১

"নোব ইফেক্ট"  প্লাসিব এফেক্ট

মানুষ বারবার বলে যে, আমরা অস্থির সময়ের মধ্যে রয়েছি। এটা অবশ্য ভুল। পৃথিবীর ইতিহাস থেকে দেখা যায়, এই সময়ে আমরা সবচেয়ে ভালো আছি এবং আগামী দিনগুলোতে মানুষ আরো বেশি ভালো থাকবে। যেমন- এই মুহূর্তে এক লাখ মানুষের মধ্যে হয়তো একজন বন্ধু আরেকজন বন্ধুকে খুন করে ফেলেছে। তাই বলে বাকি ওই এক লাখ বন্ধুদের গল্প তো নিউজ হচ্ছে না, নিউজ তো হচ্ছে ওই এক্সেপশন এক বন্ধুকে নিয়ে। অতীতে এরকম এক্সেপশনাল ঘটনা আরও বেশি হতো, যেটা বর্তমানে মত হাতে হাতে মিডিয়া না থাকার কারণে ওইভাবে প্রকাশ হতো না। 


মানুষ অতীতের চেয়ে বা অমুকের শাসন আমলের চেয়ে, বর্তমানে খারাপ অবস্থায় আছে এমন বিশ্বাস করার কারণ হলো, "নোব ইফেক্ট" । "নোব ইফেক্ট" হলো, এক বা এ্কাধিক হতাশাগ্রস্ত, নেতিবাচক ব্যক্তির দ্বারা সৃষ্ট কোনো বিশেষ প্রভাব। এই মানুষগুলো যখন অসফল হয় বা কোনো হতাশায় ভোগে, তখন তার ভুলগুলোকে অন্যের উপর বা বিশেষ কোনো পরিস্থিতি কিংবা কোনো ঘটনার উপর চাপায়। এই দোষ চাপানোগুলো যখন অন্যকে প্রভাবিত করে, তখন তাকে "নোব ইফেক্ট"  বলে। চিকিতসা ক্ষেত্রে এই "নোব ইফেক্ট"কে নোসিবো ইফেক্ট বলে।  যেমন- মনে করুন, আপনি ডাক্তারের কাছে গেলেন, ডাক্তার সব দেখে বললঃ আপনার কিন্তু হার্টটা ঠিক নেই, একটু যত্ন নেবেন। ব্যাস, তার পরদিন থেকে বুকের সেই জায়গাটায় একটু চিনচিন করবে। যদিও আপনার হার্টে কোন সমস্যা নেই, তারপরও কিন্তু বুক চিনচিন করবে। এটাকে বলে নসিভো এফেক্ট। এর বিপরীতে আছে,  প্লাসিব এফেক্ট। কি এই প্লাসিব? । প্লাসিবো এফেক্ট হলো, যেখানে কোনো রোগী মনে করে যে,  কোনো লতাপাতা বা ঝাড় কুক, তাবিজ-কবজ, জাদু টোনা কিংবা কোনো ওষুধ তাকে সুস্থ কবেছে,; যদিও সেই ব্যবস্থা বা ওষুধটির আসলে কোনো ঔষধিগুণ নেই। কিন্তু রোগীর বিশ্বাস ও ইতিবাচক মানসিকতার কারণে, তার শরীর ও মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যেমন-  আপনি অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে গেলেন। ডাক্তার আপনার শরীরের পরীক্ষা-টরীক্ষা করে বললেন যে, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এমনটা হচ্ছে, আসলে আপনার কিছুই হয়নি, সব ঠিক আছে। তিনি একটা ট্যাবলেট দিয়ে দিলেন; ওর মধ্যে আদ্তে কিচ্ছু নেই; কিন্তু সেটা খেয়ে আপনার মনে হলো, হ্যাঁ এবার ঠিক আছি। এটাকে বলে প্লাসিবো এফেক্ট।


এইরকম পিগম্যালিয়ান ইফেক্ট-এর মাধ্যমে যদি কাউকে বিশ্বাস করানো হয় যে, তুমি ভালো আছো বা তুমি খুব ভালো মানুষ; বা তুমি খুব মেধাবী ছাত্র, তাহলে সে নিজেকে অনেক বেশি ভালো অনুভব করবে, তার ভিতরের ক্ষমতা বেড়ে যাবে এবং ধীরে ধীরে সে উন্নতি করবে। 


২


রকফেলার ফাউন্ডেশন


তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন — ২৫ বছর বয়সে, তিনি আমেরিকার বৃহত্তম তেল শোধনাগারগুলির মধ্যে একটি পরিচালনা করতেন। ৩১ বছর বয়সে, এটি বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনাগারের মালিক হয়ে ওঠে এবং ৩৮ বছর বয়সে, তিনি মার্কিন তেল পরিশোধনের ৯০% নিয়ন্ত্রণ করতেন। ৫০ ​​বছর বয়সে, তিনি সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির মর্যালা পান।কিন্তু ৫৩ বছর বয়সে, তার শরীর খারাপ হতে শুরু করে। লিভারে সমস্যার কারণে  খুব একটা খেতে পারতেন না। সর্বদা  যন্ত্রণা এবং বিচ্ছিন্নতার মধ্যে বাস করতেন। ডাক্তাররা সতর্ক করলেন যে, তিনি হয়তো বেশি দিন বাঁচবেন না। রকফেলার বুঝতে পেরেছিলেন: তার টাকা তাকে বাঁচাতে পারবে না। সুখ, শান্তি  ফিরিয়ে আনতে পারে না। তাই, তিনি তার সঞ্চিত সম্পত্তিকে মানবকল্যানে বিলিয়ে দিতে শুরু করেন। তিনি রকফেলার ফাউন্ডেশন তৈরি করেন এবং এর মাধ্যমে চিকিৎসা, শিক্ষা এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য অর্থায়ন করেন। শুধুমাত্র অতি সামান্য সবুজ শাকসবজি এবং ফলমূল খেয়ে এবং  মজুরের মত পরিশ্রম করেতিনি স্বাস্থ্যের উন্নতি করেন। তিনি ৯৮ বছর বেঁচে ছিলেন।

রকফেলার সেই রহস্য আবিষ্কার করেছিলেন যে, টাকা দিয়ে অনেককিছু কেনা যায় না; পরিশ্রম এবং সঠিক খাবারের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।


৩


সুইস ব্যাংক ও টাইম ব্যাংক’


সুইজারল্যান্ড ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত একটি ছোট্ট রাষ্ট্র, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত নয়। সুইজারল্যান্ডের মুদ্রার নাম সুইস ফ্রাংক।

এটি পৃথিবীর সবচেয়ে স্থিতিশীল মুদ্রা। সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি পৃথিবীর অন্যতম স্থিতিশীল অর্থনীতি। দেশটির রাজনৈতিক অবস্থাও খুব ভারসাম্যমূলক ও সুস্থির। সুইস সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিবছর ১ জানুয়ারিতে এর রাষ্ট্রপতি পরিবর্তিত হয়। ছয় বছরের জন্য গঠিত মন্ত্রিপরিষদের একজন মন্ত্রী পালাক্রমে এক বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।


সুইজারল্যান্ড কখনো কোনো যুদ্ধে জড়ায় না। নিরপেক্ষ থাকার বিষয়েই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আর এ জন্যই রাষ্ট্রটিকে অত্যন্ত নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই ব্যাংক ব্যবস্থাও এখানে খুব নিরাপদ। গ্রাহকের তথ্য প্রকাশ করার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা না থাকায় সারাবিশ্বের ধনীদের অর্থ জমানোর জনপ্রিয় উৎস হলো সুইস ব্যাংক। বিশ্বের নানা দেশের রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে বহু বিত্তশালী ব্যক্তি সুইস ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন।এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হলো, অনেকেই গোপনীয়ভাবে টাকা রাখতে গিয়ে তার পরিবারের কাছেও সুইস ব্যাংক বিষয়ক কোনো তথ্য দেন না। ফলে, এমন ব্যক্তির মৃত্যুর পর কেউ জানতেই পারে না যে, তার সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট আছে। সেদেশের নিয়ম অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি কোনো উত্তরাধিকারী সম্পত্তি দাবি না করেন, তবে সুইস সরকার সে সম্পত্তি তাদের কোষাগারে জমা করেন।ফিলিপিন্সের একসময়ের প্রভাবশালী শাসক মার্কোস তীব্র গণআন্দোলনের মুখে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ক্ষমতা ছাড়ার আগে দেশ থেকে মোটা অঙ্কের ডলার সুইস ব্যাংকে পাচার করেন। তার মৃত্যুর পর এসব ডলার সুইজারল্যান্ডের সরকারি কোষাগারে চলে যায়। একইভাবে লিবিয়ার তৎকালীন শাসক কর্নেল গাদ্দাফি ও মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটে।


সরকারিভাবে সুইজারল্যান্ডের অধিবাসীরা সুইস নামে পরিচিত। রাজধানী বার্ন। অন্যতম দুটি শহর হলো জেনেভা ও জুরিখ। আল্পস পর্বতমালা ও প্রশস্ত হ্রদ সুইজারল্যান্ডকে এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিভূষিত করেছে। বিশ্বের পর্যটকদের জন্য এটি একটি অন্যতম আকর্ষণীয় দেশ।

ইজারল্যান্ডে সুইস ব্যাংক ছাড়াও আরেক ধরনের ব্যাংক রয়েছে, যার নাম ‘টাইম ব্যাংক’। বিশ্বের আর কোথাও এ ধরনের ব্যাংক আছে বলে আমার জানা নেই। সুইজারল্যান্ডের এ টাইম ব্যাংকিং সিস্টেম আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে। ব্লাড ব্যাংকের নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছেন। টাইম ব্যাংক অনেকটাই ব্লাড ব্যাংকের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে। ব্লাড ব্যাংকে যেমন ব্লাড সংরক্ষণ বা জমা রাখা হয়, একইভাবে টাইম ব্যাংকেও টাইম জমা রাখা হয়।


টাইম ব্যাংক মূলত Swiss Federal Ministry of Social Security কর্তৃক উদ্ভাবিত একটি অবসরকালীন ভাতা প্রকল্প (Old Age Support Programme)। এতে কমবয়সীরা কর্মক্ষম অবস্থায় নিজেদের কাজের ফাঁকে ফাঁকে অসুস্থ বয়স্ক মানুষদের যতটা সময় ধরে সেবা প্রদান করেন, সেই সময়টা টাইম ব্যাংকে জমা থাকে। যেমন- বয়স্ক মানুষের জন্য বাজার ঘাট করা, ঘর দোর পরিষ্কার করা, তার জন্য পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা, তাকে রোদে নিয়ে যাওয়া, তার সঙ্গে গল্প করা ইত্যাদি ইত্যাদি যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘Old Age Support’।


টাকা-পয়সার মতো টাইম জমিয়ে রাখার লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডের বেশির ভাগ মানুষ সে দেশের টাইম ব্যাংকে সোশ্যাল সিকিউরিটি অ্যাকাউন্ট বা টাইম ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেন। এই অ্যাকাউন্টের বিপরীতে উক্ত ব্যাংক তাকে ‘টাইম ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড’ ইস্যু করেন, যা দ্বারা তিনি পরবর্তীতে বার্ধক্য সেবা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।


সুইজারল্যান্ড ধনী দেশ। অবসরকালীন সময় তাদের পেনশনও বেশ ভালো। শেষ বয়সে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের তেমন একটা অসুবিধা হয় না। কিন্তু তা সত্ত্বেও বার্ধক্যের সময়টা তারা আরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে টাইম ব্যাংকে টাইম জমান। সেবাপ্রদানকারী ব্যক্তি যখন নিজেও বয়োবৃদ্ধ হবেন, আগের মতো নড়াচড়া করতে পারবেন না, তখন তার ক্রেডিট কার্ডের রেফারেন্স দিয়ে টাইম ব্যাংককে দরখাস্ত করলেই তাকে দেখভাল করার জন্য তারা সেবাকর্মী পাঠাবেন।

৪


পঙ্গু স্ত্রীকে শহর দেখানোর ইচ্ছা থেকেই রিকশার আবিষ্কার


রিকশা যদিও প্রথম উদ্ভাবিত হয় জাপানে, তবে এর নকশা করেছিলেন একজন মার্কিন খ্রিস্টান মিশনারি—জোনাথন স্কোবি (বা জোনাথন গোবলে)। পারকার এফ. ক্যালভিনের লেখা "জোনাথন গোবলে ইন জাপান" বইয়ে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

ধর্ম প্রচারের কাজে মি. স্কোবি থাকতেন জাপানের ইয়োকোহামা শহরে। তাঁর স্ত্রী এলিজা গোবলে চলাফেরা করতে পারতেন না। স্ত্রীকে ইয়োকোহামা শহর ঘুরে দেখানোর ইচ্ছা থেকেই ১৮৬৯ সালে তিনি একটি দুই চাকার, সামনের দিকে হাতলযুক্ত একটি বাহনের নকশা করেন এবং কাঠ দিয়ে সেটি তৈরি করেন। এই বাহনের নাম দেন "জিনরিকশা"।

সময়ের বিবর্তনে এই বাহনই "রিকশা" নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। হাতে টানা এই দুই চাকার যানটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রাথমিক রিকশা হিসেবে পেটেন্টও পায়।

পরে এই নকশার ভিত্তিতে জাপানে রিকশা তৈরির কাজ শুরু হয়। যদিও প্রথমদিকে এটি মানুষের পরিবর্তে মালপত্র পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হতো।

তবে রিকশার আবিষ্কার নিয়ে আরও কিছু মত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ১৮৮৮ সালে আরেকজন মার্কিন ব্যাপ্টিস্ট রিকশা আবিষ্কার করেন। উইলিয়াম ই. লুইসের "থ্রু দ্য হার্টল্যান্ড অব ইউএস" বইয়ে দাবি করা হয়, রিকশার আবিষ্কার হয় ১৮৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ওরচেস্টারে। সেখানে অ্যালবার্ট টোলম্যান নামের এক কামার দক্ষিণ আমেরিকান এক মিশনারির চলাফেরার সুবিধার জন্য এই বাহন তৈরি করেন।

এছাড়া বার্লিংটন কাউন্টি হিস্টোরিকাল সোসাইটির এক গবেষণায় জানা যায়, মার্কিন গাড়ি নির্মাতা জেমস বার্চের জাদুঘরে ১৮৬৭ সালের দিকে এই ধরনের এক রিকশার মডেল প্রথম প্রদর্শিত হয়। মি. বার্চ দাবি করেন, সেটি তাঁরই তৈরি করা নকশা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


৫



কীভাবে আজকের বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে উঠেছে।


প্রায় ৬ হাজার বছর আগে আমাদের এই ভূমিতে প্রথম পা রাখে আদি-অস্ট্রাল জাতিগোষ্ঠী। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা এই নব্য প্রস্তর যুগের মানুষেরাই ছিল এই অঞ্চলের আদিম অধিবাসী। আমাদের পরিচিত সাঁওতাল, মুণ্ডা, শবর, কোলের মতো আদিবাসী গোষ্ঠীগুলো তাদেরই উত্তরসূরী।

তাদের আগমনের প্রায় এক থেকে দুই হাজার বছর পর, অর্থাৎ প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার বছর আগে দক্ষিণ ভারত থেকে আসেন দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর মানুষ।

অনেকে মনে করেন, সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা ছিল এই দ্রাবিড়রা। তারা কৃষিকাজ ও নগর সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দুই আদিম গোষ্ঠীর সংমিশ্রণই আমাদের জাতিগত পরিচয়ের প্রথম ভিত্তি স্থাপন করে।

মধ্য এশিয়ার যাযাবর গোষ্ঠী  শকরা আসে প্রায় ২০০০ বছর আগে আর হুনরা আসে ১৫০০ বছর আগে। তারা স্থানীয় ধর্ম ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে নিজেদের পরিচয়কে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিশিয়ে দেয়।

৩৫০০ বছর পূর্ব  থেকে আর্যদের আগমন শুরু হয়। উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা এই গোষ্ঠী তাদের ভাষা, সংস্কৃতি নিয়ে আসে। সময়ের সাথে সাথে আর্য, আদি-অস্ট্রাল ও দ্রাবিড়দের মিশ্রণ ঘটে এবং বাঙালি জাতিসত্তায় এক নতুন মাত্রা যোগ হয়।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব এবং পার্বত্য অঞ্চলে ত্রিপুরা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী  আসে প্রায় ৫ হাজার বছর আগে মঙ্গোলিয়া থেকে। এদের পর গারোরা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বছর আগে তিব্বত থেকে।

আবার চাকমা ও মারমারা আসেন ৫০০ থেকে ৭০০ বছর আগে, আর ম্রো জনগোষ্ঠীর আগমন ঘটে প্রায় ৬০০ বছর আগে।

দশম শতাব্দী থেকে বাণিজ্যিক কাফেলা নিয়ে আসে আরবরা। এদের মধ্যে অনেক পীর, দরবেশ, এবং শাসক ছিলেন।

এরপরে আসে ১৫১৬ খৃষ্টাব্দে পর্তুগিজ, ইংরেজ, আর্মেনীয়দের মতো ইউরোপীয় জাতিগোষ্ঠী। বাণিজ্যিক ও শাসনের প্রয়োজনে তারা এখানে আসে এবং তাদের রক্তের ধারাও বাঙালির সাথে মিশে যায়।

এই দীর্ঘ হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে আজকের বাঙালি জাতি একটি সমৃদ্ধ ও মিশ্র জাতিসত্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আমরা বিভিন্ন সংস্কৃতির এক বিশাল এবং প্রাণবন্ত মেলবন্ধন। 


৬


 সমুদ্রপথে ভারত আবিষ্কার – ভাস্কো দা গামা থেকে কলম্বাস পর্যন্ত


১৫শ শতকের শেষ ভাগে ঘটে যাওয়া সমুদ্রপথ আবিষ্কার মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। তখনকার ইউরোপ ছিল বাণিজ্যে পিছিয়ে থাকা, ছোট ছোট রাজ্য আর অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে জর্জরিত এক মহাদেশ। অন্যদিকে পূর্ব দিক—ভারত, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া—ছিল সমৃদ্ধ বাণিজ্য, মসলা, রত্ন আর উন্নত প্রযুক্তির আধার। তাই ইউরোপীয়দের চোখে ভারত তখন স্বপ্নের দেশ। কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই—ওখানে পৌঁছানো। ১৪৫৩ সালে অটোমান তুর্কিরা কনস্টান্টিনোপল দখল করার পর ইউরোপ থেকে পূর্বে যাবার রাস্তা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তখনই ইউরোপীয় রাজ্যগুলো বুঝতে পারল, টিকে থাকতে হলে নতুন সমুদ্রপথ খুঁজে বের করতেই হবে। তাই ইউরোপীয় শক্তিগুলো এক অদম্য লোভে নেমে পড়ল নতুন সমুদ্রপথ খুঁজে বের করতে। এই অভিযাত্রার দুই বড় নাম—ভাস্কো দা গামা আর ক্রিস্টোফার কলম্বাস। একজন সত্যিই ভারতে পৌঁছালেন, আরেকজন রাস্তা ভুলে গিয়ে আবিষ্কার করে ফেললেন। ১৪৯৭ সালের জুলাই মাসে পর্তুগিজ অভিযাত্রী ভাস্কো দা গামা লিসবন থেকে চারটি জাহাজ নিয়ে যাত্রা শুরু করেন।  ১৪৯৮ সালের মে মাসে এসে পৌঁছান ভারতের ক্যালিকটে (আজকের কেরালা)। দা গামার যাত্রার মাধ্যমে ইউরোপ আর ভারতের মাঝে সরাসরি বাণিজ্যের দরজা খুলে যায়। ব্যবসা থেকে বিশাল লাভ বের করে পর্তুগাল একসময় ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। গোয়া, কোচিন, মালাবারের মতো বন্দরগুলোতে পর্তুগিজরা তাদের দুর্গ আর বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলে। 

অন্যদিকে ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস, চেয়েছিলেন ভারত পৌঁছাতে। ১৪৯২ সালে স্পেনের রাজা ফার্দিনান্দ আর রানি ইসাবেলা তাঁর যাত্রায় অর্থায়ন করেন। কিন্তু তিনি ভুল পথে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পৌঁছে গেলেন আমেরিকায়। মজার ব্যাপার কলম্বাস ভেবেছিলেন তিনি ভারতেই পৌঁছেছেন। তাই জায়গাটার নাম দেন ইন্ডিজ, পরে ভুল জানার পর নাম দেন  ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কারের পর শুরু হয় ইউরোপীয় শক্তিগুলোর এক দৌড়।

এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে নতুন খাবার, প্রযুক্তি, ভাষা ও ধর্ম। নতুন কাঁচামালের উৎস খুঁজে তারা শিল্পবিপ্লবের পথে এগোয়।

, এই “আবিষ্কার” ছিল দুই ধারী তরবারি। একদিকে এটি বিশ্বকে একসাথে যুক্ত করেছে, নতুন জ্ঞান আর সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে এটি নিয়ে এসেছে ঔপনিবেশিকতা, শোষণ, দাসপ্রথা আর ধ্বংস। 

৭


 সঙ্গীত চর্চার ভাল-মন্দ


আমাদের মস্তিষ্কের দুইপাশে ‘হিপ্পোক্যামপাস’ এবং ‘ফ্রন্টাল করটেকস’ নামের দুটো অংশ স্মৃতি সংরক্ষণের কাজ করে। সংগীতের ছন্দ মেলানো কথা, সুর, বাদ্যযন্ত্র, এবং নৃত্য ; মস্তিষ্কের ডান ও বাম অংশের এই স্মৃতি সংরক্ষণের কোষগুলিতে,  'আলফা ও থিটা তরঙ্গ' উৎপন্ন করে। ফলে মস্তিষ্কের এই  'স্মৃতি কোষগুলির' সক্রিয়তাকে বাড়িয়ে তোলে এবং মনঃসংযোগে সাহায্য করে। স্নায়ুবিজ্ঞানী রবার্ট জ্যাটোর বলেন, ‘ আপনার সংগীত উপভোগের অভিজ্ঞতা যত বেশি হবে, আপনার মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমের কার্যকলাপ তত বেশি সংঘটিত হবে। বর্তমানে নিউরোসায়েন্সে সংগীতকে ওষুদের বিকল্প হিসেবে দেয়া হয়। কোমা বা মৃতপ্রায় মস্তিষ্কের চিকিৎসায় রোগীদের কানে মিউজিক থেরাপি দেয়া হয়। আলঝেইমার্স রোগের একমাত্র চিকিৎসা এখন সংগীত।  এমনকি বর্তমানে অটিজম চিকিৎসা এবং পুরোনো স্মৃতি ফেরাতে ডাক্তাররা মিউজিক থেরাপি দেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ছোটবেলা থেকে সংগীত চর্চার সুযোগ পায়, তাদের স্মরণশক্তি, মনোযোগ এবং শেখার ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি হয়। অর্থাৎ শিশুর স্মরণশক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সংস্কৃতিচর্চা যেমন সংগীত, নাচ, খেলাধুলা, নাটক, বিতর্ক ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্ব রাখে।  সঙ্গীত চর্চা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে থাকলেও, সরকারি স্কুলে নাই। মেধাবী আমলারা বিষয়টি যথার্থ উপলব্দি করেছেন।  শিশুরা সঙ্গীত শিখলে তাদের গণিতের দক্ষতাও বাড়ে। আল রাজির মত আলেম এই কারণেই সঙ্গীত সম্পর্কেও অনেক বড় জ্ঞানী ছিলেন। বলতে কি, মধ্যযুগের বহু বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত সঙ্গীতের জ্ঞান আর গণিতের জ্ঞানের এই আন্তসম্পর্ক বিষয়ে জানতেন। তারের বাদ্যযন্ত্রের বিকাশে মধ্যযুগের, এবং বিশেষ করে স্পেনের গণিত জানা মুসলমানদের ভূমিকা ছিল। .... ভাষার ব্যবহার, স্মরণশক্তি বিকাশ এগুলোতেও ছড়া বা গান ভূমিকা রাখে। বিশেষকরে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধি করতেও এর গুরুত্ব আছে। সঙ্গীতের জ্ঞানকে অবশ্যই শিশুশিক্ষায় বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। সন্তানের সৃজনশীলতা বিকাশ নিয়ে আগ্রহী যে কোন অভিভাবকেরও উচিত এই বিষয়ে তৎপর হওয়া।.. 


৮


প্রতিহিংসা  নতুন অশান্তির ভিত্তি গড়ে তোলে


প্রতিহিংসা শান্তি আনে না; বরং নূতন অশান্তির ভিত্তি গড়ে তোলে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিশোধ স্পৃহা  পোষণ করলে মানসিক স্বাস্থ্য দুর্বল হয়; উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং আত্মঅহংকার বাড়তে থাকে। দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতিহিংসার চিন্তা লালন করে, সে নিজেই নিজের শুকানো ক্ষতকে খোচিয়ে গভীর ঘা করেতোলে। 


দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক নেলসন ম্যান্ডেলা যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তার হাতে ছিল প্রতিশোধ নেবার পূর্ণ রাজনৈতিক সুযোগ ও সামর্থ্য। অথচ তিনি সেই পথ ত্যাগ করে গঠন করেন ' মানবিক কমিশন', যার উদ্দেশ্য ছিল মানবিক পুনর্মিলনের মধ্য দিয়া এক নূতন রাষ্ট্র নির্মাণ। চল্লিশ বছর দমনপীড়নের পরও তিনি প্রতিপক্ষের প্রতি প্রতিশোধ পরায়ণ হন নাই। বরং বলেছিলেন-'যদি আমি হৃদয়ে ঘৃণা বহন করি, তা হলে আমি আজীবন বন্দীই থাকব।' তার সেই উদার নৈতিকতার ফলেই দক্ষিণ আফ্রিকা ভাতৃত্ব ও শান্তির নতুন দেশ হিসেবে পরিচিত পায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির উপর কঠোর প্রতিশোধ হিসেবে বিভিন্ন শর্ত চাপানো  ও তীব্র হেনস্তার কারণে পরবর্তীকালে নাৎসিবাদের পুনর্জাগরণ এবং আরেকটি মহাযুদ্ধের জন্ম হয়। অন্যদিকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের উপর মার্কিনদের বোমাবর্ষণের পর তাদের প্রতি প্রতিহিংসার পরিবর্তে জাপান দেশ পুনর্গঠনের জন্য মার্কিন 'মার্শাল প্ল্যান'-গ্রহন করে । আজ সেই জাপান অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও উন্নয়নের সব ক্ষেত্রেই এক উদাহরণ। 


৯


পুরুষ জলহস্তী কেন নিজ ছেলেকে হত্যা করে? 


প্রায় ২৪৩ দিন গর্ভধারণ শেষে একটি জলহস্তী মা জন্ম দেয় তার সন্তানকে। কিন্তু যদি সন্তানটি ছেলে হয়, তখন বাবা জলহস্তী সন্তানকে মেরে ফেলার জন্য সর্বদা ওত পেতে থাকেন। পিতার আক্রমণ থেকে তাকে রক্ষার জন্য পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা সর্বক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখে। জলহস্তী পরিবারে ৬-১০টি সদস্য থাকে। এর মধ্যে মাত্র একজনই পুরুষ, বাকিরা নারী। পুরুষটি পুরো দলের একক 'রাজত্ব করার জন্য অন্য  কোনো পুরুষকে সহ্য করতে পারে না। যদি মা ও পরিবার সন্তানের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়, একদিন বড় হয়ে সে-ই হয়তো ক্ষমতা কেড়ে নেয়। 

জানলে অবাক হবেন~~

একবার ভাবুন প্রায় ২৪৩ দিন গর্ভধারণ শেষে একটি জলহস্তী মা জন্ম দেয় তার সন্তানকে। কিন্তু যদি সন্তানটি ছেলে হয়, তবে শুরু হয় এক নি*ষ্ঠু*র বাস্তবতা। বাবা জলহস্তীই হয়ে ওঠে তার প্রা*ণ*না*শে*র জন্য সবচেয়ে বড় হু*ম*কি!

মায়ের অশান্তি ও পরিবারের সতর্ক পাহারা:

ছেলে সন্তান জন্মের পর পরিবারজুড়ে তৈরি হয় এক অজানা আ*ত*ঙ্ক। পিতার আক্রমণ থেকে তাকে রক্ষার জন্য পরিবার তাকে সর্বক্ষণ পাহারা দিয়ে রাখে। কারণ, পিতা সারাক্ষণ খুঁজে ফেরে সুযোগ—নিজ সন্তানকে প্রা*ণে মে*রে ফেলার।

জলহস্তীর সমাজব্যবস্থা:

ডাঙায় বসবাসকারী প্রাণীদের মধ্যে জলহস্তী আকারে তৃতীয় বৃহত্তম। সাধারণত এক একটি দলে ৬-১০টি সদস্য থাকে, যার মধ্যে মাত্র একজনই পুরুষ, বাকিরা নারী। পুরুষটি পুরো দলের একক শাসক—তার 'রাজত্ব' অক্ষুণ্ণ রাখাই তার প্রধান লক্ষ্য। তাই দল বা হেরেমে আর কোনো পুরুষকে সে সহ্য করতে পারে না।

তাই যদি সন্তান ছেলে হয়...

পুরুষ জলহস্তী ভাবে—এই ছোট ছেলেটিই ভবিষ্যতে তার জন্য রাজনৈতিক হুমকি। একদিন বড় হয়ে সে-ই হয়তো ক্ষমতা কেড়ে নেবে। তাই জন্মের পরপরই সুযোগ পেলেই ছেলেকে হ**ত্যা করে ফেলে। বিশেষ করে, যদি সন্তান বাবার সামনে আত্মসমর্পণ না করে বা বশ্যতা না মানে।

যদি বেঁচে যায়...

যদি মা ও পরিবার সন্তানের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়, তবে অনেক ক*ষ্টে লুকিয়ে তাকে বড় করতে হয়। তবে এক সময় সেই সন্তান বড় হয়ে বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তখন শুরু হয় পিতা-পুত্রের র*ক্ত*ক্ষ*য়ী লড়াই, যার শেষ হয় হয় কারও মৃ*ত্যু*তে, নয়তো দল ত্যাগে।

এমন প্রবণতা শুধু জলহস্তীতেই নয়...

প্রকৃতির আরো কিছু প্রাণীর মধ্যেও এমন আচরণ দেখা যায়। তবে জলহস্তীদের মধ্যে এই ছেলেশিশু হত্যার প্রবণতা সবচেয়ে প্রকট।


১০


ইনকা সভ্যতা  


ইনকা সাম্রাজ্যের উত্থান হয়েছিল দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেস পর্বতমালায়। বর্তমান পেরু, বলিভিয়া, চিলি, ইকুয়েডর ও আর্জেন্টিনার কিছু অংশ জুড়ে ছিল এই বিশাল সাম্রাজ্য। রাজধানী ছিল কুসকো, যাকে তারা "বিশ্বের নাভি" বলত। ইনকাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের সংগঠিত প্রশাসন। এক বিশাল পর্বতশ্রেণীজুড়ে বিস্তৃত সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য তারা নির্মাণ করেছিল সড়কব্যবস্থা – প্রায় ২৫,০০০ মাইল লম্বা পথ, যা রোমানদের সড়কব্যবস্থাকেও টেক্কা দিত। এই রাস্তার মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে যেত চাস্কি নামের দৌড়বিদদের মাধ্যমে।

ইনকাদের সবচেয়ে বিস্ময়কর সাফল্য ছিল কৃষি। খাড়া পাহাড়কে ধাপে ধাপে কেটে চাষযোগ্য জমি বানানো হয়েছিল। তারা আলু, ভুট্টা, কুইনোয়া চাষে দক্ষ ছিল। ইনকাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে ছিল সূর্যদেব ইন্তি। তাদের প্রধান মন্দির কোরিকানচা ছিল সোনার প্রলেপে মোড়ানো। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অনেক সময় মানব বলিও দেওয়া হতো, বিশেষ করে শিশুদের, যাদের পাহাড়ের চূড়ায় উৎসর্গ করা হতো দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্য।

ইনকাদের সমাজ ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। কর ব্যবস্থার বদলে তারা শ্রম দিত, যাকে বলা হতো মিত্তা সিস্টেম। জনগণকে কৃষিকাজ, সড়ক নির্মাণ বা সামরিক কাজে বাধ্যতামূলকভাবে অংশ নিতে হতো। ১৫৩২ সালে ফ্রান্সিসকো পিজারোর নেতৃত্বে স্প্যানিশরা ইনকা সাম্রাজ্যে প্রবেশ করে। ইউরোপীয়দের সঙ্গে আনা গুটি বসন্ত রোগ, উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ইনকাদের শেষ করে দেয়। শেষ সম্রাট আতাহুয়ালপা বন্দি হয়ে নিহত হন।



১১


অ্যাজটেক সভ্যতা  


অন্যদিকে, উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো উপত্যকায় গড়ে উঠেছিল অ্যাজটেক সভ্যতা। তাদের রাজধানী টেনোচটিটলান ছিল এমন এক শহর, যা আজকের মেক্সিকো সিটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে। ১৪শ শতকে লেকের মাঝখানে দ্বীপের ওপর নির্মিত এই শহর ছিল প্রকৌশল কীর্তি।

অ্যাজটেকরা কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করেছিল, যাকে বলা হয় চিনাম্পাস। এগুলো ভাসমান কৃষিজমি, যা লেকের পানিতে মাটি ভরে বানানো হতো। এর ফলে তারা বছরে একাধিক ফসল তুলতে পারত। অ্যাজটেক সভ্যতার সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ঙ্কর দিক ছিল মানব বলিদান। তাদের বিশ্বাস ছিল, সূর্য দেবতাকে শক্তি জোগাতে হলে মানুষের রক্ত প্রয়োজন। এজন্য যুদ্ধে বন্দি শত্রুদের মন্দিরে এনে দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হতো। ইতিহাসবিদদের মতে, একেকবার উৎসবে হাজার হাজার মানুষকে বলি দেওয়া হতো।

অ্যাজটেকদের সমাজ ব্যবস্থা ছিল সামরিক শক্তিনির্ভর। সম্রাট ছিলেন সর্বোচ্চ শাসক, তবে পুরোহিত শ্রেণি বিশাল প্রভাব রাখত। তাদের অর্থনীতি নির্ভর করত বাণিজ্য ও কৃষির ওপর।  ১৫১৯ সালে হার্নান কোর্তেজ নেতৃত্বাধীন স্প্যানিশরা মেক্সিকোয় প্রবেশ করে। ইউরোপীয় অস্ত্র, ঘোড়া, এবং গুটি বসন্তের মহামারির কারণে অ্যাজটেকরা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৫২১ সালে শেষ সম্রাট মোন্টেজুমা নিহত হন এবং অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।



১২


জমিদারি প্রথা 


জমিদারি প্রথা বিলোপ করা হয়েছিল ‘স্টেট অ্যাকুজিশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্ট, ১৯৫০-এর মাধ্যমে। কার্যকর করা হয়েছে ১৯৫১ সনের ১৬ মে থেকে। প্রখ্যাত লেখক বদরুদ্দীন উমর তার ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলাদেশের কৃষক’ গ্রন্থে লিখেছেন ‘জমির ওপর রাষ্ট্র অথবা জমিদার জাতীয় কোন শ্রেণির দখলী স্বত্ব মোগল আমলে ছিল না। জমির সত্যিকার মালিক তখন ছিল তারাই, যারা নিজেরা গ্রামে কৃষি কার্যের দ্বারা ফসল উৎপাদন করতো। সে সময় যাদেরকে জমিদার বলা হতো, তারা ছিল সরকারের রাজস্ব আদায়ের এজেন্ট মাত্র, তারা জমির মালিক নয়।’ সুতরাং দেখা যায় মোঘলদের সময় বা তার পূর্ববর্তী শাসনামলেও বাংলায় প্রচলিত অর্থে কোনো জমিদার ছিল না। জমির মালিক ছিল কৃষক। সে সময় জমির মালিকদের বলা হতো রায়ত বা চাষি। 


ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে একটি অঞ্চলের বেশিরভাগ জায়গাকে ভাগ করে করে বছরে খাজনা প্রদানকারী এক ধরনের ভূস্বামীদের হাতে ছেড়ে দেয়া হতো। এসব ভূস্বামীরাই সমাজ ব্যবস্থায় ‘জমিদার’ নামে পরিচিত হয়ে উঠে। জমিদারেরা তাদের প্রজাদের কাছ থেকে ইচ্ছামত কর আদায় করতে পারতো। এই সুযোগ ব্যবহার করে তৎকালীন জমিদারেরা শোষণ নিপীড়নের প্রতীক হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। অনেক সাধারণ প্রজা জমিদার শ্রেণির রোষানলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে এলাকা ছাড়া হয়েছে এরকম উদাহরণ প্রচুর। তবে এটাও সত্য যে, এই জমিদার শ্রেণি দ্বারা এখানে শিক্ষার বিস্তার হয়েছে ব্যাপক।


 লর্ড কর্নওয়ালিশ  ইংল্যান্ডের জমিদার পরিবার থেকে এসেছিলেন। তিনি ১৭৯০ সালে জমিদার শ্রেণি তৈরির উদ্দেশ্যে দশশালা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, যা ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিবর্তিত হয়।  লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালুর মাধ্যমে জমিদারদের করে দেয়া হলো জমির মালিক , অথচ এই জমিদারেরাই একসময় ছিল খাজনা আদায়ের এজেন্ট মাত্র। তৎকালীন পূর্ব বাংলায় বর্তমানে বাংলাদেশে ১৯৫০ সনের পূর্বে জমিদারি প্রথা বিদ্যমান ছিল। ১৯৪৭ সনে ব্রিটিশ সরকার বিতাড়িত হয়ে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুইটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে ১৯৫০ সনে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ ও প্রজাদের স্ব-স্ব ভূমিতে মালিকানা অর্জনের আইন পাস হয়। যা রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে এখনো রয়ে গেছে জমিদারি প্রথা।


১৩


 ক্লিনিং স্প্রে বা বাড়ী ঘর ধোয়া-মোছা


নরওয়ের ইউনিভার্সিটি অব বার্গেনের গবেষকরা বিশ বছর ধরে ছয় হাজারেরও বেশি মানুষের উপর একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালান। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ক্লিনিং স্প্রে বা বাড়ী ঘর ধোয়া-মোছা বা পরিষ্কার করেন, বিশেষ করে নারীরা, তাদের ফুসফুসের কর্মক্ষমতা অন্যদের তুলনায় দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতি এতটাই হয় যে, যেটা প্রতিদিন এক প্যাকেট সিগারেট একটানা কুড়ি বছর ধরে খাওয়ার সমান। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে হাঁপানির ঝুঁকিও অনেক বেশি হয়। গবেষকরা মনে করছেন, ক্লিনিং কেমিক্যালের রাসায়নিক পদার্থ ঘরের ধুলো-বালি বা ময়লায় থাকা ব্যাকটেরিয়া শ্বাসনালিতে বারবার জ্বালা ও প্রদাহ সৃষ্টি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রদাহ স্থায়ী ক্ষতিতে রূপ নেয়, যা ধীরে ধীরে ফুসফুসের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। 


১৪

মানবজাতির সেরা অর্জন 

ভ্যাকুয়াম টিউব থেকে আজকের সেমিকন্ডাক্টর চিপ


১৯৪৩ সালের মার্চ মাসের কথা। তখন একদিকে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আর অন্যদিকে উত্তর আটলান্টিক কাঁপছে ঝড়ো হাওয়া আর বরফ শীতল ঢেউয়ে। এই ভয়াবহ আবহাওয়ার মধ্যে কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড থেকে এক ঝাঁক জাহাজ রওনা দিয়েছে ইংল্যান্ডের লিভারপুলের উদ্দেশ্যে। এই বহরে ছিল ৪০ টিরও বেশি জাহাজ, আর জাহাজগুলো বোঝাই ছিল শস্য, তেল, কাঁচামাল, যুদ্ধের সরঞ্জাম দিয়ে। হিটলারের ভাষায় এই বহরটা ছিল ব্রিটেনের ‘লাইফলাইন’। কারণ ব্রিটেন সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর একটা দ্বীপরাষ্ট্র। এই জাহাজগুলো ইংল্যান্ডে না পৌঁছালে ব্রিটেনের খাদ্যভাণ্ডার দ্রুতই খালি হয়ে যাবে।

কিন্তু ভাগ্য সেদিন ব্রিটিশদের পক্ষে ছিল না, গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে ওঁত পেতে ছিল জার্মানির সাবমেরিন। তবে একটা সাবমেরিন নয়, প্রায় ৩০টিরও বেশি সাবমেরিন মিলে তৈরি হয়েছিল এক বিশাল “উলফপ্যাক”। রাত নামতেই তারা নেকরের মতো একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়বে ব্রিটিশ নৌবহরের ওপর। ব্রিটিশ এসকর্ট জাহাজগুলো সেদিন মরিয়া হয়ে প্রতিরোধ করছিল; ডেপথ চার্জ ছুড়ে সাবমেরিন ধ্বংসের চেষ্টা করছিল। কিন্তু জার্মান সাবমেরিনগুলো সংখ্যায় এত বেশি ছিল যে সবগুলো আক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হয়নি। ফলে মাত্র দুই রাতের মধ্যেই বহরের ২১টি জাহাজ ডুবে যায়। হাজার হাজার টন খাবার, তেল, কাঁচামাল হারিয়ে যায় সমুদ্রগর্ভে। শত শত নাবিক প্রাণ হারায় ঠান্ডা পানিতে।

জার্মানির এই সাবমেরিন আক্রমণ শুরু হয়েছিল এই ঘটনার আরও অনেক আগে। একটা পর্যায়ে একের পর এক ব্রিটিশ জাহাজ ডুবিয়ে দিতে থাকে জার্মান সাবমেরিনগুলো। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সময়টা এসেছিল ১৯৪২ সালে। জার্মানি তখন এমন গতিতে জাহাজ ডুবাচ্ছিল যে, নতুন জাহাজ তৈরি করার আগেই আগের জাহাজগুলোকে আর সমুদ্রের বুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।


ঘন ঘন সাবমেরিন আক্রমণের ফলে ১৯৪২ সালের শেষের দিকে এসে ব্রিটেনের গমের মজুত প্রায় শেষ হয়ে আসে। একটা পর্যায়ে মাত্র ছয় সপ্তাহের গম অবশিষ্ট ছিল ব্রিটেনেরা হাতে। যদি এই অবস্থা কয়েক মাস চলে তাহলে বাজারে আর কোনো খাবারই পাওয়া যাবে না। না খেয়ে মারা যাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ। যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের আগেই খাবারের অভাবে ব্রিটেন হয়তো আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে। আসলে ব্রিটেনের বেঁচে থাকার জন্য খাবার, তেল, অস্ত্র, কাঁচামাল সবকিছুই আসতো অ্যামেরিকা, কানাডা এবং অন্যান্য উপনিবেশ থেকে—সমুদ্রপথে। জার্মানির পরিকল্পনা ছিল এই জাহাজগুলো ডুবিয়ে ব্রিটেনকে শ্বাসরোধ করে দেওয়া—যেন খাবার ফুরিয়ে যায়, শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, যুদ্ধ চালানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে ব্রিটেন। হিটলারের ভাষায় এটাকে বলা হতো ব্রিটেনের ‘লাইফ লাইন কেটে ফেলা’। ব্রিটেন যদি খুব দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না করতে পারে, তাহলে যুদ্ধে হেরে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। 


কিন্তু জার্মানির এই সাবমেরিন আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো সহজ উপায় ছিল না। জার্মানি যে সাবমেরিনগুলো  দিয়ে ব্রিটিশ জাহাজ আক্রমণ করত সেগুলোর নাম ছিল ইউ-বোট। এই ইউ-বোটগুলো চলত একটা গোপন নির্দেশনা অনুযায়ী। জার্মানরা এমন একটা মেশিন তৈরি করেছিল যে মেশিনের সাহায্যে এক ধরনের গুপ্ত সংকেত বা কোড তৈরি করা যেত। এই মেশিনটি ছিল অ্যাটলান্টিক যুদ্ধে জার্মানির সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এটার নাম ছিল এনিগমা মেশিন। জার্মান নৌ-অফিসাররা প্রতিদিন এনিগমা মেশিন ব্যবহার করে দুইটা গোপন বার্তা পাঠাত। একটা বার্তা যেত অ্যাটলান্টিকে থাকা ইউ-বোটগুলোর কাছে এবং আরেকটা বার্তা যেত স্থলভাগ থাকা সদর দপ্তরে। এই গোপন বার্তার সাহায্যে জানানো হতো—ব্রিটেন এবং তাদের মিত্রবাহিনীর কোন কোন কনভয় কোথায় যাচ্ছে, কতগুলো জাহাজ আছে, আর কোন “উলফপ্যাক” সাবমেরিন আক্রমণের জন্য একত্র হবে। এনিগমা মেশিনের সাহায্যে প্রতিদিন নতুন সংকেত তৈরি করা হতো বলে মিত্রবাহিনী এই বার্তাগুলো পড়তে পারত না। ফলে ইউ-বোটগুলো কোথায় আছে সে সম্পর্কে মিত্র বাহিনী ছিল সম্পূর্ণ অজ্ঞ। ইউ-বোটগুলো যেন হঠাৎ করেই আটলান্টিকের বিশাল সমুদ্র থেকে ভুতের মতো উঠে এসে আক্রমণ করত।

সহজভাবে বললে: এনিগমা মেশিনের কারনে জার্মানির ইউ-বোটগুলো জানত যে ব্রিটিশ কনভয় কোথায় আছে, কিন্তু ব্রিটিশরা জানত না যে ইউ-বোটগুলো কোথায় আছে।


ব্রিটেন এবং মিত্রবাহিনী বুঝতে পারল—এই কোড না ভাঙ্গতে পারলে জার্মানির সাথে পেরে উঠা অসম্ভব। কিন্তু সমস্যাটা ছিল খুব জটিল। জার্মানরা মেশিনের সাহায্যে এমন জটিল কোড তৈরি করেছিল যে অনেকেই তখন বলেছিল—এই কোড ভাঙ্গা অসম্ভব। আর একটা কোড ভাঙতে পারলেও কোনো লাভ নেই। কারন, জার্মানরা এনিগমা মেশিন ব্যবহার করে প্রতিদিনই তাদের কোডের ধরণ বদলে ফেলত। পরের কোডটা হতো সম্পূর্ণ আলাদা। মাঝে মাঝে একই দিনে তারা দুই বা তিন ধরনের কোডও ব্যবহার করত। এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশরা মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে পড়েছিল। 

এখন জার্মান আক্রমণ থেকে বাঁচার একটা মাত্র উপায়ই আছে। সেটা হলো—জার্মানরা যে মেশিন ব্যবহার করে দ্রুত কোড তৈরি করছে, তার চেয়েও আরও শক্তিশালী একটা মেশিন তৈরি করে কোড পাওয়ার সাথে সাথেই নতুন কোড ভেঙ্গে ফেলা।  

দেশের এই সংকটের মুহূর্তে কাজে নেমে পরে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা Government Code and Cypher School (GC&CS)। তখন GC&CS-এর প্রধান ছিলেন অ্যালেস্টার ডেনিস্টন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাদের পুরো গোয়েন্দা বিভাগ একসাথে কাজ করলেও এই জটিল কোড ভাঙ্গা সম্ভব নয়। এজন্য তিনি অক্সফোর্ড আর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের কাছে চিঠি পাঠালেন—যাতে তারা দেশের সেরা মেধাবী গণিতবিদ আর যুক্তিবিদদের একটা তালিকা তাদের অফিসে পাঠায়।


সেই তালিকায় উঠে আসে এক তরুণ প্রতিভাবান গণিতবিদ। নাম তার অ্যালান টিউরিং। তখন তার বয়স মাত্র ২৭ বছর। ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ “Universal Machine” তাঁকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল। এই Universal Machine-কেই আজ আমরা টিউরিং মেশিন বলি। যুদ্ধ শুরুর পর ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে টিউরিংকে ব্লেচলি পার্কের একটি গোপন দলে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পাঠানো হয়।

অ্যালান টিউরিং যখন প্রথম দিন ব্লেচলি পার্কে হাজির হলেন, তখন গোটা জায়গাটাকে মনে হচ্ছিল যেন রহস্যে মোড়া একটা সামরিক ঘাঁটির মতো। সেখানে প্রবেশের আগে তাঁকে কঠোর গোপনীয়তার অঙ্গীকারে সই করতে হয়। টিউরিং দেখলেন, সবাই স্যুট-টাই পরে সামরিক বাহিনীর মতো গম্ভীর ভঙ্গিতে হাজির হয়েছে।


কিন্তু টিউরিং ঢুকলেন একখানা পুরোনো সাইকেল চালিয়ে। সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝুলছে একটা গ্যাসমাস্ক। তখন জার্মানদের বোমাবর্ষণের ভয়ে লন্ডন থেকে বেরোনো লোকদের মধ্যে গ্যাসমাস্ক বহন করা ছিল সাধারণ ব্যাপার। তবে টিউরিংয়ের স্টাইল ছিল একেবারেই ভিন্ন। তাঁর পোশাক ছিল বেশ অগোছালো, চুল ছিল এলোমেলো, মুখে গম্ভীর অথচ একটু অন্যমনস্ক ভাব। কিন্তু প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দলের সবাই বুঝে ফেলল যে, জার্মানদের বিরুদ্ধে কোড ভাঙ্গার যুদ্ধে এই মানুষটিই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠবে।


প্রথম দিন কাজ করার পরই টিউরিং আর তাঁর সহকর্মীরা বুঝতে পারলেন যে, শুধু মানুষের মস্তিষ্ক ব্যবহার করে হাতে কলমে হিসাব কষে এনিগমা মেশিনকে হারানো সম্ভব নয়। কারণ এনিগমার সেটিংস প্রতিদিন বদলাত, আর এর ফলে তৈরি হতো বিলিয়ন বিলিয়ন সম্ভাব্য আউটপুট। এত বিশাল জটিলতার সামনে মানুষের গতি খুবই ধীর। তাদের দরকার ছিল কোড ভাঙ্গার যুক্তিকে যান্ত্রিক করে তোলা।

ক্রিপ্টোগ্রাফিকে শুধু মানসিক দক্ষতা হিসেবে না দেখে তাদের এখন এমন একটা যন্ত্র তৈরি করতে হবে, যা নির্দিষ্ট কিছু লজিক বা যৌক্তিক নির্দেশনা বারবার চালাতে পারবে। আর এই কাজটা করার জন্য তাদের দরকার ছিল একটা প্রোগ্রামেবল কম্পিউটার। এই কম্পিউটারটা নির্দিস্ট কিছু যৌক্তিক নির্দেশনা মেনে বার বার একই কাজ করতে যেতে থাকবে ঘন্টার পর ঘন্টা। এটাই ছিল আধুনিক প্রোগ্রামিংয়ের সূচনালগ্ন। 


জার্মানির এনিগমা কোড ভাংগার জন্য ট্যুরিংয়ের নকশা অনুযায়ী তৈরি করা হয় বোম্বে মেশিন । এটা ছিল এক ধরনের বিশালাকার ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল মেশিন। এই যন্ত্রে শত শত ঘূর্ণমান ড্রাম আর ‘রিলে’ বা যান্ত্রিক সুইচ বসানো ছিল। এনিগমার সম্ভাব্য সেটিংসগুলোকে এটি দ্রুত পরীক্ষা করতে পারত। জার্মানির কোড ভাঙ্গার জন্য ট্যুরিং “ক্রিব” নামের একটি কৌশল ব্যবহার করতেন। এক্ষেত্রে টুরিং ধরে নিতেন যে, জার্মানির পাঠানো বার্তার ভেতরে কিছু শব্দ বা বাক্যাংশ প্রায় নিশ্চিতভাবেই আছে, যেমন: “Heil Hitler”। এবার এই অনুমান থেকে শুরু করে বোম্বে মেশিন সম্ভাব্য কম্বিনেশনগুলো একে একে বাতিল করত, যতক্ষণ না সঠিক কী পাওয়া যায়। একবার সঠিক কী পেয়ে গেলে সেই কোড ভাঙ্গা তুলনামূলক সহজ হয়ে যেত।


কিন্তু যুদ্ধ চলতে চলতে জার্মানরা আরও উন্নত কোড চালু করে। এই কোডের নাম ছিল Lorenz cipher। এই কোড এনিগমার থেকেও ভয়ংকর। ফলে এই কোড ভাঙ্গার জন্য বোম্বে মেশিন যথেষ্ট ছিল না। তখনই আসে ইতিহাস বদলে দেওয়া এক আবিষ্কার: কলোসাস।

কলোসাস তৈরি করেছিলেন প্রকৌশলী টমি ফ্লাওয়ার্স। এটা ছিল বিশ্বের প্রথম electronic programmable computer। এখানে রিলে বা ঘূর্ণমান ড্রামের বদলে ব্যবহৃত হতো হাজার হাজার ভ্যাকুয়াম টিউব। নতুন এই যন্ত্রটি অসাধারণ দ্রুতগতিতে গণনা করতে পারত। কলোসাসকে প্রোগ্রাম করা যেত সুইচ আর পাঞ্চড টেপ দিয়ে। এই মেশিনের গতি এতটাই বেশি ছিল যে, আগে যেখানে মাস লেগে যেত কোড ভাঙতে, সেখানে এখন কয়েক ঘন্টার ভেতরে কোড ভাঙা সম্ভব হলো।


এই আবিষ্কারের ফলাফল ছিল নাটকীয়। মিত্রবাহিনী হঠাৎ করেই জার্মান বাহিনীর সকল মেসেজ পড়তে শুরু করে। জার্মানির ইউ-বোটগুলো কোথায় ওঁত পেতে আছে, জার্মান জেনারেলরা কী নির্দেশ দিচ্ছে—সব ধরা পড়ছিল রেডিওতে। ইতিহাসবিদদের অনুমান, এই কোড ভাঙার সাফল্য যুদ্ধকে অন্তত দুই বছর কমিয়ে দিয়েছিল। প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল অন্তত কয়েক লাখ মানুষ।

তবে ইংল্যান্ডের ব্লেচলি পার্কের এই গোপন দলটি ছাড়াও পৃথিবীর আরেকটা জায়াগায় কম্পিউটার জিনিসটার খুব দরকার ছিল। ওই সময় ব্রিটিশদের মতো মার্কিন সেনাবাহিনীর সামনেও ছিল একটা ভয়াবহ সমস্যা। গোলন্দাজ কামানের ফায়ারিং টেবিল আর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ কীভাবে নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা যায় তা নিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর তখন ঘুম হারাম। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আটলান্টিকের ওপারেও কম্পিউটারের জন্ম হচ্ছিল এই যুদ্ধক্ষেত্রের চাহিদা থেকেই।  


যুদ্ধের আগে পর্যন্ত এইসব কাজ করতেন “হিউম্যান কম্পিউটার” নামে পরিচিত একদল মানুষ। এদের বেশিরভাগই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত নারী। এরা হাতে-কলমে অঙ্ক কষে ফলাফল বের করতেন। কিন্তু সমস্যাটা ছিল গতি নিয়ে।  কামান, রকেট বা দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ নির্ভর করে অনেকগুলো বিষয়ের ওপর। এজন্য হিসাবের মধ্যে ধরতে হয় বাতাসের গতি, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা, এমনকি পৃথিবীর বক্রতাঁকেও। ফলে প্রতিবার নতুন পরিস্থিতির জন্য তৈরি করতে হতো আলাদা আলাদা হিসাব। আর সেই হিসেব শেষ করতে অনেক ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টাও লেগে যেত। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এত ধীরগতি মানেই পরাজয়।


এই বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে জন্ম নিল ENIAC নামের এক কম্পিউটার। ১৯৪৫ সালে এই কম্পিউটার তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়। এই কম্পিউটারটিকেই আমরা এখন সাধারণ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার উপযোগী প্রথম ইলেকট্রনিক কম্পিউটার বলি। তবে নামটা যাই হোক না কেন, এই কম্পিউটারের জন্ম মূলত সামরিক প্রয়োজনে।  মার্কিন সেনাদের কামান চালনা আর পরবর্তীতে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির গণনা আরও দ্রুত ও সঠিক করার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল এই কম্পিউটার।


ENIAC কম্পিউটারের আকার ছিল বিশাল, ওজন প্রায় ৩০ টন। এর মধ্যে ছিল ১৮,০০০ ভ্যাকুয়াম টিউব। আর পুরো একটি হলঘর জুড়ে ছিল এই কম্পিউটারের তার ও যন্ত্রাংশ। এই মেশিনটি চালু করার সময় এত বিদ্যুৎ লাগত যে আশেপাশের শহরের আলো এক মুহূর্তের জন্য কমে যেত। কিন্তু এর ক্ষমতা ছিল অভাবনীয়। সেই সময়ের মানুষের হাতে করা হিসাবের চেয়ে অন্তত কয়েক হাজারগুণ বেশি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির বিজয়ের পেছনে বেশ বড় অবদান ছিল কম্পিউটারের। প্রথমত, এনিগমা আর লরেঞ্জ কোড না ভাঙ্গা গেলে গোটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধই হয়ত আরও দুই বছর দীর্ঘ হতো। যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগেই চালু হয় ENIAC। এটি পরমাণু বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রোগ্রামে কাজে লাগে। পারমাণবিক বোমার কারনেও যুদ্ধে মিত্রশক্তি অনেকখানি এগিয়ে ছিল। পাশাপাশি ব্রিটিশ রাডার সিস্টেম পরিচালনায় প্রচুর গণনা করতে হতো। সেখানে ব্যবহার করা হতো অ্যানালগ কম্পিউটার। বিটিশরা বোমার ট্রিজেকটরি বের করতেও প্রাথমিক যুগের কম্পিউটারগুলো ব্যবহার করেছিল। যুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের সাপ্লাই চেইন ও পরিবহন পরিকল্পনায়ও গণনা দ্রুত করার জন্য ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল যন্ত্র কাজে লাগত। 


সবচেয়ে বড় কথা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কম্পিউটার শব্দটার অর্থই বদলে যায়। এর আগে “computer” মানে ছিল একদল নারী, যাদের কাজই ছিল বসে বসে গণনা করা। কিন্তু যুদ্ধের পরে সেই অর্থ বদলে যায়, আর মেশিনকেই বলা হতে থাকে কম্পিউটার। 

যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন কিছু নয়। সেই প্রাচীনকাল থেকেই আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন গোপন প্রযুক্তির ব্যবহার দেখতে পাই। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য একবার অদ্ভুত একটা দাহ্য তরল তৈরি করেছিল। এই তরলে আগুন ধরিয়ে দিলে পানির ওপরও জ্বলত। একবার একটা আরব নৌবহর কনস্টান্টিনোপলের কাছে আসা মাত্রই বাইজেন্টাইন জাহাজ থেকে সেই তরল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় নৌবহরে। শত্রুদের জাহাজ পানির ওপরেই পুড়ে যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের গোপন অস্ত্র।


বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনও হয়েছিল এই প্রযুক্তির কারনেই। ১৪৫৩ সালে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মহম্মদ কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন। ইউরোপীয় প্রকৌশলী দ্বারা নির্মিত বিশাল কামান এক মাস ধরে গোলা নিক্ষেপ করে শহরের দেয়ালে। দেয়াল ভেঙে পড়লে হাজার বছরের পুরনো বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য শেষ হয়ে যায়। গানপাউডার প্রযুক্তি বদলে দেয় ইতিহাস। 

তবে প্রযুক্তি সবসময় আধুনিক হতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। চেঙ্গিস খান আর তার সৈন্যরা এক ধরনের ছোট আকারের তীর-ধনুক ব্যবহার করত। দেখতে ছোট হলেও ভীষণ শক্তিশালী ছিল এই তীর। সবচেয়ে বড় কথা আকারে ছোট হওয়ায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তীর চালিয়ে দিতে পারত মঙ্গোল যোদ্ধারা। দ্রুত গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে চারপাশ ঘিরে শত্রুর ওপর তীরের বৃষ্টি নামাত তারা। ইউরেশিয়ার অর্ধেক দখল হয়ে যায় মঙ্গোলদের এই ধনুক-প্রযুক্তির জোরে। 


ইতিহাস ঘাটলে এমন শত শত উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে। সভ্যতা যত এগিয়ে গেছে, মানুষের প্রযুক্তিও তত বেশি শক্তিশালী হয়েছে। ভ্যাকুয়াম টিউবের পর মানুষ এমন একটা প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছিল, যা ছিল রীতিমত জাদুর মতো। এটা ছিল এমন এক প্রযুক্তি, যে প্রযুক্তি গড়ে দুই বছর পর পর দ্বিগুণ শক্তিশালী হতো। এই অগ্রগতি ষাটের দশক থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত অব্যাহত আছে। এই প্রযুক্তিকে এখন আমরা সিলিকন চিপ, সেমিকন্ডাক্টর, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট বা মাইক্রোপ্রসেসর নামে ডাকি। যে দেশ এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তারাই শাসন করবে পৃথিবী। আর সেটাই হয়েছে।


আবিষ্কৃত হওয়ার পরপরই যুদ্ধ ক্ষেত্রে এই সেমিকন্ডাক্টর চিপের ব্যবহার শুরু হয়। আসলে প্রথমদিকে যত সেমিকন্ডাক্টর চিপ উৎপাদিত হতো তার ৯০ শতাংশই কিনে নিত অ্যামেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর। মূলত মিসাইল গাইডেন্স সিস্টেম, বিমান চালনা, আর নাসার স্পেস প্রোগ্রামের জন্য এই চিপগুলো কিনত তারা।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অ্যামেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া আর বড় কোনো পরাশক্তি টিকে ছিল না। একটা পর্যায়ে এই দুই পরাশক্তির মধ্যে শুরু হয় পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা একটা পর্যায়ে যুদ্ধের রূপ নেয়। এজন্যই এই প্রতিযোগিতাকে অনেকেই স্নায়ুযুদ্ধ বলে উল্লেখ করেন।


স্নায়ু যুদ্ধের আমলে অ্যামেরিকাকে টেক্কা দেওয়ার জন্য রাশিয়া বিপুল পরিমাণ ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য অস্ত্র তৈরি করে। পশ্চিমা বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে বলেছেন সোভিয়েতদের সংখ্যার খেলা। ১৯৫০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে তারা তৈরি করে লক্ষাধিক ট্যাঙ্ক: T-54/55 সিরিজ: প্রায় ৮৬,০০০, T-62: প্রায় ২২,৭০০, T-72: ২৫,০০০-এর বেশি, T-80: প্রায় ৫,৫০০। অন্যদিকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ট্যাঙ্ক সংখ্যা ছিল মোটামুটি ১০ হাজারের মতো। বিমানের ক্ষেত্রেও সোভিয়েতরা সংখ্যায় এগিয়ে ছিল। এমনকি আশির দশকে এসে পারমাণবিক ওয়ারহেডের ক্ষেত্রেও সোভিয়েত ইউনিয়ন অ্যামেরিকার থেকে এগিয়ে ছিল অনেকখানি।


সেই ষাটের দশকেই অ্যামেরিকা বুঝতে পেরেছিল যে, সংখ্যা দিয়ে আধুনিক যুগে যুদ্ধে জয়ী হওয়া যাবে না। ফলে তারা সংখ্যার থেকে গুণগত মানের দিকে বেশি নজর দেয়। শক্তির চেয়ে বেশি নজর দেয় প্রযুক্তির ক্ষেত্রে। আর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার এই কাজটিই করে দেয় সিলিকন চিপ। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ট্যাঙ্ক আর পারমাণবিক বোমা তৈরিতে তাদের সকল শক্তি ব্যয় করছিল, অ্যামেরিকা তখন সিলিকন ভিত্তিক মাইক্রোচিপ তৈরিতে বিপুল পরিমাণ ডলার ব্যয় করছিল। এটাই ছিল দুই পরাশক্তির কৌশলগত পার্থক্য।


স্নায়ু যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধে অ্যামেরিকা জড়িয়ে পরে। ১৯৬৯ সালে ভিয়েতনামে ছিল প্রায় ৫ লক্ষ মার্কিন সেনা।  ভিয়েতনাম যুদ্ধে অ্যামেরিকার প্রয়োজন ছিল ভিন্ন ধরনের অস্ত্র। এই যুদ্ধে প্রথম দিকের বোমা হামলা অভিযানের মধ্যে একটি ছিল ‘অপারেশন রোলিং থান্ডার’। এই অপারেশন চলে ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত। এই অভিযানে আট লাখ টনেরও বেশি বোমা ফেলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোটা প্রশান্ত মহাসাগরীয় থিয়েটারেও এই পরিমাণে বোমা ফেলা হয়নি। তবে এত বোমা ফেলা হলেও উত্তর ভিয়েতনামের সামরিক বাহিনীর ওপর এর প্রভাব ছিল খুবই সীমিত। কারণ বেশিরভাগ বোমাই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়। 


বিমানবাহিনী তখন ক্ষেপণাস্ত্র এবং বোমা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির পরীক্ষা চালাচ্ছিল। ১৯৭০-এর দশকের গাইডেড মিউনিশনগুলোর প্রধান সমস্যাটা ছিল ভ্যাকুয়াম টিউব। ভিয়েতনামের আকাশে যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানগুলো ব্যবহার করত স্প্যারো থ্রি এন্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল। এই মিসাইলগুলো ছিল ভ্যাকুয়াম টিউবের ওপর নির্ভরশীল। টিউবগুলো হাতে ঝালাই করে লাগানো হতো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আর্দ্র আবহাওয়া এবং টেকঅফ-ল্যান্ডিংয়ের সময় তৈরি হওয়া চাপের কারণে টিউবগুলো বারবার নষ্ট হয়ে যেত।


যুদ্ধবিমানের অস্থির লড়াইয়ের কারণেও সৃষ্টি হতো সমস্যা। এই সবকিছু মিলিয়ে গড়ে প্রতি পাঁচ থেকে দশ ঘণ্টা ব্যবহারের পর ভেঙে পড়তো স্প্যারো মিসাইলের রাডার সিস্টেম। যুদ্ধের পর একটা গবেষণায় দেখা গেছে, ভিয়েতনামে নিক্ষিপ্ত স্প্যারো মিসাইলের মাত্র ৯.২ শতাংশই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়। ৬৬ শতাংশ মিসাইল কাজ করেনি, আর বাকি মিসাইলগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল।


এই যুদ্ধের সময় অ্যামেরিকান বাহিনীর কর্নেল জো ডেভিস একবার ভিয়েতনামের থানহ হোয়া সেতুর ছবি পরীক্ষা করে দেখছিলেন। এই সেতুটি ছিল ৫৪০ ফুট লম্বা একটি ধাতব কাঠামো। ডেভিস ছবির মধ্যে আটশত ক্ষতচিহ্ন গুনে বের করেছিলেন। প্রতিটি ক্ষত ছিল অ্যামেরিকান বোমা বা রকেটের আঘাতের ফল। কিন্তু সেগুলো সেতুতে সঠিকভাবে আঘাত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। আরো অনেক বোমা পড়েছিল নদীতে এবং সেগুলোর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কিন্তু সেতুটি তখনও দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ হাজারের উপর বোমা ফেলেও সেতুটি ধ্বংস করতে পারেনি অ্যামেরিকান বাহিনী।


এবার লেজার-নির্দেশিত একটা বোমা তৈরি করার জন্য টেক্সাস ইন্সট্রুমেন্টস নামে একটি সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিকে নয় মাস সময় দেন কর্নেল ডেভিস। বোমাটি দ্রুতই বিমানবাহিনীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ১৯৭২ সালের ১৩ মে অ্যামেরিকান বিমানবাহিনী থানহ হোয়া সেতুর ওপর চব্বিশটি বোমা ফেলে। সেতুটি তখনও ঠিকঠাক দাঁড়িয়ে। তবে এবার অ্যামেরিকান বোমাগুলো আঘাত করল সরাসরি সেতুর ওপর। ভেঙ্গে পড়ল সেতু। এই নতুন নির্ভুল বোমাগুলোর মাধ্যমে আঘাত হানা হয়েছিল অন্য অনেক সেতু, রেল জংশন এবং অন্যান্য কৌশলগত পয়েন্টেও। সেমিকন্ডাক্টর কীভাবে ভবিষ্যতের যুদ্ধ-কৌশল বদলে দিতে পারে সেটা ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে একদম হাতে কলমে বুঝতে পারে অ্যামেরিকা। এরপর থেকে প্রযুক্তিকে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে তারা।


ভিয়েতনাম যুদ্ধের এই অভিজ্ঞতা পুঁজি করে প্রযুক্তি নির্ভর যুদ্ধের প্রথম সত্যিকারের প্রদর্শন শুরু হয় ১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি। ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগ মুহূর্তে সৌদি আরবের মার্কিন ঘাঁটি থেকে আকাশে উড়ে গেল লকহিড এফ-১১৭ নাইটহকের প্রথম স্কোয়াড্রন। কালো রঙের স্টেলথ জেটগুলো মরুভূমির অন্ধকার আকাশে এমনভাবে মিলিয়ে গেল, যেন তারা রাতেরই অংশ। একের পর এক উড়ে গেল মোট ৩৬টি বিমান। সবগুলো বিমানের লক্ষ্য একই: বাগদাদ। সিএনএন লাইভ সম্প্রচারে দেখাচ্ছিল—শত শত বোমা আর ক্রুজ মিসাইল কীভাবে ইরাকি ট্যাংক, সাঁজোয়া যান আর সামরিক ঘাঁটিতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানছে। দর্শকদের কাছে এই যুদ্ধ হয়ে উঠেছিল অনেকটা ভিডিও গেমের মতো। এভাবে গাইডেড মিসাইল সিস্টেমের মাধ্যমে এত দুর থেকে শত্রুকে প্রস্তুত হওয়ার আগেই নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া পৃথিবীর মানুষ আগে কখনো দেখেনি। সেই ভয়টা মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্যই হয়ত যুদ্ধটা লাইভ টেলিকাস্ট করা হয়।


কিন্তু এই যে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এটা কিন্তু রাতারাতি তৈরি হয়নি। প্রথম দিকে মানুষ কল্পনাও করতে পারেনি যে এই প্রযুক্তি পুরো দুনিয়াকে পরিবর্তন করে দেবে। আজকের দিনে মোবাইল ফোন, মাইক্রোওয়েব ওভেন, ইলেকট্রিক গাড়ি থেকে শুরু করে যেকোনো অত্যাধুনিক যন্ত্রের মূল শক্তিই হলো সেমিকন্ডাক্টর চিপ। আজকের দিনে আমরা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়জন হয় জিপিইউ নামে এক ধরনের চিপ। তেমনি যেকোনো আধুনিক যন্ত্রের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে এই সেমিকন্ডাক্টর জিনিসটি।


বিশ্বের অধিকাংশ ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক চীনের ‘মালাক্কা সমস্যা’ নিয়ে বেশ গুরুত্ব দিয়েই কথা বলেন। মালাক্কা প্রণালি অবশ্যই চীনের জন্য একটি কৌশলগত সমস্যা। তবে আজকের দিনে তেলের ব্যারেল নয়, বরং চীনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে সেমিকন্ডাক্টর চিপ। এই উপলব্ধি থেকেই চীন এখন সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের লড়াইয়ে নেমেছে। এই কাজে বিনিয়োগ করা হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।

অ্যামেরিকা চীনের গলা চেপে ধরেছিল ২০১৯ সালে। হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নতুন একটি বিল পাশ করা হয়। নতুন বিলের মূল টার্গেট ছিল চীনের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে। সাশ্রয়ী মূল্যে টেকসই পণ্য সরবরাহ করার কারণে হুয়াওয়ের পণ্য অল্প সময়েই বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে এই কম দামের পেছনে মূল ভূমিকায় ছিল চীন সরকারের সরাসরি ভর্তুকি ও সহায়তা। হুয়াওয়ের মাধ্যমে বেইজিং তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। আর এজন্য যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছিল, হুয়াওয়ে যদি অচিরেই পরবর্তী প্রজন্মের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, তাহলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবস্থার ওপর ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণ কমে যাবে। এমনকি এতে চীনের ভূরাজনৈতিক প্রভাবও ব্যাপকভাবে বাড়বে—বিশেষ করে যদি এই অবকাঠামো হয় নজরদারি, প্রতিরক্ষা বা সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত। এই আশংকা থেকে প্রথম ধাপেই হুয়াওয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। চিপ তৈরি করার জন্য হুয়াওয়ে কিছু উন্নত মার্কিন প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল ছিল। সেগুলো হুয়াওয়ের কাছে বিক্রি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।


এই পদক্ষেপের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। হুয়াওয়ের বৈশ্বিক সম্প্রসারণ হঠাৎ করেই থমকে যায়। নিষেধাজ্ঞার ফলে প্রয়োজনীয় চিপ ও বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়াই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তাদের বিক্রয় এবং আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। প্রযুক্তিগতভাবে একপ্রকার শ্বাসরোধ করে ফেলা হয়েছিল এই বিশাল প্রতিষ্ঠানটিকে। এই পরিস্থিতিতে হুয়াওয়ের জন্য একটি কঠিন সত্য উন্মোচিত হয়—তাদের মতো আধুনিক ইলেকট্রনিক্স-নির্ভর চীনা কোম্পানিগুলো চিপের জন্য বিদেশের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। আর এই নির্ভরশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।


সব বুঝে শুনে চিপ তৈরিতে চীন এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢেলে দিচ্ছে। বেইজিং যদি তাদের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনায় সফল হয়, তাহলে শুধু চীন নয়, সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যই আমূল বদলে যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষমতায়। আর পরবর্তী সময়ের কোল্ড ওয়ারের ভাষা ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের আতঙ্ক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে চলমান বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ পর্যন্ত হয়তো নির্ধারিত হবে কম্পিউটিং শক্তির মাপকাঠিতে। একটি সত্য দুই পক্ষই গভীরভাবে বুঝে গেছে: মেশিন লার্নিং হোক বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, স্ব-চালিত যানবাহন হোক বা সশস্ত্র ড্রোন—আজকের দিনের প্রতিটি কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ভিত্তি উন্নত চিপ। আর এই চিপগুলো, অর্থাৎ যাকে আমরা সাধারণত ‘সেমিকন্ডাক্টর’ বা ‘ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট’ নামে চিনি, সেগুলো তৈরি করতে পারে বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র কোম্পানি।


কারণ সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর তৈরি করা এখন ভয়াবহ জটিল। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির চিপ তৈরি করতে EUV লিথোগ্রাফি নামে একটি জটিল যন্ত্র প্রয়োজন হয়। এই যন্ত্রটি এতই জটিল যে এর লেজার সিস্টেমের মধ্যেই রয়েছে ৪৫৭,৩২৯টি আলাদা যন্ত্রাংশ। এটি তৈরির জন্য অনেকগুলো দেশের বিজ্ঞানীদের প্রায় ৩০ বছর শুধু গবেষণাই করতে হয়েছে। এই যন্ত্রের লেজার থেকে EUV আলো তৈরি করতে প্রয়োজন হয় এক ধরনের প্লাজমার। এই প্লাজমার তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের চেয়েও অনেক গুণ বেশি! তাপমাত্রা পৌছে যায় প্রায় পাঁচ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াসে! এই ভয়ঙ্কর তাপ থেকে জন্ম নেয় ক্ষণস্থায়ী EUV আলো। বুঝতেই পারছেন এই ধরনের একটা যন্ত্র চাইলেই তৈরি করা যায় না। সারা পৃথিবীতে এই যন্ত্রটি তৈরি করতে পারে মাত্র একটি কোম্পানি। 


প্রযুক্তি চুরির ঘটনা খুবই সাধারণ একটি বিষয়। এই চিপ ইন্ডাস্ট্রিতেও সে ঘটনা কম ঘটেনি। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীন, কেউই আসলে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি চুরি করে সুবিধা করতে পারেনি। কারণ চিপ তৈরির প্রযুক্তি প্রতি এক দুই বছর পরপর এতটাই জটিল হয়ে উঠে যে সেগুলো নকল করে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।


অন্যদিকে আজকের দিনে সবচেয়ে সূক্ষ্ম প্রযুক্তির কিছু চিপের প্রায় ৯০ শতাংশই উৎপাদন করে তাইওয়ানের এই একটি কোম্পানিই। ফলে একটা পর্যায়ে এসে এই চিপ জিনিসটা জ্বালানী তেলের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

১৯৭৩ সালের তেল সংকটের সময় আরবের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ‘ওপেক’ তেলকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। তারা পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে তেল রপ্তানি হঠাৎ কমিয়ে দেয় এবং উৎপাদনও সীমিত করে ফেলে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে যায়। কয়েক মাসের মধ্যে তেলের দাম বেড়ে যায় চারগুণ। আর এই ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতিকে পুরো অচল করে দিয়েছিল। অবস্থা এতই খারাপ হয়েছিল যে তেলের অভাবে পশ্চিমা দেশগুলোর হাইওয়েতে স্পিড লিমিট পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়। বেড়ে যায় বেকারত্ব। অনেক দেশে পেট্রোল স্টেশনে গাড়ির লাইন কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ হয়ে যেত।


২১ শতকে এসে তেলের সেই জায়গা দখল করেছে সেমিকন্ডাক্টর। সিলিকন চিপের সরবরাহ বন্ধ হলে পৃথিবীর অর্থনীতি শুধু ধীর হবে না, বরং পুরো পৃথিবী আক্ষরিক অর্থেই থেমে যাবে। মানবজাতির  ইতিহাসে এই মাইক্রোচিপের চেয়ে জটিল কোনো কিছু আমরা কখনো তৈরি করিনি। একটা চুলের চেয়েও হাজার ভাগের এক ভাগ পাতলা সার্কিটের মধ্যে থাকে কোটি কোটি ট্রানজিস্টর। এত সূক্ষ্ম প্রযুক্তি চাইলেই তৈরি করা যায় না। ফলে সেমিকন্ডাক্টরের একটা বড় কারখানা বন্ধ হলেই কেঁপে ওঠে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি। 


তেল যখন বিশ্ব অর্থনীতিতে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ছিল, তখন তেল নিয়েই হতো সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক লড়াইগুলো। এখন এই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে সিলিকন চিপ। এই প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে শুরু হয়েছে রীতিমত এক ভয়ংকর ভূ-রাজনৈতিক লড়াই। কিন্তু এই যুদ্ধে নেই যুদ্ধবিমান, নেই ট্যাংক। কিন্তু আছে গুপ্তচর, প্রযুক্তি চুরি, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা, আর ট্রিলিয়ন ডলারের সাপ্লাই চেইন। এই যুদ্ধ নীরব, কিন্তু এর পরিণতি হবে পরমাণু যুদ্ধের মতোই মারাত্মক। এই চিপ ওয়ারে যারা এগিয়ে যাবে তারাই গোটা বিশ্বের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে।


সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরি করা অসম্ভব জটিল একটি কাজ। কাজটি যেমন জটিল তেমনি ব্যয়বহুল। ভ্যাকুয়াম টিউব থেকে শুরু করে কিভাবে আমরা ট্রাঞ্জিস্টর আবিষ্কার করলাম, তারপর কীভাবে সেই ট্রাঞ্জিস্টর থেকে আইসি তৈরি হলো, আর সেই আইসি থেকে কীভাবে আমরা আজকের এই জিপিইউ-এর যুগে চলে এলাম তা এক মহাকাব্যের মতো গল্প। হয়ত মানবজাতির সেরা অর্জনের মধ্যেও একটি এই সেমিকন্ডাক্টর চিপ। ভ্যাকুয়াম টিউব থেকে আজকের দিনের জিপিইউতে আসার রাস্তাটা সরল ছিল না। এখানে ছিল প্রযুক্তির লড়াই, ময়দানের লড়াই, প্রযুক্তি চুরি, গুপ্তচরবৃত্তি এবং আরও অনেক কিছু। এই গল্পটি যেন আমাদের আধুনিক মানুষ হয়ে উঠার গল্প। সেই গল্পটি ক্রিস মিলার তার চিপ ওয়ার বইতে ছবির মতো করে তুলে ধরেছেন। ক্রিস মিলারের চিপ ওয়ার বইটি এই বিষয়ের সবথেকে বিখ্যাত বই। ভূ-রাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি, আগামী দিনের প্রযুক্তি নিয়ে যাদের আগ্রহ আছে তাদের জন্য এই বইটি অবশ্যপাঠ্য। লেখকঃ হিমাংসু কর



১৫



ঘুম থেকে ওঠার পর, প্রথমেই আপনার এক গ্লাস পানি পান করা উচিত। ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস বা ঘামের মাধ্যমে আমাদের শরীর পানি হারায়। একে বলা হয় INSENSIBLE WATER LOSS (অদৃশ্য পানি হ্রাস)। তাই ২ গ্লাস পানি পান করুন:

• আপনার মস্তিষ্ক ও ত্বককে পুনরায় আর্দ্র করতে।

• আপনার পরিপাকতন্ত্রকে সক্রিয় করতে।

এছাড়াও, খাওয়ার ১ ঘণ্টা আগে বা পরে পানি পান করুন। খাওয়ার কাছাকাছি সময়ে পানি পান করলে:

• পাকস্থলীর এসিড নিঃসরণ ধীর হয়ে যায়।

• হজমকারী এনজাইমের নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটে।

• মস্তিষ্ক ও পরিপাকতন্ত্রের ভারসাম্যপূর্ণ সংযোগ বিঘ্নিত হয়।

• বমি বমি ভাব, বমি এবং অরুচি তৈরি হতে পারে।

মনে রাখবেন, কম সোডিয়াম বা হাইপোনাট্রেমিয়ার (Hyponatremia) কারণে হতে পারে:

* পেশিতে টান ধরা বা খিঁচুনি।

* বমি বমি ভাব এবং অরুচি।

* বুক জ্বালাপোড়া (বিষয়টি বেশ আকর্ষণীয়, তাই না?)।

* মাথাব্যথা এবং ব্রেইন ইডিমা (মস্তিষ্কে পানি জমে ফুলে যাওয়া)।

এর অর্থ হলো,

• ব্যায়ামের আগে বা পরে স্যালাইন পানি (এক চিমটি লবণযুক্ত পানি) পান করুন।

• প্রচুর ঘামার পর এক চিমটি লবণ মেশানো পানি পান করুন।

নিয়মিত আপনার খাওয়ার পানিতে এক চিমটি প্রাকৃতিক লবণ যোগ করুন।

**বি:দ্র:** আপনি যদি এখনো মনে করেন লবণ উচ্চ রক্তচাপের কারণ, তবে আপনি এখনো পুরানো ধারণার দাস হয়ে আছেন। এই মানসিক বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে আসুন।

@ Health Tips Pro



১৬


পারফেক্ট হতে হবে ভেবে শুরুই না করা আমাদের সবচেয়ে বড় জড়তা। ছোট থেকে শুরু করুন — একটা প্যারাগ্রাফ, ৫ মিনিট স্ট্রেচিং। ব্যস, এতটুকুই যথেষ্ট।

ঝুঁকি মানে ভয় না, ঝুঁকি মানে সুযোগ। স্টিভ জবস আর ইলন মাস্ক যদি নিরাপদ পথ বেছে নিতেন, আজ Apple বা Tesla থাকতোই না।

শুধু "To-Do List" না, একটা "Don't-Do List"-ও বানান। কোন কাজ এড়িয়ে চলবেন — এটা জানাটাও সমান জরুরি।

সব কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ না। Front Burner vs Back Burner — বুঝে নিন কোনটা এখনই দরকার, কোনটা পরে করলেও চলবে।

শরীরের নিজস্ব এনার্জি সাইকেল (Ultradian Rhythm) বুঝে কাজ সাজান। সবচেয়ে কঠিন কাজটা করুন যখন এনার্জি সবচেয়ে বেশি।

জীবন বদলাতে বিশাল পরিকল্পনার দরকার নেই। শুধু আজকেই একটা ছোট্ট পদক্ষেপ নিন।

আপনার জন্য কোনটা সবচেয়ে বেশি রিলেট করলো? কমেন্টে জানান

======= সামান্য ব্যাখ্যা সহ : 

১. পারফেকশনিজম ও জড়তা কাটানো কোনো কাজ শুরু করতে না পারার মূল কারণ হলো নিখুঁত হওয়ার চাপ। এর সমাধান হলো নিজের মানদণ্ড সাময়িকভাবে নামিয়ে ছোট থেকে শুরু করা — যেমন পুরো রিপোর্ট নয়, শুধু প্রথম প্যারাগ্রাফ লেখা, বা পুরো ওয়ার্কআউট নয়, মাত্র ৫ মিনিট স্ট্রেচিং।

২. অ্যাকশন আগে, মোটিভেশন পরে সাধারণ ধারণার উল্টো — মোটিভেশনের অপেক্ষায় না থেকে আগে ছোট একটা পদক্ষেপ নিলে মোটিভেশন নিজে থেকেই তৈরি হয়। কাজ শুরু করলে আত্মসন্দেহ কমে, নিজের সম্পর্কে নতুন ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়, এবং এটা একটা চক্রের মতো কাজ করে — ছোট ফলাফল → আত্মবিশ্বাস → আরও অনুপ্রেরণা।

৩. ঝুঁকি নেওয়া ঝুঁকিকে ভয় হিসেবে না দেখে সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। বুঝে-শুনে হিসেব করে ঝুঁকি নিলে ব্যর্থতার সম্ভাবনা কমে ও মানসিক দৃঢ়তা বাড়ে। স্টিভ জবস ও ইলন মাস্কের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে যে বড় সাফল্যের পেছনে সবসময় ঝুঁকি থাকে।

৪. "ডোন্ট ডু" লিস্ট শুধু টু-ডু লিস্ট যথেষ্ট নয় — কোন কাজগুলো এড়িয়ে চলতে হবে (যেমন সকালে অহেতুক সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং, অপ্রয়োজনীয় মিটিং) তার একটা তালিকা রাখলে মনোযোগ ও প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে। এটি পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবন — দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর।

এই অংশে আরও তিনটি নতুন পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে:

৫. ব্যাক বার্নার লিস্ট কাজগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা — ফ্রন্ট বার্নার (সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকারের, তাৎক্ষণিক মনোযোগ দরকার এমন কাজ) আর ব্যাক বার্নার (গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনই মনোযোগ দরকার নেই এমন কাজ)। রান্নার চুলার উপমা দিয়ে বোঝানো হয়েছে — যে পাত্রটা বারবার নাড়তে হয় সেটাই ফ্রন্ট বার্নার, বাকিগুলো ব্যাক বার্নার। এতে মাল্টিটাস্কিং কমে, সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়, আর সময়ের সাথে অগ্রাধিকার পাল্টালে লিস্টটা নিয়মিত রিভিউ করতে হয় (সাপ্তাহিক/মাসিক)।

৬. সুপারস্ট্রাকচার ডিসিশন মডেল ওভার-অ্যানালাইসিস আর ডিসিশন প্যারালাইসিস এড়াতে আগে থেকে ঠিক করা একটা সিদ্ধান্ত-নেওয়ার সিস্টেম তৈরি করা। তিনটি ধাপ:

ছোট, পুনরাবৃত্ত সিদ্ধান্তগুলো অটোমেট করে ফেলা (যেমন জাকারবার্গের একই পোশাক পরা, নির্দিষ্ট দিনে জিমে যাওয়া নির্ধারণ করা)

বড় সিদ্ধান্তের জন্য আগে থেকে কিছু মানদণ্ড/প্রশ্ন ঠিক করে রাখা (এটা কি দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের সাথে মেলে? সময়-শক্তি সঠিক ব্যবহার হবে? সবচেয়ে খারাপ কী হতে পারে?)

আগের সিদ্ধান্ত থেকে শেখা — ভুল বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে এড়ানো

এতে মানসিক স্বচ্ছতা বাড়ে, স্ট্রেস কমে, আর ছোটখাট বিষয়ে মাথা না ঘামিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ফোকাস করা যায়।

৭. আল্ট্রাডিয়ান রিদম (শক্তির স্বাভাবিক চক্র) শরীর ৯০-১২০ মিনিটের চক্রে কাজ করে — এনার্জি বাড়ে-কমে। এই ছন্দ বুঝে কাজের পরিকল্পনা করলে প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে:

নিজের এনার্জি প্যাটার্ন এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করে সবচেয়ে ফোকাসড সময় চিহ্নিত করা

সেই পিক টাইমে সবচেয়ে কঠিন/গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা (যেমন লেখালেখি, স্ট্র্যাটেজি)

এনার্জি কম থাকা সময়ে হালকা কাজ করা (ইমেইল, ফোন কল, মিটিং)

মাঝে মাঝে ছোট বিরতি (২০-৩০ মিনিট) নিয়ে বার্নআউট এড়ানো

এটা টাইম ম্যানেজমেন্ট নয়, বরং এনার্জি ম্যানেজমেন্ট — কম পরিশ্রমে বেশি ফলাফল পাওয়ার কৌশল।

@ আব্দুল্লাহ আজাদ 



১৭


Shitsuke' — জাপানি শৃঙ্খলার দর্শন: বকা না দিয়ে শিশুকে নিয়মানুবর্তী করার কৌশল।

......

সন্ধ্যা ৬টা। আপনি অফিস বা রান্নাঘরের কাজ শেষে প্রচণ্ড ক্লান্তি নিয়ে ড্রয়িংরুমে এলেন। দেখলেন পুরো ঘরজুড়ে বাচ্চার খেলনা ছড়ানো। আপনি শান্ত গলায় বললেন, "বাবা, খেলনাগুলো একটু গুছিয়ে রাখো।" বাচ্চা কোনো পাত্তাই দিল না। দ্বিতীয়বার বলার পরও সে যখন টিভি দেখা চালিয়ে গেল, তখন আপনার মাথার রগ দপদপ করে উঠল। আপনি চিৎকার করে উঠলেন, "তোকে না হাজার বার বলেছি খেলার পর জিনিস গুছিয়ে রাখতে? আর একদিন যদি খেলনা ফ্লোরে দেখি, সব ডাস্টবিনে ফেলে দেব!" ধমক খেয়ে বাচ্চাটা ভয় পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে খেলনা গোছাতে শুরু করলো।

আপনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলেন, "যাক, কাজ তো হলো! বাচ্চাদের সাথে চিৎকার না করলে এরা কথা শুনতেই চায় না।" কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবেছেন, জাপানের স্কুলগুলোতে বাচ্চারা কীভাবে সম্পূর্ণ একা নিজেদের ক্লাসরুম এবং টয়লেট পরিষ্কার করে? সাবওয়েতে বা রেস্টুরেন্টে জাপানি বাচ্চারা কীভাবে এত শান্ত হয়ে বসে থাকে? তাদের বাবা-মা তো তাদের ওপর জনসমক্ষে চিৎকার করেন না!

এর রহস্য লুকিয়ে আছে জাপানিদের প্যারেন্টিংয়ের একটি বিশেষ দর্শনে, যাকে বলা হয় 'শিতসুকে' (Shitsuke)। কিডোরা স্মার্ট প্যারেন্টিং-এর আজকের এই ইন-ডেপ্থ এবং মনস্তাত্ত্বিক আর্টিকেলে আমরা জানবো, জাপানিদের এই অসাধারণ 'শিতসুকে' দর্শন আসলে কী, এটি কীভাবে বাচ্চার ব্রেনে কাজ করে এবং বকা না দিয়েও সন্তানকে কীভাবে একজন আত্ম-নিয়ন্ত্রিত (Self-disciplined) মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন।

বিজ্ঞান কী বলছে: 'ইন্টারনাল মোটিভেশন' এবং ব্রেনের মিরর নিউরন

'শিতসুকে' (Shitsuke) শব্দটির জাপানি অর্থ হলো 'বীজ বপন করা' বা 'অভ্যস্ত করা'। এটি শাস্তি দেওয়া নয়, বরং ভালো অভ্যাসের বীজ বুনে দেওয়া। আধুনিক চাইল্ড নিউরোসায়েন্স ঠিক এই কথাটিই বলে:

ব্রেনের মিরর নিউরন (Mirror Neurons):

জাপানিরা বিশ্বাস করে বাচ্চারা কথা শুনে শেখে না, তারা দেখে শেখে। বাচ্চার ব্রেনে 'মিরর নিউরন' থাকে, যা বাবা-মায়ের কাজগুলোকে স্ক্যান করে কপি বা নকল করতে সাহায্য করে। আপনি যখন চিৎকার করেন, বাচ্চার ব্রেনও চিৎকার করতে শেখে। আর আপনি যখন শান্তভাবে কাজ করেন, তার ব্রেনও শান্ত থাকতে শেখে।

ইন্টারনাল বনাম এক্সটারনাল মোটিভেশন:

আপনি যখন ধমক দিয়ে খেলনা গোছাতে বলেন, তখন বাচ্চার ব্রেনের 'অ্যামিগডালা' (ভয়ের কেন্দ্র) সক্রিয় হয়। সে ভয়ে কাজ করে (External Motivation)। কিন্তু আপনি না থাকলে সে আর ওই কাজ করবে না। 'শিতসুকে' বাচ্চার 'প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স' (যুক্তি বোঝার অংশ)-কে ব্যবহার করে তাকে ভেতর থেকে উপলব্ধি করতে শেখায় (Internal Motivation) যে কাজটি কেন করা উচিত।

প্যারাডাইম শিফট: মিথ বনাম বাস্তবতার চরম সত্য

মিথ: বকা বা মারধর ছাড়া বাচ্চাদের কন্ট্রোল বা শাসন করা সম্ভব নয়।

বাস্তবতা: বকা দিলে সাময়িকভাবে কাজ হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাচ্চার ব্রেন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং সে মিথ্যা বলতে শেখে। 'মডেলিং' বা নিজে করে দেখানোর মাধ্যমে বাচ্চাকে সবচেয়ে ভালো শাসন করা যায়।

মিথ: শৃঙ্খলার অর্থ হলো বাবা-মায়ের সব কমান্ড বা নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা।

বাস্তবতা: শৃঙ্খলার আসল অর্থ অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং 'স্ব-নিয়ন্ত্রণ' বা সেলফ-ডিসিপ্লিন শেখা। বাচ্চা যেন নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে পারে এবং বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেটাই শৃঙ্খলার আসল উদ্দেশ্য।

মিথ: বারবার বলে বলে কান ঝালাপালা না করলে বাচ্চারা নিয়ম শেখে না।

বাস্তবতা: বারবার লেকচার দিলে বাচ্চার ব্রেনে 'হ্যাবিচুয়েশন' (Habituation) বা অভ্যস্ততা তৈরি হয়। তখন বাচ্চা বাবা-মায়ের কথাগুলোকে ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ হিসেবে ইগনোর বা ফিল্টার আউট করতে শেখে।

অ্যাকশন ব্লুপ্রিন্ট: বকা না দিয়ে 'শিতসুকে' চর্চার স্মার্ট গাইড

চিৎকার করে শাসন করার এই বিষাক্ত চক্র থেকে বেরিয়ে এসে বাচ্চার মধ্যে স্ব-নিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে আজ থেকেই এই ব্লুপ্রিন্টটি অনুসরণ করুন:

ধাপ ১: 'শো, ডোন্ট টেল' (Show, Don't Tell)

কী করবেন: মুখ দিয়ে নির্দেশ না দিয়ে নিজের কাজের মাধ্যমে বাচ্চার সামনে উদাহরণ তৈরি করুন।

কীভাবে করবেন: বাচ্চাকে "খেলনা গুছিয়ে রাখো" বলে চিৎকার করার বদলে, নিজে খেলনার বাক্সের কাছে বসে শান্ত গলায় বলুন, "চলো, আমরা দুজনে মিলে লাল খেলনাগুলো আগে বক্সে রাখি, তারপর নীলগুলো রাখবো।" মিরর নিউরনের প্রভাবে বাচ্চাও আপনার সাথে নিজে থেকেই হাত মেলাবে।

ধাপ ২: নিয়মের পেছনের 'কেন' বা লজিক বুঝিয়ে বলুন

কী করবেন: শুধু "না" না বলে, কেন না বলছেন তার কারণ বাচ্চার লজিক্যাল ব্রেন বা প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সকে বুঝিয়ে দিন।

কীভাবে করবেন: "দেয়ালে রং করবি না বলছি!"—এমন ধমক না দিয়ে বাচ্চার চোখের লেভেলে বসে বলুন, "দেয়ালে রং করলে তো দেয়ালটা নষ্ট হয়ে যায়, দেখতে খারাপ লাগে। তোমার রং করার জন্য এই যে সুন্দর খাতা, তুমি চাইলে এখানে ইচ্ছামতো আঁকতে পারো।"

ধাপ ৩: 'রুটিন' এবং 'কন্সিস্টেন্সি' বজায় রাখুন

কী করবেন: জাপানি শিশুদের মতো শৃঙ্খলার বীজ বুনতে একটি নির্দিষ্ট রুটিনের চর্চা করুন, যা প্রতিদিন একই রকম থাকবে।

কীভাবে করবেন: ঘুমানো, খাওয়া বা খেলার জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক রাখুন। আপনি আজ মুড ভালো থাকলে খেলনা ফ্লোরে পড়ে থাকলেও কিছু বললেন না, আবার কাল মুড খারাপ থাকলে প্রচণ্ড বকা দিলেন—এমনটা করবেন না। প্রতিদিন একই নিয়ম (Consistency) বাচ্চার ব্রেনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শৃঙ্খলার সাথে অভ্যস্ত করে তোলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: 'কড়া শাসন' বনাম 'আদর দিয়ে মাথায় তোলা'

আমাদের দেশের প্যারেন্টিং সাধারণত দুটি এক্সট্রিম বা চরম পন্থায় বিভক্ত। একদল বাবা-মা আছেন যারা মনে করেন, "বাপের এক ধমকেই ছেলে সোজা হয়ে থাকবে, এটাই আসল শাসন!" তারা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেন। অন্যদিকে আরেকদল বাবা-মা আছেন যারা বাচ্চার অতিরিক্ত মায়ায় পড়ে তাকে কোনো কাজই করতে দেন না। বাচ্চার প্লেটটা পর্যন্ত নিজে হাতে ধুয়ে দেন এবং বলেন, "বড় হলে ঠিকই শিখবে।"

জাপানিদের 'শিতসুকে' ঠিক এই দুই চরমপন্থার মাঝখানের একটি চমৎকার ব্যালেন্স। তারা বাচ্চাকে মারে না বা ধমক দেয় না, আবার বাচ্চার কাজগুলো নিজেরাও করে দেয় না। তারা শুধু বাচ্চার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে গাইড করে। আমাদের সমাজের এই 'ভয় দেখিয়ে শাসন করা' অথবা 'সব কাজ নিজে করে দেওয়ার' মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে, আমরা কখনোই আমাদের সন্তানদের স্বাধীন এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়তে পারবো না।

প্রিয় বাবা এবং মা,

শাসন করা বা ডিসিপ্লিন শেখানো মানে বাচ্চাকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শাস্তি দেওয়া নয়। 'ডিসিপ্লিন' শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ 'ডিসিপ্লিনা' থেকে, যার অর্থ হলো শিক্ষা দেওয়া বা গাইড করা। আপনার বাচ্চা কোনো রোবট নয় যে আপনি সুইচ চাপলেই সে সব কাজ নিখুঁতভাবে করে ফেলবে। সে শিখছে, সে ভুল করছে এবং এই ভুল করার অধিকার তার আছে। আপনি যখন সারাদিনের ক্লান্তির পর তার ওপর চিৎকার করে ফেলেন, তখন নিজেকে দোষারোপ করে হতাশ হবেন না। আমরা সবাই মানুষ। কিন্তু পরের দিন থেকে তাকে আর ধমক না দিয়ে, তার হাতটা ধরে তাকে কাজটা শিখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন। বিশ্বাস করুন, আপনার বকার আওয়াজ তার ব্রেনে যতটা না প্রভাব ফেলবে, আপনার এই শান্ত গাইডেন্স তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী হয়ে তার সারাজীবনের সঙ্গী হবে। আপনার ভালোবাসাময় এই ছোট ছোট শিক্ষাই তাকে একদিন একজন দারুণ শৃঙ্খলাপরায়ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে!

@ কিডোরা স্মার্ট কমিউনিটি:


১৮


উত্তর ইতালির ট্রেন্টো শহরে প্রতি বছর এক অদ্ভুত ও মজার শাস্তির মুখোমুখি হন স্থানীয় প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তিত্ব।

'লা তোঙ্কা' (La Tonca) নামের এই ঐতিহাসিক প্রথাটি উদযাপিত হয় শহরের বিখ্যাত 'ফেস্তে ভিজিলিয়ানে' উৎসবের সময়।

একটি প্রতীকী "শাস্তির আদালত" এমন একজন ব্যক্তিকে বেছে নেয়, যিনি বিগত বছরে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত বা হাস্যকর কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

আর তাদের শাস্তি?

আদিগে নদীতে খাঁচাসহ ঝুলিয়ে দেওয়া!

তবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা গুঞ্জনের বিপরীতে, কোনো আসল রাজনীতিবিদ বা সেলিব্রিটিকে সত্যিই নদীর ঠান্ডা জলে চুবিয়ে দেওয়া হয় না। আধুনিক এই আয়োজনে ব্যঙ্গাত্মক ও উপভোগ্য পরিবেশনা হিসেবে একজন ডামি বা প্রতিনিধি ব্যবহার করা হয়।

এই প্রথার শেকড় লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার অতীতে, যখন অপরাধীদের খাঁচায় বন্দি করে নদীতে চুবানোর মতো বাস্তব ও কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো।

আজকের দিনে কাউকেই আর শারীরিকভাবে শাস্তি দেওয়া হয় না।

তবুও, ট্রেন্টোর মানুষ মজার ছলে হলেও ভুল সিদ্ধান্তগুলোকে ঠিকই সবার চোখের সামনে মনে করিয়ে দেয়!




১৯




ইতালির ভেনিস নগরী বৃষ্টির পানির উপর নির্ভরশীল ছিল। ভেনিসকে ঘিরে যে উপহ্রদটি আছে তার পানি লবণাক্ত। তাই ভেনিসের প্রাচীন অধিবাসীরা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের একটি সিস্টেম বানায়। বৃষ্টি হলে এটাতে বিশেষভাবে তৈরী পাথরের পৃষ্ঠ দিয়ে চুইয়ে পানি পড়ত। তারপর তা বালির একটি স্তরের মাধ্যমে ছাঁকা হয়ে কূপে জমা হত।

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। এটা নতুন কিছু নয়।

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করে রাখাকে বর্তমানে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং বলা হয়।

বিশ্বব্যাপী রেইনওয়াটার হারভেস্টিংয়ের জনপ্রিয়তা এখন বাড়ছে। থাইল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ইসরায়েল এবং আফ্রিকার কিছু দেশ রেইনওয়াটার হারভেস্টিং প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে।

রেইন হারভেস্টিং দ্বারা বিশাল পরিমাণে পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা সম্ভব। সিস্টেমটি সঠিকভাবে পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ করলে দীর্ঘসময় ধরে সংরক্ষিত পানি ব্যবহারোপযোগী রাখা যায়।

থাইল্যান্ডে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেইন হারভেস্টিং করা হয়। সেদেশের সরকার ৮০’র দশক থেকেই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় করতে উদ্যোগ নিয়েছিল। তামিলনাড়ুতে ২০০১ সালে প্রতিটি বিল্ডিংয়ে বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেখানকার সব পল্লি অঞ্চলে রেইন হারভেস্টিং কাজে লাগানো হয়। সমগ্র তামিলনাড়ুতে পোস্টারিংয়ের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংগ্রহে মানুষকে সচেতন করা হয়।

বৃষ্টির পানি হলো আল্লাহর নিয়ামত যা কারেন্ট, জ্বালানি, বিল ইত্যাদি খরচ ছাড়াই পাওয়া যায়। সঠিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা গেলে এটিই সবচেয়ে নিরাপদ বিশুদ্ধ পানির উৎস। খাওয়া, ধোয়ামোছা, রান্নাবান্না, গোসল, গাছপালা ও পশুপাখিকে সরবরাহ ইত্যাদি কাজে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করা যায়। 

বাংলাদেশেও রেইন হারভেস্টিং অত্যন্ত উপযোগী ও কার্যকর। বাংলাদেশের অনেক শহুরে এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। রেইন হারভেস্টিং এর মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হলে ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমানো যাবে।

বর্তমানে সিঙ্গাপুর, টোকিও, সিডনি এইসব শহরে নতুন ভবন নির্মাণ করলে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং সিস্টেম ইন্সটল করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

বাড়িওয়ালারা রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ের জন্য যে টাকা ইনভেস্ট করবে তা দুই-তিন বছরের মধ্যে উঠে আসবে। এককালীন খরচের মাধ্যমে একটি রেইন হারভেস্টিং প্ল্যান্ট স্থাপন করলে বছরের পর বছর এর সুফল ভোগ করা যায়।

একটি সাধারণ বাড়ির জন্য রেইন হারভেস্টিং সিস্টেম তৈরি করলে কী পরিমাণ পানি রিজার্ভ করা যাবে এবং সেটি কতদিন চলবে তা নির্ভর করে বাড়ির ছাদের আকার, এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং পরিবারের দৈনন্দিন পানির চাহিদার উপর।

সাধারণত,

রেইন হারভেস্টিং প্ল্যান্টের ৩ টি অংশ থাকে:

১। ক্যাচমেন্ট এরিয়া: যে পৃষ্ঠে সরাসরি বৃষ্টিপাত হয় তাকে ক্যাচমেন্ট এরিয়া বলে। এটা আপনার বাড়ির ছাদ, উঠান কিংবা ভূপৃষ্ঠও হতে পারে। ক্যাচমেন্ট এরিয়া আপনার হার্ভেস্টিং সিস্টেমের জন্য রেইন ওয়াটার কালেক্ট করে। রুফটপ হার্ভেস্টিংয়ে ক্যাচমেন্ট এরিয়া হলো ছাদ।

২। স্টোরেজ: সংগ্রহ করা বৃষ্টির পানি স্টোরেজ ট্যাঙ্কে ডাইভার্ট করা হয়।

৩। ফিল্টারিং সিস্টেম: বৃষ্টির পানি সাধারণত বিশুদ্ধ। কিন্তু উন্মুক্ত ক্যাচমেন্ট এরিয়া থেকে এই পানিতে ধুলাবালি, ময়লা, লতাপাতা ইত্যাদি মিশে। তাই এই পানি খাওয়ার আগে ফিল্টার করা জরুরী।

কিছু রেইন হারভেস্টিং মডেল:

১। রেইন ব্যারেল: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো ‘রেইন ব্যারেল’। এই সিস্টেমের জন্য অতিরিক্ত জায়গা ও রক্ষণাবেক্ষণ কোনোটিই প্রয়োজন নেই। কেবল বাজার থেকে একটি ব্যারেল কিনে ছাদ থেকে পানি নামার পাইপের নীচে স্থাপন করলেই হলো। রেইনওয়াটার হারভেস্টিং শুরু হয় বাড়ির ছাদ থেকে। তাই ছাদ পরিষ্কার রাখা প্রথম কাজ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এর ক্যাপাসিটি খুব কম, মাত্র ২০০-৩০০ লিটার। আর এটাতে ফিল্টারিং সিস্টেম থাকেনা।

২। রুফটপ রেইন হারভেস্টিং: রুফটপ রেইন হারভেস্টিং হচ্ছে সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি, যার মাধ্যমে বাড়ির ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ছাদে পড়া বৃষ্টির পানি পাইপের মাধ্যমে একটি স্টোরেজ ট্যাঙ্কে জমা করা হয়। DIY হলে এটায় জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে না। কিছু সাধারণ উপকরণ এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেই কম খরচে বানাতে পারবেন। পরে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টমাইজও করতে পারবেন।

৩। সোলার+রেইন হার্ভেস্টিং: বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সৌর প্যানেল স্থাপন করা হলে একটা বিশাল এরিয়া ঢাকা পড়ে যায়। এক্ষেত্রে সোলার প্যানেলকে ওয়াটার ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় রুপান্তর করা যেতে পারে। তখন বৃষ্টির সময় সৌর প্যানেলের পৃষ্ঠ থেকে পানি আহরণ করা যাবে।

৪। রেইন সসার: রেইন সসার একটি উল্টানো ছাতা সদৃশ জিনিস যা দিয়ে বৃষ্টির সময় পানি আহরণ করা যায়। এই পদ্ধতিটি পানি দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা কমায় কারণ ছাদ কিংবা অন্যান্য খোলা পৃষ্ঠে ধুলা-ময়লা থাকে। রেইন সসার দিয়ে সংগ্রহকৃত পানি সরাসরি পান করা যেতে পারে।

রেইন হারভেস্টিং সিস্টেম তৈরিতে খরচের পরিসর:

১) ছোট সিস্টেম: ১০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা। এর মধ্যে একটি ছোট ট্যাঙ্ক (৫০০-১০০০ লিটার), পাইপলাইন এবং ফিল্টারিং সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত।

২) মাঝারি সিস্টেম: ৫০,০০০ থেকে ১০০,০০০ টাকা। ২০০০-৫০০০ লিটারের ট্যাঙ্ক, পাইপলাইন এবং ফিল্টারিং সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত।

৩) বৃহৎ সিস্টেম (বাণিজ্যিক বা কৃষিকাজের জন্য): ১০০,০০০ থেকে ৫০০,০০০ টাকা বা আরও বেশি। বড় ট্যাঙ্ক (১০,০০০ লিটার বা তার বেশি), পাইপলাইন এবং ফিল্টারিং সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত।

রেইন হারভেস্টিং থেকে পানি সংগ্রহের পরিমাণ নির্ভর করে যে কয়টি বিষয়ের উপর:

১) বৃষ্টিপাতের পরিমাণ: বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২০০০-৩০০০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে অধিক পরিমাণ পানি সংগ্রহ সম্ভব। একটি ছোট বাড়ির ছাদে (৫০ বর্গমিটার) সঠিক ব্যবস্থাপনায় প্রতি বর্ষাকালে ৭৫,০০০-৮০,০০০ লিটার পানি সংগ্রহ করা সম্ভব।

২) ক্যাচমেন্ট এরিয়ার সাইজ: আপনার বাড়ির ছাদ বা সংগ্রহের পৃষ্ঠতলের আকার অনুসারে পানির পরিমাণ নির্ধারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি ১০০ বর্গমিটার ছাদ থাকে এবং বছরে ২০০০ মিমি বৃষ্টিপাত হয়, তবে আপনি প্রতি বছর প্রায় ২০০,০০০ লিটার পানি সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে বাস্তবে আপনি এই পানির মোটামুটি ৭০-৮০% সংগ্রহ করতে পারবেন। বাকিটা বৃষ্টির শুরুতে ছাদ পরিষ্কারের জন্য এবং পরে নানাভাবে লস যাবে।

এক বছরে পানির পরিমাণ হিসাবের ফর্মুলা:

পানির পরিমাণ (লিটার) = ক্যাচমেন্ট এরিয়ার আকার (বর্গমিটার) × বৃষ্টিপাতের পরিমাণ (মিমি) × সংগ্রহের দক্ষতা (৭০-৮০%)

উদাহরণ: ১০০ বর্গমিটার ছাদ × ২০০০ মিমি বৃষ্টি × ৭৫% (সংগ্রহের দক্ষতা) = ১৫০,০০০ লিটার পানি (প্রতি বছর)

পানি কতদিন ধরে সংরক্ষণ করা যায়?

রেইন হারভেস্টিং সিস্টেমে সাধারণত পরিষ্কার ও ফিল্টার করা পানি ৬ মাস পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য থাকে। যদি স্টোরেজ ট্যাঙ্ক ভালোভাবে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখা হয় তাহলে পানি ১ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব।

সংগৃহীত পানি কতদিন চলবে?

সংগ্রহ করা পানি কতদিন চলবে তা নির্ভর করে দৈনিক পানির চাহিদার উপর। সাধারণত একটি পরিবারের দৈনিক পানি খরচের জায়গাগুলো হচ্ছে- খাওয়া ও রান্নার পানি, গোসল ও শৌচকার্য, কাপড় ও বাসনপত্র ধোয়া, বাগান পরিচর্যা ইত্যাদি। বাংলাদেশে একটি সাধারণ পরিবারে (৪-৫ জনের) দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ৩০০-৫০০ লিটার হতে পারে।

@ Captain Green 


২০


১৯৭২ সালের এক বিভীষিকাময় দিন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভয়াবহ বোমার গর্জন আর ধোঁয়ার মধ্যে হারিয়ে যায় এক হাসিখুশি পরিবার। স্বজন হারানোর চরম শোক আর মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে বাবা হো ভ্যান থান তাঁর মাত্র দুই বছরের শিশুসন্তান হো ভ্যান লাংকে বুকে জড়িয়ে ছুটে যান গহীন অরণ্যের দিকে। কে জানত, লোকালয় ছেড়ে পালানোর সেই যাত্রাই এক একাকী ও বিচিত্র অধ্যায়ের সূচনা করবে!

​জঙ্গলের অন্ধকারই হয়ে ওঠে তাঁদের নতুন আশ্রয়। সময় গড়ায়, কিন্তু সভ্যতার কোনো ছায়া তাঁদের ছোঁয়নি। পৃথিবীর মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে কেটে যায় দীর্ঘ ৪১টি বছর। গাছের ছাল-বাকল আর পাতা দিয়ে শরীর ঢেকে, বুনো ফলমূল আর শিকার করা পশুপাখি খেয়ে তারা টিকে থাকেন প্রকৃতির কঠিন নিয়মে। লাং বড় হতে থাকেন আধুনিক জীবনের আলো, চোখধাঁধানো প্রযুক্তি কিংবা সামাজিক নিয়মকানুন ছাড়াই। প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এই মানুষের কাছে নারী জাতির অস্তিত্বও ছিল সম্পূর্ণ অজানা এক বিস্ময়।

​অবশেষে ২০১৩ সালে, যখন এই বাবা-ছেলেকে জঙ্গল থেকে লোকালয়ে ফিরিয়ে আনা হয়, তখন পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে দেখে এক জীবন্ত অলৌকিক গল্প। পৃথিবীর মানুষ তাঁকে নাম দেয় 'বাস্তবের টারজান'। ইট-কাঠের এই দ্রুতগতির আধুনিক যুগে এসে লাং যেন এক আলাদা সময়ের যাত্রী, যিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরণীর আদিম বুকে বেঁচে থাকার এক অনন্য ইতিহাস গড়ে গেছেন।



২১


ইসলামী স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক, রসায়নবিদ ও দার্শনিক আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল-রাযী (৮৬৫–৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ) জ্ঞানচর্চায় অন্ধ অনুকরণ বা ‘তাকলিদ’-এর তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি বুদ্ধিবৃত্তি, যুক্তি এবং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে সত্য অনুসন্ধানের সর্বোচ্চ মাধ্যম মনে করতেন। 

আল-রাযীর এই অবস্থান, তাঁর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. অন্ধ অনুকরণ (তাকলিদ) বনাম যুক্তি ও বিজ্ঞান:

আল-রাযী বিশ্বাস করতেন যে, ঈশ্বর মানুষকে 'আকল' বা বুদ্ধি দিয়েছেন যাতে মানুষ ভালো-মন্দ এবং সত্য-মিথ্যা বিচার করতে পারে।

বুদ্ধির শ্রেষ্ঠত্ব:

তাঁর মতে, বিজ্ঞান ও দর্শনের অগ্রগতি কেবল তখনই সম্ভব যখন মানুষ পূর্বসূরিদের অন্ধ অনুকরণ না করে নিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যুক্তিপ্রয়োগ করে।

তাকলিদের বিরোধিতা:

তিনি মনে করতেন, ধর্মীয় ক্ষেত্রে অন্ধ অনুকরণ মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং সমাজে অসহিষ্ণুতার জন্ম দেয়। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ফি ফিলসাফাত আল-মুতাফালসিফীন' (দার্শনিকদের দর্শন) এবং অন্যান্য লেখায় তিনি মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেই মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

২. কোরআনের সাহিত্যিক মোজেজা (ই’জায):

তাঁর বিতর্কিত গ্রন্থ (যেমন: 'মাখারিফুল আম্বিয়া' বা নবীদের ছলচাতুরী—যার অস্তিত্ব এখন মূলত সমালোচকদের উদ্ধৃতিতে পাওয়া যায়) অনুযায়ী তাঁর যুক্তিগুলো ছিল নিম্নরূপ:

আপেক্ষিকতার যুক্তি:

আল-রাযী দাবি করেন যে, কোনো গ্রন্থের সাহিত্যিক মান অনন্য বা চমৎকার হতেই পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তা অলৌকিক বা ডিভাইন (ঐশ্বরিক)।

বিকল্প রচনার সম্ভাবনা:

তিনি যুক্তি দেন যে, আরবের কবি ও সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্ম, কিংবা ইউক্লিডের জ্যামিতির বই, অথবা টলেমির জ্যোতির্বিদ্যার বইগুলোও নিজ নিজ ক্ষেত্রে অনন্য। যদি কোরআনকে এর সাহিত্যিক মানের জন্য মোজেজা বলা হয়, তবে বিজ্ঞানের এসব আকর গ্রন্থকেও মোজেজা বলা উচিত।

সাংস্কৃতিক প্রভাব:

তিনি মনে করতেন, মানুষ যে ভাষায় বা সংস্কৃতিতে বড় হয়, তার প্রতি তার এক ধরণের অন্ধ মোহ তৈরি হয়। তাই আরবদের কাছে কোরআনের ভাষা অলৌকিক মনে হলেও অন্য ভাষার মানুষের কাছে তা সাধারণ মনে হতে পারে।

৩. সমালোচনা:

আল-রাযী কেবল কোরআনের সাহিত্যিক মোজেজাকেই চ্যালেঞ্জ করেননি, বরং তিনি 'নবুয়ত' বা ঐশ্বরিক বাণীর ধারণার ওপরও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর মূল আপত্তিগুলো ছিল:

মানব সমতা:

ঈশ্বর সব মানুষকে সমান বুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বিশেষ বার্তা দিয়ে অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।

জ্ঞানের উৎস:

মানুষের জন্য বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তিই যথেষ্ট। আধ্যাত্মিক বাণীর চেয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান মানবজাতির বেশি কল্যাণ বয়ে আনে।

৪. মুসলিম বিশ্বে প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা:

আল-রাযীর এই চরম যুক্তিবাদী এবং অপ্রথাবিরোধী অবস্থানের কারণে সমসাময়িক ও পরবর্তীকালের মুসলিম স্কলার এবং দার্শনিকদের দ্বারা তিনি তীব্রভাবে সমালোচিত হন।

আবু হাতিম আল-রাযী:

ইসমাইলি ঘরানার এই চিন্তাবিদ আল-রাযীর সাথে সরাসরি বিতর্কে লিপ্ত হন এবং তাঁর ‘কিতাব আলাম আল-নুবুওয়াহ’ গ্রন্থে আল-রাযীর যুক্তিগুলোকে খণ্ডন করেন।

আল-বিরুনী ও ইবনে সিনা:

আল-রাযীর বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করলেও, তাঁর ধর্মীয় ও নবুয়ত সংক্রান্ত দর্শনকে তারা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন।

বই নিষিদ্ধকরণ:

আল-রাযীর ধর্মতাত্ত্বিক ও দর্শন বিষয়ক বইগুলো এতটাই বিতর্কিত ছিল যে, রক্ষণশীল সমাজ ও শাসকদের কোপানলে পড়ে সেগুলোর সিংহভাগই ধ্বংস হয়ে যায়। আজ আমরা তাঁর এই চ্যালেঞ্জগুলোর কথা মূলত তাঁর সমালোচকদের বইয়ে দেওয়া উদ্ধৃতি থেকেই জানতে পারি।

সারসংক্ষেপ:

আল-রাযীর কাছে বিজ্ঞান ও যুক্তি ছিল পরম সত্য। তিনি মনে করতেন, মোজেজা বা অলৌকিকতার দাবি মানুষকে অন্ধ বিশ্বাসের দিকে ঠেলে দেয়, যা বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার পরিপন্থী। 



২২


কাঁচা ডিমের ভয়ানক ব্যাকটেরিয়া থেকে বাঁচতে এবং শতভাগ পুষ্টি পেতে ডিম খাওয়ার সঠিক বৈজ্ঞানিক নিয়ম

পেশি মজবুত করার আশায় অনেকেই প্রতিদিন সকালে কাঁচা বা আধা সেদ্ধ ডিম খেয়ে নিজেদের শরীরকে ভয়ংকর বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। কাঁচা ডিমে থাকা সালমোনেলা নামক প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়া অন্ত্রে প্রবেশ করে ভয়াবহ ফুড পয়জনিং এবং ডায়রিয়া তৈরি করে। না জেনে এই ভুল পদ্ধতিতে ডিম খাওয়ার কারণে শরীরের প্রোটিনের ঘাটতি তো পূরণ হয়ই না, উল্টো লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হয়।

আমেরিকান ডায়েটেটিক অ্যাসোসিয়েশনের পুষ্টিবিজ্ঞানীদের একটি আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে পূর্ণাঙ্গ সেদ্ধ ডিমের প্রোটিন মানুষের পরিপাকতন্ত্র সবচেয়ে দ্রুত শোষণ করতে পারে। গবেষকরা জানিয়েছেন ফুটন্ত পানিতে ডিম সেদ্ধ করার ফলে এর ক্ষতিকর জীবাণু মারা যায় এবং অ্যামিনো এসিডগুলোর গঠন এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যা পেশি গঠনে সরাসরি কাজ করে। কাঁচা ডিমের তুলনায় সেদ্ধ ডিম থেকে শরীর প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ কার্যকর প্রোটিন গ্রহণ করতে সক্ষম হয়।

ডিমের সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগুণ পেতে একটি পাত্রে পানি ফুটিয়ে তাতে ডিমগুলো অন্তত বারো থেকে পনেরো মিনিট ভালোভাবে সেদ্ধ করে নিন। কুসুম সম্পূর্ণ শক্ত হয়ে যাওয়ার পর খোসা ছাড়িয়ে সামান্য গোলমরিচের গুঁড়ো ছিটিয়ে প্রতিদিন সকালের নাস্তায় খাওয়ার অভ্যাস করুন। বাজার থেকে কাঁচা ডিম কিনে আনার পর তা খুব ভালোভাবে ধুয়ে ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হবে যেন বাইরের জীবাণু ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।

কাঁচা ডিম খাওয়ার ভয়ংকর ঝুঁকি থেকে নিজেকে বাঁচাতে আজ থেকেই সঠিক নিয়মে ডিম সেদ্ধ করে খাওয়ার পদ্ধতিটি আপন করে নিন। সঠিক খাদ্যাভ্যাসের এই ছোট একটি পরিবর্তন আপনার শরীরকে পুষ্টিহীনতা থেকে বাঁচিয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী করে তুলবে। @ স্বাস্থ্য পরামর্শ


২৩


দশটা লোককে একই কাজ করতে দেখলে আপনার মনে হতে পারে যে, তারা বুঝি সবাই কমবেশি একই ধরনের মানুষ। কিন্তু একই কাজ একেকজন মানুষ করে একেক চিন্তা মাথায় নিয়ে। রেনেসাঁর সময় ইউরোপের অনেক মানুষ নিজেদের বাড়ির একটি ঘর কিংবা বড় আলমারিতে বিভিন্ন দুর্লভ জিনিস সাজিয়ে রাখতেন। এইসব সগ্রহের মধ্যে থাকত বিভিন্ন অজানা প্রাণীর হাড় ও জীবাশ্ম, বিরল প্রজাতির ঝিনুক, খনিজ পাথর, সংরক্ষিত প্রাণীর দেহ ও অজানা প্রজাতির উদ্ভিদ, দূরদেশ থেকে আনা শিল্পকর্ম ও প্রত্নবস্তু। এইসব কালেকশনকে বল হতো ক্যাবিনেট অব কিউরিওসিটিস। একটা পর্যায়ে লন্ডন, প্যারিস ও বার্লিনের ক্যাবিনেট অব কিউরিওসিটিসগুলো অদ্ভুত সব প্রাণীর নমুনা দিয়ে ভরে উঠছিল। এগুলো পরবর্তীতে জীববিজ্ঞানের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। 

কিন্তু এই কালেকশন একেকজন মানুষ করত একেক কারণে। কেউ এগুলো সংগ্রহ করত কৌতূহল থেকে। তিনি হয়ত অদ্ভুত সব জীবাশ্ম, প্রাণীর হাড়, শামুকের খোলস বা বিরল পাথর দেখে প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা করতেন। কেউ কেউ এই একই কাজ করত নিজের সম্পদ ও মর্যাদা দেখাতে। তাদের কাছে এটা ছিল তার সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। আবার অনেকেই এই কাজটা করত গবেষণার জন্য। কেউ কেউ কাজটা করতেন স্রেফ দূরদেশ সম্পর্কে জানার জন্য। আবার এই একই কাজ অনেকে করতেন সবাইকে অবাক করে দেওয়ার জন্য।

কিন্তু সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে এই কাজটা খুবই অদ্ভুত। মানুষ কেন অদুভত প্রাণীর হাড় দাম দিয়ে কিনে নিজের বাড়িতে সাজিয়ে রাখবে? কিন্তু আপনার আমার কাছে অদ্ভুত মনে হলেও পৃথিবীতে এইসব অদুভত কাজ করার মানুষের সত্যি অভাব নেই। পৃথিবীর সবাই আসলে আপনার আমার মত করে ভাবে না। আসলে, আজকাল রোজগার করা ছাড়া বাকি সব কাজকেই আমরা উদ্ভট ও অপ্রয়োজনীয় মনে করি। @ হিমাংশু কর


২৪



Solomon’s Paradox...

আপনি অন্যকে যতটা ভালো পরামর্শ দিতে পারেন, নিজেকে ততটা ভালো ভাবে গাইড করতে পারেন না। এটাই আসল কথা।

আমার ছোট্ট বন্ধুরা চলো তোমাদেরকে এক দেশের এক রাজার গল্প শোনাই বলছিলাম, রাজা সলোমনের কথা, তিনি ছিলেন যুগের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ। সারা দেশ থেকে লোকজন তাঁর কাছে এসে সমস্যার সমাধান জানত। কিন্তু নিজের জীবনে? তিনি অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজ্যও ভেঙে যায়। মনোবিজ্ঞানীরা এই ঘটনা থেকেই নাম দিয়েছেন Solomon’s Paradox.

সহজ ভাষায় বলতে গেলে: 

আমরা অন্যের সমস্যা দেখে খুব সহজেই বুঝতে পারি তার আসলে কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়। কিন্তু যখন সেই একই সমস্যা আমাদের নিজের হয়, তখন আবেগ, অহং আর ভয় আমাদের চোখ ঢেকে দেয়। ফলে তখন আমরা সেই একই বুদ্ধি আর যুক্তি ব্যবহার করতে পারি না।

উদাহরণস্বরুপ:

আপনার বন্ধু টক্সিক রিলেশনশিপে আটকে আছে। আপনি তাঁকে খুব পরিষ্কার করে বললেন' 'ভাই, এখান থেকে তুই বেরিয়ে আই। কারণ, এই সম্পর্ক তোকে শুধু কষ্ট দিচ্ছে।' কিন্তু যখন আপনি নিজেও একই অবস্থা কিংবা পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। তখন মনে হয়: আর একটু সময় দিই… হয়তো বদলাবে… আমিই হয়তো ভুল বুঝছি… এভাবেই বাকি সময়টা পার করে দেন কিছুই করতে পারেন না।

আচ্ছা বুঝেছি আপনার সাথে মিলে গেছে, তো আপনি কি এখান থেকে বের হতে চান..? আচ্ছা তাহলে শুনুন; এই প্যারাডক্স থেকে বেরোনোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো Self Distancing. অর্থাৎ নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে, তৃতীয় ব্যক্তির চোখ দিয়ে নিজের সমস্যাটা দেখা। নিজেকে জিজ্ঞেসও করতে পারেন। যদি এই সমস্যাটা আমার বন্ধুর হতো, তাহলে আমি তাঁকে কী পরামর্শ দিতাম? অদ্ভুতভাবে, এই ছোট্ট ট্রিকসটাই অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

তাই পরেরবার যখন নিজেও কোনো জটিল সমস্যায় আটকে যাবেন, তখন নিজেকে বলুন; আমি যদি অন্য কেউ হতাম, তাহলে কী করতাম? হয়তো তখনই সলোমনের সেই হারানো জ্ঞানটা ফিরে আসবে।

Philosopher In Town:



২৫


মস্তিষ্ক আসলে শেখে কীভাবে? গবেষণা বলছে, একবার কিছু চাওয়া বা ভাবা মস্তিষ্কে তেমন কোনো স্থায়ী ছাপ ফেলে না। বরং যা বারবার করা হয়, একই পরিস্থিতিতে একই আচরণ যতবার ঘটে, ততবার মস্তিষ্কের নিউরনগুলোর মধ্যে সংযোগ আরও দৃঢ় হতে থাকে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সিন্যাপ্টিক শক্তিশালীকরণ, যেখানে বারবার ব্যবহৃত স্নায়ুপথ ধীরে ধীরে এমন মসৃণ হয়ে ওঠে যে একসময় সচেতন চেষ্টা ছাড়াই আচরণটি ঘটে যায়। প্রথমবার সাইকেল চালানো শেখার কথা ভাবুন, প্রতিটি প্যাডেল ঘোরানো তখন সচেতন প্রচেষ্টা দাবি করে। কিন্তু কয়েকশো বার অনুশীলনের পর সেই একই কাজ হয়ে ওঠে স্বয়ংক্রিয়, শরীর নিজেই জেনে যায় কী করতে হবে।

এই নীতিটি শুধু আচরণেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তথ্যের ক্ষেত্রেও একইভাবে কাজ করে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ইলিউশরি ট্রুথ ইফেক্ট, অর্থাৎ মিথ্যা তথ্যকৃত্রিম সত্যতার বিভ্রম। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি বিবৃতি যতবার শোনা যায়, মস্তিষ্কের কাছে সেটি ততই পরিচিত মনে হতে থাকে, আর এই পরিচিতিকেই মস্তিষ্ক প্রায়ই ভুল করে বিশ্বাসযোগ্যতা বলে ধরে নেয়। এমনকি সম্পূর্ণ ভুল তথ্যও যদি বারবার শোনা যায়, তাহলে তা ধীরে ধীরে সত্যের মতো অনুভূত হতে শুরু করে। এখানেই লুকিয়ে আছে এক বিপজ্জনক সত্য, আমাদের মস্তিষ্ক সত্য যাচাই করে না, বরং পরিচিতি যাচাই করে।

তাহলে আমাদের ইচ্ছার কি তবে কোনো মূল্যই নেই? আসলে ইচ্ছা এখনও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কী অনুশীলন করা হবে তা প্রথমে ইচ্ছাই ঠিক করে দেয়। কিন্তু একবার ব্যায়াম করার ইচ্ছা কখনো অভ্যাস তৈরি করে না, বরং বারবার ব্যায়াম করাটাই অভ্যাস গড়ে তোলে। একইভাবে কিছু শেখার আকাঙ্ক্ষা কখনো দক্ষতা তৈরি করে না, বারবার অনুশীলনই দক্ষতার জন্ম দেয়। ইচ্ছা এখানে দরজা খুলে দেয় মাত্র, ভেতরে ঢোকার কাজটা করে পুনরাবৃত্তি।

এই সত্যটি মেনে নিলে জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যায়। প্রতিদিন যা আপনি নিজেকে বলেন, যা দেখেন, যা পড়েন এবং যা অনুশীলন করেন, তার প্রতিটিই ধীরে ধীরে আপনার মনের গঠন পাল্টে দিচ্ছে। নেতিবাচক চিন্তা যদি বারবার মনে আনা হয়, সেটিও একসময় মনের কাছে স্বাভাবিক ও সত্য মনে হতে শুরু করে, ঠিক যেমন মিথ্যা তথ্য বারবার শুনলে সত্যের মতো লাগে। বিপরীতভাবে ইতিবাচক অভ্যাস, নতুন দক্ষতা কিংবা গভীর মনোযোগও একইভাবে গড়ে ওঠে, শুধু সঠিক জিনিস বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে।

আমাদের প্রতিদিনের জীবনের বেশিরভাগ অংশই আসলে এমন সব আচরণ ও চিন্তার সমষ্টি, যা আমরা এতবার অনুশীলন করেছি যে এখন আর সেগুলো লক্ষ্যই করি না। সকালে দাঁত মাজা থেকে শুরু করে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে নিজের মতামত গঠন, সবকিছুর পেছনেই আছে এই একই নীতি, পুনরাবৃত্তি।

তাহলে প্রশ্ন হলো, আপনি প্রতিদিন কী পুনরাবৃত্তি করছেন? আপনার মনোযোগ কোথায় বারবার ফিরে যাচ্ছে? মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত শিখছে আপনার পুনরাবৃত্তি থেকেই, তাই প্রশ্নটা কখনোই এই নয় যে আপনি কী চান, বরং প্রশ্নটা হলো আপনি কী বারবার করছেন। কারণ শেষ পর্যন্ত আপনার জীবন গড়ে ওঠে আপনার অভিপ্রায় দিয়ে নয়, গড়ে ওঠে আপনার পুনরাবৃত্তি দিয়েই।  @Md-Al Mamun Riton



২৬



ভয় জন্মগত নয়, ভয় হয় সামাজিক।

একটা শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, সে কোনো ভয় নিয়ে আসে না। সে আ'গুন দেখে হাত বাড়িয়ে দেয়, উঁচু জায়গা থেকে ঝাঁপ দিতে চায়, অচেনা মানুষের সামনে নির্ভয়ে হাসে। তার চোখে পৃথিবীটা একটা বিশাল খেলার মাঠ। কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা তাকে শেখাই; এটা করিস না, পড়ে যাবি, অচেনা লোকের সাথে কথা বলিস না, ফেল করলে কী হবে?, সমাজ কী বলবে?

এভাবেই তার মধ্যে ভয়ের বীজ বপন করা হয়। 

ভয় আমাদের জিনে নেই, ভয় আছে সমাজের গল্পে। আমরা যেসব গল্প শুনি, যেসব সতর্কবাণী শুনি, যেসব ব্যর্থতার উদাহরণ দেখি, সেগুলোই আমাদের ভয়কে তৈরি করে। কেউ ভয় পায় ব্যর্থতার, কেউ সমালোচনার, কেউ প্রত্যাখ্যানের, কেউ আবার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার। এই ভয়গুলো আমাদের জন্মের সাথে আসেনি, এগুলো আমাদের চারপাশ থেকে সংগ্রহ করা।

বাস্তবে দেখুন: যে শিশুটি একদিন সাইকেল চড়তে ভয় পেত না, সে বড় হয়ে জীবনের অনেক সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পায়। যে মেয়েটি ছোটবেলায় মঞ্চে নাচতে চাইত, সে বড় হয়ে লোকে কী বলবে ভেবে স্বপ্নকে চেপে রাখে। 

কিন্তু সুসংবাদ হলো: যে ভয় শেখা যায়, সে ভয় ভাঙাও যায়।

আপনি যদি আজ নিজেকে প্রশ্ন করেন.? এই ভয়টা আসলে আমার নিজের, নাকি সমাজ আমাকে শিখিয়েছে? তাহলেই আপনি মুক্তির প্রথম ধাপে পা রাখবেন। তাই ছোট ছোট সাহসের অনুশীলন করুন। যেকোনো একটা ভয়কে চ্যালেঞ্জ করুন। একবার যখন আপনি দেখবেন যে যা ভয় পাচ্ছিলেন, তা আসলে এতটা ভয়ংকর নয়, তখন আপনার ভেতরের শিশুটা আবার জেগে উঠবে।

কিছু ভয়কে ভয় করুন, কিন্তু তাকে আপনার জীবনের চালক হতে দেবেন না। শুধু এতটুকু মনে রাখবেন, আপনার ভয়ের অনেকটাই আপনার নিজের নয়, এটা সমাজের ধার করা।

সেই ধার ফেরত দিয়ে, নিজের স্বপ্নকে আবার উড়তে দিন। আপনার জন্য শুভকামনা।

Philosopher In Town:



২৭



"সে খুব আত্মকেন্দ্রিক" — এই কথাটা বলার আগে

লোকটার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আপনি খেয়াল করেছেন, আলোচনাটা যেভাবেই শুরু হোক, শেষ হয় তার নিজের গল্পে এসে। আপনার বাবার অসুখের কথা বলছিলেন, দশ মিনিট পর জানলেন তার এক চাচার আরও কঠিন অসুখ হয়েছিল, এবং সেটা তিনি কীভাবে সামলেছিলেন।

আপনি বিরক্ত হয়ে ভাবলেন — মানুষটা ভীষণ নার্সিসিস্ট।

ক্রেইগ ম্যালকিন তাঁর বইয়ে ঠিক এই জায়গাটাতেই থামান। কারণ শব্দটা এখন এত বেশি ব্যবহার হচ্ছে যে এর মানেটাই হারিয়ে যাচ্ছে। যাঁর সঙ্গে আমাদের বনছে না, তাঁকেই আমরা নার্সিসিস্ট বলে ফেলছি।

ম্যালকিনের মূল দাবিটা প্রচলিত ধারণার উল্টো —

নার্সিসিজম রোগ নয়, একটা মাত্রা। আর এই মাত্রায় শূন্যে থাকাটাও সমস্যা।

তিনি একে বলেন নিজেকে একটু বিশেষ ভাবার স্বাভাবিক প্রবণতা। ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু বাড়তি আশা, নিজের সম্পর্কে একটু উজ্জ্বল ধারণা — গবেষণা বলছে, এই সামান্য ইতিবাচক পক্ষপাতটা মানসিকভাবে সুস্থ মানুষের বৈশিষ্ট্য। যাঁদের এটা একেবারেই নেই, তাঁদের অবস্থা ভালো নয়।

০ থেকে ১০ পর্যন্ত একটা রেখা কল্পনা করুন।

মাঝখানে (৪–৬) যাঁরা, তাঁরা স্বপ্ন দেখতে পারেন, নিজের প্রাপ্যটা চাইতে পারেন, আবার অন্যের অনুভূতিও দেখতে পান। এটাই সুস্থ অবস্থান।

একেবারে ডান দিকে (৯–১০) যাঁরা, তাঁরাই আমাদের চেনা নার্সিসিস্ট — নিজেকে বিশেষ প্রমাণ করা ছাড়া যাঁরা টিকতে পারেন না।

কিন্তু বাঁ দিকের প্রান্তটা (০–১)? ম্যালকিন এদের বলেন "ইকোইস্ট" — গ্রিক পুরাণের সেই ইকোর নামে, যে শুধু অন্যের কথা প্রতিধ্বনি করতে পারত, নিজের কিছু বলতে পারত না। এঁরা কখনও নিজের কথা বলেন না, কোনো দাবি করেন না, প্রশংসা পেলে অস্বস্তিতে পড়েন। বাইরে থেকে মনে হয় অসাধারণ ভালো মানুষ। ভেতরে তাঁরা ক্লান্ত, অদৃশ্য এবং প্রায়ই নার্সিসিস্টদের সবচেয়ে সহজ শিকার।

আরেকটা ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। সব নার্সিসিস্ট হম্বিতম্বি করে না। ম্যালকিন দুই ধরনের কথা বলেন — একদল প্রকাশ্যে নিজেকে বড় করেন, আরেকদল নিঃশব্দে। দ্বিতীয় দলটা অভিমান, নীরবতা আর ভুক্তভোগীর ভঙ্গি দিয়ে কেন্দ্রে থাকেন। "আমাকে তো কেউ বোঝেই না" — এই বাক্যটাও সবাইকে ঘুরে দাঁড়ানোর একটা উপায় হতে পারে।

তাহলে চরম প্রান্তে যায় কেন?

ম্যালকিনের ব্যাখ্যাটা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে চরম নার্সিসিজমের ভেতরে থাকে ভাঙা সংযুক্তি — এমন শৈশব, যেখানে ভালোবাসা শর্তসাপেক্ষ ছিল। ভালো করলে গ্রহণ, না করলে অদৃশ্য। শিশুটা তখন শেখে, "আমি বিশেষ, তাই আমি মূল্যবান" — মানুষ হিসেবে নয়, পারফরম্যান্স হিসেবে। বড় হয়ে সেই বিশেষত্বটা টিকিয়ে রাখাই হয়ে দাঁড়ায় বেঁচে থাকার শর্ত।

এই ব্যাখ্যাটা তাঁদের আচরণকে বৈধতা দেয় না। কিন্তু আপনাকে একটা জিনিস বোঝায় — আপনি তর্ক করে তাঁর মত বদলাতে পারবেন না, কারণ তর্কটা মতের নয়, অস্তিত্বের।

এবার আপনার জন্য কী?

"নার্সিসিস্ট" শব্দটা রায় হিসেবে ব্যবহার করবেন না।একবার কাউকে এই লেবেল দিয়ে দিলে আপনি তাকে আর দেখেন না, শুধু লেবেলটাকেই দেখেন।

নিজের অবস্থানটা দেখুন। আপনি রেখার কোন দিকে? যদি নিজের চাওয়া বলতে গেলে অপরাধবোধ হয়, প্রশংসা এলে বিষয় বদলে ফেলেন, নিজের সমস্যা কাউকে বলতে সংকোচ হয় — তাহলে আপনার কাজ সহানুভূতি বাড়ানো নয়, নিজের জায়গাটা নেওয়া শেখা।

অভিযোগ নয়, অনুভূতি বলুন। ম্যালকিন বলেন, "তুমি স্বার্থপর" বললে দেয়াল ওঠে; "আমি একা লাগছি, তোমাকে দরকার" বললে দরজা খোলার সম্ভাবনা থাকে। কারণ এতে তাঁর গুরুত্বও স্বীকৃত হয়।

তারপরও সীমা রাখুন। নরম ভাষা মানে সব মেনে নেওয়া নয়। বারবার বলার পরও যদি কিছুই না বদলায়, তখন প্রশ্নটা তাঁকে নিয়ে নয় — আপনি আর কতদিন থাকবেন, সেটা নিয়ে।

সবশেষে বইটার সবচেয়ে সুন্দর কথাটা এই: নিজেকে একটু বিশেষ ভাবাটা অপরাধ নয়। অপরাধ শুরু হয় তখন, যখন নিজেকে বিশেষ ভাবতে গিয়ে অন্যকে ছোট করতে হয়।

আপনি রেখার কোন দিকে দাঁড়িয়ে আছেন — নিজের কথা বলতে গিয়ে অস্বস্তি হয়, নাকি নিজের কথা থামাতে?



২৮


ব্যারিষ্টার থেকে কায়েদে আযম

একসময় যাকে উপমহাদেশের রাজনীতিতে বলা হতো 'হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত' সময়ের প্রয়োজনে তিনিই দ্বি-জাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করলেন পাকিস্তান রাষ্ট্র। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ'র একজন কট্টর পশ্চিমা ভাবধারার বিলাসী ব্যরিস্টার থেকে কোটি কোটি মুসলিমের ‘কায়েদে আজম’ হয়ে ওঠার গল্পটি বেশ ইন্টারেস্টিং। চলুন কায়েদে আযম সম্পর্কে হালকা করে জেনে নিই।

১৮৯৬ সালে লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লিংকনস ইন (Lincoln's Inn) থেকে মাত্র ১৯ বছর বয়সে, সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় হিসেবে বার-অ্যাট-ল (ব্যারিষ্টার) সম্পন্ন করেন জিন্নাহ। তারপর করাচীতে কিছুদিন আইন প্র্যাকটিস করে বোম্বে হাইকোর্টে স্থায়ীভাবে আইন ব্যবসা শুরু করেন।১৯৩০ সালের দিকে জিন্নাহ শুধুমাত্র ওকালতি করেই মাসে ৩৫/৪০ হাজার টাকার মতো ইনকাম করতেন। ৩০/৩৫ বছর বয়সেই তিনি কোটিপতি হয়ে ওঠেন। এমনটাই ছিলো জিন্নাহ'র ব্যক্তিত্ব।

লন্ডনে পড়াকালীন সময় থেকে তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবন জুড়েই, পশ্চিমা ফ্যাশন ও বিলাসী অভিজাত্য স্পষ্টভাবে বজায় ছিল। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এতোবেশি আভিজাত্যপূর্ণ ছিলেন যে, তিনি লণ্ডনের বিখ্যাত 'স্যাভিল সারি' থেকে তৈরি দামী স্যুট, সিল্কের টাই এবং একনয়না চশমা (Monocle) পরতেন। বলা হয়ে থাকে, জিন্নাহ কখনো একই টাই দুইবার পরতেন না। এছাড়া তাঁর কালেকশনে ছিলো শত শত জোড়া জুতা ও প্রায় ২০০ টি বানানো স্যুট। তিনি জীবনের বড় একটি সময়, সম্পূর্ণ পশ্চিমা আদলে জীবনযাপন করেছিলেন। শেষ বয়সে রাজনৈতিক প্রয়োজনে শেরওয়ানি ও কারাকুল টুপি পরতেন। যা পরবর্তীতে 'জিন্নাহ টুপি' নামে পরিচিতি পায়।

কায়েদে আজমের দৈনন্দিন চলাফেরা ও বিভিন্ন কাজের জন্য সেসময়ই ব্যবহার করতেন Rolls-Royce Silver Ghost, Cadillac Series 75 Limousine, Packard, Rolls-Royce Silver Wraith ( রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ জিন্নাহকে এই বিলাসবহুল গাড়িটি উপহার দেন) এর মতো মূল্যবান অসংখ্য গাড়ি। বর্তমানে সাধারণ কোটিপতিরাও যেখানে রোলস রয়েস কিনতে হিমশিম খান, সেখানে ১৯৩০/৪০ এর দশকে জিন্নাহ এইসব হাই ফাই গাড়িতে রেগুলার যাতায়াত করতেন। এমনই বিলাসিতাপূর্ণ ছিলো জিন্নাহর জীবনযাপন।

তবে জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবন ছিলো গভীর অনুরাগের পাশাপাশি বিষাদময় ঘটনাবলীতে পূর্ণ। ​১৯১৮ সালে ৪২ বছর বয়সী জিন্নাহ বোম্বাইয়ের পার্সি ধনকুবের স্যার দিনশ পেটিটের কন্যা রত্তনবাই 'রুট্টি' পেটিটকে বিয়ে করেন। এই আন্তঃধর্মীয় প্রেম ও বিয়ে তৎকালীন বোম্বাইয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলো। অবশ্য পরে মিসেস জিন্নাহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মরিয়ম নাম গ্রহণ করেন। তবে ১১ বছরের এই সংসার বিষাদে রূপ নেয় ১৯২৯ সালে। মাত্র ২৯ বছর বয়সে মিসেস জিন্নাহ মারা যান।

মরিয়মের মৃত্যু জিন্নাহকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। জিন্নাহ ও মরিয়ম জুটির একমাত্র কন্যা ছিলেন দিনা জিন্নাহ। জিন্নাহ যেভাবে পার্সি পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন, দিনাও নেভিল ওয়াদিয়া নামের এক পার্সি ব্যবসায়ীকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। জিন্নাহ এই বিয়ে মেনে নেননি ফলে, মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কন্যার সাথে তাঁর যোগাযোগ প্রায় বন্ধই ছিল। প্রিয়তমা স্ত্রীর বিয়োগ এবং পরবর্তীতে কণ্যা বিয়োগের ব্যথা জিন্নাহ আজীবন ভুগেছেন। জিন্নাহর শেষ জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন তাঁর ছোট বোন ফাতেমা জিন্নাহ।

রাজনীতির শুরুর দিকে জিন্নাহ ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা। কংগ্রেস নেতা গোপাল কৃষ্ণ গোখলে জিন্নাহ'র ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাব দেখে তাঁকে 'হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের সেরা দূত' আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯২০-এর দশকে মহাত্মা গান্ধীর উত্থান এবং পরবর্তীতে কংগ্রেস রাজনীতির হিন্দু মেরুকরণের ফলে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে আসেন। হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবের মানুষ হয়েও, তিনি ভারতীয় মুসলমানদের দূর্দশা অনুভব করে একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ডের একচ্ছত্র দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই সময়েই উপমহাদেশের মুসলমানদের দুঃখ দুর্দশা লাঘবে তিনি হয়ে উঠলেন আস্থার প্রতিক 'কায়েদে আজম'।

​১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েই জিন্নাহ মারাত্মক যক্ষ্মা (Tuberculosis) ও ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তৎকালীন সময়ে এই রোগের কোনো চিকিৎসা ছিলো না। ​জিন্নাহ এবং তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. জাল রতনজি প্যাটেল এবং রেডিওলজিস্ট ডা. জাল ধায়ভো-কু এই প্রাণঘাতী রোগের কথা সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিলেন।

​ইতিহাসবিদ ল্যারি কলিন্স ও ডমিনিক লাপিয়ের তাঁদের 'ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট' বইয়ে উল্লেখ করেছেন, লর্ড মাউন্টব্যাটেন বা কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ যদি জানত জিন্নাহর হাতে আর মাত্র কয়েক মাস সময় আছে, তবে তারা হয়তো ১৯৪৭ সালের আগস্টে তড়িঘড়ি করে ভারত ভাগ না করে বরং জিন্নাহর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করত।

এমন ভয়াবহ শারীরিক বিপর্যয় স্বত্বেও জিন্নাহ তাঁর জীর্ণ শরীর নিয়ে চিকিৎসকের নিষেধ উপেক্ষা করে, কেবল অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি নিশ্চিত করেন। কিন্তু স্বপ্নের পাকিস্তানের সুদিন তিনি দেখে যেতে পারেননি। দেশভাগের মাত্র ১৩ মাসের মাথায় ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

মোহাম্মদ আলী আকবর 


২৯


২৫২ মিলিয়ন বছর আগে এক ভয়াবহ প্রলয়যজ্ঞে পৃথিবীর বুক থেকে প্রায় সব জীববৈচিত্র্য মুছে গিয়েছিল। কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই সূচনা হয় বিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়ের। পার্মিয়ান যুগের শেষের সেই গণবিলুপ্তির পর খালি হয়ে যাওয়া পরিবেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে ডাইনোসর, কুমিরের পূর্বপুরুষ ও তাদের আত্মীয়রা। বিজ্ঞানের ভাষায় যাদের বলা হয় আর্কোসোরোমর্ফ (Archosauromorphs)।

পরবর্তী ১৫০ মিলিয়ন বছর ধরে স্থলভাগ শাসন করা এই প্রাণীগুলোর বিবর্তন নিয়ে সম্প্রতি Proceedings of the Royal Society B-তে একটি নতুন গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। জীবাশ্মের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা উন্মোচন করেছেন বেশ কিছু রোমাঞ্চকর তথ্য।

বিবর্তনের প্রাথমিক বিস্ফোরণ (Early Burst): গণবিলুপ্তির পর পরিবেশে প্রতিযোগিতা কম ছিল এবং প্রচুর ‘খালি সুযোগ’ (Ecological Niche) ছিল। ফলে শুরুতে খুব অল্প সময়েই অবিশ্বাস্য গতিতে একের পর এক নতুন প্রজাতির আবির্ভাব ঘটেছিল।

ধীরে ধীরে গতি হ্রাস ও বিলুপ্তির চাপ: সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশের খালি জায়গাগুলো পূর্ণ হয়ে যায়। ফলে নতুন প্রজাতি তৈরির হার কমে আসে। আবার প্রজাতি বাড়ায় তাদের গড় জনসংখ্যা ছোট হয়ে পড়ে, যা তাদের পরিবেশের পরিবর্তনের কাছে সংবেদনশীল করে তোলে এবং বিলুপ্তির হার বাড়িয়ে দেয়।

লুকানো বিবর্তন (Cryptic Diversification): বিজ্ঞানীদের মতে, আর্কোসোরোমর্ফদের বিবর্তনের সর্বোচ্চ পর্যায়টি আগে যেমনটা ভাবা হতো, তারচেয়েও আগে ঘটেছিল। বিবর্তনের একদম শুরুর দিকের কিছু দুর্লভ প্রজাতির জীবাশ্ম না পাওয়ায় এতদিন তা হয়তো আমাদের নজরের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল।

দেহের আকারের সম্পর্ক নেই: গবেষণায় দেখা গেছে, বিশাল দেহের হওয়া বা ছোট আকারের থাকা, কোনও প্রজাতির টিকে থাকা বা বিলুপ্তির প্রধান কারণ ছিল না।

আজকের যুগের জন্য এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? এই গবেষণা শুধু ডাইনোসরের অতীত জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বর্তমান পৃথিবী যে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির সংকটে পড়েছে, সেখান থেকে পরিবেশ কীভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং জীববৈচিত্র্যের কেমন রূপান্তর ঘটতে পারে—তা বুঝতে প্রাচীন পৃথিবীর এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়।

ডাইনোসরদের রাজত্ব হঠাৎ কোনও অলৌকিক ঘটনায় তৈরি হয়নি। একটি প্রলয় পুরনো বিশ্বকে মুছে দিয়েছিল, আর সেই ফাঁকা সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রকৃতি কোটি কোটি বছর ধরে গড়ে তুলেছিল ডাইনোসরদের নতুন সাম্রাজ্য!

মুস্তাকিম গিয়াস



৩০


"আল্লাহ" শব্দটি নিয়ে কিছু কথা

১। আল্লাহ শব্দটি কোরআনেই প্রথম ব্যবহৃত শব্দ নয়!! মুহম্মদ সা এর বাবার (যিনি ওনার জন্মের আগেই মারা যান) নাম ছিল আবদুল্লাহ- যার মানে আল্লাহর দাস। এ ধরণের নাম কোরাইশ পৌত্তলিকদের মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং ইসলাম পূর্বযুগ থেকেই কাবাকে পৌত্তলিকেরা বায়াতুল্লাহ বলে ডাকতো। একইভাবে অন্যান্য দেবদেবীর নামের আগে আবদ (দাস) কিংবা আমাত (দাসী) যুক্ত করে নাম রাখার প্রচলন ছিল। যেমনঃ মুহম্মদ সা এর নানার (মা আমিনার বাবা) নাম ছিল ওয়াহাব ইবনে আবদ-মানাফ সুতরাং "আল্লাহ"  শব্দটির মালিক শুধু মুসলিমেরা নয়- বরং আরব পোত্তলিকেরাও এই শব্দটি ব্যবহার করতো। পৌত্তলিকেরা আল্লাহ শব্দটি দ্বারা একটি নির্দিষ্ট অর্থই বুঝতো, যা নিশ্চয়ই মুসলমানদের অনুরূপ নয়।

২। অনেকে দাবী করেন, আল্লাহ শব্দটি নাকি "আল ইলাহ" থেকে উদ্ভূত হয়েছে। ইলাহ শব্দটি দিয়ে সাধারণভাবে উপাস্য, বিভিন্ন দেব দেবীকে কমনলি বুঝা যায়। যেমন সে সময়ের দেবতা "উদ" অন্যতম ইলাহ, উজ্জাও আরেক ইলাহ। লাত এক ধরণের ইলাহ। বস্তুত, মুহম্মদ সা এর সময়ে আরব পৌত্তলিকদের সবচেয়ে প্রধান ইলাহসমূহ হলো উদ, ইয়াউক, হুবাল, লাত, উজ্জা, মানা। লাত, উজ্জা আর মানা ছিল দেবী। এই তিন দেবীকে সে সময়ে আল্লাহর তিন কন্যা বলে পৌত্তলিকেরা উপাসনা করতো। 

৩। প্রাচীণ আরবে আকাশ ও স্বর্গের দেবতা ও দেবীর উপাসনা করা হতো এবং পরবর্তীতে সেই দেবীই রূপান্তরিত হয়েই হয় লাত। চন্দ্র দেবী। আরব পৌত্তলিকদের মধ্যে চন্দ্র দেবী লাত ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেবী। চন্দ্রমাস যেমন প্রচলিত ছিল, তেমনি চাঁদ দেখে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার আচরণ পালনের চলও প্রচলিত ছিল। চাঁদের প্রতীকও ছিল ধর্মীয় প্রতীক।  

৪। দর যুদ্ধে আবু সুফিয়ানের সাথে মুহম্মদ সা এর সাহাবীদের কিছু কথা চালাচালি হয়েছিল। আবু সুফিয়ান বলেছিলঃ "O Hubal, be high!” শুনে নবী তার সাহাবীদের জবাব দিতে বললেন, সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন- কি জবাব দিবেন। তখন নবী এটা বলতে বললেনঃ “Allah is Higher and more Sublime." তখন আবু সুফিয়ান বললোঃ "We have the (idol) Al Uzza, and you have no Uzza."  নবী তার সাহাবীদের জবাব দিতে বললেন এবং সাহাবীরা কি বলবেন সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। নবী এটা বলতে বললেনঃ “Allah is our Helper and you have no helper." (Bukhari Volume 4, Book 52, Number 276)। হুবল আর আল্লাহ’র এই তুলনামূলক কথপোকথন থেকে দেখা যাচ্ছে যে, হুবল ও আল্লাহ পৃথক দেবতা ছিল।

৫। তবে অনেকের মতে, আল্লাহ আর হুবল একই দেবতা ছিল। হবল ছিল কুরায়শদের উপাসনাকৃত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেবতা। এই হুবলের উপাধি ছিল- আল্লাহ বা প্রধান দেবতা। আল্লাহর তিন কন্যার কথা কোরআনে থাকলেও অনেকের মতে আল লাত হচ্ছে হুবল ।

৬। মুহম্মদ সা এসে যে কালিমা তাইয়্যিবা প্রচার করা আরম্ভ করেন, সেখানেও আমরা "আল্লাহ" শব্দটি একটি নামবাচক বিশেষ্য হিসাবে পাই। "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু,...." লা ইলাহা মানে কোন উপাস্য বা ইলাহা নাই, ইল্লাল্লাহু মানে আল্লাহ ছাড়া। তারমানে এখানে "আল্লাহ" নামক বিশেষ এক ইলাহা ব্যতীত সকল ইলাহকে খারিজ করে দেয়া হয়েছে।

.৭। মুহম্মদ সা আরব পৌত্তলিকদের বিশ্বাসে আল্লাহর কন্যা ছিল- সন্তানও ছিল; স্ত্রী তো ছিলই। সেকারণে সুরা ইখলাস, সুরা জ্বিন সহ কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে বিশেষভাবে জানিয়ে দিতে হয়েছে- এই আল্লাহর কোন বউ- বাচ্চা- বাপ, মা নেই। আল্লাহ’র কোন লিঙ্গ নেই। @ ইতিহাসের পাতা


৩১


১৮৬০ সালের চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া কীভাবে চীনের বিশাল ভূখণ্ড দখল করেছিল, তা ১৯শ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা। এই চুক্তিটি ইতিহাসে 'পিকিং-এর চুক্তি' বা কনভেনশন অফ পিকিং (১৮৬০) নামে পরিচিত। এটি মূলত এর ঠিক দু'বছর আগে স্বাক্ষরিত আইগুনের চুক্তির (১৮৫৮) একটি চূড়ান্ত এবং সম্প্রসারিত রূপ ছিল। কোনো সরাসরি যুদ্ধ বা রক্তপাত ছাড়াই রাশিয়া চীনের প্রায় ১০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি (প্রায় ৩,৫০,০০০ থেকে ৪,০০,০০০ বর্গমাইল) বিশাল ভূখণ্ড নিজেদের দখলে নিয়েছিল।

১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চীনের চিং (Qing) রাজবংশ চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। একদিকে দেশের ভেতরে চলছিল ভয়াবহ 'তাইপিং বিদ্রোহ', অন্যদিকে বহির্বিশ্বের সাথে, বিশেষ করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে, তারা 'দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে' (Second Opium War) পর্যুদস্ত হচ্ছিল। চীনের এই চরম দুর্বলতার সুযোগ নেয় রাশিয়া। চীনের যখন দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে হার নিশ্চিত, তখন রুশ সামরিক গভর্নর নিকোলাই মুরাভিয়েভ চীনের ওপর সামরিক চাপ প্রয়োগ করেন। চিং রাজবংশ বাধ্য হয়ে ১৮৫৮ সালের ২৮ মে রাশিয়ার সাথে আইগুনের চুক্তি স্বাক্ষর করে।

- এই চুক্তির মাধ্যমে আমুর নদীর উত্তর তীরের বিশাল ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

- চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে আমুর নদীর তীরে রুশ ও চীনা সাম্রাজ্যের মধ্যকার একটি নতুন সীমান্ত স্থাপিত হয় এবং বাণিজ্যের ওপর থেকে অনেক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

প্রাথমিকভাবে চীনের সম্রাট আইগুনের চুক্তির সব শর্ত মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন এবং এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু ১৮৬০ সালে যখন ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী চীনের রাজধানী বেইজিং (তৎকালীন পিকিং) দখল করে নেয় এবং বিখ্যাত সামার প্যালেস পুড়িয়ে দেয়, তখন চীন সামরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এই চরম বিপর্যয়ের সময় রাশিয়া মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তারা ব্রিটিশ ও ফরাসিদের সাথে চীনের শান্তি চুক্তিতে সহায়তা করার বিনিময়ে চীনের কাছ থেকে আরো বিশাল ভূখণ্ড দাবি করে। বাধ্য হয়ে চীন ১৮৬০ সালে পিকিং-এর চুক্তি (Treaty of Beijing) স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির প্রধান দিকগুলো ছিল:

- ১৮৫৮ সালের আইগুনের চুক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

- উসুরি নদীর পূর্ব দিক থেকে শুরু করে জাপান সাগর পর্যন্ত বিশাল এলাকা (যা 'আউটার মাঞ্চুরিয়া' নামে পরিচিত) রাশিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

- রাশিয়ানদের জন্য আরো কিছু নতুন বন্দর উন্মুক্ত করা হয় এবং অর্থনৈতিক সুবিধা সম্প্রসারিত করা হয়।

এই চুক্তি করে রাশিয়া ধোকা দিয়ে চীনের বিশাল ভুখন্ড(১০ লক্ষ বর্গকিলোমিটার) দখল করে নেয় স্থায়ীভাবে। আজও চীনে এটাকে জাতীয় অপমান হিসাবে দেখা হয়। এই সীমান্ত বিরোধ নিয়ে ১৯৬৭ সালে চীন ও রাশিয়ার সীমান্তে ব্যাপক লড়ায় হয় এবং দুই দেশের কয়েকশ সেনা মারা যায়। অবস্থা এত খারাপ ছিলো যে রাশিয়া চীনের উপর পরমানু হামলা পর্যন্ত করতে চেয়েছিলো। এই ঘটনার জন্য আজও চাইনিজরা রাশিয়ানদের ভালো নজরে দেখে না

@ সাইফুল ইসলাম


৩২


প্রাচীন বিবরণে সন্দ্বীপ

মেঘনা মোহনার কাছে বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপ, আজকের সন্দ্বীপ। সমুদ্র, নদী ও পলিতে ক্রমাগত বদলে যাওয়া এই ভূখণ্ডের ইতিহাসও যেন তার ভূপ্রকৃতির মতোই পরিবর্তনশীল। কখনো এটি ছিল কৃষি ও লবণের জন্য সমৃদ্ধ এক দ্বীপ, কখনো বঙ্গোপসাগরের নৌপথের আশ্রয়স্থল, আবার কখনো পর্তুগিজ, আরাকানিজ ও মুঘল শক্তির সংঘর্ষের কেন্দ্র।

মধযুগের রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তারের মঞ্চ হয়ে উঠে সন্দ্বীপ। পর্তুগিজ, আরাকানি মগ, মুঘলদের পদচারণায় এখানে বার বার বেজেছে যুদ্ধের দামামা। সেই এতো গুরুত্বপূর্ণ সন্দ্বীপ মধ্যযুগের বিবরণে কীভাবে এসেছে তা আমরা আজ খুঁজে দেখব।

নিকোলো দে কন্তির বিবরণে সন্দ্বীপ নেই:

ইতালীয় পর্যটক নিকোলো দে কন্তি (Niccolò de' Conti) ১৪২১–২২ সালের দিকে বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চল দিয়ে যাতায়াত করেছিলেন। তিনি ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু বন্দর ও জনপদের বিবরণ রেখে গেছেন। কিন্তু তাঁর লেখায় সন্দ্বীপের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।

আধুনিক গবেষক রিলা মুখার্জি এই অনুপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তাঁর মতে, কন্তির সময় সন্দ্বীপ হয়তো তখনকার গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বাণিজ্যিক দ্বীপ হিসেবে গড়ে ওঠেনি। ষোড়শ শতকের প্রথম দিকের একটি পর্তুগিজ বিবরণেও সন্দ্বীপের নাম নেই। অর্থাৎ, সন্দ্বীপের উত্থান সম্ভবত পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে ঘটে।

কোনো ভ্রমণকারীর লেখায় কোনো স্থানের নাম না থাকা মানেই যে সেখানে তখন জনবসতি ছিল না, তা নয়। হতে পারে, সন্দ্বীপ তখনও এমন কোনো বন্দর বা বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠেনি, যা দূরদেশীয় পর্যটকের নজরে পড়ার মতো ছিল।

১৫৬৯: সিজার ফেদেরিচির চোখে সন্দ্বীপ

সন্দ্বীপ সম্পর্কে প্রথম প্রত্যক্ষ ও বিস্তারিত ইউরোপীয় বিবরণগুলোর একটি পাওয়া যায় ভেনিসীয় বণিক-পর্যটক সিজার ফেদেরিচি (Cesare Federici)-র লেখায়।

ফেদেরিচি ১৫৬৩ থেকে ১৫৮১ সাল পর্যন্ত এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরেছিলেন। ১৫৬৯ সালের দিকে পেগু (বর্তমান মিয়ানমারের বাগো) থেকে ফেরার পথে তাঁর জাহাজ বঙ্গোপসাগরে ভয়াবহ ঝড়ের কবলে পড়ে। ঝড় থামার পর দূরে একটি দ্বীপ দেখা যায়। সেটিই ছিল সন্দ্বীপ।

ফেদেরিচির বর্ণনায় সন্দ্বীপ যেন এক সমৃদ্ধ সবুজ দ্বীপ। তিনি দেখেছিলেন, দ্বীপটি জনবসতিপূর্ণ, অত্যন্ত উর্বর এবং ভালোভাবে চাষ করা। তাঁর চোখে এটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম উর্বর দ্বীপ। আরও আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর বিবরণ অনুযায়ী দ্বীপটি একটি জলধারা বা খাল দিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত ছিল; জোয়ারের সময় সেই জলপথ দিয়ে জাহাজও প্রবেশ করতে পারত।

ঝড়ের পর তাঁর জাহাজ সেখানে প্রায় ৪০ দিন অবস্থান করেছিল। এই সময়ের কারণে ফেদেরিচির বিবরণ অন্য অনেক পর্যটকের তুলনায় মূল্যবান, তিনি কিছুদিন সেখানে অবস্থান করে স্থানীয় জীবন লক্ষ্য করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

দ্বীপবাসীরা তাঁর জাহাজ আসতে দেখে সমুদ্রতীরে বাজার বসিয়েছিল। ফেদেরিচি স্থানীয় খাদ্যদ্রব্যের অত্যন্ত কম দাম দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। তাঁর বিবরণে সন্দ্বীপের অধিবাসীদের ‘মুর’ বা মুসলমান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং দ্বীপের শাসকও ছিলেন একজন মুসলমান। তিনি সন্দ্বীপকে বাংলার রাজার অধীন বলে উল্লেখ করেন।

এই একটি বিবরণ থেকেই ষোড়শ শতকের সন্দ্বীপ সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি পাওয়া যায়- এটি তখন জনবসতিপূর্ণ, কৃষিসমৃদ্ধ, মুসলিম-অধ্যুষিত এবং সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজের কাছে পরিচিত একটি দ্বীপ।

লবণের দ্বীপ:

ফেদেরিচির বিবরণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে, সন্দ্বীপ ছিল লবণ উৎপাদনের একটি বড় কেন্দ্র।

পরবর্তী পুরোনো গেজেটিয়ারগুলোতে তাঁর বিবরণ উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, প্রতি বছর প্রায় ২০০টি নৌযান সন্দ্বীপ থেকে লবণ নিয়ে যেত। লবণ ছাড়াও দ্বীপে জাহাজ নির্মাণের উপযোগী কাঠ ও অন্যান্য উপকরণের প্রাচুর্যও ছিল বলে পুরোনো বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।

ষোড়শ শতকের সন্দ্বীপকে শুধু কৃষিনির্ভর দ্বীপ হিসেবে দেখলে মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ হবে। এটি ছিল একই সঙ্গে কৃষি, লবণ উৎপাদন ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি দ্বীপ।

রালফ ফিচের সময়েও সন্দ্বীপ নৌপথের গুরুত্বপূর্ণ স্থান:

ইংরেজ পর্যটক ও বণিক রালফ ফিচ (Ralph Fitch) ১৫৮৬ সালে বাংলায় আসেন। তিনি হুগলি, সাতগাঁও, সোনারগাঁও, চট্টগ্রামসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে পরে পেগুর দিকে যাত্রা করেন। তাঁর ভ্রমণপথও বঙ্গোপসাগরের এই পূর্বাঞ্চল দিয়ে যায়।

ফিচের বিবরণ ফেদেরিচির মতো সন্দ্বীপকেন্দ্রিক নয়; তিনি মূলত বাংলার বিভিন্ন বন্দর ও নদীপথের বিবরণ দিয়েছেন। তবে তাঁর ভ্রমণপথে সন্দ্বীপের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। এতে বোঝা যায়, ষোড়শ শতকের শেষভাগে বাংলা থেকে পেগু ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে যাতায়াতকারী নৌপথে সন্দ্বীপ ছিল পরিচিত ভূগোলের অংশ।

সপ্তদশ শতকের শুরুতে: সমৃদ্ধির আরও প্রমাণ

সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকের বিবরণগুলোতে সন্দ্বীপের উর্বরতার কথা আবারও উঠে আসে।

ইংরেজ ধর্মযাজক ও লেখক স্যামুয়েল পারচাস (Samuel Purchas)-এর সংকলনে প্রায় ১৬২০ সালের কাছাকাছি সময়ের তথ্য থেকে জানা যায়, সন্দ্বীপের উপকূলবর্তী এলাকার অধিকাংশ মানুষ ছিল মুসলমান। পুরোনো গেজেটিয়ারগুলো আরও উল্লেখ করে যে দ্বীপে কয়েকশ বছরের পুরোনো মসজিদ থাকার কথাও তাঁর সময়কার বিবরণে পাওয়া যায়।

আর স্যার থমাস হারবার্ট (Sir Thomas Herbert), যিনি প্রায় ১৬২৫ সালের দিকে পূর্বভারত সম্পর্কে লিখেছিলেন, সন্দ্বীপকে ভারতের অন্যতম সুন্দর ও উর্বর স্থান হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর বিবরণে নারকেলগাছের প্রাচুর্য এবং চট্টগ্রাম ও আরাকানের দিকে নারকেল রপ্তানির কথাও পাওয়া যায়। আখও চাষ হতো।

ফেদেরিচির প্রায় অর্ধশতাব্দী পরও সন্দ্বীপের প্রধান বৈশিষ্ট্য একই ছিল- উর্বর ভূমি, কৃষি, নারকেল এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য।

আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের চোখে সস্তা ও সমৃদ্ধ দ্বীপ:

সপ্তদশ শতকের শেষভাগ ও অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে এ অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো স্কটিশ বণিক আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন সন্দ্বীপের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির একটি চমৎকার ছবি রেখে গেছেন।

তিনি লিখেছিলেন, সমুদ্রের মধ্যে অবস্থিত সন্দ্বীপ ছোট জাহাজকে উত্তাল সমুদ্র থেকে আশ্রয় দিতে পারে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্যটি হলো স্থানীয় দ্রব্যের দাম। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এক রুপিতে প্রায় ৫৮০ পাউন্ড চাল, অথবা আটটি রাজহাঁস, কিংবা ৬০টি মুরগি পাওয়া যেত। একই সময়ে দ্বীপ থেকে বছরে প্রায় ২০০ নৌকার বোঝাই লবণ রপ্তানি হতো।

সংখ্যাগুলোকে আজকের বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করা অর্থহীন, কিন্তু হ্যামিল্টনের বিবরণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে সন্দ্বীপ তখন খাদ্য উৎপাদনে অত্যন্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং লবণ-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এসব বিবরণ থেকে কেমন সন্দ্বীপের যে চিত্র দাঁড়ায়:

ফেদেরিচি থেকে হ্যামিল্টন পর্যন্ত প্রায় দেড়শ বছরের বিবরণ পাশাপাশি রাখলে একটি চমৎকার ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়।

সন্দ্বীপ তখন কোনো বিচ্ছিন্ন বা জনশূন্য সমুদ্রদ্বীপ ছিল না, এটি ছিল—

১. উর্বর কৃষিজমির অধিকারী একটি ঘনবসতিপূর্ণ দ্বীপ;

২. মুসলিম জনবসতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র;

৩. লবণ উৎপাদনের প্রধান অঞ্চলগুলোর একটি;

৪. চাল, পশুপাখি ও অন্যান্য খাদ্যের প্রাচুর্যের জায়গা;

৫. নারকেল ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদক;

৬. বঙ্গোপসাগরের নৌযাত্রায় আশ্রয় নেওয়ার উপযোগী স্থান;

৭. এবং বাংলা–চট্টগ্রাম–আরাকান–পেগুর সামুদ্রিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান।

তবে এই সমৃদ্ধিই পরবর্তী সময়ে সন্দ্বীপের জন্য বিপদ ডেকে আনে। বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্যপথে অবস্থান এবং লবণ ও খাদ্যসম্পদের প্রাচুর্যের কারণে দ্বীপটি ধীরে ধীরে বাংলার স্থানীয় রাজা, আরাকান, পর্তুগিজ ও মুঘল শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। ষোড়শ শতকের শেষভাগ থেকে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হবে, সেটিই পরবর্তী শতকে সন্দ্বীপকে পর্তুগিজ অভিযাত্রী, আরাকানিজ শক্তি এবং শেষ পর্যন্ত মুঘলদের সংঘর্ষের মঞ্চে পরিণত করবে।

তাই প্রাচীন ভ্রমণকারীদের চোখে সন্দ্বীপের প্রথম যে ছবিটি পাওয়া যায় তা একটি অত্যন্ত উর্বর, সস্তা খাদ্যসম্পদে সমৃদ্ধ, মুসলিম-অধ্যুষিত ও লবণ-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রদ্বীপের। আর এই সমৃদ্ধ দ্বীপের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই শুরু হলেই সন্দ্বীপের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়টি শুরু হবে। @ boikal

সূত্র:

Cesare Federici-এর ভ্রমণবৃত্তান্ত

Niccolò de' Conti-এর বিবরণ; Ralph Fitch-এর ভ্রমণবিবরণ

Samuel Purchas-এর Purchas His Pilgrimes

Sir Thomas Herbert-এর পূর্বভারত-বিষয়ক বিবরণ

Alexander Hamilton-এর A New Account of the East Indies;

Rila Mukherjee-এর গবেষণা The Struggle for the Bay


৩৩


ইতিবাচক মানসিকতা—বদলে দিতে পারে আপনার জীবনের গতিপথ

জীবনে সবকিছু আমাদের ইচ্ছামতো হবে—এমন নয়। জীবনে প্রতিকূলতা আসবেই।

কখনো পরিকল্পনা অনুযায়ী কিছু হবে না, কখনো ব্যর্থতা আসবে, কখনো ভয় বা আশঙ্কা আমাদের থামিয়ে দিতে চাইবে।। আবার কখনো এমন পরিস্থিতিও আসবে, যখন মনে হবে—“আর পারছি না।”

কিন্তু কঠিন পরিস্থিতি আমাদের জীবনকে যতটাই না প্রভাবিত করে, তার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে সেই পরিস্থিতিকে আমরা কীভাবে দেখছি এবং কীভাবে মোকাবিলা করছি।

একই পরিস্থিতি একজনকে ভেঙে দিতে পারে, আবার অন্যজন সেই পরিস্থিতি থেকেই নতুন কিছু শেখার ও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি খুঁজে নিতে পারেন। আসল পার্থক্যটা অনেক সময় পরিস্থিতিতে নয়—বরং পরিস্থিতিকে দেখার মানসিকতায়।

ইতিবাচক মানসিকতা মানে কী?

ইতিবাচক মানসিকতা মানে এই নয় যে জীবনে কোনো সমস্যা নেই, কষ্ট নেই বা সবকিছু সবসময় ভালোই হবে।

বরং এর অর্থ হলো—

সমস্যাকে অস্বীকার না করে, সমস্যার মধ্যেও সম্ভাবনার জায়গাটা খুঁজে নেওয়া।

ব্যর্থ হলে নিজেকে শেষ মনে না করে বলা—

“আমি ব্যর্থ হয়েছি, কিন্তু এখান থেকে আমি শিখতে পারি।”

কেউ সমালোচনা করলে ভেঙে না পড়ে ভাবা—

“এর মধ্যে আমার জন্য শেখার মতো কিছু আছে কি?”

কঠিন সময় এলে নিজেকে প্রশ্ন করা—

“কেন আমার সঙ্গে এমন হচ্ছে?”**-এর পাশাপাশি

“এই পরিস্থিতি থেকে আমি কী শিখতে পারি?”

এই ছোট্ট পরিবর্তনটাই আপনার চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত এবং জীবনযাপনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

মনে রাখবেন —

আপনি সবসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।

কিন্তু পরিস্থিতির প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আপনার হাতে রয়েছে।

তাই প্রতিদিন নিজের চিন্তাকে একটু একটু করে ইতিবাচক করুন।

নিজের ভুল থেকে শিখুন, ব্যর্থতাকে অভিজ্ঞতায় পরিণত করুন, অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা না করে নিজের উন্নতির দিকে মন দিন।

কারণ আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু আপনার মেধা, অর্থ বা সুযোগ নয়—

**আপনার চিন্তার ধরনও আপনার ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।**

আজকের একটি ইতিবাচক চিন্তা হয়তো আজই আপনার জীবন বদলে দেবে না।

কিন্তু সেই চিন্তা থেকে তৈরি হওয়া একটি ভালো সিদ্ধান্ত, একটি সাহসী পদক্ষেপ এবং একটি নতুন অভ্যাস—ধীরে ধীরে আপনার পুরো জীবনটাই বদলে দিতে পারে।

তাই পরিস্থিতি যেমনই হোক, আশাবাদী থাকুন।

নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন।

কারণ কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা শুরু হয়—শুধু আমাদের চিন্তার পরিবর্তন থেকেই।


৩৪


যে চিন্তার কোনো সমাধান নেই, সেটাকে কতক্ষণ বহন করবেন?

আমরা অনেক সময় এমন কিছু বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবি, যার ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই।

কেউ কী ভাবছে, অতীতে কী হয়ে গেছে, ভবিষ্যতে কী হবে, কেন কেউ বদলে গেল, কেন একটা ঘটনা আমাদের সঙ্গে ঘটল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজের বর্তমানটাকেই অস্থির করে তুলি।

কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি—

চিন্তা করা আর সমস্যার সমাধান করা এক জিনিস নয়।

যে সমস্যার সমাধানের জন্য আপনার কিছু করার আছে, সেটার জন্য পরিকল্পনা করুন।

প্রয়োজন হলে সাহায্য নিন।

একটি ছোট পদক্ষেপ নিন।

কিন্তু যে বিষয়টি আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেটাকে বারবার মনে ঘুরিয়ে কোনো নতুন উত্তর পাওয়া যায় না। বরং দীর্ঘসময় ধরে চলা দুশ্চিন্তা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে এবং ঘুম, মনোযোগ ও দৈনন্দিন স্বাভাবিকতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

তাই নিজেকে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করুন—

“এটা নিয়ে ভাবলে কি সত্যিই কোনো সমাধান বের হবে?”

যদি উত্তর হয়—না, তাহলে চিন্তাটাকে জোর করে মুছে ফেলতে হবে না। শুধু নিজেকে মনে করিয়ে দিন—

“এটা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই এটাকে আজ আর বয়ে বেড়াব না।”

সব প্রশ্নের উত্তর আজই পাওয়া প্রয়োজন নেই।

সব সমস্যার সমাধানও আপনার হাতে থাকবে না।

কখনো কখনো মানসিক শান্তি আসে সমস্যার উত্তর খুঁজে নয়,

কোন সমস্যাটা আর বহন না করাই ভালো—সেটা বুঝতে শেখার মাধ্যমে।

আজ এমন একটি চিন্তা ছেড়ে দিন, যেটা আপনাকে শুধু ক্লান্ত করছে—কিন্তু কোনো সমাধান দিচ্ছে না।

@ edu quest



৩৫


মেধাবী হওয়ার জন্য অসংখ্য ঘণ্টা পড়তে হয়—এটা একটা বড় মিথ। আসল রহস্য লুকিয়ে আছে স্মার্ট স্টাডি টেকনিক-এ। আপনি যদি স্মার্টলি পড়তে জানেন, তাহলে কম সময়েই অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে যেতে পারবেন।"

এসব সমস্যার পেছনে কারণ একটাই—পড়ার সঠিক কৌশল জানা নেই। বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ব বলছে, কিছু নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করলে পড়া শুধু মুখস্থ হবে না, বরং মস্তিষ্কে দীর্ঘস্থায়ীভাবে গেঁথে যাবে।

পড়া দ্রুত মুখস্থ ও সহজে বোঝার ২২টি বিজ্ঞানভিত্তিক কৌশল (বিস্তারিত বিশ্লেষণসহ)

পড়ার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করা (𝗣𝘂𝗿𝗽𝗼𝘀𝗲 𝗗𝗿𝗶𝘃𝗲𝗻 𝗦𝘁𝘂𝗱𝘆)

মনস্তত্ত্ব: মানুষের মস্তিষ্ক তখনই সবচেয়ে ভালোভাবে তথ্য ধরে রাখে যখন সে বোঝে “কেন” সে কিছু শিখছে।

উদাহরণ: ধরো তুমি বিজ্ঞান পড়ছো— যদি জানো এই জ্ঞানটা তোমার জীবনে কোথায় কাজে লাগবে (যেমন চিকিৎসক হতে চাইলে জেনেটিক্স কেন দরকার), তাহলে পড়াটা অর্থবহ হয়ে ওঠে এবং সহজে মুখস্থ হয়।

মন প্রস্তুত করো (𝗠𝗲𝗻𝘁𝗮𝗹 𝗣𝗿𝗶𝗺𝗶𝗻𝗴)

বিশ্লেষণ: পড়ার আগে কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করে গভীর নিশ্বাস নাও এবং ভাবো—"আমি পড়তে বসেছি, এটা আমার ভবিষ্যতের জন্য দরকার।" এটা ব্রেনকে ‘𝗳𝗼𝗰𝘂𝘀 𝗺𝗼𝗱𝗲’-এ নিয়ে আসে।

মনস্তত্ত্ব: এটি প্রাক-ফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সক্রিয় করে, যা মনোযোগ ও পরিকল্পনার জন্য দায়ী।

𝗣𝗼𝗺𝗼𝗱𝗼𝗿𝗼 𝗧𝗲𝗰𝗵𝗻𝗶𝗾𝘂𝗲 অনুসরণ করো (২৫ মিনিট পড়া + ৫ মিনিট বিরতি)

মনস্তত্ত্ব: মানুষের গড় মনোযোগকাল ২০-৩০ মিনিট। তার বেশি হলে ক্লান্তি আসে।

উদাহরণ: ২৫ মিনিট পড়ে ৫ মিনিট ঘুরে এসো বা জল খাও—তাহলে আবার মন ফ্রেশ হয়ে পড়ায় ফেরা যায়।

𝗦𝗤𝟯𝗥 মেথডে পড়া (𝗦𝘂𝗿𝘃𝗲𝘆, 𝗤𝘂𝗲𝘀𝘁𝗶𝗼𝗻, 𝗥𝗲𝗮𝗱, 𝗥𝗲𝗰𝗶𝘁𝗲, 𝗥𝗲𝘃𝗶𝗲𝘄)

𝗦𝘂𝗿𝘃𝗲𝘆: শিরোনাম, সাবহেডিং, চিত্র দেখে সংক্ষিপ্ত ধারণা নাও।

𝗤𝘂𝗲𝘀𝘁𝗶𝗼𝗻: “এই অধ্যায়ে কী শিখব?” এরকম প্রশ্ন করো।

𝗥𝗲𝗮𝗱: মনোযোগ দিয়ে পড়ো।

𝗥𝗲𝗰𝗶𝘁𝗲: নিজের ভাষায় বোঝাও।

𝗥𝗲𝘃𝗶𝗲𝘄: পড়া শেষে ঝালিয়ে নাও।

মনস্তত্ত্ব: এটি মস্তিষ্কের 𝗲𝗻𝗰𝗼𝗱𝗶𝗻𝗴 ক্ষমতা বাড়ায়।

𝗙𝗲𝘆𝗻𝗺𝗮𝗻 𝗧𝗲𝗰𝗵𝗻𝗶𝗾𝘂𝗲 – বোঝো এবং অন্যকে বোঝাও

উদাহরণ: তুমি যদি "গ্রাভিটি" পড়ো, তারপর সেটি ৭ বছরের শিশুকে বোঝাতে পারো, তাহলে বোঝো তুমি সত্যিই বুঝেছো।

মনস্তত্ত্ব: যখন আমরা কাউকে শেখাই, তখন আমাদের ব্রেন “𝗿𝗲𝘁𝗿𝗶𝗲𝘃𝗮𝗹 𝗽𝗿𝗮𝗰𝘁𝗶𝗰𝗲” করে—এটা মুখস্থ করার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

𝗠𝗶𝗻𝗱 𝗠𝗮𝗽𝗽𝗶𝗻𝗴 – চিত্রের মাধ্যমে ধারণা গাঁথা

বিশ্লেষণ: বিষয়ভিত্তিক শব্দ, সংযোগরেখা ও রঙ ব্যবহার করে চিত্র তৈরি করো।

উদাহরণ: 'ফুড চেইন' বোঝার জন্য ‘সূর্য → গাছ → ঘাসফড়িং → ব্যাঙ → সাপ’ এভাবে চিত্র আঁকো।

মনস্তত্ত্ব: ভিজ্যুয়াল ইমেজ দীর্ঘমেয়াদী মেমোরিতে ভালোভাবে থাকে।

অ্যাকটিভ রিকল – নিজেকে প্রশ্ন করে শেখা

উদাহরণ: প্রথম সংবিধান কবে তৈরি হয়?” নিজেকে প্রশ্ন করে স্মরণ করো।।

মনস্তত্ত্ব: শুধু পড়ে যাওয়া নয়, তথ্য ব্রেইন থেকে টেনে বের করার অভ্যাসই শেখাকে স্থায়ী করে।

𝗠𝗻𝗲𝗺𝗼𝗻𝗶𝗰𝘀 বা শর্টকাট রিমাইন্ডার ব্যবহার করো

উদাহরণ: রং মনে রাখতে “বিবিজিওয়াইভি” (বেগুনি, নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল)।

মনস্তত্ত্ব: তথ্যকে ছন্দ বা কৌতুকপূর্ণভাবে সাজালে মস্তিষ্ক তা সহজে স্মরণ করতে পারে।

ছন্দ বা গানে মুখস্থ করা (𝗥𝗵𝘆𝘁𝗵𝗺𝗶𝗰 𝗠𝗲𝗺𝗼𝗿𝗶𝘇𝗮𝘁𝗶𝗼𝗻)

উদাহরণ: গুণের সূত্র বা ইংরেজি 𝗴𝗿𝗮𝗺𝗺𝗮𝗿 𝗿𝘂𝗹𝗲𝘀 ছন্দে বললে মুখস্থ হয় সহজে।

মনস্তত্ত্ব: ছন্দে তথ্য নিলে তা আবেগিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়—তাই স্মরণযোগ্যতা বেড়ে যায়।

𝗖𝗵𝘂𝗻𝗸𝗶𝗻𝗴 𝗧𝗲𝗰𝗵𝗻𝗶𝗾𝘂𝗲 – তথ্যকে ছোট ছোট টুকরায় ভাগ করা

উদাহরণ: “১৫৭৫২৩০১৯৫” মনে রাখা কঠিন। কিন্তু “১৫৭-৫২৩-০১৯৫” ভাগ করলে সহজ হয়।

মনস্তত্ত্ব: মস্তিষ্ক একসঙ্গে ৭±২ আইটেম রাখতে পারে। তাই ছোট ছোট অংশে ভাঙলে বোঝা ও মনে রাখা সহজ হয়।

 𝗠𝗲𝗺𝗼𝗿𝘆 𝗣𝗮𝗹𝗮𝗰𝗲 – মনে করার জন্য অবস্থান নির্ধারণ করা

উদাহরণ: ঘরের প্রতিটি কোণ একটা তথ্য। খাটে আছে প্রথম তথ্য, টেবিলে দ্বিতীয়, দরজার পাশে তৃতীয়।

মনস্তত্ত্ব: স্থানভিত্তিক স্মৃতি মানুষ খুব ভালো রাখতে পারে। তাই স্থান অনুযায়ী তথ্য সাজালে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

বাস্তব উদাহরণ খুঁজে শেখা (𝗖𝗼𝗻𝘁𝗲𝘅𝘁𝘂𝗮𝗹 𝗟𝗲𝗮𝗿𝗻𝗶𝗻𝗴)

উদাহরণ: গণিতের শতাংশ বোঝার সময় রেস্টুরেন্ট বিল বা ডিসকাউন্টের উদাহরণ নাও।

মনস্তত্ত্ব: রিয়েল লাইফ কানেকশন ব্রেইনের ‘𝗲𝗺𝗼𝘁𝗶𝗼𝗻𝗮𝗹 𝘁𝗮𝗴’ তৈরি করে, যা স্মৃতিকে শক্ত করে।

দলে পড়া ও আলোচনা করা (𝗚𝗿𝗼𝘂𝗽 𝗗𝗶𝘀𝗰𝘂𝘀𝘀𝗶𝗼𝗻)

উদাহরণ: বন্ধুরা মিলে প্রতিদিন একেকজন একটি করে বিষয় শেখায়।

মনস্তত্ত্ব: আলোচনা করলে 𝗔𝗰𝘁𝗶𝘃𝗲 𝗟𝗶𝘀𝘁𝗲𝗻𝗶𝗻𝗴 ও 𝗥𝗲𝗽𝗵𝗿𝗮𝘀𝗶𝗻𝗴 হয়—যা 𝗥𝗲𝘁𝗲𝗻𝘁𝗶𝗼𝗻 বাড়ায়।

পড়ার পর ৬ ঘণ্টার মধ্যে রিভিশন (𝗜𝗺𝗺𝗲𝗱𝗶𝗮𝘁𝗲 𝗥𝗲𝘃𝗶𝗲𝘄)

মনস্তত্ত্ব: '𝗘𝗯𝗯𝗶𝗻𝗴𝗵𝗮𝘂𝘀 𝗙𝗼𝗿𝗴𝗲𝘁𝘁𝗶𝗻𝗴 𝗖𝘂𝗿𝘃𝗲' অনুযায়ী, পড়ার ৬ ঘণ্টার মধ্যে রিভিশন না দিলে ৭০% ভুলে যাই।

উপায়: পড়া শেষ করেই চট করে একবার ঝালিয়ে নাও।

পরিচ্ছন্ন পরিবেশে পড়া (𝗖𝗹𝘂𝘁𝘁𝗲𝗿-𝗙𝗿𝗲𝗲 𝗭𝗼𝗻𝗲)

মনস্তত্ত্ব: বিশৃঙ্খলা ব্রেইনে 𝗰𝗼𝗴𝗻𝗶𝘁𝗶𝘃𝗲 𝗹𝗼𝗮𝗱 বাড়ায়। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ মনোযোগ ও উৎসাহ বাড়ায়।

একটা সময়ে একটা বিষয় (𝗠𝗼𝗻𝗼-𝘁𝗮𝘀𝗸𝗶𝗻𝗴)

বিশ্লেষণ: একসঙ্গে বিজ্ঞান ও গণিত পড়লে কোনোটা ঠিকমতো হয় না। একটা শেষ করে আরেকটা ধরো।

মনস্তত্ত্ব: 𝗠𝘂𝗹𝘁𝗶𝘁𝗮𝘀𝗸𝗶𝗻𝗴 ব্রেইনের 𝗰𝗼𝗴𝗻𝗶𝘁𝗶𝘃𝗲 𝘀𝘄𝗶𝘁𝗰𝗵 বাড়ায়, যা শেখার গভীরতা কমায়।

ঘুম ও বিশ্রাম (𝗦𝗹𝗲𝗲𝗽 & 𝗖𝗼𝗻𝘀𝗼𝗹𝗶𝗱𝗮𝘁𝗶𝗼𝗻)

মনস্তত্ত্ব: ঘুমের সময় আমাদের হিপোক্যাম্পাস দিনের শেখা তথ্যকে 𝗹𝗼𝗻𝗴-𝘁𝗲𝗿𝗺 𝗺𝗲𝗺𝗼𝗿𝘆 তে রূপান্তর করে।

তথ্য: রাতে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম না হলে পড়া ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক।

৭-২-১ রিভিশন রুল (𝗦𝗽𝗮𝗰𝗲𝗱 𝗥𝗲𝗽𝗲𝘁𝗶𝘁𝗶𝗼𝗻)

রিভিশন করো:

১ দিন পর

২ দিন পর

৭ দিন পর

মনস্তত্ত্ব: 𝗦𝗽𝗮𝗰𝗲𝗱 𝗥𝗲𝗽𝗲𝘁𝗶𝘁𝗶𝗼𝗻 মস্তিষ্কের রিটেনশন শক্তি বাড়ায়। এটি লং-টার্ম মেমোরির জন্য সেরা কৌশল।

𝗠𝗼𝗰𝗸 𝗧𝗲𝘀𝘁 বা নিজেকে প্রশ্ন করো

উদাহরণ: প্রতিদিন শেষে নিজের পড়া নিয়ে ৫টা প্রশ্ন তৈরি করে উত্তর দাও।

মনস্তত্ত্ব: পরীক্ষার আগে বারবার নিজেকে যাচাই করলে 𝘁𝗲𝘀𝘁 𝗮𝗻𝘅𝗶𝗲𝘁𝘆 কমে যায় এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

𝗦𝗲𝗹𝗳-𝗥𝗲𝘄𝗮𝗿𝗱 𝗦𝘆𝘀𝘁𝗲𝗺 তৈরি করো

উদাহরণ: একটা অধ্যায় শেষ করলেই নিজেকে ১০ মিনিট গান শুনতে দাও বা চকোলেট খাও।

মনস্তত্ত্ব: পুরস্কার 𝗱𝗼𝗽𝗮𝗺𝗶𝗻𝗲 𝗿𝗲𝗹𝗲𝗮𝘀𝗲 করে—যা শেখাকে আনন্দদায়ক করে তোলে।

ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করো (𝗔𝗻𝗸𝗶, 𝗡𝗼𝘁𝗶𝗼𝗻, 𝗠𝗶𝗻𝗱𝗠𝗲𝗶𝘀𝘁𝗲𝗿)

উদাহরণ: 𝗡𝗼𝘁𝗶𝗼𝗻-এ নোট নাও, 𝗔𝗻𝗸𝗶-তে ফ্ল্যাশকার্ড তৈরি করো।

মনস্তত্ত্ব: ডিজিটাল সংরক্ষণ ও পুনরাবৃত্তি স্মৃতিকে সহায়তা করে।

ভিডিও দেখে শেখা (𝗩𝗶𝘀𝘂𝗮𝗹 𝗟𝗲𝗮𝗿𝗻𝗶𝗻𝗴)

উদাহরণ: ইউটিউবে দেখা যায়—‘𝗗𝗡𝗔 কীভাবে কাজ করে’ তা 𝗮𝗻𝗶𝗺𝗮𝘁𝗶𝗼𝗻 𝘃𝗶𝗱𝗲𝗼-তে সহজে বোঝা যায়।

মনস্তত্ত্ব: মস্তিষ্কের ৬০% অংশ ভিজ্যুয়াল প্রসেসিং করে। তাই চোখ দিয়ে দেখা জিনিস সহজে মনে থাকে।

শুধু বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানো পড়া নয়, পড়া হওয়া উচিত বুদ্ধিদীপ্ত, উদ্দেশ্যমূলক ও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত। উপরের প্রতিটি কৌশল আপনি প্রতিদিন একটু একটু করে প্রয়োগ করতে শুরু করলে, আপনার শেখার ধরন, মনে রাখার ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস এক অসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছবে।

@edu quest


৩৬



সকালের মাত্র ১০ মিনিট হাঁটা মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক থেরাপি (Natural Brain Therapy)।

কারণ এই সময়ে হাঁটার ফলে মস্তিষ্কে এমন কিছু পরিবর্তন হয় যা স্ট্রেস কমায়, চিন্তা পরিষ্কার করে, এবং মুড উন্নত করে।

নিচে সহজভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হলো।

কর্টিসল (Cortisol) নিয়ন্ত্রণ করে

ঘুম থেকে ওঠার পরে শরীরে স্বাভাবিকভাবে কর্টিসল হরমোন (Stress Hormone) বাড়ে।

যদি আপনি তখনই

মোবাইল স্ক্রল করেন

বা চিন্তা শুরু করেন

তাহলে কর্টিসল আরও বেড়ে যায়।

কিন্তু ১০ মিনিট হাঁটলে —

শরীরের স্ট্রেস রেসপন্স নিয়ন্ত্রণে আসে

মস্তিষ্ক বুঝতে পারে আপনি নিরাপদ পরিবেশে আছেন

উদ্বেগ (Anxiety) কমে

এই কারণেই অনেক মনোবিজ্ঞানী সকালে হাঁটাকে Stress Reset Activity বলেন।

ডোপামিন (Dopamine) ও সেরোটোনিন (Serotonin) বাড়ায়

হাঁটার সময় শরীরে Happy Chemicals তৈরি হয়।

বিশেষ করে—

ডোপামিন (Dopamine) → motivation বাড়ায়

সেরোটোনিন (Serotonin) → mood ভালো করে

এন্ডরফিন (Endorphin) → মানসিক ব্যথা কমায়

ফলাফল—

মন ভালো লাগে

দিন শুরু হয় ইতিবাচকভাবে

বিষণ্নতার ঝুঁকি কমে

নিউরোপ্লাস্টিসিটি (Neuroplasticity) বাড়ায়

নিউরোপ্লাস্টিসিটি মানে মস্তিষ্কের নতুন সংযোগ তৈরি করার ক্ষমতা।

সকালের আলো + হাঁটা মিলে মস্তিষ্কে BDNF (Brain Derived Neurotrophic Factor) বাড়ায়।

এটা—

নতুন নিউরন তৈরি করতে সাহায্য করে

স্মৃতি শক্তি বাড়ায়

শেখার ক্ষমতা উন্নত করে

এই কারণে অনেক গবেষক বলেন—

Morning walk is a natural brain fertilizer.

চিন্তা পরিষ্কার করে (Mental Clarity)

হাঁটার সময় মস্তিষ্কের Default Mode Network (DMN) সক্রিয় হয়।

এর ফলে—

চিন্তা গুছিয়ে আসে

নতুন আইডিয়া আসে

সমস্যার সমাধান সহজ মনে হয়

এই কারণেই অনেক বড় চিন্তাবিদ যেমন

Friedrich Nietzsche

এবং Steve Jobs

নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস করতেন।

সূর্যের আলো মস্তিষ্কের ঘড়ি ঠিক করে

সকালের সূর্যের আলো Circadian Rhythm ঠিক করে।

এর ফলে—

রাতে ভালো ঘুম হয়

মেলাটোনিন (Melatonin) ঠিকভাবে নিঃসৃত হয়

শরীরের এনার্জি বাড়ে

ঘুম ভালো হলে

মস্তিষ্কও সুস্থ থাকে।

মানসিক ভার কমায়

হাঁটা এক ধরনের Moving Meditation।

এর সময়—

মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়

অতিরিক্ত চিন্তা কমে

emotional balance তৈরি হয়

অনেক সময় ১০ মিনিট হাঁটা

১ ঘণ্টা চিন্তার থেকেও বেশি উপকার দেয়।

ছোট একটা সহজ রুটিন

সকালে চেষ্টা করুন—

ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস পানি

১০ মিনিট হাঁটা

সূর্যের আলোতে ২ মিনিট দাঁড়ানো

গভীর শ্বাস নেওয়া

এটাই হতে পারে আপনার Natural Brain Therapy Routine।

মস্তিষ্কের যত্ন নেওয়ার জন্য সব সময় বড় থেরাপি দরকার হয় না। অনেক সময় প্রকৃতি (Nature)-ই সবচেয়ে বড় চিকিৎসক।

প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট হাঁটা

আপনার মস্তিষ্ককে নতুন করে রিসেট করতে পারে।

@ সাইকোলজি ও মনের যত্ন


৩৭

১. যখন ক্ষিদে পাবে তখনই খাবেন। 2MAD বা OMAD

যদি আপনি কেবল তখনই খান যখন সত্যিই ক্ষিদে পায় এবং পেট ভরে গেলে খাওয়া বন্ধ করেন, তবে আপনার শরীর অনেক বেশি দক্ষতার সাথে কাজ করে। অনবরত খেতে থাকলে তা আপনার শরীরের ওপর ক্রমাগত চাপ ফেলে এবং স্বাভাবিক বিপাকীয় (metabolic) ভারসাম্য নষ্ট করে। এটি তত্ত্বে সহজ হলেও প্রয়োগে অত্যন্ত কার্যকরী।

২. তৃষ্ণা পেলেই কেবল পানি পান করুন

সারাদিন জোর করে পানি পান করলে তা আপনার ইলেক্ট্রোলাইট, বিশেষ করে সোডিয়ামকে পাতলা করে দিতে পারে। বেশি পানি মানেই সব সময় ভালো হাইড্রেশন নয়। কিছু ক্ষেত্রে, সাধারণ পানির চেয়ে কার্বনেটেড পানি আপনাকে বেশি হাইড্রেটেড বোধ করতে সাহায্য করতে পারে।

৩. নিজের জন্য লো কার্ব ডায়েট বেছে নিন

আপনার শরীর ইনসুলিন সেনসেটিভ থাকলেও দৈনিক ২০০ গ্রামের বেশি কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। উচ্চ ফ্যাট ও প্রোটিন নির্ভর খাদ্যভ্যাস আপনাকে দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকে নিরাপদ রাখবে।

৪. ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করুন

আপনি 'কী' খাচ্ছেন তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি 'কখন' খাচ্ছেন। ফাস্টিং বা উপবাস আপনার শরীরকে কোষ মেরামত করতে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রোটিনকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করতে এবং প্যাথোজেন (রোগজীবাণু) দূর করতে সাহায্য করে। কৌশলগতভাবে আপনার খাবারের সময় নির্ধারণ করা সামগ্রিক স্বাস্থ্য এবং বিপাকীয় কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

৫. স্নাকস বা হালকা খাবার খাওয়া বন্ধ করুন

ঘন ঘন স্নাকস খেলে ইনসুলিনের মাত্রা বেশি থাকে এবং বিপাকক্রিয়া ব্যাহত হয়। মূল খাবারগুলোর মাঝখানে হালকা খাবার বাদ দিলে তা ফ্যাট-বার্নিং (চর্বি পোড়ানো) বাড়ায়, এনার্জি বা শক্তি স্থিতিশীল করে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে উন্নত করে, এমনকি আপনার ডায়েট পরিবর্তন না করলেও।

৬. শুধু চিনি নয়, মোট কার্বোহাইড্রেটের দিকে নজর দিন

স্টার্চ, মাল্টোডেক্সট্রিন এবং ময়দার মতো লুকানো কার্বোহাইড্রেটগুলো শর্করার পরিমাণ কম থাকলেও রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। দৈনিক কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখলে তা শক্তির স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যকর ইনসুলিনের মাত্রা এবং সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে।

৭. আপনার ফাস্টিং ইনসুলিন পরীক্ষা করুন

রক্তে শর্করা বাড়ার কয়েক বছর আগেই ফাস্টিং ইনসুলিনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এটি আগে থেকে পর্যবেক্ষণ করলে ডায়াবেটিস বা বিপাকীয় সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই আপনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন। আগে থেকে শনাক্ত করতে পারাই হলো প্রতিরোধের চাবিকাঠি।

৮. ভিটামিন ডি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

ভিটামিন ডি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হরমোনের ভারসাম্য এবং জিন এক্সপ্রেশনকে সমর্থন করে। অনেক মানুষের প্রতিদিন ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ আইইউ (IU) প্রয়োজন হয় এবং কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আরও বেশি মাত্রার প্রয়োজন হতে পারে। আপনার মাত্রা পরীক্ষা করলে সর্বোত্তম স্বাস্থ্যের জন্য আপনি সঠিক পরিমাণ পাচ্ছেন কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়।

৯. ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাশিয়ামকে অগ্রাধিকার দিন

ম্যাগনেসিয়াম পেশীর কার্যকারিতা ও স্নায়ুর স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং ভিটামিন ডি-কে সক্রিয় করে। পটাশিয়াম হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে, স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখে এবং শক্তির মাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করে। বিপাকীয় এবং কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের জন্য এই দুটিরই পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্রহণ অপরিহার্য। ভিটামিন D3K2 এবং ম্যাগনেসিয়াম গ্লাইসিনেট সাপ্লিমেন্ট হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।

১০. ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট নিয়ে সতর্ক থাকুন

অনেক মাল্টিভিটামিন সিন্থেটিক এবং নিম্নমানের হয়, যেগুলোতে প্রায়শই জৈব-উপলব্ধ (bioavailable) পুষ্টির অভাব থাকে। উচ্চমানের সাপ্লিমেন্ট বা পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের দিকে মনোযোগ দিন যাতে আপনার শরীর গ্রহণ করা ভিটামিনগুলো আসলে শোষণ করে এবং কাজে লাগাতে পারে।

১১. রেড মিট বা লাল মাংসকে ভয় পাবেন না

ঘাস-খাওয়া প্রাণীর লাল মাংস অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন এবং এটি প্রোটিন, আয়রন এবং অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিডের একটি উচ্চমানের উৎস। আপনার ডায়েটে এটি অন্তর্ভুক্ত করলে তা আপনার শক্তি বাড়াতে পারে, রক্তে শর্করা স্থিতিশীল করতে পারে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে।

১২. আপনার অন্ত্রের স্বাস্থ্য (গাট হেলথ) পুনর্গঠন করুন

অ্যান্টিবায়োটিক এবং আধুনিক ডায়েট দীর্ঘমেয়াদে আপনার অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমকে ব্যাহত করতে পারে। অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো পুনরুদ্ধার করা আপনার হজম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে সমর্থন করে। ফারমেন্টেড (গাঁজানো) খাবার বা উচ্চমানের প্রোবায়োটিক একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য পুনরায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।

১৩. অতিরিক্ত ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন

পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়া অতিরিক্ত ব্যায়াম করা আপনার টেস্টোস্টেরন কমিয়ে দিতে পারে, প্রদাহ বাড়াতে পারে এবং শক্তি নিঃশেষ করতে পারে। সর্বোত্তম পারফরম্যান্স, হরমোনের ভারসাম্য এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্য বিশ্রামের সাথে ব্যায়ামের ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য।

১৪. সার্জারির আগে এবং গর্ভাবস্থায় ভিটামিন ডি গ্রহণ করুন

সার্জারির সময় পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি ইমিউন ফাংশন, দ্রুত সেরে ওঠা এবং নিরাময়ে সাহায্য করে। গর্ভাবস্থায়, এটি মাতৃস্বাস্থ্য, ভ্রূণের বিকাশ এবং প্রসবোত্তর জটিলতার ঝুঁকি কমানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

@ Health Tips Pro


**"র‍্যাচেট ইফেক্ট" (Ratchet Effect)** — অর্থাৎ, একবার আরাম আর সুযোগ-সুবিধার স্তর বেড়ে গেলে, সেখান থেকে আবার পুরনো, সাধারণ জীবনে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। মনে রাখবেন, আরাম যত বেশি বাড়তে থাকে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা ততই কঠিন হয়ে যায়। তাই নিজেকে কখনোই এতটা আরামে অভ্যস্ত করে ফেলবেন না। 


৩৮


ল্যাটিন বর্ণমালা (A, B, C, D)

আজ আমরা যে ল্যাটিন বর্ণমালা (A, B, C, D) ব্যবহার করি, তা একদিনে তৈরি হয়নি। আমরা অনেক সময় ল্যাটিন বর্নমালাকে ইংরেজি বর্নমালা বলে ভুল করি। আসলে (A, B, C, D) এই বর্নমালাকে ল্যাটিক বর্নমালা বলে আর এর জন্ম হয়েছে ইতালিতে। হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন সভ্যতার হাত ঘুরে এটি বর্তমান রূপ পেয়েছে। ওপরের চিত্রটিতে বর্ণমালার এই সুদীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস ধাপে ধাপে তুলে ধরা হয়েছে।

চলুন দেখে নিই বর্ণমালার এই ঐতিহাসিক যাত্রাপথ:

১. মিশরীয় চিত্রলিপি (প্রায় খ্রিঃ পূঃ ৩২০০): বর্ণমালার আদি রূপ শুরু হয় প্রাচীন মিশরে। সেসময় মানুষ তাদের ধর্মীয়, প্রশাসনিক ও স্মারক স্তম্ভের জন্য ছবি বা প্রতীকের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করত।

২. আদি-সিনাইটিক লিপি (প্রায় খ্রিঃ পূঃ ১৮৫০-১৫৫০): মিশরীয় চিত্রলিপির প্রভাবে সিনাই উপদ্বীপ ও দক্ষিণ লেভান্ট অঞ্চলে প্রথম একটি আদি বর্ণমালার উদ্ভব হয়। এখানে পূর্ববর্তী সচিত্র প্রতীকগুলো ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট ধ্বনির প্রতীকে পরিণত হতে শুরু করে।

৩. ফিনিশীয় বর্ণমালা (প্রায় খ্রিঃ পূঃ ১০৫০): আধুনিক লেবানন এবং এর নিকটবর্তী উপকূলে ফিনিশীয়রা পূর্বের লিপিগুলোকে আরও সহজ ও বিমূর্ত করে একটি ব্যঞ্জনবর্ণভিত্তিক বর্ণমালা তৈরি করে। আধুনিক অনেক বর্ণমালার মূল ভিত্তি এটিই।

৪. গ্রীক বর্ণমালা (প্রায় খ্রিঃ পূঃ ৮০০): গ্রীকরা ফিনিশীয় বর্ণমালা গ্রহণ করে এবং তাতে নতুন মাত্রা যোগ করে। তারাই প্রথম বর্ণমালায় স্বরবর্ণ (Vowels) যুক্ত করে একে আরও পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়।

৫. ইট্রুস্কান বর্ণমালা (প্রায় খ্রিঃ পূঃ ৭০০): প্রাচীন ইতালিতে ব্যবহারের জন্য গ্রীক বর্ণমালাকে কিছুটা পরিবর্তন করে ইট্রুস্কান বর্ণমালার প্রচলন করা হয়।

৬. ল্যাটিন বর্ণমালা (খ্রিঃ পূঃ ৬০০ থেকে): ইট্রুস্কান বর্ণমালা থেকেই পরবর্তীতে ল্যাটিন বর্ণমালার উদ্ভব ঘটে প্রাচীন রোমে। এটিই ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়ে আজকের আধুনিক ল্যাটিন বা ইংরেজি বর্ণমালার রূপ ধারণ করেছে।

ইতিহাসের এই পথটি অবশ্য আরও অনেক বেশি জটিল। সময়ের সাথে সাথে অসংখ্য লিপি একে অপরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তবে ওপরের ধাপগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কীভাবে প্রাচীন যুগের সাধারণ ছবি বা প্রতীক থেকে ধীরে ধীরে আজকের আধুনিক ও সুশৃঙ্খল বর্ণমালার জন্ম হয়েছে।

@ Saiful Islam


৩৯


ধ্বংসস্তূপ থেকে পৃথিবীর ১ নম্বর সুখী দেশ,নাম তার ফিনল্যান্ড!

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযু' দ্ধের তান্ডবে বরফে ঢাকা ছোট্ট দেশ ফিনল্যান্ড তখন ধ্বংসস্তূপ! একপাশে রাক্ষসের মতো রাশিয়া অন্যপাশে বিশ্বযু''দ্ধের ধ্বংসলীলা।

যু' দ্ধের পর ফিনল্যান্ডের অবস্থা কী ছিল জানেন?

দেশের ১০% ভূখণ্ড রাশিয়া দখল করে নিলো। ৪ লাখ মানুষ রাতারাতি গৃহহীন ও শরণার্থী! আর তার উপর দিয়ে রাশিয়া বিশাল অঙ্কের জরিমানা  চাপিয়ে দিলো, যার পরিমাণ আজ হিসাব করলে মাথা ঘুরে যাবে!

সবাই ভেবেছিলো ফিনল্যান্ড শেষ, এই দেশ আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু এরপর ফিনল্যান্ড যা করলো, তা আমাদের দেশের দুর্নীতিবাজদের মুখে জুতার বাড়ি মারার মতো ইতিহাস!

ফিনল্যান্ডের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিসো র্যুটি  জানতেন, রাশিয়াকে থামাতে জার্মান অ* স্ত্র দরকার। কিন্তু চুক্তি করলে যু* দ্ধশেষে বিজয়ী মিত্রশক্তি ফিনল্যান্ডকে ছিঁড়ে খাবে।

তিনি কী করলেন? পার্লামেন্টকে বাঁচিয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্বাক্ষরে জার্মানির সাথে চুক্তি করলেন! যাতে সব দায় তাঁর একার ওপর পড়ে, দেশের ওপর নয়। অ* স্ত্র এলো, ফিনল্যান্ড স্বাধীন থাকলো। আর যু' দ্ধ শেষে প্রেসিডেন্ট র্যুটি নীরবে পদত্যাগ করলেন এবং দেশের সার্বভৌমত্ব বাঁচাতে ১০ বছরের কারাদণ্ড নিজের মাথায় তুলে নিলেন!

নিজের ক্যারিয়ার, নিজের জীবন ধ্বংস করে দেশকে বাঁচিয়ে গেলেন। একেই বলে রিয়েল লিডারশিপ!

আর আমাদের দেশের নেতারা হলে কি করতেন বলেন তো?দেশ বিক্রি করে হলেও নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকতো...!

যাইহোক, রাশিয়া ফিনল্যান্ডের কাছে টাকা চায়নি, চেয়েছিলো জাহাজ আর বড় বড় মেশিনারি। কৃষিভিত্তিক একটা দেশের কাছে যা দেওয়া অসম্ভব ছিলো।

তবুও ফিনল্যান্ড আমাদের মতো বিদেশি ঋণের ভিক্ষার থালা নিয়ে ছোটেনি। প্রশাসনে শতভাগ সততা আর ১ পয়সার দুর্নীতি না করে পুরো জাতিকে কারখানায় নামিয়ে দিলো।

১৯৫২ সালের মধ্যে রাশিয়ার প্রতিটা পাই-পয়সা শোধ করলো।আর এই ঋণ শোধ করতে করতেই ফিনল্যান্ড একটা সাধারণ কাঠের দেশ থেকে বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও শিল্পোন্নত দেশে রূপ নিলো। কারণ, সেখানে প্রজেক্টের নামে কোনো টাকা চুরি হয়নি, কোনো আমলা বিদেশে বেগমপাড়া বানায়নি!

ফিনল্যান্ডের কোনো সোনার খনি ছিলো না, তেলের খনি ছিলো না। ছিলো শুধু বরফ আর কাঠ।

কিন্তু তাদের নেতাদের ভিশন ছিলো পরিষ্কার, দুর্নীতি বন্ধ করো, প্রতিটি ট্যাক্সের টাকা জনগণের শিক্ষায় ঢালো।

কোনো আমলা বা নেতার পকেটে এক আনা টাকাও গেল না। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার, ফ্রি বই আর বিশ্বমানের শিক্ষক তৈরি করা হলো।

ফলাফল, যে দেশটি যু' দ্ধের পর ঋণে জর্জরিত একটা বরফের টুকরো ছিলো, শতভাগ সৎ প্রশাসন আর শিক্ষার শক্তিতে আজ সেই ফিনল্যান্ড  টানা বহু বছর ধরে পৃথিবীর ১ নম্বর সুখী দেশ...পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ দুর্নীতিমুক্ত ও নিরাপদ রাষ্ট্র!

দুর্নীতি বন্ধ করলে বরফের টুকরোও যে সোনা হয়ে উঠতে পারে ফিনল্যান্ড তার  প্রমাণ!

দেশ উন্নত করতে কোনো আলাদিনের চেরাগ বা তেলের খনি লাগে না। লাগে খাঁটি দেশপ্রেম আর চুরিমুক্ত প্রশাসন।আমাদের দেশের যে তথাকথিত 'নেতা', 'আমলা' আর 'উন্নয়নের ফেরিওয়ালারা' প্রজেক্টের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে বিদেশে পাচার করছেন, ফিনল্যান্ডের এই ইতিহাস শুনলে কি তাতের চামড়ায় একটু লজ্জা লাগে? লজ্জা থাকলে চুরি বন্ধ করুন, দেশ এমনিতেই উন্নত হবে!

আর নেতা আমলাদের সাথে দেশের জনগনকেও ভালো হতে হবে।

লেখা ~ Diary of She


৪০



আপনি কতটুকু পজিটিভ এখনই দেখে নিন

১. পশুপাখিরা আপনাকে সহজে বিশ্বাস করে

কোনো জোর ছাড়াই বিড়াল বা অন্যান্য অবলা প্রাণী আপনার কাছে শান্ত বোধ করে এবং নিজে থেকেই কাছে চলে আসে।

২. শিশুরা আপনার উপস্থিতিতে নিরাপদ বোধ করে

ছোট বাচ্চারা কোনো ভীতি ছাড়া সহজে আপনার সাথে মিশে যায় এবং দীর্ঘক্ষণ আপনার কাছাকাছি সময় কাটাতে পছন্দ করে।

৩. আসল বয়সের চেয়েও আপনাকে তরুণ দেখায়

আপনার ভেতরের পজিটিভিটি ও মানসিক সতেজতার কারণে মানুষ প্রায়ই আপনার আসল বয়স অনুমানের চেয়ে কম মনে করে।

৪. অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কথা সহজে কেউ বিশ্বাস করে না

আপনার মার্জিত চালচলন ও ব্যক্তিত্বের ভারসাম্যের কারণে পকেটে টাকা না থাকার কথা বললেও অনেকে সহজে বিশ্বাস করতে চায় না।

৫. মানুষের চোখে আপনি স্বাভাবিকভাবেই শ্রদ্ধা ও সমীহ পান

কোনো কৃত্রিম ভাব না নিয়েও পরিচিত ও অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে আপনি সম্মান ও আন্তরিক ভালোলাগা অর্জন করেন।

৬. আপনার উপস্থিতিতে পরিবেশের ভাইব বদলে যায়

আপনি কোনো শান্ত বা গম্ভীর জায়গায় প্রবেশ করলে চারপাশের এনার্জিতে এক ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, যা অন্যরা ঠিকই টের পায়।

৭. কঠিন ও সংকটাপন্ন মুহূর্তেও আপনি শান্ত থাকেন

পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক না কেন, দ্রুত ধৈর্য না হারিয়ে ভেতরের স্থৈর্য বজায় রেখে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

@ Nasir Uddin Shamim


৪১


স্বেচ্ছায় দাসত্ব বরণ করার চেয়ে বড় কোনো বন্দিদশা নেই, 

​মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত দুটি বিপরীতমুখী শক্তির দ্বন্দ্ব। একদল বাইরের পৃথিবী জয় করতে চেয়েছে, অন্যদল চেয়েছে নিজের মনোজগতকে বশ করতে। মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাহ্যিক জগতের যেকোনো অর্জন, তা হতে পারে অর্থ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক পরিচিতি, আসলে মানুষের ভেতরের এই মানসিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার লড়াইয়ের একটি গৌণ উপজাত মাত্র। যে মুহূর্তে একজন মানুষ নিজের ইচ্ছা ও আকস্মিক আবেগের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, ঠিক সেই মুহূর্তেই সে তার সার্বভৌমত্ব অন্যের হাতে তুলে দেয়। প্রাচীন যুগে যা ছিল শক্তির দাসত্ব, আধুনিক যুগে তা রূপান্তরিত হয়েছে ডিজিটাল অ্যালগরিদমের সূক্ষ্ম প্রলোভন, সামাজিক মাধ্যমের সস্তা ডোপামিন এবং অনিয়ন্ত্রিত মানসিক চাহিদায়।

​গ্রীক দর্শনে এই বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে বলা হতো Encratia, যার শাব্দিক অর্থ নিজের ওপর নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা। রোমান স্টোইক দর্শনের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য পরিচালনা করেও সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস তাঁর চিন্তার বড় অংশ ব্যয় করেছিলেন নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজে। তাঁর কাছে রাজনীতি বা সামরিক বিজয়ের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজ চিন্তার গতিপথকে পরিচালনা করা। একইভাবে সেনেকা বিপুল ধন-সম্পদের মাঝে বাস করেও স্বেচ্ছায় চরম দারিদ্র্যের মতো জীবনযাপন করতেন নির্দিষ্ট কিছু দিন। এটি কোনো বৈরাগ্য ছিল না, বরং এটি ছিল এক মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা, নিজের ভয়কে পরিমাপ করা এবং নিশ্চিত করা যে বাইরের পরিস্থিতি যতই পরিবর্তিত হোক, অন্তরের স্থিরতা যেন কখনো বিনষ্ট না হয়।

​সাইকোলজি এবং নিউরোসায়েন্সের আধুনিক গবেষণা এই দার্শনিক সত্যকেই বিজ্ঞানভিত্তিক রূপ দিয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্ববিদ ওয়াল্টার মিশেলের বিখ্যাত মার্শমেলো টেস্ট প্রমাণ করেছিল যে, তাৎক্ষণিক সুখ বা পরিতৃপ্তি স্থগিত করার ক্ষমতাই একজন মানুষের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের প্রধান নিয়ামক। চার দশক ধরে পর্যবেক্ষণ করা সেই গবেষণায় দেখা যায়, যে শিশুরা প্রলোভন সংবরন করতে পেরেছিল, তারা ভবিষ্যতে কেবল একাডেমিক বা পেশাগত দিক থেকেই নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্য ও সম্পর্কের দিক থেকেও বহু গুণে স্থিতিশীল ছিল।

​মস্তিষ্কের গঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অংশটি যুক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের চালিকাশক্তি। যখন একজন মানুষ মানসিক চাপ, ক্লান্তি বা প্রলোভনের মুখে পড়ে, তখন মস্তিষ্কের প্রাচীন আদিম অংশ অ্যামিগডালা তাৎক্ষণিক সুখের জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে। প্রতিবার যখন কোনো মানুষ সহজ প্রলোভনকে না বলে কঠিন পথ বেছে নেয়, তখন নিউরোপ্লাস্টিসিটির নিয়মে তার মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এটি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয় এটি একটি শারীরিক ও নিউরোলজিক্যাল প্রক্রিয়া, যা অনুশীলনের মাধ্যমে যেকোনো মানুষ বিকাশ করতে পারে।

​তবে আত্মশাসনকে অনেক সময় একটি নিষ্ঠুর যুদ্ধ বা মনকে যন্ত্রণা দেওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, অন্ধ প্রতিরোধ বা ইচ্ছাকে জোর করে চেপে রাখা খুব দ্রুত মানসিক ক্লান্তি বা উইলপাওয়ার ডিপলেশন-এর দিকে নিয়ে যায়। প্রকৃত আত্মশাসন হলো মনস্তাত্ত্বিক বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ। এটি নিজেকে কোনো শাস্তির মধ্যে ঠেলে দেওয়া নয়, বরং এটি হলো নিজের আবেগ থেকে নিজেকে খানিকটা দূরত্বে রেখে পর্যবেক্ষণ করার সক্ষমতা। মন যখন আলসেমি বা প্রলোভনের দিকে চালিত হতে চায়, তখন যুদ্ধ না করে শান্তভাবে জীবনের দিকনির্ণয় যন্ত্রটি সঠিক লক্ষ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়াই হলো আসল সক্ষমতা।

​বাহ্যিক কোনো অর্জন দিয়ে মানুষের অন্তরের এই গভীর শূন্যতা কখনো পূরণ করা যায় না। যে মানুষ নিজের ভেতরের এই মানসিক রাজত্ব গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, সে সারাজীবন বাইরের দুনিয়ায় একটি কৃত্রিম সাম্রাজ্য গড়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যায়। অথচ সত্যিকারের রূপান্তর ঘটে খুব নীরবে, লোকচক্ষুর অন্তরালে। প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, যেমন অলসতার মুহূর্তেও নিজের দায়িত্বে অবিচল থাকা, অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনায় নীরবতা পালন করা, কিংবা ক্ষণিক সুবিধার চেয়ে কঠিন সততাকে বেছে নেওয়া, এই অনুশীলনের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে একটি দৃঢ় ও অটল ব্যক্তিত্ব। @ Esrat Jahan Lima



৪২


মানুষের ডানহাত ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক ও বিবর্তনীয় কারণ!

কেন প্রায় প্রতি দশজনের মধ্যে নয়জন মানুষ প্রধানত তাদের ডানহাত ব্যবহার করে? এর উত্তর শুধু অভ্যাস বা লালন-পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্ক, শরীরের গঠন এবং দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাস। PLOS Biology জার্নালে ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা বলছে, মানুষের অসাধারণ ডানহাতি প্রবণতার সঙ্গে দ্বিপদী চলন (bipedalism) এবং মস্তিষ্কের বিবর্তনীয় সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পর্কিত হতে পারে।

গবেষকেরা ৪১টি anthropoid primate species-এর মোট ২,০২৫টি individual-এর handedness সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এরপর phylogenetic comparative model ব্যবহার করে মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন বিলুপ্ত hominin প্রজাতির সম্ভাব্য handedness-এর প্রবণতাও অনুমান করা হয়।

প্রাইমেট বনাম মানুষ: আধুনিক Homo sapiens-এর প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের ডানহাতি প্রবণতা রয়েছে, যা অন্যান্য anthropoid primate-এর তুলনায় অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। কিছু প্রাইমেট প্রজাতির মধ্যে ডান বা বাম হাতের দুর্বল প্রবণতা দেখা গেলেও মানুষের মতো শক্তিশালী ও ধারাবাহিক population-level right-handedness সাধারণ নয়।

বিবর্তনের ধারাবাহিকতা: গবেষণার মডেল অনুযায়ী, Ardipithecus ramidus ও Australopithecus afarensis-এর মতো প্রাচীন hominin-দের handedness direction আধুনিক মানুষের তুলনায় অনেক দুর্বল ছিল। গবেষকরা এদের mean handedness index (MHI) যথাক্রমে প্রায় ০.১৬ ও ০.৩২ হিসেবে অনুমান করেছেন।

ডানহাতি প্রবণতার বৃদ্ধি: genus Homo-এর আবির্ভাবের সঙ্গে handedness-এর দিকনির্দেশ আরও শক্তিশালী হতে দেখা যায়। গবেষণার মডেল অনুযায়ী Homo ergaster-এর MHI প্রায় ০.৫০, Homo erectus-এর প্রায় ০.৫৪ এবং Homo neanderthalensis-এর প্রায় ০.৬৪। অর্থাৎ বিবর্তনের ধারায় Homo গণের সদস্যদের মধ্যে ডানহাতি প্রবণতা ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে বলে গবেষণাটি ইঙ্গিত করে।

গবেষকদের বিশ্লেষণে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উঠে এসেছে। মানুষের অসাধারণ ডানহাতি প্রবণতাকে শুধু “হাতের ব্যবহার” দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; মস্তিষ্কের আকার এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অনুপাত, বিশেষ করে intermembral index-এর মতো বৈশিষ্ট্যগুলো মডেলে অন্তর্ভুক্ত করলে মানুষের ব্যতিক্রমী অবস্থান অনেকটাই ব্যাখ্যা করা যায়। গবেষণাটি তাই মনে করে, দ্বিপদী চলন এবং মস্তিষ্কের বিবর্তনীয় সম্প্রসারণ মানুষের lateralization বা শরীরের দুই পাশের কার্যগত বিশেষায়নের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ শুধু দুই পায়ে হাঁটতে শুরু করার কারণেই ডানহাতি হয়ে গেছে। Handedness একটি জটিল বৈশিষ্ট্য, যার সঙ্গে মস্তিষ্কের hemispheric specialization, আচরণ, পরিবেশ এবং বিবর্তনীয় ইতিহাস—বিভিন্ন বিষয় জড়িত। এমনকি মানুষের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কাজের সময় handedness-এর মাত্রা পরিবর্তিত হতে পারে।

এই গবেষণা তাই মানুষের ডানহাতি হওয়ার একটি সম্ভাব্য বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা সামনে এনেছে। দীর্ঘ সময় ধরে দুই পায়ে চলার পাশাপাশি মস্তিষ্কের আকার ও জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের হাত ব্যবহারের lateralization আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, আজকের মানুষের ডানহাতি হওয়ার প্রবণতা কোনো সাম্প্রতিক অভ্যাস নয়; এর শিকড় বহু প্রাচীন মানববিবর্তনের ইতিহাসে। তবে এটি একটি সম্ভাব্য বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা, চূড়ান্ত কারণ হিসেবে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। @ BIGYAN ALO


৪৩


সন্দ্বীপ দখলের লড়াই: যে দ্বীপে মুখোমুখি হয়েছিল পর্তুগিজ, আরাকান ও মুঘল শক্তি

বঙ্গোপসাগরে চট্টগ্রামের একটি দ্বীপ সন্দ্বীপ। বিচ্ছিন্নতা এই দ্বীপটির মানুষের জীবনযাপনকে কঠিন করেছে, দ্বীপবাসীর জীবনযাত্রার মান এখনও হতাশজনক, সম্ভবনা থাকার পরও সেখানে ভ্রমণ সহজ হয় নি। কিন্তু চারশ বছর আগে এই দ্বীপটিতে পর্তুগিজ, আরাকান ও মুঘলরা হাজির হয়েছিল অন্যরকম "পর্যটনের" প্রত্যাশায়।

আজ না হলেও আদিতে দ্বীপটি ছিল বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্য ও রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। লবণ উৎপাদন, উর্বর কৃষিজমি এবং মেঘনা মোহনা ও চট্টগ্রাম উপকূলের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে সন্দ্বীপের ওপর নিয়ন্ত্রণ মানে ছিল সমুদ্রপথ ও উপকূলীয় বাণিজ্যের ওপরও প্রভাব বিস্তার। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে তাই দ্বীপটি বারবার হাতবদল হয়েছে- কখনো বাংলার আঞ্চলিক শক্তির হাতে, কখনো আরাকানের, কখনো পর্তুগিজদের।

পর্তুগিজদের সন্দ্বীপ-অধ্যায়ের সবচেয়ে নাটকীয় পর্ব শুরু হয় ১৬০২ সালে। জোয়াকিম জোসেফ এ. ক্যাম্পোস তাঁর History of the Portuguese in Bengal গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, ডোমিঙ্গো কার্ভালহোর নেতৃত্বে পর্তুগিজরা সে বছর সন্দ্বীপ দখল করে। দ্বীপে প্রতিরোধ দেখা দিলে দিয়াঙ্গার (দেয়াঙ) পর্তুগিজ কমান্ডার মানুয়েল দে মাতোস সৈন্য নিয়ে কার্ভালহোকে সহায়তা করেন। পরে কার্ভালহো ও মাতোস দ্বীপটির কর্তৃত্ব নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন।

কিন্তু পর্তুগিজদের এই সাফল্য আরাকান রাজ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন চট্টগ্রাম ও বঙ্গোপসাগরের পূর্ব উপকূলে আরাকানের শক্তিশালী প্রভাব ছিল। পর্তুগিজরা আরাকানের অধীনস্থ অঞ্চলে বসতি ও বাণিজ্যিক ঘাঁটি গড়লেও তারা সব সময় আরাকানি রাজার নিয়ন্ত্রণ মেনে চলেনি। সন্দ্বীপ দখলের পর সেই টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়।

ভূমি ছাড়াও সন্দ্বীপের আরও গুরুত্ব ছিল। রিলা মুখার্জির গবেষণায় দেখা যায়, দ্বীপটি ছিল লবণ উৎপাদন ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের বৃহত্তর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের অংশ। পরবর্তী সময়ে এটি আরাকানি ও পর্তুগিজ নৌ-অভিযানের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে।

সপ্তদশ শতকের প্রথম ভাগে সন্দ্বীপকে ঘিরে পরিস্থিতি আর জটিল হয়ে উঠে। পর্তুগিজদের একটি অংশ আরাকানের সঙ্গে সহযোগিতা করলেও তাদের কিছু নেতা স্বাধীন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। সেবাস্তিয়ান গনসালেসের মতো পর্তুগিজ অভিযাত্রীরা এই অস্থিরতার সুযোগ নেন। ফলে সন্দ্বীপের ইতিহাসে তখন কোনো পক্ষই স্থায়ী মিত্র ছিল না। পর্তুগিজ, আরাকানি, বাংলার স্থানীয় শাসক এবং পরে মুঘল, সব পক্ষই নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী জোট বদল করেছে।

এই সময় থেকেই বঙ্গের উপকূলে আরাকানি মগ ও পর্তুগিজ নৌ-অভিযানের একটি অন্ধকার অধ্যায় তৈরি হয়। পর্তুগিজ ও মগদের দ্বারা লুটপাটের পাশাপাশি ব্যাপকহারে মানুষ ধরে নিয়ে যাওয়া ও দাস হিসেবে বিক্রি করার ফলে পুরো দক্ষিণ বঙ্গের মানুষের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠে, যা সেই সময় স্থানীয় লোকসাহিতেও প্রভাব ফেলেছে। সন্দ্বীপের অবস্থান এ ধরনের নৌ-অভিযানের জন্যও সুবিধাজনক ছিল। ফলে দ্বীপটি একদিকে বাণিজ্যকেন্দ্র, অন্যদিকে সামরিক ও নৌঘাঁটি এই দুই ভূমিকাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কিন্তু সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি মুঘল সাম্রাজ্য পূর্ব বাংলায় নিজেদের কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী করতে শুরু করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। শায়েস্তা খান বাংলার সুবাদার হয়ে আসার পর তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রাম আবার আয়ত্ত্বে নেয়া। আরাকান-নিয়ন্ত্রিত চট্টগ্রাম তখন মুঘলদের জন্য একটি সীমান্ত সংকট এবং বঙ্গের উপকূলীয় নিরাপত্তা ও নৌবাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল।

চট্টগ্রাম আক্রমণের আগে শায়েস্তা খান তাই সন্দ্বীপ দখলের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ স্থলবাহিনীর জন্য ভূলুয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হলেও সমুদ্রপথে অভিযান চালানোর জন্য একটি নৌঘাঁটি প্রয়োজন ছিল। সেই কাজে সন্দ্বীপ ছিল আদর্শ। ১৬৬৫ সালের নভেম্বরে মুঘল নৌবাহিনী দ্বীপটির দিকে অগ্রসর হয়। সেখানে তখন দীর্ঘদিনের শাসক দিলাওয়ার খান, যিনি দিলাল রাজা নামেও পরিচিত, প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রথম সংঘর্ষ সহজ ছিল না; কিন্তু শক্তিশালী মুঘল বাহিনী শেষ পর্যন্ত দ্বীপটি দখল করে।

এরপর ঘটে আরও তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। চট্টগ্রামের আরাকানি শাসকদের সঙ্গে সেখানকার পর্তুগিজদের দোস্তি ভেঙে যায়। পর্তুগিজরা পরিবার, জাহাজ ও অস্ত্র নিয়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে মুঘলদের আশ্রয় নেয়। শায়েস্তা খান তাদের আশ্রয়ই দেন ও সামরিক বাহিনীতেও অন্তর্ভুক্ত করেন। অর্থাৎ কয়েক দশক আগে যারা সন্দ্বীপের দখল নিয়ে লড়ছিল, তাদেরই একটি অংশ এবার মুঘলদের হয়ে আরাকানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামল।

সন্দ্বীপ জয়ের পর মুঘলদের জন্য চট্টগ্রামের পথ অনেকটাই খুলে যায়। ১৬৬৬ সালে মুঘল বাহিনী চট্টগ্রাম করায়ত্ব করে এবং আরাকানের দীর্ঘদিনের প্রভাবের অবসান ঘটে। সন্দ্বীপ তাই ইতিহাসে যতটা কম আলোচিত বিপরীতে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধগুলো ছিল বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্যপথ, নৌক্ষমতা ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘ সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। @ বইকাল



৪৪


যখন দুটো পথই আপনার দিকে আসে, আর আপনি চান অন্যজন এমন একটা পথ বেছে নিক যা আপনার জন্য ভালো, তখন এই সহজ কৌশলগুলো কাজে লাগাতে পারেন:

১. সামনের মানুষের মন বুঝুন:

যাকে পছন্দ দেবেন, তার কী দরকার, সে কী চায়, আর তার দুর্বলতা কোথায়—এই সব ভালো করে জেনে নিন।

২. আপনার জন্য লাভজনক অপশন দিন:

এমনভাবে দুটো বা বড়জোর তিনটে পছন্দ দিন, যেন যেটাই সে বেছে নিক, আপনারই লাভ হয়। উদাহরণ: 'আপনি কি সকাল ১০টায় শুরু করবেন নাকি দুপুর ১২টায়?' দুটোই আপনার কাজের সময়।

৩. পছন্দগুলো আকর্ষণীয় করে তুলুন:

আপনার পছন্দের অপশনগুলো এমনভাবে বলুন যেন অন্যজনের কাছে সেগুলো খুব ভালো মনে হয়। তার দিক থেকে কী কী সুবিধা, তা তুলে ধরুন।

৪. বেশি পছন্দ দেবেন না:

মানুষকে দুটো বা বড়জোর তিনটে পছন্দ দিন। এর বেশি পছন্দ দিলে তারা গুলিয়ে ফেলে, আর আপনার হাতের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে।

৫. ছোট্ট একটা ছাড় দেওয়ার ভান করুন:

মাঝে মাঝে এমন একটা অপশন রাখুন যেটা আপনার জন্য খুব সামান্য খারাপ হলেও, অন্যজনের কাছে মনে হবে আপনি তার জন্য কিছু ছাড় দিচ্ছেন। এতে সে খুশি হবে।

৬. খারাপ অপশনগুলোর ক্ষতি বুঝিয়ে দিন:

যদি এমন কোনো অপশন থাকে যা আপনি চান না, সেটার খারাপ দিকগুলো কৌশলে তুলে ধরুন, যাতে সে ওটা বেছে না নেয়।

৭. ফলাফল আগে থেকে ভাবুন:

প্রতিটি পছন্দের কী ফল হতে পারে, তা আগে থেকে ভেবে রাখুন। তাহলে যেকোনো পরিস্থিতি সামলানো সহজ হবে।

৮. ধৈর্য রাখুন:

কৌশল কাজে লাগানোর পর সাথে সাথেই ফল না-ও পেতে পারেন। একটু ধৈর্য ধরুন এবং পরিস্থিতি ফলো করুন।

জীবনে এমন অনেক পরিস্থিতি আসে যখন আপনাকে অন্যকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হয়। কিন্তু বুদ্ধিমানের কাজ হলো, সেই পছন্দগুলো এমনভাবে সাজানো যাতে শেষ পর্যন্ত আপনারই জয় হয়। এই কৌশলগুলো জেনে নিন আর হয়ে উঠুন আপনার খেলার মাস্টার! @ মায়া


৪৫


নিজের ছোটখাটো ভুলগুলো আপনাকে আরও বেশি 'মানুষ' বানায়, 

১. কেউ নিখুঁত না: সবাই চায় আসল মানুষ, কোনো রোবট না। নিজের ছোটখাটো ভুলগুলো আপনাকে আরও বেশি 'মানুষ' বানায়, যা সহজেই অন্যের মনে জায়গা করে নেয়।

২. সহজ হওয়া: যখন আপনি নিজেকে নিখুঁত দেখানোর চেষ্টা করেন না, তখন অন্যেরা আপনার সাথে মিশতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এটা আপনাকে আরও সহজ ও আপন করে তোলে।

৩. বিশ্বাস বাড়ে: যে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে, তাকে মানুষ বেশি বিশ্বাস করে। এতে বোঝায় আপনি সৎ এবং স্বচ্ছ, কোনো কিছু লুকাতে চান না।

৪. স্মৃতিতে থাকা: আপনার কিছু অদ্ভুত অভ্যাস বা সামান্য ভুল অন্যদের মনে আপনাকে গেঁথে রাখতে সাহায্য করে। এগুলো আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে এবং স্মরণীয় করে রাখে।

৫. ব্যক্তিত্ব প্রকাশ: ভুলগুলো আপনার ব্যক্তিত্বের অংশ। এগুলো আপনাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে, যা অনেক সময় দারুণ আকর্ষণীয় মনে হয়। নিজের ত্রুটিগুলো আপনার ব্যক্তিগত ছাপ তৈরি করে।

৬. 'প্রাটফল এফেক্ট': অনেক সময়, দারুণ স্মার্ট বা সফল মানুষের ছোটখাটো ভুল দেখলে মানুষ তাদের আরও বেশি পছন্দ করে। কারণ তারা দেখে যে, এত স্মার্ট হয়েও সে ভুল করে! এতে তাদের মানবিক দিকটা আরও বেশি ফুটে ওঠে।

৭. আত্মবিশ্বাস: নিজের অসম্পূর্ণতাকে মেনে নিয়ে হাসতে পারা এক ধরনের আত্মবিশ্বাস দেখায়। আর আত্মবিশ্বাস সব সময়ই দারুণ আকর্ষণীয় একটি গুণ, যা আপনাকে অন্যদের কাছে অনন্য করে তোলে।

সবাই চায় নিখুঁত থাকতে, কিন্তু আসল জাদুটা লুকিয়ে আছে আমাদের ছোট ছোট অসম্পূর্ণতাতে! জানো কি, সামান্য ভুলই কিভাবে তোমাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে?

নিজের ত্রুটিগুলোকে ভালোবাসতে শেখো, দেখবে জীবন কতটা সহজ আর সুন্দর হয়ে উঠেছে। @ মায়া


৪৬


প্রেম একটা  ডাইনামিক্যাল সিস্টেম

আমরা প্রেমকে সাধারণত একটা অনুভূতি, আকর্ষণ আর পারস্পরিক বোঝাপড়ার ব্যাপার হিসেবে দেখি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এটাকে এখন একদম অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। তাও একটা ডাইনামিক্যাল সিস্টেম হিসেবে। অর্থাৎ, সময়ের সাথে দুজনের অনুভূতি কীভাবে বদলায়, একজনের আচরণে অন্যজন কীভাবে সাড়া দেয়, আর জীবনের চাপ কীভাবে সম্পর্ককে প্রভাবিত করে—এসবের কিছু প্যাটার্ন গাণিতিক মডেল দিয়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব।

ফ্রান্সের université claude bernard lyon 1‑এর গণিতবিদ অধ্যাপক laurent pujo‑menjouet বহু বছর ধরে এই গতিশীলতা নিয়ে কাজ করছেন। তার গবেষণার লক্ষ্য কোনো প্রেমের ভবিষ্যৎ বলতে না, বরং বোঝা। কেন কিছু সম্পর্ক সময়ের সাথে আরও স্থিতিশীল হয়, আর কেন কিছু ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। গাণিতিক মডেলগুলোতে তারা কয়েকটা বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

প্রথমে, পারস্পরিক আকর্ষণ। দুজন একে অপরের মধ্যে কী পছন্দ করে, কতটা আকৃষ্ট হয়, আর সেই আকর্ষণ কতটা সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। এগুলো সবই গতিপথে প্রভাব ফেলে।

দ্বিতীয়ত, সময়ের সঙ্গে অনুভূতির স্বাভাবিক ক্ষয়। শুরুতে নতুনত্ব, উত্তেজনা, আবেগ সবই উঁচুতে থাকে। তবে দিন দিন মানুষ একে অপরের উপস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়, আর শুরুর তীব্র অনুভূতি একটু কমে যায়। মডেলে এইটা ‘erosion’ বা অনুভূতির ক্ষয় হিসেবে ধরা হয়।

তৃতীয়ত, একজনের অনুভূতির প্রতি অন্যজনের প্রতিক্রিয়া। কেউ যত্ন, ভালোবাসা বা স্নেহ দেখালে অন্যজন কীভাবে সাড়া দেয়—এটা সম্পর্ককে মজবুত করতে পারে, আর নেতিবাচক সাড়া দিলে দূরত্ব বাড়ে।

এর পাশাপাশি একটা আকর্ষণীয় ধারণা আছে, সেটা হলো ‘ক্রিটিক্যাল থ্রেশহোল্ড’। গবেষকদের মডেল অনুযায়ী, কোনো সম্পর্কের একটা সীমা থাকতে পারে; যদি শক্তি ওই সীমার উপরে থাকে, সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু যদি শক্তি সেই সীমার নিচে নামে, সম্পর্ক দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে যায়।

এই ধারণা প্রকৃতির পরিচিত ঘটনা ‘allee effect’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। কোনো প্রাণীর জনসংখ্যা যদি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে যায়, টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই রকম, যতই দুর্বল হয়, ততই টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়।

কিন্তু এটাই মানে না যে গাণিতিক সমীকরণে দুজনের তথ্য বসিয়ে বলা যাবে৷ তাদের সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে টিকবে নাকি ভেঙে যাবে। মানুষ কোনো স্থির সমীকরণ মেনে চলে না। তারা নিজের আচরণ বদলাতে পারে, যোগাযোগের ধরন পরিবর্তন করতে পারে, সমস্যার সমাধান করতে পারে, আর সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।@ মায়া



৪৭


যারা কোনো বিষয়ে আসলে কম জানে বা কম বোঝে, তারা নিজেদের অনেক জ্ঞানী মনে করে  

আবার যারা সত্যি সত্যি অনেক জানে, তারা প্রায়ই নিজেদের জ্ঞান নিয়ে সংশয়ে ভোগে বা ভাবে যে তারা হয়তো এখনো যথেষ্ট জানে না? এই অদ্ভুত ব্যাপারটাকেই মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট'।

সহজ কথায়, ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট মানে হলো, অদক্ষ বা কম অভিজ্ঞ মানুষরা নিজেদের যোগ্যতা বা জ্ঞানকে অনেক বেশি বড় করে দেখে। এর কারণ কী জানেন? কারণ তাদের জ্ঞানের পরিধি এতই সীমিত যে, তারা বুঝতেই পারে না কোন জিনিসগুলো তারা জানে না! তাদের মধ্যে নিজের ভুল ধরার বা নিজের জ্ঞান যাচাই করার ক্ষমতাই থাকে না। তারা নিজের অযোগ্যতা বোঝার মতো যোগ্যতাই রাখে না। যেমন, যে লোকটা সাইকেল ভালো করে চালাতে পারে না, সে হয়তো নিজেকে অলিম্পিক রেসার ভাবতে পারে, কারণ সে জানেই না যে একটা পেশাদার রেসারের আসলে কত কঠিন অনুশীলন আর দক্ষতার প্রয়োজন হয়। তার কাছে যা আছে, সেটাই সর্বোচ্চ মনে হয়।

অন্যদিকে, যারা কোনো বিষয়ে সত্যি অনেক দক্ষ বা অভিজ্ঞ, তারা আবার নিজেদের জ্ঞানকে ছোট করে দেখে। তারা ভাবে, 'আরে, এটা তো সবাই জানে!' তারা ধরেই নেয় যে অন্যরাও তাদের মতোই জ্ঞানী বা তাদের মতো সহজে কাজটা করতে পারবে। এর ফলে তারা নিজেদের দক্ষতা বা জ্ঞানকে অন্যদের তুলনায় কম মূল্য দেয়। তারা হয়তো ভাবে, 'আমার কাজটা তো সহজ, এতে কী এমন আছে?' কিন্তু আসলে তাদের জ্ঞান বা দক্ষতা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। যেমন, একজন দারুণ রাঁধুনি হয়তো মনে করেন, 'আমি তো কেবল কয়েকটা পদ রাঁধতে পারি, এর চেয়েও কত ভালো রাঁধুনি আছে!' অথচ তার হাতের রান্না হয়তো অসাধারণ এবং অনেকেই সেটা করতে হিমশিম খাবে।

তাহলে কি দাঁড়াল? যারা জানে না, তারা ভাবে সব জানে। আর যারা জানে, তারা ভাবে আরও জানার আছে। এই চক্র ভাঙতে গেলে নিজেকে খোলা মনে যাচাই করা, নিজের সীমাবদ্ধতাগুলো খুঁজে বের করা এবং সব সময় শেখার আগ্রহ রাখা খুব জরুরি। সত্যিকারের জ্ঞানীরা বিনয়ী হন এবং বুঝতে পারেন যে এই বিশাল জগতে শেখার কোনো শেষ নেই।

আপনার জীবনে এমন অনেক মানুষ দেখেছেন নিশ্চয়ই? যাদের যোগ্যতা কম কিন্তু আত্মবিশ্বাস আকাশছোঁয়া, আবার যারা আসলেই অনেক গুণী, তারা নিজেদের যোগ্যতাকে ছোট করে দেখে! ডানিং-ক্রুগার ইফেক্ট নিয়ে আপনার কী মতামত? কমেন্ট করে জানান।@ মায়া



৪৮



যাদের কোনো ব্র্যান্ডের প্রয়োজন হয় না।

এমন মানুষও দেখেছি, যাদের গাড়ি আছে, বাড়ি আছে, দামি পোশাক আছে, বিলাসবহুল জীবন আছে কিন্তু আচরণে এতটা অমার্জিত যে, তাদের চারপাশের সব Luxury ই যেন হঠাৎ খুব সস্তা মনে হয়।

Expensive হওয়া আর Classy হওয়া দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

আমরা অনেক সময় একটা Luxury car, Designer outfit কিংবা পাঁচতারা রেস্টুরেন্ট দেখে বলে ফেলি

Wow! কী classy!

না।

ওটা expensive হতে পারে। কিন্তু classy কিনা, সেটা জিনিসটা নয় মানুষটা ঠিক করে।

Class আসলে কী?

ক্ষমতা হাতে থাকার পরেও কাউকে ছোট না করা।

রাগের সময়ও নিজের ভাষার সীমা না হারানো।

মতের অমিল হলেও অন্য মানুষটাকে অসম্মান না করা।

কারো ব্যক্তিগত কথা বা দুর্বলতাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার না করা।

নিজের Ego সরিয়ে ভুল স্বীকার করতে পারা।

কখন কথা বলতে হবে আর কখন নীরব থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ সেটা বুঝতে পারা।

প্রতিটা তর্কে নিজেকে জিতিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব না করা।

প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পেয়েও নিজেকে সংযত রাখা।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজেকে বড় প্রমাণ করার জন্য অন্য কাউকে ছোট করার প্রয়োজন না হওয়া।

টাকা আপনাকে দামি পোশাক কিনে দিতে পারে।

দামি গাড়ি কিনে দিতে পারে। বড় বাড়ি, Luxury lifestyle সবই দিতে পারে। কিন্তু ভদ্রতা, সংযম, রুচি, ব্যক্তিত্ব আর চরিত্র কিনে দিতে পারে না। একজন মানুষ কতটা ধনী, সেটা তার সম্পদ দেখে বোঝা যায়।

কিন্তু একজন মানুষ কতটা মূল্যবান, সেটা বোঝা যায় সে তার চেয়ে দুর্বল, অসহায় কিংবা কোনোভাবেই তার কাজে লাগবে না এমন একজন মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, সেটা দেখে।

Money tells you what someone can afford.

Class tells you who they are.

শেষ পর্যন্ত মানুষ আপনার গাড়ির Brand মনে রাখবে না।

আপনার পোশাকের দামও মনে রাখবে না। তারা মনে রাখবে

আপনার সঙ্গে দেখা করার পর তারা নিজেদের সম্পর্কে কেমন অনুভব করেছিল।

Luxury চোখে পড়ে।

Class অনুভব করতে হয়।

আর সত্যি বলতে, প্রচুর অর্থ-সম্পদ থাকার পরেও যদি একজন মানুষের মধ্যে ভদ্রতা, সংযম আর চরিত্রের অভাব থাকে তাহলে তার সবচেয়ে দামি জিনিসটাও তাকে সত্যিকারের classy করে তুলতে পারে না।@ মায়া



৪৯



ছেলেদের সাইকোলজিক্যাল ফ্যাক্ট—

১. ছেলেদের মধ্যে নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন কিছু করার ভাবনা মেয়েদের তুলনায় অনেক গুন বেশি হয়ে থাকে। রিস্ক নেওয়ার প্রবণতা ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কোনো বিপদে ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় আগে এগিয়ে যায়, কিন্তু পক্ষান্তরে মেয়েরা সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই কারণেই হয়ত বলা হয় যে, প্রত্যেক মেয়ের অন্তত একজন ভালো ছেলে বন্ধু থাকা উচিত গৃহ পরিবেশের বাইরে, সুরক্ষার খাতিরে।

২. ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় অনেক দেড়িতে পরিপক্ক হয়। অর্থাৎ সামাজিকতার মনোভাব ছেলেদের মধ্যে অনেকটা দেড়িতে আসে। কিন্তু মেয়েদের মধ্যে সামাজিকতার মনোভাব তাড়াতাড়ি চলে আসে।

৩. ভারতীয় বা বাংলাদেশী হোক বা বিদেশী, প্রেমে প্রপোজ করার দিক দিয়ে ছেলেরাই অগ্রগামী। খুব কম সংখ্যক মেয়েই আছেন যারা ছেলেকে প্রপোজ করেন।

৪. বুদ্ধিমান ছেলেরা প্রথমে নিজের ক্যারিয়ার বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে, পড়ে প্রেম বিবাহ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করে। আর এটি করতে করতেই তাদের বয়স বেড়ে যায়। স্বভাবতই তার সমবয়সী পছন্দের মেয়েটির ততদিনে বিবাহ হয়ে যায়। এদের মনের বাসনা মনেই থেকে যায়।

৫. এমন অনেক ছেলেই আছে, যারা অনেকটা চাঁপা স্বভাবের হয়ে থাকে। এদের মুখ থেকে কথা বেড় করা মুশকিল। কিন্তু যদি আপনি রাতের বেলায় তার মনের কথা জানতে চান, তাহলে অনেকটাই সফল হতে পাড়েন।

৬.ছেলেরা কথা গোপন রাখতে বেশি ভালোবাসে। এরা শুধু তাদের পছন্দের মানুষদের সাথেই গোপন বিষয়ে মুখ খুলে।

৭. প্রতিহিংসা পরায়ণতা মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এরা কিভাবে উপযুক্ত জবাব দিতে হয় সেটা ভালোভাবেই জানে।

৮.নিজের বয়ফ্রেন্ড নিয়ে কোনো মেয়ে যদি অন্য ছেলের সাথে কথা বলে, তাহলে সেই ছেলেটি মনে মনে খুবই বিরক্ত হয়। কিন্তু প্রসঙ্গ যখন বন্ধুর এক্স এর তখন সে খুব মনযোগ দিয়ে কথা শুনতে থাকে।

৯.একজন ছেলের সাথে আপনি যদি খারাপ বব্যহার করেন, তাহলে ভবিষ্যতে ছেলেটির সাথে কথা বলার সময় আপনার মনে হবে যে ছেলেটি হয়ত আপনার করা খারাপ ব্যবহারটি ভুলে গেছে, কিন্তু বাস্তব অনেকটাই আলাদা। ছেলেরা তাদের মনে আঘাত দিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের কখনো ভুলে না, শুধু ভুলে থাকার ভান করে।

১০. কোনো ছেলে যতই খারাপ চরিত্রের হোক না কেন, নিজের পছন্দের মানুষের সামনে সে সর্বদা ভালোভাবে নিজেকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে।@ মায়া



১০



কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে শেখা 

১. কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে শেখা যায়:

  যখন স্বেচ্ছায় একটু কষ্ট সহ্য করেন, তখন আসল কঠিন সময়ে ভেঙে পড়েন না। আপনার সহ্য শক্তি বাড়ে।

২. ছোট ছোট জিনিসের কদর করা শেখা যায়:

  মাঝে মাঝে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলে বা অল্প খাবার খেলে, সাধারণ আরামগুলো অনেক বেশি ভালো লাগে, আপনি কৃতজ্ঞ হতে শেখেন।

৩. অপ্রয়োজনীয় ভয় কমে যায়:

  আপনার মন বোঝে যে আপনি অল্প কষ্ট সহ্য করতে পারেন। এতে ভবিষ্যতের বিপদ নিয়ে অযথা ভয় পাওয়া কমে।

৪. মানসিক শক্তি বাড়ে:

  কষ্ট থেকে পালানোর বদলে, সেটাকে মেনে নিলে আপনার মন অনেক বেশি শক্তিশালী হয়, আপনি আত্মবিশ্বাসী হন।

৫. নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ে:

  নিজের আরামের অভ্যাস ভেঙে নতুন কিছু করার চেষ্টা করলে আপনার ইচ্ছাশক্তি (willpower) শক্তিশালী হয়।

৬. খারাপ সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকা:

  জীবনের খারাপ সময় বলে কয়ে আসে না। আগে থেকে একটু আধটু কষ্টের অভ্যাস থাকলে, আসল খারাপ সময়ে মানিয়ে নিতে সুবিধা হয়।

৭. জীবনকে সহজ মনে হয়:

  যখন আপনি বুঝতে পারেন যে আপনি অনেক কিছু ছাড়াই ভালো থাকতে পারেন, তখন জীবনের জটিলতাগুলো কম মনে হয় এবং আপনি চাপমুক্ত থাকেন।

মাঝে মাঝে আরাম জোন থেকে বেরিয়ে আসাটা খুব দরকার! স্টোয়িকরা এটাকে বলে 'স্বেচ্ছামূলক অস্বস্তি'। অবাক হবেন, যখন দেখবেন এই ছোট্ট কষ্টগুলো আপনার জীবনকে কতটা সহজ আর সুন্দর করে তুলছে। আপনি কি কখনও এমন কিছু করেছেন?@ মায়া