পলিয়্যামোরি কি?

ইংরেজিতে পলিয়্যামোরি নামক একটি শব্দ আছে, যা মূলত সম্পর্কের একটি ধরন। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি যদি একসাথে একাধিক প্রেমের সম্পর্ক বজায় রাখেন এবং সব পক্ষই বিষয়টি সম্বন্ধে জানেন ও রাজি থাকেন, তখন সেই সম্পর্ককে পলিয়্যামোরি হিসাবে সঙ্গায়িত করা হয়। যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটির এভোলিউশনারি বায়োলজিস্ট কিট ওপি জানান, গরিলারা বহুগামী। একটি পুরুষ গরিলা একাধিক নারী গরিলার সাথে মিলিত হয়। শিম্পাঞ্জি ও বোনোবো আবার প্রজননের ক্ষেত্রে অন্য কৌশল অনুসরণ করে। তারা বহু পুরুষের সাথে মিলিত হয়, মানুষের সমাজেও অতিতে এই ধরনের মিলন ব্যবস্থাই প্রচলিত ছিল, যেখানে নারী ও পুরুষ, উভয়ই একাধিক মানুষের সঙ্গে মিলিত হতো। সন্তানকে বড় করে তোলার জন্য মায়েদের বিভিন্ন পুরুষদের সহায়তা দরকার হতো, বিশেষত যেকোনও একজন পুরুষ যখন কোন নারী বা তার সন্তানের খাদ্য ও নিরাপত্তা দিত তখনই নারীরা একগামিতাকে বেছে নেয়।


রকফেলার ফাউন্ডেশন


তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন — কিন্তু  মারা গেছেন সম্পূর্ণ শূণ্য হাতে! জন ডি. রকফেলার তেল এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়ে একটি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। ২৫ বছর বয়সে, তিনি আমেরিকার বৃহত্তম তেল শোধনাগারগুলির মধ্যে একটি পরিচালনা করতেন।

৩১ বছর বয়সে, এটি বিশ্বের বৃহত্তম শোধনাগার হয়ে ওঠে। এবং ৩৮ বছর বয়সে, তিনি মার্কিন তেল পরিশোধনের ৯০% নিয়ন্ত্রণ করতেন।

তার শক্তি। তার ভাগ্য। তার নিয়ন্ত্রণ। ৫০ ​​বছর বয়সে, তিনি জীবিতদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন - তিনি প্রথম বিলিয়নেয়ার হয়ে উঠেন।

কিন্তু ৫৩ বছর বয়সে, তার শরীর খারাপ হতে শুরু করে।

তার চুল পড়ে যায়। তিনি  খুব একটা খেতে পারতেন না। তিনি  যন্ত্রণা এবং বিচ্ছিন্নতার মধ্যে বাস করতেন। তার অকল্পনীয় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও, তিনি খুবই অসন্তুষ্ট ছিল।

ডাক্তাররা সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে তিনি হয়তো বেশি দিন বাঁচবেন না। এবং একটি  ঘটনা সবকিছু বদলে দিয়েছে।

রকফেলার বুঝতে পেরেছিলেন: তার অর্থ তাকে বাঁচাতে পারবে না। এটি স্বাস্থ্য, শান্তি, বা সময় ফিরিয়ে আনতে পারে না।

তাই, তিনি তার সঞ্চিত সম্পত্তিকে মানবকল্যানে অবদানে অবদান রাখা ষুরু করেন।

তিনি রকফেলার ফাউন্ডেশন তৈরি করেছিলেন এবং এর মাধ্যমে চিকিৎসা, শিক্ষা এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য অর্থায়ন করেছিলেন -

ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, হুকওয়ার্ম এবং আরও অনেক কিছুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার সহায়তাকারী অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তিনি লক্ষ লক্ষ ডলার দান করেছিলেন - প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, বরং দান করেছিলেল তাকে জীবিত বোধ করানোর জন্য।

এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে  অসাধারণ কিছু ঘটেছিল।

তার স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছিল। তার আনন্দ ফিরে এসেছিল। তিনি কেবল আরও এক বছর বেঁচে ছিলেন না...

তিনি ৯৮ বছর বেঁচে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত, রকফেলার সেই রহস্য আবিষ্কার করেছিলেন যে সবকিছু  টাকা দিয়ে কেনা যায় না:

প্রকৃত সম্পদ তা নয় যা আপনি সংরক্ষণ করেন। আপনি যা দেন তাই আপনার চেয়ে বেশি বেঁচে থাকার সম্পদ হয়ে উঠে।



ত্রিশ বছরের বালক


আমাদের সমাজে ত্রিশ বছর বয়সী অনেক ছেলেই বালকের মতো জীবন কাটায়। তারা কোনো দায়িত্ব নিতে পারে না, কোনো লক্ষ্য স্থির করে না, অর্জনের পথে হাঁটে না। অধিকাংশ বাবা-মাকে দেখা যায় বলতে—“আমরা অনেক কষ্ট করেছি, আমাদের ছেলেমেয়েদের যেন কষ্ট করতে না হয়।”
ফলে সন্তানরা হয় দায়িত্বজ্ঞানহীন। বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া সম্পদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সম্পদ ফুরিয়ে গেলে তারা অসহায় জীবন যাপন করে। যারা একটু শিক্ষার প্রতি যত্নশীল, তারা সন্তানকে পড়াশোনায় এগিয়ে দেন, কিন্তু বাস্তবতা থেকে এতটা দূরে রাখেন যে, শেষ পর্যন্ত সন্তান হয়ে ওঠে কেবল ‘শিক্ষিত ব-ল-দ’। সমাজ ও জাতির জন্য কোনো কার্যকর অবদান রাখার যোগ্যতা তৈরি হয় না।

দায়িত্ব নেওয়ার সঠিক সময়: একজন মানুষ যদি ১৫-১৬ বছর বয়স থেকেই কাজ ও দায়িত্ব নেওয়া শুরু করে, তাহলে তার অবদানের মান ও মাত্রা দুটোই বাড়ে। অথচ আমরা সন্তানদের অনেক দেরি করে দায়িত্বে অভ্যস্ত করি। তখন তারা শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীন হয় না, দায়িত্ব পালনের যোগ্যতাও হারিয়ে ফেলে। ইসলামে ছেলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সাথে সাথেই শরিয়তের সকল দায়িত্ব তার উপর কার্যকর হয়। আল্লাহ তা-আলা এ সীমা নির্ধারণ করেছেন যেন সে দায়িত্ব নেওয়া শুরু করে। অথচ আমরা স্পুন ফিডিং করে তাদের একটি অ'ক'র্মণ্য প্রজন্মে পরিণত করছি। আমাদের সন্তানদের জন্য বাড়ি-গাড়ি জমিয়ে যাওয়া দায়িত্ব নয়। প্রকৃত দায়িত্ব হলো—তাদেরকে সঠিক সময়ে দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলা। না হলে তারা কখনো সত্যিকারের “পুরুষ” হতে পারবে না।


২০৩০ সালের মধ্যে AI এর বুদ্ধিমত্তা এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে


Kodak কোম্পানির কথা মনে আছে? ১৯৯৮ সালে কোড্যাক কোম্পানিতে ১ লক্ষ ৭০ হাজার কর্মচারী কাজ করতেন এবং বিশ্বে ছবি তোলার ৮৫%ই কোড্যাক ক্যামেরায় তোলা হত। গত কয়েক বছরে মোবাইল এবং ডিজিটাল ক্যামেরার বাড়বাড়ন্ত হওয়ায় এমন অবস্থা হয় যে Kodak কোম্পানিটাই উঠে যায়। এমনকি Kodak সম্পূর্ণ দেউলিয়া হয়ে পড়ে এবং এদের সমস্ত কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক ছাঁটাই করা হয়।

Uber কেবলমাত্র একটি software এর নাম। এদের নিজস্ব কোনো গাড়ি নেই। তবুও আজ তারা পৃথিবীর বৃহত্তম ট্যাক্সিভাড়ার কোম্পানি।

Airbnb হল আজকে দুনিয়ার সবথেকে বড় হোটেল কোম্পানি। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পৃথিবীর একটি হোটেলও তাদের মালিকানায় নেই।

আজকে উন্নত দেশগুলোতে জুনিয়র আইনজীবীদের জন্য কোনো কাজ নেই, কারণ Clio, My Case, Practice Partner নামের সফটওয়্যারগুলো যে কোনো নতুন উকিলের থেকে অনেক ভালো ওকালতি করতে পারে। নতুন ডাক্তারদেরও চাকরি যেতে বসেছে। Medscape, Merative, Telemedicine, eClinicalWorks, Doctor on Demand নামের অ্যাপগুলো মানুষের থেকে ৪ গুণ নিখুঁতভাবে ক্যান্সার এবং অন্যান্য রোগ শনাক্ত করতে পারে।

পরের ১০ বছরে ৯০% মানুষের কোনো চাকরি থাকবে না। বাকি থাকবে কেবল ১০%। এই ১০% হলো বিশেষ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। ২০৩০ সালের মধ্যে AI এর বুদ্ধিমত্তা এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাবে, যার ফলে কর্মী হিসেবে মানুষের প্রয়োজনীয়তা একেবারেই কমে যাবে।

সামনের ২০ বছরে আজকের ৯০% গাড়িই রাস্তায় দেখা যাবে না। বেঁচে থাকা গাড়িগুলো হয় ইলেক্ট্রিকে চলবে অথবা হাইব্রিড হবে।

গাড়িগুলো চালকবিহীন হবার ফলে ৯৯% দুর্ঘটনা কমে যাবে। এবং সেই কারণেই গাড়ি বীমা করানো বন্ধ হবে এবং গাড়ি বীমার কোম্পানিগুলো সব উঠে যাবে। ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ডের যুগ ছিল কদিন আগেও। এখন সেটাও বদলে গিয়ে হয়ে যাচ্ছে মোবাইল ওয়ালেট এর যুগ। bKash, Nagad, Paytm, GoodLeap, Brex, Plaid এর রমরমা বাজার — মোবাইলের এক টিপে টাকা এপার ওপার।

যারা সময়ের সাথে বদলাতে পারে না, সময় তাদেরকে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়। তাই টিকে থাকতে চাইলে ক্রমাগত নিজেকে আপডেট করতে থাকুন।



স্ক্যান্ডিনেভিয়া


স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ বলতে উত্তর ইউরোপের এই পাঁচটি দেশকে বোঝায়। সর্বসম্মতিক্রমে নরওয়ে, সুইডেন এবং ডেনমার্ক এই তিনটি দেশ হচ্ছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ তবে অনেকেই এর সাথে ফিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ডকেও যোগ করে। অবশ্য এই পাঁচ দেশকে একত্রে নর্ডিক দেশও বলা হয়।   

===

জীবনে কিছু মানুষ আবর্জনা ছড়াতে আসবে। লাইফ আপনার, চয়েস আপনার, ডিসিশন আপনাকেই নিতে হবে। নেগেটিভিটি যেখানেই দেখবেন, সটান সেখান থেকে দূরে সরিয়ে নেবেন নিজেকে।

শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি আপনি যাদের বন্ধু ভাবেন তাদের অনেকেই আপনার সর্বনাশ দেখতে চায়। তারা চায় আপনার কাটা ঘায়ে সহানুভূতি নামক মলমের সাথে একটু নুন ছিটাতে। আপনি সিম্পলি সেই সুযোগটাই দেবেন না। অযথা তর্কে যাবেন না, বোঝাতে যাওয়ার তো প্রয়োজনই নেই। কেউ যদি আপনাকে মূর্খ বলে, তাই মেনে নিয়ে হেসে বেরিয়ে আসুন। এই যে আপনি সময় আর এনার্জি বাঁচিয়ে নিলেন, ব্যাস ওইটাই দরকার। যে যা বলছে শুনে নিন আর মুচকি হেসে থ্যাংক ইউ বলে নিজের সিদ্ধান্তটা নিজেই নিন। যারা শিরদাঁড়া সোজা করে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে, তারা আসলেই জীবনটা চেনে, বোঝে।

 


আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা 

ব্যক্তিগত বিশ্বাস কেবল পরিবেশগত নয়।

বরং এইসব  আমাদের মস্তিষ্কের সাথে সম্পর্কিত


৯৮০-র দশকের শেষ দিকে একজন মার্কিন নারীকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে তোলপার শুরু হয়। ডাক্তারের পরীক্ষা থেকে জানা যায়- এই ভদ্রমহিলার মধ্যে কোনো প্রকার ভয় নেই। বিজ্ঞানীরা দেখতে পেলেন যে সাপ, মাকড়সা, ভয়াবহ সিনেমা, অন্ধকার ঘর—কোনো কিছুতেই তিনি ভয় পান না। একবার তাকে একটি হন্টেড হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে তাকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো হয়। এই ভয়ংকর পরিবেশেও তিনি হাসছিলেন এবং বলেছিলেন, “It was fun!”।

নিউরোসায়েন্সের ইতিহাসে এই নারী ছিলেন অন্যতম বিখ্যাত কেস স্টাডি। কেস স্টাডিতে তার ছদ্মনাম ছিল SM। তিনি মূলত একটি বিরল জেনেটিক রোগে ভুগছিলেন। এই রোগ হলে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা নামের একটি অংশ ধীরে ধীরে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। অ্যামিগডালা নিয়ে অবশ্য এটাই প্রথম পরীক্ষা নয়। ১৯৩০-এর দশকে দুইজন বিজ্ঞানী মস্তিষ্কের কার্যকলাপ নিয়ে একটি সিরিজ গবেষণা পরিচালনা করেন। সেই পরীক্ষাতে তারা বানরের মস্তিষ্ক থেকে অ্যামিগডালা অংশ পুরোটাই কেটে ফেলেন। সেই গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, অ্যামিগডালা কেটে ফেলে দিলে শুধু যে ভয় কমে তা’ই নয়। বরং প্রাণীটির আচরনই পুরো পাল্টে যায়। অ্যামিগডালা না থাকলে প্রাণীটির আগ্রাসী মনোভাব পুরোপুরি চলে যায়, যৌন আচরণ হয়ে উঠে খুবই অদ্ভুত, মুখ দিয়ে সবকিছু পরীক্ষা করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়।

এইসব পরীক্ষা থেকে এই বিষয়টা স্পষ্ট বোঝা যায় যে- মানুষের আগ্রাসী মনোভাব, ভয় পাওয়া, কোনকিছুকে হুমকি মনে করা ইত্যাদি আচরণের সাথে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা নামের একটি অংশের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। নিউরোসায়েন্সের গবেষকরা তাই অ্যামিগডালাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। মানুষের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আমাদের মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স বা ‘ACC’ নামের আরেকটি অংশ। মস্তিষ্কের এই অংশের কাজটা আরও বেশি ইন্টারেস্টিং।

কোনটি আপনার ‘নিজের মত’, আর কোনটি ‘তথ্য’ এই বিষয়টা সবাই সমানভাবে বুঝতে পারে না। যারা এই বিষয়টা ভালমতো বুঝতে পারে, তারা তাদের নিজের মতের সাথে না মিললেও কোন তথ্য মেনে নিতে পারেন। যেসব লোকের মস্তিষ্কের ACC নামের অংশটি বেশ সক্রিয়, এইসব লোক সাধারণত ‘নিজের মত’ আর ‘তথ্য’-এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। কিন্তু যেসব লোকের ACC অংশটা খুব বেশি সক্রিয় না, তারা সাধারণতো একটু গোয়ার টাইপের হয়। নিজের মত দিয়েই সারা দুনিয়াকে বিচার করতে চায়, কোনটি সত্য সেটা তারা বুঝতে পারে না।

এই একই ধরনের কাজ করে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্ট্রাল কর্টেক্স নামের আরেকটি অংশ। যেসব মানুষের মস্তিষ্কের এই অংশটি বেশি সক্রিয়, তারা চিন্তা করার সময় যুক্তি ব্যবহার করেন। ফলে তাদের মধ্যে যুক্তি দিয়ে কোনকিছু বোঝার ক্ষমতা থাকে, অন্যের মতামত তারা বিবেচনা করেন, তাদের cognitive flexibility বেশি থাকে।

মানুষের আচরণের সাথে সম্পর্কিত এইসব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন ড. লেওর জ্‌মিগ্রড। তার গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত বিশ্বাস কেবল পরিবেশগত নয়। বরং এইসব বিষয় সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের সাথে সম্পর্কিত। আগ্রাসী আচরণ, উগ্র মতাদর্শে বিশ্বাস ইত্যাদি বিষয়ের শক্তপোক্ত স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। কিছু মানুষ কেন সহজেই কট্টোর মতাদর্শে আকৃষ্ট হয় সেই বিষয়গুলো তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। এই বিষয়ে নিয়ে লেখা তার বইয়ের নাম The Ideological Brain: The Radical Science of Flexible Thinking।

বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন বাড়ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে উগ্র ও কট্টোর ডানপন্থী মতবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে।  @ হিমাংসু কর



চীনের সবুজায়ন কর্মসূচি 'গ্রেট গ্রিন ওয়াল'


গত কয়েক দশকে চীন যেভাবে বন ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে, তা দেশটির জলচক্রকে এতটাই সক্রিয় করে তুলেছে যে পানি এখন এমন সব নতুন পথে সঞ্চালিত হচ্ছে, যা বিজ্ঞানীরাও আগে ভাবতে পারেননি। মরুকরণ কমানো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থামানো এবং মৃতপ্রায় ভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যেই দেশটি অসংখ্য গাছ লাগিয়েছে এবং নষ্ট তৃণভূমিকে পুনর্গঠন করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই সব প্রচেষ্টা চীনের ভেতরে পানির গতিপথকে বিস্ময়করভাবে বদলে দিয়েছে।পানির প্রাপ্যতা বদলে গেছে দেশের চুয়াত্তর শতাংশ এলাকায়।

দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে চীনের পূর্বাঞ্চলীয় মৌসুমি অঞ্চল ও উত্তর–পশ্চিমের শুষ্ক অঞ্চলে গাছপালা বাড়লেও মানুষ ও বাস্তুতন্ত্রের জন্য ব্যবহারযোগ্য মিঠা পানির পরিমাণ কমে গেছে। এই দুই অঞ্চল মিলে চীনের প্রায় তিন–চতুর্থাংশ  ভূমি গঠিত।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণে আরও জানা যায় যে একই সময়ে তিব্বতি মালভূমিতে পানির প্রাপ্যতা বরং বেড়েছে।

গবেষণার সহলেখক উটরেখ্‌ট ইউনিভার্সিটির গবেষক আরিয়ে স্টাল ব্যাখ্যা করেন যে ভূমির আচ্ছাদন বদলালে পানি নতুনভাবে বণ্টিত হতে থাকে। চীন গত কয়েক দশকে ব্যাপক মাত্রায় পুনঃবনায়ন করেছে। বিশেষ করে লোয়েস মালভূমিতে তারা সক্রিয়ভাবে বাস্তুতন্ত্র পুনর্গঠনের কাজ করেছে, যা দেশের জলচক্রকে আরও শক্তিশালী করেছে।

জলচক্র কীভাবে উদ্ভিদের কারণে বদলায়, তা বুঝতে ভূমি থেকে পানি বায়ুমণ্ডলে ওঠার পথগুলো জানা প্রয়োজন। প্রথম পথ হলো ইভাপোরেশন যেখানে মাটি বা ভূমির ওপরের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে উঠে যায়। দ্বিতীয় পথ ট্রান্সপিরেশন যেখানে উদ্ভিদ মাটি থেকে পানি টেনে নিয়ে পাতা দিয়ে বাতাসে পাঠায়।

তৃতীয় পথ প্রিসিপিটেশন যার মাধ্যমে মেঘে জমা পানি আবার বৃষ্টি হয়ে ভূমিতে নামে। ইভাপোরেশন ও ট্রান্সপিরেশন মিলেই ইভাপোট্রান্সপিরেশন হয়, এবং এটি নির্ভর করে ভূমিতে কত পরিমাণ উদ্ভিদ আছে তার ওপর। স্টাল জানান, ঘাসভূমি ও বন উভয়ই ইভোপোট্রান্সপিরেশন বাড়ায়, তবে বন বাড়লে এর প্রভাব আরও তীব্র হয়, কারণ গাছের শেকড় সাধারণত গভীর পর্যন্ত যায় এবং শুষ্ক মৌসুমেও তারা গভীর থেকে পানি টেনে বাতাসে পাঠাতে সক্ষম।

চীনের সবচেয়ে বড় সবুজায়ন কর্মসূচির নাম গ্রেট গ্রিন ওয়াল, যা ১৯৭৮ সালে শুরু হয়েছিল মরুভূমির বিস্তার ঠেকাতে। তখন চীনের মাত্র দশ শতাংশ ভূমি বনাঞ্চল ছিল, আর এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে পঁচিশ শতাংশে। যার আয়তন প্রায় পুরো আলজেরিয়া দেশের সমান। গত বছর তারা ঘোষণা করেছে যে দেশের সবচেয়ে বড় মরুভূমিকে সম্পূর্ণভাবে বৃক্ষরোপণ করে ঘিরে ফেলা হয়েছে।

এর পাশাপাশি গ্রেইন ফর গ্রিন প্রোগ্রাম নামের আরেক প্রকল্প ১৯৯৯ সালে চালু হয়, যা কৃষকদের চাষের জমিকে বন বা ঘাসভূমিতে রূপান্তর করতে উৎসাহিত করেছে। একই বছর শুরু হওয়া ন্যাচারাল ফরেস্ট প্রোটেকশন প্রোগ্রাম প্রধান বনাঞ্চলে কাঠ কাটা নিষিদ্ধ করে এবং পুনঃবনায়নের কাজ আরও বাড়ায়। এসব উদ্যোগ মিলিয়ে ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে যত নতুন পাতা জন্মেছে তার এক চতুর্থাংশ এসেছে শুধু চীন থেকেই।

তবে এত সবুজ ফিরে পাওয়াই যে সর্বত্র পানি বাড়ার নিশ্চয়তা দেয়, তা নয়। গবেষণায় দেখা গেছে গাছপালা বাড়লে ইভাপোট্রান্সপিরেশনও বাড়ে, ফলে বাতাসে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, কিন্তু সেই পানি সব জায়গায় বৃষ্টি হয়ে নামে না।

বাতাস অনেক সময় সাত হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পানি বহন করতে পারে। তাই পূর্বাঞ্চল ও উত্তর–পশ্চিমে পানি কমেছে, আর তিব্বতি মালভূমিতে বৃষ্টি বেড়েছে। স্টাল বলেন, জলচক্র আগের চেয়ে আরও সক্রিয় হলেও দেশের কয়েকটি অঞ্চলে আগের তুলনায় বেশি পানি হারিয়ে যাচ্ছে।

চীন এমনিতেই গুরুতর পানি বৈষম্যের সমস্যায় ভুগছে। দেশের মাত্র বিশ শতাংশ পানি উত্তরাঞ্চলে পাওয়া যায়, অথচ এখানেই বসবাস করে প্রায় ছেচল্লিশ শতাংশ মানুষ এবং রয়েছে চাষাবাদের ষাট শতাংশ জমি। সরকার বহু বড় জলবণ্টন প্রকল্প চালাচ্ছে, কিন্তু গবেষকদের মতে, সবুজায়নের কারণে পানি কোথায় কমছে আর কোথায় বাড়ছে তা না বুঝলে এসব প্রকল্প ব্যর্থ হতে পারে।

বিশ্বের বহু দেশই এখন বাঁশবন, তৃণভূমি বা বন ফিরিয়ে আনার কাজ করছে। স্টাল মনে করেন যে, প্রতিটি এলাকাকে আলাদা করে গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সেখানে গাছ লাগালে আদৌ পানি বাড়বে নাকি বরং কমে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, যে পানি গাছপালা বাতাসে তুলছে তা আবার কোথায় গিয়ে বৃষ্টির আকারে জমা হচ্ছে। ©  অরণ্যের অভিযাত্রী



জীবন একঘেয়ে নয়; মনই একঘেয়ে। 

আমরা এমন এক শক্তপোক্ত মন তৈরি করি নিজেদের চারপাশে যেন এক চীনের প্রাচীর যা জীবনের প্রবেশই বন্ধ করে দেয়। মন আমাদের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আমরা হয়ে উঠি বিচ্ছিন্ন, বদ্ধ, জানালাহীন। কারাগারের দেয়ালের ভেতরে থাকলে তো আর সকালের রোদ দেখা যায় না, উড়ন্ত পাখি দেখা যায় না, তারাভরা রাতের আকাশ দেখা যায় না। তখন অবশ্যই মনে হবে জীবন একঘেয়ে। মূল: ওশো রজনীশ


নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহর জীবন,কর্ম ও জনশ্রুতি 

পূর্ববঙ্গবাসীর স্বার্থ আদায়ে বিশ শতকের গোড়ার দিকে যিনি নেতৃত্বের হাল ধরেন,তিনি হলেন নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ। জন্ম ৭ জুন ১৮৭১। তাঁর বাবা ছিলেন নওয়াব স্যার আহসানুল্লাহ (১৮৪৬-১৯০১) এবং দাদা ছিলেন নওয়াব স্যার আবদুল গনী (১৮১৩-১৮৯৬)।

জমিদার পরিবার হিসেবে পূর্ববঙ্গে এই পরিবারের নাম ছিল অগ্রগণ্য। সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর "স্যার ফিলিপ হার্টগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য" গ্রন্থে ঢাকার এই ব্রিটিশ প্রদত্ত নবাব পরিবার সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছেন - নবাবেরা ছিলেন ধর্মভীরু কিন্তু আধুনিক ও সংস্কারমুক্ত,অসাম্প্রদায়িক এবং হিন্দুদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। সে জন্য বড় বড় হিন্দু নেতা ও নগরের গোটা হিন্দু সম্প্রদায় নবাবদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলেন।

পূর্বপুরুষের আর্থিক স্থিতিশীলতা নওয়াব সলিমুল্লাহর সময়ে এসে ব্যাহত হয়েছিল। ১৮৯৩ সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি নেন। ১৯০১ সালে পিতার মৃত্যুর পর নওয়াব এস্টেটের কর্তৃত্ব লাভ করেন। নওয়াব হিসেবে দায়িত্ব পালনের শুরুতেই ঢাকার সব মহল্লায় তিনি স্থাপন করেছিলেন নৈশ বিদ্যালয়। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ১৯০২ সালে সিএসআই,১৯০৩ সালে নওয়াব বাহাদুর,১৯০৯ সালে কেসিএসআই এবং ১৯১১ সালে জিসিএসআই উপাধি প্রদান করে। পূর্ববাংলার ভাগ্যহত মানুষের উন্নতি এবং পশ্চাৎপদ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিনিই প্রথম স্বতন্ত্র প্রদেশ সৃষ্টির দাবি জানান। তাঁর দাবি অনুযায়ী ইংরেজ সরকার ১৯০৫ সালে "পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ" সৃষ্টি করে ঢাকাকে এর রাজধানী ঘোষণা করেছিল।

নওয়াব সলিমুল্লাহ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে চেয়েছেন পূর্ব বাংলায় একটি জ্ঞানবিভাসিত মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠুক,বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া বাঙালি মুসলমানের মধ্যে। ১৯০৬ সালের ২৭-২৯ ডিসেম্বর শাহবাগ বাগানবাড়িতে অনুষ্ঠিত "অল-ইন্ডিয়া মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স" এর ২০তম সভায় দেওয়া তাঁর ভাষণের ক্ষুদ্রাংশ পাঠ করেও সলিমুল্লাহর চিন্তার ধারা গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়,

আমাদের শিক্ষার অবস্থা খুবই শোচনীয়। কলকাতায় ৩ জন অশিক্ষিতের অনুপাতে ১ জন শিক্ষিত,অথচ ঢাকায় ৮ জন অশিক্ষিতের অনুপাতে মাত্র ১ জন শিক্ষিত লোক রয়েছে। ... অন্য কথায়,সমগ্র বঙ্গে প্রতি ১৬ জন মুসলমানের মধ্যে ১৫ জনই অশিক্ষিত। এতে আপনারা অনুধাবন করতে পারবেন যে,আমরা তথা মুসলমানরা শিক্ষায় কত পশ্চাৎপদ।...উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় দেড় হাজার ডেলিগেট,পাঁচ শতাধিক দর্শকসহ মোট প্রায় দুই হাজার লোক এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। যাবতীয় ব্যয় বহন করেন সলিমুল্লাহ।

সম্মেলন শেষে ৩০ ডিসেম্বর সলিমুল্লাহর প্রস্তাবে গঠিত হয় "নিখিল ভারত মুসলিম লীগ" নতুন প্রদেশ গঠনের সময় থেকেই নওয়াব সলিমুল্লাহ,নওয়াব আলী চৌধুরী,

শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ অন্য নেতাদের দাবি ছিল ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা সফরে আসেন। সলিমুল্লাহসহ সহযোগী নেতারা হার্ডিঞ্জের সঙ্গে দেখা করলে তিনি আশ্বাস দেন,প্রদেশ বাতিলের ক্ষতিপূরণস্বরূপ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। ঢাকার মতো একটি অবহেলিত ও অনগ্রসর প্রাচীন নগরীতে একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তখন অনেকের কাছেই ছিল অযৌক্তিক। কবি,শিল্পী,সাহিত্যিক,শিক্ষাবিদ,

বিজ্ঞানী,বুদ্ধিজীবী,রাজনীতিক,সমাজসংস্কারক,প্রশাসকসহ গত ৯৮ বছরে যে বিদ্বৎসমাজ তৈরি হয়েছে,তার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা নওয়াব সলিমুল্লাহর অবদান অনস্বীকার্য।

নওয়াব সলিমুল্লাহকে নিয়ে বেশ কিছু শ্রুতি বা মিথ্যা রয়েছে। তাঁর জীবন ও কর্ম পর্যালোচনায় সেগুলোর সত্যাসত্য অনুসন্ধানটাও জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সলিমুল্লাহ ৬০০ একর জমি দান করেছেন,এমন একটি গুঞ্জন ও মুখরোচক আলোচনা মুখপুস্তিকার দেয়ালগুলোতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে দান করার মতো জমি নওয়াব পরিবারের ছিল না। "বাংলাপিডিয়ার তথ্যানুযায়ী" বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার আওতায় পূর্ববাংলা ও আসাম সরকারের প্রশাসনিক দপ্তর প্রতিষ্ঠার জন্য রমনা এলাকায় এর আগে অধিগ্রহণ করা ২৪৩ একর ভূমি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত হয়। সে সময়কার ভূমিসংক্রান্ত পরিপূর্ণ রেকর্ড ঢাকা কালেক্টরেটে রয়েছে। আরেকটি বিষয় এখানে আলোচনা করা প্রাসঙ্গিক। সার্বিক উন্নয়নের জন্য ১৮৮৮ সালে নওয়াব আহসানুল্লাহ বর্তমান বঙ্গভবন ও দিলকুশা এলাকার একটি বিস্তীর্ণ এলাকা সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে সেখানকার ঝোপঝাড়,গর্ত-টিলা পরিষ্কার করেন। পরবর্তী সময়ে যার একটি অংশ পল্টন ময়দান নামে পরিচিতি পায়।

ধারণা করা যায় যে,এইরূপ লিজের জমিগুলো আপামর জনতা হয়তো নওয়াব পরিবারের বলেই জানত। ড. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ-এর লেখা "নওয়াব সলিমুল্লাহ্" গ্রন্থে নওয়াব পরিবার কর্তৃক দান ও অনুদানের একটি সংক্ষিপ্তসার দেওয়া আছে।

মুসলিম হল,ইসলামিয়া এতিমখানা,মিটফোর্ড হাসপাতাল ও সার্ভে স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও সলিমু্ল্লাহ নামটিকে ঘিরে বেশ কিছু জনশ্রুতি রয়েছে। ইতিহাসের স্বার্থেই ইতিহাসের সত্যগুলো আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। পূর্ব বাংলার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে নওয়াব সলিমু্ল্লাহর নানামুখী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রদের প্রথম ছাত্রাবাসের নাম রাখা হয় "সলিমুল্লাহ মুসলিম হল" সলিমুল্লাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলামিয়া এতিমখানাটি তাঁর মৃত্যুর পর নামকরণ করা হয় "সলিমুল্লাহ এতিমখানা"। রবার্ট মিটফোর্ড নামে ঢাকার এক সাবেক জেলা প্রশাসকের প্রদত্ত অর্থ দিয়ে ১৮৫৮ সালে মিটফোর্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।

কালের পরিক্রমায় ১৮৭৫ সালে স্থাপিত হয় ঢাকা মেডিকেল স্কুল। মিডফোর্ড হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে এই মেডিকেলে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অধ্যয়ন চলমান থাকে। ১৯৬২ সালে স্কুলটিকে কলেজে রূপান্তর করা হয়। নামকরণ করা হয় "মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ" পরবর্তীতে নাম বদলে রাখা হয় "স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ"। বর্তমানে হাসপাতাল ও কলেজ মিলে পূর্ণ নাম "স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল"। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় তথা বুয়েটের শুরু ১৮৭৬ সালে ঢাকা সার্ভে স্কুলের মাধ্যমে। ১৯০২ সালে তৎকালীন সরকার সার্ভে স্কুলকে ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিলে অর্থাভাবে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছিল না। নওয়াব আহসানুল্লাহ সে সময় ১ লক্ষ ১২ হাজার টাকা দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে তিনি ইন্তেকাল করলে পরবর্তী সময়ে নওয়াব সলিমুল্লাহ সেই অর্থ পরিশোধ করেন। বিদ্যায়তনটির নামকরণ করা হয় "আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল"। ১৯৪৭ সালে এটি কলেজে উন্নীত করা হয়। ১৯৬২ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নাম দেওয়া হয় "পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়"। মহান মুক্তিযুদ্ধের পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় "বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়"।

ঢাকার সমাজ জীবন পঞ্চায়েত পদ্ধতিকে সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে নওয়াব সলিমুল্লাহর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি খেলাধুলার পৃষ্ঠপোষকতা যেমন করতেন,তেমনি করতেন গান-বাজনা,বায়োস্কোপ প্রদর্শনী,নাট্যাভিনয় প্রভৃতির পৃষ্ঠপোষকতাও। ঈদ,ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম প্রভৃতি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গেছেন। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় জার্মানির খ্যাতিমান আলোকচিত্রী ফ্রিৎজ ক্যাপ ঢাকায় স্টুডিও স্থাপন করেন। স্বনামধন্য সেই আলোকচিত্রীর ছবি ঢাকার অনেক সামাজিক ইতিহাসের সাক্ষী। বঙ্গভঙ্গ রদের ঘটনায় নওয়াব সলিমুল্লাহ দারুণ মর্মাহত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে স্থবিরতা আসে। ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন। মাত্র ৪৪ বছরের জীবনে নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ সর্বভারতীয় পর্যায়ে যতটুকু প্রভাব ফেলতে পেরেছিলেন তা তাঁর উত্তর ও পূর্বপুরুষদের কেউই পারেননি।

 তথ্য সূত্র: ঢাকার কয়েকজন মুসলিম সুধী,

ড. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ- ঢাকার নওয়াব পরিবারের ডায়েরি (১৭৩০-১৯০৩) অনুপম হায়াৎ- নওয়াব পরিবারের ডায়েরিতে ঢাকার সমাজ ও সংস্কৃতি (১৯০৪-১৯৩০) অনুপম হায়াৎ- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এলাকার ইতিহাস (১৫৯৯-২০১২), মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম।।

হোসাইন মোহাম্মদ জাকি -----

গবেষক,সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ।।


‘হজরত মুহম্মদ এবং তাঁর সমকালীন বিশ্ব’


হযরত মুহম্মদ (সঃ) ৫৭০ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এবং এর ঠিক ৫২ বছর পরে ৬২২ খৃষ্টাব্দে তিনি এই পৃথিবীর প্রথম ইসলামী সরকারটি গঠন করেছিলেন। তারপরে ৬৩৩ খৃষ্টাব্দের মধ্যেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই সরকার দিগ্বিজয়ের ধ্বজা ধরে বিভিন্ন অভিযানের জন্য প্রায় তৈরি হয়ে গিয়েছিল; আর এমনকি প্রাথমিক পর্যায়েও তাঁদের এই অভিযান আরবের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত ইরান, এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত মিশরকে অতিক্রম না করে ক্ষান্ত হয়নি। কিন্তু এসময়ের মধ্যে বাকি বিশ্বের বিভিন্ন অংশের মানুষ হযরত মুহম্মদ (সঃ) ও তাঁর আদর্শ সম্পর্কে মোটামুটিভাবে অজ্ঞই ছিলেন, , তাঁরা তখন নিজেদের সমস্যাগুলি নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন।

ইতিহাস বলে যে, হযরত মুহম্মদের (সঃ) জন্মের সময়ে ইউরোপ সবেমাত্র মহাশক্তিশালী রোমের পতন এবং রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিম অংশ ধ্বংস হওয়ার আঘাত কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছিল। এসময়ে ইউরোপের বিভিন্ন জাতি, যথা—ফ্রাংক (Frank), মেরোভিজিয়ান (Merovingians), ভিসিগথ (Visigoths), অষ্ট্রগথ (Ostrogoths) ও অন্যান্যরা একে অন্যের বিরুদ্ধে ক্রমাগত যুদ্ধে লিপ্ত হলেও তাঁরা কেউই নিজেদের অভিলাষ অন্যদের উপরে চাপিয়ে দিতে সমর্থ হয়নি। এছাড়া সেযুগের ইউরোপের জনসাধারণের একটা বিরাট অংশ তখনও বর্বর থাকা সত্ত্বেও গির্জাই তাঁদের একমাত্র প্রধান প্রতিষ্ঠান ছিল, যেটাকে ইউরোপের জনসাধারণমাত্রই তখন মান্য করত। ইউরোপের ইতিহাসে এই সময়কে মহান পোপ গ্রেগরীর যুগ বলা হয়ে থাকে। পোপ যখন ৫৯০ খৃষ্টাব্দে তাঁর রাজত্ব আরম্ভ করেছিলেন, তখন হযরত মুহম্মদের (সঃ) বয়স ছিল ২০ বছর, এবং এর ১৪ বছর পরে, অর্থাৎ—হযরত মুহম্মদের (সঃ) ৩৪ বছর বয়সে এই মহামান্য পোপের মৃত্যু হয়েছিল। 


হযরত মুহম্মদের (সঃ) সময়ে সুবিশাল আরব উপদ্বীপের উত্তরের ভূখণ্ড দুটি বৃহৎ ও গর্বিত শক্তির পদানত ছিল। তখন এর পশ্চিম দিকে ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য,—যার আধিপত্যে সমগ্র বলকান এলাকা ও এশিয়া মাইনর, ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীর, মিশর এবং উত্তর আফ্রিকার কিছু অংশ অবস্থান করত। এই সাম্রাজ্য রোমান সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ছিল, এবং এর রাজধানী ছিল বাইজান্টিয়ম বা কনস্টান্টিনোপলে। তখন এই সাম্রাজ্যের সরকারি ধর্ম ছিল প্রাচ্য খৃষ্টান ধর্ম বা ‘Eastern Orthodox Christianity’, এবং এখানকার মূল ভাষা ছিল গ্রিক। অন্যদিকে আরব উপদ্বীপের পূর্বে তখন প্রাচীন আখমানিয়ান সাম্রাজ্যের (Achaemenid Empire) উত্তরাধিকারী সাসানীয়দের কর্তৃক শাসিত পারস্যবাসীরা বাস করতেন। সেসময়ে কাম্পিয়ান সাগরের উভয় তীর ফারটাইল ক্রিসেন্টের পূর্ব অংশ এবং টাইগ্রিস ও সিন্ধু নদীসমূহের মধ্যবর্তী সমগ্র এলাকা এই সাসানীয়দের অধিকারে ছিল। তাঁদের শীতকালীন রাজধানী ছিল টাইগ্রীস নদীর তীরে অবস্থিত চ্যেসিফনে (Chesiphon), এবং গ্রীষ্মকালীন রাজধানী ছিল একবাতানায় বা আধুনিক হামাদানে। এঁদের ধর্ম ছিল জরথ্রুষ্ট, এবং ঐতিহাসিকেরা এঁদের ভাষাকে পাহলভী বা মধ্যযুগীয় ফারসি বলে থাকেন। আলোচ্যসময়ে এই পারস্য ও বাইজেন্টাইন উভয়েই স্বেচ্ছাচারী ছিল বলে ধর্মকে তাঁরা রাষ্ট্রের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত, তবে অন্যদিকে অবশ্য ভাষা ও সংস্কৃতিগতভাবে পারস্যবাসীদের মধ্যে বেশি একাত্মতা ছিল বলে নিজেদের ঐতিহ্যের বিষয়ে তাঁরা গর্বিত ছিলেন। কিন্তু এই দুটি সাম্রাজ্যই তখন সবসময় যুদ্ধে লিপ্ত থাকত, এবং কোন পক্ষই অন্য পক্ষকে পদানত করে রাখবার মত শক্তিশালী ছিল না।


এসময়ে আরব উপদ্বীপের মধ্য ও উত্তর অংশে অবস্থিত হেজাজ ও নজদের বেশীরভাগই অনুর্বর মরুভূমি ছিল, এবং এমনকি এখানে মরুদ্যানের সংখ্যাও তখন অত্যন্ত কম ছিল। আলোচ্যযুগে এই বিশাল মরুভূমির বেদুইন অধিবাসীরা শুধুমাত্র কোথাও পানি দেখলেই উট থেকে অবতরণ করতেন, এবং সেই পানির সম্ভার নিঃশেষ হওয়া পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করতেন। পরবর্তীকালের বিখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিক ইবন খালদুনের (১৩৩২-১৪০৬ খৃষ্টাব্দ) মতানুসারে এই যাযাবররা নিরক্ষর ছিলেন, তাঁরা কোন নৈপুণ্যের ধার ধরতেন না, এবং একইসাথে তাঁরা সভ্যতা ধ্বংসকারীও ছিলেন। কারণ, সেযুগে আরবীয়রা নিজেদের রান্নার পাত্র স্থাপন করবার জন্য পাথর ব্যবহার করতেন বলে এই পাথর সংগ্রহ করবার জন্য তাঁরা কোন দালান ভেঙ্গেও এগুলিকে বের করতে পিছপা হতেন না। এমনকি প্রয়োজনে জ্বালানির জন্য কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁরা বাড়ির ছাদও ভেঙ্গে ফেলতেন। এছাড়া আলোচনা প্রসঙ্গে একথাও উল্লেখ্য যে, লুঠতরাজ করাই সেযুগের আরবীয় অর্থনীতির একটি মূল স্তম্ভ এবং একইসাথে আরবদেরও জীবনপদ্ধতি ছিল। বস্তুতঃ সেযুগে তাঁরা নিজেদের সমগ্র জীবনই খাদ্য, উট ও নারীদের পিছনে ব্যয় করতেন। তবে আরবের এই এলাকায় তখন অবশ্য অল্প সংখ্যক বসতি ছিল। আর সেগুলির মধ্যে হেজাজের মক্কা অন্যতম ছিল, এটি লোহিত সাগর থেকে প্রায় ৫০ মাইল ব্যবধানে অবস্থিত। আলোচ্যসময়ে এই শহরের প্রাণমূল ছিল ‘জমজম’ নামক একটি কূপ; এবং দক্ষিণ আরব থেকে উত্তরের ভূমধ্যসাগরের বন্দরগুলি পর্যন্ত পরিচালিত মসলা সরবরাহের পথে অবস্থিত এখানকার অর্থনৈতিক উন্নতির চাবিকাঠি ছিল। তবে সেযুগে এই শহরের বিখ্যাত হওয়ার মূলে এযুগের মতোই প্রাচীন পবিত্রস্থান কাবা ছিল, যা বরাবরই এই উপদ্বীপের অধিবাসীদের আচরিত ধর্মের কেন্দ্রস্থল ছিল। জনশ্রুতি রয়েছে যে, খৃষ্টের জন্মের হাজার বছরেরও অনেক আগে এই অঞ্চলের আরবরা আকাশ থেকে একটি উল্কাখণ্ড পড়তে দেখে এটিকে পবিত্র বলে জ্ঞান করেছিলেন। আর এরপরে তাঁরা এই কালো রঙের পাথর, অর্থাৎ—‘হাজর-উল-আসওয়াদ’ (Hajar-ul-Aswad) সংগ্রহ করেছিলেন, এবং এটিকে কেন্দ্র করে একটি ঘনক্ষেত্রফল (cubic) বিশিষ্ট ঘর নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। এটাকেই এখন কা’বা বলা হয়ে থাকে। অন্যদিকে আল-কোরানের ভাষ্য অনুযায়ী হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এই পাথরটি সংগ্রহ করেছিলেন, এবং এরপরে এটিকে কেন্দ্র করে কা’বা গৃহ নির্মাণ করিয়ে হজের নিয়ম প্রচলিত করেছিলেন। 


যাই হোক, এসময় থেকেই আরব উপদ্বীপের প্রতিবেশী গোত্রগুলি এই কা’বাকে পূজা করবার জন্য প্রত্যেক বছর এখানে আসতে আরম্ভ করেছিল, এবং এরপরে কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই এই কা’বার চারিদিকে একটি উপসনালয় গড়ে উঠেছিল ও উপদ্বীপের পৌত্তলিক আরবদের মধ্যে এর উপাসনা সার্বজনীনতা লাভ করেছিল। 


আসলে মক্কা তখন একটি রাজধানীর মতোই গড়ে উঠেছিল; এবং তীর্থযাত্রীরা তাঁদের গোত্রীয় দেবতাগুলিকেও নিজেদের সঙ্গে নিয়ে এসে কা’বার আঙ্গিনায় স্থাপন করে দিয়েছিলেন। তখন তীর্থের অনুশাসন সম্পন্ন করবার পরে আরবরা এখানে নিজেদের পণ্য বিনিময় করতেন, বিভিন্ন খেলাধূলার প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতেন, এবং কবিতার মাধ্যমে তাঁদের শৌর্যবীর্য-গাথা আবৃত্তি করে অন্যদের শোনাতেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, তখন উটের দৌড় এবং ঘোড়ার দৌড় আরবদের এই প্রতিযোগিতার মধ্যে অন্যতম ছিল। আর এসময়ে তাঁদের কবিরা একাধারে চারণ, কোন জ্ঞানী ব্যক্তি, ঐতিহাসিক, গীতিবাগীশ ও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হতেন। এঁরা কৌতুক ও অভিশাপের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বী আরবীয় গোত্রগুলিকে তিরস্কার করতেন, এবং নিজের গোত্রের মানুষকে তাঁদের বীরত্ব, সম্মান ও সাহসিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। কিন্তু প্রাক-ইসলামী আরবের এসব কবিতাবলীর অতি অল্প ঐতিহাসিক নমুনাই বর্তমান সময়ে পাওয়া যায়। তবে জনশ্রুতি রয়েছে যে, সেযুগে তীর্থযাত্রার সময়ে পুরস্কার প্রাপ্ত কবিদের কবিতাগুলি কা’বার প্রবেশদ্বারে ঝুলিয়ে রাখা হত; এবং এগুলিকে তখন ‘মুয়াল্লাকাত’ বা ‘ঝুলন্ত’ বলা হত। বর্তমানে প্রাপ্ত আরবীয় কবিতাগুলির বিষয়বস্তু থেকে অনেকে অনুমান করেন যে, সেযুগে অন্ততঃ তিনটি বিষয় আরবদের অত্যন্ত প্রিয় ছিল; যথা—কড়া প্রকৃতির মদ, বেগবান ঘোড়া এবং মরুভূমিতে কালো তাঁবুর মধ্যে সুন্দরীর ক্ষণিক সঙ্গ।


তাছাড়া এসময় থেকেই মক্কা, মধ্য ও উভয় আরবের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। আর এযুগে এই শহরের রাজনৈতিক ক্ষমতা কোরাইশ গোত্রের হাতে থাকলেও, হযরত মুহম্মদের (সঃ) সময় থেকেই এই কোরাইশ বংশ ক্ষমতার শীর্ষ থেকে অবতীর্ন হয়ে নিজেদের প্রতিপত্তি ও আধিপত্য হারাতে শুরু করেছিল বলে ইতিহাসে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাছাড়া আরবীয়দের উপ-গোত্রগুলির মধ্যে তখন অনৈক্য বিরাজমান ছিল বলে পরবর্তীসময়ে এগুলিই তাঁদের প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্রগুলিকে এখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আহ্বান করেছিল। কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও কোরাইশ বংশ তখনও আরবে ক্ষমতা ও আধিপত্যের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। আর তাই এসময়ে হজের সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পরে এখানকার অন্য গোত্রগুলি যেখানে উপদ্বীপের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ত, এবং যথারীতি নিজেদের চিরাচরিত নীতি—পানি, সম্পদ ও নারীদের লুঠ করবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ত; সেখানে অন্যদিকে কোরাইশ বংশীয় নেতারা কিন্তু তখন পরবর্তী মরশুমে ব্যবসা করবার জন্য তাঁদের পুঁজি সংগ্রহ করবার উদ্দেশ্যে উত্তরে সিরিয়া, মিশর ও ইরানে নিজেদের সুরক্ষিত কাফেলা প্রেরণ করতেন। ফলে এই কোরাইশদের মধ্যে উৎসাহী ব্যক্তিরা তখন বহির্বিশ্ব সম্পর্কে তেমন অজ্ঞ ছিলেন বলা চলে না। @–রানা  


আপনার মূল্যায়ন 

নিজের প্রতি আপনার আচরণ কেমন, তার ওপর নির্ভর করে পৃথিবী আপনাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে। আমরা প্রায়ই অন্যের কাছে সম্মান আর ভালোবাসা খুঁজি, কিন্তু ভুলে যাই যে সেই সম্মানের শুরুটা হতে হয় নিজের ভেতর থেকে।

​আপনি যদি নিজেকে অবহেলা করেন, পৃথিবীও আপনাকে অবহেলা করার সুযোগ পাবে। তাই আগে নিজেকে ভালোবাসুন, নিজের যত্ন নিন এবং নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখুন। আপনি যখন নিজেকে গুরুত্ব দেবেন, তখনই পৃথিবী শিখবে আপনাকে কীভাবে গুরুত্ব দিতে হয়।

​লিসা নিকোলস-এর এই শক্তিশালী কথাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিজের জন্য সেরা সংস্করণ হয়ে ওঠাই হলো বিশ্বকে জেতানোর প্রথম ধাপ।


  শালীনতা বজায় রাখতে জন্ম স্টোথোস্কোপের।

উনিশ শতকের শুরুর দিক। প্যারিসের জনপদ ফিয়ে হেঁটে চলেছেন এক চিকিৎসক। মাথা নিচু করে পেরিয়ে যাচ্ছেন প্যারিসে উচ্ছ্বল যাপনচিত্রকে। ভেতরে ভেতরে চলছে এক অবিরাম তোলপাড়। চিকিৎসা করতে গিয়েই কি তিনি পেরিয়ে যাচ্ছেন শ্লীলতার সীমারেখা? হৃদযন্ত্র বা ফুসফুস পরীক্ষা করতে মহিলার রোগীর বুকে কান পেতে শোনা, একপ্রকার হেনস্থাই তো। না, এভাবে হয় না। কিন্তু উপায়? চিকিৎসা ছাড়ার কথাও আগে বার বার ভেবেছেন তিনি। এমনকি কয়েকদিন যানওনি হাসপাতালে। কিন্তু রোগীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াও যে অমানবিকতার সমতুল্য। চিকিৎসক হিসাবে নিজের দায়িত্বকে এড়িয়ে যাওয়া।

চিকিৎসক রেনে লেনেকের প্রতিদিনের ঠিকানা প্যারিসের নেকার হাসপাতাল। ফ্রান্সের এই প্রাণকেন্দ্র নগরীতে বেশ নামডাক লেনেকের। সাধারণ জ্বর থেকে শুরু করে, যক্ষ্মার মতো যে কোনো দুরারোগ্য রোগেই শেষ ভরসা লেনেক। তিনি হাল ছাড়েন না কোনো মতেই। চেষ্টা চালিয়ে যান শেষ মুহূর্ত অবধি। আর সব থেকে বড়ো কথা হল সম্ভ্রান্ত থেকে শুরু করে হতদরিদ্র, যে কোনো রোগীই সমান তাঁর কাছে।

লেনেকের পাশ দিয়ে যেতে যেতেই দু’জন মানুষ স্মিত হেসে গেলেন। কৃতজ্ঞতা ভরে রয়েছে সেই হাসিতে। লেনেক সামান্য মুখ তুলে দেখলেন ফুটপাথে দুটো ছোট্ট বাচ্চা খেলা করছে। হাতে একটা লম্বা কার্ডবোর্ডের চোঙ। চোঙের একদিক একজনের কানের কাছে ঠেকিয়ে, আরেকদিকে তার ছোট্ট বন্ধু কথা বলছে কিছু একটা। প্রথম জন ঠিকরে উঠছে তাতে। তারপর হাসির রোল। ছোটবেলায় এমনভাবে অভিজ্ঞতা হয়েছে লেনেকেরও। কত আস্তে বলা কথাও কী ভীষণ জোরালো শোনায়, তা নতুন করে বলার কিছু নেই।

ছোটবেলার সেই স্মৃতিকেই যেন উসকে দিল বাচ্চা দুটো। মনে মনে খানিকটা হাসলেন লেনেক। প্যারিসের এই প্রাণোচ্ছ্বলতার জন্যই এত ভালো লাগে তাঁর এই শহরকে। খানিকটা এগিয়েই গিয়েছিলেন লেনেক। বিদ্যুৎগতিতে তাঁর মাথায় সঙ্গে সঙ্গে খেলে গেল বহুদিন ধরে তাঁকে অস্বস্তি দিয়ে চলা এক সমস্যার সমাধান। যদি তাঁর ধারণাই ঠিক হয়, তবে মহিলা রোগীদের আর হয়রান হতে হবে না। বাড়িতে ঢুকেই শুরু হল প্রতীক্ষার প্রহর গোনা। পরদিন হাসপাতালে গিয়ে এটা যে পরীক্ষা করে দেখতে হবে তাঁকে।

যেমনটা চেয়েছিলেন তেমনটাই হল। হাসপাতালে পরদিন হৃদরোগের সমস্যা নিয়ে হাজির হলেন এক স্থূলকায় তরুণী। লেনেক বসতে বললেন তাঁকে। তারপর টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিলেন ওষুধ লিখে দেওয়ার নোটবুকটা। রোল করে চোঙ বানিয়ে ধরলেন তরুণীর বুকে। চোঙের আরেকদিকে কান।

লেনেকের এই কাণ্ড কারখানা দেখে বিস্মিত তরুণী। তাঁর সঙ্গে আসা পরিবারের আত্মীয়রাও। তবে অন্যদিকে ততক্ষণে হাসির রেখে ফুটে উঠেছে লেনেকের ঠোঁটে। তিনি ততক্ষণে স্পষ্ট শুনতে পেয়ে গেছে হৃদপিণ্ডের একটানা বাজতে থাকা বাদ্যযন্ত্রের তাল। এবার শুধু তাঁকে এই নোটবুকের বদলে বানিয়ে ফেলতে হবে একটা চোঙ।

তেমনটাই হল। ১৮১৬ সালে প্যারিসের নেকার হাসপাতালেই জন্ম নিল এক অদ্ভুত যন্ত্র। যার মাধ্যমে দূর থেকেই শোনা যাবে হৃদযন্ত্র কিংবা ফুসফুসের শব্দ। বলে দেওয়া যাবে রোগের কারণ। লেনেক নাম দিলেন ‘সিলিন্ডার’। আর এইভাবে শব্দ শোনার পদ্ধতিকে তিনি নাম দিলেন মিডিয়াম অসকাল্টেশন।

তবে এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পরও বেশ সমস্যার মুখেই পড়তে হল তাঁকে। বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখলেন না তৎকালীন সমাজ, অন্য চিকিৎসকরাও। তবে বছর চারেকের মধ্যেই তাঁর এই পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ল ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইতালিতে। ধীরে ধীরে পেল জনপ্রিয়তা। পরে লেনেক নিজেও বেশ কিছু বদল করেছিলেন ‘সিলিন্ডার’-এর। এই আবিষ্কারের সাড়ে তিন দশক পর ১৮৫১ সালে আয়ারল্যান্ডে তৈরি হল আধুনিক স্টোথোস্কোপ। দিশা দেখিয়ে দিয়েছিলেন লেনেক। এবার আইরিশ চিকিৎসক আরথার লেয়ার্ড দু’কানে শোনার মতো করেই রূপ দিলেন যন্ত্রটিকে।

তবে তাঁর আবিষ্কারের এই পরিণতি দেখে যেতে পারেননি লেনেক। ‘সিলিন্ডার’ আবিষ্কারের বছর দশেক পরেই মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে। ১৮২৬ সালে। সারাদিন যক্ষ্মা রোগীদের নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে করতে কখন নিজেই আক্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন মারণ ব্যাধিতে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে এই যক্ষ্মাই কেড়ে নিয়েছিল তাঁর মায়ের প্রাণও। তাই সমাপ্তি টানতে চেয়েছিলেন এই রোগের ইতিহাসে। তা আর সম্ভব হল না। কিন্তু বাকি চিকিৎসকদের জন্য লিপিবদ্ধ করে গেলেন যক্ষ্মার যাবতীয় লক্ষণ এবং উপসর্গের প্রকৃতি। কী ধরণের শব্দ শোনা গেলে বোঝা যাবে যক্ষ্মাকে, তাও দেখিয়ে গেলেন লেনেক।

পাশাপাশি শবদেহের পার্শ্ব ব্যবচ্ছেদের পদ্ধতি এবং লিভার সিরোসিসের মতো রোগকেও সনাক্ত করে গেলেন তিনি। আজও লিভার সিরোসিসকে তাই বলা হয় ‘লেনেক সিরোসিস’। আর স্টোথোস্কোপ ছাড়া সত্যিই কি কোনো চিকিৎসকের চরিত্র ভেসে ওঠে আমাদের মনে? বোধ হয় না। দুই শতক পেরিয়ে এসেও আধুনিক চিকিৎসায় তাঁকে অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই আজও...সংগৃহীত..!!


 শিক্ষামূলক একটি গল্প  

বাদশাহ হারুনুর রশীদের কাছে এক লোক একটি চাতক পাখি বিক্রি করার জন্য নিয়ে এলো । তিনি দাম জিজ্ঞেস করলে সে বাজারমূল্যের চেয়েও অনেক বেশি দাম চাইলো। বাদশাহ জানতে চাইলেন পাখিটির এত দাম কেন? অথচ তার একটি পা নেই!

লোকটি বললো মার্জনা করবেন জাহাপানা। দেখতে সাধারন হলেও এটি আসলে একটি বিশেষ ধরনের পাখি। এর বিশেষত্ব হলো - আমি যখন শিকারে যাই,তখন এই চাতক পাখিটিকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাই। আমার পাতানো ফাদের সাথে এই পাখিটিকেও বেধে রাখি। এই পাখিটি তখন অত্যাশ্চর্য এক আওয়াজে অন্য পাখিদের মনোযোগ আকর্ষন করে। তার এই আওয়াজ শুনে ঝাকে ঝাকে পাখিরা এসে জড়ো হয়। তখন আমি একসাথে সব পাখিকে শিকার করি। বলা যায় এই পাখিটি আমার শিকারের প্রধান ফাদ ।

বাদশাহ তার কথা শুনে পাখিটিকে শিকারীর চাহিদা অনুযায়ী চড়া দামেই কিনলেন। এবং সাথে সাথে জবাই করে ফেললেন। শিকারী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, জাহাপনা! আপনি অনেক দামে কেনা পাখিটি এভাবে জবাই করে দিলেন?

তখন বাদশাহ হারুনুর রশিদ তাকে একটা মহামূল্যবান কথা বললেন, যা ইতিহাসে আজ্ও অমর হয়ে আছে। তিনি বললেন, “যে অন্য জাতির দালালি করার জন্য তার স্বজাতির সাথে অনায়াসে এমন গাদ্দারি করতে পারে,তার এই পরিনতিই হওয়া উচিত”।


বিশ্বসেরা আলেমদের মতে ইসলামে সংগীত হারাম নয়।।

আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাণ্ড মুফতি(১৯৮২–১৯৯৬) শেখ জাদ আল হক এবং আজাহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ডক্টর ইউসুফ কারযাভীর মত হল-মানুষকে হারামের দিকে না টানিলে, কিংবা মানুষকে ফরজ ইবাদত (আল ওয়াজিবাত) হইতে সরাইয়া (বা ভুলাইয়া) না দিলে সংগীত শোনা, সংগীত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা, এবং বাদ্যযন্ত্র বৈধ"।

   ডক্টর কারযাভী বলেছেন- "কাজী আবুবকর ইবনুল আরাবী বলিয়াছেন 'গান হারাম হওয়া পর্যায়ে একটি হাদিসও সহীহ নহে'।

ইবনে হাজম বলিয়াছেন – 'এ পর্যায়ের সকল বর্ণনাই বাতিল ও মনগড়া রচিত'…বহুসংখ্যক সাহাবী ও তাবেয়ীন গান শুনিয়াছেন,…

যে গানের সাথে মদ্যপান, ফষ্টিনষ্টি ও চরিত্রহীনতার মতো কোনো হারাম জিনিসের সংমিশ্রণ হয়...সেই গান হারাম… রাসূলে করীম (স)বলিয়াছেন-

'কার্যাবলীর ভালোমন্দ নির্ভর করে তাহার নিয়তের ওপর।' কাজেই যেই লোক স্বভাব মেজাজের সুস্থতা লাভের উদ্দেশ্যে শুনিল,

তার এই কাজ নিশ্চয়ই অন্যায় বা বাতিল নহে।

সংগীতের আরবী হচ্ছে "মুসিকি", সারা কোরানে ওই "মুসিকি" শব্দটাই নেই। কোরান কোথাও সংগীতকে নিষিদ্ধ করেনি অথচ "সঙ্গীত হারাম" দাবি করা হয় কোরানের একটি আয়াত দিয়ে- (১) সুরা লোকমান ৬ নম্বর আয়াত− "একশ্রেণির লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ হইতে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে অবান্তর কথাবার্তা সংগ্রহ করে, সঙ্গীত-বিরোধীরা বলেন সুরা লোকমান ৬-এর 'অবান্তর কথাবার্তা-ই নাকি 'সঙ্গীত' (মওলানা মুহিউদ্দিনের কোরানের অনুবাদ, পৃঃ ৭৮৩ ও ১০৫৩-৫৪)।

চলুন আরো কিছু দলিল দেখা যাক।

১. অখণ্ড ভারতের সর্বোচ্চ ইসলামি নেতাদের অন্যতম, ভারতীয় কংগ্রেসের দুইবারের সভাপতি, কলকাতার ঈদের নামাজ পড়ানোর পেশ ইমাম মওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেছেন: "পয়গম্বর দাউদ (আঃ)-এর কণ্ঠস্বর অত্যন্ত মিষ্টি ছিল। তিনি সর্বপ্রথম হিব্রু সংগীতের সংকলন করেন ও মিশরের ও ব্যাবিলনের গাছ হইতে উচ্চমানের বাদ্যযন্ত্র উদ্ভাবন করেন"। (তর্জুমান আল্ কুরান, ২য় খণ্ড পৃঃ ৪৮০।)

২. "হজরত ওমর(রঃ)-এর আবাদকৃত শহরের মধ্যে দ্বিতীয় হইল বসরা। আরবি ব্যাকরণ, আরূয শাস্ত্র এবং সংগীতশাস্ত্র এই শহরেরই অবদান" (বিখ্যাত কেতাব 'আশারা মোবাশশারা', মওলানা গরীবুল্লাহ ইসলামাবাদী,  ফাজেল-এ দেওবন্দ, পৃষ্ঠা ১০৬।)

এরকম অজস্র দলিল আছে। 'অশ্লীল আদেশ শয়তান দেয়' (সুরা নূর ২১)।

কাজেই সংগীতসহ শ্লীল কোনোকিছু হারাম হবার প্রশ্নই ওঠেনা। গানের কুৎসিৎ কথা, কুৎসিৎ অঙ্গভঙ্গি বা গানের অতিরিক্ত নেশায় জীবনের ক্ষতি ইত্যাদির সীমা টানেননি ধর্মান্ধরা, পুরো সংগীতকেই ঢালাওভাবে বাতিল করেছেন। করে লাভ কিছুই হয়নি বরং সংগীত আজ সুবিশাল বিশ্ব-ইন্ডাস্ট্রি। দুনিয়ায় কোটি কোটি সংগীতপ্রেমী পরিবার পালছেন, বাচ্চাদের বড় করছেন, প্রতিভার বিকাশ ঘটাচ্ছেন। সংগীত হলো আমাদের সসীম জীবনে এক টুকরো অসীমের ছোঁয়া। চারদিকের আকাশবাতাস সাগর-পর্বত গ্রহ-নক্ষত্র, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড এক বিপুল সুরস্রষ্টার মহাসংগীত। তাই, গান শুনুন এবং বাচ্চাদের গান শোনান। গান করুন এবং বাচ্চাদের গান শেখান। গান যে ভালবাসে না, সে মানুষ খুন করতে পারে। 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো' হারাম নয়।

'আমি বাংলার গান গাই', 'বাড়ির পাশে আরশিনগর', 'কান্দে হাছন রাজার মন ময়না', মায়েদের মধুকণ্ঠে 'আয় আয় চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা' হারাম হবার প্রশ্নই ওঠেনা। শ্লীল সংগীত ইসলামে হারাম নয়। 'কোনো কিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ইসলামে নিষিদ্ধ' (মায়েদা ৭৭, নিসা ১৭১ ও বিদায় হজ্বের ভাষণ)। সঙ্গীত হারাম মনে করলে শুনবেন না, অসুবিধে কী। কিন্তু যারা সংগীত ভালোবাসেন, সংগীতের পক্ষের বিশ্ববরেণ্য ইসলামী স্কলারদের কথা বিশ্বাস করেন, তাদেরকে আঘাত করাই সেই ইসলাম-বিরোধী বাড়াবাড়ি। (সংগৃহীত)


বাংলায় জন্মিত তুমি বাঙালী হও!

প্রতিটি জাতির থাকে একটি মাতৃভাষা ও একটি পিতৃভূমি। তুমি যে বলো জাতিতে তুমি মুসলমান, তোমার মাতৃভাষা কী এবং তোমার পিতৃভূমি কোথায়?

মুসলমান জাতি বলে কোনো জাতি পৃথিবীতে কখনও ছিলো না, এখনও নেই, এবং ভবিষ্যতেও হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখি না। আছে আরব, ইরানী, তুর্কী, ইত্যাদি। হ্যাঁ, ইসলাম একটি ধর্ম, যার অনুসারীদেরকে মুসলমান বলা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন জাতির মধ্যেই মুসলমান আছে। মুসলমান একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় - কোনো জাতি নয়। মুসলমানেরা একটি অভিন্ন জাতি হলে, সে-জাতির একটি অভিন্ন দেশ থাকতো এবং সে-দেশে প্রতিটি মুসলমানের সমান অধিকার থাকতো। কারণ, ইসলাম বলে সকল মুসলমান সমান। বলে না?

তুমি যদি বলো মুসলমানের মাতৃভাষা আরবি এবং পিতৃভূমি আরব এবং তুমি হচ্ছো মুসলমান জাতির লোক, তো আরবি ভাষায় কথা বলো তো মায়ের সাথে, ভায়ের সাথে, বোনের সাথে, স্ত্রী-কন্যা-পুত্রের সাথে, আত্মীয়স্বজনের সাথে, এবং তাদের সবাইকে নিয়ে যাও তো দেখি তোমার পিতৃভূমি আরবদেশে! পারবে? পারবে না! তবে, কেনো তুমি বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কল্পনার জগতে বাস করো? স্বীকার করো যে, বাংলা তোমার মাতৃভাষা, বাংলা তোমার পিতৃভূমি এবং জাতিতে তুমি বাঙালী। আরও স্বীকার করো যে, বাঙালী জাতির সংখ্যাগুরু ধর্মীয় সম্প্রদায় মুসলমান হলেও এ-জাতির মধ্যে রয়েছে অন্যান্য আরও ধর্মের অনুসারী এবং এদের সকলেরই মাতৃভাষা বাংলা ও পিতৃভূমি বাংলা। তারা তোমার জাত-ভাই-বোন। তাই জাতি হিসেবে তোমাদের সকলের ভাগ্য একত্রে বাঁধা।

এই সত্যকে স্বীকার করে নিজদের দেশে নিজের জাতিকে সুসভ্য মানুষের স্তরে উন্নীত ও সমৃদ্ধ করো এবং জাতি হিসেবে সুসভ্য কিছু বিধান মেনে চলো।অন্যথায়, তুমি নিজেকে মুসলমান জাতির লোক এবং আরবি তোমার মাতৃভাষা ও আরব তোমার দেশ বলে যতোই চিৎকার করো, খোদ আরব জাতির লোকেরা তোমাকে "মিসকিন" ছাড়া আর কিছুই মনে করবে না। তাই, যদি মানুষের মর্য্যাদা নিয়ে পৃথিবীতে বাঁচতে চাও, প্রকৃতি তোমাকে যে-বাংলায় বাঙালী করে সৃষ্টি করেছে, তার ভিত্তিতেই আত্মপরিচয় নিয়ে মানুষ হওয়ার চেষ্টা করো। এতেই তোমার সম্মান এবং এতেই তোমার মর্য্যাদা - অন্য কিছুতে নয়। @ মাসুদ রানা



মস্তিষ্ককে আজীবন সুস্থ ও সচল রাখার ১৩টি বৈজ্ঞানিক সূত্র

আমাদের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু হল মস্তিষ্ক। এটি শরীরের মাত্র ২ শতাংশ ওজন দখল করলেও শরীরের মোট শক্তির প্রায় ২০ শতাংশ একাই খরচ করে। আমরা আমাদের পেশি বা ত্বকের যত্ন যতটা গুরুত্ব দিয়ে করি, শরীরের এই 'মাস্টার কন্ট্রোল রুম' বা আসল চালকটির কথা প্রায়ই ভুলে যাই। প্রচলিত ধারণা হল, বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া অনিবার্য। কিন্তু আধুনিক নিউরোসায়েন্স বলছে ভিন্ন কথা। আমাদের মস্তিষ্ক ‘প্লাস্টিক’ বা নমনীয় (Neuroplasticity), অর্থাৎ সঠিক চর্চায় এটি যেকোনো বয়সে নিজেকে নতুন করে সাজাতে পারে।

আপনি যদি আজ থেকেই সচেতন হন, তবে আপনার মেধাকে আরও ধারালো, স্মৃতিকে স্বচ্ছ এবং বার্ধক্যের ছায়া থেকে মস্তিষ্ককে মুক্ত রাখা সম্ভব। নিচের ১৩টি বৈজ্ঞানিক সূত্র আপনার মস্তিষ্ককে আজীবন সচল রাখার সূত্র হিসাবে কাজ করবে।

.

১. অবিরাম শেখা এবং মেধাকে চ্যালেঞ্জ জানানো (কগনিটিভ রিজার্ভ তৈরি)

মস্তিষ্কের একটি বিশেষ ক্ষমতা হল 'কগনিটিভ রিজার্ভ' বা বুদ্ধিবৃত্তিক সঞ্চয়। এটি অনেকটা সুরক্ষা জালের মত কাজ করে। নিয়মিত নতুন কিছু শেখার মাধ্যমে মস্তিষ্কের নিউরনগুলির মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি হয়। এর ফলে বার্ধক্যে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও মানুষ তার চিন্তাশক্তি সচল রাখতে পারে। কেবল পুরোনো জ্ঞান ঝালাই নয়, বরং নতুন ভাষা শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো বা জটিল ধাঁধার সমাধানের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে প্রতিদিন চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।

২. পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত সার্কাডিয়ান রিদম (মস্তিষ্কের বর্জ্য নিষ্কাশন)

মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের জন্য কেবল পর্যাপ্ত ঘুমই যথেষ্ট নয়, বরং সময়মত ঘুমানো এবং রাত জাগার অভ্যাস ত্যাগ করা অপরিহার্য। ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্ক একটি বিশেষ পদ্ধতিতে (Glymphatic System) সারা দিনের জমা হওয়া বিষাক্ত প্রোটিন বা বর্জ্য পরিষ্কার করে।

গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকা মস্তিষ্কের এই স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতা প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। দীর্ঘমেয়াদী রাত জাগার ফলে মস্তিষ্কে 'অ্যামাইলয়েড বিটা' নামক ক্ষতিকর প্রোটিন জমতে থাকে, যা আলঝেইমার ও অন্যান্য নিউরো-ডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

নিয়মিত একই সময়ে ঘুমানো এবং ভোরে জাগার অভ্যাস আপনার ফোকাস বা মনোযোগ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে। তাই ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন। শোবার অন্তত এক ঘণ্টা আগে নীল আলো (মোবাইল বা ল্যাপটপ স্ক্রিন) থেকে দূরে থাকুন, কারণ এটি মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়। রাত জেগে কাজ করা বা বিনোদন নেওয়া আপনার মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাকে সময়ের আগেই কমিয়ে দিতে পারে।

৩. উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ (মস্তিষ্কের রক্তনালী রক্ষা)

মস্তিষ্কের রক্তনালীগুলি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘদিনের উচ্চ রক্তচাপ এই সূক্ষ্ম নালীগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা অনেক সময় 'সাইলেন্ট স্ট্রোক' বা মস্তিষ্কের সাদা অংশে (White Matter) পরিবর্তন ঘটায়। এর ফলে স্মৃতিশক্তি দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। তাই রক্তচাপ ১২০/৮০ mmHg বজায় রাখা মস্তিষ্কের রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ সচল রাখার জন্য অপরিহার্য।

৪. স্বাস্থ্যকর ওজন ও খাদ্যাভ্যাস (মস্তিষ্কের পুষ্টি ও সুরক্ষা)

শরীরের অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা কেবল হৃদরোগ নয়, বরং মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত মেদ শরীরে এমন কিছু রাসায়নিক তৈরি করে যা মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা পরবর্তীতে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা অটুট রাখতে এবং এই ঝুঁকি কমাতে সঠিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অপরিহার্য।

এক্ষেত্রে ভূমধ্যসাগরীয় (Mediterranean) ও MIND ডায়েট অত্যন্ত কার্যকরী, যার মূল ভিত্তি হল প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি, অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর রঙিন বেরি জাতীয় ফল, আস্ত বা পূর্ণ শস্য (Whole Grains) এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ সামুদ্রিক মাছ। এছাড়া জলপাই তেল (Olive Oil), বাদাম এবং অ্যাভোকাডো থেকে প্রাপ্ত 'হেলদি ফ্যাট' মস্তিষ্কের কোষের আবরণ বা মেমব্রেন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিপরীতে, ভাজাপোড়া বা প্রক্রিয়াজাত খাবারে থাকা 'ট্রান্স ফ্যাট' রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি করে বলে তা যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা উচিত। সেই সাথে সারা দিন পর্যাপ্ত পানি পান করে শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা জরুরি, কারণ সামান্য পানিশূন্যতাও আপনার মনঃসংযোগ এবং মেজাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

৫. শ্রবণশক্তির সুরক্ষা (শ্রবণ ও চিন্তাশক্তির গভীর সম্পর্ক)

গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে (৪০-৬০ বছর) শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রমের অন্যতম বড় কারণ। যখন আমরা কানে কম শুনি, তখন মস্তিষ্ককে শব্দ বুঝতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়, যার ফলে স্মৃতি ও চিন্তার জন্য নির্ধারিত শক্তি কমে যায়। এছাড়া কানে কম শোনার ফলে মানুষ সামাজিক মেলামেশা কমিয়ে দেয়, যা মস্তিষ্ককে স্থবির করে তোলে। তাই বছরে অন্তত একবার শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে 'হিয়ারিং এইড' ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।

৬. ধূমপান ও তামাকমুক্ত জীবন (অক্সিজেন ও রক্ত সঞ্চালন)

ধূমপান কেবল ফুসফুসের ক্ষতি করে না, বরং এটি মস্তিষ্কের রক্তনালীরও সবচেয়ে বড় শত্রু। তামাকের বিষাক্ত উপাদানগুলি রক্তনালীতে চর্বি জমিয়ে দেয় (Atherosclerosis), যার ফলে মস্তিষ্কে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।

এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্কের কোষে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে আশার কথা এই যে, আপনি যে বয়সেই ধূমপান ত্যাগ করুন না কেন, শরীর অত্যন্ত দ্রুত নিজেকে মেরামত করতে শুরু করে।

ধূমপান ছাড়ার কয়েক বছরের মধ্যেই স্ট্রোকের ঝুঁকি একজন অধূমপায়ীর কাছাকাছি চলে আসে এবং মস্তিষ্কে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে 'ব্রেইন ফগ' বা মানসিক ধোঁয়াশা দূর হয় এবং মানসিক স্বচ্ছতা ও কর্মক্ষমতা পুনরায় ফিরে আসে।

৭. ব্যয়াম (মস্তিষ্কের জন্য প্রাকৃতিক মহৌষধ)

ব্যায়ামকে মস্তিষ্কের জন্য একটি 'ফ্রি প্রেসক্রিপশন' বা বিনামূল্যের ওষুধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি কেবল পেশি গঠন করে না, বরং মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যও রক্ষা করে।

ব্যায়ামের ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং এমন কিছু প্রোটিন নিঃসৃত হয় যা নতুন নিউরন বা কোষ তৈরি ও তাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। নিয়মিত হাঁটা, সাঁতার কাটা বা যোগব্যায়াম করলে স্ট্রেস হরমোন (Cortisol) কমে এবং আনন্দের হরমোন (Endorphins) বাড়ে। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি ধরনের পরিশ্রম আপনার স্মৃতিশক্তি এবং শেখার ক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

৮. সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা (মানসিক ব্যায়াম ও একাকীত্ব দূরীকরণ)

মানুষের সাথে মেলামেশা করা মস্তিষ্কের জন্য একটি অত্যন্ত জটিল এবং কার্যকর ব্যায়াম। একাকীত্ব স্বাস্থ্যের ওপর ধূমপানের মতই ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। যখন আপনি কারও সাথে কথা বলেন, তখন আপনার মস্তিষ্ককে একসাথে অনেক কাজ করতে হয়—ভাষা বুঝতে হয়, স্মৃতি হাতড়াতে হয়, সামনের জনের মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে হয় এবং দ্রুত উত্তর তৈরি করতে হয়। এটি আপনার নিউরাল সার্কিটগুলিকে সচল ও ধারালো রাখে।

তাছাড়া, সামাজিক যোগাযোগ মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা কমায়। বন্ধুবান্ধব, পরিবার বা স্বেচ্ছাসেবা মূলক কাজের সাথে যুক্ত থাকলে একাকীত্ব দূর হয়, যা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

৯. মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন (স্ট্রেস ও বিষণ্নতা ব্যবস্থাপনা)

মানসিক স্বাস্থ্য এবং মস্তিষ্কের গঠন একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িত। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা স্ট্রেস শরীরে 'কর্টিসল' নামক হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস (Hippocampus) বা স্মৃতির প্রধান কেন্দ্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমনকি সংকুচিতও করে ফেলতে পারে।

বিষণ্নতা কেবল মনের অবস্থা নয়, এটি মস্তিষ্কের কগনিটিভ রিজার্ভ কমিয়ে দেয় এবং ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত মেডিটেশন বা ধ্যান করলে মস্তিষ্কের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স শক্তিশালী হয়। এছাড়া পর্যাপ্ত ঘুম, শখের কাজ করা এবং প্রয়োজনে সংকোচ না করে পেশাদার সাইকোলজিস্ট বা নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া আপনার মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।

১০. ডায়াবেটিস ও রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ

রক্তে শর্করার আধিক্য বা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস মস্তিষ্কের নিউরন এবং রক্তনালী—উভয়ের জন্যই নীরব ঘাতক। যখন রক্তে চিনির মাত্রা দীর্ঘ সময় বেশি থাকে, তখন তা মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়।

উচ্চ শর্করা মস্তিষ্কের কোষগুলির মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় 'ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ইন দ্য ব্রেইন' বলা হয়। এটি আলঝেইমার রোগের অন্যতম কারণ হতে পারে। নিয়মিত রক্তের শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা, গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম এমন খাবার গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের আয়ু বৃদ্ধি করতে নিতে পারেন।

১১. মাথায় আঘাত থেকে সুরক্ষা (ট্রমা প্রতিরোধ)

মস্তিষ্কের যেকোনো আঘাত, তা ছোট হোক বা বড়, ভবিষ্যতে কগনিটিভ সমস্যার ঝুঁকি তৈরি করে। ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি (TBI) মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যপদ্ধতি ব্যাহত করে এবং বার্ধক্যে দ্রুত স্মৃতিভ্রমের পথ প্রশস্ত করে।

বাইক চালানো বা স্কেটিং করার সময় উন্নত মানের হেলমেট পরা তাই আবশ্যক। গাড়িতে চলাচলের সময় অবশ্যই সিটবেল্ট ব্যবহার করুন, যা আকস্মিক ঝাঁকুনিতে মস্তিষ্কের আঘাত রোধ করে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাথরুমে বা সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই পিচ্ছিল মেঝে বা অন্ধকারে হাঁটাচলার সময় সতর্ক থাকুন।

১২. বায়ুদূষণ থেকে দূরে থাকা (পরিবেশগত সচেতনতা)

আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণ কেবল ফুসফুসের রোগ নয়, বরং মস্তিষ্কের রোগেরও অন্যতম কারণ। বাতাসের অতি ক্ষুদ্র কণা (PM2.5) নিঃশ্বাসের সাথে রক্তে মিশে সরাসরি মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় এবং সেখানে প্রদাহ বা ইনফ্লেমেশন সৃষ্টি করে।

দীর্ঘ সময় দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকলে মস্তিষ্কের কোষের ক্ষয় ত্বরান্বিত হয় এবং মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। শিল্পাঞ্চল বা অতিরিক্ত ট্রাফিক জ্যামের এলাকায় এন-৯৫ (N95) মাস্ক ব্যবহার করুন। ঘরের ভেতরে বাতাস পরিষ্কার রাখতে 'এয়ার পিউরিফায়ার' ব্যবহার করা যেতে পারে এবং সম্ভব হলে গাছপালা সমৃদ্ধ ও দূষণমুক্ত পরিবেশে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন।

১৩. দাঁত ও মাড়ির সুস্বাস্থ্য রক্ষা (ওরাল হাইজিন ও ব্রেইন কানেকশন)

শুনতে অবাক লাগলেও, মুখের স্বাস্থ্য সরাসরি মস্তিষ্কের সাথে যুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, মাড়ির রোগ বা পিরিওডন্টাইটিস (Periodontitis) সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া রক্তস্রোতের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী মাড়ির ইনফেকশন আলঝেইমার ও কগনিটিভ ডিক্লাইন বা স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

তাই প্রতিদিন দুই বেলা ব্রাশ করা, ফ্লসিং করা এবং নিয়মিত ডেন্টিস্টের পরামর্শ নেওয়া কেবল উজ্জ্বল হাসির জন্য নয়, বরং আপনার মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখার জন্যও একটি অপরিহার্য বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ।

.

মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা কোনো স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য নয়, বরং এটি একটি জীবনব্যাপী সাধনা। আধুনিক নিউরোলজি আমাদের আশ্বস্ত করছে যে, আমাদের চিন্তাশক্তির স্থায়িত্ব অনেকটাই আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। উপরের এই ১৩টি বৈজ্ঞানিক সূত্র মেনে চলা মানে কেবল রোগ প্রতিরোধ করা নয়, বরং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নিজের ব্যক্তিত্ব, অমূল্য স্মৃতি আর আত্মনির্ভরশীলতাকে অক্ষুণ্ণ রাখা।

@ সিটি আলো



ওভারথিংকিং কমানোর সহজ কিছু উপায়


শুধু ইচ্ছাশক্তি দিয়ে নয়, বরং নির্দিষ্ট ও কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতিতে এই ওভারথিংকিং চক্র ভাঙতে হয়। এমন পদ্ধতি, যা ব্যক্তিভেদে সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করে এবং ধীরে ধীরে মস্তিষ্ককে বিভ্রান্তির অভ্যাস থেকে সরিয়ে আনে।

১. ৫-সেকেন্ড রুল (মানসিক জড়তা কাটাতে): কোনো কাজ করতে ইচ্ছা হলে বা সিদ্ধান্ত নিতে হলে আর দেরি না করে ৫-৪-৩-২-১ গুনে তৎক্ষণাৎ শুরু করে দিন। এটি মস্তিষ্ককে দ্বিধা করার বা অজুহাত দেওয়ার সময় না দিয়ে সরাসরি অ্যাকশনে নিয়ে যায়। যখন মস্তিষ্ক কোনো কাজ শুরু করতে ভয় পায় বা অতিরিক্ত বিশ্লেষণ করতে চায়, তখন এটি সবচেয়ে কার্যকর।

২. ২-মিনিট রুল (কাজ জমিয়ে রাখা বন্ধ করতে): যদি কোনো কাজ করতে ২ মিনিটের কম সময় লাগে (যেমন: একটা ইমেইলের উত্তর দেওয়া বা ঘর গুছিয়ে রাখা), তবে সেটি 'পরে করব' বলে ফেলে না রেখে এখনই করে ফেলুন। ছোট ছোট অসম্পূর্ণ কাজের স্তূপ পরে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি কাজের ব্যবস্থাপনা বা প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে সাহায্য করে।

৩. মাইক্রো-অ্যাকশন ও ছোট বিজয়: বড় কোনো দুশ্চিন্তাকে ছোট ছোট কর্মপরিকল্পনায় ভাগ করে ফেলুন। যখন আপনি একটি ছোট কাজ শেষ করবেন, আপনার মস্তিষ্ক সুস্থ ধারার ডোপামিন নিঃসরণ করবে। দীর্ঘ চিন্তার চেয়ে কাজে হাত দেওয়া মস্তিষ্কের জন্য বেশি আরামদায়ক।

৪. নির্দিষ্ট ‘চিন্তার সময়’ বরাদ্দ করা: সারাদিন না ভেবে দিনে মাত্র ১৫-২০ মিনিট একটা নির্দিষ্ট সময় রাখুন। বাকি সময় মাথায় কোনো চিন্তা এলে নিজেকে বলুন, “এটা নিয়ে ভাবার জন্য আলাদা সময় আছে, এখন নয়।” এটি আপনার মস্তিষ্ককে শৃঙ্খলায় ফেরাবে।

৫. রেডিক্যাল একসেপ্টেন্স (গ্রহণ করার মানসিকতা): “আমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না”—এই সত্যটি মেনে নেওয়াই হল ওভারথিংকিং-এর সবচেয়ে বড় ওষুধ। অনিশ্চয়তাকে জীবনের অংশ হিসাবে গ্রহণ করলে মস্তিষ্কের ‘অ্যালার্ম সিস্টেম’ বা অ্যামিগডালা শান্ত হয়।

৬. 'ব্রেন ডাম্প' বা লিখে ফেলা: মাথার ভেতর যখন চিন্তার জট লেগে যায়, তখন সেগুলি কাগজে লিখে ফেলুন। যখন আমরা চিন্তাগুলিকে লিখে ফেলি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক সেগুলিকে 'প্রসেসড' বা সংরক্ষিত হিসাবে গণ্য করে। ফলে একই চিন্তা বার বার ফিরে আসার প্রবণতা কমে যায়।

৭. 'কেন' এর বদলে 'কীভাবে': অতীতের দিকে তাকিয়ে "আমার সাথেই কেন এমন হল?"—এই প্রশ্ন না করে বর্তমানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করুন—"কীভাবে আমি এই পরিস্থিতি সামলাতে পারি?"। প্রশ্নের এই পরিবর্তন মস্তিষ্ককে সমাধান খোঁজার দিকে ধাবিত করে।

৮. কগনিটিভ ডিস্ট্যান্সিং বা 'তৃতীয় ব্যক্তির দৃষ্টিতে দেখা' (The Third-Person Perspective): যখন আমরা ওভারথিঙ্ক করি, তখন আমরা সমস্যার ভেতরে ঢুকে পড়ি। ফলে আবেগ আমাদের যুক্তিকে ঢেকে দেয়। নিজেকে প্রশ্ন করুন, "আমার প্রিয় কোনো বন্ধু যদি এই একই সমস্যায় পড়ত, তবে আমি তাকে কী পরামর্শ দিতাম?" নিজের সমস্যার কথা যখন অন্য কারো সমস্যা হিসেবে কল্পনা করা হয়, তখন মস্তিষ্ক অনেক বেশি যৌক্তিক এবং কার্যকর সমাধান দিতে পারে।

৯. অসম্পূর্ণতার সৌন্দর্য গ্রহণ করা (Wabi-Sabi বা 'Done is Better than Perfect'): ওভারথিংকিং-এর অন্যতম জ্বালানি হল 'পারফেকশনিজম' বা সবকিছু নিখুঁত করার তাড়না। আমরা ভাবি, যতক্ষণ না সব তথ্য জানছি বা সেরা সিদ্ধান্তটা নিচ্ছি, ততক্ষণ কাজ শুরু করব না। নিজেকে বলুন, "আমি একটি চলনসই (Good enough) সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ শুরু করব এবং প্রয়োজনে পথে সংশোধন করে নেব।" কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে বসে থাকার চেয়ে একটি মোটামুটি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাওয়া মানসিক শান্তির জন্য অনেক বেশি কার্যকর।

১০. তথ্য ও ডিজিটাল ডিটক্স: সোশ্যাল মিডিয়া বা অপ্রয়োজনীয় তথ্যের উৎস কমিয়ে দিন। যত কম অপ্রাসঙ্গিক তথ্য মস্তিষ্কে ঢুকবে, প্রসেসিং করার চাপ তত কমবে। সেই সঙ্গে নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়ামের অভ্যাস করুন, যা নতুন স্নায়বিক সংযোগ তৈরিতে সাহায্য করে।


@ সিটি আলো


রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধরে রাখতে অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার বর্জন করার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব

চিনি বা অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য এমন এক সুস্বাদু বিষ যা অলক্ষ্যে আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। আপনি কি জানেন যে মাত্র কয়েক চামচ চিনি খাওয়ার পর আপনার শরীরের শ্বেত রক্তকণিকাগুলো কয়েক ঘণ্টার জন্য নিস্তেজ হয়ে পড়ে যা আপনাকে যেকোনো ভাইরাসের সহজ শিকারে পরিণত করে? অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার ফলে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা দেয়াল ভেঙে পড়ে যার ফলে আপনি খুব সহজেই সাধারণ সর্দি কাশি থেকে শুরু করে মারাত্মক সব সংক্রমণের কবলে পড়েন। এই অবহেলা চলতে থাকলে আপনার শরীর একসময় বাইরের কোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবে এবং আপনি দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার মরণ ফাঁদে আটকে যাবেন। মিষ্টির এই মোহ আপনার জীবনের আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে এবং আপনার শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে এক ভয়ংকর বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে যা আপনি কল্পনাও করতে পারছেন না।

কিন্তু আপনি কি জানেন যে এই মরণঘাতী অভ্যাসটি ত্যাগ করার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই আপনার শরীর আবার আগের মতো সজীব ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে? মিষ্টি বর্জনের ফলে আপনার শরীরের প্রতিটি কোষ নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় এবং আপনার ইমিউন সিস্টেম বহুগুণ বেশি সক্রিয় হয়ে কাজ শুরু করে। অবাক করার মতো তথ্য হলো যখন আপনি চিনি খাওয়া বন্ধ করেন তখন আপনার শরীরের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কমে যায় যা আপনাকে হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে জাদুর মতো কাজ করে। এটি কেবল আপনার ওজন কমায় না বরং আপনার মানসিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করে এবং আপনাকে সারাদিন অফুরন্ত প্রাণশক্তি প্রদান করে যা আপনি আগে কখনো অনুভব করেননি। এই একটি সাহসী সিদ্ধান্ত আপনার শরীরকে এক দুর্ভেদ্য দুর্গের মতো শক্তিশালী করে তুলবে যা যেকোনো কঠিন রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম।

আধুনিক ইমিউনোলজি এবং মেটাবলিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে অতিরিক্ত চিনি শরীরের ভিটামিন সি শোষণে সরাসরি বাধা প্রদান করে যা রোগ প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার। এক বিশেষ গবেষণায় দেখা গেছে চিনি সেবনের মাত্র ৩০ মিনিট পর শরীরের নিউট্রোফিল নামক কোষগুলোর জীবাণু ধ্বংস করার ক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে রক্তে উচ্চমাত্রার শর্করা শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বড় ও সার্থক আবিষ্কার। আমেরিকান জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনের তথ্য অনুযায়ী যারা চিনিযুক্ত পানীয় বেশি পান করেন তাদের শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরির হার অন্যদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি থাকে। নিয়মিত মিষ্টি বর্জনের ফলে শরীরের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমে যায় যা আপনার দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করতে এবং বার্ধক্য রুখতে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সহায়তা করে।

শরীরের এই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং মিষ্টি খাওয়ার আসক্তি দূর করতে আপনাকে কিছু সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক নিয়ম কঠোরভাবে পালন করতে হবে। প্রথমেই আপনার চা কফি কিংবা শরবতে অতিরিক্ত সাদা চিনি মেশানোর অভ্যাসটি আজ থেকেই সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিন। প্যাকেটজাত পানীয়, কোল্ড ড্রিঙ্কস এবং কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত সস বা বিস্কুট কেনা বাদ দিন কারণ এগুলো আপনার অজান্তেই শরীরে চিনির পাহাড় জমা করছে। যখনই মিষ্টি কিছু খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা হবে তখন চিনির বিকল্প হিসেবে অল্প পরিমাণে তাজা ফলমূল কিংবা সামান্য মধু বা খেজুর খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন যা আপনার শরীরের পুষ্টির চাহিদা মেটাবে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন এবং খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমিয়ে প্রোটিন ও শাকসবজির হার বাড়ান যাতে রক্তে শর্করার মাত্রা সবসময় স্থিতিশীল থাকে।

আপনার এই অমূল্য জীবনকে সুস্থ রাখা এবং একটি শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্পূর্ণ আপনার নিজের সচেতনতার ওপর নির্ভর করছে। আমরা চাই না সামান্য স্বাদের লোভে পড়ে আপনি আপনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং সুস্বাস্থ্যকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিন। প্রকৃতির দেওয়া খাঁটি খাবারগুলোর ওপর আস্থা রাখা এবং কৃত্রিম মিষ্টির মোহ ত্যাগ করাই হবে আপনার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার আনন্দই হচ্ছে প্রকৃত সার্থকতা যা একটি সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব। আজ থেকেই এই বৈজ্ঞানিক সতর্কবার্তাটি নিজের জীবনে প্রয়োগ করুন এবং একটি রোগমুক্ত শক্তিশালী হৃদয়ের অধিকারী হয়ে আগামীর পথে এগিয়ে যান। @স্বাস্থ্য পরামর্শ


কে এই "ভিকারুন নেসা নুন" ?

"ভিকারুণ নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ" চিনেন না এমন কেউ নেই, কিন্তু এই "ভিকারুণ নিসা নুন" কে ছিলেন? কেমন ছিলেন? তা অনেকেই জানিনা। "ভিকারুণ নিসা নুন" ছিলেন ফিরোজ খান নুনের স্ত্রী। "ফিরোজ খান নুন" ছিলেন ১৯৫৭-৫৮ এর সময় পাকিস্তানের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। এর আগে তিনি ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ বছর পর্যন্ত পূর্ব বাংলার গভর্নর ছিলেন। তারপর পরের তিন বছর (১৯৫৩-১৯৫৬) পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ফিরোজ খান নুন বিয়ে করেন ভিক্টোরিয়াকে (ভিকারুণ নিসার পূর্ব নাম)। জন্মগত দিক দিয়ে ভিক্টোরিয়া অস্ট্রিয়ান ছিলেন। বিয়ের পর ভিক্টোরিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে 'ভিকার-উন-নিসা' নাম পরিবর্তন করেন।

ফিরোজ খানের এর রাজনৈতিক জীবনেরও সক্রিয় সঙ্গী ছিলেন ভিকারুণ নিসা। ফিরোজ খানের সাথে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। ইন্ডিয়ার ভাইসরয়ের মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করে স্ত্রীকে নিয়ে লাহোর চলে আসেন ফিরোজ খান নুন। তারপর ফিরোজ খানের পাশাপাশি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন ভিকারুণ নিসা। পাঞ্জাবে যখন Civil Disobedience Movement চলছিল, সে সময় লেডি নুন তিনবার গ্রেফতার হওয়ার পরেও দমে যাননি। ব্রিটিশ সমর্থিত খিজরের মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে পুণরায় আন্দোলনকে সংগঠিত করতে সহযোগিতা করেন।

স্বামীর মৃত্যুর পরেও ভিকারুণ নিসা বিভিন্ন সামাজিক সেবা মূলক কাজে জড়িত থাকেন। পূর্ব বাংলার মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এই দেশ থেকে যেন মেয়েরা অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজ এর মতো উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য যেতে পারে, সেজন্য চেষ্টা করে যান ভিকারুণ নিসা নুন।

সেই ছোট পরিসরের ভিকারুণ নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ আজ দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ। প্রত্যেকটা মহৎ কাজের পেছনে কারা ছিলেন সেসব জানার জন্যে আমাদের ইতিহাস পাঠ খুবই জরুরি। © vikarunnesa



সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ — জাতিকে বাঁচাতে যিনি করেছিলেন পিতৃহত্যা।

পনেরো শতকের শুরুর দিকে, ইলিয়াস শাহী বংশের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ভাটির কায়স্থ জমিদার রাজা গণেশ বাঙ্গালার সিংহাসন দখল করেন। গণেশ ছিলেন কট্টরপন্থী; তার লক্ষ্য ছিল বাঙ্গালাকে মুসলিমশূন্য করা। ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুরু করেন মুসলিমদের ওপর নানাবিধ জুলুম—মসজিদ ধ্বংস, সুফি-আলেম ও উলামাদের নিপীড়ন। এমনকি পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদে তিনি মূর্তি স্থাপন করেন, যার ধ্বংসাবশেষ আজও রয়ে গেছে।

এই অবস্থায় হজরত নূরে কুতুবে আলম (রহ.) গণেশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান। তিনি জৌনপুরের সুলতানকে সাহায্যের জন্য চিঠি পাঠান এবং বাঙ্গালার মুসলিমদের রক্ষা করার জন্য বিশাল বাহিনী নিয়ে আসেন। এই খবর শুনে গণেশ ভীত হয়ে নূরের দরবারে আসে। নূরে কুতুবে আলম তাকে বলেন—“তোমার সামনে দুটি পথ, ইসলাম গ্রহণ করো অথবা যুদ্ধ করো।” গণেশ প্রথমে ইসলাম গ্রহণের দিকে রাজি হলেও স্ত্রীর প্ররোচনায় পিছিয়ে আসে। তবে তার ছেলে যদু নারায়ণ ইসলাম গ্রহণ করে; নামকরণ হয় সুলতান জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ।

কয়েক বছর পর নূরে কুতুবে আলমের মৃত্যু ঘটে। গণেশ আবার ক্ষমতা দখল করে এবং আরও বিধ্বংসী ও আগ্রাসী হয়ে ওঠেন। তিনি পুত্রকে হিন্দুধর্মে ফেরানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। মুসলিমদের ওপর তার অত্যাচার তীব্র হয়; বহু মসজিদকে মন্দিরে রূপান্তর করা হয় এবং সাধারণ মানুষ সহ মুসলিম সমাজ ভয়ঙ্কর নিপীড়নের শিকার হয়।

জালালউদ্দিন কারাবন্দি অবস্থায় নিজের পিতার অমানবিক অত্যাচার দেখেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নেন—মুসলিমদের বাঁচানোর একমাত্র পথ হলো রাজা গণেশকে হত্যা করা। তার অনুচরদের সাহায্যে তিনি পিতৃহত্যা করেন এবং বাঙ্গালার মুসলিমরা বাঁচে। সেদিন সুলতান জালালউদ্দিন বিজয়ী না হলে হয়তো বাঁচত না বাঙ্গালার মুসলিম সমাজ ও ইসলামী সভ্যতা।



আমেরিকার ইতিহাস‎ 

 আনুমানিক ১৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে স্থানীয় আদিবাসী আমেরিকানদের উত্তর আমেরিকার ভূখন্ডে আগমনের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস শুরু হয়। সেখানে অনেক স্থানীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল যার অধিকাংশ ষোলশতকের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৪৯২ সালে ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে সেখানে ইউরোপিয় ঔপনিবেশিক যুগের শুরু হয়। আমেরিকা মহাদেশের বেশীরভাগ উপনিবেশ ১৬০০ সালের পরে গড়ে উঠেছিল। 

১৭৬০ সালে উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলে ২.৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা নিয়ে তেরটি বৃটিশ কলোনি স্থাপিত হয়েছিল। ফ্রান্স ইন্ডিয়ান যুদ্ধে জয়লাভের পর বৃটিশ সরকার উপনিবেশের উপর বেশ কিছু কর ধার্য করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে প্রতিবাদ শুরু হয়। ১৭৭৩ সালে বোষ্টন টি পার্টির প্রতিবাদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আন্দোলন দমনের জন্য বৃটিশ পার্লামেন্ট বিশেষ আইন পাশ করে। পরবর্তিতে ১৭৭৫ সালে এই আন্দোলন এক রক্তক্ষয়ি সংঘর্ষে রূপ নেয়। তবে সেখানের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং তার চেয়েও বেশি হারে বৃদ্ধি পায় সেখানের অর্থনীতির আকার। ১৯৪০ সালের পূর্ব পর্যন্ত শান্তিকালিন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তখনো কোন উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেনি।

তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অসন্তোষ ও প্রগতিশীল আন্দোলন শুরু হয়। যার ফলে ফেডারেল আয়কর, সিনেটরদের সরাসরি নির্বাচন, মদ নিষিদ্ধকরণ এবং মহিলাদের ভোটাধিকারসহ বেশ কিছু সংস্কার করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে নিরপেক্ষ থাকলেও, ১৯১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং পরের বছর মিত্র বাহিনীর যুদ্ধে অর্থায়ন করে। ‘সমৃদ্ধ গর্জনশীল বিশ’ (Roaring Twenties) এর পর, ১৯২৯ সালের ওয়াল স্ট্রিট শেয়ার বাজারের ব্যাপক ধ্বস এক দশক যাবত বিশ্বব্যাপী মহামন্দার সূচনা করেছিল। প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট `নিউ ডিল' নামের একটি নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। এই কর্মসূচির মধ্যে ছিল, বেকার ও কৃষকদের সহায়তা দান, সামাজিক নিরাপত্তা বা সোসাল সিকিউরিটি এবং সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ। এই কর্মসূচি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আধুনিক উদারবাদ (Modern liberalism) প্রতিষ্ঠা করেছিল। মার্কিন রণঘাঁটি পার্ল হারবার আক্রান্ত হবার পর ১৯৪১ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে অংশ নিয়ে মিত্র শক্তিকে অর্থ সহায়তা প্রদান করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকা নাৎসী জার্মান ও ইটালির ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাস্ত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। যুদ্ধে মার্কিনদের অংশগ্রহণ চূড়ান্ত রূপ পায় যখন তারা জাপান সাম্রাজ্যের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে তাদের নতুন আবিষ্কৃত ‘আনবিক বোমা’ নিক্ষেপ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল হিসাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্ধী শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হল। স্নায়ু যুদ্ধের সময় এই দুই পরাশক্তি, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, মাহাকাশ, প্রচার প্রচারণা এবং কমিউনিস্ট সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে স্থানীয় যু্দ্ধের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধে ঠান্ডা যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ১৯৬০ এর দশকে, প্রবল নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রভাবে, সামাজিক সংস্কারের আরেকটি দিক, আফ্রিকান আমেরিকান এবং অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার এবং চলাচলের স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর শীতল যুদ্ধের অবসান হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে একমাত্র পরাশক্তি হিসাবে পরিগনিত হতে থাকে। শীতল যুদ্ধের অবসানের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি মূলতঃ মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব অক্ষুন্ন রাখার বিষয়টি অধিক প্রাধান্য পায়। বিশেষ করে ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক হামলা এবং ইসলামিক স্টেটের মোকাবেলাই তাদের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক নীতিমালার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।


|| নীল বিদ্রোহ ||

নীল চাষীদের আন্দোলনের সমর্থনে চাঁদপুরের হাজি মোল্লা বলেছিলেন- "নীল চাষ অপেক্ষা ভিক্ষা উত্তম।"

নীল বিদ্রোহের সূচনা হয় ১৮৫৯ সালের ফেব্রুয়ারী-মার্চ মাসের দিকে। ভারতীয় উপমহাদেশের মাটি ছিল নীল চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। বিপুল লাভের আশায় ব্রিটিশ নীলকররা নীল চাষের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেন। নদীয়া, রংপুর, যশোর, বগুড়া প্রভৃতি জেলায় নীল চাষ শুরু হয়েছিল। কিন্তু উনিশ শতকের শেষের দিকে এই নীল চাষ আর অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক থাকে না। ফলে চাষীরা নীল চাষ না করে ধান, পাট চাষ করতে চান। কিন্তু নীলকর সাহেবরা চাষীদের ওপর ব্যাপক অত্যাচার, দমন পীড়ন নামিয়ে তাদেরকে নীল চাষ করতে বাধ্য করে। এর বিরুদ্ধে চাষীরা সংঘবদ্ধ হয়ে নীল চাষের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন। ইতিহাসে এই আন্দোলন 'নীল বিদ্রোহ' নামে পরিচিত।

নীল চাষ যখন প্রথম শুরু হয়েছিল তখন নীল চাষ ছিল ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া দখলে। কিন্তু ১৮৩৩ সালের সনদ আইনের ফলে এই একচেটিয়া অধিকার আর থাকল না, ব্রিটেন থেকে বহু সংখ্যক নীলকর বাংলায় এসে ইচ্ছেমতো নীল চাষ শুরু করে। কৃষকদের ওপর চলে অকথ্য অত্যাচার। ১৮৫৯ সালের ফেব্রুয়ারী-মার্চ মাস নাগাদ নীলচাষীরা সংঘবদ্ধ হয়ে নীল চাষ করবে না বলে ঘোষণা করে। নীল চাষীদের এই আন্দোলন দমন করার জন্য শুরু হয় ভয়ানক পুলিশি অত্যাচার, গ্রেফতার করা হয় আন্দোলনকারীদের। এর উল্টোদিকে নীল চাষীদের আন্দোলনও আরও বৃহৎ আকার ধারণ করে। ইংরেজ সরকার ১৮৬০ সালে 'নীল কমিশন' গঠন করে, নীল বিদ্রোহ দমন করার উদ্দেশ্যে। এই কমিশন তদন্ত করে চাষীদের অভিযোগ যথার্থ বলে রায় দিয়েছিল। এরপর সরকার নীল চাষের ওপর আইন পাশ করতে বাধ্য হয় ১৮৬২ সালে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইংল্যাণ্ডের শিল্প বিপ্লবের ফলে বস্ত্র শিল্পের বিপুল চাহিদা তৈরি হয়, ফলে কাপড় রঙ করার জন্য নীলের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেইসময় নীল চাষ অন্যতম লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়। একটি হিসেবে দেখা যায় যে- ১৮০৩ সাল পর্যন্ত নীল চাষ করতে যে খরচ হত, তার সবটাই কোম্পানি অল্প সুদে আগাম দিয়ে দিত। এতে যে নীল উৎপাদিত হত, তার সবটাই চলে যেত ইংল্যাণ্ডে, কোম্পানির লাভের অঙ্ক বেড়ে চলত বহুগুণে। একে একে খুলনা, ২৪ পরগণা, রাজশাহী, মালদা, পাবনা, ফরিদপুর, যশোর, বরিশাল, ময়মনসিংহ প্রভৃতি জেলায় অসংখ্য নীলকুঠি গড়ে ওঠে।

নীল চাষের লাভজনক প্রসার দেখে বাংলার শীর্ষস্থানীয় মুৎসুদ্দি, জমিদার-গোষ্ঠী, প্রভাব প্রতিপত্তি সম্পন্ন শহুরে মানুষেরা নীল চাষের প্রসারের জন্য আন্দোলন করেছিল। এর প্রধান লক্ষ্য ছিল ইংরেজ সরকারের সুনজরে থাকা। এদের মধ্যে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায়, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রমুখ ছিলেন। এঁরা ১৫ই ডিসেম্বর, ১৮২৯ কলকাতার টাউন হলে সভা করে নীল চাষ প্রসারের দাবী জানিয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছিলেন। সেই সময় ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি একাধিক কুঠি স্থাপন করে ব্যবসা চালাত। তার মাঝে একটি কুঠিতে সমগ্র কাজ পরিচালনা করার জন্য একটি পরিচালনা পর্ষদ থাকত, এটি সদর কুঠি বা কনসার্ন নামেও পরিচিত ছিল। সদর কুঠিতে পরিচালনা পর্ষদ থেকে প্রতি কুঠিতে একজন অধ্যক্ষ নিয়োগ করা হত। সেই অধ্যক্ষকে 'বড় সাহেব' এবং তার সহকারীকে 'ছোট সাহেব' বলে সম্বোধন করা হত আর এই দুটি পদই নির্দিষ্ট ছিল ইংরেজ শ্বেতাঙ্গদের জন্য। বাকি পদগুলিতে এই দেশের মানুষদের চাকরি দেওয়া হত।

বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলার (তৎকালীন নদীয়া) চৌগাছাতে প্রথম নীল বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাসের নেতৃত্বে। এরপর এই বিদ্রোহের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বর্ধমান, বাঁকুড়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, পাবনা, খুলনা প্রভৃতি জেলায়। কৃষকরা বহু নীলকুঠি ভেঙে দেয়। অত্যাচারী নীলকর সাহেবদের মাল বহনের যোগাযোগের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। নীল বিদ্রোহে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কৃষকরা ঐক্যবদ্ধভাবে যোগদান করেছিল। নীল বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করার চেষ্টা হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার এবং জমিদারদের প্রত্যক্ষ মদতে পুলিশ কৃষকদের ওপর অত্যাচার চালাত। কিন্তু তাতে এই আন্দোলন থেমে যাওয়ার পরিবর্তে ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে সমগ্র বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। নদীয়া জেলার দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস, পাবনার কাদের মোল্লা, মালদার রফিক মণ্ডল এই আন্দোলনের জনপ্রিয় নেতৃত্ব ছিলেন। অত্যাচারী নীলকরদের রীতিমতো ভয়ের কারণ ছিলেন আন্দোলনকারী বিশ্বনাথ সর্দার, তাঁর নেতৃত্বে একাধিক নীলকুঠি আক্রমণ করা হয়েছিল। নদীয়ার আসান নগরে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায়ের মতে, বিশ্বনাথ সর্দারকে নীল বিদ্রোহের প্রথম শহীদ হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে, ইংরেজরা নীলবিদ্রোহী বিশ্বনাথ সর্দারকে 'বিশে ডাকাত' বলে ডাকত।

ব্রিটিশ শাসকদের ওপর এই নীল বিদ্রোহের প্রভাব ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিদ্রোহের খবর ইংল্যান্ডে পৌঁছানো মাত্রই ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়ে যায়। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কৃষকদের দুরবস্থার বিষয়ে ইংরেজ শাসকদের কাছে কৈফিয়ত চায়- নীল বিদ্রোহ ও চাষীদের অসন্তোষের কারণ অনুসন্ধানের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি সবকিছু তদন্ত করে নীল গাছের দাম বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে লাভের পরিমাণ কমে আসায় নীলকর সাহেবরা নীল তৈরির কারখানাগুলো বিক্রি করে দেয়। ১৮৯৫ সালে নীলের উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে এই ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় তারা।

১৮৫৯ সালে দীনবন্ধু মিত্র নীল বিদ্রোহ নিয়ে 'নীলদর্পণ' নাটক রচনা করেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই নাটকটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। রেভারেন্ড জেমস লং এই ইংরেজি নাটকটি প্রকাশ করেন। সেই অপরাধে ব্রিটিশ সরকার তাকে কারাদণ্ড ও জরিমানার শাস্তি দিয়েছিল। সাহিত্যক কালীপ্রসন্ন সিংহ তার জরিমানার টাকা পরিশোধ করেছিলেন। নীল বিদ্রোহের সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল গুরুত্বপূর্ণ। লেখা - Shreya