মেয়েটা যা হতে চায়, তা হতে দিন। ছেলেটা যা হতে চায়, তা হতে দিন। বৃদ্ধ বয়সে যদি কেউ জীবনসঙ্গী পেতে চায়, তাকে পেতে দিন। চল্লিশ বছরেও যদি কেউ মা হতে চায়, তাকে হতে দিন। নারী/পুরুষ যাকে ভালোবাসে, তার সাথেই সুখে-শান্তিতে থাকতে দিন।

আপনার তাতে ক্ষতি কী?

"লোক-সমাজ কী বলবে?"– এই ভেবে কারোর জীবনটাকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে দিবেন না। কারোর সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে লোক-সমাজ কখনোই বড় হতে পারে না।


যে হবে বিজ্ঞানমনস্ক, কুসংস্কারমুক্ত, মানবিক ও সংস্কৃতিমনা

একটি শিশুর মানসিক বিকাশ শুধু তার বইয়ের জ্ঞান দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং তার সৃজনশীল চিন্তাধারা, প্রশ্ন করার ক্ষমতা, সংস্কৃতিচর্চা এবং বাস্তবতা যাচাই করার অভ্যাসই তাকে একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। এমন একজন মানুষ– যে হবে বিজ্ঞানমনস্ক, কুসংস্কারমুক্ত, মানবিক ও সংস্কৃতিমনা।

এই গুণগুলো জন্মগত নয়; বরং সঠিক পরিবেশ, শিক্ষা ও অভ্যাসের মাধ্যমে গড়ে তোলা যায়। উদাহরণসহ কিছু কার্যকর পরামর্শ দিলাম–

১) প্রশ্ন করতে উৎসাহ দিন, থামাবেন নাঃ

শিশুরা স্বভাবতই কৌতূহলী। “কেন?”, “কিভাবে?”– এই প্রশ্নগুলোই তার শেখার মূল চাবিকাঠি। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

আপনার সন্তানের প্রশ্নকে বিরক্তিকর মনে না করে গুরুত্ব দিন।

“এটা এমনই” না বলে ব্যাখ্যা দিন।

যদি উত্তর না জানেন, একসাথে খুঁজে বের করুন।

যেমন– একটি শিশু যদি জিজ্ঞেস করে “বৃষ্টি কেন হয়?”, তখন “সৃষ্টিকর্তা দেয়” বললে সে থেমে যাবে। কিন্তু জলীয় বাষ্প, মেঘ, ও বৃষ্টিপাতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলে তার চিন্তাশক্তি বাড়বে।

২) পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার অভ্যাস গড়ে তুলুনঃ

বিজ্ঞান শুধু বই নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

ছোট ছোট এক্সপেরিমেন্ট করান (যেমন– পানিতে কী ভাসে, কী ডোবে)।

প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে নিয়ে যান।

“দেখো কী হচ্ছে” এই অভ্যাস গড়ে তুলুন।

যেমন– একটি গাছ লাগিয়ে প্রতিদিন তার পরিবর্তন দেখা। এটি শিশুকে “কারণ-ফলাফল” বুঝতে সাহায্য করে।

৩) যুক্তি ও প্রমাণের গুরুত্ব শেখানঃ

আপনার সন্তানকে শেখাতে হবে– কোনো কিছু সত্য কিনা তা যাচাই করতে হয়। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

গল্প বা তথ্য শুনে “এর প্রমাণ কী?” জিজ্ঞেস করুন।

সামাজিক কুসংস্কার নিয়ে আলোচনা করুন।

“সবাই বলছে” মানেই সত্য নয়, এটা বোঝান।

যেমন– যদি কেউ বলে “কালো বিড়াল রাস্তা পার হলে অমঙ্গল”, তাহলে আপনার সন্তানের সাথে আলোচনা করুন– এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী?

৪) কুসংস্কার থেকে দূরে রাখুনঃ

আপনার সন্তানকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করতে হবে, তবে হঠাৎ আঘাত দিয়ে নয়। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

কুসংস্কারকে সরাসরি “ভুল” না বলে ব্যাখ্যা করুন।

যুক্তি ও উদাহরণ দিয়ে বোঝান।

ভয়ভিত্তিক শিক্ষা এড়িয়ে চলুন।

যেমন– “রাতে নখ কাটলে অমঙ্গল” এর বদলে বলুন “আগে বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে নখ কাটলে আঘাত লাগতে পারতো।”

৫) নৈতিকতা ও মানবিকতা শেখানঃ

বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া মানে শুধু যুক্তিবাদী হওয়া নয়, নীতিবান হওয়াও জরুরি। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

সততা, সহানুভূতি ও দায়িত্ববোধ শেখান।

নিজের আচরণ দিয়ে উদাহরণ দিন।

অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার অভ্যাস করান।

যেমন– কোনো ভুল করলে সন্তানকে শাস্তি না দিয়ে বোঝান– কেন এটা ভুল এবং এর প্রভাব কী।

৬) বই পড়া ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ তৈরি করুনঃ

এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

বিজ্ঞানভিত্তিক বই, গল্প ও ডকুমেন্টারি দিন।

মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা দিন।

ভিন্ন মতকে সম্মান করতে শেখান।

যেমন– শিশু যদি আপনার মতের বিরোধিতা করে, তাকে থামাবেন না; বরং তার যুক্তি শুনুন।

৭) ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখানঃ

এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

ভুল করলে অপমান নয়, বিশ্লেষণ করুন।

“কেন ভুল হলো?”– এই প্রশ্ন করুন।

যেমন– গণিতে ভুল করলে বকা না দিয়ে ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দিন কোথায় সমস্যা হয়েছে।

৮) তথ্য যাচাই (Fact-checking) শেখানঃ

আপনার সন্তানকে শেখান– ইন্টারনেট বা অন্য কোথাও পাওয়া সব তথ্যই সত্য নয়। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

“এই খবরটা কোথা থেকে এসেছে?”– জিজ্ঞেস করুন।

একাধিক উৎস থেকে মিলিয়ে দেখতে শেখান।

যেমন– সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো গুজব দেখলে তাকে যাচাই করতে শেখানো। এটা ভবিষ্যতে আপনার সন্তানকে বিভ্রান্তি থেকে বাঁচাবে।

৯) বিতর্ক করার অভ্যাস গড়ে তুলুনঃ

মতের অমিল মানেই ঝগড়া নয়, এটা শেখানো জরুরি। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

ভিন্ন মতকে সম্মান করতে শেখান।

যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে উৎসাহ দিন।

যেমন– একই বিষয়ে দুইজন ভিন্নভাবে ভাবতে পারে। এটা বোঝা শিশুকে সহনশীল করে।

১০) আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সমালোচনামূলক চিন্তাঃ

শুধু যুক্তি নয়, আবেগ নিয়ন্ত্রণও জরুরি। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

রাগ বা ভয় পেলে তা কীভাবে সামলাতে হয় শেখান।

“তুমি এখন কী অনুভব করছ?”—এই প্রশ্ন করুন।

যেমন– রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরে ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া– এটা বড় দক্ষতা।

১১) বৈচিত্র্য ও ভিন্ন সংস্কৃতিকে সম্মান করতে শেখানঃ

সংকীর্ণতা কুসংস্কারের জন্ম দেয়। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও মত সম্পর্কে ধারণা দিন।

“সবাই আমার মতো না হলেও ঠিক আছে”– এটা বোঝান।

যেমন– ভিন্ন উৎসব বা সংস্কৃতি সম্পর্কে জানলে শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়।

১২) প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখানঃ

প্রযুক্তি যেমন শেখায়, তেমনি বিভ্রান্তও করতে পারে। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করুন।

শিক্ষামূলক কনটেন্ট বেছে দিন।

অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে তা সহজভাবে বোঝান।

যেমন– ইউটিউবের রিকমেন্ডেশন সবসময় সত্য বা ভালো নাও হতে পারে। এটা বোঝানো জরুরি।

১৩) সৃজনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ দিনঃ

বিজ্ঞান ও যুক্তির সাথে সৃজনশীলতা মিললে চিন্তা আরও গভীর হয়। এক্ষেত্রে আপনি যা করবেন–

আপনার সন্তানকে আঁকা, লেখা, গল্প বানানো– এসব করতে দিন।

“তুমি কীভাবে ভাবছ?”– জিজ্ঞেস করুন।

যেমন– একটি সমস্যার একাধিক সমাধান ভাবা– এটাই সৃজনশীলতা।

১৪) নিজেই রোল মডেল হোনঃ

শিশুরা সবচেয়ে বেশি শেখে অনুকরণ করে। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

নিজের আচরণে যুক্তি, সততা ও মানবিকতা দেখান।

ভুল হলে স্বীকার করুন।

যেমন– আপনি যদি বলেন “আমি ভুল করেছি”, তাহলে আপনার সন্তানও তা শিখবে।

১৫) সহানুভূতি (Empathy) শেখানঃ

অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শেখানোই মানবিকতার শুরু। এক্ষেত্রে আপনি যা করবেন–

“ওর জায়গায় তুমি হলে কেমন লাগত?”– আপনার সন্তানকে এই প্রশ্ন করুন।

গল্প বা বাস্তব ঘটনা দিয়ে বোঝান।

যেমন– বন্ধু পড়ে গেলে হাসার বদলে সাহায্য করা– এটাই সহানুভূতি।

১৬) ন্যায্যতা (Fairness) বোঝানঃ

সবাই সমান– এই ধারণা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

খেলায় বা কাজে সবাইকে সমান সুযোগ দিন।

পক্ষপাত এড়িয়ে চলুন।

যেমন– একজনকে বেশি সুবিধা দিলে অন্যজনের কেমন লাগে তা বোঝানো।

১৭) ক্ষমা করা ও ভুল স্বীকার শেখানঃ

ভুল করা স্বাভাবিক, কিন্তু তা স্বীকার করাই মানবিকতা। এক্ষেত্রে আপনি যা করবেন–

আপনার সন্তানকে “সরি” বলা শেখান।

অন্যকে ক্ষমা করতে উৎসাহ দিন।

যেমন– ঝগড়ার পর নিজে থেকে মিটমাট করা।

১৮) বিচার করার আগে বোঝার অভ্যাসঃ

মানুষকে না বুঝে বিচার করা অমানবিকতা বাড়ায়। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

“সে এমন কেন করল?”– এই দৃষ্টিভঙ্গি দিন।

পরিস্থিতি বিবেচনা করতে শেখান।

যেমন– কেউ খারাপ আচরণ করলে তার পেছনের কারণ খুঁজে দেখা।

১৯) শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা করতে দিনঃ

গান, নাচ, আবৃত্তি, আঁকা– এসব রুচি ও অনুভূতি গড়ে তোলে। এক্ষেত্রে আপনি যা করবেন–

আপনার সন্তানকে কোনো একটি শিল্পে নিয়মিত চর্চার সুযোগ দিন।

শুধু পড়াশোনার চাপ না দিয়ে সৃজনশীল সময় দিন।

যেমন– রবীন্দ্রসঙ্গীত বা নজরুলগীতি শেখা শিশুর মানসিক বিকাশে সাহায্য করে।

২০) নান্দনিকতা (Aesthetic sense) গড়ে তুলুনঃ

সৌন্দর্য বুঝতে পারাও সংস্কৃতির অংশ। এক্ষেত্রে আপনি আপনার সন্তানের জন্য যা করবেন–

ভালো গান, ছবি, চলচ্চিত্র দেখান।

“কেন এটা সুন্দর?”– এই প্রশ্ন করুন।

যেমন– একটি ছবির রং বা কম্পোজিশন নিয়ে আলোচনা করা।

একজন বিজ্ঞানমনস্ক, কুসংস্কারমুক্ত, মানবিক ও সংস্কৃতিমনা শিশু গড়ে তোলা মানে তাকে শুধু তথ্য দেওয়া নয়, বরং তাকে কিভাবে চিন্তা করতে হয় তা শেখানো। এই প্রক্রিয়ায় অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিশুরা শোনার চেয়ে দেখেই বেশি শেখে। আপনি যদি যুক্তি, প্রমাণ, মানবিকতা ও সংস্কৃতিচর্চা করেন; তাহলে আপনার সন্তানও সেটাই অনুসরণ করবে। @ অনিন্দ্য জয়




ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড

ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং একটি রাসায়নিক পরীক্ষা। এটা কোনো ব্যক্তি বা জীবের জেনেটিক মেকআপ দেখায়। আদালতে প্রমাণ হিসেবে, মৃতদেহগুলো শনাক্ত করতে, রক্তের সম্পর্কের সন্ধান করতে এবং রোগের সন্ধানের জন্যও ব্যবহৃত হয় এই পরীক্ষা পদ্ধতি।

ডিএনএ হলো ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিডের সংক্ষিপ্তরূপ। আমাদের দেহের প্রতিটি কোষের ভেতর রয়েছে এই দ্বি-সূত্রাকার রাসায়নিক যৌগ। পলিমারের মতো একত্রে বন্ধন তৈরি করে জীবনের স্থায়ী নীলনকশা তৈরি করে এই ক্ষারজাতীয় যৌগ। এর মধ্যে চারটি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষার রয়েছে। তারা একে অন্যের সঙ্গে জুটি বাঁধে, একে বেসপেয়ার বা জোড়াবদ্ধ ক্ষার বলে। মানুষের ডিএনএতে প্রায় ৩ বিলিয়ন বেসপেয়ার রয়েছে। এরা একটি আরেকটির সঙ্গে পেঁচিয়ে থাকে। যৌগগুলোর সম্পূর্ণ সেটটি জিনোম নামে পরিচিত। যেকোনো মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের জিনোমের ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশই হুবহু একরকম। তবে সামান্য শূন্য দশমিক ১ শতাংশ পার্থক্যই শারীরিক ও মানসিকভাবে একজনের সঙ্গে আরেকজনের চেহারা, আচরণ ও বংশগতভাবে পার্থক্য তৈরি করে দেয়। এই পার্থক্যটাই ব্যবহার করা হয় ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট পদ্ধতিতে।

মানুষের জিনোমের ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রকাশ করতে কিছু রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। ডিএনএর ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক টুকরা তথ্যই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে কিংবা নির্দোষ প্রমাণ করতে পারে। এ ছাড়া কোনো পুরোনো বা নষ্ট হওয়া মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যেতে পারে এই পদ্ধতিতে।

ধরা যাক, কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবার আগে অপরাধ সংঘটনের স্থান থেকে প্রাপ্ত জেনেটিক নমুনা এবং সন্দেহভাজনের জেনেটিক নমুনাকে সংগ্রহ করা হবে। তারপর ১৩টি মূল STR-এর জন্য স্ক্যান করা হবে এগুলোকে। STR হলো জিনোমে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা ২-৬টি নিউক্লিওটাইড-দীর্ঘ অনুক্রমের পুনরাবৃত্তি সংগ্রহ। যেহেতু STR-এর পুনরাবৃত্তিগুলো দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, তাই এই জেনেটিক মার্কারের সেট প্রতিটি ব্যক্তির আলাদা হয়। এই বৈশিষ্ট্য STR-কে একটি অনন্য ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট হিসেবে আদর্শ করে তোলে।

টিভি সিরিজের সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক। একটি এএনএ বিশ্লেষক মেশিনে অপরাধীর চুল, নখ বা অন্য কোনো নমুনার কিছু অংশ প্রবেশ করিয়ে অপরাধীর চেহারা কেমন, তার ধারণা পাওয়া যেতে পারে। সম্প্রতি একদল ডাচ গবেষকেরা নতুন একটি পরীক্ষা-পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। অপরাধ সংঘটিত স্থান থেকে সংগৃহীত ডিএনএ নমুনাকে পর্যবেক্ষণ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তির চোখের রং শনাক্ত করা যায় এ পদ্ধতিতে। ছয়টি নির্দিষ্ট এসএনপিকে ব্যবহার করা হয় অপরাধীর চোখের রং শনাক্ত করতে। কিন্তু পরীক্ষাটি ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর জিনোমের নকশার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। তাই আরও বিচিত্র জনগোষ্ঠীর জন্য এটা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তা ছাড়া শুধু চোখের রঙের মিলের কারণেই কারও কাউকে দোষী করা যায় না। পরীক্ষাটি শুধু অপরাধীকে খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং একটি অত্যন্ত নির্ভুল পদ্ধতি। বেশির ভাগ দেশে এখন ঠিক একইভাবে ডিএনএ রেকর্ডগুলো রাখে, ঠিক যেমন পুলিশ আসল ফিঙ্গারপ্রিন্টের অনুলিপি রাখে। চিকিৎসাক্ষেত্রে এর আরও ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে, যেমন কোনো রোগীর হয়তো অঙ্গ প্রতিস্থাপন করতে হবে। এ জন্য দাতার দেহের টিস্যুর সঙ্গে গ্রহীতার টিস্যুর ম্যাচিং করতে হয়। এ কাজ দ্রুত করা যায় ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশ্লেষণের মাধ্যমে। পারিবারিকভাবে যেসব রোগ বংশানুক্রমে ছড়ায়, সেগুলো সহজে শনাক্ত ও নিরাময়েও এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।

ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং পদ্ধতি দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। কারণ ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা সহজ। তবে ফরেনসিক বিজ্ঞান মূলত একটি সম্ভাব্যতা-নির্ভর বিজ্ঞান, এমনকি এটি নিশ্চিতভাবে অপরাধী শনাক্ত করতে পারে না। তাই চেষ্টা চলছে এই পদ্ধতিকে আরও নিখুঁত করে তোলার। @ ফারহানা তাসনীম চৌধুরী  প্রভাষক, প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


যেভাবে মানুষ নিজের সম্ভাবনা নষ্ট করে!

আপনি কি জানেন পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ ব্যর্থ হওয়ার সুযোগই পায় না, কারন তারা কখনও শুরুই করে না?

তারা অপেক্ষা করে সেই দিনের জন্য যেদিন তাঁরা নিজেদের প্রস্তুত বলে মনে করবে। দুঃখজনক সত্য হলো, সেই দিন কখনও আসে না।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বিভ্রমগুলোর একটি হলো, সে বিশ্বাস করে তার ভেতরে কোথাও একটি "আসল আমি" লুকিয়ে আছে, যাকে একদিন সে খুঁজে পাবে। তারপর হঠাৎ করেই তার জীবনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে যাবে; সে বুঝে যাবে কী করা উচিত, কোথায় যাওয়া উচিত এবং কীভাবে সফল হওয়া উচিত। শুনতে সুন্দর লাগলেও বাস্তব জীবন এমনভাবে কাজ করে না।

অস্টিন ক্লিওন দ্বিতীয় অধ্যায়ে এমন একটি সত্য তুলে ধরেছেন যা অনেকের জন্য অস্বস্তিকর। তিনি বলেন, যদি তুমি নিজের পরিচয় পুরোপুরি বুঝে নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করো, তাহলে হয়তো কখনও শুরুই করতে পারবে না।

আপনার আইডেন্টিটি বা পরিচয় কোনো গুপ্তধন নয় যা খুঁজে বের করতে হয়, পরিচয় হলো এমন কিছু যা তৈরি করতে হয়। এখানেই অধিকাংশ মানুষ ভুল করে। তারা মনে করে প্রথমে পরিচয় তৈরি হবে, তারপর কাজ শুরু হবে। বাস্তবে প্রথমে কাজ শুরু হয়, তারপর পরিচয় তৈরি হয়। এটা বুঝতে পারা জীবনের একটি বড় ঘটনা।

আমরা সাধারণত নিজেদের সম্পর্কে যেভাবে চিন্তা করি, তার বেশিরভাগই ভুল। আমরা ভাবি আমাদের পরিচয় আমাদের চিন্তা থেকে তৈরি হয়। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা বলে, মানুষ নিজের সম্পর্কে বিশ্বাস তৈরি করে নিজের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। অর্থাৎ আপনি নিজেকে যা ভাবেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি প্রতিদিন কী করেন।

পরিচয় আসে প্রমাণ থেকে, আর প্রমাণ আসে কাজ থেকে।

***এ কারণেই পৃথিবীর সফল মানুষদের জীবনী পড়লে একটি বিষয় বারবার চোখে পড়ে, তারা শুরুতেই জানত না তারা কী হতে যাচ্ছে। ***

তারা শুধু কোনো একটি পথে হাঁটা শুরু করেছিল, পথই তাদের পরিবর্তন করেছে।

আজকের মানুষের জন্য একটি বড় সমস্যা হলো তারা নিজেদের প্যাশন খুঁজতে গিয়ে আটকে যায়। তারা মনে করে কোথাও একটি নিখুঁত কাজ আছে যা তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে, একদিন তারা সেটি খুঁজে পাবে এবং তারপর সব জাদুর মতো বদলে যাবে। বাস্তবে প্যাশন খুব কম ক্ষেত্রেই খুঁজে পাওয়া যায়, এটি তৈরি করে নিতে হয়।

একজন মানুষ প্রথমে কোনো কাজ শুরু করে, কাজ করতে করতে কিছুটা দক্ষ হয়, দক্ষতা থেকে ছোট ছোট সাফল্য আসে, সাফল্য থেকে আনন্দ আসে, আনন্দ থেকে আগ্রহ বাড়ে এবং আগ্রহ ধীরে ধীরে প্যাশন এ পরিণত হয়। অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্যাশন শুরুতে থাকে না, এটি তৈরি হয় পথ চলার সময়। এই কারণেই যারা প্যাশন খুঁজতে থাকে তারা অনেক সময় স্থির হয়ে যায়, আর যারা কাজ শুরু করে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের প্যাশন তৈরি করে ফেলে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ের আরেকটি অসাধারণ শিক্ষা হলো ইমপোস্টর সিন্ড্রোম। এটি এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ মনে করে সে আসলে যোগ্য নয়, সে শুধু অভিনয় করছে এবং একদিন সবাই বুঝে ফেলবে যে তাঁকে যতটা দক্ষ মনে হয়, আসলে ততটা নয়। মজার ব্যাপার হলো, এই অনুভূতি শুধু নতুনদের হয় না, বরং যারা বড় কাজ করে তাদের অনেকেরই হয়। কারণ তারা সবসময় এমন কিছু করার চেষ্টা করে যা আগে কখনও করেনি।

যখন আপনি পরিচিত গণ্ডির বাইরে যান, তখন অনিশ্চয়তা আসবেই। অনেক মানুষ ভয় পেলে ধরে নেয় তারা প্রস্তুত নয়। কিন্তু বাস্তবে ভয় অনেক সময় অপ্রস্তুতির নয়, নতুন করে প্রস্তুতি নেয়ার সংকেত।

আপনি যখন এমন কিছু করতে যাচ্ছেন যা আপনার বর্তমান পরিচয়ের বাইরে, তখন মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তি অনুভব করবে। এটাই গ্রোথ জোন। যেখানে উন্নতি হয় সেখানে অনিশ্চয়তাও থাকে, আর যেখানে সবকিছু আরামদায়ক সেখানে সাধারণত খুব বেশি পরিবর্তন হয় না। তাই ভয়কে স্টপ সিগন্যাল হিসেবে না দেখে গ্রোথ সিগন্যাল হিসেবে দেখতে শেখা জরুরি।

অস্টিন ক্লিওন এই অধ্যায়ে "ফেক ইট টিল ইউ মেক ইট" ধারণার কথাও বলেছেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এই ধারণাকে ভুল বোঝে। তারা ভাবেন এর অর্থ হলো মানুষকে বোকা বানানো, আসলে এর অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর অর্থ হলো ভবিষ্যতের মানুষটির মতো আচরণ করা, যাকে আপনি ধীরে ধীরে সেই মানুষটি হয়ে উঠেন।

ধরুন আপনি একজন লেখক হতে চান, তাহলে প্রশ্ন হলো একজন লেখক প্রতিদিন কী করে? সে লেখে। তাহলে লেখক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই, লেখা শুরু করলেই লেখক হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।

ধরুন আপনি উদ্যোক্তা হতে চান, তাহলে উদ্যোক্তা কী করে? সে সমস্যা খুঁজে বের করে, সমাধান তৈরি করে, মানুষের সাথে কথা বলে এবং ঝুঁকি নেয়। তাহলে উদ্যোক্তা হওয়ার সার্টিফিকেটের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই, এক্টিভিটিই আপনার আইডেন্টিটি তৈরি করে।

এখানে একটি গভীর ব্যবসায়িক শিক্ষা লুকিয়ে আছে। বর্তমান যুগে সবচেয়ে বড় কম্পিটিটিভ এডভান্টেজ প্রতিভা নয়, বরং লার্নিং স্পিড। অর্থাৎ আপনি যত দ্রুত শিখতে পারেন, পরীক্ষা করতে পারেন, ভুল করতে পারেন এবং ঠিক ততো দ্রুত জীবনে এগিয়ে যেতে পারেন।

যে মানুষ এক বছর ধরে পরিকল্পনা করে, আর যে মানুষ এক মাসের মধ্যে ছোট পরিসরে পরীক্ষা শুরু করে, তাদের শেখার গতির পার্থক্য বিশাল। বাস্তব পৃথিবী চিন্তাবিদদের নয়, পরীক্ষাকারীদের পুরস্কৃত করে। কারণ বাস্তবতা সম্পর্কে সবচেয়ে মূল্যবান জ্ঞান চিন্তা থেকে আসে না, অভিজ্ঞতা থেকে আসে।

একজন মানুষ ব্যবসা সম্পর্কে শত বই পড়তে পারে, কিন্তু প্রথম গ্রাহকের সাথে কথা বলার অভিজ্ঞতা তাকে এমন শিক্ষা দেবে যা কোনো বই দিতে পারবে না। একজন মানুষ শত ভিডিও দেখে পাবলিক স্পিকিং শিখতে পারে না, তাকে একদিন মঞ্চে উঠতেই হবে। একজন মানুষ শত পরিকল্পনা করেও উদ্যোক্তা হতে পারে না, তাকে একদিন বিক্রি করতেই হবে। জীবনের অনেক শিক্ষা এমন, যা শুধু কাজের মাধ্যমে শেখা যায়।

তাই, পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য এমন একটি পরিচয় বেছে নিন যা আপনি গড়ে তুলতে চান।

আপনি কে, তার উত্তর ভবিষ্যতের কোনো রহস্যে লুকিয়ে নেই। উত্তরটি লুকিয়ে আছে আজ আপনি কী কাজ করছেন তার মধ্যে। কারণ মানুষ নিজেকে গুপ্তধনের মতো হঠাৎ কোথাও খুঁজে পায় না, বরং মানুষ নিজেকে প্রতিনিয়ত তৈরি করে।

@ Nur Rahman ( Steal Like an Artist বইয়ের ২য় অধ্যায় অবলম্বনে )





অস্টিন ক্লিওন বলেন, পৃথিবীতে প্রায় কিছুই সম্পূর্ণ নতুন নয়। প্রতিটি নতুন ধারণা আসলে পুরোনো কয়েকটি ধারণার নতুন সংমিশ্রণ। প্রথমে এটি হতাশাজনক শোনাতে পারে, কিন্তু একটু গভীরে গেলে বুঝবেন, এটি আসলে অত্যন্ত স্বস্তি দেয়ার মতো একটি খবর।

ভাবুন, আপনি একটি ব্যবসা শুরু করতে চান। আপনার মাথায় হয়তো কোনো বিলিয়ন ডলারের ইউনিক আইডিয়া নেই, তখন আপনি নিজেকে ছোট মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে অ্যামাজন, উবার, এয়ারবিএনবি বা নেটফ্লিক্স কেউই শূন্য থেকে নতুন কোনো সমস্যা আবিষ্কার করেনি।

মানুষ কেনাকাটা করত, মানুষ যাতায়াত করত, মানুষ ভ্রমণ করত এবং মানুষ বিনোদন নিত। তারা শুধু পুরোনো সমস্যাকে নতুনভাবে দেখেছে।

এখানেই প্রথম অধ্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লুকিয়ে আছে। সফল মানুষ নতুন আইডিয়া তৈরি করে না, সফল মানুষ আইডিয়ার মধ্যে নতুন সম্ভাবনা খুঁজে বের করে।

এটা অনেকটা রান্নার মতো। চাল, ডাল, তেল ও মসলা পৃথিবীতে হাজার বছর ধরে আছে, কিন্তু একজন দক্ষ রাঁধুনি সেই একই উপাদান দিয়ে এমন কিছু তৈরি করতে পারে যা আগে আপনি কখনও খাননি। আইডিয়ার জগতও ঠিক এমন। জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ নয়, জ্ঞানকে কীভাবে একত্রিত করা হয় সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

এখানেই বেশিরভাগ মানুষ কপি আর স্টিল করার পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হয়। একজন সাধারণ মানুষ কপি করে ফলাফল, আর একজন শিল্পী চুরি করে চিন্তার কাঠামো।

ধরুন আপনি একটি সফল ইউটিউব চ্যানেল দেখলেন। সাধারণ মানুষ তার থাম্বনেইল কপি করবে, ভিডিওর স্টাইল কপি করবে এবং কথা বলার ধরন কপি করবে। কিন্তু একজন আর্টিস্ট অন্য প্রশ্ন করবে।

মানুষ কেন ভিডিওটিতে ক্লিক করছে? কোন কৌতূহল কাজ করছে? কোন মনস্তাত্ত্বিক ট্রিগার দর্শককে আটকে রাখছে? কোন সমস্যার সমাধান ভিডিওটি দিচ্ছে?

সে বাইরের রূপ নয়, ভেতরের সিস্টেম চুরি করবে। এই কারণেই একজন কপিকার কখনও বড় হতে পারে না, কিন্তু একজন চিন্তাবিদ বারবার নতুন কিছু তৈরি করতে পারে।

অস্টিন ক্লিওন আরেকটি অসাধারণ ধারণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের সবার একটি ভুল ধারণা আছে। আমরা সাধারণত ভাবি আমাদের পরিচয় তৈরি হয়েছে আমাদের পরিবার থেকে। এটি আংশিক সত্য, কিন্তু আমাদের মানসিক পরিচয় তৈরি হয়েছে আমরা কাদের পড়েছি, কাদের শুনেছি, কাদের অনুসরণ করেছি এবং কাদের ভালোবেসেছি তার মাধ্যমে।

আপনি আজ যে মানুষ, তার একটি বড় অংশ গঠিত হয়েছে আপনার গ্রহণ করা চিন্তাগুলো থেকে।

এই বিষয়টি ব্যবসা এবং ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অধিকাংশ মানুষ নিজেদের দক্ষতা উন্নত করার চেষ্টা করে, কিন্তু খুব কম মানুষ নিজেদের ইনফ্লুয়েন্স সিস্টেম উন্নত করার চেষ্টা করে।

তারা ভাবে, আমি কী শিখছি? কিন্তু খুব কম মানুষ জিজ্ঞেস করে, আমি কার কাছ থেকে শিখছি? এই প্রশ্নের উত্তরই অনেক সময় ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

কারণ চিন্তা সংক্রামক। আপনি যদি প্রতিদিন অভিযোগ করে এমন মানুষের সাথে থাকেন, ধীরে ধীরে আপনিও অভিযোগ করতে শিখবেন। আপনি যদি প্রতিদিন অতিউচ্চ চিন্তাবিদদের বই পড়েন, ধীরে ধীরে আপনার চিন্তার মানও উন্নত হবে।

এজন্য অস্টিন ক্লিওন বলেন, তুমি তোমার প্রভাবগুলোর সমষ্টি। এই একটি বাক্যের ভেতর পুরো ব্যক্তিগত উন্নয়নের প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে।

আজকের ইনফরমেশন ইকোনমিতে এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মস্তিষ্ক প্রতিদিন যা গ্রহণ করছে, সেটাই ধীরে ধীরে আপনার ভবিষ্যৎ তৈরি করছে। যদি প্রতিদিন আপনি শুধু বিনোদন গ্রহণ করেন, আপনার চিন্তা বিনোদনের স্তরেই আটকে থাকবে।

যদি প্রতিদিন আপনি ব্যবসা, মনোবিজ্ঞান, যোগাযোগ, নেতৃত্ব এবং সৃজনশীলতার সেরা ধারণাগুলোর সংস্পর্শে থাকেন, আপনার মস্তিষ্কও ধীরে ধীরে সেই স্তরে কাজ করতে শুরু করবে।

এ কারণেই লেখক গার্বেজ ইন, গার্বেজ আউট ধারণাটি তুলে ধরেন। এটি শুধু কম্পিউটারের জন্য নয়, এটি মানুষের জীবন পরিচালনার একটি সূত্র।

আপনি যা গ্রহণ করেন, শেষ পর্যন্ত তাই প্রকাশ করেন। আপনি যা পড়েছেন, তাই ভাবেন। আপনি যা ভাবেন, তাই সিদ্ধান্ত নেন। আপনি যে সিদ্ধান্ত নেন, সেটাই আপনার জীবন তৈরি করে।

তাই প্রথম অধ্যায়ের আসল শিক্ষা আইডিয়া চুরি করা নয়, আসল শিক্ষা হলো নিজের মানসিক খাদ্য বেছে নেওয়া। কারণ একজন মানুষের ভবিষ্যৎ শুধু তার পরিশ্রম দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত হয় সে প্রতিদিন কোন চিন্তার সংস্পর্শে আসছে তার মাধ্যমে।

যখন আপনি পৃথিবীকে একজন আর্টিস্টের চোখে দেখতে শুরু করবেন, তখন হঠাৎ করে চারপাশের সবকিছুই শিক্ষক হয়ে উঠবে। একটি বই, একটি ব্যবসা, একটি বিজ্ঞাপন, একটি ব্যর্থতা কিংবা একটি কথোপকথন, সবকিছুই।

তখন আপনি বুঝতে পারবেন, পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ নতুন আইডিয়া নয়, মূল্যবান সম্পদ হলো ভালো আইডিয়া চিনতে পারার ক্ষমতা। আর সেই ক্ষমতাই একজন সাধারণ মানুষকে অসাধারণ করে তোলে।

প্রথম অধ্যায়ের মূল শিক্ষা হলো, অরিজিনাল হওয়ার চেষ্টা করার আগে নিজেকে অসাধারণ মানুষগুলোর চিন্তাভাবনার সংস্পর্শে রাখুন। কারণ সৃজনশীলতা শূন্য থেকে জন্মায় না, এটি জন্মায় বিভিন্ন উচ্চমানের চিন্তার সংমিশ্রণ থেকে।

মনে রাখবেন, আপনার চিন্তার কোয়ালিটি কখনও আপনার তথ্যের কোয়ালিটিকে অতিক্রম করতে পারে না। তাই নিজের আইডিয়ার চেয়ে নিজের ইনফ্লুয়েন্স এনভায়রনমেন্ট নিয়ে বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

আজ থেকেই একটি আইডিয়া ভল্ট তৈরি করুন। একটি নোটবুক, নোশন বা গুগল ডকসে এমন সব ধারণা, ব্যবসায়িক মডেল, মার্কেটিং কৌশল, বইয়ের লার্নিং এবং পর্যবেক্ষণ লিখে রাখুন যা আপনাকে ভাবায়।

শুধু সংগ্রহ করবেন না, প্রতিটি আইডিয়ার পাশে লিখুন, আমি এটি আমার জীবনে, ব্যবসায় বা ক্যারিয়ারে কীভাবে ব্যবহার করতে পারি?

কয়েক মাস পরে দেখবেন আপনি আর সবার মতো শুধু তথ্য সংগ্রহ করছেন না, আপনি চিন্তার নতুন খোরাক সংগ্রহ করছেন যার সংমিশ্রণে দুর্দান্ত কিছু তৈরি হবে।

যারা শুধু কপি করে তারা ভিড়ে হারিয়ে যায়, কিন্তু যারা শিল্পীর মতো চুরি করে তারা একদিন নিজেরাই অন্যদের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। করে।

@ Nur Rahman ( Steal Like an Artist বইয়ের প্রথম অধ্যায় অবলম্বনে )





এই ৮টি সত্য জীবন বদলে দিতে পারে...

পনি কি কখনও লক্ষ্য করেছেন, একই অফিসে দুজন মানুষ কাজ করছে। একজন অন্যজনের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ, বেশি পরিশ্রমী, এমনকি বেশি জ্ঞানী। তবুও পদোন্নতি পায় অন্যজন। ব্যবসায়ও একই ঘটনা দেখা যায়। অনেক সময় সেরা পণ্য নয়, বরং বেশি প্রভাব তৈরি করা ব্যক্তি জয়ী হয়। কেন এমন হয়? কারণ বাস্তব পৃথিবী শুধু মেধা দিয়ে চলে না। এটি চলে পারসেপশন, ইনফ্লুয়েন্স, সাইকোলজি এবং হিউম্যান বিহেভিয়ার দিয়ে।

আর এই বাস্তবতাকেই নির্মমভাবে তুলে ধরেছে দ্য ফর্টি এইট লজ অব পাওয়ার বইটি। আজকের পোস্ট এ আমারা 48 Laws of Power বই থেকে ৮টি লার্নিং জানবো।


১. কেন শুধুমাত্র মেধাবী মানুষ সফল হয় না

আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, ভালো করে পড়াশোনা করো, দক্ষ হও, পরিশ্রম করো, সফলতা আসবেই। কিন্তু বাস্তব পৃথিবী একটু ভিন্নভাবে কাজ করে।

একজন অত্যন্ত দক্ষ কর্মী হয়তো বছরের পর বছর পরিশ্রম করছে। অন্যদিকে একজন তুলনামূলক কম দক্ষ ব্যক্তি নেতৃত্বের অবস্থানে পৌঁছে যাচ্ছে।

কারণ পৃথিবী শুধু ভ্যালু ক্রিয়েশন দেখে না, ভ্যালু পারসেপশনও দেখে।

একটি হীরার কথা চিন্তা করুন। যদি সেটি মাটির নিচে চাপা থাকে, তার মূল্য কমে যায় না। কিন্তু মানুষ তার মূল্য বুঝতে পারে না যে পর্যন্ত না সেটি মানুষের হাতে আসে, মানুষের দৃষ্টি গোচর হয়!

একইভাবে আপনার প্রতিভা যত বড়ই হোক, যদি মানুষ তা দেখতে না পায়, তাহলে সেই প্রতিভার বাজারমূল্যও তৈরি হবে না।

এই কারণেই বইটির শুরুতেই ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। শুধু দক্ষ হওয়া যথেষ্ট নয়, আপনাকে এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে যাতে মানুষ আপনার মূল্য উপলব্ধি করতে পারে।


২. মানুষ যুক্তি দিয়ে নয়, আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়

অনেক মানুষ মনে করে মানুষ তথ্য দেখে সিদ্ধান্ত নেয়। বাস্তবে মানুষ প্রথমে আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, পরে যুক্তি দিয়ে সেটাকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করে।

আপনি যখন কোনো ব্র্যান্ড কিনেন, তখন সবসময় কি শুধু স্পেসিফিকেশন দেখেন? না।

অ্যাপল শুধু ফোন বিক্রি করে না। তারা আইডেন্টিটি বিক্রি করে।

নাইকি শুধু জুতা বিক্রি করে না। তারা আত্মবিশ্বাস বিক্রি করে।

রাজনীতি, ব্যবসা, মার্কেটিং, নেতৃত্ব, সম্পর্ক সব জায়গায় একই নিয়ম কাজ করে।

যে ব্যক্তি মানুষের আবেগ, আশা, ভয় এবং আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারে, সে মানুষের সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করতে পারে। এই কারণেই সফল নেতারা শুধু তথ্য দেন না, তারা মানুষের অনুভূতির সাথে সংযোগ তৈরি করেন।


৩. রেপুটেশন হলো এমন সম্পদ যা ব্যাংকে জমা রাখা যায় না

ধরুন আপনি একজন ফ্রিল্যান্সার। আপনার এবং আরেকজনের দক্ষতা একই।

কিন্তু একজনের সম্পর্কে ক্লায়েন্টরা বলে, এই মানুষটাকে বিশ্বাস করা যায়।

আর অন্যজন সম্পর্কে বলে, ভালো কাজ করে, কিন্তু নিশ্চিত নই সে ঠিক মতো ডেলিভারি দিবে কিনা।

কে বেশি সুযোগ পাবে?

স্পষ্টভাবেই প্রথম ব্যক্তি।

রেপুটেশন আসলে এক ধরনের অদৃশ্য মুদ্রা। এটি একদিনে তৈরি হয় না। বছরের পর বছর ছোট ছোট কাজ, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং ধারাবাহিক আচরণের মাধ্যমে এটি তৈরি হয়।

মজার বিষয় হলো, অর্থ হারালে আবার আয় করা যায়। কিন্তু বিশ্বাস হারালে অনেক সময় পুরো ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।

এই কারণেই ক্ষমতার জগতে রেপুটেশনকে দুর্গের মতো রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।



৪. ইনফরমেশন কন্ট্রোল মানেই পাওয়ার কন্ট্রোল

আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর দিকে তাকান।

গুগল কী নিয়ন্ত্রণ করে? তথ্য।

মেটা কী নিয়ন্ত্রণ করে? মানুষের মনোযোগ।

অ্যামাজন কী নিয়ন্ত্রণ করে? ক্রেতার আচরণের ডেটা।

যে বেশি জানে, সে বেশি প্রস্তুত থাকে। যে বেশি প্রস্তুত থাকে, সে বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এটি শুধু বড় কোম্পানির জন্য সত্য নয়।

একজন বিক্রয়কর্মী যদি ক্রেতার প্রয়োজন বুঝে, একজন উদ্যোক্তা যদি বাজারের পরিবর্তন আগে বুঝে, একজন ছাত্র যদি পরীক্ষকের চিন্তাভাবনা বুঝে, তাহলে তার জয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

তাই, তথ্য অনেক সময় অর্থের চেয়েও শক্তিশালী সম্পদ।


৫. সব যুদ্ধ জেতা বুদ্ধিমানের কাজ নয়

অপরিণত মানুষ প্রতিটি বিতর্কে জিততে চায়।

পরিণত মানুষ জানে কোন যুদ্ধটি লড়তে হবে এবং কোনটি উপেক্ষা করতে হবে।

ধরুন কেউ সামাজিক মাধ্যমে আপনাকে আক্রমণ করল। আপনার সামনে দুটি পথ আছে।

প্রথমটি হলো সঙ্গে সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়া।

দ্বিতীয়টি হলো নিজের কাজের মাধ্যমে উত্তর দেওয়া।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পথটিই বেশি শক্তিশালী। কারণ যুক্তিতে জয়ী হওয়া মানেই মানুষের মন জয় করা নয়।

অনেক সময় নীরবতা, ধৈর্য এবং ফলাফলই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতি উত্তর হয়ে দাঁড়ায়।


৬. স্কেয়ারসিটি কেন মানুষের মনে মূল্য তৈরি করে

এক গ্লাস পানি মরুভূমিতে সোনার চেয়েও মূল্যবান হতে পারে। আবার একই পানি নদীর পাশে প্রায় মূল্যহীন।

কারণ মূল্য সবসময় জিনিসের মধ্যে থাকে না। মূল্য তৈরি হয় তার স্কেয়ারসিটির মাধ্যমে।

এই কারণেই লিমিটেড এডিশনের পণ্য বেশি বিক্রি হয়।

এই কারণেই বড় সেলিব্রিটিরা সব জায়গায় উপস্থিত থাকেন না।

এই কারণেই দামি ব্র্যান্ডগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের শাখা সব জায়গায় রাখে না ।

যখন কিছু সবসময় পাওয়া যায়, মানুষ সেটাকে স্বাভাবিক ধরে নেয়। যখন সেটি বিরল হয়ে যায়, তখন তার গুরুত্ব বেড়ে যায়।

মানুষের সময়, মনোযোগ এবং উপস্থিতির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কাজ করে।


৭. টাইমিং অনেক সময় ট্যালেন্টের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ

ইতিহাসে অসংখ্য অসাধারণ ধারণা ব্যর্থ হয়েছে শুধু ভুল সময়ে আসার কারণে। আবার অনেক সাধারণ ধারণা সফল হয়েছে সঠিক সময়ে আসার কারণে।

কৃষক যত ভালো বীজই ব্যবহার করুক, ভুল মৌসুমে ফসল ফলাতে পারবে না।

ব্যবসা, ক্যারিয়ার, বিনিয়োগ এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা কাজ করে।

অনেক মানুষ ব্যর্থ হয় দক্ষতার অভাবে নয়, সময়ের সিগন্যাল বুঝতে না পারার কারণে।

সঠিক সময়ে ছোট পদক্ষেপও বিশাল ফলাফল দিতে পারে।

৮. অ্যাডাপ্টাবিলিটি হলো ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি

এক সময় নোকিয়া ছিল মোবাইল বিশ্বের রাজা। কোডাক ছিল ফটোগ্রাফির সম্রাট। ব্লকবাস্টার ছিল বিনোদন জগতের বিশাল শক্তিশালি নাম।

তারা কেন হারিয়ে গেল? কারণ তারা পরিবর্তনের গতিকে অবমূল্যায়ন করেছিল।

আজ এআই, অটোমেশন এবং ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের যুগে সবচেয়ে বেশি টিকে থাকবে কে?

সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ নয়। সবচেয়ে ধনী মানুষও নয়।

সবচেয়ে দ্রুত শিখতে পারে এবং নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে এমন মানুষ।

পানির মতো হওয়ার ধারণাটি এখানেই সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে উঠে। পানি পাথরের সাথে যুদ্ধ করে না। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের রূপ পরিবর্তন করে সামনে এগিয়ে যায়।

ভবিষ্যৎও তাদেরই হবে যারা পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে গ্রহণ করতে শিখবে।


দ্য ফর্টি এইট লজ অব পাওয়ার আসলে ক্ষমতা অর্জনের বইয়ের চেয়ে বেশি কিছু। এটি মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সামাজিক প্রভাব এবং বাস্তব পৃথিবীর অঘোষিত নিয়মগুলো বোঝার বই।

এখানে বর্ণিত অনেক ধারণা নৈতিকভাবে বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু এগুলো জানার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি মানুষ কীভাবে প্রভাবিত হয়, কেন কিছু ব্যক্তি দ্রুত এগিয়ে যায় এবং কীভাবে নিজেকে প্রতারণা বা প্রভাবের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করা যায়।


ক্ষমতার সবচেয়ে বড় রহস্য হলো, এটি কখনও শুধু অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় নয়; এটি প্রথমে নিজেকে, নিজের ভাবমূর্তি, নিজের আবেগ এবং নিজের সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। যে মানুষ এই চারটি জিনিস আয়ত্ত করতে পারে, পৃথিবী ধীরে ধীরে তার জন্য নতুন দরজা খুলতে শুরু করে।

*@ Nur Rahman ** 48 Laws Of Power বই থেকে





১৪ টি মানি রুল যা পুরো জীবনটাকেই বদলে দিতে পারে!


১. আয় না, টিকে থাকা টাকা মানুষকে ধনী বানায়

মানুষ সাধারণত ভাবে বেশি আয় করলেই ধনী হওয়া যায়। বাস্তবে ধনী হয় সেই মানুষ, যে নিজের আয় থেকে ফিউচার তৈরি করতে পারে।

প্রথম টাকা হাতে পাওয়ার পর অধিকাংশ মানুষ ইমোশনালি স্পেন্ড করা শুরু করে। কারণ তারা টাকার মাধ্যমে সমাজে নিজের একটি নতুন আইডেন্টিটি কিনতে চায়; যেমন নতুন ফোন, ব্র্যান্ডেড পোশাক কিংবা লাক্সারি লাইফস্টাইল। বাইরে থেকে এগুলোকে সাকসেস মনে হলেও ভেতরে ভেতরে এগুলো ফিউচার ওয়েলথকে ধ্বংস করে দেয়।

টাকা অনেকটা বীজের মতো। আপনি চাইলে সেটা এখনই খেয়ে ফেলতে পারেন, আবার চাইলে মাটিতে পুঁতে ভবিষ্যতের এক বিশাল বন তৈরি করতে পারেন। ওয়েলথি মানুষরা শুরুতে লাইফস্টাইল আপগ্রেড না করে অ্যাসেট আপগ্রেড করে। কারণ তারা জানে, আর্লি মানি কনজাম্পশন ভবিষ্যতের ফ্রিডমকে চিরতরে মেরে ফেলে। এখানেই ডিলেইড গ্র্যাটিফিকেশন আপনার সুপারপাওয়ার হয়ে দাঁড়ায়। আজকে সামান্য স্যাক্রিফাইস করা মানে ফিউচারে এক বিশাল মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট পাওয়া।

২. আগে নিজেকে পে করুন

গরিব মানুষ সময় দিয়ে টাকা বাঁচায়, আর ধনী মানুষ টাকা দিয়ে সময় বাঁচায়। এই একটা লাইন পুরো ওয়েলথ সাইকোলজি এক্সপ্লেইন করে দেয়।

যখন একজন মানুষ লন্ড্রি, ছোটখাটো কাজ বা আননেসেসারি অপারেশনাল টাস্কে নিজের মূল্যবান এনার্জি শেষ করে ফেলে, তখন তার ব্রেইন স্ট্র্যাটেজিক চিন্তা করার ক্যাপাসিটি হারিয়ে ফেলে। সে তখন শুধু সারভাইভ মোডে বেঁচে থাকে।

যে মানুষ নিজের সময় কিনতে শেখে, সে জীবনে লেভারেজ তৈরি করে। কারণ ফ্রি টাইম মানেই শুধু বিশ্রাম না; ফ্রি টাইম মানে নতুন স্কিল শেখা, নতুন বিজনেস মডেল চিন্তা করা, নেটওয়ার্ক বিল্ড করা এবং হাই ভ্যালু ডিসিশন নেওয়া। আজকের ক্রিয়েটর ইকোনমি, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা স্টার্টআপ ওয়ার্ল্ডে সবচেয়ে বড় কারেন্সি হলো কগনিটিভ এনার্জি। যার মেন্টাল ব্যান্ডউইথ যত বেশি, তার আর্নিং পটেনশিয়াল তত বেশি।

তাই নিজের গ্রোথে ইনভেস্ট করা বোকামি না, এটা হলো এক ধরনের ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স।

৩. ফোকাস ছাড়া বড় ওয়েলথ তৈরি হয় না

আজকের জেনারেশন ডাইভার্সিফিকেশনকে এক ধরনের ইন্টেলিজেন্স ভাবে। সবাই একসাথে ১০টা জিনিস করতে চায়, ইউটিউব, ক্রিপ্টো, এজেন্সি, ড্রপশিপিং, স্টক মার্কেট এবং পার্সোনাল ব্র্যান্ড।

প্রবলেম হলো, ওয়েলথ সাধারণত আসে কনসেন্ট্রেশন থেকে; আর ডাইভার্সিফিকেশন আসে মূলত তৈরি হওয়া ওয়েলথকে প্রোটেক্ট করার জন্য।

একটি ম্যাগনিফাইং গ্লাস যখন সূর্যের আলোকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে ফোকাস করে, তখনই কেবল সেখানে আগুন জ্বলে। মানুষের স্কিল এবং ক্যারিয়ারও ঠিক তেমন।

যে মানুষ একটি নির্দিষ্ট স্কিলে ওয়ার্ল্ড ক্লাস হয়ে যায়, মার্কেট তাকে কখনো ইগনোর করতে পারে না। তখন সব সেরা অপরচুনিটিজ তার কাছে নিজে থেকে আসে।

বাইরে থেকে লোকে একে লাক মনে করলেও বাস্তবে এটা হলো ফোকাসড রিপিটেশন এর এক অনন্য রিওয়ার্ড। প্রথম মিলিয়ন সাধারণত ফোকাস থেকেই আসে, এক্সপ্যানশন আসে অনেক পরে।

৪. ইমার্জেন্সি প্ল্যান না থাকলে অ্যাম্বিশন ভয় তৈরি করে

অধিকাংশ মানুষ জীবনে বড় ডিসিশন নিতে ভয় পায়, কারণ তাদের কোনো শক্তিশালী ব্যাকআপ সিস্টেম নেই।

যে এন্ট্রেপ্রেনারের কোনো ইমার্জেন্সি ফান্ড নেই, সে কখনো ব্যবসায় অ্যাগ্রেসিভ মুভ নিতে পারবে না। কারণ তার প্রতিটা ডিসিশন হবে আদতে ফিয়ার ড্রিভেন বা ভয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিজনেস আর লাইফ, দুই জায়গাতেই একটি শক্তিশালী ইমারজেন্সি প্ল্যান তৈরি রাখা দরকার।

প্লেনের পাইলট যেমন ইমার্জেন্সি প্রোটোকল ভালো করে জানেন, তেমনি ফিন্যান্সিয়ালি স্মার্ট মানুষও জানেন যদি সবকিছু কলাপ্স করে, তবে তার নেক্সট মুভ কী হবে। এই ক্ল্যারিটি মনের ভীতি কমায়; আর মনের ভয় কমলে কাজের এক্সিকিউশন স্পিড বহুগুণ বেড়ে যায়।

৫. টাকা জমিয়ে না, সার্কুলেট করে ওয়েলথ তৈরি হয়

অনেক মানুষ শুধু টাকা সেভ করে, কিন্তু তা সঠিক জায়গায় ইনভেস্ট করে না। এটা অনেকটা নদীর পানি আটকে রাখার মতো; ফ্লো বন্ধ হয়ে গেলে সেই পানি একসময় নষ্ট হতে শুরু করে। মানি ভেলোসিটি হলো ওয়েলথ সৃষ্টির একটি অত্যন্ত পাওয়ারফুল কনসেপ্ট। টাকা যখন মার্কেটে সার্কুলেট হয়, তখন নতুন রিলেশনশিপ তৈরি হয়, নতুন অপরচুনিটি আসে এবং প্রতিনিয়ত লার্নিং তৈরি হয়।

যে মানুষ নিজের স্কিল, টিম, বিজনেস কিংবা ইনভেস্টমেন্টে সঠিক উপায়ে টাকা ব্যবহার করে, সে আসলে নিজের একটি ফিউচার আর্নিং ইঞ্জিন তৈরি করে। অন্যদিকে, শুধু সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা রেখে দিলে তা সাময়িক সাইকোলজিক্যাল সিকিউরিটি দিলেও কখনো এক্সপোনেনশিয়াল গ্রোথ দেয় না।

৬. স্মার্ট রিস্ক ছাড়া বড় ওয়েলথ আসে না

জিরো রিস্ক লাইফ দেখতে খুব সেফ মনে হতে পারে, কিন্তু লং টার্মে এটি অত্যন্ত ডেঞ্জারাস। কারণ ইনফ্লেশন, কম্পিটিশন এবং চেঞ্জিং ইকোনমি আপনাকে যেকোনো উপায়ে রিস্কের মধ্যেই ফেলবে।

সাকসেসফুল মানুষ কখনো ব্লাইন্ড রিস্ক নেয় না, তারা মূলত অ্যাসিমেট্রিকাল রিস্ক নেয়। অর্থাৎ যেখানে ডাউনসাইড লিমিটেড, কিন্তু আপসাইড হিউজ। অর্থাৎ হারালে কতটুকু টাকা হারাবেন আপনি জানেন, কিন্তু যদি কোন ভাবে জিতে যান তাহলে এক্সপোনেন্সিয়াল গ্রোথ ইনশিউর করতে পারবেন।

যেমন নতুন একটি স্কিল শেখার জন্য টাকা খরচ করা; সব চেয়ে খারাপ হতে পারে কিছু টাকা গেল এবং আপনি কিছুই শিখলেন না, বেস্ট কেস হতে পারে , সেটা আপনার পুরো ক্যারিয়ার বদলে দিল।


৭. আপনার মানি বিলিফ আপনার ইনকাম ডিসাইড করে

যদি আপনি ভেতরে ভেতরে বিশ্বাস করেন ধনী মানুষরা খারাপ, বা স্বার্থপর হয়, তবে আপনার সাবকনশাস মাইন্ড কখনো আপনাকে ধনী হতে দেবে না। কারণ মানুষ কখনো নিজের আইডেন্টিটির বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করতে পারে না।

অনেক মানুষ কনশাসলি ওয়েলথ চায়, কিন্তু সাবকনশাসলি ওয়েলথকে ভয় পায়; যার কারণে তারা নিজেরাই নিজেদের সেলফ সাবোটাজ করে বসে। এটা অনেকটা গাড়ির অ্যাক্সিলারেটর আর ব্রেক একসাথে চেপে ধরার মতো।

আপনার মনের ভেতরের এই মানি স্টোরি রিরাইট করা জরুরি। টাকা মোটেও খারাপ কিছু না, টাকা হলো আসলে একটি শক্তিশালী অ্যাম্পলিফায়ার।

ভালো মানুষের হাতে টাকা গেলে তার ইমপ্যাক্ট বাড়ে, আর খারাপ মানুষের হাতে গেলে ড্যামেজ বাড়ে।

৮. লাইফস্টাইল ক্রিপ হলো সাইলেন্ট ফিন্যান্সিয়াল ডিজিজ

ইনকাম বাড়ার সাথে সাথে নিজের লাইফস্টাইলকে আনুপাতিক হারে বাড়িয়ে ফেলাই হলো লাইফস্টাইল ক্রিপ।

প্রথমে একটি নতুন ফোন, তারপর আরও বেটার অ্যাপার্টমেন্ট, তারপর লাক্সারি কার, তারপর এক্সপেনসিভ ভ্যাকেশন। একসময় দেখা যায় ইনকাম বহুগুণ বাড়লেও জীবনের আসল ফ্রিডম বিন্দুমাত্র বাড়ে না, বরং উল্টো ডিপেন্ডেন্সি বাড়ে।

রিয়েল ওয়েলথ তখনই তৈরি হয়, যখন ইনকাম বাড়লেও নিজের স্পেন্ডিং ডিসিপ্লিন পুরোপুরি কন্ট্রোলড থাকে। কারণ আপনার জমানো এই সারপ্লাস ক্যাশই ভবিষ্যতে নতুন অ্যাসেট তৈরি করবে।

ধনী মানুষরা অনেক সময় খুব সিম্পল জীবন বেছে নেয়, কারণ তারা ভালো করেই জানে, স্ট্যাটাস টেম্পোরারি, কিন্তু ফ্রিডম পার্মানেন্ট।

৯. পার্সোনাল লাইফ কেও বিজনেস এর মতো ম্যানেজ করতে হয়

অধিকাংশ মানুষ নিজের ফিন্যান্সিয়াল লাইফ ট্র্যাক করে না, তাই তারা পুরোপুরি ইমোশনালি টাকা খরচ করে ফেলে।

কিন্তু ওয়েলথ কনশাস মানুষ সবসময় নিজের পার্সোনাল P&L ( Profit and Loss) মেইনটেইন করে। কত ইনকাম হলো, কত এক্সপেন্স হলো, কোথায় লিকেজ হচ্ছে এবং কোথায় নতুন ইনভেস্টমেন্ট অপরচুনিটি আছে, তার সবকিছু তারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ট্র্যাক করে।

আপনার জীবনও এক ধরনের বিজনেস। যদি বিজনেসের ক্যাশফ্লো ঠিকমতো ম্যানেজ না করেন, তবে বিজনেস যেমন কলাপ্স করবে, লাইফের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হবে।

সঠিক মানি অ্যাওয়ারনেস ছাড়া ওয়েলথ তৈরি করা ইমপসিবল।

১০. একা বড় হওয়া যায় না

অনেক এন্ট্রেপ্রেনার ভেতরে ভেতরে সিক্রেটলি ভয় পায় নিজের চেয়ে ট্যালেন্টেড মানুষকে হায়ার করতে; কারণ তারা ভাবে, এই টিম মেম্বাররা হয়তো একসময় তাদের ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু ব্যবসায় অ্যাভারেজ মানুষ হায়ার করলে পুরো কোম্পানিই একসময় অ্যাভারেজ হয়ে যায়।

মনে রাখবেন, স্ট্রং মানুষ সবসময় স্ট্রং মানুষকে অ্যাট্র্যাক্ট করে।

আপনি যদি আপনার টিম, ফ্যামিলি কিংবা নেটওয়ার্ককে গ্রো করতে সাহায্য করেন, তবে তারা একসময় আপনার নিজের গ্রোথের বড় মাল্টিপ্লায়ার হয়ে দাঁড়াবে। ওয়েলথ কখনো সলো গেম না, এটা হলো একটি পিওর ইকোসিস্টেম গেম।

১১. টাকা গোল না, অ্যাম্পলিফায়ার

অনেক মানুষ ভাবে বিপুল টাকা পেলেই জীবনে পরম সুখ চলে আসবে। বাস্তবে টাকা শুধু আপনার এক্সিস্টিং রিয়েলিটিকে আরও বেশি অ্যাম্পলিফাই করে মাত্র।

যদি আপনার পার্সোনাল রিলেশনশিপ খারাপ হয়, তবে টাকা সেটা অটোমেটিক্যালি ফিক্স করতে পারবে না। যদি জীবনে কোনো নির্দিষ্ট পারপাস না থাকে, তবে টাকা ভেতরের এম্পটিনেস দূর করতে পারবে না।

মানি আপনাকে ফ্রিডম দিতে পারে, অপশনস দিতে পারে এবং সমাজে বড় ইমপ্যাক্ট তৈরি করতে পারে; কিন্তু এটি কখনো জীবনের আসল মিনিং তৈরি করতে পারে না।

জীবনের মিনিং আসে মূলত কনট্রিবিউশন থেকে।

সেজন্যই অনেক বিলিয়নেয়ার জীবনের একপর্যায়ে ফিলানথ্রপি, মেন্টরশিপ কিংবা নতুন ক্রিয়েশনের দিকে ঝুঁকে পড়েন, কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের একটি পারপাস খোঁজে।

১২. আপনার নেটওয়ার্ক আপনার ফিউচার আইডেন্টিটি তৈরি করে

মানুষ সাধারণত তার চারপাশের এনভায়রনমেন্টের একটি অ্যাভারেজ আউটকাম হয়ে যায়। আপনি যাদের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান, ধীরে ধীরে তাদের চিন্তা, তাদের অ্যাম্বিশন এবং তাদের স্ট্যান্ডার্ডস আপনার নিজের অজান্তেই আপনার মধ্যে ঢুকে যায়।

যদি আপনার ফ্রেন্ড সার্কেল সবসময় স্মল থিংকিং প্রোমোট করে, তবে আপনার নিজের পার্সোনাল গ্রোথ অনেক স্লো হয়ে যাবে।

আর যদি আপনি এমন মানুষের সাথে থাকেন যারা সবসময় বড় ভিশন নিয়ে ভাবে এবং বড় এক্সিকিউশন করে, তবে আপনার ব্রেইনও খুব দ্রুত সেই নতুন রিয়েলিটিকে অ্যাকসেপ্ট করতে শুরু করবে।

নেটওয়ার্ক শুধু সাধারণ কানেকশন না, এটি মূলত আপনার আইডেন্টিটি এক্সপ্যানশন টুল।

১৩. পারপাস ছাড়া ওয়েলথ এম্পটি লাগে

শুরুতে অনেক মানুষ নিজেকে প্রুভ করার জন্য কাজ করে, পরিবার, সমাজ কিংবা পুরনো কোনো অপমানের বিরুদ্ধে এক ধরনের রিভেঞ্জ এনার্জি নিয়ে। এই ডার্ক এনার্জি শুরুতে আপনাকে কিছুটা ফুয়েল দিতে পারলেও লং টার্মে মানুষকে ভেতর থেকে একদম ক্লান্ত করে দেয়।

তাই জীবনের একপর্যায়ে এসে নিজের হোয়াই ( why )পরিবর্তন করতে হয়।

যখন আপনার কাজ পুরোপুরি কনট্রিবিউশন ড্রিভেন হয়ে যায়, তখন জীবনের কঠিন ডিসিপ্লিনও একদম এফোর্টলেস লাগে; তখন হার্ড ওয়ার্ককে আর কোনো পানিশমেন্ট মনে হয় না।

সবচেয়ে ডেঞ্জারাস সিচুয়েশন হলো জীবনে অনেক সাকসেস পাওয়া, কিন্তু ভুল দেয়ালে নিজের ল্যাডার বা মইটি দাঁড় করিয়ে দেয়া।

১৪। অয়েলথ আসলে আইডেন্টিটি

মানুষ যেভাবে চিন্তা করে, যেভাবে রিস্ক নেয়, যেভাবে নিজের সময় ব্যবহার করে এবং যেভাবে নিজের ফিউচার ইমাজিন করে, তার ফিন্যান্সিয়াল রিয়েলিটি ধীরে ধীরে সেদিকেই ধাবিত হতে শুরু করে। টাকা হলো শুধু শেষ মুহূর্তের আউটকাম; আসল গেম হলো মনের ভেতরের মাইন্ডসেট, ডিসিপ্লিন এবং সঠিক লেভারেজ।

তাই ওয়েলথ জার্নি শুরু করার আগে নিজেকে গভীরভাবে জিজ্ঞেস করুন, “আমি আসলে কেমন জীবন চাই?” কারণ ক্ল্যারিটি ছাড়া সাকসেস অনেক সময় সুন্দরভাবে প্যাকেজড করা এক টুকরো কনফিউশন ছাড়া আর কিছুই না।

মনে রাখবেন, ওয়েলথ তৈরি হয় ইনকাম থেকে নয়, বরং আইডেন্টিটি

আগামী ৩০ দিনের জন্য নিজের ফিন্যান্সিয়াল বিহেভিয়ার খুব সূক্ষ্মভাবে অবজার্ভ করুন। আপনার কোন খরচটি ইমোশনাল আর কোনটা স্ট্র্যাটেজিক, তা একটি ডায়েরিতে নোট করুন।

প্রতিমাসে অন্তত ইনকামের একটি নির্দিষ্ট অংশ নিজের স্কিল বিল্ডিং এবং ইনকাম জেনারেটিং অ্যাসেটে ইনভেস্ট করুন।

একই সাথে একটি প্রাইমারি স্কিল বেছে নিয়ে আগামী ৫ বছর সেটিতেই মাস্টারি বিল্ড করার দৃঢ় কমিটমেন্ট নিন। কারণ ওয়েলথ কখনো শর্টকাট থেকে আসে না, তা আসে মানুষের কম্পাউন্ডেড ফোকাস থেকে।

যে মানুষ টাকার পেছনে না ছুটে প্রতিনিয়ত নিজের ভ্যালু বাড়াতে শেখে, একসময় টাকা নিজেই তার জীবনের দরজায় এসে কড়া নাড়ে।

*@ Nur Rahman




যে মানুষ অস্বস্তি থেকে পালায়, সে আসলে নিজের ভবিষ্যৎ থেকেই পালায়!

মানুষ আজকাল সবকিছুর শর্টকাট খোঁজে। দ্রুত সফল হওয়ার শর্টকাট, আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর শর্টকাট, ফোকাস বাড়ানোর শর্টকাট, এমনকি সুখী হওয়ারও শর্টকাট।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন নতুন নতুন লাইফ হ্যাক ঘুরে বেড়ায়। কেউ বলে সকালে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করলেই জীবন বদলে যাবে, কেউ বলে পাঁচ মিনিট মেডিটেশনেই আপনি অন্য মানুষ হয়ে উঠবেন।

কিন্তু একটা প্রশ্ন খুব কম মানুষ করে, যদি আসল পরিবর্তনের কোনো শর্টকাট না থাকে?

সম্প্রতি নিউরোসায়েন্সে এমন একটি বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, যা শুনলে নিজের জীবনকে নতুনভাবে দেখতে ইচ্ছা করবে। আমাদের মস্তিষ্কে একটি অংশ আছে যার নাম অ্যান্টেরিয়র মিডসিংগুলেট কর্টেক্স। নামটা জটিল, কিন্তু এর কাজ খুব দারুন।

বিজ্ঞানীরা এখন মনে করছেন, এই অংশটাই হয়তো মানুষের ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য, এমনকি বেঁচে থাকার আগ্রহ তৈরির সাথেও জড়িত। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অংশ বড় হয় তখনই, যখন মানুষ এমন কিছু করে যা সে করতে চায় না, কিন্তু তবুও করে।

আজ এই বিষয়টা নিয়েই মূল আলোচনা। আমরা সাধারণত ভাবি কঠিন কাজ করলেই মানুষ এগিয়ে যায়। কিন্তু বিষয়টা শুধু কঠিন কাজে সীমাবদ্ধ নয়।

আসল ব্যাপার হলো আপনি যা করতে চান না, ভয় পান, এড়িয়ে যেতে চান কিংবা যা করতে বিরক্ত লাগে, সেটা করা। কারণ মানুষ তখনই বদলায়, যখন সে নিজের কমফোর্টজোন ভেঙে বের হয়।

ধরুন, একজন মানুষ জিমে যায় কারণ সে জিম করতে ভালোবাসে। তার জন্য ভার তোলা আনন্দের। সেখানে হয়তো শারীরিক উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু মানসিক দৃঢ়তা খুব বেশি বাড়ছে না।

অন্যদিকে আরেকজন মানুষ আছে যে প্রতিদিন সকালে দৌড়াতে বের হয়, যদিও তার ভীষণ আলসেমি লাগে, শরীর ব্যথা করে এবং মন চায় ঘুমাতে। কিন্তু তবুও সে উঠে পড়ে। এই তবুও শব্দটার মধ্যেই আসল পরিবর্তন লুকিয়ে আছে।

জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি আসে তখন, যখন আপনি নিজের ভেতরের প্রতিরোধের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। এটা অনেকটা জং ধরা দরজা খোলার মতো। প্রথম ধাক্কায় দরজা খুলতে চায় না। শব্দ করে, আটকে যায়।

কিন্তু আপনি যদি প্রতিদিন একটু একটু করে চাপ দেন, একসময় দরজাটা সহজ হয়ে যায়। মানুষের মস্তিষ্কও ঠিক এমন। কষ্টের দিকে ইচ্ছা করে হাঁটা শুরু করলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নতুনভাবে নিজেকে তৈরি করে।

এখানে একটা গভীর বাস্তবতা আছে যা অনেকেই বুঝতে চায় না। পৃথিবীর সবচেয়ে সফল মানুষদের জীবনে মোটিভেশন সবসময় ছিল না। তারা প্রতিদিন আনন্দ নিয়ে কাজ শুরু করত না। বরং এমন অনেক দিন ছিল, তারা ক্লান্ত ছিল, ভয় পেয়েছে এবং নিজেকে অযোগ্য মনে করেছে।

কিন্তু পার্থক্যটা হলো, তারা অনুভূতি কে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি। তারা নিজের সিদ্ধান্তের উপর জীবন তৈরি করেছে, সে সিদ্ধান্ত অপ্রিয় হলেও।

আজকের পৃথিবীতে আমরা এমন একটা সংস্কৃতির মধ্যে আছি যেখানে সবাই সহজ জিনিস চায়। সহজ টাকা, সহজ সম্পর্ক, সহজ ক্যারিয়ার, সহজ সুখ। কিন্তু সমস্যা হলো, সহজ জিনিস মানুষকে জীবনের গভীরতা দেয় না।

সহজ জিনিস মানুষকে আরাম দেয়, কিন্তু আইডেন্টিটি দেয় না। আপনি আসলে কে, সেটা জানা যায় তখনই, যখন আপনি এমন পরিস্থিতিতে পড়েন যেখানে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু আপনি পালান না।

অনেক মানুষ জীবনে সবকিছু পেয়েও বলে, জানি না কেন মনে হয় কিছু একটা নেই। এই অনুভূতিটা অনেকের হয়। কারও টাকা আছে, সম্পর্ক আছে, সামাজিক সম্মান আছে, তারপরও ভেতরে অনেক শূন্যতা।

কেন?

কারণ মানুষ শুধু আরাম দিয়ে পূর্ণতা পায়না। মানুষ পূর্ণ হয় নিজের ভেতরের অজানা শক্তিকে আবিষ্কার করলে। যখন একজন মানুষ বুঝতে পারে যে আমি ভেবেছিলাম আমি পারব না কিন্তু আমি পেরেছি, সেই অনুভূতির সাথে পৃথিবীর অন্যকিছুর তুলনাই চলে না।

এই কারণেই অনেক উদ্যোক্তা প্রথম জীবনের সংগ্রাম কখনও ভুলতে পারেন না। ব্যবসা দাঁড় করানোর প্রথম দিনগুলো, টাকার অভাব, মানুষের অবহেলা, রাত জেগে কাজ করা, এসবই তাদের ক্যারেকটার বিল্ড করে।

পরে যখন ব্যবসা বড় হয় এবং টাকা আসে, তখনও তারা ভেতরে সেই কষ্টের সময়টাকে নিয়েই স্মৃতিচারণ করেন, তার মূল্য দেন। কারণ তারা জানে তাদের আসল সামর্থ্য তৈরি হয়েছিল তখনই।

একজন ছাত্রের ক্ষেত্রেও একই বিষয় সত্য। যে ছাত্র শুধু পরীক্ষার আগের রাতে পড়াশোনা করে, সে হয়তো পাশ করবে।

কিন্তু যে ছাত্র প্রতিদিন নিজের দুর্বলতার সাথে লড়াই করে, মন না চাইলেও পড়ে এবং নিজের সীমা প্রতিনিয়ত বাড়াতে চেষ্টা করে, তার ভেতরে অন্যরকম আত্মবিশ্বাস জন্মায়। কারণ সে শুধু পড়াশুনার মাধ্যমে তথ্য শেখে না, সে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ আনা শেখে।

ব্যক্তিগত জীবনেও বিষয়টা একই। অনেক মানুষ সম্পর্ক, ক্যারিয়ার কিংবা আত্মবিশ্বাসের সমস্যায় আটকে থাকে কারণ তারা নিজেদের নিয়ে কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে চায় না।

মানুষ নিজের দুর্বলতা এড়িয়ে যেতে ভালোবাসে। কিন্তু যে মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারে যে হ্যাঁ আমার সমস্যা আছে কিন্তু আমি বদলাব, তার জীবন বদলানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

একটা দারুণ বিষয় কি জানেন, আমরা সবাই যেন একই সাথে বিজ্ঞানী এবং পরীক্ষাগারের ইঁদুর। জীবন আমাদের পরীক্ষা নেয়, কিন্তু একই সাথে আমরা নিজের উপরও পরীক্ষা চালাই।

আপনি প্রতিদিন যেসব সিদ্ধান্ত নেন, সেগুলোই ধীরে ধীরে আপনার ক্যারেক্টার তৈরি করে। আপনি যদি প্রতিদিন সহজ পথ বেছে নেন, তাহলে আপনার মস্তিষ্ক সহজের দিকে অভ্যস্ত হবে।

আর যদি প্রতিদিন সামান্য হলেও অস্বস্তির দিকে হাঁটেন, তাহলে আপনার ভেতরে এমন এক মানসিক শক্তি তৈরি হবে যা কোনো বই পড়ে পাওয়া যায় না।

অনেকে মনে করে ইচ্ছাশক্তি জন্মগত। কেউ কেউ নাকি স্ট্রং মাইন্ড নিয়ে জন্মায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইচ্ছাশক্তি অনেকটা পেশির মতো। ব্যবহার করলে বাড়ে, অবহেলা করলে দুর্বল হয়।

আপনি যদি প্রতিদিন এমন কিছু করেন যা আপনার জন্য অস্বস্তিকর, ধীরে ধীরে আপনার সামর্থ্য বাড়বে। প্রথম দিন হয়তো পাঁচ মিনিট মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন লাগবে। পরে এক ঘণ্টা কাজ করাও স্বাভাবিক মনে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো এই প্রক্রিয়ার কোনো শেষ নেই। আপনি একদিন কষ্ট করে শক্তিশালী হলেন, তারপর সারাজীবন আরাম করে থাকবেন, এমন নয়।

ইচ্ছাশক্তি প্রতিদিন নতুন করে তৈরি করতে হয়। ঠিক যেমন শরীর সুস্থ রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম দরকার, তেমনি মানসিক শক্তি ধরে রাখতে নিয়মিত অস্বস্তির মুখোমুখি হওয়া দরকার।

এখানেই আজকের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা লুকিয়ে আছে। জীবন বদলানোর হ্যাক আসলে খুব সাধারণ কিন্তু খুব কঠিন। সেটা হলো, যে,টা করতে ইচ্ছা করে না কিন্তু করা প্রয়োজন, সেটা বারবার করা।

পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ এখানেই হেরে যায়। তারা ফলাফল চায় কিন্তু, কষ্ট, বাধা চায় না। অথচ আগুন ছাড়া যেমন লোহা শক্ত হয় না, তেমনি অস্বস্তি ছাড়া মানুষের সামর্থ্য বাড়ে না।

মজার বিষয় হলো আমরা প্রায় সবাই নিজের ভেতরের বিরাট এক অংশকে অচেনা রেখেই জীবন পার করি। যেন আমাদের ক্ষমতার একটি বড় অংশ এখনো তালাবদ্ধ। কারণ আমরা কখনো নিজেদের সত্যিকারের পরীক্ষায় ফেলি না।

আমরা ভয় পাই ব্যর্থতাকে, কষ্টকে, অপমানকে এবং অনিশ্চয়তাকে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলো ঠিক এই ভয়গুলোর পেছনেই লুকিয়ে থাকে।

যখন একজন মানুষ প্রতিদিন নিজের সীমা একটু একটু করে ভাঙতে শুরু করে, তখন তার জীবন শুধু বাহ্যিকভাবে বদলায় না, ভেতর থেকেও বদলায়। তখন সে আর প্রতিদিন মোটিভেশন খোঁজে না।

কারণ তার আইডেন্টিটি বদলে যায়। সে জানে ভয় লাগলেও কাজ করতে হয়, ইচ্ছা না করলেও সকালে উঠতে হয়, ক্লান্ত লাগলেও এগোতে হয়। আর এই উপলব্ধিটাই মানুষকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত জীবন আসলে আপনি বনাম আপনি। বাইরের প্রতিযোগিতা যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিজের দুর্বলতার বিরুদ্ধে লড়াই করা।

আপনি প্রতিদিন কোন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কোন অজুহাত মানছেন বা মানছেন না এবং কোন ভয়কে জয় করছেন, সেটাই আপনার ভবিষ্যৎ তৈরি করছে।

আপনার ভেতরে যে মানুষটা এখনো জেগে ওঠেনি, তাকে জাগানোর একটাই উপায়, যে পথে যেতে ভয় লাগে, ঠিক সেই পথেই আজ থেকে হাঁটা শুরু করুন ।

*@ Nur Rahman




যে ৭টি অভ্যাস আজই ছেড়ে দিলে আপনি জীবনে অন্যদের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে যাবেন!

আমরা বেশিরভাগ মানুষই ভাবি সফল হতে হলে আরও বেশি কিছু করতে হবে। আরও বেশি কাজ, আরও বেশি হাসল, আরও বেশি কানেকশন।

কিন্তু সত্যিটা অদ্ভুত। জীবনে বড় পরিবর্তন অনেক সময় “কী শুরু করলাম” থেকে আসে না, বরং “কী বন্ধ করলাম” সেখান থেকেই আসে। একজন মানুষের জীবন তখনই বদলাতে শুরু করে, যখন সে বুঝতে শেখে সবকিছু ধরে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিছু জিনিস ছেড়ে দেওয়াও গ্রোথ এর অংশ।

আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা সময়ের অভাব নয়। সমস্যা হলো আমরা ভুল জায়গায় সময়, শক্তি আর মনোযোগ খরচ করি। আপনি যদি খেয়াল করেন, অনেক মানুষ সারাদিন ব্যস্ত থেকেও জীবনে কোথাও পৌঁছাতে পারে না। আবার কিছু মানুষ তুলনামূলক কম কাজ করেও অসাধারণ ফলাফল তৈরি করে। পার্থক্যটা স্কিল এ নয়, বরং মাইন্ডসেট এ।

১। Energy Vampire মানুষদের সাথে সময় কাটানো বন্ধ করো

প্রথম যে জিনিসটা একজন সফল মানুষ ছেড়ে দেয়, সেটা হলো এনার্জি ভ্যাম্পায়ার মানুষদের সাথে সময় কাটানো। এমন কিছু মানুষ আছে যারা আপনার জীবনে আসে শুধু কিছু নেওয়ার জন্য। তারা আপনার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একটি কাজও করবে না, বরং সুযোগ পেলে আপনার কাছ থেকে নিতে নিতে আপনাকে নিঃশেষ করে ফেলে।

মজার ব্যাপার হলো, অনেক সময় আমরা শুধু পুরনো পরিচয়ের কারণে মানুষকে ধরে রাখি। স্কুলে একসাথে পড়তাম, অনেক দিনের বন্ধু কিংবা আত্মীয় এই পরিচয়গুলোকে আমরা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব পুরনো সম্পর্ক হেলদি নয়।

একটা গাছকে যদি প্রতিদিন একটু একটু করে বিষ দেওয়া হয়, সে একদিন শুকিয়ে যাবে। মানুষও তাই। প্রতিদিন যদি আপনি নেতিবাচকতা, অভিযোগ, হিংসা আর নিরুৎসাহের মধ্যে থাকেন, তাহলে আপনার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে মারা যাবে। এজন্য পরিবেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ তার পারিপার্শ্বিকতার গড় হয়ে যায়।

২। ভুল মানুষের কাছ থেকে Advice নেওয়া বন্ধ করুন

দ্বিতীয় বড় শিক্ষা হলো ভুল মানুষের উপদেশ নেওয়া বন্ধ করা। আজকের পৃথিবীতে উপদেশ বিনামূল্যে পাওয়া যায়, কিন্তু এই ফ্রি উপদেশ আপনার জন্য খুব এক্সপেন্সিভ হতে পারে। সবাই মতামত দিতে ভালোবাসে, কিন্তু সবার মতামতে রেজাল্ট আসে না। একজন আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষ যদি আপনাকে ব্যবসা শেখায়, সেটা ঠিক এমন যেন সাঁতার না জানা কেউ ডুবন্ত মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

আমরা অনেক সময় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এমন মানুষের কাছে যাই যারা নিজেরাই সেই স্তরে কখনো পৌঁছাতে পারেনি। তারপর অবাক হই কেন জীবন পাল্টাচ্ছে না।

আপনি যদি অ্যাথলেট হতে চান, তবে অ্যাথলেটের কাছ থেকে শিখুন। ব্যবসা করতে চাইলে ব্যবসায়ীর কাছে যান। কারণ বাস্তব অভিজ্ঞতার মূল্য কোনো তত্ত্ব দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

৩। নিজের পরিস্থিতির জন্য অন্যকে দোষ দেওয়া বন্ধ করুন

তৃতীয় যে বিষয়টি জীবন বদলে দেয়, সেটা হলো দোষারোপের খেলা বন্ধ করা। বেশিরভাগ মানুষ নিজের ব্যর্থতার জন্য অর্থনীতি, পরিবার, দেশ, ভাগ্য কিংবা অন্য কাউকে দায়ী করে। কিন্তু অন্যকে দোষ দেওয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি আপনাকে যোগ্যতাহীন বানিয়ে দেয়।

ধরুন আপনি রান্না করলেন আর খাবার খারাপ হলো। তখন উপকরণের দোষ দিলে খাবার ভালো হবে না। রাঁধুনি হিসেবে নিজেকেই দায় নিতে হবে। জীবনের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। আপনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, কিন্তু আপনার প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

আর এটাই শক্তিশালী মানুষের বৈশিষ্ট্য। যেদিন একজন মানুষ বুঝতে পারে যে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজেরই, সেদিন থেকেই তার উন্নতি শুরু হয়।

৪। সব Opportunity তে “Yes” বলা বন্ধ করুন

চতুর্থ শিক্ষাটি আরও দারুন। সব সুযোগে হ্যাঁ বলা বন্ধ করা। শুরুতে আমরা ভাবি যত বেশি কাজ, নেটওয়ার্কিং আর অপারচুনিটি ধরব, তত দ্রুত সফল হব। কিন্তু বাস্তবে হয় উল্টোটা। যখন আপনি সবকিছুকে হ্যাঁ বলেন, তখন আসলে কোনো কিছুকেই অগ্রাধিকার দেন না।

একটা ব্যাগে যদি ক্রমাগত জিনিস দিয়ে ভরা হয়, একসময় সেটি বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মানুষের মস্তিষ্কও তাই। ফোকাস হচ্ছে এক অতিমানবীয় শক্তি, একটি সুপার পাওয়ার। স্টিভ জবস বলেছিলেন, প্রডাক্টিভ হওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি হলো না বলতে শেখা।

৫. ফোনের দাস হয়ে থাকবেন না

পঞ্চম বিষয়টি বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে বড় ফাঁদ, ফোন আসক্তি। মানুষ এখন আর একা থাকতে পারে না। দুই মিনিট অবসর পেলেই ফোন বের করে স্ক্রল করা শুরু করে। কিন্তু এই অভ্যাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এটি ধীরে ধীরে আপনার এম্বিশনকে মেরে ফেলে।

যখন আপনার জীবনে কোনো স্বপ্ন থাকে না, চ্যালেঞ্জ থাকে না, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আপনার স্কেপ রুট হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যাদের জীবনে দারুন একটি লক্ষ্য আছে, তাঁরা এই ছোট্ট স্ক্রিনের ফাঁদে পা দেয় না। কারণ তারা জানে মনোযোগ এই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান মুদ্রা।

৬. শুধু বই পড়া না, বই এপ্লাই করা শুরু করুন

ষষ্ঠ শিক্ষাটি বই পড়া নিয়ে। অনেকেই বই পড়েন শুধু “আমি এই বইটা পড়েছি” এই তৃপ্তি পাওয়ার জন্য। কিন্তু জ্ঞানের প্রকৃত মূল্য তথ্যে নয়, এর প্রয়োগে। বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ ইতিমধ্যে জানে তাদের কী করা উচিত। সমস্যা জ্ঞানের অভাব নয়, বরং বাস্তবায়নের অভাব।

একটা ব্যবসার বই পড়ে যদি ব্যবসা শুরুই না করেন, তাহলে সেই বই বিনোদন ছাড়া আর কিছুই নয়। সত্যিকারের শেখা তখনই হয় যখন আপনি শেখা জিনিস বাস্তবে প্রয়োগ করেন। এটি আরও শক্তিশালী হয় যখন আপনি তা অন্য কাউকে শেখান। কারণ শেখানো আপনার ইন্সাইটকে আরও গভীর করে তোলে।

৭. অন্য কারো সাথে নিজেকে Compare করা বন্ধ করুন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন একটি বিভ্রমের মধ্যে ফেলেছে যেখানে মনে হয় সবাই আমাদের থেকে এগিয়ে আছে। কেউ বেশি সফল, কেউ বেশি বুদ্ধিমান, কেউবা বেশি সুন্দর।

কিন্তু তুলনা হলো আত্মবিশ্বাসের এক নীরব ঘাতক। কারণ আপনি কখনো অন্য মানুষের পুরো গল্পটি জানেন না। আপনি শুধু তাদের জীবনের উজ্জ্বল অংশটুকুই দেখেন। আপনার জীবনের তৃতীয় অধ্যায়কে অন্য কারো জীবনের সাতাশতম অধ্যায়ের সাথে তুলনা করা বোকামি।

প্রত্যেক মানুষের জীবনের টাইম লাইন আলাদা। আপনার পরিবেশ, কষ্ট, সুযোগ এবং সংগ্রাম সবকিছুই অনন্য, কারো সাথেই মিলবে না। আর এই অনন্যতাই আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি। পৃথিবী অনুকরণ নয়, বরং ইউনিকনেসকে পুরস্কৃত করে। তাই অন্য কারো মতো হওয়ার চেষ্টা না করে নিজের বেস্ট ভার্সন হওয়ার চেষ্টা করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত।

আজ থেকেই নিজের জীবনেঃ

মনে রাখবেন, জীবন বদলানোর জন্য সব সময় নতুন কিছু শুরু করতে হয় না। অনেক সময় শুধু ভুল জিনিসগুলো ছেড়ে দিলেই মানুষ নিজের আসল পটেনশিয়াল খুঁজে পায়। @ Nur Rahman




শুধু বেশি কাজ করলেই সফল হওয়া যায় না, বরং একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকাই আমাদের ব্যর্থতার মূল কারণ।

বিষয়টি বোঝাতে তিনি চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়েছেন। ধরুন আপনার কাছে একটি ম্যাগনিফাইং গ্লাস আছে এবং আপনি সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে একটি কাগজে আগুন ধরাতে চান। আপনি যদি গ্লাসটি বারবার নাড়াচাড়া করেন, তাহলে কাগজে কখনোই আগুন ধরবে না, কিন্তু আলোটা যদি একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির ধরে রাখেন, তবে ঠিকই আগুন ধরে যাবে।

আমাদের ফোকাস বা মনোযোগের ব্যাপারটাও ঠিক একই রকম। আমরা যদি একসঙ্গে চার-পাঁচটি প্রজেক্ট বা কাজ শুরু করি, তাহলে কোনোটিই ঠিকমতো সফল হবে না। এর চেয়ে অনেক ভালো হতো যদি আমরা আমাদের সব সময় এবং শ্রম একটিমাত্র কাজের পেছনে ব্যয় করতাম, তাহলে হয়তো বিশাল সাফল্য আসত।


মাটির নিচের ফাঙ্গাস

বিখ্যাত মাইকোলজিস্ট জাস্টিন স্টুয়ার্টের মতে, সামান্য এক চামচ মাটির ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে প্রায় ১০ মিটার বা ৩২ ফুট লম্বা ফাঙ্গাস বা ছত্রাকের নেটওয়ার্ক! সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা 'A Hidden Infrastructure' নামে একটি প্রজেক্টের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এই বিশাল নেটওয়ার্কের একটি গ্লোবাল ম্যাপ তৈরি করেছেন। এই নেটওয়ার্কটি এতই বড় যে, এটি জালের মতো পুরো পৃথিবীকে পেঁচিয়ে রেখেছে। এই ৬২১ ট্রিলিয়ন মাইলের ফাঙ্গাল নেটওয়ার্ক পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে।

মাটির নিচের এই ফাঙ্গাসগুলো গাছের শেকড়ের সাথে মিলে পুষ্টি এবং কার্বন আদান-প্রদান করে। এই চলাচলের গতি সেকেন্ডে প্রায় ১২০ মাইক্রোমিটার। মানুষের স্কেলের সাথে তুলনা করলে এই গতিবেগ দাঁড়ায় ঘণ্টায় প্রায় ২৪৮ মাইল (বা ৪০০ কিলোমিটার)! অর্থাৎ, মাটির নিচে প্রতিনিয়ত এক হাই-স্পিড সাপ্লাই চেইন কাজ করে যাচ্ছে, যা আমরা টেরই পাই না।

এরা পৃথিবীর জন্য বিশাল এক ফিল্টার হিসেবে কাজ করছে। প্রতি বছর এই ফাঙ্গাসগুলো প্রায় ৪০০ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাস থেকে টেনে মাটির নিচে আটকে রাখে, যা মানুষের তৈরি মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ১১%। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর ওপরের স্তরের মাটিতে এই নেটওয়ার্কগুলো প্রায় ৩০০ মেগাটন কার্বন ধরে রেখেছে। মাটির ওপরের জগত নিয়ে আমরা যতই ভাবি না কেন, মাটির নিচের এই বিশাল নেটওয়ার্ক ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হতো।

@ AH Abubakkar Siddique


১০



হেডোনিক অ্যাডাপটেশন

হেডোনিক অ্যাডাপটেশন। সহজ বাংলায় বললে মস্তিষ্ক যেকোনো নতুন সুখকে কিছুদিন পর স্বাভাবিক করে ফেলে। নতুন সম্পর্ক। নতুন চাকরি। নতুন গাড়ি। নতুন মোবাইল। সবকিছু একটা নির্দিষ্ট সময় পর আর উত্তেজনা দেয় না। মস্তিষ্ক বলে ঠিক আছে এটা তো এখন স্বাভাবিক। এরপর কী।

বিজ্ঞান কী বলছে

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী এড ডিনার এবং তার দলের গবেষণা বলছে লটারিতে কোটি টাকা জেতা মানুষ এবং দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়া মানুষ দুজনেই এক বছরের মধ্যে প্রায় একই মাত্রার সুখ অনুভব করতে ফিরে আসে। মানে বিশাল সুখও মস্তিষ্ক গ্রাস করে নেয় এবং বিশাল দুঃখও মস্তিষ্ক একসময় মেনে নেয়। মস্তিষ্কের এই ক্ষমতাটা একদিক থেকে আশীর্বাদ আরেকদিক থেকে অভিশাপ।

আশীর্বাদ কারণ

আপনি কখনো স্থায়ীভাবে ভেঙে পড়েন না। যত বড় ধাক্কাই আসুক মস্তিষ্ক আপনাকে আবার টেনে তোলে। এই কারণেই মানুষ সর্বস্ব হারিয়েও আবার উঠে দাঁড়ায়।

অভিশাপ কারণ

আপনি কখনো স্থায়ীভাবে সুখীও হতে পারেন না। যা পেলেন তা পেয়েই খুশি থাকার আগেই মস্তিষ্ক পরের চাওয়াটা সামনে এনে দেয়। এই ফাঁদে পড়ে মানুষ সারাজীবন দৌড়ায় কিন্তু গন্তব্য কখনো আসে না।

তাহলে উপায় কী

গবেষণা বলছে তিনটি জিনিস এই ফাঁদ থেকে বের করতে পারে।

প্রথমত কৃতজ্ঞতার অভ্যাস। যা আছে সেটা প্রতিদিন একবার সচেতনভাবে অনুভব করা।

দ্বিতীয়ত নতুন অভিজ্ঞতায় বিনিয়োগ করা কারণ বস্তুর চেয়ে অভিজ্ঞতা অনেক দেরিতে পুরনো হয়।

তৃতীয়ত মাঝে মাঝে ইচ্ছাকৃতভাবে যা আছে তা থেকে বিরতি নেওয়া। কারণ একটু দূরত্ব তৈরি হলেই মস্তিষ্ক আবার সেই জিনিসের মূল্য বুঝতে পারে।

প্রতিদিনের ছোট সুখ যে কারণে বড় সুখের চেয়ে বেশি কাজের

বড় একটা সুখ মস্তিষ্ক দ্রুত গ্রাস করে। কিন্তু প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো মুহূর্তগুলো মস্তিষ্ক ততটা দ্রুত গ্রাস করতে পারে না। সকালের চায়ের কাপ। প্রিয় মানুষের হাসি। বৃষ্টির গন্ধ। এগুলো বারবার নতুন হয়। তাই সুখী মানুষ বড় কিছুর অপেক্ষায় থাকে না বরং ছোট জিনিসে বারবার সুখ খুঁজে নেওয়ার কৌশল শিখে নেয়। @ পার্থ প্রতিম রায়



১১


"চিনি" শব্দের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

বাংলা, হিন্দি এবং ভারতের আরও বেশ কয়েকটি ভাষায় পরিশোধিত সাদা শর্করাকে সাধারণত চিনি বলা হয়। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, আক্ষরিক অর্থে এই শব্দটির অর্থ "চিনা" (Chinese) বা "চিন দেশীয়"। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অতি পরিচিত এই শব্দটির নামকরণের পেছনে লুকিয়ে আছে দুই প্রাচীন সভ্যতার এক ঐতিহাসিক আদান-প্রদানের গল্প।

প্রাচীন ভারতে আবিষ্কার

এই ইতিহাসের শুরুটা হয়েছিল প্রাচীন ভারতে। গুপ্ত যুগে (আনুমানিক ৩৫০ খ্রিস্টাব্দ) ভারতেই প্রথম দানাদার শর্করা বা স্ফটিক মিষ্টি তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়, যা প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় 'শর্করা' নামে পরিচিত ছিল।

চিনে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও উৎকর্ষ সাধন

পরবর্তীতে, ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে চিনের(চীন) তাং রাজবংশের (Tang Dynasty) সম্রাট তাইজং উন্নত চিনি-পরিশোধন কৌশল শেখার উদ্দেশ্যে ভারতের বিহারে (তৎকালীন মগধ) তাঁর বিশেষ দূত প্রেরণ করেন। সেসময় বেশ কয়েকজন ভারতীয় বিশেষজ্ঞকে চিনে নিয়ে যাওয়া হয়। চিনারা এই প্রযুক্তিটি সাদরে গ্রহণ করে এবং তার আরও উন্নত করে। গবেষণার ফলে তারা অনেক বেশি মিহি ও উন্নত মানের সাদা শর্করা তৈরি করতে সক্ষম হয়।

নামকরণের ইতিহাস

কিছুকাল পর, ভারত নিজেই চিন থেকে এই উন্নত মানের পরিশোধিত সাদা শর্করা আমদানি করতে শুরু করে। যেহেতু এই শর্করা চিন থেকে আসত, তাই ভারতীয়রা একে কেবল "চিনি" বা "চিনা শর্করা" বলে ডাকতে শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে, পরিশোধিত সাদা শর্করার ক্ষেত্রে পুরো ভারতজুড়েই এই শব্দটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

মজার বিষয় হলো, চিনা বা ম্যান্ডারিন ভাষায় এই শর্করার প্রতিশব্দ হলো 'তাং' (táng), যা সরাসরি সেই তাং রাজবংশকেই নির্দেশ করে যারা ভারত থেকে চিনি তৈরির প্রযুক্তি চিনে নিয়ে গিয়েছিল।

অন্যদিকে, মূল সংস্কৃত শব্দ 'শর্করা' টিকে থাকলেও, তা মূলত অপেক্ষাকৃত মোটা বা ঐতিহ্যবাহী অপরিশোধিত শর্করার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে থাকে। মূলত, ভারত শর্করার প্রাথমিক প্রযুক্তিটি আবিষ্কার করেছিল এবং চিন সেটিকে আরও উন্নত করে পুনরায় ভারতে রপ্তানি করেছিল। হাজার বছর আগের সেই দ্বিমুখী বাণিজ্যিক সম্পর্কের এক চিরস্থায়ী স্মারক হয়ে আমাদের ভাষায় আজও রয়ে গেছে "চিনি" শব্দটি। @ Plabon Sarkar



১২


​১. 'হ্যাসলার' (Hasslers) কারা?

গবেষকরা সেই সব মানুষকে 'হ্যাসলার' বলছেন যারা আপনার জীবনে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ বা ঝামেলার সৃষ্টি করে। এরা হতে পারে আপনার কোনো আত্মীয়, বন্ধু বা সহকর্মী যারা আপনার জীবনকে কঠিন করে তোলে।

​২. দ্রুত বার্ধক্য বা বুড়িয়ে যাওয়া:

গবেষণায় দেখা গেছে, আপনার জীবনে যত বেশি এ ধরণের বিরক্তিকর মানুষ থাকবে, আপনার শরীর তত দ্রুত বুড়িয়ে যাবে। গড়ে প্রতি একজন এমন 'হ্যাসলার' বা ঝামেলার মানুষের কারণে আপনার জৈবিক বয়স স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১.৫% দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

​৩. পরিবারের সদস্যদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি:

আর্টিকেলটিতে বলা হয়েছে, যদি এই বিরক্তিকর মানুষটি আপনার পরিবারের কোনো সদস্য হন, তবে তার প্রভাব আপনার শরীরের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। কারণ পরিবারের সদস্যদের এড়িয়ে চলা কঠিন এবং তাদের সাথে মানসিক টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হয়।

​৪. স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব:

এই অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে শরীরের ভেতরে প্রদাহ (Inflammation) বাড়ে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এর ফলে হৃদরোগ, স্মৃতিভ্রম (Dementia) বা ক্যান্সারের মতো রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজনের অতিরিক্ত হ্যাসলারের উপস্থিতিতে একজন মানুষ ক্যালেন্ডারের এক বছরে প্রায় ১.০১৫ বছর সমপরিমাণ জৈবিক বার্ধক্যের শিকার হন।

​৫. ব্যতিক্রম:

মজার ব্যাপার হলো, গবেষণায় দেখা গেছে যে জীবনসঙ্গী বা স্বামী/স্ত্রীর সাথে ঝামেলা থাকলেও তা বার্ধক্যের ওপর অতটা প্রভাব ফেলে না, যতটা পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা বাইরের মানুষের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। এর কারণ হতে পারে দাম্পত্য সম্পর্কের গভীরতা এবং সেখান থেকে পাওয়া সমর্থন।

সুস্থ থাকতে এবং দীর্ঘকাল তারুণ্য ধরে রাখতে কেবল ভালো খাবার বা ব্যায়ামই যথেষ্ট নয়; বরং আপনার চারপাশের বিষাক্ত বা নেতিবাচক মানুষদের (Toxic People) থেকে দূরে থাকা অথবা তাদের সাথে মানসিক দূরত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

​সহজ কথায়—আপনার জীবন থেকে যত বেশি ঝামেলাপূর্ণ মানুষ কমাতে পারবেন, আপনার শরীর তত কম বুড়িয়ে যাবে! @ ·Paint with Ashraf

__________________

সূত্র: টেলিগ্রাফ



১৩

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ছিল ব্রিটিশ ভারতের বৃহত্তম ও সবচেয়ে জনবহুল প্রশাসনিক অঞ্চল। ১৬১২ সালে মুঘল আমলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের মাধ্যমে এর সূচনা এবং ১৭৬৫ সালে দেওয়ানিলাভের পর এর বিস্তৃতি ঘটে। ১৯৩৭ সালে এটি 'বেঙ্গল প্রদেশ'-এ রূপান্তরিত হয় এবং ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের মাধ্যমে এর মানচিত্র চিরতরে বদলে যায়।ভৌগোলিক বিস্তৃতি (ম্যাপের এলাকা):বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মানচিত্রের ভৌগোলিক পরিধি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে। এর অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলো হলো:অবিভক্ত বাংলা: বর্তমান বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ।অন্যান্য রাজ্য: বর্তমান ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড, আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা।ইতিহাসের প্রধান কালানুক্রম (Timeline):১৬১২-১৭৬৫: মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলায় বাণিজ্যকুঠি স্থাপন। এরপর ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর কোম্পানি শাসন ও ১৭৬৫ সালে দেওয়ানিলাভ।১৭৭৩: রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাসের মাধ্যমে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার প্রথম গভর্নর-জেনারেল নিযুক্ত হন।১৮৫৮: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে সরাসরি ব্রিটিশ রাজের (Crown) অধীনে চলে যায়।১৯০৫: লর্ড কার্জন কর্তৃক প্রথম বঙ্গভঙ্গ। বাংলা বিভক্ত হয়ে 'পূর্ব বাংলা ও আসাম' এবং 'বঙ্গ' নামক দুটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়।১৯১১: বঙ্গভঙ্গ রদ এবং রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর।১৯৩৭: আনুষ্ঠানিকভাবে 'বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি' নাম বিলুপ্ত হয়ে 'বেঙ্গল প্রদেশ' নামকরণ করা হয়।১৯৪৭: র‍্যাডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বাংলা বিভক্ত হয়। 

১৯৪৭ সালে অখণ্ড স্বাধীন বাংলার প্রস্তাবের প্রধান বিরোধী ছিলেন ভারতের শীর্ষ কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং বাঙালি হিন্দু মহাসভা নেতারা। তাদের আশঙ্কা ছিল, মুসলিম লীগ সরকারের অধীনে এমন একটি অখণ্ড রাজ্য শেষ পর্যন্ত পুরো বাংলাকে পাকিস্তানভুক্তিতে বাধ্য করবে এবং হিন্দুরা সেখানে সংখ্যালঘু হিসেবে অরক্ষিত হয়ে পড়বে।অখণ্ড বাংলার বিরোধী পক্ষের অবস্থান ও কারণ:কংগ্রেস নেতৃত্ব: জওহরলাল নেহরু ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল মনে করতেন, অখণ্ড বাংলার প্রস্তাবটি ছিল পুরো বাংলাকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মুসলিম লীগের একটি কৌশল।হিন্দু মহাসভা ও বাঙালি হিন্দু নেতৃবৃন্দ: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়। তারা অখণ্ড বাংলায় মুসলমানদের আধিপত্যের তীব্র বিরোধিতা করে হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ দাবি করেন।মুসলিম লীগের একাংশ: যদিও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসু 'যুক্তবঙ্গ' বা অখণ্ড বাংলার প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু তৎকালীন মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব (যেমন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার চেয়ে পুরো বাংলাকেই পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পাওয়ার বিষয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন।অখণ্ড বাংলার পক্ষের নেতা:হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী)শরৎচন্দ্র বসু (কংগ্রেস নেতা)আবুল হাশেম (বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সম্পাদক) @ Bakul Kumar Shaha


১৪

নারীরা গায়ের রঙ ফর্সা করতে বিষাক্ত আর্সেনিক সেবন করত।

ফর্সা, দাগহীন এবং উজ্জ্বল ত্বক পাওয়ার জন্য মানুষ যুগে যুগে কত কিছুই না করেছে। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে (১৮০০ সাল) ইউরোপ ও আমেরিকায় রূপচর্চার এমন এক ভয়ঙ্কর ট্রেন্ড চালু হয়েছিল, যা শুনলে আজ আমাদের শিউরে উঠতে হয়। তখন নিখুঁত ও ফ্যাকাশে গায়ের রঙ পাওয়ার জন্য মানুষ নিয়মিত সরাসরি 'আর্সেনিক' (Arsenic) বা মারাত্মক ইঁদুর মারার বিষ খেত! এই তথ্যটি চিকিৎসা ইতিহাসের পাতায় শতভাগ সত্য।

ভিক্টোরিয়ান যুগে (Victorian Era) ইউরোপীয় সমাজে নারীদের মধ্যে অত্যন্ত ফ্যাকাশে, ধবধবে সাদা এবং রক্তহীন ত্বককে আভিজাত্য ও সৌন্দর্যের প্রতীক মনে করা হতো। সেই সময় অস্ট্রিয়ার 'স্টাইরিয়া' (Styria) অঞ্চলের পাহাড়ি মানুষদের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এক ধরণের আর্সেনিক খাওয়ার অভ্যাস সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্টাইরিয়ার পুরুষেরা মূলত পাহাড়ে হাঁটার শক্তি বাড়াতে এবং নারীরা গায়ের রঙ ফর্সা করতে বিষাক্ত আর্সেনিক সেবন করত।

পরবর্তীতে এই বিষাক্ত উপাদানটিকে বাণিজ্যিক রূপ দেয় বিভিন্ন কসমেটিকস কোম্পানি। বাজারে দেদারসে বিক্রি হতে শুরু করে আর্সেনিক যুক্ত সাবান, ফেসওয়াশ এবং বিখ্যাত 'ডক্টর ম্যাকেঞ্জির আর্সেনিক কমপ্লেকশন ওয়েফার্স' (Dr. Mackenzie’s Arsenic Complexion Wafers) নামের চকলেট বা বিস্কুটের মতো ছোট ছোট বড়ি বা ট্যাবলেট। বিজ্ঞাপনে দাবি করা হতো, এই বড়ি রেগুলার খেলে ত্বকের সব দাগ, ব্রণ এবং তিল দূর হয়ে চেহারা চাঁদের মতো উজ্জ্বল হবে।

কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়মে আর্সেনিক আসলে শরীরের ভেতর কী করত? আর্সেনিক মূলত মানুষের শরীরের লোহিত রক্তকণিকা বা রেড ব্লাড সেল (RBC) ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে মানুষ তীব্র অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতায় ভুগত। আর এই রক্তশূন্যতার কারণেই তাদের গায়ের চামড়া স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত ফ্যাকাশে ও সাদা দেখাত। তৎকালীন সমাজ এই বিষক্রিয়ার অসুস্থতা বা ফ্যাকাশে ভাবটাকেই 'আভিজাত্যের সৌন্দর্য' বলে ভুল করেছিল!

নিয়মিত এই বিষ খাওয়ার ফলে সাময়িকভাবে ত্বক ফর্সা হলেও, কিছুদিন পর মানুষের চুল ও নখ ঝরে পড়তে শুরু করত, চামড়ায় ক্যান্সার হতো, লিভার-কিডনি বিকল হয়ে যেত এবং অবশেষে অনেকেই যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। বিষাক্ত আর্সেনিককে রূপচর্চার উপাদান বানিয়ে নেওয়ার এই অন্ধকার ইতিহাস প্রমাণ করে যে, অন্ধ ফ্যাশন ও সুন্দরের মোহে মানুষ কতটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।



১৫

 মস্তিষ্কহীন মাথা 

পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটি প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র মানুষই জানে যে, তাকে একদিন মরতে হবে এবং সে আর এই সুন্দর পৃথিবীতে আর আসতে পারবে না। আবার এই কোটি কোটি মানুষদের মধ্যে কেবলমাত্র গুটি কয়েক মানুষ আছেন, যারা জানেন; সে কোথা  থেকে কিভাবে এসেছেন, কোথায় তার শেষ? 

এদের আছে মস্তিষ্ক, বাকী সবার আছে মস্তিষ্কহীন মাথা। এই মাথাওয়ালারা হচ্ছে জিরো, আর মস্তিষ্ক মানে পাওয়ার (১ থেকে ৯ জ্ঞানের শক্তি কারো কম কারো বেশি)। জিরোর কোন মান নাই। সে সব সময় অন্যের (পাওয়ারের) মান বাড়ায়। ১ এর পাশে ০ বসলে ১০ হয়, ১০০,১০০০, ১০০০০ এভাবে পাওয়ারের মান বাড়ে। হাজার কিংবা লক্ষ জিরোকে যোগ করো, গুণ দাও, তার মান জিরোই হবে। 

অর্থাৎ যে-কোন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে জিরোরা থাকলে, তার অজ্ঞতার পরিণাম সংশ্লিষ্ঠ সবাইকে কম-বেশি ভোগ করতে হয়। প্রাচীন গ্রিসে পূর্ণ গণতন্ত্র  থাকার পরও নিরপরাধ সক্রেটিসের মৃত্যুদন্ড হয়েছিলো। তাই প্লেটো বলেছিলেন, গণতন্ত্র নয়, সুশাসনের জন্য দরকার জ্ঞানীদের নেতৃত্ব।

শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মস্তিষ্কের জিরো ক্ষমতাকে পাওয়ারে উন্নীত করা। এ উদ্দেশ্যেই মানব সন্তানকে পাঠশালা বা গুরুমুখী হতে হয়। সর্বোচ্চ শিক্ষালয় শেষ করেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী পাওয়ার হতে পারে না। এইসব জিরোরা সব অর্জন করে; সার্টিফিকেট, অর্থ, ক্ষমতা, এমনকি কাজ করার দক্ষতাও। ফলে এই জিরোরা মনে করে, তারা যা জানে, যা বুঝে, এজমাত্র সেটাই সঠিক। নিজের বিশ্বাসের বাইরে কোন কিছুই সে মেনে নিতে পারে না। অন্যদিকে পাওয়াররা হচ্ছে সৃষ্টিশীল ও প্রতিভাবান, সবকিছুকে তারা জ্ঞান ও যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করেন। নিজেকে পাওয়ার হিসাবে গড়ে তুলতে তারা আরো জ্ঞান অন্বেষণ জরুরী মনে করে। কাগজবার্তা প্লাটফরমটা পাওয়ারদের জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার শেয়ারিং নেটওয়ার্ক অর্থাৎ বিজ্ঞসমাজ হচ্ছে পাওয়ারদের সমাজ। 

আসুন আমরা এই আলোকিত সমাজে সক্রিয় হই এবং পার®পরিক সহযোগিতার মাধম্যে এগিয়ে থাকি, অন্যদেরও এগিয়ে রাখি। বিজ্ঞানমনষ্ক জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় একসাথে কাজ করি। @-কাগজ বার্তা


১৬

জ্ঞান ভিত্তিক শেয়ারিং নেটওয়্যার্ক

আপনার চারপাশের হাজারো মানুষের সাথে আপনার তফাত মূলত মেধাগত। কিন্তু ‘আলোকিত সমাজ গড়তে হলে’ দেশের মেধাবী ও প্রতিভাবানদেরকে একটা জ্ঞান ভিত্তিক শেয়ারিং নেটওয়্যার্কের আওতায় থাকতে হবে; নিজেদের জানার জগতকে প্রতিনিয়তই প্রসারিত করতে হবে। কারণ, মেধার চর্চা ব্যতিত প্রতিভার বিকাশ সম্ভব নয়। একটা কলি তখনই ফুল হয়ে ফুটে, যখন সে আলো-বাতাসের উপযুক্ত পরিবেশ ও বেড়ে উঠার রসদ পায়। নির্জন বনে কখনো রবীন্দ্র- নাথ বা সেক্সপিয়ার তৈরি হয় না; প্রতিভা বিকাশের জন্য মেধাগত চর্চার একটা ক্ষেত্র দরকার হয়। চর্চা না থাকলে প্রতিভা চাপা পড়ে যায়। 

আমেরিকান লেখক এবং মোটিভেশনাল বক্তা ‘জিম রন’ একটা চমৎকার কথা বলে- ছিলেন: “যে পাঁচজন মানুষের সাথে আপনি সবচেয়ে বেশি সময় কাটান, সেই পাঁচজন মানুষের গড় বুদ্ধির সমান হচ্ছে আপনার জ্ঞান-বুদ্ধি। আমরা সাধারণত রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি ব্যাপারে  কাছা কাছি ভাবনার মানুষের সাথেই বেশি মিশি। যেমন: মাদ্রাসার ছাত্ররা হুজুরদের সাথে বেশি মিশে। একই ভাবে আমরা জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটাই আমাদের পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মীদের সাথে। 

আমরা ‘যার সাথে যতো বেশি সময় কাটাই’ তার দ্বারা ততো বেশি প্রভাবিত হই।  যার জ্ঞান-ব্যক্তিত্ব বেশি দৃঢ়, তিনি বেশি প্রভাবিত করতে পারেন অন্যদেরকে।  কাজেই আমরা যতোই মেধাবী এবং সৃজনশীল মানুষ দিয়ে  নিজেদের  ঘিরে রাখবো;  ততোই  আমাদের  চিন্তা  ও মেধার  পরিধি  বাড়তে থাকবে। তাই নিজেকে বিশ্বমানের সেরা মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে কাছের প্রিয় মানুষগুলোর জ্ঞানী হওয়া খুবই জরুরী। “প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতার মাধ্যমে” আরো উন্নত, আরো সমৃদ্ধ এবং আরো সুখী ও গতিশীল জীবন যাপনের লক্ষে ‘বিজ্ঞদের প্ল্যাটফরমে’ আপনাকে সহযাত্রী হিসাবে চাই। আলোকিত জীবন তথা প্রগতিশীল সমাজ গড়ার এই প্রচেষ্ঠায় আসুন আমরা পরষ্পরের হাত ধরে এগিয়ে চলি। 

বর্তমান এ হাইটেক যুগে অতি ছোট মানুষটিও দুনিয়ার সব ধরনের খবর রাখতে পারে নেটের কল্যাণে। তাই দ্রুত পরিবর্তিত এ বিশ্বে নিজে বিজ্ঞ না হলে অন্যকে প্রভাবিত করা যায় না। যিনি মনে করেন তার 'সব শেখা হয়ে  গেছে'  তাঁর জ্ঞানের মৃত্যু ঘটে। বাঙালী সমাজে এরকম বহু মৃত  নেতা পদ ও ক্ষমতা আগলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ফলে জ্ঞাননির্ভর সমাজ থেকে আমরা আরো দূরে সরে যাচ্ছি। 

আমাদের প্রতিটি মুহুর্ত অতিব গুরুত্বপূর্ণ।  পৃথিবীতে আমরা কেউই আবার নতুন করে আসার সুযোগ পাবো না....এক জীবনেই প্রাপ্তির তরী  ভাসিয়ে  বুদবুদের  মতো মিশে যেতে হবে শূন্যে। জীবদ্ধশায় ইঁদুর দৌঁড়ের এ যুগে বিচ্ছিন্নভাবে অবিরাম ছুটে চলা নয়, পরষ্পরের পরিপূরক হয়ে ‘একে অপরকে সহযোগিতার মাধ্যমে’ নিজেদের- কেই সুন্দর সমাজ তৈরি করে এগিয়ে চলতে হবে।   তাই দেশের সেরা অগ্রণী চিন্তার মানুষ হিসাবে আমারা বিজ্ঞসমাজের ভিত্তিমূল্যে আপনাকে স্থায়ী সদস্য হিসাবে পেতে চাই। আপনার সম্মতি ও সহযোগিতা আমাদের অগ্রগতির জন্য নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে। @-কাগজ বার্তা


১৭


বেশি আয় করলেই সুখী হওয়া যায় না

প্রত্যেকেরই চেষ্টা থাকে একটু বেশি বেতনে নতুন চাকরির, বেশি আয়ের। গবেষণা বলছে, বেশি আয় হয়তো একজনের জীবনযাপন কিংবা স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে কিন্তু এটা কারও জীবনের সুখ কিনতে পারে না। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একটু বেশি উপার্জন  করেন  তাদের  মধ্যে অহংকার করার এবং স্বার্থপর  হওয়ার  মানসিকতা  দেখা দেয়। অন্যদিকে যাদের আয় তুলনামুলকভাবে কম তাদের মধ্যে সহমর্মী হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। 

 ক্যালিফোর্ণিয়া ইউভার্সিটির গবেষণা বলছে, যারা বেশি টাকা উপার্জন করেন,  তাদের জীবনে তখন টাকাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো আয়েই তখন তারা সন্তুষ্ট হতে পারেন না। আরও বেশি পরিমাণ টাকার পেছনে ছোটেন। তাদের জীবনটা আবর্তিত হয় নিজেকে নিয়েই। 

অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম উপার্জনকারীরা অন্যদের সঙ্গে তাদের স¤পর্কের মধ্যে সুখ খুঁজে নেন।  যারা স¤পদশালী তারা হয়তো তাদের সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত সাফল্য নিয়ে খুশি থাকেন কিন্তু কম উপার্জনকারীরা অন্যদের সঙ্গে তাদের স¤পর্ক, যোগাযোগ কিংবা অন্যের প্রতি নিজের দায়িত্বশীলতা নিয়ে সুখী থাকেন।  স¤পদশালীরা একটা অহংকার নিয়ে কম উপার্জনকারদের সাথে মিশেন। @-কাগজ বার্তা


১৮


পেট নয়, মাথা বাড়াও

ইহুদীরা তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েই বিশ্বের নেতৃত্ব দিচ্ছে!

থায় বলে হিন্দুদের বাড়ি মুসলমানদের ভুড়ি। অর্থাৎ হিন্দুরা অর্থ রোজগার করে বাড়ি তৈরি করার জন্য, আর মুসলমানরা রোজগার করে রসনা নিবৃত করার অর্থাৎ খাওয়ার জন্য। আর ইহুদীরা যা কিছুই করুক না কেন তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য যে জ্ঞানার্জন করা । 

তারা নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী। আর জ্ঞানই নেতৃত্বে আসীন করে। বিভিন্ন তথ্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রমাণিত হয়েছে  আমেরিকা নেতৃত্বের নেপথ্যে ইহুদীরাই পরিচালনা করে। যদিও জ্ঞানার্জনের  উত্তরাধিকার মুসলমানেরা, কিন্তু তারা  এখন ভুড়ি নিয়েই ব্যস্ত, জ্ঞানার্জনের সময় কোথায়! 

ফেসবুকে পোস্ট আর লাইক দেখলে   বুঝা যায়। দেখা যাক লেখাপড়া তথা জ্ঞানার্জনের একটা তুলনা: জনসংখ্যা: ইহুদী- এক কোটি চল্লিশ লাখ। মুসলমান- ১৬০ কোটি, একজন ইহুদীর বিপরীতে প্রায় ১১৪ জন মুসলমান। 

গত ১০৫ বছর ধরে ১ কোটি ৪০ লাখ ইহুদী ১৮০টি নোবেল পুরস্কার অর্জন  করেছে। আর একশত কোটি মুসলমান জিতেছে মাত্র ৩টি নোবেল। সাধারণত খ্রিস্টানদের স্কুল-কলেজেই ইহুদী  লেখাপড়া করে থাকে।

৫৭টি মুসলিম দেশে বিশ্ববিদ্যালয় আছে মাত্র ৫০০টির মতো। আর একমাত্র আমেরিকাতেই আছে ৫৭৫৮টি বিশ্ববিদ্যালয়। পুরো ভারত জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৭০০ টির মতো। দুনিয়াজুড়ে ইহুদী-খ্রিস্টানদের শিক্ষার হার ৯০%, আর মুসলমানদের শিক্ষার হার মাত্র ৪০%।

বেশিরভাগ  আবিষ্কারগুলি করেছে ইহুদীরা। প্রভাবশালী ব্যবসায়ীও তারা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও তারাই। আমরা ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে মত্ত থাকি। নিজেদের মাঝে হিংসা- বিদ্বেষ ছড়াই। সামান্য একজোড়া জুতা কিনে তার ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছি, তাতে লাইক দিচ্ছি শত শত। @-কাগজ বার্তা


যে কারণে খালাতো-মামাতো ভাই-বোনদের বিয়ে ঠিক নয়!

নিকটাত্মীয় অর্থ্যাৎ চাচাতো, মামাতো, খালাতো ও ফুফাতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিয়ে বিয়ের পরিণামে যে সন্তান হয়, তার মধ্যে জন্মগত ত্রুটি  জেনেটিক সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বেশি। দ্য ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, এই অস্বাভাবিকতার মধ্যে নবজাতকের অতিরিক্ত আঙুল গজানোর মতো সমস্যা থেকে শুরু করে হৃৎপিণ্ডে বা মস্তিষ্কের গঠন-প্রক্রিয়ায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে



১৯


অমৃত বচন

বেশিরভাগ শিক্ষকই পাঠবইয়ের বাইরে পড়াশোনা করতে অনাগ্রহী নয়। এরা কেবল চাকরি করে শিক্ষকতা নয়!

*মানুষকে পশু বললে ক্ষেপে যায়, কিন্তু সিংহ বললে খুশি হয়!!

*বরযাত্রার সময় বর সবার পিছনে থাকে আর বাকীরা সামনে। কিন্তু কবর যাত্রায় মৃত দেহ সবার আগে থাকে আর মানুষ- জন পিছনে!  সমস্ত পৃথিবী সুখের দিনে আগে আর দুঃখের দিনে পিছনে।

*ধর্মান্ধরা অন্য ধর্মের সমালোচনায় খুশিতে বিগলিত হয়, নিজ ধর্মের সমালোচনার গন্ধ পেলেই হিংস্র হয়ে ওঠে।

*সারাটা জীবন বোঝা বইলো দেয়ালের পেরেকটা আর মানুষ সুনাম করলো পেরেকে টাঙানো ছবিটার!!

*প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকরা কেবল শিক্ষার্থীদের শিক্ষক আর সাহিত্যিকরা গোটা সমাজের শিক্ষক!

*ছেলেরা যৌবনের শুরুতে প্রেম করার জন্য মারিয়া হয়ে ওঠে; তবে নিজের বোনকে সবসময় এসব থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে।

*পুরুষ কখনোই সুন্দর মন চায় না, সুন্দর শরীর চায়!

*কান্না হলো নারীর দাবি আদায়ের বড়ো অস্ত্র!

*নারী সুন্দর করে হেসে কথা বললেই পুরুষরা সুযোগ খোঁজে!

*টাকার বিকল্প  হচ্ছে ‘বিনয়’। কেননা, বিনয় দিয়েও অনেক কাঠিন্যকে জয় করা যায়!

*ধর্ম নিয়ে পুরুষ যতটুকু আগ্রহী নারী ততটুকু নয়!

*বেশি কথা বলা নারীদের পুরুষ কম পছন্দ করে।

*খ্যাতিমানদের সাথে ছবি তুলে যারা নিজেকে প্রচার করতে চায় বুঝতে হবে তারা ব্যক্তিত্ব সংকটে ভুগছে!

*বাধ্য না হলে বাঙালি আইনের ধার ধারে না!

*নিঃস্বার্থভাবে মানুষ অপরের প্রশংসা করে না, চাপ, লাভ এবং লোভে করে!

*শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার মুখ্য উদ্দেশ্য ভালো সার্টিফিকেট অর্জন, জ্ঞানার্জন নয়!

*কাজ করলে কাজ বাড়তেই থাকে, আর না করলে একসময় খুঁজেও পাওয়া যায় না!

*ধার করার কথা মনে থাকলেও যথাসময়ে যারা ফেরত দেওয়ার কথা ভুলে যায়, বুঝতে হবে তাদের মনুষ্যত্বে ঘাটতি রয়েছে।

*মৌলিকত্ব না থাকলে জনপ্রিয়রাও একসময় কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।

*স্ত্রী এবং লেখক উভয়ই প্রতিনিয়ত প্রশংসা কামনা করে।

*মেহমানের উপস্থিতিতে গ্রামের মানুষ খুশি আর শহরের মানুষ বিরক্ত!

*যারা ওয়াজ করে তারা কখনোই দান-খয়রাত করে না।

*পুরুষ বেশি কাম প্রত্যাশী, কারণ তারা শারীরিক আর নারী বেশি আদর-ভালবাসা প্রত্যাশী,  কেননা তারা সামাজিক।

*পুরুষের পছন্দের তালিকায় হাস্যময়ী নারীরাই শীর্ষে।

*মানুষ স্বভাবতই যেমন স্মৃতিকাতর তেমনি যৌনকাতরও।

*পশ্চিমারা পশুদের প্রতি যতটা দায়িত্বশীল সন্তানের প্রতি ততটুকু নয়।

 @-কাগজ বার্তা

২০


স্তনকর

আজ থেকে কয়েকশ বছর আগে ভারতের কেরালা অঙ্গরাজ্যে হিন্দুদের মধ্যে এক প্রকার ট্যাক্স বা কর প্রচলিত ছিলো। করটির নাম স্তনকর নৎবধংঃ ঃধী। এর আরেকটি নাম মুলাককারাম(সঁষধশশধৎধস)

স্তনকর বা ব্রেস্টট্যাক্স কি? 

ঐ সময় নিয়ম ছিলো শুধু ব্রাহ্মণ ব্যতিত অন্য কোন হিন্দু নারী তার স্তনকে ঢেকে রাখতে পারবে না। শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ শ্রেণীর হিন্দু নারীরা তাদের স্তনকে একটুকরো সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে পারতো, বাকি হিন্দু শ্রেণীর নারীদেরকে প্রকাশ্যে স্তন উন্মুক্ত করে রাখতে হতো। তবে যদি কোন নারী তার স্তনকে কাপড় দ্বারা আবৃত করতে চাইতো, তবে তাকে স্তনের সাইজের উপর নির্ভর করে ট্যাক্স বা কর দিতে হতো। 

এই নির্মম করকেই বলা হয় স্তনকর বা ব্রেস্টট্যাক্স। ১৮০৩ সালে নাঙ্গেলী (ঘধহমবষর) নামক এক নারী তার স্তনকে আবৃত করে রাখে। যখন গ্রামের ট্যাক্স কালেকটর তার থেকে স্তনকর চাইতে আসে, তখন নালেঙ্গী তা দিতে অস্বীকার করে এবং নিজের দুটি স্তনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। 

তখন ব্যাপারটা দেখে ট্যাক্স কালেকটর অবাক হয়ে যায়।  কিছুক্ষণ পরে স্তন থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য নাঙ্গেলীর মৃত্যু হয়। স্ত্রীর মৃত্যু শোকে নালেঙ্গীর স্বামীও সাথে সাথে আত্মহত্যা করে। এই ঘটনার পর থেকেই স্তনকর রোহিত হয়। 

তবে স্তনকর রোহিত হলেও দক্ষিণ ভারতে নারীদের স্তন আবৃত করার জন্য বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে।  ১৯ শতাব্দীর মাঝে এসে যখন কিছু হিন্দু নারী তাদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করার অধিকার দাবি করে, তখন হিন্দু পুরোহিতরা ¯পষ্ট করে বলে দেয়, নিচু বর্ণের নারীদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করা ধর্ম বিরোধী। বিষয়টি নিয়ে ১৮৫৯ সালে দক্ষিণ ভারতে একটি দাঙ্গা সংগঠিত হয়। এই দাঙ্গার উদ্দেশ্য ছিলো হিন্দু নারীদের শরীরের উপরের অংশ আবৃত করার অধিকার আদায় করা। এই দাঙ্গা কাপড়ের দাঙ্গা হিসেবেও পরিচিত। 

 @-কাগজ বার্তা


২১

বাল্যবিবাহ

বাল্যবিবাহের রীতি উনিশ শতকেও কত ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিখ্যাত   লোকদের জীবনী থেকে। রবীন্দ্রনাথের দাদা দ্বারকানাথ ঠাকুর বিয়ে করেছিলেন পনেরো বছর বয়সে।   চিন্তার দিক দিয়ে তিনি সে যুগের তুলনায় খুব আধুনিক হলেও তার পুত্র অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের বাবা   দেবেন্দ্রনাথের বিয়ে দিয়েছিলেন সতেরো বছর বয়সে, আর রবীন্দ্রনাথের মায়ের বা পাত্রীর বয়স ছিল  এগারো। 

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজনারায়ণ বসু, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কেশবচন্দ্র সেন, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালীপ্রসন্ন সিংহ, রমেশচন্দ্র দত্ত- সেকালের বিখ্যাত এই ব্যক্তিরা সবাই বিয়ে করেছিলেন   তাদের বয়স সতেরো হবার মধ্যেই। তাদের পাত্রীদের বয়স ছিল আরও অনেক কম। বঙ্কিমচন্দ্র যাকে বিয়ে   করেছিলেন, তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। দেবেন্দ্রনাথ এবং বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর স্ত্রীর বয়স ছিলো  ছয় বছর। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রীর বয়স ছিল সাত বছর, বিদ্যাসাগরের আট, কেশব সেন এবং   জ্যোতিরিন্দ্রনাথের নয়, শিবনাথ শাস্ত্রীর দশ আর রাজনারায়ণ বসুর স্ত্রীর বয়স ছিল এগারো বছর।   

এসব বিচারে বলতে হয়, আদর্শ পাত্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ২৩ বছর বয়সে অভিভাবক দের   ইচ্ছায় একটি নিরর ও মাত্র এগারো বছর বয়সের মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল।  আদতে ইংরেজ আমলে ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে প্রায় সব বাঙালি মেয়ের বিয়ে হতো সাত-আট থেকে ১০ বছরের   মধ্যে। 

যেসব পরিবারের অভিভাবকদের কিছুটা কাণ্ডজ্ঞান ছিল, তাঁরা রজঃবতী না হওয়া পর্যন্ত   পুত্রবধূকে শাশুড়ি, দাদিশাশুড়ি বা বিধবা পিসির কাছে শুতে দিতেন। তবে কাণ্ডজ্ঞান ও বিবেচনাস¤পন্ন   মানুষের সংখ্যা বাঙালি সমাজে চিরকালই বিরল। প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের সুখ-শান্তির কথা চিন্তা করে   অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নব বধূকে ছেলের ঘরে ঠেলে দিত। ঐ বাল্যবধূর আর্তনাদ আকাশ পর্যন্ত   পৌঁছালেও শ্বশুর-শাশুড়ি রাখতেন কানে তুলা গুঁজে।  

একদিন এরকম একটি ঘটনা ঘটে কলকাতার এক গলির মধ্যে। এক হৃষ্টপুষ্ট যুবক বছর আটেকের এক  শিশুকে ধুমধাম করে বিয়ে করে আনে। নির্মম অভিভাবকেরা তাকে বাসরঘরে ঠেলে দেন। কিছক্ষুণ   পর মেয়েটির আর্তচিৎকারে মধ্যরাতেই পাড়া-পড়শিরা সে বাড়ির সামনে এসে ভিড় করে। নিরুপায় হয়ে বাড়ির লোকজন বালিকাটিকে নিয়ে যায় কলকাতা মেডিকেল কলেজে। পরদিন হতভাগিনী   শেষ-নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। খবরটি কাগজে আসে।  পত্রিকায় খবরটি ফলাও করে আসায় ইংরেজ কর্মকর্তাদের তাতে দৃষ্টি পড়ে। ফলে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, ঋতুমতী হওয়ার আগে মেয়েদের বিয়ে নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করা হবে। এই নির্মম ঘোষণা বাঙালি পুরুষেরা মানবেন কেন? তাঁরা তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন এবং প্রতিবাদে ফেটে পড়েন।  সম্প্রতি আমাদের মন্ত্রিপরিষদ মেয়েদের বিয়ের বয়স অবস্থার পরিপেক্ষিতে ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করার কথা বলেছেন। ষোড়শী শব্দটি কয়েক’শ বছর ধরে বাঙালি কবিদের ছিল খুবই প্রিয়। আমাদের জাতীয় কবিও তাঁর   সেরা সৃৃষ্টিতে বলেছেন: 'আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি।' কবি ১৬ বছর   বয়স্কার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি ও প্রেমপিরিত করে ধন্য হবেন, আর বাংলার ছোকরারা কি বসে বসে আঙুল   চুষবে? তাই  মন্ত্রিপরিষদে   মেয়েদের বিয়ের বয়স ষোলোতে রাখতে  চান। যেটা   অসভ্যতার নিদর্শন বলে সুধী সমাজ হইচই করছে। আসলে মেয়েদের ১৬ বয়সটির প্রতি শুধু কামাতুর বাঙালি পুরুষদেরই লোভ, তা নয়।  ইংরেজরাও কম যায় না।  তারা  ষোড়শী না বলে বলে সুইট সিক্সটিন-মিষ্টি ষোলো।  -সৈয়দ আবুল মাকসুদ 



২২


মৃত শিক্ষকদের শিক্ষকতা প্রসঙ্গে

খুব অল্প লোকই আছেন, যারা নতুন কিছু শিখলে, তা উদযাপন করতে পারেন। কেউ কেউ আছেন, নতুন কিছু শেখার পর ভাব করেনঃ 'এগুলো কিছুই না; এগুলো তো আমার জানাই ছিলো।' ইণ্টারেষ্টিং!  

ব্রিটেইনে শিক্ষকেরা শুধু শেখান না। তাঁদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে লাগাতার নতুন কিছু শেখা ও প্রয়োগের জন্যে বছরে কমপক্ষে তিনবার ইন-সার্ভিস ট্রেইনিং নিতে হয়। আমি মনে করি, আমরা যার শিক্ষক আছি, আমাদের অন্তর্গত পরিচয় হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর এবং বহির্গত পরিচয় শিক্ষকের। কারণ, নিজে না শিখলে অন্যকে শেখানো যায় না। তাই, অন্যকে শেখানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার আগে নিজের শেখার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা আবশ্যক। যে-শিক্ষক 'সব শেখা হয়ে গিয়েছে' ভেবে শেখা পরিত্যাগ করেন, শেষপর্যন্ত তাঁর শেখানোরও তখন মৃত্যু ঘটে। 

তারপরও তাঁরা শিক্ষকতা করে চলেছেন। বাঙালী সমাজে রূপতঃ বহু মৃত শিক্ষক যুগ যুগ ধরে শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন, যদিও এতোদিনে ওঁদের কবর হওয়া উচিত ছিলো। @ মাসুদ রানা


২৩


নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের গলার ঘন্টি আর বৌদ্ধ ন্যাড়া ভিক্ষুকদের উপর অত্যাচারের ফলে বাঙালিরা মুসলমান হয়ে গেল!

সুফীরা বিভিন্ন দেশে তাঁদের মত প্রচারের জন্য বেরিয়ে পড়লে; তাদের কার্যকলাপে মুগ্ধ হয়ে লক্ষণ সেন পান্ডুয়ায় একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেন এবং প্রচুর ভূ-স¤পত্তি দান করেন। এতে বহু লোক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়। তবে তাদের সংখ্যা তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। 

পরবর্তীতে যে সব ধর্ম প্রচার করতে এসেছিলেন তারা মুসলমান প্রশাসক (১২০৪ থেকে ১৭৫৭ পর্যন্ত)দের সহায়তা পেয়েছিলেন। (যেমন- ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪১৪ খ্রীষ্টাব্দ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৪৬৬ খ্রীষ্টাব্দে থেকে ১৪৮৭ খ্রীষ্টাব্দে পর্যন্ত সময়ে ইরানী ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতানেরা বাংলা শাসন করেন। তারপর ১৪৮৭ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৪৯৩ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত আবিসিনীয় হাবশী বংশের সুলতানের স্বল্পকালীন শাসনের পর ১৪৯৩ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত আরবী হোসেন শাহী বংশের সুলতানেরা এ দেশ শাসন করেন। ১৫৩৮ খ্রীষ্টাব্দে হুমায়ুন বাংলা দখল করেন। কিন্তু তিনি বেশি দিন তা ধরে রাখতে পারেননি। ১৫৩৯ খ্রীষ্টাব্দে শের শাহ বাংলার অধিকার নেন । 

১৫৭৬ খ্রীষ্টাব্দের থেকে দিল্লীর মোগল সম্রাটদের নিযুক্ত সুবেদাররা বাংলা শাসন করতে থাকেন। আইনগত মোগল সম্রাটের সুবেদার থাকলেও কার্যত ১৭১৭ খ্রীষ্টাব্দে মুর্শিদ কুলি খাঁ বাংলায় স্বাধীন নবাবতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের জয়লাভ পর্যন্ত এই নবাবরাই বাংলা শাসন করেন।)

এ দেশের মানুষ মুসলমান হয়ে যাওয়ার সব থেকে বড় কারণ ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া আকুতি। পাল আমলে দেশে অনেক বৌদ্ধ ছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষক সেন-বর্মন-দেব আমলে তাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার হত। সেই অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পাবার আশায় তুর্কী 

আক্রমণকারীদের তারা দেবতার আসনে বসিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই বহু সংখ্যক বৌদ্ধ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। বাংলার যে উত্তর ও পূর্ব অংশে বৌদ্ধদের সংখ্যা বেশি ছিল, সেই উত্তর ও পূর্ব অংশে পরবর্তীকালে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ছিলেন মুণ্ডিত মস্তক অর্থাৎ ন্যাড়া। তাই তাদের নেড়ে বলে বিদ্রুপ করা হত। পরে তাঁরা যখন মুসলমান হলেন তাঁদের সূত্র ধরে সব মুসলমানকেই নেড়ে বলে উপহাস করার উন্নাসিকতা প্রচলিত হল।

সেন আমলে ব্রাহ্মণরা সমাজকে এমনভাবে বেঁধেছিল যে সাধারণ মানুষ পদে পদে শোষিত, বঞ্চিত এবং অপমানিত হত.... স্মৃতি-পুরাণ বলে অভিহিত ধর্মশাস্ত্রগুলি অংশ বিশেষ চতুর বিদ্বানরা এমনভাবে রচনা করেছিল যাতে ধর্ম বা শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষের বৃহত্তর অংশকে অনায়াসে দাস শ্রেণীতে পরিণত করা যায় এবং তাদের শ্রম, তাদের ভূমি ও তাদের নারী ভোগ করা যায়। উচ্চবর্ণের লোকেরা যাতে তাদের ছোঁয়াচ এড়িয়ে চলেতে পারে তার জন্য নিম্নবর্ণের লোকদের গলায় ঘন্টি ঝুলিয়ে চলতে হত। কিন্তু সে যদি মুসলমান হয়ে যেত, তাহলে রক্ষা পেত।

ব্রাক্ষণ্য ধর্মের তুলনায় ইসলাম ধর্ম মানুষকে অনেক বেশি সমানাধিকার দেয়। মুসলমান হলে সে আর যে কোন মুসলমানের সঙ্গে সমান। তার ছোঁয়া লাগলে তার সমাজে আর কারও জাত যায় না। যার ফলে নিম্ন বর্ণের অত্যাচারিত মানুষেরা দলে দলে মুসলমান হয়ে গেল। ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত বাংলায় সুফী প্রচারের স্বর্ণযুগ। ষোড়শ শতকে চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের  ফলে বাঙালি সমাজে সূফীদের প্রভাব অনেক কমে যায়।

 @-কাগজ বার্তা


২৪


সক্রেটিস ছিলেন একমাত্র গ্রীক যিনি জানতেন যে, তিনি মূর্খ। কিন্ত তাঁর প্রভাব আজও বিশাল।

[বক্ষ্যমান লেখাটি জাপানের হিরোসাকি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জন এডওয়ার্ড ফিলিপসের ইংরেজিতে লেখা একটি প্রবন্ধ, নাম ‘The Wisest of the Greek

রোপীয়দের মধ্যে গ্রীকরাই প্রথম সভ্যতার শিল্প শেখে। তাদের দার্শনিক ও জ্ঞানীগণের দেখানো পথ ধরেই ইউরোপের অন্যান্য জাতির  মধ্যে শিক্ষা আলো ও সভ্যতা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেন। 

 সক্রেটিস  ছিলেন এক দরিদ্র নিরক্ষর ব্যক্তি, যিনি বাস করতেন গ্রীসের এ্যাথেন্সে। তিনি ছিলেন এক ভালো যোদ্ধা, যিনি জিমনিশিয়ামে লড়তেন; কিন্তু তিনি জানতেন যে, তিনি  বুদ্ধিজীবী নন। তাই গ্রীসের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তির কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করতে চেয়েছিলেন বলেই তিনি গ্রীকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী কে’ তা খুঁজতে তিনি গিয়েছিলেন ডেলফির বিখ্যাত পুরোহিতের কাছে। পুরোহিত ডেলফির গুহায় তাঁর আসনে বসে সক্রেটিসের প্রশ্ন শুনলেন। অতঃপর তাঁর উত্তর ছিলো, “গ্রীকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী হচ্ছে সক্রেটিস তুমি নিজে।”

“কিন্তু, এটা অসম্ভব!” তোতলিয়ে সক্রেটিস বললেন, “আমি এক মূর্খ।”

পুরোহিত বললেন, যে ব্যাক্তি নিজেকে মূর্খ বলে জানে এবং জ্ঞানের সন্ধান করে, সে হচ্ছে জ্ঞানী।  কিন্তু সক্রেটিস এই কথায় সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি তাঁর নিজ নগরী এ্যাথেন্সে ঘুরে, যেখানে যতো লোক জ্ঞানী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁদের সবাইকে একই প্রশ্ন করতে লাগলেন ।

ঘটনাটি ছিলো যীশু ও মুহাম্মদ(সঃ)-এর জন্মেরও শতশত বছর আগে। গ্রীকরা তখন  বহু দেব-দেবীতে বিশ্বাস করতো এবং তাদের সকলেই বলিদান দিতো। সক্রেটিসও ধার্মিক হতে চেয়েছিলেন, তাই তিনি আর এক বিখ্যাত  পুরোহিতের কাছে গেলেন। 

 “ধর্মপরায়ণতা কী?” জিজ্ঞেস করলেন সক্রেটিস। “এটি হচ্ছে দেবতাদের সম্মান করা এবং তাঁদের ইচ্ছা তামিল করা।” পুরোহিত উত্তর দিলেন। সক্রেটিস পুনরায় বিভ্রান্ত হলেন। বললেন- “কিন্তু গ্রীসে দেবতারা [সংখ্যায়] অনেক। আমাদের দৈব-কাহিনীতে প্রায়ই তাঁরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করেন। আমি কীভাবে জানবো কখন একজন দেবতাকে সমর্থন করতে হবে এবং কখন অন্য জনকে অনুসরণ করতে হবে?”

প্রশ্ন শুনে পুরোহিত বিব্রত হলেন এবং সক্রেটিসের জন্যে কোনো উত্তর ছিলো না তাঁর। এরপর সক্রেটিসের ধারালো প্রশ্নমালার উত্তর খুঁজতে অনেক জনসমাবেশ হতে থাকলো। জিমনিশিয়ামে অনেক তরুণ সক্রেটিসকে জ্ঞান বিষয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করলো। এই তরুণদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ্য দেব- দেবীর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলো। 

সক্রেটিস তখন এথেন্সের বাজারে এলোমেলোভাবে ঘোরাফেরা করতো, যেদিকে যেতো যেনো হেমিলনের বাঁশিওয়ালা, পিছনে যুবকদের সারি। শেষ পর্যন্ত এ্যাথন্সের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে বিষয়টি অসহ্য ঠেকলো। তারা সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অধর্ম, দেবনিন্দা, দেবতাদের প্রশ্নবিদ্ধ করা দিয়ে তরুণদের নষ্ট করার অভিযোগ এনে তাঁকে বিচারের সম্মুখিন করলেন।

সক্রেটিস অভিযোগসমূহ অস্বীকার করলেন এই বলে যে, তাঁর প্রশ্নগুলো ছিলো দেবতাদের সম্মান করার জন্যে । তাঁর অভিযোগকারীগণ যখন  জিজ্ঞেস করলেন তিনি দেব-দেবীদের বিশ্বাস করতে পারেন কিনা, তখন সক্রেটিস এর সম্ভাব্যতা অস্বীকার করলেন।

তখন তারা তাঁকে অভিযুক্ত করলো তরুণদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্রষ্ট করার, তারা জোর করতে থাকলেন এই বলে যে, সমাজের ওপর তাঁর মন্দ প্রভাব পড়ছে এবং তাঁর প্রশ্ন দিয়ে সমাজে আরও গোল বাঁধাবার পূর্বেই তাঁর মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। 

সক্রেটিসকে তাঁর বন্ধুরা মিনতি করলেন প্রশ্ন করা বন্ধ করতে, কিন্তু তিনি বললেন এর অর্থ হবে দেব-দেবীকে স্বীকার করা। যখন বন্ধুরা পরামর্শ দিলেন ক্ষমা প্রার্থনার অথবা দেশান্তরী হওয়ার, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। মুলত সক্রেটিস ছিলেন এক লড়াকু লোক এবং যুদ্ধের ময়দানে কখনও তাঁর অস্ত্রত্যাগ করেননি কিংবা ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হলো। নির্ধারিত সময়ে সক্রেটিস হেমলক বিষ পান করলেন এবং কারাগারে মৃত্যুবরণ করলেন শোকাকুল বন্ধু পরিবেষ্টিত হয়ে। 

সক্রেটিসের সবেচেয়ে বিখ্যাত ছাত্র ছিলেন প্ল্যাটো। প্ল্যাটো চিন্তা করতে শুরু করেন যে, আমরা যে জগতকে জানি, তা সত্য জগৎ হতে পারে না। তিনি আরও ভাবেন, গণতন্ত্র যেহেতু সক্রেটিসকে মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করেছে, শাসন ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্র ভালো হতে পারে না। তিনি এই ধারণা বিকশিত করেন যে,শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হওয়া উচিত জ্ঞানীদের দ্বারা।

এ্যারিস্টটল ছিলেন প্ল্যাটোর ছাত্র। তিনি ভাবনা-চিন্তা পরীক্ষার জন্যে নিয়মতান্ত্রিক যুক্তির এক শক্তিশালী পদ্ধতি বিকশিত করেন, যা আজ এ্যারিস্টটলিয়ান [যুক্তি] বলে পরিচিত। তিনি শিক্ষক হয়েছিলেন আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেইটের।

গ্রীকদের মধ্যে এসব সক্রেটিসপন্থীরা ছিলেন সংখ্যালঘু, কিন্তু তাঁদের প্রভাব আজও বিশাল। যখন খ্রিস্টধর্ম এবং পরবর্তীতে ইসলামধর্ম  গ্রীক সভ্যতা ও গ্রীস প্রভাবিত করলো, তখন মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করলো যে, সক্রেটিসের ছাত্রদের দেব-দেবী নিয়ে প্রশ্ন করা ঠিক ছিলো।  আজ, কেউই গ্রীক দেব-দেবীর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। মিথসমূহ সাহিত্য হিসেবে পঠিত হচ্ছে। 

ইসলাম ও ক্রিশ্চিয়ানিটি উভয় ধর্মের  চিন্তকদের মধ্যেও প্ল্যাটোর বিশাল প্রভাব রয়েছে। তার বাস্তব উদাহরণ ইসলামের মোতাজিলা।  ওসমান দানফোদিও থেকে শুরু করে  লেনিন পর্যন্ত যাঁরা মনে করেন যে, সমাজ পরিচালিনার দায়িত্ব থাকা উচিত একদল বুদ্ধিজীবীদের হাতে, তাঁদের চিন্তায় প্ল্যাটোর রাজনৈতিক ধারণার প্রভাব  আছে।

প্রাচীন গ্রীকদের মধ্যে আলেক্সান্ডাররের মতো সক্রেটিসও  বিশ্ব জয় করেছেন, জ্ঞানের সমুদ্রে নামার আগে সক্রেটিস অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠে জ্ঞানপ্রত্যাশীর কাছে । যেখানেই সভ্যতার বিস্তার, সেখানে এই  নিরক্ষর, সুযোদ্ধা অথচ দরিদ্র চিন্তকের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়; যিনি গ্রীকদের মধ্যে ছিলেন শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানী।  @-কাগজ বার্তা অনুবাদঃ মাসুদ রানা


২৫


বাংলা সংস্কৃতির পোশাক

পাঞ্জাবী পাঞ্জাবের পোশাক।  এটি আফগানিস্তান, পাকিস্তান ঘুরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এটি ৫০০ বছরের অধিক সময় বাংলায় পরিধেয় হয়ে আসছে। পূর্বে পাঞ্জাবীর সাথে ধুতি পরা হতো। কারণ ধুতি ছাড়া পরিধেয় কোন পোশাক ছিলো না। পরবর্তিতে  পায়জামা আসার পর পায়জামা ধুতির স্থান দখল করে। হিন্দু দাদারা যেহেতু ধুতি পরে, তার বিপরীতে পায়জামার চল মুসলিম সমাজে  দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 

তবে পাকিস্তান হওয়ার আগ পর্যন্ত মুসলিমদের আনেকেই ধুতি পড়ত। যেমন-কবি কাজী নজরুল ইসলাম পাঞ্জাবীর সাথে সর্বদা ধুতি পরতে পছন্দ করতেন। উল্লেখ্য, পায়জামা হল ইরানী পোশাক। লুঙ্গি তামিল নাড়ুর পোশাক। এটি শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া সব ঘুরে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে। ১০০ বছরের কিছু বেশিকাল লুঙ্গি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সে সময় রেক্সগুন থেকে লুঙ্গি আমদানি হতো। লুঙ্গির ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে বাঙালি মুসলমান সমাজ হিন্দুদের সাথে বেশভূষার পরিবর্তন ঘটাতে ধুতি পরিত্যাগ করে লুঙ্গীকে নিজেদের পরিধেয় হিসেবে গ্রহণ করে। তাহলে চার হাজারের বেশি সময় ধরে যে "বাঙাল" বা "বাঙ্গালা" জনপদ গড়ে উঠেছিলো তাদের পোশাক কি ছিলো!

বাঙ্গালিরা সেলাইবিহীন পোশাক পরতো। এর কারণ তখনো সুঁই নামক বস্তু আবিষ্কৃত হয়নি। চরকায় বোনা সুতো আর তাঁতে বোনা সেলাইবিহীন মোটা কাপড় ছিলো তাদের পরিধেয়। পুরুষদের পোশাক ছিলো খাটো ধুতি, কাধে গামছা, কখনোবা চাদর, শাল, আর নারীদের শাড়ি। এগলো সব সেলাইহীন পোশাক। 

বাংলার সহজিয়া সম্প্রদায়সহ আনেক ধর্মীয় গোষ্ঠী (আমাদের সহজিয়া কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদসহ) এখনো সেলাহীন পোশাক পরে। এদেশে লুঙ্গী আসার পর থেকে ধুতি হিন্দুয়ানী পোশাক আর লুঙ্গি মুসলমানদের পোশাক বলে মগজে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। 

এখনও ধুতির নাম শুনলে বাংলাদেশের মুসলিমরা এটাকে শুধু দাদাবাবুদের পোশাক বলে মনে করে, নিজেদের পোশাক বলে কল্পনাও করতে পারে না। তবে মজার ব্যাপার হল বাঙালী হিন্দুসমাজেও ধুতি হারিয়ে গেছে। শ্রাদ্ধ, বিয়ে, পূজা ছাড়া এখন আর কাউকে ধুতি পরতে দেখা যায় না। বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে পুরোনো এই পোশাকটিই হারিয়ে গেছে ধর্মীয় বিভেদের জালে পড়ে।

পহেলা বৈশাখে যারা বাঙালিয়ানা দেখাতে পায়জামা, পাঞ্জাবী, ফতুয়া, লুঙি পরে বেরুন, তাদের পোশাক কি আদৌ বাঙালি পোশাক? নাকি ধার করা সংস্কৃতি? পোশাকের কথা কি বলব, অনেকে তো পহেলা বৈশাখকেই বাঙালি সংস্কৃতি হিসাবে মানতে চান না। তাদের কাছে প্রশ্ন: আপনারা  পহেলা বৈশাখকে বর্জন করছেন ভাল কথা, কিন্তু বাংলায় কথা বলেন কেন? যাই হোক, আজকাল তো দেশে-বিদেশে অনেক বাঙালি ইংরেজিতেই কথা বলে। তারা সাহেবদের অনুকরণে কোট-প্যান্ট পরতে শিখে গেছে, তবে সেগুলোকেই  আজও বাঙালিরা নিজেদের পোষাক বলে মনে করে না। 

বাঙালি মেয়েদের আদি পোষাক শাড়িও হচ্ছে সেলাইহীন পোষাক। সুতা এবং কাপড় বোনার শিল্প ভারতবর্ষে এসেছিল মেসোপটেমিয়ান সভ্যতা থেকে। সিন্ধু উপত্যকার নারী- পুরুষ সুতা বুনত। ভারতে  সুতা প্রথম চাষ ও বুনন শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে। ঐ সময় সুতায় যে রঙ ব্যবহার হতো, তা এখনো ব্যবহার করা হয়; যেমন- নীল গাছ বা হলুদ থেকে পাওয়া রং।  

শাড়ির সর্বপ্রথম চিত্রায়ন পাওয়া যায় সিন্ধু প্রদেশের এক পুরোহিতের প্রস্তর মূর্তিতে। সিন্ধু উপত্যকার লোকেরা দীর্ঘ কাপড়ের টুকরা কোমরবন্ধ হিসেবে ব্যবহার করতো। 

আর্যরা যখন প্রথম দক্ষিণ ভারতের নদী অববাহিকায় আসে, তখন স্থানীয় অধিবাসীদের থেকে তারা প্রথম সুতায় বোনা লম্বা কাপড় পরিধানের অভ্যাস শুরু করে। সিন্ধু এলাকার মহিলাদের এই কটিবন্ধ কাপড়ের নাম ছিল নিভি (ঘরার)। মহিলাদের এই কটিবন্ধ নিভি-ই হল শাড়ির অগ্রদূত। পরবর্তীতে কাঁচুকি (কধহপযঁশর) নামে এক টুকরা কাপড় শরীরের উপরের অংশে জড়িয়ে পরার প্রচলন নারীদের মধ্যে ছিল, যা থেকে ব্লাউজের প্রচলন শুরু হয়।

এরপর কারুকাজ ও নকশার উন্নতি এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যই এই সেলাইবিহীন কাপড়ের দীর্ঘ  তিন খন্ডে বিভক্ত হয়- নীভি কোমর ও নিম্নাংশ জড়িয়ে থাকতো এক টুকরো, কাচুকি উপরের অংশে থাকতো আর এক টুকরো এবং তৃতীয় টুকরো শালের মতো দীর্ঘ কাপড়টাকে বলা হত উত্তরীয়। পুরার যুগে এবং সাহিত্যের যুগে মেয়েদের মধ্যে শাড়ির একটা অংশ মাথায় তোলার কোনো প্রচলন ছিল না।

শাড়ির এই পথ চলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে মোঘল শাসনামলে।  মোঘল ছেলেরা দীর্ঘ কোর্তা পরতো, সাথে সরু সালোয়ার। এই সময়েই প্রথম নারীদের শাড়ির শেষ অংশ আঁচল বা পাল্লু হিসাবে পরিচিত হয় এবং মহিলারা তা মাথা ঢাকতে বা ওড়না হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করে, যেহেতু সেই সময় মুসলিম শাসনাধীন।  সেহেতু এ সময় থেকে মহিলাদের মাথা ঢাকার রেওয়াজ চালু হতে শুরু হয়। 

বর্তমানে শাড়ির যে দীর্ঘ আঁচল রাখা হয় এবং তা মাথা ও ঘাড়ে ঘুরিয়ে নেয়া হয়, তা ওই সময় থেকেই চালু হয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকা বিভিন্ন ধরনের শাড়ির উৎপাদনের জন্যে বিখ্যাত; যেমন ঢাকাই জামদানী, কাশ্মিরী রেশমী সিল্ক, টাংগাইলের তাঁত বা মধ্য প্রদেশের মহেশ্বর শাড়ী।


২৬


লোকচক্ষুর আড়ালে নিজেকে উন্নত করে চলুন। এখানে কারো প্রশংসা বা হাততালির প্রয়োজন নেই৷ সবার অলক্ষ্যে নিজেকে গড়ুন।

​১. প্রদর্শন বনাম প্রকৃত শৃঙ্খলা:

অনেকে সকালে খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে বা স্বাস্থ্যকর খাবার খায় শুধু অন্যকে দেখানোর জন্য (যেমন: সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা)। যারা তাদের ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলাকে সবার সামনে প্রদর্শন করে, তারা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং একসময় সেটি ছেড়ে দেয়। কিন্তু যারা প্রচার ছাড়াই নীরবে নিজের কাজ করে যায়, তারা বছরের পর বছর তা ধরে রাখতে পারে।

​২. কেন অন্যকে জানালে ক্ষতি হয়? 

মনোবিজ্ঞানে ‘ওভারজাস্টিফিকেশন ইফেক্ট’ (Overjustification Effect) বলে একটি বিষয় আছে। এর মানে হলো, আপনি যখন নিজের আনন্দের জন্য কোনো কাজ করেন এবং সেই কাজের জন্য বাইরের কোনো পুরস্কার (যেমন: লাইক, কমেন্ট বা প্রশংসা) পেতে শুরু করেন, তখন আপনার ভেতরের আসল অনুপ্রেরণা কমে যায়। কাজটা তখন আপনার নিজের থাকে না, সেটি হয়ে যায় ‘পারফরম্যান্স’ বা দর্শক দেখানোর বিষয়।

​৩. দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের রহস্য:

যেকোনো ভালো অভ্যাস ধরে রাখার জন্য তিনটি জিনিস প্রয়োজন:

​স্বাধীনতা (Autonomy): আমি নিজের ইচ্ছায় এটা করছি।

​দক্ষতা (Competence): আমি বুঝতে পারছি যে আমি উন্নতি করছি।

​সম্পর্ক (Relatedness): অন্যের সাথে সংযোগ।

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী সফলতার জন্য প্রথম দুটি—অর্থাৎ নিজের ইচ্ছা এবং নিজের উন্নতির বোধই সবচেয়ে বেশি কাজ করে। এখানে ইন্টারনেটের অপরিচিত মানুষের প্রশংসার কোনো ভূমিকা নেই।

​যখনই আপনি কোনো অভ্যাস নিয়ে খুব বেশি গল্প করেন, তখন আপনার মন সেই কাজটির চেয়ে 'মানুষ কী ভাবছে' তা নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে কাজের মান কমে যায়।

​৪. যারা টিকে থাকে, তারা শান্ত থাকে:

আপনার পরিচিত সবচেয়ে সুশৃঙ্খল মানুষটির কথা ভাবুন। দেখবেন, তিনি সাধারণত নিজের রুটিন নিয়ে খুব বেশি চিৎকার করেন না। তিনি প্রতিদিন তার কাজটা করে যান খুব নীরবে। আমাদের সমাজ আমাদের শিখিয়েছে যে—কিছু করলে সেটা দেখাতে হবে। কিন্তু আসল সার্থকতা হলো নিজের পরিবর্তন, যা অন্যকে দেখানোর জন্য নয়।

​৫. লোকচক্ষুর আড়ালে শৃঙ্খলা গড়ার উপায়:

লক্ষ্য গোপন রাখুন: আপনি নতুন কিছু শিখতে চাইলে বা করতে চাইলে এখনই সবাইকে জানানোর দরকার নেই। নীরবে শুরু করুন।

ভেতরের উন্নতি মাপুন: বাইরে থেকে কেমন দেখাচ্ছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন আপনার ভেতরে কেমন অনুভব হচ্ছে তার ওপর।

অহেতুক কষ্ট নয়, ধারাবাহিকতা: শৃঙ্খলার মানেই হলো শুধু কষ্ট পাওয়া নয়, বরং কোনো বাহাদুরি ছাড়াই প্রতিদিন কাজটি চালিয়ে যাওয়া।

আসল 'ফ্লেক্স' বা বাহাদুরি এটা নয় যে আপনি কত কঠিন কাজ করতে পারেন। আসল বাহাদুরি হলো আপনি কতটা নিঃশব্দে এবং ধারাবাহিকভাবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন, যেখানে কেউ আপনার স্কোর রাখছে না। যখন আপনি নিজের কাজের মধ্যেই তৃপ্তি পাবেন, তখন আপনার আর বাইরের কোনো অনুপ্রেরণার প্রয়োজন হবে না। @ Paint with Ashraf


২৭


 নিজের কথা শুনলে কান খাড়া হয়ে যায় কেন

আপনি কি কখনো লক্ষ্য করেছেন যে একটা ঘরভর্তি গোলমালেও কেউ যদি আপনার নাম ধরে ডাকে আপনার কান সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে চলে যায়? এটাকে মনোবিজ্ঞানীরা বলেন Cocktail Party Effect। মস্তিষ্ক সারাক্ষণ হাজারটা তথ্য ফিল্টার করে কিন্তু নিজের নাম বা নিজের সম্পর্কিত কিছু দেখলেই সে লাফ দিয়ে ওঠে। এই কারণেই জন্মতারিখ দিয়ে ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ — এই ধরনের পোস্ট দেখলে আপনি স্ক্রোল থামিয়ে পড়তে বসেন।

 বিজ্ঞান কী বলছে এই ব্যাপারে

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক Sherry Cormier-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে মানুষ নিজের সম্পর্কে তথ্য পড়লে তার মনোযোগ সাধারণ তথ্যের তুলনায় প্রায় পাঁচগুণ বেশি সময় ধরে থাকে। মানে আপনি যদি একটা সাধারণ স্বাস্থ্য টিপস পড়েন এবং একটা পোস্ট পড়েন যেখানে লেখা আছে আপনার রাশি অনুযায়ী আপনার স্বাস্থ্যের অবস্থা তাহলে দ্বিতীয়টা আপনি অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে পড়বেন। এই ঘটনাকেই বিজ্ঞানীরা বলছেন Self-Relevance Effect।

 রাহুলের গল্পটা ……

রাহুল চ্যাটার্জি সারাদিন অফিসের কাজে ব্যস্ত। ফেসবুকে স্ক্রোল করছিলেন রাতে শুয়ে। একটার পর একটা পোস্ট চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা পোস্টে লেখা আছে আপনার জন্মতারিখের শেষ সংখ্যা যদি ৪ হয় তাহলে আপনি প্রেমে এই ধরনের মানুষ। রাহুলের জন্মতারিখ ১৪। মানে শেষ সংখ্যা ৪। সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রোল থেমে গেল। পুরোটা পড়লেন। কমেন্ট করলেন। বন্ধু সুমিতকে ট্যাগ করলেন। হাসতে হাসতে বললেন এটা একদম সত্যি হয়ে গেছে। এই হলো Personalization-এর জাদু।

 আসল রহস্যটা কোথায়

মানুষ আসলে নিজেকে বুঝতে চায়। প্রতিটা মানুষের মনের ভেতরে একটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে যে আমি আসলে কেমন। কেন আমার সম্পর্কগুলো এভাবে যায়। কেন আমি প্রেমে এত বেশি দিই অথচ ফিরে পাই কম। অথবা কেন আমি এত দূরত্ব রাখি। এই উত্তরটা খোঁজার তাড়না থেকেই মানুষ জন্মতারিখ ভিত্তিক বিশ্লেষণে এত আগ্রহী হয়ে পড়ে। এটা কুসংস্কার নয় এটা আত্মপরিচয়ের খোঁজ।

 কাজের কথায় আসি

সত্যি বলতে জন্মতারিখের শেষ সংখ্যা ০ থেকে ৯ পর্যন্ত মাত্র দশটি। মানে পৃথিবীর সাত শো কোটি মানুষকে দশটা বাক্সে ভরে ফেলা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যত রাহুল সুমিত প্রিয়া আনন্দ আছেন তারা সবাই একই বাক্সে। কিন্তু তবুও পড়ার সময় মনে হয় এটা শুধু আমার কথাই বলা হচ্ছে। এই অনুভূতিটাকে মনোবিজ্ঞানীরা বলেন Barnum Effect বা Forer Effect। এটা আমাদের মস্তিষ্কের একটি মিষ্টি ধোঁকা।

 তাহলে কী করবেন

জন্মতারিখের বিশ্লেষণ মিলুক বা না মিলুক সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু এই কৌতূহলটাকে কাজে লাগান। নিজেকে জানার জন্য একটা সহজ অভ্যাস করুন। প্রতিদিন রাতে শুয়ে পাঁচ মিনিট ভাবুন আজকে আমি সম্পর্কের ক্ষেত্রে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দিলাম। এতে করে আস্তে আস্তে নিজের আসল প্যাটার্ন বুঝতে পারবেন। কোনো সংখ্যা ছাড়াই। @ পার্থ প্রতিম রায়


২৮


পরিণত বা বুদ্ধিমান মানুষ ৭টি পরিস্থিতিতে চুপ থাকা বা নীরবতা অবলম্বন করাকে শ্রেয় মনে করেন।

​আসল বুদ্ধিমত্তা বা পরিপক্বতা কেবল কথা বলায় নয়, বরং কখন চুপ থাকতে হয় তা জানার মধ্যেও নিহিত। এই আর্টিকেলে এমন ৭টি পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে যেখানে চুপ থাকাটাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।

​১. যখন কেউ কেবল নিজের মনের কথা বলতে চায়।

মাঝে মাঝে মানুষ কোনো সমাধানের জন্য নয়, বরং কেবল মনের বোঝা হালকা করার জন্য কথা বলে। এমন পরিস্থিতিতে বুদ্ধিমান মানুষ অযথা উপদেশ না দিয়ে মন দিয়ে শোনেন। তারা বুঝতে পারেন যে, তখন কেবল তাদের উপস্থিত থাকা এবং শোনাটাই সবচেয়ে বড় সাহায্য।

​২. উত্তপ্ত বিতর্ক যেখানে কারও মন পরিবর্তন হবে না।

কিছু তর্কে লিপ্ত হওয়া মানে শক্তি অপচয়। যখন দেখা যায় যে অন্য পক্ষ জেদ ধরে আছে এবং কোনো যুক্তি মানতে নারাজ, তখন বুদ্ধিমান মানুষ চুপ হয়ে যান। তারা 'সঠিক' হওয়ার চেয়ে নিজের 'মানসিক শান্তি'কে বেশি গুরুত্ব দেন।

​৩. যখন আপনি রাগান্বিত বা ক্ষুব্ধ।

রাগের মাথায় আমরা এমন অনেক কিছু বলে ফেলি যা পরে অনুশোচনার কারণ হয়। বুদ্ধিমান মানুষ জানেন যে ক্রোধের মুহূর্তে নীরব থাকা হলো সবচেয়ে বড় ঢাল। তারা অন্তত ২৪ ঘণ্টা সময় নেন নিজেকে শান্ত করতে, যাতে কথা দিয়ে কারও মনে আঘাত না লাগে।

​৪. যখন কেউ পরনিন্দা বা গীবত করতে চায়।

অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমালোচনা বা গীবত করা ব্যক্তিত্বহীনতার লক্ষণ। যখন কেউ কোনো গসিপ নিয়ে আসে, তখন স্মার্ট মানুষরা তাতে অংশ না নিয়ে চুপ থাকেন। এটি তাদের ব্যক্তিত্বকে অন্যের কাছে নির্ভরযোগ্য করে তোলে।

​৫. যখন আপনার কাছে সব তথ্য নেই।

অর্ধেক তথ্য নিয়ে কথা বলা বিপজ্জনক হতে পারে। বুদ্ধিমান মানুষ কোনো বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। তারা ভুল তথ্য ছড়ানোর চেয়ে চুপ থাকাকেই নিরাপদ মনে করেন।

​৬. যখন কথা বললে কোনো লাভ হবে না।

কিছু মানুষ থাকে যারা বারবার একই ভুল করে বা অন্যের কথাকে তোয়াক্কা করে না। এমন মানুষের পেছনে বারবার যুক্তি দিয়ে সময় নষ্ট না করে নীরব থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ কর্মই যখন কথা বলে না, তখন মুখে বলে লাভ নেই।

​৭. যখন নীরবতা কথা বলার চেয়েও বেশি শক্তিশালী।

সব সময় কথা বলে সবকিছু বোঝানো যায় না। গভীর শোকের সময় বা খুব আবেগী মুহূর্তে কেবল পাশে চুপচাপ বসে থাকাও অনেক বড় সহমর্মিতা। বুদ্ধিমান মানুষ বোঝেন যে নীরবতাও একটি ভাষা।

​_______________

পরিপক্বতা মানে সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়, বরং এটি হলো বেছে নেওয়া—কোন লড়াইয়ে আপনি অংশ নেবেন আর কোনটিতে নীরব থাকবেন। সঠিক সময়ে নীরব থাকা আপনার মানসিক শক্তি বাড়ায় এবং সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করে।@ Paint with Ashraf


২৯

হিমালয় ক্রমশ আরও সবুজ হয়ে উঠছে

পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতমালা হিমালয়কে আমরা সাধারণত বরফ, হিমবাহ আর তুষারাবৃত শৃঙ্গের রাজ্য হিসেবে কল্পনা করি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন এমন একটি পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন, যা প্রথম দেখায় ইতিবাচক মনে হলেও বাস্তবে উদ্বেগের কারণ হতে পারে। হিমালয় ক্রমশ আরও সবুজ হয়ে উঠছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে উদ্ভিদ দ্রুত উপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আগে যে এলাকাগুলো অতিরিক্ত ঠান্ডা, তুষারাচ্ছন্ন বা প্রতিকূল হওয়ায় গাছপালা টিকে থাকতে পারত না, সেখানেও এখন উদ্ভিদের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, এর প্রধান কারণ হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং তুষারের স্তর কমে যাওয়া।

বিশ্ববিদ্যালয় অব এক্সেটারের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় ভারতের লাদাখ থেকে শুরু করে ভুটান পর্যন্ত ছয়টি হিমালয় অঞ্চলের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফল দেখায়, সব এলাকাতেই উদ্ভিদের সর্বোচ্চ বিস্তারের সীমা ক্রমশ উপরের দিকে সরে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রতি বছর কয়েক ফুট করে এই পরিবর্তন ঘটছে।

শুনতে বিষয়টি পরিবেশের জন্য ভালো খবর মনে হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, হিমালয়ের মতো সংবেদনশীল পরিবেশে অতিরিক্ত সবুজায়ন বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ পাহাড়ের তুষার ও বরফ শুধু সৌন্দর্যের অংশ নয়, এগুলো বিশাল প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবেও কাজ করে। উদ্ভিদের বিস্তার তুষার জমার ধরন, গলনের সময় এবং পানির প্রবাহকে পরিবর্তন করতে পারে।

এর ফলে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও সিন্ধু নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানির সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে। এই নদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল প্রায় ১৬০ কোটি মানুষের কৃষি, পানীয় জল ও দৈনন্দিন জীবন। তাই হিমালয়ের উঁচু অঞ্চলে সামান্য উদ্ভিদ বৃদ্ধিও ভবিষ্যতে বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

গবেষকরা আরও বলছেন, নতুন উদ্ভিদের আগমনে অনেক ঠান্ডা-নির্ভর স্থানীয় প্রজাতি তাদের আবাসস্থল হারাতে পারে। ফলে পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ সবুজের এই বিস্তার প্রকৃতির পুনরুদ্ধারের চিহ্ন নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের একটি নীরব সতর্কবার্তা।

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ১৯৯৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এই পরিবর্তনের প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। তাদের মতে, হিমালয়ের রং বদলানো শুধু উদ্ভিদের গল্প নয়; এটি ভবিষ্যতের পানিসম্পদ, পরিবেশ এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনের গল্প।

জলবায়ু পরিবর্তন সব সময় ধ্বংসের ছবি আঁকে না। কখনও কখনও তা নতুন সবুজের রূপ ধরে আসে। কিন্তু সেই সবুজ যদি ভুল জায়গায়, ভুল সময়ে এবং অস্বাভাবিক গতিতে জন্মায়, তবে সেটিও হতে পারে এক গভীর সংকটের পূর্বাভাস।

@ সাইন্স নিউজ


৩০


স্যামসন অপশন" 

এটি এমন একটি বিষফোড়ক নীতি ইসরায়েলের পরমাণু সুইসাইড সিসস্টেম, যা নিজের সাথে ধ্বংস করতে চায় পুরো বিশ্বকে.!

একটি বাইবেলীয় উপাখ্যান থেকে রাষ্ট্রীয় মতবাদ হলো

"স্যামসন অপশন"। এই নামটি শুনতে কাল্পনিক থ্রিলারের মতো মনে হলেও, এটি ইসরায়েলের একটি অত্যন্ত বাস্তব ও মরণকামড় পরমাণু সামরিক মতবাদ। ১৯৯১ সালে পুলিৎজার বিজয়ী সাংবাদিক সিমোর হার্শের বই "The Samson Option: Israel's Nuclear Arsenal and American Foreign Policy"-এর মাধ্যমে এটি প্রথমবারের মতো ব্যাপক আলোচনায় আসে। এই মতবাদের সারমর্ম ভয়ঙ্কররূপে সহজ: "আমরা যদি বাঁচি না, তবে তোমরাও বাঁচবে না – সমগ্র সভ্যতা আমাদের সাথে ধ্বংস হয়ে যাবে।"

এই মতবাদের নামকরণ করা হয়েছে বাইবেলের স্যামসন (স্যামসন) নামক এক ইহুদি বীরের কাহিনী থেকে। শত্রুদের হাতে বন্দী ও চরম অপমানিত হয়ে, স্যামসন শত্রুদের মন্দিরের স্তম্ভ ধরে টেনে নিজের সাথে সকলেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন। এই 'আত্মঘাতী-বিধ্বংসী' চেতনাই ইসরায়েলের স্যামসন অপশনের মূলভিত্তি, যা রাষ্ট্রটির জন্য 'লাস্ট রিসোর্ট' বা শেষ সমাধান হিসেবে কাজ করে।

স্যামসনের লক্ষ্যবস্তু গুলো কী কী.?

স্যামসন অপশানের লক্ষবস্তু শুধু শত্রুরাষ্ট্র নয় বরং পুরো মানব সভ্যতাও বিভিন্ন ফাস হওয়া গোয়েন্দা তথ্য, দলিল ও বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, স্যামসন অপশনের টার্গেট তালিকা শুধু প্রত্যক্ষ শত্রুরাষ্ট্রই নয়, বরং বৈশ্বিক পরাশক্তি, তাদের মিত্র এবং ইসলামের দুই পবিত্রতম নগরী মক্কা ও মদিনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

মক্কা-মদিনা শহর কেন লক্ষ্য? মক্কা মদিনা শহর তাদের কি ক্ষতি করলো.?

ইসরায়েলের পরিকল্পনায় মক্কা ও মদিনাকে একেবারে প্রথমেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে গভীর কৌশলগত ও মনস্তাত্ত্বিক চাল। এটি একটি 'শক্তিশালী প্রতিরোধক' হিসেবে কাজ করে। ইসরায়েলের প্রথম ও মূল হুমকি আরব বা মুসলিম বিশ্ব। আর তাই কোনো আরব বা মুসলিম রাষ্ট্র (বা জোট) যদি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সামরিক আক্রমণের চিন্তা করে, তাহলে তাদের জানতে হবে যে এর প্রত্যক্ষ ফলাফল হবে ইসলামের কেন্দ্রস্থল ধ্বংস। এটি শিয়া-সুন্নি, আরব-অনারব নির্বিশেষে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এক অবর্ণনীয় আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ট্র্যাজেডি।

এই হুমকিই আরব বিশ্বের অনেক দেশকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সোজাসুজি যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত রাখার অন্যতম প্রধান কারণ। এটি সৌদি আরব, UAE-সহ অনেক আরব রাষ্ট্রকে গোপনে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং প্রকাশ্যে সরাসরি বিরোধিতা না করতে বাধ্য করে। এটি কেবল একটি সামরিক হুমকি নয়, বরং একটি "ধর্মীয় আতঙ্কের অস্ত্র" যা মুসলিম বিশ্বকে ভয়ে বিভক্ত রাখতে সাহায্য করে।

স্যামসন অপশন কেবল আঞ্চলিক নয়, একটি বৈশ্বিক হুমকি। এর সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:

ক.ইসলামিক পবিত্র স্থান মক্কা (কাবা), মদিনা (রাসূল (সা.)-এর মাজার) – প্রথম সারির লক্ষ্য

ক.রাশিয়া ও চীন মস্কো, সেভাস্টোপল, বেইজিং, সাংহাই

মধ্যপ্রাচ্য তেহরান, দামেস্ক

অন্যান্য কৌশলগত লক্ষ্য মিশরের আসওয়ান বাঁধ

তাদের লক্ষে শুধু শত্রুরাষ্ট্র না বন্ধু রাষ্ট্রও আছে। যেমন:- ইস*রায়েলের জন্মদাতা, রক্ষাকর্তা ও সর্বমিত্র :- আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মতন দেশও। তাদের লক্ষে আছে :- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওয়াশিংটন DC ., নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, কলোরাডো (NORAD কমান্ড সেন্টার)। ইউরোপের ব্রাসেলস (ন্যাটো সদর দপ্তর), লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন, রোম.

ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞদের এই অপশানের ব্যাপারে স্বীকারোক্তি

· অধ্যাপক মার্টিন ভ্যান ক্রেভেল্ড (জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত সামরিক ইতিহাসবিদ) ২০০৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলেন:

 "আমাদের কাছে কয়েক শত পরমাণু ওয়ারহেড আছে... আমরা সেগুলো সব দিকের লক্ষ্যবস্তুতে নিক্ষেপ করতে পারি, সম্ভবত রোমেও। বেশিরভাগ ইউরোপীয় রাজধানীই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের এই সক্ষমতা আছে যে আমরা বিশ্বকে আমাদের সাথে ডুবিয়ে দিতে পারি। এবং আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি, ইসরায়েলের পতনের আগেই সেটা ঘটবে।"

তিনি আরও যোগ করেন যে, ইসরায়েল নিজেকে একটি "পাগলা কুকুর"-এর সাথে তুলনা করতে পারে, যা এতই বিপজ্জনক যে কেউ তাড়াতে ভয় পায়।

· সিমোর হার্শ তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে ইসরায়েলের জার্মান নির্মিত ডলফিন ক্লাস সাবমেরিনগুলো পরমাণু মিসাইল বহন করে এবং রাষ্ট্র চূড়ান্ত সংকটে পড়লে এগুলো বিভিন্ন বৈশ্বিক রাজধানীকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে সক্ষম।

· সিআইএ রিপোর্ট (২০০২) অনুসারে ইসরায়েলের কাছে আনুমানিক ৭৫ থেকে ৪০০টি পরমাণু অস্ত্র থাকতে পারে, যা পুরো অঞ্চলকে বহুবার ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। তাদের মতে এটি একটি প্রতিরোধক (Deterrence) "আমাদের ধ্বংস করার চেষ্টা করো না, নইলে সবার ক্ষতি হবে।" এটি একটি চরমপন্থী রাষ্ট্রীয় আত্মরক্ষা নীতি।

জিম্মিনীতি (Blackmail) "তোমাদের আমাদের সাথে সহযোগিতা করতেই হবে, আমাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, নইলে আমরা সবাইকে ধ্বংস করে দেব।" এটি একটি অমানবিক ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ।

"যদি বিশ্বের অন্য কোনো রাষ্ট্রের কাছে এমন একটি মতবাদ থাকত, যেখানে তারা তাদের মিত্র ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোর রাজধানী এবং বিশ্বের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোকে ধ্বংস করার হুমকি দিত, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাকে কী বলত?

এখন বিষয় হচ্ছে ইসরায়ে*ল নিজ যদি ধ্বংস হয় এবং অনান্য পরাশক্তি যেমন আমেরিকা,রাশিয়া, চীনকে পরমাণু হামলা চালায় তাহলে তো তারাও পরমাণু  হামলা চালাবে এবং পর্যায়ে ৩য় বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হবে আর তা অবশ্যই পারমানবিক যুদ্ধ হবে। আর পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হলে তো মানব সম্প্রদায় তো চরম হুমকির মধ্যে পড়বে ও শত শত কোটি মানুষ মারা যাবে বা খুব অল্প সংখ্যাক মানুষ বেঁচে থাকবে। হ্যা তারা এটাই চায়, তারা মূলত তাদের মাসিহার জন্য দুনিয়াকে তৈরী করতে চায়। আর এত জনসংখ্যা হলে তাদের মাসিহার গ্রহণযোগ্যতা হবে না। তাই তারা চায় একটা গ্রেট রিসেট হোক দুনিয়াতে এবং তাতে তাদের সিলেক্টেড পারসন ছাড়া সবাই মারা যাক। যাতে তাদের মাসিহা আসলে তাদের মাসিহাকে নিয়া তারা নতুন করে দুনিয়া সাজাতে পারে। আর এই পরিকল্পনা গুলো সেই ১৭৭৪ সালের দিকেই তৈরী হয়ে গেছে। ১ম বিশ্ব যুদ্ধ, ২য় বিশ্ব যুদ্ধ যে সুপরিকল্পিত ছিল এবং ৩য় বিশ্বযুদ্ধও যে সুপরিকল্পিত যা মিডিল ইস্ট থেকে শুরু হবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে আমার এই পোস্ট পড়ুন:- https://www.facebook.com/share/v/14KVDbv7Fe8/

এখন আসি আরেক আরেকটা কথায় ইসরা*য়েল হচ্ছে ইহু*দীদের কেন্দ্র বিন্দু, এখন ইসরায়েল ও যদি তার মিত্র পক্ষের সবাই যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে তারা কিভাবে তাদের মাসিহা নিয়ে দুনিয়া পুনরায় সাজাবে। @ নাফিজ


৩১

খরগোশ

খরগোশ প্রকৃতিতে বেঁচে থাকার জন্য এক বিশেষ ধরনের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে বিবর্তিত হয়েছে। তাদের চোখ মাথার দুই পাশে অবস্থিত হওয়ায় তারা প্রায় ৩৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত চারপাশ দেখতে সক্ষম। এই বিশেষ গঠন তাদেরকে পিছনের দিকেও বড় অংশ দেখতে সাহায্য করে, ফলে তারা সহজেই শিকারি প্রাণীর উপস্থিতি টের পায়। তাই বলা যায়, মাথা না ঘুরিয়েও তারা প্রায় পুরো পরিবেশের বড় একটি অংশ পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

খরগোশ মূলত শিকার প্রাণী (prey species), তাই প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য তাদের এই বিস্তৃত দৃষ্টিক্ষেত্র (wide field of vision) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাদের দ্রুত বিপদ শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

তবে এই সুবিধার একটি সীমাবদ্ধতাও আছে। তাদের সামনে ঠিক নাকের কাছে একটি “blind spot” থাকে, যেখানে তারা খুব ভালোভাবে দেখতে পারে না। তাই তারা প্রায়ই ঘ্রাণ ও কান ব্যবহার করে পরিবেশ বুঝে নেয়। এছাড়া খরগোশের চোখের গঠন তাদের দ্রুত গতিতে দৌড়ানোর সময়ও চারপাশ পর্যবেক্ষণে সাহায্য করে, যা শিকারি থেকে পালানোর ক্ষেত্রে কার্যকর।



৩২

মানুষ কেন প্রশংসার চেয়ে দুর্নাম বেশি বিশ্বাস করে, তা বোঝা বর্তমান সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মনোবিজ্ঞানে “Negativity Bias” নামে একটি ধারণা রয়েছে, যার অর্থ হলো মানুষের মস্তিষ্ক নেতিবাচক তথ্যকে ইতিবাচক তথ্যের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেয়। কেউ যদি শুনে কোনো ব্যক্তি দশটি ভালো কাজ করেছেন, আর একটি খারাপ কাজ করেছেন, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে সেই একটিমাত্র খারাপ কাজই মানুষের মনে বেশি জায়গা করে নেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিপদ বা হুমকি সম্পর্কিত তথ্য দ্রুত শনাক্ত করা মানুষের বিবর্তনগত বৈশিষ্ট্য, কারণ অতীতে এটি বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। ফলে মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক খবরের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। কোনো ব্যক্তির সাফল্যের খবর বা প্রশংসামূলক তথ্য যতটা না শেয়ার হয়, তার চেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে বিতর্ক, সমালোচনা বা কেলেঙ্কারির খবর। কারণ নেতিবাচক সংবাদ মানুষের মধ্যে কৌতূহল, বিস্ময় ও আবেগ সৃষ্টি করে, যা দ্রুত প্রতিক্রিয়া আনতে সাহায্য করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নেতিবাচক শিরোনাম ইতিবাচক শিরোনামের তুলনায় বেশি ক্লিক ও বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে। ফলে অনেক সময় ভিত্তিহীন গুজবও সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

সামাজিক রীতিনীতি ও সংস্কৃতিও এই প্রবণতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক সমাজে মানুষ অন্যের সাফল্যের প্রশংসা করতে কুণ্ঠাবোধ করে, কারণ এতে ঈর্ষা, প্রতিযোগিতা বা আত্মতুলনার অনুভূতি কাজ করতে পারে। কিন্তু কারো ব্যর্থতা বা দুর্নাম শুনলে অনেকেই সেটিকে সহজে গ্রহণ করেন, কারণ এতে নিজের অবস্থানকে তুলনামূলকভাবে ভালো মনে হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, গসিপ বা পরনিন্দা সামাজিক বন্ধনের একটি পুরোনো রূপ হলেও এটি প্রায়ই সত্যকে বিকৃত করে এবং মানুষের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আরেকটি কারণ হলো মানুষ সাধারণত খারাপ খবরের ক্ষেত্রে প্রমাণের চেয়ে আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেয়। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অনেকেই “ধোঁয়া আছে মানেই আগুন আছে” ধরনের ধারণা পোষণ করেন। অথচ বাস্তবে অনেক অভিযোগই পরে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত প্রমাণিত হয়। অন্যদিকে কারো প্রশংসা শুনলে মানুষ সন্দেহ করে যে হয়তো প্রশংসাকারীর ব্যক্তিগত স্বার্থ রয়েছে। ফলে সুনাম প্রতিষ্ঠা করতে দীর্ঘ সময় লাগে, কিন্তু দুর্নাম ছড়াতে কয়েক মিনিটই যথেষ্ট হয়।

একজন মানুষের চরিত্র, সততা ও অবদান বিচার করার ক্ষেত্রে শুধু শোনা কথার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। কারণ প্রশংসা যেমন কখনো অতিরঞ্জিত হতে পারে, তেমনি দুর্নামও হতে পারে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। @ SAM Motivation


৩৩

৯,০০০ বছরের পুরাতন একটা সমাজ

আল-জাজিরা খুবই ইন্টারেস্টিং একটা নিউজ কভার করেছে। তারা জানাচ্ছে, তুরস্কের প্রত্নতত্ত্ববিদরা ৯,০০০ বছরের পুরাতন একটা সমাজের সন্ধান পেয়েছে, যারা ছিল মাতৃতান্ত্রিক।

গত প্রায় এক দশক ধরে তুরস্কের একটা গবেষণা দল দেশটার Catalhoyuk শহরে ৯,০০০ বছরের পুরাতন একটা শহরের মাটির নিচে পাওয়া প্রায় ৩০০ কঙ্কাল এবং অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নিয়ে গবেষণা করেছে।

কঙ্কালগুলোর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে এবং অন্যান্য লক্ষণ বিশ্লেষণ করে তারা সিদ্ধান্তে এসেছে, ঐ সমাজে মহিলারা বিয়ের পর তাদের বাড়ি ছেড়ে যেত না। বরং পুরুষরাই তাদের বাড়ি ছেড়ে মহিলার বাড়িতে গিয়ে উঠত।

মহিলাদেরকে কবর দেওয়া হতো তাদের মা-বোনদের পাশে, বাড়ির কাছাকাছি। এবং তাদের পাশে থাকত অন্য বাড়ি থেকে আসা তাদের স্বামীরা।

এগুলো এবং অন্যান্য আরও প্রমাণ থেকেই তারা সিদ্ধান্তে আসে, এই সমাজটা ছিল মাতৃকেন্দ্রিক।

এই সমাজটা এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রাচীনতম সমাজগুলোর মধ্যে একটা। গবেষকদের মতে এটা স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ১,০০০ বছর। এবং এই সময়ের মধ্যে এর সর্বোচ্চ জনসংখ্যা ছিল তিন থেকে আট হাজারের মধ্যে। @ আল-জাজিরা


৩৪


"ছোট্ট শিশুদের হাতের মুঠি এত শক্তিশালী কেন হয়?

আসলে এটি একটি আদিম জীবনদায়ী প্রতিবর্ত ক্রিয়া (Primitive Reflex)

যার শিকড় আমাদের “না মানুষ” পূর্বপুরুষে।

আমাদের ঘন লোমশ সাধারণ পূর্বপুরুষদের সময় শিশুরা জন্মের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের শরীরের লোম শক্তভাবে আঁকড়ে ধরত।

এটিকে “পামার গ্রাসপ রিফ্লেক্স” বলে (Palmar Grasp Reflex)।

এই রিফ্লেক্সটি তখনই প্রাকৃতিক নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিল যখন আধুনিক মানুষদের বেশিরভাগ পূর্বপুরুষরা গাছে বসবাস করত এবং গাছের ওপরেই শিশুর জন্ম দিত (Arboreal primates)।

তারা শিকারী প্রাণীদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে এবং নিজেদের সুরক্ষার জন্য মাটির চেয়ে গাছের উঁচু ডালকেই প্রসবের নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিল।

মা যখন এক গাছ থেকে অন্য গাছে যেত, তখন পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে এই মুঠি সাহায্য করত। এটি মূলত টিকে থাকার লড়াইয়ে এক ধরণের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছিল।

তখন যেসব সদ্যোজাত শিশুগুলি মায়ের লোম জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই শক্তভাবে আঁকড়ে ধরত এবং নিচে পড়ে যেতনা, তারাই বয়স্ক হয়ে সন্তানের জন্ম দিতে সক্ষম হত, অর্থাৎ প্রাকৃতিক নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিল, বাকিরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এখনকার বানররা তো সব গাছে প্রসব করেই, বৃক্ষবাসী বা গাছে বসবাসকারী বেশিরভাগ অমানব প্রাইমেটসরাও শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচতে এবং নিরাপত্তার জন্য গাছের ডালে বা মাচায় প্রসব করে, যেমন ওরাংওটাং , এরা গাছের ডালে প্রসব করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুপরিচিত, প্রসবের দিন এগিয়ে এলে মা ওরাংওটাং গাছের উঁচুতে শক্ত ডালপালা এবং নরম পাতা দিয়ে একটি অত্যন্ত মজবুত ও বাটি আকৃতির বাসা বা মাচা তৈরি করে, তারা এই বাসার ভেতরেই সম্পূর্ণ একাকী এবং নিরিবিলিতে সন্তান প্রসব করে, যাতে কোন শিকারী প্রাণী বা স্থলচর শত্রু তাদের ক্ষতি করতে না পারে।

এছাড়া আরেক প্রাইমেট গিবন বানররা তাদের জীবনের প্রায় সম্পূর্ণ সময় গাছের ডালে কাটায়, এরা গাছের উঁচুতে থাকা ডালপালা আঁকড়ে ধরে থাকা অবস্থাতেই সন্তান প্রসব করে. প্রসবের পরপরই মা গিবন নবজাতককে টেনে তার বুকের কাছে নিয়ে আসে, নবজাতক পামার গ্রাসপ রিফ্লেক্সের কারণে মায়ের বুকের লোম সবসময় শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকে, এই মুঠি এতটাই শক্তিশালী হয় যে এটি শিশুর নিজের শরীরের পুরো ওজন ধরে রাখতে পারে এবং বানরেরা শিশুসহ এক ডাল থেকে অন্য ডালে ঝাঁপ দিলেও শিশু নিরাপদ থাকে।

এখনকার মানব শিশুদের ক্ষেত্রে এটি একটি “বিবর্তনীয় অবশেষ” (Vestigial behaviour);

এটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত বা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবর্ত ক্রিয়া।

শিশুর হাতের তালুতে সামান্য স্পর্শ করলেই আঙুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

এই রিফ্লেক্সটি মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থাতেই (প্রায় ১৬ সপ্তাহের দিকে) তৈরি হয়। জন্মের পর থেকে এটি খুবই সক্রিয় থাকে এবং সাধারণত শিশুর ৩ থেকে ৬ মাস বয়সের মধ্যে এটি স্বাভাবিকভাবে কমে যায়, ৫ বা ৬ মাস বয়সের পর থেকে শিশুরা নিজের ইচ্ছায় কোন কিছু ধরা বা ছাড়ার ক্ষমতা অর্জন করে। নবজাতকে এই রিফ্লেক্সটি মস্তিষ্ককাণ্ড ও সুষুম্নাকান্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। @ বিজ্ঞান কথা

বিস্তারিত জানতে পড়ুন :-

https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC3384944/

https://www.stanfordchildrens.org/en/topic/default...

https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC4305166/

https://www.orangutans-sos.org/how-do-orangutans-give.../

https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC5121892



৩৫


মানুষ যে ধর্ম ও পরিবেশে বেড়ে উঠে সেটাতেই অভ্যস্থ হয়ে যায়৷ 

মান্দাই  ধর্মাবলম্বীরা একেশ্বরবাদী হলেও তাদের মধ্যে দ্বৈতনীতি লক্ষ্য করা যায়। এ ধর্মের অনুশীলন বেশি লক্ষ্য করা যায় ইরাক ও ইরানে৷ দুদেশেই এখন হাজার পাচেক করে আছেন৷ ইরাক-ইরান যুদ্ধ ও আইএসের নিপীড়নে হাজার হাজার মান্দাই দেশ ছেড়েছেন কিন্তু ধর্ম ছাড়েননি৷ তারা বিশ্বাস করে তাদের ধর্মই শ্রেষ্ঠ এবং তারাই স্বর্গে যাবেন৷ বাকি বিশ্বে এখন হাজার পঞ্চাশেক মান্দাই আছেন। তারা আলোকে পিতা ও অন্ধকারকে মাতা হিসেবে বিশ্বাস করে। আলো ও অন্ধকারের মিলনেই মানবজাতির সৃষ্টি৷ আত্মা অবিনশ্বর বলে তাদের বিশ্বাস। মৃত্যুর পর তাকে ফিরে যেতে হবে তার ঠিকানায়। ভাগ্যের উপর গ্রহ নক্ষত্রের  প্রভাব রয়েছে বলে তাদের বিশ্বাস। এই বিশ্বাসে তারা অটল থাকে হাজারো ধর্ষণ ও রক্তপাতে।

জরথুষ্ট্র, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের সংমিশ্রণে ইয়াজেদি ধর্ম তৈরি বলে মনে করা হয়। এ ধর্মের নবী শেখ আদি ইবনে মুসাফির মুসলমানদের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর পরেই আসেন। তিনি উমাইয়া খলিফা মারওয়ান বিন আল হাকামের একজন উত্তরসূরী ছিলেন। অর্থাৎ তিনি পারিবারিকভাবে মুসলিম ছিলেন এবং নতুন ধর্ম প্রবর্তন করেন। তার ধর্ম মতে, তিনিও গুহায় ধ্যান করে অলৌকিক শক্তির অধিকারী হন। তারা আজাজিল মানে শয়তান অর্থাৎ মালিক তাউসকে প্রধান ফেরেস্তা হিসাবে উপাসনা করেন।

এই ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা সাত লক্ষ ছিল। তাদের নারীদের ইসলামিক স্ট্যাটস (আইএস) এর সৈন্যরা ধরে ধরে যৌনদাসী বানিয়েছে। আইএসের নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডে তাদের সংখ্যা অনেক কমেছে। এরপরেও তারা কেন তাদের ধর্ম বিশ্বাস ত্যাগ করে ইসলামে যাচ্ছে না। কেন? নিপীড়নে ৮০% মান্দাই দেশ ছাড়লেন কিন্তু ইসলামে আসলেন না? তারাও ভাবছেন তাদের ধর্মই শ্রেষ্ঠ এবং স্রষ্টা পরীক্ষা নিচ্ছেন৷

তাহলে ইসলামের পরে যে ব্যক্তি নবী দাবি করছেন তার নবুয়াত মুসলিমদের মতে ভ্রান্ত। অথচ তারাও দাবী করছে তাদের ধর্মই শ্রেষ্ঠ৷ তাদের নবী শেষ নবী৷ পারস্যেই ছিলেন নবী মণি৷ তার ধর্ম ইসলাম আগমনের আগে পারস্যের প্রধান ধর্ম ছিল৷ তিনিও দাবী করতেন শ্রেষ্ঠ ও শেষ নবী এবং সত্য ও শ্রেষ্ঠ ধর্ম!

এতো কিছু জেনেও ইয়াজেদিরা তাদের ধর্ম বিশ্বাসে অটুট রয়েছেন এবং শয়তানের উপাসনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের ভরসার স্থান ঈশ্বর, মালিক তাউস (ময়ুর দেবতা-শয়তান) আর নবী শেখ আদি। তাদের ধর্ম-বিশ্বাস পৃথিবীর আরো ৪২৯৯টি ধর্মাবলম্বীর কাছেই ভ্রান্ত। অথচ তারা নিশ্চিত তাদের নবীই সঠিক, তাদের ঈশ্বর এবং ফেরেস্তা শয়তান বা আজাজিল বা মালিক তাউসই সত্য-শ্রেষ্ঠ। তারা মনে করে পৃথিবীর অন্য সকল ধর্মই মিথ্যা এবং ভুল। শুধু তাদের ধর্মাবলম্বীরাই স্বর্গে যাবে। তাদের ধর্মাবলম্বীদের জন্য মালিক তাউস দোজখ নিভিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু অন্যদের জন্য জ্বালিয়ে রেখেছেন৷ মানে হল ইয়াজেদি ছাড়া অন্যরা দোজখে জ্বলবে!

একই ধরনের বিশ্বাস সব ধর্মকেই টিকিয়ে রেখেছে। এ প্রগাঢ় বিশ্বাসের কারণেই হিন্দু, খৃস্টান, ইহুদী, জরথুষ্ট্র, শিখ, জৈন, ইসলামসহ সকল ধর্মের মানুষই মনে করে তাদের ধর্মই একমাত্র সঠিক, স্বর্গের নিশ্চয়তা দেয়। অন্য ধর্ম ভুল। তাই তারা যত নিপীড়িত হয় ততই ঈশ্বরের আশির্বাদ বলে মনে করে।

ইয়াজিদি নারী ইরাকের নোবেলজয়ী নাদিয়া মুরাদ ইসলামিক স্ট্যাটের জঙ্গীদের যৌনদাসী ছিলেন। একাধিকবার হাতবদল হয়েছেন। প্রতিদিনই বহুবার ধর্ষিতা হয়েছেন। তারপর তাদের ঈশ্বর তাকে পালানোর সুযোগ করে দেন। যে ঈশ্বর, আজাজিল ফেরেস্তা তাউস তাকে এতো নিপীড়নের মুখে রাখলো, তারপরও তিনিও তাঁর ধর্ম ইয়াজিদি ছাড়েননি। পরীক্ষা বলে কথা! আইএসের বিপুল হত্যাকাণ্ডে কতজন ইয়াজিদি নিহত হয়েছেন এবং এখন কতজন টিকে আছেন শয়তানের উপাসনা করার জন্য তার সঠিক তথ্যও নেই। মান্দাইদের কথাও আমরা নিশ্চিত জানি না৷ জরথুষ্ট্ররা পারস্য ছেড়ে ভারতে এসে টিকে আছে৷ ইন্দিরা গান্ধীর স্বামী ফিরোজ গান্ধী, টাটা গোষ্ঠী ও ভারতের শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী জাহাঙ্গীর ভাভার ধর্ম জরথুষ্ট্র!

শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বাস এতোটাই শক্তিশালী যে তার জন্য জীবন দিচ্ছে অকাতরে। কিন্তু কেউ কোন ধর্মই নিপীড়নের মুখেও ছাড়তে চায় না এ সময়ে। মনি ধর্মসহ হাজার হাজার ধর্ম বিলুপ্তও হয়েছে৷ তবে টিকে থাকা ধর্মও ৪৩০০টি৷ বিলুপ্ত ধর্মগুলোর শেষ বিশ্বাসীও ভাবতো তার ধর্মই শ্রেষ্ঠ! @ Mojib Rahman



৩৬

​খাবারে বৈচিত্র্য আনুন, সুস্থ থাকুন।

আজকের দিনে আমাদের আধুনিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে মূলত 'কয়েকটি নির্দিষ্ট শস্যকেন্দ্রিক' (প্রধানত চাল ও গম) হয়ে পড়লেও, অতীতে তা কখনোই এমন ছিল না। সবুজ বিপ্লবের (Green Revolution) আগে জোয়ার, বাজরা, রাগি প্রভৃতি মিলেট ছিল অনেক অঞ্চলের প্রধান খাদ্য (প্রায় ৪০% শস্য)। তখনকার খাদ্যতালিকা ছিল অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়; থালায় থাকত মিলেট, নানা পদের ডাল, এবং দৈনন্দিন খাবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল দুধ, দই, মাখন, ঘি ও তাজা ফলমূল। এর পাশাপাশি থাকত রকমারি শাকসবজি এবং প্রয়োজন ও প্রাপ্যতা অনুযায়ী মাছ-মাংস। এই পুষ্টির বৈচিত্র্যই ছিল সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি।

​শস্য (চাল ও গম) কেন প্রধান ফসল হয়ে উঠল?

​ সস্তা

সহজে সংরক্ষণযোগ্য

চাষ করা সহজ

কায়িক শ্রমের জন্য দ্রুত শক্তি

​দুর্ভিক্ষের সময় শস্যই ছিল প্রাণ বাঁচানোর একমাত্র অবলম্বন। ভারতীয় উপমহাদেশে বারবার এমন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছে, যেমন ১৭৭০-এর বাংলার মহাদুর্ভিক্ষ, ১৮৭৬-৭৮-এর গ্রেট ফেমিন, ১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি। এই বিপুল জনসংখ্যাকে ক্ষুধার হাত থেকে বাঁচাতে এবং খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতেই সবুজ বিপ্লবে চাল ও গমের মতো দ্রুত শক্তিবর্ধক শস্যকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়। সবার মুখে দ্রুত পর্যাপ্ত ক্যালরি তুলে দেওয়ার এই তাগিদে, আমাদের খাদ্যাভ্যাস থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে আগের সেই পুষ্টির বৈচিত্র্য।

​আমরা শস্যকে সুস্বাদু করতে দারুণ সব কৌশল বের করেছিলাম:

সাদা রুটি + ঘি + মশলাদার তরকারি = সুস্বাদু

ময়দার তাল + তেল + চিনি = জিলাপি/লুচি = অসাধারণ!

​কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন:

​আজ আর সেই অর্থে দুর্ভিক্ষ নেই। কায়িক শ্রমও আগের তুলনায় অনেক কম। বেশিরভাগ মানুষ এখন সেডেন্টারি বা বসে থাকার জীবনযাপন করেন।

​তবুও অতীতের অভ্যাস মেনে একইভাবে প্রচুর সাদা চাল ও ময়দা খাওয়া চালিয়ে যাওয়া বিপৎজনক। এটি টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ওবেসিটি ও বিপাকীয় রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। দুঃখজনকভাবে, আমাদের এই অঞ্চল এখন বিশ্বের অন্যতম ডায়াবেটিস হটস্পট।

​সময় এসেছে পরিবর্তনের।

​শুধুমাত্র শস্যকেন্দ্রিক একঘেয়ে খাদ্যতালিকা থেকে সরে এসে হারানো সেই বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্যাভ্যাস পুনরায় গ্রহণ করুন। আপনার পাতের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে থাকুক প্রোটিন এবং ফাইবার—ডাল, দই, ডিম, মাছ, মাংস, পনির, তাজা ফল, হরেক রকমের সবজি এবং অবশ্যই প্রাচীন মিলেট বেশি করে খান। @ Plabon Sarkar



৩৭

বিবর্তন ঘটছে প্রতিনিয়ত, আপনার শরীরের ভেতরে

একটা দৃশ্য কল্পনা করুন। আপনি অন্ধকার ঘরে বসে আছেন। সামনে একটি দরজা। দরজার ওপাশে আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু। আপনি দরজা শক্ত করে বন্ধ করে দিলেন। কিছুদিন পর দেখলেন, সে নতুন চাবি বানিয়ে তালা খুলে ফেলেছে। আপনি পাথর বাঁধলেন, সে দেয়াল টপকানো শিখে নিল। আপনি বিষ ছড়ালেন, সে সেই বিষ হজম করার ক্ষমতা অর্জন করল।

এই যে লুকোচুরির খেলা, টিকে থাকার লড়াই—এটাই বিবর্তন। আমরা ভাবি বিবর্তন মানে কোটি কোটি বছর আগে ডাইনোসরের বিলুপ্তি বা বানর থেকে মানুষ হওয়ার গল্প। কিন্তু সত্যটা হলো, বিবর্তন ঘটছে এই মুহূর্তে, আপনার শরীরের ভেতরে। আপনার রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে, প্রতিটি কোষে এক অদৃশ্য যুদ্ধ চলছে।

আজ আমরা জানব কেন এক সময়ের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আজ অকেজো হয়ে পড়ছে, কেন ভাইরাস প্রতি বছর তার রূপ বদলায়, কেন ক্যান্সার বারবার ফিরে আসে, আর কেন আমাদের শরীরের জ্বর বা ব্যথার মতো কষ্টগুলো আসলে পরম বন্ধু।

ফিরে যাই ১৯২৮ সালে। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করলেন। পৃথিবীজুড়ে হইচই পড়ে গেল। মানুষ ভাবল আমরা মৃত্যুকে জয় করে ফেলেছি! সাধারণ ইনফেকশনে আর কেউ মারা যাবে না। কিন্তু প্রকৃতি মুচকি হাসছিল।

বিজ্ঞান আমাদের শেখায় "Survival of the Fittest" বা যোগ্যতমের জয়। যখন আমরা শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক দিই, তখন কোটি কোটি ব্যাকটেরিয়ার ওপর মরণ কামড় পড়ে। অধিকাংশ দুর্বল ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। কিন্তু তাদের মধ্যে দুই-একটি এমন থাকে, যাদের জিনে বিশেষ মিউটেশন ঘটেছে। তারা সেই বিষাক্ত ওষুধেও মরছে না। বাকি সব মারা যাওয়ায় এই সুপার ব্যাকটেরিয়াগুলোর জন্য পুরো ময়দান খালি হয়ে যায়। তারা দ্বিগুণ উৎসাহে বংশবিস্তার শুরু করে। কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই তৈরি হয় এমন এক বাহিনী, যাদের ওপর আমাদের শক্তিশালী ওষুধ আর কাজ করে না।

মানুষ যত ওষুধ বানায়, বিবর্তন তত বেশি শেখায় জীবাণুকে—কীভাবে আরও শক্তপোক্ত হয়ে ফিরতে হয়।  

এবার ভাবুন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা সাধারণ ফ্লু ভাইরাসের কথা। আপনি কি কখনো ভেবেছেন, কেন প্রতি বছর আমাদের নতুন করে ফ্লু ভ্যাকসিন নিতে হয়? কেন একবার টিকা দিলেই সারা জীবনের মুক্তি মেলে না?

ভাইরাস কোনো স্থির সত্তা নয়। এরা বিবর্তনের সবচেয়ে দ্রুতগামী খেলোয়াড়। বিশেষ করে ফ্লু বা করোনার মতো প্যাথোজেনগুলো প্রতিনিয়ত তাদের জিনগত কাঠামো বদলায়। একে বলে "অ্যান্টিজেনিক শিফট বা ড্রিফ্ট"।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা যখন একটি টিকা তৈরি করেন, সেটি ভাইরাসের একটি নির্দিষ্ট চেহারার বিরুদ্ধে কাজ করে। কিন্তু ভাইরাস যখন মুখোশ বদলে ফেলে, তখন আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাকে আর চিনতে পারে না। তাই বিজ্ঞানীদের সারাবছর গোয়েন্দার মতো ভাইরাসের বিবর্তনীয় গতিপথ পর্যবেক্ষণ করতে হয়। তারা বোঝার চেষ্টা করেন, আগামী বছর ভাইরাসটি কোন রূপ ধারণ করতে পারে। 

ক্যান্সার নামটা শুনলেই আমাদের মনে গভীর আতঙ্ক দানা বাঁধে। কিন্তু ক্যান্সার আসলে কী? এটি আমাদের নিজস্ব কোষেরই এক অনিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহ।

আমাদের শরীরের ভেতরেই ক্যান্সার কোষগুলো বিবর্তিত হতে থাকে। একটি টিউমারের ভেতরে হাজার হাজার রকমের কোষ থাকতে পারে। আপনি যখন কেমোথেরাপি দিচ্ছেন, তখন হয়তো অধিকাংশ কোষ মারা যায়। কিন্তু ডারউইনের নিয়ম এখানেও অমোঘ—যে কোষগুলো ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তারা টিকে যায়। তারা পুনরায় বিভাজিত হয়ে এমন ক্যান্সার তৈরি করে যা আগের চেয়েও ভয়ংকর।

এ কারণেই আধুনিক চিকিৎসায় এখন "কম্বিনেশন থেরাপি" বা যৌথ চিকিৎসা ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসকরা একসঙ্গে একাধিক পথে আক্রমণ চালান, যাতে ক্যান্সার কোষগুলো বিবর্তিত হওয়ার সময় না পায়। তবে এখানেও নতুন সমস্যা আছে। টিউমারের মাঝে কিছু কোষ থাকে "পার্সিস্টার সেল"—এরা কেমোথেরাপি চলাকালীন ঘুমিয়ে থাকে। ওষুধ শেষ হলে আবার জেগে ওঠে। তাই গবেষকরা এখন "অ্যাডাপটিভ থেরাপি" নিয়ে কাজ করছেন, যেখানে লক্ষ্য ক্যান্সার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা নয়, বরং তাকে স্থিতিশীল রাখা। ওষুধ দেওয়া হয় সামান্য মাত্রায়, যাতে সবচেয়ে সংবেদনশীল কোষ মরে, কিন্তু প্রতিরোধী কোষদের দখল নেওয়ার সুযোগ না পায়।

জ্বর, বমি, ডায়রিয়া, ব্যথা এগুলোকে আমরা সাধারণত অসুস্থতার লক্ষণ বা নেতিবাচক কিছু মনে করি। আমরা দ্রুত ওষুধ দিয়ে এগুলো চেপে দিতে চাই। কিন্তু বিবর্তন কী বলে?

কোটি কোটি বছর ধরে আমাদের শরীর কিছু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। জ্বর: শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি আসলে জীবাণুর বংশবৃদ্ধি কমিয়ে দেওয়ার কৌশল। গবেষণা বলছে, ৩৮-৩৯ ডিগ্রি জ্বরে কিছু ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি ২০০ গুণ কমে যায়। আর টি-সেল নামের রোগ প্রতিরোধী কোষগুলো তখন আরও সক্রিয় হয়। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব রোগী জ্বরে প্যারাসিটামল খান, তাদের সংক্রমণ থেকে সুস্থ হতে গড়ে এক দিন বেশি লাগে।

একইভাবে বমি বা ডায়রিয়া হলো শরীর থেকে বিষ বের করে দেওয়ার জরুরি প্রস্থান পথ। আর ব্যথা? ব্যথা যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু এটি নিরাপত্তার বর্ম। কনজেনিটাল ইনসেনসিটিভিটি টু পেইন (জন্মগত ব্যথা অনুভব না করার ব্যাধি) যাদের আছে, তারা প্রায়ই নিজের হাত-পা কামড়ে ফেলে, জিভ পুড়িয়ে ফেলে, কারণ তারা বুঝতে পারে না শরীর বিপদে পড়েছে। তারা খুব কম বয়সেই মারাত্মক আঘাত পায়। তাই ব্যথা আসলে বিপদ সংকেত।

আমরা যদি শরীরের এই বিবর্তনীয় সংকেত না বুঝে কেবল ওষুধ দিয়ে লক্ষণ চেপে দিই, তবে আমরা আসলে শরীরের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকেই দুর্বল করে দিচ্ছি।

এবার আরেকটি নতুন তথ্য যোগ করি। আপনার শরীরের ভেতরে এক বিশাল সাম্রাজ্য আছে, যার নাম মাইক্রোবায়োম। আপনার পেট, চামড়া, মুখের ভেতর লাখ লাখ জীবাণু বাস করে। এদের অধিকাংশই বন্ধু। কিন্তু আপনি যখন শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক নেন, তখন শুধু খারাপ ব্যাকটেরিয়াই মরে না, উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোও মারা যায়। ফলে সুযোগ বুঝে ক্লস্ট্রিডিয়াম ডিফিসিল নামের এক জীবাণু বংশবিস্তার করে, যা মারাত্মক ডায়রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। একে বলে ডিসবায়োসিস।

মানুষ এবং জীবাণুর মধ্যে এই যুদ্ধ আদিম কাল থেকে চলছে এবং সম্ভবত অনন্তকাল চলবে। এটি একটি চলমান অভিযোজন। বিজ্ঞান কখনো স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না, কারণ জীবন নিজে কখনো স্থির নয়। @Bigyan Tottho



৩৮

“নক্ষত্র মরলে তার গ্রহ-উপগ্রহের কি হয়?

মহাকাশের বিশাল মঞ্চে নক্ষত্রেরা চিরস্থায়ী নয়। একটি নক্ষত্র যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার ভর ও প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে তার পরিণতি ভিন্ন হয়—সাদা বামন, নিউট্রন তারা কিংবা কৃষ্ণগহ্বরে রূপ নেয়। আর এই নক্ষত্রের মৃত্যুর প্রভাব পড়ে তার আশপাশের গ্রহ-উপগ্রহের উপর, যাদের কপালে জোটে চরম বৈরী পরিণতি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গ্রহ-উপগ্রহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, অথবা চিরদিনের জন্য নিজ কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যায়।

মাঝারি আকারের নক্ষত্র (যেমন সূর্য) যখন মৃত্যুর আগে লাল দানবে পরিণত হয়, তখন সেটি প্রচণ্ডভাবে স্ফীত হয়ে যায়। এতে নিকটবর্তী গ্রহগুলো নক্ষত্রের গ্যাসীয় স্তরে বিলীন হয়ে যায়। পৃথিবী থেকে শুরু করে অনেক অভ্যন্তরীণ গ্রহ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। দূরবর্তী গ্রহ ও চাঁদগুলো কিছুদিন উত্তপ্ত থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের বায়ুমণ্ডল ও পৃষ্ঠের জলীয় বাষ্প উড়ে যাবে।

ভারী নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটে সুপারনোভা বিস্ফোরণে। এক মুহূর্তে সূর্যের চেয়ে কোটি কোটি গুণ উজ্জ্বল শক্তি নির্গত হয়। এই বিস্ফোরণের তীব্র বিকিরণ ও শকওয়েভের কাছে কোনো গ্রহ-উপগ্রহ টিকতে পারে না। তারা সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত অথবা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে।

বিস্ফোরণে টিকে যাওয়া দূরবর্তী গ্রহগুলো যদি কোনোভাবে ধ্বংস না হয়, তাহলে তারা নক্ষত্রের মৃত দেহ—সাদা বামন বা নিউট্রন তারার চারপাশে থাকে। কিন্তু সেখানেও আর প্রাণ বা স্থিতিশীলতা থাকে না। তীব্র বিকিরণ ও মাধ্যাকর্ষণ অনিয়মিত টানে গ্রহগুলো ধীরে ধীরে ভেসে যায় বা ভেঙে পড়ে। অনেক সময় গ্রহটি টুকরো টুকরো হয়ে ধ্বংসাবশেষের বলয় সৃষ্টি করে।

বৃহত্তম নক্ষত্র মৃত্যুর পর কৃষ্ণগহ্বরে পরিণত হয়। কাছের কোন গ্রহ বা চাঁদ কৃষ্ণগহ্বরের মহাকর্ষীয় সীমানা (ইভেন্ট হরাইজন) পার করলে তা চিরদিনের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। এর ভেতরে পদার্থ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে একক বিন্দুতে বিলীন হয়।

কিছু তাত্ত্বিক মডেল বলে, অতি দূরবর্তী এবং সঠিক কক্ষপথে থাকা গ্রহেরা হয়তো মৃত্যুকে ফাঁকি দিতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষেত্রেও গ্রহটি নিঃসঙ্গ ও অনাথ হয়ে যায়—আর কোনো নক্ষত্রের তাপ ও আলো পায় না। সেখানে তাপমাত্রা পরম শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসে। জমে বরফ হয়ে যাওয়া সেই জগৎ চিরঅন্ধকারে ভেসে বেড়ায়।

“নক্ষত্র মরলে তার গ্রহ-উপগ্রহের কপালে ধ্বংস, নির্বাসন আর অনন্ত শূন্যতা।” তবুও এই মৃত্যুই নতুন নক্ষত্র ও গ্রহের জন্ম দেয়। আমাদের সৌরজগতে স্বর্ণ, ইউরেনিয়াম, রূপার মতো ভারী মৌলগুলো আগের নক্ষত্রের মৃত্যুরই স্মৃতিচিহ্ন। তাই শুধু ধ্বংস নয়, মহাকাশের এই চক্রে মৃত্যু সৃষ্টিরও বীজ বপন করে।@Bigyan Tottho


৩৯

মহাজাগতিক বিপর্যয়

৬৬ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে আঘাত হেনেছিল ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর মহাজাগতিক বিপর্যয়। প্রায় ১৫ কিলোমিটার ব্যাসের চিক্সুলুব (Chicxulub) গ্রহাণুর আঘাতে বিলুপ্ত হয়ে যায় পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি, যার মধ্যে ছিল ডাইনোসরদের অধিকাংশও। এতদিন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, এই বিধ্বংসী সংঘর্ষের পর আঘাতস্থলটি প্রায় ২০ লক্ষ বছরের মধ্যে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, বাস্তবতা ছিল আরও বিস্ময়কর।

ব্রিটেনের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যানেমারি পিকার্সগিল এবং তাঁর সহকর্মীদের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপে অবস্থিত চিক্সুলুব গহ্বরের নিচে তাপীয় কার্যকলাপ অন্তত ৮০ লক্ষ বছর ধরে সক্রিয় ছিল। অর্থাৎ গ্রহাণুর আঘাতের বহু মিলিয়ন বছর পরও ভূগর্ভে গরম পানি প্রবাহিত হচ্ছিল এবং সেখানে টিকে ছিল অণুজীবের এক বিশাল বাস্তুতন্ত্র।

গবেষকদের মতে, সংঘর্ষটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে পৃথিবীর পৃষ্ঠের অন্তত ৩৫ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত শিলাস্তর বিকৃত হয়ে যায়। আঘাতের ফলে প্রায় ১০ হাজার ঘনকিলোমিটার শিলা গলে যায়। গলিত শিলা ও সমুদ্রের পানির মিশ্রণে তৈরি হয় ছিদ্রযুক্ত ভূগর্ভস্থ পরিবেশ, যেখানে অসংখ্য ক্ষুদ্র গহ্বরে আটকে থাকা গরম পানি দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিশাল হাইড্রোথার্মাল সিস্টেম তৈরি করে।

এই রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য গবেষকরা গহ্বরের ভেতর প্রায় ১ কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত ড্রিল করে শিলার নমুনা সংগ্রহ করেন। শিলায় আটকে থাকা আর্গন গ্যাস বিশ্লেষণ করে তারা জানতে পারেন, সেখানে তাপীয় কার্যকলাপ ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে সংঘর্ষের সময় থেকে শুরু হয়ে অন্তত ৫৮ মিলিয়ন বছর আগ পর্যন্ত চলমান ছিল। অর্থাৎ আঘাতস্থলটি ঠান্ডা হতে লেগেছিল কমপক্ষে ৮ মিলিয়ন বছর।

আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, শিলার সালফার আইসোটোপ বিশ্লেষণে ভূগর্ভস্থ এই গরম পানির পরিবেশে অণুজীবের উপস্থিতির শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবীর পৃষ্ঠে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটলেও ভূগর্ভে সৃষ্টি হয়েছিল জীবনের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল, যেখানে ক্ষুদ্র প্রাণীরা দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল।

এই আবিষ্কার শুধু পৃথিবীর অতীত ইতিহাস নয়, জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কেও নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করছে। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাচীন পৃথিবীতে বৃহৎ গ্রহাণু-গহ্বরগুলো হয়তো দীর্ঘমেয়াদি বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখানে জীবনের বিকাশ ও বিস্তারের সুযোগ ছিল অনেক বেশি। একই ধারণা ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহসহ অন্যান্য গ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা অনুসন্ধানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ ক্রিস কির্কল্যান্ড বলেন, বৃহৎ গ্রহাণু সংঘর্ষ শুধু ধ্বংস ডেকে আনে না; অনেক ক্ষেত্রে তা ভূগর্ভে দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণ ও রাসায়নিকভাবে সমৃদ্ধ পরিবেশও সৃষ্টি করতে পারে, যা জীবনের বিকাশের জন্য অনুকূল হতে পারে। @ Science News

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী Communications Earth & Environment-এ (


৪০


"ইতিহাসের ৬টি রহস্যময় প্রাচীন স্থাপনা — যা কীভাবে তৈরি হলো, আজও পুরোপুরি বোঝা যায়নি। একটা বানিয়েছিল এমন মানুষ যারা তখনো চাষবাস শেখেনি। আর একটা — আমাদের ভারতেই — কাটা হয়েছিল একটা গোটা পাহাড় থেকে, ওপর থেকে নিচে।"

প্রায় সাড়ে এগারো হাজার বছর আগে কিছু মানুষ বিশাল বিশাল পাথরের স্তম্ভ দিয়ে একটা মন্দির বানিয়েছিল। তখনো মানুষ চাষবাস শেখেনি, চাকা আবিষ্কার করেনি, ধাতুর যন্ত্র বানায়নি। তাহলে তারা এটা বানাল কী করে? ইতিহাসে এমন কিছু স্থাপনা আছে, যেগুলোর সামনে দাঁড়ালে একটাই প্রশ্ন মাথায় আসে — এত আগে, এত সামান্য যন্ত্র দিয়ে, মানুষ এটা করল কীভাবে? আর না, উত্তর "এলিয়েন" নয়। আসল উত্তরটা আরও অবিশ্বাস্য — মানুষের নিজের বুদ্ধি আর জেদ। আজ সেই ছয়টা রহস্যময় স্থাপনার কথা বলব।

প্রথম — গোবেকলি টেপে (তুরস্ক)।

আজকের তুরস্কে একটা পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো মন্দির। বয়স প্রায় ১১,৫০০ বছর। এটা এত পুরোনো যে এর সামনে মিশরের পিরামিড বা স্টোনহেঞ্জও নতুন মনে হয়। বিশাল বিশাল T-আকৃতির পাথরের স্তম্ভ, কয়েক টন ওজনের, গায়ে খোদাই করা পশুপাখির ছবি। কিন্তু আসল চমক — এটা বানিয়েছিল এমন মানুষ, যারা তখনো শিকার করে আর ফলমূল কুড়িয়ে খেত। চাষবাস তখনো আবিষ্কার হয়নি। আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, প্রথমে মানুষ চাষ শিখল, তারপর সভ্যতা গড়ল, তারপর মন্দির বানাল। গোবেকলি টেপে সেই ধারণাটাই উল্টে দিল — হয়তো বিশ্বাস আর একসাথে কাজ করার ইচ্ছাই মানুষকে প্রথমে এক জায়গায় এনেছিল।

দ্বিতীয় — গিজার মহাপিরামিড (মিশর)।

প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে তৈরি। প্রায় ২৩ লক্ষ বিশাল পাথরের ব্লক, একটার ওপর আরেকটা। প্রতিটা ব্লক কয়েক টন ওজনের। আর পুরোটা এত নিখুঁতভাবে সাজানো, এত নিখুঁতভাবে দিক বরাবর বসানো, যা আজও মানুষকে অবাক করে। আর এখানেই জন্ম নিয়েছে অনেক ভুয়া গল্প — কেউ বলে এলিয়েন  বানিয়েছে, কেউ বলে ক্রীতদাস দিয়ে জোর করে বানানো হয়েছে। কিন্তু সত্যিটা এই দুটোর চেয়েও সুন্দর। পিরামিডের পাশেই খুঁজে পাওয়া গেছে শ্রমিকদের গ্রাম, তাদের কবর — যা প্রমাণ করে, এরা ছিল দক্ষ, সম্মানিত, বেতনভোগী মিশরীয় শ্রমিক। তাদের ভালো খাবার (মাংস, রুটি) দেওয়া হতো। সম্প্রতি পাওয়া প্রাচীন নথি থেকে এমনকি জানা গেছে, নীল নদ ধরে নৌকায় করে কীভাবে পাথর আনা হতো। শুধু পাথর তোলার সঠিক র্যাম্প-পদ্ধতি নিয়ে আজও তর্ক চলছে। মানে, এটা এলিয়েন বা দাসত্বের গল্প নয় — এটা সংগঠিত, বুদ্ধিমান মানুষের অবিশ্বাস্য কীর্তি।

তৃতীয় — স্টোনহেঞ্জ (ইংল্যান্ড)।

ইংল্যান্ডের এক খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল পাথর দিয়ে বানানো একটা বৃত্ত — স্টোনহেঞ্জ। বয়স প্রায় ৫,০০০ বছর। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা প্রশ্ন — এই পাথরগুলো এলো কোথা থেকে? গবেষণায় দেখা গেছে, এর ছোট "নীল পাথর"গুলো আনা হয়েছিল প্রায় ২২৫ কিলোমিটার দূরের ওয়েলস থেকে। আর সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কারটা একদম সাম্প্রতিক — ২০২৪ সালে জানা গেল, এর কেন্দ্রের ৬ টন ওজনের পাথরটা এসেছে প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার দূরের স্কটল্যান্ড থেকে! এখন প্রশ্ন — চাকা ছাড়া, আধুনিক যন্ত্র ছাড়া, ৫,০০০ বছর আগের মানুষ এত ভারী একটা পাথর এত দূর থেকে আনল কীভাবে? নৌকায়, নাকি টেনে — কেউ নিশ্চিত নয়। কিন্তু একটা জিনিস পরিষ্কার — এর পেছনে ছিল অবিশ্বাস্য পরিকল্পনা আর সম্মিলিত শ্রম।

চতুর্থ — সাকসেইহুয়ামান (পেরু)।

দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা সভ্যতা পাহাড়ের ওপর বানিয়েছিল বিশাল পাথরের দেয়াল। কিন্তু এই দেয়ালের পাথরগুলো সাধারণ নয়। বিশাল বিশাল, অসমান আকৃতির পাথর — কোনোটা ১০০ টনেরও বেশি ভারী — একটার সাথে আরেকটা এত নিখুঁতভাবে বসানো যে, মাঝখানে একটা ছুরি বা কাগজের টুকরোও ঢোকানো যায় না। কোনো সিমেন্ট নেই, কোনো জোড়া নেই। শুধু পাথরের সাথে পাথরের নিখুঁত মিল। এটাও "এলিয়েন তত্ত্ব"-এর প্রিয় বিষয়। কিন্তু সত্যিটা হলো — ইনকারা ছিল ইতিহাসের সেরা পাথর-শিল্পীদের একটা। তারা ধৈর্য ধরে পাথর কেটে, ঘষে, বারবার মিলিয়ে এই নিখুঁত জোড়া তৈরি করত। আর এই কৌশলেই তাদের দেয়াল শত শত বছরের ভূমিকম্পেও দাঁড়িয়ে আছে — আধুনিক অনেক বাড়ি যা পারে না।

পঞ্চম — ইস্টার আইল্যান্ডের

"হেঁটে চলা" মূর্তি। প্রশান্ত মহাসাগরের নিঃসঙ্গ ইস্টার আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৯০০টা বিশাল পাথরের মূর্তি — মোয়াই। কোনোটা কয়েক টন, কোনোটা আরও অনেক বেশি ভারী। প্রশ্নটা সহজ কিন্তু কঠিন — চাকা নেই, বড় কোনো পশু নেই। তাহলে এত ভারী মূর্তিগুলো দ্বীপের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নিল কীভাবে?  স্থানীয়দের পুরোনো কথায় বলা হতো — মূর্তিগুলো নাকি "হেঁটে" গিয়েছিল। বহুদিন একে কল্পনা ভাবা হতো। কিন্তু কয়েক বছর আগে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখালেন — সত্যিই এটা সম্ভব! কয়েকজন মানুষ দড়ি দিয়ে মূর্তিটাকে এপাশ-ওপাশ দুলিয়ে, ঠিক যেভাবে আমরা ভারী আলমারি "হাঁটিয়ে" সরাই, সেভাবেই খাড়া অবস্থায় সামনে এগিয়ে নেওয়া যায়। স্থানীয়দের সেই "হেঁটে চলা" কিংবদন্তি আসলে সত্যি ছিল — শুধু সেটা ছিল চতুর মানুষের কৌশল।

ষষ্ঠ — কৈলাস মন্দির, ইলোরা (ভারত)।

এই শেষ স্থাপনাটা আমাদের নিজেদের, আর হয়তো এই তালিকার সবচেয়ে অবিশ্বাস্য। মহারাষ্ট্রের ইলোরায় দাঁড়িয়ে আছে কৈলাস মন্দির। প্রায় ১,২০০ বছর আগে তৈরি। দেখতে মনে হয় বিশাল একটা মন্দির — স্তম্ভ, মূর্তি, কারুকাজ সব আছে। কিন্তু আসল রহস্যটা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। এই গোটা মন্দিরটা আলাদা আলাদা পাথর জুড়ে বানানো নয়। এটা কাটা হয়েছে একটাই বিশাল পাহাড়ের পাথর থেকে — আর কাটা হয়েছে ওপর থেকে নিচের দিকে। মানে, কারিগররা পাহাড়ের চূড়া থেকে কাটতে শুরু করেছিলেন, ধীরে ধীরে নিচে নামতে নামতে ভেতর থেকে গোটা একটা মন্দির খোদাই করে বের করে এনেছেন। আনুমানিক ২ লক্ষ টন পাথর সরানো হয়েছিল। আর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য — এখানে ভুল করার কোনো সুযোগ ছিল না। একবার কাটা পাথর তো আর ফেরানো যায় না। হাজার বছর আগে, এত নিখুঁত পরিকল্পনায় একটা গোটা মন্দির একটা পাহাড় থেকে খোদাই করা — এ যেন উল্টো দিক থেকে ভাস্কর্য গড়া।

ইতিহাসের এই ছয়টা স্থাপনার দিকে তাকালে একটা গর্বের সত্যি বেরিয়ে আসে। আমরা যখন বুঝতে পারি না কীভাবে কিছু তৈরি হলো, তখন সহজ উত্তর হলো — "নিশ্চয়ই এলিয়েন বা জাদু।" কিন্তু এই উত্তরটা আসলে আমাদের পূর্বপুরুষদের অপমান। কারণ আসল উত্তরটা আরও মহৎ। হাতে সামান্য যন্ত্র, অসীম ধৈর্য, হাজার মানুষের সম্মিলিত শ্রম আর অবিশ্বাস্য বুদ্ধি — এই দিয়েই মানুষ এমন সব জিনিস বানিয়েছে, যা আজও আমাদের থমকে দেয়। রহস্যটা আকাশের কোনো প্রাণী নয় — রহস্যটা মানুষের নিজের সীমাহীন ক্ষমতা।

আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা স্থাপনার মধ্যে কোনটা দেখে আপনি সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন?  

১. গোবেকলি টেপে — চাষের আগের মন্দির

২. গিজার পিরামিড — এলিয়েন নয়, দক্ষ শ্রমিক

৩. স্টোনহেঞ্জ — ৭৫০ কিমি দূর থেকে আসা পাথর

৪. সাকসেইহুয়ামান — ছুরিও ঢোকে না যে জোড়ায়

৫. ইস্টার আইল্যান্ড — "হেঁটে চলা" মূর্তি

৬. কৈলাস মন্দির — একটা পাহাড় থেকে খোদাই করা

@ সম্রাট রায় চৌধুরী 


৪১



ডাইনোসর ছিল এক ধরনের স্থলচর সরীসৃপ, যারা কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বাস করত। 

বিজ্ঞানীদের মতে: ডাইনোসর প্রথম দেখা যায় প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে (Triassic যুগে)।

তারা পৃথিবীতে প্রায় ১৬ কোটি বছর আধিপত্য বিস্তার করে।

প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে অধিকাংশ ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়।

একটি জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো, একটি বিশাল গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত করেছিল, যার ফলে জলবায়ুতে বড় পরিবর্তন আসে এবং ব্যাপক বিলুপ্তি ঘটে।

কিছু বিখ্যাত ডাইনোসর:

Tyrannosaurus rex (T. rex) – মাংসাশী।

Triceratops – তিন শিংযুক্ত তৃণভোজী।

Brachiosaurus – দীর্ঘ গলাযুক্ত বিশাল তৃণভোজী।

Velociraptor – তুলনামূলক ছোট কিন্তু দ্রুতগতির শিকারি।

বিজ্ঞানীদের বর্তমান ধারণা অনুযায়ী, পাখিরা আসলে কিছু ডাইনোসরের বংশধর। অর্থাৎ সব ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়নি; তাদের একটি শাখা আজকের পাখি হিসেবে টিকে আছে।

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, কুরআন ও সহিহ হাদিসে ডাইনোসরের নাম উল্লেখ নেই। তাই তারা ঠিক কখন ছিল বা মানুষের আগে ছিল কি না—এসব বিষয়ে ইসলামী গ্রন্থগুলো সরাসরি আলোচনা করে না। তবে ডাইনোসরের জীবাশ্ম (fossil) পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে, যা তাদের অস্তিত্বের পক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত

@ Ariful Islam Arif


৪২


তর্ক ছাড়াই জয়ী হওয়ার রাজকীয় কৌশল!

সব যুদ্ধে জয়ী হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিছু যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়াও এক ধরনের বিজয়। জীবনে এমন অনেক তর্ক আসে, যেখানে শেষ পর্যন্ত কেউ জেতে না; বরং সম্পর্ক নষ্ট হয়, মানসিক শান্তি হারিয়ে যায় এবং সম্মান কমে যায়।

তর্কে জিতে যাওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয় জয় করা অনেক কঠিন। তাই জ্ঞানীরা সবসময় কথার যুদ্ধ নয়, প্রজ্ঞার পথ বেছে নেন।

১. সব কথা প্রমাণ করার দরকার নেই

প্রত্যেক মানুষ তার অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও বিশ্বাস অনুযায়ী কথা বলে। সবাইকে নিজের মতের সঙ্গে একমত করানো সম্ভব নয়। তাই কখনো কখনো চুপ থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর।

২. আগে শুনুন, পরে বলুন

অধিকাংশ মানুষ উত্তর দেওয়ার জন্য শোনে, বোঝার জন্য নয়। আপনি যদি মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনেন, তাহলে অর্ধেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়।

৩. আবেগ নয়, ধৈর্যকে বেছে নিন

রাগের মুহূর্তে বলা একটি কথা বছরের সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে। তাই উত্তেজিত অবস্থায় প্রতিক্রিয়া না দিয়ে কিছু সময় নিন। ধৈর্য অনেক তর্ককে জন্ম নেওয়ার আগেই শেষ করে দেয়।

৪. ভুল হলে স্বীকার করুন

ভুল স্বীকার করা দুর্বলতার নয়, বরং আত্মবিশ্বাসের পরিচয়। যে ব্যক্তি নিজের ভুল মেনে নিতে পারে, মানুষ তার প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল হয়।

৫. শেষ কথা বলার লোভ ত্যাগ করুন

সব সময় শেষ কথা আপনাকেই বলতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। অনেক সময় নীরব হাসি, একটি সুন্দর আচরণ বা বিষয় পরিবর্তন করাই সবচেয়ে কার্যকর উত্তর।

৬. ব্যক্তিকে নয়, বিষয়কে গুরুত্ব দিন

তর্কের সময় অনেকেই বিষয় ছেড়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ শুরু করে। এতে সমাধান আসে না, দূরত্ব বাড়ে। সম্মান বজায় রেখে কথা বললে বিরোধও সৌহার্দ্যে রূপ নিতে পারে।

৭. নিজের শান্তিকে অগ্রাধিকার দিন

কিছু মানুষ তর্ক জিততে চায়, সমাধান নয়। তাদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে নিজের সময় ও মানসিক শক্তি নষ্ট করার কোনো অর্থ নেই।

মনে রাখবেন

তর্কে জিতে আপনি একজনকে হারাতে পারেন, কিন্তু নীরবতা, ধৈর্য ও সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি মানুষের হৃদয় জয় করতে পারেন। সত্যিকারের বিজয় হলো নিজের চরিত্র, সম্মান এবং মানসিক শান্তি অক্ষুণ্ণ রাখা।

তাই সব তর্কের উত্তর তর্ক নয়; কখনো কখনো হাসিমুখে চুপ করে চলে আসাটাই সবচেয়ে রাজকীয় বিজয়

@ লক্ষ্যভেদ


৪৩


কোনো কারণ ছাড়াই কেন মিথ্যা বলে কিছু মানুষ?

স্পষ্ট কারণ ছাড়াই অনেকেই বারবার মিথ্যা বলেন, বাস্তব ঘটনাকে বাড়িয়ে উপস্থাপন করেন

কখনো ঝামেলা এড়াতে, কখনো নিজের বাঁচার জন্য টুকটাক মিথ্যা বলেন অনেকেই। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যারা কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই বারবার মিথ্যা বলেন, গল্প বানান, আর বাস্তব ঘটনাকেও অনেক সময় বাড়িয়ে উপস্থাপন করেন। চিকিৎসা ও মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রবণতাকে বলা হয় মিথোম্যানিয়া বা প্যাথলজিক্যাল লাইয়িং।

এ ধরনের মানুষদের গল্প অনেক সময় এতটাই আকর্ষণীয় হয় যে শুনলে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ধরা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব গল্পের বেশিরভাগেরই বাস্তব ভিত্তি থাকে না। এমনকি অনেক সময় তাদের নিজেরই কোনো লাভ হয় না—বরং ধীরে ধীরে সম্পর্ক নষ্ট হয়, বিশ্বাস ভেঙে যায়, আর সমাজে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়।

স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ওয়েবএমডি এক প্রতিবেদনে বলছে, প্যাথলজিক্যাল লাইয়িং একটি দীর্ঘমেয়াদী আচরণগত প্রবণতা, যা অনেক সময় কিশোর বয়স থেকেই শুরু হয়ে বছরের পর বছর চলতে থাকে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কারো ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের অভাব, কারো ক্ষেত্রে অন্যদের মনোযোগ পাওয়ার প্রবল ইচ্ছা, আবার কারও ক্ষেত্রে শৈশবের চাপ বা মানসিক আঘাত কাজ করে। কিছু ক্ষেত্রে এটি ব্যক্তিত্বজনিত মানসিক সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

এই অভ্যাসটা ধীরে ধীরে মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। একসময় পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের আস্থা কমে যায়। বারবার মিথ্যা বলার কারণে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, আর ব্যক্তি নিজেও মানসিক চাপ ও অস্থিরতার মধ্যে পড়ে যান।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এর কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তবে সাইকোথেরাপি, বিশেষ করে কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি, এই আচরণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে কাউন্সেলিং ও পারিবারিক সমর্থনও খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো-এ ধরনের আচরণ দেখা গেলে সেটিকে শুধু “খারাপ অভ্যাস” বলে উড়িয়ে না দিয়ে, মানসিক স্বাস্থ্যের দিক থেকেও দেখা দরকার। সময়মতো সাহায্য পেলে এই প্রবণতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। @ Dhaka Tribune


৪৪


"ইতিহাসের ৬টি বিশ্বাসঘাতকতা — যা গোটা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। একজন বন্ধুর ছুরিই থামিয়ে দিয়েছিল রোমের সবচেয়ে বড় সম্রাটকে। আর বাংলায় — একজন সেনাপতির একটা চুক্তিই খুলে দিয়েছিল প্রায় ২০০ বছরের পরাধীনতার দরজা।"

একজন সম্রাট তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধুদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ একের পর এক ছুরি বসতে লাগল তাঁর শরীরে। আর শেষ ছুরিটা যে হাতে — সেটা ছিল তাঁর প্রিয়, সবচেয়ে বিশ্বাসের মানুষটার। ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনার সত্যিগুলোর একটা হলো — অনেক মহান মানুষকে হারিয়েছে শত্রু নয়, বরং নিজের লোকের বিশ্বাসঘাতকতা। আর এমন কিছু বিশ্বাসঘাতকতা গোটা ইতিহাসের মোড়ই ঘুরিয়ে দিয়েছে। আজ সেই ছয়টা ঘটনার কথা বলব।

প্রথম — ব্রুটাস ও জুলিয়াস সিজার (৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)।

রোমের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্রাট জুলিয়াস সিজার। আর ব্রুটাস ছিলেন তাঁর অত্যন্ত স্নেহের, বিশ্বাসের একজন — প্রায় পুত্রতুল্য। কিন্তু কিছু ষড়যন্ত্রকারী সিজারকে হত্যার পরিকল্পনা করল। আর সেই দলে যোগ দিলেন ব্রুটাসও। সেদিন সেনেটে সিজারকে ঘিরে ধরে একের পর এক ছুরি বসানো হলো। কথিত আছে, ভিড়ের মধ্যে ব্রুটাসকে দেখে সিজার থমকে গিয়েছিলেন — শত্রুর আঘাত তিনি সইতে পারতেন, কিন্তু প্রিয় বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতা নয়। সিজারের মৃত্যুর পর রোম এক রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধে ডুবে গেল, আর ইতিহাসের মোড় ঘুরে গেল। ব্রুটাসের নাম আজও বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক।

দ্বিতীয় — এফিয়ালটিস ও থার্মোপাইলির ৩০০ (৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)।

বিশাল পারস্য সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, থার্মোপাইলির এক সরু গিরিপথে, রাজা লিওনিদাসের নেতৃত্বে মাত্র ৩০০ স্পার্টান যোদ্ধা অবিশ্বাস্য সাহসে রুখে দাঁড়িয়েছিল। এই সরু পথে গুটিকয়েক যোদ্ধাই বিশাল বাহিনীকে আটকে রাখছিল। পারস্য সম্রাট দিশেহারা। ঠিক তখন এগিয়ে এলো এফিয়ালটিস নামের এক বিশ্বাসঘাতক। লোভে পড়ে সে পারস্য সম্রাটকে দেখিয়ে দিল পাহাড়ের একটা গোপন পথ — যা দিয়ে শত্রু সেনারা ঘুরে গিয়ে স্পার্টানদের পেছন থেকে ঘিরে ফেলতে পারল। ফলে সেই অসমসাহসী ৩০০ জন শেষ পর্যন্ত পরাজিত হলো। একজন মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা এক বীরত্বের গল্পকে বিয়োগান্ত করে দিল। গ্রিক ভাষায় এফিয়ালটিস শব্দটাই আজ "দুঃস্বপ্ন" বোঝায়।

তৃতীয় — বেনেডিক্ট আর্নল্ড (১৭৮০)।

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। বেনেডিক্ট আর্নল্ড ছিলেন আমেরিকার পক্ষের এক উজ্জ্বল, সাহসী সেনাপতি — একজন যুদ্ধনায়ক। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধ। আর সেই ক্ষোভ তাঁকে নিয়ে গেল বিশ্বাসঘাতকতার পথে। তিনি গোপনে শত্রুপক্ষ ব্রিটিশদের সাথে চুক্তি করলেন — টাকার বিনিময়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ (ওয়েস্ট পয়েন্ট) তাদের হাতে তুলে দেবেন। ভাগ্যক্রমে ষড়যন্ত্রটা শেষ মুহূর্তে ফাঁস হয়ে গেল। আর্নল্ড শত্রুপক্ষে পালিয়ে গেলেন। যিনি একসময় ছিলেন জাতীয় বীর, তিনিই হয়ে গেলেন বিশ্বাসঘাতকতার চিরস্থায়ী প্রতীক। আজও আমেরিকায় "বেনেডিক্ট আর্নল্ড" নামটাই মানে — বিশ্বাসঘাতক।

চতুর্থ — ভিদকুন কুইসলিং (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ)।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যখন নাৎসি জার্মানি নরওয়ে দখল করতে চাইল, তখন নরওয়ের এক রাজনীতিবিদ ভিদকুন কুইসলিং নিজের দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে শত্রুকে সাহায্য করলেন। তিনি জার্মানদের দেশ দখলে সহায়তা করলেন, আর বিনিময়ে হলেন তাদের হাতের পুতুল শাসক।

নিজের জাতিকে শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া — এর চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা আর কী হতে পারে?

যুদ্ধের শেষে তাঁর বিচার হলো, শাস্তি হলো। কিন্তু তাঁর নামটা ইতিহাসে এমনভাবে গেঁথে গেল যে, আজও ইংরেজি ভাষায় "Quisling" শব্দটার মানেই হলো — যে নিজের দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। একটা নাম, যা চিরতরে কলঙ্কের সমার্থক হয়ে গেল।

পঞ্চম — নাইট টেম্পলারদের সর্বনাশ (১৩০৭)।

মধ্যযুগে নাইট টেম্পলার ছিল ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী আর সম্মানিত যোদ্ধা- সংগঠনগুলোর একটা। তারা ছিল ধনী, প্রভাবশালী — আর রাজাকেও বিপুল টাকা ধার দিয়েছিল। ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ ফিলিপ তাদের কাছে বিশাল ঋণে জর্জরিত ছিলেন। আর সেই ঋণ আর তাদের সম্পদই হয়ে উঠল কাল। ১৩০৭ সালের এক শুক্রবার (১৩ তারিখ), রাজা হঠাৎ বিশ্বাসঘাতকতা করে একযোগে সারা দেশে টেম্পলারদের গ্রেফতার করালেন। মিথ্যা অভিযোগ এনে, অত্যাচার করে, অনেককে মেরে ফেলা হলো, আর গোটা সংগঠনটাই গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। যে রাজার পাশে তারা দাঁড়িয়েছিল, সেই রাজাই তাদের পিঠে ছুরি বসাল। বলা হয়, "শুক্রবার ১৩ তারিখ"-কে অপয়া ভাবার একটা শিকড়ও এই ঘটনায়।

ষষ্ঠ — মীরজাফর ও পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭)। আমাদের নিজেদের বাংলার সবচেয়ে বড় ক্ষত।

এই শেষ বিশ্বাসঘাতকতাটা আমাদের নিজেদের মাটির, আর সবচেয়ে বেদনার।

১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন, পলাশীর আম্রকাননে মুখোমুখি দুই বাহিনী। একদিকে বাংলার তরুণ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার প্রায় ৫০,০০০ সৈন্যের বিশাল বাহিনী। অন্যদিকে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাত্র ৩,০০০ সৈন্য। সংখ্যায় নবাবের জয় ছিল প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল আগেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল — যুদ্ধের ময়দানে নয়, ষড়যন্ত্রের টেবিলে। নবাবেরই সেনাপতি মীরজাফর গোপনে ব্রিটিশদের সাথে চুক্তি করেছিলেন। যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, তিনি তাঁর অধীনে থাকা বিশাল বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় বসিয়ে রাখলেন — একটাও গুলি চলল না। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিরাজ পরাজিত হলেন। পুরস্কার হিসেবে মীরজাফরকে বানানো হলো বাংলার পুতুল নবাব, আর কোম্পানি পেল বাংলার অফুরন্ত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। ইতিহাসবিদরা বলেন, এই একটা বিশ্বাসঘাতকতাই ভারতে প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের দরজা খুলে দিয়েছিল। আজও বাংলায় "মীরজাফর" নামটাই বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক।

ইতিহাসের এই ছয়টা বিশ্বাসঘাতকতার দিকে তাকালে একটা গভীর, নাড়িয়ে দেওয়া সত্যি বেরিয়ে আসে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি প্রায়ই বাইরের শত্রু করে না — করে ভেতরের বিশ্বাসের মানুষ। কারণ শত্রুকে আমরা সাবধানে পাহারা দিই, কিন্তু আপন মানুষের জন্য দরজা খোলা রাখি। আর সেই খোলা দরজা দিয়েই ঢুকে পড়ে সর্বনাশ। পলাশীর গল্পটা আমাদের আরেকটা জিনিস শেখায় — একটা জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরের সেনা নয়, ভেতরের বিভেদ আর স্বার্থ। সিরাজের ৫০,০০০ সৈন্যকে হারায়নি ক্লাইভের ৩,০০০ — হারিয়েছিল একজনের লোভ।

হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — ঐক্য থাকলে বাইরের কোনো শক্তিই সহজে হারাতে পারে না। ভাঙন আসে ভেতর থেকেই।

আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যে কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিল? আর পলাশীর সেই মুহূর্ত — যদি মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতা না করতেন, ভারতের ইতিহাস কি অন্যরকম হতো বলে আপনার মনে হয়?

১. ব্রুটাস — বন্ধুর ছুরি

২. এফিয়ালটিস — থার্মোপাইলির গোপন পথ

৩. বেনেডিক্ট আর্নল্ড — জাতীয় বীর থেকে বিশ্বাসঘাতক

৪. কুইসলিং — নিজের দেশকে শত্রুর হাতে

৫. নাইট টেম্পলার — রাজার পিঠে-ছুরি

৬. মীরজাফর — পলাশীর সেই কালো দিন

কমেন্টে নম্বর দিন আর পলাশী নিয়ে আপনার মতামত লিখুন। এই গল্প যদি ভাবিয়ে থাকে — একটা শেয়ার করুন। @ সম্রাট রায় চৌধুরী 


৪৫


ইতিহাসের রহস্য "ইতিহাসের ৬টি যুদ্ধ — যা মানুষ নয়, প্রকৃতি থামিয়ে দিয়েছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নৌবহর ডুবিয়ে দিয়েছিল একটা ঝড়। আর বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডারকে থামিয়ে দিয়েছিল ভারতের বর্ষা আর নদী।"

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী এক সম্রাট পাঠালেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিশাল নৌবহরগুলোর একটা — একটা গোটা দেশ জয় করতে। কিন্তু সেই বিশাল বহর শত্রুর হাতে নয়, ধ্বংস হলো একটা ঝড়ের হাতে। মুহূর্তে। মানুষ ভাবে যুদ্ধ জেতে অস্ত্র আর সেনাবাহিনী দিয়ে। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে — প্রকৃতির সামনে মানুষের সব অহংকার, সব শক্তি কত তুচ্ছ। আজ সেই ছয়টা যুদ্ধের কথা বলব, যা থামিয়ে দিয়েছিল মানুষ নয় — ঝড়, বরফ, বৃষ্টি আর বর্ষা।

প্রথম — মঙ্গোলদের জাপান আক্রমণ ও "কামিকাজে" ঝড় (১২৭৪ ও ১২৮১)।

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্য — মঙ্গোল। তাদের মহান শাসক কুবলাই খান ঠিক করলেন, এবার জাপান জয় করবেন। তিনি পাঠালেন এক বিশাল নৌবহর — হাজার হাজার জাহাজ, লক্ষ লক্ষ সৈন্য। জাপানের পক্ষে এই শক্তি রোখা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই সমুদ্রে আছড়ে পড়ল এক ভয়ঙ্কর টাইফুন (ঝড়)। সেই ঝড় মঙ্গোলদের বিশাল বহরকে চূর্ণ করে সমুদ্রে ডুবিয়ে দিল। শুধু একবার নয় — দুবার, দুটো আলাদা আক্রমণে, ঠিক একইভাবে ঝড় এসে জাপানকে বাঁচাল। জাপানিরা এই ঝড়ের নাম দিল "কামিকাজে" — অর্থাৎ "ঈশ্বরের বাতাস।" তারা বিশ্বাস করল, স্বয়ং প্রকৃতি তাদের রক্ষা করেছে।

দ্বিতীয় — স্প্যানিশ আর্মাডা ও সমুদ্রঝড় (১৫৮৮)।

স্পেন ছিল তখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। তারা ইংল্যান্ড জয় করতে পাঠাল "আর্মাডা" — প্রায় ১৩০টি যুদ্ধজাহাজের এক বিশাল নৌবহর। ছোট্ট ইংল্যান্ডের পক্ষে এই শক্তি রোখা প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কিন্তু প্রকৃতির পরিকল্পনা ছিল আলাদা। ইংরেজদের সাথে কিছু লড়াইয়ের পর, পিছু হটার সময় স্কটল্যান্ড আর আয়ারল্যান্ডের উপকূলে স্প্যানিশ বহর পড়ল এক ভয়ঙ্কর ঝড়ের কবলে। একের পর এক জাহাজ পাথরে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে গেল, ডুবে গেল। আর্মাডার প্রায় অর্ধেক ধ্বংস হলো — বেশিরভাগই শত্রুর হাতে নয়, ঝড়ের হাতে। সেই ঝড় ইংল্যান্ডের ইতিহাসই বদলে দিল।

তৃতীয় — নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান ও "জেনারেল উইন্টার" (১৮১২)।

মহাশক্তিধর নেপোলিয়ন প্রায় ৬ লক্ষ সৈন্যের এক অপরাজেয় বাহিনী নিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করলেন। তিনি মস্কো পর্যন্ত পৌঁছেও গেলেন। কিন্তু রাশিয়ানরা এক অদ্ভুত কৌশল নিল — তারা পিছু হটতে হটতে জেদের শহর-খাবার পুড়িয়ে দিল। নেপোলিয়ন খালি, পোড়া মস্কো দখল করলেন — কিন্তু কিছুই পেলেন না। তারপর এলো রাশিয়ার ভয়ঙ্কর শীত। মাইনাস তাপমাত্রা, বরফ, খাবারের অভাব — ফেরার পথে নেপোলিয়নের সেই বিশাল বাহিনী ঠান্ডায় জমে, না খেয়ে মরতে লাগল। ৬ লক্ষ সৈন্যের মধ্যে ফিরল মাত্র কয়েক হাজার। কোনো শত্রু সেনাবাহিনী নয় — রাশিয়ার শীতই ("জেনারেল উইন্টার") নেপোলিয়নের অজেয় বাহিনীকে গুঁড়িয়ে দিল।

চতুর্থ — অ্যাজিনকোর্টের যুদ্ধ ও কাদা (১৪১৫)।

ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের যুদ্ধ। একদিকে ফরাসিদের বিশাল, ভারী বর্ম পরা অশ্বারোহী বাহিনী। অন্যদিকে সংখ্যায় অনেক কম, ক্লান্ত ইংরেজ সেনা। কাগজে-কলমে ফরাসিদের জয় নিশ্চিত। কিন্তু যুদ্ধের আগের রাতে নামল মুষলধারে বৃষ্টি। যুদ্ধক্ষেত্র পরিণত হলো এক হাঁটু-সমান কাদার জলায়। ভারী বর্ম পরা ফরাসি সৈন্য আর ঘোড়া সেই কাদায় আটকে গেল, নড়তে পারল না। আর ঠিক তখনই ইংরেজ তিরন্দাজরা দূর থেকে অজস্র তির ছুঁড়ে কাদায় আটকে থাকা ফরাসিদের ঘায়েল করল। বৃষ্টি আর কাদা সেদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ, শক্তিশালী বাহিনীকেই হারিয়ে দিল।

পঞ্চম — হাত্তিনের যুদ্ধ ও মরুভূমির তৃষ্ণা (১১৮৭)।

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রুসেডার বাহিনীর মুখোমুখি হলেন কিংবদন্তি সেনাপতি সালাদিন। ক্রুসেডারদের বাহিনী ছিল শক্তিশালী, কিন্তু সালাদিন জানতেন — এই মরুভূমিতে আসল শত্রু সৈন্য নয়, তৃষ্ণা। তিনি কৌশলে ক্রুসেডারদের জলহীন, খোলা মরুভূমির মধ্যে টেনে আনলেন, আর তাদের জলের সব উৎস থেকে কেটে দিলেন। জুলাইয়ের গনগনে রোদে, ভারী বর্ম পরা ক্রুসেডার সৈন্যরা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়ল। জল ছাড়া, ক্লান্ত, দিশেহারা সেই বাহিনীকে সালাদিন সহজেই পরাজিত করলেন। মরুভূমির গরম আর তৃষ্ণাই আসলে যুদ্ধটা জিতিয়ে দিল — আর এই জয়ের পথ ধরেই সালাদিন জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করলেন। ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিল প্রকৃতির এক নিষ্ঠুর শক্তি — তৃষ্ণা।

ষষ্ঠ — বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার, থামলেন ভারতের বর্ষায় (৩২৬ খ্রিস্টপূর্ব)।  

এই শেষ গল্পটা আমাদের নিজেদের মাটির, আর সবচেয়ে গর্বের। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট — যিনি পারস্য থেকে মিশর, প্রায় গোটা পরিচিত পৃথিবী জয় করে ফেলেছিলেন। তাঁকে থামানোর সাধ্য কারও ছিল না। সেই অপ্রতিরোধ্য বাহিনী এসে পৌঁছল ভারতের সীমান্তে। এখানে ঝিলাম নদীর তীরে, প্রবল বর্ষার মধ্যে, তাঁর মুখোমুখি হলেন বীর রাজা পোরাস। আলেকজান্ডার শেষমেশ জিতলেন বটে, কিন্তু পোরাসের অসমসাহসী প্রতিরোধ তাঁকে স্তম্ভিত করে দিল — আর বুঝিয়ে দিল, ভারত জয় করা সহজ হবে না। এরপর শুরু হলো আসল পরীক্ষা। মাসের পর মাস অবিরাম বর্ষা, কাদা, রোগ, আর বছরের পর বছর যুদ্ধের ক্লান্তি। সামনে আবার অপেক্ষা করছিল আরও বিশাল, আরও শক্তিশালী ভারতীয় সাম্রাজ্য (নন্দ বংশ), যাদের ছিল হাজার হাজার হাতির বাহিনী। ভারতের এই বর্ষা, নদী আর প্রতিরোধের সামনে আলেকজান্ডারের ক্লান্ত সৈন্যরা শেষমেশ বিয়াস নদীর তীরে থমকে দাঁড়াল — আর সাফ জানিয়ে দিল, তারা আর এক পা-ও এগোবে না। ফলে যে মানুষ গোটা পৃথিবী জয় করেছিলেন, তাঁকে ভারতের নদীর সামনে থেকেই ফিরে যেতে হলো। ভারতের মাটি, বর্ষা আর সাহসই হয়ে দাঁড়াল বিশ্বজয়ীর শেষ সীমানা।

ইতিহাসের এই ছয়টা যুদ্ধের দিকে তাকালে একটা গভীর, নম্র সত্যি বেরিয়ে আসে। মানুষ যত বড় সাম্রাজ্যই গড়ুক, যত শক্তিশালী সেনাবাহিনীই বানাক — প্রকৃতির সামনে সে আজও অসহায়। একটা ঝড়, একটা শীত, এক পশলা বৃষ্টি — গোটা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আমরা ভাবি আমরা প্রকৃতিকে জয় করে ফেলেছি। কিন্তু এই গল্পগুলো মনে করিয়ে দেয় — আমরা প্রকৃতির মালিক নই, প্রকৃতির অতিথি মাত্র। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — মানুষের সবচেয়ে বড় অহংকারও, প্রকৃতির একটা নিঃশ্বাসের কাছে কত ছোট।

আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা ঘটনার মধ্যে কোনটা শুনে আপনি সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন?  

১. কামিকাজে ঝড় — মঙ্গোলদের বহর ডুবল

২. স্প্যানিশ আর্মাডা — ঝড়ে চূর্ণ

৩. নেপোলিয়ন — রাশিয়ার শীতে শেষ

৪. অ্যাজিনকোর্ট — কাদায় হারল ফরাসিরা

৫. হাত্তিন — মরুভূমির তৃষ্ণা

৬. আলেকজান্ডার — ভারতের বর্ষায় থামলেন

কমেন্টে নম্বর দিন। এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে — একটা শেয়ার করুন। বিশেষ করে আলেকজান্ডারের কথা —।  @ সম্রাট রায় চৌধুরী 


৪৬


"ইতিহাসের ৬টি অদ্ভুত প্রথা ও আইন — যা একসময় সত্যিই চালু ছিল, কিন্তু আজ শুনলে বিশ্বাস হয় না। একটা দেশে মৃত মানুষকেও আদালতে বিচারের জন্য হাজির করা হতো। আর এক রাজা একটা গোটা যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন একটা বালতি নিয়ে।"

একবার একটা গোটা যুদ্ধ হয়েছিল — একটা সাধারণ কাঠের বালতি নিয়ে। হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। কারণ? একটা বালতি চুরি। ইতিহাস সবসময় গম্ভীর নয়। মাঝে মাঝে এটা এতটাই অদ্ভুত যে শুনলে মনে হয় কেউ বানিয়ে বলছে। অথচ এগুলো সত্যি — সত্যিকারের প্রথা, সত্যিকারের আইন, যা একসময় মানুষ মেনে চলত। আজ সেই ছয়টা অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্যি ঘটনার কথা বলব।

প্রথম — মৃত পোপের বিচার।

মধ্যযুগের এক ভয়ঙ্কর ঘটনা। ৮৯৭ সালে এক পোপ আরেক মৃত পোপের বিরুদ্ধে বিচার বসালেন। কিন্তু সমস্যা একটাই — অভিযুক্ত পোপ ততদিনে কয়েক মাস ধরে কবরে শুয়ে। তবু থামা হলো না। মৃতদেহটা কবর থেকে তুলে আনা হলো, পচাগলা অবস্থায় একটা সিংহাসনে বসিয়ে আদালতে হাজির করা হলো। তার হয়ে কথা বলার জন্য একজনকে পাশে রাখা হলো। তারপর "বিচার" করে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলো! ইতিহাসে এটা "ক্যাডাভার সিনড" নামে পরিচিত — একটা মৃতদেহের আনুষ্ঠানিক বিচার। সত্যিই, এটা ঘটেছিল।

দ্বিতীয় — বালতি নিয়ে যুদ্ধ।

১৩২৫ সাল। ইতালির দুটো শহর — মোডেনা আর বোলোনিয়া। এদের মধ্যে অনেকদিনের রেষারেষি ছিল। তারপর একদিন মোডেনার কিছু সৈন্য বোলোনিয়ায় ঢুকে একটা সাধারণ কাঠের বালতি চুরি করে আনল। ব্যস। অপমানে বোলোনিয়া ফুঁসে উঠল। একটা বালতি ফেরত পাওয়ার জেদে শুরু হলো রীতিমতো যুদ্ধ। দুই শহরের হাজার হাজার মানুষ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল, অনেকে মারা গেল। আর সবচেয়ে অদ্ভুত — মোডেনা যুদ্ধে জিতল, আর সেই বালতিটা আজও তারা গর্বের সাথে রেখে দিয়েছে। ইতিহাসে এটা "বালতির যুদ্ধ" নামে বিখ্যাত।

তৃতীয় — ইংল্যান্ডে দাড়ির ওপর কর।

কল্পনা করুন, আপনার দাড়ি রাখার জন্য আপনাকে সরকারকে টাকা দিতে হচ্ছে! ১৫৩৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরি ঠিক এই কাজটাই করলেন — দাড়ির ওপর কর বসালেন। আপনার দাড়ি যত বড়, যত সম্ভ্রান্ত — তত বেশি কর। পরে রাশিয়াতেও জার পিটার দ্য গ্রেট এই একই কাজ করলেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর দেশের মানুষ আধুনিক ইউরোপের মতো দাড়ি কামিয়ে ফেলুক। যারা দাড়ি রাখতে চাইত, তাদের কর দিয়ে একটা বিশেষ "দাড়ির টোকেন" সাথে রাখতে হতো — প্রমাণ হিসেবে যে তারা কর দিয়েছে। দাড়ি রাখাও তখন ছিল টাকার ব্যাপার।

চতুর্থ — প্রাণীদের আদালতে বিচার।

মধ্যযুগের ইউরোপে আরেকটা অদ্ভুত প্রথা ছিল — পশুপাখিকেও মানুষের মতো আদালতে বিচার করা হতো। কোনো শূকর যদি কাউকে আঘাত করত, কিংবা ইঁদুর-পোকা যদি ফসল নষ্ট করত — তাদের বিরুদ্ধে রীতিমতো মামলা হতো। প্রাণীটির হয়ে একজন উকিল পর্যন্ত নিয়োগ করা হতো! আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ নেওয়া হতো, তারপর বিচারক "রায়" দিতেন। কখনো কখনো প্রাণীটিকে "শাস্তি"ও দেওয়া হতো। আজ শুনলে হাস্যকর মনে হয়, কিন্তু সেই যুগে মানুষ এটাকে একদম গুরুত্বের সাথে নিত।

পঞ্চম — ভিক্টোরিয়ান যুগে "মৃত্যুর পরের ছবি"।

উনিশ শতকে ক্যামেরা সবে এসেছে, আর ছবি তোলা ছিল খুব দামি ও বিরল। তখন একটা অদ্ভুত প্রথা চালু হলো — পরিবারের কেউ মারা গেলে, তার মৃতদেহকে সুন্দর পোশাক পরিয়ে, জীবিত মানুষের মতো বসিয়ে বা শুইয়ে ছবি তোলা হতো। কখনো মৃত মানুষকে এমনভাবে সাজানো হতো যেন সে শুধু ঘুমিয়ে আছে। কারণ অনেক পরিবারের কাছে এটাই ছিল প্রিয়জনের একমাত্র ছবি — জীবনে কখনো ছবি তোলার সুযোগ হয়নি, তাই মৃত্যুর পরের এই ছবিটাই হয়ে থাকত শেষ স্মৃতি। আজ অদ্ভুত শোনালেও, এর পেছনে ছিল ভালোবাসা আর হারানোর গভীর কষ্ট।

ষষ্ঠ — ভারতে "ঘুমন্ত" শহর ও অদ্ভুত স্থানীয় নিয়ম।

আমাদের ভারতেও অদ্ভুত প্রথার অভাব নেই — আর কিছু আজও টিকে আছে। যেমন, মহারাষ্ট্রের শনি শিঙ্গণাপুর গ্রাম। এই গ্রামের একটা বিখ্যাত প্রথা — এখানকার বেশিরভাগ বাড়ি আর দোকানের কোনো দরজাই নেই, কিংবা থাকলেও তাতে তালা লাগানো হয় না। কারণ গ্রামবাসীদের বিশ্বাস — তাদের গ্রামদেবতা শনি স্বয়ং গ্রাম পাহারা দেন, তাই এখানে চুরি হয় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ এই বিশ্বাসেই দরজাহীন বাড়িতে বসবাস করে আসছে। সত্যি-মিথ্যে যাই হোক, একটা গোটা গ্রাম শুধু বিশ্বাসের জোরে দরজা ছাড়া বেঁচে আছে — এটাই বা কম অবাক করা কী! ইতিহাসের এই ছয়টা অদ্ভুত প্রথা ও আইনের দিকে তাকালে একটা মজার সত্যি বেরিয়ে আসে। আজ আমরা যে নিয়মগুলো একদম স্বাভাবিক মনে করি, একদিন হয়তো ভবিষ্যতের মানুষ সেগুলো শুনে হাসবে — "এরা সত্যিই এসব করত?" প্রতিটা যুগের নিজস্ব যুক্তি থাকে, নিজস্ব ভয় থাকে, নিজস্ব বিশ্বাস থাকে। যা একসময় একদম স্বাভাবিক ছিল, পরের যুগে তা-ই হয়ে ওঠে অবিশ্বাস্য। ইতিহাস আসলে আমাদের একটা আয়না — দেখিয়ে দেয়, মানুষ কত বদলায়।

আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা অদ্ভুত প্রথার মধ্যে কোনটা শুনে আপনি সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন? আর আপনি কি এমন কোনো অদ্ভুত পুরোনো প্রথা বা নিয়মের কথা জানেন, যা আজ শুনলে বিশ্বাস হয় না?

১. মৃত পোপের বিচার

২. বালতি নিয়ে যুদ্ধ

৩. দাড়ির ওপর কর

৪. প্রাণীদের আদালতে বিচার

৫. মৃত্যুর পরের ছবি

৬. দরজাহীন গ্রাম (শনি শিঙ্গণাপুর)

কমেন্টে নম্বর দিন আর আপনার জানা অদ্ভুত প্রথার কথা লিখুন। এই গল্প যদি ভালো লেগে থাকে — একটা শেয়ার করুন। @ সম্রাট রায় চৌধুরী 


৪৭


গাধা আর ঘোড়ার বিয়ে হলে কী হয়? জন্ম নেয় এক ‘সুপার অ্যানিমেল’! যার নাম খচ্চর। হাজার বছর ধরে মানুষ একে খাটিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু কেন জানেন? কারণ সে তার বাবা-মা উভয়ের সেরা গুণগুলো নিয়ে জন্মায়!

কীভাবে তৈরি হয় এই সুপারস্টার?

পুরুষ গাধা (Jack) + মাদি ঘোড়া (Mare) = খচ্চর (Mule)

কেন খচ্চর এতো স্পেশাল? (The Ultimate Hybrid Power):

বাবার কাছ থেকে পেয়েছে: চরম ধৈর্য, সহনশীলতা এবং যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার অদ্ভুত ক্ষমতা।

মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে: ঘোড়ার মতো শক্তি, গতি এবং চমৎকার শারীরিক গঠন।

খচ্চরের কিছু ‘অবিশ্বাস্য’ সুপারপাওয়ার:

পাহাড়ের রাজা: পাহাড়ি বা দুর্গম রাস্তায় চলাচলের জন্য এর চেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী আর নেই। এরা খুব হিসাব কষে পা ফেলে, তাই দুর্ঘটনার ঝুঁকি শূন্যের কাছাকাছি!

হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন: নিজের ওজনের চেয়েও অনেক বেশি মাল অনায়াসে বহন করতে পারে।

লো-মেইনটেইন্যান্স: ঘোড়ার চেয়ে কম খাবার ও পানিতে এরা বেশি খাটাখাটনি করতে পারে। রোগবালাইও হয় না বললেই চলে।

দীর্ঘায়ু: এরা সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত বাঁচে!

কিন্তু একটা ‘ট্র্যাজেডি’ আছে...

ঘোড়ার ক্রোমোজোম ৬৪টি আর গাধার ৬২টি। ফলে খচ্চর ক্রোমোজোম পায় ৬৩টি। এই বেজোড় সংখ্যার কারণে খচ্চর সাধারণত বন্ধ্যা (Sterile) হয়। অর্থাৎ, এরা নিজেরা কোনোদিন বাবা-মা হতে পারে না। প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়ম!

আজকের আধুনিক যুগেও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, সেনাবাহিনী বা প্রত্যন্ত খামারে খচ্চরের কোনো বিকল্প নেই। স্যালুট প্রকৃতির এই অদ্ভুত সুন্দর সৃষ্টিকে!

গাধা + ঘোড়া = খচ্চর! প্রকৃতির তৈরি এক ‘লিভিং লেজেন্ড’।

আমরা অনেক সময় কাউকে গালি দিতে ‘খচ্চর’ শব্দটা ব্যবহার করি, কিন্তু আপনি কি জানেন— খচ্চর আসলে প্রকৃতির অন্যতম সফল এবং বুদ্ধিমান সংকর (Hybrid) প্রাণী?

বাবার (গাধা) থেকে পেয়েছে: অসম্ভব ধৈর্য ও কম খেয়ে বেঁচে থাকার ক্ষমতা।

মায়ের (ঘোড়া) থেকে পেয়েছে: রাজকীয় শক্তি, গতি ও বড় শরীর।

কেন এরা সেরা?

সাধারণ ঘোড়ার চেয়ে এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি।

পাহাড়ি ও বিপজ্জনক রাস্তায় এরা মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা।

নিজের ওজনের চেয়েও বেশি লোড নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটতে পারে।

বিজ্ঞানের খেলা: গাধার ৬২ আর ঘোড়ার ৬৪ ক্রোমোজোমের মিলনে খচ্চরের ক্রোমোজোম হয় ৬৩টি। আর এই অমিলের কারণেই খচ্চর বংশবৃদ্ধি করতে পারে না (বন্ধ্যা হয়)।

@Science with Fahad


৪৮


"ইতিহাসের ৬টি গণ-উন্মাদনার ঘটনা — যখন বহু মানুষ একসাথে অদ্ভুত আচরণ শুরু করেছিল, আর কেউ আসল কারণ জানে না। একটা গোটা শহরের মানুষ দিনের পর দিন নাচতে নাচতে মারা গিয়েছিল। আর আমাদের দিল্লিতে — এক রাতে গোটা শহর এক 'কালা বান্দার'-এর ভয়ে কাঁপছিল।"

একজন মহিলা হঠাৎ রাস্তায় নাচতে শুরু করলেন। থামলেন না। কয়েকদিনের মধ্যে তাঁর সাথে নাচতে শুরু করল আরও শত শত মানুষ — থামার কোনো নাম নেই। কেউ কেউ নাচতে নাচতেই ক্লান্ত হয়ে মারা গেলেন। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর — কেউ জানে না কেন। মানুষের মন অদ্ভুত। কখনো কখনো একটা ভয়, একটা গুজব, একটা চাপ — গোটা একটা জনগোষ্ঠীর মধ্যে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, আর সবাই একসাথে অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করে। একে বলে "গণ-উন্মাদনা" (mass hysteria)। আজ সেই ছয়টা রহস্যময় ঘটনার কথা বলব।

প্রথম — ১৫১৮ সালের "নাচের মহামারি" (স্ট্রাসবুর্গ)।

প্রায় ৫০০ বছর আগে, ইউরোপের স্ট্রাসবুর্গ শহরে এক মহিলা হঠাৎ রাস্তায় নাচতে শুরু করলেন। কোনো গান নেই, কোনো উৎসব নেই — শুধু একটানা নাচ।আশ্চর্যের ব্যাপার, কয়েকদিনের মধ্যে আরও মানুষ তাঁর সাথে নাচতে শুরু করল। সংখ্যাটা বাড়তে বাড়তে কয়েকশোতে পৌঁছল। তারা দিনের পর দিন, প্রায় না থেমে নাচতেই থাকল। ফলাফল ছিল ভয়ঙ্কর — অনেকে অতিরিক্ত ক্লান্তি, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকে নাচতে নাচতেই মারা গেলেন। আজও ইতিহাসবিদরা নিশ্চিত নন কেন এমন হলো — কেউ বলেন বিষাক্ত ছত্রাক-লাগা খাবার, কেউ বলেন প্রবল মানসিক চাপ আর কুসংস্কার থেকে জন্মানো এক গণ-উন্মাদনা।

দ্বিতীয় — সালেমের ডাইনি-বিচার (১৬৯২)।

আমেরিকার সালেম গ্রামে কয়েকজন কিশোরী হঠাৎ অদ্ভুত আচরণ শুরু করল — খিঁচুনি, চিৎকার, শরীর বেঁকে যাওয়া। ডাক্তাররা কোনো রোগ খুঁজে পেলেন না। তখন মানুষ ভাবল — নিশ্চয়ই এটা ডাইনিবিদ্যা! কেউ এদের জাদু করেছে। শুরু হলো এক ভয়ঙ্কর ডাইনি-শিকার। একের পর এক মানুষকে "ডাইনি" সন্দেহে অভিযুক্ত করা হলো, বিচারের নামে প্রায় ২০ জন নিরীহ মানুষকে মেরে ফেলা হলো। পরে গবেষকরা মনে করেন, সেই কিশোরীদের আচরণ আসলে ছিল গণ-উন্মাদনা, কুসংস্কার আর সামাজিক চাপের মিশ্রণ। একটা ভুল বিশ্বাস কীভাবে নিরীহ মানুষের প্রাণ কাড়তে পারে, এটা তার ভয়ঙ্কর উদাহরণ।

তৃতীয় — মিউ মিউ করা সন্ন্যাসিনীরা (মধ্যযুগ)।

এই ঘটনাটা শুনলে অদ্ভুত লাগে, কিন্তু ইতিহাসের নথিতে এর উল্লেখ আছে। মধ্যযুগের ইউরোপে এক মঠে এক সন্ন্যাসিনী হঠাৎ বিড়ালের মতো "মিউ মিউ" করতে শুরু করলেন। আর তারপর? ধীরে ধীরে মঠের অন্য সন্ন্যাসিনীরাও তাঁর সাথে যোগ দিলেন। শেষে গোটা মঠের সবাই মিলে নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে বিড়ালের মতো ডাকতে শুরু করলেন! কথিত আছে, ব্যাপারটা থামাতে শেষে সৈন্য ডাকতে হয়েছিল। মধ্যযুগে এমন আরও ঘটনার কথা শোনা যায় — যেমন এক মঠে এক সন্ন্যাসিনী অন্যদের কামড়াতে শুরু করলে সেই আচরণ ছড়িয়ে পড়েছিল অন্য মঠেও। বদ্ধ পরিবেশে, প্রবল চাপের মধ্যে মানুষের মন কীভাবে একে অপরকে নকল করে — এটা তারই অদ্ভুত উদাহরণ।

চতুর্থ — সিয়াটলের উইন্ডশিল্ড রহস্য (১৯৫৪)।

আমেরিকার সিয়াটল শহরে হঠাৎ মানুষ লক্ষ্য করতে শুরু করল — তাদের গাড়ির কাচে (উইন্ডশিল্ডে) ছোট ছোট দাগ, খুদে গর্ত! আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বলল মহাজাগতিক রশ্মি, কেউ বলল পরমাণু পরীক্ষার তেজস্ক্রিয়তা এই দাগ ফেলছে। হাজার হাজার মানুষ পুলিশে অভিযোগ করল।কিন্তু তদন্তে বেরিয়ে এলো মজার সত্যিটা।আসলে সেই দাগগুলো সবসময়ই ছিল — রাস্তার সাধারণ ধুলো-পাথরের আঁচড়। শুধু আতঙ্কের চোটে মানুষ এই প্রথম কাচের ভেতর দিয়ে না তাকিয়ে কাচের দিকে তাকাতে শুরু করেছিল! কোনো রহস্য ছিল না — পুরোটাই ছিল একটা গণ-বিভ্রম। ভয় কীভাবে আমাদের সাধারণ জিনিসকেও অস্বাভাবিক দেখায়, এটা তার দারুণ উদাহরণ।

পঞ্চম — তাঙ্গানিকার হাসির মহামারি (১৯৬২)।

আফ্রিকার তাঙ্গানিকার (আজকের তানজানিয়া) একটা মেয়েদের স্কুলে, কয়েকজন ছাত্রী হঠাৎ হাসতে শুরু করল। সাধারণ হাসি নয় — থামানো যায় না এমন অদম্য হাসি।

আর সেই হাসি ছোঁয়াচে রোগের মতো ছড়াতে লাগল। একজন থেকে আরেকজন, আরেকজন থেকে আরও অনেকে। পরিস্থিতি এমন হলো যে স্কুল বন্ধ করে দিতে হলো। কিন্তু থামল না। হাসির এই "মহামারি" স্কুল থেকে ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের গ্রামে, অন্য স্কুলে — কয়েক মাস ধরে প্রায় হাজার মানুষকে কাবু করল। কোনো জীবাণু নয়, কোনো বিষ নয় — বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রবল মানসিক চাপ থেকে জন্মানো এক গণ-উন্মাদনাই ছিল এর কারণ।

ষষ্ঠ — দিল্লির "মাঙ্কি ম্যান" আতঙ্ক (২০০১)।  

২০০১ সালের মে মাস। দিল্লিতে তখন প্রচণ্ড গরম, আর রাতে ঘন ঘন লোডশেডিং — মানুষ অন্ধকার ছাদে ঘুমাতে বাধ্য হচ্ছিল। ঠিক তখনই গুজব ছড়াল — রাতের অন্ধকারে নাকি ঘুরে বেড়াচ্ছে এক ভয়ঙ্কর "কালা বান্দার" (মাঙ্কি ম্যান) — ধাতব নখ, জ্বলজ্বলে চোখ, মানুষকে আঁচড়ে-কামড়ে আক্রমণ করছে। আতঙ্ক দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ ভয়ে রাতে ঘুমানো বন্ধ করল, দলবেঁধে লাঠি নিয়ে পাহারা দিতে লাগল। ৩৫০-এরও বেশি মানুষ এই প্রাণী "দেখার" দাবি করল, ষাটেরও বেশি মানুষ আহত হলো। সবচেয়ে দুঃখজনক — আতঙ্কে অন্ধকার ছাদ বা সিঁড়ি থেকে পড়ে কয়েকজন প্রাণও হারালেন। অথচ পুলিশ বিপুল খোঁজাখুঁজি করেও কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব পেল না। চিকিৎসা-বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে বললেন — আঘাতগুলো আসলে আতঙ্কে পড়ে যাওয়া, ইঁদুর-কুকুরের কামড় বা সাধারণ আঁচড়। গরম, অন্ধকার আর চাপের মধ্যে জন্মানো এক বিশুদ্ধ গণ-উন্মাদনা — যা আজও বিশ্বজুড়ে এই বিষয়ের পাঠ্যবই উদাহরণ হিসেবে পড়ানো হয়।

ইতিহাসের এই ছয়টা ঘটনার দিকে তাকালে একটা গভীর, একটু ভয়ের সত্যি বেরিয়ে আসে।

আমাদের মন যতটা স্বাধীন ভাবি, ততটা নয়। ভয়, গুজব আর চাপ — এই তিনটে জিনিস একসাথে হলে, একজন মানুষের আতঙ্ক মুহূর্তে শত শত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর তখন যুক্তি, প্রমাণ — সব হার মানে। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিসটা সবসময় বাইরে থাকে না। মাঝে মাঝে সেটা থাকে আমাদের নিজেদের মনের ভেতরে — ভয় আর গুজবের রূপে। তাই গুজব বিশ্বাস করার আগে, একটু থেমে প্রশ্ন করা — এটাই আমাদের আসল রক্ষাকবচ।

আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা গণ-উন্মাদনার মধ্যে কোনটা শুনে আপনি সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন?  

১. নাচের মহামারি (১৫১৮) — নাচতে নাচতে মৃত্যু

২. সালেমের ডাইনি-বিচার (১৬৯২)

৩. মিউ মিউ করা সন্ন্যাসিনীরা (মধ্যযুগ)

৪. সিয়াটলের উইন্ডশিল্ড রহস্য (১৯৫৪)

৫. তাঙ্গানিকার হাসির মহামারি (১৯৬২)

৬. দিল্লির মাঙ্কি ম্যান (২০০১)

 @ সম্রাট রায় চৌধুরী 


৪৯

"ডিনোটিফাইড ট্রাইব।"

ভারতের মাদ্রাজের একটি থানায় একজন তরুণ বসে আছে। পুলিশ তার নাম জিজ্ঞেস করেনি প্রথমে। জিজ্ঞেস করেছে তার সম্প্রদায়ের নাম। উত্তর শুনে অফিসারের চোখে একটি পরিচিত পরিবর্তন এসেছে — সন্দেহের ছায়া।

এই তরুণ কোনো অপরাধ করেনি। কিন্তু তার সম্প্রদায়ের নাম একটি তালিকায় আছে — "ডিনোটিফাইড ট্রাইব।" এই তালিকা তৈরি হয়েছিল দেড়শো বছর আগে। সেই তরুণ জন্মায়নি তখন। তার বাবা-মাও জন্মায়নি। কিন্তু তালিকা এখনো আছে — এবং তালিকার ছায়া এখনো তার গায়ে।

সে জানে না — এই ছায়ার জন্ম হয়েছিল একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানীর হাতে, যিনি কখনো তার গ্রামে যাননি। যিনি শুধু কয়েক ডজন মানুষের মাথার খুলি মেপেছিলেন এবং একটি সিদ্ধান্ত লিখে দিয়েছিলেন।

১৮৯০-এর দশকে এডগার থার্সটন নামের একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তার হাতে ছিল মাপার যন্ত্র — তিনি মাপতেন মাথার খুলির আকার, উচ্চতা, নাকের প্রস্থ। প্রতিটি মাপ লেখা হতো। প্রতিটি মানুষ একটি সংখ্যা হয়ে যেত এবং প্রতিটি সংখ্যা একটি র‍্যাঙ্কিংয়ের অংশ — কে "উচ্চ", কে "নিম্ন", কে "সভ্য", কে "অসভ্য"।

মিশনারিরা তাকে সাহায্য করেছিল কিছু সম্প্রদায়ের তথ্য সংগ্রহে, যাদের তারা খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরের চেষ্টা করছিল। দুই পক্ষের লক্ষ্য একই ছিল — ভারতীয়দের এমনভাবে উপস্থাপন করা যেন তারা "নিকৃষ্ট" — যাদের প্রভু এবং ক্রুশ দুটোই প্রয়োজন।

থার্সটন ১৮৮৫ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত মাদ্রাজ গভর্নমেন্ট মিউজিয়ামের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন। তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার দিতেন এবং তিনি মাদ্রাজ পুলিশকে প্রশিক্ষণ দিতেন — "অ্যানথ্রোপোমেট্রি" নামের একটি ছদ্মবিজ্ঞান, যা শরীরের মাপ থেকে অপরাধপ্রবৃত্তি নির্ধারণ করার দাবি করত।

তিনি বিশ্বাস করতেন বুদ্ধিমত্তা নাকের প্রস্থের সাথে সম্পর্কিত এবং তিনি দাবি করতেন — কর্মচারী নিয়োগের সময় তিনি এই পরীক্ষা ব্যবহার করতেন।

একটি মুহূর্ত থামুন এবং এই বাক্যটি আবার পড়ুন।

একজন মানুষের নাকের প্রস্থ দেখে নির্ধারণ করা হতো সে চাকরি পাবে কিনা।

১৯০১ সালে থার্সটন ভারতের এথনোগ্রাফিক সার্ভেতে যোগ দেন। তিনি দক্ষিণ ভারত জুড়ে ৩০০-র বেশি জাতি ও উপজাতি পরিমাপ করেন — ১৫০,০০০ বর্গমাইল এলাকা, চার কোটিরও বেশি মানুষ।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটি — তার নমুনার আকার প্রায়ই ছিল হাস্যকরভাবে ছোট। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি জাতির জন্য মাত্র কয়েক ডজন মানুষ পরিমাপ করা হয়েছিল।

কয়েক ডজন মানুষ। চার কোটি মানুষের প্রতিনিধি এবং এই কয়েক ডজনের পরিমাপ থেকে যে "সিদ্ধান্ত" তৈরি হলো, তা ব্রিটিশ শাসনের জন্য একটি "বৈজ্ঞানিক" বৈধতা হয়ে দাঁড়াল। এত অবিশ্বাস্য যে এটি কল্পকাহিনী মনে হয়, কিন্তু এটি ইতিহাসের নথিভুক্ত সত্য।

প্রতিটি সাম্রাজ্যের একটি প্রয়োজন থাকে — নিজের শাসনকে নৈতিকভাবে বৈধ দেখানো। সরাসরি বলপ্রয়োগ সাময়িক। কিন্তু যদি শাসিত জনগোষ্ঠীকে "বৈজ্ঞানিকভাবে নিকৃষ্ট" প্রমাণ করা যায়, তাহলে শাসন আর দখলদারি মনে হয় না — মনে হয় দায়িত্ব।

থার্সটনের পরিমাপ ব্রিটিশদের একটি অমূল্য হাতিয়ার দিয়েছিল — ভারতের নিজের সম্প্রদায়গুলোর বোঝাপড়াকে উপেক্ষা করার অধিকার। সাংস্কৃতিক সূক্ষ্মতা, আঞ্চলিক পরিচয়, শতাব্দীর ঐতিহ্য — সবকিছু বাতিল হয়ে গেল মাথার খুলির মাপের সামনে।

এই যুক্তি ১৮৭১ সালের "ক্রিমিনাল ট্রাইবস অ্যাক্ট"-কে সমর্থন করেছিল — এমন একটি আইন যার অধীনে সম্পূর্ণ সম্প্রদায়কে জন্মগতভাবে "অপরাধী" ঘোষণা করা হলো। জন্মগতভাবে অপরাধী। অর্থাৎ, আপনি কোনো অপরাধ করার আগেই আপনি অপরাধী — কারণ আপনি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ে জন্মেছেন।

১৯৪৭ সাল নাগাদ, ১২৭টি সম্প্রদায়ের প্রায় ১.৩ কোটি মানুষ এই আইনের অধীনে প্রভাবিত হয়েছিল — নিবন্ধন, নজরদারি, চলাফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা।

১.৩ কোটি মানুষ। জন্মের কারণে অপরাধী তালিকায়। ১৯৪৯ সালে আইনটি বাতিল হয়। ১৯৫২ সালে সাবেক "ক্রিমিনাল ট্রাইব"-দের ডিনোটিফাই করা হয়। কাগজে-কলমে, সমস্যা সমাধান হয়ে গেল। কিন্তু একটি কলমের খোঁচায় ক্ষতি মুছে যায় না।

আজ ভারতে ৩১৩টি যাযাবর উপজাতি এবং ১৯৮টি ডিনোটিফাইড ট্রাইব আছে, যারা পুলিশিং এবং বিচারব্যবস্থায় আজও বিচ্ছিন্নতা এবং স্টেরিওটাইপের মুখোমুখি হয় — কারণ ব্রিটিশদের তৈরি করা শ্রেণিবিন্যাস।

সেই থানায় বসে থাকা তরুণটি এই ইতিহাস জানে না। সে শুধু জানে — পুলিশ তার সম্প্রদায়ের নাম শুনলে অন্যভাবে তাকায়। সেই "অন্যভাবে তাকানো"-র শিকড় একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানীর মাপার টেপে।

এই গল্পটি শুধু ব্রিটিশ অতীতের সমালোচনা নয়। এই গল্প আমাদের একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় — "বিজ্ঞান"-এর ভাষা যখন ক্ষমতার সেবায় ব্যবহৃত হয়, তখন কতদিন সেই মিথ্যা টিকে থাকতে পারে?

থার্সটনের অ্যানথ্রোপোমেট্রি আজ ছদ্মবিজ্ঞান বলে প্রমাণিত। কিন্তু সেই সময়ে এটি "বিজ্ঞান" নামে পরিচিত ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখানো হতো, পুলিশ প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতো।

আজকের পৃথিবীতে — যখন অ্যালগরিদম, AI, এবং "ডেটা-ভিত্তিক" সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয় — আমরা কি নিশ্চিত যে নতুন প্রজন্মের "বৈজ্ঞানিক" শ্রেণিবিন্যাস ভিন্ন কিছু? নাকি এটি একই পুরনো খেলা, নতুন পরিভাষায়?

সেই তরুণ থানা থেকে বের হবে। হয়তো কোনো অভিযোগ ছাড়াই, হয়তো কোনো শাস্তি ছাড়াই। কিন্তু তার মনে একটি প্রশ্ন থাকবে — কেন তার নাম শুনে অফিসারের চোখে সেই বিশেষ দৃষ্টি এলো?

সে জানে না উত্তরটা একজন মৃত ব্রিটিশ বিজ্ঞানীর হাতে লেখা একটি খাতায় আছে। যে মাপ একদিন নেওয়া হয়েছিল কয়েক ডজন মানুষের শরীরে, সেই মাপ আজও কোটি মানুষের কাঁধে বসে আছে — অদৃশ্য, কিন্তু ভারী।

@মনিরুল ইসলাম জামাল



৫০


কেন ধীরে খাবেন?

আজকের দ্রুতগতির বিশ্বে, বেশিরভাগ মানুষ আট মিনিটের মধ্যেই খাবার শেষ করে ফেলে, যা মস্তিষ্ক পরিপূর্ণ হওয়ার সংকেত পাওয়ার অনেক আগেই ঘটে।

জৈবিক ব্যবধান

আমাদের পাকস্থলী থেকে পূর্ণতার সংকেত (যেমন, কোলেসিস্টোকিনিন হরমোন এবং পাকস্থলীর প্রসারণের সংকেত) মস্তিষ্কে পৌঁছাতে প্রায় ২০ মিনিট সময় নেয়। আমরা সাধারণত এর চেয়ে দ্রুত খাই বলে প্রায়ই অজান্তে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার খেয়ে ফেলি এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ করি।

ধীরে খাওয়ার উপকারিতা

বিজ্ঞানসম্মত গবেষণায় দেখা গেছে যে, খাওয়ার গতি কমিয়ে আনলে দারুণ কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যায়:

১। ক্যালোরি গ্রহণ হ্রাস: গবেষণায় দেখা গেছে, ধীরে খেলে প্রতি বেলার খাবারে আপনি ৮-১০% কম ক্যালোরি গ্রহণ করতে পারেন।

২। তৃপ্তি বৃদ্ধি: খাওয়ার পর ক্ষুধা কম লাগে এবং অনেক বেশি সন্তুষ্টি অনুভূত হয়।

৩। হজম প্রক্রিয়ার উন্নতি: খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খেলে তা শরীরের স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে।

৪। দীর্ঘমেয়াদী ওজন নিয়ন্ত্রণ: এই অভ্যাসের মাধ্যমে কোনো কঠোর ডায়েট বা ইচ্ছাশক্তির লড়াই ছাড়াই স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সচেতনভাবে খাওয়ার উপায় (Mindful Eating)

আপনার শরীরের স্বাভাবিক সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দিতে নিচের সহজ অভ্যাসগুলো গড়ে তুলতে পারেন:

ক. ভালোভাবে চিবিয়ে খান: খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খেলে তা হজমে সাহায্য করে এবং খাওয়ার গতি ধীর করে।

খ. প্রতি গ্রাসের মাঝে চামচ বা হাত নামিয়ে রাখুন: প্রতিটি গ্রাসের মাঝে বিরতি নিন।

গ.স্বাদ নিন: প্রতিটি গ্রাসের স্বাদ ও গঠন অনুভব করার চেষ্টা করুন।

মূল কথা: আপনার শরীর জানে তার ঠিক কতটা প্রয়োজন। খাওয়ার গতি কমিয়ে দিয়ে খাবারকে তাড়াহুড়োর বিষয় না বানিয়ে সচেতনভাবে উপভোগ করুন। আপনার শরীরকেই আপনাকে জানাতে দিন যে আপনার পেট ভরে গেছে। @ Plabon Sarkar