মীরজাফর
মীরজাফর সবে মাত্র নবাব হয়েছেন। ইংরেজদের সাথে চুক্তির তিন কোটি টাকা মেটাতে গিয়ে তার তহবিল শূন্য হয়ে গেল। নবাবের সৈন্যবাহিনীর ঘোড়সওয়াররা মাইনে না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠল। ফলে নবাবী সৈন্যবাহিনী ভেঙে পড়ল।
নবাবের সেই দুরবস্থায় সুযোগ বুঝে বহু জমিদার ও ফৌজদারেরা নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। নবাব তখন বিদ্রোহীদের দমন করতে গিয়ে ইংরেজ ফৌজ ব্যবহার করতে বাধ্য হলেন।
গোরা ও তেলেঙ্গা সৈন্যদের সমস্ত খরচ নবাবকেই বহন করতে হবে, এই শর্তে ক্লাইভ নবাবকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসলেন। বিদ্রোহীরা তখনকার মত শায়েস্তা হল বটে, কিন্তু যুদ্ধের খরচ মেটাবার জন্য পর্যাপ্ত টাকা ছিল কোথায়? মীরজাফর ‘বর্ধমান’ ও ‘নদীয়া’ জেলার গোটা খাজনা ইংরেজদের নামে লিখে দিতে বাধ্য হলেন।
নবাবের খাজনা আদায়ের শাসনযন্ত্রে সেই যে ইংরাজদের প্রবেশ শুরু হল, এরপরে ধীরে ধীরে সারা ‘দেওয়ানী’ ও ‘নিজামত’ ইংরেজদের হাতে সম্পূর্ণভাবে চলে গেল। তখন থেকেই নবাবী শাসনযন্ত্র ক্রমশঃ অচল হয়ে পড়তে শুরু করল। নবাবের দরবারের সব ওমরাওরা তখন থেকেই উপলব্ধি করতে পারছিলেন যে তাঁদের দিন ক্রমশ শেষ হয়ে আসছে।
পলাশীর ষড়যন্ত্রে যেসব মনসবদারা মীরজাফরকে সাহায্য করেছিলেন, তারা বুঝে গেল যে মীরজাফর ইংরেজদের ‘ঠুটো জগন্নাথ’ মাত্র। তার হাত থেকে তাদের কোন কিছুই প্রাপ্তির কোন সম্ভাবনা নেই। মীরজাফরের এক বন্ধু আশা করেছিলেন যে নতুন নবাব তাকে যথোচিত পুরস্কার দেবেন। কিন্তু তিনি কিছুই পেলেন না। আশাহত সেই আমীর, নতুন নবাবের নবাবিয়ানা ভেতর থেকে যে কতটা ফাঁপা, সেটা প্রকাশ্য দরবারে বাজিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
ওই ঘটনার আগের দিনই ক্লাইভের লোকজনদের সঙ্গে সেই আমীরের লোকজনদের প্রকাশ্যে হাতাহাতি হয়ে গিয়েছিল। পরের দিন সকালে নবাব মীরজাফর তার পুরনো বন্ধুর দিকে রক্ত চক্ষে তাকিয়ে বলেছিলেন, “জনাব, কর্নেল সাহেবের লোকেদের সঙ্গে কাল আপনার লোকেরা ঝগড়া বাঁধিয়েছিল। জনাবের কি জানা আছে, এই কর্নেল ক্লাইভ কে? জান্নাতের হুকুমে জাহানে তাঁর কি জায়গা?”
নবাবের পুরানো বন্ধু ‘মির্জা শামসুদ্দিন’ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সবার সামনেই উত্তর দিয়েছিলেন, “হুজুর নবাব বাহাদুর, কর্নেলের সঙ্গে ঝগড়া করব আমি? এই আমি? যে রোজ সকালে উঠে তার গাধাটাকে পর্যন্ত তিন বার সলাম না করে কোনো কাজ করে না? তবে কোন সাহসে আমি গাধাটার সওয়ারের সঙ্গে লাগতে যাবো?”
মীরজাফর ‘আলিবর্দি খানের’ মতো ‘মহাবৎ জঙ্গ’ নামে খ্যাত হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ‘ক্লাইভের গাধা’ নামে শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রসিদ্ধি হয়েছিল।
রাজকার্যে বীতশ্রদ্ধ হয়ে মীরজাফর‘ভাঙ’ খেয়ে চুর হয়ে থাকতেন। লোকে তাঁর ছেলে ‘মীরন’কে বলত ‘ছোট নবাব’। যত দিন সেই নিষ্ঠুর নবাবজাদা বেঁচেছিলেন তত দিন প্রকৃতপক্ষে তিনিই মীরজাফরের হয়ে রাজকার্য চালিয়ে গেলেন। তার হুকুমে ‘ঘসেটি বেগম’ ও ‘আমিনা বেগম’ - দুই নবাবনন্দিনীকে জলে ডুবিয়ে মারা হল।
‘ঘসেটি বেগম’ তাঁর সমস্ত লুকানো ধনরত্ন দিয়ে মীরজাফরকে পলাশীর ষড়যন্ত্রে সাহায্য করেছিলেন। শোনা যায় যে, জলে ডুবে মরবার আগে ওই দুই বোন মীরনের মাথায় ‘বজ্রাঘাতের’ অভিসম্পাত করে গিযেছিলেন।
মীরনের সব দুষ্কার্যের সাথী ছিলেন ‘খাদেম হোসেন খান। নয়া জমানায় সেই ‘খাদেম হোসেন খান’ ‘পূর্ণিয়ার ফৌজদার’ হয়ে বসলেন। তারপর মীরন ও খাদেম হোসেন খানের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে গেল। বিদ্রোহী খাদেম হোসেন খানের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে খোলা মাঠে তাঁবুর মধ্যে ‘বজ্রাহত’ হয়ে মীরন মৃত্যুর মুখে পতিত হলেন।
ইংরেজদের টাকা মেটাতে না পারায় মীরজাফর প্রথমে মসনদচ্যুত হলেন। তারপরে আবার ইংরেজদের কৃপায় তিনি মসনদে বসেছিলেন, শেষে মীরজাফর ‘কুষ্ঠ রোগে’ মরেছিলেন। শেষের দিকে তিনি একপ্রকার মরিয়া হয়ে ইংরেজদের একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আপনারা কি ভাবেন টাকার বৃষ্টি হয়?”
পলাশীর অপর নায়ক ছিলেন ‘রায় দুর্লভ’। নতুন নবাব ও তাঁর নতুন দেওয়ানের মধ্যে দু’ দিন যেতে না যেতেই মারাত্মক রেষারেষি শুরু হয়ে গেল। মীরজাফর সন্দেহ করলেন যে, রায় দুর্লভ সিরাজের ছোট ভাই ‘মীর্জা মেহদী’কে মসনদে বসিয়ে নিজে রাজত্ব করবার মতলব আঁটছেন।
সন্দেহের বশবর্তী হয়ে মীরন সেই নিরাপরাধ তরুণকে হত্যা করেন। এরপর রায় দুর্লভের উপরে চোরা গোপ্তা আঘাত হানবার ফিকির খুঁজতে থাকেন।
ক্লাইভের কৃপায় রায় দুর্লভের প্রাণ রক্ষা হয়েছিল। কিন্তু তারপরেই মীরন ঢাকার ‘রাজবল্লভ’কে ডেকে এনে রায় দুর্লভকে তার হাতে রাজকার্য তুলে দেবার হুকুম দিলেন। ফলে রায় দুর্লভের দু’ দিনের দেওয়ানী ঘুচে গেল। রায় দুর্লভ কলকাতায় পালিয়ে গিয়ে নিজের ধন প্রাণ বাঁচাতে সমর্থ হলেন।
যদিও তার সঞ্চিত ধন তাঁর উত্তরপুরুষদের ভোগে লাগে নি। ছেলে ‘রাজবল্লভ’ ইংরেজ আমলে ‘রায় রায়ান’ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর একমাত্র সন্তান ‘মুকুন্দবল্লভ’ তাঁর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ায় রায় দুর্লভের বংশ চিরতরে লোপ পেল।
সিরাজের বিশ্বস্ত প্রধানমন্ত্রী ‘মোহনলাল কাশ্মীরী’কে রায় দুর্লভ বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন। পলাশীর যুদ্ধের ঠিক আগে নিযুক্ত সিরাজের আরেক বিশ্বস্ত কাবুলী সেনাপতি ‘খাজা আবদুল হাদি খান’কে মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেন। ঢাকার ভূতপূর্ব নায়েব ‘রাজবল্লভ সেন’ পরে ‘পাটনার নায়েব’ হলেন। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত মীরকাশিমের হুকুমে গঙ্গাবক্ষে সলিল সমাধি প্রাপ্ত হলেন।
হুগলীর অস্থায়ী ফৌজদার ‘নন্দকুমার’ পরে মীরজাফরের ‘দেওয়ান’ হয়েছিলেন। তিনিও শেষ পর্যন্ত ‘ওয়ারেন হেস্টিংসের’ ষড়যন্ত্রের বলি হয়ে ফাঁসিতে প্রাণ দিয়েছিলেন। সিরাজের অতি বিশ্বস্ত গুপ্তচর ও ‘পাটনার নায়েব’ ‘রামনারায়ণ’ নবাব মীরকাশিমের হুকুমে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হলেন। অর্থাৎ পলাশীর যুদ্ধের কুড়ি বছরের মধ্যে প্রায় সমস্ত ‘মহাবৎজঙ্গী’ ওমরাওরা সমূলে বিনষ্ট ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন।
‘জগৎশেঠ মহাতাব রায়’ ও ‘মহারাজা স্বরূপচন্দের’ পরিণামও ভয়াবহ হল। নবাব মীরকাশিম আরো অনেকের সঙ্গে সেই দুই প্রধান শেঠকে গঙ্গার জলে ডুবিয়ে হত্যা করেন। ওই ঘটনায় জগৎশেঠ পরিবারের ব্যবসা যে ঘা খেল, সেটা থেকে তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারেন নি।
দেওয়ানী হাতে পেয়েই ক্লাইভ রুক্ষভাবে তাঁদের উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে রাজকোষের চাবি ছিনিয়ে নিল। রাজকোষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগের ভিত্তিতেই জগৎশেঠের বিশাল ব্যবসা গড়ে উঠেছিল। সেই সংযোগ ঘুচে যাবার পরে তাদের ব্যবসাও আর টিকে থাকে নি। ইংরেজরা অসংখ্য প্রকারে ওই পরিবারের কাছে ঋণী ছিল। সেই ঋণ তারা চরম বেইমানি দিয়েই শোধ করল।
নদীয়ার রাজা ‘কৃষ্ণচন্দ্র’ তলে তলে পলাশীর ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের সাহায্য করেছিলেন। ইংরেজরা সে সবও মনে রাখে নি। তিন কোটি টাকার দাবি মেটাতে মীরজাফর লিখে দিয়েছিলেন যে নদীয়া জমিদারীর খাজনা মুর্শিদাবাদে না গিয়ে ইংরেজদের ‘তনখা’ হয়ে কলকাতায় যাবে।
ওই টাকা আদায় করবার জন্য ইংরেজরা কৃষ্ণচন্দ্রকে অশেষ উৎপীড়ন করল। এমন কি সনাতন হিন্দু সমাজের প্রধান ধারক ও বাহক সেই রাজার ‘জাতিনাশ’ করবার ভয় পর্যন্ত দেখানো হল। শেষে বুড়ো বয়সে তাঁর জমিদারী অপরিমেয় ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ল। রাজা মারা যাবার পরে তার বংশধরেরাও সেই জমিদারীকে আর রক্ষা করতে পারল না। ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূর্যাস্ত আইনে’ নদীয়া জমিদারীর প্রায় সব নিলাম হয়ে গেল।
© রাজিক হাসান
মানব সভ্যতার” নিরানব্বই ভাগ সময়টাইমানুষ কাটিয়েছে বনে জঙ্গলে ফলমূল সংগ্রহ করে
প্রায় এক লক্ষ বছর আগে মানুষ আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে আসে। সে সময় থেকে শুরু করে আধুনিক সময়কাল বিবর্তনের পঞ্জিকায় হিসেব করলে খুবই ক্ষুদ্র একটা সময়। আর দশ হাজার বছর আগে কৃষি কাজের উদ্ভব কিংবা তারো পরে শিল্প বিপ্লব ইত্যাদি তো আরো তুচ্ছ। সঠিকভাবে বলতে গেলে, মানুষ শিকারী-সংগ্রাহক ছিল প্লাইস্টোসিন যুগের পুরো সময়টাতে: ২৫ লক্ষ বছর পূর্ব থেকে ১২,০০০ বছর পূর্ব পর্যন্ত। “হোমো” গণ এর উদ্ভবের সময়কালটাও ২৫ লক্ষ বছর পূর্বের দিকে। তার মানে মানুষের ২৫ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ইতিহাসে ৯৯% সময়ই তারা ছিল শিকারী-সংগ্রাহক। অর্থাৎ, ইভল্যুশনারী স্কেলে মানুষেরা “মানব সভ্যতার” শতকরা নিরানব্বই ভাগ সময়টাই বনে জঙ্গলে ফলমূল সংগ্রহ করে আর শিকার করে কাটিয়েছে, বনে-জঙ্গলে বিষাক্ত পোকা-মাকড়ের সঙ্গে কাটিয়েছে।
ইলুমিনাতি : সিক্রেট সোসাইটি
ইলুমিনাতি শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ইলুমিনেটাস এর বহুবচন, যার অর্থ হলো আলোকিত, কিংবা প্রত্যাদেশ। অর্থাৎ যার উপর সুপারন্যাচারাল কোনো সত্ত্বার পক্ষ থেকে জ্ঞান আসে। ইসলামি পরিভাষায় আমরা যাকে বলি ওহি। ইতিহাসের নানা যুগে এই নামে একাধিক সংগঠনের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। ইলুমিনাতিদের ব্যাপারে সর্বপ্রথম তথ্য উদ্ঘাটন করেন উনিশ শতকের স্পেনিশ ইতিহাসবিদ মার্সেলিনো মেনেন্দে পিলায়ো (Marcelino Menéndez y Pelayo)। ১৪৯২ সালের দিককার এক ডকুমেন্টে ইলুমিনাতি শব্দটির স্পেনিশ উচ্চারণ আলুমিনাদোস শব্দটির উল্লেখ পান তিনি। তার ভাষ্যমতে তৎকালীন স্পেনে ইলুমিনাতিদের উত্থান ঘটেছিল ইতালির প্রভাবে। তাদের প্রধান নেত্রী ছিল মারিয়ে দ্য সান্তো দোমিঙ্গো (María de Santo Domingo)। স্পেনের শহর সালামানকার এক দরিদ্র শ্রমিকের মেয়ে। আনুমানিক ১৪৮৫ সালের দিকে তার জন্ম। সেসময় ক্যাথলিক খৃষ্টানদের প্রধান চারটি ধারা ছিল, তন্মধ্যে একটি ছিল ডোমিনিকান ধারা। কিশোরী বয়সে মারিয়ে দ্য সান্তো দোমিঙ্গো এই ধারায় যোগ দেয়।
কিছুদিন পর সে নিজেকে নবি দাবি করতে শুরু করে। যিশু খৃষ্ট এবং মেরির সাথে তার সরাসরি আলাপসালাপ হয় বলে দাবি করে। তাকে কেন্দ্র করে যে ধারা গড়ে উঠে, ইতিহাসে তারা আলোমব্রাডোস (alumbrados) নামে পরিচিত। তাদের আন্দোলনের মূল দাবিই ছিল—চর্চার মাধ্যমে কেউ নিজেকে আলোকিত করতে পারলে তার সাথে সরাসরি যিশু খৃষ্টের সাক্ষাৎ ঘটবে।
স্পেনের তৎকালীন শাসক দ্বিতীয় ফার্দিন্যান্দ তাকে ডাকে। এই সেই ফার্দিন্যান্দ যিনি ইসাবেলার সাথে মিলে স্পেন থেকে মুসলিমদেরকে বিতাড়িত করেছিল। মারিয়েকে রাজপ্রাসাদে ডেকে নিয়ে কথা বলে সে নিজেও তার মিশনে আশ্বস্ত হয় এবং এই আন্দোলনে যোগ দেয়। আরও একাধিক প্রভাবশালী শাসক মারিয়ের আন্দোলনের সদস্য ছিল। এখানকার ডোমিনিকান খৃষ্টানরা নতুন আন্দোলনের প্রতি বিরক্ত হয়ে পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াসের নিকট পত্র পাঠায়। আলোমব্রাডো ইলুমিনাতিদের বিরুদ্ধে শুরু হয় চার্চের ইনকুইজেশন। ধীরে ধীরে স্পেনিশ ইলুমিনাতিদের অনেকে পালিয়ে যায়, বাকিরা আত্মগোপনে চলে যায়।
১৬২৩ সালের দিকে স্পেন থেকে এই আন্দোলন ফ্রান্সে যায়। কিন্তু মাত্র ১২ বছরের ভেতর ১৬৩৫ সাল নাগাদ তাদেরকে দমন করা হয়। তবে ১৭২২ খৃষ্টাব্দের দিকে ফ্রান্সে তাদের আরেকটি গ্রুপের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। সেসময় ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষ ফুঁসছিল। সময়টা ছিল ফরাসি বিপ্লবের প্রাককাল। এসময় নানা সশস্ত্র গোষ্ঠির উদ্ভব হচ্ছিল। তেমনই একটি দল ছিল কমিসার্ড। ক্যাথলিক খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে এটি ছিল ফরাসি প্রোটেস্ট্যান্ট খৃষ্টানদের একটি দল। এই দল থেকে ভেঙ্গে আরেকটি দল গঠিত হয়, যারা ফ্রেঞ্চ প্রফেটস বা ফরাসি নবি হিশেবে পরিচিত। তাদের সঙ্গে তৎকালীন ফরাসি ইলুমিনাতিদের যোগসাজশ ছিল।
ইলুমিনাতিদের দ্বিতীয় আরেকটি প্রাচীন গ্রুপের কথা জানা যায়। সময়ের বিচারে তারা যদিও আলোমব্রাডোসদের চাইতে প্রাচীন, কিন্তু তাদের তথ্য উদ্ঘাটন হয়েছে আলোমব্রাডোসদের পরে। ১৬১৪ খৃষ্টাব্দে ফামা ফ্র্যাটারনিটাটিস নামে একটি লিফলেট প্রচারিত হয়। এতে ক্রিশ্চিয়ান গোজেনকুয়েজ (Christian Rosenkreuz) নামে এক জার্মান পরিব্রাজক ও গুপ্তজ্ঞানচর্চাকারীর কথা বিবৃত হয়েছে। ধারণা করা হয় ১৩৭৮ সালে তার জন্ম হয়েছিল। পরে দামেস্ক, ইয়েমেন, মিশর, ফেজ ইত্যাদি নানা শহর ভ্রমণের পর জার্মানিতে ফিরে এসে নতুন গুপ্তসংঘ প্রতিষ্ঠা করে। ইতোপূর্বে সে আলোমব্রাডোসদের সংস্পর্শেও এসেছিল।
বইয়ের ভাষ্যমতে সে জার্মানিতে এসে প্রথমে তিনজন এবং পরে আটজনকে শিষ্য বানিয়েছিল। তাদেরকে তার গুপ্তজ্ঞানে দীক্ষিত করার পর নানা দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়—তাদের জ্ঞান ও অস্তিত্বের কথা ১০০ বছর গোপন রাখতে হবে। ঠিক একশো বছর পর তার এক শিষ্য তার লাশ ও গোপন নথিপত্র খুঁজে পায়। তারা একে পুনরায় লুকিয়ে ফেলে এবং শিষ্যরা চিরদিনের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। ইলুমিনাতিদের এই ধারাটি রোজিক্রুশিয়ান (Rosicrucians) নামে পরিচিত। বলা হয়ে থাকে বৃটিশ দার্শনিক ও রাষ্ট্রনায়ক স্যার ফ্রান্সিস বেকন এদের সাথে যুক্ত ছিল।
বেভারিয়ান ইলুমিনাতি
বর্তমানে ইলুমিনাতিদের যে শাখাটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়, তাদেরকে বলা হয় বেভারিয়ান ইলুমিনাতি। বেভারিয়া বর্তমান জার্মানির একটি শহর। কিন্তু যে সময় গুপ্তসংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বর্তমান জার্মানির অস্তিত্ব ছিল না। তখন এখানে ছিল দ্য হোলি রোমান এম্পায়ার। হোলি রোমান এম্পায়ারের সাথে দ্বন্দ্ব চলছিল প্রতিবেশি ফ্রান্সের। ফ্রান্সে তখন রাজনতন্ত্রবিরোধী এবং গণতন্ত্রকামীদের উত্থানকাল চলছিল। ফ্রান্সের চিন্তকরা গণতন্ত্রের পক্ষে, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে অনবরত লিখে যাচ্ছিলেন।
তাদের চিন্তার প্রভাব গিয়ে পড়ে বেভারিয়াতে বসবাসকারী পাগলাটে ধরনের এক প্রফেসরের উপর। নাম এডাম ওয়েইজহপ্ট (Adam Weishaupt)। বেভারিয়ার ইংগোশত্যাত (Ingolstadt) শহরে ১৭৪৮ সালে এডামের জন্ম। ওয়েইজহপ্টের পূর্বসূরীরা ছিল ইহুদি ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত খৃষ্টান। বারো বছর বয়সে তারা বাবা মারা যাওয়ার পর এক চাচার কাছে বড় হয়। চাচা ছিল জ্ঞানপিপাসু এবং পণ্ডিত লোক। তিনি তাকে খৃষ্টানদের একটি ধারা জেস্যুইট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। পড়াশোনা শেষে এডাম ওয়েইজহপ্ট ইউনিভার্সিটি অব ইংগোশত্যাত-এ ন্যাচারাল এন্ড ক্যানন ল এর প্রফেসর হিশেবে কর্মজীবন শুরু করে।
ওয়েইজহপ্টের জীবনে লক্ষ করলে দেখা যায় সবসময়ই তিনি ছিলেন অস্থিরমতি। বালক বয়সে চাচার লাইব্রেরিতে ফরাসি বিপ্লবের উপর প্রচুর বইপত্র পড়াশোনার পর তার উপলব্ধি ছিল—রাজতন্ত্র এবং চার্চ মানুষের চিন্তাকে আটকে রাখছে। মনে রাখতে হবে—সেসময় বেভারিয়া ছিল হোলি রোমান এম্পায়ারের অংশ। ফলে সেখানে ছিল কট্টর ক্যাথলিক খৃষ্টবাদের প্রভাব। রাজা সবসময় ফরাসি বিপ্লব নিয়ে আতঙ্কিত থাকতেন, কখন না জানি এটা তার রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ে!
ওয়েইজহপ্ট মনে করতেন খৃষ্টধর্ম আধুনিক রাষ্ট্রের সমস্যা সমাধানে সক্ষম না। সেসময় ইউরোপে ফ্রিম্যাসনদের বেশ প্রসিদ্ধি ছিল। প্রথাগত চিন্তার বাইরে বিপ্লবী ও বাস্তববাদী চিন্তার ধারক হিশেবে অনেকেই তাদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল। ওয়েইজহপ্টও ফ্রিম্যাসনে যোগ দিতে মনস্থ করেছিল। কিন্তু তাদের অনেক চিন্তার সাথে একমত হতে না পেরে নিজেই মানুষকে ‘ইলুমিনেট’ বা আলোকিত করার সিদ্ধান্ত নেন। ফ্রিম্যাসন, প্রাচীন মিশরীয় মিথলোজি আর ইহুদিদের রহস্যময় কাব্বালা ধারা থেকে ধার নিয়ে নিজেরই আরেকটা দল দাঁড় করিয়ে ফেলেন, ইতিহাসে যা পরিচিতি পায় ‘ইলুমিনাতি’ নামে।
১৭৭৬ সালের মে মাসের প্রথম রাতে ইংগোশত্যাতের জঙ্গলে টর্চলাইটের আলোতে যখন পাঁচজন লোক গোসল করে ইলুমিনাতি সংগঠন আর তাদের গুপ্তপ্রথার সূচনা করছিল, তাদের কেউই জানত না একুশ শতকে এসেও তাদের এই ক্ষুদ্র সংগঠন মানুষকে কীভাবে আচ্ছন্ন করে রাখবে। সে রাতেই ঠিক করা হয় ইলুমিনাতির গঠন ও পরিচালনা প্রক্রিয়া। সদস্যদেরকে তিনটি ধাপে বিভক্ত করা হয়। সংগঠনের রীতিনীতি আর আদর্শে যত বেশি বলীয়ান হবে, এক ধাপ থেকে উন্নতি ঘটবে পরের ধাপে।
প্রথমদিকে ইলুমিনাতি ওয়েইজহপ্টের ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ১৭৮২ সালে সংগঠনের ছয়শো সদস্যের কথা জানা যায়। অবশ্য ইলুমিনাতি যখন সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত ছিল, তখনই এর সদস্য সংখ্যা সর্বোচ্চ ২-৩ হাজারে পৌঁছেছিল।
এসময় ওয়েইজহপ্টের শিষ্যরা ছাড়াও বেভারিয়ার প্রভাবশালী অনেকেই ইলুমিনাতিতে যোগ দেয়। এদের ভেতর ছিল ব্যারন এডলফ ভন কেনিগে (Baron Adolph von Knigge)। আগে ফ্রিম্যাসন ছিলেন। ১৭৮৪ সালে ইলুমিনাতিতে যোগ দেওয়ার পর এর কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। তিন স্তর বিশিষ্ট সদস্যপদকে তেরো স্তরে ভাগ করেন। যদিও মূল ধাপ তিনটিই ছিল। কিন্তু প্রতিটির ভেতর একাধিক উপ-স্তর করা হয়। ইলুমিনাতিদের বিখ্যাত সেই সিম্বলে দেখা যায় তেরো স্তর বিশিষ্ট একটি পিরামিড। এটি এখান থেকেই শুরু। এর দ্বারা ইলুমিনাতিদের তেরো স্তর নির্দেশ করা হচ্ছে। এর উপরে আছে একটি চোখ। যা ফ্রিম্যাসনদের প্রতীক। ইলুমিনাতিদের পিরামিডের উপরও প্রতীকটি জুড়ে দেন ভন কেনিগে। ফ্রিম্যাসনে সবাইকে গোপন সাংকেতিক নাম দেওয়া হতো, ইলুমিনাতিতেও এর সূচনা হয় তার হাত ধরে।
১৭৮৯ সালে শুরু হয় ফরাসি বিপ্লব। এদিকে ইলুমিনাতির ভেতরেও শুরু হয় কোন্দল। তীব্র রেষারেষিতে টিকতে না পেরে ভন কেনিগে অবশেষে গুপ্তসংগঠন ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। এসময় ইলুমিনাতির আরেক সাবেক সদস্য বেভারিয়ার শাসক বা গ্র্যান্ড ডাচেসের নিকট চিঠি লিখে ইলুমিনাতির সব গোপন কার্যক্রম ফাঁস করে দেন। এবং সতর্ক করেন যে তারা বেভারিয়াতেও ফরাসি বিপ্লবের মতো বিদ্রোহ সংগঠিত করতে চাচ্ছে।
১৭৮৭ সালের আগস্টে বেভারিয়ার ডিউক এক ডিক্রিতে ইলুমিনাতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং এর সাথে সম্পৃক্ততার সাজা মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। এর আগেও অবশ্য ১৮৮৪ ও ৮৫ সালে তাদের বিরুদ্ধে দুটি ডিক্রি জারি করা হয়েছিল।
এডাম ওয়েইজহপ্টের আখড়ায় অভিযান চালানো হয়। প্রাপ্ত নথিপত্রে দেখা যায় তারা শত্রু বিনাশে আত্মহত্যার পক্ষপাতী। গোপন কালি ও অন্যান্য অনেক সিক্রেট সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। ওয়েইজহপ্টকে ইউনিভার্সিটি থেকে চাকরিচ্যুত করে পার্শ্ববর্তী আরেক শহরে নির্বাসিত করা হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় ইউরোপের অনেক দেশের একটি, জার্মানি, জার্মানির অনেক শহরের একটি—বেভারিয়ায় খেয়ালি প্রফেসরের ইচ্ছায় গড়ে উঠা অতি ক্ষুদ্র এক সংগঠন ‘ইলুমিনাতি’।
ইলুমিনাতি কি এখনো আছে?
আধুনিককালে ইলুমিনাতি টিকে আছে নাকি ১৭৮৭ সালের নিধনের ফলে বিলুপ্ত হয়ে গেছে? বিষয়টি আজও তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে ইলুমিনাতিদের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব সম্পর্কে তিনটি ধারণা জনপ্রিয়।
এক : ইলুমিনাতিরা ফ্রিম্যাসনের ভেতর মিশে গেছে। এবং ফ্রিম্যাসন যেহেতু এখনো টিকে আছে, তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে, তাদের ঘোষিত সদস্য সংখ্যা ৫ মিলিয়ন বা পঞ্চাশ লাখ, তাই ফ্রিম্যাসনের ভেতর দিয়ে মূলত ইলুমিনাতিও টিকে আছে। ইলুমিনাতির প্রথম দিককার সদস্যরা যেমন অনেকেই ফ্রিম্যাসন থেকে এসেছিল। তদ্রূপ ইলুমিনাতির বিলুপ্তির পর তাদের অনেকেই পুনরায় ফ্রিম্যাসনে যোগ দেয়। ফলে নিজ নামে না হলেও ইলুমিনাতি এখনো বেশ দাপটের সাথেই টিকে আছে।
এই মতের সপক্ষে আছেন বিখ্যাত ফিজিশিস্ট জন রবিনসন। ১৭৯৭ সালেই তিনি মন্তব্য করেন যে ইলুমিনাতিরা ফ্রিম্যাসনদের ভেতর মিশে গেছে।
দুই : তাদের ব্যাপারে দ্বিতীয় মতটির উদ্ভব ঘটে তাদের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির পরপরই, ১৭৯৭ সালে। ফরাসি জেস্যুইট পাদরি ও লেখক এবে অগাস্টিন বাগুয়েল (Abbe Augustin Barruel) ১৭৯৭ সালে তার প্রকাশিত ফরসি বিপ্লবের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থে লেখেন যে ইলুমিনাতিরা ফরাসি বিপ্লবের মূল নটরাজ। ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন যে বিশ্বব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে, এর মূলে আছে ইলুমিনাতিরা। এখনো বিশ্বের কলকাঠি বহুলাংশে তাদের হাতে, তাদের নিয়ন্ত্রিত। ১৭৯৯ সালে তার বইটির প্রথম ইংরেজি ভার্সন প্রকাশিত হয় “Memoirs Illustrating the History of Jacobinism” নামে।
তিন : তৃতীয় ধাপে আছেন যারা মনে করেন ইলুমিনাতি পুরোপুরি কাল্পনিক বিষয় এবং মিথ। বর্তমানে ইলুমিনাতিদের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাদের মতে—একুশ শতকে ইলুমিনাতি ধারণা জনপ্রিয়করণের জনক মার্কিন প্রযোজন ও নাট্যকার রবার্ট উয়িলসন, এবং তার সতীর্থ কেরি থর্নলি।
রবার্ট উয়িলসন প্লেবয় ম্যাগাজিনে কাজ করতেন। ১৯৬০ এর দশকে তাদের মনে হয়েছে পৃথিবীটা খুব বেশি নিয়ন্ত্রণবাদী, খুব বেশি আঁটসাঁট এবং ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে যাচ্ছে। একে ভেঙ্গে ফেলা দরকার। ঠিক যেমন মনে হয়েছিল খেয়ালি প্রফেসর এডম ওয়েইজহপ্টের। এবং তা ভাঙ্গার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হচ্ছে ভুল তথ্যের মাধ্যমে অস্থিরতা ছড়িয়ে দেওয়া। সেই চিন্তা থেকে উয়িলসন আর থর্নলি যৌথভাবে মানুষের কাছে ইলুমিনাতিদের নিয়ে নানা চিঠিপত্র লেখতে শুরু করেন। যখন পাঠকরা অধিকতর তথ্য চেয়ে চিঠি লেখত, তারা আগের তথ্যের পুরো বিপরীত তথ্য দিতেন। এভাবে পাঠকদের মাঝে শুরু হয় কানাঘুষা, অস্থিরতা। তীব্র বেগে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে ইলুমিনাতিদের বিশ্বনিয়ন্ত্রণের ধারণা।
এক দশক পর ১৯৭৫ সালে রবার্ট উয়িলসন আর রবার্ট শেয়া মিলে লেখেন ‘দ্য ইলুমিনাতি ট্রিলোজি : দ্য আই ইন দ্যা পিরামিড’ বইটি। তিন খণ্ডের ঢাউস এই থ্রিলার তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই সাথে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে আধুনিক মানুষের মন ও মস্তিষ্কে আঠারো শতকে হারিয়ে যাওয়া ইলুমিনাতিদের বসবাস। @ রাকিবুল হাসান
এডওয়ার্ড সাঈদ : দ্য ভয়েস অফ প্যালেস্টাইন
লোকটি তার বারো বছরের বাচ্চাকে নিয়ে প্রাচীরের আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেছিল। তার ডানদিকে ছিল ইসরায়েলি সৈন্য এবং তাদের বিপরীতে ছিল ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনী। তার ঠিক সামনেই ছিল ইসরায়েলি ঘাঁটি। আমি তখন কী করতে পারি। রাস্তা পার হওয়াও সম্ভব ছিল না। গুলির মতো বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছিল। আমার চারপাশের শিশুরা ভয় ও আতঙ্কে কাঁপছিল; চিৎকার করছিল। এদিকে, আমি আমার ক্যামেরা মারফত দেখলাম, যে শিশুটি তার বাবার সাথে গুলি থেকে পালাতে চেষ্টা করছিল, গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছে। সাথে সাথে তার বাবাকেও গুলি করা হয়েছে, কিন্তু সে হাত নেড়ে সাহায্যের জন্য ডাকছিল, গুলি বন্ধ করতে অনুরোধ করছিল। এই মুহূর্তে আমাকে যা চিন্তা করতে হয়েছিল, তা হলো আমি যা কিছু শুট করেছি; আমাকে তা রক্ষা করতে হবে, কারণ এটি আমার জীবিকা। কিন্তু আমি নিজেকে নিয়েও চিন্তিত ছিলাম, আমি জানতাম এই ছবি মূল্যবান বটে, তবে মানুষের জীবনের (আমার নিজের জীবন) চেয়ে বেশি নয়। আমি যখন ভাবছিলাম, তখন একটা গগণবিদারী শব্দ আর ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। ধোঁয়া পরিচ্ছন্ন হবার আগ পর্যন্ত বারো বছরের ছেলেটি বেঁচে ছিল। দেখলাম, ছেলেটি তার বাবার কোলে নিথরদেহে শায়িত। বাবা দেয়ালের সাথে লেপ্টে আছেন, নিশ্চল, নিষ্ক্রিয়। আমি যখন অফিসে ফিরে যেতে লাগলাম, একটি সংবাদ সংস্থার সাংবাদিক পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, তাকে জিজ্ঞেস করলাম হতাহতের সংখ্যা কত? তিনি জানালেন, তিন। আমি বললাম আরও দুই যোগ করুন। এই বলে বাবা-ছেলের ভিডিওটি দেখালাম ভিডিও দেখে তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার জবান থেকে বেরিয়ে আসল—‘হায় আল্লাহ, এই হলো জামাল আর এই হলো মুহাম্মদ, এরা উভয়ে বাজারে গিয়েছিল।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি তাদের চেনেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এরা আমার শ্যালক ও ভাতিজা।’
এটি ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০০০ সালের একটি ঘটনার বিবরণ, যা গাজায় বসবাসকারী সাংবাদিক তালাল আবু রাহমা বর্ণনা করেন। তিনি ফ্রান্স ২ (টিভি) এর জন্য কাজ করতেন। পিতার নাম জামাল আল-দুরা এবং পুত্রের নাম ছিল মুহাম্মদ আল-দুরা। সে সময়, ছবিটি সারা বিশ্বের সংবাদপত্রে ছাপা হয়। বড় বড় পত্রিকাও তাদের প্রথম পাতায় এটিকে স্থান দেয়। ফিলিস্তিনিরা এটিকে ‘দ্বিতীয় ইন্তিফাদা’র সবচেয়ে আলোচিত ও ঐতিহাসিক চিত্র বলে মনে করেন। ভিডিও থেকে নেওয়া ছবিগুলির একটি সিরিজ স্পষ্টভাবে দেখায় যে, কীভাবে মুহাম্মদকে গুলি করা হয়েছিল আর সে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল, এবং তার বাবার গায়ে গুলি বিদ্ধ হচ্ছিল।
মুহাম্মদের বাবা জামাল আল-দুরা আহত হলেও বেঁচে যান। এনডিটিভির সাম্প্রতিক এক খবরে বলা হয়েছে, ‘মুহাম্মদের শাহাদাতের ৩২ বছর পর জামাল আল-দুরা এখন তার পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে কাঁদছেন আর এই বলে শোকের বর্ণনা দিচ্ছেন—‘গাজা উপত্যকায় আমার ছেলের রক্ত এখনো বইছে। আজ থেকে ৩২ বছর আগে আমার ছেলে শহীদ হয়েছিল। আর আজ ইসরায়েলি সেনারা আমাদের বাড়ি টার্গেট করে, যার ফলে আমার দুই ভাই, ভাবী ও আমার ভাতিজি আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। আমার অনেক প্রতিবেশীও মারা গেছেন, যাদের অধিকাংশই শিশু। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিশেষভাবে শিশুদের টার্গেট করে। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি সেনারা প্রতিদিন একটি করে শিশুকে হত্যা করে।’
এটাই ফিলিস্তিনের প্রাত্যহিক জীবন। চেকপোস্টে কখন কাকে থামানো হবে, কখন কাকে তল্লাশি করা হবে, কখন কোন বাড়ির ওপর দিয়ে বুলডোজার চলে যাবে, কখন কোন এলাকা গুলির শব্দে প্রতিধ্বনিত ও প্রকম্পিত হতে শুরু করবে, কেউ জানে না। আজ গাজায় বর্বরোচিত বোমাবর্ষণ চলছে, আমরা সেখানকার খবরা-খবর মনোযোগ সহকারে শুনছি ও দেখছি। কাল যুদ্ধ থেমে যাবে এবং সবকিছু ‘নরমাল’ হয়ে যাবে। তারপর আমরাও স্বাভাবিক হয়ে উঠব; কিন্তু ফিলিস্তিন নামের সেই অঞ্চলটি কখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে না। যুদ্ধ সেখানে চলতেই থাকে, ছোট হোক বা বড়, সংবাদমাধ্যমে আসুক বা না আসুক, শরীরের রক্ত ঝরুক বা জমে যাক! এ এক করুণ কাহিনি, মানুষ ও মানবতার ট্রাজেডি। হ্যাঁ, এটি ‘সভ্য’ পৃথিবীর একটি কুৎসিত চেহারা।
কেন তবে এ যুদ্ধবিগ্রহ? রক্তের এই হোলির হেতু কী? মুক্ত পৃথিবীতে কেন এই নির্দয় দাসত্বের শৃঙ্খল?কেন? কখন? কী জন্য? এই সমস্ত প্রশ্নের জবাব নিহিত ও বিবৃত আছে জনৈক নিরপেক্ষ ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান, আত্মবোধসম্পন্ন ফিলিস্তিনি নাগরিক এডওয়ার্ড সাঈদের লেখালেখি ও বক্তৃতামালায়।
এডওয়ার্ড সাঈদ জেরুজালেমে জন্মগ্রহণ করেন। জেরুজালেম এবং মিশরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর আমেরিকায় চলে আসেন এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এবং পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। এখানে বাউডইন (Bowdoin) পুরস্কারেও ভূষিত হন সাঈদ। ১৯৭৪ সালে, এডওয়ার্ড সাঈদ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যের ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। ১৯৭৫-৭৬ সালে, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান এবং আচরণ-বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষা বিভাগে ফেলো হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালে, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য-সমালোচনার উপর বক্তৃতা প্রদান করেন। ১৯৭৯ সালে আরেকটি বিখ্যাত আমেরিকান ইউনিভার্সিটি, জন হপকিন্স-এর মানবিক বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। এর পরে নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ও তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হয়েছিলেন।
এডওয়ার্ড সাঈদের গ্রন্থগুলো এ পর্যন্ত আটটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি তাকে তার ‘বিগিনিংস : ইনটেনশন অ্যান্ড মেথড’ (Beginnings: Intention & Method) গ্রন্থের জন্য প্রথম বার্ষিক ট্রিলিং (Trilling) পুরস্কার প্রদান করে। ১৯৭৮ সালে, তার Orientalism গ্রন্থটি আমেরিকার ন্যাশনাল বুক ক্রিটিক সার্কেল পুরস্কারের সমালোচনা বিভাগে দ্বিতীয় স্থান লাভ করে। তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “Literature and Society” Ges “Conrad and the Fiction of Autobiography’। সাঈদ প্যালেস্টাইন জাতীয় কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ফিলিস্তিনিদের অবস্থান জোরালোভাবে উপস্থাপন করার দায়ে (!) জায়নবাদীরা শুধু মৌখিকভাবে নয়, শারীরিকভাবেও তাঁর উপর আক্রমণ করেছে। ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০০৩ এ নিউ ইয়র্ক সিটিতে তাঁর প্রয়াণ হয়।
লেখনী, বক্তৃতা ও তৎপরতা—তিন ক্ষেত্রেই বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের এক অত্যন্ত দক্ষ ও সক্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত এডওয়ার্ড সাঈদ। উত্তর-ঔপনিবেশিক অধ্যয়ন ও গবেষণায় তার রয়েছে অসাধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রাচ্যতত্ত্বের ধারণায় এডওয়ার্ড সাঈদ সামগ্রিকভাবে অনেক বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক এবং সমালোচকদের প্রভাব স্বীকার করেন, যাঁদের মধ্যে জ্যঁ-পল সার্ত্র (১৯০৫-১৯৮০), মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪), আন্তোনিগ্রামসি (১৮৮৯-১৯৩৭) এবং জোসেফ কনরাড (১৮৫৭-১৯২৪) সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। সাঈদের মতে, ঔপনিবেশিকতার সময় প্রাচ্যতাত্ত্বিকরা তাদের সাম্রাজ্যবাদী সরকারের জন্য স্থায়ী ভূমিকা পালন করেছিল। তারা পরাধীন জনগণকে বুঝিয়েছিল ঔপনিবেশিকতাই তাদের সমৃদ্ধি, শান্তি ও অগ্রগতি এনে দেবে।
এডওয়ার্ড সাঈদ বিশিষ্ট ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদদের ধারণা ও রচনার বিশ্লেষণ হাজির করেছেন, যারা প্রাচ্যবাদকে বিশেষ দিক-মাত্রা দিয়েছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ আর্থার জেমস বেলফোর (১৮৪৮-১৯৩০)। বেলফোর তার অসাধারণ একাডেমিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থানের কারণে ব্রিটিশ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ঔপনিবেশিকতার পক্ষে যুক্তি দেন যে, ইউরোপ তার অধিকৃত অঞ্চলে তার সেরা সেরা মস্তিষ্ক অর্থাৎ বুদ্ধিজীবী-বিশেষজ্ঞদের প্রেরণ করার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সচেতনতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অন্তর্দৃষ্টি তৈরি করে। পরাধীন ভূখণ্ড শাসন করা পশ্চিমাদের অনুগ্রহ। সাঈদ ঔপনিবেশিকতা সম্পর্কে বেলফোরের এ তত্ত্বের সমালোচনা করেন। তার দৃষ্টিতে, মিশরে ব্রিটেনের উপস্থিতি ছিল সম্পূর্ণতই সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যের অধীন।
সাঈদ ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তার দুটি গ্রন্থ, ‘ওরিয়েন্টালিজম’ এবং ‘দ্য কোয়েশ্চেন অফ প্যালেস্টাইন’ দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। ফুকো, ফ্রাঞ্জ ফ্যানো, রাইমুন্ডোলেমস এবং ইব্রাহিম আবুলগুর দ্বারা অনুপ্রাণিত ৩২ বছরের সাহিত্যের শিক্ষকের এ গ্রন্থ দুটি পশ্চিমা জ্ঞানিক ঐতিহ্যকে জেরা করে দেখায়, কীভাবে পশ্চিমা পণ্ডিতদের মাধ্যমে (প্রাচ্যের মানুষ) বিশেষ করে আরব, তাদের সমাজ ও সভ্যতা সম্পর্কে উৎপাদিত জ্ঞান প্রাচ্যের ওপর পশ্চিমের ঔপনিবেশিক দখলকে শক্তিশালী করতে কাজ করেছে। কীভাবে পশ্চিমের চিন্তাবিদ, শিল্পী ও লেখকদল জান্তে-অজান্তে প্রাচ্যের হীনমন্যতার মিথ তৈরিতে লিপ্ত হয়েছে, যা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের ভিত তৈরি করে দেয়। এবং, তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ইউরোপীয় রেনেসাঁর মূল্যবোধ ইউরোপীয় উপনিবেশবাদকে প্রভাবিত করেছিল।
সাঈদের সকল সৃষ্টিকর্মের মধ্যে Orientalism বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি মিশেল ফুকোর Truth, Knowledge, Power তত্ত্বের আলোকে প্রাচ্যের উপর পশ্চিমের নিয়ন্ত্রণবিধিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন এ গ্রন্থে। ইম্পেরিয়াল কালচার নিয়ে সাঈদের আগে, ফ্রাঞ্জ ফানোঁ তার বইয়ে (১৯৬১) ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন যে, ঔপনিবেশিকতা একটি জাতির অতীত এবং বর্তমানকে তার নিজস্ব এজেন্ডা অনুসারে পুনর্গঠন করতে কাজ করে। তাই উপনিবেশিতের (Colonized) প্রথম কাজ হওয়া উচিত তার আদি অতীত পুনরুদ্ধার করা। প্রাচ্যতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাঈদ আন্তোনিও গ্রামসির Hegemony ধারণারও ব্যবহার করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনা সাঈদের এ গ্রন্থটির মাধ্যমে শুরু হয়েছে এবং আজ এটি একটি নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত। সাঈদের এ গ্রন্থ ইউরোপ ও পাশ্চাত্য কেন্দ্রিকতাকে ইনকার করে। এমন নয় যে, এই বিষয়ে সাঈদ প্রথম বলেছেন। কিন্তু সাঈদই প্রথমবারের মতো শক্ত তাত্ত্বিক ভিত্তিতে পাশ্চাত্যের ধারণায় প্রাচ্যের উপর ছেয়ে থাকা আস্তরণকে প্রামাণিক পদ্ধতিতে উন্মোচন করেছেন।
ফিলিস্তিন সমস্যা কয়েক দশক ধরে অমীমাংসিত। ১৮৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে, জায়নবাদী উপনিবেশবাদীদের প্রথম কাফেলা ফিলিস্তিনের উপকূলে এসে ভিড়তে থাকে এবং ১৯৬৭ সালের মধ্যে এই উর্বর অঞ্চলটি জোরপূর্বক দখল করে নেয়। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত হওয়ায় এডওয়ার্ড সাঈদ পশ্চিমাদের আগ্রাসন এবং ইহুদিদের জোরপূর্বক দখলদারত্বের বিরুদ্ধে লিখিত প্রতিবাদ করেন। তিনি তার The Question Of Palestine (১৯৭৮) গ্রন্থে কলোনাইজারের কুৎসিৎ মুখোশ উন্মোচন করেন। ইউরোপ ও আমেরিকার দ্বৈত নীতি ও পক্ষপাতদুষ্টতাকে নগ্ন করেন নিদারুণভাবে।
এডওয়ার্ড সাঈদ উক্ত গ্রন্থে যেসব মৌলিক বাহাস, যেমন জায়নবাদ কী? কোথা থেকে এর উৎপত্তি? এর প্রচারের জন্য ইহুদিরা কী চাতুরি করেছে? পশ্চিমা রাজনীতিবিদরা ফেরেব-প্রতারণার কী কী জাল বিস্তার করেছে? তথাকথিত উদারপন্থি বুদ্ধিজীবী, ঔপন্যাসিক, কবি, কলামিস্ট, ভ্রমণ-লেখক এবং জায়নবাদের অন্যান্য সহানুভূতিশীলরা কীভাবে পরিবেশকে মসৃণ করে তুলেছে? স্বয়ং জায়নবাদীরা ফিলিস্তিনে বসতি গাড়তে কী কী তদবির কাজে লাগিয়েছে এবং নিজেদের দাবিকে সত্য প্রমাণ করার জন্য কীরূপ বয়ানের আশ্রয় নিয়েছে? এভাবে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠার পর ফিলিস্তিনিদের কিভাবে নির্বাসিত করা হয় এবং সকল দাবি-দাওয়া সত্ত্বেও অদ্যাবধি কীভাবে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রাখা হয়েছে? ফিলিস্তিনিরা কীভাবে স্বাধীনতা আন্দোলন সংগঠিত করেছে এবং কীভাবে ফিলিস্তিনি কবি, গল্পকার, অন্যান্য লেখক-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা এ আন্দোলনের জন্য জমিকে উর্বর ও মসৃণ করেছে? পিএলও এবং অন্যান্য আন্দোলন কিভাবে অস্তিত্বে এলো? ছিয়াত্তরের যুদ্ধের ফলাফল কী ছিল? ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির কী ফল হয়েছিল? ফিলিস্তিনিদের দৃষ্টিকোণ থেকে ফিলিস্তিন সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান কী?… এবং বিবিধ প্রশ্ন ও প্রসঙ্গকে সাঈদ তাঁর গ্রন্থটির বিষয়বস্তু করেছেন এবং তিনি সে-সবের উপর যে বিস্তৃত আলাপ করেছেন, তা আমাদের এ বিষয়টিকে সঠিক পটভূমিতে দেখতে দারুণ সহায়তা করে। সাঈদ তার বইটি লিখেন ইহুদিবাদের মুখ ও মুখোশ এবং এ ব্যাপারে পাশ্চাত্যের তথাকথিত উদারপন্থি রাজনীতিবিদ-বুদ্ধিজীবীদের ঘৃণ্য ভূমিকাকে নগ্ন করার উদ্দেশ্যে। তিনি তার লক্ষ্যে কতটা সফল হয়েছেন, তা এ থেকে অনুমান করা যায় যে, জায়নবাদীরা এ বইটিকেই বাজার থেকে গায়েব করে দিয়েছিল!
সাঈদ এই নীতির পোষক যে, কোনো মানুষ বা জাতিকে কোনো অবস্থাতেই তাদের স্বদেশ, জাতীয় পরিচয় বা সংস্কৃতি থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। বেদনাভরা কণ্ঠে, লাখো ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠস্বর হয়ে তিনি ‘সভ্য’ বিশ্বের উদ্দেশ করে বলেছেন, “আমি একটি জিনিস উল্লেখ করছি, যদিও তা দিবালোকের চেয়ে স্পষ্ট, এজন্য যাতে এই মৌলিক অস্তিত্বগত নীতির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যার উপর আমার ধারণায়, একটি জাতি হিসাবে আমাদের অভিজ্ঞতা নির্ভর করে। আমরা ফিলিস্তিন নামক এক দেশে বাস করতাম। যেভাবে আমাদেরকে বহিষ্কৃত করা হয়েছে এবং যেভাবে আমাদের অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে, এই সব কি কেবলমাত্র এজন্য বৈধ ছিল যে, যাতে সেই ইহুদিদেরকে, যারা নাৎসিবাদের গ্রাস থেকে বেঁচে গিয়েছিল; আশ্রয় দেওয়া যেতে পারে? (ইহুদিদেরকে আশ্রয় দেওয়া প্রশংসনীয়, কিন্তু) এই প্রক্রিয়ায় আমাদের প্রায় এক মিলিয়ন ফিলিস্তিনিকে আমাদের মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে এবং আমাদের সমাজকে অস্তিত্বহীন করে দেওয়া হয়েছে। কোন সেই নৈতিক বা রাজনৈতিক মানদণ্ড, যার ভিত্তিতে আমাদের থেকে এমনটা আশা করা হয় যে, আমরা আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব; আপন মাতৃভূমি ও আপন মানবিক অধিকারের দাবি থেকে সরে আসব? যখন একটি গোটা জাতিকে এই সংবাদ দেওয়া হয় যে, সে আইনত গরহাজির, এমনকি তার নাম-চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীও ব্যবহার করা হয়, প্রোপাগান্ডা চালানো হয়, তার ইতিহাসকে পাল্টে দেওয়া হয় বিশ্বকে এটা বোঝানোর জন্য যে, তার কোনো অস্তিত্বই নেই, আমাদেরকে তবে বলে দেওয়া হোক কোথায় এমন জগৎ রয়েছে, যেখানে এ ধরনের কর্মকাণ্ড এবং অপকৌশলের বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি কাজে লাগতে পারে না?” [1]
সাম্রাজ্যবাদী চিন্তার পথিকৃৎদের এহেন ধারণাকে, যে, তারা পৃথিবীতে সভ্যতা, মানবতা এবং উন্নয়নের বিস্তারের জন্যই ‘অনাবাদী’ বা ‘অসভ্য’ জাতিগুলির উপর চড়াও হয়, সমালোচনা করে সাঈদ প্যালেস্টাইনের প্রেক্ষিত থেকে বলেন, “বহু শতাব্দী ধরে এই ভূমিতে একটি বৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের বসবাস ছিল, যা সিংহভাগ কৃষকদের নিয়ে গঠিত হলেও, এটিকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। এই জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা ছিল আরবি এবং ধর্ম ছিল ইসলাম। এই জাতি নিজেদের পরিচয় দিত এই ভূখণ্ডের সূত্রে; যার বুক চিরে তারা শস্য ও নানা ফসল চাষ করত এবং যাতে তারা নিজেদের পশুগুলি চরাত।” [2]
প্যালেস্টাইন কোনো জনশূন্য, মানববসতিহীন বা অনুর্বর ভূমি ছিল না যে, যাকে দখল করে আবাদ করা এবং এর ‘অসভ্য’ জনগণকে সভ্য করার চেষ্টা করা হবে। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতেই ফিলিস্তিন একটি আরব ও মুসলিম দেশে পরিণত হয়। গোটা ইসলামি দুনিয়ায় এর উর্বরতা ও সৌন্দর্যের কারণে; এর ধর্মীয় গুরুত্বের কারণেও, এর ভূগোল এবং বৈশিষ্ট্যগুলি ছিল সুবিদিত। এডওয়ার্ড সাঈদ জ্যাক লে স্যাট্রাঞ্জের ’প্যালেস্টাইন আন্ডার দ্য মুসলিমস : এ ডিস্ক্রিপশন অব সিরিয়া অ্যান্ড হোলি ল্যান্ড ফ্রম এডি 650 থেকে 1500’ বইটির বরাত দিয়ে লিখেন, ‘‘ফিলিস্তিন সিরিয়ার প্রদেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পশ্চিমের প্রদেশ। এর দীর্ঘতম প্রসারণটি রাফাহ থেকে শুরু হয়ে হাজ্জুনের সীমান্তে শেষ হয়েছে। এই দূরত্ব অতিক্রম করতে একজন ঘোড়সওয়ারের দুই দিন সময় লাগবে। বৃষ্টি ও শিশির ফিলিস্তিনকে সেচ দেয়। এর গাছপালা এবং চাষের জমিতে কৃত্রিম সেচের প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র নাবলুসে আপনি এ উদ্দেশ্যে প্রবাহিত জল ব্যবহার করা দেখতে পাবেন। সিরিয়ার প্রদেশগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিন সবচেয়ে উর্বর। এর রাজধানী এবং বৃহত্তম শহর রামাল্লা। কিন্তু জনসংখ্যা ও আয়তনের দিক থেকে বায়তুল মাকদিস প্রায় এর সমান। ছোট আয়তন সত্ত্বেও, ফিলিস্তিনে প্রায় বিশটি মসজিদ এমন রয়েছে, যেখানে জুমার খুতবা দেওয়া হয় এবং নামাজ আদায় করা হয়।” [3]
জ্যাক লে স্যাট্রাঞ্জের উল্লিখিত বইটি প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন মুসলিম ভূগোলবিদদের লেখাপত্রের প্রতিফলন। প্রাচীন ফিলিস্তিন কীরূপ জনবহুল ছিল এবং মুসলমানদের সমৃদ্ধির উদ্ধৃত মানচিত্রটি মুসলিম ভূগোলবিদ ইবনে হায়কলের লেখার রূপায়ন। এতে দেখা যাচ্ছে যে, শহরটি অর্থনৈতিকভাবেও স্থিতিশীল ছিল এবং বিশ্বাসের দিক থেকে এটি ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের আবাসস্থল। ১৫১৬ সালে, ফিলিস্তিন উসমানী খিলাফতের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। এর একশ বছর পরে, জনৈক ইংরেজ কবি জর্জ স্যান্ডস নিম্নলিখিত শব্দযোগে প্যালেস্টাইনের এই মানচিত্র আঁকেন : “এই সেই দেশ যেখানে দুধ ও মধুর নদী প্রবাহিত হয়। এটি বাসযোগ্য বিশ্বের হৃদয়, এর জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। এটি সুন্দর এবং মনোমুগ্ধকর পর্বতমালা এবং উর্বর উপত্যকায় শোভা পায়। এর শিলাগুলি থেকে সতেজ জল উৎসারিত হয় এবং এর এমন কোনও অঞ্চল নেই, যা নান্দনিকতা বা সুবিধা বর্জিত।” [4]
পশ্চিমা এবং আমেরিকান লেখকরাও ইহুদিদের জোরপূর্বক দখলদারিকে ‘বৈধ’ হিসেবে দেখাতে তাদের নিজস্ব প্রচেষ্টা চালিয়েছে। আঠারো এবং উনিশ শতকে, মার্ক টোয়েন (আমেরিকান সাংবাদিক); ল্যামার্টিন (ফরাসি রাজা); নেভাল (ফরাসি লেখক); ডিসরাইলি (ব্রিটেনের ইহুদি প্রধাানমন্ত্রী ও লেখক) প্রাচ্য সম্পর্কে যেসব ভ্রমণকাহিনী লিখেছেন, সেগুলোতে আরবদেরকে চিত্তাকর্ষণহীন এবং অনুন্নত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদিও ফিলিস্তিনে আরবদের বসবাসের বিষয়টিও প্রকাশ করেছেন তারা। স্বয়ং ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে সাঈদ বর্ণনা করছেন, ইসরায়েলি সূত্র অনুসারে, ১৮২২ সালে ফিলিস্তিনে বসবাসকারী ইহুদিদের সংখ্যা চব্বিশ হাজারের অধিক ছিল না এবং এ সংখ্যাটি দেশের মোট জনসংখ্যার, যার অধিকাংশই ছিল আরবদের, দশ শতাংশেরও কম ছিল। [5]
সাঈদ বিংশ শতাব্দীর আদমশুমারিও উপস্থাপন করেন। আদমশুমারিটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত The Anglo Palestine Years Books 1947; (১৯৪৮ সালে প্রকাশিত) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাঈদ লিখেছেন, যদিও ১৮৮২ সাল থেকে ইহুদি দখলদার ক্রমাগত ফিলিস্তিনে প্রবেশ করছিল, কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল যে ১৯৪৮ সালের বসন্তের কয়েক সপ্তাহ আগ পর্যন্তও, যখন ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে আরবদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৩১ সালের আদমশুমারি অনুসারে, দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল এক কোটি তেত্রিশ হাজার তিন হাজার চৌদ্দ। এতে ইহুদির সংখ্যা ছিল মাত্র এক লাখ চুয়াত্তর হাজার ছয়শ। ১৯৩৬ সালে, ইহুদিদের সংখ্যা বেড়ে তিন লাখ চুরাশি হাজার আটাত্তরে পৌঁছে যায়, যেখানে মোট জনসংখ্যা ছিল তেরো লাখ ছেষোট্টি হাজার ছিয়ান্নব্বই। ১৯৪৬ সালে, মোট জনসংখ্যা ছিল উনিশ লক্ষ বারো হাজার একশ বারো এবং ইহুদিদের সংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ আট হাজার দুইশত পঁচিশ। [6]
ইহুদি নেতাদের ধূর্ততার কথাও সাঈদ স্পষ্ট করেছেন। অস্ট্রিয়ান-হাঙ্গেরিয়ান নাগরিক থিওডর হার্জলকে (১৮৬০-১৯০৪) ‘জায়নবাদ’ এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পেশায় ছিলেন একজন সাংবাদিক এবং জায়নবাদের মূল দস্তাবেজ তারই রচিত। তার উল্লেখ করে সাঈদ লিখেন, ১৮৯৫ সালে তিনি তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন যে, প্যালেস্টাইন সম্পর্কে কিছু একটা করতেই হবে। এই বিষয়ে হার্জল যে শব্দগুলি ব্যবহার করে, তা ছিল এরূপ : আমাদের নিজেদের দেশে নিঃস্ব ও দরিদ্র মানুষকে তাদের কর্মসংস্থানের সমস্ত উপায় থেকে বঞ্চিত করতে হবে এবং করিডোরের দেশগুলিতে তাদের জীবিকার উপায় খুঁজে বের করে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিতে হবে। কিন্তু দরিদ্র ও নিঃস্ব জনগণের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাদের নির্বাসন প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত সতর্কতা, ভব্যতা, বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। [7]
ফিলিস্তিনের ভিতর ইসরায়েল গজিয়ে তোলার পরিকল্পনা এবং কৌশলগুলি যে কতটা নিষ্ঠুর এবং নৃশংস ছিল তার একটি আভাস দেখা যায় ১৯৬৯ সালের এপ্রিল মাসে একটি ইসরায়েলি জার্নালে হারে তাজ-এ মোশে দায়ানের বক্তব্য থেকে। সাঈদ সেই বক্তব্যও তার গ্রন্থভুক্ত করেছেন। মোশে দায়ান ছিলেন একজন বিখ্যাত ইসরায়েলি জেনারেল এবং রাজনীতিবিদ। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি বেশ কয়েক বছর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ইহুদি সন্ত্রাসী সংগঠন ‘হাগানাহ’-এর প্রধানও ছিলেন। তার সেই বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা এদেশে জুড়ে বসেছি; যেখানে পূর্বেই আরবরা আবাদ ছিল এবং আমরা এখানে একটি হিব্রু অর্থাৎ ইহুদি রাষ্ট্র কায়েম করছি। আমরা এদেশের অনেক এলাকায় আরবদের কাছ থেকে জমি কিনেছি। আমরা আরব গ্রামের পরিবর্তে ইহুদি গ্রাম তৈরি করেছি, আপনি এখন সেই আরব গ্রামের নামও জানেন না এবং এই অজ্ঞতার জন্য আমি আপনাকে দোষ দিচ্ছি না, কারণ এখন সেই ভূগোলের বইগুলিই অদৃশ্য হয়ে গেছে, যেখানে এই আরব গ্রামের নামগুলো উল্লেখ ছিল। শুধু এই বইগুলোই গায়েব হয়ে যায়নি, আরবের সেই গ্রামগুলোও গায়েব হয়ে গেছে। যেখানে আগে ‘মাহবা’; ছিল; সেখানে আবির্ভূত হয় ’নিহালাল’; (দয়ানের নিজের গ্রাম)। এভাবে ‘জবা’কে ‘জাবোট’, ‘হানিফিস’কে ’সারিদ’ এবং ’তাল শামান’কে ’কেকার কিহোশুয়া’ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। এই দেশে এমন একটি জায়গা নেই, যেখানে আরব জনগণ আগে ছিল না। [8]
একজন ইসরায়েলি অধ্যাপক; নাম শাহাক, ইসরায়েলি সন্ত্রাসীদের এই নৃশংস কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত মর্মাহত ছিলেন। তিনি এমন চারশোটি গ্রামের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই গ্রামগুলো, এর ঘর-বাড়ি; বাগানের দেয়াল, কবরস্থান এবং কবরের ফলকও নিস্তনাবুদ করে দেওয়া হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের গল্প এখানেই শেষ নয়। একটি পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৯৪৮ সালে, প্রায় সাত লাখ আশি হাজার আরব ফিলিস্তিনিকে তাদের বাড়িঘর ও সম্পত্তি থেকে বেদখল করা হয়েছে, যাতে করে ফিলিস্তিনের ‘পুনর্গঠন’ এর কাজকে সহজ করা যায়। [9]
ইসরায়েল পুনর্গঠনের পর যে ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলি ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে আসে, সেখানে তাদের জাতীয় জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে উপহাস ও নিন্দার লক্ষবস্তু বানানো হয়। আধুনিক শিক্ষা বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক জীবনে তীব্র সংঘাতের সৃষ্টি করে এবং সমস্ত বস্তুগত সম্পদ কেড়ে নেওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের থেকে তাদের ধর্মকেও ছিনিয়ে নেওয়া হয়। শিক্ষাব্যবস্থার উপর এই নেতিবাচক প্রভাব বিশ্লেষণ করে সাঈদ লিখেন, পাঠ্যক্রমকে হঠাৎ বদলে দেওয়া হয়। এখানকার স্কুলগুলিতে উপলব্ধ সুযোগ-সুবিধা খুবই বাজে। তাদের প্রতিটি সম্ভাব্য উপায়ে শেখানো এবং বোঝানো হয় যে, তাদের এবং হীনমন্যতার জন্ম একইসাথে। তারা কখনই এর থেকে পরিত্রাণ পাবে না এবং সর্বদা ইজরাইল রাষ্ট্রের উপর অপমানজনকভাবে নির্ভর করতে হবে তাদের। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনায় এডওয়ার্ড সাইদের প্রভাব মৌলিক। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সাহিত্য-তাত্ত্বিক সমালোচক ও চিন্তক নিছক একজন ব্যক্তি মানুষ ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন চিন্তা ও সক্রিয়তার একটি ধারা। তাঁর ব্যক্তিত্ব শুধু পাশ্চাত্যের নয়, প্রাচ্যের মানুষের জন্য ছিল সত্যের এক উচ্চকিত কণ্ঠস্বর, যার অনুরণন পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত ইতিহাসের ফাটল থেকে আলোর মতো ফুটতে থাকবে। @ ড. ইমতিয়াজ আব্দুল কাদির
বুদ্ধিমান বীরবলের গল্প
একদিন আকবর তাঁর হাতের একটি আংটি হারিয়ে ফেলেছিলেন। আংটিটি তাঁর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। সেই আংটিটি তাঁর বাবা হুমায়ুন তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন এবং সেটিকে হারিয়ে ফেলে আকবর খুবই দুঃখিত হয়ে পড়েছিলেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেই আংটিটি পাওয়া গেলো না।
আকবর বীরবলকে ডেকে পাঠালেন এবং সেই আংটিটিকে খুঁজে দেওয়ার জন্য তাঁকে অনুরোধ করলেন। সেই সময় রাজ দরবার ছিল প্রচুর সভাসদে পরিপূর্ণ। এমন সময় বীরবল ঘোষণা করলেন, “হে আমার প্রিয় রাজন ! আংটিটি ঠিক এই সভাকক্ষের মধ্যেই রয়েছে, এবং যার কাছে সেই আংটিটি আছে, তার দাড়িতে একটি খড় আটকে আছে।”
তখন সকলেই একে অপরের মুখ চাওয়া–চাওয়ি শুরু করলো এবং উপস্থিত সভাসদদের মধ্যে একজন তার দাড়ির মধ্যে খড় খুঁজতে শুরু করলো। বীরবল তখন সিপাহীদের ডাকলেন এবং তাদের বললেন- সেই সন্দেভভাজন ব্যক্তিটিকে ভালো করে পরীক্ষা করতে। সেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিটিকে ভালো করে তল্লাশি চালানোর পর তার থেকে সেই আংটিটি উদ্ধার হলো।
তখন বিস্মিত হয়ে আকবর বীরবলকে প্রশ্ন করলেন, “বীরবল, কী করে তুমি সেই আংটিটি খুঁজে বের করলে ?"
উত্তরে বীরবল জানান, “হে আমার প্রভু ! যাঁর মধ্যে অপরাধবোধ থাকবে, বা যিনি ভুল কাজ করবেন, তিনি সর্বদাই ভয় পাবেন।”
নীতিকথা : যার মধ্যে অপরাধবোধ থাকে, তার প্রতি আর আলাদা করে অভিযোগ করার প্রয়োজন পড়ে না।
১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ: সেক্টর ও সেক্টর কমান্ডারদের বীরত্বগাথা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে সংগঠিত করা হয়। প্রতিটি সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন সাহসী ও দূরদর্শী সেক্টর কমান্ডাররা, যাদের নেতৃত্ব ও বীরত্বেই নিশ্চিত হয়েছিল আমাদের বিজয়।
সেক্টর ১
চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম
মেজর জিয়াউর রহমান
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। চট্টগ্রামে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
সেক্টর ২
ঢাকা ও আশপাশ
মেজর খালেদ মোশাররফ
রাজধানীর চারপাশে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করে পাক বাহিনীকে চাপে রাখেন।
সেক্টর ৩
সিলেট অঞ্চল
মেজর কে. এম. শফিউল্লাহ
পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধ চালিয়ে শত্রুকে বিপর্যস্ত করেন।
সেক্টর ৪
কুমিল্লা, নোয়াখালী
মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত (সি. আর. দত্ত)
একের পর এক আক্রমণে পাক সেনাদের মনোবল ভেঙে দেন।
সেক্টর ৫
সিলেট
মেজর মীর শওকত আলী
সীমান্ত এলাকায় কৌশলী প্রতিরোধ গড়ে তুলে শত্রু অগ্রযাত্রা থামান।
সেক্টর ৬
রংপুর
উইং কমান্ডার এম. খালেদ মোশাররফ
উত্তরাঞ্চলে সংগঠিত যুদ্ধ পরিচালনা করে মুক্তাঞ্চল সৃষ্টি করেন।
সেক্টর ৭
রাজশাহী, পাবনা
মেজর নাজমুল হক
সাহসিকতার সাথে সম্মুখ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন; শহীদ হন দেশের জন্য।
সেক্টর ৮
যশোর, খুলনা
মেজর আবু ওসমান চৌধুরী
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে সফল অভিযান পরিচালনা করেন।
সেক্টর ৯
বরিশাল, পটুয়াখালী
মেজর এম. এ. জলিল
নদীমাতৃক এলাকায় নৌ ও গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে শত্রু দমন করেন।
সেক্টর ১০ (নৌ কমান্ডো)
কমান্ডার এম. এন. সামাদ
অপারেশন জ্যাকপটসহ নৌ অভিযানে শত্রুর জাহাজ ধ্বংস করেন।
সেক্টর ১১
ময়মনসিংহ
মেজর আবু তাহের
সীমান্ত এলাকায় দুর্ধর্ষ যুদ্ধ পরিচালনা করে পাক বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেন।
এই সাহসী সেক্টর কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ।
১২টি সত্য একে একে উন্মোচন করি—
১. কঠোর পরিশ্রম = ধনী হওয়া নয়, তোমাকে বলা হয়—কষ্ট করে কাজ করলেই সব পাবে। কিন্তু ধনীরা জানে—ধনী হওয়া মানে কষ্ট নয়, লেভারেজ। তুমি সময় বিক্রি করো, আর তারা মানুষের সময়, দক্ষতা ও অর্থ ব্যবহার করে সাম্রাজ্য বানায়।
২. তারা চায় তুমি ভাবো—টাকা খারাপ, যাতে তুমি কখনো টাকার পেছনে ছুটতে সাহস না পাও। কিন্তু ধনীরা জানে—টাকা হলো শক্তি, স্বাধীনতা আর প্রভাবের চাবিকাঠি।
৩. সঞ্চয় করে কেউ ধনী হয় না “সঞ্চয় করো”—এটা শুধু ক্লাস থ্রি-এর বাচ্চাকে বলা যায়। ধনীরা টাকা ঢালে—ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট, স্টার্টআপ আর শেয়ারে। যেখানে ঝুঁকি বেশি, কিন্তু লাভ তার চেয়েও বেশি।
৪. শিক্ষাব্যবস্থা মানুষ তৈরি করে না—কর্মচারী তৈরি করে স্কুল শেখায় চাকরি করতে। ধনীদের স্কুল শেখায়—কীভাবে চাকরি দিতে হয়।
৫. কর ব্যবস্থাকে তারা নিজেদের জন্যই বানিয়েছে তুমি বেতনভোগী—তাই কর দাও। তারা সম্পদের মালিক—তাই করমুক্তির সুবিধা পায়। গেমটা শুরু থেকেই অসম।
৬. ঋণ হলো অস্ত্র — যদি চালাতে জানো তুমি ঋণ মানে সমস্যা ভেবে দূরে থাকো। ধনীরা ঋণ নিয়ে সম্পদ কেনে—যা আয়ও দেয়, আর ঋণটাও শোধ করে।
৭. তোমার ভোগবাদ তাদের লাভ, মোবাইল, ব্র্যান্ডেড জুতা, দামি কফি— সবই তাদের পকেটে যায়। তারা? অর্থ ঢালে এমন সম্পদে, যেটা প্রতিদিন বড় হয়।
৮. প্রতিভা নয়—যোগাযোগই আসল শক্তি, ধনীরা জানে, একা কেউ বড় হয় না। তাই তারা এলিট সার্কেল বানায়— যেখানে সুযোগ, অর্থ এবং ক্ষমতা ঘুরে বেড়ায় নিজেদের মধ্যেই।
৯. সময় তাদের চোখে সোনার চেয়েও দামি, তারা নিজের হাতে কাজ করে না—কাজ করায়। কারণ তাদের ফোকাস—সম্পদ বৃদ্ধি, শ্রম নয়।
১০. শেয়ার বাজার তোমার নয়—তাদের মাঠ, তোমার কাছে বাজার মানে আশা, তাদের কাছে মানে—ইন্সাইডার ইনফো + টেকনোলজি + বড় পুঁজি।
এটা অসম যুদ্ধ।
১১. ব্যর্থতা তাদের শিক্ষক, তুমি ব্যর্থতাকে ভয় পাও, তারা ব্যর্থতাকে ব্যবহার করে আরও বড় হওয়ার সিঁড়ি বানায়। বড় লাভ মানেই বড় ঝুঁকি—এটা তারা জানে।
১২. তারা চায় তুমি অজ্ঞ থাকো কারণ যত কম জানবে তুমি—তত বেশি ব্যবহারযোগ্য হবে তাদের কাছে। তাহলে তুমি কী করবে?
খেলার নিয়ম বদলানো লাগবে।
– আর শুধু কাজ নয়, সম্পদের মালিক হও।
– সঞ্চয় নয়, বিনিয়োগ শেখো।
– ভোগ নয়, সম্পদ বানাও।
– চাকরি নয়, লেভারেজ তৈরি করো।
এটাই সেই পথ, যেটা তুমি শিখলে—
ধনীরা আর তোমার উপর দিয়ে হাঁটতে পারবে না। এটা শুধু লেখা নয়—একটা ডাক। নিজের খেলায় নিজেই রাজা হও। সময় এসেছে—তোমার সাম্রাজ্য গড়ার।─সংগৃহিত
যেসব শিশু প্রতিদিন বা বারবার বকা, দোষারোপ কিংবা কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হয়,
তাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে এমনভাবে প্রতিক্রিয়া করতে শেখে যেন তারা সবসময় বিপদের মধ্যে রয়েছে।
শিশুরা মানসিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাই যখন তারা বারবার নেতিবাচক কথা শোনে বা অপমানের অভিজ্ঞতা পায়, তখন তাদের মস্তিষ্কের নিরাপত্তাবোধ নষ্ট হয়ে যায় এবং শরীরে স্ট্রেস হরমোন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে তারা প্রতিনিয়ত সতর্ক, ভীত বা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অনুভব করে, ছোট বিষয়েও রেগে যায় এবং মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হয়। এই অবস্থাকে “fight or flight” বা “লড়াই করবে নাকি পালাবে” প্রতিক্রিয়া বলা হয়—যা সাধারণত বাস্তব বিপদের সময় সক্রিয় হয়, কিন্তু বেশি সমালোচনার কারণে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি প্রায় সারাক্ষণ চালু থাকে। এই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও শারীরিক চাপ তাদের শেখার ক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক আচরণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ফলে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের অযোগ্য ভাবতে শুরু করে, নিজের অনুভূতি প্রকাশে দ্বিধা বোধ করে এবং নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। অর্থাৎ, নিয়মিত সমালোচনা কেবল মুহূর্তের কষ্ট দেয় না; এটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, মানসিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ আত্মবিশ্বাসের ওপর গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ফেলে। @ Psychological mind
ভুল সবই ভুল।জেনে নিন নির্ভুল কোনটা।
১. ভুলঃ কোমর ব্যথা মানে কিডনি রোগ!
নির্ভুলঃ কিডনি রোগে প্রস্রাব কমে যায়, খাওয়ার রুচি কমে যায়, বমি বমি লাগে, মুখ ফুলে যায়!
২. ভুলঃ ঘন ঘন প্রস্রাব মানেই ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ!!
নির্ভুলঃ ডায়াবেটিস হলে প্রথম অনুভূতি হল- এতো খেলাম, তবুও কেন শক্তি পাইনা, এছাড়া ওজন কমে যায়, মুখে দুর্গন্ধ হয়, ঘা শুকাতে চায়না!
৩. ভুলঃ ঘাড়ে ব্যথা মানেই প্রেসার!
নির্ভুলঃ প্রেসার বাড়লে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোন উপসর্গ পাওয়া যায় না! একটু অস্বস্তিকর অনুভুতি হয় মাত্র।
৪. ভুলঃ বুকের বামে ব্যথা মানে হার্টের রোগ!
নির্ভুলঃ হার্টের রোগে সাধারণত বুকে ব্যথা হয় না। হলেও বামে নয়তো বুকের মাঝখানে ব্যথা হয়... হার্টের সমস্যায় সাধারণত বুকের মাঝখানে চাপ চাপ অনুভূতি হয়, মনে হয় বুকের মাঝখানটা যেন কেউ শক্ত করে ধরে আছে!!
৫. ভুলঃ মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হয়।
নির্ভুলঃ ডায়াবেটিস হরমোনাল অসুখ। অগ্ন্যাশয় ঠিকমত কাজ না করলে ডায়াবেটিস হয়। তাই মিষ্টি খাওয়ার সাথে এই রোগ হবার সম্পর্ক নেই। কিন্তু ডায়াবেটিস হয়ে গেলে মিষ্টি খেতে হয় না।
৬. ভুলঃ প্রেগন্যান্সিতে বেশি পানি খেলে পায়ে পানি আসে।
নির্ভুলঃ প্রেগন্যান্সিতে প্রোটিন কম খেয়ে, কার্বোহাইড্রেট বেশি খেলে পায়ে পানি আসে। তাই প্রোটিন বেশি বেশি খেতে হয়।
৭. ভুলঃ এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং করাকালীন বেবির (৬মাসের আগে পানিও খাওয়ানো যায় না একারণে) ডায়রিয়া হলে, মা স্যালাইন খেলেই বেবিরও চাহিদা পূরণ হয়ে যায়।
নির্ভুলঃ মা খেলেই বাচ্চার চাহিদা পূরণ হয় না... বেবিকেও স্যালাইন খাওয়াতে হয়।
৮. ভুলঃ দাঁত তুললে চোখের আর ব্রেইনের ক্ষতি হয়।
নির্ভুলঃ দাঁত তোলার সাথে চোখের আর ব্রেইনের কোনো সম্পর্ক নেই। দাঁত, চোখ, মাথার নার্ভ সাপ্লাই সম্পূর্ণ আলাদা।
৯. ভুলঃ মাস্টারবেশন করলে চোখের জ্যোতি কমে যায়!
নির্ভুলঃ ভিটামিন এ জাতীয় খাবার না খেলে চোখের জ্যোতি কমে যায়।
১০. টক/ ডিম/ দুধ খেলে ঘা দেরীতে শুকায়।
নির্ভুলঃ টক/ ডিমের সাদা অংশ/ দুধ খেলে ঘা তাড়াতাড়ি শুকায়।
১১. ভুলঃ অস্বাভাবিক আচরন, ভাংচুর, পাগলামি মানেই জ্বিন ভুতে ধরা!!!
নির্ভুলঃ এটা বাইপোলার ডিসঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, হ্যালুসিনেশন।
১২. ভুলঃ তালু কাটা, এক চোখ, কপালে চোখ, বাঘের মত ডোরাকাটা দাগ নিয়ে জন্ম গ্রহন করা বাচ্চা কিয়ামতের আলামত, আল্লাহর গজব, বাঘের বাচ্চা।
নির্ভুলঃ মানুষের পেট থেকে বাঘের বাচ্চা হয় না আর কিয়ামতের আলামত বা গজব বাচ্চাদের উপর আসে না। এসব জিনগত রোগ বা জন্মগত রোগ।
১৩. ভুলঃ প্রেগন্যান্ট মহিলা আয়রণ, ক্যালসিয়াম এসব খেলে বাচ্চা বড় হয়ে যায়। তাই গাইনী ডাক্তার সিজার করার জন্য এগুলা প্রেসক্রাইব করে....
নির্ভুলঃ প্রেগন্যান্ট মহিলা আয়রণ, ক্যালসিয়াম না খেলে গর্ভস্থ বেবির নিউরাল টিউব ডিফেক্ট হয়।
১৪. ভুলঃ প্রেগন্যান্সিতে সাদাস্রাব হলে ফ্লুইড কমে যায়।
নির্ভুলঃ White discharge এবং Amniotic fluid সম্পূর্ণ আলাদা দুটো ফ্লুইড.. একটার সাথে আর একটার কোনো সম্পর্ক নেই।
১৫. বাচ্চা না হওয়া মানেই বন্ধ্যা নারী।
নির্ভুলঃ বন্ধ্যা, নারী এবং পুরুষ উভয়ই হতে পারে।।
এ ধরণের আরো অনেক ধরণের গুজব বা কুসংস্কার আমাদের সমাজে প্রচলিত, যেগুলোর কোনো ভিত্তি বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।
শহীদ প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার—মাত্র ২১ বছরেই অমর সংগ্রামের প্রতীক
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে অগ্নিকন্যার নাম শ্রদ্ধায় ও গর্বে উচ্চারিত হয়, তিনি প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি বেছে নিয়েছিলেন নিজের জীবন বিসর্জন—হতাশা থেকে নয়, বরং দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং বিপ্লবী সংগঠনের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য।
প্রীতিলতার জন্ম ও শৈশব
১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের পটিয়ায় জন্ম প্রীতিলতার। ছোটবেলা থেকেই আত্মমর্যাদা, সাহস ও দেশপ্রেম তাঁর চরিত্রের মূল শক্তি ছিল। শিক্ষাজীবনে ছিলেন মেধাবী, আর মনে ছিল শুধু একটাই লক্ষ্য—দেশকে মুক্ত করা।
ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ
ব্রিটিশ শাসনের বর্ণবাদী প্রতীক ইউরোপিয়ান ক্লাবের গেটে লেখা ছিল—
“Dogs and Indians not allowed”
এই অপমান চলবে না—এ বিশ্বাস থেকেই মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে প্রীতিলতা ও তাঁর সঙ্গীরা ছক করেন ঐ ক্লাব আক্রমণের।
১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সাহসিকতার সঙ্গে আক্রমণ পরিচালনা করেন প্রীতিলতা। অভিযান শেষ হওয়ার পর ব্রিটিশ বাহিনী তাঁকে ঘিরে ফেললে ধরা পড়লে গোপন তথ্য ফাঁসের আশঙ্কায় তিনি নিজের কাছে রাখা সায়ানাইড সেবন করে শহীদ হন। এটি ছিল বিপ্লবীদের পূর্বনির্ধারিত নিয়ম—ধরা পড়লে আত্মবলিদান, যেন সংগঠনের কেউই বিপদে না পড়ে।
কেন আত্মহত্যা করেছিলেন?
গ্রেপ্তার হয়ে অত্যাচার ও তথ্য ফাঁস এড়াতে
বিপ্লবী দলের নিরাপত্তা রক্ষায়
অপমান সহ্য না করা এক অগ্নি-নারীর প্রতিজ্ঞা থেকে
দেশের স্বাধীনতার পথে নিজের জীবন উৎসর্গ করার অদম্য ইচ্ছা
এটাই ছিল তাঁর বেছে নেওয়া মহিমান্বিত মৃত্যু—যা তাঁকে করেছে অমর।
প্রীতিলতা—আমাদের প্রজন্মের প্রেরণা
আজও তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম আমাদের পথ দেখায়।
এক তরুণী, যে প্রমাণ করে গেছেন—
দেশকে ভালোবাসার জন্য বয়স নয়, হৃদয়ের আগুনটাই যথেষ্ট।
সক্রেটিস এবং জ্ঞানীর মুখোশ
একবার সক্রেটিসের কাছে একজন যুবক শিষ্য এসেছিলেন, যিনি নিজেকে অত্যন্ত জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমান মনে করতেন। তিনি প্রায়ই অন্য শিষ্যদের ছোট করে দেখতেন এবং অহংকার করতেন যে, তিনি সব জানেন।
একদিন সক্রেটিস তাঁকে একটা শিক্ষা দিতে চাইলেন। সক্রেটিস যুবকটিকে একটি বড় গাছের নিচে নিয়ে গেলেন। সেখানে মাটিতে একটি ছোট্ট বৃত্ত আঁকলেন এবং বললেন, "তুমি এই বৃত্তের মধ্যে থাকো, আর আমি এর বাইরে থাকি। তুমি আমাকে একটি করে প্রশ্ন করবে, আর আমি উত্তর দেবো। তুমি এমন প্রশ্ন করবে যা তুমি জানো, আর আমি এমন উত্তর দেবো যা তুমি জানো না।"
যুবকটি তো খুব খুশি! সে ভাবল, এবার সক্রেটিসকে অপ্রস্তুত করে দেবো।
যুবকটি অনেক কঠিন কঠিন প্রশ্ন করল, যেমন— জ্যোতির্বিজ্ঞান, রাজনীতি, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে। সক্রেটিস প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নিখুঁতভাবে, সাবলীল ও বিস্তারিতভাবে দিলেন।
প্রশ্ন করতে করতে যুবকটির প্রশ্ন ফুরিয়ে গেল। সে তখন বুঝতে পারল, সক্রেটিসের জ্ঞান কত গভীর!
তখন যুবকটি হতাশ হয়ে বলল, "গুরু, আমার আর কোনো প্রশ্ন জানা নেই। আপনি যা জানেন, তার সবকিছুই আমার জানার বাইরে বলে মনে হচ্ছে।"
সক্রেটিস হাসলেন। তিনি যুবকটিকে বললেন, "এসো, আজ তোমাকে জ্ঞান সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শেখাই।"
সক্রেটিস মাটিতে বসে, আগের আঁকা ছোট বৃত্তের পাশে আরও একটি অনেক বড় বৃত্ত আঁকলেন।
সক্রেটিস বললেন, "দেখো, আমি এই বড় বৃত্তটি (বৃহত্তর জ্ঞান) এবং তুমি এই ছোট বৃত্তটি (সীমিত জ্ঞান)।"
তারপর তিনি দুটি বৃত্তের পরিধি (Circumference) নির্দেশ করে বললেন:
"আমাদের প্রত্যেকের জ্ঞান একটি বৃত্তের মতো। এই বৃত্তের ভেতরের অংশটুকু হলো যা আমরা জানি।
আর এই বৃত্তের বাইরের দিকটা, অর্থাৎ পরিধি হলো সেই স্থান যেখানে আমাদের জ্ঞানের শেষ এবং অজ্ঞতার শুরু।"
সক্রেটিস এরপর খুব গুরুত্বপূর্ণ কথাটা বললেন, যা হলো আসল শিক্ষা:
"আমার জ্ঞান তোমার চেয়ে অনেক বেশি, তাই আমার বৃত্তটি বড়। কিন্তু দেখো, যেহেতু আমার বৃত্তটি বড়, তাই আমার পরিধিও অনেক বড়! অর্থাৎ, আমি জানি যে আমি তোমার চেয়ে অনেক বেশি জিনিস জানি না। আমার অজ্ঞতা তোমার অজ্ঞতার চেয়ে অনেক বড়।"
যুবকটি তাঁর জ্ঞানের পরিধি এবং অজ্ঞতার গভীরতা বুঝতে পারল। তাঁর অহংকার ভেঙে গেল।
গল্পের শিক্ষা
এই গল্পটি উপস্থিত বুদ্ধি এবং জ্ঞান উভয়েরই চূড়ান্ত প্রকাশ। সক্রেটিস এখানে একটি কঠিন তত্ত্বকে একটি সাধারণ উদাহরণ (বৃত্তের মাধ্যমে) দিয়ে অত্যন্ত কার্যকরভাবে উপস্থাপন করেছেন।
উপস্থিত বুদ্ধি: কঠিন দার্শনিক ধারণা বোঝাতে একটি সরল চিত্রের ব্যবহার।
জ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষা: প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তিই জানেন যে তিনি কত কম জানেন। অজ্ঞতা স্বীকার করে নেওয়ার মধ্যেই জ্ঞানের শুরু। এটিই সক্রেটিসের বিখ্যাত উক্তি: "আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না"-এর একটি চমৎকার উদাহরণ।
সক্রেটিসের উদ্দেশ্যে বিচারকেরা
“যদি আপনি কথা বলা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করেন, তবে আমরা আপনাকে ক্ষমা করে দিতে পারি। আপনি যা সত্য বলে ভাবেন, সেসব আপনাকে যাদের মাঝে বসবাস করতে হবে তারা সত্য বলে মনে করেন না।
.আপনার সত্য তাদের অসন্তুষ্ট করে তুলছে। আপনি যদি এ ব্যাপারে কথা দেন, তবে আমরা আপনাকে বিশ্বাস করি। আমরা জানি আপনি কথা দিয়ে কথা রাখেন। যদি আপনি পুনরায় কথা না বলার অঙ্গীকার করেন এবং নীরব থাকার ব্যাপারে সম্মতি দেন, তবে আপনি আপনার জীবন রক্ষা করতে পারেন।”
.সক্রেটিস বললেন “সত্য বলার জন্যই আমার জীবনধারণ। অস্তিত্ব আমায় জীবন দিয়েছে সত্যের অভিজ্ঞতা লাভের জন্য। অন্ধকারে সত্য হাতড়ে বেড়ানো মানুষদের মাঝে সত্যের বাণীকে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে জীবনের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতাবোধের বহিঃপ্রকাশ।
.যদি আমাকে কথা বলতে না দেয়া হয়, তবে আমি বেঁচে থাকার কোন মানে খুঁজে পাচ্ছি না। আমার জীবন এবং সত্যের বাণী সমার্থক। আপনারা আমায় ভ্রষ্ট করার চেষ্টা করবেন না। যদি আমি বেঁচে থাকি, তবে আমি বলেই যাবো”
.বিচারকেরা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তাদের একজন বলে উঠলেন, “আপনি একজন কঠিন ও জেদি ব্যক্তি ব্যতীত কিছুই নন।”
.সক্রেটিস বললেন, “আমি কঠিন নই। কঠিন হচ্ছে সত্য। কঠিন হচ্ছে নৈতিকতা। সত্য আপোস করতে জানে না। আমি ক্ষুদ্র একটি জীবনের জন্য আপোস করতে পারি না। চিরতরে অবদমিত হবার চেয়ে, আমার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়। ইতোমধ্যেই বার্ধক্যের সাথে আমার দেখা হয়েছে।
.যে কোনভাবেই মৃত্যু আমার কাছে আসবে। বরং এভাবে মৃত্যুকে গ্রহণ করাই অধিকতর সুন্দর, কারণ এতে করে মৃত্যুও অর্থবহ হয়ে উঠবে। আপনাদের শর্তমতে আমি মৃত্যুকে গ্রহণ করছি যাতে এটি স্পষ্ট হয় যে , তুচ্ছ মৃত্যু আমাকে সত্য বলা হতে বিরত রাখতে পারেনি।
একে ফজলুল হক
১৯৩৭ সালে বাংলার গ্রামাঞ্চলে তখন জমিদারের অন্যায়, মহাজনের সুদের বোঝা আর দারিদ্র্যের চাপে কৃষকেরা দম বন্ধ হয়ে বাঁচে।
সে সময় বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একে ফজলুল হক—সবাই যাকে ডাকত শেরে বাংলা।
একদিন বিকেলে এক পরিচারক এসে বলল—— “স্যার, বাইরে এক কৃষক দাঁড়িয়ে আছেন। খুব বিপদে মনে হয়।”
শেরে বাংলা মাথা তুলে বললেন—— “নিয়ে আসো। দরজা সবসময় গরিবের জন্যই খোলা থাকে।”
ছেঁড়া ধুতি, ধুলো–মাখা কাঁধ, চোখে দুর্দশার ছাপ—এই অবস্থায় কৃষকটি সামনে দাঁড়াল।
মৃদু, কাঁপা গলায় বলল—— “হুজুর… দেনা শোধ করতে পারিনি। মহাজন কাল আমার জমি দখল করে নেবে। আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।”
শেরে বাংলার দৃষ্টি কোমল হলো। তিনি বললেন—— “এখানে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বলো, কীভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি?”
কৃষকের চোখ ডলমল করছিল।— “আমি গরিব মানুষ, স্যার। আমার কথা কে শুনবে?”
শেরে বাংলা হেসে বললেন—— “এই বাংলার মালিক তোমরাই—কৃষক। তোমাদের কথা না শুনলে আমি এই চেয়ারে বসে আছি কেন?”
ঠিক তখনই পাশ থেকে এক দারোগা এসে বলল—— “স্যার, আইনমাফিক মহাজন তার জমি নিতে পারে। এ লোকটি অতিরঞ্জন করছে।”
কথা শেষ হতেই দেখা গেল—
ফজলুল হক ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর কণ্ঠ মুহূর্তে কঠোর হয়ে উঠল—— “আইন শেখাতে এসেছ আমাকে? আইন আছে দুর্বলকে রক্ষা করার জন্য—তার ঘাড় মটকানোর জন্য নয়!”
দারোগার মুখ শুকিয়ে গেল। ঘরে এক নির্মম নীরবতা নামে।
শেরে বাংলার সিদ্ধান্ত
শেরে বাংলা নিজের ব্যবহৃত কলমটি কৃষকের হাতে তুলে দিয়ে বললেন—— “এই কলম দিয়ে লিখে নাও—তোমার জমি কেউ নিতে পারবে না। আর মহাজনকে বলে দিও, তার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছি আমি—ফজলুল হক।”
কৃষক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
শেরে বাংলা আরও বললেন—— “তুমি শুধু জমি চাষ করো। অন্যায়ের বোঝা আমি সামলাব।”
কৃষকের চোখ ভিজে উঠল।
সে মাথা নিচু করে বলল—— “হুজুর… আপনাকে কীভাবে ধন্যবাদ দেব?”
শেরে বাংলা স্নেহভরা কণ্ঠে উত্তর দিলেন—— “ধন্যবাদ নয়—মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়াবে, এটাই চাই।”
এরপর যা ঘটল
ঘটনাটা রটে গেল চারদিকে। মহাজনরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল।
পরদিন দারোগাই কৃষকের বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা চেয়েছিল।
গ্রাম–শহরজুড়ে মানুষ বলতে লাগল—“গরিবের কান্না থামাতে যার চোখে কঠোরতা আসে—তিনিই শেরে বাংলা।”॥
মহান দাতা জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কেএল জুবিলী স্কুলের ভূমিদাতা মহান জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী।
আজ ১৯ নভেম্বর ২০২৫, এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের জন্মজয়ন্তী।
জগন্নাথ হলের ভূমিদাতা হওয়া সত্ত্বেও আমরা তাঁর সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই জানি না।
নীচে জগন্নাথ হলের জমি দানের ইতিহাস সংক্ষেপে, সুন্দরভাবে ও তথ্যসমৃদ্ধ করে তুলে ধরা হলো—
জগন্নাথ হলের জমিদাতা: জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন দুটি আবাসিক হলের একটি হলো জগন্নাথ হল। হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য এই হল প্রতিষ্ঠার পেছনে যে মহান ব্যক্তিত্বের অবদান সর্বাধিক, তিনি হলেন মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদারি পরিবারের জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী (১৮৪৮–১৯২৫)।
জমি দানের প্রেক্ষাপট
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় ছাত্রাবাসের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব ছিল। হিন্দু শিক্ষার্থীদের আলাদা আবাসনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য ভূমিদাতাদের সাথে যোগাযোগ শুরু করে। তখনই কিশোরীলাল রায় চৌধুরী এগিয়ে আসেন।
জমি দানের ঘটনা
জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী তাঁর বালিয়াটি জমিদারির অধীন থাকা ঢাকার ইংলিশ রোড–বিধান রোড সংলগ্ন একটি বিশাল সম্পত্তি দান করেন জগন্নাথ হল প্রতিষ্ঠার জন্য।
এই দানের মধ্য দিয়ে—
ঢাকায় উচ্চশিক্ষার বিস্তারে একটি বিশাল অবদান রাখেন তিনি,
হিন্দু শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যার সমাধান হয়,
জগন্নাথ হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী আবাসনে পরিণত হয়।
কেন নাম “জগন্নাথ হল”?
জমিদার কিশোরীলাল তাঁর পিতা মহাত্মা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করতে এই হলের নাম দেন “জগন্নাথ হল”।
এই একই উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৭২ সালে ঢাকা শহরে আরও প্রতিষ্ঠা করেন জগন্নাথ স্কুল, যা পরবর্তীতে জগন্নাথ কলেজ এবং পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়।
দানশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর ভূমিকা
শিক্ষাবিস্তারে আজীবন নিবেদিত ছিলেন তিনি।
অবৈতনিক বিদ্যালয়, চিকিৎসালয়, থিয়েটার, সাংস্কৃতিক পরিসর—বিভিন্ন খাতে তিনি নিজের সম্পদ ব্যয় করেছেন।
ঢাকা শহরের শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। ১৯২৫ সালের ৩ জুলাই তিনি পরলোকগমন করেন। তাঁর দানকৃত জমিতেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ হল, যা অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষা-বাসস্থান ও সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র।
কিশোরীলাল রায় চৌধুরী (১৮৪৮–১৯২৫): ১৮৪৮ সালের ১৯ নভেম্বর বৃহত্তর ঢাকার (বর্তমান মানিকগঞ্জ) সাটুরিয়া থানার বালিয়াটি জমিদার পরিবারের প্রখ্যাত পশ্চিম বাড়িতে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা ছিলেন মহাত্মা জগন্নাথ রায় চৌধুরী।
জনহিতকর ও শিক্ষানুরাগী কাজের অগ্রদূত হিসেবে কিশোরীলাল রায় চৌধুরী ছিলেন অনন্য। নিজে উচ্চশিক্ষিত না হলেও শিক্ষাবিস্তারে তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। ১৮৫৮ সালে আর্থিক সংকটে থাকা একটি অবৈতনিক স্কুলের দায়িত্ব নেন তিনি। ১৮৭২ সালে সেই বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে পিতার স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠা করেন জগন্নাথ স্কুল। পরবর্তীতে ১৮৮৪ সালের ৪ জুলাই এটি জগন্নাথ কলেজে উন্নীত হয় এবং ২০০৫ সালে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়।
১৮৮৭ সালে ঢাকার বাংলা বাজারে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কিশোরীলাল জুবিলী হাইস্কুল। একই বছরে রানী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনি ঢাকায় স্থাপন করেন ডায়মন্ড জুবিলী থিয়েটার। পরে সরদার মির্জা আবদুল কাদের এটি কিনে নেন এবং লায়ন্স সিনেমা হল প্রতিষ্ঠা করেন—যা বর্তমানে আর নেই। বালিয়াটিতে কিশোরীলাল রায় চৌধুরী একটি দাতব্য চিকিৎসালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। ১৯২৫ সালের ৩ জুলাই তিনি পরলোকগমন করেন।
আপনার বিছানা বালিশ কিছুদিন পর পর সূর্যের আলোতে রাখুন !
সূর্যের আলোতে বালিশ রাখলে বেশ কিছু উপকার এবং কিছু সতর্কতার বিষয় আছে । নিচে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো—
সূর্যের আলোতে বালিশ রাখলে কী হয়
1. জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া কমে যায় : বালিশে ঘাম, ত্বকের মৃত কোষ, ধুলা, মাইটস ইত্যাদি জমে থাকে । সূর্যের অতিবেগুনি (UV) রশ্মি এগুলোর বৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করে, ফলে বালিশ আরও স্বাস্থ্যকর হয় ।
2. গন্ধ দূর হয় : অনেক সময় বালিশে ঘামের বা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ তৈরি হয় । রোদে রাখলে প্রাকৃতিকভাবে গন্ধ অনেকটাই চলে যায় ।
3. আর্দ্রতা শুকিয়ে যায় : বালিশের ভেতরে আর্দ্রতা আটকে থাকলে ফাঙ্গাস বা ছত্রাক তৈরি হতে পারে । রোদে রাখলে ভিতরের আর্দ্রতা শুকিয়ে যায় ।
4. ধুলা ও ডাস্ট মাইট কমে যায় : রোদে ডাস্ট মাইট দীর্ঘক্ষণ বাঁচতে পারে না । তাই ২–৩ ঘণ্টা রোদে রাখলে পরিমাণ কমে যায় ।
সতর্কতা ও সম্ভাব্য ক্ষতি
1. ফাইবার নষ্ট হতে পারে : বালিশের উপাদান যদি সিনথেটিক (ফাইবার), মেমরি ফোম বা ল্যাটেক্স হয়, বেশি গরম রোদে বারবার রাখলে তা নরমতা হারাতে পারে বা দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে ।
2. রঙ ফিকে হয়ে যেতে পারে : বালিশের কভার বা বালিশের রঙ দীর্ঘ সময় রোদে থাকলে ফিকে হতে পারে ।
3. অতিরিক্ত রোদ বালিশ শক্ত বা ভঙ্গুর করতে পারে
বিশেষ করে পুরোনো বালিশে বেশি সময় গরম রোদে রাখলে ফাইবার শক্ত হয়ে যেতে পারে ।
কীভাবে নিরাপদে রোদে রাখবেন
১০–১২ টার গরম রোদ নয়, সকাল ৮–১০টার রোদ সবচেয়ে ভালো । ১–২ ঘণ্টা রাখাই যথেষ্ট ।
মেমরি ফোম বা ল্যাটেক্স বালিশ হলে সরাসরি তীব্র রোদ না দেয়া ভালো ।
মাঝে মাঝে উল্টে-পাল্টে রাখলে ভালোভাবে শুকায় ।
শেষ কথা : মাঝে মাঝে সূর্যের আলোতে বালিশ রাখা উপকারী, কারণ এটি জীবাণু, গন্ধ, আর্দ্রতা ও ডাস্ট মাইট কমায় । তবে খুব বেশি বা প্রতিদিন তীব্র রোদে রাখলে বালিশের মান নষ্ট হতে পারে ।
আপনি ক্লাসে ফেল করেছেন? তাহলে ঙ্কিকিছুই করতে পারবেন না
— এই ধারণা বহু শিক্ষার্থীকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে দেয়। অথচ ইতিহাস বলছে, যারা পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন, কিন্তু তারা প্রমাণ করে দিয়েছেন, জীবনে সফল হওয়ার জন্য নম্বর নয়, প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গি, সাহস, আর পরিশ্রম।
**জ্যাক মা:
চীনের বিখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান জ্যাক মা জীবনে বহুবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় গণিতে পেয়েছিলেন মাত্র ১ নম্বর। তিনবার চেষ্টা করেও ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি। শেষমেশ হ্যাংঝৌ নরমাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন, যেটাকে তখন ‘চতুর্থ শ্রেণির’ বিশ্ববিদ্যালয় বলা হতো।
চাকরির ক্ষেত্রেও ভাগ্য তার সহায় হয়নি। কেএফসিতে চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন, যেখানে ২৪ জনের মধ্যে ২৩ জন চাকরি পান, বাদ পড়েন কেবল তিনি। পুলিশের চাকরির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।
কিন্তু জ্যাক মা হাল ছাড়েননি। ১৮ জন সহযোদ্ধাকে নিয়ে নিজ বাড়ি থেকে শুরু করেন আলিবাবা। প্রথম দিকে কেউ তাদের পরিকল্পনায় বিশ্বাস করেনি। এমনকি ৩০ জন বিনিয়োগকারী তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তিনি বিশ্বাস রেখেছিলেন নিজের ওপর। আজ তার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি আলিবাবা একটি বৈশ্বিক শক্তি, আর তিনি নিজে হয়ে উঠেছেন তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
**স্টিভ জবস :
অ্যাপল প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস কলেজে ভর্তি হলেও তা শেষ করেননি। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কম থাকলেও প্রযুক্তি, নকশা আর উদ্ভাবনী চিন্তায় তিনি ছিলেন দুর্দান্ত। মাত্র ২০ বছর বয়সে গ্যারেজে বসেই তৈরি করেন অ্যাপল। যন্ত্রণা, চ্যালেঞ্জ, আর ব্যর্থতাকে সঙ্গী করেই এগিয়েছেন তিনি।
এক সময় তাকে নিজ প্রতিষ্ঠান থেকেও বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। ফিরে এসে আবার গড়েছেন এক অভাবনীয় প্রযুক্তির জগৎ। আইফোন, আইপ্যাড, ম্যাকবুক— সবকিছুর পেছনে রয়েছে তার দূরদর্শী চিন্তা।
**বিল গেটস :
বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি বিল গেটস হার্ভার্ডে ভর্তি হয়েও তা শেষ করেননি। কলেজের গণ্ডি না পেরিয়েও তিনি তৈরি করেন মাইক্রোসফট, যা আজ বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির শীর্ষ প্রতিষ্ঠান।
তিনি প্রমাণ করেছেন, ডিগ্রি থাকলেই মানুষ বড় হয় না— বড় হয় চিন্তা, উদ্ভাবন আর সাহসের মাধ্যমে।
**ধীরুভাই আম্বানি :
ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্পপতিদের একজন ছিলেন ধীরুভাই আম্বানি। স্কুলজীবনে লেখাপড়ায় ছিলেন একেবারেই গড়পড়তা। পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। কিন্তু তার বুদ্ধিমত্তা, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস ও পরিশ্রম তাকে নিয়ে যায় সাফল্যের শিখরে। ছোট এক দোকান থেকে শুরু করে গড়ে তোলেন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ— যেটি আজ ভারতের বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠী।
**উইনস্টন চার্চিল :
ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম সফল প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল স্কুলজীবনে ছিলেন একজন খারাপ ছাত্র। বারবার ফেল করতেন, শিক্ষকরা বলতেন— তিনি কিছুই করতে পারবেন না। অথচ তিনিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনকে নেতৃত্ব দিয়ে রক্ষা করেছিলেন।
চার্চিল জীবনে হাল ছাড়েননি। ইতিহাসে তিনি জায়গা করে নেন এক যুদ্ধনায়ক ও কূটনৈতিক বীর হিসেবে। পরবর্তীতে পান নোবেল পুরস্কারও।
শিক্ষাগত ব্যর্থতা অনেকের জীবনে এক ধাক্কা হতে পারে, কিন্তু সেটা জীবনের শেষ কথা নয়। উপরোক্ত উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, যারা নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস রাখে, যারা পরিশ্রমে ক্লান্ত হয় না, তারাই একদিন উঠে দাঁড়ায়।
আপনি পরাজয়ের পর কী করবেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি ব্যর্থ হয়ে কী শিখলেন, সেই শিক্ষাটাই আপনার ভবিষ্যতের ভিত্তি। সঠিক সময়, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, আর সাহসিকতা—এই তিনটিই যেকোনো মানুষকে সাফল্যের পথে নিয়ে যেতে পারে।
Silent Growth Mindset
১. সবকিছু সবার সাথে ভাগ করতে হবে এটা ভুল ধারণা, প্রতিটি স্বপ্নের একটা “অদৃশ্য পর্যায়” থাকে।
শুরুতে যখন তুমি কিছু নতুন করতে যাচ্ছ সেটা ব্যবসা, পড়াশোনা বা নিজেকে গড়ে তোলা তখন সেটা দুর্বল অবস্থায় থাকে।
যদি এই পর্যায়ে সবাইকে জানাও, তখন অনেকে নিরুৎসাহ করবে, কেউ সমালোচনা করবে, কেউ সন্দেহ করবে।
তাই প্রথম ধাপ হলো চুপচাপ কাজ করা এবং নিজেকে প্রমাণ করা নিজের কাছেই।
২. কাজ করো, দেখানো নয়
Silent Growth মানে লুকানো নয়, বরং ফলাফলকে নিজের হয়ে কথা বলতে দেওয়া।
যখন অন্যরা পোস্ট দিচ্ছে, তুমি তখন শিখো, অনুশীলন করো, উন্নতি করো।
তোমার ফোকাস থাকবে কাজের ওপর, প্রমাণের ওপর নয়।
উদাহরণ: যারা নিঃশব্দে ব্যবসা শুরু করে, তারাই একদিন বাজারে আলোচনার কেন্দ্রে আসে।
যারা প্রতিদিন শেখে, তারাই একদিন এমনভাবে উজ্জ্বল হয়। যেখানে ব্যাখ্যার দরকার পড়ে না, কাজই কথা বলে।
৩. প্রতিদিন অল্প একটু করে এগিয়ে যাও
Silent Growth মানে প্রতিদিন অগ্রগতি ছোট হলেও ধারাবাহিক।
আজ এক ঘণ্টা শিখলে, কাল একটুখানি প্রয়োগ করো।
এই ছোট পদক্ষেপগুলোই কয়েক মাস পর বিশাল অর্জনে পরিণত হয়।
মনে রাখো:
“Consistency builds confidence, and confidence builds visibility.”
৪. নিজের পরিকল্পনা নিজের কাছেই রাখো
বাইরের মানুষ তোমার পরিকল্পনা জানলে, তারা চাপ তৈরি করে “কখন করবে?”, “হলো না কেন?”
এই অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলোই তোমার মনোযোগ নষ্ট করে দেয়।
তাই নিজের লক্ষ্য ও ফলাফল নিজের ডায়েরিতে রাখো পোস্টে নয়।
৫. যখন প্রস্তুত, তখনই প্রকাশ করো
চুপচাপ কাজ করা মানে গোপন থাকা নয়;
তোমার সময় এলে তোমার সাফল্য এতটাই দৃশ্যমান হবে যে শব্দের দরকার পড়বে না।
তোমার কাজই তখন পরিচয় হবে।
উপসংহার
“Silent Growth” কোনো কৌশল নয়, এটা একধরনের জীবনদর্শন।
এটা শেখায় কীভাবে শব্দ না করেও নিজের সাফল্যের সুর তৈরি করা যায়।
যারা চুপচাপ কাজ করে, তারা শুধু সফল হয় না। তারা শান্ত, স্থির, এবং দৃঢ় হয়।
তাই আজ থেকেই শুরু করো।
কারও প্রশংসার জন্য নয়, নিজের উন্নতির জন্য।
একদিন তুমি দেখবে, পৃথিবী তোমার নাম নিজে থেকেই উচ্চারণ করছে।
@ Science & Psychology
শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, মহান দাতা এবং জনহিতৈষী হাজী মুহম্মদ মোহসীন
(জন্মঃ- ৩০ অক্টোবর, ১৭৩২ - মৃত্যুঃ- ২৯ নভেম্বর, ১৮১২) ভ্রমণ মানুষের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করে এই বিশ্বাসে তিনি বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। তিনি ইরান, ইরাক, আরব, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন। এইসময়ে তাঁর পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁর একমাত্র বোন মন্নুজান হুগলির নায়েব-ফৌজদার মির্জা সালাহউদ্দীনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। অল্পবয়সে বিধবা হয়ে যাওয়া নিঃসন্তান মন্নুজান তাঁর বিশাল সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য মোহসীনকে ব্যাকুলভাবে দেশে ফিরে আসার আহবান জানান। মোহসীন দীর্ঘ ২৭ বছর পর বাড়িতে ফিরে আসেন। ১৮০৩ সালে মন্নুজানের মৃত্যুর পর মোহসীন তাঁর বিশাল সম্পত্তি লাভ করেন। কঠোর তপস্বী মোহসীন ১৮০৬ সালে একটি ট্রাস্ট গঠন করেন এবং দুজন অছি নিযুক্ত করেন। তিনি তাঁর সম্পত্তিকে নয়টি শেয়ারে ভাগ করেন। তিনটি শেয়ার ধর্মীয় কর্মকান্ডে ব্যবহারের জন্য; পেনশন, বৃত্তি এবং দাতব্য কাজে ব্যয়ের নিমিত্ত চারটি শেয়ার এবং দুটি শেয়ার রাখা হয় অছিদের বেতন হিসেবে। মোহসীন খুব সাধারণ ও ধর্মীয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। অছিদ্বয় তহবিল তসরুফ করায় ১৮১৮ সালে সরকার মোহসীন ফান্ড-এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেয়। সম্পত্তির বর্ধিত অংশ বিভিন্ন দালান-কোঠা নির্মাণ কাজে ব্যয় করা হয়। উনিশ শতকের পঞ্চাশ-এর দশকে নির্মিত এই সকল দালান-কোঠার মধ্যে ছিল আবাসস্থল, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, হাসপাতাল, সমাধিসৌধ ও ইমামবারার ব্যয় নির্বাহের জন্য একটি বাজার।
হাজি মুহাম্মদ মহসীন বাংলার একজন দানবীর মানুষ হিসাবে খ্যাত। তিনি মানুষের কল্যাণে বহু কাজ করেছেন। এখনও মহসীনের নামে বহু শিক্ষালয় আছে। খুলনার হাজী মহসীন কলেজও ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও হাজি মুহাম্মাদ মহসীনের নামে ছাত্রাবাস আছে।
মুহসীন এস্টেটের আয় থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হুগলী মুহসীন কলেজ, হুগলী মাদ্রাসা এবং হুগলীর জেলা হাসপাতাল ‘ইমামবাড়া সদর হাসপাতাল’। আর এই আয় থেকে এখনো দুস্থ ও কৃতী ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া হয় বৃত্তি।
১৭৬৯-৭০ সালের সরকারি দলিল থেকে জানা যায় যে, ওই সময়ের মহাদুর্ভিক্ষে মুহম্মদ মোহসীন বহু লঙ্গরখানা স্থাপন করেছিলেন এবং সরকারি সাহায্য তহবিলে প্রচুর অর্থ প্রদান করেছিলেন। হুগলিতে তাঁর জন্ম।
জন্ম ও পরিবার
তাঁর পিতা হাজী ফয়জুল্লাহ এবং মাতা জয়নাব খানম। এটি ছিল জয়নাবের দ্বিতীয় বিবাহ। তাঁর প্রথম স্বামী আগা মোতাহার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি হুগলিতে বসতি স্থাপন করেন এবং হুগলি, যশোর, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ায় বিস্তীর্ণ জায়গির লাভ করেন। তিনি তাঁর বিপুল সম্পত্তি তাঁর একমাত্র কন্যা মন্নুজান খানম-এর নামে উইল করে যান। ফয়জুল্লাহর পিতাও ছিলেন একজন জায়গিরদার।
ফয়জুল্লাহ তাঁর পুত্রকে আধুনিক শিক্ষায় যথেষ্ট শিক্ষিত করে তোলেন। একজন গৃহশিক্ষক মোহসীন ও তাঁর সৎ বোন মন্নুজানকে শিক্ষা প্রদান করতেন। মনোযোগী ছাত্র হিসেবে মোহসীন বিভিন্ন শাস্ত্রে অসামান্য ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। পরে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে বাংলা সুবাহর তৎকালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদ গমন করেন। ভ্রমণ মানুষের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করে এই বিশ্বাসে তিনি খুব শীঘ্রই বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। তিনি ইরান, ইরাক, আরব, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন। ইমামবাড়ার একটু দূরেই মুহসীনের পারিবারিক কবরস্থান। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন হাজি মুহম্মদ মুহসীন।-সংগৃহীত
★ অসুখী মানুষ ★
এক রাজা একদিন তার উজিরকে জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা বলো তো অধিকাংশ মানুষ অসুখী কেন?"
উজির কিছুক্ষণ নীরব থেকে রাজাকে বললেন, "এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আপনাকে একটি ছোট কাজ করতে হবে।"
রাজা বললেন,"কি কাজ?"
উজির বললেন, "আপনাকে একটি থলেতে নিরানব্বইটি স্বর্ণমুদ্রা রাখতে হবে। সাথে একটি কাগজে লিখে রাখতে হবে, যাতে লেখা থাকে থলেতে ১০০টি স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে। তারপর থলিটি রাতে আপনার কোন কর্মচারীর ঘরের সামনে রেখে আসুন।"
রাজা উজিরের কথা মত তাই করলেন। মুদ্রা ভরা থলেটি একজন রাজকর্মচারীর ঘরে সামনে রেখে এলেন।
কর্মচারী রাতে প্রকৃতির ডাকে ঘর থেকে বের হলে দেখতে পেলেন ঘরের সামনে একটি থলে পড়ে আছে। থলেটা ঘরে নিয়ে খোলার পর স্বর্ণমুদ্রা গুনা শুরু করলো। গুনে নিরানব্বইটি স্বর্ণমুদ্রা পেল। কিন্তু কাগজে লেখা ১০০টি স্বর্ণমুদ্রা। আরো কয়েকবার গুনেও স্বর্ণমুদ্রা ৯৯টিই পেল। একটি মুদ্রা না পেয়ে সেই কর্মচারী ঘরের সবাইকে ঘুম থেকে উঠিয়ে স্বর্ণমুদ্রা খোঁজার কাজে লাগিয়ে দিল। সবাই মিলে সারারাত খোঁজাখুঁজি করেও স্বর্ণমুদ্রাটি আর পেলেন না।
এদিকে রাজা আর উজির আড়ালে দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ করছিলেন। সকালে ওই কর্মচারী যখন রাজবাড়ি আসলেন,রাজা দেখতে পেলেন কর্মচারীর মুখ মলিন। তার মন যেন অতিমূল্যবান কিছু হারিয়ে যাওয়ার ব্যাথায় জর্জরিত।
এবার উজির রাজাকে বললেন, "রাজা মশাই ওই একের জন্যই আমরা এত অসুখী! সৃষ্টিকর্তা আমাদের যত কিছুই দেন না কেন, সবই হচ্ছে নিরানব্বইটি স্বর্ণমুদ্রার মত। আমরা সেগুলো নিয়ে তুষ্ট থাকি না। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি না। সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে কি দিয়েছেন, সেই হিসাব না করে আমরা শুধু অপ্রাপ্তি হিসেব করি। এক সময় অপূর্ণতা এত বেশি থাকে যে, কি পেয়েছি তা একেবারে মনেই থাকে না। তখন সবদিকে শুধু অপ্রাপ্তিই আমাদের চোখে পড়ে, আর মনে শুধু অপূর্ণতার হাহাকার।"
আমরা যদি সৃষ্টিকর্তার দেওয়া অসংখ্য প্রাপ্তির কথা মনে রাখি, তাহলে মনে অশান্তি থাকবে না। হতাশা আমাদেরকে স্পর্শও করতে পারবে না। তখন শুধু মনে হবে সৃষ্টিকর্তা তো আমি না চাইতেই আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন। তাই মনে বিশ্বাস রাখুন আপনি অনেক ভালো আছেন।
বিখ্যাত "দশ(১০) ব্যর্থ ব্যক্তির গল্প"
যারা পৃথিবী বদলে দিয়েছেন। মাত্র চার মাস পর টমাস এডিসনকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল; তার শিক্ষক তাকে মানসিকভাবে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছিলেন। পরে তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা আবিষ্কারক হয়ে ওঠেন।
চার্লস ডারউইনকে চিকিৎসাবিদ্যা ত্যাগ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল, তার বাবা তিক্তভাবে বলেছিলেন: "তুমি তোমার কল্পনা ছাড়া আর কিছুই পরোয়া করো না!" তিনি শেষ পর্যন্ত জীববিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।
"সৃজনশীলতার অভাব" এর জন্য ওয়াল্ট ডিজনিকে একটি সংবাদপত্রের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এরপর তিনি বিশ্বব্যাপী প্রজন্মের কাছে প্রিয় একটি বিনোদন সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।
বিথোভেনের সঙ্গীত শিক্ষক তাকে সম্পূর্ণ প্রতিভাহীন বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি বিশ্বের সবচেয়ে কালজয়ী কিছু মাস্টারপিস রচনা করেছিলেন।
আলবার্ট আইনস্টাইন চার বছর বয়স পর্যন্ত কথা বলতেন না এবং তার শিক্ষক তাকে মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হয়ে উঠেন।
আর্ট স্কুলের প্রবেশিকা পরীক্ষায় তিনবার ব্যর্থ হওয়ার পর অগাস্ট রডিনের বাবা তাকে "বোকা" ঘোষণা করেছিলেন। রডিন এখন সর্বকালের সেরা ভাস্করদের একজন হিসেবে পরিচিত।
সম্রাট ফার্দিনান্দ বিখ্যাতভাবে মোজার্টের "দ্য ম্যারেজ অফ ফিগারো"-এর সমালোচনা করেছিলেন "অনেক বেশি নোট" হিসেবে। আজ, মোজার্টের প্রতিভা প্রশ্নাতীত।
দিমিত্রি মেন্ডেলিফ রসায়নে গড় নম্বর অর্জন করেছিলেন, তবুও তিনি পরে পর্যায় সারণী তৈরি করেছিলেন, যা বিজ্ঞানকে মৌলিকভাবে রূপান্তরিত করেছিল।
ফোর্ড অটোমোবাইলের কিংবদন্তি স্রষ্টা হেনরি ফোর্ড মৌলিক সাক্ষরতার সাথে লড়াই করেছিলেন এবং অসাধারণ সাফল্য অর্জনের আগে একাধিকবার দেউলিয়া ঘোষণা করেছিলেন।
যখন মার্কনি রেডিও আবিষ্কার করেছিলেন এবং বাতাসের মাধ্যমে শব্দ প্রেরণের বর্ণনা দিয়েছিলেন, তখন তার বন্ধুরা তাকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান, ভেবেছিলেন যে তিনি তার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। কয়েক মাস পরে, তার আবিষ্কার সমুদ্রে অসংখ্য জীবন বাঁচিয়েছিল।
শিক্ষা: অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গিকে কখনই আপনার সম্ভাবনা সংজ্ঞায়িত করতে দেবেন না। মহত্ত্ব প্রায়শই ব্যর্থতা দিয়ে শুরু হয়। নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন!
মাঝে মাঝে ভুল
কথায় আছে, মাঝে মাঝে ভুল বলো, না হলে তুমি বুঝতে পারবে না লোকে তোমার কথা শুনছে কিনা! মাঝে মাঝে ভুল লিখো, তাহলে যে তোমার ফেসবুকে জীবনেও কমেন্ট করবে না বলে পণ করেছে, সেও কমেন্ট করবে।
স্ট্যাসি বালিসের "How to change a life" বইটি দ্বিতীয় সংস্করণে নামের ভুলে "How to change a wife" হয়ে বের হয়েছিল। পরেরটা ইতিহাস। নামের ভুলের কারণে বইটি বেস্ট সেলার হয়ে যায়!
দুধ খারাপ হলে দই হয়ে যায়। দই কিন্তু দুধের চেয়ে দামি। যদি এটা আরো খারাপ হয়, এটা পনির হয়ে যায়। দই এবং দুধের চেয়ে পনিরের মূল্য অনেক বেশি।
আঙুরের রস টক হলে তা ওয়াইনে রূপান্তরিত হয়, যা আঙ্গুর রসের চেয়েও দামি। আপনি ভুল করেছন মানেই আপনি ব্যর্থ ব্যাপারটা এমন নয়। ভুল হলো সেই অভিজ্ঞতা যা আপনাকে একজন ব্যক্তি হিসেবে আরো মূল্যবান করে তোলে। আপনি ভুল থেকে শেখেন যা আপনাকে আরো বেশি নিখুঁত করে তোলে!
ক্রিস্টোফার কলম্বাস একটি নেভিগেশন ভুল করেছিলেন, যা তাকে আজকের আমেরিকা আবিষ্কার করতে বাধ্য করেছিল। আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের ভুল তাকে পেনিসিলিন আবিষ্কার করতে সাহায্য করেছিল। টমাস আলভা এডিসনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "আপনি জীবনে কতবার ভুল করেছেন?" তিনি মৃদু হেসে জবাব দিয়েছিলেন, "অসংখ্যবার!" এটা শুনে প্রশ্নকর্তা বলেছিলেন, "তাহলে তো আপনার মাথায় বুদ্ধি কম?" উত্তরে এডিসন যা বলেছিলেন তা এরকম, "মাথায় বুদ্ধি কম ছিল কিন্তু অসংখ্যবার ভুল করার কারণে তা বেড়ে বহুগুণ বড় হয়ে গিয়েছে!" ব্যাপারটা এমন, প্রতিবার ভুলের পর এডিসন নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করতেন।
কানাডিয়ান বিখ্যাত লেখক রবিন শর্মা বলেছিলেন, "ভুল বলে কিছু নেই সবই নতুন শিক্ষা।" বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, "কেউ যদি বলে সে কখনো ভুল করেনি, তার মানে সে কখনো চেষ্টাই করেনি!"
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছিলেন, "উন্নয়ন হলো চেষ্টা এবং ভুলের একটি সমন্বিত পক্রিয়া।"
বিজনেস গুরু রিচার্ড ব্রানসনের মতে, "নিয়ম মেনে কেউ হাঁটা শিখতে পারে না, বরং চেষ্টা এবং বার বার ভুল পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে হাঁটা শিখতে হয়।"
কলিন পাওয়েলের মতে, "যোগ্য নেতা জন্ম নেয় না, তৈরি হয় চেষ্টা, ভুল এবং অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।"
অন্যতম সেরা ক্রীড়াবিদ মাইকেল জর্ডান বলেছিলেন, "আমি অসংখ্যবার ভুল করেছি এবং ব্যর্থ হয়েছি বলেই আজ আমি সফল।"
হেনরি ফোর্ড বলেছিলেন, "ভুল হলো একমাত্র সুযোগ যার মাধ্যমে নতুন করে শুরু করার আরো সুযোগ পাবেন।'
এক প্রেমিকের ভাষ্য, "ভুল মানুষের প্রেমে পড়া মানে আরেকটি শুদ্ধ মানুষের প্রেমে পড়ার অন্যতম সুযোগ।"
কথায় আছে, সত্যিকার মানুষ কখনো নির্ভুল হতে পারে না। যদি সবকিছু নির্ভুল থাকে তাহলে তুমি কখনো কিছু শিখতে পারবে না।
পেন্সিল মানসিকতা হওয়ার চেষ্টা করো, তাহলে ভুল হলে পিছন দিয়ে ঘষে মুছে নতুন করে চেষ্টা করার সুযোগ থাকবে! মুছতে না পারলে চিত্র হয় না! কলম মানসিকতার মানুষগুলো নিজেকে নির্ভুল ভাবে! তাই কলম দিয়ে সুন্দর চিত্র হয় না!
সৌজন্যে:-বৈজয়ন্ত বিশ্বাস ভিক্টর
মৌমাছি
মৌমাছির দুটি পেট থাকে একটি তার নিজের খাবারের জন্য, আর অন্যটি অমৃত সংরক্ষণ করে মধু বানানোর জন্য, যেটিকে 'বীক' (Bee stomach) বলা হয়। একটি মৌমাছি গড়ে ৪০ দিন বাঁচে, এই সময়ের মধ্যে কমপক্ষে ১০০০টি ফুলে ঘুরে মধুর অমৃত সংগ্রহ করে, আর সারাজীবনে মাত্র এক চা চামচ মধু উৎপাদন করতে পারে। আমাদের কাছে এক চামচ মধু হয়তো কিছু না, কিন্তু তার কাছে সেটাই তার পুরো জীবনের গল্প ।
বৌদ্ধদের উপর হিন্দু নিপীড়নের সিলসিলা
ড. দীনেশচন্দ্র সেন ( ১৮৬৬-১৯৩৯) রচিত প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান বই থেকে আমরা জানতে পারি, মুসলিম-পূর্বকালে এ দেশে নিম্নবর্গের মানুষের পাশাপাশি বৌদ্ধদেরও ভয়াবহ নির্যাতন করা হতো। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দুঃশাসনে তাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। একাধিকবার তাদের গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হতে হয়। ড. দীনেশচন্দ্র সেন আরও লিখেছেন, ‘কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্কের (৫৯০-৬২৫) আদেশ ছিল সেতুবন্ধ হতে হিমগিরি পর্যন্ত যত বৌদ্ধ আছে, বালক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাইকে হত্যা করবে, যে না করবে তার মৃত্যুদণ্ড হবে।’ মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ( ১৮৫৩-১৯৩১) দেখাচ্ছেন, ‘যে জনপদে (পূর্ববঙ্গে) এক কোটির অধিক বৌদ্ধ এবং ১১ হাজার ৫০০ ভিক্ষু বাস করত, সেখানে একখানা বৌদ্ধগ্রন্থ ৩০ বছরের চেষ্টায় পাওয়া যায় নাই।’ এর পাশাপাশি শশাঙ্ক এ অঞ্চল থেকে বৌদ্ধ অধিকারের চিহ্নমাত্র বিলুপ্ত করতে চেয়েছেন। শশাঙ্কের পর বাংলায় চারশ বছর পাল বংশ রাজত্ব করে। এগারো শতকে আবারও ক্ষমতায় আসে সেন বংশ। এ বংশ ছিল গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদী ও এর কঠোর প্রয়োগে অনমনীয়। অন্য ধর্মের প্রতি বিন্দুমাত্র সহিষ্ণুতা ছিল না তাদের। জনগণের অর্থনৈতিক বিপন্নতা, ভয়াবহ বর্ণাশ্রম প্রথা, প্রশাসনের উচ্চতর থেকে শুরু করে নিম্নতর পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্য অনুশাসন চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তখন করুণ অবস্থা। তাদের অস্তিত্ব ছিল চরম হুমকির মুখে। তারা দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছিল। মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছিল।
নলিনী দাশগুপ্ত ও ভিক্ষু সুনীথানন্দ দেখিয়েছেন, বৌদ্ধদের উপাসনালয় ও ঐতিহ্য বিনাশ চলছিল তুমুলভাবে। এমনকি তারা ‘বৌদ্ধদের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম অধ্যায়কে এ দেশীয় ইতিহাসের পাতা থেকে চিরদিনের জন্য মুছে ফেলতে প্রয়াসী হয়েছিলেন’। বাংলাদেশের বৌদ্ধবিহার ও ভিক্ষু জীবন গ্রন্থে ভিক্ষু সুনীথানন্দ দাবি করেন, এর জন্য একমাত্র হিন্দুরাই দায়ী। এ অত্যাচার কী তীব্র আকার ধারণ করে এবং বৌদ্ধজীবন কী ভয়াবহতায় পর্যবসিত হয়, এর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রাচীন শঙ্কর বিজয় ও শূন্য পুরাণ—এর মতো গ্রন্থে। ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর বৃহৎবঙ্গ গ্রন্থের প্রথম খন্ডে বৌদ্ধদের উপর হিন্দু নিপীড়নের বিস্তর আলোচনা করেছেন। তার মতে, হিন্দুরা শুধু বৌদ্ধদের অত্যাচার ও তাদের ধর্ম নষ্ট করে ক্ষান্ত হননি, তারা এতকালের সঞ্চিত বৌদ্ধ ভান্ডারের সর্বৈব লুন্ঠন করে লুণ্ঠিত সম্পদ নিজেদের নামাঙ্কিত করে সামগ্রিকভাবে সর্ববিধ নিজস্ব করে নিয়েছেন। হিন্দুদের পরবর্তী ন্যায়, দর্শন, ধর্মশাস্ত্র প্রভৃতির মধ্যে এ লুন্ঠন পরিচয় পাওয়া যায়। এ পরিস্থিতিতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ত্রাণকর্তা রুপে আবির্ভূত হন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি। তিনি বঙ্গ জয় করলে বৌদ্ধরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নিপীড়ন থেকে মুক্তি পায়। অথচ এ লোকটিকেই ইতিহাসে খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে। বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায় (১৮৮৭-১৯৫৬) লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণ্য প্রতিক্রিয়ায় বৌদ্ধ-বিপ্লব যখন পর্যুদস্ত হয়ে গেল আর তাতেই হলো ভারতের সমাজে বিশৃঙ্খলার উৎপত্তি; তখন অগণিত জনসাধারণ তা থেকে স্বস্তি ও মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচার জন্য ইসলামের বার্তাকেই জানাল সাদর সম্ভাষণ।’
মুসলিম-বিদ্বেষী লেখক আর্নেস্ট হ্যাভেলও ( ১৮৬১-১৯৩৪) তাঁর দ্য হিস্ট্রি অব এরিয়ান রুল ইন ইন্ডিয়া গ্রন্থে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, “মুসলমান রাজনৈতিক মতবাদ শুদ্রকে দিয়েছে মুক্ত মানুষের অধিকার, আর ব্রাহ্মণদের উপরেও প্রভুত্ব করার ক্ষমতা। ইউরোপের পুনর্জাগরণের মতো চিন্তাজগতে এ-ও তুলেছে তরঙ্গাভিঘাত, জন্ম দিয়েছে অগণিত দৃঢ় মানুষের আর অনেক অদ্ভূত মৌলিক প্রতিভার। পুনর্জাগরণের মতো এ-ও ছিল আসলে এক প্রৌঢ় আদর্শ।… এরই ফলে গড়ে উঠল বাঁচার আনন্দে পরিপূর্ণ এক বিরাট মানবতা।’ ড. দীনেশচন্দ্র সেন-এর ভাষায়, ‘মুসলমানগণ কর্তৃক বঙ্গবিজয়কে বৌদ্ধরা ভগবানের দানরূপে মেনে নিয়েছিল।’
এমন জায়গা দেখাও যেখানে আল্লাহ নেই!!!!!............ মির্জা গালিব
মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ, ডাক নাম গালিব (গালিব অর্থ সর্বোচ্চ) এবং (পূর্বের ডাক নাম) আসাদ ( আসাদ অর্থ সিংহ)
ভারতবর্ষে মোঘল-সম্রাজ্যের শেষ ও ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকের একজন উর্দু এবং ফার্সি ভাষার কবি । সাহিত্যে তার অনন্য অবদানের জন্য তাকে দাবির-উল-মালিক ও নাজিম-উদ-দৌলা উপাধি দেওয়া হয়। তার সময়কালে ভারতবর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য তার ঔজ্জ্বল্য হারায় এবং শেষে ১৮৫৭ সালের সিপাহীবিদ্রোহ এর মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা পুরোপুরিভাবে মোঘলদের ক্ষমতাচ্যুত করে সিংহাসন দখল করে, তিনি তার লেখায় এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। মহাবিদ্রোহের সময়কার তার লেখা সেই দিনলিপির নাম দাস্তাম্বু। তিনি জীবনকালে বেশ কয়েকটি গজল রচনা করেছিলেন যা পরবর্তীতে বিভিন্ন জন বিভিন্ন আঙ্গিকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন ও গেয়েছেন। তাকে মোঘল সম্রাজ্যের সর্বশেষ কবি হিসেবে ও দক্ষিণ এশিয়ায় তাকে উর্দু ভাষার সবচেয়ে প্রভাবশালী কবি বলে মনে করা হয়। আজ শুধু ভারত বা পাকিস্তানে নয় সারা বিশ্বেই গালিবের জনপ্রিয়তা রয়েছে।
জন্ম : ২৭ ডিসেম্বর ১৭৯৭ আগ্রা, মুঘল সাম্রাজ্য মৃত্যু : ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৯ (বয়স ৭২) দিল্লী, ছদ্মনাম : আসাদ, গালিব পেশা : কবি, সময়কাল : মুঘল আমল ধরন : গজল, বিষয় : প্রেম, দর্শন
গালিব কখনো তার জীবিকার জন্য কাজ করেননি। সারা জীবনই তিনি হয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অথবা ধার কর্য করে নতুবা কোনো বন্ধু উদারতায় জীবন যাপন করেন। তার খ্যাতি আসে তার মৃত্যুর পর। তিনি তার নিজের সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে, তিনি বেঁচে থাকতে তার গুণকে কেউ স্বীকৃতি না দিলেও, পরবর্তী প্রজন্ম তাকে স্বীকৃতি দিবে। ইতিহাস এর সত্যতা প্রমাণ করেছে। উর্দূ কবিদের মধ্যে তাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি লেখা হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন
গালিব ১৭৯৭ সালে আগ্রায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষরা আগ্রার আদি বাসিন্দা ছিলেন না৷ তার দাদা কাকান বেগ খান সামরিক উচ্চাভিলাষী ব্যক্তি হিসেবে সমরকন্দ থেকে ভারতে আগমণ করার পর বিভিন্ন সময়ে পাঞ্জাবের গভর্নর, মোগল সম্রাট শাহ আলম ও জয়পুরের মহারাজার অধীনে সামরিক দায়িত্ব পালন করেন৷ কাকান বেগের বিরাট পরিবারের মধ্যে তার দুই পুত্র আবদুল্লাহ বেগ খান ও নসরুল্লাহ বেগ খান তার পদাংক অনুসরণ করে সৈনিকের পেশা গ্রহণ করেছিলেন বিভিন্ন শাসকের অধীনে৷ অষ্টাদশ শতাব্দীর ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতে এই পেশা অত্যন্ত অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক ছিল৷ গালিবের পিতা আবদুল্লাহ বেগ খানের মৃত্যুর সময় তার বয়স মাত্র চার বছর৷ ভাই এর পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নসরুল্লাহ বেগ খান৷ ১৮০৬ সালে নসরুল্লাহ খান মারাঠাদের অধীনে আগ্রা দুর্গের অধিনায়ক হন এবং এক পর্যায়ে ব্রিটিশের কাছে দুর্গ সমর্পণ করলে তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পুরস্কৃত হন৷ চাচার মৃত্যুর সময়ে গালিবের বয়স নয় বছর৷
মির্জা গালিবের পিতা আগ্রার এক অভিজাত পরিবারে বিয়ে করেছিলেন৷ সৈনিক জীবনের অনিশ্চয়তার কারণে তিনি তার স্ত্রীকে আগ্রায় পিতার পরিবারেই অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিলেন৷ মামার বাড়িতেই গালিবের জন্ম এবং তুলনামূলকভাবে তিনি আরামদায়ক শৈশব কাটান, যা তার পিতা ও চাচার মৃত্যুর পরও ব্যাহত ছিল৷ কিন্তু পিতা ও চাচার অকাল মৃত্যুতে তার মধ্যে বঞ্চনার স্থায়ী প্রভাব হয়নি৷ তাছাড়াও বংশের ঐতিহ্যের কারণে অহংকারী গালিবের মধ্যে তার মায়ের পিতৃগৃহে অবস্থানের প্রভাব নেতিবাচক ছিল৷ কিন্তু সৌভাগ্যবশত: শৈশবে তার শিক্ষা এমন ছিল যে তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ব্যাহত হয়নি৷ আগ্রার খ্যাতিমান পণ্ডিত শেখ মোয়াজ্জেম তার শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন৷ এছাড়া সম্ভবত: তিনি মীর আযম আলী পরিচালিত একটি মাদ্রাসায়ও যেতেন৷ তিনি যুক্তিবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিত্সাশাস্ত্র ও অধিবিদ্যা ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে পড়াশুনা করেন৷ কিন্তু তার ঝোঁক ছিল ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি, এবং বিশেষত: ফার্সি ভাষার প্রতি৷ এসময়ে আরবি ও ফার্সি ভাষায় দক্ষ আবদুস সামাদ নামে এক জ্ঞানী ব্যক্তি আগ্রা সফর করেন৷ গালিব তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন৷ আবদুস সামাদ গালিবের মামার বাড়িতে দুই বছর অতিবাহিত করেন৷ গালিব কখনো কাউকে তার 'উস্তাদ' বলে স্বীকার না করলেও পরবর্তীকালে আবদুস সামাদের উল্লেখ করেছেন অত্যন্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার সাথে৷
নয় বছর বয়সেই গালিব ফার্সিতে কবিতা লিখতে শুরু করেন৷ পুরো জীবন ধরে তিনি ফার্সিকে তার প্রথম প্রেম বলে বর্ণনা করেছেন৷ কিন্তু তিনি যে শৈশবেই উর্দুতে কবিতা লিখতেন তারও দৃষ্টান্ত রয়েছে৷ কবি আলতাফ হোসেন হালীর বর্ণনা অনুসারে কানাইয়া লাল নামে এক লোক গালিবের একটি মসনবী সংরক্ষণ করেছিলেন যা গালিবের আট বা নয় বছর বয়সে লিখা৷ এটির অস্তিত্ব গালিব বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু পরে যখন তাকে এটি দেখানো হয় তখন তিনি অত্যন্ত ব্যগ্রতার সাথে সেটি পাঠ করেন৷
বলা হয়ে থাকে যে, আগ্রার এক অভিজাত ও কবি হোসাইন-উদ-দৌলা একবার কিছু তরুণ কবির কবিতা নিয়ে যান লক্ষ্ণৌর বিখ্যাত কবি মীর তকী মীরের কাছে৷ মীর তকী কবি খ্যাতির পাশাপাশি চড়া মেজাজের জন্যেও পরিচিত ছিলেন এবং ভালো কবিতা ছাড়া সবই বাতিল করে দিতেন৷ কেউ সাহস করে তাকে গালিবের কবিতা দেখায় এবং গালিবের মেধা সম্পর্কে অবহিত করে৷ গালিবের গজল পাঠ করে তিনি মন্তব্য করেন যে, কোন ভালো উস্তাদের তত্ত্বাবধানে ছেলেটি বিরাট কবি হতে পারবে৷
১৮১০ সালের ৮ আগস্ট তের বছরের কম বয়সে গালিব নওয়াব ইলাহী বখশ খানের কন্যা ওমরাও বেগমকে বিয়ে করেন এবং বিয়ের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আগ্রা থেকে দিল্লিতে চলে আসেন৷ সম্ভবত তা ১৮১১ সালে এবং পরবর্তী একান্ন বছর ধরে তিনি দিল্লিতেই বসবাস করেছেন৷ অবশ্য সাত বছর বয়স থেকেই তিনি দিল্লিতে আসতেন বলে নগরীটি তার কাছে নতুন ছিল না৷ তার শ্বশুর দিল্লির অভিজাতদের অন্যতম ছিলেন৷ 'মারুফ' ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন তিনি৷ কবি হিসেবে খ্যাতি লাভের জন্যে আগ্রার চাইতে দিল্লির পরিবেশ অনুকূল ছিল ৷ অবশ্য অব্যাহত রাজনৈতিক সমস্যার কারণে তার পূর্বেকার কবি মীর তকী মীর ও সওদাকে দিল্লি ত্যাগ করতে হয়েছিল৷ কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর সূচনায় ব্রিটিশ উপনিবেশিক শক্তির উপস্থিতি দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে শান্ত রেখেছিল৷
দিল্লিতে আগমণের পর গালিব চাঁদনী চকের কাছে একটি প্রাসাদ ভাড়া নেন৷ শ্বশুরের প্রভাবের কারণে দিল্লির অভিজাত মহলের সাথে পরিচিত হতে তাকে বেগ পেতে হয়নি৷ কিন্তু তার কবি সূচনা খুব স্বচ্ছন্দ ছিল না৷ তার প্রথমদিকের কবিতা ফার্সি ঘেঁষা ছিল৷ উর্দু সাধারণ মানুষের ভাষায় পরিণত হওয়ায় সাহিত্যের মাধ্যম হিসেবেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল৷ কিন্তু গালিবের ওপর ফার্সি কবি বুখারি, আসীর ও বেদীর প্রভাব ছিল৷ সমালোচকদের মতে গালিবের প্রথম জীবনের কবিতা তার ব্যক্তিগত জীবনের মতোই দুর্বোধ্য ও সামঞ্জস্যহীন ছিল৷ গালিব যদি কোন মুশায়রায় উপস্থিত থাকতেন, তাহলে খুব কমসংখ্যক কবিই অর্থহীন শব্দ সংবলিত কবিতা উপস্থাপন করতেন৷ একবার দিল্লির সুপরিচিত এক কবি হাকিম আগা খান একটি কবিতা আবৃত্তির সময় হাত-পা ছুঁড়ে হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, গালিবের কবিতা একমাত্র আল্লাহ এবং স্বয়ং গালিবের পক্ষেই বুঝা সম্ভব৷ অন্যেরাও কমবেশি একইভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেন৷ রামপুরের মৌলভি আবদুল কাদের একবার গালিবকে বলেন, 'আপনার উর্দু কবিতাগুলোর একটি আমি বুঝতে পারি না', এবং তিনি তখন একটি কবিতা রচনা করে তাকে শোনান,
"প্রথমে মোষের ডিম থেকে গোলাপের নির্যাস নাও, এছাড়াও সেখানে অন্য যে সব ওষুধ আছে সেগুলোও মোষের ডিম থেকে বের করে নাও"
গালিব চমকে উঠে বলেন, 'এটি অবশ্যই আমার কবিতা নয়৷' মৌলভি কাদের রসিকতা বজায় রেখে বলেন, 'আমি আপনার দিওয়ানেই এটি পেয়েছি৷ কপি থাকলে আনুন, আমি এখনই দেখিয়ে দিচ্ছি৷' অবশেষে গালিব উপলব্ধি করেন যে, তাকে পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে তার দিওয়ানে এ ধরনের অসঙ্গতিপূর্ণ কবিতার উপস্থিতি আছে৷ অবশ্য বিরূপ সমালোচনার জবাবও দিয়েছেন গালিব:
"আমি প্রশংসার কাঙ্গাল নই পুরস্কারের জন্যে লালায়িত নই আমার কবিতার যদি কোন অর্থও না থাকে তা নিয়েও আমার তোয়াক্কা নেই৷"
আরেকটি কবিতায় তিনি ব্যঙ্গ করে লিখেন,
"ও, আমার হৃদয়, এটা তো সত্য যে আমার কবিতা খুবই কঠিন! খ্যাতিমান ও সফল কবিরা আমার কবিতা শুনে সেগুলো সহজ করতে বলে৷ কিন্তু কঠিন ছাড়া কোন কবিতা লিখা আমার জন্যেই কঠিন৷"
তা সত্ত্বেও গালিবের কবিতা অপূর্ব, ছন্দময় এবং সহজ ভাবসমৃদ্ধ৷ কিন্তু সমালোচনার প্রতি গালিবের অসহিষ্ঞুতাকে অনেকে পছন্দ করতে পারেননি৷ তার কবিতার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে নিজের অহংকার এতো প্রচন্ড ছিল যে, তিনি মনে করতেন যে খুব কম লোকই তার কবিতাকে বিচার করতে সক্ষম৷
"আমার হৃদয়ের আগুন থেকেই আলো দিচ্ছে আমার কবিতা, আমি যা লিখছি তাতে একটি আঙ্গুল দেয়ার সাধ্য নেই কারো৷"
গালিব নিজেকে দিল্লির অভিজাতদের মধ্যে গণ্য করতেন এবং সেভাবে চলতে ফিরতে ও আচার আচরণে অভ্যস্ত ছিলেন৷ কবি আলতাফ হোসেন হালী লিখেছেন যে, গালিব কখনো পালকি ছাড়া কোথায়ও যেতেন না এবং যারা তার সাথে সাক্ষাতের জন্যে আসতেন, তিনিও শুধু তাদের কাছেই যেতেন৷
গালিব মদ্য পান করতেন এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে তার নিষ্ঠা ছিল না৷ অতএব, সেজন্যেও তাকে তীব্রভাবে সমালোচিত হতে হয়েছে৷ তার কবিতায় ধর্মীয় শব্দাবলী উঠে এসেছে প্রতীকি অর্থে, যা অনিবার্যভাবে ধর্মের প্রতি তার বিরূপতা নাও হতে পারে৷
"কা'বা তওয়াফের প্রয়োজন নেই আমার আমাকে জমজম কূপের কাছে থামতে হবে, কারণ আমার ইহরাম সুরায় ভিজে গেছে৷ গত রাতে আমি জমজমের পাশে বসে আকন্ঠ সুরা পান করেছি৷ প্রথম আলো ফুটতেই ইহরাম থেকে সুরার দাগ ধুয়ে ফেলতে হবে৷"
হালীর মতে গালিব মদ পান করার সময় লিখতেন এবং তা প্রায়ই সন্ধ্যায়৷ একা বসে একটি সুতা নিয়ে খেলতেন৷ কবিতার একটি লাইন লিখার পর সুতায় একটি গিট দিতেন৷ যখন শুতে যেতে তখন সুতায় অনেকগুলো গিট থাকতো৷ সকালে তিনি গিটগুলো খুলতেন৷ লাইনগুলো তিনি মুখস্থও বলতে পারতেন৷ তার সৃজনশীলতা ও কল্পনার ক্ষেত্রে মদিরা সহায়ক ছিলো বলে অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেছেন৷ সুরার প্রতি আসক্তিকে গালিব মনে করতেন আশির্বাদ৷ তিনি লিখেছেন: "ও আসাদ, সুরা পান করতে অস্বীকারকারী পুরোপুরিই অজ্ঞ; তার বেহেশতের সাকীর ভালোবাসা ছাড়া সুরা নিষিদ্ধ৷"
গালিবের আরেকটি দুর্বলতা ছিল জুয়া খেলার প্রতি৷ এ ব্যাপারে তার কোন রাখঢাক ছিল না৷ গ্রীষ্মের একদিন এবং তখন রমজান মাসও ছিল, গালিবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিশিষ্ট কবি ও ইসলামী আইনে বিশেষজ্ঞ মুফতি সদরুদ্দিন আজুর্দা গালিবের সাথে সাক্ষাত্ করতে গিয়ে দেখতে পান যে তিনি জুয়া খেলছেন৷ ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি মন্তব্য করেন যে এখন তার সন্দেহ হচ্ছে যে, পবিত্র গ্রন্থাদিতে যে বলা হয়েছে রমজান মাসে শয়তান কারারুদ্ধ থাকে, তা সত্য৷ গালিব তাকে স্বাগত জানিয়ে উত্তর দেন, গ্রন্থের বক্তব্য যথার্থ, শয়তান যথার্থই কারারুদ্ধ এবং তা এই কক্ষেই৷ গালিব কখনো রোজা রাখেননি এবং তিনি তা স্বীকার করেছেন৷ অন্যান্য দোষও তিনি স্বীকার করতেন এবং ধর্মের বাণী প্রচারকারীদের বিদ্রূপ করতেন৷ আর্থিক অনটন গালিবের জীবনকে বেপরোয়া করে তুলেছিল এবং নিজ বাড়িতে বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানাতেন জুয়া খেলতে৷ জুয়া খেলাকে নৈতিকভাবে অপরাধ মনে করতেন না তিনি৷ তখনকার ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছিল এবং জুয়া খেলাকে 'দেশীয়'দের বদভ্যাস বলে বিবেচনা করতো৷ জুয়াখেলার কারণে ১৮৪১ সালে গালিবকে সতর্ক করে দেয়া হয় এবং ১০০ রুপি জরিমানাও করা হয়৷ কিন্তু পরবর্তীতে দিল্লির কোতোয়াল ফৈয়াজ হাসান খান গালিবের বাড়িতে হানা দিয়ে জুয়া খেলারত অবস্থায় তাকে পাকড়াও করেন এবং বিচারে তাকে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও দু'শ রুপি জরিমানা করা হয়৷ জরিমানা দেয়া না হলে কারা মেয়াদ বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ৫০ রুপি দেয়া হলে সশ্রম কারাদন্ড বিনাশ্রম হওয়ার শর্ত ছিল৷
এই রায়ের বিরম্নদ্ধে প্রবল আপত্তি উঠে৷ তখনকার সংবাদপত্রগুলো প্রতিবাদে সোচ্চার হয়৷ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার পরও সরকার অনড় ছিল৷ সম্রাটকে জানানো হয় যে বিচারাধীন বিষয়ে তার হস্তক্ষেপ না করাই ভালো৷
গালিবকে অবশ্য পুরো মেয়াদ কারাবাস করতে হয়নি৷ তিন মাস পরই তাকে মুক্তি দেয়া হয়৷ কারাগারে তাকে কোন শ্রম দিতে হয়নি৷ বাড়ি থেকে পাঠানো খাবার খেতে দেয়া হয়েছে এবং দর্শনার্থীদের সাথে সাক্ষাতও করতে দেয়া হয়েছে৷ অবশেষে দিল্লির সিভিল সার্জনের সুপারিশে মেয়াদ পূর্তির আগেই তাকে মুক্তি দেয়া হয়৷ কিন্তু গালিবের ওপর এই শাস্তির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল৷ অভিজাত, বুদ্ধিজীবী এবং দুঃখ ও আনন্দে অতি স্পর্শকাতর কবি হিসেবে তার যে অহংকার ছিল তা গুঁড়িয়ে যায় তার সাথে সাধারণ অপরাধীর মতো আচরণ করায়৷ শাসকদের দৃষ্টিতে তার গুরুত্ব রয়েছে বলে ধারণা ধুলিসাত্ হয়ে যায় এবং নামসর্বস্ব মোগল সম্রাটের অক্ষমতাও তার কাছে স্পষ্ট হয়৷ তার বিপদে বন্ধুরাও তাকে পরিত্যাগ করেছিল৷ গালিবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমিনুদ্দিন খান গালিবের সাথে তার সম্পর্কের বিষয় মুছে ফেলতে সংবাদপত্রে বিবৃতি পর্যন্ত দিয়েছেন৷ ব্যতিক্রম ছিলেন শুধু মোস্তফা খান শেফতা নামে এক বন্ধু, যিনি তার কারাদন্ড লাঘবের চেষ্টা এবং প্রতিদিন তার সাথে সাক্ষাত্ করেছেন৷ গালিব জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো পর্যন্ত তার প্রতি ঋণ স্বীকার করে গেছেন৷
ফার্সি ভাষায় লিখা এক চিঠিতে তিনি পৃথিবীতে আর না থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন কারামুক্ত হয়ে৷ যদি বাঁচতেই হয় তাহলে হিন্দুস্থানে নয়, রুম, মিশর, ইরান, বাগদাদে এমনকি মক্কায় গিয়ে থাকতে চেয়েছেন৷ তার আগে সকল বন্ধন থেকে মুক্ত হতে চেয়েছেন তিনি৷
অবশ্য এ পরিস্থিতিতে বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফর গালিবের সহায়তায় এগিয়ে আসেন৷ ১৮৫০ সালে তিনি গালিবকে 'নাজমুদ দৌলাহ দাবির উল-মুলক নিজাম জং' খেতাবে ভূষিত করে তাকে তৈমুরের বংশের ইতিহাস লিখার দায়িত্ব ন্যস্ত করেন বার্ষিক ছয়শ' রুপি ভাতায়৷ এতে গালিব মানসিকভাবে কিছুটা স্থিতিশীল হন৷ কিন্তু ইতিহাস রচনার কাজে যে পড়াশুনা ও ধৈর্য্যের প্রয়োজন গালিবের তা ছিল না এবং দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে তিনি মোগল বংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের চাইতে বেশি আর অগ্রসর হতে পারেননি৷ তার আর্থিক অবস্থা ছিল নাজুক এবং তাকে মাসিক ভিত্তিতে ভাতা দেয়ার জন্যে বাহাদুর শাহকে লিখেন৷ বাহাদুর শাহ এতে অনুমোদন দেন, কিন্তু ১৮৫১ সালের মধ্যে সম্রাট হুমায়ুনের জীবনকাহিনীর চাইতে বেশি আর লিখতে পারেননি৷ অতএব, প্রকল্পটি ভেস্তে যায়৷ তিনি যতটুকু লিখেছিলেন তা 'মিহির-ই-নিমরোজ' নামে ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হয়৷
১৮৫৪ সালে গালিব বাহাদুর শাহ জাফরের উস্তাদ হিসেবে মর্যাদা লাভ করেন৷ তার বার্ষিক ভাতা চারশ' রুপিতে দাঁড়ায়৷ গালিবের কবি খ্যাতি আরো বৃদ্ধি পায়৷ গালিব একই সাথে অযোধ্যার নওয়াব ওয়াজিদ আলী শাহের ওপর তার প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন৷ এক পর্যায়ে তিনি তাকে বার্ষিক পাঁচশ' রুপি ভাতা মঞ্জুর করেন৷ আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে এলেও গালিবের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ছিল৷ চোখে কম দেখছিলেন এবং কানেও কম শুনছিলেন৷ মোটামুটি এ সময়েই তার কবি বন্ধু মোমিন ও জওক এর মৃত্যু ঘটে এবং দু'জনের মৃত্যুতে তিনি ব্যথিত হন৷ ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অযোধ্যাকে ব্রিটিশ আওতায় নিয়ে আসে এবং একই বছরে পরবর্তী মোগল সম্রাট বলে নির্ধারিত মির্জা ফখরুদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন৷ অতএব দুটি উৎস থেকেই গালিবের ভাতা প্রাপ্তি বন্ধ হয়ে যায়৷
কিন্তু এর চাইতে ভয়াবহ বিপর্যয় অপেক্ষা করছিল৷ তা ছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, যার ফলে জীবনের পরিচিত সবকিছু তছনছ হয়ে যায় এবং বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যে ব্যবস্থা চালু করে তা ব্যক্তিজীবন, সামাজিক জীবনকে পুরোপুরি পাল্টে দেয়৷ মোগল বাদশাহ'র সময়ে তিনি যে ভাতা লাভ করতেন, তা ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বাতিল করেন৷ ফলে মির্জা গালিবকে নতুন করে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়৷ ভাতা পুনর্বহালের জন্যে তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির করেন, কিন্তু তাতে কোন ফল হয়নি৷
১৮৬৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি মহান কবি গালিব মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের কাছে পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়৷ বর্তমানে গালিবের সমাধিক্ষেত্র টি চরম অবহেলায় পর্যবসিত।
বখতিয়ার খিলজি, নালন্দা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
মালিক গাজী ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি। তিনি ‘ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি’ বা শুধু ‘বখতিয়ার খিলজি’ হিসেবে বেশি প্রসিদ্ধ। বখতিয়ার খিলজি তুর্কি জাতির খিলজি গোত্রের সন্তান ছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস চর্চায় বখতিয়ারকে আফগানিস্তান থেকে আগত দেখানো হলেও খলজি বা খিলজি ট্রাইব মূলত তার্কি বা তুর্কিস্তানের। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ রচিত তবাকাতে নাসিরি–র ইংরেজি অনুবাদক রেভার্টির স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে এ বিষয়ে। তুরস্ক থেকেই এদের একাংশ ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে আফগানিস্তানে এসে বসতি স্থাপন করে। তারপর বিভিন্ন আক্রমণকারী সৈন্যদলের হয়ে এরা ভারতে আসে। আফগানিস্তানে এরা মূলত যাযাবর জাতি হিসেবে পরিচিত। পশুচারণ ছিল এদের পেশা। আফগানিস্তানে এরা গিলজি বা গিলজাই নামে প্রসিদ্ধ ছিল, যা ভারতে এসে খলজি বা খিলজি নামে উচ্চারিত হতে থাকে। এ কারণে জন্মসূত্রে বখতিয়ার খিলজি আফগানি হলেও তাঁকে তুর্কি বলা হয়। তাঁর জন্মস্থান উত্তর আফগানিস্তানের গরমশির (বর্তমানে এটি দশত-ই-মার্গ নামে পরিচিত) এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বাল্যকাল সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয়, দারিদ্র্যের কারণে তিনি স্বদেশ ত্যাগ করে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়েছিলেন। সে সময় খিলজি গোত্রের পুরুষেরা সৈনিক পেশাকে অগ্রাধিকার দিত। বখতিয়ার খিলজিও তাই ১১৯৫ সালে গজনীর সুলতান শিহাবুদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরি’র সেনাবাহিনীতে যোগদানের আবেদন করেন। কিন্তু দৈহিক গড়নে তিনি ছিলেন খাটো। এছাড়া তাঁর দু’বাহু ছিল হাঁটুর নিচ পর্যন্ত লম্বা–যা ছিল দৃষ্টিকটু। শুধু তাই নয়, তিনি দেখতেও ছিলেন কুশ্রী । এ কারণে মুহাম্মদ ঘুরি’র বাহিনীর সেনাধ্যক্ষ তাঁর আবেদন নাকচ করে দিয়েছিলেন।
গজনীতে চাকুরি না পেয়ে তিনি দিল্লি চলে আসেন। দিল্লির প্রথম মুসলিম শাসক কুতুবউদ্দিন আইবেকের দরবারে চাকুরিলাভের চেষ্টা করেন। অসম সাহসী ও উচ্চাভিলাষী হওয়া সত্ত্বেও অনার্কষণীয় ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি দিল্লিতে বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। এবারও তিনি ব্যর্থ হন। এরপর তিনি বাদায়ুন চলে যান। বাদায়ুন বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি জেলা শহর। বাদায়ুনের তৎকালীন শাসক মালিক হিজবরউদ্দিন বখতিয়ার খিলজিকে নগদ বেতনে সেনাবাহিনীতে চাকুরি দেন। কিন্তু বখতিয়ার ছিলেন উচ্চাভিলাষী। সামান্য বেতনভুক্ত সিপাই হিসেবে চাকুরি করে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। কিছুদিন পর তিনি অযোধ্যা চলে যান। অযোধ্যার শাসক হুসামুদ্দিন তাকে বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর জেলার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত ভগবৎ ও ভিউলি নামের দুটি পরগণার জায়গীর দেন। এ পরগণা দুটিই পরবর্তীতে তাঁর শক্তির উৎস হয়ে ওঠে এবং এখানেই তিনি খুঁজে পান তাঁর উন্নতির শিখরে পৌঁছার উৎস সোপান। ১২০১ সালে বখতিয়ার মাত্র দু হাজার সৈন্য নিয়ে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন ছোট ছোট হিন্দু রাজ্যে আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকেন। এতে একদিকে তাঁর ধনসম্পদ বাড়তে থাকে, অন্যদিকে তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। খিলজি গোত্রের অন্যরাও দলে দলে তাঁর সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে থাকে। এতে তাঁর সৈন্যসংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। তাঁর বাহিনী আরো শক্তিশালী ও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। @ মুহাম্মাদ হাসিবুল হাসান
বখতিয়ার খিলজি ও নালন্দা : মিথ বনাম বাস্তবতা
১২০১-১২০২ সালে বখতিয়ার খিলজি বিহার আক্রমণ করেন। সেখান থেকে অনেক মূল্যবান সম্পদ তাঁর হস্তগত হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, বিহার আক্রমণকালে তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দ্বারা ৪২৭ সালে নির্মিত পৃথিবীর প্রাচীন বিদ্যাপীঠ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেছিলেন এবং এখানকার লাইব্রেরির সব বই পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান বিহারের নালন্দা জেলার রাজগীরে অবস্থিত। ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়। ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম ফের শুরু করা হয়।
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বহিরাগতদের দ্বারা বেশ কয়েকবার আক্রান্ত হয়েছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসক স্কন্ধগুপ্তের সময়ে (৪৫৫-৪৬৭ খ্রিস্টাব্দ) চরম বৌদ্ধ বিদ্বেষী মিহিরাকুল এখানে আক্রমণ করে গণহত্যা চালায়। পরে স্কন্ধগুপ্ত ও তার পরবর্তী শাসকদের অনুকূলে নালন্দা ফের উঠে দাঁড়ায়। কিন্তু রাজা শশাঙ্ক মগধে প্রবেশ করে আবারও নালন্দা ধ্বংস করেন। বৌদ্ধদের পবিত্র স্থানগুলোর ওপর চড়াও হন। গৌতম বুদ্ধের পদচিহ্ন বিনষ্ট করেন। বিখ্যাত চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ (৬০২-৬৬৪)-এর ভ্রমণকাহিনীতে শশাঙ্কের বিনাশযজ্ঞের বিবরণ পাওয়া যায়। রাজা জাতবর্মা সোমপুর মহাবিহার আক্রমণ করে ধ্বংস করেন। মঠাধ্যক্ষ করুণাশ্রী মিত্রকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেন। হিন্দু রাজা ভোজবর্মার বেলাবলিপি-তে এ বিবরণ পাওয়া যায়।
বখতিয়ার খিলজি ঠিক কবে নালন্দা ধ্বংস করেছেন তার সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায় না। ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জানাচ্ছে, ১১০০ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি নালন্দা ধ্বংস করেন। স্যার উলসলি হেগ-এর মতে, বখতিয়ার ওদন্তপুরী আক্রমণ করেছেন ১১৯৩ সালে। স্যার যদুনাথ সরকার ( ১৮৭০-১৯৫৮) বলছেন, ১১৯৯ সালে। অথচ বখতিয়ার খিলজি বঙ্গে এসেছেন ১২০৪ সালে। বাংলায় আসার ১০৪ বছর আগ থেকেই তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করতে শুরু করেছিলেন? অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করা হয় ১১৯৩ সালে। কিন্তু তখনও বখতিয়ার খিলজির আগমন ঘটেনি। যদিও স্যার যদুনাথ সরকার বখতিয়ার খিলজির আগমনকে ১২০৪ থেকে পিছিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, বখতিয়ার খিলজি ১১৯৯ সালে বঙ্গে এসেছেন। কিন্তু তাতেও ১১৯৩ সালে নালন্দা ধ্বংসের দায় তার ওপর চাপানো যায় না।
বাংলাদেশের ইতিহাস গ্রন্থে রমেশচন্দ্র মজুমদার ( ১৮৮৮-১৯৮০) লিখেছেন, ‘বখতিয়ার খিলজির বাংলা জয় প্রশ্নে যত কাহিনী ও মতবাদ চাউর আছে, সবই মিনহাজের ভাষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ এ সম্পর্কে অন্য কোন সমসাময়িক ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় নাই।’ বখতিয়ার খিলজির বাংলা জয়ের ৪০ বছর পর মিনহাজ বাংলা সফরে আসেন এবং এ সম্পর্কে প্রচলিত মৌখিক বক্তব্য ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহ করেন। রিচার্ড এম ইটন ( ১৯৬১-২০১৩) তাঁর দ্য রাইজ অব ইসলাম এন্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার বইয়ে লিখেছেন, ‘১২০৪ সালে মুহাম্মদ বখতিয়ারের সেন রাজধানী দখলের প্রায় সমসাময়িক একমাত্র বর্ণনা হচ্ছে মিনহাজের তবাকাতে নাসিরি।’
এ গ্রন্থের রচয়িতা ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দিন উমর ইবনে সিরাজ উদ্দিন জুজযানি, যিনি মিনহাজ-ই-সিরাজ নামে পরিচিত। তবাকাতে নাসিরি-তে রয়েছে, বখতিয়ার খিলজির সৈন্যরা ভুলক্রমে ওদন্তপুরীর বৌদ্ধমঠে আক্রমণ করে। মিনহাজের ভাষ্যমতে, ২০০ সৈন্য নিয়ে বখতিয়ার বিহার দুর্গ আক্রমণ করেন। ওদন্তপুরীকে তিনি শত্রুদের সেনাশিবির মনে করেন। হামলায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। আদতে এটি দেখতে সেনাশিবিরের মতোই ছিল। এর চারদিকে ছিল বেষ্টনী প্রাচীর। বিখ্যাত তিব্বতি ঐতিহাসিক লামা তারানাথ ( ১৫৭৫-১৬৩৪) লিখেছেন, সেন আমলে তুর্কি অভিযানের ভয়ে বৌদ্ধবিহারগুলোতে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হতো।
ওদন্তপুরী বিহারের প্রতিষ্ঠাতা পাল বংশের রাজা ধর্মপাল ( ৭৭০-৮১০)। এটি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মগধে অবস্থিত। কোন কোন গবেষক দাবি করেন, সেন রাজাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী গুপ্তচররা তুর্কি বাহিনীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ওদন্তপুরীতে আক্রমণ করতে প্ররোচিত করে। ড. দীনেশচন্দ্র সরকার ( ১৯০৭-১৯৮৪) দেখিয়েছেন, ওদন্তপুর বৌদ্ধবিহার ধ্বংস করা হয় ১১৯৩ সালে। বিভিন্ন গবেষকের মতে, ১১৯১-৯৩ সময়কালে। বলাবাহুল্য, বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ জয় এর বেশ পরের ঘটনা। যদিও ওদন্তপুরী আক্রমণের বিষয়টিও নানা কারণে সংশয়পূর্ণ। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের ওদন্তপুরী তত্ত্ব নালন্দাকে প্রমাণ করছে না।
সুখময় মুখোপাধ্যায় (মৃত্যু : ২০০০ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে, ড. আবদুল করিম (১৮৭১-১৯৫৩) বাংলার ইতিহাস : সুলতানি আমল গ্রন্থে ও রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর বাংলাদেশের ইতিহাস গ্রন্থে দেখিয়েছেন, তবাকাতে নালন্দা অভিযানের কোন বিবরণ নেই, বখতিয়ার আদৌ নালন্দা অভিযান করেননি। বস্তুত কোন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানেও বখতিয়ারের নালন্দা আক্রমণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবাকাতের পরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগ্রন্থ হচ্ছে, আবদুল মালিক ইসামি রচিত ফুতুহুস সালাতিন ও খাজা হাসান নিজামি রচিত তাজুল মাসীর। এতেও নালন্দা অভিযানের কোন উল্লেখ নেই। তাদের পরবর্তী ঐতিহাসিক গোলাম হোসেন সলিম বা চার্লস স্টুয়ার্টও নালন্দা অভিযানের কোন সূত্র খুঁজে পাননি।
বাংলাদেশের বখতিয়ার-গবেষক সরদার আবদুর রহমান দেখিয়েছেন, নালন্দা ধ্বংস আসলে হিন্দু-বৌদ্ধ সঙ্ঘাতের ফসল। তিনি আমাদের জানাচ্ছেন, হিন্দু প্রচারক ও দার্শনিক শঙ্করাচার্য (৭৮৮-৮২০)-এর প্রচেষ্টায় বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ক্ষয় হয়। ১২ বছর ধরে সূর্যের তপস্যা করে যজ্ঞাগ্নি নিয়ে নালন্দার প্রসিদ্ধ গ্রন্থাগারে অগ্নিসংযোগ করেন ব্রাহ্মণ্যবাদীরা। ফলে নালন্দা অগ্নিসাৎ হয়ে যায়। তবাকাতে নাসিরি-র বঙ্গানুবাদক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া’র (১৯১৮-২০১৬) মতে, লড়াই সম্ভবত একপক্ষীয় ছিল না, এখানে প্রচন্ড প্রতিরোধ হয়েছিল, এমন সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও (১৮৮৫-১৯৩০) বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং সেনাদের যৌথ প্রতিরোধের বিবরণ দিয়েছেন। সেনারা চারদিক থেকে কোণঠাসা হয়ে হয়তোবা এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। ড. সুশীলা মন্ডলের মতে, ‘ওদন্তপুর ছিল দুর্গম, সুরক্ষিত, শিখরস্থিত আশ্রম। এখানে স্বয়ং বিহার রাজা গোবিন্দ পাল নিজের সৈন্যদের নিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ফলে বিহার জয়ের জন্য বখতিয়ার খিলজি রাজধানীর পরে এখানে আক্রমণ করেন। এতে সৈন্যদের পাশাপাশি বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও অস্ত্রধারণ করেন। যুদ্ধে তারা পরাজিত হন এবং গোবিন্দ পাল দেব নিহত হন।’ প্রবল যুদ্ধ শেষে অতিকষ্টে পেছনের দ্বার দিয়ে অভ্যন্তরে ঢুকে বখতিয়ারের সৈন্যরা রক্তপাত করেন। এখানে বেশির ভাগ বাসিন্দা ছিল ন্যাড়া মাথা। মুসা আল হাফিজ বলছেন, ‘বখতিয়ার যখন দেখলেন, সেখানে প্রচুর বই এবং জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারলেন এটি দুর্গ নয়, তখন নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন। ওদন্তপুর বা উদন্তপুর ছিল একটি বৌদ্ধবিহার; যা আগ থেকেই ছিল বিপর্যস্ত।’ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ( ১৮৮০-১৯৬১) তাঁর বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে নালন্দা ধ্বংসের জন্য সাম্প্রদায়িক ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দায়ী করেন। বুদ্ধপ্রকাশ তার আসপেক্টস অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি এন্ড সিভিলাইজেশ্যন গ্রন্থে এমন মতামতের পক্ষে জোরালো বয়ান হাজির করেছেন।
বখতিয়ারের বঙ্গবিজয়
বিহার জয়ের পর বখতিয়ার অনেক ধনসম্পদসহ কুতুবুদ্দিন আইবেকের সঙ্গে দেখা করেন। সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেক তাঁকে সমাদর করেন। তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার কদর করেন। সুলতান তাঁকে উপঢৌকন দেন। সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেক-এর দরবার থেকে ফিরে তিনি বাংলা জয়ের জন্য মনস্থির করেন। তিনি তাঁর বাহিনীকে বাংলা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন।
তখন বাংলার শাসক ছিলেন রাজা লক্ষ্মণ সেন। তাঁর রাজধানী ছিল নদীয়া। তিনি রাজধানীতেই থাকতেন। কেননা নদীয়া ছিল বহি:শত্রুর আক্রমণ থেকে সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকা। কথিত আছে, বখতিয়ার খিলজির বাংলা আক্রমণের আগে রাজা লক্ষণ সেনের দরবারের কিছু জ্যোতিষী তাঁকে সতর্ক করেছিলেন যে, এক তুর্কি সৈনিকের কাছে তিনি পরাজিত হতে পারেন। লক্ষণ সেন শাসক হিসেবে ছিলেন দুর্বল। জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী শুনে তিনি ভীত হয়ে পড়েন। তিনি নদীয়ার প্রবেশপথ রাজমহল ও তেলিয়াগড়ের নিরাপত্তা জোরদার করেন। ঝাড়খণ্ডের দুর্গম ও শ্বাপদসংকুল অরণ্য পাড়ি দিয়ে কোন সেনাবাহিনী নদীয়া আক্রমণ করতে পারে—লক্ষ্মণ সেন তা কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। কিন্তু রণকুশলী বখতিয়ার খিলজি এ পথেই বাংলায় আসেন। তিনি এত দ্রুতগতিতে সামনে অগ্রসর হয়েছিলেন যে, মাত্র ১৭ জন সৈনিক তাঁকে অনুসরণ করতে পেরেছিলেন। তাঁর নদীয়া আক্রমণের তারিখ সম্পর্কে পন্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ১২০০-১২০৪ সালের মধ্যে তিনি নদীয়ায় অভিযান পরিচালনা করেছেন।
সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেক-এর সভাসদ খাজা হাসান নিজামি’র তাজুল মাসীর গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১২০৩ সালের মার্চ মাসে সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেক কালিঞ্জর দুর্গ জয় করে সেখান থেকে সরাসরি বাদায়ুনে চলে আসেন। তাঁর বাদায়ুনে চলে আসার পরপরই বখতিয়ার খিলজি ওদন্তপুরী বিহার থেকে তাঁর কাছে উপস্থিত হন এবং তাঁকে বিশটি হাতি, বিভিন্ন ধরনের রত্ন ও বিপুল পরিমাণ অর্থ উপহার হিসেবে প্রদান করেন।
তবাকাতে নাসিরি থেকে জানা যায়, ‘বিজয় লাভের পর (ওদন্তপুরী বিহার দখলের পর) লুণ্ঠিত দ্রব্য নিয়ে বখতিয়ার খিলজি প্রত্যাবর্তন করেন ও সুলতান কুতুবুদ্দিন-এর নিকট উপস্থিত হন। তিনি সেখানে প্রভূত সম্মান ও পুরস্কার লাভ করেন।’ ওদন্তপুরী থেকে সংগৃহীত সম্পদ যে তখনকার দিল্লির সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেককে উপহার দেয়া হয়, সে বিষয়ে গবেষক ডক্টর মোহাম্মদ মোহর আলীও উল্লেখ করেছেন, তবে তিনি এটা স্বীকার করেননি যে, ওই অভিযানে বখতিয়ার কাউকে হত্যা করেছেন। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর তবাকাতে নাসিরিতে উল্লেখ করেছেন, বিহার থেকে প্রত্যাবর্তনের পর কুতুবুদ্দিন আইবেক বখতিয়ার খিলজিকে খিলাফত দান করেন এবং এর পরের বছর বখতিয়ার খিলজি নদীয়া আক্রমণ করেন। এ থেকে সহজেই অনুমেয় যে, ১২০৩ সালের পরের বছর অর্থাৎ ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলা আক্রমণ করেছেন।
বখতিয়ার খিলজি সরাসরি রাজা লক্ষ্মণ সেন-এর প্রাসাদে এসে উপস্থিত হন। দ্বাররক্ষী ও প্রহরীদের বাধা অতিক্রম করে তিনি প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে পড়েন। তাঁর এ অতর্কিত আক্রমণে প্রাসাদে ভীষণ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বৃদ্ধ ও অসহায় রাজা লক্ষ্মণ সেন প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান। তিনি নৌপথে পালিয়ে বিক্রমপুরে গিয়ে আশ্রয় নেন। ফলে নদীয়া মুসলমানদের অধীনে চলে আসে। এভাবে বাংলায় সর্বপ্রথম মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজা লক্ষ্মণ সেন ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন হিন্দু শাসক।
আবদুল মান্নান তালিব তাঁর বাংলাদেশে ইসলাম গ্রন্থে লিখেছেন, “ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলাদেশে মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠার ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক কিছু নয়। বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ অভিযানের কয়েক‘শ বছর পূর্ব থেকে মুসলিম সুফি, দরবেশ, আলেম ও মুজাহিদগণ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের সত্যবাণী প্রচার করে আসছিলেন। সম্ভবত ইসলাম প্রচারকদের অভাবিতপূর্ব সাফল্যই বখতিয়ার খিলজিকে বঙ্গ অভিযানে উদ্বুদ্ধ করে। বখতিয়ার খিলজি যখন নদীয়া ও লক্ষ্মণাবতী (গৌড়) অধিকার করেন, তার মাত্র কয়েক বছর পর শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজি গৌড় থেকে মাত্র ১৭ মাইল দূরে পান্ডুয়ায় অবস্থান করে সারা বাংলায় ইসলাম প্রচার অভিযান পরিচালনা করেন।” (বাংলাদেশে ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৩৫)
বখতিয়ার খিলজি এরপর গৌড়ের দিকে এগিয়ে যান। রাজা লক্ষ্মণ সেন-এর নামানুসারে গৌড় তখন লক্ষণাবতী নামে পরিচিত ছিল। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের বর্ণামতে, গৌড়ে তিনি রাজধানী স্থাপন করেন। এ লক্ষ্মণাবতীই পরবর্তীতে লখনৌতি নামে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। গৌড় জয়ের পর দু’বছর পর্যন্ত বখতিয়ার খিলজি কোন অভিযানে বের হননি। এ দু’বছর তিনি লখনৌতি রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতি মনোযোগ দেন। সমগ্র রাজ্যটিকে তিনি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন। প্রত্যেক প্রদেশে নিজের একেকজন সহযোগী সেনানায়ককে শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তিনি মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ মাদ্রাসাগুলোতে মুসলমানদের ইসলাম ও রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করা হতো। আধ্যাত্মিক সাধকদের জন্য তিনি কয়েকটি খানকাও নির্মাণ করেন। তিনি জোরপূর্বক কোন হিন্দুকে ইসলামে দীক্ষিত করেননি। তবে তাঁর আমলে অনেক হিন্দু ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি রক্ত-লোলুপ ছিলেন না। অযথা নরহত্যা ও প্রজা নিপীড়নও তিনি অপছন্দ করতেন।
বখতিয়ার খিলজির সেনাপতিদের মধ্য হতে তিনজনের নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন—বরসৌলের শাসক আলি মর্দান খিলজি, গঙ্গতরীর শাসক হুসামুদ্দিন ইওজ খিলজি ও পূর্ববঙ্গের শাসক সুবেদার আউলিয়া খাঁ। এ আউলিয়া খাঁ ছিলেন বখতিয়ার খিলজির ১৭ জন অগ্রগামী সৈনিকের অন্যতম। তিনিও আফগানিস্তানের গরমশিরের অধিবাসী ছিলেন এবং বখতিয়ারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আমৃত্যু তিনি বঙ্গ অঞ্চলের শাসক ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর বংশধরেরা এ অঞ্চল শাসন করেন। বর্তমানে ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার বক্তারপুর মূলত ছিল বখতিয়ারপুর। প্রিয় বন্ধুর স্মরণে নিজের প্রশাসনিক কেন্দ্রের এ নামকরণ করেছিলেন সুবেদার আউলিয়া খাঁ। তিনি পার্শ্ববর্তী ফুলহরী গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এক বর্ণনা অনুসারে, বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে সুবেদার আউলিয়া খাঁ’র বংশধর তৎকালীন রূপগঞ্জ সার্কেলের পুলিশ ইন্সপেক্টর মুন্সি মোহাম্মদ সরওয়ার খাঁ এ গ্রামের নাম রাখেন ফুলদী। বর্তমানে গ্রামটি এ নামেই পরিচিত।
বখতিয়ার খিলজির তিব্বত অভিযান
বখতিয়ার খিলজির রাজ্য পূর্বে তিস্তা ও করতোয়া নদী, দক্ষিণে পদ্মা নদী, উত্তরে দিনাজপুর জেলার দেবকোট হয়ে রংপুর শহর পর্যন্ত এবং পশ্চিমে পূর্বে অধিকৃত বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যদিও বাংলাদেশের বৃহদাংশ তার রাজ্যের বাইরে ছিল। তিনি সেসব অঞ্চল দখল না করে তিব্বতে অভিযান পরিচালনার প্রতি মনোনিবেশ করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি তুর্কিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা। বখতিয়ার খিলজির জীবনের শেষ উল্লেখযোগ্য কাজ তিব্বত অভিযান। তিব্বত আক্রমণের রাস্তা আবিষ্কারের জন্য বখতিয়ার খিলজি আলি মেচকে নিয়োগ দেন। লখনৌতি ও হিমালয়ের মধ্যবর্তী প্রদেশে কোচ, মেচ ও থারু নামে তিনটি উপজাতির বসবাস ছিল। আলি মেচ ছিলেন মেচ উপজাতির সর্দার। তিনি বখতিয়ার খিলজির হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
তিব্বত অভিযানে আলি মেচ বখতিয়ার খিলজিকে যথেষ্ট সাহায্য করেন। অভিযানের সব প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পন্ন হলে তিনি তিনজন সেনাপতি ও প্রায় দশ হাজার সদস্যের বাহিনী নিয়ে লখনৌতি থেকে তিব্বত রওনা হন। সেনাবাহিনী বর্ধনকোট পৌঁছে তিস্তার চেয়েও তিন গুণ চওড়া বেগমতী নদী দেখতে পান। তারা নদী পার না হয়ে নদীর তীর ধরে তিন দিনের দূরত্ব অতিক্রম করেন। এভাবে তারা একটি দুর্গের কাছে গিয়ে পৌঁছেন। দুর্গে থাকা শত্রুবাহিনীর সঙ্গে তাদের লড়াই হয়। এ যুদ্ধে বখতিয়ার খিলজি জয়ী হলেও তার বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তিনি জানতে পারেন, অদূরে করমবত্তন শহরে কয়েক লক্ষ সেনা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এ কথা শুনে পরিস্থিতি বিবেচনায় বখতিয়ার খিলজি সামনে অগ্রসর না হয়ে ফিরে যাওয়ার মনস্থ করেন। বহু কষ্টে অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তিনি দেবকোটে ফিরে আসতে সক্ষম হন। গৌহাটির কাছে ব্রহ্মপুত্রের তীরে কানাই বড়শি বোয়া নামক স্থানে তুর্কি সেনাদলের বিধ্বস্ত হওয়ার বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়। তিব্বত অভিযান ব্যর্থ হওয়ায় এবং সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে লখনৌতির মুসলিম রাজ্যের প্রজাদের মধ্যে বিদ্রোহ ও বিরোধ দেখা দিতে শুরু করে। এরই ফলশ্রুতিতে বাংলার ছোট ছোট মুসলিম রাজ্যগুলো দিল্লির সঙ্গে সম্ভাব্য বিরোধে আগে থেকেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
বখতিয়ারের মৃত্যু
তিব্বত অভিযানের পর বখতিয়ার খিলজি বুঝতে পারেন, তার শক্তি মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। নানাবিধ দুশ্চিন্তা ও পরাজয়ের গ্লানিতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এ চাপ সইতে না পেরে তিনি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এর অল্প কিছুদিন পর ১২০৬ সালে তিনি মারা যান। তবে ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের বর্ণনামতে, ৬০২ হিজরি তথা ১২০৬ সালে সেনাপতি আলি মর্দান খিলজি তাঁকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। রিয়াযুস সালাতিন গ্রন্থকারও এমনটি লিখেছেন। তবে তিনি আলি মর্দানকে নারানকোই এলাকার শাসক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার নারায়ণপুরের পীরপাল গ্রামে তার সমাধিস্থল রয়েছে। @ মুহাম্মাদ হাসিবুল হাসান
বেশিরভাগ প্রাণি বছরে এক-দুবার বংশবিস্তার করে...
কিন্ত মানুষের কোন নির্দিষ্ট সময় নেই কেন ? Amarnath Ganguly বাবু এই প্রশ্ন করেছিলেন।
বাস্তবে কোন প্রজাতির স্ত্রী-পুরুষ যদি যেকোন সময় যৌনতা করতে পারে, তাহলে তাদের মধ্যে একসাথে অনেকটা সময় থেকে পরিবার গড়ে তোলার প্রবণতা তৈরি হয়, আর এই বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য মানুষ সহ অনেক প্রাইমেটদের আপাত স্থায়ী পরিবার গড়ে তোলার মূল ভিত্তি।
মানুষ যদি বছরে একবার যৌনতার জন্য প্রস্তুত হত, তাহলে স্ত্রী-পুরুষ দীর্ঘস্থায়ী জোড় বাঁধতনা। যদিও এটাই মানুষের পরিবার গড়ে তোলার একমাত্র কারণ নয়, মানুষ ও কিছু মহাবানরদের ক্ষেত্রে দুর্বল সন্তানের জন্মদান অন্য একটি কারণ, কয়েকটি প্রজাতির ক্ষেত্রে সন্তান পালনের সময় অনেক দীর্ঘ, ফলে ব্যতিক্রম ছাড়া পুরুষকে অনেকদিন স্ত্রীর সঙ্গ দিয়ে সন্তানদের বড় করে তুলতে হয়।
আসলে শুধু মানুষ নয়, বেশিরভাগ বানর, মহাবানর (গরিলা, বোনোবো, ওরাওটাং ,শিম্পাঞ্জী), কিছু পাখি, একটি প্রজাতির ইঁদুর ও কিছু বাদুড় মানুষের মত সারাবছর প্রজনন করে।
এইসব প্রাণিদের সারাবছর প্রজনন করার কারণ হল, এদের স্ত্রীদের ডিম্বাণু নিঃসরণ লুকানো প্রকৃতির (Concealed),
লুকানো প্রকৃতির অর্থ হল, ডিম্বাণু নিঃসরণের সময় চোখে পড়ার মত বা চাক্ষুষ করার মত বড় কোন শারীরিক পরিবর্তন বা ভিসুয়াল সাইন বা ক্লু এদের পুরুষদের জন্য থাকেনা, যাতে করে পুরুষ প্রাণিরা বুঝতে পারবে যে কখন গর্ভবতী করার উপযুক্ত সময়।
আসলে মানুষ ও এই প্রাণিরা বিবর্তনের রাস্তায় এই ক্ষমতা হারিয়েছে। মানুষ, ওরাংওটাং, বোনোবো ইত্যাদি পুরুষদের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়না নারীর ডিম্বাণু কখন নিঃসরণ হবে? এইজন্যই এইসব প্রাণিদের কোন নির্দিষ্ট প্রজনন ঋতু নেই। এই কারণেই এইসব প্রাণিদের পুরুষরা সারাবছর ধরে নারীদের অণুসরণ করতে বাধ্য হয়।
এইসব প্রাণিরা যে পরিবার গঠন করে জীবনযাপন করে, তার অন্যতম কারণ এটা।
এটা বিবর্তনের পথে একটা স্টেপ মাত্র।
তবে গবেষণায় বোঝা গেছে মানব মহিলাদের যৌন ইচ্ছা ডিম্বাণু নিঃসরণের আশেপাশে বৃদ্ধি পায়। মানুষের ডিম্বাণু নিঃসরণ হয় যৌনচক্র শুরুর পরে ১০-১৪ দিনের মধ্যে, আর যৌনচক্র নারীভেদে ২১-৩১ দিনের হয়।
ওরাংওটাং ও বোনোবোদের ডিম্বনিঃসরণ মানুষের মত লুকানো প্রকৃতির, তাই এদের যৌন আচরণও মানুষের মতো।
উল্টোদিকে বানর, গরিলা, শিম্পাঞ্জীদের ডিম্বনিঃসরণের সময় শরীরের বাইরে চোখে পড়ার মতো ভিসুয়াল সাইন দেখা যায়, যেমন যোনি ফুলে যাওয়া ও লাল হয়ে যাওয়া।
গরু, কুকুর, ভেড়া ছাগলেরা তাদের তীব্র ঘ্রাণশক্তির সাহায্যে স্ত্রী প্রাণিদের ডিম্ব নিঃসরণের সময় বা "হিট পিরিয়ড" বুঝতে পারে। এখানে উদ্বায়ী বহিঃ হরমোন বা ফেরোমোনের ভূমিকা থাকে। উদ্বায়ী হরমোন স্ত্রী প্রাণির মূত্রের সঙ্গে বার হয়, যা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। এছাড়া সরাসরি মূত্র বা জনন অঙ্গ শুঁকেও পুরুষ প্রাণিরা বুঝতে
স্ত্রীকে প্রশংসা
অনেক পরিবারে দেখা যায়, পুরুষেরা স্ত্রীকে নিয়ে খোলাখুলি প্রশংসা করতে সংকোচ বোধ করেন। যেন প্রশংসা করলে মান-সম্মান কমে যাবে, অথবা স্ত্রী “বেশি মাথায় উঠবে”—এমন ভ্রান্ত ধারণাও অনেক জায়গায় রয়ে গেছে। অথচ একজন মানুষের সবচেয়ে কাছের সঙ্গী, সবচেয়ে বেশি শ্রম দেওয়া মানুষটি যদি সামান্য স্বীকৃতিও না পায়, তাহলে সেই সম্পর্কে ভালোবাসা ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে যায়।
মনোবিজ্ঞান বলছে, প্রশংসা মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, সম্পর্ক মজবুত করে, পারিবারিক স্থিতি বাড়ায়। কিন্তু বাঙালি সমাজে পুরুষদের একটি বড় অংশ এখনো এই স্বাভাবিক আচরণটিকে অভ্যাসে রূপ দিতে পারেননি।
কেন বাঙালি পুরুষেরা স্ত্রীকে প্রশংসা করতে কুণ্ঠিত হন:
১) পুরুষতান্ত্রিক লালন-পালন
বহু গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার পরিবারগুলোর আদর্শ গঠনে এখনো পুরুষতান্ত্রিকতা বড় ভূমিকা রাখে। শিশুকাল থেকেই ছেলেদের শেখানো হয় "পুরুষ মানে শক্ত", "পুরুষ মানে অনুভূতি দেখাবে না"। ফলে আবেগ প্রকাশ বা প্রশংসা করার বিষয়টি তাদের অভ্যাসে আসে না।
২) প্রশংসা মানেই দুর্বলতা—এমন ভুল ধারণা:
মানসিকতা গবেষণায় (Journal of Social Psychology) বলা হয়, পুরুষরা নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখার চিন্তায় প্রশংসা করা থেকে বিরত থাকেন।
অনেকে মনে করেন প্রশংসা করলে স্ত্রী "কন্ট্রোল" করে ফেলতে পারে। বাস্তবে এটি সম্পর্ককে দুর্বলই করে।
৩) সামাজিক লজ্জা ও অভ্যাসের অভাব:
অনেক বাঙালি পুরুষ মনে করেন প্রকাশ্যে স্ত্রীর প্রশংসা করলে বন্ধুদের কাছে “স্ত্রীঘেঁষা” বলে ঠাট্টা শুনতে হতে পারে। এই সামাজিক চাপও তাদের প্রশংসা থেকে দূরে রাখে।
৪) স্ত্রীদের কাজকে ‘দায়িত্ব’ হিসেবে দেখা:
বাঙালি পরিবারে রান্না, সন্তানের দায়িত্ব, ঘর-পরিচর্যা—এসব কাজকে অনেক সময় 'স্বাভাবিক' হিসেবে ধরা হয়, যোগ্যতার স্বীকৃতি হিসেবে নয়।
ফলে পুরুষরা বুঝতেই পারেন না যে একটি প্রশংসা স্ত্রীকে কতটা অনুপ্রাণিত করতে পারে।
স্ত্রী প্রশংসা না করার ফলাফল:
১) মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়:
পরিবারবিষয়ক মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বীকৃতি না পেলে সঙ্গীর মধ্যে একাকিত্ব, অবহেলা ও হতাশা তৈরি হয়।
২) দাম্পত্যে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে:
প্রশংসা না থাকলে স্ত্রী মনে করেন স্বামী তাকে গুরুত্ব দেন না। এতে ছোট বিষয় থেকেও বড় ঝামেলা তৈরি হয়।
৩) আত্মবিশ্বাস কমে যায়:
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্রশংসা পাওয়া নারীরা মানসিকভাবে বেশি স্থিতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী হন।
৪) ভালোবাসার উষ্ণতা কমে যায়:
প্রশংসা ভালোবাসার একটি সহজ ভাষা। এই ভাষা অনুপস্থিত থাকলে সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই ঠান্ডা হয়ে পড়ে।
স্ত্রীকে প্রশংসা করলে কী লাভ:
১) সম্পর্ক আরও গভীর হয়:
হার্ভার্ডের সম্পর্কবিষয়ক গবেষণায় বলা হয়েছে, দৈনিক সামান্য প্রশংসা দাম্পত্য সম্পর্কে সুখ ৪২% পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে।
২) স্ত্রী মানসিকভাবে নিরাপদ বোধ করেন:
মানসিক নিরাপত্তা একটি নারীর সবচেয়ে বড় চাহিদা। প্রশংসা এই নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করে।
৩) পরিবারের পরিবেশ ইতিবাচক হয়:
শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মূল হলো স্বীকৃতি। যে পরিবারে প্রশংসা আছে, সেই পরিবারে ঝগড়া কম, হাসি বেশি।
৪) পুরুষের প্রতি সম্মান বাড়ে:
যে স্বামী স্ত্রীকে মূল্যায়ন করে, স্ত্রী তাকে আরও বেশি সম্মান ও ভালোবাসা দেয়—এটি বিশ্বব্যাপী গবেষণায় প্রমাণিত।
কী কী বিষয়ে প্রশংসা করা যায়:
*তার রান্না *সন্তানের প্রতি যত্ন *ঘরের কাজ *তার ধৈর্য *তার ত্যাগ *তার পরিশ্রম *তার সৌন্দর্য (শুধু বাহ্যিক নয়, আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যও) *তার ব্যক্তিগত গুণ—ভালো আচরণ, সহমর্মিতা , একটি সাধারণ বাক্যও যথেষ্ট: “তোমার জন্যই সবকিছু এত সুন্দরভাবে চলছে। ধন্যবাদ।”
এই বাক্যটি অনেক নারীকে দিনের পর দিন অনুপ্রাণিত করে রাখতে পারে।
কীভাবে প্রশংসার অভ্যাস তৈরি করবেন:
প্রতিদিন অন্তত একবার স্ত্রীকে কিছু ভালো বলুন। তার ছোট অর্জনগুলোকেও স্বীকৃতি দিন। হাসিমুখে বলুন, কৃত্রিমভাবে নয়। অন্যের সামনে তার গুণগুলো উল্লেখ করতে সংকোচ করবেন না। নিজের ভিতরের ভুল বিশ্বাসগুলো ভাঙুন—প্রশংসা করলে সম্মান কমে না,বরং বাড়ে। স্ত্রী সংসারের ভিত্তি। তার পরিশ্রম, ভালোবাসা, ধৈর্য—সবকিছুই পরিবারকে ধরে রাখে। অথচ প্রশংসা না করা আমাদের সমাজে একটি নীরব অবহেলার সংস্কৃতি তৈরি করেছে। সময় এসেছে পুরুষদের এই মানসিকতা বদলানোর। একটি প্রশংসা শুধু একটি শব্দ নয়—এটি ভালোবাসার স্বীকৃতি, সম্মানের প্রকাশ, সম্পর্কের ওষুধ। যে পুরুষ স্ত্রীকে মূল্যায়ন করতে পারে, তার সংসারও হয় শান্ত, সুন্দর এবং স্থিতিশীল।
বাঙালি পুরুষেরা নারীদের কাছ থেকে যথাযথ সম্মান পান না: একটি মমনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
সম্মানের অভাব পুরুষের আত্মসম্মান ভেঙে দেয়। সম্পর্ক দুর্বল হয়, মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে নারীর প্রতি অবহেলা যতটা আলোচিত, পুরুষের প্রতি অবহেলা ততটাই অঘোষিত। কেন অনেক বাঙালি নারী স্বামীকে যথাযথ সম্মান দেন না?
*১) সম্পর্কের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়া:*
গবেষণা (APA – Family Power Dynamics Study) বলছে, অনেক দাম্পত্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একদিকে ঝুঁকে থাকে। যখন ক্ষমতা একপাক্ষিক হয়, সম্মান হারায়।
বহু পরিবারে স্ত্রী আবেগ বা মতবিরোধের সময় স্বামীকে ছোট করে কথা বলেন, বিদ্রূপ করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক ক্ষতি তৈরি করে।
*২) সমাজে পুরুষের ‘সহ্য করার বাধ্যবাধকতা’
শৈশব থেকে পুরুষদের শেখানো হয় “চুপ থাকাই ভালো”, “পুরুষের কাঁদা মানায় না”, “অভিযোগ করা দুর্বলতা”।
ফলে স্বামী যখন অপমানিত হন, তিনি প্রতিবাদ করেন না। এর সুযোগে অপমানের মাত্রা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
*৩) মিডিয়া–সৃষ্ট ‘পুরুষ দোষী’ স্টেরিও টাইপ
বাংলাদেশি নাটক, টকশো, সোশ্যাল মিডিয়ায় বরাবরই পুরুষকে দোষী হিসেবে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে।
Journal of South Asian Media Behaviour দেখিয়েছে, মিডিয়ার এই সাংস্কৃতিক চাপ অনেক নারীকে মনে করায়, “পুরুষ ভুল করবে—এটাই স্বাভাবিক।” তাই তারা কথা বলার সময় যত্নবান হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন না।
*৪) রাগ প্রকাশের গ্রহণযোগ্যতা নারীদের ক্ষেত্রে বেশি
একটি ফিল্ড স্টাডিতে (Delhi School of Relationship Psychology) দেখা গেছে—
দাম্পত্যে রাগ, অপমানজনক কথা, ব্যক্তিগত আক্রমণ—এগুলো নারীদের ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে বেশি “মাফ” পেয়ে যায়।
স্বামী একই কাজ করলে তাকে অত্যাচারী বলা হয়, কিন্তু স্ত্রী করলে “মেজাজ খারাপ” বলা হয়।
*৫) পুরুষের অবদান ‘অবশ্যই পাওয়া উচিত’ মনে করা
অনেকেই মনে করেন—টাকা আনা স্বামীর দায়িত্ব,, সমস্যা সামলানো স্বামীর দায়িত্ব,, পরিবারের প্রয়োজন মেটানো স্বামীর দায়িত্ব।
ফলে তার পরিশ্রমকে কৃতিত্ব নয়, বরং ‘ডিফল্ট’ মনে করা হয়। এর ফলে সম্মানের জায়গা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
সম্মান না পেলে পুরুষের ওপর কী প্রভাব পড়ে?
*১) আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়*:
মার্কিন Mental Health Association জানায়—
একজন পুরুষ বারবার অপমানিত হলে তার self-worth কমে যায়।
এটি তার কাজে, সিদ্ধান্তে, আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে।
*২) মানসিক অবসাদ ও নীরব হতাশা*:
পুরুষরা অনুভূতি প্রকাশ করেন না বলে দীর্ঘদিনের অবহেলা বা অপমান ভেতরে জমে থাকে। এতে depression ও chronic stress তৈরি হয়।
*৩) সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়* :
সম্মানহীন সম্পর্ক ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যায়।
আলাপ কমে যায়, দূরত্ব বাড়ে, আর এতে দাম্পত্যের স্বাভাবিক উষ্ণতা হারিয়ে যায়।
*৪) পরিবারে নীরব টেনশন জমে*:
বাবার উপর মানসিক চাপ থাকলে সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কেও তার ছাপ পড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সম্মানহীন পরিবেশে বড় হওয়া শিশুদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়।
*কীভাবে অনেক নারী অজান্তেই স্বামীকে মানসিক নির্যাতন করেন*:
অনেক বাঙালি নারীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিয়ের পর স্বামীর পরিবারকে নিজের পরিবার হিসেবে মানতে সময় লাগে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন এই দূরত্ব ইচ্ছাকৃত, দীর্ঘস্থায়ী এবং মনস্তাত্ত্বিক বিরূপতা হিসেবে গড়ে ওঠে।
Family Systems Psychology-এর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে: যে দাম্পত্যে স্ত্রী ধারাবাহিকভাবে স্বামীর পরিবারকে “ওদের পরিবার” হিসেবে দেখে, সেখানে স্বামীর মানসিক চাপ তিনগুণ বেড়ে যায়। কারণ সে দুই দিকেই টান অনুভব করে—স্ত্রীর আবেগ আর পরিবারের দায়িত্ব।
*১) শ্বশুরবাড়িতে নিজেকে পরিবারের অংশ হিসেবে না দেখা অনেক নারী শ্বশুরবাড়িকে একটি “স্থায়ী অস্থায়ী জায়গা” মনে করেন। ফল—
• ঘরের সিদ্ধান্তে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখা
• দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া
• আবেগিক দূরত্ব তৈরি করা
• স্বামীকে নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা এটাকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় Relationship Triangulation। এতে স্বামী মাঝখানে পড়ে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
*২) আজে-বাজে তথ্য বিকৃতি করে স্বামীর মন বিষিয়ে দেওয়া
অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী অভিযোগ বা তথ্য এমনভাবে সাজিয়ে বলেন, যেন—স্বামীর পরিবারই সব ভুল করছে, স্বামী সবসময় স্ত্রীকেই সমর্থন দিক, এবং যে কোনো ছোট ঘটনার ব্যাখ্যায় ড্রামাটাইজেশন থাকুক। একে বলা হয় Emotional Narrative Manipulation—এটি সম্পর্কের ভরসাকে ধীরে ধীরে গিলে ফেলে। গবেষণা (Journal of Family Therapy) বলছে: যেসব দাম্পত্যে একজন সঙ্গী তথ্য বিকৃতি করে নিয়মিত নেতিবাচক আবেগ তৈরি করেন, সেখানে সম্পর্কের সন্তুষ্টি ৬০% কমে যায়।
*৩) ছোট বিষয়কে বড় করে উপস্থাপন করা
এটি South Asian marital conflict-এর খুব পরিচিত চরিত্র।
চারটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট—
• ভুল করে কথা বলা → “ওরা আমাকে অপমান করতে চায়”
• কাজে ব্যস্ত থাকলে → “ইচ্ছে করে এড়িয়ে যায়”
• স্বামীর পরিবার ব্যস্ত থাকলে → “আমাকে মানুষই ভাবে না”
• ক্ষুদ্র মতবিরোধ → “আমি এখানে নিরাপদ নই”
এটা আসলে Cognitive Magnification—মনোবিজ্ঞানের এক ধরণের চিন্তার বিকৃতি, যা ছোট বিষয়কে বড় ঝামেলায় পরিণত করে।
*৪) স্বামীর বাড়ির তথ্য নিজের বাপের বাড়িতে পাঠানো
এটা অনেক নারীর কাছে “সহজ যোগাযোগ” হলেও বাস্তবে এটি দাম্পত্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ভুলগুলোর একটি।
• পরিবারের আর্থিক তথ্য পাঠানো
• কে কী বললো—এসব বর্ণনা করে টানাটানির গল্প বানানো
• স্বামীর পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় বাইরে ফাঁস করা
Family Privacy Violation গবেষণায় বলা হয়েছে—এই আচরণ পরিবারের “trust boundary” ভেঙে দেয়।স্বামী গভীরভাবে হেয়, লজ্জিত এবং নিয়ন্ত্রিত বোধ করেন।
*৫) বাপের বাড়ির প্রেসক্রিপশন মেনে শ্বশুরবাড়িতে চলা
এটি দাম্পত্যকে তৃতীয় পক্ষের নিয়ন্ত্রণে ঠেলে দেয়। যেখানে—স্ত্রী নিজের পরিবার থেকে নির্দেশনা পায়, শ্বশুরবাড়ির নিয়মকে তুচ্ছ করে,
স্বামীকে এই সংঘর্ষের মাঝে ফেলে দেয়। মনোবিজ্ঞানে এটাকে বলা হয় External Authority Intrusion।ফল——
• সিদ্ধান্তে বিশৃঙ্খলা
• স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস
• দুই পরিবারের মধ্যে শত্রুতা
• এবং স্বামীর উপর মানসিক চাপ।
সোজা ভাষায় বললে—এগুলো নীরব নির্যাতন।
যার ফলে স্বামীর -
• আত্মসম্মান ভেঙে যায়
• দায়দায়িত্বের চাপ বাড়ে
• পরিবার পরিচালনায় দ্বিধা জন্মায়
• নিজের ঘরেও ‘অতিথি’ বোধ হয়
• নীরব হতাশায় ডুবে যায়
• কাজ, জীবন সবকিছুতে প্রভাব পড়ে
Mental Health Review জানায়—
“Triangular conflict and relational manipulation” দীর্ঘমেয়াদে পুরুষদের depression, anxiety এবং emotional exhaustion তৈরি করে।
*স্বামীকে যথাযথ সম্মান দিলে কী লাভ হয়*
*১) সম্পর্ক স্থিতিশীল হয়
গবেষণা বলছে, একজন পুরুষ যখন সম্মানিত বোধ করেন, তিনি সম্পর্কের প্রতি বেশি নিবেদিত হন।
*২) পারিবারিক শান্তি বাড়ে
সম্মান মনোসংযোগ বাড়ায়।
চাপ কমায়।
বিতর্ক কম হয়।
*৩) স্বামী আরও দায়িত্বশীল হন
Positive reinforcement পুরুষদের কাজের প্রবাহ বাড়ায়—এটি মানসিকতার মৌলিক বৈজ্ঞানিক নিয়ম।
*৪) সন্তানদের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হয়
যে পরিবারে বাবা-মা পরস্পরকে সম্মান করেন, সেই পরিবারে সন্তানরা সবচেয়ে সুস্থ মানসিক গঠন পায়।
*স্বামীকে কীভাবে সম্মান দেখানো যায়* :
• তার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিন
• ছোট অর্জনেও তার পরিশ্রম স্বীকার করুন
• অন্যের সামনে তাকে সমর্থন দিন
•অপমান নয়, সমস্যা হলে শান্তভাবে কথা বলুন
• তার কাজ বা দায়িত্বকে “ডিফল্ট” ধরে নেবেন না
• কৃতজ্ঞতা শব্দে বা কাজে জানাতে কুণ্ঠা করবেন না।
•একটি সাধারণ বাক্যই অনেকসময় যথেষ্ট—
“তোমার পরিশ্রম নেই হলে এই সংসার চলত না।”
এই স্বীকৃতি একজন পুরুষের ভিতর থেকে শক্তি এনে দেয়।
*শেষ কথা*:
যতটা আলোচনা হয় নারীর অপমান, ঠিক ততটাই লুকানো পুরুষের মানসিক নির্যাতন।
একটি সম্পর্ক দুইজনের ওপর দাঁড়ায়।
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে সম্মান দিলে দাম্পত্য হয় সবচেয়ে সুন্দর, নিরাপদ, স্থিতিশীল জায়গা।
আমাদের সমাজে সময় এসেছে—নারী যেমন সম্মান চান, পুরুষও তেমনই সম্মান পাওয়ার যোগ্য—এটি স্বীকার করার।
@ মো নাছির উদ্দিন