পুথি সাহিত্য আসলে কী?

‘পুথি’ শব্দটা এসেছে ‘পুস্তিকা’ থেকে। সাধারণভাবে যার অর্থ বই বা গ্রন্থ। তবে মজার ব্যাপার হলো— সব পুথিকে বই বলা গেলেও সব বইকে পুথি বলা যায়না। পুথি সাহিত্য মানে কিন্তু একদম আলাদা কিছু। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক সময় ছিল, যখন বিশেষ ধরণের কিছু রচনা তৈরি হয়েছিল— যেখানে ভাষা, বিষয় আর ধাঁচ—সবকিছুই ছিল আলাদা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সেই বিশেষ সময়ে রচিত বিশেষ ধরণের সাহিত্যই পুথি সাহিত্য নামে পরিচিত।

প্রাচীন পুথির ছবি

ইতিহাসের পাতায় পুথি সাহিত্য

পুথি সাহিত্য শুরু হয়েছিল প্রায় আঠারো শতকে। আরবি, ফারসি, উর্দু আর হিন্দির প্রভাব মিশে গিয়েছিল বাংলার মাটির গন্ধে। আনুমানিক ১৬৮০-১৭৭০ হুগলির বালিয়া-হাফেজপুরের কবি ফকির গরীবুল্লাহ এ কাব্যধারার সূত্রপাত করেন আমীর হামজা রচনার মধ্য দিয়ে। আরব দেশের ইতিহাস-পুরাণ মিশ্রিত কাহিনী অবলম্বনে রচিত আমীর হামজা এক যুদ্ধকাব্য, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পরিসংখ্যান মতে যার ৩২ শতাংশ শব্দ ছিল বিদেশী। মধ্যযুগে প্রায় পাঁচশ বছর ধরে বাংলা ভাষার যে ঐতিহ্য, তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ধারণা করা হয়, এর উৎস ছিল কলকাতা, হাওড়া, হুগলি ও ২৪ পরগনা অঞ্চলের মুসলমানদের কথ্যভাষা। ভাবুন তো, বাংলা শব্দের মধ্যে আরবি-ফারসি এমনভাবে মিশেছে যে তৈরি হয়েছে একদম আলাদা এক সাহিত্যভাষা!

বাংলা পুথি: মুসলমান সমাজের কণ্ঠস্বর

পুথির লেখক আর পাঠক— দুজনই ছিলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। বিশেষ করে, নিম্নবিত্ত চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা ছিল বিস্ময়কর। ফকির গরীবুল্লাহ নিজে এবং তার শিষ্য সৈয়দ হামজার অনুসরণে পরবর্তীকালে বহু সংখ্যক মুসলমান কবি এ জাতীয় কাব্য রচনা করেন। তখনকার দিনে এ পুথিগুলোই ছিল বিনোদন, ধর্মীয় শিক্ষা আর ইতিহাসের অন্যতম উৎস।

ভাষার জাদু

পুথির ভাষাকে কেউ বলতেন ‘মুসলমানী বাংলা’, কেউ বলতেন ‘দোভাষী পুথি’, আবার কেউ বলেতেন ‘মিশ্র ভাষারীতির কাব্য’। কলকাতার বটতলার ছাপাখানায় ছাপা হতো বলে একে ‘বটতলার পুথি’ও বলা হতো।

সাধারণ বাংলা গ্রন্থের মতো পুথি সাহিত্য বাম দিক থেকে পড়া হলেও তা ছাপা হতো আরবি-ফারসির মতো ডান দিক থেকে। পয়ার-ত্রিপদী ছন্দে রচিত অলঙ্কারবর্জিত গদ্যধর্মী সরল ভাষা এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

কাব্যের ধরণ বৈচিত্র্য

বিষয় ও রস বিচারে পুথি সাহিত্য ছয় ভাগে ভাগ করা যায়—

১. রোম্যান্টিক প্রণয়কাব্য (ইউসুফ-জুলেখা, লাইলী-মজনু)

২. জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাব্য (আমীর হামজা, হাতেম তাই)

৩. নবী-আউলিয়ার জীবনীকাব্য

৪. লৌকিক পীর পাঁচালি (সত্যপীরের পাঁচালি, বনবিবির জহুরনামা)

৫. ইসলামের ইতিহাস, ধর্ম, রীতিনীতি বিষয়ক শাস্ত্রকাব্য (নসিহতনামা)

৬. সমসাময়িক ঘটনা নির্ভর কাব্য

প্রেম থেকে পীর, জীবনীকাব্য থেকে জঙ্গনামা— সবকিছুই ছিল পুথির পাতায়।

পুথি লেখার উপকরণ ও প্রস্তুত প্রণালি

কাগজ আবিষ্কারের আগে পুথি লেখার জন্য ব্যবহার করা হতো চামড়া, ভূর্জপত্র, তেরেটপত্র, গাছের বাকল, কলা ও তালপাতার মতো প্রাকৃতিক উপাদান। এগুলো জলে ভিজিয়ে, সেদ্ধ করে ও শুকিয়ে লেখার উপযোগী করা হতো। ফলে রঙ হতো ধূসর বা পান্ডু এবং টেকসই হতো। পরে এসব উপকরণের সীমাবদ্ধতা দূর করতে শন, তুলা, তিসি ও ছেঁড়া কাপড়ের তন্তু দিয়ে তৈরি হয় তুলট কাগজ। লেখার জন্য কলম হিসেবে ব্যবহার করা হতো বাঁশের কঞ্চি, পাখির পালক বা নলজাত ঘাস। আর কালি তৈরি হতো শিমুলের ছাল, জবা, গাব, আমলকী, কাঠকয়লা ও পোড়া চালের গুঁড়োসহ নানা প্রাকৃতিক উপাদান থেকে।

পুথি লেখার প্রাচীন উপকরণ তুলট কাগজ ও বাঁশের কঞ্চি

বাংলার উল্লেখযোগ্য পুঁথি সাহিত্য

ইউসুফ-জুলেখা, লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল— এসব ছিল প্রেমের কাব্য। আর আমীর হামজা, সোনাভান, জৈগুনের পুথি, হাতেম তাই— এসব কাব্যে পাওয়া যায় বীরপুরুষদের যুদ্ধ আর ইসলাম প্রচারের গল্প।

এরপর আছে নবী, পীর আর আউলিয়াদের জীবনীভিত্তিক কাব্য— যেমন কাসাসুল আম্বিয়া, তাজকিরাতুল আউলিয়া।

তবে সবচেয়ে চমৎকার বিষয় যেখানে হিন্দু দেবতা আর মুসলমান পীরের গল্প একসঙ্গে মেলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সত্যপীরের পাঁচালি, গাজীকালু চম্পাবতী বা বনবিবির জহুরনামার কথা।

আরো ছিল ধর্মীয় উপদেশভিত্তিক পুথি— নসিহতনামা বা ফজিলতে দরুদ। এমনকি হাজী শরিয়তুল্লাহর সময়কার সমাজঘটনাও উঠে এসেছে কিছু কাব্যে।

তখনকার মুসলমান সমাজ ছিল এক রকম হতাশা আর পরাজয়ের ভেতর। তাই এ কাব্যগুলোয় তারা খুঁজে পেয়েছিল আশ্বাস, গৌরব আর আত্মতৃপ্তি। এ কারণেই খুব অল্প সময়ে পুথি সাহিত্য সমগ্র বাংলায় ছাড়িয়ে উড়িষ্যা আর ত্রিপুরাতেও ছড়িয়ে পড়ে।

পুথি সাহিত্যের লেখক পরিসংখ্যান

পুথি সাহিত্যের এ ধারায় ঠিক কতজন কবি কতগুলো কাব্য রচনা করেছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান আজও জানা যায়নি। তবে বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

১৮৫৫ সালে জেমস লং তার ‘এ ডেসক্রিপ্টিভ ক্যাটালগ অব বেঙ্গলি ওয়ার্কস’-এ ৪১টি দোভাষী পুথির তালিকা প্রকাশ করেন। ১৯৬৪ সালে মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন ‘বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন ২৭০টি দোভাষী পুথির কথা, যদিও রচয়িতাদের নাম সেখানে নেই।

অন্যদিকে, অধ্যাপক আহমদ শরীফ সম্পাদিত ‘পুথি-পরিচিতি’ গ্রন্থে পাওয়া যায় শতাধিক কবির প্রায় ২০০ পুথির তালিকা। আর অধ্যাপক আলী আহমদের সংকলিত তালিকায় পুথিকারের নামসহ রয়েছে ৫৬৯টি কাব্যের নাম। সব উৎস একত্রে বিশ্লেষণ করলে পুনরাবৃত্তি বাদ দিয়ে শতাধিক কবির রচিত প্রায় দুই থেকে আড়াইশ পুথির তথ্য পাওয়া যায়।

যেভাবে হারিয়ে গেল পুথি

যখন বাংলা সাহিত্যে এলেন রাজা রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মধুসূদন দত্ত; তখন শুরু হলো আধুনিক গদ্যের যুগ। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ‘পন্ডিতি বাংলা’ আর কোম্পানির ভাষানীতি বদলে দিল সব কিছু। মুসলমান সমাজও ধীরে ধীরে পুথির ভাষা ত্যাগ করল। এর ফলে আজ পুথি সাহিত্য শুধু ইতিহাসের পাতায় থেকে যাওয়া এক অধ্যায় হয়েই রয়ে গেছে।

আজকের প্রাসঙ্গিকতা

তবুও ভাবুন, এ পুথিগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক সময়ের সমাজ, ভাষা আর সংস্কৃতির চিত্র। এতে দেখা যায়, একজন বাঙালি মুসলমান কেমন করে নিজের সাহিত্য তৈরি করেছিল, নিজের কণ্ঠে। সেই কণ্ঠ, সেই ভাষা আজও আমাদের সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ।

@ শাকিলা জেরিন 



প্রীতিলতা: সাহসিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের ধলঘাটে জন্ম নেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। পরিবারের সবাই আদর করে তাকে ডাকত 'রাণী' বলে। অন্তর্মুখী ও লাজুক স্বভাবের সেই ছোট্ট রাণীর শিক্ষা জীবনের শুরু ডা. খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে। সেখানেই ইতিহাসের শিক্ষকদের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হন। ঝাঁসীর রাণী লক্ষীবাই-এর সাহসিকতা তার মনে গভীর ছাপ ফেলে। এরপর বন্ধু কল্পনা দত্তের সঙ্গে স্বপ্ন দেখা, পড়াশোনা, নাট্যচর্চা— সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুই তাকে বিপ্লবের সঙ্গে প্রস্তুত করতে থাকে।

গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের পর চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা যখন সক্রিয় হচ্ছিল, সে সমতটাতে কেবলই কৈশরে পা রেখেছেন প্রীতিলতা। ১৯২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর টাইগার পাসে সূর্য সেনের দলের ছিনতাই ও পরবর্তীতে পুলিশের হানায় গ্রেফতার—এসব ঘটনা কিশোরী প্রীতিলতার মনে প্রশ্নের জন্ম দেয়। স্কুলের শিক্ষক ঊষাদির সঙ্গে আলাপে তিনি মামলার বিস্তারিত জানতে পারেন। সে সময়টায়েই লুকিয়ে লুকিয়ে 'দেশের কথা', 'বাঘা যতীন', 'ক্ষুদিরাম' পড়ে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। একপর্যায়ে দাদা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছে বিপ্লবী সংগঠনে যোগ দেয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন, যদিও তখনো মহিলা সদস্যদের দলে নেয়ার অনুমতি ছিল না।

ঢাকায় পড়াশোনার সময় 'শ্রীসংঘ'-এর মহিলা শাখা 'দীপালী সঙ্ঘ'-এ যোগ দেন প্রীতিলতা। লীলা নাগের নেতৃত্বে নারীশিক্ষা ও গোপনে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চালাতেন তারা। ইডেন কলেজের শিক্ষক নীলিমাদির মাধ্যমে পরিচয়, লাঠিখেলা, ছোরাখেলা প্রশিক্ষণ এবং বিপ্লবী আদর্শের দীক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯২৯ সালে চট্টগ্রামে সূর্য সেন নারী সম্মেলন আয়োজনের অনুমতি দিলে প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্ত সেখানে অংশ নেন, তবে বিপ্লবী দলে সরাসরি যুক্ত হতে পারেননি। ১৯৩০ সালের ১৯ এপ্রিল আইএ পরীক্ষা শেষে চট্টগ্রামে ফিরে 'চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ'-এর সংবাদ পান তিনি।

১৯৩২ সালে চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের দুই বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। মাস্টারদা সূর্য সেন ও নির্মল সেন গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ধলঘাটের সাবিত্রী দেবীর বাড়ি, যেটি বিপ্লবীদের কাছে মূলত 'আশ্রম' নামে পরিচিত, সেটি ছিল তাদের অন্যতম গোপন আস্তানা। ঝড়-ঝাপটা মাথায় নিয়ে ১২ জুন রাতে সেই আশ্রমে পৌঁছান প্রীতিলতা। ১৩ জুন সন্ধ্যায় পটিয়া পুলিশ ক্যাম্প অভিযান চালালে মাস্টারদা প্রীতিলতা ও অপূর্ব সেনকে সঙ্গে নিয়ে কচুরিপানা ভরা পুকুর ও জঙ্গলের মধ্য দিয়ে জৈষ্ট্যপুরার 'কুটির' গোপন আশ্রয়ে পৌঁছান। পরের দিন সূর্য সেন প্রীতিলতাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন।

ধলঘাট সংঘর্ষের পর সকালে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার ও সেনাধ্যক্ষ ঘটনাস্থলে এসে সাবিত্রী দেবী, তার ছেলে এবং আরো তিন যুবককে বিপ্লবীদের আশ্রয় দেয়ার দায়ে গ্রেফতার করেন। তাদের চার বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ সময় তাদের তল্লাশিতে প্রীতিলতা ও অন্যদের ছবি, চিঠি, বইয়ের পান্ডুলিপি উদ্ধার হয়। পুলিশের অনুসন্ধান শেষে ছাত্র পড়ানোর অজুহাত দেখিয়ে ৫ জুলাই মনিলাল দত্ত ও বীরেশ্বর রায়ের সহায়তায় আত্মগোপনে চলে যান প্রীতিলতা। কয়েকদিন চট্টগ্রামের গোপন আস্তানায় কাটিয়ে তিনি পড়ৈকড়া গ্রামের রমণী চক্রবর্তীর 'কুন্তলা' বাড়িতে আশ্রয় নেন, যেখানে মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদারও ছিলেন। ১৩ জুলাই ১৯৩২ আনন্দবাজারে খবর প্রকাশিত হয়: 'চট্টগ্রামের পটিয়া থানার ধলঘাটের শ্রীমতী প্রীতি ওয়াদ্দাদার ৫ জুলাই চট্টগ্রাম শহর হইতে অন্তর্ধান করেছেন; বয়স ১৯ বছর। পুলিশ তাঁহার সন্ধানে ব্যস্ত।'

'ইউরোপীয়ান ক্লাব' নামে ব্রিটিশ প্রমোদকেন্দ্র ক্লাবটিতে ১৯৩২ সালের ১০ আগস্ট শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে প্রথম আক্রমণ ব্যর্থ হয়। এরপর মাস্টারদা ২৩ সেপ্টেম্বর নারী বিপ্লবী প্রীতিলতার নেতৃত্বে আক্রমণের নির্দেশ দেন। প্রীতিলতা ধুতি-পাঞ্জাবী, সাদা পাগড়ি ও রবার জুতা পরে, ক্লাবের পাশ দিয়ে পাঞ্জাবী ছেলেদের কোয়ার্টার অতিক্রম করে প্রথমে আক্রমণ শুরু করেন। বাঁ-পাশে গুলির আঘাত পেয়েও দলের সঙ্গে এগিয়ে যান তিনি।

পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের পর প্রীতিলতা পূর্ব সিদ্ধান্ত মতো মুখে পটাসিয়াম সায়ানাইড পূর্ণ করেন। বিপ্লবীরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। পরদিন পুলিশ ক্লাব থেকে ১০০ গজ দূরে প্রীতিলতার মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহ তল্লাশি করে লিফলেট, অপারেশন পরিকল্পনা, রিভলবারের গুলি, রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ছবি ও হুইসেল পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হয়, গুলির আঘাত গুরুতর নয়—মৃত্যুর কারণ পটাসিয়াম সায়ানাইড।

নতুন ভাষা শিখলে কি মানুষ আরো স্মার্ট হয়ে উঠে?


নতুন ভাষা শেখার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। কেউ শেখে পেশাগত প্রয়োজন থেকে, কেউ ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগের জন্য, আবার কেউ শেখেন কোনো অঞ্চলের সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি আগ্রহ থেকে। গবেষণা বলছে, ভাষা শেখা শুধু প্রয়োজন নয়, এটি মস্তিষ্কের জন্যও উপকারী। খবর ডয়চে ভেলে।

২০২৪ সালে জার্মানির সিরিয়ান শরণার্থীদের ওপর এ গবেষণা চালানো হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল, জার্মান ভাষা শেখার সময় তাদের মস্তিষ্কে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে সেটা দেখা। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ভাষা শেখার আগে, শেখার সময় এবং শেখার পরে পরিমাপ করা হয়।

সেখানে দেখা যায়, ভাষা শেখার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিউরাল স্ট্রাকচার বা মস্তিষ্কের গঠনগত কাঠামো পরিবর্তিত হয়। কিন্তু আসলে নতুন ভাষা শেখার সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে? আর এটা কি সত্যিই মানুষকে আরও বুদ্ধিমান করে তোলে?

ভাষা প্রক্রিয়াকরণের জন্য দুটি প্রধান সার্কিট কাজ করে। একটি শব্দ শোনা ও উচ্চারণ করার জন্য, যা ভাষার ভিত্তি তৈরি করে। আরেকটির কাজ হল, কোন ভাষার শব্দ ব্যবহার করা হবে সেটা ঠিক করা। বহুভাষীদের ক্ষেত্রে এ দুটি সার্কিট আরো সক্রিয়ভাবে কাজ করে, যা তাদের মানসিক সক্ষমতা বাড়ায়—এমনটিই জানান ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, নিউরোসায়েন্টিস্ট আর্তুরো হার্নান্দেজ।

ডয়চে ভেলেকে তিনি জানান, আমরা যখন নতুন ভাষা শিখি বা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় যাই, তখন এ সার্কিটগুলো নতুনভাবে গঠিত হয়। এটি এভাবে মূলত শব্দের মানচিত্র তৈরি করে এবং ঠিক করে, আমরা কোন ভাষা ব্যবহার করব।

গবেষণার ফল অনুযায়ী, ভাষা শেখার ফলে মস্তিষ্কের গঠন পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে গ্রে-ম্যাটার বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি এটি মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ায়। ফলে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং মানসিক নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা উন্নত হয়। সুতরাং এটি ভাষা প্রক্রিয়াকরণ ও নির্বাহী কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ তথ্য দিয়েছেন পেনসিলভানিয়া এলিজাবেট টাউন কলেজের কগনিটিভ নিউরোসায়েন্টিস্ট জেনিফার উইটমেয়ার।

ছোট বয়সে ভাষা শেখা সহজ হয়, কারণ তখন মস্তিষ্ক খুব দ্রুত নতুন তথ্য গ্রহণ করতে পারে। শিশুদের জন্য ভাষা শেখা সহজ হলেও, প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্কেও ভাষা শেখার সময় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। এটি এক ধরনের মানসিক ব্যায়াম, যা স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ায়। তাই বলা যায়, ভাষা শেখা মানুষকে আরো স্মার্ট করে তোলে।

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, একাধিক ভাষা জানা ব্যক্তিরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মনোযোগ ধরে রাখা এবং মাল্টিটাস্কিংয়ে একভাষীদের তুলনায় বেশি দক্ষ। ২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, বহুভাষী শিশুদের একাগ্রতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউরোপের প্রায় ৫৪ শতাংশ মানুষ অন্তত দুটি ভাষায় কথা বলতে পারেন। এশিয়ায় এ হার তুলনামূলকভাবে কম হলেও, ভাষা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাষা শেখা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়, বরং পেশাগত ও সামাজিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

রুইকাতসু: দেহ-মনের চাপ কমাতে কান্নার কর্মশালা


হাসলে আয়ু বাড়ে— এই বাক্য শুনে শুনে বড় হয়েছি আমরা প্রায় সবাই। আর তাই জীবনের সমস্ত চাপ, দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা একপাশে রেখে আমরা ভালো থাকার অভিনয় করি। নিজেকে ও অন্যকে বলি— ‘মেনে নাও, এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলার নামই জীবন।’ তবে এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম জাপান। হাসিহাসি মুখে দুঃখ চেপে রাখা মানুষদের জাপানিরা বলছে, ‘তিষ্ঠ ক্ষণকাল, একটু কাঁদো, কেঁদে নাও, মন হালকা হবে।’

জাপানিরা কেঁদে ভালো থাকার এ পদ্ধতির নাম দিয়েছে রুইকাতসু। ‘রুই’ শব্দের অর্থ অশ্রু, আর ‘কাতসু’ মানে কার্যক্রম। রুইকাতসুর ভাবনা যারা প্রথম এনেছিলেন তাদের অন্যতম হিদেফুমি ইওশিদা। হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হিদেফুমি মনে করেন, কান্না মানুষের দুর্বলতা নয়। বরং কান্না মানুষের শক্তি। আবেগ প্রকাশের অত্যন্ত কার্যকরী একটি পদ্ধতি। সেই ভাবনা থেকেই ২০২৩ সাল থেকে কান্নার কর্মশালা পরিচালনা শুরু করেন তিনি।

কর্মশালায় মানুষ একসঙ্গে বসে আবেগঘন সিনেমা দেখে, পুরনো চিঠি পড়ে বা গল্প শোনে, যাতে সবার চোখে জল আসে। কেউ কেউ আবার প্রশিক্ষিত কান্না-সহায়ক হিসেবে উপস্থিত থাকেন, যারা অংশগ্রহণকারীদের স্বাচ্ছন্দ্যে কান্না করতে উৎসাহ দেন। রুমাল এগিয়ে দেন, বাড়িয়ে দেন কাঁধও।

জাপানি বিশেষজ্ঞদের মতে, অশ্রু ঝরালে শরীর থেকে কর্টিসল নামক মানসিক চাপের হরমোন কমে যায়। নিয়মিত কান্না করলে ঘুম ভালো হয়, উদ্বেগ কমে ও মন হালকা লাগে। তাই অনেকের কাছে রুইকাতসু এখন এক ধরনের বিকল্প থেরাপি।

জাপানের কর্মসংস্কৃতি অত্যন্ত কঠোর। সেখানে দীর্ঘ সময় কাজ, প্রতিযোগিতা আর একাকিত্ব অনেককে আবেগ দমন করতে বাধ্য করে। পরিবার বা বন্ধুদের কাছে খোলামেলা আবেগ প্রকাশ করা সবসময় সহজ নয়। তাই নিরাপদ পরিবেশে কান্না করার এই আয়োজন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যবয়সীদের মধ্যে।

নোবেল পুরস্কার: কবে শুরু, বিজয়ীরাই বা নির্বাচিত হন কিভাবে


বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর মধ্যে অন্যতম নোবেল পুরস্কার। প্রতি বছর অক্টোবর মানেই, বিজ্ঞান থেকে সাহিত্য—সব জায়গায় একটাই প্রশ্ন: এবার নোবেল পাচ্ছেন কে? আজ শুরু হচ্ছে চলতি বছরের নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা। চলুন জেনে নেয়া যাক কবে, কিভাবে, কেনই বা নোবেল পুরষ্কারের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর কোন কোন শাখায় দেয়া হয় এ পুরষ্কার।

কবে, কার হাত ধরে শুরু?

নোবেল পুরস্কারের যাত্রা শুরু হয় সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের হাত ধরে। ডিনামাইট আবিষ্কার করে বিশাল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে করে যান এক অসাধারণ উইল। এতে তিনি বলেন, তার এ সম্পদ খরচ হবে মানবকল্যাণে কাজ করা মানুষদের পুরস্কৃত করতে। সে অনুযায়ী প্রথমবার নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় ১৯০১ সালে।

কোন কোন শাখায় দেয়া হয় এ পুরস্কার

চিকিৎসা, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, সাহিত্য, অর্থনীতি ও শান্তি—এ ছয়টি শাখায় অনবদ্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

তবে প্রথমে অর্থনীতি বাদে বাকি পাঁচ শাখায় নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হতো। আলফ্রেড নোবেলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ৩০০তম বার্ষিকীতে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার চালু করে ১৯৬৮ সালে।

কে দেয় কোন পুরস্কার

আলফ্রেড নোবেল নিজেই ঠিক করেছিলেন কোন শাখার পুরস্কার কে ঘোষণা করবে। সে অনুযায়ী, পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস, চিকিৎসায় সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট, সাহিত্যে সুইডিশ অ্যাকাডেমি, শান্তিতে নরওয়ের সংসদ এবং সবশেষে চালু হওয়া অর্থনীতিতে নোবেল পুরষ্কার ঘোষণা করা হয় সুইডিশ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের মাধ্যমে।

কীভাবে নির্বাচিত হন নোবেলজয়ীরা

নোবেল পুরষ্কারের মনোনয়ন তালিকা ও নির্বাচনের আলোচনা-পর্যালোচনা অত্যন্ত গোপনীয়, ফলে ৫০ বছর পর্যন্ত তা গোপন রাখা হয়। নোবেল কমিটি কখনোই মনোনীত প্রার্থীদের নাম গণমাধ্যমে এমনকি প্রার্থীদের কাছেও প্রকাশ করে না। তবে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ধাপ উল্লেখ করা থাকে নোবেল প্রাইজ-এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে। সে অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির ১ তারিখের আগে মনোনয়ন জমা দিতে হয়, ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত শর্টলিস্ট করা হয়, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময় বরাদ্দ থাকে উপদেষ্টাদের রিভিউর জন্য, অক্টোবরে ঘোষণা করা হয় বিজয়ীদের নাম। আর নোবেল প্রাইজ অ্যাওয়ার্ড সেরেমনি অনুষ্ঠিত হয় ডিসেম্বরে।

তবে অনেক সময় গণমাধ্যমে কিছু নাম প্রকাশ পায়—কখনো তা নিছক অনুমানভিত্তিক, আবার কখনো এমনও হয় যে মনোনয়নের তথ্য মনোনয়নদাতারাই নিজেরা জানিয়ে দেন।

পুরষ্কার হিসেবে কী পান বিজয়ীরা

প্রতিটি বিভাগে পুরস্কার হিসেবে ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনর, যা প্রায় ১২ লাখ ডলার বা প্রায় ১৪ কোটি বাংলাদেশী টাকা দেয়া হয়। এছাড়া একটি ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণপদক ও একটি সম্মাননাপত্রও দেয়া হয়।

একক ও যৌথ উভয় ক্ষেত্রেই এ পুরষ্কার প্রদান করা হয়। প্রতিটি শাখায় সর্বোচ্চ তিনজনকে যৌথভাবে পুরস্কৃত করা যেতে পারে।

নতুন ভ্রমণ ট্রেন্ড ‘স্লিপ ট্যুরিজম’: কী, কেন, কোথায়?


কী এই স্লিপ ট্যুরিজম?

এটি এমন এক ধরনের ভ্রমণ, যেখানে মূল লক্ষ্য—ভালো ঘুম নিশ্চিত করা। হোটেলের আরাম ছাড়াও, এখানে থাকে বিশেষ ঘুম-উপযোগী প্রোগ্রাম, স্পা থেরাপি, মেডিটেশন সেশন— এমনকি ব্যক্তিগত ঘুম বিশেষজ্ঞও!

স্লিপ ট্যুরিজমের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য কী?

১. ঘুম-কেন্দ্রিক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা: এ ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য হলো শরীর ও মনের পুনরুজ্জীবন, গভীর ও প্রশান্ত ঘুম নিশ্চিত করা।

২. ব্যক্তিগত ঘুম বিশ্লেষণ: ভ্রমণকারীর ঘুমের ধরন, অভ্যাস ও সমস্যার ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয় পুরো প্রোগ্রাম—শুরুতেই হয় ঘুম মূল্যায়ন ও কনসালটেশন।

৩. বিশেষ ঘুম-বান্ধব পরিবেশ: রুমের তাপমাত্রা, আলো-আঁধারির ভারসাম্য, শব্দনিরোধক ব্যবস্থা—সবকিছুই বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত থাকে ঘুমের মান উন্নত করতে।

৪. হোলিস্টিক থেরাপি ও ওয়েলনেস প্রোগ্রাম: ঘুম উন্নত করার পাশাপাশি যোগব্যায়াম, মেডিটেশন, সুগন্ধ থেরাপি (aromatherapy), স্পা ট্রিটমেন্ট ও মাইন্ডফুলনেস সেশন অন্তর্ভুক্ত থাকে।

৫. প্রাকৃতিক আবহে রিসোর্ট বা রিট্রিট: পাহাড়, জঙ্গল বা সাগরপাড়ের শান্ত নির্জন পরিবেশে নির্মিত কটেজ বা কেবিন—যেখানে প্রকৃতির সান্নিধ্য ঘুমে এনে দেয় প্রশান্তি।

৬. পুষ্টি ও ঘুম-বান্ধব খাবার: ঘুমের হরমোন (melatonin) বৃদ্ধিতে সহায়ক খাবার ও পানীয় পরিবেশন করা হয়; কফিন বা চিনি-সমৃদ্ধ খাবার পরিহার করা হয়।

৭. বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধান: ঘুম বিশেষজ্ঞ, নিউরোলজিস্ট বা ওয়েলনেস কোচের সার্বক্ষণিক নির্দেশনায় চলে পুরো প্রোগ্রাম।

৮. প্রযুক্তিনির্ভর স্লিপ ট্র্যাকিং: স্মার্ট সেন্সর, ওয়্যারেবল বা ঘুম বিশ্লেষণ অ্যাপের মাধ্যমে মাপা হয় ঘুমের সময়, গভীরতা ও মান—প্রতিদিন রিপোর্ট প্রদান করা হয়।

৯. ডিজিটাল ডিটক্স প্রোগ্রাম: অনেক রিসোর্টে মোবাইল, ল্যাপটপ বা স্ক্রিন থেকে সম্পূর্ণ বিরতি—যাতে মস্তিষ্ক পায় সত্যিকারের বিশ্রাম।

১০. লুসিড ড্রিমিং: কিছু প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত থাকে লুসিড ড্রিম, যা সুযোগ করে সেয় নিজের ইচ্ছে মতো স্বপ্ন দেখার।

কীভাবে কাজ করে স্লিপ ট্যুরিজম?

এক্ষেত্রে প্রথমে ব্যক্তির ঘুমের অভ্যাস ও সমস্যা বিশ্লেষণ করা হয়। তারপর তৈরি হয় ‘পারফেক্ট স্লিপ এনভায়রনমেন্ট’, সঠিক তাপমাত্রা, আলো-আঁধারি, নরম বালিশ, ঘুমের আগে যোগব্যায়াম বা মেডিটেশন। সবকিছুই সাজানো থাকে যেন আপনি ঘুমান ঠিক শিশুর মতো।

কোথায় পাবেন অভিজ্ঞতা?

বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় গন্তব্যের তালিকায় রয়েছে— স্পেনের এসএইচএ (SHA) ওয়েলনেস ক্লিনিক, লন্ডনের কিম্পটন ফিৎসরয়-রুম টু ড্রিম, মালদ্বীপের সোনেভা সোল স্লিপ প্রোগ্রাম, ইতালির লেফে রিসোর্ট ও স্পা, শ্রীলংকার সান্তানি ওয়েলনেস, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পোস্ট র‍্যাঞ্চ ইন অন্যতম।

কেন বাড়ছে এই প্রবণতা?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে- বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন। শহরের চাপ, প্রযুক্তি, মানসিক ক্লান্তি মানুষকে গভীর ঘুম থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তাই এখন ছুটি মানেই বিশ্রাম, রিস্টার্ট আর পুনর্জীবন— স্লিপ ট্যুরিজম তারই প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের ভ্রমণধারায় শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাই হবে মুখ্য। তাই ঘুম এখন শুধু প্রয়োজন নয়—একটি ‘লাক্সারি এক্সপেরিয়েন্স’।

ভালো ঘুম মানেই ভালো জীবন। আর স্লিপ ট্যুরিজম সেই ঘুমকেই পরিণত করেছে এক শিল্পে, যেখানে ভ্রমণ মানে শুধু দেখা নয়, নিজেকে খুঁজে পাওয়া, নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করা। @ শাকিলা জেরিন



পৃথিবীর প্রাচীনতম পাতাল শহর ডেরিনকুয়ু

হতো দুর্গ থেকে বেশ কিছু দূরে, যাতে করে শত্রুর আক্রমণের মুখে দুর্গের অধিবাসীরা নিরাপদে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পারে। শত্রুদের দ্বারা অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় বিভিন্ন খাদ্য ও যুদ্ধ সামগ্রীও এসব সুড়ঙ্গ পথেই আনা-নেয়া করা হতো। এছাড়া কোনো কোনো সুড়ঙ্গ গিয়ে শেষ হতো কোনো গোপন কুঠুরিতে যেখানে লুকিয়ে থাকা যেতো, রসদ লুকিয়ে রাখা যেতো কিংবা খুঁড়ে রাখা হতো পানির কূপ।

তবে প্রাচীনিকালেই সুড়ঙ্গ ব্যবস্থাকে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কাপাডোশিয়া অঞ্চলের হিট্টাইট সম্প্রদায়। অসংখ্য সুড়ঙ্গপথ ও চেম্বার তৈরির মাধ্যমে রীতিমতো তারা নির্মাণ করেছিল ডেরিনকুয়ু পাতাল শহর। ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ১২০০-১৬০০ শতাব্দীতে কাপাডোশিয়ায় নির্মিত হয়েছিল এই পাতাল শহর।

ওই সময়ে অঞ্চলটিতে বসবাস করতো হিট্টাইট সম্প্রদায়ের মানুষজন। বৈরী প্রকৃতি, আগ্রাসী জাতিগোষ্ঠী ও দুর্ধর্ষ ডাকাতদের সঙ্গে অভিযোজন করেই চলছিল তাদের জীবন। একদিন তারা স্বজাতি ও সম্পদের সুরক্ষায় অদূরে নরম শিলা মাটি খুঁড়ে নির্মাণ করলেন সুরক্ষিত পাতাল শহর।

হিট্টাইট সম্প্রদায়ের কঠোর পরিশ্রমে নির্মিত ডেরিনকুয়ু মাটির প্রায় ২৫০ ফুট গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শান্তিপ্রিয় হিট্টাইট জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০ হাজার মানুষ বসবাস করতো এ শহরে। আর তাই সবার নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিতে মাটির উপরিভাগে তৈরি করা হয়েছিল ৬০টি গোপন দরজা। শহরের অলিতে-গলিতে আলো-বাতাস ও অক্সিজেনের বাধাহীন চলাচল নিশ্চিতে আরো নির্মিত হয় প্রায় দেড় হাজার চিমনি।

হিট্টাইট সম্প্রদায়ের নির্মিত পাতালশহরের খোঁজ প্রত্নতাত্ত্বিকরা পেয়েছিলেন ১৯৬৩ সালের দিকে। তুরস্ক তখন আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। একদিন এক অধিবাসী নিজের বাড়ি মেরামত করছিলেন। আর তখনই আচমকা খসে পড়ে মেঝে। নিজের অজান্তেই তিনি আবিষ্কার করে ফেলেন ৩ হাজার বছরের পুরনো ডেরিনকুয়ু পাতাল শহর। আর তার পরপরই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন বেশ কজন প্রত্নতাত্ত্বিক। সরঞ্জাম গুছিয়ে শুরু করেন অনুসন্ধান।

প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে নগরীর রহস্যময় গোলকধাঁধাপূর্ণ গঠনশৈলীর বৃত্তান্ত।প্রায় ১৮ তলাবিশিষ্ট এ শহরের বিভিন্ন তলায় খুঁজে পাওয়া যায় আস্তাবল, তেলের ঘাঁনি, গুদামঘর, ভোজনকক্ষ, ভূগর্ভস্থ রত্নভান্ডার, প্রার্থনাকক্ষসহ আরও অনেক কিছুই। শহরের দ্বিতীয় তলায় দেখা মিলেছে কিছু অদ্ভুতদর্শন সমাধিরও।

এ থেকে অনুমান করা হয়, দ্বিতীয় তলাটি প্রার্থনালয়, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও অপরপাশে মৃতদের বিশেষ নিয়মে সমাহিত করার কাজে ব্যবহৃত হতো। এছাড়াও শহরের অভ্যন্তরে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য খুঁজে পাওয়া যায় নলাকৃতির বিশেষ সুরঙ্গের। এসব সুরঙ্গ দিয়ে পানি এসে জমা হতো কূপের তলদেশে। ইতিহাসবিদদের ধারণা, স্কুল, গির্জা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারও ছিল এখানে। সবমিলিয়ে এক পরিপূর্ণ সমৃদ্ধ শহর ছিল এই ডেরিনকুয়ু পাতাল নগরী।

ইতিহাসের পালাক্রমে বহুবছর ধরে হাত বদল হয়েছিল হিট্টাইট সম্প্রদায়ের পাতাল শহর। ইতিহাসের বাঁক ঘুরে সুরক্ষিত ডেরিনকুয়ু শহর একসময় ফ্রিজিয়ানদের হাত হয়ে কুক্ষিগত হয় বাইজেনটাইনদের হাতে। তারপর বাইজেনটাইনদের হাত থেকে অটোমানদের হাতে আসে ডেরিনকুয়ু।

অটোমানদের হাতে পড়ার পর পাতাল শহরটি বন্দীদের আটকে রাখতে ব্যবহার করা শুরু হয়।এর পরের ১০০ বছরে ঘটেছে অসংখ্য ঘটনা। একটা সময় পরে শেষ হয়েছে অটোমান অধ্যায়ও। গ্রিস ও তুরস্কের যুদ্ধের পর ১৯২৩ সালে উভয় ভূখণ্ডের মধ্যে আদান-প্রদান হয় নিজেদের জনগণ। সে সময় সেখানে বসবাসরত খ্রিস্টান অধিবাসীরা ছেড়ে যায় রহস্যময় এই পাতাল শহর। অবশেষে চূড়ান্তভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে প্রায় ৩ হাজার বছর পূর্বে গড়ে ওঠা এই পাতাল নগরী।

তথ্যসূত্র- হিস্টোরিক মিস্ট্রিস



প্রাচীন ইরানের উৎসব শাবে ইয়ালদা


'শাবে ইয়ালদা বা শাবে চেল্লেহ' নওরোজ ও চাহা'র শাম্বে সুরির মতো ইরানের ঐতিহ্যবাহী বিখ্যাত প্রাচীন উৎসবগুলোর মধ্যে একটি। এ উৎসব ইরানে অতীতের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে এখনো প্রচলিত রয়েছে। শাবে ইয়ালদার রাতে পরিবারের সদস্যরা একত্রে দিওয়ানে হাফিজ ও শাহনামা থেকে পাঠের মাধ্যমে সকাল পর্যন্ত জেগে থাকেন। আর সঙ্গে থাকে নানা স্বাদের খাবার আর ফলমূল। এই রাতটি হয় বছরের দীর্ঘতম রাত আর বংশপরম্পরায় ইরানিরা এ রাতেই উৎসবটি পালন করে।

'শাবে ইয়ালদা' উৎসব শরৎকালের শেষ দিন অর্থাৎ ইরানি 'অজার' মাসের শেষ দিন ৩০ তারিখের সূর্যাস্তের মাধ্যমে শুরু হয় এবং শীতকালের প্রথম দিন অর্থাৎ 'দেই' মাসের প্রথম দিন সকালের সূর্য উদিত হওয়ার মাধ্যমে শেষ হয়। খ্রিস্টীয় বর্ষ অনুযায়ী শাবে ইয়ালদা ২১ ডিসেম্বর রাতে হয়ে থাকে কিন্তু অধিবর্ষে ২০ ডিসেম্বরও হয়। তাই স্বাভাবিকভাবে শাবে ইয়ালদা ডিসেম্বরের ২১ বা ২০ তারিখে হয়ে থাকে। 'ইয়ালদা' সুরিয়ানী শব্দ যার অর্থ 'জন্ম বা সূচনা'। সুরিয়ানী ভাষাটি মাসিহিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, ইয়ালদা শব্দটি কখন ও কীভাবে ফারসি ভাষায় প্রবেশ করেছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, মাসিহিরা প্রাচীন রোমে অনেক কষ্টে জীবন অতিবাহিত করেছিল। এ কারণে তাদের অনেকে ইরানে হিজরত করে। এ দুই ভাষা ও সংস্কৃতির বিনিময়ের ফলে ইয়ালদা শব্দটি ফারসি ভাষায় জায়গা করে নেয়।

প্রকৃতপক্ষে শাবে চেল্লেহ-ই শাবে ইয়ালদা। 'চেল্লেহ' শব্দের অর্থ শীতকাল। এজন্য শাবে ইয়ালদাকে শাবে চেল্লেহ বলা হয়। চেল্লেহ দু'ভাগে বিভক্ত। চেল্লেহ এ বোযোর্গ অর্থাৎ বড় চেল্লেহ আর চেল্লেহ এ কুচাক অর্থাৎ ছোট চেল্লেহ। শীতকালের প্রথম ৪০ দিনকে বড় চেল্লেহ আর পরের ২০ দিনকে ছোট চেল্লেহ বলা হয়। বড় চেল্লেহটা শাবে ইয়ালদার পর শুরু হয়। এসময় শীতের শুরু হয় ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ে যা ইরানি দেই মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে বাহমান মাসের ১০ তারিখ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এরপরেই ছোট চেল্লেহ শুরু হয় যা ইরানি বাহমান মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত চলতে থাকে আর এসময় ঠাণ্ডা কম পড়ে ও কম অনুভূত হয়। শাবে ইয়ালদার প্রচলন কবে হয়েছে তা সঠিকভাবে বলা যায় না তবে অনেকেই মনে করেন উৎসবটি অন্তত সাতশ বছর পুরনো।

শাবে ইয়ালদা বা শাবে চেল্লেহ উদযাপনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব হলো উৎসব উপলক্ষে বাহারি খাবারের পরিবেশনা। শাবে ইয়ালদার রীতি ও রেওয়াজের মধ্যে রয়েছে ফা'লে হাফেজ (হাফিজের কবিতার মাধ্যমে ভাগ্য গণনা), শাহনামা পাঠ ও ফলমূল নিয়ে সোফরে (দস্তরখানা) সাজানো যেখানে তরমুজ ও ডালিম ঐতিহ্যবাহী ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল। আনার (ডালিম) ও তরমুজ শাবে ইয়ালদা উৎসবের জন্য সাজানো সোফরের মধ্যে সবসময় থাকে এমন দুটি ফল। পূর্বে আনারকে (ডালিম) উর্বরতা ও বরকতের ফল ভাবা হতো। একইসঙ্গে লাল রঙের হওয়ায় সূর্য ও আনন্দের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তরমুজ গ্রীষ্মকালীন ফল হলেও শাবে ইয়ালদার সোফরেতে রাখার কারণ হলো এটি সূর্যের প্রতীক যা গ্রীষ্মকালের উষ্ণতা ও তাপমাত্রাকে মনে করিয়ে দেয়।

এছাড়াও অজিল (শুকনো ফল) এর মধ্যে বাদাম, আখরোট, খোরমালু, মিষ্টি কুমড়া, পেস্তা ও মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হয়। সোফরেতে দিওয়ানে হাফিজ ও শাহনামাও রাখা হয়। সেইসঙ্গে এগুলো থেকে পাঠ করা হয়। শুকনো ফলগুলোকে বরকত, সুস্থতা ও অসীম সুখের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইরান ছাড়াও শাবে ইয়ালদা আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, আজারবাইজান ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও কোথাও কোথাও উদযাপিত হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে বিশ্বের যে প্রান্তে ইরানিরা রয়েছেন সেখানেও খুব আড়ম্বরপূর্ণভাবে শাবে ইয়ালদা উদযাপিত হয়। ইউনেস্কোর ১৭তম বৈঠকে শাবে ইয়ালদাকে 'ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। @ সুজন পারভেজ



জাপানের চেরি ব্লসম বা 'হানামি' উৎসব



ফুল পছন্দ করে না কিংবা ফুল দেখে মনে আনন্দ হয় না এমন মানুষ মেলা দুরূহ। ছেলে থেকে বুড়ো সকলেরই পছন্দ ফুল। বন্ধু, প্রিয়জনকে তাই তো বিশেষ বিশেষ দিনে ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ করতে মানুষ ফুল উপহার দেয়।

চেরি ফুল জাপানের জাতীয় ফুল। আর এই ফুল নিয়ে প্রায় দেড় হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে জাপানিরা পালন করে আসছে উৎসব 'হানামি'।

চেরি ফুল নিয়ে উদযাপিত হয় এই হানামি উৎসব। জাপানি শব্দ হানামির বাংলা ‘সবাই মিলে চেরি ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করা।‘

চেরি ফুলকে জাপানিরা ডাকে সাকুরা নামে। জাপানে এমন কোনো অঞ্চল নেই যেখানে চেরি ফুল ফোটে না।

খুব ক্ষণস্থায়ী জীবন এই চেরি ফুলের। মূলত মার্চ মাসের শেষের দিকে এবং এপ্রিলের শুরুতে জাপানে চেরি ব্লসমের দেখা মিলে। এই পুরো সময়টা জুড়েই জাপানিদের উৎসাহ ও আনন্দের বাধ ভেঙে যায়।


চেরি ব্লসম মৌসুমের ইতিহাস

চেরি ব্লসম বা সাকুরার সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক শতাব্দী-প্রাচীন। এর ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় হেইয়ান যুগে (৭৯৪-১১৮৫ খ্রিস্টাব্দ)। সে সময় অভিজাত শ্রেণির লোকেরা ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ‘হানামি’ বা ফুল দেখার উৎসবের প্রথা শুরু করে।

চেরি ব্লসমে মুগ্ধ বিশ্ব ছবি: রয়টার্স

প্রাথমিকভাবে এটি প্লাম ব্লসম নিয়ে শুরু হলেও নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চেরি ব্লসম প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে। সাকুরা জাপানি সংস্কৃতিতে জীবনের ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়, যা জাপানিজ দর্শনের ‘মনো নো আওয়ারে’ (ক্ষণস্থায়ী জিনিসের সৌন্দর্য) ধারণার প্রতিফলন।

এডো যুগে (১৬০৩-১৮৬৮) হানামি সাধারণ মানুষের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শোগুনরা চেরি গাছ রোপণকে উৎসাহিত করায় শহর ও গ্রামাঞ্চলে এর বিস্তার ঘটায়।

ওয়াশিংটনে চেরি ব্লসম ছবি: রয়টার্স

আধুনিক যুগে জাপানের বিভিন্ন পার্কে ব্যাপকভাবে সাকুরা গাছ লাগানো হয়। পাশাপাশি, ১৯১২ সালে জাপান ওয়াশিংটন ডিসি-তে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে ৩,০০০ চেরি গাছ উপহার দেয়। ফলে এর প্রচলন শুধু জাপানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী।

অপূর্ব দৃশ্যে মুগ্ধ হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা ছবি: রয়টার্স

বিংশ শতাব্দীতে চেরি ব্লসম জাপানের জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি সৈনিকদের জন্য আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে যুদ্ধের পর তা আবার শান্তি ও পুনর্জন্মের প্রতীক হয়ে ফিরে আসে। আজ জাপানে প্রায় ৬০০ প্রজাতির চেরি গাছ রয়েছে, যার মধ্যে ‘সোমেই ইয়োশিনো’ সবচেয়ে জনপ্রিয়।


পুরো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ভীড় জমায় চেরি ব্লসম দেখবার জন্য। আর চেরি ফুলকে বরণ করে নিতে জাপান জুড়ে চলে নানা আয়োজন।

চেরি ফুলের পার্কগুলোতে থাকে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভীড়। চেরি ফুলের মিষ্টি গন্ধ সকলের মনে প্রশান্তি এনে দেয়। নানা রঙের প্রজাপতির দেখা মেলে চেরি ফুল গাছগুলোয়।

চেরি ফুলের গন্ধ মনমাতানো হলেও ফুলটি ক্ষণস্থায়ী যার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় জাপানিদের জীবন দর্শনেও। চেরি ফুল মানব জীবনের জন্যেও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

জাপানের মতোই সারা বিশ্বজুড়ে চেরি ফুল এক উন্মাদনার নাম। জাপান ছাড়িয়ে অন্যান্য দেশেও এখন শোভা ছড়াচ্ছে এই ফুলটি। মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিল জুড়ে জাপানে আয়োজিত 'হানামি' উৎসব যা কিনা রূপ নেয় বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের এক মিলনমেলা।


১০



ব্ল্যাক বক্স’ কীভাবে বিমান দুর্ঘটনার রহস্য উন্মোচন করে

ব্ল্যাক বক্স সাধারণত বিমানের লেজের দিকে বসানো থাকে, কারণ সেই অংশ তুলনামূলকভাবে দুর্ঘটনায় তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: রোববার ১৩ জুলাই ২০২৫, ১৭:১৩ 

  

আহমেদাবাদে দুর্ঘটনা কবলিত বিমানের পেছনের অংশ আটকে আছে একটি ভবনে | ছবি- এপি

ব্ল্যাক বক্সে সাধারণত ককপিট ভয়েস রেকর্ডার এবং ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডারের তথ্য মেলে। মূলত ককপিট ভয়েস রেকর্ডার ও ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার—দুটি যন্ত্রকে একসঙ্গে বলা হয় ব্ল্যাক বক্স। এটি বিমান দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।

গত মাসে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, উড্ডয়নের পরপরই জ্বালানি নিয়ন্ত্রণের সুইচ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এতে ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং ইঞ্জিন থ্রাস্ট কমে যায়। ভারতের এয়ারক্রাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো শনিবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, ফ্লাইটের শেষ মুহূর্তে এক পাইলট আরেক পাইলটকে জিজ্ঞাসা করেন—কেন জ্বালানি বন্ধ করে দিয়েছেন। জবাবে অন্য পাইলট জানান, তিনি তা করেননি।

প্রতিবেদনটি বিমানের ব্ল্যাক বক্স থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ব্ল্যাক বক্সে সাধারণত ককপিট ভয়েস রেকর্ডার এবং ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডারের তথ্য মেলে। মূলত ককপিট ভয়েস রেকর্ডার ও ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার—দুটি যন্ত্রকে একসঙ্গে বলা হয় ব্ল্যাক বক্স। এটি বিমান দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।

ব্ল্যাক বক্স আসলে কমলা রঙের হয় যাতে ধ্বংসাবশেষের মধ্যে সহজেই তা খুঁজে পাওয়া যায়। ব্ল্যাক বক্স সাধারণত বিমানের লেজের দিকে বসানো থাকে, কারণ সেই অংশ তুলনামূলকভাবে দুর্ঘটনায় তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ককপিট ভয়েস রেকর্ডার বিমানের রেডিও বার্তা, পাইলটদের কথা, ইঞ্জিনের শব্দ প্রভৃতি রেকর্ড করে। এই সব শব্দের ভিত্তিতে ইঞ্জিনের গতি, কোনো সিস্টেমের ব্যর্থতা ইত্যাদি নির্ণয় করা সম্ভব।

পাইলট ও ক্রুর আলাপ এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের কথোপকথনও এতে সংরক্ষিত হয়। পরে বিশেষজ্ঞরা এই রেকর্ডিংয়ের ট্রান্সক্রিপশন করে। এতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

অন্যদিকে, ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার বিমানের উচ্চতা, গতি, দিকনির্দেশসহ অন্তত ৮৮টি বিষয়ের তথ্য রেকর্ড করে। আধুনিক বিমানে এই সংখ্যা হাজারেরও বেশি হতে পারে—যেমন ডানার ফ্ল্যাপের অবস্থান থেকে শুরু করে ধোঁয়া সনাক্তকরণের অ্যালার্ম পর্যন্ত। এই তথ্য দিয়ে তদন্তকারীরা একটি কম্পিউটার এনিমেশন তৈরি করতে পারেন, যা দেখায় বিমান কীভাবে ও কোথায় উড়ছিল।

বিমানের তথ্য রেকর্ডিং ডিভাইস তৈরির কৃতিত্ব অন্তত দুজনকে দেয়া হয়। ফ্রান্সের বিমান প্রকৌশলী ফ্রাঁসোয়া হুসানো ১৯৩০-এর দশকে আলোকচিত্র ফিল্মে বিমানের তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী ডেভিড ওয়ারেন ১৯৫০-এর দশকে ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের ধারণা দেন। ১৯৫৩ সালে প্রথম কমার্শিয়াল জেট এয়ারলাইনার ‘কোমেট’ বিধ্বস্ত হলে তিনি ভাবেন, পাইলটদের কথোপকথনের রেকর্ড থাকলে তদন্তে অনেক সুবিধা হবে। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রোটোটাইপ তৈরি করেন। পরে এটিকে বাণিজ্যিক বিমানে বাধ্যতামূলক করা হয়।

ব্ল্যাক বক্স নামকরণের রয়েছে বিভিন্ন ব্যাখ্যা। এয়ারবাসের তথ্যানুযায়ী, হুসানোর যন্ত্রটি আলোকরোধী বাক্সে রাখা হতো, এজন্য একে ব্ল্যাক বক্স বলা হয়।

অন্য ধারণা বলছে, দুর্ঘটনায় পুড়ে কালো হয়ে যাওয়ার কারণেও এই নাম হতে পারে। তাই রঙ কমলা হলেও ব্ল্যাক বক্স নামটিই থেকে গেছে। তাছাড়া, বিমান দুর্ঘটনার রহস্যময়তা বোঝাতেও এই নাম বেশি ব্যবহৃত হয়।
এপি অবলম্বনে



১১

সমকাল


রেড ইন্ডিয়ানদের টিকে থাকার লড়াই

ছবি: ন্যাশনাল টুডে

মো. গোলাম মোস্তফা

 প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৩ | ০৬:৩৪ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৩ | ০৬:৪৬

Facebook

X

WhatsApp

LinkedIn

Telegram

Messenger

Email

Share

-+

১৫ শতাব্দীর শেষভাগে ১৪৯২ সালে ইতালীয় নাবিক ঔপনিবেশিক কলম্বাস ভূলক্রমে আমেরিকা আবিষ্কার করলে তার খেসারত দিতে হয় সেখানকার আদিম আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের। পৃথিবীর সময়প্রবাহের জীবন ও সংস্কৃতির গণ্ডিতে নানান চড়াই উৎরাই পার করে আজও যেভাবে টিকে আছে রেড ইন্ডিয়ানরা-

রেড ইন্ডিয়ান কারা?

বলা হয় রেড ইন্ডিয়ানরা প্রায় ১৬ হাজার বছরের পুরোনো জাতি। দেখতে লম্বা, ফর্সা বা তামাটে। অনেকটা নাক চ্যাপটা এই জনগোষ্টীর লোকজন পূর্বে পিরু নামে পরিচিত ছিলেন। শান্তা মারিয়া জাহাজে করে দলবল নিয়ে কলম্বাস যখন আমেরিকা পৌঁছালেন তখন সেখানকার প্রথম বসতি স্থাপনকারী লোকেরা কলম্বাস ও তার ভ্রমণসঙ্গীদের স্বাগত জানালেন। তিনি ভাবলেন, তিনি ইন্ডিয়াতে এসে পৌঁছেছেন কিন্তু আসলে ছিল এটি আমেরিকা। দীর্ঘদিন কলম্বাস প্রেইরির দিগন্ত জোড়া এলাকায় আধিবাসীদের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করলেন। দেখলেন এই আধিবাসীরা শিকারে বা কোন উৎসবে যাওয়ার সময় একধরনের লাল রং মুখে ও শরীরে নানান অংশে ব্যবহার করেন। তাই কলম্বাস তাদের নাম দিলেন রেড ইন্ডিয়ান। কিন্তু কলম্বাস যাদের রেড ইন্ডিয়ান নামে অভিহিত করেছিল তারা কি কখনো নিজেদেরকে রেড ইন্ডিয়ান নামে পরিচয় দিয়েছে? উত্তর হল কখনই না। তারা নিজেদেরকে সে দেশের বাসিন্দা বলেই জানত। ‘রেড ইন্ডিয়ান’ ধারণাটি  মূলত ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের চিন্তা ও প্রচারপ্রসূত প্রপাগান্ডারই ফসল।

ভূমি মালিক থেকে ভূমিহীন

গবেষকরা মনে করেন প্রাচীন কালে উত্তর আমেরিকার বেরিং প্রণালীটি সেসময় তুষারে আবৃত ছিল। বর্তমানে সেটি এখন এশিয়া ও উত্তর আমেরিকাকে পৃথক করেছে। রাশিয়ার সাইবেরিয়ার সাথেও মেক্সিকোর যোগাযোগ ছিল। এসব অঞ্চল থেকেই প্রথম লোকজন বর্তমানের যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় প্রথম বসতি স্থাপন করে। পৃথিবীর সময় প্রবাহের সাথে সাথে বেরিং প্রণালীর তুষারখণ্ড আলাদা হয়ে যায়। এতে এশিয়া ও আমেরিকা পৃথক হয়। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো-কানাডায় যারা এভাবে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিলেন, তাদেরকেই ঔপনিবেশিকরা এভাবে রেড ইন্ডিয়ান তকমা লাগিয়ে দেয়।

মেক্সিকোর আ্যজটেক সভ্যতায় এই রেড ইন্ডিয়ানদের সমৃদ্ধ অবদান ছিল। মায়া ও ইনকা সভ্যতার গবেষকগণও মনে করেন, রেড ইন্ডিয়ান বলে যারা পরিচিত, তারাই এই সভ্যতা দুটির অন্যতম ধারক ও বাহক ছিল। কিন্তু কলম্বাসের নজর আমেরিকার উর্বর ভূমি আকর্ষণ করার পর থেকে এইসব আধিবাসীদের জীবন দুর্বিষহ হতে শুরু করে। এভাবে একসময় তারা ভূমি মালিক থেকে ভূমিহীন হয়ে যায়। 

টিকে থাকার লড়াই

আজকের দিনের ফিলিস্থিনিরা যেমন নিজ নিজ দেশে প্রবাসী, ঠিক তেমনি ঘটেছে আমেরিকার আদি ভূমি মালিকদের সাথে। অতিথিপরায়ন আমেরিকার আদি বাসিন্দারা যাদেরকে রেড ইন্ডিয়ান ডিসকোর্সের মাধ্যমে আমরা এতদিন বুঝে এসেছি, তাদেরকে প্রায় ৪০০ বছর পর্যন্ত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালাতে হয়েছে। আজকের ইউরোপ যাকে মহান কলম্বাস বলেন, তিনি ছিলেন প্রচন্ড মাত্রায় ঔপনিবেশিক মনোভাবের অধিকারী। তিনি ইন্ডিয়ায় ঔপনিবেশ স্থাপনের বৃহৎ পরিকল্পনা সেসময়ে ইতালির শাসকদের কাছে উপস্থাপন করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পরে স্পেনের শাসকবর্গের সহায়তায় তিনি প্রথম আমেরিকায় পৌঁছালেন। পুরো ইউরোপ তখন আমেরিকার চমৎকার ভূখণ্ডগুলো সম্পর্কে জানতে পারল। দলে দলে ইউরোপিয়ানরা এসে রেড ইন্ডিয়ানদের উৎখাত করে তাদের ভূমি দখল করল। পনেরশ শতাব্দীতে বিশ্বের সাম্রাজ্যগুলো নিজেদের মধ্যে নৌ শক্তি বৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় ছিল। পর্তুগাল, স্পেন ও ফ্রান্সের পর ব্রিটিশরা নৌ শক্তির একক হেজিমন হিসেবে নিজদের আধিপত্য তৈরি করেছিল। ব্রিটিশ ও ফ্রান্সের মধ্যে শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ শেষ হবার পর আটলান্টিকের উপকূলজুড়ে আমেরিকায় ব্রিটিশরা ১৩ টি ঔপনিবেশ স্থাপন করে। ফলে রেড ইন্ডিয়ানরা আরও ভূমি হারাতে থাকে। এরমধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ১৭৫৬-১৭৬৩ সাল পর্যন্ত সাত বছর ব্রিটেন ও ফ্রান্সে মধ্যে যুদ্ধ হয়। ফ্রান্স এতে পরাজিত হয়। বর্তমান আমেরিকার ভূখণ্ডের তখন ব্রিটিশদের ঔপনিবেশ শাসন জোরদার হয়। রেড ইন্ডিয়ানরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ব্রিটিশদের স্থাপন করা কলোনিগুলোর উপর  ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নানান শর্ত ও মাত্রাতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দিলে কলোনিগুলোর বসিন্দারা স্বাধীন আমেরিকা গঠনের উদ্যেগ নেয়। রেড ইন্ডিয়ানরা ভাবে তাদের বোধহয় মুক্তি মিলবে। কেননা আমরিকার স্বাধীনতার জনক জর্জ ওয়াশিংটন সবাইকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিল যে, আমরিকার ভূখণ্ড স্বাধীন হলে সেখানকার আধিবাসীরা সবাই মুক্ত ও স্বাধীন থাকবে। আর আগে থেকেই যেহেতু রেড ইন্ডিয়ানদের উপর ব্রিটিশদেরে নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়েছিল, তাই ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণার পর ব্রিটিশদের সাথে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত যে যুদ্ধ চলেছিল, তাতে রেড ইন্ডিয়ানদেরও অংশগ্রহণ ছিল। অথচ রাজনৈতিক সংস্কৃতির চরম বাস্তববাদ তত্ত্বের অনুশীলনকারী অমেরিকার ইতিহাসে রেড ইন্ডিয়ানদের কথা অনুচ্চারিত অবস্থাতেই থেকেছে। বরং আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের পর রেড ইন্ডিয়ানদেরকে তারা একপেশে করে রাখে। সিআরআই এর সম্পাদকীয় থেকে জানা যায়, বর্তমান আমেরিকা প্রায় ১৫০০ বার রেড ইন্ডিয়ানদেরকে আক্রমণ করেছে। ওই সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি রেড ইন্ডিয়ান নারীকে জোর করে বন্ধ্যা করা হয়। দেখা যায় ১৫ শতাব্দীর শেষে রেড ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা যেখানে ৫০ লাখ ছিল, সেখানে ২০শতাব্দীর শেষে এসে রেড ইন্ডিয়ানদের সংখ্যা দাড়িয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজারের মতো। 

রেড ইন্ডিয়ানদের উপর মূল খড়গ নেমে আসে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অ্যান্দ্রু জাকসনের আমলে। তিনি ১৮৩০ সালে ইন্ডিয়ান রিমুভাল অ্যাক্ট তথা আদিবাসী উৎখাত নীতি গ্রহণ করেন। ফলে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে রেড ইন্ডিয়ান জাতিগোষ্ঠীরা লড়াই সংগ্রাম ও কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। 

আমেরিকার গণমাধ্যমগুলোতে রেড ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কে তেমন খবরাখবর পাওয়া যায় না। তবে ২০১৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ভয়েস অব আমেরিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রেড ইন্ডিয়ান মহিলাদের পাঁচ জনের মধ্যে চার জনই যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকে। 

২০২২ সালের জুলাই মাসে রেড ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সবার নজরে আসে। মেক্সিকো, কানাডা ও আমেরিকায় রেড ইন্ডিয়ানদের বসবাস। ঘটনাটি ঘটে ২০২১ সালের মে ও জুন মাসে। জানা যায়, মে মাসে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার একটি স্কুল থেকে ২১৫ জন শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আর জুন মাসে সাসফাচেওয়ান প্রদেশের আরও একটি স্কুল থেকে ৭১৫টি কবরের সন্ধান মেলে। 

এই ঘটনার পর আদিবসীরা প্রতিবাদ শুরু করলে পুরো বিশ্বে জানাজানি হয়। তখন পোপ গিয়ে আদিবাসীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে তাদেরকে শান্ত করেন।

দেড় লক্ষাধিক আদিবাসী শিশুকে সভ্য করে তোলার নামে ১৮৬৩ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সময়ে ১৩০টি আবাসিক স্কুলে পাঠানো হয়। ছয় হাজার শিশু এর মধ্যে মৃতুবরণ করে। 

সহস্র নির্যাতন সহ্য করেও আমেরিকার আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানরা বর্তমান সময়ে আমেরিকার মোট জনসংখ্যার ১.৬% এর প্রতিনিধিত্ব করছে। আমেরিকার মূল ক্ষমতা কাঠামোয় বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত আদিবাসীদের তেমন কোন উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল না। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আদিবাসী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডেব হল্যান্ড দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই কলঙ্ক কিছুটা ঘুচেছে। মার্কিন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক রোক্সান দুনবার অর্তিজ তার ‘অ্যান ইন্ডিজিনাস পিপলস হিস্ট্রি অব ইউনাইটেড স্টেটস’ গ্রন্থে বলেন, উপনিবেশবাদী মার্কিনিরা আদিবাসীদের ভূমি কেড়ে নিয়ে তাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। আর সেটা করতে গিয়ে তাদের উপর সীমাহীন অত্যাচার চালিয়েছে। কিন্তু এই আদিবাসীরা প্রকৃতির নানান প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছেন। তাদের সেই অদম্য মনোভাবই তাদেরকে টিকিয়ে রেখেছে। 

জীবনযাপন

আমেরিকার আদি বাসিন্দা হিসেবে রেড ইন্ডিয়ানদের জীবনযাপন বেশ চমকপ্রদ। আধুনিক সভ্যতার মানুষ খাদ্য হিসেবে যে ভুট্টা ব্যবহার করেন, সেটি প্রথম উদ্ভাবন করেন রেড ইন্ডিয়ানরা। পশুপালন, শিকার ও কৃষিই তাদের জীবিকার প্রধান উপায় ছিল। তথাপি আমেরিকার একপেশে বর্ণবাদ, বৈষম্য ও পুঁজিবাদি ধারণা চর্চার ফলে রেড ইন্ডিয়ানদের উপর নানান বিধিনিষেধ জারি করে তাদের জীবনপ্রণালী পরিবর্তনের চেষ্টা চলেছে বহু বছর ধরে। রেড ইন্ডিয়ানরা নিজেদের ভেতর নানান ভাষায় যোগাযোগ রাখে। এসব ভাষার মধ্যে রয়েছে নাভাজো, আলাস্কান, ইয়ুপিক, ডাকোটা, সিওক্স, ত্র্যাপাচি, চক্কা, ক্রিক প্রভৃতি। এখনও প্রায় ১৫০টি ভাষা তাদের গোত্রের মধ্যে টিকে আছে। লোকসংখ্যার অধিকাংশই খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। অসুখ বিসুখ হলে এরা বিভিন্ন গাছের ছাল, বাকল, রস ব্যবহার করত। ধারণা করা হয় আমেরিকায় লাউ ও শিম সবজি দুটির প্রচলন রেড ইন্ডিয়ানরাই করেছিল। বিশেষ অনুষ্ঠানের দিন পাখির পালক দিয়ে তৈরি পোষাক পরিধান করেন। মুখে লালচে তরল রং মাখেন। তারা মূলত সিউ, অ্যাপাচি, উতে প্রভৃতি গোত্রে বিভক্ত।

সিউ গোত্রের মানুষজন ডাকোটা, লাকোটা এবং নাকোটা এই তিনভাগে বিভক্ত। ১৮৬২ সালে সিউদের বিরুদ্ধে শেতাঙ্গদের উপর হামলার অভিযোগ আনা হয়। ড্যানিয়েল ডাব্লিউ হোমস্টাড সিউদের নিয়ে এক নিবন্ধে লেখেন, প্রায় তিনশতাধিক সিউদের ওই হামলার অভিযোগ এনে হত্যা করা হয়েছিল। মহিষের মতো দেখতে একধরনের প্রাণী বাইসন। এই বাইসনের মাংস সিউদের প্রধান খাবার ছিল। আব্রাহাম লিংকনের প্রশাসন সিউদের পবিত্র জায়গা ব্ল্যাক হিলস দখল করে ও বাইসন হত্যা করে। ফলে অনেক সিউরা খাদ্য সংকটে পড়ে মারা যায়।

নাভাহোরা বসবাস করত মাটির তৈরি ঘরে। নাভাহোরা মেক্সিকোর সাথে যুদ্ধের সময় আমেরিকাকে সাহায্য করেছিল। অথচ যুদ্ধ শেষ হবার পর তাদের ভূখণ্ড আমেরিকার দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল থেকে আরও তিনশ মাইল দূরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তারা খাদ্য সংকটে পড়ে এবং বহু নাভাহোরা মারা যায়। 

কোমানচিরা খুব লড়াকু অশ্বারোহী যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিল। যাযাবর প্রকৃতির কোমানচিরা বাইসন শিকার করত। 

অন্যদিকে উতেদের আদিবাস হল যুক্তরাষ্ট্রের উতাহ অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায়। ভুট্টাচাষে এরাই সবচেয়ে বেশি দক্ষ ছিল। 

মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলে অ্যাপাচিদের আদিবাস ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মেক্সিকোর যুুদ্ধের সময় অ্যাপাচিরা যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করেছিল। পরে মার্কিন সরকার তাদের আদিবাস অ্যাপাচেরিয়া অঞ্চলটি আক্রমণ করে। তাদের খাবার ও বাসস্থান ধ্বংস করার ফলে বহু অ্যাপাচি মারা যায়। 

মূল্যায়ন

মূলত উত্তর আমেরিকার আদিবাসীরা তাদের আবাসিক ভূখণ্ডে ইউরোপীয়দের কলোনি স্থাপন কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। তাই এই আদিবাসীরা যাদেরকে আমরা রেড ইন্ডিয়ান বলে চিনি, তারা চিরকাল তাদের উপর হওয়া অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে। এদিকে শিল্প বিপ্লবের ফলে সৃষ্টি হওয়া ইউরোপের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের কাছে  তারা ধরাশায়ী হয়েছে। ড. অনদ্রিল ভৌমিকের “রেড ইন্ডিয়ান, কম্বল ও জৈব অস্ত্র” বিষয়ক নিবদ্ধ থেকে আমরা জানতে পারি, পৃথিবীতে প্রথম জৈব অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল ব্রিটিশরা রেড ইন্ডিয়ানদের উপর। 

আমেরিকার আদিবাসীরা ১৭৬০ সালের দিকে যখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেন, তখন ব্রিটিশ সেনা প্রধান ছিলেন জেফ্রি আহমার্স্ট। তিনি কর্নেল হেনরি বোকেটকে রেড ইন্ডিয়ানদের নির্মূল করতে নির্দেশ দেন। হেনরি বোকেট সেসময় গুটি বসন্তের জীবাণুযুুুক্ত কম্বল রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করেন। আর এতেই প্রচুর আদিবাসীরা মারা যায়। 

পরে আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জিত হলেও রেড ইন্ডিয়ানদের ভাগ্যের চাকা খোলেনি। বরং হত্যা ও নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে। তাইতো সিআরআই প্রতিবেদন দাবি করেছে, রেড ইন্ডিয়ানদের উপর মার্কিনিরা পরিকল্পিত গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু টিকে থাকার সংগ্রামে যারা প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকেন তাদের নিশ্চহ্ন করা সহজ কথা নয়। তাইতো হাজার বছর সংগ্রাম করে আজও টিকে আছে রেড ইন্ডিয়ানরা। 

বিশ্বমানবতার ধ্বজাধারী আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ-শেতাঙ্গ দ্বন্দ্ব অভ্যন্তরীণ মানসিক সংকীর্ণতার পরিমণ্ডলে এখনো আবৃত। মানবিক হস্তক্ষেপ তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা বিভিন্ন দেশে সমমনাদের নিয়ে যে হামলা চালায় তা সাম্প্রতিক বিশ্বে প্রশ্নাধীন। এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকা কীভাবে তার আদি বাসিন্দা তথা রেড ইন্ডিয়ানদেরকে বিবেচনা করছে সেটা মূল্যায়ন করেই আগামীর বহুমেরু বিশ্বে হয়ত আমেরিকার প্রকৃত মর্যাদা কী হবে সেটা নিয়ে খানিকটা ভাববে। 

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১. বেরি মাই হার্ট অ্যাট উনডেডনি, লেখক: ডি ব্রাউন

২. রেড ইন্ডিয়ান, লেখক: নিকোলা গ্রানিয়ে

৩. আটলান্টিক হিস্ট্রি: কনসেপ্ট এন্ড কাউন্টারস, লেখক: বার্নার্ড বিলেন


১২


শয়তানের পূজারি' ইয়াজিদি জনগোষ্ঠীর রহস্যময় সংস্কৃতি

ছবি: বিবিসি

ইয়াজিম পলাশ

 প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৩ | ০৪:৪৮ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৩ | ১০:১৭

Facebook

X

WhatsApp

LinkedIn

Telegram

Messenger

Email

Share

-+

আরব দেশগুলোতে যেখানে ইসলামের জন্ম হয়েছে, সেখানেই আজও টিকে আছে পুরাতন ধর্ম ইয়াজিদি। ইয়াজিদি এমন এক সম্প্রদায় যারা নিজেদের ঐতিহ্য এবং স্বতন্ত্র ধর্ম পরিচয়কে সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেও ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুক থেকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এদের অত্যন্ত পবিত্র স্থান ‘লালিশ’। তারা লালিশকে মুসলিমদের ‘মক্কা’, খ্রিস্ট্রানদের জেরুজালেমের মতোই পবিত্র বলে মনে করে। লালিশ একটি ছোট্ট পাহাড়ে গড়ে উঠা গ্রাম। যেটি ইরাকের কুর্দিস্তানে (ইরবিল থেকে ১২৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে) অবস্থিত। অথচ সবুজে ঘেরা এই ছোট্ট পাহাড়ে মাত্র ২৫ জনের বাস। সেখানে ইয়াজিদিদের প্রধান ধর্মীয় নেতারা সবাই বাস করেন।

সাত হাজার বছরের পুরোনো এই ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুসারীর সংখ্যা বিশ্বব্যাপী সাত লাখ। এদের অনেকে জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং অস্ট্রেলিয়াতে পুনর্বাসিত হয়েছে। অনেকে বিশ্বের অন্যান্য শরণার্থীদের সাথে মিশে এখনো উন্নত দেশগুলোতে আশ্রয়ের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর হাজার হাজার ইয়াজিদি বাস করছে ইরাক আর সিরিয়ার শরণার্থী ক্যাম্পে।

ইয়াজিদি ধর্ম বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মীয় ঐতিহ্যের একটি। ‘ইয়াজিদি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হল ‘আল্লাহর উপাসক’। এই শব্দটি মূলত ফার্সি ভাষা থেকে এসেছে। ইয়াজিদিরা তাদের দেবতাকে ‘ইয়াজদান’ বলে ডাকে।

ইয়াজিদিজম কী?

ইয়াজিদিরা বিশ্বাস করে যে ইয়াজিদিজম বা ইয়াজিদিবাদ হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীনতম ধর্ম এবং ইসলাম, খ্রিষ্টধর্মের কিছু কিছু বিষয় এক হওয়ায় এই ইয়াজিদি ধর্ম এই দুই ধর্মের মতোই অনন্য।

ইয়াজিদিরা বিশ্বাস করে, ঈশ্বর এই পৃথিবী আর আদম-হাওয়াকে সৃষ্টি করতে সাহায্য করার জন্য সাতজন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন। এরপর ঈশ্বর এই সাতজন ফেরেশতাকে বললেন, `তোমরা আদমের সামনে মাথা নত করো'। একজন বাদে বাকি ছয়জন ফেরেশতা ঈশ্বরের আদেশ পালন করলো। যে ফেরেশতা মাথা নত করলোনা ঈশ্বর তাকে পৃথিবীতে নির্বাসিত করলেন ময়ূর বেশে এবং সে `মালাইকা আত-তাউস' (ময়ূর ফেরেশতা) নামে পরিচিত হলো। পরবর্তীতে ঈশ্বর এই ফেরেশতাকে সকল ফেরেশতা এবং পৃথিবীতে মানুষের দায়িত্ব দেন।

এটিই মূলত ইয়াজিদিদের উপর নিপীড়ণের মূল কারণ যেখানে দেখা যায় ইয়াজিদিরা একজন পতিত ফেরেশতাকে উপাসনা করে। ইসলাম এবং খ্রিষ্ট ধর্মমতে `শয়তান' হচ্ছে সেই পতিত ফেরেশতা এবং অনেক মানুষ বিশ্বাস করে ইয়াজিদিরা তাহলে শয়তানের উপাসক।

কিন্তু ইয়াজিদিদের মতে, ইয়াজিদিরা শয়তানে বিশ্বাস করে না এবং শয়তান পাপের উৎস একথাও মানতে নারাজ। এদের বিশ্বাস ঈশ্বর প্রদত্ব সমস্ত ভালো কিছুই মানুষের জন্য এবং মন্দ যা তা সব মানুষেরই কাছ থেকে আসে।

ইয়াজিদিরা ঈশ্বরকে এত পবিত্র মনে করে যে তারা সরাসরি তার উপাসনাও করে না। তাদের মতে, ইয়াজদান সমগ্র মানব সৃষ্টির স্রষ্টা, তবে তিনি মহাবিশ্বকে রক্ষা করেন না, এই কাজটি তার অবতার দ্বারা করা হয়, যাতে ময়ূর ঈশ্বর প্রধান হুহ। ইয়াজিদিরা ময়ূরের দেবতার পাশাপাশি তার ময়ূরের পালককেও পূজা করে।

ইয়াজিদিদের আরেকটি ধর্মীয় বিশ্বাস হচ্ছে তারা প্রকৃতি পূজারী। তাদের মন্দিরের ফটকে একটি কালো রঙের সাপের প্রতিকৃতি থাকে। যাকে তারা ‘প্রকৃতির মা’ হিসেবে বিবেচনা করে। তারা কখনও সাপ হত্যা করে না, এমনকি সেটি বিষাক্ত হলেও। 

ইয়াজিদি ধর্মমতে অন্য ধর্মের কেউ ইয়াজিদি ধর্ম গ্রহণ করতে পারবে না। ইয়াজিদি হতে হলে তাকে ইয়াজিদি বাবা-মার সন্তান হতে হবে। এর মানে হলো কেউ ইয়াজিদি না হলে ইয়াজিদি হতে পারবে না। ধর্মীয় আরও কিছু প্রথা এই ধর্মকে দিন দিন সংকুচিত করে ফেলছে যার মধ্যে রয়েছে এদের বিবাহ নিজেদের ধর্মের মধ্যেই হতে হবে।

ইয়াজিদিদের প্রার্থনা কেমন?

ইয়াজিদিরা দৈনিক পাঁচবার প্রার্থনা করে। নিভেজা বেরিস্পেদে (ভোরের প্রার্থনা), নিভেজা রোঝিলাতিনে (সূর্যোদয়ের প্রার্থনা), নিভেজা নিভ্রো (দুপুরের প্রার্থনা), নিভেজা এভারি (বিকেলের প্রার্থনা), নিভেজা রোজাভাবুনে (সূর্যাস্তের প্রার্থনা)। তবে বেশিরভাগ ইয়াজিদি মাত্র দুই বারই প্রার্থনা করে আর তা হলো সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তর সময়। এই দুই সময় এরা সূর্যের দিকে এবং বাকি সময় গুলো লালিশের (যেখানে এদের পবিত্র মন্দির অবস্থিত) দিকে মুখ করে প্রার্থনা করে। এই দৈনিক প্রার্থনা বাইরের লোকেদের উপস্থিতিতে করা নিষিদ্ধ। বুধবার হচ্ছে ইয়াজিদিদের পবিত্র দিন এবং শনিবার হলো বিশ্রামের দিন।

ইয়াজিদিদের উৎসব কেমন?

ইয়াজিদিদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের একটি হচ্ছে ইরাক এর উত্তর মসুলের লালিশে অবস্থিত শেখ আদি ইবনে মুসাফির (শেখ সাদী) এর মাজারে সাতদিনের হজ্বব্রত বা তীর্থভ্রমণ পালন। যদি সম্ভব হয় প্রত্যেক ইয়াজিদি তাদের জীবদ্দশায় একবার শেখ সাদীর মাজারে তীর্থভ্রমণের চেষ্টা করতে বলা হয়েছে। তীর্থভ্রমণের সময় তারা নদীতে গোছল করে। তাউস মেলেকের মূর্তি ধৌত করে এবং শেখ সাদীর মাজারে শত প্রদীপ জ্বালায়। এসময় তারা একটি ষাঁঁড় কুরবানি করে। 

ব্যাপ্টিস্ট খ্রিষ্টানদের মতো ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের শিশুদের সর্বাঙ্গ পবিত্র পানিতে ডুবিয়ে দীক্ষা দেন একজন পীর। ডিসেম্বর মাসে ইয়াজিদিরা তিন দিন রোজা রাখে। পরে পীরের সঙ্গে সুরা পান করে। 

ইয়াজিদিরা কেন নির্যাতিত?

মূলত ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের লোকজন নিপীড়ণের লক্ষ্য হয়েছে। তবে এই নিপীড়ন সবসময় সহিংস রূপে ছিলোনা। এদের ভূমি থেকে উচ্ছেদও এদের প্রতি নিপীড়ণের একটা কারণ। ধর্মীয় বিচার ছাড়াও আরেকটি কারণে ইয়াজিদিরা নিপীড়িত হয়েছে আর তা হলো সাদ্দাম হোসেন কর্তৃক উত্তর ইরাকে আরব বসতি বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে অনারব ইরাকিদের বাস্তুচ্যুত করার চেষ্টা।

সূত্র: বিবিসি, ইনফো টেক লাইফ ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক



১৩

 রোর 


জরাথুস্ত্রবাদ: একটি ধর্মের আখ্যান

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিমে 17, 2019

article

তিন হাজার বছরের ইতিহাস বুকে আগলে টিকে থাকা জরাথুস্ত্রবাদ পৃথিবীর প্রাচীন ধর্মগুলোর একটি। সর্বোচ্চ দেবতা আহুরা মাজদার নাম অনুসারে এর অন্য নাম মাজদাইজম। সমাজবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ মনে করেন, এই ধর্ম পরবর্তী একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করেছে। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার ভাষ্য অনুযায়ী- 

“জরাথুস্ত্রের কাছ থেকেই পিথাগোরাস নির্দেশনা লাভ করেন এবং ক্যালিডীয়রা জ্যোতিষশাস্ত্র ও যাদুবিদ্যায় অনুপ্রাণিত হয়। জরাথুস্ত্রবাদ পরবর্তীতে ইহুদি মতবাদের অগ্রগতি ও খ্রিস্টীয় মতবাদের জন্মকে প্রভাবিত করে।” (খণ্ড- ২৯, পৃষ্ঠা- ১০৮৩) 

জরাথুস্ত্রবাদের বহুল প্রচলিত প্রতীক ফারাভাহার; Image Source: oldfirstucc.org

পারস্যের মাটিতে জন্ম নেওয়া ধর্মটি ব্যাপকতা লাভ করে সাসানীয়দের (২২৪-৬৫১ খ্রিস্টাব্দ) আমলে। স্বর্ণযুগে ছড়িয়ে পড়েছিল সুদূর গ্রিসেও। তারপর সহ্য করতে হয়েছে আলেকজান্ডারের আক্রমণ, সেলুসিড ক্ষমতার উত্থান, আরব মুসলমানদের অভিযান, মোঙ্গলদের তাণ্ডব এবং স্থানীয় তুর্কিদের দৌরাত্ম্য। বিক্ষিপ্তভাবে শুধু ইরান না; ভারত, পাকিস্তানসহ এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আজও টিকে আছে মহান জরাথুস্ত্রের অনুসারীরা। 

জরাথুস্ত্র এবং জরাথুস্ত্রবাদ

জরাথুস্ত্রবাদের জনক জরাথুস্ত্র নামের গ্রিক উচ্চারণ জরোয়েস্টার। প্রথাগত মত অনুসারে তাঁর জন্ম ৬২৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বর্তমান ইরানে এবং মৃত্যু ৫৫১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। যদিও তাঁর জন্ম-মৃত্যুর কাল নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। কিছু সূত্র বলছে, আলেকজান্ডারের পার্সিপোলিস জয়ের ২৫৮ বছর আগে তিনি বেঁচে ছিলেন। সে হিসেবে তাঁর মৃত্যুসাল ৮২ খ্রিস্টাব্দ। এমনও জানা যায়, ৪০ বছর বয়সে অনুগত শিষ্য ভিশতাস্পকে ৫৮৮ খ্রিস্টপূর্বে ধর্মান্তরিত করেন। সে সূত্র মোতাবেক তার জন্মসাল ৫৪৮ খ্রিস্টাব্দ। কেউ আবার আরো পিছিয়ে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জরাথুস্ত্রের সময় বলে দাবি করেছেন। এনসাইক্লোপিডিয়া অব রিলিজিয়ন বলছে-

“পূর্ব ইরানের গ্রাম্য সংস্কৃতিতে প্রোথিত জরাথুুস্ত্রবাদের শেকড়। ধর্মটি খ্রিস্টের জন্মের ১০০০ বছর আগে উৎপত্তি লাভ করে এবং পারসিক সাম্রাজ্যের ‍পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়।” (খণ্ড- ১৫, পৃষ্ঠা- ৫৮০)

জরাথুস্ত্রের আগমন বদলে দেয় বিশ্বাসের ইতিহাস; Image Source: ancient-origins.net

জরাথুস্ত্রবাদের কত অংশ জরাথুস্ত্রের শিক্ষা, আর কত অংশ প্রাচীন পারসিক বিশ্বাস থেকে গৃহীত, তাও স্পষ্ট বের করে আনা শক্ত। জরাথুস্ত্রবাদ অনুযায়ী, ঈশ্বর ‘আহুরা মাজদা’ কর্তৃক সত্য প্রচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন জরাথুস্ত্র।

যদিও প্রথাগত বহু-ঈশ্বরবাদী পারসিক ধর্মকে পুরোপুরি নাকচ করার চেষ্টা করেননি। শুধু চেয়েছেন ঈশ্বর হিসেবে আহুরা মাজদার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের অনেকেই তাকে বাইবেলে বর্ণিত নবী এজিকিয়েল, সেথ, নিমরোদ, বালাম এমনকি স্বয়ং যীশু বলে দাবি করেন। আদতে জরাথুস্ত্রবাদকে ইহুদি বা ইসলামের মতো একত্ববাদী বলা যায় না। বরং একে গ্রিক, ল্যাটিন ও ভারতীয়দের সাথে তুলনীয় বহু-ঈশ্বরবাদী প্রথাকে একক ও সার্বভৌম ঈশ্বরের ধারণায় আনার প্রয়াস বলা চলে।

জরাথুস্ত্র পূর্ববর্তী পারসিক ঐতিহ্য

পারসিক ভাষা সম্পর্কের দিক থেকে উত্তর ভারতের ভাষার খুব কাছাকাছি। দুই অঞ্চলের ভাষাই বুৎপত্তিগতভাবে ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠীভুক্ত। এমনকি ধারণা করা হয়, তাদের একটা সাধারণ পূর্বপুরুষও ছিল। ফলে সংস্কৃতি ও ধর্মের মধ্যে মিল থাকাই স্বাভাবিক। ধর্মগ্রন্থগুলো দেখে তারই প্রমাণ পাওয়া যায়। বেদ আর আবেস্তার মধ্যে রয়েছে বিস্ময়কর মিল। উভয় ধর্মই কাছাকাছি ধরনের বহু-ঈশ্বরবাদের ধারণা দেয়। দেবতাদের নামে পর্যন্ত পাওয়া যায় সাদৃশ্য। ভারতের ‘মিত্র’ পারস্যের মাটিতে ‘মিথরা’য় পরিণত হয়েছে। এসেছে ইন্দ্রসহ অন্যান্য বহু দেবতার নাম।

জরাথুস্ত্রপূর্ব বিশ্বাস, দেবতা-অসুরে সংঘর্ষ; Image Source: heritageinstitute.com

ইন্দো-ইরানীয়রা অলৌকিকতাকে দুটি ভাগে ভাগ করত- দেব ও অসুর। সংস্কৃত ‘দেব’ এর সাথে তুলনা করা যায় পারসিক আবেস্তার শব্দ ‘দৈব’, যার অর্থ স্বর্গীয় সত্তা। বৈদিক ভারতে অসুর মানে অতিপ্রাকৃতিক শক্তি। সংস্কৃতে শব্দটির দ্বারা বিশেষ প্রকার দানবকে বোঝানো হয়। পারস্যে ব্যাপারটি প্রায় উল্টো। আহুর (অসুর) এখানে প্রশংসিত হয় এবং দেবতাদের স্থান হয় দানব শ্রেণীতে। যেমন সর্বোচ্চ প্রশংসিত আহুরা মাজদা বা প্রজ্ঞাবান আহুরা।

প্রাথমিক দিনগুলো

অনেক আহুরার মধ্যে জরাথুস্ত্র শুধু আহুরা মাজদাকে প্রাধান্য দেন। জরাথুস্ত্রের প্রশস্তিগুলো ‘গাথা’ নামে পরিচিতি পায়। দারিয়ুস এবং তার উত্তরাধিকারীরা আহুরা মাজদার উপাসনা করতো।

একামেনিড আমলে প্রথম মাথা তোলে ইরান, মাথা তোলে জরাথুস্ত্রবাদও; Image Source: religionsweg.weebly.com

প্রভাবশালী গৌমাতা জরাথুস্ত্রবাদ গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে সমাজের অভিজাতবর্গের মধ্যে প্রিয় হয়ে ওঠে আহুরা মাজদা। দারিয়ুস এক অর্থে সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষার জন্যই খাপ খাইয়ে নেন। পরবর্তীকালে বহু দেবতার বিকল্প হিসেবে জার্কসিস জরথুস্ত্রবাদ গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় আর্টাজার্কসিসের আমলে (৪০৪-৩৫৯ খ্রিস্টপূর্বে) আহুরা মাজদার পাশাপাশি মিথরা এবং অনাহিতের নাম শোনা যায়। তাদের উপস্থিতি মোটেও নতুন উপাস্যের আবির্ভাব নয়, কেবল গুরুত্বের ফারাকই নির্দেশ করে।   

পার্থিয়ান সময়কালে (২৪৭ খ্রিস্টপূর্ব- ২২৪ খ্রিস্টাব্দ)

আলেকজান্ডারের অভিযানের মধ্য দিয়ে গোটা পারসিক সংস্কৃতি থমকে যায়। প্রথমদিকের মুদ্রা এবং শিলালিপিতে কেবল গ্রিকের উপস্থিতি থাকলেও পরবর্তীকালে উভয় সংস্কৃতি সামনে আসে।

সেলুসিডদের দ্বারা ইরানি সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করার প্রমাণ মেলে মুদ্রা ও শিলালিপিতে; Image Source: iranchamber.com

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের মাঝামাঝি গ্রিক এবং পারসিক উপাস্যের নামের মধ্যে অন্যরকম সামঞ্জস্যতা তৈরি হয়, যেমন- জিউস অরোমাজদেস, অ্যাপোলো মিথরা, হেলিয়োস হার্মেস প্রভৃতি। খ্রিস্টপূর্ব ৪০ অব্দে বর্তমান তুর্কমেনিস্তানে জরাথুস্ত্রীয় দিনপঞ্জিকার প্রচলন এই ধর্মের বিশেষ স্বীকৃতি প্রমাণ করে। সাসানীয়দের সময়ে স্থানীয় ইরানীয় ধর্মের প্রতি আগ্রহ কমে আসে।   

সাসানীয় আমল (২২৪- ৬৫১ খ্রিস্টাব্দ)

বিভিন্ন উৎস থেকে কার্তার এবং তানসার নামে দুজন ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। সাসানীয় যুগে তারা জরাথুস্ত্রবাদ প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছিলেন। তানসার ছিলেন প্রভাবশালী এহরপাত, যার অর্থ ধর্মতাত্ত্বিক ও পণ্ডিত। তানসার লিখিত বাণীগুলো একত্র ও ‍সুসংবদ্ধ করেন। শাপুরের (মৃত্যু ২৭২ সাল) আমলে কার্তারও এহরপাত ছিল। দ্বিতীয় বাহরাম (২৭৬-২৯৩ সাল) কার্তারকে ‘সাম্রাজ্যের প্রধান বিচারক’ উপাধি প্রদান করেন।

পাথরে খোদাইকৃত কার্তার; Image Source: britannica.com

সাফল্যের চরমতম পর্যায়ে দাঁড়িয়ে তিনি ইহুদি, বৌদ্ধ, ব্রাহ্মণ, খ্রিস্টান এবং ধর্মত্যাগীদের উপর ব্যাপকভাবে চড়াও হন। দ্বিতীয় শাপুরের তার ক্ষমতাকালে (৩০৯-৩৭৯ খ্রিস্টাব্দ) প্রধান পুরোহিত আতুরপাত আবেস্তা সংকলনের জন্য সম্মেলন আহ্বান করেন। অনেকটা সফল হয় এই উদ্যোগ। ৪৮৮ – ৪৯৬ এবং ৪৯৮ – ৫৩১ খ্রিস্টাব্দ এই দুই দফায় ক্ষমতায় ছিলেন কোবাদ। তার সময়েই মাজদিয়ান মতবাদের উত্থান গোটা ইতিহাসকে বদলে দিতে শুরু করে। কোবাদের পুত্র প্রথম খসরু মাজদিয়ান চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন। এই টানাপোড়েনের শেষপ্রান্তে দ্বিতীয় খসরু (৫৯১-৬২৮ সাল) এক খ্রিস্টান রমণীকে বিয়ে করেন। খুব সম্ভবত নিজেও ধর্মান্তরিত হন।

মুসলিম আগমনের পর

৬৩৫ সালে মুসলমানরা কাদিসিয়ার যুদ্ধে শেষ সাসানীয় সম্রাট ইয়াজদিজার্দকে পরাজিত করে। জরাথুস্ত্রবাদীরা বিদ্রোহ করতে গেলে হিতে বিপরীত হয়। 

কাদেসিয়ার যুদ্ধ ঘুরিয়ে দেয় ইতিহাসের গতিমুখ; Image Source: weaponsandwarfare.com

শেষ অবধি পুরোনো বিশ্বাস ও চর্চাকে আঁকড়ে ধরে খুব অল্প সংখ্যকই টিকতে পারলেন। ধর্ম রক্ষার জন্য বই প্রস্তুত করা হতে থাকলো। সংখ্যালঘুরা পরিচিত হতে থাকলেন ‘গাবার’ নামে। যাদের বেশিরভাগ থাকতেন ইয়াজদ্ এবং কিরমান অঞ্চলে। পরবর্তীকালে অনেকেই ইরান ত্যাগ করে বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে পাড়ি জমান।  

কিতাব ও দলিলাদি

আবেস্তা হলো বিভিন্ন সময়ে লেখার সংকলন, যা শেষ হয় সাসানীয় আমলে। তৎকালীন আবেস্তা ছিল বর্তমানে টিকে থাকা আবেস্তার ৪ গুণ। কেবলমাত্র ‘গাথা’কেই জরাথুস্ত্রের বাণী বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

জরাথুস্ত্রবাদের প্রাণ আবেস্তা; Image Source: Birmingham.ac.uk

ভেনদিদাদের প্রথম দুই অধ্যায়ে মানুষের জন্য কীভাবে আইন এসেছে, তা বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তী আঠারো অধ্যায়ে আছে বিভিন্ন আইন। অন্যদিকে ইয়াশত পরিচয় করিয়ে দিয়েছে মিথরা, অনাহিতা এবং ভেরেথ্রাগ্ন এর মতো একুশজন উপাস্যের সাথে। জরাথুস্ত্রবাদের উপর নয় খণ্ডে রচিত বিশ্বকোষ দিনকার্ত রচিত হয় নবম শতকে মুসলিম শাসনামলে। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে আছে মেনক-ই-খরাত, বুন্দাহিশন নামে আবেস্তার ব্যাখ্যা এবং বুক অব আরতায় ভিরাফ।

বিশ্বাস ও বৈশিষ্ট্য

ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাসে জরাথুস্ত্র একত্ববাদ ও দ্বৈতবাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু তার একত্ববাদ এবং দ্বৈতবাদ পরস্পর বিরোধী নয়, বরং সামঞ্জস্যকারী। স্পেনটা মাইনু এবং আঙরা মাইনু দুই জমজ সত্ত্বা। স্পেনটা মাইনু হলো সত্য ও শুভর প্রকাশক এবং আঙরা মাইনু মিথ্যা ও অশুভর নির্দেশক। উভয়ের জন্মই পরম একক সত্তা আহুরা মাজদা থেকে, ‘আশা’ বা সত্য এবং ‘দ্রুজ’ বা মিথ্যা থেকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে। সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম এবং অসৎ চিন্তা, অসৎ বাক্য, অসৎ কর্ম বেছে নেবার মাধ্যমে উভয়ের প্রকাশ। জমজ এই দুই সত্তার বেছে নেবার ধারণাই দ্বৈতবাদের জন্ম দেয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে আদিম সেই তাৎপর্য বিদ্যমান।  

জগতের সকল ক্ষেত্রেই ভালো আর মন্দের সংঘাত; Image Source: oshisushidonzbronz.weebly.com/beliefs.html

আহুরা মাজদাই আকাশ-মাটি, আলো-অন্ধকার ও দিন-রাত সৃষ্টি করেছেন। সেই সাথে সৃষ্টি করেছেন ভালো ও মন্দ। সৃষ্টির প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে বলা হয় তিনটি সময়ের কথা; প্রথমে বুন্দাহিশন বা সৃষ্টি, তারপর গোমেজিশন বা দুই বিপরীত শক্তির সমাবেশ এবং সর্বশেষ উয়িজারিশন বা পৃথকীকরণ। জগতে অস্তিত্বশীল সবকিছুই এজন্য দুটি অবস্থায় বিরাজ করে- আধ্যাত্মিক এবং শারীরিক। একটা ভাব এবং অন্যটা বস্তু। এখানে প্লেটো ও এরিস্টটল নামদ্বয় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

আবেস্তার মতে, পৃথিবী সৃষ্টি করা হয়েছে ছয়টি ক্রমিক ধাপে। প্রথম মানব এবং প্রথম মানবী আঙরা মাইনুর দ্বারা পথভ্রষ্ট হয়। মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মরণশীল হিসেবে। কিন্তু তার ভেতর অমরত্বের গুণাবলি বিদ্যমান। মৃত্যুর পর সবাইকে চিনবৎ সাঁকো পার হতে হবে। পূন্যশীলেরা সেটি পার হয়ে বেহেশতে প্রবেশ করবে আর পাপীরা নিচে দোজখে পতিত হবে। ভালো আর মন্দের বিচারও হবে সেই দিন। যাদের ভালো আর মন্দের পরিমাণ সমান, তারা হামিস্তাগান নামক মধ্যবর্তী স্থানে থাকবে।

চিনবৎ সাঁকোর কল্পচিত্রায়িত রূপ; Image Source: Heritageinstitute.com

জরাথুস্ত্রের মতে, জগৎ হলো ভালো ও মন্দের মধ্যকার যুদ্ধক্ষেত্র। যদিও এখন আঙরা মাইনুর জয়জয়কার। তবে খুব দ্রুতই আহুরা মাজদার জয় আর আঙরা মাইনুর ধ্বংসপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে সব দ্বন্দ্বের শেষ হবে। আর সবকিছু শেষ হবার আগে তিনজন ত্রাতা আসবেন। ভবিষ্যতে ধর্মের রক্ষক আগমনের উক্ত ধারণা পরবর্তীকালে অনেক ধর্মই গ্রহণ করেছে। 

চর্চা ও রীতিনীতি

জরাথুস্ত্রবাদের কিছু উপাসনাকেন্দ্র আবিষ্কৃত হয়েছে। নকশাগত দিক থেকে এগুলো টাওয়ার ও বর্গাকৃতির। চার দরজা বিশিষ্ট পবিত্র দেয়ালকে বলা হয় চাহারতাক। ইরান জুড়ে এর অসংখ্য নজির বিদ্যমান। পবিত্র আগুনের মধ্যে আবার বিস্তর ফারাক। যাজকদের জন্য আগুনের নাম ফারবাগ, যা প্রথমে খাওয়ারিজমে দেখা যায়, পরে ফারসে স্থানান্তরিত হয়। যোদ্ধাদের জন্য আগুন ছিল গুশনাস্প। তবুও ধর্মীয় একত্বতার প্রতীক এই আগুন। অন্যদিকে বুর্জেন-মিহর আগুন ছিলো কৃষকদের জন্য। এর বাইরেও আগুন দুইভাগে বিভক্ত। আদুরান বা গ্রাম্য আগুন এবং ভারহরান বা রাজকীয় আগুন। 

আগুনের মধ্যেও রয়েছে নানান প্রকরণ; Image Source: planetdetective.com

এ রাজকীয় আগুনের দেখভাল যারা করতেন, তাদেরই পেশাগত পদবি ছিল এহরপাত। গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তার ভূমিকা থাকতো অনেকটা সহকারী যাজকের মতো। তার ওপরের পদবি হলো মোবেদ আর সর্বোচ্চ পদবি ‘দস্তুর’। দস্তুরের কাজ প্রধান ধর্মযাজকের মতো, যার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যাজকত্বের দায়িত্ব বংশানুক্রমিক। কিন্তু প্রত্যেককেই একটা নির্দিষ্ট শিক্ষা ও চর্চার ভেতর দিয়ে যেতে হতো। প্রত্যেক জরাথুস্ত্রবাদীর ৭ বা ১০ বছর বয়সে অভিষেক হয়। তখন তাকে ‘সাদরে’ (শার্ট) এবং ‘কুস্তি’ (কোমরবন্ধনী) দেওয়া হয়, যা তাকে পরতে হয় পরবর্তী জীবনভর। পায়দাব, নাহন ও বারেশনুম নামে তিন ধরনের পবিত্রতা পদ্ধতি আছে। 

পবিত্র অনুষ্ঠান ইয়াসনা মূলত পবিত্র আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে আবেস্তার শ্লোক পাঠ করা ও আহুতি দেয়া। পবিত্র আগুনকে নিরন্তর প্রজ্বলিত অবস্থায় রাখা ও দিনে পাঁচবার উপাসনা করা অন্যতম প্রধান আচার। মৃত্যুর পর লাশকে যথাযথভাবে গোসল করানো হয়। সামনে বিশেষ কুকুর নিয়ে আসা হয়। পরের ধাপে একটা ঘরে রাখা হয় পবিত্র আগুনের সাথে। সবশেষে জোড় সংখ্যক বাহকের দ্বারা লাশকে দাখমাত (Tower of Silence)-এ সরিয়ে নেওয়া হয়।

কবর বা চিতায় না, লাশ যায় দাখমাতে; Image Source: Persepolis.nu

এ ধর্মমতে, যেহেতু মৃত্যু আঙরা মাইনুর কাজ, তাই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেহ অপবিত্র হয়। এ অপবিত্র দেহ যদি মাটির ওপর রেখে পোড়ানো হয় বা পুঁতে ফেলা হয়, কিংবা পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, তবে দেহের শুদ্ধিলাভ হয় না। উল্টো পৃথিবীই অপবিত্র হয়। তাই তারা দাখমাত নামক উঁচু টাওয়ারের ওপর লাশকে ফেলে যায় শকুনের উদ্দেশ্যে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তা নিঃশেষিত হয়।

উৎসব ও অন্যান্য 

উৎসব জরাথুস্ত্রবাদে উপাসনারই অংশবিশেষ। প্রধান উৎসব ‘গাহামবার’ বছরে ছয় পর্বে পালিত হয়। প্রতি পর্ব পাঁচদিন ব্যাপী বিস্তৃত। প্রতি মাসের একদিন ও প্রতি বারোমাসের একমাস উপাস্যের জন্য উৎসর্গকৃত। এছাড়া নওরোজ বা বছরের প্রথম দিন, ফ্রাওয়ারদিগান বা ১০ দিনব্যাপী হামাসপাথমাইদিয়াম গাহামবার, পাতেতি বা বছরের শেষ দিন, সাদেহ এবং জরাথুস্ত্রের জন্ম ও মৃত্যুদিন উদযাপন করা হয়। 

বিভিন্ন সময়ে চিত্রচর্চার ধারা গড়ে উঠেছে সংস্কৃতিকে আশ্রয় করে। সাসানীয় ও পরবর্তীদের মধ্যে যার প্রভাব স্পষ্ট।

সাদেহ উৎসব; Image Source: Yazd.todayহাজার বছর পর এসেও জরাথুস্ত্র ভাবায় পণ্ডিতদের; Image Source: kobo.com

পরিশেষ

বর্তমান বিশ্বে জরাথুস্ত্রবাদীদের আনুমানিক সংখ্যা দুই লাখ। কিন্তু তার চিন্তা প্রভাবিত করেছে বহু পণ্ডিতকে। জরাথুস্ত্রবাদকে প্রথম দেখায় ততটা নৈতিকতা নির্ভর মনে না হলেও প্রকৃতপক্ষে এর পরিধি ব্যাপক। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সকল প্রকার মন্দ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা এবং ভালো কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট রাখার ওপর জোর দেয়া হয়েছে এতে। প্রাচীন পৌত্তলিকতা থেকে বের হয়ে ইহ ও পরজাগতিক যে চিন্তার বিপ্লব জরাথুস্ত্র ঘটিয়েছেন, তা বিবর্তিত অবস্থায় প্রবাহিত হয়েছে অন্যান্য বেশ কিছু ধর্মেও। তিন হাজার বছর পরে এসেও জরাথুস্ত্রের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই। এজন্যই আধুনিক কালের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিক ফ্রেডেরিখ নীৎশেকে লিখতে হয় ‘দাজ স্পোক জরাথুস্ত্র’



১৪


হিট্টাইট ধর্ম: পশ্চিম এশিয়ার প্রতিবিম্ব

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিমার্চ 13, 2022

article

বর্তমান এশিয়া মাইনরের কথা। খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০০ অব্দের দিকে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী এক সভ্যতা। ধীরে ধীরে যারা প্রতিষ্ঠা করে সাম্রাজ্য। আয়তনে বিশাল এবং ক্ষমতায় প্রবল। তাদের প্রভাব এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, সমকালীন হিব্রু ধর্মগ্রন্থ এবং মিশরীয় লিপিতেও নাম দেখা যায়। ইতিহাসে তারা পরিচিত হিট্টাইট বা হিট্টি সভ্যতা নামে। ধর্ম এবং বিশ্বাসের ইতিহাসে তাদের প্রভাব একেবারে উপেক্ষা করা যায় না।

হিট্টিদের ইতিহাস মোটা দাগে দুইটা সময়ফ্রেমে বিভক্ত। খ্রিষ্টপূর্ব ১৭০০ অব্দ থেকে ১৫০০ অব্দ পর্যন্ত সময় পুরাতন রাজবংশের যুগ; ১৪০০ থেকে ১২০০ অব্দ পর্যন্ত সময় নতুন রাজবংশের যুগ। মধ্যবর্তী সময়টুকু বিক্ষিপ্ততা ও অন্ধকারের; যা নিয়ে খুব একটা নিশ্চয়তায় আসা যায় না। সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ সম্রাট প্রথম সুপ্পিলুলিউমা (১৩৪৪-১৩২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) এবং তার পুত্র দ্বিতীয় মুরসিলি (১৩২১-১২৯৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) এর আমল। তারপর থেকেই ধীরে অবক্ষয় এবং সবিশেষ আসিরিয়দের কাছে পতন।

হিট্টিদের বিশ্বাস এবং ধর্মীয় জীবানাচার নিয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। কেবল মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, প্রাপ্ত লিপি থেকে দৈবধারণা এবং বিভিন্ন উৎসবের রেওয়াজ থেকে সংস্কৃতির ধারণা মেলে। ধারণা পাওয়া যায় বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধির ব্যাপারে।

এশিয়ার পশ্চিমে হিট্টিরা গড়ে তুলেছিল কৃষিনির্ভর সমৃদ্ধ সভ্যতা; Image Source: asor

 

প্রাচীন এশিয়া মাইনর কৃষি ও পশুপালনে সমৃদ্ধ ছিল। সেই প্রভাব পড়েছে সেখানকার ধর্মচিন্তা এবং আচারে। প্রতিবার প্রার্থনায় সাধারণ মানুষ সম্রাট ও তার পরিবারসহ যে শক্তির প্রভাবে হিট্টির ভূমিতে প্রাণ সঞ্চারিত হয়, তাদের উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতো। সমকালীন লিপিতে ‘সহস্রদেবতা’ বলে উল্লেখ করা হলেও তাদের নাম বা নিদর্শন মেলেনি। অবশ্য নেরিক, হাততুসা এবং সাপিনুয়ার মতো নগরগুলোতে পৃথক বিশ্বাসের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই সাথে দেখা যায় পার্শ্ববর্তী লুউইয়ান বিশ্বাস এবং সংস্কৃতির প্রভাব। খ্রিষ্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতকের দিকে বিচ্ছিন্ন উপাস্যদের বিশেষ সংগঠিত অবস্থায় উপসনা শুরু হয়; যার প্রমাণ ইয়াজিলিকায়ার ধ্বংসাবশেষ। দেবতাদের এমন চক্র বা দল পরিচিত ছিল কালুতি নামে।

সবচেয়ে পরিচিত সূর্যদেবী উরুসিমা। ইন্দো-ইউরোপীয় অধিকাংশ উপকথাতেই সূর্যকে দেবতা বলে চিহ্নিত করা হলেও হিট্টাইট সংস্কৃতিতে এসেছে দেবী রূপে। উরুসিমা কেবল সূর্যদেবী ছিলেন না; ছিলেন ধরণী মাতাও। এইজন্যই প্রাচীন প্রার্থনাতে তাকে হুরিয়ান দেবী খেবাতের সাথে তুলনা করা হয়েছে।

“হে আরুন্য নগরের সূর্যদেবী! হে মহিয়সী!! আপনি এই জমিনের রাণী। হাত্তি নগরে আপনি আপনি সূর্যদেবী নাম নিয়েছেন। কিন্তু দারুবৃক্ষের দেশে (হুরিয়া) আপনিই খেবাত।”

সূর্যদেবী উরুসিমার বিয়ে হয় দেবতা তারহান্ত-এর সাথে। তাদের দুইজনের সন্তান তেলিপিনু এবং ইনারা। তেলিপিনু ছিলেন কৃষির দেবতা; অন্যদিকে ইনারা প্রতিরক্ষার দেবী। তাদের বাইরে আছেন চিকিৎসার দেবি কামরুসিপা। ক্রমে হুরিয়ান উপাস্যরা প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে কুমারবি এবং উলিকুম্মি অন্যতম।

এশিয়ার পশ্চিমে গড়ে উঠেছিল কৃষিভিত্তিক সমৃদ্ধ সভ্যতা; Image Source: istambul.com

 

হিট্টাইট বিশ্বাসে দেবতা এবং মানুষের মধ্যস্থতায় যাজকশ্রেণির অতটা দাপটের নজির দেখা যায় না। অন্তত মিশরীয় কিংবা মেসোপটেমিয় সভ্যতার মতো প্রভাব অর্জন করতে পারেনি। এখানে দেবতা এবং মানুষকে একে অপরের প্রতি সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এক প্রার্থনায় দেখা যায়,

সমস্ত হাত্তির জমিন শুকিয়ে যাচ্ছে; ফলে কেউ আপনাদের জন্য উৎসর্গ করতে পারছে না। কৃষক মারা গেছে, ফলে দেবতার জমিতে কাজ করার বা ফসল তোলার কেউ নেই। কর্মী নারীটিও বেঁচে নেই, ফলে দেবতাদের জন্য উৎসর্গ দ্রব্য প্রস্তুত করার কেউ নেই। গরু ও মহিষের রাখাল মারা গেছে। খোয়ারগুলোও শূন্য। ফলে  উৎসর্গও থেমে গেছে। হে দেবতাগণ, দেখুন। এইখানে আমাদের ঘাড়ে কীভাবে দায় চাপাবেন!

রাজা ছিলেন হিট্টাইট জীবনব্যবস্থার প্রধান নিয়ামক। তাকে গণ্য করা হতো মহাবিশ্বের অপরিহার্য উপাদান হিসাবে। যার প্রভাব পড়েছিল ধর্মজীবনে। সম্রাট একাধারে দেবতাদের মনোনীত মানুষের প্রতিনিধি। অন্যদিকে মানুষের কাছ থেকে দেবতাদের প্রতি সমস্ত প্রার্থনা ও উপাসনা প্রেরণের বাহক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য খোদ সম্রাটই পরিগণিত হয়েছে সূর্যদেবতা হিসেবে। ইয়াজিলিকায়াতে ধারণা করা হতো রাজা মৃত্যুবরণ করলে দেবতার রূপ গ্রহণ করেন। ফলে সেখানে মৃত সম্রাটের প্রতিও উপাসনা উৎসর্গ করা হতো। প্রায় ক্ষেত্রেই রাণীকে তুলনা করা হতো সূর্যদেবীর সাথে। অর্থাৎ রাজপরিবার নেহায়েত একটা পরিবার না। দুনিয়ায় স্বর্গীয় উপস্থিতি। ফলে রাজপরিবারের সদস্যরাও বছরের বিভিন্ন সময়ে পূজা পেতেন। সেখানে তীব্র না আকারে না হলেও পার্শ্ববর্তী মিশরীয় কিংবা মেসোপটেমিয় ধর্মের প্রভাবও দেখা যায়। দায়িত্ব গ্রহণকালে রাজা আবৃত্তি করতেন-

সূর্যদেবতা ও চন্দ্রদেবতা আমার প্রতি আস্থা রেখেই রাজত্ব দিয়েছেন। দিয়েছেন ভূখণ্ড এবং নাগরিকদের উপর কর্তৃত্ব। আর তাই আমি রাজা হিসাবে এই রাজ্যের ভূখণ্ড এবং নাগরিকদের রক্ষা করবো সমস্ত বিপদ থেকে।

হিট্টাইট নাগরিকদের বিশ্বাসব্যবস্থার কেন্দ্রে ছিলেন রাজা; Image Source: istambul.com

 

বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা মন্দির ছিল দেবতাদের বাসস্থান। যাজকদের জন্য থাকতো নানা রকম যাগ-যজ্ঞ এবং কঠিন নিয়ম কানুন। দেবতাভেদে উপাসনার রীতি ও সময় ভিন্ন। দেবতার প্রাধান্য হিসেবে তারতম্য হতো মন্দিরের চাকচিক্যেও। মন্দিরের প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুর সংস্থান করতে পাশেই থাকতো ওয়ার্কশপ এবং স্টোররুম। কিন্তু প্রত্যেক দেবতার মন্দিরের জন্যই বিভিন্ন অনুপাতে নগরের বাইরে ফসলি জমি বরাদ্দ থাকতো। অর্থাৎ মন্দিরের প্রভাব নেহায়েত কম ছিল না। উৎসবের দিনগুলোতে স্থানীয় দেবদেবীরা পেতেন সম্পূর্ণ নতুন রূপ। তার একটা প্রমাণ খ্রিষ্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতকে লাপানায় প্রাপ্ত একটা জরিপের মধ্যে।

দেবী ইয়াইয়ার কাঠের মূর্তি। উচ্চতা এক কিউবিট। স্বর্ণের প্রলেপ দেয়া মাথা। শরীর আর সিংহাসনে প্রলেপ টিনের। কাঠে নির্মিত দুইটা পাহাড়ি মেষ। দেবীর দুই পাশে বসিয়ে রাখা। তাদের শরীরেও টিনের প্রলেপ বসানো। এছাড়া টিনের প্রলেপ দেয়া একটা ঈগলমূর্তি, তামানির্মিত দুটি গামলা এবং ব্রোঞ্জনির্মিত দুটি পানপাত্র। দেবীর নতুন মন্দির। পুরোহিত একজন পুরুষ।

হিট্টাইট দেবতারা যেন এক বিশেষ অভিজাত শ্রেণি। মন্দির ছোট হোক কিংবা বড়। কোনো অবস্থাতেই দেবদেবীদের অযত্নে পড়ে থাকতে হতো না। উপরন্তু তাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হতো খাদ্য। পরিয়ে রাখা হতো মূল্যবাদ কাপড়। আর এ সবই থাকতো যাজকদের প্রাত্যহিক কাজের তালিকায়। উৎসবের মৌসুমে তা পেতো বাড়তি মাত্রা। উপাস্য ভেদে উৎসবের সময় যেহেতু ভিন্ন; তাই সাংস্কৃতিকভাবে বছর জুড়েই লেগে থাকতো আমেজ। তবে বেশিরভাগ উৎসব ছিল কৃষি পঞ্জিকাকে অনুসরণ করে। আরো স্পষ্ট করে বললে ফসল তোলার মৌসুমে। হাত্তুসাতে নতুন বছরের আগমনকে বরণ করা হতো ঝড়ের দেবতাকে উপাসনা দিয়ে।

খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্দশ শতকের খোদাই কর্মে হিট্টি উৎসবে গান ও নৃত্য; Image Source: Wikipedia

উৎসবগুলোর গুরুত্ব এতটাই ছিল যে, সেখানে খোদ রাজাকে হাজির থাকতে হতো। ফলে শরৎ এবং বসন্তে সম্রাটকে দুই দফায় ধারাবাহিক দীর্ঘ সফর করতে হতো। কেবল বসন্তেই এই সফরের বিস্তৃতি থাকতো ৩৮ দিন। মাঝে মাঝে রাজার পক্ষ থেকে হাজির থাকতেন রাজপুত্র, রানী কিংবা অন্য কোন প্রতিনিধি। খাবার ও অন্যান্য উপঢৌকনের পাশাপাশি বিশেষ দিনগুলোতে ছিলো নানান উদ্যোগ। থাকতো ঘোড়াদৌড়, মল্লযুদ্ধ এবং পাথর নিক্ষেপের মতো প্রতিযোগিতা। পরিবেশন করা হতো নাচ এবং গান। ধারণা করা হতো, উপাসনায় দেবতারা সন্তুষ্ট হলে কৃষিতে সমৃদ্ধি আসবে। নাগরিক জীবনে আসবে সুখ। রাজার রাজত্ব দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং জন্ম নেবে যোগ্য উত্তরসূরী। রাজা জয় লাভ করবেন ভিন্ন রাজ্যের উপর। অর্থাৎ দেবতাদের কোন সন্তুষ্টি লাভে ব্যর্থতা মানেই সেই বছরে দুর্ভোগ।

হিট্টাইট জীবনে ছোটখাটো রোগব্যাধিকেও মনে করা হতো দেবতাদের ক্রোধ। দ্বিতীয় মুরসিলির সময়ে হাত্তিতে মহামারি হয়। তার কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয় উৎসবে উদযাপনে অনীহা এবং মিশরের সাথে চুক্তি ভঙ্গকে। সাংস্কৃতিক ভাবে পালিত হতো জন্ম, মৃত্যু এবং রাজার সিংহাসনে অভিষেকের মতো ঘটনা। মিশরীয় ও মেসোপটেমিয় সভ্যতার মতো হিট্টাইট সংস্তৃতিও প্রাধান্য বিস্তার করেছিল বিভিন্ন মাত্রার পৌরাণিক আখ্যান।

হিট্টি সাম্রাজ্যের রাজধানী হাত্তুসা; Image Source: brewminate.com

 

মানুষের যাবতীয় দুর্ভোগের প্রথম কারণ দেবতাদের ক্রোধ; দ্বিতীয় পাপরাতার। পাপরাতার-এর সহজ অর্থ দূষণ। মানুষ ক্রমাগত খারাপ কাজ করতে থাকলে তার ভেতর দূষিত হতে থাকে। ফলে সে নিজের জন্য নিয়ে আসে দুর্ভোগ। আবার, অন্য কেউ জাদু করলেও মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই এই দূষণের প্রভাব ব্যক্তির অনিষ্ট; যা দূর করতে উপাসনা এবং পাল্টা জাদুর আশ্রয় নেয়া হতো। পারিবারিক কলহ এবং ব্যক্তিগত সমস্যগুলো থেকেও মুক্তি লাভের জন্য পালিত হতো বিশেষ আচার।

হিট্টাইট ধর্মবিশ্বাসে দেবতা আর মানুষ চিরন্তন চুক্তিতে আবদ্ধ। একদিকে মানুষ ও তাদের প্রতিনিধি হিসেবে শাসকগণ নিজেদের অভাব তুলে ধরতো প্রার্থনার মাধ্যমে। অন্যদিকে দেবতাগণ বিভিন্ন ইশারা ও স্বপ্নের মাধ্যমে জানাতেন নিজেদের ইচ্ছা ও অসন্তুষ্টি। ফলে ভবিষ্যদ্বাণী শোনা ও শোনানোর রীতি পেয়েছিল প্রাতিষ্ঠানিকতা। কৃষি নির্ভরতার সাথে ক্রমাগত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের প্রভাব পড়েছিল মানুষ-দেবতা সম্পর্কে। সেই প্যাটার্ন অনুসারেই গড়ে উঠেছে বিশ্বাস ও উপকথা। পরবর্তী ধর্মবিশ্বাসে যা যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা। পরবর্তী রোমান এবং রাশান সাম্রাজ্যের যুগে যে দুই মাথাওয়ালা ঈগলের প্রতীক ব্যবহৃত হতো; তার আদি শিকড় হাত্তুসাতে।



১৫


বাহাই ধর্মের ইতিবৃত্ত

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিমে 20, 2019

article

ইউরোপীয় রেনেসাঁর অন্যতম মূল সুর ছিলো ইহজাগতিকতাবাদ। চার্চের অনাচার এবং ব্যক্তিজীবনে ধর্মগুরুর হস্তক্ষেপে অতিষ্ঠরা এই সুযোগে ছুড়ে ফেলে দেয় ধর্মকে। সেই ধারণায় প্রভাবিত হয় পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্র। প্রচণ্ড ধার্মিকও ভাবতে থাকে নতুন করে। সত্যিই কি ফুরিয়ে গেছে ধর্মের প্রয়োজন? উত্তর দেবার জন্যই যেন আগমন ঘটলো নতুন এক বিশ্বাসের, বাহাই ধর্ম। পৃথিবীর অন্যতম কনিষ্ঠ স্বাধীন বিশ্বাস ব্যবস্থা। ঈশ্বরের একত্ববাদের পাশাপাশি যেখানে প্রাধান্য পেয়েছে মানবজাতির একত্ব ও ধর্মের সামঞ্জস্য। বাহাউল্লাহ বলেছেন-

সকল মানুষ এবং সকল জাতি একটা মাত্র পরিবার। এক পিতার সন্তান। তাদের সেভাবেই থাকা উচিত, যেভাবে ভাইবোনেরা একে অপরের সাথে থাকে।

বাহাই মতবাদ সকল ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রচারকদের বৈধতা দেয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধর্মের আগমন কেবল মানুষের সাথে স্রষ্টার সম্পর্কের প্রগতিশীলতাই প্রমাণ করে। উনবিংশ শতকের ইরানে মির্জা হুসাইন আলী নুরীর মুখে যে দুঃসাহসিক কথা উচ্চারিত হয়, তার বিস্তার ঘটে বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে । যেমনটা ঘটেছিলো তিন হাজার বছর আগের জরাথুস্ত্রের সময়। 

মানুষ ও স্রষ্টার সম্পর্ক প্রতীকায়িত করে রিংস্টোন সিম্বল © the-symbols.net

প্রেক্ষাপট

বাহাই ধর্মের জন্ম ‘বাব’ মতবাদের উপর ভিত্তি করে। আরবী বাব শব্দের অর্থ দরজা। শিয়াদের মধ্যে বাবের ধারণা অনেক পুরনো। দশম শতকের দিকে দ্বাদশ ও শেষ ইমাম আত্মগোপনে যান। তার অনুপস্থিতিতে ইমানদারদের দিক নির্দেশনার জন্য কাউকে নিযুক্ত করা হতো। তিনি বাব নামে পরিচিতি পেতেন। তাৎপর্যগতভাবে বাব-এর অর্থ ইমানদার ও গুপ্ত ইমামের মধ্যকার যোগযোগের দুয়ার। যা-ই হোক, পর পর চারজন বাব আসার পর এই ধারণার বিলুপ্তি ঘটে। ১৮৪৪ সালে পারস্যে শিরাজের এক তরুণ ব্যবসায়ী সৈয়দ আলী মুহম্মদ আচমকা নিজেকে ‘বাব’ দাবি করে বসলেন। এমনকি তিনি দাবি করেন, তার পরে নাকি আরো সম্মানিত একজন আসছেন।

হাইফাতে বাবের সমাধি © Bahai.org

তাকে গ্রেফতার করে আজারবাইজানের পার্বত্য দুর্গে রাখা হলো। সেখানকার গভর্নরসহ অনেককেই নিজের অনুসারী করে ফেললেন তিনি। তার লেখা ‘বায়ান’ পবিত্র গ্রন্থের মর্যাদা পায় অনুসারীদের মাঝে। তারপরেও দ্রুতই রোষানলে পড়তে হলো সবাইকে। ১৮৫০ সালে নিজেই নিহত হলেন। প্রধান প্রধান অনুসারীদের নির্বাসনে দেয়া হলো ইরাকে। এদের মধ্যে ছিলেন মির্জা হুসাইন আলী নুরী বা বাহাউল্লাহ এবং তার সৎ ভাই মির্জা ইয়াহিয়া নুরী বা সুবহ-ই আজল। ১৮৬৪ সালে বাহাউল্লাহ নিজেকে প্রতিশ্রুত ব্যক্তি হিসেবে দাবি করলে দুটি ধারার জন্ম হয়। সুবহ-ই আজলের অনুসারীরা বাব মতবাদের উপর স্থির থেকে আজালি নামে পরিচিতি লাভ করে। অন্যদিকে বাহাউল্লাহর অনুসারীরা পরিচিতি পায় বাহাই নামে।

বাহাউল্লাহ এবং তার যুগ

বাহাউল্লাহর জন্ম তেহরানের সমৃদ্ধ পরিবারে। খুব অল্প সময়েই বাব মতবাদ গ্রহণ করলেও বাবের সাথে তার সরাসরি দেখা হয়নি। ১৮৫২ সালে তাকে তেহরানের কারাগারে বন্দী করা হয়। এই সময়েই তিনি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং পরবর্তী মিশন সম্পর্কে সচেতন হন। ১৮৫৩ সালে কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করলেও সপরিবারে বাগদাদে নির্বাসিত হন। সেখানে নিজের ভাই সুবহ-ই আজলসহ অনেক বাব মতাবলম্বীর সাথে সাক্ষাৎ ঘটে।

নির্বাসন আর কারাভোগের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছে বাহাইদের ইতিহাস © Bahaiteachings.org

১৮৫৪ সালে কুর্দিস্তানে যান এবং দুই বছর দরবেশি জীবন যাপন করেন। বাগদাদ ফেরার পর তার প্রভাব সকলের উপর এতটা প্রবলভাবে পড়ছিলো যে, কর্তৃপক্ষ ভয় পেয়ে গেলো। ২১শে এপ্রিল, ১৮৬৩ সালে বাগদাদে নাজিব পাশার বাগানে তিনি নিজেকে আল্লাহর প্রেরিত এবং বাব কর্তৃক প্রতিশ্রুত সেই ব্যাক্তি বলে ঘোষণা দেন। ইস্তাম্বুলে কিছুদিন থাকার পর তাকে নির্বাসন দেয়া হয় এড্রিনে। সেখান থেকে খোলাখুলিভাবে নিজের মত প্রচার করতে থাকেন। পোপ চতুর্দশ পায়াসসহ অনেককে পত্র প্রেরণ করেন। বেশিরভাগ বাবপন্থীই এই মতবাদ গ্রহণ করলো। অটোম্যান সুলতান তাকে পরেরবার ফিলিস্তিনে নির্বাসন দিলে ১৮৬৮ সালে তিনি সেখানে পৌঁছান। এ কারণেই ফিলিস্তিন বাহাইদের কাছে পবিত্র স্থান। প্রায় নয় বছর তাকে আক্রার দুর্গে অবরুদ্ধ থাকতে হয়। ১৮৭৭-৮৪ সালের মধ্যে তার জীবনের সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখা “কিতাবুল আকদাস” রচনায় ব্যাপৃত থাকেন। ১৮৮০ সালের দিকে তাকে অনুমতি দেয়া হয় হাইফা গমনের। এর ঠিক বারো বছর পর ১৮৯২ সালে কিছুদিন শারীরিক অসুস্থতায় ভুগে মৃত্যুবরণ করেন। 

আক্রাতে বাহাউল্লাহর সমাধি © Bahai.org

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

বাহাউল্লাহর পর তার ইচ্ছাতেই দায়িত্ব পান বড় ছেলে আব্বাস এফেন্দি (১৮৪৪-১৯২১) । পিতার প্রতি বিশ্বস্ততার প্রমাণ রাখার দোষে তাকে নির্বাসনে যেতে হয়। করতে হয় কারাবরণ। আবদুল বাহা নামে পরিচিতি পান তিনি। ১৯০৮ সালে তুরস্কে ‘ইয়ং টার্কস’ সরকারের সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি লাভ করেন।

প্রবীণ আবদুল বাহা এবং অক্সফোর্ড পড়া শোগি এফেন্দি © Bahai.org

স্বীয় ভাইয়ের শত্রুতা সত্ত্বেও ঈর্ষনীয় সাফল্য আসে। যে দেশে ভ্রমণ করতেন, প্রতিষ্ঠা করে আসতেন বাহাইদের সংগঠন। ব্রিটিশ সরকার নাইট উপাধি দেয় ১৯২০ সালে। এর কিছুদিনের মাথায় মৃত্যুবরণ করলে বাহাইদের নেতৃত্ব নেন শোগি এফেন্দি রাব্বানী (১৮৯৯-১৯৫৭)। অক্সফোর্ড থেকে শিক্ষা লাভ করে ১৯২৩ সালে তিনি হাইফাতে ফেরত আসেন এবং একে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। কাউকে মনোনীত করে না যাবার কারণে তার মৃত্যুর পর প্রশাসনিক কাজের জন্য ১৯৬২ সালে গঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল হাউস অব জাস্টিস। সেই থেকে প্রতি পাঁচ বছর পর পর কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

বাহাই বিশ্বাস

অন্যান্য ধর্মের মতো বাহাই বিশ্বাসীরা ধর্মীয় সত্যকে অপরিবর্তনীয় হিসেবে মনে করে না। বরং ধর্ম তাদের কাছে আপেক্ষিক সত্য। স্রষ্টা এক এবং অবিনশ্বর। মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান ও চিন্তা তাকে পুরোপুরি উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে স্রষ্টা তার বার্তাবাহক পাঠিয়েছেন। হযরত ইবরাহীম (আ), কৃষ্ণ, জরাথুস্ত্র, হযরত মুসা (আ), বুদ্ধ, যীশুখ্রিস্ট বা হযরত ঈসা (আ) এবং হযরত মুহম্মদ (সা) তাঁদের মধ্যে অন্যতম।হযরত ইবরাহীম (আ) একটি গোত্রকে একত্রিত করেছেন। হযরত মুসা (আ) করেছেন একটি সম্প্রদায়কে। নবী মুহম্মদ (সা) করেছেন একটি জাতিকে। যীশুখ্রিস্ট বা হযরত ঈসা (আ) কাজ ছিলো ব্যক্তিজীবনের পবিত্রতা। কিন্তু এটিই শেষ কথা নয়। গোটা মানবজাতির জন্য পবিত্রতা প্রয়োজন। মানবজাতির আধ্যাত্মিক, জ্ঞানতাত্ত্বিক ও নৈতিক উন্নয়নের জন্য আধুনিক যুগে প্রেরণ করা হয়েছে ‘বাব’ এবং বাহাইকে।

বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলোকে একত্রিত করেছে ‘বাহাই স্টার’  © minorityrights.org

সভ্যতার ক্রম অগ্রসরতার সাথে সাথে ধর্মও প্রাগ্রসর হয়েছে। সভ্যতা তার শৈশব অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করে দিন দিন পরিণত হচ্ছে। নতুন যুগে তার দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই অন্যরকম হতে হবে। আবদুল বাহা বলেছেন,

আদিম মানুষের প্রয়োজন যা দিয়ে পূরণ করা যেত, তা বর্তমান মানুষের জন্য যথেষ্ট না। এই যুগের জন্য নতুনত্ব ও পরিপূর্ণতা প্রয়োজন। এখন তাকে নতুন গুণাবলি ও সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে অগ্রগতি ঘটেছে ধর্মের © Bahaiteachings.org

গোটা মানবজাতি প্রকৃতপক্ষে একটি শরীরের মতো। প্রকৃতিকে বাহাইরা স্রষ্টার গুণাবলির প্রকাশক হিসেবে দেখে। যদিও প্রকৃতির তাৎপর্য আছে. কিন্তু তা কোনোভাবেই প্রকৃতিপূজার দিকে টানে না। বলা হয়,

যতক্ষণ মানুষ পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির খাঁচায় আবদ্ধ, ততক্ষণ সে হিংস্র পশু। কেননা অস্তিত্বের জন্য ‍যুদ্ধ-বিগ্রহ করা বস্তুজগতের বৈশিষ্ট্য।

আত্মাকে বাহাউল্লাহ সূর্যের সাথে তুলনা করেছেন। আত্মার কারণেই দেহ অস্তিত্বশীল হয় এবং স্থিতিশীলতা পায়। মানুষ নিজেও স্বর্গীয় গুণাবলি অর্জন করতে সক্ষম। এজন্য তাকে উপাসনা করতে হবে এবং পবিত্র গ্রন্থাবলি পাঠ করতে হবে, নানা বিপত্তি অতিক্রম করতে হবে এবং মানবতার জন্য কাজ করতে হবে। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আত্মা শরীর থেকে মুক্ত হয়ে আরো পূর্ণতার পথে অগ্রসর হয়।

ধর্মপালন ও পুণ্যচর্চা

বাহাউল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, এমন যে কেউই বাহাই সমাজের সদস্য। কোনোপ্রকার সংস্কার, অনুষ্ঠান কিংবা যাজক নেই এ ধর্মে। প্রত্যেক বাহাইকে প্রাত্যহিক আধ্যাত্মিক চর্চার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। শরাব, অ্যালকোহল কিংবা মনের উপর প্রভার ফেলে- এমন কিছু থেকে বিরত থাকার আদেশ দান, একক বিবাহের উপর জোর আরোপ ও বিয়েতে পিতামাতার সম্মতি গ্রহণে গুরুত্ব দেয়া হয়। বাহাই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী প্রতি মাসের প্রথম দিন একত্রিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। বলা বাহুল্য, বাব তার কিতাবুল বায়ানে নতুন ধরনের ক্যালেন্ডারের ধারণা দেন। এর বিশেষত্ব, ১৯ দিনে মাস এবং ১৯ মাসে বছর, যেখানে চার দিন অতিরিক্ত যোগ করা হয়। এই মতে, সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য শেষ মাস ১৯ দিনব্যাপী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোজা রাখতে হবে। উনিশ ‍দিন ভোজ উৎসব মূলত বাহাই ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বাহাই পঞ্জিকার উদ্ভাবক মূলত বাব নিজে © Bahaiteachings.org

খ্রিস্ট ও ইসলাম ধর্মের বিপরীতে তারা কেবল মৃতের জন্য ছাড়া বাকি ক্ষেত্রে একাকী উপাসনায় গুরুত্ব দেয়। এছাড়া কিতাবুল আকদাসে উত্তরাধিকার, ১৯% কর প্রদান এবং খুঁটিনাটি অনেক সমস্যা নিয়ে কথা বলা হয়েছে। নারী আর পুরুষকে দেয়া হয়েছে সমান অধিকার। তালাক দেয়াকে বৈধ ঘোষণা করা হলেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

প্রথমদিকে সামর্থ্যবানদের জন্য জীবনে একবার শিরাজে বাবের বাসভূমে এবং বাগদাদে বাহাইয়ের বাসভূমে পরিদর্শন করার নিয়ম ছিলো। পরে তা শিথিল হয়ে যায়। প্রাধান্য পায় আক্রা ও হাইফা। যদিও তা প্রতিবছর আগ্রহী ভ্রমণকারী বাহাইদের জন্য সাধারণ তীর্থস্থান হিসেবেই পরিগণিত হয়।  

সংগঠন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম

বাহাই সম্প্রদায় পরিচালনার জন্য মূলনীতি বাহাউল্লাহ নিজেই দিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে আবদুল বাহার মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা ও বিস্তার লাভ ঘটেছে। গঠনগতভাবে পিরামিডীয় দুই ধরনের পরিষদ গড়ে উঠেছে- প্রশাসনিক ও নির্দেশনামূলক। প্রশাসনিক পরিষদ বলতে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের আধ্যাত্মিক সমাবেশ এবং সেই সাথে ‘ইন্টারন্যাশনাল হাউস অব জাস্টিস’কে বোঝায়। 

হাইফাতে ইন্টারন্যাশনাল হাউস অব জাস্টিস © Bahai.org

সার্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ৯ জনের পরিষদ গঠিত হবে। এই নির্বাচন পবিত্র কাজ হিসেবে গণ্য। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় প্রতি বছর রিজওয়ান উৎসবের ‍দিন (২১শে এপ্রিল – ২রা মে)। পর্যাপ্ত সংখ্যক স্থানীয় পরিষদ গঠিত হলে তাদের নিয়ে ৯ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদ গঠিত হবে। আবার প্রতি পাঁচ বছর পর পর জাতীয় পরিষদের সকল সদস্যকে নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হবে, যা ‘ইন্টারন্যাশনাল হাউস অব জাস্টিস’ নামে পরিচিত। ইসরায়েলের হাইফাতে অবস্থিত কেন্দ্র, যা সর্বোচ্চ ক্ষমতা ধারণ করে, নতুন সমস্যার সমাধান এবং সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে নির্দেশনামূলক পরিষদের ধারণা আসে মনোনীত করার মাধ্যমে। বোর্ডের সদস্যরা তাদের সহকারী মনোনীত করেন। এই সদস্যরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পরিষদকে মেনে চলে।

কিতাব ও দলিলাদি

বাহাউল্লাহর লেখা ও নির্দেশনাগুলো বাহাইদের কাছে পবিত্র এবং অনুসরণীয় বলে গণ্য হয়। বাহাউল্লাহর লেখা গ্রন্থগুলোর মধ্যে আছে ‘কিতাবুল আকদাস’, কিতাব আল ইকান এবং জাওয়াহিরুল আসরার।

কিতাবুল আকদাসের মতো অন্যান্য গ্রন্থগুলোও দলিল হিসাবে গৃহীত হয় © manybooks.net

এছাড়া আছে The Call of the Divine Beloved, Days of Remembrance, Epistle to the Son of the Wolf, The Hidden Works, Gleanings from the Writings of Bahaullah, Prayers and Meditations by Bahaullah ইত্যাদি। বাবের লেখার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘বায়ান’ ও ‘কিতাবুল আসমা’। আবদুল বাহা, শোগি এফেন্দি এবং হাউস অব জাস্টিসের সিদ্ধান্তও দলিল হিসাবে বাহাইরা গ্রহণ করে।  

উপসনালয়

যদিও বাহাই মতবাদে আনুষ্ঠানিক উপাসনা নেই। তথাপি কিতাবুল আকদাসে বাহাউল্লাহ ‘মাশরিকুল আজকার’ নামক উপসনাগৃহ নির্মাণের কথা বলেছেন। এটি নয় পাচিল বিশিষ্ট ভবন, যার উপরে আছে নয়ভাগে বিভক্ত গম্বুজ। গৃহটি সকল বিশ্বাসের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। ১৯২০ সালে ইশাকাবাদে তৎকালীন তুর্কিস্তানে এ ধরনের উপসনালয় প্রথম নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে তা ভূমিকম্পে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

স্থাপত্য কাজে বাহাইদের অনন্যতার নিদর্শন একেকটি উপাসনাগৃহ © Bahaullah.org

একুশ শতকের দিকে নয়টি বাহাই উপাসনাগৃহ নির্মিত হয়েছে। এগুলো আছে অস্ট্রেলিয়া, কম্বোডিয়া, চিলি, জার্মানি, ভারত, পানামা, যুক্তরাষ্ট্র, উগান্ডা এবং সামোয়াতে।

পরিশিষ্ট

বাহাই কোনো স্বাধীন ধর্ম বলে স্বীকৃতি না পাবার কারণে প্রায়ই এর অনুসারীদের উপর আসতো অত্যাচার ও নিপীড়ন। বিশেষত ইরান এবং মিশরে বেশ কয়েকবার তাদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে। কম আর বেশি বিপাকে পড়তে হয়েছে আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, ইরাক, ইয়েমেন প্রভৃতি দেশে। তারপরও বর্তমান বিশ্বে অন্যতম প্রভাবশালী ধর্ম হিসেবে ছড়িয়ে পড়ছে বাহাই মতবাদ। সাম্প্রতিক তথ্য মতে, পৃথিবীব্যাপী প্রায় ৬ মিলিয়ন বাহাই এবং তাদের জন্য ১৬৫টি জাতীয় পরিষদ আছে। স্থানীয় আধ্যাত্মিক পরিষদের সংখ্যা ২০,০০০। ৮০২টি ভিন্ন ভাষা এবং ২,১১২টি ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী এর সাথে সংশ্লিষ্ট। ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম থেকে প্রভাবিত হলেও বাহাই ধর্ম প্রমাণ করেছে নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব। স্রষ্টার একত্ববাদের পাশিপাশি গীত হয়েছে মানবজাতির ঐক্যের গান। যেমনটা বলা হয়,

বাহাউল্লাহর মূল শিক্ষা হলো সকলকিছুকে বরণ করার ভালোবাসা। কেননা কেবল ভালোবাসাই মানবজাতির প্রতিটি মহৎ গুণকে একত্রে ধারণ করতে পারে। ফলে প্রতিটা আত্মা সামনে এগিয়ে যায়। একটা আরেকটাকে উত্তরাধিকার অর্পনের মাধ্যমে অমরত্ব দেয়। খুব শীঘ্রই তোমরা দেখতে পাবে, প্রতিপালকের স্বর্গীয় শিক্ষা কীভাবে পৃথিবীর আকাশকে আলোকিত করে। (Abdul Baha, Selections from the Writings of Abdul Baha, Page- 66) 


১৬


মুন্ডারি: গরুপ্রেমী এক আদিবাসী জনগোষ্ঠী

Nayeem Ahmad

শিল্প-সংস্কৃতিমে 27, 2019

article

বিশ্বের নবীনতম দেশের নাম দক্ষিণ সুদান। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ২০০৫ সালে স্বায়ত্বশাসন; অতঃপর ২০১১ সালের ৯ই জুলাই গণভোটের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা অর্জন করে আফ্রিকার এই দেশটি। সুদান থেকে আলাদা হয়ে দেশটি তার প্রতিশ্রুত শান্তির পথে যাত্রা করছে ঠিকই, কিন্তু দেশভাগের ফলে উভয় দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যে যাত্রাভঙ্গ বা ছন্দপতন ঘটেছে তা অবর্ণনীয়। স্বাধীনতা অর্জন করতে গিয়ে উভয় দেশের জনগোষ্ঠীর বিপুল পরিমাণ রক্ত ঝরেছে। জাতিসংঘের হিসেব মতে, দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে উভয় দেশ থেকে প্রায় ২০ লাখ মানুষ স্থানচ্যুত ও প্রায় ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। যুদ্ধ ও দেশভাগের এই প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপরেও।

তবে এদের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল দক্ষিণ সুদানের সেন্ট্রাল ইকুয়েটরিয়া অঞ্চলে বসবাসরত মুন্ডারি আদিবাসীরা। তারা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। তাদের সকল ভাবনা তাদের গৃহপালিত পশুদের নিয়ে। সুদানে যখন চূড়ান্ত পর্যায়ের গৃহযুদ্ধ ও দাঙ্গা চলে, তখনো তাদের তর্ক সীমাবদ্ধ ছিল ‘কারা তাদের পশুদের নিরাপত্তার জন্য ভালো হবে’ এই বিষয়ের মধ্যে। দেশভাগের ভৌগলিক বাস্তবতায় তারা আজ দক্ষিণ সুদানের অধিবাসী।   

‘আনখল-ওয়াতুসি’ প্রজাতির গরুর সাথে এক মুন্ডারি কিশোর; Photographer: Tariq Zaidi

মুন্ডারি আদিবাসীদের প্রধান পরিচয় হলো তারা রাখাল সম্প্রদায়। গরু তাদের প্রধান সম্পদ। গরু লালন-পালনকে কেন্দ্র করেই তাদের জীবন আবর্তিত হয়। সুউচ্চ গরুদের পাহাড়ায় তাদের সর্বদা বন্দুক হাতে পাহারা দিতে দেখা যায়। তাদের আবাসভূমি পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্বণা করতে গিয়ে সিএনএন-এর বিশিষ্ট ফিচার সাংবাদিক থমাস লিখেছেন,

আমি তাদের দেখে প্রথমে বেশ অবাক হয়েছি। তারা রাখাল হিসেবে বিশ্বের অন্য সব আদিবাসীদের থেকে অধিক পরিশ্রমী। তারা রাজধানী জুবার উত্তরে নাইল নদীর তীরে বসবাস করে। তাদের জীবনচক্র গবাদি পশু লালন-পালনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়।

তবে তাদের পালিত গরুর জাত অনেক উন্নত ও আর্থিক বিবেচনায় বেশ দামি। বিশেষত তারা ‘আনখল-ওয়াতুসি’ নামের এক প্রজাতির গরু লালন-পালন করে থাকেন, যাকে ‘গবাদি পশুর রাজা’ বলে অবিহিত করা হয়। এই গরু আট ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে; যা আমাদের দেশের গরুর বিবেচনায় বৃহদাকৃতির; গড়ে প্রতিটি গরুর মূল্য ৫০০ মার্কিন ডলার। আফ্রিকার কোনো অঞ্চলের গবাদি পশুর এই পরিসংখ্যান অনেকটা অবাক করার মতো। ফলে এই সম্পদ মুন্ডারিদের কাছে স্বর্ণের চেয়েও দামি সম্পদে রূপান্তরিত হয়েছে।

‘আনখল-ওয়াতুসি’ প্রজাতির গরুকে ‘গবাদি পশুর রাজা’ বলা হয়; Photographer: Tariq Zaidi

কিন্তু সম্পদের মূল্য যত বেশি হয়, মালিকদের ঝুঁকিও তত বাড়তে থাকে; আর সেটা যদি কোনো আদিবাসী সম্প্রদায়ের সম্পদ, তাহলে তো কথাই নেই- কেননা বিশ্বের অধিকাংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠী পার্শ্ববর্তী সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের দ্বারা নির্মম বৈষম্যের স্বীকার হন; মুন্ডারিদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তাই রাত জেগে সম্পদ পাহারা দেয়া তাদের অভ্যাস কিংবা দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। আনাড়ি রাখালদের বন্দুক হাতে দিন-রাত গবাদিপশু পাহারা দিতে দেখা যায়। তবুও কখনো কখনো তাদের গবাদিপশু চুরি হয়ে যায়। স্থানীয় প্রভাবশালী দুষ্টচক্র এই কাজ করে থাকে। এ যেন এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প; যার নেই কোনো বিচার, নেই কোনো সম্পদ ফিরে পাওয়ার কিংবা ক্ষতিপূরণের আশ্বাস।

প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার ও সাংবাদিক তারিক যায়িদি মুন্ডারিদের জীবনযাপন অবলোকন ও পর্যবেক্ষণ করতে তাদের সাথে দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন। এ সময় তিনি মুন্ডারিদের অসাধারণ কিছু মুহূর্ত তার ক্যামেরায় ধারণ করেছেন। যায়িদি শুধু মুন্ডারি নয়- আফ্রিকার প্রায় ৩০টি আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জীবনবোধ ও সংস্কৃতি তার ক্যামেরায় ধারণ করেছেন এবং তাদের নিয়ে গবেষণাপূর্ণ ডকুমেন্টারি তৈরি করেছেন। কিন্তু তিনি কখনো, কোথাও পশুদের সাথে মানুষের এমন ঘনিষ্ঠপূর্ণ সম্পর্ক অবলোকন করেননি; বিশেষত মুন্ডারি পুরুষদের সাথে তাদের পালিত গরুদের সম্পর্ক অবাক করার মতো। যায়িদি বলেন,

মুন্ডারি রাখালদের সাথে গবাদিপশুর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও আত্মিক। তাদের কাছে গবাদিপশুর গুরুত্ব বলে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই পশুরাই তাদের জীবনের সবকিছু। 

প্রিয় গরুর সাথে এক মুন্ডারি রাখাল; Photographer: Tariq Zaidi

যায়িদি তার ধারণকৃত কিছু ছবির ব্যাখ্য দিতে গিয়ে বলেন-

প্রায় সকল পুরুষই আমাকে দেখে তাদের পছন্দের পশুর সাথে ছবি তুলতে চেয়েছে। এমনকি তাদের স্ত্রী ও শিশুরাও তাদের প্রিয় পশুর সাথে ছবি তুলতে চেয়েছে।

এর মধ্যে ‘আনখল-ওয়াতুসি’ প্রজাতির গরু মুন্ডারিদের কাছে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ গবাদি পশু। অনেক সময় এই প্রজাতির গরুরা তাদের উপাসনার লক্ষ্যবস্তুতেও পরিণত হয়। সাধারণত মাংস খাওয়ার জন্য তারা তাদের গরুদের হত্যা করে না। যদিও এর বাজারমূল্য অত্যন্ত চড়া হওয়ার কারণে অধিকাংশ মুন্ডারি সদস্যের কাছে গরুর মাংস খাওয়া বিলাসিতাপূর্ণ ব্যাপার মাত্র। তবে গরু তাদের হাঁটাচলার সঙ্গী; পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য; একটি মহিমান্বিত সম্পদ; রোগ প্রতিষেধক; সর্বোপরি একজন উত্তম বন্ধু। ফলশ্রুতিতে গরু শুধুমাত্র তাদের সম্পদ নয়, জীবন পরিচালনার একটি পথও বটে।

গরুর দুধ পান করছেন এক মুন্ডারি কিশোর; Photographer: Tariq Zaidi

যায়িদির বর্ণনামতে, মুন্ডারিরা আকৃতিতে লম্বা ও পেশীবহুল স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে থাকে। যায়িদি বলেন,

তাদেরকে দেখতে ‘বডিবিল্ডারের’ মতো মনে হয়। কিন্তু তাদের খাদ্যাভ্যাস খুব সাধারণ, তবে নিয়মতান্ত্রিক। তারা প্রচুর পরিমাণ দুধ ও দই খেয়ে থাকেন। এটাই তাদের সুস্বাস্থ্যের গোপন রহস্য।

তারা গরুর প্রস্রাবও পান করে থাকেন। গরু যখন প্রস্রাব করে, মুন্ডারি পুরুষরা তখন নুইয়ে পড়ে তা মুখে ধারণ করেন। তাদের ভাষ্যমতে, এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং এতে থাকা অ্যামোনিয়া তাদের চুলকে কমলা রঙে রাঙিয়ে তুলতে সাহায্য করে।

এছাড়া গরুর গোবর তারা রান্নার কাজে ব্যবহার করেন। এতে পীচ-রঙের সুন্দর ছাই উৎপাদন হয়। এই ছাইকে তারা জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। রোদের তীব্রতা থেকে ত্বক সুরক্ষিত রাখতে তারা এই ছাই ব্যবহার করে থাকেন।

গরুর প্রস্রাব মাথায় নিচ্ছেন এক মুন্ডারি পুরুষ; Photographer: Tariq Zaidi

যায়িদি জানান, তাদের পালিত ‘আনখল-ওয়াতুসি’ বিশ্বের সবচেয়ে আদুরে স্বভাবের গরু হিসেবে পরিচিত। ফলে তাদের সেবা-যত্ন অনেক বেশি করতে হয়। মুন্ডারি রাখালরা প্রতিদিন দুবার করে তাদের শরীর মালিশ করে দেন। গোবরের ছাই টেলকম পাউডারের মতো তাদের দেহে মাখিয়ে দেন, যা তাদের ক্ষতিকর জীবাণু থেকে সুরক্ষিত রাখে। তাদের ত্বক পরিস্কার করতে এবং থাকার ঘরেও এই ছাই বিছিয়ে দেয়া হয়। মশাদের হাত থেকে রক্ষা করতে তাদের ঘরের চারিধারে নান্দনিক উপায়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া মুন্ডারিরা গবাদি পশুর সাথেই ঘুমান। যায়িদি বলেন,

আক্ষরিক অর্থে তারা তাদের পশুদের থেকে মাত্র দুই ফুট দূরে রাত্রিযাপন করেন এবং তাদের মধ্য থেকে একজন সেখানে বন্দুক হাতে গবাদি পশুর পাহারা দেন। অকারণে তারা পশুর এত নিকটে রাত্রিযাপন করেন না; পশুর ডাক ও খচমচ আওয়াজ তাদের জন্য একটি বড় ব্যাপার। যেন এই আওয়াজ ছাড়া তারা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন না।

পশুদের থেকে মাত্র দুই ফুট দূরে রাত্রিযাপন করেন মুন্ডারি রাখালরা; Photographer: Tariq Zaidi

গবাদি পশু মুন্ডারিদের কাছে অর্থ-সম্পদ ও মর্যাদার প্রতীকও বটে। তাদের পারিবারিক প্রথায় যৌতুক হিসেবে গবাদি পশুর গুরুত্ব সর্বাধিক। গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলে হাজার হাজার পুরুষ নববধূর সন্ধানে দক্ষিণ সুদানে ফিরে আসে। তখন একটি জটিলতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যাদের অধিক গবাদি পশু আছে, তারা এর বিনিময়ে ‘নববধূ ক্রয়ের’ মতো নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। একপর্যায়ে তা ভয়ানক দাঙ্গার সৃষ্টি করে।

এই দাঙ্গা ছিল মুন্ডারিদের জন্য আত্মঘাতি। যুদ্ধের রেশ শেষ হতে না হতেই এই ধাক্কা ছিল নির্মম ও পীড়াদায়ক। যদিও দাঙ্গার চেয়ে গৃহযুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব ছিল বহুমুখী ও ব্যাপক; এতে তাদের গবাদি পশুর চারণভূমি পরিণত হয়েছিল ভয়ানক এক জুয়ার আসরে। এ কারণে মুন্ডারিরা বাধ্য হয়ে তখন নাইল নদীর বুকে গড়ে ওঠা ছোট একটি দ্বীপে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এখন সেখানেই তারা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এটি তাদের জন্য এক দ্বিমুখী সঙ্কটের সৃষ্টি করেছে। যায়িদি বলেন,

যুদ্ধ মুন্ডারি জনগোষ্ঠীকে বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। তারা নিরাপত্তার ভয়ে শহরে আসতে পারছেন না। তাদের বর্তমান আবাসস্থলের অবস্থা খুবই নাজুক। ফলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও প্রচণ্ডভাবে ব্যহত হচ্ছে।

নাইল নদীর এই ছোট দ্বীপে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে মুন্ডারি জনগোষ্ঠী ও তাদের পশুদের জীবন; Photographer: Tariq Zaidi

তিনি আরও বলেন,

যুদ্ধ থেকে মুন্ডারিদের বিশেষ কোনো অর্জন নেই। যুদ্ধে তাদের কোনো অংশগ্রহণও ছিল না। তাদের বন্দুক কাউকে হত্যা করে না, কিন্তু তাদের পালিত পশুদের নিরাপত্তা প্রদান করে।

সর্বোপরি, মুন্ডারিরা তাদের পালিত পশুদের অত্যন্ত সুন্দরভাবে সেবা-যত্ন করে থাকেন এবং জীবনের বিনিময় হলেও তা তারা রক্ষা করতে চান। বাণিজ্যিক দিক বাদ দিলেও পশুদের প্রতি তাদের গভীর প্রেম বিশ্বের অন্যান্য রাখালশ্রেণীর তুলনায় অনেক উচ্চাঙ্গে। তাই পৃথিবীও এই রাখালদের গভীর প্রেমে আবদ্ধ করুক- এটাই আমাদের কামনা।  

১৭


কাব্বালাহ: ইহুদি অতীন্দ্রিয়বাদের আদ্যোপান্ত

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিজুন 29, 2019

article

কাব্বালাহ শব্দটি হিব্রু ‘কাবাল’ থেকে উৎসারিত। যার অর্থ গ্রহণ করা। ত্রয়োদশ শতকের দিকে ইহুদি অতীন্দ্রিয়বাদের প্রধান পরিভাষা ছিলো এই কাব্বালাহ। মূখ্যত তাদের আলোচনা কয়েকটা বিষয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। প্রথমত, পৃথিবীর সৃষ্টি ও ঈশ্বরের প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা, পরম সত্যের রূপক উত্থাপন, ধর্মীয় জীবনের অলৌকিকতা অনুসন্ধান এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবন আলোচিত হয়েছে বিশেষভাবে। দ্বিতীয়ত, স্বর্গীয় নামগুলোর মধ্য দিয়ে কীভাবে অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়, পূরণ করা যায় জীবনের প্রধানতম উদ্দেশ্য- বাতলে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে তার উপায়। তারপরেও ঢালাওভাবে গোটা ইহুদি অতীন্দ্রিয়বাদকে কাব্বালাহ বলে আখ্যা দেয়া হয়। সে যা-ই হোক, প্রকৃতপক্ষে সকল সংস্কৃতি ও ধর্মের ভেতর যে অতীন্দ্রিয় দিক রয়েছে, কাব্বালাহ তার ইহুদি রূপ। ঈশ্বরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ এবং নৈকট্য লাভের চর্চা, সাধারণ যুক্তিগ্রাহ্য জ্ঞানে যা সম্ভব না।  

কাব্বালাহ: মূলধারাকে বদলে দেয়া এক স্রোতের নাম © kabbalahrock.bandcamp.com

গুপ্ত সংস্কৃতি হলেও কাব্বালাহ আধুনিক যুগ পর্যন্ত বেশ জনপ্রিয় হিসাবে পরিগণিত। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ইহুদি ধর্মকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে কাব্বালাহ। ফেলে যাচ্ছে এখন অব্দি। এমনকি অইহুদিদের উপরও এর প্রভাব ছিলো উল্লেখযোগ্য।

বাইবেলিয় উৎস

হিব্রু বাইবেলে স্পষ্ট করে অতীন্দ্রিয়বাদকে উল্লেখ করা হয়নি। তথাপি অলৌকিক ঘটনার প্রাচুর্য বিদ্যমান। মোজেসের (হযরত মুসা (আ)) হাতের লাঠি সাপে পরিণত হওয়া, ইয়াকুবের (আ) দৃষ্টিশক্তি প্রাপ্তিসহ পুরো বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীর ঐতিহ্য অতীন্দ্রিয়বাদকে প্রভাবিত করেছে। সবচেয়ে প্রভাবশালী বলে প্রতীয়মান হয়েছে এজেকিয়েলের ঈশ্বরের সিংহাসন-রথ দর্শন।

এজিকিয়েলের দর্শন কাব্বালাহর অন্যতম অনুপ্রেরণা, © wikiart.org

বিষয়টা পরাবাস্তব এবং ঈশ্বরের মানবীকরণের মতো বিপজ্জনক দিকে নিয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। তথাপি প্রথমদিকের দুটি ঐতিহ্যের জন্মলাভে এর ভূমিকা ছিল। প্রথমটি ‘মাসেহ হা-মেরকাবাহ’ বা রথের কাজ এবং দ্বিতীয়টি ‘মাসেহ বেরেশিত’ বা সৃষ্টির শুরুর কাজ।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

কাব্বালাহর প্রথম লিখিত সূত্র পাওয়া যায় ফ্রান্সের প্রোভ্যান্সে। লেখাগুলো দ্বাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের। একদল হালাখি লেখকের দ্বারা যাত্রা শুরু। আব্রাহাম বেন ডেভিড, জ্যাকব দ্য নাজিরাইটের মতো সুপরিচিত ব্যক্তিরা। পরবর্তীতে যুক্ত হয় মোজেস নাহমানাইডস এবং তার প্রধান ছাত্র শেলোমাহ বেন আব্রাহামের নাম। যদিও কাব্বালাহর অজস্র লেখার ভিড়ে তাদের অংশ ক্ষুদ্রই। ছোট্ট পরিসরে অভিজাতদের মধ্যে গোপনে চর্চা হতো প্রথমদিকে। ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকে গোপনীয়তা দূর হতে থাকে। এই সময়ের পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন ইতশাক সাগি নাহর, আব্রাহাম বেন ডেভিড, আশের বেন ডেভিড প্রমূখ। তাদের লেখার প্রচেষ্টা ও বিষয়বস্তু লক্ষণীয়। ‘সেফের ইয়েতজিরাহ’ নামে সৃষ্টিতত্ত্ব, ‘মাসেহ বেরেশিত’ বা সৃষ্টি নিয়ে বাইবেলের মত এবং টেন কমান্ডমেন্টের ব্যাখ্যা তাদের মধ্যে উল্লেযোগ্য। 

সেফের ইয়েতজিরাহ সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ক প্রথমদিকের প্রচেষ্টা © store-us.kabbalah.com

ত্রয়োদশ শতকের মধ্যভাগে স্পেনে কাব্বালিস্টদের মধ্যে চিন্তার বিপ্লব আসে বলতে গেলে। এদের পথিকৃৎ ছিলেন আজরিয়েল এবং ইয়াকুব বেন শেশেত। আস্তে আস্তে কাতালোনিয়া থেকে ক্যাস্টাইলের দিকে প্রভাব ভারী হতে শুরু করে। ক্যাস্টাইলে অজ্ঞাত কাব্বালিস্টদের লেখা পাওয়া যায় ‘ইয়য়ুন’ নামে। এটি আসলে মেরকাভাহ সাহিত্যকে নব্য প্লেটোবাদী অতীন্দ্রিয় ধারণার সাথে সমন্বয় আনার প্রচেষ্টা। অন্য অংশ অশুভের ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় আগ্রহী ছিল। অশুভ জগৎ নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করে গেছেন ইয়াকুব, ইতশাক, মোশেহ, তদ্রোস আবুল আফিয়া প্রমূখেরা। স্পেনীয় এই ঘরনার সবচেয়ে বিশুদ্ধ প্রকাশ ঘটেছে যোহার-তে। এটি মূলত ক্যাস্টালিয়ান কাব্বালিস্টদের লেখার সংকলন, যা ১২৮০ সালের দিকে শুরু হয়েছিলো। ১২৮৫ থেকে ১৩৩৫ সালের মধ্যে যত অনুবাদ, ব্যাখ্যা এবং প্রতিলিপি তৈরি করেছে, তাতে যোহারকে প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসাবেই নেয়া হয়েছে। 

যোহার পরিণত হয়েছিলো প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসাবে © haaretz.com

স্পেনে ইহুদিদের স্বর্ণযুগ ছিল মূলত মুসলিম শাসকদের আমলে। ধীরে ধীরে মুসলমানরা স্পেনের অধিকার হারাতে থাকে। নতুন ক্যালিক শাসক সবার আগে ইহুদিদের উপর খড়গহস্ত হন। হয় ধর্মান্তর, নাহলে দেশত্যাগ।  ১৪৯২ এবং ১৪৯৭ সালে স্পেন এবং পর্তুগাল থেকে সমূলে বের হয়ে যায় ইহুদিরা। ফলে আইবেরিয়ান উপদ্বীপ থেকে সরে গিয়ে উত্তর আফ্রিকা, ইতালি ও লেভ্যান্টের দিকে চলে আসে কাব্বালিস্টদের চর্চা। শিকর গজাতে শুরু করে নতুন অঞ্চলে। বিকাশমান কাব্বালাহ সমাজে পনের শতকের স্পেনের কাব্বালাহ চর্চা বিশেষ করে যোহার দারুণ প্রভাবক হিসাবে গৃহীত হয়। ষোল শতকের দিকে এদের প্রথম প্রজন্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইতালিতে ইয়াহুদাহ হায়্যাতের ‘মিনহাত ইয়েহুদাহ’ এবং অটোম্যান সাম্রাজ্যে মেইর ইবন গাব্বাইয়ের ‘আভোদাত হাকো-দেশ’। স্পষ্টভাবে দেখা যায় স্পেনিয় লেখা সংকলনের প্রবণতা। চেষ্টা করা হয়েছে দর্শন, জাদু এবং কাব্বালাহকে মেলানোরও।

নির্বাসনের পরে ফিলিস্তিনেও বাড়তে থাকে তারা। ষোল শতকের গোড়ার দিকে জেরুজালেম ছিলো কাব্বালাহ শেখার উর্বর ভূমি। এদের মধ্যে প্রধান ছিলেন ইয়াহুদাহ আল বতিনি, ইয়োসেফ ইবনে সাইয়াহ, এবং আব্রাহাম বেন এলিয়েজের। ১৫৪০ এর দশকের শুরুর দিকে গ্যালিলিয়ান গ্রাম সাফাদ হঠাৎ আধিপত্য শুরু করে। অর্ধশতক ধরে সাফাদ ছিলো কাব্বালাহ চর্চায় অগ্রগতির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাছাকাছি সময়ে তুরস্কে দুজন প্রধান চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। ইয়োসেফ কারো এবং শেলোমাহ হা-লেভি আলকাবেতস। তারা অতীন্দ্রিয়বাদী একটা সংঘ চালনা শুরু করলেন, যা মূলত কাব্বালিস্টদের কর্মাদি পালন করতো। ইয়োসেফ কারোর অতীন্দ্রিয় দিনপঞ্জি এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ।

সে যা-ই হোক, ফিলিস্তিনে সবচেয়ে প্রভাবশালী কাব্বালিস্ট ছিলেন মোশেহ কর্ডোভারো (১৫২২-১৫৭০)। ১৫৪৮ সালে তিনি তার গুরুত্বপূর্ণ লেখা ‘পারদেস রিমোনিম’ সামনে আনেন। পূর্বের সকল প্রকার কাব্বালাহ মতবাদকে পরিষ্কার ভাষায় উপস্থাপন করার জন্য তার প্রচেষ্টা গোটা শতককে অনুরিত করেছে। কর্ডোবারোর প্রধান শিষ্য ছিলেন হায়্যিম ভিতাল, এলিয়্যাহু দি ভিদাস এবং এলাযার আযিকরি। কর্ডোবারোর মৃত্যুর পর তার সাবেক শিষ্য আইজ্যাক লুরিয়া হঠাৎ করে সাফাদের কাব্বালাহ সমাজের মধ্যমণি হয়ে ওঠেন। তার ব্যক্তিত্ব, দরবেশি আচরণ এবং ধর্মের ব্যাখ্যা নতুন সৃষ্টি করে। লুরিয়া সাধারণত মুখে ব্যাখ্যা প্রদান করতেন। তার মতবাদের প্রভাব ছিলো সুদূরপ্রসারী। কর্ডোবারোর শিষ্যরা ব্যাপকভাবে তার ধর্মতত্ত্বকে মেনে নিলো। এই মতবাদ স্বীকৃত হলো সবার সেরা হিসাবে। 

লুরিয়ার ব্যাখ্যা দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে তার পরবর্তী যুগে © kabbalah.com

১৫৭২ সালে মৃত্যুবরণ করলেন লুরিয়া। শিষ্য হায়্যিম ভিতাল তার মতবাদ লেখার জন্য এগিয়ে এলেন। তার বিখ্যাত রচনা ‘এতস হায়্যিম’ বা ট্রিজ অব লাইফ। লুরিয়ার মতবাদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন মত ১৫৯০ এর দিকে ইতালিতে প্রচারিত হয়েছে। প্রচারক ইসরায়েল সারুগ নিজেকে লুরিয়ার শিষ্য বলে দাবি করতেন। মতবাদের সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যাকার মেনাহেম আজরাইয়া। অপর শিষ্য আব্রাহাম হেরেরা তার লেখা গ্রন্থ ‘শা’আর হা-শামায়িন’ এবং ‘বেইত এলোহিম’ তে নব্য প্লেটোবাদী দর্শনের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। নব্য প্লেটোবাদী এবং পরমাণুবাদী ধারণা একসাথে এসেছে ইয়োসেফ শেলোমাহ ডেলমেডিগো এবং সারুগের অন্যান্য শিষ্যের লেখায়। সপ্তদশ শতকের দিকে ভিতাল এবং সারুগের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। কাব্বালিস্টদের মধ্যে ভিতালের মতবাদ টিকে থাকে শেমুয়েল ভিতাল, মেইর পপার এবং ইয়াকুব সেমাহের সংকলনে। পরের শতকগুলোতে কর্ডোবারিয়ান এবং লুরিয়ানিক মতবাদের মিশেল ঘটে।

অষ্টাদশ শতকের ধর্মতত্ত্বে পোলিশ হাসিদিজমে কর্ডোবারো মতবাদের কিছুটা পুনর্জাগরণ ঘটে। বিশেষ করে উপাসনা নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি, যেগুলোতে লুরিয়ানিক কাব্বালিস্টরা যথাযথ উত্তর দিতে অসমর্থ ছিল। অষ্টাদশ শতকের প্রধান কাব্বালিস্টদের মধ্যে এলিজাহ বেন শেলোমোন জালমান অন্যতম। তিনি পরিচিত গায়োন অব ভিলনা (১৭২০-১৭৯৭) নামে। লুরিয়ানিক ঐতিহ্যকে সামনে নিতে ইয়াকুব এমদেন (১৬৯৭-১৭৭৬)– এর ভূমিকাও ব্যাপক।

উনিশ শতকের দিকে এই ধারার অন্যতম উত্তরসূরী ইতশাক এইজিক হাভের এবং শেলোমোহ এলায়শার। আধুনিক সময়ে কাব্বালিস্টদের মধ্যে সবচেয়ে আধিপত্য বিস্তারকারী ধারা লুরিয়ানিক ধারা। এটি পাঠ করা হয় মোশেহ হায়্যিম লুয্যাত্তো, এলিয়্যাহু বেন শেলোমোহ জালমান, হাবাদ প্রমূখের প্রদত্ত ব্যাখ্যার আলোকে। তার সাথে আছে জেরুজালেমের বেইত এল একাডেমির সেফারদিক কাব্বালিস্টরা। আব্রাহাম ইতশাক কুক (১৮৬৫-১৯৩৫) একটা অতীন্দ্রিয় ও সর্বেশ্বরবাদী ধারণার অবতারণা করেন আধুনিক অনেক ইহুদিদের ধর্ম নিরপেক্ষতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য। তার মতবাদের প্রভাব ছিলো দারুণ। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার পর এবং বিশেষভাবে ১৯৬৭ এর পর প্রবল হয় তার পুত্র ইয়াহুদাহ কুকের মাধ্যমে। ডেভিড হা কোহেন এই অভিযাত্রায় অন্যতম প্রধান পুরুষ। তিনি তার ‘কুল হা-নেভুয়াহ’-তে অন্যরকম অতীন্দ্রিয়দের উন্মেষ ঘটান, যা ইহুদি ঐতিহ্যের মৌখিক দিককে প্রভাবিত করে। হাসিদিক সার্কেলে আবুল আফিয়ার গূঢ় কাব্বালাহ সাম্প্রতিক সময়ে উদঘাটিত হচ্ছে। 

আধ্যাত্মিকতার স্রোতে নতুন মাত্রা দেন কুক © orot.com

বর্তমানে কাব্বালাহ অন্যতম জনপ্রিয় চর্চা হিসাবে ইহুদি, এমনকি অইহুদিদের মধ্যেও টিকে আছে।

কাব্বালাহ ধর্মতত্ত্ব

তালমুদ এবং মিদরাশ দুই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ গুণের কথা বলে। প্রথমত ক্ষমা বা মিদ্দাত হা রাহামিম এবং দ্বিতীয়ত কঠোর বিচার বা মিদ্দাত হা দিন। গুণগুলো স্বর্গীয়। পৃথিবীর জন্ম এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। অন্যান্য পুস্তকে দশটি সৃজনশীল শব্দের (মা-আমারুত) কথা বলা হয় এই প্রেক্ষাপটে। সেফের ইতসিরাহতে দশটা সেফাইরত প্রসঙ্গ এসেছে। মেরকাবাহ সাহিত্যে আছে প্লেটোবাদী ধ্যানধারণার চিহ্ন। প্রথমদিকে তেমন কোনো ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা কাব্বালিস্টদের থেকে পাওয়া যায়নি। বেশিরভাগই স্বর্গীয় সত্তাকে দুটি স্তরবিশিষ্ট বলে ধারণা করতো। প্রথমত, পরম দেবতা বা এইন সফ, এবং দ্বিতীয়ত, নিঃসৃত জগৎ যা পরম সত্তা থেকে স্বতস্ফুর্তভাবে নিঃসৃত হচ্ছে। এমন দশটি দশা পরিচিত সেফাইরত নামে। যুহর এবং প্রধান কাব্বালিস্টদের অভিমত অনুসারে, সেফাইরত পরম সত্তার মূলের প্রকাশ। আবার কারো মতে, স্বর্গীয় সক্ষমতা ধারণের জন্য সেফাইরত পাত্রের কাজ করে। 

সেফাইরত ব্যাখ্যা করে সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে, © deliriumsrealm.com

মানুষের অলৌকিকতা

কাব্বালিস্টদের মতে, মানুষ তার সঠিক চর্চার মধ্য দিয়ে পরম সত্তার অন্তঃস্থলকে প্রভাবিত করতে পারে। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রাচীন ইহুদি চিন্তায় সত্যিই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমদিককার তালমুদ ও মিদরাশে দেখা যায় ঈশ্বর প্রায়ই মোজেসের কাছে অনুরোধ করেন। লুরিয়ানিক কাব্বালাহতে এই জোরারোপ পরিবর্তিত হয়েছে স্বর্গীয় স্ফুলিঙ্গ নামে। সে যা-ই হোক, জাদু আর কাব্বালিস্টদের অলৌকিকতার ধারণায় বিস্তর ফারাক আছে। মানুষকে শক্তিশালী এবং স্বাধীন সত্তা হিসাবে উপস্থাপনের পরও স্রষ্টা ও মানুষের মধ্যে ব্যবধান থাকে। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে কাব্বালিস্টদের unio mystica বা স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে স্বর্গীয় মিলনের ধারণা। 

মানুষকে স্বাধীন ও শক্তিশালী হিসাবে উপস্থাপন করাটা ছিলো যুগান্তকারী, © tumblr.com

অতীন্দ্রিয় পদ্ধতি

ত্রয়োদশ শতকের দিকেই অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য কাব্বালিস্টদের বেশ কিছু লেখা পদ্ধতি প্রচারিত হয়। তার মধ্যে অন্যতম ছিল আব্রাহাম আবুল আফিয়া (১২৪০-১২৯১)। স্বর্গীয় নাম স্মরণের মধ্য দিয়ে তিনি চিন্তাকে একত্রিত করার কথা বলেন। পরবর্তীতে তার পদ্ধতি কিছুটা বিবর্তন ঘটিয়ে গ্রহণ করেন আশকেনাজিক হাসিদিক গুরুরা। খুব সম্ভবত আবুল আফিয়া সুফীবাদ এবং ভারতীয় যোগ-এর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তার লেখাগুলো ল্যাটিনে অনুদিত হয়, যা পরবর্তীতে খ্রিষ্টান কাব্বালাহ গঠনেে প্রভাব ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে তার চর্চা বিনা শর্তে গ্রহণ করেন ইতশাক বেন শেমুয়েল এবং ইয়েহুদাহ আলবোতিনি। বিশেষ করে ফিলিস্তিনে আবুল আফিয়ার মতো মুসলিম সুফি ইবনুল আরাবির চিন্তার সাথে মিলিয়ে গ্রহণ করা হয়। ইউরোপ এভাবেই কাব্বালাহর সাথে পরিচিত হয়। 

আবুল আফিয়া অতীন্দ্রিয় চর্চায় পথিকৃৎ © jewishboston.com

কাব্বালাহ ব্যাখ্যার ধরন

পবিত্র গ্রন্থকে ব্যাখ্যা করার জন্য দুই ধরনের পদ্ধতি চালু হয় তাদের মাঝে। রূপক এবং গাণিতিক। অলৌকিকতাবাদী ও অতীন্দ্রিয়বাদী কাব্বালিস্টদের মধ্যে রূপক পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করার অবস্থান ছিলো সবার উপর। ধর্মগ্রন্থ যেখানে গণ্য হয়েছে প্রাকৃতিক পরিবর্তন এবং ইতিহাসের ঘটনার আলোকে। এভাবে সীমাবদ্ধ বর্ণের সমাহার পরিণত হয়েছে অসীম অর্থের আধার হিসাবে। আশকেনাজিক হাসিদিজমের প্রভাবে ত্রয়োদশ শতকে কাব্বালিস্টরা গাণিতিক ব্যাখ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে। গিমাতরিয়া বা বর্ণসমূহের গাণিতিক মান বের করা, নোতারিকোন বা বর্ণকে পুরো শব্দের সংক্ষেপ হিসাবে ব্যবহার করা এবং তেমুরাহ বা বর্ণের পারস্পারিক পরিবর্তন। আবুল আফিয়া সাত ধরনের গাণিতিক পদ্ধতির অগ্রগতি সাধন করেন, যা পরবর্তিতে নতুন পথ উন্মোচন করে। 

গাণিতিক ব্যাখ্যার জন্য বর্ণের গাণিতিক মান, © bq.blakearchieve.org

লেখালেখি

ইহুদিদের অন্য অংশের মতো কাব্বালিস্টরাও ধর্মীয় গ্রন্থাদির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছে। সাধারণ সেফরুতের উপর কাব্বালিস্টদের দেড়শোরও বেশি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। বিশেষভাবে দশটা স্বর্গীয় সম্ভাব্যতা রূপকসহ আলোচিত হয়েছে। নবীশদের জন্য এগুলো পাঠ্য হিসাবে ব্যবহার করা হতো। ত্রয়োদশ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে এই ধারা বিকাশ লাভ করে। শুরু থেকেই তাদের ভেতর টেন কমান্ডমেন্ট ব্যাখ্যা এক অন্যমাত্রা নিয়ে এসেছে। সেফের ইতজিরাহ, যোহার এবং নৈতিক অন্যান্য প্রধান গ্রন্থাবলির ব্যাখ্যাও জন্ম লাভ করতে থাকে, যার স্রোত এখন পর্যন্ত বিদ্যমান। 

টেন কমান্ডমেন্ট-এর ব্যাখ্যা নিয়ে ছিল বিস্তর চিন্তা, ©  amazon.in

সবিশেষ

নাহমান ক্রোচমালের মতলতো আধুনিক পন্ডিতের কেউ কেউ দাবি করেন, কাব্বালাহর উপর নস্টিক ধ্যানধারণার প্রভাব ছিল। যদিও শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি তার পেছনে। তবে প্রথমদিককার কাব্বালাহ মুসলিম এবং খ্রিষ্টান নব্য প্লেটোবাদীদের দ্বারা সত্যিই প্রভাবিত। অশুভ সম্পর্কে কাব্বালিস্টদের ধারণা পারসিক বিশেষ করে যুরভানিজমের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে মনে হয়। রেনেসাঁর প্রভাব দার্শনিক ব্যাখ্যায় আসে সপ্তদশ শতকের দিকে। বাইরের বিভিন্ন উৎস থেকে বিভিন্ন চিন্তা গ্রহণ করার ব্যাপারে কাব্বালিস্টরা যথেষ্ট উদার থাকলেও বাইরের উপাদান কখনো মূখ্য হয়ে ওঠেনি। বরং তারা তাকে নিজেদের চিন্তা ও মতাদর্শের আলোকে অভিযোজিত করে নিয়েছে। খাপ খাইয়ে নিয়েছে পুরাতনের সাথে নতুনের সংযোজনে।  


১৮


নকশী কাঁথা: বাংলার লোকসংস্কৃতির এক বৈচিত্র্যময় উপাদান

Shah MD. Minhajul Abedin

শিল্প-সংস্কৃতিজুলাই 4, 2019

article

বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি, সাথে বইছে ঠাণ্ডা হাওয়া- এ সময়ে বাঙালীর ঘুমোতে যাওয়ার আগে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটির কথা মনে পড়বে সেটি কাঁথা। হতে পারে বাহারি নকশাদার কিংবা নকশা ছাড়াই। বাংলার লোকসংস্কৃতি আর গ্রামীণ কুটির শিল্পের একটি বড় জায়গা দখল করে আছে কাঁথা।

বাংলার লোকসংস্কৃতিতে জড়িয়ে আছে নকশী কাঁথা; Image Source: commons.wikimedia.org

বাড়িতে সন্তান জন্ম নেওয়ার সময়ে তার জন্য নতুন কাঁথা তৈরির রেওয়াজ টিকে আছে দীর্ঘদিন ধরে। বাড়িতে বিয়ে কিংবা পার্বণের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে অতিথিদের নতুন কাঁথা দিয়ে বরণ করে নেওয়ার চিরাচরিত রেওয়াজ পাওয়া যায় বাংলার কোনো কোনো গ্রামে। বিয়ের পরে মেয়েকে শ্বশুরালয়ে পাঠিয়ে দেওয়ার সময় উপহারের তালিকায় থাকে নকশী কাঁথা।

বাংলায় দীর্ঘসময় ধরে চলে বর্ষাকাল। মাঠ ঘাট থৈ থৈ বর্ষায় ঘরের বাইরের কাজ কমে আসে নারীদের, একটুখানি অবসরের সন্ধান পায় তারা। বাঙালী নারীদের এই অবসর সময়ে পান আর সুপারির আড্ডায় সুঁই সুতো হাতে কাঁথা সেলাই এক চিরাচরিত অভ্যাস। গ্রামীণ সমাজে দ্রুত পরিবর্তন আসার সাথে সাথে এ ধরনের সামাজিকতায়ও পরিবর্তন আসছে।

তবে এখনো গল্পে গল্পে গ্রামীণ নারীরা দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নকশী কাঁথার কাজ করে যান। অনুপম দক্ষতায় কাঁথার জমিনে ফুটে উঠে গাছ, পাখি কিংবা লতাপাতার ছবি। কোনোসময় কাঁথায় উঠে এসেছে দুঃখ আর সুখের কাহিনী, কখনো লন্ঠনের নিভু আলোয় শোনা পুঁথির গল্পই সূচ দিয়ে কাঁথায় ফুটিয়ে তুলেছেন নারীরা।

কাঁটাতারে বাংলা এফোঁড় ওফোঁড় হলেও দুই বাংলাতেই কাঁথা সেলাইয়ের ধরন আর নকশাও মিল পাওয়া যায়, কারণ বাংলা ভাগ হওয়ার অনেক আগেই এই শিল্পের জন্ম। তাই বাংলার প্রবাদে, গল্প, গানে কিংবা কবিতায় অমর হয়ে আছে নকশী কাঁথা। ‘ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখা’র মতো বাগধারা যেমন আছে ঠিক তেমনি আছে পল্লীকবি জসীম উদদীনের আখ্যানকাব্য ‘নকশী কাঁথার মাঠ’। এই আখ্যানকাব্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যে উঠে এসেছে কীভাবে কাঁথায় সূচের প্রতিটি পরতে পরতে ফুটে উঠতে পারে ভালোবাসা আর বেদনার কাহিনী। প্রেমিক রুপাই আর প্রেমিকা সাজুর ভালোবাসার অমর আখ্যান এই কাব্য।

অমর এক আখ্যানের নাম ‘নকশী কাঁথার মাঠ’

বিয়ের পরে রুপাই আর সাজুর ভালোবাসায় আখ্যান বেশি দূর যেতে পারেনি। ফেরারি হয়ে যায় রুপাই। স্বামীর অপেক্ষায় স্ত্রী সাজু বাকি জীবন নকশী কাঁথা বুনতে শুরু করে, দিন-মাস-বছর যায়। সাজু নকশী কাঁথায় সুঁইয়ের আচড় দিয়ে যায়, কাঁথায় লেখে কত গল্প, রুপাই ফিরে আসে না। সারা জীবন সাজুর এভাবেই কেটে যায়। সাজুর নকশী কাঁথা বোনা যেদিন শেষ হয়ে যায় সেদিন সে মাকে অনুরোধ করে, তার মৃত্যুর পর যেন তার কবরের উপরে নকশী কাঁথাটি বিছিয়ে দেওয়া হয়। বহুদিন পরে নকশী কাঁথার নিচে শুয়ে থাকা সাজুর কবরের পাশে ভিনদেশী বংশীবাদকের মরদেহ পাওয়া যায়।

“কেহ কেহ নাকি গভীর রাত্রে দেখেছে মাঠের পরে
মহা-শূন্যেতে উড়াইছে কেবা নকসী কাঁথাটি ধরে
হাতে তার সেই বাঁশের বাঁশিটি বাজায় করুণ সুরে
তারি ঢেউ লাগি এ-গাঁও ওগাঁও গহন ব্যথায় ঝুরে।” 

(‘নকশী কাঁথার মাঠ’; জসীম উদদীন) 

জসীম উদদীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’; Image Source: goodreads.com

এভাবেই বাংলার নারীরা স্বামী কিংবা প্রেমিকের বিরহেও নকশী কাঁথা বুনেছে, প্রবাসে কিংবা বিদেশ বিভূঁইয়ে আত্মীয় স্বজন কিংবা পরিবার পরিজনের স্মৃতি কাঁথার জমিনে জীবন্ত হয়ে ওঠেছে। কেউ হয়তো স্বজনের কাছে নতুন কাঁথা তুলে দিতে পেরেছে, কেউ রুপাই-সাজুর মতো পারেনি।

কাঁথার ভেতরে বাইরে

কাঁথার প্রচলন দুই বাংলা জুড়েই আছে। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, যশোর, খুলনাসহ সারা বাংলার গ্রামে গঞ্জেই ছিটিয়ে আছে কাঁথা বানানোর সংস্কৃতি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহারেও দেখা যায় বৈচিত্রপূর্ণ কাঁথার সমাহার। বিহারের ‘সুজনী’ কাঁথার আছে আন্তর্জাতিক মহলে ‘ভৌগলিক স্বীকৃতি’। যদিও একই নামে এবং প্রায় একই ধরনের কাঁথা বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলেও প্রচলিত আছে। 

খানিকটা ছিড়ে যাওয়া, পুরাতন হয়ে যাওয়া শাড়ি, লুঙ্গি, ধুতি কিংবা চাদরকেই সাধারণত কাঁথা বানানোতে কাজে লাগানো হয়, তবে কাঁথা বানাতে শাড়ির আছে আলাদা কদর। প্রথমে পুরাতন কাপড়কে ধুয়ে, এতে মাড় (ভাত রান্নার সময় অবশিষ্ট তরল) দেওয়া হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। পুরুত্বের দিক থেকে ক্ষেত্রবিশেষে একটি কাঁথায় তিনটি থেকে সাতটি শাড়িও ব্যবহার করা হয়।

নকশী কাঁথা ছাড়াও গ্রামে গঞ্জে সাধারণ সেলাই করা কাঁথা দেখা যায়। সেখানে নকশার বাহাদুরী নেই, প্রয়োজনটাই মুখ্য সেখানে। সেলাইয়ের পর সেলাই করে সেখানে পুরাতন কাপড়গুলোকে একত্র করে কাঁথা বানানো হয়। কাঁথার চারদিক ঘিরে মজবুত সেলাই দেওয়া হয় যাতে সহজে ছিড়ে না যায়। শীত নিবারণের জন্য সেলাই করা কাঁথা বেশ পুরো আর মোটা হয়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে রাজশাহী এবং চাপাই নবাবগঞ্জ এলাকায় তৈরিকৃত কাঁথা বেশ মোটা হয়। শীত নিবারণের জন্য আমাদের দেশীয় লেপ কিংবা কম্বলের পাশাপাশি কাঁথার আলাদা সমাদর আছে।

নকশী কাঁথার নকশা 

তবে কাঁথায় হরহামেশা নকশা দেখা যায়, অনেকেই নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ফুল, পাখি, লতাপাতা আঁকেন। পারিবারিকভাবে মা কিংবা দাদীর করা নকশার অনুকরণ করেন অনেকেই। গল্প, লোককথা, গ্রামীণ পুঁথির চরিত্র কিংবা ধর্মীয় চরিত্র আর অনুশাসন কাঁথার নকশায় আনে বৈচিত্র্য। কাঁথার পাশাপাশি নামাজের জন্য নির্মিত নকশী জায়নামাজ কিংবা কোরআন রাখার গিলাফে দেখা যায় চাঁদ তারা, ধর্মীয় গ্রন্থের লাইন, মসজিদ কিংবা মিনারের ছবি। 

মন্দিরের টেরাকোটার সাথে কাঁথার নকশার মিল; Image Source: Ms. SreenandaPalit

তবে এমন অনেক নকশাই আছে যা বাংলার মাঠে প্রান্তরে ঘরে ঘরে হাজার বছর ধরে জড়িয়ে আছে। এর দার্শনিক উৎস ভারতীয় হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা ইসলাম ধর্মে পাওয়া যায়। তবে সব ক্ষেত্রে নকশাকাররা সেই দার্শনিক তত্ত্ব কিংবা চিহ্নের গুরুত্বের দিকে নজর দিয়েই নকশা আঁকেন ব্যাপারটি মোটেও এমন নয়। অনেকক্ষেত্রেই নকশাটি সুন্দর বলে পারিবারিকভাবে ছড়িয়ে যায়, আবার নকশা সংরক্ষণে ছোট রুমালের আকারের কাপড়ে সেই নকশার ছাঁচটি তুলে রাখা হয়। ফলশ্রুতিতে পরবর্তী প্রজন্ম সেই নকশা দেখে সেটিকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলতে পারে, কখনো পরের প্রজন্ম থেকে নতুন করে উপাদান যুক্ত হয়ে সমৃদ্ধও হয় সেই নকশা।

যাদুঘরে রক্ষিত নকশী কাঁথা; Image Source: Los Angeles County Museum of Art

এমনই একটি বিখ্যাত নকশা হচ্ছে একটি বৃত্তকে কেন্দ্র করে চতুর্দিকে ছড়িয়ে থাকা পদ্ম কিংবা চাকা। বৃত্তকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে থাকা এই নকশা শুধু কাঁথা কিংবা রুমালেই নয় সারা ভারতের স্থাপত্যকলাতেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নকশী কাঁথাও একটি বৃত্তকে কেন্দ্র করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়া নকশা দেখা যায় হরহামেশাই। এছাড়া পদ্মফুল এবং চাকার নকশাও চোখে পড়ে কাঁথায়।

নকশী কাঁথার জমিনে নকশার বৈচিত্র; Image Source: gurusadaymuseum.org

লতাপাতা 

ভারতীয় হস্তশিল্প এবং কুটিরশিল্পগুলোতে গাছ আর লতাপাতার নকশা এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। কাঁথা, রুমাল আর শীতল পাটিতে এই গাছের নকশা ঘুরেফিরে বিভিন্নভাবে এসেছে। কোনো কাঁথায় আবার ফুটে উঠেছে মানুষের পাশাপাশি ঘোড়া, ময়ুর কিংবা অন্যান্য প্রাণীর ছবি। কিছু কাঁথায় দেখা যায় নকশার সাথে নকশাকারী তার কিংবা তার প্রিয়জনের নাম কিংবা আদ্যক্ষর যুক্ত করে দেওয়ার মতো ঘটনাও দেখা যায়।  

নকশী কাঁথায় পাখির সাথে গাছপালার নকশাই প্রাধান্য পায়; Image Source: Indian Ethnic Embroidery

কাঁথার নকশার এই বৈচিত্র্যের কারণে একে ধরাবাধা ছকে ফেলা কিংবা সেই নকশার দার্শনিক উৎস খোঁজাও দুঃসাধ্য ব্যাপার। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই শিল্পে যত দিন গিয়েছে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। নকশী কাঁথার নকশা শুধু কাঁথার মধ্যেই থেমে থাকেনি, গাছ-লতা-পাতা কিংবা ফুল-পাখি সম্বলিত যে নকশা কাঁথায় দেখা যায় প্রায় একই ধরনের নকশা দেখা যায় টেবিলক্লথ, রুমাল, টুপি , বালিশ কিংবা বিছানার চাঁদরে। 

কতদিন সময় লাগে?

নকশী কাঁথা সাধারণত একদিনে তৈরি হয় না, সময় নিয়ে ধীরে ধীরে এতে কারুকার্য ফুটিয়ে তোলা হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এটি একসময়ে বাংলার নারীদের অবসরের অনুষঙ্গ ছিল। পূজা, পার্বণ কিংবা অন্য কোনো অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে দেওয়ার নজিরও পাওয়া যায়। মাঝারি আকারের কাঁথা তৈরিতে সাত থেকে পনের দিন সময় লেগে যায়। বড় কাঁথা এবং জটিল নকশা করতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে।

একটি নকশী কাঁথা সেলাইয়েই অংশগ্রহণ করছেন অনেক নারী; Image Source: alamy.com

অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মূল্য

পুরাতন কাপড়কে জোড়া দিয়ে এর জমিনে কারুকার্য করে নতু্নের মতোই করে তোলা যায় বলে মধ্যবিত্ত থেকে গরীব সবার কাছেই ছিল এর কদর। তবে আধুনিক সমাজে উচ্চবিত্তের কাছে এর অর্থনৈতিক মূল্য নতুন করে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। 

দীর্ঘসময় ধনীর চোখে কাঁথা ছিল গরীব আর মধ্যবিত্তের শীত নিবারণের বস্তু। বাংলার উচ্চবিত্ত সমাজে প্রয়োজনের খাতিরে ফরমায়েশে নকশী কাঁথা বানিয়ে নেওয়ার প্রচলন ছিল।

তবে সময়ের সাথে নকশী কাঁথার জমিনে যে নিপুণ কারুকার্য করা হয় তার একটি সাংস্কৃতিক আবেদন তৈরি হয়েছে, ফলে এর অর্থমূল্য বেড়েছে। এই আবেদন থেকেই নকশী কাঁথাকে কুটির শিল্প হিসেবে দাঁড় করানোর প্রবল সম্ভাবনা জেগে উঠেছে। নকশী কাঁথার পেশাদার কারিগর বলতে এক সময়ে কাউকে পাওয়া যেত না, কারণ এই শিল্পটি নিতান্তই শখের বশে আর প্রয়োজনের খাতিরে দাঁড়িয়েছিল। এর ফলে আর্থসামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে কাঁথাও হারিয়ে যেতে বসেছিল। যুগ যুগ ধরে চলে আসা নকশী কাঁথার মহামূল্যবান নকশাও ছিল ঝুঁকিতে। তবে বর্তমান বাংলাদেশ আর ভারতের বিভিন্ন এলাকায় এই নকশী কাঁথার বুননকে কুটির শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে নানা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

নকশী কাঁথার নকশায় বেঁচে থাকুক বাংলার লোকসংস্কৃতির গল্প; Image Source: www.textiletoday.com.bd

নকশী কাঁথার নকশা শুধু কাঁথার জমিনে সুঁইয়ের ফোঁড়ে ফুটিয়ে তোলা নকশাই নয়, একেকটি নকশী কাঁথার জমিনে লুকিয়ে থাকে গল্প, কখনো ভালোবাসার, কখনো দুঃখের। বাংলার পথে প্রান্তরে হারিয়ে যাওয়া গল্পকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একেকটি নকশী কাঁথা।


১৯


আদিবাসী সমাজ ও সংস্কৃতি: সাঁওতাল

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিআগস্ট 16, 2019

article

১৮৫৫ সালের ৩০শে জুন। ইংরেজ শাসন, জমিদার এবং নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠে বীরভূমের মাটিতে। নেহায়েত দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আধুনিক বন্দুক কামানের মুখোমুখি হয়েও কাঁপিয়ে দিল ব্রিটিশ মসনদ। সিধু, কানু, চান্দ ও ভৈরবের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এক বছরের মাথায় বিদ্রোহ স্তিমিত হলো বটে। কিন্তু গোটা ভারতের মোহনিদ্রা ভেঙে দিয়ে গেলো। জন্ম নিলো অধিকার সচেতনতা। তার দলিল ঠিক পরের বছর থেকেই এই মাটিতে একের পর এক বিদ্রোহ। বিপ্লব ছোঁয়াচে রোগের মতো কী না! ইতিহাসের পাতায় ঘটনাটি সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সান্তাল হুল নামে স্বীকৃত। আর এর মধ্যে দিয়ে আলোচনায় আসে একটা আদিবাসী জনগোষ্ঠী- সাঁওতাল।

সাঁওতাল বিদ্রোহ: যে বিপ্লব জন্ম দিয়েছে আজাদির স্বপ্ন; Image source: thebetterindia.com

এক সময়ে উত্তর ভারত থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের ইস্টার আইল্যান্ড অব্দি বিস্তৃত ছিল অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ। নাক চওড়া ও চেপ্টা, গায়ের রং কালো এবং মাথার চুল ঢেউ খেলানো। আনুমানিক ত্রিশ হাজার বছর আগেই তারা ভারত থেকে অস্ট্রোলিয়া যায়। সেই অস্ট্রিক গোষ্ঠীরই উত্তরাধিকারী বর্তমানের সাঁওতাল। খুব সম্ভবত সাঁওত বা সামন্তভূমিতে বাস করার কারণে সাঁওতাল নামে পরিচিত হয়ে পড়েছে।  

একটি গল্প ও কয়েকটি উত্তর

যুগের ব্যবধানে ভারতের ভূমিতে এসেছে আর্য, গ্রীক, আরব এবং ‍মোঙ্গলদের মতো অজস্র জাতি। সেই অর্থে সাঁওতালরাও বহিরাগত। এদের কেউ কেউ নিজেদেরকে মহাভারতে বর্ণিত বীর একলব্যের বংশধর মনে করে। তবে তাদের উৎস এবং আদি নিবাসভূমি সম্পর্কে বলতে বহুল প্রচলিত এক লোককথাকে ‍গুরুত্ব দেয়া হয়।

তখনো পৃথিবীর জন্ম হয়নি, ছিল শুধু পানি। একদিন চন্দ্রের কন্যা স্নান করতে এসে শরীরের ময়লা থেকে সৃষ্টি করলেন দুটি পাখি- হাঁস এবং হাঁসিল। অনেকদিন ভেসে থাকার পর পাখি দুটি ঈশ্বর (ঠাকুরজিউ)-এর কাছে খাবার চাইলো। ফলে ঠাকুরজিউ পৃথিবী সৃষ্টির মনস্থ করলেন। 

সাঁওতাল পুরাণ অনুসারে হাঁস ও হাঁসিল; Image Source: santhaledisom.com

এজন্য যেহেতু মাটির দরকার এবং মাটি সমুদ্রের তলদেশে, তাই বোয়ালকে ডাকা হলো। প্রথমে বোয়াল এবং তারপর কাঁকড়া মাটি আনতে ব্যর্থ হলে এগিয়ে আসলো কেঁচো। কচ্ছপকে পানির উপর ভাসতে বলে কেঁচো নিজের লেজ রাখলো তার পিঠে। তারপর মাটি খেয়ে তা লেজ দিয়ে বের করে কচ্ছপের পিঠে রাখলে জন্ম নিলো পৃথিবী। নরম মাটি শুকানোর জন্য ঠাকুরজিউ পৃথিবীতে ঘাস, শাল ও মহুয়াসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষ রোপন করলেন।

কিছুদিন পর মেয়ে পাখিটা দুটি ডিম দিলো। নয়মাস দশদিন পর ডিম ফুটে বেরিয়ে এলো একজন পুরুষ ও একজন নারী। এরাই পৃথিবীর প্রথম নরনারী- পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়ি। হিহিড়ি-পিহিড়ি নামক স্থানে তারা বসবাস করলে লাগলো। নাটকীয়ভাবে তাদের সঙ্গম থেকেই জন্ম নেয় সাতটি পুত্র ও আটটি কন্যা। ঠাকুরজিউ এবার পিলচু হাড়ামকে পুত্রদের নিয়ে সিংবীরে এবং পিলচু বুড়িকে কন্যাদের নিয়ে মানবিরে যাবার নির্দেশ দিলেন। আদেশ পালিত হলো দ্রুতই।

অনেকদিন পর শিকার থেকে ভুলক্রমে সাত পুত্র এক বিলের ধারে চলে গেল। সেখানে শাক তুলছিল আট কন্যা। পরস্পরকে দেখে আকর্ষিত হলো। ধীরে ধীরে সেই আকর্ষণ গড়ালো বিয়ে পর্যন্ত। ছোট কন্যাকে বাদ রেখে বড় বড়কে এবং ছোট ছোটকে এইভাবে জুটি তৈরি হলো। সেই সাত পুত্র থেকে জন্ম নিলো সাতটি বংশ- হাঁসদা, মূর্মূ, কিস্কু, হেমব্রোম, মারাণ্ডি, সোরেন এবং টুডু। তখন থেকেই মূলত গোত্রপ্রথা এবং বিয়েপ্রথার শুরু।

তারপর তারা খোজা-কামান দেশে গিয়ে বসবাস করতে লাগলো। নৈতিক অবক্ষয়, অন্যায় ও অত্যাচারে লিপ্ত হবার কারণে ঠাকুরজিউ তাদের উপর রুষ্ট হলেন। সাতদিন সাতরাত টানা অগ্নিবৃষ্টিতে তারা ধ্বংস হলো। হারাতা পর্বতে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে গেলো পিলচু হাড়াম এবং পিলচু বুড়ি। গজব শেষে প্রথমে সাসাংবেদা এবং পরে চায়চাম্পাতে গিয়ে বসবাস শুরু করলো তারা। ঠাকুরজিউ আবার সন্তানাদি দান করলেন। (বাংলাদেশের সাঁওতাল: সমাজ ও সংস্কৃতি, মুহম্মদ আবদুল জলিল, পৃষ্ঠা- ৪)

কাহিনীতে বেশ কিছু স্থানের নাম উদ্ধৃত হয়েছে। গবেষকেরা বিদ্যমান বিভিন্ন অঞ্চলের নামের সাথে তা মেলাতে চান। বিষয়টা কঠিন আর তাই মতবিরোধের কমতি নেই। মোটা দাগে, সাঁওতালরা অনেকটা বিক্ষিপ্তভাবেই বসবাস করছিল। ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদের দামিনিকোতে বসবাস নির্দিষ্ট করে। স্থানটির পরবর্তী নাম হয় সাঁওতাল পরগণা।

বিদ্রোহের পর

১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের পরাজয়ের ফলে আবার বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে তারা। ছড়িয়ে পড়ে বাংলা, ত্রিপুরা ও উড়িষ্যায়। দীর্ঘদিন সেভাবেই কেটেছে। ১৯৬১ সালে ভারতের আদম শুমারিতে দেখা যায় বিহারে ১৫,৪১,৩৪৫ জন, পশ্চিমবঙ্গে ১২,০০,০১৯ জন, উড়িষ্যায় ৪,১১,১৮১ জন এবং ত্রিপুরায় ১,৫৬২ জন সাঁওতালের বসবাস। একই সালে আদম শুমারি হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। দেখা যায় সাঁওতালদের সংখ্যা দিনাজপুরে ৪১,২৪২ জন, রংপুরে ৪,২৯২ জন, রাজশাহীতে ১৯,৩৭৬ জন, বগুড়ায় ১,৮৬১ জন এবং পাবনায় ১৭০ জন। ২০০১ সালের এক হিসাবে মতে, বাংলাদেশে সাঁওতালদের মোট সংখ্যা ১,৫৭,৬৯৮ জন। বর্তমানে এই সংখ্যা ২ লাখ অতিক্রম করেছে বলে ধারণা করা হয়। 

উত্তরপূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশে সাঁওতালদের মানচিত্র, image source: researchgate.net

সমাজ ও বিচারিক কাঠামো

যুগ যুগ ধরে হিন্দু এবং মুসলিমদের সাথে বসবাস করার পরেও সাঁওতালরা তাদের সামাজিক স্বাতন্ত্র্য হারায়নি। বস্তুত রাষ্ট্রীয় বিধানাবলির চেয়ে সামাজিক প্রথার প্রতি তাদের আনুগত্য অধিক। তার অন্যতম প্রমাণ বিচারব্যবস্থা। সাঁওতাল গ্রামের বিশেষ পাঁচজনকে নিয়ে গঠিত হয় গ্রাম পঞ্চায়েত। তারা হলেন- মাঝি হাড়াম বা গ্রামপ্রধান, পরাণিক, জগমাঝি, গোডেৎ এবং নায়েকে। আবার কয়েকটি গ্রামের প্রধানদের নিয়ে গঠিত হয় পরগণা পঞ্চায়েত। এর প্রধানকে বলা হয় পারগাণা। এর থেকেও বৃহত্তর ব্যবস্থা দেশ পঞ্চায়েত। সাঁওতাল সমাজে দেশ বলতে নির্দিষ্ট এলাকাকে বোঝানো হয়। সাধারণত দেশপ্রধানের অধীনে পাঁচ-ছয় জন পারগণা ও মাঝি হাড়াম থাকতে পারে। এই তিন স্তরের বিচারব্যবস্থার বাইরে আছে ল’বীর বা সুপ্রিম কোর্ট। জটিল বিষয়াদি নিয়ে বছরে মাত্র একবার এই আদলত বসে।     

সাঁওতালদের একটি বৈঠক; Image Source: ecojesuit.com

মাঝি হাড়াম বলতে গ্রামপ্রধানকেই বোঝানো হয়। শুধু বিচারিকভাবে না, সার্বিকভাবে গ্রামের সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু তিনি। তার সহায়ক হিসেবে বাকি পদগুলো সৃষ্ট। পরাণিক পালন করে সহকারি গ্রামপ্রধানের দায়িত্ব। মাঝি হাড়াম অসুস্থ কিংবা অনুপস্থিত থাকলে তার দায়িত্ব বর্তায় পরাণিকের উপর। জগমাঝি পালন করে উৎসব তদারকির ভার। সেই সাথে উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীরা তার মাধ্যমেই নিজেদের ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করে। সে হিসেবে তিনি যুব প্রতিনিধি। গোডেৎ এর কার্যাবলী অনেকটা চৌকিদারের অনুরূপ। আর নায়েকে বিশেষ করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও পূজা উপলক্ষে বলি দেওয়ার মতো বিষয়ের দায়িত্ব পালন করে।

স্থানীয় সমস্যাগুলো মীমাংসা করা হয় গ্রাম পঞ্চায়েতে। গ্রাম পঞ্চায়েতে অমীমাংসিত বিষয়গুলো পরগণা পঞ্চায়েতে উত্থাপিত হয়। দেশ পঞ্চায়েতে উঠে পরগণা পঞ্চায়েতে অমীমাংসিত সমস্যা। সবার শেষে স্থিত ল’বীরের মুঠোতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা।

গোত্রবিন্যাস

বাংলার আবহাওয়াই গোত্রব্যবস্থার অনুকূল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রে বিভক্ত হিন্দু সমাজের দেখাদেখি এখানকার মুসলমান সমাজও বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল সৈয়দ, শেখ, পাঠান ও দেশি মুসলিম হিসেবে। তবে তাদের কারোরই প্রভাব সাঁওতাল সমাজে পড়েনি। সাঁওতাল সমাজ মূলত ১২টি ভাগে বিভক্ত। তারা হলো- কিস্কু, হাঁসদা, মূর্মূ, হেমব্রম, মারণ্ডি, সোরেন, টুডু, বাস্কি, গুয়াসোরেন, বেসরা, পাউরিয়া এবং চোঁড়ে। পূর্বে বেশ কিছু উপগোত্রের কথা শোনা গেলেও বর্তমানে বাংলাদেশে এই বারোটি গোত্রের কথাই জানা যায়। 

গোত্রের ভিন্নতায় আচারেও ভিন্নতা আসে; Image source: dailyhunt.in

দৈনন্দিন জীবনাচার

সাঁওতালদের খাদ্যতালিকা বাঙালি হিন্দু কিংবা মুসলমানের খাদ্যতালিকার মতোই। ভাত, মাছ, মাংস নিরামিষ কিংবা বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক পিঠা তাদের খাবার হিসেবে বিদ্যমান। নেশা জাতীয় খাদ্যের মধ্যে হাড়িয়া বা ভাত পচানো মদ প্রধান। এছাড়া আছে ভাঙ, তাড়ি, হুকা এবং গাঁজা। অনেক মেয়ে হাড়িয়া ও ধূমপানে অভ্যস্ত থাকলেও সব সাঁওতাল ধূমপান করে না। অতি ‍উৎসাহী অনেকেই তাদের খাদ্যাভ্যাসে কাঠবিড়ালী, গুইসাপ এবং কাঁকড়ার নাম উল্লেখ করেন, যা সর্বৈব মিথ্যা এবং দুঃখজনক।

গরীব পুরুষদের প্রধান পরিধেয় নেংটি। পোশাকটি একসময় বাংলার অধিকাংশ মানুষই পরিধান করতো বলে এখনো পরিচিত। তবে স্বচ্ছলদের মধ্যে সাধারণ পোশাক হিসাবে ধুতি এবং পাগড়ি বেশ জনপ্রিয়। আধুনিক শিক্ষিতরা বাঙালি হিন্দু-মুসলমানদের অনুরূপ প্যান্ট, শার্ট, পাঞ্জাবি ও পাজামা প্রভৃতি পরিধান করে। মেয়েদের পোশাক মোটা শাড়ি বা ফতা কাপড়। তবে স্বচ্ছল পরিবারের মেয়েরা বাঙালি মেয়েদের মতোই শাড়ি, ব্লাউজ এবং পেটিকোট পরে। 

ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সাঁওতাল নারী ও পুরুষ, Image Source: erosbonazzi.altervista.org

সাঁওতাল রমণীরা সৌন্দর্য সচেতন। স্বর্ণালঙ্কারের প্রচলন না থাকলেও গলায় হাঁসুলি, মালা ও তাবিজের ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়া কানে দুল, নাকে নথ ও মাকড়ী, সিঁথিতে সিঁথিপাটি, হাতে বালা, চুড়ি এবং বটফল, বাহুতে বাজু, কোমরে বিছা, হাতের আঙুলে অঙ্গুরী, পায়ের আঙুলে বটরী প্রভৃতি অলঙ্কার বেশ জনপ্রিয়। কখনো খোঁপায় ফুল গুঁজে, কখনো কাঁটা ও রঙিন ফিতা দিয়ে চুল বাঁধা হয়। দরিদ্র মেয়েরা বিশেষ প্রকার মাটি ব্যবহার করে শরীর মাজতে, যা নাড়কা হাসা নামে পরিচিত।

ক্ষুদ্রাকার ঘরগুলো বেশ পরিচ্ছন্ন। নিম্নাংশ রঙিন করা ছাড়াও দেয়ালে আঁকা হয় নানা রঙের ছবি। বাসায় আসবাবপত্রের আধিক্য নেই। কাঠ, বাঁশ ও পাট ব্যবহারের প্রাচুর্য দেখা যায়। তীর ধনুক ও টোটা প্রায় সব সাঁওতাল বাড়িতেই আছে।

উৎসব-অনুষ্ঠান

সাঁওতাল সমাজ উৎসবপ্রধান। সাধারণত দুই ধরনের উৎসব দেখা যায়- জন্ম-বিবাহ ও মৃত্যুকেন্দ্রিক উৎসব এবং পার্বণিক উৎসব। সব অনুষ্ঠান ঝাঁকঝমকপূর্ণ না হলেও বিয়ে ও পার্বণিক অনুষ্ঠানগুলো পালিত হয় ঘটা করে। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের মতো সাঁওতাল শিশু জন্মের পাঁচ কিংবা পনেরো দিনে অনুষ্ঠিত হয় অন্নপ্রাশন। এছাড়া নামকরণ, কানে ছিদ্র করা এবং সিকা দেওয়াকে কেন্দ্র করে পালিত হয় উৎসব। সিকার বদলে মেয়েরা ব্যবহার করে খোদা চিহ্ন। 

সাওতাল রমণীদের বসন্তবরণ;  Image source: thedailystar.net

সাঁওতাল সমাজে চার ধরনের বিয়ে প্রচলিত আছে। অভিভাবকের পছন্দ মাফিক বিয়ে হলে তাকে বলা হয় ডাঙ্গুয়া বাপ্লা বা আনুষ্ঠানিক বিয়ে। আগে থেকে বিদ্যমান প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ালে সেই বিয়েকে বলা হয় আঙ্গির বা প্রেমঘটিত বিয়ে। এছাড়া আর দুই প্রকারের বিয়ে হলো অ-র বা বলপূর্বক বিয়ে এবং ইতুত বা কৌশলে বিয়ে। অ-র বিয়েতে কোন তরুণ তার পছন্দের তরুণীকে সিঁদুর পরিয়ে দেয় জোর করে। পরবর্তীতে বৈঠক ডেকে তরুণীর মতামত নেওয়া হয়। তরুণী হ্যাঁ বললে কিছু করার থাকে না কিন্তু না বললে তরুণকে দণ্ডিত করা হয়। ইতুত বিয়েটাও প্রায় কাছাকাছি। শুধু এক্ষেত্রে তরুণ সিঁদুর পরিয়ে দিয়ে সিঁদুর পাতা গ্রামপ্রধানের কাছে জমা দেয়। গ্রামপ্রধান যুবতীর মত জানতে চান। হ্যাঁ হলে বিয়ে হয়ে গেছে বলে ধরা হয়।

সাঁওতাল সমাজে পণপ্রথা প্রচলিত আছে। তবে তা খুবই নগণ্য। সর্বনিম্ন ১২টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪৫টাকা। বরপক্ষ কন্যাপক্ষকে তিনটা কাপড় প্রদান করে। কনের নানীকে দেয়া শাড়িকে বলা হয় বোঙ্গা শাড়ি। বাকি দুটি পায় কনের ফুফু এবং মা। বিধবাবিবাহ প্রচলিত আছে। বিধবাকে সেই সমাজে বলা হয় ‘রাণ্ডি’। অন্যদিকে তালাক প্রাপ্তা মেয়েদের বলা হয় ছাডউই। অন্যদিকে মৃত ব্যক্তির আত্মার জন্য পালিত হয় শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান। সাঁওতালর মৃতকে কবর দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে।

‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ কথাটা সাঁওতাল সমাজের জন্য আরো বেশি করে সত্য। বাংলা ফাল্গুন মাসে উদযাপিত হয় নববর্ষ। চৈত্রমাসে বোঙ্গাবুঙ্গি, বৈশাখে হোম, জ্যৈষ্ঠ মাসে এরোয়া, আষাঢ়ে হাড়িয়া, ভাদ্র মাসে ছাতা, আশ্বিনে দিবি, কার্তিকে নওয়াই এবং পৌষ মাসে সোহরাই উৎসব পালিত হয়। ধর্ম-কর্ম, উৎসব-অনুষ্ঠান সবকিছুকে ঘিরে থাকে নৃত্যু আর গান।

ধর্ম-কর্ম

সাঁওতালদের নিজস্ব ভাষা আছে, বর্ণ নেই; ধর্ম আছে, ধর্মগ্রন্থ নেই। ধর্মের আদি দেবতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। সিং বোঙ্গা হলো সূর্যদেবতা। সূর্যের এমন প্রকাশ অনেক ধর্মেই দেখা যায়। চান্দো শব্দের অর্থও সূর্য। অন্যদিকে মারাংবুরু আদিতে একটি পাহাড়ের নাম ছিল। ধীরে ধীরে তা পরিণত হয় মহাজাগ্রত দেবতায়। বস্তুতপক্ষে সিং বোঙ্গা, চান্দো এবং মারাংবুরুর সাথে ঈশ্বরের মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। শ্রেষ্ঠদেবতা অর্থে ঠাকুরজিউ ব্যবহৃত হয়। খুব সম্ভবত তা পরবর্তীকালে সংযোজিত। অনুরূপ কথা ধর্মদেবতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। 

গোটা ধর্ম জুড়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে পূর্বপুরুষের আত্মা; Image source: youtube

সাঁওতাল বিশ্বাস মতে, আদি দেবতা নিরাকার। স্বর্গ-নরক কিংবা জন্মান্তরবাদের তেমন কোন ধারণা তাদের মধ্যে নেই। ধর্ম-কর্ম আবর্তিত হয় পার্থিব জীবনের মঙ্গল অমঙ্গলকে কেন্দ্র করে। বোঙ্গা মানে নৈসর্গিক আত্মা। তাদের মতে, আত্মা কখনো মরে না; সর্বদা পৃথিবীতেই বিচরণ করে। বোঙ্গারাই সুখ-দুঃখের নিয়ন্তা। সাঁওতাল ধর্মীয় জীবনের অধিকাংশ স্থান জুড়ে বোঙ্গাদের অবস্থান। এমনকি প্রত্যেক বাড়ির জন্য গৃহদেবতা হিসেবে আবে বোঙ্গা থাকে। আদিতে মূর্তিপূজা না থাকলেও ইদানিং দূর্গা ও শ্যামা পূজার মতো দাঁসাই উৎসব এবং মাই বোঙ্গার পূজা চালু হয়েছে। তবে সাঁওতালদের মধ্যে খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরের প্রভাব দিনকে দিন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে।

লোক-সংস্কৃতি

সাঁওতাল সমাজ একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। জীবনের নানান সত্যকে বোধগম্যভাবে উপস্থাপন করার জন্য গড়ে উঠে লোকজ গল্প ও কাহিনী এবং শ্লোক। যেমন-

দারে সাকাম সাগে নেনা
ঞুরুঃলাগিৎ চান্দো পালোঃ লাগিৎ
নিংমাঞ জানা মাকান নোয়া ধারতিরে
বাংদঞ টুণ্ডোং চান্দো বাং দঞ বাং আ।।

ভাবার্থঃ গাছের পাতা আসে ঝরে যাবার জন্য। আর আমি জন্মগ্রহণ করলাম পৃথিবী থেকে সরে যাবার জন্য। (বাংলাদেশের সাঁওতাল সমাজ ও সংস্কৃতি, মুহম্মদ আবদুল জলিল, পৃষ্ঠা- ৪)

এরকম অজস্র গল্প রয়েছে। আবার যাপিত জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ভেতর জন্ম নিয়েছে নানান বিশ্বাস ও সংস্কার। অমাবস্যা বা পূর্ণিমায় ফসল লাগালে অমঙ্গল হয়, চুল ছেড়ে গোশালায় গেলে গৃহপালিত পশুর অকল্যাণ ঘটে, রাতে এঁটো থালা বাইরে ফেললে দারিদ্রতা আসে- প্রভৃতি কালের ব্যবধানে বিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়েছে। এছাড়া সুলক্ষণা ও কুলক্ষণা নারীর বৈশিষ্ট্য, যাত্রা শুভ কিংবা অশুভ হবার কারণ, বৈবাহিক সম্পর্কের ঠিক-ভুলের প্রতীক প্রভৃতি তাদের বিশ্বাস ও সংস্কারে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে লোক-সংস্কৃতির অফুরন্ত উপাদানে সমৃদ্ধ সাঁওতাল সমাজ। 

এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতির লালন করছে হাজার বছর ধরে; Image source: santhaledisom.com

তারপর

ভারতীয় ইতিহাসের সাঁওতাল বিদ্রোহ ঘটে ১৮৫৫-৫৬ সালে। ১৯৪৫ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে তেভাগা আন্দোলনে শহিদ ৩৫ জনের অনেকেই ছিলেন সাঁওতাল কৃষক। ১৯৫০ সালে নাচোলে কৃষক বিদ্রোহের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে তারা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও সাঁওতাল যুবকদের সক্রিয় সহযোগিতা খাটো করে দেখার জো নেই। 

সাঁওতাল চিত্রকলাতেও রয়েছে স্বাতন্ত্র; image source: dailyhunt.in

হাজার বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমান সমাজের সাথে বসবাস করেও সাঁওতাল সমাজ তাদের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হতে দেয়নি। ক্ষুন্ন হতে দেয়নি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারা। প্রতিদিনের প্রকৃতি, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিশ্বাস এবং নৈতিক মূল্যবোধের আদর্শকেও দেয়নি কালিমালিপ্ত হতে। আদিবাসী সংস্কৃতির মূল বৈশিষ্ট্য এখানেই।


২০


আদিবাসী সমাজ ও সংস্কৃতি: চাকমা

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিসেপ্টেম্বর 10, 2019

article

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতির পীঠস্থান। পাহাড়, ঝর্ণা এবং সবুজ অরণ্য মিলিয়ে যেন প্রকৃতির বিস্ময়কর লীলাক্ষেত্র। দেশের মোট আদিবাসীর বেশিরভাগের বসবাস এখানে। সাধারণভাবে নিজেদের জুম্ম জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ তাদের। ভিন্ন ভাষাভাষী সেই সব আদিবাসীদের মধ্যে বিশেষ অবস্থান করে আছে চাকমারা।

বাংলাদেশে বসবাসরত বৃহত্তম আদিবাসী চাকমা; Image Source: prothomalo.com

রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে সবচেয়ে বেশি এবং কক্সবাজারে টেকনাফের অন্তত ১১টি স্থানে চাকমাদের অবস্থান। বাংলা কিংবা ইংরেজিতে চাকমা বলা হলেও মূলত তা ‘চাঙমা’ শব্দের রূপান্তরিত উচ্চারণ। নিজেদের তারা ভিন্ন উচ্চারণে চাঙমা বলেই পরিচয় দেয়। অন্যান্য আদিবাসীদের দ্বারা ডাকা নামেও আছে ভিন্নতা। কখনো সাক, কখনো আচাক, আইএং, তাকাম কিংবা দৈননাকের মতো আরো নানা নামে যা বোঝায়, তা মূলত চাকমা আদিবাসীদেরই নির্দেশ করে।

কিংবদন্তি অথবা ইতিহাস

চম্পকনগরের রাজা সাধেংগিরির দুই পুত্র বিজয়গিরি ও সমরগিরি। দুর্দান্ত এক অভিযানে বিজয়গিরি চট্টগ্রাম ও আরাকান বিজয় করলেন; আর সেই মুহূর্তেই শুনতে পেলেন দুঃসংবাদ। পিতার মৃত্যু হয়েছে আর মসনদ দখল করেছে ছোট ভাই সমরগিরি। মর্মাহত রাজপুত্র আর প্রাসাদের না ফিরে অনুগত সৈন্যদের নিয়ে থেকে যান এখানেই। সেখান থেকে সাপ্রেইকুল নামক স্থানে গিয়ে স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে থিতু হবার অনুমতি প্রদান করেন সৈন্যদের। কালের ব্যবধানে চম্পকনগরের সাথে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। চাকমা ধারণামতে, তারা সেই থেকে যাওয়া বিজয়ী সৈন্যদের বংশধর।

কিংবদন্তি অনুসারে বিজয়গিরির সাথে তারা এই অঞ্চলে আসে; image Source: joshuaproject.net

চাকমাদের শাক্যবংশীয় মনে করতো কেউ কেউ। খুব সম্ভবত এ কারণেই সাক বা থেগ নামে অভিহিত করা হতো তাদের। গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর আগেই শাক্যরা ভারতে কোনঠাসা হয়ে পড়তে থাকে। কালের বিবর্তনে চলে যেতে থাকে বার্মা, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এবং মালয়ে। তাদেরই একটা অংশ ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলে। 

কিংবদন্তি ঘেঁটে মনে হয়, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কাছে কোথাও ছিল চম্পকনগর। আর রামুর দুই মাইল দূরে বাকখালী নদীর তীরে আছে চাকমাকূল নামক স্থান। এই চাকমাকূলই কিংবদন্তি নায়ক বিজয়গিরির সাপ্রেইকুল। যদি সেটাই সত্য হয়; তবে বিজয়গিরি তার বাহিনী নিয়ে কক্সবাজারের রামু পর্যন্ত অধিকার করেছিলেন।

বিজয়গিরির শাসনকাল ৬১৫ থেকে ৬৪৫ সাল। তাকেই যদি প্রথম রাজা ধরা হয়; তবে ৩২/৩৩ তম রাজা ছিলেন অরুণযুগ (ইয়াংজ)। তার শাসনকাল ১৩১৬ থেকে ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দ। পঞ্চদশ এবং ষোড়শ শতকে ইউরোপীয় পণ্ডিতদের হাতে কখনো চাকোমাস আবার কখনো চাডমা নামে উদ্ধৃত হয়েছে তাদের কথা। তবে চাকমাদের উপর আরাকানিদের প্রভাব ছিল তীব্র। সেই প্রভাব কমে আসে রাজা থুধম্মা (১৬৫২-১৬৮৪) এর মৃত্যুর পর থেকে।

পর্তুগিজদের হাতে আঁকা পার্বত্য চট্টগ্রামের মানচিত্র, wikipedia.org

১৭১৩ সালে রাজা জল্লীল খান চাকমা শাসনে নতুন স্রোত আনলেন। প্রয়োজনীয় দ্রব্যকে সহজলভ্য করার জন্য তিনি উপহার ও পত্র প্রেরণ করেন মোগলদের কাছে। মোগল আর চাকমা এভাবেই পরস্পরের কাছে এসেছিল। কিন্তু কথায় আছে, বাঘে-মহিষে বন্ধুত্ব হয় না। মোগলদের আধিপত্যকামীতার জন্য সম্পর্ক বেশিদূর এগিয়ে আসতে পারেনি। তবে ব্রিটিশ শাসনের আগপর্যন্ত চাকমা তথা জুম্ম রাজন্যবর্গ ছিল কার্যত স্বাধীন ও সার্বভৌম।

পলাশী যুদ্ধের পর ১৭৭৭ সালে ইংরেজরা প্রথম নজর দেয় পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে। এবছর তাদের প্রেরিত অভিযান শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় চাকমা সেনাপতি রুনু খানের কাছে। একের পর এক সংঘর্ষ হয় ১৭৮৩, ১৭৮৪ এবং ১৭৮৫ সালে। ইতিহাসে তুলা যুদ্ধ নামে পরিচিত এসব সংঘর্ষে বারবার ব্যর্থ হয় ইংরেজ। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারী সকল জায়গাতেই থাকে। ১৭৮৭ সালে কয়েকজন অভিজাত ব্যক্তির ষড়যন্ত্রে দুর্বল হয়ে চাকমা রাজা ইংরেজদের সাথে সমঝোতামূলক চুক্তিতে আসতে বাধ্য হন। সেদিন থেকেই প্রত্যাশার আকাশে জমতে শুরু করলো মেঘ। ১৭৯১ সালে কার্পাসের বদলে টাকায় কর নেয়া শুরু করে ব্রিটিশরা।

‘ডিভাইড এন্ড রুল’- ব্রিটিশদের এই কুখ্যাত নীতি চাকমাদের উপরও পড়ে। ১৮৭১ সালে বোমাং সার্কেল এবং ১৮৮৪ সালে মং সার্কেল গঠন করার পেছনে ছিল চাকমা রাজ্যকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে ফেলার অজুহাত। দেশভাগের সময় অমুসলিম অধ্যুষিত এলাকা হিসাবে ভারতে যুক্ত হবার দাবি উঠলেও যুক্ত করা হয় পাকিস্তানের সাথে।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ খগেন্দ্রনাথ চাকমা, Image Source: hscvoice.blogspot.com

পাকিস্তানী আমলে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিল তরুণ ও বৃদ্ধরা। অসহযোগ আন্দোলনের সময় জুম্ম জনগোষ্ঠীকে সাথে নিয়ে অচল করে দেয়া হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম। অনেকেই যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস্ (ইপিআর) এ চাকমাদের প্রায় সবাই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যাদের অনেকেরই খোঁজ পাওয়া গেছে; অনেকে হারিয়েছে জীবন। চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়কে নিয়ে সমালোচনা হলেও তার চাচা কোকনদাক্ষ রায়ই ত্রিপুরা গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে।

জনসংখ্যা      

১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সরকারের অধীনে আদম শুমারি হয়। সে মতে, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান এবং রাঙামাটি মিলিয়ে মোট চাকমা আদিবাসী জনসংখ্যা ২,৩৯,৪১৭ জন। ১৯৯১ সালের পরে থেকে জাতিভিত্তিক গণনা না থাকায় চাকমাদের মোট সংখ্যা নির্ণয় করা যায়নি। বিশিষ্ট চাকমা ঐতিহাসিক সুগত চাকমার মতানুসারে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে বসবাসকারী চাকমাদের জনসংখ্যা তিন লক্ষ। তারপরেও কেউ কেউ আরো বাড়িয়ে প্রায় চার লাখ বলে দাবি করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদমশুমারি ভিত্তিক চাকমা জনসংখ্যা নিম্নরূপে তালিকায় সাজানো যেতে পারে-

আদমশুমারি

১৮৭১

১৯০১

১৯৫১

১৯৮১

১৯৯১

জনসংখ্যা

২৮০৯৭

৪৪৩৯২

১৩৩০৭৫

২৩০২৭৩

২৩৯৪১৭

এছাড়া ভারতে ত্রিপুরা ও অরুণাচলে চাকমাদের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। আরাকানে চাকমা বংশদ্ভূত দৈননাক বসবাস করে নেহায়েত কম না। অনেক লেখকই চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা এবং দৈননাককে একটি জাতির তিনটি বড় দল হিসেবে দেখতে চান। বর্তমানে সমাজ এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে তাদের স্বাতন্ত্র্য স্বীকৃত।

পরিবার ও গোত্র

চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রেও পুরুষদের প্রাধান্য থাকে। বিয়ের পরে মেয়েরা স্বামীর পরিবারের সদস্য বলে গণ্য হয়। একসময় যৌথ পরিবার দৃশ্যমান থাকলেও বর্তমানে একক পরিবার প্রাধান্য লাভ করেছে। পিতা-মাতা জীবনের শেষ দিকটা অতিবাহিত করে পুত্রের ঘরেই।      

সমাজে পিতার সূত্র ধরেই গঠিত হয় গোত্র। চাকমা ভাষায় গোষ্ঠীকে গঝা এবং গোত্রকে গুত্থি বলা হয়। কয়েকটি গুত্থি নিয়ে গঠিত হয় গঝা। গঝার সংখ্যা ত্রিশের অধিক, আর গুত্থির সংখ্যা অর্ধশত। অতীতে দলপতিদের কেন্দ্র করে গঝাগুলি গঠিত হয়েছে। পরে বসতি অঞ্চল বা নদীর নাম অনুসারে সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পায়। নিম্নে বৈশিষ্ট্য সমেত কয়েকটি গঝার নাম উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হলো-

অতীতের পদ

ধাবেং (গভর্নর)

চেগে (সেনা অফিসার)

লচ্চর (লস্কর)

স্থানের নাম

তৈন্যা (তৈনছড়ি তীরবাসী)

মুলিমা (মাতামুহুরী তীরবাসী)

ফাকসা (ফাস্যাখালী তীরবাসী)

টোটেম ধারণা

বগা (বক-গঝা)

তদেগা (টিয়া-গঝা)

কুদুগো (সজারু-গজা)

ব্যক্তিজীবন ও আচার

সাধারণত স্বামীর ঘরেই সন্তান জন্ম নেয়। তা সম্ভব না হলে নির্মাণ করে দিতে হয় পৃথক ঘর। আগে ‘ওঝারাই’ বা বিশেষ ধাত্রী থাকলেও বর্তমানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আধুনিক পদ্ধতি নেয়া হয়। সন্তান জন্মের সাথে সাথে মুখে মধু দেয়া হয় জীবন মধুময় হয়ে উঠার প্রত্যাশায়। নবজাতকের নাভী ছেড়ার এক সপ্তাহের মধ্যে আয়োজন করা হয় ‘কোজোই পানি লনা’ নামে বিশেষ অনুষ্ঠান। ওঝা ডেকে ‘ঘিলে-কোজোই-পানি’ বা বিশুদ্ধ পানি দিয়ে শিশুর চুল ধুয়ে পবিত্র করা হয়। সামান্য খানাপিনা এবং সেই সাথে নেয়া হয় ওঝাকে পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা। শিশুর মাথা মুড়িয়ে দেয়াকে তাদের ভাষায় বলে ‘বিষচুল মুরানা’।

বিয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত এক স্বামী এক স্ত্রীই দেখা যায়। অভিজাতদের মধ্যে সীমিত সংখ্যায় একাধিক স্ত্রীর পরিবার আছে। সেই সাথে আছে বিধবা বিবাহের প্রথা। মামাতো, খালাতো কিংবা অনাত্মীয় কাউকে বিয়ে করা গেলেও কাকাতো বা জেঠাতো বোনকে বিয়ে করা যায় না চাকমা বিধি মতে। বিয়ের জন্য কয়েকটি পদ্ধতি বেশ প্রচলিত। অভিভাবকদের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে আগে সুপ্রচলিত ছিল, দিনকে দিন তা হ্রাস পাচ্ছে। পাত্র এবং পাত্রীর পছন্দ আর সেই সাথে অভিভাবকদের সম্মতি নিয়ে বিয়েটা বেশ জনপ্রিয়। 

বর ও কনেকে পাশাপাশি বসিয়ে জোড়া বেঁধে দেয়া হয়; Image Source: parbattanews.com

অভিভাবকের অমত থাকলে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করাও বৈধ। সালিশে পিতা-মাতা অমত হলে মেয়েকে ফেরত পায়। তবে তৃতীয়বারের মাথায় পলায়ন করলে আর ফেরত পাওয়া যায় না। এই রীতি বর্তমানে নেই বললেই চলে। একই অবস্থা জোরপূর্বক বিয়ের জন্যও।

পাত্রের বাবাকে পাত্রীর বাবার কাছে বিয়ের আগেই অন্তত তিনবার যেতে হয় উপহার সমেত। দিন তারিখ ঠিক করতে মদ নিয়ে যাওয়াকে বলা হয় মদপিলাং। বিয়ের দিন শুভক্ষণ দেখে পাত্রপক্ষ উপহার নিয়ে হাজির হয়। কন্যাকে তুলে দেবার আগে বিশেষ আশির্বাদ দেয়া হয় চাল ও তুলা দিয়ে। বিয়ের মূল পর্বের শুরু মূলত বরের বাড়িতে। পবিত্র পানি সংগ্রহ এবং পাতা ভাসানো, বউকে বরের বাড়িতে তুলে আনা, জরাবানা বা বর ও কনেকে পাশাপাশি আসনে বসিয়ে জোড়া বেঁধে দেয়া, চুঙুলাং বা দেবদেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ এবং বিসুত ভাঙানা বা তিনদিনের মধ্যে বরকে বউসহ শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কমপক্ষে একরাত যাপন করা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ রীতি হিসেবে প্রচলিত। তবে আজকাল বিয়েতে নতুন ধারা যুক্ত হয়েছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুর দ্বারা বিয়ে, আংটি ও মালা বদলের মাধ্যমে বিয়ে আর শিক্ষিত সমাজে রেজিস্ট্রির মাধ্যমে বিয়ের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে।  

চাকমারা মৃতদেহকে দাহ করে। তবে বুধবারে মৃতদেহ দাহ করা হয় না। মৃত্যু হলে ভিক্ষুকে খবর দেয়া এবং বিশেষ আচারের মাধ্যমে শবদেহকে চিতায় নিয়ে যাওয়া হয়। দাহের সপ্তম দিনে আবার ভিক্ষু ঢেকে মৃতের সদগতি ও পরিবারের শান্তি কামনা করে ধর্মসূত্র ও দেশনা শ্রবণ করে। অনুষ্ঠানটিকে বলা হয় সাদ্দিন্যা। এছাড়া মৃত্যুবার্ষিকী হিসেবে পালিত হয় বোঝোরী।

পোষাক আর অলঙ্কারের ব্যবহারেও তাদের স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট; Image Source: steemit.com

চাকমা নারীর পোশাকের মধ্যে নিচে পরার জন্য পিনোন, বক্ষ বন্ধনীর জন্য খাদি আর সেই সাথে কাগই এবং পাগড়ি উল্লেখযোগ্য। কাপড় তৈরির জন্য বিশেষ প্রকারের তাঁত আছে; যার নাম বেইন। অলংকারের মধ্যে নাকে নাকফুল, গলায় হালছরা, বাহুতে হাসুলি, কানে ঝুমুলি, পায়ে থেংখারুর মতো সোনা, রূপা এবং হাতির দাঁতে নির্মিত রকমারি অলংকারে চাকমা নারীর সৌন্দর্য সচেতনতা প্রকাশ করে। ঘরে শোভা পায় বাঁশ এবং বেতের তৈরি আসবাবপত্র। খুব সম্ভবত চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী রান্না সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত। সিদোল, ফুজি, এবং সাবারাং চাকমা সমাজে প্রিয় মসলা হিসেবে পরিচিত।

প্রচলিত খেলার পাশাপাশি নিজস্ব কিছু ইনডোর এবং আউটডোর খেলা আছে চাকমাদের মাঝে। ঘিলা খারা, নাদেং খারা, পাঝা খারা এবং কাত্তোল খারা খেলা হিসেবে বেশ জনপ্রিয়।     

ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সংস্কার

চাকমারা মূলত বৌদ্ধধর্মের হীনযান মতবাদ অনুসরণ করে। আঘরতারা নামে প্রাচীন এক ধর্মগ্রন্থের হদিসও পাওয়া যায়, যাতে ২৮টির মতো সূত্র আছে বলে মনে করা হয়। আগে লুরি বা বৌদ্ধভিক্ষুর মাধ্যমে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন হতো। আধুনিক সময়ে তাদের প্রভাব অনেকটাই কমে এসেছে। বৌদ্ধ ধর্মের মতো তাদের ভেতরেও ধর্মীয় উৎসবাদি উদযাপিত হয়। কঠিন চীবর দান, বৈশাখী পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা, মধু পূর্ণিমা, ওয়া ধরানা, ওয়া ভাঙানা, ব্যুহ চক্র, ফানাস বাত্তি উড়ানা, গাড়ি টানা, আহজার বাত্তি জ্বালানা, এবং মহাসংঘ দানের মতো উৎসবগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবে, তাদের বিশ্বাসে নানা দেবতা এবং অপদেবতার প্রভাবও বিদ্যমান।  

চাকমারা হীনযানপন্থী; চিত্রে শ্রদ্ধেয় বন ভান্তে ও তার শিষ্যমণ্ডলি; Image Source: tourshelp.blogspot.com

প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের দিকে কোনো কোনো চাকমা পরিবারে হিন্দুদের পূজার ধারণা প্রবেশ করেছে। তাদের মধ্যে ভাতদ্যা পূজা, থানমানা পূজা, ধর্মকাম, মা লক্ষ্মীমা পূজা, শিজি পূজা প্রভৃতির প্রাধান্য একসময় ছিলো। তবে মূলধারা থেকে এদের একরকম বিলুপ্তি ঘটেছে অনেক আগেই।    

প্রতি আষাঢ় মাসের ৭ তারিখ পালিত হয় হাল-পালনি। ঐশ্বর্যের দেবী মা লক্ষ্মীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয় মুরগি এবং ডিমসহ ভাত। মদ, পাজন এবং নানা খাবারের আয়োজন থাকে বাড়িতে বাড়িতে। আবার কোনো গৃহস্থ ফসল কাটার মতো বড় কোনো কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে চাইলে অন্যান্যদের সাহায্য কামনা করে। একে বলে মালেইয়া-দাগানা বা দশের সাহায্য চাওয়া। পারস্পারিক সহযোগিতায় কাজ শেষ হলে তাদের মজুরির বদলে বড় একটা ভোজের আয়োজন করে খাইয়ে দিতে হয়। অস্বচ্ছল হলে ভোজ দেবার প্রয়োজন হয় না। সন্তান প্রসবের পর আত্মীয়-স্বজনেরা নানা কিছু রেঁধে প্রসূতিকে দিয়ে যায়। এই প্রথা ভাতমঝা দেনা নামে পরিচিত।

বিজু উৎসব পালিত হয় তিনদিন ব্যাপী; Image Source: steemit.com

সামাজিক উৎসবের মধ্যে বৃহত্তম বিজু উৎসব। পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীই বিভিন্ন নামে এই উৎসব পালন করে। বাংলা বর্ষের শেষ দুদিন এবং নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ তিন দিন জুড়ে এর বিস্তৃতি। প্রথম দিন পরিচিত ফুলবিজু নামে। তরুণ-তরুণীরা ভোরের দিকে নানা রকমের ফুল সংগ্রহ করে আনে এবং বাড়ির আঙিনা পরিস্কার করে সাজায়। বুদ্ধের উদ্দেশ্যে ফুল নিবেদন এবং সন্ধ্যায় বাতি প্রজ্বলন করা হয়। দ্বিতীয় দিন মূল বিজু- জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে দরজা। দিনব্যাপী নানা আয়োজনের সাথে থাকে ঐতিহ্যবাহী হরেক খাবারের সমাহার। পবিত্র হবার প্রতীক হিসাবে তরুণ-তরুণীরা গোসল করিয়ে দেন বৃদ্ধদের। গোজ্যাপোজ্যা নামে স্বীকৃত শেষদিন পালিত হয় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে। কিয়াঙ বা আঙিনায় আমন্ত্রণ করা হয় ভিক্ষু।

ভাষা ও লোকসংস্কৃতি

কারো কারো মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীদের ভাষাগুলোর মধ্যে কেবল চাকমা এবং তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর ইন্দো-ইরানীয় শাখার অন্তর্ভুক্ত। এজন্য বাংলা, হিন্দি, অসমীয়ার প্রভৃতি ভাষার সাথে চাকমা ভাষার মৌলিক শব্দগুলোর ধ্বনিগত, অর্থগত এবং রূপগত সাদৃশ্য বিদ্যমান। তবে, অনেকেই সিনো-তিবেতিয়ান ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত বলে চাকমা ভাষাকে সনাক্ত করেন। চাকমাদের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, তাদের ভাষায় বিদ্যমান ধ্বনিসমূহ এবং বর্ণের ব্যবহারকে তারা প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। সেই সাথে পালি, সংস্কৃত, আরাকানি, বর্মী, পাংখোয়া, পর্তুগিজসহ অন্যান্য বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ এসেছে বলে জানা যায়।

চাকমা বর্ণমালায় গড়ে উঠেছে সাহিত্যিক নানা উপাদান; image Source: calphabd.blogspot.com

চাকমা বর্ণমালায় ওঝা এবং বৈদ্যরা প্রাচীন অজস্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। ওঝাদের লিখিত বর্ণমালা অঝা-পাঠ নামে পরিচিত। এতে বর্ণ সংখ্যা ৩৩। যদিও সুগত চাকমা প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি বলে মত প্রকাশ করেছেন। চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা অনেক পুরোনো হলেও বেশিরভাগ সময় লেখা হয়েছে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করে।

প্রাচীনকাল থেকেই চাকমারা সমৃদ্ধ সংস্কৃতির অধিকারী। গত শতকের সত্তরের দশক থেকে আধুনিক চাকমা গান, কবিতা, গল্পের উল্লেখযোগ্য বিকাশ শুরু হয়। জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর, গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠী, মুড়োল্যা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী প্রভৃতি এসব ক্ষেত্রে দারুণ ভূমিকা রাখে। গান এবং সুরের ক্ষেত্রের তাদের স্বাতন্ত্র্য লক্ষণীয়। একটি প্রবাদ নিম্নরূপ- 

 চাকমা ভাষায়,

লোগ মুয়ত জয় লোগ মুয়ত খয়
ভাত ভালা চুধা খা, পথ ভালা বেঙা যা,
আমনত্তুন থেলে খা, পরত্তুন থেলে চা
লাভে লুয়া বয়, অলাভে তুলায়্য ন বুয়ায়।

বাংলায় রূপান্তর,

লোকের মুখে জয়, লোকের মুখে ক্ষয়
ভাত ভালো তরকারি ছাড়াই খাওয়া যায়; পথ ভালো বাঁকাতেও চলা যায়;
নিজের থাকলে খাও, পরের থাকলে চাও
লাভে লোহা বহন করে, বিনা লাভে তুলাও বহন করেনা।
                                        (বাংলাদেশের আদিবাসী, উৎস প্রকাশন, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা- ২৩৭)

সংগঠন ও অন্যান্য

সকল জুম্ম জনগোষ্ঠীর জন্যই সামাজিক, প্রশাসনিক এবং বিচার বিচার ব্যবস্থা রয়েছে। সার্কেলের প্রধানকে বলা হয় রাজা। প্রথমত, তিনি গ্রামের ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখেন এবং প্রথা অনুযায়ী বিচার করেন। আদিবাসীদের অধিকার ও দাবি-দাওয়া নিয়ে জেলা পরিষদে যোগ দেন। পরামর্শ দেন প্রশাসনকে।   

কৃষিভিত্তিক সমাজ হবার কারণে অর্থনীতি মূলত ভূমিনির্ভর। বহু পুরুষ ধরে বসবাস করার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিতে তাদের একটা আলাদা সম্পর্ক এবং অধিকার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের কেউ জুমচাষী, কেউ লাঙল চাষী আবার কেউ উদ্যান চাষী। তবে ইদানিং ইপিজেড এলাকায় কিংবা বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা এবং চাকরিতে তাদের প্রবেশ উল্লেখযোগ্য হারে দেখা যাচ্ছে। 

চাকমা সমাজ মূলত কৃষিনির্ভর; image Source: thefinancialexpress.com.bd

১৯১৫ সালে ‘চাকমা যুবক সমিতি’ এবং ১৯২০ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসমিতি’-এর প্রতিষ্ঠা তাদের রাজনৈতিক সচেতনতার প্রমাণ। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে কামিনী মোহন দেওয়ান এবং ১৯৬২ সালের নির্বাচনে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে নির্বাচিত হন জাতীয় পরিষদে রাজা ত্রিদিব রায় এবং প্রাদেশিক পরিষদে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও অং শৈ প্রু চৌধুরি। 

চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়কে নিয়ে সমালোচনা হয়। মনে রাখা দরকার, ত্রিদিব রায় নিজ জাতির স্বাতন্ত্র্য নষ্টের ভয়েই পাকিস্তানকে সমর্থন দেন সেই সময়। পরে বাংলাদেশের জন্ম হলে পাকিস্তানে গমন করে থিতু হন এবং ইসলামাবাদে মৃত্যুবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকার দায় গোটা গোষ্ঠীর উপর বর্তায় না। ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ এবং গাজি অজস্র চাকমা আছেন। ত্রিদিব রায়ের চাচা কোকনদাক্ষও তাদের একজন। 

স্বাধীনতার পর থেকে স্বতন্ত্র নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারণে সাংসদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। সেই আলোকে সম্মিলিত আন্দোলনে নামে ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জনগোষ্ঠী। বাস্তবিক অর্থেই এম.এন. লারমা ছিলেন জুম্ম জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার অভিভাবকের মতো।   

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এবং রাজা ত্রিদিব রায়, Image Source: 

ফুলের ভিন্নতা বাগানে বৈচিত্র্য আনে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জন্যও কথাটা সমানভাবে সত্য। তাদের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি, ইতিহাসের স্বাতন্ত্র্য এবং অধিকার অক্ষুন্ন রাখার জন্য দেশের মূলধারার সংস্কৃতিই জায়গা করে দিতে পারে। রক্ষা করতে পারে দীর্ঘদিনের জীবনাচারকে।  


২১


তাওবাদ: প্রকৃতিকে বুঝতে শেখার এক ধর্মদর্শন

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিমার্চ 23, 2020

article

“অন্যকে জানার নাম বুদ্ধি; নিজেকে জানার নাম প্রজ্ঞা
অন্যকে আয়ত্তে রাখা- শক্তি; নিজেকে আয়ত্তে রাখা- সত্যিকার ক্ষমতা।
যদি বুঝতে পারো তোমার পর্যাপ্ত আছে,
তবে তুমি যথার্থ ধনী।
কেন্দ্রকে আকড়ে ধরো,
নিজের সমস্তটা দিয়ে গ্রহণ করে নাও মৃত্যুকেই,
দেখবে তুমি অমর।” 
(তাও তে চিং, অনুচ্ছেদ- ৩৩)

আখ্যানের শুরু খ্রিষ্টের জন্মের পাঁচশত বছর আগে। প্রাচীন চীনের প্রকৃতিবাদের মধ্য থেকে উঠে আসে আনকোরা এক জীবনদর্শন- তাওবাদ। বৈশিষ্ট্যগতভাবে একে বরং ধর্ম আর দর্শনের সমন্বয় বলা যেতে পারে। প্রথম দিকে লোকজ বিশ্বাস হিসাবে থাকলেও তাং সাম্রাজ্য (৬১৮-৯০৭)-এর আমলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়। সম্রাট শুয়াংচং (৭১২-৭৫৬ খ্রি.) তো রীতিমতো এগিয়ে যান কয়েক ধাপ সামনে। রাজ্যের প্রতিটি বাড়িতে বাধ্যতামূলক করে দেন তাওবাদের গ্রন্থ রাখা। পরবর্তীতে বহু শতাব্দী ব্যাপী সেই আধিপত্য অক্ষুন্ন ছিল।

বর্তমানেও চীনে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত পাঁচটি ঐতিহ্যের মধ্যে একটি তাওবাদ। জীবনবোধটি জোর দেয় প্রকৃতির প্রবাহমানতার মাঝে নিজেকে ছেড়ে দেবার উপর। আরো সহজভাবে, মহাবিশ্ব এক অপূর্ব ভারসম্যের মধ্যে আছে। চিরন্তন শক্তি তাওয়ের মাধ্যমে চালিত হচ্ছে প্রকৃতির প্রত্যেকটি বিষয়- জন্ম-মৃত্যু, উত্থান-পতন সব। সেই চিরন্তন ভারসম্যতায় নিজেকে চালানোই তাওবাদের কেন্দ্রবিন্দু।

তাওবাদ একটি দর্শন; মহাবিশ্বের ভারসম্যের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নেবার; Image Source: arthistoryproject.com

একজন বৃদ্ধ-শিশু

তাওবাদের প্রবক্তা হিসেবে লাওজুর নাম আসে সবার আগে। তিনি ছিলেন সমসমায়িক চু প্রদেশের রাজকীয় লাইব্রেরির তত্ত্বাবধায়ক এবং প্রকৃতিবাদী দার্শনিক। জীবনাচারের কারণে খ্যাতি ছিলে ‘বৃদ্ধ-শিশু’ বলে। বিশ্বাস করতেন, মহাজগতের প্রতিটি বস্তুই ভারসম্যমূলক নিয়মে আবর্তিত হচ্ছে। মানুষকে একবারের জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থ ও লালসার ঊর্ধ্বে উঠে আসতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে সামষ্টিক মঙ্গলকে। তবেই সামাজিক সুখ সম্ভব। বস্তুত মানুষ আর রাষ্ট্রের প্রতিনিয়ত দুর্নীতি ডেকে এনেছিল ক্রমবর্ধমান দুর্ভোগ আর দুর্দশা। লাওজু তা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ঐতিহাসিক সিমা চিয়ান (১৪৫- ৮৬ খ্রি.পূ.)-এর একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। 

দেশ ত্যাগের উদ্দেশ্যে ষাঁড়ের পিঠে লাওজু রওনা হন সীমান্তের দিকে; © Lao tzu in Painting by Zhang lu

“মানুষের আচরণ পরিবর্তনের চেষ্টায় ব্যর্থতা লাওজুকে হতাশ করে দেয়। নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নেন নির্বাসনে যাবার। পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে চীন ত্যাগ করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সীমান্তরক্ষীদের প্রধান ইন সি তার পথ আটকে দাঁড়ায়। ইন সি চিনতে পেরেছিল দার্শনিককে। দাবি করলো চিরতরে জনপদ ত্যাগ করার আগে সাধু যেন কিছু উপদেশ দেন। তার জন্য সঠিক জীবন যাপনের পাথেয় হিসেবে। অনেক ভেবে রাজি হলেন লাওজু। সীমান্তরক্ষীর পাশে একটা পাথরের উপর বসলেন। লিখে ফেললেন তাওবাদের মহাগ্রন্থ তাও তে চিং। শেষ হলে ইন সির হাতে তুলে দেন গ্রন্থটি। তারপর পশ্চিমের কুয়াশায় চিরতরে হারিয়ে যান লাওজু। ইন সিই পরে তা অনুলিপি ও প্রচারে ভূমিকা রাখে।”

ইতিবৃত্ত এক নজরে

খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ ও তৃতীয় শতাব্দী। শতধা বিভক্ত রাষ্ট্রগুলো একটা আরেকটার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত। জীবনদর্শন প্রতিষ্ঠিত ছিল প্রকৃতিবাদের উপর। সেই দৃষ্টিকোণে পৃথিবী সৃষ্টির মূল উপাদান পাঁচটি- আগুন, মাটি, পানি, কাঠ এবং ধাতু। এদের একত্রে বলা হতো উ-শিং বা পাঁচ মহামূল। জগৎ পরিচালনার জন্য ইন-ইয়াং এবং চি তো আছেই। মতবাদগুলো সামগ্রিকভাবে তাও ধর্মের ভিত্তি প্রস্তুতিতে কাজ করেছে। রবিনেট অবশ্য চারটি উপাদানকে শনাক্ত করেছেন।

 ১) তাও তে চিং এবং চুয়াং জি- এর মতো দার্শনিক লেখা
২) জীবনে প্রকৃত সুখ লাভের তরিকা
৩) অমরত্বের প্রচেষ্টা
৪) নিগূঢ়বাদ ও তন্ত্রচর্চা  
(Taoism: Growth of a religion, Page-25)

পূর্ব উপকূল থেকেই চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসের সূচনা। খণ্ড খণ্ড রাজ্য একত্রিত হবার সাথে সাথে ঘটতে থাকে সাংস্কৃতিক বিস্তার। খ্রিষ্টের জন্মের পরবর্তী দ্বিতীয় শতাব্দীর দিকে সাংগঠনিক রূপ লাভ করতে থাকে। প্রথম দিকের অন্যতম এক উপদল থিয়ানশি। সেখানকার গুরু চাং তাওলিং দাবি করেন, তার কাছে লাওজু আবির্ভূত হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে থিয়ানশি উপদলটি ২১৫ সালে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে রাজা চাও চাও-এর অধীনে। লাওজুকে দেয়া হয় স্বর্গীয় পুরুষের মর্যাদা। 

হান রাজবংশের সময়ে বিভিন্ন লেখা নিয়ে সাংগঠনিক রূপ দেয়া হয়; Image Source: timetoast.com

হান রাজবংশের সময়ে (২০৬-২২০ সাল) বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত লেখা সংগৃহীত হয়। ভারসম্যপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের রূপ লাভ করে তাওবাদ। অবশ্য আচার পালনের কেন্দ্র ছিল শু (বর্তমান সিচুয়ান) প্রদেশ। প্রথম দিকে সন্ন্যাস জীবনকেই বেছে নিয়েছিল সবাই। রাজনৈতিক বিষয়াদিতে আগ্রহ দেখা যায়নি খুব একটা। গুরু চুয়াংজির জীবনই তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। লাওজু এবং চুয়াংজির পরে পরিণত হতে থাকে মতবাদটি। আর আইনগুলোকেও তাওচাং বা বিধিবদ্ধ ধর্মীয় আইন আকারে প্রকাশ করা হয়। অস্তিত্ব নিয়ে চুয়াংজির একটা কথা খুব জনপ্রিয়। 

“একবার স্বপ্নে দেখলাম আমি প্রজাপতি। উড়াউড়ি করছি এখান থেকে ওখানে। সমস্ত সচেতনতা জুড়ে কেবল প্রজাপতি হিসাসেবেই উৎফুল্লতা। প্রকৃত প্রজাপতি। জানি না, আমি চুয়াংজি। হঠাৎ জেগে উঠলাম। যথার্থভাবে ‘আমি’-তে। এখন সত্যিই জানি না কোনটা সত্য। আমি কি তখনকার মানুষটাই যে প্রজাপতিকে স্বপ্নে দেখছে? নাকি আমি এখনকার প্রজাপতিটা যে স্বপ্ন দেখছে, সে মানুষ? মানুষ আর প্রজাপতিতে একটা অত্যাবশ্যকীয় ফারাক আছে। একেই বলে রূপান্তর।”    

সতেরো শতকের আগে অব্দি বেশ কয়েক দফায় তাওবাদ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। জনৈক ইয়াং শির কাছে স্বর্গীয় খবর আসে ৩৬৪ থেকে ৩৭০ সালের মধ্যে। দানা বাঁধতে থাকে শাংচিং আন্দোলন। তাওবাদের একটি উপদল হিসেবে তাদের অগ্রগতি ছিল ঈর্ষনীয়। শাংচিং-রা রাজনৈতিক সমাদর পায় তাং সাম্রাজ্যের সময়েই (৬১৮-৯০৮ সাল)। সম্রাটদের দাবি ছিল মহামতি লাওজু তাদের পূর্বপুরুষ। চতুর্থ শতকের শেষ এবং পঞ্চম শতকের গোড়ার দিকে কো চাও ফুর মাধ্যমে তাওবাদের অন্য আরেকটি উপদল লিংপাও-এর ভিত্তি স্থাপিত হয়। ৯৬০ থেকে ১২৭৯ সাল অব্দি বিস্তৃত ছং সাম্রাজ্যের আমলে তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। বেশ কয়েকজন সম্রাট সক্রিয়ভাবে মতবাদের প্রচার প্রচারণায় কাজ করেছেন।

লাওজুর পর চুয়াংজিই সবথেকে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছে; Image Source: m.yac8.com

সময়ের সাথে দুইটি মূল ধারায় বিভাজিত হয়ে পড়ে- চুয়ানচেন তাওবাদ এবং চেংয়ি তাওবাদ। দ্বাদশ শতাব্দীতে চুয়াংচেন উপদল স্থাপিত হয়। পরবর্তী দুই শতকব্যাপী এর বিস্তার ঘটে। উত্তর চীনের ইউয়ান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ বলে স্বীকৃত হয় ‍চুয়ানচেন। দিগ্বিজয়ী চেঙ্গিস খান অব্দি এই মত ও তার সাধুর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। মুক্ত করেছিলেন করভার থেকে। অবশ্য ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকের দিকে বৌদ্ধধর্ম এবং কনফুশীয় মতবাদের জয়যাত্রায় তাওবাদের জোর কমে আসে। বিশ শতক অব্দি পোহাতে হয় হরেক কিসিমের ঝড় ঝাপটা। বর্তমানে চীনের পাঁচটি স্বীকৃত ধর্মের একটি তাওবাদ।

বিশ্বাস নির্দেশিকা

তাওবাদের পেছনে ইন-ইয়াং ধারণার প্রভাব বেশ শক্তিশালী। প্রভাব বলা হচ্ছে কারণ, ইন-ইয়াং-এর ইতিহাস আরো অনেক বেশি পুরাতন। চীনা পুরাণে এর জন্ম মহাবিশ্বের উৎপত্তিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। ইন এবং ইয়াং দুই আদিম বিপরীত শক্তি। দুইয়ের মধ্যকার সম্পর্কের ভিত্তিতেই বিশ্বজগতের সৃষ্টি ও প্রবাহ। অবশ্য তাদের সাথে অন্য একটি নিয়ামক জীবনীশক্তি ‘চি’ আছে। জগৎ চিরন্তন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধাবিত। আজ যা আছে; কাল তা ‘নাই’ তে পরিণত হচ্ছে। প্রকৃতির সব কিছুতে তাই ‘চি’-এর মধ্য দিয়ে ইন আর ইয়াং এর চিরন্তন খেলা। খ্রিষ্টিয় ট্রিনিটির বাইরে যেন অন্য এক ট্রিনিটি। ইন-ইয়াং প্রতীকের মধ্য দিয়েই জীবনের ভারসম্যতা প্রকাশ পায়। নারী-পুরুষ, আলো-অন্ধকার, সক্রিয়তা-নিষ্ক্রিয়তা সবকিছুতেই চি, ইন এবং ইয়াং।

একইভাবে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তিনজন উপাস্যের ধারণা দেখা যায় তাওবাদের মধ্যে। ইউচিং বা সর্বশ্রদ্ধেয় আদিস্রষ্টা, শাংচিং বা সর্বশ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় বাহক এবং থাইচিং বা সর্বশ্রদ্ধেয় প্রাজ্ঞপুরুষ। প্রথম জন সকল সৃষ্টির কেন্দ্র। সৃষ্টিজগতের সূচনা ঘটে তার হাতে। সেই সাথে পবিত্র গ্রন্থসমূহের আদিলেখক। শাংচিং-এর অবস্থান দূতের মতো। তিনি স্বর্গীয় বার্তা নিয়ে উপদেবতা কিংবা মানুষের কাছে আগমন করেন। প্রায়শ হাতে মাশরুম আকৃতির রাজদণ্ড দেখা যায়। তৃতীয় জন থাইচিং মানুষের মাঝে আসা সক্রিয় এবং পূর্ণ অবতার। হাতে থাকে পাখা। অবতারের আবার অনেক ধরণ হতে পারে; তাদের মধ্যে একজন গুরু লাওজু। তিনজন উপাস্য তিনটি শক্তিকে প্রতীকায়িত করে। যথাক্রমে সৃজনীশক্তি, জীবনীশক্তি এবং আধ্যাত্মিক শক্তি।  

তাওবাদের কেন্দ্রে তিন উপাস্য- ইউচিং, শাংচিং এবং থাইচিং;  Image source: sites.psu.edu

তাওবাদ অনুসারে, মানুষ প্রকৃতপক্ষেই ভেতর থেকে ভালো। শুধু সেই ভালোত্বকে জাগিয়ে তুলতে হয় মন্দত্বকে ছাপিয়ে। সঠিক নির্দেশনা এবং শিক্ষা প্রদান করা হলে যে কাউকে মহৎ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। সম্ভব মহাবিশ্বের চিরায়ত সঙ্গীতের সাথে তাল মেলাতে সক্ষম করে তোলা। পুরো বিষয়টা পশ্চিমা দার্শনিক এপিকটেটাস এবং মার্কাস অরেলাসের লগোস তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। লগোস মন্দ হতে পারে না। পরিস্থিতি অনুধাবনে মানুষের অক্ষমতাই তাকে মন্দ বলে প্রতিপন্ন করে। শুদ্ধ জীবন যাপনের মানে মেনে নিতে পারার মানসিকতা। যেকোনো পরিস্থিতি এবং পরিবর্তনকে সহজভাবে গ্রহণ করা। গুরু চুয়াংজি মতে- 

“জুতা জুতসই হলে পায়ের উপস্থিতিই টের পাওয়া যায় না। বেল্ট জুতসই হলে বুঝাই যায় না- কোমর আছে কি না। হৃদয় তার জুতসই অবস্থায় থাকলে ‘কার জন্য’ কিংবা ‘কার বিরুদ্ধে’- এসব মনে থাকে না। তাড়া নেই তো জবরদস্তি নেই। প্রয়োজন নেই তো আসক্তিও নেই। তাহলেই তুমি সজ্ঞানে আছো। তখনই তুমি সত্যিকারে মুক্ত।”

দুঃখের অন্যতম উৎস জগতের পরিবর্তনশীলতাকে গ্রহণ করতে না পারা। তাওবাদের পথ আত্মসমর্পনের পথ। মহাজাগতিক ইচ্ছার কাছে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে সমর্পন করার রাস্তা। বিশ্বজগতের বিরাজমান ভারসম্যের মাঝে নিজের ইচ্ছাকে আরোপ করতে গেলে নষ্ট করার চেষ্টাই হয় শুধু। সমস্ত কিছু ঘটে তাও কে অনুসরণ করে। তাও যেহেতু স্বাভাবিক; সবকিছুই স্বাভাবিক।

“সফলতা বিপজ্জনক ব্যর্থতার মতোই,
আর প্রত্যাশা ভীতির মতোই ফাঁপা।
সফলতা আর ব্যর্থতাকে সমান বিপজ্জনক বলার কারণ কি জানো?
মইয়ের উপরের ধাপেই যাও কিংবা নিচের ধাপে-
তোমার অবস্থান নড়বড়ে।
দুই পা মাটিতে রাখলেই কেবল রাখতে পারবে ভারসম্য;
মহাবিশ্বকে নিজের মতো করে দেখো
বিশ্বাস রাখো যা যেভাবে আছে;
ভালোবাসো পৃথিবীকে, যেমনটা নিজেকে বাসো
তবেই পারবে সব কিছুর যত্ন নিতে।”

সত্যিকার সাধু কোন কিছু না করেই সবকিছু করেন। একে বলা হয় উ-ওয়েই বা কিছু না করে করা। এভাবে চেষ্টা চলে সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থায় ফেরার। সেখানে চাপিয়ে দেয়া কোন প্রকার কৃত্রিমতা নেই; আছে শুধু সম্ভাবনা। তাওবাদে তা পরিচিত চি-রেন বা চু-চান নামে। মানুষ মহাবিশ্বেরই ছোট্ট প্রতিরূপ; অথবা মহাবিশ্ব নিজেই এক বৃহৎ শরীর। জগতকে বুঝার এই পদ্ধতির কারণেই তাও দর্শন চীনে প্রভাবশালী বলয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল।

আচার ও উৎসব

ধর্মীয় আচারগুলো প্রকৃতিকে অনুধাবনের উপর প্রোথিত। দৃশ্যমান জগৎ এবং বিভিন্ন প্রতীকের ভাষাকে পাঠ করার প্রচেষ্টার উপর। তথাপি বৌদ্ধ এবং কনফুশীয় আচার-রীতির প্রভাব রয়েছে বেশ বড় অংশ জুড়ে। প্রতিটি উৎসব এবং মন্ত্র সংক্ষেপে সতর্কতার সাথে পালন করতে হয়। উৎসব পালিত হয় গ্র্যান্ড মাস্টারের তত্ত্বাবধানে। যেকোনো স্থানে যেকোনো সময়ে কয়েকদিন কিংবা সপ্তাহব্যাপী। আচারগুলো পূর্বপুরুষের গ্রাম, শহর, সংঘকে সম্মান জানাতে তৎপর। গ্র্যান্ড মাস্টার আগুনে সুগন্ধি পোড়ানোর সময় আহবান করেন প্রাচীন সফল আধ্যাত্মিক সত্ত্বাকে। প্রতিটি পদক্ষেপের পূর্ব শর্ত পবিত্রতা। প্রাত্যহিক জীবনের আটপৌড়ে স্থানগুলো দেবতা আর আত্মার সমাবেশে পূন্যভূমিতে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে।

শুধু বিশ্বাস না; আচারেও ফুটে উঠেছে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য; Image Source: daoistmusichk.org 

পবিত্র ট্রিনিটির অবতার রূপে আগমন করেছিলেন লাওজু। উপাসনা করা হয় তারও। বিভিন্ন শাখা আবার বিভিন্ন ছোট দেবতাকে গ্রহণ করেছে উপাস্য হিসেবে। দেবতারা সব বিশ্বজগতের বিভিন্ন নিয়ামকের সাথে জড়িত বলে গণ্য। আগে প্রাণী কিংবা ফল উৎসর্গ করার রীতি প্রচলিত ছিল। গুরু চাং তাওলিং উৎসর্গের রীতিকে কেবল প্রত্যাখ্যান করেই থেমে থাকেননি। উৎসর্গপন্থী গুরু এবং মন্দিরগুলোর বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপও নিয়েছিলেন। বর্তমানে মন্দিরগুলো কোনো ধরনের পশুবলি বা প্রাণীহত্যা থেকে মুক্ত। তবে চিং জি বা জস পেপার ‍পুড়ানোটা এক ধরণের উৎসর্গের রূপ নিয়েছে।

বিশেষ বন্ধের দিনগুলোতে র‌্যালি বের হয় রাস্তায়। বাজি, ফুল এবং ঐতিহ্যবাহী সংগীতের মধ্য দিয়ে কাটে গোটা দিন। সিংহ নাচ, ড্রাগন নাচ, কুংফু প্রভৃতির ভেতর দিয়ে মিলে আদিম আর বর্তমান আত্মা। ই-চিং কিংবা অন্যান্য মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণী নিয়েও কাটে সময়।

পবিত্র গ্রন্থাবলি

তাও তে চিং তাওবাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থ হিসাবে স্বীকৃত। আপাতভাবে ধর্মগ্রন্থ না; বরং একগুচ্ছ দার্শনিক কবিতার মাধ্যমে জীবন যাপনের নির্দেশিকা। তাও তে চিং শব্দের অর্থ গুণ এবং পথের পুস্তক। ব্যক্তি, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তিতে থাকার সহজ ইঙ্গিত। লেখক হিসেবে লাওজুর নাম প্রতিষ্ঠিত। আপাত বিরোধীভাবে উদ্ধৃত হলেও গেঁথে রাখা ভিন্ন এক বোধ। বইটির শুরুর লাইনদ্বয় দারুণ জনপ্রিয়।

“তাও ক তাও ফেই ছাং তাও, মিং ক মিং ফেই ছাং মিং”
অর্থাৎ যে তাওকে মুখে প্রকাশ করা যায়; তা চিরন্তন তাও না। আর যে নামকে নামে আবদ্ধ করা যায়; তা চিরন্তন নাম না।

গ্রন্থের মূল উপজীব্য প্রকৃতির প্রবাহমানতায় নিজেকে ছেড়ে দিতে শেখা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাষায় গ্রন্থটিকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিভিন্ন উৎস থেকে লেখা নিয়ে তাওবাদের অপর একটি গ্রন্থ চুয়াং জি; প্রণেতার নামও চুয়াং জি। প্রথম সাত অধ্যায় তিনি নিজেই লিখেছেন। পরবর্তী অধ্যায়গুলো ছাত্র ও সমমনাদের অবদান। এখানেও মূল আলোচনা ব্যক্তিকে প্রাকৃতিক নিয়ম ও আইনের সাথে ভারসম্যপূর্ণ হিসাবে প্রস্তুতকরণ।

তাও তে চিং এবং চুয়াং জু ছাড়াও আরো কিছু গ্রন্থকে স্বীকৃতি দেয়া হয়; Image Source: amazon.in

খ্রিষ্টপূর্ব ১১৫০ অব্দের দিকে রচিত ই-চিং। যদিও তাওবাদ জন্মের বহু আগে; তথাপি গ্রন্থটিকে গ্রহণ করা হয়েছে বিশেষ মর্যাদায়। ইন-ইয়াং তত্ত্ব এবং সৃষ্টি সম্পর্কিত বিশ্বাসের একটা বড় অংশ এসেছে এখান থেকে। তাওচাং নামে আরো একটা বই গড়ে উঠেছে চিন, তাং এবং সাং রাজবংশের সময়কালে। বৌদ্ধধর্মের ত্রিপিটককে অনুসরণ করে তিনভাগে বিভাজিত তা। প্রথমত চেন বা সত্য, দ্বিতীয়ত শুয়ান বা রহস্য এবং তৃতীয়ত শেন বা স্বর্গীয়। এছাড়া অন্যান্য কিছু উপদেশ এবং নীতিকথা সম্বলিত লেখাও পাওয়া যায় তাওবাদ চর্চার ক্ষেত্রে।

শেষের আগে

তাওবাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় ইন-ইয়াং। জড়াজড়ি করে থাকা দুই বিপরীত শক্তি। চীন এবং তাইওয়ানে মন্দিরগুলোর ছাদে চীনামাটি নির্মিত বিভিন্ন রঙের ড্রাগন এবং ফিনিক্স রাখা হয়। তারাও ইন এবং ইয়াংকেই প্রতীকায়িত করে। ২০১০ সালের শুমারি অনুযায়ী চীনের মোট জনসংখ্যার ১৩% নিজেদের তাওবাদী বলে দাবি করেছিল। এশিয়ার বাইরে সুদূর ব্রাজিলেও তাওবাদের শিকড় ছড়িয়েছে। তার প্রমাণ সাও পাওলো এবং রিও ডি জেনিরোতে গড়ে উঠা তাও মন্দির। তাও সাহিত্য এবং চিত্রকলা যে নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে তা আধুনিক কাল অব্দি পরিব্যপ্ত। 

বিভিন্ন প্রতীককে স্থাপত্যের নান্দনিকতায় মেলে ধরা হয় তাও মন্দিরে; Image Source: kfntravelguide.com

কনফুশীয় মতবাদের আচার সর্বস্বতা এবং কড়াকড়িকে শুরু থেকেই বিরোধিতা করে তাওবাদ। তার স্থানে স্থাপন করে স্বাভাবিকতা ও স্বতস্ফুর্ততা। শুধু চীন না; প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কোরিয়া, জাপান কিংবা ভিয়েতনামের সংস্কৃতিতেও তাওবাদের প্রভাব লক্ষণীয়। চীনে বৌদ্ধধর্মের বিকাশের পথ তৈরি করেছে তাওবাদ। গ্রহণ যে করেনি; তা কিন্তু না। সন্ন্যাস, নিরামিষভোজ কিংবা মদবর্জনের মতো নিয়মগুলো বৌদ্ধধর্মের হাত ধরেই তাওবাদে ঢুকেছে।


২২


স্বর্ণযুগে মুসলমানদের সঙ্গীতচর্চা

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিজুন 26, 2020

article

সঙ্গীতের প্রসঙ্গ আসলেই মুসলিম মানসে একপ্রকার টানাপোড়েন তৈরি হয়। কোরআনে সরাসরি আয়াত না থাকার দরুণ পূর্বেকার আলেমদের মতও বিভাজিত। ইমাম গাজ্জালির মতো কয়েকজন অবশ্য সঙ্গীতের পক্ষে মত দিয়েছেন। বিপক্ষে অবস্থানকারীদের দলও কম ভারি না । তবে দিনশেষে তাদের বিচারে বৈধতা বা অবৈধতা নির্ধারিত হয়েছে গানের বিষয়বস্তুর উপর। যে বিতর্ক এখন অব্দি বিস্তৃত। আর সেই বিতর্কে চাপা পড়ে গেছে মুসলিম স্বর্ণযুগে সংগীতশাস্ত্রের যুগান্তকারী অধ্যায়ের ইতিহাস। সঙ্গীতের সকল দিকে আরবদের চর্চার কাছে এককভাবে অন্যান্য দেশের ইতিহাস সামান্য বলেই মনে হয়।

যুদ্ধাভিযানেও ব্যবহৃত হতো বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্র; Art: Yahya ibn Mahmud al-Wasiti

ইসলামপূর্ব আরবের আল হিরা এবং গাসসান রাজ্য দুটি প্রভাবিত ছিল যথাক্রমে পারস্য এবং বাইজ্যান্টাইন রীতি দ্বারা। সেখানে গ্রীক আর সিরিয় উপাদানের সাথে পিথাগোরিয়ান স্বরগ্রাম মিলে তৈরি করেছিল স্বতন্ত্র অভিযাত্রা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে অন্যতম রাজনৈতিক কেন্দ্র হেজাজে প্রচলিত ছিলে পরিমাপমূলক সঙ্গীত রীতি; যা ইকা নামে পরিচিত। সঙ্গীতজ্ঞ ইবনে মিসজাহ (মৃত্যু আনুমানিক ৭০৫-১৪) প্রবর্তন করেন নিজস্ব মতবাদ। ১২৫৮ সালে বাগদাদের পতন অব্দি এই ধারা অব্যাহত থাকে। ইতোমধ্যে ইসহাক আল মাউসিলি সাবেক স্বরগ্রামে সংস্কার আনেন। যালযালিয়ান এবং খরাসানিয়ানের মতো কয়েকটি ধারা দেখা যায়। সেই সাথে এরিস্টটল, ইউক্লিড, নিকোমেকাস এবং টলেমির লেখা অনুবাদের মধ্য দিয়ে প্রাচীন মতবাদের সাথে যোগাযোগ ঘটে। ধীরে ধীরে তা এমন অবস্থায় উত্তীর্ণ হয় যে; পরবর্তীতে সংস্কৃতিতেও রেখে গেছে ছাপ।

সঙ্গীত চর্চা

সঙ্গীত নিয়ে আরবদের আগ্রহের ধারণা পাওয়া যায় সহস্র এক আরব্য রজনী (আলিফ লায়লা)-তে। ইবনে আবদ রাব্বিহির ‘`ইউনিক নেকলেস’, আবুল ফারাজ আল ইসফাহানির ‘কিতাবুল আগানি’ এবং আল নুওয়াইবির ‘The extreme need’ গ্রন্থগুলো আরব সংগীতের স্পষ্ট ধারণা দেয়। আরব জীবনের সুখ, দুঃখ, কর্মমুখরতা, যুদ্ধ কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও গানের ছিল নিজস্ব স্থান। স্বচ্ছল আরবদের ঘরে নিজস্ব গায়িকার নজির বিরল না। অবশ্য তাদের কাছে যন্ত্রসঙ্গীতের চেয়ে কণ্ঠ সঙ্গীত সমাদৃত ছিল বেশি। গীতি কবিতা বা কাসিদা ছাড়াও কণ্ঠসঙ্গীতের পদ্যরীতির মধ্যে কিত’সা বা খণ্ড কবিতা, গজল বা প্রেমের গান এবং মাওয়াল বিশেষভাবে সমাদৃত। শিল্পী মাত্রই অকটেভের সাথে পরিচিতি থাকা আবশ্যক। আবর যুগপৎভাবে ধ্বনিত হতো চতুর্থ, পঞ্চম এবং অষ্টম মেলোডির সুর; যার আরবি নাম তারকিব।

রাজদরবার এবং অভিজাতদের বাসায় থাকতো সঙ্গীতশিল্পী; Image source: 8tracks.com

খলিফার দরবারে গায়কেরা পৃষ্ঠপোষকতা পেতেন। কেবল শিল্পী হিসাবে না; রাজনৈতিক ব্যবহারের উদ্দেশ্যেও। পেশার সূত্রে শিল্পী বিভিন্ন পরিবারে অবাধে গমণ করতে পারতেন। স্পাই হিসাবে অভ্যন্তরীণ কথা বের করে আনার জন্য এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কী হতে পারে!  

বাদ্যযন্ত্র বৃত্তান্ত

সামরিক মহড়া এবং মিছিলে উচ্চস্বরের যন্ত্রের ব্যবহার ছিল বেশি। রীডপাইপ (সারনাই), শিঙ্গা (বাক), রণভেরি (নাফির), দামামা (নাকারা) তাদের মধ্যে প্রধান। সামরিক কৌশলের বিশেষ দিক হিসেবে জায়গা করে নেয় এই বাদ্যযন্ত্রগুলো। সামরিক কর্মকর্তার পদের অনুপাতে তার সাথে বাদকদল এবং নাউবায় নিনাদের সংখ্যা নির্ধারিত ছিল। বস্তুত সমরকন্দ থেকে আটলান্টিক অব্দি সঙ্গীতের পরিভাষা প্রাচ্য সঙ্গীত চর্চায় আরবদের প্রত্যক্ষ অবদানেরই প্রমাণ বহন করে।

সঙ্গীতের এক নয়া স্রোত তৈরি হয় আরবদের হাতে; Image Source: muslimheritage.com

আরব বাদ্যযন্ত্র বেশুমার। প্রাক ইসলামি যুগে মিযহার ছিল চামড়ার পেটওয়ালা বীণা। ক্লাসিক্যাল বীণা বা উদ কাদিম ছিল অনেকটা বর্তমান ম্যান্ডেলিনের মতো। মুরাব্বা ছিল চ্যাপ্টা আয়াতাকার গিটার। পরবর্তীকালে এটাই কিতারা নামে পরিচিত হয়। সেই সাথে সমাদৃত ছিল তানবুর (প্যান্ডোর), কানুন (সল্টারি) কিংবা কাদিব (ওয়াল্ড)। সঙ্গীতের সূচনা, বিরতি কিংবা সমাপ্তি অংশে ব্যবহৃত হয়েছে নাউবার মতো ছোট ছোট যন্ত্র।

কাঠের বায়ু চালিত বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ছিল বিভিন্ন আকারের বাঁশি। তিন ফুট লম্বা নাইবাম থেকে এক ফুট লম্বা শাব্বাবা এবং জুয়াক। তাম্বুরা জাতীয় বাদ্যযন্ত্রকে বলা হতো দফ; দেখতে বর্গাকার। থালা আকৃতির চেপ্টা ছোট করতাল পরিচিত সিনজ্ নামে। ধীরে ধীরে বায়ু এবং পানি চালিত অর্গ্যান প্রচলিত হয়। তাদের মধ্যে দুলাব পরবর্তীকালে ইউরোপে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। আরবি সঙ্গীত যন্ত্রের উদ্ভাবনে কয়েকটা নাম সবার আগে সামনে আসে। তাদের মধ্যে আল ফারাবি রাবাব ও কানোনের জন্য, আল যুনাম বায়ুচালিত বাদ্যযন্ত্র যুনামির জন্য এবং যালযাল (মৃত্যু- ৭৯১) উদ আল শাব্বুতের জন্য। আল বাইয়াসি এবং আবুল মজিদ- দুজনেই ছিলেন অর্গান নির্মাতা।

আল উদ, রিবাব এবং কিতারাই বর্তমানে যথাক্রমে লিউট, রেবাক এবং গিটার; Image Source: wikimedia common

উল্লেখযোগ্য রচনাবলী

আরবি সাহিত্যের একটা বড় অংশ দখল করে আছে সঙ্গীত বিষয়ক রচনাবলী। গানের ইতিহাস, সংগ্রহ, বাদ্যযন্ত্র, গানের বৈধ দিক, নান্দনিকতা এবং সঙ্গীতজ্ঞদের জীবনী এসব রচনার অন্তর্ভুক্ত। আল মাসউদীর লেখা ‘মুরুজুজ জাহাব ওয়া মায়দানুল জাওয়াহির’ গ্রন্থে প্রাথমিক যুগে আরব সঙ্গীত চর্চার চমকপ্রদ সব তথ্যাবলি সন্নিবেশিত। অন্যদিকে একুশ খণ্ডে রচিত ইসফাহানীর গ্রন্থ ‘কিতাবুল আগানি’ অনেকটা বিশ্বকোষের কাজ করেছে। ইবনে খালদুন এই গ্রন্থকে আরবদের দিওয়ান বলে আখ্যা দেন। সঙ্গীত সম্পর্কে তার আরো চারটি গ্রন্থের হদিস পাওয়া ‍যায়। মুহম্মদ ইবনে ইসহাক আল ওয়াররাক (মৃত্যু.৯৯৫)-এর দ্য ইনডেক্স গ্রন্থটি সঙ্গীত তত্ত্ব, বিভিন্ন লেখকের নাম এবং সাধারণ রচনাবলীর নির্দেশিকা হিসেবে রচিত।

আবুল ফারাজ ইস্পাহানির কিতাবুল আগানি মূলত গান ও কবিতার সংকলন; Image Source: library.yale.edu

পশ্চিমের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইবনে আবদ রাব্বিহি (মৃত্যু-৯৪০) ‘দ্য ইউনিক নেকলেস’ গ্রন্থে সঙ্গীতজ্ঞদের জীবনী এবং সঙ্গীতের প্রতি সমর্থন উঠে এসেছে। ইয়াহইয়া আল খুন্দুজ আল মুরসি তার পূর্ববর্তী লেখক ইসফাহানির অনুকরণে লেখেন কিতাবুল আগানি। বাগদাদের পতনের পর সঙ্গীত বিষয়ক বিশিষ্ট লেখকদের প্রায় বিলুপ্তি ঘটে। তাদের স্থলে আবির্ভাব ঘটে ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞের। তারা গানের পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি চালাচালি করেন। পরবর্তীতে সঙ্গীতের উপরে উল্লেখ যোগ্য রচনা ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমা’ এবং আল ইবশিহিরের ‘মুসতারাফ’। ইয়েল ইউনিভার্সিটির সংগ্রহশালায় আরব সঙ্গীতের পাণ্ডুলিপি দেখতে একবার ঢুঁ মারতে পারেন।

সঙ্গীত তত্ত্ববিদ

সঙ্গীত তত্ত্বের প্রথম যে লেখক সম্পর্কে আমরা সুনির্দিষ্ট ধারণা পাই; তার নাম ইউনুস আল কাতিব (মৃ. ৭৬৫)। ঠিক তার পরেই আছেন আরবি ছন্দশাস্ত্রের সুবিন্যাসকারী ও প্রথম শব্দকোষ সঙ্কলক আল খলিল (মৃ.৭৯১)। ইবনে ফিরনাস স্পেনে যে মতবাদের প্রবর্তন করেছেন; খুব সম্ভবত তা আল খলিলের। ইবনে ফিরনাসই আন্দালুসিয়াতে সর্বপ্রথম সঙ্গীতবিজ্ঞান শিক্ষা দেন। অবশ্য তিনি অধিক সমাদৃত হয়েছেন আকাশে উড়ার প্রচেষ্টার কারণে। প্রাচীন আরব পদ্ধতিকে পুনর্বিন্যাস করেন ইসহাক ইবনে মাউসিলি। ‘বুক অব রিদমস্’ নামক গ্রন্থে উঠে আসে তার মতবাদ।

অষ্টম থেকে দশম শতকে সঙ্গীত ও স্বরবিজ্ঞানের উপর লেখা বহু গ্রীক রচনা অনূদিত হয় আরবিতে। পিথাগোরাসের মতবাদ আরবি ভাষায় পাওয়া যায়। প্লেটোর টিমিয়াস অনূদিত হয় ইউহান্না ইবনে বাডরিক (মৃ.৮১৫) এর হাতে। এরিস্টটলের ‘ডি অ্যানিমা’, গ্যালেনের ‘ডি ভসে’ এবং সিমপ্লিসিয়াসের রচনা অনুবাদ করেন হুনাইন ইবনে ইসহাক। এসব থেকে আরবদের মধ্যে বিকাশ লাভ করে স্বরবিজ্ঞানের ধ্যানধারণা। এরিস্টোজেনাস আরবদের কাছে পরিচিত ছিলেন তার ‘দি প্রিন্সিপল অব হারমোনি’ এবং ‘অন রিদম’ নামক দুটি গ্রন্থের কারণে। সঙ্গীত রচনাতে ইউক্লিডের রচনা হিসেবে ছিল ‘দি ইন্ট্রোডাকশান টু হারমোনি’। ‘গ্র্যান্ড বুক অন মিউজিক’ নামক বৃহদাকার গ্রন্থ আরবিতে প্রচলিত ছিল নিকোমেকাসের নামে; যার অনুবাদকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাবিত ইবনে কাররা (মৃ.৯০১)।

আরব পথিকৃৎদের মধ্যে অন্যতম নাম আল কিন্দী। সঙ্গীত তত্ত্বের উপর তার রচনার সংখ্যা সাত। সেগুলোর মধ্যে অন্তত তিনটি সংরক্ষিত আছে- দি এসেনশিয়ালস্ অব নলেজ ইন মিউজিক, অন দি মেলোডিজ এবং দি নেসেসারি বুক ইন দি কমপোজিশান অব মেলোডিজ। এর ঠিক পর পরই আবির্ভাব ঘটে সবচেয়ে প্রভাবশালী আরব সঙ্গীত তত্ত্ববিদ আল ফারাবির। তার প্রভাবশালী রচনাগুলো- গ্র্যান্ড বুক অন মিউজিক, স্টাইলস্ ইন মিউজিক এবং অন দি ক্লাসিফিকেশন অব রিদম। অন্যতম আরব গণিতশাস্ত্রবিদ আল বায়যানি রচনা করেন দ্য কম্পেন্ডিয়াম অন দি সায়েন্স অভ রিদম। প্রায় কাছাকাছি সময়ে ইখওয়ানুস সাফা এবং আল খাওয়ারিজমির সঙ্গীত আলোচনাও ব্যাপক ভাবে সমাদৃত হয়।

আল ফারাবি এবং ইবনে সিনার লেখায় সঙ্গীতের বহু তাত্ত্বিক দিক উঠে এসেছে; Image Source: muslimheritage.com

 ইবনে সিনার নাম চিকিৎসাবিজ্ঞানে জোরেশোরে নেয়া হলেও সঙ্গীতশাস্ত্রে তার অবদান কম ছিল না। কিতাবুশ শিফা এবং নাজাত গ্রন্থেই তার প্রমাণ স্পষ্ট। ‘ইনট্রুডাকশন টু দ্য আর্ট অভ মিউজিক’ নামে রচিত গ্রন্থ বেশ পরিচিতি লাভ করে। সমকালীন পদার্থবিজ্ঞানী ইবনে আল হাইসাম ইউক্লিডের রচনার দুটি ভাষ্য রচনা করেন। দ্বাদশ শতকের দিকে আবির্ভাব ঘটে ইবনে আল নাক্বাশ, আল বাহিলী এবং তার পুত্র আবুল মজিদ, ইবনে মানআ এবং আরো কয়েকজন বিখ্যাত তাত্ত্বিকের।

মুসলিম স্পেনে ফিরনাসের পর মাসলামা আল মাজরিতি এবং আল কিরমানীর রচনা দেখা যায়। ইখওয়ানুস সাফার রচনাগুলো এরা জনপ্রিয় করে তোলেন। সঙ্গীত তত্ত্বের উপর অধিকতর প্রতিভাবান লেখক ইবনে বাজা। পাশ্চাত্যে তার রচনাবলী প্রাচ্যের আল ফারাবির মতোই জনপ্রিয়। ত্রয়োদশ শতকে সফিউদ্দিন আবদুল মুমিন কর্তৃক নতুন পদ্ধতি ধারার প্রচলন ঘটে। শারাফিয়্যাহ এবং বুক অভ মিউজিক্যাল মুডস্ গ্রন্থে তার মতবাদসমূহ আলোচিত হয়। শামসুদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আল মারহুম, মুহাম্মদ ইবনে ঈসা ইবনে কারা বিশেষ অবদান রাখেন। আমর ইবনে খিজির আল কুর্দি রচনা করেন ‘দ্য ট্রেজার অভ দি ইনকোয়ারি ইনটু দ্য মুডস্ এণ্ড দ্য রিদমস্’। ইবনে আল ফানারি তার বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থে সঙ্গীতের বিষয়ও তুলে ধরেছেন। পদ্ধতিবাদী ধারার প্রতিষ্ঠাতার রচনার পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা মুহম্মদ ইবনে মুরাদের ট্রিটিজ। এটি বর্তমানে বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।

তাত্ত্বিকদের কদর

কোয়াড্রিভিয়ামে দক্ষ হবার কারণে অধিকাংশ আরব তাত্ত্বিকই গণিত ও পদার্থবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। গ্রীক মতবাদের পরীক্ষামূলক যাচাই বাছাই এবং নিজেদের বাস্তব ও প্রায়োগিক ভিত্তি নির্মাণে তাদের অবদান ছিল বিস্ময়কর। পূর্বপুরুষ যত নির্ভুলই হোক; তাদের পরীক্ষা না করে গ্রহণ করা হতো না। আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যেভাবে টলেমি ও অন্যান্য গ্রিক লেখকের ত্রুটি সংশোধন করেন; সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে। আরব তাত্ত্বিকরা স্বরের পরিমাপসহ বাদ্যযন্ত্রসমূহের যে সতর্ক বর্ণনা দিয়েছেন, তা তাদের স্বরলিপির সঠিকতারই জানান দেয়। তাদের রচনায় অবগত হওয়া যায় বীণা, প্যান্ডোর, হার্প এবং বায়ুচালিত বাদ্যযন্ত্রের বিষয়ে। ইউরোপে এ ধরনের যন্ত্র আসার শত শত বছর আগেই আরবরা এর সাথে পরিচিত ছিল। সফিউদ্দিনের মতবাদ সম্পর্কে স্যার হুবার্ট প্যারি বলেন,

“এ যাবত উদ্ভাবিত স্বরলিপিসমূহের মধ্যে এটি সব চাইতে পূর্ণাঙ্গ।”

উত্তরাধিকার

সঙ্গীতে আরবদের অবদানকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কেবল আরব ভূখণ্ডে না; পারস্য এবং তুর্কি ভূখণ্ডেও দাপটের সাথে বিস্তার লাভ করে তাদের সৃষ্ট ধারা। এমনকি ভারতেও আমরা আরবি গ্রন্থের অনুবাদ দেখতে পাই। আরবদের থেকে ইউরোপে গমণ করে মৌখিক ভাষা ও বিভিন্ন অনুবাদের মাধ্যমে। এরিস্টটলের ‘ডি এনিমা’ এবং গ্যালেনের ‘ডি ভসে’ মূলত আরবি থেকেই ল্যাটিনে অনূদিত হয়েছে। আল ফারাবির দুটি বিশ্বকোষ জোহানস্ হিসপালেনসিস ও জিরার্ড অভ ক্রিমোনা কর্তৃক যথাক্রমে ‘ডি সায়েন্টিস’ এবং ‘ডি অটু সায়েন্টিয়ারাম’ শিরোনামে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়। ভাষান্তরিত হয়ে আসে ইবনে সিনা এবং ইবনে রুশদের রচনাও।

আরবি থেকে হিব্রু অনুবাদও পশ্চিম ইউরোপে পরিচিতি লাভ করে। ইসাইয়া বেন আইজাক, মোজেস ইবনে তিব্বান, ইবনে আকনিন কর্তৃক ভাষান্তরিত হয় বিভিন্ন রচনা। এছাড়া কনস্ট্যান্টাইন দ্য আফ্রিকানের রচনায় ইবনে সিনা এবং গুণ্ডিসাল ভাসের লেখায় আল ফারাবির ছাপ স্পষ্ট। রজার বেকন ওপাস টেটিয়ামের সঙ্গীতাংশে টলেমি ও ইউক্লিডের সাথে আল ফারাবির উদ্ধৃতি প্রদান করেছেন। মুসলিম স্পেন ছিল সে সময় ইউরোপের জ্ঞান বিজ্ঞানের বাতিঘর। সেখান থেকে বহু তত্ত্বই ল্যাটিনে অনূদিত হয়েছে। তাছাড়া পরবর্তী বহু ইউরোপীয় পণ্ডিত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আরব সঙ্গীতশাস্ত্র থেকে প্রভাবিত হয়েছে।

ইউরোপীয় সঙ্গীতে আরবদের প্রভাব পরিভাষাতে এখনো বিদ্যমান;  Image Source: fourteenthcenturyfiend.com

ইউরোপের জন্য আরবদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্ভবত পরিমাপমূলক সঙ্গীত। আগে তারা এর সাথে অপরিচিত ছিল। অথচ আরবীয় সঙ্গীতে সপ্তম শতক থেকেই তা ইকায়াত বা ছন্দ নামে তার পরিচিতি। ফ্রাঙ্কো এবং তার প্রবর্তিত ধারায় স্বরলিপির পরিমাপমূলক ব্যবস্থা ও ছান্দিক যে রূপ দেখা যায়; তা মূলত আরবদের থেকে ধার করা। ল্যাটিন গ্রন্থ ডি মেনসিউরিস এট ডিসক্যান্টোতে আমরা এলমুয়াহিম এবং এল মুয়ারিফা নামের যে ছন্দের দেখা পাই; তা আরবি নামকেই নির্দেশ করে। ডি মুরিসের রচনায় অ্যালেনট্রেড কৌশল, রবার্ট ডি হ্যান্ডলোর হকেট নামের স্বরলিপি ও যতিচিহ্নের সংমিশ্রণ- উভয়ই এসেছে আরবি থেকে। আরবি ইকায়াতেরই ল্যাটিন নাম হকেট।

আরবি শব্দ আল-উদ থেকেই ইংরেজিতে লিউট শব্দের জন্ম। রাবাব, কিতারা এবং নাককারা শব্দ থেকেই এসেছে আধুনিক রেবেক, গিটার এবং নাকের। মধ্যযুগের সঙ্গীত রচনার অন্যতম পদ্ধতি কন্ডাক্টাস শব্দটি আরবি মাজরা শব্দের অনুরূপ। স্পেনীয় উস্তাদরা আরব লিউটের বিকাশ সাধন করতে গিয়েই মিউজিকা ফিকটা উদ্ভাবন করেন।

এবং তারপর

১২৫৮ সালে মোঙ্গলদের কাছে বাগদাদের পতন এবং ১৪৯২ সালে স্পেনীয়দের কাছে গ্রানাডার পতন আরবদের রাজনৈতিক আধিপত্যে ইতি টানে। ক্ষমতার সাথে সংস্কৃতির যোগসূত্র আরো একবার প্রমাণ করেই অবনতি ঘটে সঙ্গীত তত্ত্ব ও চিন্তাধারার। অবশ্য উনিশ শতকের দিকে পশ্চিমা প্রভাব আসে প্রাচ্যে। শুরু হয় নতুন স্রোত। সেই প্রতিক্রিয়াতেই পুনর্জাগরণ ঘটতে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের। সিরিয়া, ইরাক, মিশর, তুরস্ক কিংবা উত্তর আফ্রিকা এবং ভারতে নিজস্বতা নিয়ে সঙ্গীত চর্চা হতে থাকে। ১৯৩২ সালে কায়রোতে আরব সঙ্গীতের আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কায়রোতে।   

ধর্ম ইসলাম এবং সঙ্গীতের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তর টানাপোড়েন সত্ত্বেও আরবরা এক মাইলফলক রেখে গেছে সঙ্গীতের ইতিহাসে। এই ব্যাপারে একটা গল্প সামনে আনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। 

মসনবি প্রণেতা দার্শনিক জালাল উদ্দীন রুমিকে একবার প্রশ্ন করা হয়, কোন ধরণের সঙ্গীত হারাম? রুমির জবাব ছিল- “গরীব এবং ক্ষুধার্তের সামনে বিত্তশালীর থালায় চামচ নাড়ানোর শব্দ।”  


২৩


মেসায়াহ: বিভিন্ন ধর্মে প্রতিশ্রুত ভবিষ্যত ত্রাণকর্তা

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিআগস্ট 24, 2020

article

বর্তমানে মেসায়াহ অনেক বেশি আলোচিত। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে নিজেদের প্রতিশ্রুত ব্যক্তি হিসেবে দাবি করা মানুষের সংখ্যা ঢের। অতীত ইতিহাস থেকে নাম লিপিবদ্ধ করতে গেলেও কম দীর্ঘ হবে না তালিকা। অন্যায় আর বিশৃঙ্খলায় পরিপূর্ণ দুনিয়ায় ধর্মে প্রতিশ্রুত পাঞ্জেরীর স্বপ্নে বিভোর ধার্মিকেরা। মেসায়াহ মতবাদ তাই কেবল ধর্মে সীমাবদ্ধ নেই; মনোবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব এমনকি রাজনৈতিক আলোচনার টেবিলেও চিন্তার খোরাক।

মেসায়াহ মূলত ভবিষ্যতের কোনো নিখুঁত স্থান এবং সময়ের মতবাদ। প্রত্যেক ধর্মের একটা সমৃদ্ধ স্বর্ণযুগ আছে অতীতে। প্রধান ধর্মনেতার মৃত্যুর পর অনুসারীদের মধ্যে দেখা দেয় বিচ্যুতি ও বিশৃঙ্খলা। স্বর্ণযুগের পতন ঘটে অজস্র প্রতিবন্ধকতায়। মেসায়াহ তাই সমস্ত বিশৃঙ্খলাকে পরাজিত করে বাসযোগ্য পৃথিবী প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি। শ্বাসরুদ্ধকর জীবনকে পাশ কাটিয়ে স্বর্ণযুগের পুনরুদ্ধার।

সাওশিয়ান্ত

মেসায়াহ মতবাদের গোড়ার উদাহরণ জরাথুস্ত্রবাদের সাওশিয়ান্ত। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে পারস্যে জন্ম নেন জরাথুস্ত্র। বহুধাবিভক্ত গোত্রীয় কাল্টগুলো তার প্রচারেই আসে একটা ধর্মের ছায়াতলে। পরবর্তীতে একেমেনিড সাম্রাজ্যের সময় (৫৫৮-৩২৩ খ্রিষ্টপূর্ব ) ধর্মের সাথে সংগঠিত হয় ধর্মগ্রন্থ জেন্দাবেস্তা। জগৎ তাদের চোখে শুভ আর অশুভের অবিরাম যুদ্ধের ময়দান। প্রধান দেবতা আহুরা মাজদা আর অশুভের নায়ক আঙরা মাইনুর মধ্যকার দ্বন্দ্ব। যদিও ধর্মগ্রন্থাদি ঘেটে তিনজনের ভবিষ্যদ্বাণী পাওয়া যায়; তবু সাওশিয়ান্ত প্রভাব বিস্তার করে আছে ধর্মতত্ত্বে।

সাওশিয়ান্ত পৃথিবীতে এসে অশুভের বিনাশ করবেন চিরতরে; Image Source: religionworld.in

সাওশিয়ান্ত শব্দের অর্থ ‘যে শুভ আনে’। স্বর্গীয় গুণাবলী নিয়ে আহুরা মাজদার দূত হিসাবে তার আগমন। পরিচিত হবে ভিসপা তাওরুয়াইরির সন্তান বলে। স্পর্শেই নিখুঁত আর পবিত্র হয়ে উঠবে দুনিয়া। তাকে সাহায্য করবে সাত স্বর্গীয় দূত আমেশা স্পেন্টা। বিশ্বাসীরা মুক্তি পাবে। দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য করতে থাকা অন্যায় আর অনাচার হবে পরাজিত। নিশ্চিহ্ন হবে দ্রুগ এবং অশুভের হোতা আঙরা মাইনু। আবেস্তার বর্ণনা মতে,

“বিজয়ী সাওশিয়ান্ত এবং সাহায্যকারীরা পৃথিবী পুনর্গঠিত করবে। আর বয়স ফুরিয়ে যাওয়া নেই, মৃত্যু নেই। অবক্ষয় নেই, পচন নেই। কেবল চিরন্তন জীবন, চিরন্তন বৃদ্ধি আর ইচ্ছাপূরণ। মৃতরা জেগে উঠবে, জীবন আর অমরত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে; পৃথিবী হবে পুনরুদ্ধার”। (Darmesteter, 1883, Pages 306-307)

কল্কি

প্রাচীন ভারতীয় সময়ের ধারণা সরলরৈখিক না; চক্রাকার। ক্রম আবর্তিত চিরন্তন সময়কে প্রধানত চারটি যুগে বিভক্ত করা হয়েছে- সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এবং কলি। বর্তমানে মানুষ কলিযুগে বসবাস করছে; যা শুরু হয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ পর পরই। কল্কি হলো হিন্দুধর্ম অনুসারে বিষ্ণুর দশম এবং শেষতম অবতার। সত্য প্রতিষ্ঠা করবেন; পদানত করবেন অসত্য। যেমনটা শ্রীকৃষ্ণের দাবি, 

“যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত,
অভ্যুত্থানম ধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাং
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।”

অর্থাৎ “যখনই ধর্মের গ্লানি হয়; অধর্মের অভ্যুত্থান ঘটে। হে ভরতবংশীয় (অর্জুন), তখনই সাধুদের পরিত্রাণ এবং দুষ্কৃতিকারীদের বিনাশ করতে; পুনরায় ধর্ম স্থাপন করতে যুগে যুগে আমি আবির্ভুত হই।” সত্যিকার অর্থেই কল্কি এই বাণী পূর্ণ করবেন। ঘোড়ায় চড়ে হাতে তরবারি নিয়ে আগমন হবে ধূমকেতুর মতো। কল্কি শব্দের অর্থই ‘অন্ধকারের বিনাশকারী’। তার পিতার নাম হবে বিষ্ণুযশ এবং মায়ের নাম সুমতি।

হাতে তরবারি নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে আসবেন কল্কি; Image Source: Punjabi manuscript 255, Photo no: L0040774

কলিযুগে মানুষ ক্রমশ লোভ আর পার্থিবতায় নিমজ্জিত। আধ্যাত্মিকতা, ভক্তি এবং ধর্মীয় অনুভূতি ক্রমশ ফিকে হচ্ছে। দেবতাদের নিয়ে চলে হাসি তামাশা। ব্যক্তির জীবন থেকে রাষ্ট্রের গলা অব্দি ডুবন্ত অন্যায় আর অবিচারে। যার চরমতম অবস্থায় ঘটবে কল্কির আবির্ভাব। অন্ধকার কেটে গিয়ে নতুন করে দেখা দেবে আরেক সত্যযুগ। মানুষ ফিরবে সমৃদ্ধি আর স্বর্ণ সময়ের দিকে। যেমনটা বলা হয়েছে,

“কল্কি আর তার অনুসারীরা রাজ্যের কোনায় কোনায় গিয়ে দুষ্টের দমন করবেন। সময়ের ব্যবধানে যে সব মানুষ বিভ্রান্ত, অশান্ত, লোভে অন্ধ, পাপে আকণ্ঠ নিমজ্জিত এমনকি নিজের পিতামাতার সাথেও বেপরোয়া; তাদের সকলকে। নতুন করে শুরু হবে সত্য আর সততার শাসন।”  (Knapp, 2016)

মৈত্রেয়ী

বোধি বলতে সেই জ্ঞানকে বোঝায়; যার চর্চায় দুঃখের নিবারণ ঘটে। এই জ্ঞানের জন্য বারবার জন্মগ্রহণ করতে হয়। গৌতম বুদ্ধ এর আগে ৫৫০ বার জন্মগ্রহণ করে মানুষের দুঃখের সমাধানে কাজ করেছেন। তখন তাকে চিহ্নিত করা হতো বোধিসত্ত্ব হিসেবে। অর্থাৎ বোধিসত্ত্ব হলো নির্বাণ পূর্ববর্তী অবস্থা; যখন সকল জীবের প্রতি অসীম করুণা ও মৈত্রী অনুভূত হয়। বৌদ্ধধর্ম অনুসারে মৈত্রেয়ী একজন বোধিসত্ত্ব; গৌতম বুদ্ধের উত্তরাধিকারী হিসেবে যিনি ভবিষ্যতে আগমন করবেন। অধর্মের অবসান ঘটিয়ে উত্থান ঘটাবেন ধর্মের।

মৈত্রেয়ী পরিপূর্ণ রূপে জাগরিত, পরম প্রাজ্ঞ এবং অতুলনীয় পথ নির্দেশক; Image Source: Maitreya Project

মৈত্রেয়ীকে চিত্রিত করা হয়েছে সিংহাসনে বসে অবতরণের অপেক্ষায় এক মহাপুরুষ হিসেবে। গায়ে ভিক্ষুর পোশাক। তার জন্ম হবে চক্রবর্তী রাজা শঙ্খের রাজ্য খেতুমতিতে। সন্তান জন্মের পর গৃহত্যাগ করবেন নিগূঢ় জ্ঞান সাধনার জন্য। সাত দিনের মাথায় বোধি লাভ করবেন। শিষ্যত্ব বরণ করবে অশোক, ব্রহ্মদেব, সুমন, পাদুম এবং সিহা। তার আগমণের মধ্য দিয়েই গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা অপ্রচলিত হয়ে পড়বে। পুনরায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে দুনিয়ায়। গৌতম বুদ্ধের ভাষ্যে,

“ভ্রাতৃসকল, মৈত্রেয়ী নামে এক মহাত্মা আবির্ভূত হবেন। পরিপূর্ণ রূপে জাগরিত; জ্ঞান, কল্যাণ, সুখ আর প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ; অতুলনীয় পথনির্দেশক, দেবতা আর মানবকূলের শিক্ষক এবং বুদ্ধ; এমনকি আমার থেকেও। তিনি নিজে থেকেই সৃষ্টিজগতের সকল কিছু দেখবেন এবং জানবেন; যেন মুখোমুখি বসা। এমনকি আমি যতটা জানি ও দেখি; তার চেয়েও স্পষ্ট।” (Dagha Nikaya xxvi.25 Pages. 73-74)

মোশিয়াহ

হিব্রু শব্দ মোশিয়াহ এর অভিধানগত অর্থ ‘উপলিপ্ত’ আর পারিভাষাগত অর্থ পরিত্রাতা। হিব্রু বাইবেলে মর্যাদাবান এবং মহৎপ্রাণ ব্যক্তিদের সাথে মোশিয়াহ ব্যবহার করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রধান যাজককে বলা হতো কোহেন হা-মোশিয়াহ। তালমুদীয় আলাপ আলোচনায় মোশিয়াহ বলতে ডেভিডের বংশে প্রতিশ্রুত ভবিষ্যত নেতাকে বুঝানো হয়। তিনি জেরুজালেমের টেম্পল পুণঃনির্মাণ করবেন, ইহুদিদের একত্রিত এবং ইসরায়েলের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত করবেন। সারা বিশ্বের মানুষ মোশিয়াহকে বিশ্বনেতা বলে স্বীকৃতি দেবে এবং আনুগত্য করবে। সেই যুগ হবে শান্তির, উপদ্রবহীন এবং জীবনীশক্তিতে পরিপূর্ণ।

মোশিয়াহ কেবল ইহুদিদের পুনর্গঠন করবে না; শান্তিতে ভাসাবে সমগ্র মানবজাতি; Image Source: chabad.org

বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় মূল্যবোধ আর নৈতিকতার ভয়াবহ অধঃপতন ঘটেছে। হত্যা, অপরাধ, নেশাদ্রব্য যেন খুব সাধারণ ঘটনা। মোশিয়াহ আসবেন সমস্ত সংঘাত, ঘৃণা, যুদ্ধ আর অনাচার বিলোপ করে। তোরাহের মৌখিক আর লিখিত উভয় পারদর্শীতা নিয়ে। কোনো কোনো বর্ণনায় মোশিয়াহর সঙ্গী হিসেবে নবী এলিজাহর পুনরাগমনের কথা বলা হয়েছে। ইহুদি দীর্ঘ ইতিহাসের এই মতবাদ ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাবক হিসাবে কাজ করেছিল। ওল্ড টেস্টামেন্টের বিবৃতি মতে,

“কেটে ফেলা গাছের মতো ডেভিডের ধারা কেটে আছে। কিন্তু গাছে নতুন কুঁড়ি গঁজানোর মতোই নতুন রাজার উত্থান ঘটবে উত্তরাধিকারীদের থেকে। ঈশ্বর তাকে প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং শাসন ক্ষমতা দান করবেন। তিনি ঈশ্বরের ইচ্ছা সম্যক অবগত থাকবেন এবং কৃতজ্ঞতা জানাবেন। সন্তুষ্ট থাকবেন আনুগত্যে। বাইরের চাকচিক্য দেখে বিচার করবেন না। গরীবদের প্রতি ন্যায়বিচার করবেন; অসহায়ের অধিকার সুরক্ষা দেবেন। তার আদেশেই শাস্তি হবে; হবে বিশঙ্খলাকারীর বিনাশ। মানুষ শাসিত হবে ন্যায় আর ভালোবাসায়।” (ইসায়াহ: ১১:১-৫)

দ্বিতীয় আগমনী

ইহুদি মেসিয়ানিক মতবাদের উপর দাঁড়িয়েই খ্রিষ্টধর্মের বিকাশ। যীশুর জীবিত অবস্থায় এবং মৃত্যুর পরে অনুসারীদের দ্বারা বনি ইসরায়েলের প্রতিশ্রুত পুরুষ বলে পরিগণিত হন। কিন্তু শেষ অব্দি ইহুদি ধর্মতাত্ত্বিকদের প্রত্যাশাকে যীশু পূর্ণ করতে পারেননি। পিটার এবং পলের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মূলধারার ইহুদিরা মুখ ফিরিয়ে নিল। পরিণামে ইহুদি ধর্মের থেকে আলাদা হয়ে পড়লো খ্রিষ্টধর্ম। পরবর্তীতে গ্রীক আর রোমানদের মধ্যে ব্যাপকতা লাভ করে মতবাদ। যীশুর পার্থিব জীবন মেসিয়ানিক ছিল; ঠিক একইভাবে ভবিষ্যৎ পুনরাবির্ভাবের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। (বুক অভ রেভেলেশন, ২২:১২)

সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নিয়ে আবার আসবেন যীশু; Image Sourc: latterdaylight.com

খ্রিষ্ট শব্দটি হিব্রু মোশিয়াহর গ্রীক অনুবাদ; অর্থ উপলিপ্ত। ধর্ম প্রচারের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহী তকমা নিয়ে পন্টিয়াস পিলেটের আদালতে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করা যীশুর পুনরাগমন হবে প্রকাশ্য। প্রত্যেকটা চোখ তাকে দেখতে পাবে। তার সাথে থাকবে ফেরেশতারা। মৃতরা জীবিত হবে; সৎকর্মশীলরা পাবে যথার্থ প্রতিদান। দুষ্কৃতিকারীরা ধ্বংস হয়ে যাবে চিরতরে। সেই সাথে ধ্বংস হবে অসন্তুষ্টি, বিশৃঙ্খলা, ক্লেশ এবং খোদ মৃত্যুও। বাইবেলের ভাষ্য,

“যখন প্রধান স্বর্গদূতের কণ্ঠে ঈশ্বরের তূরীধ্বনি হবে, প্রভু নিজে স্বর্গ থেকে নেমে আসবেন। যেসব খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের মৃত্যু হয়েছে; তারা আগে জেগে উঠবে। আমাদের যারা তখনো জীবিত থাকব, তাদেরকে মেঘে করে তুলে নেয়া হবে প্রভুর সাক্ষাতের জন্য। আর এভাবেই আমরা চিরকাল প্রভুর সাথে থাকব।” (থেসালোনিকীয়-১, ১৬-১৭)

ইমাম মাহদী

মুহম্মদ সা. এর নাতি হোসেনের পরিবারের উপর জুলুম এবং ৬৮০ সালে কারবালায় নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা সমর্থকগোষ্ঠীকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক পাটাতন দান করে। শিয়া বিশ্বাস তার পরে থেকেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক জ্ঞানচর্চায় ক্রমবর্ধমান কোণঠাসা পরিস্থিতিতে বিস্তার লাভ করে ভবিষ্যত ত্রাণকর্তা বা ইমাম মাহদি মতবাদ। সুন্নি মূলধারার সমান্তরালে ইরান ও ইরাকে বৃদ্ধি পেতে থাকে তৎপরতা। ৯০৯ সালে উবায়দুল্লাহ মিশরে ফাতেমীয় খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেন মাহদি মতবাদে ভর করেই।

ক্যালিগ্রাফিতে ইমাম মাহদি; Image Source: wikipedia

মাহদি শব্দের অর্থ পথপ্রাপ্ত। কোরানে সরাসরি এই ধারণা অনুপস্থিত; যদিও সূরা আল ইমরানের ৪৬ এবং মারিয়ামের ২৯ নম্বর আয়াতে শৈশব অর্থে ‘মাহদি’ শব্দের ব্যবহার আছে। মাহদি সংক্রান্ত হাদিসের সংখ্যা সব মিলিয়ে প্রায় ৫০। সুনানে আবু দাউদ অনুসারে তার নাম মুহম্মদ, উপাধি মাহদি এবং পিতার নাম আবদুল্লাহ। কিয়ামতের আগে সৎকর্মশীলদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করতে আসবেন রাসুলের বংশ থেকে। পতন ঘটবে দাজ্জাল এবং ইয়াজুজ-মাজুজের। নিম্নশ্রেণি কিংবা বিত্তশালী; কেউ তাকে প্রত্যাখ্যান করবে না। হাদিস অনুসারে,

“মাহদি আমার বংশধর। তিনি উজ্জ্বল ললাট আর বাঁকা নাসিকা বিশিষ্ট হবেন। পৃথিবীকে ন্যায়-নীতি এবং ইনসাফ দিয়ে ভরে দেবেন। তার শাসনকাল হবে সাত বছর।” (সুনানে আবু দাউদ: হা/ ৪২৮৫; সনদ সহীহ)

লি হং

ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিক মতবাদ হিসাবে তাওবাদের প্রতিষ্ঠা খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে। আসক্তিবিহীন কর্ম এবং মহাবিশ্বের চিরন্তন সুর অনুযায়ী নিজেক গঠনের চর্চা হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে দ্রুত। যার গোড়ায় রয়েছে গুরু লাওৎসে এবং মহাগ্রন্থ তাও তে চিং। লি হং তাওবাদের ভবিষ্যৎ ত্রাতা যিনি পৃথিবী ধ্বংসের আগে এসে সৎকর্মশীল মানুষদের উদ্ধার করবেন। সমৃদ্ধ থাকবেন জ্ঞান, অনুধাবনশক্তি আর চর্চায়।

খ্রিষ্টপূর্ব ২০২ থেকে খ্রিষ্ট পরবর্তী ২২০ অব্দি বিস্তৃত হান সাম্রাজ্যের সময়ে সংগঠিত হয় লি হং মতবাদ। ‍একজন আদর্শ শাসক তিনি; যেমনটা ধর্মগ্রন্থ বর্ণনা করেছে। ক্রমবর্ধমান ভ্রান্তি আর বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটিয়ে জমিনে শান্তি নেমে আসবে। ব্যক্তি, সমাজ আর রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে দূরীভূত হবে কালিমা। কখনো কখনো লাওৎসের ভবিষ্যৎ অবতার হিসাবে বর্ণনা করা হয়। তাকে ব্যবহার করে পরবর্তী চীনে বহু বিদ্রোহ এবং আন্দোলন বৈধতা পেয়েছে।

লি হং পুরাতন বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা করবেন; Image Source: Wikipedia  

পৃথিবীর সমাপ্তি সংক্রান্ত আলোচনা বিধৃত ‘থাইশাং তংউয়ান শেং চৌ চিং’ নামক গ্রন্থে। অন্যান্য অনেক মেসিয়ানিক মতবাদের মতো, তাওবাদেও পৃথিবীর সমাপ্তি মানে পুরাতন বিশ্বব্যবস্থার পরিসমাপ্তি এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা। ইতিহাস সেখানে চক্রাকার।

অবশেষ

প্রধান ধর্মগুলোর বাইরে রাশান, লাতিন আমেরিকান এবং আফ্রিকান অনেক ধর্মেও মেসায়াহ মতবাদ ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক আবেদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অঙ্কিত হয়েছে মানবজাতির ভবিষ্যৎ চিত্র। জগতের অন্যায় আর অনাচারের পতন ঘটিয়ে পরিশুদ্ধ আর সুখী সময়ের প্রতিশ্রুতি। অধর্মের কাছে প্রতি পদে মার খাওয়া ধার্মিকদের জন্য ইহকালীন বিজয়ের আশ্বাস। আত্মানুসন্ধানীর জন্য সান্ত্বনা রাত্রিশেষের।  

সব সময় মানুষ মেসায়াহর অপেক্ষায় থাকেনি। সমাজের অবিচার আর নিপীড়ন বৃদ্ধি পেলে মজলুমদের মধ্য থেকে কেউ বিদ্রোহ করেছে এই ধর্মতত্ত্ব প্রয়োগ করে। কেউ ব্যবহার করেছে নিজের স্বেচ্ছাচারী শাসনকে শক্তিশালী ও বৈধ করতে। সকল ধর্মের ইতিহাসে তাকালে তাই অজস্র মেসায়াহ দাবিকারীর নাম পাওয়া যায়। সেই জেরুজালেমে রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে হিটলারের নাৎসি মেসিয়ানিজম। প্রাচীন চীনের ইয়োলো টারবান বিদ্রোহ থেকে সুদানের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। এই মতবাদ দিয়েছে শক্তি ও সমর্থন। তাই শুধু ধর্ম নিয়ে মেসায়াহ বুঝতে যাওয়াটা অবিচার হবে; নিপীড়িত কৃষকদের মুক্ত করতে জমিদার এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামা সিলেটের আগা মোহাম্মদ রেজা বেগের মাহদি দাবি তার বড় প্রমাণ।


২৪


শিখ: এক ব্যতিক্রম ধর্মের আদ্যোপান্ত

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিঅক্টোবর 10, 2020

article

পাঞ্জাবের মতো বিচিত্র অঞ্চল খুব একটা নেই। সেই সিন্ধু সভ্যতার ধ্যান-ধারণা দিয়ে ইতিহাসের শুরু। তারপর বৈদিক চিন্তা, আলেকজান্ডার পরবর্তী গ্রীক বিশ্বাস, বৌদ্ধ মতবাদের জয়রথ, আরব-মোগল-আফগানদের সাথে ইসলাম এবং ইউরোপীয় মিশনারির সাথে খ্রিষ্টধর্ম- সচেতন কিংবা অবচেতনেই থিতু হয়েছে এখানে। পাশাপাশি হাত ধরে বেড়ে উঠেছে সুফিবাদ এবং ভক্তিবাদ। ষোড়শ শতকের দিকে ইউরোপে যখন মার্টিন লুথার ক্যাথোলিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলনে মগ্ন। সে সময় পৃথিবীর অন্য প্রান্ত পাঞ্জাবের মাটিতে গুরু নানক প্রচার করছেন আরো বিশ্বজনীন জীবনদর্শন। উত্থান ঘটছে নয়া অনুসারীর- যারা শিখ নামে পরিচিত হয় অদূর ভবিষ্যতে।

পৃথিবীর কনিষ্ঠ ধর্মগুলোর মধ্যে একটা শিখ। চিত্র অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির; image Source: velivada.com

শিখ নামে প্রচলিত হলেও সঠিক উচ্চারণ ‘সিখ’। ইংরেজিতে seek শব্দের কাছাকাছি; কেবল k এর স্থানে kh উচ্চারণের ন্যায়। পাঞ্জাবি ‘সিখনা’ শব্দের অর্থ শিক্ষা এবং সিখ অর্থ শিক্ষার্থী বা শিষ্য। যিনি শিক্ষা দেন তাকে বলা হয় গুরু। অবশ্য অনুসারীরা বাংলায় শিখ হিসাবেই পরিচিত। যে ব্যক্তি এক অদ্বিতীয় সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে, নানক থেকে গোবিন্দ সিং অব্দি দশ গুরুতে বিশ্বাস করে, গ্রন্থসাহিব, শিক্ষাকীর্তন এবং অন্য ধর্মমতের প্রতি সহনশীলতায় বিশ্বাস করে; তিনিই শিখ হিসাবে পরিগণিত। 

প্রেক্ষাপট

শিখ ধর্মদর্শনের স্পষ্টতার জন্য হাঁটতে হবে পেছনে। নবম শতকের দিকে দক্ষিণ ভারতে হিন্দু ধর্মের বিপ্লব শুরু হয়। প্রথম সারিতে ছিল আলভার এবং আদ্যার নামে দুটি দল। বৌদ্ধ এবং জৈনধর্মের দার্শনিক তত্ত্ব আলোচনায় আবেগময়তার অনুপস্থিতিকে কটাক্ষ করেন তারা। আলভাররা ছিল বিষ্ণুর ভক্ত আর আদ্যাররা শিবের। তবে দিনশেষে উভয়েই এক স্রষ্টারই উপাসনা করতো। তারা বর্ণপ্রথার কঠোরতা শিথিল করে ছড়িয়ে দেয় ভালোবাসার বাণী। একেশ্বরবাদ, মানবতার সাম্য এবং দলগতভাবে স্তুতিগান তাদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে দ্রুত। ফলে সাধারণ মানুষ ধর্মের নীরস তাত্ত্বিকতা ছেড়ে ঝুঁকে পড়তে থাকে তাদের দিকে।

সেই প্রাচীনকাল থেকেই আরবের সাথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ভারতের। বণিকদের অনেকেই আর আরবে ফিরে যায়নি। ইসলাম আগমনের পরে সেই বৈশিষ্ট্য আরো পোক্ত হয়। ৬৩৬ সালের পর থেকে আরব মুসলমানরা মালাবার উপকূলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এখানেই বিয়ে করে স্থায়ী হতে থাকে। এভাবে স্থানীয়দের মধ্যে ধর্মের বিস্তার হওয়াতে দ্রুত নতুন ইন্দো-আরবীয় সমাজের তৈরি হলো। মুসলিমদের এ এক অন্য রূপ। ঘোড়ায় চড়ে সামরিক পোশাকে না; বণিক ও সুফির পোশাকে সমাজের নিচুতলায় চললো প্রচারণা।

দার্শনিক তত্ত্ব ছেড়ে তারা হাজির করেছিল ঈশ্বরপ্রেম আর মানুষের জয়গান; Image Source: apnaorg.com

এই সময়েই প্রসারিত হয় হিন্দুধর্মে ভক্তিবাদ আর ইসলামে সুফিবাদ। ভক্তিবাদ ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারতে। উত্তর ভারতের রামানন্দ থেকে বাংলার চৈতন্য অব্দি। কবির যেন এগিয়ে যান কয়েক ধাপ সামনে। ঈশ্বরকে পাবার পথ হিসাবে তিনি ভালোবাসা আর ইচ্ছা সমর্পনের যে ব্যাখ্যা দেন; তাতে মিলিত হয়েছে ইসলাম আর হিন্দুধর্মের বিশ্বাস। অন্যদিকে মুসলিম সুফিরা ‘তোমরা যেদিকেই ঘুরবে, সেদিকেই পাবে আল্লাহকে’ বাণীতে নিজেদের নিবিষ্ট করে দিলেন। সুফিদের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তাদের জীবনপদ্ধতি এবং শ্রেণিহীনতার প্রচার। পাঞ্জাবের আলি মখদুম হুজুরি দানশীলতার কারণে গঞ্জ বকশ বা খোদার কোষাগার বলে খ্যাত হন। শেখ ফরিদ খ্যাত হন গঞ্জশোকর নামে। খোদাপ্রাপ্তির পথে ভক্ত আর সুফি উভয়েই হাঁটছে যেন একই পথে।

জন্ম

১৩৯৮ সালে তৈমুর লঙ-এর আক্রমণ ভারতের সংগঠিত সরকার ব্যবস্থায় একরকম সমাপ্তি আনে। রাজ্যপালরা দিল্লীর বিরোধিতা করে নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে থাকে। বিক্ষিপ্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক শাসনের প্রভাব পড়লো জনতার উপর। রাজকোষের স্বার্থে ভারী হয়ে আসতে থাকলো করের বোঝা। যতোই চাপ বাড়তে থাকলো, ধর্মান্তরিত মানুষেরা ফিরতে থাকে স্বধর্মে। লোদি বংশের যে বিশৃঙ্খলা বাবরকে ভারতে আসতে প্রলুব্ধ করেছিল; একই সময়ে জন্মানো ঘৃণা আর জবরদস্তির আবহে চাপা পড়ে যাচ্ছিল সুফি ও ভক্তদের ভালোবাসার গান।

১৪৬৯ সালের ১৫ এপ্রিল রাই ভো দি তালওয়ান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নানক। পিতা মেহতা কালিয়া এবং মা তৃপ্ত। সাত বছর বয়সে বর্ণমালা ও সংখ্যা শেখানোর জন্য পণ্ডিতের কাছে পাঠানো হয়। পরে আরবি ও ফারসি শেখার জন্য এক মুসলিম আলেমের সান্নিধ্যে থাকেন দুই বছর। কিন্তু পার্থিবতায় তার আগ্রহ ছিল না কখনোই। তাই পূন্যবান ব্যক্তিদের সাথে কিংবা নির্জনে ধ্যানমগ্ন সময় কাটাতে লাগলেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার শেষে একদিন নদীতে পূন্যস্নান করতে গেলে শুনতে পান দৈববাণী। আমূল বদলে দেয় তাকে ঘটনাটা। ছুটাছুটি করেন শ্রীলঙ্কা থেকে লাদাখ এবং মথুরা থেকে মক্কা। ১৫৩৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ভোরে ইহধাম ত্যাগ করেন।

গুরু নানক মক্কা, মদিনা এবং বাগদাদ ভ্রমণের সময় তাজউদ্দিন ও অন্যান্য শিষ্যের সাথে;  Image Source: sikhnet.com

নানকের প্রচারণা ছিল সহজ। ঈশ্বর তার কাছে কেবল আধ্যাত্মিক ধারণা হয়ে থাকেনি; এসেছে সামাজিক আচরণের নীতিমালা হিসাবেও। ঈশ্বর চূড়ান্ত সত্য হবার কারণে যা কিছুই অসত্য, তা অনৈশ্বরিক। জগতে হিন্দু বা মুসলিম বলে কিছু নেই। নেই সাদা কিংবা কালো, রাজা কিংবা ফকির, নারী কিংবা পুরুষের পার্থক্য। কেবল আছেন এক ঈশ্বর। এজন্য বলা হয় ‘ইক ওয়াঙ্কার’ বা সৃষ্টি কর্তা এক। তার সামনে সকল মানবজাতি সমান। নানক বিশ্বাস করতেন, জগতের সকল অনিষ্টের পেছনে মানুষের অহম সম্পৃক্ত। দল এবং উপদল জনিত প্রতিযোগিতাকে দেখেছেন অনর্থক হিসেবে। তার মতে,

যোগীর পরনের ছেড়া তালি দেয়া কাপড়ে ধর্ম নেই,
সে যা বহন করে, তাতেও নেই
শরীরের ভস্মেও নেই;
কানের আংটিতেও থাকে না ধর্ম,
কামানো মাথাতেও না,
শাঁখের খোসায় ফুঁ দেয়াতেও না।
যদি সত্যিই ধর্মের পথ দেখতে চাও;
পৃথিবীর সকল অবিশুদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকো।

পরিণতি

নানক বরাবরই গুরুর আবশ্যকতা নিয়ে কথা বলতেন। পরবর্তীতে ধর্ম এগিয়ে গিয়েছে সেই গুরুদের হাত ধরে। লেহনা (১৫০৪-৫২) ছিলেন অনুরক্ত হিন্দু। নানকের সংস্পর্কে এসে হয়ে উঠলেন গুরু অঙ্গদ। তার নম্রতার দরুণ বিভাজন রোধ হয়ে শিষ্যের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। তিনিই বর্ণমালা বাছাই করে নানকের স্তুতিগুলো গ্রন্থিত করা শুরু করেন; যা গুরুমুখী নামে পরিচিত। দুই ছেলে থাকার পরও পরবর্তী গুরু হিসেবে মনোনীত করে যান তেয়াত্তর বছর বয়সী শিষ্য অমর দাসকে (১৪৭৯-১৫৭৮)। শিখদের জন্য বার্ষিক উৎসব, এক বিয়ের প্রচলন, বিধবাদের পুনর্বিবাহের প্রচেষ্টার মতো যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ নেন অমর দাস।  

পঞ্চম গুরু অর্জুনের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। ধর্মীয় সম্প্রীতির চিহ্ন হিসেবে লাহোরের সুফি মিয়া মীরকে দিয়ে তিনি হরমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পূর্ববর্তী লেখা সংকলিত করে স্থাপন করেন অমৃতসরে। মোগল সম্রাট আকবর পছন্দ করলেও জাহাঙ্গীরের কোপদৃষ্টি পড়ে তার উপর। কিন্তু প্রথমদিকে তেমন কিছু করেননি। পরবর্তীতে বিদ্রোহী শাহজাদা খসরুকে সমর্থন দেবার অভিযোগে দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। অর্জুনের রক্ত শিখ সম্প্রদায়ের পাশাপাশি পাঞ্জাব জাতীয়তাবাদের বীজে পরিণত হয়। আধ্যাত্মিকতার সাথে যুক্ত হয় অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টা। স্থানীয় মুঘল প্রশাসকের স্বেচ্ছাচার থেকে নিপীড়িত হিন্দু ও মুসলমানদের রক্ষা করার তদবির চলে। পরিণামে ১৬৭৫ সালে নবম গুরু ত্যাগ বাহাদুরকে মৃত্যুদণ্ড দেন আরেক সম্রাট আওরঙ্গজেব। বলা প্রাসঙ্গিক, ধর্মের ইতিহাসে ত্যাগ বাহাদুরই একমাত্র প্রচারক, যে ভিন্নধর্মের অধিকার আদায়ে শহিদ।

ত্যাগ বাহাদুরের ত্যাগ শিখধর্মকে নতুন করে জেগে উঠার শক্তি দিয়েছে; Image Source: Dailysikhupdates.com

পিতার মৃত্যুর পর তার ইচ্ছা অনুসারেই মাত্র নয় বছর বয়সে গুরুর আসনে বসেন গোবিন্দ সিং (১৬৬৬-১৭০৮)। বয়সে কম হলেও তার নেয়া পদক্ষেপগুলোই শিখ বিশ্বাসকে মহিরুহে পরিণত করে। তিনি একাধারে শিখেন সংস্কৃত, হিন্দি, পাঞ্জাবি এবং ফারসি; অন্যদিকে রপ্ত করেন ঘোড়ায় চড়া এবং বন্দুক চালনা। পড়াশোনা করেন নানকের বোধিপ্রাপ্তি থেকে তার পিতার মৃত্যুদণ্ড অব্দি শিখদের সংগ্রাম নিয়ে। দাদা হরগোবিন্দের মতো হাতে তুলে নেন তলোয়ার। পরিবর্তন আসলো শিখ সম্প্রদায়ের সাধারণ বৈশিষ্ট্যেও। শাসকের নিপীড়ন থেকে অসহায় এবং সাধারণকে রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠা করলেন বিশেষ বাহিনী খালসা। চলতে থাকে সশস্ত্র সংগ্রাম। ততদিনে সকল গুরুর আপ্তবাক্য নিয়ে সুসংগঠিত করা হয়েছে গ্রন্থ সাহিব। গুরু গোবিন্দ মানুষ গুরু পর্বের সমাপ্তি টেনে পরবর্তী গুরু হিসাবে গ্রন্থ সাহিবকে নিযুক্ত করলেন। 

গ্রন্থসাহিব

বিশ্বের ধর্মগ্রন্থগুলোর মধ্যে গ্রন্থসাহিব অনেক দিক দিয়েই আলাদা। কোনো ধর্মীয় প্রধান পুরুষের মতোই এই গ্রন্থ শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে শিখদের অমর গুরুর ভূমিকা পালন করছে। তাছাড়া গ্রন্থসাহিবই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ; যার ভেতরে অন্য ধর্মের মানুষের লেখাও স্থান পেয়েছে। শিখরা মূর্তিপুজা করে না; কিন্তু গ্রন্থটিকে জীবিত গুরুর ন্যায় শ্রদ্ধা করে। মানুষের আত্মিক আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে লেখাগুলি মূলত কবিতার আদলে। লেখাগুলো কেবল পাঠ করা হয় না; কীর্তন হিসাবে সমাবেত কন্ঠে গাওয়া হয়। গ্রন্থসাহিবের থাকার স্থান হিসাবেই শিখ উপসনালয়ের নাম গুরুদুয়ারা বা গুরুর দরজা।

পঞ্চম গুরু অর্জুন বিকৃতির হাত থেকে সত্যবাণী সুরক্ষার জন্য হাত দিয়েছিলেন লেখা সংকলনের। সেই লক্ষ্যে ভাই পিয়ারা, ভাই গুরুদাস এবং বাবা বুদ্ধেকে প্রেরণ করেছিলেন বিভিন্ন প্রান্তে পাণ্ডুলিপি অন্বেষণে। নিজেও ছোটাছুটি করেন পুরাতন গুরুদের পরিবারে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরে ১৬০৬ সালে অমৃতসরের হরমন্দিরে স্থাপন করা হয় গ্রন্থসাহিবকে। গুরু অর্জুন নিজেই তার সামনে অবনত শিরে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতেন। প্রথম থেকেই লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণভেদে সকলেই এটি পড়তে পারতো। পরবর্তীতে নানা টানাপোড়েন পার হয়ে গুরু গোবিন্দ ১৭০৫ সালে এর সংকলন সমাপ্তি করেন। তখন তার নিজের বয়সও শেষের দিকে। তাই অন্য এক সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। নতুন কাউকে গুরু নিযুক্ত না করে গ্রন্থসাহিবকেই পরবর্তী চিরন্তন গুরু বলে নিযুক্ত করলেন ১৭০৮ সালে।

গ্রন্থসাহিব কেবল ধর্মগ্রন্থ না, চিরন্তন গুরু; Image Source: khalsaforce.in

গ্রন্থসাহিবের বিবরণ ধারাবাহিক। গুরুদের স্তোত্রের পরে আছে ভগত বা সাধুদের লেখা। যেখানে গুরু নানকের ৯৭৪টি স্তোত্র, অঙ্গদের ৬২ শ্লোক, অমর দাসের ৯০৭ স্তোত্র, রাম দাসের ৬৭৯ স্তোত্র, অর্জুনের ২২১৮ স্তোত্র, ত্যাগ বাহাদুরের ৫৯ স্তোত্র এবং গুরু গোবিন্দের ১টি শ্লোক। ভগত বা সাধুরা ছিল নানা বিশ্বাসের। তাদের মধ্যে শেখ ফরিদ এবং শেখ ভিখান ছিলেন মুসলমান, কবির ছিলেন ব্রাহ্মণ বংশে জন্ম নিয়ে মুসলিম ঘরে বেড়ে উঠা, জয়দেব বিখ্যাত সংস্কৃত কবি, রামানন্দ, পরমানন্দ, রবিদাসসহ অনেকেই হিন্দু সাধু। সম্মিলনের এই বৈচিত্র্য গ্রন্থকে অন্য অনেক গ্রন্থ থেকে আলাদা করেছে।

সংস্কৃতি

১৬৯৯ সালের প্রথম প্রহরে উৎসবে যোগদানের জন্য অনুসারীদের জন্য বিশেষ বার্তা পাঠান গুরু গোবিন্দ সিং। নিষেধ করেন চুল ও দাড়ি কাটার জন্য। নির্ধারিত দিনে প্রচুর মানুষের সমাগম হলো। গুরু খাপ থেকে তরবারি বের করে পাঁচজন ব্যক্তির জীবন চাইলেন। কিছুক্ষণ দ্বিধাগ্রস্থ থাকার পর রাজি হলো এক ব্যক্তি। তাকে নিয়ে তাঁবুতে প্রবেশ করলেন গুরু। বের হলেন রক্ত মাখা তরবারি হাতে। এভাবে পঞ্চম শিকার নিয়ে তাঁবুর ভেতরে ঢুকে বের হবার সময় পাঁচজনকেই সাথে নিয়ে বেরিয়ে আসেন। জনসম্মুখে ঘোষণা দিয়ে তাদেরকে খ্যাত করেন পাঞ্জপিয়ারে বা পছন্দের পাঁচ ব্যক্তি নামে। পরবর্তীতে তারাই পরিণত হন শিখ সম্প্রদায়ের মনোযোগের কেন্দ্র; খালসা বা বিশুদ্ধ নামে।

খালসার দীক্ষা পুনর্জন্মকেই চিহ্নিত করে। গুরু গোবিন্দ পরিষ্কার পানিতে কিছুটা চিনি দিলেন। মেশালেন দুই প্রান্ত বিশিষ্ট খঞ্জরের সাহায্যে। দীক্ষিত করলেন মন্ত্রের মাধ্যমে। পুরুষদের নাম পরিবর্তন করে তার শেষ সিং পদবি লাগিয়ে দেয়া হলো। পরবর্তীতে নারীদের দেয়া হতো কৌর উপাধি। দীক্ষার মধ্য দিয়ে পূর্ববর্তী পেশা (ক্রীতনাশ), সম্পর্ক (কুলনাশ), প্রাথমিক ধর্ম (ধর্মনাশ) এবং শিখ পরিপন্থী আচার (কর্মনাশ) ছেড়ে দিতে হয়।

খালসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গুরু গোবিন্দ সিং শিখদের নতুন পরিচয় ও রূপ প্রদান করেন; Image Source: sikhcouncil.co.uk

খালসাদের জন্য পাঁচটা প্রতীক চিহ্নিত হয়। কেশ, কঙ্ঘ, কাচ, কড়া এবং কিরপান। কেশ বা চুল-দাড়ি কাটা যাবে না। পরিপাটি রাখার জন্য চুলে একটা কঙ্ঘ বা চিরুনি বহন করতে হবে। সেই সময়ের যোদ্ধাদের মতো হাঁটু অব্দি লম্বা প্যান্ট বা কাচ পরতে হবে। ডান কব্জিতে একটা লোহার ব্রেসলেট বা কড়া ধারণ করতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য সর্বদা একটা তলোয়ার বা কিরপান বহন করতে হবে। এই পাঁচটা প্রতীকের বাইরেও আরো চারটি নিয়ম বা রাহাত আছে। কখনোই চুল কাটা যাবে না (আগের আইনের পরিসর বৃদ্ধি), মদ্যপান করা যাবে না, শুধু ঝটকা মাংস বা যেখানে এক কোপে প্রাণী বধ করা হয়, তা খেতে হবে এবং কোন মুসলমান ব্যক্তিকে নিপীড়ন করা যাবে না। বর্তমানে বহুল পরিচিত শিখ পাগড়ির জন্ম আসলে ধর্মীয় মৌলিক আদেশ থেকে না; চুলের সুরক্ষার জন্য পরবর্তীতে উদ্ভাবিত। যাহোক, গুরু গোবিন্দ পাঁচ জনকে দীক্ষিত করে বলে দিলেন ভ্রাতৃসম্প্রদায়ের দীক্ষা দিতে। এভাবে ছড়িয়ে পড়লো শপথ।

ওয়াহে গুরু জি কা খালসা
ওয়াহে গুরু জি কা ফাতেহ;
অর্থাৎ খালসারা ঈশ্বরের পছন্দের; আমাদের ঈশ্বরের জয় হোক।

তারপর

ভারতে শিখ ধর্মের অনুসারী প্রায় বিশ মিলিয়ন, যা মোট জনসংখ্যার ২% এর মতো। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী শিখ নাগরিকের ৮০ শতাংশ কেবল পাঞ্জাবেই থাকে। সেই সময়ে পাঞ্জাবের নাগরিকদের ৬৩ শতাংশ ছিল শিখ। ২০০১ সালের হিসাবে অনুসারে যুক্তরাজ্যে ৩৩৬০০০ মানুষ শিখ ধর্মের অনুসারী; যা মোট জনসংখ্যার ০.০৬%। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের অবস্থান বেশ পোক্ত। তবে পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রায়ই শিখদের মুসলিম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ইসলামবিদ্বেষের বলির পাঠা হচ্ছে শিখরা; তার কারণ শিখ সম্পর্কে নিয়ে ধারণার কমতি।

 ঢাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক গুরুদুয়ারা নানকশাহী; Image Source: worldgurudwaras

হিন্দুধর্ম ও ইসলামের দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের মিলনবিন্দুতে জন্ম নিয়েছে শিখধর্ম। স্রষ্টার সামনে মানুষকে হাজির করেছে নতুন শক্তি দিয়ে। ষোড়শ শতকের দিকে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র এবং লিঙ্গের সমতা নিয়ে কথা বলা কম আশ্চর্যের না। শুরুতে আধ্যাত্মিকতা নিয়ে যাত্রা হলেও পরপর গুরুদের হত্যাকাণ্ড তাদেরকে সামরিক কৌশলী করে তোলে। মুঘল যুগের সমাপ্তির দিকে পাঞ্জাবকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয় শিখ রাজ্য। খালিস্তান আন্দোলনের কথা কে না জানে! বর্তমান ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিংহভাগ সদস্যই শিখ। বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের ঠিক পশ্চিম পাশে অবস্থিত শিখধর্মাবলম্বীদের গুরুদুয়ারা। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার এখানে সকল ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গের অভ্যাগতরা আহার করতে পারেন। 

 

২৫


কুভাগাম উৎসব: দক্ষিণ ভারতের তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের এক মহোৎসব

Pieu Nandy

শিল্প-সংস্কৃতিডিসেম্বর 29, 2020

article

তামিলনাড়ুর ভিল্লাপুরাম জেলার উলুন্দুপেত্তাই তালুকের এক শান্ত ও নিরিবিলি গ্রামের নাম কুভাগাম। চেন্নাই শহর থেকে প্রায় একশ নব্বই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই কুভাগাম গ্রামে প্রতি বছর তামিল পঞ্জিকার চিত্তিরাই মাসে অর্থাৎ এপ্রিল মাসের মাঝ বরাবর হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে কুভাগামে। আঠারো দিন ধরে চলে গ্রামের দেবতা কুথান্ডাভার বা আরভানের উদ্দেশ্যে পালিত কুভাগাম উৎসব। এই উৎসবে প্রধানত যোগদান করেন তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা। ভারত তথা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে এই কুভাগাম উৎসবই হলো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য অনুষ্ঠিত সবচেয়ে বড় উৎসব।

এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয় দেবতা আরাভান বা ইরাবানের মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে আত্মবলিদানের এক মহান গাথাকে সম্মান জানিয়ে। মূল সংস্কৃত মহাভারতে এই ঘটনার সেভাবে উল্লেখ না থাকলেও নবম শতকের তামিল সাহিত্যিক পেরুন্তেভানার লেখা মহাভারতের তামিল সংস্করণে এই ঘটনার সুবিস্তৃত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এছাড়া দাক্ষিণাত্যের মানুষের মুখে মুখে আরাভানের বীরত্ব ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের কাহিনী প্রচলিত।

কুভাগামে আরভানের শোভা যাত্রা; Image source: tripoto.com

এই ইরাবান বা আরাভান ছিলেন মহাভারতের অন্যতম সেরা চরিত্র মধ্যম পাণ্ডব অর্জুনের পুত্র। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠির এবং দ্রৌপদীর একান্ত নিভৃত মুহূর্তে বিনা অনুতিতে কক্ষে প্রবেশ করার কারণে অর্জুনকে দ্বাদশ বর্ষের জন্য ব্রহ্মচর্য পালনপূর্বক পাণ্ডবদের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ পরিত্যাগ করে তীর্থ ভ্রমণে যেতে হয়। ভ্রমণ করতে করতে অর্জুন এসে পৌঁছান ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের নাগ রাজ্যে। এখানেই তিনি বিয়ে করেন নাগরাজ কৌরভ্য নাগের কন্যা উলুপীকে। নাগরাজ কন্যা উলুপী ও বীর অর্জুনের পুত্র আরভান একজন নির্ভীক এবং দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হওয়ার পাশাপাশি অত্যন্ত নীতিপরায়ণ ও নিঃস্বার্থ প্রকৃতির।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন তাঁর পুত্রদের আহ্বান করলেন পাণ্ডব পক্ষে যোগদান করার জন্য। আরাভান পিতার ডাকে এসে পৌঁছালেন কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে। কৌরব-পাণ্ডব দুই পক্ষেরই যুদ্ধের প্রস্তুতি তুঙ্গে। সময় একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিল। যুদ্ধের পূর্বে দেবী আদিপরাশক্তির উপাসনা করে দেবীকে তুষ্ট করে যুদ্ধে জয় নিশ্চিন্ত করার জন্য প্রয়োজন ‘কালাপল্লি’ বা নরবলির। যুদ্ধে যে পক্ষ তার সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধাকে দেবীর কাছে নিবেদন করবে সেই পক্ষের যুদ্ধে জয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সেই যোদ্ধার শরীরে বত্রিশটি দৈব লক্ষণ থাকা অবশ্য প্রয়োজন।

পাণ্ডব পক্ষে কেবলমাত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুন এবং আরাভানের দেহেই সেই দৈব লক্ষণ বর্তমান। আরাভান এবার নিজেই এগিয়ে এলেন। সকলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেবীর উদ্দেশ্যে বলিপ্রদত্ত রূপে ঘোষণা করলেন। কিন্তু তার পূর্বে আরভান তিনটি শর্ত রাখলেন। প্রথমত, তিনি যেন যুদ্ধে বীর যোদ্ধার মতো সম্মানজনক মৃত্যু লাভ করেন, দ্বিতীয়ত, তিনি মৃত্যুর পরেও যেন যুদ্ধ চাক্ষুষ করতে পারেন, এবং তৃতীয়ত, যেহেতু আরাভান অবিবাহিত ছিলেন তাই মৃত্যুর পূর্বে তাঁর কৌমার্য পরিত্যাগ করতে চান। এই তৃতীয় শর্তের ওপরে ভিত্তি করেই বর্তমানে কুভাগাম উৎসবটি পালন করা হয়।

প্রথম দুটি শর্ত সহজেই মেনে নেওয়া হলো, কিন্তু তৃতীয় শর্ত পালন করতে গিয়ে একটা সমস্যা দেখা দিল। বিবাহের পরদিনই স্বামীর মৃত্যু নিশ্চিত এমন কাউকে কোনো মেয়েই পতিরূপে বরণ করতে রাজি হলো না। শেষ পর্যন্ত শ্রী কৃষ্ণ তাঁর নারীবেশ মোহিনী রূপ ধারণ করলেন এবং আরভানকে বিয়ে করে রাত্রিযাপন করলেন। পরদিন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অষ্টম দিনে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে অলম্বুস নামক এক রাক্ষসের হাতে আরাভানের মৃত্যু হয়। আরাভানের শোকে মোহিনীরূপী শ্রী কৃষ্ণ তাঁর বিবাহের চিহ্ন মুছে ফেলে আকুল হয়ে ক্রন্দন করতে করতে বিধবার পোশাক পরিধান করেন। এরপরে আরাভানের কর্তিত মস্তক একটি বড় বর্শার ফলায় গেঁথে যুদ্ধক্ষেত্রে রাখা হয় যাতে তিনি তাঁর ইচ্ছানুসারে সমস্ত যুদ্ধের দৃশ্য দেখতে পারেন। এই কারণেই আরাভানের মন্দিরে কেবলমাত্র তাঁর কর্তিত মস্তকই পূজিত হয়।

আরাভানের কাষ্ঠনির্মিত মস্তক; Image source: holidify.com

প্রতি বছর তামিল চিত্তারাই মাসে আরাভানের আত্মবলিদান, শ্রী কৃষ্ণের মোহিনী বেশে তাঁর মৃত্যুতে ক্রন্দন ও বৈধব্য পালন এই পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুথান্ডাভার বা আরাভানের উপাসনা করা হয় এবং হিজড়া সম্প্রদায়ের মহিলারা এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। কারন তাঁরা মনে করেন হিজড়া জনগোষ্ঠীর আদি দেবতা আরাভান এবং তাঁরা মোহিনী ও আরাভানের সন্তান। তাই তাঁরা নিজেদের ‘আরাভানিয়ান’ বলেও পরিচয় দেন।

কুভগাম গ্রামের আরাভানের মন্দির ঘিরে আঠারো দিনব্যাপী এক বর্ণাঢ্য উৎসবের আয়োজন করা হয়। শুধুমাত্র ভারত নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয় লিঙ্গ সম্প্রদায়ের মানুষেরা এসে কুভগামে এসে জড়ো হন। প্রতিদিন স্থানীয় নাচ, গান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বর্তমানে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা নানা ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালায়। এছাড়া একটি বাৎসরিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ‘মিস কুভাগম’ আয়োজন করা হয় যেখানে শুধুমাত্র বৃহন্নলা নারীরা অংশগ্রহণ করেন। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য আয়োজিত এই অভিনব উদ্যোগ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে। প্রথম ষোল দিন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পরে সতেরতম দিনে শুরু হয় আসল উৎসব।

নববধূর বেশে হিজড়া মহিলারা; Image source: newindiaexpress.com

এই দিন হিজড়া সম্প্রদায়ের মহিলারা নববধূর মতো শৃঙ্গার করেন। বিবাহের চিহ্নস্বরূপ মাথায় ‘গজরা’ বা ফুলের মালা জড়ান এবং গলায় ‘থালি ‘ বা মঙ্গলসূত্র পরেন, হাতে পরেন কাচের চুড়ি এবং সিঁথিতে সিঁদুর লাগান। এভাবে তাঁরা ভগবান আরাভানের নবপরিণীতা বধূ হিসেবে নিজেদের দেবতার চরণে সমর্পন করেন। এদিন রাতভর স্থানীয় ভাষায় নাচ, গান করে বিয়ের অনুষ্ঠানকে উপভোগ করা হয়। পরদিন মন্দির থেকে আরাভানের প্রতীক কাষ্ঠনির্মিত মস্তক নিয়ে এক শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। লাখ লাখ মানুষ এই শোভাযাত্রায় অংশ নেন। আরাভানকে অনেক ফুলের মালা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এরপর যে মহিলারা আরাভানের নববধূ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন তারা শোকপালন শুরু করেন। মন্দিরের পুরোহিত তাদের গলায় বাধা মঙ্গলসূত্র ছিড়ে দেন এবং হাতের চুড়ি ভেঙে দিয়ে সিঁদুর মুছে দেন। তারপরে বুক চাপড়ে উচ্চস্বরে বিলাপ করতে করতে আরাভানের অকালমৃত্যুতে শোক প্রকাশ করতে থাকেন।

এ সময় আরাভানের মৃত্যুর প্রতীকস্বরূপ তাঁর গলায় ঝুলতে থাকা ফুলের মালাও টেনে টেনে ছিড়ে ফেলা হয়। এরপরে রঙিন শাড়ি ছেড়ে স্নান করে বৈধব্যের শুভ্র বেশ ধারণ করেন। এভাবেই অষ্টাদশ দিবসব্যাপী উৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই বৈধব্য সাজ তারা মাসখানেক পালন করেন। তারপর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান।

আরাভানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ চলছে; Image source: Holidify.com

যুগ যুগ ধরে হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা ভারতীয় সমাজে অবহেলিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত হয়ে চলেছে। ট্রেনে, বাসে রাস্তায় বৃহন্নলাদের দেখে বিরক্তিতে মুখ বেঁকে যায় অনেকেরই। দীর্ঘ কয়েক দশকের কঠিন লড়াই শেষে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি পেলেও সমাজের চোখে আজও তারা ব্রাত্য। হিন্দু ধর্মে একসময় যাঁদের অর্ধনারীশ্বর বা ভগবান শিব এবং আদি শক্তি মহামায়ার এক সম্মিলিত রূপ হিসেবে পূজা করা হত, সম্মান করা হত স্বয়ং শিব ও শক্তির আশীর্বাদধন্য কিন্নর সম্প্রদায় হিসেবে, সেই মানুষগুলো আজ সমাজের এককোণে অবহেলায় পড়ে থাকে।

কুভাগম উৎসব যেন এই সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে এই প্রান্তিক মানুষগুলোরও নিজেদের মতো করে সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। উৎসবের এই দিনগুলোতে তারা নিজেদের মতো করে অনেক আনন্দ করে। নাচ, গান, হইহুল্লোড় করে তাদের অপমানজনক জীবনের গ্লানি কিছুটা হলেও ভোলার চেষ্টা করে।

মিস কুভাগাম প্রতিযোগিতার বিজয়ীরা; Image source: newindiaexpress.com

তারা নিজেদের স্বয়ং শ্রী কৃষ্ণের মোহিনী অবতারের অংশ বলে গণ্য করেন এবং দেবতা আরাভানকে বিয়ে করে সেই স্বীকৃতি লাভেরই চেষ্টা করেন। এই উৎসবকে ঘিরে আঠারো দিন ধরে যেসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় তার মধ্যে সাম্প্রতিকতম সংযোজন হলো শুধুমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার আয়োজন।২০০০ সাল থেকে এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয় এবং প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানাধিকারীদের পুরস্কৃত করা হয়। এভাবেই বোধহয় সমাজের পদদলিত এই মানুষগুলো একদিনের জন্য হলেও নিজেদের দৈনন্দিন সমস্ত দুঃখ, সমস্ত অপমান ভুলে জীবনের আনন্দের স্বাদ উপভোগ করেন; একরাতের জন্য হলেও বিয়ের সুখ অনুভব করতে পারেন যে সুখ থেকে তারা চিরকালই বঞ্চিত।

এই কুভাগাম উৎসব যেন এই গতানুগতিক সমাজকে হিজড়াদের এক অন্যরকম দৃষ্টিতে দেখার চোখ খুলে দেয়। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদেরকে তাদের ব্যক্তিগত যৌন পরিচয় বাদ দিয়ে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে স্বীকার করা এবং সর্বোপরি তাদের মানবিক অনুভূতিগুলোকে সম্মান জানানো যে প্রয়োজন, তা যেন সমাজের জীর্ণ ধ্যানধারণার গালে এক সপাটে থাপ্পর মেরে বুঝিয়ে দেয়।


২৬


ডিংকা: দক্ষিণ সুদানের সর্ববৃহৎ জাতিগোষ্ঠী

Wazedur Rahman Wazed

শিল্প-সংস্কৃতিঅক্টোবর 21, 2020

article

ডিংকা; সুদানের অন্যতম বৃহৎ নৃগোষ্ঠী। হাজার বছর আগে মিশরীয়, পরবর্তীতে গ্রীক পরিব্রাজক এবং তারও পরে ভূগোলবিদদের মাধ্যমে ডিংকাদের পরিচিতি পেয়েছিল বিশ্ববাসী। তারা মূলত নাইলোটিক সংস্কৃতির অন্তর্ভূক্ত। যাদের সবাই-ই বর্তমানে দক্ষিণ সুদানে বসবাস করে। নাইলোটিক বলতে বোঝায় নীল নদ অঞ্চলের অধিবাসীদের। 

ডিংকা শব্দটা মূলত বহিরাগতদের আবিষ্কার। তবে এই শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য নেই। তাদেরকে ডিংকা নামে ডাকা হলেও তারা নিজেদেরকে মুয়োঞ্জ্যাং বা জিয়েং নামে অভিহিত করে থাকে। গুটিকয়েক শিক্ষিত ডিংকাই জানে তাদেরকে এই নামে অভিহিত করা হয়। 

একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এক আদমশুমারিতে প্রায় ৪৫ লাখ ডিংকার সন্ধান পাওয়া যায়। তারা এক হাজার থেকে শুরু করে ত্রিশ হাজার অবধি ব্যক্তির সমন্বয়ে স্বতন্ত্র দল বা গোত্র গঠন করে। এই দল বা গোত্রগুলো আঞ্চলিক, ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিক গুচ্ছের ভিত্তিতে সংগঠিত; যেগুলোর মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত হচ্ছে অ্যাগার, আলিয়াব, বোর, রেক, টুইক (টিউইক, টিউ) এবং ম্যালুয়াল। 

গাভীর ওলান থেকে সরাসরি দুগ্ধ পান করছে এক ডিংকা রাখাল; Photos by Stefanie Glinski/AFP/Getty Images

প্রতিটি দল বা গোত্রই ছোট আকারে রাজনৈতিক শ্রেণিতে বিভক্ত। বিশাল অঞ্চল জুড়ে থাকা ডিংকাদের বিভিন্ন উপভাষা আর বিভিন্ন বৈচিত্র্যে স্বাতন্ত্র্য থাকলেও, শত্রুদের আগমনে তারা ঐক্যবদ্ধ হতে সময় নেয় না। 

ডিংকারা মূলত ট্রান্সহিউম্যান্ট পাস্টোলরিস্ট; বাংলায় বললে বলা যায় ঋতুভেদে দেশান্তরি। ঠিক দেশান্তরিও না অনেকটা যাযাবর ধরনের, তবে নির্দিষ্ট জায়গার ক্ষেত্রে। আরেকটু খুলে বলা যাক। শুকনো মৌসুমে (ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল) নিজেদের স্থায়ী আবাস ছেড়ে বা উঁচু ভূমি ছেড়ে নদী তীরবর্তী চারণভূমিতে নিয়ে যায় গবাদি পশুর পালকে। শুকনো মৌসুমের বলতে গেলে পুরোটা সময় সেখানেই কাটায় তারা, গবাদিপশুর পাল সমেত। 

ডিংকাদের ঐতিহাসিক অস্ত্র বর্শা হাতে এক ডিংকা বালক; Photos by Stefanie Glinski/AFP/Getty Images

আবার অনেক ক্ষেত্রে যদি স্থায়ী আবাস নদী তীরবর্তী হয় তাহলে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করে গবাদি পশুর পালকে নিয়ে। বর্ষা আসার পূর্বেই তারা পুনরায় ফিরে আসে নিজেদের স্থায়ী আবাসস্থলে, বৃক্ষহীন তৃণভূমিতে বা উঁচুভূমিতে। ইতিমধ্যেই তাদের রোপণ করা প্রধান খাদ্যশস্য ভুট্টা খাওয়ার উপযুক্ত হয়ে গেছে। যেজন্য বর্ষার দিনে তাদেরকে খাদ্যের আশায় আর ঘুরে বেড়াতে হয় না। 

ডিংকারা একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। দেবতা নিহালই মূলত জন্ম আর মৃত্যুসহ সকল কিছুর স্রষ্টা। তারা এটাও বিশ্বাস করে যে, দেবতা নিহাল এবং তাদের পূর্বপুরুষদের আত্মারা তাদের প্রাত্যহিক জীবনযাপনে বেশ অন্তরঙ্গভাবে জড়িয়ে আছে। আর তাদের জীবনে অনেকটাই কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। এমনকি তাদের কাছে মিথ্যা থেকে খুন, এসব পাপাচারও ঐশ্বরিক বলিসংক্রান্ত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়। 

বর্তমানে ডিংকারা আধুনিক অস্ত্রও ব্যবহার করে থাকে, তারই প্রমাণ; Photos by Stefanie Glinski/AFP/Getty Images

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলো বিয়ে, জন্ম, মৃত্যু এবং সংকটকালীন সময়েই পালন হয়ে থাকে। গান আর নৃত্য হচ্ছে ডিংকাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যুদ্ধের গান থেকে শুরু করে জন্ম, মৃত্যু এবং এমনকি ঈশ্বরকে স্মরণ করার গানও তাদের রয়েছে। ডিংকাদের একটি নিত্যদিনের গানকে অনুবাদ করে দেয়া হলো- 

হে স্রষ্টা,
স্রষ্টা যিনি আমাকে মাতৃগর্ভে সৃষ্টি করেছেন
আমাকে খারাপ কিছুর সম্মুখীন করেননি
গবাদি পশুর স্থান দেখিয়েছেন আমায়
যাতে আমি আমার ফসল ফলাতে পারি
আর আমার পশুপালকে রক্ষণাবেক্ষণ করি। 

গান আর নৃত্য ডিংকাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; Photos by Stefanie Glinski/AFP/Getty Images

ডিংকাদের বয়ঃসন্ধিকাল উত্তীর্ণের সময়কে অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে স্মরণীয় করে রাখা হয়। আবার একইসঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এটা সংকেত হিসেবে দেখানো হয় যে তাদেরও সময় হয়ে আসছে। তাদের নিত্যদিনের জীবনে যে প্রাণীটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত সেটি হচ্ছে তাদের গবাদি পশু। যখন কোনো বালক প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে, তখন তাকে আর তার জন্মগত নামে ডাকা হয় না। বরং তাদের পছন্দসই এবং বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন গবাদি পশুর নামকরণ গ্রহণ করতে হয়। শুধু গবাদি পশুই না; বরং তার নিজের গুণ হিসেবেও নামকরণ করা হয়ে থাকে।

যেমন- থিসডেং, যার মানে হচ্ছে দেবতাদের ক্লাব; কিংবা আচিনবাই, যার অর্থ যে কখনো তার পশুর পালকে পেছনে ফেলে যায় না। আবার বাচ্চাদের নামকরণ হয় ওদের জন্মের মুহূর্তের উপর নির্ভর করে। যেমন- কোনো বাচ্চার নাম যদি হয় কিউরেক; এর মানে হচ্ছে বনের মধ্যে চলার পথে জন্ম নেয়া কেউ। কিংবা আমৌম নামে বুঝায় তাকেই যে কিনা তার মৃত ভাইদের মধ্যে বেঁচে গেছে। আবার আয়ুমপিও বলতে বোঝায় এমন একজন যে হৃদয়কে শীতল করে। 


২৭


বাংলার হারিয়ে যাওয়া মেয়েলি ব্রতানুষ্ঠান: মাঘব্রত ও সূর্যব্রত

Monjori Bhattacharjee

শিল্প-সংস্কৃতিজানুয়ারি 10, 2021

article

এপার বাংলা-ওপার বাংলার বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে যে বঙ্গীয় সংস্কৃতি ব্যাপৃত হয়ে আছে, কোনো কাঁটাতারের বেড়া কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে যাকে দ্বিখণ্ডিত করা যায়নি আজও, সেই বাংলার কোল জুড়ে ছেয়ে আছে হাজার হাজার মেয়েলি ব্রতানুষ্ঠান, উৎসব-পার্বণ আর মেলার ইতিহাস। ইতিহাস এ কারণে, বারবার বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর ওপর সুপরিকল্পিত ঐতিহাসিক টানাহ্যাঁচড়ায় যেভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়েছে গোটা বাঙালি সমাজ; সে বিভাজনের ফলস্বরূপ আমরা হারিয়েছি সমাজজীবনে প্রতিপালিত এমন হাজারো ব্রত-অনুষ্ঠান, যার অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনা আজও আমাদের সম্প্রীতির নতুন পাঠ শেখায়। কালক্রমে সমাজজীবন থেকে দ্রুত বিলুপ্ত হতে হতে আজ বিচ্ছিন্নতার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সেরকমই দুটি মেয়েলি ব্রত– মাঘমণ্ডলব্রত এবং সূর্যব্রত।  

একদিন নিজের অজ্ঞাতেই আদিম নারীরা যখন আবিষ্কার করেছিলেন ফসল উৎপাদনের গোপন কৌশল, কৃষিসভ্যতার পদধ্বনি শোনা গিয়েছিল সেই প্রথম। শস্যের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ক্রমেই এখতিয়ারভুক্ত হয়েছিল কিছু ঐন্দ্রজালিক ধর্মাচার, যেখানে নারীর ভূমিকা ছিল মুখ্য। পৃথিবীর বিভিন্ন আদিম জাতির মধ্যেই নানারকম জাদুভিত্তিক ক্রিয়াকর্মের সঙ্গে সূর্য-উপাসনা লক্ষ্য করা যায়। আদিম সমাজ যথার্থই মনে করত, নারীর সন্তান ধারণের ক্ষমতা ও শস্য উৎপাদনের ক্ষমতা আসলে একই ধরনের গুণের বহিঃপ্রকাশ। আর তাই আদিম সূর্যদেবতার সঙ্গে কুমারী নারীর সম্পর্কই লক্ষ্য করা যায় বেশি। একসময় শ্রীহট্ট-কাছাড়ে বাঙালি হিন্দু-কুমারী মেয়েদের অবশ্য পালনীয় ব্রত ছিল মাঘব্রত বা মাঘমণ্ডল ব্রত। সিলেট-কাছাড় ছাড়াও ঢাকা, কুমিল্লা, বিক্রমপুর অঞ্চলেও ব্রতটির প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। ব্রতটি যে সময়ে উদযাপিত হত, সেই সময়টিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তখন থেকেই সূর্যের উত্তরায়ণ আরম্ভ হয় এবং তা মূলত পৃথিবীর বহু আদিমজাতির সূর্যোৎসবের অন্যতম সময় ।

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে মাঘমণ্ডল ব্রতের দুই ব্রতিনী; Image Source: Author’s Personal Collection 

পাঁচ বছর বয়স থেকে শুরু করে ঋতুমতী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নানা কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে ব্রতটি সম্পন্ন করেন একজন বালিকা। স্বাভাবিকভাবে মনে হতেই পারে, মাঘমাসের প্রচণ্ড শীতে ভোরের অন্ধকার কুয়াশায় একাটি দুগ্ধপোষ্য বালিকাকে দিয়ে এমন একটি ব্রত উদযাপনের আড়ালে কোন সামাজিক কারণ লুকিয়ে থাকতে পারে! কিন্তু আজ যখন দেখি দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিশুর দৈহিক-মানসিক বিকাশের জন্য শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার, ছড়া মুখস্থ বলা কিংবা রঙ্গোলি প্রতিযোগিতা প্রভৃতি আধুনিক পাঠ্যক্রমের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে, তখন কেবলই মনে হয় কত যুগ ধরে আমাদের গ্রামীণ সমাজ লৌকিক ব্রতগুলোর ভেতর দিয়ে এভাবেই একজন মানুষকে ভবিষ্যতের সুশৃঙ্খল, কঠোর পরিশ্রমী, স্বাবলম্বী পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার পাঠ শিখিয়ে এসেছে, যা এক সামাজিক দায়বদ্ধতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ব্রতটির নামকরণ থেকেই বোঝা যায়, এর সঙ্গে এক অদ্ভুত শিল্পক্রিয়া জড়িত। মণ্ডল শিল্পকলা। মুক্ত আঙিনায় যেখানে ব্রতটি করা হবে, সেখানে মাটি দিয়ে একটি স্বতন্ত্র মাটির ভিটি বা ভিত্তি তৈরি করা হয়। এ ভিটিতেই রঙিন ইটের গুঁড়ো, নানা রঙের বালি, হলুদ গুঁড়ো, শুকনো পাতার গুঁড়ো ইত্যাদি দিয়ে প্রাচীন কোনো বয়স্কা নারীর নেতৃত্বে ব্রতিনী মণ্ডলক্রিয়া করে থাকেন। এই সংগৃহীত বস্তুগুলো দিয়ে কীভাবে রঙের গুঁড়ি তৈরি করে মণ্ডল দেওয়া হবে স্বভাবতই সে নিয়ে শিশুর মনে কাজ করে একরকম রোমাঞ্চ ও আনন্দ।

মাঘমণ্ডল ব্রতে মণ্ডলক্রিয়ায় ব্রতিনীকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার ঠাকুমা; Image Source: Author’s Personal Collection 

শ্রীহট্ট-কাছাড়ে আল্পনা থেকে বেশি জনপ্রিয় ছিল এ মণ্ডলক্রিয়া। এ জনপ্রিয়তার একমাত্র কারণ হলো, প্রাচীন জাদুবিশ্বাসজনিত আদিম ধর্মীয় সংস্কার। কিছু বিশেষ বিশেষ চিহ্ন বা প্রতীক অঙ্কন করলে তারই অনুরূপ বিশেষ ধরনের কামনা-বাসনা পরিপূর্ণ হবে- এ ধারণা থেকেই মণ্ডলকর্মের উদ্ভব। ‘মাঘমণ্ডল ব্রত’টিও তার ব্যতিক্রম নয়। রঙের গুঁড়ি দিয়ে নানারকম লতাপাতার নকশা তৈরি করতে করতে সূক্ষ্ণ শিল্পকর্মের সঙ্গে শিশুর মনোজগতের এক যোগসূত্র তৈরি হয়ে ওঠে সেই প্রথম।

তাছাড়া, এত ভিন্ন ভিন্ন ধরনের কুলীন-অকুলীন ফুল-লতা-পাতা সংগ্রহ করতে হয় ব্রতিনীকে যে, অনুষ্ঠানের গোটা  প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে সে শিখে নেয় প্রকৃতির নাম না জানা অসংখ্য ফুল-পাতার নাম ও তার ব্যবহার। এ ব্রতক্রিয়ায় কোনো পুরোহিতের প্রয়োজন পড়ে না, কিছু মন্ত্র আওড়াতে হয়; তবে তা বৈদিক শাস্ত্রীয় মন্ত্র নয়- দেশীয় ভাষার মিশ্রণে একধরনের ছড়া। ঘরের বয়স্কা নারী, যার সঞ্চালনায় ব্রতক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়, প্রয়োজনে তিনিই আবার তাৎক্ষণিক মন্ত্ররচনা করে দেবারও অধিকারিণী।  

মাটির ভিটিতে সাতাশ রকম প্রতীক চিহ্নে এঁকে ছড়া কেটে কেটে ফুল ধরে দেবার রীতি পালন করেন ব্রতধারিণী। সাধারণত দেখা যায়, একটি অনন্তনাগ এঁকে সুকৌশলে তার মধ্যে সাতাশটি কোঠা তৈরি করা হয় এবং সাপের লেজভাগ ও ফণাভাগ একত্রে এনে উত্তরমুখী করে গড়ে ওঠে এক বিশাল মণ্ডল। বলাই বাহুল্য, একাধিক নারীর যৌথ প্রচেষ্টাতে এই অদ্ভুত শিল্পকর্ম নান্দনিক রূপ পায়। মাটির ভিটির ওপরেই দুটি গর্ত তৈরি করে পুকুর কাটা হয়, একটি চৌকোনো, আর একটি গোলাকৃতি। দূর্বাগুচ্ছ হাতে নিয়ে কল্পিত পুকুরে জল নাড়তে নাড়তে ব্রতিনী মন্ত্রোচ্চারণ করেন।

এরপর সাতাশ রকম অঙ্কিত মণ্ডলচিহ্নের ওপর তিনি ফুল নিবেদন করেন সূর্যদেবতার উদ্দেশে। এই সাতাশ রকম অঙ্কিত  চিহ্নগুলো হলো চাঁদ, সূর্য, পৃথিবী, সিংহাসন, কবলীর গোবর, থালা-ভাত, ভিঙ্গার পানি, তিনকোণ, সমকোণ, মাঘমণ্ডল, সোনার কুণ্ডল, বাপ রাজা, ভাই প্রজা, দোলা, আইঙ্গন-বাইঙ্গন, আটপুজি, আটেশ্বর, তিনকুণ্ডলী, তিনরাজ, সিন্দুর, শাঁখা, চিরুনি, কাজল-আলতা, শাড়ি, কলা-জিয়ারী, দেউ-দুয়ার ও স্বর্গ-দুয়ার।

                            কাঠের পিঁড়িতে অঙ্কিত অনন্তশয্যা; Image Source: Personal Collection 

অঙ্কিত এসব মণ্ডলচিহ্নের সঙ্গে মুখে বলা ছড়ার একটা অর্থ দাঁড় করানো যেতে পারে এরকম, “চন্দ্র-সূর্যের মিলনে পৃথিবী আনন্দে ভেসে উঠল, সেই আনন্দের অংশীদার হয়ে আমি সিংহাসনে বসে ব্রত করছি। কবলীর পদচিহ্ন, কবলী গোবর, থালা ভাত, ভিঙ্গার পানি চতুর্দিকে সব মাঙ্গলিক চিহ্ন, জন্মে জন্মে এয়ো থাকার প্রার্থনা। ত্রিকোণাকৃতি পৃথিবী আর সমকোণাকৃতি রাজ্য পুজে স্বামী পাব, স্বামী যেন রাজ্যেশ্বর হয়, বাবা যেন রাজা হয়, ভাই হয় প্রজা, তাদের কাছে দোলায় চড়ে আসব যাব, দুধভাত খাব, সংসারে কোনো অভাব হবে না। গুঁড়ির সিঁদুর পুজো করছি– পাই যেন চীনা সিঁদুর, গুঁড়ির চিরুণীর বদলে পাই যেন হাতির দাঁতের চিরুনি, গুঁড়ির গয়নাগাটির বদলে যেন জীবনে আসে সোনা-হিরার গয়নাগাটি।“

বাস্তবজীবনে প্রত্যেকটি দ্রব্যসামগ্রীর অনুকরণে কামনা করে এভাবে মন্ত্রোচ্চারণ করেন ব্রতিনী। একটি পালকি অংকন করা হয়; তাতে একটি কলাগাছ বাঁধা আর তার ভেতরে বসা নববধূ। ছয়জন বেহারা পালকি বহন করে নিয়ে চলেছে, যারা আসলে ষড়রিপুর ছয় প্রতীক আর ভেতরে বসা নববধূ নবজীবনের– চরৈবেতি, অর্থাৎ এগিয়ে চলাই এর মূলমন্ত্র। সবশেষে দেউদুয়ার মানে- দেবতাদের দ্বার আর স্বর্গদ্বার পুজো করছি, আমার পরিবার, গোটা সমাজজীবন যেন সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে ওঠে। ব্রতের সর্বশেষ অনুষ্ঠান ছাতাঘুরানী বা ছাতাফিরানী পর্ব। মণ্ডলক্রিয়ার উপর পূর্বমুখী হয়ে বসে একটি ছাতা অনবরত ঘোরাতে থাকেন ব্রতিনী। সেই ঘূর্ণায়মান ছাতার উপর তিল, তিসি, চিড়া-মুড়ির নাড়ু ইত্যাদি নানা ভোজ্যদ্রব্য ফেলা হয় আর সেগুলো সংগ্রহের জন্য দর্শকদের মধ্যে চলে আনন্দ-উল্লাসের ধুম।

এসব ক্রিয়া চলাকালীন সমবেত নৃত্য-গীতে বিরতি পড়ে না একেবারেই। বরং অনেকক্ষেত্রেই পেশাদার বাদ্যযন্ত্র-নৃত্যদলকে এনে উৎসবকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয়। ধনী-দরিদ্র, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষের প্রবেশকে স্বীকৃতি জানিয়ে শ্রীহট্ট-কাছাড়ের মাঘব্রত একসময় হয়ে উঠেছিল সার্বজনীন আনন্দ উৎসবের এক অনন্য নজির।   

মাটির ভিটিতে অংকিত মাঘমণ্ডল ব্রতের অপূর্ব শিল্পকর্ম; Image Source: Personal Collection 

আসলে দেখতে গেলে সমগ্র ব্রতটি শীতের কুয়াশা ভেঙে সুর্যের অভ্যুদয়ের নাট্যরূপান্তর। অন্ধকার কেটে আলোর প্রকাশ হোক সমাজজীবনে, সমস্ত বিশ্বচরাচরে– এর জন্যেই তো এত আয়োজন! এই যে সূর্যের কাছে ঐহিক বর প্রার্থনার ভেতর দিয়ে নারীর মাতৃত্বের একটা সলজ্জ প্রকাশ প্রচ্ছন্ন হয়ে  উঠতে দেখি আমরা, তাতে মনে হতেই পারে ব্রতগুলো যেন ধরে ধরে বাচ্চা মেয়েদের পাকামো শেখানোর জন্যই উদযাপিত। কিন্তু এখানে ভুলে গেলে চলবে না যে, সেসময়ের পুরুষশাসিত সমাজে গৌরীদান প্রথা ছিল অনিবার্য, অপরিপক্ব বয়স থেকে শিশুমনে গেঁথে দেওয়া হতো স্বামীর সুযোগ্যা ঘরণী হয়ে উঠতে না পারলে বিকল্প কোনো জীবনভাবনা নেই– সেখানে এক কাল্পনিক সুন্দর জীবন লাভের আকুলতাই যে উপাস্য দেবতার কাছে প্রার্থনার আকারে ফুটে উঠবে, তাতে আর আশ্চর্য কী!

তবে সবটাই কাল্পনিক সুন্দর দিয়ে গড়া নয়, এর মধ্যে রয়েছে খানিকটা প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের ভাষাও। যে পুরুষশাসিত সমাজে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে মেয়েদের অধিকার স্বীকৃত হয়নি কোনোকালেই, সেখানে এই মেয়েলি ব্রতগুলো কি সেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্বঘোষিত প্রতিবাদ নয়? যে নারীকে আমরা পরভর্তৃকারূপে দেখতে অভ্যস্ত, নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যাকে পদে পদে পুরুষের ওপর নির্ভর করা ছাড়া কোনো গতি নেই, সেই নারী ব্রতানুষ্ঠানে পুরুষের অধিকারকে করেছে নিষিদ্ধ। এমনকি কোনো পৌরোহিত্যের ব্যবস্থাও রাখা হয়নি ব্রতে, নেই কোনো সংস্কৃত মন্ত্র। মন্ত্রের স্থান নিয়েছে কতগুলো ছড়া আর কথা, যেগুলো নারীদের দ্বারাই রচিত, তাদের দ্বারাই উচ্চারিত।

কিন্তু, পুরুষের ভূমিকাকে একেবারে নাকচ করে দিয়ে যে মেয়েলি ব্রতগুলোর উদ্ভব, বিশেষ করে মাঘব্রত, তা কোনোভাবেই আত্মকেন্দ্রিকতায় পরিসমাপ্ত নয়, বরং নিজের বিচিত্র সব কামনা সফল করতে গিয়ে সে পুরুষবেষ্টিত নিজের বাপ, ভাই, স্বামী এমনকি প্রতিবেশী, গোটা সমাজের মঙ্গল, সুখ, সমৃদ্ধিই বারবার চেয়েছে তার উপাস্য দেবতার কাছে।

                          বিভিন্ন প্রতীকচিহ্নে ফুল ধরে ধরে মন্ত্র পড়ছেন ব্রতিনী; Image Source: Personal Collection 

মাঘমণ্ডল ব্রতের মতোই শ্রীহট্ট-কাছাড়ে মহিলাদের দ্বারা পালিত আরেকটি ব্রতানুষ্ঠান সূর্যব্রত বা কালাঠাকুরের ব্রত। কালাঠাকুর বা ঠাকুরব্রত নামে পরিচিত এ ব্রত হতে পারে কোনো অনার্য সমাজের ধর্মঠাকুরের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। যেকোনো বয়সের মহিলারাই এই ব্রতটি করতে পারেন। মাঘমাসের কোনো এক রবিবার উপবাস করে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত গোটা দিন দাঁড়িয়ে থেকে ব্রতিনীরা এ অনুষ্ঠান পালন করেন। প্রহরে প্রহরে জ্বলন্ত ঘিয়ের প্রদীপ হাতে নিয়ে সূর্যকে অর্ঘ্য নিবেদন করেন ব্রতিনীরা। মাঘব্রতের মতো এখানেও একটি মাটির ভিটি প্রস্তুত করে মণ্ডলক্রিয়ার সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয় নানারকম বিষয়বস্তু; যেমন- কদমগাছ, গাছের নিচে রাধা-কৃষ্ণের যুগলমূর্তি, চন্দ্র-সূর্য-পৃথিবী, নানারকম নকশা, রাধার বিভিন্ন অলংকার ইত্যাদি। তবে মাঘব্রতের মতো এই ব্রতটিকে খাঁটি মেয়েলি ব্রত বলা যাবে না। তার কারণ, এখানে দেখা যায় বিভিন্ন লৌকিক আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি কিছু বৈদিক শাস্ত্রীয় আচার পালনের রীতি। নারীদের দ্বারা পালিত এ ব্রতে পুরোহিত এসে পুজো করেন বিষ্ণু শালগ্রাম শিলা, উচ্চারিত হয় পুরোহিত কণ্ঠে সংস্কৃত মন্ত্র।

সাধারণত মেয়েলি ব্রতের পুরোহিত হন মেয়েরা নিজেরাই, কোনো ব্রাহ্মণ পুরোহিতের কোনো প্রয়োজন এতে হয় না। কিন্তু সূর্যব্রত এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী। বাংলাদেশে একসময় আর্যসভ্যতা বিস্তৃত হওয়ার আগে যে লৌকিক সূর্যপূজার অস্তিত্ব বর্তমান ছিল কৃষিসমাজে, পরবর্তীকালে ব্যাপক আর্যীকরণের ফলে সে ধারাই কতকটা বদলে গিয়ে বর্তমান আকার ধারণ করেছে। তবু বদল হতে হতে সবটাই যে হারিয়ে যায়নি তার প্রমাণ, ঘ্রাণ নিলে ভেতরে এখনও পাওয়া যায় তার আদিম সুবাস।

সূর্যব্রতে ঘিয়ের প্রদীপ হাতে নিয়ে ব্রতিনীরা। পাশে বড় করতাল বাজিয়ে কৃষ্ণলীলার গীত গাইছেন নারীরা; Image Source: Personal Collection 

সূর্যব্রতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো নারীদের দ্বারা বৃত্তাকারে অনুষ্ঠিত ধামাইল গান ও নৃত্য। পরিবার-প্রতিবেশীর বিভিন্ন বয়সের মহিলারা একত্র হয়ে শ্রীকৃষ্ণের জন্মলীলা থেকে গোষ্ঠলীলার বিভিন্ন কাহিনী নৃত্য-গীত সহকারে বড় করতাল বাজিয়ে পরিবেশন করেন। শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলার এই কাহিনি-গীতগুলোও বেশ মজাদার। গোপবালকদের সঙ্গে কৃষ্ণ গোচারণে যাবেন, কিন্তু মা যশোদার ছোট্ট কৃষ্ণকে নিয়ে চিন্তার শেষ নেই, পথে কত ভয়! মায়ের মন কিছুতেই প্রবোধ মানে না। তাই বারবার তিনি সতর্ক করে দিচ্ছেন অগ্রজ বলরাম ও দলের অন্যান্য বালকদের, তারা যেন কৃষ্ণকে চোখে না হারায়।

খুব গভীরভাবে বিষয়টা চিন্তা করলে সমাজের দুটো স্রোতধারাকে আমরা এখানে একসাথে পাশাপাশি দেখতে পাই, একটি পুরোহিত ব্রাহ্মণ্যশাসিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, আরেকটি শাস্ত্রধর্ম বহির্ভূত নারীসমাজ। যে নারীসমাজ মনে করেন, ধর্মীয় সাধনায় আরাধ্য দেবতার সঙ্গে যোগসূত্র তৈরির জন্য কোনো মধ্যপন্থা, কোনো বৈদিক মন্ত্র, কোনো ব্রাহ্মণ পুরোহিত ব্যক্তিবিশেষের উপর তারা নির্ভরশীল নন। ঘন ঘন করতাল ধ্বনির সঙ্গে মহিলাদের দ্রুত পদচারণা আর তার সঙ্গে একাধিক নারীকণ্ঠে আঞ্চলিক ভাষায় রচিত কৃষ্ণকীর্তন– সব মিলে কোথাও যেন মনে হয় পুরোহিততন্ত্রকে ছাপিয়ে ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধ সঙ্গীত’ মুখ্য হয়ে ওঠে চারপাশে। শাস্ত্রের চেয়ে গানই এখানে বড়, যে গান দিয়েই তারা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন আনুষ্ঠানিক মন্ত্র-তন্ত্রকে। শাস্ত্রের ভগবানকে নিয়ে আনুষ্ঠানিক শ্লোক চলে, কিন্তু শাস্ত্র বহির্ভূত যে ভগবান, সমস্ত উপাসনালয় ছাড়িয়ে ভক্ত হৃদয়ে যার অধিষ্ঠান– একমাত্র তার কাছেই এভাবে আনন্দ-উল্লাসে আত্মনিবেদন করা যায়। সেই গানের ভাষাও হয় একান্তই নিজস্ব, তা নাহলে সেই আহবান তার কাছে গিয়ে পৌঁছবে কী করে!  

সংস্কৃতের আবরণ ভেদ করে আত্মকণ্ঠে এভাবেই গান গেয়েছিলেন রাজস্থানের মীরাবাঈ, গেয়েছিলেন আসামের শ্রীমন্ত শংকরদেব, পাঞ্জাবের গুরুনানক আবার কখনো বাংলাদেশের চৈতন্য মহাপ্রভু। ভক্তি আন্দোলনের এটা একটা মস্ত বড় দিক। আত্মকণ্ঠের এই মগ্নতাই যদি বলি আমরা দেখতে পাই এসব গ্রামীণ ব্রতাচারে পালিত নারীদের ধর্ম সাধনায়, তাহলে খুব ভুল বলা হয় কি? বোধহয় না, ভগবানের সঙ্গে ভক্তহৃদয়ের মিলনের জন্য কোনো মন্ত্রের আড়াল এরা রাখেননি, তেমনি রাখেননি কোনো শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিক আড়ম্বর।

মাঘব্রত হোক কিংবা সূর্যব্রত, সেদিক থেকে বিচার করলে এই লোকাচারকেন্দ্রিক ব্রতানুষ্ঠানগুলো যেন সামন্ততন্ত্র সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ। তবে সমাজ ইতিহাসের ধারায় এগুলোর গুরুত্ব এতটাই যে, অবক্ষয়গ্রস্ত হয়েও আজ সংহত জীবনভাবনার রূপায়ণে সেগুলো আমাদের নতুন করে পথ দেখায়।


২৮


আমাজিঘ: উত্তর আফ্রিকার বঞ্চিত আদিবাসী মুক্ত মানবেরা

Mozammel Hossain Toha

শিল্প-সংস্কৃতিজানুয়ারি 12, 2021

article

উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর আরবি ভাষাভাষী জনগণকে নিয়ে অনেকের মনেই একটা প্রশ্ন আছে- তারা কি আফ্রিকান, নাকি আরব? ভৌগলিক দিক থেকে উত্তর আফ্রিকা পরিষ্কারভাবেই আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত। সেদিক থেকে এর আরবি ভাষাভাষী জনগণও আফ্রিকান। কিন্তু জাতিগত দিক থেকে?

জাতিগত দিক থেকে উত্তর আফ্রিকার জনগণের এক অংশ নিঃসন্দেহে আরব। সপ্তম শতকে ইসলাম প্রচারের জন্য আরবরা যখন উত্তর আফ্রিকায় অভিযান চালায়, তারপর থেকে তাদের অনেকেই সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে। কালক্রমে ব্যবসায়িক এবং প্রশাসনিক কারণেও আরব উপদ্বীপ থেকে অনেকে উত্তর আফ্রিকায় পাড়ি জমায়। বর্তমানে উত্তর আফ্রিকার জনগণের একটা অংশ তাদেরই বংশধর।

কিন্তু এই অংশটা কম। মরক্কো, আলজেরিয়াসহ উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বর্তমানে যে বিপুল সংখ্যক আরবি ভাষাভাষী জনগণ বসবাস করে, তাদের অধিকাংশই আরবদের বংশোদ্ভূত আরব না। তারা মূলত আরবিকৃত স্থানীয় জনগোষ্ঠী। কালের আবর্তনে তারা আরবি ভাষা এবং সংস্কৃতি গ্রহণ করে আরব হয়ে গেছে। উত্তর আফ্রিকার এই স্থানীয় জনগোষ্ঠী, যারা আরবদের আগমনের পূর্বে হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূমিতে বসবাস করে আসছিল, এরাই আমাজিঘ (Amazigh, বিকল্প বাংলা বানান আমাজিগ) নামে পরিচিত।

উত্তর এবং পশ্চিম আফ্রিকার দশটি দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই আমাজিঘরা এসব এলাকায় বসবাস করে আসছে অন্তত ১০,০০০ বছর ধরে। যুগে যুগে বিভিন্ন জাতি এবং সভ্যতার বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা আজও টিকে আছে তাদের নিজস্ব ভাষা এবং সংস্কৃতির স্বকীয়তা নিয়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রায় প্রতিটি দেশে তারা আজও অবহেলিত, বঞ্চিত এবং অস্বীকৃত। এমনকি নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের অধিকার, নিজেদের নববর্ষ পালনের অধিকারের জন্যও তাদেরকে সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে।

আমাজিঘদের এলাকা তামাজঘার বিস্তার; Image Source: Youtube

বহির্বিশ্বের আমাজিঘদের পরিচিতি মূলত তাদের ইংরেজি নাম বার্বার (Berbers) হিসেবে। শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ বার্বারোস থেকে, যার অর্থ বর্বর। গ্রিকরা মূলত তাদের নিজেদের দেশের বাইরের সবাইকেই বার্বারোস হিসেবে অভিহিত করত। পরবর্তীতে রোমান এবং আরবরাও শব্দটা ব্যবহার করে। কিন্তু ঋণাত্মক অর্থের কারণে আমাজিঘরা নিজেরা এই নামে পরিচিত হতে পছন্দ করে না। নিজেদেরকে তারা আমাজিঘ বলেই অভিহিত করে। দাবি করা হয়, তাদের ভাষা তামাজিঘ্‌ত অনুযায়ী ‘আমাজিঘ’ শব্দটির বা এর বহুবচন ‘ইমাজিঘেন’ শব্দটির অর্থ ফ্রি পিপল (মুক্ত মানব) বা নোবেল পিপল (সৎ মানুষ)।

আমাজিঘদের বসবাস উত্তর এবং পশ্চিম আফ্রিকার বিশাল এলাকা জুড়ে। পূর্বে মিশর-লিবিয়া সীমান্তের সিওয়া মরুদ্যান থেকে শুরু করে পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগরের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত এবং উত্তরে ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ উপকূল থেকে দক্ষিণে প্রায় নাইজার ও সেনেগাল নদী পর্যন্ত সুবিশাল এলাকা জুড়ে আমাজিঘদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এই এলাকার মধ্যে আছে ঐতিহ্যগতভাবে ইসলামিক মাগরেব নামে পরিচিত লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো এবং মৌরতানিয়া, ছাড়াও ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ, মালি, নাইজার, বুরকিনা ফাসো এবং মিশরের কিছু অংশ। প্রায় ৭০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটারের এই বিশাল বাসভূমি তামাজিঘ্‌ত ভাষায় তামাজঘা নামে পরিচিত। বিভাজিত না হলে তামাজঘা হতে পারত বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম রাষ্ট্র।

বর্তমানে অবশ্য এসব এলাকায় আরবিকৃত আমাজিঘরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, শত শত বছর আগেই আরবি ভাষা আত্মীকরণ করে নেওয়ার কারণে যারা নিজেদেরকে আর আমাজিঘ হিসেবে বিবেচনা করে না। এখনও যারা নিজেদেরকে আমাজিঘ হিসেবে বিবেচনা করে, অর্থাৎ যাদের এখনও যাদের মাতৃভাষা তামাজিঘ্‌ত অথবা অন্য কোনো আমাজিঘ উপভাষা, তাদের অবস্থান বর্তমানে এই তামাজঘার অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি জাতিরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকায়। প্রতিটি রাষ্ট্রেই আমাজিঘরা বর্তমানে সংখ্যালঘু। এবং অধিকাংশ রাষ্ট্রেই তাদের অবস্থান পাহাড়ি বা মরুময় এলাকায়।

নির্ভরযোগ্য আদমশুমারি না হওয়ার কারণে আমাজিঘ জনগোষ্ঠীর বর্তমান সংখ্যা সঠিকভাবে জানা যায় না। তারপরেও ধারণা করা হয়, তামাজঘা অঞ্চলের দেশগুলোতে বর্তমানে মোটামুটি ৩ থেকে ৪ কোটি আমাজিঘ বসবাস করে। এরমধ্যে মরক্কোতেই আছে প্রায় দেড় কোটি, আলজেরিয়াতে আছে প্রায় সোয়া এক কোটি, মৌরিতানিয়াতে প্রায় ২৮ লক্ষ, নাইজারে প্রায় ১৬ লক্ষ, মালিতে প্রায় ৮ লক্ষ, লিবিয়াতে প্রায় ৩-৪ লক্ষ এবং তিউনিসিয়াসহ অন্যান্য দেশে আরও কয়েক লক্ষ করে। মরক্কোতে আমাজিঘদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ, এবং আলজেরিয়াতে প্রায় ২৫ শতাংশ। এর বাইরেও ফ্রান্সসহ ইউরোপের কিছু দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আমাজিঘ প্রবাসী বাস করে।

লিবিয়ায় ১০ হাজার বছর আগে পাহাড়ের গায়ে আমাজিঘদের খোদাই করা আর্ট; Image Source: temehu.com

লিবিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশে প্রাচীন গুহায় আঁকা চিত্রকর্ম থেকে বোঝা যায়, এসব অঞ্চলে আমাজিঘদের বসবাস অন্তত ১০-১২ হাজার বছর ধরে। তবে লিখিত আকারে তাদের সম্পর্কে প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় প্রায় ৩,৩০০ বছর আগের মিশরীয় লিপিতে। মিশরীয়দের মতোই সে সময় আমাজিঘরা প্রধানত সূর্য এবং চন্দ্র দেবতার পূজা করত। তাদের ধর্ম এবং সংস্কৃতির সাথেও মিশরীয়দের ধর্ম এবং সংস্কৃতির বেশ মিল ছিল।

পাশাপাশি এলাকা হওয়ার কারণে লিবিয়ার আমাজিঘদের সাথে মিশরীয়দের ব্যবসায়িক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বজায় ছিল। কিন্তু একইসাথে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দিতাও ছিল। খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের দিকে লিবিয়ান আমাজিঘ গোত্র মেশওয়েশের সদস্যরা ধীরে ধীরে মিশরে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করে এবং সেখানকার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে এবং খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীতে এই মেশওয়েশ গোত্রের আমাজিঘ রাজা প্রথম শোশেঙ্ক মিশরের ফারাও হিসেবে দ্বাবিংশতম রাজবংশের সূচনা করে। এটি ছিল প্রথম কোনো আমাজিঘের সর্বোচ্চ অর্জন।

অবশ্য এর বিপরীতে প্রাচীনকাল থেকেই আমাজিঘরা নিজ ভূমিতে বহিঃশত্রুদের দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়ে এসেছে। কার্থেজিনিয়ান, রোমান, গ্রিক, ভ্যান্ডাল এবং বাইজেন্টাইনরা প্রত্যেকেই আমাজিঘদের এলাকা আক্রমণ করে তাদের উর্বর ভূমিতে বসতি স্থাপন করার চেষ্টা করেছে। এরকম ক্ষেত্রে আমাজিঘরা শহরগুলো শত্রুর হাতে ছেড়ে দিয়ে মরুভূমিতে কিংবা পাহাড়ে-পর্বতে পালিয়ে যেত এবং এরপর সেখান থেকে পুনরায় সংগঠিত হয়ে শত্রুর উপর আক্রমণ করত।

সপ্তম শতকে মুসলমানরা যখন উত্তর আফ্রিকায় অভিযান পরিচালনা করে তখন আমাজিঘরা প্রথম ইসলামের এবং সেই সাথে আরবদের সংস্পর্শে আসে। আরবদের সাথে আমাজিঘদের সম্পর্ক ছিল পূর্বের ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্কের তুলনায় ভিন্ন। আরবদের সাথেও কিছু কিছু আমাজিঘ গোত্রের যুদ্ধ হয়েছে, রানী কাহিনাসহ অনেকেই আরবদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, কিন্তু মোটের উপর বাইজেন্টাইনদেরকে পরাজিত করার জন্য আমাজিঘরা মুসলমান আরবদের অভিযানকে স্বাগতই জানিয়েছিল।

যেসব দেশ জুড়ে আমাজিঘদের বসবাস; Image Source: kabyle.com

স্থানীয় আমাজিঘদের সহায়তায়ই মুসলমানরা বাইজেন্টাইনদেরকে পরাজিত করে সমগ্র উত্তর আফ্রিকা নিজেদের করতলে নেয়। পরবর্তীতে যখন মুসলমানরা ইউরোপের দিকে নজর দেয় এবং ইবেরিয়া দ্বীপপুঞ্জে অভিযান পরিচালনা করে, তখন তাদের সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশই ছিল নতুন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা এই আমাজিঘরা। যে মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ প্রথম জিব্রাল্টার পাড়ি দিয়ে স্পেনের ভিসিগথ সাম্রাজ্য জয় করেন, তিনি নিজেও ছিলেন একজন আমাজিঘ, এবং তার ৭,০০০ সৈন্যের বিশাল সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যও ছিল আমাজিঘ।

আমাজিঘদের উত্তর আফ্রিকা ছিল আরবের মুসলিমানদের সাথে একদিকে নতুন জয় হওয়া মুসলিম স্পেন, অন্যদিকে সাব-সাহারান আফ্রিকার সাথে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আমাজিঘরা অল্প সময়েই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিয়েছিল। এরপর ধর্ম প্রচার, রাজ্য জয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে আরবদের সংস্পর্শে থেকে থেকে তাদের অনেকেই ধীরে ধীরে আরব হয়ে ওঠে। অবশ্য প্রায় সকল আমাজিঘ সুন্নি মুসলমান হলেও শেষ পর্যন্ত সবাই আরব হয়নি। আর মুসলমানদের বাইরে প্রচুর আমাজিঘ ইহুদিও ছিল আফ্রিকাতে, যারা পরবর্তীতে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার পর সেখানে পাড়ি জমায়।

মুসলমানদের শাসনামলে আমাজিঘরা তাদের পৃথক ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতি বজায় রেখে, আরবদের সাথে মিলেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিল। এ সময় তারা নিজেরাও মোরাভিদ (আল-মুরাবেতুন), আলমোহাদ (আল-মুয়াহ্‌হেদুন) সহ একাধিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে এবংসাহিত্য, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যে উল্লেখযোগ্য উৎকর্ষ সাধন করে। কিন্তু পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তারা দুর্বল হয়ে আসে। স্পেনে মুসলমানদের পতনের ষোড়শ শতাব্দীতে উসমানীয়রা যখন উত্তর আফ্রিকা জয় করে নেয়, তখন আমাজিঘরা ধীরে ধীরে ক্ষমতার বলয় থেকে দূরে সরে যায়।

তবে আমাজিঘদের, বিশেষ করে আলজেরিয়া এবং মরক্কোর সংখ্যাগরিষ্ঠ আমাজিঘদের ভাগ্যে চূড়ান্ত বিপর্যয় নেমে আসে উনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনামলের সময় থেকে। ১৮৩০ সালে ফরাসিরা যখন আলজেরিয়া আক্রমণ করে, তখন স্থানীয় ক্যাবায়ল আমাজিঘরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কয়েকমাসের মধ্যেই রাজধানী আলজিয়ার্সের পতন ঘটলেও আমাজিঘদের ঘাঁটি ক্যাবায়লিয়া পার্বত্য অঞ্চল দখল করতে ফরাসিদের সময় লেগে যায় দীর্ঘ ৩০ বছর।

ক্যাবায়লিয়া দখল করার পর ফরাসিরা আলজেরিয়াতে ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতি প্রচলনের লক্ষ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আরবদের তুলনায় আমাজিঘদেরকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমাজিঘরা তা প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের লড়াই চালিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত আলজেরিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মরক্কোর এক মিছিলে এক আমাজিঘ নারী; Image Source: Reuters

একইভাবে মরক্কোতেও ফরাসি এবং স্প্যানিশ ঔপনিবেশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রিফ অঞ্চলের আমাজিঘ গোত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মরক্কোর কিংবদন্তী গেরিলা নেতা আব্দুল করিম আল-খাত্তাবি, যাকে আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়, যার রণকৌশল অনুপ্রাণিত করেছিল মাও সে তুং, হো চি মিন এবং চে গুয়েভারাকে, সেই খাত্তাবিও ছিলেন একজন আমাজিঘ।

কিন্তু স্বাধীনতার জন্য আমাজিঘদের এই আত্মত্যাগের মূল্যায়ন স্বাধীনতা-পরবর্তী আলজেরিয়া এবং মরক্কোর আরব শাসকগোষ্ঠী করেনি। ডিকলোনাইজেশনের অংশ হিসেবে সর্বক্ষেত্রে ফরাসি ভাষাকে অপসারণ করে তারা আরবি প্রচলন করতে গিয়ে দেশগুলোর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে কেবলমাত্র আরবিকেই স্বীকৃতি দেয়। ফলে আড়ালে চলে যায় আমাজিঘদের মাতৃভাষা। এছাড়া আরব জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয় ঐক্যের নামেও তারা দেশের ভেতরে বিভিন্ন জাতির মধ্যকার স্বাভাবিক বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে দেশগুলোকে কেবল আরব পরিচয়ে পরিচিত করানোর চেষ্টা করে।

তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিশরসহ অন্যান্য আরব রাষ্ট্রেও একই চিত্র দেখা যায়। সেসব দেশেও আরব জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ স্বৈরশাসকরা আমাজিঘদের ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতিকে জোরপূর্বক দমন করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমাজিঘ ভাষা চর্চার কোনো সুযোগ না রেখে তাদেরকে বাধ্য করা হয় আরবিতে পড়াশোনা করতে। লিবিয়া, মরক্কোসহ বিভিন্ন দেশে এমনকি শিশুদের আমাজিঘ নামও রেজিস্ট্রেশন করতে দেওয়া হতো না। প্রকাশ্যে কোথাও আমাজিঘ লিপি প্রচার করতে দেওয়া হতো না। আমাজিঘদেরকে তাদের সাহিত্য এবং সংস্কৃতির চর্চা করতে হতো অনেকটাই গোপনে।

এই উগ্র আরব জাতীয়তাবাদ এবং আরবিকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে অনেক সময়ই আমাজিঘরা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছে। এরকম একটি প্রতিবাদ থেকেই ১৯৮০ সালে আলজেরিয়ার ক্যাবায়েল এলাকায় সংঘটিত হয় আমাজিঘ স্প্রিং। তার ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় আমাজিঘ ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস, যাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সমগ্র উত্তর আফ্রিকার আমাজিঘদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা।

আমাজিঘদের পতাকা; Image Source: Wikimedia Commons

১৯৯৮ সালে আমাজিঘ ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস আমাজিঘদের জন্য একটি পতাকা নির্ধারণ করে। আমাজিঘদের নির্দিষ্ট কোনো দেশ নেই, এবং আমাজিঘ অ্যাক্টিভিস্টরা সেরকম কোনো দেশ দাবিও করে না, কিন্তু তারপরেও তাদের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিটি দেশের আমাজিঘদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে পতাকাটি।

তিন রঙের এই পতাকার উপরের নীল রং হচ্ছে সমুদ্রের প্রতীক, মাঝের সবুজ রং হচ্ছে উর্বর পাহাড়ি সবুজ ভূমি, এবং নিচের হলুদ রং হচ্ছে সাহারা মরুভূমি। আর মাঝখানের লাল প্রতীকটি হচ্ছে তামাজিঘ্ত ভাষা লেখার জন্য যে তিফিনাঘ (Tifinagh) বর্ণমালা ব্যবহৃত হয়, সেই বর্ণমালার একটি বর্ণ, ইয়াজ (ⵣ)। দেখতে দুই হাত-পা দুই দিকে ছড়িয়ে রাখা এই প্রতীক আমাজিঘ তথা মুক্ত মানুষকে নির্দেশ করে।

আমাজিঘদের নিজস্ব একটি ক্যালেন্ডারও আছে। কিছু কিছু আমাজিঘ যাযাবর এবং শিকারী হিসেবে জীবন যাপন করলেও অধিকাংশই মূলত কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। ফলে হাজার হাজার বছর ধরেই তারা নববর্ষ পালন করে আসছে, যদিও পূর্বে তারিখটি নির্ধারিত ছিল না। পরবর্তীতে রোমানদের শাসনের সময় আমাজিঘরা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে এবং সে অনুযায়ী বর্তমানের জানুয়ারির ১৩ তারিখকে নববর্ষ হিসেবে নির্ধারণ করে।

আমাজিঘদের নববর্ষের অনুষ্ঠান শুরু হয় জানুয়ারির ১২ তারিখে এবং শেষ হয় ১৩ তারিখে। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ইয়ানায়ের। এটি একইসাথে আমাজিঘ ক্যালেন্ডারের প্রথম মাসেরও নাম। ধারণা করা হয়, ইয়ানায়ের শব্দটি এসেছে তামাজিঘ্ত শব্দ ইয়েন এবং আইয়ুর থেকে। ইয়েন অর্থ এক এবং আইয়ুর অর্থ মাস। সেই হিসেবে ইয়ানায়ের (জানুয়ারি) অর্থ বছরের প্রথম মাস।

মরক্কোর রাস্তায় তামাজিঘ্ত ভাষার ব্যবহার; Image Source: moroccoworldnews.com

ষাটের দশকে আমাজিঘরা প্রথম তাদের ক্যালেন্ডারের জন্য শূন্য বর্ষ নির্ধারণ করে। আর এই শূন্য বর্ষকে নির্ধারণ করার জন্য তারা বেছে নেয় তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা অর্থাৎ লিবিয়ান আমাজিঘ রাজা শোশেঙ্কের ক্ষমতা গ্রহণের বছরকে। হিব্রু বাইবেলে শিশাক নামে মিশরের এক ফারাওর নাম উল্লেখ আছে, ধারণা করা হয় এই শিশাকই হচ্ছেন আমাজিঘ রাজা শোশেঙ্ক। সে হিসেবে এটিই হচ্ছে কোনো আমাজিঘ ব্যক্তি সম্পর্কে লিখিত সবচেয়ে প্রাচীন ঐতিহাসিক দলিল।

একেই মানদণ্ড হিসেবে নিয়ে শোশেঙ্কের ক্ষমতায় আরোহণের বছরকে, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৯৫০ সালকে প্রথম বর্ষ হিসেবে ধরে এরপর আমাজিঘদের ক্যালেন্ডারে বছর গণনা করা হয়। সেই হিসেবে এ বছর (২০২১ সালে) ১২ জানুয়ারি আমাজিঘরা ২,৯৭১ তম নববর্ষকে বরণ করে নিবে।

দীর্ঘদিন বঞ্চিত থাকলেও গত কয়েক দশকে ধীরে ধীরে আমাজিঘদের ভাগ্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। ২০০০ সালে দ্বিতীয় আমাজিঘ স্প্রিং তথা আমাজিঘ ব্ল্যাক স্প্রিং আন্দোলনের পর আলজেরিয়ার সরকার তামাজিঘ্‌তকে সাংবিধানিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় মরক্কোও তামাজিঘ্‌তকে সাংবিধানিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং পরবর্তীতে ২০১৬ সালে অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

যদিও এখনও যথেষ্ট না, কিন্তু মূলত আরব বসন্তের পর থেকে কিছু কিছু স্কুলে তামাজিঘ্ত ভাষা পড়ানোর সুযোগ চালু করা হয়েছে। এছাড়াও মরক্কোতে এখন সরকারি বিভিন্ন ঘোষণা আরবির পাশাপাশি তামাজিঘ্ত ভাষাতেও প্রচার করা হচ্ছে। এছাড়াও রাস্তাঘাটে বিভিন্ন সাইনবোর্ডেও ক্রমশ আরবির পাশাপাশি তামাজিঘ্ত ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ইয়ানায়ের উপলক্ষে কুসকুস রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে আলজেেরিয়ার আমাজিঘ মহিলারা; Image Source: thearabweekly.com

তারপরেও আমাজিঘদেরকে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হচ্ছে অধিকতর অধিকার আদায়ের জন্য। ২০১৭ সালে আলজেরিয়াতে আমাজিঘ নববর্ষকে সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু অন্যান্য দেশের আমাজিঘরা এখনও নববর্ষের ছুটি, তামাজিঘ্তকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি এবং স্কুলে তামাজিঘ্ত ভাষা শেখানোর দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

ভাষা এবং সংস্কৃতির বাইরে আমাজিঘদের সাথে উত্তর আফ্রিকার আরব জনগোষ্ঠীর পার্থক্য খুব বেশি না। সকলের ধর্মই ইসলাম। এবং যদিও আমাজিঘদের ঐতিহ্যবাহী রঙিন নকশাযুক্ত পোশাক, তাদের খাদ্যাভ্যাস, নারীদের মুখে ট্যাট্টু অঙ্কনের সংস্কৃতি দেশগুলোর মূল আরবিকৃত জনগোষ্ঠীর তুলনায় ভিন্ন, কিন্তু সে ভিন্নতাও অন্যান্য দেশের আদিবাসীদের সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্যকার ভিন্নতার মতো প্রকট না। যেহেতু এই আরবিকৃতরা নিজেরাও কয়েকশো বছর আগেও আমাজিঘই ছিল, তাই উভয়ের জীবনযাত্রায় যথেষ্ট মিলও খুঁজে পাওয়া যায়।

আমাজিঘরা কুর্দিদের মতো পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আগ্রহী না। ভৌগলিক বিবেচনায় সেটা বাস্তবসম্মতও না। তারা কেবল নিজেদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতেই আগ্রহী। এবং এই দাবি তাদের ন্যায্য অধিকার। রাষ্ট্রে যদি ন্যায় বিচার থাকে, যদি সকলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়, কাউকে বঞ্চিত করা না হয়, তাহলে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ধারণ করেও জাতীয় ঐক্য টিকিয়ে রাখা যায়।



২৯


ডাডাবাদ: সবরকম নিয়মের বাইরে দাঁড়ানোও একটা নিয়ম, এটিই শ্রেষ্ঠ নিয়ম

Mahamudul hasan

শিল্প-সংস্কৃতিমার্চ 9, 2021

article

সম্মুখ সমরে যারা যুদ্ধ করে, সামরিক পরিভাষায় এদের ফ্রন্ট লাইন বলে। বিশেষ ব্যক্তিত্বের আশেপাশে, গাড়ির আগে-পরে নিরাপত্তাকর্মীর হুড়োহুড়িকে ভ্যান গার্ড বলে, এমন মিলিটারি জার্গন আমাদের মোটামুটি জানা। ফরাসিতে এই শ্রেণিকে বলা হয় এভান্ট গার্ড। এভান্ট গার্ডের এই শব্দকে পুঁজি করে প্রগতিবাদ বেড়ে ওঠে বুদ্ধিদীপ্ত আন্দোলনে, শিল্পে, কলায়।

১৮৫০ সালের শুরুর দিকে শিল্পের নয়া রূপ খুঁজতে, নতুনকে সামনে আনতে; সহজ কথায় যা উদ্ভাবন বা আবিষ্কার বলা চলে, তাকেই এভান্ট গার্ড বলা হবে। গুস্তাভে কার্বেটের বাস্তববাদ দিয়ে শুরু হয় এই ধারা। শিল্পের আন্দোলন বহুমাত্রিক হবে, মহাযজ্ঞকে পেরিয়ে বহু জাগতিক হবে- এমনটা শুরুতে কেউ ভেবেছিল কি না, আমরা জানি না; যা জানি, সে আলাপ এরকম শঙ্কাকে উড়িয়ে দেয় না। 

পিকাসোর চিত্রকর্ম; Image Source: Wikiart.org

শিল্পযুগে, আধুনিকতার প্রাক্কালে, ১৯০৭ সালে পাবলো পিকাসোর চোখ দিয়ে দেখতে পাই, উদ্ভাবিত বাস্তবতার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য কিউবিজম অন্যরকম এক বিপ্লব। প্রতিটি বিপ্লব অচলায়তন ভাঙে, এ বিশ্বাস আজও ভীষণ রকমের পোক্ত, এ কথায় দ্বিমত করার লোক খোদ মার্কনিরাও নন। একটি বস্তুনিরপেক্ষ চিত্রকর্মকে যতগুলো বিষয়ে আমরা ভাবতে পারি, তার সবগুলোকে এক তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা যায়- এ আশ্চর্য আমাদের দেখায় কিউবিজম।

একটি ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট’-এর প্রতিটি ভিন্নমত ও ভিন্ন  দর্শন সহাবস্থানে রেখে জর্জস ব্রাক ও পাবলো পিকাসো অনন্য শিল্পের ধারা জন্ম দেন। তা দেখতে চূর্ণ-বিচূর্ণ লাগে, ধবংসাবশেষ মনে হয়, অথচ ছবির কথা টের পাওয়া যায় সত্ত্বার মধ্য দিয়ে, এর নাম কিউবিজম। যদিও এ আলাপ অনেক বিস্তৃত ও প্রকট, প্রচ্ছন্ন নয়, আমরা তাই এখানেই ইতি টানব। আমাদের আলাপের বিষয় কিউবিজম থেকে প্রভাবিত হয়ে একদল বেয়াড়া কবির।

সৌরজগতে তিন নম্বর গ্রহ আমাদের পৃথিবী। এখানে আদিম রূপ থেকে মানুষের সভ্য হতে কেটেছে কয়েক কোটি বছর। দীর্ঘদিন শান্তির পর হঠাৎ মহাযুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৪ সালের এই যুদ্ধ মানুষকে আঘাত দেয় ভীষণ, যার চোট থেকে জন্ম নেয় ‘ডাডাবাদ’।

হুগো বল; Image Source: Wikimedia Commons

যুদ্ধের ভয়াবহতা থামাতে, দমাতে বা কমাতে সাহিত্য-শিল্পের কিছু দায়বদ্ধতা থাকে, অথচ মূল ধারার শিল্পীরা ছিলেন বদ্ধ। এই নিস্তেজ, স্থবিরতা উন্মাদ করে দিল ত্রিস্তান জারা, হুগো বলদের। যুদ্ধ যেকোনো শান্তিপূর্ণ জায়গাকে এলোমেলো করে দেয়, শৃঙ্খলকে ভেঙে আনে উন্মাদনা। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে চাইলেন ত্রিস্তান জারার মতো কবিরা, যে যুদ্ধ বিশৃঙ্খলা বয়ে আনে, তাকে মোকাবেলা করতেও বিশৃঙ্খলাকেই বেছে নিল ডাডাবাদ। এ নিয়ে হান্স আর্প পরে লিখেছিলেন,

১৯১৪ সালের বিশ্বযুদ্ধে কসাইরা যখন বিদ্রোহ করছে, তখন জুরিখে আমরা নিজেদের  শিল্পকলায় নিয়োজিত করেছিলাম। বন্দুকের গুলি দূর-দূরত্বে ছড়িয়ে পড়ার সাথে, আমরাও জড়ো হয়েছি সবাই, আমরা আমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে গান গাইলাম, রং করলাম এবং কবিতা লিখলাম।

ক্যাবারে ভলতেয়ার; Image Source: airfrance.in

জুরিখে ক্যাবারে ভলতেয়ার নামে এক রেস্তোরাঁয় হুগো বল এক সন্ধ্যায় তার মতো একই আদর্শ ও ভাববাদী মানুষদের জড়ো করেন। সেখানে আর্প, মার্সেল ডুচাম্প, ফ্রান্সিস পিকাবিয়া, কার্ট, ত্রিস্তান জারার মতো ভবিষ্যতের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন।  হুগো তামাশার এক কবিতা শোনান রেস্তোরাঁর মঞ্চে। যে কবিতা শুধুই এলোমেলো অক্ষর বসিয়ে অর্থহীন কিছু শব্দের অর্থহীন বাক্য রচনা করা। হুগো জোর গলায় পেশ করেন,

“এখানে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ আমাদের কমপক্ষে এটি নিশ্চিত করে, যুদ্ধ আমাদের কোনো কল্যাণ বয়ে আনেনি। মহারথী নেতারা যতই এই যুদ্ধকে মহত্বের দাবি করেন, আমরা এ মিথ্যেকে অস্বীকার করব। যেখানে বোঝানো হয়- দুনিয়ার এত অর্থহীন কাজে জনতা আত্মতুষ্ট, নির্বোধ পুঁজিবাদী সমাজ, যুদ্ধের মতো নৃশংসতাকে মানুষ মেনে নিচ্ছে, তবে এই অর্থহীন কবিতা মানতে, শুনতে ও উপভোগ করতে জনতা বাধ্য নয় কেন?

শুধুই যুদ্ধবিরোধী নয়, তারা ছিলেন বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধেও। এই নতুন, যুক্তি ও বোধ-বর্জিত শিল্প-আন্দোলনের নাম ডাডা রাখা হয়। জার্মান শিল্পী রিচার্ড হিউলসনবেক ফরাসি-জার্মান অভিধানে এই শব্দটি খুঁজে পান, আর হুগো বল বললেন, এটাই চলনসই। ডাডা রুমানিয়ায় সম্মতি অর্থে “হ্যাঁ, হ্যাঁ”, ফরাসি ভাষায় শখের ঘোটক বা যে ঘোড়া পেন্ডুলামের মত ছোটে। মূলত ডাডা দৈবচয়নে ঠিক করা এক নাম, যার সঠিক কোনো অর্থ করা যায় না।  

ত্রিস্তান জারা; Image Source: Wikimedia Commons

ডাডা খুব অল্প সময় চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। জুরিখ থেকে টোকিও, নিউ ইয়র্কে ডাডাবাদীরা উন্মাদনা ছড়ায়। ত্রিস্তান জারা এক ইশতেহারে বলেন, “ডাডাবাদীরা কী চায়? কিছুই না।” কিছু চাই না বলে তারা, চাওয়ার মতো তুমি কোনো হেতু নও- এমনটাই জানান দেয়। এমন ইশতেহার, যা কোনো ইশতেহার নয়, সবরকম নিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোও যে একটা নিয়ম- এ নিয়মই শ্রেষ্ঠ, সেসব কথাই আমরা শুনি ত্রিস্তান জারার মুখ থেকে।

ডাডাবাদের কবিতা হবে এলোমেলো, যা যে কেউ লিখতে পারেন। “সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি”- এ কথাকে অস্বীকার করে তারা বললেন, এক খণ্ড খবরের কাগজকে টুকরো টুকরো করে এর প্রতিটি শব্দকে কেটে আলাদা করুন। এরপর কাটা শব্দগুলোকে একটা পাত্রে নিয়ে ভালো করে ঝাঁকুন, শব্দগুলোকে নিয়ে একের পর এক বসান, কবিতার আদলে সাজান। যা হবে, তা-ই ডাডাবাদী কবিতা। ডাডার কোলাজগুলো দেখতে অনেকটা এখনকার ফটোশপের মতো লাগে। ডাইমেনশন বদলে দেয়, দেখতে কোনোরকম অর্থ প্রকাশ করে না, অ্যাবসার্ড লাগে। জ্যামিতিক, মেকানিকাল, আর্কিটেকচারাল এমন কোনো খাত নেই যেখানে ডাডা প্রবেশ করেনি, সবখানে ডাডার ধবংসযজ্ঞ চোখে পড়ার মতো। ডাডাবাদীরা বলেন,

“সব কিছু ঠিক হয়ে এসেছে আমরা মানলাম, তবে একবার আমাদের ভুল করার সুযোগ দিন, যদিও ডাডাবাদীরা কোনো ভুল করছেন না।”

এলোমেলো-অগোছালো হওয়া ছিল ডাডাবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য; Image Source: widewalls.ch

ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল গ্যালারি অভ আর্টের ডাডা প্রদর্শনীতে প্রায় ৪০০টি চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, ফটোগ্রাফ, কোলাজ, লিফলেট এবং ৪০টিরও বেশি শিল্পীর চিত্র ও রেকর্ডিং উপস্থাপন করা হয়েছে। ডাডাকে আরও সহজ করার প্রয়াসে আমেরিকান কিউরেটর, ন্যাশনাল গ্যালারি, লেয়া ডিকম্যান এবং এমএমএ-র অ্যান উমল্যান্ড ২০০৫ সালে পুনরায় এই প্রদর্শনীগুলোকে সংরক্ষণ করেন, যে শহরগুলোর চারপাশে আন্দোলনটি বিকশিত হয়েছিল— সেই জুরিখ, বার্লিন, হ্যানোভার, কোলন, নিউ ইয়র্ক এবং প্যারিসের সব ধবংসাবশেষ তুলে আনেন।

শুধুমাত্র যুদ্ধ নয়, যন্ত্রের উপর ব্যাপক নির্ভরতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত নতুন শিল্পও ডাডাবাদীদের উস্কে দিয়েছে। যেমন আর্প একবার অভিযোগ করেছিলেন,

“মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছে তার বানানো দানবীয় অস্ত্র, এক ট্রিগার ছাড়া যেখানে নিয়ন্ত্রণের কিছু নেই”।

দুই পাতার ডাডা ইশতেহার; Image Source: Khan Academy

ডাডাবাদীরা এমন নৈরাজ্য অব্যাহত রেখেছে। রাস্তা বন্ধ করে কবিতা পাঠের আসর, সিনেমা হলে শো চলাকালীন পর্দার সামনে গিয়ে নাচ-গান, সভা-সমাবেশ , ছাপানো ম্যগাজিন, ক্রোড়পত্র, নগ্নতা একরকম  মাথা ব্যথার কারণ হয়ে ওঠে যথাযথ কর্তৃপক্ষের। ১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে, ডাডা বার্লিন, কোলোন, হ্যানোভার এবং প্যারিসে শান্তি বিঘ্নিত করা শুরু করে। বার্লিনে শিল্পী হান্না হ্যাচ ডাডার কোলাজে একটি বিদ্রূপাত্মক দেয়ালিকা বানান ফ্যাশন ম্যাগাজিন থেকে তোলা ছবি, পত্রিকা ও সামরিক প্রকাশনা থেকে, যেখানে জার্মান সামরিক এবং শিল্প সমাজকে তিরস্কার করা হয়। বার্লিন বা প্যারিস যেকোনো শিল্প আন্দোলন সহ্য করলেও নিজের গায়ে কাদা ছিটানো সহ্য করবে না।

শুরু হলো ‘ডাডাবাদ হটাও’ পদক্ষেপ। ১৯২০ সালের শেষদিকে প্যারিসে ডাডাবাদের শেষ চিৎকার শোনা যায়, আর ডাডাবাদীরা বিভক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু ডাডাবাদ কি আসলেই শেষ? শিল্পের উন্মাদনা এত ভঙ্গুর? যদিও সেখান থেকে শুরু হয় পরবাস্তববাদ, সে আলাপ অন্য এক কোথাও তোলা থাক, ভিন্ন সুরে, কিন্তু একই।

“আমি কেবল আমার কথাই বলি, অন্য কারো কথার সুর আমার গলায় নেই। আমিও অন্য কারও নদীতে যাই না, কেউ আমার। শিল্প চলে তার বিধি মেনে, ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যে। এ আলাপ নতুন বা পুরাতন নয়, প্রয়োজনীয়।”

– ত্রিস্তান জারা , ডাডা মেনিফেস্টো , ১৯১৮



৩০


সাপ উপাসনা: ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিজুলাই 18, 2022

article

বেহুলা আর লখিন্দরের কাহিনী সম্পর্কে জানে না- এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন। শিবভক্ত চাঁদ সওদাগরের জেদ, দেবী মনসার ক্রোধ, লখিন্দরের মৃত্যু, বেহুলার অসম্ভবকে সম্ভব করার কাহিনীর উৎস পদ্মপুরাণ। মধ্যযুগের বাঙালি সাহিত্যিকদের বড় একটা অংশই এ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। মঙ্গলকাব্যের এই অংশ পরিচিত হতো মনসামঙ্গল নামে। এই মনসা মূলত সর্পদেবী। আর এই আখ্যান ভারতীয় সংস্কৃতিতে সর্প উপাসনার ঐতিহ্য প্রমাণ করে। আদতে শুধু ভারতে না; পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতেই সাপ উপাস্য হিসেবে বিদ্যমান।

সাপের শরীর এবং খোলস বদলের ঘটনা প্রায়ই সাপকে অমর প্রাণী হিসেবে মানবসমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। হয়ে উঠেছে পুনর্জন্মের প্রতীক। পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য গিলগামেশে দেখা যায় কীভাবে সঞ্জীবনী লতা নিয়ে সাপ চলে যায়। প্রায়শ সাপকে দৈব আশির্বাদে অমরত্ব প্রাপ্ত গণ্য করা হয়েছে। তাছাড়া সাপের গায়ের মোহনীয় সজ্জার ও কোমলতার পাশাপাশি হিংস্রতা ও ক্রুদ্ধ রূপ মানুষের মনে বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে। সাপকে কখনও সংযুক্ত করা হয়েছে মৃত্যু এবং দুর্ঘটনার সাথে, কখনও কোনো রত্নভাণ্ডারের পাহারাদার, কখনো আবার সাপ এসেছে পৃথিবীর সৃষ্টিপর্বেই।

প্রাচীন মিশর

মিশরীয় পুরাণে সাপের তাৎপর্য বহুবিধ। নানা উপাস্যের রূপে মিশরীয় ধর্মের সাথে একীভূত হয়েছে। প্রাচীন বিশ্বাসে জন্মদান ও শিশুপালনের অভিভাবক দেবী ওয়াজেত। পরবর্তীতে অবশ্য তাকে ফারাওদের রক্ষকদেবী হিসেবেও চিত্রিত করা হয়। যেকোনো মুহূর্তে ছোবল দিতে প্রস্তুত, এমন ভঙ্গিতে ফনা তুলে থাকা কোবরার চিত্র। এই দেবী সম্পর্কিত ছিল সূর্যদেবতা রা-র সাথে। অন্যদিকে, নেহেবকাও সবচেয়ে পুরনো দেবতাদের একজন। অমরত্বের প্রতীক তিনি। পাতাল দরজার প্রহরি এবং মা’ত সভার একজন বিশেষ সদস্য। পুরাণ অনুসারে, মৃতের আত্মার বিচারের জন্য পাতালদেবতা ওসিরিসের সাথে ৪২ জনের একটা দল থাকে; সেটাই মা’ত সভা।

বিশৃঙ্খলার আদিতম দেবতা আপেপ; Image source: landioustravel.com

মৃত্যু আর বিশৃঙ্খলার দেবতা আপেপ। সৃষ্টির শুরুতে সমস্ত কিছুই বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত ছিল। সেই অর্থে বলতে গেলে তিনিই আদি দেবতা। তাকে বিবৃত করা হয় অতিকায় হিংস্র সাপদেবতা হিসেবেই। সৃষ্টির শুরুতে রা এই আপেপকেই যুদ্ধে পরাজিত করে প্রতিষ্ঠা করেন শৃঙ্খলা।

গ্রিক পুরাণ

প্লেটোর দেয়া ভাষ্য অনুসারে, মৃত্যুশয্যায় সক্রেটিস বলেন,

ক্রিটো, এসক্লিপিয়াস একটা মোরগ পায় আমাদের কাছে। দিয়ে দিও, ভুলে যেও না আবার।

এই এসক্লিপিয়াস মূলত প্রাচীন গ্রিসের চিকিৎসার দেবতা। গোটা গ্রিস জুড়েই ছিল তার খ্যাতি। তাকে গণ্য করা হতো দেবতা অ্যাপোলোর সন্তান হিসেবে। সেই অর্থে তিনিও দেবতা। প্রাচীন গ্রিসে সাপ অমরত্বের প্রতীক। এসক্লিপিয়াসের হাতেও তাই আরোগ্যকারী একটা দণ্ড, যাকে পেঁচিয়ে রয়েছে একটা সাপ। যদিও বর্তমান চিকিৎসাশাস্ত্রে বহুল ব্যবহৃত প্রতীক দেবতা হারমেসের দুই সাপওয়ালা দণ্ড ক্যাডিওসিয়াস

সাপের ক্ষমতা এবং ভয়ানক চিত্র অঙ্কিত হয়েছে গরগন হিসেবে। স্থিনু, ইউরাইলি এবং মেডুসা নামে তিন বোন তারা। তাদের তামার হাত আর স্বর্ণের পাখা। তাদের মুখের দিকে তাকালে যে কেউ পাথরে পরিণত হবে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ানক তাদের মাথায় চুলের জায়গায় অজস্র জীবন্ত আর বিষাক্ত সাপ। সাপ নিয়ে তৃতীয় বিখ্যাত বিবরণ খুব সম্ভবত হাইড্রা। দানবীয় এই সামুদ্রিক সাপ শুধু অমর না; তার একটা মাথা কেটে ফেলা হলে সেই ক্ষত থেকে দুটো মাথা গজিয়ে উঠতো নতুন করে।

একটা মাথা কেটে ফেলা হলে সেই ক্ষত থেকে দুটো নতুন মাথা বের হয়; Image Source: wallhere.com

অস্ট্রেলিয়ার উপকথা

আদি অস্ট্রেলীয় বিশ্বাসে সৃষ্টির প্রাথমিক দেবতাই সাপ। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে তার নামও ভিন্ন। তবে সমস্ত আদিবাসী সংস্কৃতিতেই বিদ্যমান এই সাপদেবতা। জীবনদাতা হিসেবে তিনি একদিকে পানির সাথে সম্পৃক্ত। তিনি একদিকে মানুষের রক্ষাকর্তা, এবং একইসাথে দুষ্টের জন্য শাস্তিপ্রদানকারী। আকাশে রঙধনু ওঠার মানে তিনি এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে যাচ্ছেন। অজস্র নাম থাকার কারণে নৃবিজ্ঞানীরা তাকে সহজে পরিচয় করিয়ে দেন ‘দ্য রেইনবো স্নেইক’ নামে।

কোনো জাতিগোষ্ঠীর বিশ্বাসে তিনি পুরুষ হলেও কিছু সমাজে তিনি নারী রূপে উল্লেখিত। তখন মহান মাতা হিসেবে পূর্বপুরুষদের জন্ম দিয়েছেন। মানুষকে শিখিয়েছেন কীভাবে ধর্মপালন করতে হয়। কোনো বর্ণনায় তিনি বৃষ্টি ও বন্যা আনয়নকারী, আবার ঋতু পরিবর্তনকারী। তবে সমস্ত ক্ষেত্রেই তার অবস্থান শক্ত।

নর্স পুরাণ

ইয়োরমুঙ্গানদর হলো মিদগার্দ বা মানুষের পৃথিবীতে ঘিরে রাখা এক সাপের নাম। আরো স্পষ্টভাবে বললে, লোকি এবং তার দানবী স্ত্রী আঙ্গরবদার তিন দানবসন্তানের একজন ইয়োরমুঙ্গানদর। বাকি দুজন নেকড়ে ফেনরির এবং পাতালের হেল। ইয়োরমুঙ্গানদরের জন্মের পর ওদিন তাকে মিদগার্দকে ঘিরে থাকা সমুদ্রে নিক্ষেপ করলেন। দানবটা সেখানেই বড় হতে হতে পৃথিবীকে পেঁচিয়ে ফেলে। বৃত্তাকারে নিজের লেজকে মুখে পুরে রাখে। বেনজিন চক্র কিংবা ইউরোবরাসের কথা মনে করা যেতে পারে।

র‌্যাগনারকের সময় মুখোমুখি হবে থর এবং ইয়োরমুঙ্গানদর; Image Source: bavipower.com

বজ্রদেবতা থর ঘৃণা করে তাকে। বেশ কয়েকবার মুখোমুখিও হয়েছে দুজন। ইয়োরমুঙ্গানদর ফের ফিরে গেছে সমুদ্রে। যেদিন সে নিজের লেজকে মুখ থেকে বের করে ভূমিতে উঠে আসবে, সেই মুহূর্ত থেকেই র‌্যাগনারকের শুরু। সেদিন তার সাথে যোগ দেবে ভাই ফেনরির। ফেনরির পৃথিবীতে আগুন জ্বালাবে, আর ইয়োরমুঙ্গানদর বাতাসে মিশিয়ে দেবে বিষ। অবশেষে মুখোমুখি হবে থর আর ইয়োরমুঙ্গানদর। তাকে হত্যা করার পরে থর নিজেও তার বিষের দরুন মৃত্যুমুখে পতিত হবেন সেদিন। এটাই নিয়তি।

মেসোপটেমিয়ার বিশ্বাস

সুমেরিয় সভ্যতায় দেবতা নিনগিশজিদাকে চিত্রিত করা হয় কুণ্ডলি পাকানো সাপের আকৃতিতে। অনেকটা কাছের শিকড়ের মতো। তিনি কৃষি আর পাতালের দেবতা। কখনও তার প্রতীক হারমেসের ক্যাডিওসিয়াসের মতোই। একইভাবে বাসমু আরেকটি শিং এবং পাখাওয়ালা দানবাকৃতির সাপ। বাসমু নামের অর্থই বিষাক্ত সাপ। প্রতীকায়িত করে পুনর্জন্ম এবং মৃত্যুকে।

মুহুসসু নামের অর্থ দুর্ধর্ষ সাপ। যদিও তার মধ্যে কয়েকটা ধারণা মিশ্রিত হয়েছে। ব্যাবিলনের ইশতার গেটের খোদাইয়ে তাকে কৃশকায় দেখা যায়। সেই সাথে আছে শিং, লম্বা ঘাড়, এবং কাঁটাযুক্ত জিহবা। শরীর আবৃত নরম আঁশ দিয়ে। মুহুসসুকে ব্যাবিলনের প্রধান দেবতা মারদুকের ঘনিষ্ঠ রূপে গণ্য করা হতো। মনে করা হতো আত্মার অভিভাবক।

ভারতভূমি

হিন্দুধর্ম মোতাবেক নাগ দৈব সত্তা। যখন খুশি সাপে রূপান্তরিত হতে পারে। কল্যাণের উপাস্য হিসেবে পূজিত হলেও তাদের শত্রুতা ভয়াবহ। কোনো গুপ্তধনের প্রহরি হিসেবে তাদের উপস্থিতি বেশ সাধারণ। আদিশীষ হলো নাগরাজ। পাঁচ মাথাবিশিষ্ট এই সাপ পৃথিবী সৃষ্টির আদিতম অবস্থা থেকেই বিরাজমান। যখন সমস্ত কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে মহাপ্রলয়ে, তখনও টিকে থাকবে। এজন্যই তার নাম আদিশীষ। কুণ্ডলি পাকিয়ে সে যেন একটা আসনের আকার ধারণ করেছে, যেখানে বসে আরামরত বিষ্ণু।

আদিশীষকে আসন বানিয়ে আরামরত বিষ্ণু; Image Source: irshadgul.com

ঋষি জরতকারু এবং দেবী মনসার ছেলে আস্তিক। রারেজা জনমেজয়ের পিতা পরীক্ষিত সাপরাজা তক্ষকের কামড়ে মৃত্যুবরণ করেন। ক্রোধে জনমেজয় গোটা সাপ প্রজাতিই উপড়ে ফেলতে আয়োজন করেন যজ্ঞের, যা সর্পসত্র নামে পরিচিত। যখন সমস্ত সাপ যজ্ঞের আগুনে গিয়ে পড়ছে, তখন মনসার পুত্র আস্তিক রাজা জনমেজয়কে যজ্ঞ থামাতে সম্মত করেন। বেঁচে যায় নাগ। সেই দিনটি পরবর্তীতে নাগপঞ্চমী হিসেবে পালিত হয় হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈনধর্মে। অন্যদিকে, শিবের সঙ্গী বাসুকি। শিবের কাছে সে এতটাই প্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, শিব তাকে মালার মতো করে গলায় পরে থাকেন। তার মাথায় থাকে নাগমণি, যা তার শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি প্রমাণ। সর্পদেবী মনসার কথা তো শুরুতেই বলা হয়েছে।

কোরিয়া এবং জাপান

কোরিয়ান সংস্কৃতিতে ইয়োপসিন সম্পদ এবং সমৃদ্ধির দেবী। প্রায়শ তাকে চিত্রিত করা হয় সাপের অবয়ব দিয়ে। গৃহদেবী হিসেবে বাড়ির ছাদে তার অবস্থান বিশ্বাস করা হয়। ছাদ ভিন্ন অন্য কোথাও তার থাকার ইঙ্গিত মানেই দুর্ঘটনার পূর্বাভাস। হতে পারে শারীরিক বা মানসিক কোনো দুর্ঘটনা এগিয়ে আসছে। কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তি কমে যাচ্ছে শিগগিরই। ভক্তরা নানা রকম উপাসনার মধ্য দিয়ে শান্ত রাখতে চায় এই অভিভাবককে। সংসার জীবনের অভিভাবক এবং পার্থিব বিষয়াদির তদারককারী পরিচয়ের বাইরেও ইয়োপসিনের আলাদা পরিচয় আছে। কোরিয়ান উপকথার অন্তত সাতজন দেবীর মা তিনি।

জাপানি উপকথায় অমোননুশি একজন সর্পদেবতা হলেও মানুষের আকৃতি নিতে পারেন। তিনি সন্তান জন্মদান ও লালনপালনের দেবতা। অন্যদিকে ওরোচি নামের অর্থই অতিকায় সাপ। তিনি ফসল ও উর্বরতার দেবতা। উভয়েই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল নদী ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলগুলোতে।

আফ্রিকান ঐতিহ্য

পশ্চিম আফ্রিকার বেনিন জুড়ে একসময় হিদা এবং দাহৌমি রাজ্য ছিল। গোটা সময় জুড়ে সাপ পরিণত হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে। তাদের মধ্যে প্রধান দাঙবি। জ্ঞান এবং সমৃদ্ধির দেবতা দাঙবি। বিশেষ করে গাছ এবং সমুদ্রের সাথে তাকে সম্পর্কিত করা হতো। হিদা রাজ্যের কেন্দ্রে নির্মিত ছিল মন্দির। অজগর হত্যার শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড; যদিও পরবর্তীতে তা জরিমানায় কমিয়ে আনা হয়।

হাইতির ভুডু সংস্কৃতিতে আদি স্রষ্টা লোয়া ডামবালাকে চিত্রিত করা হয় সাপের আকৃতিতে। অতিকায় দীর্ঘ সাদা সাপ। সাপ যেমনটা জলে ও স্থলে বিচরণ করে, লোয়া ডামবালা তেমন জলে ও স্থলে জীবন দান করেন। কখনও কখনও তাকে জ্ঞান ও সৌহার্দ্যের সাথেও সম্পৃক্ত করা হয়। মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকায় উপাসনা করা হয় মামি ওয়াতার। তিনি উর্বরতা ও আরোগ্যের দেবী। কোথাও চুলখোলা নারীর অতিকায় সাপ ধরে রাখা অবস্থায়, আর কোথাও নারীর শারীর নিচের অংশ সাপ হিসেবে তিনি উপস্থাপিত হন।

উর্বরতা ও আরোগ্যের দেবী মামি ওয়াতা; Image Source: behance.net

কেল্টিক কাহিনী

কোররা কেল্টিক বিশ্বাসে জীবন, মৃত্যু এবং উর্বরতার দেবী। কোথাও তাকে ধরণীমাতা হিসেবেই হাজির দেখা যায়। পুনর্জন্ম, এবং জীবনের বিভিন্ন স্তরে সফরও প্রকাশিত হয় তার মাধ্যমে। চিত্রিত হয় দুটো সাপ পরস্পর পেঁচানো অবস্থায়। কোররার উত্থান ও তার স্থিতিকাল নিয়ে বিস্তারিত না জানা গেলেও তার পতনের আখ্যান জানা যায়।

আয়ার‌ল্যান্ড থেকে সমস্ত সাপ সরিয়ে দেয়ার কৃতিত্ব দেয়া হয় সেইন্ট প্যাট্রিকের নামে। তিনি স্থানীয় কেল্টিক ধর্ম এবং ড্রুইড উপাসনার বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়েছিলেন। বাস্তবিক অর্থেই বিপুল পরিমাণে হ্রাস পেলো সাপের অস্তিত্ব। সাপ উপাসনার সংস্কৃতি প্রতিস্থাপিত হলো খ্রিষ্টধর্মের নানা আচারের মাধ্যমে। কোররার সাথে মোকাবিল হলো সেইন্ট প্যাট্রিকের। কোররা পরিণত হয় পাথরে। এই কিংবদন্তি হয়তো আক্ষরিক অর্থে সত্য না। কিন্তু খ্রিষ্টধর্মের আগমন কীভাবে স্থানীয় সংস্কৃতিতে বিলুপ্ত করেছে; তা স্পষ্ট হয়।

তারপর

অ্যাজটেক উপকথায় প্রধান দেবতা কেতজালকোতল। নামের অর্থ মূল্যবান পালকের সাপ। অ্যাজটেক আমলে (১১০০-১৫২১ খ্রিষ্টাব্দ) তার উপাসনা করা হতো বেশ আড়ম্বরের সাথে। তিনি ছিলেন শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষক। এছাড়া প্রাচীন রোমান উপকথা, চীনা উপকথা, এবং আমেরিকার আদিবাসীদের বিভিন্ন সংস্কৃতিতেও সাপকে বেশ প্রভাবশালী রূপে হাজির হতে দেখা যায়। বাইবেলে আদম ও ইভের গল্প থেকে শুরু করে গসপেলে যীশুর বিবরণী অব্দি সাপকে বিভিন্ন রূপে হাজির হতে দেখা যায়।

সাপ বরাবরই রহস্যময়। মানুষের কল্পনা সাপকে নিয়ে অবচেতনেই মনোযোগ ও আকর্ষণ দেখিয়েছে। সে ভারতে হোক বা মেসো-আমেরিকা; চীনে হোক বা গ্রিসে। কখনও শুভশক্তি ও মানুষকে সুরক্ষাদাতা রূপে; কখনও অপশক্তি ও শত্রুর রূপে। কখনও অমরত্বের প্রতীক ও গুপ্তভাণ্ডারের প্রহরী। আবার কখনও দুর্দশা ও মৃত্যু আনয়নের নায়ক। মানুষ কখনও জন্ম, মৃত্যু, সফলতা আর ব্যর্থতার চক্র থেকে বের হতে পারেনি। ফলে সাপ কেবল প্রাসঙ্গিক হয়েই ওঠেনি, পেয়েছে উপাস্যের মর্যাদা।



৩১


কনফুসিয়ানিজম: ভারসাম্যের প্রতিশ্রুতিতে ধর্মদর্শন

Ahmed din Rumi

শিল্প-সংস্কৃতিজুন 15, 2021

article

পাঁচজন বৃদ্ধ সাধুপুরুষ সামনে থেকে পথ দেখাচ্ছেন। পেছনে অদ্ভুত এক প্রাণী। দেখতে ড্রাগনের মতো হলেও মাথায় শিং। যেন ড্রাগন আর ইউনিকর্নের সম্মিলিত রূপ। চীনা সংস্কৃতিতে একে চিলিন বলে। প্রাণীটা ধীরে ধীরে সামনে এসে অবনত করলো মাথা। তারপর মুখ থেকে বের করে দিলো একটা পাথরের টুকরা। তাতে লেখা, ‘তোমার ছেলে হবে মুকুটবিহীন সম্রাট’। গর্ভবতী ছেংচাই এই স্বপ্নটা দেখেছেন কয়েক দফা। আর অচিরেই প্রমাণিত হলো ভবিষ্যদ্বাণী। বিশৃঙ্খল দুনিয়ায় ভারসম্য স্থাপন করতে আগমন করলেন এক অনন্য সম্রাট, কনফুসিয়াস।

বর্তমান বিশ্বের ষাট লাখেরও বেশি মানুষ নিজেদের কনফুসিয় মতবাদের অনুসারী বলে গণ্য করে। অবশ্য অনুসারী তৈরির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বচিন্তায় এই মতবাদের ভূমিকা। আড়াই হাজার বছরেরও আগে কোনো এক ব্যক্তির চিন্তা কীভাবে চীনা ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য এবং মূল্যবোধকে সংহত রূপ দিয়েছে, তা রীতিমত বিস্ময়কর। চীনের কথা বাদ দিলেও জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান এবং সিঙ্গাপুরের সংস্কৃতিতে এখনো দাগ লেগে আছে কনফুসিয় মতবাদের। পৌঁছে গেছে ইউরোপ, আমেরিকা এমনকি আফ্রিকার মাটিতেও।

কনফুসিয়াস

মূলত মান্দারিন কং ফুচি নামের ল্যাটিনকৃত উচ্চারণ কনফুসিয়াস। জন্মগ্রহণ করেন ৫৫১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে চীনের চৌ সাম্রাজ্যের পতনের যুগে। পিতা কং শুলিয়াং ছিলেন ছোট্ট নগরী সু এর শাসনকর্তা। ধমনীতে তার শাং সম্রাটদের রক্ত। নয় কন্যা আর এক খোড়া পুত্রের পিতা শুলিয়াং শেষ বয়সে উপনীত হয়ে ছেংচাইকে বিয়ে করেন শুধু একটা উত্তরাধিকারের জন্য। ভাগ্য তাকে নিরাশ করেনি। তাদের ঘরেই জন্ম নেয় সেই পুত্র, যে বদলে দেয় গোটা চীনের ভবিষ্যৎ।

বিশ্বের উচ্চতম কনফুসিয়াস মূর্তি, Image Source: theculturetrip.com

মাত্র তিন বছর বয়সে পিতার মৃত্যুতে দরিদ্রতা যেন ঠেসে ধরে পরিবারকে। কনফুসিয়াস জীবনকে খুব কাছে থেকে উপলব্ধি করতে শেখেন তখন থেকেই। খাদ্য সংগ্রহ করে দিতেন মাকে। অবসরে মজে থাকতেন সংগীতে। নিয়মিত পড়তেন কবিতা। তবে প্রাচীন চীনের বিখ্যাত পাঁচ ক্লাসিক তার জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে। পুস্তকের পাঠ চুকিয়ে সরকারি কর সংগ্রাহক পদে কিছুদিন চাকুরি করেন। নিজের চোখে দেখেন আমলাদের দুর্নীতি এবং কৃষকদের উপর চলমান জুলুম। একদিকে বিদ্যমান অর্থব্যবস্থায় ঘুষের প্রকোপ আর অন্যদিকে ফল ও ফসলে কর দেয়ার কারণে কৃষক পরিবারই অভুক্ত। এই অরাজকতা দেখেই মূলত খোলেন চুন জু নামে এক শিক্ষাকেন্দ্র।

বলতে গেলে তার উদ্দেশ্য ছিল, তরুণরা পরিশুদ্ধ মানুষ হয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণে নিবেদিত হবে। লম্বা সময় ধরে সেখানে শেখানো হতো উপাসনা, সংগীত, লেখালেখি, তীর চালনা, রথচালনা এবং গণিত। কনফুসিয়াস একজন ন্যায়পন্থী কল্যাণকামী শাসক চেয়েছিলেন। দক্ষাতা দেখিয়েছেন রাজনৈতিক মীমাংসায়। কিন্তু লু অঞ্চলের ডিউক তাকে কেবল জ্ঞানী হিসেবে দরবারের সৌন্দর্য করেই রাখলেন। হতাশ কনফুসিয়াস বাসা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন যাযাবরের মতো। এই সময়েই দেখা হয় চীনা ইতিহাসের আরেক সিদ্ধাপুরুষ লাওজুর সাথে। এদিকে অচিরেই তার শিক্ষার যথার্থতা প্রমাণ করলো ছাত্র চান ছিউ। তার পরামর্শ আর কৃতিত্বের কারণে লু প্রতিবেশি রাজ্যের উপর বিজয়ী হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮৪ সালে ঘরে ফেরার দাওয়াত আসলো কনফুসিয়াসের। ঘটনাবহুল জীবনযাপনের পর ৪৭৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মৃত্যুবরণ করেন এই মহাপুরুষ।

মতবাদ

নিজেকে নতুন কিছুর প্রবক্তা মনে করতেন না কনফুসিয়াস। নিজেকে ভাবতেন প্রাচীন সাধু পুরুষদের রেখে যাওয়া জ্ঞানের প্রচারক হিসেবে। চিন্তায় প্রাধান্য পেয়েছে নৈতিকতা, ভালোবাসা এবং মানবতাবোধ। একবার এক শিষ্য তাকে প্রশ্ন করে, ‘এমন কোন কাজ আছে, যার মাধ্যমে মানুষের সমস্ত দায়িত্ব পালিত হয়?’ কনফুশিয়াস উত্তর দিলেন, ‘সহানুভূতি। তুমি অন্যের জন্য কখনোই তা করবে না। যা তুমি অন্যের মাধ্যমে নিজের সাথে ঘটতে অপছন্দ করো।’ তার সমস্ত কর্মযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ব্যক্তি ও সমাজজীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে ভারসম্য। এজন্য গুরুত্ব পেয়েছে ব্যক্তি-ব্যক্তি এবং ব্যক্তি-রাষ্ট্র সম্পর্কে ন্যায়ের সর্বোচ্চ চর্চা। সমাজের ইউনিট হচ্ছে পরিবার। ব্যক্তির ভেতরে নৈতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা পরিবারের মাধ্যমেই বিকশিত হয়। ফলে পরিবার বিশেষ স্থান নিয়ে আছে তার চিন্তায়।

গ্রিসে তখনো সক্রেটিস জন্ম নেননি, চীনে তখন কনফুসিয়াসের দরবার জমজমাট; Image Source: chatty.com

কনফুসিয় মতবাদের প্রতিক লি। সৎ ব্যবহার আর ভারসম্যপূর্ণ আচরণ ও ভদ্রতা বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। গোটা দর্শনের কেন্দ্রে যার অবস্থান। ভদ্রতা বলতে কনফুসিয়াস পাঁচটি গুণের সমাবেশকেই বুঝতেন। সৌজন্যবোধ, মহানুভবতা, সৎ বিশ্বাস, দয়া এবং অধ্যাবসায়। ভদ্রলোক আগে চর্চা করে, তারপর প্রচারে নিমগ্ন হয়। মানুষে মানুষে সম্পর্ককে পাঁচটা শ্রেণিতে ভাগ করেন তিনি। পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-ভাই, বন্ধু-বন্ধু এবং শাসক-প্রজা। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব রয়েছে। গোটা ব্যবস্থায় নারী ছিল যথেষ্ট নিরাপদ। অপেক্ষাকৃত কম সুন্দরী নারীও পরিবারে মর্যাদা নিয়ে থাকবে। পুত্র থাকবে আনুগত্য প্রবণ এবং পিতা দায়িত্ববান। শাসক-প্রজা সম্পর্কটা মূলত পিতা-পুত্র সম্পর্কেরই বিস্তৃত রূপ। রাজ্য যেন বিশাল পরিবারের মতো। প্রজা আনুগত্য আর সম্মান দেখাবে, শাসক প্রমাণ দেবেন দায়িত্ববোধের। মানুষের কল্যাণের জন্য সর্বদা ত্যাগে প্রস্তুত থাকবেন। কনফুসিয়াসের মৃত্যুর শত বছর পরে চীনে তার মতবাদ রাষ্ট্রীয় বিশ্বাস হিসাবে গৃহীত হয়।

বিবর্তন

কনফুসিয়াসের মৃত্যুর পরে তার শিষ্যরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। তিনি অভ্যন্তরীণ অনুভূতিকে বাহ্যিক আচরণের আত্মা হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। অথচ অধিকাংশ উপদেশ শিষ্যদের কাছে হয়ে উঠে নেহায়েত আচারসর্বস্ব। জনৈক শিষ্য মোজি (৪৭০-৩৯১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) তাই সেই পন্থা ত্যাগ করে নিজেই নতুন সহজিয়া ধরার পত্তন ঘটান। একই সময়ে বিস্তার লাভ করে তাওবাদ। কনফুসিয়াস এবং লাওজু- দুইজনেই ভারসম্যের কথা বলেছেন। ফারাক হলো প্রথমজনের কণ্ঠে সামাজিক ভারসম্য মূখ্য আর দ্বিতীয়জনের ভাষায় মূখ্য প্রকৃতিতে অন্তর্নিহিত ভারসম্যের সাথে নিজেকে মেলাতে পারায়।

কনফুশিয়াসের পরে মেনসিয়াসই শ্রেষ্ঠ ভূমিকা পালন করে মতবাদ বিস্তারে; Image Source: libertarianism.org

কনফুসিয় মতবাদের উত্তরণ ঘটে শিষ্য মেংচি (৩৭১-২৮৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)-এর মাধ্যমে। ল্যাটিন ভাষায় পরিচিত মেনসিয়াস নামে। সরাসরি কনফুসিয়াসের সান্নিধ্য না পেলেও তার এক নাতির অধীনে লাভ করেন শিক্ষা। প্রজ্ঞা আর বক্তৃতায় সমকালে বেশ প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন খোদ কনফুসিয়াসের চেয়েও আত্মবিশ্বাসী। মানুষকে নিয়ে আরো বেশি আশাবাদী। তার ভাষ্যে,

সত্যিকার মানুষ সে-ই, যে তার দায়িত্ব পালন করে। সম্পদ আর সম্মানের নেশা যাকে দূষিত করে না। দারিদ্র আর নির্ভরতা যারে পরিবর্তিত করে না। ক্ষমতা যাকে নতজানু করতে পারে না।

মেনসিয়াসের পরেই আগমন করেন শুনচি (২৮৯-২৩৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)। মানুষকে তিনি প্রকৃতিগত ভাবেই লোভী আর অপরাধপ্রবণ বলে মনে করতেন। সৎকর্ম পালনকারীকে পুরস্কার এবং দুষ্কৃতিকারীকে শাস্তি দিয়ে হলেও আলোর পথে আনা জরুরি। তার অনুসারীরাই চিন রাজার পরামর্শক থাকাকালেই রাজ্য বিস্তারের বুদ্ধি দেন। চৌ সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন সাম্রাজ্য। ২২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে চিন রাজা শিহুয়াংতি বা প্রথম সম্রাট নাম ধারণ করেই আইন প্রয়োগের মাধ্যমে রাজ্য শাসনে মনোনিবেশ করতে চান। কিন্তু কনফুসিয়াসের নীতি, ‘শাসক আইন দিয়ে না, নিজে উদাহরণ সৃষ্টির মাধ্যমে শাসন করবে’। কনফুসিয়াসের শিষ্যদের সাথে বিরোধের জেরে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সম্রাট। কৃষি আর চিকিৎসা বাদে সমস্ত পুস্তক পুড়িয়ে ফেলা হয়। অন্তত ৪০০ পণ্ডিতকে দেয়া হয় জীবন্ত কবর।

শিহুয়াংতির ক্ষমতা দীর্ঘ হয়নি। তার মৃত্যুর পর অরাজকতার সুযোগে লিও পাং প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত হান সাম্রাজ্য (২০৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ-২২০ খ্রিষ্টাব্দ)। লিও পাং নিজে পণ্ডিতদের খুব একটা পছন্দ করতেন না। কিন্তু নিজের ক্ষমতাকে স্থায়ী করার জন্যই কনফুসিয়াসের অনুসারীদের সহযোগিতা নেন। নতুন করে শুরু হয় চর্চা। অবশেষে ১৩৬ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট উ তি কনফুসিয় মতবাদকে রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসের মর্যাদা দেন। মৃত্যুর চারশো বছর পর সত্যতা পেলো কনফুসিয়াসের স্বপ্ন।

সম্রাট উ তির আমলেই কনফুশিয় মতবাদ রাষ্ট্রীয় ধর্মের স্বীকৃতি লাভ করে, Image Source: weekinchina.com

বৌদ্ধধর্ম এবং তাওবাদের মতো প্রভাবশালী মতবাদের সামনেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে কনফুসিয়ানিজম। যাজক সম্প্রদায়ের বদলে তাদের ছিল সরকারি কর্তাব্যক্তি এবং পণ্ডিত। ছিল দর্শন, নন্দনতত্ত্ব, শিল্প, সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের নকশাও। ফলে কেবল চীনই না, আশেপাশের দেশগুলোও এই সংস্কৃতিকে জড়িয়ে ধরলো সাগ্রহে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, কোরিয়া, তাইওয়ান এবং জাপানে সৃষ্টি হয় স্বতন্ত্র ধারা।

পুস্তাকাদি

প্রাচীন চীনা জ্ঞানরাজ্যের আলোচিত পাঁচটি ক্লাসিকই কনফুসিয় মতবাদের প্রাথমিক ভিত্তি। সম্রাট উ তি-এর আমলে সরকারি চাকুরি প্রত্যাশী প্রত্যেককেই পুস্তকগুলো পড়তে হতো।

১) ৩০০ কবিতা নিয়ে গ্রন্থ শিচিং। একই সাথে গানও, কারণ সেই সময়ে চীনা কবিতা গাওয়াও হতো। অর্ধেক কবিতার বিষয়বস্তু প্রেম, যুদ্ধ আর কাজ। বাকি অর্ধেক বলতে গেলে দরবারি কবিতা। কনফুশিয়াস নিজেই শিষ্যদের কবিতা মুখস্থ করে ফেলার তাগিদ দিতেন। আবৃত্তি করতেন প্রায়শ।

২) আচার ও উপাসনা পদ্ধতি নিয়ে রচিত গ্রন্থ লিচি। পুস্তকটিকে আবার তিনটা অংশে ভাগ করা যায়। প্রথমত, চৌ লি বা চৌ সাম্রাজ্যের আমলে আমলাতান্ত্রিক রীতিনীতি। দ্বিতীয়ত, ই লি বা অভিজাতবর্গের আচারাদি। বিয়ে, ধর্মীয় উৎসর্গ, শেষকৃত্য, তীরচালনা প্রতিযোগিতা এবং ভোজ উৎসবের মতো। শেষ অংশটাই মূলত লিচি। সরকার পরিচালনা, রথ চালনা, রান্না, ঘরোয়া কাজ, শিশুর নামকরণ এবং ব্যক্তির মার্জিত ব্যবহারের পদ্ধতি তুলে ধরা। অবশ্য কনফুশিয়াসের পড়া আর লিচি পরবর্তীতে শিষ্যদের হাতে বিবর্তিত হয়েছে।

৩) আদিম রাজাদের কিংবদন্তি ও ইতিহাস সংবলতি গ্রন্থ শুচিং। উপকথা, কিংবদন্তি আর ইতিহাস মিলে এক অদ্ভুত দ্যোতনা তৈরি হয়েছে সেখানে। চীনে প্রথম সভ্যতার উদ্ভব থেকে শুরু করে চৌ আমলের প্রথম দিক অব্দি। আরো স্পষ্ট করতে বলতে গেলে ২০৭০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ২৫৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত।

৪) লু প্রদেশের ইতিহাস নিয়ে রচিত ছুন চিউ। ৭২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৮১ খ্রিষ্টপূর্বাদ অব্দি। কনফুসিয়াসের প্রদেশ এই লু। বইটাতে অনেক ইশারাপূর্ণ কথা আছে। শিষ্যদের দাবি, আসলে কনফুসিয়াস নিজেই এই গ্রন্থের রচয়িতা। প্রদেশের সংরক্ষণাগারের নথি ব্যবহার করে লিখেছেন।

৫) লোকজ জ্ঞান আর জ্যোতিষবিদ্যা বিষয়ক গ্রন্থ ই চিং। মানব অস্তিত্বের অর্থবাচকতা, প্রাকৃতিক ঘটনাবলির তাৎপর্য এবং ভবিষ্যত বুঝতে এই পুস্তক পাঠ করা হয়। ৬৪টি হেক্সাগ্রাম রয়েছে এখানে। সাথে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা। হেক্সাগ্রামের যেকোনো একটা লাইনের উপর পয়সা ফেলে বা কাঠি রেখে ব্যক্তির পরিবর্তন ব্যাখ্যা করা হতো। কনফুসিয় মতবাদের অন্যান্য ক্লাসিক পুস্তকের থেকে ব্যতিক্রম। অনেক বেশি আধ্যাত্মবাদ নির্ভর। ফলে বলতে গেলে এই পুস্তকে এসে কনফুসিয় মতবাদ তাওবাদের বিকল্প হিসাবে দাঁড়িয়েছে।

পরবর্তী পুস্তকগুলো সরকারি চাকুরি লাভের জন্য অবশ্যপাঠ্যে পরিণত হয়; Image Source: chinahao.com

পরবর্তী সময়ে নয়া-কনফুসিয় মতবাদের অনুসারীদের মাঝে চারটি পুস্তক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাদের মধ্যে লিচি বা আচারপুস্তক থেকে দুইটা অংশ। তৃতীয়টি দীর্ঘ সময় ধরে শিষ্যদের মাঝে টিকে থাকা কনফুসিয়াসের উপদেশাবলি বা এনালেক্টস্। ৪৯৭টি সংক্ষিপ্ত পঙক্তি নিয়ে আড়াই হাজার বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে পঠিত পুস্তকের তালিকায় আছে। চতুর্থটি মেনসিয়াসের শিক্ষা ও প্রচারণা। এর বাইরে ছং ইয়ং নামের কিতাব পঠিত হয় মধ্যমপন্থা ও ভারসম্য চর্চার পাথেয় হিসেবে।

সংস্কারবিধি

দক্ষিণায়নের দিনে সবচেয়ে বড় উৎসব পালিত হয়। শীতের পরে সূর্যের পুনরায় রাজত্বের শুরু। ইনের আধিপত্যের পরে ক্ষমতায় আসে ইয়াং। উৎসর্গের বেশ কিছু ধরন আছে। শাসক নিজের তত্ত্বাবধানে সকলকে সাথে নিয়ে উৎসর্গ করেন বিপুল পরিসরে। জীবিত করা হয় হাজার বছরের ঐতিহ্য। বিভিন্ন মন্দিরেও তার সম্মানে উৎসর্গ করা হয়। বিপুল না হলেও মোটামুটি মাত্রায়। অন্যদিকে পারিবারিকভাবে উৎসর্গের নিয়ম তো থাকছেই। সবটাই হয় লিচি মেনে, ফলে কালের বিবর্তনেও উৎসর্গের ধরন একই। তিন দফায় কনফুসিয়াসকে স্মরণ করা হয়। প্রথমবার তার জন্মদিন। দ্বিতীয়বার তিনি যখন পণ্ডিত মহলে গুরু রূপে আবির্ভূত হলেন। সবিশেষ, কনফুসিয় মতবাদ যখন রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা পেল।

২০০৫ সালে কনফুসিয়াসের ২৫৫৬তম জন্মদিন পালিত হয়; Image Source: learnreligions.com

কনফুসিয় মতবাদের প্রধান এবং বৃহত্তম মন্দির হলো চুফুর মন্দির। মিং শাসনামলে (১৩৬৮-১৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) ৪৯ একর জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত পুণ্যভূমি। কয়েকশো হলরুম, সুদৃশ্য মূর্তি এবং পাথরে খোদাই করা সাধুগণের বাণী। প্রতি বছর ২৮শে সেপ্টেম্বর পালিত হয় কনফুসিয়াসের জন্মদিন। মানুষ দলে উপদলে এসে নিজের প্রার্থনা করে। প্রতি গ্রামেই স্থানীয়দের উপসনার জন্য নির্মিত হয় মন্দির। তাছাড়া অভিজাত পরিবারের বাড়ির পূর্বপাশে কক্ষ নির্ধারিত থাকে। স্থান ও কাল ভেদে নিবেদনের ধরন ভিন্ন হয়। হওয়াটা স্বাভাবিক।

প্রথম পাঠ হিসেবেই শিশুকে বড়দের প্রতি আচরণ শেখানো হয়। কথা বলতে শেখার সাথে সাথে রপ্ত করানো হতে থাকে ভাষা ব্যবহারের সংযম। ছয় বছর বয়সে চলে সংখ্যা ও দিক সম্পর্কে জ্ঞানদান। ছেলে ও মেয়ে উভয়েই কনফুসিয়াসের এনালেক্টস্ পাঠের ক্ষমতা অর্জন করে। দশ বছর থেকে শুরু হয় ক্লাসিক বইগুলো আয়ত্ব করার তোরজোড়। ছেলেরা বাইরের জ্ঞান অর্জনে লিপ্ত আর মেয়েরা ঘরোয়া। বয়স পনেরো থেকে বিশের মধ্যে ছেলে ও মেয়েকে যথাক্রমে পরিণত পুরুষ ও নারী বলে স্বীকৃতি দেয়া হয় উৎসবের মধ্য দিয়ে। বিয়ের পুরো ক্ষমতা থাকে পাত্র ও পাত্রী পক্ষের অভিভাবকদের হাতে। পারিবারিক বন্ধনকে সুস্থ ও ভারসম্যপূর্ণ করতে সম্পর্কিত সকলের উপর অর্পিত হয় দায়িত্ব। বিপরীতে, প্রিয়জনের মৃত্যুতে তিন মাস ব্যাপী চলে শোক সন্তপ্ত আত্মীয়ের আচারাদি পালন।

তারপর

নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অন্যান্য ধর্ম ও মতবাদের দৌরাত্ম, ইউরোপীয়দের আগমন এবং কম্যুনিজমের উত্থানের পরেও একবিংশ শতকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কনফুসিয় মতবাদ। বর্তমানে চীনা সরকার ব্রিটিশ কাউন্সিলের আদলে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট স্থাপন করে যাচ্ছেন বিভিন্ন দেশে। চীনা সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে বয়ে চলছে কনফুসিয়াসের জীবন-দর্শন।

কনফুসিয়াস নিজেকে ব্যর্থ মনে করতেন। নিজেকে অভিহিত করতেন ‘গুপ্ত অর্কিড’ নামে; যার প্রস্ফুটিত হওয়া মানুষ দেখতে পায় না। অথচ তিনি জানতেন না নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে। তার মৃত্যুর পরে তিন বছর জুড়ে শিষ্যরা কেবল সমাধিতে বসে আহাজারি করেছে। নিবেদিত হয়েছে তার দেয়া দায়িত্ব পালনে। পৃথিবীকে বদলে দেবার দায়িত্ব। তারা পুরোপুরি সফল। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো চীনা ব্যক্তিই উস্তাদ কনফুসিয়াসের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারেননি। আজ আড়াই হাজার পরে তার সমাধির দৃশ্যই সেই সাক্ষ্য বহন করে।


৩২


রহস্যময় কৈলাস পর্বত

Mohammad Sayem

ইতিহাসনভেম্বর 26, 2022

article

কৈলাস পর্বত পশ্চিম তিব্বতে অবস্থিত একটি পবিত্র স্থান। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬,৬৫৬ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই পর্বতটি হিন্দু, বৌদ্ধ, বন এবং জৈন ধর্মের অগণিত মানুষের কাছে পবিত্র জায়গা হিসেবে বিবেচিত। হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী এই পর্বতটি দেবতা শিবের বাসস্থান এবং বিশ্বের কেন্দ্রস্থল। আবার জৈন ধর্মমতে পর্বতটি সেই জায়গা যেখানে তাদের পূর্বপুরুষ ঋষভনাথ পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। তিব্বতী বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন যে এই পর্বত সীমাহীন সুখের প্রতিনিধিত্বকারী চক্রসমভারের আবাসস্থল। বন ধর্মের কাছে কৈলাস একটি স্বস্তিকা পর্বত, যা আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এই পর্বত ও তার আশপাশের এলাকায় বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনা বহুকাল আগে থেকেই ঘটে আসছে। এসব ঘটনা লোকমুখে শোনা যায়। সেখানে তদন্ত করা হলেও এখনও পর্যন্ত কোনো উপসংহার পৌঁছান যায়নি। কৈলাস পর্বতকে ঘিরে তেমনই কিছু রহস্য নিয়ে আজকের লেখা।

কৈলাস পর্বত; Image source: Isha Foundation

হিমালয়ে অবস্থিত কৈলাস পর্বত সেখানকার সবচেয়ে উঁচু পর্বত না হলেও এই পর্বতশৃঙ্গে কেউ আরোহণ করেনি। কারণ, এটা বিশ্বাস করা হয় যে কৈলাস পর্বতে আরোহণ করা দেবতাদের অপমান করার সামিল। তবে প্রাচীন কিংবদন্তী অনুযায়ী, মিলারেপা নামে একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এ পর্বতে আরোহণ করেছিলেন। চারজন পর্বতারোহী এই পর্বতে আরোহণের সময় মারা গিয়েছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাস হোক বা প্রাকৃতিক কারণ, কৈলাস পর্বতে আরোহণ যেন একপ্রকার নিষিদ্ধ কাজ

বিজ্ঞানীদের অনুমান, কৈলাস পর্বতের চূড়াটি আসলে একটি মনুষ্যসৃষ্ট ভ্যাকুয়াম পিরামিড, এবং এটি ১০০টিরও বেশি ছোট পিরামিড দিয়ে বেষ্টিত। প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, পিরামিড কমপ্লেক্সের উচ্চতা ১০০ থেকে ১,৮০০ মিটারের মধ্যে, যেখানে মিশরীয় পিরামিডের উচ্চতা মাত্র ১৪৬ মিটার। এই অনুমান যদি সত্য হয়, তবে এটি আজকের যেকোনো পরিচিত পিরামিডের চেয়ে বড় হবে

ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে একে পৃথিবীর কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। তবে ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে এর বিশেষত্ব রয়েছে। কারণ, যুক্তরাজ্যের স্টোনহেঞ্জ থেকে এর দূরত্ব ৬,৬৬৬ কিলোমিটার, যা কৈলাস থেকে উত্তর মেরুর দূরত্বও বটে। আবার কৈলাস থেকে দক্ষিণ মেরুর দূরত্ব ১৩,৩৩২ কিলোমিটার, যা উত্তর মেরু বা স্টোনহেঞ্জের দূরত্বের ঠিক দ্বিগুণ

কিছু বিজ্ঞানীর মতে, কৈলাস পর্বতমালায় এমন কোনো শক্তি রয়েছে যা শরীর এবং মনকে উদ্দীপ্ত করে। বলা হয়ে থাকে, কৈলাসের আশেপাশে যারা ১২ ঘন্টা সময় ব্যয় করেন, তাদের চুল এবং নখের বৃদ্ধি এত বেশি হয় যা স্বাভাবিক সময়ের দুই সপ্তাহের সমান!

কৈলাস পর্বতের পাদদেশে দুটি হ্রদ রয়েছে। একটি মানস সরোবর হ্রদ ও আরেকটি রাক্ষস তাল হ্রদ। মানস সরোবর হ্রদটি পবিত্র এবং এটি একটি মিঠা পানির হ্রদ। আবার রাক্ষস তাল হ্রদ একটি লবণাক্ত জলের হ্রদ যা ভূতের হ্রদ হিসেবে পরিচিত। মানস সরোবরের একটি বৃত্তাকার আকৃতি রয়েছে যা সূর্যের অনুরূপ এবং রাক্ষস তাল দেখতে অর্ধচন্দ্রের মতো। এজন্য হ্রদ দুটি যথাক্রমে আলো ও অন্ধকারের প্রতিনিধিত্ব করে।

মানস সরোবর হ্রদ ও রাক্ষস তাল হ্রদ; Image source: Eugene Kaspersky

যখন সূর্য অস্ত যায়, তখন পর্বতের ছায়া এমনভাবে পড়ে যে ধর্মীয় প্রতীক স্বস্তিকার সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যা হিন্দুদের মধ্যে একটি শুভ চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়

হিমালয়ের কৈলাস এবং নিকটবর্তী মানস সরোবর হ্রদ থেকে এশিয়ার সিন্ধু, গঙ্গা, সতলজ নদী এবং ব্রহ্মপুত্র নদের জন্ম হয়েছে। সেখান থেকে উৎপন্ন হয়ে চারটি নদী হাজার হাজার মাইল পথ প্রবাহিত হয়ে ভারত মহাসাগরে পতিত হয়েছে।

দক্ষিণ দিক থেকে দেখলে কৈলাস পর্বতের গায়ে ওম (ॐ) প্রতীক আছে বলে মনে হয়। বিশেষত পাহাড়ের চূড়া থেকে বিশাল বরফের গর্ত এবং অনুভূমিক শিলা গঠনের ভূপ্রাকৃতিক কারণে এরূপ আকৃতি গঠন করে। তবে ধর্মীয় দিক থেকে এই বিষয়টি বিশ্বাসের সাথে জড়িত।

বরফের আবরনে কৈলাশ পর্বতের গায়ে ওম প্রতীক ফুটে উঠেছে; Image source: Trip Advisor

হিন্দুদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বেদে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, কৈলাস পর্বত স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যে একটি সিঁড়ি। মহাভারত অনুসারে, পাণ্ডবরা তাদের একমাত্র সঙ্গী দ্রৌপদীর সাথে মোক্ষ অর্জনের জন্য কৈলাস পর্বতে আরোহণ করেছিলেন। স্বর্গে যাওয়ার পথে, যুধিষ্ঠির ব্যতীত সকলেই চূড়ায় আরোহণ করার সময় একে একে পিছলে গেল। এটা বিশ্বাস করা হয় যে স্বর্গের দরজা শুধুমাত্র যুধিষ্ঠিরের জন্য খোলা হয়েছিল। পিরামিড-আকৃতির কৈলাস পর্বতের চারটি ঢাল কম্পাসের চারটি দিকের দিকে মুখ করে রয়েছে, যা একে পরিপূর্ণতার প্রতীক করে তোলে। শিষ্যরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে এটি স্বর্গের প্রবেশদ্বার

কৈলাস পর্বত গ্রানাইট দিয়ে গঠিত। এ পর্বতের চারটি মুখ চারটি দিক, যেমন- উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে মুখ করে আছে। ধর্মীয় বিশ্বাসমতে, এই পর্বত তার চারটি দিক থেকে বিভিন্ন শক্তি নির্গত করে। প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বিষ্ণু পুরাণে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে- কৈলাস পর্বতের পশ্চিম মুখ চুনি বা পদ্মরাগমণি দিয়ে, দক্ষিণ মুখ নীলকান্তমণি দিয়ে, উত্তর মুখ স্বর্ণ দিয়ে এবং পূর্ব মুখ ক্রিস্টাল বা স্ফটিকের মতো মূল্যবান পাথর দিয়ে গঠিত। এটি কৈলাস পর্বতের রহস্য নিয়ে আরও একটি আলোচিত বিষয়।

কৈলাস পর্বতের চারটি দিকের আলাদা ছবি; Image source: Aradhya Tour

কেউ কেউ দাবি করেছেন যে তারা রাতে কৈলাস পর্বতের কাছ থেকে অদ্ভুত ফিসফিস শুনতে পান। প্রকৃতপক্ষে, এই কৈলাস পর্বত রহস্য ড. আর্নস্ট মুল্ডাশিফের লেখা একটি বইয়েও নথিভুক্ত করা হয়েছে। কৈলাস পর্বতের নিঃশব্দ প্রাসাদ থেকে আসা অদ্ভুত ফিসফিসের বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন

ড. আর্নস্ট মুল্ডাশিফ; Image source: Russia Beyond

অন্য একরাতে ড. মুল্ডাশিফ এবং তার দলের সদস্যরা পাথর পড়ার একটি বিভীষিকাময় শব্দ শুনতে পান যা কৈলাস পর্বতের ভেতর থেকে আসার মতো মনে হয়েছিল। তার মতে, এটা খুবই সম্ভব যে এখনও কিছু জীবিত প্রাণী কৈলাস পর্বতের পিরামিডের ভেতরে বাস করে

এটি কৈলাস পর্বতের সেই রহস্যগুলোর একটি যা দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। তিব্বতি গুরুদের মতে, কৈলাস পর্বতের আশেপাশের অঞ্চলে অতিপ্রাকৃত শক্তি রয়েছে যা বর্ণনা করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে, তিব্বতীরাও বিশ্বাস করে যে রহস্যময় শহর শাম্ভালাও কৈলাস পর্বতের আশেপাশের অঞ্চলে অবস্থিত। বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুসারে, সিদ্ধা এবং তপস্বী লোকেরা এখনও রহস্যময় শাম্ভালা শহরে বাস করে।

অনেকে বলেন, কৈলাস পর্বত ভেতর থেকে ফাঁপা। কেউ কেউ আবার দাবি করেছেন, ‘ওম’ শব্দ কৈলাস পর্বত থেকে আসে। কোনো কোনো বিজ্ঞানীর আবার দাবি, এই শব্দ আসলে বরফ গলার আওয়াজ। বলা হয়, যখন শব্দ ও আলো মিলিত হয়, তখনই ‘ওম’ শব্দটি উৎপন্ন হয়

কৈলাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ; Image source: Medium

মানস সরোবর হ্রদের রহস্যময় আলো কৈলাসের সবচেয়ে বড় রহস্য। বেশ কয়েকবার মানস সরোবর হ্রদের উপরে রহস্যময় আলো দেখা গেছে। এছাড়া এলিয়েন নিয়েও এই পর্বতকে ঘিরে রয়েছে বেশ কিছু তত্ত্ব। অনেক অভিযাত্রীর ভাষ্যে, তারা কৈলাস পর্বতের আশেপাশে রহস্যময় আলোর পাশাপাশি ‘এলিয়েন শিপ’ দেখেছে! অনেকের ধারণা, কৈলাস আসলে এলিয়েনদের গোপন শহর, যেখানে তারা একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসে বৈঠক করে।

তবে এতসব রহস্য থাকলেও কৈলাস পর্বত ধর্মীয় দিক থেকে একটি অনন্য স্থান দখল করে আছে। এই পর্বতের রহস্য উদঘাটন করতে না পারলেও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবশ্যই মানুষকে বিমোহিত করবে।

৩৩

আবুল ফজল: নবরত্নের শ্রেষ্ঠ রত্নটি

Ahmed din Rumi

জীবনীজানুয়ারি 19, 2022

article

সিন্ধুর সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান শেখ মুসা। চরিত্র আর জ্ঞান- উভয় কারণেই বেশ পরিচিত। তারই বংশধর শেখ খিজিরের মধ্যে প্রধান হয়ে দেখা দিল আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা। অদ্ভুত অনুসন্ধিৎসার কারণে ছুটে বেড়ালেন পূর্ব থেকে পশ্চিম। পূর্বপুরুষ এসেছিল আরব থেকে। তাই আরবের ঠিক যে বংশ থেকে তাদের উদ্ভব, সেই জাতিগোষ্ঠীর সাথেও কাটান বেশ কিছুদিন। শেষমেশ থিতু হলেন আজমীরের নিকটে নাগোর নামক স্থানে। নিয়মিত হাজির হতেন চিশতিয়া তরিকার সুফি শেখ হামিদুদ্দিনের জলসায়। এই শেখ খিজিরের পরিবারেই ৯১১ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন শেখ মোবারক। শেখ খিজিরের পুত্র।

মাত্র চার বছর বয়স থেকেই শেখ মোবারক পরিচয় দিতে থাকেন রক্তের। তা ফুটে উঠে মেধা এবং চিন্তাশক্তির মাধ্যমে। পিতার উত্তরাধিকার হিসেবেই পেয়েছিলেন ভেতরের তৃষ্ণা। পিতার চেয়ে ছুটাছুটি কম করেননি তিনি তার জন্য। সুফি মননের কারণে সমালোচিতও কম হননি। তারপরেও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি হিসেবে মোঘল শাসক বাবরের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। বাবর তখন ভারতে এসে সদ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। আরো পরে ৯৫০ হিজরিতে মহররম মাসে আগ্রায় চারবাগ ভিলার নিকটে স্থায়ী হন। সেই চারবাগ ভিলাও বাবরেরই নির্মিত। যা-ই হোক, সেখানেই জন্মগ্রহণ করে দুই পুত্র। প্রথমজন আবুল ফয়েজ কবি ও গণিতজ্ঞ। নিজের যোগ্যতাতে অনেক আগেই জায়গা করে নেন তৃতীয় মোঘল সম্রাট আকবরের প্রিয়মহলে। তবে প্রজ্ঞা আর প্রভাবে তাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন ছোট ভাই। শুধু মোঘল আমল না; ভারতের গোটা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ইতিহাসে বিশেষভাবে উজ্জ্বল সেই নাম- আবুল ফজল।

স্বীয় জ্ঞান ও যোগ্যতায় দরবারে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন আবুল ফজল; Image Source: ancient-origins

আবুল ফজলের ব্যক্তিত্ব এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ জীবন গঠনে পিতা শেখ মোবারকের ভূমিকা ব্যাপক। শৈশব থেকেই উৎসাহ আর মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করতে থাকেন তার সান্নিধ্যে। মাহদি মতবাদ সমর্থনের দরুণ রাজ দরবারের পণ্ডিত ব্যক্তিদের হাতে নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে শেখ মোবারককে। সেই সময় হিজরি সহস্রাব্দের পরিবর্তন ঘটছিলো। খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকেই সৈয়দ মুহাম্মদ জৈনপুরী নিজেকে ইমাম মাহদি দাবি করে দারুণ সাড়া পান। তিনি ক্রমবর্ধমান বস্তুবাদিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আধ্যাত্মিক অগ্রগতির পথে ডাকেন। 

বিদ্যমান নানা অস্থিরতার কারণে ক্রমে মাহদি মতবাদ জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। যেকোনো সহস্রাব্দ বদলের ঘটনায় বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তনের বিশেষ আন্দোলন দেখা যায় বিভিন্ন ধর্ম ও সমাজে। এই ধারণা মিলেনারিয়ানিজম নামে পরিচিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ক্রুসেডপূর্ব জেরুসালেমমুখী পশ্চিমা জনতার স্রোতের একটা বড় কারণ ছিলো খ্রিষ্টীয় পঞ্জিকায় সহস্রাব্দ বদলের ঘটনা। যীশুর পুনরায় আবির্ভূত হবার সম্ভাব্য সময়। অর্থাৎ সহস্রাব্দ মতবাদ। ভারতের প্রেক্ষাপটে হিজরি সহস্রাব্দের এই পরিবর্তন ধারণা মাহদি মতবাদের পেছনে কিছুটা হলেও জ্বালানির ভূমিকা পালন করা অসম্ভব না। অসম্ভব না পরবর্তীতে খোদ আকবরের দীন-ই ইলাহি প্রতিষ্ঠার পেছনে ক্রিয়াশীল মনস্তত্ত্ব গঠনে।

যা-ই হোক, তরুণ আবুল ফজলের মনে সেই বিশ্বাসের অস্থিরতা গভীর রেখাপাত করে। এই প্রভাবেই শিক্ষালাভ করেন ধর্ম, দর্শন এবং অন্যান্য শাস্ত্র; যা তাকে উদার হিসেবে পরিণত করেছে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে আরবি বলতে ও লিখতে পারার যোগ্যতা এবং পনের বছর বয়সেই মানসিক পরিপক্কতা সমসাময়িক ব্যক্তিদের বিস্মিত করে। আবুল ফজলের লেখাপড়াতে মনোযোগ ছিল প্রবল। দরবারে থাকার ফলে বন্ধনের সৃষ্টি হয়। এ কারণে অনাড়ম্বর বন্ধনহীনতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। নিজেকে লুকিয়ে রাখার দরুণ তাকে কেউ অনুভব করতে পারেনি গোড়ার দিকে। অবশেষে বড় ভাই আবুল ফয়েজ তার জন্য তৈরি করে দেন দরবারে পথ। ৯৮১ হিজরির শেষ এবং ১৫৭৪ সালের দিকে আবুল ফজল সম্রাট আকবরের সামনে হাজির হন বড় ভাইয়ের সাথে। সেই উপস্থিতিই বদলে দেয় সবকিছু। আকবর তার প্রতিভায় রীতিমতো অভিভূত। রত্নের অন্বেষণে থাকা ডুবুরির কাছে যেন এক আস্ত সমুদ্র এসে ধরা দিলো।

নবরত্নের সাথে আকবরের আড্ডা; Image Source: omyindian

১৫৭৯ সাল থেকে আবুল ফয়েজ এবং আবুল ফজল- দুই ভাইয়ের সাথে সম্রাট আকবরের সম্পর্ক ঘনীভূত হতে থাকে। আকবরের কাছে বড় ভাইয়ের অবস্থান বোঝা যায়; যখন দেখা যায় রাজপুত্র মুরাদের শিক্ষক হিসেবে তাকে ‍নিযুক্ত দেয়া হলো। অবশ্য ফয়েজ এবং ফজল উভয়েই সেনাবাহিনীতে প্রবেশ করেছিলেন। বিভিন্ন বিভাগে চাকরির ফলে নতুন নতুন সম্মানের সুযোগ খুলে যায়। দুই ভাই-ই থাকতেন ফতেহপুর সিক্রিতে। বছর দুইয়ের মধ্যেই বড় ভাই আগ্রা, কালপী এবং কালিঞ্জরের সদর নিযুক্ত হন। অন্যতম কাজ ছিলো নিষ্কর ভূমি দখলে আনার চেষ্টা করা। অন্যদিকে আবুল ফজল ১৫৮৫ সালে নিযুক্ত হন এক হাজারি মনসবদারে। এক হাজারি মনসবদার বলতে এক হাজার ঘোড়সওয়ারের সেনাপতি বোঝানো হয়। পরের বছরই দিল্লি প্রদেশের দেওয়ান নিযুক্ত হন তিনি। ১৫৮৯ সালের শেষের দিকে আবুল ফজলের মা মারা যান। তার স্মরণেই উৎসর্গ করা হয় আকবরনামা গ্রন্থটি। সম্রাট সান্ত্বনা দিতে তার নিকট গমন করেন এবং বলেন, ‘এই পৃথিবীর লোকেরা যদি চিরদিন বেঁচে থাকত’!

ধর্মীয় বিষয় এতদিনে আরো বহুদূর অগ্রসর হয়ে গেছে। আকবর প্রবর্তন করেছেন ‘দীন-ই ইলাহি’ নামের নতুন মতবাদ। এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং আকবরকে দুনিয়ায় তার প্রতিনিধি বলে স্বীকৃতি দান এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। অবশ্য বিভিন্ন সংস্কৃতিতে শাসকদের ঐশ্বরিক হিসেবে গণ্য করার ঐতিহ্য বেশ প্রাচীন। দরবারে ইসলামী আচার-উপাসনা হ্রাস পেল। তারিখ-ই ইলাহি নামে প্রবর্তন করা হলো নতুন অব্দ গণনা। পরবর্তীকালে এই তারিখ-ই ইলাহি থেকে জন্ম লাভ করে বাংলা বর্ষপঞ্জি। যা-ই হোক, দরবারের আমির-উমরাহগণ আকবরের উপর আবুল ফজলের প্রভাব দেখে নাখোশ ছিলেন। রাজপুত্র সেলিম (পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর) সেই নাখোশ ব্যক্তিদের অন্যতম। তার ক্রোধ এতটাই গভীর ছিল যে, সেলিম মনে করতে লাগলেন তার সমস্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় আবুল ফজল। কয়েকবার তাকে বিপাকে ফেলতে সফলও হন। দুয়েকবার সম্পর্কের অবনতি ঘটে সম্রাট আকবরের সাথে। অবশ্য তা সাময়িকের জন্য।

আকবরের দরবারে তখন পণ্ডিতদের মহাসমারোহ। বাদায়ুনী, নকীব খান, শেখ সুলতান, হাজী ইব্রাহীম, শেখ মুনাউয়ার এবং ফয়েজি তথা আবুল ফয়েজ। যে যার মতো ইতিহাস, বিজ্ঞান, সংস্কৃত ও হিন্দি থেকে ফারসি ভাষায় পুস্তক রূপান্তরের কাজে হাত দিয়েছেন। ফয়েজি গণিতশাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ লীলাবতী অনুবাদে রত। আর আবুল ফজল ফারসিতে অনুবাদ করেন আরবি গ্রন্থ ‘কালিলা ওয়া দিমনা’ এবং ‘ইয়ার দানিশ’। মহাভারতের অনুবাদ তারিখে আলফির অনুবাদেও ছিল তার অংশগ্রহণ। হিজরি ১০০০ অব্দ বা ১৫৯২ সালের মাঝামাঝি আকবর আবুল ফজলকে দোহাজারি মনসবদারে উন্নীত করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি দরবারে উমারায়ে কিবার বা প্রধান আমীরদের মধ্যে পরিগণিত হতে লাগলেন।

আকবর নিজেকে ঘিরে রাখতেন পণ্ডিতদের দ্বারা; Image source: hindustantimes.com  

শেখ মোবারকের মৃত্যু হয় ১৫৯৩ সালে। ঠিক তার দুই বছর পর ৫০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ফয়েজি। পর পর দুটি আঘাত আবুল ফজলকে ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়। শোকে মুহ্যমান হয়ে যান খোদ সম্রাট। ভাইকে কত গভীরভাবে ভালোবেসে ছিলেন আবুল ফজল তা বোঝা যায় আকবরনামা এবং আইন-এ আকবরীতে। নিজের শত কর্মব্যস্ততা সত্ত্বেও ভাইয়ের মৃত্যুর দুই বছর পর ফয়েজির ‘মারফাজুল আদওয়ার’ নামক সংকলনে বিক্ষিপ্ত কবিতাগুলো একত্র করে সংগ্রহ করেছিলেন। তাছাড়া আকবরনামাতে ফয়েজির অসংখ্য লেখা উদ্ধৃত করে গিয়েছেন আবুল ফজল। প্রায় কাছাকাছি সময়ে আড়াই হাজার ঘোরসওয়ার সৈন্যের সেনাপতি পদে উন্নীত হন। সমাপ্ত করেন আইন-এ আকবরী লেখার কাজও।

আকবরের রাজত্বের ৪৩ তম বছরে আবুল ফজল প্রথম সক্রিয় কাজে অংশগ্রহণ করেন। দাক্ষিণাত্যে মুরাদ ঠিকমতো শাসনকাজ চালাতে পারছিলেন না। উদ্বিগ্ন সম্রাট আবুল ফজলকে পাঠালেন রাজপুত্রকে নিয়ে রাজধানীতে ফিরে আসার জন্য। দীর্ঘ নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় আবুল ফজলের আনুগত্য এবং নিষ্ঠা। ১০০৮ হিজরিতে যখন সম্রাট আকবরের সাথে বিলাগড়ের নিকটে আবুল ফজল মিলিত হন, তখন সম্রাট তাকে কবিতা দিয়ে অভিনন্দিত করেন। উন্নীত করা হয় চার-হাজারি মনসবদারে। ঠিক কাছাকাছি সময়ে দাক্ষিণাত্যে গোলযোগ বাধলে ফের সেখানে যাবার প্রয়োজন হয়। রাজপুত্র দানিয়েলকে বুরহানপুরে রেখে আকবর ফিরে যান আগ্রাতে। আবুল ফজল তখন সম্রাটের অন্যতম ভরসার বিন্দু।

আকবরের রাজত্বের ৪৭ তম বছর। রাজপুত্র সেলিমের মধ্যে বিদ্রোহের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। চিন্তিত আকবর একমাত্র বিশ্বাসভাজন আবুল ফজলকে তলব করেন। বাহিনীকে দাক্ষিণাত্যে রেখে আসার পরামর্শ দিলেন। শাহজাদা সেলিম ব্যক্তি আবুল ফজলের প্রতি অতটা ক্রুদ্ধ ছিলেন না। তৎপর ছিলেন আকবরের ভরসার জায়গাটা সরিয়ে দেবার জন্য। অরক্ষিত আবুল ফজলকে হত্যা করাটা আকবরের ডান হাত ভেঙে দেবার শামিল।

পিতার সাথে সেলিমের সম্পর্কের টানাপোড়েনে বলি হন আবুল ফজল; Image Source: culturalindia

সেলিম উবচার বুন্দেলা নেতা রাজা বীর সিংহকে অনুরোধ করেন তার এলাকা দিয়ে যাবার সময় আবুল ফজলকে যেন হত্যা করা হয়। ১০১১ হিজরী মোতাবেক ১৬০২ সালের ১২ আগস্ট নারওয়ারের ছয় ক্রোশ দূরে সরাইবার থেকে এক ক্রোশ দূরে বীর সিংহের সৈন্যরা আবুল ফজলের হদিশ পেলো। সঙ্গীরা পলায়নের পরামর্শ দিলেও আবুল ফজল তা নিজের জন্য অপমানজনক বলে মনে করলেন। খুব অল্প সময় সাহসের সাথে টিকে থাকতে পারলেন। তারপর জনৈক পদাতিকের বর্শার আঘাতে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।

এভাবে পিতার সাথে সেলিমের সম্পর্কের টানাপোড়েনে বলি হলেন আবুল ফজল। বীর সিংহ তার মাথা কেটে এলাহাবাদে সেলিমের কাছে পাঠিয়ে দেয়। আবুল ফজলের মৃত্যুসংবাদ সম্রাট আকবরের সামনে দিতে কেউ সাহস পায়নি। অবশেষে তার উকিল হাতে নীল রুমাল বেঁধে উপস্থিত হলে আকবর বিষয়টা বুঝতে পারেন। তৈমুরিয় বংশের রীতিই ছিলো রাজপুত্রদের কেউ মারা গেলে; তা সাধারণ ভাষায় দরবারে উপস্থাপন করা যাবে না। উকিল নীল রুমাল কবজিতে বেঁধে হাজির হলে সবাই বুঝে নিতো। সে যা-ই হোক, আবুল ফজলের মৃত্যুসংবাদে আকবর পুত্রশোকের চেয়েও বেশি বিলাপ করেছিলেন।

আবুল ফজলের সমাধি; Image Source: justdial

লেখক হিসেবে আবুল ফজল অদ্বিতীয়। শব্দের তেজস্বিতা, পদ গঠনের শৈলী, যৌক্তিক শব্দ প্রয়োগের দক্ষতা, এবং যতি ছেদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছিলে নিজস্ব ধরন। ফলে সর্বত্র পঠিত হলেও তার লেখার অনুকরণ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। সে যুগে আবুল ফজলের প্রভাবও ছিল অসাধারণ। তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করা হলেও তার বেশিরভাগই অতি উৎসাহী প্রচারণা। আকবরনামার ভূমিকা পড়লে যে কারো দ্বারা তা বোঝা সম্ভব।

আবুল ফজলের লেখা গ্রন্থগুলোর মধ্যে প্রধান- আকবরনামা, মাকতুবাত-ই আল্লামী এবং আয়ার দানিশ। প্রথমটি সম্রাট আকবরের শাসনকাল ও প্রশাসনব্যবস্থার সামগ্রিক ধারণা, দ্বিতীয়টি বিভিন্ন শাসক ও বিশিষ্ট ব্যক্তির প্রতি আবুল ফজলের লেখা চিঠির সংকলন এবং শেষেরটি অনুবাদ। এছাড়া রিসাল-ই মুনাজাত, জামিউল-লুগাত প্রভৃতি তার রচনা। শেষ করা যায় আবুল ফজলের একটি লেখা দিয়ে; যা কাশ্মিরের এক মন্দিরে খোদিত-

“হে আল্লাহ, সব মন্দিরে আমি দেখি লোক তোমার সন্ধান করছে। সব ভাষাতেই শুনি তোমার প্রশংসা। একেশ্বরবাদী এবং বহু ঈশ্বরবাদী- উভয়েই তোমার অনুগামী। মসজিদ হলে লোক দরুদ ও মোনাজাত পড়ে, আর গীর্জা হলে তোমারই প্রেমে ঘন্টা বাজায়। তোমার দুঃখের তীরে লক্ষ প্রেমিক হৃদয়, তোমাতে মগ্ন জগৎ, অথচ তুমি লক্ষের অগোচরে। তাই আমি কখনো মঠে, কখনো মসজিদে, আবার কখনো মন্দিরে তোমাকে খুঁজি।



৩৪


তক্ষশীলা: প্রাচীন ভারতের গৌরবোজ্জ্বল এক নগরী

Mohasin Alam Roni

ইতিহাসজুলাই 24, 2023

article

দক্ষিণ এশিয়ায় সভ্যতাভিত্তিক ইতিহাসে পাকিস্তানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। থাকবেই বা না কেন? সুপ্রাচীন মহেঞ্জোদারো সভ্যতা থেকে শুরু করে গান্ধার রাজ্য, তখত-ই-বাহিসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব দখল করে আছে দেশটি। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে গড়ে উঠেছিল ‘গান্ধার’ নামে এক ইন্দো-আর্য রাজ্য। এই গান্ধার ছিল প্রাচীন ভারতবর্ষের ষোড়শ মহাজনপদের একটি। তক্ষশীলা ছিল এর রাজধানী। উন্নত শিক্ষা-সংস্কৃতির জন্য তখন সারা বিশ্বব্যাপী দারুণ খ্যাতি কুড়িয়েছিল তক্ষশীলা

প্রায় হাজার বছর ধরে মাটির নিচে চাপা পড়েছিল তক্ষশীলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আঠারো শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ রাজ সরকারের দুই প্রত্নতাত্ত্বিক আলেকজান্ডার কানিংহাম, এবং জন মার্শালের প্রচেষ্টায় সকলের সামনে আসে তক্ষশীলার ধ্বংসাবশেষ। মার্শাল সিন্ধু সভ্যতার পাশাপাশি প্রাচীন এই সুসংগঠিত নগরীকেও আলোর মুখ দেখান।

শিল্পীর তুলিতে তক্ষশীলা; Image Source: Juan de Lara.

নামকরণ

রামায়ণ অনুসারে, দশরথের দ্বিতীয় ছেলে ভরত গান্ধার রাজ্য জয়ের পর নিজ সন্তান ‘তক্ষ’ এর নামানুসারে এই অঞ্চলের নাম দেন ‘তক্ষশীলা’। মহাভারতেও তক্ষশীলার উল্লেখ আছে। আবার অনেকের মতে, প্রাচীন ভারতের নাগা জনগোষ্ঠীর ‘তক্ষক’ নাম থেকে এই অঞ্চলের নামকরণ করা হয়েছিল ‘তক্ষখন্ড’। সময়ের পরিক্রমায় ‘তক্ষখন্ড’ শব্দটি রূপ নেয় তক্ষশীলায়। গ্রীকদের লেখনীতে তক্ষশীলা হয়ে ‘ট্যাক্সিলা’। বর্তমানে ইংরেজিতে তক্ষশীলাকে ‘Taxila’ লিখা হয়।

খ্রি.পূ. আনুমানিক ১০০ অব্দে পালি ব্রাহ্মী লিপিতে লিখা তক্ষশীলা; Image Source: Wikimedia Commons.

প্রাগৈতিহাসিক তক্ষশীলা

বহুকাল আগে থেকেই এই এলাকায় মনুষ্যবসতির প্রমাণ পাওয়া যায়। খ্রি.পূ. প্রায় ৩,৫০০ অব্দের দিকে মাইক্রোলিথিক শিকারিরা এখানের তিনটি গুহায় (ভামালা, মোহরা মোরাডু, খানপুর) বসবাস করত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। খ্রি.পূ. ৩৫০০-২৭০০ অব্দের দিকে কৃষির সাথে সম্পৃক্ত সম্প্রদায়ের লোকেরা সারাইকালা উপত্যকার দিকে বসতি গড়ে তোলে। এখানে পাথর, হাড়, ছোট ছোট পাথরের হাতিয়ার, কুঠার, হস্তনির্মিত মৃৎশিল্পের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। খ্রি.পূ. ২৭০০ – খ্রি.পূ. ২১০০ অব্দের দিকে নব্য প্রস্তর থেকে ব্রোঞ্জ যুগে প্রবেশ করে তক্ষশীলা।

তক্ষশীলায় প্রাপ্ত হস্তনির্মিত মৃৎশিল্প; Image Source: Taxila Museum.

তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়

তৎকালীন বিশ্বে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় বা তক্ষশীলা মহাবিহার ছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ। খ্রি.পূ. প্রায় ৫০০ অব্দে নির্মিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল বিভিন্ন পণ্ডিত ও শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা। সারা এশিয়া থেকে জ্ঞান তৃষ্ণা নিবারণ করতে এখানে আসতেন জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীরা। তক্ষশীলা মহাবিহারের আঙিনা মুখরিত থাকত বিভিন্ন জ্ঞানী-গুণীর পদচারণায়। তবে কেউ ইচ্ছা করলেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেত না। সেজন্য তার বয়স কমপক্ষে ষোলো বা তার বেশি হতে হতো। নিজ এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার পাট চুকিয়ে তাকে প্রমাণ করতে হতো, সে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের যোগ্য।

তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়; Image Source: Art Station.

পড়াশোনার খরচ শিক্ষার্থীকেই বহন করতে হতো। তবে যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছিল, তারা গায়ে-গতরে খেটে তা পরিশোধ করে দিত। এখানে পড়ানো হতো গণিত, বেদশাস্ত্র, অর্থনীতি, চিকিৎসাবিদ্যা, দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ব্যাকরণ বিষয়ক বিভিন্ন জিনিস। এর শিক্ষা পদ্ধতি ছিল যথেষ্ট আধুনিক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে জড়িতে আছে চাণক্য, পাণিনি, চরক, আত্রেয়, বিষ্ণু শর্মা, নাগার্জুন, জীবকের মতো প্রাচীন বিশ্বের প্রথিতযশা পণ্ডিত ও গুণীজনদের নাম। খ্রিস্টপূর্ব ৪০৫ অব্দের দিকে বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন এসেছিলেন এই শিক্ষাঙ্গনে। তিনি একে অত্যন্ত পবিত্র এবং সমৃদ্ধশালী বলে যথেষ্ট প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন।

চাণক্য, চরক, নাগার্জুন, আত্রেয়, জীবক্‌, ফা-হিয়েন; Image Source: Wikimedia Commons.

রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ

তক্ষশীলা তার জীবদ্দশায় এই অঞ্চলকে পালাক্রমে বহু শাসকের হাত বদল হতে দেখেছে। কখনো স্বদেশী রাজা, কখনো ভিনদেশীরা এসে শাসন করে গেছে। তক্ষশীলার শাসকবর্গের তালিকা:

ভারতবর্ষে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট; Image Source: Charles Le Brun

খ্রি.পূ. ৬০০ অব্দ থেকে খ্রি.পূ. ৩৭২ অব্দ পর্যন্ত আকেমেনিড সাম্রাজ্যের ছায়া বিস্তৃত ছিল গান্ধারে। এরপর আসেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। তবে তিনি বেশিদিন এই এলাকাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেননি। খ্রি.পূ. ৩২১ অব্দে ক্ষমতার নাট্যমঞ্চে আবির্ভাব ঘটে মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মৌর্য সাম্রাজ্য, ভারতের প্রথম ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য। তিনি ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের পাড় পৃষ্ঠপোষক। তাই তখন বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তক্ষশীলা। চন্দ্রগুপ্তের পর সম্রাট অশোকের আমলে তক্ষশীলা তার স্বর্ণযুগ পার করে। অশোকের মৃত্যুর পর গান্ধারে আক্রমণ করে বসে ইন্দো-গ্রীকরা। মধ্য এশিয়া থেকে শকরা এসে তাদের হারায়। আবার খ্রি.পূ. ১ম শতকে পার্থিয়ানরা এসে দখল করে এই জায়গা।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য; Image Source: Jonathan Tao.

প্রায় শতবর্ষ ধরে চলতে থাকে পার্থিয়ান অনুশাসন। ৫০ খ্রিষ্টাব্দে চীনের উত্তর-পশ্চিম থেকে আগত কুশান গোত্র কাবুল উপত্যকা এবং গান্ধার জয় করে নেয়। কুশান সম্রাট কনিষ্কের আমলে (৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) পুরো কুশান সাম্রাজ্যে গান্ধার হয়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ এক কেন্দ্র। পশ্চিমে মারভে থেকে পূর্বের খোতান, এবং উত্তরে আরাল সাগর থেকে দক্ষিণের আরব সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছিল এর সীমানা। কনিষ্কের পাশাপাশি তার বংশধর হুবিষ্ক এবং বসুদেবকেও এই রাজ্যের উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছিলেন। একসময় কুশান সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়লে, একে একে বহু রাজবংশের ক্ষমতা হাতবদল হয় গান্ধারের।

সম্রাট কনিষ্ক; Image Source: History.

স্থাপত্যশিল্প

বৌদ্ধ স্থাপত্যশিল্পে ঢিবির আকৃতিবিশিষ্ট বৌদ্ধ সমাধিস্তম্ভ হিসেবে খ্যাত ‘স্তূপ’ এর কদর ছড়িয়ে আছে সারাবিশ্বে। প্রাচীন ভারতের বহু সাম্রাজ্যে এই সুনিপুণ কারুকার্যখচিত স্তূপের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। স্থাপত্যশিল্পের পাশাপাশি এগুলো ধর্মীয় গুরুত্বও বহন করত। তক্ষশীলায় নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্তূপ:

ধর্মরাজিক স্তূপ

মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোক এই ধর্মরাজিক স্তূপের নির্মাতা। এটিই তক্ষশীলার সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ স্থাপত্যকীর্তি। বিশ্বাস করা হয়, গৌতম বুদ্ধকে যেখানে সমাহিত করা হয়েছিল, সেখান থেকে তার অবশিষ্টাংশ এখানে স্থানান্তর করে এই সৌধ নির্মাণ করা হয়েছিল।

ধর্মরাজিক স্তূপ; Image Source: Alamy Stock Photo.

কুণাল স্তূপ

এই কুণাল স্তূপের কিংবদন্তি অশোকের সন্তান কুণালের সাথে সম্পৃক্ত। সম্রাট অশোকের পঞ্চম স্ত্রী তিস্যরাক্ষা ছিলেন কুণালের সৎ মা। তিনি কপটতার আশ্রয়ে সম্রাট অশোকের নাম করে কুণালের কাছে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে কুণালের দুই চোখ উপড়ে ফেলার আদেশ লেখা ছিল। অথচ, অশোক এই ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। পরে অশোকের দরবারে কুনাল নিজের চোখ উপরে পাঠালে তাতে দারুণ ব্যথিত হন অশোক। সাথে সাথে তিস্যরাক্ষাকে মৃত্যুদণ্ড দান করেন তিনি। জনশ্রুতি অনুসারে, বোধ গয়াতে নিয়ে কুণালের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অশোক। এই কাহিনির উপর ভিত্তি করেই তক্ষশীলায় গড়ে ওঠে কুনাল স্তূপ।

১৯১০ সালে কুনাল স্তূপ; Image Source: Wikimedia Commons.

সিরকাপ

সিরকাপ শহরের গোড়াপত্তন ঘটে ইন্দো-গ্রিকদের হাত ধরে, খ্রি.পূ. দ্বিতীয় শতকের দিকে। এই সিরকাপ স্তূপের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে স্থানীয় লোকগাথার বীর রাসালুর কিংবদন্তি, যিনি সাতটি রাক্ষসের সাথে লড়েছিলেন। বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি সিরকাপ নামে এক রাক্ষসকে এই স্থানেই বধ করেছিলেন।

সিরকাপ; Image Source: Taxila Museum.

গ্রিকদের নগরায়ণ পরিকল্পনা এই শহরে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান থাকলেও এখানে গ্রিকদের কোনো মন্দির কিংবা প্রাসাদের অস্তিত্ব নেই। পরবর্তীতে এখানে ভারতীয়রা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য বলতে এখানে রাজকীয় বাসভবন, সূর্য মন্দির, আপসিডাল মন্দির, দ্বিমস্তকবিশিষ্ট স্তূপ, জৈন মন্দির উল্লেখযোগ্য।

দ্বিমস্তকবিশিষ্ট স্তূপ; Image Source: Alamy Stock Photo.

সিরসুখ

কুশান জাতি দ্বারা নির্মিত সিরসুখের গোড়াপত্তন ঘটে খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ধারণা করা হয়, ভূমিকম্প কবলিত সিরকাপকেই এখানে স্থানান্তর করা হয়েছিল। আয়তাকার এই নগরীতে লাইমস্টোনের দুর্গ এবং গোলাকার গম্বুজের নিদর্শন পাওয়া যায়, যার সাথে মিল রয়েছে ইউরোপীয় স্থাপত্যবিদ্যার। এখন পর্যন্ত পুরো এলাকাটি খনন করা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষকদের ধারণা, নির্মাণের ১০০০ বছর পর্যন্ত প্রাণবন্ত ছিল এই শহর।

সিরসুখের প্রাচীর; Image Source: Alamy.

তক্ষশীলার পতন

দীর্ঘ সময় যাবত বহু জাতির ক্ষমতা-কর্তৃত্বের দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত তক্ষশীলা আস্তে আস্তে ভেতর থেকে ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছিল। কফিনে সর্বশেষ পেরেকটি ঠুকেছিল হূণ জাতির লোকেরা। এই সময়ে, ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ভারতে প্রাধান্য লাভ করে, যার ফলে পতন ঘটে বৌদ্ধধর্মের, যা এই অঞ্চলে এক হাজার বছর ধরে নিজের প্রভাব বজায় রেখেছিল। হূণ শাসকরা শিবের উপাসক হওয়ায়, গান্ধারে বৌদ্ধ ধর্ম তেমন সুবিধা করতে পারেনি। ফলে, বৌদ্ধ মঠগুলো হারায় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা। এর পুরো প্রভাব পড়ে নগর জীবনে। এরপর আর কখনো নিজ গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারেনি তক্ষশীলা। ক্রমশ ভেঙে পড়তে পড়তে নিঃশেষ হয়ে এককালের খ্যাতিমান এই নগরী।



৩৫


জৈন শব্দটি এসেছে সংস্কৃত জিন শব্দ থেকে। সংস্কৃতিতে জিন অর্থ জয়ী।

যে মানুষ আসক্তি, আকাঙ্ক্ষা, ক্রোধ, অহংকার, লোভ ইত্যাদি জয়ের মাধ্যমে পবিত্র অনন্ত জ্ঞান লাভ করেছে, তাকে জিন বলা হয়। জিনদের আচরিত ও প্রচারিত পথের অনুগামীদের বলে জৈন। এরা তাদের প্রধান ধর্মগুরুকে বলতেন তীর্থঙ্কর। এই ধর্মের মূল ভিত্তি হলো ২৪ জন তীর্থঙ্করের বাণী, যার মধ্যে সর্বশেষ তীর্থঙ্কর মহাবীর (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক) এবং তার পূর্বসূরি পার্শ্বনাথের শিক্ষা প্রধান [২, ৩, ৫]। জৈন বিশ্বাস মতে, প্রতিটি জীব পবিত্র এবং সমস্ত জীবের প্রতি অহিংসা (Ahimsa) তাদের মূলমন্ত্র [১, ৬]। 

জৈন ধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য:

জৈনরা কঠিন শৃঙ্খলাপরায়ণ জীবনযাপন করেন এবং পৃথিবীর সমস্ত জীবের প্রতি অ-ঘৃণা ও অ-ক্ষতির নীতি অনুসরণ করেন 

মহাবীর জৈন ও জৈন ধর্ম  ( Mahavira )

১) জন্ম ও বংশপরিচয়

জৈন ধর্মের প্রধান প্রচারক ছিলেন মহাবীর। জৈন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা না হলেও জৈন ধর্মকে প্রকৃত অর্থে তিনিই এগিয়ে নিয়ে যান।

খ্রিস্টপূর্ব ৫৪০ অব্দ নাগাদ বৈশালীর কুণ্ডগ্রাম বা বর্তমান বিহারের বসকুন্ড-তে মহাবীর জন্মগ্রহণ করেন।

মহাবীরের পিতা সিদ্ধার্থ গ্রামের জ্ঞাতৃক নামে একটি গোষ্ঠীর প্রধান ছিলেন। আর মাতা ত্রিশলা ছিলেন লিচ্ছবী রাজা চেতকের বোন।

জীবনের প্রথমদিকে একজন ক্ষত্রিয় যুবরাজ হিসেবেই শিক্ষালাভ হয়েছিল মহাবীরের।

এরপর জীবনের যথাসময়ে যশোদা নামে একটি মেয়ের সাথে মহাবীরের বিবাহ হয়। এমনকি প্রিয়দর্শনা নামে একটি কন্যা সন্তানেরও জনক হন মহাবীর। 

২) মহাবীরের বিভিন্ন নামগুলি ( Mahavira )

মহাবীর ছাড়াও বর্ধমান, জ্ঞাতপুত্র, ন্যায়পুত্ত, বেসালিয়, বেদেহদিন্ন এইসকল নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। প্রথম তিনটি নামের অর্থ জানা যায়।

মহাবীর নামের মধ্যে বীরত্ব, নির্ভীকতা প্রকাশ পায়।

জানা যায় যে, দুঃখকষ্টকে বীরত্বের সাথে অতিক্রমের মানসিকতা ছিল তাঁর। তাই নাম রাখা হয় মহাবীর।

অপর নাম বর্ধমান অর্থাৎ যা বেড়ে চলে।

মনে করা হয় মহাবীরের জন্মের পর রাজ্যের ধন সম্পদ, মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাই এইরূপ নামকরণ করা হয়। আর জ্ঞাতপুত্র নাম হয় জ্ঞাতৃক বংশে জন্মের কারণে।

৩) মহাবীরের গৃহত্যাগ

পিতা মাতার অনুরোধে মহাবীর সাংসারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এমনটাই মত শেতাম্বর জৈন সম্প্রদায়ের।

কিন্তু দিগম্বর নামে জৈনদের অন্য সম্প্রদায়গণ মনে করেন মহাবীর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হননি।

এসব সত্বেও বলা যায় সাংসারিক সুখ, বিলাসিতা, মোহ তাঁকে আকর্ষিত করতে পারেনি। তাই মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে মুক্তির পথের খোঁজে গৃহত্যাগ করেন।

বেছে নেন কঠোর তপস্যার জীবন।

তপস্যা জীবনের প্রথমদিকে সামান্য একখণ্ড কাপড়ে কাটালেও পরবর্তী জীবদ্দশায় পুরোপুরি নগ্ন অবস্থা ধারণ করেছিলেন।

গৃহত্যাগের পর বারো বছর বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করে কাটান মহাবীর। লক্ষ্য ছিল একটাই জীবের মুক্তির পথ অনুসন্ধান। কঠোর তপস্যার ফল মিললো তেরোতম বছরে।

মহাবীর কৈবল্য বা বিশুদ্ধ জ্ঞান লাভ করলেন। এই জ্ঞানলাভের মাধ্যমে জয় করে নিলেন সমস্ত সুখদুঃখকে।

মহাবীরের নাম হোলো জিন অর্থাৎ বিজেতা। জিন নামের কারণ মহাবীর জগতের সুখদুঃখকে জয় করেছেন বলে। 

আর এই জিন নাম থেকেই মহাবীরের ধর্মঅনুগামীদের নাম হোলো জৈন।

৪) মহাবীরের জৈন ধর্মপ্রচার

একবস্ত্রে কঠোর তপশ্চর্যায় রত থেকে গৃহত্যাগের তেরোতম বছরে মহাবীর কৈবল্য লাভ করেন। ‘কেবলিন’, ‘জিন’ প্রভৃতি নামে তিনি পরিচিত হন।

সুখদুঃখকে তিনি জয় করেন। কৈবল্য বা বিশুদ্ধ জ্ঞানলাভের পর মহাবীরের খ্যাতি আরো বেড়ে যায়।

বৃদ্ধি পায় অনুরাগীদের সংখ্যা। কৈবল্য লাভের পর দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে গঙ্গার তীরবর্তী স্থানগুলিতে তিনি তাঁর ধর্মমত প্রচার করেন।

যেহেতু গাঙ্গেয় উপত্যকায় বৈশালীতেই মহাবীরের জন্ম, তাই এখান থেকেই এই ধর্মমত প্রচারিত হয়। 

সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অনেক রাজারাও এইসময় জৈন ধর্মমতের প্রতি আকৃষ্ট হন। যেমন তাঁরা হলেন – বিম্বিসার, অজাতশত্রু, উদয়িন প্রমুখ।

এমনটা জানা যায় যে, এইসব শাসকদের সাথে মহাবীরের ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছিল।

শুধু শাসকশ্রেণী নয়, সমাজের তথাকথিত চণ্ডাল, শূদ্র প্রভৃতি শ্রেণীর মানুষজনও জৈনধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।

মহাবীর দেখান যে, মহিলারাও পুরুষদের মতো মোক্ষলাভের অধিকারী হতে পারে। তাই চন্দনবালা নামে এক মহিলার জৈনধর্মে দীক্ষালাভ হোলো এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

৫) মহাবীরের দেহত্যাগ

ত্রিশ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করে এরপর দীর্ঘ তেরোবছর কঠিন তপস্যার মাধ্যমে জ্ঞান ও নির্বাণ লাভ করেছিলেন মহাবীর। জৈন ধর্মের প্রধান প্রচারক ছিলেন তিনি।

কিন্তু জীব মাত্রেই জন্ম ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তিলাভ বা মোক্ষলাভ ঘটে।

মহাবীর ৭২ বছর বয়সে মোক্ষলাভ করেন। সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৮ অব্দ।

রাজগৃহের কাছে পাবাপুরীতেই মহাবীরের দেহত্যাগ ঘটেছিল। বর্তমানে পাবাপুরীতে মহাবীরের দেহত্যাগের স্থানে স্মারক হিসেবে একটি জল মন্দির গড়ে তোলা হয়েছে।

জৈন ধর্মমত ( Mahavira )

মহাবীর, জৈন ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা না হয়েও তিনিই ছিলেন এই ধর্মের প্রধান প্রচারক।

জৈন ঐতিহ্য অনুসারে মহাবীরের আগে মোট ২৩ জন তীর্থঙ্কর আবির্ভূত হয়েছিলেন। ঋষভদেব বা আদিনাথ হলেন জৈন ধর্মের প্রথম তীর্থঙ্কর।

আর পার্শ্বনাথ ছিলেন জৈনদের তেইশতম তীর্থঙ্কর। এই তীর্থঙ্করগণরা তাঁদের সময়কালে জৈন ধর্ম প্রচার করেছেন।

তবে এঁদের সময় জৈন ধর্মমত ততটা জনপ্রিয়তা পায়নি। মহাবীর ২৪তম এবং শেষ জৈন তীর্থঙ্কর রূপে আবির্ভূত হলেন।

জৈন ঐতিহ্য অনুযায়ী, তেইশতম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের মৃত্যুর ২৫০ বছর পর নাকি মহাবীরের জন্ম হয়। 

মহাবীরের আবির্ভাব জৈন ধর্মের প্রচারে এক ঐতিহাসিক দিকরূপে চিহ্নিত হোলো। তিনি সম্প্রসারিত করলেন জৈন ধর্মমতকে।

(১) তীর্থঙ্কর কারা 

জৈন ধর্মের সাথে তীর্থঙ্কর কথাটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এবার প্রশ্ন এই তীর্থঙ্কর কারা ? বা এই তীর্থঙ্কর কথার অর্থ কি ?

জৈন ধর্মমতে একজন তীর্থঙ্কর হলেন রক্ষাকর্তা বা ত্রাণকর্তা। সেই ত্রাণকর্তা যিনি কিনা পুনর্জন্মের জীবনের স্রোত অতিক্রম করতে সফল হয়েছেন।

অর্থাৎ তিনি মোক্ষলাভে সমর্থ হয়েছেন।

এবং তাঁর সেই সফলতার পথ যাতে অন্যরা অনুসরণ করতে পারে তার জন্য একটি সুগম পথ তিনি তৈরী করেছেন।

এক্ষেত্রে তীর্থঙ্কর হয়ে উঠেছেন একজন শিক্ষক। সেই শিক্ষক যিনি তাঁর শিষ্যদের জীবনের মুক্তিলাভের উপায় বাতলেছেন।

(২) জৈন তীর্থঙ্করদের তালিকা 

জৈন ধর্মে তীর্থঙ্কর-এর সংখ্যা মোট চব্বিশ জন। এই সকল তীর্থঙ্করদের নামের তালিকা ও তাদেরকে চিনবার প্রতীক চিহ্নগুলি সম্পর্কে নীচে দেওয়া হোলো। এঁরা হলেন যথাক্রমে –

(৩) জৈন ধর্মের নীতি

মহাবীরের মৃত্যুর পর জৈন ধর্মের প্রচার থেমে থাকেনি। মহাবীরের উপদেশ গুলিকে বা শিক্ষাকে জৈন ধর্মনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে নেওয়া হয়। 

মহাবীরের আগে তেইশতম তীর্থঙ্কর ছিলেন পার্শ্বনাথ। ইনি একশো বছরেরও বেশি বয়সে বাংলার সম্মেত পর্বতে দেহত্যাগ করেছিলেন।

পার্শ্বনাথ জৈন ধর্মে চারটি মূল শিক্ষা বা নীতিকে সংযুক্ত করেছিলেন।

জৈন ধর্মের এই চারটি মূল নীতি ছিল – হিংসা না করা, মিথ্যে না বলা, চুরি বৃত্তি থেকে বিরত থাকা, সম্পত্তি অর্জন না করা

পরবর্তী সময়ে মহাবীর এই চারটি নীতি বা উপদেশের সাথে যুক্ত করলেন ব্রহ্মচর্য বা সংযম রক্ষার নীতিকে।

এর উদ্দেশ্য অনুগামীদের কঠোর সংযমের সাথে পবিত্র সাদামাটা জীবনযাপনে যুক্ত করা। এই পাঁচটি নীতি পঞ্চমহাব্রত নামে পরিচিত।

আসলে এগুলিই জৈনধর্মের সারকথা।

(৪) জৈন ধর্মমতে ঈশ্বর ও জীবের অস্তিত্ব

জৈনধর্মে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে পুরোপুরি মেনে নেওয়া হয়নি। কারণ জৈনরা মনে করেন এই বিশ্বব্রহ্মান্ড তৈরিতে ঈশ্বরের কোনো অবদান নেই।

তাঁদের বিশ্বাস এই গোটা বিশ্বই অনন্ত। জগৎ সৃষ্টি ও ধ্বংসের পিছনে একটি চিরন্তন শাশ্বত নিয়ম দায়ী।

মানুষ, জন্তুদের মতোই ঈশ্বরের শরীরেও আত্মা বিদ্যমান। এমনটাই মনে করেন জৈন ধর্মানুরাগীরা।

জৈন ধর্মের অনুগামীদের মতে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উত্থানের মতো পতনও ঘটবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরে। এই পতনের দিনক্ষণ শুরু হয়েছে শেষ তীর্থঙ্কর মহাবীরের নির্বাণ লাভের পর থেকেই।

যা নাকি চলবে অন্তত চল্লিশ হাজার বছর ধরে। তারপর আবার শুরু হবে নতুন করে উত্থানের পর্ব।

এবার আসা যাক জৈনধর্মে  জীবের অস্তিত্বের প্রশ্নে। জৈনরা কিন্তু জীবের অস্তিত্বে ব্যাপক বিশ্বাসী।

মানুষ ও জন্তু জানোয়ার ছাড়াও প্রাণ আছে মাটি, জল, পাথর, বায়ু, আগুন এই সবেতেই।

জৈনদের ভাষায় এগুলির প্রত্যেকটির মধ্যেই আত্মা রয়েছে। কিন্তু এরা আলাদা কর্ম নামক বস্তুতে।

কর্মের বন্ধনেই মানুষ আবদ্ধ। কর্ম বন্ধন সাংসারিক বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে। জৈনধর্ম এই বন্ধন থেকেই মুক্তিলাভের কথা বলছে।

জৈনরা মনে করেন এই মুক্তিলাভ সম্ভব বিশুদ্ধ কর্মের মাধ্যমে। অর্থাৎ কর্মের দ্বারাই কর্মের খণ্ডন।

তাই এই কর্মবন্ধন ছিন্ন করে জীবনের মুক্তিলাভ বা নির্বাণ লাভকেই জৈনধর্মে পরম সুখলাভ বলা হয়েছে।

(৫) জৈন ধর্মের ত্রিরত্ন নীতি

জৈনধর্মে পুনর্জন্মের বিষয়টিকে নস্যাৎ করা হয়েছে। জৈনরা কর্ম বন্ধনকে ছিন্ন করে মোক্ষ বা মুক্তিলাভের কথা বারেবারে বলেছেন।

পুনর্জন্মের দ্বারা জীব কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই জৈন বিশ্বাস অনুযায়ী কর্মবন্ধন ছিন্ন করলেই মুক্তিলাভ হবে।

তবে এই মুক্তিলাভের পথ ততটা সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন কঠোর সংযম ও নিয়মানুবর্তিতা।

তাই মহাবীর এই মুক্তিলাভের উপায় হিসেবে তিনটি পথের হদিশ দিয়েছেন। এগুলি হোলো – সৎ বিশ্বাস, সৎ আচরণ, সৎ জ্ঞান

এই তিনটি নীতি একত্রে ‘ত্রিরত্ন নীতি‘ নামে পরিচিত।

(৬) জৈনধর্মে অহিংসা নীতি

‘অহিংসা পরম ধর্ম’ – এই বাণীটি আমাদের মজ্জায় গেঁথে রয়েছে। সেই অহিংসার ওপরই জৈনধর্মে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

অহিংসা নীতির ওপর জৈনদের কঠোর বিশ্বাস অন্য ধর্মের থেকে জৈনধর্মকে আলাদা করেছে। 

যেকোনো জীবের প্রতি হিংসা প্রদর্শন করাকে এই ধর্মে পাপাচারের সমান বলা হয়েছে।

জৈনদের ধারণা, মানুষ ও অন্য জীবেরা অহিংসা নীতির দ্বারাই পাপকর্ম থেকে পরিত্রান পেতে পারে। একটি ক্ষুদ্র পিঁপড়েকেও মেরে ফেলা জৈনধর্ম অনুযায়ী অপরাধ।

যেহেতু জৈনরা বিশ্বাস করে জল, পাথর ইত্যাদিতে প্রাণ আছে সেহেতু জলে পাথর ছুঁড়ে ফেলাও অপরাধের মধ্যে পড়ে।

কারণ জৈন অনুরাগীদের মতে অজীব বস্তুর মধ্যেও আত্মা বিদ্যমান। শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় কোনো কীট যাতে শ্বাসের মাধ্যমে বিনষ্ট নাহয় সেবিষয়েও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

জমিতে চাষ করার সময় কীটপতঙ্গকে নষ্ট করাও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে এই ধর্মে দেখা হোতো। তাই জৈনরা পেশা হিসেবে ব্যবসাকে বেছে নিয়েছিল।

কারণ ব্যবসার দ্বারা না ছিল জীবকে আঘাতের সম্ভাবনা, আবার অন্যদিকে মিতব্যয়িতাকেও উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল এই ধর্মে।

তাই দেখা গেছে বণিকরাই জৈনধর্ম গ্রহণ করেছিল। সেই ট্র্যাডিশন আজও বজায় আছে।


জৈনধর্মের দুটি ভাগ 

জৈনধর্মের ধর্মগ্রন্থ

প্রথমদিকে জৈনধর্মের উপদেশগুলি মুখে মুখেই থাকতো। পরে উপদেশগুলির লিখে রাখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

তৃতীয় শতাব্দী থেকে শুরু হয় উপদেশগুলির লেখার কাজ। ইতিমধ্যেই মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে।

মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তিনিও জৈনধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনকালে জৈন আচার্য ভদ্রবাহুর ওপর জৈন উপদেশ লিপিকরণের দায়িত্ব এসে পড়ে।

জৈন আচার্য ভদ্রবাহু ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের ধর্মীয় শিক্ষাগুরু। ভদ্রবাহু ‘কল্পসূত্র‘ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।

এই গ্রন্থটিকে জৈনদের প্রথম লিখিত ধর্মগ্রন্থ বলে মানা হয়।

কল্পসূত্র গ্রন্থে ১৪টি জৈন অনুশাসন যা মহাবীরের বাণী হিসেবে পরিচিত সেটিকেই সংকলিত করা হয়েছিল।

ভদ্রবাহু মারা গেলে তাঁর ও সম্ভূতবিজয়ের শিষ্য স্থুলভদ্র পাটলিপুত্রে ( বর্তমান পাটনা ) প্রথম জৈন সংগীতির অধিবেশন ডাকেন।

এই জৈন অধিবেশনে ১৪টি জৈন অনুশাসনের পরিবর্তে ১২টি অনুশাসনকে মর্যাদা দেওয়া হয়।

অনুশাসন বা মহাবীরের বাণীগুলি বারোটি খন্ডে সংকলিত হয়ে রচিত হয় ‘দ্বাদশ অঙ্গ’

প্রাকৃত ভাষায় রচিত হওয়া এই দ্বাদশ অঙ্গই জৈন ধর্মগ্রন্থ নামে পরিচিত। পরে দ্বাদশ অঙ্গ চার ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। অঙ্গ, উপাঙ্গ, মূল ও সূত্র।

উপসংহার

ক্ষত্রিয় বংশজাত মহাবীর ছিলেন এই ধর্মের প্রবক্তা। মহাবীরের সময়েই জৈনধর্ম প্রসারলাভ করেছিল।

বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিরুদ্ধে যে ধর্মআন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার পরিণতি হিসেবে জৈনধর্মের সৃষ্টি হয়।

যদিও বৌদ্ধ ধর্মের মতো জৈনধর্ম ভারতের বাইরে ততটা প্রচারিত হয়নি। ভারতের মধ্যে থেকেই মানুষকে দেখিয়েছিল মুক্তির পথ।

সমাজের উচ্চ-নীচ ভেদাভেদহীন, সহজ সরল এই ধর্মমত সেইসময় ভারতে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 

আজও ভারতের নির্দিষ্ট কিছু অংশে যেমন, গুজরাত, রাজস্থান প্রভৃতি স্থানে বহু জৈন অনুগামীরা এই ধর্মের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছেন। 

বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের পার্থক্য

১. আত্মার ধারণা:

২. মোক্ষের পথ:

৩. আহিংসার মাত্রা:


৩৬

বৌদ্ধ ধৰ্ম

আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ৫০০ সনে গৌতম বুদ্ধের দ্বারা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠা হয়।

গৌতম বুদ্ধের জীবন

গৌতম বা সিদ্ধার্থ এই নামেই তিনি শৈশবে সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন কপিলাবস্তুর রাজা এবং মা রানী মায়া। খুবই বিলাসিতার মধ্যে তিনি বড় হন। যশোধরার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর পুত্রের নাম ছিল রাহুল। সিদ্ধার্থ জাগতিক দুঃখকষ্ট থেকে দূরে রাজপ্রাসাদে সুরক্ষিত জীবন যাপন করতেন। একবার তিনি প্রাসাদের বাইরে বেরিয়ে, একজন বৃদ্ধ, একজন পীড়িত ব্যক্তি, একটি শবদেহ ও একজন সন্ন্যাসীকে দেখেন। বৌদ্ধরা এগুলিকে চার প্রকার দর্শন বলেন। গৌতম বুঝতে পারলেন যে জরা, ব্যাধি, দুঃখ এবং মৃত্যু সকল মনুষ্য জীবনের অবশ্যম্ভাবী অঙ্গ ও পরিণতি। সন্ন্যাসীর সৌম্যকান্তি তাঁর হৃদয়ে মুদ্রিত হয়ে যায়। গৌতম স্থির করেন যে তিনিও গৃহত্যাগ করবেন। সেইমত তিনি বনে গিয়ে সত্যের অনুসন্ধানে অভিনিবিষ্ট হন।

গৌতম একজন যোগীর মতন জীবন শুরু করলেন। তিনি নানা প্রকার কৃচ্ছসাধন করতেন। কঠিন উপবাস ছিল তার অঙ্গ। একদিন যখন উপবাস তাঁকে মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে দিল , তখন তিনি একটি গ্রাম্য বালিকার কাছ থেকে অল্প পায়েস গ্রহণ করলেন। এই অভিজ্ঞতা সিদ্ধার্থকে যে শিক্ষা দিল, তা হল, উপবাস, প্রাণায়াম, দুঃখ সহ্য করা ইত্যাদি যৌগিক অভ্যাসগুলি থেকে যে আধ্যাত্মিক উপকার হয় ,তা খুবই সামান্য। তিনি কৃচ্ছসাধন ত্যাগ করে’ অনাপনসতি’ ধ্যানে মনোনিবেশ করলেন। (অর্থাৎ কেবল স্বীয় শ্বাস প্রশ্বাস সম্বন্ধে অবহিত থেকে,তাতে মনঃসংযোগ করা। )এইভাবে তিনি সেই সত্যকে জানলেন, যাকে বৌদ্ধরা বলেন ‘মধ্যপন্থা’। এটি হল চরম আত্মপ্রশ্রয় এবং চরম কৃচ্ছসাধনের মধ্যবর্তী পন্থা।

সাত বছর পরে বুদ্ধগয়ায় বোধিবৃক্ষের তলায় গভীর ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি বোধি বা প্রজ্ঞান লাভ করেন। তখন তিনি ‘বুদ্ধ’ (অর্থাৎ যিনি আলোকপ্রাপ্ত হয়েছেন ) নামে খ্যাত হন। এরপর বুদ্ধদেব স্থান থেকে স্থানান্তরে ভ্রমণ করতে থাকেন। তিনি হাজার ,হাজার লোকের জীবনকে প্রভাবিত করেন। তার মধ্যে উচ্চবংশ জাত ব্যক্তি যেমন ছিল, তেমনি নিম্নশ্রেণীর মানুষও ছিল। রাজকুমার ছিলেন এবং ছিলেন চাষি, কেউ বাদ ছিলনা। বুদ্ধদেব এরপর তাঁর অবশিষ্ট জীবন’ ধর্মের /ধম্মের’ প্রচারে অতিবাহিত করেন।

৪৫ বছর বুদ্ধদেব মানুষকে যে শিক্ষা দেন, তাতে তিনি সৌন্দর্য্য, ত্যাগের আনন্দ, সরল জীবন যাপনের প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা এবং হৃদয়কে সর্বদা দয়ায় ভরে রাখার কথা বলেন। বুদ্ধদেব আশি বছর বয়সে, কুশিনগরে পরিনির্বাণ লাভ করেন। বৌদ্ধদের বর্ষপঞ্জিতে এই দিনটিকে পবিত্রতম দিন বলে গণ্য করা হয়।

খুব তাড়াতাড়ি বুদ্ধের মতবাদ ধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করল। এশিয়ার অধিকাংশ জায়গায় বৌদ্ধধর্মের অনুশীলন প্রচলিত হল।

বৌদ্ধ ধর্ম

২। চারটি মহান সত্য

৩। নির্বাণের অষ্টাঙ্গ মার্গ

বুদ্ধদেব পঞ্চশীলের কথা বলেছেন। এগুলি সাধারণ মানুষকে তাদের জীবনে পালন করতে হবে। এগুলি হল:

বুদ্ধের শিক্ষা খুবই সরল। তিনি তাঁর শিক্ষায় কখনই ঈশ্বর বা আত্মার কথা বলেননি। তিনি সকল কর্মের প্রণোদক ‘মানস’ এর কথা বলেছেন। ঠিক এই কারণেই তিনি বলেন যে মনের বিশুদ্ধতা, আবেগের শুদ্ধতা, শব্দের এবং ক্রিয়ার শুদ্ধতা যাতে বজায় থাকে, তার জন্য অবশ্যই সচেষ্ট থাকতে হবে।

ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম হিন্দু ধর্মের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং হিন্দুরা বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার বলে গ্রহণ করেন। বৌদ্ধধর্ম দেশ দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। আজ এশিয়ার বহু দেশের মানুষ বৌদ্ধধর্মকে তাদের আপন ধর্ম বলে গণ্য করেন।

বৌদ্ধ প্রার্থনা

বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি
আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম
ধম্মম শরণং গচ্ছামি
আমি ধর্মের শরণ নিলাম
সংঘ্ং শরণং গচ্ছামি
আমি সংঘের শরণ নিলাম।

ধর্মচক্র

এটি হল বৌদ্ধধর্মের প্রতীক। এই চক্রটিতে আটটি দন্ড আছে। এর প্রত্যেকটি বৌদ্ধধর্মের এক একেকটি নীতির প্রতীক। চক্রটি বৌদ্ধধর্মের সম্পূর্ণতার প্রতীক।

বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র (পালি ত্রিপিটক)

পালি ত্রিপিটক (ত্রি, অর্থাৎ তিন। পিটক অর্থাৎ ঝুড়ি বা পাত্র)

৩৭

মানুষ বহুদিন ধরেই একটি প্রশ্ন নিয়ে ভাবছে—মন আর মস্তিষ্ক কি একই জিনিস? নাকি তারা আলাদা? আমরা যখন কষ্ট পাই, ভালোবাসি, ভয় পাই, রাগ করি, স্বপ্ন দেখি, সিদ্ধান্ত নিই—তখন আমরা সাধারণত বলি, “আমার মন খারাপ”, “মনে ভয় হচ্ছে”, “মন থেকে চাইছি”। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান যখন বিষয়টি দেখে, তখন তারা বলে—এই অনুভূতি, চিন্তা, স্মৃতি, সিদ্ধান্ত—সবকিছুর সঙ্গেই মস্তিষ্কের গভীর সম্পর্ক আছে।

এখানেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কারণ মস্তিষ্ককে আমরা চোখে দেখতে পারি—এটি শরীরের একটি অঙ্গ। কিন্তু মনকে আমরা সেইভাবে দেখতে পারি না। তবুও আমরা সবাই মনকে অনুভব করি। তাই প্রশ্নটি খুবই স্বাভাবিক—মন কি শুধু মস্তিষ্কেরই কাজ? নাকি এটি আলাদা কোনো সত্তা?

সহজ উত্তর হলো:

মস্তিষ্ক (Brain) একটি দৃশ্যমান শারীরিক অঙ্গ, আর মন (Mind) হলো সেই অঙ্গের মাধ্যমে তৈরি হওয়া চিন্তা, অনুভূতি, সচেতনতা, স্মৃতি, ইচ্ছা, উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার জগৎ।

অর্থাৎ, একে পুরোপুরি একও বলা যায় না, পুরোপুরি আলাদাও বলা যায় না। সম্পর্কটি আরও গভীর।

মস্তিষ্ক হলো শারীরিক অঙ্গ, মন হলো অভিজ্ঞতার জগৎ ( 𝘽𝙧𝙖𝙞𝙣 = 𝙥𝙝𝙮𝙨𝙞𝙘𝙖𝙡 𝙤𝙧𝙜𝙖𝙣; 𝙈𝙞𝙣𝙙 = 𝙚𝙭𝙥𝙚𝙧𝙞𝙚𝙣𝙘𝙚𝙨)

মস্তিষ্ক আমাদের শরীরের একটি বাস্তব অঙ্গ। এটিকে ছোঁয়া যায়, দেখা যায়, পরীক্ষা করা যায়। এর ভেতরে আছে কোটি কোটি স্নায়ুকোষ, যেগুলো বার্তা আদান-প্রদান করে। আমরা যখন কিছু দেখি, শুনি, মনে রাখি, ভয় পাই, সিদ্ধান্ত নিই—এই সব কিছুর পেছনে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ কাজ করে। অর্থাৎ মস্তিষ্কের কাজ ছাড়া মানুষের মানসিক জীবন কল্পনা করা যায় না।

কিন্তু “মন” বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি, তা হলো—আমার চিন্তা, আমার অনুভূতি, আমার ইচ্ছা, আমার স্মৃতি, আমার সচেতন অভিজ্ঞতা। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক হলো যন্ত্র বা জৈব ভিত্তি, আর মন হলো সেই ভিত্তির উপর তৈরি হওয়া জীবন্ত মানসিক জগৎ। যেমন একটি বাদ্যযন্ত্র আছে, কিন্তু সুর আলাদা জিনিস; তেমনি মস্তিষ্ক আছে, আর তার কার্যকলাপ থেকে যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, সেটাকেই আমরা মন বলি।

সহজভাবে

মস্তিষ্ক শরীরের অঙ্গ

মন হলো চিন্তা-অনুভূতির জগৎ

মস্তিষ্ক দেখা যায়

মন সরাসরি দেখা যায় না, অনুভব করা যায়

মন মস্তিষ্কের কাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত

তাহলে কি মন পুরোপুরি মস্তিষ্কেরই ফল? ( 𝙈𝙞𝙣𝙙 𝙢𝙤𝙨𝙩𝙡𝙮 𝙖𝙧𝙞𝙨𝙚𝙨 𝙛𝙧𝙤𝙢 𝙩𝙝𝙚 𝙗𝙧𝙖𝙞𝙣)

স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি, মনোযোগ, ভাষা, স্বপ্ন—সবকিছুর সঙ্গে মস্তিষ্কের সম্পর্ক আছে। মস্তিষ্কের কোনো অংশে আঘাত লাগলে মানুষের স্মৃতি বদলে যেতে পারে, আচরণ বদলাতে পারে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে, এমনকি নিজের পরিচয়ের অনুভূতিও বদলে যেতে পারে। এই তথ্যগুলো আমাদের বলে—মনকে মস্তিষ্ক থেকে আলাদা করে ভাবা কঠিন।

তবে এখানেই আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। মন শুধু স্নায়ুকোষের যান্ত্রিক কাজ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা, অর্থ, সম্পর্ক, ভাষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি, জীবনের ইতিহাস। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের জৈব কাজের উপর দাঁড়িয়েই মন তৈরি হয়, কিন্তু মনকে শুধু “বিদ্যুৎ চলা” বা “রাসায়নিক বিক্রিয়া” বললে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ মানুষ শুধু যন্ত্র নয়; সে নিজের অভিজ্ঞতাকে অর্থও দেয়।

তাই বলা যায়

মন মস্তিষ্কের উপর নির্ভরশীল

কিন্তু মন শুধু যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়

অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক ও স্মৃতিও গুরুত্বপূর্ণ

মস্তিষ্ক ভিত্তি দেয়

মন সেই ভিত্তির জীবন্ত প্রকাশ

মনকে আমরা কেন আলাদা কিছু মনে করি? (𝙒𝙚 𝙛𝙚𝙚𝙡 𝙞𝙩 𝙨𝙚𝙥𝙖𝙧𝙖𝙩𝙚 𝙙𝙪𝙚 𝙩𝙤 𝙨𝙪𝙗𝙟𝙚𝙘𝙩𝙞𝙫𝙚 𝙚𝙭𝙥𝙚𝙧𝙞𝙚𝙣𝙘𝙚)

আমরা যখন বলি “আমার মন খারাপ”, তখন মনে হয় যেন “আমি” আর “আমার মন” আলাদা। এই ভাষার কারণেই অনেক সময় মনে হয় মন বুঝি একটি আলাদা সত্তা। আবার আমরা ভেতরে ভেতরে অনুভব করি—আমি চিন্তা করছি, আমি অনুভব করছি, আমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। এই “আমি”-র অভিজ্ঞতাই মনকে একধরনের আলাদা বাস্তবতা দেয়।

মনস্তাত্ত্বিকভাবে, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ তার ভেতরের অভিজ্ঞতাকে সরাসরি অনুভব করে, কিন্তু মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকে অনুভব করে না। আপনি দুঃখকে অনুভব করেন, কিন্তু নিউরনের কাজকে অনুভব করেন না। এই কারণেই মন আমাদের কাছে “জীবন্ত” লাগে, আর মস্তিষ্ক “জৈব” লাগে। এখান থেকে মনে হতে পারে দুটো পুরো আলাদা। আসলে তারা আলাদা স্তরে একই বাস্তবতার দুই দিক।

এই বিভ্রান্তি হয় কারণ

আমরা মনকে ভেতরে অনুভব করি

মস্তিষ্ককে বাহ্যিকভাবে বুঝি

ভাষা মনকে আলাদা সত্তা বানিয়ে তোলে

অনুভূতি সরাসরি ধরা পড়ে

জৈব প্রক্রিয়া সরাসরি ধরা পড়ে না

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে “মন” কী? ( 𝙄𝙣 𝙥𝙨𝙮𝙘𝙝𝙤𝙡𝙤𝙜𝙮, 𝙢𝙞𝙣𝙙 = 𝙩𝙝𝙤𝙪𝙜𝙝𝙩𝙨, 𝙚𝙢𝙤𝙩𝙞𝙤𝙣𝙨, 𝙗𝙚𝙝𝙖𝙫𝙞𝙤𝙧)

মনোবিজ্ঞানে “মন” বলতে সাধারণত বোঝানো হয় মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ, প্রেরণা, ইচ্ছা, মনোযোগ, স্মৃতি, কল্পনা, সচেতনতা—এই পুরো মানসিক প্রক্রিয়ার জগৎ। অর্থাৎ মন হলো একটি কার্যকরী ধারণা, যার সাহায্যে আমরা মানুষকে বুঝি। কেউ কেন কাঁদছে, কেন ভয় পাচ্ছে, কেন ভালোবাসছে, কেন নিজেকে ব্যর্থ ভাবছে—এসব বোঝার জন্য “মন” ধারণাটি খুব দরকারি।

অর্থাৎ, চিকিৎসাবিদ্যার ভাষায় আপনি বলতে পারেন মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু কাউন্সেলিং বা মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হবে—ব্যক্তির self-worth কমেছে, ভয় বেড়েছে, চিন্তার ধরন নেতিবাচক হয়েছে, attachment pattern অনিরাপদ হয়েছে। এখানে “মন” শব্দটি বাস্তবতার মানসিক দিককে ধরতে সাহায্য করে।

মনোবিজ্ঞানে মন বলতে

চিন্তা

অনুভূতি

আচরণ

প্রেরণা

সচেতন অভিজ্ঞতার জগৎ

মস্তিষ্কে পরিবর্তন হলে মন বদলায়, আবার মানসিক অভিজ্ঞতায়ও মস্তিষ্ক বদলাতে পারে (𝘽𝙧𝙖𝙞𝙣 𝙈𝙞𝙣𝙙 𝙞𝙣𝙛𝙡𝙪𝙚𝙣𝙘𝙚 𝙚𝙖𝙘𝙝 𝙤𝙩𝙝𝙚𝙧)

এখানেই বিষয়টি আরও গভীর। শুধু মস্তিষ্ক মনকে প্রভাবিত করে না; মানুষের অভিজ্ঞতা, শেখা, অনুশীলন, সম্পর্ক, ট্রমা, ধ্যান, থেরাপি—এসবও মস্তিষ্কে পরিবর্তন আনতে পারে। একে আমরা সহজ ভাষায় বলতে পারি—মস্তিষ্ক ও মন পরস্পরকে প্রভাবিত করে।

যেমন দীর্ঘদিনের ট্রমা একজন মানুষের ভয়, চিন্তা, সম্পর্কের ধরন বদলে দিতে পারে—অর্থাৎ তার “মন” বদলায়। একই সঙ্গে এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তার মস্তিষ্কের ভয়-সংক্রান্ত অংশকেও আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। আবার কাউন্সেলিং, নতুন অভ্যাস, নিরাপদ সম্পর্ক, ধ্যান, আত্মসচেতনতা—এসব মানুষের মানসিক জগৎকে বদলায়, এবং ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কাজের ধরনেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সম্পর্কটা একমুখী নয়।

এর মানে

মস্তিষ্ক মনকে প্রভাবিত করে

মনও মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করতে পারে

অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ

থেরাপি ও অনুশীলন কাজ করে

পরিবর্তন সম্ভব

“মন” কি আত্মা? — এই প্রশ্ন আলাদা (𝙈𝙞𝙣𝙙 ≠ 𝙣𝙚𝙘𝙚𝙨𝙨𝙖𝙧𝙞𝙡𝙮 𝙨𝙤𝙪𝙡 (𝙨𝙚𝙥𝙖𝙧𝙖𝙩𝙚 𝙙𝙚𝙗𝙖𝙩𝙚)

অনেক মানুষ মন, আত্মা, চেতনা—এই শব্দগুলো একসঙ্গে ব্যবহার করেন। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক আলোচনায় “মন” আর “আত্মা” এক জিনিস নয়। আত্মা একটি দার্শনিক, আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় ধারণা হতে পারে। কিন্তু মনোবিজ্ঞান যখন “মন” নিয়ে কথা বলে, তখন সেটি মানুষের মানসিক প্রক্রিয়া, অনুভূতি, চিন্তা ও আচরণের জগৎ নিয়ে কথা বলে।

অর্থাৎ, আপনি ব্যক্তিগত বিশ্বাসে আত্মার কথা মানতেই পারেন, কিন্তু মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় “মন” বলতে আমরা সাধারণত মানসিক কার্যকলাপের কথাই বুঝি। এই দুটিকে গুলিয়ে ফেললে অনেক সময় বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা একসঙ্গে মিশে যায়।

তাই

মন ও আত্মা এক জিনিস নয়

আত্মা আধ্যাত্মিক ধারণা হতে পারে

মনোবিজ্ঞান মানসিক প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলে

“মন” হলো অনুভূতি-চিন্তার ক্ষেত্র

আলাদা স্তরের আলোচনা আলাদা রাখা দরকার

তাহলে কাউন্সেলিং-এ আমরা “মস্তিষ্ক” না “মন”—কোনটা নিয়ে কাজ করি? (𝘾𝙤𝙪𝙣𝙨𝙚𝙡𝙡𝙞𝙣𝙜 𝙢𝙖𝙞𝙣𝙡𝙮 𝙬𝙤𝙧𝙠𝙨 𝙬𝙞𝙩𝙝 𝙩𝙝𝙚 𝙢𝙞𝙣𝙙)

কাউন্সেলিং-এ প্রধানত মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করা হয়—যেমন চিন্তার ধরন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সম্পর্কের ভয়, আত্মসম্মান, অতীতের কষ্ট, বর্তমানের মানসিক চাপ, আচরণের ধরন। কিন্তু এর মানে এই নয় যে মস্তিষ্কের বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক। বরং কাউন্সেলিং ধরে নেয় যে মানসিক অভিজ্ঞতার জৈব ভিত্তি আছে, তবুও মানুষের অনুভূতি ও অর্থবোধের দিকটি আলাদা গুরুত্ব পায়।

যেমন একজন মানুষ depression-এ থাকলে তার মস্তিষ্কেও পরিবর্তন থাকতে পারে, আবার তার চিন্তার ধরন, hopelessness, self-talk, সম্পর্কের আঘাত—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কাউন্সেলিং শুধু “brain chemistry” দেখে না, শুধু “মন খারাপ” বলেও থামে না; বরং পুরো মানুষটিকে বোঝার চেষ্টা করে।

কাউন্সেলিং-এ গুরুত্ব পায়

চিন্তার ধরন

আবেগ

সম্পর্ক

self-talk

মানসিক অভিজ্ঞতার অর্থ

“মন” ও “মস্তিষ্ক” — আলাদা বললে কী সমস্যা, এক বললে কী সমস্যা? (𝘽𝙤𝙩𝙝 “𝙨𝙚𝙥𝙖𝙧𝙖𝙩𝙚” 𝙖𝙣𝙙 “𝙨𝙖𝙢𝙚” 𝙫𝙞𝙚𝙬𝙨 𝙝𝙖𝙫𝙚 𝙡𝙞𝙢𝙞𝙩𝙨)

যদি আমরা বলি মন আর মস্তিষ্ক পুরোপুরি আলাদা, তাহলে মনে হতে পারে মানসিক কষ্টের সঙ্গে শরীরের কোনো সম্পর্ক নেই। এতে মানুষ ভাবতে পারে শুধু ইচ্ছাশক্তি দিয়েই সব ঠিক করা যায়। আবার যদি আমরা বলি মন আর মস্তিষ্ক একেবারে একই, তাহলে মানুষের জীবন্ত অভিজ্ঞতা, কষ্টের অর্থ, সম্পর্কের প্রভাব, childhood trauma, self-worth—এসবকে খুব যান্ত্রিকভাবে দেখা হতে পারে।

তাই সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি হলো—

মস্তিষ্ক হলো জৈব ভিত্তি, মন হলো সেই ভিত্তির উপর গড়ে ওঠা জীবন্ত মানসিক অভিজ্ঞতা।

দুটি আলাদা ভাষা, কিন্তু বাস্তবে গভীরভাবে জড়ানো।

ভারসাম্যপূর্ণ বোঝাপড়া

পুরো আলাদা ভাবা ঠিক নয়

পুরো এক বলা-ও অসম্পূর্ণ

মস্তিষ্ক জৈব ভিত্তি

মন মানসিক অভিজ্ঞতা

দুটো পরস্পরনির্ভর

এই বোঝাপড়া আমাদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? (𝙐𝙣𝙙𝙚𝙧𝙨𝙩𝙖𝙣𝙙𝙞𝙣𝙜 𝙩𝙝𝙞𝙨 𝙞𝙢𝙥𝙧𝙤𝙫𝙚𝙨 𝙨𝙚𝙡𝙛-𝙖𝙬𝙖𝙧𝙚𝙣𝙚𝙨𝙨)

কারণ আমরা যদি বুঝতে পারি যে মন ও মস্তিষ্ক একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, তাহলে আমরা মানসিক স্বাস্থ্যকে আরও সহানুভূতিশীলভাবে দেখতে পারি। তখন আমরা কাউকে “দুর্বল” বলে দাগাই না, আবার শুধুই “রাসায়নিক সমস্যা” বলেও তার জীবন-অভিজ্ঞতাকে ছোট করি না। তখন বোঝা যায়—মানুষের কষ্ট বাস্তব, তার জৈব দিকও আছে, তার মানসিক ইতিহাসও আছে।

এই বোঝাপড়া counselling, therapy, lifestyle change, sleep, food, exercise, medication, relationship healing—সবকিছুর গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, মানসিক সুস্থতা শুধু “মনের জোর” না, শুধু “ওষুধ”ও না; এটি পুরো মানুষকে বোঝার বিষয়।

কেন গুরুত্বপূর্ণ

মানসিক কষ্টকে বাস্তবভাবে দেখা যায়

self-blame কমে

সাহায্য নেওয়া সহজ হয়

counselling ও treatment-এর মূল্য বোঝা যায়

পুরো মানুষটিকে দেখা যায়

তাহলে চূড়ান্ত উত্তর কী? (𝙁𝙞𝙣𝙖𝙡: 𝙈𝙞𝙣𝙙 𝙖𝙣𝙙 𝙗𝙧𝙖𝙞𝙣 𝙖𝙧𝙚 𝙙𝙚𝙚𝙥𝙡𝙮 𝙞𝙣𝙩𝙚𝙧𝙘𝙤𝙣𝙣𝙚𝙘𝙩𝙚𝙙)

চূড়ান্তভাবে বলা যায়—

মস্তিষ্ক (Brain) ও মন (Mind) পুরোপুরি দুই আলাদা সত্তা নয়, আবার একেবারে একই জিনিসও নয়।

মস্তিষ্ক হলো শরীরের অঙ্গ, আর মন হলো সেই অঙ্গের কার্যকলাপ, অভিজ্ঞতা, অর্থ, অনুভূতি ও সচেতনতার জগৎ। আপনি মনকে মস্তিষ্ক থেকে আলাদা করে বাঁচতে পারবেন না, আবার মনের জটিল অভিজ্ঞতাকে শুধু স্নায়ুকোষের ভাষায়ও পুরো বোঝা যাবে না।

সহজভাবে:

মস্তিষ্ক হলো ভিত্তি, মন হলো সেই ভিত্তির জীবন্ত প্রকাশ।

চূড়ান্ত সারাংশ

মস্তিষ্ক শরীরের অঙ্গ

মন মানসিক অভিজ্ঞতার জগৎ

মন মস্তিষ্কের উপর নির্ভরশীল

কিন্তু মন শুধু রাসায়নিক বিক্রিয়া নয়

দুটো একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত

আমরা যখন বলি “আমার মন ভালো নেই”, তখন তার ভেতরে শুধু আবেগের কথাই থাকে না—থাকে মস্তিষ্ক, স্মৃতি, সম্পর্ক, ভয়, অতীত, বর্তমান, শরীর, ঘুম, অভ্যাস—সবকিছুর ছাপ। তাই মনকে বুঝতে গেলে মস্তিষ্ককে বাদ দেওয়া যায় না; আবার মস্তিষ্ককে বুঝতে গেলেও মানুষের জীবন্ত অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা যায় না।

এই কারণেই mental health বা মানসিক সুস্থতা নিয়ে কাজ করতে হলে আমাদের দরকার একটি সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে শরীরও আছে, মস্তিষ্কও আছে, মনও আছে, সম্পর্কও আছে, জীবনের গল্পও আছে।  @ মনের কথা 

38

চিনতে পারছি, কিন্তু নামটা তবু মনে পড়ছে না। এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়েছেন কারো মুখ একদম পরিষ্কার মনে আছে

কোথায় দেখা হয়েছিল তাও মনে আছে

কিন্তু নামটা… ঠিক সেই মুহূর্তে কিছুতেই মনে পড়ছে না? কাউন্সেলিং-এ এইরকম অভিযোগ বা আক্ষেপের লিস্ট দীর্ঘ।

দেখা যায় আপনি যত বেশি মনে করার চেষ্টা করছেন

তত বেশি মাথা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে

মনে হচ্ছে নামটা “আছে”… কিন্তু বের হচ্ছে না

এই অভিজ্ঞতা আপনাকে ভেতরে ভেতরে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়।

মনে প্রশ্ন আসে—

“আমার কি স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে?”

“আমি কি আগের মতো নেই?”

“এটা কি কোনো বড় সমস্যার লক্ষণ?”

কিন্তু সত্যিটা হলো—

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা কোনো রোগ নয়

বরং মস্তিষ্কের একটি স্বাভাবিক “processing gap”

অর্থাৎ— তথ্য আপনার মাথায় আছে, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সেটি বের হওয়ার পথটা সাময়িকভাবে আটকে গেছে।

মনোবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয়—

Tip of the Tongue (মুখের আগায় আটকে থাকা স্মৃতি)। এটা “ভুলে যাওয়া” নয়— এটা হলো “ঠিক সময়ে মনে করতে না পারা”।

আর এই ছোট অভিজ্ঞতার পেছনে লুকিয়ে আছে—

মস্তিষ্কের জটিল কাজের প্রক্রিয়া

মনোযোগ, চাপ, ঘুম, তথ্যের চাপ

আর আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রভাব

এই লেখায় আমরা খুব সহজভাবে বুঝব—

কেন এমন হয়

কখন এটা স্বাভাবিক

আর কীভাবে ধীরে ধীরে এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়

মনে রাখবেন কারণ বুঝলেই—সমাধানের পথ নিজে থেকেই পরিষ্কার হতে শুরু করে।

এই সমস্যাটি আসলে কী?

অনেক সময় আপনি লক্ষ্য করবেন—আপনি জানেন যে আপনি জানেন। এটাই এই সমস্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আপনি পুরোপুরি অচেনা অনুভব করছেন না। বরং আপনার ভেতরে একটা স্পষ্ট অনুভূতি কাজ করছে—“নামটা আমি জানি, কিন্তু এখন মনে করতে পারছি না।” এই অনুভূতি প্রমাণ করে যে স্মৃতি মুছে যায়নি। সমস্যা হয়েছে স্মৃতি বের করার প্রক্রিয়ায়।

এই কারণেই অনেক সময় দেখা যায়—আপনি তখন মনে করতে পারলেন না, কিন্তু কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ করে নামটা নিজে থেকেই মনে পড়ে গেল। এর মানে তথ্যটি হারিয়ে যায়নি। শুধু তখন আপনার মস্তিষ্ক সেটি তুলতে পারেনি। অর্থাৎ, এটি যতটা না “ভুলে যাওয়া”, তার চেয়ে বেশি “ঠিক সময়ে মনে করতে না পারা”।

নামের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি হয়। কারণ মুখ, ভঙ্গি, ব্যবহার, জায়গা—এসবের সঙ্গে অনেক রকম চিহ্ন জড়িয়ে থাকে। কিন্তু নাম অনেক সময় শুধু একটি শব্দ। তার সঙ্গে যদি আলাদা করে কোনো মানসিক ছবি, গল্প, বা অর্থ না জুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি সহজে আটকে যেতে পারে।

এই অভিজ্ঞতার সাধারণ রূপ

মুখ চিনতে পারছেন, কিন্তু নাম মনে পড়ছে না

সিনেমা দেখেছেন, কিন্তু নাম মনে নেই

কোনো শব্দ জিভের ডগায় আটকে আছে

পরে হঠাৎ করে মনে পড়ে যাচ্ছে

মনে করতে গেলে মাথা ফাঁকা লাগে

চাপ দিলে আরো ব্লক হয়ে যায়

পরিচিত মানুষকে দেখে নাম মনে আসে না

কিন্তু কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই মনে পড়ে

ঘটনাটা মনে আছে, নামটা নেই

নিজেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা শুরু হয়

মস্তিষ্ক কীভাবে নাম, মুখ ও তথ্য মনে রাখে?

আমাদের মস্তিষ্ক কোনো তথ্য আলাদা আলাদা বাক্সে জমা রাখে না। বরং এটি একটি বড় জালের মতো কাজ করে। একটি মুখ, একটি নাম, একটি জায়গা, একটি অভিজ্ঞতা, একটি অনুভূতি—সবকিছু অনেকগুলো সংযোগের মধ্যে বাঁধা থাকে। তাই আপনি যখন কাউকে দেখেন, তখন মস্তিষ্ক প্রথমে মুখ চিনে নেয়। তারপর সেই মুখের সঙ্গে যুক্ত জায়গা, সময়, সম্পর্ক, প্রসঙ্গ—এসব খুঁজে বের করতে শুরু করে। তারপর কোনো এক ধাপে নামটি সামনে আসে।

সমস্যা হলো, এই পুরো কাজটি এক ধাপে হয় না। এটি বহু ধাপের একটি প্রক্রিয়া। আর এই ধাপগুলোর যেকোনো এক জায়গায় সাময়িক বাধা এলেই আপনি বুঝতে পারেন—“আমি চিনি, কিন্তু নামটা মনে পড়ছে না।” এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং মস্তিষ্কের জটিল কাজের মধ্যে এ ধরনের ছোটখাটো আটকে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

বিশেষ করে নাম মনে রাখা কঠিন, কারণ নামের সঙ্গে অনেক সময় তেমন দৃশ্য, আবেগ বা অর্থ জড়িয়ে থাকে না। যেমন “নীল শাড়ি পরা আপা” বা “যিনি স্কুলে দেখা করেছিলেন”—এগুলো তুলনামূলক সহজে মনে থাকতে পারে। কিন্তু “তার নাম কী?”—এই প্রশ্নে মস্তিষ্ককে আরও নির্দিষ্টভাবে খুঁজতে হয়।

এই প্রক্রিয়ার ধাপ

মুখ চিনতে পারা

স্মৃতির সাথে সংযোগ তৈরি করা

আগের অভিজ্ঞতা খোঁজা

কোথায় দেখেছেন তা মনে করা

নামের দিকে পৌঁছানো

ভাষার অংশ সক্রিয় হওয়া

সঠিক শব্দ খুঁজে বের করা

স্মৃতি থেকে তথ্য টেনে আনা

মনোযোগ ধরে রাখা

মুখে প্রকাশ করা

“মনে পড়ছে না” কেন হয়?

এই সমস্যার মূল কারণ হলো—মস্তিষ্ক তথ্য ধরে রেখেছে, কিন্তু সেটি ঠিক সময়ে বের করতে পারছে না। এটাকে বলা হয় retrieval problem (তথ্য বের করার সমস্যা)। অনেক সময় আমরা ভুল করে ভাবি, “আমি ভুলে গেছি।” কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক কথা হলো—“আমি তখন মনে করতে পারিনি।”

এই ব্লক হওয়ার পেছনে অনেক ছোট ছোট কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। কখনো তথ্যটি প্রথমে ঠিকভাবে মনে রাখা হয়নি। কখনো তখন মনোযোগ ছিল না। কখনো খুব ক্লান্ত ছিলেন। কখনো আবার মাথার মধ্যে এত বেশি তথ্য চলছিল যে সাধারণ জিনিসও সামনে আসতে চায়নি।

আজকের দিনে আমরা অনেক দ্রুত অনেক তথ্য নিচ্ছি—মানুষের নাম, ভিডিও, খবর, বার্তা, নোটিফিকেশন, কাজের চাপ, সামাজিক যোগাযোগ—সব মিলিয়ে মস্তিষ্কের ওপর একটি অদৃশ্য বোঝা পড়ে। ফলে সাধারণ তথ্যও অনেক সময় আটকে যায়।

সাধারণ কারণগুলো

তথ্য বের করার সমস্যা

মনোযোগের ঘাটতি

প্রথমে ঠিকভাবে মনে না রাখা

একসাথে বেশি তথ্য নেওয়া

মানসিক ক্লান্তি

চাপ

উদ্বেগ

মন বিক্ষিপ্ত থাকা

কম ঘুম

মানসিক অতিরিক্ত চাপ

মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কীভাবে স্মৃতিকে প্রভাবিত করে?

যখন আপনি মানসিক চাপে থাকেন, তখন মস্তিষ্কের প্রধান কাজ হয়ে যায় নিরাপত্তা বজায় রাখা। সেই সময় মস্তিষ্ক “শান্তভাবে মনে করা”র অবস্থায় থাকে না। বরং কিছুটা সতর্ক, টানটান, অস্থির অবস্থায় চলে যায়। এই অবস্থায় যে ধরনের মনোযোগ ও ভেতরের প্রশান্তি দরকার স্মৃতি তুলতে, তা কমে যায়।

এ কারণে অনেক সময় আমরা দেখি—মনে করতে চাইছি, কিন্তু যত বেশি চেষ্টা করছি, তত বেশি মাথা যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারণ স্মৃতি বের করতে শুধু চেষ্টা নয়, মানসিক স্বস্তিও দরকার। উদ্বেগ এসে সেই জায়গাটাকে শক্ত করে দেয়। তখন মানুষ যত বেশি নিজেকে বলে—“না, এখনই মনে করতে হবে”—তত বেশি ভেতরে ভিতরে ভয় বাড়ে, আর স্মৃতি বের হওয়ার পথ তত আটকে যায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একবার নাম মনে না পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে ভয় তৈরি হতে পারে। তারপর পরেরবার মানুষ আগে থেকেই দুশ্চিন্তা করে—“আবার না ভুলে যাই!” এই ভয় নিজেই নতুন করে স্মৃতিকে আটকে দেয়। অর্থাৎ, ছোট একটি ভুল পরেরবার বড় মানসিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

চাপ ও উদ্বেগের প্রভাব

মনোযোগ কমে যায়

স্মৃতি দুর্বল লাগে

চিন্তা আটকে যায়

তথ্য মনে করা কঠিন হয়

অতিরিক্ত ভাবনা বাড়ে

মাথা ঝাপসা লাগে

সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হয়

আত্মবিশ্বাস কমে

মানসিক ক্লান্তি বাড়ে

উদ্বেগ বাড়ে

আজকের জীবনযাপনেও কেন এই সমস্যা বাড়ছে?

আগের তুলনায় এখন মানুষের মাথার ভেতর অনেক বেশি তথ্য ঢুকছে। আমরা সারাক্ষণ মোবাইল, ভিডিও, বার্তা, খবর, ছবি, সামাজিক মাধ্যম, নতুন নতুন নাম ও মুখের মধ্যে আছি। ফলে মস্তিষ্ককে অবিরত তথ্য বাছাই করতে হচ্ছে। এই ক্রমাগত তথ্যের ভিড় অনেক সময় মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে ফেলে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো—আমরা উপস্থিত থেকেও অনেক সময় পুরো উপস্থিত থাকি না। কারো সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে, কিন্তু সেই মুহূর্তে মাথায় অন্য কিছু চলছে। আমরা নাম শুনছি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজের চিন্তা, নিজের উত্তর, নিজের চাপ নিয়ে ব্যস্ত। ফলে নামটি গভীরে ঢোকে না। পরে মনে করতে গেলে সমস্যা হয়।

অতিরিক্ত মোবাইল -নির্ভরতা, খণ্ডিত মনোযোগ, বিশ্রামের অভাব, দ্রুত বদলানো তথ্যের অভ্যাস—এসব মিলে মস্তিষ্কের গভীরভাবে তথ্য ধরে রাখার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

কারণগুলো

তথ্যের সংখ্যা বেশি

মিল থাকা নাম

কম ব্যবহার করা তথ্য

দ্রুত মনে করার চাপ

মস্তিষ্কের ক্লান্তি

মনোযোগ কম

নতুন তথ্য বেশি নেওয়া

পুরনো তথ্য রিভিউ না করা

মন বিক্ষিপ্ত থাকা

স্মৃতির ওপর অতিরিক্ত চাপ

এটা কি বড় সমস্যা?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক। যদি আপনি পরে মনে করতে পারেন, দৈনন্দিন কাজ ঠিকভাবে করতে পারেন, এবং অন্যসব কাজ মোটামুটি স্বাভাবিক থাকে, তাহলে খুব ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। মাঝে মাঝে নাম ভুলে যাওয়া, পরে মনে পড়া, পরিচিত কাউকে দেখে একটু সময় নেওয়া—এসব মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার অংশ।

তবে যদি দেখেন—এই ভুলে যাওয়া খুব ঘন ঘন হচ্ছে, শুধু নাম নয়—গুরুত্বপূর্ণ কথা, কাজ, জায়গা, প্রয়োজনীয় তথ্যও ভুলে যাচ্ছেন, অথবা এতে আপনার দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কারণ তখন শুধু সাময়িক আটকে যাওয়া নয়, অন্য কারণও থাকতে পারে—যেমন বেশি মানসিক চাপ, অবসাদ, ঘুমের সমস্যা, বা অন্য কোনো শারীরিক বা স্নায়বিক অসুবিধা।

সতর্ক হওয়ার লক্ষণ

প্রতিদিন অনেক কিছু ভুলে যাওয়া

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুলে যাওয়া

একই জিনিস বারবার ভুলে যাওয়া

পথ ভুলে যাওয়া

কথা বলতে সমস্যা হওয়া

দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হওয়া

হঠাৎ পরিবর্তন

বিভ্রান্তি বাড়া

আচরণ পরিবর্তন

অন্য বোধগত সমস্যা দেখা দেওয়া

কীভাবে এই সমস্যা কমাবেন? অর্থাত সমাধান

“সমাধান জোর করে মনে করার মধ্যে নয়—মস্তিষ্ককে সঠিকভাবে সাহায্য করার মধ্যে” এই অংশটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কারণ জানা দরকার, কিন্তু সমাধানই আসল লক্ষ্য। অনেকেই এখানে ভুল করেন। তারা ভাবেন—“আমাকে আরও বেশি চেষ্টা করতে হবে”, “আরো জোরে মনে করতে হবে”, “নিজেকে চাপ দিলে নিশ্চয়ই মনে পড়বে।” কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় ঠিক তার উল্টোটা দরকার হয়।

মস্তিষ্ককে জোর করে কাজ করানো যায় না। তাকে কাজের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে হয়। যেমন ক্লান্ত শরীর বিশ্রাম পেলে ভালো কাজ করে, তেমনি ক্লান্ত বা চাপে থাকা মস্তিষ্ক শান্তি, ছন্দ, মনোযোগ ও অর্থপূর্ণ সংযোগ পেলে স্মৃতিও ভালোভাবে কাজ করতে শুরু করে। তাই নিচের উপায়গুলো শুধু টিপস নয়—এগুলো মনস্তাত্ত্বিকভাবে কার্যকর সহায়ক পদ্ধতি।

নাম শুনে সঙ্গে সঙ্গে আবার বলুন

যখন আপনি কোনো নতুন নাম শোনেন, তখন সেটি মস্তিষ্কে খুব কোমলভাবে ধরা পড়ে। তখন তা সহজেই হারিয়ে যেতে পারে। আপনি যদি সঙ্গে সঙ্গে নামটি আবার বলেন, তাহলে মস্তিষ্ক সেটিকে দ্বিতীয়বার গ্রহণ করে। এর ফলে তথ্যটি আরও শক্তভাবে বসে যায়।

এখানে মূল বিষয় হলো পুনরাবৃত্তি। একটি তথ্য যতবার সচেতনভাবে নেওয়া হয়, ততবার তার স্নায়বিক চিহ্ন কিছুটা শক্ত হয়। নাম শুনে আবার বললে আপনি শুধু শব্দটি উচ্চারণ করছেন না; আপনি আপনার মস্তিষ্ককে জানাচ্ছেন—“এটা গুরুত্বপূর্ণ, এটা ধরে রাখো।”

কী করবেন

নাম শোনার পর সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রভাবে আবার বলুন

কথার মধ্যে এক-দুবার নাম ব্যবহার করুন

প্রয়োজনে আবার জিজ্ঞেস করতে লজ্জা পাবেন না

নামটি শুনেই মনে মনে একবার বলুন

পরিচয়ের মুহূর্তে নামটির দিকে আলাদা মন দিন

নামের সঙ্গে কোনো ছবি, বৈশিষ্ট্য, ঘটনা বা জায়গা জুড়ে দিন

মস্তিষ্ক একা শব্দের চেয়ে ছবি, দৃশ্য, সম্পর্ক ও অনুভূতি বেশি ভালো মনে রাখে। তাই নাম যদি একা থাকে, তা দ্রুত হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনি যদি নামটির সঙ্গে কিছু জুড়ে দেন, তাহলে স্মৃতি অনেক বেশি স্থায়ী হয়।

যেমন, কারো নামের সঙ্গে তার পোশাক, চেহারার বৈশিষ্ট্য, কোথায় পরিচয় হয়েছে, কী কথা হয়েছিল—এসব জুড়ে নিতে পারেন। এতে নামটি আর একা থাকে না; একটি মানসিক ছবির অংশ হয়ে যায়। ফলে পরে তা মনে করা সহজ হয়।

কী করবেন

নামের সঙ্গে মুখের একটি বৈশিষ্ট্য জুড়ুন

পোশাক বা রঙের সঙ্গে মিলিয়ে রাখুন

কোথায় দেখা হয়েছিল তা যুক্ত করুন

কোনো পরিচিত মানুষ বা ঘটনার সঙ্গে মিল খুঁজুন

ছোট একটি মানসিক ছবি তৈরি করুন

নাম শোনার সময় সত্যি সত্যি মনোযোগ দিন

অনেক সময় আমরা ভুলে যাই না; বরং শুরুতেই গভীরভাবে গ্রহণ করি না। মন অন্যদিকে থাকলে তথ্য গভীরে যায় না। ফলে পরে মনে করতে গেলে মনে হয় ভুলে গেছি, অথচ বাস্তবে তা প্রথমেই পূর্ণভাবে ধরা পড়েনি।

মনোযোগ হলো স্মৃতির দরজা। আপনি কোনো তথ্যকে যত গভীর মনোযোগ দিয়ে নেবেন, সেটি মনে থাকার সম্ভাবনা তত বেশি। তাই পরিচয়ের সময় একটু ধীর হওয়া, চোখে চোখ রেখে শোনা, নিজের মাথার ভেতরের শব্দ কমানো—এসব খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কী করবেন

নাম শোনার সময় একটু থামুন

চোখে চোখ রেখে শুনুন

সেই মুহূর্তে অন্য চিন্তা সরান

নিজেকে বলুন—“এটা মনে রাখব”

নাম শুনেই ভেতরে ভেতরে পুনরাবৃত্তি করুন

জোর করে মনে করার চেষ্টা কমান

এটি সবচেয়ে জরুরি উপায়গুলোর একটি। কারণ স্মৃতি টেনে বের করার চাপে অনেক সময় স্মৃতি আরও আড়ালে চলে যায়। আপনি যত বেশি মাথায় জোর করবেন, ভিতরে ভিতরে তত বেশি টান তৈরি হবে। আর এই টান স্মৃতি বের হওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়।

অনেক সময় সঠিক উপায় হলো—অল্প সময়ের জন্য ছেড়ে দেওয়া। নিজেকে একটু ঢিলা করা। অন্যদিকে মন দেওয়া। ধীরে শ্বাস নেওয়া। তখন ভিতরের চাপ কমে যায়, আর কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সেই নামটি নিজে থেকেই মনে পড়ে যেতে পারে।

কী করবেন

মনে না পড়লে সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কিত হবেন না

নিজেকে বলুন—“পরে মনে পড়তে পারে”

মাথায় চাপ না দিয়ে একটু বিরতি নিন

ধীরে শ্বাস নিন

কয়েক মিনিট অন্যদিকে মন দিন

মস্তিষ্ককে শান্ত রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন

শান্ত মস্তিষ্ক স্মৃতি, মনোযোগ ও ভাষা—সবকিছুই তুলনামূলক ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে। আপনি যদি সারাক্ষণ তাড়াহুড়ো, অস্থিরতা, চাপ, উদ্বেগের মধ্যে থাকেন, তাহলে ছোট ছোট স্মৃতিও আটকে যেতে পারে। তাই সমাধানের বড় অংশ হলো স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত হতে দেওয়া।

প্রতিদিন কিছু সময় ধীরে হাঁটা, নীরব বসা, হালকা শ্বাসের অনুশীলন, প্রার্থনা, প্রকৃতির মধ্যে থাকা—এসব মস্তিষ্ককে নিরাপদ বার্তা দেয়। যখন মস্তিষ্ক ভেতরে ভেতরে নিরাপদ বোধ করে, তখন স্মৃতি তুলতে তার কম কষ্ট হয়।

কী করবেন

প্রতিদিন কিছুক্ষণ ধীরে শ্বাস নিন

অযথা তাড়া কমান

দিনে কিছু নীরব সময় রাখুন

হালকা হাঁটুন

নিজের ভেতরের অস্থিরতা ধীরে নামান

পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমকে অগ্রাধিকার দিন

ঘুমের সময় মস্তিষ্ক দিনের সব তথ্য গুছিয়ে রাখে। কোনটা দরকার, কোনটা গুরুত্বপূর্ণ, কোনটা পরে লাগতে পারে—এসব বাছাইয়ের বড় কাজ ঘুমের সময় হয়। তাই ঘুম কম হলে বা ভাঙা ভাঙা হলে স্মৃতিও এলোমেলো লাগতে পারে।

অনেকেই ভাবেন, ঘুম শুধু শরীরের বিশ্রাম। কিন্তু আসলে স্মৃতি, মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য—সবকিছুর সঙ্গেই ঘুমের গভীর সম্পর্ক আছে। যারা নিয়মিত কম ঘুমান, তাদের মধ্যে নাম মনে করতে সমস্যা, মাথা ঝাপসা লাগা, মনোযোগ কমে যাওয়া—এসব বেশি দেখা যায়।

কী করবেন

প্রতিদিন সম্ভব হলে একই সময়ে ঘুমাতে যান

পর্যাপ্ত সময় ঘুমান

ঘুমের আগে অতিরিক্ত মোবাইল কমান

ঘুমকে গুরুত্ব দিন

রাত জাগা অভ্যাস কমানোর চেষ্টা করুন

ধ্যান, প্রার্থনা বা মন-শান্তির অনুশীলন করুন

মনকে স্থির রাখার অনুশীলন স্মৃতির জন্য খুব উপকারী। কারণ এতে মনের ছুটোছুটি কমে, মনোযোগ এক জায়গায় থামতে শেখে, আর ভিতরের ভয় বা অস্থিরতাও ধীরে ধীরে কমে। ফলে মনে করার সময় ভেতরের চাপ কম কাজ করে।

এখানে বড় কিছু করার দরকার নেই। প্রতিদিন ৫–১০ মিনিট চুপচাপ বসা, শ্বাসের দিকে মন দেওয়া, প্রার্থনায় মন রাখা—এসব ছোট কাজও স্নায়বিক টান কমাতে অনেক সাহায্য করে।

কী করবেন

প্রতিদিন কয়েক মিনিট চুপচাপ বসুন

শ্বাসের দিকে মন দিন

মন অন্যদিকে গেলে ধীরে ফিরিয়ে আনুন

প্রার্থনা বা ধ্যানকে নিয়মে আনুন

মনকে প্রতিদিন একটু বিশ্রাম দিন

পর্দার (screen) সময় ও তথ্যের অতিরিক্ত ভিড় কমান

সারাক্ষণ মোবাইল, ভিডিও, ছোট ক্লিপ, দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন—এসব মস্তিষ্ককে গভীর মনোযোগের বদলে খণ্ডিত মনোযোগে অভ্যস্ত করে। এতে তথ্য আসে অনেক, কিন্তু ভেতরে জমে কম। ফলে পরে মনে করতেও সমস্যা হয়।

তাই সব তথ্য বন্ধ করতে হবে এমন নয়, কিন্তু মস্তিষ্ককে একটু ফাঁকা জায়গা দিতে হবে। কারণ মস্তিষ্ক একটানা তথ্য খেতে থাকলে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আর তখন সাধারণ স্মৃতিও আটকে যেতে পারে।

কী করবেন

অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ব্যবহার কমান

একটানা ছোট ভিডিও দেখতে থাকবেন না

তথ্যের মধ্যে বিরতি রাখুন

দিনের কিছু সময় পর্দামুক্ত রাখুন

বাস্তব কথোপকথনে বেশি মন দিন

মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখুন, কিন্তু চাপে নয়

মস্তিষ্কও চর্চায় সজীব থাকে। নিয়মিত পড়া, লেখা, মনে করা, নতুন কিছু শেখা—এসব মস্তিষ্কের সংযোগগুলোকে সক্রিয় রাখে। এতে স্মৃতির পথগুলোও সচল থাকে। তবে এটিকে পরীক্ষার মতো চাপ বানালে লাভ কমে যায়। আনন্দের সঙ্গে, ধীরে, নিয়মিত চর্চা বেশি উপকারী।

ছোট ছোট মানসিক অনুশীলন খুব কার্যকর হতে পারে। যেমন—দিন শেষে মনে করা আজ কী কী করলেন, কার সঙ্গে কথা হলো, কী শুনলেন। এগুলো মস্তিষ্ককে সুশৃঙ্খলভাবে স্মৃতি ব্যবহার করতে সাহায্য করে।

কী করবেন

প্রতিদিন কিছু পড়ুন

ছোট নোট লিখুন

দিনের ঘটনা মনে করার অভ্যাস করুন

ধাঁধা বা শব্দখেলা করুন

নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন

নিজের উপর মানসিক চাপ কমান

এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো নিজের সঙ্গে কঠোর ব্যবহার। আপনি যদি বারবার নিজেকে বলেন—“আমার সমস্যা হচ্ছে”, “আমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছি”, “আমি আগের মতো নেই”—তাহলে ভেতরে ভেতরে ভয় বাড়বে। আর সেই ভয় আবার স্মৃতিকে আরও দুর্বল করবে।

তাই নিজেকে একটু নরমভাবে দেখতে হবে। মানুষ হিসেবে মাঝে মাঝে নাম ভুলে যাওয়া, মনে করতে সময় লাগা—এসব খুব স্বাভাবিক। সব ভুলকেই রোগের লক্ষণ ধরে নিলে মন অকারণে আতঙ্কিত হয়। আর আতঙ্কিত মন সহজে স্মৃতি ব্যবহার করতে পারে না।

কী করবেন

ভুলে গেলে নিজেকে দোষ দেবেন না

ছোট ভুলকে বড় রোগ ভাববেন না

নিজেকে শান্তভাবে বলুন—“এটা হয়”

ধীরে ধীরে সমাধানের পথে থাকুন

নিজের মনকে শত্রু নয়, সহযোগী ভাবুন

আপনি যদি অনুভব করেন—

কাউকে চিনতে পারছেন, কিন্তু নাম মনে পড়ছে না,

সাধারণ জিনিসের নামও কখনো কখনো আটকে যাচ্ছে, অথবা যত বেশি চেষ্টা করছেন, তত বেশি মাথা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে—

তাহলে প্রথমেই ভয় পাবেন না।

কারণ অনেক সময় এটি স্মৃতি নষ্ট হওয়ার লক্ষণ নয়। বরং এটি মস্তিষ্কের ক্লান্তি, অতিরিক্ত চাপ, উদ্বেগ, কম ঘুম, মনোযোগের ভাঙন, বা তথ্যের অতিরিক্ত ভিড়ের একটি সংকেত। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সমস্যার অনেকটাই কমানো সম্ভব, যদি আপনি মস্তিষ্ককে একটু বুঝে তার সঙ্গে কাজ করেন।

মনে রাখবেন—

মস্তিষ্ককে জোর করে নয়, সঠিক পরিবেশ দিয়ে সাহায্য করতে হয়। শান্ত মন, পর্যাপ্ত ঘুম, মনোযোগ দিয়ে শোনা, তথ্যের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা, পর্দার সময় কমানো, আর নিজের উপর অযথা চাপ না দেওয়া—এই ছোট কিন্তু গভীর পরিবর্তনগুলোই অনেক বড় ফল দিতে পারে।

আপনি যদি দেখেন—

এই ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে

এতে দুশ্চিন্তা তৈরি হচ্ছে

আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে

বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে

তাহলে বিষয়টিকে অবহেলা না করে বোঝার চেষ্টা করুন। অনেক সময় সঠিক মানসিক গাইডেন্স, একটু জীবনযাপনের পরিবর্তন, আর নিজের প্রতি একটু সহানুভূতি—এই তিনটিই বড় পরিবর্তনের শুরু করতে পারে।


39


টাকাপয়সার অভাবে মানুষের আইকিউ কমে যায়!

গবেষণাটি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের। ২০১৩ সালে Science জার্নালে প্রকাশিত হয় এটি। দুটো ভিন্ন পরিবেশে এই পরীক্ষা চালানো হয়। একটি নিউ জার্সির শপিং মলে এবং দ্বিতীয়টি ভারতের আখ চাষীদের ওপর।

শপিং মলে একদল মানুষকে কিছু আর্থিক সমস্যার সমাধান করতে দেওয়া হয়। সহজ অঙ্কগুলো ধনী-দরিদ্র সবাই সমাধান করে ফেলেন। কিন্তু জটিল এবং বড় অঙ্কগুলো সমাধানে নিম্ন আয়ের ব্যক্তিরা তুলনামূলক খারাপ পারফরম্যান্স করেন।

একই ঘটনা ঘটে ভারতেও। আখ চাষীরা বছরে একবার ফসল বিক্রি করে অনেক টাকা আয় করেন। কিন্তু ফসল বোনার আগে চরম অর্থকষ্টে ভোগেন। পরীক্ষায় দেখা যায় যখন অভাব থাকে, তখন তাদের আইকিউ অন্য সময়ের চেয়ে ১৩ পয়েন্ট কম। ফসল বিক্রির পর পুনরায় বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধি পায়। এভাবেই চলতে থাকে।

গবেষণা অনুযায়ী, অর্থচিন্তার দরুণ আইকিউ কমার ফলে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষতি হয়, তা এক রাত না ঘুমানোর ফলে হওয়া ক্ষতির সমতূল্য।

প্রতিবেদন: বিজ্ঞানপ্রিয়।


40

একটা অন্ধকার টানেলে হাঁটা, যেখানে কোনো আলোর রেখা নেই, কোনো গন্তব্য নেই, শুধু পা চলছে আর সময় কেটে যাচ্ছে।

কল্পনা করুন আপনি অসুস্থ, একদিন ডাক্তার আপনার সামনে বসে গম্ভীর গলায় বললেন: আপনার হাতে আর খুব বেশি সময় নেই। আপনি বাঁচবেন আর মাত্র ৪ বছর, ২ মাস, ২১ দিন।

এই খবরটা শোনার পর যদি আপনার জীবনে কোনো উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে কী হবে? তাহলে বেশিরভাগ সময় আপনি দুশ্চিন্তায়, ভয়ে, হতাশায় কাটিয়ে দেবেন। রাতে ঘুম আসবে না। সারাদিন মাথায় ঘুরবে "এখন আমি কী করব? কীভাবে সময় কাটাব? এত কম সময়ে কী অর্জন করা সম্ভব?" আপনি হয়তো ইউটিউবে ভিডিও দেখবেন, বই পড়বেন, বন্ধুদের সাথে কথা বলবেন কিন্তু কিছুই মনকে শান্তি দিতে পারবে না। জীবনটা মনে হবে একটা অসমাপ্ত গল্প, যেটা হঠাৎ করে শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু ধরুন, একই সময়ে আপনাকে একটা সুনির্দিষ্ট *দায়িত্ব* দেওয়া হলো। ডাক্তারের পাশে আরেকজন বললেন, "আপনি যতদিন বাঁচবেন, 'বিজ্ঞানী সাহেবকে' সবরকমভাবে সাহায্য করবেন। তার স্বপ্নকে সত্যি করতে, তার সামাজিক কাজে তাকে সাহায্য করবেন এটাই আপনার শেষ দায়িত্ব।

এই দায়িত্বটা গ্রহণ করার পর কী হবে? 

আশ্চর্যজনকভাবে আপনার জীবনটা এক মুহূর্তে বদলে যাবে। দুশ্চিন্তা কমে যাবে। মৃ'ত্যুর ভয়টা আর এত তীব্র থাকবে না। কারণ এখন আপনার কাছে একটা *উদ্দেশ্য* আছে। এখন স্বেচ্ছায় আপনি নিজের জীবনটা তার জন্য উৎসর্গ করে দিবেন।

উদাহরণ দিয়ে বলছি:

সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনি আর আজকের দিনটা কীভাবে কাটাব ভাববেন না। বরং ভাববেন, আজ আমি তার জন্য কী করতে পারি?

যখন শরীর খারাপ করবে, তখনও আপনি হাল ছাড়বেন না। কারণ আপনার দায়িত্বটা এখনো বাকি। 

ছোট ছোট সাফল্যগুলো তার একটা সমস্যা সমাধান করা, তার মুখে হাসি ফোটানো, তার স্বপ্নের একটা অংশ বাস্তবায়ন করতে পারা এগুলোই আপনার কাছে বড় পুরস্কার হয়ে উঠবে।

এই দায়িত্ব আপনাকে ভেতর থেকে *হালকা* করে দেবে। মনের সেই ভারী অনুভূতি চলে যাবে। আপনি আবার শিশুর মতো সরল, আনন্দিত, কৌতূহলী হয়ে উঠবেন। হাসতে হাসতে কথা বলবেন। ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ পাবেন। কারণ আপনি এখন আর নিজের জন্য বাঁচছেন না আপনি অন্য কারো জন্য বাঁচছেন। আর মানুষ যখন অন্যের জন্য বাঁচে, তখন তার নিজের জীবনটা সবচেয়ে সুন্দর হয়ে ওঠে।

জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য এটাই *উদ্দেশ্য ছাড়া জীবন শুধু চলে, কিন্তু উদ্দেশ্য থাকলে জীবন বাঁচে।*

তাই যদি আজ আপনার জীবনে কোনো উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে একটা খুঁজে নিন। কাউকে সাহায্য করুন, কোনো কাজে নিজেকে উৎসর্গ করুন, কারো স্বপ্নের অংশ হয়ে উঠুন। দেখবেন, মৃ'ত্যুর ভয়ও আর এত ভয়ঙ্কর লাগবে না। কারণ আপনি জানবেন আপনি যা করছেন, তা অর্থপূর্ণ।

কারণ উদ্দেশ্যই জীবনকে অমর করে তোলে, 

আর অমরত্বের জন্য বেশিদিন বাঁচার দরকার হয় না, শুধু সঠিক কারণে বাঁচার দরকার হয়। @ বিথী দাস

৪১

ডেভিড ফ্যাগেনবম ছিলেন একজন সুঠামদেহী কলেজ অ্যাথলিট এবং মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।

কিন্তু হঠাৎ করেই তার জীবন থমকে যায়। কোনো কারণ ছাড়াই তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একে একে কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছিল। বেশ কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকরা জানালেন, তিনি 'ক্যাসলম্যান ডিজিজ' (Idiopathic Multicentric Castleman Disease) নামক এক অত্যন্ত বিরল এবং প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত। এটি এমন এক রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে নিজের সুস্থ অঙ্গগুলোকেই আক্রমণ করতে শুরু করে।

অবস্থা এতই খারাপ ছিল যে, ডেভিড ৫ বার মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসেন। চিকিৎসকদের হাতে এই রোগের কোনো নির্দিষ্ট বা কার্যকর চিকিৎসা ছিল না।

কিন্তু ডেভিড মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করেননি।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই তিনি নিজের রক্তের নমুনা এবং মেডিকেল ডেটা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। অগণিত গবেষণাপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে তিনি একটি বৈজ্ঞানিক সূত্র খুঁজে পান। তিনি খেয়াল করেন, তার ইমিউন সিস্টেমে 'mTOR' নামক একটি কমিউনিকেশন লাইন অতিরিক্ত মাত্রায় সক্রিয় হয়ে আছে, যা এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে।

এরপর তিনি এমন একটি পুরনো ওষুধের খোঁজ পান—যার নাম 'সিরোলিমাস' (Sirolimus)। এই ওষুধটি সাধারণত কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের পর রোগীদের দেওয়া হতো। ডেভিড বুঝতে পারেন, এই নির্দিষ্ট ওষুধটি তার ওই অতিসক্রিয় ইমিউন সিস্টেমের 'mTOR' লাইনটিকে ব্লক করতে সক্ষম!

তিনি চিকিৎসকদের রাজি করিয়ে নিজের ওপরই ওষুধটি প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেন। এবং এটি কাজ করে! ডেভিডের শরীর ধীরে ধীরে সুস্থ হতে শুরু করে। তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে গড়ে তোলেন 'ক্যাসলম্যান ডিজিজ কোলাবোরেটিভ নেটওয়ার্ক'। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার একজন চিকিৎসক ও গবেষক। তাঁর আবিষ্কৃত এই পদ্ধতি আজ বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার বিরল রোগীর জীবন বাঁচাচ্ছে।

Science and Psychology

World Vision (বিশ্ব দর্শন)

৪২

ভারত ও বাংলাদেশের মেয়েরা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন?

আমাদের মেয়েরা একসময় অপুষ্টিতে ভুগতেন।

আমরা ভাবছিলাম সেই যুগ শেষ হয়েছে।

কিন্তু বাস্তব চিত্র আরও জটিল।

আমাদের দেশে এখন দুই ধরনের সংকট একসাথে চলছে- কেউ অতিরিক্ত খাচ্ছেন, ফলে স্বাভাবিকের থেকে মুটিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ পর্যাপ্ত পাচ্ছেন না। ফলে স্বাভাবিক ওজন অর্জন করতে পারছেন না।

ভারতের চিত্র:

জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার (NFHS) তথ্য অনুযায়ী, প্রজননক্ষম বয়সের ভারতীয় নারীদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে, দক্ষিণ এশিয়ায় এখনও প্রায় ২৪% নারী কম ওজনের।

শহরে অতিরিক্ত ওজন বেশি। গ্রামে কম ওজন বেশি।

বাংলাদেশের চিত্র:

২০২২ সালের বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপে ( BDHS) দেখা গেছে, প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের মধ্যে ১০% কম ওজনের, ১৯% অতিরিক্ত ওজনের এবং ৩৭%-এর বেশি স্থূলকায়। শহরের ৬০%-এর বেশি নারী অতিরিক্ত ওজনের। গ্রামেও এখন প্রায় ৪৫%।

এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়।

প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন নারী আছেন।

তাঁর একটি স্বপ্ন আছে- সুস্থ মা হওয়ার, সুস্থ সন্তান দেওয়ার। অতিরিক্ত ওজন বা কম ওজন দুটোই সুস্থ সন্তান জন্মদানের জন্য বাঁধা।

শহরায়ন বেড়েছে। প্রক্রিয়াজাত খাবার সহজলভ্য হয়েছে। পরিশ্রমের কাজ কমেছে। ফলে আমাদের মেয়েরা এখন একটি নতুন বিপদের মুখে।

@ Better Food, Better Nutrition


৪৩

১৮৬৬ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ—ইতিহাসে যা Orissa Famine of 1866 নামে পরিচিত—

সেই সময় বাংলার মাটিতে মানুষের আর্তনাদ এক বিভীষিকাময় রূপ নিয়েছিল। একমুঠো ভাতের জন্য হাহাকার, ক্ষুধার জ্বালায় মানুষের জীবনসংগ্রাম—সবকিছু মিলিয়ে এক মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র ফুটে উঠেছিল চারদিকে।

এই দুর্দিনে চুপ করে থাকেননি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। নিজের জন্মভূমি বীরসিংহে তিনি খুললেন অন্নছত্র। দিনরাত বারোজন মানুষ রান্না করতেন, কুড়িজন পরিবেশন করতেন—তবুও যেন চাহিদার শেষ ছিল না। বিদ্যাসাগরের একটাই নির্দেশ—

“যত টাকা খরচ হোক, কেউ যেন অভুক্ত না থাকে।”

অন্নছত্রে খিচুড়ি খেতে খেতে যখন গরিব মানুষদের অরুচি ধরে গেল, তারা ইচ্ছা প্রকাশ করল—সপ্তাহে একদিন যদি মাছভাত পাওয়া যেত! সেই কথা পৌঁছাল বিদ্যাসাগরের কানে। আর দেরি নয়—তিনি ব্যবস্থা করলেন সপ্তাহে একদিন ভাত, পোনা মাছের ঝোল আর দই। ক্ষুধার্ত মানুষের ছোট্ট ইচ্ছাকেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন হৃদয় দিয়ে।

শুধু খাদ্য নয়, সম্মানের কথাও ভেবেছেন তিনি। অন্নছত্রে আসা গরিব, তথাকথিত ‘নিম্নবর্ণের’ নারীদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ—রুক্ষ চুল, অনাহারের চিহ্ন। তেলের ব্যবস্থা করা হলেও বিক্রেতারা দূর থেকে তেল দিত, যেন ছোঁয়াছুঁয়ি না হয়। এই অবমাননা সহ্য করতে পারেননি বিদ্যাসাগর। তিনি নিজেই এগিয়ে এসে সেই নারীদের মাথায় তেল মেখে দিয়েছিলেন—মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

বীরসিংহ ছাড়াও কলকাতার কলেজ স্কোয়ার এলাকায়ও তিনি নিজের হাতে উপোসী মানুষদের ভাত, ডাল, তরকারি পরিবেশন করেছেন। শুধু নিজে উদ্যোগ নিয়েই থেমে থাকেননি—সরকারের কাছেও আবেদন করেছেন যেন আরও অন্নছত্র খোলা হয়। তাঁর প্রচেষ্টায় সরকারি উদ্যোগেও বহু স্থানে খাদ্য বিতরণের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

এই অসীম মানবপ্রেম ও দয়ার জন্যই মানুষ তাঁকে ডাকতে শুরু করে—“দয়ার সাগর”।

এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরবর্তীকালে গভীর শ্রদ্ধায় বলেছিলেন—

“অনেক মহৈশ্বর্যশালী রাজা রায় বাহাদুর প্রচুর ক্ষমতা লইয়া যে উপাধি লাভ করিতে পারে নাই, এই দরিদ্র পিতার দরিদ্র সন্তান (বিদ্যাসাগর) সেই ‘দয়ার সাগর’ নামে বঙ্গদেশে চিরদিনের জন্য বিখ্যাত হইয়া গেলেন।”

মানবতার ইতিহাসে এই ঘটনাগুলো শুধু দানশীলতার উদাহরণ নয়—এগুলো এক মহান আত্মার গভীর সহমর্মিতা, যিনি মানুষের দুঃখকে নিজের দুঃখ বলে অনুভব করেছিলেন।

@ বিশ্ব দর্শন


গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক প্লেট চটপটিতেই থাকতে পারে ৭ কোটির বেশি মলমূত্রজাত জীবাণু। যা মানবদেহে ঢুকলে ডায়রিয়া থেকে শুরু করে পেটের নানা জটিল রোগের কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বেশিরভাগ রাস্তার খাবারই স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। ফুটপাতের দোকানগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব, ময়লা পানিতে প্লেট ধোয়া, খোলা খাবারে ধুলা-ধোঁয়া লাগা। সব মিলিয়ে খাবারগুলো হয়ে উঠছে জীবাণুর বড় উৎস।

অনেক বিক্রেতা একই তেল বারবার ব্যবহার করেন। যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর চর্বিতে পরিণত হয়। আবার শরবত বা আখের রসে যে বরফ ব্যবহার করা হয়, তার বড় অংশই আসে অস্বাস্থ্যকর উৎস থেকে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক পরীক্ষায় রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করা খাবারে মলমূত্রজাত জীবাণুসহ আরও ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চটপটিতেই জীবাণুর মাত্রা সবচেয়ে বেশি।


৪৪


পঞ্চানন কর্মকার ছিলেন বাংলা মুদ্রণশিল্পের ইতিহাসে এক অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। তিনি মূলত বাংলার প্রথম দিককার হরফ নির্মাতা (type designer) ও মুদ্রণ প্রযুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত।

নিচে তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো—

জন্ম ও পরিচয়

জন্ম: আনুমানিক ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি

জন্মস্থান: পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার শ্রীরামপুর অঞ্চলে

পেশা: হরফ নির্মাতা (Type Founder), কারিগর

তিনি মূলত একজন দক্ষ কারিগর ছিলেন, যিনি ধাতুর ওপর কাজ করে অক্ষর তৈরি করতে পারতেন।

বাংলা মুদ্রণশিল্পে অবদান

১️⃣ বাংলা হরফ নির্মাণের পথিকৃৎ

পঞ্চানন কর্মকার প্রথম দিকের ব্যক্তি যিনি বাংলা ভাষার জন্য ধাতব হরফ তৈরি করেন।

তার তৈরি হরফ বাংলা মুদ্রণশিল্পের ভিত্তি স্থাপন করে

এর আগে বাংলা ভাষায় ছাপাখানার কাজ খুব সীমিত ছিল

২️⃣ শ্রীরামপুর মিশনের সঙ্গে কাজ

তিনি Serampore Mission Press-এ কাজ করেন, যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন William Carey।

এই মিশনে তিনি বাংলা, সংস্কৃতসহ বিভিন্ন ভাষার হরফ তৈরি করেন

তার কাজের ফলে বহু ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক বই ছাপা সম্ভব হয়

৩️⃣ বাংলা ছাপাখানার বিকাশ

তার অবদানের ফলে—

বাংলা ভাষায় বই প্রকাশ সহজ হয়

শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারে গতি আসে

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটে

প্রযুক্তিগত দক্ষতা

ধাতব হরফ (metal type) তৈরিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন

অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত অক্ষর ডিজাইন করতে পারতেন

হাতে তৈরি হরফের মাধ্যমে তিনি আধুনিক টাইপোগ্রাফির ভিত্তি গড়ে দেন

গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক প্রভাব

পঞ্চানন কর্মকারের অবদানকে তিনভাবে বোঝা যায়—

বাংলা ভাষাকে মুদ্রণযোগ্য করে তুলেছেন

শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন

আধুনিক বাংলা প্রকাশনার ভিত্তি স্থাপন করেছেন

উত্তরাধিকার

তার পরবর্তী প্রজন্মও এই কাজ চালিয়ে যায় এবং বাংলা মুদ্রণশিল্পকে আরও উন্নত করে। আজকের বাংলা বই, সংবাদপত্র, ও প্রকাশনা শিল্প তার কাজের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।

সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন

পঞ্চানন কর্মকার শুধু একজন কারিগর ছিলেন না—

তিনি বাংলা ভাষার আধুনিক রূপ গঠনের এক নীরব স্থপতি।

সংকলিত


৪৫

ফলাফল নাকি দক্ষতা, কর্মক্ষেত্রে কোনটি বেশি জরুরি

মাত্র কয়েক বছর আগেও ভালো ফল, অর্থাৎ উচ্চ সিজিপিএ ক্যারিয়ারে প্রবেশের প্রধান চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু দ্রুত পরিবর্তনশীল বর্তমান চাকরির বাজারে শুধু একাডেমিক ফল আর যথেষ্ট নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এখন এমন প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যিনি কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানেই নয়, বাস্তব কাজের দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানে পারদর্শী। ফলে ‘ফল নাকি দক্ষতা’—এই প্রশ্নটি এখন বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। পরামর্শ দিয়েছেন বরিশালের ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক নাদিয়া আফরিন নিগার।

সিজিপিএ একজন শিক্ষার্থীর অধ্যবসায় ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের একটি ধারণা দেয়, এটি নিঃসন্দেহে খুব ভালো। তবে প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান কর্মক্ষেত্রে এর পাশাপাশি প্রয়োজন বাড়তি কিছু দক্ষতা। বিশেষ করে সফট স্কিল; যেমন যোগাযোগদক্ষতা, দলগত কাজের মানসিকতা, সময় ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্বগুণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষা—নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

একজন শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকায় ইন্টারভিউ বা বাস্তব কাজের পরিস্থিতিতে পিছিয়ে পড়েন। আবার এমন অনেক শিক্ষার্থী আছেন, যাঁদের সিজিপিএ তুলনামূলক কম হলেও যোগাযোগ ও উপস্থাপন দক্ষতার কারণে তাঁরা পড়াশোনার সময়ে চাকরি পেয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে যাঁরা কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞানেই মনোযোগী, তাঁদের অনেককে চাকরি পেতে বেশি বেগ পোহাতে হচ্ছে।

এখানে ভাষাগত দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশেষ করে ইংরেজিতে সাবলীলতা অনেক ক্ষেত্রেই বাড়তি সুবিধা এনে দেয়, কারণ অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভাষাগত দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাই শিক্ষার্থীদের উচিত পড়াশোনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সফট স্কিল গড়ে তোলা। 

কেন সফট স্কিল জরুরি

প্রথমত, আধুনিক কর্মক্ষেত্রে কাজের ধরন দলনির্ভর। সহকর্মীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ করতে না পারলে কাজের গতি ও মান—দুটিই ব্যাহত হয়।

দ্বিতীয়ত, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অত্যন্ত মূল্যবান। শুধু তত্ত্ব জানা নয়, সেই জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করে সমাধান দেওয়াই মুখ্য।

তৃতীয়ত, দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা না থাকলে টিকে থাকা কঠিন।

বর্তমানে শিক্ষার্থীরা খুব সহজে কিছু সফট স্কিলে পারদর্শী হতে পারে—

প্রথমত, ক্লাস প্রেজেন্টেশন ও দলগত কাজকে গুরুত্ব দিতে হবে। এগুলোকে আনুষ্ঠানিকতা মনে না করে শেখার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করলে আত্মবিশ্বাস ও যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ে।

দ্বিতীয়ত, সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ জরুরি। বিতর্ক, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ভলান্টিয়ারিং—এসব কার্যক্রম নেতৃত্বগুণ, দলগত কাজ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা বাড়ায়।

তৃতীয়ত, সময় ব্যবস্থাপনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিকল্পিতভাবে দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করলে এ দক্ষতা ধীরে ধীরে তৈরি হয়।

চতুর্থত, ডিজিটাল-দক্ষতার পাশাপাশি ভাষাগত ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নত করা প্রয়োজন। মাতৃভাষা ও ইংরেজি—উভয় ভাষায় স্পষ্টভাবে ভাব প্রকাশের ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।

পঞ্চমত, আত্মমূল্যায়ন ও ফিডব্যাক গ্রহণের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। এতে দুর্বলতা চিহ্নিত করে দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব।

ক্যারিয়ারে প্রভাব

সফট স্কিল উন্নত হলে একজন শিক্ষার্থী শুধু চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে নয়, কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা এবং অগ্রগতির দিক থেকেও এগিয়ে থাকে। ইন্টারভিউ বোর্ডে আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপন, গোছানো চিন্তাপ্রকাশ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা একজন প্রার্থীকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। পাশাপাশি নেতৃত্বগুণ ও দল পরিচালনার দক্ষতা থাকলে পদোন্নতির সুযোগও দ্রুত তৈরি হয়।

সবশেষে বলা যায়, একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত যোগ্যতা নির্ভর করে তাঁর জ্ঞান, দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বের সমন্বিত প্রকাশের ওপর। তাই আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে ‘ভালো ফলাফল’-এর পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ দক্ষতা অর্জনই সাফল্যের আসল চাবিকাঠি। @ আজকের পত্রিকা 

৪৬

অনেক সময় ঘুমানোর ঠিক মুহূর্তে বা গভীর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শরীর কেঁপে ওঠে বা ঝাঁকুনি দেয়। অনেকেই ভয় পেয়ে জেগে ওঠেন এবং মনে করেন এটি কোনো রোগের লক্ষণ। তবে চিকিৎসকদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি স্বাভাবিক একটি শারীরিক ঘটনা।

বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে হাইপনিক জার্ক (Hypnic Jerk) বা স্লিপ স্টার্ট (Sleep Start) বলে থাকেন। সাধারণত ঘুমের শুরুতে যখন শরীর ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকে, তখন মস্তিষ্ক কখনো কখনো ভুলভাবে সংকেত দেয় যে শরীর পড়ে যাচ্ছে। তখনই প্রতিক্রিয়া হিসেবে শরীর হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে।

চিকিৎসাবিদদের মতে, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, ক্লান্তি, ক্যাফেইন গ্রহণ, ঘুমের ঘাটতি এবং অনিয়মিত ঘুমের রুটিন এই ঝাঁকুনির প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। অনেক সময় বেশি কাজের চাপ বা দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের পর ঘুমাতে গেলে এ সমস্যা আরও বেশি দেখা দেয়।

তবে যদি ঘুমের মধ্যে ঝাঁকুনি খুব ঘন ঘন হয়, শরীর কাঁপা দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় বা সঙ্গে খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়া কিংবা স্মৃতিভ্রংশের মতো লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে তা স্নায়ুবিক সমস্যা বা মৃগীরোগের (Epilepsy) ইঙ্গিতও হতে পারে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ কমানো, রাতে চা-কফি কম পান করা এবং ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার কমালে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে।

সব মিলিয়ে চিকিৎসকদের মতে, ঘুমের মধ্যে হঠাৎ ঝাঁকুনি সাধারণত বিপজ্জনক নয়। তবে সমস্যা অতিরিক্ত হলে বা অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। @বিজ্ঞান চক্র


৪৭


সবাই সফল হচ্ছে, শুধু আপনিই পিছিয়ে পড়ছেন? বেকারত্বের এই নীরব হাহাকার যাদের তিলে তিলে শেষ করছে, লেখাটি তাদের বুকে নতুন আশা জাগাবে।

Every Masterpiece Takes Time

আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের প্রতি কেমন একটা ঘেন্না আর অপরাধবোধ কাজ করে, তাই না? মনে হয়, সমবয়সীদের সফলতার ভিড়ে আপনি বড্ড বেমানান আর মূল্যহীন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুকলেই দেখা যায় কেউ নতুন গাড়ি কিনছে, কেউ পদোন্নতি পাচ্ছে, আবার কেউ বিয়ের পিঁড়িতে বসছে। আর আপনি? আপনি আজও সেই পুরোনো ঘরে বসে নিজের ভবিষ্যৎ হাতড়ে বেড়াচ্ছেন আর ভাবছেন, "আমার জীবনে কি কখনোই কোনো ভালো কিছু ঘটবে না?"

যখন বন্ধুদের আড্ডায় যান, তখন নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। ওদের লাখ টাকার আলোচনা আর সফলতার গল্পের মাঝে আপনার নীরবতা কেউ খেয়াল করে না। পকেটে টাকা না থাকলে যে নিজের ছায়াও উপহাস করে, সেটা বেকারত্বের এই কঠিন সময় ছাড়া আর কেউ বোঝাতে পারে না। এই যে প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকে শেষ হয়ে যেতে দেখা, রাত জেগে নিজের ব্যর্থতার হিসাব মেলানো—এই কষ্ট কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়।

কিন্তু একবার ভেবে দেখুন তো, অন্যের ঘড়ির কাঁটার সাথে নিজের জীবনের সময় মেলাতে গিয়ে আপনি কি নিজের প্রতি অবিচার করছেন না? সবার গল্প একরকম হয় না। কেউ খুব দ্রুত সফল হয়, কারণ তাদের গন্তব্য হয়তো খুব কাছে। আর আপনার সময় লাগছে, কারণ আপনার গন্তব্যটা সাধারণ নয়। অন্যের দৌড় দেখে নিজের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করাটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বোকামি।

একটি সাধারণ গাছ কয়েক মাসের মধ্যেই বড় হয়ে যায়, কিন্তু একটি বিশাল বটগাছ বড় হতে বছরের পর বছর সময় নেয়। আপনি সেই বটগাছ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আপনার এই নীরব হাহাকার, এই একাকীত্ব আর চোখের জল—এগুলো কোনো দুর্বলতা নয়। এগুলো হলো আপনাকে আরও শক্তিশালী করার এক একটি ধাপ। এই শূন্য পকেটই আপনাকে চেনাচ্ছে কে আপন আর কে পর।

হতাশ হওয়ার আগে এই ৩টি কথা মনে গেঁথে নিন:

১. অন্যের সাথে তুলনা বন্ধ করুন: পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনের গল্প আলাদা। আপনার বন্ধুর দশ নম্বর অধ্যায়ের সাথে নিজের প্রথম অধ্যায়ের তুলনা করবেন না। আপনার লড়াইটা শুধুই আপনার নিজের সাথে। আজ আপনি যেখানে আছেন, গতকালের চেয়ে নিজেকে একটু উন্নত করার চেষ্টা করুন।

২. সময় লাগছে মানেই আপনি ব্যর্থ নন: দেরিতে শুরু করার অর্থ হেরে যাওয়া নয়। যে লোহা যত বেশি আগুনে পোড়ে, তার ধার তত বেশি হয়। জীবনের এই কঠিন সময়গুলো আপনাকে শেষ করতে নয়, বরং আপনার শেকড় আরও মজবুত করতে এসেছে।

৩. নিজের প্রতি বিশ্বাস হারাবেন না: চারপাশের মানুষ যতই উপহাস করুক না কেন, নিজের ভেতরের আগুনটাকে নিভতে দেবেন না। এই শূন্য পকেট আর অপমানের দিনগুলোই একদিন আপনার সবচেয়ে বড় শক্তিতে পরিণত হবে। শুধু আর একটু ধৈর্য ধরুন।

শেষ কথা

সবাই সফল হচ্ছে বলে আপনি পিছিয়ে পড়ছেন, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। আপনার গল্পটা একটু দেরিতে লেখা হচ্ছে, কিন্তু যখন লেখা শেষ হবে, তখন তা ইতিহাস গড়বে। নিজের চোখের জল মুছে ফেলুন এবং নতুন করে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিন।

নিজেকে বলুন—

"অন্যের সফলতায় আমি হতাশ হব না, আমার নীরব লড়াই একদিন ইতিহাস গড়বে।"

কারা এই নীরব লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন? কমেন্টে লিখুন— "আমি হাল ছাড়ব না"

@ MotivationalQuotesBangla




স্লিপ' নামক জার্নালে ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আরভাইন-এর গবেষকরা ১০-১২ বছর বয়সী প্রায় ৩,০০০ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, নিয়মিত দুপুরে ঘুমানো উন্নত মানসিক এবং শিক্ষাগত ফলাফলের সাথে সম্পর্কিত। যে শিশুরা সপ্তাহে তিন বা তার বেশি বার ঘুমাতো, তাদের মধ্যে অধিক আনন্দ, উন্নত আত্ম-নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ মাত্রার দৃঢ়তা দেখা গেছে এবং শিক্ষকদের দ্বারা তাদের আচরণগত সমস্যাও কম রিপোর্ট করা হয়েছে।

সবচেয়ে শক্তিশালী ফলাফলটি ছিল শিক্ষাগত পারদর্শিতার ক্ষেত্রে: ষষ্ঠ শ্রেণির যে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ঘুমাতো, তারা যারা ঘুমাতো না তাদের তুলনায় শিক্ষাগতভাবে ৭.৬% বেশি নম্বর পেয়েছে। গবেষকরা বয়স্ক শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্চ আইকিউ স্কোরের সাথেও এর সম্পর্ক লক্ষ্য করেছেন। এই গবেষণাটি ইঙ্গিত দেয় যে, বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নিয়মিত দুপুরে ঘুম জ্ঞানীয় কার্যকারিতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রেণিকক্ষের আচরণকে সহায়তা করতে পারে।



৪৮


ভোলগা'র পরে দানিউব (Danube) হল ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী। নদীটি ১০টি দেশের ভেতর দিয়ে গিয়েছে, যা একটি বিশ্ব রেকর্ড। এর পাড়ে অবস্থিত ৪টি দেশের রাজধানী। নদীটি যেন ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে যোগসূত্র।

উৎপত্তি: দানিউব নদীর উৎপত্তি হয়েছে জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিমের শ্‌ভার্ৎসভাল্ড (Schwarzwald), যা ব্ল্যাক ফরেস্ট নামে পরিচিত, পর্বতমালা থেকে। মূলত ব্রিগাচ (Brigach) এবং ব্রেগ (Breg) নামে দুটি ছোট স্রোতধারা ডোনাউএসচিঙ্গেন (Donaueschingen)-এর কাছে মিলিত হয়ে দানিউব নাম ধারণ করে।

সমাপ্তি: নদীটি প্রায় ২,৮৫০ কিলোমিটার (১,৭৭০ মাইল) পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে রোমানিয়ার উপকূলে কৃষ্ণ সাগরে পতিত হয়েছে। পতিত হওয়ার আগে এটি রোমানিয়া ও ইউক্রেনের সীমান্তে সুবিশাল দানিউব ডেল্টা তৈরি করেছে, যা একটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান।

যে দেশগুলোর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত:

দানিউব নদী বিশ্বের একমাত্র নদী যা ১০টি দেশের ভেতর দিয়ে সরাসরি প্রবাহিত হয়েছে, যা একটি বিশ্ব রেকর্ড। দেশগুলো হলো:

১. জার্মানি (Germany)

২. অস্ট্রিয়া (Austria)

৩. স্লোভাকিয়া (Slovakia)

৪. হাঙ্গেরি (Hungary)

৫. ক্রোয়েশিয়া (Croatia)

৬. সার্বিয়া (Serbia)

৭. বুলগেরিয়া (Bulgaria)

৮. রোমানিয়া (Romania)

৯. মলদোভা (Moldova)

১০. ইউক্রেন (Ukraine)

নদীর পাড়ের রাজধানীসমূহ:

নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে বহু গুরুত্বপূর্ণ শহর। এদের মধ্যে ৪টি দেশের রাজধানীও এই নদীর তীরে অবস্থিত, যা বিশ্বের অন্য কোনো নদীর ক্ষেত্রে দেখা যায় না:

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা (Vienna), স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিস্লাভা (Bratislava), হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্ট (Budapest) ও সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড (Belgrade) এই নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে।

দানিউব নদীটি বিভিন্ন দেশের স্থানীয় ভাষায় বিভিন্ন নামে পরিচিত:

দেশ- স্থানীয় নাম

জার্মানি ও অস্ট্রিয়া- ডোনাউ (Donau)

স্লোভাকিয়া- দুনাই (Dunaj)

হাঙ্গেরি- দুনা (Duna)

ক্রোয়েশিয়া ও সার্বিয়া- দুনাভ (Dunav / Дунав)

বুলগেরিয়া- দুনাভ (Dunav / Дунав)

রোমানিয়া- দুনারেয়া (Dunărea)

ইউক্রেন- দুনাই (Dunay / Дунай)

@ বইকাল


৪৯


১৯০০ সালের শুরুর দিকের কথা। তখন চিকিৎসাবিজ্ঞান আজকের মতো এত উন্নত ছিল না। কোনো শিশু সময়ের আগে (Premature) জন্ম নিলে, হাসপাতালগুলো তাদের চিকিৎসা করতে চাইত না। ধরে নেওয়া হতো, এই দুর্বল শিশুদের বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। 

ঠিক সেই সময়েই এই শিশুদের ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসেন মার্টিন কুনি (Martin Couney)। যদিও তাঁর নিজের কোনো বৈধ মেডিকেল লাইসেন্স ছিল না! কিন্তু তাঁর ছিল গভীর মানবতা এবং একটি ধারণা।

সেসময় পোল্ট্রি ফার্মে মুরগির ডিম ফোটানোর জন্য ইনকিউবেটর ব্যবহার করা হতো। এটি দেখে কুনির মাথায় একটি বুদ্ধি আসে। তিনি ভাবলেন, "মুরগির বাচ্চার জন্য যদি এটি কাজ করে, তবে মানুষের দুর্বল শিশুর জন্য কেন নয়?"

হাসপাতালগুলো যখন এই শিশুদের জায়গা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন কুনি নিউইয়র্কের বিখ্যাত 'কোনি আইল্যান্ড' (Coney Island) অ্যামিউজমেন্ট পার্কে (যা মূলত একটি মেলা ছিল) একটি ভিন্নধর্মী প্রদর্শনী খোলেন। সেখানে কাঁচ দিয়ে ঘেরা আধুনিক ইনকিউবেটরে রাখা হতো সময়ের আগে জন্ম নেওয়া ছোট ছোট শিশুদের। সার্বক্ষণিক দেখভালের জন্য রাখা হয়েছিল দক্ষ নার্স।

দর্শনার্থীরা নির্দিষ্ট মূল্যের টিকিট কেটে এই শিশুদের দেখতে আসত। আর এই টিকিটের টাকা দিয়েই মেটানো হতো শিশুদের দামি ইনকিউবেটরের খরচ, বিদ্যুৎ বিল এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা। কোনো শিশুর বাবা-মায়ের কাছ থেকে কুনি এক পয়সাও নিতেন না!

তৎকালীন অনেক চিকিৎসক কুনিকে 'প্রতারক' বা 'পাগল' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কিন্তু এই মানুষটির একগুঁয়েমি এবং ভালোবাসার কারণে প্রায় ৭,০০০ অপরিণত শিশু সেদিন মৃ/ত্যু/র হাত থেকে ফিরে মায়ের কোলে যেতে পেরেছিল।

১৯৪৩ সালে যখন কুনির এই প্রদর্শনী স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়, ততদিনে আমেরিকার হাসপাতালগুলো বুঝতে পেরেছিল যে ইনকিউবেটর কোনো পাগলামি নয়, বরং এটিই বিজ্ঞান। আজ বিশ্বের প্রতিটি হাসপাতালে যে 'NICU' বা ইনকিউবেটরের মাধ্যমে লাখো শিশুর প্রাণ বাঁচানো হচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে ডিগ্রিবিহীন এই মানুষটির অসীম সাহস।

মাঝে মাঝে দুনিয়া বদলাতে বড় কোনো ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না, শুধু একটু মানবিকতা আর জীবন বাঁচানোর অদম্য ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।  @ মহাকাশ


৫০

DNA-র ইতিহাস 

১৯৫৩ সালের এই দিনে।  দেখতে পাব এক বৈপ্লবিক মুহূর্ত। সেই দিনেই বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পত্রিকা Nature–এ প্রকাশিত হয়েছিল একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র। লেখক—James Watson, Francis Crick, Maurice Wilkins এবং অনন্য অবদান রাখা বিজ্ঞানী Rosalind Franklin।

তাঁদের হাত ধরেই বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হয় জীবনের অনন্য সুতোর গঠন—DNA-এর সেই বিখ্যাত দ্বিতন্ত্রী সর্পিল গঠন, মানে ডাবল হেলিক্স মডেল।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই কি DNA-র আবিষ্কার?

না, একেবারেই নয়।

এটি DNA-র কাঠামোর আবিষ্কার, DNA অণুর রাসায়নিক গঠন নয়।

DNA-র ইতিহাস আরও প্রাচীন। ১৮৬০-এর দশকে, সুইস রসায়নবিদ Friedrich Miescher মানুষের শ্বেত রক্তকণিকা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এক অদ্ভুত পদার্থের সন্ধান পান। এটি ছিল না প্রোটিন, কিন্তু তাতে ফসফরাসের প্রাচুর্য—এ যেন এক নতুন রহস্যের দ্বার। তিনি এর নাম দেন “নিউক্লিইন” (nuclein)। সেই নিউক্লিইনই পরবর্তীকালে পরিচিত হয় নিউক্লিক অ্যাসিড, আর তারই এক রূপ ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড মানে DNA নামে।

এরপর একে একে এগিয়ে আসে গবেষণার ধারা।

Phoebus Levene প্রথম দেখান যে DNA গঠিত অসংখ্য নিউক্লিওটাইড দিয়ে—যেখানে আছে এক একটি নাইট্রোজেন ক্ষারক অ্যাডিনিন (A), থাইমিন (T), গুয়ানিন (G), সাইটোসিন (C), একটি পেন্টোজ শর্করা এবং একটি ফসফেট।

তারপর Erwin Chargaff আবিষ্কার করেন এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র—অ্যাডিনিনের পরিমাণ থাইমিনের সমান, আর গুয়ানিনের সমান সাইটোসিন। যেন প্রকৃতির গোপন সমতা!

এই ধারাবাহিকতার মাঝেই ১৯৪৪ সালে Oswald Avery প্রমাণ করেন DNA-ই আসলে বংশগতির আসল বাহক, জিনের মূল আশ্রয় স্থল।

এই সমস্ত আবিষ্কারের উপর দাঁড়িয়েই ১৯৫৩ সালে গড়ে ওঠে DNA-র গঠন রহস্যের সেই চূড়ান্ত মডেল—ডাবল হেলিক্স।

বহু বিজ্ঞানীর হাতের ছোঁয়ায় তৈরি এক বৈজ্ঞানিক সফলতা।

১৯৬২ সালে এই কাজের জন্য শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার  প্রদান করা হয় James Watson, Francis Crick এবং Maurice Wilkins–কে।

তবে দুঃখের বিষয়, Rosalind Franklin সেই সম্মান পাননি। তাঁর অমূল্য অবদান আজ সর্বজনবিদিত, কিন্তু নোবেল ঘোষণার আগেই অকালে তাঁর জীবনাবসান ঘটে—আর নোবেল পুরস্কার মরণোত্তর দেওয়া হয় না। তাছাড়া তাঁর জীবদ্দশায় তিনি তাঁর প্রাপ্য সম্মান থেকে কীভাবে চরম বঞ্চিত হয়েছিলেন তা আমরা আজ অনেকেই জানি।

তারপর থেকে DNA গবেষণা যেন এক অদম্য গতিতে ছুটে চলেছে—RNA-এর রহস্য উন্মোচন, জেনেটিক কোডের পাঠোদ্ধার, জিন প্রযুক্তি, জিন ক্লোনিং, জিনোম সিকোয়েন্সিং, এমনকি জিনোম এডিটিং।

২০০৩ সালে মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম পাঠোদ্ধার—মানব ইতিহাসের এক মাইলফলক।

এই ঐতিহাসিক যাত্রাপথকে স্মরণ করেই National Human Genome Research Institute ২৫ এপ্রিলকে DNA দিবস হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়।

আজ, এই বিশেষ দিনে, আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই সকল বিজ্ঞানীকে—যাঁদের নিরলস সাধনা আমাদের জীবনের অন্তর্লিখিত রহস্যকে উন্মোচিত করেছে।

DNA শুধু একটি অণু নয়—এ আমাদের অস্তিত্বের ভাষা, আমাদের পরিচয়ের ছাপ, আমাদের উত্তরাধিকারের ইতিহাস।

লেখা — পঞ্চানন মণ্ডল ২৫