১

ভয়ানক একটি গবেষনা 'ইউনিভার্স ২৫'

 

ইদুঁরের কলোনির উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপর ভিত্তি করে মানব সভ্যতাকে বোঝার চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা। যা 'ইউনিভার্স ২৫' নামে বিখ্যাত। এতে ইদুঁরের জন্য একটি 'আদর্শ দুনিয়া' নির্মাণ করেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে ইঁদুরেরা থাকবে এবং বংশবৃদ্ধি করবে। যাকে ইদুরের স্বর্গও বলা যায়। অঢেল খাবার, পানি ও থাকার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জায়গা। শুরুতে সেখানে তিনি চার জোড়া ইঁদুর রাখা হয়, যেগুলা অল্প সময়ের মধ্যে বংশবৃদ্ধি শুরু করে।

অবাক করা ব্যাপার হল, ইঁদুরদের সেই স্বর্গে মাত্র ৩১৫ দিন পরেই বংশবৃদ্ধির হার কমে যায়। যখন ইঁদুরের সংখ্যা বেড়ে ৬০০ তে পৌছালো, তখন সেখানে দুটি জাত তৈরি হয়ঃ ভালো ও 'বিকৃত'। এর পর থেকে দূর্বল ইঁদুরগুলো সবলদের আক্রমণের শিকার হয় এবং কোণঠাসা হয়ে পড়ে'।

নারী ইঁদুররা বেশি সন্তান জন্ম দেবার পরিবর্তে জন্ম নেয়া সন্তানদের প্রতি আক্রমনাত্মক হয়ে উঠে এবং জন্মহার ক্রমেই কমতে শুরু করে । পুরুষদের মাঝে একটি নতুন জাতের ইঁদুরের উৎপত্তি হয়, যারা নারীদের সাথে বংশবৃদ্ধি ও জায়গার জন্য 'লড়াই' কর‍তে অস্বীকৃতি জানায়। তারা শুধু খাদ্য ও ঘুম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞানী জন ক্যালহোনের মতে, আগামীতে সমৃদ্ধ পৃথিবীর মানব জাতীর জন্য দুটি ধাপ আসছে। 'প্রথমত হচ্ছে জীবন অর্থহীন হয়ে পড়া এবং বংশবৃদ্ধির ইচ্ছার অভাব তৈরি হওয়া, সন্তান প্রতিপালনের প্রতি অনিহা। ক্যালহোনের এই বৈজ্ঞানিকপরীক্ষার মাধ্যমে নাগরিক সমাজ ও সভ্যতার অবক্ষয় টের পাওয়া যায় । 'দ্বিতীয়্ত হচ্ছে মৃত্যু'। কারণ সমৃদ্ধির পরিনাম হচ্ছে মৃত্যু। তাই স্টিভ জবসের সূত্র মেনে চলুনঃ "ক্ষুধার্ত থাকুন ভালো থাকুন।" 


২


প্রাচীন গ্রিসে রাষ্ট্র ব্যবস্থা


প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কথা। প্রাচীন গ্রিসে তখন প্রধানত দুই ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছিল। এর মধ্যে একটি হলো অলিগার্কি, আর অন্যটি হলো ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্র। অলিগার্কি মানে অল্প কয়েকজন লোকের শাসন। এই অল্প কয়েকজন লোক হচ্ছেন সমাজের সবচেয়ে উঁচু বংশ এবং সম্পদশালী পরিবারের লোক। প্রাচীন গ্রিসের স্পার্টা রাষ্ট্রে ছিল এই অলিগার্কি শাসনব্যবস্থা।

স্পার্টার মূলত যুদ্ধ এবং সামরিক শক্তির বিষয়েই তাদের বেশিরভাগ সম্পদ খরচ করত। স্পার্টা ছিল তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী নগর রাষ্ট্র। স্পার্টা মত আরেক শক্তিশালী রাষ্ট্র ছিল এথেন্স। এথেন্সে আবার চলত ডেমোক্রেট্রিক বা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। এথেন্সের মূল ফোকাস ছিল সংস্কৃতি ও জ্ঞান চর্চার দিকে। এক পর্যায়ে এথেন্সও স্পার্টার মত শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে স্পার্টা ছিল প্রতিষ্ঠিত শক্তি, অন্যদিকে এথেন্স ছিল উঠতি শক্তি। এথেন্স সবেমাত্র শক্তিশালী হয়ে উঠছিলো এবং সে সময়ের ভূ-রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এই অবস্থা বেশিদিন চলতে পারেনি। একসময় গিয়ে এই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ইতিহাসে এই যুদ্ধ “পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ” নামে পরিচিত। আর এই যুদ্ধের মাধ্যমেই গ্রীক সভ্যতার সোনালী যুগের ধ্বংস শুরু হয়ে যায়।

এথেন্সের সাথে স্পার্টার এই যুদ্ধের কারণ সম্পর্কে অনেক বিশেষজ্ঞই অনেক ব্যখ্যা দিয়েছেন। এদের মধ্যে গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিসের ব্যখ্যায় একদম মূল কথাটা উঠে আসে। তাঁর মতে, এথেন্স যে নতুন শক্তি হিসেবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিল, এতে স্পার্টার ভয় হচ্ছিলো। এথেন্স যেন স্পার্টাকে ছাড়িয়ে না যেতে পারে সে ব্যবস্থা করাটাই তখন স্পার্টার একমাত্র মাথাব্যথা।    স্পার্টার এই ভয় থেকেই দুই রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। এই ঘটনাটা শুধু প্রাচীন গ্রীসেই সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসে বার বার এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।


৩



। চীনের ঘুম সত্যি ভেঙেছে।

সেই উনিশ শতকের শুরুতে নেপোলিয়ন বলেছিলেন, “চীন ঘুমাচ্ছে, তাকে ঘুমাতে দাও। যদি এই ঘুম ভাঙে, সে পুরো পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিবে।” নেপোলিয়নের সেই কথার পর কেটে গেছে বহু বছর। এখন ২০২৩ সাল। চীনের ঘুম সত্যি ভেঙেছে। বর্তমান পৃথিবীতে শিল্প ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের চরম মুহুর্ত চলছে। আর এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে আমরা স্পার্টা-এথেন্সের মতো একই ধরনের বৈশিষ্ট্য দেখতে পাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং প্রতিষ্ঠিত শক্তি। অন্যদিকে চীন হলো উঠতি শক্তি। শক্তিশালী দেশ হিসেবে চীনের উত্থান ছিলো আশ্চর্যজনকভাবে দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং নাটকীয়। এই নব্বইয়ের দশকেই চীন ছিল একটা গোবেচারা রাষ্ট্র। কিন্তু মাত্র কয়েক দশকের ভেতর চীন কৃষিপ্রধান সমাজ থেকে শিল্পোন্নত জাতিতে এবং বিশ্বের শীর্ষ শিল্প-উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে চীন এখন একটি মুখ্য চরিত্র।


চীনের এই বিস্ময়কর উত্থান তাকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই বিশ্ব শক্তির ভারসাম্যের এই বিশাল পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন একটি শক্তি। চীনের বিভিন্ন কার্যকলাপ থেকেই বোঝা যায় চীন নিজেও ক্ষমতার জন্য মরিয়া। নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার পথে যত প্রতিবন্ধকতা, সেসব কিছুর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে কিংবা আগ্রাসী হুমকি দিতে চীন দ্বিধা করে না।


একটা নতুন রাষ্ট্র যখন নতুন করে শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে তখন সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র তাকে হুমকি মনে করে। ধীরে ধীরে তারা যুদ্ধের দিকে ঝুকে পরে, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই যুদ্ধ এড়ানো যায় না। এই পরিস্থিতিকে বলা হয়, “থুসিডাইডস ট্র্যাপ”। আর এই থুসিডাইডস ট্র্যাপ আমাদের বলে দেয়, যখন কোনো উঠতি শক্তি প্রতিষ্ঠিত শক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন যুদ্ধই হলো সম্ভাব্য ফলাফল। চতুর্থ শতাব্দীর গ্রীক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডস হলেন এই তত্ত্বের প্রবক্তা। এই তত্ত্ব অনুসারে চীন আর যুক্তরাষ্ট্রও এখন সেই থুসিডাইসের ফাদে আটকা পড়েছে।


বর্তমান বিশ্বে আমেরিকার উপর চীনের ভূমিকা কী প্রভাব ফেলতে পারে তা এখনও দেখার বাকি আছে। রাজনৈতিক, বিশ্লেষকসহ বিশ্বের বড় বড় থিংক ট্যাংকরা এই ভবিষ্যৎ আঁচ করার চেষ্টা করে চলেছে। এই ভবিষ্যৎকে আঁচ করতে চাইলে  আমাদের অতীতের আরও এমন ঘটনার উপর নজর দিতে হবে।


এজন্য আমরা চলে যাব বিশ শতকের জাপানে। জাপানের তখন সবেমাত্র শক্তিশালী দেশ হিসেবে উত্থান শুরু হয়েছে। তার আগে অর্থাৎ ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতিতে জাপানের তেমন কোন ভূমিকা ছিলোনা। কিন্তু এরপর এমন একটা ঘটনা ঘটে যা জাপানের অর্থনীতিকে ফুলে ফেপে উঠতে সাহায্য করেছিল। ঐ সময় মার্কিন নৌবাহিনীর কমোডোর ম্যাথিউ পেরি এদো উপসাগরে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের জন্য গানবোট জাহাজের একটি বহর নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। সেখানে গিয়ে তিনি জাপানের সম্রাটকে বাণিজ্যের জন্য জাপান সীমান্ত খুলে দিতে কিছুটা জোরপূর্বকই রাজি করান। লোভি জাপান তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং রাশিয়ার মতো বড় বড় দেশের সামরিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার সাথে পাল্লা দিতে ছুটে যায়। ১৮৮৫ থেকে ১৮৯৯ সালের মধ্যে দেশটির জিডিপি প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু জাপান তখন কেবলমাত্র বড় বড় দেশগুলোর সমান পদমর্যাদা অর্জন করেই সন্তুষ্ট হয়নি। জাপান তখন আশেপাশের অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারেরও প্রবল চেষ্টা চালাচ্ছিলো।


জাপানের প্রতিবেশী দেশ কোরিয়ায় যখন বিদ্রোহ শুরু হয়, তখন জাপানের শক্তি প্রদর্শন করার সুযোগ আসে। তখন জাপান এবং চীন দুই দেশই সেখানে সৈন্য পাঠানোর সুযোগ নেয়। অতি শীঘ্রই তারা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধে জাপান জয়ী হয়। ফলে কোরিয়া, তাইওয়ান এবং মঞ্চুরিয়ার নিয়ন্ত্রণ জাপানের হাতে চলে আসে। এই অঞ্চলগুলোর মধ্যে মঞ্চুরিয়াতে আবার রাশিয়ার কৌশলগত স্বার্থ ছিল। ফলে এই ঘটনায় রাশিয়া স্বভাবতই নাক গলাতে আসবে। জাপান ঐ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ার ছয় দিন পর রাশিয়ার অনুরোধে ইউরোপ জাপানের উপর চাপ প্রয়োগ করা শুরু করে। ফলে জাপান বাধ্য হয়ে মঞ্চুরিয়া থেকে সরে আসে। অবশ্য জাপান আশা করেছিল যে এই পদক্ষেপের ফলে রাশিয়া হয়ত কোরিয়াকে জাপানের অংশ হিসাবে স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু রাশিয়া স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার জানায়। রাশিয়া কোরিয়ায় একটি নিরপেক্ষ অঞ্চল তৈরির প্রস্তাব দেয়। মঞ্চুরিয়া ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে জাপান তখন নিজেদের জন্য ক্ষতি হিসেবে দেখা শুরু করে। এর ফলে জাপান রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে জাপানই জয়ী হয়।


জাপানের এই মনোভাব বিশ্ব-রাজনীতির ইতিহাসে আমরা বার বার দেখতে পাই। জাপানের দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণেই সে তখন বিশ্ব দরবারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল। কিন্তু চীনের সাথে দ্বন্দ্বে রাশিয়া এবং ইউরোপের হস্তক্ষেপে জাপান বেশ অপমানিত বোধ করে। এই ঘটনায় জাপানের যে মনোভাব দেখতে পাওয়া যায়, অর্থাৎ অর্থনৈতিক অগ্রগতির ফলে প্রভাব বিস্তার করা, আগ্রাসী ভূমিকা, প্রতিষ্ঠিত শক্তির হস্তক্ষেপে অপমানিতবোধ হওয়া- সবই একটি উঠতি শক্তির বৈশিষ্ট্য। আর এসব বৈশিষ্ট্য সামরিক আগ্রাসনের চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে।

ঠিক একই ঘটনা লক্ষ করা যায় বর্তমান সময়ের চীনের মধ্যে। ঐ সময় জাপান যা যা করেছিল এবং জাপানের যে ধরনের মনোভাব ছিল তার সবই এখন চীনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। চীনের পাগলা ঘোড়ার মত অগ্রগতি চীনকে সেই একই অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে বর্তমানের প্রতিষ্ঠিত শক্তি অ্যামেরিকার সাথে তার ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিরোধে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। কিন্তু এই বিরোধ আর প্রতিযোগিতা কোথায় গিয়ে থামবে? চীন আর অ্যামেরিকা কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে? চীন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন মূলত থুসিডাইসের ট্র্যাপের মধ্যে পরে গেছে। এই ট্র্যাপ থেকে বের না হতে পারলে আরেকটা বড় যুদ্ধ বা বিশ্বযুদ্ধ এড়ানোর খুব কঠিন।


৪


সেমিকন্ডাক্টর ইন্ড্রাস্ট্রি


একটা সময়ে সেমিকন্ডাক্টর ইন্ড্রাস্ট্রি ছিল একচাটিয়া অ্যামেরিকার দখলে। কিন্তু এখন তাইওয়ান, কোরিয়া, ইউরোপ এবং সর্বোপরি চীনের প্রতিযোগীতার কারনে আমেরিকার হাত থেকে এই ইন্ড্রাস্ট্রির আধিপত্য চলে যেতে বসেছে। এই চিপ তৈরির প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রীতিমত এক ভু-রাজনৈতিক যুদ্ধ। অনেকেই এটাকে বলেন চিপ ওয়ার। চীন এখন তেল আমদানির চেয়ে চিপ আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় করে। কিন্তু চীনের লক্ষ সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়া। এখন চীনকে যদি এই চিপ আমদানীই করতে হয়, তাহলে চীন কখনোই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াতে পারবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য চীন চিপ তৈরির উদ্যোগে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢেলে দিচ্ছে। ফলে ঝুঁকিতে রয়েছে আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।


সিলিকন দিয়ে তৈরি মাইক্রোচিপ আজকের দিনে আর শুধুমাত্র ইলেক্ট্রনিক্সেই সীমাবদ্ধ নেই। এই সেমিকন্ডাক্টর চিপ আগামী দিনে জ্বালানী তেলের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হতে চলেছে। তেল নিয়ে যে বিখ্যাত ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে, হয়ত তার থেকেও ভয়াবহ হবে এই সেমিকন্ডাটরের রাজনীতি। কারন আজকের এই আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হলো ইলেক্ট্রনিক্স বা সেমিকন্ডার চিপ। এমনকি সামরিক শক্তি, অর্থনীতি, বা ভূ রাজনৈতিক ক্ষমতার সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো এই সেমিকন্ডাকটর। মিসাইল হোক বা মাইক্রোওয়েব ওভেন, সেটা তৈরি করতে শেষ পর্যন্ত এই চিপ ছাড়া গতি নেই। ফলে পৃথিবী যত আধুনিক হচ্ছে এই সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে, দেশগুলোও তাদের শক্তি বৃদ্ধি করতে বা অন্য দেশের উপর তাদের নির্ভরতা কমাতে এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠছে।


অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ক্রিস মিলার ব্যাখ্যা করেছেন যে সেমিকন্ডাক্টর কীভাবে আধুনিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চিপ ডিজাইন এবং উত্পাদনে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেছিল। আর এই চিপ তৈরির কারনেই কিভাবে দেশটি সামরিক শক্তিতে মারাত্মক অগ্রগতি লাভ করেছিল। স্নায়ুযুদ্ধে আমেরিকার বিজয় এবং এর বৈশ্বিক সামরিক আধিপত্যের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল অ্যামেরিকার কম্পিউটিং শক্তি। কিন্তু এখন চীন তার চিপ তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সামরিক আধুনিকীকরনের হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। তাহলে আগামী দিনে কি হতে চলেছে? চীন কি অ্যামেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে। এই বইতে ক্রিস মিলার সেই বিষয়টাই বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন।


৫



নিউরোলজিক্যাল ব্যাখ্যা

১৯৮০-র দশকের শেষ দিকে একজন মার্কিন নারীকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে তোলপার শুরু হয়। ডাক্তারের পরীক্ষা থেকে জানা যায়- এই ভদ্রমহিলার মধ্যে কোনো প্রকার ভয় নেই। বিজ্ঞানীরা দেখতে পেলেন যে সাপ, মাকড়সা, ভয়াবহ সিনেমা, অন্ধকার ঘর—কোনো কিছুতেই তিনি ভয় পান না। একবার তাকে একটি হন্টেড হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানে তাকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো হয়। এই ভয়ংকর পরিবেশেও তিনি হাসছিলেন এবং বলেছিলেন, “It was fun!”। 

নিউরোসায়েন্সের ইতিহাসে এই নারী ছিলেন অন্যতম বিখ্যাত কেস স্টাডি। কেস স্টাডিতে তার ছদ্মনাম ছিল SM। তিনি মূলত একটি বিরল জেনেটিক রোগে ভুগছিলেন। এই রোগ হলে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা নামের একটি অংশ ধীরে ধীরে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। অ্যামিগডালা নিয়ে অবশ্য এটাই প্রথম পরীক্ষা নয়। ১৯৩০-এর দশকে দুইজন বিজ্ঞানী মস্তিষ্কের কার্যকলাপ নিয়ে একটি সিরিজ গবেষণা পরিচালনা করেন। সেই পরীক্ষাতে তারা বানরের মস্তিষ্ক থেকে অ্যামিগডালা অংশ পুরোটাই কেটে ফেলেন। সেই গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, অ্যামিগডালা কেটে ফেলে দিলে শুধু যে ভয় কমে তা’ই নয়। বরং প্রাণীটির আচরনই পুরো পাল্টে যায়। অ্যামিগডালা না থাকলে প্রাণীটির আগ্রাসী মনোভাব পুরোপুরি চলে যায়, যৌন আচরণ হয়ে উঠে খুবই অদ্ভুত, মুখ দিয়ে সবকিছু পরীক্ষা করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়।

এইসব পরীক্ষা থেকে এই বিষয়টা স্পষ্ট বোঝা যায় যে- মানুষের আগ্রাসী মনোভাব, ভয় পাওয়া, কোনকিছুকে হুমকি মনে করা ইত্যাদি আচরণের সাথে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা নামের একটি অংশের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। নিউরোসায়েন্সের গবেষকরা তাই অ্যামিগডালাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখেন। মানুষের আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আমাদের মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স  বা ‘ACC’ নামের আরেকটি অংশ। মস্তিষ্কের এই অংশের কাজটা আরও বেশি ইন্টারেস্টিং।


কোনটি আপনার ‘নিজের মত’, আর কোনটি ‘তথ্য’ এই বিষয়টা সবাই সমানভাবে বুঝতে পারে না। যারা এই বিষয়টা ভালমতো বুঝতে পারে, তারা তাদের নিজের মতের সাথে না মিললেও কোন তথ্য মেনে নিতে পারেন। যেসব লোকের মস্তিষ্কের ACC নামের অংশটি বেশ সক্রিয়, এইসব লোক সাধারণত ‘নিজের মত’ আর ‘তথ্য’-এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। কিন্তু যেসব লোকের ACC অংশটা খুব বেশি সক্রিয় না, তারা সাধারণতো একটু গোয়ার টাইপের হয়। নিজের মত দিয়েই সারা দুনিয়াকে বিচার করতে চায়, কোনটি সত্য সেটা তারা বুঝতে পারে না।


এই একই ধরনের কাজ করে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্ট্রাল কর্টেক্স নামের আরেকটি অংশ। যেসব মানুষের মস্তিষ্কের এই অংশটি বেশি সক্রিয়, তারা চিন্তা করার সময় যুক্তি ব্যবহার করেন। ফলে তাদের মধ্যে যুক্তি দিয়ে কোনকিছু বোঝার ক্ষমতা থাকে, অন্যের মতামত তারা বিবেচনা করেন, তাদের cognitive flexibility বেশি থাকে।


মানুষের আচরণের সাথে সম্পর্কিত এইসব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন ড. লেওর জ্‌মিগ্রড। তার গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত বিশ্বাস কেবল পরিবেশগত নয়। বরং এইসব বিষয় সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের সাথে সম্পর্কিত। আগ্রাসী আচরণ, উগ্র মতাদর্শে বিশ্বাস ইত্যাদি বিষয়ের শক্তপোক্ত স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। কিছু মানুষ কেন সহজেই কট্টোর মতাদর্শে আকৃষ্ট হয় সেই বিষয়গুলো তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। এই বিষয়ে নিয়ে লেখা তার বইয়ের নাম The Ideological Brain: The Radical Science of Flexible Thinking। 

বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন বাড়ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে উগ্র ও কট্টোর ডানপন্থী মতবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এই বইটি আমাদেরকে বুঝতে সাহায্য করবে- কিভাবে আমাদের মস্তিষ্ক বিভিন্ন ধরেনের মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়। পাশাপাশি কিভাবে আমরা আরও নমনীয় ও সহনশীল চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে পারি সেই বিষয়েও এই বইতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

আপনি যদি মানুষের রাজনৈতিক চিন্তা, আগ্রাসী আচরণ, উগ্র মতবাদ এইসব বিষয়ের নিউরোলজিক্যাল ব্যাখ্যা জানতে চান, তাহলে এই বইটি আপনার জন্য একদম আদর্শ।  



টিপটপ লাইফস্টাইল, গুছালো সংসার!

মানুষের লাইফ স্টাইল কেমন হবে, সেটা তার পারিবারিক শিক্ষা এবং আশেপাশের পরিবেশের উপরে নির্ভরশীল। ছোটবেলায় যে পরিবার ও পরিবেশে মানুষ বড় হয়, সেটাই তার ভেতরে পাকাপাকিভাবে একটা ছাপ রেখে যায়। যে শিক্ষিত মা সীমিত উপার্জনের মাঝেও খুব সুন্দর করে গুছিয়ে ছেলেমেয়েদের বড় করেন। তাদের ঘরদোর বলেন আর লাইফস্টাইল, সবকিছুই খুব টিপটপ থাকে। 

স্পেন্ট গেম

আমি আপনাকে স্পেন্ট নামক একটি গেম-এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিব। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েল সোসাইটির অধীনে এই গেমটি পরিচালিত হয়। এটি ধনী পরিবারের সন্তানদেরকে এমন একটি পরিস্থিতিতে ফেলে, যেখানে তাকে একজন দরিদ্র ব্যক্তি হিসাবে এক মাস বেঁচে থাকতে হবে। খাবারের কষ্ট, থাকার কষ্টসহ একজন দরিদ্র ব্যক্তি্র প্রতিদিন কি অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন-রাত কাটে তা তাকে ভোগ করতে হয়। কিন্তু গরিব হলেও তার আচরণ যদি রয়েল ফ্যামিলির মানুষের মত বজায় থাকে, তবেই সে উপযুক্ত সার্টিফিকেট পায়; যা তার রয়েল ফ্যামিলিতে গেইট বা সিঁড়ির সঙ্গে ঝুলানো থাকে।


৬


সম্পদ মানে কি? ধনী কে? গরীব কে?

এক প্রশ্নের উত্তরে বিশ্বের সেরা ধনী বিল গেটস বলেছিলেনঃ সম্পদ মানে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা জমা থাকা নয়! সম্পদ হচ্ছে মূলত সম্পদ তৈরি করার ক্ষমতা। উদাহরণস্বরূপ: একজন ব্যক্তি লটারি বা জ্যাকপট জিতল। যদিও সে 100 মিলিয়ন ডলার জিতেছে, সে আসলে একজন ধনী মানুষ নয়: সে প্রচুর টাকাসহ একজন গরিব মানুষ, এবং এ কারণে 90% লটারি বিজেতা 5 বছরের মধ্যে আবার গরিব হয়ে যায়।

ধনীরা মূলত টাকায় নিঃস্ব। উদাহরণস্বরূপ, অধিকাংশ উদ্যোক্তাই হচ্ছে ধনী। তারা আসলে সম্পদের পথে আছেন, যদিও তাদের কাছে টাকা নেই, কারণ তারা তাদের টাকা-বুদ্ধি বিনিয়োগ করছেন এবং সেটাই হলো সম্পদ।

যদি আপনি একটি যুবককে দেখেন যে, সে নতুন জিনিস শিখতে চায় এবং সবসময় নিজেকে উন্নত করতে চায়, তবে জানবেন সে একজন ধনী ব্যক্তি। কিন্তু যদি আপনি একটি যুবককে দেখেন যে, সে বিশ্বাস করে ধনী হতে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়; টাকাওয়ালাদেরই টাকা আসে, চুরি দুর্নীতি ছাড়া টাকা ইনকাম সম্ভব নয়, সব ধনীরা চোর, তবে জানবেন সে একজন গরিব, কারণ তার চিন্তাভাবনা গরিব!

ধনীরা বিশ্বাস করে যে, তাদের শুধু তথ্য এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ধনী হওয়ার জন্য। আর গরিবরা মনে করে তাদের প্রচুর টাকা লাগবে, ব্যবসা শুরু করার জন্য। 

৭


 নিজেকে একটু ছেঁটে নিন

 

সাধারণত মানুষের ক্ষমতা ও অর্থবল বেড়ে গেলে তার অপরিকল্পিত কাজ বৃদ্ধি হয়। সোজা বাংলায় বলে অতি বাড় বাড়া। গরিব যদি ধনী হয়ে উঠে তাহলে তারা পুরনো বন্ধু-বান্ধব পরিচিতদের ধীরে ধীরে চিনতে পারে না। ক্ষমতায়িত লোকেরা তার চেয়ে বেশি ক্ষমতাবানদের সাথে মেশে। গণতান্ত্রিক সুশীল নেতা বা নেত্রীও একচ্ছত্র ক্ষমতা পেলে স্বৈরাচারিতে পরিণত হয়।

বহু জাদরেল অফিসার রিটায়ার করার পর সাপ থেকে কেঁচোয় পরিণত হন। নামের আগে যতক্ষণ না একটা এক্স বা প্রাক্তন বসছে ততক্ষণ আর তিনি এ পৃথিবীর মানুষ থাকেন না।

আমার এক প্রতিবেশির যখন টাকা-পয়সা বেশি ছিলো না, তখন তিনি আমাকে দাদা বলে ডাকতেন। যেই তাঁর আঙুল ফুলে কলাগাছ হলো, অমনি তিনি আমাকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নিতেন। আড়ালে দাদার বদলে গাধা বলতেন।

যার যত অর্থ জমে তার তত স্বার্থ বিনাশ হয়। ক্ষমতায়িত ব্যক্তি তার কাজকর্মের জন্যই প্রতিদিন শত্রু তৈরি করে। এই শত্রুরা তার পতন ডেকে আনে। যখন অর্থ যশ একনাগারে চলতে থাকে; তখন নিজেকে কন্ট্রোল করতে শিখুন। কোথায় থামতে হবে তা উপলব্ধি করুন। অতিরিক্ত আশা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, অতিরক্তক কল্পনা ছেঁটে নিন। নয়তো আপনাকে স্থায়ীভাবেই থেমে যেতে হবে। 


৮


নিজেকে পরাজিত ভাববেন না


গত মহাযুদ্ধে জার্মানি ও জাপান পরাজিত হয়েছিলো। কিন্তু জার্মান ও জাপানিরা নিজেদের পরাজিত ভাবেনি। তাই এই দুই জাতি আবার কিছুদিনের মধ্যেই অসাধারণ উন্নতি করেছে।

জিতবার মতো, হারার জন্যও তৈরি থাকতে হয়; হারা মানে আবার আরও বড় ধরনের প্রস্তুতি। পরাজিত মানসিকতা, বিপর্যস্ত মানসিকতার চেয়ে ক্ষতিকর।

মনে রাখবেন,সাফল্য ও ব্যর্থতা হাত ধরাধরি করে চলে। একটি বিখ্যাত উক্তি মনে রাখুন: সফল হবার জন্য বুদ্ধিমান, বিদ্বান, বিত্তবান ও ভাগ্যবান হবার প্রয়োজন নেই। এমন মানুষের দরকার, যে কখনও নিজেকে পরাজিত মনে করে না; পরাজয় মেনে নেয় না। মিলটন অন্ধ হয়ে যাবার পর অমর মহাকাব্য প্যারাডাইস লস্ট লেখেন।

নিজেকে দীন-হীন ভাববেন না। নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে ভাবতে শিখুন। তুচ্ছ মানুষেরা আপনাকে তুচ্ছ প্রমাণ করার চেষ্টা করবে, কিন্তু বড় মাপের মানুষেরা আপনার ভেতরের গুণগুলি খুঁজে বার করার চেষ্টা করবে।

সুযোগ পেলে অন্যের অসাক্ষাতে অন্যের প্রশংসা করুন। সর্বদা মনে রাখুন, আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে লোকে অন্যের নিন্দা করে।

পরিকল্পনাহীন জীবনযাপন করবেন না। আগামী বছর আপনি কী করবেন এই বছর পরিকল্পনা করুন। আগামী মাসের পরিকল্পনা এই মাসে করুন। আগামীকালের পরিকল্পনা আজ রাতে ঘুমোবার আগে সেরে ফেলুন। 


৮


আমরা কি আমাদের পরাজয় টের পাচ্ছি?

 

আমাদের পূর্বপুরুষরা কৃষক ছিলেন, শ্রমিক ছিলেন। থাকতেন মাটির কাঁচা ঘরে। অর্থাভাবে-অন্নাভাবে কখনও-সখনও উপোসও করতেন। পরতেন মলিন পোশাকপরিচ্ছদ। আমাদের বাবারা চাইলেন আমরাও যেন পূর্বসূরিদের মতো শ্রমিক না হই, আমরা যেন পাকা ঘরে থাকি, যেন পেট পুরে তিনবেলা খেতে পাই। বাবারা আমাদেরকে মফস্বলে এনে পড়াশোনা করালেন, উচ্চশিক্ষার্থে মহানগরে এলাম, কায়িক পরিশ্রম থেকে মুক্ত হলাম, বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকর্ম (আসলে কেরানিগিরি) করে জীবিকা নির্বাহ করা শুরু করলাম,কায়িক পরিশ্রম না-করতে না-করতে আমাদের দেহে পুরু চর্বি জমল, সার্বক্ষণিক রোগবালাই বাসা বাঁধল, ডায়াবেটিস হানা দিলো। চিকিৎসকরা আমাদের খাবারের পরিমাণ বেঁধে দিলেন— দিনে ছয় কাপ ভাত, চারটা রুটি, এক কাপ শবজি, একটা শশা। চিকিৎসকরা আমাদেরকে প্রতিদিন দৌড়াতে বলে দিলেন। আমরা স্টপওয়াচ চালু করে হাফপ্যান্ট পরে ভুঁড়ি নাচিয়ে রাজপথে দৌড়াতে লাগলাম, জিমনেশিয়ামে গিয়ে বাঁদরের মতো এ-ডাল ও-ডাল ঝুলতে লাগলাম, বুকডনের নামে নাকে খত দিতে লাগলাম; আমরা সেসবের গালভরা নাম দিলাম— 'ওয়ার্ক আউট', 'ক্যালরি বার্ন'।

 

কুঁড়েঘরে থাকব না বিধায় আমরা গ্রাম ছেড়েছিলাম, শহরে থাকতে-থাকতে ক্লান্ত হয়ে আমরা দু-তিন মাস পরপর ছুটতে লাগলাম রিসোর্টে। একটু গাছপালা আর ডোবার মতো পুকুরে। শ্রমিকদের মতো দৌড়াব না বলে আমরা সুট-বুট পরে দালানে ঢুকেছিলাম, আমরা এখন মেসিন কিনে সেই একই দালানের ভেতরই দৌড়াচ্ছি। গায়ে মাটি লাগাব না বলে আমরা গ্রাম ছেকিংবা ছাদবাগান করছি। 'চাষাভুষা' শব্দটাকে আমরা গালি বানিয়েছিলাম, এখন ছাদবাগানে এক ডজন টমেটো ফলাতে পারলে গর্বিত 'নগরচাষি' হিশেবে বুক ফুলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার করছি। মাছধরা মানুষদের জাইল্লা বলে তাচ্ছিল্য করা আমরাই লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে বড়শি পেতে বসে থাকছি সরকারি দিঘিতে সেই মাছই ধরার জন্য। শবজি খাব না বলে আমরা বড়লোক হয়েছিলাম; এখন বাজারে শবজির দামই বেশি, শবজি এখন বড়লোকদেরই খাবার। যে শবজি বেড়ে উঠত বাড়ির পেছনের ঝোপঝাড়ে অনাদরে-অবহেলায়; শহরে আমরা এখন সেই শবজিই কিনে খাচ্ছি ।

 

আমাদের পূর্বপুরুষরা ছেঁড়া কাপড় পরতেন অর্থাভাবে, এখন আমরা চড়া দামে ছেঁড়া-খোঁড়া জিন্স কিনে পরি। স্বাবলম্বনের দাপটে আমাদের মা-বাবারা বার্ধক্য কাটাচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমে, সন্তানরা শৈশব কাটাচ্ছে চাইল্ড কেয়ারে, আমরা যৌবন কাটাচ্ছি ডেস্কটপে। সময় বাঁচানোর জন্য আমরা ফোন কিনেছিলাম। পরে, দেখলাম— ফোনই আমাদের জীবনের সিংহভাগ সময় খেয়ে ফেলেছে। ফেইজবুকে শত-সহস্র বন্ধু-অনুরাগী; কিন্তু মন খুলে কথা বলার মতো এখন আমরা কাউকেই খুঁজে পাই না, মানুষ খুঁজে পেলেও কথা খুঁজে পাই না। গাঁয়ের বিঘা-বিঘা জমি বেচে শহরে এসে আমরা ফ্ল্যাট নামক সাড়ে সাতশো বর্গফুটের খোপ কিনছি।

প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত বিয়ে করব না ভেবে আমরা কেউ-কেউ ত্রিশেও বিয়ে করছি না, পঁয়ত্রিশে বা চল্লিশের পরে করছি । অথচ পূর্বপুরুষরা চল্লিশে দিব্বি নাতি-নাতনির মুখ দেখতেন। কিসের জন্য যেন অপেক্ষা করতে-করতে আমরা যৌবনেই বুড়িয়ে যাচ্ছি, আর বুড়ো বয়সে যুবকের ভূমিকায় অভিনয় করছি।; কোনোকিছুই শুরু বা শেষ করছি না যথাসময়ে। আমরা কি আমাদের পরাজয় টের পাচ্ছি?(সংক্ষেপিত)


৯



পরিবর্তনের বিরোধিতা করবেন না

 

পরিবর্তন ইতিহাসের অনিবার্য গতি। আপনি কিছুদিন তার গতিরোধ করতে পারেন, কিন্তু চিরদিন পারেন না। পরিবর্তনের বিরোধিতা করলে পরিবর্তনের ঝড়ে ও বৃষ্টিতে আপনি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবেন। পরিবর্তনের পক্ষে থাকুন। নতুন ভাবনা-চিন্তা উপেক্ষা করবেন না। একসময় যা প্রাসঙ্গিক ছিলো আজ তার প্রাসঙ্গিকতা নেই। পুরুষের সবচেয়ে ভালো এবং বোকামীর দিক হলো সে কোনোদিন পরিবর্তন হয় না।

কনফুসিয়াস বলেছিলেন— পুরুষের সবচেয়ে খারাপ এবং বোকামীর দিক হলো সে সহজে পরিবর্তন মেনে নেয় না। আর রুমি বলেছিলেন-গতকাল আমি চালাক ছিলাম তাই পুরো পৃথিবীটাকে পরিবর্তন করতে চেয়েছিলাম। আজ আমি জ্ঞানী তাই নিজেকে পরিবর্তন করছি। 


 সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করবেন না।

 

যদি আপনি খুব বলবান হন, সমালোচকদের পিটিয়ে ঠাণ্ডা করতে চাইবেন। যদি ধনবান হন, তাহলে টাকা দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করতে চাইবেন আর যদি আপনি কমজোরি হন তাহলে ধুত্তোর নিকুচি করেছে বলে কাজটা ছেড়ে দেবেন। কিন্তু কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে নিজের কানে ছিপি দেবেন। সমালোচনায় আপনার কান বন্ধ রাখুন।

কোনোমতেই সমালোচকদের কণ্ঠরুদ্ধ করবেন না। তাহলে বড় কাজ করার চ্যালেঞ্জটা নষ্ট হয়ে যাবে। পৃথিবীতে এমন কোনো দার্শনিক বা তাত্ত্বিক নেই যাদের দর্শন-তত্ত্ব সমাজ নির্বিবাদে মেনে নিয়েছে।

তবে, মাঝে মাঝে কানের কুলুপটা খুলে একবার একঝলকে শুনে নিন সমালোচকদের মোদ্দা কথাটা কি। যদি দেখেন রাবিশ তাহলে আবার কানের ছিপি বন্ধ করে যে কাজ করছিলেন দ্বিগুণ উৎসাহে তাতে লেগে পড়ুন। 


 নিজের বিপদকে সম্পদে পরিণত করতে শিখুন।

প্লেপন নামে এক চীনা ব্যবসায়ীর ১৭ বছর বয়সে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। ২০ বছর বয়সে তিনি পারিবারিক ব্যবসায়ে যখন যোগ দেন তখন ব্যবসা পড়তির মুখে। এক পয়সা লগ্নি করার মতো কোম্পানির ফান্ডে নেই। কিন্তু প্লেপন এই পড়ে যাওয়া পৈত্রিক ব্যবসাকে রমরমা করে তোলেন।

ডায়াবেটিসের রোগী বলে তার বিয়ে হচ্ছিলো না। তিনি অনেক কষ্টে চুক্তিভিত্তিক বিয়ের পাত্রী জোগাড় করেন। যে ডায়াবেটিস প্লেপনের জীবনে অভিশাপ ছিলো, তিনি ডায়াবেটিস কনট্রোলে করে শান্তিতে সাফল্যের সাথে জীবন-যাপন করছেন। তার বিশ্বাস আগামী এক দশকের মধ্যে ডায়াবেটিসের নিরাময়যোগ্য ঔষধ আবিষ্কার হবে। তথন সে সন্তান নেবে। কাজেই 'সব সময় একটা কথা মনে রাখবেন, 'রাত যত গভীর হয়, প্রভাত তত নিকটে আসে। কোন বিপদ বা সমস্যাকে ভয় পাবেন না। বিপদ বা ভয়কে সম্ভাবনা হিসেবে তৈরি করার চ্যালেঞ্জ নিন।  


অন্যকে দুঃখ দেবেন না

 

আমাদের জীবনে অর্ধেক দুঃখ আসে আমরা অপরকে দুঃখ দেই বলে। বাকি অর্ধেক দুঃখ আসে অন্যেরা আমাদের দুঃখ দিতে চায় বলে। অন্যকে দুঃখ না দিলে আমাদের অন্তত অর্ধেক দুঃখ কমে যায়।

মানবসমাজ ব্যক্তিস্বার্থের প্রশ্নে পশুকেও হার মানিয়ে দেয়। কোথাও উৎস নারী, কোথাও অর্থ। যে প্রেমিক এতদিন প্রেমের কথা শোনাতো, একদিন সে আর একজনকে পেয়ে আপনাকে নির্মমভাবে ত্যাগ করে চলে গেলো।

অথবা প্রাণের বন্ধু বিশ্বাসঘাতকতা করলো। এভাবে কাছের মানুষগুলো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আপনি অসুস্থ জেনেও আমার নিকট-আত্মীয় দেখতে এলো না। ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে কথা বললো। এভাবে মানুষ ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে। সে যেন এক জনবহুল প্লাটফর্মে একা দাঁড়িয়ে আছে। প্রাথমিক সম্পর্কগুলো একে একে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আপনি অপরকে সুখী করার আন্তরিক চেষ্টা না করলে নিজে সুখি হতে পারেন না। দেশে এখন প্রচুর বিত্তবান মানুষ আছে, কিন্তু চিত্তবান মানুষ কমছে। তাই সুখও কমছে। 


১০


নিজেকে অভ্রান্ত ভাববেন না, অন্যদের তো নয়ই।

 

যখন টাকা নেবেন, অন্যে গুনে দিলেও নিজে দুবার গুনে নেবেন। দিন বদলায়, যুগ বদলায়, সমাজও বদলায় ও নতুন সমাজ পুরনো দিনের ধ্যান-ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে অথবা নতুন দিনের ভোরে পুরনো দিনের ভাবনা-চিন্তা ভুল ছিলো বলে প্রমাণ হয়।

তাই কখনো ভাববেন না, যা ভাবছেন, যা বলছেন সেটাই শেষ কথা। অথবা আপনার গুরু বা আপনার নেতা আপনাকে যা বুঝিয়েছেন সেটাই সত্যি। আবার বিপরীতটাও সত্যি নয়। বলতে পারেন তখনকার মতো সত্যি, কিন্তু চিরকালের জন্য নয়।

পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে বহু মানুষ তাঁদের বিশ্বাসের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। প্রাণ দানটা সত্যি। কিন্তু বিশ্বাসটা সত্যি নাও হতে পারে। দুটি পরস্পরবিরোধী বিশ্বাসের পক্ষে বহু লোক থাকে। সেই বিশ্বাসের জন্য দুপক্ষের লোকই প্রাণ দেয়। বার্টান্ড রাসেলকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিলো আপনার বিশ্বাসের জন্য আপনি কি প্রাণ দিতে পারেন? রাসেল বলেছিলেন, না। আমার বিশ্বাসটা তো ভুল হতে পারে। সময়ই একমাত্র বিচার করতে পারে কোনটা ভুল, কোনটা ঠিক।  



অতিরিক্ত অর্থ আপনাকে অহংকারী ও বিচ্ছিন্ন করে তুলবে।

 

আপনি যত বিলাসবহুল জীবনযাপন করবেন তত বেশি খাদ্যদূষণে আপনার শরীর ব্যাধিতে ভরে উঠবে। দেখা দেবে নানা লাইফস্টাইল অসুখ। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ নানা মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করবে। সবচেয়ে যে ক্ষতিটা করবে, মানুষের সঙ্গে সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্ক নষ্ট করে দেবে। দৃষ্টিভঙ্গি এমনভাবে আচ্ছন্ন করবে যে মনে হবে টাকা দিয়ে আপনি সবই কিনতে পারেন। আপনার ধারণা হবে একমাত্র আপনিই এ পৃথিবীতে যোগ্যতম ব্যক্তি ।

আমি জীবনে খুব কমই মানুষ দেখেছি, যারা বিদ্বান অথচ বিনয়ী, ধনী অথচ স্থিতধী, রূপসী অথচ সরল। মনে রাখবেন আপনার বংশগতি, জন্ম মেধা রূপ এমনকি বহু ক্ষেত্রে অর্থও দৈব বশে পেয়েছেন। কিন্তু আপনার পৌরুষ, চিন্তাধারা, মূল্যবোধ, আপনার নিজস্ব অর্জন। । 

১২


কারও অভদ্র আচরণে দুঃখ পাবেন না

 

ভদ্রতা অনেকটা জন্মগত। ভদ্রলোকের ছেলেরাই সাধারণ ভদ্রলোক হয়। এটি একটি জেনেটিক উত্তরাধিকার। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ছেলে-মেয়েরা খুবই ভদ্র। রাজনীতিকদের ছেলেরা সাধারণত অভদ্র হয় কারণ রাজনীতিকদের মধ্যে খুব কম লোকই ভদ্র। পরিবেশগত কারণে ভদ্রলোকদের সংখ্যা কমছে। কারণ নিজে সুখীবোধ না করলে লোকে ভদ্র আচরণ করতে পারে না। আজকাল নানা কারণে লোকের মেজাজ খিঁচড়ে থাকে। ভেতরে ভেতরে থাকে অভাববোধ, অপারাগতাবোধ, হীনম্মন্যতা। তাই মন বিক্ষিপ্ত হলে চিত্তও হতাশগ্রস্ত ও বিষাদগ্রস্ত হয়ে থাকে।

অন্যের কাছ থেকে ভদ্র ব্যবহার চাইলে নিজে ভদ্র ব্যবহার করুন। অন্যের অভদ্রতার দ্বারা প্রভাবিত হবেন না। আপনি নিজে ভদ্র না হলে অন্যের কাছ থেকে ভদ্র ব্যবহার দাবি করতে পারেন না। ভদ্র হতে গেলে রাগ ক্ষোভ দমন করুন। হেসে কথা বলুন। একশো জনের মধ্যে একজন ভদ্রলোক দেখতে পেলে তাকে সম্মান করুন। 

১৩


সমাজতন্ত্র কি একটা ইউটোপিয়া?


জারের সময় রাশিয়ায় লেখকদের স্বাধীনতা ছিল না। সাইব্রেরিয়ার কারাগার জারের সময় নরক ছিল। দস্তয়ভস্কি সেখানে জেল খেটে এসে জেল স্মৃতি নিয়ে বই লিখলেন। জার সে বই পড়ে কাঁদলেন। সাইব্রেরিয়ার কুখ্যাত জেলখানা জার বন্ধ করলেন। ১৯১৭ সালে লেনিন রাশিয়াতে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লব করে জারের রাশিয়া দখল করে নিলো। কমিউনিস্ট আমলে সে জেলখানা আবার চালু হলো। লেনিনের কমিউনিস্ট রাশিয়ায় কত লেখক জেলে পঁচল, মরে গেলো; দেশ ছেড়ে পালালো। স্তালিন হিটলারের সঙ্গে মিলে পোল্যান্ড দখল করে নিলো। শুরু হলো শ্রমিক শ্রেণীর সাম্রাজ্যবাদ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিকে আমেরিকা রাশিয়া ভাগাভাগি করে নিলো। পশ্চিম জার্মানি আমেরিকার মত পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক হলো। পূর্ব জার্মানি সোভিয়েত রাশিয়ার মত কমিউনিস্ট হলো। দুই জার্মানি হলো দু রকম। পশ্চিম জার্মানি ধনী। খাদ্য চাকরি কোন কিছুর অভাব নেই। পূর্ব জার্মানিতে কিছুই ছিল না কমিউনিজম ছাড়া। পূর্ব জার্মানি একদিন ইতিহাস খ্যাত বার্লিন দেয়াল ভেঙে ফেলল। 

 

অর্থনৈতিকভাবে কারো ওপর নির্ভরশীল হবেন না।

ছেলে-মেয়েরা একটু বড় হলেই তাদের বলে দিন বাবা-মা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব তোমাদের সাধ্যমত লেখাপড়া শেখানো। তারপর তোমরা আমার ওপর আর্থিকভাবে নির্ভর করো না। আমরাও বৃদ্ধ বয়সে তোমাদের ওপর নির্ভর করবো না।

যতক্ষণ ছেলে-মেয়েরা জানবে আমাদের পিছনে বিত্তশালী বাবা আছে, ততদিন ছেলে-মেয়েরা স্বাবলম্বী হবে না। যুদ্ধে সৈনিকদের মনোবল বাড়াবার শেষ উপায় আপনাদের জাহাজটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া। তখন আর সৈন্যদের যুদ্ধ করা ছাড়া উপায় থাকে না। বৃদ্ধ বয়সে সম্পদ খুইয়ে ছেলে-মেয়েদের পিছনে খরচ করবেন না। বৃদ্ধ বয়সে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পদে পদে যন্ত্রণা।

১৪


সাফল্যের জন্য আত্মহারা হবেন না।

ব্যর্থতার জন্যও খুব বেশি ভেঙে পড়বেন না। সাফল্য এলে দায়িত্ব বেড়ে যায়। লোকের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। লোকে অকারণে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে ওঠে। তাই সফল লোকের ওপর সাফল্য ধরে রাখার জন্য চাপ বাড়ে। এই চাপ থেকে সাফল্যকে ধরে রাখার জন্য হয় সে সাধ্যাতিরিক্ত পরিশ্রম করে, নয় তো আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। সফল ব্যক্তির শত্রুর সংখ্যা বাড়ে। কার্যসিদ্ধির জন্য বন্ধুর ছদ্মবেশে প্রচুর স্বার্থপরায়ণ লোক এসে তাকে কুপরামর্শ দেয়। সেই হিতৈষীদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য সে অনেক সময় অন্যায় ও অসঙ্গত কাজ করে। সে আরো সাফল্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করার চেষ্টা করে না। ফলে আবার ব্যর্থতা আসে। হতাশা। হতাশা থেকে ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশন সমস্ত কর্মপ্রচেষ্টা বন্ধ করে দেয়। 

সাফল্য আপনাকে বসিয়ে দেয়। আপনাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করে। কিন্তু ব্যর্থতাই আপনার চালিকাশক্তি। সে আপনাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। আমি জীবনে বারবার ব্যর্থ হয়েছি বলেই বারবার নতুন অভিজ্ঞতার সামনাসামনি হতে পেরেছি।

========

বাড়িতেও আদবকায়দা অনুশীলন করা দরকার, বেশিরভাগ লোকই এটা এড়িয়ে চলে। বাচ্ছাদেরও অল্প বয়সে সৌজন্যবোধ শিক্ষা দেওয়া উচিত, একবার শিখলে তা সারা জীবন থাকবে। স্মরণ রাখা দরকার, ভদ্র ব্যবহার অন্যকেও ভদ্র ব্যবহারে অনুপ্রাণিত করে। সেজন্য ভদ্র ব্যবহার অনুশীলন করা দরকার। অন্য কেউ আপনার সাথে যত অভদ্র আচরণ করুক না কেন আপনি ভদ্র ব্যবহারের মাধ্যমে এই জঘন্য রুচিকে প্রতিহত করুন।

১৫


  আপনি কি হেরে যাচ্ছেন কিছু মানুষের সমালোচনার তোপে?

কিছু মানুষ কি আপনার সব কিছুকেই নেগিটিভলি নিচ্ছে এবং আপনার মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে অযথাই? আসুন জেনে নিই কেমন করে জীবনে তাদের সহ্য করবেন ?

# নির্লিপ্ত থাকুনঃ যখন কেউ আপনার স¤পর্কে নেতিবাচক কথা বলবে সবসময় তখন পাল্টা জবাব না দিয়ে নির্লিপ্ত থাকুন। ঠিক তার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসুন। সে নিজেই লজ্জা পেয়ে যাবে আপনার নির্লিপ্ততায়।

# প্রশংসা করুনঃ তার ব্যক্তিগত জীবনের ছোট ছোট অর্জনগুলোর প্রশংসা করুন। দেখবেন সে দ্বিধাবোধ করছে পরের বার আপনার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করতে ।

#  সঠিক সময়ে না বলতে শিখুন। কোন আড্ডায় আপনাকে ছোট করা হচ্ছে? খুব শান্ত স্বরে বলুন "আমরা কি ভিন্ন কোনো বিষয়ে কথা বলতে পারি?  নয়তো আমার এখন চলে যাওয়া উচিত"।

মোট কথাঃ আপনি যখন অন্যের ব্যাপারে নেতিবাচক কথা শুনতে অনাগ্রহ প্রকাশ করবেন। তখন আপনার বন্ধুটিও আপনার ব্যপারে নেতিবাচক কথপোকথনে প্রতিবাদ করবে। এভাবেই গড়ে তুলতে হবে একটি সভ্য সমাজ।


১৬


ব্রিটিশ নাট্যকার ইসরাইল জাংউইল-এর "দ্য মেন্টিং পট'

 

১৯০৮ সালে একটি মঞ্চনাটক বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। দ্য মেন্টিং পট নামের এ নাটকে মূলত অভিবাসী সম্প্রদায়গুলোর একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে একটি নতুন জাতির উদ্ভবের কাহিনী বলা হয়। মেন্টিং পটে বিভিন্ন ধরনের ধাতুকে একত্রে রাখা হয় এবং তারপর উত্তপ্ত করে গলানো হয়। এই উত্তাপে প্রতিটি ধাতু তার নিজস্ব গঠনতন্ত্র হারিয়ে ফেলে এবং অন্য ধাতৃগুলোর সঙ্গে মিশে একক, সমন্বিত ধাতু তৈরি করে। এতে প্রতিটি ধাতুর বৈশিষ্ট্য এবং রং আলাদা থাকলেও গলিত সবগুলো ধাতু মিশে গিয়ে একটি একক পদার্থে পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রেও তেমন ব্যাপারটি ঘটেছে। সেখানে বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি এবং ধর্মের মানুষ একত্রে মিশে একটি অভিন্ন সামাজিক পরিচয় তৈরি করেছে।

মেন্টিং পটের মাধ্যমে একটি বহুমুখী, সহনশীল এবং সংহত সমাজ গড়ে ওঠে যেখানে সকল সংস্কৃতি মিলেমিশে একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের জন্ম হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এমনিভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষজন একত্রে মিলিত হয়ে একটি বৃহত্তর সংস্কৃতির সৃষ্ট করেছে। এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র দেশটাকে চিন্তার নতুন দিগন্তে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে। সমাজে মুক্তভাবে মতামত বিনিময়ের সুযোগ থাকায় নতুন আইডিয়া এবং উদ্ভাবনের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং শিল্পকলায় বিপ্লব ঘটিয়েছে। এই জন্যই যুক্তরাষ্ট্র সকলের কাছে এখনো স্বপ্ন পূরণের দেশ হিসেবে পরিচিত৷

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনকে (১৭৮৯-১৭৯৭) কোনো রাজনৈতিক দলে যোগদান করেননি এবং দলগত রাজনীতিকে তিনি ক্ষতিকর বলে মনে করতেন ৷ তিনি মনে করতেন, রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থকে সামনে রেখে কাজ করে, যা গণমানুষের উন্নতি, দেশের স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য ক্ষতিকর। 

১৭


স্ফুলিঙ্গ এক জায়গা থেকে শুরু হয় কিন্তু ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র

 

সত্তরের দশকের আগে মহিলাদের গৃহবন্দী করে রাখত আমাদের সমাজ। খাওয়া পরার জন্য রীতিমতো হাত পাততে হত স্বামী, বাবা অথবা সন্তানের কাছে। পুরুষ মানুষের মূল্য বুঝাতে লোকে বলতো সোনার আংটি বাঁকা হলেও দাম কমে না। আর নারীর মূল্য বুঝাতে লোকে বলত: মেয়ের নাম ফেলি; পরে নিলেও গেলি, যমে নিলেও গেলি। অর্থাৎ কোনরকম ফেলতে পারলেই বাঁচে। মেয়েদের উপনাম ছিল তিনটা- আপদ, বিপদ ও মুসিবত।

১৯৫৯ সালে ভারতে ৭জন গুজরাটি গৃহবধূ ঘরের মধ্যে থেকেই স্বাবলম্বী হয়ে নিজেদের স্বাধীন করতে স্বপ্ন দেখলেন। যশয়ন্তী, পার্বতী, উজাম, ভানু, লাগু, দিওয়ালী ও জয়াবেন নামের সাত গৃহবধূ তৎকালীন ৮০ টাকা (বর্তমান প্রায় ১০,০০০) ঋণ করে পাপড়ের ব্যবসায় নামেন।

তাদের উদ্যোগ ছিল এমন একটি ব্যবসা, যেটা ঘরের মধ্যেই তৈরি করা যায়, ঘরের বাইরে বেরোতে হবে না। প্রথমে মাত্র চার প্যাকেট পাঁপড় তারপর আস্তে আস্তে ব্যবসা বাড়ে। কিন্তু তারা কর্মচারী নিয়োগ করেননি বরং অন্যান্য পরিবার থেকে যুক্ত হওয়া মহিলাদের পার্টনারশিপ নিয়েছিলেন। নাম দিলেন "লিজ্জত পাঁপড় ", ভারতে লিজ্জতের বর্তমান রেভেনিউ ১৬০০ কোটি, লিজ্জত পরিবার ৪৫০০০! তারা হাজার হাজার নারীকে সাবলম্বী করেছেন! ২০২১ সালে ভারত সরকারের পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত করা হয় শ্রীমতী যশয়ন্তীকে।

মোট কথা হল: আপনি যা-ই করেন, তা যদি সংঘবদ্ধভাবে করতে পারেন, তাহলে জয় সুনিশ্চিত হয়। সুতরাং যেকোনো ক্লাব, ফোরাম, সংঘ বা দলের সাথে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে হলেও সঙ্গে থাকুন,সঙ্গবদ্ধ থাকুন। সংগৃহীত।


১৮


 নিজেকে প্রতিপক্ষের যায়গায় কল্পনা করুন

 

কখনো কি না ভেবে কথা বলে কিংবা অতিরিক্ত রেগে গিয়ে পরে অপরাধবোধ হয়েছে আপনার? আপনি নিশ্চয় দেখে থাকবেন, চারপাশে মানুষ চিৎকার করে কলহ করছে, এমনকি কোনো কর্মী বসের সঙ্গে ঝগড়া করে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। একটি সফল বৈবাহিক সম্পর্ক, ক্যারিয়ার, এমনকি ব্যাবসায়িক সম্পর্কও উত্তেজনার কারণে নষ্ট হতে পারে। তাই সাফল্যময় পরিপূর্ণ একটি জীবন পাওয়ার জন্য আপনাকে অবশ্যই অন্য কাউকে মনঃক্ষুণ্ন করে এমন কথা বলা, বা সমালোচনা কিংবা তর্ক-বিতর্ক অথবা কাজ করা বন্ধ করতে হবে। নিতান্তই কারো সঙ্গে যদি রেগে যান’ তাহলে ধীরস্থির হয়ে তাকে বোঝান ব্যাপারটা এবং বিনয়ের সঙ্গে সরি বলে ক্ষমা চেয়ে নিন। তার জায়গায় নিজেকে চিন্তা করুন। এমনটি করতে পারলে আপনি কদাচিৎ নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারাবেন।

প্রথমে আপনি যেমন ইচ্ছা তেমন ব্যবহার করে ফেললেন এবং পরবর্তীতে কষ্ট পেলেন, এমন করা বন্ধ করুন। প্রচণ্ড রাগ, হিংসা কিংবা দুঃখ পেলে অন্য কারো সঙ্গে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়ুন এবং নিস্তব্ধ থাকুন। অন্য কেউ যদি আপনার থেকে কিছু শোনার আগ্রহ পোষণ করে, তবে তাকে বলুন ‘আমাকে ভাবার জন্য একটু সময় দিন’। 


১৯


শিক্ষার্থী হোন,  তা না হলে আপনি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না।

শেখা এবং সাফল্য লাভ ব্যাপার দুটো অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। ‘মানুষের শেখা কখনো শেষ হয় না। এটি একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া’। জীবনের কোন কোন পর্যায়ে আপনার শিক্ষাগ্রহণ জরুরি। আমাদের জীবন একটি বিশ্ববিদ্যালয়। আপনি যা-ই করেন কিংবা যে-ই অভিজ্ঞতা হোক না কেন আপনার, আপনি কিছু একটা শিখবেন। এটিই আমাদের জীবন। প্রতিদিনই আপনি নতুন চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি এবং মনোবল সঞ্চার করবেন।

প্রতিদিন নিত্যনতুন জিনিস শেখাও কিন্তু এক ধরনের সাফল্য। আপনার জ্ঞানকে প্রসারিত করার জন্য  শেখার জন্য হাত বাড়িয়ে দিন। বিরক্তিকর কোনো কাজ থেকেই আনন্দময় কিছু নেওয়ার চেষ্টা করুন।

আপনাকে নতুন নতুন জিনিস শিখতেই হবে, তা না হলে আপনি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না।

প্রতিদিন শেষে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, ‘আজ আমি কী শিখলাম? জীবনে সফলতা অর্জন করার জন্য আমাকে আর কী কী করতে হবে?। কখনো আপনার উত্তরগুলো হবে ¯পষ্ট, আবার কখনো হবে অ¯পষ্ট। কিন্তু নিয়মিত প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করলে আপনি নিজেকে আরো ভালো করে বুঝতে ও জানতে পারবেন। মাঝে মাঝে আবার এমন হবে যখন আপনার দিন পুরোটাই বৃথা যাবে। এমন দিনগুলো থেকেও কিছু শেখার চেষ্টা করুন। মুহূর্তগুলোকে কাজে লাগান।

২০

কথায় আছে, নিজে চেষ্টা না করলে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও কাউকে  সহযোগিতা করেন না।

সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্ম বুঁদ হয়ে আছে আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন গ্যাজেটের মধ্যে। তারা ভিডিও গেম কিংবা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকে। অথচ নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করবার বিনিময়ে তারা বেকার অবস্থা হতে উত্তরণের নূতন কোনো প্রচেষ্টায় বা কোয়ালিটি টাইম দিতে ইচ্ছুক নয়।

সত্যি কথা বলতে আমাদের তরুণ প্রজন্ম সারা রাত ধরে অনলাইনে থাকে, সারা সকাল ঘুমায়। এরা সূর্যোদয় দেখে না, সূর্যাস্ত দেখে না। সূর্যোদয়ে বিছানায় থাকে, সূর্যাস্তে মোবাইলে থাকে। এরা ফার্স্টফুডে আসক্ত। এরা আউটডোর খেলা পছন্দ করে না। ইনডোরে স্বস্তি পায়। এক অস্থির জেনারেশন তৈরি করছি আমরা। এদের স্পেসিফিক কোনো লক্ষ্য নাই। আদর্শিক কোনো এমবিশান নাই। এরা বই পড়ে না, নিউজপেপার পড়ে না। এরা হাঁটতে পছন্দ করে না। আধা কিলোমিটার গন্তব্যে যেতে আধা ঘন্টা রিক্সার জন্য অপেক্ষা করে। এরা অনর্থক তর্ক জুড়ে দেবে। এদের নেই বিনয়, নেই কৃতজ্ঞতাবোধ। এদের উদ্ধত আচরণে আপনি ভয়ে কুকড়ে যাবেন।

তাদের বুঁদ হয়ে থাকার আর একটা বিষয় হচ্ছে ক্রিকেট খেলা। ইউরোপে ইংল্যান্ড বাদে বাকি দেশগুলোর মানুষ ক্রিকেট কী, সেটা জানেই না। যে নেদারল্যান্ডস দল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রিকেট খেলে, তাদের দেশের নারীরা বলছিলেন, ক্রিকেট একধরনের পোকা। আমেরিকায় বেস বল, ভলিবল—এসবের দাপট দেখার মত। বেশিরভাগ আমেরিকান ক্রিকেট-নামে নামে একটি খেলা আছে, তা জানে না। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের দেশে জ্ঞানবিজ্ঞান, আর্ট-কালচার সব ছাপিয়ে এই ক্রিকেটাররা হয়ে গেলেন জাতীয় হিরো। এদের ফলোয়ার অনুগামীর সংখ্যা লাখে লাখে। একসময় ফুটবল ছিল আকাশ সমান জনপ্রিয় খেলা। ধীরে ধীরে সে খেলা ইতিহাসে ঠাঁই নিতে চলেছে। সত্যি কথা বলতে কি, সনাতন সমাজব্যবস্থা হতে আমরা আধুনিক সমাজব্যবস্থায় পদার্পণ করেছি বটে; কিন্তু মডার্ন সোসাইটির রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন আমরা ফলো করি না।

২১

মানসম্পন্ন ও যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা

জ্ঞান বিনির্মাণের কাঁচামাল হলো তথ্য। তথ্য থেকে সৃষ্টি হয় জ্ঞান; জ্ঞান পরিচর্যায় আসে প্রজ্ঞা এবং প্রজ্ঞাবানের কর্মের ফসল হলো সৃজনশীলতা।

মুসলিম শাসকদের স্বর্ণযুগে নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে মধ্য এশিয়া, ইরান, স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে ও উত্তর আফ্রিকার কিছু দেশে জ্ঞানচর্চার জোয়ার এসেছিল। এরই সূত্র ধরে ইউরোপের রেনেসাসে তা পরিপূর্ণতা পায়। এ সময় জ্ঞানচর্চার সূত্র ধরেই পশ্চিমে উচ্চতর গবেষণা ও পঠনপাঠনের সহায়ক নানা প্রতিষ্ঠান যেমন গড়ে উঠেছিল, তেমনি আবিষ্কৃত হয়েছিল জ্ঞানচর্চার উপযোগী সহায়ক অনেক যন্ত্রপাতি। আড়াই শ বছর আগে ইংরেজদের মাধ্যমে রেনেসাঁ-পরবর্তী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে আমাদের সংযোগ ঘটতে শুরু করে।

বর্তমানে বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে বরাবরই ভালো করছে স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলো। এবারো শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে সুইজারল্যান্ড। দ্বিতীয় অবস্থানে সুইডেন। তৃতীয় অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম পাঁচে আছে স্ক্যান্ডিনেভীয় আরো দুটি দেশ: ফিনল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস। এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো করেছে সিঙ্গাপুর। দেশটির বৈশ্বিক অবস্থান ষষ্ঠ। ভালো অবস্থানে আছে ইসরায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও চীন।

মূলত প্রশিক্ষণ ও গবেষণার পর্যাপ্ত সুবিধা, মানসম্পন্ন ও যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা দেশগুলোকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রেখেছে।বৈশ্বিক দৃশ্যপটে সবকিছু দ্রুত বদলে যাচ্ছে, এই দেশগুলো দ্রুততার সাথে প্রবেশ করছে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে। দুর্বল মানবসম্পদ দিয়ে আমরা ওই প্রতিযোগিতায় পেরে উঠব না। কাজেই মানবসম্পদের উত্পাদনশীলতা ও দক্ষতা অনেক বাড়াতে হবে।

ইউনেস্কোর মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষা খাতে ন্যূনতম জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে  বাংলাদেশ ব্যয় করে ২ শতাংশেরও কম। এমনকি তা আফ্রিকার দক্ষিণ সুদান, নাইজেরিয়া ও সোমালিয়ার মতো দারিদ্র্য ও সংকটপীড়িত দেশের চেয়েও কম। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের মাধ্যমে উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্র কিভাবে গড়ে তোলা যায় তার কোনো জাতীয় নীতিমালা এখন পর্যন্ত আমাদের তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রক্রিয়া প্রকৃত সমাজসংস্কারকের অভাবে গড়ে উঠছে না। এর প্রধান কারণ হলো, মানুষ এখন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার চেয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

জ্ঞান আহরণের অনেক বিকল্প বের হলেও শিক্ষকরা জ্ঞান বিতরণের চেয়ে জ্ঞান বাণিজ্যিকীকরণের বিষয়টি প্রাধান্য দিচ্ছে।

শিক্ষার গুণগত মান যত শক্তিশালী হবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের ভিত্তি তত দৃঢ় হবে।  তিন রকম মানুষ সামাজিক জীবনে পরিবর্তন আনতে পারেন। তাঁরা হলেন- পিতা, মাতা ও শিক্ষক।’

================

সক্রেটিস বলেছেন, তোমার যা আছে তা নিয়ে তুমি যদি সুখী না হও, তবে যা তুমি পেতে চাও তা নিয়ে সুখী হবে না। প্লেটোর মতে, সুখ, প্রকৃতি, সৌন্দর্য ও সমাজ পরস্পর সম্পর্কিত। সুখী হওয়ার অর্থ একজন প্রতিদিন প্রতিক্ষণ নির্মল আনন্দ ও প্রফুল্লতা উপভোগ করবেন—এই ধারণাও সঠিক নয়। সুখী হওয়ার পন্থা একেক জনের কাছে একেক রকম হলেও সুখী থাকার ব্যাপারে কতগুলো সাধারণ বিষয়ে সবাই একমত প্রকাশ করেছেন—কৃতজ্ঞতা ও মননশীলতার চর্চা করা, মানসিকতার উন্নয়ন করা, নিজের পছন্দসই বা শখের কাজে যুক্ত থাকা, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো, চ্যালেঞ্জকে আলিঙ্গন করা, মানবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া এবং অন্যের প্রতি দয়ালু হওয়া ও সাহায্য করা, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককে প্রতিপালন দ্বারা সামাজিক বন্ধন জোরদার করা, পর্যাপ্ত ঘুম, ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে নিজের প্রতি যত্নশীল থাকা, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করা, স্ব-আলাপে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা ইত্যাদি। তবে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং বৃহত্তর কিছুর অংশ হওয়ার বোধ থেকেই আসে স্থায়ী সুখ।


২২


কমফোর্ট জোন কী। কেন মানুষ আটে আটকায়?

একটি সুপরিচিত কথা রয়েছে—‘আপনি যদি আপনার আরামের অঞ্চল থেকে বেরিয়ে না যান তবে আপনি সবসময় একই জায়গায় আটকে থাকবেন।’ পাশাপাশি একটি জনপ্রিয় গল্প আছেঃ একবার একটি এরোপ্লেন তার পাশে থাকা একটি রকেটকে জিজ্ঞাসা করল- রকেটভাই, তুমি এত দ্রুত গতিতে কিভাবে উড়ে যাও বলতো? তখন রকেট বলে, আমার মত পাছায় আগুন ধরিয়ে দিলে তুমিও আবার মত দ্রুত যেতে পারবে। অর্থাৎ চাপে ও তাপে সবকিছুর অবস্থান পরিবর্তন হয়। লক্ষ কোটি বছরের চাপে ডায়মন্ড এবং গোল্ড তৈরি হয়েছে। জীবনে যে যত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে, সে তত সফল মানুষ। আর চ্যালেঞ্জ বাদ দিয়ে যে বা যারা কমফোর্ট জোনে পড়ে থাকে; তারা সব দিক থেকে ব্যর্থ মানুষ।

কমফোর্ট জোন হলো সেই আরামদায়ক জায়গা যেখানে মানুষ নিজের রুটিনমত কাজ নিরাপদে করতে পারেন। সাধারণত মানুষ আটে আটকায়। অর্থাৎ সে যা কিছু করে, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-অফিস, বিয়ে সাদি সবকিছু ৮ কিলোমিটার জায়গার মধ্যেই করে। যারা এই ৮কে অতিক্রম করতে পারেন, তারাই নেতা হিসেবে গড়ে উঠে।

সর্বদা মনে রাখবেন, জীবনের চ্যালেঞ্জগুলি জেতার জন্য একটি বৃহত্তর ক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করা ভীষণ জরুরি, আর তা হলো ‘ভয়’। এটি প্রায়শই আমাদেরকে কমফোর্ট জোন বা আরামের অঞ্চলের বাইরে যেতে বাধা দেয়।  অথচ নিজের উন্নতির জন্য এই কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই। এটি এমন একটি যাত্রা, যার জন্য সাহস, দৃঢ়তা এবং পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করা জরুরি হয়ে পড়ে।

ঠান্ডা বরফের মধ্যে পর্যাপ্ত গম উৎপাদন করতে না পেরে পশ্চিমারা না খেয়ে মরতে বসেছিল। ফলে বাধ্য হয়ে পালতোলা জাহাজে করে অজানা উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয় এবং আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি আবিস্কার করে। তারা ইউরোপের বরফের স্তুপ থেকে বের না হলে ডাইনোসরদের মত বিলুপ্ত হয়ে যেত।  কাজেই আপনার উন্নতি তখনই ঘটবে, যখন আরাম বা কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে অজানায় পা রাখতে পারবেন।


২৩


ইবন বতুতার মালদ্বীপ সফর (১৩৪৩–১৩৪৪): উপনিবেশ-পূর্ব এক সমুদ্র-বাণিজ্যের জানালা


১৩৪৩ সালে বিখ্যাত মরক্কোর ভ্রমণকারী ইবন বতুতা মালদ্বীপে পৌঁছান। তখন মালদ্বীপ ছিল একটি বিস্তীর্ণ ইসলামী সুলতানাত, যা প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত- মিনিকয় (মালিকু) থেকে শুরু করে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত।


তার বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি রিহলা-তে তিনি যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা আমাদের সামনে তুলে ধরে এক প্রাণবন্ত সামুদ্রিক সমাজের ছবি- যা ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য নেটওয়ার্কের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।


সে সময় মালদ্বীপ ছিল অ্যাম্বারগ্রিস (“ভাসমান সোনা”), কোকো-দে-মেয়ার, কাউড়ি শাঁস, নারিকেলের আঁশ (coir), এবং শুকনো মাছের বড় রপ্তানিকারক। এই পণ্যগুলো দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকা- এমনকি পরোক্ষভাবে পশ্চিম আফ্রিকার মালির সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল।


১৪শ শতকের মালদ্বীপ: ইউরোপীয় প্রভাবের আগের এক স্বাধীন জগৎ


ইবন বতুতার আগমনের সময় মালদ্বীপ ছিল একটি স্বাধীন ইসলামী সুলতানাত। ১১৫৩ সালে আরব ব্যবসায়ীদের প্রভাবে এখানকার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।


এই সময়টা ছিল ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের আগের যুগ—পর্তুগিজরা ভারত মহাসাগরে আসে আরও প্রায় দেড়শ বছর পরে। ফলে মালদ্বীপ তখন পুরোপুরি নিজস্ব সামুদ্রিক শক্তি ও কৌশলের উপর নির্ভর করে বাণিজ্য চালাত।


এই সময় মালদ্বীপ তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে পুরো ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। বিশেষ করে কড়ি (cowrie shells) ছিল এর প্রধান রপ্তানি পণ্য—যা বাংলা অঞ্চল থেকে শুরু করে পশ্চিম আফ্রিকা পর্যন্ত মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো।


কড়ির রাজত্ব: মালদ্বীপের অর্থনৈতিক শক্তি


ইবনে বতুতার বর্ণনায় মালদ্বীপের অর্থনীতি মূলত নির্ভর করত কড়ি রপ্তানির ওপর। এই ছোট খোসাগুলো ছিল সেই সময়ের এক ধরনের বৈশ্বিক মুদ্রা।


মালদ্বীপের নাবিকরা দক্ষতার সঙ্গে সমুদ্রপথে চলাচল করত এবং মৌসুমি বায়ু ব্যবহার করে তারা বাণিজ্য চালাত দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব আফ্রিকার সঙ্গে। কড়ির বড় চালান যেত বাংলায়, আবার পূর্ব আফ্রিকার বন্দর—মোগাদিশু, জানজিবার, কিলওয়াতেও পৌঁছাত।


শুধু অর্থনৈতিক পণ্য হিসেবেই নয়, কড়ি ছিল মালদ্বীপের বৈশ্বিক প্রভাবের প্রতীক।


সুলতানা খাদিজার সময়:


ইবনে বতুতার আগমনের সময় শাসন করছিলেন সুলতান আহমদ শিহাবুদ্দিন। তার কিছুদিন পর ক্ষমতায় আসেন সুলতানা খাদিজা (১৩৪৭–১৩৮০), যিনি দীর্ঘ সময় ধরে শাসন করেন।


যদিও ইবনে বতুতা সরাসরি তার শাসনের বর্ণনা দেননি, তবে তিনি যে সমৃদ্ধ মালদ্বীপের কথা বলেছেন—তা খাদিজার আমলেও বজায় ছিল। তার শাসনে বাণিজ্য, বিশেষ করে কড়ি ও অ্যাম্বারগ্রিস রপ্তানি, আরও সুসংহত হয়।


পূর্ব আফ্রিকার সঙ্গে সংযোগ:


মালদ্বীপের বাণিজ্য নেটওয়ার্ক বিস্তৃত ছিল পূর্ব আফ্রিকার উপকূল পর্যন্ত। মোগাদিশু, জানজিবার ও কিলওয়া—এসব বন্দর ছিল কড়ির বড় বাজার।


সোয়াহিলি ব্যবসায়ীরা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করত। তারা মালদ্বীপ থেকে কড়ি নিয়ে আফ্রিকার ভেতরে ছড়িয়ে দিত, এমনকি সাহারা পেরিয়ে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত।


মালি সাম্রাজ্য পর্যন্ত কড়ির যাত্রা


ইবনে বতুতা উল্লেখ করেন যে এই কড়ি পৌঁছাত “কালোদের দেশ”-এ—যা মূলত মালি সাম্রাজ্যের ইঙ্গিত। টিম্বাকটু ও গাও-এর মতো শহরে কড়ি ছিল গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা।


মালি সম্রাট মানসা মুসার (১৩১২–১৩৩৭) বিখ্যাত হজযাত্রা এই বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে। তার ফলে উত্তর আফ্রিকা হয়ে কড়ি পৌঁছে যেত পশ্চিম আফ্রিকার বাজারে।


এক বিস্মৃত বৈশ্বিক সংযোগ:


১৩৫২–১৩৫৩ সালে ইবনে বতুতা যখন মালি ভ্রমণ করেন, তখন তিনি টিম্বাকটুর ব্যস্ত বাজারের কথা লিখেছেন—যেখানে কড়ি, স্বর্ণ ও লবণ একসঙ্গে লেনদেন হতো।


এই পুরো বাণিজ্য নেটওয়ার্ক—মালদ্বীপ থেকে পূর্ব আফ্রিকা, সেখান থেকে সাহারা পেরিয়ে পশ্চিম আফ্রিকা—প্রমাণ করে যে মধ্যযুগেই পৃথিবী কতটা সংযুক্ত ছিল।


সংক্ষেপে:


ইবনে বতুতার মালদ্বীপ ভ্রমণ আমাদের দেখায় এক শক্তিশালী, স্বয়ংসম্পূর্ণ সামুদ্রিক সভ্যতা—যা ইউরোপীয় উপনিবেশের আগেই ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল।


কড়ির মতো একটি ছোট জিনিস কীভাবে বাংলা থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত অর্থনীতিকে যুক্ত করেছিল- এই ইতিহাস তারই প্রমাণ।


সেই সময় মালদ্বীপ বৈশ্বিক বাণিজ্য-সেতু হয়ে উঠেছিল- যার প্রভাব পৌঁছেছিল টিম্বাকটুর বাজার পর্যন্ত। 

@ boikal


২৪


মেক্সিকো ট্যাকো 

রনের সবজি কিংবা শিম। এরপর তার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয় কুচানো পেঁয়াজ, ধনেপাতা, সালসা এবং লেবুর রস।


মেক্সিকোতে ট্যাকো সাধারণত ছোট আকারের হয়। একটি ট্যাকোকে পূর্ণাঙ্গ খাবার হিসেবে ধরা হয় না; একজন মানুষ একসঙ্গে তিন থেকে পাঁচটি ট্যাকো খেয়ে থাকেন।


ট্যাকোর জন্ম: স্প্যানিশদেরও বহু আগে


ট্যাকোর ইতিহাস শুরু হয় স্প্যানিশদের মেক্সিকো বিজয়েরও বহু শতাব্দী আগে।


অ্যাজটেক, মায়া এবং মধ্য আমেরিকার অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভুট্টা। তারা ভুট্টাকে বিশেষ একটি প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করে ময়দা বানাতেন, যাকে আজ নিক্সটামালাইজেশন (Nixtamalization) বলা হয়। এরপর সেই ময়দা দিয়ে তৈরি হতো পাতলা গোলাকার রুটি—টর্টিলা।


এই টর্টিলাই ছিল একসঙ্গে প্লেট, চামচ এবং খাবারের অংশ। মাছ, টার্কি, হরিণের মাংস, শিম কিংবা অন্যান্য রান্না করা খাবার টর্টিলার ওপর রেখে ভাঁজ করে খাওয়া হতো। আধুনিক ট্যাকোর মূল ধারণার জন্ম সেখানেই।


অর্থাৎ, ট্যাকোর ইতিহাস প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো বলে অনেক গবেষক মনে করেন।


"ট্যাকো" নামটি কোথা থেকে এল?


ট্যাকো নামটির উৎপত্তি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে পুরোপুরি ঐকমত্য নেই।


সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, উনবিংশ শতকে মেক্সিকোর রূপার খনিতে শ্রমিকরা কাগজে মোড়ানো ছোট বিস্ফোরক প্যাকেটকে "ট্যাকো" বলতেন। পরে একই রকম ভাঁজ করা খাবারের ক্ষেত্রেও শব্দটি ব্যবহার হতে শুরু করে।


আরেকটি মত অনুযায়ী, স্প্যানিশ ভাষায় "taco" শব্দটি আগে থেকেই ছোট গোঁজ, প্লাগ বা ভাঁজ করা কোনো জিনিস বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। খাবারটির আকৃতির সঙ্গে মিল থাকায় সেই নামই জনপ্রিয় হয়ে যায়।


যদিও শব্দটির উৎস নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে উনবিংশ শতকের শেষ দিক থেকেই "ট্যাকো" নামটি মেক্সিকোজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠে।


মেক্সিকোর সংস্কৃতিতে ট্যাকোর স্থান


মেক্সিকোতে ট্যাকো শুধু একটি খাবার নয়; এটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ।


ভোরবেলার নাশতা থেকে শুরু করে গভীর রাতের খাবার—যেকোনো সময় ট্যাকো খাওয়া যায়। অফিসফেরত কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, নির্মাণশ্রমিক কিংবা পর্যটক—সবাই একই টাকেরিয়ায় (ট্যাকোর দোকান) দাঁড়িয়ে ট্যাকো খেতে দেখা যায়।


মেক্সিকোর প্রায় প্রতিটি শহর, এমনকি ছোট ছোট গ্রামেও রাস্তার ধারে অসংখ্য ট্যাকো বিক্রেতা রয়েছে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এসব দোকানে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, উৎসব কিংবা খেলাধুলার পরেও ট্যাকো একটি জনপ্রিয় পছন্দ।


এ কারণেই অনেক নৃতত্ত্ববিদ ট্যাকোকে শুধু একটি খাবার নয়, বরং মেক্সিকান সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন।


এক দেশ, অসংখ্য ট্যাকো


মেক্সিকো একটি বিশাল দেশ। ফলে অঞ্চলভেদে ট্যাকোর ধরনও বদলে যায়।


উত্তরে গরুর মাংসের কার্নে আসাদা জনপ্রিয়, মধ্য মেক্সিকোতে আল পাস্তর সবচেয়ে পরিচিত, পশ্চিমে বিরিয়া, আর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের বাহা ক্যালিফোর্নিয়া অঞ্চলে মাছের ট্যাকো বিশেষভাবে জনপ্রিয়।


আল পাস্তরের ইতিহাস আবার অভিবাসনের স্মৃতিও মনে করিয়ে দেয়। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে লেবানন থেকে আসা অভিবাসীরা শাওয়ারমার মতো উল্লম্ব স্পিটে মাংস রোস্ট করার পদ্ধতি মেক্সিকোতে নিয়ে আসেন। স্থানীয় মসলা, মাংস এবং আনারস যোগ হয়ে জন্ম নেয় আজকের বিখ্যাত টাকোস আল পাস্তর।


টর্টিলা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?


ট্যাকোর প্রাণ হলো টর্টিলা। ভুট্টা মেক্সিকোর খাদ্যসংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু। দেশটির বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে ভুট্টাকে খাদ্যের চেয়েও বেশি, জীবনের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে।


এই সাংস্কৃতিক বিশ্বাসের কারণেই কর্ন টর্টিলা এখনও মেক্সিকোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যগুলোর একটি।


আসল মেক্সিকান ট্যাকো বনাম আমেরিকান ট্যাকো:


বিশ্বের অনেক মানুষ ট্যাকো বলতে শক্ত, ভাজা খোলসের ভেতর গরুর কিমা, চেডার চিজ, লেটুস এবং সাওয়ার ক্রিম বোঝেন।


কিন্তু সেটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা টেক্স-মেক্স ধারার ট্যাকো।


ঐতিহ্যবাহী মেক্সিকান ট্যাকো সাধারণত নরম কর্ন টর্টিলায় তৈরি হয়। এতে অতিরিক্ত চিজ বা সাওয়ার ক্রিম ব্যবহার করা হয় না। বরং খাবারের মূল স্বাদ আসে ভালোভাবে রান্না করা মাংস, তাজা পেঁয়াজ, ধনেপাতা, ঝাল সালসা এবং লেবুর রস থেকে।


এই পার্থক্যই দেখায়, একই খাবার সীমান্ত পেরিয়ে কীভাবে নতুন রূপ নিতে পারে।


বিশ্বজয়ী এক রাস্তার খাবার


বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকান অভিবাসন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্যাকো আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেতে শুরু করে।


আজ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বড় শহরে ট্যাকো বিক্রি হয়। কখনও ঐতিহ্যবাহী রূপে, কখনও স্থানীয় স্বাদের সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে। কোথাও কোরিয়ান বারবিকিউ দিয়ে, কোথাও ভারতীয় মসলা দিয়ে, আবার কোথাও নিরামিষ উপকরণ দিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন সংস্করণ।


তবু মেক্সিকোর মানুষ এখনও বিশ্বাস করেন, আসল ট্যাকোর সৌন্দর্য তার সরলতায়। ট্যাকোকে শুধু একটি খাবার হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না। এটি প্রাচীন আদিবাসী সভ্যতার উত্তরাধিকার, স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক যুগের সাক্ষী, অভিবাসনের ইতিহাসের ধারক এবং আধুনিক মেক্সিকোর জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক।  

@ boikal


২৫


বাল্টিক রাষ্ট্র বা বাল্টিক দেশ

ইউরোপের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত তিনটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে একত্রে বাল্টিক রাষ্ট্র বা বাল্টিক দেশ (Baltic States) বলা হয়। দেশ তিনটি হলো:


১. এস্তোনিয়া (Estonia)

২. লাতভিয়া (Latvia)

৩. লিথুয়ানিয়া (Lithuania)


কেন এদের 'বাল্টিক রাষ্ট্র' বলা হয়?


এই দেশগুলোকে "বাল্টিক" বলার প্রধান কারণ ভৌগোলিক অবস্থান এবং এদের সাধারণ ইতিহাস।


বাল্টিক সাগরের তীরবর্তী অবস্থান: এই তিনটি দেশই উত্তর ইউরোপের বাল্টিক সাগরের (Baltic Sea) পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। সাগরের নামানুসারেই এই অঞ্চল এবং এর সংলগ্ন দেশগুলোকে একত্রে বাল্টিক রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।


ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক ঐক্য: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৮ সালে রুশ সাম্রাজ্যের পতনের পর এই তিনটি দেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের (USSR) অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে আবার একসাথে স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার কারণে বিশ্ব রাজনীতি ও ভূগোলে এদের একসাথে "বাল্টিক রাষ্ট্র" হিসেবে চেনার রেওয়াজ তৈরি হয়।


তিন দেশই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ও ন্যাটো (NATO)–এর সদস্য। তুলনামূলকভাবে প্রযুক্তি-নির্ভর, দ্রুত উন্নয়নশীল ছোট অর্থনীতি।


সুইডেন, ফিনল্যান্ড, জার্মানি বা পোল্যান্ডের মতো আরও বেশ কিছু দেশের সাথে বাল্টিক সাগরের সীমান্ত রয়েছে। তবে ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক অভিন্নতার কারণে কেবল এস্তোনিয়া, লাতভিয়া এবং লিথুয়ানিয়া—এই তিনটি দেশকেই সমষ্টিগতভাবে "বাল্টিক রাষ্ট্র" বলা হয়ে থাকে।


Estonia

বিশ্বের সবচেয়ে ডিজিটাল দেশগুলোর একটি।

ইন্টারনেট ভোটিং-এ বিশ্বের পথিকৃত।

Skype, TransferWise (Wise) এর মতো টেক কোম্পানি এস্তোনিয়া-উদ্ভুত।

রাজধানী Tallinn-এর পুরনো শহর UNESCO World Heritage Site।

ভাষা: এস্তোনিয়ান

জনসংখ্যা: ১৩ লক্ষ ৬৩ হাজার


Latvia

রাজধানী Riga হলো ইউরোপের সবচেয়ে বড় Art Nouveau স্থাপত্যসংগ্রহের শহর।

Latvia-তে আগের যুগের Pagan ধারা এখনও লোকসংস্কৃতিতে টিকে আছে—Jāņi midsummer festival খুব বিখ্যাত।

এখানে Gauja National Park সবচেয়ে বড় বন্যপ্রাণীর আবাস।

ভাষা: লাটভিয়ান

জনসংখ্যা: ১৮ লক্ষ ৪২ হাজার


Lithuania

লিথুয়ানিয়া ছিল একসময় ইউরোপের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র (১৪শ–১৫শ শতক)—Baltic থেকে Black Sea পর্যন্ত বিস্তৃত।

বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো বাল্টিক ভাষা—Lithuanian—প্রাচীন বৈশিষ্ট্য এখনও বহন করে।

রাজধানী: ভিলনিয়াস

জনসংখ্যা: ২৮ লক্ষ ৯৭ হাজার

ভাষা: লিথুনিয়ান 

@ boikal


২৬


আয়ারল্যান্ড, একটা দ্বীপ, দুটো দেশ। 

১৯২১ সালের এপ্রিল পর্যন্ত একটা দেশই ছিল। তারপর এই দিনে ৩ মে আয়ারল্যান্ড পার্টিশন করা হয়। উত্তরের ছোট একটি অংশ রাখা হয় যুক্তরাজ্যের অধীনে, নাম উত্তর আয়ারল্যান্ড; বাকিটা স্বাধীন আয়ারল্যান্ড।


আয়ারল্যান্ডের স্বাধীন সময়ের ইতিহাস, যুক্তরাজ্যের সাথে দ্বন্দ্ব, স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলা, আন্দোলন, বিভক্তি, স্বাধীনতা এসব মিলিয়ে খুব জটিল ইতিহাস। আমরা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে গভীরে না গিয়ে মূল বিষয়গুলো জানব।


আদি আয়ারল্যান্ড: যখন ছিল পূর্ণ স্বাধীনতা


খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড ছিল মূলত একটি স্বাধীন অঞ্চল। তখন আয়ারল্যান্ড ‘হাই কিংস’ (High Kings) বা প্রধান রাজাদের অধীনে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্রে বিভক্ত ছিল। সেন্ট প্যাটরিকের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের পর আয়ারল্যান্ড শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই স্বর্ণযুগে আইরিশরা কোনো একক কেন্দ্রীয় রাজতন্ত্রের চেয়ে বরং সাংস্কৃতিক ঐক্যের ভিত্তিতে স্বাধীন ছিল।


নরমান আক্রমণ ও ব্রিটিশ শাসনের শুরু (১১৬৯ খ্রিষ্টাব্দ):


আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার সূর্য প্রথম অস্তমিত হতে শুরু করে ১১৬৯ সালে। বহিষ্কৃত আইরিশ রাজা ডারমট ম্যাকমোরোর আমন্ত্রণে ইংল্যান্ডের নরমানরা আয়ারল্যান্ডে পা রাখে। রাজা দ্বিতীয় হেনরি নিজেকে আয়ারল্যান্ডের অধিপতি ঘোষণা করেন। ধীরে ধীরে ডাবলিনের আশেপাশে একটি ছোট এলাকা (যাকে 'দ্য পেল' বলা হতো) ব্রিটিশদের শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ১৫৪১ সালে রাজা অষ্টম হেনরি নিজেকে 'কিং অফ আয়ারল্যান্ড' ঘোষণা করলে পুরো দ্বীপটি সরাসরি লন্ডনের শাসনের অধীনে চলে আসে।


প্রোটেস্ট্যান্ট আধিপত্য ও 'প্ল্যান্টেশন':


সপ্তদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা আয়ারল্যান্ডে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করতে এক কৌশল অবলম্বন করে, যা 'প্ল্যান্টেশন' (Plantation) নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডের আদি ক্যাথলিকদের জমি কেড়ে নিয়ে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড থেকে আসা প্রোটেস্ট্যান্টদের বসতি গড়ে দেওয়া হয়। বিশেষ করে উত্তর আয়ারল্যান্ডের আলস্টার (Ulster) প্রদেশে এই বসতি স্থাপন ছিল সবচেয়ে বেশি সফল, যা আজও আয়ারল্যান্ডের বিভক্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


স্বাধীনতার সূর্য ডোবা: ইউনাইটেড কিংডমের সাথে একীভূতকরণ (১৮০১):


১৭৯৮ সালের ব্যর্থ এক বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আয়ারল্যান্ডকে পুরোপুরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। ১৮০১ সালে 'অ্যাক্ট অফ ইউনিয়ন' পাসের মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডের নিজস্ব সংসদ বিলুপ্ত করা হয় এবং এটি 'ইউনাইটেড কিংডম অফ গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ড'-এর অংশ হয়ে পড়ে। এর ফলে আয়ারল্যান্ড তার অবশিষ্ট রাজনৈতিক স্বকীয়তাও হারায়।


মহা-দুর্ভিক্ষ ও জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান:


১৮৪৫-১৮৫২ সালের মধ্যে আয়ারল্যান্ডে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (The Great Famine) দেখা দেয়। এতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা যায় এবং আরও ১০ লাখ মানুষ দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়। আইরিশদের অভিযোগ ছিল, ব্রিটিশ সরকার ইচ্ছা করলেই এই দুর্যোগ ঠেকাতে পারত। এই ক্ষোভ থেকেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে 'হোম রুল' বা স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন দানা বাঁধে।


কিন্তু আলস্টারের প্রোটেস্ট্যান্টরা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। তারা ভাবে, যদি আয়ারল্যান্ড স্বশাসিত হয়, তাহলে ক্যাথলিকদের অধীনে তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে তারা জোর দিয়ে বলে- “আমরা ব্রিটেনের সঙ্গেই থাকব।”


১৯১৬ থেকে ১৯২১: স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বিভাজন:


বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আয়ারল্যান্ডে সশস্ত্র বিপ্লবের জোয়ার আসে।


ইস্টার রাইজিং (১৯১৬): প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন একদল বিপ্লবী ডাবলিনে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। যদিও এই বিদ্রোহ কয়েক দিনের মধ্যেই দমন করা হয়, কিন্তু এর প্রভাব ছিল বিস্ময়কর। ব্রিটিশদের কঠোর প্রতিক্রিয়া সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ঘুরিয়ে দেয় বিদ্রোহীদের দিকে।


স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৯১৯-২১): আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি (IRA) ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দুই পক্ষ সন্ধিতে বসতে বাধ্য হয়।


১৯২১ সালের বিভক্তি ও আংশিক স্বাধীনতা:


অবশেষে ১৯২১ সালে স্বাক্ষরিত হয় অ্যাংলো-আইরিশ চুক্তি। এই চুক্তি আয়ারল্যান্ডকে স্বাধীনতার পথ দেখাল—কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। দ্বীপটি ভাগ হয়ে গেল।


ক্যাথলিক প্রধান দক্ষিণের ২৬টি জেলা নিয়ে গঠিত হয় 'আইরিশ ফ্রি স্টেট', যারা ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অধীনে স্বায়ত্তশাসন পায়। ১৯৪৯ সালে এটি পুরোপুরি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে 'রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ড' নাম নেয়।


প্রোটেস্ট্যান্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তরের ৬টি জেলা নিয়ে গঠিত হয় 'উত্তর আয়ারল্যান্ড', যা ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবেই থেকে যায়।


বর্তমান পরিস্থিতি ও একীভূতকরণের প্রশ্ন:


বিভক্তির পর উত্তর আয়ারল্যান্ডে কয়েক দশক ধরে চলা সংঘাত (দ্য ট্রাবলস) ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তির মাধ্যমে স্তিমিত হয়। তবে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার ইতিহাস আজও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে অনেক আইরিশের কাছে, যারা বিশ্বাস করেন একদিন পুরো দ্বীপটি আবার এক হবে। ১৯৯৮ সালের 'গুড ফ্রাইডে' চুক্তির পর উত্তর আয়ারল্যান্ড এবং রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ডের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান সীমান্ত বা তল্লাশি চৌকি ছিল না। কিন্তু ২০১৬ সালের "ব্রেক্সিট" সেই স্থিতাবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে। বর্তমানে আয়ারল্যান্ড দ্বীপের রাজনীতি এখন এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

@ boikal


২৭


মেসোপটেমিয় ভেনিস: ইরাকের হারিয়ে যাওয়া ভাসমান গ্রাম


ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত মেসোপটেমীয় জলাভূমি বা 'আহওয়ার' (Al-Ahwar) কেবল একটি প্রাকৃতিক এলাকা নয়, এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত এই অঞ্চলটি টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত। জলাভূমিগুলোতে 'মাদান' বা 'জলাভূমির আরব' (Marsh Arabs) জনগোষ্ঠী বসবাস করে। তারা এক অনন্য সংস্কৃতির অধিকারী আধা-যাযাবর গোত্র, যাদের জীবনধারা গত কয়েক হাজার বছরে খুব সামান্যই পরিবর্তিত হয়েছে।


স্থাপত্যের বিস্ময়: নলখাগড়ার ঘর


মাদানদের পুরো জীবন গড়ে উঠেছে এই জলাভূমিকে কেন্দ্র করে। তাদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো তাদের ভাসমান বাড়িগুলো, যা সম্পূর্ণভাবে জলাভূমি থেকে সংগৃহীত 'কাসাব' নামক এক ধরণের বিশাল নলখাগড়া দিয়ে তৈরি। এই ঘাসগুলো বাঁশের মতো দেখতে এবং প্রায় ২৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।


মাদানরা এই জাঁকজমকপূর্ণ ভাসমান বাড়িগুলো তৈরি করে ছোট ছোট দ্বীপের ওপর, যেগুলোকে বলা হয় 'তুহুল'। এই দ্বীপগুলো দেখতে স্থিতিশীল মনে হলেও আসলে তা বেশ নরম এবং কর্দমাক্ত। তাই প্রতিবেশীদের দিকে ভেসে যাওয়া এড়াতে গ্রামবাসীরা প্রায়ই তাদের দ্বীপগুলোকে নোঙর দিয়ে আটকে রাখে।


এই বাড়িগুলোর নির্মাণকৌশলও বিস্ময়কর:


এগুলো তৈরি করতে কোনো পেরেক, কাঠ বা কাঁচের প্রয়োজন হয় না। মাত্র তিন দিনেই একটি বাড়ি তৈরি করা সম্ভব। এই বাড়িগুলো বহনযোগ্য। বসন্তকালে পানির স্তর বেড়ে গেলে এগুলো খুলে উঁচু স্থানে নিয়ে আবার একদিনের মধ্যেই বসানো যায়। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করলে একটি নলখাগড়ার বাড়ি ২৫ বছরেরও বেশি সময় টিকে থাকে।


ঐতিহাসিকভাবেই এই জলাভূমি ছিল পলাতক দাস এবং কৃষকদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মাদানরা তাদের আতিথেয়তার জন্য পরিচিত; তারা কখনোই সাহায্যপ্রার্থী কোনো আগন্তুককে ফিরিয়ে দেয় না। তাদের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘরকে বলা হয় 'মুধিফ' (Mudhif), যা মূলত মেহমানখানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।


মাশহূফ (Mashoof): জলাভূমিতে চলাচলের জন্য তারা এক ধরণের বিশেষ ঐতিহ্যবাহী নৌকা ব্যবহার করে, যাকে 'মাশহূফ' বলা হয়। এটিই তাদের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম।


অর্থনীতি: মাদানদের প্রধান জীবিকা হলো মহিষ পালন এবং মাছ ধরা। এখানকার মহিষগুলো পানিতে সাঁতার কাটতে অভ্যস্ত, যা পর্যটকদের জন্য একটি দারুণ দৃশ্য।


বিপর্যয়:


মাদানদের এই ঐতিহ্যের ওপর বড় আঘাত আসে ১৯৯১ সালের ইরাক বিদ্রোহের সময়। বিদ্রোহীদের একটি বড় অংশ দক্ষিণ ইরাকের এই দুর্গম জলাভূমিগুলোতে আশ্রয় নেয়। এখানকার বিশাল বিশাল নলখাগড়ার বন এবং গোলকধাঁধার মতো জলপথ বিদ্রোহীদের জন্য নিখুঁত লুকানোর জায়গা ছিল। সদ্দাম হোসেন বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিদ্রোহীদের নির্মূল করতে হলে আগে তাদের আশ্রয়ের জায়গাটি ধ্বংস করতে হবে। তাই সরকার ১৯৭০-এর দশকের একটি সেচ প্রকল্প পুনরায় চালু করে। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর পানি যাতে জলাভূমিতে ঢুকতে না পারে, সেজন্য বিশাল সব কৃত্রিম বাঁধ এবং মাটির দেয়াল (Dykes) তৈরি করা হয়। যার মাধ্যমে এই বিশাল জলাভূমি শুকিয়ে যায়।


খুব দ্রুত জলাভূমি মরুভূমিতে পরিণত হয়, খাদ্যের অভাব দেখা দেয় এবং মাদানরা তাদের পৈতৃক ভিটা ছাড়তে বাধ্য হয়। এক সময়ের সমৃদ্ধ এই এলাকাটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। জলাভূমির আকার ১০%-এ চলে গিয়েছিল।


পুনর্জন্ম ও বর্তমান অবস্থা:


২০০৩ সালে সদ্দাম সরকারের পতনের পর, স্থানীয় জনগণ বাঁধগুলো ভেঙে দেয় যাতে পুনরায় জলাভূমিতে পানি ফিরে আসতে পারে। একই সময়ে চার বছরের একটি দীর্ঘ খরার অবসান ঘটে, যা প্রাকৃতিক উপায়ে জলাভূমিকে পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। এটি ১৯৭০-এর দশকের আয়তনের প্রায় ৫০ শতাংশে ফিরে এসেছে।


২০১৬ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) এই জলাভূমিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে। যদিও বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং তুরস্ক ও ইরানের বাঁধ নির্মাণের কারণে উদ্ধারকৃত জলাভূমিটি আবার পানির সংকটে পড়েছে, তবুও এটি এখনও মাদানদের টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


মাদানদের এই জীবনধারা আমাদের পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ছাড়াও যে যুগযুগান্ত ধরে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে চমৎকার স্থাপত্য গঠন করা সম্ভব, ইরাকের এই 'মেসোপটেমীয় ভেনিস' তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। 

@ boikal


২৮



নীল দিগন্তের শহর: শেফশাউয়েনের রহস্যময় নীলিমা


মরক্কোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রিফ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি শহর যেন রূপকথার পাতা থেকে উঠে এসেছে। পাহাড়ের সবুজ ঢালে কেউ যেন যত্ন করে ঢেলে দিয়েছে এক বালতি নীল রঙ। শহরটির নাম শেফশাউয়েন—যাকে পর্যটকরা ডাকেন 'ব্লু পার্ল' বা 'নীল মুক্তা' নামে।


কিন্তু একটি পুরো শহর নীল কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে মিশে যেতে হয় ইতিহাস, ধর্ম আর লোকজ বিশ্বাসের এক রোমাঞ্চকর মিশেলে।


ইতিহাসের পদচিহ্ন: স্বর্গীয় নীল


শেফশাউয়েনের এই নীল রঙের পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিটি হলো ধর্মীয়। ১৪৯২ সালে স্পেনের ইনকুইজিশন থেকে বাঁচতে প্রচুর ইহুদি পরিবার এই শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, নীল রঙ আকাশ এবং পরমেশ্বরের প্রতীক। এই রঙ তাদের আধ্যাত্মিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিত এবং মনে করিয়ে দিত যে পৃথিবীর ঊর্ধ্বে একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। সেই সময় থেকেই তারা তাদের ঘরবাড়ি নীল করতে শুরু করেন, যা আজ এক বৈশ্বিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।


প্রকৃতির সাথে লড়াই ও উদ্ভাবন:


ধর্মীয় কারণ ছাড়াও এই নীল রঙের পেছনে রয়েছে দারুণ কিছু ব্যবহারিক কারণ:


প্রাকৃতিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ: মরক্কোর কড়া রোদে পাথুরে ঘরগুলো খুব দ্রুত তেতে ওঠে। নীল রঙ সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিকে প্রতিফলিত করে ঘরকে শীতল রাখতে সাহায্য করে।


মশা তাড়ানোর কৌশল: স্থানীয়দের মতে, নীল রঙের আধিক্য মশা এবং অন্যান্য পতঙ্গকে দূরে রাখে। তাদের ধারণা, নীল রঙ মশার কাছে স্বচ্ছ পানির বিভ্রম তৈরি করে, যা তাদের বিচরণে বাধা দেয়।


পর্যটন ও আধুনিক পুনর্জাগরণ:


বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত শেফশাউয়েন আজকের মতো এতটা নীল ছিল না। কিন্তু ১৯৩০-এর পর থেকে যখন পর্যটকরা এই শহরের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করেন, তখন স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দারা একে একটি অনন্য রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আজ পুরো শহরের প্রতিটি অলিগলি, দরজা, জানালা এমনকি সিঁড়িগুলোও নীলের বিভিন্ন শেডে (অ্যাজুর, কোবাল্ট, পার্সিয়ান ব্লু) রঞ্জিত।


রঙের শহর, প্রাণের শহর:


শেফশাউয়েনের নীল শুধু দেয়ালেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি এখন স্থানীয়দের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর অন্তত দুইবার শহরের বাসিন্দারা দলবেঁধে তাদের ঘরবাড়ি রঙ করেন। সরু আঁকাবাঁকা গলি দিয়ে হাঁটার সময় যখন নীল দেয়ালের বিপরীতে ঝুলে থাকা লাল-হলুদ মাটির টবগুলো চোখে পড়ে, তখন মনে হয় সময় যেন এখানে থমকে দাঁড়িয়েছে।

আজ শেফশাউয়েন কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি মানুষের বিশ্বাস আর প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের এক জীবন্ত ক্যানভাস। আপনি যদি ফটোগ্রাফি পছন্দ করেন বা নির্জন পাহাড়ি শহরের প্রশান্তি খোঁজেন, তবে এই নীল দিগন্ত আপনাকে নিরাশ করবে না। 

@ boikal


২৯


একই দেশের দুই রাজধানী

সকালের কলম্বো। ভারত মহাসাগরের ঢেউ এসে ধাক্কা খায় ব্যস্ত বন্দরে, ট্রাফিকের শব্দে মিশে থাকে ইতিহাসের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। আর সেখান থেকে খুব দূরে নয়, সবুজে ঘেরা শান্ত এক শহর- যেখানে নীরবে বসে দেশের সংসদ। আমরা সবসময় জেনে আসছি শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বো, এই নামের আড়ালে ঢাকা পড়ে ছিল আরেকটি শহর- শ্রী জয়াবর্ধনপুরা কোট্টে। এই শহরটিও রাজধানী। একই দেশের দুই রাজধানী:


১. শ্রী জয়বর্ধনপুর কোট্টে (Sri Jayawardenepura Kotte): এটি শ্রীলঙ্কার প্রশাসনিক বা আইন বিভাগীয় রাজধানী। ১৯৮২ সালে দেশটির সংসদ বা পার্লামেন্ট এখানে স্থানান্তরিত করা হয়। সরকারি অফিস এবং প্রশাসনিক মূল কর্মকাণ্ড এখান থেকেই পরিচালিত হয়।


২. কলম্বো (Colombo): এটি শ্রীলঙ্কার নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় রাজধানী। এ ছাড়া এটি দেশটির বৃহত্তম শহর এবং প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। রাষ্ট্রপতি ভবন, সুপ্রিম কোর্ট এবং বড় বড় ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কলম্বোতেই অবস্থিত।


ইবনে বতুতা এই শহরটিকে বর্ণনা করেছেন কালানপু নামে। পর্তুগিজ, ডাচ, আর শেষ পর্যন্ত ব্রিটেন- সব উপনিবেশিক শক্তিই কলম্বোকে বানিয়েছিল প্রশাসন ও বাণিজ্যের কেন্দ্র।


স্বাধীনতার পরও সেই ধারা বদলায় নি। সরকার, বন্দর, ব্যবসা—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এই শহর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কলম্বো যেন নিজের সাফল্যের ভারেই নুয়ে পড়তে থাকে। অতিরিক্ত জনসংখ্যা, যানজট, আর প্রশাসনিক চাপ- সব মিলিয়ে শহরটা হয়ে ওঠে ভারাক্রান্ত।


নতুন রাজধানীর সন্ধানে:


১৯৭০-এর দশকে শ্রীলঙ্কা সরকার বুঝতে পারে—একটি শহরের ওপর এত দায়িত্ব চাপিয়ে রাখা দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার। দরকার নতুন সমাধান। তাই নজর যায় কাছের ঐতিহাসিক শহর Sri Jayawardenepura Kotte-এর দিকে। একসময় এই শহর ছিল প্রাচীন রাজাদের রাজধানী। ইতিহাস যেন আবার ফিরে আসে আধুনিক রূপে।


পরিকল্পনা শুরু হয়: প্রশাসনিক রাজধানী সরিয়ে নেওয়া হবে এখানে। ১৯৮২ সালে নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধনের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ নেয়।


এখন মিলে মিশে একাকার:


কিন্তু এখন আর দুটো শহরকে আলাদা করা যায় না! ভৌগোলিকভাবে শ্রী জয়বর্ধনপুর কোট্টে আসলে কলম্বো শহরের খুব কাছেই অবস্থিত, এমনকি এটি কলম্বো মেট্রোপলিটন এলাকার অংশ। তবে কিছু প্রশাসনিক ও আইনি কারণে এটি আলাদা শহর হিসেবে পরিচিত।


কলম্বো মূল শহর থেকে কোট্টের দূরত্ব মাত্র ১০-১১ কিলোমিটার। সময়ের সাথে সাথে কলম্বো শহর এতোটাই বড় হয়েছে যে, কোট্টে এখন কলম্বোর একটি উপশহর বা 'স্যাটেলাইট টাউন' হিসেবে মিশে গেছে। এটি অনেকটা আমাদের দেশের ঢাকা ও সাভার বা পূর্বাচলের সম্পর্কের মতো।


প্রশাসনিকভাবে কলম্বো এবং শ্রী জয়বর্ধনপুর কোট্টে দুটি আলাদা স্থানীয় সরকার বা মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল দ্বারা পরিচালিত হয়।


১৯৮২ সালে যখন শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্ট কমপ্লেক্সটি কোট্টেতে উদ্বোধন করা হয়, তখন এটি ছিল কলম্বোর মূল কেন্দ্র থেকে বেশ কিছুটা দূরের একটি এলাকা। সেই সময়ে কোট্টে ছিল মূলত জলাভূমি (marshland) এবং ধানক্ষেত বেষ্টিত একটি শান্ত এলাকা। কলম্বো ছিল একটি ঘনবসতিপূর্ণ বন্দরনগরী, আর কোট্টে ছিল তার বাইরের একটি গ্রামীণ বা আধা-শহর অঞ্চল।


কেন কোট্টেকে বেছে নেওয়া হয়েছিল? কলম্বো শহরের ভিড় থেকে দূরে একটি নিরিবিলি জায়গায় প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানোর জন্যই কোট্টেকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। দিয়াবান্না ওয়া (Diyawanna Oya) লেকের মাঝখানে একটি দ্বীপে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বর্তমান পার্লামেন্ট ভবনটি তৈরি করা হয়।


পার্লামেন্ট সরিয়ে নেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই সেই এলাকায় রাস্তাঘাট উন্নত হয়, নতুন নতুন সরকারি কোয়ার্টার তৈরি হয় এবং মানুষের যাতায়াত বাড়ে। এদিকে গত ৪০ বছরে কলম্বো শহর চারদিকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে কলম্বো এবং কোট্টের মাঝখানের যে 'ফাঁকা জায়গা' বা 'বাফার জোন' ছিল, তা ঘরবাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভরে গেছে।


বর্তমানে আপনি যদি কলম্বোর কেন্দ্র থেকে কোট্টের দিকে গাড়ি চালিয়ে যান, তবে কোনো সীমানা বা গেট দেখতে পাবেন না। আপনার কাছে মনে হবে আপনি একই শহরের এক রাস্তা থেকে অন্য রাস্তায় যাচ্ছেন। বর্তমানে পুরো এলাকাটি গ্রেটার কলম্বো বা কলম্বো মেট্রোপলিটন এলাকার অংশ হিসেবে গণ্য হয়। 

@ boikal


৩০


দক্ষিণ আফ্রিকা: এক রাষ্ট্র, তিন রাজধানী


দক্ষিণ আফ্রিকার রাজধানী কোনটি? এক কথায় উত্তর দিতে পারবেন? সাধারণ জ্ঞানের বইগুলোতেই এই বিষয়ে সবচে' বেশি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। কোনো বইয়ে কেপটাউনের নাম, কোনোটাতে প্রিটোরিয়া, আবার কোনোটাতে জোহানেসবার্গ যেটি আদৌ রাজধানী নয়, ব্লুমফন্টেইনের নাম কিন্তু কোথাও নেই। ক্রিকেটের কারণে এই শহরটা আমরা চিনেছি।


বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের রাজধানী একটি। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা সেই সহজ নিয়ম মানেনি। সেখানে একটি নয়, তিনটি রাজধানী—প্রিটোরিয়া, কেপ টাউন, আর ব্লুমফন্টেইন। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এর পেছনে আছে এক জটিল রাজনৈতিক সমঝোতার ইতিহাস।


প্রিটোরিয়া, কেপ টাউন এবং ব্লুমফন্টেইন—এই তিনটি শহর মিলে দেশটির প্রশাসনিক, আইন বিভাগীয় এবং বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি দেশের কেন তিনটি রাজধানী প্রয়োজন হলো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে দেশটির রক্তক্ষয়ী ইতিহাস এবং রাজনৈতিক সমঝোতার গভীরে।


ইতিহাসের প্রেক্ষাপট: চার উপনিবেশের লড়াই


বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বর্তমানের দক্ষিণ আফ্রিকা চারটি পৃথক ব্রিটিশ উপনিবেশে বিভক্ত ছিল: কেপ কলোনি, নাটাল কলোনি, ট্রান্সভাল কলোনি এবং অরেঞ্জ রিভার কলোনি। দীর্ঘ সময় ধরে চলা 'বোয়ার যুদ্ধ' (Boer War) শেষ হওয়ার পর ১৯১০ সালে এই চারটি অঞ্চলকে একত্রিত করে 'ইউনিয়ন অফ সাউথ আফ্রিকা' গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।


কিন্তু একীভূত হওয়া মানেই সবাই খুশি—এমন ছিল না। প্রতিটি অঞ্চলেরই নিজস্ব রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক গুরুত্ব ছিল, আর সবাই চাইছিল রাষ্ট্রের কেন্দ্র যেন “তাদের” শহরেই হয়। বিশেষ করে কেপ টাউন এবং প্রিটোরিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল চরমে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একটি একক শহরকে বেছে নিলে নবগঠিত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।


রাজনৈতিক সমঝোতার ফলাফল:


গৃহযুদ্ধ এড়াতে এবং চারটি অঞ্চলের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে ১৯১০ সালে একটি বিশেষ রাজনৈতিক সমঝোতা হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ক্ষমতা কোনো একটি নির্দিষ্ট শহরে কুক্ষিগত না রেখে ভাগ করে দেওয়া হবে:


১. প্রিটোরিয়া (প্রশাসনিক): ব্রিটিশদের পরাজিত করা বোয়ারদের প্রধান কেন্দ্র ছিল ট্রান্সভাল। তাদের শান্ত রাখতে প্রিটোরিয়াকে প্রশাসনিক রাজধানী করা হয়, যেখানে বর্তমানে প্রেসিডেন্টের কার্যালয় অবস্থিত।


২. কেপ টাউন (আইনসভা): কেপ কলোনির গুরুত্ব বিবেচনা করে কেপ টাউনকে করা হয় আইনসভা বা পার্লামেন্টের কেন্দ্র। ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ধারক এই শহরটি দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম প্রাচীন শহর।


৩. ব্লুমফন্টেইন (বিচারিক): অরেঞ্জ ফ্রি স্টেটের রাজধানী ব্লুমফন্টেইনকে দেওয়া হয় বিচারিক দায়িত্ব। এখানে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট অফ আপিল অবস্থিত।


উল্লেখ্য, নাটাল কলোনির প্রধান শহর ডারবানকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেশটির প্রধান বন্দর ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।


এই সিদ্ধান্ত আসলে ছিল ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়ার এক উপায়। এক শহরকে সবকিছু দিলে অন্য অঞ্চলগুলো নিজেদের বঞ্চিত মনে করত। তাই রাজধানীকে “বিভক্ত” করে দক্ষিণ আফ্রিকা শুরু থেকেই রাষ্ট্রকে বানাতে চেয়েছিল একধরনের সমঝোতার প্রকল্প।


এই কারণেই জোহানেসবার্গ নিয়ে বিভ্রান্তি হয়। শহরটি দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্র, ব্যবসা-বাণিজ্য, ফাইন্যান্স, মিডিয়া—সবকিছুর প্রাণকেন্দ্র। উপরন্তু, দেশের Constitutional Court-ও জোহানেসবার্গে অবস্থিত। ফলে অনেকে ধরে নেন, “আসল রাজধানী” বুঝি এটাই। কিন্তু অফিশিয়ালি জোহানেসবার্গ রাজধানী নয়—এটি বরং দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনৈতিক হৃদস্পন্দন।


এখনও কেন তিনটি রাজধানী?

অ্যাপার্থাইড বা বর্ণবৈষম্যের অবসানের পর ১৯৯৪ সালে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে যখন নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়, তখন রাজধানী একীভূত করার আলোচনা উঠেছিল। কিন্তু তিনটি ভিন্ন শহরে সরকারি অবকাঠামো নির্মাণে যে বিশাল বিনিয়োগ হয়ে গেছে এবং এই শহরগুলোর অর্থনীতি যেভাবে সরকারের ওপর নির্ভরশীল, তাতে পরিবর্তন আনাটা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল। এক শহরে রাজধানী কেন্দ্রীভূত করতে হলে অনেক স্থাপনা নতুন করে তৈরি করতে হত। তাই রাজধানী আগের মতই রাখা হয়।  

@ boikal


৩১


আমাজন নদী

আমাজনকে শুধু নদী হিসেবে না দেখে একটি জলীয় মহাদেশ হিসেবে কল্পনা করা। আন্দিজ পর্বতমালার কোলে জন্ম নিয়ে এটি পশ্চিম থেকে পূর্বে দক্ষিণ আমেরিকার বুক চিরে বয়ে গেছে আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে। পথে এটি ছুঁয়ে যায় পেরু, ব্রাজিলসহ বিস্তীর্ণ আমাজন অববাহিকাকে, আর এর জলধারা ও উপনদীগুলো মিলে তৈরি করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদী-নেটওয়ার্কগুলোর একটি।


আসলে কত বড় এই নদী?


আমাজনের দৈর্ঘ্য নিয়ে এখনো কিছু বিতর্ক আছে। বহু গবেষকের মতে এটি কমপক্ষে প্রায় ৬,৪০০ কিলোমিটার (৪,০০০ মাইল) দীর্ঘ। কেউ কেউ এটিকে নীল নদের চেয়েও লম্বা বলার চেষ্টা করেন, যদিও এ নিয়ে চূড়ান্ত ঐকমত্য নেই। কিন্তু দৈর্ঘ্য নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয়ে বিতর্ক নেই—জলের প্রবাহে আমাজন পৃথিবীর এক নম্বর।


এ নদী এত বেশি পানি বহন করে যে পৃথিবীর নদীগুলো থেকে সমুদ্রে গিয়ে পড়া মোট মিঠাপানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ একাই আমাজনের মাধ্যমে যায়—এমন তথ্যও পাওয়া যায়। অর্থাৎ, পৃথিবীর স্থলভাগ থেকে যে বিপুল পরিমাণ মিঠাপানি সাগরে মেশে, তার এক বিশাল অংশের দায় একা এই নদীর।


একটি নদী, হাজারো নদীর পরিবার:


আমাজনকে একা ভাবলে ভুল হবে। এটি আসলে হাজারো উপনদীর সমষ্টি। ১,০০০-এরও বেশি পরিচিত উপনদী এই নদী ব্যবস্থার অংশ, যার মধ্যে কয়েকটি আবার নিজেরাই বিশাল নদী। যেমন—নেগ্রো, মাদেইরা, তাপাজোস, শিংগু—এগুলো একেকটি জলীয় জগত।


এই কারণেই আমাজনকে অনেকে “একটা নদী” না বলে “একটা জলতন্ত্র” বা river system বলেন। বর্ষাকালে এর অনেক অংশ এতটাই ফুলে-ফেঁপে ওঠে যে কোথায় মূল নদী, কোথায় বন, কোথায় প্লাবনভূমি—সীমানা আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়।


আমাজনের পানি সাগরকে বদলে দেয়:


আমাজনের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো, এটি আটলান্টিকে গিয়ে শুধু মিশে যায় না—সমুদ্রের চরিত্রই বদলে দেয়। নদীটি এত বেশি মিঠাপানি বহন করে যে মোহনা ঘেঁষা সমুদ্রের লবণাক্ততা অনেক দূর পর্যন্ত কমে যায়। অর্থাৎ, একটি নদী তার মুখে গিয়ে সাগরের পানির স্বাদ পর্যন্ত বদলে দিতে পারে।


এই দৃশ্যটা কল্পনা করুন: জঙ্গল, কাদা, বৃষ্টি আর পাহাড়ের পানি হাজার হাজার কিলোমিটার ভেসে এসে শেষ পর্যন্ত মহাসাগরকেও নিজের উপস্থিতি টের করায়।


নদীর সঙ্গে জন্ম নেওয়া এক জঙ্গলসভ্যতা:


আমাজন নদীকে আলাদা করে দেখার আরেকটি ভুল হলো—এটিকে আমাজন রেইনফরেস্ট থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবা। বাস্তবে এই নদী আর বন একে অন্যের প্রাণ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উষ্ণমণ্ডলীয় অরণ্য আমাজন রেইনফরেস্ট এই নদীর জলচক্র, প্লাবনভূমি ও পুষ্টি ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।


বছরের একটা বড় সময় জুড়ে নদীর পানি বেড়ে বনাঞ্চলের বিশাল অংশ প্লাবিত হয়। তখন গাছের গোড়া পানির নিচে, মাছ ডালে ডালে ঘোরে, আর জঙ্গল যেন সাময়িকভাবে নদীতে পরিণত হয়। এই মৌসুমি প্লাবনই আমাজনের প্রাণচক্রের বড় অংশ।


এখানে প্রাণীরা শুধু থাকে না, তারা ‘রাজত্ব’ করে:


আমাজন নদী ও তার অববাহিকা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। শুধু নদী ব্যবস্থাতেই হাজার হাজার প্রজাতির মাছ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আছে বিশালাকার পিরারুকু, ভয়ংকর খ্যাতির পিরানহা, বিচিত্র ক্যাটফিশ, কাইমান, কচ্ছপ, ম্যানাটি, এমনকি বিখ্যাত রিভার ডলফিনও।


আর হ্যাঁ, সেই অ্যানাকোন্ডা—যার নাম শুনলেই অনেকে সিনেমার দৃশ্য মনে করেন—আমাজনের জলাভূমি ও অববাহিকার বাস্তব বাসিন্দা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর আমাজন অঞ্চলে বড় অ্যানাকোন্ডা নিয়ে নতুন বৈজ্ঞানিক আগ্রহও দেখা গেছে।


এই নদী এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে প্রাণীরা শুধু টিকে নেই—বরং অবিশ্বাস্যভাবে অভিযোজিত। কোথাও গাছের বীজ ছড়ায় মাছ, কোথাও মৌসুমি প্লাবন নির্ধারণ করে প্রাণীদের জীবনচক্র।


এবার একটু “ওয়াও” টাইপ তথ্য:


১) আমাজন একসময় উল্টো দিকে বইত


বিজ্ঞানীদের মতে, বহু কোটি বছর আগে আমাজন নদীর পূর্বমুখী প্রবাহ ছিল না; একসময় এটি উল্টো দিকে, অর্থাৎ পশ্চিমমুখে বইত। পরে আন্দিজ পর্বতমালার গঠন ও ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে নদীর প্রবাহ পাল্টে যায়।


২) পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদী—কিন্তু এর ওপর মূল প্রবাহে কোনো সেতু নেই


শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, আমাজন নদীর মূল ধারার ওপর কোনো পূর্ণাঙ্গ সেতু নেই—এ তথ্য বহুদিন ধরেই কৌতূহলের বিষয়। কারণ নদীটি এত প্রশস্ত, এত পরিবর্তনশীল, আর এর আশপাশের অঞ্চল এত দুর্গম যে সেতু নির্মাণের বাস্তব প্রয়োজন ও ব্যয়—দুটোই জটিল।


৩) এর পানি এত বেশি যে তুলনা করা কঠিন


আমাজনের পানিপ্রবাহ এতই বিশাল যে একে অনেক সময় পরের কয়েকটি বড় নদীর সম্মিলিত প্রবাহের চেয়েও বেশি বলা হয়। তাই “বড় নদী” বললে শুধু লম্বা হলেই হয় না—আমাজন হলো শক্তির দিক থেকে এক জলদানব।


৪) এখানে ‘কালো পানি’ আর ‘বাদামি পানি’ পাশাপাশি বয়


ব্রাজিলের মানাউস শহরের কাছে এক বিখ্যাত দৃশ্য আছে—Meeting of the Waters। এখানে কালচে রিও নেগ্রো আর কাদামাটিযুক্ত সোলিমোয়েস/আমাজন নদীর পানি পাশাপাশি অনেক দূর পর্যন্ত বয়ে যায়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মিশে না। কারণ দু’নদীর তাপমাত্রা, গতি ও ঘনত্ব আলাদা। এই দৃশ্য পৃথিবীর অন্যতম অদ্ভুত নদী-প্রকৌশল।


৫) এখানে মাছের মাইগ্রেশনও ‘মহাকাব্যিক’


আমাজন অববাহিকায় কিছু মাছ হাজার হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক মূল্যায়নগুলো দেখাচ্ছে, এ ধরনের মিঠাপানির মহামাত্রার মাছ-অভিবাসন এখন পরিবেশগত চাপের মুখে।


আমাজনের নাম এল কোথা থেকে?


“আমাজন” নামটিও বেশ নাটকীয়। ১৬শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রী ফ্রান্সিসকো দে ওরেয়ানা এই নদী অভিযানের সময় স্থানীয় যোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষের কথা লিখেছিলেন। তিনি নাকি গ্রিক পুরাণের নারী যোদ্ধা Amazons-এর সঙ্গে তুলনা করে নদীটির নামকরণে প্রভাব ফেলেন।


অবশ্য স্থানীয় ও আঞ্চলিকভাবে নদীটির বিভিন্ন অংশের আলাদা নামও আছে—যেমন মারানিয়ন, সোলিমোয়েস ইত্যাদি। অর্থাৎ “আমাজন” এক অর্থে একটি আন্তর্জাতিক নাম; নদীটির স্থানীয় পরিচয় আরও বহুস্তরবিশিষ্ট।


কেন আজও এত গুরুত্বপূর্ণ?


আমাজন নদী শুধু একটি প্রাকৃতিক বিস্ময় নয়; এটি জলবায়ু, বৃষ্টি, বন, প্রাণবৈচিত্র্য, খাদ্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নদীটি ও এর অববাহিকা লক্ষ লক্ষ মানুষের বাসস্থান, পরিবহনপথ, মাছের উৎস এবং সাংস্কৃতিক জগতের অংশ।


কিন্তু একই সঙ্গে এটি ঝুঁকির মধ্যেও আছে। বন উজাড়, খনন, দূষণ, বাঁধ, খরা এবং জলবায়ু পরিবর্তন—সব মিলিয়ে আমাজনের ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু দক্ষিণ আমেরিকার প্রশ্ন নয়; এটি পুরো পৃথিবীর পরিবেশগত ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত। সাম্প্রতিক গবেষণা ও প্রতিবেদনগুলো দেখাচ্ছে, এই অঞ্চলের নদী-প্রাণবৈচিত্র্য ও জলচক্র ইতিমধ্যেই চাপের মুখে।


শেষ কথা:


আমাজন নদীকে “নদী” বলা যায়—কিন্তু তাতে পুরো সত্য বলা হয় না। এটি একসঙ্গে ভূগোল, জীববিজ্ঞান, জলবিজ্ঞান, পুরাণ, ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু-রাজনীতির গল্প।


পৃথিবীতে কিছু জিনিস আছে, যেগুলোকে দেখে মানুষ নিজের মাপটা বুঝতে পারে। আমাজন নদী তাদেরই একটি।

এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি শুধু বড় নয়, অবিশ্বাস্য রকম জটিল, জীবন্ত এবং এখনও পুরোপুরি অজানা 

@ boikal


৩২


সাইরাস সিলিন্ডার

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায় হলো প্রস্তর যুগ—যখন মানুষ মূলত পাথরের তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার করত। পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩০০০–২০০০ সালের দিকে ধীরে ধীরে শেষ হতে থাকে—যখন মানুষ ব্রোঞ্জ ও পরে লোহা ব্যবহার শুরু করে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এর সমাপ্তি হয়েছে ভিন্ন সময়ে। কোথাও কৃষি, কোথাও ধাতু, কোথাও নগরসভ্যতা—এই রূপান্তর সমান গতিতে ঘটেনি। “প্রস্তর যুগ” শুধু গুহা আর কুঠারের গল্প নয়; এটা হলো মানুষের ধীরে ধীরে সভ্যতায় উঠতে শেখার দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্ব। কিন্তু এই আদিম পর্যায়টি আধুনিক মানুষের কাছে এখন কেবলই 'অনগ্রসরতার' প্রতীক।


সাইরাস সিলিন্ডার: যখন ইরান আর ‘প্রস্তর যুগ’ একে অন্যের বহু দূরে


খ্রিস্টপূর্ব ৫৩৯ সালের পর, যখন Cyrus the Great ব্যাবিলন দখল করেন, তখন এই বিখ্যাত মাটির নলাকার শিলালিপিটি রচিত হয়। এতে সাইরাস নিজেকে কেবল বিজেতা হিসেবে নয়, বরং এমন এক শাসক হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি বিশৃঙ্খলার বদলে শৃঙ্খলা, দখলের বদলে পুনর্বিন্যাস, এবং জোরের বদলে বৈধতার ভাষা ব্যবহার করছেন।


এখানে একটা ভুল ধারণা আগে থেকেই সরিয়ে রাখা দরকার:

সাইরাস সিলিন্ডার “আধুনিক মানবাধিকার সনদ” নয়, যদিও পরে সেটিকে সেইভাবে জনপ্রিয়ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আসলে এটি ছিল একটি সাম্রাজ্যিক রাজনৈতিক দলিল—যেখানে বিজয়, বৈধতা, শাসনের নৈতিকতা ও ধর্মীয় সহনশীলতা—সব একসঙ্গে মেশানো।


তবু এটাও সত্য: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে দাঁড়িয়ে এমন ভাষায় শাসনকে সাজাতে পারা নিজেই একটি পরিণত রাষ্ট্র-সংস্কৃতির চিহ্ন। এবং এই জায়গাটিই আজকের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।


সাইরাস সিলিন্ডারের সময় ইরান কেমন ছিল?


সাইরাস সিলিন্ডারের সময়কার পারস্য বা প্রাচীন ইরানকে বোঝার জন্য একটি জিনিস মনে রাখতে হয়:

এটি ছিল প্রসারমান সাম্রাজ্য, কিন্তু কেবল সামরিক জোরে নয়। এর শক্তি ছিল—


প্রশাসনিক সংগঠনে

বহুজাতিক ভূখণ্ড শাসনের দক্ষতায়

ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে শাসনের আওতায় আনার কৌশলে

বিজয়কে “ন্যায্য” করে তোলার রাজনৈতিক বয়ানে


অর্থাৎ, এটি ছিল এমন এক শক্তি, যে শুধু অঞ্চল দখল করে না; অঞ্চলকে শাসনযোগ্য করে তোলে।


এই বৈশিষ্ট্যই ইরানের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ে আজও টিকে আছে। আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে ইরান যতই চাপে থাকুক, তার ভেতরে একটি দীর্ঘস্থায়ী সভ্যতাগত স্মৃতি কাজ করে—যে স্মৃতি নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষণস্থায়ী খেলোয়াড় নয়, বরং ইতিহাসের পুরোনো কেন্দ্র হিসেবে দেখে।


সেই সময় ইউরোপ:

আমরা ইরানের সাথে আমেরিকার তুলনা না করে ইউরোপের সাথে কেন করছি? কারণ আজকের আমেরিকার স্বেতাঙ্গরা তখন ইউরোপে বাস করত। সে সময় আমেরিকা ছিল অন্য জগৎ।


এই সময়ের ইউরোপের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আজ আমরা “ইউরোপ”কে একক সভ্যতাগত ব্লক হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে এমন কোনো একক ইউরোপ ছিল না।


দক্ষিণে গ্রিসে ছোট ছোট নগররাষ্ট্র—এথেন্স, স্পার্টা, করিন্থ—রাজনীতি, যুদ্ধ, দর্শন ও নাগরিকতার নতুন পরীক্ষায় ব্যস্ত। সেখানে চিন্তা, বিতর্ক ও শহরজীবনের উন্মেষ ঘটছে। ইতালিতে ইত্রুস্কান সভ্যতা নগরজীবন, ধর্মীয় আচরণ ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলছে, আর ভবিষ্যতের রোম তখনও মাত্র উদীয়মান শক্তি।


কিন্তু উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপে তখনও বড় অংশজুড়ে ছিল লোহা যুগের আঞ্চলিক সমাজ—কেল্টিক প্রধানতন্ত্র, গোত্রভিত্তিক কৃষিজীবন, পাহাড়ি দুর্গ, যোদ্ধা-অভিজাতের প্রাধান্য। সেখানে উন্নয়ন ছিল, প্রযুক্তি ছিল, সমাজ ছিল—কিন্তু তা পারস্যের মতো কেন্দ্রীয় সাম্রাজ্যিক রাষ্ট্রযন্ত্রে সংগঠিত ছিল না।


তাই “যখন ইউরোপ গুহায় ছিল, ইরান তখন সভ্য”—এই বক্তব্য ইতিহাসগতভাবে অতিরঞ্জিত হলেও রোম ও গ্রিস বাদে ইউরোপের অধিকাংশ এলাকাই তখন পারস্যের সাথে তুলনা করার অবস্থায় ছিল না।


আজকের যুদ্ধ-উত্তেজনায় এই ইতিহাস কেন ফিরে আসে


এখন প্রশ্ন হলো: এই আড়াই হাজার বছরের পুরোনো তুলনা আজ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?


কারণ, বর্তমান ইরান-সংকট শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, প্রক্সি যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রশ্ন নয়; এটি ন্যারেটিভের যুদ্ধও।


ইরানকে “প্রস্তর যুগে ফেরানো”র ভাষা আসলে তিনটি কাজ করে:


প্রথমত, এটি সামরিক শক্তিকে সভ্যতাগত উচ্চতার সঙ্গে জুড়ে দেয়।

অর্থাৎ, “আমরা শুধু শক্তিশালী নই; আমরা উন্নত, আর তোমরা পশ্চাৎপদ।”


দ্বিতীয়ত, এটি প্রতিপক্ষকে ইতিহাসহীন করে। ইরানকে তখন কেবল একটি বর্তমান নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে নয়, বরং “সমস্যাজনক”, “পিছিয়ে থাকা”, “অসভ্য” সত্তা হিসেবে ফ্রেম করা হয়।


তৃতীয়ত, এটি যুদ্ধকে নৈতিক নাটকে পরিণত করে। একপক্ষ “শৃঙ্খলা”, অন্যপক্ষ “বিশৃঙ্খলা”—এই সহজ গল্প আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে কার্যকর।


কিন্তু ইরানের পাল্টা বয়ানও সমান কৌশলী। যখন তারা সাইরাস, পারস্য, প্রাচীন সভ্যতা, ঐতিহাসিক মর্যাদা—এসব তুলে আনে, তখন তারা শুধু অতীত স্মরণ করছে না; বরং বলছে: “আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানে কেবল একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, একটি দীর্ঘ সভ্যতাগত ধারাবাহিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।”


এই ভাষা বিশেষ করে কার্যকর তখন, যখন সামরিক ভারসাম্য আপনার পক্ষে না থাকলেও প্রতীকী ও নৈতিক বৈধতা আপনার সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।


হরমুজ থেকে ইতিহাস: ইরানকে অবমূল্যায়নের ঝুঁকি


বর্তমান ভূরাজনীতিতে ইরানকে অনেক সময় কেবল দুইভাবে দেখা হয়—

একটি নিরাপত্তা সমস্যা, অথবা একটি ধর্মীয়-আদর্শিক সমস্যা হিসেবে। কিন্তু এই দুই ফ্রেম যথেষ্ট নয়।


ইরান নিজেকে দেখে একটি ঐতিহাসিক সত্তা হিসেবে। এই আত্মপরিচয়ই তাকে শুধু রাষ্ট্র হিসেবে নয়, অবরোধ-সহিষ্ণু সভ্যতা হিসেবে দাঁড় করায়। তাই তাকে কেবল সামরিক চাপ দিয়ে বোঝা যায় না। বরং তাকে অপমান করলে অনেক সময় তার অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ-পরিচয় আরও শক্তিশালী হয়।


এ কারণেই “প্রস্তর যুগে ফেরানো” ধরনের ভাষা রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। এগুলো কেবল হুমকি নয়; এগুলো প্রতিপক্ষকে সভ্যতাগত অপমানের বিরুদ্ধে একত্রিত করতেও পারে।


প্রস্তর যুগ থেকে সাইরাস সিলিন্ডার, সেখান থেকে আজকের হরমুজ—এই দীর্ঘ রেখাটি আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়: সভ্যতা কেবল প্রযুক্তির মাপ নয়, স্মৃতিরও মাপ।


কার হাতে বড় অস্ত্র আছে, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কে নিজের অতীতকে কীভাবে মনে রাখে, কে নিজেকে ইতিহাসে কোথায় বসায়—আধুনিক রাজনীতিতে সেটিও সমান শক্তিশালী।


ইরানকে “প্রস্তর যুগে” ফেরানোর ভাষা তাই শুধু যুদ্ধের ভাষা নয়; এটি স্মৃতি মুছে দেওয়ার ভাষা। আর সাইরাসের স্মৃতি তুলে আনা—তা যতই রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত হোক—সেটিও এক ধরনের জবাব: রাষ্ট্র ধ্বংস করা যায়, কিন্তু সভ্যতার স্মৃতি এত সহজে নয়।


তেলের রাজনীতি: এক অদৃশ্য অগ্নিগর্ভ হুমকি


সবচেয়ে চমকপ্রদ ও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যটি এসেছে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে। তিনি যখন বলেন, “বর্তমান ও প্রস্তর যুগের মধ্যে একটিই বড় পার্থক্য, তখন মধ্যপ্রাচ্যে কোনো তেল বা গ্যাস উত্তোলিত হতো না”- তখন তিনি কেবল ইতিহাসের কথা বলছেন না, বরং বর্তমান বিশ্বের জ্বালানি অর্থনীতির নাড়ি চেপে ধরেছেন।


এই বাক্যের নেপথ্যে থাকা হুমকিটি পরিষ্কার: যদি ইরানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয় বা 'প্রস্তর যুগে' পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তবে ইরানও বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণভোমরা 'তেল সরবরাহ' ব্যবস্থা অচল করে দেবে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে বা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের খনিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো বিশ্বই একটি অর্থনৈতিক 'প্রস্তর যুগে' বা অন্ধকার যুগে ফিরে যাবে। তেলের অভাব হলে আধুনিক যন্ত্রনির্ভর সভ্যতা মুহূর্তেই অচল হয়ে পড়বে। 

@ boikal


৩৩


এক দ্বীপে দুই দেশের উদাহরণ হল সাইপ্রাস। 

যদিও দেশ দুটো কিন্তু অথরিটি চারটা। দেশ দুটো হল উত্তর সাইপ্রাস ও দক্ষিণ সাইপ্রাস। এর মধ্যে উত্তর সাইপ্রাস একটি ডি ফ্যাক্টো স্বাধীন দেশ কিন্তু স্বীকৃতি নেই বললেই চলে, শুধু তুর্কি দেশটির স্বীকৃতি দিয়েছে। আর ম্যাপে দেখানো সবুজ এলাকা যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে, ও নীল এলাকা জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রীত বাফার জোন।

দ্বীপটি বড় না, ছোটই। যদিও ইউরোপে ধরা হয়, তবু অবস্থান এশিয়ারই বেশি ঘনিষ্ট বলা চলে।


সাইপ্রাস দ্বীপটি ঐতিহাসিকভাবে গ্রিক সাইপ্রিয়ট এবং তুর্কি সাইপ্রিয়ট এই দুই জাতিগোষ্ঠীর আবাসস্থল।

গ্রিক সাইপ্রিয়টরা দ্বীপটিকে গ্রিসের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিল (এনোসিস), আর তুর্কি সাইপ্রিয়টরা এর বিরোধিতা করে বিভাজন বা তুরস্কের সাথে একীভূত হতে চেয়েছিল (তাকসিম)। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাস ও সংঘাত দীর্ঘকাল ধরে বিদ্যমান ছিল।


বিভাজনের মূল কারণ হলো ১৯৭৪ সালে গ্রিক সামরিক জান্তার মদদে গ্রিক সাইপ্রিয়ট জাতীয়তাবাদীরা সাইপ্রাসের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট তৃতীয় মাকারিয়ুসকে উচ্ছেদ করে দ্বীপটিকে গ্রিসের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে।

গ্রিক অভ্যুত্থানের প্রতিক্রিয়ায়, ১৯৬০ সালের গ্যারান্টি চুক্তি অনুসারে সাংবিধানিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার অজুহাতে তুরস্ক দ্বীপের উত্তরাঞ্চলে সামরিক অভিযান চালায়।

এই অভিযানের ফলে দ্বীপটি কার্যত বিভক্ত হয়ে যায়। গ্রিক সাইপ্রিয়টরা উত্তর থেকে দক্ষিণে এবং তুর্কি সাইপ্রিয়টরা দক্ষিণ থেকে উত্তরে চলে যেতে বাধ্য হয়।


বর্তমান পরিস্থিতি:

বর্তমানে দ্বীপের উত্তর তৃতীয়াংশ (প্রায় ৩৭%) তুর্কি প্রজাতন্ত্রের উত্তর সাইপ্রাস (Turkish Republic of Northern Cyprus - TRNC) নামে তুরস্ক-সমর্থিত সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই অঞ্চলটিকে শুধুমাত্র তুরস্কই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

দ্বীপের বাকি অংশ সাইপ্রাস প্রজাতন্ত্র (Republic of Cyprus) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য।


জাতিসংঘ এলাকা ও ব্রিটিশ এলাকা কেন?


জাতিসংঘ বাফার জোন (Green Line):

জাতিসংঘের একটি এলাকা রয়েছে যা উত্তর ও দক্ষিণ সাইপ্রাসের মাঝখানে বাফার জোন (Buffer Zone) বা গ্রিন লাইন নামে পরিচিত।


কারণ: ১৯৭৪ সালের সামরিক সংঘাতের পর গ্রিক ও তুর্কি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ এড়াতে এবং শান্তি বজায় রাখতে এই নিরপেক্ষ অঞ্চলটি তৈরি করা হয়েছিল।

পরিচালনা: এটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী (UNFICYP) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং প্রায়শই এটি একটি "নো-ম্যান'স ল্যান্ড" হিসাবে বিবেচিত। রাজধানী নিকোসিয়াও এই বাফার জোনের মাধ্যমে বিভক্ত।


ব্রিটিশ সার্বভৌম বেস এলাকা (Sovereign Base Areas - SBAs):


সাইপ্রাস ভূখণ্ডে দুটি ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—আক্রোটিরি (Akrotiri) এবং ডেকিলিয়া (Dhekelia)। এই এলাকাগুলি ব্রিটিশ সার্বভৌম বেস এলাকা (SBAs) নামে পরিচিত।


কারণ: সাইপ্রাস ১৯৬০ সালে ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করার সময়, সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ব্রিটেন এই দুটি এলাকাকে চিরস্থায়ীভাবে নিজেদের সার্বভৌমত্বের অধীনে রেখে দেয়। স্বাধীন সাইপ্রাসকে দেয় নি।

উদ্দেশ্য: এই ঘাঁটিগুলি মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটেনের সামরিক কার্যক্রম এবং গোয়েন্দা তথ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান হিসেবে রেখে দিয়েছে। এই এলাকাগুলি সাইপ্রাস প্রজাতন্ত্র বা উত্তর সাইপ্রাস কোনোটিরই অংশ নয়। 

@ boikal


৩৪


বৃদ্ধ বয়সেও স্মৃতিশক্তি ধরে রাখার কৌশল।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্মৃতিশক্তি একটু একটু করে কমতে থাকে, এটা খুবই স্বাভাবিক। আপনি কোথায় গাড়ি পার্ক করেছিলেন বা আপনার প্রথম স্কুলের শিক্ষকের নাম কী ছিল—এসব কথা ৫০ বছর বয়সের তুলনায় ৮০ বছর বয়সে মনে করাটাও বেশ কঠিন। কিন্তু সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা এই নিয়মের একেবারে বাইরে! ৮০ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়স হলেও তাঁদের স্মৃতিশক্তি এমন তীক্ষ্ণ থাকে যে, কয়েক দশক কম বয়সী তরুণদের স্মৃতিও তাঁদের কাছে হার মানে। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এই অসাধারণ মানুষদের বলা হয় সুপারএজার।

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ইউনিভার্সিটির নিউরোসায়েন্টিস্ট এমিলি রোগালস্কি এই সুপারএজারদের নিয়েই একটি যুগান্তকারী গবেষণা চালাচ্ছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য, এই মানুষগুলোর মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে এত বছর পরও এতটা সতেজ থাকে, তা খুঁজে বের করা। এমিলি ও তাঁর দল ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছেন, সুপারএজারদের মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্স এবং হিপোক্যাম্পাস সাধারণ মানুষদের চেয়ে আকারে বড়। কিন্তু শুধু আকারই কি সব? নাকি এর পেছনে আরও কোনো গভীর রহস্য আছে?

এমিলির ভাষায়, ‘সুপারএজার হলেন এমন একজন ব্যক্তি, যাঁর বয়স ৮০-এর কোঠা পেরিয়েছে, কিন্তু তাঁর স্মৃতিশক্তি অন্তত ৫০ বা ৬০ বছর বয়সীদের সমান।’ তবে শুধু স্মৃতিশক্তি ভালো হলেই হবে না, তাঁদের মনোযোগ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও অন্তত তাঁদের বয়সের গড় মানুষের মতো হতে হবে। আপনি নিশ্চয়ই এমন কাউকে চেনেন, যাঁর বয়স হয়তো ৯০, কিন্তু কথা বললে মনে হয় তাঁর বয়স বড়জোর ৫০! এঁরাই হলেন সম্ভাব্য সুপারএজার।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটি করে, তা হলো স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া বা ভুলে যাওয়া। এই ভুলে যাওয়াটাই হলো আলঝেইমার রোগের প্রধান লক্ষণ। এমিলি বলেন, ‘আলঝেইমার গবেষণার দুটি দিক আছে। একটি হলো, মস্তিষ্কে কী সমস্যা হচ্ছে তা খুঁজে বের করা এবং তা ঠিক করার চেষ্টা করা। অন্যটি হলো, এমন মানুষদের খুঁজে বের করা, যাঁরা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি না হারিয়ে বরং তা আরও শাণিত করছেন।’

কীভাবে খুঁজে পাওয়া যায় এই সুপারএজারদের

সুপারএজারদের খুঁজে বের করাটা বেশ মজার। এমিলি ও তাঁর দল বিভিন্ন অবসরপ্রাপ্তদের কমিউনিটিতে গিয়ে সুস্থভাবে বয়স বাড়ার ওপর লেকচার দেন। সেখান থেকেই মূলত এই মানুষগুলোর খোঁজ মেলে। আবার অনেক সময় একজন সুপারএজার আরেকজন সুপারএজারকে খুঁজে বের করতে সাহায্য করেন। শুরুতে শুধু শিকাগো শহরে এই গবেষণা চললেও, এখন তা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পাঁচটি ভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চল, বর্ণ ও গোষ্ঠীর সুপারএজারদের ওপর গবেষণা করা সম্ভব হচ্ছে।

কীভাবে বোঝা যায় কেউ সুপারএজার

সুপারএজারদের বাছাই করার প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ। প্রথমে তাঁদের বেশ কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষা, জরিপ এবং ক্লিনিক্যাল সাক্ষাৎকার দিতে হয়। এরপর তাঁদের মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান করা হয় এবং জিনগত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে রক্ত নেওয়া হয়। মজার ব্যাপার হলো, অনেক সুপারএজারই জানতেন না যে তাঁদের স্মৃতিশক্তি এতটা অসাধারণ! যখন তাঁরা এটা জানতে পারেন, তখন তাঁদের গর্ব আর দেখে কে!

এমিলি জানান, এই মানুষগুলো গবেষণার সঙ্গে সারা জীবনের জন্যই যুক্ত হয়ে যান। প্রতি দুই বছর অন্তর তাঁরা ফলোআপের জন্য আসেন এবং প্রতি ছয় মাস পরপর ফোনে তাঁদের খোঁজখবর নেওয়া হয়। এমনকি মৃত্যুর পর গবেষণার জন্য তাঁরা নিজেদের মস্তিষ্ক দান করারও সম্মতি দিয়ে রাখেন।

মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট অংশে সাধারণ মানুষের তুলনায় সুপারএজারদের নিউরন চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি থাকে! মস্তিষ্কের এই অংশটি মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুর পর মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে কী পাওয়া যায়

মৃত্যুর পর সুপারএজারদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দারুণ কিছু তথ্য পেয়েছেন। সাধারণত আলঝেইমার রোগের জন্য দায়ী মনে করা হয় টাউ নামে একধরনের প্রোটিনকে, যা মস্তিষ্কে জট পাকিয়ে যায়। সুপারএজারদের মস্তিষ্কে এই টাউ প্রোটিনের পরিমাণ অনেক কম থাকে।

তবে সবচেয়ে বড় চমকটা অন্য জায়গায়! এমন অনেক সুপারএজার আছেন, যাঁদের মস্তিষ্কে আলঝেইমার রোগের প্রচুর জীবাণু বাসা বেঁধেছে। সাধারণ কোনো মানুষের মস্তিষ্কের এই অবস্থা দেখলে চিকিৎসকেরা বলতেন, তাঁর স্মৃতিশক্তি ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই সুপারএজারদের স্মৃতিশক্তির কোনো ক্ষতিই হয়নি! তাঁরা আলঝেইমার জীবাণু বয়ে নিয়েও দিব্যি সুস্থ জীবন যাপন করেছেন।

এর পেছনের রহস্যটা কী

তাহলে কি এঁদের জিনগত কোনো বিশেষত্ব আছে? এমিলির মতে, সুপারএজাররা জেনেটিক্যালি সাধারণ মানুষের চেয়ে খুব একটা আলাদা নন। তাহলে রহস্যটা কোথায়?

বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সুপারএজারদের মস্তিষ্কে ভন ইকোনোমো নামে একধরনের বিশেষ নিউরন বা স্নায়ুকোষের ছড়াছড়ি থাকে। মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট অংশে সাধারণ মানুষের তুলনায় সুপারএজারদের নিউরন চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি থাকে! মস্তিষ্কের এই অংশটি মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনোযোগ ছাড়া স্মৃতি তৈরি হওয়া অসম্ভব।

সাধারণত আলঝেইমার রোগের জন্য দায়ী মনে করা হয় টাউ নামে একধরনের প্রোটিনকে, যা মস্তিষ্কে জট পাকিয়ে যায়। সুপারএজারদের মস্তিষ্কে এই টাউ প্রোটিনের পরিমাণ অনেক কম থাকে।

জীবনযাপনের স্টাইল: ডায়েট নাকি অন্য কিছু

আপনি হয়তো ভাবছেন, সুপারএজাররা নিশ্চয়ই ঘড়ি ধরে স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং প্রচুর ব্যায়াম করেন। কিন্তু না! এমিলির গবেষণায় দেখা গেছে, সুপারএজারদের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে কোনো মিল নেই। অনেকেই বলেছেন, তাঁরা ছোটবেলায় প্রচুর বাইরের খাবার খেয়েছেন। ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও কেউ হয়তো হুইলচেয়ারে বসে হালকা হাত-পা স্ট্রেচ করেন, আবার কেউ হয়তো শত শত মাইল সাইকেল চালান।

তাহলে আসল জাদুমন্ত্রটা কী? এমিলি বলেন, ‘সুপারএজারদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে মিলটি আমরা দেখেছি, তা হলো তাঁরা সামাজিকভাবে প্রচণ্ড সক্রিয়।’

বয়স যখন ১০০ পার হয়ে যায়, তখন সমবয়সী বন্ধু বলতে আর কেউ বেঁচে থাকে না। তাই একাকীত্ব কাটানোর জন্য সুপারএজাররা নিজেদের চেয়ে অনেক কম বয়সী মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেন। কেউ হয়তো স্কুলে গিয়ে বাচ্চাদের সঙ্গে ভলান্টিয়ারিং করেন, আবার কেউ নিজের নাতি-নাতনিদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সময় কাটান।

সুপারএজারদের আরেকটি বড় গুণ হলো, তাঁদের মানসিক দৃঢ়তা। এঁদের জীবন যে খুব মসৃণ ছিল, তা নয়। কেউ হয়তো হলোকাস্ট বা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা পার করে এসেছেন, কেউ হয়তো খুব অল্প বয়সেই নিজের সন্তান হারিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা সব সময়ই বলে এসেছেন, ‘জীবন আমাকে যতই কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলুক না কেন, আমি ঠিকই ঘুরে দাঁড়াব।’

এমিলি বলেন, ‘সুপারএজারদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে মিলটি আমরা দেখেছি, তা হলো তাঁরা সামাজিকভাবে প্রচণ্ড সক্রিয়।’

সামাজিক মেলামেশা মস্তিষ্কের জন্য এত ভালো কেন

আমাদের মস্তিষ্ক সব সময় নতুন ও চ্যালেঞ্জিং কিছু করতে ভালোবাসে। আমরা যেমন ভারোত্তোলন করে মাংসপেশি মজবুত করি, তেমনি মস্তিষ্কের জন্যও এক্সারসাইজ দরকার। অপরিচিত বা নতুন মানুষের সঙ্গে কথা বলা বা আড্ডা দেওয়াটা মস্তিষ্কের জন্য দারুণ এক্সারসাইজ।

এমিলির একজন সুপারএজারের কথা খুব মনে পড়ে। তিনি নিজের নাতি-নাতনিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য তাদের যুগে ঢুকে গিয়েছিলেন। তিনি এমিলিকে বলেছিলেন, ‘ওরা তো আর ফ্রাঙ্ক সিনাত্রাকে চেনে না, তাই ওদের সঙ্গে কথা বলার জন্য আমাকে জানতে হয় টেইলর সুইফট বা চান্স দ্য র‍্যাপার শহরে কনসার্ট করতে আসছে কি না!’ এই প্রজন্মের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই তাঁদের মস্তিষ্ককে সচল রাখে।

আমাদের জন্য কী পরামর্শ

আমরা অনেক সময়ই ভাবি, আমাদের জিন ভালো না হলে হয়তো আমরা বেশি দিন সুস্থভাবে বাঁচতে পারব না। কিন্তু এমিলির মতে, জিনই সব নয়। আমাদের জীবনযাপনের স্টাইল একে অনেকটাই বদলে দিতে পারে।

আপনি যদি বৃদ্ধ বয়সেও সুপারএজারদের মতো তরতাজা মগজ পেতে চান, তবে এমিলির এই ছোট্ট পরামর্শটি মনে রাখতে পারেন: ‘আপনি হয়তো অফিস থেকে একা হেঁটে ফিরছেন। আপনার মনে হলো, কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনবেন নাকি কোনো পুরোনো বন্ধুকে ফোন করবেন? আমি বলব, বন্ধুকেই ফোন করুন!’

হ্যাঁ, সামাজিক যোগাযোগ এবং হাসি-আড্ডাই হতে পারে আপনার মস্তিষ্কের আসল তারুণ্যের চাবিকাঠি!

সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ইউনিভার্সিটির নিউরোসায়েন্টিস্ট এমিলি রোগালস্কি ।

World Vision (বিশ্ব দর্শন)



৩৫

কাজে উপস্থিত থেকেও ঘুমিয়ে পড়া।

জাপানে “ইনেমুরি (Inemuri)” নামে একটি শব্দ আছে। এর অর্থ মোটামুটি হলো—কাজ বা কোনো দায়িত্বের জায়গায় উপস্থিত থেকেও ঘুমিয়ে পড়া।

অফিসের ডেস্কে একটু তন্দ্রা যাওয়া থেকে শুরু করে ট্রেনে বসে ঘুমিয়ে পড়া—সবই এর মধ্যে পড়ে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এটাকে সবসময় অলসতা বা দায়িত্বহীনতা হিসেবে দেখা হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি এমন একজন মানুষের চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়, যিনি এতটাই পরিশ্রম করেছেন যে শরীর আর বিশ্রাম ছাড়া থাকতে পারছে না।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ব্রিজিট স্টেগার (Brigitte Steger) বহু বছর ধরে ‘ইনেমুরি’ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, জাপানের কঠোর কর্মসংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে এই অভ্যাসের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

তাহলে আপনার কর্মস্থলে যদি ন্যাপ পড বা ঘুমানোর ছোট্ট জায়গা থাকে—আপনি কি সেটিকে স্বাগত জানাবেন?

নাকি আপনার কাছে এটি শুধু বার্নআউটকে একটু আরামদায়কভাবে মেনে নেওয়ার আরেক নাম?

সূত্র: BBC, Amusing Planet


৩৬


মালদ্বীপ যেভাবে ইসলামের আলোয় আলোকিত হলো...

আমাদের প্রতিবেশি দেশ মালদ্বীপ খুব জাঁকজমকভাবে দেশটির ইসলাম গ্রহণের ৯০০ হিজরি বছর পূর্তি উদযাপন করছে। সরকারি হিসাবে মালদ্বীপ ইসলাম গ্রহণ করে ৫৪৮ হিজরি / ১১৫৩ খ্রিস্টাব্দে। সেই হিসেবে, চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে মালদ্বীপ এই ঐতিহাসিক মাইলফলক উদযাপন করছে।

মালদ্বীপ দেশটি মূলত ভারত মহাসাগরের ছোট ছোট দ্বীপের সমষ্টি। ইসলাম আসার আগে সেখানে প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ছিল। তবে আরব, ভারতীয় উপমহাদেশ ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। ফলে ইসলাম গ্রহণের আগেই মুসলিম ব্যবসায়ী ও নাবিকদের সঙ্গে মালদ্বীপের যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক গবেষণায় উল্লেখ আছে।

মালদ্বীপের প্রচলিত সরকারি ইতিহাস অনুযায়ী, ১১৫৩ সালে মালদ্বীপের তৎকালীন রাজা ধোভেমি কালামিঞ্জা ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর নাম হয় সুলতান মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ এবং তিনি তাঁর প্রজাদের ইসলাম গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর মধ্য দিয়েই মালদ্বীপে ইসলামী সালতানাতের যুগ শুরু হয়।

তবে মালদ্বীপ সরকার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটিকে সাধারণত আবু আল-বারাকাত ইউসুফ আল-বারবারি নামের এক মুসলিম সাধক ও দাঈর সঙ্গে যুক্ত করে। এক্ষেত্রে বলা দরকার যে, মালদ্বীপের সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিক কিংবদন্তিগুলোর একটি হলো “রান্নামারি”। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, একটি সমুদ্র-দানবকে শান্ত রাখার জন্য প্রতি মাসে একজন কুমারী মেয়েকে উৎসর্গ করা হতো। আবু আল-বারাকাত একবার সেই মেয়েটির পরিবর্তে নিজে সেখানে যান এবং রাতে কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকেন। পরদিন কথিত সেই দানব আর ফিরে আসেনি। এরপর রাজা ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইসলাম গ্রহণের পর মালদ্বীপের রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইন, রাজপরিবারের উপাধি, স্থাপত্য এবং সামাজিক জীবনে ইসলামের গভীর প্রভাব পড়ে। দেশটি দীর্ঘ সময় ইসলামী সালতানাত হিসেবে পরিচালিত হয়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মসজিদ, ইসলামি শিক্ষা ও স্থানীয় ইসলামী সংস্কৃতি মালদ্বীপের সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

এই ঘটনাটি ঘটে

৫৪৮ হিজরি = ১১৫৩ খ্রিস্টাব্দ

৫৪৮ হিজরি থেকে ১৪৪৮ হিজরি:

১৪৪৮ − ৫৪৮ = ৯০০ হিজরি বছর

অর্থাৎ ২০২৬ সালে মালদ্বীপ ৯০০ হিজরি বছর পূর্তি পালন করছে। দেশটিতে প্রতি বছর ইসলাম গ্রহণের দিবসটি ইসলামী ক্যালেন্ডারের ২ রবি‘উস সানি তারিখে স্মরণ করা হয়। এবারের আয়োজন শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠান নয়; মালদ্বীপ সরকার এক বছরব্যাপী কর্মসূচি নিয়েছে। পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে কুরআন তিলাওয়াত উৎসব, ইসলামি ইতিহাসের জাদুঘর/গ্যালারি, ইসলামি ক্যালিগ্রাফি উৎসব, একাডেমিক আয়োজন এবং ঐতিহাসিক ইসলামি স্থাপত্য প্রদর্শন। এরই অংশ হিসেবে, গত

১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ হুলহুমালে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৯০০ হিজরি বছর পূর্তি স্মরণ করা হয় এবং এক বছরের জন্য আনুষ্ঠানিক লোগো ও স্লোগান উন্মোচন করা হয়।@মায়া


৩৭


নতুন পরিবেশে যান, তখন সেখানকার মানুষকে বুঝতে পারা

যখন আপনি কোনো নতুন অফিস, কলেজ বা যেকোনো নতুন পরিবেশে যান, তখন সেখানকার মানুষকে বুঝতে পারা খুব জরুরি। কে কেমন, কার সাথে কার সম্পর্ক, এখানকার আসল নিয়মকানুন কী – এগুলো না জানলে মানিয়ে নেওয়া কঠিন। এর জন্য একটা দারুণ কৌশল আছে, যাকে আমরা বলি 'নীরব গুপ্তচর' কৌশল।

এটা কোনো জটিল কাজ নয়, বরং স্মার্টলি সবকিছু খেয়াল করা। প্রথমত, কম কথা বলুন আর বেশি শুনুন। সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, কিন্তু নিজে বেশি মন্তব্য করবেন না। মানুষ যখন কথা বলে, তখন তাদের ভেতরের অনেক খবর বেরিয়ে আসে।

দ্বিতীয়ত, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখুন। কে কার সাথে কথা বলার সময় কেমন ব্যবহার করছে? কেউ কি নার্ভাস, নাকি আত্মবিশ্বাসী? চোখাচোখি করছে কি না? হাত বা পায়ের ভঙ্গি কেমন? এগুলো আপনাকে মানুষের আসল মনোভাব বুঝতে সাহায্য করবে।

তৃতীয়ত, গ্রুপ ডাইনামিকস বুঝুন। একটা গ্রুপে কে নেতা, কে তার কথা মেনে চলে, কে চুপচাপ থাকে, আর কে মজা করে – এই বিষয়গুলো খেয়াল করুন। কে বেশি কথা বলছে, আর কার কথায় অন্যরা গুরুত্ব দিচ্ছে – এটা বুঝতে পারলেও ভেতরের ক্ষমতা সম্পর্কটা ধরতে পারবেন।

চতুর্থত, ছোট ছোট ঘটনা লক্ষ্য করুন। কেউ একজন মজার কথা বলল, কে হাসলো, কে চুপ করে থাকলো? কারো উপর রাগ দেখালে কার কেমন প্রতিক্রিয়া হলো? এই ছোটখাটো ঘটনাগুলোই আপনাকে সবার আসল চরিত্র আর সম্পর্কগুলো বুঝিয়ে দেবে।

পঞ্চমত, তাড়াহুড়ো করবেন না। প্রথমে শুধু অবজার্ভ করুন। নিজেকে সবার সাথে মিশিয়ে দিন, কিন্তু চোখকান খোলা রাখুন। মোবাইল ঘাঁটার ভান করে বা অন্য কোনো কাজ করতে করতেও আপনি অনেক কিছু খেয়াল করতে পারেন।

এই কৌশল আপনাকে ওই পরিবেশের অদৃশ্য নিয়মকানুনগুলো বুঝতে সাহায্য করবে। আপনি জানবেন কার সাথে কেমন ব্যবহার করতে হবে, বা কোন বিষয়ে কথা বলা ঠিক হবে। এতে নতুন পরিবেশে আপনার মানিয়ে নেওয়া এবং সফল হওয়া অনেক সহজ হবে।

নতুন জায়গায় গিয়ে মানিয়ে নিতে সমস্যা হচ্ছে? সবার ভেতরটা বুঝতে চান কিন্তু বুঝতে পারছেন না কিভাবে? এই 'নীরব গুপ্তচর' কৌশলটি ফলো করুন আর অনায়াসে সবার মন জয় করুন।  @মায়া



৩৮



গ্রে রাইনো ইফেক্ট

ঘন জঙ্গলে এক হরিণ শান্তমনে শিশিরভেজা সবুজ ঘাস খাচ্ছিল। ঠিক তখনই কিছুটা দূরে সে দেখতে পেল এক বিশাল গণ্ডারকে হেঁটে বেড়াতে।

*"অনেক দূরে তো আছে, এখনই কী ভয়?"*—এই ভেবে হরিণটি বিপদকে পাত্তাই দিল না। মুখের ঘাসটুকু ফেলে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনও বোধ করল না। নিশ্চিন্তে সে খেয়েই চলল।

আর ঠিক তখনই—গণ্ডারটি হঠাৎ পূর্ণ গতিতে ছুটে এল তার দিকে!

হরিণটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, ভারী পায়ের তলায় পিষে গেল তার শরীর—**আর তার মুখে তখনও অর্ধেক ঘাস চাপা পড়ে ছিল।**

** এটাই "গ্রে রাইনো ইফেক্ট"**

মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় **"গ্রে রাইনো ইফেক্ট"**। অর্থাৎ, যে বিপদ আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট দেখা যায়, তা সত্ত্বেও আমরা সেটাকে অগ্রাহ্য করতে থাকি—যতক্ষণ না সেই বিপদ একদম সামনে এসে দাঁড়ায়, ততক্ষণ কোনো পদক্ষেপ নিই না।

** আমাদের জীবনেও ঠিক এমনটাই ঘটে**

আমরা জানি—রাত জেগে থাকলে শরীর ভেঙে পড়বে, তবুও অনর্থক রিলস স্ক্রল করেই চলি।

আমরা জানি—সঙ্গী বারবার প্রতারণা করছে, তবুও মিথ্যে আশায় টিকে থাকি।

আমরা জানি—এই চাকরিতে কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তবুও আরামের মোহে দিন গুনতে থাকি।

**বিপদ চোখের সামনেই থাকে, শুধু আমরা তাকে "দূরের" মনে করে অবহেলা করি।**

** সতর্কবার্তা**

যে বিপদকে আপনি বারবার এড়িয়ে চলছেন, সেটাই আসলে আপনার মাথার ওপর ঝুলে থাকা এক টাইম বোমা। তাই—

বিপদের জন্য অপেক্ষা করবেন না

যেসব অভ্যাস আপনার সময় নষ্ট করছে, তার ওপর কাজ শুরু করুন

যারা আপনার এনার্জি শুষে নেয়, তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন

নিজের ভবিষ্যতের জন্য আজই পদক্ষেপ নিন

** মনে রাখবেন**

আজ যে সমস্যাটাকে "ছোট" মনে হচ্ছে, কালই সেটা হয়ে উঠতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ।

**তাই বিপদের জন্য অপেক্ষা করবেন না—সময় থাকতেই তাকে চিনুন, আর আজই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।**

কারণ যে গণ্ডার "দূরে" মনে হয়, সে যেকোনো মুহূর্তে আপনার সামনে চলে আসতে পারে—আর তখন হয়তো আর কিছু করার থাকবে না।

@ gayan



৩৯


**"হোয়াইট উইজল ইফেক্ট"** 

যখন কোনো মানুষ নিজের মিথ্যা জাঁকজমক আর লোকদেখানো ইমেজের দাসে পরিণত হয়, তখন সে নিজের হাতেই নিজের উন্নতির পথ বন্ধ করে দেয়।

আজ আমাদের চারপাশেও এমন অনেক মানুষ আছেন

হাতে ডিগ্রি আছে, কিন্তু মাসের পর মাস বেকার বসে আছেন। ঋণের বোঝা বাড়ছে, ছোট কাজের সুযোগ সামনে আছে, তবুও মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়—

*"আমি তো অফিসে বসে কাজ করার মানুষ, এই খাটুনি করব কী করে? আত্মীয়-বন্ধুরা কী ভাববে?"*

এই মিথ্যা মান-সম্মানের চক্করে পড়ে মানুষ তলিয়ে যায় ঋণের সাগরে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দামি কফির ছবি আপলোড হয়, অথচ বাস্তবে ব্যাংকের রিকভারি কলের রিংটোনেই বুক কেঁপে ওঠে!

       সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য

কাউকে ধ্বংস করার জন্য তাকে নিচে ফেলে দেওয়ার দরকার নেই। শুধু তার মনে মিথ্যা অহংকার আর লোকদেখানোর মানসিকতা ভরিয়ে দিন—**সে নিজেই নিজের সব পথ বন্ধ করে দেবে।**

** তাহলে কী করণীয়?**

বন্ধু, মনে রাখবেন—যখন সময় খারাপ যায়, তখন লোকদেখানো বন্ধ করে দিন।

**কোনো সৎ কাজই ছোট নয়।**

স্যুট-প্যান্ট পরে খালি পকেটে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে অনেক ভালো সেই ছোট্ট কাজ, যা আপনার ঘরের চুলা জ্বালিয়ে রাখতে পারে।

গায়ে কাদা লাগলে কী এসে যায়? যতক্ষণ আপনি পরিশ্রম করছেন, আর পকেটে সৎ উপার্জন আছে—ততক্ষণ জেনে রাখুন, **প্রকৃত সম্মান অর্জন করে নিতে হয়, দেখিয়ে নয়।**

** শেষ কথা **

জীবনে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় জয়। মিথ্যা অহংকারের কাদা-ভয়ে নিজের প্রাণ, নিজের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দেবেন না। বাস্তবতাকে মেনে নিন, পরিশ্রম করুন—কারণ আসল সাফল্য লুকিয়ে আছে বিনয় আর অধ্যবসায়ের মধ্যেই, লোকদেখানো চাকচিক্যে নয়।

@ gayan


৪০


এস্কেলেশন অব কমিটমেন্ট

পানির নিচে একটি কুমির শিকার করতে গিয়ে চেপে ধরল একটি লম্বা ইলেকট্রিক ইলকে। তার মনে হয়েছিল—এ তো আর দশটা শিকারের মতোই সাধারণ একটা শিকার! কিন্তু পরের মুহূর্তেই ঘটল ভয়ংকর কিছু। ৮০০ ভোল্টের কারেন্ট ছড়িয়ে পড়ল কুমিরের শরীরে। এত যন্ত্রণা পাওয়ার পর যেকোনো প্রাণীর উচিত ছিল শিকার ছেড়ে পালানো। কিন্তু প্রকৃতি কুমিরকে দিয়েছিল এক ভয়ানক দুর্বলতা—

যত বেশি যন্ত্রণা হয়, তার চোয়াল তত বেশি শক্ত হয়ে লক হয়ে যায়! আর যত শক্ত হয় সেই ধরা, ইলও তত বেশি কারেন্ট ছাড়তে থাকে।

শেষমেশ ইলের শরীর ভেঙে পড়ল, আর কুমির ততক্ষণে ভেতর থেকে পুড়ে কালো হয়ে গেছে। দুটো লাশই ধীরে ধীরে ডুবে গেল কাদার মধ্যে।

এই গল্প আমাদের কী শেখায়?

মনোবিজ্ঞানে একে বলে "এস্কেলেশন অব কমিটমেন্ট"।

আমরাও অনেক সময় বুঝে যাই—"এই পথটা ভুল, এই সম্পর্কটা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে, এই কাজটা আমার জন্য নয়।" কিন্তু তারপরও আমরা ছাড়তে পারি না। কেন?

কারণ আমরা ইতিমধ্যে অনেক কিছু বিনিয়োগ করে ফেলেছি—সময়, শ্রম, আবেগ।

"এতদিন ধরে করছি, এখন ছাড়লে সব বৃথা যাবে"—এই ভাবনাই আমাদের আটকে রাখে যন্ত্রণার মধ্যে, ঠিক যেমন কুমিরের চোয়াল লক হয়ে গিয়েছিল।

কুমিরকে ইল মারেনি। তাকে মেরেছিল তার নিজের জেদ—ভুল জিনিস ছাড়তে না পারার অক্ষমতা।

কিন্তু মানুষ তো কুমির নয়! মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—সে তার ভুল ধরা চিনতে পারে, আর নিজেই নিজের হাত খুলে দিতে পারে।

মনে রাখবেন—প্রতিটি লড়াই জেতার জন্য লড়া হয় না।

কিছু লড়াই ছেড়ে দিতে হয়, যাতে আপনি নিজেকে হারিয়ে না ফেলেন। কিছু সম্পর্ক, কিছু অভ্যাস, কিছু সিদ্ধান্ত—যতই বিনিয়োগ করা থাকুক না কেন, যেদিন বুঝবেন এটা ভুল পথ, সেদিনই ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃত সাহস।

নিজেকে বাঁচানোর জন্য মাঝে মাঝে হাত খুলে দেওয়াটাই সবচেয়ে বড় জয়।

@ gayan



৪১


প্রতিদান ছাড়া সবকিছু বারবার করা

পিঁপড়েদের দলে একটি অত্যন্ত পরিশ্রমী পিঁপড়ে ছিল। যেখানে বাকি পিঁপড়েরা ১টি করে দানা বইত, সেখানে সে একাই ৩-৩টি করে দানা তুলে নিত! অন্য সবাই যখন বিশ্রাম করত, সে তখনও একটানা কাজ করে যেত।

‎শুরুতে তার এই কাজ দেখে সঙ্গীরা খুব প্রশংসা করল এবং তাকে চরম ভরসাযোগ্য মনে করল। কিন্তু ধীরে ধীরে ঘটল এক তিতো পরিবর্তন! বাকি পিঁপড়েরা অলস হয়ে পড়ল এবং নিজেদের শস্যের দানাগুলোও তার সামনে এনে ফেলতে লাগল—কারণ তারা জানত, কাজটা শেষ পর্যন্ত তাকেই করতে হবে!

‎একদিন অতিরিক্ত খাটনিতে প্রচণ্ড ক্লান্তিতে চুরমার হয়ে পিঁপড়েটি মাটিতে পড়ে গেল। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা দেখুন—পিঁপড়েদের দলটি তার জন্য একবারের জন্যও থামল না! কেবল তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেল এবং কাজ চালিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন আরেকটা পিঁপড়ে খুঁজে নিল!

‎ আমাদের বাস্তব জীবনের এক নির্মম সত্য:

‎প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আত্মত্যাগ করা মানুষের পরিণতিও ঠিক এমনটাই হয়:

‎প্রথমবার সাহায্য করলে: মানুষ মন থেকে ধন্যবাদ জানায়।

‎দ্বিতীয়বার সাহায্য করলে: সেটাকে তাদের অধিকার বা অভ্যাস বানিয়ে নেয়।

‎তৃতীয়বার মানা করে দিলে: অসন্তুষ্ট হয়ে বলে—"তুমি কতটা বদলে গেছ!"

‎ মনোবিজ্ঞানের একটি তিতো নিয়ম:

1. ‎বিনামূল্যে সেবার অবমূল্যায়ন: আপনি যখন কারো জন্য সবসময় কোনো প্রতিদান ছাড়া সবকিছু করে যাবেন, মানুষ ভবিষ্যতে সেটাকে আপনার ভালোমানুষি না ভেবে আপনার 'দায়িত্ব' ধরে নেবে।

2. ‎সব পরিশ্রম সম্মান আনে না: কিছু পরিশ্রম কেবল অন্যদের আলসেমি এবং সুযোগসন্ধানী মানসিকতা বাড়ায়।

3. ‎নিজের মূল্য বুঝুন: নিজের মূল্য প্রমাণ করার জন্য নিজেকে তিল তিল করে ক্ষয় করা বন্ধ করুন। যে মানুষটি সত্যিই আপনার গুরুত্ব বোঝে, সে কখনো সমস্ত বোঝা একা আপনার কাঁধে চাপিয়ে দেবে ।

‎@ gayan



৪২



"প্রজেকশন ইফেক্ট"

একটি কাক ভাবত, তার কর্কশ ডাক-ই পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি সুর! তাই প্রতিদিন সকালে সে কৃষকের বাড়ির কুল গাছে বসে, ঘুমন্ত শিশুর দোলনার পাশে জোরে জোরে "কা-কা" ডাকত। তার বিশ্বাস ছিল—এই "উপকারের" বদলে হয়তো কিছু শস্য উপহার পাবে।

কিন্তু গৃহকর্তার কাছে এটা উপকার নয়, ছিল বিরক্তি। শিশুর ঘুম ভাঙানো এই ডাক তার সহ্য হলো না। গুলতি হাতে নিয়ে সোজা নিশানা—কাকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, শেষ মুহূর্তে ভাবতে ভাবতে, "আমি তো উপকারই করলাম, তাহলে এই প্রতিদান কেন?"

**গল্পটা শুধু কাকের নয়, আমাদেরও।**

মনোবিজ্ঞানে একে বলে "প্রজেকশন ইফেক্ট"। আমরাও প্রায়ই এই কাকের মতোই ভুল করি—

নতুন কারো সাথে পরিচয় হলেই দ্রুত বিশ্বাস করে ফেলি, মনের সব কথা উজাড় করে বলে দিই। ভেবে নিই, "ও নিশ্চয়ই আমার মতোই ভাববে।" কিন্তু পরে দেখা যায়, আমাদের সেই ব্যক্তিগত কথাগুলোই হয়ে দাঁড়ায় অন্যের হাসির খোরাক।

আমরা ধরে নিই—সামনের মানুষটা ঠিক আমার মতোই ভাবছে। তারপর তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি আচরণ নিজের প্রত্যাশার ছাঁচে ফেলে অর্থ বের করতে থাকি।

**অথচ সত্যিটা হলো—**

প্রতিটি মানুষের ভাবনা, অনুভূতি, দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। কেউই বাধ্য নয় আপনার মতো করে ভাবতে।

অনেক সম্পর্ক ভাঙে না অন্যের দোষে—ভাঙে আমাদের নিজের ভুল ধারণার কারণে।

তাই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে একবার থামুন, ভাবুন—

এটা কি সত্যিই বাস্তব, নাকি শুধুই আমার মনের প্রতিফলন?

মনে রাখবেন: **আপনার কাছে যা সত্য মনে হয়, তা সবসময় সত্যি হয় না।**

‎@ gayan



৪৩



Unnecessary Friction

একবার আকাশে শান্তমনে ডানা মেলে উড়ছিল একটি চিল। হঠাৎ কোথা থেকে একটি কাক এসে চিলের মাথায় একের পর এক ঠোকর মারতে শুরু করল! সাধারণভাবে মনে হতে পারে, চিলটি হয়তো ঘুরে দাঁড়িয়ে কাকটিকে পাল্টা আক্রমণ করবে। কিন্তু আকাশের রাজা চিলটি তা না করে এক অদ্ভুত কাজ করল—সে কাকের দিকে কোনো নজরই দিল না! সে কেবল নিজের উড্ডয়ন আরও উঁচুতে নিয়ে যেতে শুরু করল।

‎যেমন যেমন চিলটি ওপরের দিকে উঠতে লাগল, তেমনই ধীরে ধীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকল এবং তাপমাত্রা প্রচণ্ড কমে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চরম উচ্চতায় টিকে থাকা কাকটির জন্য অসম্ভব হয়ে উঠল। সে নিজের ডানা গুটিয়ে নিল এবং সোজা নিচে আছড়ে পড়ল!

‎ সাইকোলজির ভাষায় একে বলা হয়: "Unnecessary Friction" (অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়ানো)

‎আমাদের বাস্তব জীবনেও আমরা প্রতিনিয়ত এমন অনেক "কাক"-এর মুখোমুখি হই—যারা কেবল অহেতুক সমালোচনা করে, অনর্থক ঝগড়া করে এবং আপনার মনোযোগ নষ্ট করতে চায়।

‎ এই গল্প থেকে জীবনের ৩টি বড় শিক্ষা:

1. ‎সবাইকে জবাব দেওয়া জরুরি নয়: ছোটখাটো বিষয়ে বা বেকার মানুষের তর্কে জড়ানো মানে আপনার মূল্যবান সময় ও মানসিক শান্তি নষ্ট করা।

2. ‎মারামারি নয়, উচ্চতাই উত্তর: কাউকে হারানোর সবচেয়ে সেরা উপায় তার সাথে লড়াই করা নয়; বরং নিজেকে এত উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া—যাতে সে আপনা-আপনিই পেছনে পড়ে যায়!

3. ‎নিজের লক্ষ্যে ফোকাস রাখুন: যদি আপনি সবার উস্কানিতে কান দিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাতে থাকেন, তবে নামতে নামতে একসময় নিচে গিয়েই পড়বেন। চিলের মতো নিজের উড্ডয়ন উঁচুতে বজায় রাখুন, বাঁধাগুলো একা একাই ঝরে যাবে।

‎ কথা একটাই: অহেতুক তর্কে নিজের শক্তি নষ্ট না করে, শান্তভাবে নিজের উঁচুতে ওঠার যাত্রায় মন দিন!

‎ আজ থেকে জীবনের অপ্রয়োজনীয় সংঘাত বা 'Unnecessary Friction' এড়িয়ে চলবেন তো?

‎@ gayan



৪৪



প্রকৃত ভালোবাসা মানে আগলে রাখা, বেঁধে রাখা নয়

একটা মুরগি একদিন নর্দমার পাশে একটা ব্যাঙকে একা পড়ে থাকতে দেখল। তার মনে হলো, "বেচারা কত একা, কত বিষণ্ণ!" ভালোবাসার তাগিদে সে জোর করে ব্যাঙটাকে তুলে নিয়ে এলো নিজের উষ্ণ, নিরাপদ বাসায়।

কিন্তু ব্যাঙটা তো কাদা-জলেই সুখী ছিল। নিজের চেনা জগৎ থেকে হঠাৎ ছিনিয়ে নেওয়ায় সে অস্বস্তিতে ছটফট করতে লাগল, বমি করতে লাগল।

**সবচেয়ে করুণ অংশটা এখানেই**

মুরগি ভাবল, ব্যাঙটা বুঝি আনন্দেই এমন করছে, খুশিতে আত্মহারা! তাকে আরও বেশি উষ্ণতা দেওয়ার জন্য সে তার ওপর বসে পড়ল। কিন্তু সেই ভালোবাসার চাপ সহ্য করতে না পেরে দমবন্ধ হয়ে ব্যাঙটার মৃত্যু হলো।

মুরগি কেঁদে উঠল, বলল, "আমি তো শুধু চেয়েছিলাম, তুমি যেন কখনো একা না থাকো!"

**এই গল্পটা আসলে আমাদেরই গল্প**

মনোবিজ্ঞানে একে বলে **"কম্প্যানিয়ন কিডন্যাপিং"** — এখানে কোনো শত্রুতা নেই, আছে শুধু ভালোবাসার নামে নিজের ইচ্ছেকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া।

আমাদের চারপাশেও কি এমনটা ঘটে না? বাবা-মা সন্তানের জন্য, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য, বন্ধু বন্ধুর জন্য — সবাই ভাবেন, "আমি যা ভালো মনে করি, সেটাই তো ওর জন্যও ভালো হবে।" কিন্তু ভুলে যাই, প্রতিটা মানুষের চাহিদা, পছন্দ, আর স্বস্তির জায়গা সম্পূর্ণ আলাদা।

**তাহলে প্রকৃত ভালোবাসা কেমন?**

প্রকৃত ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের ছাঁচে ঢেলে ফেলা নয়। প্রকৃত ভালোবাসা মানে তার স্বাধীনতাকে সম্মান করা, তার পছন্দকে বুঝতে চেষ্টা করা — এমনকি যদি সেটা আমাদের চেনা পথের বাইরেও হয়।

কারণ কখনো কখনো, আমরা যাকে ভালোবাসা বলে মনে করি এবং জোর করে চাপিয়ে দিই, সেটাই সামনের মানুষটার কাছে হয়ে দাঁড়ায় এক নিঃশব্দ দমবন্ধ যন্ত্রণা। মনে রাখবেন — ভালোবাসা মানে আগলে রাখা, বেঁধে রাখা নয়।

‎@ gayan



৪৫



সঞ্চয় যখন ধ্বংসের কারণ

‎আপনি কি বিশ্বাস করতে পারেন যে একটি হ্যামস্টার অর্থাৎ বুনো ইঁদুর নিজেরই কষ্টে জমা করা খাবারের কারণে জীবন্ত চাপা পড়ে গেল?

ইঁদুরটির গর্তে শীতকালের জন্য আগে থেকেই প্রচুর খাবার জমানো ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে খাবার জমা করা বন্ধ করেনি। সে মাটিতে পড়ে থাকা সমস্ত শস্য আর বীজ কুড়িয়ে আনল এবং জবরদস্তি নিজের গর্তে ঠেসে ঠেসে স্তূপ তৈরি করতে লাগল। গর্তের ভিতরের জায়গা পুরোপুরি ভরে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও সে থামতে প্রস্তুত ছিল না।

যখন রাখার মতো আর কোনো জায়গা রইল না, তখন সে শস্যের স্তূপকে চেপে চেপে ফাঁকফোকরে জায়গা বানিয়ে সেগুলোতেও খাবার ভরতে থাকল। তার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে যত বেশি জিনিস থাকবে, তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও তত বেশি হবে। সে ক্রমাগত শস্য জমা করতেই থাকল এবং গর্তের খালি জায়গা ভরাতে থাকল। এমনকি খাবারের স্তূপ গর্তের একমাত্র যাওয়ার রাস্তাটাও পুরোপুরি বন্ধ করে দিল।

এখন সে আর বাইরে বেরোতে পারছিল না। তাকে খাবার জমা করা বন্ধ করতে হলো, কিন্তু সে আরাম করাও ছেড়ে দিল। সে দিনরাত শস্যের স্তূপের পাশে বসে থাকত এবং এক মুহূর্তের জন্যও সেখান থেকে দূরে যেত না। কিছু সময় পর বন্ধ গর্তে বাতাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল, যার ফলে ভিতরের সমস্ত অক্সিজেন শেষ হয়ে গেল। বেঁচে থাকার জন্য পাগলের মতো খাবার জমা করা সেই ইঁদুরটি অবশেষে নিজেরই জমা করা খাবারের স্তূপের মাঝে দম আটকে মারা গেল। একে সাইকোলজিতে 'হ্যামস্টার হোর্ডিং এফেক্ট' (Hamster Hoarding Effect) বলে।

মানুষকে ধ্বংস করার জিনিস সব সময় সম্পদের অভাব হয় না; বহু সময় প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পরেও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জিনিস ক্রমাগত জমা করতে থাকার অভ্যাসই মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

আজ এই অভ্যাস আমাদের ডিজিটাল জীবনেও দেখা যায়। আমরা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পিডিএফ, স্ক্রিনশট, ভিডিও আর ই-বুক ক্রমাগত সেভ করতে থাকি, কিন্তু পরে সেগুলো খুলে পর্যন্ত দেখি না। ধীরে ধীরে এমন বেকার তথ্য আমাদের ফোনের মেমোরিই নয়, মস্তিষ্কও ভরিয়ে দেয় এবং আমাদের সময়, মনোযোগ আর মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়।

মনে রাখবেন, জীবনে প্রতিটি জিনিস জমা করা জরুরি নয়। যে জিনিসগুলো কোনো কাজের নয় এবং শুধু আপনার সময় আর শান্তি কেড়ে নেয়, সেগুলোকে ছেড়ে দিতে শিখুন। কারণ অহেতুক জমা করা জিনিস একদিন আশ্রয় হওয়ার বদলে নিজেই বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

‎@ gayan



৪৬



'ইগো কনফ্লিক্ট' 

এক কৃষক দুটো ঘোড়াকে একটা ভারী কাঠের গুঁড়ি দিয়ে একসাথে বেঁধে দেয়। একপাশে সবুজ ঘাস আর অন্যদিকে পরিষ্কার জল। না তাদের দিয়ে কোনো কাজ করানো হচ্ছে, আর না তাদের মারা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও কিছুক্ষণ পর দুটো ঘোড়াই ক্লান্ত হয়ে নিচে পড়ে যায়।

জানেন কেন? একটা ঘোড়ার খুব খিদে পেয়েছিল তাই সে সবুজ ঘাসের দিকে টানছিল, আর অন্য ঘোড়াটার খুব তেজ তৃষ্ণা পেয়েছিল তাই সে জলের দিকে টানছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউই প্রথমে অন্যের দিকে এক পা বাড়াতে রাজি ছিল না। দুজনেই নিজেদের সব শক্তি এগিয়ে যাওয়ার কাজে নয়, বরং একে অপরের বিরুদ্ধে লাগাতে ব্যস্ত ছিল এবং শেষে ক্লান্ত হয়ে দুজনেই নিচে পড়ে যায়।

সাইকোলজিতে এটাকে 'ইগো কনফ্লিক্ট' (Ego Conflict) বলে। আমি তোর দিকে কেন যাব? কেবল এই চিন্তাই দুজনকে এগিয়ে যেতে দিচ্ছে না। কিন্তু ইগো কি শুধু ঘোড়াদের মধ্যেই আছে? আমাদের ভেতরেও দেখুন কত ইগো।

কখনো ভেবে দেখেছেন? একই বাড়িতে থাকি, কিন্তু অনেক সময় একসাথে থাকতে পারি না। আর বিজনেসেও ঠিক এটাই হয়। দুজন বিজনেস পার্টনারের লক্ষ্য একটাই থাকে—ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

কিন্তু যখন মতবিরোধ তৈরি হয়, তখন ফোকাস বিজনেস গ্রো করা থেকে সরে গিয়ে এই কথার ওপর চলে আসে: আমার কথা ঠিক নাকি তোমার। তারপর দুজনেই নিজেদের এনার্জি প্রবলেম সলভ করার বদলে একে অপরকে ভুল প্রমাণ করতে লাগিয়ে দেয়।

যখন কোনো মতবিরোধ আসে, তখন একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করার বদলে আমরা আমাদের সমস্ত চেষ্টা তাকে ভুল প্রমাণ করতে লাগিয়ে দিই। আর কথা এত দূর বেড়ে যায় যে, যাদের আমরা চিনি না সেইসব লোকেদের সাথে আমরা কম্প্রোমাইজ করতেও তৈরি হয়ে যাই, কিন্তু নিজেদের লোকেদের সাথেই অ্যাডজাস্ট করি না।

রাস্তায় কোনো অজানা মানুষ ভুল করে আমাদের ধাক্কা মারলে আমরা হেসে বলি, "কোনো ব্যাপার না।" কিন্তু ঘরের ভেতরে একটুখানি খাবারও যদি আমাদের মনমতো না হয়, তবে আমরা পুরো ঘর মাথায় তুলে নিই। এখনো বুঝতে পারেননি? দেখুন, আপনারা যদি একসাথে এগিয়ে যেতে চান, তবে এক পা পেছনে হেঁটে নেওয়াতে কোনো সমস্যা নেই।

কারণ এক পা পেছনে যাওয়া মানে হেরে যাওয়া নয়; অনেক সময় তা আপনার রিলেশনশিপ আর বিজনেসকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যায়। সো প্লিজ, আজ শুধু একদিনের জন্য নিজের ইগোকে পাশে সরিয়ে রাখুন, আর সে আপনার ফ্যামিলি মেম্বার হোক বা বিজনেস পার্টনার—তাকে ভুল প্রমাণ করার বদলে তাকে বোঝার চেষ্টা করুন।

‎@ gayan



৪৭


**‘ইনভোলিউশন ট্র্যাপ’**

একটি শিয়াল হঠাৎ একটি মুরগির ঘরের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়ল। ভিতরে ভয়ে কাঁপতে থাকা মুরগিগুলোকে দেখেও সে তাদের ওপর আক্রমণ করল না। বরং সোজা উঁচু চাতালের ওপর বসে একটি ভয়ংকর **নিয়ম** বানিয়ে দিল—

**“প্রতিদিন সূর্য ডোবার ঠিক আগে যে মুরগিটি সবার শেষে ভিতরে আসবে, সে আমার হবে।”**

মুরগিগুলো সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল, বাঁচতে হলে শিয়ালকে হারানো জরুরি নয়; বরং নিজেদের প্রজাতির অন্য সঙ্গীদের থেকে আগে দৌড়ে ভিতরে ঢুকতে হবে।

আর সেই মুহূর্তেই তাদের নিজেদের সঙ্গীরাই তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে গেল।

সেই ছোট্ট দরজা দিয়ে সবার আগে ঢোকার প্রতিযোগিতায় তারা একে অপরকে পিছনে ঠেলতে শুরু করল। পথে যে মুরগিগুলো বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল, তাদের ঠোকর মেরে মেরে আহত করতে লাগল। ফলে চারদিকে ধুলো আর রক্ত ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

ফলাফল ছিল অবাক করার মতো!

শিয়াল প্রতিদিন দরজার কাছে বসে থাকত এবং একটুও নড়াচড়া না করেই একটি মুরগি পেয়ে যেত। আর মুরগিগুলো নিজেদের মধ্যে এই অন্ধ দৌড়ে ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যেতে লাগল। তারা ছুটতে ছুটতে নিজেরাই শিয়ালের সহজ শিকারে পরিণত হলো।

সাইকোলজিতে এটাকে **‘ইনভোলিউশন ট্র্যাপ’** বলা হয়।

মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মুরগিগুলো বুঝতেই পারল না যে তাদের শেষ করে দিচ্ছিল শুধু শিয়াল নয়, বরং একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সেই অন্ধ দৌড়—যে দৌড়ে তারা কোনো সঠিক ফলাফল ছাড়াই ক্রমাগত ছুটে চলেছিল।

**মনে রাখবেন, প্রতিটি দৌড়ে সবার আগে এগিয়ে যাওয়া জরুরি নয়।**

আপনার সমস্ত শক্তি এবং ২০০% পরিশ্রম এমন জায়গায় ব্যয় করবেন না, যেখানে পরিশ্রম ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু ফলাফল একই জায়গায় থেকে যাচ্ছে।

**পরিশ্রম অবশ্যই করুন। কিন্তু শুধু অন্যদের হারানোর জন্য নয়—নিজেকে আরও ভালো করার জন্য।**

কারণ আসল জয় অন্যদের থেকে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে নয়, বরং **সঠিক দিকে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে।**

‎ব্যক্তিত্ব উন্নয়ন এবং জীবনের গূঢ় রহস্য জানতে এই পোস্টটি সেভ করে রাখুন এবং অন্যদের সাথেও শেয়ার করুন। প্রতিদিন নিজেকে ১% উন্নত করার লক্ষ্যে আমাদের এই পেজটিকে ফলো করে রাখুন।

‎@ gayan



৪৮



যে মানুষটি আপনার গুরুত্ব দিচ্ছে না, তাকে বারবার আঁকড়ে ধরার চেষ্টা

সম্পর্কের টান যখন কমতে শুরু করে, তখন মানুষটি মুখ ফুটে কিছু না বললেও তার আচরণে পরিবর্তনের স্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়। মানুষ যখন কোনো সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চায় বা তার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তখন তার মধ্যে মূলত তিনটি প্রধান লক্ষণ বা সংকেত ফুটে ওঠে। নিচে এই লক্ষণগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

‎১. আপনার জীবনে কী ঘটছে তা নিয়ে কৌতুহল বা প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেওয়া

· ‎আগ্রহের অভাব: ভালোবাসার প্রথম শর্তই হলো অপর মানুষটার প্রতি আগ্রহ থাকা। কিন্তু যখন কেউ সম্পর্ক শেষ করতে চায়, তখন আপনার দিনটি কেমন কাটল, আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কার সাথে আছেন বা কী করছেন—এইসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সে আর কোনো প্রশ্ন করবে না।

· ‎কথা বলার উদ্যোগ না নেওয়া: সে কখনো নিজে থেকে কথা শুরু করার বা কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করার উদ্যোগ (Initiative) নেবে না। কথা বললে শুধু আপনিই বলবেন, তার তরফ থেকে কেবল নীরবতা বা সংক্ষিপ্ত উত্তর আসবে। এর মানে হলো, আপনার জীবনের ঘটনার প্রতি তার আর কোনো মানসিক টান নেই।

‎

‎২. ভবিষ্যতের কোনো পরিকল্পনায় আপনাকে না রাখা

· ‎ভবিষ্যতের ভাবনা থেকে বাদ পড়া: যারা কাউকে সত্যি ভালোবাসে, তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ ভাবনায় সবসময় সেই মানুষটিকে জড়িয়ে রাখে। ছুটির দিনে কোথাও ঘুরতে যাওয়া থেকে শুরু করে জীবনের বড় কোনো সিদ্ধান্ত—সব কিছুতেই প্রিয়মানুষের উপস্থিতি থাকে।

· ‎দূরত্ব তৈরি করা: যখন কেউ আপনাকে তার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা (Future Plans) থেকে ধীরে ধীরে বাদ দিতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে সে আপনাকে ছাড়া জীবন কাটানোর মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে যে পরিকল্পনাগুলো করছে, তাতে আপনার কোনো জায়গা নেই—যা সম্পর্কের শেষ বয়সের স্পষ্ট সংকেত।

‎

‎৩. বার্তার উত্তর দেরিতে দেওয়া বা একদমই না দেওয়া

· ‎গুরুত্ব কমে যাওয়া: যেকোনো সম্পর্কের জন্য যোগাযোগ সবচেয়ে বড় ভিত্তি। কিন্তু যখন কোনো মানুষের কাছ থেকে উত্তর খুব দেরিতে আসতে শুরু করে, বার্তা দেখেও ফেলে রাখা হয়, কিংবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়ার পর কোনো সাধারণ উত্তর আসে—তখন বুঝতে হবে আপনি তার অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছেন।

· ‎এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা: মানুষ হাজার ব্যস্ততার মাঝেও তার প্রিয় মানুষকে সময় দেওয়ার উপায় ঠিকই খুঁজে নেয়। কিন্তু যদি কেউ আপনাকে অবহেলা করতে শুরু করে এবং উত্তরের বদলে অজুহাত দিতে থাকে, তবে বুঝতে হবে সে অলিখিতভাবে আপনার থেকে দূরত্ব তৈরি করতে চাইছে এবং সম্পর্কটি শেষ করার পথ খুঁজছে।

‎সামনে এগিয়ে যাওয়ার উপায়

‎কোনো সম্পর্কে এই লক্ষণগুলো ফুটে উঠলে ভেঙে না পড়ে বাস্তবতাকে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। যে মানুষটি আপনার গুরুত্ব দিচ্ছে না, তাকে বারবার আঁকড়ে ধরার চেষ্টা নিজের আত্মসম্মান কমায়।

· ‎নিজের খেয়াল রাখুন: এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে প্রথমে নিজেকে সময় দিন। যে জিনিসগুলো আপনাকে আনন্দ দেয়, সেগুলোতে মনোযোগ দিন।

· ‎কাজে মনোযোগ দিন: আপনার ক্যারিয়ার, পড়াশোনা বা লক্ষ্যের দিকে নতুন করে নজর দিন। নিজের উন্নতিই হলো যেকোনো অবহেলার সবচেয়ে বড় জবাব।

· ‎নতুন ইতিবাচক দিক: অতীতের বিষাক্ত বা টানাপোড়েনের অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে নিজের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন করুন। নিজেকে সফল হিসেবে গড়ে তোলাই জীবনের আসল ঘুরে দাঁড়ানো। 

‎@ gayan



৪৯



"মানুষ আপনার কদর বুঝছে না? 

এই ৬টি মনস্তাত্ত্বিক ট্রিক প্রয়োগ করে দেখুন, ফল দেখে নিজেই অবাক হবেন!"

    আংশিক ইগনোর করুন:

সবসময় অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে মাঝে মাঝে একটু দূরে থাকুন। এতে সামনের মানুষের মনে আপনার চিন্তা বাড়বে।

    কৌতূহল বজায় রাখুন

সব বিষয়ে সবসময় স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলবেন না। কিছুটা রহস্য ও কৌতূহল বজায় রাখলে আপনাকে নিয়ে আগ্রহ বাড়বে।

কাছে আসুন, আবার একটু দূরত্ব তৈরি করুন

সবসময় মানসিকভাবে জড়িয়ে না থেকে মাঝে মাঝে একটু দূরত্ব বজায় রাখুন। এই ওঠানামা অপরপক্ষের মানসিক টান বা অ্যাটাচমেন্ট বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

হালকা হিংসে বা জেলসি প্রকাশ করুন

সম্পর্কের মাঝে খুব সামান্য ঈর্ষা বা জেলসি দেখালে সামনের মানুষটির আসল প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়।

   নিজের ব্যক্তিত্ব ও সিমানা বজায় রাখুন

নিজের সম্মান ও গুরুত্ব কখনো কমতে দেবেন না। এর জন্য নির্দিষ্ট সীমানা (Boundaries) নির্ধারণ করে নিন।

নিজের গুরুত্ব বাড়াতে নিজেকে 'বিরল' রাখুন

সব জায়গায় এবং সব সময়ে সবার জন্য সহজলভ্য বা ‘এভেলেবল’ থাকবেন না। নিজেকে একটু রেয়ার করে তুললে আপনার গুরুত্ব নিজে থেকেই বৃদ্ধি পাবে।

‎@ gayan



৫০



না বলতে না শেখা আসলে নিজেকেই ক্ষতি করা

একটি গ্রামে রামু নামে একজন সহজ-সরল মানুষ থাকত। স্বভাবের দিক থেকে সে খুবই নরম মনের ছিল। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল—সে কখনো কাউকে ‘না’ বলতে পারত না।

প্রতিবেশীরা বাজারে গেলে তাদের গবাদি পশুগুলো রামুর দেখাশোনায় রেখে যেত। নিজের ফসলের কথা না ভেবেই সে হ্যাঁ বলে দিত এবং শেষ পর্যন্ত নিজেরই ক্ষতি করে বসত।

কেউ কোনো যন্ত্রপাতি বা সাহায্য চাইলে সে না বলতে পারত না। মানুষ তার নতুন যন্ত্রপাতি নিয়ে গিয়ে নষ্ট করে ফিরিয়ে দিত। বিনা পয়সায় তার দিয়ে কাজ করিয়ে নিত, এমনকি তাকে খেতেও জিজ্ঞাসা করত না।

এসব দেখে রামু মনে মনে কষ্ট পেত।

ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ তার সরলতাকেই তার দুর্বলতা হিসেবে ধরে নিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এতবার সাহায্য করার পরেও কেউ তার কদর করত না। কিন্তু একবার না বললেই সবাই তাকে স্বার্থপর বলতে শুরু করত।

রামু রাতের পর রাত ভেবে চিন্তায় অস্থির হয়ে থাকত—মন খুলে সবাইকে সাহায্য করার পরেও কেন তাকে এত খারাপ কথা শুনতে হয়?

সে সিদ্ধান্ত নিল, এবার থেকে সে আর কাউকে সাহায্য করবে না।

কিন্তু পরের দিনই কেউ হাসিমুখে এসে কিছু চাইলে সে আবার নরম হয়ে যেত।

তার ভয় ছিল—যদি মানুষ তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে!

গ্রামের একজন বয়স্ক মানুষ সবকিছু লক্ষ্য করছিলেন। তিনি রামুকে কাছে ডেকে বোঝালেন—

“সহজ-সরল হওয়া খারাপ নয়। কিন্তু নিজের মূল্য দিয়ে অন্যকে খুশি করা ভুল।”

তিনি বললেন,

“প্রতিবার হ্যাঁ বলা জরুরি নয়। প্রয়োজন হলে শুধু বলে দাও—‘সময় নেই’, ‘সাহায্য করতে পারব না’ অথবা ‘এই মুহূর্তে আমার সুবিধা নেই।’

কারণ তুমি যত বেশি ঝুঁকবে, মানুষ তত বেশি তোমাকে ব্যবহার করবে।

যেদিন তুমি ‘না’ বলতে শিখে যাবে, সেদিন থেকেই মানুষ তোমাকে সম্মান করতে শুরু করবে।”

বয়স্ক মানুষটির এই কথাগুলো রামুর হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে গেল।

এরপর সে বদলে গেল।

যখনই কেউ অন্যায়ভাবে তার সুযোগ নিতে আসত, সে সরাসরি এবং পরিষ্কারভাবে না বলে দিত।

নির্দ্বিধায় বলত—“সময় নেই।”

দু-চারবার এমন হওয়ার পর গ্রামের মানুষ বুঝে গেল—এখন আর রামুকে সহজে বোকা বানানো যাবে না।

সাইকোলজিতে একে নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করা বা **Boundary Setting** বলা হয়।

এর অর্থ এই নয় যে আমরা কঠোর বা নিষ্ঠুর হয়ে যাব। প্রয়োজনমতো মানুষকে অবশ্যই সাহায্য করুন।

কিন্তু নিজের মূল্য দিয়ে অন্যকে খুশি করা বন্ধ করুন।

নিজের মূল্যকে চিনতে পারাই নিজের প্রতি সবচেয়ে বড় বিশ্বস্ততা।

আপনিও যদি সবাইকে খুশি করার চেষ্টায় নিজের মূল্য ভুলে যান, তাহলে আজ থেকে একটি কথা মনে রাখুন—

**সব জায়গায় হ্যাঁ বলা জরুরি নয়।**

যেখানে প্রয়োজন, সেখানে **‘না’ বলতে শিখুন।**

‎@ gayan