়ে শুরু করুন

শুরুতেই দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন না। ১০–১৫ মিনিট দিয়ে শুরু করুন, তারপর ধীরে ধীরে সময় বাড়ান। এতে বাচ্চা চাপ অনুভব করবে না এবং সহজে অভ্যাস তৈরি হবে।

“Time Block” পদ্ধতি ব্যবহার করুন

একটা নির্দিষ্ট সময় (যেমন ১৫ মিনিট পড়া + ৫ মিনিট বিরতি) সেট করুন। এই রুটিন মেনে চললে brain বুঝতে শেখে কখন focus করতে হবে আর কখন relax করতে হবে।

মাঝেমধ্যে ছোট বিরতি দিন

একটানা কাজ করালে মনোযোগ ভেঙে যায়। তাই মাঝখানে ৩–৫ মিনিটের ছোট বিরতি দিন, যাতে brain refresh হতে পারে।

একসাথে একটাই কাজ করতে দিন

একই সময়ে পড়া, কথা বলা, মোবাইল দেখা—এইসব একসাথে করলে মনোযোগ ভেঙে যায়। তাই একসময় একটাই কাজ করতে শেখান।

কাজকে আকর্ষণীয় করে তুলুন

শুধু বই খুলে বসানো নয়—

গেম, ছবি, গল্প বা উদাহরণের মাধ্যমে শেখালে বাচ্চা বেশি আগ্রহ পায় এবং মনোযোগ ধরে রাখতে পারে।

Eye Contact তৈরি করে কথা বলুন

কিছু বলার আগে নিশ্চিত করুন যে বাচ্চা আপনার দিকে তাকাচ্ছে। এতে তার attention আপনার কথার দিকে আসবে।

নাম ধরে ডাকুন

সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার আগে তার নাম ধরে ডাকলে brain alert হয় এবং মনোযোগ বাড়ে।

ছোট ও পরিষ্কার নির্দেশ দিন

একসাথে অনেক কিছু না বলে, ছোট ছোট step-এ ভাগ করে বলুন। এতে বাচ্চা সহজে follow করতে পারে।

একই কাজ নিয়মিত করান (Repetition)

একই ধরনের কাজ নিয়মিত করলে brain-এ pattern তৈরি হয়, ফলে মনোযোগ ধীরে ধীরে স্থির হয়।

নির্দিষ্ট পড়ার জায়গা তৈরি করুন

একটা fixed জায়গা রাখুন যেখানে শুধু পড়াশোনা হবে। এতে brain ওই জায়গাকে “focus zone” হিসেবে চিনতে শেখে।

পরিবেশ শান্ত রাখুন

অতিরিক্ত শব্দ, টিভি, মোবাইল—এইসব distraction কমিয়ে দিন। শান্ত পরিবেশে মনোযোগ বেশি স্থির থাকে।

Screen Time নিয়ন্ত্রণ করুন

অতিরিক্ত মোবাইল বা ভিডিও দ্রুত stimulation দেয়, ফলে slow কাজ boring লাগে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্ক্রিন ব্যবহার সীমাবদ্ধ করুন।

ছোট সাফল্যে প্রশংসা করুন

বাচ্চা যদি ১০ মিনিট মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, সেটাকেই appreciate করুন। এতে তার motivation বাড়বে।

রাগ না করে ধৈর্য ধরুন

বারবার বকা দিলে বাচ্চার মনোযোগ আরও কমে যায়। শান্তভাবে guide করা বেশি কার্যকর।

Routine তৈরি করুন

প্রতিদিন একই সময়ে পড়া, খেলা, ঘুম—এই রুটিন brain-কে stable করে এবং মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।

Physical Activity (শারীরিক খেলা) বাড়ান

দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা brain-এ রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়, যা মনোযোগ উন্নত করতে সাহায্য করে।

পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন

ঘুম কম হলে brain ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। তাই বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম খুব গুরুত্বপূর্ণ।

Healthy খাবার দিন

পুষ্টিকর খাবার (fruits, nuts, protein) brain function উন্নত করে, ফলে মনোযোগ বাড়ে।

কাজকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করুন

বড় কাজ একসাথে না দিয়ে ছোট অংশে ভাগ করে দিন। এতে overwhelm কমে এবং focus বাড়ে।

নিজে উদাহরণ দিন

আপনি যদি নিজের কাজে মনোযোগী হন, বাচ্চা সেটাই শিখবে। কারণ বাচ্চারা বেশি শেখে observation থেকে।

মনে রাখুন অনেক সময় আমরা খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি যে বাচ্চার সমস্যা আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সেটা বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক।

সহজভাবে

বয়স অনুযায়ী মনোযোগ ভিন্ন হয়

আগ্রহ থাকলে মনোযোগ বাড়ে

চাপ দিলে কমে যায়

সঠিক পদ্ধতিতে উন্নতি সম্ভব

আপনার সন্তান যদি বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে না পারে, তাহলে তাকে অমনোযোগী বলে দাগিয়ে দেওয়ার আগে একটু ভেবে দেখুন—সে কি সত্যিই সমস্যার মধ্যে আছে, নাকি সে তার বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক আচরণ করছে।

এই জায়গায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য এবং সঠিক বোঝাপড়া। কারণ আপনি যদি বাস্তবসম্মতভাবে বিষয়টা দেখেন, তাহলে চাপ কমবে এবং ধীরে ধীরে মনোযোগও বাড়বে।

@ মনের কথা 


2

খৃস্টীয় ষোড়শ শতাব্দির শেষভাগে একদল পর্তুগীজ বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূলে আরাকানে আশ্রয় লয়, এবং আরাকানের মগ রাজার এবং চাটগাঁর মগরাজ প্রতিনিধির অধীনে বাস করিতে থাকে।–কর্ণফুলী নদীর মুখে চাটগাঁ শহরের কাছে এই ফিরিঙ্গিদের পৃথক গ্রাম ছিল, নাম ফিরিঙ্গি বন্দর। আরাকান হইতে মগ ও ফিরিঙ্গিগণ প্রতি বৎসর জলপথে বাংলায় ডাকাতি করিতে আসিত। হিন্দু মুসলমান, স্ত্রী পুরুষ, ধনী দরিদ্র যাহাকে পাইত বন্দী করিত এবং তাহাদের হাতের পাতা ফুটা করিয়া তাহার মধ্যে পাতলা বেত চালাইয়া দিয়া বাঁধিয়া নৌকার পাটাতনের নিচে ফেলিয়া লইয়া যাইত। যেমন খাঁচার মধ্যে মুরগীকে দানা ফেলিয়া দেওয়া হয়, তেমনি এদের জন্য প্রাতে ও সন্ধ্যায় কাঁচা চাউল ফেলিয়া দেওয়া হইত। এ কষ্ট ও অত্যাচারে অনেকে মরিয়া যাইত; যে কয়টি ‘শক্ত প্রাণ’ লোক বাঁচিয়া যাইত তাহাদের চাষবাস ও অন্যান্য নীচ কাজের জন্য দাসভাবে রাখিত, অথবা ইংরেজ, ফরাসি ও ডাচ বণিকদের নিকট দাক্ষিণাত্যের বন্দরে বিক্রয় করিত। এইরূপে ক্রমে মগ ও ফিরিঙ্গিগণের সংখ্যা ও সম্পদ বাড়িতে লাগিল আর বাঙ্গালা দিন দিন জনশূন্য ও উচ্ছন্ন হইতে লাগিল। চাটগাঁ হইতে ঢাকা পর্যন্ত দস্যুদের যাতায়াতের পথে নদীর দু’ধারে একটিও বাড়ি রহিল না।

সপ্তদশ শতাব্দির মাঝামাঝি চাটগাঁয় ফিরিঙ্গিদের ১০০ দ্রুতগামী অস্ত্রপূর্ণ যুদ্ধপোত (নাম: জলবা) ছিল। ফিরিঙ্গিরা তাঁহার চাকর এবং তাহাদের যথেষ্ঠ নৌকা ছিল বলিয়া, আরাকানের রাজা ইদানিং নিজের নৌকা বাংলায় পাঠাইতেন না; কেবল ফিরিঙ্গিদের দিয়া লুঠ করাইয়া তাহার অর্ধেক ভাগ লইতেন, ১৬৬৫ খৃ. শেষে যখন শায়েস্তা খাঁ চাটগাঁ জয় করিবার আগে লোভ দেখাইয়া ভাঙ্গাইয়া ঢাকায় আনিলেন, তখন প্রথম রাত্রে দরবারে তাহাদের জিজ্ঞাসা করিলেন: মগরাজ তোমাদের বাংলায় লুটতরাজের জন্য কি বেতন দিতেন? তাহারা উত্তর করিল, মোগল রাজ্যে আমাদের বেতন ছিল। আমরা সমস্ত বাঙ্গালাকে আমাদের জাগীর বলিয়া মনে করিতাম,এবং বারোমাসে মহাসুখে আমাদের খাজনা (অর্থাৎ লুঠ) আদায় করিতাম। আমলা, আমীন, জরীপ, জমাবন্দী, ওয়াশিল বাকির ধার ধারিতাম না। মগরাজার সঙ্গে লুঠের আধাআধি ভাগ হইত; তাহার চল্লিশ বৎসর ধরিয়া হিসাবপত্র আমাদের কাছে আছে।

---

# শিহাব উদ্দিন তালিশ, “ফতিয়া ই ইবরিয়া” থেকে হুবহু

অনু: স্যার যদুনাথ সরকার,


3

পানের সাথে বা খাওয়ার পরে সুপারি খান? আজ থেকে আর খাবেন না।

ভারত ও বাংলাদেশে সুপারি খাওয়ার একটি দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। বিয়ে-শাদি থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন, দৈনন্দিন অভ্যাস—সব ক্ষেত্রেই পান সুপারি অনেকের সাথি। অনেকের কাছে এটি শুধু মুখরোচক বা হালকা উত্তেজক, আবার কারও কাছে খাবারের পর “হজমের সহায়ক” বলেও বিবেচিত। কিন্তু এই পরিচিত অভ্যাসটির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক গভীর বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা, যা আমাদের সচেতনতার অভাবে বহুদিন ধরেই অবহেলিত।

সুপারি একটি গাছের ফল, যার বৈজ্ঞানিক নাম Areca catechu, আসলে এমন এক রাসায়নিক উপাদানের ভাণ্ডার যা মানবদেহের উপর ধীরে কিন্তু নিশ্চিত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এর প্রধান সক্রিয় উপাদান arecoline স্নায়ুতন্ত্রকে উত্তেজিত করে সাময়িক ভালো লাগা তৈরি করলেও, একই সঙ্গে এটি কোষের ভেতরে ক্ষতিকর জৈব-রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করে।

সুপারি চিবানোর সময় এর রস মুখের নরম টিস্যুর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ সংস্পর্শে থাকে এবং সেই সংস্পর্শ থেকেই শুরু হয় কোষের স্তরে ক্ষয়। এই রাসায়নিকগুলি DNA-র গঠনকে পরিবর্তিত করে, যার ফলে কোষের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই কারণেই World Health Organization সুপারিকে সরাসরি ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পদার্থ মানে কারসিনোজেন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এই ক্ষতির একটি বিশেষ রূপ হলো Oral Submucous Fibrosis— ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এমন এক রোগ, যেখানে মুখের ভেতরের টিস্যু শক্ত হয়ে যায়, স্থিতিস্থাপকতা হারায় এবং শেষ পর্যন্ত মুখ খোলা পর্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। প্রথমদিকে সামান্য জ্বালা বা অস্বস্তি দিয়ে শুরু হলেও, এটি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে স্বাভাবিকভাবে খাওয়া বা কথা বলাও অসম্ভব হয়ে যায়, এবং এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়।

শুধু মুখগহ্বরেই নয়, সুপারি পুরো শরীরের উপর প্রভাব ফেলে। arecoline স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে সিমপ্যাথেটিক কার্যকলাপ বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। তাই দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে এটি মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে এক ধরনের নীরব আসক্তি তৈরি করে, যা অনেকেই বুঝতে পারেন না, কারণ এটি ধূমপানের মতো নয়।

ধীরে ধীরে এই অভ্যাস এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে সুপারি ছাড়া অস্বস্তি হয়, মনোযোগের ঘাটতি বা খিটখিটে ভাব দেখা দেয়। মানে অভ্যাস নেশাতে পরিনত হয়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গর্ভাবস্থায় সুপারি গ্রহণ ভ্রূণের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করতে পারে, কম ওজন নিয়ে জন্ম বা অকাল প্রসবের ঝুঁকি বাড়ায়—অর্থাৎ এর প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

এই সমস্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ একসঙ্গে আমাদের স্পষ্ট বার্তা দেয়—সুপারি খাওয়া কোন ভালো সামাজিক অভ্যাস নয়, বরং একটি ধীরে কাজ করা স্বাস্থ্যঝুঁকি। আমাদের সমাজে সুপারি খাওয়া যতটাই স্বাভাবিক বলে মনে হোক না কেন, বাস্তবে এর “নিরাপদ মাত্রা” বলে কিছু নেই। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সচেতনতা।

তাই সুপারি খাওয়ার প্রচলিত অভ্যাসকে ত্যাগ করা, এর ক্ষতিকর দিকগুলি সম্পর্কে পরিবার পরিজন ও সমাজের সর্বসময়ের মানুষকে জানানো এবং ধীরে ধীরে এই অভ্যাস থেকে সরে আসা। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তই এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিতে পারে—কারণ একটি ছোট অভ্যাস ত্যাগ করার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতে ক্যানস্যারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।

লেখা পঞ্চানন মণ্ডল 

4

একটা ইঁদুর শস্যের গুদামে ঢুকে পরেছিল।

সেখানে  ৫ টন খাদ্যশস্য ছিল।

একটি ছোট্ট একটা ফাটল দিয়ে ইঁদুরটি  ভিতরে প্রবেশ করেছিল। তখন ইদুরটি অনেক চিকন ছিল। এইজন্য সে খুব সহজেই ছোট জায়গাটি দিয়ে আসা যাওয়া করতে পারত।

কিন্তু ভেতরে গিয়ে এত খাদ্যশস্য দেখে ও পাগল হয়ে গেল এবং  পাগলের মত সেগুলো খেতে শুরু করলো।

দিনরাত শুধু খেতেই লাগলো।

আর ধীরে ধীরে ওর শরীর মোটা হওয়া শুরু হলো।

একমাস পর ওর খাওয়ার চিন্তা দূর হয়ে গেল। ওর মনে হলো ও জান্নাতে বসবাস করছে।

না কোন বিড়ালের ভয়, না কোন খাবারের চিন্তা, না কোন পরিশ্রম।

শুধু খাওয়া আর খাওয়া।

কিন্তু একদিন হঠাৎ তার বাড়ির কথা মনে পড়ল।

ও দৌড়ে সেই  ফাটলটির দিকে ছুটলো কিন্তু ওর শরীর অত্যাধিক মোটা হওয়ার কারণে ছোট ফাটলটি দিয়ে বের হতে  পারল না।

ওর মোটা শরীর দেয়ালটিতে ফেঁসে গিয়েছিল।

এটা সেই চর্বি  ছিল যেটা ও আরাম আর লোভ করে কামিয়ে ছিল।

এখন বাঁচার  একটাই পথে ছিল, আবার চিকন হওয়া।

কিন্তু চারপাশে এত খাবার দেখে ইঁদুরটি  নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারল না।

সে ভয় পাওয়া সত্ত্বেও শুধু খেতেই লাগলো।

আর ধীরে ধীরে ও নিজের বাঁচার রাস্তা বন্ধ করে দিল।

psychological একে

          Didero Effect বলে।

যখন মানুষ অনেক বেশি কিছু পায়, তখন তার প্রয়োজনও আরো বেড়ে যায় এবং সে নিজেকে একটা তার নিজের  বানানো জালের  মধ্যেই ফাঁসিয়ে ফেলে।

বাস্তব জীবনে এটাই হয়,

যখন  আকাঙ্ক্ষা প্রয়োজনের চেয়েও বেশি হয়ে যায়,

তখন সেটা আর কমানো যায় না।

মনে রেখো শক্তি কেবলমাত্র সবকিছু পাওয়ার মধ্যে নয়,

বরং প্রয়োজনের সময় কিছু জিনিস ছেড়েও দিতে হয়।

Follow লক্ষ্যপথ

5


স্মৃতি–শক্তি বৃদ্ধিতে

আপনি কি পারফিউম পছন্দ করেন? নিশ্চয়ই হ্যাঁ, সেটা কে না করে। তবে আপনি যদি ঘুমানোর আগে আপনার ঘরে কিছু নির্দিষ্ট পারফিউম ছড়িয়ে দেন, তবে আপনার মস্তিষ্কের বিরাট পরিবর্তন হতে পারে বলে জানিয়েছে নতুন গবেষনা।

University of California - এর গবেষনা অনুযায়ী আপনি যদি গোলাপ, লেবু, কমলা, ল্যাভেন্ডার এরকম কিছু পারফিউম ছড়িয়ে দিয়ে ঘুমান তবে আপনার সিদ্ধান্ত নেয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, আপনার মেমোরি বৃদ্ধি পাবে, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, যারা এটি অবলম্বন করেছে এবং যারা করে নি কিংবা দুর্গন্ধযুক্ত ঘরে ঘুমিয়েছে তাদের mental ability এর মধ্যে স্পষ্ট ভাবে ২২৬% এর তফাৎ পাওয়া গেছে। এছাড়াও বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের ডিমেনশিয়া এর মত যে রোগ হয়, সেগুলোর গতিও অনেকটা কমিয়ে দিতে পারে এই প্রক্রিয়াটি বলে জানিয়েছে গবেষকরা।

বেশি কষ্ট করতে হবে না, শুধু এই ধরনের সুগন্ধি গুলো ছড়িয়ে দিয়ে ঘুমান। নির্দিষ্ট সময় পর নিজেই নিজের পরিবর্তন দেখে নিন।

Team Science Bee

World Vision (বিশ্ব দর্শন)

6

ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই বহু পুরনো, কিন্তু গত কয়েক দশকে সেই যুদ্ধ ভয়ংকরভাবে জটিল হয়ে উঠেছে “অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স” নামের এক নীরব বিপর্যয়ে। এমন অসংখ্য জীবাণু তৈরি হয়েছে, যাদের ওপর প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক আর ঠিকমতো কাজই করে না; চিকিৎসাবিজ্ঞান এদেরই বলে সুপারবাগ। তাই নতুন কোনো জীবাণুনাশক প্রযুক্তি মানেই এখন শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন। এই অবস্থায় দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানীরা গ্রাফিন অক্সাইড নামের এক-পরমাণু পুরুত্বের কার্বন-উপাদানের ভেতরে এমন এক আচরণ শনাক্ত করেছেন, যা আধুনিক চিকিৎসার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। তারা দেখিয়েছেন, এই অতি সূক্ষ্ম ন্যানোম্যাটেরিয়াল ব্যাকটেরিয়াকে নিখুঁতভাবে টার্গেট করে ধ্বংস করতে পারে, অথচ মানবদেহের কোষকে ক্ষতি করে না। অর্থাৎ এটি সাধারণ জীবাণুনাশকের মতো অন্ধ আক্রমণ চালায় না; বরং যেন আগে শত্রুকে শনাক্ত করে, তারপর আঘাত হানে। এতদিন গ্রাফিনের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা থাকলেও কেন এটি মানুষের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ—তার সুস্পষ্ট অণু-স্তরের ব্যাখ্যা ছিল না। নতুন গবেষণা সেই অন্ধকার ঘরেই আলো জ্বালিয়েছে।

বিষয়টি আসলে আরও দারুণ, কারণ এখানে গ্রাফিন অক্সাইড কোনো রাসায়নিক বিষের মতো কাজ করছে না; এটি ব্যবহার করছে বুদ্ধিমান জৈব-নির্বাচন। ব্যাকটেরিয়ার কোষঝিল্লিতে POPG নামের একটি বিশেষ ফসফোলিপিড থাকে, যা মানবকোষে থাকে না বললেই চলে। গ্রাফিন অক্সাইডের গায়ে থাকা অক্সিজেন-সমৃদ্ধ গ্রুপগুলো ঠিক এই POPG-কে শনাক্ত করে ব্যাকটেরিয়ার ঝিল্লিতে আটকে যায়, তারপর ঝিল্লির গঠন ভেঙে ফেলে। ফলে জীবাণুর প্রতিরক্ষাবর্ম মুহূর্তে দুর্বল হয়ে যায় এবং কোষটি ধ্বংস হয়। পুরো ব্যাপারটা যেন এমন—একজন নিরাপত্তারক্ষী ভিড়ের মধ্যে শুধু অপরাধীর পোশাক চিনে তাকে ধরে ফেলছে, বাকিদের একবারও স্পর্শ করছে না। এ কারণেই গবেষকরা একে selective antibacterial action বা নির্বাচনী জীবাণুনাশক আচরণ বলেছেন। এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু জীবাণু মারাই নয়, সেই সঙ্গে রোগীর সুস্থ কোষকে বাঁচিয়ে রাখা। গ্রাফিন অক্সাইড ঠিক সেই দুই প্রান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এমন এক সমাধান দেখাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের “স্মার্ট অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল” উপাদানের ভিত্তি হতে পারে।

শুধু ল্যাবের পরীক্ষানলেই নয়, বাস্তব প্রয়োগেও এর ফল আশাব্যঞ্জক। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রাফিন অক্সাইড-যুক্ত ন্যানোফাইবার অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী নানা সুপারবাগের বৃদ্ধি বন্ধ করে দিতে সক্ষম। প্রাণী মডেলে ক্ষতের ওপর এটি ব্যবহার করলে প্রদাহ না বাড়িয়ে বরং ক্ষত দ্রুত শুকাতে সাহায্য করেছে, যা wound-healing material হিসেবে এর সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করে। আরও বড় সুবিধা হলো—এই উপাদান বারবার ধোয়ার পরও তার জীবাণুনাশক ক্ষমতা ধরে রাখে। ফলে এটি কেবল মেডিক্যাল ব্যান্ডেজে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভবিষ্যতে টুথব্রাশ, মাস্ক, হাসপাতালের পোশাক, খেলাধুলার ইউনিফর্ম, এমনকি শরীরে পরিধানযোগ্য স্বাস্থ্য-মনিটরিং ডিভাইসের কাপড়েও ঢুকে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়েছে, এবং গবেষকদের মতে এটি অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প না হলেও অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেওয়ার মতো এক নতুন প্রতিরক্ষা-স্তর তৈরি করতে পারে। সহজ ভাষায় বললে, ভবিষ্যতে হয়তো আমরা শুধু ওষুধ খেয়ে জীবাণুর সঙ্গে যুদ্ধ করবো না—আমাদের পোশাক, ব্রাশ, ব্যান্ডেজ আর দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্রই জীবাণুর বিরুদ্ধে নীরব সৈনিক হয়ে দাঁড়াবে।

**নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র (Sources/References):**

• ScienceDaily, 26 April 2026

• Korea Advanced Institute of Science and Technology official research release

• Sujin Cha et al., *Advanced Functional Materials* (2026)

• Nanowerk Nanotechnology Spotlight coverage

7

মীরজাফর সবে মাত্র নবাব হয়েছেন। ইংরেজদের সাথে চুক্তির তিন কোটি টাকা মেটাতে গিয়ে তার তহবিল শূন্য হয়ে গেল। নবাবের সৈন্যবাহিনীর ঘোড়সওয়াররা মাইনে না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠল। ফলে নবাবী সৈন্যবাহিনী ভেঙে পড়ল।

নবাবের সেই দুরবস্থায় সুযোগ বুঝে বহু জমিদার ও ফৌজদারেরা নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল।

নবাব তখন বিদ্রোহীদের দমন করতে গিয়ে ইংরেজ ফৌজ ব্যবহার করতে বাধ্য হলেন।

গোরা ও তেলেঙ্গা সৈন্যদের সমস্ত খরচ নবাবকেই বহন করতে হবে, এই শর্তে ক্লাইভ নবাবকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসলেন। বিদ্রোহীরা তখনকার মত শায়েস্তা হল বটে, কিন্তু যুদ্ধের খরচ মেটাবার জন্য পর্যাপ্ত টাকা ছিল কোথায়? মীরজাফর ‘বর্ধমান’ ও ‘নদীয়া’  জেলার গোটা খাজনা ইংরেজদের নামে লিখে দিতে বাধ্য হলেন।

নবাবের খাজনা আদায়ের শাসনযন্ত্রে সেই যে ইংরাজদের প্রবেশ শুরু হল, এরপরে ধীরে ধীরে সারা ‘দেওয়ানী’ ও ‘নিজামত’ ইংরেজদের হাতে সম্পূর্ণভাবে চলে গেল। তখন থেকেই নবাবী শাসনযন্ত্র ক্রমশঃ অচল হয়ে পড়তে শুরু করল। নবাবের দরবারের সব ওমরাওরা তখন থেকেই উপলব্ধি করতে পারছিলেন যে তাঁদের দিন ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে।

পলাশীর ষড়যন্ত্রে যেসব মনসবদারা মীরজাফরকে সাহায্য করেছিলেন, তারা বুঝে গেল যে মীরজাফর ইংরেজদের ‘ঠুটো জগন্নাথ’ মাত্র। তার হাত থেকে তাদের কোন কিছুই প্রাপ্তির কোন সম্ভাবনা নেই। মীরজাফরের এক বন্ধু আশা করেছিলেন যে নতুন নবাব তাকে যথোচিত পুরস্কার দেবেন।

কিন্তু তিনি কিছুই পেলেন না। আশাহত সেই আমীর, নতুন নবাবের নবাবিয়ানা ভেতর থেকে যে কতটা ফাঁপা, সেটা প্রকাশ্য দরবারে বাজিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।

ওই ঘটনার আগের দিনই ক্লাইভের লোকজনদের সঙ্গে সেই আমীরের লোকজনদের প্রকাশ্যে হাতাহাতি হয়ে গিয়েছিল। পরের দিন সকালে নবাব মীরজাফর তার পুরনো বন্ধুর দিকে রক্ত চক্ষে তাকিয়ে বলেছিলেন, “জনাব, কর্নেল সাহেবের লোকেদের সঙ্গে কাল আপনার লোকেরা ঝগড়া বাঁধিয়েছিল। জনাবের কি জানা আছে, এই কর্নেল ক্লাইভ কে? জান্নাতের হুকুমে জাহানে তাঁর কি জায়গা?”

নবাবের পুরানো বন্ধু ‘মির্জা শামসুদ্দিন’ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সবার সামনেই উত্তর দিয়েছিলেন, “হুজুর নবাব বাহাদুর, কর্নেলের সঙ্গে ঝগড়া করব আমি? এই আমি? যে রোজ সকালে উঠে তার গাধাটাকে পর্যন্ত তিন বার সলাম না করে কোনো কাজ করে না? তবে কোন সাহসে আমি গাধাটার সওয়ারের সঙ্গে লাগতে যাবো?”

মীরজাফর ‘আলিবর্দি খানের’ মতো ‘মহাবৎ জঙ্গ’ নামে খ্যাত হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ‘ক্লাইভের গাধা’ নামে শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রসিদ্ধি হয়েছিল।

রাজকার্যে বীতশ্রদ্ধ হয়ে মীরজাফর ‘ভাঙ’ খেয়ে চুর হয়ে থাকতেন। লোকে তাঁর ছেলে ‘মীরন’কে বলত ‘ছোট নবাব’। যত দিন সেই নিষ্ঠুর নবাবজাদা বেঁচেছিলেন তত দিন প্রকৃতপক্ষে তিনিই মীরজাফরের হয়ে রাজকার্য চালিয়ে গেলেন। তার হুকুমে ‘ঘসেটি বেগম’ ও ‘আমিনা বেগম’ - দুই নবাবনন্দিনীকে জলে ডুবিয়ে মারা হল।

‘ঘসেটি বেগম’ তাঁর সমস্ত লুকানো ধনরত্ন দিয়ে মীরজাফরকে পলাশীর ষড়যন্ত্রে সাহায্য করেছিলেন।

শোনা যায় যে, জলে ডুবে মরবার আগে ওই দুই বোন মীরনের মাথায় ‘বজ্রাঘাতের’ অভিসম্পাত করে গিযেছিলেন।

মীরনের সব দুষ্কার্যের সাথী ছিলেন ‘খাদেম হোসেন খান। নয়া জমানায় সেই ‘খাদেম হোসেন খান’ ‘পূর্ণিয়ার ফৌজদার’ হয়ে বসলেন। তারপর মীরন ও খাদেম হোসেন খানের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে গেল। বিদ্রোহী খাদেম হোসেন খানের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে খোলা মাঠে তাঁবুর মধ্যে ‘বজ্রাহত’ হয়ে মীরন মৃত্যুর মুখে পতিত হলেন।

ইংরেজদের টাকা মেটাতে না পারায় মীরজাফর প্রথমে মসনদচ্যুত হলেন। তারপরে আবার ইংরেজদের কৃপায় তিনি মসনদে বসেছিলেন, শেষে মীরজাফর ‘কুষ্ঠ রোগে’ মরেছিলেন। শেষের দিকে তিনি একপ্রকার মরিয়া হয়ে ইংরেজদের একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আপনারা কি ভাবেন টাকার বৃষ্টি হয়?”

পলাশীর অপর নায়ক ছিলেন ‘রায় দুর্লভ’। নতুন নবাব ও তাঁর নতুন দেওয়ানের মধ্যে দু’ দিন যেতে না যেতেই মারাত্মক রেষারেষি শুরু হয়ে গেল। মীরজাফর সন্দেহ করলেন যে, রায় দুর্লভ সিরাজের ছোট ভাই ‘মীর্জা মেহদী’কে মসনদে বসিয়ে নিজে রাজত্ব করবার মতলব আঁটছেন।

সন্দেহের বশবর্তী হয়ে মীরন সেই নিরাপরাধ তরুণকে হত্যা করেন। এরপর রায় দুর্লভের উপরে চোরা গোপ্তা আঘাত হানবার ফিকির খুঁজতে থাকেন।

ক্লাইভের কৃপায় রায় দুর্লভের প্রাণ রক্ষা হয়েছিল। কিন্তু তারপরেই মীরন ঢাকার ‘রাজবল্লভ’কে ডেকে এনে রায় দুর্লভকে তার হাতে রাজকার্য তুলে দেবার হুকুম দিলেন। ফলে রায় দুর্লভের দু’ দিনের দেওয়ানী ঘুচে গেল। রায় দুর্লভ কলকাতায় পালিয়ে গিয়ে নিজের ধন প্রাণ বাঁচাতে সমর্থ হলেন।

যদিও তার সঞ্চিত ধন তাঁর উত্তরপুরুষদের ভোগে লাগে নি। ছেলে ‘রাজবল্লভ’ ইংরেজ আমলে ‘রায় রায়ান’ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর একমাত্র সন্তান ‘মুকুন্দবল্লভ’ তাঁর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ায় রায় দুর্লভের বংশ চিরতরে লোপ পেল।

সিরাজের বিশ্বস্ত প্রধানমন্ত্রী ‘মোহনলাল কাশ্মীরী’কে রায় দুর্লভ বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন। পলাশীর যুদ্ধের ঠিক আগে নিযুক্ত সিরাজের আরেক বিশ্বস্ত কাবুলী সেনাপতি ‘খাজা আবদুল হাদি খান’কে মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেন। ঢাকার ভূতপূর্ব নায়েব ‘রাজবল্লভ সেন’ পরে ‘পাটনার নায়েব’ হলেন। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত মীরকাশিমের হুকুমে গঙ্গাবক্ষে সলিল সমাধি প্রাপ্ত হলেন।

হুগলীর অস্থায়ী ফৌজদার ‘নন্দকুমার’ পরে মীরজাফরের  ‘দেওয়ান’ হয়েছিলেন। তিনিও শেষ পর্যন্ত ‘ওয়ারেন হেস্টিংসের’ ষড়যন্ত্রের বলি হয়ে ফাঁসিতে প্রাণ দিয়েছিলেন। সিরাজের অতি বিশ্বস্ত গুপ্তচর ও ‘পাটনার নায়েব’ ‘রামনারায়ণ’ নবাব মীরকাশিমের হুকুমে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হলেন। অর্থাৎ পলাশীর যুদ্ধের কুড়ি বছরের মধ্যে প্রায় সমস্ত ‘মহাবৎজঙ্গী’ ওমরাওরা সমূলে বিনষ্ট ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন।

‘জগৎশেঠ মহাতাব রায়’ ও ‘মহারাজা স্বরূপচন্দের’ পরিণামও ভয়াবহ হল। নবাব মীরকাশিম আরো অনেকের সঙ্গে সেই দুই প্রধান শেঠকে গঙ্গার জলে ডুবিয়ে হত্যা করেন। ওই ঘটনায় জগৎশেঠ পরিবারের ব্যবসা যে ঘা খেল, সেটা থেকে তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারেন নি।

দেওয়ানী হাতে পেয়েই ক্লাইভ রুক্ষভাবে তাঁদের উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে রাজকোষের চাবি ছিনিয়ে নিল। রাজকোষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগের ভিত্তিতেই জগৎশেঠের বিশাল ব্যবসা গড়ে উঠেছিল। সেই সংযোগ ঘুচে যাবার পরে তাদের ব্যবসাও আর টিকে থাকে নি। ইংরেজরা অসংখ্য প্রকারে ওই পরিবারের কাছে ঋণী ছিল। সেই ঋণ তারা চরম বেইমানি দিয়েই শোধ করল।

নদীয়ার রাজা ‘কৃষ্ণচন্দ্র’ তলে তলে পলাশীর ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের সাহায্য করেছিলেন। ইংরেজরা সে সবও মনে রাখে নি। তিন কোটি টাকার দাবি মেটাতে মীরজাফর লিখে দিয়েছিলেন যে নদীয়া জমিদারীর খাজনা মুর্শিদাবাদে না গিয়ে ইংরেজদের ‘তনখা’ হয়ে কলকাতায় যাবে।

ওই টাকা আদায় করবার জন্য ইংরেজরা কৃষ্ণচন্দ্রকে অশেষ উৎপীড়ন করল।

এমন কি সনাতন হিন্দু সমাজের প্রধান ধারক ও বাহক সেই রাজার ‘জাতিনাশ’ করবার ভয় পর্যন্ত দেখানো হল। শেষে বুড়ো বয়সে তাঁর জমিদারী অপরিমেয় ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ল। রাজা মারা যাবার পরে তার বংশধরেরাও সেই জমিদারীকে আর রক্ষা করতে পারল না। ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূর্যাস্ত আইনে’ নদীয়া জমিদারীর প্রায় সব নিলাম হয়ে গেল।

© রাজিক হাসান

8

আধুনিক মুদ্রা ব্যবস্থা প্রচলনের অনেক আগে, আজটেক সভ্যতায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য নির্ধারণের এক অত্যন্ত ভিন্ন পদ্ধতি ছিল। আর যা ছিল, মুদ্রার বিকল্প হিসেবে কোকো বিনের ব্যবহার।

আজটেকদের কাছে কোকো বিন কেবল চকলেট পানীয় তৈরির উপকরণ ছিল না, বরং এটি ছিল সম্পদ, ক্ষমতা এবং আভিজাত্যের প্রতীক। এই বীজগুলো এতটাই মূল্যবান ছিল যে, এগুলো প্রায়ই বাজারে খাদ্যদ্রব্য, পোশাক এবং এমনকি বিভিন্ন সেবার বিনিময়ে লেনদেন করা হতো। প্রকৃতপক্ষে, নির্দিষ্ট পরিমাণ কোকো বিন দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো পণ্য কেনা যেত, যা অনেকটা আধুনিক দোকানের নির্ধারিত দামের মতো কাজ করত।

​কোকো বিনের এই উচ্চ মূল্যের পেছনে কারণ কেবল চকলেট তৈরির প্রধান উপাদান হিসেবে এর ভূমিকা ছিল না (যা মূলত অভিজাত শ্রেণি, যোদ্ধা এবং উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের বিলাসবহুল পানীয় হিসেবে বিবেচিত হতো), বরং এর দুষ্প্রাপ্যতা এবং নির্দিষ্ট আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠার সীমাবদ্ধতাও এর মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছিল।

একদিকে এই বীজগুলোর যেমন  ব্যপক চাহিদা ছিল, অন্যদিকে এর সরবরাহও ছিল সীমিত, যা স্বাভাবিকভাবেই এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। মজার ব্যাপার হলো, আজটেকদের কাছে সোনার অস্তিত্ব জানা থাকলেও এটি কোকো বিনের মতো দৈনন্দিন ব্যবহারিক মূল্য বহন করত না। সোনা মূলত অলঙ্কার বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো, যেখানে কোকো বিন সরাসরি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে প্রভাবিত করত।

​এই অনন্য ব্যবস্থাটি আমাদের দেখায় যে, কোনো কিছুর মূল্য সব সময় আজকের যুগের নিরিখে মূল্যবান মনে হওয়া জিনিসের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে একটি সমাজ কোন বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়, অর্থবহ এবং সহজলভ্য মনে করে তার ওপর। ভাবতে অবাক লাগে, কীভাবে একটি সাধারণ বীজের মতো বস্তু সে সময়ের অন্যতম উন্নত একটি সভ্যতার পুরো অর্থনৈতিক কাঠামো পরিচালনা করতে পারত।

9

১১ কিলোমিটার গভীরে খনন করে, ৫০০

মিলিয়ন বছরেরও পুরোনো শিলা উন্মোচন!

চরম মরুপ্রান্তরের এক প্রকল্পে চীন প্রায় ১১ কিলোমিটার গভীরে খনন করে ভূপৃষ্ঠের নিচে ৫০০ মিলিয়ন বছরের পুরোনো রহস্য উন্মোচন করেছে

কঠোর তাকলামাকান মরুভূমির কেন্দ্রস্থলে, চীনা প্রকৌশলীরা এশিয়ার অন্যতম গভীরতম কূপ খনন করে এক বিশাল সাফল্য অর্জন করেছেন—যা ভূপৃষ্ঠের অবিশ্বাস্য ১০,৯১০ মিটার গভীরে পৌঁছেছে। চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই প্রকল্পটি সম্পন্ন হতে ৫৮০ দিনেরও বেশি সময় লেগেছে এবং প্রযুক্তিকে তার সর্বোচ্চ সীমায় ঠেলে দিয়েছে। প্রচণ্ড তাপ এবং নিষ্পেষণকারী চাপের কারণে শুধুমাত্র শেষ এক কিলোমিটার খনন করতেই প্রায় এক বছর সময় লেগেছে।

ড্রিলটি নিচে নামার সময় ১২টি ভিন্ন ভূতাত্ত্বিক স্তর ভেদ করে ৫০০ মিলিয়ন বছরেরও বেশি পুরোনো শিলা উন্মোচন করেছে। এত গভীরে তাপমাত্রা ২০০° সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং চাপ এতটাই তীব্র হয় যে তা ধাতুকে বিকৃত করে ফেলতে পারে। এই প্রকল্পটি কেবল একটি প্রকৌশলগত কৃতিত্বই নয়—বরং পৃথিবীর সুদূর অতীত এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোর এক বিরল জানালা খুলে দিয়েছে।

যদিও এই অভিযানটি শক্তি অনুসন্ধানে সহায়তা করে, এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্বও ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের প্রকল্পগুলো বিজ্ঞানীদের পৃথিবীর ভূত্বক বুঝতে, ভূতাপীয় শক্তির বিকাশ ঘটাতে এবং ভূগর্ভে মানুষের অর্জনের সীমানা প্রসারিত করতে সাহায্য করে—যা আমাদের গ্রহের গভীরতম রহস্য উন্মোচনের আরও কাছে নিয়ে আসে।

উৎস: চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (& bjn Wall)

10

Penicillin হলো বিশ্বের প্রথম সফল অ্যান্টিবায়োটিক, যা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটায়। এর আবিষ্কার আধুনিক চিকিৎসার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।

পেনিসিলিনের আবিষ্কার করেন Alexander Fleming ১৯২৮ সালে। তিনি লন্ডনের একটি ল্যাবে কাজ করার সময় লক্ষ্য করেন যে, একটি ছাঁচ (mold) ব্যাকটেরিয়া কালচারের ওপর পড়ে যাওয়ায় তার চারপাশে ব্যাকটেরিয়া মারা যাচ্ছে। এই ছাঁচটি ছিল Penicillium notatum, এবং এখান থেকেই “penicillin” নামটির উৎপত্তি।

ফ্লেমিং বুঝতে পারেন যে এই ছাঁচ থেকে একটি রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হচ্ছে, যা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম। তবে শুরুতে এর ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে সীমিত অগ্রগতি হয়েছিল, কারণ এটি বিশুদ্ধভাবে উৎপাদন করা কঠিন ছিল।

পরবর্তীতে ১৯৪০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা Howard Florey এবং Ernst Boris Chain পেনিসিলিনকে ব্যাপকভাবে উৎপাদনযোগ্য ও চিকিৎসায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি অসংখ্য সৈনিকের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ফ্যাক্ট চেক অনুযায়ী, পেনিসিলিন “হঠাৎ একদিনে” তৈরি হয়নি; বরং এটি ছিল এক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, দীর্ঘ গবেষণা এবং উন্নয়নের ফল। এছাড়া ফ্লেমিং একা এটি পূর্ণভাবে ওষুধ হিসেবে তৈরি করেননি—এর ব্যবহারিক রূপ দেন পরবর্তী বিজ্ঞানীরা। আজ Penicillin ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ যেমন নিউমোনিয়া, স্ট্রেপ ইনফেকশন এবং সিফিলিস চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পেনিসিলিনে অ্যালার্জি হতে পারে, যা চিকিৎসকদের সতর্কভাবে বিবেচনা করতে হয়।

সার্বিকভাবে, পেনিসিলিনের আবিষ্কার মানব ইতিহাসে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক বিপ্লব। এটি প্রমাণ করে যে, একটি ছোট পর্যবেক্ষণও পুরো বিশ্বকে পরিবর্তন করতে পারে। @ Voice of Pipul


11

আঠারোশ শতকের দিকে 'চিজ ​​পয়জন' নামে পরিচিত দুগ্ধজাত এক রহস্যময় বিষ এক সময় বহু আমেরিকানকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। অনেকে এটাকে প্রকৃতি বা ঈশ্বরের অভিশাপ হিসেবে ভয় পেত। তবে ঐ ঘটনাটি আমেরিকায় খাদ্য নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় এক বিপ্লবের সূচনা করেছিল।

উনিশ শতকের শেষের দিকে, মিশিগানের গ্রামীণ অঞ্চল টাইরোটক্সিজম বা 'চিজ পয়জন' নামে পরিচিত এক ভয়াবহ মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছিল। আপাতদৃষ্টিতে তাজা দুগ্ধজাত পণ্য গ্রহণকারী পরিবারগুলো হঠাৎ করে তীব্র বমি বমি ভাব, সায়ানোসিস (ত্বকের নীলচে ভাব) এবং 'নার্ভাস প্রোস্ট্রেশন' (মানসিক অবসাদ)-এর সম্মুখীন হয়েছিল।

শুধুমাত্র ১৮৮৪ সালের একটি প্রাদুর্ভাবেই প্রায় ৩০০ জন আক্রান্ত হয়েছিল।  এর জন্য দায়ী ছিল টাইরোটক্সিকন নামক বিষ, যা অস্বাস্থ্যকর দুগ্ধ কারখানার গাঁজন পাত্রে বংশবৃদ্ধি করত।

আধুনিক রেফ্রিজারেশনের আবির্ভাবের আগে, এই ছোট আকারের কারখানাগুলো নিজের অজান্তেই ব্যাকটেরিয়াঘটিত পচনের প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। যা চীজের মতো একটি পুষ্টিকর খাদ্যকে রাসায়নিক অস্ত্রে পরিণত করেছিল।

অবশেষে ১৮৮৫ সালে বিজ্ঞানী ভিক্টর সি. ভন এই রহস্য উন্মোচন করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, এই অসুস্থতা কোনো অভিশাপ নয়, বরং রেখে দেওয়া দুধে ব্যাকটেরিয়ার পচনের ফল। তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা খাদ্যবাহিত অসুস্থতা সম্পর্কে জনসাধারণের ধারণাকে অলৌকিক ভয় থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্বাস্থ্যবিধির দিকে পরিবর্তন করে দেয়।

বিংশ শতাব্দীতে পাস্তুরায়ন এবং কঠোর স্যানিটেশন মান চালু হওয়ার সাথে সাথে টাইরোটক্সিজম রোগটি সমাজ থেকে নির্মূল হয়ে যায়। আজ, এই "পনিরের বিষ" আমাদের আধুনিক খাদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কষ্টার্জিত শিক্ষার এক ভয়ংকর স্মারক হয়ে আছে, যা নিশ্চিত করে যে এক টুকরো সাধারণ চিডার পনির আর আতঙ্কের কারণ নয়।

Source : Hashem Al-Ghaili


12

থলিতে একটি ক্যাঙ্গারু শাবক। একটি বড় শাবক তখনও দুধ পান করছে। একটি ভ্রূণ সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষায় বিকাশের স্থবির অবস্থায় রয়েছে। সবই একই সময়ে। প্রকৃতি পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ শিশু উৎপাদন যন্ত্র তৈরি করেছে। স্ত্রী ক্যাঙ্গারুর শুক্রাণু পরিবহনের জন্য দুটি পার্শ্বীয় যোনি, একটি কেন্দ্রীয় প্রসব পথ এবং দুটি পৃথক জরায়ু থাকে।

শাবকটি জন্মানোর পর নিজে থেকেই হামাগুড়ি দিয়ে থলিতে প্রবেশ করে এবং কয়েক মাস ধরে ক্রমাগত বিকাশের জন্য একটি বাঁটে লেগে থাকে। এরই মধ্যে, দ্বিতীয় একটি ভ্রূণ ভ্রূণীয় সুপ্তাবস্থায় প্রবেশ করতে পারে, যা থলির শাবকটি বেরিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত তার বিকাশ থামিয়ে রাখে।

তৃতীয় একটি বড় শাবক তখনও একটি পৃথক বাঁট থেকে দুধ পানের জন্য ফিরে আসতে পারে। আশ্চর্যজনকভাবে, মা ক্যাঙ্গারু পাশাপাশি দুটি বাঁট থেকে একই সাথে দুই ধরনের দুধ উৎপাদন করে — থলির শাবক এবং বড় শাবকটির জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপাদানে তৈরি।

উৎস: অস্ট্রেলিয়ান মিউজিয়াম / জার্নাল অফ রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড ফার্টিলিটি / ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক (পিয়ার-রিভিউড মার্সুপিয়াল বায়োলজি)


13

লুৎফুন্নেসা প্রথম জীবনে ছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাবেব হারেমের একজন সাধারণ হিন্দু পরিচারিকা। তার নাম ছিল রাজকুনোয়ার। সে কি বাঙ্গালী ছিল নাকি উত্তর প্রদেশের? তা জানা যায়নি। তার শৈশবের ইতিহাস আমরা জানতে পারেনি। রাজকুনোয়ার নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার মা আমিনা বেগমের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর রূপ-সৌন্দর্য এবং মধূর ব্যবহারে সিরাজউদ্দৌল্লার আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সিরাজের অনুরোধে মা আমিনা বেগম রাজকুনোয়ারকে ছেলের সেবায় নিয়োজিত করেন। একপর্যায়ে সিরাজউদ্দৌল্লা তাঁকে বিয়ে করেন এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে নবাব তার নাম রাখেন লুৎফুন্নেসা বেগম।

অবশ্য,সিরাজউদ্দৌল্লার প্রথম বিয়ে হয়েছিল ১৭৪৬ সালে ইরাজ খানের মেয়ে উমদাতুন্নিসার বেগমের সাথে। প্রথম স্ত্রীর গর্ভে সিরাজউদ্দৌল্লার কোন সন্তান ছিলনা। উমদাতুন্নেসা বেগম সবসময় আনন্দ-বিলাসেই মগ্ন থাকতেন। ঠিক এই সময়,নবাব আলীবর্দী খাঁ নাতি সিরাজকে লুৎফুন্নেসার সাথে আবার বিয়ে দেন কোটি টাকা খরচ করে ও বিপুল উৎসব আয়োজন করে। তাঁদের ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় একমাত্র কন্যা সন্তান যোহরা। ধীরে ধীরে লুৎফুন্নেসা বেগম সিরাজউদ্দৌল্লার প্রধান স্ত্রীতে পরিণত হন। তবে তার এই সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। চারদিক থেকে ঝড় শুরু হলো। জীবন উলোট পালোট হয়ে গেল।

১৭৫৭ সাল,বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের ষড়যন্ত্রে পলাশির যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌল্লা পরাজিত হলে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি একা যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু লুৎফুন্নেসা তাঁকে সঙ্গী করার জন্য আকুল আবেদন জানান। পরে সিরাজউদ্দৌল্লা তাঁর বিশ্বস্ত স্ত্রী লুৎফুন্নেসা,মেয়ে যোহরা এবং একজন অনুগত খোজা সহ গভীর রাতে নিভৃতে মুশির্দাবাদ শহর ত্যাগ করেন। হতভাগ্য সিরাজউদ্দৌল্লা ও তার পরিবারসহ মীরজাফরের ভাই মীর দাউদের হাতে রাজমহলে ধরা পড়েন। পরে সিরাজউদ্দৌল্লাকে হত্যা করেন,আর স্ত্রী লুৎফুন্নেসাকে প্রথমে মুর্শিদাবাদ কারাগারে ও পরে ঢাকার জিনজিরা প্রাসাদে সাত বছর বন্দি করে রাখেন।

বুড়িগঙ্গার পাড়ে জিনজিরা প্রাসাদ। বাংলার মুঘল সুবহাদার ২য় ইব্রাহিম খান (১৬৮৯-১৬৯৭) তাঁর প্রমোদ কেন্দ্র হিসেবে প্রাসাদটি নির্মান করেন। ১৭৫৮ সালে মীরজাফর নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের মহিলা সদস্যদের ঢাকায় নির্বাসিত করে এই জিনজিরা প্রাসাদে থাকার নির্দেশ দেন।

ঢাকার জিনজিরার প্রাসাদ কয়েদখানার আরেক নাম। এই প্রাসাদের প্রতিটি ইটে মিশে আছে লুৎফুন্নেসা,

আমেনা বেগম,সরফুন্নেসা বেগমের বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস,

আর্তনাদ ও গোঁঙ্গানির আওয়াজ,যা আজও শুনতে পাওয়া যায়। সেই ইতিহাস আমাদের পূর্ব-পুরুষদের এক অব্যক্ত করুণ-বেদনার ইতিহাস। কারাগারে লুৎফুন্নেসা ও তাঁর ৪ বছরের শিশুকন্যা যোহরা বন্দি জীবন কাটান। সাত বছর পর ১৭৬৫ সালে ঢাকার জিনজিরার বন্দীখানা থেকে মুক্তি পেয়ে মুশির্দাবাদ গেলেন লুৎফুন্নেসা।

বাংলাদেশের আজকের রাজধানী ঢাকার গা ঘেঁষে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গার ওপাড়ে জিনজিরা প্রাসাদটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে রয়েছে অযত্নে আর অবহেলায়।

সিরাজের মৃত্যুর পরে লুৎফুন্নেসা বেগম প্রায় ৩০ বছর আরো বেঁচেছিলেন। নবাবি রাজঅন্তঃপুরের নিষ্পেশন ও জীবনের বাকি দিনগুলির নিদারুণ সংগ্রাম ও সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিয়ে কাটিয়েছিলেন। যা বর্ণনা করা খুবই অসাধ্য ব্যাপার। নবাব সিরাজউদ্দৌলার হত্যার পর মীর কাসিম লুকানো সোনা-রুপার সন্ধান চেয়ে লুৎফুন্নেসার ওপর অমানবিক অত্যাচার করেন।

এদিকে মীরজাফরের ছেলে মীরণ লুৎফুন্নেসাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং মুশির্দাবাদ নগরে অত্যন্ত অপমান জনক অবস্থায় ফেলেন। কিন্তু স্বামীর শাহাদতের পর লুৎফুন্নেসা মীরজাফর ও মীরণের বিবাহ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সারাজীবন স্বামীর কবরে পবিত্র কোরআন শরীফ পাঠ করে সময় অতিবাহিত করে গেছেন।

আসলে নবাব সিরাজের চরিত্রের বিরাট প্রভাব পড়েছিল লুৎফুন্নেসার উপর,ফলে তিনি উন্নত চরিত্র গুণাবলীর অধিকারিনী হয়েছিলেন এবং সারাজীবন সিরাজউদ্দৌলার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। লুৎফুন্নেসা খোশবাগে সিরাজউদ্দৌলার কবরের পাশে একখানি কুঁড়ে ঘর তৈরী করে বাকি জীবনটা সেখানেই কাটিয়ে দেন। তিনি ছিলেন বড় বিদূষী ও মহীয়সী নারী,যে কারণে জীবনের সব লোভ ও আয়েশ-আরাম পরিত্যাগ করে প্রিয় স্বামীর ধ্যানে কাটিয়ে দেন। তিনি মাসিক যে মাসোহারা পেতেন সেটা দিয়ে প্রতিদিন কাঙালী ভোজের ব্যবস্থা করতেন। তিনি সুদীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এভাবে স্বামীর কবরের সেবা-যত্ন করে গেছেন।

যাইহোক,নবাব আলীবর্দী এবং সিরাজউদ্দৌলার সমাধিসৌধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোম্পানি প্রতি মাসে মাত্র ৩৫০ টাকা অনুদান দিত। তা দিয়েই সমাধিস্থলে লুৎফুন্নেসা প্রতিদিন পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করতেন এবং সন্ধ্যায় সেখানে মোমবাতি জ্বেলে দিতেন। লুৎফুন্নেসার একনিষ্ঠ প্রেম,ভালোবাসা এবং ত্যাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বকালে সমুজ্জল হয়ে থাকবে।

নারী বলে পলাশীর ইতিহাসে তাঁর অস্তিত্বের উপস্থিতি তেমন বলা হয় না,কিন্তু পলাশী কখনো তাঁকে পাশ কাটিয়েও যেতে পারেনি। পলাশীর ২৫০ বছর পরেও দুর্ভাগা নারী লুৎফুন্নেসা উপেক্ষিতা থাকেনি।

জানা যায়,ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী লুৎফুন্নেসা ও তাঁর মেয়ের ভরণ পোষণের জন্য মাসিক ৬০০/- টাকা বরাদ্দ করেন। ক্লাইভের নির্দেশে লুৎফুন্নেসা ও তাঁর মেয়ে যোহরাকে মুশির্দাবাদে আনা হয়েছিল। মুর্শিদাবাদে আসার কয়েক বছর পর একদমই ভেঙে পড়েন লুৎফুন্নেসা। মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে গেছে কিন্তু বিয়ে দেয়ার কোনো সামর্থ ছিল না তাঁর। অবশেষে,যোহরার বিয়ে হয়েছিল ১৭৬৪ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সিরাজের ছোট ভাই ইকরাম-উদ-দৌলার ছেলে মুরাদ-উদ্-দৌলার সাথে। তবে তাঁর দুঃখ ফুরাই না। হঠাৎ জামাই মুরাদ মারা গেলেন। এরপর আরেকটি বড় আঘাত এলো ১৭৭৪ সালে,মেয়ে যোহরাও তাকে ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে গেলেন। কন্যার মৃত্যুতে এবার তিনি একদমই ভেঙে পড়লেন। পাঁচ পাঁচটি নাতি ও নাতনীকে নিয়ে কীভাবে জীবন চালাবেন? শুধু তাই নয়,একে একে চারজন বিবাহযোগ্য নাতনী নিয়ে দেখা দিল সমস্যা।

কোথায় তিনি টাকা-কড়ি পাবেন? কে তাকে সাহায্য করবে? উপায়ন্তর না দেখে,১৭৮৭ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিসের কাছে ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়ার জন্য আবেদন করলেন। আবেদনে বললেন - নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুতে এবং তাঁর যাবতীয় মালামাল ও সম্পদ লুণ্ঠিত হওয়ায় এবং বার বার চরম নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে আমি নিস্ব হয়ে গিয়েছি। লুৎফুন্নেসার আবেদন নাকচ করে দিলেন লর্ড কর্নওয়ালিস। ১৭৯০ সালে লুৎফুন্নেসার মৃত্যু হয়। খুশবাগে সিরাজউদ্দৌলার কবরের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। এই দুর্ভাগা নারীর অসহায় এক নাতী ও চার নাতনীর আর কোনো খোঁজ-খবর রাখেনি ইতিহাস।।

তথ্যসূত্রঃ বাংলাপিডিয়া =====

বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ

(ইকবাল শাহরিয়ার - লুৎফুন্নেসা বেগম) =====

জিনজিরা প্রাসাদ,প্রথম আলো পত্রিকা। =====

সংবাদ টুডে পত্রিকা,শিয়ালদহ,কলকাতা। =====

14

সময় আছে ভেবে বসে আছেন? এটাই আপনার সবচেয়ে বড় ভুল!

আপনি কি এখনও ভাবছেন—“সময় তো আছে, পরে করবো”?

এই একটা চিন্তাই আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে। কারণ বাস্তবতা হলো—সময় কখনো থেমে থাকে না, আর আপনি অপেক্ষা করতে করতে একসময় পিছিয়ে পড়ে যান।

আজ আপনি যেটা কাল করার জন্য রেখে দিচ্ছেন, সেটাই ধীরে ধীরে আপনার স্বপ্নকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আপনি বুঝতেও পারছেন না—সময় আপনার হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, আর আপনি ভাবছেন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সত্যি হলো, কিছুই নিজে নিজে ঠিক হয় না—আপনাকেই শুরু করতে হয়।

Motivational Quotes Bangla

আমরা অনেকেই মনে করি—“একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে”, “সঠিক সময় এলে শুরু করবো।” কিন্তু সেই ‘সঠিক সময়’ বলে কিছু নেই। আপনি যখন শুরু করবেন, তখনই সঠিক সময়।

যারা আজ সফল, তারা অপেক্ষা করেনি। তারা ভয় পেয়েছে, কষ্ট পেয়েছে, তবুও শুরু করেছে। আর আপনি যদি শুধু ভাবতেই থাকেন, তাহলে একসময় দেখবেন—অন্যরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে, আর আপনি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন।

কেন এই ভুলটা মারাত্মক?

কারণ সময় চলে গেলে আপনি সেটা আর ফেরত পাবেন না। টাকা হারালে আবার পাওয়া যায়, সুযোগ হারালে নতুন সুযোগ আসতে পারে—কিন্তু হারানো সময় কখনো ফিরে আসে না।

তাহলে এখন কী করবেন?

আজ থেকেই শুরু করুন। বড় কিছু না, ছোট একটা কাজ দিয়েই শুরু করুন। প্রতিদিন ১% উন্নতি করলেও একসময় আপনি অনেক দূর এগিয়ে যাবেন।

অজুহাত নয়, অ্যাকশন নিন

“সময় নেই”, “মুড নেই”, “পরিস্থিতি ভালো না”—এই কথাগুলো বাদ দিন। এগুলো শুধু আপনাকে পিছিয়ে দেয়। সফল মানুষরা পারফেক্ট সময়ের অপেক্ষা করে না, তারা সময়কে পারফেক্ট বানিয়ে নেয়।

নিজেকে একটা প্রশ্ন করুন:

“আজ যদি আমি শুরু না করি, তাহলে আগামীকাল কি বদলাবে?”

উত্তরটা আপনি নিজেই জানেন।

শিক্ষা:

সময় আছে ভেবে বসে থাকা মানেই নিজের ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করা। আজই শুরু করুন, কারণ আজকের এই ছোট্ট সিদ্ধান্তই আপনার আগামীকালকে বদলে দিতে পারে।


যেখানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২.৩ বছর, সেখানে স্বর্ণকার হিসেবে যারা কাজ করেন তাদের বেশিরভাগই ৬০ বছরে পা দিতে পারেন না। ২০২৪ সালে গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি চারজন কর্মকারের তিনজনই ভুগছেন দুই বা ততোধিক অসংক্রামক রোগে। উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন ৬৫ ভাগ, ডায়াবেটিস আছে অর্ধেকের, হৃদরোগে ভোগেন ৩৫ আর কিডনি রোগে ২০ শতাংশ। কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বর্ণকারদের আয়ু কম হওয়ার পেছনে বিভিন্ন ক্ষতিকর কেমিক্যাল যেমন দায়ী, একইভাবে দায়ী তাদের জীবনাচারও।

কারিগররা জানান, সালফিউরিক অ্যাসিড হিট দিলে এটার থেকে ধোঁয়া হয়। যতই ঢেকে রাখা হয় ধোঁয়াটা আসবেই। অবশ্য এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া গ্যাসটা যখন যায় তখন বুক জ্বলে, কাশি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বর্ণ কারিগররা যে পরিবেশে কাজ করেন সেই পরিবেশ উন্নত করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি জীবনাচারেও পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন, অ্যালকোহল পান না করা, ধূমপান না করা। এর সঙ্গে ব্যায়ামও করতে হবে। তার পাশাপাশি ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।


15

প্রায় দু'শো বছর ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেছে ব্রিটিশরা। সেই ব্রিটিশদের ৪০০ বছর শাসন করেছিল রোমানরা। আমাদের বাচ্চাদের ব্রিটিশ , ইসলাম ও পাকিস্তানের ইতিহাস পড়ানো হলেও মানব সভ্যতার ইতিহাস পড়ানো হয় না। জাতি , ধর্ম ও রাষ্ট্র সম্পর্কে ওদের সঠিক জ্ঞান দেওয়া হয় না বলেই একটি নষ্ট , উন্মাদ ও বিকলাঙ্গ প্রজন্ম তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে।

যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৭৫৩ বছর আগে টাইবার নদীর তীরে সাতটি পাহাড়কে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে প্রতিবেশী এট্রুস্কান ও সাবিইন জাতির সমন্বয়ে ইতালির রোম শহরে জন্ম হয়েছিল রোমান জাতির। রোমান সভ্যতা আজ থেকে ২৭৭৯ বছরের পুরোনো সভ্যতা। অর্থাৎ তখনও পৃথিবীতে ইসলাম ও খ্রিষ্টান ধর্মের আবির্ভাব ঘটেনি। গ্রীক সভ্যতা রোমান সভ্যতার চেয়েও পুরোনো সভ্যতা। গ্রীক সভ্যতার শেকড় আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। অর্থাৎ তখন পৃথিবীতে ইহুদি , খ্রীষ্টান ও ইসলাম কোন ধর্মের আবির্ভাব হয়নি। কিন্তু বাচ্চাদের শুধু আরবের ইতিহাস , মোগলের ইতিহাস আর ব্রিটিশের ইতিহাস শেখানো হয়।এতে একদল শিশু ভাবতে থাকে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের চর্চা পৃথিবীতে বুঝি মুসলমানরাই শুরু করেছিল।কত নির্বোধ আমরা!

জ্ঞান ও বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ বলা হয় গ্রীক সভ্যতাকে। পৃথিবীতে ইসলাম ও খ্রিষ্টান ধর্মের আগেই ২৬০০ বছর আগে থেকেই গ্রীকের মানুষ জ্ঞান ও বিজ্ঞানের অনুসন্ধান শুরু করে। আজ থেকে ২,৩৬১ বছর আগে অ্যারিস্টটল লাইসিয়াম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।২,৪১৩ বছর আগে প্লোটো প্লোটো এথেন্সে প্লোটোর একাডেমী প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।এটি এখনও ইউরোপের প্রথম উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। প্লোটোর একাডেমীতে আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগেই গণিত ও জ্যামিতির শিক্ষা দেয়া হতো যোগ্য শাসক তথা ফিলোসফার কিং তৈরির জন্য। অ্যারিস্টটলের লাইসিয়ামে বায়োলজি , ফিজিক্স ও প্রকৃতি বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হতো।

আজ থেকে ২৬০০ বছর আগে গ্রীক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক থ্যালিস জ্যামিতি ও জোতির্বিদ্যা চর্চা করতেন।

আজ থেকে ২৫০০ বছর আগে পীথাগোরাস গণিত ও জ্যামিতির তত্ত্ব দিয়েছেন, যা এখনও আমার আপনার বাচ্চারা পড়ে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস এর জন্ম হয়েছিল আজ থেকে ২৪০০ বছর আগে। খ্রিস্টান ও ইসলাম কোনও ধর্মের উৎপত্তি তখনও হয়নি। আজ থেকে ২৩০০ বছর আগে ইউক্লিড ও আর্কিমিডিস এর মতো প্রকৌশল ও গণিত বিদ্যায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছিল গ্রীক সভ্যতা। খোয়ারিজমি তাদের জ্ঞানের অনুসারী ছিলেন , আর্কিমিডিসরা খোয়ারিজমীর জ্ঞান ধার করে পড়েননি।রোমান সাম্রাজ্য ভাগ হওয়ার পরও গ্রীকদের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ১,১০০ বছর পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে। আপনার সন্তানকে সুশিক্ষা দিন। গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যারিস্টার্কাস আজ থেকে ২৩০০ বছর আগেই ধারণা দিয়েছিলেন যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। তখন খ্রিস্টান ও ইসলাম কোনও ধর্মের আবির্ভাব হয়নি। তাই দয়া করে আপনার সন্তানদের ইতিহাসের সঠিক শিক্ষা দিন সন্তানকে সবসময় মানুষ হওয়ার প্রকৃত শিক্ষা দিন।

১৭০৭ সালে " অ্যাক্ট অব ইউনিয়ন" পাসের মাধ্যমে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড রাজ্য যুক্ত হয়ে " কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন" গঠিত হয়। এই ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের আদি অধিবাসী ছিলো সেল্টিকরা। পরবর্তীতে তারা রোমান , অ্যাংলো - স্যাক্সন উপজাতি , ভাইকিং ও ফ্রান্সের নরম্যান দ্বারা হাজার বছর শাসিত হয়ে ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামে ব্রিটিশদের শাসন শুরু হয়। ১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাণী এলিজাবেথ -১ এর কাছ থেকে  "ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি" নামে রাজকীয় সনদ নিয়ে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় মশলার বাণিজ্য করতে এসে বণিকের বেশে ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশের দখল নিয়েছিল।

ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড , উত্তর আয়ারল্যান্ড ও ওয়ালেস নিয়ে ব্রিটিশ জাতি গঠিত। ইংল্যান্ডে যারা বসবাস করে তাদের ইংরেজ , স্কটল্যান্ডের মানুষ স্কটিশ , আয়ারল্যান্ডের মানুষ আইরিশ ও ওয়েলস এর নাগরিকরা ওয়েলশ নামে পরিচিত। ব্রিটিশ হচ্ছে একটি জাতি, এটি কোন ধর্মীয় পরিচয় নয়। জাতি ও ধর্ম পরিচয় সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আজ থেকে ১৫০০ থেকে ২০০০ বছর পূর্বে বিভিন্ন শক্তিশালী জাতির সংমিশ্রণে ব্রিটিশ জাতির সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এসব সত্য কবে বুঝতে শিখবে?

ব্রিটিশের মতো বাঙালি একটি জাতি। আর্যরা এই অঞ্চলে আসার আগেই অস্ট্রিক , দ্রাবিড় , মঙ্গোলীয়রা এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। ধান চাষ , পান-সুপারি, ধুতি -শাড়ি এসব অস্ট্রিক থেকে বাংলাদেশে এসেছে। মহোঞ্জোদাড়ো , হরপ্পা সভ্যতা হয়ে আজ থেকে ৩ হাজার বছর পূর্বে আর্যরা বাংলা শাসন শুরু করে। আর্য , পাল , তুর্কি , আরব, পারস্য , আফগান , ব্রিটিশ ও পাকিস্তান হয়ে আজকের বাংলাদেশ। এই বাংলা ভূখণ্ডেকে পর্তুগিজ , ওলন্দাজ , ফরাসী , ব্রিটিশ , মোগল ও পাকিস্তানীরা শাসন করেছে বলে আমরা সেই জাতির অংশ হয়ে যাইনি। মুসলমানরা ভারতীয় উপমহাদেশ ৬৫০ বছর ( দিল্লী সালতানাত ৩২০+ মোগল ৩৩০বছর) শাসন করেছে বলে সবাই মোগল / আফগান  ও মুসলমান হয়ে যায়নি। ব্রিটিশরা দুইশো বছর শাসন করেছে বলে আপনি ব্রিটিশ হয়ে যাননি। এমনকি পাকিস্তানীরা ২৩ বছর শাসন করেছে বলে আপনি নিশ্চয়ই পাকিস্তানী হয়ে যাবেন না।বরং বাংলা ভূখণ্ডে তারা ছিল ভাড়াটিয়া । জাতি হিসেবে আজ থেকে পাঁচ হাজার হাজার আগে থেকেই আমরা বাঙালি পরিচয় বহন করছি। ব্রিটিশদের মতো বিভিন্ন জনগোষ্ঠী দ্বারা শাসিত হয়ে আমাদের রক্তে বিভিন্ন ভাগ্যান্বেষীদের রক্ত মিলেছে। তাই বলে জাতি হিসেবে আমরা পারসিক , আরব ও ব্রিটিশ হয়ে যাইনি , যাবো না। আমাদের আমরা বাঙালি। ইতিহাস চাইলেই কেউ মুছতে পারবে না।

আজ থেকে ৩ হাজার বছর আগেও এই জনপদে বঙ্গ জনগোষ্ঠী বসবাস করতো। বঙ্গ থেকেই বাঙালি । হিন্দুদের মহাকাব্য রামায়নেও বঙ্গ অঞ্চলের বীরত্ব ও শক্তিশালী নৌবাহিনীর বর্ণণা আছে। যিশু খ্রিস্টের জন্মের পাঁচশো বছর আগে বঙ্গের রাজপুত্র শ্রীলঙ্কা বিজয় করেছে। প্রাচীন বাংলা পুণ্ড্র, গৌড় এমন সব সমৃদ্ধ ও ক্ষমতাধর জনপদ ছিল। ব্রিটিশ ও মুসলিমরা বাংলা শাসন করলেই আমাদের জাতি পরিচয় মুছে যাবে না। রোমানরা ৪০০ বছর ব্রিটিশদের শাসন করেছে বলে ব্রিটিশ জাতি পরিচয় মুছে যায়নি। বাঙালির মহাস্থানগড় , উয়ারী - বটেশ্বরী , পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ময়নামতি ( শালবন বিহার) , গৌড় সভ্যতা চাইলেও কেউ ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে পারবে না।যুগে যুগে ভাড়াটিয়ারা রাজ্য শাসন করতে পারে , কিন্তু জাতি পরিচয় কখনোই মুছে ফেলা সম্ভব নয়। একটি জাতির মানুষ বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী হতে পারে , ধর্ম পালন নাও করতে পারে। কিন্তু তাদের জাতি পরিচয় এক ও অভিন্ন। এখানে কোন যদি/ কিন্তু এসবের প্রয়োগ করলে আপনি/ আপনারা ভণ্ড ছাড়া আর কিছুই নন।

১৯০৫ সালে ব্রিটিশরা তাদের ডিভাইড অ্যান্ড রুল প্রয়োগ করে বাঙালিদের বিভক্ত করে বাংলা শাসনের জন্য " বঙ্গভঙ্গ" করলে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়ায় । ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের হিন্দু ও মুসলমান সকল বাঙালি এক হয়ে একে অপরের হাতে রাখি বেঁধে সমস্বরে " আমার সোনার বাংলা " গাইতে থাকে। ব্রিটিশদের জবাব দিতে ১৯০৫ সালেই " বঙ্গভঙ্গ" আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর " আমার সোনার বাংলা" গানটি লিখেছিলেন। বাঙালির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে ১৯১১ সালে ব্রিটিশরা " বঙ্গভঙ্গ" বাতিল করতে বাধ্য হয়। ১৯৬০ এর দশকে পাকিস্তানের  সুদীর্ঘ নির্যাতন , হত্যা ও জুলুমের বিরুদ্ধে আমাদের জাতি পরিচয়ের বাঙালি স্লোগান বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি জনতার হৃদয়ে গেঁথে যায়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের হিন্দু ও মুসলমান সব এক হয়ে পাকিস্তানের ২৩ বছরের গোলামী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে। এজন্য যখনি বাংলা সংকটে পড়েছে তখনি বাংলাদেশের হিন্দু , মুসলিম , বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সকল বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

16

যত বেশি মানুষ, তত বেশি গড় মানের বুদ্ধি

Socrates-কে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল যে সমাজ, তারা ভাবেনি তারা ভুল করছে। তারা ভেবেছিল তারা ন্যায়বিচার করছে। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ তাই বলেছিল। এখানে সমস্যা গণতন্ত্র না, সমস্যা ‘সংখ্যা’র ওপর অন্ধ বিশ্বাস। তুমি ধরে নিয়েছো, বেশি মানুষ মানেই বেশি সত্য। অথচ বাস্তবটা ঠিক উল্টো—যত বেশি মানুষ, তত বেশি গড় মানের বুদ্ধি। আর সেই গড় মানের বুদ্ধি যখন সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেটার ফলাফল গড়েরও নিচে নেমে যায়।

প্লেটো যে ভয় পেয়েছিলেন, সেটা কোনো শাসনব্যবস্থা নিয়ে ছিল না। সেটা ছিল মানুষের মন নিয়ে। তুমি যখন এমন একটা সিস্টেম বানাও, যেখানে দক্ষতা আর জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই, তখন তুমি নিজের হাতেই নিজের কবর খুঁড়ছ। কারণ ক্ষমতা তখন চলে যায় তাদের হাতে, যারা জানে না তারা কী করছে—আর আরও ভয়ঙ্কর, তারা জানেই না যে তারা জানে না।

আজকের পৃথিবীতে দেখো—রাজনীতি একটা সার্কাস। নেতারা ক্লাউন, আর জনতা দর্শক না, তারাও ক্লাউনের অংশ। কেউ কাউকে প্রশ্ন করে না, কারণ প্রশ্ন করার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে। সবাই শুধু স্লোগান রটায়, ট্রেন্ড ফলো করে, আর নিজের অজ্ঞতাকে ‘অধিকার’ বলে দাবি করে। তুমি যদি একটু আলাদা কথা বলো, একটু গভীর কিছু বোঝার চেষ্টা করো, তখন তোমাকে বলা হয় ‘এলিটিস্ট’। কারণ তুমি তাদের আরামদায়ক বোকামিকে ভেঙে দিচ্ছ।

প্লেটো বলেছিলেন, প্রথমে আসে নীতিহীন স্বাধীনতা। আজ তুমি সেটাই দেখছ। সবাই স্বাধীন, কিন্তু কেউ দায়িত্ববান না। সবাই মতামত দিচ্ছে, কিন্তু কেউ জ্ঞান অর্জন করছে না। এরপর আসে বিশৃঙ্খলা। কারণ যখন সবাই ক্যাপ্টেন হতে চায়, তখন জাহাজ চালানোর কেউ থাকে না। আর ঠিক তখনই আসে সেই ‘মেসায়া’—যে বলে, “আমি সব ঠিক করে দেব।” জনতা ক্লান্ত, তারা বিশৃঙ্খলা থেকে পালাতে চায়, তাই তারা সেই মিথ্যা ত্রাণকর্তাকে ক্ষমতা দেয়। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় স্বৈরতন্ত্র।

তুমি ভাবছো তুমি স্বাধীন, কিন্তু তুমি আসলে প্রোগ্রামড। তোমার চিন্তা, তোমার মতামত, তোমার রাগ—সবই ইনপুটের ফল। তুমি নিজের মাথা ব্যবহার করো না, তুমি শুধু প্রতিক্রিয়া দাও। আর সেই প্রতিক্রিয়াকেই তুমি বলো ‘মতামত’। এটা কোনো গণতন্ত্র না, এটা একটা বিশাল ইকো-চেম্বার, যেখানে সবাই একই বোকামি বারবার রিপিট করে।

প্লেটো গণবিরোধী ছিলেন না। তিনি জানতেন, জনতা নিজেরা নিজেদের শত্রু হতে পারে। তিনি বুঝেছিলেন, সবাই সমান না—কমপক্ষে জ্ঞান আর দক্ষতার দিক থেকে তো নয়ই। কিন্তু তুমি এই কথাটা শুনলেই আহত হও। কারণ তুমি সমান হতে চাও, কিন্তু তুমি সমান পরিশ্রম করতে চাও না। তুমি সম্মান চাও, কিন্তু তুমি যোগ্যতা অর্জন করতে চাও না।

এই যে ‘শিপ অফ স্টেট’, এটা এখন আর মাঝসমুদ্রে না—এটা প্রায় ডুবে গেছে। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার, যাত্রীরা এখনো তর্ক করছে কে ক্যাপ্টেন হবে। কেউ দিক দেখছে না, কেউ মানচিত্র পড়ছে না, কেউ ঝড়ের ভাষা বুঝতে চাইছে না। তারা শুধু চেঁচাচ্ছে, হাততালি দিচ্ছে, আর নিজেদের বোকামিকে উদযাপন করছে।

তুমি যদি সত্যি দেখতে চাও, তাহলে একটা প্রশ্ন করো নিজেকে—তুমি কি জানো তুমি কীসের জন্য সিদ্ধান্ত নিচ্ছ? নাকি তুমি শুধু ভিড়ের অংশ? কারণ ভিড়ের একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে—ওরা কখনো ভাবে না, ওরা শুধু চলে। আর সেই চলার দিকটা ঠিক করে দেয় সবচেয়ে জোরে চেঁচানো লোকটা।

শেষ পর্যন্ত, প্লেটোর সতর্কবার্তা কোনো তত্ত্ব না, এটা একটা ভবিষ্যদ্বাণী। আর তুমি সেই ভবিষ্যতের ভেতরেই বাস করছ। পার্থক্য শুধু এই—তিনি এটা দেখে ভয় পেয়েছিলেন, আর তুমি এটাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিয়েছ।

জাহাজ ডুবছে।

আর তুমি এখনো ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে আছ।

17

"শেখা মানে শুধু জানা নয়, বরং বদলে যাওয়া" (Learning is not just knowing, but changing)

আমেরিকান দার্শনিক এবং শিক্ষাবিদ জন ডিউই (John Dewey) বলেছিলেন "শেখা মানে শুধু জানা নয়, বরং বদলে যাওয়া" (Learning is not just knowing, but changing) কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃত শিক্ষা কেবল তথ্য বা জ্ঞান অর্জন নয়, বরং এটি এমন একটি অভিজ্ঞতা যা মানুষের চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে।

তাঁর এই মন্তব্যের পেছনের মূল কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

১) অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষা (Learning by Doing):

ডিউই মনে করতেন, মুখস্থ বা নিষ্ক্রিয়ভাবে জ্ঞান গ্রহণ করা সত্যিকারের শিক্ষা নয়। শিক্ষার্থীরা যখন কোনো কাজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শেখে, তখন সেই জ্ঞান তাদের ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে এবং তাদের 'বদলে দেয়'।

২)দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন (Transformation of Perspective):

প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জগতকে দেখতে শেখায়। একটি নতুন কিছু শেখার পর মানুষ যদি আগের চেয়ে ভালো, যুক্তিযুক্ত এবং সহানুভূতিশীল হয়, তবেই সেটিকে সত্যিকারের শিক্ষা বলা যায়।

৩) চলমান প্রক্রিয়া বা বৃদ্ধি (Growth and Transformation):

ডিউই শিক্ষা এবং জীবনকে আলাদা করে দেখতেন না। তাঁর মতে, শিক্ষা কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া যা মানুষের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেয় এবং নিরন্তর উন্নততর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

৪) অভ্যাসের পরিবর্তন (Revision of Habits):

শিক্ষা মানুষের আগের ভুল অভ্যাস বা কুসংস্কার বদলে নতুন, গঠনমূলক অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করে।

৫) সমাজ ও জীবনের সাথে সংযোগ:

শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত তথ্য ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করে না, বরং এটি ব্যক্তিকে সামাজিক পরিবর্তনের এজেন্ট হিসেবে তৈরি করে। মানুষ সমাজ ও সম্প্রদায়ের সাথে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে শেখে এবং নিজেকে সমাজ উপযোগী করে গড়ে তোলে।

সহজ কথায়

ডিউই বোঝাতে চেয়েছেন যে, যে জ্ঞান মানুষকে নতুনভাবে চিন্তা করতে বা নতুনভাবে কাজ করতে শেখায় না, তা মৃত। যা জীবনকে উন্নত করে এবং মানুষকে নতুনভাবে গড়ে তোলে, সেটাই সত্যিকারের শেখা বা শিক্ষা।

শিক্ষাবিদ জন ডিউই (John Dewey)

জন ডিউই (১৮৫৯-১৯৫২) ছিলেন একজন প্রখ্যাত মার্কিন দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী এবং শিক্ষাবিদ, যিনি প্রগতিশীল শিক্ষা ও প্রয়োগবাদ (Pragmatism) মতবাদের জন্য বিখ্যাত। তিনি "কাজের মাধ্যমে শিক্ষা" (Learning by Doing) এবং অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষার ওপর জোর দেন, যেখানে শিক্ষকের ভূমিকা সহায়তাকারীর। তাঁর দর্শন অনুযায়ী, শিক্ষা হলো জীবনের প্রস্তুতি নয়, বরং শিক্ষা নিজেই জীবন।

১)জন ডিউই-র শিক্ষাদর্শনের মূল দিকসমূহ:

প্রয়োগবাদ (Pragmatism):

ডিউই বিশ্বাস করতেন যে কোনো ধারণার সত্যতা তার ব্যবহারিক প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে।

২)কাজের মাধ্যমে শিক্ষা (Learning by Doing):

তিনি তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

৩)অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা (Experience and Education):

শিক্ষা হলো অভিজ্ঞতার পুনর্গঠন। শিক্ষার্থীর নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে সে নতুন জ্ঞান অর্জন করে।

৪)গণতন্ত্র ও শিক্ষা (Democracy and Education):

ডিউই শিক্ষাকে গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি হিসেবে মনে করতেন।

৫)পরীক্ষামূলক বিদ্যালয় (Laboratory School):

১৮৯৬ সালে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ল্যাবরেটরি স্কুল' স্থাপন করে শিক্ষার নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান।

বিখ্যাত বইসমূহ:

Democracy and Education (১৯১৬)

Experience and Education (১৯৩৮)

School and Society

ডিউইয়ের শিক্ষাদর্শন শিক্ষা ক্ষেত্রে সক্রিয়তা ও শিশুর কেন্দ্রিক শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছে।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া

World Vision (বিশ্ব দর্শন


সব ভালো একটু দেরি করেই আসে। খারাপটা একটু ধৈর্য ধরে কাটিয়ে নিতে হবে। যতক্ষন শক্তি আছে দৌড়াবেন, শক্তি কমে গেলে হাঁটবেন। সব পরিস্থিতির মাঝে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলেই জীবন সুন্দর। কেউ আপনাকে কষ্ট দিয়ে কথা বললে তার সাথে তর্কে না জরিয়ে উল্টো তাঁর জন্য দোয়া করেন। নিশ্চয়ই আপনি যা করবেন তার অনুরুপ পাবেন।। 

18

সে কী তুঘলকি কাণ্ড 

বাংলা ভাষায় কোনো অসংলগ্ন, খামখেয়ালি বা অবিবেচনাপ্রসূত কাজকে বোঝাতে আমরা 'তুঘলকি কাণ্ড' বাগধারাটি ব্যবহার করি। এই বাগধারাটির নেপথ্যে রয়েছেন চতুর্দশ শতাব্দীর দিল্লির সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলক। তিনি ইতিহাসে একজন অত্যন্ত মেধাবী অথচ চরম বিতর্কিত শাসক হিসেবে পরিচিত।

'তুঘলকি কাণ্ড' বাগধারাটি মূলত সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে (১৩২৫–১৩৫১ খ্রিষ্টাব্দ) গৃহীত তাঁর হঠকারী সিদ্ধান্তগুলো থেকে এসেছে। তবে এটি বাংলা সাহিত্যে ও জনমানসে বাগধারা হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয় সুলতানি আমলের পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে যখন ইতিহাসবেত্তারা তাঁর ব্যর্থতাগুলোকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। মূলত মধ্যযুগের শেষভাগ থেকে আধুনিক বাংলার প্রারম্ভিক সময়ে এই শব্দবন্ধটি স্থায়িত্ব পায়।

কেন এই কুখ্যাতি?

সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলক তাঁর রাজত্বকালে হুটহাট সিদ্ধান্ত নিতেন, যখন তখন বড় কোনো কাজে হাত দিয়ে ফেলতেন যা দেখে তখনকার মানুষ বুঝে নিত সুলতান তুঘলকের কাজ। আর সেখান থেকেই মূলত এই বাগধারার জন্ম। তিনি অত্যন্ত বিদ্বান শাসক হওয়া সত্ত্বেও এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যা সেই সময়ে হাস্যকর ও বিপর্যয়কর মনে হয়েছিল:

১. রাজধানী পরিবর্তন:

১৩২৭ সালে তিনি দিল্লি থেকে প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ ভারতের দেবগিরিতে (দৌলতাবাদ) রাজধানী স্থানান্তরের নির্দেশ দেন। সাধারণ মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য করা হয়। পরে প্রশাসনিক অসুবিধার কারণে তিনি পুনরায় দিল্লিতে ফেরার নির্দেশ দেন। এই যাতায়াতে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়।

২. প্রতীকী মুদ্রা বা টোকেন কারেন্সি:

তিনি সোনা ও রূপার মুদ্রার বদলে তামা ও ব্রোঞ্জের মুদ্রা চালু করেন। কিন্তু সরকারি নিয়ন্ত্রণের অভাবে ঘরে ঘরে জাল মুদ্রা তৈরি হতে থাকে, যা পুরো অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তামার মুদ্রার স্তূপ পাহাড়ের মতো জমে গিয়েছিল। রেগে গিয়ে তিনি ঘোষণা করেন, যারা এই মুদ্রা ফেরত দেবে তাদের সরকারি কোষাগার থেকে সোনা-রূপা দেওয়া হবে। এর ফলে রাজকোষ প্রায় খালি হয়ে গিয়েছিল।

৩. বিফল সামরিক অভিযান:

তিনি মধ্য এশিয়ার খোরাসান অঞ্চল জয়ের এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি প্রায় ৩,৭০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করেন এবং তাদের পুরো এক বছরের বেতন অগ্রিম দিয়ে দেন। কিন্তু এক বছর পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় তিনি অভিযান বাতিল করেন। এতে রাজকোষের বিপুল অর্থ অপচয় হয় এবং বিশাল সেনাবাহিনী বেকার হয়ে পড়ে।

৪. কারাচিল অভিযান (হিমালয় অভিযান):

চীন বা তিব্বত সীমান্ত জয় করার উদ্দেশ্যে তিনি হিমালয় অঞ্চলের কারাচিল নামক স্থানে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী পাঠান। পাহাড়ি দুর্গম পথ, প্রচণ্ড শীত এবং বৃষ্টির কারণে তাঁর পুরো বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়। বলা হয়, ১০ হাজার সৈন্যের মধ্যে মাত্র ১০ জন প্রাণ নিয়ে দিল্লিতে ফিরে আসতে পেরেছিলেন।

৫. দোয়াব অঞ্চলে কর বৃদ্ধি ও কৃষি বিভাগ (দিওয়ান-ই-কোহি):

গঙ্গা ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী উর্বর এলাকা দোয়াব অঞ্চলে তিনি করের পরিমাণ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেন। দুর্ভাগ্যবশত, ঠিক সেই সময়েই সেখানে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। কৃষকরা কর দিতে না পেরে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি 'দিওয়ান-ই-কোহি' নামে একটি কৃষি বিভাগ খুলে কৃষকদের ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন, কিন্তু দুর্নীতির কারণে সেই পরিকল্পনাও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।

তার টোকেন কারেন্সি প্রকল্প ব্যর্থ হলেও সেটি ছিল আজকের যুগে আমরা যে কাগজের নোট বা টোকেন কারেন্সি ব্যবহার করি তার আদি রুপ  যার চিন্তা তিনি ৭০০ বছর আগে করেছিলেন। যদিও জাল মুদ্রার কারণে এটি ব্যর্থ হয়, কিন্তু অর্থনৈতিক সংস্কারক হিসেবে তাঁর এই চিন্তা ছিল বৈপ্লবিক। 

তিনি ছিলেন একাধারে গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং দর্শনে পারদর্শী। তিনি কোনো অন্ধ বিশ্বাসে চলতেন না, বরং যুক্তির মাধ্যমে সবকিছু বিচার করতে চাইতেন। তাঁর রাজদরবার ছিল দেশি-বিদেশি পণ্ডিতদের মিলনস্থল। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর সময়েই ভারতে এসেছিলেন এবং বিচারক (কাজী) হিসেবে কাজ করেছিলেন। তার বেশ কিছু ভাল অবদান ছিল কিন্তু উদ্ভট কাজের জন্য সেগুলো চাপা পড়ে গিয়েছে। তিনি তার "তুঘলকি কাণ্ডের" জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। @ বইকাল


সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ককে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন শহর। কিছু সূত্র মতে এখানে খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ বছর আগে জনবসতি ছিল, তবে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে প্রায় ৬,৩০০ বছর (খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০০ অব্দ) আগে থেকে এখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে মানুষ বসবাস করছে। 

19

কখন বুঝবেন আপনি ঈর্ষাপ্রবণ, ক্ষতিকর কিংবা খারাপ চিন্তার মানুষ :

​১. যখন দেখবেন, কেউ আপনার জন্য অনেক করছে, কিন্তু আপনি কিছুতেই তার বা তাদের ভালো নিয়ে ভাবতে পারছেন না। এমনকি আপনার নিজ মুখে স্বীকারই করতে ইচ্ছে করছে না যে- কেউ আপনার জন্য এতো করেছে বা করছে।

​২. যখন দেখবেন, কারো খারাপ সংবাদে আপনি কষ্ট পাওয়ার চেয়ে খুশি বেশি হচ্ছেন। সে হোক না আপনার শত্রু কিংবা তথাকথিত বন্ধু।

​৩. যখন দেখবেন, আপনি জায়গা ভেদে একেকজন মানুষের সাথে একেক রকম আচরণ করছেন। যেমন : নিজের প্রিয় মানুষের সাথে আপনি যতটা আন্তরিক, অচেনা বা আপনার আপন কেউ নয়- তাদের সাথে আপনি আলাদা ব্যবহার করছেন। স্বার্থ ভেদে বদলে যায় আপনার নিজের রূপ। সহজভাবে বুঝতে গেলে খেয়াল করবেন, শ্বশুরবাড়ি আর বাপের বাড়ির মানুষের সাথে আপনার আচরণ হবে ভিন্ন।

​৪. নিজে গরিব অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পর যখন গরিব মানুষ দেখলেই আপনি নাক শিটকান। যখন আপনি একেবারে ভুলেই যান আপনার ফেলে আসা অতীত।

​৫. যখন আপনি প্রতিনিয়ত কারো অনুকরণ করছেন, কিন্তু তার সামনে ভাব দেখাচ্ছেন- আপনি নিজেই এসবে সর্বেসর্বা; এবং আপনি শুধু তার ভালো অবস্থার অনুকরণ করছেন, অথচ ভালো থাকার জন্য তার সাধনা, চেষ্টা, অধ্যবসায় কিংবা পরিশ্রম কিছুই অনুকরণ করছেন না।

​৬. যখন দেখবেন আপনি কখনোই নিজের ভালো থাকার হিসাব না করে বা তার জন্য শুকরিয়া আদায় না করে সারাক্ষণ অন্যের ভালো থাকার হিসাব রাখছেন।

​আপাতত এই কয়েকটি উপায়ই থাক। নিজের সাথে এই কয়েকটা পয়েন্ট মেলাতে গিয়ে যদি আপনি সংকোচ বা বিরক্ত বোধ করেন, তাহলে বুঝতে হবে আপনার মধ্যে কিছুটা হলেও আচরণগত বা বোধশক্তির সমস্যা আছে। যার সমাধান বা শুধরাতে হবে আপনার নিজেকেই। @ লক্ষ্যপথ 


২০

Dancing Plague of 1518 

এটি ঘটেছিল ১৫১৮ সালে, পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের অংশ Strasbourg শহরে (বর্তমান ফ্রান্সের আলসেস অঞ্চল)।

ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ঘটনাটি শুরু হয় একজন নারীকে দিয়ে, যিনি হঠাৎ রাস্তায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে নাচতে শুরু করেন এবং থামতে পারছিলেন না। এরপর ধীরে ধীরে আরও মানুষ একই আচরণে যুক্ত হয়। কয়েক দিনের মধ্যে এই অস্বাভাবিক “নাচের প্রবণতা” শহরে ছড়িয়ে পড়ে।

সমসাময়িক রেকর্ড অনুযায়ী শতাধিক মানুষ এই ঘটনায় আক্রান্ত হয়—প্রায় ৫০ থেকে কয়েকশো মানুষ পর্যন্ত, তবে সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত নয়। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন নাচতে থাকে। ক্লান্তি, আঘাত এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে কিছু মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে সমসাময়িক কিছু সূত্রে উল্লেখ থাকলেও এটি পুরোপুরি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।

এই ঘটনার কারণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে এখনো মতভেদ আছে। আধুনিক গবেষণার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো এটি ছিল একটি mass psychogenic illness (সমষ্টিগত মানসিক প্রতিক্রিয়া), যেখানে তীব্র মানসিক চাপ, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ এবং সামাজিক উদ্বেগ মানুষের আচরণে অস্বাভাবিক প্রভাব ফেলেছিল।

তৎকালীন সময়ে ইউরোপে খাদ্য সংকট, রোগব্যাধি এবং ধর্মীয় ভয়ভীতি প্রচলিত ছিল, যা মানুষের মানসিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলতে পারে। কিছু গবেষক আবার ধর্মীয় বা কুসংস্কারজনিত বিশ্বাসকেও একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি কোনো “সংক্রামক নাচের রোগ” ছিল না, বরং সামাজিক ও মানসিক পরিস্থিতির কারণে তৈরি একটি বিরল মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা। আজও Dancing Plague of 1518 মানব ইতিহাসে একটি রহস্যময় কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা দেখায় মানুষের মন ও সমাজিক চাপ কত গভীরভাবে আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। @ Voice of Pipul

২১

ধ্যানের পর গৌতম বুদ্ধ বিশ্রাম নিতে যাবেন। এমন সময় এক দরিদ্র ব্যক্তি গৌতম বুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করলোঃ "আমি এতো দরিদ্র কেন?"

জবাবে গৌতম বুদ্ধ বললেনঃ "কারন তুমি দান কর না এবং করতেও জানো না।"

দরিদ্র ব্যক্তি বললঃ "আমার তো দান করার মত কিছুই নেই।"

অতঃপর গৌতম বুদ্ধ বললেনঃ "দান করার মত অনেক জিনিস আছে তোমার কাছে, যা কারো কাছেই কম নেই অর্থাৎ তা ধনী-গরীব সবার কাছেই সমপরিমাণ থাকে।

আর তা হল..

১. চেহারাঃ যা দ্বারা তুমি সুখ ও আনন্দের হাসি উপহার হিসেবে অন্যদের দিতে পারো।

২. মুখঃ যা দ্বারা তুমি মাধুর্য্যপূর্ণ উৎকৃষ্ট কথা বলে মানুষকে আনন্দ ও উৎসাহ প্রদান করতে পারো।

৩. হৃদয়ঃ যা তুমি আন্তরিকতা ও উদারতা দ্বারা অন্যদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারো।

৪. চোখঃ যা দ্বারা তুমি দয়া ও ভালোবাসার সাথে অন্যদের দেখতে পারো।

৫. দেহঃ যা দ্বারা তুমি নিজের শ্রমের মাধ্যমে অন্যদের সাহায্য প্রদান করতে পারো।

আর তাই তো তুমি একেবারেই দরিদ্র নও। মূলত হৃদয়ের দারিদ্রতাই প্রকৃত দারিদ্রতা, আর্থিক দারিদ্রতা মূল দারিদ্রতা নয়।

সংগৃহীত @ World Vision (বিশ্ব দর্শন)

জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে মনে হয়। আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়, চারপাশে কেবল হতাশার শব্দ শোনা যায়। ঠিক তখনই মানুষ দুইভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে—হয় সে হাল ছেড়ে দেবে, নয়তো নিজের ভেতরের শক্তিকে জাগিয়ে তুলবে। যারা দ্বিতীয় পথটা বেছে নেয়, তারাই একদিন প্রমাণ করে দেয় যে পতন তাদের দুর্বল করেনি, বরং আরও শক্তিশালী করেছে। মনে রাখবেন, সফলতা শুধু উপরে ওঠার গল্প নয়; এটা বারবার পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প। তাই যদি কখনো পড়ে যান, নিজেকে শেষ ভেবে বসে থাকবেন না। কারণ আপনার সবচেয়ে বড় জয় হলো- আবার উঠে দাঁড়ানো, আগের চেয়েও দৃঢ়ভাবে, আগের চেয়েও আত্মবিশ্বাস নিয়ে। 

২২

যারা নিজেরা কমদামী তারা অতিরিক্ত দামী জিনিসপত্র ব্যবহার করে

সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি কিছু মানুষ নিজেদের অবস্থান বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ঢাকতে বাহ্যিক চাকচিক্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে। মানুষের প্রকৃত মূল্য আসে চরিত্র, জ্ঞান ও আচরণ থেকে, কিন্তু অনেকে মনে করেন দামি পোশাক, ফোন বা গাড়িই মর্যাদার পরিচয়। মনোবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় “Compensatory Consumption”, যেখানে মানুষ নিজের অভাববোধ পূরণ করতে বিলাসী জিনিসের আশ্রয় নেয়। গবেষণায় দেখা গেছে আত্মসম্মান কম হলে মানুষ ব্র্যান্ড ও বিলাসী পণ্যের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। ফলে ব্যক্তিত্বের ঘাটতি ঢাকতে বস্তুগত প্রদর্শনই হয়ে ওঠে প্রধান পরিচয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা আচরণ বিষয়ক একাধিক গবেষণায় দেখা যায় সামাজিক স্বীকৃতির অভাব থাকলে মানুষ দামি ব্র্যান্ড ব্যবহার করে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করতে চায়। “Journal of Consumer Research”-এর গবেষণা বলছে, সামাজিকভাবে অনিরাপদ মানুষরা লোগোযুক্ত ও দৃশ্যমান বিলাসী পণ্য বেশি ব্যবহার করে। কারণ তারা চায় মানুষ তাদের সম্পর্কে দ্রুত উচ্চ ধারণা তৈরি করুক। বাস্তবে আত্মবিশ্বাসী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা অনেক সময় সরল জীবনযাপন করেন, কারণ তাদের পরিচয় প্রমাণের জন্য বাহ্যিক প্রদর্শনের প্রয়োজন হয় না। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, ভেতরের শক্তি কম হলে বাহ্যিক প্রদর্শন বাড়ে। তাই অনেক সময় অতিরিক্ত বিলাসিতা আত্মবিশ্বাসের নয়, বরং অস্বস্তির লক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়।

ইতিহাস ও বাস্তব জীবনে দেখা যায় প্রকৃত মহৎ মানুষরা সাধারণ জীবনেই স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজেছেন। সফল উদ্যোক্তা ও চিন্তাবিদদের মধ্যে মিনিমাল জীবনধারা জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হলো আত্মপরিচয়ের স্থিরতা। অন্যদিকে সামাজিক তুলনা ও প্রতিযোগিতা মানুষকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে মানুষ নিজের বাস্তবতার চেয়ে প্রদর্শিত জীবনকে গুরুত্ব দেয়। এতে ঋণগ্রস্ততা, মানসিক চাপ ও অসন্তুষ্টি বাড়ে বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণায় উল্লেখ আছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সত্যিকারের আত্মমর্যাদা তৈরি হয় দক্ষতা, সততা ও মানবিকতা থেকে, দামী জিনিস থেকে নয়। যে ব্যক্তি নিজের মূল্য বুঝে, সে প্রদর্শনের বদলে উন্নয়নে বিনিয়োগ করে। অতিরিক্ত বিলাসী ভোগ কখনো কখনো সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার প্রতিফলন হতে পারে। তাই মানুষকে শেখা দরকার নিজের পরিচয় গড়তে, জিনিসপত্র দিয়ে পরিচয় বানাতে নয়। আত্মবিশ্বাসী মানুষ কম দেখায় কিন্তু বেশি প্রভাব ফেলে।

মানুষের আসল দাম নির্ধারিত হয় তার চিন্তা, কাজ ও চরিত্র দিয়ে; ব্যবহৃত পণ্যের দাম দিয়ে নয়। যারা নিজের ভেতরের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না, তারা প্রায়ই বাহ্যিক চাকচিক্যে আশ্রয় খোঁজে। সমাজ যদি মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়, তবে প্রদর্শনের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে কমে যাবে। প্রকৃত সম্মান আসে মানুষ হওয়া থেকে, বিলাসী দেখানো থেকে নয়। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজেকে দামী মানুষ বানানো, দামী জিনিসের মালিক হওয়া নয়। @ SAM Motivation

References :

Journal of Consumer Research – Compensatory Consumption Theory

American Psychological Association – Self-esteem and Materialism Studies

Belk, R.W. (Consumer Behavior and Materialism Research)

Kasser, T. (The High Price of Materialism)

Griskevicius, V. et al. (Conspicuous Consum

২৩

আমরা অনেক সময় মনে করি, যদি খুব করে অনুরোধ করি, হাত-পা ধরি বা খুব অনুগত হয়ে চলি, তবে অপরপক্ষ হয়তো দয়া করবে বা ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো। আজ এই বিষয়ে লজিক্যাল কিছু উত্তর দেব।

১. প্রশ্ন: আমি যখন খুব কান্নাকাটি করি বা মিনতি করি, তখন তিনি আরও নিষ্ঠুর কেন হয়ে যান?

উত্তর: মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো তারা শক্তিশালী ব্যক্তিত্বকে সম্মান করে, দুর্বলকে নয়। আপনি যখন অতিরিক্ত আকুতি করেন, তখন আপনি নিজের অজান্তেই নিজেকে তার নিচে নামিয়ে ফেলেন। এতে অপরপক্ষের মনে আপনার প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায় এবং তার ইগো বা অহংকার আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।

২. প্রশ্ন: কেন অনুগত হয়ে চললেও তিনি দিন দিন আরও বিরক্ত হচ্ছেন?

উত্তর: অতিরিক্ত আনুগত্য আপনাকে একজন স্বাধীন মানুষ থেকে একটি 'রোবট' বা 'সহজলভ্য বস্তুতে' পরিণত করে। যখন কেউ জানে যে আপনি তাকে ছাড়া কোথাও যাবেন না বা সবকিছু মেনে নেবেন, তখন সে আপনার গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দেয়। আপনার এই আচরণ তাকে ট্রিগার করে না, বরং আপনার উপস্থিতি তাকে বিরক্ত করে তোলে।

৩. প্রশ্ন: নিজেকে ছোট করলে কি অপরপক্ষ কখনো ঠিক হয়?

উত্তর: কখনোই না। বরং এতে তিনি মনে করেন তিনি যা করছেন তা সঠিক, কারণ আপনি তো তা মেনে নিচ্ছেন। আপনার নীরবতা বা ছোট হওয়া তার অন্যায় আচরণকে এক ধরণের 'লাইসেন্স' দেয়।

৪. প্রশ্ন: এটা কি কেবল পুরুষদের ক্ষেত্রে ঘটে?

উত্তর: না, এটি নারী এবং পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সম্পর্কের ডাইনামিকস সবখানে একই। যে পক্ষ নিজেকে বেশি ছোট করবে, অপরপক্ষ তাকে অবহেলা করবে—এটিই মানুষের সাধারণ মনস্তত্ত্ব।

৫. প্রশ্ন: তবে কি সম্পর্কে নমনীয় হওয়া ভুল?

উত্তর: নমনীয়তা এবং আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া এক কথা নয়। ভালোবাসা মানে সমঝোতা, কিন্তু সেই সমঝোতা যদি কেবল আপনার পক্ষ থেকেই হয় এবং আপনাকে প্রতিনিয়ত ছোট হতে হয়, তবে সেটা ভালোবাসা নয়, বরং শোষন।

৬. প্রশ্ন: আকুতি করলে কেন তারা 'পেয়ে বসে'?

উত্তর: কারণ তারা বুঝতে পারে আপনার নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি তাদের হাতে। তারা জানে আপনি প্রতিবাদ করবেন না। এই নিশ্চিতবোধ থেকেই তাদের দাম বেড়ে যায় এবং তারা আপনার ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে।

৭. প্রশ্ন: আমি তো তাকে ফেরানোর জন্য করি, এতে কি ভুল আছে?

উত্তর: আপনি তাকে ফেরানোর জন্য যা করছেন, তা আসলে তাকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। মানুষ তার কাছেই ফিরতে চায় যাকে সে সম্মান করে। নিজের সম্মান হারানো মানে তাকে ফেরানোর শেষ সুযোগটিও হারানো।

৮. প্রশ্ন: এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?

উত্তর: নিজেকে গুরুত্ব দিতে শিখুন। আকুতি করা বন্ধ করে নিজের কাজ এবং ব্যক্তিত্বে মনোযোগ দিন। আপনি যখন নিজের পায়ে দাঁড়াবেন এবং নিজের সীমানা নির্ধারণ করবেন, তখন অপরপক্ষ বাধ্য হবে আপনাকে সম্মান দিতে।

সম্পর্ক টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর, দয়ার ওপর নয়। আপনি যদি নিজেকে সম্মান না করেন, তবে পৃথিবী আপনাকে সম্মান করবে না। কারো পায়ে ধরে ভালোবাসা পাওয়ার চেষ্টা ছেড়ে দিন; কারণ দয়ায় পাওয়া ভালোবাসা কখনো স্থায়ি হয় না। @ Nazmul Hasan Akash


পজিটিভ প্যারেন্টিং

সব বাবা-মায়েরা চান, তাদের সন্তান আদর্শ মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে। রেস্টুরেন্টে চাকরির জন্য মানুষ ‘চিকেন স্যান্ডউইচ বানাতে’ অনেক প্রশিক্ষণ নেয়। কিন্তু বাবা-মা হওয়ার পর সন্তানকে লালনপালনের জন্য তেমন কোনো প্রশিক্ষণ নেয় না। এ কারণে বেশিরভাগ বাবা-মা সন্তানের সমস্যায় নিজেদের মতো করে প্রতিক্রিয়া দেখান। যা অনেক সময় শিশুর সমস্যা সমাধানে খুব একটা কাজে লাগে না। আমরা যেটাকে খারাপ আচরণ বলি, সেটাও অনেক সময় শিশু কোনো প্রয়োজন থেকে করে। সাধারণত শিশুর বিভিন্ন আচরণের পেছনে তিনটা কারণ থাকে—সময় চাওয়া, নিয়ন্ত্রণ ও কোনো কিছুর ঘাটতি। আবার অনেক শিশু কথা শোনে না। বাবা-মা যা বলে তার উল্টো করে। অনেক সময় এর মানে দাঁড়ায়, ‘আমার এখন বয়স হয়েছে। আমি নিজের জীবনে একটু বেশি নিয়ন্ত্রণ চাই।’ কেউ কেউ রেগে যায় বা ভাইবোনের সঙ্গে ঝগড়া করে। সাধারণত এমন করার কারণ হলো, সে এখনো রাগ নিয়ন্ত্রণ বা সমস্যার সমাধান শিখে ওঠেনি। অনেক অভিভাবক তার জন্য শাস্তি দেন। কিন্তু পজিটিভ প্যারেন্টসরা শাস্তির বদলে সেই দক্ষতা শেখান এবং সম্ভাব্য সমস্যাগুলো আগে থেকেই কমিয়ে আনার ওপর জোর দেন।  পজিটিভ প্যারেন্টিংয়ের শাস্তি কখনোই অপমানজনক, লজ্জাজনক বা প্রতিশোধমূলক হয় না।  সন্তানকে তার নিজের গন্তব্যের মালিক হতে দেওয়াটাই হলো শ্রেষ্ঠ অভিভাবকত্ব। তাই প্যারেন্টিং সহজ এবং সরল স্বীকারোক্তি হল তাকে পরিবর্তন করা নয়, বরং তাকে তার মতো হতে দেওয়া। 


২৪


বিষাক্ত ত্রয়ীঃ ঈর্ষা, ভয় এবং দুশ্চিন্তায় যখন কাহিল হয় অবচেতন মন

মিজানুর রহমান লাবু

মানুষের অবচেতন মন একটি অতি সংবেদনশীল এবং শক্তিশালী রেকর্ডিং যন্ত্রের মতো। জন্মের পর থেকে আমাদের প্রতিটি আবেগ, অনুভূতি এবং চিন্তা সেখানে জমা হয়।

অবচেতন মন আমাদের জীবনের চালিকাশক্তি—এটি আমাদের হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে, আমাদের অভ্যাস গঠন করে এবং আমাদের অগোচরে আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে। তবে এই শক্তিশালী ইঞ্জিনটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তিনটি নেতিবাচক আবেগের দ্বারা; ঈর্ষা, ভয় এবং দুশ্চিন্তা। যখন এই তিনটি আবেগ অবচেতন মনের ওপর সওয়ার হয়, তখন মানুষ মানসিকভাবে তো বটেই, শারীরিকভাবেও নিঃস্ব ও ‘কাহিল’ হয়ে পড়ে।

ভয়ঃ অবচেতন মনের অন্ধকার শৃঙ্খল

ভয় হলো মানুষের আদিমতম আবেগ। প্রাচীনকালে এটি মানুষকে হিংস্র পশুর হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করত, কিন্তু আধুনিক যুগে ভয় তার রূপ পরিবর্তন করেছে। ব্যর্থতার ভয়, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় কিংবা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার ভয় এখন আমাদের অবচেতন মনের প্রধান শত্রু।

যখন আমরা কোনো কিছু নিয়ে ভয় পাই, অবচেতন মন তখন ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ (Fight or Flight) মোডে চলে যায়।

অবচেতন মন বাস্তব এবং কল্পনার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। ফলে আমরা যখন কাল্পনিক কোনো বিপদের কথা ভেবে ভয় পাই, অবচেতন মন তখন শরীরকে এমনভাবে উত্তেজিত করে তোলে যেন সত্যি সত্যিই কোনো বিপদ সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

দীর্ঘস্থায়ী ভয় অবচেতন মনকে ক্লান্ত করে ফেলে, যার ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং আত্মবিশ্বাস ধুলোয় মিশে যায়। ভয় আমাদের সম্ভাবনার দুয়ারগুলো বন্ধ করে দেয় এবং অবচেতন মনকে একটি ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে বন্দি করে ফেলে।

ঈর্ষাঃ নিজের বাগানে বিষ প্রয়োগ

ঈর্ষা হলো এমন এক বিষ যা মানুষ নিজে পান করে আর আশা করে যে অন্য কেউ মারা যাবে। যখন আমরা অন্যের সাফল্য, সম্পদ বা রূপ দেখে ঈর্ষান্বিত হই, তখন আমরা আমাদের অবচেতন মনে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা পাঠাই। সেই বার্তাটি হলো— "আমার যা আছে তা যথেষ্ট নয়" অথবা "আমি অযোগ্য"।

ঈর্ষা অবচেতন মনের প্রাচুর্যের (Abundance) বোধকে ধ্বংস করে দেয়। অবচেতন মন তখন অভাবের (Scarcity) দিকে মনোনিবেশ করে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, আমরা যা নিয়ে তীব্রভাবে চিন্তা করি, আমাদের অবচেতন মন সেটিকেই আমাদের জীবনে আকর্ষণ করে।

ফলে ঈর্ষাতুর ব্যক্তি নিজের অজান্তেই তার জীবনে আরও অভাব এবং ব্যর্থতাকে ডেকে আনে। অন্যের উন্নতি দেখে অবচেতন মনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়, তা মানুষের সৃজনশীলতাকে নষ্ট করে দেয়।

ঈর্ষা মানুষের ভেতরের শান্তিকে কুরে কুরে খায় এবং মনকে এতটাই ভারাক্রান্ত করে তোলে যে, ব্যক্তিটি নতুন কিছু করার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।

দুশ্চিন্তাঃ ভবিষ্যতের ঋণ যা আমরা আজও পরিশোধ করিনি

দুশ্চিন্তা হলো এমন এক সুতো যা দিয়ে আমরা ভবিষ্যতের কাল্পনিক দুঃখগুলোকে বর্তমানের গলায় ফাঁস হিসেবে পরিয়ে দিই।

অবচেতন মন প্রতিটি দুশ্চিন্তাকে একটি বাস্তব সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করে। যখন আমরা প্রতিনিয়ত ‘কী হবে’, ‘যদি এমন হয়’—এই জাতীয় নেতিবাচক ভাবনায় মগ্ন থাকি, তখন অবচেতন মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

দুশ্চিন্তা অবচেতন মনের প্রসেসিং ক্ষমতাকে ধীর করে দেয়। এটি অনেকটা কম্পিউটারের ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকা ভারী কোনো ভাইরাসের মতো, যা পুরো সিস্টেমকে হ্যাং করে ফেলে।

দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা থেকে জন্ম নেয় উদ্বেগ (Anxiety) এবং বিষণ্ণতা। অবচেতন মন যখন দুশ্চিন্তার ভারে নুইয়ে পড়ে, তখন মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লোপ পায় এবং সে এক ধরণের মানসিক পক্ষাঘাতের শিকার হয়। মানুষ তখন বর্তমান মুহূর্তের আনন্দ উপভোগ করতে ভুলে যায় এবং এক কাল্পনিক অন্ধকারের গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে থাকে।

বিষাক্ত ত্রয়ীর সম্মিলিত প্রভাবঃ যখন মন কাহিল হয়

ঈর্ষা, ভয় এবং দুশ্চিন্তা যখন একসাথে অবচেতন মনের ওপর আক্রমণ করে, তখন মানুষের জীবনীশক্তি বা ‘ভাইটাল এনার্জি’ দ্রুত ফুরিয়ে যায়। শরীর ও মন একে অপরের পরিপূরক। অবচেতন মন যখন এই নেতিবাচক আবেগে জর্জরিত থাকে, তখন তার প্রভাব শরীরেও পড়ে। অনিদ্রা, উচ্চ রক্তচাপ, হজমের সমস্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি হলো অবচেতন মনের ‘কাহিল’ হওয়ার লক্ষণ।

এই অবস্থায় মানুষ এক ধরণের আধ্যাত্মিক শূন্যতা অনুভব করে। তার কাছে জীবনকে একটি বোঝা বলে মনে হয়। অবচেতন মন যেহেতু আমাদের অভ্যাসের নিয়ন্ত্রক, তাই এই নেতিবাচকতাগুলো একসময় আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। মানুষ চাইলেও তখন ইতিবাচক হতে পারে না, কারণ তার অবচেতন মনের ‘সফটওয়্যার’ তখন ঈর্ষা, ভয় আর দুশ্চিন্তার কোডিংয়ে ভর্তি হয়ে গেছে।

মুক্তি ও নিরাময়ের পথ

এই বিষাক্ত চক্র থেকে বের হয়ে আসার চাবিকাঠি আমাদের হাতেই রয়েছে। অবচেতন মনকে পুনরায় সুস্থ ও শক্তিশালী করতে হলে কিছু কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজনঃ

১. সচেতনতা ও পর্যবেক্ষণঃ

প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে আমাদের মনের ভেতরে এই নেতিবাচক আবেগগুলো কাজ করছে। কোনো আবেগকে অস্বীকার করলে তা আরও শক্তিশালী হয়। তাই সেগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

২. কৃতজ্ঞতা (Gratitude):

ঈর্ষার একমাত্র ওষুধ হলো কৃতজ্ঞতা। অন্যের দিকে না তাকিয়ে নিজের জীবনের ছোট ছোট প্রাপ্তিগুলোর জন্য কৃতজ্ঞ হলে অবচেতন মনের অভাববোধ দূর হয়।

৩. বর্তমান মুহূর্তে বসবাসঃ

দুশ্চিন্তা দূর করার সেরা উপায় হলো বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়া। আমরা যদি আজকের কাজটিকে ঠিকঠাক করতে পারি, তবে ভবিষ্যৎ এমনিতেই সুন্দর হবে।

৪. ইতিবাচক নিশ্চিতকরণ (Affirmations):

অবচেতন মনকে নতুন করে প্রোগ্রাম করতে হবে। "আমি শান্ত", "আমি আত্মবিশ্বাসী", "আমি অন্যের সাফল্যে খুশি"—এই জাতীয় কথাগুলো বারবার বললে অবচেতন মনের পুরনো ক্ষতিকর বিশ্বাসগুলো মুছে যায়।

৫. ধ্যান ও নিঃশব্দতাঃ

নিয়মিত ধ্যান করলে অবচেতন মনের কোলাহল শান্ত হয়। এটি মনের আবর্জনা পরিষ্কার করার একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।

আমাদের মন একটি বাগান। ঈর্ষা, ভয় এবং দুশ্চিন্তা হলো সেই বাগানের আগাছা। আমরা যদি নিয়মিত এই আগাছা পরিষ্কার না করি, তবে তা আমাদের সম্ভাবনার ফুলগুলোকে কুপিয়ে মারবে। অবচেতন মনকে কাহিল হতে দেওয়া মানে হলো জীবনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। তাই আমাদের উচিত সচেতনভাবে ইতিবাচক চিন্তার চাষ করা।

মনে রাখবেন, ঈর্ষা আমাদের ছোট করে, ভয় আমাদের থামিয়ে দেয় আর দুশ্চিন্তা আমাদের ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়। এই তিন দানবের হাত থেকে অবচেতন মনকে মুক্ত রাখাই হলো সার্থক ও সফল জীবনের গোপন রহস্য।

আপনার অবচেতন মন যখন হালকা ও ভারমুক্ত থাকবে, তখনই আপনি আপনার জীবনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করতে পারবেন। জীবন তখন আর সংগ্রাম নয়, বরং এক পরম উদযাপনে পরিণত হবে। @ Mejanur Rahman Labu


২৫


পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত কেন উর্দুর পরিবর্তে ফারসিতে লেখা?

পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত কওমী তারানা উর্দুতে নয়, বরং ফারসিতে লেখা। এমনকি জাতীয় সঙ্গীতের ৫০টি শব্দের মধ্যে মাত্র একটি শব্দ উর্দু, সেই 'কা', শব্দটি মূলত উর্দু ব্যাকরণের অংশ। বাকি সব শব্দ ফারসি।

পাকিস্তানের সৃষ্টি ১৯৪৭ সালে হলেও জাতীয় সঙ্গীত তৈরি হতে সময় লেগেছিল প্রায় সাত বছর। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, পাকিস্তান সৃষ্টির তিন দিন আগে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর অনুরোধে কবি জাগান নাথ আজাদ একটি গান লিখেছিলেন, যা স্বাধীনতার পর কিছুদিন ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে এর কোনো দাপ্তরিক স্বীকৃতি ছিল না।

উর্দুতে জাতীয় সঙ্গীত না লেখার পেছনে দুটো কারণ ছিল। প্রথমত, উর্দু পাকিস্তানের সব মানুষের ভাষা না। দ্বিতীয়ত, উর্দুর প্রায় ৭০% শব্দ হিন্দির সাথে মিলে যায়, ফলে উর্দুতে জাতীয় সঙ্গীত লেখা হলে সেটি ভারতীয় মনে হতো। এ কারণে ফারসিকে বেছে নেওয়া হয়। কারণ ফারসি উপমহাদেশে মুসলিম ইতিহাসের স্বর্ণযুগকে প্রতিনিধিত্ব করে।

উপমহাদেশে ফারসি ভাষা আগমন ঘটেছিল সুলতান মাহমুদ গজনবীর মাধ্যমে। এটি ছিল দরবারের ভাষা। আর উর্দুর সৃষ্টি হয়েছিল তৎকালীন সময়ে সাম্রাজ্যের তুর্কি সেনা, প্রশাসনিক লোকজন আর দিল্লির আশেপাশের সাধারণ লোকজনের ভাষার মিশ্রণের মাধ্যমে। উর্দু শব্দ এসেছে তুর্কি শব্দ থেকে, যার অর্থ সৈন্য শিবির। এ কারণে উর্দুকে “সেনা শিবিরের ভাষা” বা "উচ্চ পর্যায়ের ভাষা" বলা হয়।

যাই হোক, পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত লেখার আগে এর সুর তৈরি হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা পাকিস্তানি ব্যবসায়ী এ আর গণি জাতীয় সঙ্গীতের লিরিক্স আর মিউজিকের জন্য ৫ হাজার রূপি পুরস্কার ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ডিসেম্বরে সরকার জাতীয় সঙ্গীতের জন্য কমিটি গঠন করে।

১৯৪৯ সালে বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ আহমেদ জি. চাগলা একটি সুর তৈরি করেন। ১৯৫০ সালে ইরানের শাহ যখন পাকিস্তান সফরে আসেন, তখন তাকে সম্মান জানানোর জন্য কোনো গান ছাড়াই এই সুরটি প্রথম বাজানো হয়েছিল। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সুরটিকে জাতীয় সঙ্গীতের সুর হিসেবে অনুমোদন দেয়।

সুর আগে থেকেই চূড়ান্ত থাকায় শর্ত ছিল যে, গানের কথাগুলো অবশ্যই সুরের তালের সাথে মিলতে হবে। এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শত শত কবি গান জমা দেন।

অবশেষে ১৯৫২ সালে ৭২৩টি লেখার মধ্যে থেকে প্রখ্যাত কবি হাফিজ জলন্ধরীর লেখা গানটি মনোনীত হয়। হাফিজ জলন্ধরীর শিক্ষক ছিলেন বিখ্যাত গোলাম কাদির ঘরামি।

১৯৫৪ সালের ১৩ আগস্ট রেডিও পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় সঙ্গীতটি সম্প্রচার করা হয়।

৫০ শব্দের এই গানটি তৈরি করতে মোট ২১টি বাদ্যযন্ত্র এবং ৩৮ জন কণ্ঠশিল্পী অংশ নিয়েছিলেন।

আশির দশকে জিয়াউল হক ক্ষমতায় বসার পর অনেক ফারসি শব্দের পরিবর্তে আরবির প্রচলন শুরু করেন। কিন্তু  তিনি ফারসি জাতীয় সঙ্গীতের পরিবর্তন করেননি। কারণ ফারসি শুধু একটি ভাষা, এটি মুসলিম সাম্রাজ্যের অংশ। যে সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল ইস্তাম্বুল থেকে দিল্লি পর্যন্ত। ফারসিতে জাতীয় সঙ্গীত রচনার মাধ্যমে পাকিস্তান নিজেকে নতুন রাষ্ট্র নয়, বরং সেই সাম্রাজ্যের আদি অংশ হিসেবে অংশ মনে করে।  @ Zahid Hasan Mithu


২৬


সর্বপ্রথম "চা" আবিস্কারের কথা

সৌভাগ্যবান এই পানীয় আবিষ্কার করেন ১৫০০ খ্রিষ্টপুর্বাব্দে চৈনিক শাসক শেন নাং( উচ্চারণটা শেনাং হতে পারে। চৈনিক নামগুলো উচ্চারণ করতে গেলে অধিকাংশ সময় আমি ক্লান্ত বোধ করি।)।

শেন তার সাম্রাজ্যে এই বলে ডিক্রি করেন যে তার প্রজাদের সবাইকে জলপানের পূর্বে অবশ্যই সেটা ফুটিয়ে নিতে হবে। তিনি নিজেই সবসময় ফোঁটানো পানি পান করতেন। একদিনের কথা, শেন তখন চীনের জুন্নান প্রদেশে অবস্থান করছেন। যাত্রাপথে এক বনানীর নিচে যাত্রা বিরতি করা হলো।

খোলা প্রান্তরে গাছের ছায়ায় বসে আছে সবাই। কেউ বিশ্রাম করছে, কেউ খাবারের ব্যবস্থা করছে। জলপাত্রে পানি ফুটানো হচ্ছে। রাজকীয় ফরমান সে তো আর বৃথা যেতে পারেনা। শেনের রাজ্যে তা হবার জো নেই। তাই পানিকে ফুটতেই হবে। পানির স্ফূটনাংক ১০০ ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেড। হঠাৎ বাতাস পাশের ঝোপ থেকে কিছু পাতা উড়িয়ে এনে ফুটন্ত পানির ভিতর ফেলল। পাতাটাকে তুলে ফেলার চেষ্টা করার আগেই সেটা জলে দ্রবীভূত হয়ে গেছে। জলের রং বদলে গেলো। কৃষি এবং ভেষজ চিকিৎসায় শেনের ব্যাপক আগ্রহ ছিলো। শেন কৌতূহলী হয়ে জলের ঘ্রাণ শুঁকে দেখেন অন্যরকম এক মাদকতা ছড়ানো গন্ধ। তিনি এটার স্বাদ নিলেন। প্রথম মানুষ চায়ের স্বাদ নিলো। তারপর তো রীতিমত চায়ের প্রেমে পড়ে গেলো। টি এর বাংলা হিসেবে আমরা চা ব্যবহার করি। চা কিন্তু বাংলা শব্দ না। চা চীনা শব্দ।শাং শাসনামলে (১৫০০-১০৪৬ খ্রিষ্টপুর্বাব্দ) চা পাতার রস ঔষধি পানীয় হিসেবে সেবন করা হত।

সিচুয়ান প্রদেশের লোকেরা প্রথম চা পাতা সিদ্ধ করে ঘন লিকার তৈরী করা শেখে। ১৬১০ সালের দিকে ইউরোপে চায়ের প্রবেশ ঘটে পর্তুগীজদের হাত ধরে । শীতের দেশে উষ্ণ চায়ের কাপ প্রাণে স্ফুর্তির জোয়ার নিয়ে এলো। আজ থেকে আনুমানিক আড়াইশো বছর পুর্বে এশিয়ার অনেক দেশে চা পাতার তৈরী ইট মুদ্রার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হত। এ থেকে সহজেই বোঝা যায় তৎকালীন সময়ে চায়ের কদর বোঝা যায়।

১৭০০ সালের দিকে ব্রিটেনে চা জনপ্রিয় হয়। ইংরেজদের হাত ধরে চা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। তারা ভারতের আসাম রাজ্যে চায়ের চাষ শুরু করে। চা উৎপাদনে চীনের একআধিপত্যকে খর্ব করতে বিলাতিরা ভারতে চা চাষ শুরু করে। প্রথম দিকে এংলো ইন্ডিয়ানরাই চা ব্যবসা শুরু করে পরে ভারত স্বাধীনতা লাভ করার পর চা শিল্প দেশীয়দের হাতে বিকশিত হয়। আসাম থেকে আসে বাংলায়।

সংগৃহীত

World Vision (বিশ্ব দর্শন)


২৭


শিশুদের অটিজম

শিশুদের অটিজম সম্পর্কে প্রত্যেক অভিভাবকের যা জানা বিশেষ ভাবে জরুরি। অটিজম বা Autism Spectrum Disorder (ASD) একটি স্নায়ুবিক বিকাশজনিত অবস্থা, যা শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশকে প্রভাবিত করে। এর ফলে শিশুর সামাজিক যোগাযোগ, ভাষা ব্যবহার এবং আচরণে ভিন্নতা দেখা যায়। একে “স্পেকট্রাম” বলা হয়, কারণ অটিজমে আক্রান্ত প্রতিটি শিশুর লক্ষণ ও সক্ষমতা ভিন্ন ভিন্ন হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি ১০০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ১–২ জন অটিজমে আক্রান্ত হতে পারে। অনেক শিশুর বুদ্ধিমত্তা স্বাভাবিক বা বেশি হলেও তাদের যোগাযোগে সমস্যা থাকতে পারে। আবার কারও কথা বলার ক্ষমতা সীমিত থাকে এবং শেখার ক্ষেত্রে বিলম্ব দেখা যায়। বেশিরভাগ শিশুই নির্দিষ্ট রুটিন পছন্দ করে এবং ছোটখাটো পরিবর্তনেও অস্বস্তি বোধ করে।

প্রাথমিক লক্ষণ (Early Signs)

অটিজমের লক্ষণ সাধারণত শৈশবেই প্রকাশ পায়। অনেক ক্ষেত্রে এক বছর বয়সের মধ্যেও বোঝা যায়। অভিভাবকদের সচেতনতা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১) নামে সাড়া না দেওয়া

২) নিজের প্রয়োজন প্রকাশ না করা

৩) কথা বলতে দেরি হওয়া বা কথা না বলা

৪) খেলায় অর্থহীন শব্দ বা অস্বাভাবিক আচরণ

৫) কোনো কিছু দেখালে সেদিকে দৃষ্টি না দেওয়া

স্ক্রিন টাইম ও শিশুর বিকাশ

১) বর্তমানে শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়টি উদ্বেগজনক। ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য স্ক্রিন একেবারেই নিরুৎসাহিত করা হয়।

২) অনেক সময় বাবা-মা শিশুকে খাওয়ানোর জন্য মোবাইল বা টিভি ব্যবহার করেন, যা ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়। এতে করে মুখোমুখি যোগাযোগ কমে যায়, ভাষা শেখার গতি ধীর হয় ও সামাজিক দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নির্ণয় ও চিকিৎসা

১) অটিজম নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো রক্ত পরীক্ষা বা স্ক্যান নেই। শিশুর আচরণ ও বিকাশ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই এটি শনাক্ত করা হয়।

২) অটিজমের স্থায়ী নিরাময় না থাকলেও, সঠিক সময়ে সঠিক সহায়তা শিশুর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চিকিৎসা ও সহায়তার প্রধান উপায়গুলো হলো:

৩) স্পিচ থেরাপি: ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়নে

৪) অকুপেশনাল থেরাপি: দৈনন্দিন কাজ শেখাতে (খাওয়া, দাঁত ব্রাশ করা ইত্যাদি)

৫) বিহেভিয়ারাল থেরাপি: সামাজিক আচরণ উন্নয়নে

৬) অভিভাবক প্রশিক্ষণ: শিশুকে সঠিকভাবে সহায়তা করার জন্য

৭) কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে, যা অতিসক্রিয়তা, ঘুমের সমস্যা বা খিটখিটে মেজাজ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, তবে এটি অটিজম নিরাময় করে না।

৮) অভিভাবকদের করণীয়

অটিজম ব্যবস্থাপনা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে

১) অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

২) শিশুর সাথে নিয়মিত কথা বলুন

৩) তার সাথে খেলুন এবং সময় কাটান

৪) তার আচরণ মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করুন

৫) কোনো উদ্বেগ হলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, বিকাশ বিশেষজ্ঞ বা শিশু স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। টিকা দেওয়ার সময়গুলো শিশুর বিকাশ পর্যবেক্ষণের একটি ভালো সুযোগ হতে পারে।

শেষ কথা

প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিকভাবে শনাক্ত ও সহায়তা পেলে অটিজমে আক্রান্ত অনেক শিশুই কথা বলা, শেখা এবং দৈনন্দিন জীবনের দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি করতে পারে। সচেতনতা, ভালোবাসা এবং ধৈর্যই পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে।

তথ্যসূত্র: World Health Organization | Centers for Disease Control and Prevention | American Academy of Pediatrics | National Institute of Mental Health | Autism Speaks

World Vision (বিশ্ব দর্শন)


২৮


ভাগ্য নয়, সংযমই আমাদের সাফল্যের চাবিকাঠি– একটি অনুপ্রেরণামূলক লেখাটা পড়ে কমেন্টে জানাবেন কেমন লাগলো।

আমাদের আশেপাশে অনেকেই আছেন, যারা জীবনের প্রতিটা ব্যর্থতার পেছনে ভাগ্যকে দায়ী করেন। “ভাগ্যে না ছিল”, “আমার কপালে সাফল্য নেই”— এই কথাগুলো যেন আমাদের জীবনের অজুহাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সত্যিটা হল, ভাগ্য নয়, সংযম আর অধ্যবসায়ই হলো সেই গোপন চাবিকাঠি, যা দরজা খুলে দেয় সাফল্যের রাজপথে।

সংযম মানে কি শুধু ত্যাগ?

অনেকেই ভাবেন, সংযম মানেই জীবন থেকে সবকিছু বাদ দিয়ে কঠিন পথে হাঁটা। না, সংযম মানে হল— নিজের ইচ্ছেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, যখন দরকার তখন নিজেকে থামিয়ে দেওয়া, যাতে বড় কোনো লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। ছোট ছোট লোভ, তাৎক্ষণিক আনন্দ— এইসব বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হওয়াই সংযমের প্রকৃত মানে।

উদাহরণ দিয়ে বলি...

ধরো, তুমি একজন স্টুডেন্ট। তোমার সামনে দুইটা অপশন— একটা সিরিজ দেখা, আর একটা হলো পড়াশোনা করে পরের দিনের টেস্টের জন্য প্রস্তুত হওয়া। তোমার মাথা বলছে, “আজ একটু রেস্ট নিই”, কিন্তু হৃদয় জানে— এই একদিনের প্রস্তুতিই হয়তো তোমার রেজাল্ট বদলে দিতে পারে। যদি তুমি সেই মুহূর্তে সংযম দেখাতে পারো, তাহলে তুমি নিজের ভবিষ্যতের প্রতি সম্মান দেখালে। এটাই সাফল্যের শুরু।

বড় মানুষেরা কি ভাগ্যে ভরসা করতেন?

স্টিভ জবস, এপিজে আবদুল কালাম, স্বামী বিবেকানন্দ—এদের কারো সাফল্য ভাগ্যের দয়া ছিল না। ওরা নিজেদের চাওয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন। ওদের জীবনে একটা জিনিস ছিল—discipline এবং self-control।

সংযম আসলে কীভাবে সাফল্য এনে দেয়?

ফোকাস বাড়ায়– যখন তুমি নিজের ইচ্ছেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখো, তখন তোমার মন একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলে।

সময় নষ্ট হওয়া কমে– তোমার কাছে প্রতিটা মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সাহস আর আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়– নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, তুমি বুঝতে পারো— তুমি সবকিছু পারো।

শেষ কথা

ভাগ্য কেবল একটা গল্প, যেটা আমরা বলি নিজের ব্যর্থতাকে লুকাতে। কিন্তু সংযম হল সেই বাস্তব শক্তি, যেটা দিয়ে মানুষ পাহাড়ও সরিয়ে ফেলে। তাই আজ থেকে অজুহাত নয়, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনো। রোজ একটু একটু করে নিজেকে গড়ে তোলো। দেখবে, সাফল্য দরজায় কড়া নাড়বেই।

তোমার হাতে আছে সেই চাবিকাঠি। শুধু দরজাটা খোলার সাহস দেখাও। @  লক্ষ্যপথ


২৯


হ্যাগফিশ

সমুদ্রের এমন একটা প্রাণী আছে… যাকে ধরতে গেলেই পুরো পানি হঠাৎ জেলির মতো হয়ে যায়!

পৃথিবীতে এমন কিছু প্রাণী আছে, যেগুলো দেখলে মনে হবে—এগুলো যেন অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে! তেমনই এক অদ্ভুত প্রাণী হলো Hagfish।

এই প্রাণীটা দেখতে অনেকটা সাপের মতো, কিন্তু আসলে এটা মাছের খুব প্রাচীন এক ধরনের প্রজাতি—যারা প্রায় ৩০ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে আছে!

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আর অবাক করা বিষয় হলো—হ্যাগফিশ বিপদের সময় এমন এক ধরনের slimy পদার্থ বের করে, যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পানির সাথে মিশে বিশাল জেলির মতো হয়ে যায়!এই slime এতটাই ঘন হয় যে, শিকারী প্রাণীর গিলস (শ্বাস নেওয়ার জায়গা) বন্ধ হয়ে যেতে পারে! ফলে শিকারী নিজেই পালিয়ে যায়!

আরও অবাক করার মতো ব্যাপার—হ্যাগফিশের কোনো হাড় (bone) নেই! তাদের শরীর পুরোটা নরম cartilage দিয়ে তৈরি।

Scientistরা এখন এই slime নিয়ে research করছে, কারণ এটা দিয়ে ভবিষ্যতে bulletproof material পর্যন্ত তৈরি করা সম্ভব হতে পারে!

ভাবো তো, একটা ছোট্ট প্রাণী—যার “পিচ্ছিল রস” একদিন মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজে লাগতে পারে! @ মহাকাশ


৩০


পড়াশোনায় এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার

:

মো . নাজমুল হাসান বর্তমান সময়ে যেকোনো কিছু শেখা ও জানার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ( এআই ) ব্যবহার । অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে , এআইকে শুধু উত্তর পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে নয় , বরং শেখার সহকারী হিসেবে ব্যবহার করলে শেখা আরও দ্রুত , গভীর ও কার্যকর হয় । এআই শুধু তথ্য দেয় না , বরং তথ্যকে গুছিয়ে উপস্থাপন করে , ব্যাখ্যা করে এবং বিষয়টি বুঝতেও সাহায্য করে । তাই পড়াশোনায় এআই সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য নিচে কিছু কার্যকর কৌশল তুলে ধরা হলো— সঠিকভাবে প্রশ্ন করুন এআই থেকে ভালো উত্তর পেতে অবশ্যই নির্দিষ্ট ও পরিষ্কার প্রশ্ন করতে হবে । কী জানতে চান , কীভাবে উত্তর চান এবং উদাহরণ প্রয়োজন কি না— এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন । প্রেক্ষাপট দিলে উত্তর আরও নির্ভুল হয় । যেমন আপনি কোন শ্রেণিতে পড়েন , কত বড় উত্তর চান বা কোন

স্তরের ব্যাখ্যা প্রয়োজন । এসব জানালে এআই আরও কার্যকরভাবে সাহায্য করতে পারে । প্রথমবারে সন্তোষজনক উত্তর না পেলে প্রশ্নটি পুনর্গঠন করে আবার জিজ্ঞেস করা এবং তথ্য যাচাই করা উচিত ।

একই বিষয় বিভিন্নভাবে শিখুন একই বিষয় শুধু একভাবে না পড়ে বিভিন্নভাবে বোঝার চেষ্টা করুন । এআইকে সহজ ভাষায় , গল্প আকারে বা বাস্তব উদাহরণসহ ব্যাখ্যা দিতে বলুন । প্রয়োজনে সংক্ষিপ্ত , বিস্তারিত বা উভয় ধরনের ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে । এতে ধারণা আরও পরিষ্কার হয় এবং শেখা সহজ ও কার্যকর হয় ।

নোট , টেবিল তৈরি করুন গবেষণায় দেখা গেছে , গঠনমূলক ও চিত্রভিত্তিক তথ্য মস্তিষ্ক দ্রুত গ্ৰহণ করে এবং দীর্ঘ সময় মনে রাখতে পারে । তাই এআই ব্যবহার করে সারাংশ , টেবিল , পয়েন্ট বা ফ্লোচার্ট আকারে নোট তৈরি করা যেতে পারে । এতে কঠিন পড়াও সহজে বোঝা ও মনে রাখা যায় ।

নিজেকে যাচাই করুন এআই দিয়ে অনুশীলন , কুইজ তৈরি বা সমস্যা সমাধান করে নিজের প্রস্তুতি যাচাই করা যায় । ভুল উত্তর দিলে এআইকে জিজ্ঞেস করা যায় , কোথায় ভুল হয়েছে বা কীভাবে উন্নতি করা যায় ।

শেখার সঙ্গী হিসেবে এআই এআইকে শুধু তথ্যের উৎস হিসেবে না দেখে শেখার ও চিন্তার সঙ্গী হিসেবে ব্যবহার করা উচিত । কোনো বিষয় না বুঝলে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা চাইতে পারেন , নতুন ধারণা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন । এতে সৃজনশীল চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং শেখা আরও গভীর হয় ।

নতুন দক্ষতা অর্জন এআই ব্যবহার করে নতুন ভাষা শেখা বা বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপ করা যায় । এআইকে বলা যেতে পারে বেসিক থেকে শেখাতে বা প্রতিদিন অল্প অল্প করে অনুশীলন করাতে । এতে ধীরে ধীরে দক্ষতা অর্জন সহজ হয় । সবশেষে বলা যায় , এআই শতভাগ নির্ভুল নয় । তাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবশ্যই যাচাই করা প্রয়োজন ।

সোর্স আজকের পত্রিকা


৩১


পারস্যের আকিমেনিড সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা  সাইরাস দ্য গ্রেট

মহাকালের শ্রেষ্ঠতর মহানায়কের কাহিনি যার মৃত্যু হয়েছিল ৫৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। তাঁর জন্ম ছিল অলৌকিক। জন্মের পূর্বে রাজজ্যোতিষী গণনা করে বলেছিলেন যে তিনি জন্ম  নেবেন এবং তরুণ বয়সে তাঁর নানা অর্থাৎ ক্ষমতাসীন সম্রাটকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করবেন।

রাজজ্যোতিষীর কথা শুনে মিডিয়ার সম্রাট অস্তাইজেস তাঁর মেয়েকে স্বামীর বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন। সম্রাট লক্ষ করেন যে রাজকুমারী মান্দানে অন্তঃসত্ত্বা; তিনি জামাতা প্রথম ক্যাম্বিসেসকে খবর পাঠালেন যে নবজাতক ভূমিষ্ঠ না হওয়া পর্যন্ত মান্দানে অস্তাইজেসের রাজপ্রাসাদে থাকবেন। ক্যাম্বিসেস ছিলেন অস্তাইজেসের অধীন আনসান প্রদেশের গভর্নর । এ অবস্থায় রাজকুমারী একটি পুত্রসন্তান প্রসব করলে সম্রাট শিশুটিকে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রধান সেনাপতি হারপাগাসের কাছে হস্তান্তর করেন এবং নবজাতককে মেরে তার লাশ গুম করার নির্দেশ দেন।

সেনাপতি হারপাগাস ছিলেন ধর্মভীরু নীতিপরায়ণ মানুষ। তিনি শিশু হত্যা বিশেষত রাজ শিশু হত্যা করে অভিশপ্ত হতে চাচ্ছিলেন না। ফলে তিনি একটি কুকুর হত্যা করেন এবং পশুটির রক্ত সম্রাটকে দেখান। অন্যদিকে শিশুটিকে লালন-পালনের জন্য একটি কৃষক-রাখাল পরিবারে হস্তান্তর করেন। রাখাল এবং তার বউ অত্যন্ত যত্নের সাথে শিশুটিকে লালনপালন করে। দশ বছর বছর পর আসটিয়াজেস ঘটনাক্রমে নিজের নাতিকে চিনতে পারেন এবং মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেন।  রাজজ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, শিশুটি তরুণ বয়সে তার নানা অস্তাইজেসকে হত্যা করে মিডিয়া সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর ৩০ বছরের শাসনামলে তিনি এত বড় একটি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা মানবজাতির ইতিহাসে অন্য কোনো সম্রাট করতে পারেননি। পৃথিবীর তিনটি প্রধান ধর্মমত অর্থাৎ ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম এই সম্রাটকে মর্যাদার সাথে সম্মান করে। পবিত্র বাইবেল, কোরআনে সম্রাটের নাম বহুবার সম্মানের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। ইহুদিবাদের ইতিহাসে সম্রাটকে ইহুদি জাতির ত্রাণকর্তা এবং জেরুজালেমের রক্ষক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

পবিত্র কোরআন যাকে জুলকারনাইন বলে সম্বোধন করেছে, ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তানাখ বা ওল্ড টেস্টামেন্টের বুক অব ইশাইয়া এবং বুক অব এজরাতে তাঁকে মসিহ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইতিহাসে তাঁর নাম সাইরাস দ্য গ্রেট। মাত্র ৩০ বছরের শাসনামলে তিনি লিডিয়া, মিডিয়া, ব্যাবিলন ও মিসরের মতো চারটি বৃহৎ সাম্রাজ্য দখল করেছিলেন। সমগ্র ইরান, ইরাক, তুরস্ক, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য, জেরুজালেমসহ কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে শুধু তাঁর প্রভুত্ব নয়; বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থান নিশ্চিতকরণ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রীয় পূর্তকর্মের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সাম্রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপন করার এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। এত কিছু করার পরও ছোট্ট একটি লোভের কারণে এই কিংবদন্তির শাসকের কিভাবে মৃত্যু হয়েছিল ।

মধ্য এশিয়ার মাসাগেতাই জাতির রানি তোমিরিসকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান সাইরাস। আজকের তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তান রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী ছোট একটি রাষ্ট্রে যাযাবর মাসাগেতাইরা সবেমাত্র স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে। হঠাৎ রাজার মৃত্যু হলে প্রজারা রানিকে সিংহাসনে বসান। তিনি এর আগে রাজনীতি, যুদ্ধ ইত্যাদি কোনো বিষয়েই পারদর্শী ছিলেন না। অন্যদিকে বয়সে প্রবীণা রানি রূপে-গুণে এমন ছিলেন না, যার জন্য কোনো পুরুষ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। তা ছাড়া সাইরাসের সাম্রাজ্যের আয়তন যেখানে ৬০ লাখ বর্গকিলোমিটার, সেখানে রানি তোমিরিসের রাষ্ট্রের আয়তন ২০ হাজার বর্গকিলোমিটারও ছিল না। এ অবস্থায় সাইরাস কেন রানিকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন এবং সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর বিক্ষুব্ধ সাইরাসের যুদ্ধ ঘোষণা এবং সেই যুদ্ধে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নানা মত আছে।

রানি তোমিরিস বহু অনুনয়-বিনয় এবং কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েও যুদ্ধ এড়াতে পারলেন না। সাইরাস তাঁর বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে সির দরিয়া নদীর তীরে উপস্থিত হলেন। রানি তোমিরিস চসাইরাসকে একটি চিঠিও লিখেন, যা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। রানি লেখেন—

রক্তপিপাসু সাইরাস, আমি শপথ করছি, আমি তোমাকে রক্ত দিয়েই তৃপ্ত করব।

উল্লিখিত ঘটনার পর স্বয়ং রানি আহত বাঘিনীর মতো গর্জন করতে করতে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হন। ফলে মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে অসম যুদ্ধে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাহিনী পরাজিত হয় এবং পৃথিবীর সর্বকালের সেরা সাম্রাজ্যের অধিপতি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন।

উল্লিখিত কাহিনির উপসংহার হল-অতি প্রাপ্তি এবং অতি সফলতা মানুষকে নিয়ন্ত্রণহীন বানিয়ে ফেলে, এবং দ্রুত পতন ডেকে আনে। 

-সংগৃহিত


৩২


দা ভিঞ্চির টু-ডু লিস্ট দেখলে বুঝতেন — শেষ না করাটাও একটা প্রতিভা, নাম হল Creative Restlessness অর্থাৎ সৃষ্টিশীল অস্থিরতা

যে মানুষটা পৃথিবী বদলে দিল সে নিজেই নিজের কাজ শেষ করতে পারত না — এবং এটা তার ত্রুটি ছিল না

ব্যথার জায়গাটা চিনুন

আপনি কি এমন কেউ যে একটা কাজ শুরু করেন এবং তারপর আরেকটা আইডিয়া মাথায় আসে আর প্রথমটা আর শেষ হয় না। নোটবুকে অর্ধেক লেখা আছে। ফোনে বিশটা ড্রাফট পড়ে আছে। একটা কোর্স শুরু করেছিলেন তিন মাস আগে — দ্বিতীয় ক্লাসের পর থেকে বন্ধ। আপনি নিজেকে বলেছেন আমি অলস বা আমার ধৈর্য নেই। কিন্তু আসল সমস্যা হয়তো একদম অন্য জায়গায়।

দা ভিঞ্চির গোপন সমস্যা

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি মানুষটার কথা একটু ভাবুন। মোনালিসা এঁকেছেন। উড়োজাহাজের নকশা করেছেন রাইট ব্রাদার্সের চারশো বছর আগে। মানুষের শরীরের ভেতরটা ছবি এঁকে বুঝিয়েছেন ডাক্তারদের। কিন্তু এই মানুষটারই ঠিকাদার কাজ দিয়ে বিরক্ত হয়ে যেত। কারণ কাজ আর শেষ হত না। প্রায় বিশটার বেশি বড় কাজ তিনি মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তখন লোকে ভাবত এই লোক হয়তো ঠিক নেই।

 বিজ্ঞান এর নাম দিয়েছে

এখন বিজ্ঞানীরা এই বিষয়টার একটা নাম দিয়েছেন। নাম হল Creative Restlessness অর্থাৎ সৃষ্টিশীল অস্থিরতা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শেলি কারসন ২০১১ সালে তার গবেষণায় দেখান যে যাদের মস্তিষ্কে Leaky Sensory Gating থাকে তারা একসাথে অনেক বেশি তথ্য প্রক্রিয়া করে। সহজ কথায় বললে তাদের মস্তিষ্কের ফিল্টার একটু আলগা থাকে। ফলে একটা কাজ করতে করতেই মাথায় আরও দশটা আইডিয়া ঢুকে যায়। এটা দুর্বলতা নয় — এটা এক ধরনের অসাধারণ মস্তিষ্কের বৈশিষ্ট্য।

রমেশ স্যারের গল্প

ধরুন রমেশ স্যার। সকালে উঠে ঠিক করলেন আজ একটা বাংলা প্রবন্ধ লিখবেন। লিখতে বসে মনে হল একটা ছবি থাকলে ভালো হত। ছবি খুঁজতে গিয়ে ইউটিউবে চলে গেলেন। সেখানে একটা রান্নার ভিডিও দেখলেন। মনে হল আজ ওই রান্না বানাবেন। রান্না করতে করতে ভাবলেন রেসিপি লিখে রাখবেন। রেসিপি লিখতে গিয়ে মনে পড়ল প্রবন্ধটার কথা। সন্ধ্যায় দেখা গেল প্রবন্ধ নেই রান্নাও শেষ হয়নি রেসিপিও লেখা হয়নি। রমেশ স্যার অলস নন। তার মস্তিষ্ক শুধু একটু বেশি সক্রিয়।

 একটাই সমাধান যা কাজে লাগে

দা ভিঞ্চি নিজে একটা কৌশল ব্যবহার করতেন। তিনি প্রতিটা নতুন আইডিয়া নোটবুকে লিখে রাখতেন কিন্তু সেই মুহূর্তে সেটা ধরতেন না। আইডিয়াটাকে বলতেন তুমি অপেক্ষা করো। এখন যেটা করছি সেটা শেষ করি। মনোবিজ্ঞানীরা এই কৌশলকে বলেন Capture and Release। নতুন আইডিয়া এলে সেটা একটা আলাদা খাতায় বা ফোনে লিখে ফেলুন। মস্তিষ্ককে বলুন ঠিক আছে আমি ভুলিনি। এখন পরের কাজে মনোযোগ দিচ্ছি। এইটুকু করলেই মস্তিষ্ক অনেকটা শান্ত হয়।

আপনিও কি এই অসম্পূর্ণ কাজের দলে আছেন।

আপনার জীবনেও কি এমন কোনো কাজ আছে যেটা শুরু হয়েছিল কিন্তু শেষ হয়নি। নিচে কমেন্টে লিখুন সেই কাজটার নাম। একটা কমেন্ট করলেই হয়তো সেটা শেষ করার প্রথম পদক্ষেপ হয়ে যাবে। @  পার্থ প্রতিম রায়


33



টোটালিটারিয়ান রাষ্ট্র 


জর্জ অরওয়েলের 1984 উপন্যাসটা যারা পড়েছেন তাদের নিশ্চয়ই জানা আছে ওই উপন্যাসে এমানুয়েল গোল্ডস্টেইন নামে একটা রহস্যময় চরিত্র আছে।

.

ওই বইয়ে অরওয়েল দেখিয়েছেন কিভাবে একটা টোটালিটারিয়ান রাষ্ট্র টিকে থাকতে হলে, একটা ছদ্ম শত্রুর ( Shadow Enemy ) উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরী। গোল্ডস্টেইন হচ্ছে অরওয়েলের সেই ছদ্ম শত্রু।

.

টোটালিটারিয়ান রাষ্ট্রের যাবতীয় ব্যর্থতার দায়ভার কৌশলে ঐ ছদ্ম শত্রুর উপর চাপানো হয়ে থাকে। যার ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র নিরাপদ থাকে এবং জনগণের উপর আরো অধিক নিয়ন্ত্রণ লাভ করে।

.

জনগণের উপর যত বেশি নিয়ন্ত্রণ টোটালিটারিয়ান রাষ্ট্র তত নিরাপদ। উপন্যাসের একদম শেষে এসে নায়ক জানতে পারে ওই ছদ্ম শত্রু আর কিছুই না। বরং হেড অফ স্টেট সিকিউরিটির একটা ফেক আইডি মাত্র।

.

আজ বিশ্বের কোনায় কোনায় জর্জ অরওয়েলের সেই টোটালিটারিয়ান রাষ্ট্র কায়েম হয়েছে। স্বভাবতই ছদ্ম শত্রুর প্রয়োজন হচ্ছে অনেক বেশি।

.

কোল্ড ওয়ার আমলে যেমন কমিউনিজম ও ক্যাপিটালিজম দুই রাষ্ট্রের এই চাহিদা পূরণ করেছিল। যার ফলে উভয় রাষ্ট্রই নিজ জনগণের উপর নিরংকুশ কর্তৃত্ব স্থাপন করে নিয়েছিল।

.

কোল্ড ওয়ার শেষ হয়ে গেলে আমেরিকার প্রয়োজন হয়ে পড়ে নতুন শত্রুর। তখন সে খুজে নেয় ইসলামী মৌলবাদকে। দুনিয়ার যে প্রান্তে যাই ঘটুক না কেন মুসলিম ও ইসলামী মৌলবাদকে দায়ী করা হতে থাকে।

.

কালের বিবর্তনে এই শত্রুর আবেদনও এক সময় শেষ হয়ে যায় এবং আমেরিকা খুঁজতে শুরু করে নতুন শত্রু। খুব শিগ্রই পেয়েও যায়। এই নতুন শত্রুর নাম চীনা দানব।

.

এক কালে যে সমস্ত পত্র পত্রিকা ও মিডিয়া কম্যুনিজম ও ইসলামী মৌলবাদকে আমেরিকার এবং বিশ্বের সব সমস্যার কারণ হিসাবে দেখিয়েছিল , এখন তাদের কলম চীনকে সমস্ত বিশ্বের যাবতীয় সমস্যার মূল কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে। @  ইতিহাসের আড্ডা


৩৪


ভিড়ে তো ভেড়ারা থাকে, বাঘ একাই চলে; একা চলতে ভয় পাবেন না—মনে রাখবেন, ইতিহাস যারা গড়ে, তারা কখনোই দল বেঁধে চলে না; আপনার রাস্তাটা কঠিন হতে পারে, কিন্তু গন্তব্যটা সবার চেয়ে সুন্দর হবে।

Better to Walk Alone than with a Crowd Going in the Wrong Direction

আমরা ছোটবেলা থেকে শিখি—"সবাই মিলেমিশে থাকো।"

কিন্তু বড় হয়ে দেখি, যারা সবার সাথে মিশে থাকে, তারা ভিড়ের মধ্যেই হারিয়ে যায়।

আর যারা ভিড় থেকে আলাদা হয়ে নিজের রাস্তায় চলে, তারাই ইতিহাস গড়ে।

একা থাকাটা কোনো দুর্বলতা নয়, এটা একটা শক্তি।

ঈগল পাখি একাই আকাশের অনেক উঁচুতে ওড়ে, আর পায়রা বা কাকেরা দল বেঁধে নিচুতে ওড়ে।

আপনি যদি জীবনে সত্যিই বড় কিছু করতে চান, তবে আপনাকে একা চলার অভ্যাস করতে হবে।

কারণ, সফলতার চূড়াটা খুব সরু, সেখানে সবার জায়গা হয় না।

সবাই আপনাকে বুঝবে না, আর আপনার বোঝানোর দরকারও নেই।

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে অন্যের জন্য হাততালি দেওয়া খুব সহজ।

কিন্তু মঞ্চে একা দাঁড়িয়ে হাততালি পাওয়াটা খুব কঠিন।

তার জন্য কলিজা লাগে।

আপনার বন্ধু কম? বা নেই? মন খারাপ করবেন না।

এর মানে হলো—আপনার লেভেল মেইনটেইন করার মতো মানুষ খুব কম।

কেন একা চলা শিখবেন?

১. নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ (Total Control)

দলে থাকলে অন্যের মতের সাথে সমঝোতা করতে হয়।

"ওরা কী ভাববে?"—এই ভয়ে নিজের স্বপ্নগুলো মারতে হয়।

কিন্তু একা থাকলে আপনি স্বাধীন।

আপনি যখন খুশি দৌড়াতে পারেন, যখন খুশি থামতে পারেন।

আপনার রিমোট কন্ট্রোলটা আপনার হাতেই থাকে।

২. মানসিক শক্তি (Mental Toughness)

যে একাই সব সামলায়, তাকে কেউ ভয় দেখাতে পারে না।

বিপদে পড়লে সে এদিক-ওদিক তাকায় না, সে জানে—"আমাকে একাই লড়তে হবে।"

এই আত্মবিশ্বাসটা আপনাকে অপরাজেয় বানিয়ে দেয়।

মনে রাখবেন, হীরে একা একাই মাটির নিচে তৈরি হয়, কয়লার মতো গাদা গাদা থাকে না।

৩. ফোকাস (Laser Focus)

বন্ধুবান্ধব, আড্ডা আর সোশ্যাল মিডিয়া—এগুলো আপনার সময়ের বড় শত্রু।

একা থাকলে আপনার ফোকাস নষ্ট হয় না।

আপনি নিজের লক্ষ্যের দিকে তীরের মতো এগিয়ে যেতে পারেন।

ভিড় আপনাকে শুধু শব্দ দেবে, আর একাকিত্ব আপনাকে বুদ্ধি দেবে।

শেষ কথা

তাই একা খেতে, একা ঘুরতে বা একা সিনেমা দেখতে লজ্জা পাবেন না।

নিজেকে সময় দিন।

ভিড় থেকে সরে এসে দেখুন, পৃথিবীটা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।

বাঘের মতো গর্জন করতে হলে, জঙ্গলে একাই রাজত্ব করতে হয়।

নিজেকে বলুন—

"আমি ভিড়ের অংশ নই, আমিই পথপ্রদর্শক।"

@  MotivationalQuotesBangla


৩৫


 সাইকোলজিক্যাল রিঅ্যাক্ট্যান্স

অত্যাচার যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন প্রতিটি সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে বিপ্লবীতে পরিণত হয়। মানুষ সবকিছু হারাতে প্রস্তুত থাকতে পারে, কিন্তু একটি জিনিস কখনোই নয়—স্বাধীনতা। যখন মানুষ অনুভব করে তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তখন তার ভেতরে জমতে থাকে অদম্য প্রতিরোধের শক্তি  যাকে  সাইকোলজিক্যাল রিঅ্যাক্ট্যান্স (Psychological Reactance) বলা হয়।

মনোবিজ্ঞানী জ্যাক ব্রেহম এই তত্ত্বটি প্রদান করেন। যখন কোনো ব্যক্তি অনুভব করেন যে তার স্বাধীনভাবে চিন্তা করার বা কাজ করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের তীব্র মানসিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এই অবস্থাকে 'রিঅ্যাক্ট্যান্স' বলা হয়। এটি মানুষকে হারানো স্বাধীনতা ফিরে পেতে বা নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট হতে প্ররোচিত করে, যা বিপ্লবের প্রাথমিক ধাপ।

তখন প্রতিটি মানুষ যেন একেকটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি—ভেতরে ভেতরে জমতে থাকে বিস্ফোরক আবেগ। কখন, কোথায়, কীভাবে সেই বিস্ফোরণ ঘটবে, তা আগে থেকে বোঝা যায় না। ইতিহাসের পাতা বারবার সেই বিস্ফোরণের সাক্ষী হয়েছে, আর সময়ে সময়ে তার পুনরাবৃত্তিও আমরা দেখেছি।  

সাইকোলজিক্যাল রিঅ্যাক্ট্যান্সের মূল দিকসমূহ:

উদাহরণ:

কেন এটি ঘটে?

মানুষ স্বভাবতই নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পছন্দ করে। যখন সেই স্বাধীনতায় বাধা আসে, তখন মানসিক চাপে পড়ে মানুষ তা পুনরুদ্ধার করতে চায়।

@  পার্থ প্রতিম রায়


মন ভালো করার জাদুকরী ‘হাঁটা’ থেরাপি

বিজ্ঞান বলছে, যখনই মনে হবে মনটা ‘খারাপ হয়ে গেছে, তখনই একজোড়া স্যান্ডেল বা জুতো পায়ে গলিয়ে নিন। মাত্র ১০ মিনিট হাঁটুন। এই হাঁটাচলা মগজে ‘এন্ডোরফিন’ নামের একটা হ্যাপি হরমোন রিলিজ করে, যা আপনার মুডকে এক তুড়িতে ঠিক করে দিতে পারে। কোনো দামি পডকাস্ট বা স্যাড সং শোনার দরকার নেই, জাস্ট রাস্তায় যান আর হাঁটুন।



৩৬


নেগেটিভ সেলফ-টক লুপ এব সেলফ-কম্প্যাশন প্র্যাকটিস। 

রতন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। পাঁচবার প্রমোশন পায়নি। কিন্তু রতনের মনে হয় সে যোগ্য না কারণ সে প্রমোশন পায়নি। আসলে উল্টোটা সত্যি। সে প্রমোশন পায়নি কারণ সে নিজেকে যোগ্য মনে করে না। মিটিংয়ে কথা বলতে সাহস পায় না। ভালো আইডিয়া থাকলেও চুপ থাকে। ভাবে "কী দরকার বলে কারো কাজে আসবে না।" এই গল্পটা শুধু রতনের না। এটা হয়তো আপনারও।

ব্যার্থতার বেলুন ফোলাচ্ছি কিন্তু . . .

সকালে উঠে মনে হয় আজ কিছু একটা করব। তারপর দুপুর হয়। বিকেল হয়। রাতে শুতে গিয়ে মনে হয় আরেকটা দিন গেল। কোনো কারণ নেই অথচ ভেতরে একটা ফাঁকা ফাঁকা লাগে। মনে হয় সবাই এগিয়ে যাচ্ছে আর আপনি কোনো এক অদৃশ্য মাটিতে আটকে আছেন। এই অনুভূতিটার নাম কি ব্যর্থতা? না। এটা অন্য কিছু।

নেতিবাচক আত্মকথনের বিষ-বৃত্ত |  নেগেটিভ সেলফ-টক লুপ।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন গবেষণা করে দেখলেন যে আত্মবিশ্বাস কমার মূল কারণ ব্যর্থতা নয়। বরং কারণটা হলো নিজের সম্পর্কে বারবার নেতিবাচক কথা মনে মনে বলার অভ্যাস। সহজ বাংলায় বলতে গেলে আপনি যখন মনে মনে বলেন "আমি দিয়ে হবে না" বা "আমি এর যোগ্য না" তখন মস্তিষ্ক সেটাকে সত্যি ঘটনা হিসেবে রেকর্ড করে নেয়। এটাকে বলে নেগেটিভ সেলফ-টক লুপ। মানে নিজেই নিজেকে রোজ একটু একটু করে ছোট করে যাচ্ছেন আর টেরও পাচ্ছেন না।

বোকা  মস্তিষ্কের টুটি চেপে ধরতে হবে 

নিউরোসায়েন্স বলছে মস্তিষ্ক কল্পনা আর বাস্তবের পার্থক্য পুরোপুরি করতে পারে না। আপনি যদি রোজ মনে মনে বলেন "আমি পারব" তাহলে মস্তিষ্ক সেটাকেও সত্যি ঘটনার মতো প্রসেস করে। ডোপামিন ছাড়ে। উৎসাহ তৈরি হয়। কাজ করার শক্তি আসে। এটা শুনতে যতটা সহজ ততটাই শক্তিশালী। মানে মস্তিষ্ককে একটু বোকা বানিয়ে আপনার কাজে লাগাতে পারেন।

এখনই করতে পারেন এই একটা কাজ

আজ রাতে ঘুমানোর আগে একটি কাগজে লিখুন "আজ আমি একটি কাজ শেষ করেছি।" যত ছোট হোক সেই কাজ। বিছানা গোছানো হোক বা একটা ইমেল পাঠানো হোক। তারপর পরদিন সকালে উঠে সেটা পড়ুন। এই অভ্যাসটা মাত্র তিন সপ্তাহে মস্তিষ্কের নেতিবাচকতার চক্র ভাঙতে শুরু করে। হার্ভার্ডের গবেষকরা এটাকে বলেছেন সেলফ-কম্প্যাশন প্র্যাকটিস। জটিল নাম কিন্তু কাজ একটাই — নিজের সাথে একটু ভালো ব্যবহার করুন।


৩৭


গান কেন মুহূর্তেই মন বদলে দেয়?

গান শুধু বিনোদন নয়, এটি সরাসরি আপনার মস্তিষ্কের উপর কাজ করে। আপনি যখন প্রিয় কোনো সুর শোনেন, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন নামের একটি নিউরোকেমিক্যাল নিঃসৃত হয়। এটি সেই একই “ভালো লাগার” রাসায়নিক, যা আমরা সুস্বাদু খাবার খাওয়া, প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা করা বা কোনো অর্জন পূরণ করার সময় অনুভব করি।

অর্থাৎ, একটি গান আপনার মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে। ফলাফল?   মন হালকা হয়, চাপ কমে, এবং শরীর শিথিল হতে শুরু করে।

বিজ্ঞান যা বলছে (সহজ ভাষায়)

ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রমাণ করেছে — প্রিয় গান শুনলে মস্তিষ্কের স্ট্রাইটাম অংশ জেগে ওঠে, যেটি আনন্দ ও তৃপ্তির কেন্দ্র। এই একই অংশ সক্রিয় হয় খাবার খেলে বা প্রিয়জনের সাথে থাকলে।

সুর শুধু কানে ঢোকে না — সে হৃদস্পন্দন কমায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, এবং স্ট্রেস হরমোন কমিয়ে দেয়।

সহজ কথায়: গান শোনা কোনো বিলাসিতা নয় — এটি আপনার শরীরের একটি জৈবিক চাহিদা। মস্তিষ্ক সুরকে পুরস্কার হিসেবে চেনে।

একটি পরিচিত দৃশ্য

ধরুন, সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে আপনি বাসায় ফিরছেন। মনটা ভারী। হেডফোনে হঠাৎ বাজতে শুরু করলো বহুদিনের প্রিয় একটি গান। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পরিবেশ বদলে যায়। আপনি অজান্তেই তালের সাথে মাথা নাড়েন। ক্লান্তি পুরোপুরি না গেলেও তার তীব্রতা কমে আসে।

এই পরিবর্তনটা বাহ্যিক নয়, ভেতর থেকে শুরু হয়।

ছোট অভ্যাস, বড় প্রভাব

প্রতিদিন ১০–১৫ মিনিট সময় রাখুন শুধুমাত্র গান শোনার জন্য।

এটি বিলাসিতা নয়, মানসিক পরিচর্যা।

নিয়মিত সুরের সংস্পর্শে থাকলে—

• চিন্তা পরিষ্কার হয়

• আবেগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়

• কাজের উদ্যম বাড়ে

• স্ট্রেস সহনশীলতা বৃদ্ধি পায়

গান অনেক সময় কথায় না বলা অনুভূতিগুলোকে ভাষা দেয়।


অনেক অপশন সামনে থাকলে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। মন বিভ্রান্ত হয়, আর ছোট সিদ্ধান্তও বড় চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একে বলা হয় “পছন্দের পক্ষাঘাত” বা Choice Paralysis। কম অপশন অনেক সময় দ্রুত ও শান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। 


৩৮


১৬৬৫ সাল। ইংল্যান্ডে তখন প্লেগের থাবা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। নিউটন বাধ্য হয়ে একা চলে গেলেন গ্রামের বাড়িতে উলস্টর্প ম্যানরে। কেউ নেই। কোনো ক্লাস নেই। কোনো আড্ডা নেই। শুধু একটা বাগান আর একটা মাথা। আর সেই একাকীত্বের মধ্যেই মাত্র আঠারো মাসে তিনি আবিষ্কার করলেন ক্যালকুলাস মাধ্যাকর্ষণের সূত্র এবং আলোর বিচ্ছুরণ তত্ত্ব। ইতিহাসবিদরা এই সময়টাকে বলেন তাঁর সবচেয়ে সৃজনশীল বছর। ভাবুন একবার। লকডাউনে আপনি নেটফ্লিক্স দেখেছিলেন আর নিউটন মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কার করেছিলেন।

আপনিও কি একা থাকলে অস্বস্তি লাগে?

বন্ধু নেই কাছের মানুষ নেই সারাদিন একা — এই পরিস্থিতিতে পড়লে বেশিরভাগ মানুষ ভাবেন জীবনটা বরবাদ হয়ে যাচ্ছে। ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রোল করেন। কাউকে না কাউকে ধরেন ফোনে। কারণ একটাই — একাকীত্বকে আমরা ভয় পাই। কিন্তু একটু থামুন। যে মানুষটা গোটা পৃথিবীর পদার্থবিদ্যার ভিত্তি বদলে দিয়েছিলেন তিনি ২৫ বছর একটা সম্পর্কেও ছিলেন না। এবং সেটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।

মনোবিজ্ঞান কী বলছে এই ব্যাপারে

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যাডাম অ্যান্ডারসন দেখিয়েছেন যে মানুষ একা থাকলে মস্তিষ্কের ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়। সহজ কথায় বললে এই মোডে মস্তিষ্ক ভেতরমুখী হয় — নিজেকে নিয়ে ভাবে নতুন সংযোগ তৈরি করে এবং সৃজনশীলতার দরজা খুলে দেয়। দলে থাকলে মস্তিষ্ক বাইরের উদ্দীপনায় ব্যস্ত থাকে। কিন্তু একা থাকলে সে নিজেই নিজের সাথে কথা বলে। আর সেই কথোপকথন থেকেই জন্ম হয় বড় বড় ভাবনার।

একাকীত্ব আর নিঃসঙ্গতা এক জিনিস না

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। নিঃসঙ্গতা হলো যখন আপনি একা থাকতে চান না কিন্তু থাকতে বাধ্য হন। সেটা কষ্টের। কিন্তু একাকীত্ব হলো যখন আপনি সচেতনভাবে নিজের জন্য সময় বেছে নেন। নিজের চিন্তার সাথে বসেন। নিউটন ঠিক এটাই করেছিলেন। তিনি নিঃসঙ্গ ছিলেন না — তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে বাইরের গোলমাল থেকে আলাদা করেছিলেন।

আজ থেকে একটাই কাজ করুন

প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট নিজের জন্য রাখুন। ফোন বন্ধ। কেউ নেই। শুধু আপনি আর আপনার ভাবনা। চা বানান। জানালার পাশে বসুন। শুধু ভাবুন। প্রথম দিন অস্বস্তি লাগবে। দ্বিতীয় দিনও। কিন্তু তৃতীয় দিন থেকে আপনার মাথার ভেতর এমন কিছু আসতে শুরু করবে যা আগে কখনো আসেনি। কারণ ভিড়ের মধ্যে নিজেকে খোঁজা যায় না।




৩৯


যুদ্ধের আগের রাতে আলেকজান্ডার গভীর ঘুমাতেন। তাঁর সেনাপতিরা ভোরে ডাকতে গিয়ে অবাক হয়ে যেতেন। এত বড় যুদ্ধ সামনে আর তিনি নাক ডাকছেন। আসলে এটা ছিল তাঁর সচেতন কৌশল। ভয়ের মধ্যে শরীরকে জোর করে বিশ্রামে নিয়ে যাওয়া মানে মস্তিষ্ককে বলা যে পরিস্থিতি আমার নিয়ন্ত্রণে আছে।

বিজ্ঞান কী বলছে

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষণা বলছে মানুষ যখন ভয়ের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে শরীর শিথিল করে তখন কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমে যায় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বেড়ে যায়। সহজ কথায় ভয়ের সময় জোর করে শান্ত থাকলে মস্তিষ্ক আরও ভালো কাজ করে। আলেকজান্ডার এটা বইয়ে পড়েননি জীবন থেকে শিখেছিলেন।

আপনার জীবনে এটা কোথায় লাগে

ধরুন আপনার কাল একটা বড় ইন্টারভিউ বা প্রেজেন্টেশন আছে। রাত তিনটায় ছাদে পায়চারি করছেন আর মাথায় হাজার চিন্তা ঘুরছে। ঠিক এই মুহূর্তে আলেকজান্ডারের কৌশল হলো শুয়ে পড়ুন। ভয়টাকে স্বীকার করুন মনে মনে বলুন হ্যাঁ আমি একটু ভয় পাচ্ছি এটা স্বাভাবিক এবং তারপর চোখ বন্ধ করুন।

একটাই সমাধান যা কাজ করে

ভয় আসলে আপনার শত্রু নয়। ভয় আপনার শরীরের অ্যালার্ম সিস্টেম যা বলছে এই বিষয়টা আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পরের বার ভয় লাগলে সেটাকে দূর করার চেষ্টা করবেন না বরং বলুন ঠিক আছে তুমি এসেছ মানে আমি সঠিক পথেই আছি। এটাকে মনোবিজ্ঞানে বলে Reframing এবং এটাই সাহসীদের আসল অস্ত্র।



৪০

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক Amy Cuddy একটা গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মাত্র ২ মিনিট সোজা ভঙ্গিতে দাঁড়ালে শরীরে Testosterone অর্থাৎ আত্মবিশ্বাসের হরমোন বেড়ে যায় এবং Cortisol অর্থাৎ চাপের হরমোন কমে যায়। মানে আপনার মস্তিষ্ক আগে অনুভব করে না — শরীর আগে সংকেত পাঠায় তারপর মন সেটা বিশ্বাস করে।

উল্টো হিসাবটা

আমরা ভাবি আগে ভালো লাগলে তখন ভালো করব। কিন্তু শরীর বলছে উল্টো কথা। আগে ভালো ভঙ্গি করুন — ভালো লাগাটা পরে এমনিই আসবে। এটাকে বলে Embodied Cognition। সহজ কথায় — শরীর মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

একটা চেনা উদাহরণ

ধরুন আপনার বন্ধু পরীক্ষার আগের রাতে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে ভাবছে আমার দ্বারা হবে না। সেই ভঙ্গিতেই তার মস্তিষ্ক সেটা বিশ্বাস করে নিচ্ছে। আর যে বন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে একটু হাঁটছে সোজা মাথায় — তার মস্তিষ্ক আলাদা সংকেত পাচ্ছে।

এখনই করুন

আজ থেকে যখনই মনে হবে আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে — চেয়ার ছেড়ে উঠুন। দুই মিনিট সোজা হয়ে দাঁড়ান। বুক একটু সামনে রাখুন। এটুকুই যথেষ্ট শুরু করতে।


৪১


Divergent Thinking মানে কী সহজ করে বললে

বেশিরভাগ মানুষ একটা প্রশ্নের একটাই উত্তর খোঁজেন। এটাকে বলে Convergent Thinking। কিন্তু কিছু মানুষ একটা প্রশ্নে দশটা পনেরোটা উত্তর খুঁজে পান। নতুন কোণ থেকে দেখেন। অদ্ভুত সংযোগ তৈরি করেন। এটাই Divergent Thinking।

জে পি গিলফোর্ড নামের একজন মনোবিজ্ঞানী ১৯৫০ সালে প্রথম প্রমাণ করেন যে সৃজনশীলতা আর প্রথাগত বুদ্ধিমত্তা সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা Divergent Thinking করতে পারেন তারা সমস্যার এমন সমাধান খুঁজে পান যেটা সাধারণ বুদ্ধিমান মানুষ কল্পনাও করেন না। মজার বিষয় হলো এই ক্ষমতা জন্মগত নয় — অভ্যাসে তৈরি হয়।

আপনার জীবনে এটা কোথায় আছে

ধরুন আপনার বন্ধু অফিসে একটা সমস্যায় পড়েছেন। বাকি সবাই বলছে এটা সমাধান হবে না। কিন্তু আপনি হঠাৎ একটা উল্টো রাস্তা দেখতে পাচ্ছেন যেটা কেউ ভাবেনি। সবাই আপনাকে বলছে আজব। কিন্তু পরদিন দেখা গেল আপনার রাস্তাটাই কাজ করেছে। এটাই Divergent Thinking এর আসল রূপ।

এখন আপনি কী করবেন

প্রতিদিন একটা সাধারণ জিনিস নিয়ে পাঁচটা অস্বাভাবিক প্রশ্ন করুন। যেমন একটা চেয়ার দিয়ে চেয়ার ছাড়া আর কী করা যায়। উত্তর খুঁজতে বসুন। হাসবেন। তারপর দেখবেন মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নতুন পথ তৈরি করতে শিখছে। আইনস্টাইন প্রতিদিন এই কাজটাই করতেন — তবে তখন এর কোনো নাম ছিল না।



৪২

Cognitive Diversity

সবাই একইভাবে ভাবে তাহলে সিদ্ধান্তগুলো একইরকম ভুলে ভরা হবে। মনোবিজ্ঞানে এটাকে বলে Groupthink। ইরভিং জ্যানিস নামক গবেষক ১৯৭২ সালে দেখিয়েছিলেন যে বড় বড় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার পেছনে Groupthink একটা বড় কারণ। মানে আলাদা আলাদা চিন্তার ধরন একসাথে কাজ করলে ফলাফল অনেক শক্তিশালী হয়। টাকে আজকের ভাষায় বলে Cognitive Diversity।  যার লক্ষ্য হলো উদ্ভাবন বৃদ্ধি করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ উন্নত করা,

আপনার কাছের মানুষদের মধ্যে যারা আপনার সাথে দ্বিমত করে তাদের দূরে না রেখে কাছে রাখুন। তারাই আপনার নবরত্ন। দ্বিমত মানে শত্রুতা নয় — দ্বিমত মানে আপনার অন্ধ জায়গাটা দেখিয়ে দেওয়া।

আপনার জীবনে কে আছেন যে সবসময় আপনার সাথে একমত হন না কিন্তু পরে দেখা যায় সে ঠিক ছিল


২১ দিনে অভ্যাস বদলায় না, বিজ্ঞান বলছে, অভ্যাস গড়তে গড়ে ৬৬ দিন সময় লাগে। কারও কম, কারও বেশি। 


৪৩


আমরা সবাই প্রতিদিন অন্তত ২ বার মিথ্যে বলি!

শুনতে গায়ে লাগলেও এটাই তেতো সত্যি। আপনি, আমি—আমরা সবাই দিনশেষে কোনো না কোনোভাবে সত্য গোপন করি। কিন্তু কেন? মানুষ কি জন্মগতভাবেই মিথ্যেবাদী? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো মনস্তাত্ত্বিক রহস্য?

সাইকোলজি কী বলে?

গবেষণা বলছে, মানুষ সবসময় ইচ্ছে করে বা ক্ষতি করার জন্য মিথ্যে বলে না। আমাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি যে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে এটি Adaptive Feature হিসেবে মিথ্যেকে বেছে নেয়। মূলত ৪টি কারণে আমরা মিথ্যের আশ্রয় নিই:

• শাস্তি এড়াতে: ছোটবেলা থেকেই ভুল করলে বকুনি খাওয়ার ভয়ে আমরা এটা শিখি।

• সম্পর্ক বাঁচাতে: অনেক সময় অপ্রিয় সত্য বললে সম্পর্ক ভেঙে যেতে পারে, তাই আমরা 'সাদা মিথ্যে' বলি।

• ইমেজ ধরে রাখতে: অন্যের চোখে নিজেকে পারফেক্ট প্রমাণ করার একটা সহজাত চেষ্টা।

• অন্যকে রক্ষা করতে: কাউকে মানসিক কষ্ট থেকে দূরে রাখতে আমরা সত্য গোপন করি।

মিথ্যে কি সব একই রকম?

সব মিথ্যে কিন্তু সমান অপরাধ নয়। মনোবিজ্ঞানীরা মিথ্যেকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন:

1. White Lie (সাদা মিথ্যে): কাউকে খুশি করতে বা কষ্ট না দিতে বলা ছোট মিথ্যে। যেমন: "তোমাকে এই পোশাকে দারুণ লাগছে!"

2. Self-centered Lie: যেখানে শুধুমাত্র নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ বা সুবিধা জড়িত।

3. Manipulative Lie: এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক। অন্যকে নিয়ন্ত্রণ বা ঠকানোর জন্য এই মিথ্যে বলা হয়।

শেষ কথা

ছোট মিথ্যে হয়তো সাময়িক অস্বস্তি এড়াতে সাহায্য করে, কিন্তু মনে রাখবেন—বিশ্বাস কাঁচের মতো। একবার ফাটল ধরলে তা জোড়া লাগানো অসম্ভব। মানুষ মিথ্যে বলে ব্যথা এড়াতে আর এক চিলতে সুখ পেতে,

সেই সুখ কি দীর্ঘস্থায়ী হয়?


৪৪


হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে মোবাইলের নীল আলো মেলাটোনিন নামের একটি হরমোনের উৎপাদন প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দেয়। এই মেলাটোনিনই আপনাকে ঘুম পাড়ানোর কাজ করে। অর্থাৎ আপনি ফোন দেখতে দেখতে নিজেই নিজের ঘুমকে তাড়িয়ে দিচ্ছেন। এবং মজার বিষয় হলো আপনি জানেনও না।

নীল আলোর মরীচিকা।

এখানে মনোবিজ্ঞান একটা মজার কথা বলে। আমাদের মস্তিষ্ক নীল আলোকে দিনের আলো মনে করে। তাই রাত ১১টায় ফোন দেখলে মস্তিষ্ক ভাবে এখনো দুপুর এবং ঘুমের দরকার নেই। এটাকে বলে সার্কাডিয়ান রিদম ডিসরাপশন। সহজ বাংলায় বললে আপনার শরীরের ঘড়িটাকে কেউ উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। আর সেই কেউটা আপনার হাতেই থাকে।

একটাই কাজ করুন আজ রাত থেকে

ঘুমানোর কমপক্ষে ৪৫ মিনিট আগে ফোন রেখে দিন। এটুকুই। প্রথম কয়েকদিন অস্থির লাগবে কারণ মাথা অভ্যাস পাল্টাতে ঝামেলা করে। কিন্তু মাত্র সাত দিন এই কাজ করলে অনেকেই জানাচ্ছেন ঘুম গভীর হয়েছে এবং সকালে শরীর হালকা লাগছে। ফোনের নাইট মোড বা ব্লু লাইট ফিল্টার চালু রাখাটাও সাহায্য করে।



৪৫


Harvard Medical School বলছে, মাত্র ৩০ মিনিট হাঁটলে সেরোটোনিন ৫৫% বেড়ে যায়। মানে আপনার জুতোজোড়া আসলে একটা হাঁটা-চলা ফার্মেসি!

মস্তিষ্কের “নিউরন উৎসবে” আপনিও আমন্ত্রিত।

হাঁটার সময় আপনার মাথার ভেতরে BDNF নামের একটা জাদুকরী প্রোটিন তৈরি হয় — বিজ্ঞানীরা এটাকে বলেন "ব্রেনের সার"। মানে আপনি হাঁটছেন, আর ভেতরে নতুন নতুন নিউরন জন্মাচ্ছে — যেন মাথার ভেতর একটা নতুন পাড়া গড়ে উঠছে! Lancet Psychiatry (২০১৮)-এর ১২ লাখ মানুষের গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত হাঁটা অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধের চেয়ে দ্বিগুণ কার্যকর। হ্যাঁ, আবার পড়ুন। আমি অপেক্ষা করছি।

শরীর নিজেই বানাচ্ছে "আনন্দের হোম ডেলিভারি"— একদম ফ্রিতে!

হাঁটার সময় আপনার শরীর এন্ডোরফিন আর ডোপামিন ছাড়ে। এগুলো মূলত শরীরের নিজস্ব "ভালো লাগার ইনজেকশন" — কোনো প্রেসক্রিপশন লাগে না, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই! আর Stanford University বলছে, হাঁটার পরে সৃজনশীলতা ৮১% বাড়ে। মানে হেঁটে আসার পর মাথায় যে আইডিয়া আসবে, সোফায় শুয়ে সেটা কোনোদিন আসত না!

৩ মিনিটের "পরম অলস মানুষের সুপার হ্যাক" — এক্সকিউজ এখন ব্যান!

University of Michigan বলছে, মাত্র ৩ মিনিট হাঁটলেই মুড ২৮% ভালো হয়! তিনটা কাজই শুধু করুন — দরজা খুলুন, বাইরে বেরিয়ে তিনটা গভীর শ্বাস নিন, আর তিন মিনিট হাঁটুন। জুতো পরাটাই আসলে ৫০% যুদ্ধ জেতা — বাকিটা আপনার পা আপনাআপনি করে নেবে। জিম লাগবে না, দৌড় লাগবে না, শুধু হাঁটুন!


Harvard University-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১৭ মিনিট হাঁটলেই মানুষের মস্তিষ্কের সৃজনশীলতা প্রায় ৬০% পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ, হাঁটতে হাঁটতেই চিন্তা হয়ে উঠতে পারে আরও গভীর, আরও সৃজনশীল


৪৬


জেরুজালে সিনড্রোম  

বিশ্বাস আর মস্তিষ্কের মাঝখানে একটা সরু রেখা আছে এবং জেরুজালেম সিনড্রোম  সেই রেখাটা মুছে দেয়

ভ্রমণে যখন বিভ্রম ঘটে

জেরুজালেম গিয়ে অনেক সুস্থ মানুষ হঠাত করে নিজেকে পবিত্র গ্রন্থের কোনো মহাপুরুষ ভাবতে শুরু করেন। তারা সাদা চাদর গায়ে জড়িয়ে ভাষণ দিতে থাকেন। মনোবিজ্ঞানে একেই বলে জেরুজালেম সিনড্রোম। ভাবুন তো আপনি গেছেন সেলফি তুলতে আর ফিরে আসছেন নিজেকে অবতার দাবি করে। এটা শুনতে মজার হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের মনের এক গভীর অতৃপ্তি।

মস্তিষ্ক আসলে কী করছে

মানুষের মস্তিষ্ক সারাজীবন ধরে কিছু গল্প গড়ে তোলে। ধর্মীয় পরিবেশে বড় হওয়া মানুষের ভেতরে জেরুজালেম একটা স্বপ্নের জায়গা হয়ে থাকে। যখন সেই জায়গায় সত্যিই পা পড়ে তখন মস্তিষ্কের ইমোশনাল মেমোরি সিস্টেম অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন এটা একধরনের ডিসোসিয়েটিভ স্টেট যেখানে মানুষ নিজের পরিচয় থেকে আলাদা হয়ে একটা বড় পরিচয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

গবেষণা কী বলছে

ইসরায়েলের কেফার শাউল মেন্টাল হেলথ সেন্টারের গবেষক ইয়ায়ির বার এল এবং তার দল ১৯৮০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এই বিষয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে এই সিনড্রোমে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষ সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন এবং শহর ছেড়ে যাওয়ার পরে তারা আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছেন। এমন কি অনেকে পরে নিজেই হেসেছেন এই ঘটনা মনে করে।

আসল ব্যথাটা কোথায়

সত্যি কথা হলো আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে বিশেষ হতে চাই। ঈশ্বরের প্রিয় হতে চাই। জীবনের একটা বড় অর্থ খুঁজি। জেরুজালেম সিনড্রোম আসলে সেই গভীর মানবিক চাওয়ার একটা চরম প্রকাশ। শহরটা দোষী না। মস্তিষ্কটা দোষী না। মানুষের ভেতরে থাকা সেই একাকীত্ব আর অর্থহীনতার অনুভূতি এই পরিস্থিতি তৈরি করে।

আপনার জীবনে এটা কীভাবে ঘটতে পারে

আপনাকে জেরুজালেমে যেতে হবে না। আপনি কি কখনো কোনো বক্তার কথা শুনে মনে করেছেন যে এই কথাগুলো যেন আপনার জন্যই বলা হয়েছে। অথবা কোনো বইয়ের একটা লাইন পড়ে মনে হয়েছে এটা তো আমার গল্প। এটাও একই মনস্তত্ত্ব। আমরা সবাই নিজেকে কেন্দ্রে রাখতে চাই এবং মস্তিষ্ক সেই সুযোগ খোঁজে।

বের হওয়ার রাস্তা

যদি কখনো দেখেন আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ কোনো বিশেষ স্থানে গিয়ে নিজেকে অতিপ্রাকৃত ভাবছে তবে প্রথমেই তাকে ওই পরিবেশ থেকে সরিয়ে আনুন। তাকে প্রচুর জল পান করতে দিন আর পর্যাপ্ত ঘুমের ব্যবস্থা করুন। মনকে শান্ত করার জন্য বাস্তব জগতের সাধারণ ছোট কাজ করতে দিন। আসলে আমরা সবাই আমাদের ভেতরে একটু আধ্যাত্মিকতা খুঁজি কিন্তু সেটা যেন বাস্তবকে ছাপিয়ে না যায় তা খেয়াল রাখাই হলো আসল কথা।


৪৭


সবাইকে খুশি করার অদ্ভুত নেশা

আপনি কি কখনো খেয়াল করেছেন যে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আপনি প্রায়ই নিজের ইচ্ছাগুলোকে বিসর্জন দিচ্ছেন। অফিসের বাড়তি কাজ হোক কিংবা কোনো বন্ধুর অযৌক্তিক অনুরোধ আপনি চাইলেও না বলতে পারছেন না। এই মানুষগুলোকে খুশি করতে গিয়ে আপনি নিজেই নিজের কাছে আস্তে আস্তে অপরিচিত হয়ে উঠছেন। সত্যি বলতে এটি কোনো মহত্ত্ব নয় বরং এক ধরণের মানসিক চাপ যা আপনার ভেতরটাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে।

একে পিপল প্লিজিং সিনড্রোম

কেন আমরা না বলতে পারি না। এর পেছনে রয়েছে সবার কাছে ভালো থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। মনস্তাত্ত্বিকভাবে একে পিপল প্লিজিং সিনড্রোম বলে। আমরা ভয় পাই যে না বললে হয়তো মানুষ আমাদের ভুল বুঝবে বা আমাদের গুরুত্ব কমে যাবে। আসলে এই ভয়ের পেছনে রয়েছে নিজেদের আত্মসম্মানবোধের অভাব। আপনি হয়তো ভাবছেন সবাইকে খুশি করা মানেই সুসম্পর্ক কিন্তু আদতে আপনি আপনার নিজস্ব সত্তা হারিয়ে ফেলছেন।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যা ঘটছে

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা সবসময় অন্যের চাহিদা মেটাতে ব্যস্ত থাকেন তাদের মস্তিষ্কে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। এটি অনেকটা মোবাইল চার্জে দিয়ে গেম খেলার মতো অবস্থা। মোবাইল গরম হয়ে হ্যাং হয়ে যায় ঠিক তেমনি আপনার মস্তিষ্কও একসময় ক্লান্তিতে অকেজো হয়ে পড়ে।

এক বাস্তব উদাহরণ

ভাবুন আপনার খুব জরুরি একটি কাজ আছে কিন্তু বন্ধু এসে বলল চল ঘুরতে যাই। আপনি জানেন না বললে সে রাগ করবে। আপনি কাজ ফেলে চলে গেলেন। ঘুরতে গিয়ে আপনি সারাক্ষণ চিন্তায় থাকলেন কাজটা হলো না বলে। দিনশেষে বন্ধু খুশি হলেও আপনি নিজের কাছে লজ্জিত। এটাই হলো পিপল প্লিজিং এর মাশুল।

সীমানা নির্ধারণ

এখন সমাধান কী। সমাধান হলো বাউন্ডারি বা সীমানা তৈরি করা। আপনি কি পৃথিবীর সবার দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়েছেন। একদম না। আপনি যখন বিনয়ের সাথে না বলতে শিখবেন তখন দেখবেন মানুষ আপনাকে সম্মান করতে শুরু করেছে। নিজের সময়ের মূল্য আপনি না দিলে অন্য কেউ দেবে না। এক গ্লাস জল খাওয়ার সময়ও নিজের ভালো লাগার কথা আগে ভাবুন।


৪৮



সিমিলার টু মি ইফেক্ট।

মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি যে আমরা নিজেদের মতো মানুষকেই বেশি পছন্দ করি। একে বলা হয় সিমিলার টু মি ইফেক্ট। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে মানুষ তাদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয় যাদের সাথে তাদের চিন্তা বা অভ্যাসের মিল আছে। অর্থাৎ আপনি যত বেশি মানুষের সাথে মিল খুঁজে পাবেন তত বেশি তারা আপনাকে পছন্দ করবে।

বাস্তব উদাহরণ

ভাবুন তো একটি অনুষ্ঠানে আপনি এমন একজনের সাথে দেখা করলেন যে আপনার মতোই পুরোনো গান শুনতে ভালোবাসে। দেখবেন মুহূর্তের মধ্যেই তার সাথে আপনার একটা অদৃশ্য টান তৈরি হয়েছে। কারণ মানুষ সমমনস্ক মানুষের কাছাকাছি থাকতে ভালবাসে। মস্তিষ্ক এক ধরনের আরাম পায় । এটা কোনো জাদু নয় বরং সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক  জীববিজ্ঞান।

কার্যকর ম্যাজিক মন্ত্র।

• সবাইকে ভালো লাগাতে চাইলে অন্যকে কপি করার দরকার নেই।

• পরিবর্তে অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। মানুষ নিজের কথা বলতে ভালোবাসে। আপনি যখন কাউকে মন দিয়ে শুনবেন তখন সে অবচেতনভাবে আপনাকে একজন দারুণ মানুষ হিসেবে বিচার করতে শুরু করবে।

• হাসি মুখে কথা বলার চেষ্টা করা।

• চোখে চোখ রাখা।

• বিনয়ের সাথে নিজের মতামত পরিবেশন করা।          

• কথা বলার সময় কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নিচু রাখুন — এতে এক ধরনের অন্তরঙ্গ পরিবেশ তৈরি হয়।

• কথা বলার সময় সামান্য ঝুঁকে বসা ভালো — এতে বোঝায় যে আপনি অন্য মানুষের প্রতি আগ্রহী।

এই আচরণগুলো মানুষের মধ্যে আত্মীয়তার অনুভূতি তৈরি করে।

এগুলো ব্যবহার করলে অন্য মানুষের চোখে আপনি একজন শ্রদ্ধাশীল ও পরিণত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠতে পারেন।                                                        

এ সবই অন্যের চোখে প্রিয় হয়ে ওঠার ম্যাজিক মন্ত্র।



৪৯



হঠাৎ ভালো লাগার ধাক্কা

জীবনে সবকিছু ঠিকঠাক চললে মাঝেমধ্যে হঠাৎ করে অন্য কাউকে দেখে আমাদের মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত শিরশিরানি শুরু হয়। মনে হয় এই মানুষটাই বোধহয় আমাকে সবচেয়ে ভালো বুঝবে। আসলে এটি আপনার মনের এক ধরণের ফাঁদ।

পছন্দের লটারি

মন সব সময় নিরাপত্তা আর পরিচিতির দিকে ঝোঁকে। যাকে দেখে আপনার অবচেতন মনে পরিচিত অনুভূতি জাগে তাকে আপনি সহজেই পছন্দ করতে শুরু করেন। অনেক সময় একই রকম অভ্যাস একই রকম কথা বলার ধরন অথবা একই রকম হাসিও এই অনুভূতি তৈরি করে।

মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় একে বলা হয় লিমারেন্স বা প্রবল আকর্ষণের একটি পর্যায়। নিউরোসায়েন্স বলছে যখন আমরা নতুন কাউকে দেখি তখন মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম হুড়মুড় করে ডোপামিন নিঃসরণ করে। এটি অনেকটা লটারিতে জেতার মতো আনন্দ দেয়। আপনি ভাবছেন মানুষটা অসাধারণ অথচ আসলে আপনার মস্তিষ্ক একটা মায়াজাল বুনে   ফেলেছে।

হ্যালো এফেক্ট।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যখন মানুষ একঘেয়েমিতে ভোগে তখন তার মস্তিষ্ক অপরিচিত মানুষের মধ্যে অতিপ্রাকৃত গুণাবলী খুঁজতে থাকে। একে বলা হয় হ্যালো এফেক্ট। অর্থাৎ আপনি যখন একজনের একটি গুণ পছন্দ করছেন তখন আপনার মন ধরে নিচ্ছে তার বাকি সব কিছুই স্বর্গীয়। এটি পুরোপুরি একটি মনস্তাত্ত্বিক মরীচিকা ।

আপনার মনের শূন্যস্থান পূরণ।

আসলে আমরা অন্য মানুষের প্রেমে পড়ি না বরং আমরা নিজের ভেতরে থাকা কোনো একটা অভাবের প্রেমে পড়ি। হয়তো আপনি জীবনে একটু বেশি উত্তেজনা চাইছেন অথবা বর্তমানে কেউ আপনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। তখনই আপনার মন পাশের মানুষটির ওপর সেই কাল্পনিক গুণগুলো চাপিয়ে দেয়। আপনার মস্তিষ্ক তখন আপনার সাথে অনেকটা সেই বন্ধুর মতো আচরণ করে যে জেনেশুনে আপনাকে ভুল পথে নিয়ে যায়।

সমাধানের সহজ উপায়

যখনই এমন হবে তখন নিজেকে একটু সময় দিন। মনে রাখবেন এটি আপনার জল তেষ্টা পাওয়ার মতো একটি সাধারণ অনুভূতি। নিজের বর্তমান সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে ভাবুন এবং নিজেকে প্রশ্ন করুন যে মানুষটাকে আপনি ভালো বলছেন তাকে কি আপনি আসলেই চেনেন নাকি তার একটা কাল্পনিক ছবি আপনি এঁকে নিয়েছেন। মনকে বলুন যে ডোপামিনের এই জোয়ারে  খুব তাড়াতাড়ি ভাঁটা নেবে আসবে।



৫০



বেন ফ্র্যাঙ্কলিন ইফেক্ট ─ সাহায্য করার অবিশ্বাস্য

কেন মানুষ আপনাকে পছন্দ করবে

সাধারণত আমরা ভাবি যে কাউকে অনেক উপকার করলে বা উপহার দিলে সে আমাদের বেশি ভালোবাসবে। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে ঘটনা আসলে উল্টো। আপনি যদি কারো কাছে ছোট একটি সাহায্য চান তবে তার মনে আপনার প্রতি এক ধরনের পজিটিভ ধারণা তৈরি হয়। একেই মূলত বেন ফ্র্যাঙ্কলিন ইফেক্ট বলা হয়। এর পেছনের কারণ হলো মানুষ যখন কাউকে সাহায্য করে তখন তার মস্তিষ্ক নিজে থেকেই ধরে নেয় যে সে মানুষটিকে পছন্দ করে বলেই সাহায্য করছে। এই অদ্ভুত মানসিক অবস্থাকে কগনিটিভ ডিসোনেন্স বলা হয়।

সহযোগিতার গোপন সুইচ

আপনি ভাবেন মানুষ আপনাকে পছন্দ করলে সাহায্য করে। বাস্তবে উল্টোটা বেশি ঘটে। আপনি যখন কাউকে ছোট একটি উপকার করতে বলেন তখন তার মস্তিষ্ক ভাবে আমি তো এই মানুষটার জন্য কিছু করলাম। তার মানে নিশ্চয়ই আমি তাকে পছন্দ করি। এই ভাবনাই সম্পর্কের ভিত নরম করে দেয়।

বিজ্ঞানের সহজ ব্যাখ্যা

মনোবিজ্ঞানী জন জেকার এবং ডেভিড ল্যান্ডি ১৯৭০ সালে একটি গবেষণা চালিয়েছিলেন যেখানে দেখা গেছে যারা গবেষকের কাছে ছোট একটি ব্যক্তিগত সাহায্যের অনুরোধ পেয়েছিলেন তারা বাকিদের চেয়ে গবেষককে অনেক বেশি পছন্দ করেছিলেন। মানুষের মস্তিষ্ক সবসময় নিজের কাজের একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা খোঁজে। আপনি যখন কারো কলম ধার নিচ্ছেন বা কারো কাছে একটু পরামর্শ চাইছেন তখন সেই ব্যক্তির অবচেতন মন নিজেকে বোঝাতে শুরু করে যে আপনি মানুষ হিসেবে বেশ ভালো। না হলে সে কেন আপনাকে সাহায্য করছে। এই চিন্তা থেকেই আপনার প্রতি তার ভালোবাসা বাড়তে থাকে।

বাস্তব জীবনের একটি উদাহরণ

ধরুন আপনার অফিসে এমন একজন সহকর্মী আছে যার সাথে আপনার সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। আপনি যদি তাকে গিয়ে বলেন ভাই আপনার চা বানানোর হাতটা খুব দারুণ আমাকে কি এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়াবেন তবে দেখবেন তার মনের কঠিন ভাবটা মুহূর্তেই নরম হয়ে গেছে। সে ভাববে আপনি তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং তার দক্ষতা স্বীকার করছেন। এই ছোট একটি ঘটনা থেকেই একটি দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের শুরু হতে পারে।

বিজ্ঞানের প্রমাণ

১৯৬৯ সালে জেকার আর ল্যান্ডি নামের দুজন গবেষক একটা পরীক্ষা করেন যেখানে লোকেদের সাহায্য চেয়ে দেখা যায় যে সাহায্যকারীরা পরে সেই মানুষটাকে আরো ভালোবাসে। এটা সিম্পল পরীক্ষা ছিল কিন্তু প্রমাণ করেছে যে এই ইফেক্ট সত্যি কাজ করে। আপনি চাইলে নিজে ট্রাই করে দেখতে পারেন।এক মিনিটের সহজ প্র্যাকটিস

আজই আপনার পরিচিত এমন কাউকে একটি ছোট মেসেজ দিন যার সাথে আপনার সম্পর্ক ঠিক সহজ নয়। তাকে কোনো কঠিন কাজ নয় বরং খুব তুচ্ছ কোনো বিষয়ে তার পরামর্শ বা সাহায্য চান। যেমন কোনো একটা ভালো বইয়ের নাম জানতে চাওয়া বা কোনো নির্দিষ্ট রেস্টুরেন্টের খাবার কেমন তা জিজ্ঞেস করা। দেখবেন সামনের বার দেখা হলে সেই মানুষটি অনেক বেশি হাসিমুখে আপনার সাথে কথা বলছে। এই ছোট কাজটি করতে আপনার ৬০ সেকেন্ডও সময় লাগবে না কিন্তু এর প্রভাব হবে দীর্ঘস্থায়ী।