টাকার অভাব খুব ভয়ংকর। এটা শুধু পকেট শূন্য করে না। মানুষের মনটাকেও ধীরে ধীরে নিঃস্ব করে দেয়। টাকা না থাকলে মানুষ তার ন্যায্য কথাটাও জোর দিয়ে বলতে পারে না। মাথা নত করে চলতে হয় প্রতিটি মুহূর্তে। অভাব মানুষের আত্মসম্মান কেড়ে নেয়। সম্পর্কের ভেতর তৈরি করে অদৃশ্য দূরত্ব। অনেক সময় যোগ্যতা থাকা সত্বেও সুযোগ মেলে না। কারণ দারিদ্র্য সব দরজায় নিরব তালা ঝুলিয়ে দেয়। কিছু কষ্ট শুধু টাকার অভাবেই জন্ম নেয়।
====
সৃষ্টিকর্তা কাউকে ঠকান না। যাকে সুন্দর গায়ের রং দেননি, কিন্তু দিয়েছেন মায়া কাড়া চেহারা। যাকে মেঘের মতো ঘন কালো চুল দেননি, তাকে দিয়েছেন হরিণের মতো টানা টানা মায়াবী চোখ। কাউকে মেধা দিয়েছেন, আবার কাউকে দিয়েছেন অসাধারণ গুণ। কাউকে হয়তো টাকা পয়সা দেননি, কিন্তু দিয়েছেন অগাধ ভালোবাসার ক্ষমতা। কাউকে হয়তো কিছুই দেননি, কিন্তু দিয়েছেন সুন্দর মন মানসিকতা। কাউকে দিয়েছেন অগাধ ধৈর্য, আবার কাউকে দিয়েছেন অগাধ দুঃখ নিয়েও সব পরিস্থিতি হাসিমুখে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। আবার কাউকে কিছু না দিয়ে দিয়েছেন মানসিক শান্তি। সৃষ্টিকর্তা কাউকেই ঠকান না, একদিক না একদিক দিয়ে ঠিকই পূর্ণ করে দেন।
====
১
কেউ বলে দেশ চালাতে লাগে নৈতিক নেতা, “ভালো মন”।
হান ফেইজি (Han Feizi, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৮০–২৩৩) বলতেন—ভালো মন দিয়ে না, রাষ্ট্র চলে ব্যবস্থা দিয়ে।
তার বার্তা ছিল পরিষ্কার: মানুষকে “ভালো হতে বললে” সবাই ভালো হয় না; কিন্তু নিয়ম ভাঙলে ক্ষতি হলে, নিয়ম মানতে সবাই শেখে।
তিনি বিশ্বাস করতেন—মানুষ স্বার্থ দেখে, সুবিধা দেখে।
আপনি যদি শুধু নীতির গল্প বলেন, শক্তিশালী লোক নিয়ম ভাঙবে, দুর্বল লোক শাস্তি পাবে।
হান ফেইজি বললেন—নৈতিকতা দারুণ, কিন্তু নৈতিকতা দিয়ে রাষ্ট্রের ইঞ্জিন চলে না।
কারণ নৈতিকতা একেক জনের কাছে একেক রকম।
তার চোখে “ভালো শাসন” মানে শাসকের ভালোবাসা নয়—সিস্টেমের নিরপেক্ষতা।
ভয়ংকর সত্য: শাসকের চারপাশে ভণ্ড বেশি থাকে।
আজ হান ফেইজি কেন প্রাসঙ্গিক
আজ আমরা “সৎ নেতা চাই” বলি, কিন্তু সৎ নেতা এসে চলে গেলে সিস্টেম যদি দুর্নীতিগ্রস্ত থাকে, তাহলে আবারও একই জায়গায় ফিরি।
হান ফেইজি বলতেন—লিডার না, দরকার ব্যবস্থা। মানুষ বদলায়, আইন-প্রক্রিয়া বদলালে রাষ্ট্র বদলায়। কিন্তু আইনবাদ যদি কেবল শাস্তি হয়, ন্যায় না হয়—তাহলে রাষ্ট্র হয় ভয়-চালিত জেলখানা।
তার দর্শন এক বাক্যে: মানুষের ভালোত্বের ওপর রাষ্ট্র দাঁড়ায় না, রাষ্ট্র দাঁড়ায় এমন নিয়মে, যেখানে খারাপ মানুষও বাধ্য হয় ঠিক কাজ করতে
@অনন্ত লোকের স্পর্শ
২
কিছু প্রাণী কেনো নিজের সন্তানকেই খেয়ে ফেলে?
প্রকৃতিতে মা-বাবার ভালোবাসার নানা নিদর্শন রয়েছে। সন্তানকে বাঁচাতে জীবন দিয়ে দেওয়ার গল্পও আমরা প্রায়শই শুনি। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটা দেখেছেন কি? যে মা-বাবা সন্তানকে পরম স্নেহে বড় করছে, সেই আবার খিদে পেলে সন্তানকেই গপাগপ খেয়ে ফেলছে!
শুনতে গা শিউরে উঠলেও জীবজগতে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের বিহেভিওরাল ইকোলজিস্ট আনিস বোস বলছেন, ‘স্বজাতি বা নিজের সন্তানকে খেয়ে ফেলার এই স্বভাব প্রাণিজগতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে এই আচরণের দেখা মেলে। বালুচড়া গবি মাছ থেকে শুরু করে স্ট্যাগ বিটল, এমনকি আমাদের খুব পরিচিত পোষা প্রাণীদের মধ্যেও দেখা যায় এই আচরণ।’
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সন্তানের বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করাটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। তাহলে কেন প্রাণীরা উল্টো নিজের বংশধরকেই ধ্বংস করে দেয়? এর পেছনে আছে প্রকৃতির এক নির্মম কিন্তু টিকে থাকার কৌশল।
বেশির ভাগ সময় মাছ, পোকা বা মাকড়সারা তাদের শত শত বাচ্চার মধ্য থেকে কয়েকটাকে খেয়ে ফেলে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে।
খাবারের অভাব: খাবার কমে গেলে বাবা-মা কিছু সন্তানকে খেয়ে ফেলে, যাতে বাকিরা পর্যাপ্ত খাবার পায় এবং বেঁচে থাকতে পারে।
শক্তির অপচয় রোধ: কুকুর বা বিড়ালের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অনেক সময় মৃত বা অসুস্থ বাচ্চা খেয়ে ফেলে। সন্তান জন্ম দেওয়াটা মায়েদের জন্য খুব ধকলের কাজ। মৃত বা দুর্বল বাচ্চাকে খেয়ে তারা সেই হারানো শক্তি কিছুটা পুনরুদ্ধার করে।
বাবার সন্দেহ: কিছু মাছের ক্ষেত্রে (ব্লুগিল সানফিশ) বাবা যদি গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারে যে ডিম বা বাচ্চাগুলো তার নিজের নয়, তবে সে ওগুলো খেয়ে ফেলে! মজার ব্যাপার হলো, মায়েরা এটা হতে দিতে চায় না। তাই অনেক সময় মা মাছ ডিম পাহারা দেয়, যাতে বাবা মাছ সেগুলোকে খেয়ে ফেলতে না পারে।
ইঁদুর বা খরগোশের মতো ছোট স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এটা দেখা যায়। মা যদি দেখে বাচ্চার সংখ্যা খুব কম, অথবা পরিবেশ খুব বিপজ্জনক, তখন সে সব বাচ্চা খেয়ে ফেলে। ওরা চায় এখনকার দুর্বল প্রচেষ্টাকে বাতিল করে শক্তি সঞ্চয় করতে, যাতে পরে পরিবেশ ভালো হলে নতুন করে এবং ভালোভাবে বেশি বাচ্চার জন্ম দিতে পারে।
কুকুরের মতো স্তন্যপায়ী প্রাণীরা অনেক সময় মৃত বা অসুস্থ বাচ্চা খেয়ে ফেলে লেখা:কমল দাস
৩
দুশ্চিন্তা বাড়লে কি পেট বাড়ে?" – কর্টিসল হরমোনের খেলা
"আমি তো চিনি খাই না, ভাতও কম খাই, নিয়মিত হাঁটাহাঁটিও করি। শরীরের অন্য জায়গার মেদ একটু কমলেও পেটের চর্বি বা ভুঁড়িটা যেন জেদি একরোখা! কিছুতেই নড়ছে না।"—এই অভিযোগটা কি আপনারও? আপনি হয়তো ভাবছেন, নিশ্চয়ই আপনার ডায়েটে কোথাও ভুল হচ্ছে, তাই আরও কম খাওয়া শুরু করলেন। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হলো—দুর্বল হলেন, মেজাজ খিটখিটে হলো, কিন্তু পেটের মাপ কমল না। আসলে, এই জেদি পেটের চর্বির পেছনের খলনায়ক কোনো 'খাবার' নয়, এর নাম হলো 'দুশ্চিন্তা' বা স্ট্রেস।
আমাদের শরীরটা আদিম যুগের নিয়মে চলে। আদিম যুগে মানুষের স্ট্রেস বা টেনশন ছিল—হয়তো কোনো হিংস্র প্রাণী তাড়া করেছে অথবা খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। সেই বিপদ থেকে বাঁচার জন্য শরীর তখন 'ফাইট অর ফ্লাইট' (Fight or Flight) মোডে চলে যেত এবং প্রচুর পরিমাণে 'কর্টিসল' (Cortisol) নামের এক হরমোন নিঃসরণ করত। এই কর্টিসলের কাজ হলো তাৎক্ষণিক শক্তি জোগানো। তাই সে যকৃৎ বা লিভার থেকে জমানো গ্লুকোজ রক্তে ঢেলে দেয়, যাতে আপনি দৌড়ে পালাতে পারেন।
কিন্তু মুশকিল হলো, আধুনিক জীবনে আমাদের বাঘ-ভাল্লুক তাড়া করে না। আমাদের স্ট্রেস হলো—অফিসের ডেডলাইন, ট্রাফিক জ্যাম, লোনের কিস্তি, বা সংসারের অশান্তি। আমরা চেয়ারে বসেই টেনশন করি। ফলে কর্টিসল রক্তে যে গ্লুকোজ বা সুগার ঢেলে দিল, তা খরচ করার মতো কোনো শারীরিক পরিশ্রম আমরা করি না। তখন শরীরে ইনসুলিন আসে এবং সেই বাড়তি সুগারকে চর্বি হিসেবে জমা করে। আর জানেন কি? আমাদের পেটের চর্বি কোষগুলোতে (Visceral Fat) কর্টিসলের রিসেপ্টর বা গ্রাহক সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই কর্টিসল হরমোন সোজা পেটের কাছেই চর্বি জমা করতে পছন্দ করে। একেই ডাক্তাররা বলেন 'স্ট্রেস বেলি' (Stress Belly)।
শুধু তাই নয়, যখন আপনি খুব স্ট্রেসে থাকেন, তখন আপনার ঘুম ভালো হয় না। আর ঘুমের অভাবে কর্টিসল আরও বেড়ে যায়। তখন শরীর আপনার মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়—"তাড়াতাড়ি শক্তি দরকার, কার্বোহাইড্রেট বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাও।" খেয়াল করে দেখবেন, মন খারাপ থাকলে বা টেনশন থাকলে আমাদের চকলেট, আইসক্রিম বা ভাজাপোড়া খাওয়ার তীব্র ইচ্ছে জাগে। এটা আপনার দোষ নয়, এটা হরমোনের কারসাজি।
তাহলে সমাধান? পেটের চর্বি কমাতে হলে ডায়েট চার্টের দিকে তাকানোর আগে নিজের মনের দিকে তাকান। দিনে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন। কারণ ঘুমই একমাত্র সময় যখন শরীর কর্টিসল লেভেল নামিয়ে আনে এবং হরমোনের ভারসাম্য ঠিক করে। এছাড়া ধীর লয়ে শ্বাস নেওয়া (Deep Breathing) বা যোগব্যায়াম স্ট্রেস কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। মনে রাখবেন, শরীর যদি নিরাপদ বা 'রিল্যাক্সড' বোধ না করে, তবে সে কিছুতেই তার জমানো পুঁজি বা চর্বি খরচ করবে না। তাই ওজন কমাতে চাইলে আগে নিজেকে শান্ত করুন।
আপনার কি মনে হয় অতিরিক্ত টেনশনই আপনার ওজন কমানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? কমেন্টে জানাতে পারেন। Probal Kumar Mondal
নিউজিল্যান্ডের ভেড়ার সংখ্যা এবং জনসংখ্যার এই অনুপাতটি আসলেই অবাক করার মতো! যেখানে নিউজিল্যান্ডে মানুষের মানুষের সংখ্যা মাত্র ৪.৫ মিলিয়ন (৪৫ লক্ষ) সেখানে ভেড়ার সংখ্যা প্রায় ৩০ মিলিয়ন (৩ কোটি)। অর্থাৎ, নিউজিল্যান্ডে প্রতি ১ জন মানুষের বিপরীতে প্রায় ৬ থেকে ৭টি ভেড়া রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক ভেড়া দেশটির অর্থনীতি এবং ল্যান্ডস্কেপের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৪
জেজু দ্বীপের সমুদ্র-কন্যা: হেনীয়ো
দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের উপকূলে 'হেনীয়ো' বা "সমুদ্র-কন্যা" নামে পরিচিত একদল বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ডুবুরি রয়েছেন। তারা কোনো প্রকার অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই সমুদ্রের তলদেশ থেকে সামুদ্রিক খাবার সংগ্রহ করেন। পানির নিচে তারা দীর্ঘ কয়েক মিনিট দম ধরে রাখতে পারেন।
তাদের অনেকের বয়স ৮০ বছরের বেশি, তবুও তারা অসাধারণ দক্ষতা ও শারীরিক সামর্থ্যের সাথে সমুদ্রে ডুব দেন।
শত বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য বংশপরম্পরায় চলে আসছে।
বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী জীবনশৈলীকে ইউনেস্কো (UNESCO) তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সম্মানিত করেছে।
৫
বায়তুল হিকমাহ
বায়তুল হিকমাহর ধারণার সূচনা হয় বাগদাদ প্রতিষ্ঠার সময়। আব্বাসীয়দের দ্বিতীয় খলিফা, আল-মনসুর এখানে রাজধানী সরিয়ে আনেন। উদ্দেশ্য ছিল দামেস্ককেন্দ্রিক উমাইয়াদের প্রভাব একেবারে মুছে ফেলা। আল-মনসুর বাগদাদে কিছু করতে চাইলেন।
খলিফা আলেক্সান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি থেকেও অনুপ্রাণিত হন। তার ইচ্ছে বাগদাদে এমন একটি সংগ্রহ গড়ে তোলা যার নাম হবে খিজানাত আল-হিকমাহ (Khizanat al-Hikmah/ Library of Wisdom)। ৭৭৫ সালে মারা যান তিনি। তার স্বপ্ন সত্যি করেন খলিফা হারুন আল-রশিদ (Harun al-Rashid)। ৭৮৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই রাজদরবারের লাইব্রেরির একাংশ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন তিনি। উজির ইয়াহইয়া আল-বারমাকির (Yahya Al Barmaki) ওপর দায়িত্ব পড়ে বড় পরিসরে লাইব্রেরি তৈরি করার।
প্রাথমিক পর্যায়ে খলিফার দাদা এবং বাবার কাছে থাকা শিল্পসাহিত্য আর বিজ্ঞান বিষয়ক বইয়ের ঠাঁই হয় লাইব্রেরিতে। পারস্যের উপকথা, সাসানিয়ান জ্যোতির্বিদদের লেখনি ইত্যাদি আরবিতে অনুবাদ করা হয়। এজন্য নিয়োগ পেয়েছিলেন অনুবাদক এবং বই বাঁধাইকারকেরা। এই পর্যায়ে অবশ্য প্রাচীন পারস্যভাষার গ্রন্থই কেবল আরবিতে অনুবাদ হয়েছিল।
হারুন আল-রশিদের পুত্র পরবর্তী খলিফা আল-মামুনের সময় এই পাঠাগার চূড়ান্ত উৎকর্ষ অর্জন করে। ৮১৩ থেকে ৮৩৩ সাল পর্যন্ত শাসন করেছিলেন আল-মামুন। মূল ভবনকে পরিবর্ধিত করে তিনি একটি অ্যাকাডেমি স্থাপন করেন, এর নামই হয় বাইতুল হিকমাহ (the House of Wisdom)। ৮২৯ সালে আল-মামুন এখানে একটি মানমন্দিরও (observatory) বানিয়ে দেন।
সংগ্রহশালা বাড়াতেও নানা পদক্ষেপ নেন খলিফা। কিংবদন্তী আছে- সিসিলির রাজকীয় লাইব্রেরির পুরোটাই নিয়ে এসেছিলেন তিনি। তৎকালীন বিশ্বে বিজ্ঞান আর গণিতের উঁচুমানের কিছু পাণ্ডুলিপি ছিল সেখানে। আল-মামুন মূলত সেগুলো কপি করতে চেয়েছিলেন। এই ব্যাপারে সিসিলিতে বার্তা পাঠান তিনি। রাজা তার উপদেষ্টাদের সাথে আলাপ করেন। তাদের মতামত ছিল গ্রন্থাগারের এসব বই তাদের পূর্বপুরুষদের কোনো উপকারে আসেনি, এগুলো দিয়ে দেয়াই ভাল। রাজা এরপর খলিফাকে সম্পূর্ণ লাইব্রেরিই দিয়ে দেন। বলা হয়, ৪০০ উট লেগেছিল সমস্ত বই নিয়ে আসতে।
বাইতুল হিকমাহর অন্যতম একটি কাজ ছিল বিজ্ঞানের বই গ্রীক, সংস্কৃত, ল্যাটিন ইত্যাদি ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদ করা। বলা হয়, এই কাজকে প্রণোদনা দিতে চমকপ্রদ কৌশল অবলম্বন করেছিলেন খলিফা আল-মামুন- অনূদিত বইয়ের ওজনের সমপরিমাণ স্বর্ণ দেয়া হবে অনুবাদককে।
গ্রীক পন্ডিতদের অনেক লেখা আরবিতে তর্জমা করা হয়েছিল। পিথাগোরাস, প্লাটো, অ্যারিস্টোটল, হিপোক্র্যাটস, গ্যালেন, সক্রেটিস, ইউক্লিড কেউ বাদ যাননি। বলা হয়, গ্রন্থাগারে পা রাখলে আরবি, ফারসি, হিব্রু, গ্রীক, ল্যাটিন হেন কোনো ভাষা নেই যা শোনা যেত না। লিঙ্গ, ধর্মবিশ্বাস, গায়ের রঙ, জাতপাত, ভাষা যা-ই হোক, কারো জন্যই বন্ধ ছিল না লাইব্রেরির দরজা।
ধ্বংস
বাইতুল হিকমাহ চূড়ান্তভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ত্রয়োদশ শতকে। ১২৫৮ সালে ঝড়ের মতো ইরাকে ঢুকে পড়ে দুর্ধর্ষ মোঙ্গল বাহিনী, বাগদাদ তছনছ করে দেয় তারা। নির্বিচার নরহত্যায় লাল হয়ে যায় টাইগ্রিসের পানি। এককালের জৌলুষময় বাগদাদকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় মোঙ্গলরা। এর সাথে সাথেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বাইতুল হিকমাহ। @ Imtiaz Ahmed
৬
রাশিয়ার সাহিত্যিক লিও তলস্তয়
১৯০১ সাল থেকে সাহিত্যে নোবেল দেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত নোবেলের সবচেয়ে বড় বিতর্ক হচ্ছে সাহিত্যে লিও তলস্তয়কে নোবেল পুরস্কার দিতে না পারা। ১৯১০ সালে মৃত্যুবরণ করেন মহামতি তলস্তয়। তখনও বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে বড় নাম লিও তলস্তয়কে নোবেল দিতে পারেনি নোবেল কমিটি। শুধু তখনই না, বরং এখনও বিশ্বসাহিত্যের মহীরুহ হয়ে আছেন তলস্তয়। তার লেখা ‘ওয়ার এন্ড পিস’ এবং ‘আন্না কারেনিনা’ বিশ্বসাহিত্যের যেকোনো শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের তালিকায় সবচেয়ে উপরের দুটি নাম। ওয়ার এন্ড পিস’ লেখা হয়েছে দীর্ঘ ৫ বছর ধরে, হাজারের উপর পৃষ্ঠা উপন্যাসটির। চরিত্রের সংখ্যাই ছয় শতাধিক। নেপোলিয়ান বোনাপার্টের রাশিয়া আক্রমণ ও কয়েকটি অভিজাত পরিবারের ভাঙাগড়ার খেলা নিয়ে এর কাহিনী। ‘আন্না কারেনিনা’ ৩ বছর ধরে লেখা উপন্যাস। তৎকালীন বিস্তৃত রাশিয়ান সমাজ ও একটা নিরেট ঝামেলাপূর্ণ প্রেমের গল্প আন্না কারেনিনা, এটাও এক বিশাল উপন্যাস। রিসারেকশন, আত্মজীবনী এবং বেশ কয়েকটি কালজয়ী গল্প লিখে গেলেও লিও তলস্তয়ের পরিচয় এই দুটো উপন্যাসই।
১৮২৮ সালে এক সম্ভ্রান্ত রুশ পরিবারে তলস্তয়ের জন্ম। অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারান। ছোটবেলা থেকে অসম্ভব মেধাবী ও পরিশ্রমী ছিলেন তিনি। ম্যাক্সিম গোর্কির মতে, তলস্তয় নিজেই একটা পৃথিবী। নিজ আগ্রহে শেখেন লাতিন, ইংরেজি, আরবি, ইতালীয়, হিব্রুসহ আরো কয়েকটি ভাষা। প্রচুর বই পড়তেন তিনি, যখনই মনে হতো একটা বিদেশী বই মূল ভাষায় পড়া দরকার, তাহলেই ঐ মূল ভাষা শিখেই বই পড়ার চেষ্ঠা করতেন।
কম বয়সে তিনি বুঝতে পারছিলেন না সাহিত্যের জগতে আসবেন কিনা। কাছের বন্ধু আরেক বিখ্যাত লেখক তুর্গেনেভের অনুপ্রেরণায় লিখতে বসেন। তার প্রথম বই ‘চাইল্ডহুড’, কয়েক বছরের মধ্যে অটোবায়োগ্রাফির অপর দুই খন্ডও লিখে ফেলেন। সাধারণত মানুষ জীবনের শেষের দিকে আত্মজীবনী লিখে থাকেন, অথচ তলস্তয় তার লেখালেখি শুরুই করেন আত্মজীবনী দিয়ে। তার জীবন ছিল এতটাই ঘটনাবহুল। অল্প বয়সে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর দাদির মৃত্যু, পরে এক ফুফুর আশ্রয়ে বড় হতে থাকলে ফুফুও মৃত্যুবরণ করেন। এত সব দুঃখ সামলে নিজের পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি তিনি। আকৃষ্ট হয়ে যান মন্টেস্কো আর রুশোর দর্শনে। বাড়িতে এসে জমিদারী করতে গিয়ে আবার ব্যর্থ হন। ইউরোপ সফরে বের হন। সৈনিক হিসেবে যান ক্রিমিয়ার যুদ্ধ লড়তে।
এত অভিজ্ঞতা তলস্তয়কে একজন ভালো লেখক হিসেবে সমৃদ্ধই করে গেছে শুধু। প্রচুর লিখেছেন তিনি। শুধু উপন্যাসই না, তার লেখা গল্পও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ছিলেন দার্শনিকও। তার দেখানো অহিংস দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। শেষ দিকে তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকে মনোযোগ দেন। নিজের মতো ধর্মচর্চায় মনোযোগ দেন। নিজের প্রায় সব সম্পদ বিলিয়ে যেতে লাগলেন। কপর্দকশূন্য অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে বের হয়ে যান ঘর থেকে, আক্রান্ত হন নিউমোনিয়ায়। রাশিয়ার ছোট এক স্টেশনে নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যান বিশ্ব সাহিত্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলোর একজন মহামতি লিও তলস্তয়। @ Himel Mahmud
৭
আগুন মমি
উত্তর ফিলিপাইনের বেঙ্গুত (Benguet) প্রদেশের পাহাড়ি এক অঞ্চল কাবাইয়ান (Kabayan)। এখানে বাস করে ইবালোই (Ibaloi ) উপজাতি। টিম্বাক (Timbac) পর্বতের পাদদেশে ছোট ছোট গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে তারা। এই পাহাড়ের গুহায় পাওয়া যায় আগুন মমির দেখা। ইবালোইদের পূর্বপুরুষেরা মৃতদের মমি করে রেখে আসতেন টিম্বাক, বাঙ্গাও, টেনোগচোল, নাপাই, ওপডাস এরকম আরো নানা গুহায়। এজন্য এই মমি ইবালোই মমি বা কাবাইয়ান মমি নামেও পরিচিত।
ইবালোইরা ঠিক কীভাবে মমি করতো সেটা নিয়ে খুব বেশি লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে আসা গল্প থেকে বেশ ভালো তথ্য পাওয়া যায়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও জানা গেছে অনেক কিছু।
সব সুতো জোড়া দিয়ে জানা যায় মমিকরণের শুরুটা হতো ব্যক্তি জীবিত থাকাকালেই। মুমূর্ষুকে পান করতে দেয়া হতো লবণাক্ত একরকম পানীয়। নোনা পানি শরীরকে পানিশূন্য করে দেয়, সেটা জানা ছিল স্থানীয়দের। তারা মনে করতো মৃত্যুর আগে এই পানীয় খাওয়ালে শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যাবে তাড়াতাড়ি। তবে আধুনিক বিজ্ঞানের মতে মমি তৈরির পেছনে এই প্রক্রিয়ার অবদান ছিল না বললেই চলে।
মূল কাজ শুরু হতো ব্যক্তি মারা যাবার পর। সব মিলিয়ে সপ্তাহখানেক থেকে মাসও লাগতে পারত। প্রাথমিক ধাপে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল দেয়া হত মৃতদেহ। এরপর তাকে ঢেকে দেয়া হত কোলেবাও (kolebao/pinagpagan) নামে বিশেষ ধরনে র কম্বলে। মাথায় পড়ানো হতো সিনালিবুবো (sinalibubo) নামে একরকম স্কার্ফ। মৃতকে বসানো হতো মৃতদের চেয়ার/সাঙ্গাচিলে (sangachil)। কম্বল দিয়ে বাঁধা থাকত তার দেহ, আর স্কার্ফ দিয়ে সোজা করা থাকত মাথা।
পরবর্তী ধাপ ছিল ধোঁয়া দিয়ে মৃতদেহ শুকিয়ে ফেলা। এজন্য ছোট করে আগুন জ্বালিয়ে তার নিচে রাখা হতো চেয়ার। তবে সরাসরি মৃত ব্যক্তিকে আগুনের সংস্পর্শে আনা হতো না কখনোই। তাপে শরীরের সমস্ত পানি ধীরে ধীরে বের হয়ে যেতো, সেটা সংরক্ষণ করা হতো বোতলে। পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে চেয়ার থেকে মৃতদেহ নামিয়ে আনত ইবালোইরা।
এবার আসতো শেষ ধাপের কাজ। কুঁচকে যাওয়া দেহ সূর্যের আলোতে রেখে দুদুয়ান (duduan) অনুষ্ঠান পালন করতো আত্মীয় ও সমাজের বয়োজ্যোষ্ঠরা। উদ্দেশ্য চামড়ার ওপরের অংশ ছাড়িয়ে নেয়া। স্থানীয় লতাপাতা আর শেকড়-বাকড় দিয়ে তৈরি বিশেষ ঔষধ শরীরে লাগিয়ে জ্বালানো হতো তামাক। এমন ব্যবস্থা করা হতো যাতে এই ধোঁয়া মৃতের নাকমুখ দিয়ে প্রবেশ করে। ইবালোইরা মনে করতো এর ফলে শরীরের ভেতর যদি আর কোনো পানি থেকেও থাকে সেটা শুকিয়ে যাবে। বলাই বাহুল্য, বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বও ভুল বলে জানিয়েছেন।
কাজ শেষ! এবার মৃত ব্যক্তি প্রস্তুত শেষবিদায় নেবার জন্য। মমিকে কোলেবাও দিয়ে কয়েকস্তরে ঢেকে কাঠের কফিনে মায়ের পেটে শিশু যেভাবে থাকে অনেকটা সেভাবে রেখে দিত সমাজের লোকেরা। নানা আচার পালন করতে করতে বয়ে নিয়ে যেত পাহাড়ি গুহায়। সেখানে তাকে রেখে দিয়ে তবেই সমাপ্ত হতো শেষকৃত্য।
ইবালোইদের বিশ্বাস অনুযায়ী আগুন মমিকে যেই গুহায় রাখা হয়েছে সেখান থেকে কখনোই বের করা যাবে না, তাহলে কষ্ট পাবে তাদের আত্মা। তেমন হলে নেমে আসবে অভিশাপ, দেখা দেবে নানা দুর্যোগ। গুহার ভেতরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় অবশ্য নেয়া যাবে। আগুন আর ধোঁয়া ব্যবহার করে মমি করার পদ্ধতি কিন্তু ইবালোইদের একার নয়। পাপুয়া নিউ গিনির বেশ কিছু উপজাতির মধ্যেও এর প্রচলন ছিল। তবে ফিলিপাইনের আগুন মমিই বেশি পরিচিত। @ Imtiaz Ahmed
৮
তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠায় প্রাচীন বাঙালিদের অবদান
তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্ম এবং তিব্বতি সভ্যতার গোড়াপত্তনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিলো পা, নারো পা এবং অতীশ দীপঙ্কর। তিব্বতিরা তাদের শান্তি এবং সার্বজনীন শুভেচ্ছা বার্তার জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত।যেখানে এই জ্ঞানের সূচনা হয়েছিল। এবং তা বাস্তবায়িত হয়েছিল প্রাচীন বাঙালি বৌদ্ধদের দ্বারা।
প্রাচীন বাঙালি তিলো পা
৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে, তিলো পা নামে এক প্রাচীন ভারতীয় বাঙালি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য গৃহত্যাগ করেন। ধারণা করা হয়, বঙ্গদেশের চাটিভাভো বা অধুনা চট্টগ্রামে এক ব্রাহ্মণ বা রাজপরিবারে জন্মেছিলেন তিনি। জ্ঞানপিপাসু তিলো পা জ্ঞানান্বেষণে ঘুরে বেড়ান পুরো ভারতজুড়ে, শিক্ষালাভ করেন বিভিন্ন পণ্ডিত-গুরুর থেকে। শেষ পর্যন্ত তিনি থিতু হন নেপালে। ওখানে এক গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নেওয়ার সময় নির্বাণ বা ‘সিদ্ধি’ লাভ করেন তিনি। কিছু কিংবদন্তি অনুসারে, তার এই বোধিলাভ ছিল সরাসরি এক দৈব উপহার। তিলো পা ছিলেন একজন পরিশ্রমী বৌদ্ধ সাধক। জ্ঞানের দীর্ঘ অনুসন্ধানের একপর্যায়ে তিনি তিল পিষে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন।
নারো পা
তিলো পা’র শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তার দর্শন শিক্ষালয়ের অংশ হন নারো পা নামে একজন লোক। গুরুর মতো তার জন্মও এক রাজকীয় বাঙালি পরিবারে। তার আসল নাম ছিল সামন্তভদ্র বা অভয়কীর্তি। স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর নারো পা বাড়ি ছেড়ে চলে যান, একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হিসাবে নিযুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তার প্রবল আগ্রহ তাকে ধাবিত করে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে। নালন্দায় ভর্তির পর তিনি বিভিন্ন বিষয়ে সেখানে অধ্যয়ন শুরু করেন। নালন্দার একজন মহান পণ্ডিত হিসেবে চারপাশে শুরু হয় তার জয়জয়কার। জনশ্রুতি আছে, একজন ডাকিনীর আহ্বানে তিলো পা’কে খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন নারো পা। মূল উদ্দেশ্য ছিল, তিলো পা’র দীক্ষায় জ্ঞানের সর্বোচ্চ চূড়ায় আহরণ করা। ততদিনে মহাসিদ্ধ হিসেবে তিলো পা’র জ্ঞান গরিমার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল চারিদিকে। যা-ই হোক, অবশেষে তিলো পা’র দর্শন পেলেন নারো পা। প্রথম দেখাতে নারো পা তাকে চিনতে পারেনি। জ্ঞান পরিধি বিস্তৃতির জন্য বারোটি কঠিন এবং বারোটি সহজসাধ্য কাজ দেওয়া হয়েছিল নারো পা’কে। নিজ অধ্যবসায় এবং কঠোর সাধনার গুণে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নারো পা তার গুরুর সমস্ত দীক্ষা আয়ত্তে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে, নারো পা তার শিষ্যদের মাঝে এই সমস্ত তত্ত্বজ্ঞান ছড়িয়ে দিয়ে যান।
অতীশ দীপঙ্করের আখ্যান
অতীশ দীপঙ্করকে প্রাক বৌদ্ধধর্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুরু হিসেবে সম্মান করা হয়। তিনি তিব্বত, সুমাত্রা এবং ভারত ও এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে বৌদ্ধধর্মের শান্তি ও অহিংসার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার বজ্রযোগিনী গ্রাম ছিল তার জন্মস্থান। অতীশের আসল নাম ছিল চন্দ্রগর্ভ। শৈশব থেকেই ক্রমশ স্ফুরণ ঘটাতে থাকে তাঁর জ্ঞানমহিমা। যুবক বয়সেই তিনি জ্যোতির্বিদ্যা, যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, সাহিত্য, ধ্যান বিজ্ঞান, শিল্প এবং সঙ্গীতের বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠেন। এর পাশাপাশি তিনি বৈষ্ণব, তান্ত্রিক হিন্দু এবং শৈব ধর্মের দীক্ষাও আয়ত্ত করেছিলেন।
অসংখ্য শিক্ষকের অধীনে শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। শীঘ্রই একজন সন্ন্যাসী হিসেবে নিযুক্ত হবার পর আরও অনেক ধর্মোপদেষ্টার কাছ থেকে বৌদ্ধ শাস্ত্রীয় শিক্ষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন অতীশ দীপঙ্কর। এরপর তিনি বৌদ্ধধর্মকে আরও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে জানার আগ্রহে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রচণ্ড জ্ঞানতেষ্টাই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে সফলতার স্বর্ণশিখরে। করে রেখেছে ইতিহাসের পাতায় অমর। তিনি অন্যান্য ধর্মের পণ্ডিতদের বিতর্কে সফলভাবে পরাজিত করাতেও ছিলেন বেশ পটু। তার তত্ত্বাবধানে গুটিকতক মঠ পরিচালিত হতো।
এগারো শতকের গোঁড়ার দিকে, অতীশ সুবর্ণদ্বীপে (বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপ) ভ্রমণ করেন। সেখানে মোট ১২ বছর অবস্থান করে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন তিনি। ভারতে ফিরে আসার পর তাঁকে বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর কয়েক বছর পর, তিব্বতি রাজার একজন দূত আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি অতীশ দীপঙ্করকে অনুরোধ করেন তার সাথে তিব্বতে গিয়ে সেখানকার মানুষকে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করার জন্য। তিব্বতে পা রাখার পর নিজ জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ও মেধার স্বাক্ষরে সেখানকার লোকজনকে করেছিলেন আকৃষ্ট। বানিয়েছিলেন বহু অনুসারী এবং শিষ্য। তিব্বতের মঠগুলোতে দ্বিতীয় বুদ্ধের পদে উন্নীত হন, যার প্রভাব ও খ্যাতি আজও অব্যাহত রয়েছে। ধারণা করা হয়, এই তিব্বতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন অতীশ দীপঙ্কর। রাজধানী লাসার কাছে তাঁকে সমাহিত করা হয়। @ Mohasin Alam Roni
৯
ভারতের ধনী সম্প্রদায়
অষ্টম থেকে দশম শতকে ইরান থেকে যে জরথুস্ত্রপন্থি মানুষেরা ভারতে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে ঠাঁই নেয়, তাদেরকেই ভারতীয় পারসি বলে অভিহিত করা হয়। সম্প্রদায়ের লোকেরা যে ধর্মে বিশ্বাস করে, তার নাম হলো ‘জরথুস্ত্রবাদ‘ বা ‘পারসিক ধর্ম’। আবেস্তা বা জেন্দাবেস্তা হলো তাদের ধর্মগ্রন্থ। প্রায় ৪,০০০ বছর পূর্বে উদ্ভব হওয়া এই ধর্মকে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হয়। সপ্তম শতাব্দীতে পারস্য (ইরান) ছিল সাসানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে। ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমদের পারস্য বিজয় পতন ঘটায় সাসানীয় সাম্রাজ্যের। ক্রমশ ম্লান হয়ে আসে জরথুস্ত্রীয় ধর্মের প্রভাব। এরপর থেকে ছোট ছোট পারসিকদের দল খণ্ড খণ্ডভাবে আসতে থাকে ভারতে। তৎকালীন গুজরাটের সাঞ্জান শহরের শাসক ছিলেন সম্রাট জাদি রানা। সেই সম্রাটের সাথে বাতচিতের জন্য পাঠানো হয় জরথুস্ত্র এক পুরোহিতকে। তিনি রাজাকে বলেন, আপনার রাজ্যে শরণার্থী হিসেবে থাকতে দিলে আমাদের বেজায় উপকার হতো। কিন্তু রাজামশাই অপরিচিত এই সম্প্রদায়কে নিয়ে খানিকটা সন্দিহান ছিলেন। তিনি তাদের দুধে কানায় কানায় পূর্ণ একটি বাটি দেখিয়ে বললেন, আমার রাজ্যে জনসংখ্যার অবস্থা এই দুধের বাটির মতোই। অতিরিক্ত আরেকটু যুক্ত হলেই উপচে পড়ে যাবে। পুরোহিত তখন রাজার কাছে একমুঠো চিনির আবদার করেন। চিনি নিয়ে আসা হলে সেই চিনিকে দুধের পাত্রে মিশিয়ে দেন পুরোহিত। বলেন, দুধে এই চিনির মিশ্রণের মতোই আমরা আপনার রাজ্যে প্রজাদের সাথে মিলেমিশে থাকব। পুরোহিতের উপস্থিত বুদ্ধি দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হন সম্রাট। তাদেরকে দেওয়া হয় থাকার অনুমতি। কিন্তু এর সাথে কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন তিনি। তা হলো:
পারসি নারীদের অবশ্যই শাড়ি পরিধান করতে হবে।
পারসি পুরুষেরা কোনো অস্ত্র বহন করতে পারবে না।
গুজরাটি ভাষা শিখতে হবে।
পরবর্তী কয়েকশো বছরে আরও ছোট ছোট কিছু পারসি গোষ্ঠী বসতি গড়ে গুজরাটের সাঞ্জান এলাকায়। তাদের সম্মানার্থে ১৯২০ সালে সাঞ্জান স্তম্ভ নামে এক স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। সময়ের সাথে সাথে অধিকাংশ পাড়ি জমায় মুম্বাইয়ের পথে। সেজন্য বর্তমানে ভারতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পারসি পাওয়া যায় মুম্বাই শহরে। প্রথমে তারা আফিমের ব্যবসা করতো। ১৭২৯ সালে চীন সরকার আফিমের আমদানি ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কারণ, চীনে তখন মাদকদ্রব্যের প্রতি মানুষের আসক্তি পৌঁছেছিল চরম পর্যায়ে। ১৮৩০ আসতে আসতে পারসিরা আফিমের ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। বিকল্প হিসেবে তারা তুলা উৎপাদনের দিকে মনোনিবেশ করে। আর সেসময় তুলার চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। তাই, ঝোপ বুঝে কোপ মেরে অল্প সময়েই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয় ভারতীয় পারসি সম্প্রদায়ের। ব্রিটিশ রাজের শাসনামলে তারা নিজ সন্তানদের ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পাঠানো শুরু করে। পারসিদের সন্তানেরা শিখে ফেলে ইংরেজি ভাষা, আয়ত্ত করে পশ্চিমাদের আচার-ব্যবহার, যেটা সেসময়ের জন্য বিলাসপূর্ণ চালচলন হিসেবেই গণ্য করা হতো। এজন্য তারা নিজেদের এক ব্যক্তিত্বশালী সম্প্রদায় হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছিল। তখন পারসি মাত্রই ছিল শিক্ষিত, প্রগতিশীল, এবং সফল এক সম্প্রদায়। পারসিদের অনন্যসাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তারা দানশীলতার সাথে সংযুক্ত। সমাজ ও নিজ সম্প্রদায়ের উন্নয়নে তারা দানকর্মে অংশগ্রহণ করে থাকে। এর বীজ প্রোথিত ছিল জরথুস্ত্র ধর্মের মূল ভিত্তিতে। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, সর্বদা সৎ কাজ করলেই মন্দকে দূরীভূত করা সম্ভব। জামসেটজি টাটাকে উল্লেখ করা হয় ভারতীয় শিল্পের জনক হিসেবে। তিনি টাটা গ্রুপের প্রতিষ্ঠা এবং জামশেদনগর নামে এক শহর স্থাপনের সাথে জড়িত। জরথুস্ত্রবাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, পারসিদের বংশের ধারা প্রবাহিত হতে পারবে শুধুমাত্র পুরুষদের মাধ্যমে। অর্থাৎ, একজন পারসি পুরুষের সাথে যদি একজন অ-পারসি মহিলার বিয়ে হয়, তাদের সন্তান হবে পারসি। অপরদিকে যদি একজন অ-পারসি পুরুষের সাথে একজন পারসি মহিলার বিয়ে হয়, তাদের সন্তানকে সেক্ষেত্রে পারসি বলা যাবে না। @ Mohasin Alam Roni
১০
‘জুলফিকার আলী ভুট্টো: দক্ষিণ এশিয়ার কুলীন রাজনীতির এক অধ্যায়’
প্রাচীন ভারতের জাতিগুলোর মধ্যে রাজপুত অন্যতম। তারা জাতে ক্ষত্রীয় অর্থাৎ যুদ্ধ করাই তাদের কাজ। প্রায় মধ্যযুগ পর্যন্ত উত্তর ভারতের একটা অংশ রাজত্ব করে রাজপুতরা। মোহাম্মদ ঘুরি ১১৯২ সালে সর্বশেষ রাজপুত রাজা পৃথ্বিরাজ চৌহানকে পরাজিত করলে রাজপুত সাম্রাজ্য ভেঙে যায়। তবে মুসলিম শাসকদের সাথে রাজপুতদের সম্পর্ক যে সবসময় খারাপ ছিল তা বলা যায় না। সম্রাট আকবরের সাথে রাজপুতদের ছিল বিশেষ সম্পর্ক। আকবরের শীর্ষ সামরিক বা বেসামরিকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল রাজপুতদের দখলে। নবরত্ন ভগবান দাস, অর্থমন্ত্রী টোডরমল, প্রধান সেনাপতি মানসিংহ, সভাসদ বীরবল এরা সবাই ছিলেন রাজপুত। আকবরের স্ত্রী যোধাবাই, যিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের মা, তিনি ছিলেন রাজপুত। সম্রাট শাহজাহানের মা-ও রাজপুত ছিলেন। মোগলরা এই ভুট্টোদের ‘খান’ উপাধিতে ভুষিত করেন। রাজপুত একটা বিশাল জাতি। তারা মোট ৩৬টি গোত্র আছে। তার মধ্যে একটি ভুট্টো গোষ্ঠী। তারা ভাট্টি বা ভাটিয়া ইত্যাদি নামেও পরিচিত। ইসলামের সংস্পর্শে আসা ভুট্টোরা বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধুতে পাড়ি জমায়। মোগল জমানা থেকে মুসলমানদের সাথে রাজপুতদের বিয়ের প্রচলন দেখা যায়।রাজপুত মেয়েরা ধর্ম পরিবর্তন না করেই তখন মুসলমানদের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্দ হতে পারতো। পাকিস্তানের ইতিহাসের একটা বড় অংশে জুড়ে বস করত ভুট্টোরা। জুলফিকার আলী ভুট্টো এই গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় নাম। জুলফিকার যেমন ভালো বক্তা ছিলেন, একইসাথে একজন অনুসন্ধিৎসু ছিলেন। এই অনুসন্ধিৎসু মনই তাকে সারাজীবন বাকি সবার চেয়ে আলাদা করে রেখেছিল। তার বাবা শাহনওয়াজ করেন একাধিক বিয়ে। ভুট্টোর মা লক্ষ্ণীবাই (খুরশীদ বেগম) জন্মসূত্রে একজন হিন্দু। ভুট্টো সারাজীবন তার মায়ের পরিচয় নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগতেন। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও তার এই পরিচয় নিয়ে আক্রমণ করতো। ভুট্টোর দ্বিতীয় স্ত্রী নুসরাতও একজন শিয়া মুসলিম। এটা নিয়েও কথা শুনতে হতো ভুট্টোকে।
জুলফিকারের পিতা শাহনওয়াজ ভুট্টোও একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ছিলেন। বিশেষ করে সিন্ধু অঞ্চলে তার প্রভাব ছিল অনেক। তিনি ছিলেন স্বাধীন পাকিস্তান গঠনের একজন শক্তিশালী কন্ঠস্বর। তার দ্বিতীয় স্ত্রীর জ্যেষ্ঠ পুত্র জুলফিকার। বড় হবার সকল উপকরণ দিয়ে ছেলেকে বড় করতে থাকেন বাবা। পড়ান ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ও অক্সফোর্ডের মতো জায়গায়। পড়া শেষে দেশে এসে রাজনীতিতে যোগ দেন ভুট্টো।
পরিবারের ঐতিহ্য বজায় রেখে জুলফিকার ভুট্টোও একাধিক বিয়ে করেন। তার বয়স যখন ১২, বছর তখন তিনি ১০ বছরের বড় শিরিন আমিরকে বিয়ে করেন বা বিয়ে দেয়া হয়। এই বিয়ের উদ্দেশ্য ছিলো জমিদারী বৃদ্ধি। বিবাহিত থাকা অবস্থাতেই বোম্বেতে পরিচয় হয় জন্মসূত্রে ইরানী নুসরাতের সাথে। সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী ইস্পাহানী পরিবারের মেয়ে নুসরাত। তার শিয়া পরিচয়ের কারণে বিপদে পড়তে হয় জুলফিকারকে, যদিও নুসরাতকে নিয়ে গর্বিত ছিলেন তিনি। নুসরাত ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ও আধুনিকমনা। রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি ছিল তার। নুসরাতের রাজনৈতিক জ্ঞান ও যোগাযোগ জুলফিকারকে অনেক সুবিধা এনে দিয়েছিল। জুলফিকার যখন বিপদে পড়েন, তার দল পিপিপির হাল ধরতে দেখা যায় নুসরাতকে।
জুলফিকারের সর্বশেষ স্ত্রী হুসনা শেখ। ঢাকার জনৈক আব্দুল আহাদের স্ত্রী হুসনা ছিলেন দুই সন্তানের জননী।জুলফিকারের টানে ঢাকা ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান হুসনা। শুধু এই তিনজনই না, আরো অনেক নারী জুলফিকর আলী ভুট্টোর উপপত্নী ছিলেন। তিনি কখনো এ ব্যাপারে অস্বীকারও করতেন না। বরং অনেকটা গর্বের সাথেই স্বীকার করতেন। বাংলাদেশ জন্মলাভের ৪ দিন পর, ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে, জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হন। পরবর্তীতে হন প্রধানমন্ত্রীও। ১৯৭৯ সালে ভুট্টোর নিয়োগ দেয়া জিয়াউল হকের সামরিক আদালতে ফাঁসি দেয়া হয় রাজপুতদের এই বংশধরের। @ Himel Mahmud
১১
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর সুখের কারণ কী?
ভৌগলিকভাবে ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে ও সাংস্কৃতিকভাবে এই তিনটিসহ আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড ও ফারো দ্বীপপুঞ্জকে বলা হয় স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ। ইউরোপের উত্তরের স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা সুখ সূচকে এগিয়ে বা এত সুখী হওয়ার রয়েছে বিভিন্ন কারণ। তাছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুক্তবাজার অর্থনীতির জন্য দেশের অর্থনীতি ভালো কাজ করে, মানুষের আয় তুলনামূলক ভালো থাকে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি থাকায় মানুষের সামাজিক সুরক্ষা অত্যন্ত শক্তিশালী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ফ্রিসহ মৌলিখ অধিকার নিয়ে চিন্তা করতে হয় না জনগণকে।
কটি শিশু যখন নর্ডিক দেশে জন্ম নেয়, তার দায়িত্ব সরকারও নেয়। ফ্রি স্কুল, ফ্রি চিকিৎসা পেয়ে থাকে দেশের সকল নাগরিক। সামাজিক সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে চ্যারিটি, অন্যের উপকার। একজন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান নাগরিক দিনশেষে চিন্তা করবে আমি কি চ্যারিটিতে দান করেছি? এই চ্যারিটির মাধ্যমে একজন মানুষ মানসিক শান্তি পেয়ে থাকে। ঠিক তেমনিভাবে পরোপকারের মাধ্যমে তারা মানসিক শান্তি পেয়ে থাকে। শারীরিক অসুস্থতার জন্য সরকারের সহযোগিতা থাকে। শিক্ষার পর কেউ যদি চাকরি চলে যায়, রাষ্ট্র তার সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে থাকে।
দেশসমূহ সামজিক কল্যাণ প্রোগ্রামের উপর জোর দেয়, যেমন- সার্বজনীন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সামাজিক সুবিধা। যার ফলে সেখানে আয়বৈষম্য, বিভেদ কম। একজন অশিক্ষিত বাবা-মায়ের সন্তান চাইলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে ফ্রিতে। রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে আয়বৈষম্য কম থাকার দরুন মানুষের মধ্যে হতাশা কম কাজ করে।
১২
সিন্ধু সভ্যতার অবদান
প্রাচীন পৃথিবীর দক্ষিণ এশিয়ায় গড়ে ওঠা সিন্ধু সভ্যতা এক অপার বিস্ময়ের নাম। আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর পূর্বে যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত ইউরোপের মানুষজন গুহায় বসবাস করত, ঠিক সে-সময়ে পৃথিবীর আরেক প্রান্তে প্রাচীন ভারতবর্ষে গড়ে উঠেছিল এক সুসংগঠিত সভ্যতা। উন্নত জীবনযাপনের পাশাপাশি তারা ব্যবসা-বাণিজ্যেও যোজন যোজন ক্রোশ এগিয়ে গিয়েছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে তারা দৈনন্দিন জীবনযাপনকে করে তুলেছিল অধিকতর সহজ ও সাবলীল। যার প্রমাণ বয়ে বেড়াচ্ছে সিন্ধু সভ্যতা থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নসম্পদ।
মহেঞ্জোদারো শহরের নগর পরিকল্পনা ও প্রকৌশলের কাঠামোর কথা বিবেচনা করলে, তা তৎকালীন বিশ্বের যেকোনো শহরকে টেক্কা দেওয়া ক্ষমতা রাখত। মহেঞ্জোদারোতে ছিল বিশাল এক শস্যাগার। গম আর যব ছিল এখানকার প্রধান কৃষিজ ফসল। গ্রামাঞ্চল থেকে গরুর গাড়িতে করে শস্য এনে এই শস্যভাণ্ডারে তা সংরক্ষণ করে রাখা হতো। খাদ্যশস্য যেন অনেকদিন পর্যন্ত ভালো অবস্থায় থাকে, সেজন্য শস্যভাণ্ডারে বাতাস চলাচলের জন্যও উপযুক্ত ব্যবস্থা ছিল। মহাশস্যাগারের পাশাপাশি এখানে বিশাল এক স্নানাগারের অস্তিত্ব ছিল। বাড়িঘর নির্মাণ করা হতো পোড়া মাটির ইট দিয়ে এবং অধিকাংশই ছিল দোতলা। বৃহৎ স্নানাগারের পাশাপাশি কয়েকটি বাড়িতে নিজস্ব স্নানাগারও ছিল। মহেঞ্জোদারোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল বর্তমানের মতো আধুনিক। প্রত্যেক বাড়ির ময়লা যাতে শহরের নর্দমায় গিয়ে মিলিত হতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হয়েছিল তখন।
শহরের রাস্তাগুলোও কিন্তু এলোপাথাড়ি তৈরি করা হয়নি, হয়েছে গাণিতিক নিয়ম মেনে। হরপ্পায় রাস্তার পাশে একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে সড়ক বাতির পাশাপাশি শহরের প্রধান রাস্তাগুলোর পাশে মূল নর্দমাগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। তারা প্রতিরক্ষাকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিত বলে গড়ে তুলেছিল প্রাচীর। বিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে গরুর গাড়ি এবং নৌকা তৈরি করেছিল তারা। নৌকাগুলো আকারে ছিল ছোট এবং চালানো পালের সাহায্যে, বাতাসকে কাজে লাগিয়ে। , ভিন্ন ঋতুতে ভিন্ন ফসল ফলাত হরপ্পাবাসী। গ্রীষ্মকালীন ফসল হিসেবে ধান, ভুট্টা, শিম, এবং শীতকালে গম, বার্লি, ডাল চাষের নিয়ম জানত তারা। আজ থেকে ৫০০০ বছর আগের এই মানুষেদের সভ্যতা নদীমাতৃক হওয়ায় উন্নত সেচ প্রক্রিয়ার উদ্ভাবন ঘটিয়েছিল তারা।
ধাতুবিদ্যায় হরপ্পাবাসীর জ্ঞান ছিল প্রখর। তারা নির্দিষ্ট ওজন ও আকৃতির পোড়ামাটির ইট বানাতে পারত। তুলা ব্যবহারের নিয়মও ভালোভাবে জানা ছিল তাদের। প্রত্নস্থল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তারা গয়না হিসেবে সোনা, রূপা, তামা, লাপিস লাজুলি, নীলকান্তমণি, পান্না, শ্বেতস্ফটিক ইত্যাদি ব্যবহার করত। তারা তামা, পিতল, সীসা, টিনসহ বিভিন্ন ধাতু নিষ্কাশনের নতুন কিছু পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। হরপ্পার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে স্বর্ণমোড়ানো এক পাথর পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, সেটা স্বর্ণের বিশুদ্ধতা পরিমাপের জন্য কষ্টিপাথর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সিন্ধু সভ্যতার কুমারেরা মাটির পাত্র তৈরি করত চাকার সাহায্যে। বিভিন্ন আকার ও আকৃতির মাটির তৈজসপত্র তৈরি হতো সেখানে। এদের উপর আঁকা থাকত বিভিন্ন চিত্রকল্প। তারাই সর্বপ্রথম স্কেল আবিষ্কার করেছিল। লোথালে হাতির দাঁতের একটি স্কেলের সন্ধান পাওয়া গেছে যেটা দিয়ে ১.৬ মিলিমিটার পর্যন্ত মাপা যেত। সিন্ধু সভ্যতায় ওজন পরিমাপের জন্য বাটখারার প্রচলনও ছিল। রোগবালাই সারাতে সিন্ধু সভ্যতার বাসিন্দারা বিভিন্ন ঔষধি এবং ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার জানত। @ Mohasin Alam Roni
১৩
খ্রি.পূ. ৩২২ অব্দ থেকে খ্রি.পূ. ১৮৫ অব্দ পর্যন্ত শাসন করত মৌর্য সাম্রাজ্য। পাটলিপুত্র ছিল এর রাজধানী। চাণক্যের সাথে মৌর্য সাম্রাজ্য ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা। সুপ্রাচীন রাষ্ট্রনীতি বিষয়ক গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’ তাঁরই হাতেই রচিত। এই চাণক্য, কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও সুপরিচিত ছিলেন। চাণক্যের সহায়তায় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এই সুবিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। প্রাচীন লোককথা অনুসারে, নন্দ রাজবংশের সম্রাট ধননন্দ একবার অপমান করেছিলেন চাণক্যকে। এর প্রতিশোধ হিসেবে তিনি নন্দ সাম্রাজ্যকে ধসিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। সম্রাট অশোক কলিঙ্গ রাজ্য জয়ের মাধ্যমে সমগ্র দক্ষিণ ভারতকে মৌর্য সাম্রাজ্যের ছায়াতলে নিয়ে আসেন।
উত্তরে হিন্দুকুশ পর্বতমালা থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশ বাদ দিয়ে মোটামুটি সমগ্র ভারতবর্ষই চলে আসে তার শাসনের আওতায়। এরপর তিনি পরিকল্পনা করেন কলিঙ্গ রাজ্য আক্রমণের। এই কলিঙ্গ যুদ্ধই সম্রাট অশোককে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছিল। এই যুদ্ধের ভয়াবহতা এতোই তীব্র ছিল যে, প্রায় ১ লক্ষ মানুষ এতে প্রাণ হারিয়েছিলেন, নির্বাসিত হয়েছিল দেড় লক্ষেরও বেশি। রক্তের এই মহাসমুদ্র এবং অধিকসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি দেখে দারুণ বিমর্ষ হয়ে পড়েন সম্রাট অশোক। তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হন তিনি। এই যুদ্ধের পরেই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, জীবনে আর কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ কিংবা সংঘর্ষে জড়াবেন না। তিনি সকলকেই হানাহানি, সন্ত্রাস রাহাজানি এসব ত্যাগ করে শান্তিতে বসবাসের আহবান জানান। হয়ে যান বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক, শান্তিকামী, প্রজাবৎসল এক রাজা। তার আমলে শুধু মৌর্য সাম্রাজ্যই নয়, এশিয়ার বিভিন্ন রাজ্যেও বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটেছিল।
মৌর্য সাম্রাজ্যের একটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কৌটিল্যের বুদ্ধিতে বিভিন্ন গুপ্তচর পুষতেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। তারা বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে গোপন ও স্পর্শকাতর সকল সংবাদ এনে দিত রাজামশাইকে। এই সাম্রাজ্যের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সর্বদা বৃহৎ এক সেনাবাহিনী তৈরি থাকত এই রাজ্যে। আদেশ পাওয়া মাত্রই তারা যেকোনো কিছুর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ত। এমনকি মৌর্য সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট অশোক যুদ্ধ-বিগ্রহ থামিয়ে দেওয়ার পরেও তার কাছে ওই সেনাবাহিনী মজুদ ছিল। সৈনিকদের প্রধান কাজ ছিল যুদ্ধে শামিল হয়ে প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করা। যখন কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ থাকত না, তখন তারা তাদের খেয়ালখুশি মতো যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারত।
সৈনিকেরা অনেকগুলো ভাগে বিভক্ত ছিল। যেমন, পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী সৈন্য, নৌবাহিনী, রথারোহী, হাতি বাহিনী, সরবরাহকারী ইত্যাদি। সৈনিকদের ভরণপোষণ এবং অস্ত্র যোগান দেওয়ার দায়িত্ব ছিল রাজার। পদাতিক সৈন্যদের কাছে থাকত তীর-ধনুক, বর্ম, বর্শা, এবং লম্বা তরবারি।
মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন হিন্দু ধর্মের অনুসারী। বিন্দুসার পালন করতেন অজীবিক নামক ধর্ম। শেষ জীবনে তিনি জৈন ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তার দৌহিত্র অশোক পুরো রাজ্যে বৌদ্ধধর্মের বাণী ছড়িয়েছিলেন। হিন্দু, জৈন, ও বৌদ্ধধর্ম ছাড়াও মৌর্য সাম্রাজ্যের একটা অংশ ছিল নাস্তিক এবং অজ্ঞেয়বাদী। @ Mohasin Alam Roni
১৪
খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে গড়ে উঠেছিল ‘গান্ধার’ নামে এক ইন্দো-আর্য রাজ্য। এই গান্ধার ছিল প্রাচীন ভারতবর্ষের ষোড়শ মহাজনপদের একটি। তক্ষশীলা ছিল এর রাজধানী। উন্নত শিক্ষা-সংস্কৃতির জন্য তখন সারা বিশ্বব্যাপী দারুণ খ্যাতি কুড়িয়েছিল তক্ষশীলা।
প্রায় হাজার বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়েছিল তক্ষশীলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আঠারো শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ রাজ সরকারের দুই প্রত্নতাত্ত্বিক আলেকজান্ডার কানিংহাম, এবং জন মার্শালের প্রচেষ্টায় সকলের সামনে আসে তক্ষশীলার ধ্বংসাবশেষ।
রামায়ণ অনুসারে, দশরথের দ্বিতীয় ছেলে ভরত গান্ধার রাজ্য জয়ের পর নিজ সন্তান ‘তক্ষ’ এর নামানুসারে এই অঞ্চলের নাম দেন ‘তক্ষশীলা’। মহাভারতেও তক্ষশীলার উল্লেখ আছে। আবার অনেকের মতে, প্রাচীন ভারতের নাগা জনগোষ্ঠীর ‘তক্ষক’ নাম থেকে এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছিল ‘তক্ষখন্ড’। সময়ের পরিক্রমায় ‘তক্ষখন্ড’ শব্দটি রূপ নেয় তক্ষশীলায়। গ্রীকদের লেখনীতে তক্ষশীলা হয়ে ‘ট্যাক্সিলা’। বর্তমানে ইংরেজিতে তক্ষশীলাকে ‘Taxila’ লিখা হয়।
তৎকালীন বিশ্বে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় বা তক্ষশীলা মহাবিহার ছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। খ্রি.পূ. প্রায় ৫০০ অব্দে নির্মিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল বিভিন্ন পণ্ডিত ও শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা। সারা এশিয়া থেকে জ্ঞান তৃষ্ণা নিবারণ করতে এখানে আসতেন জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীরা। তক্ষশীলা মহাবিহারের আঙিনা মুখরিত থাকত বিভিন্ন জ্ঞানী-গুণীর পদচারণায়। তবে কেউ ইচ্ছা করলেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেত না। সেজন্য তার বয়স কমপক্ষে ষোলো বা তার বেশি হতে হতো। নিজ এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার পাট চুকিয়ে তাকে প্রমাণ করতে হতো, সে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের যোগ্য।
পড়াশোনার খরচ শিক্ষার্থীকেই বহন করতে হতো। তবে যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছিল, তারা গায়ে-গতরে খেটে তা পরিশোধ করে দিত। এখানে পড়ানো হতো গণিত, বেদশাস্ত্র, অর্থনীতি, চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ব্যাকরণ বিষয়ক বিভিন্ন জিনিস। এর শিক্ষা পদ্ধতি ছিল যথেষ্ট আধুনিক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে জড়িতে আছে চাণক্য, পাণিনি, চরক, আত্রেয়, বিষ্ণু শর্মা, নাগার্জুন, জীবকের মতো প্রাচীন বিশ্বের প্রথিতযশা পণ্ডিত ও গুণীজনদের নাম। খ্রিস্টপূর্ব ৪০৫ অব্দের দিকে বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন এসেছিলেন এই শিক্ষাঙ্গনে। তিনি একে অত্যন্ত পবিত্র এবং সমৃদ্ধশালী বলে যথেষ্ট প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন। @ Mohasin Alam Roni
১৫
এস্কিমোদের রোমাঞ্চকর সাত জীবনাচার
সুমেরু অঞ্চল; বরফ-স্নিগ্ধ হিমশীতল প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করে টিকে থাকা এস্কিমো জনগোষ্ঠীর এক রহস্যময় জনপদ। জমাটবদ্ধ জলরাশি, কনকনে ঠাণ্ডা পরিবেশ ও বৈরী আবহাওয়ার এমন রোমাঞ্চকর স্থান পৃথিবীর রহস্যময়তাকে যেন আরও বাড়িয়ে তোলে। কল্পকাহিনীর গল্পকেও হার মানায় এখানে বসবাসরত বাসিন্দাদের জীবনধারা।
জনপদের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা রহস্য, প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম, টিকে থাকার লড়াই ও বেঁচে থাকার এক অমোঘ যুদ্ধে লিপ্ত এস্কিমোরা। এভাবেই শতবছর ধরে তারা রচনা করছে নিজেদের বিচিত্র জীবনগাঁথা। গড়ে তুলেছে বৈচিত্র্যময় জনপদ ও অদম্য সাহসী বংশপরম্পরা।
১. কুকুরটানা গাড়ি
নর্থ আলাস্কা, কানাডা ও সাইবেরিয়ার বৈরী পরিবেশে উন্নত যাতায়াতব্যবস্থা কল্পনা করাও কঠিন। যেখানে টিকে থাকাই এক জীবন্ত রহস্য, সেখানে যাতায়াতের জন্য পিচঢালা সড়কপথ যেন এক বিমূর্ত কল্পনা। তবে প্রয়োজনের তাগিদে, খাদ্যের খোঁজে কিংবা বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে পাড়ি জমানোর প্রয়োজন পড়েছে এস্কিমোদের। তারই সুবাদে একসময় তারা গড়ে তুলেছে নিজস্ব যাতায়াতব্যবস্থা। শৈল্পিক এ মানুষগুলোর বিচিত্র মেধায় সৃষ্টি করেছে এক অনন্য বাহন কুকুরের গাড়ি!
এসব বাহনে একত্রে জুড়ে দেওয়া হয় গোটাদশেক কুকুর। মনিবের প্রতি এসব কুকুরের অপরিসীম বিশ্বাস বিরূপ পরিস্থিতিতেও নিরাপদ দিগন্তের পানে অভিগমনের সাহস যোগায়। এস্কিমো ভাষায় এসব কুকুরের গাড়িকে বলা হয় কামুতিক। জমাটবাঁধা পিচ্ছিল বরফের উপর দিয়ে খুবই দ্রুতবেগে চলতে পারে এ গাড়ি। এছাড়াও স্বল্পপাল্লার যাতায়াতে কায়াক নামক ছোট ছোট নৌকাও ব্যবহার করে তারা।
২. বরফের তৈরি ইগলু ঘর
মেরু অঞ্চলে সূর্যালোকের অভাবে গাছপালার অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। যেগুলো আছে সেগুলোও কেবল ব্যবহৃত হয় রান্নাবান্না ও অন্যান্য জ্বালানি কাজে। আর তাই গাছশূন্য সে স্থানে গাছ কেটে গৃহনির্মাণ যেন বিলাসিতা। তবে, এরূপ পরিস্থিতিতেও এস্কিমোরা দেখিয়েছে চমকপ্রদ সৃজনশীলতা। অবারিত বরফের রাজ্যে নান্দনিক পদ্ধতিতে তারা তৈরি করে নিয়েছে নিজেদের বাসস্থান বরফের ইগলু ঘর!
বিশালাকার বরফের মজবুত খন্ডাংশ সংগ্রহ করে তৈরি করা হয় এ ঘর। জীবনধারণের জন্য এসব ঘরের উচ্চতা হয় সর্বোচ্চ ৫-৬ ফুট। তবে, কিছু কিছু ঘরের উচ্চতা হয় এর চেয়েও কম। ফলে হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করতে হয় সেসবে। দেখে মনে হয় যেন সাদা বিরানভূমিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছোট ছোট বরফের গুহা। অবশ্য শীতের শেষে গ্রীষ্ম এলে এসব ঘর গলে যায়, মিশে যায় বরফের নদীর অববাহিকায়। এসময় এস্কিমোরা খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে রাত্রিযাপন করে। এসব তাঁবুর ছাদ তৈরিতে তারা ব্যবহার করে চামড়া আর দেয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয় পশুর হাড় ও তিমি মাছের বিশালাকার কাঁটা। রাতের বেলা এসব ঘরে সিল মাছের চর্বি দিয়ে জ্বালানো হয় উষ্ণ তেলের প্রদীপ।
৩. বসতির নিচে সমুদ্রতল
উত্তর মেরু যেন এক বরফের শুভ্র নির্মল চাদর। এ চাদরের নিচে বইছে শান্ত-স্নিগ্ধ সমুদ্র। যেন সাগরের বুকে ভাসমান জনপদ। সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে বিচিত্র সব প্রাণীর বসবাস। রয়েছে সুস্বাদু সব মাছ ও নাম না জানা রূপসী সব উদ্ভিদের সমাহার। সাগরতলে তাদের ভাসমান দৃশ্যপট এক চোখধাঁধানো অপরূপ সৌন্দর্যের আধার৷
বরফের এমন সুবিশার আবরণের শেষ নেই। তবে, মাঝে মাঝেই একচিলতে খালি জায়গায় দেখা মিলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি আইসবার্গ। গ্রীষ্মকালে হিমশীতল জলের অল্প স্রোতে তারা ভেসে বেড়ায় বিভিন্ন স্থানে।এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়ায় আর্কটিক জুড়ে। বরফগুলোর ধূসর সাদা গাত্রবর্ণ চোখে পড়ার মতো। এছাড়াও বরফের নিচে থাকা সমুদ্রের জলও বেশ বিশুদ্ধ। তবে, অতিরিক্ত লবণাক্ততা জলের স্বাভাবিক ব্যবহারে সমস্যা সৃষ্টি করেছে। আর তাই খাবার জল উনুনে ফুটিয়ে রাখতে হয় আগেভাগেই।
৪. শূন্য ডিগ্রি সর্বোচ্চ তাপমাত্রা
এ অঞ্চলে সাধারণ দুটি ঋতু বিদ্যমান- শীত ও গ্রীষ্ম। তবে, দুই ঋতুর পরিচিতি থাকলেও গ্রীষ্মকালের স্থায়িত্ব হয় খুবই অল্প সময়। এসময় অঞ্চলের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা গিয়ে দাঁড়ায় কেবল শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। আর শীতের আগমন সঙ্গে করে নিয়ে আসে বিবর্ণ ঠাণ্ডা আধার। এসময় বফরের আবরণে ঢাকা পড়ে পুরো আর্কটিক অঞ্চল। সমস্ত অঞ্চল আচ্ছাদিত থাকে কনকনে শীতের আবরণে।
বরফে ঘেরা সমুদ্র, তাই জলীয়বাষ্পও নেই। আকাশে মেঘও জমে না, তাই বৃষ্টিও হয় না। ফলে আকাশ থাকে ঝকঝকে পরিষ্কার। যেন সাদা মরুর উপরে একটুকরো স্বচ্ছ নীল আয়না। তবে, কিছু কিছু স্থানে মাঝে মাঝেই ঘটে তুষারপাতের ঘটনা। অবশ্য সম্প্রতি পরিবেশবিদরা শীত-গ্রীষ্ম ছাড়াও শরৎ ও বসন্ত ঋতুরও সন্ধান পেয়েছেন সেখানে। তবে তাদের সময় খুবই সংক্ষিপ্ত।
৫. রোমাঞ্চকর শিকার অভিযান
সংগ্রামী মানুষদের জীবন্ত উদাহরণ এই এস্কিমোরা। বিরূপ প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকা তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। আর তাই এমন পরিবেশে খাদ্য সংগ্রহ ও ধূর্ত পশু শিকার মোটেই সহজ কথা নয়। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় তাদের সঙ্গে অভিযোজন করে টিকে থাকা পশুদেরই শিকার করে তারা। ক্ষুধা মেটায় পশুর মাংসের সুস্বাদু ভোজনে। এসব পশুর মধ্যে রয়েছে বল্গা হরিণ, বন্য খরগোশ, মেরু ভাল্লুক, উড়ন্ত হাঁস, শিকারি পাখি ও পেঙ্গুইন। মাছের মধ্যে সিল ও তিমি মাছও বেশ পছন্দের আহার তাদের।
এসব প্রাণী শিকারে ব্যবহৃত হয় পূর্বে শিকার করা প্রাণীদেরই হিংস্র দাঁত ও সূচালো হাড় দিয়ে তৈরি করা বিশেষ ধরনের বর্শা। গ্রীষ্মকালের উষ্ণ মৌসুমে পরিচালিত হয় এসব শিকারের বেশিরভাগ অভিযান। এসময় সংগৃহীত মাংস ও অন্যান্য খাবারের একটা নির্দিষ্ট অংশ শীতকালের জন্য তোলে রাখে তারা। নিম্ন তাপমাত্রার সুবিধার্তে এসব কাঁচা খাবারও অনায়াসে টিকে থাকে দিনের পর দিন।
৬. পশুর চামড়ার গাত্রাবরণ
শিকারকৃত পশুর চামড়া দিয়ে এস্কিমোরা তৈরি করে একপ্রকার উষ্ণ পোশাক। এসব পোশাক তৈরিতে তারা ব্যবহার করে মেরু ভাল্লুক, বল্গা হরিণ ও শিয়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর মোটা চামড়া। তৈরিকৃত এসব পোশাকের নাম ক্যারিবো ফারস। জবুথবু ঠাণ্ডায় একমাত্র এই পোশাকই সুরক্ষা প্রদান করে তাদের।
শিকারকৃত পশুর চামড়াকে শরীর থেকে আলাদা করার পর কিছুদিনের জন্য বরফের পাতলা আবরণের নিচে রেখে দেওয়া হয়। অতঃপর, শুরু হয় পোশাক তৈরির অনন্য প্রক্রিয়া। প্রথমেই চামড়ায় লেপ্টে থাকা মাংসসমূহ ভালোভাবে পরিষ্কার করে নেয় তারা। ঠাণ্ডা পানিতে ধৌত করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় শুকাতে দেওয়া হয়। এভাবে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা এসব চামড়া। চামড়া দিয়ে তৈরি হওয়া এসব পোশাকও টেকসই হয় বছরের পর বছর। তাই একজন এস্কিমোর খুব বেশি কাপড়ের প্রয়োজন পড়ে না।
৭. ছয় মাস দিন ও ছয় মাস রাত
পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরে অবস্থান করছে এই আর্কটিক অঞ্চল। তাই প্রকৃতির খেয়ালিপনায় সেখানে সূর্য যেন অমাবস্যার চাঁদ! ফলস্বরূপ, থাকে ছয় মাস দিন, বাকি ছয় মাস রাত। অর্থাৎ উত্তর গোলার্ধে যদি একটানা রাত থাকে, তখন দক্ষিণ গোলার্ধে একটানা দিন। একটানা এই রাতকে বলা হয় পোলার নাইট বা মেরু রাত্রি। যার জন্য বছরে কেবল একবারই পুরোপুরি সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখা যায় সেখানে।
গ্রীষ্মকালের স্থায়িত্ব হয় টানা ১৮৭ দিন, এ সময় সূর্যের কিরণ সার্বক্ষণিক আকাশে মিলে বলে এসময়কে একটানা দিন বলা হয়। গ্রীষ্মের পর আসে শীতকাল, যার স্থায়িত্ব হয় অবশিষ্ট ১৭৮ দিন। এসময় আকাশে সূর্যের দেখা মেলে না বলে এসময়কে বলা হয় একটানা রাত। @ Md. Mizanur Rahman
১৬
পাতাল শহর
বর্তমান তুরস্কের নেভশেহির প্রদেশের কাপাডোশিয়া অঞ্চল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ফুট উঁচু এ অঞ্চলে ডাইনোসর যুগের পর ব্যাপকহারে সংগঠিত হয় অগ্নুৎপাতের ঘটনা। তেমনই এক ভয়াবহ অগ্নুৎপাতে ফলে লাভার গরম আবরণের নিচে চাপা পড়ে বিস্তীর্ণ এই এলাকা। দিনের পর দিন রোদ-বৃষ্টি ও বাতাসের আর্দ্রতার প্রভাবে লাভার আবরণ পরিবর্তিত হয়ে রূপ নেয় নরম শিলামাটিতে। একসময় এসব মাটি ভেদ করে সৃষ্টি হয় সবুজ-সতেজ প্রকৃতি। গড়ে ওঠে বিভিন্ন মানববসতি।
ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০-১৬০০ শতাব্দীতে কাপাডোশিয়ায় বসবাস করতো হিট্টাইট সম্প্রদায়ের মানুষজন। বৈরী প্রকৃতি, আগ্রাসী জাতিগোষ্ঠী ও দুর্ধর্ষ ডাকাতদের সঙ্গে অভিযোজন করেই চলছিল তাদের জীবন। একদিন তারা বুঝতে পারলেন, স্বজাতি ও সম্পদের সুরক্ষায় অদূরে নরম শিলা মাটি খুঁড়ে নির্মাণ করা সম্ভব এক সুরক্ষিত পাতাল শহর। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। একে দুইয়ে সামর্থ্যবান সকলেই হাত লাগালেন নির্মাণযজ্ঞে।
কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে ধীরে ধীরে মাটির প্রায় ২৫০ ফুট গভীরে ছড়িয়ে যেতে থাকে নগরীর পরিসীমা। অবশেষে গড়ে ওঠে কারুকার্যখচিত সুরক্ষিত এক গোপন শহর ডেরিনকুয়ু। শান্তিপ্রিয় হিট্টাইট জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০ হাজার মানুষ একত্রে বসবাস করতো এ শহরে। আর তাই সবার নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিতে মাটির উপরিভাগে তৈরি করা হয় ৬০টি গোপন দরজা। শহরের অলিতে-গলিতে আলো-বাতাস ও অক্সিজেনের বাধাহীন চলাচল নিশ্চিতে আরও নির্মিত হয় প্রায় ১,৫০০ চিমনি।
একসময় মাটি কেটে বানানো হয় অগণিত আঁকাবাকা সুড়ঙ্গপথও। এগুলো তৈরির মূল কারণ অন্য জাতির কেউ এ শহরে এলে যেন মুহূর্তেই দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন, দ্বিধায় পড়ে যান শহরের অভ্যন্তরে প্রবেশের মূল সুরঙ্গ নিয়ে। এভাবেই কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে তৈরি হয় জটিল ও দুরুহ গঠনবিশিষ্ট এককালের রহস্যময় ডেরিনকুয়ু পাতাল নগরী।
প্রায় ১৮ তলাবিশিষ্ট এ শহরের বিভিন্ন তলায় খুঁজে পাওয়া যায় আস্তাবল, তেলের ঘাঁনি, গুদামঘর, ভোজনকক্ষ, ভূগর্ভস্থ রত্নভান্ডার, প্রার্থনাকক্ষসহ আরও অনেক কিছুই। শহরের দ্বিতীয় তলায় দেখা মিলেছে কিছু অদ্ভুতদর্শন সমাধিরও। @ Md. Mizanur Rahman
১৭
হাম্মুরাবি: এক আদর্শবাদী রাজা
খ্রিস্টপূর্ব ১৮১০ অব্দে মেসোপটেমিয়ায় জন্ম নেওয়া হাম্মুরাবি ছিলেন ব্যাবিলনিয়ার প্রথম রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা। তিনি আদর্শবাদী রাজা বলেও সুপরিচিত। তবে হাম্মুরাবি ইতিহাসের পাতায় সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছেন তার প্রণীত আইন হাম্মুরাবি কোডের জন্য। এছাড়াও প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ইতিহাসে তিনিই প্রথম শাসক, যিনি জয়লাভের পর বিদ্রোহ ছাড়াই সফলভাবে সমস্ত মেসোপটেমিয়া নিজ শাসনের ছায়াতলে আনতে সক্ষম হন। রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সম্রাট হাম্মুরাবি আইন-কানুনের লিখিত অনুশাসনও তৈরি করেছিলেন, যা ইতিহাসে ‘হাম্মুরাবি কোড’ নামে পরিচিত।
এই হাম্মুরাবি কোডে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অন্যায়ের জন্য নির্দিষ্ট শাস্তি বরাদ্দ ছিল। ব্যাবিলন ও তার ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহের প্রত্যেক নাগরিককেই মেনে চলতে হতো প্রণীত সেই নীতিমালা। এ নীতিমালাকে স্থায়ী দলিল হিসেবে রূপ দিতে তা খোদাই করা হয়েছিল পাথরে। এগুলোর মধ্যে কিছু আইন ছিল এরকম-
যদি কোনো ব্যক্তি মন্দির বা সম্রাটের সম্পত্তি চুরি করে, তবে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। চুরির মাল যার কাছে পাওয়া যাবে, তার জন্যও একই শাস্তি বরাদ্দ।
কোনো ব্যক্তি কারও দাসী হরণ করলে, তাকে প্রাণদণ্ড দেয়া হবে।
পলাতক দাসকে কেউ আশ্রয় দিলে, তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
যদি কেউ কোনো ব্যক্তির কাছে ঋণজালে আবদ্ধ থাকে, তাহলে তার স্ত্রী, পুত্র, বা কন্যা ওই ব্যক্তির কাছে তিন বছর দাস-জীবন যাপন করতে বাধ্য থাকবে।
এরকম প্রায় ২৮২টি আইন লিপিবদ্ধ করে রাজার কাছে পেশ করেন সভাসদেরা। চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই ও কাটছাঁটের পর আইনগুলোকে অনুমোদন দেয়া হলে ব্যাবিলনজুড়ে কার্যকর হয় ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন আইন ‘হাম্মুরাবি কোড’। তবে মজার ব্যাপার হলো, হাম্বুরাবির প্রণীত আইন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন আইন নয়। উর-নাম্মু, এশনুন্নার আইন, এবং লিপিত ইশতারের আইন হাম্বুরাবির আইনের চেয়ে প্রাচীন আইন। ১৯০১ সালে এলামীয়দের প্রাচীন রাজধানী সুসা থেকে আবিষ্কার করা হয়েছিল এই অমূল্য রত্ন। মোট ১২টি পাথরের টুকরোয় লেখা এই আইন সংকলন পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন আইন হিসেবে সুপরিচিত। আক্কাদীয় ভাষায় লেখা এই আইনগুলো অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন যে কেউ পড়তে পারতেন। @ Mohasin Alam Roni
১৮
গ্ল্যাডিয়েটর যোদ্ধাদের অজানা দশ কাহিনি
১. গ্ল্যাডিয়েটরদের সবাই দাস নয়
যুদ্ধে বিজয়ী প্রত্যেক গ্ল্যাডিয়েটর সম্রাটের নিকট থেকে পেত মহামূল্যবান পুরষ্কার। আর তাই, দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মুক্তি পেতে সাধারণ মানুষ, এমনকি সাবেক দক্ষ সেনারাও নাম লিখিয়েছে গ্ল্যাডিয়েটরের খাতায়। হয়ে উঠেছে একেকজন অদম্য সাহসী যোদ্ধা।
২. খেলাটি ছিল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার একাংশ
প্রাচীন রোমানরা বিশ্বাস করতো, মৃত্যুর পর মৃতদেহের সামনে রক্ত ঝরালে মৃতের আত্মা নির্বাণ লাভ করে, মুক্তি পায় শাস্তি থেকে। আর তাই অভিজাত সম্প্রদায়ের কারও মৃত্যু ঘটলে সম্রাটের আদেশে আয়োজিত হতো এই বীভৎস খেলা। যেখানে দুঃসাহসী গ্ল্যাডিয়েটরদের বিপরীতে যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে দেওয়া হতো সাজাপ্রাপ্ত ভয়ংকর সব আসামীদের। সংঘটিত হতো এক রক্তক্ষয়ী বীভৎস যুদ্ধ। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের রাজত্বকালে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এটি। সম্রাট নিজেও মৃত পিতা ও কন্যার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ১০০ যোদ্ধার এক সুবিশাল লড়াইয়ের আয়োজন করেন।
৩. লড়াই মানেই মৃত্যু অবধারিত, এমন নয়
সম্রাটের আদেশেই নির্ধারিত হতো খেলার নির্মমতার মাত্রা ও খেলোয়াড়দের মৃত্যু। কিছু কিছু খেলা আয়োজিত হতো কেবলই আনন্দ-বিনোদনের জন্য। সেসবে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের ভেতর দিয়ে যেতে হতো খেলোয়াড়দের। যেখানে খেলা পরিচালনায় থাকতো একজন সুদক্ষ রেফারিও। দু’জন খেলোয়াড়ের কেউ যদি মারাত্মকভাবে আহত হতো, তখনই তিনি খেলা থামিয়ে দিতেন। তবে, কিছু খেলার নিয়মই ছিল মৃত্যু পর্যন্ত লড়াই।
৪. বৃদ্ধাঙ্গুলি নামানো মানেই মৃত্যু নয়
কলোসিয়ামের ভেতর চলমান যুদ্ধে গ্ল্যাডিয়েটরদের কেউ মারাত্মক আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার মৃত্যু নির্ধারিত হতো সম্রাটের সিদ্ধান্তে। কখনো কখনো নির্ভর করতো দর্শকদের মতামতের উপরও। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, সম্রাটের দু’হাতের ইশারাই কেবল নির্ধারণ করতো তা। এছাড়াও, সাদা রুমালের নাড়াচাড়া রক্ষা করতো আহত গ্ল্যাডিয়েটরের জীবন।
৫. তারা একাধিক দলে বিভক্ত ছিল
কলোসিয়ামে আয়োজিত হওয়া প্রথমদিকের যুদ্ধে অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের পূর্ববর্তী খেলার বিজয়গাঁথা সাফল্য, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার উপর একাধিক দলে বিভক্ত করা হতো। অতঃপর আয়োজিত হতো এই খেলা। পাশাপাশি, প্রত্যেক দলের যোদ্ধাকে প্রদান করা হতো ধারালো অস্ত্র ও ছোরা। এসব দলের মধ্যে সেসময় সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল থারেসেস ও মুরমিলুনস নামে দুটি দল। এছাড়াও ঘোড়ার পিঠে চড়ে ইকুইটিস নামের একদল গ্ল্যাডিয়েটর সবেগে প্রবেশ করতো রণাঙ্গনে। তখনই হর্ষধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠতো রণাঙ্গন।
৬. হিংস্র প্রাণীদের সঙ্গে লড়াই করতো
অদম্য সাহসী গ্ল্যাডিয়েটরদের ভেতর থাকা একাধিক দলের মধ্যে অন্যতম দুটো হলো ভেনাতোরেস ও বেস্টিয়ারি। দল দুটোর যোদ্ধারা হিংস্র সিংহ, কুমির, ভাল্লুক, এমনকি বিশালাকার হাতিদের সঙ্গেও যুদ্ধ করেছে। তবে, এসব খেলায় তাদের অংশগ্রহণের পূর্বে হিংস্র প্রাণী শিকার করে পূর্ণ করতে হয়েছে নিজেদের অভিজ্ঞতার ঝুলি। এভাবে কলোসিয়ামে খেলা শুরু হওয়ার মাত্র একশো দিনের মাথায় গ্ল্যাডিয়েটরদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ৯ হাজার প্রাণী!
৭. নারীরাও ছিল গ্ল্যাডিয়েটর যোদ্ধা
রোমান ইতিহাস অনুযায়ী, পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও অংশগ্রহণ করতো রক্তক্ষয়ী এই খেলায়। তারাও পারদর্শী ছিল হিংস্র প্রাণীদের সঙ্গে বীভৎস যুদ্ধে। অংশ নিয়েছে অসংখ্য রণে হিংস্র প্রাণীদের বিপক্ষে। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রথম শতাব্দীর প্রারম্ভে নারী যোদ্ধারা মেতে ওঠে এই খেলায়।
৮. রোমান সম্রাটরাও ছিলেন গ্ল্যাডিয়েটর
ইতিহাস বলে, জীবন বাজি রাখা মরণপণ এ লড়াইয়ে বেশ কয়েকজন রোমান সম্রাটও নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনে অংশ নিয়েছেন। এভাবে কখনো তারা আয়োজকের ভূমিকা থেকে নেমে এসেছেন খেলোয়াড়ের কাতারে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা, টাইটাস ও হাড্রিয়ান। যদিও সম্রাটদের সঙ্গে যুদ্ধে গ্ল্যাডিয়েটররা হামলা নয়, কেবল আত্মরক্ষার পন্থা অনুসরণ করেছে।
৯. লাভ করতো সম্মান ও খ্যাতি
গ্ল্যাডিয়েটর যোদ্ধারা রোমান সাম্রাজ্যে কুৎসিত মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। তবে, সবকিছু ছাপিয়ে সাহসী গ্ল্যাডিয়েটরদের কীর্তিও শোনা যেত রাজ্যের আনাচে-কানাচে। গুরুত্বপূর্ণ দেয়ালে আঁকা হতো তাদের চিত্র। ঝোলানো থাকতো একেকজন সফল যোদ্ধার অর্জনের গল্প। ফলে, শিশু, যুবক ও বৃদ্ধদের মুখে ধ্বনিত হতো তাদের সুনাম। যুবতীরা আকৃষ্ট হতো তাদের প্রতি।
১০. পরিশেষে ছিল এক মজবুত ভ্রাতৃত্ববোধ
হিংস্র মনোভাব নিয়ে আজন্ম যুদ্ধ করা গ্ল্যাডিয়েটরদের ভেতরও ছিল ভ্রাতৃত্ববোধ। ছিল একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও মমত্ববোধ। সেখান থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে গ্ল্যাডিয়েটরদের একটি সহযোগী ইউনিয়ন। আহত গ্ল্যাডিয়েটরদের সেবা-শুশ্রূষা ও নিহতদের যথাযোগ্য মর্যাদায় কবর দেওয়া ছিল এই ইউনিয়নের অন্যতম কাজ। এছাড়াও মৃতের স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্বও নিত তারা।
অদম্য সাহসী গ্ল্যাডিয়েটর যোদ্ধারা আদিম রোমান সাম্রাজ্যের এক অপ্রতিরোধ্য ঐতিহাসিক চরিত্র। তাদের প্রকৃত পরিচয় লড়াকু, দুরন্ত ও বীরত্বপূর্ণ দুঃসাহসী মানব। @ Md. Mizanur Rahman
১৯
6-6-6 রুল সফল ক্যারিয়ার ও সুস্থ জীবনের ভারসাম্য
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক যুগে দিনরাত এক করে কাজ করাকে আমরা ভাবি সাফল্যের শর্টকাট । কিন্তু শরীর আর মন যখন বিদ্রোহ করে, তখন উপলব্ধি হয় যে আমরা বাঁচার জন্য কাজ করছি, না কি কাজ করার জন্য বাঁচছি? যারা কাজের চাপে নিজের ব্যক্তিগত জীবন হারিয়ে ফেলছেন, তাদের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানের এক জাদুকরি সমাধান হলো "৮-৮-৮ রুল'।
কী এই ৮-৮-৮ রুল
আমাদের প্রত্যেকের হাতে দিনে ২৪ ঘণ্টা সময় আছে। এই সময়কে তিনটি সমান ভাগে ভাগ করে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন যাপন করাই হলো এই নিয়মের মূল কথা। অর্থাৎ প্রথমত, ৮ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম (Hard Work), এটি আপনার অফিস, ব্যবসা বা পড়াশোনার সময়।
এই ৮ ঘণ্টা হবে নিরেট কাজ বা 'ডিপ ওয়ার্ক'-এর জন্য। দ্বিতীয়ত, ৮ ঘন্টা প্রশান্তির ঘুম (Good Sleep), সুস্থ মস্তিষ্ক এবং শরীরের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য। এটি আপনার পরের দিনের কাজের জ্বালানি। তৃতীয়ত, বাকি ৮ ঘণ্টা নিজের জন্য (Personal Time), এই শেষ ৮ ঘণ্টাই নির্ধারণ করে আপনি কতটা সুখী মানুষ। এটি ব্যয় হবে পরিবার, শখ, প্রার্থনা, ব্যায়াম এবং সামাজিক কাজে।
১. প্রোডাক্টিভিটি বা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি : অফিসে অতিরিক্ত সময় কাটালেই বেশি কাজ হয়—এই ধারণাটি ভ্রান্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত পরিশ্রম মানুষের সৃজনশীলতা কমিয়ে দেয়। ৮ ঘণ্টা মন দিয়ে কাজ করলে যে আউটপুট আসে, ক্লান্ত মস্তিষ্কে ১২ ঘণ্টায়ও তা সম্ভব নয়।
২. বার্নআউট থেকে মুক্তি : টানা কয়েক মাস ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করলে 'বার্নআউট' বা মানসিক অবসাদ দেখা দেয়। ৮-৮-৮ রুল মেনে চললে কাজের প্রতি একঘেয়েমি আসে না এবং দীর্ঘ মেয়াদে ক্যারিয়ারে টিকে থাকা সহজ হয়।
৩. শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য : আমরা কাজের পেছনে ছুটতে গিয়ে স্বাস্থ্য বিসর্জন দিই। কিন্তু ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে পৌঁছে যদি শরীর ভেঙে পড়ে, তবে সেই সাফল্যের স্বাদ নেওয়া যায় না। পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিজের জন্য সময় রাখলে উচ্চ রক্তচাপ বা দুশ্চিন্তার মতো সমস্যাগুলো দূরে থাকে।
এটি বাস্তবায়ন করবেন যেভাবে
অনেকে বলতে পারেন, 'কর্পোরেট চাকরিতে কি আর ৮ ঘণ্টায় কাজ শেষ হয়?' তাদের জন্য কিছু টিপস— > কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করুন : প্রতিদিন সকালে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৩টি কাজ চিহ্নিত করুন এবং সেগুলো ৮ ঘণ্টার মধ্যেই শেষ করার চেষ্টা করুন ।
ডিজিটাল ডিটক্স : অফিস থেকে ফেরার পর ল্যাপটপ বা অফিসের ইমেইল থেকে দূরে থাকুন। বাড়ির ৮ ঘণ্টা সময় যেন অফিসের চিন্তা দখল করতে না পারে।
৩-এফ ও ৩-এইচ ফর্মুলা : নিজের জন্য বরাদ্দ ৮ ঘণ্টাকে আরও অর্থবহ করতে ৩-এফ (Family, Friends, Faith) এবং ৩-এইচ (Health, Hygiene, Hobby)-এর পেছনে ব্যয় করুন।
এই ভারসাম্য কেন জরুরি
কাজ জীবনের একটি অংশ মাত্র, পুরো জীবন নয়। তাই আজ থেকেই শুরু করুন ৮-৮-৮ রুলের চর্চা । নিজের ২৪ ঘণ্টাকে নতুন করে সাজান, দেখবেন সাফল্য এবং সুখ—দুটোই আপনার হাতের মুঠোয়। @ মো. আশিকুর রহমান
২০
গুছিয়ে কথা বলবেন যেভাবে
কারও কথা বলার জাদুতে মুগ্ধ হয়ে কি কখনও মনে হয়েছে—"ইশ! আমিও যদি এমন দারুণভাবে বলতে পারতাম?” মনে রাখবেন, সুন্দর করে কথা বলা কোনো দুর্লভ জন্মগত প্রতিভা নয়, বরং এটি একটি সুনিপুণ শিল্প যা চর্চার মাধ্যমে যে কেউ আয়ত্ত করতে পারে।
কেন গুছিয়ে কথা বলবেন?
কর্মক্ষেত্রে যারা গুছিয়ে কথা বলেন, তারা খুব সহজেই সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতনদের আস্থা অর্জন করেন। একজন উদ্যোক্তার জন্য বাচনভঙ্গি হল তার অন্যতম প্রধান ব্যবসায়িক পুঁজি। একটি সাধারণ পণ্যও যদি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়—যেমন সেটি গ্রাহকের ঠিক কোন সমস্যাটি সমাধান করছে—তবে সেটির চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। সঠিক বাচনভঙ্গি একজন উদ্যোক্তাকে কেবল একজন বিক্রেতা নয়, বরং একজন নেতা বা লিডার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
সহজ কথায়—আপনার চিন্তাভাবনা আর কণ্ঠস্বরের মধ্যে নিখুঁত সামঞ্জস্য থাকাই হল সাফল্যের মূল মন্ত্র। নিজের ব্যক্তিত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আজই অনুসরণ করুন নিচের এই ৮টি কার্যকর টিপস।
১. সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট হোন
আপনার বক্তব্যের মূল অংশটুকু সরাসরি বলার অভ্যাস করুন। দীর্ঘ এবং প্যাঁচানো বাক্য শ্রোতাকে ক্লান্ত করে দেয় এবং মূল আলোচনা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়। পাঁচটি বড় বাক্যের চেয়ে একটি শক্তিশালী ও সহজ বাক্য অনেক বেশি কার্যকর।
প্রতিটি কথা উচ্চারণের আগে একবার ভেবে নিন আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন। সংক্ষেপে মূল কথা বলার চর্চা করুন। যদি দেখেন আপনি অপ্রয়োজনীয় কথা বলছেন, তবে তাৎক্ষণিক নিজেকে থামিয়ে পুনরায় মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসুন।
২. প্রথম বাক্যটি ভেবেচিন্তে শুরু করুন
আপনার কথার শুরুটাই নির্ধারণ করে দেয় শ্রোতা আপনার কথা শেষ পর্যন্ত শুনবেন কিনা। তাই গতানুগতিক ভূমিকা বা কুশল বিনিময় দিয়ে শুরু না করে সরাসরি এমন কিছু বলুন যা শ্রোতার মনে কৌতূহল জাগায়।
যদি আপনাকে কোথাও বক্তৃতা দিতে হয় তবে বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রশ্ন, কোনো চমকে দেওয়া তথ্য কিংবা ছোট কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করতে পারেন।
৩. স্পষ্ট এবং দৃঢ়ভাবে কথা বলুন
আপনার বিষয়বস্তু যতই ভাল হোক, শ্রোতারা যদি শব্দগুলিই বুঝতে না পারে তবে তার কোনো মূল্য নেই। প্রতিটি শব্দ পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করুন এবং অস্পষ্টতা এড়িয়ে চলুন। একঘেয়ে সুরে কথা বললে শ্রোতারা দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
কথা বলার সময় গলার স্বরে কখনও কিছুটা জোর দিন, আবার কখনও ধীরস্থিরভাবে বুঝিয়ে বলুন। প্রয়োজনে মাঝে মাঝে বিরতি দিন, যাতে আপনার কথাগুলি মানুষের মনে গেঁথে যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনুশীলন বা নিজের কণ্ঠ রেকর্ড করে শোনা আপনার এই জড়তা কাটাতে দারুণ সাহায্য করবে।
৪. নিয়মিত অনুশীলন করুন
বাকপটুতা রাতারাতি অর্জিত হয় না, এটি নিরন্তর অভ্যাসের বিষয়। কথা বলার প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগান—তা হতে পারে আড্ডায়, মিটিংয়ে বা নিজের সাথে একান্তে কথা বলা। শব্দ করে পড়ার অভ্যাস করুন এবং কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করুন। অন্যের কাছ থেকে গঠনমূলক মতামত বা ফিডব্যাক চান। সহকর্মী বা বন্ধুরা বলে দিতে পারবে আপনার উন্নতির জায়গাগুলি কোথায়।
৫. কথা বলার গতি নিয়ন্ত্রণ করুন
আপনি কতটা দ্রুত বা ধীরে কথা বলছেন, তার ওপর নির্ভর করে শ্রোতারা আপনাকে কতটা অনুসরণ করতে পারবে। খুব দ্রুত কথা বললে মানুষ খেই হারিয়ে ফেলে, আবার খুব ধীরে বললে তারা একঘেয়েমি অনুভব করে। একটি মাঝারি ও স্বাচ্ছন্দ্যময় গতি বজায় রাখুন।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সময় গতি কিছুটা কমিয়ে দিন যাতে শ্রোতারা তা প্রসেস করার সময় পায়। কথা বলার সময় শ্রোতাদের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করুন। যদি দেখেন তারা মনোযোগ হারাচ্ছে, তবে গলার স্বর বা গতি পরিবর্তন করে পুনরায় সংযোগ তৈরি করুন।
৬. হাত এবং মুখের ভঙ্গি ব্যবহার করুন
কথা বলার দক্ষতা শুধু শব্দের কারুকার্যে সীমাবদ্ধ নয়। আপনার শারীরিক ভাষা বা বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এতে বড় ভূমিকা রাখে। হাত নেড়ে বা চেহারার অভিব্যক্তির মাধ্যমে আপনার কথাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলুন। সোজা হয়ে বসা বা দাঁড়ানো এবং কাঁধ পেছনের দিকে রাখা আপনাকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হিসাবে উপস্থাপন করে।
কথা বলার সময় পরিমিতভাবে হাতের ব্যবহার করুন, যা শ্রোতাদের মনে বিষয়টি গেঁথে দিতে সাহায্য করবে। যেমন কোনো তালিকা বোঝাতে আঙুল দিয়ে গুণতে পারেন। এটি শ্রোতাদের মনে গেঁথে যায়। একইভাবে হাসিমুখে কথা বলা বা চোখের যোগাযোগ রাখা মানুষের সাথে সংযোগ তৈরি করে।
৭. শ্রোতাদের যুক্ত করুন
বক্তব্য যেন একতরফা বক্তৃতা না হয়ে বরং একটি প্রাণবন্ত আলাপচারিতা হয়। সরাসরি শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে কথা বলুন এবং তাদের আলোচনার অংশ করে নিন। মাঝে মাঝে এমন সব প্রশ্ন করুন যা তাদের চিন্তার খোরাক জোগায়। যেমন, "আপনারা কি কখনও এমন সমস্যায় পড়েছেন?"—এভাবে শ্রোতারা নিজেদের আপনার কথার সাথে মেলাতে পারবে। মানুষের কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে কথা বললে তাদের মনোযোগ দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখা সম্ভব হয়।
৮. গল্পের শক্তি ব্যবহার করুন
মানুষ শুকনা তথ্য বা উপাত্ত ভুলে গেলেও সুন্দর একটি গল্প সবসময় মনে রাখে। 'স্টোরিটেলিং' হল কথাকে আকর্ষণীয় করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। আমাদের মস্তিষ্ক গল্পের মাধ্যমে কোনো বিষয়কে দ্রুত গ্রহণ করতে পারে।
আপনার বক্তব্যের মাঝে প্রাসঙ্গিক ছোট কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা রূপক ব্যবহার করুন। এটি শ্রোতাদের মনে একটি দৃশ্যপট তৈরি করে এবং আবেগের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। তবে খেয়াল রাখবেন গল্প যেন খুব বেশি দীর্ঘ না হয় এবং অবশ্যই তা মূল প্রসঙ্গের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
যে সাধারণ ভুলগুলি এড়িয়ে চলবেন
সবাই ভুল করে, কিন্তু সেগুলি চিনতে পারাটাই বড় কথা। এই ৫টি বিষয় এড়িয়ে চলুন—
১. জটিল শব্দের ব্যবহার: খুব বেশি টেকনিক্যাল ও জটিল শব্দ ব্যবহার করলে মানুষ আপনার কথা বুঝতে পারবে না। সহজ ও প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করুন।
২. কথার পুনরাবৃত্তি: একই কথা বার বার বললে মানুষ ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। একবার পরিষ্কার করে বুঝিয়ে পরের পয়েন্টে চলে যান।
৩. লম্বা ও জটিল বাক্য: বাক্যের মারপ্যাঁচে আসল কথা হারিয়ে যায়। বড় চিন্তাকে ছোট ছোট বাক্যে ভাগ করুন।
৪. নেতিবাচক বা পরোক্ষ প্রকাশভঙ্গি: সবসময় ইতিবাচক ও সক্রিয় শব্দ ব্যবহার করুন। "এটা খারাপ না" না বলে বলুন "এটা বেশ ভাল"। এতে আপনার আত্মবিশ্বাস প্রকাশ পায়।
৫. মূল বিষয় থেকে দূরে সরে যাওয়া: আলোচনায় মূল বিষয় ধরে রাখুন। অপ্রাসঙ্গিক গল্প বা কথা শ্রোতাদের মনোযোগ নষ্ট করে।
সুন্দর করে কথা বলা কোনো জাদুকরী বিষয় নয়। এটি মূলত জ্ঞান, অনুশীলন এবং সচেতন যোগাযোগের ফল। যে কেউ চাইলে এই দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এখানে দেওয়া টিপসগুলি আপনার জন্য একটি টুলবক্সের মত কাজ করবে। নিয়মিত এগুলি ব্যবহার করুন।
কোনো বক্তৃতা বা আলোচনা নিখুঁত না হলে মন খারাপ করবেন না। ভুল থেকেই মানুষ শেখে। প্রতিটি নতুন সুযোগ আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। পরবর্তী প্রেজেন্টেশন বা আড্ডায় এখান থেকে অন্তত একটি টিপস কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন। দেখবেন, খুব দ্রুতই আপনি একজন দারুণ বক্তা হিসাবে নিজেকে আবিষ্কার করবেন।
২১
পড়াশুনা নিয়ে পাঁচটি সাইকোলজি টিপস
১. বই পড়া বা হাইলাইট করার বদলে বই বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করুন এবং উত্তর লিখুন। ভুল হলে শুধরে নিন।
কারণ মস্তিষ্ক যত বেশি তথ্য নিয়ে কাজ করে, তত শক্তিশালী মেমরি হয়। রিডিং এর চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।
২. ফেইনম্যান টেকনিক: সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করুন
কোনো টপিককে ১২ বছরের বাচ্চাকে বোঝানোর মতো সহজ করে বলুন বা লিখুন। যত সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করবেন তত গভীর বোঝাপড়া তৈরি হয়।
৩. পড়তে গিয়ে অন্য চিন্তা এলে একটা কাগজে লিখে রাখুন, পরে দেখবেন এটা বের করে।
এতে করে চিন্তা “অফলোড” হয়ে যায়, মন ফিরে আসে অ্যাংজাইটি কমে হয়। বর্তমান সোশাল মিডিয়ার যুগে ভালো কাজে দিবে।
৪. শুধু পড়ার জন্য একটা পরিষ্কার, আলোকিত জায়গা রাখুন বিছানা বা খাবার টেবিলে নয়।
কারণ সেই জায়গায় গেলে পরিবেশ মস্তিষ্ককে “এখন পড়ার মুড” এর সিগন্যাল দেয়। ট্রাই করে দেখুন।
৫. ভুলকে ভয় পাবেন না ভুল করলে মস্তিষ্কে নিউরাল কানেকশন তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ভুল উত্তর দেওয়ার পর সঠিকটা শিখলে মনে থাকে বেশি।
২২
'গ্রোথ মাইন্ডসেট' কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ক্যারল ডোয়েক তার দীর্ঘ গবেষণার পর একটি যুগান্তকারী ধারণা দিয়েছেন, যা 'গ্রোথ মাইন্ডসেট' (Growth Mindset) নামে পরিচিত।
মাইন্ডসেট কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
সহজ কথায়, মাইন্ডসেট হলো আমাদের চিন্তা করার ধরন বা দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা নিজেদের এবং নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে যা বিশ্বাস করি, তা-ই আমাদের জীবনকে চালিত করে। ডুয়েকের মতে, মানুষের মানসিকতা প্রধানত দুই প্রকার:
১. ফিক্সড মাইন্ডসেট (Fixed Mindset): যারা বিশ্বাস করেন যে মানুষের মেধা, বুদ্ধি এবং দক্ষতা জন্মগতভাবে নির্ধারিত এবং তা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এরা ব্যর্থতাকে ভয় পায় এবং নতুন চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে চলতে চায়।
২. গ্রোথ মাইন্ডসেট (Growth Mindset): যারা বিশ্বাস করেন যে কঠোর পরিশ্রম, সঠিক কৌশল এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে যেকোনো দক্ষতা বা মেধা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এরা ব্যর্থতাকে শেখার একটি সুযোগ হিসেবে দেখে।
সাফল্যের সিঁড়িতে আরোহণ করতে হলে গ্রোথ মাইন্ডসেটের কোনো বিকল্প নেই। কারণ, যেখানে ফিক্সড মাইন্ডসেট মানুষকে থামিয়ে দেয়, সেখানে গ্রোথ মাইন্ডসেট মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
সাফল্যের সিঁড়ি হিসেবে গ্রোথ মাইন্ডসেটের ভূমিকা
সাফল্যের পথ কখনো মসৃণ হয় না। সেখানে থাকে বাধা, সমালোচনা এবং অনেক ব্যর্থতা। গ্রোথ মাইন্ডসেট কীভাবে এই প্রতিটি ধাপে আমাদের সাহায্য করে, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. চ্যালেঞ্জকে আলিঙ্গন করা
ফিক্সড মাইন্ডসেটের অধিকারীরা চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে চলে কারণ তারা ভয় পায় যে ব্যর্থ হলে লোকে তাদের 'অযোগ্য' ভাববে। কিন্তু গ্রোথ মাইন্ডসেট সম্পন্ন ব্যক্তিরা চ্যালেঞ্জকে স্বাগত জানান। তারা জানেন যে একটি কঠিন কাজ করার মাধ্যমেই মস্তিষ্কের নতুন নতুন নিউরন সক্রিয় হয় এবং তারা আরও দক্ষ হয়ে ওঠেন। সাফল্যের প্রথম সিঁড়ি হলো আরামদায়ক অবস্থা বা 'কমফোর্ট জোন' থেকে বেরিয়ে আসা, যা কেবল গ্রোথ মাইন্ডসেট থাকলেই সম্ভব।
২. ব্যর্থতাকে শিক্ষার অংশ হিসেবে দেখা
টমাস আলভা এডিসন বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কারের আগে হাজার বার ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "আমি ব্যর্থ হইনি, আমি কেবল ১০,০০০টি উপায় খুঁজে পেয়েছি যা কাজ করে না।" এটিই হলো খাঁটি গ্রোথ মাইন্ডসেট।
সাফল্যের সিঁড়িতে প্রতিটি ব্যর্থতা আসলে একটি করে অভিজ্ঞতার ধাপ। গ্রোথ মাইন্ডসেট আমাদের শেখায় যে ব্যর্থতা মানে পরাজয় নয়, বরং এটি একটি সংকেত যে আমাদের কৌশল পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
৩. প্রচেষ্টাকে শ্রেষ্ঠত্বের পথ হিসেবে গণ্য করা
অনেকেই ভাবেন, "আমার যদি প্রতিভা থাকত, তবে আমাকে এত খাটতে হতো না।" এটি একটি নেতিবাচক ধারণা।
গ্রোথ মাইন্ডসেট বলে যে, পরিশ্রমই প্রতিভাকে শাণিত করে। বাস্কেটবল কিংবদন্তি মাইকেল জর্ডান বা ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির মতো সফল মানুষেরা তাদের অলৌকিক দক্ষতার পেছনে হাজার হাজার ঘণ্টার কঠোর পরিশ্রম ব্যয় করেছেন। তারা বিশ্বাস করতেন যে অনুশীলনের মাধ্যমেই অসাধ্য সাধন সম্ভব।
৪. সমালোচনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ
সাফল্যের পথে অন্যের গঠনমূলক সমালোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিক্সড মাইন্ডসেটের মানুষ সমালোচনা শুনলে আঘাত পায় এবং নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
অন্যদিকে, গ্রোথ মাইন্ডসেটের মানুষ সমালোচনার মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যটি খুঁজে নেয় যা তাকে ভবিষ্যতে আরও ভালো করতে সাহায্য করবে। তারা অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে তাদের সাফল্য থেকে অনুপ্রেরণা নেয়।
গ্রোথ মাইন্ডসেট গঠনের কৌশল
গ্রোথ মাইন্ডসেট কোনো জন্মগত বৈশিষ্ট্য নয়; এটি চর্চার মাধ্যমে গড়ে তোলা যায়। নিচে কিছু কার্যকরী কৌশল দেওয়া হলো:
১. "এখনও" (Yet) শব্দের জাদু:
যখনই মনে হবে "আমি এই কাজটি পারছি না", তখন বাক্যটি এভাবে বলুন— "আমি এই কাজটি এখনও পারছি না।" এই ছোট একটি শব্দ আপনার মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতাকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে ভবিষ্যতে আপনি অবশ্যই এটি পারবেন।
২. ফল নয়, প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিন:
সাফল্য অর্জনে চূড়ান্ত ফলাফলের চেয়ে আপনি কীভাবে কাজটি করছেন, সেই প্রক্রিয়া বা চেষ্টার প্রশংসা করুন। আপনি যখন নিজের পরিশ্রমের মূল্যায়ন করতে শিখবেন, তখন ফলাফল আপনার অনুকূলে আসতে বাধ্য।
৩. প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখা:
নিজেকে সব সময় একজন শিক্ষার্থীর ভূমিকায় রাখুন। প্রতিদিন অন্তত নতুন একটি তথ্য বা দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করুন। জ্ঞান অর্জনের এই তৃষ্ণা আপনার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
৪. কমফোর্ট জোন ত্যাগ করা:
যে কাজগুলো করতে আপনি ভয় পান বা অস্বস্তি বোধ করেন, সেগুলো করার চেষ্টা করুন। ছোট ছোট ঝুঁকি নিন। প্রতিবার যখন আপনি নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবেন, আপনার আত্মবিশ্বাস এবং মাইন্ডসেট শক্তিশালী হবে।
নিউরোপ্লাস্টিসিটি: বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গ্রোথ মাইন্ডসেট
আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্স গ্রোথ মাইন্ডসেটের ধারণাকে সমর্থন করে। বিজ্ঞান বলছে, আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা প্লাস্টিকের মতো নমনীয়, যাকে 'নিউরোপ্লাস্টিসিটি' বলা হয়।
আমরা যখন নতুন কিছু শিখি বা কোনো কঠিন সমস্যার সমাধান করি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে নতুন নতুন সংযোগ (Synapse) তৈরি হয়। অর্থাৎ, আমরা আক্ষরিক অর্থেই আমাদের মস্তিষ্ককে আরও বুদ্ধিমান করে তুলতে পারি। তাই আপনি জন্মগতভাবে কতটা মেধাবী, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো আপনি নিজের মস্তিষ্ককে কতটা ব্যবহার করছেন।
সাফল্য ও গ্রোথ মাইন্ডসেটের বাস্তব উদাহরণ
পৃথিবীর ইতিহাসে যারাই বড় কিছু করেছেন, তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই এই গ্রোথ মাইন্ডসেট প্রবল ছিল। জে.কে. রাউলিং-এর 'হ্যারি পটার' পাণ্ডুলিপি ১২টি প্রকাশনী প্রত্যাখ্যান করেছিল। তিনি যদি ফিক্সড মাইন্ডসেটের হতেন, তবে হয়তো প্রথম দুই-তিনবার প্রত্যাখ্যাত হয়েই লেখা ছেড়ে দিতেন। কিন্তু তিনি নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন এবং ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
একইভাবে, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা 'স্পেস এক্স'-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের প্রথম তিনটি রকেট উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়েছিল। তিনি দেউলিয়া হওয়ার পথে ছিলেন, কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে চতুর্থবার তিনি সফল হন। এই জেদ আর হার না মানা মানসিকতাই হলো সাফল্যের আসল সিঁড়ি।
সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হলে আপনাকে কেবল আপনার কাজের দক্ষতাই বাড়াতে হবে না, বরং আপনার চিন্তা জগতের খোলনলচে বদলে ফেলতে হবে।
গ্রোথ মাইন্ডসেট মানে এই নয় যে প্রত্যেকেই আইনস্টাইন বা ম্যারাডোনা হয়ে যাবে, বরং এর অর্থ হলো প্রত্যেকেই তার বর্তমান অবস্থা থেকে অনেক বেশি উন্নতি করতে সক্ষম।
মনে রাখবেন, মেধা বা প্রতিভা আপনাকে কেবল শুরুর লাইনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে, কিন্তু শেষ রেখা অতিক্রম করতে হলে প্রয়োজন অদম্য মানসিকতা এবং নিরলস পরিশ্রম।
আজ থেকেই নিজের সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্ন করুন, ব্যর্থতাকে আলিঙ্গন করতে শিখুন এবং বিশ্বাস করুন যে আপনি আপনার চেষ্টায় যেকোনো পর্বত জয় করতে পারেন। কারণ সাফল্য আপনার ভাগ্যে নয়, আপনার মাইন্ডসেট বা মানসিকতায় লুকিয়ে আছে।
আপনার চিন্তা পরিবর্তন করুন, আপনার জীবন পরিবর্তিত হবে। সাফল্যের সিঁড়ি আপনার অপেক্ষায়।
২৩
প্রাচীন গ্রীসের জীবনযাত্রার অজানা ৬টি দিক
প্রাচীন গ্রীসের দৈনন্দিন জীবনে মজার কিছু ব্যাপার ছিল যা জানলে অবাক না হয়ে উপায় নেই। তৎকালীন গ্রীসের তেমনই ৭টি মজার বিষয় জানাতে আজকের এ লেখার আয়োজন।
১. ডাক্তারদের পরীক্ষানিরীক্ষা
প্রাচীন গ্রীসে যখন কোনো রোগী শরীর পরীক্ষা করাতে ডাক্তারের কাছে যেত, তখন এক অদ্ভুত কাজ করে বসতেন সেই ডাক্তার। রোগীকে ধরে তার কানের ময়লা বের করে এরপর সোজা সেটা নিজের মুখে চালান করে দিতেন তিনি, জিহবায় নাড়িয়ে নাড়িয়ে চেষ্টা করতেন সেই ময়লার স্বাদ বোঝার!
উপরে যা পড়লেন তা বিন্দুমাত্র বাড়িয়ে বলা হয়নি কিন্তু। সত্যি সত্যিই প্রাচীনকালে গ্রীসের ডাক্তাররা এভাবে একজন রোগীকে পরীক্ষা করতেন। এটা আসলে রোগীর রোগের উপর ভিত্তি করে পরিবর্তিত হতো। আজকের দিনে নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা করে রোগীর রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়, কিন্তু সেই যুগে তেমন ব্যবস্থা ছিল না। তাই রোগীর কফের মাঝেই আঙুল চালিয়ে কিংবা বমির সামান্য অংশ চেখে নিয়েই রোগীর অবস্থা ও রোগের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা করতে হতো একজন ডাক্তারকে।
এর সূচনা হয়েছিলো হিপোক্রেটিসের হাত ধরে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শরীর তরল পদার্থে পরিপূর্ণ এবং সেই তরলের প্রতিটির স্বাদ আলাদা। গ্রীক ডাক্তারদের শেখানো হতো সেই তরলগুলোর প্রকৃত স্বাদ কেমন সেই সম্পর্কে, যেন অসুখে ধরলে রোগীর দেহের নানা তরলের স্বাদ পরখ করে তিনি অসুস্থতা সম্পর্কে বুঝতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে মূত্রের কথাতেই আসা যাক। হিপোক্রেটিক মেডিসিন অনুযায়ী মূত্রের স্বাদ হওয়ার কথা ডুমুরের জুসের মতো। তাই রোগীর কোনো শারীরিক সমস্যা হলে ডাক্তার যদি মূত্রের খানিকটা চুমুক দিয়ে সেই স্বাদ না পেতেন, তাহলেই তিনি বুঝে নিতেন যে কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে।
২. পাথর দিয়ে পরিষ্কার
টয়লেট পেপার আজকের দিনে সহজলভ্য হলেও মাত্র ষোড়শ শতকে ইউরোপে এর প্রচলন ঘটে। এর আগে যে মানুষ নানাবিধ জিনিস ব্যবহার করে টয়লেট পেপারের কাজ সারতো তা তো বলাই বাহুল্য। প্রাচীন গ্রীসের কথাই ধরা যাক। রোমানদের মতো তারাও লাঠির আগায় স্পঞ্জ লাগিয়েই লজ্জাস্থান পরিষ্কার করার কাজটা সারতো। অবশ্য সবাই এমনটা করতো না। বরং অধিকাংশ লোক ব্যবহার করতো পাথর! তাদের টয়লেটগুলোতে জমানো থাকতো পাথর। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার পর লজ্জাস্থানে পাথর ঘষে তারা নিজেদের পরিষ্কার করে নিত। পাথর তো আর অফুরন্ত ছিল না। তাই পাথর ব্যবহারে জনগণকে মিতব্যয়ী হবার পরামর্শ দিয়ে প্রাচীন গ্রীসে একটি কথা প্রচলিত ছিল, “পরিষ্কার করতে তিনটি পাথরই যথেষ্ট!”
কখনো তারা সিরামিকের ভেঙে যাওয়া পাত্রের টুকরো দিয়ে সেই কাজ সারতো। কেউ যদি আবার অতিরিক্ত প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠতো, তাহলে প্রথমে কোনো পাত্রে শত্রুর নাম খোদাই করতো। এরপর সেই পাত্র ভেঙে ভাঙা টুকরোগুলো দিয়ে নিজেকে পরিষ্কার করে অদ্ভুত সুখ লাভ করতো তারা, যেন শত্রুর মুখেই মাখিয়ে দিচ্ছে হলুদ পদার্থ!
৩. ‘ভালোবাসার পুরুষ
প্রাচীনকালে রোমে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক লোক অল্প বয়স্ক কোনো ছেলেকে তার ‘ভালোবাসার মানুষ’ হিসেবে বেছে নিত। এক্ষেত্রে সাধারণত বয়স্ক লোকটিই এগিয়ে যেত। দেখতে সুন্দর, বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায়নি, এমন একজন ছেলের সামনে তারা জীবন্ত মোরগ নিয়ে হাজির হতো উপহার হিসেবে। আর এই উপহার দিয়েই ছেলেটির মন জয় করে নিত সেই লোকটি।
এরপর থেকে কৈশোরে উপনীত হবার আগপর্যন্ত ছেলেটি তার ভালোবাসার মানুষের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে থাকতো। যখনই তার মুখে দাড়ি গজাতে শুরু করতো, তখনই তার বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসতো। ওদিকে মুখে দাড়ি গজানোর অর্থ সেই ছেলেটি ততদিনে ‘আসল পুরুষ’ হয়ে উঠেছে। তাই নতুন পুরুষ হিসেবে সেই ছেলেটি আবার অন্য কোনো বাচ্চা ছেলেকে সঙ্গী হিসেবে নিতে চাইত। এভাবে ‘ভালোবাসার চক্র চলতেই থাকত প্রাচীন রোমে।
৪. খেলোয়াড়দের ঘাম
এককালে গ্রীসে খেলোয়াড়রা অদ্ভুত এক কাজ করতো। কোনো খেলা শুরুর আগে শরীরে একটা সুতোও রাখতো না তারা, বরং সারা গায়ে মেখে নিত তেল। এরপর উলঙ্গ হয়েই খেলার ময়দানে নেমে যেত তারা। খেলা শেষে তেলের কারণে সারা গায়ে ভালোই ময়লা লেগে থাকতো। তেল মাখানো শরীর থেকে এই ঘাম ও ধূলাবালি মিশ্রিত ময়লা পরিষ্কার করা যে সহজ ও দৃষ্টিনন্দন কোনো বিষয় ছিল না তা তো সহজেই অনুমেয়। তবে এগুলো কিন্তু ফেলনা কিছু ছিল না!
‘গ্লৈওস সংগ্রাহক’ নামে এক শ্রেণীর দাস ছিল গ্রীসে, যাদের কাজই থাকতো খেলোয়াড়দের শরীর থেকে এসব ময়লা সংগ্রহ করা। তারা বোতল নিয়ে খেলা শেষে খেলোয়াড়দের কাছে ছুটে যেত আর একের পর এক বোতল পূর্ণ করতে থাকতো। কেন এই ময়লা সংগ্রহ? কারণ এগুলোই যে পরবর্তীতে বাজারে বিক্রি করা হতো! শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সত্যি যে, এককালে গ্রীসের মানুষ খেলোয়াড়দের শরীর থেকে পাওয়া এই ময়লাই তাদের নিজেদের শরীরে মাখাতো ব্যথা থেকে মুক্তির আশায়!
৫. হাঁচি দিয়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণ
গ্রীক চিকিৎসক সরেনাস মনে করতেন, গর্ভধারণ রোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পুরো দায়দায়িত্ব একজন নারীর। এজন্য কোনো নারী যদি গর্ভবতী হয়ে যেতেন, তাহলে তিনি স্বামীর বদলে তার স্ত্রীকেই বরঞ্চ দায়ী বলতেন। আসলে একজন পুরুষ কীভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধে সাহায্য করতে পারবে, এ জিনিসটাই তাদের মাথায় আসতো না।
তবে হাজার বছর আগের গ্রীসে নারীদের গর্ভধারণের ব্যাপারে মনে করতেন, হাঁচি দিলেই বুঝি একজন নারী অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ঠেকাতে পারবে। তারা পরামর্শ দিতেন, একজন নারী উবু হয়ে বসে হাঁচি দিয়ে নিজেকে পরিষ্কার করে নিলেই তার আর গর্ভধারণ নিয়ে ভাবার দরকার পড়বে না।
৬. কুমিরের মল দিয়ে বানানো ক্রিম
হাজার হাজার বছর আগেকার গ্রীসের জীবনের সাথে কুমির বেশ ভালোভাবেই জড়িয়ে ছিল। এজন্য গ্রীকরা চোখের চারপাশে দাগ প্রশমনে কুমিরের মল সংগ্রহ করে সেটাকে মিহি গুঁড়া করে এরপর পানিতে মিশিয়ে চোখের চারপাশে মাখাত! Mohasin Alam Roni
২৪
ট্রোজান যুদ্ধ: দেব-দেবীদের দ্বন্দ্ব ও ষড়যন্ত্র থেকে ট্রয় নগরীর পতন
গ্রিক উপাখ্যানে বর্ণিত এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হলো ট্রোজান যুদ্ধ। এই যুদ্ধ গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কথিত আছে, দেবরাজ জিউস নাকি মনে করতেন পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত বেড়ে গেছে, তাই তা কমানোর দরকার। সেই সঙ্গে কমানো প্রয়োজন মর্ত্যের নারীদের গর্ভে জন্ম নেওয়া উপদেবতার সংখ্যা। এজন্য তিনি তার কূটকৌশলের মাধ্যমে একটি যুদ্ধ বাধানোর চেষ্টা করেন যাতে মানুষের সংখ্যা কমে যায়। এই যুদ্ধ গ্রিক ও ট্রোজানদের মধ্যে সংঘটিত হলেও এর পটভূমি শুরু হয় গ্রিক মিথোলজির দেব-দেবীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে।
উপকথা অনুযায়ী, দেবরাজ জিউস ও সমুদ্র দেবতা পসাইডন উভয়ে থেটিস নামক এক সুন্দরী জলপরীর প্রেমে পড়েন। জিউস ও পসাইডন দুজনেই থেটিসকে নিজের স্ত্রী রুপে পেতে চেষ্টা করতে থাকেন, কিন্তু এক ওরাকল (ভবিষ্যদ্রষ্টা) বলেন, থেটিসের যে পুত্র হবে সে নিজের পিতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী হবে। কিছু মত অনুযায়ী থেমিস অথবা প্রমিথিউস এই ভবিষ্যদ্বাণী করেন। জিউস চাননি তার পুত্র তার চেয়েও বেশি শক্তিমান হয়ে তাকে সিংহাসনচ্যুত করুক। জিউস নিজেই তার পিতা ক্রোনাসকে উৎখাত করে স্বর্গের রাজত্ব দখল করেছিলেন। একই পরিণাম যেন নিজেকেও ভোগ করতে না হয় সেই ভয়ে জিউস থেটিসকে পেলেউস নামক এক মানবের সাথে বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
জিউসের নির্দেশে থেটিস ও পেলেউসের বিয়ে ঠিক করা হয়। ট্রোজান যুদ্ধের বীর অ্যাকিলিস ছিলেন থেটিস ও পেলেউসের পুত্র। থেটিস ও পেলেউসের বিয়েতেই ট্রোজান যুদ্ধের পটভূমির সূত্রপাত হয়। এই বিয়েতে ‘বিবাদের দেবী’ ইরিসকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাকে ছাড়া অন্য দেব-দেবীদের নিমন্ত্রণ জানানো হয়। ফলে ইরিস এই অপমানে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন, এবং তার স্বভাবজাত কান্ড অর্থাৎ বিবাদ সৃষ্টির চেষ্টায় লিপ্ত হন।
ইরিস একটি সোনার আপেল নিয়ে পেলেউস ও থেটিসের বিয়েতে হাজির হয়, এবং সবচেয়ে সুন্দরী দেবীকে এটি উপহার দেবেন বলে জানান। উপস্থিত সকল নারীই নিজেকে সবচেয়ে সুন্দরী দাবি করে এক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। হেরা, অ্যাথেনা ও আফ্রোদিতি- এই তিন দেবী উক্ত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হন। তারা ছিলেন সবচেয়ে শক্তিশালী দেবী। হেরা ছিলেন দেবরাজ জিউসের স্ত্রী, দেবলোকের রানী এবং বিয়ের দেবী। অ্যাথেনা ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবী, এবং আফ্রোদিতি ছিলেন সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও যৌনতার দেবী। দেবরাজ জিউস নিজে এই দেবীদের মধ্যে কাউকে সবচেয়ে সুন্দরী বলে সিদ্ধান্ত দিতে রাজি হননি। কারণ কোনো একজনকে নির্বাচিত করলে অন্য দুই দেবীর সঙ্গে তার সংঘর্ষ তৈরির সম্ভাবনা ছিল। জিউস চালাকি করে এই সম্ভাব্য সংঘাত এড়িয়ে যান।
দেবরাজ জিউসের আদেশে ট্রয়রাজ প্রায়ামের পুত্র অর্থাৎ ট্রোজান রাজপুত্র প্যারিসের উপর এই প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্ব বর্তায়। প্যারিস তখন আইডা পর্বতে তার পাল চড়াচ্ছিল, তখন তিন দেবী তার কাছে গিয়ে সবচেয়ে সুন্দরী দেবীকে নির্বাচনের দায়িত্ব দেয়। দেবীদের সবাই নগ্ন হয়ে প্যারিসকে সিদ্ধান্ত নিতে বলে, কিন্তু যুবরাজ অনাবৃত দেবীদের দেখে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। প্রত্যেক দেবীই যুবরাজ প্যারিসকে নিজের পক্ষে আনার চেষ্টা করতে থাকেন। সবাই প্যারিসকে নিজেদের সাধ্যমতো বিভিন্ন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
দেবালয়ের রানী হেরা প্যারিসকে অসীম রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রচুর ধনসম্পদের প্রস্তাব দেন। জ্ঞানের দেবী অ্যাথেনা দেন অফুরন্ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রস্তাব। সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতি প্যারিসকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারীর সঙ্গে প্রেম করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। প্যারিস আফ্রোদিতির এই প্রস্তাব ফেলতে পারেনি। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী রমণীকে পাওয়ার আশায় প্যারিস আফ্রোদিতিকে সেরা সুন্দরী হিসেবে নির্বাচিত করেন, এবং সোনার আপেল দেবীকে উপহার দেন। এর মানে হলো অন্য দুই দেবীর উপর আফ্রোদিতির বিজয়। প্যারিসের এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিকভাবেই অ্যাথেনা ও হেরা অনেক ক্ষুব্ধ হন।
আফ্রোদিতিও তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন। মর্ত্যের সবচেয়ে সুন্দরী নারী হেলেনের সঙ্গে প্যারিসের প্রেম করিয়ে দেন। কিন্তু সমস্যা হলো, হেলেন ছিলেন স্পার্টারাজ মেনেলাওসের স্ত্রী। প্যারিস তখন হেলেনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। আফ্রোদিতির বরে হেলেনও প্যারিসের প্রেমে পড়ে। একপর্যায়ে কোনোরকম পরিণামের কথা না ভেবেই প্যারিস হেলেনকে নিয়ে ট্রয়ে পালিয়ে যায়। মেনেলাওস স্বাভাবিকভাবেই এই কর্ম মেনে নিতে পারেনি। তিনি কোনো বিলম্ব না করেই ট্রোজানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
প্রথমদিকে গ্রিকরা কূটনৈতিকভাবে এই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করলেও ট্রোজানরা ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। সুতরাং গ্রিকদের কাছে যুদ্ধ ছাড়া কোনো পন্থা ছিল না, তারা তা-ই করে। মেনেলাওসের ভাই আগামেমনন ছিলেন মাইসেনিয়ার রাজা। তিনি তার ভাইয়ের সাহায্যে এগিয়ে আসেন, এবং যুদ্ধের জন্য মিত্রবাহিনী গঠন করতে থাকেন। আগামেমনন আচিয়ানদের তাদের পক্ষে যুদ্ধের জন্য আহ্বান জানান। আচিয়ানরাও তখন আগামেমননের আহ্বানে সাড়া দেয়। এভাবে গ্রিকরা অনেক সৈন্য ও বীরদের জড়ো করে একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠনে সক্ষম হয়। গ্রিক বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মেনেলাওসের ভাই আগামেমনন।
করিন্থ, ম্যাগনেসিয়া, ক্রীট, রুডস, এথেন্স ও স্পার্টাসহ আরো কিছু রাজ্যের সমন্বিত বাহিনী নিয়ে গ্রিকরা ট্রয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। গ্রীক যোদ্ধাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন তৎকালীন বীর যোদ্ধাদের মাঝে শীর্ষস্থানীয়। অ্যাকিলিস, ওডিসিয়াস, অ্যাজাক্স, ডিওমেডিস, প্যাট্রোক্লাস, অ্যান্টিলোকাস, মেনেসথিউস এবং ইডোমেনাসের মতো পরাক্রমশালী গ্রিক বীরেরা ছিলেন উপদেবতা বা দেব-দেবীদের বংশধর। এদের কারো পিতা অথবা কারো মাতা ছিলেন দেব-দেবী। ফলে অনেক ক্ষমতাধর দেব-দেবী গ্রিকদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। অ্যাথেনা, পসাইডন, হেরা, হেফাস্টাস, হার্মিস এবং থেটিস গ্রীকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য করেন।
ট্রয়রাজ প্রায়ামের নেতৃত্বে ট্রোজানরাও এক শক্তিশালী মিত্র বাহিনী গঠন করে। ট্রোজানদের সাহায্যে এগিয়ে আসে তাদের অনেক মিত্ররাজ্য। ট্রোজানদেরও ছিল হেক্টর, ঈনিয়াস ও গ্লুকাসের মতো অনেক বীর যোদ্ধা। গ্রিকদের মতো ট্রোজানরাও দেব-দেবীদের থেকে সহযোগিতা পায়। আফ্রোদিতি, অ্যাপোলো, অ্যারিস ও লেটো এই যুদ্ধে ট্রোজানদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করে।
শেষপর্যন্ত গ্রিকরা তাদের বিশাল বাহিনী নিয়ে ট্রয় নগরীকে আক্রমণ করে। ট্রয় নগরী ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য দেয়াল এবং দুর্গ দ্বারা সুরক্ষিত। গ্রিক পৌরাণিক কাহিনীমতে, ট্রয়ের দেয়ালগুলো দেবতা পসাইডন ও অ্যাপোলো নির্মাণ করেছিল ফলে এগুলো ভেদ করা অসম্ভব ছিল। এজন্য শহরের বাইরের সমভূমিতে গ্রিক ও ট্রোজান বাহিনী একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকে। বছরের পর বছর ধরে ট্রয়ের বাইরে এই যুদ্ধ চলতে থাকে। গ্রিক সৈন্যরা ট্রয়কে দীর্ঘ দশ বছরব্যাপী অবরুদ্ধ করে রাখে। কিন্তু ট্রয় তাদের এশিয়ান মিত্রদের সাথে বিভিন্নভাবে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছিল, তাই সমস্যায় পড়তে হয়নি ট্রোজানদের। যুদ্ধ যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল, তখন শেষ বছরে এসে তুমুল যুদ্ধে লিপ্ত হয় দুই বাহিনী। দ্বন্দ্বযুদ্ধে লিপ্ত হয় পরাক্রমশালী বীরেরাও।
দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধ অমীমাংসিত থাকায় যোদ্ধারা বেশ বিরক্ত হয়। একপর্যায়ে মেনেলাওস প্যারিসকে একক যুদ্ধে আহ্বান জানান। প্যারিসও এই আহ্বানে সাড়া দেয়। ফলে প্যারিস ও মেনেলাওস দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। প্রথমে প্যারিস মেনেলাওসকে লক্ষ্য করে একটি বর্শা নিক্ষেপ করে, কিন্তু তার বর্শাটি মেনেলাওস তার ঢালের মাধ্যমে আটকে দেন। এরপর মেনেলাওস প্রতিআক্রমণ হিসেবে প্রচন্ড জোরে তার বর্শা নিক্ষেপ করেন। সেটি প্যারিসের ঢাল ভেদ করে ঢুকে পড়ে। বর্শাটি তার শরীরে লাগেনি। এরপর মেনেলাওস তার তরবারি দিয়ে প্যারিসের হেলমেটে সজোরে আঘাত হানে। এই আঘাতে মেনেলাওসের তলোয়ার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। মেনেলাওস তখন খালি হাতে প্যারিসের হেলমেট ধরে তাকে মাঠ থেকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কথিত আছে, আফ্রোদিতির হস্তক্ষেপে প্যারিস সে যাত্রায় বেঁচে যান। এরপর আরো দুই বীর হেক্টর ও অ্যাজাক্স যুদ্ধে লিপ্ত হয়। দীর্ঘক্ষণ তুমুল যুদ্ধের পর অমীমাংসিত থাকে তাদের যুদ্ধ।
মহাপরাক্রমশালী বীর থেটিসপুত্র অ্যাকিলিস ছিলেন মর্ত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। আগামেমনন অ্যাকিলিসের প্রিয় উপপত্নীকে নিয়ে নেন। ফলে অ্যাকিলিস ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং তিনি আর যুদ্ধ করবেন না বলে জানিয়ে দেন। অ্যাকিলিসকে ছাড়া শুরুতে কিছু লড়াইয়ে গ্রিকরা জয়লাভ করলেও একপর্যায়ে বিপর্যয়ে পড়ে গ্রিকরা, এবং হারতে শুরু করে। ট্রোজানদের আক্রমণে পিছু হটতে হটতে গ্রিকরা সাগরতীরে তাদের জাহাজের কাছাকাছি চলে যায়। ট্রোজানরা তখন কিছু গ্রিক জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগামেমনন অনুধাবন করেন, এই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে অ্যাকিলিসকে প্রয়োজন।
আগামেমনন অ্যাকিলিসকে প্রচুর ধনসম্পদের প্রস্তাব দিয়ে পুনরায় যুদ্ধে যোগদানের কথা বলেন। অ্যাকিলিস এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। উপায় না দেখে অ্যাকিলিসের প্রিয় বন্ধু প্যাট্রোক্লাস অ্যাকিলিসকে যুদ্ধে যোগদানের অনুরোধ করেন, কিন্তু অ্যাকিলিস তার প্রস্তাবও নাকচ করে দেন। অসহায় প্যাট্রোক্লাস এবার প্রিয় বন্ধু অ্যাকিলিসের কাছে তার ঢাল ও বর্ম পরিধানের অনুমতি চেয়ে বসেন। উপায় না দেখে অ্যাকিলিস এই প্রস্তাবে রাজি হন। প্যাট্রোক্লাস অ্যাকিলিসের সরঞ্জাম পরিধান করে বীরদর্পে যুদ্ধ করতে করতে ট্রোজানদের গ্রিক শিবির থেকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। প্যাট্রোক্লাস এতটাই বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন যে তিনি ট্রোজান বীর সার্পেডনকেও হত্যা করতে সক্ষম হন। প্রবল উত্তেজিত প্যাট্রোক্লাস অগ্রসর হতে হতে ট্রয়ের দেয়ালের কাছাকাছি চলে আসেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কিছুক্ষণ পরেই ট্রয়ের যুবরাজ ও বীর যোদ্ধা প্রায়ামপুত্র হেক্টরের হাতে মারা পড়েন প্যাট্রোক্লাস; যদিও এতে দেবতা অ্যাপোলোর সহায়তা ছিল। প্রিয় বন্ধু প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুর সংবাদে শোকে কাতর অ্যাকিলিস রাগ ও ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এরই মধ্যে তার উপপত্নীকে ফিরিয়ে দেওয়ায় সিদ্ধান্ত নেন আগামেমনন। ক্রোধাক্রান্ত অ্যাকিলিস পুনরায় রণক্ষেত্রে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন, সেই সঙ্গে ট্রোজানদের, এবং বিশেষ করে হেক্টরের উপর ভয়ানক প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ করেন। অ্যাকিলিসের নতুন বর্ম প্রয়োজন ছিল। তার নতুন বর্মের যোগান দেন তার মা থেটিস। ক্রোধে ফেটে পড়া অ্যাকিলিস নতুন বর্ম পেয়ে তান্ডব চালাতে থাকেন। অ্যাকিলিসের তুমুল আক্রমণে ট্রোজানরা পিছু হটতে হটতে নগরীর ভেতরে ঢুকে পড়ে।
চরম সাহসী যুবরাজ হেক্টর একাই দেয়ালের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো। অবশেষে অ্যাকিলিস ও হেক্টর একে অপরের মুখোমুখি হয়। সময়ের দুই শ্রেষ্ঠ বীর সামনাসামনি লড়তে শুরু করে। মহাপরাক্রমশালী যোদ্ধা অ্যাকিলিসের কাছে হেক্টর বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। প্রায়ামপুত্র ট্রোজান যুবরাজ হেক্টরকে নির্মমভাবে হত্যা করেন অ্যাকিলিস। হেক্টরকে মেরে মৃতদেহ রথের পেছনে বেঁধে ট্রয়ের বিখ্যাত দেয়ালের সামনে দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে আসেন গ্রিক শিবিরে। সেখানে বীর হেক্টরের স্থান হয় ময়লার স্তুপে।
নিজের প্রিয়বন্ধু প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়ে কিছুটা তৃপ্ত হয় বীর অ্যাকিলিস। এবার তিনি তার নিহত বন্ধুর সম্মানে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আয়োজন করেন। সেদিন রাতে ট্রোজানরাজ প্রায়াম ছদ্মবেশে গ্রীক শিবিরে প্রবেশ করেন এবং অ্যাকিলিসকে তার ছেলে হেক্টরের লাশ ফেরত দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন যাতে তাকে যথাযথভাবে সমাধিস্থ করা যায়। প্রথমে অনিচ্ছুক থাকলেও শেষপর্যন্ত বৃদ্ধ পিতার মানসিক আবেদন ফেলতে পারেননি অ্যাকিলিস। তিনি হেক্টরের মৃতদেহ ফিরিয়ে দিতে সম্মত হন। এখানেই হোমারের জগদ্বিখ্যাত ‘ইলিয়াড’ সমাপ্ত হয়। তবে যুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি।
অ্যাকিলিস এই ঘটনার পর খুব বেশি দিন তার প্রতাপ চালাতে পারেননি। তিনি একপর্যায়ে ট্রয় নগরীর ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। শহরে ঢোকার পর যুবরাজ প্যারিস অ্যাকিলিসকে লক্ষ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করে। এই তীর দেবতা অ্যাপোলোর সহায়তায় অ্যাকিলিসের গোড়ালিতে আঘাত হানে। মিথোলজি মতে, অ্যাকিলিসের গোটা দেহ অভেদ্য ছিল। তার মা থেটিস শৈশবে তাকে স্টাইক্স নদীর জলে ডুবিয়ে নেন, যার ফলে তিনি অভেদ্য হয়ে ওঠেন। কিন্তু তার গোড়ালির যে অংশ ধরে তাকে ডুবানো হয়েছিল সেই অংশে জল না লাগায় তা ভেদ্য ছিল, ফলে অ্যাপোলো সেখানেই তীরের আঘাত লাগিয়ে দেন। এই তীরের আঘাতেই মহাপরাক্রমশালী বীর যোদ্ধা, এক মানব কিংবা উপদেবতা, থেটিসপুত্র অ্যাকিলিস মারা যান। এরপর থেকে মানুষের দুর্বল জায়গা বোঝাতে ‘অ্যাকিলিস হিল’ প্রবাদটি ব্যবহৃত হয়।
পরবর্তীতে এই যুদ্ধে আরো অনেক বীরের মৃত্যু হয়। অবশেষে, ওডিসিয়াস যুদ্ধ শেষ করার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেন। তিনি ভেতরে ফাঁপা এমন একটি কাঠের ঘোড়া নির্মাণের নির্দেশ দেন। রাতের আঁধারে এই ঘোড়ার অভ্যন্তরে গ্রিক সৈন্যরা লুকিয়ে পড়ে। সেদিন রাতে ঘোড়াকে ট্রয়ের গেটের সামনে রেখে সমগ্র গ্রিক নৌবহর ট্রয়ের উপকূল থেকে পশ্চাদপসরণ করে নিকটবর্তী দ্বীপ টেনেডোসে চলে যায়। গ্রিকরা ট্রয়ে সিনন নামক এক ডাবল এজেন্টকে রেখে যায়। পরদিন ট্রোজানরা ট্রয়ের বাইরে গ্রিক সৈন্যদের না দেখে অবাক হয় এবং কাঠের ঘোড়াটি দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে।
গ্রিক ডাবল এজেন্ট সিনন ট্রোজানদের বোঝান যে গ্রীকরা এই যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করে পলায়ন করেছে, এবং ‘ট্রোজান হর্স’ একটি ঐশ্বরিক উপহার যা ট্রয়ের জন্য অনেক সৌভাগ্য নিয়ে আসবে। যদিও অ্যাপোলোর পুরোহিত লাওকুন এবং জ্যোতিষ ক্যাসান্দ্রা ট্রোজানদের সতর্ক করে, কিন্তু তাদেরকে কেউ বিশ্বাস করেনি। সব নিষেধ উপেক্ষা করে কোনোকিছু না ভেবেই আনন্দের সঙ্গে ট্রোজানরা ঘোড়াকে শহরে নিয়ে আসে। এরপর ট্রয়ের বাসিন্দারা বিজয় উদযাপন শুরু করে। ট্রোজানদের এই বিজয়োল্লাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সেদিন রাতে গ্রিক জাহাজগুলো পুনরায় ট্রয়ের উপকূলে ফিরে আসে, এবং ঘোড়ার ভিতরে লুকিয়ে থাকা গ্রিক সৈন্যরা বের হয়ে এসে শহরের প্রধান ফটক খুলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই হাজার হাজার গ্রিক সৈন্য ট্রয় নগরীর অভ্যন্তরে ঢুকতে থাকে।
এক দশকব্যাপী ধরে রাখা ট্রোজানদের প্রতিরক্ষা এত সহজেই অতিক্রম করে গ্রিকরা। শহরে ঢুকেই গ্রিকরা গণহত্যা শুরু করে, এবং নগরীর অধিকাংশ স্থানে আগুন লাগিয়ে দেয়। গ্রিকরা ট্রয়ের বসতবাড়ি থেকে শুরু করে উপাসনালয় পর্যন্ত ধ্বংস করতে শুরু করে। ট্রোজানরাজ প্রায়ামকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ট্রোজানরা আর কোনো প্রতিরোধই করতে পারেনি। অবশেষে, এক দশকব্যাপী যুদ্ধের পর, গ্রিকদের হাতে ট্রোজানদের বিখ্যাত ট্রয় নগরীর পতন ঘটে। এভাবে এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের অবসান হয়। গণহত্যা থেকে বেঁচে থাকা কয়েকজন বীরের একজন ছিলেন ঈনিয়াস, যিনি পরবর্তীকালে ট্রয় থেকে ইতালিতে যান, এবং প্রথম রোমান রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন।
দেব-দেবীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও ষড়যন্ত্র থেকে শুরু হয়ে গ্রিস এবং ট্রয়ের মধ্যে দীর্ঘ ১০ বছরব্যাপী সংঘটিত এই যুদ্ধ প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনাগুলোর একটি। ট্রয়ের যুদ্ধ গ্রিক উপকথা ও প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের অন্যতম কথিত কাহিনী। হোমারের ইলিয়াড ও অডেসি থেকে শুরু করে ভার্জিলের ইনিডসহ অনেক সাহিত্যে ট্রোজান যুদ্ধের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। ট্রোজান যুদ্ধ প্রাচীন পৃথিবী থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে পশ্চিমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। শিল্পী-সাহিত্যিকরা এখনও এই পৌরাণিক যুদ্ধ নিয়ে মাতামাতি করেন। এই যুদ্ধগাথা গ্রিক তথা পশ্চিমা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।
২৫
বিখ্যাত ট্রয় নগরীর গোড়াপত্তন হলো যেভাবে
ট্রয় নগরী উত্থানের আখ্যান বর্ণনা করতে হলে ফিরে যেতে হবে সম্রাট ড্যারডানাসের আমলে। ড্যারডানাস হলেন গ্রিক পুরাণে বর্ণিত পৃথিবীর একদম শুরুর দিকের একজন বাদশাহ। পৃথিবীতে মহাপ্লাবন সংঘটিত হবার আগে তিনি অ্যারকাডিয়া সাম্রাজ্যের মসনদে আসীন ছিলেন। তবে পরিচালনার দায়ভার শুধু তার একার ছিল না। ড্যারডানাসের অগ্রজ ইয়াজিনও ছোট ভাইয়ের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাম্রাজ্য দেখাশোনা করেছেন। এই দুজন ছিলেন দেবরাজ জিউস এবং ইলেক্ট্রার ঔরসজাত সন্তান। সেই হিসেবে তারা ছিলেন টাইটান অ্যাটলাসের দৌহিত্র।
গ্রিক পুরাণ অনুসারে, এই ধরণী অধার্মিক, ঝগড়াটে ও হিংসুক মানুষ দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গেলে দেবরাজ জিউস এক মহাপ্লাবনের পরিকল্পনা করেন। জিউসের উদ্দেশ্য ছিল, তিনি পৃথিবী থেকে সকল পাপী ও পাপের চিহ্ন মুছে ফেলবেন। মহাপ্লাবনের সময় বেঁচে থাকা অ্যারকাডিয়ানরা আশ্রয় নিয়েছিল এক পাহাড়ের চূড়ায়। জিউসের আদেশেই ড্যারডানাস এবং ইয়াজিয়ন সিদ্ধান্ত নিলেন, অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হবার জন্য তারা বিশাল এক নৌকা নির্মাণ করবেন। সবাই হাত লাগালে দ্রুতই ফুরিয়ে এলো নৌকার কাজ। ভ্রমণের জন্য মহাপ্লাবনের বুকে প্রজাদের নিয়ে তরী ভাসালেন ড্যারডানাস। বলে রাখা ভালো, আইডাস ও ডেইমাস নামে দুই পুত্র সন্তান ছিল ড্যারডানাসের। আইডাস তার বাবার সাথে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলেও ডেইমাস ওখানেই থেকে গেলেন। মহাপ্লাবনের সমাপ্তি ঘটার পর ডেইমাস হয়ে উঠেছিলেন ওই জায়গার শাসনকর্তা।
এভাবে দিনের পর দিন গড়িয়ে যেতে লাগল। চলতে চলতে তরী গিয়ে ঠেকল স্যামোথ্রেসের এক দ্বীপে। সবাই সেই দ্বীপে কিছুদিন অবস্থান করল। অনুর্বর জমির জন্য সেই দ্বীপ মনে ধরেনি ড্যারডানাসের। এছাড়াও দ্বীপটিতে বড় ভাই ইয়াজিয়নকে হারিয়ে ফেলেছিলেন ড্যারডানাস। তবে ইয়াজিয়নকে নিয়ে অন্যরকম আরেকটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। ক্যাডমাস ও হারমোনিয়ার বিয়েতে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল ড্যারডানাস এবং ইয়াজিয়নকে। বিবাহ ভোজনের সময় দেবী ডিমিটার ভুলিয়ে ভালিয়ে মোহের মায়ায় আচ্ছন্ন করে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন ইয়াজিয়নকে। রঙ-তামাশার পর যখন তারা বিবাহ ভোজনে ফিরে আসলেন, তখন পুরো ব্যাপারটি জানতে পারেন দেবরাজ জিউস। ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে তিনি বজ্রাঘাতে সাথে সাথে খুন করে ফেলেন ইয়াজিয়নকে।
যা-ই হোক, ড্যারডানাস এবং তার পুত্র আইডাস স্যামোথ্রেস ত্যাগ করার পর এশিয়া মাইনরের নিকটবর্তী শহর অ্যাবিডসে এসে পৌঁছলেন। আগন্তুক হিসেবে তাদের সাদরে আমন্ত্রণ জানালেন ওখানের বাদশাহ টিউকার। তারপর ড্যারডানাসের সাথে বাদশাহ টিউকার তার নিজ কন্যা বাটেয়াকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দেন। উত্তরাধিকারসূত্রে টিউকাস তার রাজ্যের কিছু অংশ ড্যারডানাসকে দিয়ে দেন। ওই স্থানে ড্যারডানাস নতুন এক বসতি গড়ে তুললেন, এবং ওই অঞ্চলের নামকরণ করলেন নিজের নামানুসারেই।
সময়ের সাথে সাথে সেই ড্যারডানিয়া নগরীর ক্রমশ বিস্তৃতি ঘটতে লাগল। সম্রাট ড্যারডানাস এবং বাটেয়ার কোল আলো করে আইরাস ও এরিক্টোনিয়াস নামে দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করে, যাদের উত্তরসূরিরাই গ্রিক উপকথার পাতায় পাতায় সুবিদিত হয়ে আছেন। এরিক্টোনিয়াসের সাথে নদীর দেবী সিমোয়েসের কন্যা অ্যাস্টিওসির বিয়ের ফলে তাদের ঘরে জন্ম নেয় ট্রস নামক এক সন্তান। এই ট্রসের পুত্রের মধ্যে আবার আইলাস, গ্যানোমিড এবং অ্যাসারাকাস অন্যতম। এই আইলাস ইলিয়ান নামে এক নগরীর নির্মাণে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। বাবা ‘ট্রস’ এর সম্মানার্থে পরবর্তীতে ইলিয়ান নগরীর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ট্রয়’।
কিংবদন্তি অনুসারে, গ্যানোমিডকে দেখে প্রচণ্ড ভালো লেগে যাওয়ায় তাকে অপহরণ করেন দেবরাজ জিউস। ছেলে হারানোর শোকে পাথর হওয়া ট্রসকে সান্ত্বনাস্বরূপ জিউস তখন উপহার পাঠালেন। তিনি দেবদূত হারমেসকে দিয়ে দুটি স্বর্গীয় ঘোড়া ট্রসের নিকট উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করলেন, যেগুলো ছুটতে পারত হাওয়ার বেগে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, স্বর্গীয় সামগ্রী হওয়ায় দুটি ঘোড়াই ছিল অমর। হারমেস ট্রসকে এ বলেও আশ্বস্ত করে দিয়েছিল যে, গ্যানোমিডকে নিযুক্ত করা হয়েছে দেবতাদের মদ্য পরিবেশক হিসেবে। যেহেতু সে দেবতাদের সেবায় সরাসরি নিযুক্ত, তাই সে অমরত্বও লাভ করে ফেলেছে।
ট্রয় নগরীর বর্ণনা দিতে হলে সম্রাট লাওমেডনের পরিচিতিও খোলাসা করার প্রয়োজন। লাওমেডন ছিলেন আইলাসের সন্তান এবং গ্যানোমিড এবং অ্যাসারাকাসের ভ্রাতুষ্পুত্র। লাওমেডনের মায়ের নাম ছিল ইউরিডাইসি, যিনি ছিলেন অ্যারগসের বাদশাহ অ্যাড্রাস্টাসের কন্যা। থেমিস্ট ও টেলেক্লিয়া নামে দুই বোনও ছিল লাওমেডনের। একাধিক স্ত্রী নিয়ে রাজমহল আলোকিত করে রেখেছিলেন সম্রাট লাওমেডন।
তাদের মধ্যে পটামই স্ক্যামান্ডারের কন্যা স্ট্রেইমো এবং রিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্য স্ত্রীদের নাম হলো প্ল্যাসিয়া, থোসা, এবং লিওসিপ। এই স্ত্রীদের গর্ভেই জন্ম নিয়েছিল লাওমেডনের সন্তান থিটোনাস, ল্যাম্পাস, ক্লাইটিয়াস, হাইসটাও, পোডারসেস প্রমুখ। এদের মধ্যে উপকথায় প্রথম জনপ্রিয়তার মুখ দেখে থিটোনাস, যাকে দেবী ইয়োস অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য পোডারসেসের কপালেই জনপ্রিয়তার মুকুট চিরস্থায়ী হয়। লাওমেডনের কন্যাদের মধ্যে হেসিওনি, সিলা, অ্যাস্টিওসি, অ্যান্টিগন, প্রোক্লিয়ার নাম উপকথার পাতায় অক্ষয় হয়ে আছে।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, ট্রয় নগরীর সুবিশাল প্রাচীর তৈরিতে হাত লাগিয়েছিল খোদ দেবতারাও। প্রাচীর নির্মাণের কাহিনীটাও বেশ চমৎকার। দেবরাজ জিউস একবার ষড়যন্ত্রের অপরাধে সঙ্গীতের দেবতা অ্যাপোলো এবং সমুদ্র দেবতা পসেইডনকে এক বছরের জন্য অলিম্পাসের চূড়া থেকে নির্বাসিত করে দিলেন। ফলে মর্ত্যলোকে এসে ঠাঁই নিলেন দেবতা অ্যাপোলো এবং পসেইডন।
পৃথিবীতে এসে জনসাধারণের মতোই কর্মসন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন দুই দেবতা। তারা কাজ পেয়ে গেলেন তৎকালীন ট্রয়ের অধীশ্বর রাজা লাওমেডনের কৃপায়। অ্যাপোলোকে নিযুক্ত করা হলো পশুসম্পদ দেখভালের জন্য, আর পসেইডন পেলেন ট্রয়ের প্রাচীর নির্মাণের কাজ। পসেইডন একা হাতে কাজ সামলাতে পারছিলেন না বলে তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন অ্যাগিনার মরণশীল রাজা অ্যাকাস। লাওমেডন সমুদ্র দেবতা পসেইডন এবং দেবতা অ্যাপোলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হলেন যে, দুই দেবতা মিলে যদি ট্রয়ের দুর্ভেদ্য এক প্রাচীর নির্মাণ করে দেন তাহলে বাদশাহ তাদেরকে বিপুল পারিতোষিকে তুষ্ট করবেন। কিন্তু প্রাচীর নির্মাণের পর শঠতার কালো ছায়ায় আশ্রয় নিলেন লাওমেডন। তিনি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে ফেললেন। ফলে দারুণ ক্ষোভে ফেটে পড়লেন দেবতা অ্যাপোলো এবং পসেইডন। ক্রুদ্ধ হয়ে অ্যাপোলো পুরো ট্রয়ের মাটিতে মড়ক বিস্তার করে দিলেন।
ওদিকে ট্রয়ের ধ্বংস কামনা করে সমুদ্র থেকে ‘ট্রোজান সিটাস‘ নামে বিশালাকার এক দানব পাঠালেন পসেইডন। লাওমেডন সেই দানব বধের জন্য সৈন্য পাঠালেও আদতে কোনো লাভ হয়নি। ওই দানবের সামনে একমুহূর্তও টিকতে পারেনি লাওমেডনের ফৌজ। দানবটা একে একে নগরবাসীর বাড়িঘর, শস্য, ফসল সবকিছুই ধ্বংস করে ফেলতে লাগল। প্রজাদের জন্য কেঁদে উঠল বিশ্বাসঘাতক লাওমেডনের মন। তিনি মন্দিরে গিয়ে বিষণ্ণ মনে নিজ প্রজাদের জন্য দয়া ভিক্ষা চাইলেন। লাওমেডনের জন্য খানিক দয়া উদয় হলো দেবতাদের মন কোণে। তাই মন্দির থেকে দৈববাণী হলো, প্রতি বছর ট্রয়ের একজন কুমারীকে ওই দানবের কাছে দিয়ে আসতে হবে, তবেই দেবতাদের সন্তুষ্টি মিলবে। এভাবে প্রতি বছর লটারির মাধ্যমে বেছে নেয়া হতো একজন কুমারীকে, এবং তাকে উৎসর্গ করা হতো ওই সমুদ্র রাক্ষসের নিকট।
লাওমেডনের বিশ্বাসভঙ্গের ক্ষতিপূরণ চুকাতে গিয়ে একে একে বলি হলো পাঁচজন কুমারী। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে ষষ্ঠ বছরে লটারি পরীক্ষায় উঠে এলো স্বয়ং লাওমেডন কন্যা রাজকুমারী হেসিওনির নাম! কপাল চাপড়াতে থাকলেন বাদশাহ লাওমেডন, মানসিকভাবে একেবারেই ভেঙে পড়লেন তিনি। তখন রাজা গিয়ে আবারও তার ললাট ঠেকিয়ে পড়ে রইলেন দেবতাদের মন্দিরে। ফের দেবতারা সম্রাটের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে বিপদ থেকে পরিত্রাণের জন্য এক সাহায্যের ব্যবস্থা করলেন। বীরযোদ্ধা হেরাক্লিস (হারকিউলিস) তখন রাজা অ্যারিসকাসের রাজদরবার থেকে সঙ্গীদের সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তার জাহাজ ট্রয় নগরীর বন্দরে এসে থামার পর হঠাৎ তিনি দেখলেন, রাজকন্যা হেসিওনিকে নিয়ে সমুদ্রপাড়ে বিরাট শোকের মাতম চলছে। বাদশাহ লাওমেডন এবং তার রানী অঝোরে অশ্রুবর্ষণ করে যাচ্ছেন। কৌতূহলপরবশ হয়ে সমাগমের দিকে এগিয়ে গেলেন হেরাক্লিস, ঘটনার বিস্তারিত জানতে চাইলেন লাওমেডনের কাছে। বাদশাহর কাছ থেকে সমস্ত বিবরণ জানার পর ওই দানবের সাথে যুদ্ধ লড়তে সম্মত হলেন হেরাক্লিস।
যুদ্ধে লড়ার আগে হেরাক্লিস শর্ত জুড়ে দিলেন, সেই দানবকে বধ করলে তাকে যেন সম্রাটের সেই স্বর্গীয় ঘোড়া জোড়া উপহার দেয়া হয়। রাজা সানন্দে মেলে নিলেন সেই শর্ত। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন হেরাক্লিস। যেই তিনি তার সিংহচর্মে নির্মিত বস্ত্র খুলে শক্ত হাতে মুগুরটা পাকরাও করলেন, তখন বীরত্ব যেন তার ইস্পাত সদৃশ শরীর থেকে ঠিকরে পড়ছিল। খানিক পরেই বিশাল জলরাশির বুক চিড়ে বেরিয়ে এলো বিশালাকার সেই দানব। বড় বড় দাঁতের ফাঁকে ফেনা গড়িয়ে পড়ছে তার, ভারিক্কি ও ভয়ংকর চেহারার জন্য পুরো সমুদ্রটাকে মৃত্যুপুরী মনে হচ্ছে। দুঃসাহসী হেরাক্লিসের মুগুরের এক আঘাতেই ধরাশায়ী হলো দানব, অচেতন হয়ে গেলো সে। পরবর্তীতে হেরাক্লিস তার তরবারি দাবনটার হৃৎপিণ্ড বরাবর ঢুকিয়ে দিতেই সমুদ্রের নীল জলরাশি টকটকে লাল শরবতের রূপ নিলো।
এই যাত্রায় বেঁচে গেলো রাজকন্যা হেসিওনি। সকলেই ভাবল, পূর্বের বিশ্বাসঘাতকতার ফল ভোগ, পাপের প্রায়শ্চিত্ত এবং হেরাক্লিসের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রাজা লাওমেডন হয়ত তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। কিন্তু সকলের ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করে এবারেও বেঁকে বসলেন রাজা লাওমেডন। কিছুদিন পর একটি পরীক্ষা শেষ করে রাজা লাওমেডনের কাছে ফিরে এলেন হেরাক্লিস। কিন্তু হেরাক্লিসের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নিলেন লাওমেডন। তিনি দুটো ঘোড়া পাঠালেন ঠিকই, তবে সেগুলো দেবরাজ জিউসের দেয়া স্বর্গীয় ঘোড়া নয়। প্রবঞ্চনার শিকার হওয়ায় হেরাক্লিস ক্রোধে অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, লাওমেডনকে তিনি উপযুক্ত শাস্তি দিয়েই ছাড়বেন।
ট্রাকিসে যুবতী স্ত্রী ডিয়ানিরাকে রেখে ভ্রাতুষ্পুত্র আইওলাসকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন হেরাক্লিস। সাহায্যে পাওয়ার আশা নিয়ে প্রথমেই দ্বারস্থ হলেন পুরনো বন্ধু টেলামন এবং পেলিয়াসের কাছে। টেলামন মাত্র কিছুদিন আগেই অ্যাথেন্সের স্যালামিসে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন। সাংসারিক সকল ব্যস্ততার পাট চুকিয়ে মোট ছ’টা জাহাজের ব্যবস্থা করলেন টেলামন। সাথে যোগ দিলেন পেলিয়াস, ওইক্লিস, আইওলাস, ডাইমাকাসের মতো গ্রীক বীরেরা। প্রত্যেককে একটি করে জাহাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হলো।
মহাবীর হেরাক্লিসের নেতৃত্বে সমুদ্রের বুক চিরে আপন গতিতে ট্রয়ের দিকে এগিয়ে চলল যুদ্ধজাহাজগুলো। ট্রয়ের উপকূলে এসে ওইক্লিসকে জাহাজের পাহারায় রেখে বাকিরা আক্রমণ চালালেন নগরীতে। অকস্মাৎ এই হামলার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না রাজা লাওমেডন। তবে তৎক্ষণাৎ তিনি ফন্দি আঁটলেন। কিছু সৈন্য যোগাড় করে গোপন পথে এগোতে থাকলেন জাহাজগুলোর দিকে। প্রথমেই কব্জায় পেয়ে গেলেন অপ্রস্তুত ওইক্লিসকে, নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো তাকে। ওই গোপন পথের বাঁক ধরেই ট্রয়ে ফিরে এলেন লাওমেডন। পথে অবশ্য হেরাক্লিসের কিছু সৈন্যের সাথে হালকা যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি, কিন্তু সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেন। সুস্থ দেহে নগরীতে পৌঁছানোর সাথে সাথেই বন্ধ করে দিলেন নগরীর দরজা।
ওদিকে, পুরো ট্রয় নগরীকেই চারদিক থেকে অবরোধ করে রাখলেন হেরাক্লিস। তবে তাকে বেশিদিন এ নগরী অবরোধের বেষ্টনীতে রাখতে হয়নি। ট্রয় নগরীর প্রাচীর দেবতা অ্যাপোলো এবং পসেইডন নির্মাণ করলেও, তাদের সাহায্য করেছিলেন টেলামন আর পেলিয়াসের বাবা সম্রাট অ্যাকাস। মরণশীল মানুষের হাত লেগেছে বলে প্রাচীরটি পুরোপুরি অমর হতে পারেনি। বাবার মুখে ট্রয়ের বিখ্যাত প্রাচীরের গল্প শুনতে শুনতেই বড় হয়েছেন পেলিয়াস। প্রাচীরের কোথায় ফাঁকফোকর আছে, তা পেলিয়াস ভালো করেই জানতেন। বাকিদের জানিয়ে দিলেন সেই দুর্বলতার কথা, গর্ত দিয়ে পঙ্গপালের মতো প্রবেশ করল তার অনুসারীরা। হেরাক্লিস নগরীর প্রধান দুর্গে আক্রমণ শুরু করলেই দু’পক্ষের মাঝে বাধে মরণপণ লড়াই। খানিক বাদে দেখা গেলো মৃত লাওমেডনের নিথর দেহ লুটিয়ে আছে মাটিতে। রাজার ছোট সন্তান পোডারসেস বাদে আর কেউ বেঁচে নেই তখন। যুদ্ধের পর সকল বন্দীদের সামনে এনে দাঁড় করালেন হেরাক্লিস। বন্দীদের মধ্যে রাজকুমারী হেসিনওনিও ছিল। তখন হেরাক্লিস বললেন,
“টেলামন, উপহার হিসেবে নিয়ে নাও এই রাজকুমারীকে। আর হেসিওনি, তুমি চাইলে এই বন্দীদের মাঝখান থেকে যেকোনো একজনকে মুক্ত করে নিতে পারো।”
বেদনায় জর্জরিত হেসিওনি তখন ক্রন্দনরত কণ্ঠে জবাব দিলো, “হে মহাবীর হেরাক্লিস, আমার ভাইকে আপনি মুক্ত করে দিন। সে যেন এই ধ্বংসপ্রাপ্ত ট্রয়কে আবার নিজ হাতে পুনর্নির্মাণ করতে পারে।”
প্রত্যুত্তরে হেরাক্লিস জানান দিলেন, “আমি তোমার এই প্রার্থনা এক শর্তে মঞ্জুর করব। যেহেতু সে আমার দাস, সেজন্য তাকে ক্রয় করে নিতে হবে
আমার কাছ থেকে। তোমার মুখাবরণটাও মুক্তিপণ হিসেবে মন্দ নয়।”
সাথে সাথে নিজের স্বর্ণ-খচিত মুখাবরণ খুলে দিলো হেসিওনি, মুক্ত করল পোডারসেসকে। এরপর থেকেই পোডারসেসের নাম হয়ে গেলো ‘প্রায়াম’, যার অর্থ ‘মুক্তিপণ দেয়া হয়েছে’। হেসিওনিকে অনুচর টেলামনের সাথ বিয়ে দিয়ে, প্রায়ামকে ট্রয়ের মসনদে বসিয়ে আসলেন হেরাক্লিস। তারপর তিনি দলবল নিয়ে চিরদিনের জন্য ট্রয় ছেড়ে চলে আসেন। রাজা লাওমেডন চিরনিদ্রায় শায়িত ছিলেন ট্রয়ের সিয়ান ফটকের কাছে। কথিত আছে, লাওমেডনের কবর যতদিন অক্ষত ছিল, ততদিন ট্রয় নগরীতে কোনো শত্রুর অনুপ্রবেশ হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখব গ্রিস ও ট্রয়ের টানা দশ বছরের যুদ্ধ শেষে কাঠের ঘোড়া নগরীতে ঢোকানোর সময় নগরীর প্রধান ফটক বড় করার প্রয়োজন পড়ে। ফলে উচ্ছেদ করা হয় লাওমেডনের অক্ষত কবর। এরপরেই পতন ঘটে শত বছর শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত ট্রয় নগরীর।
ওদিকে, ধীরে ধীরে শৌর্যবীর্য নিয়ে ট্রয়ের নির্মল আলো-বাতাসে বেড়ে উঠতে লাগলেন প্রায়াম। একসময় তিনি হেকুবার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রাজা প্রায়াম এবং তার রানী হেকুবার রাজত্বকালে ট্রয় ক্রমশ সম্পদ ও শক্তিতে ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে। নগরীর কল্যাণ এবং সেটাকে সংঘাত-সংঘর্ষের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুললেন, নির্মাণ করলে বিশাল বিশাল সুউচ্চ এবং সুদৃঢ় দুর্গ। ট্রয়ের পাশ দিয়ে কোনো জাহাজ গেলে সেটা থেকেও কর আদায়ের ব্যবস্থা করলেন। ক্রমে ক্রমে প্রায়ামের শাসনামলে ট্রয় নগরী হয়ে উঠলো তৎকালীন প্রাচীন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর এবং পরাক্রমশালী এক রাষ্ট্রে। রাজা প্রায়াম এবং রানী হেকুবার কোল আলো করে মোট উনিশজন সন্তান জন্ম নিয়েছিল।
তাদের মধ্যে হেক্টর, প্যারিস, হেলেনাস, ক্যাসান্ড্রা, ডেইফোবাস, ট্রলিয়াস, পলিক্সেনা, ক্রিউসা, পলিডোরাস অন্যতম। তবে পৃথিবীজোড়া খ্যাতি অর্জন করতে পারা একমাত্র সন্তান ছিল হেক্টর। মহাবীর অ্যাকিলিসের নাম নিলে হেক্টরের নামও শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করা হয়। তার যুদ্ধনীতির জ্ঞান এবং যুদ্ধকৌশলে পারদর্শিতা তৎকালীন ট্রয়ের আর কারও ছিল না। মনের উদারতা, এবং আনুগত্যেও তিনি সকলের নজর কেড়ে নিয়েছিলেন। যদি গুণের দিকগুলো তুলনা করা হয়, তবে প্রেমের দেবী আফ্রোদাইতির সন্তান এবং প্রায়ামের ভ্রাতুষ্পুত্র ইনিয়াস ছাড়া তার সমকক্ষ আর কেউ ছিলেন না। এই ইনিয়াসই রোমান জাতির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। Mohasin Alam Roni
২৬
আমাদের চারপাশে কীভাবে একটি সুন্দর সামাজিক পরিবেশ বা "কমিউনিটি" গড়ে তোলা যায়, সে বিষয়ে ৮টি চমৎকার বুদ্ধি এখানে দেয়া হলো-
১. প্রতিবেশীদের ছোট ছোট সাহায্য করা: অনেক সময় আমরা সাহায্য চাইতে দ্বিধা করি। কিন্তু বাগানের কাজ বা কেনাকাটার মতো ছোট ছোট বিষয়ে প্রতিবেশীর সাহায্য নেওয়া বা তাঁদের সাহায্য করা সম্পর্কের জড়তা কাটায়।
২. একই জায়গায় বারবার যাওয়া: আপনি যদি নিয়মিত কোনো একটি নির্দিষ্ট কফিশপ, লাইব্রেরি বা পার্কে যান, তবে সেখানকার পরিচিত মুখগুলোর সাথে ধীরে ধীরে সখ্যতা গড়ে ওঠে। এটি একাকীত্ব দূর করতে সাহায্য করে।
৩. নিজে উদ্যোগ নিয়ে আয়োজন করা: কেউ আপনাকে ডাকবে সেই অপেক্ষায় না থেকে নিজেই ছোট কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করুন। হতে পারে সেটা সামান্য চা-চক্র বা একসাথে হাঁটা। মানুষ সাধারণত আমন্ত্রিত হতে পছন্দ করে।
৪. কাজের বিনিময় (Skill Sharing): আপনার যা দক্ষতা আছে (যেমন: রান্না বা কম্পিউটার ঠিক করা) তা দিয়ে অন্যকে সাহায্য করুন। বিনিময়ে অন্য কারও কাছ থেকে আপনার প্রয়োজনীয় কিছু শিখে নিন। এতে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়।
৫. খাবার ভাগ করে নেওয়া: খাবার মানুষের মন জয় করার সবচেয়ে সহজ উপায়। অতিরিক্ত রান্না করলে প্রতিবেশীকে এক বাটি দিয়ে আসুন। এটি খুব দ্রুত বন্ধুত্ব তৈরি করে।
৬. বাচ্চা বা পোষা প্রাণীর মাধ্যমে যোগাযোগ: যাদের সন্তান আছে বা পোষা প্রাণী আছে, তারা পার্কে গিয়ে খুব সহজেই অন্য অভিভাবকদের সাথে কথা বলতে পারেন। এটি নতুন বন্ধু তৈরির একটি প্রাকৃতিক মাধ্যম।
৭. অনলাইন গ্রুপকে বাস্তবে রূপ দেওয়া: আপনার এলাকার ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শুধু চ্যাট না করে মাঝে মাঝে সামনাসামনি দেখা করার প্রস্তাব দিন।
৮. সহজ ও সাধারণ থাকা: খুব বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। সাধারণ ব্যবহার এবং একটু হাসি দিয়েই একটি সুন্দর কমিউনিটি গড়ে তোলা সম্ভব।
__________________
আমরা একা থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু মানুষের সাহচর্য আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমেই আপনি আপনার চারপাশের মানুষদের নিয়ে একটি আপন 'গ্রাম' বা 'সমাজ' তৈরি করতে পারেন।
২৭
এরিদু: মেসোপটেমীয় সভ্যতার প্রাচীনতম শহর
সোপটেমিয়ার দক্ষিণ অংশে গড়ে উঠা সুমেরীয় সভ্যতাকে বলা যেতে পারে মেসোপটেমীয় সভ্যতার স্রষ্টা। বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী উর্বর স্থানেই গোড়াপত্তন ঘটে সুমেরীয় সভ্যতার। প্রাচীন এই সুমেরীয়রাই গড়ে তুলেছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম শহর এরিদু। খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ৫৪০০ অব্দের দিকে এরিদু শহরের উত্থান বলে বিশেষজ্ঞদের মতামত।
গঠন
উর শহরের ১২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এরিদু ছিল মেসোপটেমিয়ার সর্বদক্ষিণের এক প্রাচীন শহর, যা গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন ধর্মীয় মন্দিরকে ঘিরে। একটি মাটির ইটের পিঠে আরেকটি ইট চাপিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এর দালানসমূহ। চারপাশের বিভিন্ন গ্রামের মাঝে ভিতরে সুরক্ষিত মন্দির। এটিই ছিল এরিদু শহরের মূল ভিত্তি-কাঠামো। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে পাওয়া যায়, খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের দিকে এরিদু ১০০ একরের জায়গা দিয়ে বেষ্টিত ছিল। এর মধ্যে ৫০ একর ছিল আবাসিক স্থল আর ৩০ একর বরাদ্দ ছিল অ্যাক্রোপলিসের (নগর-কেন্দ্রের উচ্চভূমি) জন্য।
অস্ট্রেলিয়ান ইতিহাসবিদ গয়েনডলিন লেইকের মতানুযায়ী, এরিদু ছিল তিনটি পৃথক সংস্কৃতি ও জাতির মিলনস্থল। উত্তরের সামারা সংস্কৃতি থেকে আগত মানুষেরা জড়িত ছিল কৃষিব্যবস্থার সাথে। তারা সেচ ব্যবস্থার পাশাপাশি খাল নির্মাণের সাথেও জড়িত ছিল। তাদের ঘরগুলো ছিল কাদামাটির ইট দিয়ে তৈরি। আবার, আরব উপকূলীয় অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায় আরব উপকূল বরাবর বাসস্থান গড়ে তুলেছিল। এদের একাংশকে ধরা হয় আদি সুমেরীয় হিসেবে। তারা বাস করত কুঁড়েঘরে।
এরিদু শহর নির্মাণে অবদান রাখা তৃতীয় সংস্কৃতিটি হলো মরুতে বসবাসরত সেমিটিক-ভাষাভাষী যাযাবর সম্প্রদায়, যারা ভেড়া ও ছাগলের পালের উপর জীবিকা নির্বাহ করত। শহর উত্থানের সময়কালে এই তিন সংস্কৃতির মানুষই শহরে এসে জড়ো হয়েছিল, যা এরিদুর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক অনুপম মিশ্রণকে প্রদর্শন করে। এরিদু সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার মন্দির জিগুরাতের জন্য। জিগুরাত মানে হচ্ছে মন্দিরের ভিত্তি। এর দ্বারা উচ্চ স্থানে অবস্থিত মন্দিরে পৌঁছানো যায়। এরিদুতে সর্বপ্রথম জিগুরাত নির্মাণ করা হয় উবাইদ যুগে, খ্রি.পূ. ৫৫৭০ অব্দে। এই জিগুরাতের কেন্দ্রে থাকত ছোট এক কক্ষ, বিশেষজ্ঞরা যার নাম দিয়েছেন ‘কাল্ট নিচে’। দীর্ঘ একটা সময় বিরতির পর এর চেয়েও বৃহৎ মন্দির নির্মিত হয়েছে।
উপকথায় এরিদু
সুমেরীয় পুরাণে বর্ণিত সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে এরিদু শহরের নাম। এরিদু ছিল দেবতা ‘এনকি’র আবাসস্থল। কে এই এনকি? জানতে হলে ফিরে যেতে হবে আরও অতীতে, সুমেরীয় উপকথার সৃষ্টিতত্ত্বে। আদিতে ছিল শুধু এক ঘূর্ণায়মান জলধারা, যার নাম হলো নাম্মু। আমাদের চিরচেনা পৃথিবীর আকাশ, বাতাস কিংবা স্বর্গ, নরক কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না তখন। নাম্মু জন্ম দিলেন স্বর্গ ও পৃথিবীর। স্বর্গের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হলেন দেবতা আনু, আর পৃথিবীর দায়িত্ব নিলেন দেবী কি।
এরিদু শহরের গুরুত্ব
অ্যাসিরিয়ার দরবার থেকে এরিদুতে এসে চিকিৎসকেরা প্রশিক্ষণ নিয়ে যেত, যাতে তারা উপসর্গ দেখেই রোগের কারণ, প্রতিকার, ও প্রতিরোধের উপায় বাতলে দিতে পারেন। নিরাময়ে তারা ঔষধের পাশাপাশি জাদুবিদ্যায়ও বিশ্বাস রাখতেন। শুরুর দিকে এখানকার বাসিন্দাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম ছিল মৎস্য শিকার। ধ্বংসাবশেষে মাছ ধরার জাল, মাছের কাটা ইত্যাদি পাওয়া গেছে। এছাড়াও, মেসোপটেমিয়ায় সর্বপ্রথম বৃহৎ নৌকা তৈরির সন্ধান পাওয়া গেছে এই এরিদুতেই। ধারণা করা হয়, এই শহর ছিল মৃৎশিল্প উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল।
এরিদুর পতন
এরিদু বেশ ভালোভাবে বিস্তৃতি লাভ করে উবাইদ যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব ৬৫০০ অব্দ – খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭০০ অব্দ)। তখন এর আয়তন ছিল ২০-২৫ একরের কাছাকাছি, জনসংখ্যাও ছিল প্রায় ৪ হাজার ছুঁই ছুঁই। উবাইদ যুগের পর, এরিদুতে সমস্ত ব্যবহারিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয় প্রাক-রাজবংশীয় সময়কালে (খ্রিষ্টপূর্ব ২৯০০ অব্দ – খ্রিষ্টপূর্ব ২৩৫০ অব্দ) শহরটি পুনরায় সচল করা। ওই রাজবংশের একটি প্রাসাদও নির্মাণ করেছিল এরিদুতে। ইতিহাসবিদ রুথ হোয়াইটহাউজ এই শহরকে ‘প্রধান প্রারম্ভিক রাজবংশীয় শহর’ বলেও অভিহিত করেছেন। খ্রি.পূ. ২০৫০ অব্দের পর শহরটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
দীর্ঘ সময় ধরে পরিত্যক্ত থাকতে থাকতে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে এটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। বিভিন্ন সমস্যার মুখে পতিত হওয়ায় এরিদুর বাসিন্দারা সরে যায় অন্যত্র, গড়ে ওঠে ব্যবিলন শহর। ব্যবিলন শহরে গড়ে ওঠার পর পরই সমাপ্তি ঘটে সুমেরীয় সভ্যতার। @ Mohasin Alam Roni
২৮
সিন্ধু সভ্যতা কি আর্যরাই গড়ে তুলেছিল?
অনুমান করা হয়, সিন্ধু সভ্যতার কালপর্ব খ্রিষ্টপূর্ব ২৮০০ অব্দ থেকে শুরু হয়ে খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই সভ্যতার কেন্দ্রস্থল ছিল প্রাচীন ভারতবর্ষের পশ্চিমাঞ্চলের সিন্ধু অববাহিকায়। পরবর্তীতে তা বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে ঘগ্গর নদী উপত্যকায়। অনেকের দাবি, সিন্ধু সভ্যতার উত্থান ঘটেছিল আর্যদের হাত ধরেই।
ধারণা করা হয়, ভারতবর্ষে ৮০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার বছর পূর্বে মানবজাতি বসতি গড়েছিল। তবে তারা বনে-জঙ্গলে আর পাহাড়ের গুহায় বাস করতো। খাদ্যের মূল উৎস ছিল পশু শিকার এবং গাছের ফলমূল। ভারতবর্ষ আধুনিক সভ্যতার যাত্রা শুরু করে পাঁচ হাজার বছর আগে। সামসময়িক যুগে দজলা-ফোরাতের অববাহিকায় প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতা, নীল নদের তীরে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতাসহ কয়েকটি অঞ্চলে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, প্রাচীন ভারতবর্ষের এই সভ্যতার জনক কারা? হরপ্পায় যে সকল নরকঙ্কালের সন্ধান মিলেছে, সেগুলো বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালিয়ে ধারণা করা হচ্ছে, অনেক ছোট ছোট জাতি সে অঞ্চলে বহু আগে থেকেই বসবাস করতো। এদের মধ্য থেকে একদল এসেছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে। তাদের আবাসস্থল ছিল পশ্চিম এশিয়া। সম্ভবত তারা প্রোটো-দ্রাবিড় গোষ্ঠী ছিল। তাই, সিন্ধু সভ্যতা নির্মাণের কৃতিত্ব বহুলাংশেই অনার্য জাতিগোষ্ঠীর উপর বর্তায়।
আর্যরা কোনো জাতি নয়। আর্য হলো এক ভাষাগোষ্ঠীর নাম। সকল ইন্দো-ইয়োরোপীয় ভাষাভাষীদের আর্য বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এরা বসবাস করত প্রাচীন ইরাক, ইরান, মধ্য এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, গ্রিস, ইত্যাদি অঞ্চলে। এদের মধ্যে একটা অংশ একসময় ইউরোপের দিকে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। আর এক অংশ পাকিস্তান, আফগানিস্তান হয়ে প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। ঠিক এই কারণেই, মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ এবং ভারতীয় উপমহাদেশে পৌরাণিক দেব-দেবী, প্রাচীন শিল্প, ভাষা ও শব্দে বহু সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। এদেরকেই মূলত আর্য বলা হয়। স্বাভাবিকভাবে যারা আর্য নয়, তারাই অনার্য।
১
আর্যরা ভারতবর্ষে তাদের প্রথম পদচিহ্ন রেখেছিল আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে। তখন সিন্ধু সভ্যতা বিকাশের অন্তিম বা অন্তিম মধ্য পর্যায় চলমান। আর্যরা ভারতের দোয়াব অঞ্চলে সর্বপ্রথম নিজেদের আস্তানা গেড়েছিল। মহেনজোদারোর খননকার্য থেকে প্রাপ্ত নিদর্শনকে কার্বন ডেটিং করে জানা গেছে, সিন্ধু সভ্যতা পূর্ণ পরিণতি লাভ করেছিল খ্রিষ্টপূর্ব বাইশ শতকে এবং তার ক্রমবিকাশ অব্যাহত ছিল খ্রিষ্টপূর্ব আঠারো শতক পর্যন্ত। হরপ্পাবাসীরা নগর নির্মাণে দক্ষ ছিল। অপরদিকে আর্যরা নগর সভ্যতা ধ্বংস করত। আর্যদের ধর্মগ্রন্থের নাম হলো বেদ। ঋগ্বেদে পুর বা নগর ধ্বংসের কাহিনী বিবৃত আছে। ঋগ্বেদ অনুযায়ী, আর্য দেবতা ইন্দ্রের নাম হলো পুরন্দর। এই পুরন্দর শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়, ‘নগর ধ্বংসের দেবতা’। যেহেতু পুরন্দর নগর ধ্বংস করেন, তাই প্রত্নতত্ত্ববিদ হুইলারের মতে, নগরজীবনের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণকারী আর্যগোষ্ঠী স্বীয় দেবতা ইন্দ্রের নেতৃত্বে হরপ্পা সভ্যতার উপর অন্তিম আঘাত হানে। তবে হরপ্পা সভ্যতা ধ্বংসের পেছনে শুধু আর্যদেরকে ঢালাওভাবে দোষারোপ করা যায় না। হরপ্পা আগে থেকেই অর্থনীতিসহ বিভিন্ন দিকে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গিয়েছিল।
২
হরপ্পাবাসীরা শিশ্নের উপাসনা ও মাতৃকা দেবীর পূজা করত। অপরদিকে আর্যরা লিঙ্গ পূজা ঘৃণা করত। আর্যরা বেদ নিয়ে এসেছিল ভারতবর্ষে। মাতৃকা দেবীর পূজার বিষয়ে ঋগ্বেদে কোনোকিছু উল্লেখ নেই। আর্যরা নিয়মিত দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ দিতো। ওই যজ্ঞে ব্যবহৃত কোনো উপকরণের সন্ধান আজ পর্যন্ত হরপ্পা সভ্যতার প্রত্নস্থল থেকে পাওয়া যায়নি।
৩
প্রাচীন ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম ঘোড়া নিয়ে এসেছিল আর্যরা। কিন্তু হরপ্পার কোনো প্রত্নক্ষেত্র থেকে এখন অবধি কোনো ঘোড়ার কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়নি।
৪
শিব বর্তমান সনাতন ধর্মে গুরুত্বপূর্ণ একজন দেবতা হলেও, শিব ছিল মূলত হরপ্পাবাসীদের দেবতা। হরপ্পার প্রত্নস্থল থেকে শিবের স্মারক পাওয়া গেছে। ‘শিব’ শব্দের সন্ধান মিলেছে দ্রাবিড় ভাষাভাষী মানুষের শব্দভাণ্ডার থেকে। বৈদিক সমাজে শিবের আরাধনা সম্ভবত হরপ্পাবাসীদের থেকেই উদ্ভূত হয়েছিল।
৫
মৃতদেহকে আগুনে দাহ করার রীতি চালু ছিল আর্যদের মধ্যে। কিন্তু হরপ্পাবাসীরা মৃতদেহকে মাটির নিচে সমাহিত করে দিত।
৬
হরপ্পাবাসীদের মধ্যে লিপির প্রচলন থাকলেও আর্যদের কোনো লিপির প্রচলন ঘটেনি না তখনও। তারা বৈদিক সাহিত্যের শ্লোক কণ্ঠস্থ করত। আর্যদের মাঝে লিপি সূত্রপাত ঘটে আরও কয়েক শতাব্দী পর।
৭
হরপ্পাবাসীরা ব্যবসায় পটু ছিল। তারা ছিল বণিক জাতি। পারস্য উপসাগর দিয়ে মেসোপটেমিয়া, মিশরের সাথে তাদের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। অপরপক্ষে, আর্যরা ছিল যোদ্ধা জাতি। তারা ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধের পাশাপাশি স্পোক যুক্ত চাকা ব্যবহার করত। তারা তীর-ধনুক ব্যবহারেও ছিল পটু।
৮
হরপ্পা সভ্যতা ছিল কৃষিভিত্তিক। আর্যরা প্রথমে ভূমি-কর্ষণ দ্বারা ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত ছিল না। তারা ছিল যাযাবর, এবং শীতপ্রধান কোনো দেশে ছিল তাদের বাসস্থান। শরীরকে উষ্ণ রাখার উদ্দেশ্যে তারা মাংস ভক্ষণ করত। যজ্ঞে উৎসর্গীকৃত প্রাণীদের মাংস তারা ভক্ষণ করত। ভারতবর্ষে পদার্পণের পর অশ্বমেধ যজ্ঞই ছিল তাদের প্রধান যজ্ঞ। অপরদিকে হরপ্পা সভ্যতার লোকেরা ছিল মৎস্যভোজী। আবার আর্যরা মৎস্য ভক্ষণ করত না। এই হরপ্পাবাসীদের থেকেই আর্যরা কৃষিকাজের কৌশল রপ্ত করেছিল।
৯
হরপ্পা সভ্যতা যে আর্যদের দান নয়, তার জ্বলন্ত প্রমাণ বহন করছে ওই সময়ের মৃৎশিল্প। আর্য সভ্যতা যেখানে বিকশিত হয়েছিল, সে অঞ্চলে মৃৎপাত্রের রঙ ছিল গাঢ় ধূসর বর্ণের। অপরদিকে, হরপ্পা সভ্যতা থেকে যে সকল মৃৎপাত্র উদ্ধার করা গেছে, সেসবের রঙ ছিল কালো আর লাল।
১০
হরপ্পা সভ্যতায় পোড়া ইটের ব্যবহার ছিল প্রচুর। কিন্তু পোড়া ইট কীভাবে বানাতে হয় তা আর্যরা জানত না।
১১
হরপ্পা সভ্যতা ছিল মাতৃপ্রধান। কিন্তু বৈদিক সভ্যতা ছিল পুরুষপ্রধান।
১২
হরপ্পা সভ্যতা যে আর্যরা গড়ে তোলেনি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো ডিএনএ পরীক্ষা। কঙ্কালের ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে হরপ্পায় প্রান্ত কঙ্কাল আর্যভাষীদের বলে প্রমাণিত হয়নি। ওইখানে যে কঙ্কাল পাওয়া গেছে তারা মূলত, প্রোটো অস্ট্রালয়েড, মঙ্গোলয়েড, এবং আলপিয়ান জনগোষ্ঠীর মানুষের। এ থেকেই প্রতীয়মান হয়ে যে, সিন্ধু সভ্যতা আর্যরা গড়ে তুলেনি, এবং এর বহু আগেই এখানে বসবাসরত মানুষের তিলে তিলে সেই নগর সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। @ Mohasin Alam Roni
২৯
পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো ১০টি শহরের কথা
১০) বৈরুত- লেবনন
বৈরুত লেবাননের রাজধানী এবং দেশের বৃহত্তম শহর। এই শহরের সাথে জড়িয়ে আছে কমপক্ষে ৫০০০ বছরের ইতিহাস। ফিনিশীয়, গ্রীক হেলেনিয়, রোমান, আরব, ওসমানীয় আমলের সাক্ষী হয়ে আজও বেঁচে আছে বৈরুত। প্রায় ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ফেরাউনের চিঠিতে উল্লেখ্য পাওয়া যায় এই শহরের নাম। বর্তমানে প্রায় ২২ লক্ষ লোকের বাস ভূমধ্যসাগরের পাড়ে অবস্থিত এই শহরে। ১৯৯০ সালে গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে দ্রুত উন্নতি করে চলেছে বৈরুত। ২০১৫ সালে বৈরুতকে সাতটি New 7 Wonders Cities এর একটি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
০৯) গাজিয়ানটেপ-তুরস্ক
তুরস্কের দক্ষিণে আনাতোলিয়া অঞ্চলে অবস্থিত এই শহরটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন শহর। বর্তমানে গাজিয়ানটেপ শহরে প্রায় ১৫ লক্ষ অধিবাসী বাস করে। সিরিয়ার আলেপ্পো শহর থেকে মাত্র ৯৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই শহরটি ভৌগলিক অবস্থানগত দিক থেকে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে যুগে যুগে।
০৮) প্লভদিভ-বুলগেরিয়া
প্লভদিভ বুলগেরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। বর্তমান জনসংখ্যা ৫ লক্ষের মত। নিওলিথিক যুগ থেকেই এই শহরে মনুষ্য বসতির চিহ্ন পাওয়া যায়। তবে ধারণা করা হয় বিগত ৪০০০ বছর ধরে এখনও জীবিত আছে প্লভদিভ। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে পারসিয়ান সম্রাট দারিয়ুস দ্যা গ্রেট প্লভদিভ জয় করেন। এরপর বিভিন্ন সময় গ্রীক, রোমান, গথ, স্লাভ ও বাইজান্টাইন, ওসমানীয়দের অধীনে ছিল এই শহর।
০৭) সিডন-লেবানন
লেবাননের তৃতীয় বৃহত্তম শহর সিডন। ফিনিশিয় সভ্যতা গুরুত্বপূর্ণ এই শহর রাজধানী লেবননের মাত্র ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট ৩৩৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিডন জয় করেন। বলা হয়ে থাকে যিশুখ্রিস্ট এবং সেইন্ট পল নাকি এই শহরে এসেছিলেন। বর্তমানে সিডনের জনসংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষ।
০৬) আল ফায়ুম-মিশর
আল ফায়ুম আফ্রিকা এবং মিশরীয় সভ্যতার প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি। গ্রিকদের কাছে আল ফায়ুম পরিচিত ছিল কুমিরের শহর হিসাবে। আজ থেকে প্রায় ৬০০০ বছর আগে গোড়াপত্তন ঘটে এই শহরের। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে যুগে যুগে ফায়ুমের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এই বর্তমানে এর আয়তন বেশ ছোট তবে শহরের বাইরে পিরামিডসহ বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং ঐতিহাসিক মসজিদ বিদ্যমান।
০৫) শুশ- ইরান
শুশ পৃথিবীর প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি। হিব্রু বাইবেলেও উল্লেখ্য পাওয়া যায় এর নাম। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সমূহ থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে শুশ শহরের বয়স অন্তত সাড়ে ৬ হাজার বছর। বর্তমানে প্রায় এক লক্ষ লোকের বাস এই শহরে। মেসোপটেমিও এবং পারস্য সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ এই শহর ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত।
০৪) দামেস্ক-সিরিয়া
সভ্যতার প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হবে কিন্তু সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের নাম উঠে আসবে না এটা কল্পনা করাও দুরূহ ব্যাপার। প্রায় দশ হাজার বছর ধরে মানুষের বসতির চিহ্ন মেলে এখানে। তাই অনেকেই দাবি করেন দামেস্কই পৃথিবীর প্রাচীনতম শহর। তবে এখনও সেই দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ মেলেনি। সেই আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট, পম্পেই থেকে শুরু করে খালেদ ইবনে ওয়ালিদের মত অসাধারণ সব বিজেতার পদধূলিতে যুগ যুগ ধরে ধন্য দামেস্কের মাটি।
০৩) আলেপ্পো-সিরিয়া
আরবিতে হালব নামেই পরিচিত এই শহর। গৃহযুদ্ধ শুরুর আগে সিরিয়ার বৃহত্তম শহর ছিল আলেপ্পো। ইতিহাসে দামেস্কের সাথে আলেপ্পোর নাম যেন আপনা আপনিই চলে আসে। সেই প্রাচীনকালে হিট্টি, অ্যাসেরিয়, পারসিয়ান থেকে শুরু করে মধ্যযুগে ক্রুসেডসহ অসংখ্য সভ্যতার স্মৃতিবিজড়িত আলেপ্পো। যুগে যুগে ধ্বংস স্তূপ থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বারবার। মঙ্গোলরা আলেপ্পো ধ্বংস করেছে, আলেপ্পো ধ্বংস হয়েছে ক্রুসেডের সময় বারবার। তবু আজও বেঁচে আছে আলেপ্পো। বেঁচে আছে অতীতের গর্বিত ইতিহাস নিয়ে। তবে চলমান গৃহযুদ্ধে মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে সিরিয়ার উত্তরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক শহরটি। সকল ইতিহাসপ্রেমী মানুষরই এখন প্রত্যাশা হয়ত গৃহযুদ্ধ শেষে কোন একদিন আবারও আগের মতই প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর হয়ে উঠবে ৬০০০ বছরের পুরনো আলেপ্পো।
০২) বাইব্লস- লেবানন
ফিনিশিও সভ্যতার আরও একটি নিদর্শন বাইব্লস শহর। আরবী নাম জুবাইল। পৃথিবীর দ্বিতীয় প্রাচীন এই নগরের ইতিহাস প্রায় ৭০০০ বছরের পুরনো। গ্রিকরা বাইব্লোস থেকে প্যাপিরাস আমদানি করত। বাইব্লোস নামটি তাদেরই দেওয়া। রাজধানী বৈরুত থেকে ৪২ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত জুবাইল শহরের জনসংখ্যা এখন প্রায় এক লাখ। শহরটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত।
০১) জেরিকো- ফিলিস্তিন
ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্ত জেরিকো নগরীকে বলা হয় পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবিত নগরী। জেরিকোর সাথে জড়িয়ে আছে প্রায় ১১০০০ বছরের মানব সভ্যতার ইতিহাস। আরবিতে জেরিকোর নাম আরিয়াহ বা সুবাস। পৃথিবীর প্রাচীনতম নগর জেরিকোতে বর্তমান লোকসংখ্যা মাত্র ২৫ হাজার।
একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন মানব সভ্যতার প্রাচীনতম শহরগুলোর অবস্থান কিন্তু ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং তার আসে পাশে। নব্যপ্রস্তর যুগে কৃষিকাজ আয়ত্ত্ব করার পর পরই নগর সভ্যতার বিকাশ ঘটাতে শুরু করেছিল। সেই সময়ে গড়ে ওঠা কিছু শহর আজও বেঁচে আছে অতীতের সাক্ষী হয়ে। জানান দিয়ে যাচ্ছে মানব সভ্যতার ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবার ইতিহাস। হয়ত এই শহরগুলোর রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়া মানুষগুলো কান পাতলে আজও শোনে হাজার হাজার বছরের পুরনো সেই কাহিনী! Shakib Mustavee
৩০
কুকুর যেভাবে মানুষের বন্ধু হলো
কুকুরের মতো একটি প্রাণী কীভাবে মানুষের এত কাছাকাছি এলো? কীভাবে তারা মনিবের জন্য প্রাণ দিতে শিখলো? কেন তারা এত প্রভুভক্ত? কত বছরের পরিক্রমায় মানুষের বন্ধুতে পরিণত হয়েছে? কে সর্বপ্রথম কুকুরকে পোষ মানিয়েছিল?
কুকুরের বিবর্তন পরীক্ষা করার জন্য মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (mtDNA) ব্যবহার করা হয়েছে। এই গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, আজ থেকে প্রায় এক লক্ষ বছর আগে নেকড়ে এবং কুকুর দুটি আলাদা প্রজাতিতে বিভক্ত হয়েছিল। এই গবেষণার আলোকে আরো ধারণা করা হচ্ছে, কুকুরকে পোষ মানানোর প্রথা সর্বপ্রথম চালু হয়েছিল আজ থেকে ৪০ হাজার বছর আগে। কিছু পরীক্ষার বিশ্লেষণ মতে, কুকুরকে পোষ মানানোর সর্বপ্রথম প্রচেষ্টাটি গৃহীত হয়েছিল পূর্ব এশিয়ায়। আবার অনেক বিশ্লেষকের মতে, কুকুরকে সবার আগে পোষ মানানো হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে এবং পরবর্তীতে ইউরোপে ।
দুটি স্থানে পোষা কুকুরের উৎপত্তি?
২০১৬ সালে জীব প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী গ্রেগর লারসনের নেতৃত্বে একটি গবেষণা দল এমটিডিএনএ গবেষণা প্রকাশ করেছিল। প্রকাশিত গবেষণার বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, এশিয়া অঞ্চলের কুকুরগুলো এশিয়ার নেকড়েদের বংশধর। প্রায় ১২,০০০ বছর আগে এই নেকড়েদেরকে পোষ মানানোর মাধ্যমে এশীয় কুকুরদের আগমন হয়। অন্যদিকে ইউরোপের কুকুরদের আদি বংশধর হচ্ছে পুরাতন প্রস্তর যুগের ইউরোপিয়ান নেকড়ে, যাদেরকে ১৫ হাজার বছর পূর্বে মানুষ বশ্যতা স্বীকার করানোর চেষ্টা করেছিল এবং সময়ের পরিক্রমায় সেগুলো আজকের ইউরোপিয়ান কুকুরে পরিণত হয়েছে। এরপর এশিয়ান কুকুরগুলো মানুষের মাধ্যমেই ইউরোপে পৌঁছেছে এবং ইউরোপিয়ান প্রস্তরযুগের কুকুরকে ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপিত করেছে।
কুকুর পোষার গোড়াপত্তন
স্বীকৃত তথ্য এবং গবেষণালব্ধ উপাত্ত অনুসারে, পোষা কুকুরের সন্ধান সর্বপ্রথম পাওয়া গিয়েছিল ১৪ হাজার বছরের পুরনো জার্মানির বন-ওবারকাসেলের একটি কবরস্থানে, যেখানে মানুষ এবং কুকুরকে কবর দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। চীনে সর্বপ্রথম পোষা কুকুরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল ৭০০০-৫৮০০ খ্রিস্টপূর্বে নব্য প্রস্তরযুগে হেনান প্রদেশে। তবে মানুষ এবং কুকুরের সহাবস্থানের সর্বপ্রথম সন্ধান পাওয়া যায় ইউরোপের প্রস্তরযুগীয় উত্তরাঞ্চলে। সেই কুকুরগুলো যে অবধারিতভাবে পোষ্য কুকুর ছিল এমনটি না-ও হতে পারে। এসব অঞ্চলের মধ্যে বেলজিয়ামের গোয়েত গুহা, ফ্রান্সের চাউভেত গুহা, চেক-রিপাবলিকের প্রেডমস্তি অন্যতম।
ইউরোপে মধ্য প্রস্তরযুগের কিছু কবরস্থানে, যেমন- সুইডেনের স্কটহোমে কুকুরের সমাধির (খ্রিস্টপূর্ব ৫২৫০-৩৭০০) সন্ধান পাওয়া যায়। অর্থাৎ তখন থেকেই শিকারীদের সাথে কুকুরের বন্ধুত্ব রয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার উতাহ অঞ্চলের ডেঞ্জার গুহায় ১১ হাজার বছর আগের একটি সমাধিতে একটি কুকুরের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, কুকুরের এই প্রজাতিটিই এশিয়ান কুকুরদের পূর্বসূরি। নেকড়ের সাথে চলমান সংকরায়নের ফলে কুকুরের একটি চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য আমেরিকান কালো নেকড়ের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল। কালো পশম কুকুরের বৈশিষ্ট্য, নেকড়ের নয়।
আধুনিক প্রজাতি এবং প্রাচীন প্রজাতির তুলনা
ইউরোপিয়ান প্রস্তরযুগের কিছু অঞ্চলে কুকুরে প্রজাতিগত বৈচিত্র্যর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। ১৫,৫০০-১১,০০০ বছরের পুরনো মধ্যম আকারের কুকুরের অস্তিত্ব অদূর প্রাচ্যের নাটুফিয়ান অঞ্চলে পাওয়া গিয়েছিল। ১৭,০০০ থেকে ১৩,০০০ বছরের পুরনো মধ্যম বা বড় আকারের কিছু কুকুরের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল জার্মানি, রাশিয়া এবং ইউক্রেনে। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডের কিছু জায়গায় ১৫,০০০ থেকে ১২,৩০০ বছরের পুরনো ছোট আকৃতির কিছু কুকুরের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এসএনপি (সিংগেল নিউক্লিওটাইড পলিমরফিজম) নামক একধরনের ডিএনএ গবেষণা ২০১২ সালে কুকুরের প্রজাতি এবং বিবর্তন সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছিল। এই গবেষণায় বলা হয়েছিল, প্রাচীনকালের বিভিন্ন আকৃতির কুকুরের অস্তিত্বের যে প্রমাণ পাওয়া যায় তার সাথে আধুনিক প্রজাতির কুকুরের কোনো সম্পর্কই নেই! আধুনিক কুকুরের যেসব প্রজাতি দেখা যায় তার মধ্যে সবচাইতে পুরনো প্রজাতিটি খুব বেশি হলে ৫০০ বছরের পুরনো ।
প্রাচীনকালে অল্প সংখ্যক কুকুরের প্রজাতি বিকশিত হলেও, সভ্যতা যত এগিয়েছে এবং মানুষের জনসংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়েছে, সেই সাথে বেড়েছে কুকুরের প্রজাতিও। কারণ মানুষ যখনই এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়েছে, এক কাজ থেকে আরেক কাজে নিজেদের নিয়োগ করেছে, তখনই এই বন্ধুপ্রতীম প্রাণীটিকে তারা সাথে রেখেছে। ফলে কুকুরের প্রজাতির বিকাশও বেড়েছে আগের চাইতে বেশি হারে। @ Sarwar Chowdhury
৩১
ডিওক্যালিয়নের প্লাবন: গ্রিক পুরাণে বর্ণিত মহাপ্লাবনের আখ্যান
গ্রিক উপকথা অনুসারে, প্যান্ডোরা হলেন বিশ্বের প্রথম মানবী। এই প্যান্ডোরা এবং টাইটান এপিমেথিয়াসের গভীর প্রণয়ের ফলে জন্ম নেয় পিরা। ডিওক্যালিয়ন এই পিরার সাথেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পিরাও ছিলেন ডিওক্যালিয়নের মতো বিশুদ্ধ ধার্মিক, এবং তার মা প্যান্ডোরার মতো রূপবতী।
সেই সময়ে প্রাচীন গ্রিসের মসনদে বসে আর্কাডিয়া অঞ্চল সামলাচ্ছিলেন সম্রাট লাইকায়ন। তিনি মোট পঞ্চাশজন পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। কারও কারও মতে সেই সংখ্যাটা আবার বাইশ। জনশ্রুতি অনুসারে, লাইকায়ন এবং তার পুত্রদের মতো এত অহংকারী, দুরাচারী, নিষ্ঠুর, এবং অধার্মিক মানুষ পৃথিবীতে আর কখনো জন্ম নেয়নি। পাপের কালিমায় পরিপূর্ণ ছিল তাদের আত্মা। লাইকায়নের ও তার পুত্রদের এই খবর পৌঁছে স্বয়ং জিউসের কানেও।
সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তিনি স্বর্গ থেকে নেমে এলেন মর্ত্যলোকে, ধরলেন ছদ্মবেশ। তিনি আর্কাডিয়ায় আসবেন, এর ইঙ্গিত আগেই দিয়ে রেখেছিলেন। তাই, ওখানকার লোকজন সকল খারাপ কর্ম ছেড়ে শুরু করল জিউসের উপাসনা। লাইকায়ন তাদের এই উপাসনা দেখে ফেটে পড়ল অট্টহাসিতে। জিউসের শক্তিমত্তা নিয়েও করতে লাগল হাসি-তামাশা।
এক রাতে জিউস সেই ছদ্মবেশ নিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য ভেবে স্বভাবতই লাইকায়ন ওই বুড়োকে নৈশভোজের নিমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু লাইকায়নের কলুষিত মনে তখনও লুকিয়ে আছে ছলনা ও প্রবঞ্চনার ছাপ। নৈশভোজে সে তার নিজ পুত্র নিকটিমোসকে হত্যা করে নরমাংস পরিবেশন করল ছদ্মবেশী জিউসের সামনে। এক টুকরো মাংস মুখে নিতেই জিউস তাদের জোচ্চুরি ধরে ফেলতে পারল। প্রচণ্ড ক্ষোভে লাইকায়নকে নেড়কেমানবে পরিণত করলেন তিনি। নিজের তৈরি বজ্র দিয়ে সহসাই লাইকায়নের সুউচ্চ প্রাসাদ এবং তার ছেলেদের ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন জিউস। আর নিকটিমোসকে পুনরায় জীবন দান করলেন। লাইকায়নের পর সিংহাসন দেখভালের দায়িত্ব গিয়ে বর্তায় নিকটিমোসের উপর।
একইসাথে ঘটা কিছু কাহিনির জন্য মনুষ্যজাতির উপর বেজায় চটে গেলেন জিউস। বললেন,
ওরা ঐদিনের চুনোপুঁটি মাত্র। আমার আদেশেই ওদেরকে তৈরি করা হয়েছে। আর ওরা আমার উপর চালাচ্ছে মাতব্বরি! পাপে পূর্ণ হয়েছে এই ধরা। অহমিকা, নৃশংসতা, শঠতার কালো থাবা গ্রাস করেছে পৃথিবীকে। একসময় ওরা আমাদের বিপদে কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই, এই ঝামেলা মিটানোর একমাত্র উপায় হলো মানবজাতিকে সমূলে উৎপাটন করা।
প্রমিথিউসের পুত্র ডিওক্যালিয়ন প্রতিবছরই ককেশাস পাহাড়ে যেতেন, তার বাবার সাথে দেখা করার জন্য। বাবা ডিওক্যালিয়নকে মহাপ্লাবনের ইঙ্গিত দিয়ে দিলেন। সেই সাথে বললেন, প্রস্তুতি নিয়ে রাখার জন্য। পাপ থেকে দূরে থাকা শুদ্ধচিত্তের এই মানুষটি সবাইকে সঠিক পথে ফিরে আসার অনুরোধ করতে লাগলেন। বললেন পাপ কাজ ছেড়ে দেবতাদের উপাসনা করার কথা। পাপের ফল হিসেবে কী দুর্দমনীয় শাস্তি ধেয়ে আসছে, সে সম্পর্কেও সতর্ক করলেন।
অবশ্য মানুষ বিপথগামী হবার পেছনে দোষ রয়েছে স্বয়ং জিউসেরও। ককেশাস পর্বতে প্রমিথিউসকে বন্দি করে রাখার সময় প্যান্ডোরার বাক্সে তিনি জরা, ব্যাধি, অসুস্থতা, ঝগড়া, হিংসা, ঈর্ষা ইত্যাদি বন্দি করে রেখেছিলেন। সেই বাক্স খোলার পরেই এসব জিনিস ঢুকে পড়ে মানুষের মনে। মানুষ জড়িয়ে পড়ে হানাহানি ও সংঘর্ষে, লিপ্ত হয় অপকর্মে।
যে-ই ভাবা সেই কাজ। ধরণী থেকে অধার্মিক, ঝগড়াটে, হিংসুক, এবং সকল পাপী ও পাপের চিহ্ন মুছে ফেলতে এক মহাপ্লাবনের পরিকল্পনা করেন জিউস। ডাকা হলো তার ভাই সমুদ্র দেবতা পসাইডনকে। দুজনে মিলে স্বর্গ থেকে নামালেন বৃষ্টি। মুষলধারে ঝরা সেই বৃষ্টিতে ক্রমশ তলিয়ে যেতে লাগল স্থলভাগ। কানায় কানায় পূর্ণ হতে লাগল নদীসমূহ, জলে টইটম্বুর হয়ে যেতে লাগল চারপাশ। যেদিকে চোখ যায় শুধু বিস্তীর্ণ জলরাশি ছাড়া আর কোনোকিছুর অস্তিত্ব চোখে পড়ে না।
আশু বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মজবুত এক নৌকা নির্মাণ করেছিলেন ডিওক্যালিয়ন। পানি বাড়ার সাথে সাথেই নিজ স্ত্রী পিরাকে নিয়ে নৌকায় আশ্রয় গ্রহণ করেন তিনি। টানা নয় দিন নয় রাত বিস্তীর্ণ জলরাশিতে ভাসতে ভাসতে তাদের নৌকা গিয়ে ঠেকে পারন্যাসাস পাহাড়ের চূড়ায়। নৌকা থেকে বের হয়ে উঁকি দিলেন দুজন। কোথাও কোনো প্রাণের অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে না। শুধু অথৈ জলধি। দুজনেই সৎ ও ধার্মিক হওয়ায়, জিউস তাদের প্রতি দয়া দেখালেন। কমিয়ে দিলেন প্লাবনের পানি। ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুকে আবারও জেগে উঠল স্থলভাগ।
পারন্যাসাস পাহাড় থেকে নামার পর প্রথমেই তাদের চোখে পড়ল দেবী থেমিসের মন্দিরে। দীর্ঘ সময় ধরে পানির নিচে থাকায় মন্দিরে শেওলা পড়ে তা পিচ্ছিল হয়ে গেছে। তবে তখনও সেটি টিকে ছিল। মন্দিরে গিয়েই ভক্তিতে লুটিয়ে পড়লেন দুজন। প্রাণের জন্য কৃতজ্ঞতা জানালেন দেবতাদের নিকট। ঠিক ঐসময় তাদের পেছন থেকে এক দৈবস্বর ভেসে এলো। বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে পেছনে তাকালে দেখা গেল- পাথরের উপর সুদর্শন এক যুবক দাঁড়িয়ে আছেন। সুঠাম গড়নের সেই যুবকের চুল ছিল হলুদ, চোখ ছিল নীল রঙয়ের। উচ্চতায় অনেক লম্বা তিনি। জুতোজোড়া এবং টুপিতে ডানা লাগানো, এবং পোশাকে প্যাঁচানো সোনালি সাপ দেখেই ডিওক্যালিয়ন বুঝতে পারলেন তিনি হলেন হার্মিস, জিউসের বার্তাবাহক।
হার্মিস বললেন, দেবতারা তোমাদের উপর সন্তুষ্ট। তোমরা কী চাও? যা চাও, তা-ই দেওয়া হবে।
বিনয়ের সাথে ডিওক্যালিয়ন উত্তর দিলেন, আমাদের মানুষ দরকার। বন্ধু, প্রতিবেশী, সমাজ ছাড়া এই পৃথিবীতে একা বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তোমরা নিজেদের মাথা ঢেকে, চোখ বন্ধ করে তোমাদের মায়ের অস্থিগুলোকে পিছনে নিক্ষেপ করো, এই বলে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন দেবতা হার্মিস।
দেবতার কথা মাথামুণ্ডু কেউই কিছু বুঝতে পারলেন না। কারণ, তাদের দুজনের মা-ই ভিন্ন এবং দুজনেই গত হয়েছে বহু আগেই। অনেক চিন্তাভাবনার পর তারা বুঝতে পারল, মা বলতে বোঝান হয়েছে গায়াকে। বলা যায়, গ্রিক পুরাণের সকল কিছুর উৎপত্তিই গায়া বা পৃথিবী থেকে। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তার চিরপরিচিত রূপ ধারণ করেছে এই গায়ার জন্যই। যা-ই হোক, তারা মায়ের অস্থি বলতে বুঝল নদীর ধারের পাথরকে। তখন তারা দেবরাজ জিউসের নাম নিয়ে, চোখ বন্ধ করে একে একে পাথরগুলো পেছন দিকে মাটিতে নিক্ষেপ করতে থাকেন। প্রত্যেকটা পাথর থেকে একেকজন মানুষ জন্মাতে লাগল। হার্মিস তাদের চোখ বন্ধ রাখতে বলেছিলেন, যাতে মরণশীল কোনো মানুষ মানবসৃষ্টির প্রক্রিয়া দেখতে না পারে।
ডিওক্যালিয়ন যে পাথরগুলো নিক্ষেপ করেছিলেন তা থেকে সৃষ্টি হলো পুরুষ, আর পিরার নিক্ষেপকৃত পাথর থেকে স্ত্রীলোক। যেহেতু পাথর থেকে তাদের জন্ম হয়েছিল, তাদের ‘পাথরমানব’ বলেও অভিহিত করা হয়। তারা ছিল সাধারণের চেয়ে সুদৃঢ় এবং দীর্ঘস্থায়ী এক প্রজন্ম। জনশূন্য ও নিস্তেজ পৃথিবীর বুকে প্রাণ সঞ্চার করে একে সুজলা-সুফলায় রূপ দিতে এমন এক প্রজন্মেরই দরকার ছিল। দেবতাদের ইচ্ছাই ছিল সেরকম। ডিওক্যালিয়ন এবং পিরার ঘরে জন্ম নিলো বহু সন্তান। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল হেলেন, হেলেনিক সভ্যতার প্রথম পুরুষ।
এরপর জিউসের আদেশে একে একে অন্যসকল প্রাণীও সৃষ্টি হতে লাগল। সূর্য উদয়ের সাথে সাথে নতুন ভোরের বার্তা পৃথিবীতে ঘটাল বহু নতুন প্রজাতির প্রাণস্পন্দন। কিছুটা পুরনো রূপে, কিছুটা নয়া ধাঁচে। তবে, মহাপ্লাবনে বেঁচে যাওয়া একমাত্র মানব-মানবী ছিলেন ডিওক্যালিয়ন ও পিরা, এমনটা ভাবাও উচিত নয়। জেরানিয়া পর্বতের চূড়া মহাপ্লাবনের তোপে ডুবে যায়নি। সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন জিউসের এক সন্তান। সেখানে আরও ছিলেন পেলিয়নের কেরাম্বাস, এক নিম্ফের ডানার সাহায্যে চূড়ায় আরোহণ করেন তিনি।
প্রাচীন উপকথাগুলোর বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য হলো, এক সভ্যতা আরেক সভ্যতার তা ছড়িয়ে গিয়েছিল বলে কাহিনিগুলোতে প্রচুর মিল লক্ষ্য করা যায়। ফারাক থাকে শুধু চরিত্রের নামে। ডিওক্যালিয়নের প্লাবনের সাথে মেরীয় মহাপ্লাবনের কাহিনির অনেক সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। প্রাচীন পৃথিবীর প্রায় সকল সভ্যতায় বর্ণিত মহাপ্লাবনের উপাখ্যানের সারকথা একটাই- দেবতা বা ঈশ্বর মানবজাতির উপর ক্ষুব্ধ হয়ে এই গজব বর্ষণ করেছিলেন। তবে যুগভেদে কাহিনি কিছুটা নতুনত্ব মোড় নিলে বা কিছু সংযোজন ঘটলেও মূল কাহিনি ঘুরে ফিরে একইরকম। সকল উপকথাতেই মহাপ্লাবন শেষে শুধু ধার্মিক, ঈশ্বরের প্রতি অনুগত, এবং নিষ্পাপ মানুষগুলোই বেঁচে ছিল। তাদের থেকেই রিক্ত পৃথিবীতে আবার জন্ম নিয়েছিল পুরো মানবসভ্যতা। Mohasin Alam Roni
৩২
ইসলাম-পূর্ব আরবের ধর্ম ও সংস্কৃতি
প্রাক-ইসলামী আরব ছিল একটি যাযাবর সমাজ, যাদের বেশিরভাগই ছিল বিভিন্ন গোত্র ও উপজাতিতে বিভক্ত। এই বেদুইন উপজাতি, যাদের মধ্যে আজও অনেকে তাদের ঐতিহ্যবাহী যাযাবর জীবনধারা বজায় রেখেছে। ক্রমাগত যুদ্ধ এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলাই ছিল আরব সমাজের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তবে আরবের এই উপজাতিরা তাদের আত্মীয় সম্পর্কিত গোষ্ঠী এবং পরিবারকে খুব গুরুত্ব দিত। তারা তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে তাঁবুতে বাস করত এবং তাদের পশুদের নিয়ে মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াত, যার মধ্যে ছিল প্রধানত উট, ভেড়া ও ছাগল।
আরবের গোত্রগুলোর সমাজ ছিল পিতৃতান্ত্রিক এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পুত্রসন্তানরা সম্পত্তির দাবীদার হতো। নারীরা সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে পারত না। যুদ্ধে লুণ্ঠনকৃত সম্পদ বাজেয়াপ্ত হতো এবং পুরুষরা বন্দীদের বিয়ে করতে পারতো। এভাবে নেতারা সমাজে তাদের অলিখিত নিয়ম প্রয়োগ করত।
জাহেলিয়ার যুগের আরবরা তাদের কন্যাদের জীবন্ত কবর দিত, কারণ পুরুষরা প্রায়ই নারীদের বোঝা হিসেবে বিবেচনা করত। আবার, রক্ষণশীল আরব সমাজে প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রগুলোর দ্বারা নিজ গোত্রের নারীদের বন্দী করাকে অপমানজনক বলে মনে করা হতো। আরবে নিজ গোষ্ঠীর নারীদের সাথে বিয়ে ছাড়াও বহিরাগতের সাথে বিয়ে করারও নিয়ম ছিল। যদিও দক্ষিণ আরবের (ইয়েমেন) উত্তর-পূর্বে মাতিরা শহরে একজন বহিরাগতের সাথে নিজ গোত্রের নারীদের বিয়ে দেয়ার জন্য গোত্রের অনুমতির প্রয়োজন পড়ত। তবে, আরবের কিছু কিছু সম্ভ্রান্ত বংশের নারীদের মর্যাদা অনেক বেশি ছিল। তাদের কেউ কেউ ব্যবসা সাথেও যুক্ত ছিল।
এছাড়া, নিজ গোত্রে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া, নিজ গোত্রকে রক্ষা করা ছিল উচ্চ সম্মানের বিষয়। তবে এটি তাদেরকে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ এবং সংঘর্ষের দিকে পরিচালিত করত। রক্তের বিনিময়ে রক্ত আর জীবনের বিনিময়ে জীবনই ছিল তাদের অলিখিত সংবিধান। গোত্রগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করা বা কাফেলা ও বসতিতে আক্রমণ করা বা লুণ্ঠন করাই যেন ছিল আরবদের আইন।
কাফেলা ও বসতি স্থাপনকারীরা আক্রমণ এড়াতে তাদের শ্রদ্ধা জানাত। আরবের বেশিরভাগ গোত্রই যাযাবর জীবনধারা মেনে চললেও কিছু কিছু গোত্র নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রভাব অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মক্কার কুরাইশ বংশ। এই বংশের দক্ষ বণিকরা ৫ম শতাব্দীতে এই শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
মূলত, মক্কা ছিল এমন এক স্থান ছিল যে পথ দিয়ে কাফেলারা আসা-যাওয়া করত। সেই সাথে এখানে ছিল পবিত্র ক্বাবা ঘরের অবস্থান, যা আরবের পৌত্তলিকদের কাছেও বিশেষ সম্মানের স্থান ছিল, কারণ সেখানে তাদের বিভিন্ন মূর্তি রাখা ছিল। গ্রীক ইতিহাসবিদ ডিওডোরাস সিকুলাস তার ‘Bibliotheca Historica’-তে ক্বাবাকে একটি “অত্যন্ত পবিত্র” জায়গা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা সমস্ত আরববাসীর কাছে অত্যন্ত সম্মানের গৃহ ছিল।
জলদস্যুতা এবং রোমান ও পার্সিয়ান বাহিনীর সংঘর্ষের কারণে লোহিত সাগর, টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক বাণিজ্য পথগুলোতে যাতায়াত ব্যাহত হতো। ফলে ব্যবসায়ীরা মক্কার মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের বাণিজ্যপথে পরিবর্তন এনেছিল। এছাড়া, মক্কায় ক্বাবার উদ্দেশে হজ্জযাত্রা করার জন্যও প্রতিবছর অনেক মানুষের আগমন হতো। মক্কার মতো আরবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল ইয়াসরিব বা মদিনা। এটি হিজাজে অবস্থিত একটি শহর, যা লোহিত সাগরের পাশ দিয়ে ভ্রমণকারী বাণিজ্য কাফেলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণপথ ছিল। ইয়াসরিবে মূলত ইহুদি গোত্রগুলোর আধিপত্য ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে বেশ কিছু আরব গোত্র ইয়াসরিবে চলে আসে এবং এই শহরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব অর্জন করে।
আরবে জাদুটোনার প্রচলন ছিল। এছাড়া ছিল তাবিজ বা মন্ত্রের প্রয়োগ। শত্রুর ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে আরবের লোকেরা জাদুর সাহায্য নিত। এর পাশাপাশি উত্তর আরবের লোকেরা জিনদের উপাসনাও করত। নিজেদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পাওয়ার আশায় তারা জিনদের আহ্বান জানাত।
এছাড়া, আরবের লোকেরা ভবিষ্যদ্বাণী বা ভাগ্যগণনার উপর বেশ নির্ভরশীল ছিল। দক্ষিণ আরবের অধিবাসীদের মধ্যে একপ্রকার বিশ্বাস ছিল যে ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য দেবতারা প্রায়শই তাদের সরাসরি বা অন্য কোনো মাধ্যমে (যেমন- স্বপ্ন) উত্তর দিতে পারেন। এমনকি তারা তাদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথাও বলতো! বায়দার পশ্চিমে জার আল-লাব্বার অভয়ারণ্যে দুটি পাথরের শিলালিপি পাওয়া গেছে। এটি দুর্ভাগ্যবশত খণ্ডিত হলেও সেটিতে ‘ঐশ্বরিক জবাব’ পাওয়ার পদ্ধতির বিশদ বিবরণ দেয়া হয়েছে। পদ্ধতিটি হলো- ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বলি দেয়া। তারপর বলিদানের বেদির উপরে ভবিষ্যদ্বাণী জানতে চাওয়া। পরবর্তী একজনকে অপেক্ষা করতে হবে যতক্ষণ না পরিচারক ‘আততার’ (দক্ষিণ আরবের প্রধান দেবতা)-এর অনুপ্রেরণায় বাণীমূলক উত্তর প্রদান করেন এবং অবশেষে ‘উত্তম প্রত্যুত্তর’ পাওয়ার পরে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতেন। এসব আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে ‘রক্ত-উৎসর্গ করা’, ‘স্তম্ভ দ্বারা চিহ্নিত সীমানার দিকে একবার বা তিনবার ঘোরা’ এবং ‘তিনবার ঘুরতে গিয়ে মাথা নত করা’র মতো কাজগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রাচীনকালে দক্ষিণ আরববাসীরা নিজেদের এবং তাদের নিকটাত্মীয় পরিবারকে দেব-দেবীদের কাছে উৎসর্গ করত। এই ধরনের অনেক উৎসর্গকারী উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিল। তবে এটি সম্ভবত কোনোপ্রকার দাসত্ব থেকে নয়, বরং নিজ সম্প্রদায়ের ধর্মানুষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য থেকে করা হতো। আরবে মানুষ বলিদানের প্রচলনও ছিল। হাজরামাউতের রাজার একজন প্রজা সায়িন এবং শাবওয়ার দেবতাদের কাছে ঐশ্বরিক সুরক্ষার বিশ্বাসে তার আত্মা, সন্তান, জিনিসপত্র, চোখের আলো এবং হৃদয়ের চিন্তা বলিদানের কথা এসেছে। খরা থেকে বাঁচতে বৃষ্টির জন্য আরবে বলিদানের প্রচলন ছিল। গৃহপালিত পশু, বিশেষ করে উট, ভেড়া এবং গরু দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দেয়া হতো। দক্ষিণ আরবে কিছু বিশেষ ধর্মীয় ব্যক্তির দ্বারা এই অনুষ্ঠানগুলো সম্পন্ন করা হতো।
এছাড়া, তাদের বিশ্বাসমতে- ঈশ্বরের সাথে সংযোগ স্থাপন করার সবচেয়ে প্রচলিত মাধ্যম ছিল নিজের মূল্যবান কিছু দেবতাকে উৎসর্গ করা। কার্যত, যেকোনো কিছু দেবতার মূর্তির সামনে উপস্থাপন করা হতো, কিন্তু ইচ্ছা যত বড় হতো, উৎসর্গ করা জিনিসও তত বেশি মূল্যবান হওয়া জরুরি ছিল। সবচেয়ে সাধারণ উৎসর্গকৃত বস্তু ছিল পশু, শস্য, খাদ্য, তরল (দুধ বা মদ), খোদাই করা ধাতু বা পাথরের ফলক, সুগন্ধি দ্রব্য (সুগন্ধ তৈরি করতে পোড়ানো হতো), ভবন (বিশেষত দেয়াল, ছাদ, মন্দির, কূপ, স্তম্ভ ইত্যাদি) এবং অন্যান্য বস্তু (বেদি, ধূপ, পাটাতন, ধাতব ফলক, মূর্তি ইত্যাদি)। উট পালনকারী আরবরা তাদের কিছু উট এই ইচ্ছায় দেবতাদের কাছে উৎসর্গ করত যেন তাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়।
প্রাক-ইসলামী আরবে মক্কার অদূরে তায়েফের উকাজ নামক স্থানে প্রতিবছর একটি মেলা হতো যেখানে কবিতা ও সাহিত্যের আসর বসত। আরবের কবিরা তাদের কবিতা আবৃত্তি করত। যার কবিতা সবচেয়ে সেরা হিসেবে গণ্য হতো, সে শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে পুরস্কার পেত। কবিতার প্রতি ভালোবাসার কারণে আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকজন সেখানে একত্রিত হতো, এবং এই সমাবেশের সময় তাদের অনেকেই আবৃত্তি করা কবিতাগুলোর শৈল্পিক মূল্যের প্রশংসা করত।
আরবে পুরোহিত-যাজকশ্রেণির মধ্যে প্রায়শই উচ্চস্তরের সামাজিক সংহতি ও একতা লক্ষ্য করা যেত। এছাড়া, উত্তর আরবের যাজকদের কবিতায় মদ, নারী ও গান উপভোগের উদ্দেশ্যে সমাবেশের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।
আরবে গোষ্ঠীর প্রধানের কাজ হতো আইনকে ধারণ ও স্পষ্ট করা। মূলত, তার উপরই গোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্যরা নির্ভর করত, আর তার কথা মেনে চলত। সেখানে ছোটখাট অপরাধের জন্য কেউ কাফফারা দেওয়ার পর তার গোত্রে পুনরায় যোগদান করতে পারত, কিন্তু বড় অপরাধের ক্ষেত্রে একজন সদস্য তার স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হতো। আরবে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের শিলালিপি প্রায়শই আইনি প্রকৃতির হতো। যেমন- আরবে সমাধির শিলালিপিগুলোর প্রায়শই মালিকানা দাবি হতো যে সেখানে উল্লিখিত গোত্রের সদস্যদের দাফনের অধিকার এবং উত্তরাধিকার সূত্রে সে স্থান পরবর্তী প্রজন্মকে হস্তান্তর করা। এছাড়া, সমাধির সাথে কী করা যায় বা কী করা যায় না এবং এর সাথে অপব্যবহারের কারণে দণ্ডিত হওয়ার বিশদ বিবরণও পাওয়া যায়।
প্রাক-ইসলামী আরবের বিভিন্ন ধর্ম
প্রাক-ইসলামী সময়ে আরব উপদ্বীপে ধর্ম বিষয়টি আরব পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইসলাম আগমনের আগে আরবে বিভিন্ন ধর্ম ছিল, যেমন- বহু-ঈশ্বরবাদ, ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইরানি ধর্মের মিশ্রণ।
বহু-ঈশ্বরবাদ বা পৌত্তলিকতা বা মূর্তি উপাসক
আরবে বহু-ঈশ্বরবাদ বা পৌত্তলিকতা ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় বিশ্বাস। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত আরবের প্রায় সকল অধিবাসীই ছিল পৌত্তলিক বা মূর্তি উপাসক। তারা অসংখ্য দেব-দেবীর উপাসনা করত। তাদের প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব দেবতা ছিল। প্রতিটি গোত্র, শহর এবং অঞ্চলের নিজস্ব দেবতা বা মূর্তি ছিল। এছাড়া, তারা বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত প্রাণীতে বিশ্বাস করতো। তারা ক্বাবায় ৩৬০টি মূর্তি রেখেছিল যেগুলোর বেশিরভাগই ছিল পাথরের তৈরি। তাদের অনেক দেবতার নাম ইতিহাস বা বিভিন্ন বই থেকে জানা যায়।
আরবীয় শিলালিপিগুলোতে দেখা যায় তারা কোন উপায়ে দেবতাদের আহ্বান করতো, সাধারণত তাদের অনুরোধ করা বা অনুগ্রহ খোঁজা বা তাদের ধন্যবাদ জানানো এবং দেবতাদের প্রকৃতি ও সেগুলোর কার্যকারিতা। এসব দেবতা সেই শক্তিগুলোর প্রতিনিধিত্ব করত যেগুলো পূজারিদের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল, যেমন- বৃষ্টি, উর্বরতা, স্বাস্থ্য, প্রেম, মৃত্যু এবং এমন আরও অনেক কিছু। চারটি প্রধান জাতি তাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছিল- আলমাকাহ (সাবিয়ান), ওয়াদ (মিনিয়ান), আম্ম (কাতাবানিয়ান) এবং সায়িন (হাদরামাউত)। প্রত্যেক লোককে সম্মিলিতভাবে তাদের নিজ নিজ পৃষ্ঠপোষক ‘দেবতার সন্তান’ বলা হতো।
উত্তর-পূর্ব আরবে সূর্য দেবতা শামসের উপাসনা হতো। এছাড়া, এই অঞ্চলের হেলেনিস্টিক শৈলীর মুদ্রায় দক্ষিণ আরবীয় অক্ষরে দেবতার নামের উপস্থিতি দ্বারাও এটি বোঝা যায়। নাবাতিয়ানদের রাজধানী ছিল পেট্রা (বর্তমান জর্ডানে), এবং তারা তাদের দেবতা দুশারার প্রতি অনুগত ছিল। দেবতা দুশারাকে ‘শারা পর্বতমালা’র প্রভু হিসেবে মনে করা হতো। পেট্রাতে আরেক জনপ্রিয় দেবী ছিল আল-উজ্জা। এছাড়া, আরবের অন্যান্য অঞ্চলে আরও অনেক দেব-দেবীর উপাসনা করা হতো, যেমন- হিজাজ অঞ্চলে হুবাল, মানাত এবং হাওরান এবং সিরিয়াতে দেবী আল-লাত। এছাড়া আরবরা আন্তর্জাতিকভাবে অন্যান্য দেশের সাথে বাণিজ্য করার সুবাদে সেসব দেশের ধর্মীয় প্রভাবও তাদের উপর পড়েছিল, যেমন- মিশরীয় দেবী আইসিসের ধর্ম নাবাতিয়ানদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
৩২ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে সিরিয়ার পালমিরাতে সর্বোত্তম নথিভুক্ত ধর্ম ছিল বেল, ইয়ারহিবোল এবং অ্যাগলিবোল নামের তিন দেবতার উপাসনা। এদের মধ্যে বেল ছিল সর্বোচ্চ দেবতা। আবার মরূদ্যানের দেবতা ছিল ইয়ারহিবোল এবং অ্যাগলিবোল ছিল উত্তর সিরিয়ার অভিবাসী সম্প্রদায়ের দেবতা। পালমিরায় আরেকটি ত্রিত্ব দেবতার উপাসনার প্রমাণ মিলেছে। এরা হলো বালশামিন, অগ্লিবোল এবং মালাকবেল। এছাড়া প্রাচীন কানানাইট বা ফোনিশিয়ান দেবতা বালশামিন, মেসোপটেমিয়ার দেবতা নেরগাল ইত্যাদিও উল্লেখযোগ্য ছিল। আবার গ্রিক-আরামিয়ান সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত অঞ্চলগুলোতে বেশ কিছু ভাগ্য দেবতা ছিল (এদেরকে ‘গাদ-Gad’ বলা হতো; যেমন- ‘পালমিরার গাদ’)।
পূর্ব আরবের ‘এনকি’ এবং ‘নিনহুরসাগ’ এর পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায় মাগান রাজ্যে ‘নিনসিকিলা’ দেবতা, এবং দিলমুন রাজ্যে ‘ইনজাক’ দেবতার উপাসনা হতো।
ইহুদি ধর্ম
খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে দক্ষিণ আরবের শিলালিপিতে ধর্মীয় বাক্যাংশ পরিবর্তনের গতি ও প্রকৃতি একটি ধর্মীয় বিপ্লবের ইঙ্গিত দেয়। প্রাচীন ঐতিহ্যের পৌত্তলিক দেবতাদের উল্লেখ প্রায় সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়, এবং এক অনন্য সৃষ্টিকর্তার উল্লেখ পাওয়া যায় যাকে ‘দয়াময়’ বা কেবল ‘ঈশ্বর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এবং সাধারণত ‘স্বর্গের প্রভু’ বা ‘স্বর্গ এবং পৃথিবীর প্রভু’ বলা হয়েছে, এবং এই সময় থেকে আমরা ইহুদি অভিব্যক্তি, যেমন- ‘শান্তি’ (shalom or slwm) সম্বলিত শিলালিপি দেখতে পাই।
রোমানদের অত্যাচারের ফলে ইহুদিদের আরবে অভিবাসন শুরু হয় খ্রিষ্টীয় ১ম শতাব্দীর প্রথমদিকে। ৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমানরা যখন জেরুজালেম ধ্বংস করে এবং ইহুদিদের ফিলিস্তিন ও সিরিয়া থেকে তাড়িয়ে দেয়, তাদের অনেকেই আরবের হিজাজে বসবাস করতে শুরু করে। তাদের প্রভাবে অনেক আরবও ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। তাদের শক্তিশালী কেন্দ্র ছিল ইয়াসরিব, খায়বার, ফাদাক এবং উম্মুল কুরা শহর। ইয়েমেনের হিমিয়ার রাজ্যের উপজাতিরা খ্রিষ্টীয় ৪র্থ শতাব্দীতে ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়, এবং মধ্য আরবের কিন্দাহ উপজাতির কিছু গোত্র খ্রিষ্টীয় ৫ম শতাব্দীতে এ ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। ইয়েমেনে যু-নুওয়াসের সময়ে ইহুদি ধর্ম রাজধর্মের মর্যাদা পায়।
আরব উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিমে একটি অতি প্রাচীন ইহুদি সম্প্রদায় ছিল। শুবায়ত নামে এক ব্যক্তি ছিলেন যিনি ৪২ খ্রিষ্টাব্দে হেগরায় (বর্তমান জর্ডানের মাদাইন সালেহ) একটি পারিবারিক সমাধি স্থাপন করেন। তিনি স্পষ্টভাবে নিজেকে ইহুদি হিসেবে পরিচয় দেন। এই অঞ্চলের কিছু গ্রাফিতিতে সাধারণ ইহুদি নাম, যেমন- আইজ্যাক বা স্যামুয়েল দেখতে পাওয়া গেছে। তবে দক্ষিণ আরবে ইহুদি ধর্মের প্রাধান্য ছিল অনেক বেশি।
খ্রিষ্টধর্ম
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য, ইথিওপিয়া, পারস্য এবং অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে আরব ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল, যা আরবে খ্রিষ্টধর্ম প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে আরব ব্যবসায়ীরা আরবে খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে আসে। রোমানরা উত্তর আরবের গাসসান উপজাতিকে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করেছিল। গাসসানের কিছু গোত্র হিজাজে হিজরত করে বসতি স্থাপন করে। দক্ষিণে, ইয়েমেনে অনেক খ্রিস্টান ছিল যেখানে ধর্মটি মূলত ইথিওপিয়ান খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরা এনেছিল। তাদের শক্তিশালী কেন্দ্র ছিল নাজরান শহর। দেশের কিছু অংশে নেস্টোরিয়ান খ্রিস্টধর্ম শক্তিশালী ছিল। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় ধর্ম ছিল মনোফিজিটিজম।
বাইজেন্টাইন মতবাদ অনুযায়ী, কনস্ট্যান্টিয়াস কর্তৃক প্রেরিত ধর্মপ্রচারকরাই হিমিয়ারদের খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করেন। থিওফিলাস তার বিস্ময়কর অলৌকিকতার দ্বারা খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের সত্যতা একবার বা দু’বার প্রমাণ করার সাথে সাথেই ইহুদীদের প্রথাগত প্রতারণা এবং বিদ্বেষ প্রমাণিত হয়। খ্রিষ্টধর্মের ধর্মপ্রচারকরা সফলভাবে কাজটি করতে পেরেছিল এবং তারা সেখানে তিনটি গির্জাও তৈরি করে।
চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীতে খ্রিষ্টধর্ম আরবে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ের মধ্যে পূর্ব আরবের সমস্ত দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চলে তারা অসংখ্য গির্জা প্রতিষ্ঠা করে। পঞ্চম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বাইজেন্টিয়ানরা শক্তিশালীভাবে দক্ষিণ আরবে খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপক প্রচার শুরু করে।
ইরানি ধর্ম
এই ধর্মের অনুসারীরা প্রকৃতির দ্বৈতবাদের পারস্য মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত ছিল। তারা বিশ্বাস করত যে দুজন দেবতা ভাল এবং মন্দ বা আলো এবং অন্ধকারের দ্বৈত শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে, এবং উভয়ই আধিপত্যের জন্য একটি সীমাহীন সংগ্রামে লিপ্ত। জরথুষ্ট্রিয়ানিজম, মাজদাকিজম এবং পারস্যের ধর্মীয় মতবাদের প্রভাব অনুসরণ করে আরবেও এসব ধর্মের একটি ছোট সংখ্যালঘু দলের অস্তিত্ব ছিল। জরথুষ্ট্রবাদ ছিল একটি প্রাচীন পারস্য ধর্ম, যা প্রায় ৪,০০০ বছর আগে আবির্ভূত হয়। জরথুষ্ট্র ছিলেন এই ধর্মের প্রবক্তা। একক সৃষ্টিকর্তা, স্বর্গ, নরক এবং বিচার দিবস এসব জরথুষ্ট্রীয় বিশ্বাসের অন্তর্গত। জরথুষ্ট্রীয় ধর্মের সৃষ্টিকর্তার নাম আহুর মাজদা ও ধর্মীয় শাস্ত্রের নাম জেন্দা আবেস্তা। এ ধর্মে আগুন ও পানিকে বিশুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মূলত, এই ধর্মে অগ্নি উপাসনা করা হয়। বর্তমানে ইরান ও ভারতের কিছু অংশে এই ধর্মের অগ্নি উপাসকদের অস্তিত্ব রয়েছে।
সাবিয়ান
চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারকা এসব মহাজাগতিক বস্তুর উপাসনা নিয়েও পৃথিবীতে ধর্মের আবির্ভাব হয়েছিল। আরবেও এমন কিছু অনুসারী বিদ্যমান ছিল। এরা তারকার পূজা করত। সাবিয়ান নামে পরিচিত ছিল তারা। অবশ্য বর্তমানেও এরকম ধর্মের অনুসারী পৃথিবীতে আছে।
নাস্তিক্যবাদ
ইসলাম-পূর্ব আরবেও নাস্তিক্যবাদের চর্চা ছিল। মূলত, এই দলটি বস্তুবাদীদের নিয়ে গঠিত। তাদের বিশ্বাস ছিল যে পৃথিবীর জীবনই চিরন্তন ও সত্য। এই সৃষ্টিজগতের কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই, পরকাল বলতে কিছু নেই, এবং মানুষের মৃত্যুর পর তাদের কাজের হিসাবনিকাশ হবে না। তাই তারা স্বর্গ বা নরক এমন কোনো জায়গায় যাবে না।
একেশ্বরবাদী হানিফি সম্প্রদায়
একেশ্বরবাদী ইসলাম ধর্মের উত্থানের প্রাক্বালে আরবে একেশ্বরবাদীদের একটি ছোট দলের অস্তিত্ব ছিল। এর সদস্যরা মূর্তিপূজা করত না, এবং তারা হযরত ইব্রাহীম (আ) এর অনুসারী ছিলেন। আব্রাহামিক ধর্মগুলোর একটি একক সৃষ্টিকর্তার উপাসনাকে কেন্দ্র করে একেশ্বরবাদী এই ধর্ম দৃশ্যত খ্রিষ্টান বা ইহুদি ধর্মের সাথে যুক্ত ছিল না। এই ধর্মের অনুসারীদের ‘হানিফিন’ বা হানিফি সম্প্রদায় বলা হতো, এবং তাদের অধিকাংশই আরবের মূর্তিপূজা এবং পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে ছিল, আর তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। অন্যান্য আব্রাহামিক ধর্মের কিছু বৈশিষ্ট্য, যেমন- শুকরের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল এই ধর্মে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পরিবারের সদস্যবৃন্দ, কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রের সদস্যরা এই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। হযরত মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফেলও এই ধর্মের অনুসারী ছিলেন বলে ধারণা করা হয় (যদিও বিভিন্ন কাহিনীতে তাকে খ্রিষ্টান বলে উল্লেখ করা হয়েছে)।
ইসলামের আগমনের পর আরব থেকে পৌত্তলিকতা পুরোপুরি নির্মূল হলেও অন্যান্য ধর্মের অনুসারী, বিশেষ করে ইহুদি আর খ্রিষ্টান ধর্মের মানুষদের একাংশ আরবে রয়ে যায়। তবে তাদের মধ্যেও পরবর্তীতে অনেকে অন্যত্র চলে যায়। এছাড়া, তারকা ও অগ্নি উপাসকরাও ধীরে ধীরে অন্যান্য দেশে পাড়ি জমান। Mohammad Sayem
৩৩
ফরাসি বিপ্লবের কারণ ও তৎকালীন ফ্রান্সের সমাজব্যবস্থা
কোনো সমাজ ব্যবস্থা দুটি শ্রেণি থাকে। এক শ্রেণি সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করে এবং অপর শ্রেণি শোষিত হয়। শোষিত শ্রেণি শেষ পর্যন্ত অধিকারভোগী শ্রেণীর প্রথাগত রাজনৈতিক এবং আর্থিক সকল অধিকার বিপ্লবের মাধ্যমে ধ্বংস করে। শ্রেণিসংগ্রামই বিপ্লবের বাহন। যেমনটি দেখা যায় ফরাসি বিপ্লবে, যেখানে অধিকারভোগী অভিজাত শ্রেণিকে উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণি ক্ষমতাচ্যুত করে।
১৭৮৯ সালে ফ্রান্সে যে বিপ্লব দেখা যায়, তা কোনো আকস্মিক কারণে ঘটেনি। দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতিতে যে ব্যবস্থা চলে আসছিল, তার সঙ্গে ফ্রান্সের বৃহত্তর জনসমষ্টির স্বার্থ যুক্ত ছিল না। শেষপর্যন্ত বুর্জোয়া শ্রেণীর নেতৃত্বে পুরাতন ব্যবস্থা ভেঙে নতুন ব্যবস্থা গঠনে তৎপর হয় সাধারণ জনগণ।
ফ্রান্সের রাজনৈতিক অবস্থা
ফরাসি রাজার স্বৈরাচারী ক্ষমতা: সপ্তদশ শতকের ফরাসী রাজনীতিজ্ঞ রিশেল্যু ও ম্যজারিন এবং ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই ফরাসি রাজতন্ত্রকে একটি স্বৈরতন্ত্রী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। এই যুগের রাজারা মনে করতেন যে ঈশ্বর রাজাকে নিযুক্ত করেছেন। তারা ঈশ্বর ছাড়া আর কারও কাছে দায়ী নন। ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতা নীতির উপর ভিত্তি করে চতুর্দশ লুই ফরাসী রাজতন্ত্রকে সরবময় ক্ষমতার আধারে পরিণত করেন। রাজার এই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি একসময়ে মন্তব্য করেন- “The state, it is myself” –রাজাই হলেন রাষ্ট্র। রাজার ক্ষমতাকে সর্বময় করার জন্য ফ্রান্সের পার্লামেন্ট সভা স্টেট জেনারেলের অধিবেশন ১৬১৪ সালে বন্ধ করে দেয়া হয়। যেহেতু রাজা আহ্বান না করলে জাতীয় সভা বা স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন বসতে পারত না, সেহেতু ফ্রান্সের বুরবো রাজারা স্বৈরতন্ত্রকে নিরংকুশ করার জন্যে জাতীয় সভার অধিবেশন আহ্বান করেননি। প্রতিনিধি সভা না থাকায়, ফ্রান্সে রাজার নিজ ইচ্ছা অনুসারে শাসনকার্য চলতে থাকে। অষ্টাদশ শতকে ইউরোপের বিভিন্ন রাজারা জ্ঞানদীপ্ত স্বৈরাচার নীতি গ্রহণ করেন। কিন্তু ফ্রান্সের বুরবো বংশীয় রাজা পঞ্চদশ এবং ষোড়শ লুই কেবলমাত্র স্বৈরতন্ত্রকেই গ্রহণ করেন। তাঁরা সমকালীন আলোকিত স্বৈরাচারকে স্বীকার করতেন না। ফরাসী রাজশক্তি শুধু অধিকারের কথাই ভাবত, কর্তব্যের কথা ভাবত না। এজন্য ফ্রান্সে প্রজাদের সঙ্গে রাজশক্তির কোন যোগাযোগ ছিল না। বুরবো রাজারা সকল ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে প্রজাদের সকল চাহিদা ও অধিকার অগ্রাহ্য করতেন। ঐতিহাসিক শেভিল এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছিলেন-
“স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন বন্ধ থাকার কারণে সাধারণ লোকেরা তাঁদের অসুবিধা ও অভিযোগের কথা রাজার নিকট পৌঁছাতে পারত না। এর ফলে বুরবো রাজতন্ত্র বৃহত্তর জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়’।
শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা ও অভিজাত শ্রেণীর প্রভাব: বুরবো রাজতন্ত্র আইনত সর্বশক্তিমান বাস্তবে রাজার ক্ষমতাই ছিল সর্বাধিক । ফ্রান্সের সামন্ত অভিজাত ও যাজক শ্রেণী রাজার তরফে সরকারি ক্ষমতা হস্তগত করে সুযোগসুবিধা ভোগ করত। ফরাসী অভিজাতরা দাবি করত, তারা রাজার সমশ্রেণিভুক্ত লোক। সুতরাং, দেশ শাসনের ক্ষেত্রে একমাত্র তারাই রাজাকে সাহায্য করার অধিকারী। রাজবংশের মতো তাদেরও বংশকৌলীন্য ছিল। এই বংশ মর্যাদার জোরে তারা দেশ শাসনের অধিকার ভোগ করত। লেফেভারের মতে, “ফরাসী রাজতন্ত্র ছিল ইংল্যান্ডের নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র এবং ইউরোপ মহাদেশের স্বৈরতন্ত্রের মাঝামাঝি ব্যবস্থা।” চতুর্দশ লুইয়ের পর বুরবো বংশে সুযোগ্য শাসকের অভাব দেখা যায়। পঞ্চদশ লুই ছিলেন “বিলাসী, রমণীরঞ্জন, প্রজাপতি রাজা” (Butterfly Monarch)। তিনি ছিলেন পরিশ্রমবিমুখ এবং তার উপপত্নী মাদাম দ্যু পম্পাদ্যুরের দ্বারা প্রভাবিত। ষোড়শ লুই সৎ এবং সদিচ্ছাপরায়ণ হলেও তার সুন্দরী গর্বিতা পত্নী অস্ট্রিয়ার রাজকুমারী মেরী অ্যানটোনেটের বশীভূত ছিলেন। বুরবো রাজাদের এই ব্যক্তিগত অযোগ্যতার ফলে রাজার তরফে সকল ক্ষমতা অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা হস্তগত করে।
যাজক শ্রেণীর স্বায়ত্ত্বশাসন: ফ্রান্সের গির্জা (গ্যালিকান চার্চ) স্বয়ং শাসিত সংস্থা। রাজা গির্জার অভ্যন্তরীণ শাসনে হস্তক্ষেপ করতে পারতেন না। ১৫৬১ সালে পোইসির চুক্তি অনুসারে যাজকেরা গির্জার ভূ-সম্পত্তির ওপর স্বেচ্ছা কর দিত। রাজা কোনো কর ধার্য করতে পারতেন না।
প্রাদেশিক সভার ক্ষমতাঃ ফ্রান্সের প্রদেশগুলিতে যে সভা ছিল সেগুলির সম্মতি ছাড়া রাজার কোনো নির্দেশ প্রদেশগুলিতে কার্যকরী করা যেত না। প্রাদেশিক সভাগুলিতে স্থানীয় অভিজাতরা প্রাধান্য ভোগ করত। রাজা কোনো নতুন আইন জারি করলে প্রথমে পার্লামেন্ট নামক বিচার সভায় নথিবদ্ধ করতে হত। নতুবা এ আইন বৈধ হত না। পার্লামেন্ট ইচ্ছা করলে রাজার প্রস্তাবিত আইন নাকচ করে দিতে পারত। পার্লামেন্টের বিচারকেরা ছিলেন অভিজাত শ্রেণীর।
ফ্রান্সে পার্লামেন্টের সংখ্যা ছিল ১২টি । এদের মধ্যে প্যারিসের বিচারসভা ছিল এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রতিপত্তিশালী। প্যারিসের পার্লামেন্টের অভিজাত শ্রেণীর বিচারক সদস্যরা এতই ক্ষমতাবান ছিলেন যে, তারা মন্ত্রী টুরগোর প্রস্তাবিত মৌলিক সংস্কারের ব্যবস্থাকে কার্যকরী হতে দেয়নি। রাজা অবশ্য Lit de Justice প্রথা দ্বারা পার্লামেন্টের বিরোধিতা দমন করতে পারতেন। Lit de justice হলো রাজা নিজে পার্লামেন্টের সভায় সভাপতিত্ব করে আইন পাশ করিয়ে নেয়ার প্রথা। কিন্তু পার্লামেন্টের বিরোধিতা রাজা কার্যতঃ অগ্রাহ্য করতে সাহস করতেন না। সুতরাং ফ্রান্সের রাজারা ঐশ্বরিক ক্ষমতা দাবি করলেও বাস্তবে তাদের ক্ষমতা ছিল সীমিত। ঐতিহাসিক ডেভিড থমসনের মতে, “ফরাসী রাজতন্ত্র আসলে ছিল সামন্ত রাজতন্ত্র” – ‘The French monarchy was a feudal monarchy’ .
বিচার ব্যবস্থার দুর্নীতি: ফ্রান্সের বিচারব্যবস্থা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সরকারি কর্মচারীরা ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত ও অত্যাচারী। Letters de Grass and Letters de Cachet দ্বারা নাগরিকদের বিচারের ক্ষেত্রে রাজা হস্তক্ষেপ করতে পারতেন। প্রথম ক্ষমতা প্রয়োগ করে তিনি আদালতের দ্বারা প্রদত্ত শাস্তি মাফ করতে পারতেন। দ্বিতীয় ক্ষমতা দ্বারা তিনি যেকোনো নাগরিককে বিনা বিচারে কারাগারে আটক রাখতে পারতেন।প্রদেশগুলিতে রাজস্ব আদায়কারী ইনটেনডেনটরা ছিল ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত অর্থলোলুপ।তারা বহু প্রকার বাড়তি কর আদায় করত এবং এর বৃহৎ অংশ তারা আত্মসাৎ করত। তাদের দুর্নীতি ও প্রতাপে তৃতীয় শ্রেণীর লোকেদের দুর্গতির সীমা ছিল না।
বৈদেশিক নীতি: এক্ষেত্রে পঞ্চদশ ও ষোড়শ লুই প্রকাণ্ড ব্যর্থতার নজির সৃষ্টি করেন। পঞ্চদশ লুই অষ্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধে (১৭৪০-১৭৪৮খ্রিঃ) এবং সপ্তবর্ষের যুদ্ধে পরাজিত হন। ষোড়শ লুই এ পরাজয় থেকে শিক্ষা না নিয়ে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যোগ দেন। এই দীর্ঘ যুদ্ধগুলোতে ফ্রান্সের পরাজয়ে ফ্রান্সের মর্যাদা নষ্ট হয়। এছাড়া জনস্বার্থের ব্যাপক ক্ষতি হয় ও রাজকোষ শূন্য করে দেয়।
রাজস্ব নীতি: প্রথমত, যাদের কর প্রদানের ক্ষমতা ছিল যথা- অভিজাত ও উচ্চ যাজক, তারা কর প্রদান থেকে অব্যাহতি ভোগ করত। অন্যদিকে যাদের কর প্রদানের ক্ষমতা ছিল না, যথা- কৃষক, পাতি বুর্জোয়া ও উচ্চ বুর্জোয়া, তারাই করের ভারে নিষ্পেষিত হতো। রাজা অভিজাত ও যাজকদের ওপর কর বসিয়ে রাজস্ব ঘাটতি দূর করতে সাহস করেননি। এজন্য সরকার সর্বদাই অর্থসংকটে ভুগত।
বুরবো রাজারা ছিলেন ঘোর অমিতব্যয়ী। যুদ্ধ ও অমিতব্যয়ের ফলে রাজস্ব ক্রমশ কমতে থাকে। আদায়ী রাজস্ব থেকে সরকারি ব্যয় সঙ্কুলান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। উপায় না দেখে রাজা ষোড়শ লুই অবশেষে স্টেটস জেনারেলের অধিবেশন ডাকেন। এর ফলে বুরবো স্বৈরতন্ত্রের দুর্বলতা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সাধারণ জনগণ শেষ পর্যন্ত এই শাসনের নামে শোষণব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য তৎপর হয়। শুরু হয় বিপ্লবের। @ Bayzid Ahmed
৩৪
কিংবদন্তির খনা: যার প্রজ্ঞায় হেরে জিহ্বা কেটে নিয়েছিল স্বামী ও শ্বশুর
কথিত আছে খনা ছিলেন একজন বিদুষী নারী। তার নামে অনেকগুলো ছড়া-বচন প্রচলিত আছে গ্রামে গ্রামে মানুষের মুখে মুখে। সেসব বচনে দেখা যায় কৃষি বিষয়ে, খাদ্য বিষয়ে, আবহাওয়া বিষয়ে তার গভীর পাণ্ডিত্য। কখন কোন কাজ করলে ভালো হবে, কোন মাসে কোন ফসলের বীজ বপন করলে উত্তম হবে, কোন পরিস্থিতিতে ঝড়, তুফান, বন্যা হবে ইত্যাদি সকল বিষয়ে তার বাস্তবসম্মত উপদেশ ছিল। অনেকগুলোর মাঝে কয়েটি উদাহরণ তুলে ধরছি-
ষোল চাষে মুলা,
তার অর্ধেক তুলা;
তার অর্ধেক ধান,
বিনা চাষে পান।
এটির মানে হলো ১৬টি চাষ দিয়ে মূলা বপন করলে ফলন পাওয়া যাবে ভালো। তুলা চাষ করতে হলে এর অর্ধেক চাষ অর্থাৎ ৮টি চাষ দিলেই হবে। ধান রোপণে এত চাষের প্রয়োজন নেই, মূলার অর্ধেক পরিমাণ অর্থাৎ ৪টি চাষ হলেই যথেষ্ট। অন্যদিকে পান উৎপাদন করলে কোনো চাষেরই প্রয়োজন নেই।
শীষ দেখে বিশ দিন
কাটতে মাড়তে দশ দিন।
অর্থাৎ চাষি যখন তার ধানের গাছে শীষ দেখতে পাবে তার ঠিক ২০ দিন পরেই যেন সে ধান কেটে নেয়। শীষ বের হবার ২০ দিন পর ধান কাটার এবং মাড়াই করার উপযুক্ত সময়।
শুনরে বাপু চাষার বেটা
মাটির মধ্যে বেলে যেটা
তাতে যদি বুনিস পটল
তাতে তোর আশা সফল
অর্থাৎ বেলে মাটিতে যদি পটল চাষ করা হয় তাহলে চাষি তার আশা অনুরূপ ফলন পাবে। এগুলো বাদেও আরো শত শত খনার বচন প্রচলিত আছে লোককথায়।
কিন্তু একজন নারীর এমন প্রাজ্ঞা স্বাভাবিক ছিল না সে সময়। তার প্রজ্ঞায় ঈর্ষান্বিত হয়ে, তার কাছে তর্কে হেরে গিয়ে, তাকে দমিয়ে রাখার জন্য, চিরকালের জন্য তার মুখ বন্ধ করে দেবার জন্য শ্বশুর ও স্বামী মিলে তার জিব কেটে দেয়। সত্য-মিথ্যা যাচাই করার ক্ষমতা নেই। এ ঘটনা স্রেফ একটি উপকথা বা লোকবিশ্বাস ব্যতীত আর কিছুই নয়।
তবে খনা নামে একজন জ্ঞানী নারীর অস্তিত্ব যে ছিল এবং কোনো কারণবশত তার জিব যে কেটে ফেলা হয়েছে এটি সত্য। একটি ধারণা অনুসারে তার জন্ম হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসতের দেউলি গ্রামে। সেখানে তার বাবার নাম অটনাচার্য। বাবার নাম কীভাবে এখন বেরিয়ে এলো? অটনাচার্যই যে তার বাবা এর শক্ত কোনো ভিত্তি নেই। শুধু খনার একটি বচনে তার উল্লেখ আছে বলে একেই তার বাবা বলে অনুমান করা হয়। বচনটি এরকম- “আমি অটনাচার্যের বেটি, গণতে গাঁথতে কারে বা আঁটি।”
এই ধারণা অনুসারে খনা বেড়ে উঠেছিল রাজা ধর্মকেতুর আমলে। সে এলাকায় মাটি খনন করে বেশ কিছু প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয় এগুলো রাজা ধর্মকেতুর রাজ্যে চন্দ্রকেতুর ধ্বংসাবশেষ। স্থানীয় লোকেরা এখানে একটি পাকা সমাধি বা ঢিবির মতো অংশ খুঁজে পান। তাদের ধারণা এটিই খনার সমাধি। এ ধারণা থেকে তারা একে ‘খনা-মিহির ঢিবি’ বলেও ডাকে।
তবে প্রত্নতত্ত্ববিদরা বলছেন এসব নিদর্শন আরো অনেক প্রাচীন। সে হিসেবে এখানেই খনার সমাধি আছে এরকম তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হয় না।
আরেকটি ধারণা বলছে, খনা ছিলেন সিংহল রাজ্যের রাজকন্যা। আর এদিকে রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজ্যের জ্যোতিষবিদ ছিলেন বরাহ। জ্যোতিষবিদ্যায় তার দখল ছিল বেশ। কথিত আছে, একদিন তার পুত্র মিহিরের কোষ্ঠী গণনা করে দেখতে পান তার আয়ু আর মাত্র এক বছর আছে। এত অল্প আয়ু দেশে আশা ছেড়ে দিয়ে ছেলেকে একটি পাত্রের মাঝে ভরে ভাসিয়ে দেন সমুদ্রের জলে। সেই পাত্র ভাসতে ভাসতে এসে ঠেকে সিংহল দ্বীপে। সিংহলের রাজা তাকে তুলে নিয়ে লালন পালন করতে থাকে। ছেলেটি বড় হলে নিজের কন্যা লীলাবতীর সাথে বিয়ে দেন। লীলাবতীই পরবর্তীতে খনা নামে সকলের কাছে পরিচিত হয়। লীলাবতী ও মিহির পরবর্তীতে ঘটনাক্রমে বাংলায় চলে আসেন।
তার নাম কীভাবে খনা হলো এটিও ভাবার বিষয়। প্রচলিত ধারণা অনুসারে লীলাবতীর জন্ম হয়েছিল এক শুভক্ষণে। এজন্য তিনি ক্ষণা। এখান থেকেই পরিবর্তিত হয়ে খনা নামটি এসেছে। আরেকটি ধারণানুসারে উড়িয়া ভাষায় খোনা মানে হলো বোবা। লীলাবতীর জিব কেটে দেবার ফলে তিনি বোবা হয়ে যান বলে সেখান থেকে তার নাম খোনা বা খনা হয়ে থাকতে পারে।
তিনি কত আগে জীবনকাল অতিবাহিত করেছিলেন সেটি নিয়েও মতভেদ আছে। কেউ কেউ অনুমান করেন ৮০০ থেকে ১১০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝে কোনো একসময়ে তার জীবনকাল ব্যাপ্ত ছিল।
খনার বচনগুলোর কোনো লিখিত রূপ ছিল না। এগুলো মানুষের মুখে মুখে বেঁচে ছিল এতদিন। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে গেছে সময়ে সময়ে। মানুষের মুখে মুখে বেঁচে রয়েছিল বলে স্বাভাবিকই এর মাঝে পরিবর্তন আসবে। শুরুতে বচনগুলো প্রাচীনই ছিল, সময়ের সাথে সাথে মানুষের মুখে মুখে সেগুলো বিবর্তিত হয়ে আজকের রূপে এসে দাঁড়িয়েছে।
খনার বচন নিয়ে আরো একটি প্রশ্ন দেখা দেয়। এখানে কৃষি, আবহাওয়া, খাদ্য, জ্যোতিষবিদ্যা সম্বন্ধে অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা বলা আছে। একজনের পক্ষে এতকিছু জানা সম্ভব নয়। বর্তমানের শিক্ষা পদ্ধতিতে কেউ বই পুস্তক পড়ে স্বল্প সময়ে অনেক কিছু জেনে ফেলতে পারে। কিন্তু সে সময়ে কোনোকিছু সম্বন্ধে জানতে হলে লাগতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা।
এর একটি সমাধান হতে পারে এমন- যুগে যুগে বিভিন্ন সময়ে মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা থেকে নানা ধরনের শ্লোক তৈরি করেছে। সেগুলো প্রচলিতও হয়েছে। পরবর্তীতে সেসব শ্লোক বিশেষ ব্যক্তির নামে প্রচলিত না হয়ে সবগুলো একত্রে একজন ব্যক্তি খনার নামে প্রচলিত হয়েছে। এখান থেকে একটি প্রশ্ন জাগে খনা নামে কেউ কি আদৌ ছিল?
উত্তর হলো হ্যাঁ, খনা নামে একজন নারীর অস্তিত্ব ছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই। পাশাপাশি তিনি বেশ কতগুলো শ্লোক বা বচন প্রদান করেছিলেন তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। সন্দেহ হলো খনার বচনের সবগুলোই তিনি প্রদান করেছেন কিনা? সবগুলোর প্রদত্তা তিনি না হওয়াটাই বাস্তবসম্মত।
এদিকে খনার পরিণতির কথাও প্রণিধানযোগ্য। খনার শ্বশুর বরাহ কাজ করতেন বিক্রমাদিত্যের রাজ্যের রাজসভায়। খনার স্বামী মিহির একসময় পিতার সাথে রাজসভায় কাজে যোগ দেন এবং জ্যোতিষবিদ্যায় বুৎপত্তি লাভ করেন। একসময় তারা গণনায় একটি সমস্যা দেখা দেয়। কোনোভাবেই সে সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছিল না। এমতাবস্থায় এ সমস্যা সমাধান করে দেন লীলাবতী তথা খনা। সমাধান করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন রাজার। এতে সভার পদ হারানোর সম্ভাবনা দেখেন শ্বশুর। একপর্যায়ে সম্ভবত খনার সাথে তার তর্কও হয়। একজন নারীর তর্কে না পেরে এবং রাজ সভাসদের পদ হারানোর ভয়ে পুত্রকে আদেশ দেন তার জিহ্বা কেটে নিতে[10], যেন আর কোনোদিন কথা বলতে না পারে।
স্বামী ও শ্বশুর মিলে তার জিহ্বা কেটে দিলে সেখান থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাতেই খনা মৃত্যুবরণ করেন। কথিত আছে, জিহ্বা কেটে ফেলার আগে তিনি ফরিয়াদ জানিয়েছিলেন তার কিছু কথা বলার আছে, কারণ জিহ্বা কেটে ফেললে সেগুলো আর বলা সম্ভব হবে না। তাকে অনুমতি দেয়া হলো। একজন সে কথাগুলো লিখে রাখার চেষ্টা করলো কিংবা শ্রুতিতে ধরে রাখার চেষ্টা করলো। সেগুলোই পরবর্তীতে খনার বচন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
খনাকে নিয়ে লেখা হচ্ছে বই, কবিতা-
শোন সব্বাই খনার কাহিনী এবারে
মধ্যযুগের বঙ্গভূমিতে
এক ছিল মেয়ে, তার নাম খনা
প্রথম মহিলা কবি বাংলার
তার জিব কেটে নিলো পাঁচজনা
জিব কেটে নেওয়া খনার বচন
সাগরে পাহাড়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়ল।
খনা নামের সেই মেয়েটিই শুধু
রক্তক্ষরণে মরলো।
(মল্লিকা সেনগুপ্ত, খনার গান) Monirul Hoque
৩৫
দ্বিজাতি তত্ত্ব কি ভুল ছিল?
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এক সাংবাদিক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে প্রশ্ন করেছিলেন; গ্রামে, পাড়ায় কিংবা মহল্লায় হিন্দু ও মুসলিম উভয়েই মিলেমিশে থাকে। এদের মধ্যে ব্যাপক পরিমাণে সম্প্রীতিও পরিলক্ষিত হয়। তারপরও তাদেরকে আপনি হিন্দু-মুসলিম দুই জাতি হিসেবে আলাদা করছেন কেন? প্রশ্নটির উত্তরে জিন্নাহ বলেছিলেন, যেখানে এবং যেভাবেই তারা থাকুক না কেন, তারা বাস করে দুটি আলাদা জাতি হিসেবে। তারা একসাথে থাকলেও তারা এক নয়। তারা ভিন্ন, তারা স্বতন্ত্র।
দ্বি-জাতি তত্ত্বের প্রবক্তা
সৈয়দ আহমদ খান সর্বপ্রথম দ্বি-জাতি তত্ত্বের ধারণা জনসমক্ষে নিয়ে আসেন বলে ধারণা করা হয়। যখন সমগ্র ভারত স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতীয়তাবাদী রূপ নিচ্ছে, তখনই তিনি মুসলমানদের আলাদা জাতি হিসেবে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হতে নিরুৎসাহিত করেন। সেসময় তার এই প্রচারকে সানন্দে গ্রহণ করে তৎকালীন শাসকেরা। কেননা ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন রুখতে এটিই ছিল অন্যতম ট্রাম্প কার্ড।
পরবর্তীতে কবি ও দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবাল মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারণা সামনে নিয়ে আসেন। মুহাম্মদ ইকবাল ১৯৩০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের এক অধিবেশনে তার ধারণা পেশ করতে গিয়ে বলেন যে, ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মাঝে মাত্র আট কোটি মুসলমানের নিরাপত্তা প্রদান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সমাধান হিসেবে হয়তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনতা মেনে নেয়া অথবা সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা হয়ে সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করা।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ
জিন্নাহ’র দ্বি-জাতি তত্ত্বের প্রস্তাবনার পর ব্রিটিশদের প্ররোচনায় এ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িকতা আরও প্রকট আকার ধারণ করলে ক্যাবিনেট মিশন ভারতীয় উপমহাদেশকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করার চিন্তার দিকে এগোচ্ছিল। হিন্দু-মুসলিম হিসেবে ভাগ করার পাশাপাশি বঙ্গভঙ্গ এবং বঙ্গভঙ্গ রদের কথাও তাদের মাথায় ছিল। লর্ড মাউন্টব্যাটন ধারণা করেছিলেন, সকলে সম্মত হলেও বাংলা স্বতন্ত্র ‘ডোমিনিয়ান’ হিসেবেই থাকতে চাইবে। তবে বাস্তবে ঘটে তার উল্টোটা!
ভারত ভাগ করতে গিয়ে সবচেয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছিল বাংলা ও পাঞ্জাব অঞ্চলকে নিয়ে। ভারত এবং পাকিস্তান উভয়েই চেয়েছিল এই দুটো অঞ্চল তাদের সঙ্গে থাকুক। কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে সবটুকু রাখাও সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ উভয়েই বাংলা ও পাঞ্জাবভাগের পক্ষে সম্মত হলেন। ইংল্যান্ড থেকে উড়িয়ে আনা হলো ব্যারিস্টার র্যাডক্লিফকে। কখনো ভারতবর্ষের মাটিতে পা না রাখাই র্যাডক্লিফের যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হলো। তারপর বাংলা ও পাঞ্জাবের প্রায় নয় কোটি মানুষের ভাগ্য তিনি পেন্সিল দিয়ে কেটে ভাগ করে দিলেন। হয়তো এ কারণে তিনি মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্তও হয়েছিলেন। ১৯৪৭ তাদের ১৩ই অগাস্ট ভারত ত্যাগ করেন র্যাডক্লিফ আর ১৬ই অগাস্ট লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত ও পাকিস্তানের মানচিত্র উন্মুক্ত করেন সকলের সামনে। এভাবে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে গেল একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী।
দেশভাগের পর
দেশভাগের পরেও দেখা গেলো, অনেক মুসলমান ভারতে রয়ে গেছে। পরবর্তীতে দেখা গেলো, পাকিস্তানে অবস্থানরত মুসলমানের তুলনায় ভারতেই মুসলমানের সংখ্যা বেশি! তবে দেশভাগের পরপরই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ফিরে গেলেন তার প্রথম জীবনের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানে। পাকিস্তানে এসেই তিনি ঘোষণা দিলেন, এখানকার সবাই এখন থেকে পাকিস্তানী। সে হোক হিন্দু কিংবা মুসলিম, বাঙালি কিংবা পাঞ্জাবী সকলেই পাকিস্তানী। আবার যে সংখ্যক মুসলিম ভারতে অবস্থান করছিল, তারা সকলেই হয়ে যায় ভারতীয়! অর্থাৎ যে সংস্কৃতি ও বৈপরীত্যের দোহাই দিয়ে ভারতকে বিভক্ত করা হলো, সে বৈপরীত্য নিয়েই বিভক্ত দুই রাষ্ট্র আবারও চলতে শুরু করে।
পাকিস্তান কিংবা ভারতে হিন্দু-মুসলমান সবাই যদি সমানই হবে, তবে দেশভাগের প্রয়োজন কী ছিল? শুধুই কি ক্ষমতার লোভ, নাকি ইংরেজদের ষড়যন্ত্র? কিন্তু তারপরেও কী সবাই সমান হতে পেরেছিল? সাতচল্লিশের পূর্বে যেমন দাঙ্গা হতো, দেশভাগের পরেও তেমনি দুই দেশেই দাঙ্গা হতে থাকলো। সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হল না।
পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের মানুষেরা ভেবেছিল, পাকিস্তান হলেই মুক্তি। কিন্তু তখন বিভাজন দেখা গেলো বাঙালি-অবাঙালি প্রশ্নে। অর্থাৎ উভয়েই মুসলিম হলেও সাংস্কৃতিক বৈপরীত্যের ফলে একসাথে চলা সম্ভব হচ্ছিল না। ১৯৫২ সালে প্রথমেই আঘাত এলো সংস্কৃতির ওপরে। সে আঘাতের জের ধরেই তৈরি হয় ‘৬২, ‘৬৬, ‘৬৯, ‘৭১ এর পটভূমি। দাবিটা কিন্তু বাঙালিয়ানার ছিল না, ছিল অধিকারের। কথা ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রে আমরা বৈষম্যের স্বীকার হবো না। কিন্তু বৈষম্য পিছু ছাড়েনি। তাই বিভক্ত হতে হলো আবারও। মাঝে ৩০ লাখ লোককে প্রাণ দিতে হল, দুই লাখ মা-বোনকে হারাতে হল তাদের সম্ভ্রম। তারপর এলো বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক চিত্র
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরেও দ্বি-জাতি তত্ত্ব ঠিকই বিদ্যমান রয়েছে গেছে। শুরুতেই বলা হয়েছিল, জাতি হিসেবে হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি বাস করা সমস্যা নয়। সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ধনী-গরিব দু’টি আলাদা জাতির অবস্থান। জাতি হিসেবে ধনী-গরিব পাশাপাশি বাস করলেও তারা সর্বদাই আলাদা।
দ্বি-জাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রথমে ভারত-পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ভাগ হয়েছে। কিন্তু মূল যে দু’টি জাতি- ধনী এবং গরিব, সে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি, সে বৈষম্যের ঘটেনি কোনো তারতম্য। ধর্মের ভিত্তিতে এই উপমহাদেশ ভাগ হলেও, ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ তিনটি দেশেই হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশেই বাস করছে। কিন্তু ক্ষমতালোভী রাজনীতিকরা নিজেদের স্বার্থে ভাগ করেছে এই কোটি কোটি জনগণকে। Abu Rayhan Khan
৩৬
টিপু সুলতান: ইতিহাসের নায়ক নাকি খলনায়ক
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে টিপুর নাম ছিলো এক বিভীষিকা। ইউরোপে তখন নেপোলিয়নের জয়জয়কার। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের ভয় ছিলো, টিপু সুলতান নেপোলিয়নের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতকে ব্রিটিশমুক্ত করবেন। আশঙ্কা একেবারে অমূলকও নয়। অটোমান এবং ফরাসি সাম্রাজ্যের প্রধানদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সাহায্য চেয়েছিলেনও টিপু সুলতান। যা-ই হোক, ১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তমে টিপুর মৃত্যু ছিলো তাদের কাছে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার মতো। ভারতের মাটিতে তো বটেই, টিপুর মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর ব্রিটেনের মাটিতেও উৎসবের ঢেউ লাগে। টিপুর মৃত্যুর পর তাঁর রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তমে লুটতরাজের এক মহোৎসব শুরু হয়।
ভারতীয়দের মধ্যে টিপুকে নিয়ে এই আগ্রহের পেছনে অবশ্য যত না ইতিহাস চর্চার অবদান, তার চেয়েও বেশি অবদান নব্বইয়ের দশকে ডিডি ন্যাশনাল টিভি চ্যানেলে দেখানো ‘দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান’ নামের সিরিয়ালটির। এমনকি ‘দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান’-এর লেখক ভগবান এস গিদোয়ানীও স্বীকার করেছেন কোনো ভারতীয় নয়, বরং লন্ডনে এক ফরাসী ছাত্রই তাকে টিপু সুলতানের বীরত্বগাথার সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দেয়। ডিডি ন্যাশনালের পরে এই গিদোয়ানীর মাধ্যমেই ‘টিপু ভক্তি’ আবারও ফিরে আসে ভারতে।
কিন্তু কথার পিঠেও কথা থাকে। টিপুকে নিয়ে বর্তমানে এই ‘কথার পিঠের কথা’গুলোই জোরদার হয়ে উঠেছে। বছর দুই আগে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে দেশটির কর্ণাটক রাজ্য একটি প্যারেড বের করা হয়, যাতে একদম সম্মুখভাগে ছিলো তরবারি হাতে টিপুর একটি চলমান ভাষ্কর্য। প্রজাতন্ত্র দিবসে ভারতীয় জাতীয়তার প্রতীক হিসাবে টিপুকে গ্রহণ করা যেতে পারে কিনা, তাই নিয়েই উত্তপ্ত আলোচনা শুরু হয় টুইটারে। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, ২০০ বছরেরও বেশি সময় আগে মারা যাওয়া এই ব্যক্তিকে নিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার টুইট হয়েছে।
টুইটগুলোর বেশিরভাগেই টিপুকে ‘বীর’ এবং ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দেয়া হলেও এমন টুইটও কম নয় যেখানে তাকে স্রেফ ‘বর্বর’ এবং ‘খুনী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘টিপু সুলতানঃ দ্য টায়রান্ট অব মহীশুর’ নামের ইতিহাস গ্রন্থের রচয়িতা সন্দীপ বালাকৃষ্ণা টিপুভক্তিকে ‘ইতিহাসের একটি খোলাখুলি বিকৃতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সন্দীপ এবং অন্যান্য টিপু-সমালোচকদের দাবি, টিপু গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছেন, হিন্দুদের মন্দির, খ্রিস্টানদের চার্চ ধ্বংস করেছেন, অন্তত দশ হাজার ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছেন। বলা হয়ে থাকে, কর্ণাটকের কোদাভা সম্প্রদায়ের হিন্দুদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে টিপু বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবন্দীকে চাপের মুখে ইসলামে দীক্ষিত করেন। এছাড়া মালাবার ও কালিকূট আক্রমণেও এমন ধর্মান্তরের ঘটনা ঘটে বলে টিপু-বিরোধীরা দাবি করে থাকে।
কিন্তু টিপুকে ভারতের স্বাধীনতার রক্ষাকারী বীর হিসেবে যেসব ইতিহাসবিদেরা দাবি করেন, তারা এই সমালোচনাগুলোকে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের প্রচারণা হিসেবেই আখ্যা দিয়েছেন। ভারতের বিকল্পধারার অনলাইন জার্নাল ‘কাউন্টার কারেন্টস’-এর লেখক সুভাষ গাতাদি টিপুর বিরুদ্ধে আনা ধর্মান্তরের অভিযোগকে ইতিহাসের বিকৃতি উল্লেখ করে জানান, ১৯২৮ সালে ভারতের এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক বি.এন. পাণ্ডের কাছে তার ছাত্ররা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর একটি লেখা নিয়ে আসেন, যেখানে বলা ছিলো টিপুর ধর্মান্তরের চাপের মুখে ৩০০০ ব্রাহ্মণ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। ছাত্রদের আগ্রহের কারণে তথ্যের সূত্র চেয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে চিঠি পাঠান বি.এন পাণ্ডে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী উত্তরে জানান, তিনি মহীশুর গ্যাজেটিয়ার পত্রিকাতে এই তথ্য পেয়েছেন। পরবর্তীতে মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক শ্রীকান্তিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্যগুলোকে মিথ্যা বলে বি.এন.পাণ্ডেকে জানান। আর পুরো ঘটনাটা ‘সাম্রাজ্যবাদের সেবায় ইতিহাস’ নামে ১৯৭৭ সালে রাজ্যসভায় দেয়া একটি ভাষণে উল্লেখ করেন বি.এন পান্ডে।
‘কাউন্টার কারেন্টস’ এ প্রকাশিত এই লেখায় সুভাষ গাতাদি আরো দাবি করেন, কর্ণাটকের উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী সংঘ পরিবারই এ টিপু বিদ্বেষের মূল হোতা। টিপুকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে দিন দিন প্রভাবশালী হয়ে উঠতে থাকা এই উগ্রবাদী শক্তিগুলোর রাজনীতির রূপ আবার নানা রকম। বছর পাঁচেক আগের কথা ধরা যাক। কর্ণাটক রাজ্যের বিজেপি থেকে বেরিয়ে গিয়ে কর্ণাটক জনতা পক্ষ নামের এক দল খোলেন হিন্দুত্ববাদী নেতা বি.এস. য়েদ্দিউরুপ্পা। যথারীতি এলো নির্বাচন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় মুসলিম ভোটারদের কাছে নিজেকে তুলে ধরতে অন্য রকম এক পদক্ষেপ নেন য়েদ্দিরুপ্পা। টিপু সুলতানের সেই বিখ্যাত তলোয়ার এবং তাঁর রণকৌশলের অনুকরণে এক সুন্দর মহড়া বা ‘সোর্ড ড্যান্স’-এর আয়োজন করেন তিনি। এরপর গঙ্গায় অনেক জল বয়ে গেছে। নির্বাচনের বৈতরণী পেরিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন তিনি। ২০১৪ সালে নিজের গড়া দল নিয়ে ফের ভিড়েছেন বিজেপিতে। গদিতে বসার পরপরই রাজ্যের জনপ্রিয় উৎসব ‘টিপু জয়ন্তী’ বন্ধের উদ্যোগ নেন তিনি। এ লক্ষ্যে জোর জনসংযোগও শুরু করেন। ভারতের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক বিভেদ যতই জোরালো হচ্ছে, ততই জোরালো হচ্ছে টিপু বিদ্বেষ। কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও সত্তরের দশকে টিপু সুলতানের নামে এক জীবনী প্রকাশ করে, যেখানে তাঁর নামে কোনো ধরনের নিপীড়নের অভিযোগ আনা হয়নি। টিপু ইস্যুতে আরএসএসের অবস্থান এখন প্রায় উল্টো।
কর্ণাটকের জনগণের মধ্যে টিপুর গ্রহণযোগ্যতার গভীরতা মাপতে রাজ্যের লোকসাহিত্যের দিকে একটু নজর দেয়া যেতে পারে। ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে অর্থাৎ টিপু সুলতানের মৃত্যুর পরপরই অনেকগুলো লোকসংগীত রচিত হয়, যা কালের ধারাবাহিকতায় এখনও জনপ্রিয়। কর্ণাটকের লোকসাহিত্যের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রিটিশবিরোধী হাতেগোনা কিছু গোত্রপতি ছাড়া আর কোনো সম্রাটকে নিয়ে কর্ণাটকে শোকগাথা রচিত হয়নি। আর এই শোকগাথা বা ‘লাভানা’গুলোর জনপ্রিয়তাই এই নেতার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়।
সম্প্রতি কর্ণাটকে একটি নির্মিতব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে ‘টিপু বিশ্ববিদ্যালয়’। এই নামকরণের পক্ষে-বিপক্ষেও চলছে প্রচারণা। টিপুকে নিয়ে এই বিতর্কের মূল কারণ এই যে, তাকে নিয়ে যত তথ্য পাওয়া যায় তার মূল উৎস ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের লেখা বই, যেগুলোর অধিকাংশেরই সত্যতা যাচাই করা এখন আর সম্ভব নয়। তাই টিপু সুলতানকে নিয়ে এই বিতর্ক যে খুব সহজেই থামবে এমন সম্ভাবনাও নেই। @ Team Roar
৩৭
ইতিহাসের আলোচিত বিচারগুলো
সক্রেটিসের অপরাধ
৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্ব। এথেন্সের আদালতে হাজির হলেন এক বয়স্ক আসামী। অপরাধ এথেন্সের যুবসমাজকে পথভ্রষ্ট করা এবং প্রচলিত ধর্মের অবমাননা। অথচ সক্রেটিস নিজেকে মনে করতেন ধাত্রীর মতো। মানুষের চিন্তার প্রসবের সহযোগিতা করা যার কাজ। মাঝে মাঝে নিজেকে তুলনা করেছেন মাছির সাথে। যে পশুরূপী রাষ্ট্রের চারপাশে ভনভন করে। গ্রীক দর্শনের জন্মদাতা। আদালতে দাঁড়িয়ে অসঙ্কোচে ধরিয়ে দিয়েছেন নিজের অবস্থান।
এথেন্সের মানুষ, আমি তোমাদের শ্রদ্ধা করি ও ভালোবাসি। কিন্তু তারচেয়ে বেশি দায়বদ্ধ ঈশ্বরের প্রতি। যতক্ষণ জীবন ও সামর্থ্য আছে, দর্শন চর্চা এবং শিক্ষাদান থেকে কেউ আমাকে থামাতে পারবে না। কখনো বদলাবোনা আমার এই পথ। যদি বহুবার মৃত্যুবরণ করতে হয়, তবুও না। (Socrates: The apology and Crito of Plato, Boston, Roberts Brothers, 1882, Page- 47)
বিচারে সক্রেটিসকে বন্দী রাখা হলো। সিদ্ধান্ত এলো হেমলক পানে মৃত্যুদণ্ডের। সকল ঘটনা বর্ণনা করেছেন শিষ্য দার্শনিক প্লেটো ও জেনোফোন। কারাগার থেকে সক্রেটিসের পালানোর সুযোগ করে দিতে চাইলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। বরং নির্ধারিত দিনে স্বেচ্ছায় মুখে তুলে নিলেন হেমলক।
এই বিচার দার্শনিক মহলকে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। উত্থাপন করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন। গণতন্ত্রের প্রকৃতি কেমন? মত প্রকাশে স্বাধীনতার মূল্য কতটুকু? নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের বিরোধ কোথায়? রাষ্ট্রের মূলনীতি কেমন হওয়া উচিত?
গ্যালিলিও বনাম চার্চ
সক্রেটিসের দুই হাজার বছর পর। ১৬৩৩ সাল। রোমে তলব করা হলো গ্যালিলিওকে। অপরাধ চার্চের আদেশ অমান্য, বিনা অনুমতিতে বই প্রকাশ, ধর্মবিরোধী মত এবং বাইবেল সম্পর্কে সংশয় প্রচার। তারও আগে ১৬১৬ সালের দিকে তাকে বলা হয়েছিল কোপার্নিকাসের মত নিয়ে ঘাটাঘাটি না করতে। ইতোমধ্যে গ্যালিলিও আবিষ্কার করেন টেলিস্কোপের মতো যন্ত্র। সাথে আছে পড়ন্ত বস্তু এবং সরল দোলকের সূত্রের মতো কিছু মতবাদ। প্রত্যক্ষ করেন পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে নিয়ত ঘূর্ণায়মান।
এরিস্টটল ও টলেমীয় নীতি মোতাবেক, পৃথিবীই সৌরজগতের কেন্দ্র। স্বয়ং বাইবেলের বর্ণনাও তা বলে। সুতরাং ১৬৩২ সালে গ্যালিলিও তার মত প্রকাশের সাথে সাথে ডাকা হয় আদালতে। বিচারক পোপ অষ্টম আরবানের নিযুক্ত ফাদার ভিনসেনজো ম্যাকোলিনি। জীবনের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে গ্যালিলিও বিবাদে জড়াতে চাননি। গ্যালিলিও কৌশল করলেন। তিনি যা লিখেছেন, তা নিজে বিশ্বাস করেন না। বিচারক শুনে শাস্তির মাত্রা কমালেন। বই বাজেয়াপ্ত, অনির্দিষ্টকালের জন্য কারাবাস এবং প্রতি সপ্তাহে সাতটি করে তিন বছর বাইবেলের শ্লোক পাঠ। রায় শুনে গ্যালিলিও শুধু আস্তে পা ঠুকে বলেছিলেন, E Pur Si Muove যার অর্থ ‘তবুও পৃথিবী ঘুরবে’।
১৯৯২ সালে ক্যাথোলিক চার্চ নিজের ভুল মেনে নেয়। ২০০০ সালে পোপ দ্বিতীয় জন পল গ্যালিলিওর বিচার ও অন্যান্য ভুলের জন্য স্বীকারোক্তি দেন।
সালেমের ডাইনি
ম্যাসাচুসেটস্-এর একটা গ্রামের নাম সালেম। সময়টা ১৬৯২ সালের বসন্তের দিকে। ৯ বছর বয়সী এলিজাবেথ এবং ১১ বছর বয়সী আবিগেইল আক্রান্ত হলো হিস্টেরিয়ায়। স্থানীয় ডাক্তার কিছুক্ষণ দেখেশুনে সিদ্ধান্ত দিলেন জাদুর কারসাজি। জাদু করেছে কোনো ডাইনি। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো হিস্টেরিয়া। প্রতিষ্ঠিত হলো ডাইনিদের জন্য বিশেষ বিচারের ব্যবস্থা। টিটুবা, সারাহ অসবোর্ন ও সারাহ গুডকে সাব্যস্ত করা হলো ডাইনি হিসেবে।
বিচারের জন্য আনা হলে বাকি দুজন অস্বীকার করে। প্রচণ্ড চাপে ও ভয়ে নিজেকে ডাইনি বলে স্বীকার করে নেয় টিটুবা। খুব সম্ভবত কিছু তথ্য দিয়ে নিজেকে রক্ষা করার জন্য। ফলে গোটা ম্যাসাচুসেটস্ জুড়ে প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ল। চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে যোগাড় করা হলো সন্দেহভাজন ডাইনিদের। ১৯ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। কারাগারে অসংখ্য।
আবহাওয়া পরিবর্তন ঘটতে শুরু করলো দ্রুত। হ্রাস পেতে থাকলো হিস্টেরিয়া প্রকোপ। বিচার নিয়ে সন্দেহ উঠতে দেরি হলো না। প্রথমে থামলো, তারপর নিন্দা জানালো মানুষ। অন্যান্য অপরাধের ন্যায় ডাইনিদের অপরাধের শাস্তি দেবার আগে প্রমাণের শর্ত যুক্ত করার প্রসঙ্গ আসলো। দশজন ডাইনির মুক্তি পাওয়া একজন নিষ্পাপকে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে উত্তম। গভর্নর বিশেষ আদালতের বিলুপ্তি ঘোষণা করলেন অক্টোবরের দিকে। মুক্তি পেলো যারা কয়েদি অবস্থায় কালাতিপাত করছিল। ম্যাসাচুসেটস্-এর সাধারণ আদালত পরবর্তীতে দণ্ডপ্রাপ্তদের ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করেন।
লিজি বোর্ডেন আখ্যান
তার খালাস পাবার একশো বছর পরেও ঘটনাটা মানুষকে প্রভাবিত করেছে। জন্ম দিয়েছে ভৌতিক, রোমাঞ্চকর এবং রহস্যময় নানা গল্পের। ঘটনাটা আরো বেশি পরিচিতি পায় নার্সারিতে পাঠ্য একটা ছড়ার জন্যও।
“লিজি বোর্ডেন কুঠার নিলো তুলে,
আর তা দিয়ে চল্লিশ কোপে মাকে দিলো ফেলে;
দেখলো যখন কী করেছে সব,
বাপ ফিরলে বসিয়ে দিলো একচল্লিশ কোপ।”
(লেখক কর্তৃক অনূদিত)
লিজি বোর্ডেন সম্পর্কে অভিযোগ, সে তার বাপ-মাকে কুড়াল দিয়ে হত্যা করেছে। আগস্টের ৪ তারিখ, ১৮৯২সাল। লিজির বাবা এন্ড্রু ব্যবসায়িক কোনো কাজে বাইরে বেড়িয়েছিলেন। বাসায় ছিল লিজি, তার সৎ মা অ্যাবি এবং এক আইরিশ দাসী ব্রিজেট সালিভান। বাসায় ফেরার পর এন্ড্রু একটু শুয়েছিলেন। সময় সকাল ১১:১৫। লিজির ভাষ্যমতে, সে তার বাবাকে মৃত দেখতে পায়। কুড়াল দিয়ে বারবার আঘাত করা হয়েছে মাথায়। উপরের তলায় পাওয়া গেলো অ্যাবির মৃতদেহ। তাকে হত্যা করা হয়েছে আরো নির্মমভাবে। পরবর্তীতে পরীক্ষায় জানা যায় অ্যাবির মৃত্যু হয়েছে স্বামী এন্ড্রুর আগে।
জানা যায়, আগের দিন ৩রা আগস্ট লিজি প্রাসিক এসিড বা হাইড্রোজেন সায়ানাইড (একপ্রকার বিষ) কেনার চেষ্টা করে। কিছু দিন পরে অভিযোগ করা হয় সে চুলায় একটা পোশাক পুড়েছিল। তারপরেও ১৮৯৩ সালে বিচারকেরা তাকে খালাস দেয়। কারণ তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ শুধুই অনুমিত, প্রমাণিত নয়। ঘটনার সাথে সরাসরি লিজি জড়িত এমন কোনো তথ্য নেই। সে যা-ই হোক, পরবর্তী সংস্কৃতিতে এই রহস্যময় ঘটনাকে নানাভাবে উপস্থাপন করে রচিত হয়েছে নানা আখ্যান।
একজন স্কোপস এবং বানর মামলা
১৯২৫ সাল। যুগের দুই বিখ্যাত আইনজীবী মুখোমুখি হলেন একে অপরের। রাষ্ট্র ও বাদীপক্ষে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান এবং বিবাদীপক্ষে ক্ল্যারেন্স ডারো। মামলাটা ডারউনের বিবর্তনবাদ শিক্ষা দেওয়াকে কেন্দ্র করে।
১৯২৫ সালের মার্চে টেনিসীর প্রশাসক বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব অস্বীকার করাকে অপরাধ ঘোষণা করেন। ডারউইনের মতবাদ বাইবেলের সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং তা শিক্ষা দেওয়া আইন অস্বীকারের নামান্তর। জন টি স্কোপস্ নামক স্কুলশিক্ষককে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। রাষ্ট্রীয় ব্যায়ে চালিত স্কুলে ভুল শিক্ষা দেবার দায়ে জরিমানা করা হলো ১০০ ডলার। মামলাটি ‘মৌলবাদী আক্ষরিক বিশ্বাস বনাম ধর্মগ্রন্থের উদার ব্যাখ্যা’ হিসাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে মানুষের। ব্রায়ান মামলায় জিতলেও জনগনের সামনে অপমানিত হন তার মৌলবাদী ধ্যানধারণার জন্য। ঠিক পাঁচ দিন পরে মৃত্যুবরণ করেন ব্রায়ান।
১৯২৭ সালে আবার সামনে আসে মামলাটি। সাংবিধানিক বিষয়গুলো মীমাংসিত হয় ১৯৬৭ সালে। বিতর্কিত আইনকে রদ করার মধ্য দিয়ে।
চার্লস ম্যানসনের কাণ্ড
প্রথম দিকে বেশিরভাগ সময় ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার কিশোর সংশোধনাগারে থেকেছেন চার্লস ম্যানসন। ১৯৬৭ সালের দিকে ক্যালিফোর্নিয়ায় পাড়ি জমান। পরের বছর প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও প্রচারণামূলক সংগঠন ‘ফ্যামিলি’। অনুসারীরা তাকে যীশুর অবতার বলে মনে করতো। মূলত তাদের বিশ্বাসের অধিকাংশ গড়ে উঠে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী এবং মনোবৈজ্ঞানিক বিষয়কে কেন্দ্র করে। ম্যানসন প্রচার করতে থাকেন খুব শীঘ্রই জাতিতে জাতিতে যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। তার ফলে ধ্বংস হয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। ‘ফ্যামিলি’-কে প্রতিষ্ঠিত করে যাবে ক্ষমতায়।
ম্যানসনের অনুসারীর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ফ্যামিলির সদস্যরা ম্যানসনের নির্দেশে কয়েকটি খুন করে। তার মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় অভিনেত্রী শ্যারন টেট, মোশন-পিকচার পরিচালক রোমান পোলানস্কির স্ত্রী। খুন করা হয়েছে তিনজন অতিথিসহ লস এঞ্জেলেসের বাসায়।
১৯৭০ সালে ম্যানসন ও তার অনুসারীদের বিচার রাষ্ট্র ও জনগনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরের বছর ম্যানসনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ায় ১৯৭২ সালে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তির কারণে কার্যকর করা যায়নি। তার বদলে আজীবনের জন্য কারাবাস দেয়া হয়।
ও. জে. সিম্পসন ও জোড়া খুন
সিম্পসন একজন ফুটবল তারকা। দুই খুনের মামলায় তার জড়িত হবার ঘটনা এতটাই আলোচনায় আসে যে, একে ‘সিম্পসন বনাম জনগন’ বলে আখ্যা দেওয়া শুরু হতে থাকে। সিম্পসন তার নিজের জন্য বাঘা বাঘা সব আইনজীবী নিযুক্ত করেন রবার্ট শাপিরোর নেতৃত্বে। তাদের মধ্যে এলেন ডেরশোভিটজ্ এবং জনি কোক্রেনও ছিলেন।
১২ই জু্ন, ১৯৯৪সাল। সিম্পসনের সাবেক স্ত্রী নিকোল ব্রাউন সিম্পসন এবং তার বন্ধু রোনাল্ড গোল্ডম্যানকে হত্যা করা হয় লস এঞ্জেলেসের বাসায়। সন্দেহের তীর যায় সিম্পসনের দিকে। ১৭ জুন বন্ধু এ.সি. কাউলিংসের গাড়িতে করে পুলিশ থেকে সিম্পসনের ছুটে যাওয়া ৯৫ মিলিয়ন মানুষ টেলিভিশনে দেখেছে। তারপরেও গ্রেফতারের পর মামলায় দোষী প্রমাণ করা যায়নি। বেশকিছু আলামত পাওয়া গেলেও ১৯৯৫ সালের ৩রা অক্টোবর তাকে খালাস দেওয়া হয়।
আসলে বাদীপক্ষের চৌকস আইনজীবীরা ঘটনায় অন্যরকম ঘ্রাণ আনেন। উল্টো অভিযোগ করেন লস এঞ্জেলেসের পুলিশ বিশেষ করে মার্ক ফারম্যানকে বর্ণবাদী বলে। মার্ক ফারম্যান ঘটনাস্থল সিম্পসনের বাড়িতে রক্তাক্ত দস্তানা (Gloves) পেয়েছিল। আসামীপক্ষের দাবি, তাকে ফাঁসানোর জন্য সাজানো হয়েছে। সে যাত্রায় মু্ক্তি পেলেও ১৯৯৬ সালেই আবার তাকে আদালতে দাঁড়াতে হয়। এই দফায় বিচারকেরা দোষ খুঁজে পেলেন। মৃতের পরিবারকে ৩৩.৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে আদেশ হলো।
পরবর্তীকালে সিম্পসন লিখেন “If I Did It” গ্রন্থ। সেখানে বর্ণনা করা হয়েছে কীভাবে সে খুন করতে পারতো। প্রাথমিকভাবে জনরোষে ২০০৬ সালে আটকে গেলেও ২০০৭ সালে বইটা প্রকাশিত হয়।
বিল ক্লিনটনের কেলেঙ্কারি
হাল আমলের সবচেয়ে আলোচিত প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং হোয়াইট হাউসের ইন্টার্ন মনিকা লিউনস্কির সম্পর্ক। যার পরিণতি বিল ক্লিনটনের অভিশংসন বিষয়ক টানাপোড়েন। যদিও তিনি নিজে শপথ নিয়ে অস্বীকার করেন কথাটা। গণমাধ্যমের কাছেও তার বক্তব্য ছিলো –
“ইন্টার্ন মনিকা লিউনস্কির সাথে আমার কোনো প্রকার শারীরিক সম্পর্ক ছিল না।”
দ্রুতই প্রমাণিত হয় প্রেসিডেন্ট মিথ্যা বলেছেন। তদন্ত মূলত শুরু হয়েছিল আরকানসাসের রিয়াল এস্টেটের লেনদেনে। কিন্তু কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে যায়। ৪৪৫ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে কেনেথ স্টার সেই ভূমির প্রসঙ্গ টেনেছেন মাত্র দুইবার আর প্রেসিডেন্টের যৌন কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনেছেন ৫০০ বারেরও বেশি। ১৯৯৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর ‘হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস্’-এ শপথ ভঙ্গ ও ন্যায়বিচারে বিঘ্নতার অভিযোগে অভিশংসন অনুমোদিত হয়।
সিনেটের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৯৯ সালের ৭ই জানুয়ারি। প্রধান বিচারক উইলিয়াম রেনকুইস্টের তত্ত্বাবধানে। ১২ই জানুয়ারি সিনেট ৫৫-৪৫ ভোটে ক্লিনটনকে শপথ ভঙ্গের দায় থেকে রেহাই দেয়। ১০ রিপাবলিকান ও ৪৫ ডেমোক্রেট। যারা পক্ষে ভোট দিয়েছে, তারাও প্রবল সমালোচনা করেছে প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের। কিন্তু এটাও বলা হয়, আনীত অভিযোগ প্রমাণিত নয়। আর যদি হয়েও থাকে, তাতেও সমস্যা নেই। কেননা সাংবিধানিক মতে অফিস থেকে প্রত্যাহার করার মতো অপরাধ বা অপকর্ম হয়ে যায়নি। @ Ahmed din Rumi
৩৮
প্রাচীন চীনে খোজা বানানোর সংস্কৃতি
রাজা বাদশাদের অনেকেই নিজেদের হারেমে প্রচুর নারী রাখতো। বিয়ে টিয়ে বা এরকম কোনো সম্পর্ক ঐ নারীদের সাথে থাকতো না। সময়ে সময়ে রাজা তাদের সাথে সময় কাটাতো। রাজ্যের অন্যান্যরা রাজার ক্ষেত্রে একে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতো। রাজকীয় সদস্যদের বেলায় এটাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হতো না। এটা ছিল অলিখিত এক নিয়ম। এই ধরনের নারীদেরকে বলে ‘রক্ষিতা’। প্রাচীন চীনে শাসক রাজারা রক্ষিতা রাখার দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। বিস্তৃত চীনের অবস্থা এমন ছিল যে যার যত বেশি রাক্ষিতা নারী আছে সমাজে তার স্ট্যাটাস তত উঁচুতে। কোনো কোনো সম্রাটের হারেমে হাজার হাজার রক্ষিতা থাকতো। মিং রাজবংশ এই দিক থেকে বিখ্যাত। মিং শাসনামলে তাদের হারেমে ২০ হাজার নারী ছিল।
এই নারীগুলোকে জোর করে ধরে আনা হতো কিংবা পরিবার থেকে ছিনিয়ে আনা হতো। তাই এরা যেন পালিয়ে না যায় বা ভেতরে কোনো ঝামেলা না করে তার জন্য পাহারাদার রাখা হতো। নারী দিয়ে পাহারার কাজ চলে না, পাহারাদার হতে হবে কোনো পুরুষ। কিন্তু এখানে একটা সমস্যা দেখা দেয়, পাহারাদার হিসেবে যে যে পুরুষ থাকবে তারা আবার রক্ষিতাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলবে নাতো? রক্ষিতাদের ঔরসে শুধুই রাজ রক্তের উত্তরাধিকার তৈরি হবার পাশাপাশি বাইরের রক্ত মিশ্রিত হয়ে যাবার একটা ভয় থেকেই যায়। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য রাজারা একটা পথ বেছে নেয়। পাহারাদারদের যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়া। এই প্রক্রিয়াকেই বলে খোজাকরণ। ইংরেজিতে Eunuch ইউনাক ।
এই প্রক্রিয়ায় খুব ধারালো ছুরির সাহায্যে পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষ উভয়ই কেটে ফেলা হতো। চীনে খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০ অব্দ থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া প্রচলিত ছিল। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ঝুঁকি বেশি। তাই এই সমস্যার সমাধানে ধীরে ধীরে পুরুষাঙ্গ রেখে শুধুমাত্র শুক্রথলী কেটে খোজা বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
৩৯
মানুষ প্রথম জুতো পরতে শুরু করে কবে থেকে?
সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে আসে যে, মানুষ প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে জুতো পরতে শুরু করেছিল। এখন পর্যন্ত টিকে থাকা মানুষের সবচাইতে পুরোনো যে জুতো খুঁজে পাওয়া গিয়েছে তার বয়স ১০ হাজার বছর।
হাড়ের অবস্থা এবং জুতো
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার নৃতাত্ত্বিক দলনেতা ওয়েভার জানান, একজন মানুষ নিয়মিত শরীরচর্চা করলেও তার হাড়ের গড়ন পুরুষ্ট হয়। ফলে একজন মানুষ অনেক দিন ধরে তার হাড়ের উপরে চাপ পড়ে এমন কিছু ব্যবহার করে তাহলে হাড় একটু অন্যরকম আকৃতি নেবেই।
ইতিহাসে বিভিন্ন সময় দেখা গিয়েছে যে, তাদের পায়ের আকৃতি বড় এবং হাড় অন্যদের চাইতে বেশি মোটা ও পুরুষ্ট। তারা অনেকটা সময় হাঁটত, ভারী জিনিস বহন করতো এবং গাছে চড়তো। এগুলোই মূলত এমনটা হওয়ার পেছনের মূল কারণ। মানুষের পায়ের হাড়ে আসা এই পরিবর্তনের মূল কারণ জুতো। সেই সময়, ৪০ হাজার বছর আগেই জুতো পরিধান করতে শুরু করে প্রাচীন মানবেরা।
জুতো, নাকি অন্যকিছু?
অন্য নৃতাত্ত্বিকদের মতে, হাড় কি কেবল এই একটি কারণেই ছোট হতে পারে? না! একদম নয়। নৃতাত্বিকগণ জানান যে, ইতিহাসের যে সময়টায় এসে এরিক হাড় এবং জুতো পরার মধ্যে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছেন সেই সময়ে মানুষ পূর্বের চাইতে অনেক বেশি কর্মঠ হতে শুরু করেছিল। ফলে তাদের কার্যক্রম কমে যাওয়ার ফলে হাড়ের গঠনগত পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল এমনটাও হতে পারে।
সেই একই সময়ে কেবল মানুষের পায়ের নয় বরং পুরো শরীরের হাড় সংকুচিত হতে শুরু করে। এদিক দিয়েও এরিকের জুতোর তত্ত্ব খাটে না। তবে এরিকের গবেষণা ও যুক্তিকে একদম উড়িয়ে দিয়েছেন তা-ও নয়। আর সেটা সম্ভবও নয়। @ সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি
৪০
কলম্বাসের আগমন ও আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের করুণ পরিণতি
ক্রিস্টোফার কলম্বাস, যাকে আমেরিকা মহাদেশের আবিষ্কারক নামে সবাই জানেন। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে ভুলবশত আমেরিকার ভূখন্ড আবিষ্কার করে ফেলেন। আমেরিকায় ইউরোপিয়দের শাসন প্রতিষ্ঠায় ও আধুনিক সভ্যতার সূচনায় যার ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন একজন ঈশ্বর পূজারী। ভাগ্যচক্রে সামান্য একজন তাঁতী থেকে ‘সাগর-মহাসাগরের নৌ সেনাপতি’ রূপে আবির্ভাব ঘটে তার। আমেরিকার ভূখণ্ডের আবিষ্কারক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় একটি বড় অংশ দখল করে সারা দুনিয়া জুড়ে অনেক সম্মান কামিয়েছেন কলম্বাস।
কিন্তু এটিই কি সম্পূর্ণ ইতিহাস? তার এই অর্জনের পেছনে চাপা পড়ে গেছে অসংখ্য নিরপরাধ নারী, শিশু, পুরুষ ও বৃদ্ধের মৃত লাশের আর্তনাদ। চাপা পড়ে গেছে দাসে পরিণত হওয়া অসহায় মানুষগুলোর যন্ত্রণা। চাপা পড়ে গেছে সাজানো গোছানো সংসার আর স্বাভাবিক জীবনযাপন হারানোর বেদনা। ক্রিস্টোফার কলম্বাস যে দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছেন সেগুলো হচ্ছে আটলান্টিক দাস বাণিজ্য ও আমেরিকায় আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের উপর সংঘটিত গণহত্যা। একজন খুনী ও অত্যাচারী শাসক হিসেবেও তার পরিচয় আছে। আমেরিকার আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের জীবনে এটি ছিল সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য যে, কলম্বাস ভারতে না পৌঁছে আমেরিকায় পদার্পণ করেন। কী ঘটেছিল তখন?
প্রথমেই বলে রাখা ভালো, কলম্বাস আমেরিকা মহাদেশে আসা প্রথম ইউরোপিয়ান নন। বেশ কিছু তথ্যমতে, তারও ৫০০ বছর আগে লেইফ এরিকসন নামের আইসল্যান্ডের একজন পরিব্রাজক উত্তর আমেরিকায় পা রাখেন। ১৫ শতকের দিকে স্পেনের আর্থিক অবস্থা অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রের মতো তেমন উন্নত ছিল না। তাই তারা ভাবলেন, যদি তারা তাদের স্বর্ণের পরিমাণ বাড়াতে পারেন তাহলে হয়তো তাদের অনেক লাভ হবে।
অন্যদিকে কলম্বাসও অজানা ভূখণ্ডের সন্ধানে গিয়ে অনেক টাকা ও সুনাম কামানোর জন্য অনেক উদগ্রীব ছিলেন। সেই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে তখনকার স্পেনের রাজা- রানীকে ভারতীয় উপমহাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্য সাহায্য আবেদন করলেন এবং অনেক স্বর্ণ ও মূল্যবান মসলা সামগ্রী এনে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। প্রতিদানে স্পেনের শাসক কলম্বাসকে লাভের ১০ শতাংশ ও নতুন আবিষ্কৃত ভূমির গভর্নর পদ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কলম্বাস তিনটি জাহাজ নিয়ে রওনা দিলেন এবং ভুলবশত আমেরিকার বাহামাস দ্বীপে পৌঁছালেন। দিনটি ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর, যা কলম্বাস দিবস হিসেবে পালিত হয়।
সেখানকার আরাওয়াক গোষ্ঠী তাদেরকে সাদরে আমন্ত্রণ জানালো। নানা রকম আপ্যায়ণ করলো এবং কোনো কিছুর কমতি রাখলো না। এমনকি কলম্বাসের সবচেয়ে বড় জাহাজ ‘সান্তা মারিয়া’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেলে সেটি মেরামতের কাজেও আরাওয়াকরা সাহায্য করে। স্থানীয় ইন্ডিয়ানদের এমন অমায়িক, কোমল ও অতিথিপরায়ণ আচরণ দেখে কলম্বাস ভাবলেন, মাত্র ৫০ জন লোক দিয়েই এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
আদিবাসীরা তখন অলংকার পরতেন। এটি কলম্বাস লক্ষ্য করেন। মনে মনে ভাবলেন, এখানে নিশ্চয়ই অনেক স্বর্ণ পাওয়া যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় সেই স্বর্ণ? সেটি খুঁজতে তিনি কয়েকজন ইন্ডিয়ানকে বন্দী বানিয়ে জাহাজ নিয়ে গেলেন। প্রথমে কিউবায়, তারপর হিস্পানিওলাতে (বর্তমান হাইতি ও ডমিনিকান ডিপাবলিক )। কলম্বাস আমেরিকার প্রথম ঘাঁটি বানান হিস্পানিওলাকে।
সেখানে দলের ৩৯ জনকে রেখে স্পেনের উদ্দেশ্যে বাকি দুটি জাহাজ নিয়ে রওনা দেন তিনি। যেকোনো মূল্যে স্বর্ণের খোঁজ করতে নির্দেশ দেয়া হয়। কলম্বাস তার জাহাজে আরো কয়েকজন ইন্ডিয়ানকে বন্দী করে স্পেনে নিয়ে যান। একটি ঘটনা না বললেই নয় যে, ফেরত আসার পূর্বে স্থানীয় কিছু তাইনোদের সাথে তীর-ধনুক নেয়া নিয়ে কলম্বাসের কথা কাটাকাটি হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে তার নির্দেশে দুজন আদিবাসীকে তলোয়ারের আঘাতে মেরে ফেলা হয়।
এদিকে স্পেনে ফিরে এসে কলম্বাস অনেক মনোমুগ্ধকর তথ্য দেন রাজা-রানীকে। যার বেশির ভাগই ছিল মিথ্যা। তিনি তাদের জানান, তিনি এশিয়া পৌঁছেছেন ও চীনের একটি দ্বীপে তিনি ঘাঁটি বানিয়েছেন এবং সেখানে অনেক স্বর্ণ ও মসলা সামগ্রী রয়েছে, যার জন্য তার আরো বড় দল প্রয়োজন। এজন্য তিনি ১৭টি জাহাজ ও প্রায় ১,২০০ লোক নিয়ে আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এরপর থেকে শুরু হলো আরাওয়াকদের (যারা তাইনো নামেও পরিচিত) উপর আসল নির্মমতা।
তিনি ফিরে এসে দেখলেন, তার রেখে যাওয়া লোকেরা সবাই স্থানীয়দের সাথে সংঘর্ষে নিহত হয়েছে। কারণ, তারা স্বর্ণ খুঁজতে গিয়ে নারী ও শিশুদের জোর করে ধরে নিয়ে এসে যৌন নির্যাতন করার চেষ্টা করেছিল। এই যাত্রায় কলম্বাস স্বর্ণের সন্ধান না পেলেও আদিবাসীদের ক্রীতদাস হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কয়েকজন স্প্যানিশ ও পোষা হিংস্র কুকুর মিলে প্রায় ১,৫০০ আরাওয়াক নারী, পুরুষ ও শিশুকে ধরে নিয়ে এসে একসাথে জড়ো করা হয়। সময়টা তখন ১৪৯৫ সাল। সেখান থেকে ৫০০ জনকে বাছাই করে জাহাজে করে দাস হিসেবে কলম্বাস স্পেনে পাঠান, যার মধ্যে পথেই মারা যায় প্রায় ২০০ জন।
হিস্পানিওলার একটি প্রদেশে ১৪ বছরের উপরের সব স্থানীয় ইন্ডিয়ানকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনা তিন মাস পরপর জমা দেওয়ার আদেশ করেন কলম্বাস। যারা এতে ব্যর্থ হয় তাদের দুই হাত কেটে ফেলা হতো এবং ফলশ্রুতিতে রক্তপাতে তারা মারা যেত। অনেকে সহ্য করতে না পেরে পালানোরও চেষ্টা করতো। তাদেরকে হিংস্র কুকুর দিয়ে খুঁজে বের করে মেরে ফেলা হতো। যাদেরকে বন্দী করা হতো তাদেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা আগুনে পুড়িয়ে মারা হতো।
এত নির্মমতা সইতে না পেরে আরাওয়াক গোষ্ঠীর লোকরা বিষ পানে গণ-আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। মায়েরা তাদের ছোট ছোট বাচ্চাদের বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে, যাতে স্প্যানিশরা সেসব বাচ্চাদেরকে কুকুরের খাবারে পরিণত করতে না পারে। এভাবে নানা উপায়ে প্রায় ৫০ হাজার আদিবাসী আত্মহত্যা করে। খুন, অঙ্গহানী ও আত্মহত্যার কারণে মাত্র দুই বছরে হাইতির ২ লক্ষ ৫০ হাজারের অর্ধেক জনসংখ্যা লাশে পরিণত হয়, যার সবকিছুই ঘটে শুধুমাত্র স্বর্ণ উত্তোলনেকে কেন্দ্র করে।
যখন কলম্বাস দেখলেন, এখানে আসলে কোনো স্বর্ণ নেই তখন তিনি আরাওয়াকদের বিভিন্ন জমি দখল করে তাদের দাসে পরিণত করলেন এবং হাজার হাজার ইন্ডিয়ানকে নিষ্ঠুর পরিশ্রম করতে বাধ্য করলেন। যার ফলে হাজার হাজার মানুষ মারা গেলো। যুদ্ধ, অত্যাচার, রাহাজানিতে ছেয়ে গিয়েছিল আদিবাসীদের জীবন। ১৫১৫ সাল নাগাদ ৫০ হাজার ইন্ডিয়ান প্রাণে বেঁচে ছিল। ১৫৫০ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়ালো মাত্র ৫০০ জনে এবং ১৬৫০ সালের হিসাব অনুসারে, দ্বীপটিতে আদি আরাওয়াক গোষ্ঠীর কেউ বেঁচে রইলো না।
কলম্বাসের আবির্ভাবের পর ইন্ডিয়ান আদিবাসীদের সাথে যে অত্যাচার সংঘটিত হয়েছে তার অনেক তথ্য উঠে এসেছে কলম্বাসের নিজস্ব জার্নাল ও বিভিন্ন চিঠির মাধ্যমে। আরো বিশদ ইতিহাস জানা যায় ফাদার বার্তোলমে দে লাস কাসাস নামক একজন স্প্যানিশ ঐতিহাসিকের লেখা ‘হিস্টোরি অব দ্য ইন্ডিস’ এ। তিনি বেশ কয়েক বছর কলম্বাসের সাথে কাজ করেছিলেন। এমনকি কলম্বাসের ব্যক্তিগত যে জার্নাল ছিল, যেখানে কলম্বাস নিজের হাতে সব ঘটনার বর্ণনা লিখেছেন, সেই জার্নালটিও লাস কাসাসের কাছে পরবর্তীতে প্রদান করা হয়।
ফাদার বার্তোলমে একসময় কলম্বাসকে নিজের আদর্শ ভাবতেন। কিন্তু যখন তিনি আস্তে আস্তে দেখলেন, কলম্বাস একটির পর একটি অপরাধ করেই যাচ্ছেন, তখন তিনি কলম্বাসের সঙ্গ ছেড়ে আদিবাসীদের আসল তথ্য তুলে ধরার কাজ শুরু করলেন। তাদের উপর হওয়া নির্মমতার চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করলেন। সেজন্য তাকে ‘ইন্ডিয়ানদের রক্ষাকারী’ বলে অভিহিত করা হয়। তার ভাষ্যমতে, স্প্যানিশরা তাদের ছুরি কিংবা তলোয়ারের ধার পরীক্ষা করার জন্য ইন্ডিয়ানদেরকে টুকরো টুকরো করে কাটতো। এমনকি একদিন দুটি ছোট্ট আদিবাসী শিশুর হাত থেকে পাখি ছিনিয়ে নিয়ে কোনো কারণ ছাড়াই সেই শিশু দুটির শিরচ্ছেদ করে তারা।
একজন স্প্যানিশ ইতিহাসবিদের মতে, ১৫১৬ সালে যেকেউ জাহাজ নিয়ে কোনো রকম মানচিত্র অথবা কম্পাস ছাড়াই বাহামাস থেকে হিস্পানিওলা যাওয়া যেত, কারণ পানিতে মৃত আদিবাসীদের লাশই দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করতো। বিভিন্ন সময়ে আদিবাসীরা বাধা দেয়ার চেষ্টা করে, দখলদারদের উপর আক্রমণ চালায় এবং অত্যাচারীদের সাথে সংঘর্ষে যায়। কিন্তু কখনোই তারা সফল হতে পারেনি। কারণ আদিবাসী ও স্প্যানিশদের মধ্যে অস্ত্রের একটি বিশাল পার্থক্য বিরাজমান ছিল।
একপক্ষের কাছে ছিল আধুনিক, অত্যন্ত ফলপ্রসূ হাতিয়ার এবং অন্য পক্ষের কাছে ছিল হাতে বানানো, সামান্য অলাভজনক হাতিয়ার। এতে আমেরিকার আদিবাসী ইন্ডিয়ানরা স্প্যানিশদের সাথে পেরে উঠতে পারেনি। তাদেরকে কেউ সাহায্য করতে এগিয়েও আসেনি। এদিকে কলম্বাসের কর্মকান্ডের জন্য তাকে ও তার ভাইদেরকে যখন গ্রেফতার করে শাস্তির জন্য স্পেনের রাজা-রানীর সামনে হাজির করা হলো, তখন স্বর্ণ ও ক্রীতদাস লাভের অজুহাত দেখিয়ে কলম্বাস ও তার ভাইদেরকে ক্ষমা করে ছেড়ে দেয়া হয়। ক্রিস্টোফার কলম্বাস তার অপরাধের জন্য কখনো শাস্তিভোগ করেননি।
হয়তো সেজন্যই ইতিহাসের পাতায় যুগান্তকারী নায়ক হিসেবে তার পরিচয়। বাহামাস, হিস্পানিওলা ও কিউবার লাখ লাখ আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের উপর করা অত্যাচারের কোনো বিচার হয়নি। উল্টো স্কুলের ইতিহাসের বইগুলোতে তাকে একজন মহান ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। জাঁকজমক করে কলম্বাস দিবস পালন করা হয়। নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা থেকে গেছে তার কালো অধ্যায়। Tasnim Ferdows Fatir
৪১
কেন বেশিরভাগ উড়োজাহাজ সাদা রঙের হয়
আকাশে তাকালে আমরা প্রায় সব উড়োজাহাজকেই সাদা রঙের দেখি। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, নীল, লাল বা সবুজ রঙের প্লেন কেন সচরাচর দেখা যায় না? এর পেছনে কেবল সৌন্দর্য নয়, বরং বড় বড় কিছু বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক কারণ লুকিয়ে আছে।
১. সূর্যের তাপ থেকে সুরক্ষা (Heat Reflection)
সাদা রং সূর্যের আলো এবং তাপ সবথেকে বেশি প্রতিফলিত করে। একটি প্লেন যখন কয়েক হাজার ফিট ওপর দিয়ে ওড়ে, তখন সেটি সরাসরি প্রখর রোদের সংস্পর্শে আসে। সাদা রঙের কারণে প্লেনটি খুব বেশি গরম হয় না, ফলে ভেতরের কেবিন এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিগুলোও ঠান্ডা থাকে। অন্য গাঢ় রং হলে তা তাপ শোষণ করে প্লেনকে উত্তপ্ত করে তুলত।
২. বিশাল অংকের টাকা সাশ্রয় (Cost Efficiency)
একটি বড় উড়োজাহাজ রং করা মোটেও সস্তা কাজ নয়। একবার পুরো প্লেন রং করতে প্রায় ১ কোটি টাকারও বেশি খরচ হয়। এছাড়া সাদা রঙের মেইনটেইনেন্স বা রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক কম। রঙিন প্লেনের রং রোদে তাড়াতাড়ি ফিকে বা ফ্যাকাশে হয়ে যায়, ফলে বারবার রং করার প্রয়োজন পড়ে, যা কোম্পানির জন্য অনেক ব্যয়বহুল।
৩. ত্রুটি বা ফাটল সহজেই ধরা পড়ে (Safety Inspection)
নিরাপত্তার খাতিরে প্লেন নিয়মিত চেক করা হয়। সাদা রঙের ওপর যেকোনো ছোট ফাটল (Crack), তেল লিক (Oil leakage) বা অন্য কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি খুব সহজেই চোখে পড়ে। গাঢ় রঙের ওপর এই ধরণের সমস্যাগুলো খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে, যা বড় ধরণের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
৪. ওজন কমানো (Weight Reduction)
আপনি কি জানেন, রঙিন পেইন্ট প্লেনের ওজন কয়েকশ কেজি বাড়িয়ে দিতে পারে? রঙিন পেইন্টে অনেক পিগমেন্ট থাকে যা সাদা রঙের চেয়ে ভারী। প্লেনের ওজন যত বেশি হবে, তার জ্বালানি খরচও তত বাড়বে। তাই সাদা রং ব্যবহার করে জ্বালানি খরচও কমানো সম্ভব হয়।
৫. পুনরায় বিক্রয় মূল্য (Resale Value)
একটি সাদা প্লেন অন্য কোনো কোম্পানির কাছে বিক্রি করা সহজ। কারণ, নতুন কোম্পানি চাইলে খুব সহজেই তার ওপর নিজেদের লোগো বসিয়ে দিতে পারে। কিন্তু পুরো রঙিন প্লেন হলে সেটি নতুন কোম্পানির মনের মতো করে আবার রং করা অনেক সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়সাধ্য ব্যাপার।
শেষ কথা
রঙিন প্লেন যে একেবারেই হয় না তা নয়, কিছু শৌখিন কোম্পানি রঙিন প্লেন ব্যবহার করে। তবে উপরের এই গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর জন্যই বিশ্বের বড় বড় এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলো তাদের উড়োজাহাজের জন্য সাদাকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেয়।
৪২
বুদ্ধিমান মানুষ তার শক্তি ব্যয় করে নিজের ওপর, আর বোকারা সারা জীবন নষ্ট করে অন্যের স্বভাব বদলাতে
আমরা সবাই সমাজ সংস্কারক হতে চাই, আমরা সবাই চাই আমাদের চারপাশের মানুষগুলো আমাদের মনের মতো হয়ে উঠুক। কিন্তু এই চাওয়ার আড়ালে আমরা একটা অমোঘ সত্য ভুলে যাই। নিচের পয়েন্টগুলো আপনার ভাবনার জগতকে ওলটপালট করে দিতে পারে:
নিজের সাথে যুদ্ধে পরাজয়
আপনি কতদিন ধরে ভাবছেন কাল থেকে ভোরে উঠবেন? কতদিন ধরে ভাবছেন ওই বাজে অভ্যাসটা ছেড়ে দেবেন? অথচ আজও পারেননি। যে মানুষটি নিজের সামান্য একটা অভ্যাস বদলাতে বছরের পর বছর হিমশিম খাচ্ছে, সে কোন সাহসে অন্য একজনকে আমূল বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখে? নিজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নেই, অথচ অন্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই চেষ্টা কি হাস্যকর নয়?
নিয়ন্ত্রণের সীমানা এবং আমাদের বোকামি
পৃথিবীতে দুটি জিনিস আছে: একটি আপনার নিয়ন্ত্রণে (আপনার কাজ, আপনার চিন্তা, আপনার আচরণ), আর অন্যটি আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে (অন্যের স্বভাব, অন্যের সিদ্ধান্ত)। বুদ্ধিমান মানুষ তার শক্তি ব্যয় করে নিজের ওপর, আর বোকারা সারা জীবন নষ্ট করে অন্যের স্বভাব বদলাতে গিয়ে। দিনশেষে তারা কেবল হতাশাই পায়।
পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতা
একবার ঠান্ডা মাথায় ভাবুন—নিজেকে বদলানো কতটা কষ্টের। নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করা, নিজের অলসতা কাটানো কতটা যন্ত্রণাদায়ক। যখন বুঝবেন নিজেকে বদলানোই পৃথিবীর সবথেকে কঠিন কাজ, তখন অন্যের প্রতি আপনার ঘৃণা বা বিরক্তি কমে যাবে। আপনি বুঝবেন—সেও হয়তো তার নিজের স্বভাবের কাছে আপনার মতোই বন্দী।
পরিবর্তনের শুরু হোক 'আমি' থেকে
"তুমি যে পরিবর্তনটি পৃথিবীতে দেখতে চাও, সেটি আগে নিজের মধ্যে নিয়ে এসো।" আপনি যখন নিজেকে বদলে ফেলবেন, আপনার চারপাশের জগতটাও বদলে যেতে শুরু করবে। আপনি যখন শান্ত হবেন, অস্থির মানুষগুলো আপনাকে দেখে দিশা পাবে। অন্যকে উপদেশ দেওয়ার চেয়ে নিজের জীবন দিয়ে উদাহরণ তৈরি করা অনেক বেশি শক্তিশালী।
ইগো বনাম আত্মিক শান্তি
অন্যকে বদলানোর চেষ্টা আসলে আমাদের 'ইগো' বা অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। আমরা ভাবি আমরাই সেরা, আর বাকিরা ভুল। কিন্তু যেদিন আপনি এই সত্যটা বুঝবেন যে, প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—সেদিন আপনি অন্যকে বদলানোর বৃথা চেষ্টা ছেড়ে তাকে গ্রহণ করতে শিখবেন। আর এই 'গ্রহণ' করে নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল শান্তি।
স্ক্রল করার আগে একটি শেষ কথা
পরের বার যখন কারো ওপর রাগ হবে বা কাউকে বদলে দিতে ইচ্ছে করবে, তখন একটু থামুন। নিজের বুকের ওপর হাত রেখে নিজেকে প্রশ্ন করুন— "আমি কি নিজেকে পুরোপুরি বদলাতে পেরেছি?"
যদি উত্তর 'না' হয়, তবে অন্যের ওপর আঙুল তোলার অধিকার আপনার নেই। নিজেকে জয় করাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জয়। আগে নিজের মনের রাজা হোন, অন্যের ওপর রাজত্ব করার চেষ্টা ছেড়ে দিন।
৪৩
সুখী দাম্পত্যের আসল রহস্য: দামী উপহার নাকি ছোট ছোট স্বীকৃতি?
সংসার মানে কেবল চার দেয়ালের একটি ঘর নয়; এটি হলো দুটি মনের এমন এক মিলনস্থল যেখানে ভালোবাসা আর শান্তির চাষ হয়। কিন্তু অনেক সময় আমরা বড় বড় সুখ খুঁজতে গিয়ে ছোট ছোট সেই বিষয়গুলো ভুলে যাই, যা আসলে একটি সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে।
পুরুষদের জন্য: নারীর শক্তির উৎস তার ‘স্বীকৃতি’
একজন নারী একটি পরিবারের জন্য যতটুকু ত্যাগ করেন, তার কানাকড়িও হয়তো আমরা শোধ করতে পারব না। কিন্তু আপনি কি জানেন, তাকে খুশি রাখার সবথেকে সহজ উপায় কী?
পাবলিক স্বীকৃতি
যখন আপনি পরিবার, বন্ধু বা পরিচিত মহলে আপনার স্ত্রীর প্রশংসা করেন, তখন তার আত্মবিশ্বাস কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সবার সামনে যখন আপনি বলেন— "ওর সহযোগিতা ছাড়া আমি এতদূর আসতে পারতাম না" কিংবা "ও সবটা কত সুন্দর সামলায়", তখন তার সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি এক নিমেষে সার্থক হয়ে যায়।
কেন এটি জরুরি: নারী শুধু ভালোবাসা চায় না, সে চায় তার কাজের মূল্যায়ন বা স্বীকৃতি। আপনার সামান্য কয়েকটা কথার সম্মান তার কাছে হীরা-জহরতের চেয়েও বেশি দামি।
নারীদের জন্য: পুরুষের আশ্রয়ের নাম ‘শান্তি’
বাইরের পৃথিবীটা পুরুষদের জন্য এক ক্লান্তিকর যুদ্ধক্ষেত্র। সারাদিন লড়াই করে, মানুষের কথা শুনে আর দায়িত্বের বোঝা বয়ে সে যখন ঘরে ফেরে, তখন সে কেবল একটি জিনিসই খোঁজে— 'শান্তি'।
হাসিমুখে স্বাগতম: ঘরোয়া ঝগড়া বা অভিমান থাকতেই পারে, কিন্তু সে বাড়ি ফেরার প্রথম মুহূর্তেই তাকে অভিযোগের তিরে বিদ্ধ করবেন না। তাকে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় দিন, এক গ্লাস জল আর এক টুকরো হাসি দিয়ে তাকে বুঝিয়ে দিন যে— এই ঘরটা তার সবথেকে নিরাপদ আশ্রয়।
কেন এটি জরুরি: একজন পুরুষ যখন ঘরে ফিরে একটু শান্ত পরিবেশ আর হাসিমুখ পায়, তখন সে পরের দিনের যুদ্ধের জন্য আবার শক্তি পায়। তার কাছে শান্তির মানে হলো আপনার সঙ্গ।
সম্পর্কের সেই সোনালী সমীকরণ
সুখী সংসারের গোপন সূত্রটি আসলে খুব সহজ:
স্বামীর চাওয়া: সে চায় তার বীরত্বের সম্মান আর ঘরের শান্তি।
স্ত্রীর চাওয়া: সে চায় তার ত্যাগের স্বীকৃতি আর মনের ভালোবাসা।
এই আদান-প্রদান যখন সমানভাবে চলে, তখন সেই সংসারে অভাব থাকলেও অশান্তি থাকে না। সম্পর্কটা তখন কেবল টিকে থাকার জন্য নয়, বরং ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হওয়ার জন্য এগিয়ে যায়।
মনে রাখবেন, বড় বড় উপহার দিয়ে হয়তো সাময়িক হাসি কেনা যায়, কিন্তু আজীবন হাসি ধরে রাখতে প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
স্বামীদের প্রতি অনুরোধ: আজই সুযোগ বুঝে সবার সামনে আপনার জীবনসঙ্গিনীর অন্তত একটি ভালো গুণের কথা বলুন।
স্ত্রীদের প্রতি অনুরোধ: আজ তিনি বাড়ি ফিরলে সব অভিযোগ পাশে সরিয়ে রেখে তাকে একটু প্রশান্তির হাসি দিন।
দাম্পত্য মানে একে অপরের ওপর জয়ী হওয়া নয়, বরং একে অপরের হয়ে ওঠা।
আপনার কি মনে হয় এই ছোট পরিবর্তনগুলো একটি সংসার বদলে দিতে পারে? আপনার মতামত কমেন্টে জানান!
এই সুন্দর বার্তাটি আপনার জীবনসঙ্গীর সাথে শেয়ার করুন এবং আজ থেকেই আপনাদের সুন্দর আগামীর নতুন সূচনা করুন। Rohit Baagdii
৪৪
যখন কেউ আপনাকে ইগনোর বা অবহেলা করে
যখন কেউ আপনাকে ইগনোর বা অবহেলা করে, তখন আপনার মনে হয় পৃথিবীটা আপনার বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। আপনি নিজেকে প্রশ্ন করেন— "আমার দোষ কী ছিল?" কিন্তু মনস্তত্ত্ব বা সাইকোলজি বলছে, অবহেলার এই বিষাক্ত অনুভূতি আসলে আপনার জন্য এক বিরাট সুযোগ।
অবহেলা বা 'Ignore' হওয়া মানেই কিন্তু হেরে যাওয়া নয়। এটি আসলে একটি 'পাওয়ার গেম' বা ক্ষমতার লড়াই। যখন কেউ আপনাকে ইগনোর করে, তখন সে আসলে দেখতে চায় তার অনুপস্থিতি আপনাকে কতটা অস্থির করতে পারে। নিচের পয়েন্টগুলো আপনার ভাবনার জগত বদলে দেবে:
১. ইগনোর করা সবসময় ঘৃণা নয়, এটি একটি পরীক্ষা
সাইকোলজিতে একে বলা হয় 'Emotional Distancing'। অনেক সময় মানুষ আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য নয়, বরং আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ইগনোর করে। সে দেখতে চায় আপনি তাকে কতটা 'চেজ' বা পিছু তাড়া করছেন। আপনি যত বেশি মরিয়া হয়ে তার মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা করবেন, সে তত বেশি শক্তিশালী অনুভব করবে। আপনার অস্থিরতাই তার শ্রেষ্ঠ পাওনা।
২. প্রতিক্রিয়াহীনতার শক্তি (The Power of No Reaction)
ইগনোর করার পর আপনার নীরবতাই হলো আপনার সবথেকে বড় অস্ত্র। যখন সে দেখবে তার অবহেলা আপনার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়াই তৈরি করছে না— আপনি আগের মতোই হাসিখুশি আছেন, আপনার জীবন স্বাভাবিকভাবে চলছে— তখনই টেবিল ঘুরে যায়। আপনার এই শান্ত থাকাটাই তাকে অস্থির করে তুলবে। সে তখন নিজেকে প্রশ্ন করতে শুরু করবে, "আমি কি তবে তার জীবনে গুরুত্বহীন হয়ে গেলাম?"
৩. পিছু ছোটা মানে নিজের মূল্য কমানো
আপনি কি কখনো মরীচিকার পিছু ছুটেছেন? তৃষ্ণা তাতে মেটে না, শুধু ক্লান্তি বাড়ে। অবহেলাকারী মানুষের পেছনে ছোটা মানে নিজের আত্মসম্মান বা 'Self-Value' নিলামে তোলা। মনে রাখবেন, পৃথিবীতে যে জিনিসের যোগান বেশি, তার দাম কম। আপনি যখনই সহজে পাওয়া যাওয়ার ঊর্ধ্বে চলে যাবেন, তখনই আপনার গুরুত্ব বাড়তে শুরু করবে।
৪. নীরবতা যখন কথা বলতে শুরু করে
যে আপনাকে ইগনোর করছিল, একটা সময় সেই আপনার নীরবতায় গলতে শুরু করবে। কেন জানেন? কারণ মানুষ শূন্যতা সহ্য করতে পারে না।
৫. আত্মসম্মানই শেষ কথা
দিনশেষে, যে আপনাকে অবহেলা করে সে আসলে আপনাকে পাওয়ার যোগ্যই নয়। আপনার জীবন কোনো 'বিকল্প' বা 'অপশন' নয় যে কেউ চাইলেই ইগনোর করবে আর চাইলেই ফিরে আসবে। নিজের ভ্যালু এমন এক জায়গায় নিয়ে যান যেন কেউ আপনাকে ইগনোর করার আগে দশবার ভাবে যে— "আমি কি সত্যিই এই মানুষটিকে হারানোর ঝুঁকি নিতে পারব?"
শেষ কথা
পরের বার যখন কেউ আপনাকে ইগনোর করবে, তখন কাঁদবেন না বা তার মেসেজ আসার অপেক্ষায় ফোন চেক করবেন না। বরং একটা দীর্ঘ শ্বাস নিন এবং নিজের কাজে মন দিন।
মনে রাখবেন:
আপনার নীরবতা যদি তাকে ফেরাতে না পারে, তবে আপনার চিৎকারও কখনো তাকে ফেরাতে পারত না। যে আপনার নীরবতা বোঝে না, সে আপনাকেও বোঝে না।
নিজের গুরুত্ব নিজে দিতে শিখুন, পৃথিবী আপনাকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবে।
এমনই সব পাওয়ারফুল টিপস এবং প্র্যাকটিক্যাল জীবন দর্শন পেতে আমাদের পেজটি 'ফলো' করে রাখুন। ইন্টারনেটে ভালো কনটেন্টের ভিড়ে এই ধরণের ‘Real & Practical’ তথ্য পাওয়া সত্যিই বিরল। হারিয়ে যাওয়ার আগেই যুক্ত হোন আমাদের সাথে!
৪৫
১৮০ দিনের মাস্টারপ্ল্যান: আপনার সাফল্যের রোডম্যাপ
আপনি যদি জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে (ক্যারিয়ার, পড়াশোনা বা নতুন কোনো স্কিল) সফল হতে চান, তবে নিচের এই '৬ মাসের রূপান্তর গাইড' টি Follow করুন।
১. প্রথম ১৫ দিন: লক্ষ্য নির্ধারণ ও মানসিক প্রস্তুতি (Clarity Phase)
সফলতার প্রথম শর্ত হলো আপনি ঠিক কোথায় পৌঁছাতে চান তা জানা।
একটি লক্ষ্য বেছে নিন: একসাথে ১০টি কাজ না করে যেকোনো ১টি বড় লক্ষ্য স্থির করুন।
কেন (Why) খুঁজুন: আপনি কেন এই সফলতা চান? এই 'কেন' আপনার যখন খুব শক্তিশালী হবে, তখন আলস্য আপনাকে আটকাতে পারবে না।
রিসার্চ: আপনার লক্ষ্যের জন্য কী কী স্কিল বা রিসোর্স লাগবে তার একটি লিস্ট তৈরি করুন।
২. প্রথম মাস: পরিবেশ তৈরি ও বদভ্যাস ত্যাগ (Cleaning Phase)
আপনার চারপাশ যদি আবর্জনায় ভরা থাকে, তবে আপনি এগোতে পারবেন না।
ডিজিটাল ডিটক্স: ফালতু সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় অপচয়, গেম বা অর্থহীন ইউটিউব ভিডিও দেখা বন্ধ করুন। দরকার হলে অ্যাপ ডিলিট করে দিন।
রুটিন তৈরি: ঘুম থেকে ওঠা এবং ঘুমানোর সময় নির্দিষ্ট করুন। একটি কঠোর 'Daily Checklist' তৈরি করুন।
পরিবেশ: পড়ার বা কাজের টেবিল গুছিয়ে রাখুন। নেতিবাচক বন্ধুদের থেকে দূরে থাকুন।
৩. দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাস: গভীর সাধনা ও দক্ষতা অর্জন (Learning Phase)
এই সময়টা হবে আপনার সবথেকে কঠিন পরিশ্রমের সময়।
৮০/২০ নিয়ম: আপনার লক্ষ্যের ২০% কাজ আপনাকে ৮০% রেজাল্ট দেবে। সেই গুরুত্বপূর্ণ ২০% কাজ বা স্কিলের ওপর সবথেকে বেশি ফোকাস করুন।
Deep Work: দিনে অন্তত ৪-৬ ঘণ্টা এমনভাবে কাজ করুন যাতে ফোন বা অন্য কেউ আপনাকে ডিস্টার্ব করতে না পারে।
১% উন্নতি: প্রতিদিন নিজেকে গতদিনের চেয়ে মাত্র ১% উন্নত করার চেষ্টা করুন। মাস শেষে দেখবেন আপনি অনেক এগিয়ে গেছেন।
৪. চতুর্থ মাস: প্রয়োগ ও পরীক্ষা (Implementation Phase)
শুধু শিখলে হবে না, যা শিখলেন তার প্রয়োগ শুরু করতে হবে।
প্রজেক্ট শুরু করুন: আপনি যা শিখছেন তা দিয়ে ছোট ছোট প্রজেক্ট বা কাজ শুরু করুন। ভুল হবে, কিন্তু সেই ভুল থেকেই শিখবেন।
ফিডব্যাক: আপনার কাজ অভিজ্ঞ কাউকে দেখান। সমালোচনা শোনার মানসিকতা রাখুন এবং তা সংশোধন করুন।
ব্যর্থতাকে আলিঙ্গন: এই মাসে অনেকবার মনে হবে "আমাকে দিয়ে হবে না"। এই ভয়টাকেই জয় করতে হবে।
৫. পঞ্চম মাস: ধারাবাহিকতা ও গতি বৃদ্ধি (Scaling Phase)
এখন আপনি আপনার কাজের একটি লয় বা ছন্দ খুঁজে পেয়েছেন। এবার গতি বাড়ানোর পালা।
অ্যাডভান্স লার্নিং: আপনার স্কিলের আরও গভীরে যান। জটিল বিষয়গুলো সমাধান করার চেষ্টা করুন।
নেটওয়ার্কিং: আপনার ফিল্ডের সফল মানুষদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করুন।
স্বাস্থ্য রক্ষা: কঠোর পরিশ্রমের মাঝে শরীর যেন ভেঙে না পড়ে। পুষ্টিকর খাবার এবং হালকা ব্যায়াম করুন। মন শান্ত রাখতে মেডিটেশন করুন।
৬. ষষ্ঠ মাস: চূড়ান্ত রূপান্তর ও ফলাফল (Final Push)
এই মাসটি হলো আপনার বিগত ৫ মাসের পরিশ্রমকে সার্থক করার মাস।
রিভিউ: আপনি কতটুকু অর্জন করলেন তার হিসাব করুন। কোথায় ঘাটতি আছে তা দ্রুত পূরণ করুন।
আত্মবিশ্বাস: এখন আপনার আর মোটিভেশন লাগবে না, কারণ আপনার ভেতরে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়ে গেছে।
লক্ষ্যভেদ: আপনার মূল লক্ষ্যের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানুন। এই মাস শেষে আপনি নিজেকে আয়নায় দেখে চিনতে পারবেন না।
সাফল্যের এই ৬ মাসের 'সোনালী নিয়ম' (Golden Rules):
১. অজুহাত বন্ধ: "আজ শরীর ভালো নেই" বা "কাল থেকে করব"—এই কথাগুলো আপনার ডিকশনারি থেকে মুছে ফেলুন।
২. নীরবতা: আপনার পরিকল্পনার কথা সবাইকে ঢাক পিটিয়ে বলবেন না। আপনার কাজকে শব্দ করতে দিন।
৩. ইমোশন কন্ট্রোল: মন খারাপ বা ভালো লাগার ওপর ভিত্তি করে কাজ করবেন না। কাজ করবেন আপনার ডিসিপ্লিন বা নিয়মের ওপর ভিত্তি করে।
৪. ঘুমের সাথে আপস নয়: দিনে অন্তত ৭ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন যাতে আপনার মস্তিষ্ক ১০০% কাজ করতে পারে।
৫. প্রতিদিন ডায়েরি লেখা: দিন শেষে ডায়েরিতে লিখুন আজ আপনি কী কী করলেন এবং আগামীকাল কী করবেন।
শেষ কথা
এই ১৮০ দিন যদি আপনি নিজেকে দুনিয়া থেকে আলাদা করে শুধু নিজের লক্ষ্যের ওপর কাজ করতে পারেন, তবে এটা নিশ্চিৎ— ৬ মাস পর আপনার সফলতা কোনো স্বপ্ন থাকবে না, তা হবে আপনার বাস্তবতা।
৪৬
সাফল্য হলো একটি বিশেষ রসায়ন, যার জন্য তিনটি উপাদানের সঠিক সংমিশ্রণ প্রয়োজন।
পৃথিবীতে দুই ধরণের মানুষ আছে—একদল যারা শুধু স্বপ্ন দেখে, আর অন্যদল যারা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়। এই দ্বিতীয় দলে নাম লেখাতে হলে আপনার চরিত্রের তিনটি স্তম্ভ শক্ত হওয়া জরুরি।
১. Will (সংকল্প বা করার ইচ্ছা): আপনার ইঞ্জিনের জ্বালানি
ইচ্ছা মানে কেবল "আমি এটা চাই" বলা নয়। ইচ্ছা মানে হলো— "আমি এটা করবই, তা যত বাধাই আসুক।" আপনার ভেতরে যদি সেই আগুন না থাকে, তবে আপনি প্রথম হোঁচট খেয়েই থেমে যাবেন।
কেন এটি জরুরি: মেধা অনেকের থাকে, কিন্তু সংকল্প সবার থাকে না। যার সংকল্প বা ‘Will’ শক্তিশালী, সে হারার পরও আবার উঠে দাঁড়ানোর সাহস পায়। এটি আপনার সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তর।
২. Coachable (শেখার মানসিকতা): আপনার চরিত্রের নমনীয়তা
অনেকের ইচ্ছা আছে, কিন্তু তাদের ইগো বা অহংকার অনেক বড়। তারা মনে করে "আমি সব জানি।" মনে রাখবেন, যে পাত্রটি আগেই ভর্তি, তাতে নতুন কিছু রাখা যায় না। আপনাকে ‘Coachable’ হতে হবে—অর্থাৎ শেখার জন্য মাথা নত করার মানসিকতা থাকতে হবে।
কেন এটি জরুরি: একজন সঠিক গুরু বা মেন্টর আপনাকে গর্তে পড়া থেকে বাঁচাতে পারেন। আপনি যদি নিজের ভুল স্বীকার করতে না পারেন এবং অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে না পারেন, তবে আপনার পথ চলা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। বিনয়ই আপনাকে বড় হতে সাহায্য করে।
৩. Hungry (ভেতরের ক্ষুধা): আপনার নিরন্তর দৌড়
আপনার ইচ্ছা আছে, আপনি শিখতেও রাজি, কিন্তু আপনার যদি তীব্র ক্ষুধা না থাকে, তবে আপনি অল্পতেই সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। জয়ের ক্ষুধা মানে হলো শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা। যখন সারা পৃথিবী ঘুমাবে, তখনও আপনার ভেতরের সেই ক্ষুধা আপনাকে ঘুমাতে দেবে না।
কেন এটি জরুরি: ক্ষুধার্ত বাঘ যেমন শিকার ছাড়া ফেরে না, তেমনি সফল হওয়ার প্রবল ক্ষুধা আপনাকে মাঝপথে থেমে যেতে দেবে না। এটি আপনাকে আপনার সীমানা ছাড়িয়ে কাজ করতে বাধ্য করে।
গণিতের মতো পরিষ্কার হিসাব: একটিও কম হলে কী হবে
সাফল্যের এই সমীকরণে একটি উপাদানের অভাব মানেই পুরো ফলাফল শূন্য। লক্ষ্য করুন:
ইচ্ছা + শেখার মন আছে, কিন্তু ক্ষুধা নেই: আপনি একজন খুব ভালো ছাত্র হতে পারবেন, কিন্তু জীবনে বড় কোনো ইতিহাস লিখতে পারবেন না। আপনি ‘কমফোর্ট জোনে’ আটকে যাবেন।
ইচ্ছা + ক্ষুধা আছে, কিন্তু শেখার মন নেই: আপনি খুব দৌড়াবেন ঠিকই, কিন্তু বারবার ভুল পথে গিয়ে হোঁচট খাবেন। আপনার অহংকার আপনাকে ধ্বংস করে দেবে।
ক্ষুধা + শেখার মন আছে, কিন্তু করার ইচ্ছা নেই: আপনি কেবল একজন অলস স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে থেকে যাবেন। আপনি জানবেন কী করতে হবে, কিন্তু কাজটা শুরু করার হিম্মত আপনার থাকবে না।
শেষ কথা এই তিনের মিলনেই আপনি ‘অজেয়’
যেদিন আপনার ইচ্ছা, আপনার বিনয় (শেখার মন) এবং আপনার ক্ষুধা—এই তিনটি বিন্দু এক রেখায় আসবে, সেদিন এই মহাবিশ্বের কোনো শক্তি আপনাকে রুখতে পারবে না।
আজই নিজেকে প্রশ্ন করুন:
১. আমি কি সত্যিই এটা করতে চাই? (Will)
২. আমি কি গুরুর কাছে মাথা নত করতে রাজি? (Coachable)
৩. আমার ভেতরে কি জেতার তীব্র আগুন জ্বলছে? (Hungry)
৪৭
মনস্তত্ত্ব বা সাইকোলজি ব্যবহার করে সামনের মানুষটিকে চিনে নিতে ৫টি অব্যর্থ কৌশল
১. অনবরত কথা বলা: ইনসিকিউরিটির লক্ষণ
অনেকেই আছেন যারা এক মুহূর্ত চুপ থাকতে পারেন না, অনবরত নিজের কথা বলে যান। সাইকোলজি বলে, যারা অতিরিক্ত কথা বলে তারা অনেক সময় মানসিকভাবে দুর্বল বা ইনসিকিউর হয়। তারা চায় সবাই তাকে গুরুত্ব দিক এবং তার কথা শুনুক।
বিপরীত দিক: যারা সত্যিই মানসিকভাবে শক্তিশালী এবং আত্মবিশ্বাসী, তারা কথা কম বলে এবং অন্যের কথা বেশি মনোযোগ দিয়ে শোনে (Observe)।
২. চোখের ভাষা: সত্য বনাম মিথ্যে
কথায় আছে, মুখ মিথ্যে বললেও চোখ কখনো মিথ্যে বলে না। কথা বলার সময় যদি কেউ বারবার চোখ সরিয়ে নেয় বা সরাসরি আপনার চোখের দিকে তাকাতে না পারে, তবে বুঝবেন সেখানে কিছু একটা সমস্যা আছে।
লক্ষণ: সে হয় কোনো সত্য লুকাচ্ছে, নয়তো সে আপনার সামনে প্রচণ্ড অস্বস্তিতে আছে কিংবা ডাহা মিথ্যে বলছে। একজন আত্মবিশ্বাসী এবং স্বচ্ছ মানুষ স্বাভাবিকভাবে ‘আই কনট্যাক্ট’ মেইনটেইন করে।
৩. পোশাকের ধরণ: মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা
পোশাক মানুষের রুচির পরিচয় দেয়। যারা সবসময় অতিরিক্ত উজ্জ্বল, চড়া রঙের বা খুব বেশি ‘ফ্ল্যাশি’ পোশাক পরে সবার নজর কাড়তে চায়, তারা সাধারণত ‘অ্যাটেনশন সিকার’ (Attention Seeker) হয়।
দুর্বলতা: এদের একটু প্রশংসা করলেই এরা খুব সহজে ইমপ্রেস হয়ে যায়। এদের ভেতরে একধরণের একাকীত্ব থাকে যা তারা বাহ্যিক জৌলুস দিয়ে ঢাকতে চায়।
৪. ধীরস্থির বাচনভঙ্গি: উচ্চ বুদ্ধিমত্তার পরিচয়
যারা খুব শান্তভাবে এবং প্রতিটি শব্দ মেপে ধীরে কথা বলে, তারা সাধারণত উচ্চ বুদ্ধিমান (Highly Intelligent) হয়। তারা কথা বলার আগে চিন্তা করে এবং হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না।
প্রভাব: যারা ধীরে কথা বলে, মানুষ তাদের কথা বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করে এবং তাদের ব্যক্তিত্ব সমাজে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।
৫. অতিরিক্ত হাসি-ঠাট্টা: ভেতরের ক্ষত ঢাকার দেয়াল
আপনার চারপাশে এমন কেউ কি আছে যে সারাক্ষণ জোকস বলে সবাইকে হাসিয়ে রাখে? সবকিছু নিয়ে মজা করে? সাইকোলজি বলে, যে মানুষটি বাইরে সবথেকে বেশি কমেডি করে, সে ভেতরে ভেতরে ততটাই একা বা ভাঙা থাকে।
কারণ: এই হাসি বা কৌতুক হলো তার একটি ‘ডিফেন্স মেকানিজম’। সে চায় না পৃথিবীর কেউ তার ভেতরের কষ্ট বা কান্নাটা দেখতে পাক। তাই সে হাসির মুখোশ পরে থাকে।
পর্যবেক্ষণই আসল শক্তি
কাউকে বিচার করার আগে এই ছোট ছোট বিষয়গুলো খেয়াল করলে আপনি মানুষের আসল রূপটি ধরতে পারবেন। তবে মনে রাখবেন, সাইকোলজি কেবল মানুষকে বিচার করার জন্য নয়, বরং মানুষকে সহমর্মিতার সাথে বোঝার জন্যও।
৪৮
শান্তির ঘুম নিশ্চিত করতে কিছু কার্যকর উপায়
অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়া কেবল শারীরিক ক্লান্তি নয়, এটি একটি মানসিক যন্ত্রণাও বটে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে এবং শান্তির ঘুম নিশ্চিত করতে নিচে কিছু কার্যকর উপায় দেওয়া হলো, যা আপনার জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনবে।
রাতের নিস্তব্ধতা যখন আপনার মাথার ভেতরের চিন্তার শব্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়, তখন বুঝবেন আপনার শরীরের চেয়ে আপনার মনের বিশ্রামের বেশি প্রয়োজন। শান্তির ঘুমের জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে দেখুন:
১. স্মার্টফোনকে 'গুড নাইট' বলুন (Digital Detox)
আমাদের ঘুমের সবথেকে বড় শত্রু হলো স্মার্টফোনের 'নীল আলো' (Blue Light)। এই আলো আমাদের মস্তিষ্ককে বিশ্বাস করায় যে এখনো দিন আছে, ফলে 'মেলাটোনিন' নামক ঘুমের হরমোন তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
টিপস: ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে ফোনটি দূরে রাখুন। ওই সময়টা স্ক্রিনের বদলে বইয়ের পাতায় চোখ রাখুন।
২. ৪-৭-৮ ব্রিদিং টেকনিক (নিশ্বাসের জাদু)
এটি একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যা আপনার স্নায়ুতন্ত্রকে দ্রুত শিথিল করতে সাহায্য করে।
৪ সেকেন্ড: নাক দিয়ে গভীর শ্বাস নিন।
৭ সেকেন্ড: শ্বাসটি ধরে রাখুন।
৮ সেকেন্ড: মুখ দিয়ে আস্তে আস্তে শ্বাস ছাড়ুন।
এটি ৩-৪ বার করলেই আপনার শরীর রিল্যাক্স হতে শুরু করবে।
৩. চিন্তার ঝুড়ি খালি করুন (Brain Dump)
সারাদিনের দুশ্চিন্তা বা আগামীকালের পরিকল্পনা বালিশে শুয়ে করবেন না। যখনই দুশ্চিন্তা মাথায় আসবে, একটি ডায়েরিতে সেগুলো লিখে ফেলুন। যখন আপনি মনের কথা কাগজে লিখে ফেলেন, তখন মস্তিষ্ক হালকা অনুভব করে এবং ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয়।
৪. ঘরে ঘুমের পরিবেশ তৈরি করুন
আপনার ঘুমানোর জায়গাটি হতে হবে আরামদায়ক।
ঘরের আলো একদম নিভিয়ে দিন অথবা খুব হালকা ডিম লাইট জ্বালান।
ঘরের তাপমাত্রা কিছুটা শীতল রাখুন।
বিছানাটি কেবল ঘুমের জন্যই ব্যবহার করুন; সেখানে বসে ল্যাপটপ চালানো বা খাবার খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন।
৫. জোর করবেন না (The 20-Minute Rule)
যদি বিছানায় যাওয়ার ২০ মিনিটের মধ্যেও ঘুম না আসে, তবে জোর করে শুয়ে থাকবেন না। এতে মস্তিষ্কে জেদ চেপে বসে এবং ঘুম আরও দূরে পালায়।
কী করবেন: উঠে পড়ুন। অন্য ঘরে যান। হালকা আলোতে কোনো বই পড়ুন অথবা ধীর লয়ের কোনো যন্ত্রসংগীত শুনুন। যখন শরীর ক্লান্ত লাগবে, তখন আবার বিছানায় ফিরুন।
৬. ক্যাফেইন এবং ভারী খাবার থেকে দূরত্ব
বিকেলের পর চা বা কফি খাওয়া এড়িয়ে চলুন। ক্যাফেইন আপনার মস্তিষ্ককে ৬-৮ ঘণ্টা সজাগ রাখতে পারে। রাতে খুব ভারী বা ঝাল খাবার না খেয়ে হালকা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন।
রাতের জন্য আজকের দিনটি শেষ করুন।
আমরা অনেক সময় অতীতের আক্ষেপ বা ভবিষ্যতের ভয় নিয়ে ঘুমাতে যাই। মনে রাখবেন, বালিশ হলো ঘুমানোর জন্য, দুশ্চিন্তা করার জন্য নয়। যা হয়ে গেছে তা পাল্টানো যাবে না, আর যা হবে তা আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
আজকের দিনটি আপনার সাধ্যমতো কাটিয়েছেন, এটাই যথেষ্ট। এবার নিজেকে এবং অন্যকেও ক্ষমা করে দিন এবং শরীরকে বিশ্রাম দিন।
শেষ কথা
আপনার ঘুম আপনার মানসিক সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি। আজ রাত থেকেই ফোনটা দূরে রেখে, লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে নিজের মনকে শান্ত করুন।
৪৯
মধ্যবিত্তের শিকল ছিঁড়তে চান? তবে এই ৩টি তেতো সত্য হজম করতে শিখুন!
আমরা যারা মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হই, আমাদের রক্তে মিশে থাকে 'মানিয়ে নেওয়া' আর 'টিকে থাকা'র গল্প। কিন্তু আপনি যদি এই বৃত্ত ভেঙে এগিয়ে যেতে চান, তবে শুধু স্বপ্ন দেখলে হবে না—আপনার মানসিকতায় আনতে হবে এক আমূল পরিবর্তন।
নিজের জীবনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে এই ৩টি জীবনদর্শন আপনার হৃদয়ে গেঁথে নিন:
১. পরিকল্পনার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে 'কাজের পাগলামি' শুরু করুন
আমাদের সবথেকে বড় সমস্যা হলো আমরা 'ভাবি' অনেক, কিন্তু 'করি' খুব কম। আমরা নিখুঁত সময়ের অপেক্ষা করি, যেটা কখনো আসে না। মধ্যবিত্তের দেওয়াল টপকাতে হলে আপনাকে একশন-টেকিং মেশিন হতে হবে।
আজ আপনার মাথায় যে আইডিয়াটা আছে, সেটা কালকের জন্য ফেলে রাখবেন না। লেপ-তোশক আর কমফোর্ট জোনের মায়া ত্যাগ করুন। অলসতা আপনার সবথেকে বড় শত্রু। মনে রাখবেন, পৃথিবী কেবল তাদেরই সম্মান দেয় যারা কাজ করে দেখায়, যারা শুধু পরিকল্পনা করে তাদের নয়।
২. সারভাইভাল লুপ ভাঙতে প্রয়োজনে 'নিষ্ঠুর' হোন
আমাদের পরিবার আমাদের শিখিয়েছে—"বেশি উড়ো না, যা আছে তা নিয়েই ভালো থাকো।" তারা আমাদের কেবল 'সারভাইভ' বা টিকে থাকতে শেখায়, কিন্তু 'গ্রোথ' বা বড় হতে শেখায় না।
নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে অনেক সময় আপনাকে আপনার প্রিয়জন বা আত্মীয়দের অবাধ্য হতে হবে। তাদের চোখে আপনি হয়তো 'অহংকারী' বা 'ভিলেন' হয়ে যাবেন। কিন্তু মনে রাখবেন, নিজের চোখে 'হিরো' হওয়ার জন্য কখনো কখনো অন্যদের চোখে 'ভিলেন' হওয়া জরুরি। আপনি যদি আজ এই প্রথাগত লুপটা ভাঙতে পারেন, তবে আপনার পরের প্রজন্ম আপনাকে 'থ্যাঙ্ক ইউ' বলবে। তারা আর অভাবের সাথে লড়াই করবে না, তারা এক সচ্ছল জীবনযাপন করবে।
৩. নিজের আবেগের রিমোট কন্ট্রোল নিজের হাতে রাখুন
যদি পাশের বাড়ির লোকের কথায় আপনার মেজাজ খারাপ হয়, যদি কারো একটা তুচ্ছ মন্তব্যে আপনার পুরো দিন নষ্ট হয়ে যায়—তবে জেনে রাখুন, আপনার জীবনের মালিক আপনি নন, ওই মানুষগুলো।
মানসিকভাবে ইস্পাতের মতো শক্ত হতে শিখুন। মানুষের কথায় রিঅ্যাক্ট করা বন্ধ করুন। কেউ আপনাকে অপমান করলে রেগে না গিয়ে চুপ থাকতে শিখুন; আপনার নীরবতা এবং সাফল্যই হবে সবথেকে বড় চপেটাঘাত। যখন আপনি নিজের ইমোশন নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবেন, তখন বাইরের কোনো ঝড়ই আপনার মানসিক শান্তি কেড়ে নিতে পারবে না।
শেষ কথা
ব্যবধানটা শুধু আপনার ভাবনার!
আপনি আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন আর যেখানে পৌঁছাতে চান—এই দুইয়ের মাঝে কোনো অলৌকিক বাধা নেই। বাধাটা হলো আপনার 'মাইন্ডসেট'।
মধ্যবিত্ত হয়ে জন্মানো আপনার অপরাধ নয়, কিন্তু মধ্যবিত্ত মানসিকতা নিয়ে মরে যাওয়াটা আপনার ব্যর্থতা। সমাজ আপনাকে ছোট করে রাখতে চাইবে, পরিস্থিতি আপনাকে টেনে ধরবে। কিন্তু আপনি যদি একবার ঠিক করে নেন যে আপনি হার মানবেন না, তবে মহাবিশ্বের কোনো শক্তি আপনাকে আপনার লক্ষ্যে পৌঁছাতে আটকাতে পারবে না।
আজই নিজেকে প্রশ্ন করুন—আপনি কি সারাজীবন শুধু 'টিকে' থাকবেন, নাকি নিজের যোগ্যতায় নতুন ইতিহাস লিখবেন?
৫০
জীবনের ‘সিক্রেট রুলস’
জীবন এক গোলকধাঁধা, আর এই গোলকধাঁধা পার করার জন্য কিছু ‘সিক্রেট রুল’ জানা থাকলে পথ চলা অনেক সহজ হয়ে যায়। পৃথিবীর সফলতম ব্যক্তিরা অবচেতনভাবে এই নিয়মগুলো মেনে চলেন।
আমরা সবাই সফল হতে চাই, কিন্তু সফল হওয়ার ‘ম্যাপ’ বা মানচিত্র আমাদের জানা থাকে না। আজ আমি আপনাদের সাথে এমন ৫টি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক নিয়মের কথা বলব, যা আপনার চিন্তা করার ধরন বদলে দেবে এবং আপনাকে একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
১. মারফির ল’ (Murphy’s Law): ভয়কে নয়, লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিন
সূত্র: আপনি যেটাকে যত বেশি ভয় পাবেন, সেটার ঘটার সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়।
আমাদের মস্তিষ্ক যখন নেতিবাচক চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকে, তখন আমরা অজান্তেই ভুল কাজ করে ফেলি। আপনি যদি সারাক্ষণ ভাবেন “আমি হয়তো ব্যর্থ হব”, তবে আপনার কাজগুলোতে সেই ভয়ের ছাপ পড়বে।
টিপস: ভয়কে প্রশ্রয় দেবেন না। আপনার ফোকাস বা মনোযোগ সবসময় ‘কীভাবে জিতবেন’ সেদিকে রাখুন। ইতিবাচক চিন্তা আপনার চারপাশে এক অদৃশ্য জয়ের বলয় তৈরি করে।
২. কিডলিনের ল’ (Kidlin’s Law): কলম আর কাগজই আপনার শ্রেষ্ঠ বন্ধু
সূত্র: যেকোনো সমস্যা যদি পরিষ্কার করে লিখে ফেলেন, তবে সেই সমস্যার অর্ধেক সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়।
আমাদের মাথায় সমস্যাগুলো যখন ঘোরে, তখন সেগুলো খুব বড় আর জটিল মনে হয়। কিন্তু যখনই আপনি কাগজে লিখবেন, আপনার মস্তিষ্ক সেই সমস্যার একটি কাঠামো দেখতে পায়। তখন সমাধানের রাস্তাগুলোও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে শুরু করে।
টিপস: কোনো বড় দুশ্চিন্তা হলে আজই তা ডায়েরিতে লিখে ফেলুন। দেখবেন মনের বোঝা অনেকটা হালকা হয়ে গেছে।
৩. উইলসনের নিয়ম (Wilson’s Rule): টাকার পেছনে নয়, দক্ষতার পেছনে ছুটুন
সূত্র: যদি সবসময় জ্ঞান আর দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেন, তবে টাকা আপনার পেছনে দৌড়াবে।
টাকা সরাসরি ধাওয়া করলে ধরা দেয় না। টাকা হলো আপনার ‘ভ্যালু’ বা মূল্যের বাই-প্রোডাক্ট। আপনি যখন নিজেকে দক্ষ করে তুলবেন, সমাজ আপনাকে তার প্রতিদান হিসেবে টাকা দিতে বাধ্য হবে।
টিপস: নিজেকে প্রতিদিন অন্তত ১% উন্নত করার চেষ্টা করুন। নতুন কিছু শিখুন। দক্ষ মানুষের জন্য পৃথিবী সবসময় দরজা খুলে রাখে।
৪. ফকল্যান্ডের নিয়ম (Falkland’s Rule): নীরবতার শক্তি ও সঠিক সময়
সূত্র: যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনই প্রয়োজন নেই, তখন সিদ্ধান্ত নেবেন না।
তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত অধিকাংশ সময় ভুল হয়। যদি কোনো পরিস্থিতি আপনার নিয়ন্ত্রণে না থাকে বা এখনই কোনো উত্তর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকে—তবে সময় নিন। অনেক সময় চুপ থাকা এবং সময়কে তার কাজ করতে দেওয়াটাই শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত।
টিপস: হুট করে রেগে গিয়ে বা আবেগের বশে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। একটু সময় দিলে হয়তো আপনি পরিস্থিতি অন্যভাবে দেখার সুযোগ পাবেন।
৫. গিলবার্টের ল’ (Gilbert’s Law): নিজে দায়িত্ব নিতে শিখুন
সূত্র: কোনো কাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—আপনাকে কেউ ঠিক করে বলে দেবে না যে আসলে আপনার করণীয় কী।
স্কুলে বা কলেজে আমাদের সব বলে দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তব জীবনে বা কর্মক্ষেত্রে কেউ আপনাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে না। সফল তারাই হয়, যারা নিজের দায়িত্ব নিজে নেয় এবং নিজেই খুঁজে বের করে যে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে কী করতে হবে।
টিপস: অন্যের নির্দেশের অপেক্ষা করা ছেড়ে দিন। নিজে ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ হোন। নিজের জীবনের সিইও নিজেই হোন।
শেষ কথা
এই পাঁচটি নিয়ম কেবল পড়ার জন্য নয়, মানার জন্য। আপনি যখন ভয়কে জয় করবেন (মারফি), সমস্যাকে লিখে ফেলবেন (কিডলিন), দক্ষতাকে গুরুত্ব দেবেন (উইলসন), সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করবেন (ফকল্যান্ড) এবং নিজের দায়িত্ব নিজে নেবেন (গিলবার্ট)—তখন আপনি এক অজেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হবেন।