মিনিমালিস্ট বা পরিমিতিবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা আলাদা হলেও, বেশিরভাগ মিনিমালিস্টরাই সাধারণত যে ১৫টি জিনিস কেনা বা রাখা এড়িয়ে চলেন, তা এখানে দেওয়া হলো:

​১. শো-পিস এবং অপ্রয়োজনীয় ঘর সাজানোর জিনিস:

অনেকে ঘরের প্রতিটি কোণ ছোটখাটো শো-পিস বা সাজসজ্জার জিনিস দিয়ে ভরিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। কিন্তু মিনিমালিস্টরা ঘরের এই হিজিবিজি পরিবেশ এড়িয়ে চলেন। তারা অনেকগুলো ছবির ফ্রেম বা পুতুলের চেয়ে ঘরের টেবিলে একটি তাজা ফুলের ফুলদানি রাখতে বেশি পছন্দ করেন। এর ফলে ঘর যেমন শান্ত ও গোছানো দেখায়, তেমনি ঘর পরিষ্কার করা ও ধুলাবালি মোছাও অনেক সহজ হয়।

​২. ফাস্ট ফ্যাশন (সস্তা ও ট্রেন্ডি পোশাক):

আজকাল সস্তা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল ট্রেন্ডের পোশাক বা 'ফাস্ট ফ্যাশন' খুব জনপ্রিয়। কিন্তু এগুলো যেমন টেকসই হয় না, তেমনি আলমারিতে কাপড়ের স্তূপ বাড়িয়ে তোলে। মিনিমালিস্টরা কম কিন্তু মানসম্মত ও ক্লাসিক পোশাক কেনেন, যা অনেক বছর ধরে পরা যায়। অনেকে পরিবেশ ও অর্থ সাশ্রয়ের জন্য সেকেন্ড-হ্যান্ড বা পুরোনো কাপড়ের দোকান থেকেও পোশাক কেনেন। তারা সংখ্যার চেয়ে কাপড়ের গুণের ওপর জোর দেন।

​৩. অতিরিক্ত জুতো:

ফ্যাশন পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতিবার নতুন জুতো কেনার অভ্যাস মিনিমালিস্টদের নেই। তারা অপ্রয়োজনীয় বা ফিট না হওয়া জুতো বাদ দিয়ে তাদের প্রিয় এবং আরামদায়ক কয়েকটি জুটিই ব্যবহার করেন।

​৪. ফিজিক্যাল মিডিয়া (সিডি, ডিভিডি বা কাগজের বই):

আগেকার দিনে সিডি, ডিভিডি, ক্যাসেট বা বইয়ের জন্য ঘরে আলাদা আসবাবপত্র লাগতো। এখন স্ট্রিমিং সার্ভিস ও ই-বুকের (যেমন কিন্ডল) কল্যাণে একটি মাত্র ক্লিকেই সবকিছু ফোনে বা কম্পিউটারে দেখা ও পড়া যায়। তাই মিনিমালিস্টরা ঘর ফাঁকা রাখতে ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহার করেন এবং ফিজিক্যাল মিডিয়া কেনা বাদ দেন।

​৫. শুধু একটি কাজের জন্য তৈরি রান্নাঘরের গ্যাজেট:

বাজারে রসুন কুচি করার, আপেল কাটার বা অ্যাভোকাডো কাটার জন্য আলাদা আলাদা গ্যাজেট পাওয়া যায়। কিন্তু মিনিমালিস্টরা মনে করেন, একটি ভালো চপার বা ছুরি দিয়েই এসব কাজ করা সম্ভব। তাই তারা রান্নাঘরের ড্রয়ার বা ক্যাবিনেট হাবিজাবি গ্যাজেট দিয়ে না ভরে বহুমাত্রিক ও প্রয়োজনীয় কিছু বাসনকোসন ও হাঁড়ি-পাতিল রাখেন।

​৬. একই জিনিসের একাধিক কপি (ডুপ্লিকেট জিনিস):

অনেকে ঘরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জিনিস জমিয়ে রাখেন—যেমন ১০টি অতিরিক্ত তোয়ালে, ৬ সেট বিছানার চাদর, বা আলমারিতে গাদা গাদা জিন্স প্যান্ট। মিনিমালিস্টরা এই অভ্যাস এড়িয়ে চলেন। তারা অল্প কিছু ভালো মানের জিনিস রাখেন, যা তাদের পুরো সপ্তাহের প্রয়োজন মিটিয়ে দেয়।

​৭. হরেক রকমের ঘর পরিষ্কারের সামগ্রী:

বাজারের একেকটি বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয় যে মেঝে, কাচ, বেসিন বা চুলার জন্য আলাদা আলাদা লিকুইড বা স্প্রে লাগবে। মিনিমালিস্টরা এই ফাঁদে পা দেন না। তারা বহুমুখী কাজে ব্যবহার করা যায় এমন অল্প কিছু কার্যকরী ক্লিনার ব্যবহার করেন।

​৮. প্রতিটি ভ্রমণের পর স্যুভেনির (স্মারক):

মিনিমালিস্টরা জিনিসপত্র জমানোর চেয়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে বেশি মূল্য দেন। তারা ঘুরতে গিয়ে ঘর সাজানোর শো-পিস বা স্যুভেনির কিনে ব্যাগ ভারী করেন না। ছবি তোলার মাধ্যমেই তারা স্মৃতি ধরে রাখেন। যদি কিছু কিনতেই হয়, তবে তারা খাওয়ার জিনিস বা ব্যবহার্য জিনিস কেনেন, যা শো-পিস হিসেবে ধুলাবালি জমাবে না।

​৯. হুটহাট কেনাকাটা (Impulse Purchases):

ডিসকাউন্ট বা সেল দেখে হুট করে কোনো কিছু কিনে ফেলা মিনিমালিস্টদের স্বভাব নয়। তারা যেকোনো কিছু কেনার আগে ভালোমতো চিন্তা করেন এবং অনেক সময় কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছুদিন অপেক্ষা করেন। এতে অযথা টাকা নষ্ট হয় না এবং অনুশোচনাও করতে হয় না।

​১০. সাধারণ বা প্রথাগত উপহার:

যেহেতু তারা নিজেরা ঘরে জিনিসপত্রের স্তূপ পছন্দ করেন না, তাই অন্য কাউকে উপহার দেওয়ার সময়ও তারা সচেতন থাকেন। তারা শো-পিস বা ডেকোরেশনের জিনিস উপহার না দিয়ে এমন কিছু দেন যা ব্যবহার করে শেষ করা যায় (যেমন খাবার, পারফিউম) অথবা কোনো সুন্দর অভিজ্ঞতা (যেমন কোনো কনসার্টের টিকিট বা রেস্টুরেন্টের ভাউচার) উপহার দেন।

​১১. অতিরিক্ত স্কিনকেয়ার এবং বিউটি প্রোডাক্ট:

সোশ্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সারদের প্ররোচনায় পড়ে মিনিমালিস্টরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রূপচর্চার সামগ্রী কেনেন না। তারা কেবল তাদের ত্বকের সাথে মানানসই ও প্রয়োজনীয় কয়েকটি পণ্যই ব্যবহার করেন। কোনো পণ্য পছন্দ না হলে তারা তা জমিয়ে না রেখে অন্যকে দিয়ে দেন বা ফেলে দেন।

​১২. একবার ব্যবহারযোগ্য জিনিস:

টিস্যু পেপার, প্লাস্টিকের চামচ, কাগজের প্লেট, বা প্লাস্টিকের পানির বোতলের মতো একবার ব্যবহারযোগ্য জিনিসের ব্যবহার মিনিমালিস্টরা যথাসম্ভব কমিয়ে দেন। তারা পরিবেশবান্ধব ও বারবার ব্যবহার করা যায় এমন কাপড় বা পাত্র ব্যবহার করেন, যা অপচয় ও খরচ দুই-ই কমায়।

​১৩. বাড়তি স্টোরেজ বক্স বা কন্টেইনার:

ঘর গোছানোর জন্য অনেকে প্লাস্টিকের সুন্দর সুন্দর বাক্স বা কন্টেইনার কেনেন। কিন্তু মিনিমালিস্টরা মনে করেন, জিনিসপত্র কমানো ছাড়া ঘর গোছানো সম্ভব নয়। তারা আগে অপ্রয়োজনীয় জিনিস ঘর থেকে বিদায় করেন, যার ফলে বাড়তি বাক্স কেনার আর প্রয়োজনই পড়ে না।

​১৪. ফ্রি বা বিনামূল্যে পাওয়া জিনিসপত্র গ্রহণে সতর্কতা:

যেকোনো জিনিস ঘরে আনা মানেই সেটির পেছনে সময় ও শক্তি ব্যয় করা। তাই মিনিমালিস্টরা বিনামূল্যে কোনো জিনিস পেলেই তা ঘরে নিয়ে আসেন না। তারা নিশ্চিত হন যে জিনিসটি আসলেই তাদের কাজে লাগবে কিনা, তবেই তা গ্রহণ করেন।

​১৫. স্টোরেজ ইউনিট ভাড়া নেওয়া:

মিনিমালিস্টদের যেহেতু প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস থাকে না, তাই তাদের ঘরের বাইরে আলাদা কোনো গুদাম বা স্টোরেজ ইউনিট ভাড়া নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এতে তাদের অনেক টাকা সাশ্রয় হয়।

​•

মিনিমালিজম বা সহজ জীবনযাপনের মূল কথা হলো—আপনি যা-ই কিনুন না কেন, তা যেন সচেতনভাবে এবং বুঝেশুনে কেনা হয়। এটি কেবল আপনার টাকাই বাঁচাবে না, বরং আপনার ঘর ও জীবনকে রাখবে একদম চাপমুক্ত ও গোছানো।



2


সঙ্গীত কেন এত মানুষকে আকর্ষণ করে? পছন্দের সঙ্গীত কেন মানসিক চাপ কমায়?

মানুষের জোট বেঁধে সভ্যতা তৈরি পেছনে সঙ্গীত, অর্থাৎ সুর, তাল, ছন্দ, লয়ের (rhythm, tempo/pace) খুব বড় ভূমিকা আছে। মানুষের বিবর্তনে সঙ্গীত ছিল আদিম মানুষের টিকে থাকা এবং সমাজ গঠনের একটি শক্তিশালী ‘সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র’। সুর ও ছন্দের মাধ্যমে আদি মানবগোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে ঐক্য, সুরক্ষা ও শক্তিকে সুদৃঢ় করেছিল।

সঙ্গীত আমাদের স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে, পছন্দের সুর মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক 'ফিল-গুড' হরমোন বাড়ায় এবং স্ট্রেস হরমোন (যেমন- কর্টিসোল) কমায়, ফলে হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস ধীর হয়ে শরীর ও মন শিথিল হয়।

আদিমানব সমাজে সুর, ছন্দ ও দলবদ্ধ গান বা নাচের তাল গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও একতা বাড়াতে সাহায্য করছিল, যা দলবদ্ধভাবে বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য ছিল, এবং এটা সমানভাবে প্রযোজ্য।

ভাষা উদ্ভবের বহু আগে আদি মানুষেরা বিভিন্ন সুর ও ছন্দের মাধ্যমে বিপদ, আনন্দ বা শোকের আবেগ প্রকাশ করত, তাই সুরের এই আদিম সংযোগ আজও আমাদের অবচেতন মনে স্বস্তি দেয়। প্রকৃতির বিভিন্ন ছন্দ (যেমন- নদীর স্রোত, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ বা হৃদস্পন্দন) মানুষের বেঁচে থাকার সাথে যুক্ত। সুর ও ছন্দের লয় আমাদের মস্তিষ্ককে সেই স্বস্তিদায়ক প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা মনে করিয়ে দিয়ে নিরাপদ বোধ করায়। প্রকৃতিতে শান্ত ও ছন্দোবদ্ধ সুর সাধারণত কোনো বিপদের অনুপস্থিতি এবং নিরাপদ পরিবেশ নির্দেশ করে, তাই শান্ত সঙ্গীত শুনলে মস্তিষ্ক বিশ্রাম নেওয়ার সিগন্যাল পায়।

পূর্ণাঙ্গ ভাষা আবিষ্কারের আগে আদিম মানুষেরা সুর ও ছন্দের (যেমন: হাঁক দেওয়া বা ছন্দোবদ্ধ আওয়াজ) মাধ্যমে বিপদের সংকেত আদান-প্রদান করত এবং নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করত।

আবার বিবর্তনীয় গবেষকদের মতে, আদিম মানুষেরা দলবদ্ধভাবে জোরে গান গাওয়া, ড্রাম বাজানো এবং ছন্দবদ্ধ শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে হিংস্র প্রাণীদের দূরে রাখার চেষ্টা করত এবং নিজেদের এলাকা সুরক্ষিত রাখত। গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে দৃঢ় আত্মিক ও সামাজিক বন্ধন তৈরি করতে সঙ্গীত বা সমবেত সুর খুব বড় ভূমিকা পালন করে এবং দলের ঐক্য বাড়াতে সাহায্য করে। দলবদ্ধ কাজের সময় ছন্দবদ্ধ গান ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করত এবং মানসিক প্রশান্তি ও প্রেরণা জোগাত।

এভাবেই সঙ্গীত আদিম মানবকে টিকে থাকার লড়াইয়ে (Survival of the Fittest) জয়ী হতে সাহায্য করেছিল।

গবেষণা বলে যে সঙ্গীত হোমো স্যাপিয়েন্স মানুষের টিকে থাকার ক্ষেত্রে নিয়ান্ডারথালদের তুলনায় একটি নির্ণায়ক কৌশলগত সুবিধা প্রদান করেছিল, গবেষক নিকোলাস কনার্ড এবং তার সহকর্মীদের মতে, সঙ্গীত কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং এটি হোমো স্যাপিয়েন্স মানুষের জনসংখ্যাগত বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

হোমো স্যাপিয়েন্সদের সঙ্গীত চর্চা সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি করেছিল এবং বৃহত্তর সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সাহায্য করেছিল, আধুনিক মানুষদের একে অপরের সাথে যুক্ত হতে এবং একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী তৈরি করতে সাহায্য করেছিল, বিপরীতে নিয়ান্ডারথালরা ছোট এবং বিচ্ছিন্ন দলে বাস করত, ফলে তারা বেশি অসহায় ছিল।

মানব বিবর্তনে সঙ্গীতকে এক প্রকার "জনসংখ্যাগত বিজয়ের অস্ত্র" (weapon of demographic conquest) হিসেবে দেখা যেতে পারে।

সঙ্গীতের মাধ্যমে মানুষ দূরবর্তী এলাকাগুলোতেও নিজেদের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করতে পারত এবং অপরিচিতদের দ্রুত বিশ্বাস করতে শিখত । এই "সামাজিক প্রযুক্তি" ব্যবহার করে তারা উপজাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে নিজেদের আচরণকে একই সূত্রে গাঁথতে পারত, যা তাদের দ্রুত বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করেছিল। বিপরীতে নিয়ান্ডারথালরা সঙ্গীতে দক্ষ না হওয়ায় তাদের সামাজিক কাঠামো ছিল সীমিত।

সঙ্গীতের মাধ্যমে তৈরি হওয়া হোমো স্যাপিয়েন্সদের এই সংহতি বা ঐক্য কঠোর শীত, শিকারি প্রাণীর আক্রমণ এবং অনাহারের মতো অনিশ্চিত পরিস্থিতিতেও জোটবদ্ধ থাকতে সাহায্য করেছিল, বলা যায় সঙ্গীত গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে এমন এক ধরনের একতা তৈরি করত যা তাদের জীবনধারণের লড়াইয়ে শক্তি জোগাত।

হোমো স্যাপিয়েন্স মানুষ যখন তাদের হাড়ের বাঁশি এবং সম্মিলিত গান নিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করে, তার ১০,০০০ বছরের মধ্যেই নিয়ান্ডারথালরা বিলুপ্ত হয়ে যায়। সঙ্গীতের মাধ্যমে তৈরি হওয়া শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন আধুনিক মানুষকে এমন এক সাংগঠনিক শক্তি দিয়েছিল যা নিয়ান্ডারথালদের ছিলনা।প্রত্নতাত্ত্বিক উইল রসের মতে, সঙ্গীতের সম্মিলিত চর্চা আধুনিক মানুষকে অনেক বড় সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি করতে সাহায্য করেছিল।

ডায়াটনিক স্কেল -

আমরা আমাদের জীবনে বর্তমানে সচরাচর যে ধরনের সঙ্গীত শুনি, তার প্রায় সবকিছুর মূলে বা কাঠামোতে রয়েছে এই ডায়াটনিক স্কেল, ডায়াটোনিক স্কেল হলসুরের সাতটি মাত্রা। এই ডায়াটনিক স্কেলটি এতটাই মৌলিক যে এর অস্তিত্ব অন্তত ৫০,০০০ বছর আগেও পাওয়া গেছে, স্লোভেনিয়ার ডিজবে বাবে (Divje Babe) গুহায় নিয়ান্ডারথালদের তৈরি যে হাড়ের বাঁশিটি পাওয়া গেছে, তার ছিদ্রগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত ছিল যা থেকে নির্গত সুর আধুনিক ডায়াটনিক স্কেলের নোটগুলোর সাথে হুবহু মিলে যায়।

এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক সঙ্গীতের এই গাণিতিক বা সুরের কাঠামো কোনো আধুনিক উদ্ভাবন নয়; বরং এটি এমন একটি বিষয় যা কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষের (এমনকি নিয়ান্ডারথালদেরও) শ্রবণেন্দ্রিয় ও মস্তিষ্কের সাথে মিশে আছে।

সংক্ষেপে বলা যায়, সঙ্গীত হোমো স্যাপিয়েন্স মানুষদের স্নায়ুতন্ত্রে এমন এক ধরনের সংহতি ও উদ্দীপনা তৈরি করেছিল যা তাদের বৃহত্তর দলে কাজ করতে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে সফলতা অর্জন করতে সহায়তা করেছিল।

@ Alok Śrabak 

#বিজ্ঞানকথা #বিবর্তন #বিজ্ঞান #জীববিজ্ঞান

তথ্যসূত্র:

Music. Cognitive Function, Origin, And Evolution of Musical Emotions". Webmed Central

Neurobiology: Music, maestro, please!". Nature

Carroll, Joseph (1998). "Steven Pinker's Cheesecake for the Mind". Cogweb.ucla.edu. Retrieved 29 December 2012.



3

 শব্দেরও একটি নৈতিকতা আছে। যে শব্দ মানুষকে সম্মান দিতে শেখায়, সে শব্দ সভ্যতার ভিত নির্মাণ করে। আর যে শব্দ মানুষকে অপমান করে, বিদ্বেষ ছড়ায়, কুরুচিকে উৎসাহ দেয়, সে শব্দ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।  

আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে যুক্তির চেয়ে গালাগালির বাজার বড়, চিন্তার চেয়ে চিৎকারের মূল্য বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম , সেখানে ভিন্নমত মানেই শত্রু, প্রতিবাদ মানেই ব্যক্তিগত আক্রমণ, আর অশ্লীলতাকেই অনেকে সাহসের প্রতীক বলে মনে করে।  

নোংরা কথার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি ধীরে ধীরে মানুষের বিবেককে অসাড় করে দেয়। যে মানুষ প্রতিদিন অশ্লীলতা উচ্চারণ করে, একসময় সে অশ্লীলতাকেই স্বাভাবিক বলে মনে করতে শুরু করে। তখন ভাষার অবক্ষয় থেকে জন্ম নেয় আচরণের অবক্ষয়, আর আচরণের অবক্ষয় থেকেই সমাজে বাড়ে হিংসা, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা। একটি নোংরা বাক্য শুধু একজন মানুষকে অপমান করে না; তা একটি পরিবারের মূল্যবোধ, একটি সমাজের সংস্কৃতি এবং রুচিবোধকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। 

আজ পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই; অভাব সৌজন্যের। শিক্ষার অভাব নেই; অভাব সংস্কৃতির। মতের অভাব নেই; অভাব মত প্রকাশের শালীনতার। আজ নোংরা কথার বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু অশ্লীল শব্দের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়; এটি মানুষের মানবিকতা, সহিষ্ণুতা এবং সভ্যতার পক্ষে দাঁড়ানোর সংগ্রাম। সভ্য মানুষ কখনও সত্য বলতে ভয় পায় না, কিন্তু সেই সত্য প্রকাশের ভাষা বেছে নেয়। ভদ্রতা দুর্বলতার পরিচয় নয়; এটি আত্মসংযমের শক্তি। যে নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে নিজের ক্রোধ, অহংকার বা বিদ্বেষকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ভাষার স্বাধীনতা নয়, ভাষার দায়িত্ববোধ। কারণ স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন তার সঙ্গে শালীনতা, সহনশীলতা ও মানবিকতা যুক্ত থাকে। মতের অমিল থাকতেই পারে; কিন্তু সেই অমিল যদি নোংরা কথায় প্রকাশ পায়, তবে তা আর মতপ্রকাশ নয় তা কেবল নিজের রুচিহীনতার প্রকাশ।

শেষ পর্যন্ত নোংরা কথা কখনও কাউকে বড় করে না। বরং তা বক্তার শিক্ষা, সংস্কৃতি, রুচি ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এমন সব প্রশ্ন তুলে দেয়, যার উত্তর কোনো যুক্তি দিয়ে মুছে ফেলা যায় না। মানুষ তার সম্পদ দিয়ে নয়, ক্ষমতা দিয়ে নয়, ভাষা দিয়েই সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকে। তাই আমাদের মনে রাখা উচিত শব্দেরও একটি নৈতিকতা আছে। শব্দ দিয়ে যেমন হৃদয় জয় করা যায়, তেমনি শব্দ দিয়েই সভ্যতার ভিত্তি ভেঙে ফেলা যায়।

নোংরা ভাষা তাই কেবল কানের জন্য অস্বস্তিকর নয়; এটি সমাজের আত্মার ওপরও এক নীরব আঘাত। আর যে সমাজ তার ভাষাকে শুদ্ধ রাখতে পারে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে সভ্য, সংস্কৃতিমান এবং মানবিক। @সংগৃহীত

4


ইথিলিনের রহস্য: কলার বোঁটা মুড়ে রাখলে কেন পচন থামে?

শুরুটা হোক একটা পরিচিত দৃশ্য দিয়ে।

বাজার থেকে এক কাঁদি কলা কিনে আনার পর প্রায় প্রত্যেক ঘরেই একটা চেনা সমস্যা দেখা দেয় — দুই-তিন দিনের মধ্যেই কলাগুলো অতিরিক্ত পেকে কালচে হয়ে যায়, নরম হয়ে পচতে শুরু করে। অথচ পাশের বাসায় একই বাজার থেকে কেনা কলা পাঁচ-ছয়দিন পরও দিব্যি সতেজ! রহস্যটা কোথায়?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে একটি ছোট্ট, চোখে দেখা যায় না এমন গ্যাসে-ইথিলিন (Ethylene)। আর এর সমাধানও অবিশ্বাস্য রকম সহজ: কলার কাঁদির বোঁটা বা মাথার অংশটুকু প্লাস্টিক দিয়ে শক্ত করে মুড়ে রাখা। এই ছোট্ট কাজটির পেছনে রয়েছে সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত একটি ব্যাখ্যা।

**ইথিলিন কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

ইথিলিন হলো সবচেয়ে সরল গঠনের একটি জৈব যৌগ, যার রাসায়নিক সংকেত C₂H₄। দুটি কার্বন পরমাণুর মধ্যে একটি দ্বিবন্ধন (double bond) এবং প্রতিটি কার্বনের সাথে দুটি করে হাইড্রোজেন পরমাণু যুক্ত থাকে। গঠনে সরল হলেও উদ্ভিদজগতে এর প্রভাব বিশাল — একেই বলা হয় 'রাইপেনিং হরমোন' বা পক্বতাদায়ক হরমোন।

ফল যখন পরিপক্ব হতে শুরু করে, তখন ফলের কোষ নিজেই স্বল্প পরিমাণে ইথিলিন গ্যাস তৈরি করে। এই গ্যাস ফলের ভেতরে একটি জৈবরাসায়নিক শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া (biochemical chain reaction) শুরু করে দেয়:

**শ্বসন হার বৃদ্ধিঃ ইথিলিন ফলের শ্বসন প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করে, যার ফলে সঞ্চিত শর্করা দ্রুত ভেঙে শক্তি নির্গত হয়।

**স্টার্চ থেকে চিনিতে রূপান্তরঃ কাঁচা কলার শ্বেতসার (স্টার্চ) ভেঙে সহজ শর্করায় পরিণত হয়, যার ফলে কলা মিষ্টি হয়ে ওঠে।

**ক্লোরোফিল ভাঙনঃ সবুজ রঙের জন্য দায়ী ক্লোরোফিল ভেঙে যায়, ফলে খোসার রং হলুদ থেকে বাদামি হতে থাকে।

**কোষপ্রাচীর নরমকরণঃ পেকটিন নামক যৌগ ভেঙে ফলের কোষপ্রাচীর নরম হয়ে যায়, যার ফলে কলা নরম হয়ে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইথিলিন একটি স্বয়ংক্রিয়-উদ্দীপক হরমোন- অর্থাৎ সামান্য ইথিলিন তৈরি হলে তা আরও বেশি ইথিলিন উৎপাদনে উদ্দীপনা যোগায়। এই কারণেই একবার পাকা শুরু হলে তা দ্রুত ত্বরান্বিত হতে থাকে।

**কলার বোঁটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

কলার সবচেয়ে বেশি ইথিলিন উৎপন্ন হয় এর বোঁটা বা কাঁদির সংযোগস্থল থেকে। এই অংশে কোষবিভাজন ও বিপাকীয় কার্যকলাপ সবচেয়ে সক্রিয় থাকে বলে এখান থেকেই সবচেয়ে বেশি ইথিলিন গ্যাস নির্গত হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।

যখন এই বোঁটার অংশ খোলা থাকে, তখন উৎপন্ন ইথিলিন সহজেই বাতাসে মিশে যায় এবং পুরো কাঁদির প্রতিটি কলাকেই দ্রুত পাকিয়ে ফেলে। কিন্তু বোঁটার অংশটুকু প্লাস্টিক দিয়ে শক্ত করে মুড়ে দিলে কী ঘটে?

- নির্গত ইথিলিন গ্যাসটি প্লাস্টিকের আবরণের ভেতরেই আটকা পড়ে বাইরে বেরোতে বাধাগ্রস্ত হয়।

- আটকে পড়া ইথিলিন কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্বও বাড়িয়ে দেয়, যা শ্বসন প্রক্রিয়াকে কিছুটা মন্থর করে।

- বাতাসের সাথে অক্সিজেনের অবাধ চলাচল কমে যাওয়ায় সামগ্রিক জারণ (oxidation) প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে পড়ে।

ফলাফল: পাকার শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে ধীরগতির হয়ে যায়, এবং কলা কয়েকদিন বেশি সতেজ থাকে।

ইথিলিনের এই প্রভাব শুধু কলার বেলায় নয় বরং আপেল, আম, টমেটো, পেঁপে, অ্যাভোকাডোর মতো "ক্লাইম্যাক্টেরিক (climacteric)" ফলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য- অর্থাৎ যেসব ফল গাছ থেকে তোলার পরও পাকতে থাকে। এই কারণেই দেখা যায়:

- একটি পাকা আপেল অন্য কাঁচা ফলের পাশে রাখলে সেগুলোও দ্রুত পেকে যায়।

- বাজারে বিক্রেতারা প্রায়ই কলার সাথে আপেল বা অন্য ফল রাখেন না, যাতে ইথিলিনের প্রভাবে দ্রুত পচন না ধরে।

** বাড়িতে কীভাবে কাজে লাগাবেন....

বৈজ্ঞানিক এই নীতিকে দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগানোর কিছু সহজ উপায়ঃ

১. কলার কাঁদি কেনার পরপরই বোঁটার অংশটুকু প্লাস্টিক র‍্যাপ বা ফয়েল দিয়ে শক্ত করে মুড়ে দিন।

২. কলাকে অন্যান্য ইথিলিন-সংবেদনশীল ফল (যেমন আপেল, আম) থেকে আলাদা রাখুন।

৩. সরাসরি সূর্যালোক এড়িয়ে ঠান্ডা ও ছায়াময় স্থানে সংরক্ষণ করুন, কারণ তাপ ইথিলিন উৎপাদন ও শ্বসন হার দুটোই বাড়িয়ে দেয়।

৪. কলা যদি দ্রুত পাকাতে চান, তাহলে উল্টো কাজ করুন-কাগজের ব্যাগে বন্ধ করে রাখুন, যাতে ইথিলিন জমে দ্রুত পাকে।

একটি সাধারণ প্লাস্টিক র‍্যাপ আর কলার বোঁটার সংযোগস্থলে জড়িয়ে দেওয়ার মতো ক্ষুদ্র একটি অভ্যাসের পেছনে আসলে লুকিয়ে আছে উদ্ভিদ শারীরবৃত্তবিদ্যা ও জৈব রসায়নের এক চমৎকার সমন্বয়। ইথিলিন গ্যাসের নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে আমরা প্রকৃতির নিজস্ব পাকা-প্রক্রিয়াকেই সাময়িকভাবে ধীর করে দিতে পারি- বিজ্ঞানকে রান্নাঘরের বাস্তবতায় প্রয়োগ করার এক চমৎকার উদাহরণ এটি। @ আবু নাছের আখন্দ


5


রোমান সম্রাট এবং স্টোইক দার্শনিক মার্কাস অরেলিয়াস তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরিতে একটি অসাধারণ ধারণা লিখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মানুষের জীবনে যে বাধা আসে, সেটিই নতুন পথ তৈরি করার সুযোগ করে দেয়।

আমরা সাধারণত বাধাকে শত্রু মনে করি। মার্কাস অরেলিয়াস বাধাকে ইনফরমেশন হিসেবে দেখতেন। 

জার্মান গণিতবিদ কার্ল জ্যাকোবি একটি বাক্যের মাধ্যমে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন,

তিনি বলতেন, "ইনভার্ট, অলওয়েজ ইনভার্ট।"

এই ছোট্ট বাক্যের অর্থ শুধুই গণিতের জন্য নয়, এটি চিন্তার একটি ইউনিভার্সাল রুল।

গণিতে যখন কোনো জটিল সমস্যা সরাসরি সমাধান করা কঠিন হয়ে যেত, তখন জ্যাকোবি সমস্যাটিকে উল্টো দিক থেকে দেখতে শুরু করতেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক কঠিন সমস্যা উল্টোভাবে ভাবলেই সহজ হয়ে যেত। রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং বর্তমানের একটি জনপ্রিয় হ্যাক যা হাই অ্যাচিভাররা ব্যবহার করেন।

ধরুন, একজন অ্যান্ট্রপ্রেনার নিজেকে প্রশ্ন করলেন, "আমি কীভাবে এক কোটি টাকার ব্যবসা গড়ে তুলব?" প্রশ্নটি বিশাল, উত্তরও অস্পষ্ট। এখানে একেক জনের একেক রকম বিষয় মনে হতে পারে।

কিন্তু যদি তিনি প্রশ্নটি বদলে বলেন, "কোন ভুলগুলো করলে আমার ব্যবসা নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হবে?" হঠাৎ উত্তরগুলো পরিষ্কার হয়ে যেতে শুরু করে

এখন লক্ষ্য করুন, সাকসেস এখনও আসেনি, কিন্তু ফেইলিউর এর বড় দরজাগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর বাস্তব পৃথিবীতে দীর্ঘমেয়াদি সাকসেস অনেক সময় এভাবেই তৈরি হয়।

ক্যারিয়ার গ্রোথে ইনভার্সন কেন গেম চেঞ্জার

অনেকেই মনে করেন ক্যারিয়ারের উন্নতি মানেই নতুন স্কিল শেখা, এটি আংশিক সত্য। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কোন অভ্যাসগুলো আপনার ক্যারিয়ার ধীরে ধীরে নষ্ট করছে?

এই ছোট ছোট বিষয়গুলো একদিনে সমস্যা তৈরি করে না, কিন্তু কয়েক বছর পরে এগুলোই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

একজন সাধারণ কর্মী স্কিল বাড়ানোর চেষ্টা করেন, অন্য দিকে একজন অসাধারণ প্রফেশনাল স্কিলের পাশাপাশি নিজের লিমিটিং হ্যাবিট ও দূর করেন। এই পার্থক্যই দীর্ঘমেয়াদে সফলতা তৈরি করে।

রিফ্লেকশন

নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন…

আপনি কি প্রতিদিন সাকসেস বাড়ানোর চেষ্টা করছেন? নাকি প্রতিদিন এমন একটি ভুল কমানোর চেষ্টা করছেন, যা আপনার ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করতে পারে?

বেশিরভাগ মানুষ প্রথমটি করেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, দীর্ঘমেয়াদে দ্বিতীয় ধরনের মানুষরাই বেশি দূর এগিয়ে যান।

ইনভার্সন কোনো নেগেটিভ থিংকিং নয়, এটি মূলত স্ট্র্যাটেজিক থিংকিং।

এটি আমাদের শেখায়, ভবিষ্যৎ গড়ার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো আগে ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিতে পারে এমন কারণগুলো শনাক্ত করা।

যে ব্যক্তি নিজের ব্লাইন্ড স্পট দেখতে শেখে, তার ডিসিশন সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়; কারণ সে শুধু সুযোগ নয়, ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দেয়।

@ Nur Rahman



6


স্পেনের উপনিবেশ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র: আর্জেন্টিনার জন্মের ইতিহাস

১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রা ইউরোপীকে ঘর থেকে বাইরে তাকানোর সুযোগ করে দেয় এবং বদলে দিয়েছিল পুরো বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র। নতুন বিশ্বের বিশাল ভূখণ্ডের দখল নিয়ে শুরু হয় স্পেন ও পর্তুগালের প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতারই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বর্তমান আর্জেন্টিনা—যে দেশটি প্রায় তিন শতাব্দী স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল, পরে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

পোপের এক দাগে ভাগ হয়ে গেল “নতুন পৃথিবী”:

কলম্বাস আমেরিকায় পৌঁছানোর পরপরই স্পেন ও পর্তুগালের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে—নতুন আবিষ্কৃত ভূমিগুলোর মালিক কে হবে?

এই বিরোধ মেটাতে ১৪৯৪ সালে স্বাক্ষরিত হয় বিখ্যাত টর্ডেসিয়াস চুক্তি (Treaty of Tordesillas)। পোপের মধ্যস্থতায় আটলান্টিক মহাসাগরে একটি কাল্পনিক রেখা টেনে পৃথিবীর বাইরের নতুন ভূখণ্ড দুটি দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।

এই বিভাজনের ফলে বর্তমান ব্রাজিলের পূর্বাংশ পর্তুগালের ভাগে পড়লেও দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় পুরো বাকি অংশ, যার মধ্যে বর্তমান আর্জেন্টিনাও ছিল, স্পেনের দাবিকৃত অঞ্চলে পরিণত হয়।

তখন অবশ্য এসব ভূমির ওপর ইউরোপীয়দের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সেখানে হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করছিল। তারা মূলত ইউরোপে বসে নতুন আবিষ্কার করা পৃথিবীকে ভাগ করে নিয়েছিল। তারপর দখল নেবার ইতিহাস মানবতার ইতিহাসে সবচে’ লজ্জাজনক ঘটনাগুলোর জন্ম দিয়েছিল।

ওহ, সেই সময় ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা আর এশিয়া ছাড়া বাকি পৃথিবীই ইউরোপের কাছে ‘নতুন পৃথিবী’!

স্প্যানিশদের আগে:

স্প্যানিশরা আসার আগে বর্তমান আর্জেন্টিনা ছিল অসংখ্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। তারা কোনো একক সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল না; বরং ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা গড়ে তুলেছিল। প্রধান জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ছিল— ডিয়াগিতা, গুয়ারানি, মাপুচে, কুয়েরান্দি, তেহুয়েলচে ইত্যাদি।

স্প্যানিশ উপনিবেশ স্থাপনের পর আদিবাসীদের ভাগ্য ছিল অত্যন্ত করুণ। ইউরোপীয়দের বয়ে আনা গুটি বসন্ত, হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগে লাখো আদিবাসী মারা যায়। যুদ্ধ ও দমন-পীড়ন, জোরপূর্বক শ্রম ও গনহত্যার মাধ্যমে তারা বিলুপ্তির দিকে চলে যায়।

আজও আর্জেন্টিনায় মাপুচে, কোল্লা, কোম (টোবা), উইচি, গুয়ারানিসহ বহু আদিবাসী সম্প্রদায়ের উত্তরসূরিরা বাস করেন। সর্বশেষ জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার প্রায় ২–৩ শতাংশ মানুষ নিজেদের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য বা বংশধর হিসেবে পরিচয় দেন। যদিও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মিশ্রবিবাহ ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কারণে আদিবাসী ঐতিহ্যের অনেকটাই হারিয়ে গেছে, তবুও তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূমির অধিকার রক্ষার আন্দোলন এখনও আর্জেন্টিনার গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু।

রিও দে লা প্লাতার পথে স্প্যানিশ অভিযাত্রা:

১৫১৬ সালে স্প্যানিশ নাবিক হুয়ান দিয়াস দে সোলিস প্রথম ইউরোপীয় হিসেবে রিও দে লা প্লাতা মোহনায় পৌঁছান। কিন্তু স্থানীয় আদিবাসীদের হাতে তিনি নিহত হন।

১৫৩৬ সালে স্পেনের প্রতিনিধি পেদ্রো দে মেন্দোসা বর্তমান বুয়েনোস আইরেসে প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করেন। কিন্তু খাদ্য সংকট, রোগব্যাধি এবং আদিবাসীদের প্রতিরোধের কারণে সেই বসতি কয়েক বছরের মধ্যেই পরিত্যক্ত হয়।

চার দশক পর, ১৫৮০ সালে হুয়ান দে গারাই একই স্থানে আবার শহর প্রতিষ্ঠা করেন। এবার বুয়েনোস আইরেস টিকে যায় এবং ধীরে ধীরে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে পরিণত হয়।

স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের এক প্রান্তিক অঞ্চল:

প্রথমদিকে বর্তমান আর্জেন্টিনা ছিল ভাইসরয়্যালটি অব পেরু-এর অংশ। এর রাজধানী ছিল লিমা। ফলে বুয়েনোস আইরেস ছিল প্রশাসনিকভাবে অনেকটাই উপেক্ষিত।

স্পেনের দৃষ্টি তখন মূলত পেরু ও বলিভিয়ার রূপার খনির দিকে। দক্ষিণের বিস্তীর্ণ তৃণভূমি—পাম্পাস—তাদের কাছে তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।

কেন হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল বুয়েনোস আইরেস?

অষ্টাদশ শতকে আটলান্টিক বাণিজ্যের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। একই সময়ে ব্রিটিশ ও পর্তুগিজ প্রভাবও দক্ষিণ আটলান্টিকে বাড়ছিল। এই বাস্তবতায় ১৭৭৬ সালে স্পেন নতুন প্রশাসনিক একক “ভাইসরয়্যালটি অব রিও দে লা প্লাতা” গঠন করে। এর রাজধানী করা হয় বুয়েনোস আইরেসকে।

নতুন ভাইসরয়্যালটির অন্তর্ভুক্ত ছিল— বর্তমান আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে ও আংশিক বলিভিয়া। এই পরিবর্তনের ফলে বুয়েনোস আইরেস দ্রুত বাণিজ্য, প্রশাসন ও সামরিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখানেই জন্ম নিতে শুরু করে স্থানীয় অভিজাত শ্রেণি, যারা ক্রমে স্পেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে।

ব্রিটিশ আক্রমণ বদলে দেয় মানসিকতা:

১৮০৬ ও ১৮০৭ সালে ব্রিটিশ বাহিনী দু’বার বুয়েনোস আইরেস দখলের চেষ্টা করে। স্পেন তখন ইউরোপের যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় উপনিবেশকে কার্যত নিজেরাই রক্ষা করতে হয়। স্থানীয় মিলিশিয়া ব্রিটিশদের পরাজিত করে। এই ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

কারণ প্রথমবারের মতো স্থানীয় জনগণ উপলব্ধি করল—স্পেনের সাহায্য ছাড়াও তারা নিজেদের শহর রক্ষা করতে সক্ষম। এই আত্মবিশ্বাসই পরবর্তী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

নেপোলিয়নের এক সিদ্ধান্ত কাঁপিয়ে দেয় স্প্যানিশ সাম্রাজ্য:

১৮০৮ সালে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট স্পেন আক্রমণ করেন। তিনি স্পেনের রাজা সপ্তম ফার্দিনান্দকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজের ভাই জোসেফ বোনাপার্টকে সিংহাসনে বসান। ফলে প্রশ্ন দেখা দেয়—

যদি বৈধ রাজাই না থাকেন, তাহলে আমেরিকার উপনিবেশগুলো কার অধীনে থাকবে?

এই রাজনৈতিক সংকটই স্প্যানিশ আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হয়ে ওঠে।

মে বিপ্লব: স্বাধীনতার সূচনা

১৮১০ সালের ২৫ মে বুয়েনোস আইরেসে সংঘটিত হয় ইতিহাসখ্যাত মে বিপ্লব (May Revolution)। জনগণের চাপের মুখে স্প্যানিশ ভাইসরয় বালতাসার হিদালগো দে সিসনেরোসকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। তার পরিবর্তে গঠিত হয় প্রিমেরা হুনতা (Primera Junta)—স্থানীয়দের প্রথম স্বশাসিত সরকার। তবে তখনও আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় নি।

অনেক নেতা দাবি করছিলেন, তাঁরা কেবল বন্দি রাজা ফার্দিনান্দের নামে সাময়িকভাবে শাসন করছেন। কিন্তু বাস্তবে স্পেনের নিয়ন্ত্রণ দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছিল।

স্বাধীনতার ঘোষণা:

ছয় বছর ধরে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর অবশেষে ১৮১৬ সালের ৯ জুলাই উত্তর-পশ্চিমের শহর তুকুমানে জাতীয় কংগ্রেস বসে। সেখানে প্রতিনিধিরা ঘোষণা করেন—

ইউনাইটেড প্রভিন্সেস অব সাউথ আমেরিকা (বর্তমান আর্জেন্টিনা) স্পেনের কাছ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন।

আজও ৯ জুলাই আর্জেন্টিনার জাতীয় স্বাধীনতা দিবস।

হোসে দে সান মার্তিন: যিনি শুধু আর্জেন্টিনা সহ পুরো মহাদেশকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন:

আর্জেন্টিনার স্বাধীনতার গল্প হোসে দে সান মার্তিনকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। ইউরোপে সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়া এই অফিসার উপলব্ধি করেছিলেন, কেবল আর্জেন্টিনাকে স্বাধীন করলেই হবে না। স্পেনের প্রধান সামরিক ঘাঁটি ছিল পেরুতে। তাই তিনি এক সাহসী পরিকল্পনা করেন।

প্রথমে আন্দিজ পর্বতমালা অতিক্রম করে চিলিকে মুক্ত করবেন, তারপর সমুদ্রপথে পেরু আক্রমণ করবেন। ১৮১৭ সালে প্রায় পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সামরিক অভিযানে আন্দিজ পর্বত অতিক্রম করেন।

চিলিকে স্বাধীন করার পর তিনি পেরুর দিকে অগ্রসর হন এবং দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিশ শক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। এই অভিযানের কারণেই তাঁকে আজ আর্জেন্টিনা, চিলি ও পেরু—তিন দেশেই জাতীয় বীর হিসেবে সম্মান করা হয়।

তবে এমন চিন্তা তিনি একাই করেন নি। সাইমন বলিভারও করেছিলেন, এবং সফলও হয়েছিলেন। সে ইতিহাসও আমরা অধ্যয়ন করব।

স্বাধীনতা ঘোষণা মানেই যুদ্ধের শেষ নয়:

১৮১৬ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা হলেও স্পেন তা স্বীকার করে নি। বিভিন্ন অঞ্চলে আরও কয়েক বছর যুদ্ধ চলতে থাকে। স্পেন আশা করেছিল, সুযোগ পেলে আবার উপনিবেশগুলো পুনর্দখল করবে।

কিন্তু সান মার্তিন, সিমন বলিভার এবং অন্যান্য স্বাধীনতাকামী নেতাদের ধারাবাহিক অভিযানের ফলে স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের অবস্থান ক্রমশ ভেঙে পড়ে। ১৮২৪ সালের আয়াকুচোর যুদ্ধ কার্যত দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনের সামরিক আধিপত্যের সমাপ্তি ঘটায়।

স্পেন কবে স্বাধীনতা মেনে নেয়?

বাস্তবে আর্জেন্টিনা অনেক আগেই স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও স্পেন দীর্ঘদিন তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। অবশেষে ১৮৫৭ সালে স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে আর্জেন্টিনার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ স্বাধীনতা ঘোষণার ৪১ বছর পর দুই দেশের মধ্যে সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

তিন শতকের ইতিহাসের উত্তরাধিকার:

স্পেনের সাথে আর্জেন্টিনার সম্পর্কের গভীরাত তার ইতিহাসের সাথে প্রোথিত। ১৪৯৪ সালের কূটনৈতিক চুক্তি থেকে শুরু করে ১৮১০ সালের মে বিপ্লব, ১৮১৬ সালের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পরবর্তী যুদ্ধ—সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন শতকের ইতিহাস; স্পেনের হাতে পত্তন ও স্পেনের থেকে স্বাধীনতা।

তাই স্পেনের শাসন আর্জেন্টিনাকে গভীরভাবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবিত করেছে আজ আর্জেন্টিনার সরকারি ভাষা স্প্যানিশ। দেশের আইন, প্রশাসন, স্থাপত্য, শহর পরিকল্পনা, ক্যাথলিক ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং অসংখ্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের শিকড় সেই ঔপনিবেশিক যুগে। @ boikal


7


জাপানীজরা সাধারণত কোন কিছুর মনুমেন্ট বানাতে চায় না। জাপানের সফল প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে অন্যতম শিনজু আবের হত্যাকান্ডের পর, ঐ ঘটনাস্থলে একটি ভাস্কর্য বানাতে চাইলে, সেই এলাকার সিটি কর্পোরেশন তা নাকচ করে দেয়!

তবে আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে তারা একটি কুকুরের ভাস্কর্য বানিয়েছিলো! কারন কখনো কখনো একটি কুকুরও মানুষকে এমন একটি শিক্ষা দিয়ে যায়, যা হাজারো বই পড়েও শেখা যায় না।

জাপানের হাচিকো নামের কুকুরটি ছিল একটি আকিতা জাতের কুকুর। প্রতিদিন সে তার মালিক অধ্যাপক হিদেসাবুরো উয়েনোকে বাসা থেকে টোকিওর সবচেয়ে ব্যস্থতম শিবুইয়া স্টেশন পর্যন্ত পৌছে দিত এবং বিকেলে ৫ টায় আবার একই স্টেশনে এসে তার ফেরার অপেক্ষা করত।

কিন্তু ১৯২৫ সালের ২১শে মে  বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় অধ্যাপক হঠাৎ মারা যান এবং সেখান থেকেই তার মরদেহ সমাধি করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। তাই তিনি আর কখনো শিবুইয়া স্টেশনে ফিরে আসেননি।

কিন্তু তার পোষা কুকুর হাচিকো তা জানত না। পরের দিনও সে স্টেশনে গিয়েছিল। তারপরের দিনও। এভাবেই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সে একই জায়গায় দাড়িয়ে তার প্রিয় মানুষটির জন্য অপেক্ষা করেছে। 

আর হাচিকোর এই ভালোবাসা দেখে ততকালীন স্টেশন মাস্টার, স্টেশনের সামনের দোকানদার, এলাকাবাসী তাকে খাবার দিতো। এভাবে এই হাচিকো টানা ৯ বছর ৯ মাস ১৫ দিন, সে এই শিবুইয়া স্টেশনের সামনে এসে তার মালিকের জন্য অপেক্ষা করেছে। আর ১৯৩৫ সালের ৮ই মার্চ এই স্টেশনের সামনেই হাচিকো মারা যায়!

হাচিকোর এই অবিশ্বাস্য আনুগত্য পুরো জাপানকে স্পর্শ করেছিল। সে মারা যাবার পরে তার এই ভালোবাসা ও আনুগত্যের স্মৃতি রক্ষার্থে, টোকিওর শিবুইয়া স্টেশনের সামনে তার ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয়,  যা আজো দাড়িয়ে আছে!

এটি জাপানীজদের কাছে শুধু একটি কুকুরের স্মৃতিচিহ্ন নয়, বরং ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা এবং অটুট সম্পর্কের প্রতীক। এই হাচিকোর ঘটনা নিয়ে কয়েকটি মুভিও হয়েছে, এরমধ্যে Hachiko Monogotari এবং Hachi: A Dog's Tale অন্যতম। 

এই যুগে আমাদের ব্যস্ত জীবনে সম্পর্কগুলো যখন প্রায়ই স্বার্থের হিসাবের কাছে হার মেনে যায়, তখন হাচিকোর গল্প মনে করিয়ে দেয় একটি গভীর সত্য- "সত্যিকারের ভালোবাসা প্রতিদানের অপেক্ষায় নয়, বরং বিশ্বাস, ধৈর্য এবং শেষ পর্যন্ত পাশে থাকার নামই প্রকৃত ভালোবাসা"!

ছবিটি শিবুইয়া স্টেশনের সামনে থেকে তোলা। এই জায়গাতেই সে বেশীরভাগ সময় তার মালিকের জন্য অপেক্ষা করতো। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় ভালো করে ছবি তুলতে পারিনি।

বিল্লাল হোসাইন



8


ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের থেকে বেলুচদের ইতিহাস ও পরিচিতি কেন আলাদা?

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার সময় অনেক ক্ষেত্রেই পুরো অঞ্চলটিকে একটি সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রবণতা রয়েছে। তবে উপমহাদেশের অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে বেলুচদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস বিচার করা হয় সিন্ধু নদের পূর্ব পার বা এপার থেকে। অষ্টম শতাব্দীতে সিন্ধুর বুকে আরবদের আক্রমণকেই এই উপমহাদেশে প্রথম ইসলামি শাসনের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে, বেলুচিস্তান কখনোই এই উপমহাদেশের মূল ভূখণ্ডের অংশ ছিল না। সিন্ধু নদের পশ্চিমের এই অঞ্চলটি দীর্ঘকাল ধরে পারস্য ও মধ্য এশীয় সভ্যতার বলয়েই বেশি যুক্ত ছিল। আধুনিক যুগে এসে, মূলত ব্রিটিশ শাসনামলেই বেলুচিস্তানকে প্রথম উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, এর আগে তাদের সাথে উপমহাদেশের খুব একটা সম্পৃক্ততা ছিল না।

জাতিগতভাবে বেলুচরা মূলত ইরানীয় বংশোদ্ভূত। তাদের চিন্তাভাবনা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সাথে উপমহাদেশের চেয়ে পারস্যের মিল অনেক বেশি। উপমহাদেশের মুসলিমদের জীবনযাত্রায় যেখানে উর্দু ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে এবং বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে হিন্দি সিনেমা ব্যাপক জনপ্রিয়, সেখানে বেলুচদের চিত্রটি ভিন্ন। তারা ফার্সি ভাষা এবং ইরানি অনুষ্ঠান বা বিনোদন মাধ্যমগুলোর প্রতি বেশি টান অনুভব করে। এছাড়া, জেনেটিক ও ভৌগোলিক কারণে তাদের চেহারা ও শারীরিক গঠনও উপমহাদেশের সাধারণ মুসলিমদের থেকে বেশ আলাদা, যা তাদের ইরানীয় উৎসকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

উপমহাদেশের অন্যান্য মুসলিমদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের সাথেও বেলুচদের চিন্তাভাবনার কোনো মিল নেই। ভারত বা হিন্দুত্ববাদ নিয়ে উপমহাদেশের রাজনীতিতে যে ধরনের মেরুকরণ বা ভীতি কাজ করে, বেলুচদের কাছে তা সম্পূর্ণ অবাস্তব একটি বিষয়। ইতিহাসে হিন্দুরা কখনোই বেলুচদের ওপর কোনো ধরনের অত্যাচার বা নিপীড়ন চালায়নি, তাই তাদের মধ্যে হিন্দুদের প্রতি কোনো ঐতিহাসিক ক্ষোভ বা ভীতি নেই। আরব, ইরান বা আফগানিস্তানের মানুষরা যেমন ভারতকে অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে দেখে বা হিন্দুদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে, বেলুচদের দৃষ্টিভঙ্গিও ঠিক তেমনই। তারা ভারত ও হিন্দুদের বন্ধু হিসেবেই বিবেচনা করে। উপমহাদেশের মুসলিমদের একাংশের কাছে হিন্দুত্ববাদকে যেভাবে একটি হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, বেলুচদের কাছে তার কোনো আবেদন নেই। তাই ভারত বা হিন্দুত্বের ভয় দেখিয়ে বেলুচদের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা বা নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা একেবারেই অর্থহীন। মূলত এই ভৌগোলিক অবস্থান, ইরানীয় জাতিগত শেকড়, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং ভিন্ন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কারণেই বেলুচদের ইতিহাস ও মনস্তত্ত্ব উপমহাদেশের মুসলিমদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। @Saiful Islam


9


মানচিত্রে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার অবস্থান খুবই অদ্ভুত! দেশটি সম্পূর্ণভাবে সেনেগাল দ্বারা পরিবেষ্টিত মনে হয় যেন সমুদ্র থেকে সেনেগালের ভেতরে ঢুকে গেছে। চিকন একটা দেশ, একটা নদীর দুই পাড়ে বিস্তৃত। নদীটির নামও গাম্বিয়া, আসলে নদীর নাম থেকেই দেশের নাম। এর পেছনের কারণ মূলত ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং দুই ভিন্ন ইউরোপীয় শক্তির উপনিবেশ, স্বার্থের সংঘাত ও সমঝোতা।

সেনেগালের তিনটি বড় জাতি হল: উলুফ (৩৯%), ফুলানি (২৭.৫%) ও সেরের (১৬%), ওই হিসেবে একক বৃহৎ জাতি নেই। ৬টি জাতীয় ভাষা আছে। ৯৭% মুসলিম। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৯৬ জন।

গাম্বিয়ায় মান্দিনকা ৩৫%, ফুলা ৩১%, উলুফ ১১%। জাতিভিত্তিক অনেক ভাষা আছে তবে সরকারি ভাষা ইংরেজি। ৯৫% মুসলিম। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২২৭ জন।

১. ঔপনিবেশিক বিভাজন: গাম্বিয়ার এই অদ্ভুত আকৃতির জন্য দায়ী হলো গাম্বিয়া নদী এবং ব্রিটিশ-ফরাসি ঔপনিবেশিক প্রতিযোগিতা।  এটাকে একটা "নদী-রাষ্ট" বললে ভুল হয় না, এক নদী, এক দেশ!

গাম্বিয়া ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ। গাম্বিয়া নদী এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ও বাণিজ্য রুট ছিল।

সেনেগাল ছিল ফরাসি উপনিবেশ। ১৮৮৯ সালে, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স আনুষ্ঠানিকভাবে গাম্বিয়ার বর্তমান সীমানা নির্ধারণের জন্য একটি চুক্তিতে আসে। এই চুক্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ গাম্বিয়া নদীর দুই পাশে প্রায় ১৬ কিলোমিটার (১০ মাইল) পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এর ফলে গাম্বিয়া নদীকে কেন্দ্র করে এই সংকীর্ণ ভূখণ্ডটি ব্রিটিশদের হাতে থেকে যায়।

২. বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ: ব্রিটিশরা এই নদীপথের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তর পর্যন্ত বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল, তাই এই নদীর গতিপথ অনুসরণ করেই গাম্বিয়ার সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল।

৩. এক দেশ হল না কেন: স্বাধীনতা লাভের পরও দেশ দুটি এক হতে পারে নি, যদিও এমন প্রচেষ্টা হয়েছিল। ১৯৬৫ সালে গাম্বিয়া ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। পরে ১৯৮২ সালে, গাম্বিয়া ও সেনেগাল একত্রিত হয়ে একটি কনফেডারেশন গঠন করেছিল, যার নাম ছিল 'সেনেগাম্বিয়া'। কিন্তু এই রাজনৈতিক জোটটি ১৯৮৯ সালে ভেঙে যায়।

মূলত, দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মতপার্থক্য এবং সম্পূর্ণ একীকরণের বিষয়ে গাম্বিয়ার অনীহা ছিল এই ভাঙনের কারণ।@boikal



10


ফ্রান্সিসকো পিজারো: ইনকা সাম্রাজ্যের পতন এবং পেরু বিজয়ের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস

ফ্রান্সিসকো পিজারো (Francisco Pizarro) ছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর একজন স্প্যানিশ ‘কনকুইস্টাডর’ বা বিজেতা। তিনি মূলত দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল ও শক্তিশালী ইনকা সাম্রাজ্য ধ্বংস করে সেখানে স্প্যানিশ উপনিবেশ স্থাপনের মূল নায়ক হিসেবে পরিচিত। অত্যন্ত সাধারণ ঘরে জন্ম নেওয়া পিজারো সোনা এবং ক্ষমতার লোভে আমেরিকায় পাড়ি জমান এবং ইতিহাসে অন্যতম নিষ্ঠুর বিজেতা হিসেবে নিজের নাম খোদাই করেন।

১৫৩২ সালে পেরুর কাহামার্কা (Cajamarca) শহরে পিজারো এবং ইনকা সম্রাট আতাহুয়ালপা-এর (Atahualpa) মধ্যে ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ হয়। পিজারো আগে থেকেই একটি ফাঁদ পেতে রেখেছিলেন। তার নির্দেশে স্প্যানিশ যাজক ভিসেন্তে দে ভালভের্দে একটি বাইবেল (বা প্রার্থনা পুস্তক) হাতে সম্রাটের কাছে এগিয়ে যান। যাজক সম্রাটকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে এবং স্পেনের রাজার বশ্যতা স্বীকার করতে বলেন।

ইনকা সম্রাট, যিনি এর আগে জীবনে কখনো বই দেখেননি বা এর ব্যবহার সম্পর্কে জানতেন না, তিনি বাইবেলটি নেড়েচেড়ে বুঝতে না পেরে তা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলেন। পিজারো ঠিক এই সুযোগটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি একে "খ্রিস্টধর্মের চরম অবমাননা" হিসেবে আখ্যায়িত করে তার লুকিয়ে থাকা সৈন্যদের অতর্কিত আক্রমণের নির্দেশ দেন। অপ্রস্তুত ইনকা রক্ষীদের পরাস্ত করে পিজারো খুব সহজেই সম্রাট আতাহুয়ালপাকে বন্দি করেন।

আতাহুয়ালপাকে বন্দি করার দিনটি ছিল পেরুর আদিবাসীদের জন্য এক চরম বিভীষিকাময় দিন। পিজারোর কাছে মাত্র ১৬৮ জন সৈন্য থাকলেও, তাদের কাছে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র, স্টিলের তলোয়ার এবং ঘোড়া—যা ইনকাদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা ছিল। এই আধুনিক অস্ত্রের সাহায্যে স্প্যানিশরা হাজার হাজার নিরস্ত্র ইনকা সৈন্য ও সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে কচুকাটা করে।

সম্রাটকে মুক্ত করার শর্ত হিসেবে পিজারো একটি বিশাল ঘর ভর্তি সোনা এবং রূপা মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করেন। ইনকারা সেই মুক্তিপণ পরিশোধ করলেও পিজারো চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেন। ১৫৩৩ সালে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে তিনি আতাহুয়ালপাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর স্প্যানিশরা ইনকা সাম্রাজ্যে অবাধ লুটপাট চালায়। পিজারোর দখলদারিত্বের ফলে লাখ লাখ আদিবাসী নিহত হয়। যুদ্ধ এবং স্প্যানিশদের নিয়ে আসা নতুন রোগে (বিশেষ করে গুটিবসন্ত) ইনকা জনসংখ্যা প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয় এবং যারা বেঁচে ছিল তাদের দাসে পরিণত করা হয়।

ইনকাদের আদি রাজধানী ছিল আন্দিজ পর্বতমালার উঁচুতে অবস্থিত শহর 'কুজকো' (Cuzco)। পিজারো ১৫৩৩ সালে কুজকো দখল করে নেন। কিন্তু কুজকো ছিল পাহাড়ের অনেক উঁচুতে, যা স্পেন থেকে জাহাজে করে সৈন্য বা রসদ আনার জন্য খুব একটা সুবিধাজনক ছিল না।

স্পেনের সাথে সমুদ্রপথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য তার একটি উপকূলীয় শহরের প্রয়োজন ছিল। তাই ১৫৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারি তিনি পেরুর উপকূলে একটি নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এর নাম দেন "সিউদাদ দে লোস রেইয়েস" (Ciudad de los Reyes) বা 'রাজাদের শহর', যা পরবর্তীতে লিমা (Lima) নামে পরিচিত হয়। এই লিমা শহরটিই হয়ে ওঠে স্প্যানিশ পেরুর প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং এটি বর্তমানে আধুনিক পেরুর রাজধানী।

লিমা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পিজারো পেরুর ওপর স্পেনের নিরঙ্কুশ আধিপত্য স্থায়ী করেন, যদিও তার এই সাম্রাজ্যের ভিত গড়া হয়েছিল ইনকাদের রক্ত আর সম্পদের ওপর।

@@Saiful Islam


11


আজকালকার দিনে আমরা সবাই মনে করি যে আমাদের জীবনে যত বেশি স্বাধীনতা থাকবে, আমরা তত বেশি সুখী হবো। আর এই স্বাধীনতা আসে কোথা থেকে? আমাদের সাধারণ ধারণা হলো, আমাদের সামনে যত বেশি অপশন বা বাছাই করার সুযোগ থাকবে, আমাদের স্বাধীনতাও ঠিক ততটাই বাড়বে। পশ্চিমা সমাজ বা আধুনিক দুনিয়ার এটাই হলো সবচেয়ে বড় একটা অলিখিত নিয়ম। আমরা ভাবি, মানুষের মঙ্গল নিশ্চিত করার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বাড়িয়ে দেওয়া। আর এই স্বাধীনতা বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ রাস্তা হলো তাদের সামনে প্রচুর অপশন এনে হাজির করা।

চারপাশের দিকে তাকালে দেখবেন কথাটার মধ্যে বেশ যুক্তি আছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? ব্যারি শোয়ার্টজ নামের একজন বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী তার দ্য প্যারাডক্স অফ চয়েস নামের আলোচনায় আমাদের এই প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি উল্টে দিয়েছেন। তিনি আমাদের খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছেন যে, অতিরিক্ত অপশন বা বাছাই করার সুযোগ আমাদের সুখী করার বদলে আরও হতাশ করে তুলছে। ব্যাপারটা অদ্ভুত শোনালেও, প্রাত্যহিক জীবনের খুব সাধারণ ঘটনা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, কীভাবে বেশি অপশন আমাদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে বিশাল অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

চলুন, একটা খুব সাধারণ উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করি। ধরুন, আপনি কোনো সুপারমার্কেটে গেলেন। আপনার হয়তো একটুখানি স্যালাড দরকার। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলেন তাকের পর তাক সাজানো শুধু স্যালাড দিয়ে। প্রায় ১৭৫ রকমের স্যালাড ! এত কিছুর মধ্যে আপনি কোনটা রেখে কোনটা নেবেন?

এই যে এত এত অপশন, এগুলো প্রথমে দেখলে মনে হয় আমাদের জীবনটাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝবেন, এগুলো আসলে আমাদের আরও বেশি কনফিউজড বা বিভ্রান্ত করে দিচ্ছে। আমরা প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি। শুধু কেনাকাটা নয়, জীবনের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। 

ব্যারি শোয়ার্টজ বলছেন, এই অতিরিক্ত অপশন জীবনে দুটো খুব খারাপ প্রভাব ফেলে। প্রথম প্রভাবটি হলো এক ধরনের স্থবিরতা বা প্যারালাইসিস।

সামনে যখন অনেক অপশন থাকে, তখন আমরা আসলে কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারি না। যেমন, একটা গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো অফিসে কর্মীদের যখন অবসরের জন্য কয়েকটি ফান্ডে টাকা জমানোর সুযোগ দেওয়া হয়, তখন অনেকেই সেখানে অংশ নেন। কিন্তু যখন অপশন বাড়িয়ে পঞ্চাশটা করা হয়, তখন অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে যায়।

পঞ্চাশটা ফান্ডের মধ্যে কোনটা সবচেয়ে ভালো হবে, সেটা ঠিক করতে করতে মানুষ এত বেশি ক্লান্ত হয়ে যায় যে শেষ পর্যন্ত তারা কাজটা কালকের জন্য ফেলে রাখে। শেষ পর্যন্ত তাদের অনেক বড় আর্থিক ক্ষতি হয়।

দ্বিতীয় খারাপ প্রভাবটি হলো, অনেক কষ্টে কোনো সিদ্ধান্ত নিলেও আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারি না। অনেকগুলো অপশন থাকলে আমরা যেটাই বেছে নিই না কেন, মনের মধ্যে একটা খুঁতখুঁতানি থেকে যায়। আমরা ভাবতে থাকি, অন্য অপশনটা বেছে নিলে হয়তো আরও ভালো হতো! এটাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় অপরচুনিটি কস্ট। এই আক্ষেপ আমাদের বর্তমানের আনন্দকে মাটি করে দেয়।

এছাড়া বেশি অপশন আমাদের প্রত্যাশাকে অনেক বাড়িয়ে দেয়।

আগে শুধু এক ধরনের জিন্স প্যান্ট থাকায় প্রত্যাশা কম ছিল। কিন্তু এখন দোকানে শত শত ডিজাইনের জিন্স থাকায় আমরা আশা করি আমাদের প্যান্টটা একেবারে নিখুঁত হবে। যখন সেটা নিখুঁত হয় না, আমরা ভীষণ হতাশ হই।

ব্যারি শোয়ার্টজ মজা করে বলেন, জীবনে সুখী হওয়ার বড় গোপন মন্ত্র হলো প্রত্যাশাকে একদম কমিয়ে রাখা। @ Touhidul Islam

যোগ্য মানুষের সাথে অহংকার বা প্রতিযোগিতা না করে তাদের পাশে থেকে শেখার মানসিকতা রাখুন। নিজের বিকাশ ও উন্নতি অন্যের সাথে শত্রুতা করে নয়, বরং সহযোগিতার মাধ্যমেই আসে। 

12



আজকের স্পেন ও পর্তুগাল নিয়ে যে উপদ্বীপটি গঠিত, সেটিকে আমরা বলি আইবেরীয় উপদ্বীপ। কিন্তু রোমানদের কাছে এর নাম ছিল হিস্পানিয়া (Hispania)।

খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে রোমানরা কার্থেজকে পরাজিত করে পুরো অঞ্চলটি নিজেদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য তারা এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের নাম দেয় Hispania।

এটি ছিল একটি ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক পরিচয়—অনেকটা আজ আমরা যেমন "স্ক্যান্ডিনেভিয়া" বা "বালকান" বলি। এটি কোনো স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র ছিল না।

তবে এই নামটিই টিকে যায় শতাব্দীর পর শতাব্দী। ভাষা বদলায়, সাম্রাজ্য বদলায়, শাসক বদলায়—কিন্তু Hispania ধীরে ধীরে রূপ নিতে থাকে España-তে।

আল-আন্দালুস: মুসলিম শাসনে

৭১১ সালে উত্তর আফ্রিকা থেকে মুসলিম বাহিনী জিব্রাল্টার প্রণালী পেরিয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে প্রবেশ করে। কয়েক বছরের মধ্যেই ভিসিগথ রাজ্য ভেঙে পড়ে।

নতুন শাসকেরা অঞ্চলটির নাম দেন আল-আন্দালুস (Al-Andalus)।

তবে বেশিরভাগ হলেও পুরো উপদ্বীপই আল-আন্দালুস ছিল না। উত্তরে ছোট ছোট কয়েকটি খ্রিস্টান রাজ্য টিকে ছিল—আস্তুরিয়াস, লেওন, নাভারা, কাস্তিল, আরাগন।

এই রাজ্যগুলোরও কেউ নিজেদের "স্পেন" বলত না। তারা ছিল কাস্তিল, তারা ছিল আরাগন, তারা ছিল নাভারা—কিন্তু স্পেন নয়।

একটি বিয়ে, যা বদলে দিল ইউরোপের ইতিহাস: পৃথিবীরও

১৪৬৯ সাল, কাস্তিলের রাজকুমারী ইসাবেলা এবং আরাগনের যুবরাজ ফের্দিনান্দের বিয়ে হয়। ইতিহাসে এই বিয়েকে অনেক সময় "স্পেনের জন্ম" বলা হয়। কিন্তু এটি পুরো সত্য নয়।

দশ বছর পর দুজন নিজ নিজ সিংহাসনে বসেন। তখন কাস্তিল ও আরাগনের মুকুট একই দম্পতির হাতে আসে। কিন্তু দুটি দেশ তখনও আলাদা।

আলাদা আইন, আলাদা আদালত, আলাদা সংসদ, আলাদা করব্যবস্থা—সবই বহাল ছিল। আজকের ভাষায় বলা যায়, এটি ছিল দুটি দেশের মধ্যে ব্যক্তিগত রাজবংশীয় ইউনিয়ন (dynastic union), একীভূত রাষ্ট্র নয়।

তাহলে কলম্বাস কোন দেশের হয়ে যাত্রা করেছিলেন?

এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে মজার মোড়। ১৪৯২ সালে কলম্বাস যাত্রা শুরু করেন ইসাবেলা ও ফের্দিনান্দের অর্থায়নে। আজ আমরা বলি, তিনি স্পেনের হয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু সে সময়ের সরকারি নথিতে এমন কথা লেখা ছিল না। ইসাবেলা ছিলেন কাস্তিলের রানি। ফের্দিনান্দ ছিলেন আরাগনের রাজা। তাদের পূর্ণ সরকারি উপাধিতে কাস্তিল, লেওন, গ্রানাডা, আরাগন, ভ্যালেন্সিয়া, সিসিলি—অসংখ্য রাজ্যের নাম ছিল। কিন্তু "King of Spain"—এই উপাধি ছিল না।

অথচ ইউরোপ তখনই দেশটিকে "স্পেন" বলা শুরু করেছে:

মজার ব্যাপার হলো, বিদেশিরা এত জটিল উপাধি ব্যবহার করতে চাইত না। ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ইতালি কিংবা 'পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যে'র কূটনীতিকেরা সহজ করেই বলতে শুরু করলেন—

King of Spain.

এভাবেই "স্পেন" ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

অর্থাৎ বাইরের পৃথিবীর কাছে দেশটি ছিল স্পেন, কিন্তু নিজের আইনি কাঠামোতে সেটি তখনও বহু রাজ্যের সমষ্টি। এক অর্থে বলা যায়, রাষ্ট্রের জন্মের আগেই তার আন্তর্জাতিক ডাকনাম জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল।

তিনশো বছর ধরে এক দেশ, কিন্তু পুরোপুরি এক নয়:

হ্যাবসবার্গ শাসনামলে (১৫১৬–১৭০০) স্পেন ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। আমেরিকা থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্য পরিচালিত হচ্ছিল মাদ্রিদ থেকে। তবু ভেতরে ভেতরে কাস্তিল আর আরাগনের আলাদা আইনি পরিচয় বহাল ছিল।

অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর একটি হয়েও স্পেন তখনও পুরোপুরি একক রাষ্ট্র হয়ে ওঠে নি।

সত্যিকারের একীকরণ:

১৭০০ সালে বোরবোঁ রাজবংশ ক্ষমতায় আসে। স্প্যানিশ উত্তরাধিকার যুদ্ধ শেষে রাজা পঞ্চম ফিলিপ ১৭০৭ থেকে ১৭১৬ সালের মধ্যে Nueva Planta Decrees জারি করেন।

এর মাধ্যমে—

আরাগনের বিশেষ আইন বাতিল হয়,

কেন্দ্রীয় প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়,

একীভূত শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

এটাই আধুনিক স্পেনের প্রশাসনিক ভিত্তি। তবুও রাষ্ট্রের নাম তখনও সংবিধানে লেখা হয় নি; আরও এক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হয়।

১৮১২ সালে, নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে, কাদিস শহরে স্পেনের প্রথম উদারপন্থী সংবিধান রচিত হয়। এই সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদেই ঘোষণা করা হয়—

"La Nación Española" — "স্প্যানিশ জাতি"।

এই প্রথম আধুনিক সাংবিধানিক অর্থে España রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা পায়।

তাহলে স্পেনের জন্ম কবে?

এই প্রশ্নের এক লাইনের উত্তর নেই। কারণ "স্পেন" তিনবার জন্ম নিয়েছে।

প্রথম জন্ম—রোমানদের Hispania হিসেবে, একটি ভূখণ্ডের নাম।

দ্বিতীয় জন্ম—১৪৬৯–১৪৭৯ সালে, যখন কাস্তিল ও আরাগনের মুকুট এক হলো।

তৃতীয় জন্ম—১৮১২ সালে, যখন España প্রথমবার আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রের পরিচয় পেল।

রোমানদের Hispania থেকে মুসলিমদের আল-আন্দালুস, সেখান থেকে কাস্তিল ও আরাগনের যুগ, এবং শেষ পর্যন্ত আধুনিক España—প্রায় দুই হাজার বছরের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে একটি নাম ধীরে ধীরে একটি রাষ্ট্রে রূপ নিয়েছে। @ boikal


13


প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে পৃথিবীর আকার কত বড়—এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য মানুষের হাতে ছিল না উপগ্রহ, জিপিএস বা আধুনিক মানচিত্র। তবু সেই সময়েই একজন গ্রিক পণ্ডিত শুধু সূর্যের আলো, একটি খাড়া দণ্ড এবং দুটি শহরের মধ্যকার দূরত্ব ব্যবহার করে পৃথিবীর পরিধি নির্ণয়ের চেষ্টা করেছিলেন। আজকের দৃষ্টিতে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এই হিসাব বিজ্ঞানের ইতিহাসে যুক্তিনির্ভর চিন্তার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই কাহিনির নায়ক ইরাটোস্থেনিস। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৪০ সালে তিনি মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত গ্রন্থাগারের প্রধান ছিলেন। গণিত, ভূগোল ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে সমান দক্ষ এই পণ্ডিতের সবচেয়ে বিখ্যাত অবদান হলো পৃথিবীর পরিধি নির্ণয়। তবে সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ দেখায়, জনপ্রিয় গল্পে যেভাবে ঘটনাটি বলা হয়, বাস্তব ইতিহাস তার চেয়ে কিছুটা বেশি জটিল এবং আরও বেশি আকর্ষণীয়।

ইরাটোস্থেনিস জানতেন যে গ্রীষ্মকালীন অয়ন দিবসে, অর্থাৎ বছরের সবচেয়ে দীর্ঘ দিনে, সায়েনে শহরে (বর্তমান আসওয়ান) দুপুরবেলা সূর্য প্রায় মাথার ঠিক ওপরে অবস্থান করে। ফলে একটি খাড়া দণ্ডের কার্যত কোনো ছায়া পড়ে না। একই সময়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় একটি দণ্ডের ছায়া পড়ে এবং সেই ছায়া থেকে তিনি সূর্যের কৌণিক অবস্থান মাপেন। সেই কোণ ছিল প্রায় ৭ ডিগ্রি ১২ মিনিট, অর্থাৎ পূর্ণ ৩৬০ ডিগ্রির প্রায় এক-পঞ্চাশ ভাগ। এরপর সাধারণ জ্যামিতি ব্যবহার করে তিনি যুক্তি দেন, যদি দুই শহরের দূরত্ব ৫,০০০ স্টাডিয়া হয়, তবে পৃথিবীর মোট পরিধি হবে ২,৫০,০০০ স্টাডিয়া। পরে কিছু প্রাচীন লেখক ২,৫২,০০০ স্টাডিয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন, সম্ভবত সংখ্যাটিকে আরও সহজে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করার সুবিধার জন্য।

দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি গল্পে বলা হয়, সায়েনের একটি গভীর কূপে ওই দিনে সূর্যের আলো সরাসরি তলদেশে পৌঁছাত এবং সেই দৃশ্য থেকেই ইরাটোস্থেনিস ধারণাটি পান। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসবিদ পিটার গেইনসফোর্ডসহ কয়েকজন গবেষক দেখিয়েছেন, এই কূপের গল্পটি সম্ভবত পরবর্তী সময়ের সংযোজন। প্রাচীন রোমান লেখক প্লিনি কূপটির উল্লেখ করলেও সেটি মূলত সায়েনে কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করার একটি প্রতীকী প্রমাণ ছিল, পৃথিবীর পরিধি নির্ণয়ের যন্ত্র নয়। বরং ধারণা করা হয়, ইরাটোস্থেনিস নিজে সায়েনে যাননি। তিনি রাজকীয় জরিপকারীদের মাপা দূরত্ব এবং আগে থেকেই প্রকাশিত ছায়া-পরিমাপের তথ্য ব্যবহার করেছিলেন।

তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইরাটোস্থেনিস তাঁর ফল প্রকাশ করেছিলেন "স্টাডিয়া" এককে। কিন্তু একটি স্টাডিয়ার প্রকৃত দৈর্ঘ্য ঠিক কত ছিল, সে বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজও ঐকমত্য নেই। বিভিন্ন গবেষণায় এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫৭ মিটার থেকে ১৮৫ মিটারের মধ্যে ধরা হয়েছে। এই পার্থক্যের কারণে তাঁর হিসাবকে আধুনিক কিলোমিটারে রূপান্তর করলে ভিন্ন ভিন্ন ফল পাওয়া যায়। ১৯৪৩ সালে Nature সাময়িকীতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণেও দেখানো হয়েছিল যে, এই এককটির অনিশ্চয়তাই তাঁর সাফল্যের নির্ভুলতা মূল্যায়নকে জটিল করে তোলে।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর ব্যবহৃত কয়েকটি মৌলিক তথ্য পুরোপুরি সঠিকও ছিল না। সায়েনে ঠিক কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করে না, শহরটি আলেকজান্দ্রিয়ার ঠিক দক্ষিণেও নয়; বরং প্রায় ৩ ডিগ্রি পূর্বে অবস্থিত। দুই শহরের মধ্যকার দূরত্বও ছিল আনুমানিক। তবু ভূগোলবিদ জন বল ১৯৪২ সালে দেখিয়েছিলেন, এই পৃথক ত্রুটিগুলো পরস্পরকে অনেকাংশে বাতিল করে দিয়েছিল। ফলে চূড়ান্ত ফল বাস্তব মানের আশ্চর্যজনকভাবে কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় "ত্রুটির পারস্পরিক সমন্বয়", যেখানে একাধিক ভুল বিপরীত দিকে কাজ করে মোট ভুলকে কমিয়ে দেয়।

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সংখ্যায় নয়, চিন্তার পদ্ধতিতে। ইরাটোস্থেনিস ধরে নিয়েছিলেন পৃথিবী গোলাকার এবং সূর্য পৃথিবী থেকে এত দূরে যে তার আলোকরশ্মি কার্যত সমান্তরালভাবে আসে। এই দুটি ধারণার ওপর ভিত্তি করেই তিনি দেখিয়েছিলেন, একই দিনে দুটি স্থানে ছায়ার পার্থক্য থেকে পুরো গ্রহের আকার অনুমান করা সম্ভব। আজও বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা একই পদ্ধতিতে পৃথিবীর পরিধি মাপার অনুশীলন করে। এত শতাব্দী পরেও কেবল একটি প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি—ইরাটোস্থেনিসের ব্যবহৃত স্টাডিয়ার প্রকৃত দৈর্ঘ্য কত ছিল। সেই রহস্যের সমাধান হলে মানবসভ্যতার অন্যতম বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক হিসাবের শেষ অনিশ্চয়তাটিও দূর হবে।

সূত্র: প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিক সূত্র, Nature, জন বলের Egypt in the Classical Geographers, Space Daily, ২০২৬.

© উপম বিকাশ |



14


১৯১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে একদিন Edward N. Hines লক্ষ্য করেন, একটি দুধবাহী ঘোড়ার গাড়ি থেকে দুধ পড়ে রাস্তার মাঝখানে দীর্ঘ একটি সাদা রেখা তৈরি হয়েছে। সেই দৃশ্য থেকেই তাঁর মাথায় আসে এক যুগান্তকারী ধারণা—যদি রাস্তার মাঝখানে স্থায়ী সাদা লাইন আঁকা হয়, তবে চালকদের জন্য নিজের লেন চেনা সহজ হবে এবং মুখোমুখি সংঘর্ষ অনেকটাই কমে যাবে।তাঁর এই সহজ কিন্তু অসাধারণ চিন্তাই ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আজ প্রায় প্রতিটি মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে দেখা যায় সেই সেন্টার লাইন, যা প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ চালককে সঠিক পথে থাকতে সাহায্য করে এবং অসংখ্য প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।  



আয়ারল্যান্ড, একটা দ্বীপ, দুটো দেশ, একটা স্বাধীন, একটা পরাধীন। ১৯২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত একটা দেশই ছিল। তারপর এই দিনে ৩ মে আয়ারল্যান্ড পার্টিশন করা হয়। উত্তরের ছোট একটি অংশ রাখা হয় যুক্তরাজ্যের অধীনে, নাম উত্তর আয়ারল্যান্ড; বাকিটা স্বাধীন আয়ারল্যান্ড।

আয়ারল্যান্ডের স্বাধীন সময়ের ইতিহাস, যুক্তরাজ্যের সাথে দ্বন্দ্ব, স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলা, আন্দোলন, বিভক্তি, স্বাধীনতা এসব মিলিয়ে খুব জটিল ইতিহাস। আমরা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে গভীরে না গিয়ে মূল বিষয়গুলো জানব।

আদি আয়ারল্যান্ড: যখন ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা

খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড ছিল মূলত একটি স্বাধীন অঞ্চল। তখন আয়ারল্যান্ড ‘হাই কিংস’ (High Kings) বা প্রধান রাজাদের অধীনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্রে বিভক্ত ছিল। সেন্ট প্যাটরিকের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের পর আয়ারল্যান্ড শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই স্বর্ণযুগে আইরিশরা কোনো একক কেন্দ্রীয় রাজতন্ত্রের চেয়ে বরং সাংস্কৃতিক ঐক্যের ভিত্তিতে স্বাধীন ছিল।

নর্মান আক্রমণ ও ব্রিটিশ শাসনের শুরু (১১৬৯ খ্রিষ্টাব্দ):

আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার সূর্য প্রথম অস্তমিত হতে শুরু করে ১১৬৯ সালে। বহিষ্কৃত আইরিশ রাজা ডারমট ম্যাকমোরোর আমন্ত্রণে ইংল্যান্ডের নর‌মানরা আয়ারল্যান্ডে পা রাখে। রাজা দ্বিতীয় হেনরি নিজেকে আয়ারল্যান্ডের অধিপতি ঘোষণা করেন। ধীরে ধীরে ডাবলিনের আশেপাশে একটি ছোট এলাকা (যাকে 'দ্য পেল' বলা হতো) ব্রিটিশদের শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ১৫৪১ সালে রাজা অষ্টম হেনরি নিজেকে 'কিং অফ আয়ারল্যান্ড' ঘোষণা করলে পুরো দ্বীপটি সরাসরি লন্ডনের শাসনের অধীনে চলে আসে।

প্রোটেস্ট্যান্ট আধিপত্য ও 'প্ল্যান্টেশন':

সপ্তদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা আয়ারল্যান্ডে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে এক কৌশল অবলম্বন করে, যা 'প্ল্যান্টেশন' (Plantation) নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডের আদি ক্যাথলিকদের জমি কেড়ে নিয়ে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড থেকে আসা প্রোটেস্ট্যান্টদের বসতি গড়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে উত্তর আয়ারল্যান্ডের আলস্টার (Ulster) প্রদেশে এই বসতি স্থাপন ছিল সবচেয়ে বেশি সফল, যা আজও আয়ারল্যান্ডের বিভক্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধীনতার সূর্য ডোবা: ইউনাইটেড কিংডমের সাথে একীভূতকরণ (১৮০১):

১৭৯৮ সালের ব্যর্থ এক বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আয়ারল্যান্ডকে পুরোপুরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। ১৮০১ সালে 'অ্যাক্ট অফ ইউনিয়ন' পাসের মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডের নিজস্ব সংসদ বিলুপ্ত করা হয় এবং এটি 'ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ড'-এর অংশ হয়ে পড়ে। এর ফলে আয়ারল্যান্ড তার অবশিষ্ট রাজনৈতিক স্বকীয়তাও হারায়।

মহা-দুর্ভিক্ষ ও জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান:

১৮৪৫-১৮৫২ সালের মধ্যে আয়ারল্যান্ডে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (The Great Famine) দেখা দেয়। এতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায় এবং আরও ১০ লাখ মানুষ দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়। আইরিশদের অভিযোগ ছিল, ব্রিটিশ সরকার ইচ্ছা করলেই এই দুর্যোগ ঠেকাতে পারত। এই ক্ষোভ থেকেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে 'হোম রুল' বা স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন দানা বাঁধে।

কিন্তু আলস্টারের প্রোটেস্ট্যান্টরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। তারা ভাবে, যদি আয়ারল্যান্ড স্বশাসিত হয়, তাহলে ক্যাথলিকদের অধীনে তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে তারা জোর দিয়ে বলে- “আমরা ব্রিটেনের সঙ্গেই থাকব।”

১৯১৬ থেকে ১৯২১: স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বিভাজন:

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আয়ারল্যান্ডে সশস্ত্র বিপ্লবের জোয়ার আসে।

ইস্টার রাইজিং (১৯১৬): প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন একদল বিপ্লবী ডাবলিনে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যদিও এই বিদ্রোহ কয়েক দিনের মধ্যেই দমন করা হয়, কিন্তু এর প্রভাব ছিল বিস্ময়কর। ব্রিটিশদের কঠোর প্রতিক্রিয়া সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ঘুরিয়ে দেয় বিদ্রোহীদের দিকে।

স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৯১৯-২১): আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি (IRA) ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দুই পক্ষ সন্ধিতে বসতে বাধ্য হয়।

১৯২১ সালের বিভক্তি ও আংশিক স্বাধীনতা:

অবশেষে ১৯২১ সালে স্বাক্ষরিত হয় অ্যাংলো-আইরিশ চুক্তি। এই চুক্তি আয়ারল্যান্ডকে স্বাধীনতার পথ দেখাল—কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। দ্বীপটি ভাগ হয়ে গেল।

ক্যাথলিক প্রধান দক্ষিণের ২৬টি জেলা নিয়ে গঠিত হয় 'আইরিশ ফ্রি স্টেট', যারা ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অধীনে স্বায়ত্তশাসন পায়। ১৯৪৯ সালে এটি পুরোপুরি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে 'রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ড' নাম নেয়।

প্রোটেস্ট্যান্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তরের ৬টি জেলা নিয়ে গঠিত হয় 'উত্তর আয়ারল্যান্ড', যা ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবেই থেকে যায়।

বর্তমান পরিস্থিতি ও একীভূতকরণের প্রশ্ন:

বিভক্তির পর উত্তর আয়ারল্যান্ডে কয়েক দশক ধরে চলা সংঘাত (দ্য ট্রাবলস) ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তির মাধ্যমে স্তিমিত হয়। তবে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার ইতিহাস আজও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে অনেক আইরিশের কাছে, যারা বিশ্বাস করেন একদিন পুরো দ্বীপটি আবার এক হবে। ১৯৯৮ সালের 'গুড ফ্রাইডে' চুক্তির পর উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ডের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান সীমান্ত বা তল্লাশি চৌকি ছিল না। কিন্তু ২০১৬ সালের "ব্রেক্সিট" সেই স্থিতাবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে। বর্তমানে আয়ারল্যান্ড দ্বীপের রাজনীতি এখন এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। @ boikal


15


মঙ্গোল সাম্রাজ্যের পতনের পর ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে, চীনের দূরবর্তী পশ্চিম সীমান্তে একটিমাত্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র টিকে ছিল।

এটি ছিল কুমুলের খানাত, যা কুমুল খানাত নামেও পরিচিত এবং চেঙ্গিস খানের দ্বিতীয় পুত্রের বংশধরদের দ্বারা শাসিত হতো।

এই কারণেই, এর শাসকরাই মঙ্গোল সাম্রাজ্যের ভূখণ্ডের ওপর শাসনকারী সর্বশেষ ব্যক্তি ছিলেন এবং তাদের রাজবংশ সরাসরি ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে নেমে এসেছিল।

খানাতটি বর্তমান সিনজিয়াংয়ে অবস্থিত ছিল এবং সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ মরূদ্যান নিয়ন্ত্রণ করত।

চীনা সম্রাটদের সাথে যুদ্ধ করার পরিবর্তে, এর শাসকরা তাদের আধিপত্য মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে কিং রাজবংশের আমলে তারা যথেষ্ট স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছিল, স্বাধীনভাবে শাসন করেছিল এবং তাদের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী রেখেছিল।

এর বিনিময়ে তারা সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করত, কর দিত এবং প্রতি ছয় বছর পর পর বেইজিং সফর করে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আনুগত্য নিশ্চিত করত।

এই ব্যবস্থাটি অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী প্রমাণিত হয়। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে (মূল পাঠে ৩০০ বছর বা দীর্ঘ সময় বোঝানো হয়েছে) কুমুলের খানাত টিকে ছিল, এবং এর বংশধরেরা কিং রাজবংশের শেষ পর্যন্ত এই অঞ্চল শাসন করে গেছেন।

সিনজিয়াংয়ের নতুন গভর্নর জিন শুরেন ১৯৩০ সালে কুমুলের খানাত বিলুপ্ত করেন, যিনি এর উত্তরসূরিকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছিলেন। পরিবর্তে, তিনি খানাতটি ভেঙে দেন এবং এর ভূখণ্ডকে সাধারণ চীনা প্রশাসনিক ইউনিটে বিভক্ত করেন।

এই সিদ্ধান্তটি চেঙ্গিস খানের সরাসরি বংশধরদের দ্বারা শাসিত শেষ রাষ্ট্রের ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটায়।

এই সিদ্ধান্তের পরিণতি ছিল তাৎক্ষণিক। খানাত বিলুপ্তির ফলে কুমুল বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা সাবেক রাজবংশ পুনরুদ্ধারের দাবি জানায়। এই অভ্যুত্থান দ্রুত একটি বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নেয় এবং বিংশ শতাব্দীজুড়ে (মূল পাঠে ৩০তম শতাব্দী উল্লেখ রয়েছে, যা মূলত বিংশ বা ২০তম শতাব্দী হবে) সিনজিয়াংয়ের অন্যতম অস্থিতিশীলতাকারী কারকে পরিণত হয়। @ইতিহাসের অধ্যায়


16



রসুন নিয়ে অনেক প্রশ্ন আসে, খালি পেটে কাঁচা রসুন খাওয়ার কথা বলা হয়, রসুন নাকি কোলেস্টেরল কমায়।

আসুন দেখি এই দাবীর মধ্যে কতটা সত্যতা আছে, এবং রসুন আমাদের সত্যিই অতিরিক্ত কোলেস্টেরল থেকে বাঁচাতে পারবে কিনা?

রসুনে উপস্থিত প্রধান জৈব যৌগটি হল ”অ্যালিসিন”, তবে গোটা রসুনে এই যৌগটি থাকেনা, রসুনের কোয়া ক্ষতিগ্রস্ত হলে অ্যালিনেজ এনজাইম অ্যালিনের সাথে বিক্রিয়া করার ফলে অ্যালিসিন উৎপন্ন হয়, অর্থাৎ কাঁচা রসুন ভাঙলে এই যৌগটি সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়, যখন রসুনের কোশের দেয়াল ভেঙে যায় তখন অ্যালিন এবং অ্যালিনেজ একে অপরের সংস্পর্শে আসে। তবে এটি অত্যন্ত অস্থিতিশীল যৌগ এবং তাপে সহজেই নষ্ট হয়ে যায়।

অ্যালিসিন থায়োসালফিনেট যৌগ, যা রসুন গাছের নিজস্ব প্রাকৃতিক কীটনাশক, জীবাণু-ছত্রাকনাশক উপাদান হিসেবে কাজ করে রসুনকে পোকার আক্রমণ ও পচন থেকে অনেকটা রক্ষা করে এটি উদ্ভিদের আত্মরক্ষার একটি প্রাকৃতিক কৌশল হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে।

অ্যালিসিন কীভাবে কাজ করে :-

অ্যালিসিন জীবকোশের কোশীয় প্রোটিনে থাকা মুক্ত থায়োল গ্রুপের সাথে বিক্রিয়া করে জীব কোশকে দ্রুত ধ্বংস করে (নেক্রোসিস ঘটায়)।

রসুনে অ্যালিসিন তৈরির পেছনের বিবর্তনীয় কারণ হল রসুন যখন পোকা, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া বা মাটির নিচের অন্য কোনো প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন এটি নিজেকে রক্ষা করার জন্য এই সালফারযুক্ত যৌগটি তৈরি করে, এটি রসুনের একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক কীটনাশক বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এজেন্ট।

রসুনের প্রধান সক্রিয় উপাদান অ্যালিসিন পোকাদের লার্ভা দমনে অত্যন্ত কার্যকর, এটি মূলত লার্ভার ওপর স্পর্শ বিষ (contact poison) এবং প্রতিরোধক (repellent) হিসেবে কাজ করে।

পোকাদের লার্ভা বা অপরিণত অবস্থার শরীর মূলত কাইটিন (chitin) নামক একটি শক্ত পদার্থ, প্রোটিন, এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ চর্বি ও পেশি দিয়ে গঠিত। লার্ভার শরীর প্রাপ্তবয়স্ক পোকার মতো শক্ত খোলসে ঢাকা না থাকলেও, লার্ভার শরীর কাইটিন ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত একটি পাতলা ও নমনীয় বহিঃকঙ্কাল দ্বারা আবৃত থাকে, এটি তাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোকে রক্ষা করে এবং আর্দ্রতা বজায় রাখে। লার্ভার শরীরের ভেতরে ফ্যাট বডি বা চর্বি কোষ থাকে, যা গ্লাইকোজেন এবং ট্রাইগ্লিসারাইড আকারে শক্তি সঞ্চয় করে, এটি তাদের দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

রসুনের অ্যালিসিন লার্ভার শরীরে কোলেস্টেরল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইমগুলোর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, বিশেষত HMG-CoA reductase নামক এনজাইমকে বাধা দেয়, যা পোকাদের কোলেস্টেরল তৈরির প্রধান পথ, এছাড়াও অন্ত্রের লিপিড বা চর্বি হজম প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে, কোলেস্টেরল বা লিপিড বিপাক প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটে, ফলে লার্ভার পুষ্টির অভাব হয়, এবং বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে একসময় মৃত্যু হয়। এছাড়াও অ্যালিসিন পোকা ও লার্ভার কোশপর্দার কোলেস্টেরলের সাথে বিক্রিয়া করে, যা তাদের কোশ নষ্ট করে দেয় এবং লার্ভা মারা যায়, অ্যালিসিন লার্ভার শরীরের নরম চামড়া ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।

রসুন খেলে কি পোকার লার্ভার মত মানুষের শরীরেও কোলেস্টেরল উৎপাদন ব্যাহত হবে? মানুষের অন্ত্রে লিপিড ও চর্বি হজম প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি হবে?

মানুষের শরীরেও HMG-CoA reductase এনজাইম থাকে, শুধু মানুষ নয়, এনজাইমটি ইউক্যারিওট এবং প্রোক্যারিওট উভয় ধরনের জীবেই পাওয়া যায়। মানুষসহ সমস্ত স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং অন্যান্য ইউক্যারিওটিক প্রাণিতেও এই এনজাইমটি পাওয়া যায়, এটি প্রাণীদের শরীরে কোলেস্টেরল জৈব সংশ্লেষণের হার সীমিতকারী এনজাইম হিসেবে কাজ করে, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ স্ট্যাটিন এই এনজাইমকে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে কাজ করে।

তাত্ত্বিকভাবে তাই রসুন সামান্য হলেও মানুষের লিভারে কোলেস্টেরল উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করে, দেখা গেছে নিয়মিত কাঁচা রসুন খেলে তা প্রায় ১০–১৫% পর্যন্ত কোলেস্টেরল কমাতে পারে, তবে উচ্চ কোলেস্টেরলের রোগীদের জন্য তা মোটেই ওষুধের বিকল্প নয়।

পরিমিত পরিমাণে রসুন খেলে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না, তবে অতিরিক্ত পরিমাণে কাঁচা রসুন খেলে পেটে অস্বস্তি, অ্যাসিডিটির সমস্যা হতে পারে।

আপনি যদি কোলেস্টেরলের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ সেবন করেন, তবে রসুন বা রসুন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কারণ এটি ওষুধের কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এমনিতেই সুস্থ কোলেস্টেরল মাত্রার অধিকারীরা ১-২ কোয়া কাঁচা রসুন থেঁতো করে খেতেই পারেন, তাতে সামান্য লাভ আছে।

কিন্তু অলরেডি রোগীদের জন্য কোন ম্যাজিক্যাল লাভ দেবেনা, সেক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসাই একমাত্র পথ।

বেশি তাপে অ্যালিসিন নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তাই কাঁচা খাওয়াই শ্রেয়। @ বিজ্ঞানকথা

সোর্স:

https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC6271412/

https://www.sciencedirect.com/.../pii/S2161831322012479

https://www.sciencedirect.com/.../abs/pii/S0924224418307398

https://en.wikipedia.org/wiki/HMG-CoA_reductase



17



 উইলসন ইফেক্ট (Wilson Effect): অবাক করার মতো বিষয় হলো, বয়সের সাথে সাথে বুদ্ধিমত্তার ওপর বংশগতির প্রভাব বাড়তে থাকে। শৈশবে যেখানে এর প্রভাব ২০% থাকে, সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় এটি ৬০-৮০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, কারণ প্রাপ্তবয়স্করা তাদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নিজেদের পরিবেশ বেছে নেয়। 


টেস্টোস্টেরন শুধু পুরুষদের শরীরেই তৈরি হয়না, নারীদের শরীরেও তৈরি হয়, এবং নারীদের স্বাস্থ্য ও মন নিয়ন্ত্রণে এর বড় ভূমিকা আছে, তবে নারীদের শরীরে পুরুষদের তুলনায় ১০ থেকে ২০ গুণ কম তৈরি হয়, যেটা বেড়ে বা কমে গেলে নানারকম সমস্যার সৃষ্টি হয়।

মহিলাদের শরীরেও টেস্টোস্টেরন একটি গুরুত্বপূর্ণ যৌন হরমোন, যা ডিম্বাশয় এবং অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে উৎপাদিত হয়। এটি মূলত যৌন আকাঙ্ক্ষা তৈরি করা (libido), হাড় ও পেশীর শক্তি বজায় রাখা, মেজাজ ভালো রাখা এবং সামগ্রিক কর্মশক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

মহিলাদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের প্রধান ভূমিকা:

এটি নারীদের যৌন আকাঙ্ক্ষা বা লিবিডো নিয়ন্ত্রণের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি।

হাড় ও পেশীর স্বাস্থ্য: এটি পেশীর পরিমাণ (muscle mass) বাড়াতে এবং হাড়ের ঘনত্ব বা শক্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে।

শক্তি ও মেজাজ: শরীরের শক্তির মাত্রা বৃদ্ধি এবং মেজাজ ভালো রাখতে এটি সাহায্য করে ।

প্রজনন স্বাস্থ্য: ডিম্বাশয়ের সুস্থতা এবং সামগ্রিক প্রজনন ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে।

সাধারণত, নারীদের শরীরে ৩৫ বছরের পর থেকে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমতে শুরু করে। এই হরমোনটির ভারসাম্যহীনতা তৈরি হলে ক্লান্তি, যৌন ইচ্ছা হ্রাস এবং হাড়ের দুর্বলতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

অনেক নারীদের শরীরে জেনেটিক বা বংশগত কারণে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা বেশি হতে পারে। আবার বিভিন্ন রোগের কারণেও হয়, যেমন পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS)। এছাড়া, কনজেনিটাল অ্যাড্রিনাল হাইপারপ্লাসিয়া (CAH) নামক জেনেটিক ব্যাধিও মহিলাদের অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিকে অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন তৈরিতে প্ররোচিত করে ।

সাধারণত মহিলাদের মধ্যে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেশি হলে লিবিডো বা যৌন আকাঙ্খা বেড়ে যেতে পারে, কারণ টেস্টোস্টেরন মহিলাদের যৌন আকাঙ্খা চালনা (sex drive) বা ইচ্ছার অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হরমোন। তবে, অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন পিসিওএস (PCOS)-এর মতো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে, যা বন্ধ্যাত্ব, ব্রণ, এবং পুরুষালি শারীরিক বৈশিষ্ট্য (যেমন মুখে লোম) তৈরি করতে পারে।

আবার স্বাভাবিকের চেয়ে কম টেস্টোস্টেরন তৈরি হলে সাধারণত লিবিডো কমে যায়, আবার খুব উচ্চ মাত্রায় টেস্টোস্টেরনও অনেক ক্ষেত্রে নারীদের মানসিক চাপ বা শারীরিক অস্বস্তির কারণ হয়, ও পরোক্ষভাবে লিবিডোয় প্রভাব ফেলতে পারে, তবে সোজা কথায় এটি যৌন ইচ্ছা কমায় না, যদি টেস্টোস্টেরন মাত্রাতিরিক্ত কমে যায় (বিশেষ করে মেনোপজের পরে) তবেই সাধারণত লিবিডো উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। @ বিজ্ঞানকথা

সোর্স: https://advancedobgynassociates.com/importance-of-testosterone-in-women/



18




গরু, ছাগলের মত তৃণভোজী প্রাণিরা প্রোটিন পায় কোথা থেকে!!

তৃণভোজী প্রাণীদের (যেমন গরু, ছাগল বা হরিণ) প্রোটিন পাওয়ার প্রক্রিয়াটি বেশ চমৎকার। যদিও তারা শুধু ঘাস বা লতা-পাতা খায় যাতে প্রোটিন খুব কম থাকে, তবুও তাদের কখনো প্রোটিনের অভাব হয়না!!

১. তৃণভোজীদের পাকস্থলীতে প্রোটিনের কারখানা!

গরু বা ছাগলের মতো রোমন্থক (Ruminant) প্রাণীদের পাকস্থলীতে চারটি প্রকোষ্ঠ থাকে। এর মধ্যে 'রুমেন' (Rumen) নামক অংশে কোটি কোটি জীবাণু এবং প্রোটোজোয়া বাস করে, এই অণুজীবগুলো ঘাস-পাতার সেলুলোজ ভেঙে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন সংশ্লেষ করে নিজেরা বড় হয় এবং প্রচুর বংশবৃদ্ধি করে (দিনে কয়েক কিলো পর্যন্ত)। এই অণুজীবগুলোই প্রাণীগুলোর হজম প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে যায় এবং গরু, ঘোড়াদের পাচনতন্ত্র ওই জীবাণুগুলোকেই হজম করে ফেলে, একে বলে Microbial Protein.

তবে ঘোড়া রোমন্থক বা রুমিন্যাণ্ট নয়, ঘোড়ার পাচনতন্ত্রের সিকাম (Caecum) অঙ্গটিই মাইক্রোবিয়াল প্রোটিন তৈরির প্রধান স্থল, এখানে সিকাম হল একটি প্রধান গাঁজন ভ্যাট (fermentation vat), যেখানে অণুজীবের (ব্যাকটেরিয়া ও প্রোটোজোয়া) মাধ্যমে খাদ্যের আঁশ বা সেলুলোজ ভেঙে ভোলাটাইল ফ্যাটি অ্যাসিড, এসেনসিয়াল অ্যামিনো অ্যাসিড এবং প্রোটিন উৎপাদিত হয়।

সিকামের অণুজীবগুলো উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করে। যদিও ঘোড়া সিকাম থেকে সরাসরি প্রোটিন ততটা কার্যকরভাবে শোষণ করতে পারে না, তবুও সিকামে উৎপাদিত কিছু অ্যামিনো অ্যাসিড বৃহদান্ত্রের মাধ্যমে শোষিত হয়ে ঘোড়ার পুষ্টি জোগায়। আবার ঘোড়ার খাবারে থাকা প্রোটিন ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরোপুরি হজম হয় না, কিন্তু সিকামে থাকা এনজাইম এবং অণুজীব সেই জটিল প্রোটিনগুলোকে ভেঙে সরল উপাদানে পরিণত করে, যা ঘোড়ার শরীর ব্যবহার করতে পারে।

২. উদ্ভিজ্জ প্রোটিন -

ঘাস, পাতা বা বীজের মধ্যে অল্প পরিমাণে হলেও প্রোটিন থাকে, তৃণভোজীরা সারাদিন ধরে প্রচুর পরিমাণে খাবার খায়, এই বিপুল পরিমাণ ঘাস, পাতা বা বীজে থেকেও অনেকটা প্রোটিন আসে।

৩. নাইট্রোজেন রিসাইক্লিং -

তৃণভোজী প্রাণীদের শরীর নাইট্রোজেন ধরে রাখায় খুব দক্ষ, তারা শরীরের বর্জ্য ইউরিয়াকে পুনরায় লালার মাধ্যমে পাকস্থলীতে পাঠিয়ে দেয়, সেখানে থাকা ব্যাকটেরিয়া এই ইউরিয়া ব্যবহার করে নতুন প্রোটিন তৈরি করে, অর্থাৎ, তারা তাদের নিজস্ব বর্জ্যকেও প্রোটিন তৈরিতে কাজে লাগাতে পারে।  


19


শুধু মানুষ নয়, বেশিরভাগ বানর, মহাবানর (গরিলা, বোনোবো, ওরাওটাং ,শিম্পাঞ্জী), কিছু পাখি, একটি প্রজাতির ইঁদুর ও কিছু বাদুড় মানুষের মত সারাবছর প্রজনন করে।

এইসব প্রাণিদের সারাবছর প্রজনন করার কারণ হল, এদের স্ত্রীদের ডিম্বাণু নিঃসরণ লুকানো প্রকৃতির (Concealed),

লুকানো প্রকৃতির অর্থ হল, ডিম্বাণু নিঃসরণের সময় চোখে পড়ার মত বা চাক্ষুষ করার মত বড় কোন শারীরিক পরিবর্তন বা ভিসুয়াল সাইন বা ক্লু এদের পুরুষদের জন্য থাকেনা, যাতে করে পুরুষ প্রাণিরা বুঝতে পারবে যে কখন গর্ভবতী করার উপযুক্ত সময়।

আসলে মানুষ ও এই প্রাণিরা বিবর্তনের রাস্তায় এই ক্ষমতা হারিয়েছে। মানুষ, ওরাংওটাং, বোনোবো ইত্যাদি পুরুষদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়না নারীর ডিম্বাণু কখন নিঃসরণ হবে? এইজন্যই এইসব প্রাণিদের কোন নির্দিষ্ট প্রজনন ঋতু নেই। এই কারণেই এইসব প্রাণিদের পুরুষরা সারাবছর ধরে নারীদের অণুসরণ করতে বাধ্য হয়। এইসব প্রাণিরা যে পরিবার গঠন করে জীবনযাপন করে, তার অন্যতম কারণ এটা।

তবে গবেষণায় বোঝা গেছে মানব মহিলাদের যৌন ইচ্ছা ডিম্বাণু নিঃসরণের আশেপাশে বৃদ্ধি পায়। মানুষের ডিম্বাণু নিঃসরণ হয় যৌনচক্র শুরুর পরে ১০-১৪ দিনের মধ্যে, আর যৌনচক্র নারীভেদে ২১-৩১ দিনের হয়।

ওরাংওটাং ও বোনোবোদের ডিম্বনিঃসরণ মানুষের মত লুকানো প্রকৃতির, তাই এদের যৌন আচরণও মানুষের মতো।

উল্টোদিকে বানর, গরিলা, শিম্পাঞ্জীদের ডিম্বনিঃসরণের সময় শরীরের বাইরে চোখে পড়ার মতো ভিসুয়াল সাইন দেখা যায়, যেমন যোনি ফুলে যাওয়া ও লাল হয়ে যাওয়া।

গরু, কুকুর, ভেড়া ছাগলেরা তাদের তীব্র ঘ্রাণশক্তির সাহায্যে স্ত্রী প্রাণিদের ডিম্ব নিঃসরণের সময় বা "হিট পিরিয়ড" বুঝতে পারে। এখানে উদ্বায়ী বহিঃ হরমোন বা ফেরোমোনের ভূমিকা থাকে। উদ্বায়ী হরমোন স্ত্রী প্রাণির মূত্রের সঙ্গে বার হয়, যা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এছাড়া সরাসরি মূত্র বা জনন অঙ্গ শুঁকেও পুরুষ প্রাণিরা বুঝতে পারে।

কুকুর জাতীয় ও অন্যান্য প্রাণী যারা বছরে একবার নির্দিষ্ট ঋতুতে প্রজননক্ষম হয়, তাদের ক্ষেত্রে দিনের আলোর দৈর্ঘ্য ও তাপমাত্রা যৌন হরমোন নিঃসরণ শুরু করে। এরজন্য জীবদেহের নিজস্ব বায়োলজিক্যাল ঘড়ি আছে, সেটা সময়ের হিসাব রাখে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুভেদে তাপমাত্রার ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, যার ফলে এইসব প্রাণিগুলির প্রজনন সময়ের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।  

জীবেদের বংশবিস্তারের এই কৌশল (Strategy) বিষয়ে একটি বিবর্তনীয় তত্ত্ব আছে, যাকে বলে r / K নির্বাচন তত্ত্ব।

কিছু প্রজাতি প্রচুর সন্তান উৎপাদন করে, কিন্তু পিতামাতা বাচ্চাদের প্রায় যত্ন করেনা, বা লালন-পালন করেনা, এদের r-নির্বাচিত প্রজাতি বলা হয়।

বিপরীতে কিছু জীব আছে যারা খুব কম সন্তানের জন্ম দেয়, কিন্তু পিতামাতা বাচ্চাদের লালন-পালনে অনেক সময় ও রিসোর্স (সম্পদ?) ব্যয় করে, তাদের K-নির্বাচিত প্রজাতি বলা হয়।

এই r / K- নির্বাচনের তত্ত্বটি ১৯৬৭ সালে ইকোলজিস্ট রবার্ট ম্যাকআর্থার এবং ই. ও. উইলসন তাঁদের গবেষণার উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছিলেন।

মাছ, ব্যাঙ, পোকামাকড় ইত্যাদিদের r-নির্বাচিত প্রজাতিতে রাখা হয় (r-selected species), এরা একবারে প্রচুর পরিমাণে সন্তানের জন্ম দেয়, কিন্তু এদের শিশু জীবদের মৃত্যুর হার অনেক বেশি, ফলে কম সংখ্যক জীব বয়স্ক হয়, এইভাবে জীবজগতের ভারসাম্য রক্ষিত হয়।

আবার হাতি, মানুষ, গরু ইত্যাদিদের K-নির্বাচিত প্রজাতিতে রাখা হয় (K-selected species), যারা একবারে ১-২টি সন্তানের জন্ম দেয়, কিন্তু তাদের অনেক যত্ন নেয়, ফলে সন্তানদের বেঁচে থেকে বয়স্ক হওয়ার হার অনেক বেশি।

এই তত্ত্বে 'r' দিয়ে rate of increase বোঝানো হয় (দ্রুত বংশবৃদ্ধি), এবং 'K' দিয়ে carrying capacity বোঝানো হয় (পরিবেশের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা)।

কুকুরদের সাধারণত r-নির্বাচিত প্রজাতি হিসাবে বিবেচনা করা হয়, তবে বাস্তবে কুকুর r/K মাঝামাঝি কোথাও অবস্থান করে, কারণ তারা মানুষের তুলনায় শিশু প্রতি তুলনামূলকভাবে কম "পিতামাতার বিনিয়োগ" করে, আবার কুকুর, ব্যাঙ বা মাছের মত চরম r-selected species নয়। @ বিজ্ঞানকথা

সূত্র: Advanced Biology, Oxford University Press.

https://www.nature.com/articles/s41598-019-42562-7



20



টাক পড়ার ঘটনা আসলে “পুরুষ প্রভাবিত”  টাক পড়া পলিজেনিক বৈশিষ্ট্য - অর্থাৎ একাধিক জিন একসাথে কাজ করে টাক তৈরি করে। এই জিনগুলো সাধারণত X বা Y ক্রোমোজোমে থাকেনা, কিন্তু তাদের প্রকাশ (expression) X বা Y ক্রোমোজোমের প্রভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়।

পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরন ও ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন মাত্রা বেশি থাকায় এই জিনগুলো সক্রিয় হয়, কিন্তু নারীদের মধ্যে একই জিন থাকলেও ইস্ট্রোজেনের প্রভাবে তা “চুপ” করে বসে থাকে, তাই অনেক মহিলারা হয়তো টাকের জিন বহন করে, কিন্তু তা সাধারণত প্রকাশ পায় না, অন্তত ঋতুস্রাব বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত, যতদিন ইস্ট্রোজেনের প্রভাব বেশি থাকে ।

পুরুষদের মধ্যে টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর জিন এবং তার ফলাফল (যেমন বেশি পেশিশক্তি, আগ্রাসীভাব ও আগ্রাসন ইত্যাদি) প্রজনন সাফল্য বাড়িয়েছে, কিন্তু নারীদের জিনোমে ইস্ট্রোজেনের প্রতিরোধী সিস্টেম শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, যা মহিলাদের টাক পড়ার জিনের প্রকাশ ও ফ্রিকোয়েন্সি দুই-ই কমিয়েছে। 

অনবরত চুল পড়ে টাক পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন নামক এক হরমোন, এটা সাধারণ চুল পড়ার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, পুরুষদের শরীরে নারীদের তুলনায় প্রায় ৩ থেকে ৫ গুণ বেশি ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন উৎপাদন হয়, আবার DHT তৈরি হয় টেস্টোস্টেরন থেকে, ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন হল টেস্টোস্টেরনের একটি শক্তিশালী রূপ।

টেস্টোস্টেরন (Testosterone) যদিও চুলের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু এর বিপরীতে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন চুলের ফলিকলগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা চুল পড়ার একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে পুরুষদের টাক পড়ার জন্য DHT র পরিমাণ বেশি হওয়াকে দায়ী করা হয়। মেয়েদের শরীরেও অল্প পরিমাণ টেস্টোস্টেরন থাকে, কিন্তু DHT র পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম, তাই তাদের টাক পড়ার সম্ভাবনা অনেক কম।

টাক পড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বংশগতিতে প্রবাহিত হয়, যাদের মা-বাবা কোন একজনের বা উভয়েরই পরিবারে পুরুষদের টাক পড়ার ইতিহাস আছে, তাদের মধ্যে টাকপড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি দেখা যায়।

নারীদের ক্ষেত্রে এই ফলিকল তুলনামূলকভাবে DHT র প্রতি কম সংবেদনশীল, তাই টাক পড়ার ধরনও আলাদা, নারীদের ক্ষেত্রে সাধারণত চুল পাতলা হয়ে যায় কিন্তু পুরো টাক হয় না। @ বিজ্ঞানকথা

Reference:

The evolutionary significance and social perception of male pattern baldness and facial hair.



21



যারা ফুলের পরাগ খায়, যেমন মৌমাছি বা কিছু প্রজাপতি, তারা প্রচুর প্রোটিন পায়, কারণ পরাগে প্রোটিনের পরিমাণ অনেক বেশি। কেবলমাত্র কয়েকটি প্রজাতির স্ত্রী মশা ও মাছিরই রক্তের প্রয়োজন হয়, বিভিন্ন প্রজাতির মশা বিভিন্ন প্রাণিদের থেকে রক্ত নেয়, কিছু আছে যারা মাছ, ব্যাঙ ও সাপের থেকে রক্ত খায় (যেসব মাছ বাতাসে শ্বাস নিতে জলের ওপরে আসে তাদের রক্ত খায়, এই মশারা জলাজমিতে থাকে)। আবার কিছু এক্সক্লুসিভ রক্ত ও মাংসখেকো পতঙ্গও আছে, এরা সুযোগ পেলে মানুষেরও রক্তপান করে, খোলা ঘা থেকে রস খায় এবং ডিম পেড়ে দেয়।

মশার “রক্তের নেশা”র বিবর্তনীয় প্রেক্ষাপট -

বিভিন্ন ফসিল প্রমাণ থেকে বোঝা যায় মশার বিবর্তন প্রায় আজ থেকে ২০ কোটি বছরেরও আগে শুরু হয়েছিল, মশার সেই অতি আদিম পূর্বপুরুষরা মূলত উদ্ভিদের রস খেত, কিছু স্ত্রী মশা হয়ত একধাপ এগিয়ে প্রাণিদের ঘামের লবণ বা ক্ষত থেকে বের হওয়া তরলও পান করতে শুরু করেছিল, ধীরে ধীরে শিকারী প্রাণিদের শিকারের খোলা মাংসে বসে রক্ত ও রস খেতে শুরু করেছিল।

আবার জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিবর্তনও মশাদের রক্তপানের অভ্যাসের দিকে চালিত করেছে বলে মনে করা হয়, প্রাচীনতম মশার জীবাশ্ম প্রায় ১০ কোটি বছর আগের (ক্রিটেশিয়াস যুগ), মশাদের (Culicidae পরিবার) বিবর্তন ঘটেছিল মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র ক্রান্তীয় ও নিরক্ষীয় অঞ্চলের কাছাকাছি। এই জীবাশ্মগুলি পাওয়া গেছে বর্তমান মায়ানমার, কানাডা, সাইবেরিয়া ও লেবাননে, যে অঞ্চলগুলি সেই সময় উষ্ণ ও আর্দ্র অরণ্য ছিল। তো সেই সময়ের বিস্তৃত বনাঞ্চল এবং উষ্ণ-আর্দ্র জলবায়ু প্রচুর সরস ফুলযুক্ত গাছপালার বাড়বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছিল, যাদের মকরন্দ ও রস আদিম মশাদের পর্যাপ্ত প্রোটিনযুক্ত খাদ্য সরবরাহ করত। পরবর্তীকালে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে, দীর্ঘ শুকনো ঋতু ও শীতকাল চলে আসে, ফলে বনাঞ্চল তৃণভূমিতে পরিণত হয়, কিছু অঞ্চল ও ঋতুতে ফুলের গাছপালার প্রাচুর্য কমে যায় এবং উভচর, সরীসৃপ, পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বিশাল জনগোষ্ঠী আবির্ভূত হয়, যাদের রক্ত প্রোটিনের সমৃদ্ধ এবং নির্ভরযোগ্য উৎস প্রদান করে, ফলে যেসব মশাদের মধ্যে চামড়া ছিদ্র করে রক্ত ​​টানার বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা সুবিধা পেয়ে যায়। যেসব প্রজাতির স্ত্রী মশাদের মুখ উপাঙ্গ (প্রোবোসিস) দক্ষতার সাথে রক্ত ​​আহরণের জন্য উপযুক্ত ছিল এবং মুখের লালা ও পাকস্থলীতে রক্ত হজম করার জন্য এনজাইম ছিল, তাদের ব্যাপক বংশবৃদ্ধি হয়। 

@ বিজ্ঞানকথা

Reference:

 Mosquito Evolution & Impact: A Brief Evolutionary Journey 


22


মানুষ হারিয়েছে ভিটামিন-সি সংশ্লেষ করার ক্ষমতা...

গরু-ভেড়া-ঘোড়া-হাতি-কুকুর-বিড়াল-ইঁদুর-শূকর সহ কিছু প্রাণি নিজের শরীরেই ভিটামিন-সি সংশ্লেষ করতে পারে, ফলে এদের বাইরে থেকে ভিটামিন-সি নেওয়ার দরকার পড়েনা বা ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার খুঁজে বেড়াতে হয়না।

ভিটামিন সি (অ্যাসকরবিক অ্যাসিড) শরীরে কোলাজেন সংশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের কাজ করে।

বেশিরভাগ মেরুদণ্ডী প্রাণী নিজের শরীরেই এই যৌগটি সংশ্লেষণ করতে সক্ষম। কিন্তু অনেক প্রজাতি, যেমন টেলিওস্ট মাছ (শক্ত হাড়ের মাছ), অ্যানথ্রোপয়েড প্রাইমেট (বানর, মহাবানর, মানুষ), গিনিপিগ, সেইসাথে কিছু বাদুড় এবং প্যাসেরিফর্মিস পাখি প্রজাতি, এটি সংশ্লেষণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

মানুষ সহ মহাবানর ও কিছু বানরদের শরীরে ভিটামিন-সি সংশ্লেষ করার জিন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার পেছনে সম্ভাব্য কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে এদের পূর্বপুরুষরা বেশি পরিমাণে ফল খেত (Frugivore), বেশিরভাগ ফলে যথেষ্ট ভিটামিন-সি থাকায় মানুষের শরীরে ভিটামিন-সি সংশ্লেষ করার প্রয়োজনীয়তা ছিলনা, তাই সেইসময় প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপে ভিটামিন-সি সংশ্লেষের জিন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

এদের ভিটামিন সি সংশ্লেষণের ক্ষমতা হারানোর মূল কারণ হলো একটি জিনের মিউটেশন, যা ভিটামিন-সি তৈরির শেষ ধাপের জন্য দায়ী এনজাইম (L-gulonolactone oxidase) তৈরি করে। প্রায় ৪ কোটি বছর আগে এই মিউটেশন ঘটেছিল। এই ক্ষমতা হারানোর ফলে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাইমেটরা তাদের খাদ্য থেকে ভিটামিন-সি গ্রহণ করার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, কারণ তাদের শরীর এখন আর নিজে এটি তৈরি করতে পারে না।

@ বিজ্ঞানকথা

তথ্যসূত্র: https://www.nature.com/scitable/topicpage/the-mystery-of-vitamin-c-14167861/ https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3145266/



23


আখ গাছের ইতিহাস :-

বিজ্ঞান অনুযায়ী (জেনেটিক বিশ্লেষণ, প্রজাতির বিবর্তন ইত্যাদি অনুযায়ী) আখের গৃহপালন (ডোমেস্টিকেসন) আজ থেকে আনুমানিক ১০ হাজার বছর আগে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের নিউ গিনিতে শুরু হয়েছিল, শুরুতে আখ আজকের মত মোটা ও মিষ্টি ছিলনা, প্রথমে একটি বন্য ঘাস ছিল, অষ্ট্রোনেশিয়ান আদিবাসীরা সেই ঘাসের মিষ্টি স্বাদ অনুভব করে এবং এর কান্ড চিবানো শুরু করে, যা ধীরে ধীরে সেই মানুষদের আখের চাষাবাদের দিকে পরিচালিত করে এবং কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে আজকের মোটা আকার ও মিষ্টত্ব এসেছে।

এরপর আখ অষ্ট্রোনেশিয়ানদের ব্যাক মাইগ্রেশনের সঙ্গে সঙ্গে আজকের ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছায়, কারণ এই অষ্ট্রোনেশিয়ান আদিবাসীরা খুবই সাহসী ও দক্ষ সমুদ্র অভিযাত্রী ছিল, যারা বড় বড় ভেলা তৈরি করে পৃথিবীর বিভিন্ন সূদূর দ্বীপগুলোতে পৌঁছে যায়। অস্ট্রোনেশিয়ান ভাষাভাষী মানুষেরা আজকের ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মাদাগাস্কার, নিউজিল্যান্ড, হাওয়াই, সামোয়া, তাহিতি, ইস্টার দ্বীপে বসবাস করে। তবে তাইওয়ান তাদের আদি আবাসস্থল হিসাবে পরিচিত, অস্ট্রোনেশিয়ান ভাষাভাষী মানুষেরা প্রায় ৪০০০ বছর আগে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

এই অস্ট্রোনেশিয়ান মানুষদের সঙ্গে আদি ভারতীয়দের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল, যাদের মাধ্যমে আনুমানিক ৪-৬ হাজার বছর আগে আখ জলপথে পূর্ব ভারতে পৌঁছায়, (আজকের পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ওড়িশা এবং মায়ানমারের উপকূলে কোন এক জায়গায়)

তবে আখ থকে চিনি তৈরির কৃতিত্ব আমাদের পূর্বপুরুষদের, “চিনি” শব্দটি এসেছে ইরানী বা ফারসি শব্দভান্ডার থেকে, যার অর্থ “চীনদেশীয়”, প্রাচীনকালে পারস্য বা ইরানে চীন থেকে আখের চিনি আসত বলে মানুষ সেটিকে “চীনদেশীয় মিষ্টি” বলত। @ বিজ্ঞানকথা

তথ্যসূত্র:

An overview of Neem (Azadirachta indica)

A short review on sugarcane: its domestication, molecular manipulations and future perspectives.

Genetic Transformation of Sugarcane.

Sugarcane in Prehistory - Archaeology in Oceania

The Austronesian Homeland: A Linguistic Perspective


২৪



ABCD গুলো (বর্ণমালা) কোথা থেকে এল!

আসলে জৈবিক বিবর্তনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিবর্তনও সমানতালে চলে।

ইংরেজি অ্যালফাবেট (বর্ণমালা), যেটা আসলে ল্যাটিন স্ক্রিপ্ট বা লিপি, এই ল্যাটিন লিপি এসেছে ফিনিশীয় লিপি (Phoenician Alphabet) থেকে, আবার ফিনিশীয় লিপি এসেছিল মিশরীয় চিত্রলিপি থেকে।

শুধু তাই নয়, হিব্রু ও আরবি লিপিও এই ফিনিশীয় লিপি থেকেই এসেছে।

ফিনিশীয় লিপিকে পৃথিবীর প্রথম অক্ষরভিত্তিক লিপি ধরা হয়, তবে তখন এতে শুধু ছিল ব্যঞ্জনধ্বনির চিহ্ন, যে বৈশিষ্ট্য আজও হিব্রু ও আরবি লিপিতে আছে। আনুমানিক ১০৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ফিনিশীয় লিপির উদ্ভব হয়েছিল।

এরপর আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিকরা ফিনিশীয় লিপি গ্রহণ করে এবং এতে স্বরধ্বনির চিহ্ন (ভাওয়েল) যুক্ত করে, এইভাবে প্রথম পূর্ণধ্বনিভিত্তিক লিপির উদ্ভব হয় (phonetic script)।

আনুমানিক ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আজকের ইতালিতে বসবাসকারী ইট্রাস্কান জনগোষ্ঠী গ্রিক লিপি গ্রহণ করে ব্যবহার শুরু করে, আর রোমানরা এই ইট্রাস্কানদের লিপি গ্রহণ করে ধীরে ধীরে নিজেদের একটি সংস্করণ গড়ে তোলে, যেটা ছিল প্রাচীন ল্যাটিন লিপি।

প্রথমদিকে ল্যাটিন বর্ণমালায় ২১ টি অক্ষর ছিল; Y, Z, J, U, ও W ছিলনা, এগুলো পরে যোগ করা হয়। রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ল্যাটিন লিপি ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

একসময় রোমান ক্যাথলিক চার্চও এই লিপিকে ধর্মীয় গ্রন্থ লেখায় ও চর্চায় ব্যবহার করতে শুরু করে, ফলে ল্যাটিন লিপি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।

আজকের ল্যাটিন লিপি ২৬ টি অক্ষরবিশিষ্ট লিপি, যেটি আমরা ইংরেজি ও অনেক ভাষায় দেখি, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত লিপি।

ফিনিশিয় জনগোষ্ঠী-

ফিনিশিয় (Phoenicia) ছিল একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠী, যাঁদের অস্তিত্ব আনুমানিক ৪৫০০ বছর আগে থেকে পাওয়া যায় (২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ), এরা আধুনিক সিরিয়া, লেবাননের উপকূলীয় এলাকা এবং কিছু ইস্রায়েল অঞ্চলে বাস করত, তারা সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্যে বিশেষ পারদর্শী ছিল, তারা আফ্রিকা, স্পেন এবং সম্ভবত ব্রিটেন পর্যন্ত সমুদ্র পথে বাণিজ্য করত। এঁদের সভ্যতা ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সক্রিয় ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ফিনিশিয়রা ভূমধ্যসাগরের চারদিকে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল, বিশেষ করে কার্থেজ ছিল তাঁদের একটি বিখ্যাত উপনিবেশ, যা বর্তমানে তিউনিসিয়ার অংশ।

প্রাচীন ফিনিশীয় ভাষা আজকের হিব্রু ও আরবি ভাষার মত ছিল, ভাষাবিজ্ঞানীরা বলেন যে এই ভাষাগুলি একটিই সাধারণ প্রাচীন ভাষা থেকে বিবর্তিত হয়েছে। @ বিজ্ঞানকথা

রেফারেন্স: A History of Writing - Fischer, R. Steven


২৫

কুমড়া পরিবার

কুমড়ো, লাউ, শসা, ফুটি, তরমুজ, করলা, পটল ইত্যাদি উদ্ভিদ গুলোকে "কিউকারবিটাসি" (Cucurbitaceae) বা কুমড়া পরিবারও বলা হয়, এই উদ্ভিদ পরিবারটির প্রায় ৯৬৫টি প্রজাতি চিহ্নিত করা গেছে, যার মধ্যে মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল:

কিউকারবিটা (Cucurbita) - কুমড়া, পটল, কিছু লাউ, স্কোয়াশ ও জুকিনি।

ল্যাজেনারিয়া (Lagenaria) – চালকুমড়া (ক্যালাবাশ), লাউ।

সাইট্রুলাস (Citrullus) – তরমুজ।

কুকুমিস (Cucumis) - শসা, ও কিছু মেলন।

মোমরডিকা (Momordica) – উচ্ছে, করলা, কাঁকরোল।

লুফা (Luffa) - ঝিঙা, ধুন্দল বা তুরাই।

সাইক্লানথেরা (Cyclanthera) - কাইগুয়া (পেরুতে পাওয়া যায়)।

এই পরিবারের উদ্ভিদগুলি স্বাভাবিকভাবে নিরক্ষীয় এবং নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে জন্মে।

আসলে আমরা বর্তমানে যে ফল-সব্জি গুলো খাই সেগুলো প্রথম থেকেই আজকের মত বড়, রঙিন ও সুস্বাদু ছিল না! এমনকি অনেক ফল-সব্জি যথেষ্ট বিষাক্তও ছিল! যেমন বন্য আলু, টমেটো, বেগুন তিতকুটে ও বিষাক্ত ছিল!

আমাদের ফল-সব্জি গুলোকেও গৃহপালিত করা হয়েছে!

আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন সেগুলো প্রথম জঙ্গল থেকে তুলে এনেছিল, তখন সেগুলো ছিল ছোট ও বিস্বাদ। তারপর আমাদের পূর্বপুরুষেরা সবথেকে বড়, সুস্বাদু ফলটা বীজ হিসাবে চয়ন করত, এই পদ্ধতিকে জীববিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘‘কৃত্রিম নির্বাচন‘‘(Artificial selection), এটা ডারউইনের ’’প্রাকৃতিক নির্বাচন’’ এর বিপরীত। চার্লস ডারউইন প্রাকৃতিক নির্বাচন ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে এই শব্দটি উদ্ভাবন করেন। ডারউইন খেয়াল করেছিলেন যে পোষ মানানো প্রাণী ও উদ্ভিদের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাদের আদিম পুর্বসূরীদের মধ্যে ছিল না! আমাদের পূর্বপুরুষেরা ওইসব বিশেষ লাভদায়ক বৈশিষ্ট্যযুক্ত জীবদের প্রকৃতি থেকে তুলে এনে বার বার প্রজনন করিয়ে লাভদায়ক বৈশিষ্ট্যটির বিকাশ ঘটিয়ে ছিলেন।

উদাহরণস্বরূপ বন্য আপেলগাছ থেকে যে গাছটির ফল বেশি মিষ্টি ছিল সেটির বীজটি সংরক্ষণ করেছিলেন। আবার যে গাছটির আপেল বড় ছিল সেটির সঙ্গে মিষ্টি আপেল গাছটির সংকরায়ণ (হাইব্রিড) করে বড় ও মিষ্টি আপেল উদ্ভাবন করেছিলেন।

বর্তমানে যে হাজার হাজার রকমের ফল-সব্জি সব ঋতুতে পাওয়া যায়, তা আসলে মানুষের কীর্তি এবং হস্তক্ষেপের ফল!

এইভাবেই সব শাক-শব্জি ও গৃহপালিত প্রাণিদের বিকাশ ঘটানো হয়েছে। @ বিজ্ঞানকথা

রেফারেন্স https://en.wikipedia.org/wiki/Cucurbitales



২৬


"বুদ্ধিমত্তায় মানুষের পর তার নিকটতম প্রাণী কারা ? মানুষের সঙ্গে তাদের বুদ্ধির ব‍্যবধান কত ?

বর্তমানে জীবন্ত মানুষের সবথেকে কাছের আত্মীয় হল শিম্পাঞ্জি, ডিএনএ মিল প্রায় ৯৮% এর বেশি, তবে শিম্পাঞ্জির সঙ্গে মানুষের বুদ্ধিমত্তার পার্থক্যের থেকে বড় পার্থক্য হল হাত-পা ও আঙুলের গঠন ও ডিজাইন, বিবর্তনে মানুষ উপযুক্ত নকশার হাত ও আঙুল না পেলে শুধু বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কিছু করতে পারতনা!

মানুষের হাত ও আঙুল যে সমস্ত গতি সঞ্চালন করতে পারে, তা আর কোন প্রাণি পারেনা।

মানুষের বর্তমান অবস্থায় পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের টুল বা সরঞ্জামের অবদান।

মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রজাতিগুলো সহ শিম্পাঞ্জিদের টুল ও যন্ত্র বানানো ও ধরার মত আঙুলই নেই, তাই মানুষের সবচেয়ে কাছের প্রজাতিগুলো সহ শিম্পাঞ্জিরা মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবেনা।

তবে আজকের হোমো স্যাপিয়েন্স মানুষের আঙুলের এই দক্ষতা হঠাৎ আসেনি, শিম্পাঞ্জি ও আজকের মানুষ একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকেই বিবর্তিত হয়েছে, মানুষের পূর্বপুরুষ ও শিম্পাঞ্জির পূর্বপুরুষ আলাদা হওয়ার পর সেই প্রজাতি আর আজকের হোমো স্যাপিয়েন্স মানুষের মাঝে অসংখ্য প্রজাতি ছিল, যেমন হোমো ইরেক্টাস, হোমো হ্যাবিলিস ইত্যাদি, তাদের আঙুলগুলো আজকের শিম্পাঞ্জি ও মানুষের মধ্যবর্তী গঠনের ছিল।

উটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ডেভিড ক্যারিয়ার বলেছেন যে আমাদের মূল সুবিধা হল আমাদের লম্বা বুড়ো আঙুল এবং অবস্থান (configuration) যা দ্বিতীয় এবং তৃতীয় আঙ্গুলকে অবলম্বন দেয়, এতে কোন কিছুকে আঘাত করার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়, ফলে মানুষ পাথর বা বর্শা ছুঁড়ে শিকার করতে পারে।

অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির শারীরিক নৃবিজ্ঞানী (Physical anthropologist) মেরি মার্জক বলেছেন মানুষের বিবর্তনের ক্ষেত্রে দুই আঙুলের দূরত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এই কারণেই মানুষ শিম্পাঞ্জী-গরিলাদের থেকে ভালোভাবে কোন বস্তু ছুঁড়তে পারে। মানুষের আঙুলের সূক্ষ্ম গতি দক্ষতা (motor skill) প্রাণিদের মধ্যে সর্বোচ্চ। লম্বা ও সঠিক দূরত্বে অবস্থিত বুড়ো আঙুল এবং আঙুলের বিন্যাসের কারণেই মানুষ বৃদ্ধাঙ্গুলিকে অপর চার আঙুলের বিপরীত দিকে টেনে আনতে পারে ও মাটি থেকে সূঁচ তোলার মতো সুক্ষ কাজও করতে পারে। মানুষের আঙুল ব্যবহারের সুক্ষতা সবথেকে বেশি। একটি সরল যন্ত্র ব্যবহার করে অন্য আরও জটিল যন্ত্র তৈরি করতে পারে।

বিবর্তনের সময়রেখায় মানুষের পূর্ববর্তী প্রজাতিগুলি যখন এই আঙুলের এই দক্ষতা পেল, তখন অনেক বেশি শিকার করতে সক্ষম হল এবং প্রচুর মাংস পেতে শুরু করল, মাংসে ফ্যাটের প্রাচুর্যে মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ অন্যান্য বানরদের ছাড়িয়ে গেল।

এরপর মানুষ ক্রমাগত নানারকম "টুল" তৈরি করে ব্যবহার করতে শুরু করল, “সরঞ্জাম বা Tool" হল একটি বস্তু যা একটি উদ্দেশ্যের সাথে মানানসই করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়, যা পরিবেশে দ্রুত পরিবর্তন ঘটাতে পারে এবং লক্ষ্য অর্জনের সুবিধা হয়। সরঞ্জামের সাহায্যে কাজকর্ম আরও দ্রুত ও সহজে করা সম্ভব হয়।

প্রাচীন কালে আদিম মানুষরা অসহায় জীবনযাপন করত, সব সময় মাংসাশী প্রাণিদের আক্রমণের ভয় নিয়ে বাস করত।

মানুষ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ধীরে সরঞ্জাম তৈরি ও উন্নত করার মাধ্যমে কাজ কর্মে দ্রুততা নিয়ে এসেছে। সরঞ্জাম ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ উন্নত ও আরও গতিময় হতে পেরেছে।

মানুষপূর্ব প্রজাতিদের ব্যবহার করা প্রায় ২৬ লক্ষ বছরের পুরোনো হাড়ের হাতুড়ি পাওয়া গেছে যার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে সরঞ্জাম ব্যবহার মানুষের মানুষ হওয়ার আগেই শুরু হয়ে গেছিল। অতি প্রাচীনকালের সরঞ্জামগুলোর প্রধান উপাদান ছিল পাথর, হাড়, গাছের ডাল।

প্রাচীনকালে আদিম মানুষেরা লম্বা হাড়ের সাথে পাথর, প্রাণির অন্ত্র বা লতা দিয়ে শক্ত করে বেঁধে হাতুড়ির মতো সরঞ্জাম তৈরি করেছিল যার সাহায্যে শিকারের মাথায় আঘাত করা বা কিছু ভাঙার চেষ্টা করতো। আগুন জ্বালানোর জন্য তাঁরা পাথরের সরঞ্জাম ব্যবহার করতো।

এরপর সময়ের সাথে সাথে নূতন সরঞ্জাম আবিষ্কার হয়েছে ও কর্মক্ষমতায় বৃদ্ধি হয়েছে, যেমন বর্শা ও তীর-ধনুক।

উন্নত সরঞ্জাম ব্যবহারে শিকারের সংখ্যা বৃদ্ধি হল, খাবারের প্রাচুর্য হল, মানুষের সংখ্যা বাড়তে শুরু করল, মানুষ ধীরে ধীরে সঙ্ঘবদ্ধ হতে শুরু করল, নেতৃত্বের বিকাশ ঘটল, ফলে অনেক মানুষ একত্রে বসবাস করার পরিবেশ সৃষ্টি হল।

এরপর মানুষ একটি যুগান্তকারী সরঞ্জাম "চাকা" আবিষ্কার করে।

চাকা আবিষ্কারের পর মানুষের সভ্যতার দ্রুত বিকাশ ঘটল, এই সময় সরঞ্জামের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে, মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদকে আয়ত্তে আনে, বিভিন্ন ধাতব পদার্থের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে শুরু করে, ফলে পূর্বের পাথর, হাড়, কাঠের সরঞ্জামের বদলে মানুষ ধাতব সরঞ্জাম ব্যবহার শুরু করল।

আমরা আজকে যে মোটরগাড়ি, এরোপ্লেন, রকেট বা কম্পিউটার বা ব্যবহার করছি সেগুলোও আসলে মানুষের "Tool বা সরঞ্জাম"।

আধুনিক মানুষ মোটেই আকাশ থেকে টপ করে পড়েনি, এই টুলগুলো তৈরি করতে মানুষ লক্ষ লক্ষ বছর সময় নিয়েছে।

অন্যান্য কিছু প্রাণিদের মধ্যে খুবই সরল কিছু টুলের ব্যবহার দেখা গেছে, যেমন কাঠি দিয়ে খাবার টেনে আনা, পিঁপড়ে ধরা, পাথর দিয়ে বাদাম ভাঙা, হাড়ের মজ্জা ভাঙা, ঝিনুক ভাঙা, ইত্যাদি। কাক, বানর, শিম্পাঞ্জী, গরিলা, ওরাংওটাং, উদবিড়াল, ডলফিন ইত্যাদি প্রাণিদের এই কাজ করতে দেখা গেছে।

অন্যকোন প্রাণি যদি আমাদের থেকে বেশি বু্দ্ধিমান হয় তাহলেও সে মানুষের মত কাজ করতেই পারবেনা! কারণ তাদের হাত-আঙুলই নেই।

তাই মানুষের সভ্যতা আসলে তার "আঙুলের ফসল"।

মানুষ আসলে সেই প্রাচীন পূর্বসূরী প্রাণিগুলোর বর্তমান সময়ে থাকা একটি কার্যকর "ডিজাইন"। @ বিজ্ঞানকথা

রেফারেন্স: The Animal Connection: A New Perspective on What Makes Us Human, Pat Shipman (2011)

https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC1571064/



২৭


ভারত ও চীনে এত জনসংখ্যা কেন? 


প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারত ও চীনের বিপুল জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে জলবায়ু, কৃষি ব্যবস্থা, এবং উর্বর মাটি—এই তিনটি বিষয়েরই গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে, এই পরিবেশগত উপাদানগুলিই সরাসরি মানুষের উচ্চহারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হয়েছে।

চীন ও ভারত, উভয় দেশেরই সমতল নদী অববাহিকাগুলিতে নির্দিষ্ট বর্ষাকাল এবং দীর্ঘ গ্রীষ্মকাল বছরে একাধিকবার ফসল ফলাতে সহায়ক। প্রচুর বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার কারণে গঙ্গা, ইয়াংসি নদী অববাহিকা পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ ধান উৎপাদনশীল অঞ্চল, অর্থাৎ বিশেষ কোন ব্যবস্থা ছাড়াই ধান উৎপাদন হয়, যা বহু মানুষকে কার্বোহাইড্রেটের মত তাৎক্ষণিক উচ্চ এনার্জির খাদ্য জোগাতে সক্ষম।

হিসাব মত আনুমানিক ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই ভারতের জনসংখ্যা মিশর ও মেসোপোটেমিয়াকে ছাড়িয়ে যায়, এবং প্রথম স্থানে চলে আসে, যেটা ১ থেকে ২ কোটির মধ্যে ছিল।

এরফলে সেই কয়েক হাজার বছর আগে ধান চাষের শুরু থেকেই ভারত পৃথিবীর সবথেকে বেশি প্রজননশীল মানুষের জনসমষ্টি হয়েছে, এবং আধুনিক চিকিৎসা আবিষ্কার হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকতে পেরেছে।

কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, ট্রাক্টর ও কৃষি যন্ত্রপাতি এসে যাওয়ায় জন্য খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, যা প্রজননশীল জনসংখ্যাকে খাদ্য সরবরাহ করে জন্মহার বৃদ্ধি ধরে রাখতে উৎসাহ দেয়।

অন্যদিকে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে শিল্পযুগ আগে শুরু হয়, তবে পশ্চিমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির জনপ্রিয়তা শুরু হয়নি, বরং স্বাধীনচেতা, বাইরে কাজ করা স্বনির্ভর নারীরা অবাঞ্ছিত গর্ভ জনিত বন্ধন এড়াতেই গর্ভনিরোধকের খোঁজ শুরু করে, আর তাতে ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি হয়, ফলে গবেষণা শুরু হয়। শিল্পে শ্রমিকের কাজের সুবাদে নারীরা আর্থিক ও সামাজিক স্বাধীনতা লাভ করে, উত্তর আমেরিকাতে ১৮৪২ সালেই উল্লেখযোগ্যভাবে গর্ভনিরোধক ব্যবস্থা শুরু হয়ে যায়, প্রথমে ক্যাপ এবং ডায়াফ্রাম দিয়ে শুরু হয়, ১৯৩০ এর দশকে এই দুটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি।

ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যে প্রথম ডায়াফ্রাম (বা সার্ভিক্যাল ক্যাপ) প্রবর্তন করেন উদ্ভিদ বিজ্ঞানের পিএইচডিধারী মহিলা “ম্যারি স্টোপস”, তিনি দেশে প্রথম জন্মনিয়ন্ত্রণ ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি সেইসব মহিলাদের সাহায্য করতে চেয়েছিলেন, যারা দুই সন্তানের মধ্যে অনেকটা বিরতি চেয়েছিলেন, বা ২-৩টি সন্তান জন্ম দেওয়ার পর আর সন্তান চাননি।

আবার ব্যবসায়িক ভিত্তিতে শুক্রাণু নাশকের সর্বপ্রথম ব্যবহার ব্রিটেনে ১৮৫০ সালে শুরু হয়ে যায়, সেখানে এগুলো সাপোজিটরির আকারে পাওয়া যেত। ব্রিটেনেই ১৮৫৫ সালেই আধুনিক কন্ডোম তৈরি হয়, ও ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়, ১৯৩০ সালে উত্তর আমেরিকায় হরমোন গর্ভনিরোধক আবিষ্কারের সূচনা হয়, এবং ১৯৬০ সালের পর থেকেই উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপে গর্ভনিরোধক বড়ির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়ে যায়।

অন্যদিকে ভারতে প্রচলিত হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের কারণে, নারীদের শিক্ষার অভাব, বাইরে কাজে না যাওয়া, আর্থিক পরাধীনতা, কম বয়সে বিয়ে, ইত্যাদি কারণে সমাজে জন্মনিয়ন্ত্রণ দ্রুত জনপ্রিয় হয়নি, ভারত ও চীনের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে সন্তানদের পারিবারিক "সম্পদ" হিসেবে দেখা হত, কৃষিকাজ ও অন্যান্য শ্রমনির্ভর কাজে বেশি মানুষের প্রয়োজন হওয়ায়, পরিবারে বেশি সন্তান থাকার প্রবণতা ছিল, বিশেষ করে কৃষিপ্রধান গ্রামীণ এলাকায়, যেখানেই ভারতের অধিকাংশ জনসংখ্যা বাস করত। আবার পুত্রসন্তান জন্ম দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পরিবারগুলি পরপর অনেক সন্তান গ্রহণ করত।

ভারতের সবধর্মের অল্প শিক্ষিত ও অস্বচ্ছল পরিবারগুলিতেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবথেকে বেশি ছিল, অনেকেরেই হয়ত জানা নেই যে অনগ্রসর ক্যাটাগরিগুলিই ভারতের ৮০% জনসংখ্যা গঠন করে। ভারতের উচ্চশিক্ষিত ও স্বচ্ছল হিন্দু-মুসলিম ফরওয়ার্ড বা জেনারেল ক্যাটাগরিগুলি ১৯৮০ দশক থেকেই এক বা দুই সন্তানের নীতি গ্রহণ করেছে, কিন্তু এর কারণেই জেনারেল ক্যাটাগরিগুলির মধ্যে নারী-পুরুষ, যুবক-বয়স্কদের অনুপাতের ভারসাম্য সবথেকে বেশি নষ্ট হয়েছে।

চীন ১৯৭৯ সালে ‘এক সন্তান নীতি’ চালু করলেও তার আগেই জনসংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল, আবার সংখ্যালঘু ও জনজাতিদের ‘এক সন্তান নীতি’র বাইরে রাখা হয়েছিল, এরফলে চীনে নারী-পুরুষের ভারসাম্য বিগড়ে যায়, তাই জনসংখ্যায় নারী-পুরুষের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ২০১৫ সালে ‘এক সন্তান নীতি’ রদ করা হয়।

তবে ভারত গণতান্ত্রিক দেশ হওয়ায়, জোর করে সন্তান নিয়ন্ত্রণ নীতি নেওয়া যায়নি, আবার ১৯৬০ এর দিকে জনসংখ্যার ৮০% ই শিক্ষায় পিছিয়ে ছিল, ফলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা তৈরি করতে অনেক সময় লেগেছে, এখন ভারতে জনসচেতনতা ও জীবনযাপনের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার পরেই সব ধর্মের মানুষে জন্মহার কমছে ।

বর্তমানে ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, পৃথিবীর গড় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার(০.৯%) থেকে কম (০.৭%) @ বিজ্ঞানকথা

রেফারেন্স- - Historical trend of population evolution in India.



২৮


ডিম্বাণু কেন স্থির, শুক্রাণু কেন চলমান?

প্রাথমিক জীবগুলো ছিল এককোশী, স্ত্রী-পুরুষ ছিলনা, একটা কোশ দুই ভাগ হয়ে সংখ্যা বৃদ্ধি করত, একে বলে অযৌন জনন, এখনও অনেক জীব করে চলেছে।

এরপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপে সরল যৌন জননের আবির্ভাব হল, আইসোগ্যামি হল যৌন প্রজননের একটি প্রাথমিক রূপ যাতে একই আকারের দুটি জনন কোশ অংশগ্রহণ করে থাকে, এই পদ্ধতি বেশিরভাগ এককোশী ইউক্যারিওটে পাওয়া যায়। যেহেতু উভয় গ্যামেট দেখতে একই রকম, ফলে তাদের মেল বা ফিমেল হিসাবে ভাগ করা যায়না।

প্রায় ১২০কোটি বছর আগে কিছু এককোশী জীবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপে “মিয়োসিস” নামের একটি নূতন কোশ বিভাজন প্রক্রিয়ার আবির্ভাব হয়, এর ফলে তারা অর্ধেক সংখ্যক ক্রোমোজোম বিশিষ্ট জনন কোশ তৈরি করতে শুরু করল, যা অন্য একটি অর্ধেক সংখ্যক ক্রোমোজোম সম্পন্ন কোশের সঙ্গে মিলিত হয়ে নূতন জীব গঠন করতে শুরু করল, এটিই প্রকৃত যৌন প্রজননের সূচনা।

প্রোটিস্টদের আইসোগ্যামি পদ্ধতিতে, দুটি জননকোশ একে অপরের সাথে মিলিত হওয়ার জন্য একই রকম আকার, গঠন এবং গতিশীলতা সম্পন্ন হয়, এই পদ্ধতিতে, জননকোশ গুলিকে আলাদাভাবে পুরুষ বা মহিলা হিসাবে চিহ্নিত করা যায়না, কারণ তাদের মধ্যে কোন আকৃতিগত পার্থক্য নেই। এখানে উভয় জননকোশেই ফ্ল্যাজেলা বা লেজ থাকে, যা তাদেরকে জলে সহজে চলনশীল করতে সাহায্য করে।

বড় ও নিশ্চল ডিম্বাণু এবং ছোট গতিশীল শুক্রাণুর আবির্ভাব;

জীববিজ্ঞানে একে বলে অ্যানাইসোগ্যামি (anisogamy)র আবির্ভাব, অ্যানাইসোগ্যামির উদ্ভবের পেছনে একাধিক বিবর্তনীয় কারণ কাজ করেছে।

যেমন, প্রতিটি কোশের শক্তি সীমিত, যদি জননকোশ বড় হয়, তাহলে তাতে বেশি পুষ্টি ও শক্তি থাকবে, যা ভ্রূণ অবস্থায় টিকে থাকার জন্য কার্যকরী, কিন্তু এতে বেশি জননকোশ তৈরি করা সম্ভব নয়, অন্যদিকে, যদি জননকোশ ছোট হয়, তাহলে অল্প শক্তিতে অনেক জননকোশ তৈরি করা যায়, কিন্তু এতে পুষ্টির অভাব থাকে। এই দ্বন্দ্বের ফলে কিছু জীব বড় ও পুষ্টিকর জননকোশ তৈরি করতে শুরু করে, এবং অন্য কিছু জীব ছোট, চলনক্ষম এবং বেশি সংখ্যক জননকোশ তৈরি করতে থাকে। এখন বড় জনন কোশগুলিকে আমরা ডিম্বাণু নামে ডাকছি, আর ছোটগুলিকে শুক্রাণু নামে, এভাবেই দুটি ভিন্ন আকার ও স্বভাবের জননকোশ ডিম্বাণু ও শুক্রাণু এসেছিল।

যখন দুই আকার-প্রকারের জননকোশের ভিন্নতা চলে এল, তখন একই প্রজাতির একদল জীব ছোট কিন্তু চলনশীল, প্রচুর সংখ্যক জননকোশ শুক্রাণু উৎপাদনে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করল, যাদের এখন আমরা পুরুষ নাম দিয়েছি; আর অন্যদল যারা বড়, পুষ্টিসম্পন্ন, কমসংখ্যক জননকোশ ডিম্বাণু উৎপাদনে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করল, যাদের এখন আমরা নারী নাম দিয়েছি।

 @ বিজ্ঞানকথা

রেফারেন্স- সার্চ টপিক: Evolution of Anisogamy 



২৯


বেশি চিৎকার বা চেঁচামেচি করার পর গলা বসে যায়, বা গলায় ব্যথা হয় কেন?

(যাদের দীর্ঘ সময় জোরে কথা বলার, বা ভাষণ দেওয়ার অভ্যাস নেই, তাদের সঙ্গে এটা বেশি হবে)

মানুষের গলায় শব্দ তৈরি করে স্বরযন্ত্রের ভিতরে থাকা দুটি স্বরতন্ত্রী বা ভোকাল কর্ড। স্বরতন্ত্রী তৈরি হয় তরুণাস্থি (cartilage), নমনীয় ঝিল্লি (mucous membrane) দিয়ে, এবং স্বরতন্ত্রী দুটিকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন কয়েকটি মাংসপেশি রয়েছে, মাংসপেশি গুলি স্বরতন্ত্রী দুটিকে খোলে এবং বন্ধ করে।

এই তরুণাস্থি এবং ঝিল্লির সমন্বয়ে তৈরি স্বরতন্ত্রী ফুসফুস থেকে বের হওয়া বাতাসের সাহায্যে কম্পিত হয়, যার ফলে শব্দ বা ধ্বনি উৎপন্ন হয়।

আমরা যখন জোরে বা দীর্ঘক্ষণ চিৎকার করে কথা বলি, তখন স্বরতন্ত্রী ও তার মাংসপেশির ভীষণ ভাবে কাঁপতে থাকে, এবং ঘষা লাগে। এই অতিরিক্ত কাঁপন ও ঘর্ষণের কারণে স্বরতন্ত্রীর ঝিল্লি ফেটে বা ছিঁড়ে যায় (micro tears), একে মাইক্রো-ইনজুরি বলে, এর ফলে স্বরতন্ত্রীর ঝিল্লিতে হিস্টামিন ক্ষরণ হয়ে ফুলে যায়, জল জমে যায়, যাতে স্বরতন্ত্রী ভারী হয়ে যায়, শব্দের কম্পাঙ্ক কমে যায়, ব্যথা হয় - একেই গলা ধরে যাওয়া বা বসে যাওয়া বলে।

এছাড়াও জোরে চেঁচামেচির সময় গরম বাতাস দ্রুত স্বরতন্ত্রীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, ফলে নরম ঝিল্লিগুলো শুকিয়ে যায়, এর কারণেও জ্বালা ও ব্যথা শুরু হয়।

স্বাভাবিক কথাবার্তার কারণেই যদি কারও ঘন ঘন গলা বসে যায়, ব্যথা হয়, তাহলে কোন গঠনগত ত্রুটি, সংক্রমণ, পেশি দুর্বলতা বা অন্যকোন মেডিক্যাল কারণ থাকতে পারে, তাই মেডিক্যাল পরীক্ষ করিয়ে নেওয়া উচিত।

@ বিজ্ঞানকথা


৩০


মানুষের দাঁত দুইবারের বেশি কেন ওঠে না?"

এই ঘটনার ব্যাখা শুধু বিবর্তন তত্ত্ব থেকেই দেওয়া সম্ভব;

শুরুতে মানুষের দাঁতের নিচে থাকা বীজকোশ বা ডেন্টাল জার্ম সেল (dental germ cell) সক্রিয় থাকে এবং, দুইবার দাঁত তৈরির পর সেটি ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে আর নূতন দাঁত তৈরির জন্য কোন বীজকোশ সংরক্ষিত থাকে না। হাঙর বা কুমিরের মত কিছু প্রজাতির প্রাণির দাঁত বারবার ওঠে, কারণ তাদের ধারালো কিন্তু ভঙ্গুর দাঁত শিকার করার সময় সহজেই ভেঙে যায়, ফলে তারা বারবার দাঁত তুলতে পারে।

কিন্তু মানুষের সাধারণ পূর্বপুরুষ প্রাণি গুলির খাদ্যাভাস এমন ছিলনা যে, দাঁত বার বার ভেঙে যাবে, ফল-পাতা-পোকামাকড় এবং পাখির মত ছোট প্রাণির মাংসের খাদ্যাভাসের জন্য দাঁত অনেক শক্ত ছিল, আবার জঙ্গল জীবনে মানুষের জীবনকাল খুব ছোট ছিল, আদিম শিকারি-সংগ্রাহক পর্যায়ে মানুষের গড় জীবনকাল ছিল মাত্র ২৫ থেকে ৩৫ বছর, তখনই স্থায়ী দাঁত মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা অনুযায়ী গড়ে ২৫ থেকে ৩৫ বছরের জীবনে টিঁকে থাকার মতো করে বিবর্তিত হয়ে গেল, বহু লক্ষ বছর ধরে মানুষের খাদ্যাভ্যাস এবং চোয়ালের গঠন এমনভাবে পরিবর্তিত হয়ে গেছিল যে গড়ে ২৫ থেকে ৩৫ বছরের জীবনে দুই সেট দাঁত যথেষ্ট ছিল। তাই তৃতীয়বার দাঁতের প্রয়োজন বিবর্তনগতভাবে অনুভূত হয়নি, অতিরিক্ত দাঁতের প্রয়োজন বিবর্তনে টিঁকে থাকেনি। @ বিজ্ঞানকথা

সোর্স: How did diphyodont teeth evolve?

Why mammals are diphyodont?


৩১


কুকুরগুলো মাঝরাতে কেন ঐভাবে অদ্ভুত সুরে ডাকে কেন! দিনে তো ডাকেনা!

রাতে কুকুরদের ওই বিশেষ সুরের ডাক কে "হাউলিং" বলে....

কুকুর আসলে বন্য নেকড়ে জাতীয় প্রাণি থেকে বিবর্তিত হয়েছে, কুকুর, নেকড়ে, শিয়াল ইত্যাদি ক্যানাইন পরিবারের প্রাণিদের মধ্যে হাউলিং সাধারণত একটি দীর্ঘ দূরত্বে যোগাযোগ করার জন্য ডাক।

কারণ কুকুরের পূর্বপুরুষেরা ছিল দলবদ্ধ, সক্রিয় শিকারী ও টেরিটোরিয়াল (নির্দিষ্ট এলাকা দখলকারী) প্রাণি, এইরকম ডাক তাদের দলের সদস্যদের একত্রিত করতে, তাদের অঞ্চল চিহ্নিত করতে এবং অন্যদের সতর্ক করতে ব্যবহৃত হয়, তারা হাজার হাজার বছর আগে বন্য জীবন ছেড়ে এলেও মাঝে মাঝেই পূর্বপুরুষদের বন্য স্বভাব "জেগে ওঠে"।

এখানে হাউলিং এর কয়েকটি বিশেষ কারণ হল - একে অপরের সাথে তাদের অবস্থান, দলবদ্ধতা, এবং সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে তথ্য শেয়ার করা। নেকড়ে ও কুকুরের দল (প্যাক) তাদের শক্তিশালী বন্ধন এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার জন্য পরিচিত, তারা দলবদ্ধভাবে শিকার করে, একে অপরের সাথে সহযোগিতা করে এবং হাউলিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের ও অন্য দলের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে, আবার তাদের নিজেদের অঞ্চল চিহ্নিত করতে ব্যবহার করে, অন্য দল বা শিকারীদের কাছে তাদের উপস্থিতি এবং অধিকার জানানোর একটি উপায় বলে গণ্য। বর্তমানে কুকুরেরা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতেও হাউলিং করতে পারে, বিশেষ করে যদি তারা একা বা কোনো কারণে হতাশ থাকে।  @ বিজ্ঞানকথা

আবরা কিছু ক্ষেত্রে একাকী কুকুরের হাউলিং কোন স্বাস্থ্য সমস্যা বা মানসিক কষ্টের লক্ষণ হতে পারে। @ বিজ্ঞানকথা

রেফারেন্স: Canine Behavior: Insights and Answers. Bonnie V. G. Beaver, Elsevier Health Sciences.



৩২


চড়কে পিঠের চামড়ায় বড় লোহার বড়শি গেঁথে ঘোরানো হয়, ছিঁড়ে পড়েনা কেন? প্রচুর রক্তপাত হয়না কেন?

কারণ হচ্ছে, পিঠের ত্বকের গঠন, এবং বড়শি বা হুক ঢোকানোর কৌশল;

মানুষের পিঠের চামড়ার কোলাজেন তন্তু, চর্বি এবং পেশি মিলে একটা স্তর তৈরি করে যার টেনসাইল স্ট্রেন্থ (Tensile Strength) ৩০০-৫৯০ MPa পর্যন্ত হয়, যা প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে বেশ কয়েক কেজি ওজন ঝুলিয়ে রাখতে সক্ষম।

(টেনসাইল স্ট্রেন্থ বলতে একটি পদার্থের সেই ক্ষমতাকে বোঝায়, যা মূলত একটি পদার্থের ছিঁড়ে বা ভেঙে যাওয়ার আগে সর্বোচ্চ চাপ সহ্য করার ক্ষমতা)

হুক ঢোকানো হয় চামড়ার ফ্যাসিয়া স্তরে, যা মূলত উচ্চ ইলাস্টিক গুণ সম্পন্ন কোলাজেন ও অন্যান্য ফাইবার দিয়ে তৈরি, সাধারণত প্রতিটি হুক সঠিকভাবে ঢোকালে ৫০–৭০ কেজি পর্যন্ত ভর নিতে পারে, ২ বা ৪ হুক মিলে পুরো শরীরের ওজন সহজেই বহন করে নেয়, হুক গুলো এমনভাবে ঢোকানো হয় যাতে একটি পয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে না, দেহের ওজনটা সুষমভাবে ভাগ হয় যায়।

রক্তপাত কম হয় কেন?

হুক ঢোকানোর জায়গা গুলিতে বড় কোনো রক্তনালী থাকে না, পিঠের উপরিভাগে ত্বকের নিচে সরু সরু রক্তের কৈশিকনালী বা ক্যাপিলারি থাকে, যেগুলো ছিঁড়লে খুব অল্প রক্তপাত হয়, যা জমাট বেঁধে দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়।

অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা ত্বক টেনে হুক ঢোকায়, যাতে গভীরে ক্ষতি হয়না।

এছাড়া ভক্তরা স্বইচ্ছায়, মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে কাজটি করে, ফলে ট্রমা হয়না, ব্যথার অনুভূতি অগ্রাহ্য করে, শরীর অ্যাড্রিনালিন নিঃসরণ করে, এটা একধরনের হরমোন যা ব্যথা কমায়, সাহস বাড়ায়, একধরনের নেশা কাজ করে।

পিঠ ফোঁড়ার সংস্কৃতি কোথা থেকে এল?

সংস্কৃতির বিবর্তন;

চড়কে পিঠ ফোঁড়ার সংস্কৃতি আসলে একটি আদিম সংস্কৃতির বর্তমান রূপ; যাকে অ্যানথ্রোপলজিতে "শরীর ভেদন" বা Body piercing সংস্কৃতি বলে।

প্রথাটি হাজার হাজার বছর আগে আফ্রিকাতে শুরু হয়েছিল, ৫ হাজার বছর আগের পুরাত্বাত্ত্বিক প্রমাণ আছে, এটি বিশ্বের নানা প্রান্তে স্বতন্ত্রভাবে বিবর্তিত হয়েছে, যা ইঙ্গিত করে এটি মানুষের আদিম সংস্কৃতির একটি মৌলিক অঙ্গ ছিল।

পরবর্তীকালে ইহুদী, খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মে শরীর ভেদন নিষিদ্ধ করা হয়, কিন্তু বর্তমানে খ্রিষ্টান সমাজে শরীর ভেদন আবার শুরু হয়েছে।

শুধু ভারত বা এশিয়াতে নয়; আফ্রিকা, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের জনজাতিদের মধ্যে এই প্রথা এখনও বিদ্যমান।

ভারতে শরীর ভেদন সংস্কৃতি দ্রাবিড় ও বাঙালী সংস্কৃতিতে এখনও বিদ্যমান।

আফ্রিকান জনজাতি গোষ্ঠীগুলিতে কানের লতি ও ঠোঁট প্রসারণ, গাল ফোঁড়া উপজাতীয় পরিচয়ের চিহ্ন হিসেবে প্রবলভাবে বিদ্যমান।

দক্ষিণ আমেরিকার মায়া ও আজটেক সভ্যতায় জিহ্বা ও যৌনাঙ্গ ভেদন ছিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অঙ্গ।

প্রাচীন রোম ও গ্রিসের সৈন্যরা কখনো কখনো প্রতীকী বা সামরিক কারণে শরীর ভেদন করত।

বাঙালী, ওড়িয়াদের চড়ক ও দ্রাবিড়দের “থাইপুষাম” (தைப்பூசம்) উৎসবে শরীর ভেদনের রীতি আছে, এই রীতি প্রাচীন বাঙালী, ওড়িয়া ও দ্রাবিড়দের সংযোগ নির্দেশ করে।

থাইপুষাম উৎসবে ভক্তরা দ্রাবিড় দেবতা মুরুগানের প্রতি সমর্পণ দেখাতে পিঠ, গাল, জিভে লোহার শলাকা ফুঁড়ে নেয়। @ বিজ্ঞানকথা

রেফারেন্স: - Native Life in East Africa: the Results of an Ethnological Research Expedition - Sir I. Pitman


৩৩


জিনোমের ক্রোমোজোমে ডিএনএ থাকে, জিনোমে থাকা ডিএনএ কোড পুরো শরীর তৈরির ও বেসিক মানসিক গঠন তৈরির ব্লু-প্রিণ্ট বহন করে।

স্বাভাবিক মানুষের ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে, ২৩টি মায়ের ডিম্বাণু কোশ থেকে আসে, ২৩টি বাবার শুক্রাণু কোশ থেকে।

মানুষের ৪৬টি বা ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমে ২০ থেকে ২৫ হাজার জিন থাকে,

যাতে গড়ে ৩০০ কোটি "বেস পেয়ার" থাকে,

এই বেস পেয়ার গুলি মাত্র কয়েকশ পরমাণু নিয়ে তৈরি,

যদি একটি কোশের সমস্ত বেস পেয়ারকে পর পর সাজানো হয়, তবে তা প্রায় ৬ ফুট (১.৮ মিটার) লম্বা হবে। ফলে একটি মানুষের কয়েক কোটি ছোট-বড় বৈশিষ্ট্য এতে এঁটে যায়।

গড়ে ৩,০০০ বেস জোড়া নিয়ে একটি জিন তৈরি হয়,

জিন প্রোটিন তৈরির নির্দেশিকা বহন করে, আর এই প্রোটিনগুলোই বিভিন্ন শারীরিক বৈশিষ্ট্য তৈরি করে।

জিন দ্বারা কিভাবে শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রিত হয় ?

জিনের মধ্যে থাকা নিউক্লিওটাইডের ক্রম বা জেনেটিক কোড একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরি করে।

প্রোটিনগুলো শরীরের বিভিন্ন কাজে অংশ নেয়, যেমন - এনজাইম হিসাবে কাজ করা, হরমোন, স্নায়ুপ্রেরক তৈরি করা, যা শরীর ও মনের বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম বৈশিষ্ট্য প্রবাহ:

মা-বাবা জিনোমের একটি করে কপি সন্তানের মধ্যে সঞ্চালিত করে, যেগুলি তারা তাদের মা-বাবার থেকে পেয়েছিল, তাঁরা আবার তাদের মা-বাবার থেকে.........

জিনের প্রকারভেদ:

প্রতিটি জিনের দুটি করে কপি বা "অ্যালিল" থাকে, যা বাবা-মা উভয়ের কাছ থেকে পাওয়া যায়। এই কপিগুলোর মধ্যে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে, যা বৈশিষ্ট্যগুলোর ভিন্নতা তৈরি করে।

পরিবেশের প্রভাব:

কোনো বৈশিষ্ট্য শুধুমাত্র জিনের উপর নির্ভর করে না, পরিবেশের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি প্রজন্মে মানুষের জেনেটিক কোড সাধারণত ০.১% পরিবর্তিত হয়, আবার সকল ধরণের ভারসাম্যহীন পরিবর্তন বিবেচনা করলে প্রায় ১.৩% পরিবর্তিত হয়।

@ বিজ্ঞানকথা


৩৪



সর্দি হলে নাক দিয়ে যে এত পানি পড়ে, প্রশ্ন হল এই  পানি আসে কোথা থেকে!!

পানি কেন পড়ে সেটা এখানে বলছি না, আসলে মানুষের শরীর গড়ে ৬৫%  পানি দিয়েই তৈরি।

৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের শরীরে গড়ে ৮০%  পানি দিয়ে তৈরি।

৫-২০ বছর বয়সীদের শরীরের গড়ে ৭৫%  পানি থাকে।

২০-৩৫ বছর বয়সীদের শরীরের গড়ে ৬৫%  পানি থাকে।

৪০-৬০ বছর বয়সীদের শরীরের গড়ে ৫৫%  পানি থাকে।

৬০ বছরের বেশি বয়সীদের শরীরে গড়ে গড়ে ৫০%  পানি থাকে।

জীবনের উৎপত্তি সমুদ্রের  পানিতে, আর সব জীব শরীরে সেই সমুদ্রের  পানি নিয়ে জন্মায়। যতদিন বাঁচে, ততদিন সেই সমুদ্র নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, এবং  পানির একটি পরিমাণ বজায় রাখতে হয়।

মানুষের শরীরের  পানি ২-৩% কমে গেলে তৃষ্ণা আসে এবং শরীরের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে শুরু করে।

শরীর থেকে ৪-৫%  পানিবেরিয়ে গেলে তীব্র ক্লান্তি, মাথা ব্যথা শুরু হয়।

আর ১০%  পানি বেরিয়ে গেলে মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হয়।

আমাদের রক্তের ৮৩% পানি, মস্তিষ্কের ৭৫ পার্সেন্ট পানি, হাড়ের ২২ শতাংশ পানি, লিভারের ৮৫% পানি

পৃথিবীর ৭০ ভাগ পানি  ৩০ ভাগ স্থল। মানুষের দেহে ওজনের ৭০ ভাগ পানির ওজন ৩০ ভাগ অন্যান্য মেটেরিয়াল-এর ওজন...,

৭০ ভাগ পানি থাকা পৃথিবীতে চন্দ্রের জন্য জোয়ার ভাটা হয় অর্থাৎ চাঁদ এর প্রভাব আছে। কিন্তু ৭০ ভাগ ওজনের পানি থাকা সত্ত্বেও মানবদেহে চাঁদের কোন প্রভাব নেই....  

@ বিজ্ঞানকথা

পরিসংখ্যানের উৎস: ইউনাটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে The Water in You, ওৎসুকা ফার্মা।


৩৫

ভাইরাস মূলত কি কি দিয়ে তৈরি ?

ভাইরাস মূলত নিউক্লিক অ্যাসিড ও প্রোটিন দিয়ে তৈরি। কিছু ভাইরাসের বাইরের দিকে লিপিডের (চর্বি বা ফ্যাট) একটি অতিরিক্ত স্তর থাকে।

নিউক্লিক অ্যাসিড ভাইরাসের জেনেটিক উপাদান, RNA বা DNA হতে পারে, যা ভাইরাসের বংশগতির তথ্য বহন করে। প্রোটিন দিয়ে তৈরি একটি আবরণ নিউক্লিক অ্যাসিডকে ঘিরে রাখে।

ভাইরাস সৃষ্টির ৩টি তত্ত্ব খাড়া করেছেন বিজ্ঞানীরা -

ভাইরাস প্রথম হাইপোথিসিস, প্রোগ্রেসিভ হাইপোথিসিস ও রিগ্রেসিভ হাইপোথিসিস। (Virus-First Hypothesis, Progressive Hypothesis, Regressive Hypothesis)

ভাইরাস প্রথম হাইপোথিসিসে অনুমান করা হয় যে ভাইরাসই সবার প্রথমেই সৃষ্টি হয়েছে, আনুমানিক ৪৫৬ কোটি বছর আগে পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছিল, তখন পৃথিবী ছিল জ্বলন্ত আগুনের গোলা। তারপর মহাসাগর সৃষ্টি হয়, ধারণা করা হয় ৪০০ কোটি বছর আগে প্রবল উল্কাবর্ষণ শেষ হওয়ার পর প্রথম স্বপ্রজননশীল আরএনএ অণুর বিবর্তন শুরু হয়। আদিম একতন্ত্রী RNA ভাইরাসগুলি তখনই সৃষ্টি হয়েছে। RNA ভাইরাসগুলি পরে বিবর্তিত হয়ে DNA ভাইরাস সৃষ্টি করেছে।

প্রোগ্রেসিভ হাইপোথিসিসে বলা হয়েছে কোশের কিছু টুকরো জেনেটিক বস্তু স্বাধীনভাবে চলাচলের ক্ষমতা অর্জন করে এবং কালক্রমে কোশের বাইরে বেরিয়ে আসে, বহিরাবরণ যুক্ত হয়ে ভাইরাসের রূপ নিয়েছে।

রিগ্রেসিভ হাইপোথিসিসে মনে করা হয় কোন কোশ ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে হয়ে শুধুমাত্র জেনেটিক বস্তু ও বহিরাবরণ থেকে যায়, যেগুলোই ভাইরাসে পরিণত হয়।

@ বিজ্ঞানকথা



৩৬


বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে সূর্যের আলোয় না বেরোনো, বা দিনের বেলায় বেশিরভাগ সময় ঘরের ভিতরে কাটোনোর সঙ্গে কমবয়সে তাড়াতাড়ি ক্ষীণদৃষ্টি বা মায়োপিয়া (Myopia) হওয়ার একটা সম্পর্ক আছে....

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে রোল অফ আউটডোর অ্যাক্টিভিটি ইন মায়োপিয়া (ROAM) গবেষণায় মায়োপিয়া এবং নন-মায়োপিয়া শিশুদের মধ্যে গড় দৈনিক আলোর এক্সপোজার সঙ্গে একটি সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।

মায়োপিয়া আক্রান্ত শিশুরা নন-মায়োপিয়া শিশুদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম আলো এবং কম বাইরের আলোর এক্সপোজার পেয়েছিল।

বাইরের আলো ও উজ্জ্বল আলো বলতে সূর্যের আলো বোঝানো হচ্ছে। যারা দৈনিক কয়েক ঘণ্টা ১০০০ লাক্স তীব্রতার বেশি আলো, অর্থাৎ সূর্যের আলোর এক্সপোজার পেয়েছিল, তাদের মধ্যে মায়োপিয়া হওয়ার হার কম।

সোজা কথায় যেসব শিশুর আউটডোর অ্যাক্টিভিটি কম, তাদের মধ্যে কমবয়সে মায়োপিয়া বেশি পাওয়া গেছে।

প্রাণীদের ওপর পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে উজ্জ্বল আলো চোখের প্রতিসরাঙ্ক ত্রুটিকে প্রভাবিত করতে পারে এবং মায়োপিয়া প্রতিরোধ করতে পারে।

এবং সূর্যের আলোর সঙ্গে রেটিনার ফটোরিসেপ্টর কোশগুলির সুস্বাস্থ্যের একটি সম্পর্ক আছে।

তাই বর্তমানে শিশুদের বেশ কয়েক ঘণ্টা সূর্যের আলোয় কাটানোর জন্য বিভিন্ন আউডোর অ্যাক্টিভিটি করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। @ বিজ্ঞানকথা

সোর্স:

Dim Light Exposure and Myopia in Children - Pubmed

Ambient Light Regulates Retinal Dopamine Signaling and Myopia Susceptibility - Pubmed



৩৬


ত মানুষের মধ্যে কিছু হবহু একই চেহারার মানুষ পাওয়া যায় কেন?

আজকের ৮০০ কোটির বেশি মানুষ খুব বেশি হলে মাত্র ১০ হাজার মা-বাবার সন্তান! তাই মিল থাকা তো স্বাভাবিক।

একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে একসময় পৃথিবীতে মানুষের কার্যকর জনসংখ্যা মাত্র ১০ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছিল!

প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে, অর্থাৎ যখন আজকের আধুনিক মানুষ হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতির আবির্ভাব হল, তখন কার্যকর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০ থেকে ৩০ হাজারের মধ্যে! আর মোট জনসংখ্যা ছিল ১ থেকে ৩ লাখের মধ্যে।

(স্থূল অর্থে কার্যকর জনসংখ্যাকে মোট প্রজননকারী জনসংখ্যা ধরতে পারেন)

কিন্তু প্রায় ৭৪,০০০ বছর আগে আজকের ইন্দোনেশিয়ায় একটি বিশাল আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের ফলে বিশাল পরিমাণে আগ্নেয়গিরির ছাই, গ্যাস এবং সালফার ডাইঅক্সাইড বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল। যার কারণে সূর্যের তাপ পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে আসা আটকে যায়, যার ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ৫-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যায়, এবং এই অবস্থা আনুমানিক ১০ বছর ধরে বজায় ছিল, মানুষের উপর এর প্রভাব ছিল গভীর এবং সুদূরপ্রসারী।

টোবা আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণের মানব বিবর্তনের ইতিহাসে একটি ভীষণ প্রভাবশালী প্রাকৃতিক ঘটনা, বিভিন্ন আধুনিক জেনেটিক বিশ্লেষণ, বিভিন্ন প্রাচীন মানুষের ডিএনএর তুলনা, এবং পৃথিবীজুড়ে মানব জনসংখ্যার বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করে গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে সেইসময় পৃথিবীতে মানুষের কার্যকর জনসংখ্যা মাত্র ১০ হাজারে পৌঁছে গেছিল!

অর্থাৎ জেনেটিক্সের পরিভাষায় টোবা বিস্ফোরণ মানুষের পপুলেশনে একটি জেনেটিক বটলনেক সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে পরবর্তী প্রজন্মে জিন ভান্ডার বা জেনেটিক পুল সীমিত হয়ে যায়, জিনগত বৈচিত্র্য অনেক কমে যায়।

যদিও মানুষের জিনগত উপাদান অনেক বৈচিত্র্যপূর্ণ, তবুও কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা মানুষের সব জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে কমন, বিশেষ করে নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে। এর ফলে কিছু মুখের বৈশিষ্ট্য বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে আছে। @ বিজ্ঞানকথা

Alu Evolution in Human Populations: Using the Coalescent to Estimate Effective Population Size"

Mobile elements reveal small population size in the ancient ancestors of Homo sapiens

Ask a Mathematician 



৩৭


ভিনিগার কি?


ভিনিগার শব্দটি আসলে প্রাচীন ফ্রেন্চ শব্দ, যার অর্থ "টক ওয়াইন/মদ" (Old French vyn + egre - sour wine)

আঙুর থেকে তৈরি ওয়াইন, বা চাল, যব থেকে তৈরি ওয়াইনে অ্যাসিটোব্যাকটর নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে ইথাইল অ্যালকোহল জারিত হয়ে ইথানয়িক বা অ্যাসেটিক এসিডের লঘু জলীয় দ্রবণ তৈরি করে, ভিনিগারে ৫%-১৮% অ্যাসেটিক থাকে।

এছাড়া যেকোন চিনির (গ্লুকোজ, সুক্রোজ, ফ্রুক্টোজ) দ্রবণ, যেমন আখ, খেজুর, তাল, নারকেল ইত্যাদির রস প্রথমে ইস্ট দ্বারা গাঁজনের ফলে ইথাইল অ্যালকোহলে পরিণত হয়, এরপর অ্যাসিটোব্যাকটর সংক্রমণ হলে তাতে অ্যাসেটিক অ্যাসিড তৈরি হয়।

বিভিন্ন দেশে আপেল, নাশপাতি, পিচ, স্ট্রবেরি, রাস্পবেরি, এপ্রিকট, টমেটো থেকেও ভিনিগার প্রস্তুত করা হয়। ফল বা শস্যের নামানুসারে ভিনিগারের নামকরণ হয়।

বর্তমানে বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারের জন্য কৃত্রিম পদ্ধতিতে মিথানল এবং কার্বন মনোক্সাইডের বিক্রিয়া ঘটিয়ে বা আরো বিভিন্ন বিক্রিয়ার সাহায্যে অ্যাসিটিক অ্যাসিড তৈরি করা হয়, এই শিল্পজাত অ্যাসিটিক অ্যাসিডে জল মিশিয়ে লঘু করে কৃত্রিম ভিনিগার তৈরি হয়।


ভিনিগার তৈরির প্রথা ওয়াইনের মতই প্রাচীন, কারণ ওয়াইন টকে গেলেই ভিনিগার তৈরি হয়, প্রাচীন ব্যাবিলন ও মিশরে ভিনিগারের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

বাস্তবে ফ্রান্সে এই ওয়াইন টকে ভিনিগার হয়ে যাওয়া রুখতেই ফরাসি অণুজীব বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর একটি বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যাকে পাস্তুরাইজেশন বলে।


ভিনিগারের ব্যবহার:-


ভিনিগারের ব্যবহারও খুব প্রাচীন; ফল-সব্জি সংরক্ষণ করতে; আচার, সস, স্যুপ, চাটনি তৈরিতে, বিভিন্ন খাবারের বিশেষ স্বাদ, গন্ধ ও টেক্সচার আনতে ভিনিগার ব্যবহার হয়।


ভিনিগারের বিশেষ পুষ্টিগুণ নেই, তবে বিভিন্ন ফলের তৈরি অর্গানিক ভিনিগারে কিছু পলিফেনল, ফ্ল্যাভনয়েডস থাকে।


বিভিন্ন দেশে ফলের ভিনিগার পান করার রীতি আছে, চিরাচরিত চিকিৎসায় বিভিন্ন সুফল দাবি করা হয়, তবে পরীক্ষায় তেমন কার্যকর ফল পাওয়া যায়না। ভিনিগার পান করলে প্রস্রাব ক্ষারকীয় হয়, কারণ রক্তে অ্যাসিড-ক্ষার ভারাসাম্য রক্ষা করতে হয়।

নিয়মিত ভিনিগার পান করলে দাঁতের এনামেল ক্ষয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।


খাবার ছাড়াও গৃহস্থালীর কাজেে ভিনিগারের ব্যবহার আছে, যেমন যেমন কাচ, চীনামাটির জিনিস, সাদা কাপড় পরিষ্কারের জন্য ভিনিগার ব্যবহার হয়। হালকা জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে এবং ময়লা ও দাগ দূর করতে সাহায্য করে। ভিনিগার চুলের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। @ বিজ্ঞানকথা


৩৮


"বিজ্ঞান অনুযায়ী মানুষ নিজেদের ভাই বোনে বিয়ে করলে সেই সন্তান বিকলাঙ্গ বা অসুস্থ জন্মাতে পারে l কিন্তু পশুরা তো সেটা মেইনটেইন করতে জানে না, তাহলে তাদের সুস্থ বাচ্চার জন্ম হয় কি করে??"

ঘনিষ্ঠ রক্ত সম্পর্কের মধ্যেই সন্তানের জন্ম দেওয়াকে জীববিজ্ঞানে আন্তঃপ্রজনন বা ইনব্রিডিং বলে;

আদিম অবস্থায় মানুষও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আন্তঃপ্রজনন করত, তবে ধীরে ধীরে খারাপ প্রভাবটা বুঝতে পারে, বিজ্ঞানীরা জিন বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছেন মোটামুটি ৩৪,০০০ বছর আগে মানুষ আন্তঃপ্রজনন এড়াতে শুরু করে। কারণ আমাদের পূর্বপুরুষরা এর খারাপ ফলাফল দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষেণের ফলে বুঝতে পেরেছিলেন।

ছাগলের মত ব্যাপক আন্তঃপ্রজনন করা প্রাণিদের বিবর্তনীয় মূল্য চোকাতে হয়, এইসব প্রাণীদের মধ্যে আন্তঃপ্রজননের ফলে শিশু মৃত্যুর হার খুব বেশি। এই প্রাণিগুলিতে বৈচিত্র্য খুবই কম, ইমিউনিটি কমে যায়, কোন নূতন ভাইরাস-জীবাণু এলে এরা দলে দলে মৃত্যুবরণ করে বিবর্তনীয় মূল্য চোকায়।

কিছু প্রজাতিতে যেমন শিম্পাঞ্জী, গরিলা ও বানরেরা আন্তঃপ্রজনন প্রতিরোধ করার উপায় হিসাবে স্ত্রী প্রাণিরা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের থেকে পৃথক হয়ে নূতন দল গঠন করে,যা জীববিজ্ঞানে "ন্যাটাল ডিসপারসাল" নামে পরিচিত।

গবেষণায় দেখা গেছে মেজর হিস্টোকম্প্যাটিবিলিটি কমপ্লেক্স (MHC) ঘ্রাণসংকেতের মাধ্যমে অনেক মেরুদণ্ডী প্রাণীর জন্য সঙ্গী পছন্দের সাথে জড়িত।

 @ বিজ্ঞানকথা


৩৯


ডিসোসিয়েটিভ ডিসঅর্ডার (Dissociative Disorder) বা তথাকথিত "ভূতে ধরা"  ব্যক্তিদের মধ্যে, বিশেষত মহিলাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত শারীরিক শক্তি ও আগ্রাসী আচরণ বৃদ্ধির কারণ হল অ্যাড্রেনালিন রাশ (Adrenaline Rush) - এদের শরীরে সাময়িকভাবে অ্যাড্রেনালিন হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এটি মাংসপেশিকে অতিরিক্ত শক্তি দিতে পারে এবং অস্বাভাবিক শারীরিক ক্ষমতা তৈরি করতে পারে, এটি আসলে তথাকথিত ভূত-প্রেত-আত্মার কারণে বৃদ্ধি নয়। 


আমাদের মনের দুটি অংশ - চেতন আর অবচেতন,

এই অবচেতন মনে কি দোলাচাল চলছে, সেটা কোন মানুষ জানতে পারেনা, কিন্তু তার প্রকাশ চেতন মনে ধরা দেয়। অর্থাৎ আপনি নিজেই নিজেকে সম্পূর্ণ চেনেননা! কি বিস্ময়কর না!

আর এই ভূতে ধরা হল অবচেতন মনের দোলাচাল, যা চেতন মনকে অস্বাভাবিক আচরণ করতে বাধ্য করায়।

আগে মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাকে হিস্টিরিয়া (Hysteria) বলা হত, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হচ্ছে ডিসোসিয়েটিভ ডিজঅর্ডার (Dissociative Disorder), বাংলায় অনুবাদ করলে বলতে হবে, বিচ্ছিন্ন-বিপর্যস্ত মনের ব্যাধি।

এটি একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা যেখানে একজন ব্যক্তি তার চিন্তা, স্মৃতি, অনুভূতি বা পরিচয়ের সঙ্গে চেতন মনের সংযোগ হারিয়ে ফেলে, এমন একটি অবস্থা যেখানে মানুষের মস্তিষ্ক কিছু সময়ের জন্য স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না এবং তাঁর পরিচয় বা বাস্তবতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।

কিছু মানসিক ভাবে দুর্বল অর্থাৎ যাঁরা মন নিয়ন্ত্রণ করা, বা নিজের মনের কথা খুলে বলাটা শেখেনি, তাঁরা হঠাৎ দৃশ্যমান কোন কারণ ছাড়াই এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে। তাই দেখে থাকবেন কোন খোলামনের, স্পষ্টবাদী, উচ্চশিক্ষিত বা জ্ঞানী মহিলা-পুরুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়না।

এই হঠাৎ মানসিক বিপর্যয় অনিচ্ছাকৃত ও মানসিক প্রতিরক্ষা মূলক। হরমোনগত ও মানসিক গঠনের কারণেই মহিলাদের ক্ষেত্রে এটি আরও প্রকট হয়, কারণ তাঁদের ওপর ধর্মীয় ও সামাজিক নানা নিষেধের চাপ, পারিবারিক নিষেধের চাপ পুরুষদের থেকে আলাদা।

ধরুন একজন অন্তর্মুখী মেয়ে বা মহিলা নিজের পরিবারের কারো, বা সমাজে প্রভাবশালী কারো দ্বারা মানসিক বা যৌন দিক দিয়ে অত্যাচারিত হয়েছে, কিন্তু সে এটা কাউকে সামাজিক ও পারিবারিক অতিপ্রতিক্রিয়ার ভয়ে বলতে পারছেনা, তাহলে হঠাৎ তার অবচেতন মন একদিন চেতন মনের ওপর ভেঙে পড়বে, এটাই ডিসোসিয়েটিভ ডিজঅর্ডার।

ডিসোসিয়েটিভ ডিজঅর্ডারের আরও কারণগুলি হল অসম্পূর্ণ যৌনতৃপ্তি, শারীরিক শোষণ, মানসিক আঘাত, মানসিক ক্লান্তি ইত্যাদি।

যদি কোন মেয়ে বা মহিলা উপযুক্ত বয়সে তাঁর অনুভূতিকে প্রকাশ করতে না পারেন বা তা সফলভাবে প্রক্রিয়া করতে না পারেন, তবে তার শরীরে শারীরিক খিঁচুনি বা মানসিক বিপর্যস্ততা প্রকাশ পেতে পারে।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, যেসব মহিলা বা পুরুষদের পরিবারে জেনেটিক মানসিক দুর্বলতা, অন্তর্মুখীতা রয়েছে, তাদের মধ্যে হিস্টিরিয়া বা উদ্বেগজনিত সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বেশি।

আবার আধুনিক যুগে শিক্ষার প্রসারের ফলে মহিলা-পুরুষদের মধ্যে এই রোগ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে, শিক্ষায় উন্নত দেশগুলোতে এই রোগ আর দেখা যায়না।

ডিসোসিয়েটিভ ডিজঅর্ডারের বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ থাকতে পারে, যেমন:

ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া বা ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতির কিছু অংশ ভুলে যাওয়া।

ডিপার্সোনালাইজেশন/ডেরিয়ালাইজেশন - ব্যক্তি নিজেকে বা তাঁর চারপাশের জগতকে অস্বাভাবিক বা অবাস্তব মনে করে।

ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিজঅর্ডার (ডিআইডি বা মাল্টিপল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার) - একজন ব্যক্তি একাধিক পরিচয় বা চরিত্র অনুভব করতে পারে।

এখন প্রশ্ন হল ওঝার ঝাড়ফুঁকে এই মানসিক সমস্যা কিভাবে ঠিক হয়?

ওঝার উচ্চস্বরে মন্ত্রপাঠ, ঝাঁটা-লাথি, ঠান্ডা জলে ছিটা, ধুনোর গন্ধ বা আগুনের ছ্যাঁকা স্নায়ুতন্ত্রে বড় একটা ঝটকা দেয়, অ্যাড্রিনালিন হরমোর ক্ষরণ বাড়ে, ফলে মানসিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী নিউরোট্রান্সমিটার গুলি মেটাবলাইজ হয়, ফলে মন শান্ত হয়ে আসে।

তবে এইসব সমস্যায় ওঝার ঝাড়ফুঁক ঝাঁটা-লাথি ক্ষতিকারক, তাই ওঝার কাছে না নিয়ে গিয়ে বৈধ মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে সাইকোথেরাপি ও কাউন্সেলিং নেওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞ মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলর বা সাইকোলজিস্টের সঙ্গে কথা বললে, ব্যক্তি তাঁদের মানসিক সমস্যা বা উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারেন এবং সেটির সমাধান খুঁজে পাবেন। সবচেয়ে সাধারণ থেরাপি হলো কগনিটিভ-বিহেভিয়রাল থেরাপি (CBT), যা মানুষের চিন্তা ও আচরণে পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে।

তবে আমাদের দেশে আধুনিক মানসিক চিকিৎসা খরচবহুল, তাই সমাজের সেইসব প্রান্তিক শ্রেণির কাছে সহজলভ্য নয়, যাঁরা এইসব সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হন। @ বিজ্ঞানকথা

বিশদ অনুসন্ধান - Evolution of bodily distress disorders. Current Opinion in Psychiatry

Gender differences in response to emotional stress: an assessment across subjective, behavioral, and physiological domains and relations to alcohol craving.


৪০


কিভাবে দ্রুত বদলে যায় একটি সমাজের চিন্তা-ভাবনা, সংস্কৃতি? 

পড়াশোনার বাইরে আমাদের চিন্তা-ভাবনা "মিম" দ্বারা গড়ে ওঠে মানববিজ্ঞান বা অ্যানথ্রোপলজিতে "মিম" হল চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতির একক।  মিমগুলো একশ্রেণীর মানুষদের চিন্তাভাবনাকে প্রোগ্রাম করে! মিম ভাইরাসের মত ছড়িয়ে পড়তে পারে; যেমন হিটলারের পাগলাটে ভাবনা একটি মিম, যেটি হল একটি উন্নত ও হোমোজেনাস জাতির সুপার নেশন গড়ে তুলতে হবে, তবেই তুমি নিরাপদ থাকবে। স্কুল-কলেজের প্রথাগত পড়াশোনা, বা বই, গবেষণাপত্র পড়ার বাইরে এই মিম গুলো দিয়েই আমাদের চিন্তাভাবনার ছাঁচ গড়ে ওঠে! একটি মিম থেকে আসা বিশ্বাস দ্বারা আক্রান্ত হলে আপনি তাদের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে পারেন, যারা আপনার মত একই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করে না । 

এই মিমগুলি এক মানুষের মস্তিষ্ক থেকে আরেক মানুষের মস্তিষ্কে সংক্রমিত হয়! এবং বংশ পরম্পরায়ও বাহিত হয়! এই “মিম” গুলিই আমাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনার একক। জিন এবং মিম গুলোতে কি মিল আছে?

উত্তর হল এগুলো বেঁচে থাকতে চায় এবং ছড়িয়ে যেতে চায় (বংশবিস্তার)। জিনের মতই এই মিম বা কনসেপ্টগুলিও প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপে পরিবর্তিত হয়, যা আমাদের বেঁচে থাকাকেও প্রভাবিত করতে পারে! মিমস তথ্য প্রেরণে বেশ শক্তিশালী হতে পারে, প্রায়শই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। জিনগুলো শুক্রাণু বা ডিম্বাণুর মাধ্যমে শরীর থেকে অন্য শরীরে গিয়ে জিন পুলে নিজেদের প্রকাশ করে, তেমনি মিমগুলোও মিম পুলে নিজেদের প্রকাশ করে, মস্তিষ্ক থেকে মস্তিষ্কে লাফিয়ে যায়, আর রিপিট হয়। যখন কেউ আমার মাথায় একটি উর্বর মিম রোপণ করে, তখন আক্ষরিক অর্থে আমার মস্তিষ্ককে পরজীবী করে দেয়, আমার মস্তিষ্ককে মিমের বংশবিস্তার করার জন্য একটি বাহকে পরিণত করে, ঠিক যেভাবে একটি ভাইরাস একটি আশ্রয়দাতা কোষের জেনেটিক প্রক্রিয়াকে হাইজ্যাক করে কোষটিকে পরজীবী করে তুলতে পারে। বাস্তবেই মিম সমগ্র বিশ্বের মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের কাঠামো তৈরি করে, যেমন 'ভুত' । জিনের চেয়ে প্রকৃতপক্ষে লক্ষ লক্ষ গুণ শক্তিশালী মিম। কোন দেশে কিছু ধ্বংসাত্মক যুক্তিহীন মিম শক্তিশালী হয়ে বিকশিত হতে পারে, যা সেই সমাজের মেরুকরণ চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে দেশের অগ্রগতিতে বাধা ও ধ্বংসের কারণ হতে পারে। @ বিজ্ঞানকথা


৪১


নিউ মেক্সিকো হুইপটেল টিকটিকিদের মধ্যে পুরুষ নেই, সকলেই স্ত্রী; তাহলে বংশবিস্তার কিভাবে হয়!

নিউ মেক্সিকো হুইপটেল টিকটিকিরা অপুংজনি বা পার্থেনোজেনেসিসের মাধ্যমে অযৌনভাবে প্রজনন করে।

পার্থেনোজেনেসিস হল প্রজননের একটি প্রাকৃতিক রূপ যাতে নিষেক বা ফার্টিলাইজেশন ছাড়াই জীবের বিকাশ শুরু হয় ও জন্ম হয়, ফলে এখানে পুরুষ-স্ত্রী প্রয়োজন হয় না, প্রাণীদের ক্ষেত্রে পার্থেনোজেনেসিসের অর্থ হলো একটি অনিষিক্ত ডিম্বাণু বা ভ্রুণকোষ থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রাণীর বিকাশ হওয়া। (Parthenogenesis, গ্রিক parthénos=Virgin, génesis=Birth ইন্দো-ইউরোপীয়ান শব্দভান্ডারে জনতি = জন্ম)

ডিম পাড়ার আগে, নিউ মেক্সিকো হুইপটেল টিকটিকি তাদের প্রজাতির অন্যান্য স্ত্রীদের সাথে মিলনের মতো আচরণ করে, এই আচরণকে সিউডোকোপুলেটরি আচরণ বলা হয়, এই আচরণ ডিম্বাশয়ে ডিমের বিকাশকে উদ্দীপিত করে, ডিম পূর্ণাঙ্গ হলে ডিম পাড়া হয় বা শরীরে বাইরে আসে এবং স্বাভাবিক ভাবে বিকশিত হয় ও ফোটে।

নিউ মেক্সিকো হুইপটেল টিকটিকিরা সবাই তাদের মায়ের ক্লোন, সবাই স্ত্রী। 

টিকটিকি প্রজাতির Komodo dragon আরেকটি উদাহরণ। পার্থেনোজেনেসিস প্রজনন প্রক্রিয়ায় স্ত্রী কমোডো ড্রাগন পুরুষ ছাড়াই ডিম দিতে এবং সেই ডিম থেকে বাচ্চা ফোটাতে সক্ষম হয়। @ বিবিসি সায়েন্স



৪২


একদম শুরুতে দুধ থেকে দই কীভাবে তৈরি হয়েছিল?

ঠিকই তো, এখন তো নূতন দই তৈরি হয় পুরোনো দই একটু দিয়ে, যাকে বিজ্ঞানে কালচার বলে, তাহলে প্রথম দইয়ের কালচার কিভাবে এসেছিল!

ল্যাক্টোব্যাসিলাস (Lactobacillus) নামের জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়াদের একটি পরিবার দুধকে দইয়ে পরিণত করে, এই প্রক্রিয়াটিকে বাংলায় বলে "গাঁজন", আর ইংরেজিতে ফারমেন্টেশন বলে। এটি একটি জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া, যেখানে ল্যাক্টোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়ারা দুধে উপস্থিত ল্যাকটোজ নামক চিনি থেকে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে।

দুধে থাকা ল্যাকটোজ কে (দুধের চিনি, যা দুধকে মিষ্টি স্বাদ দেয়) ল্যাক্টোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়ারা এনজাইমের সাহায্যে ভেঙে গ্লুকোজ ও গ্যালাক্টোজে পরিণত করে, আরো পরের একটা ধাপে গ্লুকোজ এবং গ্যালাক্টোজ ল্যাকটিক এসিডে রূপান্তরিত হয়। এইভাবে ক্রমশ ল্যাকটিক অ্যাসিড বাড়ার কারণে দুধের পিএইচ (pH) কমে যায়, অর্থাৎ অম্লত্ব বেড়ে যায়, এই অবস্থায় দুধের প্রোটিন (বিশেষ করে ক্যাসিন) জমাট বাঁধতে শুরু করে, কারণ প্রোটিনের বৈশিষ্ট্যই হল অ্যাসিডের সংস্পর্শে এলে জমাট বেঁধে যাওয়া। দুধের প্রোটিন জমাট বাঁধলে একটি ঘন ও মোলায়েম টেক্সচার তৈরি হয়, যাকে দই বলা হয়, আর ল্যাকটিক অ্যাসিডের উপস্থিতির কারণে দইয়ের স্বাদ টক হয়।

এছাড়া কিছু অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া দুধের ফ্যাটের গাঁজন ঘটায়, যার থেকে মাখন সহ যে বাইপ্রোডাক্টগুলি তৈরি হয়, তা দইয়ের বিশেষ গন্ধ ও স্বাদ তৈরি করে।

মজার বিষয় হল এই ল্যাক্টোব্যাসিলাস জীবাণুদের প্রধান উৎস ও আধার হল মানুষের নিজের শরীর, বিশেষ করে মহিলাদের যোনি।

ল্যাক্টোব্যাসিলাস মানব শরীরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বিশেষত পিএইচ স্তর নিয়ন্ত্রণ করে অন্ত্র, যোনির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং রোগ প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখে। এই অঙ্গগুলিতে ল্যাক্টোব্যাসিলাসের বিভিন্ন প্রজাতি ও স্ট্রেন প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র গড়ে তুলে, যেগুলিকে "মাইক্রোবায়োটা" বলে, যা ক্ষতিকারক জীবাণু ও ফাঙ্গাসের বৃদ্ধি রোধ করে, এছাড়াও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি প্রভাব সৃষ্টি করে, যা শরীরকে প্রদাহজনিত রোগ থেকে রক্ষা করে, অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া কমাতে এবং অ্যাটপিক ডার্মাটাইটিস (চর্মরোগ) নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

শুধু মানুষ নয়, গরু বা অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের শরীরেও ল্যাক্টোব্যাসিলাস থাকে। বাছুরের মুখেও ল্যাক্টোব্যাসিলাস থাকে, যা দুধে চলে আসে, কারণ দুধ দোয়ানোর আগে বাছুরকে খাওয়ানো হয়, আবার দুধকে গাঁজানোর জন্য মানুষের আঙুলের ছোঁয়াই যথেষ্ট, মানুষের শরীর ও যোনিতে থাকা ল্যাক্টোব্যাসিলাস কোন না কোনভাবে আঙুলে এসে পড়ে, এখন না ফোটানো কাঁচা দুধ রেখে দিলে ১-২ দিনে এমনিতেই দই হয়ে যাবে, এইভাবেই ন্যাচার‍্যালি প্রথম দই শুরু হয়েছিল। @ বিজ্ঞানকথা

রেফারেন্স: International Journal of Systematic and Evolutionary Microbiology


৪৩


অ্যালার্জি কি ? অ্যালার্জি কি বংশগতিতে প্রবাহিত হয়?

আসলে অ্যালার্জি হল আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেমের ভুল ও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার ফলাফল।

সাধারণত আমাদের ইমিউন সিস্টেম ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবীর বিরুদ্ধে শরীরকে রক্ষা করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ইমিউন সিস্টেম কিছু নির্দিষ্ট উপাদানের - যেমন কিছু প্রোটিন ও জটিল শর্করা, (যেগুলো পশুর লোম, পোকা-মাকড়, পরাগ, কিছু খাবার বা ঔষধ থেকে আসতে পারে) প্রতি অতিরিক্ত বা ভুল প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। যখন শরীর এসব উপাদানকে "শত্রু" হিসাবে চিহ্নিত করে, তখন ইমিউন সিস্টেম এই উপাদানের বিরুদ্ধে অতি সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া দেখায়, এর ফলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জি উপসর্গ দেখা দেয়।

এই অ্যালার্জি বা ইমিউন সিস্টেমের ভুল ও অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার বৈশিষ্ট্যটি জেনেটিক বা বংশগতভাবেও চলে আসে। অ্যালার্জির জন্য দায়ী কিছু জিন (জেনেটিক কোড) বংশানুক্রমে পৌঁছাতে পারে, যা শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে কিছু উপাদানের প্রতি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দিতে উৎসাহিত করে।

বিশেষ কিছু জিন যেমন অ্যান্টিজেন প্রেজেন্টিং সেল (APC) জিন এবং ইমিউন রেসপন্স জিন অ্যালার্জির প্রবণতা বাড়াতে পারে। এসব জিন ইমিউন সিস্টেমের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে, এবং যখন এসব জিনের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা বা পরিবর্তন ঘটে, তখন এটি শরীরের অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার সৃষ্টি করে।:

অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা সৃষ্টি: যখন একজন মানুষের শরীরে কোন এলার্জেন প্রথমবার শ্বাসের মাধ্যমে বা অন্যভাবে প্রবেশ করে, তখন ইমিউন সিস্টেম ওই এলার্জেনকে শনাক্ত করে এবং একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করতে শুরু করে, ইমিউন সিস্টেম "IgE" (Immunoglobulin E) নামক একটি অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা ওই নির্দিষ্ট এলার্জেনের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেয়, এরপর প্রস্তুত হওয়া অ্যান্টিবডিটি শরীরের রক্তপ্রবাহে প্রবাহিত হয়।

প্রথম সংক্রমণ বা সংস্পর্শ: প্রথমবার শরীর এলার্জেনের সংস্পর্শে এলে, IgE অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে থাকে, এই অ্যান্টিবডি বিশেষ কোশে (যেমন মাষ্ট সেল এবং বেসোফিল) আটকে যায়, এই অবস্থায় এলার্জি প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়না, শরীরের কোন ক্ষতি করে না, কিন্তু ইমিউন সিস্টেম প্রস্তুতি নেয়।

পুনরায় সংস্পর্শে আসা: পরবর্তীতে, যখন ওই ব্যক্তি আবার ওই একই এলার্জেনের সংস্পর্শে আসে (যেমন চিংড়িমাছের বিশেষ প্রোটিন), তখন IgE অ্যান্টিবডি পুনরায় সক্রিয় হয় এবং মাষ্ট কোশকে হিস্টামিন ছাড়তে উত্তেজিত করে। হিস্টামিন হল একটি শরীরে তৈরি হওয়া জৈবরাসায়নিক পদার্থ যা শরীরে অ্যালার্জি উপসর্গ সৃষ্টি করে, যেমন রক্তনালীকে প্রসারিত করে, যার ফলে ত্বক বা শ্বাসনালীতে স্ফীতি বা ফোলাভাব দেখা দেয়; ফলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। চামড়ায় র‍্যাশ তৈরি করে, চুলকানি হয়।

উন্নত বিশ্বে প্রায় ২০% মানুষ অ্যালার্জির কারণে নাকের প্রদাহ (রাইনাইটিস) বা সর্দিতে ভুগছেন, প্রায় ৬% মানুষের অন্তত একটি খাদ্যে অ্যালার্জি রয়েছে। ২০% ক্ষেত্রে চামড়ায় চুলকানি হয়। প্রায় ১-১৮% ব্যক্তি অ্যাজমা বা হাঁপানিতে আক্রান্ত হয়।

০.০৫-২% ক্ষেত্রে বিষম অতিপ্রতিক্রিয়া (অ্যানাফাইল্যাক্সিস) হয়, যার চিকিৎসা সময়ে না হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

@ বিজ্ঞানকথা


৪৪


পোষা হাঁস বা মুরগি কিভাবে প্রতিদিন ডিম দিতে সক্ষম হয়?

বর্তমানের অতিরিক্ত ডিম পাড়া পোলট্রি মুরগি আসলে কৃত্রিম নির্বাচনের ফসল।

পোলট্রি মুরগির পূর্বপুরুষ বন্য মুরগি বছরে ১০ থেকে ১৪টির বেশি ডিম পাড়েনা, অনিষিক্ত ডিম পাড়ার ঘটনা বিরল।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লাল জংলী মুরগি বা রেড জঙ্গলফাউল (𝘎𝘢𝘭𝘭𝘶𝘴 𝘨𝘢𝘭𝘭𝘶𝘴) পোষা মুরগির প্রাথমিক বন্য পূর্বপুরুষ।

পোলট্রি মুরগি বছরে ৩০০টি পর্যন্ত অনিষিক্ত ডিম পাড়ে, কিন্তু বন্য কোন পাখিই এতগুলি অনিষিক্ত ডিম পাড়েনা, বন্য মুরগি মোরগের সংস্পর্শে না থাকলে সহজে ডিম পাড়বেনা, প্রকৃতিতে অনিষিক্ত ডিম পাড়ার ঘটনা বিরল।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সম্ভবত ১০ হাজার বছর আগে বন্য মুরগিকে গৃহপালিত করা হয়েছিল।

তবে গৃহপালিত মুরগির দ্রুত বিস্তার ঘটার মূল কারণটি মাংস বা ডিম ছিলনা! ছিল মুরগিলড়াই খেলা!

সেই সময় মানুষ মাংসের জন্য সরাসরি জঙ্গল থেকেই মুরগি শিকার করে নিয়ে আসত, সরাসরি জঙ্গল থেকে ডিম সংগ্রহ করে আনত, কারণ তখন জনসংখ্যা বেশি ছিলনা, ফলে জংলী মুরগিই চাহিদা মিটিয়ে দিত।

অনেক বেশি ডিম পাড়া হাইব্রিড মুরগি তৈরির বেশিরভাগ কৃতিত্ব আমেরিকার পাইওনিয়ার হাইব্রিড বীজ কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা হেনরি এ. ওয়ালেসকে দেওয়া যেতে পারে, ১৯৩৬ সালে ওয়ালেস আইওয়াতে তাঁর খামারে হাই-লাইন পোল্ট্রি জেনেটিক্স প্রতিষ্ঠা করেন।

বর্তমানে ডিমপাড়া হাইব্রিড মুরগি জেনেটিক্সের গবেষণার বেশিরভাগই বেশ কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিতে কেন্দ্রীভূত, এই কোম্পানীগুলি প্যারেন্ট স্টক তৈরি করে।

কৃত্রিম নির্বাচনে মানুষ একটি প্রজাতির মধ্য থেকে নিজের পছন্দসই বৈশিষ্ট্য রয়েছে শুধুমাত্র এমন সদস্যদেরই বেছে নেয়; যেমন অনিষিক্ত ডিম পাড়া মুরগি বা বেশি দুধ দেওয়া গাই গরু। কয়েক প্রজন্মের Selective breeding বা নির্বাচনী প্রজননের পর নির্বাচিত জীবগুলি আরও বেশি করে পছন্দসই বৈশিষ্ট্যটি লাভ করে।

তবে ঘটনাটি এমন নয় যে মানুষ জীবগুলিকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বা জীবকে কাঙ্খিত বৈশিষ্ট্যের শিক্ষা দিচ্ছে।

বরং জেনেটিক মিউটেশনের কারণে পরবর্তী প্রজন্মে বিভিন্ন ধরনের নতুন বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়, মাত্র একটি প্রজন্মে সাধারণত খুব ছোট পরিবর্তন হয়।

প্রশ্ন হল "কেন মুরগি বা পাখি অনিষিক্ত ডিম দেয়?"

কারণটি হল ডিমটি নিষিক্ত হওয়ার আগেই বিকশিত হয়ে যায়, ডিমটি নিষিক্ত হবে কি না তা শরীর আগে থেকে জানতে পারে না, তাই শরীর ডিমটি নিষিক্ত হবে; এই উদ্দেশ্যেই ডিমের বিকাশ ঘটায়। প্রকৃতিতে এই পদ্ধতিটি ভাল কাজ করে, কারণ প্রকৃতিতে পাখিদের মধ্যে যৌন মিলন সাধারণ এবং বেশিরভাগ ডিমই নিষিক্ত হয়।

@ বিজ্ঞানকথা

তথ্যসূত্রঃ https://livestock.extension.wisc.edu/articles/origin-and-history-of-the-chicken/



৪৫


পান্তাভাত;

পান্তাভাত নিয়ে অনেকদিন আগেই ইন্টারনেটে কিছু খ‌োঁজ চালিয়েছিলাম; দেখলাম পান্তাভাত শুধু বাঙালি বা দক্ষিণ ভারতীয়দের চিরাচরিত পছন্দের খাবার নয়, পুরো এশিয়ার চাল উৎপাদক অঞ্চল বা "রাইস বেল্ট" এর চিরাচরিত ও জনপ্রিয় খাবার!

জাপান-কোরিয়া-তাইওয়ান ইত্যাদি উন্নত দেশের পান্তাপ্রেমীরা পান্তাভাতকে রীতিমতো আধুনিক টেট্রাপ্যাকে ভরে সুপারমার্কেটের তাকে তুলে দিয়েছে!

শিয়ো-কোজি (Shio-koji) হল জাপানের পান্তাভাত ডিশ, এছাড়া শাকে, আামাজাকে ইত্যাদি পান্তাভাত থেকে তৈরি ড্রিংক জাপানি, কোরিয়ান, চাইনিজদের মধ্যে জনপ্রিয়, এবং এগুলো ভেন্ডিং মেশিনের মাধ্যমে প্রচুর বিক্রি হয়।

নৃবিজ্ঞানীরা বলছেন যে পান্তাভাতের উৎপত্তি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রোটো-অস্ট্রালয়েড মানুষদের হাতে; কারণ তারা দিনে একবার মাত্র ভাত রান্না করত, আর সেটা সন্ধ্যায়, ফলে বেঁচে যাওয়া ভাত জল দিয়ে রেখে দেওয়া হত ও পরদিন খাওয়া হত।

আর বাঙালি সহ জাপান-কোরিয়া-তাইওয়ান এবং ভিয়েতনাম-থাইল্যান্ড ইত্যাদি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশের মানুষ অস্ট্রালয়েড উত্তরাধিকার বহন করছে।

আর পশ্চিমী সংস্কৃতির ভাষায় "পান্তাভাত" আসলে ফার্মেন্টেড ফুডের আওতায় পড়ছে;

যেমন দই, আচার, ইয়োগার্ট, বাটারমিল্ক, কেফির, কিমচি, মিশো, সালামি (ফার্মেন্টেড মাংস), নারেসবা, কুসায়া (ফার্মেন্টেড মাছ), নাত্তো (ফার্মেন্টেড সয়াবিন) ইত্যাদি।

গবেষণায় দেখা গেছে ফার্মেন্টেড খাবারে ভিটামিন-মিনারেলের Bioavailability (বায়োঅ্যাভেলিবিলিট) বা জৈবউপলভ্যতা বেড়ে যায়, অর্থাৎ মিনারেল জটিল রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে বেরিয়ে আসে, ফলে শরীরে সহজে শোষিত হয়; আবার ফার্মেন্টেশনের সময় ভালো জীবাণুরা ভিটামিন-কে, রাইবোফ্লাভিন, ভিটামিন-বি ইত্যাদির উৎপাদন বাড়ায়।

অন্যদিকে একটু টক পান্তাভাত প্রোবায়োটিক খাবার; অর্থাৎ এতে ভালো জীবাণু থাকে, যেগুলো মানুষের অন্ত্রে খারাপ জীবাণুদের বাড়তে দেয়না, অন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

আবার ভাত দীর্ঘক্ষণ ভিজিয়ে রাখার ফলে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ বেড়ে যায়, এছাড়াও ফার্মেন্টেশনে তৈরি হওয়া অর্গানিক অ্যাসিডের কারণে তাজা ভাতের তুলনায় গ্লাইসিমিকি ইন্ডেক্স কমে যায়।

তবে যেকোন ফার্মেন্টেড খাবার ও পান্তাভাত স্বাস্থ্যবিধি না মেনে তৈরি করলে প্রায়শই খারাপ জীবাণু দ্বারা দূষিত হতে পারে, বিশেষ করে পরে যে জল দেওয়া হয়, তাতে পেটের রোগের জীবাণু থাকতে পারে যা ফার্মেন্টেশনের সময় বেড়ে গিয়ে বিপদ ঘটাতে পারে, এই বিপদ এড়াতে ফোটানো জল ঠান্ডা করে দেওয়া যেতে পারে এবং পান্তাভাতে সরাসরি হাতের ছোঁয়া এড়িয়ে যেতে হবে, পরিষ্কার করে ধোয়া পাত্রে ফার্মেন্ট করতে হবে।

পান্তাভাতের সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ খাওয়া হয়ে যায়, সেটা খেয়াল রাখতে হবে ও ব্যালান্স করতে হবে।

যাঁদের টক খাবারে অম্বল হয় বা পান্তাভাতে রুচি নেই, তাঁদের জোর করে পান্তাভাত খাওয়ার দরকার নেই, নিজের রুচি অনুযায়ী অন্যান্য ফার্মেন্টেড খাবার বেছে নিতে পারেন।

@ বিজ্ঞানকথা

তথ্যসূত্র:

Traditional rice-based fermented products: Insight into their probiotic diversity and probable health benefits - Elsevier Food Bioscience

Synbiotic Effects of Fermented Rice on Human Health and Wellness - US National Institutes of Health



৪৬


লুসি

৩২ লক্ষ বছরের প্রাচীন এক স্ত্রী অস্ট্রালোপিথেকাস।

Australopithecus afarensis

ফরাসী ও আমেরিকান প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজিস্টদের একটি দল ১৯৭৪ সালের ২৪ নভেম্বর ইথিওপিয়ার "আফার" উপত্যকায় লুসিকে আবিষ্কার করে।

শুরুতে হাড়ের সংখ্যা কম থাকলেও বিগত কয়েক বছরে লুসির আরো ১০২ টি হাড় পাওয়া যায়।

লুসির কঙ্কালের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে একটি হল ভালগাস হাঁটু; যা দেখে বোঝা যায় লুসির প্রজাতি বেশিরভাগ সময় সোজা হয়ে হাঁটত।

লুসির হিউমেরাস হাড় (বাহু) থেকে ফিমার (উরু) এর দৈর্ঘ্যের অনুপাত 84.6%, যা আধুনিক মানুষের 71.8% এবং বর্তমান শিম্পাঞ্জিদের 97.8% এর সঙ্গে তুলনীয়, ফলে লুসির প্রজাতির মধ্যবর্তী অবস্থান বোঝা যায়।

সেগুলো মিলিয়ে এখন লুসিকে অনেকটাই পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়া সম্ভব হয়েছে।

এই জীবাশ্মটির নাম লুসি রাখা হয়েছিল বিটলসের জনপ্রিয় গান 'Lucy in the sky with diamonds' অনুসারে।

ইথিওপিয়ার স্থানীয় ভাষায় এর নাম দেয়া হয়েছিল 'Dinknesh', যার অর্থ 'আশ্চর্যজনক'।

@ বিজ্ঞানকথা

বিস্তারিত তথ্য: https://iho.asu.edu/about/lucys-story

 


৪৭



অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশের প্রাগৈতিহাসিক মানববসতি বা মানবায়নের (Peopling of Australia) ইতিহাস অনেকেরই জানা নেই।

অষ্ট্রেলিয়া শেতাঙ্গদের দেশ নয়, অষ্ট্রেলিয়াতে শেতাঙ্গরা পৌঁছায় মাত্র ১৬০৬ সালে।

এর আগে প্রায় ৬৫,০০০ থেকে ৬০,০০০ বছর আগেই অষ্ট্রেলিয়াতে মানুষ পৌঁছায়, এরাই অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসিন্দা, এরা ভারত হয়েই অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছায়। আদিবাসীরা অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান জনসংখ্যার ৩.২%।

অষ্ট্রেলিয়ার এই আদিবাসীদের সংস্কৃতিই হল মানুষের একটানা চলে আসা সবথেকে লম্বা সংস্কৃতি, যার বয়স প্রায় ৬৫,০০০ বছর বা এর বেশি।

১৭ শতাব্দীর আগে পর্যন্ত অষ্ট্রেলিয়া বহির্বিশ্বের কাছে অজানা ছিল।

অষ্ট্রেলিয়ার প্রথম শেতাঙ্গ মানুষরা আসলে ব্রিটিশ কয়েদিরা!

ইংল্যান্ডের দুর্ধষ অপরাধীদের অষ্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে শাস্তি দেওয়া হত।

এই কয়েদিরাই ১৭৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারি দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়ার পোর্ট জ্যাকসনে প্রথম স্থায়ী উপনিবেশ নিউ সাউথ ওয়েল্স শহর বসায়, এটিই পরবর্তীকালে বড় হয়ে সিডনী শহরে পরিণত হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়া শব্দটি লাট্যিন টেরা অস্ট্রেলিস থেকে উদ্ভুত, যার অর্থ "দক্ষিণ ভূমি"।

ইউরোপীয়দের পৌঁছানোর আগে আদিবাসী অস্ট্রেলীয়দের সমাজব্যবস্থা শিকারি-সংগ্রাহক পর্যায়ে ছিল এবং তাঁদের জনসংখ্যা প্রায় ৭,৫০,০০০ এর কাছাকাছি ছিল।

অস্ট্রেলিয়াতে মানব বসবাসের এপর্যন্ত যত নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেছে তার মধ্যে প্রাচীনতম হল মাঙ্গো মানবের দেহাবশেষ, যেটি প্রায় ৪১,০০০ বছরের পুরোনো।

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনেক বৈচিত্র্য আছে। এঁদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক রীতি-নীতি রয়েছে। ইউরোপীয়দের আগমনের আগে অস্ট্রেলিয়াতে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টি ভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর বসবাস ছিল, প্রায় ৬০০ টি উপভাষা তারা ব্যবহার করত। আজ ২০০ টির মত ভাষা এবং উপভাষা ব্যবহৃত হয় এবং তার মধ্যেও ২০টি বিলুপ্তির পথে। আদিবাসীদের সিংহভাগের বসবাস মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে মারি নদীর আশে পাশে। অষ্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত বুমের‍াং অস্ত্র এই আদিবাসীদের তৈরি। 

তথ্য: উইকিপিডিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার সরকারি ওয়েবসাইট।

https://www.niaa.gov.au/

https://www.indigenous.gov.au/


৪৮


বিড়াল কেন বাঘের মাসি?

বিড়াল কেন বাঘের ক্ষুদ্র সংস্করণ!

আসলে সমস্ত বিড়াল জাতীয় প্রাণিরা একটিই সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছে।

জীববিজ্ঞানে পুরো বিড়াল পরিবারটিকে "ফেলিডি" নামে ডাকা হয়।

ফেলিডি হল স্তন্যপায়ী প্রাণীদের একটি পরিবার যা আবার বৃহত্তর মাংসাশী কার্নিভোরা বর্গের সদস্য।

প্রাপ্ত জীবাশ্মের জেনেটিক বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে প্রায় ২.৫ কোটি বছর আগে অলিগোসিন যুগে প্রোইলুরাস এবং সিউডাইলুরাসের এর মত প্রাণি থেকে প্রথম বিড়ালদের আবির্ভাব ঘটে। এরমধ্যে সিউডেইলুরাস বংশটি হিমযুগের পরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

বর্তমানে বেঁচে থাকা বিড়ালরা ৮টি প্রজাতির শ্রেণীতে পড়ে। ৪১টি বিড়াল প্রজাতির নিউক্লিয়ার ডিএনএর জিনোটাইপিং করে দেখা গেছে যে ৮টি বংশের অধিকাংশের মধ্যে বিবর্তনের সময় সংকরায়ণ ঘটেছে।

জীববিজ্ঞানে "বিড়াল" শব্দটি সাধারণভাবে বড় সদস্য যেমন বাঘ-সিংহ-চিতা ও ছোট যেমন গৃহপালিত বিড়াল, খটাশ, বনবিড়াল ইত্যাদি উভয়কেই বোঝায়।

@ বিজ্ঞানকথা



৪৯


বর্ষাকালে বৃষ্টিতে মাঠ-ঘাট জলে ভরে উঠলেই ব্যাঙ ডাকতে শুরু করে কেন!

ব্যাঙ হচ্ছে একটি উভচর বা অ্যাম্ফিবিয়ান প্রাণি, এমনিতে আমরা উভচর তাদেরই বলি যারা জল ও স্থল উভয়েই বাস করে।

কিন্তু জীববিজ্ঞানে উভচর প্রাণি তাদেরই বলা হয় যাদের শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন বা নিষেক, দৈহিক বিকাশ ও জন্মের জন্য জলাশয় অবশ্যই প্রয়োজন।

কারণ বিবর্তনের পথে এই উভচররাই প্রথম প্রাণি যারা জল থেকে ডাঙায় উঠে আসে, কিন্তু এরা সম্পূর্ণ স্থলচর নয়, নিষেক, দৈহিক বিকাশ ও জন্মের জন্য এদের জলাশয়ে আসতেই হয়, কারণ উভচররা সম্পূর্ণ জলচর প্রাণি মাছ থেকে বিবর্তিত হয়েছে, মাছের পরের ধাপ উভচর, এরপর সরীসৃপ, ও তার পরে সরীসৃপ থেকে মানুষের মত স্তন্যপায়ীরা বিবর্তিত হয়েছে।

মাছ ও উভচরদের শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন শরীরের বাইরে ঘটে।

কিন্তু শুক্রাণু জলীয় পরিবেশ ছাড়া চলাচল করতে পারেনা, এবং জলীয় পরিবেশে না পড়লে শুকিয়ে মারা যায়, তাই পুরুষ ব্যাঙ যদি শুকনো মাটিতে শুক্রাণু ত্যাগ করে দেয় তাহলে শুক্রাণু ডিম্বাণুর কাছে কখনই পৌঁছাতেই পারবেনা।

বিবর্তনের পথে পরে আসা সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ীদের নিষেকও শরীরের ভিতরে জলীয় পরিবেশেই ঘটে।

আসলে মানুষের নিষেকও জলীয় পরিবেশেই ঘটে, তবে মাছ-উভচরের মত প্রচুর তরল জলের প্রয়োজন হয়না, মানুষের শুক্রাণুর জন্য নারীর জননতন্ত্রের অর্ধতরল মিউকাস পর্দা জলাশয়ের মতই কাজ করে, কারণ শুক্রাণু এতই ছোট যে মিউকাসেই সাঁতরাতে পারে।

আর ব্যাঙের ডাক হচ্ছে "প্রণয় বা মিলনের ডাক", বিজ্ঞানের ভাষায় "মেটিং কল", আবার শুধু পুরুষ ব্যাঙই ডাকতে পারে, বৃষ্টিতে মাঠ-ঘাট জলে ভরে উঠলেই পুরুষ ব্যাঙ জলাশয় বা ডোবার পাড়ে গিয়ে ডাকতে শুরু করে, ডাক অণুসরণ করে স্ত্রী ব্যাঙ পুরুষের কাছে পৌঁছে যায়, জলে নেমে স্ত্রী ডিম দেয় ও পুরুষ ডিমের ওপর শুক্রাণু ছাড়ে।

@ বিজ্ঞানকথা


৫০

প্রচুর গাছ কিভাবে পৃথিবীকে শীতল করবে?

বায়ুমন্ডলের যে সব গ্যাস সূর্যের অবলোহিত তাপ শোষণ করে ধরে রাখে সেই সব গ্যাসগুলোকে গ্রিনহাউস গ্যাস বলে।‌

কার্বন ডাই-অক্সাইড একটি অন্যতম গ্রিনহাউস গ্যাস, অর্থাৎ বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধি পেলে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।

বায়ুমন্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড সরানোয় গাছের ভূমিকা।

গাছ সরাসরি বায়ুমন্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিয়ে প্রথমে গ্লুকোজ তৈরি করে, এই গ্লুকোজ থেকে পরে পুরো গাছটাই তৈরি হয়।

(গ্লুকোজ--> সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ, লিগনিন ইত্যাদি জটিল কার্বোহাইড্রেট পলিমার সংশ্লেষ হয়ে কাঠ, পাতা তৈরি হয়, আর প্রোটিন, ফ্যাটও তৈরি হয়, যা প্রাণিদের খাদ্য জোগায়)

এইভাবে পৃথিবীর সব উদ্ভিদ ও শ্যাওলা মিলে কোটি কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমন্ডল থেকে সরায়।

১৭৫০ সালের দিকে স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়ে শিল্প বিপ্লব ও পরে পেট্রল-ডিজেল চালিত ইঞ্জিন আবিষ্কার হয়ে মোটরগাড়ি ইত্যাদি তৈরি হয়ে পেট্রল-ডিজেল, প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোর ফলে ও মানুষের আরও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলে বর্তমান সময় পর্যন্ত বায়ুমন্ডলে ৪০% কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে মানুষের বসতি স্থাপন, ঘর-বাড়ি, দরজা-জানালা-বিছানা ও জ্বালানি ইত্যাদির প্রয়োজনে প্রচুর গাছ কাটা হয়েছে, ফলে বায়ুমন্ডলে অতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড রয়ে যাচ্ছে ও পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে যে হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হচ্ছে তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ২০৩৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, এর ফলে পৃথিবীর জলবায়ু সিস্টেমে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।

বর্তমানে মানুষের হাতে এমন কোন কার্যকর পদ্ধতি নেই যার দ্বারা এই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড সরিয়ে ফেলা যায়।

ফলে বর্তমানে একমাত্র কয়েকশ কোটি গাছই পারে এই অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড সরিয়ে ফেলতে, তাই গাছ লাগানোর কথা বলা হচ্ছে।

@ বিজ্ঞানকথা

বৈজ্ঞানিক তথ্য: https://iopscience.iop.org/article/10.1088/1748-9326/ac2966