বিজ্ঞান বলছে, শুধু একদিকে জোর দিলে ওর আসল মেধা কোনোদিনও খুলবে না!

"বাচ্চাকে শুধু পড়াশোনা আর অংক করালেই ও বুদ্ধিমান হবে, আর্ট বা সঙ্গিত চর্চা করালে ভবিষ্যৎ নষ্ট!" : মুরুব্বিদের এই চেনা আইডিয়া কিন্তু আমাদের বাচ্চার ব্রেইনের চরম ক্ষতি করছে। বিজ্ঞান বলছে, শুধু একদিকে জোর দিলে ওর আসল মেধা কোনোদিনও খুলবে না!

আমাদের বাচ্চার মাথা খাটিয়ে কোনো লজিক্যাল ধাঁধা মেলানো বা চমৎকার কোনো ছবি আঁকা: এই প্রতিটা কাজের পেছনে কাজ করে ওর ব্রেইনের দুটি ভিন্ন অংশ। একটি হলো বাম ব্রেইন যা যুক্তি ও ভাষা নিয়ন্ত্রণ করে, আর অন্যটি হলো ডান ব্রেইন যা আবেগ ও সৃজনশীলতা সামলায়।

নিউরোসায়েন্স ও চাইল্ড সাইকোলজির আধুনিক গবেষণা বলছে, সফল প্যারেন্টিংয়ের আসল চাবিকাঠি হলো এই দুই অংশের মধ্যে চমৎকার একটি সমন্বয় বা ব্যালেন্স তৈরি করা।

বাম ও ডান মগজের এই যুগলবন্দী কীভাবে আমাদের বাচ্চার বুদ্ধিমত্তা বাড়িয়ে দেয়, চলুন খুব সহজে জেনে নিই:

বাম ব্রেইন (যুক্তি ও নিয়ম): এটি আমাদের বাচ্চাকে গুছিয়ে কথা বলতে, অংক করতে এবং যেকোনো বিষয়ের পেছনের লজিক বা কারণ বুঝতে সাহায্য করে।

ডান ব্রেইন (আবেগ ও আর্ট): এটি ওর ভেতরের গল্প বলার ক্ষমতা, ছবি আঁকা, নতুন কিছু আবিষ্কারের ইচ্ছা এবং মানবিক অনুভূতিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে।

হোল-ব্রেইন ইন্টিগ্রেশন বা পূর্ণাঙ্গ বিকাশ: যখন ও কোনো লজিক্যাল কাজের পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ কাজে অংশ নেয়, তখন ব্রেইনের নিউরনগুলো একে অপরের সাথে দ্রুত যুক্ত হয়। এর ফলে বাচ্চার প্রবলেম-সলভিং স্কিল বা যেকোনো কঠিন সমস্যা নিজে সমাধান করার ক্ষমতা বহুণ বেড়ে যায়।

তাই ওকে শুধু সারাক্ষণ পড়ার টেবিলে বই মুখস্থ করতে বাধ্য করবেন না। পড়াশোনার পাশাপাশি ওকে ছবি আঁকতে দিন, গান শুন্তে দিন,মাটি দিয়ে খেলনা বানাতে দিন কিংবা মনের মাধুরী মিশিয়ে রূপকথার গল্প বলতে উৎসাহিত করুন। ব্রেইনের দুই অংশের এই ভারসাম্যই আমাদের বাচ্চাকে ভবিষ্যতে একজন অত্যন্ত স্মার্ট, শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। @Kiddification


আমেরিকার ৪ জন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন অবস্থায় খুন হইছে।

সর্বপ্রথম জন আব্রাহাম লিঙ্কন। সর্বশেষ কেনেডি।

আব্রাহাম লিঙ্কনের জানাযা বা অন্ত্যষ্টিক্রিয়ায় হোয়াইট হাউজে উপস্থিত ছিল ৬০০ (ছয়শো) জন।

তার লাশ টানা দুই মাস ধরে রেলে করে ১ হাজার ৬ শ মাইলের বেশি ঘুরানো হয়। আমেরিকার স্টেটে স্টেটে।

এই পুরা জার্নিতে তার কফিনে শ্রদ্ধা জানাইতে আসছে ১ মিলিয়ন বা ১০ লাখ মানুষ। দুই মাসে।

কেনেডির মৃত্যুর পর তার বউ মার্কিন সেনাবাহিনিকে অনুরোধ করছিল যেন তার শেষকৃত্যও লিঙ্কনের মত হয়।

তার শেষকৃত্যে এরকমই রাষ্ট্রীয়ভাবে ৯২ টা দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হইছে।

তার শেষকৃত্যের দিনকে রাষ্ট্রীয় শোক দিবস ঘোষণা করে সবকিছু ছুটি দেওয়া হইছে, যেন সবাই অংশ নিতে পারে।

আমেরিকার টেলিভিশনগুলোতে টানা ৪ দিন, কোনো ধরনের বিজ্ঞাপন ছাড়া, বিরতিহীনভাবে কেনেডির অন্ত্যষ্টিক্রিয়া প্রচারিত হইছে।

এই সবকিছুর পরে তার শেষকৃত্যে লোক হইছিল ১২ শ জন। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা সহ।

জনগণকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ১৮ ঘণ্টা সময় দেওয়া হইছিল। এই সময়ে আড়াই লাখ মানুষ শ্রদ্ধা জানাইছে তাকে।

এদিকে খামেনির জানাযায় বিবিসি, রয়টার্স, আল জাযিরা-সহ গ্রহণযোগ্য সমস্ত পত্রিকার ভাষ্যমতে দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ হবে।

জানাযা উপলক্ষে আসা মুসল্লিদের মাঝে বিতরণের জন্য ৫ কোটি রুটি তৈরি করা হচ্ছে।

কোথায় আড়াই লাখ, আর কোথায় দুই কোটি!!

অথচ কেনেডির মৃত্যুর সময় আমেরিকার জনসংখ্যা ছিল ১৮ কোটি ৯২ লাখ, অর্থাৎ প্রায় ১৯ কোটি।

ইরানের বর্তমান জনসংখ্যা ৯ কোটি।

১৯ কোটি থেকে আড়াই লাখ, ৯ কোটি থেকে দুই কোটি!

তারপরও মার্কিন প্রেসিডেন্টরা অফ দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল। আর ইরানি রেজিম জনবিচ্ছিন্ন!

@ রাকিবুল হাসান


যদি জ্বর, সর্দি বা কাশি থাকে, তাহলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, বেশি করে পানি পান করুন, পুষ্টিকর খাবার খান এবং অন্যদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার করুন। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু না করে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন 

2


তিদিন পানিভর্তি গ্লাসে লবণ মিশিয়ে পান করা কি বুদ্ধিমানের কাজ?  


লবণ-পানি পানের ব্যাপারে ভারতের জুপিটার হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের ডিরেক্টর ডা. অমিত সরাফ বলেন, আপনার প্রতিদিনের খাবার থেকে শরীরের প্রয়োজনীয় সোডিয়ামের চাহিদা পূরণ হয়। এ কারণে প্রতি গ্লাস পানিতে বাড়তি লবণ মিশিয়ে পান করা হলে তা সহজেই আপনার দৈনিক সোডিয়াম গ্রহণের মাত্রা অতিক্রম হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যা থেকে উচ্চ রক্তচাপ, শরীরে পানি জমে যাওয়া বা ওয়াটার রিটেনশন এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। 

তিনি বলেন, লবণের পানি নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে সাহায্য করে, যেমন- অতিরিক ঘাম পড়লে, দীর্ঘ সময় শরীরচর্চা করলে, বমি বা ডায়রিয়া হলে বা তীব্র গরমে যখন শরীর থেকে লবণ বের হয়। তবে এই লবণ-পানিকে প্রতিদিন পানের অভ্যাসে পরিণত করা ঠিক নয় এবং এতে ক্ষতিও হতে পারে।

কাদের লবণ-পানি পান করা ঠিক নয়:
উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনির রোগ, শরীরে ফোলাভাব বা পানি জমা ও থাইরয়েডের সমস্যা থাকা ব্যক্তিদের কখনো লবণ-পানি পান করা উচিত নয়। ডা. অমিত বলেন, কিডনি রোগে আক্রান্তদের ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া পানিতে বাড়তি লবণ মিশিয়ে পান করা উচিত নয়। কেননা, তাদের শরীর সোডিয়ামের প্রতি অনেক সংবেদনশীল থাকে।

কোন পরিস্থিতি পানিতে লবণ মেশানো উপযুক্ত:
খুবই সীমিত ক্ষেত্রে পানিতে লবণ মেশানো উপযুক্ত হতে পারে। এ ব্যাপারে ডা. অমিত বলেন, বেশি পরিশ্রমের খেলাধুলা, অসুস্থতার কারণে পানিশূন্যতা বা দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র গরমে থাকার কারণে ইলেক্ট্রোলাইট (সোডিয়ামসহ) দিয়ে শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনে পানিতে লবণ মিশিয়ে পান করা যেতে পারে। তবে এসব পরিস্থিতিতে পানিতে ধারণার ওপর লবণ না মিশিয়ে বরং ওআরএস বা চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুমোদিত ইলেক্ট্রোলাইট ড্রিংকস পান করা নিরাপদ ও কার্যকরী বিকল্প। @ channel24bd

ফার্সী নামক ভাষা এটি সাতশ' বছর ধরে ভারতের রাষ্ট্রভাষা ছিল। যদিও পাঠান ও মোগল কারোরই মাতৃভাষা ফার্সী ছিল না। শেষ বাদশা বাহাদুর শা বাদশার অন্তঃপুরেও তুর্কী বলা হত। যদিও রাজদরবারের ফার্সী চলতো, কিন্তু কবিসম্মেলনে প্রধানত উর্দু। ইংরেজও প্রথম একশ' বছর এ দেশে ফার্সী দিয়েই কাজ চালায়। ১৮৪০-এর কাছাকাছি একদিন তারা ফার্সী নাকচ করে দিয়ে ইংরিজি চালালে। যে হিন্দু কায়স্থরা একদা অত্যুত্তম ফার্সী শিখে পদস্থ রাজকর্মচারী হতেন, তাঁরা ৫০/৬০ বছরের ভিতর ফার্সী বেবাক ভুলে গিয়ে ইংরিজির মাধ্যমে রাজকর্ম চালিয়ে যেতে লাগলেন। -~ সৈয়দ মুজতবা আলী, টুনিমেম, 


3

"নরওয়ে" নামটি শুনলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে বিশাল সমুদ্র, তুষারঢাকা পর্বত আর ভয়ংকর ভাইকিং যোদ্ধাদের ছবি। ইতিহাসে এমন একটি জাতির নাম ভাইকিং, যারা ইউরোপের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামুদ্রিক ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে। এ কারণেই নরওয়েকে প্রায়ই "ভাইকিংদের দেশ" (Land of the Vikings) বলা হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে নরওয়ের সবাই ভাইকিং ছিল বা আজও নরওয়েজিয়ানরা ভাইকিং। এটি মূলত একটি ঐতিহাসিক পরিচয়।

কারা ছিল ভাইকিং?

ভাইকিং বলতে মূলত অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর (প্রায় ৭৯৩–১০৬৬ খ্রিস্টাব্দ) স্ক্যান্ডিনেভিয়ার সমুদ্রযোদ্ধা, ব্যবসায়ী, অভিযাত্রী ও বসতি স্থাপনকারীদের বোঝায়। তারা বর্তমান নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্রপথে ভ্রমণ করত। "Viking" শব্দটি সম্ভবত প্রাচীন নর্স ভাষার víkingr থেকে এসেছে, যার অর্থ সমুদ্র অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তি।

নরওয়ের সঙ্গে ভাইকিংদের সম্পর্ক কেন এত গভীর?

নরওয়ের ভৌগোলিক অবস্থান ভাইকিংদের সমুদ্রযাত্রার জন্য আদর্শ ছিল। দীর্ঘ উপকূলরেখা, অসংখ্য ফিয়র্ড এবং উন্নত জাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি নরওয়েজিয়ান ভাইকিংদের দক্ষ নাবিকে পরিণত করেছিল। তারা শুধু লুটপাটই করেনি; বরং দূরদূরান্তে বাণিজ্য করেছে, নতুন নতুন ভূমিতে বসতি গড়েছে এবং বিভিন্ন সভ্যতার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি করেছে। নরওয়েজিয়ান ভাইকিংরা আইসল্যান্ড, গ্রিনল্যান্ড এবং উত্তর আমেরিকার ল'আঁস অ মেদোজ (L'Anse aux Meadows) পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ইউরোপীয়দের আমেরিকায় পৌঁছানোর সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণগুলোর একটি, যা ক্রিস্টোফার কলম্বাসেরও প্রায় ৫০০ বছর আগের ঘটনা।

ভাইকিংরা কি শুধু যোদ্ধাই ছিল?

জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও সিরিজে ভাইকিংদের প্রায়ই শুধু নির্মম যোদ্ধা হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে তারা ছিল বহুমুখী দক্ষতার অধিকারী। তারা কৃষিকাজ করত, মাছ ধরত, ব্যবসা-বাণিজ্য চালাত, লোহা ও কাঠের কাজ করত এবং বিশ্বের অন্যতম উন্নত কাঠের জাহাজ নির্মাণে পারদর্শী ছিল। তাদের তৈরি লংশিপ (Longship) ছিল দ্রুতগামী, শক্তিশালী এবং অগভীর পানিতেও চলতে সক্ষম। এই প্রযুক্তিই তাদের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রাকে সম্ভব করেছিল।

ভাইকিং যুগের সমাপ্তি

একাদশ শতাব্দীর দিকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় খ্রিস্টধর্মের বিস্তার, শক্তিশালী রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং ইউরোপে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ভাইকিং যুগের অবসান ঘটে। এরপর ধীরে ধীরে তাদের লুটতরাজ ও সামরিক অভিযান বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা স্থায়ী সমাজব্যবস্থায় একীভূত হয়।

আজও কেন নরওয়েকে ভাইকিংদের দেশ বলা হয়?

বর্তমান নরওয়ের মানুষ ভাইকিং নয়, তবে তারা সেই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। নরওয়ায় এখনও ভাইকিং যুগের অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, জাদুঘর, প্রাচীন জাহাজ এবং ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষিত রয়েছে। দেশটির সংস্কৃতি, পর্যটন ও জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে এই ভাইকিং ঐতিহ্য। তাই নরওয়েকে "ভাইকিংদের দেশ" বলা হয় মূলত তার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণে, বর্তমান জনগণকে ভাইকিং বোঝানোর জন্য নয়।

ভাইকিংরা শুধু ভয়ংকর যোদ্ধা ছিল না; তারা ছিল দক্ষ নাবিক, ব্যবসায়ী, অভিযাত্রী এবং নতুন পৃথিবীর অনুসন্ধানকারী। নরওয়ের ইতিহাসে তাদের অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে হাজার বছর পরও দেশটি বিশ্বজুড়ে "ভাইকিংদের দেশ" হিসেবেই পরিচিত। এটি নরওয়ের অতীতের গৌরবময় ইতিহাসের প্রতীক, বর্তমান পরিচয়ের নয়।

 প্রত্যয় সাহা, 

4


১৭৬৫: যে বছরে বাংলার সম্পদ লুটের সরকারি অনুমতি পেল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি!

১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে। এই ঘটনাই বাংলার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় এনে দেয়। মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভের মাধ্যমে কোম্পানি কেবল একজন বণিক হিসেবে নয়, কার্যত একটি শাসকশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। রবার্ট ক্লাইভ কোর্ট অফ ডিরেক্টরসকে লিখেছিলেন যে বাংলার দেওয়ানি থেকে যে বিপুল রাজস্ব আদায় হবে, তা দিয়ে কোম্পানির প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি ব্যবসার মূলধনও সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। বাস্তবেও তাই ঘটেছিল। এতদিন ব্রিটেন থেকে সোনা-রূপো এনে ভারতীয় পণ্য কেনা হতো, কিন্তু দেওয়ানি লাভের পর সেই প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়। বাংলার রাজস্বই কোম্পানির ব্যবসার মূলধন হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, বাংলার সম্পদ বাংলার উন্নয়নে ব্যয় না হয়ে ধারাবাহিকভাবে ব্রিটেনে প্রবাহিত হতে থাকে। ইতিহাসে এটিই ‘সম্পদ-নিষ্কাশন’ (Drain of Wealth)-এর অন্যতম সূচনা হিসেবে বিবেচিত।

অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লোভে কোম্পানি জমিদারি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। বহু প্রাচীন বনেদি জমিদার, যাঁদের সঙ্গে প্রজাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও মানবিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তাঁদের জমিদারি নিলামে বিক্রি হতে থাকে। সেই জায়গায় উঠে আসেন এক নতুন ধনী ব্যবসায়ী শ্রেণি। তাঁরা সর্বোচ্চ দর দিয়ে জমিদারি কিনে প্রথমেই সেই বিনিয়োগের টাকা সুদে-আসলে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে প্রজাদের ওপর অসহনীয় খাজনার বোঝা চাপতে থাকে। বনেদি জমিদাররা দুর্ভিক্ষ, বন্যা বা অন্য দুর্যোগে অনেক সময় প্রজাদের পাশে দাঁড়ালেও নতুন জমিদারদের কাছে প্রজারা ছিল কেবল রাজস্ব আদায়ের মাধ্যম। একই সঙ্গে আমিলদারি ব্যবস্থার প্রসার সাধারণ কৃষকের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে।

এই সময় বাংলার অধিকাংশ মানুষ যখন দারিদ্র্য, ঋণ ও অনাহারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন অল্প কয়েকজন ব্যক্তি বিপুল ধনসম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। ওয়ারেন হেস্টিংসের ঘনিষ্ঠ বেনিয়ান কান্তবাবু একের পর এক জমিদারি কিনতে থাকেন। অন্যদিকে দেওয়ান গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ ক্ষমতা, প্রভাব, উৎকোচ ও নানা কৌশলের মাধ্যমে বিপুল অর্থসম্পদ অর্জন করেন। সে সময় অধিকাংশ জমিদারই নিজেদের জমিদারি রক্ষা করতে কান্তবাবু ও গঙ্গাগোবিন্দ সিংহকে সন্তুষ্ট রাখতে বাধ্য হতেন। ফলে প্রশাসনে তাঁদের প্রভাব ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত।

পরে ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ইমপিচমেন্টের সময় বিশিষ্ট ব্রিটিশ রাষ্ট্রনায়ক এডমন্ড বার্ক গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, গঙ্গাগোবিন্দ সিংহের নাম শুনলেই সমগ্র ভারত ভয়ে শিউরে উঠত; তাঁর মতো দুর্বৃত্ত, শঠ ও কুশলী ব্যক্তি ভারত আর জন্ম দেয়নি। যদিও এই বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল, তবুও এটি সমকালীন প্রশাসনিক দুর্নীতি ও শোষণের চিত্র তুলে ধরে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল এই যে, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কঠোর শোষণের মাধ্যমে সংগৃহীত বিপুল অর্থের একটি অংশ সামাজিক ও ধর্মীয় আড়ম্বর প্রদর্শনে ব্যয় করা হয়। গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ তাঁর মাতৃশ্রাদ্ধে সেই যুগে প্রায় কুড়ি লক্ষ টাকা ব্যয় করেছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। পৌত্রের অন্নপ্রাশনের নিমন্ত্রণপত্র স্বর্ণপত্রে খোদাই করে পাঠানো হয়েছিল এবং পুরাণকথকদের লক্ষ লক্ষ টাকা দান করা হয়েছিল। একদিকে বাংলার মানুষ যখন দুবেলা দুমুঠো অন্নের জন্য সংগ্রাম করছে, অন্যদিকে এমন বিলাসবহুল আয়োজন সেই সময়কার সামাজিক বৈষম্যের এক নির্মম প্রতীক হয়ে ওঠে।

১৭৬৯ সালে মুর্শিদাবাদ দরবারে নিযুক্ত কোম্পানির রেসিডেন্ট রিচার্ড বীচার স্বীকার করেছিলেন যে কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর বাংলার মানুষের অবস্থা আগের তুলনায় আরও শোচনীয় হয়েছে। তিনি লিখেছিলেন, স্বেচ্ছাচারী দেশীয় শাসকদের আমলেও এই দেশ ছিল সমৃদ্ধ ও স্বচ্ছল; কিন্তু যখন শাসনভার প্রধানত ইংরেজদের হাতে এল, তখন থেকেই দেশ ধ্বংসের পথে এগোতে শুরু করল। একজন উচ্চপদস্থ কোম্পানি কর্মকর্তার এই মন্তব্য সে সময়কার বাস্তব অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই নির্মম অর্থনৈতিক শোষণের মধ্যেই ১৭৬৮ সালের আগস্ট থেকে ১৭৬৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ অনাবৃষ্টি, খরা ও ভয়াবহ শস্যহানি বাংলাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও কোম্পানি রাজস্ব আদায়ে কোনো উল্লেখযোগ্য ছাড় দেয়নি। ফলে দুর্ভিক্ষ দ্রুত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে এবং ১৭৭০ সালে ইতিহাসের কুখ্যাত ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’-এর সৃষ্টি হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, গ্রাম উজাড় হয়ে যাওয়া, কৃষি ও অর্থনীতির ধ্বংস এবং বাংলার জনজীবনের দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়—সব মিলিয়ে দেওয়ানি লাভের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই বাংলা এক নজিরবিহীন মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়।

©Manas Bangla



5


গরম পানি সত্যিই ঠাণ্ডা পানির চেয়ে দ্রুত বরফ বা জমাট বাঁধতে পারে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই অদ্ভুত কিন্তু সত্য ঘটনাটিকে বলা হয় ‘এমপেম্বা প্রভাব’ (Mpemba Effect)।

১৯৬০-এর দশকে তানজানিয়ার একজন স্কুলছাত্র এরাস্তো এমপেম্বা আইসক্রিম তৈরির সময় প্রথম লক্ষ্য করেন যে, গরম দুধ ও চিনির মিশ্রণটি ঠাণ্ডা মিশ্রণের চেয়ে আগে জমাট বেঁধেছে। পরবর্তীতে physicists এবং গবেষকরা বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এই ঘটনার সত্যতা খুঁজে পান।

তাত্ত্বিকভাবে, গরম পানিকে বরফ হতে হলে প্রথমে ঠাণ্ডা পানির তাপমাত্রায় আসতে হবে, তারপর সেটি বরফ হবে। তাহলে গরম পানি কীভাবে আগে জমে? বিজ্ঞানীরা এর পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করেছেন:

বাষ্পীভবন (Evaporation): গরম পানি থেকে দ্রুত বাষ্প উড়ে যায়। ফলে পাত্রে পানির পরিমাণ বা ভর কিছুটা কমে যায়। কম পানি থাকার কারণে তা দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে বরফে পরিণত হতে পারে।

দ্রবীভূত গ্যাস (Dissolved Gases): ঠাণ্ডা পানিতে সাধারণত বেশি পরিমাণে গ্যাস (যেমন অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড) দ্রবীভূত থাকে, যা পানি জমার প্রক্রিয়াকে কিছুটা ধীর করে।

অন্যদিকে, পানি গরম করলে এই গ্যাসগুলো বের হয়ে যায়, যা দ্রুত বরফ হতে সাহায্য করে।

পরিচলন স্রোত (Convection Currents): গরম পানির পাত্রে তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে দ্রুত পরিচলন স্রোত তৈরি হয়। এতে পাত্রের ভেতরের গরম পানি দ্রুত ওপরে চলে আসে এবং চারপাশের দেয়াল দিয়ে তাপ ছেড়ে দিয়ে দ্রুত ঠাণ্ডা হয়।

যদিও সব পরিস্থিতিতে এই ঘটনাটি ঘটে না এবং এটি পানির পাত্রের আকার, ফ্রিজের তাপমাত্রা ও বাতাসের প্রবাহের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে,


6


১২৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি। বাগদাদ শহর, তখনকার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জ্ঞান-কেন্দ্র।

কয়েকশো বছর ধরে, এই শহরে জমা হয়েছিল মানবজাতির সংগৃহীত জ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডার — গ্রিক দর্শন, পারস্যের বিজ্ঞান, ভারতের গণিত, সবকিছু অনূদিত, সংরক্ষিত, নতুন করে বিকশিত। এই জ্ঞানকেন্দ্রের নাম — "বায়ত আল-হিকমা," জ্ঞানের ঘর। সেই ফেব্রুয়ারির এক সকালে, মঙ্গোল বাহিনী শহরের দেয়াল ভেঙে ঢুকে পড়ল।

প্রথম অধ্যায় — এক স্বর্ণযুগের শহর।

অষ্টম শতাব্দীতে, খলিফা হারুন আল-রশিদ প্রতিষ্ঠা করেন এই জ্ঞানকেন্দ্র। তার ছেলে, খলিফা আল-মামুনের সময়, এটা পরিণত হয় এক পূর্ণাঙ্গ গবেষণা-প্রতিষ্ঠানে, বিশ্বজুড়ে থেকে আসা পণ্ডিতদের মিলনস্থল। ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে বিদ্বানরা এখানে আসতেন জ্ঞান আহরণে।

দ্বিতীয় অধ্যায় — যা এখানে সংরক্ষিত ছিল।

এই গ্রন্থাগারে ছিল গ্রিক, পারস্য, ভারতীয়, সিরিয়ান বিজ্ঞানের হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি — জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, গণিত, দর্শন। পণ্ডিতরা এসব অনুবাদ করতেন আরবিতে, তারপর তাদের নিজস্ব গবেষণা দিয়ে আরও বিকশিত করতেন। এই একটা প্রতিষ্ঠানই ইউরোপীয় রেনেসাঁর বহু আগে বিজ্ঞানের এক বিশাল আলো জ্বালিয়ে রেখেছিল।

তৃতীয় অধ্যায় — যে বাহিনী শহরের দরজায়।

চেঙ্গিস খানের নাতি, হুলাগু খান, তার বিশাল বাহিনী নিয়ে বাগদাদ অবরোধ করলেন। কয়েক সপ্তাহের বোমাবর্ষণের পর, শহরের দেয়াল ভেঙে পড়ল। মঙ্গোলরা শহরে ঢুকে শুরু করল ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ধ্বংসযজ্ঞ।

চতুর্থ অধ্যায় — খলিফাকে বাধ্য করা হলো দেখতে।

এটার জন্যই Save করতে বলেছিলাম (দ্বিতীয় অংশ)।

মঙ্গোলরা পণ্ডিত, কবি, শিক্ষকদের হত্যা করল নির্বিচারে। তারপর তারা শুরু করল গ্রন্থাগার ধ্বংস। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফাকে বাধ্য করা হয়েছিল স্বচক্ষে এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে — যখন সৈন্যরা হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি বইয়ের পাতা টাইগ্রিস নদীতে ছুঁড়ে ফেলছিল।

পঞ্চম অধ্যায় — নদী যখন কালো হয়ে গেল।

ইতিহাসবিদদের বর্ণনায়, এত বিপুল পরিমাণ বই নদীতে ফেলা হয়েছিল যে নদীর পানির রং বদলে গেল — কালিতে কালো হয়ে গেল, আর নাকি কিছু বর্ণনায় রক্তেও লাল হয়ে গিয়েছিল। কয়েক দিন ধরে নাকি নদীর ওপর দিয়ে ঘোড়া চালানো সম্ভব ছিল, এত বই ভাসছিল পানিতে।

ষষ্ঠ অধ্যায় — এক দূরদর্শী পণ্ডিতের সাহস।

সব হারায়নি, তবে। এক পারস্য জ্যোতির্বিজ্ঞানী, নাসির আল-দিন আল-তুসি, আসন্ন এই বিপর্যয়ের আভাস পেয়ে হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি আগেই সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন — ইরানের এক মানমন্দিরে, নিরাপদে। তার এই দূরদর্শিতাই বাঁচিয়ে দিয়েছিল জ্ঞানের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা নাহলে চিরতরে হারিয়ে যেত।

সপ্তম অধ্যায় — যা কখনো পূরণ হয়নি।

এই একটামাত্র সপ্তাহে, শত শত বছরের সংগৃহীত জ্ঞান ধ্বংস হয়ে গেল। ইতিহাসবিদরা প্রায়ই এই ঘটনার তুলনা করেন আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের পতনের সাথে — পার্থক্য শুধু এই যে আলেকজান্দ্রিয়ায় ক্ষয় ছিল ধীর, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে; বাগদাদে ধ্বংস এলো এক লহমায়, নির্মম এক সপ্তাহে।

অষ্টম অধ্যায় — একটা যুগের সমাপ্তি।

বাগদাদের এই পতন চিহ্নিত করে ইসলামি স্বর্ণযুগের সমাপ্তি — এক যুগ, যা প্রায় পাঁচশো বছর ধরে বিশ্বের বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাবিদ্যাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। শহরটা কখনো পুরোপুরি তার আগের গৌরব ফিরে পায়নি।

শেষ কথা।

বায়ত আল-হিকমার গল্প আমাদের কয়েকটা গভীর সত্য শেখায়। প্রথমত — জ্ঞান ধ্বংস করা সবচেয়ে নির্মম যুদ্ধাস্ত্র হতে পারে: একটা শহর জয় করাই যথেষ্ট ছিল না মঙ্গোলদের জন্য — তারা চেয়েছিল সেই শহরের বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মাও নিশ্চিহ্ন করে দিতে। দ্বিতীয়ত — একজন মানুষের দূরদর্শিতা ইতিহাসকে বাঁচাতে পারে: আল-তুসির সেই সাহসী পদক্ষেপ ছাড়া, আমরা হয়তো আরও অনেক বেশি হারাতাম — প্রমাণ করে দেয়, বিপর্যয়ের মধ্যেও একজন মানুষের প্রজ্ঞা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে। আর তৃতীয়ত — সভ্যতার আলো কখনো একটামাত্র জায়গায় স্থায়ী থাকে না: বাগদাদের আলো নিভে গেলেও, সেই জ্ঞান ততদিনে ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ পর্যন্ত, পরবর্তী রেনেসাঁর বীজ বুনে দিয়ে — প্রমাণ করে, সত্যিকারের জ্ঞান কখনো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না, এটা শুধু নতুন জায়গায় শিকড় গাড়ে। @সম্রাট রায় চৌধুরী 


7

১ জুন, বিশ্ব সঙ্গীত দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি উদযাপিত হচ্ছে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে। সঙ্গীত বা গান শুনেন না, এমন মানুষ কমই রয়েছেন। আনন্দ, দুঃখ, ভালোবাসা কিংবা স্মৃতির মুহূর্ত– সব অনুভূতিরই এক অনন্য ভাষা হলো গান। যেকোনো স্বাধীকার আন্দোলনে সঙ্গীত হয়ে উঠে অনুপ্রেরণার অন্যতম এক উৎস। তবে সঙ্গীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের মানসিক প্রশান্তি, শারীরিক সুস্থতা এবং সামাজিক বন্ধন তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত গান শোনা মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়তা করে!

ডোপামিন নিঃসরণ:

গবেষণা বলে, গান মস্তিষ্ককে ডোপামিন নিঃসরণ করতে উদ্দীপিত করে। ডোপামিন আনন্দ ও প্রাপ্তির অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ফলে মনমেজাজ ভালো করে, মানসিক চাপ কমে। গান মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের অধ্যাপক ডেইজি ফ্যানকোর্ট বলেন, ❝গান গাইলে কোর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন বা মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের পরিমাণ কমে যায়। এছাড়া এটি এন্ডরফিন হরমোনের নি:সরণেও সাহায্য করে। যে হরমোনের মাত্রার ওপর আমাদের মেজাজ ভাল থাকা-না থাকা নির্ভর করে।❞ এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ৪০ মিনিট ধরে দলীয় গান গাওয়ার পরে মানুষের শরীরে কর্টিসোল বা স্ট্রেস হরমোন স্বাভাবিক সময়ের চাইতে আরো কম হারে নিঃসরিত হয়েছে। বিশেষ করে ধ্রুপদী সঙ্গীত শুনলে আরো বেশি কার্যকারিতা পাওয়া যায়।

স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি:

গান শুনলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ সক্রিয় হয়ে উঠে। ফলে স্মৃতি শক্তি প্রখর হয়। মনকে শিথিল করে, অশান্ত মনকে শান্ত করে। সঙ্গীত ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রষ্ট রোগে আক্রান্ত রোগীদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে অনেকটা ওষুধের মতো কাজ করে। এজন্য গানকে থেরাপি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। ড. সাইমন ওফার বলেন, ❝যখন আমরা গান করি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের পিকর্টিক্যাল অংশে রক্তের প্রবাহ বাড়ে। মস্তিষ্কের এই অংশটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণেই মানুষের ডিমেনশিয়া হয়ে থাকে। যখন ডিমেনশিয়া রোগীরা গান গেয়ে ওঠেন বা গান শোনেন, তখন তারা অনেকটা ঘুম থেকে জেগে ওঠার অনুভূতি এবং বিভিন্ন কাজে নিজেদের আরও গভীরভাবে জড়িয়ে নেন।❞ ২০২০ সালের একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায় যে, সঙ্গীতশিল্পীরা বিভিন্ন স্মৃতি পরীক্ষায় অ-সঙ্গীতশিল্পীদের চেয়ে ভালো করেন এবং তাদের কার্যকরী স্মৃতির ধারণক্ষমতাও বেশি হতে পারে । আলঝেইমার রোগের কারণে সংগীত স্মৃতিও কম প্রভাবিত হতে পারে । নির্দিষ্ট কিছু সংগীতের সাথে স্মৃতি যুক্ত করা আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কিছু স্মৃতি আরও বিস্তারিতভাবে স্মরণ করতে সাহায্য করতে পারে।

মনোযোগ বৃদ্ধি:

পড়াশোনা এবং দৈনন্দিন অন্যান্য কাজে মনোযোগ অনেক প্রয়োজন। সঙ্গীত এই মনোযোগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তাছাড়াও সৃজনশীল হয়ে উঠতেও সঙ্গীতের ভূমিকা অনেক। মার্কিন গবেষণাবিদদের দাবি গণিত করার সময় গান শুনলে সাফল্যের হার আরো বৃদ্ধি পায়!

শারীরিক উপকারিতা:

গান শোনা শারীরিকভাবেও উপকারি। হৃৎকম্পন স্বাভাবিক রাখতে, রক্তচাপ ও উদ্বেগ কমাতে এবং প্রশান্তি বাড়াতে সাহায্য করে গান। ধীর গতির নরম সুরের গান শুনলে শ্বাস প্রশ্বাস ধীর হয় এবং স্ট্রেস লেভেল কমে যায়। অনেক সময় চিকিৎসকেরা কিছু কিছু অস্ত্রোপচারের পর ব্যথা লাঘবে ও দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য বিশেষ ধরনের গান শোনার পরামর্শ দেন!

অনিদ্রা দূর করতে:

অনেক ক্লান্তিতেও যদি ঘুম না আসে, তবে ঘুমের আগ মুহূর্তে শান্ত প্রকৃতির গান শোনা হতে পারে একটি সুন্দর সমাধান! গান শুনলে উদ্বেগ দূর হয়,মনে আসে প্রশান্তি–তাই অনিদ্রা দূর করতে গান শোনা কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তবে উচ্চ শব্দে এবং উচ্চ লয়ের গান শুনলে হিতে বিপরীত হতে পারে!

সঙ্গীত মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং মানসিক প্রশান্তি, স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বৃদ্ধি, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ হ্রাস এবং শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিক গবেষণাও সঙ্গীতের এই ইতিবাচক প্রভাবের স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এর সুফল পেতে পরিমিত মাত্রায় ও উপযুক্ত ধরনের গান শোনা প্রয়োজন। বিশ্ব সঙ্গীত দিবসে বলা যায়, সঙ্গীত শুধু কানের শান্তি নয়, বরং এটি মন, মস্তিষ্ক ও শরীরের জন্যও এক অনন্য আশীর্বাদ। @প্রত্যয় সাহা,



8


মিষ্টি খাবার কেন আমাদের ক্লান্ত করে?

অতিরিক্ত চিনি, বিশেষ করে রিফাইন্ড বা পরিশোধিত চিনি খাওয়ার অভ্যাস আমাদের শরীরে ভিটামিন বি-এর (যেমন: বি১, বি২ এবং বি৩) চাহিদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমরা যে খাবার খাই, তার গ্লুকোজকে ভেঙে কোষের ভেতরে এনার্জি বা শক্তিতে রূপান্তরিত করতে এই ভিটামিনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

​মুশকিল হলো, চিনি আমাদের শরীরে প্রচুর ক্যালোরি জোগালেও এতে বিন্দুমাত্র ভিটামিন বা পুষ্টিগুণ থাকে না। ফলে, চিনি হজম করতে গিয়ে শরীর তার আগে থেকে জমা থাকা ভিটামিন ও পুষ্টি উপাদানগুলোকে খরচ করে ফেলে, কিন্তু নতুন করে সেই ঘাটতি আর পূরণ করতে পারে না। একে বলা যায় একমুখী খরচ। এভাবে শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন বি-এর অভাব দেখা দিলে আমাদের এনার্জি বা শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া অনেকটাই ধীর হয়ে পড়ে, যার ফলে আমরা সহজেই ক্লান্তি অনুভব করি।

​আমাদের শরীরের স্বাভাবিক রসায়ন (Body chemistry) এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবারের ওপর পরিচালিত বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাগুলো এই বিষয়টির জোরালো প্রমাণ দেয়। তাই, শরীরের মেটাবলিজম (Metabolism) বা বিপাক ক্রিয়াকে মসৃণ ও সচল রাখতে এবং পুষ্টির ঘাটতি এড়াতে আমাদের প্রতিদিনের খাবারে চিনির পরিমাণ কমিয়ে 'হোল ফুডস' (Whole foods) বা প্রাকৃতিক ও অপরিশোধিত খাবার বেশি করে রাখা উচিত। @ Plabon Sarkar


9


ফেব্রুয়ারি মাসে ২৮ দিন হয় কেন? 

আমরা সবাই জানি, বছরের অন্য মাসগুলো ৩০ বা ৩১ দিনের হলেও ফেব্রুয়ারি মাত্র ২৮ দিনের (লিপ ইয়ার হলে ২৯ দিন)। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, কেন শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই ২৮ দিন ?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রাচীন রোমান সভ্যতার ইতিহাসে।

হাজার হাজার বছর আগে রোমানরা যখন তাদের ক্যালেন্ডার তৈরি করছিল, তখন পুরো বছরকে ১২ মাসে ভাগ করার সময় বিভিন্ন মাসে ২৯, ৩০ ও ৩১ দিন নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বছরের মোট দিনের হিসাব ঠিক রাখতে গিয়ে একটি মাসকে অন্যগুলোর চেয়ে ছোট রাখতে হয়েছিল।

আর সেই মাসটিই ছিল ফেব্রুয়ারি।

পরবর্তীতে ক্যালেন্ডারে অনেক পরিবর্তন এলেও ফেব্রুয়ারির এই বিশেষ অবস্থান আর বদলানো হয়নি। তাই আজও সাধারণ বছরে ফেব্রুয়ারি ২৮ দিন এবং প্রতি ৪ বছর পর লিপ ইয়ার হলে ২৯ দিন হয়।

মজার বিষয় হলো, এটি প্রকৃতির কোনো নিয়ম নয়; বরং প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের প্রভাব, যা আমরা আজও ব্যবহার করছি!

ভাবুন তো, যদি সেই সময় অন্য কোনো মাসকে ছোট রাখা হতো, তাহলে হয়তো আজ ফেব্রুয়ারিও ৩০ বা ৩১ দিনের মাস হতো! @ WonderVortex


10


"দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষা" এই প্রবাদটি আমরা সিনেমা, নাটক, গল্প-উপন্যাস, এমনকি বাস্তব জীবনেও অসংখ্যবার শুনেছি এবং ব্যবহারও করেছি। অকৃতজ্ঞ বা বিশ্বাসঘাতক কাউকে বোঝাতে এই প্রবাদটি আমরা হরহামেশাই ব্যবহার করে থাকি।

কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, আসলেই কি দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষা যায়? সাপ কি সত্যিই দুধ পান করে? কিংবা কলা খায়?

​উত্তরটি হলো না। সাপ দুধ পান করে না, কলাও খায় না। কারণ সাপ সম্পূর্ণ মাংসাশী প্রাণী। প্রকৃতিতে তারা ইঁদুর, ব্যাঙ, টিকটিকি, পাখি ও অন্যান্য ছোট প্রাণী শিকার করে খায়। তাদের শরীর প্রাণিজ খাবার হজম করার জন্যই তৈরি, তাই দুধ বা কলা তাদের স্বাভাবিক খাদ্য নয়।

​বিশেষ করে দুধের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাপের শরীরে ল্যাকটোজ নামের দুধের শর্করা ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাকটেজ এনজাইম থাকে না। তাই দুধ খাওয়ালে তা হজম হওয়া তো দূর, বরং পেটের সমস্যা, বদহজম, পেট ফেঁপে যাওয়া, এমনকি পানিশূন্যতাও হতে পারে।

​আর কলার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কলা একটি উদ্ভিজ্জ খাদ্য, অথচ সাপের শরীর ফলমূল হজম করে সেখান থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নেওয়ার জন্য তৈরি নয়।

​তাহলে অনেক সময় সাপকে দুধ পান করতে দেখা যায় কেন? এর অন্যতম কারণ হলো তৃষ্ণা। দীর্ঘ সময় পানি না পেলে সাপ সামনে রাখা তরল থেকেও কিছুটা পান করতে পারে। যা দেখে অনেকেই ভুল করে ভাবেন সাপ হয়তো দুধ পান করে। কিন্তু বাস্তবে এটি সাপের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসের অংশ নয় এবং দুধও তাদের জন্য উপযুক্ত খাদ্য নয়।

সবশেষে"দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষা" কথাটি শুধু একটি মিথ হিসেবেই ঠিক আছে, বিজ্ঞানে এর কোনো ভিত্তি নেই। তাই সেইসব মানুষ থেকেও দূরে থাকুন এবং দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষা থেকেও দূরে থাকুন।  @ Ashim Kumar


11


১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফের নির্ধারিত সীমানা রেখা (যা র‍্যাডক্লিফ লাইন নামে পরিচিত) অনুযায়ী তৎকালীন অবিভক্ত বাংলা প্রদেশটি ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দুই ভাগে বিভক্ত হয়: 

পূর্ব বাংলা (পাকিস্তান অংশ): মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে এটি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

পশ্চিমবঙ্গ (ভারত অংশ): হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে এটি ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য হিসেবে যুক্ত হয়。

তৎকালীন জেলাগুলোর বিভাজনের বিস্তারিত সীমানা নিচে দেওয়া হলো: [3, 6]

১. পূর্ব বাংলা বা পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সীমানা:

অবিভক্ত বাংলার মোট ১৬টি সম্পূর্ণ জেলা এবং কয়েকটি জেলার অংশবিশেষ পূর্ব বাংলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল: [4, 7]

সম্পূর্ণ জেলাসমূহ: ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ (বরিশাল), নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা (কুমিল্লা), রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, রংপুর, যশোর এবং কুষ্টিয়া (নদীয়ার অংশ)। 

সিলেট (আসামের অংশ): আসাম প্রদেশের সিলেট জেলায় একটি ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের রায় অনুযায়ী সিলেটের সিংহভাগ এলাকা (৪টি থানা বাদে) পূর্ব বাংলার সাথে যুক্ত হয়। 

পার্বত্য চট্টগ্রাম: অমুসলিম (হিন্দু-বৌদ্ধ) সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও ভৌগোলিক যোগাযোগ এবং কৌশলগত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। [4, 7, 8]

খুলনা জেলা: এটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ (প্রায় ৫১%) হওয়া সত্ত্বেও নদীপথের সীমানা এবং ভৌগোলিক কারণে এটিকে পূর্ব বাংলার অংশ করা হয়েছিল। [3, 7]

২. পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের সীমানা:

অবিভক্ত বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল এবং কলকাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র ভারতের অধীনে যায়: [5, 7]

সম্পূর্ণ জেলাসমূহ: কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর, চব্বিশ পরগনা এবং দার্জিলিং।

মুর্শিদাবাদ জেলা: এটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ (প্রায় ৭০%) হওয়া সত্ত্বেও ঐতিহাসিক গঙ্গা নদীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কলকাতার বন্দর সচল রাখার জন্য কৌশলগত কারণে এটিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত করা হয়। [3, 6, 7, 9, 11]

৩. যে জেলাগুলো দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল:

র‍্যাডক্লিফ লাইনের কাটাকুটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৪টি প্রধান জেলা: [2]

দিনাজপুর: জেলার প্রধান অংশ (দিনাজপুর শহরসহ) পূর্ব বাংলায় আসে, আর পশ্চিম অংশটি ( রায়গঞ্জ,বালুরঘাট ও বর্তমানের গঙ্গারামপুর মহকুমা (গঙ্গারামপুর তখন বালুরঘাট মহকুমার মধ্যে ছিল) ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ]

মালদহ: জেলার পূর্ব অংশ (মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ থানাগুলো) পূর্ব বাংলায় যুক্ত হলেও জেলা সদরসহ প্রধান অংশটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যায়। [12]

নদীয়া: জেলার পূর্ব অংশ (কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর) পূর্ব বাংলার কুষ্টিয়া জেলা হিসেবে গঠিত হয় এবং কৃষ্ণনগর ও রাণাঘাটসহ পশ্চিম অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে থাকে। [4, 11]

জলপাইগুড়ি: জেলার দক্ষিণ-পূর্বের ৫টি থানা (যেমন- দেবীগঞ্জ, বোদা, পঞ্চগড়) পূর্ব বাংলার রংপুরের সাথে যুক্ত হয় এবং বাকি অংশ ভারতে থেকে যায়। @ Bakul Kumar Shaha



১২


বাঙালি সমাজে প্রচলিত প্রধান প্রধান ঐতিহাসিক পদবিগুলোকে তাদের মূল উৎসের ভিত্তিতে নিচে চারভাগে ভাগ করে দেওয়া হলো।

## ১. রাজকীয় প্রশাসনিক উপাধি (সুলতানি ও মুঘল আমল)

রাজ দরবার বা জমিদারদের অধীনে প্রশাসনিক ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালনের জন্য এই পদবিগুলো দেওয়া হতো:

* চৌধুরী: চার ভাগের এক ভাগের কর আদায়কারী বা অঞ্চলের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা।

* মজুমদার: ফারসি শব্দ 'মজমুয়াদার' থেকে আগত, যার অর্থ রাষ্ট্রীয় হিসাবরক্ষক বা অডিটর।

* বিশ্বাস: বিশ্বস্ত কর্মচারী বা কোষাধ্যক্ষদের রাজ দরবার থেকে দেওয়া খেতাব।

* সরকার: মুঘল আমলের জেলা বা পরগনার প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা।

* লস্কর: সুলতানি ও মুঘল সেনাবাহিনীর সৈনিক বা ল্যান্স নায়েক পদমর্যাদার কর্মকর্তা।

* মল্লিক: আরবি শব্দ 'মালিক' থেকে আগত, রাজকীয় সম্মানসূচক উপাধি বা ক্ষুদ্র রাজন্য।

* শিকদার: পরগনার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং রাজস্ব আদায়কারী পুলিশ কর্মকর্তা।

* তালুকদার: 'তালুক' বা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের কর আদায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি।

* কানুনগো: ভূমির মালিকানা এবং সীমানা নির্ধারণকারী প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা। [1, 2, 3, 4]

## ২. পেশা ও ব্যবসাভিত্তিক পদবি

সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য বা ধর্মীয় পেশা থেকে এই পদবিগুলোর উৎপত্তি:

* চট্টোপাধ্যায়/চ্যাটার্জী: 'চট্ট' নামক গ্রামের উপাধ্যায় বা বেদ শিক্ষক (পুরোহিত)।

* সেন: সংস্কৃত 'সেনা' থেকে আগত, চিকিৎসাকাজে যুক্ত বৈদ্য বা সামরিক যোদ্ধা।

* বণিক/পোদ্দার: স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রা পরীক্ষক ও ব্যবসায়ী (পোদ্দার শব্দটি ফারসি 'ফুতাদার' থেকে এসেছে)।

* দাস: মূলত সেবাধর্মী কাজে যুক্ত ব্যক্তি, যা পরে নমঃশূদ্র ও কায়স্থ সম্প্রদায়ের সাধারণ পদবি হয়।

* আচার্য: ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনাকারী বা টোলের প্রধান শিক্ষক।

* মণ্ডল/প্রামাণিক: গ্রামীণ সালিশি ব্যবস্থার প্রধান বা গ্রামের মাতব্বর।

* হালদার: হাল বা লাঙল প্রস্তুতকারী অথবা কৃষি কাজের সাথে যুক্ত ব্যক্তি। [5]

## ৩. ভূ-সম্পত্তি ও জমিদারি ভিত্তিক পদবি

জমি এবং অঞ্চল শাসনের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে এই পদবিগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল:

* ভৌমিক: ভূমির মালিক বা আদি জমিদার।

* রায়: রাজা বা রাজপরিবারের অত্যন্ত প্রভাবশালী সামন্ত প্রভু।

* রায়চৌধুরী: উচ্চপদস্থ কর আদায়কারী, যিনি একাধারে রায় এবং চৌধুরী খেতাবপ্রাপ্ত।

* খান: তুর্কি-আফগান সামরিক ও প্রশাসনিক অভিজাত শ্রেণির উপাধি।

## ৪. কুলীন হিন্দু পদবি (কায়স্থ ও অন্যান্য)

প্রাচীন বাংলার কৌলিন্য প্রথা এবং সামাজিক মর্যাদা রক্ষার্থে এই বংশীয় পদবিগুলোর বিকাশ ঘটে:

* ঘোষ: মূলত গো-পালনকারী সম্প্রদায় বা কায়স্থদের উচ্চ বংশীয় খেতাব।

* বসু: সংস্কৃত 'বসু' (ধন বা শ্রেষ্ঠ) থেকে আগত কায়স্থদের প্রধান কুলীন পদবি।

* মিত্র: প্রাচীন বৈদিক দেবতা 'মিত্র' বা বন্ধু থেকে আগত উচ্চ কায়স্থ বংশের পদবি।

* গুহ: কায়স্থ সমাজের অন্যতম প্রধান কুলীন পারিবারিক নাম।

@ Bakul Kumar Shaha



১৩


প্রাচীন ভারতের প্রধান এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা কেন্দ্রের বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো। খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলো চিকিৎসাবিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, রাজনীতি এবং দর্শনের বৈশ্বিক কেন্দ্র ছিল। 

১. তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় (Takshashila)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ থেকে ৫ম শতাব্দীতে এটি গড়ে ওঠে। রামানুযায়ী শ্রীরামের ভাই ভরতের পুত্র 'তক্ষ' এর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। [2, 3, 4]

বর্তমান অবস্থান: পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডির কাছে। [1, 5]

বিশেষত্ব ও অবদান: একে বিশ্বের প্রথম প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় ধরা হয়। এখানে প্রায় ৬৮টি বিষয়ে পড়ানো হতো, যার মধ্যে চিকিৎসাবিজ্ঞান, ধনুর্বিদ্যা ও রাজনীতি অন্যতম। এখানকার বিখ্যাত শিক্ষক ও ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন চাণক্য (অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা), পাণিনি (সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ) এবং জীবক (বুদ্ধের ব্যক্তিগত চিকিৎসক)। ৫ম শতাব্দীতে হুন আক্রমণের ফলে এটি ধ্বংস হয়ে যায়।  

২. নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় (Nalanda)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: ৫ম শতাব্দীতে (৪২৭ খ্রিস্টাব্দ) গুপ্ত বংশের সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্তের শাসনামলে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

বর্তমান অবস্থান: ভারতের বিহারের রাজগীরের কাছে।

বিশেষত্ব ও অবদান: এটি ছিল বিশ্বের প্রথম সুসংগঠিত আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে ১০,০০০ শিক্ষার্থী এবং ২,০০০ শিক্ষক ছিলেন। চীন, কোরিয়া ও তিব্বত থেকে হিউয়েন সাঙ এবং ই-তসিং-এর মতো পরিব্রাজকরা এখানে পড়তে এসেছিলেন। এর বিখ্যাত লাইব্রেরিটির নাম ছিল 'ধর্মগঞ্জ'। ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি আক্রমণকারী বখতিয়ার খিলজি এটি পুড়িয়ে ধ্বংস করেন।  

৩. বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয় (Vikramashila)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: পাল বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ধর্মপাল ৮ম শতাব্দীর শেষভাগে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।

বর্তমান অবস্থান: ভারতের বিহারের ভাগলপুর জেলায়।

বিশেষত্ব ও অবদান: এটি বজ্রযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের মূল কেন্দ্র ছিল। এখানে ১ শতাধিকেরও বেশি শিক্ষক ছিলেন এবং নিয়ম মেনে কৃতি ছাত্রদের 'ডিগ্রি' বা উপাধি দেওয়া হতো। এখানকার বিখ্যাত পন্ডিত অতিশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান পরবর্তীতে তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটান। ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে এটিও বখতিয়ার খিলজির দ্বারা ধ্বংস হয়। [3, 5, 8, 10, 11]

৪. বল্লভী বিশ্ববিদ্যালয় (Vallabhi)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে মৈত্রী রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় এটি গড়ে ওঠে।

বর্তমান অবস্থান: ভারতের গুজরাটের ভাবনগর বা সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে।

বিশেষত্ব ও অবদান: এটি মূলত হীনযান বৌদ্ধধর্মের প্রধান কেন্দ্র ছিল। তবে বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি এখানে আইন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং কৃষিশিক্ষা দেওয়া হতো। প্রাচীন নালন্দার সমকক্ষ প্রতিযোগী ছিল এই প্রতিষ্ঠানটি। ১২শ শতাব্দীতে আরব আক্রমণের পর এটি ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে।  

৫. ওদন্তপুরী বিশ্ববিদ্যালয় (Odantapuri)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: পাল বংশের প্রথম রাজা গোপাল ৮ম শতাব্দীতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।

বর্তমান অবস্থান: ভারতের বিহারের বিহারশরিফ নামক স্থানে।

বিশেষত্ব ও অবদান: এটি প্রাচীন ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম মহাবিহার। এখানে প্রায় ১২,০০০ শিক্ষার্থী অবস্থান করত। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলেই তিব্বতের বিখ্যাত 'সাময়ে' (Samye) মঠ তৈরি করা হয়েছিল। ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে নালন্দার সাথেই এটিও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।  

৬. সোমপুর মহাবিহার / বিশ্ববিদ্যালয় (Somapura)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: পাল সম্রাট ধর্মপাল ৮ম শতাব্দীর শেষভাগে এটি নির্মাণ করেন।

বর্তমান অবস্থান: বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে।

বিশেষত্ব ও অবদান: এটি বৌদ্ধ, জৈন এবং সনাতন ধর্মের এক অপূর্ব মিলনস্থল ছিল। এখানে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ব্যাপক চর্চা হতো। এটি বর্তমানে একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। 

৭. জগদ্দল মহাবিহার (Jagaddala)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: পাল বংশের শেষদিকের রাজা রামপাল ১১শ শতাব্দীর শেষভাগে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।

বর্তমান অবস্থান: বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলায়।

বিশেষত্ব ও অবদান: নালন্দা ও বিক্রমশীলা যখন ধ্বংসের মুখে, তখন এটি তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের অন্যতম শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তিব্বতি ভাষায় বহু গ্রন্থের অনুবাদ এখান থেকেই সম্পন্ন হয়েছিল। 

৮. পুস্পগিরি বিশ্ববিদ্যালয় (Pushpagiri)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: খ্রিষ্টীয় ৩য় শতাব্দীতে কলিঙ্গ রাজাদের আমলে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

বর্তমান অবস্থান: ভারতের ওড়িশা রাজ্যের জাজপুর ও ভুবনেশ্বরের পাহাড়ী অঞ্চলে।

বিশেষত্ব ও অবদান: সম্রাট অশোকের সময়কাল থেকে এটি বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল। হিউয়েন সাঙ তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে পুস্পগিরিকে শিক্ষা ও দর্শনের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ পীঠস্থান বলে উল্লেখ করেছেন। 

৯. শারদা পীঠ (Sharada Peeth)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: এর প্রতিষ্ঠার সঠিক সময় জানা না গেলেও এটি অন্তত ২০০০ বছরেরও প্রাচীন বলে মনে করা হয়।

বর্তমান অবস্থান: পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নীলম উপত্যকায়।

বিশেষত্ব ও অবদান: এটি ছিল সনাতন ধর্ম এবং বেদ-উপনিষদ চর্চার প্রধানতম কেন্দ্র। এখানে নিজস্ব 'শারদা লিপি'র বিকাশ ঘটেছিল। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ কলহন (রাজতরঙ্গিণীর রচয়িতা) এবং আদি শঙ্করাচার্য এখানে অধ্যয়ন ও গবেষণা করেছিলেন। 

১০. মিথিলা বিশ্ববিদ্যালয় (Mithila)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: এটি বৈদিক যুগ থেকেই ব্রাহ্মণ সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল, তবে রাজা জনক এবং পরবর্তীতে গঙ্গেশ উপাধ্যায়ের সময়কাল থেকে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়。 [6]

বর্তমান অবস্থান: ভারতের বিহার এবং নেপালের কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত প্রাচীন মিথিলা অঞ্চল। [6]

বিশেষত্ব ও অবদান: এটি ছিল নব্য-ন্যায় (যুক্তিবিদ্যা) এবং বিচার ব্যবস্থার প্রধান কেন্দ্র। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠোর নিয়ম ছিল যে, শিক্ষার্থীরা এখানকার কোনো বই বা নোট বাইরে নিয়ে যেতে পারবে না, সবকিছু মুখস্থ করে পরীক্ষা পাস করতে হতো।  

১১. নাগার্জুন বিদ্যাপীঠ (Nagarjuna Vidyapeeth)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: খ্রিষ্টীয় ৭ম শতাব্দীতে এটি তার গৌরবের চরম শিখরে পৌঁছায়।

বর্তমান অবস্থান: ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের কৃষ্ণা নদীর তীরে অবস্থিত নাগার্জুনকোন্ডা।

বিশেষত্ব ও অবদান: বিখ্যাত বৌদ্ধ দার্শনিক মহাত্মা নাগার্জুনের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। এখানে দক্ষিণ ভারতের ছাত্ররা ছাড়াও সিংহল (শ্রীলঙ্কা) ও চীন থেকে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য আসত।  

১২. উজ্জয়িনী বিশ্ববিদ্যালয় (Ujjayini)

সময়কাল ও প্রতিষ্ঠাতা: প্রাচীন অবন্তী রাজ্যের রাজধানী উজ্জয়িনীতে এটি গড়ে উঠেছিল।

বর্তমান অবস্থান: ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যে।

বিশেষত্ব ও অবদান: এটি ছিল প্রাচীন ভারতের গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং ভূগোলের সবচেয়ে বড় গবেষণা কেন্দ্র। বিখ্যাত গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী বরাহমিহির এবং ব্রহ্মগুপ্ত এই শিক্ষা কেন্দ্রের সাথে যুক্ত ছিলেন। @ Bakul Kumar Shaha



১৪

ভারতে মুসলিম শাসন 

ভারতে মুসলিম শাসন মূলত সামরিক অভিযান, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং স্থানীয় বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘ কয়েকশ বছর ধরে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি মূলত তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়:  

১. সিন্ধু বিজয় ও প্রাথমিক আগমন (৭১২ খ্রিষ্টাব্দ)

মুহাম্মদ বিন কাসিমের অভিযান: উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালিদের আমলে সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে সিন্ধুর রাজা দাহিরকে পরাজিত করে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন।

প্রভাব: এই বিজয় ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলেই (বর্তমান পাকিস্তান এলাকা) সীমাবদ্ধ ছিল এবং তা পুরো ভারতে ছড়িয়ে পড়েনি।  

২. সুলতান মাহমুদের আক্রমণ (১০০০–১০২৭ খ্রিষ্টাব্দ)

গজনীর সুলতান মাহমুদ: গজনী সাম্রাজ্যের তুর্কি শাসক সুলতান মাহমুদ প্রায় ১৭ বার ভারতবর্ষে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন।

প্রভাব: তাঁর মূল লক্ষ্য স্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠা ছিল না, বরং ধনসম্পদ আরোহণ এবং নিজের সাম্রাজ্য সুরক্ষিত করা ছিল। তবে তাঁর এই অভিযান ভারতের অভ্যন্তরে রাজপুত রাজাদের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। 

৩. তরাইনের যুদ্ধ ও স্থায়ী মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা (১১৯২ খ্রিষ্টাব্দ)

মুহাম্মদ ঘুরি: ঘোরের আফগান শাসক মুঈজউদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরি ভারতে স্থায়ী মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মূল স্থপতি।

তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১১৯২ খ্রি.): এই ঐতিহাসিক যুদ্ধে তিনি দিল্লির চৌহান বংশীয় শক্তিশালী রাজপুত রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করেন। এই বিজয়ের মাধ্যমেই দিল্লির সিংহাসন মুসলিম শাসনের অধীনে আসে।  

৪. দিল্লি সালতানাতের সূচনা (১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ)

কুতুবউদ্দিন আইবক: মুহাম্মদ ঘুরির মৃত্যুর পর তাঁর বিশ্বস্ত তুর্কি দাস ও সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবক ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে নিজেকে দিল্লির স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমেই ভারতে দীর্ঘ ৩৫০ বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী দিল্লি সালতানাতের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। [ 

মুসলিম শাসন সহজ হওয়ার প্রধান কারণসমূহ:

রাজনৈতিক বিভেদ: তৎকালীন ভারতের হিন্দু ও রাজপুত রাজারা ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিলেন এবং নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন।

সামাজিক অসমতা: হিন্দু সমাজের কঠোর জাতিভেদ প্রথার (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) কারণে সাধারণ ও নির্যাতিত মানুষ মুসলিম শাসকদের সাম্য ও মানবতার বাণীতে আকৃষ্ট হয়।

@ Bakul Kumar Shaha


১৫


১৯০৫ সালে ভারতের ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাতে প্রথমবার বাংলা প্রদেশকে বিভক্ত করেছিলেন, যা ইতিহাসে 'বঙ্গভঙ্গ' (Partition of Bengal) নামে পরিচিত। কার্জনের এই সিদ্ধান্তের মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাকে দুর্বল করা।  

লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের বিস্তারিত সীমানা ও ফলাফল নিচে দেওয়া হলো:

১. ১৯০৫ সালের বিভাজনের সীমানা

কার্জনের পরিকল্পনা অনুযায়ী অবিভক্ত বাংলা প্রদেশকে ভেঙে দুটি নতুন প্রদেশ তৈরি করা হয়:  

পূর্ববঙ্গ ও আসাম:

অন্তর্ভুক্ত এলাকা: ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিভাগ, মালদহ জেলা এবং সমগ্র আসাম প্রদেশ।

রাজধানী: ঢাকা।

বৈশিষ্ট্য: এটি ছিল একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ।  

পশ্চিমবঙ্গ:

অন্তর্ভুক্ত এলাকা: বিহার ও ওড়িশা (তৎকালীন বাংলার অংশ), এবং বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের এলাকাগুলো।

রাজধানী: কলকাতা।

বৈশিষ্ট্য: এটি ছিল একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ। 

২. লর্ড কার্জনের মূল উদ্দেশ্য

'ভাগ কর ও শাসন কর' (Divide and Rule) নীতি: হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক বিভেদ তৈরি করা।

জাতীয়তাবাদ দমন: কলকাতার বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও জাতীয়তাবাদী নেতাদের রাজনৈতিক প্রভাব এবং আন্দোলনকে দুর্বল করা।

৩. প্রতিক্রিয়া ও বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)

বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন: এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হিন্দু সমাজ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে, যা 'স্বদেশী আন্দোলন' নামে পরিচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর প্রতিবাদে 'রাখীবন্ধন' উৎসবের সূচনা করেন।

মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া: পূর্ব বাংলার মুসলিম সম্প্রদায় প্রথমে শিক্ষাদীক্ষা ও চাকরির সুবর্ণ সুযোগের আশায় এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিল। ১৯০৬ সালে ঢাকায় 'মুসলিম লীগ' গঠনের পেছনেও এর প্রভাব ছিল।

বঙ্গভঙ্গ রদ: তীব্র গণ-আন্দোলন ও সশস্ত্র বিপ্লবের মুখে টিকতে না পেরে ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জের আমলে বঙ্গভঙ্গ রদ (বাতিল) করতে বাধ্য হয় এবং বাংলা আবার একত্রিত হয়। @ Bakul Kumar Shaha


১৬


স্বাধীন অখণ্ড বাংলা গঠনের মূল রূপরেখা (চুক্তি) এবং এটি ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণগুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:স্বাধীন বাংলার রূপরেখা (বসু-সোহরাওয়ার্দী চুক্তি)১৯৪৭ সালের মে মাসে শরৎচন্দ্র বসু এবং আবুল হাশেমের বাসভবনে বৈঠকের পর একটি ১০ দফার খসড়া চুক্তি তৈরি হয়। এর মূল শর্তগুলো ছিল:সার্বভৌম রাষ্ট্র: বাংলা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে। এটি ভারত বা পাকিস্তান কোনো দেশেই যোগ দেবে না।যৌথ নির্বাচন ব্যবস্থা: পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার বদলে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে যৌথ নির্বাচন (Joint Electorate) হবে।ক্ষমতার সমতা: আইনসভায় হিন্দু ও মুসলিম আসনের সংখ্যা জনসংখ্যার অনুপাতে নির্ধারিত হবে।যৌথ মন্ত্রিসভা: প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ দুটি হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে ভাগ করা হবে। যেমন—মুসলিম প্রধানমন্ত্রী হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন হিন্দু।চাকরিতে সমতা: সরকারি ও সামরিক চাকরিতে হিন্দু ও মুসলিমদের সমান সুযোগ থাকবে।পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণকংগ্রেসের বিরোধিতা: জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধী ছিলেন। তাঁরা মনে করেছিলেন, স্বাধীন বাংলা কার্যত একটি বড় মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং ভারতের অখণ্ডতা নষ্ট করবে।হিন্দু মহাসভার অবস্থান: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা দাবি তোলে যে, বাংলা ভাগ না হলে হিন্দুরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলায় সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। তাঁরা 'বাঙালি হিন্দু'দের জন্য আলাদা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের জোরালো দাবি জানান।মুসলিম লীগের অনীহা: মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথমে কিছুটা ইতিবাচক থাকলেও, পরে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পাকিস্তান দাবির স্বার্থে এই পরিকল্পনা থেকে সমর্থন তুলে নেয়।জনগণের মধ্যে অবিশ্বাসের দেয়াল: ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গা (Great Calcutta Killings) এবং নোয়াখালীর দাঙ্গার কারণে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। ফলে সাধারণ জনগণ এই যৌথ পরিকল্পনার ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। @ Bakul Kumar Shaha


17


ইনান্না ও এবিথ একটি সুমের কাব্য। রচনা কাল সাধারণ পূর্বাব্দ ২২৮৫ থেকে ২২৫০ এই সময়ের মধ্যে। রচনা করেছেন আক্কাদ সম্রাট সারগন কন্যা এনহেদুয়ান্না। পিতা যেমন ছিলেন মানব সভ্যতার প্রথম সম্রাট, তেমনি কন্যা ছিলেন মানব সভ্যতার প্রথম মহিলা কবি, যিনি স্বনামে রচনা করে গেছেন একাধিক কাব্য আর কয়েকশত মন্দিরে গীত বন্দনাগীতি। যাঁর রচনা করা বহু কাব্যই (মাটির ট্যাবলেটে কিউনিফর্ম লিপিতে) প্রায় দুই হাজার বৎসর ধরে ছিল প্রবল জনপ্রিয়। আর বন্দনা গীতি মন্দিরে মন্দিরে গাওয়া হয়েছে নিরলস, সম্ভবত আলেকজান্ডারের জয়ের পরেও। অনেকের ধারনা চার্চে সঙ্গীতের প্রচলন এই বন্দনাগীতের ধারাবাহিকতাতেই।

এই কাব্যের কাহিনি বিচিত্র। এক পর্বত দেবীর সম্মুখে শ্রদ্ধায় নতমস্তক হয়নি। তাই দেবী সেই উদ্ধত্যের শাস্তি দিতে পর্বতকে ধ্বংস করলেন। কোন পর্বত কোনকালে আনত হয় না, বাস্তবে সম্ভব না। অথচ কবি এমন এক বিচিত্র কাহিনি শোনাচ্ছেন।

কবির পিতা দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার আক্কাদ সম্রাট সারগন। সারগন দি গ্রেট। সারগনের জন্মের সঠিক বৎসর জানা যায় না। তবে তাঁর রাজত্ব কাল আনুমানিক সাধারণ পূর্বাব্দ ২৩৩৪ বা ২৩৪০ থেকে ২২৮৪ র মধ্যে। তিনি ঠিক কত বৎসর রাজত্ব করেছিলেন তা নিয়েও কিছু গোলমাল আছে। ৩৭, ৪০, ৪৪, ৫৫ বৎসর, এই রকম আলাদা আলাদা অনুমান চলে আসছে।

সারগনের মা এক মন্দিরের প্রধান পুজারীনি লোকলজ্জার ভয়ে জন্মের পরেই পুত্রকে একটি ঝুড়িতে করে ভাসিয়ে দেন ইউফ্রেটিস নদীতে। সেই ভাসমান ঝুড়ি থেকে শিশুকে উদ্ধার করে এক সেচকর্মি। পরে সেই পুত্র প্রথমে কিশের রাজার বাগানে কাজ পেলেন। তারপরে হয়ে গেলেন রাজার প্রধান পার্শ্বচর। এবং তারপরে সেই কিশের রাজা উর-জাবাবাকেই সিংহাসনচ্যুত করে নিজেই হয়ে গেলেন কিশের রাজা। তাঁর ভাষায় দেবী ইনান্নার ইচ্ছায়।

তারপরে এক অবিশ্বাস্য কাহিনির জন্ম। সেই পিতৃপরিচয়হীন যুবকটি সমগ্র দক্ষিণ মেসোপটেমিয়া দখল করে হয়ে গেলেন মানব সমাজের প্রথম সম্রাট সারগন। সারগনের প্রকৃত নাম তাঁর পিতৃপরিচয়ের মতোই অজানা। কারন সারগন হল একটি পদবী মাত্র। সারগন উচ্চারণ সাররু-উকিন অথবা সাররু-কেন। এছাড়ও কিউনিফর্ম লিপিতে তাঁর নামের আরো বিভিন্ন উচ্চারণ পাওয়া যায়, যথা লুগাল-উ-কিন, সার-রু-গেন, সার-রু-কি-ইন, সার-রু-উম-কি-ইন। সারগন নামটি এসেছে হিব্রু বাইবেলের উল্লেখ থেকে। হিব্রু বাইবেলের লেখা থেকেই সারগনের তৈরী তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানী আগাদে নগরকে বলা শুরু হল আক্কাদ। এর থেকেই জাতিটিরও নাম হল আক্কাদ।

এহেন সম্রাটের কন্যা এনহেদুয়ান্না।

এবং সমস্যা সারগনের মতো এনহেদুয়ান্নার নাম নিয়েও। এনহেদুয়ান্নার নামের অর্থ খুঁজলে দেখা যাবে সেটি আদতে কোন নামই নয়। একটি উপাধি মাত্র।

এনহেদুয়ান্নার প্রথম শব্দ "এন"। "এন" কথার অর্থ হল প্রধান পুরোহিত। তারপরে "হেদু"। "হেদু" শব্দের অর্থ হল গয়না বা অলঙ্কার। আর শেষ শব্দ "আনা"।"আনা" কথার অর্থ হল আকাশ। ফলে সব মিলিয়ে বোঝা গেল এনহেদুয়ান্না শব্দটির অর্থ হল প্রধান পুরোহিত যিনি আকাশের অলঙ্কার।

এর ফলে অনেকেরই সন্দেহ এনহেদুয়ান্না কি সত্যিই সারগনের কন্যা ছিলেন? যদি সম্রাটের কন্যাই হয়ে থাকেন তবে তাঁর আসল নাম কেন কোথাও পাওয়া গেল না। এনহেদুয়ান্না নাম তো কেবল তিনি প্রধান পুরোহিত হবার পরেই হবার কথা।

তা এনহেদুয়ান্না সম্রাটের কন্যা যদি নাও হয়ে থাকেন তাতেও কিছু যায় আসে না। সম্রাট তাঁকে কন্যার মর্য্যদা দিয়েছিলেন। তিনি সম্রাটের একান্ত বিশ্বাসভাজন ছিলেন। আর জনগন তাঁকে সম্রাটের কন্যা হিসাবেই মেনেও নিয়েছিল।

তবে চার হাজার বৎসর অনেক লম্বা সময়। এত বৎসর পরেও একজন কবির রচনা শুধু কেন ওনার অস্তিত্বও সন্দেহ জনক হতেই পারে আমাদের কাছে।

কিন্তু না, তার সমর্থনে প্রয়োজনীয় সমস্ত পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বৃটিশ প্রত্নতত্ববিদ লিওনার্ড উলি ১৯২৭ খৃষ্টাব্দে প্রথম ঊর শহরে একটা চাকতি খুঁজে পান, যেখানে এনহেদুয়ান্নার ছবি খুব গুরুত্ব সহকারে দেখানো হয়েছে। আর তাতে লেখা ছিলঃ "এনহেদুয়ান্না, প্রধান পুরোহিত, নান্নাদেবের স্ত্রী, পৃথিবীর রাজা সারগনের কন্যা, এই ইনান্নাদেবীর মন্দিরে।"

এখন এনহেদুয়ান্নার এই "ইনান্না ও এবিথ" কাব্যটি যে রূপকার্থে তাতে কোন সন্দেহ থাকার কারণ নেই। তবে রূপকটির একাধিক অর্থ হতে পারে।

যেমন সুমেরদের পবিত্র পর্বত এবিথ সম্রাট সারগন নিশ্চয়ই যুদ্ধ করেই দখলে আনেন। সম্ভবত সম্রাটের করা সফল যুদ্ধকে দেবী ইনান্নাকে উৎসর্গ করে যুদ্ধটি দেবীই করেছেন এমন বলা হয়েছে। এমন কিছু ভাবার সপক্ষে বলা যায় সম্রাট সিংহাসন দখল করেও বলেছিলেন সেই কাজ সম্ভব হয়েছে কেবল মাত্র দেবী ইনান্নার ইচ্ছায়। এমনটা দৈবী বিশ্বাসের পরিচয় আমারা আমাদের পৌরানিক কাহিনিতেও অহরহ পাই।

আবার অন্য দিক থেকে দেখলে সুমেরদের জন্য পবিত্র এই পর্বতে যুদ্ধের মত ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে সুমেরদের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত লাগার কথা। সেই আঘাতকে সহনীয় করতেই প্রচার করা হতে পারে এই ঘটনা দেবী ইনান্নাই করেছেন।

এমন কাহিনিও সুমেরদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে। কারণ এই কাহিনি বলছেন কবি এনহেদুয়ান্না। কবি এনহেদুয়ান্না তো কেবল মাত্র সম্রাট কন্যা নন, তিনি উর শহরের প্রতিষ্ঠিত চন্দ্রদেবতা নান্নার প্রধান পুজারী। এবং ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী এনেহেদুয়ান্না চন্দ্রদেব নান্নার স্ত্রী নিনগালের জাগতিক প্রতিভু। চন্দ্রদেবের জাগতিক পত্নী। এই নান্না-নিনগালের কন্যাই দেবী ইনান্না। তাছাড়া সম্রাট এবং সম্রাট কন্যা দুজনই ইনান্না অটল ভক্ত।

অতএব এনহেদুয়ান্নর লেখনিতে পবিত্র পর্বতের ভগ্নদশার কারণ যদি দেবী ইনান্নাই হয়ে থাকেন, তবে সমগ্র দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার আক্কাদ—সুমের জনগনের কাছে সেটাই পরম সত্য।

কেন সারগনের এই এবিথ পর্বত অভিযান প্রয়োজন হল?

সম্রাট সারগনের সাম্রাজ্যের প্রথম দিকে তাঁর অধীনে থাকা পলিমাটির দেশটিতে পাথর খনিজসম্পদ কিছুই ছিলো না। এমনকি কাঠ হিসাবে ব্যবহার করা চল এমন বড় গাছও ছিলো না। অথচ নিয়মিত যুদ্ধ করে শক্তিশালী সাম্রাজ্য নির্মান ও তা টিকিয়ে রাখতে এগুলোর প্রয়োজন প্রতিনিয়ত। সেই উদ্দেশ্যেই সম্রাটের এই পার্বত্য এলাকা দখলের সমরাভিযান। এই কাব্যে বেশ সরাসরিই বলা আছে পর্বতের পাথর গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা। বনাঞ্চল ধ্বংস করার কথা। বলা হয়েছে ক্ষমতার সিংহাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার কথাও। অনুমান করা যায় মানব সমাজের প্রথম সম্রাট সারগনের হাত দিয়েই মানব সমাজের প্রাকৃতিক সম্পদের নির্বিচার লুন্ঠনের সুচনা হল। যার সপক্ষে লেখা হল এই কাব্য।এবং একইসাথে এটাও সম্ভবত মানবসমাজের প্রথমবার, সাম্রাজ্যের ভিতকে মজবুত করতে ধর্মবিশ্বাসকে হাতিয়ার করা হল।

অবশ্য অনেকে এমন কথাও বলেন যে সম্ভবত একটি ভুমিকম্পে এবিথ পর্বত ধ্বংস হয়েছিল। সেই ঘটনার কথাই এখানে রূপক হিসাবে বর্ণিত।

কিন্তু কাব্যে দেবী ইনান্নার সমরাভিযানের উল্লেখ সহ প্রাসাদ ও সিংহাসনের প্রতিষ্ঠা উল্লেখ সম্রাটের সমরাভিযানের ধারনাকেই সমর্থন করে।

ইনান্না ও এবিথ কাহিনি নিয়ে বলা দরকার কেন এই কাহিনি আমাকে টেনেছিল? কেন এই কাহিনি আপানাদের শোনানোর চেষ্টা? মুল কাহিনিতে পাঠকের মনযোগ ধরে রাখার মত কোন নাটকীয় উত্থানপতন নেই। কাহিনিতে কোন বাঁক নেই, এমনকি কোন অলৌককতাও নেই। তবু কেন বেছে নেওয়া এই কাহিনি?

শুধু সম্রাট সারগনের মাধ্যমে মানব সমাজের প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠনের আরম্ভ কাহিনি বলতে নয় তার সাথে দেবী ইনান্নার বর্ণময় চরিত্র বর্ণনারও ইচ্ছে ছিল। সুমেরদের কাছে দেবী মুলত প্রেম ভালোবাসা ও যৌনতার দেবী। আক্কাদদের কাছে দেবী ইনান্নার নাম চরিত্র দুটোই পাল্টে গেল। আক্কাদ ভাষায় ইনান্না হয়ে গেলেন ইশতার। প্রেম ভালোবাসা যৌনতার দেবী হয়ে গেলেন যুদ্ধের দেবী।

সুমের দেবী ইনান্না কবে থেকে সুমেরদের দেবী হলেন সেটা বলা কঠিন। একটি মতে ইনান্না বা ইন-আন-না আদৌ সুমের শব্দই না। এটি আসলে উবেইদ শব্দ। তার অর্থ দাঁড়ায় ইনান্নাদেবী ছিলেন আসলে উবেইদ দেবী। কিন্তু সেটা বহুলাংশেই একটি বিতর্কিত ধারনা।@ তুষারমুখার্জি



18

প্রত্নপ্রমান হিসাবে প্রায় ছয় হাজার বৎসর আগেই ইনান্নাদেবীর মন্দির গড়ে ওঠে উরুক শহরে। ইনান্নার দেবী হিসাবে উরুকে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সাথে জড়িয়ে আছে উরুকের রাজনৈতিক উত্থানপতন কাহিনি।

গোড়ায় দুই ভাগে বিভক্ত উরুক শহরটির একটি একক শহরে পরিণত হবার ঘটনা পেছনে সম্ভাব্য রাজনৈতিক ক্ষমতাদ্বন্দ। যার কিছু আভাস পাওয়া যায় ইনান্নাকে দেবতা আন-এর উত্তরাধিকারী ও স্বর্গের অধিশ্বরী আখ্যা দেওয়ায়।

উরুক শহরের শুরুতে শহরের প্রতিষ্ঠিত দেবতা ছিলেন আন। তাঁর শ্বেতশুভ্র বিশাল মন্দিরের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দক্ষিণ মেসোপটেমিয়াতে। সেই মন্দিরের গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকে। প্রচারের আলোয় আসে ইনান্নাদেবীর মন্দির।

ইনান্নাদেবীকে বলা হতে থাকে দেবতা আনের উত্তরাধিকারী। তারপরে তাঁকে বলা হতে থাকে স্বর্গের অধিশ্বরী। উরুকের রাজা হন ইনান্নার স্বামী মেষপালক দুমুজ়িদ।

কিন্তু চিরকাল কাহারো সমান নাহি যায়। ইনান্নার সেই গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকে উরুকের রাজা গিলগামেশের আমলে। গিলগামেশের কাহিনীতে পাই গিলগামেশ ইনান্নার প্রেম প্রত্যাখ্যান করছেন। এবং প্রতিশোধ স্পৃহায় ক্রুদ্ধ ইনান্না আনকে বাধ্য করেন উরুকে খরা ও ধ্বংসের ব্যবস্থা করতে। সেই অবস্থা থেকে উরুককে উদ্ধার করেন গিলগামেশ তাঁর বন্ধু এনকিডুর সহযোগিতায়। ফলে অধিকতর ক্রুদ্ধ ইনান্না গিলগামেশের এনকিডুর প্রান হরণ করেন। এই সব ঘটনাও রূপকে বর্ণিত।

ইনান্না বলতে আমরা ধরে নিতে পারি ইনান্নার মন্দিরের পুরোহিতকুল। এখানে মনে রাখতে হবে সেচের ব্যবস্থাপনা থাকতো মন্দিরের পুরোহিতদের হাতে। সম্ভবত উরুকের সেচের ব্যবস্থা ছিল দেবতা আন-এর মন্দিরের পুরোহিতদের হাতে। গিলগামেশের সাথে ইনান্নার মন্দিরের পুরোহিতদের সংঘাতে আন-এর মন্দিরের পুরোহিতদের বাধ্য করা হয় উরুকের সেচ ব্যবস্থার ক্ষতি করতে। ফলে খাদ্যাভাবে শতশত উরুকবাসীর মৃত্যু ঘটে। সম্ভবত এমনি সংঘাতে এনকিডু আহত হয় ও পরে মৃত্যুবরণ করে। গিলগামেশ সাময়িকভাবে উরুকের ক্ষমতা হারায়। কিন্তু কালক্রমে আবার ক্ষমতা ফিরে পায়। গিলগামেশের কাহিনি পড়লেই এই ঘটনাবলি অনুমান করা সম্ভব।

সুমেরদের নগর-রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল 'মন্দির-পুরোহিত-রাজা' ত্রিভুজ। প্রতিটি নগর-রাজ্যের প্রায় সব কৃষিজমিই থাকত মন্দিরের অধিনে। পুরোহিতরা নিয়ন্ত্রন করতেন সেচের জল। ফলে রাজনৈতিক প্রয়োজনে 'মন্দির-পুরোহিত-রাজা' ত্রিভুজের ব্যবহার হতো খুব স্বাভাবিক ভাবেই।

'মন্দির-পুরোহিত-রাজা' ছিল সর্বার্থেই সুমেরদের প্রাণভোমরা। এবং হয়ত মানব সভ্যতারও বীজ রোপন হয়েছিল এগুলোতেই। খেয়াল করতে পারি, উরুকের ইনান্নার মন্দিরের হিসাব রাখতেই শুরু হয় লেখা।

সুমের দেবী ইনান্না কে ঘিরে অনেক বাঙালি দুর্গার অতীত রূপ খোঁজেন। আমি কেন একমত নই, সেই তর্কে সরাসরি না গিয়ে ইনান্নার পরিচিত চরিত্র বর্ণনা দেখা যাক।

সুমেরদের প্রেম-ভালোবাসা-যৌনতা-যুদ্ধের দেবীর প্রতীক সন্ধ্যাতারা-শুকতারা। দেবীর সহদোরা এরেস্কিগালা মৃত্যুলোকের অধিশ্বরী। ইনান্নার জমজ ভাই উতু সূর্যদেবতা। ইনান্না বিবাহিতা, প্রেমিক স্বামী মেষপালক দুমুজিদ। ইনান্নার স্বামী বিয়ের পরে প্রতিষ্ঠিত হন উরুকের রাজা হিসাবে। (সুমের রাজাদের তালিকায় দুমুজিদের নামও আছে উরুকের রাজা হিসাবে।)

ইনান্না খেয়ালবশে মৃত্যলোকে গেলে তাঁকে নিয়মানুযায়ী মৃত্যুদন্ড দেওয়া হলে তিনি প্রাণহীন দেহে পরিনত হন। জাদুকরী জ্ঞানের দেবতা এনকির সাহায্যে ইনান্না প্রাণ ফিরে পান শর্ত সাপেক্ষে, সেই শর্ত হল ইনান্নার বদলে অন্য কাউকে মৃত্যলোকে মৃত হয়ে থাকতে হবে। ইনান্নার স্বল্পকালীন মৃত্যলোকবাসকালে প্রেমিক স্বামী দুমুজিদ যথাযথ শোক জ্ঞাপন করেন নি সেই অপরাধে দেবী ইনান্না স্বামীকে পাঠিয়ে দেন মৃত্যলোকে, বছরে ছয়মাস মৃত থাকার জন্য বাকি ছয়মাস মৃত থাকবে দুমুজিদের বোন জেসতিআনা।  

এখানেও আছে রূপক। দুমুজিদ ঝোপঝাড়ের দেবতা। বছরের ছয়মাস ইরাকের তীব্র তাপপ্রবাহে সব ঝোপঝাড় মৃত হয়েই থাকে।

সুমের বিশ্বাসে পৃথিবী নারী, আকাশ পুরুষ। এই নারী পুরুষের মিলনে পৃথিবী জন্ম দেয় দেবতাদের। সুমের দেবতারা স্বয়ম্ভু নন। তাঁদেরও জন্ম হতে হয় এবং তাঁরাও মরণশীল।

সুমের দেবতারা যখন মানব জগতে তখন তাঁরা মানবিক চরিত্রের অধিকারী, মানবিক দেহের অধিকারী। তাই তাঁদের জন্ম হতেই হবে কোন না কোন নারীর গর্ভে।

প্রকৃতি আর প্রাকৃতিক নিয়মেই তাঁরা এসেছেন।

তাহলেও, আকাশ আর পৃথিবীর মিলনে দেবতার জন্ম হয় কেমন করে? আকাশ পৃথিবীর মিলনে আকাশের বৃষ্টির ফোঁটা গর্ভে ধারন করে পৃথিবী গর্ভবতী হন। সেই গর্ভবতী জন্মদেন দেবতাদের। তারপরে দেবতারা জন্ম দেন মানুষের। কোথাও কোন অলৌকিক ঘটনা নেই।

আকাশ থেকে পড়া প্রতিটি বারি বিন্দু এক একটি প্রাণের উৎস। তাই তো ইনান্নার মৃত্যলোক অভিযানে প্রানহীন ইনান্নার দেহে প্রানের স্পন্দন ফিরে আসে এনকিদেবের পাঠানো পুতবারি বিন্দুর স্পর্শে। তারপরে নব জন্মের বীজের স্পর্শে তাঁর নব উত্থান, মৃত্যুলোকের সব নিয়ম তুচ্ছ করে জীবিত দেবী ফিরে আসেন মর্তভুমে।

এই মৃত্যু আর নবজন্ম ঘটে পৃথিবীতে প্রতিবৎসর। দেবী ইনান্না আর তাঁর স্বামী দুমুজ়িদ মিলে এই ঘটনাই প্রত্যক্ষ করান আমাদের। ঝোপঝাড় গাছপালার দেবতা, মেষপালক স্বামী প্রতি বৎসরের ছয়মাস মৃত্যুলোকে আর ছয়মাস মর্তলোকে বিরাজ করেন। এই বাৎসরিক প্রাণহীনতা থেকে প্রাণে ফিরে আসা, ঘটে তাঁরই প্রেমিকা, তাঁরই স্ত্রী, ইনান্নারই আদেশে।

ইনান্না প্রেম-ভালোবাসা-যৌনতার দেবী, তিনি আপন যৌনতায় উদ্দাম স্বেচ্ছাচারী, অথচ এক আহাম্মক কৃষকের দ্বারা ধর্ষিতা দেবী (হ্যাঁ, এই সুমের দেবীও) প্রতিশোধ স্পৃহায় গোটা পৃথিবীকে প্রাণহীন করে তুলতেও তাঁর দ্বিধা নেই। এবং এই কাহিনির রূপকার্থে আমাদের বলে, কৃষক যদি আহাম্মক হয়, কৃষিকাজে অনভিজ্ঞ হয়, তার কৃষিকাজে ফসল ফলবে না। কৃষিজমি বন্ধা হয়ে থাকবে। 

সিংহ অবশ্যই ইনান্নার বহু প্রতীকগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইনান্না কিন্তু সিংহবাহিনি নন। মেসোপটেমিয়ার ঐতিহ্য হল সিংহকে শক্তির প্রতীক হিসাবে দেখা। তাই গিলগামেশের সাথেও সিংহ থাকে। আসিরীয় সম্রাট আসুরবানীপালের দেওয়াল চিত্রেও সিংহ।

অন্তে, দেবী ইনান্না হলেন সুমের দেবী। তিনি প্রেম আর যুদ্ধের দেবী। পরবর্তী কালে এই ইনান্নাই পরিচিত হতে থাকেন আক্কাদ দেবী ইশতার নামে। এই ইনান্নাই পরবর্তী কালে হলেন ভেনাস আর আফ্রোদিতি।

ব্যাবিলনের ইশতার দেবীর মন্দিরের প্রবেশ তোরন হল প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম আশ্চর্য সৃষ্টি।(এখন সেটি আছে বার্লিন মিউজিয়ামে)

@ তুষারমুখার্জি



10

এবিথ ও ইনান্না ॥॥

মুল রচনাঃ এনহেদুয়ান্না। রচনাকালঃ আনুমানিক ২২৮৫ থেকে ২২৫০ পূর্বাব্দ।

সুমের ভাষায় রটিত এই কাব্যের বিষয় খুবই অদ্ভুত। এবিহ্ পর্বত নতমস্তকে ইনান্নাদেবীকে শ্রদ্ধা জানায়নি তাই সেই পর্বতকে ধ্বংস করে দেবী তার ঔদ্ধত্যের শাস্তি দিলেন। কথা হবে পর্বত কি করে মাথা নোয়াবে? এতো অসম্ভব। (অগস্তমুনি আর বিন্ধ পর্বতের কাহিনী মনে পড়ারই কথা)। 

এর অর্থ এটি রূপকে বলা অন্য কাহিনি। তবে কবি কি বলতে চেয়েছেন তা নিয়ে বিভিন্ন মত আছে। সেগুলো আগের দুই পর্বে বিশদে আলোচনা করা হয়ে গেছে।

কাব্যটি অনুবাদের সময় আমি যতদুর সম্ভব মুল কাব্যকে অনুসরন করেছি। তবে সুমের বাক্য রচনা পদ্ধতি, বাংলায় ঠিক ততটা সুখপাঠ্য হয় না। তাই বাধ্য হয়েই সামান্য কিছু বদল করতে হয়েছে।

আমি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মুল সুমের ভাষা থেকে সরাসরি ইংরেজীতে অনুবাদ অনুসরন করেছি। লেখার পরিবর্তন হয়েছে বাক্যের গঠনে, কিছু শব্দের চয়নে। বাক্য ক্রম, পরিচ্ছদ ভাগ, পরিচ্ছদ ক্রম, সবই মুল রচনার অনুসারী।

-----------------------------

মূল কাব্যঃ ইনান্না ও এবিহ্

লেখিকাঃ এনহেদুয়ান্না।

ভয়ঙ্কর দৈবী শক্তির অধিকারিনী, আতঙ্ক যাঁর আবরণ, যিনি ভীতিপ্রদ আঙ্কার অস্ত্রধারিনী, ভুমিতশায়িত যাঁর ঢাল, যিনি রক্তস্নাতা, যাঁকে ঘিরে থাকে ঝড় আর বন্যা, রণনীতির পূর্ণজ্ঞান সমৃদ্ধা যিনি রণক্ষেত্র থেকে রণক্ষেত্রে অবিরত পর্যটনশীলা, তিনিই দেবী ইনান্না।

স্বর্গে বা মর্তে, গর্জনরতা সিংহীর তেজে, মত্ত বুনো ষাঁড়ের বিক্রমে, যিনি শত্রুভুমি তছনছ করে দেন, পরাক্রমী সিংহের মতই যিনি প্রবল প্রতাপে শত্রুকে পদানত করেন, তিনিই দেবী ইনান্না।

হে মহিয়সী দেবী, আপনি স্বর্গলোকের অধিশ্বরী, আপনি মর্ত্যলোকের অধিশ্বরী। এই মর্তভুমির মতই বিশাল আর সুবৃস্তিত আপনার বাহুদ্বয়ের পরিমন্ডল, সূর্যদেবতা উতুর মতো অত্যুজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত করে আপনার স্বর্গলোকে ভ্রমণ সর্বলোকে প্রবল ভীতির উদ্রেক করে।

মর্তলোকে দিবালোক সদৃশ্য উজ্জ্বল দিব্যবিভামন্ডিত পরিচ্ছদ ভুষিতা, পবিত্র পর্বতশ্রেনীর জন্মদাত্রী, আপনার পরিভ্রমণেকালে পর্বতশৃঙ্গ থেকে বিচ্ছুরিত হয় আলোক ছটা, বৃক্ষরাজী স্নাত হয় সেই উজ্জ্বলালোকে।

ধ্বংসের ভল্ল হস্তে সদা উৎফুল্ল, জয়োল্লাসে উল্লাসিত ইনান্না দেবীর বন্দনা সুললিত সুরে গাইছে কৃষ্ণকেশী ভক্তজন।

বন্দনা করি সুএন কন্যা সেই রণপ্রিয়া মহীয়সী দেবী ইনান্নার।

ইনান্না বলছেনঃ

"আমি, দেবী, যথেচ্ছ ভ্রমণ করি স্বর্গলোকে, মর্তলোকে, ইলম বা সুবিরদের দেশে, ভ্রমণ করি লুলুবি পর্বতশ্রেনীতে। আমি, দেবী ইনান্না, ভ্রমণকালে পর্বত এবিহ্-র কাছে গেলেও সে আমাকে শ্রদ্ধা জানায়নি, এবিহ্ পর্বতশ্রেণীর মধ্যভাগে গমন কালেও সে পর্বত আমাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেনি।"

"এবিহ্ নতমস্তক হয়নি আমার সম্মুখে, নতমস্তকে সে তার নাসিকাকে ভুমিস্পর্শ করায়নি. তার ওষ্ঠ আমার পদধুলি স্পর্শ করেনি। এই অপরাধে উদ্ধত এবিহ্-কে আমি ভীত আতঙ্কিত করে তুলবো।"

"আমি এই পর্বতের সুবিশাল পার্শ্বদেশ চূর্ণ করবো বিশালকার দুরমুশাঘাতে, এর ক্ষুদ্র পার্শ্বদেশ চূর্ণ করবো ক্ষুদ্র দুরমুশাঘাতে।  আমি ইনান্না, রণোল্লাশে ঝাঁপিয়ে পড়বো এই পর্বতে। শুরু হবে পবিত্র ইনান্নার মারণ হানা, এই পর্বতের প্রতিটি কন্দরে। শুরু করব এক ধ্বংসলীলা।"

"এই সমরের জন্য প্রস্তুত থাকবে আমার তুনীর ভরা তীক্ষ্ণাগ্র শর, রজ্জু থাকবে পাথর নিক্ষেপের জন্য, প্রস্তুত থাকবে নিক্ষেপ দন্ড। শান দেবো ভল্লে, প্রস্তুত থাকবে ঢাল।"

"অগ্নি সংযোগ করব এর ঘণ অরন্যে। কুঠারাঘাতে পতিত হবে এর বিশাল বৃক্ষশ্রেণী। আমার নির্দ্দেশে জিবিল তার নখদন্ত প্রকাশ করবে পর্বতের স্বচ্ছ জলধারায়। আরাত্তার এই পর্বতশ্রেণীতে আমার আতঙ্ক বিরাজমান হবে।"

"যেমন করে দেবতা আনের করা ধ্বংসস্তুপ থেকে কোন শহর আর ফিরে দাঁড়াতে পারেনা, যেমন করে দেবতা এনলিলের ভ্রকুটিতে ধ্বস্ত শহর আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনা, তেমনি এক ধ্বংসের ভয়ে আতঙ্কিত হবে এই এবিহ্ পর্বত। কম্পিত হৃদয়ে আমাকে শ্রদ্ধা আর সম্মান জানাতে সে বাধ্য হবে।"

সুএন কন্যা দেবী ইনান্না নিজেকে সজ্জিত করলেন রাজকীয় পোশাকে। উৎফুল্ল চিত্তে বেঁধে নিলেন সে পোশাক নিজ অঙ্গে। তাঁর ললাট রঞ্জিত হল ভীতিপ্রদ এক আতঙ্কের বিভায়। তাঁর কন্ঠে দোদুল্যমান রক্তিম কর্নেলিয়ান পাথরের গহণা। তিনি দক্ষিণ পার্শ্বে ধারণ করলেন ভয়াবহ সপ্তমুখী সিটা অস্ত্র। পদমুলে বেঁধে নিলেন ল্যাপিস-ল্যাজুলি খচিত গহণা।

দিবসান্তে, গধুলিক্ষণে দেবী রাজকীয় পদসঞ্চালনে উপস্থিত হলেন দেবলোকের দ্বারে। সেই দ্বারপ্রান্তে তিনি দেবকুলের পিতৃ সম দেবতা আনকে উদ্দেশ্য করে বন্দনা জানালেন।

উৎফুল্লিত চিত্তে দেবীকে আবাহন শেষে দেবতা আন আপন পবিত্র দেবাসনে অধিষ্ঠিত হলেন।

তখন আনদেবকে উদ্দেশ্য করে ইনান্না বললেনঃ

"হে দেবপিতা, আপনাকে অভিনন্দন। আপনি আমার নিবেদন শুনুন। আপনিই আমাকে দেবকুলের সর্বাধিক ভীতিপ্রদ দেবী করে তুলেছেন। আপনারই কৃপায় আজ মর্তলোক বা স্বর্গলোকে আমাকে কেউ অবজ্ঞা করে না। আমার ক্ষমতার নির্দশন প্রকাশের জন্য আপনিই আমাকে সিলিগ অস্ত্র আর আন্তিবাল আর মানসিয়ুম প্রতীক দান করেছেন।"

"আপনিই আমাকে ক্ষমতা দিয়েছেন, ক্ষমতার স্তম্ভকে সুদৃড় করতে। সাহায্য করেছেন দৃড় ভিত্তির উপর বসাতে ক্ষমতার সিংহাসন। দিয়েছেন সেই ক্ষমতা যা মাম্বুম ডালের মত নমনীয় অথচ ভয়াবহ সিটা অস্ত্র ধারনক্ষম। জোয়াল দিয়ে শত্রুর উরু প্রসারিত করার যন্ত্রনাদায়ক পদ্ধতি, শত্রুকে নিরন্তর অনুসরন করার পদ্ধতি, সামরিক অভিযানে উন্মত্ত হত্যালীলা চালানোর নৃশংসতা, এই সবই তো আপনারই শিক্ষা। আপনিই আমাকে প্রস্তুত করেছেন, মই চালিয়ে শত্রুর জমির ফসল নষ্ট করতে, তাদের বন আর ফলের গাছকে পঙ্গপালের নির্দ্দয়তায় শেষ করে ফেলতে, তাদের নগর প্রাচীরের প্রবেশদ্বারের তালা হরণ করতে, যাতে তাদের নগর দ্বার সদা উন্মুক্ত হয়েই থাকে। শত্রুর উপর তীক্ষ্ণ শরবর্ষণ ক্ষমতাও তো আপনারই দেওয়া। হে দেবরাজ আন এই সব ক্ষমতা আমি পেয়েছি কেবল আপনারই কৃপায়।"

"পর্বতের সানুদেশে মস্তক চুর্ণ করে বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য আপনিই আমাকে রাজার দক্ষিণ হস্ত করেছেন। দেশের প্রতিটি অংশ আপনার মহিমা গ্রন্থিতে আবদ্ধ করার উদ্দেশ্যেই আপনি এই ক্ষমতা আমাকে দিয়েছেন।"

"আনুন্নাদেবগণের সহায়তায় রাজা যেন পাহাড়ের খাঁজে লুক্কায়িত সর্পের মত পিচ্ছিল মসৃন গতিতে অবতরন করে শত্রু ভুমি ধ্বংস করতে সক্ষম হন, তিনি যেন পর্বতের প্রতিটি কন্দর অবগত হন, গোটা পর্বত যেন রাজার নিয়ন্ত্রনে থাকে, আপনি সে সবই লক্ষ্য রেখেছেন অবিরত।"

"তবুও এমন ঘটনা ঘটে কি করে?

পর্বত এবিহ্ কেন আমার ভয়ে ভীত হল না? স্বর্গলোকে বা মর্তলোকে কি ঘটলো যে, উদ্ধত পর্বত এবিহ্ আমাকে অবজ্ঞা করার সাহস দেখায়? পর্বত এবিহ্ আমাকে দেখে তার মস্তক নত করেনি, তার নাসিকা ভুমি স্পর্শ করেনি, তার ওষ্ঠ পদধুলি লেহন করেনি।" 

"আমাকে অনুমতি দিন, আমার বিশাল দুরমুশ তার বিশাল পার্শদেশ আঘাত করবে, আমার ক্ষুদ্র দুরমুশ তার ক্ষুদ্র পার্শদেশ আঘাত করবে। ইনান্নার রণন্মোত্ততার ঝড়ের দাপট তাকে আঘাত করবে। অনুমতি দিন তার প্রতিটি কন্দর হোক তুমুল রণক্ষেত্র।"

"অনুমতি দিন আমার তুনীর ভরে তুলি তীক্ষ্ণাগ্র শরে, রজ্জু প্রস্তুত করি প্রস্তর নিক্ষেপের জন্য, শানিত করি ভল্লাগ্র, সংগ্রহ করি নিক্ষেপ দন্ড। অগ্নি সংযোগ করি এবিহ্-র অরন্যে, জিবিলকে প্রস্তুত করি তার স্বচ্ছ জলস্রোতকে স্তব্ধ করতে, দুরাগম্য আরাত্তা পার্বত্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ুক ইনান্নার মারণ খেলার আতঙ্ক।"

"আনদেব , যেমন করে আপনি বিধস্ত করেন নগরকে, যেন তাকে আর কখনও পূর্ণগঠন করা না যায়। যেমন করে এনলিলদেব ধ্বংস করেন নগর যেন সে নগর আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়ানোর ক্ষমতা অর্জন না করে। তেমনি এক ধ্বংসের আতঙ্কে কম্পিত হোক এবিহ্ পর্বতও। ভীত সন্ত্রস্ত এবিহ্ আমাকে আমার প্রাপ্য শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করুক।"

ইনান্নার কথা শেষ হলে, দেবতাদের প্রধান আনদেব শান্ত কন্ঠে ইনান্নাকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ "ইনান্না, আমার প্রিয় কনিষ্ঠা, তুমি কেন এই পর্বত ধ্বংসে উদ্যত? কেন তোমার এমন তীব্র আগ্রহ এই পর্বত ধ্বংসে? কি অর্জন করবে এবিহ্ ধ্বংস করে?"

"শোন ইনান্না, এবিহ্ পর্বত অতি বিশাল আর ভয়ঙ্কর। এবিহ্-র উত্তুঙ্গ ঔদ্ধত্য আর অবজ্ঞা সর্ব লোকে জ্ঞাত। দেবকুলের মনেও সে তার স্বকীয় বিশালত্বের দ্বারা ভীতির সঞ্চার করে। সে ভীতিতে আচ্ছন্ন আনুন্নাদেবগণ। সেই ভীতিতে আচ্ছন্ন সমগ্র ভুখন্ড।"

"মর্তলোক হতে সুদুর স্বর্গলোক অবধি বৃস্তিত পাদদেশ নিয়ে দাঁডিয়ে এবিহ্। এবিহ্-র অনন্য অরণ্য সমৃদ্ধ সুবিশাল সাইপ্রাস বৃক্ষরাজীতে। ফল পুস্পে ভরভরন্ত সেই অরন্যে সদা বিচরনরত মৃগকুল। সেই অরন্যের বৃক্ষশাখার ছায়ায় সবিক্রমে পদচারণা করে সিংহ। আর তারই তৃণভুমিতে বিচরণ করে বুনো ছাগ আর শক্তিশালী বন্য ষাঁড়।"

"না, প্রিয় ইনান্না, এই বিশাল পর্বতের ভীতি আর আতঙ্কের ঘেরে তুমি প্রবেশ করতে পারবে না। করা উচিত হবে না। তোমার এই এবিহ্ বিরোধিতা একান্তই অনভিপ্রেত।"

আন দেবের কথা শুনে হতাশ, ক্রুদ্ধা দেবী ক্ষণিকের জন্য আপন পার্শ্বদেশ থেকে উন্মুক্ত করলেন সিটা অস্ত্র, বুঝিবা আঘাত হানবেন দেবপ্রধান আনকেই। পরক্ষণেই নিজেকে সম্বরণ করলেন। আসন ত্যাগ করে, রূঢ় করাঘাতে সশব্দে উন্মুক্ত করলেন দেব প্রাসাদের ল্যাপিস-ল্যাজুলি খচিত বদ্ধদ্বার। ক্রদ্ধা দেবী বের হয়ে এলেন সেই উন্মুক্ত দ্বারপথ দিয়ে।

আপন সংকল্পে অটুট দেবী আরম্ভ করে দিলেন এবিহ্-র বিরুদ্ধে তাঁর রণ। বইয়ে দিলেন প্রবল ঝঞ্ঝাবাত্যা।  তার সাথে বন্যার উত্তুঙ্গ জলরাশি ধেয়ে গেল পর্বতের বিশাল মাটি-পাথরের স্তরের পর স্তর ভাসিয়ে নিয়ে।  প্রবল বায়ুবেগে খড়কুটোর মত বাতাসে উড়তে লাগল পার্বত্যলোকের বাসিন্দাদের মাটির বাসনের ভগ্নখন্ড। দেবী বের করে নিলেন তীক্ষ্ণাগ্র শর তাঁর তুনীর থেকে।

মহিয়সী দেবী উদ্ধত পর্বত এবিথের সাথে রণে অবতীর্ন।

তিনি সতর্ক পদে ধাপে ধাপে এগুতে লাগলেন। হাতে নিলেন দ্বি-ধার ছুরিকা। সুউচ্চ ঘাস মুঠো করে ধরার মত করেই চেপে ধরলেন এবিহ্-র স্কন্ধদেশ। হু-হুঙ্কার রবে আমুল বিঁধে দিলেন হাতের ছুরিকা এবিহ্-র শিলাময় গাত্রে।

সে তীব্র আঘাতে আঘাতে এবিহ্-র প্রস্তরময় গাত্র থেকে খসে পড়তে লাগল প্রস্তরের আবরন। প্রস্তরগাত্রের কন্দরে লুক্কায়িত সর্পরা আতঙ্কে তাদের বিষ ত্যাগ করতে থাকল। দেবী ইনান্না এবিহ্-র অরন্য ধ্বংস করে দিলেন। দেবীর আদেশে প্রবল খরা এবিথ্-র অরন্যের সমস্ত বৃক্ষ শুষ্ক করে দিলে দেবী তাতে করলেন অগ্নি সংযোগ। ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে গেল সমস্ত পর্বত। দেবী যা চাইছিলেন তাই করলেন। তিনি এবিহ্-কে ধ্বস্ত করে আপন অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন।

ধস্ত এবিহ্-র সম্নুখে দন্ডায়মান মহীমাময়ী দেবী ইনান্না উচ্চ কন্ঠে বললেনঃ-

"এবিহ্! তোমার ছিল ভয়াবহ উচ্চতা। অপরিমেয় প্রাকৃতিক সম্পদে তোমার সর্বাঙ্গ ছিল আচ্ছাদিত। তোমার সেই গগনচুম্বী উচ্চতার অহঙ্কার বশে তুমি আমার সম্মুখে নতমস্তক হওনি, তোমার নাসিকা ভুমি স্পর্শ করেনি, তোমার ওষ্ঠ পদধুলি লেহন করেনি, তাই আমি তোমাকে ধ্বংস করলাম, তোমার উন্নত মস্তক অবনত করলাম।"

"যেমন ভাবে শুন্ড আকর্ষণ দ্বারা হস্তি দমন করা হয়, বুনো ষাঁড়ের সিং বজ্রমুষ্টিতে ধারণ করে তাকে দমন করা হয়, সেই ভাবেই আমি তোমার উদ্ধত সিং আকর্ষণ করেছি। বুনো ষাঁড়ের সিং ধরে যেমন করে তাকে ভুমি শয্যা নিতে বাধ্য করি, তেমনি ভাবেই তোমাকেও আমি ভুতলশায়িত করেছি। অদম্য বন্য শক্তির বশেই আমি তোমাকে ধ্বস্ত করলাম। তোমার চোখে জল থাকবে চিরতরের জন্য। তোমার হৃদয় থাকবে চিরতরে শোকাহত। দেখ কেবল দুঃখের গান গাওয়া পাখিরা এখন তোমার শরীরে বাসা বেঁধেছে।"

সেই ভীতিপ্রদ রণ হুঙ্কার আরেকবার দিলেন দেবী ইনান্না। তারপরে জয়োল্লাশে মত্ত হলেন মহিয়সীা দেবী ইনান্না।

"এবিহ্ আমার দেবপিতা এনলিল তার ভয়াবহ আতঙ্ক তোমার দেহের মধ্যভাগে গেঁথে দিলেন। তাঁরই দেওয়া অস্ত্র আমার দেহের দক্ষিণ পার্শে রক্ষিত।  আমার ক্রোধ আর দর্প এই পর্বতকে ধ্বংস করল।"

"এইখানে আমি প্রাসাদ গড়লাম, আর অধিকারের আসন স্থাপিত হল সুদৃড় ভিত্তি ভুমিতে। এই উপলক্ষে আমি কুরজারা সম্প্রদায়ের গায়ক বাদকদের দিলাম ছুরিকা আর শলাকা, গালা সম্প্রদায়ের গায়ক বাদকদের দিলাম উব আর লিলিস ঢোল আর পিলিপিলি সম্প্রদায়ের গায়ক বাদকদের উষ্ণীস বদলে দিলাম।"

"জয়োল্লাশে আমি দুরন্ত গতিতে ছুটে গিয়েছিলাম এবিহ্ পর্বতের দিকে। ছুটে গেলাম  আর বাঁধ ভাঙ্গা বন্যার ফুঁসে ওঠা জলরাশির মত প্লাবিত করলাম এবিহ্কে। এবিহ্-র উপর আমার জয় প্রতিষ্ঠা হল।"

এবিহ্-কে ধ্বংস করার জন্য সুএন কন্যা ইনান্নার বন্দনা করুন সকলে।

সমাপ্ত॥


@ তুষারমুখার্জি



20


 আর্যগণ প্রথমে পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তারা দলবদ্ধ হয়ে অনেকগুলো পশু সাথে নিয়ে ঘাস আচ্ছাদিত অঞ্চল বা প্রদেশে গমন করতেন। পরে সে  স্থানের ঘাস পশু খাদ্য হিসেবে নিঃশেষিত হলে তারা পুনরায় অন্য অঞ্চল বা  প্রদেশে যেতেন। এভাবে তারা প্রতিনিয়ত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করতেন বলে আর্য (অর্থাৎ গমনশীল) নামে পরিচিত হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে আর্যগণ  নিরন্তর এরূপ স্থান পরিবর্তন খুবই কষ্টদায়ক বিবেচনায় এনে এক স্থানে  অবস্থানের উপর গুরুত্ব আরোপ করে এবং এ সমস্যা সমাধানের উপায় বের করার চেষ্টা চালায়। উপায় হিসেবে কৃষিকাজকেই তারা অধিক গুরুত্ব দিয়ে ফসল উৎপাদনে নিযুক্ত হয়। এজন্যই তারা আর্য (অর্থাৎ কৃষিজীবি) নামে প্রসিদ্ধ হন। শেষোক্ত পক্ষের মতবাদে আর্য শব্দের অর্থ দাঁড়ায় কৃষিকর্মকারী।

হিটলারের নাৎসি পার্টি ‘আর্য' শব্দটিকে জার্মান শব্দ ‘এহরে' এর অর্থের সমতুল্য ধরতেন, যার মানে সম্মান। এর সুবাদে ‘আর্য’ শব্দটির অর্থ সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ। জাতিগত বিশুদ্ধতায় বিশ্বাসী হিটলার আর্যকে ‘বিশুদ্ধ জার্মান জাতি' হিসেবে ঘোষণা করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। কেননা তার মতে, বিশ্বে আর্য জাতির মানুষদের রক্তই সবচেয়ে বেশি পবিত্র। হিটলারের মতে, আর্যরা লম্বা, ফর্সা এবং নীল চোখের অধিকারী ছিলেন। তিনি দাবি করেন, আর্যরা নর্ডিক হলেও তারা মূলত জার্মানির অধিবাসীই ছিলেন। উল্লেখ্য, নর্ডিক বলতে মূলত নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের অধিবাসীদের বোঝানো হয়। অবশ্য মাঝে মাঝে জার্মানির কিছু অংশও নর্ডিকের অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়।

কিন্তু এই কাল্পনিক তত্ত্বের ফানুস ফুটো হয়ে যায় ইরান থেকে বেহিস্তান শিলালিপি আবিষ্কৃত হওয়ার পর।যীশুর জন্মের প্রায় ৪৮৬ বছর আগে উৎকীর্ণ এই লেখতে পারস্য সম্রাট দারায়ুস নিজকে দাবী করেন-‘’ A Persian, a son of a Persian and an Aryan of Aryan Descent’’ হিসেবে। ব্যাস এরপরই ঐতিহাসিক মহলে তীব্র আলোড়নের সৃষ্টি হল এবং আর্য জাতির সাথে সম্পৃক্ত দেহসৌষ্ঠব সংক্রান্ত তত্ত্ব এক লহমায় বাতিলের খাতায় চলে গেল।

হিন্দু আর্য এবং জার্মান আর্যদের মাঝে সংজ্ঞাগত মিল খুজে পাওয়া যায়, দেখুন উভয়েই “আর্য”দের উচ্চ বংশীয় বলে সংজ্ঞায়িত করেন। ম্যাক্সমুলার, স্যার উইলিয়াম জোন্স প্রভৃতি পন্ডিতের মতে আর্য একটি ভাষাগোষ্ঠীর নাম। যারা আর্য ভাষায় কথা বলে তারাই আর্য জাতির অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত।

ফিলিপ্পো স্যাসেটি নামক ফ্লোরেন্সের একজন বণিক গোয়াতে পাঁচবছর অবস্থানের (১৭৮৩-১৭৮৮ খ্রিঃ) পর প্রথম সংস্কৃতের সঙ্গে ইউরোপের প্রধান কয়েকটি ভাষার সাদৃশ্যের কথা ঘোষণা করেন। ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে প্রদত্ত তাঁর বক্তৃতায় তিনি বলেন যে, একই উৎস থেকে উৎপত্তির কারণে এ সাদৃশ্য। তাঁর মতে, গ্রিক, ল্যাটিন, গথিক, কেল্টিক, সংস্কৃত, পারসিক, জার্মান ইত্যাদি একই উৎস থেকে উদ্ভুত। এ ভাষাগুলো পন্ডিতদের কাছে ইন্দো-ইউরোপীয় বা ইন্দো-জার্মান ভাষা রূপে পরিচিত। ভাষাগত সাদৃশ্যের কারণে প্রশড়ব দাঁড়িয়েছে যে, এই আর্য ভাষা যে জাতিগোষ্ঠী ব্যবহার করতো তাদের আদি বাসভূমি কোথায় ছিল।এ সম্পর্কে পন্ডিতগণ বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। একদল পন্ডিত মনে করেন যে, আর্যরা আদিতে ভারতবাসী ছিল। পরবর্তীকালে তারা ভারতের বাইরে পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদের মতে, আর্যরা বাইরে থেকে এসে ভারতে বসতি স্থাপন করেছিল। যাঁরা মনে করেন যে আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল ভারতবর্ষ, তাঁরা নিম্নলিখিত যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেছেন :

(ক) আর্যদের প্রাচীনতম গ্রন্থ বেদ ভারতে রচিত হয়েছিল। বেদে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে। বৈদিক সাহিত্যে যে সকল গাছ ও পশু-পাখির উল্লেখ আছে তা ভারতের এই অঞ্চলে দেখা যায়।

(খ) যারা দেশ ত্যাগ করে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস করে তারা তাদের আদি বাসভূমির কথা স্মরণ করে।কিন্তু বৈদিক সাহিত্যে সপ্তসিন্ধু ছাড়া অন্য কোন দেশের নাম পাওয়া যায় না।

(গ) পারগিটারের মতে, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আর্যদের অভিপ্রয়াণের কোন প্রমাণ ভারতের ইতিহাসে নেই, বরং উত্তর-পশ্চিম হতে আর্যদের ভারতের বাইরে যাওয়া সম্ভব। ঋগ্বেদের নদী স্তোত্রে যে নদীগুলোর উল্লেখ আছে তা গঙ্গা দিয়ে শুরু হয়ে উত্তর-পশ্চিমে সরস্বতী দিয়ে শেষ হয়েছে। এই নদী স্তোত্র থেকে ধারণা করা যেতে পারে যে আর্যরা পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিমে গিয়েছিল।

(ঘ) আর্যরা বহিরাগত হলে তাদের আদি বাসভূমিতে বেদের মত কোন গ্রন্থ রচিত হয়নি কেন? এসব যুক্তির মাধ্যমে কিছু ঐতিহাসিক দাবী করেন যে, আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল ভারতবর্ষ।

কিন্তু কোনো কোনো পন্ডিত এ মতের বিপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি দেখিয়েছেন। তাঁদের যুক্তিগুলো নিম্নরূপঃ

(ক) বেদে উল্লেখিত গাছপালা ও পশুপাখির নাম থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলই ছিল আর্যদের আদি বাসভূমি। ভারতে প্রবেশ করে প্রমে তারা ঐ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করায় ঐ এলাকার গাছপালা ও পশুপাখির সঙ্গে তাদের প্রম পরিচয় ঘটে। এ কারণেই এগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বেদও রচিত হয়েছিল ঐ এলাকাতেই।

(খ) এমনও হতে পারে যে দীর্ঘকাল সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে বাস করার ফলে আর্যরা তাদের আদি বাসভূমির সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিল বলেই বেদে তার উল্লেখ পাওয়া যায় না।

(গ) নদী স্তোত্র দিয়ে আর্যদের উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে বাইরে অভিপ্রয়াণ প্রমাণ করা যায় না। বৈদিক সাহিত্যে ৩৯ টি নদীর নাম পাওয়া যায়। তার মধ্যে ঋগ্বেদই পাওয়া যায় ২৫টি নদীর নাম, কিন্তু গঙ্গা নদীর নাম শুধুমাত্র একবার উল্লেখিত হয়েছে। আর্যরা ভারতের আদিবাসী হলে এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে অভিপ্রয়াণ ঘটে থাকলে গঙ্গা নদীর সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ক থাকার কথা এবং সে ক্ষেত্রে গঙ্গার নাম বারবার উল্লেখিত হওয়া উচিৎ ছিল।

(ঘ)ঋগ্বেদের মত কোন গ্রন্থ অন্য কোন দেশে রচিত হয়নি বলেই বলা যায় না যে ভারতই ছিল আর্যদের আদি বাসভূমি। এমনও হতে পারে যে ভারতে আসার আগে বেদের মত গ্রন্থ রচনা করার মত বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক উনড়বয়ন তাদের ঘটেনি।

(ঙ) তাছাড়া বলা যায় যে ভারতবর্ষ আর্যদের আদি বাসভূমি হলে তারা ভারত ত্যাগের আগেই গোটা ভারতবর্ষে আর্য বসতি ও সংস্কৃতি বিস্তার করতো। কিন্তু উত্তর ভারতের বেশ কিছু এলাকা এবং দক্ষিণ ভারত ছিল আর্য সংস্কৃতির বাইরে।

(চ) সংস্কৃত ভাষায় তালব্য বর্ণের (ন, ং, ৎ) প্রাধান্য দেখা যায় যা ইউরোপীয় অন্য কোন ইন্দো- ইউরোপীয় ভাষায় নেই। পন্ডিতেরা মনে করেন যে, ইউরোপ থেকে ভারতে আসার পর দ্রাবিড় ভাষার প্রভাবে এরকম হয়েছে।

(ছ) বৈদিক সাহিত্যে সিংহের উল্লেখ থাকলেও বাঘ ও হাতির উল্লেখ নেই। আর্যরা ভারতের আদিবাসী হলে ভারতের এই দুটি প্রাণীর নামের উল্লেখ বৈদিক সাহিত্যে অবশ্যই থাকা উচিৎ ছিল।

এসব যুক্তির বলে পন্ডিতেরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল ভারতের বাইরে।

অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে, আর্যরা ইউরোপ থেকে ভারতে এসেছিল। তাঁদের যুক্তিগুলো নিম্নরূপঃ

(ক) আর্য ভাষাগোষ্ঠীর সাতটি ভাষার মধ্যে পাঁচটি এখনও ইউরোপের ভাষা, শুধু সংস্কৃত ও পারসিক ইউরোপের বাইরের।ইউরোপে গ্রিক, ল্যাটিন, জার্মান প্রভৃতি আর্য ভাষাগুলোর যে রকম ঘন সন্নিবেশ দেখা যায় ভারতে তা দেখা যায় না। ইউরোপে আর্য গোষ্ঠীভুক্ত ভাষার আধিক্যের কারণে পন্ডিতেরা মনে করেন যে, আদিতে আর্যরা ইউরোপেই বাস করতো।

(খ) বৈদিক সাহিত্যে ওক, উইলো, বার্চ ইত্যাদি গাছ এবং ঘোড়া, গাভী, ষাঁড়, শুকর প্রভৃতি জন্তুর উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচ্য দেশের জন্তু হাতি, বাঘ, উট ইত্যাদির কোনো উল্লেখ বৈদিক সাহিত্যে নেই।

(গ) অধ্যাপক গাইলস মনে করেন যে, আর্যদের আদি বাসভূমি ছিল দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপ। আদি ইন্দো- ইউরোপীয় ভাষায় সমুদ্রের কোন উল্লেখ না থাকায় ধরে নেওয়া যায় যে আর্যদের আদি বাসভূমি কোন দ্বীপে বা সমুদ্র তীরে ছিলনা। তারা যেসব গাছপালা ও পশুপাখির নাম উল্লেখ করেছে সেগুলো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের।আর্যরা তখন স্থায়ীভাবে বসবাস এবং কৃষিকাজ শুরু করেছিল। তাদের গৃহপালিত পশুর মধ্যে গরু, ঘোড়া ও ভেড়ার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রয়োজন ছিল। তাহলে মনে করতে হবে যে আর্যদের আদি বাসস্থান এমন একটি স্থানে ছিল যেখানে কৃষি ও চারণযোগ্য পরিবেশ কোনটিরই অভাব ছিলনা । সেখানে কৃষিযোগ্য জমি, ঘোড়ার জন্য বিস্তীর্ণ স্তেপ এবং ভেড়া চরানোর জন্য উঁচু জমিই সবই ছিল। এসবের দিকে লক্ষ রেখে ড. গাইলস বর্তমান অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি অঞ্চলকেই আর্যদের আদি বাসভূমি হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।

অধ্যাপক ব্র্যান্ডেস্টাইন মনে করেন যে, উরাল পর্বতের দক্ষিণে কিরঘিজ স্তেপ অঞ্চলই ছিল আর্যদের আদি বাস ভূমি । এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য তিনি শব্দতত্ত্বের সাহায্য নিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রথম দিকের ইন্দো - ইউরোপীয় শব্দাবলীতে কোন পর্বতমালার পাদদেশে বিস্তীর্ণ স্তেপ ভূমিতে আর্যদের আদি বাসভূমির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পরবর্তীকালের ইন্দো-ইউরোপীয় শব্দাবলীতে সম্পূর্ণ ভিন্নতর ধরনের জমি, গাছপালা এবং জীবজন্তুর সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে শুষ্ক স্তেপভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শব্দাবলীর পরিবর্তে জলাভূমির স্পষ্ট ইঙ্গিতবাহী শব্দাবলী পাওয়া যায়। বর্তমানে অধিকাংশ পন্ডিতই ব্র্যান্ডেস্টাইনের মতের সমর্থক এবং তাঁরা মনে করেন যে, কিরঘিজ অঞ্চলই আর্যদের আদি বাসভূমি।

আর্যদের আদি বাসভূমি সম্পর্কে পন্ডিতগণ বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। তবে বর্তমানে অধ্যাপক ব্র্যান্ডেস্টাইনের মতানুসারে অধিকাংশ পন্ডিতই মনে করেন যে, ওরাল পর্বতের দক্ষিণে কিরঘিজ স্তেপ অঞ্চলই ছিল আর্যদের আদি বাসভূমি। বেদ হচ্ছে আর্যদের প্রাচীনতম সাহিত্য, যা প্রথমে লিখিত আকারে ছিল না। অনেক পরে বেদ লিপিবদ্ধ করা হয়। চারটি বেদের মধ্যে প্রাচীনতম হচ্ছে ঋগ্বেদ। আর্যদের ভারতে বসতি স্থাপন ও বিস্তার সম্পর্কে ঋগ্বেদ ও পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। সাধারণত পন্ডিতগণ মনে করেন আর্যরা ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হিন্দুকুশ পর্বতের গিরিপথ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে প্রথমে আফগানিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে বসতি স্থাপন করে। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে তারা ‘সপ্তসিন্ধু' নামে আখ্যা দিয়েছিল। পরবর্তীতে তারা পূর্ব ভারতের দিকে অগ্রসর হয়ে তাদের বসতি বিস্তার করে। দক্ষিণ ভারতে আর্য সভ্যতা বিস্তার সম্পর্কে সঠিক বিবরণ পাওয়া যায় না। 

দক্ষিন রাশিয়ার কাজাখস্তান থেকে আবিষ্কৃত ‘আন্দ্রনোভো সংস্কৃতি’র ক্ষেত্রে দেখা যায় যে,এই সভ্যতার অন্তর্গত পশুপালক গোষ্ঠী অশ্বের সাথে সুপরিচিত ছিল এবং এই অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত গবাদিপশুর দেহাবশেষের মধ্যে আশি শতাংশই  অশ্বের।এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এলিনা কুজমিনা উল্লেখ করেছেন যে, পন্টিক-কাস্পিক অঞ্চল হল আর্য বা ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীর আদি বাসভূমি এবং এখান থেকেই একটি শাখা ইউরোপে চলে যায় ও আরকটি শাখা ইরানে চলে যায়।ইরানের শাখাটি থেকে ভেঙে আরেকটি শাখা আবার ভারতে প্রবেশ করে।ইউরোপে যে আর্যদের একটি শাখার অভিপ্রয়ান হয়েছিল তা নিয়ে কোন সন্দেহই নেই এবং পরবর্তীকালে হিটলারের সময়ে ‘জার্মানরা আর্য’ এই জাতীয় ধারনা গড়ে উঠেছিল।

সমস্যা হল আর্যদের যে শাখাটি ইরান বা তদানীন্তন পারস্যে প্রবেশ করেছিল তাদেরকে নিয়ে।প্রাচীন পার্সিদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হল ‘আবেস্তা’ যার সাথে বৈদিক সাহিত্য সম্ভারের প্রচুর সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।তবে যেখানে ‘দেব’ শব্দটি বেদে অত্যন্ত পবিত্র সেখানে আবেস্তাতে ‘দেব’ শব্দতি নেতিবাচক অর্থ বহন করে এবং ‘অসুর’ সত্ত্বার প্রতি স্তুতি বর্ষিত হয়েছে।সর্বোপরি বৈদিক দেবতা বরুণের সম্বন্ধে আবেস্তা ঋণাত্বক মনোভাব প্রকাশ করেছে।সম্ভবত ইরানে প্রবেশের পর আর্যদের মধ্যে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল, তাই একটি গোষ্ঠী ভারতে চলে এসে ইরানীয় আর্যদের বিপরীত এক ধর্মীয় ব্যবস্থা পত্তন করে।যদিও এই বিষয়টি এতটা সরল নয়।কারণ বেদে অনার্য মুণ্ডারী ও দ্রাবিড় ভাষার প্রায় তিনশোটি শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়।তাই অনেকেই মনে করেন আর্যরা  ভারতীয় এবং ভারত থেকেই তারা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। আবেস্তা ও ঋগ্বেদের সময়কাল প্রায় একই হওয়ায় এই প্রশ্নের সমাধান বেশ কঠিন।

আর্যরা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের দিকে ভারতবর্ষে আগমন করে। ক্রমে তারা এখানে গড়ে তোলে আর্যসভ্যতা। আর্যদের ধর্মগ্রন্থ বেদ (পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থ) থেকে ভারতে তাদের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে কিছু ধারণা লাভ করা যায়। বেদ চারভাগে বিভক্ত ঋক্, সাম, যজুর এবং অথর্ব। ঋগ্বেদের সম্ভাব্য রচনাকাল ১৫০০-৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে এবং অন্য তিনটি ৯০০-৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে রচিত হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। বেদের রচনাকালের ওপর নির্ভর করে আর্যসভ্যতাকে দুভাগে ভাগ করা হয় ঋগ্বেদে বৈদিক যুগের সভ্যতা এবং পরবর্তী বৈদিক সভ্যতা। উভয় যুগের মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল বিধায় আর্যদের জীবনচর্চায় সুস্পষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। ঋগ্বেদের যুগে পাঞ্জাব ছিল আর্য সভ্যতার কেন্দ্রভূমি। কালক্রমে তারা ভারতের পূর্বদিকে বসতি বিস্তার করে এবং মধ্যদেশ তাদের কর্মকান্ডের কেন্দ্রে পরিণত হয়। আমরা বলতে পারি, ঋগ্বেদের বৈদিক যুগে আর্য সমাজ, ধর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি ক্রমে সুস্পষ্ট রূপ পরিগ্রহণ শুরু করে, তবে পরবর্তী বৈদিক যুগে তা সুসংহত ও সুসংঘবদ্ধ হয়ে ওঠে।

আর্য বিতর্ক ইতিহাসের এমন এক অধ্যায় যার সঠিক সমাধানসূত্র নির্ণয় অত্যন্ত দুরহ, তবে অসম্ভব নয়।সর্বপ্রথম সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি অতিক্রম করে এই  সমস্যাকে আরও বৃহত্তর প্রেক্ষিতে যুক্তি-সংগতভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। আর্যরা যে অভারতীয় এই বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। সেক্ষেত্রে মধ্য এশিয়ায় এদের উৎস অনুসন্ধান করলে তা সফল হবে।আর্য সমস্যার সমাধানের সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি হল নিরবিছিন্ন অনুভূমিক উৎখনন, বিশেষত তুরস্ক,ইরান,ইরাক এই সকল অঞ্চলে আর্য সভ্যতার প্রচুর উপাদান এখনও লুক্কায়িত রয়েছে।এটা কোন কাল্পনিক অবতারনা নয়, সাম্প্রতিক কালে তুরস্কের গোবেকেলি টেপে অঞ্চলে আবিষ্কৃত প্রায় সাত হাজার বৎসরের প্রাচীন মন্দির ও ইউক্রেনে প্রাপ্ত স্বস্তিকা প্রতীক আর্য ইতিহাসকে এক নতুন আঙ্গিকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।

সর্বোপরি হরপ্পা সভ্যতায় আর্য প্রভাব খোঁজার প্রয়াস বৃথা।কারন বেদে ইন্দ্রকে ‘পুরন্দর’ রূপে অভিহিত করা হয়েছে, কারন তিনি ‘হরি-গুপয়’ এর যুদ্ধে পুর বা নগর ধ্বংস করেছিলেন;আর এই হরি-গুপয় হল হরপ্পা।হরপ্পার বেশ কিছু সাইটে প্রাপ্ত কঙ্কালগুলির আঘাত পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে অতর্কিত আক্রমণে এদের মৃত্যু হয়েছে।তাছাড়া অনেক জায়গায় কঙ্কালের স্তুপ পাওয়া গেছে,যা থেকে বোঝা যায় যে এগুলির রীতি মেনে সৎকার হয়নি।হরপ্পার পতনের পশ্চাতে যে বৈদেশিক আক্রমণকে দায়ী করা হয়,সেই আক্রমণকারীরা আর অন্য কেউ নয়,তারাই হল আর্য।সুতরাং আর্যরা বিদেশী এবং শুনতে খারাপ লাগলেও মেনে নিতেই হয় যে বৈদিক সভ্যতার জন্মদাতারা ভারতের সুপ্রাচীন নগর সভ্যতার নির্মম ধ্বংসকারী ছিল এবং তারা কোনদিনই নগর সভ্যতার নিরিখে প্রাচীন ভারতীয়দের সাথে পাল্লা দিতে পারেনি।

আমি আসলে আর্য উৎস মানে ভারতীয় এবং জার্মান দাবীদারদের মাঝে কোনটা ঠিক তা বের করার চেষ্টা করতে গিয়ে কিছু বই পত্র এবং অন্তর্জাল ঘেটে দেখি। বাস্তবতা হল এখনো এব্যাপারে কোন ডিসিশান পাওয়া যায়নি। আর্য দের উৎস নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে অধিকাংশই এখন এক মত যে আর্যরা ভারতীয় উদ্ভুত না যা বর্তমান ভাবতীয়দের একটা বড় অংশ দাবী করে আসছে।

ভারতীয় আর্যদের নিয়ে জানতে হলে আপনাকে ঋগ্বেদ সন্মন্ধ্যে পড়তে হবে, আমি ঋগ্বেদ পড়তেছি এই মুহুর্তে তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা পড়ছি তাতে দেখতে পারছি ভারতীয় আর্যদের বিভিন্ন ইতিহাস, বেশ উৎসাহের সাথেই পড়ছি। হয়ত সামনে ভারতীয় আর্যদের নিয়ে লেখব। আমি ইতিহাসের ছাত্র না, কিন্তু ইতিহাস নিয়ে আমার অসীম কৌতুহল।

এলেখা লিখতে গিয়ে সায়ন দেবনাথ, এম ফিল, প্রথম বর্ষ প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর একটা নিবন্ধ থেকে অনেক কিছু জানতে পারছি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা তার লেখা থেকেই পোষ্টের বিভিন্ন জায়গায় উদ্ধৃতিও দিয়েছি।

হিটলার যেমন আর্যদের জার্মান বলে দাবী করছেন তেমনি কিছু ভারতীয় আর্যদের ভারতীয় বলে দাবী করছেন যা কোনমতেই ধোপে ঠেকে না, আমার সামান্য পড়াশুনা থেকে আমি যেটুকু উপলদ্ধি করছি তাতে আর্যদের উৎপত্তি মধ্য এশিয়ার কোন এক এক জায়গা থেকে হয়ত কিরগিজ স্তেপ বা নিকটস্থ কোথাও থেকে কিন্তু তাও এখনো শক্ত কোন ভিতের ওপর দাড়ায় নি।

R.C. Majumdar, The History and Culture of the Indian People (Vol-1), Vedic Age.

@ শোভন রেজওয়ানুল হক


লিফটের ভেতরে আয়না বসানোর পর দেখা গেল অলৌকিক কাণ্ড! মানুষের সমস্ত অভিযোগ এক নিমেষে বন্ধ হয়ে গেল। কারণ মানুষ যখন লিফটে ওঠে, তখন সে আয়নায় নিজেকে দেখতে বা চারপাশ লক্ষ্য করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে সময় যে কত দ্রুত কেটে যায়, তা সে টেরই পায় না। এছাড়া আয়না থাকার কারণে লিফটের ভেতরের ছোট জায়গাটুকুও অনেক বড় মনে হয়, যা মানুষের ক্লোস্ট্রোফোবিয়া বা বদ্ধ জায়গার ভয় দূর করতে সাহায্য করে। ছোট একটা আয়না কীভাবে মানুষের মন নিয়ে খেলে, ভাবুন 


21


সাও পাওলো-কে প্রায়ই ইতালির বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম 'ইতালীয় শহর' বলা হয়। শুনতে এটি ভ্রমণবিষয়ক কোনো ব্লগের জন্য চমৎকার এক তথ্য মনে হতে পারে। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও গভীর, আরও নির্দিষ্ট এক ইতিহাস।

আর্জেন্টিনার বেশিরভাগ মানুষ আসলে ইতালিয়ান। কিন্তু এটাও বাস্তব যে আর্জেন্টিনার চেয়ে ব্রাজিলে বেশি ইতালিয়ান বাস করে। কিন্তু সেটি তত আলোচিত হয় না। এর কারণ ব্রাজিলে ইতালিয়ানের সংখ্যা আর্জেন্টির চেয়ে বেশি হলেও ব্রাজিলের মোট জনসংখ্যার মাঝে সেটি শতাংশে অনেক কম। ইতালিয়ানদের বেশিরভাগ থাকে সাও পাওলো ও রিও ডি জেনেরিওর মত উপকূলীয় ও দক্ষিণ দিকের শহরগুলোতে।

সাও পাওলোতে যত ইতালিয়ান বাস করে ইতালির কোনো শহরেও তত না। ইতালির সবচে বড় শহর রোমের লোকসংখ্যা ২৮ লক্ষ। আর সাও পাওলোতে আছে ৫০ লক্ষ ইতালিয়ান যা শহরের অর্ধেক।

ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শহর সাও পাওলোর যে “ইতালীয়” চরিত্র, তার বড় অংশ কিন্তু মিলান, ভেনিস বা রোম থেকে আসেনি। এর শিকড় এসেছে সিসিলি থেকে।

এই শহরের ভেতরে আজও ছড়িয়ে আছে মেসিনা, পালের্মো এবং আগ্রিজেন্তো থেকে আসা পরিবারগুলোর পদচিহ্ন। তারা আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল শুধু কিছু অর্থ উপার্জন করে দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য নয়, বরং পুরোপুরি নতুন একটি জীবনে স্থায়ীভাবে মিশে যাওয়ার জন্য। এমন এক জীবন, যেখান থেকে আর কখনো ফিরে আসতে হবে না।

এই ইতিহাস আমেরিকার এলিস আইল্যান্ড-কেন্দ্রিক পরিচিত অভিবাসনের গল্পের মতো নয়।

আমেরিকান সংস্কৃতিতে ইতালীয় অভিবাসনের যে ছবি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তা হলো—জাহাজের নিচতলায় কষ্ট করে নিউইয়র্কে পৌঁছানো, মালবেরি স্ট্রিটের ঘিঞ্জি এলাকায় বসবাস, এবং পরে ধীরে ধীরে মূলধারার সমাজে মিশে যাওয়া।

কিন্তু ১৮৭৬ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে আনুমানিক দুই থেকে তিন লাখ সিসিলিয়ান দক্ষিণ দিকে, অর্থাৎ ব্রাজিলে পাড়ি জমিয়েছিল। আর যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া অনেক ইতালীয় অভিবাসীর মতো তারা একা আসে নি।

পালের্মো, মেসিনা, নেপলস ও জেনোয়া থেকে ছেড়ে যাওয়া স্টিমশিপে তারা পুরো পরিবার নিয়ে উঠেছিল। সঙ্গে ছিল তাদের সন্তানরাও। এই যাত্রা ছিল স্থায়ী—এটি কোনো সাময়িক “যাওয়া-আসা”র পরিক @ boikal


22


ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা হওয়া সত্ত্বেও মানুষ অন্ধভাবে বিশ্বাস করে—বিজ্ঞান কী বলে?

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ ভবিষ্যৎ জানার প্রতি কৌতূহলী। জ্যোতিষ, গণক, ভবিষ্যদ্বক্তা কিংবা নানা ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী—সবকিছুই মানুষের এই কৌতূহলকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বহু ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরও অনেক মানুষ সেগুলোর ওপর বিশ্বাস রাখা বন্ধ করেন না। কেন এমন হয়? এর উত্তর পাওয়া যায় মনোবিজ্ঞান ও জ্ঞানীয় বিজ্ঞান থেকে। নিচে এমন কিছু কারণ তুলে ধরা হলো:

১. কনফার্মেশন বায়াস (Confirmation Bias)

মানুষ সাধারণত নিজের বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্য বেশি গুরুত্ব দেয়, আর বিপরীত তথ্যকে উপেক্ষা করে। ফলে ১০টি ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে ৯টি ভুল হলেও, একটি ঘটনাক্রমে মিললে সেটিই মানুষের মনে গেঁথে যায়। এই প্রবণতাকেই বলা হয় Confirmation Bias।

২. বার্নাম ইফেক্ট (Barnum Effect)

অনেক ভবিষ্যদ্বাণী এতটাই সাধারণ ভাষায় লেখা হয় যে প্রায় সবাই নিজের জীবনের সঙ্গে তা মিলিয়ে নিতে পারেন। যেমন—"আপনার জীবনে শিগগিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে" বা "আপনি কখনো আত্মবিশ্বাসী, আবার কখনো দ্বিধাগ্রস্ত।" এমন অস্পষ্ট বক্তব্য অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই সত্য মনে হয়।

৩. অনিশ্চয়তার ভয়

ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা মানুষের জন্য মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। তাই অনেকেই ভবিষ্যদ্বাণীকে বাস্তব সত্য না হলেও মানসিক নিশ্চয়তার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি উদ্বেগ কিছুটা কমাতে পারে, যদিও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাও থাকতে পারে।

৪. স্মৃতির পক্ষপাত (Memory Bias)

মানুষ সাধারণত যেসব ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছে বলে মনে হয়, সেগুলোই মনে রাখে। ভুল প্রমাণিত ভবিষ্যদ্বাণীগুলো ধীরে ধীরে স্মৃতি থেকে মুছে যায়। ফলে মনে হয়, ভবিষ্যদ্বাণীগুলো প্রায়ই সত্যি হয়।

৫. সামাজিক প্রভাব

পরিবার, বন্ধু, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিবেশ কোনো বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে। আশপাশের সবাই যদি একটি ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য বলে মেনে নেয়, তাহলে ব্যক্তির পক্ষেও সেটি প্রশ্নবিদ্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

৬. নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি (Illusion of Control)

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ এমন পরিস্থিতিতে যেখানে তার নিয়ন্ত্রণ কম, সেখানে ভাগ্য, রাশিফল বা ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে। এগুলো মানুষকে মনে করায় যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সে কিছুটা হলেও ধারণা পাচ্ছে।

বিজ্ঞান কী বলে?

এ পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জ্যোতিষভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণী বা অতিপ্রাকৃত উপায়ে ভবিষ্যৎ নির্ভুলভাবে জানার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং মনোবিজ্ঞান দেখিয়েছে, মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই অর্থ খুঁজতে, কাকতালীয় ঘটনাকে সম্পর্কযুক্ত মনে করতে এবং নিজের পূর্ববিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে প্রবণ। তাই ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হলেও অনেকের বিশ্বাস ভাঙে না।

ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি মানুষের বিশ্বাস শুধু তথ্যের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জড়িত থাকে আবেগ, আশা, অনিশ্চয়তার ভয় এবং মস্তিষ্কের কিছু স্বাভাবিক জ্ঞানীয় পক্ষপাত। তাই কোনো ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য ধরে নেওয়ার আগে সমালোচনামূলক চিন্তা, প্রমাণভিত্তিক তথ্য এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ।

@প্রত্যয় সাহা, 


23


প্রায় দেড় কোটি বছর আগে, আমাদের পূর্বপুরুষদের শরীর থেকে 'ইউরিকেস' (Uricase) নামের একটি এনজাইম হারিয়ে যায়, যার কাজ ছিল ইউরিক অ্যাসিডকে ভেঙে ফেলা। এই জিনগত বা জেনেটিক পরিবর্তনটি এমন এক সময়ে ঘটেছিল যখন পৃথিবীতে ঘন ঘন খাদ্যের অভাব দেখা দিত এবং প্রাচীন সেই মানুষেরা মূলত মরশুমি ফলের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

গবেষকদের মতে, এনজাইম হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তাদের টিকে থাকার লড়াইয়ে বেশ সাহায্য করেছিল। ফলের ফ্রুক্টোজ থেকে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড শরীরকে শর্করা বা চিনি থেকে দ্রুত চর্বি তৈরি করে জমিয়ে রাখতে সাহায্য করত। এর ফলে, খাবার না জুটলেও সেই জমানো চর্বি পুড়িয়ে তারা দীর্ঘসময় বেঁচে থাকতে পারত। ল্যাবরেটরি গবেষণাতেও এর প্রমাণ মিলেছে; সেখানে দেখা গেছে যে, শরীরে সেই প্রাচীন এনজাইমটি পুনরায় ফিরিয়ে আনা হলে চর্বি জমার পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়।

কিন্তু বর্তমান যুগে আমাদের হাতের কাছে সব সময়ই প্রচুর পরিমাণে খাবার এবং শর্করাজাতীয় জিনিস পাওয়া যায়। ফলে প্রাচীন আমলের সেই শারীরিক পরিবর্তনটিই এখন আমাদের ওজন বাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের শরীর এখনও ঠিক আগের মতোই কাজ করে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের কথা ভেবেই চর্বি বা শক্তি জমিয়ে রাখার চেষ্টা করে, যদিও আজকাল বেশিরভাগ মানুষকেই আর সেই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয় না। @ plabon sarkar


24


কিসমিস মূলত শুকনো আঙুর হলেও পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে এর পুষ্টি উপাদানগুলো অত্যন্ত ঘনীভূত অবস্থায় থাকে। অনেকেই একে কেবল মিষ্টি স্বাদের জন্য চিনে থাকেন, কিন্তু বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞান একে লো-টু-মডারেট গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সমৃদ্ধ একটি 'হোল ফুড' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

​যারা নিয়মিত কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করেন, অ্যাথলেট বা জিম করেন, তাদের জন্য কিসমিস কৃত্রিম এনার্জি জেলের একটি চমৎকার প্রাকৃতিক বিকল্প। এটি রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ধরে রেখে শরীরকে দ্রুত ও দীর্ঘস্থায়ী শক্তি যোগায়। আবার এর উচ্চ পটাশিয়াম ও পলিফেনল রক্তনালীকে শিথিল করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে দারুণ ভূমিকা রাখে। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা আছে, কিসমিসে থাকা বিশেষ ফাইবার ও টারটারিক অ্যাসিড তাদের অন্ত্রের উপকারি ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি করে হজমপ্রক্রিয়াকে সহজ করে তোলে। এছাড়া এতে থাকা 'বোরন' এবং ক্যালসিয়াম যৌথভাবে কাজ করে হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখে, যা বিশেষ করে মধ্যবয়সী নারীদের হাড়ের ক্ষয় রোধে অত্যন্ত জরুরি। এমনকি এর ওলিয়ানোলিক অ্যাসিড মুখের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে দাঁতের ক্যাভিটি প্রতিরোধ করে।

​অনেকেরই ধারণা ডায়াবেটিস থাকলে কিসমিস পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তবে আধুনিক গবেষণা বলছে, প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকসের (যেমন: বিস্কুট বা চিপস) তুলনায় পরিমিত কিসমিস খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বাড়ে না, বরং এটি ইনসুলিন সেন্সিটিভিটি উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।

​তবে মনে রাখবেন, যেকোনো পুষ্টিকর খাবারই অতিরিক্ত খেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। কিসমিসে যেহেতু প্রাকৃতিক চিনি ও ক্যালোরি বেশি, তাই একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দিনে ২০-৩০ গ্রাম (প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি) কিসমিস খাওয়াই যথেষ্ট। পুষ্টিবিদ হিসেবে আমার পরামর্শ থাকবে, কিসমিস একাকী না খেয়ে সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে বাদাম, ওটস বা টক দইয়ের সাথে মিশিয়ে খান। এতে এর পুষ্টি উপাদানগুলো শরীর খুব সহজে শোষণ করতে পারে। তবে যারা টাইপ-২ ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন বা কিডনির জটিলতায় ভুগছেন, তারা অবশ্যই একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে এর পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। @ Faysal Ahmed


25


মেসোপটেমিয়ার মহা প্লাবনের কাহিনী (The Mesopotamian Flood Myth) হলো মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম ও অন্যতম বিখ্যাত এক মহাকাব্যিক গল্প। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় দুই হাজার বছর আগে মাটির ফলকে (Clay Tablets) খোদাই করা সুমেরীয় ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতার বিভিন্ন প্রাচীন সাহিত্যে—বিশেষ করে বিখ্যাত 'গিলগামেশের মহাকাব্য' (Epic of Gilgamesh) এবং 'আত্রাহাসিস মহাকাব্য' (Epic of Atrahasis)-এ এই প্লাবনের বিবরণ পাওয়া যায়। 

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার বিশ্বাস অনুযায়ী, একসময় পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। মানুষের কোলাহল, চিৎকার এবং বিশৃঙ্খলার কারণে দেবতাদের প্রধান 'এনলিল' মানুষের ওপর ভীষণ বিরক্ত হন এবং মানবজাতিকে পৃথিবী থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য একটি মহা প্লাবন বা বন্যা ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেন। দেবতাদের এই গোপন সভার সিদ্ধান্ত অন্য এক দেবতা—পানির দেবতা 'এনকি' (Enki) (ব্যাবিলনীয় মতে 'এয়া') মেনে নিতে পারেননি। তিনি মানবজাতিকে ভালোবাসতেন। তিনি সরাসরি কোনো মানুষকে না বলে, 'উতন্যাপিশতিম' (Utnapishtim) নামক এক সৎ ও ধার্মিক মানুষের ঘরের দেয়ালের সামনে গিয়ে ফিসফিস করে কথা বলতে বললেন যেন পৃথিবীর সব ধন-সম্পদ ত্যাগ করে একটি বিশাল চারকোনা নৌকা বা জাহাজ তৈরি করা হয়। উতন্যাপিশতিম দেয়ালের ওপাশ থেকে এই সতর্কবার্তা শুনে নেন। বার্তা পেয়ে উতন্যাপিশতিম তাঁর ঘরবাড়ি ভেঙে কাঠ সংগ্রহ করলেন এবং একটি বিশাল জাহাজ তৈরি করলেন। তিনি সেই জাহাজে তাঁর পরিবার, দক্ষ কারিগর, সোনা-দানা এবং পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকা সমস্ত পশুপাখি ও জীবজন্তুর জোড়া (নারী ও পুরুষ) তুলে নিলেন। জাহাজের দরজা বন্ধ করার পরপরই আকাশ কালো হয়ে গেল। ঝড়-তুফান, বজ্রপাত এবং মাটির নিচ থেকে পানি উঠে পুরো পৃথিবী প্লাবিত হতে শুরু করল। এই বন্যা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে স্বয়ং দেবতারাও ভয় পেয়ে আকাশের উঁচুতে গিয়ে আশ্রয় নিলেন এবং মানবজাতির এই করুণ পরিণতি দেখে কেঁদেছিলেন। টানা ছয় দিন এবং সাত রাত এই প্রলয়ঙ্কারী বন্যা ও ঝড় চলল। সপ্তম দিনে গিয়ে ঝড় শান্ত হলো এবং চারপাশ শান্ত হয়ে গেল। উতন্যাপিশতিম জাহাজের জানালা খুলে দেখলেন পৃথিবীর সমস্ত মানুষ মরে কাদায় মিশে গেছে। 

মানুষকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে না পেরে প্রধান দেবতা এনলিল প্রথমে রেগে গেলেও, পরে উতন্যাপিশতিমের বুদ্ধিমত্তা ও ভক্তি দেখে শান্ত হন। তিনি উতন্যাপিশতিম এবং তাঁর স্ত্রীকে আশীর্বাদ করে 'অমরত্ব' (Immortality) দান করেন এবং দেবতাদের মতো এক দূরবর্তী পবিত্র স্থানে বসবাসের সুযোগ করে দেন। মহাকাব্যে বীর গিলগামেশ নিজের মৃত্যুভয় কাটাতে অমরত্বের খোঁজে উতনাপিশতিমের কাছে যান, আর তখনই তিনি এই প্লাবনের কাহিনী শোনেন। এই গল্পটি প্রায় ৪,০০০ বছরেরও বেশি পুরনো।  মেসোপটেমিয়ার এই মহাপ্লাবনের কাহিনীর সাথে পরবর্তীকালের সেমিটিক ধর্মগ্রন্থগুলোর (যেমন: হিব্রু বাইবেল, খ্রিস্টধর্মের ওল্ড টেস্টামেন্ট এবং ইসলামের আল-কোরআন) হযরত নূহ (আঃ) বা নোয়াহ-এর নৌকার কাহিনীর এক অদ্ভুত ও গভীর মিল রয়েছে। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, মেসোপটেমিয়ার এই প্রাচীন লোকগাথাই পরবর্তীকালের ধর্মীয় প্লাবনের কাহিনীর ঐতিহাসিক বা সাহিত্যিক উৎস ছিল। 

গিলগামেশ কে ছিলেন?

গিলগামেশ ছিলেন প্রাচীন সুমেরীয় নগররাষ্ট্র উরুকের (Uruk) একজন রাজা, যিনি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ সালের দিকে রাজত্ব করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার চরিত্র পৌরাণিক কাহিনীতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। প্রাণের চেয়ে প্রিয় বন্ধু এনকিদুর  করুণ মৃত্যুর পর গিলগামেশ মৃত্যুভয়ে এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন যে তিনি অমরত্বের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। তিনি জানতে পারেন যে উতনাপিশতিম নামক একজন মানুষ—যিনি মহা প্লাবন থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন—দেবতাদের কাছ থেকে অমরত্ব লাভ করেছেন। গিলগামেশ যখন অবশেষে উতনাপিশতিমের কাছে পৌঁছান,  তিনি গিলগামেশকে দুইটি পরীক্ষা দেন—১)ছয় দিন সাত রাত না ঘুমিয়ে থাকতে বলেন। গিলগামেশ এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হন, ঘুমিয়ে পড়েন, যা প্রমাণ করে তিনি অমরত্বের যোগ্য নন—কারণ তিনি ঘুমের মতো সাধারণ একটা জিনিসও জয় করতে পারলেন না, মৃত্যুকে জয় করবেন কী করে! ২)মুদ্রের তলদেশে থাকা একটি বিশেষ কাঁটাযুক্ত  'যৌবন ফিরিয়ে পাওয়ার উদ্ভিদ' আনতে হবে। গিলগামেশ গভীর সমুদ্র থেকে সেই গাছটি সংগ্রহ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন এটি তিনি উরুক শহরের বয়োবৃদ্ধদের ওপর পরীক্ষা করবেন। কিন্তু উরুকে ফেরার পথে তৃষ্ণার্ত গিলগামেশ যখন একটি জলাশয়ে গোসল করছিলেন, তখন একটি সাপ এসে সেই অলৌকিক গাছটি চুরি করে খেয়ে ফেলে এবং নিজের খোলস ত্যাগ করে তৎক্ষণাৎ তরুণ রূপ ধারণ করে চলে যায়। অলৌকিক উদ্ভিদটি হারিয়ে ফেলায় গিলগামেশ শেষ পর্যন্ত খালি হাতে উরুকে ফিরে আসেন, কিন্তু তার মধ্যে একটি রূপান্তর ঘটে। তিনি বুঝতে পারেন যে অমরত্ব অর্জনযোগ্য নয়—মানুষের প্রকৃত অমরত্ব নিহিত তার কীর্তিতে। মানুষ অমর নয়। মানুষের কর্মই তাকে স্মরণীয় করে রাখে। ভালো শাসন, ন্যায়বিচার, নগর নির্মাণ এবং সমাজের কল্যাণ—এসবই মানুষের প্রকৃত অমরত্ব। ফলে তিনি অত্যাচারী রাজা থেকে মানবিক রাজা হয়ে উঠলেন। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ অব্দে সুমেরীয় ও আক্কাদীয় সভ্যতায় কাদামাটির ফলকে কিউনিফর্ম লিপিতে এই মহাকাব্যটি রচিত হয়। -কাগজ বার্তা


২৬


ফিনিক্স পাখির গল্প 

ফিনিক্স পাখির  কাহিনী মূলত মিশরীয়, গ্রিক ও পরবর্তী রোমান ঐতিহ্যে বিকশিত হয়েছে। ফিনিক্সের ধারণার শিকড় প্রাচীন মিশর-এর বেন্নু নামের পৌরাণিক পাখির মধ্যে পাওয়া যায়। পরে গ্রিস-এর লেখকেরা এই ধারণাকে "ফিনিক্স" নামে জনপ্রিয় করেন। ফিনিক্স ছিল ঈগলের আকৃতির এক অপূর্ব সুন্দর পাখি । এর পালক ছিল সোনালি, লাল, বেগুনি ও আগুনের মতো উজ্জ্বল রঙের। ফিনিক্স সাধারণ পাখির মতো জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ নয়। ফিনিক্স কখনো সত্যিকার অর্থে বিলুপ্ত হয় না; সে নিজেকে পুনর্জন্ম দেয়।  এ পাখি বার্ধক্যে পৌঁছালে সুগন্ধি কাঠ, দারুচিনি, মির ও অন্যান্য সুগন্ধি দিয়ে বাসা তৈরি করে। সূর্যের তাপে বা নিজের ডানার আগুনে সেই বাসা জ্বলে ওঠে। ফিনিক্স আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই ছাই থেকেই নতুন একটি তরুণ ফিনিক্স জন্ম নেয়।

বাহ্যিকভাবে, গিলগামেশ মহাকাব্যের উতন্যাপিশতিম (Utnapishtim) হলেন একজন প্রাচীন মেসোপটেমীয় মানুষ এবং ফিনিক্স হলো গ্রিক/মিসরীয় পুরাণের একটি অলৌকিক পাখি। সরাসরি কোনো প্রাচীন সাহিত্যে এদের মধ্যে কোনো কাঠামোগত সাক্ষাৎ বা ঐতিহাসিক মেলবন্ধন নেই। তবে তুলনামূলক পুরাণতত্ত্ব (Comparative Mythology) এবং দর্শনের গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দুটি চরিত্রের মধ্যে এক অদ্ভুত ও অবিচ্ছেদ্য সমান্তরাল সংযোগ রয়েছে:।

উতন্যাপিশতিম: তিনি মেসোপটেমিয়ার প্রলয়ঙ্কারী মহাপ্লাবনের পর মানবজাতি ও জীবজগৎকে রক্ষা করার অনন্য অবদানের কারণে দেবতাদের কাছ থেকে 'শারীরিক অমরত্ব' (Physical Immortality) লাভ করেন। তিনি হাজার বছর ধরে এক দূরবর্তী দ্বীপে অবিনশ্বর দেহে বেঁচে আছেন। 

ফিনিক্স: ফিনিক্সও অমরত্বের প্রতীক। তবে উতন্যাপিশতিমের মতো তার অমরত্ব স্থির নয়, বরং চক্রাকার (Cyclical)। ফিনিক্স আমাদের শেখায় যে, অমর হতে হলে পুরনো সত্তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হয় এবং নতুন রূপ ধারণ করতে হয়। 

ফিনিক্স পাখির পুরো জীবনটাই মূলত এই 'যৌবন ফিরে পাওয়ার' এক জীবন্ত রূপক। ফিনিক্স যেভাবে প্রতি ৫০০ বছর পর বুড়ো থেকে আবার শিশু হয়ে জন্ম নেয়, উতন্যাপিশতিমের দেওয়া সেই অলৌকিক উদ্ভিদটিও মানুষের বুড়ো বয়সকে কেড়ে নিয়ে তরুণ করার ক্ষমতা রাখত । মনস্তত্ত্বে (Psychology) উতন্যাপিশতিম এবং ফিনিক্স—উভয়কেই মানুষকে চরম বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর বা 'রেজিলিয়েন্স'-এর প্রতীক মানা হয়। 


 ২৭


একটি রেস্টুরেন্ট ছিল।

‎একদিন সেখানে একজন ভিক্ষুক ঢুকলেন। তাঁর মাথার চুল ছিল খুবই অগোছালো, দাড়ি অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল, আর গায়ে ছিল ছেঁড়া-পুরোনো কাপড়।

‎তাকে দেখে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার খুব রেগে গেলেন।

‎মনে মনে বলতে লাগলেন,

‎"এই ভিক্ষুকটা এখানে কেন এসেছে? এত নোংরা কাপড় পরে এসে আরাম করে বসে পড়েছে! এটা কী ভিক্ষুকদের জন্য বানানো রেস্টুরেন্ট নাকি?"

‎এদিকে খাবার পরিবেশন করা এক মেয়ে ভিক্ষুকটির কাছে গিয়ে খুব ভদ্রভাবে বলল,

‎"ভাইয়া, আপনার কী লাগবে? বলুন।"

‎যেভাবে সে অন্য সব গ্রাহকের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে কথা বলত, ঠিক সেভাবেই ভিক্ষুকটির সঙ্গেও আন্তরিকভাবে কথা বলল।

‎ভিক্ষুকটি বললেন,

‎"একটা রাভা দোসা দিন, আর একটা পেসারাট্টু দিন।"

‎মেয়েটি দ্রুত রান্নাঘরে গিয়ে খাবার তৈরি করিয়ে সুন্দরভাবে তাঁর সামনে পরিবেশন করে দিল।

‎এদিকে ম্যানেজারের রাগ যেন আরও বেড়ে গেল।

‎তিনি মেয়েটিকে ডেকে বললেন,

‎"তোমার কি কোনো বুদ্ধি নেই? বারবার গিয়ে ওর কাছে দাঁড়িয়ে আছ, খাবার পরিবেশন করছ। ও একজন ভিক্ষুক! ও কি বিল দেবে?"

‎মেয়েটি শান্তভাবে উত্তর দিল,

‎"স্যার, আমাদের রেস্টুরেন্টে যে-ই আসুক—সে ধনী হোক বা গরিব—সবার সঙ্গে সমান ব্যবহার করা উচিত। উনি ভিক্ষুক হতে পারেন, কিন্তু শুধু সে কারণেই তো আমরা কোথাও লিখে রাখিনি যে ভিক্ষুকদের এখানে প্রবেশ নিষেধ। তিনি ক্ষুধার্ত হয়ে এসেছেন, খাবারের অর্ডার দিয়েছেন। তাঁকে খাবার পরিবেশন করা আমাদের দায়িত্ব।"

‎ম্যানেজার বললেন,

‎"তুমি বলছ এটা তোমার দায়িত্ব। কিন্তু যদি সে বিল না দিয়ে পালিয়ে যায়? তখন কিন্তু তোমাকেই বিল দিতে হবে। আগে থেকেই বলে রাখছি, সাবধান!"

‎মেয়েটি আর কিছু না বলে নিজের কাজে চলে গেল।

‎এরপর যা হওয়ার তাই হলো।

‎বিল আনার আগেই সেই ভিক্ষুক উঠে চলে গেলেন।

‎ম্যানেজার রেগে আগুন হয়ে মেয়েটিকে ডাকলেন।

‎বললেন,‎"দেখলে? আমি আগেই বলেছিলাম, লোকটা বিল দেবে না। তবুও তুমি এত যত্ন করে ওকে খাওয়ালে। এখন বিলটা তোমাকেই দিতে হবে। বুঝেছ?"

‎মেয়েটি শান্তভাবে বলল,

‎"ঠিক আছে স্যার, বিল আমি দিয়ে দেব। কিন্তু আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি। যে-ই আসুক—ধনী হোক বা গরিব—আমি কোনো ভেদাভেদ করিনি। কখনও কখনও ভালো কাজ করতে গিয়েও ক্ষতি হতে পারে। আমার বেতন থেকে বিলের টাকা কেটে নিন।"

‎ম্যানেজার বললেন,

‎"ঠিক আছে, এবার যাও, টেবিল আর প্লেটগুলো পরিষ্কার করো।"

‎মেয়েটি "জি স্যার" বলে প্লেটগুলো পরিষ্কার করতে লাগল।

‎একটি প্লেট তুলতেই সে দেখল, প্লেটের নিচে একটি ছোট্ট কাগজ রাখা আছে।

‎সে কাগজটি খুলে পড়ল।

‎তাতে লেখা ছিল—

‎**"মা, তুমি আমাকে অসাধারণভাবে আপ্যায়ন করেছ। আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছ। আমি যখন ক্ষুধার্ত ছিলাম, তুমি আমাকে ভালোবেসে খাবার খাইয়েছ। আমি এই রেস্টুরেন্টের মালিক। আজ আমি ছদ্মবেশে এসেছিলাম। তুমি কোনো ভেদাভেদ না করে ধনী-গরিব সবার সঙ্গে সমান আচরণ করেছ। আমি তোমার এই সেবায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট। তাই আজ থেকেই তোমাকে এই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার পদে নিয়োগ দিলাম। অনেক অনেক অভিনন্দন।"**

‎বন্ধুরা, আপনারা প্রতিদিন জীবনে যে কাজই করুন না কেন—সেটা ঘরের কাজ হোক, অফিস বয়ের দায়িত্ব হোক, লিফট অ্যাটেনডেন্টের কাজ হোক, নিরাপত্তারক্ষীর ডিউটি হোক, গৃহকর্মীর কাজ হোক অথবা সমাজের যেকোনো ছোট বা বড় দায়িত্বই হোক না কেন—

‎**"তোমরা কথায় বা কাজে যা-ই করো না কেন, মনে করবে সবই তোমরা প্রভুর জন্য করছ।"**

‎সেদিন রেস্টুরেন্টের মালিক নিজেই ছদ্মবেশে এসে বসেছিলেন।

‎জানেন কেন?

‎যারা সততার সঙ্গে নিষ্ঠা ও আন্তরিকভাবে কাজ করছেন, তাঁদের আরও উঁচু পদে তুলে দেওয়ার জন্য।

‎একদিন না একদিন, আপনার জীবনেও কোন না কোনোভাবে নতুন সম্ভাবনা তোইরি হবে। @ Gayan


২৮


খাবার খাওয়ার পর মিষ্টি খাওয়ার জঘন্য ক্ষতিকর

ভারী বা তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার ঠিক পরপরই মিষ্টি বা ডেজার্ট মুখে দেওয়ার অভ্যাস আপনার পরিপাকতন্ত্রকে জ্যান্ত কবর দিচ্ছে। খাবারের শেষ পাতে এই অতিরিক্ত চিনি আপনার পেটের ভেতর এক প্রকার বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করে যা হজম প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেয়। এই ভয়ানক ভুলকে সাধারণ বাঙালির ঐতিহ্য ভেবে অবহেলা করলে খুব দ্রুতই আপনার লিভার ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।

আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনের একটি মেটাবলিক ডিসঅর্ডার গবেষণায় দেখা গেছে ভরা পেটে মিষ্টি খেলে শরীরের বিপাক ক্রিয়া বা মেটাবলিজম একবারে থমকে যায়। পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে ভারী খাবারের পর চিনি শরীরে প্রবেশ করলে তা চর্বি পোড়ানোর প্রক্রিয়া বন্ধ করে সরাসরি পেটে মেদ হিসেবে জমা হতে শুরু করে। এই বৈজ্ঞানিক গোলযোগের কারণে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা রকেটের গতিতে বেড়ে যায় এবং হৃদযন্ত্রের ধমনীগুলো চর্বি জমে ব্লক হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তাই সুস্থ থাকতে দুপুরের বা রাতের ভারী খাবার খাওয়ার পর ভুলেও কোনো প্রকার রসগোল্লা, ল্যাংচা বা মিষ্টি জাতীয় খাবার মুখে দেবেন না। মিষ্টি খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা হলে খাবার খাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা পর অথবা সকালে খালি পেটে সামান্য পরিমাণ মিষ্টি ফল খেতে পারেন। দীর্ঘায়ু লাভ করতে এবং ডায়াবেটিস ও হার্ট অ্যাটাকের হাত থেকে বাঁচতে আজ থেকেই এই আত্মঘাতী অভ্যাসটি চিরতরে বর্জন করুন। @ স্বাস্থ্য পরামর্শ


একটি কর্মী মৌমাছির গড় আয়ু গ্রীষ্মকালে প্রায় ৪০ দিন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই সে প্রায় দেড় লাখ ফুলে পরাগায়ন করে, যা উদ্ভিদের বংশবিস্তার এবং আমাদের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ সারাজীবনের নিরলস পরিশ্রমে একটি কর্মী মৌমাছি তৈরি করতে পারে মাত্র প্রায় ১ চা-চামচ মধু। তাই আমাদের কাছে এক চামচ মধু যতই সামান্য মনে হোক না কেন, এর পেছনে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য মৌমাছির সারাজীবনের শ্রম

২৯


দামি সব ফলের চেয়েও পেয়ারা কেন বেশি উপকারী  

প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফাইবার এবং ভিটামিনের অভাব থাকলে আপনার অজান্তেই কোষ্ঠকাঠিন্য ও ডায়াবেটিসের মতো রোগ শরীরের ভেতর বাসা বাঁধবে। দামি বিদেশি ফলের পেছনে টাকা খরচ করার পরেও যদি আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না বাড়ে তবে বুঝবেন আপনি ভুল করছেন। এই অবহেলার কারণে একটা সময় আপনার হজম প্রক্রিয়া পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়বে এবং শরীরে পুষ্টির চরম ঘাটতি দেখা দেবে।

যুক্তরাজ্যের লিডস ইউনিভার্সিটির একটি নিউট্রিশনাল সায়েন্স গবেষণায় দেখা গেছে পেয়ারাতে আপেল বা কমলার চেয়েও চার গুণ বেশি ভিটামিন সি এবং ফাইবার রয়েছে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী পেয়ারার কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়তে দেয় না এবং অন্ত্রের ভেতরের বর্জ্য দ্রুত পরিষ্কার করে। এই বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতার ফলে শরীরের হজম শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং রক্তনালীতে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল জমতে পারে না।

পূর্ণ উপকার পেতে প্রতিদিন দুপুরে খাবার খাওয়ার এক ঘণ্টা পর একটি মাঝারি সাইজের আস্ত পেয়ারা ভালোমতো ধুয়ে চিবিয়ে খাবেন। মনে রাখবেন বিকেলে বা রাতে পেয়ারা খেলে ঠান্ডা লাগা বা হজমে সমস্যা হতে পারে তাই দুপুর বা বিকেলের ব্যবধানটি মেনে চলা জরুরি। শরীরকে সুস্থ ও সতেজ রাখতে সপ্তাহের অন্তত চার দিন এই দেশি ফলটি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। @ স্বাস্থ্য পরামর্শ


৩০


কটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তার অবাক করা ফলাফল:

আমেরিকায় হওয়া একটি গবেষণায় :

 - সেখানে ৭০ বছর বয়সী কিছু প্রবীণ মানুষকে নিয়ে একটি পরীক্ষা করা হয়।

- তাঁদের বলা হয় আগামী এক মাস ধরে এমনভাবে অভিনয় ও জীবনযাপন করতে, যেন তাঁদের বয়স

   ৭০ নয়, মাত্র ৫০ বছর!

- এই এক মাস তাঁরা ৫০ বছর বয়সীদের মতো পোশাক পরেন, সিনেমা দেখতে যান, হাঁটতে যান এবং বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেন।

 - এক মাস পর তাঁদের ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেল, তাঁরা আগের চেয়ে অন্তত ২ থেকে ৩ বছর বেশি তরুণ ও সতেজ দেখাচ্ছেন!

 - এর পেছনের বিজ্ঞান: আমাদের তিন ধরণের বয়স থাকে—

১. ক্রনোলজিক্যাল বয়স  (Chronological Age):

যা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বাড়ে (এটি পরিবর্তন করা যায় না)।

২. বায়োলজিক্যাল বয়স (Biological Age):

আমাদের শরীরের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বয়স।

৩. মানসিক বয়স (Mental Age):

আমরা মনে মনে নিজেকে কত বছর বয়সী ভাবি।

   আপনি যদি মানসিকভাবে নিজেকে তরুণ ভাবেন, তবে আপনার অবচেতন মন শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে এবং আপনার বায়োলজিক্যাল বয়স বা বার্ধক্যের গতিও কমতে শুরু করে।

যে কোনো বয়সে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার ৫টি জাদুকরী ধাপ:

 - ১. অতীতের ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা (Past Conditioning):

অনেকে অতীতে কোনো কাজে ব্যর্থ হলে বা লোকসান করলে ভাবেন, "আমাকে দিয়ে আর হবে না।" এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অতীতের কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে বর্তমানের ওপর চড়াও হতে দেবেন না।

 - ২. ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখা (Taking it Positively):

অতীতের ভুলগুলোকে ব্যর্থতা না ভেবে 'শিক্ষা' হিসেবে নিন। থমাস এডিসন যেমন বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কারের আগে ৯৯৯ বার ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি সেটিকে ব্যর্থতা ভাবেননি, বরং তিনি জেনেছিলেন যে ৯৯৯টি উপায়ে বাল্ব তৈরি করা যায় না। জীবনের প্রতিটি ক্ষতি বা

ব্যর্থতা আমাদের নতুন কোনো অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান দিয়ে যায়।

- ৩. নিজের শক্তি ও যোগ্যতা খুঁজে বের করা (Discover Your Strengths):

"আমি কী পারি না"— এটা ভাবার বদলে "আমি কী ভালো পারি" বা "আমার মধ্যে কী বিশেষ যোগ্যতা  রয়েছে", সেটার ওপর নজর দিন। নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার একটি তালিকা তৈরি করুন।এতে আপনার আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে।

 - ৪. নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা (Reinvent Yourself):

মোবাইলের অ্যাপ্লিকেশনগুলো যেমন আমরা নিয়মিত আপডেট করি, তেমনই আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতাকেও

যুগের সাথে সাথে আপডেট করতে হবে। ৯০ বছর বয়সেও ওয়ারেন বাফেট তাঁর জাগরিত সময়ের

প্রায় ৮০% সময় পড়াশোনা করেন। অমিতাভ বচ্চন বা অনিল কাপুরের মতো ব্যক্তিত্বরা আজ এই বয়সেও নিজেদের ফিটনেস ও পারফরম্যান্স ধরে রেখেছেন কেবল প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আপডেট করার মাধ্যমে।

 - ৫. লক্ষ্য পূরণের যাত্রাপথকে উপভোগ করা (Enjoy the Journey):

আপনি শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলেন কি পারলেন না, তার চেয়েও বড় কথা হলো আপনি চেষ্টা

করেছিলেন কি না এবং সেই প্রক্রিয়াটি উপভোগ করেছেন কি না। ৯০ বছর বয়সে গিয়ে মানুষ নিজের ব্যর্থতার জন্য আফসোস করে না, বরং আফসোস করে সেই কাজগুলোর জন্য— যা সে করতে চেয়েছিল কিন্তু বয়সের অজুহাতে কোনোদিন চেষ্টাই করেনি।

     শেষ কথা

নিজের মনের সমস্ত ভয় আর দ্বিধা দূর করে আজ থেকেই এক নতুন লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলুন।

স্নেহ দেশাই এই লক্ষ্য নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক উপায়

মনে রাখবেন, নতুন করে শুরু করার কোনো নির্দিষ্ট বয়স হয় না। আপনি আজ যে বয়সেই থাকুন

না কেন, নতুন করে জীবন সাজানোর সেরা সময়টি এখনই!

@ Gayan



৩১


হিট্টাইট সাম্রাজ্য, যা একদা এশিয়া মাইনরের বিশাল অংশ শাসন করত, মুছে গেল মানচিত্র থেকে। গ্রিসের প্রাসাদ-সভ্যতা মাইসিনি, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। একের পর এক সমৃদ্ধ শহর পুড়ে ছাই হয়ে গেল। মিশরীয়রা লিখে গিয়েছিল, এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে ছিল সমুদ্র থেকে আসা এক রহস্যময় শত্রু। আজও, ৩,২০০ বছর পরেও, কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না তারা কারা ছিল।

প্রথম অধ্যায় — এক গৌরবময় বিশ্ব, যা হঠাৎ ভেঙে পড়ল।

খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১২০০ সাল পর্যন্ত, ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্ব ছিল আশ্চর্যজনকভাবে সংযুক্ত। মিশর, হিট্টাইট, মাইসিনি, সিরিয়ার উগারিত — সবাই একে অপরের সাথে বাণিজ্য করত, চিঠি লিখত, রাজপরিবারে বিয়ে দিত। এটা ছিল প্রাচীন বিশ্বের এক প্রথম "বিশ্বায়ন।"

দ্বিতীয় অধ্যায় — মাত্র ৫০ বছরে, সব শেষ।

তারপর, আশ্চর্যজনকভাবে দ্রুত, এই পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল। প্রায় প্রতিটা বড় শহর ধ্বংস হলো বা পরিত্যক্ত হলো। লেখার পদ্ধতি হারিয়ে গেল। বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে গেল। ইতিহাসবিদরা একে ডাকেন "ব্রোঞ্জ যুগের মহাপতন" — মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বিশাল, সবচেয়ে দ্রুত পতনগুলোর একটা।

তৃতীয় অধ্যায় — মিশরীয় দেয়ালে খোদাই করা এক সতর্কবার্তা।

এটার জন্যই Save করতে বলেছিলাম (প্রথম অংশ)।

মিশর, একমাত্র বড় সভ্যতা যা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি, তাদের রাজা তৃতীয় রামসেস মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করে রেখে গিয়েছিলেন এক ভয়ংকর বর্ণনা — সমুদ্র থেকে আসা এক বিশাল জোটবদ্ধ শত্রু, যারা একের পর এক সভ্যতা ধ্বংস করতে করতে মিশরের দোরগোড়ায় পৌঁছেছিল। তিনি লিখেছিলেন, "কোনো দেশ তাদের সামনে টিকে থাকতে পারেনি।"

চতুর্থ অধ্যায় — নয়টা নাম, কোনো পরিচয় নেই।

মিশরীয় নথিতে অন্তত নয়টা ভিন্ন গোষ্ঠীর নাম পাওয়া যায় — পেলেসেত, শের্দেন, শেকেলেশ, দেনিয়েন, আরও অনেক। কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন পেলেসেত হয়তো বাইবেলের ফিলিস্তিনিদের পূর্বপুরুষ। অন্যরা মনে করেন কিছু গোষ্ঠী হয়তো মাইসিনীয় গ্রিক বা আনাতোলিয়ার মানুষ। কিন্তু কোনোটাই নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায়নি — তারা কোথা থেকে এসেছিল, তাদের নিজস্ব কোনো লেখা আজও পাওয়া যায়নি।

পঞ্চম অধ্যায় — শিকারি, নাকি শিকার?

সবচেয়ে চমকে দেওয়া তত্ত্ব হলো — এই "সি পিপলস" হয়তো নিজেরাই ছিলেন উদ্বাস্তু, আক্রমণকারী নয়। যখন মাইসিনি বা আনাতোলিয়ার নিজস্ব সভ্যতা ভেঙে পড়ল, লক্ষ লক্ষ মানুষ হয়তো নিজের ঘরবাড়ি হারিয়ে, মরিয়া হয়ে, খাদ্য আর নতুন জমির খোঁজে সমুদ্রপথে ছড়িয়ে পড়েছিলেন — নিজেরাই সেই একই ভাঙনের শিকার, যা তারা পরে অন্যদের ওপর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

ষষ্ঠ অধ্যায় — জলবায়ু, দুর্ভিক্ষ, নাকি ভূমিকম্প?

আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই একই সময়ে ভয়াবহ খরা আঘাত হেনেছিল ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। সাইপ্রাসের প্রাচীন জলবায়ু-তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই খরা দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আর গণ-অভিবাসনের জন্ম দিতে পারত। "সি পিপলস" হয়তো একমাত্র কারণ নয়, বরং একাধিক সংকটের এক "নিখুঁত ঝড়"-এর অংশ — খরা, ভূমিকম্প, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, আর বহিরাগত আক্রমণ, সব একসাথে মিলে।

সপ্তম অধ্যায় — এক সুবিধাজনক বলির পাঁঠা?

কিছু আধুনিক পণ্ডিত আরও এগিয়ে গিয়ে বলেন, "সি পিপলস"-কে হয়তো ইতিহাস অতিরিক্ত দোষারোপ করেছে। মিশরীয় রেকর্ডই একমাত্র বিস্তারিত সূত্র, আর তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের বিজয় আর শত্রুর ভয়ংকরতা বাড়িয়ে বলতে চাইতেন। বাস্তবে, তারা হয়তো আক্রমণকারীর চেয়ে বেশি শিকার ছিলেন — এমন এক ভাঙা বিশ্বের ফসল, যা তারা নিজেরা তৈরি করেননি।

অষ্টম অধ্যায় — সমুদ্রের তলায় খোঁজা উত্তর।

আজ, সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্ববিদরা ভূমধ্যসাগরের তলদেশে ডুবে যাওয়া জাহাজ, বসতির ধ্বংসাবশেষ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, এই রহস্যের নতুন টুকরো জোড়া লাগানোর আশায়। প্রতিটা নতুন আবিষ্কার একটু একটু করে ছবিটা স্পষ্ট করছে, কিন্তু সম্পূর্ণ সত্যি এখনো অধরা।

শেষ কথা।

সি পিপলসের গল্প আমাদের কয়েকটা গভীর সত্য শেখায়। প্রথমত — সবচেয়ে উন্নত সভ্যতাও এক প্রজন্মের মধ্যে ভেঙে পড়তে পারে: সেই যুগের বিশ্বায়িত অর্থনীতি এতটাই আন্তঃসংযুক্ত ছিল যে এক জায়গার সংকট পুরো ব্যবস্থাকেই ভেঙে দিতে পারত। দ্বিতীয়ত — ইতিহাসের ভিলেন প্রায়ই সবচেয়ে অসহায় মানুষ: যাদের আমরা "আক্রমণকারী" বলে জানি, তারা হয়তো নিজেরাই ছিলেন হারানো ঘরবাড়ি, ভাঙা জীবনের শিকার — মরিয়া হয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নেমেছিলেন। আর তৃতীয়ত — বিজয়ীদের লেখা ইতিহাস সবসময় পুরো সত্যি বলে না: মিশরীয়দের রেকর্ডই একমাত্র বিস্তারিত সূত্র, আর তাই আমরা হয়তো কখনোই জানব না, সি পিপলস নিজেরা তাদের গল্প কীভাবে বলতেন।

@ সম্রাট রায় চৌধুরী 


৩২


সুইডেনে নিজের আয়, অর্থ সম্পদ কিংবা সাফল্য নিয়ে গল্প করা একেবারেই নিষিদ্ধ।

তবে এই আইন দেশটির কোনো সরকার তৈরি করেনি। সুইডেনের সংবিধানেও এমন কোনো কথা লেখা নেই। এটি মূলত সুইডেনের সামাজিক রীতি।

অধিকাংশ সুইডিশ নাগরিক তাদের সমাজের প্রচলিত এই রীতিকে মেনে চলেন। তারা মানুষের সামনে নিজের আয় ও অর্থ সম্পদ নিয়ে কথা বলতে একেবারেই অস্বস্তি বোধ করেন।

সুইডেনে প্রচলিত এই আইনকে বলা হয় ইয়ান্তেলাগেন বা ইয়ান্তেলোভেন। যার অর্থ দ্য ল অব ইয়ান্তে বা ইয়ান্তের আইন।

সুইডেন ছাড়াও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলভুক্ত ডেনমার্ক ও নরওয়েতেও ইয়ান্তেলাগেন মেনে চলা হয়।

তবে বিশেষ এই সামাজিক রীতি মেনে চলার প্রবণতা সুইডিশদের মাঝেই বেশি লক্ষ্য করা যায়।

সুইডিশরা নিজেদের নতুন গাড়ি, বাড়ি, চাকরি, মোটা অঙ্কের বেতন কিংবা আসবাবপত্র নিয়ে কখনোই শো-অফ করেন না। এমনকি তারা পরীক্ষার ভালো ফলাফল করলেও তা সবার মাঝে বলে বেড়ান না।

কেননা এতে অনেকে হিংসা করতে পারেন, আবার কেউ কেউ কষ্টও পেতে পারেন। তাই সুইডিশরা কখনোই নিজেকে বিশেষ কোনো ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন না। আর তারা এই শিক্ষা পেয়েছেন ইয়ান্তেলাগেন থেকে।

ইয়ান্তেলাগেনের সৃষ্টি হয়েছে একটি উপন্যাস থেকে। ১৯৩৩ সালে ডেনিশ-নরওয়েজিয়ান লেখক অ্যাকসেল স্যান্ডিমোজ তার 'আ ফিউজিটিভ ক্রসেস হিজ ট্র্যাকস' উপন্যাসে প্রথম ইয়ান্তেলাগেনকে তুলে ধরেন।

এই উপন্যাসে তিনি একটি কাল্পনিক ইয়ান্তে শহরের কথা তুলে ধরেছেন। যে শহরটিতে ১০টি বিশেষ নিয়ম মেনে চলা হয়। যে নিয়মগুলোই হলো ইয়ান্তের আইন বা ইয়ান্তেলাগেন।

ইয়ান্তের আইন মূলত একজন মানুষকে নিরহংকারী হওয়ার শিক্ষা দেয়।

একজন মানুষ অর্থ, সম্পদ কিংবা জ্ঞানের দিক দিয়ে এগিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু এরপরও সেই ব্যক্তি যেন নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করবেন, সেটাই ইয়ান্তের আইন।

তবে ইয়ান্তের আইনের উৎস হিসেবে স্যান্ডিমোজের উপন্যাসের কথা বলা হলেও এই রীতি শত শত বছর ধরেই স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে চলে আসছে।

শত শত বছর ধরে স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা নিজেদের অতিসাধারণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা পেয়েছে আসছেন। যার প্রমাণ সুইডিশ সমাজ।

যেমন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ফার্নিচার কোম্পানি আইকিয়ার মালিক ইংভার ক্যাম্প্রাডের কথা বলা যায়৷ বিলিয়নিয়ার হওয়া সত্ত্বেও এই সুইডিশ ব্যবসায়ী ব্যবহার করতেন পুরোনো ভলভো গাড়ি।

অথচ তিনি চাইলেই কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করে বিলাসবহুল গাড়ি কিনতে পারতেন। ক্যাম্প্রাডের মতো সুইডেনের উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদ, এমনকি রাজপরিবারের সদস্যরাও যথাসম্ভব সাধারণ জীবনযাপন করার চেষ্টা করেন।

কিন্তু যদি ব্রিটিশ রাজপরিবার কিংবা অন্য কোনো দেশের ধনীদের দিকে খেয়াল করা করেন, তাহলে তাদের আভিজাত্য আর সম্পদের প্রদর্শন খুব সহজেই নজর

কাড়ে।

ইয়ান্তেলাগেন শুধু সুইডিশদের সম্পদ আর সাফল্য জাহির করা থেকে বিরত থাকার শিক্ষাই দেয় না। পাশাপাশি নিজের ব্যর্থতা, দুঃখ-কষ্টকেও আড়াল করার শিক্ষা দেয়।

আপাতদৃষ্টিতে ধনী গরিবের বৈষম্য এবং

অপরের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দাবি করা থেকে বিরত রাখার জন্য ইয়ান্তেলাগেন চমৎকার এক নিয়ম। তবে বর্তমানে এর প্রভাব ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। নব্বইয়ের দশক থেকে সুইডেনে ধনী গরিবের বৈষম্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সুইডেনে সম্পদের দিকে শীর্ষে থাকা ২০ শতাংশ মানুষের আয় নিচের ২০ শতাংশের চেয়ে ৪ গুণ বেশি।

এ কারণেই ইয়ান্তেলাগেনের বিরুদ্ধে অনেকেই কথা বলছেন। বিশেষ করে তরুণরা এখন আর নিজেদের আয় নিয়ে কথা বলতে তেমন সংকোচ বোধ করেন না।

সুইডিশ সমাজের এই পরিবর্তনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এছাড়া সুইডেনের ২৫ শতাংশ নাগরিক হয় বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন অথবা বাবা-মা দুজনই অন্য কোনো দেশের নাগরিক।

এই ২৫ শতাংশ নাগরিক ইয়ান্তেলাগেনকে নিজেদের রীতি মনে করেন না। তাদের অনেকেই ইয়ান্তেলাগেন সেভাবে মেনে চলেন না। তবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের বয়োজ্যেষ্ঠরা এখনও ইয়ান্তেলাগেন মেনে চলেন। তারা যৌ*ন বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বললেও, নিজের আয়ের কথা কাউকেই বলেন না।


@ Zahid Hasan Mithu


জাপানের হিরোসাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বয়স্ক মানুষের শরীরে ভিটামিন সি-এর মাত্রা বেশি, তাদের মস্তিষ্কের গঠন তুলনামূলকভাবে ভালো  


৩৩


সকালের নাস্তা পরিহার করুন!!!

সকালের নাস্তা খাওয়া আপনার স্বাস্থ্যের জন্য—বিশেষ করে আপনার লিভারের স্বাস্থ্যের জন্য—সবচেয়ে ক্ষতিকর জিনিসগুলোর একটি। কারণ লিভারই হলো আমাদের শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজমের মূল কারখানা।

রাতে যখন আপনি ঘুমান, তখন আপনার শরীর রোজা বা উপবাসের (fasting) অবস্থায় থাকে! ঘুমের মধ্যে আপনার লিভার জমা থাকা গ্লুকোজ নিঃসরণ করে এবং 'অটোফ্যাজি' (autophagy) নামক একটি কোষীয় মেরামত প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। কিন্তু আপনি যখন সকালের নাস্তা খান, তখন এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয়।

সকালে আপনার ইনসুলিনের মাত্রা সবচেয়ে কম থাকে, আর চর্বি বা ফ্যাট পোড়ানোর বিষয়টি সরাসরি এই কম ইনসুলিনের মাত্রার সাথে জড়িত।

দুপুর ১টার পর ডিম এবং মাংস খাওয়াটা একটি ভালো দুপুরের খাবার হতে পারে, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ সকালেই বেশি পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবার খান, যা ইনসুলিন উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়।

অধিকাংশ মানুষের সকালের নাস্তায় থাকে পাউরুটি, ভাত, পাস্তা, নুডুলস, জুস, মিষ্টি দই, সিরিয়াল, প্যানকেক, ওয়াফেলস, মাফিন, টোস্ট, জেলি এবং আরও অনেক কিছু!

এটি রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে অনেক বাড়িয়ে দেয় (blood sugar spike), যার ফলে সারাদিন জুড়েই রক্তে শর্করার ওঠানামা চলতে থাকে। অনেকেই কার্বোহাইড্রেটের সাথে ডিম এবং মাংস খান এবং ভাবেন যে যেহেতু তারা প্রোটিন পাচ্ছেন, তাই সব ঠিক আছে।

যদিও প্রোটিন রক্তের শর্করা কমাতে সাহায্য করতে পারে, তবে এটি ইনসুলিনের মাত্রা কমায় না। দীর্ঘদিন ধরে ইনসুলিনের মাত্রা উচ্চ থাকলে তা আপনার লিভার এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নিম্নলিখিত প্রভাব ফেলতে পারে:

* চর্বি বা ফ্যাট পোড়াতে অক্ষমতা

* শরীরকে চর্বি জমিয়ে রাখার মোডে রাখা

* শরীরে সোডিয়াম বা লবণ ধরে রাখা

* ক্ষুধা বৃদ্ধি পাওয়া

* ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ সৃষ্টি

* ভিসারাল ফ্যাট (অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চারপাশে চর্বি জমা)

* শরীরে আয়রন বা লোহা ধরে রাখা

* কিটোসিস প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া

* লিভার ফাইব্রোসিস (লিভার শক্ত হয়ে যাওয়া)

* অ্যান্ড্রোজেন হরমোন বৃদ্ধি পাওয়া

* ক্লান্তি বা অবসাদ

* রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া

* কর্টিসল (ধকল সৃষ্টিকারী হরমোন) বৃদ্ধি পাওয়া

সবচেয়ে সেরা সকালের নাস্তা হলো কোনো নাস্তাই না খাওয়া! দিনে স্ন্যাকস বা হালকা খাবার ছাড়া মাত্র দুই বেলা খাওয়া এবং কিটো ডায়েট অনুসরণ করা আপনার শরীরকে শক্তির জন্য কিটোন ব্যবহার করতে বাধ্য করে, যা স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ। আর আপনি যদি ওমাড (OMAD - One Meal A Day বা দিনে মাত্র এক বেলা খাওয়া) করতে পারেন, তবে তা চমৎকার।

### সকালে খাওয়া কেন ভুল?

* এটি ইনসুলিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, রক্তের শর্করাকে হঠাৎ কমিয়ে দেয় এবং সারাদিন ধরে কার্বোহাইড্রেট/মিষ্টি খাবারের প্রতি লোভ বাড়িয়ে দেয়।

* শরীরের স্বাভাবিক চর্বি পোড়ানোর প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।

* ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের (Insulin resistance) অবস্থাকে আরও খারাপ করে তোলে।

* আপনার শরীরকে বিভ্রান্ত করে আরও বেশি চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার চাওয়ার জন্য প্ররোচিত করে।

আপনার মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়া ধ্বংস করা বন্ধ করুন!

সকালের নাস্তা সম্পূর্ণ অর্থহীন। এটি বর্জন করুন। আপনি কি জন হার্ভে কেলগ (John Harvey Kellogg) নামের এক ভদ্রলোককে চেনেন? মানব পুষ্টির ইতিহাসে অন্যতম বিভ্রান্তিকর একটি বক্তব্যের পেছনে এই মানুষটিই দায়ী।

তিনিই সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে—সকালের নাস্তা হলো দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার।

সকালের নাস্তা (Breakfast) আজও দিনের সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় খাবার হিসেবেই রয়ে গেছে। ১৯ শতকের শুরুর দিকে কেলগস (Kellogg's) এবং জেনারেল মিলস (General Mills) তাদের সিরিয়াল বিক্রি করার জন্য এটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

পরবর্তীতে প্রচারণার জনক (Father of propaganda) এডওয়ার্ড বার্নেস (Edward Bernays) বেকন এবং দুগ্ধজাত পণ্য বিক্রির জন্য এটিকে আরও জোরদার করেন। মানবজাতি আগে কখনো এভাবে সকালের নাস্তা খায়নি। এটি পরিহার করুন।

কোনো মানুষই সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুম থেকে ওঠে না, যদি না আপনি চিনিতে আসক্ত হন এবং আপনার মধ্যে মিষ্টি খাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা (cravings) ও সুগার ক্র্যাশ না থাকে। ওটা আসলে ক্ষুধা নয়, ওটা হলো চিনির প্রতি আপনার আসক্তির প্রতিক্রিয়া।

@ Health Tips Pro



34


বর্তমানে 'ওভারথিঙ্কিং' বা অতিরিক্ত চিন্তা করা আমাদের সমাজের একটি অন্যতম বড় মানসিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা স্বাভাবিক মাত্রায় চিন্তা করেন তাদের মস্তিষ্ক বেশি কার্যকর থাকে। আর যারা অতিরিক্ত চিন্তা করেন, তাদের আইকিউ (IQ) এবং মস্তিষ্কের সৃজনশীল ক্ষমতা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে।

অতিরিক্ত চিন্তা দূর করার কিছু সহজ উপায় নিচে পয়েন্ট আকারে আলোচনা করা হলো:

১. অবাস্তব মানসিক বাধা দূর করা (হ্যারি হুডিনির গল্প)

বিখ্যাত জাদুকর হ্যারি হুডিনির একটি ঘটনা থেকে আমরা একটি বড় শিক্ষা পেতে পারি। তিনি যেকোনো জেলের তালা মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে খোলার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। একবার একটি বড় জেলে তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানানো হলে, এক রক্ষী ফিসফিস করে তাঁকে বলেন যে এটি দেশের সবচেয়ে মজবুত ও আধুনিক তালা। এই কথা শুনে হুডিনির আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং তিনি অতিরিক্ত চিন্তা করতে শুরু করেন।

তিনি টানা আড়াই ঘণ্টা তাঁর কাছে থাকা তার দিয়ে তালা খোলার চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। পরিশেষে ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে যখন তিনি দরজায় হাত দিয়ে হেলে পড়েন, তখন দরজাটি নিজে থেকেই খুলে যায়! আসলে দরজাটি কখনোই লক করা ছিল না। কিন্তু রক্ষীর কথা

শুনে হুডিনির মনে যে 'তালা' লেগেছিল, সেটাই তাঁকে আড়াই ঘণ্টা আটকে রেখেছিল। আমাদের জীবনের অনেক সমস্যাও আসলে এমন অবাস্তব এবং আমাদের মনের ভেতরেই তৈরি হয়।

২. অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া (Letting Go of the Past)

আমরা প্রায়ই অতীতে করা ভুল বা ফেলে আসা দিনগুলো নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করি। মনে রাখবেন, মানুষ ও পরিস্থিতি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় অতীতকে আমরা কখনো বদলে দিতে পারব না। তাই অতীতের ভুলগুলোকে অভিজ্ঞতা হিসেবে মেনে নিয়ে বর্তমানে বেঁচে থাকা এবং ভবিষ্যতের জন্য কাজ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

৩. একবারে একটি বিষয়ে ফোকাস করা (Focus on One Thing)

আমাদের জীবনে যখন একসাথে অনেকগুলো সমস্যা বা কাজ চলে আসে, তখনই ওভারথিঙ্কিং শুরু হয়। সব কাজ বা সমস্যা একসাথে সমাধান করার চেষ্টা না করে, একবারে একটি লক্ষ্যের ওপর আপনার সমস্ত শক্তি ও মনোযোগ দিন। একটি কাজে সফল হলে বাকি বিষয়গুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা সহজ হয়ে যাবে।

৪. নেতিবাচক চিন্তাকে ইতিবাচক চিন্তায় রূপান্তর করা (Positive Thinking)

আমরা সাধারণত খারাপ বা নেতিবাচক বিষয়গুলো নিয়েই অতিরিক্ত চিন্তা করে থাকি। তাই যখনই কোনো বিষয় নিয়ে মনে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা আসবে, সেটিকে ইতিবাচক বা ভালো চিন্তায় রূপান্তর করার চেষ্টা করুন। ইতিবাচক চিন্তা মানুষের চারপাশে একটি সুন্দর মানসিক পরিবেশ (Positive Aura) তৈরি করে, যা কাজের প্রতি উৎসাহ বাড়িয়ে দেয়।

৫. পরিস্থিতি নয়, আগে নিজেকে প্রস্তুত করুন (Fix Yourself First)

অনেকেই মনে করেন, জীবনের সব পরিস্থিতি যখন একদম নিখুঁত হবে, তখন তারা সুখী হবেন বা কাজ শুরু করবেন। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, আপনাকে আগে নিজেকে ভেতর থেকে শান্ত ও শক্তিশালী করতে হবে। যখন আপনি নিজের মানসিকতা ও চিন্তাভাবনার ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারবেন, তখন চারপাশের কঠিন পরিস্থিতিও আপনার কাছে সহজ মনে হতে শুরু করবে।

      শেষ কথা

জীবনকে উপভোগ করার সহজ মন্ত্র হলো—"কম চিন্তা করুন, বেশি বাঁচুন" (Think Less, Live More)। সমস্যার ওপর অতিরিক্ত চিন্তা না করে, সমাধানের ওপর মনোযোগ দেওয়াই অতিরিক্ত চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে কার্যকরী উপায়।

@ Gayan

 

35


অর্থকে আপনি অনর্থের মূল বলতেই পারেন। তবে অর্থ ছাড়া আপনার মূল ও মূল্য কোনটাই থাকবে না। সারা পৃথিবীর কথা জানি না। কিন্তু আপনি যদি বাঙালী মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হন, তাহলে অর্থ না থাকলে আপনার মা-বাবাই আপনাকে একসময় মূল্য দিবে না।

আপনি যদি বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবারে ছেলে হোন, তাহলে তো কথাই নাই। আপনাকে হতে হবে এটিএম মেশিন। আপনার মা-বাবা বলবে কি দিয়েছো! স্ত্রী-সন্তান বলবে কি দিয়েছো! ভাই-বোনরা বলবে কি দিয়েছো!

যে বাবা আপনাকে শিখিয়েছে, বিদ্যা অমূল্য ধন–তার কাছেই বিদ্যা অর্জন করে শূণ্য হাতে গিয়ে দাঁড়ান। মূল্য দিবে না। কিছুদিন যেতে না যেতেই, অর্থশূন্য আপনি নিজেই অর্থহীন হয়ে যাবেন।

আমি নিজের চোখে দেখেছি, গ্রাম ও মফস্বল শহরের বহু বাবা তার ছেলেকে বড়ো করেছে অনাদরে, বকা-ঝকা করতে করতে। কিন্তু ছেলে যখন বড়ো হয়েছে, তখন বাবার চাওয়া একটাই। ছেলে তার জন্য অর্থ উপার্জন করবে। বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবার যে এখনো কেন একটা ছেলে সন্তান চায়–তার বহু কারণের এটা একটা।

আপনি লেখক, কবি, শিল্পী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, শ্রমিক যাই হোন না কেন, দিন শেষে বাঙ্গালী মধ্যবিত্তের সন্তানকে টাকা তৈরিতেই আসল ফোকাস দিতে হয়। তাকে এটিএম মেশিন হতে হয়। তার কাছে কারো চাওয়ার কোন কমতি থাকে না।

আপনি দিতে পারবেন তো আপনার আদর-যত্ন, খাতিরের কমতি হবে না। দিতে পারবেন না তো আপনার খোঁজও কেউ নিবে না। বাঙালী মধ্যবিত্ত সংস্কৃতিতে এই নির্মম সত্য ও নিষ্ঠুরতাটা প্রতিষ্ঠিত।

অর্থকে যতোই অর্নথের মূল বলা হোক, বাঙালী মধ্যবিত্তের ছেলেটা অনর্থের কথা ভাবার সুযোগ পায় না। তার আগেই তাকে অর্থ নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হয়। তা না হলে তার অস্তিত্বই থাকে না। আর এই যে অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে কতো কতো মানুষ তার জীবনের আনন্দ, অপ্রাপ্তি হারিয়ে একেকটা রোবটে পরিণত হয়েছে, সে খবর কেউ রাখে না। এভাবে ছুটতে ছুটতে কতো মানুষ ঝরে গেলো। তারপর যে শোক নামে, সেখানে শোকের চেয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোর শংকাই থাকে বেশি। কারণ তাদের চিন্তা হয়–অর্থটা যোগান দিবে কে?

সুতরাং অর্থকে যতোই অনর্থের মূল বলা হোক, বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের অর্থের পেছনে দৌঁড় হলো, সবচেয়ে অর্থবহ দৌঁড়। মানুষ অনেক আধ্যাত্মিক কথা বলবে ঠিকই কিন্তু দিন শেষে আপনি চায়ের বিলটা দিতে না পারলে, বাসায় ডেকে ভালো ভালো খাওয়াতে না পারলে, বিয়ে বাড়িতে বড়ো প্যাকেটটা না নিতে পারলে, পরিবারের খরচ না দিতে পারলে–বহুদিকের তীক্ষ্ণ তীর আপনার দিকেই ধেয়ে আসবে। নিশ্চিত!

অসংখ্য বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা মূলত ভিতরে মরে যাওয়া একটা প্রাণহীন যন্ত্র। যাদেরকে বেঁচে থাকতে হয় শুধুমাত্র টাকা তৈরি করার জন্য। থাকুক দেশে কিংবা প্রবাসে।

@RAUFUL ALAM



36



সৌরজগতের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় কোথায় জানেন? 

অনেকেই ভাববেন—হয়তো পৃথিবীর মাউন্ট এভারেস্ট! 

কিন্তু সত্যটা আরও অবাক করার মতো...

 মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা: প্রায় ৮,৮৪৯ মিটার (৮.৮৫ কিমি)

 আর সৌরজগতের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় হলো Olympus Mons, যা রয়েছে মঙ্গল গ্রহে। এর উচ্চতা প্রায় ২১–২২ কিলোমিটার—অর্থাৎ এভারেস্টের প্রায় আড়াই গুণ! 

 শুধু তাই নয়, Olympus Mons হলো সৌরজগতের সবচেয়ে বড় আগ্নেয়গিরি, এমনকি বর্তমানে পরিচিত মহাবিশ্বেরও সবচেয়ে বড় আগ্নেয়গিরিগুলোর একটি।

 এর গোড়ার ব্যাস প্রায় ৬০০ কিলোমিটার—এতটাই বিশাল যে পুরো পাহাড়টি বাংলাদেশের আয়তনের চেয়েও বড় এলাকা জুড়ে বিস্তৃত! 

 এত বড় হলো কীভাবে?

 পৃথিবীতে ভূত্বক (Tectonic Plates) সবসময় নড়াচড়া করে। ফলে আগ্নেয়গিরির নিচের হটস্পট এক জায়গায় দীর্ঘ সময় থাকে না, তাই একই স্থানে বিশাল পাহাড় তৈরি হওয়ার সুযোগ কম।

 কিন্তু মঙ্গলে টেকটোনিক প্লেট প্রায় নেই বললেই চলে। তাই কোটি কোটি বছর ধরে একই জায়গা দিয়ে লাভা বেরিয়ে স্তর জমতে জমতে Olympus Mons আজকের এই দৈত্যাকার রূপ নিয়েছে। 

 আরেকটি অবিশ্বাস্য তথ্য!

 Olympus Mons এতটাই প্রশস্ত যে এর মাঝখানে দাঁড়ালে পাহাড়ের কিনারা দেখা যায় না। চারপাশকে সমতল ভূমি বলেই মনে হবে!

 আর এর চূড়া এতটাই উঁচু যে তা মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের অনেক ওপর পর্যন্ত উঠে গেছে—যেন মহাকাশের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। 

 বর্তমানে Olympus Mons সুপ্ত (Dormant) আগ্নেয়গিরি। এটি এখন অগ্ন্যুৎপাত করছে না, তবে কিছু বিজ্ঞানীর মতে, এটি পুরোপুরি মৃত কিনা তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

 মহাবিশ্ব আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবী যতই বিস্ময়কর হোক, তার বাইরের জগৎ আরও অনেক বড়, আরও অনেক আশ্চর্য! @ মহাকাশ


প্রাচীন পারস্যের (বর্তমান ইরান) এক অসাধারণ পানি সরবরাহ প্রযুক্তি, যার নাম 'কানাত' (Qanat)।

​আজ থেকে প্রায় ৩,০০০ বছর আগে প্রাচীন প্রকৌশলীরা মরুভূমির শুষ্ক ও বৈরী আবহাওয়াতেও কৃষিকাজ এবং মানুষের টিকে থাকার জন্য এই অভাবনীয় ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ পথ তৈরি করেছিলেন। পাহাড়ি এলাকার মাটির নিচে থাকা পানির উৎস (Aquifer) থেকে ঢালু সুড়ঙ্গ তৈরি করে মাইলের পর মাইল দূরবর্তী গ্রাম বা ফসলি জমিতে পানি নিয়ে যাওয়া হতো। মাটির নিচে হওয়ায় মরুভূমির তীব্র গরমেও পানি বাষ্পীভবন (Evaporation) হয়ে উড়ে যেত না।


৩৭



ভুলে যাওয়া, মনোযোগের অভাব, চিন্তা ধীর হয়ে যাওয়া—এগুলো কি শুধু ক্লান্তি, নাকি মস্তিষ্ক ও মনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত?

"আগে সবকিছু খুব সহজে মনে রাখতে পারতাম, এখন কিছুই মাথায় থাকে না।"

"বই খুলে বসি, কিন্তু পড়া শেষ করেও মনে থাকে না।"

"কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ কী বলতে চেয়েছিলাম, সেটাই ভুলে যাই।"

"সারাক্ষণ মনে হয় মাথার ভেতর যেন কুয়াশা জমে আছে।"

যদি এই অভিজ্ঞতাগুলো আপনার পরিচিত মনে হয়, তাহলে আপনি হয়তো Brain Fog (ব্রেইন ফগ)-এর মতো একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

অনেকেই এটিকে অলসতা, বয়সের প্রভাব বা স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে Brain Fog কোনো নির্দিষ্ট রোগ (Disease) নয়; এটি একটি উপসর্গ (Symptom), যা আমাদের মস্তিষ্ক, শরীর বা মানসিক স্বাস্থ্যের কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে।

সহজ ভাষায়—

মস্তিষ্ক যেন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে গেছে—চিন্তা করা যায়, কিন্তু পরিষ্কারভাবে নয়; কাজ করা যায়, কিন্তু আগের মতো দ্রুত বা দক্ষভাবে নয়।

এটি কোনো রোগের নাম নয়; বরং বিভিন্ন শারীরিক, মানসিক বা স্নায়বিক সমস্যার একটি সাধারণ উপসর্গ।

Brain Fog-এর সাধারণ লক্ষণ

বারবার ভুলে যাওয়া

মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা

চিন্তা ধীর হয়ে যাওয়া

সহজ সিদ্ধান্ত নিতেও কষ্ট হওয়া

কাজ শুরু করেও শেষ করতে না পারা

একই কাজ বারবার ভুল করা

কথার মাঝখানে কী বলতে চেয়েছিলেন ভুলে যাওয়া

নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে অসুবিধা

সারাক্ষণ মানসিক ক্লান্তি অনুভব করা

মাথা ঝাপসা, ভারী বা কুয়াশাচ্ছন্ন লাগা

Brain Fog কেন হয়?

Brain Fog-এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।

দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ (Chronic Stress)

উদ্বেগ (Anxiety)

বিষণ্নতা (Depression)

Burnout বা অতিরিক্ত কাজের চাপ

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব

Vitamin B12, Vitamin D, Iron বা Folate-এর ঘাটতি

Thyroid-এর সমস্যা

Hormonal পরিবর্তন

কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

Long COVID, Chronic Fatigue Syndrome, Fibromyalgia-এর মতো শারীরিক সমস্যা

অর্থাৎ Brain Fog-এর কারণ শুধু মানসিক নয়; শারীরিক কারণও থাকতে পারে। তাই দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে সঠিক মূল্যায়ন জরুরি।

Brain Fog মানেই কি স্মৃতিভ্রংশ (Dementia)? না।

Brain Fog এবং Dementia এক জিনিস নয়। Brain Fog সাধারণত সাময়িক এবং এর পেছনের কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা বা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই উন্নতি সম্ভব।

তবে যদি স্মৃতিশক্তি দ্রুত কমতে থাকে, দৈনন্দিন কাজ করতে অসুবিধা হয়, ব্যক্তিত্ব বা আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে, তাহলে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

Brain Fog কমাতে কী করবেন?

প্রতিদিন ৭–৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করুন।

দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন।

পর্যাপ্ত জল পান করুন।

পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।

দীর্ঘ সময় একটানা স্ক্রিন ব্যবহার কমান।

Mindfulness, Meditation বা Deep Breathing অনুশীলন করুন।

Vitamin বা Hormonal Deficiency-এর সন্দেহ থাকলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করান।

উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা Burnout থাকলে Psychological Counselling গ্রহণ করুন।

Brain Fog কোনো অলসতা নয়, কোনো দুর্বল মস্তিষ্কেরও লক্ষণ নয়।

এটি অনেক সময় আপনার মস্তিষ্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত, যা বলছে—

"আমি দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে আছি। এখন আমার বিশ্রাম, যত্ন এবং সঠিক সহায়তা দরকার।"

তাই শুধু স্মৃতিশক্তির ওষুধ খোঁজার আগে নিজের ঘুম, মানসিক চাপ, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক স্বাস্থ্য এবং আবেগীয় অবস্থার দিকে নজর দিন।

মনে রাখবেন—

মস্তিষ্ক কোনো যন্ত্র নয়। এটি বিশ্রাম, পুষ্টি, মানসিক নিরাপত্তা এবং সঠিক যত্ন পেলে তবেই তার সর্বোচ্চ ক্ষমতায় কাজ করতে পারে। Brain Fog-কে অবহেলা করবেন না, কারণ এটি প্রায়ই আপনার শরীর ও মনের পাঠানো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। @ সাইকোলজি ও মনের যত্ন



38



পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় প্রাণীগুলোর মধ্যে অন্যতম ইউরোপীয় ঈল (European eel)। জীবনের একটি পর্যায়ে এই মাছ আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে ৩,০০০ মাইলেরও বেশি দীর্ঘ এক অভূতপূর্ব যাত্রা করে, যার গন্তব্য উত্তর আটলান্টিকের সারগাসো সাগর।

প্রতি বছরের মে ও জুন মাসে স্বচ্ছ দেহের কচি ঈল, যাদের গ্লাস ঈল বলা হয়, এবং অপেক্ষাকৃত বড় এলভার মিঠা জলের নদীতে প্রবেশ করে। সেখানে কয়েক বছর বেড়ে ওঠার পর আগস্টের দিকে পূর্ণবয়স্ক ঈল নদী ছেড়ে সমুদ্রের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই যাত্রার পর তাদের আর কখনও নদীতে ফিরে আসতে দেখা যায় না।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মাছের গন্তব্য ছিল এক অমীমাংসিত রহস্য। অবশেষে ২০২২ সালে বিজ্ঞানীরা ২৬টি স্ত্রী ঈল মাছের শরীরে ট্র্যাকিং ট্যাগ সংযুক্ত করেন। তাদের মধ্যে পাঁচটির যাত্রাপথ অনুসরণ করে সারগাসো সাগর পর্যন্ত পৌঁছানোর তথ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি বৈজ্ঞানিক রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ উন্মোচিত হয়।

তবে এই বিস্ময়কর প্রাণী এখন মারাত্মক সংকটে রয়েছে। ১৯৮০ সালের পর থেকে ইউরোপীয় ঈলের সংখ্যা প্রায় ৯৮ শতাংশ কমে গেছে। ফলে বর্তমানে এদের 'চরম বিপন্ন' (Critically Endangered) প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, ইউরোপীয় ঈলের জীবনচক্র ও দীর্ঘ অভিবাসন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা গেলে এই বিরল ও রহস্যময় প্রাণীকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষার কার্যকর উপায় বের করা সম্ভব হবে। @ Science News


39


সুখ মানে এমন নয় যে জীবনে কোনো সমস্যা থাকবে না। বরং সুখী মানুষরাও দুঃখ পান, ব্যর্থ হন, প্রিয় মানুষকে হারান, হতাশ হন। পার্থক্য শুধু একটাই—তাঁরা জীবনের প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে এমনভাবে গড়ে তোলেন, যাতে কঠিন সময়েও ভেঙে না পড়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন।

নিচের সাতটি নিয়ম কোনো জাদুমন্ত্র নয়। এগুলো এমন কিছু জীবনদর্শন, যা প্রতিদিন একটু একটু করে অনুশীলন করলে মন অনেক বেশি শান্ত, স্থির এবং সুখী হয়ে উঠতে পারে।

অতীতের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করুন

অতীত বদলানো যায় না। কিন্তু অতীতকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো যায়। অনেক মানুষ বছরের পর বছর একটি ভুল, একটি সম্পর্ক, একটি ব্যর্থতা কিংবা একটি সিদ্ধান্তের জন্য নিজেকে শাস্তি দিয়ে যান। অথচ সেই কষ্ট অতীতকে বদলায় না, শুধু বর্তমানকে নষ্ট করে।

অতীতকে মেনে নেওয়া মানে সেটিকে সঠিক বলা নয়। বরং এটুকু স্বীকার করা যে, যা হয়েছে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এখন সামনে এগোনোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

যা করতে পারেন—

️নিজের অতীতের ভুলগুলোর একটি তালিকা না করে, সেখান থেকে কী শিখেছেন সেটি লিখুন।

প্রয়োজন হলে নিজেকে ক্ষমা করুন। সবাই ভুল করে।

পুরোনো কষ্টের কথা বারবার মনে করে নিজেকে শাস্তি দেবেন না।

প্রতিদিন নিজেকে বলুন, "আমার অতীত আমাকে সংজ্ঞায়িত করে না; আমার বর্তমান সিদ্ধান্তই আমাকে গড়ে তোলে।"

সময়কে তার কাজ করতে দিন

কোনো বড় কষ্ট, বিচ্ছেদ, ব্যর্থতা বা প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা একদিনে দূর হয় না। অনেকেই ভাবেন, "এতদিন হয়ে গেল, এখনও কেন ভালো লাগছে না?" অথচ মানসিক ক্ষতও শারীরিক ক্ষতের মতোই সময় নিয়ে সারে।

নিজেকে সময় দেওয়া মানে দুর্বল হওয়া নয়। বরং সেটি নিজের প্রতি সবচেয়ে বড় সহানুভূতি।

যা করতে পারেন—

কঠিন সময়ে নিজের অনুভূতিকে চাপা দেবেন না।

তাড়াহুড়ো করে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

প্রতিদিন অন্তত একটি ছোট কাজ করুন, যা আপনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

মনে রাখুন, আজ যেটা অসহনীয় মনে হচ্ছে, কয়েক মাস পরে সেটিকে অন্য চোখে দেখতে পারবেন।

অন্যের মতামত দিয়ে নিজের মূল্য নির্ধারণ করবেন না

আপনি যাই করুন, সবাই আপনাকে পছন্দ করবে না। কেউ সমালোচনা করবে, কেউ ভুল বুঝবে, কেউ অবমূল্যায়ন করবে। যদি প্রতিটি মানুষের মতামতের ওপর নিজের আত্মসম্মান নির্ভর করে, তাহলে কখনোই মানসিক শান্তি পাবেন না।

অন্যের মতামত শুনুন, কিন্তু নিজের পরিচয় তাদের হাতে তুলে দেবেন না।

যা করতে পারেন—

সবাইকে খুশি করার চেষ্টা ছেড়ে দিন।

গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করুন, অপমান নয়।

নিজের মূল্যবোধ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন।

প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, "আমি কি নিজের কাছে সৎ?"

নিজের জীবনকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করবেন না

আজকের পৃথিবীতে তুলনা করা খুব সহজ। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের সাফল্য, ভ্রমণ, সম্পর্ক কিংবা বিলাসী জীবন দেখে মনে হতে পারে, শুধু আপনার জীবনটাই পিছিয়ে আছে।

কিন্তু আমরা অন্যের জীবনের হাইলাইট দেখি, পুরো গল্পটা নয়।

যা করতে পারেন—

প্রতিদিন নিজের আগের দিনের সঙ্গে নিজের তুলনা করুন।

অন্যের সাফল্য দেখে নিজেকে ছোট না করে অনুপ্রাণিত হন।

নিজের ছোট ছোট অর্জনও উদযাপন করুন।

মনে রাখুন, প্রত্যেক মানুষের সময় আলাদা।

অতিরিক্ত চিন্তা কমানোর চেষ্টা করুন

অতিরিক্ত চিন্তা কোনো সমস্যার সমাধান করে না। বরং একই বিষয় নিয়ে বারবার ভাবতে ভাবতে মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, উদ্বেগ বাড়ে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়।

সব প্রশ্নের উত্তর আজই জানতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।

যা করতে পারেন—

নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, "এই বিষয়টি কি এখনই সমাধান করা সম্ভব?"

যেটা নিয়ন্ত্রণে আছে, সেটার ওপর কাজ করুন।

প্রতিদিন কিছু সময় মোবাইল ছাড়া নিজের সঙ্গে কাটান।

গভীর শ্বাস নেওয়া বা ধ্যানের অভ্যাস গড়ে তুলুন।

চিন্তা নয়, কাজ শুরু করুন। ছোট পদক্ষেপও অনেক বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।

আপনার সুখের দায়িত্ব আপনার নিজের

অনেকেই ভাবেন, "ও আমাকে ভালোবাসলে আমি সুখী হব", "ভালো চাকরি পেলেই সুখী হব", "সব সমস্যা শেষ হলে সুখী হব।"

আসলে সুখ কোনো বাইরের মানুষ বা পরিস্থিতির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে না। সুখ অনেকটাই নির্ভর করে আপনি প্রতিদিন কীভাবে জীবনকে দেখছেন এবং নিজের যত্ন নিচ্ছেন।

যা করতে পারেন—

নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন।

এমন কাজের জন্য সময় রাখুন যা সত্যিই আপনাকে আনন্দ দেয়।

অন্যের আচরণ দিয়ে নিজের মনের শান্তি নষ্ট করবেন না।

প্রতিদিন অন্তত তিনটি বিষয় লিখুন, যার জন্য আপনি কৃতজ্ঞ।

হাসতে শিখুন

জীবনের সব সমস্যা একদিনে দূর হবে না। কিন্তু প্রতিদিন একটু হাসতে পারা, ছোট ছোট আনন্দ খুঁজে নেওয়া এবং ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখা জীবনকে অনেক সহজ করে তোলে।

হাসি শুধু একটি অভিব্যক্তি নয়, এটি অনেক সময় নিজের মনকে নতুন শক্তি দেওয়ার একটি উপায়।

যা করতে পারেন—

প্রতিদিন এমন কিছু করুন যা আপনাকে সত্যিকারের আনন্দ দেয়।

পরিবারের মানুষ বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান।

নিজের ছোট অর্জনগুলোও উদযাপন করুন।

দিনের শেষে অন্তত একটি ভালো ঘটনার কথা মনে করুন।

অযথা নেতিবাচক খবর বা বিষাক্ত পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাটানো কমিয়ে দিন।

 সুখী জীবন কোনো ভাগ্যের উপহার নয়; এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতন সিদ্ধান্তের ফল।

আজ থেকেই এই ৭টি নিয়মের মধ্যে অন্তত একটি নিয়ম নিজের জীবনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করুন। কয়েক সপ্তাহ পর নিজেই আপনার চিন্তাভাবনা, মানসিক শান্তি এবং জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অনুভব করবেন।  @ সাইকোলজি ও মনের যত্ন


40



রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাসস্থানের বারান্দার এক কোণে টেবিল-চেয়ার পেতে তিনি সারাদিন লেখায় মগ্ন থাকতেন। এক সাঁওতাল মেয়ে বাগানের ঘাস পরিষ্কারের কাজ করছিল। সকালে কাজে এসে সে দেখল, বাবু বসে লিখছেন। দুপুরেও একই দৃশ্য। বিকেলে ঘাস পরিষ্কারের কাজ শেষ করে যাওয়ার সময় আবার দেখল — তিনি এখনও সেই একই জায়গায় বসে লিখে চলেছেন।

মেয়েটি আর না পেরে তাঁর কাছে এসে দাঁড়াল। রবীন্দ্রনাথ মুখ তুলে তাকাতেই সে সরল বিস্ময়ে বলে উঠল:

“হ্যাঁ রে, তুর কী কুন কাজ নেই? সকালবেলা যখন কাজে এলাম দেখলাম এখানে বসে কী করছিস! দুপুরেও দেখলাম এখানে বসে আছিস, আবার সন্ধ্যেবেলা আমাদের ঘরকে যাবার সময় হয়েছে, এখনো তুই এখানে বসে আছিস। তুকে কী কেউ কুন কাজ দেয় না?”

রবীন্দ্রনাথ এই ঘটনাটি নিজেই অনেককে মজা করে বলতেন। তিনি বলতেন, “দেখছ সাঁওতাল মেয়ের কী বুদ্ধি! আমার স্বরূপটা ও ঠিক ধরে ফেলেছে।”

সংগৃহীত


41


পৃথিবীর ইতিহাসে জীবনের বিবর্তন কখনোই সরল পথে এগোয়নি। গত প্রায় ৫৪০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন বছরে অন্তত পাঁচটি বড় গণবিলুপ্তির ঘটনায় অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে চিকশুলুব (Chicxulub) গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসরের বিলুপ্তি সবচেয়ে সুপরিচিত, কারণ সেই ঘটনার ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ আজও পৃথিবীর শিলাস্তরে সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু আরও কয়েকটি গণবিলুপ্তির কারণ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে প্রায় ২৫১ মিলিয়ন বছর আগে পার্মিয়ান–ট্রায়াসিক গণবিলুপ্তিতে পৃথিবীর ৮০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রজাতি হারিয়ে গেলেও, তার একক ও নিশ্চিত কারণ আজও বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করতে পারেননি।

এই দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক প্রশ্নে নতুন একটি ব্যাখ্যা প্রস্তাব করেছেন ইতালির রোম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেপলসের ওসারভাতোরিও আস্ত্রোনোমিকো দি কাপোদিমন্তের গবেষক ড্যানিয়েলে ফারজিয়ন। ২০২৫ সালে ইতালির পালের্মোতে অনুষ্ঠিত একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে উপস্থাপিত এবং ২০২৬ সালে arXiv-এ প্রকাশিত তাঁর গবেষণাপত্রে তিনি ধারণা দেন, পৃথিবীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ নয়, বরং গ্রহ-আকারের বিশাল কোনো মহাজাগতিক বস্তুর কাছাকাছি অতিক্রম করাও অতীতে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সূচনা করতে পারে। অর্থাৎ, কোনো অদৃশ্য বা দূরবর্তী ভ্রাম্যমাণ গ্রহ যদি পৃথিবীর যথেষ্ট কাছে চলে আসে, তবে তার মহাকর্ষীয় আকর্ষণ পৃথিবীর ওপর এমন প্রভাব ফেলতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত গণবিলুপ্তির পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম।

গবেষণাটির মূল ধারণা হলো "গ্র্যাভিটেশনাল টাইড" বা মহাকর্ষীয় জোয়ার। চাঁদের মহাকর্ষ যেমন পৃথিবীর সমুদ্রে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি করে, তেমনি পৃথিবির কাছ দিয়ে অনেক বড় ভরের কোনো বস্তু অতিক্রম করলে তার আকর্ষণ আরও শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে পারে। ফারজিয়নের মতে, এমন পরিস্থিতিতে কয়েক কিলোমিটার উচ্চতার সুনামি, পৃথিবীর ভূত্বকে অতিরিক্ত চাপ, আগ্নেয়গিরির ব্যাপক অগ্ন্যুৎপাত, সমুদ্রপৃষ্ঠের দ্রুত পরিবর্তন এবং জলবায়ুর বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি সেই ভ্রাম্যমাণ বস্তুটি গ্রহাণুপুঞ্জ বা কুইপার বেল্ট অতিক্রম করার সময় অসংখ্য গ্রহাণুর কক্ষপথও বদলে দিতে পারে, ফলে পৃথিবীর দিকে সংঘর্ষের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, অতীতের কিছু গণবিলুপ্তিতে এই বিভিন্ন বিপর্যয় একসঙ্গে কাজ করে থাকতে পারে।

এই ধারণার পক্ষে তিনি সৌরজগতের কয়েকটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ তুলে ধরেছেন। ইউরেনাস প্রায় পাশ ফিরে ঘোরে, নেপচুনের বৃহত্তম উপগ্রহ ট্রাইটন সম্ভবত কুইপার বেল্ট থেকে ধরা পড়া একটি বস্তু, আবার সৌরজগতের কয়েকটি উপগ্রহ বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করে—যেগুলো অতীতে বৃহৎ সংঘর্ষ বা মহাজাগতিক নিকট অতিক্রমণের ইঙ্গিত দিতে পারে। পৃথিবীও এমন ঘটনার বাইরে ছিল, এমনটি ধরে নেওয়ার যথেষ্ট কারণ নেই বলে তাঁর যুক্তি। এমনকি প্রাচীন প্রবাল জীবাশ্মের বিশ্লেষণে ডেভোনিয়ান যুগের শেষে বছরে দিনের সংখ্যার পরিবর্তনের হার হঠাৎ কমে যাওয়ার যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সেটিকেও তিনি পৃথিবী-চাঁদ ব্যবস্থায় মহাকর্ষীয় টানের সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।

তবে এই গবেষণাটি এখনো একটি অনুমানভিত্তিক বা হাইপোথিসিস পর্যায়ের কাজ। গবেষক নিজেই স্বীকার করেছেন যে অতীতে পৃথিবির কাছ দিয়ে কতবার এমন বস্তু অতিক্রম করেছে, তাদের ভর কত ছিল কিংবা সুনির্দিষ্টভাবে কোন বিলুপ্তির সঙ্গে কোন ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে গণবিলুপ্তির ব্যাখ্যায় গ্রহাণুর আঘাত, দীর্ঘস্থায়ী আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কারণগুলোর পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে। তাই ফারজিয়নের প্রস্তাবিত ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ধারণাকে প্রতিস্থাপন করেনি; বরং একটি অতিরিক্ত সম্ভাবনা হিসেবে আলোচনায় এসেছে, যা ভবিষ্যতে আরও তথ্য ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।

তবুও গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পৃথিবীর ইতিহাসকে কেবল পৃথিবীকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, সমগ্র সৌরজগতের গতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার আহ্বান জানায়। ভবিষ্যতে যদি সৌরজগতের প্রান্তে থাকা বৃহৎ অজানা বস্তুগুলোর কক্ষপথ আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যায়, অথবা ভূতাত্ত্বিক নথিতে এমন ঘটনার নতুন প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে পৃথিবীর অতীত সম্পর্কে আমাদের ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। বিজ্ঞান প্রায়ই নতুন প্রশ্ন থেকে এগিয়ে যায়; এই গবেষণাও সেই ধরনের একটি সাহসী প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যার উত্তর খুঁজতে আরও বহু বছর পর্যবেক্ষণ, গণনা এবং প্রমাণের প্রয়োজন হবে। @ Murad Ahmed

(সূত্র: রোম বিশ্ববিদ্যালয় ও ওসারভাতোরিও আস্ত্রোনোমিকো দি কাপোদিমন্তে, arXiv/Universe Today, ২০২৬)— in Dhaka. See less


ঘোড়ার ঘুম কখনো আমাদের মতো নয়। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে শিকারী এড়িয়ে চলার পরে, এই প্রাণী শিখেছে কীভাবে বিশ্রাম নিতে হয় যখনও প্রস্তুত থাকতে হয়। দাঁড়ানো অবস্থায়, তার পা লক হয়ে যায়, পেশি কাজ করতে থাকে না। অচেতন বিশ্রাম, কিন্তু সম্পূর্ণ সচেতনতা। চোখ খোলা থাকে, কান চলে, নাসিকা নড়ে। 



42


"দুধ হচ্ছে সব পুষ্টির রাজা, প্রতিদিন এক গ্লাস না খাওয়ালে আমাদের বাচ্চার পেট ভরবে না আর শরীর বাড়বে না!" : মুরুব্বিদের এই চিরন্তন কথা কি চোখ বন্ধ করে মানছেন? বিজ্ঞান বলছে, এই দুধই কিন্তু ওর পেট খারাপ আর ঘন ঘন মেজাজ বিগড়ে যাওয়ার আসল কারণ হতে পারে!

বাচ্চা একটু ঘ্যানঘ্যান করলেই বা পেট খারাপের কথা বললেই আমরা ঝটপট এক গ্লাস গরুর দুধের ব্যবস্থা করি। ভাবি দুধের চেয়ে উপকারী আর কী হতে পারে!

কিন্তু আধুনিক চাইল্ড নিউট্রিশন আর গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বলছে একদম চমকে যাওয়ার মতো তথ্য। বাচ্চার হজমশক্তি এবং মানসিক প্রশান্তির জন্য দুধের চেয়ে 'টক দই' বহুগুণ বেশি কার্যকর।

এর পেছনের আসল বিজ্ঞানটা চলুন খুব সহজ এক লাইনে জেনে নিই।

টক দইয়ের ভেতরে থাকা প্রচুর পরিমাণে 'প্রোবায়োটিক' বা ভালো ব্যাকটেরিয়া সরাসরি আমাদের বাচ্চার পেটের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। আর নিউরোসায়েন্স প্রমাণ করেছে যে পেটের সাথে বাচ্চার ব্রেইনের একটা সরাসরি গভীর যোগাযোগ আছে, যাকে বলা হয় 'গাট-ব্রেন কানেকশন' (Gut-Brain Connection)।

টক দই যেভাবে আমাদের বাচ্চার জন্য জাদুর মতো কাজ করে:

সহজ হজম ও পেটের আরাম: দুধের ল্যাকটোজ অনেক বাচ্চার পেটে সহজে সহ্য হয় না, কিন্তু টক দই খুব দ্রুত হজম হয়ে যায় এবং পেট একদম ঠান্ডা রাখে।

মেজাজ ফুরফুরে রাখা: পেটের ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো সচল থাকলে বাচ্চার ব্রেইনে হ্যাপি হরমোন নিঃসরণ বাড়ে, যা ওর খিটখিটে মেজাজ আর জেদ নিমেষে কমিয়ে দেয়।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: এই প্রোবায়োটিক সরাসরি বাচ্চার ইমিউনিটি বুস্ট করে, যার ফলে ও সহজে পেটের রোগবালাই বা ইনফেকশনের শিকার হয় না।

তাই আমাদের বাচ্চার প্রতিদিনের নাস্তায় বা দুপুরের খাবারে এক বাটি চিনি ছাড়া খাঁটি টক দই রাখার অভ্যাস করুন। এটি ওর পেটও ভালো রাখবে, আবার মনও রাখবে ফুরফুরে।

@ Kiddification


43


চপিং বোর্ড

রান্নাঘরের বেশি ব্যবহৃত জিনিসগুলোর মধ্যে একটি হল, চপিং বোর্ড। সবজি কাটা, মাছ-মাংস প্রস্তুত করা বা ফল টুকরো করতে বিশেষ সহায়ক এটি। অনেকেই ধারণা করেন প্লাস্টিকের চপিং বোর্ডই সবচেয়ে সুবিধাজনক। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহারে, কিছু ক্ষতি হতে পারে। আর সঠিকভাবে ব্যবহার ও যত্ন নিলে কাঠের চপিং বোর্ড অনেক ক্ষেত্রেই বেশি কার্যকর। এছাড়া ভালো মানের কাঠের চপিং বোর্ড ছুরির ধার দীর্ঘদিন ঠিক রাখতে কার্যকর। ছুরির ধার দীর্ঘদিন ভালো থাকে। কাঠের চপিং বোর্ডের একটি বড় সুবিধা হল, এর পৃষ্ঠ কিছুটা নমনীয়। ফলে ছুরি দিয়ে কাটার সময়, বোর্ড সামান্য চাপ শোষণ করে নেয়। এতে ছুরির ফলার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না। চপিং বোর্ড খুব হালকা হলে অনেক সময় কাটার সময় নড়ে যায়। এতে কাজের ক্ষেত্রে অসুবিধাজনক। এমনকি আঙুল কেটে যাওয়া বা অন্য দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ে।

“কাঠের বোর্ড সাধারণত তুলনামূলক ভারী হলে, সহজে স্থান থেকে সরে যায় না। অর্থাৎ সবজি, ফল কিংবা মাংস যাই কাটা হোক বোর্ড স্থির থাকে। এতে কাজের গতি বাড়ে, তেমনি কাটাকাটিও হয় আরও নিরাপদ”

“ব্যবহারের পর দ্রুত ধুয়ে শুকিয়ে রাখতে হবে। দীর্ঘ সময় ভেজা অবস্থায় ফেলে রাখা উচিত নয়। এতে কাঠ পচে পোকা ও দুগন্ধ তৈরি হতে পারে। এছাড়া কাঠ ফুলেও যেতে পারে। আর নিয়মিত যত্ন নিলে একটি কাঠের বোর্ড বহু বছর ব্যবহার করা সম্ভব।” ফল, মাছ বা মাংস কাটতে, অনেক সময় রস বের হয়ে রান্নাঘরের টেবিল নোংরা হয়ে যায়। অনেক কাঠের চপিং বোর্ডের চারপাশে সরু খাঁজ থাকে, যা এই রস আটকে রাখে। এই ধরনের বোর্ড ব্যবহার উত্তম।


কাঠের বোর্ড পরিষ্কার করা কঠিন মনে হলেও, নিয়ম মেনে পরিষ্কার করলে এটি দীর্ঘদিন ভালো থাকে।

ব্যবহারের পর গরম পানি ও হালকা পরিষ্কারক দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর ভালোভাবে শুকিয়ে রাখতে হবে। দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবিয়ে রাখা ঠিক নয়। কারণ অতিরিক্ত আর্দ্রতা কাঠের গঠন দুর্বল করতে পারে।

৪৪


‘ডিজিটাল ডিটক্স’ 

মেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণা বলছে, শর্ট-ভিডিওর আসক্তি মানুষের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।মেধা বাঁচাতে এখন ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ জরুরি।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে গ্রামোফোন ও রেডিও দুটিই বৈপ্লবিক আবিষ্কার। এর আগে পরোক্ষভাবে শব্দ শোনার অভিজ্ঞতা মানুষের ছিল না। তখন সামনাসামনি থেকে কথা, গান ও অন্যান্য কিছু দেখা ও শোনার অভিজ্ঞতা থাকলেও গ্রামোফোন আবিষ্কারের পর মানুষ প্রথম শুনল রেকর্ড করা গান ও কথা। আবিষ্কারের মাত্র ১৫ বছরের মাথায় ১৯০২ সালের ৮ নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে গ্রামোফোনের রেকর্ডিং শুরু হয়। ১৯০২ সালের পর থেকেই তৎকালীন পূর্ববঙ্গের জমিদারবাড়ি ও বনেদি পরিবারগুলোতে গ্রামোফোনের ব্যবহার শুরু হয়। পরে ১৯২৮ সালে কলকাতার দমদমে গ্রামোফোন কোম্পানির স্থায়ী কারখানা গড়ে উঠলে এ দেশে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সাধারণের নাগালের মধ্যে চলে আসে।

অবিভক্ত ভারতে প্রথম রেডিওর ব্যবহার শুরু হয় ১৯২৩ সালে 'রেডিও ক্লাব অব বোম্বে'র উদ্যোগে। তবে এই বাংলায় প্রথম আনুষ্ঠানিক ও নিয়মিত বেতার সম্প্রচার শুরু হয় ১৯২৭ সালের ২৬ অগাস্ট কলকাতার 'ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি'র মাধ্যমে।

বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রথম রেডিও স্টেশন বা বেতার কেন্দ্র স্থাপিত হয় ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় (পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে)। ১ কিলোওয়াটের একটি মাঝারি তরঙ্গের ট্রান্সমিটার দিয়ে অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঢাকা কেন্দ্রের সম্প্রচার শুরু হয়েছিল, যার পরিধি ছিল মাত্র ৪৫ কিলোমিটার।

এটা গেল শোনার ইতিহাস। দেখার ইতিহাসটা শুরু হলো টেলিভিশন শুরুর সঙ্গে, ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। শুরুতে ঢাকার অভিজাত কিছু পরিবারেই শুধু টিভি দেখার সুযোগ ছিল।

তবে গত শতকের সাতের দশকের শেষ ও আটের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশে টেলিভিশন জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ওই সময় অবশ্য ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না। প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে যাদের ঘরে টেলিভিশন ছিল, সেখানে সন্ধ্যার পর ভিড় জমত। বেশিরভাগই ছিল সাদাকালো টিভি। ১৯৭৯ সালে বিটিভি রঙিন জগতে প্রবেশ করলেও আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় মধ্যবিত্তের নাগালে ছিল না রঙিন টিভি। আটের দশকের মাঝামাঝি থেকে টেলিভিশনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠে যায়। তার আগে বিনোদনের প্রধান অবলম্বন ছিল সিনেমা। আর তারও আগে থেকে যাত্রাপালা, সার্কাস, পাড়ার নাটক, জাতীয় দিবসগুলো উপলক্ষে পাড়ার সংগঠনগুলোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই ছিল বিনোদনের ক্ষেত্র। গ্রামে মৌসুমি মেলা, বলীখেলা, গরুর লড়াই, নৌকা বাইচের মতো বিষয়গুলোও ছিল।

শুরুর দিকে, অর্থাৎ টেলিভিশন যখন ঘরে ঘরে ছিল না, সে সময় সাপ্তাহিক নাটক, সিনেমা ও সিনেমার গান নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান 'ছায়াছন্দ' যেদিন থাকত, সেদিন টেলিভিশন আছে এমন পরিবারে মোটামুটি একটি পুনর্মিলনী হয়ে যেত।  

তারপর দিন বদলাতে থাকে। প্রায় প্রতিটা ঘরে টেলিভিশন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মতো স্থান পেতে শুরু করে। রঙিন যুগ আগেই শুরু হয়েছিল, এবার যুক্ত হলো ভিসিআর। আগে দলবেঁধে যেমন টিভি দেখা হতো, সেভাবে ভিসিআরে হিন্দি, ইংলিশ ও ওপার বাংলার ছবি দেখা শুরু হলো। এরপর নব্বইয়ের দশকে ভিসিআরের ক্রেজ দখল করল টিভি সিরিয়াল। ক্যাবল টিভির সুবাদে ভারতীয় টিভির কিছু সিরিয়াল এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠল যে, তা দেখার সময়ে পরিবারের অনেকে—বিশেষ করে নারীরা এতই নেশাগ্রস্ত ও মগ্ন থাকতেন যে, সে সময়ে কোথাও বেড়াতে যাওয়া বা ঘরে কোনো অতিথি আসা বন্ধ হতে থাকল। এভাবে অসামাজিক হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা চূড়ান্ত অবস্থানে পৌঁছায় নয়া শতকের শূন্যের দশক ও পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে। এখন এটি ভয়াবহ এক পারিবারিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করেছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—কেউই এই ভার্চুয়াল জগতের মোহ কাটাতে পারছেন না। নামে 'সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম' বলা হলেও এটি মানুষকে চরমভাবে অসামাজিক করে তুলেছে। ফেইসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাম্প্রতিক ক্রেজ হলো টিকটক ও রিলসের মতো অতি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও। 

কয়েক মাস আগে ৭১টি গবেষণার মোট ৯৮ হাজার ২৯৯ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম রিলসে অতিরিক্ত ডুবে থাকার ঘটনায় মানুষের মনোযোগের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যত বেশি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও দেখার ঘটনা ঘটতে থাকবে, ততই মানুষের মনোযোগ ধরে রাখা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যাবে। যে কাজগুলোতে গভীর মনোযোগ বা মানসিক শ্রম দরকার, সেগুলো তাদের কাছে আরও জটিল হয়ে উঠবে। গবেষকদের মতে, উত্তেজনামূলক ও দ্রুতগতির কনটেন্ট বারবার দেখলে ব্যবহারকারীরা ‘হ্যাবিচুয়েশন’–এ ভোগে। এতে ধীরে চলা কিংবা বেশি পরিশ্রমের কাজ—যেমন পড়াশোনা, সমস্যা সমাধান বা গভীরভাবে শেখার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যায়। গবেষকরা বলছেন, এটি মানুষকে ‘ব্রেইন রট’ বা ‘মস্তিষ্কের পচনের’ দিকে ঠেলে দেয়। অতি সম্প্রতি অক্সফোর্ড ডিকশনারি ‘ব্রেইন রট’ শব্দটিকে অভিধানে স্থান দিয়েছে। তারা বুঝিয়েছে—অতিরিক্ত তুচ্ছ বা মানহীন অনলাইন কনটেন্ট গ্রহণের ফলে মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার অবনতি। গবেষকদের মতে, ‘বিরতিহীন সোয়াইপ ও নতুন, আবেগতাড়িত কনটেন্ট পাওয়ার চক্র মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, যা এক ধরনের রিইনফোর্সমেন্ট লুপ তৈরি করে এবং এই অভ্যাসকে আরও শক্তিশালী করে।’ 

এই দ্রুতগতির কনটেন্টগুলো মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণের একটি ‘রিইনফোর্সমেন্ট লুপ’ বা চক্র তৈরি করে; যার ফলে মানুষ কোনো ধীরস্থির কাজ—যেমন বই পড়া, সমস্যা সমাধান বা গভীর কোনো তাত্ত্বিক বিষয় শিখতে গেলে মস্তিষ্ক আর সেই আগের মতো সংবেদনশীল থাকে না। জীবন যখন কেবল ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ডের একটি ঝটকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন দীর্ঘমেয়াদি পরিশ্রমের কাজগুলো পাহাড়সম বোঝা মনে হয়। এই অবক্ষয়ের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং একাকীত্বকেও উসকে দিচ্ছে। বাস্তব জগতের রক্ত-মাংসের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের চেয়ে ডিজিটাল ইন্টারঅ্যাকশন যখন মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন মানুষের মানসিক তৃপ্তি কমতে শুরু করে।

স্মর্তব্য যে, কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তির অপব্যবহারও আমাদের চিন্তাশক্তিকে অলস করে দিচ্ছে। এমআইটির গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতায় মানুষের সৃজনশীলতা ও স্মরণশক্তি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এখনই সময় এই ‘ডিজিটাল ড্রাগ’ থেকে নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মকে রক্ষা করার। প্রযুক্তির অগ্রগতিকে অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে তার দাসত্ব করা আত্মঘাতী। আমাদের ফিরে যেতে হবে ধীরস্থির অভ্যাসে—বই পড়া, বাগান করা কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে সশরীরে আড্ডা দেওয়ার সংস্কৃতিতে।  @ কামরুল হাসান বাদল 

৪৫


 নকল ও শাস্তির উদ্ভব একই শিকড় থেকে—মানহীন শিক্ষা। গত কয়েক বছরে স্কুলে শাস্তি তুলনামূলকভাবে হ্রাস পেয়েছে, তবে এখনও এর চর্চা আছে। খোদ ঢাকা শহরেই এমন অনেক সরকারি-বেসরকারি স্কুল আছে যেখানে শিশুদেরকে পান থেকে চুন খসার অপরাধে পেটানো ও মানসিকভাবে অপদস্থ করা হয়। আর ওইসব শিক্ষকেরাই পিটিয়ে শ্রেণিকক্ষে নিজেদের যোগ্যতার বেশি বেশি প্রমাণ দেন যাদের পড়ানোর যোগ্যতা সবচেয়ে কম। নিজেদের অযোগ্যতা ও বুঝিয়ে পড়ানোর অক্ষমতাকে ঢেকে রাখতে তারা শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের পুরো সময়টা পার করেন বিভিন্ন শিক্ষার্থীর ওপর হম্বিতম্বি করে। নিয়মিত তাদের এরূপ হেনস্তার শিকার হয় যেসব শিশু তারা হলো: যারা গরিব পরিবারের, যারা শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য রাখে না বা কোচিং করতে পারে না, যারা শিক্ষকের শিখিয়ে দেয়া ফরম্যাটের বাইরে উত্তর দেয় বা লেখে ইত্যাদি। এমন উদাহরণ অনেক যে, শিক্ষক বলেন অমুক গাইড বই ক্লাসে নিয়ে আসতে, না আনলে শিক্ষার্থীকে কৈফিয়ত দিতে হয়। কারণ শিক্ষক নিজে এত অল্প জানেন যে গাইড বইয়ের ওপর নির্ভর করা ছাড়া তার উপায় নেই। এছাড়াও শিশুদের হেনস্তা করার নানা কৌশল শিক্ষকের হাতে থাকে। শিশুদের অভিভাবকরাও অনেক সময় হেনস্তা হন। এসব কখনো কখনো মর্মান্তিক ঘটনারও জন্ম দেয়।  যদিও শারীরিক শাস্তি প্রদান আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ, তা বহাল তবিয়তে চলে। ওইসব স্কুলে বেশি চলে যেখানে শিক্ষকের মান কম। অর্থাৎ শিক্ষকের অযোগ্যতার দায়ভার নিতে হয় শিক্ষার্থীকে। এমন শিক্ষকগণ ক্লাসে এসে পড়ানোর পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের নানা অপরাধের ফিরিস্তি দিয়ে থাকেন। যেন শিক্ষার্থীরা এত খারাপ যে তিনি তার যোগ্যতা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আসল কারণ কি এই নয় যে, শিক্ষক মানহীন বলে ও পড়াতে পারেন না বলেই ছাত্রছাত্রীরা শিখতে পারছে না? 

শিক্ষকের মান কতটা কম তা সহজেই বোঝা যায়, যখন জানার চেষ্টা করবেন, কতজন শিক্ষক বইপুস্তক পড়েন ওই সংখ্যা। আশ্চর্য! তারা কেন বই পড়বেন? তারা কি পরীক্ষা দেবেন? তাই তো! অনেক স্কুলে কোনো পাঠাগার নেই, যেখানে আছে সেখানেও ছাত্রছাত্রীকে লাইব্রেরি থেকে বই নিতে উৎসাহিত করা হয় না। করলেই বা ছাত্রছাত্রী কেন লাইব্রেরি থেকে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই নেবে? চোখের সামনে জলজ্যান্ত যে শিক্ষককে সে দেখে তিনি যদি জীবনে লাইব্রেরি থেকে একটি বইও না নেন, তাহলে শিক্ষার্থী কেন নেবে? সে কি এতই গর্দভ! আর যে শিক্ষক কখনো বই পড়েন না তিনি কীভাবে পড়াবেন, কী পড়াবেন। শিক্ষকতার মানে তার কাছে ছাত্র পেটানো ছাড়া আর কিছুই না। 

স্কুলে শিশুকে পেটানো বন্ধ করতে হলে শিক্ষকদের বইপুস্তক পড়তে হবে ও নিজেদের মান উন্নত করতে হবে। এছাড়াও তাদের প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং বন্ধেরও বিকল্প নেই। শিক্ষার মান বাড়ানো ও পরীক্ষায় ভালো ফল করানোর জন্য কোচিংয়ের অজুহাতটি ডাহা মিথ্যা। ক্লাসে না পড়ালে তো কোচিং করাতেই হবে। যারা বেকার বা অভাবী শিক্ষার্থী তারা নিজেদের পড়ালেখা চালিয়ে নেয়ার জন্য প্রাইভেট পড়ালে হয়তো কিছু লাভ হয়। কিন্তু স্কুলের শিক্ষক যখনই প্রাইভেটে বা কোচিংয়ে পড়ান তখন তো তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৈষম্যমূলক আচরণের সুযোগ পেয়ে যান। কেননা যেসব শিক্ষার্থী দারিদ্র্যের কারণে বা বড় ভাই-বোনের সহযোগিতা পায় বলে প্রাইভেট পড়ে না বা স্কুলে কোচিং করে না, তারা হয়ে পড়ে শিক্ষকের চক্ষুশূল। আর যে বা যারা প্রাইভেট পড়ে বা কোচিং করে শিক্ষক তাদেরকে পরীক্ষার প্রশ্ন অগ্রিম বলে দেন যাতে তারা স্কুলের পরীক্ষায় ভালো ফল করে। এভাবে তারা অভিভাবকদের কাছে প্রমাণ করতে পারেন যে, প্রাইভেট পড়া বা কোচিং করার জন্যই ছেলে বা মেয়েটি ভালো ফল করেছে। আর যে বা যারা ভালো করেনি তাদের অভিভাবকরা অসচেতন, তাই সন্তানকে কোচিংয়ে দেয়নি, তার ফলে নাকি সন্তানের পরীক্ষায় খারাপ ফল! এভাবে শিক্ষকরা শিশুদের দুই দিক থেকে সর্বনাশ করেন। একদিকে কিছু ছেলেমেয়ে সত্যিকারভাবে ভালোমতো কিছু না শিখেই ভালো রেজাল্ট করে যা আখেরে ভালো ফল দেবে না, অন্যদিকে যারা সত্যিকারভাবে শিখল বা জানার চেষ্টা করল তারা অবমূল্যায়িত হলো এবং একসময় হীনমন্যতার শিকার হবে।  শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে - এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির পেছনে শিক্ষকদের নিজেদের দায়ও খুঁজে বের করতে হবে।  @ আলমগীর খান


৫৬


শ্রেষ্ঠ ধর্ম

ওয়ার্ল্ড ভ্যালুজ সার্ভে ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের নানা প্রান্তের মোট ৫৪টি দেশের জনগণের কাছে বেশ কিছু প্রশ্ন করেছিল এবং ওইসব বিষয়ে তাদের মতামত জানতে চেয়েছিল। এর মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল এরকম: ‘আমার ধর্মই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম’—এ বিষয়ে জনগণের মতামত কী? পৃথিবীর অন্তত ১২০টি দেশের মানুষের ধর্ম, পরিবার, রাজনীতি, নৈতিকতা, বিশ্বাস এবং অন্যদের প্রতি সহনশীলতাসহ নানা বিষয়ে তারা কী ভাবে, তা নিয়ে জরিপ করেছে।  জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ ‘একমত’ বা ‘সম্পূর্ণ একমত’ হয়ে এই তালিকার শীর্ষে আছে। পরের তিনটি দেশ হলো যথাক্রমে মিয়ানমার, জর্ডান ও পাকিস্তান। এসব দেশের অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষ মনে করে, তাদের ধর্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এর মানে হলো, এই বিপুলসংখ্যক মানুষ মনে করছে সমাজে থাকা অন্য ধর্মসমূহ তাদের চেয়ে অধস্তন।  ভাবার কোনো কারণ নেই যে, এই প্রবণতা শুধু ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। তালিকায় থাকা দ্বিতীয় দেশটি হলো মিয়ানমার; যেখানে প্রায় ৮৮ শতাংশ নাগরিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং মাত্র ৪ শতাংশ মুসলিম। ওই দেশেরও ৯০ শতাংশের বেশি নাগরিক মনে করে, তাদের ধর্মই একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম।

কিন্তু একই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে গিয়ে দৃশ্যপট বদলে যায়। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের ৯০ ভাগ মানুষ এই ধারণার সঙ্গে একমত নন। একই জরিপে উল্লেখিত দেশগুলোর মাঝখানে এমন কিছু দেশের নাম এসেছে, যেগুলো সামাজিকভাবে বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। একই সমাজের ভেতরেই দুটি বিপরীত প্রবণতা পাশাপাশি বাস করছে। একদিকে একটি অংশ গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে ধর্ম একটিই এবং সেটি তাদের নিজের ধর্ম; অন্যদিকে আরেকটি অংশ মনে করে, ভিন্ন ধর্মের মানুষেরও একই সামাজিক মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা আছে। যেমন ফিলিপাইন থেকে কাজাখস্তান কিংবা লেবানন, যেখানে অর্ধেক মানুষ একমত হলেও বাকি অর্ধেক কিন্তু একমত নয়। ইরানের মতো শরিয়াহভিত্তিক দেশেরও ৩৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী তাদের নিজের ধর্মকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম মনে করে না। 

সকলকে গুরুত্বের চোখে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এমনি এমনি তৈরি হয় না; এর পেছনে দেশ বা অঞ্চলের ইতিহাস, রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর প্রমাণ হলো লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ, যেমন ব্রাজিল, পেরু বা কলম্বিয়া। সেখানকার গোটা সমাজ খুবই ধর্মপ্রাণ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি সহনশীল। @ রাজু নূরুল


৪৭

ধূমপান হচ্ছে মাদক সেবনের প্রবেশপথ। 

তামাককে বলা হয় প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর প্রধান কারণ। বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ায় নিকোটিন, আর্সেনিক, বেনজিন, ক্যাডমিয়াম, কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড, অ্যামোনিয়াসহ ৭,০০০ ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান রয়েছে। তার মধ্যে ২৫০টি মারাত্মক ক্ষতিকর এবং ৭০টির অধিক শরীরের বিভিন্ন অংশে ক্যান্সার সৃষ্টির জন্য দায়ী। এছাড়া, ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্যে নিকোটিনসহ কয়েক হাজার ক্ষতিকর উপাদান এবং ই-সিগারেতেও নিকোটিন, অ্যাক্রোলেইন, ফরমালিন, বেনজিন, সিসাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘দি টোব্যাকো বডি’ নামক একটি পোস্টারচিত্রে বলা হয়েছে, তামাক শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করে। ধূমপানে ফুসফুস ও মুখগহ্বরের ক্যান্সার, ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদী রোগ (অ্যাজমা, ইমফিসেমা ও ব্রংকাইটিস), হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, বার্জার্স ডিজিজসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী অসংক্রামক রোগ দেখা দেয়। এছাড়া, ধূমপান চোখের সমস্যা, হজমে সমস্যা, কিডনি, লিভার ও পাকস্থলীরও ক্ষতি করে। অন্যদিকে ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্য সেবনে মুখ ও মুখগহ্বর (দাঁত, মাড়ি, জিহ্বা, গলা, স্বরযন্ত্র ইত্যাদি), অগ্ন্যাশয়, খাদ্যনালীসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ক্যান্সার সৃষ্টির প্রধান কারণ; এছাড়া, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। নস্যি ব্যবহারের কারণে নাসিকাগ্রন্থির ক্যান্সার হয়। নিকোটিন মারাত্মক আসক্তিকর এবং নিকোটিন আসক্তি অন্যান্য মাদকের নেশার চাইতে শক্তিশালী।

সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জাতীয়ভিত্তিক গবেষণা গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি মানুষ এসব তামাক পণ্য ব্যবহার করে। দি টোব্যাকো অ্যাটলাস ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ১ লক্ষ ৯৯ হাজারের অধিক মানুষ মারা যায়।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট ও জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনোমিক্স ফর হেলথ-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সরকার সব তামাক থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে; একই সময়ে ৮৭ হাজার কোটি টাকা তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ও পরিবেশজনিত ক্ষতির কারণে অপচয় হয়েছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়। অন্যদিকে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। 

ই-সিগারেটে ফুসফুস ও শ্বাসনালীর ক্ষতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় পৃথিবীর ৪৬টি দেশ ই-সিগারেটের উৎপাদন, বিপণন, বাজারজাতকরণ, প্রচারণা, ব্যবহার ইত্যাদি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। এছাড়া, ৮৬টি দেশ যারা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেনি, সেসব দেশ বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। যেমন: অনেক দেশে ই-সিগারেট চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া কেনা যায় না। অনেক দেশে ১৯ বছর হতে, কোনো কোনো দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক রাজ্যে ২১ বছর বয়সের আগে কেনা যায় না।  

আমাদের মনে রাখতে হবে, তামাক চাষ, চুল্লিতে আগুনের তাপে কাঁচা তামাক পাতা শুকানো, কারখানায় তামাক পণ্য উৎপাদন, ধূমপান বা ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্য সেবন এবং তামাক পণ্যের মোড়ক, বক্স, ফিল্টার, মোথা, রিফিল থেকে সৃষ্ট বর্জ্য—প্রতিটি পর্যায় জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। তামাক পাতার নিকোটিন ও অন্যান্য রাসায়নিক এবং তামাক চাষে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশকের কারণে মাটি, পানি ও বাতাস মারাত্মকভাবে দূষিত হয়।

মাত্র একটি সিগারেট উৎপাদনে ৩.৭ লিটার পানি এবং তামাক চাষে প্রতিবছর বিশ্বে দু’হাজার দু’শত কোটি লিটার পানি ব্যবহার হচ্ছে। তামাক চাষে জড়িত কৃষক ও শ্রমিকগণ শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে প্রতিদিন ৫০টি সিগারেটের সমপরিমাণ নিকোটিন গ্রহণ করে থাকেন। এতে ‘গ্রিন তোব্যাকো সিকনেস’ দেখা দেয়; ফলে অনিদ্রা, খাবারে অনীহা, মাথাব্যথা, ঝিমুনি ভাব, বমি ভাব, চর্মরোগ ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। কৃষি জমিতে তামাক চাষের কারণে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠছে। পৃথিবীর ৯০ ভাগের চেয়েও বেশি ধূমপায়ী ধূমপান শুরু করে টিনএজ বয়সে, যে বয়সে মানুষ দুরন্ত, কৌতূহলী ও বেপরোয়া থাকে। এছাড়া, এ বয়সে তামাকের ক্ষতির ব্যাপকতা সম্পর্কেও সঠিক ধারণা তৈরি হয় না। তাই শিশু-কিশোরদের তামাক কোম্পানির প্রতারণা ও প্রলোভন থেকে সুরক্ষিত করতে হবে।  @ আমিনুল ইসলাম সুজন

৪৮

প্রবীণরা বোঝা নন, তারা দেশের সম্পদ। কর্মজীবনে তাদের যে অভিজ্ঞতা, সেগুলোকে ব্যবহার করার অনেক সুযোগ রয়েছে। শুধু শিক্ষিত মানুষ নয়, গ্রামের একজন প্রবীণ কৃষকের অভিজ্ঞতাও অনেক মূল্যবান।  আমাদের শিশুদের একটি সুন্দর শৈশব দিতে নানা-নানি, দাদা-দাদির ভূমিকা অপরিসীম। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়—যা রাষ্ট্র এবং প্রবীণ ব্যক্তি উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে, তা খুঁজে বের করতে হবে। অনেকেই বয়স, অভিজ্ঞতা এবং সক্ষমতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পেলে নিজেরাই নিজেদের জীবনের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হবেন। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে বয়স্ক ভাতার ওপর তাদের যে নির্ভরশীলতা, তাও অনেক কমে আসবে। অল্প বিনিয়োগেই তাদের এই চাহিদা পূরণ সম্ভব। 

আমরা আমাদের সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটাই এমন করে রেখেছি, যেন একটা বয়সে গিয়ে বাবা-মা সন্তানের ঘাড়ে বোঝা হিসেবে চেপে বসতে বাধ্য হন। সব সন্তানের সামর্থ্য, মন-মানসিকতা এবং বাস্তবতা একরকম থাকে না। তাই মা-বাবার দায়িত্বের ক্ষেত্রে একেকজন একেক রকম আচরণ করেন। কিন্তু সমাজ সেসব বোঝে না, বোঝার চেষ্টাও করে না। মা-বাবার প্রতি যেকোনো অবহেলার ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে সন্তানদের দোষারোপ করে আমরা দারুণ বিনোদন পাই। এই ব্যবস্থা এবং মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। 

‘মা-বাবার ভরণপোষণ আইন’ অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু এই ভরণপোষণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কীভাবে সহযোগিতা করবে, তা সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে, নিজের সুখ ত্যাগ করে ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরি করব, আমার উপার্জনের টাকায় দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরবে, অথচ যখন আমি আর কর্মক্ষম থাকব না, তখন আমার সব দায়িত্ব নেবে আমার সন্তান এবং আমাকে সবসময় তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে, রাষ্ট্রের এক্ষেত্রে কোনো দায়দায়িত্ব থাকবে না—এই মর্যাদাহীন বার্ধক্য কোনো নাগরিকের প্রাপ্য হতে পারে না। আমি চাই না আমার বৃদ্ধ বয়সে আমার ভরণপোষণ করতে করতে আমার সন্তান ক্লান্ত হয়ে যাক। চাই না আমার জন্য তার নিজের সুখ-আনন্দ কিংবা তার সন্তানদের দেওয়ার মতো সময়টুকুতে টান পড়ুক। সবচেয়ে বেশি যা চাই না, তা হলো—আমার সন্তান আমার সেবা ও সুস্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকুক। সন্তান অবশ্যই দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু তার পাশে সহায়ক শক্তি হিসেবে থেকে প্রবীণ ব্যক্তির জন্য একটি আরামদায়ক এবং সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকেও প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে হবে। 

প্রবীণদের সমাজের বোঝা মনে করার মানসিকতা থেকে তাই আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। প্রবীণদের কল্যাণকে সন্তান ও রাষ্ট্রের মধ্যে দায় ঠেলে দেওয়ার বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি যৌথ সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। @ উপমা মাহবুব 


৪৯

জনশ্রুতি ও কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে, চেঙ্গিস খানের কন্যা, যাকে বিভিন্ন সূত্রে ‘তুমেলুন’ নামে উল্লেখ করা হয়, শপথ করেছিলেন: যে নগরীতে তার স্বামী নিহত হয়েছেন, সেই নগরীকে এমনভাবে ধ্বংস করতে হবে যেন সেখানে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব না থাকে। যদিও এই কাহিনির ভাষ্য ও নামের ভিন্নতা আছে, তবুও এর কেন্দ্রে রয়েছে এক নির্মম প্রতিশোধের গল্প, যা ১৩শ শতকের মোঙ্গল অভিযানের প্রকৃতি বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ। 

নিশাপুর ছিল খোয়ারিজম সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নগরী, যা ১২শ ও ১৩শ শতকে পারস্যের (বর্তমান ইরান) অন্যতম সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এটি ছিল কবি, দার্শনিক ও জ্ঞানীদের আবাসস্থল। বিশেষ করে বিখ্যাত পারস্য কবি ও গণিতবিদ ওমর খৈয়ামের নাম এই শহরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শহরটি সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় বাণিজ্যিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

উল্লেখ্য, খোয়ারিজম সাম্রাজ্য ছিল মধ্য এশিয়া ও পারস্য অঞ্চলের একটি শক্তিশালী সুন্নি মুসলিম সাম্রাজ্য। ১১শ শতকের শেষভাগে কুতুবউদ্দিন মুহাম্মদের হাতে এর স্বাধীন যাত্রা শুরু হয়। সুলতান আলাউদ্দিন খোয়ারিজম শাহের আমলে এটি এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ সাম্রাজ্যে পরিণত হলেও, ১২১৯ সালে চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল বাহিনীর আক্রমণে সাম্রাজ্যটির পতন ঘটে।

১২১৯ থেকে ১২২১ সালের মধ্যে চেঙ্গিস খান খোয়ারিজম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিরোধ, বিশেষ করে ওতরার শহরে মঙ্গল বণিকদের হত্যার ঘটনা। এই ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে চেঙ্গিস খান একের পর এক নগরী আক্রমণ করতে থাকেন।

নিশাপুর অবরোধের ক্ষেত্রে মোঙ্গল সেনাপতি তোগাচার বা তোকুচার নেতৃত্ব দেন। শহরটি অবরোধ করে রাখার সময় শহর প্রতিরক্ষাবাহিনীর নিক্ষিপ্ত এক তীরে তিনি নিহত হন। তার মৃত্যু মোঙ্গলদের মধ্যে তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা সৃষ্টি করে।

তোগাচার ছিলেন চেঙ্গিস খানের কন্যা তুমেলুনের স্বামী। তার মৃত্যুর সংবাদ শোনামাত্র তুমেলুন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তিনি তার পিতাকে বলেন, “বাবা, আমি এ নগরীর বিনাশ চাই। যে নগরীর জন্য আমার স্বামী মারা গেল, সে নগরীকে চিরদিনের জন্য বিরানভূমি করে দিতে হবে।”

চেঙ্গিস খান তার পুত্র তোলুই খানকে নির্দেশ দেন নিশাপুরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার। তোলুই ছিলেন চেঙ্গিস খানের চতুর্থ পুত্র এবং মোঙ্গল সাম্রাজ্যের একজন দক্ষ সেনাপতি। বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে তিনি নিশাপুর অভিমুখে যাত্রা করেন এবং শহরটি ঘেরাও করেন।

নিশাপুরের শাসনকর্তা শরাফ আল-দিন আমির মজলিশ এই বিপদ বুঝতে পেরে একজন দূত পাঠান তোলুইয়ের কাছে। তিনি নগরীর পক্ষ থেকে দয়া ও সন্ধির আবেদন জানিয়েছিলেন। শর্ত সাপেক্ষে কর দিতেও রাজি হয়েছিলেন।

কিন্তু তোলুইয়ের উত্তর ছিল নির্মম: তোগাচারের রক্তের মূল্য দিতে হবে নগরবাসীকে। এমনকি সেই দূতকেও ফিরে যেতে দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত মোঙ্গলরা নগরের প্রাচীর ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং শরাফ আল-দিনকে হত্যা করে।

এরপর যা ঘটেছিল, তা ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যাগুলোর একটি। নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ—কাউকেই বাঁচানো হয়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, এমনকি গৃহপালিত জন্তু—কুকুর, বেড়াল পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। নগরের বাইরে নিহতদের মাথা আলাদাভাবে তিনটি বিশাল পিরামিডের আকারে সাজানো হয়েছিল—পুরুষের মাথা, নারীর মাথা ও শিশুদের মাথা দিয়ে। কথিত আছে, ধ্বংসস্তূপের ওপর বার্লি ও লবণ ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে নতুন কোনো উদ্ভিদ জন্মাতে না পারে এবং আর কখনও এই ভূমিতে নতুন বসতি গড়ে না ওঠে। তুমেলুন সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়েছিলেন, যা ছিল তার প্রতিশোধের চূড়ান্ত প্রকাশ। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, এই ধ্বংসযজ্ঞে প্রায় ১৭ লাখ ৪৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।

নিশাপুরের ধ্বংসের ফলে শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওমর খৈয়ামের সমাধিও এই ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তীকালে তার কবর পুনর্নির্ধারণ ও পুনর্নির্মাণ করা হয়। আধুনিক ইরানে নিশাপুরে খৈয়ামের একটি স্মারক সমাধি ও জাদুঘর রয়েছে, যেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক উপকরণ সংরক্ষিত আছে।

এই ঘটনার মূল শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে প্রতিশোধ রাষ্ট্রীয় নীতি হয়ে ওঠে, সেখানে ধ্বংস কোনো সীমা মানে না। এ ঘটনাটি ইতিহাসের এক বড় প্রশ্নও তুলে ধরে—প্রতিশোধের আগুনে আসলে কী শেষ হয়? তুমেলুন কি সত্যিই স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পেরেছিলেন? সম্ভবত না। কারণ তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছিল এক যুদ্ধে, যা ছিল যুদ্ধেরই অনিবার্য পরিণতি। কিন্তু তার বদলে তিনি যে গণহত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাতে অসংখ্য নির্দোষ মানুষের প্রাণ গিয়েছে। প্রতিশোধ কখনো শোককে নিরাময় করে না, বরং আরও শোকের জন্ম দেয়। আজকের বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালেও আমরা একই প্রতিশোধের দুষ্টচক্র দেখতে পাই। এই ধারাবাহিকতা একটি প্রশ্ন সামনে আনে—রাজনীতি কি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের নাম, নাকি এটি প্রতিশোধের চক্রে আটকে থাকা এক অবিরাম পুনরাবৃত্তি?  রাজনৈতিক প্রতিশোধের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটি একসময় চলমান প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। এক পক্ষ প্রতিশোধ নিলে অন্য পক্ষ পাল্টা প্রতিশোধে নামে, এবং এই চক্র চলতেই থাকে। এর ফলে রাষ্ট্র একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থার পরিবর্তে অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় আটকে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও অনেকটাই প্রতিশোধ আর পাল্টা প্রতিশোধের এই চক্রে বন্দি।  @ চিররঞ্জন সরকার


৫০

উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপজুড়ে ইহুদি-বিদ্বেষের (পশ্চিমা পরিভাষায় অ্যান্টিসেমিটিজম) ঢেউ যখন তীব্র হচ্ছিল, তখন একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন ইহুদি বুদ্ধিজীবী মহলে জরুরি হয়ে উঠল: ইউরোপের ইহুদিরা কি কোনো দিন নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে রাজনৈতিক মতবাদের জন্ম হয়, তার নাম জায়নবাদ। শব্দটি এসেছে জেরুজালেমের একটি পাহাড়ের নাম 'জায়ন' থেকে, যা ইহুদি ধর্মীয় কল্পনায় প্রতিশ্রুত ভূমির প্রতীক। জায়নবাদ মূলত এই ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে বিশ্বের ইহুদিরা একটি জাতি এবং এই জাতির জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রয়োজন। জায়নবাদের মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো 'ইহুদি জাতিসত্তার' ধারণা, অর্থাৎ বিশ্বের যেখানেই ইহুদিরা বসবাস করুক না কেন, তারা একটি একক জাতি। এ ধারণা ঐতিহ্যগত ধর্মীয় পরিচয়কে একটি আধুনিক জাতীয়তাবাদী কাঠামোতে রূপান্তরিত করে। উনিশ শতকের ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের ঢেউয়ে যখন বিভিন্ন জাতি নিজস্ব রাষ্ট্র দাবি করছিল, ইহুদি চিন্তাবিদরাও সেই একই যুক্তিকাঠামো ব্যবহার করে ‘ইহুদি জাতির’ জন্য রাষ্ট্র দাবি করতে শুরু করেন। 

ফিলিস্তিনি-আমেরিকান চিন্তাবিদ এডওয়ার্ড সাইদ (১৯৩৫–২০০৩) তার ‘The Question of Palestine’ গ্রন্থে যুক্তি দেন যে জায়নবাদ মূলত একটি ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী প্রকল্প, যা আরেকটি জাতির ঐতিহাসিক ভূমিতে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। তার বিখ্যাত 'Orientalism' তত্ত্বের আলোকে তিনি দেখান কীভাবে পশ্চিমা ডিসকোর্সে ফিলিস্তিনিদের অনুপস্থিত, অপ্রাসঙ্গিক বা প্রান্তিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্যান-আরব জাতীয়তাবাদীরা ঐতিহাসিকভাবে যুক্তি দিয়েছেন যে ১৯৪৮ সালের 'নাকবা' (মহাবিপর্যয়)—যেখানে সাত লক্ষেরও বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন—জায়নবাদের অনিবার্য পরিণতি। 

ইহুদি জায়নবাদ-বিরোধী ধারা দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত। প্রথমত, ধর্মীয় জায়গা থেকে জায়নবাদ-বিরোধিতা: নেচুরেই কার্তা (Neturei Karta)-সহ বিভিন্ন অতি-অর্থোডক্স ইহুদি গোষ্ঠী মনে করে যে মানবিক রাজনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ধর্মীয়ভাবে অবৈধ। তাদের বিশ্বাস, ইহুদিদের 'গালুত' বা নির্বাসন ঈশ্বরের ইচ্ছার অংশ এবং কেবল মশিহের আগমনের মাধ্যমেই সেই নির্বাসনের অবসান ঘটবে। জায়নবাদকে তারা ঐশ্বরিক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে মানবিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখেন। দ্বিতীয়ত, সেক্যুলার ইহুদিদের সমালোচনা: ভাষাবিদ ও রাজনৈতিক দার্শনিক নোম চমস্কি দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েলের সম্প্রসারণ নীতির সমালোচনা করেছেন, যদিও তিনি ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন না। ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইলান পাপে তার ‘The Ethnic Cleansing of Palestine’ গ্রন্থে নথিভিত্তিক যুক্তি দিয়েছেন যে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি জনগণের বাস্তুচ্যুতি দুর্ঘটনা ছিল না, এটি ছিল পরিকল্পিত। এই 'নিউ হিস্টোরিয়ান' ধারার ইতিহাসবিদরা ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার জায়নবাদী আখ্যানের বাইরে গিয়ে ঘটনাপ্রবাহকে নতুনভাবে পাঠ করেছেন। 

জায়নবাদকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উনিশ ও বিশ শতকে উদ্ভূত ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এর তাত্ত্বিক কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হিন্দুত্ববাদ এবং ব্রিটিশ ভারতে জন্ম নেওয়া মুসলিম জাতীয়তাবাদের সঙ্গে জায়নবাদের কিছু গভীর কাঠামোগত মিল এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ভিনায়ক দামোদর সাভারকার (১৮৮৩–১৯৬৬), যিনি 'হিন্দুত্ব' ধারণার প্রবক্তা, তিনি হিন্দুদের একটি জাতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন যাদের পিতৃভূমি ও পুণ্যভূমি উভয়ই ভারতবর্ষ। মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ এবং মুসলিম লিগের দ্বি-জাতি তত্ত্ব (Two-Nation Theory) অনুযায়ী, ব্রিটিশ ভারতের মুসলিমরা হিন্দুদের থেকে আলাদা একটি জাতি, কারণ তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন ভিন্ন। জায়নবাদীরাও ঠিক এভাবে দেখেন যে বিশ্বের ইহুদিরা, তারা যে দেশেই বসবাস করুক, একটি পৃথক জাতি।  

জায়নবাদ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদ উভয়ই বিশ শতকের প্রথমার্ধে পরিপক্ব হয়েছে এবং উভয়ই প্রায় একই সময়ে—১৯৪৭-৪৮ সালে—রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সফল হয়েছে। পাকিস্তান ও ইসরায়েল উভয়ই এমন রাষ্ট্র যার জন্ম হয়েছে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে। উভয় রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছিল: ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হলেও, রাষ্ট্রটি পরিচালিত হবে সেক্যুলার, অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ নীতিতে। হিন্দুত্ববাদ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদ উভয়ই এমন একটি ভূখণ্ডে জন্ম নিয়েছে যেখানে সংশ্লিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা শতাব্দী ধরে বসবাস করছেন। কিন্তু জায়নবাদ মূলত একটি diaspora আন্দোলন—ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি জনগোষ্ঠী এমন একটি ভূখণ্ডে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে যেখানে তখন অন্য একটি জনগোষ্ঠী—ফিলিস্তিনি আরবরা—বসবাস করছিল।  

জায়নবাদ একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক রাজনৈতিক মতবাদ। এটি একদিকে ইউরোপীয় ইহুদি-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম নিয়েছিল, অন্যদিকে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। হিন্দুত্ববাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তুলনায় দেখা যায় যে ধর্মভিত্তিক জাতি-কল্পনা উনিশ ও বিশ শতকের বৈশ্বিক রাজনীতিতে একটি পুনরাবৃত্তিমূলক প্রবণতা।  @ সাঈদ ইফতেখার আহমেদ