এক জীবনে ক’টা সম্পর্ক সামলাতে পারে মানুষের মস্তিষ্ক?
মানুষ সামাজিক জীব। তারা একা বাঁচতে পারে না। সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই তাদের স্বাভাবিক প্রবণতা। গবেষণা বলছে, সৃষ্টির আদি পর্ব থেকে মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তিতই হয়েছে সামাজিক বন্ধন গড়ার জন্য। তবে ঠিক কতগুলি সম্পর্কের ভার আমাদের মস্তিষ্ক সামলাতে পারে, তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মানুষের পক্ষে এক জীবনে খুব বেশি হলে ১৫০টি সম্পর্ক লালন করা সম্ভব, দাবি গবেষকদের।
মানুষের মস্তিষ্কের ওজন প্রায় ১.৩৬ কিলোগ্রাম, সাধারণ ভাবে দেহের ওজনের দুই শতাংশ। এই মস্তিষ্কের এক- তৃতীয়াংশ জুড়ে থাকে নিওকর্টেক্স অঞ্চল। স্মৃতিশক্তি, ভাষার বিকাশ, বিভিন্ন সমস্যার সমাধান এবং আত্মচেতনার জন্য মস্তিষ্কের এই অংশ দায়ী। এই অংশই মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা এবং সর্বোপরি ‘সামাজিকতা’কে নিয়ন্ত্রণ করে। বিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক বন্ধন আমাদের আয়ু বাড়িয়ে দেয়। মানুষ যত একে অপরের সঙ্গে মিশবে, কথা বলবে এবং সম্পর্ক গড়ে তুলবে, তত স্ট্রোক, অবসাদ, স্মৃতিবিভ্রম, হার্টের রোগের সম্ভাবনা কমবে। তত বেশি দিন মানুষ বাঁচতে পারবে।
পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য মানুষের সামাজিক বন্ধন প্রয়োজন। আবশ্যিকও বলা চলে। তবে তার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অগুন্তি সামাজিক বন্ধন আমরা গড়ে তুলতে পারি না। গবেষণা বলছে, এক জীবনে সর্বোচ্চ ১৫০ জনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁদের কারও সঙ্গে সম্পর্ক বেশি ঘনিষ্ঠ হয়, কারও সঙ্গে কম। এ ছাড়া, সারা জীবনে যত জনকে আমরা চিনি, তার সংখ্যা হতে পারে হাজারের বেশি। তবে মানুষের সামাজিক ‘নেটওয়ার্ক’ সীমা ১৫০।
মানুষের আগে শিম্পাঞ্জি, বাঁদরদের নিয়ে এই সংক্রান্ত গবেষণা করে দেখা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মস্তিষ্কের নিওকর্টেক্সের বিস্তৃতির উপরে সামাজিক নেটওয়ার্কের সীমা নির্ভর করে থাকে। শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে এই সীমা ৫০-এ সীমাবদ্ধ। মানুষের নিওকর্টেক্সের আকার বড় বলে নেটওয়ার্কও বড়। ব্রিটিশ মনোবিদ রবিন ডানবার বিষয়টি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ১৫০ সংখ্যাটি সৃষ্টির আদি পর্ব থেকেই এক। সমাজমাধ্যম এবং ডিজিটাল যোগাযোগের যুগেও তা বদলায়নি।
১৫০ জনের মধ্যে আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন অন্তত পাঁচ জন। সাধারণত বন্ধু বা পরিবারের সদস্য হয়ে থাকেন তাঁরা। আবেগগত দিক থেকে এঁদের আমরা সবচেয়ে কাছের বলে মনে করি। মনের সব কথা এই পাঁচ জনের সঙ্গে ভাগ করি। সপ্তাহে অন্তত এক বার এঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এর বাইরে আমাদের আরও অন্তত ১০ জন বন্ধুর বৃত্ত থাকে, যাঁদের সঙ্গে মাসে অন্তত এক বার দেখা হয়। মোট এই ১৫ জন আমাদের সামাজিক মনোযোগের ৬০ শতাংশ পেয়ে থাকেন। বাকিদের জন্য পড়ে থাকে ৪০ শতাংশ।
গবেষণা বলছে, এই ১৫ জনের সঙ্গে আরও কিছু মানুষ মিলিয়ে মোট ৫০ জনের আর একটি বড় সামাজিক বৃত্ত তৈরি হয়। মাঝেমধ্যে দেখা করে হইহুল্লোড় করার মতো সম্পর্ক এঁদের সঙ্গে। তার বাইরে মনের তেমন কোনও যোগ এই বৃত্তের সঙ্গে থাকে না। সামাজিক যোগের এর পরের বৃত্তেই রয়েছে ১৫০ জন। খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ না থাকলেও জীবনের বড় কোনও ঘটনায় বা অনুষ্ঠানে এঁদের আমন্ত্রণ জানানো যায়। এঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডানবার বলেছেন, ‘‘রাত ৩টেয় হংকং বিমানবন্দরে আচমকা এঁদের কারও সঙ্গে দেখা হলে পিঠ চাপড়ে দিতে আমরা দ্বিধা করব না।’’
জীবনের সব পর্বেই যে এই ১৫০ জন ধ্রুবক থাকবেন, তা নয়। সময় এবং পরিস্থিতির বিচারে এই বৃত্তের মানুষ পাল্টে যেতে পারেন। যাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে, ধীরে ধীরে তাঁরা আমাদের সামাজিক নেটওয়ার্কের বাইরে বেরিয়ে যাবেন। নতুন কেউ সেই স্থানে চলে আসবেন। পাড়ার লোকজন, অফিসের সহকর্মী এই বৃহত্তর বৃত্তের অঙ্গ।
১৫০ জনের বৃত্তের বাইরে আরও ৩৫০ জনের কথা বলেছেন ডানবার, যাঁদের সঙ্গে আমাদের পরিচয়মাত্র থাকে। কোনও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর মতো সম্পর্ক নয়। এ ছাড়া সারা জীবনে আরও অন্তত ১০০০ জন থাকবেন, যাঁদের মুখ আমরা চিনি। যেমন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আমরা এঁদের চিনলেও এঁরা আমাদের চেনেন না। ফলে এই পরিচিতি ‘একতরফা’।
ডানবারের এই ধারণার সঙ্গে অনেকে একমত হতে পারেন না। গবেষকদের একাংশের মতে, মানুষের সামাজিক যোগাযোগের সীমা ১৫০-তে বেঁধে দেওয়া সম্ভব নয়। তা ব্যক্তিবিশেষের উপর নির্ভর করে। বিশেষ করে সমাজমাধ্যমের যুগে পরিচিতি এবং সম্পর্কের পরিধি আরও বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক, মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
শুধু বুদ্ধিই নয়, মানসিক রোগও আমরা পেয়েছি আদিমানবের থেকে!
আধুনিক মানুষের মধ্যে পাওয়া ৩৩ হাজার ভিন্ন ভিন্ন জিনের আদিম উৎস খুঁজে বার করার চেষ্টা করেন গবেষকেরা। তাতে দেখা যায়, ওই জিনগুলির আবির্ভাব হয়েছে গত ৩০ লক্ষ বছর থেকে চার হাজার বছরের মধ্যে।
শুধু বুদ্ধিই নয়, মানসিক সমস্যাও জিনগত ভাবে আদিম পূর্বপুরুষদের থেকেই পেয়েছে মানুষ। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানব মস্তিষ্কের বিবর্তন হয়েছে। বদল এসেছে জিনের ধারাতেও। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মানসিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলির আবির্ভাব হয়েছে প্রায় ৪,৭৫,০০০ বছর আগে। ওই প্রাচীন কালে আধুনিক মানুষ (হোমো সেপিয়েন্স)-এর অস্তিত্বের কোনও প্রমাণ এখনও পর্যন্ত মেলেনি।
আধুনিক মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায় আফ্রিকা মহাদেশের মরোক্কোয়। সেখানে যে জীবাশ্মটি পাওয়া গিয়েছে, সেটির আনুমানিক বয়স প্রায় তিন লক্ষ বছর। তারও আগে আধুনিক মানুষের অস্তিত্ব ছিল কি না, তা জানা যায়নি। ধরে নেওয়া হয়, ওই সময় থেকেই আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয় পৃথিবীতে। তার আগে (প্রায় সাত থেকে দুই লক্ষ বছর আগে পর্যন্ত) পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতেন প্রাচীন মানব প্রজাতি হোমো হাইজেলবার্গেনসিসেরা। যদিও তাঁদের থেকেই সরাসরি আধুনিক মানুষের বিবর্তন হয়েছে বলে কোনও প্রামাণ্য তথ্য নেই। সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ ফল থেকে ইঙ্গিত মেলে, পৃথিবীতে আধুনিক মানুষের আবির্ভাবের আগে থেকেই মানসিক সমস্যা সংক্রান্ত জিনের অস্তিত্ব ছিল।
মানুষের সবচেয়ে কাছের পূর্বপুরুষ কারা, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। তবে প্রচলিত মতগুলি অনুসারে, মানুষের জীবিত পূর্বপুরুষদের মধ্যে রয়েছে শিম্পাঞ্জি এবং বোনোবো বানর (সাধারণ শিম্পাঞ্জির চেয়ে এদের শারীরিক গড়ন কিছুটা আলাদা)। এই দুই প্রাণীর সঙ্গেই মানুষের জিনের অনেকাংশে (প্রায় ৯৮ শতাংশ) মিল রয়েছে। আনুমানিক প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে শিম্পাঞ্জি এবং বোনোবো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মানুষের বিবর্তন শুরু হয়। ওই সময় থেকে এখনও পর্যন্ত মানুষের মস্তিষ্কের আকার প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আদিম মানুষের জীবাশ্ম থেকে তাঁদের মস্তিষ্কের আকার সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু ওই সময়ে তাঁদের মগজের কী কী করার ক্ষমতা ছিল, তা নিয়ে খুব বেশি তথ্য জীবাশ্ম দিতে পারে না। এই সংক্রান্ত তথ্যের জন্য প্রয়োজন হয় মানবদেহের জিন সংক্রান্ত গবেষণা। সম্প্রতি বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মানুষের জিনের ধারার সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধি, মস্তিষ্কের আকার, উচ্চতায় বদল এসেছে। এমনকি বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতার সঙ্গেও জিনগত ধারার যোগ মিলেছে।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের ‘সেন্টার ফর নিউরোজেনোমিক্স অ্যান্ড কগনিটিভ রিসার্চ’-এর গবেষক ইলান লিবেডিনস্কি এই দু’টি ক্ষেত্রকে নিয়ে একসঙ্গে গবেষণা চালান। তাতে লিবেডিনস্কি এবং তাঁর সহকর্মীরা দেখেন, মানুষের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলির আবির্ভাব হয়েছে প্রায় পাঁচ লক্ষ বছর আগে। তার পর পরই এমন কিছু জিনেরও আবির্ভাব হয়, যেগুলির সঙ্গে বর্তমানে মানসিক সমস্যার যোগ রয়েছে। লিবেডিনস্কি জানান, মস্তিষ্ক এবং জিনের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধি এবং মানসিক রোগ উভয়ই মানুষের মধ্যে এসেছে বলে গবেষণায় আভাস মিলেছে।
এই তথ্যগুলির জন্য আধুনিক মানুষের মধ্যে পাওয়া ৩৩ হাজার ভিন্ন ভিন্ন ধরনের জিনের আদিম উৎস খুঁজে বার করার চেষ্টা করেন গবেষকেরা। তাতে দেখা যায়, ওই জিনগুলির আবির্ভাব হয়েছে গত ৩০ লক্ষ বছর থেকে চার হাজার বছরের মধ্যে। তুলনামূলক নতুন জিনগুলির আবির্ভাব হয়েছে গত ৬০ হাজার বছরের মধ্যে। বস্তুত, ওই সময়েই হোমো সেপিয়েন্সরা আফ্রিকা মহাদেশ থেকে বেরিয়ে অন্য মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েন বলে ধরে নেওয়া হয়।
কোন জিনগুলি কোন সময়ে আবির্ভূত হয়েছে, তারও একটি ‘টাইমলাইন’ তৈরি করেছেন গবেষকেরা। যেমন, হজম সংক্রান্ত ব্যাধিগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত জিনের আবির্ভাব হয়েছিল প্রায় আট লক্ষ বছর আগে। বর্তমানে ক্যানসারের সঙ্গে যে জিনোম সংক্রান্ত বিষয় জড়িত, সেটির আবির্ভাব হয় আনুমানিক ৫,৯০,০০০ বছর আগে। মানসিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলির এই সময়ে কোনও অস্তিস্ত দেখা যায়নি।
এর পরে আবির্ভূত হয় মানুষের উন্নত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলি। যেমন, কোনও নতুন পরিস্থিতিতে সমস্যার যৌক্তিক সমাধান করার বুদ্ধির সঙ্গে যে জিনগুলি জড়িত— তা বিবর্তিত হয়েছে আজ থেকে প্রায় পাঁচ লক্ষ বছর আগে। গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলির পর পরই আবির্ভাব হয়েছে মানসিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলি। প্রায় ৪,৭৫,০০০ বছর আগে এই সংক্রান্ত জিনগুলির আবির্ভাব হয়। আরও অনেক পরে, গত ৫০ হাজার বছর ধরে ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলি বিকশিত হয়েছে। তারও পরে মদের প্রতি আসক্তি এবং বিষণ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলি দেখা যায় মানবদেহে।
খিদে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এক প্রোটি
সাঁতার, ব্যয়াম করে ওজন নিয়ন্ত্রণে আসছে না! কারণ, পেটের খিদে। শরীর চর্চা করে যতটা মেদ ঝরাচ্ছেন, ততটাই আবার পেটে পুরছেন। এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের শরীরেই রয়েছে এক প্রোটিন, যা খিদেয় লাগাম পরাতে পারে। এমআরএপি২ নামে এই প্রোটিন খিদের নিয়ন্ত্রক হিসাবে কাজ করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মস্তিষ্কে থাকা খিদের রিসেপটর (সংবেদী স্নায়ু) এমসি৪আরকে কোষের পৃষ্ঠে পাঠিয়ে দেয় এই প্রোটিন। সেখানে গিয়েই এই রিসেপটর বলে, ‘এবার খাওয়া বন্ধ করো’! বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার এবার স্থূলতা (ওবেসিটি) নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
জার্মানির কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা একটি গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন। তার নাম সিআরসি ১৪২৩। সেই কেন্দ্রের গবেষকেরা খিদে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন। তাঁরা দেখেন, খিদের নেপথ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট এক প্রক্রিয়া। এমআরএপি২ (মেলানোকর্টিন ২ রিসেপটন অ্যাকসেসরি প্রোটিন ২) মস্তিষ্কের রিসেপটর এমসি৪আর (মেলানোকর্টিন-৪ রিসেপটর)-কে প্রভাবিত করে। এটি খিদে নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তির ভারসাম্য রাখতে উল্লেখ্য ভূমিকা নেয়। এই গবেষণা নেচার কমিউনিকেশনে প্রকাশিত হয়েছে।
এমসি৪আর মস্তিষ্কের এক সংবেদী স্নায়ু। পেপটাইড হরমোন এমএসএইচ দ্বারা সক্রিয় হয়। এই এমসি৪আর নিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেন, শরীর স্থূল হওয়ার অন্যতম কারণ হল এই এমসি৪আর-এর মিউটেশন। গবেষক দলের নেতৃত্বে রয়েছেন প্যাট্রিক স্কিরার। তিনি জানান, রিসেপটর যখন সক্রিয় হয়, তখন তার ৩ডি ছবি তোলা হয়েছে। সাধারণ আয়ন এবং সেটমেলানোটাইড নামে এক ধরনের ওষুধের সংস্পর্শে এলেই এই রিসেপটর সক্রিয় হয়ে ওঠে। সেই অবস্থায় তার কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করেন বিজ্ঞানীরা। খিদে কমানোর জন্য এই ওষুধ সেটমেলানোটাইড ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ওই ওষুধই সক্রিয় করে তোলে রিসেপটরকে।
বিজ্ঞানীরা ফ্লুওরোসেন্স মাইক্রোস্কপি প্রক্রিয়াও ব্যবহার করেছে। এতে কোষে বিশেষ উজ্জ্বল রং প্রয়োগ করা হয়। তা করে বিজ্ঞানীরা দেখেন, কোষের মধ্যে এমসি৪আর-এর অবস্থান এবং চরিত্রের বদল ঘটায় এমআরএপি২ প্রোটিনটি। এটিই এমসি৪আর-কে কোষের পৃষ্ঠে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে গিয়ে ওই রিসেপটর বলে, ‘‘এ বার খিদে নিয়ন্ত্রণ করো’’! বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই প্রক্রিয়া তাঁরা বোঝার কারণে, তা স্থূলতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। তাঁরা মনে করছেন, প্রোটিনের এই চরিত্র স্থূলতা নিয়ন্ত্রণেও কাজে আসবে। এই গবেষক দলে রয়েছেন ব্রিটেনের সেন্ট অ্যান্ড্রিউ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পাওলো অ্যানিবাল। তিনি জানান, কোষের মধ্যে অণু কী আচরণ করে, তা এই গবেষণায় কিছুটা স্পষ্ট হয়েছে। রিসেপটরের চরিত্রও অনেকটাই স্পষ্ট।
স্ত্রী স্তন্যপায়ীদের আয়ু পুরুষদের চেয়ে বেশি কেন?
জার্মানি, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি এবং বেলজিয়ামের প্রাণী বিশেষজ্ঞেরা সম্মিলিত ভাবে স্তন্যপায়ী এবং পাখিদের আয়ু নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন। মোট ৫২৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং ৬৪৮ প্রজাতির পাখি, তাদের যৌনজীবনকে তাঁরা কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে দীর্ঘায়ু স্ত্রীরাই। সম্প্রতি একটি গবেষণায় এমনটাই দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘায়ুর কারণও তাঁরা খুঁজে বার করেছেন। দেখা গিয়েছে, অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে পূর্ণবয়স্ক পুরুষের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি বাঁচে পূর্ণবয়স্ক স্ত্রীরা। যদিও পাখিদের ক্ষেত্রে হিসাব উল্টো। সে ক্ষেত্রে পুরুষেরা তুলনামূলক বেশি দিন বাঁচে।
জার্মানি, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি এবং বেলজিয়ামের প্রাণী বিশেষজ্ঞেরা সম্মিলিত ভাবে স্তন্যপায়ী এবং পাখিদের আয়ু নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন। মোট ৫২৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং ৬৪৮ প্রজাতির পাখি, তাদের যৌনজীবনকে তাঁরা কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। চিড়িয়াখানায় রাখা প্রাণী তো বটেই, পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে জঙ্গলে থাকা প্রাণীদেরও। এই সংক্রান্ত গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ নামক পত্রিকায়।
চেয়ে বেশি প্রায় পাঁচ শতাংশ। কিন্তু কেন? স্ত্রী এবং পুরুষের মধ্যে আয়ুর ফারাক নিয়ে একাধিক মত উঠে এসেছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে। তবে ক্রোমোজ়োম সংক্রান্ত তত্ত্বে সমর্থন তুলনামূলক বেশি। একে বলা হচ্ছে ‘হেটারোগ্যামেটিক সেক্স হাইপোথিসিস’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যে হেতু স্ত্রী-র শরীরে দু’টি করে এক্স ক্রোমোজ়োম থাকে এবং পুরুষের শরীরে থাকে একটি এক্স ও একটি ওয়াই ক্রোমোজ়োম, সেই কারণেই স্ত্রীর আয়ু তুলনামূলক দীর্ঘ হয়। কী ভাবে? বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা, যদি কখনও এক্স ক্রোমোজ়োমে মিউটেশন (পরিবর্তন) হয়, যাদের কাছে সেই ক্রোমোজ়োম একটির বেশি নেই, তাদের সঙ্কট বাড়ে। মিউটেশন সে ক্ষেত্রে দীর্ঘায়ুর পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জার্মানির বিশেষজ্ঞ ফার্নান্ডো কোলচেরো মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে এ কথা জানিয়েছেন।
একই যুক্তি পাখিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পাখিদের ক্ষেত্রে পুরুষের শরীরে থাকে দু’টি জ়েড ক্রোমোজ়োম। স্ত্রীর শরীরে থাকে একটি জ়েড এবং একটি ডব্লিউ ক্রোমোজ়োম। ফলে একই রকমের দু’টি ক্রোমোজ়োমধারী পুরুষের আয়ু স্ত্রীর চেয়ে বেশি হয়। তবে স্তন্যপায়ী হোক বা পাখি, উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে ব্যতিক্রম। তাই বিশেষজ্ঞেরা আরও সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন। গবেষণা চলছে।
স্ত্রীর আয়ু বেশি হওয়ার কারণ হিসাবে দ্বিতীয় যে তত্ত্বটি উঠে আসছে, তার নাম ‘সেক্সুয়াল সিলেকশন হাইপোথিসিস’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পুরুষেরা বেশি আগ্রাসী হয়। তাই তাদের মধ্যে শত্রুতাও বেশি। অনেক ক্ষেত্রেই স্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পুরুষ স্তন্যপায়ীরা নিজেদের মধ্যে মারপিট করে। এতে তাদের শক্তিক্ষয় হয়। ফলে আয়ুও কমে।
স্তন্যপায়ীদের নিয়ে এই গবেষণার ফল কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য। মহিলাদের আয়ু পুরুষের চেয়ে বেশি। নেপথ্য কারণ হিসাবে লিঙ্গ নির্ধারক এক্স ক্রোমোজ়োমের কথাই বলা হয়। এ ছাড়া, অতিরিক্ত ধূমপান এবং মদ্যপানও অধিকাংশ পুরুষের আয়ু কমিয়ে দেয় বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকার নজির রয়েছে এক মহিলার। ফ্রান্সের বাসিন্দা জিন ক্যালমেন্ট ১২২ বছর (১৮৭৫ থেকে ১৯৯৭) জীবিত ছিলেন। এ ছাড়া আর কোনও মানুষের জীবৎকাল ১২০ বছরের গণ্ডি পেরোয়নি। পুরুষদের মধ্যে দীর্ঘতম আয়ুর অধিকারী এখনও পর্যন্ত জিরোয়েমন কিমুরা। তিনি ১১৬ বছর (১৮৯৭ থেকে ২০১৩) বেঁচে ছিলেন।
প্রাচীন মমি আবিষ্কার ভিয়েতনাম ও চিনে
। নব্য প্রস্তর যুগ শুরু ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে। ভিয়েতনামে আবিষ্কার হওয়া মমিটি আরও বেশি পুরনো। মমি— কথাটি শুনলে প্রথমেই মাথায় আসে প্রাচীন মিশরের কথা। হলিউডের বিভিন্ন সিনেমার দৌলতে মমির সঙ্গে মিশরের সম্পর্ক গেঁথে গিয়েছে মানুষের মনে। কিন্তু সবচেয়ে প্রাচীন মমির খোঁজ মিশরে তো নয়-ই, আফ্রিকা মহাদেশেও নয়, মিলেছিল দক্ষিণ আমেরিকার চিলেতে। এত দিন পর্যন্ত সেটিই ছিল মৃতদেহ সংরক্ষণের সবচেয়ে প্রাচীন উদাহরণ। এ বার জানা গেল, মৃতদেহ সংরক্ষণের ইতিহাস আরও পুরনো। চিলের চেয়েও পুরনো মমি আবিষ্কার করলেন গবেষকেরা। তা-ও আবার এই এশিয়া মহাদেশেই।
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় সবচেয়ে পুরনো যে মমিটি মিলেছে, তা প্রায় ৪৫০০ বছরের পুরনো। উত্তর চিলেতে মিলেছে প্রায় ৭০০০ বছরের পুরনো মমি। চিলের ওই মমিই প্রমাণ করে দক্ষিণ আমেরিকার প্রাচীন চিনচরো সভ্যতায় মৃতদেহ সংরক্ষণের চল ছিল। মৃতদেহ সংরক্ষণে সবচেয়ে প্রাচীন উদাহরণ হিসাবে এটিকেই গণ্য করা হত। তবে সেই ইতিহাস ভেঙে দিচ্ছে চিন এবং ভিয়েতনামের সাম্প্রতিক আবিষ্কার। চিনে পাওয়া গিয়েছে ৯০০০ বছরেরও বেশি পুরনো মমি তৈরির নিদর্শন। ভিয়েতনামে যে নিদর্শন মিলেছে, তা আরও পুরনো। ভিয়েতনামের প্রায় ১৪০০০ বছরের পুরনো ওই মমিই এখনও পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া বিশ্বের প্রাচীনতম দেহ সংরক্ষণের নিদর্শন। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়াতেও মমি তৈরির উদাহরণ মিলেছে।
এই আবিষ্কারই প্রমাণ করে নব্য প্রস্তর যুগ শুরুর আগে, যখন মানুষ শিকার করে খেত, তখন থেকেই দেহ সংরক্ষণের চল ছিল। নব্য প্রস্তর যুগ শুরু ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে। ভিয়েতনামে আবিষ্কার হওয়া মমিটি আরও বেশি পুরনো। এশিয়ায় এই নতুন আবিষ্কারগুলি পুরোপুরি মমি অবস্থায় উদ্ধার হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে মাটির নীচে চাপা থাকতে থাকতে অনেকটাই কঙ্কালসার হয়ে পড়েছে সেগুলি। তবে কঙ্কালগুলি বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, সেগুলি মমি করেই রাখা হয়েছিল।
চিন, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়ার ১১টি স্থান থেকে মাটি খুঁড়ে এমন ৫৪টি কঙ্কাল উদ্ধার করে বিশ্লেষণ করেন গবেষকেরা। সবগুলি কঙ্কালেই একই ধরনের কিছু বিশেষত্ব। দেহগুলিকে হাঁটু ভাঁজ করে একটি বিশেষ ভঙ্গিমায় সমাধিস্থ করা হয়েছিল। কিছুটা কুঁকড়ে থাকা অবস্থায়। আরও একটি বিশেষত্ব হল, কঙ্কালগুলির কোথাও কোথাও হাড়ের মধ্যে দাগ এবং পোড়া চিহ্ন দেখা গিয়েছে। প্রায় আট বছর ধরে এই গবেষণা চলেছে। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দেহ একবারে পুড়ে যাওয়ার ফলে এই পোড়া চিহ্নগুলি তৈরি হয়নি। বরং দীর্ঘ সময় ধরে কম তাপে দেহগুলিকে পোড়ানো হয়েছিল। যার জেরে এই পোড়া চিহ্নগুলি তৈরি হয়েছে হাড়ের মধ্যে। তা ছাড়া একবারে দেহ পুড়ে গেলে হাড়ের সর্বত্রই পোড়া দাগ থাকার কথা। এ ক্ষেত্রে তেমন নয়। হাড়গুলির কিছু কিছু অংশেই কেবল পোড়া চিহ্ন রয়েছে।
স্বাভাবিক উপায়ে মৃতদেহকে মমি করে রাখা বা সংরক্ষণের যে পদ্ধতিগুলি প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত রয়েছে, তার মধ্যে একটি হল, দেহকে তাপে পোহানো। এ ছাড়া ধোঁয়া, নুন, তুষার বা রাসায়নিক ব্যবহার করেও দেহ মমি করার চল ছিল। এর মাধ্যমে দেহের নরম কলা (টিস্যু)-গুলি থেকে জলীয় ভাব দূর করে দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ সময়ের জন্য দেহে পচন ধরে না।
অস্ট্রেলিয়ার কিছু আদিবাসী জাতির মধ্যে তাপ এবং ধোঁয়ায় পোহানোর চল ছিল। পাপুয়া ও নিউ গিনিতে এখনও এই চল রয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রাচীন ওই কঙ্কালগুলির সঙ্গে বর্তমান সময়ে তাপে পোহানো দেহ সংরক্ষণের অনেকটা মিল রয়েছে। প্রাচীন ওই কঙ্কালগুলিতে কনুই, খুলির সামনের অংশ এবং পায়ের দিকের অংশেই পোড়া দাগ রয়েছে। বস্তুত, মানবদেহের এই অংশগুলিতেই পেশির স্তর তুলনামূলক পাতলা। তবে গবেষণার প্রারম্ভিক পর্যায়ে পুরোটাই ছিল অনুমান সাপেক্ষ বিষয়।
এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য কঙ্কালগুলির এক্স-রে করা হয়। এ ছাড়া ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপিও করানো হয়। এক্স-রে করার পরে স্পষ্ট হয়, তাপের ফলে হাড়গুলির গড়নে কিছুটা বদল এসেছে। স্পেকট্রোস্কোপিতে দেখা যায়, ৮৪ শতাংশ হাড়ের নমুনাকেই দীর্ঘ ক্ষণ ধরে কম তাপে সেঁকা হয়েছিল। ওই তাপের কারণেই হাড়ের কিছু কিছু জায়গায় কালো হয়ে গিয়ে থাকতে পারে বলে অনুমান করছেন গবেষকেরা।
এই গবেষক দলের প্রধান অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক শিয়াও-চুন হাং। মিশর এবং চিলের মমির প্রসঙ্গে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই নতুন আবিষ্কার মানুষের শবদেহ সংরক্ষণের ইতিহাসকে আরও কয়েক হাজার বছর অতীতে নিয়ে গেল।” সংবাদমাধ্যম ‘সিএনএন’কে এক ইমেলে তিনি জানান, পরিবার এবং প্রিয়জনদের যে কোনও উপায়ে সবসময় নিজের কাছে রেখে দেওয়া মানুষের এক চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা। নতুন আবিষ্কারও সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করে বলে জানান তিনি।
বয়স্কদের শরীরে তরুণ রক্ত দিলে কমতে পারে ত্বকের বয়স!
বয়স্কদের শরীরে তরুণের রক্ত কিংবা তরুণের শরীরে বয়স্ক কারও রক্ত প্রবেশ করালে কী হয়, আদৌ রক্তের ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য থাকে কি না, তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই গবেষণা চলছে। সম্প্রতি তাতে সাফল্য মিলেছে।
বয়স হয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুড়িয়ে যাচ্ছে ত্বক। রূপচর্চা করে, নিয়মিত যত্ন নিয়ে ত্বককে কিছু বেশি সময়ের জন্য সতেজ রাখা যায় বটে, তার বয়স তো ঠেকানো যায় না! তবে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে ত্বকের কোষগুলির বয়স কমিয়ে আনার কৌশল বার করা গিয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের দাবি। সম্প্রতি একটি গবেষণায় তেমন ইঙ্গিতই পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
বয়স্কদের শরীরে তরুণের রক্ত কিংবা তরুণের শরীরে বয়স্ক কারও রক্ত প্রবেশ করালে কী হয়, আদৌ রক্তের ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য থাকে কি না, তা নিয়ে অনেক দিন ধরেই গবেষণা চলছে। সম্প্রতি জার্মানির এক দল বিজ্ঞানী এই সংক্রান্ত গবেষণায় সাফল্য পেয়েছেন। গবেষণার ফল দেখে তাঁরা বিস্মিত। দাবি, ত্বকের বয়স কমে আসার লক্ষণ দেখা গিয়েছে তাঁদের পরীক্ষায়। যদিও এ নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন, মানছেন অনেকেই।
জার্মানির বেইয়ের্সডর্ফ এজি সংস্থার বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে মানুষের ত্বকের একটি মডেল তৈরি করেছিলেন। সেই ত্বকের কোষগুলিতে প্রবেশ করানো হয় তরুণ রক্তের সিরাম (রক্তরস)। প্রাথমিক ভাবে এতে ত্বকের কোষে কোনও পরিবর্তন চোখে পড়েনি। কিন্তু এর পর ওই পরীক্ষায় যোগ করা হয় অস্থিমজ্জা কোষ (বোন ম্যারো সেল)। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এর পরেই ওই ত্বকের কোষে বয়স কমার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। এর থেকে মনে করা হচ্ছে, অস্থিমজ্জা কোষের সঙ্গে তরুণ রক্তের সিরাম বিশেষ পদ্ধতিতে সংযুক্ত হয়। তাতে কোষের বয়স কমার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়।
জার্মানির বিজ্ঞানীরা গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ‘‘ত্বক আমাদের দেহের সবচেয়ে বড় অঙ্গ। বার্ধক্য নিয়ে গবেষণা করার জন্যেও ত্বক সবচেয়ে উপযোগী। বার্ধক্যের লক্ষণগুলি ত্বকেই সবচেয়ে আগে ধরা পড়ে। মানুষের সার্বিক স্বাস্থ্য তাঁর ত্বকে প্রতিফলিত হয়।’’ ত্বকের টিস্যুর বয়স নির্ধারণ করতে বিজ্ঞানীরা ডিএনএ মিথাইলেশন এবং কোষের বিস্তার পরিমাপ করে দেখেছেন। তরুণ রক্তরসের সঙ্গে অস্থিমজ্জা কোষের সংস্পর্শে ত্বকের বয়স হ্রাস পেয়েছে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, অস্থিমজ্জা কোষের সংস্পর্শে এসে তরুণ রক্তরস ৫৫টি ভিন্ন ভিন্ন প্রোটিন তৈরি করেছে। তার মধ্যে অন্তত সাতটি যে কোনও ত্বকের তারুণ্যের জন্য উপযোগী। তবে এই প্রোটিনগুলি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণাপত্রে লেখা হয়েছে, ‘‘গোটা প্রক্রিয়াটিতে আমরা বেশ কিছু প্রোটিনকে চিহ্নিত করেছি, যা আমাদের ত্বককে পুনরুজ্জীবিত করার কারণ হতে পারে। বার্ধক্যের প্রেক্ষাপটে এগুলি নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন আছে।’’
আয়ু বাড়াতে কিংবা যৌবন ফেরাতে রক্তের ভূমিকা রয়েছে বলে একটা ধারণা দীর্ঘ দিন ধরেই প্রচলিত। দেশে দেশে রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ারদের কাহিনি সে সব ধারণার ভিত্তিতেই ডালপালা মেলেছে। এ সবের বৈজ্ঞানিক কোনও ভিত্তি এত দিন ছিল না। জার্মানির গবেষকেরা দেখালেন, ত্বকের যৌবন ফেরানোর ক্ষমতা থাকলেও থাকতে পারে রক্তের মধ্যে। বিজ্ঞানের দৌলতে এখন মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। মানুষ অনেক বেশি বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকছেন। ত্বকের তারুণ্য ফেরানোর এই গবেষণা ভবিষ্যতেও যদি সফল হয়, তবে তা আগামী দিনে বৃদ্ধ বয়সের সহায় হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। বার্ধক্য হয়ে উঠবে আরও সতেজ, আরও সবল।
আলুর জন্ম: অবদান রয়েছে টম্যাটোর
কয়েক হাজার বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশে প্রথম আলুচাষ করেছিল ইনকারা। ষোড়শ শতাব্দী থেকে অভিযাত্রীদের হাত ধরে তা ইউরোপে পৌঁছোয়। সেখান থেকেই ক্রমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে আলুর মহিমা। কিন্তু এত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও আলুর বিবর্তনের ইতিহাস এত দিন ছিল অজানাই।
চিপ্স থেকে বিরিয়ানি, তরকারি থেকে মাংসের ঝোল— একটা জিনিস না থাকলে সবই ফিকে। আর সেই আলুই যে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সব্জি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। গত কয়েক শতাব্দী ধরে দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই অন্যতম প্রধান খাদ্য হয়ে উঠেছে আলু। কিন্তু এ হেন আলুর জন্ম হল কী ভাবে? সম্প্রতি সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
কয়েক হাজার বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশে প্রথম আলুচাষ করেছিল ইনকারা। ষোড়শ শতাব্দী থেকে অভিযাত্রীদের হাত ধরে তা ইউরোপে পৌঁছোয়। সেখান থেকেই ক্রমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে আলুর মহিমা। কিন্তু এত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও আলুর বিবর্তনের ইতিহাস এত দিন ছিল অজানাই। তবে সম্প্রতি কৃষিজাত আলুর ৪৫০টি এবং বন্য আলুর ৫৬টি প্রজাতির জিনোম বিশ্লেষণ করে জানা গিয়েছে, লক্ষ লক্ষ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকায় দুই সব্জির সংমিশ্রণে আলুর জন্ম হয়েছিল! এক দিকে বন্য টম্যাটো, আর এক দিকে আলুর কাছাকাছি এক প্রজাতির মধ্যে প্রাকৃতিক আন্তঃপ্রজননে জন্মেছিল আজকের আলুর পূর্বসূরি।
নতুন এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে ‘সেল’ জার্নালে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আজ থেকে প্রায় ৯০ লক্ষ বছর আগে টম্যাটো এবং আলুরই এক জাতভাইয়ের মধ্যে সংকরায়নের ফলে আলু তৈরি হয়েছিল। আর সেই থেকেই নাকি আলু হয়ে উঠেছিল কন্দজাতীয় সব্জি। এর নেপথ্যে রয়েছে দু’টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জিন। সেগুলিকেও চিহ্নিত করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা।
কী ভাবে হয়েছিল এই সংকরায়ন?
গবেষণায় জানা গিয়েছে, আধুনিক আলুর বাবা-মা হল টম্যাটো এবং পেরুর এক প্রাচীন সব্জি, যার নাম ‘এটিউবারোসাম’। এ বার, একটু তলিয়ে ভেবে দেখলেই এক অদ্ভূত বিষয় নজরে পড়বে। টম্যাটো গাছের ভোজ্য অংশটি হল ফল। অথচ, আলু গাছের যে অংশটি আমরা খাই, সেটি আদতে কন্দ বা টিউবার। তাই আধুনিক আলু গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ‘সোলানাম টিউবারোসাম’। আবার, আলুর জাতভাই এটিউবারোসামের সঙ্গে আলুর মিল রয়েছে বটে, তবে এতে কন্দ নেই! তা হলে কী ভাবে এল আধুনিক আলু? তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন গবেষকেরা। আদতে, আজ থেকে প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে একই পূর্বপুরুষের থেকে টম্যাটো ও এটিউবারোসামের জন্ম। একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ৫০ লক্ষ বছর পর প্রাকৃতিক ভাবেই ফের সংকরায়ন হয় এই দুইয়ের। আর তাতেই জন্ম হয় আলুর।
আলুর মতো এটিউবারোসামেরও পাতলা, ভূগর্ভস্থ কাণ্ড রয়েছে। তবে কোনও কন্দ নেই। অন্য দিকে, জিনগত বা বংশগত দিক থেকে আলু টম্যাটোর অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়! সে কারণেই গবেষকেরা আরও বিভ্রান্ত হচ্ছিলেন। এই ধাঁধার রহস্য উন্মোচনের জন্যই কৃষিজাত এবং বন্য— দুই ধরনের আলুর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখতে শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় দেখা যায়, আলুর প্রতিটি প্রজাতির মধ্যে এটিউবেরোসাম এবং টম্যাটো গাছের জিনের সুষম মিশ্রণ রয়েছে! অর্থাৎ, একেবারে প্রথম দিকের আলুগুলি যে এই দুই ভিন্ন প্রজাতির গাছের প্রাকৃতিক সংকরায়নের ফল ছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উদ্ভিদজগতে এমন বিরল ঘটনা সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু টম্যাটো ও এটিউবেরোসাম— দু’টি প্রজাতি আলাদা আলাদা ভাবে প্রায় ৫০ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তিত হলেও এদের মধ্যে এতই বেশি জিনগত মিল ছিল, যে ফের তাদের সংকরায়ন সম্ভব হয়।
লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্যান্ড্রা ন্যাপ বলছেন, ‘‘বিরল এই ঘটনার ফলে জিনের এমন পরিবর্তন ঘটেছিল যে অভিযোজনের ফলে পরবর্তী বংশধরদের ক্ষেত্রে কন্দ তৈরি হয়। ফলে নতুন এই উদ্ভিদগুলি আন্দিজ পর্বতের দুর্গম, প্রতিকূল পরিবেশে, অনুর্বর মাটিতে কিংবা অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়াতেও সহজেই বংশবৃদ্ধি করতে থাকে।’’ এই কন্দই আজকের আলুকে আন্দিজ এলাকার পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করেছিল। প্রতিকূল পরিবেশে পুষ্টি সঞ্চয় করে রাখা, অযৌন জননের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করা— সবেতেই আলুকে বাঁচিয়ে রেখেছিল এই কন্দ।
এখন সারা বিশ্বে ৫,০০০-এরও বেশি আলুর প্রজাতি রয়েছে। পেরুর ইন্টারন্যাশনাল পট্যাটো সেন্টার রিসার্চ অর্গানাইজ়েশনের মতে, রোজকার খাবার হিসাবে চাল এবং গমের পরেই আলুর স্থান। চাইনিজ় অ্যাকাডেমি অফ এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের জীববিজ্ঞানী সানওয়েন হুয়াং বলেন, ‘‘আজকের দিনে আলু সত্যিই মানবজাতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খাদ্যগুলির মধ্যে একটি। আলুর মতো বহুমুখীতা, পুষ্টিগুণ এবং দেশ-কাল-সংস্কৃতি ভেদে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা খুব কম ফসলের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। মানুষ প্রায় সব রান্নাতেই আলু খায়। মূলত শর্করা বলে হেয় করা হলেও আলুতে ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ফাইবার এবং স্টার্চ থাকে। এটি প্রাকৃতিক ভাবে গ্লুটেন-মুক্ত এবং কম চর্বিযুক্তও।’’ হুয়াং আরও জানাচ্ছেন, প্রজননের সময় আলুর জিনোমে থাকা সমস্ত ক্ষতিকর মিউটেশন এড়ানো এত দিন বেশ কঠিন কাজ ছিল। তবে নতুন এই আবিষ্কারের পর টম্যাটোকে ব্যবহার করে ক্ষতিকর মিউটেশনমুক্ত ‘সুস্থ’ ও উৎকৃষ্ট আলু তৈরি করা যেতে পারে। শুধু তা-ই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফলন যে বাধার মুখোমুখি হয়, তার মোকাবিলাও করা যাবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
অতিরিক্ত ঘুম রোগবালাই তো বটেই, মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে!
মানুষের ঘুমের সময়সূচি নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই কৌতূহলী। সারা দিনে ঠিক কত ক্ষণ ঘুমোনো উচিত, তা নিয়ে অনেকে অনেক রকম মতামত দিয়ে থাকেন।
সামনে পরীক্ষা? বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই হয়তো কেটে গেল সারা রাত! অথবা ওটিটি-তে নতুন কোনও ওয়েব সিরিজ়? রাতের ঘড়ির কাঁটা কখন যে ঘুরে যায়, হিসাব থাকে না। রাতে ঘুম কম হলে পরের দিন সকাল থেকে চোখেমুখে তার স্পষ্ট ছাপ পড়ে। চোখের নীচে কালি জমে, মাথা ভার হয়ে থাকে, অল্প কাজেই আসে ক্লান্তি। কম ঘুমের এই সমস্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমাদের জানা। কিন্তু ঘুম যদি বেশি হয়?
মানুষের ঘুমের সময়সূচি নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই কৌতূহলী। সারা দিনে ঠিক কত ক্ষণ ঘুমোনো উচিত, তা নিয়ে অনেকে অনেক রকম মতামত দিয়ে থাকেন। সম্প্রতি তেমনই একটি গবেষণায় উঠে এসেছে নতুন ধরনের তথ্য। বিজ্ঞানীদের দাবি, কম ঘুমের চেয়েও শরীরের বেশি ক্ষতি করতে পারে বেশি ঘুম! এমনকি, ঘুমের পরিমাণ অত্যধিক হয়ে গেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে! দীর্ঘ দিন ধরে ঘুম সংক্রান্ত নানা পরিসংখ্যান ঘেঁটে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
সাম্প্রতিক গবেষণায় ঘুম সংক্রান্ত আরও ৭৯টি সমীক্ষার ফলাফল খতিয়ে দেখা হয়েছে। গবেষকেরা অন্তত এক বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন বয়সের মানুষের ঘুমের সূচি নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁরা দেখেছেন, যে সমস্ত মানুষ কম ঘুমোন (এ ক্ষেত্রে রাতে সাত ঘণ্টার কম ঘুমের কথা বলা হয়েছে), তাঁদের মধ্যে মৃত্যুর সম্ভাবনা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। কিন্তু যাঁরা বেশি ঘুমোন (রাতে ন’ঘণ্টারও বেশি ঘুম), তাঁদের মধ্যে মৃত্যুর সম্ভাবনা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। স্বাভাবিক বলতে এখানে প্রতি রাতে অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমের কথা বলা হয়েছে। ২০১৮ সালেও ঘুম নিয়ে এই ধরনের একটি গবেষণা হয়েছিল। সেখানে ফলাফল প্রায় অনুরূপ ছিল। গবেষকেরা ৭৪টি সমীক্ষার ফল খতিয়ে দেখে জানিয়েছিলেন, রাতে ন’ঘণ্টার বেশি ঘুমোলে মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে ১৪ শতাংশ।
কী কী সমস্যা
মনে রাখতে হবে, বেশি ঘুমোনোর সঙ্গে সরাসরি মৃত্যুর কোনও সম্পর্ক নেই। তবে ঘুম বেশি হলে বেশ কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তা নিয়ে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন। প্রথমত, বেশি ঘুম মানসিক অবসাদের অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া, শরীরে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, হজমের অসুবিধা হতে পারে অতিরিক্ত ঘুমের কারণে। সবচেয়ে বেশি যেটা চোখে পড়ে, তা হল ওজন বৃদ্ধি। ঘুম বেশি হলে শরীরে বাড়তি মেদ জমে এবং ওজন বেড়ে যায়। তা বিভিন্ন জটিল রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ, বেশি ঘুম মৃত্যুর কারণ নয়। বেশি ঘুম আসলে রোগব্যাধির কারণ, যা ভবিষ্যতে মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।
ঘুম এবং রোগব্যাধি
যাঁরা বেশি ঘুমোন, তাঁদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ওষুধের প্রভাবে তাঁদের অতিরিক্ত ঘুম পেতে পারে। সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য তাঁদের বাড়তি ঘুম প্রয়োজন হতে পারে। আবার, অসুস্থ ব্যক্তিদের ঘুম কম হওয়াও স্বাভাবিক। হয়তো শারীরিক অসুস্থতার কারণেই অনেকে রাতে ঠিকমতো ঘুমোতে পারেন না। অতিরিক্ত ঘুম হতে পারে অসুস্থতার কারণ নয়, অসুস্থতার লক্ষণ।
কতটা ঘুম দরকার?
গবেষকদের মতে, কারও স্বাভাবিক ঘুমের পরিমাণ বেশি এবং কারও কম হতে পারে। ঘুম ব্যক্তিবিশেষের অভ্যাসের উপর নির্ভরশীল হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই বয়স হয়ে ওঠে অন্যতম বড় কারণ। গবেষণা অনুযায়ী, কৈশোরে তুলনামূলক বেশি ঘুম প্রয়োজন হয়। যাঁদের বয়স ১৩ থেকে ১৯, তাঁদের রাতে আট থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্ক যে কোনও মানুষের সাধারণ ভাবে প্রতি দিন সাত থেকে ন’ঘণ্টা ঘুম দরকার। বেশি বয়সে অনেকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঘুমোন। তবে শারীরিক সমস্যা না থাকলে বাড়তি ঘুমের প্রয়োজন পড়ে না। শুধু ঘুমের পরিমাণ নয়, কী রকম ঘুম হচ্ছে, তাতেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার বলে মনে করেন গবেষকেরা। পরিমিত গাঢ়, গভীর ঘুম শরীরের পক্ষে উপযোগী।
মেয়ে জন্মাবে? না ছেলে?
কিছু ব্যক্তির কেবলমাত্র একই লিঙ্গের সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। এঁরা যত বারই সন্তানধারণ করুন না কেন, দেখা যাবে প্রতি বার একই লিঙ্গের সন্তানের জন্ম দিয়েছেন তাঁরা। গত ১৮ জুলাই ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এমনটাই দাবি করা হয়েছে।
সন্তান মেয়ে হবে? না ছেলে? অঙ্কের নিয়মে সে সম্ভাবনা ৫০-৫০ শতাংশ হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এ বার সেই তত্ত্ব উড়িয়ে দিল সমীক্ষাভিত্তিক নতুন গবেষণা। জানা গেল, কিছু কিছু দম্পতির নাকি কেবলমাত্র একটি লিঙ্গের সন্তানধারণেরই প্রবণতা থাকে! বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে সেই প্রবণতাও।
কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে বার বার একই লিঙ্গের সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এঁরা যত বারই সন্তানধারণ করুন না কেন, দেখা যাবে প্রতি বার একই লিঙ্গের সন্তানের জন্ম দিয়েছেন তাঁরা। গত ১৮ জুলাই ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। সমীক্ষাভিত্তিক ওই গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে, যে সব দম্পতির ক্ষেত্রে বার বার একই লিঙ্গের সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তাঁরা সকলেই তুলনামূলক ভাবে বেশি বয়সে প্রথম সন্তান নিয়েছেন। ফলে বেশি বয়সে সন্তানধারণের সিদ্ধান্ত নিলেও বার বার একই লিঙ্গের সন্তান জন্মানোর সম্ভাবনা বাড়তে পারে বলে জানাচ্ছে নতুন গবেষণা।
সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, সন্তান ছেলে বা মেয়ে হওয়ার সম্ভাবনা ৫০-৫০ হওয়ার কথা। কারণ, প্রাথমিক ভাবে, সমান সংখ্যক শুক্রাণু কোষ এক্স এবং ওয়াই যৌন ক্রোমোজোম বহন করে। আর এই এক্স বা ওয়াই ক্রোমোজোমই নির্ধারণ করে, সন্তানের লিঙ্গ কী হবে। কিন্তু তা হলে যে সব দম্পতির বার বার পুত্র কিংবা কন্যা জন্মায়, তাঁদের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা তত্ত্বের এই সাধারণ নিয়ম খাটে না কেন? এই প্রশ্নই ভাবিয়ে তুলেছিল বস্টনে হার্ভার্ড টিএইচ চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেল্থের প্রজনন বিশেষজ্ঞ জর্জ চাভারোকে। সেই থেকে একই লিঙ্গের একাধিক সন্তান জন্মানোর পৃথক পৃথক উদাহরণ নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করেন চাভারো ও তাঁর সহকর্মীরা।
গবেষণার প্রথম ধাপ হিসাবে প্রথমে শুরু হয় সমীক্ষা। ১৯৫৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৫৮,০০০ জনেরও বেশি মানুষের গর্ভধারণ এবং সন্তানের লিঙ্গ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দেখা যায়, এদের মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ পরিবারের ক্ষেত্রে সন্তানেরা একই লিঙ্গের! এর মধ্যে কোনও কোনও পরিবারে আবার তিন, চার এমনকি পাঁচটি সন্তানও রয়েছে, যাদের সকলের লিঙ্গ একই। এই দম্পতিরা সকলেই একের পর এক সন্তানধারণ করে গিয়েছেন, সম্ভাবনা তত্ত্বের নিয়মে অন্তত একটি অপত্যের লিঙ্গ ভিন্ন হবে, এই আশায়! কিন্তু সে গুড়ে বালি। বরং প্রতি বারই দেখা গিয়েছে, জন্ম নিয়েছে একই লিঙ্গের সন্তান।
চাভারোর কথায়, ‘‘সন্তানের লিঙ্গ কী হবে, সেই সম্ভাবনা প্রতিটি দম্পতির ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা হতে পারে। প্রত্যেক দম্পতির কোনও একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গের সন্তান ধারণের ‘বিশেষ সম্ভাবনা’ থাকে। তবে পরিবারভেদে এই সম্ভাবনাও ভিন্ন হয়। সে কারণেই, সমগ্র জনসংখ্যার নিরিখে দেখলে ছেলে বা মেয়ে জন্মানোর সম্ভাবনা আপাত দৃষ্টিতে ৫০-৫০ শতাংশ বলে মনে হয়।’’ চাভারো জানাচ্ছেন, যে পরিবারগুলিতে একই লিঙ্গের সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাঁরা কেউ কেউ তত ক্ষণ পর্যন্ত সন্তানধারণের চেষ্টা করে যান যত ক্ষণ না অন্য লিঙ্গের সন্তান জন্মাচ্ছে। আবার যে সব পরিবারে প্রথম দুই সন্তানের মধ্যে একজন পুত্র এবং একজন কন্যা হয়, তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই তৃতীয় সন্তান নেওয়ার কথা ভাবেন না। সমীক্ষায় এ ধরণের উদাহরণগুলিও খতিয়ে দেখা হয়েছে। চাভারো বলছেন, ‘‘তাতেও দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন পরিবারে বেশি সংখ্যায় একই লিঙ্গের সন্তান জন্মানোর প্রবণতা দেখা গিয়েছে। বিশেষত সেই সব দম্পতির ক্ষেত্রে এটা দেখা গিয়েছে যাঁরা বেশি বয়সে প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।’’
নতুন গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, মায়ের বয়স বেশি হলে একই লিঙ্গের সন্তান জন্মানোর সম্ভাবনাও বেড়ে যেতে পারে। কেন? তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন চাভারো। তিনি বলছেন, প্রজননক্ষম বছরগুলিতে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীযৌনাঙ্গের পিএইচের পরিবর্তন হয়। যৌনাঙ্গের অভ্যন্তরের পরিবেশ বেশি অ্যাসিডিক হয়ে ওঠে, যা এক্স ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণুর পক্ষে অনুকূল। কারণ, এক্স ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণু ওয়াই ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণুর চেয়ে আকারে কিছুটা বড়। এতে অ্যাসিডিক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য ‘বাফার জাতীয়’ রাসায়নিকও থাকে। সে কারণে সেই ধরনের শুক্রাণুর সঙ্গেই ডিম্বাণুর মিলন হবে। ফলে সে ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সন্তানই হবে কন্যা। আবার, ঋতুচক্রের যে পর্যায়ে ডিম্বাশয় থেকে একটি ডিম্বাণু নিঃসৃত হয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পর্যায়ের দৈঘ্য ক্রমশ ছোট হতে থাকে। ফলে সার্ভিকাল মিউকাস, ওভিডাক্ট তরল সব মিলিয়ে এমন পরিবেশ তৈরি হতে পারে যা ওয়াই ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণুর বেঁচে থাকার পক্ষে অনুকূল। সে ক্ষেত্রে বেশির ভাগ অপত্য হবে পুত্র।
অর্থাৎ, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোন জৈবিক কারণগুলি সেই ব্যক্তির উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে, তার উপর নির্ভর করে সন্তানের লিঙ্গ কী হবে। আবার, যে সব দম্পতির বার বার একই লিঙ্গের সন্তান জন্মেছে, তাঁদের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে দু’টি বিশেষ জিন খুঁজে পেয়েছেন চাভারো ও তাঁর সহকর্মীরা। যদিও সন্তানের লিঙ্গনির্ধারণে ওই জিনগুলির ভূমিকা কী তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে আরও গবেষণা চলছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে নতুন এই গবেষণা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে বিজ্ঞানীমহলে। ইতালির বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিকোলা বারবানের কথায়, ‘‘চাভারোর আবিষ্কার ভবিষ্যতে এই সংক্রান্ত গবেষণাকে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে। তবে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন।’’ আবার, এই ফলাফলে সন্তুষ্ট নন অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিসিস্ট ব্রেন্ডন জিট্শ। তিনি বলছেন, ‘‘১৯৩১ সালের পরে জন্মানো গোটা সুইডিশ জনসংখ্যার উপর ভিত্তি করে একটি বৃহত্তর সমীক্ষায় আমরা আগেই দেখিয়েছি যে, শুধু ছেলে বা মেয়ে জন্মানোর ঘটনা কোনও বিশেষ নিয়ম মেনে হয় না।’’ জিট্শ আরও জানিয়েছেন, অপত্যের লিঙ্গ কী হবে, তার সঙ্গে এত সহজে জিনগত যোগসূত্রের সম্বন্ধ টানা সম্ভব নয়। এ জন্য পৃথক এক নমুনার উপর গবেষণা করে দেখতে হবে। চাভারোর সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা বেশির ভাগই ছিলেন মার্কিন এবং শ্বেতাঙ্গ। ফলে অন্য জনসংখ্যার উপর সমীক্ষা না করে এ বিষয়ে এত দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো যাবে না। তা ছাড়া, সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পিতার বয়স ছিল মায়ের বয়সের কাছাকাছি। ফলে অপত্যের লিঙ্গ কী হবে তা পিতার বয়সের উপর কতটা নির্ভর করে, তা-ও দেখার।
আঘাত এলে গাছপালারা আর্তনাদ করে ওঠে, আর সেই শব্দ শুনতে পায় পতঙ্গেরা!
কোনও উদ্ভিদের উপর ধারাল অস্ত্রের কোপ পড়লে বা উপড়ে ফেলার চেষ্টা হলে তাদের দেহ থেকে এক ধরনের ‘আলট্রাসাউন্ড’ নির্গত হয়। খরা পরিস্থিতিতে জলের অভাব হলেও এমনটা হয়।
প্রাণ থাকলেও তারা নীরব! উদ্ভিদজগৎ সম্পর্কে এতদিনের ধারণাটা ছিল এমনই। কিন্তু ইজ়রায়েলের তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানাচ্ছেন এমন ধারণা ভুল। তাঁদের দাবি, কোনও রকম আঘাত এলে বা প্রতিকূল পরিবেশের মুখে পড়লে গাছেরাও আর্তনাদ করে। আর সেই সূক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম ‘আলট্রাসাউন্ড’ শুনতে পায় পতঙ্গেরা!
ই-লাইফ জার্নালে প্রকাশিত নিবন্ধে ইজ়রায়েলি গবেষকেরা জানিয়েছেন, কোনও উদ্ভিদের উপর ধারাল অস্ত্রের কোপ পড়লে বা উপড়ে ফেলার চেষ্টা হলে তাদের দেহ থেকে এক ধরনের ‘আলট্রাসাউন্ড’ নির্গত হয়। খরা পরিস্থিতিতে দীর্ঘকাল ধরে জলের অভাব হলেও এমনটা হয়। মানুষ সাধারণত ২০ থেকে ২০০০০ হার্ৎজ় পর্যন্ত কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। কিন্তু ‘আলট্রাসাউন্ড’-এর কম্পাঙ্ক ২০০০০ হার্ৎজ়ের বেশি। তাই মানুষের শ্রবণশক্তি তার নাগাল পায় না।
তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ওয়াইজ ফ্যাকাল্টি অফ লাইফ সায়েন্সেস’-এর অধ্যাপক ইয়োসি ইয়োভেল এবং লিলাচ হাদানির গবেষণাগারে উদ্ভিদ ও পতঙ্গেও ‘শব্দের আদানপ্রদান’ সংক্রান্ত ওই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন রিয়া সেল্টজ়ার এবং গায়জ়েয় এশেল। তাঁর গবেষণাগারে টম্যাটো গাছের উপর গবেষণাটি করেন। সেখানে কিছু গাছের পর্যাপ্ত যত্ন নেওয়া হয়েছিল। কয়েকটিতে দীর্ঘ দিন জল দেওয়া হয়নি। আবার কয়েকটির বেশ কিছু পাতা ছিঁড়ে নিয়ে সালোকসংশ্লেষের হার কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যে টম্যাটো গাছগুলি পর্যাপ্ত যত্ন পেয়েছে তারা শান্ত থেকেছে। অন্যগুলি থেকে ভেসে এসেছে বিশেষ কম্পাঙ্কের ‘আলট্রাসাউন্ড’। টম্যাটো গাছের পাতায় কয়েকটি প্রজাতির স্ত্রী পতঙ্গ ডিম পাড়ে। অর্থাৎ, টম্যাটো তাদের ‘পোষক উদ্ভিদ’ (হোস্ট প্লান্ট)। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ‘আর্তনাদের শব্দ’ শুনেই কয়েকটি প্রজাতির স্ত্রী পতঙ্গেরা জলসঙ্কটে পড়া গাছগুলিকে পরিহার করেছে। বেছে নিয়েছে সুস্থ স্বাভাবিক গাছগুলিকে। বছর কয়েক আগেই জীববিজ্ঞানী লিলাচ এ সংক্রান্ত গবেষণা শুরু করেছিলেন। তাঁর মতে, শুধু পোকামাকড় নয়, বাদুড়ের মতো প্রাণীও সম্ভবত গাছেদের ‘শব্দ’ শুনতে পায়।
আমাদের মস্তিষ্কের মারাত্মক একটি রোগ এসেছে নিয়ানডারথালদের থেকে!
হোমো স্যাপিয়েন্সের সঙ্গে যে একাধিক প্রাচীন মানব প্রজাতির যৌনমিলন ঘটেছিল, ২০১৩ সালে তা প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেই প্রাচীন কাল থেকে প্রাচীন জিন বয়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।
সময়টা আজ থেকে প্রায় দুই কি তিন লক্ষ বছর আগে। পৃথিবীর বুকে তখন চলছে মধ্যপ্রস্তর যুগ। সেই সময় পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত নিয়ানডারথালেরা, মানুষের প্রাচীন পূর্বপ্রজাতি। একইসঙ্গে হোমো স্যাপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষের আবির্ভাবও তখন হয়ে গিয়েছিল। এই দুই মানবপ্রজাতির যৌনমিলনের একাধিক প্রমাণ অতীতেও পেয়েছেন বিজ্ঞানী এবং প্রত্নতত্ত্ববিদেরা। শুধু নিয়ানডারথালদের সঙ্গে নয়, হোমো স্যাপিয়েন্সের সঙ্গে একাধিক প্রাচীন মানব প্রজাতির মিলন ঘটেছে। বিজ্ঞানীরা আগেও আন্দাজ করেছিলেন, প্রাচীন এই সমস্ত জিন এখনকার বহু রোগের উৎস হতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেল, আধুনিক মানুষের মস্তিষ্কের একটি মারাত্মক রোগ এসেছে নিয়ানডারথালদের জিন থেকে। প্রাচীন এবং আধুনিক মাথার বহু খুলি ঘেঁটে এই তত্ত্বে উপনীত হয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
কী এই মস্তিষ্কের রোগ
বর্তমান সময়ে মস্তিষ্কের গুরুতর একটি রোগে আক্রান্ত হন অনেকে। তার নাম চিয়ারি ম্যালফর্মেশন। এই রোগে আক্রান্ত মানুষের মাথার খুলির আকারের সঙ্গে তাদের মস্তিষ্ক বা ঘিলুর আকার মেলে না। মস্তিষ্কের নীচের অংশ বেড়ে গিয়ে মেরুদণ্ড পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে মাথার খুলির পিছন দিকে স্বাভাবিকের তুলনায় ছোট আকারের অক্সিপিটাল হাড় তৈরি হয়। মাথা ব্যথা, ঘাড়ে ব্যথা এবং আরও অনেক গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে এই রোগে। পৃথিবীতে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে এক জন চিয়ারি ম্যালফর্মেশনে আক্রান্ত হন।
প্রাচীন মানব
মানুষের পূর্বপুরুষের এমন অনেক প্রাচীন প্রজাতি রয়েছে, যাদের মাথার খুলির আকার আমাদের চেয়ে আলাদা। ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় প্রথম দাবি করা হয়েছিল, চিয়ারি ম্যালফর্মেশনের মূলে রয়েছে এই সমস্ত প্রাচীন মানব প্রজাতির জিন। হোমো স্যাপিয়েন্সের সঙ্গে যে এই ধরনের প্রজাতির যৌনমিলন ঘটেছিল, তা প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেই থেকে প্রাচীন জিন বয়ে চলেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। তবে এগুলি এত দিন অধিকাংশই ছিল অনুমানের পর্যায়ে।
কী ভাবে এগোল গবেষণা
ফিলিপিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্টিয়োআর্কিয়োলজিস্ট কিম্বারলি প্লম্পের নেতৃত্বে একটি দল সম্প্রতি এই ধারণাটি নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁদের মতে, এই আন্তঃপ্রজননের উত্তরাধিকার বর্তমানে অনেক জীবিত মানুষের জিনেও শনাক্ত করা যায়। গবেষকদের ওই দলটি মোট ১০৩টি মাথার খুলি নিয়ে কাজ করেছেন। তাতে চিয়ারি ম্যালফর্মেশনে আক্রান্তদের খুলি যেমন ছিল, সুস্থ মানুষের খুলিও ছিল। এর পাশাপাশি প্রাচীন প্রজাতির আটটি জীবাশ্ম খুলিও পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছিল। জীবাশ্ম খুলিতে ছিল নিয়ানডারথাল, হোমো ইরেকটাস, হোমো হেইডেলবারজেনসিসের মতো প্রাচীন মানব প্রজাতির নমুনা।
উৎস নিয়ানডারথাল
রোগাক্রান্ত মানুষের খুলিগুলি আকারে ছিল ভিন্ন ভিন্ন। যে অংশে মস্তিষ্কের সঙ্গে মেরুদণ্ডের সংযোগ ঘটে, সে অংশের আকারও আলাদা ছিল। তবে এই ধরনের মাথার খুলির আকারের সঙ্গে একমাত্র একটি প্রাচীন প্রজাতির খুলির মিলই পাওয়া গিয়েছে। সেটা হল নিয়ানডারথাল। গবেষকেরা জানিয়েছেন, হোমো ইরেকটাস, হোমো হেইডেলবারজেনসিসের মাথার খুলির সঙ্গে বর্তমান সুস্থ মানুষের মাথার খুলির অনেক মিল পাওয়া গিয়েছে। এর থেকেই বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, নিয়ানডালথালদের থেকেই আধুনিক মানুষের জিনে চিয়ারি ম্যালফর্মেশন নামক রোগটি প্রবেশ করেছে। অন্য কোনও প্রাচীন মানব প্রজাতির থেকে নয়। এতে ২০১৩ সালের গবেষণার দাবি আরও স্পষ্ট ভাবে প্রতিষ্ঠিত হল। পাশাপাশি, হোমো স্যাপিয়েন্সের সঙ্গে নিয়ানডারথালের মিলন, প্রজনন এবং জিনগত বিনিময়ে আরও গভীর ভাবে আলোকপাত করল এই গবেষণা।
স্থান-কাল নির্বিশেষে?
সাম্প্রতিক গবেষণায় ব্যবহৃত নমুনাগুলি নিয়ে আরও কাজ করতে আগ্রহী বিজ্ঞানীরা। বয়স এবং সময় নির্বিশেষে আধুনিক মানুষ এবং প্রাচীন মানবের মাথার খুলিগুলি আমাদের বলে দিতে পারে চিয়ারি ম্যালফর্মেশনের সঙ্গে নিয়ানডারথালদের কী সম্পর্ক ছিল। তারাও এই রোগে ভুগত কি না। আজকের মানুষের মতো একই সমস্যা তাদের মাথাতেও হত কি না। বিশ্বের আলাদা আলাদা প্রান্তের মানুষের সঙ্গেও এই নমুনা মিলিয়ে দেখতে চান বিজ্ঞানীরা। আমরা জানি, আফ্রিকার জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে নিয়ানডারথালদের ডিএনএ কম। তুলনায় নিয়ানডারথাল ডিএনএ বেশি পাওয়া যায় ইউরোপ এবং এশিয়ায়। চিয়ারি ম্যালফর্মেশনের ক্ষেত্রেও সেই তত্ত্ব মিলে যায় কি না, পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
চিকিৎসায় লাভ
বিজ্ঞানীদের ধারণা, রোগের উৎস সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া গেলে আগামী দিনে এই রোগের সঙ্গে মোকাবিলা আরও সহজ হবে। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য এই রোগের চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারে। অনেকেই আশাবাদী, ভবিষ্যতে এই রোগকে সম্পূর্ণ রূপে নির্মূল এবং বিলুপ্ত করে দেওয়া সম্ভব। তবে গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। ফলে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। গবেষণাপত্রে লেখা হয়েছে, ‘‘এই তথ্য আমাদের চিয়ারি ম্যালফর্মেশনের কারণ জানতে এবং এই রোগকে আরও বিশদে বুঝতে সাহায্য করে। পরবর্তী সময়ে এই রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসাতেও এই তথ্যগুলি কাজে লাগবে পারে।’’
ব্রেন বুড়োলে আয়ু কমে! চনমনে মস্তিষ্কের সঙ্গেই বেঁচে থাকার সম্পর্ক বেশি
ক্যালিফর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক ৪৪,৪৯৮ জনের তথ্য নিয়ে তার উপর পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখেছেন। প্রয়োগ করেছেন রক্ত বিশ্লেষণ কৌশল (ব্লাড অ্যানালিসিস টেকনিক)।
বয়স বাড়ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। অকালে কারও চুল পাকছে, কারও পড়ে যাচ্ছে দাঁত। কিন্তু আপনার মস্তিষ্কের (ব্রেন) ‘বয়স’ কত? তার খোঁজ কি নিয়েছেন কখনও? নতুন গবেষণা বলছে, মস্তিষ্কের ‘বয়স’ই বলে দিতে পারে আপনার আয়ু। বেঁচে থাকার সঙ্গে চনমনে, তাজা মস্তিষ্কের সম্পর্ক অনেক বেশি।
আমাদের শরীরের এক একটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বুড়িয়ে যেতে এক এক রকম সময় নেয়। কোনও অঙ্গ হয়তো কমবয়সেই বুড়িয়ে যায়। আবার কোনও অঙ্গ বেশি বয়সেও থেকে যায় তাজা। গবেষকেরা সম্প্রতি শরীরের এমন ১১টি অঙ্গের উপর পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখেছেন। জানিয়েছেন, মস্তিষ্কই আয়ু নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযোগী।
ক্যালিফর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক ব্রিটেনের স্বাস্থ্য গবেষণা ডেটাবেস থেকে মোট ৪৪,৪৯৮ জনের তথ্য নিয়ে তার উপর পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখেছেন। ৪০ থেকে ৭০ বছর বয়সি ওই ৪৪,৪৯৮ জনের তথ্যে রক্ত বিশ্লেষণ পদ্ধতি (ব্লাড অ্যানালিসিস টেকনিক) প্রয়োগ করা হয়েছে। এর থেকে তাঁরা পেয়েছেন ওই মানুষগুলির মোট ১১টি অঙ্গের আনুমানিক বয়স। এর মধ্যে মস্তিষ্ক ছাড়াও ছিল হার্ট, ফুসফুস, পেশি, কিডনি, লিভার, অন্ত্র, অগ্ন্যাশয়, চর্বি, শিরা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
এই অঙ্গের ‘বয়স’ ব্যক্তিবিশেষের স্বাস্থ্যের দীর্ঘ ১৭ বছরের পরিসংখ্যানের (রেকর্ড) সঙ্গে তুলনা করে দেখা হয়েছে। সাধারণ ভাবে দেখা গিয়েছে, অঙ্গের চনমনে ভাব যত কম, মৃত্যুর ঝুঁকিও তত বেশি। এদের মধ্যে থেকে মস্তিষ্ককেই আদর্শ প্রতিনিধি হিসাবে বেছে নেওয়া যেতে পারে, জানিয়েছেন গবেষকেরা। পরিসংখ্যান বলছে, যাঁদের ব্রেন যত কম বুড়িয়েছে, তাঁদের আয়ু তত দীর্ঘ হয়েছে। স্ট্যানফর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসায়েন্টিস্ট টনি উইস্-কোরে বলেছেন, ‘‘ব্রেনই হল আমাদের দীর্ঘ জীবনের দ্বাররক্ষী। যদি আপনার ব্রেন বুড়িয়ে যায়, মৃত্যুর সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে। আর আপনার বয়স যতই বাড়ুক, ব্রেন সতেজ থাকলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।’’
যে রক্তপরীক্ষার পদ্ধতি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে, তা মূলত প্রোটিনের মাত্রা পরিমাপ করে। সেই প্রোটিন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। জটিল কিছু গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বার করেছেন, কোন অঙ্গ কেমন চলছে। কোন অঙ্গ কতটা সতেজ। যে অঙ্গ যত ‘বয়স্ক’, তার প্রোটিন তত বেশি ক্ষয়ক্ষতি নির্দেশ করেছে। সেই অঙ্গে রোগ ধরার সম্ভাবনাও তাই তত বেশি। একই ভাবে এমন ‘বয়স্ক’ অঙ্গের সংখ্যা যার শরীরে যত বেশি রয়েছে, তার রোগভোগের সম্ভাবনাও তত বেড়ে যায়।
গবেষণা বলছে, যাঁদের ব্রেন ‘অত্যন্ত বয়স্ক’ (বৃদ্ধ বয়সের সাত শতাংশ), তাঁদের ক্ষেত্রে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ। তুলনায় যাঁদের ব্রেনের বয়স কম, তাঁদের ব্রেন সাধারণ জৈবিক বয়সের সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ। ‘অত্যন্ত চনমনে’ মস্তিষ্কের অধিকারী যাঁরা, তাঁদের অকালমৃত্যুর (শারীরিক কারণে) সম্ভাবনা ৪০ শতাংশ কমে যায়।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তির উন্নয়নে মানুষের গড় আয়ু যত বাড়ছে, ততই চারপাশে বাড়ছে এমন মানুষের সংখ্যা, যাঁদের স্মৃতি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা অ্যালঝাইমার্সে আক্রান্ত হচ্ছেন। যে রোগ নিরাময়ের কোনও ওষুধ এখনও নেই। গবেষকদের দাবি, ‘বয়স্ক’ ব্রেনের মানুষদের অ্যালঝাইমার্সে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৩.১ গুণ বেড়ে যায়। যাঁদের ব্রেন চনমনে, তাঁদের এই রোগের সম্ভাবনা থাকে ৭৪ শতাংশ কম।
কী ভাবে ব্রেনকে সতেজ রাখবেন?
কত সাবধানে আপনি রাস্তা পার হচ্ছেন, কত পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছেন— প্রতি দিনের এমনই নানা ছোটখাটো বিষয়ের উপর মস্তিষ্কের ‘বয়স’ নির্ভর করে।
মস্তিষ্ককে সতেজ রাখতে হলে এমন কাজ করতে হবে, যা মন ভাল রাখে। যা উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। এতে মস্তিষ্কে নতুন কোষও গড়ে উঠতে পারে।
পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার উপরে অনেকাংশে নির্ভর করে ব্রেনের ‘স্বাস্থ্য’। যাঁরা ফল, সব্জি, মাছ, বাদাম জাতীয় প্রোটিনযুক্ত খাবার খান, তাঁদের স্মৃতিশক্তি সতেজ থাকে।
মস্তিষ্কের খাতিরে পেশিকেও সবল রাখা জরুরি। নিয়মিত ব্যায়াম করলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে রক্ত সরবরাহ বেশি হয়। যেখান থেকে মানুষ চিন্তা করে, সেখানেও অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত দ্রুত পৌঁছে যায় ব্যায়ামের ফলে।
উচ্চ রক্তচাপ মস্তিষ্ককে দুর্বল করে তুলতে পারে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাই প্রয়োজন ব্যায়াম, মানসিক চাপমুক্ততা এবং ভাল খাবার। দিনে দু’পেগের বেশি মদ খাওয়া উচিত নয়।
রক্তে শর্করার মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে। ডায়াবেটিস থাকলে স্মৃতিভ্রংশতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা, কম ডোজ়ের অ্যাসপিরিন নেওয়া মস্তিষ্কের বুড়িয়ে যাওয়া রুখে দিতে সক্ষম। সেই সঙ্গে যে কোনও প্রকার তামাকজাত দ্রব্য অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি মস্তিষ্ককে সতেজ রাখার অন্যতম চাবিকাঠি। গবেষণা বলছে, যাঁরা একা একা থাকেন, একা একাই চিন্তা করেন, তাঁদের মস্তিষ্কের ‘বয়স’ হয়ে যায় তাড়াতাড়ি। কিন্তু যাঁরা সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকেন, নিজের চিন্তা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেন, তাঁদের মস্তিষ্ক বেশি দিন চনমনে থাকে।
মেয়েদের কি অঙ্কে ‘মাথা’ কম?
বছর সাতেক আগে ফ্রান্সের স্কুলস্তরের প্রায় ২৫ লক্ষ ছেলে ও মেয়ের গাণিতিক দক্ষতা নিয়ে একটি সমীক্ষা শুরু করেছিল সে দেশের সরকার। সেই সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্যের উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে নতুন গবেষণা।
অনেকেই মনে করেন, মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অঙ্কে ‘কাঁচা’! সত্যিই কি তাই? সত্যিই কি লিঙ্গভেদে অঙ্কের বোঝাপড়াও ভিন্ন হয়? নতুন গবেষণা বলল— না, শৈশবের মস্তিষ্ক ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে অঙ্কে একই রকমের পারদর্শী বা একই রকম দুর্বল। লিঙ্গের নিরিখে কোনও প্রভেদ নেই অঙ্ক বোঝার ক্ষেত্রে।
বছর ২০ বছর আগে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এলিজ়াবেথ স্পেল্ক ঠিক এই কথাটাই জোরের সঙ্গে বলেছিলেন কিছু পরীক্ষানিরীক্ষার উপর ভিত্তি করে। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, বিজ্ঞান ও অঙ্কের প্রতি ঝোঁক কিংবা বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে শারীরিক বা লিঙ্গগত কারণে কোনও পার্থক্য নেই। থাকলে তা শৈশবেই স্পষ্ট হয়ে যেত। ২০০৫ সালে ‘আমেরিকান সাইকোলজিস্ট’ নামে এক জার্নালে সেই প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। সম্প্রতি ‘নেচার’ জার্নালে আবারও এক নতুন গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন স্পেল্ক এবং ইউরোপীয় গবেষকদের একটি দল, যেখানে আগের সিদ্ধান্তের সপক্ষে আরও শক্তিশালী যুক্তি খুঁজে পেয়েছেন তাঁরা। বছর সাতেক আগে ফ্রান্সের স্কুলস্তরের প্রায় ২৫ লক্ষ ছেলে ও মেয়ের গাণিতিক দক্ষতা নিয়ে একটি সমীক্ষা শুরু করেছিল সে দেশের সরকার। সেই সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্যের উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে স্পেল্কদের নতুন গবেষণা।
২০১৮ সালের ওই সমীক্ষা বলছে, প্রাক্প্রাথমিক স্তরের ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে গাণিতিক দক্ষতায় বিশেষ ফারাক নেই। কিন্তু স্কুলে ভর্তি হওয়ার মাত্র চার মাস পর থেকেই দেখা গিয়েছে, অঙ্কে মেয়েদের পিছনে ফেলে সামান্য এগিয়ে গিয়েছে ছেলেরা। ছেলেদের অঙ্কের প্রতি ঝোঁকও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। উঁচু শ্রেণিতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যত সময় পেরিয়েছে, ততই মেয়েদের তুলনায় গণিতে আরও এগিয়ে গিয়েছে সহপাঠী ছেলের দল। কাজেই এর থেকে অনেকেই মনে করতে পারেন, ছেলেদের অঙ্কের ‘মাথা’ মেয়েদের তুলনায় ভাল। অনেকে তেমনটা বিশ্বাসও করেন। কিন্তু স্পেল্কের যুক্তি, তা-ই যদি হয়, তা হলে শিশুকাল কিংবা প্রাক্প্রাথমিক স্তর থেকেই এই ফারাক চোখে পড়া উচিত ছিল। অথচ সমীক্ষা বলছে অন্য কথা! ২৫ লক্ষ শিশুর উপর দীর্ঘ সময় ধরে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছে, প্রাক্প্রাথমিক স্তরে অঙ্কে ছেলে-মেয়ে উভয়েই সমান দক্ষ।
এর আগে ২০০৩ সালে ৪০টি দেশের ২,৭০,০০০ এরও বেশি কিশোর-কিশোরীকে নিয়ে একই ধাঁচের একটি পৃথক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা করেছিলেন নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কেলগ স্কুল অফ ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক পাওলা স্যাপিয়েঞ্জা ও তাঁর সহকর্মীরা। সেই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, মেয়েরা যখন শিক্ষা ও অন্যান্য সামাজিক ক্ষেত্রে ছেলেদের সমান সুযোগসুবিধা পায়, তখন তাদের অঙ্কে প্রাপ্ত নম্বরে তথাকথিত ‘লিঙ্গ বৈষম্য’ও থাকে না। এর থেকেই গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছোন, অঙ্কে কার মাথা কেমন হবে, তা লিঙ্গের উপর নয়, বরং পারিপার্শ্বিক আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পর্কিত। আশ্চর্যজনক ভাবে, যে সব দেশে ছেলে-মেয়েদের সমান সুযোগসুবিধা রয়েছে, সেই দেশগুলিতে এই বৈষম্য নেই। বরং সে সব দেশে কোনও কোনও ক্ষেত্রে অঙ্ক ও বিজ্ঞানে মেয়েরাই ছেলেদেরকে ছাপিয়ে গিয়েছে!
তা হলে পরিসংখ্যান বলছে, শিশুকালে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে গাণিতিক দক্ষতায় কোনও পার্থক্য থাকে না। ফ্রান্সের মতো দেশে একজন ছেলে ও মেয়ের আর্থসামাজিক অবস্থাতেও বড়সড় বৈষম্য নেই। তা সত্ত্বেও সমীক্ষায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা অঙ্কে পিছিয়ে পড়ল কেন? এ নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। এই ফারাক সামাজিক কারণে, মেয়েদের শৈশব থেকে যে ভাবে বড় করে তোলা হয় সেই কারণে, না কি দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাস এর পিছনে রয়েছে, তা নিয়ে মতভেদও রয়েছে। পরিবার তথা সমাজ গোড়া থেকেই ছেলে-মেয়ের মধ্যে যে বৈষম্য তৈরি করে দেয়, তারই প্রভাব শিশুর গাণিতিক দক্ষতায় পড়ে কি না, সে সবও দেখার রয়েছে। তবে তা আপাতত স্পেল্কদের আলোচনার বিষয় নয়। আপাতত শুধু জেনে নেওয়ার ছিল, মেয়েরা ছেলেদের থেকে লিঙ্গগত কারণেই অঙ্কে কাঁচা কি না! উভয়ের মস্তিষ্কে এমন কোনও ফারাক রয়েছে কি না, যা অঙ্ক বোঝায় ফারাক গড়ে দেয়। সেই সম্ভাবনা আবারও নাকচ করে দিল সমীক্ষা।
দুই বাবার সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম!
দুই পুরুষের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে বলে অ্যান্ড্রোজেনেসিস। এই প্রক্রিয়ায় গবেষণাগারে এর আগে দুই পুরুষ ইঁদুর থেকে নতুন ইঁদুরের জন্ম দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। তবে সেই ইঁদুরগুলি নিজেরা সন্তানধারণ করতে পারেনি। এ বার তা-ও সম্ভব হল।
দুই বাবা সন্তানের জন্ম দিয়ে ইতিহাস তৈরি করেছিল। তাদের সেই সন্তান সুস্থসবলও হয়েছিল। দিব্যি খেয়েদেয়ে, হাঁটাচলা করে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু বাধা আসে বংশবিস্তারে। দুই বাবার সন্তান নিজে আর সন্তানের জন্ম দিতে পারছিল না। এত দিনে সেই ‘অসম্ভব’কেও সম্ভব করে দেখালেন বিজ্ঞানীরা! সুস্থ ভাবে সুস্থ সন্তানের জন্ম দিল দুই বাবার সন্তানও। মানুষ নয়, গোটা পরীক্ষাটি আপাতত করা হয়েছে ইঁদুরের উপর। ভবিষ্যতে মানুষের উপরেও এই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা সম্ভব কি না, এই সাফল্যের পর তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
দুই পুরুষের মাধ্যমে সন্তান উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে বলে অ্যান্ড্রোজেনেসিস। এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন সন্তান উত্তরাধিকার সূত্রে কেবল পুরুষের কাছ থেকেই জিনগত উপাদান পেয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় গবেষণাগারে এর আগে দুই পুরুষ ইঁদুর থেকে নতুন ইঁদুরের জন্ম দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। তবে সেই ইঁদুরগুলি নিজেরা সন্তানধারণ করতে পারেনি। চিনের সংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা হাল ছাড়েননি। তাঁরা দুই পুরুষ ইঁদুর থেকে প্রজননক্ষম সুস্থ ইঁদুর তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাতে সম্প্রতি এসেছে সাফল্য। তাঁদের গবেষণাপত্র ২৫ জুন পিএনএএস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
কী ভাবে কী করা হয়েছে?
প্রথমে দু’টি পুরুষ ইঁদুরের থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করেন বিজ্ঞানীরা। তা ইঁদুরের ডিম্বাণুর সঙ্গে মেশানো হয়। এই ডিম্বাণুটি থেকে নিউক্লিয়াসটি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল আগেই। নিউক্লিয়াসেই স্ত্রী-ডিএনএ থাকে। তা সরিয়ে ফেলা হলে স্ত্রী ইঁদুরের বিশেষত্ব আর ওই ডিম্বাণুতে অবশিষ্ট থাকে না। ডিএনএ সম্বলিত নিউক্লিয়াসটি সরিয়ে ফেলার পর দুই পুরুষ ইঁদুরের শুক্রাণু দিয়ে ডিমটিকে নিষিক্ত করা হয়। তৈরি হয় ২৫৯টি ভ্রূণ। নিষেকের প্রক্রিয়াটির জন্য অন্য ইঁদুরের গর্ভ (সারোগেট) ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু ২৫৯-এর মধ্যে মাত্র তিনটি ভ্রূণ থেকে ইঁদুরের জন্ম হয়। তার মধ্যে বাঁচিয়ে রাখা গিয়েছিল দু’টিকে।
এই দুই ইঁদুর প্রাপ্তবয়স্ক হলে অন্যান্য ইঁদুরের সংস্পর্শে আসে এবং যথাসময়ে তারা সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণাপত্রে তাঁরা লিখেছেন, ‘‘অ্যান্ড্রোজেনেসিস পদ্ধতিতে তৈরি ভ্রূণের বিকাশ আরও উন্নত করার চেষ্টা করছি আমরা। দু’টি শুক্রাণু কোষ থেকে প্রাপ্ত জেনেটিক উপাদান ব্যবহার করে আমরা প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রজননক্ষম ইঁদুর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি।’’ গোটা প্রক্রিয়ায় আরও উন্নতি প্রয়োজন, মেনে নিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। দুই পুরুষের শুক্রাণু থেকে নতুন ইঁদুর তৈরিতে সাফল্যের অনুপাত ২৫৯:৩ মাত্র।
কল্যাণীর ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ বায়োমেডিক্যাল জিনোমিকস’-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক পার্থপ্রতিম মজুমদার বলেন, ‘‘যে পদ্ধতিতে দুটি পুরুষ ইঁদুর থেকে নতুন ইঁদুর তৈরি করা হয়েছে, তা স্বাভাবিক পদ্ধতি নয়। দুটি পুরুষ ইঁদুরের থেকে শুক্রাণু নেওয়া হয়েছে। একটি মা ইঁদুরের ডিম্বাণু নেওয়া হয়েছে। সেই ডিম্বাণু থেকে বার করে নেওয়া হয়েছে নিউক্লিয়াস। সাধারণত যৌনজনন পদ্ধতিকে প্রভাবিত করে ইমপ্রিন্টিং কন্ট্রোল রিজন। ক্রোমোজোমের মধ্যে এমন কিছু জিন থাকে, যেগুলি সমলিঙ্গে সন্তানধারণ আটকায়। চিনা বিজ্ঞানীরা এ ক্ষেত্রে সেই বিশেষ জিনগুলিকেই কোনও না কোনও ভাবে সরাতে সক্ষম হয়েছেন। এটা ওঁদের আবিষ্কৃত কোনও পদ্ধতি নয়। আগেই এই পদ্ধতি আবিষ্কার করা হয়েছে। চিনারা সেই পদ্ধতি খুব ভাল ভাবে রপ্ত করেছে। তার ফলও পেয়েছে।’’
নতুন ইঁদুর তৈরিতে শুধুই বাবার অবদান, মা ইঁদুরের কোনও ভূমিকা নেই? পার্থ বলেন, ‘‘সেটা বলা যাবে না। আমরা আমাদের কোষে মাইটোকন্ড্রিয়াগুলি স্বাভাবিক নিয়মেই মায়ের কাছ থেকে পেয়ে থাকি। এই মাইটোকন্ড্রিয়া কিন্তু নিউক্লিয়াসের বাইরে সাইটোপ্লাজমের মধ্যে থাকে। ওঁরা শুধু নিউক্লিয়াস সরিয়েছেন। সাইটোপ্লাজমে হাত দেননি। ফলে নতুন ইঁদুরেও মাইটোকন্ড্রিয়ার মাধ্যমে মায়ের অবদান থেকেই গিয়েছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘তাতেও অবশ্য নতুন ইঁদুরের প্রজননক্ষম হওয়ার কথা নয়। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু স্টেম সেল (স্টেম কোষ) প্রবেশ করানো হয়েছে। কী ভাবে প্রজননক্ষম ইঁদুর তৈরি হল, বিজ্ঞানটা ওঁদের কাছেও খুব স্পষ্ট নয়।’’
বিজ্ঞানীরা প্রায় সকলেই একমত, ইঁদুরে যা সম্ভব হয়েছে, তা ভবিষ্যতে মানুষের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায় কি না, সেই ভাবনার সময় এখনও আসেনি। ইঁদুরের মধ্যেই এই প্রক্রিয়া এখনও অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন। অধিকাংশ প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে আপাতত এই পদ্ধতি ইঁদুরে আরও উন্নত করার দিকেই মন দিতে চান গবেষকেরা। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘‘বর্তমানে এই পদ্ধতির সাফল্যের হার কম। তবে এই আবিষ্কারটি আগামী দিনে স্তন্যপায়ীদের মধ্যে অ্যান্ড্রোজেনেসিসে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।’’
তবে অনেকেই মনে করছেন, দুই পুরুষ থেকে নতুন প্রাণ উৎপাদন সম্ভব হলে আগামী দিনে সমকামী যুগলদের জন্য তা খুশির খবর বয়ে আনবে। সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের হাত ধরে তাঁরাও সন্তানধারণের কথা ভাবতে পারবেন। কিন্তু এখনই সেই পর্যায়ের ভাবনাচিন্তায় নারাজ বিজ্ঞানীরা। পার্থ বলেন, ‘‘ইঁদুরের উপর যে পরীক্ষাটি করা হয়েছে, মানুষের উপর তা করতে দেওয়া হবে বলেই আমি মনে করি না। নীতিগত ভাবে তা সম্ভব নয়। সবথেকে বড় কথা হল, এই প্রক্রিয়া জটিল। এতে বিকৃত শিশুর জন্মের সম্ভাবনাও থেকে যায়। মানুষের ক্ষেত্রে আগামী ৫০ বছরেও এই পদ্ধতির প্রয়োগ আমি দেখতে পাচ্ছি না।’’ ইঁদুরে সাফল্য এলেও অ্যান্ড্রোজেনেসিস নিয়ে আপাতত ধীর গতিতে এগোতে চাইছেন বিজ্ঞানীরা।
মৃতের রাজ্য থেকে ‘ফিরিয়ে আনা হল’ প্রাগৈতিহাসিক মানবীকে!
প্রায় সাড়ে ১০ হাজার বছর আগে মেসোলিথিক যুগের বাসিন্দা ছিলেন ওই মানবী। সে সময় ব্রিটেনের সমারসট এলাকায় বসবাসকারী চেডারম্যানের সঙ্গে ডিএনএ-গত মিল রয়েছে তাঁর।
চোখের রং নীলচে-ধূসর। ত্বক হালকা বাদামি। মুখমণ্ডলে বয়সজনিত বলিরেখার আভাস। কপালে গভীর ভ্রূকুটি! বেলজিয়াম থেকে আবিষ্কার এক প্রাগৈতিহাসিক মানবীর দেহাবশেষের মুখ পুনর্গঠনের পরে এমনই ছবি প্রকাশ করেছেন সে দেশের ঘেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। আর তাতে উঠে এসেছে নানা অভিনব তথ্য।
ঘেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষকদল জানিয়েছে, ডিএনএ ম্যাপিং এবং ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে ওই প্রাগৈতিহাসিক মানবীর ছবি। প্রায় সাড়ে ১০ হাজার বছর আগে মেসোলিথিক (মধ্য-প্রস্তর) যুগের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। সে সময় ব্রিটেনের সমারসট এলাকায় বসবাস ছিল চেডারম্যান জনগোষ্ঠীর। তাঁদের সঙ্গে ডিএনএ-গত মিল রয়েছে ওই নারীর। সাধারণ ভাবে, মেসোলিথিক যুগের অধিকাংশ মানুষের তুলনায় ওই নারীর চোখ বেশি নীলচে। ত্বকও কিছুটা ফর্সা। যেমনটা হত চেডারম্যানের।
গবেষকদলের সদস্য ডি গ্রুথ মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে বলেছেন, ‘‘খুলির গঠন দেখে আমাদের অনুমান, ওই মহিলার বয়স ছিল ৬০ বছরের মধ্যে। চেডারম্যানের মতোই তিনিও ছিলেন উন্নতনাসা।’’ ১৯৮৮-৮৯ সালে ডিনান্টের মার্গাক্স গুহায় মেসোলিথিক যুগের একটি সমাধিস্থলের খোঁজ মিলেছিল। তাতে মোট আট জন নারীর দেহাবশেষ পাওয়া যায়। তার মধ্যেই ছিল ওই মহিলার দেহ। গ্রুথের মতে, বিষয়টি অস্বাভাবিক। কারণ সাধারণ ভাবে সে যুগে পুরুষ, মহিলা এবং শিশুদের জন্য একটি সমাধিক্ষেত্র ব্যবহারেরই রীতি ছিল। তা ছাড়া, দেহাবশেষগুলির বয়স পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, কয়েকশো বছর ধরে ওই গুহা-সমাধিক্ষেত্রটি ব্যবহার করা হত।
সে যুগের ধর্মীয় রীতি মেনে দেহগুলিতে গিরিমাটি মাখানো হয়েছিল। গর্ত বোজাতে ব্যবহার করা হয়েছিল পাথর। সাধারণ ভাবে সে সময় ইউরোপে বসবাসকারী শিকারি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ওই মহিলার ডিএনএ-র সিকোয়েন্স মেলাতে গিয়ে গঠনের স্পষ্ট ফারাক ধরা পড়েছে ঘেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের কাছে। যা নৃবিজ্ঞানীদের একাংশের দীর্ঘদিনের ধারণার বিপরীত। গবেষকদলের প্রত্নতত্ত্ববিদ ফিলিপ ক্রোম্বে বলেন, ‘‘এত দিন পর্যন্ত পশ্চিম ইউরোপে পাওয়া প্রাচীন দেহাবশেষগুলির ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে তাঁরা সকলেই একই জিনগত গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে, যা বেশ আশ্চর্যজনক।’’
গুহামানবের কাল থেকেই ছারপোকা মানুষ ভালবাসে!
মানুষের সঙ্গে ছারপোকাদের প্রাচীন সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে আগেও বিস্তর গবেষণা হয়েছে। তবে জিন প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, আজ থেকে প্রায় ২,৪৫,০০০ বছর আগে মানুষ যখন গুহাবাসী ছিল, তখন থেকেই মানুষের পিছু নিয়েছিল ছারপোকারা।
দেখতে দেখতে সবই কি সত্যি সত্যি বদলে যায়? প্রেম পাল্টায় বটে। শরীরও পাল্টায়। তবে ছারপোকাদের জন্য নয়। সাম্প্রতিকতম গবেষণা বলছে, শুধু মানুষের প্রতিই ছারপোকাদের একনিষ্ঠ প্রেম টিকে রয়েছে প্রায় আড়াই লক্ষ বছর ধরে। আদিম প্রস্তর যুগের গুহামানবদের রক্ত-গন্ধ যে ‘নেশা’ ধরিয়েছিল, তার রেশ ছারপোকার দল বয়ে চলেছে আজও।
মানুষের সঙ্গে ছারপোকাদের প্রাচীন সম্পর্কের এই ইতিহাস নিয়ে আগেও বিস্তর গবেষণা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গিয়েছে, সেই সম্পর্ক আড়াই লক্ষ বছরের পুরনো। জিন প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, আজ থেকে প্রায় ২,৪৫,০০০ বছর আগে মানুষ যখন গুহাবাসী ছিল, তখন থেকেই মানুষের পিছু নিয়েছিল ছারপোকারা। তার আগে ছারপোকারা গুহায় থাকা বাদুড়দের রক্ত খেত। বাদুড়রাই ছিল তাদের খাদ্যের একমাত্র উৎস। তার পর এক দিন ছারপোকারা বাদুড়ের গুহাতেই থাকা নিয়ান্ডারথাল মানুষদের রক্তের স্বাদ পেয়ে যায়! সেই শুরু। তার পর থেকে ক্রমে ছারপোকারা দু’টি স্বতন্ত্র প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি প্রজাতি শুধু বাদুড়ের রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। অন্যটি শুধুই মানুষের রক্ত খায়।
সাম্প্রতিক এই গবেষণাটি ‘বায়োলজি লেটার্স’ নামে এক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গুহাবাসী মানুষ যখন যাযাবরের জীবন যাপন করতে শুরু করেছিল, তখন থেকে ছারপোকারাও সংখ্যায় কমতে শুরু করে। তার পর এক সময় যাযাবর মানুষ বসতি স্থাপনের দিকে ঝোঁকে। তখনই ফের হুহু করে বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে ছারপোকারা। সেও আজ থেকে প্রায় ১৩,০০০ বছর আগের কথা! পরবর্তীতে ক্রমে ক্রমে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে একে একে সভ্যতা গড়ে তোলে মানুষ। শুরু হয় নগরায়ন। ব্যাস, সংখ্যায় আরও বাড়তে থাকে ছারপোকারা।
ভার্জিনিয়া টেকের আর্বান এন্টোমোলজি বিভাগের অধ্যাপক ওয়ারেন বুথের কথায়, ‘‘বাগানে কিন্তু ছারপোকাদের দেখা মেলে না। কারণ, এরা বংশবিস্তারের জন্য সম্পূর্ণরূপে মানুষের উপর নির্ভরশীল।’’ এন্টোমোলজি হল জীববিদ্যার একটি শাখা, যেখানে মূলত কীটপতঙ্গ নিয়ে গবেষণা করা হয়। একই বিভাগের আর এক গবেষক লিন্ডসে মাইল্স বলেন, ‘‘অতীতে মানুষ যখনই বসতি গড়ে থিতু হয়েছে, তখনই উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে গিয়েছে ছারপোকাদের সংখ্যা। ছারপোকাদের জন্য এ যেন এক চুক্তির মতো!’’
ছারপোকার এই বিবর্তনের ইতিহাস জানা গিয়েছে ডিএনএ-র জিনোম বিশ্লেষণ করে। তবে এই গবেষণা শুধু মানুষ এবং ছারপোকাদের সম্পর্কই নয়, বরং সামগ্রিক ভাবে কীটপতঙ্গদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উপরেই আলোকপাত করতে সাহায্য করবে বলে মনে করছেন ভার্জিনিয়া টেকের বিজ্ঞানীরা। কারণ, সেই আদিমকাল থেকেই মানবসভ্যতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে থেকেছে এরাও। কখনও কখনও তার মাসুলও গুনতে হয়েছে মানুষকে। ঠিক যেমনটা হয়েছিল বিউবোনিক প্লেগের সময়, যখন ইঁদুরের ত্বকে থাকা সংক্রামিত খুদে পোকা থেকে মানুষের মধ্যেও এই রোগ ছড়িয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ গিয়েছিল সেই মারণরোগে। গবেষণাপত্রটির আর এক লেখক ব্রায়ান ভেরেলির কথায়, নতুন এই গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে, জার্মান তেলাপোকা কিংবা কালো ইঁদুরদের থেকেও হাজার হাজার বছর আগে মানুষের সঙ্গে ছারপোকাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তবে পার্থক্য এটাই যে, ছারপোকারা কোনও রোগ ছড়ায়নি, মানুষের তেমন কোনও ক্ষতিও করেনি। ভেরেলি ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান সংক্রান্ত পরিসংখ্যানবিদ। তিনি বলেন, ‘‘এই গবেষণা থেকে প্রমাণ হয়, ছারপোকাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কতটা দীর্ঘ এবং দৃঢ় ছিল! এরা কিন্তু যে কোনও সময় মানুষকে ছেড়ে লাফিয়ে অন্য কোনও প্রাণীর শরীরে আশ্রয় নিতে পারত, কিন্তু তেমনটা তারা করেনি।’’
জার্মানির টিউবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্লাউস রেনহার্ড-ও জানাচ্ছেন, আজ থেকে প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে যখন আদিম মানুষ গুহাজীবন ছেড়ে যাযাবরের জীবন বেছে নেয়, সে সময় সত্যিই ভয়ানক এক জিনগত বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল ছারপোকাদের। সে সময় ছারপোকাদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছিল। এর অবশ্যম্ভাবী ফল ছিল আন্তঃপ্রজনন, অর্থাৎ জিনগত ভাবে সম্পর্কিত দুই প্রাণীর প্রজনন। তাতে ছারপোকাদের জিনগত বৈচিত্র্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদতে দেখা যায়, এতে ছারপোকাদের বিশেষ ক্ষতি হয়নি! শুধু তা-ই নয়, ছারপোকাদের আরও নানা ভাল দিক উল্লেখ করেছেন রেনহার্ড। তিনি বলেন, ‘‘ছারপোকারা খাবার না খেয়ে এক বছরেরও বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে। একটি গর্ভবতী স্ত্রী ছারপোকাকে বাক্সবন্দি করে রাখলেও সে মাত্র ছ’মাসে ৩০,০০০-এরও বেশি সন্তান উৎপাদন করতে পারে, যার প্রত্যেকটিই জিনগতভাবে সম্পর্কিত! এমনকি, এরা এতই ভাল যে, রক্ত খাওয়ার আগে তারা মানুষের ত্বককে অসাড় করার জন্য এক প্রকার তঞ্চনরোধক প্রবেশ করিয়ে দেয়, যাতে ব্যথা না লাগে!’’
ভারত, পাকিস্তান থেকে আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, ইজ়রায়েল, ইরান... ছারপোকাদের বাস সর্বত্র। আমেরিকায় ছারপোকা নিয়ে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত চলে। ছারপোকা সংক্রান্ত আইনও রয়েছে নিউ ইয়র্কে। তবে যত যা-ই হোক, ছারপোকাদের মতো নাছোড়বান্দা প্রেমিকের হাত থেকে মানুষের মুক্তি নেই। আড়াই লক্ষ বছরের সম্পর্ক বলে কথা!
সাপেরও টিমওয়ার্ক আছে!
দীর্ঘদিন ধরে সাপকে আমরা এমন এক শিকারি প্রাণী হিসেবেই জেনে এসেছি, যারা একা থাকে, একা চলাফেরা করে এবং একাই শিকার ধরে। সরীসৃপবিদ্যা ও অ্যানিমাল বিহেভিয়ারে সাপকে সাধারণত সলিটারি প্রেডেটর বা একাকী শিকারি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। তাদের জীবনধারা, শিকারের কৌশল এবং স্নায়ুতন্ত্রের গঠন সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা এতদিন ধরে বিশ্বাস করে এসেছেন যে সাপেদের মধ্যে সহযোগিতামূলক বা দলবদ্ধ শিকারের মতো জটিল আচরণ নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ এই ধারণাকে মৌলিকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে অন্তত একটি সাপ প্রজাতি আছে যারা প্রয়োজন হলে একা নয়, বরং দলবদ্ধভাবে, পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে শিকার করে। এই সাপটি হলো কিউবান বোয়া, যার বৈজ্ঞানিক নাম Chilabothrus angulifer। এটি কিউবার স্থানীয় একটি নির্বিষ বোয়া প্রজাতি, যা বনাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং বিশেষভাবে চুনাপাথরের গুহা অঞ্চলে বসবাস করে। এই চুনাপাথরের গুহাগুলোয় আবার বিশাল বাদুড় কলোনির আবাস, যা কিউবান বোয়ার প্রধান খাদ্য উৎসগুলোর একটি।
কিউবার অনেক গুহায় হাজার হাজার বাদুড় (Fruit bats) একসঙ্গে বাস করে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ও ভোরের সময় এই বাদুড়েরা দল বেঁধে গুহা থেকে বের হয় এবং আবার ফিরে আসে। এই সময়টিই শিকারির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, ঠিক এই সময়েই একাধিক কিউবান বোয়া গুহার মুখে উপস্থিত হয়। প্রথম নজরে এটি স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে, কারণ যেখানে শিকার প্রচুর, সেখানে একাধিক শিকারির একত্রিত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু দীর্ঘ ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে বোঝা যায়, এই সহাবস্থান মোটেই কাকতালীয় নয়। সাপগুলো গুহার মুখে এলোমেলোভাবে অবস্থান নেয় না, বরং তারা নিজেদের শরীর এমনভাবে স্থাপন করে যে গুহার প্রবেশপথ কার্যত একটি ব্যারিকেডে পরিণত হয়। প্রতিটি সাপ অন্য সাপের অবস্থান বিবেচনা করে নিজের জায়গা বেছে নেয়, যাতে বাদুড়দের উড়ানের পথ সর্বাধিকভাবে সংকুচিত করা যায়। ফলে গুহা থেকে বের হওয়ার সময় বাদুড়েরা স্বাভাবিক গতি ও দিক বজায় রাখতে পারে না। এই বিভ্রান্ত ও বাধাগ্রস্ত অবস্থাতেই তারা সাপেদের সহজ শিকারে পরিণত হয়। এখানে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি সাপ কেবল নিজের সুবিধার জন্য কাজ করছে না! বরং পুরো শিকার প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সংগঠিত হয় যে একাধিক সাপের সম্মিলিত উপস্থিতিতে শিকার ধরার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই আচরণকে প্রাণীবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় cooperative hunting বা সমবায়ী শিকার। এর অর্থ হলো, একাধিক শিকারি পরস্পরের অবস্থান ও ভূমিকা বিবেচনা করে এমনভাবে কাজ করে, যাতে প্রত্যেকের শিকারের সাফল্য বৃদ্ধি পায়। সাধারণত cooperative hunting স্তন্যপায়ী প্রাণী ,কিছু মাছ,বা কিছু পাখির মধ্যে দেখা যায়, যেমন নেকড়ে, সিংহ, হায়না কিংবা ডলফিন, পেঙ্গুইন, ঈগল। সাপের মতো সরীসৃপের মধ্যে এমন আচরণ প্রায় অজানা ছিল। এই কারণেই কিউবান বোয়ার এই আচরণ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে সাপদের আচরণগত ক্ষমতা আমাদের পূর্বধারণার তুলনায় অনেক বেশি জটিল।
গবেষকদের মতে, এই আচরণ কোনো সামাজিক বন্ধন বা পারিবারিক সম্পর্কের ফল নয়। কিউবান বোয়ারা সামাজিক প্রাণী নয় এবং তাদের মধ্যে স্থায়ী দল গঠনের প্রমাণও নেই। এটি মূলত পরিবেশগত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি কৌশল। যেখানে শিকার প্রচুর এবং শিকার ধরার জন্য একাধিক সাপের উপস্থিতি কার্যকর, সেখানে তারা সহাবস্থান ও সমন্বয় মেনে নেয়। অর্থাৎ এটি সামাজিকতা নয়, বরং টিকে থাকার জন্য গড়ে ওঠা একটি আচরণগত অভিযোজন। এই পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায় যে সাপের আচরণগত ক্ষমতা আমরা এতদিন যতটা সরল ভেবেছি, বাস্তবে তা ততটা সীমাবদ্ধ নয়। সাপের মস্তিষ্ক তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও তারা পরিবেশ থেকে তথ্য নিতে পারে, অন্য সাপের উপস্থিতি বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী নিজের আচরণ সামঞ্জস্য করতে পারে।
এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। প্রথমত, এটি সাপ সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। দ্বিতীয়ত, এটি প্রমাণ করে যে সরীসৃপদের আচরণগত বৈচিত্র্য এখনও পুরোপুরি অনাবিষ্কৃত। তৃতীয়ত, এটি প্রাণী আচরণ বিবর্তনের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেখায় যে সহযোগিতামূলক শিকার কেবল স্তন্যপায়ী বা উচ্চবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়! সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই গবেষণা আমাদের শেখায় প্রকৃতি সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়া বিপজ্জনক। যে প্রাণীকে আমরা সহজ, নিম্নস্তরের বা বুদ্ধিহীন প্রাণী বলে ভাবি, প্রকৃতি বারবার প্রমাণ করে দেয় যে বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কিউবান বোয়া এই আচরণের মাধ্যমে আমাদের জ্ঞানের সীমাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
এই কারণে কিউবান বোয়া আজ শুধু একটি সাপ নয়, বরং Ethology তে একটি মাইলফলক। সত্যি বলতে, প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর মধ্যেই এমন কিছু গল্প লুকিয়ে আছে, যা আমরা এখনো পুরোপুরি শুনে উঠতে পারিনি।
AditiPrakritikannya
ব্র্যাজেন বুল
প্রাচীন গ্রীসে একসময় তৈরি হয়েছিল এমন একটি যন্ত্র, যার কথা শুনলেই শরীর শিউরে ওঠে। এটার নাম ব্র্যাজেন বুল (Brazen Bull)। দেখতে ছিল একদম ধাতুর তৈরি বিশাল ষাঁড়ের মতো। ভেতরটা ফাঁপা, পাশের দিকে একটি দরজা।
নির্মাতা ছিলেন একজন দক্ষ ব্রোঞ্জ কর্মী, পেরিল্লোস। তিনি এমনভাবে ভেতরে নল আর চোঙের ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে ভেতরে থাকা মানুষের আর্তনাদ বাইরে বেরিয়ে আসে এক ক্ষুব্ধ ষাঁড়ের গর্জনের মতো।
ভেতরে কাউকে ঢুকিয়ে এরপর বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হতো। তারপর মূর্তির নিচে আগুন ধরানো হতো। ব্রোঞ্জের শরীর ধীরে ধীরে গরম হতে হতে ভয়ংকর লাল হয়ে উঠত। ভিতরের মানুষ পু*ড়ে যেতে থাকত; তাপে, দমবন্ধ হয়ে, মৃত্যুর দিকে অসহায়ভাবে এগোতে থাকত।
পেরিল্লোস ভেবেছিলেন, তার এই সৃষ্টি দেখে শাসক ফ্যালারিস বোধহয় খুশি হবেন। কিন্তু নিষ্ঠুর ফ্যালারিসের মনে ছিল অন্য পরিকল্পনা। তিনি পেরিল্লোসকে বললেন, “তুমি নিজেই ভেতরে ঢুকে দেখাও, কীভাবে শব্দ বের হয়।” পেরিল্লোস ভেতরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো। তারপর জ্বলে উঠল আগুন। আর এভাবেই নিজের বানানো ভয়ংকর যন্ত্রের প্রথম শিকার হলেন তিনিই
আনন্দ ও মুসলমান
“মুসলমান গান গাইবে না, ছবি আঁকবে না, এককথায় মনোরঞ্জনকর ললিতকলার কোনো সংশ্রবেই থাকবে না। মুসলমান পুরুষেরা কেবল কাজ করবে, আর ঘর শাসন করবে; মেয়েরা কেবল রাঁধবে, বাড়বে, আর বসে বসে স্বামীর পা টিপে দিবে;- তা’ছাড়া খেলাধুলা, হাসি-তামাসা বা কোনও প্রকার আনন্দ তারা করবে না। সবসময় আদব-কায়দা নিয়ে দুরস্ত হয়ে থাকবে।
আনন্দ? কোথায় আনন্দ? কী হবে আনন্দে? মুসলমান তো বেঁচে থাকতে আনন্দ করে না, সে মরে গিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করে পেট ভরে খাবে, আর হুরপরীদের নিয়ে অনন্তকাল ধরে আনন্দ করবে। ব্যস! এই তার সান্ত্বনা!
গৃহে যখন আমাদের থাকতেই হবে, তখন আমরা এর সংস্কারে লেগে যাই না কেন? সমাজকে যখন আমরা বাদ দিতে পারি না, তখন একে সরস শোভন এবং আনন্দময় করেই গড়ে তুলি না কেন?”
উৎস: প্রবন্ধ “আনন্দ ও মুসলমান গৃহ” , কাজী মোতাহার হোসেন।
প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়:
প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় বা সংক্ষেপে তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ধু নদের তীরে অবস্থিত বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাবের গান্ধার রাজ্যের তক্ষশীলায় প্রাকৃত, সংস্কৃত, জৈন এবং বৈদিক ঐতিহ্যের গুরুকুল শিক্ষা ব্যবস্থার একটি কেন্দ্র ছিল। এটি জৈন শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে শুরু হয়েছিল এবং খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে এটি ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ পাণ্ডিত্যেরও একটি বিশিষ্ট কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
তক্ষশীলার প্রাথমিক ইতিহাস:
প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক প্রমাণ থেকে জানা যায় যে, তক্ষশীলা বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভের আগে থেকেই জৈন ধর্মের সাথে সম্পর্কিত ছিল। স্যার জন মার্শালের সিরকাপে খননকাজ থেকে অসংখ্য ছোট-বড় মন্দিরের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে কিছুকে তিনি মথুরার কঙ্কলি টিলার মতো স্থানের স্থাপত্যিক মিলের ভিত্তিতে জৈন মন্দির হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মার্শাল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে সিরকাপের "এফ" এবং "জি" ব্লকের মন্দিরগুলি জৈন মন্দির ছিল, যা ঐতিহ্যকে সমর্থন করে যে তক্ষশীলা জৈন ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। জৈন সাহিত্যিক ঐতিহ্য অনুসারে, এই স্থানটি একসময় ৫০০টিরও বেশি জৈন মন্দির স্থাপন করেছিল এবং জৈন শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল।
৫৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আকেমেনীয়দের সিন্ধু উপত্যকা দখলের পর, তক্ষশীলা তাদের হিন্দু রাজ্যশাসনের (প্রদেশ) রাজধানীতে পরিণত হয়; প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি এই সময়ের মধ্যে পাওয়া যায়। ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শহরটি আলেকজান্ডারের কাছে আত্মসমর্পণ করে, ৩১৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে মৌর্য সাম্রাজ্যে সংযুক্ত হয়, ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ইন্দো-গ্রীক রাজ্যের অংশ হয়ে ওঠে, ৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ইন্দো-সিথিয়ানরা এটিকে সংযুক্ত করে, জয়লাভ করে, ধ্বংস করে এবং ৩০ খ্রিস্টাব্দের দিকে কুষাণ সাম্রাজ্য দ্বারা একটি নতুন শহর প্রতিষ্ঠিত হয়, বৌদ্ধ শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়, জয়লাভ করে, ধ্বংস করে এবং ৫ম শতাব্দীতে হুণদের দ্বারা পরিত্যক্ত স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তক্ষশীলা ছিল এশিয়ার প্রধান বাণিজ্য পথের সংযোগস্থলে এবং সম্ভবত ভারতীয়, পারস্য, গ্রীক, সিথিয়ান এবং আকেমেনীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশ থেকে আগত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর দ্বারা অধ্যুষিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ-তৃতীয় শতাব্দীর বৌদ্ধ জাতক কাহিনী অনুসারে, তক্ষশীলা সেই স্থান যেখানে আরুণি এবং তার পুত্র শ্বেতকেতু শিক্ষা লাভ করেছিলেন, অন্যদিকে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর ব্যাকরণবিদ, পাণিনি তার অষ্টাধ্যায়ী এই শহরের কথা উল্লেখ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়:
জন মার্শালের মতে, "উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম প্রবেশদ্বারে" ভৌগোলিক অবস্থান এবং "এর জনসংখ্যার বিশ্বজনীন চরিত্র" এর কারণে পারস্য বিজয়ের পর তক্ষশীলা শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক এবং পাঠ্য প্রমাণ থেকে জানা যায় যে এটি জৈন শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত, অন্যান্য শ্রমণ ঐতিহ্যের পাশাপাশি এই স্থানে জৈন মন্দির এবং সন্ন্যাসীরা উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে এটি ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ শিক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফ্রেজিয়ার এবং ফ্লাডের মতে, শিক্ষার অত্যন্ত সুশৃঙ্খল মডেলটি এই স্থানে একটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছিল, যা শ্রমণ এবং বৈদিক ঐতিহ্য উভয়কেই ধারণ করেছিল। এবং পরবর্তীতে নালন্দা (খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দীর মাঝামাঝি), ওদন্তপুরী (খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দীর শেষের দিকে) এবং বিক্রমশিলা (খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দীর শেষের দিকে) এই ঐতিহ্য ধারণ করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলি কেবল ধর্মীয় গ্রন্থই নয়, অঙ্গ বা বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন তাত্ত্বিক শাখাও পড়াত। যার মধ্যে ভাষাবিজ্ঞান, আইন, জ্যোতির্বিদ্যা এবং যুক্তির মতো শাখা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তক্ষশীলা চিকিৎসাবিদ্যা এবং শিল্পকলার জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত ছিল, তবে এখানে ধর্মীয় এবং ধর্মনিরপেক্ষ উভয় বিষয়ই পড়ানো হত, এমনকি ধনুর্বিদ্যা বা জ্যোতিষশাস্ত্রের মতো বিষয়ও পড়ানো হত।
জন মার্শালের মতে, "প্রাথমিক বৌদ্ধ সাহিত্যে, বিশেষ করে জাতকদের মধ্যে তক্ষশীলাকে প্রায়শই একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীরা গণিত ও চিকিৎসা থেকে শুরু করে ধর্মীয় বা ধর্মনিরপেক্ষ, এমনকি জ্যোতিষশাস্ত্র এবং তীরন্দাজবিদ্যা পর্যন্ত প্রায় যেকোনো বিষয়ে শিক্ষা লাভ করতে পারত।" খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় এবং দ্বিতীয় শতাব্দীতে মৌর্য সাম্রাজ্য এবং গ্রীক শাসনের (ইন্দো-গ্রিক) অধীনে জ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে তক্ষশীলার ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে এটি জৈন, ব্রাহ্মণ্য এবং বৌদ্ধ পাণ্ডিত্যেরও একটি বিশিষ্ট কেন্দ্র ছিল।
আধুনিক অর্থে এটি কোনও বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, কারণ সেখানে বসবাসকারী শিক্ষকদের কোনও নির্দিষ্ট কলেজের সরকারী সদস্যপদ নাও থাকতে পারে, যা পরবর্তীকালে বিহারের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে ছিল।
৫ম শতাব্দীতে তোরামান কর্তৃক ধ্বংসের ফলে শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে তক্ষশীলার কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায় বলে মনে হয়।
শিক্ষক:
তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব প্রভাবশালী শিক্ষক ছিলেন বলে জানা গেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন:
মহাবীরের প্রধান শিষ্য ইন্দ্রভূতি গৌতমকে তক্ষশীলার সাথে যুক্ত বলে মনে করা হয়।
পাণিনি, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর ব্যাকরণবিদ, সম্ভবত গান্দার অঞ্চল থেকে।
মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর প্রভাবশালী রাজা চাণক্যও তক্ষশীলায় শিক্ষকতা করতেন বলে জানা যায়।
খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এবং ভ্রমণকারী ইউয়ান চোয়াং-এর মতে, সৌত্রান্তিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা কুমারালাত তক্ষশীলার একজন চমৎকার শিক্ষকও ছিলেন এবং চীন পর্যন্ত দূর থেকে ছাত্রদের আকৃষ্ট করতেন।
শিক্ষার্থীবৃন্দ:
জৈন আখ্যান থেকে আরও জানা যায় যে মহাবীর এবং তাঁর কিছু শিষ্য তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চলে সময় কাটিয়েছিলেন এবং জৈন ছাত্ররা হয়তো স্থানটি একটি প্রধান বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হওয়ার আগে সেখানে পড়াশোনা করতেন।
স্টিফেন ব্যাচেলরের মতে, বুদ্ধ হয়তো বিদেশী রাজধানী তক্ষশীলায় তাঁর নিকটতম অনুসারীদের অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। বুদ্ধের বেশ কয়েকজন সমসাময়িক এবং ঘনিষ্ঠ অনুসারী তক্ষশীলায় পড়াশোনা করেছেন বলে জানা যায়,
যথা:
বুদ্ধের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কোশলের রাজা পাসেনদি,
পাসেদানীর সেনাবাহিনীর সেনাপতি বান্ধুলা
বুদ্ধের ঘনিষ্ঠ অনুসারী অঙ্গুলীমাল। অঙ্গুলীমাল (যাকে অহিংসকও বলা হত এবং পরে বুদ্ধের ঘনিষ্ঠ অনুসারী) সম্পর্কে একটি বৌদ্ধ গল্প বর্ণনা করে যে কীভাবে তার বাবা-মা তাকে একজন সুপরিচিত শিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করার জন্য তক্ষশীলায় পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি পড়াশোনায় পারদর্শী হন এবং শিক্ষকের প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন, তার শিক্ষকের বাড়িতে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করেন। তবে, অন্যান্য ছাত্ররা অহিংসকের দ্রুত অগ্রগতিতে ঈর্ষান্বিত হয় এবং তার গুরুকে তার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়। এই উদ্দেশ্যে, তারা এমনভাবে মনে করে যেন অহিংসক গুরুর স্ত্রীকে প্রলুব্ধ করেছে।
জীবক, রাজগৃহের রাজসভার চিকিৎসক এবং বুদ্ধের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। ভারতীয় "ঔষধের জনক" এবং আয়ুর্বেদের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ চরকও তক্ষশীলায় পড়াশোনা করেছিলেন এবং সেখানেই অনুশীলন করেছিলেন বলে জানা যায়।
বৌদ্ধ সাহিত্যে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মতে, মৌর্য সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, যদিও মগধের পাটনার (বিহার) কাছে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, চাণক্য তাকে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার জন্য তক্ষশীলায় নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানে তাকে সামরিক বিজ্ঞান সহ "সমস্ত বিজ্ঞান ও শিল্পকলায়" শিক্ষিত করেছিলেন। সেখানে তিনি আট বছর পড়াশোনা করেছিলেন। গ্রীক এবং হিন্দু গ্রন্থগুলিতে আরও বলা হয়েছে যে কৌটিল্য (চাণক্য) উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশের বাসিন্দা ছিলেন এবং চন্দ্রগুপ্ত আট বছর ধরে তাঁর আবাসিক ছাত্র ছিলেন। এই বিবরণগুলি প্লুতার্কের এই দাবির সাথে মিলে যায় যে পাঞ্জাবে অভিযান চালানোর সময় মহান আলেকজান্ডার তরুণ চন্দ্রগুপ্তের সাথে দেখা করেছিলেন।
তথ্য সংগ্রহ: মৃণাল নন্দী
কন্যাসন্তান আসলে মায়েরই আরেক রূপ
অনেক দিন আগের কথা। ইতালির রোম নগরীতে অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটেছিল। শহরের প্রহরীরা সিমন নামে এক বৃদ্ধকে রুটি চুরির অভিযোগে আটক করে। বিচারে সিমনকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হয়। মৃত্যুবরণ না করা পর্যন্ত অনাহারে কারারুদ্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় তাকে।
বৃদ্ধের যুবতী মেয়ে পেরো বাবার এই নিষ্ঠুর পরিণতি মেনে নিতে পারেনি। সে পোশাকের ভেতর খাবার লুকিয়ে দেখা করতে যায় তার বাবার সাথে। কিন্তু কারারক্ষীরা তার দেহ তল্লাশি করে খাবারগুলো কেড়ে নেয়। আর তাকে এই বলে সতর্ক করে যে, এরপর যদি এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে তাকে আর তার বাবার সাথে দেখা করতে দেওয়া হবে না!
পিতা অন্তঃপ্রাণ পেরো ভিতরে গিয়ে দেখে তার বাবার হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। ক্ষুধা তৃষ্ণায় ছটফট করছেন তিনি। এমন করুণ দৃশ্য দেখার পর সদ্য মা হওয়া পেরো আর সহ্য করতে পারে না। বাবাকে বাঁচাতে তখনই নিজের বুকের দুধ পান করায় পেরো। এতে কিছুটা বল ফিরে পায় বৃদ্ধ।
বাবার জীবন রক্ষা করার তীব্র আকুলতা থেকে দিনের পর দিন এই কাজ করে যেতে থাকে পেরো। এদিকে দীর্ঘদিন অভুক্ত থাকার পরও সিমন কেন মারা যাচ্ছে না তা সবাইকে ভাবিয়ে তোলে। অবশেষে একদিন হাতেনাতে ধরা পড়ে যায় পেরো।
কালবিলম্ব না করে উভয়কে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। বিচারসভায় রোমের বিচারকগণ পুরো ঘটনা জেনে চরম বেদনা অনুভব করেন। ব্যাপারটিকে তারা মানবতার এক অনন্য এক দৃষ্টান্ত বলে রায় দেন। রায়ের পর শাসকগোষ্ঠীর মনে মানবতাবোধ জাগ্রত হয়। এরপর পেরো এবং তার বাবাকে বন্দীদশা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
হৃদয় নাড়া দেওয়া এই ঘটনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এত বছর পর আজও একটি মেয়ের তার বাবার প্রতি ভালোবাসা কতটা গভীর তার আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয় পেরোকে। এবং সেই থেকে এই কথাটিও সর্বজন স্বীকৃত হয়ে যায় যে, কন্যাসন্তান আসলে মায়েরই আরেক রূপ! সৌজন্যে-বৈজয়ন্ত বি. ভি.
নূরজাহান: যে নারী সম্রাটকেও নিজের হাতে বন্দি করেছিলেন! সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রেম, রাজনীতি ও উত্তরাধিকার—এক অমর কাহিনি ১৬০৭ সালের এক রক্তাক্ত দিনে, বাংলার বর্ধমানের জায়গিরদার শের আফগান নিহত হলেন। তার তরুণী বিধবা স্ত্রী মেহের-উন-নিসা, কোলে ছোট্ট কন্যা লাডলী বেগম নিয়ে আশ্রয় নিলেন মুঘল দরবারে। কে জানত, এই নারী একদিন পুরো সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেবেন!
বছর চারেক পর, রাজমহলের “মীনা বাজারে” সম্রাট জাহাঙ্গীরের চোখ পড়ে মেহের-উন-নিসার ওপর। এক মুহূর্তেই রাজা হারিয়ে ফেললেন রাজনীতি, ক্ষমতা আর বুদ্ধি —
তিনি পেলেন প্রেম। জাহাঙ্গীর তাকে বিয়ে করে নাম দিলেন ‘নূরজাহান’ — পৃথিবীর আলো। এরপর থেকে মুঘল দরবারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি নীতি, এমনকি প্রতিটি নিঃশ্বাসেও ছিল এই নারীর ছাপ।
ইতিহাসবিদ ভিনসেন্ট স্মিথ লিখেছিলেন —
> “She was the power behind the throne.” অর্থাৎ, সিংহাসনের পেছনের আসল শক্তি ছিলেন নূরজাহান।
তিনি শুধু সুন্দরী ছিলেন না, ছিলেন তীক্ষ্ণবুদ্ধি, শিল্পপ্রেমী ও রাজনীতিতে অদম্য কৌশলী। জাহাঙ্গীরের নির্দেশের চেয়ে তার নির্দেশই ছিল চূড়ান্ত।
তার নাম ও প্রতিকৃতি ছাপা হয়েছিল রাজমুদ্রায়ও — ইতিহাসে বিরল ঘটনা!
নূরজাহানের প্রভাবে তার পিতা ইতিমাদ-উদ-দৌলা ও ভাই আসফ খান রাজদরবারে উঁচু পদে উন্নীত হন।
আর মেয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে তিনি নিজের কন্যা লাডলী বেগমের বিয়ে দেন জাহাঙ্গীরের পুত্র শাহরিয়ারের সঙ্গে।
এইভাবেই তিনি ক্ষমতার জাল বুনেছিলেন নিঃশব্দে — কিন্তু গভীরভাবে।
তবে, সেই প্রভাবই শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যে বিদ্রোহের বীজ বপন করেছিল — শাহজাদা খুররম (পরবর্তীতে শাহজাহান) এবং মহব্বত খান উভয়েই বিদ্রোহ করেন সম্রাটের বিরুদ্ধে। এভাবে ভালোবাসা ও রাজনীতির দ্বন্দ্বে জাহাঙ্গীরের সাম্রাজ্য কেঁপে ওঠে।
১৬২৭ সালে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর নূরজাহান রাজনীতি ছেড়ে লাহোরে ফিরে যান। সেখানে নিঃশব্দে কাটান জীবনের শেষ দিনগুলো।
১৬৪৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন —কিন্তু তার নাম আজও ইতিহাসে অমর,
কারণ তিনি ছিলেন সেই নারী, যিনি এক সম্রাটকে নিজের ভালোবাসার রাজ্যে বন্দি করেছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীর: ভালোবাসা, ন্যায়বিচার ও শিল্পের সম্রাট
ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ বলেছিলেন —> “জাহাঙ্গীর ছিলেন মুঘল ইতিহাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব।”
তিনি একদিকে ছিলেন রুচিশীল, শিল্পপ্রেমী ও কবি-মনস্ক, অন্যদিকে মদ্যপান, খামখেয়ালিপনা আর বিলাসিতায় ডুবে থাকা মানুষ।
ইতিহাসবিদরা বলেন, তার চরিত্র ছিল "kindness and cruelty, justice and whim, refinement and brutality" —
অর্থাৎ দয়া ও নিষ্ঠুরতা, ন্যায় ও খামখেয়ালিপনার অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
শাসক হিসেবে: তিনি পিতার নীতি অনুসরণ করেন, রাষ্ট্রে শান্তি ও স্থিতি বজায় রাখেন,
আর ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে উঠেন “বিচার ঘণ্টা” স্থাপন করে — যা টানলেই প্রজারা সরাসরি সম্রাটের কাছে বিচার চাইতে পারত।
শিল্প ও সাহিত্যপ্রেম: জাহাঙ্গীর নিজে ছিলেন একজন কৃতী চিত্রশিল্পী।
তার দরবারে জন্ম নেয় ভারতের চিত্রকলার স্বর্ণযুগ —আবুল হাসান, ওস্তাদ মনসুর, বিষ্ণু দাস, গোবর্ধন — এইসব শিল্পীরা তারই যুগের গর্ব।
তিনি রচনা করেন আত্মজীবনী “তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরি”, যা মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ।
স্থাপত্য ও সৌন্দর্যচর্চা:
নূরজাহানের অনুপ্রেরণায় নির্মিত হয় ইতিমাদ-উদ-দৌলার সমাধি, লাহোর প্রাসাদ, শালিমার বাগ, ও জাহাঙ্গীরের সমাধি সৌধ —
যা আজও মুঘল শিল্পের গর্ব।
জাহাঙ্গীর ছিলেন না আকবরের মতো মহান শাসক, কিন্তু তিনি ছিলেন এক রোমান্টিক সম্রাট,
যিনি ভালোবাসা, শিল্প আর মানবিকতার মিশেলে ইতিহাসে নিজের অমর আসন গড়ে নিয়েছেন। এখন বলো —
তোমার মতে জাহাঙ্গীরের যুগকে কীভাবে মনে রাখবে ইতিহাস? ভালোবাসার যুগ নাকি শিল্পের স্বর্ণযুগ?
কমেন্টে জানাও আর ইতিহাসপ্রেমী বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলো না
সংগৃহীত
মানুষের ধর্মই বদলে যাওয়া
মানুষ বদলায়। ইচ্ছায় বদলায়, অনিচ্ছায় বদলায়। কখনো নিজের ইচ্ছায় আবার কখনো বাধ্য হয় বদলে যেতে। খেয়ালে বদলায়, বেখেয়ালেও বদলায়। কাছে থেকে বদলায় আবার দূরে গিয়েও বদলে যায়।
মানুষের ধর্মই বদলে যাওয়া। পার্থক্য এটুকুই - কারো বদলে যেতে সময় লাগে না, আবার কারো বদলাতে অনেক সময় লাগে। বদলে যাওয়ার পর কারো জীবন সুখে ভরপুর থাকে, আবার কেউ অসুখী জীবন যাপন করে।
বদলে যাওয়া কারো জন্য অনেক সহজ, আবার কারো জন্য বদলে যাওয়া নিদারুণ কষ্টের হয়। তবুও কখনো কখনো বদলে যেতে হয়। কারনে অকারনে, নিজের জন্য অথবা অন্যের ভালোর জন্য অনেক সময় নিজেকে বদলে ফেলতে হয়!
জীবনানন্দ দাশ
(জন্মঃ- ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯ - মৃত্যুঃ- ২২ অক্টোবর, ১৯৫৪) (সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান অনুযায়ী)
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২৫ এর জুনে মৃত্যুবরণ করলে জীবনানন্দ তাঁর স্মরণে 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' নামক একটি কবিতা রচনা করেন, যা বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটি পরবর্তীতে তার প্রথম কাব্য সংকলন ঝরা পালকে স্থান করে নেয়। কবিতাটি পড়ে কবি কালিদাস রায় মন্তব্য করেছিলেন, "এ কবিতাটি নিশ্চয়ই কোন প্রতিষ্ঠিত কবির ছদ্মনামে রচনা"। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দেই তার প্রথম প্রবন্ধ ‘স্বর্গীয় কালীমোহন দাশের শ্রাদ্ধবাসরে' প্রবন্ধটি ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার পরপর তিনটি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ঐ বছরেই কল্লোল পত্রিকায় 'নীলিমা' কবিতাটি প্রকাশিত হলে তা অনেক তরুণ কাব্যরসিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ধীরে ধীরে কলকাতা, ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতে থাকে; যার মধ্যে ছিল সে সময়কার সুবিখ্যাত পত্রিকা কল্লোল, কালি ও কলম, প্রগতি প্রভৃতি। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশিত হয়। সে সময় থেকেই তিনি তার পারিবারিক উপাধি 'দাশগুপ্তের' বদলে কেবল 'দাশ' লিখতে শুরু করেন।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কয়েক মাসের মাথাতেই তিনি সিটি কলেজে তার চাকরিটি হারান। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কলেজটিতে ছাত্র অসন্তোষ দেখা দেয়, ফলাফলস্বরূপ কলেজটির ছাত্রভর্তির হার আশঙ্কাজনকহারে কমে যায়। জীবনানন্দ ছিলেন কলেজটির শিক্ষকদের মধ্যে কনিষ্ঠতম এবং আর্থিক সমস্যাগ্রস্ত কলেজ প্রথমেই তাকেই চাকরিচ্যুত করে। এই চাকুরিচ্যূতি দীর্ঘকাল জীবনানন্দের মনোবেদনার কারণ ছিল। কলকাতার সাহিত্যচক্রেও সে সময় তার কবিতা কঠিন সমালোচনার মুখোমুখি হয়। সে সময়কার প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস শনিবারের চিঠি পত্রিকায় তার রচনার নির্দয় সমালোচনায় প্রবৃত্ত হন। কলকাতায় করবার মতোন কোন কাজ ছিল না। কবি ছোট্ট শহর বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে তিন মাস পরেই তিনি কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন। এ সময় তিনি চরম আর্থিক দুর্দশায় পড়েছিলেন। জীবনধারণের জন্যে তিনি টিউশানি করতেন এবং লেখালিখি থেকে সামান্য কিছু রোজগার হতো। সাথে সাথে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির সন্ধান করছিলেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে তিনি দিল্লির রামযশ কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। বরিশালে তার পরিবার তার বিয়ের আয়োজন করছিল এবং ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৯ই মে তারিখে তিনি লাবণ্য দেবীর সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ে হয়েছিলো ঢাকা শহরে, পুরোনো ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের রামমোহন লাইব্রেরিতে। বিয়ের পর আর দিল্লিতে ফিরে যাননি তিনি, ফলে সেখানকার চাকরিটি খোয়ান। এরপর প্রায় বছর পাঁচেক সময় জীবনানন্দ কর্মহীন অবস্থায় ছিলেন। মাঝে কিছু দিন একটি বীমা কোম্পানির এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছেন; ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে অর্থ ধার করে ব্যবসায় করেছেন; কিন্তু কোনটাই স্থায়ী হয়নি। এসময় তাঁর পিতা জীবিত এবং জীবনান্দের স্ত্রী বরিশালেই ছিলেন বলে জীবনানন্দের বেকারত্ব পারিবারিক দুরবস্থার কারণ হয় নি।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কবির প্রথম সন্তান মঞ্জুশ্রীর জন্ম হয়। প্রায় সে সময়েই তার ক্যাম্পে কবিতাটি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং সাথে সাথে তা কলকাতার সাহিত্যসমাজে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়। কবিতাটির আপাত বিষয়বস্তু ছিল জোছনা রাতে হরিণ শিকার। অনেকেই এই কবিতাটি পাঠ করে তা অশ্লীল হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি তার বেকারত্ব, সংগ্রাম ও হতাশার এই সময়কালে বেশ কিছু ছোটগল্প ও উপন্যাস রচনা করেছিলেন;- তবে তার জীবদ্দশায় সেগুলো প্রকাশিত করেন নি। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি একগুচ্ছ গীতিকবিতা রচনা করেন যা পরবর্তী কালে তাঁর রূপসী বাংলা কাব্যের প্রধান অংশ নির্মাণ করে। জীবনানন্দ এ কবিতাগুলো প্রকাশ করেননি এবং ১৯৫৪-তে তার মৃত্যুর পর কবিতাগুলো একত্র করে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশের ব্যবস্থা করেন বোন সুচরিতা দাশ এবং ময়ুখ পত্রিকা খ্যাত ভূমেন্দ্র গুহ।
সম্ভবতঃ মা কুসুমকুমারী দাশের প্রভাবেই ছেলেবেলায় পদ্য লিখতে শুরু করেন তিনি। ১৯১৯ সালে তাঁর লেখা একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা। কবিতাটির নাম বর্ষা আবাহন। এটি ব্রহ্মবাদী পত্রিকার ১৩২৬ সনের বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। তখন তিনি শ্রী জীবনানন্দ দাশগুপ্ত নামে লিখতেন। ১৯২৭ সাল থেকে তিনি জীবনানন্দ দাশ নামে লিখতে শুরু করেন। ১৬ জুন ১৯২৫ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এর লোকান্তর হলে তিনি 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলেন যা বংগবাণী পত্রিকার ১৩৩২ সনের শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তবে দীনেশরঞ্জন দাস সম্পাদিত কল্লোল পত্রিকায় ১৩৩২ (১৯২৬ খ্রি.) ফাল্গুন সংখ্যায় তাঁর নীলিমা শীর্ষক কবিতাটি প্রকাশিত হলে আধুনিক বাংলা কবিতার ভুবনে তার অন্নপ্রাশন হয়। জীবদ্দশায় তাঁর ৭টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশিত ঝরাপালক শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে তাঁর প্রকৃত কবিত্বশক্তি ফুটে ওঠেনি, বরং এতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রকট প্রভাব প্রত্যক্ষ হয়। তবে দ্রুত তিনি স্বকীয়তা অর্জন করেছিলেন। দীর্ঘ ব্যবধানে প্রকাশিত দ্বিতীয় কাব্য সংকলন ধূসর পান্ডুলিপি-তে তাঁর স্বকীয় কাব্য কৌশল পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের ভূবনে তাঁর বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। শেষের দিককার কবিতায় অর্থনির্মলতার অভাব ছিল। সাতটি তারার তিমির প্রকাশিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুবোর্ধ্যতার অভিযোগ ওঠে। নিজ কবিতার অবমূল্যায়ন নিয়ে জীবনানন্দ খুব ভাবিত ছিলেন। তিনি নিজেই স্বীয় রচনার অর্থায়ন করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন যদিও শেষাবধি তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে কবি নিজেই নিজ রচনার কড়া সমালোচক ছিলেন। তাই সাড়ে আট শত কবিতার বেশী কবিতা লিখলেও তিনি জীবদ্দশায় মাত্র ২৬২টি কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও কাব্যসংকলনে প্রকাশ করতে দিয়েছিলেন। এমনকি রূপসী বাংলার সম্পূর্ণ প্রস্তুত পাণ্ডুলিপি তোরঙ্গে মজুদ থাকলেও তা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি জীবনানন্দ দাশ। তবে তিনি এ কাব্যগ্রন্থটির নাম দিয়েছিলেন বাংলার ত্রস্ত নীলিমা যা তার মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত এবং রূপসী বাংলা প্রচ্ছদনামে প্রকাশিত হয়। আরেকটি পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয় মৃত্যু পরবর্তীকালে যা বেলা অবেলা কালবেলা নামে প্রকাশিত হয়। জীবদ্দশায় তার একমাত্র পরিচয় ছিল কবি। অর্থের প্রয়োজনে তিনি কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন ও প্রকাশ করেছিলেন। তবে নিভৃতে গল্প এবং উপন্যাস লিখেছিলেন প্রচুর যার একটিও প্রকাশের ব্যবস্থা নেননি। এছাড়া ষাট-পয়ষটিট্টিরও বেশি খাতায় "লিটেরেরী নোটস" লিখেছিলেন যার অধিকাংশ এখনও (২০০৯) প্রকাশিত হয়নি।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন ১৯৫২ খৃস্টাব্দে পরিবর্ধিত সিগনেট সংস্করণ বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটি বাংলা ১৩৫৯-এর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ বিবেচনায় পুরস্কৃত করা হয়। কবির মৃত্যুর পর ১৯৫৫ খৃস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসে জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪) সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করে।
সমালোচনা
জীবদ্দশায় অসাধারণ কবি হিসেবে পরিচিতি থাকলেও তিনি খ্যাতি অর্জন করে উঠতে পারেননি। এর জন্য তার প্রচারবিমুখতাও দায়ী; তিনি ছিলেন বিবরবাসী মানুষ। তবে মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তিনি বাংলা ভাষায় আধুনিক কবিতার পথিকৃতদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। জীবনানন্দ দাশের জীবন এবং কবিতার উপর প্রচুর গ্রন্থ লেখা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, বাংলা ভাষায়। এর বাইরে ইংরেজিতে তার ওপর লিখেছেন ক্লিনটন বি সিলি, আ পোয়েট আর্পাট নামের একটি গ্রন্থে। ইংরেজি ছাড়াও ফরাসিসহ কয়েকটি ইউরোপীয় ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে। তিনি যদিও কবি হিসেবেই সমধিক পরিচিত কিন্তু মৃত্যুর পর থেকে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ অবধি তাঁর যে বিপুল পাণ্ডুলিপিরাশি উদ্ঘাটিত হয়েছে তার মধ্যে উপন্যাসের সংখ্যা ১৪ এবং গল্পের সংখ্যা শতাধিক।
মৃত্যু
১৪ই অক্টোবর, ১৯৫৪ তারিখে কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রাম দূর্ঘটনায় তিনি আহত হন। ট্রামের ক্যাচারে আটকে তার শরীর দলিত হয়ে গিয়েছিল। ভেঙ্গে গিয়েছিল কণ্ঠা, ঊরু এবং পাঁজরের হাড়।
গুরুতরভাবে আহত জীবনানন্দের চিৎকার শুনে ছুটে এসে নিকটস্থ চায়ের দোকানের মালিক চূণীলাল এবং অন্যান্যরা তাঁকে উদ্ধার করে। তাঁকে ভর্তি করা হয় শম্ভূনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। এ সময় ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ-সহ অনেক তরুণ কবি জীবনানন্দের সুচিকিৎসার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধেই পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কবিকে দেখতে এসেছিলেন এবং আহত কবির সুচিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছিলেন যদিও এতে চিকিৎসার তেমন উন্নতি কিছু হয়নি।
তবে জীবনানন্দের অবস্থা ক্রমশঃ জটিল হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন কবি। চিকিৎসক ও সেবিকাদের সকল প্রচেষ্টা বিফলে দিয়ে ২২শে অক্টোবর, ১৯৫৪ তারিখে রাত্রি ১১টা ৩৫ মিনিটে কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
কথাসাহিত্য
জীবদ্দশায় কথাসাহিত্যিক হিসাবে জীবনানন্দের কোনোও পরিচিতি ছিল না। তাঁর রচিত উপন্যাসের সংখ্যা ১৪ এবং ছোটগল্পের সংখ্যা শতাধিক। তিনি সম্পূর্ণ নিভৃতে উপন্যাস-ছোটগল্প লিখেছিলেন জীবনানন্দ এবং জীবদ্দশায় একটিও প্রকাশ করে যান নি। তাঁর মৃত্যুর পর উপন্যাস-গল্পের পাণ্ডুলিপির খাতাগুলো আবিষ্কার হয়। কবিতায় যেমনি, কথাসাহিত্যেও তিনি তাঁর পূর্বসুরীদের থেকে আলাদা, তাঁর সমসাময়িকদের থেকেও তিনি সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর গল্প-উপন্যাসে আত্মজৈবনিক উপদানের ভিত লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তাই বলে এই রচনাগুলো আত্মজৈবনিক নয়। তার সর্বাধিক পরিচিত উপন্যাস মাল্যবান, তবে "মাল্যবান" তাঁর বিরচিত প্রথম উপন্যাস নয়।
প্রবন্ধ
জীবনানন্দ দাশের প্রাবন্ধিক পরিচয় অদ্যাবধি বিশেষ কোন মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয় নি। তবে তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ-আলোচনা লিখেছিলেন যার প্রতিটি অত্যনত্ম মৌলিক চিনত্মা-ভাবনার স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর প্রবন্ধের সংকলন কবিতার কথা বেরিয়েছিল তাঁর মৃত্যুর পর - ১৩৬২ তে। এতে তাঁর জীবদ্দশায় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মুদ্রিত পনেরটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধগুলি বহুল পঠিত। এই বিখ্যাত পনেরটি প্রবন্ধের বাইরেও জীবনানন্দের আরো কিছু প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সমালোচনা রয়েছে। এই রচনাসমষ্টির সংখ্যা খুব বেশী নয়। হিসেব করলে দেখা যায় তাঁর সাহিত্য-সমাজ-শিক্ষা বিষয়ক রচনার সংখ্যা ৩০, গ্রন'ভূমিকা ও গ্রন'ালোচনা জাতীয় রচনার সংখ্যা ৯, স্মৃতি তর্পনমূলক রচনার সংখ্যা ৩ এবং বিবিধ প্রবন্ধ-নিবন্ধের সংখ্যা ৭। তদুপরি আরো ৭টি খসড়া প্রবন্ধের হদিশ করা গেছে।
বুদ্ধদেব বসু কবিতা পত্রিকার একটি প্রবন্ধ সংখ্যার (১৩৪৫, বৈশাখ) পরিকল্পনা করেছিলেন মূলত: কবিদের গদ্য প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে। এরই সূত্রে জীবনানন্দ তাঁর প্রথম গুরম্নত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন যার নাম ‘কবিতার কথা’। এ প্রবন্ধের শুরম্ন এই ভাবে -
“সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি ; কবি - কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিনত্মা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে, এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। কিন' সকলকে সাহায্য করতে পারে না ; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিনত্মার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয় ; নানারকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়। ”
তাঁর গদ্য ভাষারীতিও বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। প্রারম্ভিক বাক্যটি হ্রস্ব হলেও অব্যবহিত পরেই তিনি দীর্ঘ বাক্যের ঘন বুনোট গড়ে তুলেছেন। ‘এবং, ‘ও’ ইত্যাদি অন্বয়মূলক পদ এবং ’কমা’, ‘সেমিকোলন‘, ‘ড্যাশ‘ প্রভৃতি যতিচিহ্নের সম্বনয়ে গড়ে উঠেছে এমন একটি গদ্যভাষা যার সঙ্গে সমকালীন বাঙ্গালী লেখক-পাঠকের আদৌ পরিচয় ছিল না। বস্তুত: তাঁর প্রবন্ধগুলোর বাক্য গঠনরীতি সমসাময়িককালে সুপরিচিত ছিল না। এমনকী মনোযোগী পাঠকের কাছেও তা জটিল প্রতীয়মান হতে পারে। জীবনানন্দের অধিকাংশ গদ্য রচনাই ফরমায়েশী। সাহিত্য, শিক্ষা, সমাজ, এই তিনটি পরিক্ষেত্রে জীবনানন্দ প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলো লিখেছেন। তাঁর বিশিষ্ট প্রবন্ধগুলোর শিরোনাম এরকম - ‘কবিতার কথা’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা’, ‘মাত্রাচেতনা’, ‘উত্তররৈবিক বংলা কাব্য’, ‘কবিতার আত্মা ও শরীর’, ‘কি হিসাবে কবিতা শ্বাশত’, ‘কবিতাপাঠ’, ‘দেশকাল ও কবিতা’, ‘সত্যবিশ্বাস ও কবিতা’, ‘রুচি, বিচার ও অন্যান্য কথা’, ‘কবিতার আলোচনা’, ‘আধুনিক কবিতা’, ‘বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ’, ‘কেন লিখি’, ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘শরৎচন্দ্র’, ‘কঙ্কাবতী ও অন্যান্য কবিতা’, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’, ‘পৃথিবী ও সময়’, ‘যুক্তি, জিজ্ঞাসা ও বাঙালি’, 'অর্থনৈতিক দিক’, ‘শিক্ষা ও ইংরেজি’, ‘শিক্ষা-দীক্ষা-শিক্ষকতা’, ‘শিক্ষার কথা’, ‘শিক্ষা সাহিত্যে ইংরেজী’ এবং ‘শিক্ষা-দীক্ষা’। বলা যায় যে সাহিত্য, বিশেষ ক’রে কবিতা নিয়ে জীবনানন্দ বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ উপহার দিয়েছেন।
কাব্যগ্রন্থ
জীবনানন্দের কাব্যগ্রন্থসমূহের প্রকাশকাল সম্পর্কে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের একাধিক পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। নিচে কেবল প্রথম প্রকাশনার বৎসর উল্লিখিত। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে। এর দীর্ঘ কাল পর ১৯৩৬-এ প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ধূসর পান্ডুলিপি। ] ইত্যবসরে কবির মনোজগতে যেমন পরিবর্তন হয়েছে তেমনি রচনা কৌশলও অর্জন করেছে সংহতি এবং পরিপক্কতা। তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ বনলতা সেন প্রকাশিত হয় ১৯৪২-এ। এটি "কবিতাভবন সংস্করণ" নামে অভিহিত। সিগনেট প্রেস বনলতা সেন প্রকাশ করে ১৯৫২-তে। বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহ সহ পরবর্তী কবিতাগ্রন্থ মহাপৃথিবী ১৯৪৪-এ প্রকাশিত। জীবনানন্দর জীবদ্দশায় সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮)। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর কিছু আগে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা।
কবির মৃত্যু-পরবর্তী প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হলো ১৯৫৭-তে প্রকাশিত রূপসী বাংলা এবং ১৯৬১-তে প্রকাশিত বেলা অবেলা কালবেলা। জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলা'র পাণ্ডুলিপি তৈরী করে থাকলেও জীবদ্দশায় এর প্রকাশের উদ্যোগ নেন নি। তিনি গ্রন্থটির প্রচ্ছদ নাম নির্ধারণ করেছিলেন বাংলার ত্রস্ত নীলিমা। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশকালে এর নামাকরণ করা হয় "রূপসী বাংলা।" তাঁর অগ্রন্থিত কবিতাবলী নিয়ে প্রকাশিত কবিতা সংকলনগুলো হলো: সুদর্শনা (১৯৭৩), আলো পৃথিবী (১৯৮১), মনোবিহঙ্গম, হে প্রেম তোমার কথা ভেবে (১৯৯৮), অপ্রকাশিত একান্ন (১৯৯৯) এবং আবছায়া (২০০৪)।
কবির প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সকল কবিতার আঁকড় দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের কাব্যসংগ্রহ সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে। অব্যবহিত পরে গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সকল কবিতার পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে আব্দুল মান্নান সৈয়দের উদ্যোগে। পরবর্তী কালে আবিষ্কৃত আরো কবিতা অন্তর্ভুক্ত করে ক্ষেত্র গুপ্ত ২০০১-এপ্রকাশ করেন জীবনানন্দ দাশের কাব্য সমগ্র। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ভূমেন্দ্র গুহ প্রকাশ করেন জীবনানন্দ দাশের প্রকাশিত-অপ্রকাশিত-গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত সকল কবিতার আঁকড় গ্রন্থ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ।
গল্পগ্রন্থ ও উপন্যাস
তাঁর মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয় অজস্র গল্প ও উপন্যাস। এ গুলোর প্রথম সংকলন জীবনানন্দ দাশের গল্প (১৯৭২, সম্পাদনা: সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী)। বেশ কিছুকাল পর প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৮৯, সম্পাদনা: আবদুল মান্নান সৈয়দ।
প্রকাশিত ১৪টি উপন্যাস হলো উপন্যাস: মাল্যবান (১৯৭৩), সুতীর্থ (১৯৭৭), চারজন (২০০৪: সম্পাদকঃ ভূমেন্দ্র গুহ ও ফয়সাল শাহরিয়ার)।
লালন ফকির
(জন্মঃ- ১৭ অক্টোবর, ১৭৭৪ - মৃত্যুঃ- ১৭ অক্টোবর, ১৮৯০)(সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান অনুযায়ী)
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ লালনের মৃত্যুর ২ বছর পর তার আখড়া বাড়িতে যান এবং লালনের দর্শনে প্রভাবিত হয়ে প্রায় ১৫০টি গান রচনা করেন। লালন সাঁই-এর মৃত্যুর কিছুদিন পর তৎকালীন পাক্ষিক পত্রিকা হিতকরীতে প্রকাশিত একটি রচনায় সর্বপ্রথম তাঁকে "মহাত্মা" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। রচনার লেখকের নাম রাইচরণ। গান্ধীজিরও ২৫ বছর আগে, ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম, লালনকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দেয়া হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেনঃ “লালন নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন - আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিৎ।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘গোরা’ উপন্যাসের শুরুতেই ব্যবহার করেছেন লালনের গান ‘‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়/ ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতেম পাখির পায়”। লালনের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘লালন ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু কোনোও বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন জীবনে।’’
লালনের পরিচয় দিতে গিয়ে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘‘কাঙাল হরিনাথ তাঁকে জানতেন, মীর মশাররফ চিনতেন, ঠাকুরদের হাউসবোটে যাতায়াত ছিল, লেখক জলধর সেন বা অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তাঁকে সামনাসামনি দেখেছেন কতবার, গান শুনেছেন, তবু জানতে পারেননি লালনের জাতপরিচয়, বংশধারা বা ধর্ম।”
তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত প্রবাসী পত্রিকার মহাত্মা লালন নিবন্ধে প্রথম লালন জীবনী রচয়িতা বসন্ত কুমার পাল বলেছেন- "সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান, এ কথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম।" বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় লালনের জীবদ্দশায় তাকে কোন ধরনের ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করতেও দেখা যায় নি। লালনের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দুধর্ম এবং ইসলামধর্ম উভয় শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তার রচিত গানে এর পরিচয় পাওয়া যায়। প্রবাসী পত্রিকার নিবন্ধে বলা হয়, লালনের সকল ধর্মের লোকের সাথেই সুসম্পর্ক ছিল। প্রকৃতপক্ষে লালন ছিলেন মানবতাবাদী এবং তিনি ধর্ম, জাত, কূল, বর্ণ লিঙ্গ ইত্যাদি অনুসারে মানুষের ভেদাভেদ বিশ্বাস করতেন না।
একটি গানে লালনের প্রশ্নঃ
‘‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।। ”
জন্ম তথ্য
লালনের জীবন সম্পর্কে সবচেয়ে অবিকৃত তথ্যসুত্র তার নিজের রচিত অসংখ্য গান। কিন্তু লালনের কোন গানে তার জীবন সম্পর্কে কোন তথ্য তিনি রেখে যাননি, তবে কয়েকটি গানে তিনি নিজেকে "লালন ফকির" হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পনেরো দিন পর কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত হিতকরী পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, “ইহার জীবনী লিখিবার কোন উপকরণ পাওয়া কঠিন। নিজে কিছু বলিতেন না। শিষ্যরা তাহার নিষেধক্রমে বা অজ্ঞতাবশতঃ কিছুই বলিতে পারে না।" হিতকরী পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ নিবন্ধে বলা হয়েছে , লালন তরুন বয়সে একবার তীর্থভ্রমণে বের হয়ে পথিমধ্যে গুটিবসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তখন তার সাথীরা তাকে মৃত ভেবে পরিত্যাগ করে যার যার গন্তব্যে চলে যায়। কালিগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা মুমূর্ষু লালনকে উদ্ধার করেন মলম শাহ। মলম শাহ ও তার স্ত্রী মতিজান তাকে বাড়িতে নিয়ে সেবা-শুশ্রষা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। এরপর লালন তার কাছে দীক্ষিত হন এবং কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে স্ত্রী ও শিষ্যসহ বসবাস শুরু করেন। গুটিবসন্ত রোগে একটি চোখ হারান লালন। ছেঊরিয়াতে তিনি দার্শনিক গায়ক সিরাজ সাঁইয়ের সাক্ষাতে আসেন এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হন। এছাড়া লালন সংসারী ছিলেন বলে জানা যায়। তার সামান্য কিছু জমি ও ঘরবাড়ি ছিল। লালন অশ্বারোহনে দক্ষ ছিলেন এবং বৃদ্ধ বয়সে অশ্বারোহনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে যেতেন।
লালনের আখড়া
লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার ছেঁউড়িয়াতে একটি আখড়া তৈরি করেন, যেখানে তিনি তাঁর শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। তার শিষ্যরা তাকে “সাঞ’’ বলে সম্বোধন করতেন। তিনি প্রতি শীতকালে আখড়ায় একটি ভান্ডারা (মহোৎসব) আয়োজন করতেন। যেখানে সহস্রাধিক শিষ্য ও সম্প্রদায়ের লোক একত্রিত হতেন এবং সেখানে সংগীত ও আলোচনা হত। চট্টগ্রাম, রঙপুর, যশোর এবং পশ্চিমে অনেক দূর পর্য্যন্ত বাংলার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বহুসংখ্যক লোক লালন ফকীরের শিষ্য ছিলেন; শোনা যায় তার শিষ্যের সংখ্যা প্রায় দশ হাজারের বেশি ছিল।
ঠাকুর পরিবারের সাথে সম্পর্ক
কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অনেকের সঙ্গে লালনের পরিচয় ছিল বলে বিভিন্ন সুত্রে পাওয়া যায়। বিরাহিমপুর পরগনায় ঠাকুর পরিবারের জমিদারিতে ছিল তাঁর বসবাস এবং ঠাকুর-জমিদারদের প্রজা ছিলেন তিনি। ঊনিশ শতকের শিক্ষিত সমাজে তার প্রচার ও গ্রহণযোগ্যতার পেছনে ঠাকুর পরিবার বড় ভূমিকা রাখেন।
কিন্তু এই ঠাকুরদের সঙ্গে লালনের একবার সংঘর্ষ ঘটে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কুষ্টিয়ার কুমারখালির কাঙাল হরিনাথ মজুমদার গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এরই একটি সংখ্যায় ঠাকুর-জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ ও তথ্য প্রকাশের সূত্র ধরে উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তারা বিষয়টির তদন্তে প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানে আসেন। এতে করে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ওপর বেজায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ঠাকুর-জমিদারেরা। তাঁকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে লাঠিয়াল পাঠালে শিষ্যদের নিয়ে লালন সশস্ত্রভাবে জমিদারের লাঠিয়ালদের মোকাবিলা করেন এবং লাঠিয়াল বাহিনী পালিয়ে যায়। এর পর থেকে কাঙাল হরিনাথকে বিভিন্নভাবে রক্ষা করেছেন লালন।
লালনের জীবদ্দশায় তার একমাত্র স্কেচটি তৈরী করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালনের মৃত্যুর বছরখানেক আগে ৫ মে ১৮৮৯ সালে পদ্মায় তাঁর বোটে বসিয়ে তিনি এই পেন্সিল স্কেচটি করেন- যা ভারতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। যদিও অনেকের দাবী এই স্কেচটিতে লালনের আসল চেহারা ফুটে ওঠেনি।
মৃত্যু
লালন সাঁই ১১৬ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেউড়িয়াতে নিজ আখড়ায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর প্রায় একমাস পূর্ব থেতে তিনি পেটের সমস্যা ও হাত পায়ের গ্রন্থির সমস্যায় ভুগছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় দুধ ছাড়া অন্য কিছু খেতেন না। মৃত্যুরদিন ভোর ৫টা পর্যন্ত তিনি গানবাজনা করেন এবং এক সময় তার শিষ্যদের কে বলেনঃ “আমি চলিলাম’’ এবং এর কিছু সময় পরই তার মৃত্যু হয়। তার নির্দেশ বা ইচ্ছা না থাকায় তার মৃত্যুর পর হিন্দু বা মুসলমান কোন ধরনের ধর্মীয় রীতি নীতিই পালন করা হয় নি। তারই উপদেশ অনুসারে ছেউড়িয়ায় তার আখড়ার মধ্যে একটি ঘরের ভিতর তার সমাধি করা হয়। আজও সারা দেশ থেকে বাউলেরা অক্টোবর মাসে ছেউড়িয়ায় মিলিত হয়ে লালনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে। তাঁর মৃত্যুর ১২ দিন পর তৎকালীন পাক্ষিক পত্রিকা মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত হিতকরীতে প্রকাশিত একটি রচনায় সর্বপ্রথম তাঁকে "মহাত্মা" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। রচনার লেখকের নাম রাইচরণ।
বিশ্ব সাহিত্যে প্রভাব
লালনের শিষ্য ভোলাই শাহের হাতে লেখা লালনের নাম। উনবিংশ শতকের শুরুর দিকে অপ্রচলিত বাংলা অক্ষরে লেখা।
লালনের গান ও দর্শনের দ্বারা অনেক বিশ্বখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক প্রভাবিত হয়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ লালনের মৃত্যুর ২ বছর পর তার আখড়া বাড়িতে যান এবং লালনের দর্শনে প্রভাবিত হয়ে ১৫০টি গান রচনা করেন। তার বিভিন্ন বক্তৃতা ও রচনায় তিনি লালনের প্রসংগ তুলে ধরেছেন। লালনের মানবতাবাদী দর্শনে প্রভাবিত হয়েছেন সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আমেরিকান কবি এলেন গিন্সবার্গ লালনের দর্শনে প্রভাবিত হন এবং তার রচনাবলীতেও লালনের রচনাশৈলীর অনুকরন দেখা যায়। তিনি After Lalon নামে একটি কবিতাও রচনা করেন। লালনের সংগীত ও ধর্ম-দর্শন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে। ১৯৬৩ ছেঁউড়িয়ায় আখড়া বাড়ি ঘিরে লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে ১৯৭৮ সালে শিল্পকলা একাডেমীর অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় লালন একাডেমী। তার মৃত্যু দিবসে ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় স্মরণ উৎসব হয়। দেশ-বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসংখ্য মানুষ লালন স্মরণোৎসব ও দোল পূর্ণিমায় এই আধ্যাত্মিক সাধকের দর্শন অনুস্মরণ করতে প্রতি বছর এখানে এসে থাকেন। এই অনুষ্ঠানটি "লালন উৎসব" হিসেবে পরিচিত।
উপন্যাস
রণজিৎ কুমার লালন সম্পর্কে সেনবাউল রাজা নামে একটি উপন্যাস রচনা করেন। পরেশ ভট্টাচার্য রচনা করেন বাউল রাজার প্রেম নামে একটি উপন্যাস। ভারতের বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লালনের জীবনী নিয়ে রচনা করেন মনের মানুষ উপন্যাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উপন্যাস ‘গোরা’ শুরু হয়েছে লালনের গান ‘‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’’ দিয়ে(www.rabindra-rachanabali.nltr.org/node/1983)।
ছোট গল্প
১৯৩৬ খ্রীস্টাব্দে সুনির্মল বসু লালন ফকিরের ভিটে নামে একটি ছোট গল্প রচনা করেন। শওকত ওসমান ১৯৬৪ খ্রীস্টাব্দে রচনা করেন দুই মুসাফির নামের একটি ছোটগল্প।
লালনকে নিয়ে কয়েকটি চলচিত্র ও তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ হাসান ইমাম পরিচালনা করেন লালন ফকির চলচিত্রটি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে একই নামে একটি চলচিত্র নির্মাণ করেন। ম. হামিদ ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে পরিচালনা করেন তথ্যচিত্র দ্যাখে কয়জনা যা বাংলাদেশে টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয়। তানভীর মোকাম্মেল ১৯৯৬ সালে পরিচালনা করেন তথ্যচিত্রঃ অচিন পাখি। ২০০৪ সালে তানভির মোকাম্মেলের পরিচালনায় লালন নামে একটি চলচিত্র নির্মাণ করা হয়। এছাড়া ২০১০ এ সূনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে গৌতম ঘোষ মনের মানুষ নামে একটি চলচিত্র নির্মাণ করে যা ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ৪১তম ভারত ফিল্ম- ফ্যস্টিভ্যালে সেরা চলচ্চিত্রর পুরষ্কার লাভ করে।
কবিতা
আমেরিকান কবি এলেন গিন্সবার্গ লালনের দর্শনে প্রভাবিত হন এবং তার রচনাবলীতেও লালনের রচনাশৈলীর অনুকরন দেখা যায়। তিনি After Lalon নামে একটি কবিতাও রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন তিনি লালনের আছে যার মনের মানুষ সে মনে এই গানে উল্লেখিত মনের মানুষ কে তা আবিস্কার করতে পেরেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি একটি কবিতাও রচনা করেন। যার কথা ছিল আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রানে, তাই হেরি তায় সকলখানে...
দর্শন
আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা
মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাঁটা।
তার উপরে সদর কোঠা
আয়না মহল তায়।।
— লালন , দেহতত্ত্ব
লালনের গানে মানুষ ও তার সমাজই ছিল মুখ্য। লালন বিশ্বাস করতেন সকল মানুষের মাঝে বাস করে এক মনের মানুষ। তিনি সবকিছুর উর্ধ্বে মানবতাবাদকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। তার বহু গানে এই মনের মানুষের প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন মনের মানুষের কোন ধর্ম, জাত, বর্ন, লিঙ্গ, কূল নেই। মানুষের দৃশ্যমান শরীর এবং অদৃশ্য মনের মানুষ পরস্পর বিচ্ছিন্ন। সকল মানুষের মনে ঈশ্বর বাস করেন। লালনের এই দর্শনকে কোন ধর্মীয় আদর্শের অন্তর্গত করা যায় না। লালন, মানব আত্নাকে বিবেচনা করেছেন রহস্যময়, অজানা এবং অস্পৃশ্য এক সত্ত্বা রূপে। খাচার ভিতর অচিন পাখি গানে তিনি মনের অভ্যন্তরের সত্ত্বাকে তুলনা করেছেন এমন এক পাখির সাথে, যা সহজেই খাঁচা রূপী দেহের মাঝে আসা যাওয়া করে কিন্তু তবুও একে বন্দি করে রাখা যায় না।
লালনের সময়কালে যাবতীয় নিপীড়ন, মানুষের প্রতিবাদহীনতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি-কুসংস্কার, লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতা সেদিনের সমাজ ও সমাজ বিকাশের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমাজের নানান কুসংস্কারকে তিনি তার গানের মাধ্যমে করেছেন প্রশ্নবিদ্ধ। আর সে কারণেই লালনের সেই সংগ্রামে আকৃষ্ট হয়েছিলেন বহু শিষ্ট ভূস্বামী, ঐতিহাসিক, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, লেখক এমনকি গ্রামের নিরক্ষর সাধারণ মানুষও। আধ্যাত্মিক ভাবধারায় তিনি প্রায় দুই হাজার গান রচনা করেছিলেন। তার সহজ-সরল শব্দময় এই গানে মানবজীবনের রহস্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। লালনের বেশ কিছু রচনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তিনি ধর্ম-গোত্র-বর্ণ-সম্প্রদায় সম্পর্কে অতীব সংবেদনশীল ছিলেন। ব্রিটিশ আমলে যখন হিন্দু ও মুসলিম মধ্যে জাতিগত বিভেদ-সংঘাত বাড়ছিল তখন লালন ছিলেন এর বিরূদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। তিনি মানুষে-মানুষে কোনও ভেদাভেদে বিশ্বাস করতেন না। মানবতাবাদী লালন দর্শনের মূল কথা হচ্ছে মানুষ। আর এই দর্শন প্রচারের জন্য তিনি শিল্পকে বেছে নিয়েছিলেন। লালনকে অনেকে পরিচয় করিয়ে দেবার চেষ্টা করেছেন সাম্প্রদায়িক পরিচয় দিয়ে। কেউ তাকে হিন্দু, কেউ মুসলমান হিসেবে পরিচয় করাবার চেষ্টা করেছেন। লালনের প্রতিটি গানে তিনি নিজেকে ফকির ( আরবি "সাধু") হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
লালন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেনঃ “লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন - আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিৎ।”
বাউল দর্শন
বাউল একটি বিশেষ লোকাচার ও ধর্মমত। লালনকে বাউল মত এবং গানের একজন অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাউল মত সতেরো শতকে জন্ম নিলেও লালনের গানের জন্য ঊনিশ শতকে বাউল গান জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বাউল গান যেমন মানুষের জীবন দর্শন সম্পৃক্ত বিশেষ সুর সমৃদ্ধ। বাউলরা সাদামাটা জীবনযাপন করেন এবং একতারা বাজিয়ে গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোই তাদের অভ্যাস। বাংলা লোকসাহিত্যের একটি বিশেষ অংশ। ২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাউল গানকে বিশ্বের মৌখিক এবং দৃশ্যমান ঐতিহ্যসমূহের মাঝে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে ঘোষনা করে।
বাউলেরা উদার ও অসাম্প্রদায়িক ধর্মসাধক। তারা মানবতার বাণী প্রচার করেন। বাউল মতবাদের মাঝে বৈষ্ণবধর্ম এবং সূফীবাদের প্রভাব লক্ষ করা যায়। বাউলরা সবচেয়ে গুরুত্ব দেয় আত্মাকে। তাদের মতে আত্মাকে জানলেই পরমাত্মা বা সৃষ্টিকর্তাকে জানা যায়। আত্মা দেহে বাস করে তাই তারা দেহকে পবিত্র জ্ঞান করেন। সাধারণত অশিক্ষিত হলেও বাউলরা জীবনদর্শন সম্পর্কে অনেক গভীর কথা বলেছেন। বাউলরা তাদের দর্শন ও মতামত বাউল গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে থাকেন।
লালনের গান বা লালনগীতি
লালন তার সমকালীন সমাজের নানান কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক বিভেদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে তার রচিত গানে তিনি একই সাথে প্রশ্ন ও উত্তর করার একটি বিশেষ শৈলি অনুসরন করেছেন। এছাড়া তার অনেক গানে তিনি রুপকের আড়ালেও তার নানান দর্শন উপস্থাপন করেছেন।
গানের জনপ্রিয়তা
সমগ্র বিশ্বে, বিশেষ করে বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে লালনের গান বেশ জনপ্রিয়। স্রোতার পছন্দ অনুসারে বিবিসি বাংলার করা সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় লালনের খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায় গানটির অবস্থান ১৪তম। আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, গুরু বা মুর্শিদতত্ত্ব, প্রেম-ভক্তিতত্ত্ব, সাধনতত্ত্ব, মানুষ-পরমতত্ত্ব, আল্লা-নবীতত্ত্ব, কৃষ্ণ-গৌরতত্ত্ব এবং আরও বিভিন্ন বিষয়ে লালনের গান রয়েছে।
@After Lalon
বিখ্যাত "দশ(১০) ব্যর্থ ব্যক্তির গল্প" যারা পৃথিবী বদলে দিয়েছেন
মাত্র চার মাস পর টমাস এডিসনকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল; তার শিক্ষক তাকে মানসিকভাবে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছিলেন। পরে তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা আবিষ্কারক হয়ে ওঠেন।
চার্লস ডারউইনকে চিকিৎসাবিদ্যা ত্যাগ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল, তার বাবা তিক্তভাবে বলেছিলেন: "তুমি তোমার কল্পনা ছাড়া আর কিছুই পরোয়া করো না!" তিনি শেষ পর্যন্ত জীববিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।
"সৃজনশীলতার অভাব" এর জন্য ওয়াল্ট ডিজনিকে একটি সংবাদপত্রের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এরপর তিনি বিশ্বব্যাপী প্রজন্মের কাছে প্রিয় একটি বিনোদন সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।
বিথোভেনের সঙ্গীত শিক্ষক তাকে সম্পূর্ণ প্রতিভাহীন বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে কালজয়ী কিছু মাস্টারপিস রচনা করেছিলেন।
আলবার্ট আইনস্টাইন চার বছর বয়স পর্যন্ত কথা বলতেন না এবং তার শিক্ষক তাকে মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হয়ে উঠেন।
আর্ট স্কুলের প্রবেশিকা পরীক্ষায় তিনবার ব্যর্থ হওয়ার পর অগাস্ট রডিনের বাবা তাকে "বোকা" ঘোষণা করেছিলেন। রডিন এখন সর্বকালের সেরা ভাস্করদের একজন হিসেবে পরিচিত।
সম্রাট ফার্দিনান্দ বিখ্যাতভাবে মোজার্টের "দ্য ম্যারেজ অফ ফিগারো"-এর সমালোচনা করেছিলেন "অনেক বেশি নোট" হিসেবে। আজ, মোজার্টের প্রতিভা প্রশ্নাতীত। দিমিত্রি মেন্ডেলিফ রসায়নে গড় নম্বর অর্জন করেছিলেন, তবুও তিনি পরে পর্যায় সারণী তৈরি করেছিলেন, যা বিজ্ঞানকে মৌলিকভাবে রূপান্তরিত করেছিল। ফোর্ড অটোমোবাইলের কিংবদন্তি স্রষ্টা হেনরি ফোর্ড মৌলিক সাক্ষরতার সাথে লড়াই করেছিলেন এবং অসাধারণ সাফল্য অর্জনের আগে একাধিকবার দেউলিয়া ঘোষণা করেছিলেন।
যখন মার্কনি রেডিও আবিষ্কার করেছিলেন এবং বাতাসের মাধ্যমে শব্দ প্রেরণের বর্ণনা দিয়েছিলেন, তখন তার বন্ধুরা তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান, ভেবেছিলেন যে তিনি তার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। কয়েক মাস পরে, তার আবিষ্কার সমুদ্রে অসংখ্য জীবন বাঁচিয়েছিল।
শিক্ষা: অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গিকে কখনই আপনার সম্ভাবনা সংজ্ঞায়িত করতে দেবেন না। মহত্ত্ব প্রায়শই ব্যর্থতা দিয়ে শুরু হয়। নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন!
সংগৃহীত