মৌরিতানিয়ার প্রায় ১০০% (৯৯.৯%) মানুষই মুসলমান এবং এটি একটি অফিশিয়াল ইসলামিক প্রজাতন্ত্র (Islamic Republic of Mauritania)। একটি শরীয়া-ভিত্তিক দেশ ও সংবিধানের প্রস্তাবনায় শরীয়া বা ইসলামী আইনকে "আইনের একমাত্র উৎস" (Sole source of law) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে এখনো দাসপ্রথা টিকে রয়েছে, যেখানে প্রভাবশালী সাদা আরব মুর (Beidane) গোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত 'হারাতিন' (Haratin) মানুষদের দাস হিসেবে খাটিয়ে আসছে। দাস-দাসী, যৌনদাসী কেনাবেচা এবং মালিকানা বদলের মতো ঘটনা সেখানে খুবই নৈমিত্তিক। যদিও সরকার আন্তর্জাতিক চাপে ১৯৮১ সালে দাসত্ব নিষিদ্ধ এবং ২০০৭ ও ২০১৫ সালে একে চরম অপরাধ ঘোষণা করে আইন করেছে, কিন্তু বাস্তবে প্রশাসন, পুলিশ এবং বিচার বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিজেরাই এই দাস-মালিক শ্রেণীর অংশ হওয়ায় আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। ফলে বংশানুক্রমিক দাসত্বের (Hereditary Slavery) নিয়মে আজও গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলগুলোতে লাখ লাখ হারাতিন কোনো বেতন ছাড়া পশুর মতো জমিতে বা গৃহস্থালির কাজে শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ জন্মের সময়ই মায়ের সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী সন্তানও স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিকের "সম্পত্তি" হিসেবে গণ্য হয়।
.
অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে মৌরিতানিয়ায় অনানুষ্ঠানিক ও গোপন উপায়ে ইসলামের যৌনদাসী প্রথাও এখনো বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা (যেমন Amnesty International, Minority Rights Group এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদন) অনুযায়ী, দাসত্বের শিকার মানুষদের মধ্যে প্রায় ৯০%-ই হলো নারী ও শিশু, যারা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত। হারাতিন সম্প্রদায়ের দাসী এবং তরুণীদের ওপর তাদের শ্বেতাঙ্গ মালিকদের সম্পূর্ণ শারীরিক নিয়ন্ত্রণ থাকে। যেহেতু তারা আইনি বা সামাজিকভাবে কোনো স্বাধীন নাগরিক নন, তাই খামারে বা ঘরের কাজের পাশাপাশি মালিক বা তাদের পরিবারের পুরুষদের দ্বারা তারা নিয়মিত পদ্ধতিগত ধর্ষণ এবং যৌন নির্যাতনের (Sexual Violence) শিকার হন।
.
দাস-দাসী, যৌনদাসী অত্যাচার, নির্যাতনের মুখে ও তাদের মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে পালিয়ে গেলেও আল্লাহ খুবই নাখোশ হন, দাস মালিকের কাছে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার নামাজ কবুল করে না আল্লাহপাক, ইসলামী রাষ্ট্র তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় না।
বটলনেক ইফেক্ট
১৭৭৫ সাল। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপ পিনগেলাপে আঘাত হানে এক বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়। প্রায় পুরো জনবসতি মুছে যায় মানচিত্র থেকে। বেঁচে থাকেন মাত্র বিশজনের মতো মানুষ। আজ সেই দ্বীপের প্রতিটি বাসিন্দার পূর্বপুরুষ ঘুরেফিরে সেই বিশজনই।
এই দুর্যোগের একটি অদ্ভুত উত্তরাধিকার আছে। বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে ছিলেন দ্বীপের শাসক, যার জিনে ছিল পূর্ণ বর্ণান্ধতার (achromatopsia) একটি বিরল রূপ। তুফান পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যাপক হারে সন্তান উৎপাদন করেন, এবং তাঁর বংশধরদের মাধ্যমে সেই জিন ছড়িয়ে পড়ে পুরো দ্বীপে। আজ পিনগেলাপের প্রায় ১০ ভাগ মানুষ এই বিরল বর্ণান্ধতায় আক্রান্ত, যেখানে পৃথিবীর গড় হার মাত্র প্রতি ৩০,০০০ জনে একজন — অর্থাৎ স্বাভাবিক হারের চেয়ে প্রায় ৩,০০০ গুণ বেশি।
এটাই বটলনেক ইফেক্ট — যখন কোনো জনগোষ্ঠী হঠাৎ করে অতি ক্ষুদ্র সংখ্যায় নেমে আসে এবং পরবর্তী প্রজন্ম তৈরি হয় সেই সীমিত জিন পুল থেকে। কিন্তু পিনগেলাপের ক্ষেত্রে বিশজন বেঁচে ছিলেন। মাত্র দুজন থেকে শুরু হলে কী হতো?
# রাজবংশের পতনঃ ইনব্রিডিং এর মূল্য
ইতিহাসের পাতায় একটি শিক্ষামূলক উদাহরণ আছে। স্পেনের হ্যাবসবার্গ রাজবংশ একসময় ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য পরিচালনা করত। প্রতিষ্ঠাতা ফিলিপ থেকে শুরু হয়ে ১৬ প্রজন্ম ধরে এই রাজবংশ টিকে ছিল। কিন্তু ১৭০০ সালে চার্লস দ্বিতীয়ের মৃত্যুর সাথে সাথে এই বিশাল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
কারণটা রাজনৈতিক নয়, জৈবিক। হ্যাবসবার্গ পরিবারে চাচাতো-মামাতো ভাই-বোন, চাচা-ভাতিজি, এমনকি চাচা-ভাতিজার মধ্যে বিবাহ ছিল স্বাভাবিক রীতি। এই নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিবাহকে বলা হয় ইনব্রিডিং, এবং ক্রমাগত এটি চলতে থাকলে জিনগত ক্ষতির পরিমাপক সংখ্যাটি — যাকে বলা হয় ইনব্রিডিং কোএফিশেন্ট — প্রজন্মের পর প্রজন্মে বাড়তে থাকে।
২০০৯ সালে PLOS ONE-এ প্রকাশিত Álvarez, Ceballos এবং Quinteiro-র গবেষণায় স্পেনীয় হ্যাবসবার্গদের বিস্তারিত বংশতালিকা বিশ্লেষণ করা হয়।২০১৩ সালে Heredity জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় পুরো হ্যাবসবার্গ বংশ (১৪৫০–১৮০০) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৭১টি পরিবারের ৫০২টি গর্ভধারণের মধ্যে মোট শিশুমৃত্যু ছিল বিস্ময়কর উচ্চ — যা সেই যুগের সাধারণ স্পেনীয় পরিবারের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
...
# হোমোজাইগোসিটিঃ ভেতরের শত্রু
এই সমস্যার মূলে রয়েছে একটি মৌলিক জৈবরাসায়নিক ঘটনা। মানুষসহ যৌন প্রজননকারী সব প্রাণীর প্রতিটি জিনের দুটি কপি থাকে — একটি পিতা থেকে, একটি মাতা থেকে। যখন একই জিনের দুটি কপি হুবহু একই ধরনের হয়, তখন সেটাকে বলা হয় হোমোজাইগাস অবস্থা। আর যখন দুটি কপি ভিন্ন রকমের হয়, তখন সেটা হেটেরোজাইগাস।
নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিবাহ এই হেটেরোজাইগোসিটি ধ্বংস করে হোমোজাইগোসিটি বাড়ায়, ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জনগোষ্ঠীর সার্বিক টিকে থাকার ক্ষমতা কমে আসে।
২০১২ সালে PNAS-এ প্রকাশিত Henn এবং তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, আফ্রিকা থেকে মানুষের বহির্গমনের আগে আমাদের পূর্বপুরুষ জনগোষ্ঠীর কার্যকর আকার ছিল ১২,৮০০ থেকে ১৪,৪০০। এই বিশাল জিনগত বৈচিত্র্যের ভিত্তির উপরেই দাঁড়িয়ে আছে আজকের মানবজাতি। ২০২৩ সালে Science-এ প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণায় (Hu et al., 2023) নতুন একটি পদ্ধতি FitCoal ব্যবহার করে ৩,১৫৪ জন মানুষের জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা গেছে, প্রায় ৯৩০,০০০ থেকে ৮১৩,০০০ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ জনগোষ্ঠী একটি ভয়াবহ বটলনেক পার করেছিল — সেই সময় প্রজননক্ষম ব্যক্তির সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র ১,২৮০-তে, এবং এই অবস্থা প্রায় ১,১৭,০০০ বছর ধরে চলেছিল। এটি মানবজাতির প্রায় বিলুপ্তির মুখে পড়ার একটি পর্যায়। কিন্তু সেই ১,২৮০ জন বেঁচে থেকে পৃথিবীকে আজকের মানবজাতির জন্য ধারণ করেছিলেন।
মাত্র একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে কি আজকের ৮ বিলিয়ন মানুষের পৃথিবী গড়ে উঠতে পারত? প্রথমত, প্রথম প্রজন্মেই ভাই-বোনের মধ্যে যৌন সম্পর্ক ছাড়া প্রজাতি টিকত না — যা প্রথম মাত্রার আত্মীয়তা, সবচেয়ে ক্ষতিকর ইনব্রিডিং। দ্বিতীয় প্রজন্মে হোমোজাইগাস রোগের প্রকোপ এত বেশি হতো যে অধিকাংশ সন্তান বেঁচে থাকার অযোগ্য হয়ে জন্মাত। হ্যাবসবার্গরা দেখিয়েছে — শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শুধু চাচাতো-মামাতো বিয়েতেই রাজবংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। ভাই-বোনের বিয়ের পরিণতি হতো আরও দ্রুত ও নিশ্চিত।
দ্বিতীয়ত, যদি কোনো অলৌকিক পদ্ধতিতে এই জনগোষ্ঠী টিকেও থাকত — তাহলে আজকের ৮ বিলিয়ন মানুষ হতো জিনগতভাবে কার্যত অভিন্ন। কোনো চোখের রঙের বৈচিত্র্য নেই, কোনো ত্বকের টোনের পার্থক্য নেই, রোগ প্রতিরোধের কোনো বৈচিত্র্য নেই।
১
-------
পড়া মনে রাখার কৌশলগুলো কি কি?
১। বুঝে পড়া: অন্ধভাবে মুখস্থ না করে বিষয়টির মূল ভাব বোঝার চেষ্টা করুন। কোনো বিষয় পরিষ্কারভাবে বুঝলে তা মস্তিষ্কে স্থায়ী হয়।
২। লিখে পড়া : পড়ার পর তা না দেখে খাতায় লেখার অভ্যাস করুন। লেখার মাধ্যমে মস্তিষ্কের একাধিক ইন্দ্রিয় কাজ করে, ফলে পড়া সহজে মনে থাকে।
৩।ছোট ছোট অংশে ভাগ করে পড়ো: একটানা না পড়ে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে পড়ো। যেমন ধরো তোমার একটা ফোন নাম্বার মনে রাখা দরকার। এখন ০১৭১০৫০৮৮৪৪ পুরাটা একসাথে পড়লে দুই মিনিট পরেই ভুলে যেতে পার। তাই ভেঙ্গে ভেঙ্গে ০১৭ - ১০৫০ - ৮৮৪৪ স্টাইলে পড়ো।
৪। বিরতি দিয়ে রিভিশন: জার্মান মনোবিজ্ঞানী হারমান এবিনঘসের মতে, পড়ার পরপরই রিভিশন না দিয়ে একটু বিরতি দিয়ে রিভিশন দিলে মনে রাখার ক্ষমতা বহু গুণে বাড়ে। আমরা যখন পড়ি, তার এক ঘণ্টা পর ৪৪ শতাংশ পড়া আমাদের মনে থাকে। একদিন পর ৩০ শতাংশ মনে থাকে। আর এক সপ্তাহ পর মাত্র ২০ শতাংশ মনে থাকে। তার মানে, এক সপ্তাহ পর ৮০ শতাংশই ভুলে যাই। কারণ আমরা যখন পড়ি, তখন তা আমাদের ব্রেইনের শর্ট-টার্ম মেমোরিতে জমা হয়। কিন্তু যদি আমরা বারবার রিভিশন দেই, তাহলে তা শর্ট-টার্ম মেমোরি থেকে লং-টার্ম মেমোরিতে স্থানান্তরিত হয়। তাই এক/দুইদিন বা কিছুদিন পর পর রিভিশন দিতে থাকুন, যতদিন আয়ত্বে না আসে।
৫। নিজেকে শিক্ষক ভাবা: কোনো কঠিন বিষয় পড়ার পর তা এমনভাবে বলুন, যেন আপনি অন্য কাউকে বিষয়টি পড়াচ্ছেন। এতে নিজের দুর্বলতাগুলো ধরা পড়ে।
৬। পোমোডোরো পদ্ধতি : একটানা পড়লে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কিছুক্ষণ পড়ার পর মস্তিষ্ক আর লোড নিতে পারে না। তাই ২৫-৩০ মিনিট সময় নিয়ে মনযোগ দিয়ে পড়ার পর ৫-৭ মিনিটের বিরতি নেবেন। বিরতির এই পাঁচ মিনিটে করতে হবে অন্য যে কোনো কাজ কিংবা বিশ্রাম।
৭। ভিজ্যুয়ালাইজেশন: আমরা যখন কোনো নাটক বা সিনেমা দেখি তখন সেই নাটক বা সিনেমাটা সহজেই মনে রাখতে পারি। তার কারণ, ভিজুয়ালাইজেশন। পড়ার বিষয়টিকে চোখের সামনে ছবির মতো কল্পনা করুন।
৮।ফ্লো-চার্ট:মেইন পয়েন্টগুলো দিয়ে কনসেপ্ট বা ফ্লো-চার্ট বানিয়ে রাখলে দ্রুত রিভিশন দেওয়া যায়। যেমন : আপনি করোনাভাইরাস নিয়ে কোনো প্যাসেজ বা টপিক পড়ছেন। এক্ষেত্রে ফ্লো-চার্টটি এমন হতে পারে : করোনাভাইরাস কী ➡ ভাইরাসের উৎপত্তি ➡ সংক্রমণের মাধ্যম ➡ প্রতিরোধের উপায় ইত্যাদি।
৯। পর্যাপ্ত ঘুম: পড়া মনে রাখার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত জরুরি।মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করে বা জোর করে মনে করার চেষ্টা না করে মস্তিষ্ককে কিছুক্ষণ বিশ্রাম দিন। ৩০ মিনিট বা ১ ঘন্টার ছোট ঘুম বা 'Power Nap' মস্তিস্ককে পুনরায় কার্যকরী করে তুলতে সাহায্য করে।
১০। সারমর্ম তৈরি করা: বড় কোনো অধ্যায়ের মূল সারমর্ম তৈরি করুন, যেন ঐ সারমর্মটি দেখলেই পুরো অধ্যায়টি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এবার সারমর্মটি ছোট একটি কাগজে লিখে অধ্যায়টি বই এর যে পৃষ্ঠায় রয়েছে তার কোণায় পিন করে দিন। তাহলে মুখস্থ করা সহজ হয়ে যাবে। এছাড়াও কনসেপ্ট ট্রি এর মাধ্যমে লিখতে পারেন। একটি গাছ অংকন করে পয়েন্টগুলো গাছের পাতার মধ্যে এঁকে ফেলুন। গাছটিকে একটি অধ্যায়ের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এর প্রতিটি পাতায় অংশ গুলোর নিচে একটি করে সারমর্ম লিখে পড়লে পড়া মনে রাখতে সহজ হবে।
১১। কিওয়ার্ড তৈরি করা: গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো মুখস্থ করার চেষ্টা করুন। এছাড়াও বড় কোনো বাক্যকে একটি কিওয়ার্ডের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করুন, যেন ওই কিওয়ার্ডটি দেখলেই পুরো লাইনটি মনে পড়ে যায়। তাহলে, পরীক্ষার সময় ওই কিওয়ার্ডটি মনে করতে পারলে পুরো লাইনটিই আপনার মনে পড়ে যাবে।
১২। ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ার অভ্যাস করা: পর্যাপ্ত ঘুমের পর পড়া শুরু করলে মস্তিষ্ক নতুন তথ্য গ্রহণে প্রস্তুত থাকে। ফলে তাড়াতাড়ি মুখস্থ ও দীর্ঘ সময় মনে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। তবে পর্যাপ্ত ঘুম (৭–৯ ঘণ্টা) না হলে ভোরে উঠে পড়ার বিশেষ লাভ নাও হতে পারে। আবার কেউ যদি স্বাভাবিকভাবেই রাতে বেশি মনোযোগী হন, তাহলে রাতের পড়াশোনাও সমান কার্যকর হতে পারে।
১৩। 'ডোর এফেক্ট' কাটিয়ে উঠা: আপনি পড়ার টেবিলে বসে একটা পড়া মুখস্ত করলেন, দরজা পার হয়ে অন্য ঘরে ঢুকতেই পড়াটা ভুলে গেলেন, "আমি কি যেন পড়েছি?" গবেষকদের মতে, মস্তিষ্ক পরিবেশকে বিভিন্ন "ঘটনা" বা "অধ্যায়ে" ভাগ করে সংরক্ষণ করে। যখন আপনি একটি নতুন স্থানে প্রবেশ করেন, মস্তিষ্ক আগের প্রসঙ্গ থেকে নতুন প্রসঙ্গে সরে যায়। এর ফলে আগের পড়া বা চিন্তার তথ্য সাময়িকভাবে কম সহজলভ্য হয়ে যায়। এই মনস্তাত্ত্বিক ঘটনাকে 'ডোর এফেক্ট' বলে। এর ফলে ঘরে পড়া পরীক্ষার হলে গেলে অনেক কিছু মনে থাকে না। কাটানোর উপায় হল-মাঝে মাঝে ভিন্ন পরিবেশে ও অন্য কোথায় গিয়ে পড়াশুনা করা।
১৪। সুগন্ধ এফেক্ট': ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের স্নায়বিক পথ মস্তিষ্কের স্মৃতি ও আবেগ-সম্পর্কিত অংশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাই কোনো নির্দিষ্ট গন্ধের সঙ্গে শেখার অভিজ্ঞতা যুক্ত হলে, পরে সেই একই গন্ধ স্মৃতি মনে করতে সাহায্য করতে পারে। এই ধারণাকে Context-Dependent Memory-এর একটি রূপ হিসেবে দেখা যায়। পড়ার সময় একটি নির্দিষ্ট হালকা সুগন্ধ (যেমন লেবু, রোজমেরি, পুদিনা বা ল্যাভেন্ডার) ব্যবহার করলে আথবা রিভিশনের সময় বা পরীক্ষার আগে একই সুগন্ধ পেলে কিছু তথ্য মনে করতে সহায়তা করে। তাই একটি নির্দিষ্ট হালকা সুগন্ধকে পড়ার সময়ের সঙ্গে নিয়মিত যুক্ত করতে পারেন।
১৫। আনফিনিশড এফেক্ট ফলো করা: এই তত্ত্বটি অনুযায়ী, মানুষ সম্পন্ন করা কাজের চেয়ে অসম্পূর্ণ, অসমাপ্ত বা মাঝপথে থেমে যাওয়া কাজগুলো বেশি ভালোভাবে মনে রাখতে পারে। মনে করুন আপনি একটা পড়া সম্পূর্ণ শেষ করে তারপর অন্য একটি কাজ বা কিছু একটা করতে চাইছেন কিন্তু সেটা ভুল পদ্ধতি; সঠিক হল- পড়াশোনা মাঝপথে থামিয়ে দিলে বা অসম্পূর্ণ রেখে বিরতি নিলে পড়া বেশি মনে থাকে। এর কারণ হল- যখন কোনো পড়া শুরু করে শেষ করা হয় না, তখন মস্তিষ্ক সেই পড়াটিকে অসমাপ্ত হিসেবে ধরে রাখে। ফলে বাকীটুকুর জন্য মনোযোগ আকর্ষণ করে।
১৬। ‘ওয়ার্ক এফেক্ট’ হেঁটে হেঁটে পড়া: জটিল গণিত, বিশ্লেষণধর্মী বিষয় বা গভীর মনোযোগের কাজের জন্য বসে পড়া অনেক সময় বেশি কার্যকর। মুখস্থ করার অংশ, সংজ্ঞা, সূত্র, শব্দার্থ বা বক্তৃতা অনুশীলনের সময় ধীরে ধীরে হাঁটতে পারেন। হালকা হাঁটাচলা হাঁটার সময় মস্তিষ্কের রক্ত চলাচল ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং পড়া সহজে মনে গেঁথে যায়। ফলে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বহুগুণ বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, পড়ার আগে বা পড়ার সময় হালকা হাঁটা মস্তিষ্কের তথ্য ধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। তবে হেঁটে পড়ার সময় যদি একটু শব্দ করে বা উচ্চস্বরে পড়া যায়, তবে চোখ এবং কান—উভয়ের মাধ্যমেই মস্তিষ্কে তথ্য সহজে পৌঁছায়।
১৭। সান এফেক্ট': সূর্যের আলোকে মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা উন্নত করার একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে ভাবা হয়। কারণ সূর্যের আলো সরাসরি মস্তিষ্কের মেলাটোনিন ও সেরোটোনিন হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে মনোযোগ ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আপনার পড়ার টেবিলটি এমন জানালার পাশে রাখুন যেখান থেকে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো আসে। পড়ার আগে বা সকালে ঘুম থেকে উঠে ১০-১৫ মিনিট বারান্দায় বা ছাদে গিয়ে হালকা রোদ গায়ে লাগান।
১৮। পড়া মনে থাকার সাথে খাবারের অত্যন্ত সরাসরি এবং গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের মোট শক্তির প্রায় ২০% ব্যবহার করে, যা পুরোপুরি আসে খাবার থেকে। সঠিক পুষ্টিকর খাবার মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সচল রাখে এবং স্মৃতিশক্তি (Memory) ও মনোযোগ (Focus) বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাদাম ও বীজ, ডিমের কুসুম, চর্বিযুক্ত মাছ বা সামুদ্রিক মাছ, সবুজ শাকসবজি ও ফল এবং পর্যাপ্ত পানি স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে কার্যকরী সুপারফুড।
১৯। প্রোডাকশন ইফেক্ট : যখন আপনি কোনো শব্দ বা বাক্য উচ্চারণ করেন, তখন শুধু চোখ দিয়ে পড়া নয়, বরং দেখা, বলা এবং শোনা—তিনটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে। ফলে তথ্যটি মস্তিষ্কে আরও আলাদা ও স্মরণযোগ্যভাবে সংরক্ষিত হতে। এই প্রক্রিয়ার ফলে মস্তিষ্কে একাধিক স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন তৈরি হয়, যা সাধারণ বা নীরব পাঠের চেয়ে তথ্য অনেক দিন মনে রাখতে সাহায্য করে।
২
রেড ইন্ডিয়ানদের হাত ধরেই বিশ্বের কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটেছে
১৬২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে 'মেফ্লাওয়ার' (Mayflower) নামক একটি বিখ্যাত জাহাজে চড়ে ১০২ জন যাত্রী ইংল্যান্ডের প্লিমাথ বন্দর থেকে আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। এদের মধ্যে একটি বড় দল ছিল 'পিলগ্রিমস' বা তীর্থযাত্রী, যারা ইংল্যান্ডের ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতে এবং স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা করতে এক নতুন ভূখণ্ডের সন্ধান করছিলেন। দীর্ঘ ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ২ মাসের সমুদ্রযাত্রা শেষে, ১৬২০ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে জাহাজটি আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের প্লিমাথ উপকূলে এসে পৌঁছায়। এই ঐতিহাসিক সমুদ্রযাত্রা আমেরিকার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
.
নতুন এই অচেনা ভূখণ্ডে পিলগ্রিমদের প্রথম শীতকালটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ এবং নির্মম। তীব্র শীত, খাদ্যাভাব এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে সেই প্রথম বছরেই প্রায় অর্ধেক যাত্রী মৃত্যুবরণ করেন। তবে বসন্তের আগমনে তাদের জীবনে আশার আলো চকমকিয়ে ওঠে। স্থানীয় ওয়াম্পানোয়াগ (Wampanoag) উপজাতির আদিবাসী আমেরিকানরা, বিশেষ করে 'স্কোয়ানটো' নামের এক ব্যক্তি, পিলগ্রিমদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। তিনি তাদের এই নতুন মাটিতে কীভাবে ভুট্টা চাষ করতে হয়, মাছ ধরতে হয় এবং স্থানীয় পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকতে হয় তা শিখিয়ে দেন।
.
আদিবাসীদের সহায়তায় ১৬২১ সালের শরতে পিলগ্রিমরা তাদের প্রথম সফল ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হন। এই সাফল্যের আনন্দ এবং বেঁচে থাকার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পিলগ্রিমরা একটি ভোজের আয়োজন করেন। তারা তাদের সহায়তাকারী ওয়াম্পানোয়াগ উপজাতির প্রধান ম্যাসাসয়েট এবং তাঁর প্রায় ৯০ জন আদিবাসী সঙ্গীকে এই উৎসবে আমন্ত্রণ জানান। টানা তিন দিন ধরে চলা এই ঐতিহাসিক ভোজ ও মিলনমেলাই ছিল আমেরিকার ইতিহাসের প্রথম 'থ্যাংকসগিভিং' বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ উৎসব, যা আজ ঐতিহাসিকভাবে প্রতি বছর শ্রদ্ধার সাথে উদযাপিত হয়।
.
রেড ইন্ডিয়ান বা আমেরিকার আদিবাসীদের হাত ধরেই বিশ্বের কৃষিক্ষেত্রে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটেছে, কারণ আজ আমাদের অতি পরিচিত এবং বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত প্রধান প্রধান ফসল যেমন—ভুট্টা, আলু, মিষ্টি আলু, কাসাভা, টমেটো, মিষ্টি কুমড়া, স্কোয়াশ, নানা পদের শিম (কিডনি বিনস, লিমা বিনস), চিনাবাদাম, সূর্যমুখী, পেঁপে, আনারস, অ্যাভোকাডো, পেয়ারা, কোকো (চকলেট), ভ্যানিলা এবং তামাকের মতো কৃষিপণ্যগুলো মূলত তাদেরই আদি আবিষ্কার ও দীর্ঘ চাষাবাদের ফসল। এমনকি উপমহাদেশের মানুষ যে আলু ছাড়া তরকারির কথাই ভাবতে পারেন না কিংবা ভারতীয় রন্ধনশৈলী ও বাঙালিদের অতি প্রিয় অনুষঙ্গ যে ঝাল কাঁচা মরিচ বা লঙ্কা—সেগুলোও কিন্তু কোনো ভারতীয় ফসল নয়, বরং কলম্বিয়ান এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আদিবাসী আমেরিকানদেরই অনন্য অবদান।
S M Saifur Rahman
৩
জীবদ্দশায় নির্যাতন, মৃত্যুর পর গর্বঃ ঐতিহাসিক হিপোক্রেসী
------------------
ইবনে সিনা (Avicenna, ৯৮০–১০৩৭): চিকিৎসা বিজ্ঞানের বাইবেল খ্যাত 'আল-কানুন ফি আল-তিব' এর রচয়িতা ইবনে সিনা। মানবদেহের সঠিক অ্যানাটমি বোঝার জন্য তাকে রাতের অন্ধকারে কবর খুঁড়ে লাশ চুরি করতে হয়েছিল, কারণ তৎকালীন ইসলামী ধর্মীয় সমাজ ময়নাতদন্ত বা শব ব্যবচ্ছেদকে পাপ মনে করত। নাস্তিকতার অভিযোগে তাকে ইস্পাহানের জেলে বন্দি জীবনও কাটাতে হয়েছিল।
.
ইবনে রুশদ (Averroes, ১১২৬–১১৯৮): অ্যারিস্টটলের দর্শনকে পুনরুজ্জীবিত করা এই মহান দার্শনিক ও বিজ্ঞানীকে তৎকালীন ইসলামী খেলাফতের কট্টরপন্থী খলিফা মনসুরের আদেশে নির্বাসনে পাঠানো হয়। শুধু তাই নয়, রাজকীয় ফরমান জারি করে তার লেখা প্রায় সমস্ত দর্শন ও বিজ্ঞানের বই প্রকাশ্যে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল।
.
আল-কিন্দী (Al-Kindi, ৮০১–৮৭৩): "আরবদের দার্শনিক" খ্যাত এই গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চা করার অপরাধে কট্টরপন্থী খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের আমলে চরম নির্যাতনের শিকার হন। তাকে প্রকাশ্য রাজপথে ৬০ ঘা চাবুক মারা হয়, তার বিশাল লাইব্রেরিটি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং বৃদ্ধ বয়সে চরম অবমাননার মধ্যে তাকে মরতে হয়।
.
আল-ফারাবী (Al-Farabi): যুক্তিবিদ্যা ও সমাজবিজ্ঞানের এই পণ্ডিতকে তৎকালীন কট্টর মোল্লারা 'কাফের' ও 'নাস্তিক' ফতোয়া দিয়েছিলেন। ইমাম গাজ্জালী তার বইতে আল-ফারাবীকে ইসলামের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করায় তাকে প্রায় সারা জীবন এক শহর থেকে অন্য শহরে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। সেই যুগেও ইসলাম অবমাননার অযুহাত তুলে তাদের জীবনকে এখনকার মতোই ভুগিয়েছে ইসলাম!
.
ওমর খৈয়াম (Omar Khayyam, ১০৪৮–১১৩১): গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী (ক্যালেন্ডার সংস্কার, ঘন সমীকরণ সমাধান) এবং রুবাইয়াতের কবি। তার কবিতায় ধর্মীয় ভণ্ডামি ও নিয়তির প্রশ্ন তুলে ধরা হয়েছে, যা অনেককে সন্দেহবাদী বানিয়েছে। তিনি তার রুবাইয়াতে তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক ইসলাম ধর্মের ভণ্ডামিকে যেভাবে কটাক্ষ করেছেন, তাতে তাকে কোনোভাবেই প্রথাগত ধার্মিক বলা চলে না।
.
আল-রাজি (Rhazes, ৮৬৫–৯২৫): চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথিকৃৎ, গুটিবসন্ত-হামের পার্থক্যকারী। যুক্তিবাদী চিন্তার জন্য সমালোচিত। শেষ জীবনে অন্ধত্বের একটি কাহিনি প্রচলিত—যেখানে তার পৃষ্ঠপোষক বই দিয়ে মাথায় আঘাত করে অন্ধ করে দেন বলে অভিযোগ (যদিও কারণ নিয়ে বিতর্ক আছে, চোখের রোগও হতে পারে)। তিনি প্রচলিত ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও অন্ধবিশ্বাসের সমালোচনা করেছিলেন।
.
ইবনে আল-হাইথাম (Alhazen, ৯৬৫–১০৪০): আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের জনক, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রবক্তা। ফাতেমীয় খলিফা আল-হাকিমের রোষে পড়ে প্রায় ১০ বছর গৃহবন্দি থাকেন “পাগল” সেজে।
৪
ভারতর্ষে তখন সম্রাট হুমায়ূনের শাসন, আকবর দ্য গ্রেট এর শাসনকাল শুরু হতে সামান্য কিছু বছর বাকি। রাশিয়া জার সাম্রাজ্যের আইভান দ্য টেরিবল এর শাসন সবে মাত্র শুরু। সুলেমান দ্য মেগনিফিসেন্ট শাসন করছে অটোম্যান সাম্রাজ্য। ছোট্ট ইংল্যান্ডের অধিপতি টিউডর কিং হেনরি দ্য এইটথ। ঠিক তখন আরও দু'টি সাম্রাজ্য পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। চাইনিজ ও স্পেনিশ এম্পায়ার। ছোট্ট ইংল্যান্ড থেকে স্পেনিশ এম্পায়ার ছিল প্রায় ৬০ গুন্ বড়। পৃথিবীর পশ্চিমভাগের সমুদ্র পথ তখন স্পেনিশদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
সময়টা ষোড়শ শতকের প্রথম দিক। তখন দক্ষিণ আমেরিকায় চলছে স্প্যানিশ বাহিনীর হামলা ও তাদের উপনিবেশ স্থাপনা। স্থানীয়দের কাছে থেকে স্পেনিশরা জানতে পারে, নদীর তীরে যে পর্বত দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে মেতা নামের রাজ্যেটি পুরোটাই সোনায় মোড়ানো। স্প্যানিশ পর্যটক দিয়েগো দে ওরদাজ ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়া দেশ দুটির মাঝ দিয়ে বয়ে চলা ওরিনোকো নদীর চারিদিকে চোষে বেড়াতে শুরু করে সোনার লোভে। সেখান থেকেই বিদ্যুৎ গতিতে সোনার রাজ্যের কথা ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপীয়দের মাঝে।
১৫৩১ থেকে ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত দুই জার্মান সেনাপতি ভেনেজুয়েলার নিম্নভূমি, কলম্বিয়ার মালভূমি ও ওরিনোকো নদীর অববাহিকা চষে ফেলে সোনার শহরের খোঁজে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের, কিছুই খুঁজে পায়না তারা।
এদিকে কলম্বিয়ার সান্তা মার্তা শহর দখল করে স্পেনিশরা। সেখানে তারা জানতে পারলো কলম্বিয়ার মুইস্কারা সোনা আর মূল্যবান রত্ন উৎসর্গ করে থাকে দেবদেবীর উদ্দেশ্যে। পবিত্র হ্রদ ‘গুয়াতাভিতা’-য় ছুঁড়ে মারে সোনার তৈরি দ্রব্যসামগ্রী। স্পেনিশরা ১৫৩৭ সালে হামলা করে মুইস্কাদের বাসভূমিতে। তারা মুইস্কাদের সোনা দিয়ে তৈরি দ্রব্যসামগ্রী দেখে হতভম্ব হয়ে গেল। এত নিখুঁত আর সূক্ষ্ম কারুকাজ ওরা আগে কখনও দেখেনি তারা।
তারা জানতে পারলো মেত রাজ্যে সোনার তৈরি এক মন্দির আছে, যেখানে সূর্যদেবতার উপাসনা করা হয়। মন্দিরের ভেতর দেবতাদের উদ্দেশ্যে ভরি ভরি সোনা আর রত্ন রেখে দেয় জনগণ। স্পেনিশরা ভাবলো, এটাই সেই সোনার শহর। কিন্তু শত চেষ্টাতেও ওই শহরটি খুঁজে পায় না তারা।
১৫৯৪ সালে ইংরেজ পর্যটক ওয়াল্টার রাইলি সোনার শহর সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি জাহাজে করে রওনাও দেন দক্ষিণ আমেরিকার দিকে। উদ্দেশ্য, শহরটা খুঁজে বের করা। এক বছর পর রাইলি পা রাখেন গায়ানায়। গায়ানা, এবং ভেনেজুয়েলার পূর্বাঞ্চলে তল্লাশি চালিয়ে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন সোনার শহর। ওরিনোকো নদী ধরে বহুদূর চলে অভিযান।
অভিযানের এক পর্যায়ে শুরু হয় বর্ষা ঋতু। রাইলি দলবলসহ আটকা পড়েন এক আদিবাসী গ্রামে। যখন তারা সুযোগ খুঁজছেন ওরিনোকো নদীর উপকূলে ফেরার, তখন মানোয়া গোত্রের কিছু ব্যবসায়ী এল ঐ গ্রামে। রাইলি লক্ষ্য করলেন, ব্যবসায়ীরা সোনার তৈরি মনোহারী সামগ্রী আর অলংকার এনেছে গ্রামবাসীদের সাথে বিনিময় করার জন্য। সোনার জিনিসপত্র দেখে রাইলি নিশ্চিত হলেন, ব্যবসায়ীরা এসেছে সোনার শহর থেকে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন শহরটা কোথায়। কিন্তু কেউ কারো ভাষা না জানায় মানোয়ারা ঠিকমত বুঝাতে পারল না তাদের শহরের অবস্থান। রাইলি কেবল বুঝলেন ওদের শহরের নাম মানোয়া, আর ওরা একটা বিশাল জলাশয় পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছে।
১৫৯৬ সালে ইংল্যান্ডে ফিরে এসে মিঃ রাইলি একটি বই প্রকাশ করলেন - The Discovery of Guiana। সেখানে তিনি মানোয়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যা জেনেছেন, সে বিষয়ে মুখরোচক বর্ণনা দিলেন। ইউরোপে বইটি কাটতি হলো খুব। এই বইয়ের কারণে সোনার শহর বা এল ডোরাডো নিয়ে ইউরোপিয়ানদের মধ্যে তুমুল আগ্রহ তৈরি হল।
১৬৫৬ সালে নিকোলাস স্যান্সন তৈরি করলেন হ্রদে যাওয়ার মানচিত্র। এরপর এসব মানচিত্র ধরে অনেকগুলো অভিযান পরিচালনা করা হয় এই হ্রদ খুঁজে বের করার জন্য। প্রত্যেক সাম্রাজ্য আলাদা আলাদা ভাবে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু সবগুলোই ব্যর্থ হয়।
শেষমেশ জার্মান ভূতাত্ত্বিক আলেকজান্ডার ফন হাম্বোল্ট সেই হ্রদের অস্তিত্বের কথা বাতিল করে দেন। তিনি ১৭৯৯ থেকে ১৮০৪ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ বছর দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেন গায়ানার রুপুনুনি নামের সমতলভূমিটা যখন বন্যায় ভেসে যায়, তখন সেটাকে স্থানীয় মানুষজন পবিত্র হ্রদ কল্পনা করে। আর সেই কল্পনা থেকেই মানোয়া শহরের উৎপত্তি। আদতে এখানে কোনো হ্রদ নেই।
হাম্বোল্টের যুক্তির কাছে হেরে মানচিত্রগুলোও বাতিল হয়ে যায়। আর ঊনিশশো শতাব্দীর প্রথমভাগে এসে মানুষ মেনে নেয়, এল ডোরাডো বলতে কখনোই কোনো শহর ছিল না। এটা কেবলই পৌরাণিক এক কাহিনী। @ রাজিক হাসান
৫
“খোঁড়া তৈমুর”
তৈমুর লং মধ্য এশিয়ার এক নির্মম মুসলিম সামরিক শাসক, যার সাম্রাজ্য বিস্তারের পথে অসংখ্য শহর ধ্বংস হয়েছিল। ১৩৯৮ সালে ভারতের দিল্লি আক্রমণের সময় তৈমুর লোনি এলাকায় এক দিনেই এক লক্ষ বন্দী হিন্দুকে হত্যা করেছিল যেনো তারা বিদ্রোহ বা প্রতিরোধ করতে না পারে। এটি ছিল যুদ্ধের আগে “পেছন থেকে আঘাত” ঠেকানোর জন্য পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এরপর সে প্রথমে ইসলামের তাকিয়াবাজির আশ্রয় নেয়, ইসলামের মহত্ব দেখাতে সে প্রথমে হিন্দুদের “ক্ষমা” ঘোষণা করে। কিন্তু তার সৈন্যরা যখন লুটতরাজ ও নারীদের ওপর হামলা শুরু করে, তখন শহরের মানুষ প্রতিরোধ করে। এতে তৈমুর ক্ষিপ্ত হয়ে পাঁচ দিনের সংগঠিত হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। সমগ্র শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে তারা। ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে যে সৈন্যরা পাড়া ধরে ধরে ঢুকত, প্রতিরোধ দেখলেই হত্যা করত, ঘরবাড়ি লুট করে শেষে আগুন দিত। দিল্লি শহর জনশূন্য হয়ে পড়েছিল, সব মিলিয়ে ১.৫ থেকে ২ লক্ষ মানুষ নিহত হয়।
অনেক ঐতিহাসিক বলেন, তৈমুর সেই সময়ে সমগ্র বিশ্বের প্রায় ৫-৬% মানুষকে হত্যা করে। পারস্য, ইরাক, সিরিয়া, আনাতোলিয়া, মধ্য এশিয়া ও ভারত মিলিয়ে ১ কোটি থেকে ১.৭ কোটি হত্যা করে তার বাহিনী। তার সেনাবাহিনী বহু শহরে “skull towers” বানাত - হাজার হাজার মানুষের মাথা কেটে স্তূপ করে রাখত। মাথার পিরামিড তৈরি করে তৈমুর বাহিনী উল্লাস করতো। এই সবই কিন্তু সে করতো ইসলামের মহান স্বার্থে!
তৈমুর নিজেকে চেঙ্গিস খানের বংশধর দাবি করলেও সে সরাসরি রক্তসম্পর্কিত ছিল না। রাজনৈতিক বৈধতা পাওয়ার জন্য সে চেঙ্গিস খানের বংশধর এক রাজকন্যাকে বিয়ে করে “গুরগান” (Gurgan = son‑in‑law of Genghis) উপাধি নেয়। তার বংশ থেকেই পরে তিমুরিদ সাম্রাজ্য এবং তারই বংশধর বাবর ভারত উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।
তৈমুর তার ডান পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছিল - সম্ভবত যুদ্ধের সময় - এবং সারা জীবন খোঁড়াভাবে হাঁটত। তাই তাকে বলা হতো Timur‑i‑Lang = “খোঁড়া তৈমুর”।
৬
বিজ্ঞান যা পারে :
বিজ্ঞান আপনার কঙ্কাল পরীক্ষা করে প্রমাণ করে দেবে, আপনি বুড়ো বয়সে মারা গেছেন না কম বয়সে মারা গেছেন। ফর্সা ছিলেন না কালো ছিলেন।
মহিলা ছিলেন না পুরুষ ছিলেন। কোন মহাদেশের মানুষ ছিলেন, খাদ্যাভ্যাস কেমন ছিল, ঠিক কত বছর বয়সে মারা গেছেন। কি কারণে মারা গেছেন।
সব বিজ্ঞান প্রমাণসহ বলে দেবে, হাজার বছর পরেও।
বিজ্ঞান কখনোই যা বলতে পারবে না বা বলে না, তা হলো:
আপনি হিন্দু ছিলেন না মুসলিম ছিলেন। আপনি শুদ্র ছিলেন না ব্রাহ্মণ ছিলেন। আপনি শিয়া না সুন্নি ছিলেন। খ্রিস্টান ছিলেন না ইহুদি ছিলেন। বিজ্ঞান এসব বলতে পারবে না, কারণ আপনি কোনদিন ওসব ছিলেনই না, আপনাকে জন্মের পর কিছু লোক ওসব বানিয়েছিল। আর আপনি বিজ্ঞান ছেড়ে ওসব নিয়েই আছেন, যার কোনরকম মূল্যই নেই এই বিশ্বে ভালো থাকার জন্য।
৭
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেন ঘটেছিল?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ঘটেছিল সোফির মন খারাপ থকার জন্য। সোফির মন খারাপ না হলে হয়তো ইতিহাস প্রথম বিশ্বযুদ্ধটাই দেখতো না। সোফি ছিল অস্ট্রিয়ার রাজপুত্র প্রিন্স ফার্ডিনান্ডের স্ত্রী।
.
কী হয়েছিল আসলে?
সোফির মন খারাপ ছিল বলে
→ প্রিন্স ফার্ডিনান্ড তাকে নিয়ে বাইরে বের হলেন মন ভালো করতে
→ তারা খোলা রাস্তায় গাড়িতে ছিলেন
→ সেই সুযোগে তাদের উপর আগে থেকেই ক্ষুব্ধ এক সার্বিয়ান যুবক তাদের গুলি করে হত্যা করল
→ অস্ট্রিয়া সার্বিয়াকে ক্ষমা চাইতে বলল
→ সার্বিয়া ক্ষমা চাইলো না
→ অস্ট্রিয়া সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল
→ রাশিয়া সার্বিয়ার মিত্র হওয়ায় অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল
→ জার্মানি অস্ট্রিয়ার মিত্র হওয়ায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল
→ ফ্রান্স রাশিয়ার মিত্র হওয়ায় জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল
→ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট রেমন্ড ইচ্ছেমতো নয়, বাধ্য হয়ে যুদ্ধে জড়ালেন
→ এবং এভাবেই শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
.
সেজন্য বলতে পারেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা - সোফির মন খারাপ থেকে। একজন নারী কত কিছু ঘটিয়ে দিতে পারেন! তাই না?
.
এটাকে বলে বাটারফ্লাই এফেক্ট - যেখানে একটি প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোও শেষ পর্যন্ত টর্নেডো সৃষ্টি করতে পারে।
.
৮
নিজেকে আজ ছোট মনে হলেও, থেমে যাবেন না…
যে গাছ আজ হাজারো মানুষকে ছায়া দেয়, একদিন সে-ও ছিল নিঃশব্দে মাটির নিচে পড়ে থাকা একটা ছোট্ট বীজ।
সময়, ধৈর্য আর নিজের ওপর বিশ্বাস- এই তিনটাই বদলে দেয় গল্প।
আজকের সংগ্রামই আগামী দিনের শক্তি।
নিজেকে কখনো নগণ্য ভাববেন না, কারণ আপনার মধ্যেও লুকিয়ে আছে বিশাল কিছু হওয়ার সম্ভাবনা।
বৃদ্ধি সবসময় দেখা যায় না, কিন্তু সেটা চলতেই থাকে।
নিজের সময় আসবেই। শুধু হাল ছাড়বেন না।
পোশাকের ইতিহাস
মানুষের শরীরে কাপড় পরার অভ্যাস এতটাই স্বাভাবিক যে আমরা প্রায়ই ধরে নিই, কাপড়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল লজ্জা নিবারণ। কিন্তু নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব এবং বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের গবেষণা ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরে। মানুষের পূর্বপুরুষেরা যখন আফ্রিকার উষ্ণ পরিবেশে বাস করত, তখন তাদের শরীরে তুলনামূলকভাবে বেশি লোম ছিল এবং আলাদা পোশাকের প্রয়োজনও ছিল না। সময়ের সঙ্গে মানুষের শরীরের লোম কমতে শুরু করে, ফলে সূর্যের তাপ, শীতল আবহাওয়া, বৃষ্টি, ধুলোবালি এবং বিভিন্ন পরিবেশগত ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার জন্য বাহ্যিক আবরণ দরকার হয়ে ওঠে।
পোশাকের ইতিহাস সম্পর্কে একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক সূত্র এসেছে উকুনের বিবর্তন থেকে। মানুষের মাথার উকুন এবং কাপড়ের উকুনের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, কাপড়ে বসবাসকারী উকুনের একটি পৃথক শাখা সম্ভবত প্রায় ১ লক্ষ ৭০ হাজার বছর আগে উদ্ভূত হয়েছিল। যেহেতু কাপড়ের উকুন মানুষের পোশাক ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে না, তাই এই গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে আধুনিক মানুষ অন্তত সেই সময় থেকেই নিয়মিতভাবে পোশাক ব্যবহার করছিল। এছাড়া প্রত্নতাত্ত্বিকরা প্রায় ৪০ হাজার বছর পুরোনো হাড়ের তৈরি সেলাইয়ের সূঁচও আবিষ্কার করেছেন, যা প্রমাণ করে যে মানুষ তখন শুধু পশুর চামড়া গায়ে জড়াত না, বরং সেলাই করে শরীরের উপযোগী পোশাকও তৈরি করত।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পোশাকের প্রথম কাজ ছিল শরীরকে পরিবেশের প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করা। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ যখন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন তারা ঠান্ডা জলবায়ুর মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে ইউরেশিয়ার শীতল এলাকায় বেঁচে থাকার জন্য পশুর চামড়া, পশম এবং উদ্ভিজ্জ তন্তু দিয়ে শরীর ঢাকার প্রয়োজন দেখা দেয়। অর্থাৎ পোশাক ছিল এক ধরনের প্রযুক্তি, যা মানুষকে নতুন পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাপড় শুধু তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেই সাহায্য করেনি, বরং আঘাত, পোকামাকড়ের কামড়, অতিবেগুনি রশ্মি এবং বিভিন্ন রোগজীবাণুর সংস্পর্শ থেকেও কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে। আধুনিক ভাষায় বলতে গেলে, পোশাক মানুষের তৈরি একটি “জৈবিক সহায়ক ব্যবস্থা” বা biological extension, যা শরীরের প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতাকে পূরণ করেছে। তাই পোশাককে শুধু সামাজিক বা সাংস্কৃতিক বস্তু হিসেবে দেখলে তার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যায় না।
তাহলে লজ্জা বা শালীনতার ধারণা কোথা থেকে এল? গবেষকদের মতে, এটি মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ফল। মানুষ যখন বৃহত্তর সমাজ গঠন করতে শুরু করে, তখন পোশাক ধীরে ধীরে পরিচয়, মর্যাদা, পেশা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক নিয়মের প্রতীক হয়ে ওঠে। শরীরের নির্দিষ্ট অংশ ঢেকে রাখাকে অনেক সমাজে শালীনতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে এই ধারণা সব সমাজে একই রকম ছিল না; ইতিহাসে এমন বহু সংস্কৃতি ছিল যেখানে কম পোশাক পরা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল।
অতএব, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে কাপড় প্রথমে তৈরি হয়েছিল মানুষের শরীরকে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ থেকে রক্ষা করার জন্য। লজ্জা নিবারণ, শালীনতা, ফ্যাশন, সামাজিক পরিচয় কিংবা সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলো পরে ধীরে ধীরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ কাপড়ের ইতিহাস শুরু হয়েছিল বেঁচে থাকার প্রয়োজন থেকে, আর পরে তা মানবসভ্যতার সংস্কৃতি ও সামাজিক আচরণের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। | @ উপম বিকাশ Science News
৯
রাজকীয় নার্সারি"
দশকের পর দশক ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, একটি সাধারণ মৌমাছির লার্ভাকে যদি প্রচুর রয়্যাল জেলি খাওয়ানো হয়, তাহলে সেটি রানী মৌমাছিতে পরিণত হয়। কিন্তু নতুন গবেষণা এই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে!
গবেষণায় দেখা গেছে, ভবিষ্যৎ রানীর জন্য কর্মী মৌমাছিরা তৈরি করে বিশেষ "রাজকীয় নার্সারি" বা Queen Cell.এই বিশেষ কক্ষের মোম সাধারণ চাকের মোমের চেয়ে আলাদা, বেশি নমনীয় এবং তাপ ও আর্দ্রতা ধরে রাখতে সক্ষম। এমনকি একটি বিশেষ দল, যাদের বিজ্ঞানীরা "Queen Cell Builders" নাম দিয়েছেন, ভবিষ্যৎ রানীর যত্নে দিনরাত কাজ করে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, একই খাবার পেলেও যদি লার্ভাকে সাধারণ কর্মী মৌমাছির কক্ষে বড় করা হয়, তবে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যায় এবং সে ছোট আকারের রানীতে পরিণত হয়। অর্থাৎ, শুধু খাবার নয়—তার চারপাশের পরিবেশও নির্ধারণ করে কে হবে রাজ্যের পরবর্তী রাণী!
মৌচাক আসলে শুধু হাজারো মৌমাছির সমষ্টি নয়; এটি একটি অত্যন্ত সংগঠিত "জীবন্ত সমাজ", যেখানে শত শত কর্মী একসাথে কাজ করে ভবিষ্যৎ রানীকে গড়ে তোলে। প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র রাজপ্রাসাদ আমাদের শেখায়—মহান নেতৃত্ব কখনও একা তৈরি হয় না, এর পেছনে থাকে পুরো সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
মাত্র একরাত ঠিকমতো না ঘুমালে স্মৃতিশক্তি ৪০% কমে যায়।পরীক্ষার আগে রাতজাগা নয়। ভালো ঘুম পড়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ
১০
"সেন সাম্রাজ্য"
সেন সাম্রাজ্য দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দিকের মধ্যযুগীয় একটি সনাতন হিন্দু রাজবংশ ছিল, যা বাংলা থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সেন সাম্রাজ্য হিসেবে শাসন করেছিল। বল্লাল সেন রচিত গ্রন্থ অনুসারে সেন রাজবংশ এর গোরাপত্তন ৯০০ শতকেরও পূর্বে ।বাংলার পাল রাজাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে করতে তারা একসময় পাল রাজাদেরকে পরাজিত করে পাল সাম্রাজ্য করায়ত্ত করেন। সেন রাজাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে তারা রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামাজিক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাংলা হতে পরিচালিত সেন সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল বঙ্গোপসাগরের উপকুল থেকে উত্তরভারত (কনৌজ) পর্যন্ত। সেন রাজাদের আদি বাসস্থান ছিল রাঢ়ভূমের আদি কর্ণসুবর্ণে। সেনরা জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন কিন্তু ব্রাহ্মণ হয়ে রাজন্যধর্ম/ক্ষত্রিয়বৃত্তি পালনের জন্য বল্লাল সেনের অদ্ভুতসাগর গ্রন্থে ক্ষত্রচরিত্রাচার্য্য ব্রাহ্মণ ও লক্ষণ সেনের তাম্রশাসন অনুসারে রাজন্যধর্মাশ্রয়ী ব্রাহ্মণ( উভয়ের ভাবার্থ একই ) বলে শিলালিপিতে উল্লেখ করে গেছেন। রাজশাহীতে প্রাপ্ত বিজয় সেনের আমলের দেওপাড়া প্রশস্তিতে উমাপতিধরের শ্লোকে ব্রহ্মক্ষত্রিয় শব্দটি পন্ডিতদের কাছে সেনদের জাতি বর্ণনায় অধিক সমাদৃত।কৌলিন্য বিচার সেন রাজারা কুলশ্রেষ্ঠ রাজন্যব্রাহ্মণ ছিলেন। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে একাদশ শতাব্দীর অন্তিমলগ্নে পাল রাজবংশের বিশৃঙ্খলতার সুযোগ নিয়ে সেনদের উত্থান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূ্র্ণ অধ্যায়। বাংলার পাল রাজবংশের রাজা দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে বারেন্দ্র 'সামন্তচক্রের' বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে সেন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন পশ্চিমবঙ্গে ক্রমশ স্বীয় আধিপত্য বিস্তার করেন এবং অবশেষে বাংলার পাল রাজবংশের রাজা মদনপালের রাজত্বকালে স্বাধীন সত্ত্বার বিকাশ ঘটিয়ে সেন-ব্রাহ্মণতান্ত্রিক সেন সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে বাংলার সেন বংশীয় রাজাদের মধ্যে বীর সেন,সামন্ত সেন,হেমন্ত সেন, বিজয় সেন, সুখ সেন, বল্লাল সেন, ও লক্ষ্মণ সেন বিশিষ্ট স্থান অধিকার করছেন। বিশ্বরূপ সেন—তিনি বঙ্গের সেন বংশীয় নরপতি বল্লাল সেনের পৌত্র। লক্ষ্মণ সেনের অন্যতম পত্নী তন্দ্রাদেবী বা তাড়াদেবীর গর্ভে বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন নামে দুই পুত্র জন্মে। লক্ষ্মণ সেনের পরলোক গমনের পরে তার পুত্র মাধব সেন প্রথমে বাঙ্গালার রাজা হয়েছিলেন। তৎপরে তার ভ্রাতা কেশব সেন ও বিশ্বরূপ সেন পর পর বাঙ্গালার রাজা হয়েছিলেন এবং এসময় রাজকুমারগণ রাজ্যসমূহের দায়িত্বভার বণ্টন করেন। মাধব সেন ভ্রাতা কেশব সেনের হাতে বঙ্গ রাজ্য তুলে দিয়ে হিমালয় রাজ্যে গমন করেন (মতান্তরে কেশবসেনপূত্র সূর্য সেন ) এবং সেখানে রাজ্য বিস্তার করেন,উত্তরাখণ্ডের আলমোড়ার কোটেশ্বর মন্দির গাত্রের শিলালিপিতে মাধব সেনের কীর্তি বর্ণিত আছে যে,ধর্মরক্ষার্থে দূর্গম হিমালয় রাজ্যের (অধুনা ভারতের উত্তরপ্রদেশ,হিমাচল প্রদেশ এবং নেপাল) শাসন ভার গ্রহণ করেন এবং অনেক কুলীন এবং শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে যান।লক্ষণ সেনের পরেও যে গৌড়ে সেন রাজগণের আধিপত্য অক্ষুদ্র ছিল,বেঙ্গল গভর্ণমেণ্ট কর্তৃক সংগৃহীত একটি হস্ত লিখিত প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থে উল্লেখ আছে,—পরম ভট্টারক মহারাজাধিরাজ পরম সৌগত "মধুসেন” ১১৯৪ শকাব্দে (১২৭২ খ্ৰী: ) বিক্রমপুরে আধিপত্য করতেন। ‘’ কথিত আছে, ইনি তুরস্কদিগকে বারংবার পরাজিত করেছিলেন। এছাড়াও এই রাজবংশের রাজা হিসেবে পুরুষোত্তম সেন, সুর সেন/সূর্য সেন,নারায়ণ সেন,লক্ষণ সেনII, বল্লাল সেন II, দামোদর সেন। নাম পাওয়া গেছে। সেন সাম্রাজ্যের পতন সম্পর্কে জানা গেলেও সেন রাজবংশের পতন সম্পর্কে জানা যায়না কারণ তারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় (বিশেষত উত্তর ভারত, হিমাচল, নেপাল) রাজকার্য চালিয়ে এসেছিল। সর্বশেষ দুটি সেন রাজ্য(অধুনা হিমাচল প্রদেশে অবস্থিত ছিল) ১৯৪৭ সনে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে যোগ দেয়,উক্ত রাজ্যের রাজাদের পূর্বপুরুষ বাংলার সেন বংশীয় ছিলেন বলে গেজেটে তাদের কুলপঞ্জিকা উপস্থাপন করেছিলেন।লক্ষ্মণ সেন ছিলেন বৈষ্ণব মতবাদের কঠোর অনুসারী। তিনি 'পরমবৈষ্ণব' বা 'পরমনরসিংহ' উপাধি ধারণ করেন। তার ধর্মমত পরিবর্তন সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায় না। তার শাসনকালের শেষ দিকে অবশ্য রাজকার্য পরিচালনায় অশক্ত হয়ে পড়েন। এই সময় সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ও সংহতির অভাব পরিলক্ষিত হয়। সমসাময়িক লেখসূত্রে সেন রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কতগুলি বিদ্রোহী প্রধানের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আভাস পাওয়া যায়।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে সেন রাজবংশের রাজত্বকাল দীর্ঘস্থায়ী না হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেন রাজারা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু। তাই এই সময় বাংলায় হিন্দুধর্ম রাজ-পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এবং সমাজে ব্রাহ্মণদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। পুরো রাজ্য জুরে জাত প্রথা ছড়িয়ে পরার কারনে উচ্চ বর্ণের সনাতন হিন্দুদের দ্বারা নিম্ন বর্ণের হিন্দু নির্যাতন হতে থাকে মহামারি আকারে। এছাড়াও উগ্র হিন্দুত্ববাদ ছড়িয়ে দিতে গিয়ে তারা পুরো সেন রাজ্য থেকে বৌদ্ধ নিধন শুরু ও বৌদ্ধ বিহার গুলো ধ্বংস করা শুরু হয়। সকল বৌদ্ধ মন্দির দখল করে হিন্দু মন্দির বানানো শুরু হয়। এক পর্যায়ে ১২০৪ সালে তুর্কি বংশভুক্ত আফগান বীর, দিল্লী সালতানাত এর সামরিক বাহিনী থেকে বহিস্কৃত সৈনিক ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খলজির নেতৃত্বে বাংলা জয়ের মাধ্যমে অত্যাচারী সেন রাজবংশের পতন ও ধ্বংস শুরু হয়। সেন রাজাদের সাম্রাজ্য ধ্বংস হলে বিভিন্ন ছোট রাজ্য শাসন করতে থাকে। সেন বংশীয় এসব রাজার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পুন্ড্র ও বরেন্দ্র রাজ রাজা অচ্যুত সেন,কামরুপ রাজ কামতেশ্বর নীলাম্বর সেন প্রমূখ।
@ তথ্য সুত্র - ইন্টারনেট- উইকিপিডিয়া
১১
অনেক ধর্ম ও দর্শনে “সব প্রাণীকেই একদিন মরতে হবে” এই বক্তব্যটি আছে। এটি মানবজীবনের সীমাবদ্ধতা এবং পরকাল বা অস্তিত্বের ব্যাখ্যার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বিজ্ঞান যখন কোনো বক্তব্য বিচার করে, তখন সেটিকে প্রমাণ, পর্যবেক্ষণ এবং ব্যতিক্রমের আলোকে পরীক্ষা করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন ওঠে “প্রত্যেক প্রাণী কি অবশ্যই মরবে?” সংক্ষেপে উত্তর হলো– বিজ্ঞান এই দাবিকে সর্বজনীন সত্য হিসেবে স্বীকার করে না।
জীববিজ্ঞানে অধিকাংশ প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীব একসময় মারা যায়। কোষীয় ক্ষয়, ডিএনএ ক্ষতি, রোগ, পরিবেশগত চাপ, শিকারি প্রাণী, খাদ্যসংকট, এসব কারণে জীবের মৃত্যু ঘটে। মানুষসহ অধিকাংশ প্রাণীর ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে; একে বলা হয় Senescence বা জৈবিক বার্ধক্য। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন আসে– যদি কোনো জীব বয়সের কারণে না মরে, তাহলে কি “সব প্রাণীকে মরতেই হবে” কথাটি বৈজ্ঞানিকভাবে সার্বজনীন দাবি হিসেবে টিকে থাকে?
সমুদ্রের ক্ষুদ্র এক প্রাণী “Turritopsis dohrnii”, যাকে জনপ্রিয়ভাবে “Immortal jellyfish” বা “জেলিফিশ” বলা হয়, বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয়। এই প্রাণীটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও প্রতিকূল অবস্থায় আবার শিশু পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে। অর্থাৎ নিজের জীবনচক্র রিসেট করতে পারে। গবেষকেরা এটিকে “Biological immortality”-এর উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করেন। অর্থাৎ এটি বয়সজনিত বার্ধক্যে বাধ্যতামূলকভাবে মারা যায় না। তবে শিকারি প্রাণীর আক্রমণ, পরিবেশগত বিপর্যয়ে মারা যেতে পারে। কিন্তু বার্ধক্যজনিত মৃত্যু তার জন্য অনিবার্য নয়। তাই এটি “সব প্রাণীকেই একদিন মরতে হবে” বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো “হাইড্রা”। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু হাইড্রা প্রজাতির ক্ষেত্রে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে মৃত্যুহার বাড়ে না এবং প্রজননক্ষমতাও কমে না। বিজ্ঞানীরা এটিকে “Negligible senescence” অর্থাৎ অনুপস্থিত বার্ধক্য হিসেবে বর্ণনা করেন। সহজ ভাষায়, হাইড্রার ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ার নিয়মটি কাজ করে না। এরা বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবে মরে না।
অতএব, “সব প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে” এটি ধর্মীয় বা দার্শনিক বক্তব্য হতে পারে; কিন্তু বৈজ্ঞানিক ভাষায় এটি প্রমাণিত সর্বজনীন সত্য নয়। বিজ্ঞান বলে– “অধিকাংশ জীব একসময় মারা যায়, কিন্তু জৈবিক বাস্তবতায় কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। @ অনিন্দ্য জয়
১২
চমৎকার সিল্কি নাইসক্রিম
যা তৈরিতে এক ফোঁটা দুধ, ক্রিম কিংবা এক দানা চিনি লাগে না!
এটা হলো 'নাইসক্রিম'।
‘নাইস ক্রিম’ (Nice Cream) হলো শতভাগ ফলভিত্তিক, ডেইরি বিহীন এবং চিনি ছাড়া তৈরি এক আইসক্রিম।
২০১০ থেকে ২০১২ সালের দিকে পশ্চিমা বিশ্বে যখন প্রাণিজ উপাদান বর্জনের ভেগাইন্যা আন্দোলন এবং ক্লিন ইটিং জনপ্রিয় হতে শুরু করে, তখন আইসক্রিম প্রেমীরা সমস্যায় পড়ে। দুধ-ক্রিম ছাড়া তো আইসক্রিম অসম্ভব!
তখনই কিছু ফুড ব্লগার আবিষ্কার করে যে, ডিপ ফ্রিজে রাখা শক্ত জমানো কলার টুকরো ব্লেন্ড করলে কোনো ক্রিম ছাড়াই হুবহু আইসক্রিমের মতো ঘন, সিল্কি এবং ক্রিমি টেক্সচার তৈরি হয়। শুরুতে এর নাম ছিল ব্যানানা আইস ক্রিম। পরে মানুষের মুখে মুখে এর নাম হয়ে যায় নাইস ক্রিম।
কমার্শিয়াল আইসক্রিমকে বলা হতো Naughty, মানে দুষ্টু বা ক্ষতিকর, আর প্রাকৃতিক এই আইসক্রিম শরীরের জন্য ভালো, তাই এটি Nice।
বাণিজ্যিক আইসক্রিমকে ঘন, আকর্ষণীয় ও আসক্তিকর করতে ব্যবহার করা হয় প্রচুর পরিমাণে রিফাইনড চিনি, হাই-ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাপ, কৃত্রিম ফ্লেভার, কেমিক্যাল কালার এবং ইমালসিফায়ার!
বিপরীতে, ঘরে তৈরি নাইস ক্রিম সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। এতে ফলের নিজস্ব চিনি ছাড়া বাইরে থেকে চিনি যোগ করা হয় না। এটিতে ফাইবার, ভিটামিন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, তাই এটি গিল্ট-ফ্রি বা অপরাধবোধহীন ডেজার্ট।
শুরুর দিকে যখন নাইস ক্রিম তৈরি হতো, তখন উপাদান ছিল শুধুই পাকা কলা। একদম পাকা (ত্বকে বাদামী ছোপ ধরা) কলার খোসা ছাড়িয়ে ছোট চাকা করে কেটে সারারাত ফ্রিজারে জমিয়ে শক্ত করা হতো। কোনো পানি বা দুধ ছাড়াই কেবল ফ্রোজেন কলার টুকরো ব্লেন্ডার বা ফুড প্রসেসরে দিয়ে তৈরি হতো ঘন ক্রিমি নাইসক্রিম।
এদেশের পাকশালায় পশ্চিমা দেশগুলোর মতো ফুড প্রসেসর বা ভিটামিক্স ব্লেন্ডার সাধারণত থাকে না। তবে সাধারণ জুসার-ব্লেন্ডার দিয়েও পারফেক্ট নাইস ক্রিম বানাতে পারবেন। দেশি সাগর কলা বা সবরি কলা নাইস ক্রিমের জন্য সবচেয়ে উত্তম, কারণ এগুলো বেশ ক্রিমি হয়। কলা একদম পাকা হতে হবে, কাঁচা ভাব থাকলে আইসক্রিমে কষা স্বাদ আসবে।
কলার স্লাইস করে চাকাগুলো একটা চ্যাপ্টা প্লেটে পলিথিন বিছিয়ে একটি একটি আলাদা করে সাজিয়ে রাখুন। একটার ওপর আরেকটা দলা পাকিয়ে রাখলে ব্লেন্ডারের ব্লেড ভেঙে ফেলতে পারে। ডিপ ফ্রিজে কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা রাখুন।
ফ্রিজ থেকে বের করে মাত্র ২ মিনিট বাইরে রাখুন (যাতে বরফ ভাবটা সামান্য কমে)। এবার ব্লেন্ডারে ২-৩ বার ঘুরিয়ে প্রথমে কলার টুকরোগুলোকে গুঁড়ো করে নিন। এরপর মাঝারি স্পিডে চালান। প্রতি ৩০ সেকেন্ড পর পর ব্লেন্ডার বন্ধ করে চামচ দিয়ে চারপাশ থেকে মাঝখানে এনে দিন। ১-২ মিনিটের মধ্যেই চমৎকার সিল্কি নাইসক্রিম তৈরি হয়ে যাবে।
গ্রীষ্মকালে এখন দেশে সুমিষ্ট ফলের সমারোহ চলছে। এক্ষেত্রে কলাকে বেস ধরে অথবা কলা ছাড়াই দেশি ফল দিয়ে নাইসক্রিমের চমৎকার সব ভ্যারিয়েশন তৈরি করা সম্ভব।
পাকা মিষ্টি আম (যেমন হিমসাগর বা ল্যাংড়া) কিউব করে কেটে কলার মতোই প্লেটে বিছিয়ে ফ্রিজারে শক্ত করে জমিয়ে নিন। ২ কাপ ফ্রোজেন আমের টুকরোর সাথে ১ কাপ ফ্রোজেন কলার টুকরো একসাথে ব্লেন্ডারে দিন। আমের নিজস্ব টেক্সচার এমনিতেই ক্রিমি, তাই কলার সাথে মিশে চমৎকার গাঢ় হলুদ রঙের রয়্যাল ম্যাঙ্গো নাইস ক্রিম তৈরি হবে।
তারপর আছে কাঁঠাল। কাঁঠাল দিয়ে নাইসক্রিম বানানো অনেকের কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু এর স্বাদও অসাধারণ লাগবে। কাঁঠালের কোয়ার বিচি ফেলে কোয়াগুলো ফ্রিজারে সারারাত জমিয়ে নিন। ২ কাপ ফ্রোজেন কাঁঠালের টুকরোর সাথে ১ কাপ ফ্রোজেন কলার টুকরো এবং চাইলে কিছুটা দুধ যোগ করে ব্লেন্ড করুন।
নাইস ক্রিমের মূল রেসিপি ডেইরি-ফ্রি হলেও, নাইস ক্রিমে অবশ্যই দুধ ব্যবহার করা যাবে। আমরা তো আর ভেগাইন্যা নই। ব্লেন্ড করার সময় ১-২ টেবিল চামচ আগে থেকে জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করা দুধ দিতে পারেন। তবে বেশি দুধ দিলে এটি আইসক্রিম না হয়ে শেক বা স্মুদি হয়ে যাবে!
আপ্যায়নের সময় এটা বানালে ব্লেন্ড করার সময় কলার সাথে ২ চামচ ফুল-ক্লিম গুঁড়ো দুধ মিশিয়ে দিলে নাইস ক্রিমের স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
১৩
কোনো আচরণ অভ্যাস তৈরি হতে গড়ে প্রায় ৬৬ দিন লাগে। তবে এটি ব্যক্তি ও অভ্যাসের ধরনভেদে ১৮ দিন থেকে ২৫০ দিন পর্যন্ত হতে পারে।
অভ্যাস আসলে কী
অভ্যাস হল এমন একটি আচরণ যা বারবার করতে করতে স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেছে, যা করতে আমাদের আর তেমন সচেতন চিন্তা বা চেষ্টা লাগে না। মস্তিষ্ক মূলত কর্মক্ষমতা বাঁচাতে অভ্যাস তৈরি করে। প্রতিটি কাজ যদি নতুন করে ভেবে করতে হত, তাহলে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ত। তাই বারবার করা কাজগুলিকে সে এক ধরনের "স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম"-এ পরিণত করে এবং মূল চিন্তাশক্তিকে নতুন ও জটিল কাজের জন্য মুক্ত রাখে।
.
মস্তিষ্কে অভ্যাস কীভাবে কাজ করে
অভ্যাস তৈরির পেছনে মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ, যার নাম বেসাল গ্যাংগ্লিয়া, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো আচরণ যত বেশি পুনরাবৃত্তি করা হয়, সংশ্লিষ্ট স্নায়ুপথ তত শক্তিশালী হয়। একে অনেকটা ঘাসের মাঠে হাঁটাপথ তৈরির সঙ্গে তুলনা করা যায়। একই জায়গা দিয়ে বারবার হাঁটলে স্পষ্ট পথ তৈরি হয়, পরে সেই পথ দিয়েই হাঁটা সহজ ও স্বাভাবিক মনে হয়।
বিজ্ঞানীরা অভ্যাসের এই প্রক্রিয়াকে একটি চক্র দিয়ে ব্যাখ্যা করেন, যা সাধারণত "অভ্যাসের চক্র" (Habit Loop) নামে পরিচিত। এর চারটি ধাপ:
১. ইঙ্গিত (Cue): যে ঘটনা বা পরিস্থিতি মস্তিষ্ককে আচরণ শুরু করার সংকেত দেয়। যেমন: নির্দিষ্ট সময়, স্থান, মেজাজ বা আগের কোনো কাজ।
২. আকাঙ্ক্ষা (Craving): ইঙ্গিতের পর মনে যে চাওয়া বা প্রেরণা জাগে। আসলে আমরা আচরণটি নয়, বরং তার ফলে পাওয়া অনুভূতিটি চাই।
৩. কাজ (Routine): যে কাজটি আমরা আসলে করি, অভ্যাসটি নিজেই।
৪. পুরস্কার (Reward): কাজের ফলে পাওয়া তৃপ্তি বা সুবিধা, যা মস্তিষ্ককে বলে দেয় এই চক্রটি মনে রাখার মত।
পুরস্কার যত আনন্দদায়ক, চক্রটি তত দৃঢ়ভাবে গেঁথে যায় এবং পরবর্তী সময়ে একই ইঙ্গিত পেলেই মস্তিষ্ক একই কাজের দিকে ঠেলে দেয়।
.
নতুন অভ্যাস তৈরির কার্যকর কৌশল
প্রচলিত ধারণা হল অভ্যাস তৈরি হতে ২১ দিন লাগে। কিন্তু এটি একটি ভুল মিথ। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো আচরণ স্বয়ংক্রিয় হতে গড়ে প্রায় ৬৬ দিন লাগে। তবে এটি ব্যক্তি ও অভ্যাসের ধরনভেদে ১৮ দিন থেকে ২৫০ দিন পর্যন্ত হতে পারে। সহজ অভ্যাস (যেমন এক গ্লাস পানি খাওয়া) দ্রুত গড়ে ওঠে, জটিল অভ্যাস (যেমন প্রতিদিন ব্যায়াম) সময় নেয় বেশি। এখানে মূল শিক্ষাটা হল, নির্দিষ্ট কোনো জাদুর সংখ্যা নেই, ধৈর্য আর ধারাবাহিকতাই আসল।
নিচের ধাপগুলিকে কাজে লাগিয়ে আপনিও নতুন অভ্যাস তৈরি করতে পারেন।
১. ছোট থেকে শুরু করুন
বড় পরিবর্তন একবারে আনতে গেলে মস্তিষ্ক বাধা দেয়। তাই অভ্যাসকে এতটা ছোট করে নিন যেন তা প্রায় না-করাই কঠিন মনে হয়। "প্রতিদিন ৩০ মিনিট পড়ব" না বলে "প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা পড়ব" দিয়ে শুরু করুন। ছোট সাফল্য আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং ধীরে ধীরে কাজটি বড় করা যায়।
২. অভ্যাস জোড়া লাগান (Habit Stacking)
নতুন অভ্যাসকে পুরোনো কোনো অভ্যাসের সঙ্গে জুড়ে দিন। সূত্রটি হল: "[বর্তমান অভ্যাস] করার পর আমি [নতুন অভ্যাস] করব।" যেমন: "সকালে কফি বানানোর পর পাঁচ মিনিট ব্রিদিং এক্সারসাইজ করব।" পুরোনো অভ্যাসটি তখন নতুনটির জন্য ইঙ্গিতের কাজ করে।
৩. পরিবেশ সাজিয়ে নিন
ইচ্ছাশক্তির চেয়ে পরিবেশ অনেক শক্তিশালী। ভাল অভ্যাসকে সহজ ও খারাপ অভ্যাসকে কঠিন করে তুলুন। বই পড়তে চাইলে বইটি বালিশের পাশে রাখুন; ফোন কম দেখতে চাইলে সেটি অন্য ঘরে চার্জে রাখুন। চোখের সামনে যা থাকে, আমরা তা-ই করি।
৪. পরিচয়কে কেন্দ্রে রাখুন
শুধু লক্ষ্যের দিকে না তাকিয়ে নিজের পরিচয়ের দিকে তাকান। "আমি ওজন কমাতে চাই" না ভেবে ভাবুন "আমি একজন সুস্থ মানুষ।" প্রতিটি ছোট কাজ যখন সেই পরিচয়ের প্রমাণ হয়ে ওঠে, তখন অভ্যাসটি গভীর ও টেকসই হয়।
৫. তাৎক্ষণিক পুরস্কার যোগ করুন
অনেক ভাল অভ্যাসের ফল পেতে দেরি হয়, ফলে মন আগ্রহ হারায়। তাই কাজটি শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ছোট কোনো পুরস্কার দিন। একটি টিক চিহ্ন বসানো, প্রিয় গান শোনা কিংবা মনে মনে নিজেকে অভিনন্দন জানানো। তাৎক্ষণিক ভাল লাগা অভ্যাসকে শক্তিশালী করে।
৬. অগ্রগতি লিখে রাখুন
ক্যালেন্ডার বা অ্যাপে প্রতিদিনের অভ্যাস চিহ্নিত করুন। একটানা দাগের সারি দেখলে তা ভাঙতে মন চায় না। এটি নিজেই এক ধরনের প্রেরণা।
.
বাধা ও যেভাবে কাটিয়ে উঠবেন
নতুন অভ্যাস গড়ার পথে কিছু বাধা প্রায় অনিবার্য। প্রথম বাধা হল প্রেরণার অভাব। প্রেরণা ক্ষণস্থায়ী, তাই কেবল মনের ইচ্ছার ওপর নির্ভর না করে নির্দিষ্ট সময় ও পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করুন—কখন, কোথায়, কীভাবে কাজটি করবেন তা আগেই ঠিক করে রাখুন।
দ্বিতীয় বাধা হল মাঝপথে বাদ পড়া। মনে রাখবেন, একদিন বাদ পড়লে অভ্যাস ভেঙে যায় না; কিন্তু পরপর দুদিন বাদ পড়া একটি নতুন (খারাপ) অভ্যাসের সূচনা হতে পারে। তাই নিয়ম হল—কখনও দুদিন পরপর বাদ দেবেন না। পিছিয়ে পড়াটা স্বাভাবিক, আসল কথা হল দ্রুত আবার ফিরে আসা।
তৃতীয় বাধা হল নিখুঁত হওয়ার চাপ। অনেকে ভাবেন, একদিন এলোমেলো হলে সব শেষ। বাস্তবে ধারাবাহিকতা নিখুঁততার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ৮০ শতাংশ দিন কাজটি করলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় ফল আসে।
.
খারাপ অভ্যাস ভাঙা
খারাপ অভ্যাস ভাঙতে হলে অভ্যাসের চক্রটিকেই উল্টাভাবে কাজে লাগাতে হয়। প্রথমে খুঁজে বের করুন কোন ইঙ্গিত আপনাকে খারাপ অভ্যাসে টানছে। এরপর ইঙ্গিতটি যথাসম্ভব সরিয়ে দিন বা কঠিন করুন। সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল, খারাপ অভ্যাসটির জায়গায় একই পুরস্কার দেয় এমন একটি ভাল বিকল্প বসানো। আচরণ বদলান, কিন্তু পুরস্কারের চাহিদাটি মেটানোরও পথ রাখুন।
.
অভ্যাস ধরে রাখা
একবার অভ্যাস গড়ে উঠলে তা ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যাসকে দৈনন্দিন রুটিনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে নিন যেন তা স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে নিজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করুন, কী কাজ করছে আর কী করছে না তা যাচাই করুন এবং প্রয়োজনে কৌশল বদলান। ভ্রমণ বা অসুস্থতার মত পরিস্থিতিতেও অভ্যাসের একটি ছোট সংস্করণ চালু রাখার চেষ্টা করুন, যাতে ধারাবাহিকতার সুতাটি না ছেঁড়ে।
@ City Alo
১৪
আপনার ইচ্ছাশক্তির চেয়ে আপনার চারপাশের পরিবেশ সবসময় বেশি শক্তিশালী
মনস্তত্ত্বে একে বলা হয় Law of Environment, "Your environment will always win over your willpower" (আপনার ইচ্ছাশক্তির চেয়ে আপনার চারপাশের পরিবেশ সবসময় বেশি শক্তিশালী)। আপনি যতই মোটিভেশনাল ভিডিও দেখেন না কেন, আপনি যদি একটি নেতিবাচক পরিবেশে থাকেন, তবে আপনার অবচেতন মন সেই পরিবেশেরই রূপ নেবে।
আমি যাদের সাথে থাকবো, যেরকম কনটেন্ট কনজিউম করবো- আমি ঠিক সেরকমই হবো। পানের দোকানের অ্যানালজির মতো; আমি পানের দোকানে গেলে পানই পাব, রসগোল্লা পাব না। রসগোল্লা পেতে হলে আমাকে রসগোল্লার দোকানেই যেতে হবে। আমি রাগওয়ালার সাথে মিশলে রাগ পাব, হিংসাওয়ালার সাথে মিশলে হিংসা পাব।
আমরা অনেকেই মনে করি, "আমি যার সাথেই মিশি না কেন, আমি আমার মতো থাকবো।" এটি একটি ভুল ধারণা।
The Mirror Neuron Effect : আমাদের ব্রেনে এক ধরণের নিউরন থাকে যাকে বলা হয় 'মিরর নিউরন'। নিউরোসায়েন্সের গবেষণা অনুযায়ী, আমরা যখন নির্দিষ্ট কোনো মানুষের সাথে সময় কাটাই, আমাদের ব্রেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, কথা বলার ধরণ, রুচিবোধ এবং অভ্যাসগুলোকে 'কপি' করতে শুরু করে। আপনি অজান্তেই আপনার বন্ধুদের মতো হয়ে যাচ্ছেন!
The 5-People Rule (জিম রনের সূত্র): বিখ্যাত বিজনেস ফিলোসফার জিম রন বলেছিলেন, "You are the average of the five people you spend the most time with." অর্থাৎ, আপনি সবচেয়ে বেশি সময় যে ৫ জন মানুষের সাথে কাটান, আপনার উপার্জন, চিন্তা এবং চরিত্র ঠিক সেই ৫ জনের গড় (Average) মানের সমান হবে।
The Social Contagion Study: হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, আপনার বন্ধু যদি স্থূলতা (Obesity), ধূমপান বা হতাশার মধ্য দিয়ে যায়, তবে কোনো কারণ ছাড়াই আপনারও সেইসব সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৫৭% পর্যন্ত বেড়ে যায়।
ডিজিটাল যুগের নতুন 'সহবত'
বর্তমানে আমাদের মানুষের চেয়েও বেশি সময় কাটানো হয় ভার্চুয়াল কনটেন্টের সাথে। তাই, কনটেন্টের বিষয়টি এখন জীবন গঠনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনি সচেতন বা অবচেতনভাবে যা দেখছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আপনাকে ঠিক সেই ধরণের কনটেন্টই বারবার দেখাতে বাধ্য করছে।
এর ফলে আপনি একটি Echo Chamber বা বন্ধ ঘরে বন্দি হয়ে যাচ্ছেন। সস্তা, নেতিবাচক, ট্রোল বা উস্কানিমূলক কনটেন্ট দেখতে দেখতে আপনার চিন্তাভাবনা, রুচিবোধ, অভ্যাস, প্রোডাক্টিভিটি এবং মোরালিটি (নৈতিকতা) ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
আমার চিন্তাভাবনা কেমন, আমার রুচিবোধ কেমন, আমার অভ্যাস, আমার প্রোডাক্টিভিটি, আমার মোরালিটি- এগুলো অনেকটা এখন আরও কিছু বিষয়ের পাশাপাশি আমি কেমন কনটেন্ট কনজিউম করছি তার উপর নির্ভর করে।
আমরা যতবেশি ভালোর সাথে থাকবো, তত বেশি ভালো থাকতে পারবো। ভালো থাকি, ভালোর সাথে থাকি। -Nur Rahman
১৫
জয়ীদের একটি অভ্যাস: নিজেকে সেরাদের সাথে তুলনা করুন
“If you want to be a winner, then compare yourself to the best and acknowledge that it will never happen without hard work. Jamie Dimon
আমরা সবাই জীবনে সফল হতে চাই। কিন্তু সত্যি বলতে, সফলতার স্বপ্ন দেখা আর সফলতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা দুটো এক জিনিস নয়।
বেশিরভাগ মানুষ নিজের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। তারা আশেপাশের মানুষের সাথে তুলনা করে এবং ভাবতে শুরু করে, “আমি তো খারাপ করছি না।” কিন্তু বিজয়ীরা ভিন্নভাবে চিন্তা করে। তারা নিজেদের তুলনা করে সেরাদের সাথে। কারণ তারা জানে, উন্নতির সবচেয়ে বড় সুযোগ লুকিয়ে থাকে নিজের সীমাবদ্ধতাকে চেনার মধ্যে।
একজন ছাত্র যদি ক্লাসের সেরা শিক্ষার্থীর দিকে তাকায়,একজন উদ্যোক্তা যদি ইন্ডাস্ট্রির সেরাদের কাছ থেকে শেখে, কিংবা একজন কর্মী যদি নিজের ক্ষেত্রের শ্রেষ্ঠ পারফর্মারদের অনুসরণ করে তাহলেই সে বুঝতে পারে কতটা পথ এখনও বাকি।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। শুধু সেরাদের দেখে অনুপ্রাণিত হওয়াই যথেষ্ট নয়। কঠোর পরিশ্রম ছাড়া সেই উচ্চতায় পৌঁছানো সম্ভব নয়। প্রতিটি অর্জনের পেছনে থাকে অসংখ্য ব্যর্থতা, ত্যাগ, শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।
আজ নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন আমি কি আমার বর্তমান অবস্থার সাথে তুলনা করছি, নাকি আমার সম্ভাবনার সর্বোচ্চ সংস্করণের সাথে?
কারণ বিজয়ীরা ভাগ্যের অপেক্ষা করে না। তারা প্রতিদিন নিজেদের আরও ভালো সংস্করণ তৈরি করে। আর সেই যাত্রার মূল চাবিকাঠি হলো সেরাদের কাছ থেকে শেখা এবং কঠোর পরিশ্রমকে নিজের অভ্যাসে পরিণত করা। @ 𝙀𝙡𝙚𝙫 𝙄𝙌 2.0
১৬
যে কারণে সন্তানকে অভাব ও আভিজাত্য দুটোই শেখাবেন
অভাবের শিক্ষা সন্তানকে কষ্টের মূল্য বুঝতে শেখায়। যখন একটি শিশু জানতে পারে যে অর্থ উপার্জনের জন্য পরিশ্রম করতে হয় এবং প্রতিটি জিনিস সহজে পাওয়া যায় না, তখন তার মধ্যে কৃতজ্ঞতা ও সংযমের মনোভাব তৈরি হয়। সে অপচয় কম করে এবং অন্যের কষ্টকে সম্মান করতে শেখে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে সীমিত সম্পদের মূল্য বুঝে বড় হয়, তারা ভবিষ্যতে আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বেশি দায়িত্বশীল হয়। একই সঙ্গে তারা ব্যর্থতা মোকাবিলায়ও তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে আভিজাত্যের শিক্ষা সন্তানকে আত্মমর্যাদা, পরিচ্ছন্নতা, শিষ্টাচার ও উন্নত জীবনযাপনের মানদণ্ড শেখায়। সমাজে চলাফেরা, অতিথি আপ্যায়ন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলা এবং নিজের স্বপ্নকে বড় করে দেখার মানসিকতা আভিজাত্যবোধ থেকে আসে। একটি শিশু যদি কখনো ভালো পরিবেশ, উন্নত সংস্কৃতি ও সুন্দর জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত না হয়, তাহলে সে নিজের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ ভেবে নিতে পারে। তাই তাকে উন্নত জীবনের স্বাদ ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জানানো প্রয়োজন। এতে সে বড় লক্ষ্য স্থির করতে এবং তা অর্জনের জন্য পরিশ্রম করতে উদ্বুদ্ধ হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিশুর মানসিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। শুধুমাত্র প্রাচুর্য তাকে ভোগবাদী করে তুলতে পারে, আবার শুধুমাত্র অভাব তাকে হতাশ বা সংকুচিত মানসিকতার মানুষ বানাতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, যেসব পরিবার সন্তানদের বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ উভয়ের সঙ্গে পরিচিত করায়, তাদের মধ্যে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বেশি থাকে। তারা অন্য মানুষের অবস্থাও সহজে উপলব্ধি করতে পারে, ফলে সহানুভূতিশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
অভাব ও আভিজাত্যের সমন্বিত শিক্ষা সন্তানকে সামাজিক ভারসাম্য শেখায়। সে যেমন দরিদ্র মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে, তেমনি উচ্চমানের পরিবেশেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চলতে পারে। এর ফলে তার মধ্যে অহংকার জন্ম নেয় না এবং হীনমন্যতাও তৈরি হয় না। সে জানে কখন সঞ্চয় করতে হবে, আবার কখন প্রয়োজনীয় ব্যয় করতে হবে। জীবনের বাস্তবতা ও সম্ভাবনার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করার এই দক্ষতা ভবিষ্যতের সফলতা ও সুখের অন্যতম ভিত্তি।
যে সন্তান অভাবের কষ্ট এবং আভিজাত্যের সৌন্দর্য দুটোই জানে, সে জীবনের প্রতি সবচেয়ে পরিপক্ব দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে। সে অর্থের মূল্য বোঝে, আবার স্বপ্ন দেখতেও ভয় পায় না। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে এবং অনুকূল পরিস্থিতিতে বিনয়ী থাকতে শেখে। পরিবারের উচিত সন্তানকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে সে বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে উন্নতির আকাশ ছুঁতে পারে। তখন সে শুধু সফল মানুষই নয়, বরং দায়িত্বশীল, মানবিক ও বিচক্ষণ নাগরিক হিসেবেও সমাজে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। @ SAM Motivation
References:
American Psychological Association (APA), Child Development Research.
Harvard University Center on the Developing Child.
Journal of Family and Economic Issues.
UNICEF Parenting and Child Development Reports.
১৭
সেই রহস্যময় প্রাণীর নাম LUCA, যার পূর্ণরূপ Last Universal Common Ancestor।
আপনি, আমি, একটি আমগাছ, একটি চড়ুই পাখি, এমনকি একটি ব্যাকটেরিয়া—পৃথিবীর সব জীবের মধ্যে একটি আশ্চর্য মিল রয়েছে। সবার কোষে ডিএনএ আছে, সবাই কোনো না কোনোভাবে শক্তি ব্যবহার করে, আর সবাই একই ধরনের কিছু মৌলিক জৈবিক নিয়ম মেনে চলে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই মিল কাকতালীয় নয়। বরং পৃথিবীর সব জীবেরই এক দূরবর্তী সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিল। সেই রহস্যময় প্রাণীর নাম LUCA, যার পূর্ণরূপ Last Universal Common Ancestor।
LUCA পৃথিবীর প্রথম জীব ছিল না। এর আগেও আরও অনেক ধরনের আদিম জীব থাকতে পারে। তবে LUCA ছিল সেই জীব, যার বংশধরদের মধ্য থেকেই আজকের সব জীবিত প্রাণী এসেছে। সহজভাবে বললে, পৃথিবীর জীবনের বিশাল পারিবারিক গাছের যে বিন্দুতে সব শাখা এসে মিলে যায়, সেটিই হলো LUCA।
প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর পরিবেশ ছিল ভয়ঙ্কর। চারদিকে আগ্নেয়গিরি, বিষাক্ত গ্যাস আর প্রচণ্ড তাপ। তবুও সেই কঠিন পরিবেশে LUCA বেঁচে ছিল বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। এটি সম্ভবত ছিল একটি অতি ক্ষুদ্র এককোষী জীব, যা চোখে দেখা যেত না। কিন্তু ক্ষুদ্র হলেও এর মধ্যে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছিল।
মজার বিষয় হলো, বিজ্ঞানীরা কখনও LUCA-কে সরাসরি দেখেননি এবং এর কোনো জীবাশ্মও খুঁজে পাননি। তাহলে তারা এর কথা জানলেন কীভাবে? উত্তর লুকিয়ে আছে আধুনিক জীবের জিনে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাণী ও অণুজীবের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু জিন খুঁজে পেয়েছেন, যা প্রায় সব জীবের মধ্যেই রয়েছে। এই জিনগুলো সম্ভবত LUCA-এর কাছ থেকেই উত্তরাধিকার হিসেবে এসেছে।
LUCA-এর গল্প আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখায়। পৃথিবীর সব জীব, যতই আলাদা দেখাক না কেন, আসলে খুব দূর সম্পর্কের আত্মীয়। একটি গাছ, একটি মাছ, একটি কুকুর এবং একজন মানুষ—সবার শিকড় গিয়ে মিশেছে সেই এক প্রাচীন ক্ষুদ্র জীবের মধ্যে। তাই LUCA শুধু একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা নয়; এটি পৃথিবীর সব জীবনের গভীর সংযোগের গল্প।
উপম বিকাশ
১৮
Identity Erosion' বা ব্যক্তিত্বের অবক্ষয়
সে আপনাকে সরাসরি গালি দেয় না, কিন্তু আপনার নেওয়া প্রতিটি ছোট সিদ্ধান্তের পেছনে এমন একটা সন্দেহের বীজ বুনে দেয় যে, একসময় আপনি নিজের মগজটাকেই বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেন!
ডার্ক সাইকোলজির অত্যন্ত ধূর্ত আর ধীরগতির এই বিষাক্ত প্রক্রিয়াকে বলা হয় 'Identity Erosion' বা ব্যক্তিত্বের অবক্ষয়।
আপনার খুব কাছের কোনো মানুষ—সে হতে পারে পার্টনার বা পরম বন্ধু—সে আপনাকে দেখাবে সে আপনার কত বড় গাইড।
কিন্তু আপনি যখনই কোনো নতুন কাজের সিদ্ধান্ত নেবেন, সে খুব নরম গলায় বলবে, "তুমি কি আসলেই এটা পারবে? আগে তো কখনো করোনি, লস হলে সামলাতে পারবে তো?"
সে আপনার কোনো আইডিয়াকে সরাসরি ‘ফালতু’ বলবে না, জাস্ট ওটার পেছনে একটা ‘কিন্তু’ জুড়ে দেবে।
পরাবলম্বী বানানোর রাজনীতি: সে খুব ঠান্ডা মাথায় আপনার আত্মবিশ্বাসটা প্রতিদিন ১% করে কমিয়ে দেয়। উদ্দেশ্য একটাই—আপনি যেন একসময় নিজের ওপর সমস্ত ভরসা হারিয়ে ফেলেন এবং প্রতিটা ছোট কাজের জন্য তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
ফলাফল: যে মানুষটা একসময় একা পুরো একটা প্রজেক্ট বা লাইফ সামলাতে পারতো, সে আজ চতুর একজনের মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়ে একটা সাধারণ শার্ট কেনার আগেও ১০ বার তার পারমিশনের অপেক্ষায় বসে থাকে।
আপনার চারপাশেও কি এমন কোনো চতুর ‘গাইড’ আছে, যে প্রতিনিয়ত আপনার মনে সন্দেহের বীজ বুনে আপনার সাহসটা কেড়ে নিচ্ছে? কমেন্ট বক্সে এসে সেই চতুর মানুষের মুখোশটা টেনে খুলুন। @ Mind Manipulation
লক্ষ্য ঠিক করার পর কিছুদিন খুব জোশ থাকে, কিন্তু এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই সব আগের মতো হয়ে যায়- এই গল্পটা কি আপনার পরিচিত?
গবেষণা বলে, সফল মানুষেরা মোটিভেশনের ওপর নির্ভর করেন না, তারা নির্ভর করেন 'সিস্টেম' এবং 'হ্যাবিট' এর ওপর।
১৯
‘ভিড়ের মধ্যেও আলাদা’ কিভাবে হবেন?
অনেকের মধ্যে একজন—যাকে আমরা বলি ‘অন্যতম’, তেমনটা অনেকেই হতে চান। কিন্তু চাইলেই কি সব হয়? হ্যাঁ, চাইলে আদতেই হয়। কিন্তু চাইতে হবে চাওয়ার মতো করে। এমন কিছু আচরণ বা অভ্যাস আছে, যা হয়তো খুবই সাধারণ, কিন্তু আমরা চর্চা করি না, সেসবই আপনাকে আলাদা করতে পারে অনেকের মধ্য থেকে। যাকে আমরা বলতে পারি ‘ভিড়ের মধ্যেও আলাদা’। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কী সেই ৭ অভ্যাস বা আচরণ, যা আপনাকে তুলে ধরবে আলাদা করে।
•
১. অন্যের কথার মধ্যে নাক না গলানো:
মনে হতে পারে, এ আর এমন কী কঠিন কাজ! কারও কথার মধ্যে বাধা না দিলেই তো হয়। কিন্তু আপাত সহজ এই কাজটাই বেশির ভাগ লোকের পক্ষে করা বেশ কঠিন। আলাপ চলার সময় অনেকে বুঝতেই পারেন না, কখন তাঁরা অন্যের কথার মধ্যে নাক গলাচ্ছেন। কিন্তু তাঁরা এটা প্রায়ই করেন। কাজটা হয়তো তাঁরা সচেতনভাবে করেন না, কিন্তু করেন। মূলত তাঁরা অন্যের কথায় নাক গলানো বা বাধা দেন একধরনের অনিরাপত্তা বোধ থেকে। আমরা আদতে মনোযোগ চাই। নিজের উপিস্থিতি জানান দিতে চাই। চাই অন্যেরা আমাকে দেখুক, শুনুক, আমি আছি। যখনই এর অভাব ঘটে, তখনই আমাদের মধ্যে একধরনের অনিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়। ফলে অন্য কেউ যখন কথা বলে, তখন মনোযোগ নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিতেই আমরা অনিচ্ছাকৃতভাবে আলাপে বাধা দিয়ে ফেলি। নিজে কথা বলে উঠি।
এ ধরনের আচরণ আমাদের প্রতি অন্যের শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট করে। এ জন্য অন্যকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। নিজে বেশি না বলে অন্যকে বরং জায়গা দিতে হবে। অন্যের কথা শুনতে হবে, যেটা বড় নেতারাও করেন।
মনে রাখতে হবে, নিজের কথাও বলতে হবে, তবে এতে অত তাড়াহুড়ার প্রয়োজন নেই। অন্যকে কথা বলার এই সুযোগদান আপনাকে অনেকের মধ্যে দিন দিন আলাদা করেই তুলবে।
২. গড়পড়তা না হয়ে বিশেষ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন:
কোনো একটি বিশেষ বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠা খুব একটা সহজ নয়। আপনার আশপাশে দেখবেন, অনেকেই প্রায় সব বিষয়েই জানেন বা পারেন, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে? দেখবেন, তাতে অনেকেই বিশেষজ্ঞ নন। তাঁরা গড়পড়তা। তাঁদের চেয়ে আলাদা হতে হলে আপনাকে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে হবে।
কোনো বিশেষ বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠার মানে এটাও যে আপনি অন্যদের চেয়ে অধ্যবসায়ী ও সংকল্পবদ্ধ। আপনি হতে পারেন শিক্ষক, প্রশিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, অভিনেতা, ব্যাংকার, সাংবাদিক কিংবা যেকোনো পেশাজীবী। তবে আপনার বিশেষত্ব কী? আপনি কি সবার চেয়ে আলাদা? কিংবা যিনি আলাদা, তিনি কেন বাকি সবার মতো নন? খেয়াল করে দেখবেন, সব অভিনেতাই সেলিব্রেটি হন না, সব খেলোয়াড়ও চ্যাম্পিয়ন নন। তাই আপনার চারপাশের লোকদের মধ্যে কোনো বিশেষ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করুন। সেটাই আপনাকে আলাদা করবে সহজে।
৩. উপস্থিতিতেই নজর কাড়ুন:
যেকোনো স্থানে আপনার উপস্থিতি আলাদা করে বুঝিয়ে দিন। সামান্য ব্যতিক্রমী হলেও কিছু করুন। এর মানে এই নয় যে আপনি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য হাস্যকর, অদ্ভুত কোনো আচরণ করবেন, অথবা অদ্ভুত ধরনের পোশাক পরবেন। তাই এমন কিছু করুন বা পরুন, যাতে ভিড়ের মধ্যে আপনার উপস্থিতি আলাদাভাবে নজর কাড়ে।
আলাদা করে মানুষের নজর কাড়তে গিয়ে অনেক সময় কেউ কেউ হাসির পাত্রে পরিণত হন। সেদিকটায় খেয়াল রাখতে হবে। হয়তো আপনি সাদামাটা পোশাকই পরলেন, কিন্তু টাই হলো আলাদা। হাতঘড়ি, ব্রেসলেট অথবা পায়ের মোজা দুটি কিছুটা ব্যতিক্রমী হলো।
মানুষের মনোযোগ আকর্ষণে আপনি হয়তো কথায় কথায় অট্টহাসি দিলেন না, কিন্তু ঠোঁটের কোণে লেগে রইল স্মিত মিষ্টি হাসি। সারাক্ষণ ভাঁড়ামো করলেন না, কিন্তু পরিচয় দিলেন পরিমিত রসবোধের।
মনে রাখবেন, আপনার নজরকাড়া উপস্থিতির কারণেই আপনাকে আলাদা করে মনে রাখবে অনেক মানুষ।
৪. সমালোচনায় সর্বংসহা হোন:
বেশির ভাগ মানুষই সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। সামান্যতেই আহত বোধ করেন। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে আলাদা হতে গেলে আপনাকে সমালোচনায় সর্বংসহা হতে হবে, মানুষের আক্রমণে থাকতে হবে অবিচল।
মানুষ বুঝে না বুঝে আপনার সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু আপনাকে তা ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করতে হবে। যে সমালোচনা যৌক্তিক, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের দুর্বলতা শুধরে ফেলুন। আর অযৌক্তিক সমালোচনা এড়িয়ে যান সযত্নে।
সব সমালোচনা হাসি মুখে সামাল দিতে পারলে মানুষ দিন শেষে আপনার হাসিমাখা মুখটাই মনে রাখবে। আর সমালোচনায় বিরক্ত হলে, মানুষ আপনার বিরক্তিভাবটাই মনে রাখবে, এর পেছনের কারণ নয়। সমালোচনা সহ্য করার এই গুণ আপনাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
৫. এমন কিছু শেয়ার করুন, যা করতে বুকের পাটা লাগে:
কিছু মানুষ নিজের দুর্বল দিক তুলে ধরেও মানুষের প্রশংসায় ভাসেন। কেন? কারণ, তাঁরা এমন কিছু শেয়ার করেন, যা করতে বুকের পাটা লাগে। কিছু দুর্বল দিক শেয়ার করলে মানুষ দৃশ্যত আপনার ভেতরে খুঁত খুঁজে পাবে ঠিকই, কিন্তু এটা আপনাকে সামাজিকভাবে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।
ধরুন, আপনি একসময় চরম দরিদ্র ছিলেন। কিন্তু এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আপনার দারিদ্র্য তুলে ধরলে কেউ কেউ হয়তো এটাকে আপনার দুর্বলতা ভেবে ভুল করবে, কিন্তু বেশির ভাগের কাছেই আপনি সংগ্রামী এবং লড়াকু হিসেবে প্রশংসিত হবেন।
দুর্বল দিক তুলে ধরার ক্ষেত্রে একটা বিষয় মনে রাখতে পারেন, বিষয়টা যেন আপনার হেরে যাওয়া মনোভাবের পরিচায়ক না হয়। বরং তা যেন অন্যদের জন্য হয়ে ওঠে প্রেরণাদায়ী। এমন আপাত দুর্বল দিক আপনাকে অন্যের সামনে সবল করেই উপস্থাপন করবে।
৬. শরীর যেখানে, মনও সেখানে:
মাঝেমধ্যে খেয়াল করবেন, কিছু মানুষ কোনো অনুষ্ঠানে একত্র হলেও তাঁদের মন সেখানে নেই। তাঁদের শরীর এক স্থানে তো মন আরেক জায়গায়। ফলে তাঁরা মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, হাসছেন, মিশছেন বটে, আদতে কিছুই করছেন না। তাঁদের মন যেন ‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোন্খানে।’
কোনো মিলনমেলায় আপনি ‘ওখানে’ই থাকুন। অর্থাৎ আপনার শরীর যেখানে, মনটাকেও সেখানেই রাখুন। আপনার সামনের মানুষটাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। তাঁর কথাই সবচেয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
আপনার এই মনোযোগ মানুষকে আপনার প্রতি আরও মনোযোগী করবে। আপনার শরীর-মনের এই যৌথ উপস্থিতি আপনাকে অন্যের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণই করবে।
৭. বেশি ভালো ভালো নয়:
কথায় বলে, বেশি ভালো ভালো নয়। এটা মাথায় রাখুন। সব সময় অতিরিক্ত ভালোমানুষি দেখাবেন না। মাঝেমধ্যে ‘খারাপ’ হোন! ভাবছেন, এ কেমন সুপরামর্শ? শুনুন, সব সময় খারাপ আচরণ করা, আর মাঝেমধ্যে রুদ্রমূর্তি ধারণ করা এক নয়।
অনেক মানুষ সাত চড়েও রা করেন না। ফলে বাকিরা তাঁকে বোকা হিসেবেই চিহ্নিত করে। একটানা এই ভালোমানুষী তাঁর সম্পর্কে মানুষের প্রত্যাশাও বাড়িয়ে দেয়। ফলে কোনো সময় প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সামান্য ফারাকও অন্যরা মেনে নিতে চান না। আবার একটানা ভালো আচরণ মানুষের ভেতরে একঘেয়েমি তৈরি করে, অন্যরাও তাঁকে একঘেঁয়ে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে।
তাই মাঝেমধ্যে সামান্য ‘দুষ্টু’ হওয়ায় তেমন ক্ষতি নেই। এতে সম্পর্কে বৈচিত্র্য আসে। একঘেঁয়েমি কাটে। মানুষও আপনাকে নির্বোধ ভাবায় ক্ষান্তি দেবে। আপনাকে যে চাইলেই ‘ব্যবহার’ করা যায় না, সেটাও লোকজনকে বুঝতে দিতে হবে। আর জানেনই তো, যাকে চাইলেই পাওয়া যায়, অর্থাৎ যার সরবরাহ বেশি, তার চাহিদাও কম।
সুতরাং নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরতে মাঝেমধ্যে কম ভদ্র, দুষ্টুমিষ্টি আচরণ করুন। এতে মানুষ আপনাকে আরও ভালোই বাসবে। @ Paint with Ashraf
_____________
সূত্র: মিডিয়াম
লক্ষ্য শুধু বেশি আয় নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি জীবন গড়ে তোলা, যেখানে টাকা উপার্জনের জন্য আপনার প্রতিটি ঘণ্টা বিক্রি করতে না হয়।
ভাবুন তো, সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি নিজের ইচ্ছামতো সময় কাটাতে পারেন, পরিবারের সঙ্গে বসে চা খেতে পারেন, সন্তানের বড় হয়ে ওঠা দেখতে পারেন কিংবা নিজের কোনো স্বপ্ন পূরণে কাজ করতে পারেন—তাহলেই কি জীবন আরও অর্থবহ হবে না?
অনেকেই বেশি আয়ের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—সময়—হারিয়ে ফেলেন। অথচ প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই আসে, যখন আপনার আয় ধীরে ধীরে আপনার উপস্থিতির উপর কম নির্ভরশীল হয়ে যায়।
কারণ দিনের শেষে টাকা আবার উপার্জন করা যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময় আর কখনও ফিরে আসে না।
তাই নিজেকে প্রশ্ন করুন: আপনি কি শুধু বেশি টাকা আয় করতে চান, নাকি এমন একটি জীবন চান যেখানে আপনার সময়ের মালিক আপনিই?
২০
নীরবতা সবসময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়
একটি ব্যস্ত মিটিং, পারিবারিক আড্ডা কিংবা বন্ধুমহলের আলোচনায় আমরা সাধারণত সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করি সেই মানুষটিকে, যে সবচেয়ে বেশি কথা বলে। আর যে চুপচাপ বসে থাকে, তাকে প্রায়ই লাজুক, অনাগ্রহী বা আত্মবিশ্বাসহীন বলে মনে করা হয়। কিন্তু মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, অনেক নীরব মানুষ আসলে কথোপকথন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তারা চারপাশের তথ্য অন্যদের তুলনায় অনেক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে। যখন কেউ একটি কথা বলে, তখন দ্রুত উত্তর দেওয়ার বদলে তাদের মস্তিষ্ক সেই তথ্যকে বিভিন্ন দিক থেকে যাচাই করতে শুরু করে। কথাটির প্রকৃত অর্থ কী, এর পেছনে কী যুক্তি রয়েছে, এবং সবচেয়ে সঠিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে—এসব নিয়ে তারা ভাবতে থাকে। অনেক সময় এই বিশ্লেষণ শেষ হতে হতে আলোচনার বিষয়ই বদলে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তর্মুখী বা অপেক্ষাকৃত নীরব ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের কিছু অংশ বহির্মুখী মানুষের তুলনায় বেশি সক্রিয় থাকে। বিশেষ করে পরিকল্পনা, সমস্যা সমাধান এবং গভীর চিন্তার সঙ্গে যুক্ত অঞ্চলগুলো বেশি কাজ করে। অর্থাৎ তারা কম কথা বললেও, তাদের মস্তিষ্ক প্রায়ই বেশি ব্যস্ত থাকে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও দেখেছেন, অনেক অন্তর্মুখী মানুষের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স অঞ্চলে তুলনামূলক বেশি গ্রে ম্যাটার থাকে। মস্তিষ্কের এই অংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিমূর্ত চিন্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে তারা সাধারণত হঠাৎ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আগে চিন্তা করতে পছন্দ করে।
সমস্যা হলো, আধুনিক সমাজ দ্রুত প্রতিক্রিয়াকে বেশি মূল্য দেয়। অফিস মিটিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা সাধারণ আলোচনায় যে ব্যক্তি সবার আগে কথা বলে, তাকেই প্রায়শই বেশি আত্মবিশ্বাসী বা দক্ষ বলে ধরা হয়। ফলে যারা চিন্তা করার জন্য কিছুটা সময় নেয়, তাদের অবদান অনেক সময় চোখে পড়ে না।
তবে গবেষকরা বলছেন, নীরব মানুষেরা প্রায়ই এমন অনেক সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষ্য করে যা অন্যরা এড়িয়ে যায়। তারা কথোপকথনের ভেতরের আবেগ, অস্বস্তি, লুকানো সংকেত কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ছোট মন্তব্যগুলো মনে রাখে। অনেক ক্ষেত্রে পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে সঠিক চিত্রটি তাদের কাছেই থাকে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নীরবতা সবসময় দুর্বলতার লক্ষণ নয়। কখনও কখনও এটি গভীর মনোযোগ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং চিন্তার পরিপক্বতার প্রতিফলন হতে পারে। যে ব্যক্তি কম কথা বলে, তার মানে এই নয় যে তার বলার কিছু নেই; বরং সে হয়তো এমন কিছু বলতে চায়, যা ভেবে-চিন্তে বলা এবং সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। @ Science News
তথ্যসূত্র:
1. Debra L. Johnson et al., Cerebral Blood Flow and Personality: A Positron Emission Tomography Study, American Journal of Psychiatry (1999). গবেষণায় দেখা যায়, অন্তর্মুখী ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব ও অ্যান্টেরিয়র থ্যালামাসে তুলনামূলক বেশি রক্তপ্রবাহ দেখা যায়।
2. Differences in regional brain volume related to the extraversion–introversion dimension:
২১
একজন মানুষের মধ্যে খুঁজুন মাত্র ৩টি গুণ
Look for 3 things in a person: Intelligence, Energy & Integrity. If they don't have the last one, don't even bother with the first two... Buffett
আমরা জীবনে অসংখ্য মানুষের সাথে পরিচিত হই। কেউ খুব মেধাবী, কেউ অসাধারণ পরিশ্রমী, আবার কেউ কথার জাদুতে সবাইকে মুগ্ধ করে। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যায় কাকে সত্যিই বিশ্বাস করা যায়?
ওয়ারেন বাফেটের মতে, একজন মানুষের মধ্যে তিনটি গুণ খুঁজতে হবে: বুদ্ধিমত্তা, কর্মশক্তি এবং সততা।
বুদ্ধিমত্তা একজন মানুষকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কর্মশক্তি তাকে স্বপ্ন পূরণের জন্য নিরলসভাবে কাজ করতে শেখায়। কিন্তু এই দুটি গুণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সততা।
কারণ সততা ছাড়া বুদ্ধিমত্তা হয়ে উঠতে পারে প্রতারণার হাতিয়ার, আর কর্মশক্তি ভুল পথে ব্যবহৃত হতে পারে অন্যের ক্ষতির জন্য। একজন অসৎ কিন্তু মেধাবী মানুষ যতটা ক্ষতি করতে পারে, একজন কম মেধাবী সৎ মানুষ ততটা কখনোই পারে না।
আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, বন্ধুত্ব, ব্যবসা কিংবা কর্মক্ষেত্র—সব জায়গায় সম্পর্কের ভিত্তি হলো বিশ্বাস। আর বিশ্বাসের মূল শিকড় হচ্ছে সততা।
তাই পরেরবার যখন কাউকে মূল্যায়ন করবেন, শুধু সে কতটা স্মার্ট বা কতটা পরিশ্রমী তা দেখবেন না। দেখুন তার চরিত্র কেমন। কারণ মেধা আপনাকে সাফল্য এনে দিতে পারে, কিন্তু সততাই সেই সাফল্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগ হলো সৎ মানুষের ওপর আস্থা রাখা।
২২
পেঙ্গুইনের ৫৫০ মিটার গভীরতায় ডুব দেওয়ার ক্ষমতা
পেঙ্গুইন পাখি গোত্রের প্রাণী হলেও তারা আকাশে উড়তে পারে না। তবে ডানা ঝাপটে নীল আকাশে ওড়ার এই ব্যর্থতাকে তারা পুষিয়ে নিয়েছে সমুদ্রের নীল জলে দুর্দান্ত ডাইভিং বা ডুব দেওয়ার দক্ষতার মাধ্যমে। বরফশীতল অ্যান্টার্কটিকার বাসিন্দা 'এম্পারর পেঙ্গুইন' (Emperor Penguin) বা রাজকীয় পেঙ্গুইনরা কেবল তাদের প্রজাতির মধ্যেই সবচেয়ে বড় নয়, বরং তারা পাখি জগতের অন্যতম সেরা ডুবুরি। সাধারণত এরা খাবারের খোঁজে সমুদ্রের ১০০ থেকে ২০০ মিটার গভীর পর্যন্ত অনায়াসে যাতায়াত করে। তবে বিজ্ঞানীদের রেকর্ডে এদের সর্বোচ্চ গভীরতায় ডুব দেওয়ার যে প্রমাণ মিলেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য—একটি এম্পারর পেঙ্গুইন সমুদ্রের ৫৫০ মিটারেরও (১৮০০ ফুটের বেশি) বেশি গভীরতায় ডুব দিতে সক্ষম হয়েছিল! এই তথ্যটি সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে সম্পূর্ণ সত্য।
একটি পাখির জন্য সমুদ্রের এত গভীরে যাওয়া কেন অলৌকিক, তা বুঝতে হলে পানির নিচের চাপ বা প্রেশার সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। ৫৫০ মিটার গভীরে পানির চাপ উপরিভাগের চেয়ে প্রায় ৫০ গুণেরও বেশি থাকে। এই প্রচণ্ড চাপে যেকোনো সাধারণ প্রাণীর ফুসফুস চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু পেঙ্গুইনের শারীরিক গঠন এই চরম পরিবেশ সহ্য করার জন্যই তৈরি হয়েছে।
গভীর সমুদ্রে ডুব দেওয়ার সময় এম্পারর পেঙ্গুইনরা তাদের ফুসফুসের সমস্ত বাতাস বাইরে বের করে দেয়। এর ফলে ফুসফুসটি সংকুচিত হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত চাপের কারণে তা ফেটে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না। ফুসফুসে বাতাস না থাকায় তারা অক্সিজেনের জন্য নির্ভর করে তাদের রক্ত এবং পেশির ওপর। তাদের রক্তে প্রচুর পরিমাণে হিমোগ্লোবিন এবং পেশিতে 'মায়োগ্লোবিন' (Myoglobin) নামক বিশেষ প্রোটিন থাকে, যা বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন ধরে রাখতে পারে।
এর পাশাপাশি, পানির নিচে অক্সিজেনের ব্যবহার কমাতে পেঙ্গুইনরা তাদের হৃদস্পন্দন বা হার্ট রেট মারাত্মকভাবে কমিয়ে ফেলে। মিনিটে যেখানে তাদের স্বাভাবিক হৃদস্পন্দন থাকে ৬০ থেকে ১০০ বার, ডাইভিংয়ের সময় তা কমে মাত্র ১৫ থেকে ২০ বারে নেমে আসে। এমনকি তাদের শরীরের কিছু অনাবশ্যক অঙ্গে রক্ত সঞ্চালন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যাতে সেই মূল্যবান অক্সিজেন কেবল মস্তিস্ক এবং সাঁতার কাটার পেশিতে ব্যবহার করা যায়।
সাধারণত এম্পারর পেঙ্গুইনরা পানির নিচে এক এক বারে ৩ থেকে ৬ মিনিট কাটায়, তবে প্রয়োজনে তারা টানা ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত দম আটকে রাখতে পারে। অ্যান্টার্কটিকার কনকনে ঠান্ডা সাগরে স্কুইড, মাছ এবং ক্রিল শিকারের জন্য পেঙ্গুইনের এই ৫৫০ মিটার গভীরতায় ডুব দেওয়ার ক্ষমতা প্রকৃতির এক অসাধারণ বিবর্তন ও প্রকৌশল।
@ Ahmed Pipul
২৩
পরিবর্তনই পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্যের বিস্ফোরণ ঘটাতে সাহায্য করে
সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Ecology & Evolution-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা এমন একটি ধারণা তুলে ধরেছেন, যা পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করতে পারে। গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন Emily G. Mitchell এবং Andrea Manica। তাঁদের মতে, পৃথিবীর প্রথম দিকের প্রাণীরা লাখ লাখ বছর ধরে খুব ধীরে বিবর্তিত হয়েছিল, কারণ তারা মূলত নিজেদেরই কপি তৈরি করত। ফলে নতুন বৈশিষ্ট্য বা নতুন প্রজাতি তৈরির গতি ছিল অত্যন্ত কম।
প্রায় ৬০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর সমুদ্রে অদ্ভুত কিছু প্রাণী বাস করত। তাদের অনেকের মুখ ছিল না, পেট ছিল না, এমনকি চলাফেরাও করতে পারত না। তারা সমুদ্রের পানি থেকে সরাসরি পুষ্টি শোষণ করে বেঁচে থাকত। বংশবৃদ্ধির জন্য তারা নিজেদের মতোই আরেকটি প্রাণী তৈরি করত, অনেকটা গাছের ডাল থেকে নতুন চারা গজানোর মতো। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রায় একই রকম রয়ে যেত।
সমস্যা হলো, সবাই যখন একই রকম এবং সবাই মোটামুটি ভালোভাবেই বেঁচে আছে, তখন পরিবর্তনের তেমন দরকার পড়ে না। প্রতিযোগিতা কম থাকলে বিবর্তনের গতিও ধীর হয়ে যায়। গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা জীবাশ্ম, লেজার স্ক্যানিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে প্রাচীন প্রাণীসমাজের গঠন বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে অযৌন প্রজনন জীববৈচিত্র্যের বিস্তারকে সীমিত করে রাখতে পারে।
কিন্তু পরে পরিবেশ বদলাতে শুরু করে। সমুদ্রে ঝড় বাড়ে, খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়, আর বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে ওঠে। তখন কিছু প্রাণী যৌন প্রজননের পথে যায়। এর ফলে বিভিন্ন প্রাণীর জিন একসঙ্গে মিশে নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি হতে থাকে। কেউ দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে, কেউ নতুন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, আবার কেউ নতুন ধরনের জীবনধারা গড়ে তোলে।
গবেষকদের মতে, এই পরিবর্তনই পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্যের বিস্ফোরণ ঘটাতে সাহায্য করে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর প্রাণীরা যদি শুধু নিজেদের কপি বানিয়েই যেত, তাহলে হয়তো আজকের রঙিন ও বৈচিত্র্যময় প্রাণিজগৎ কখনোই তৈরি হতো না। মানুষসহ অসংখ্য প্রাণীর অস্তিত্বের পেছনে তাই যৌন প্রজননের ভূমিকা হয়তো আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বড়। @ Science News
২৪
কথোপকথন টেনিস খেলার মতো হওয়া উচিত, যেখানে দুপক্ষই অংশ নেয়।
এই আর্টিকেলে এমন 5টি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে যা মানুষ নিজেদের "আকর্ষণীয়" প্রমাণ করার জন্য আলোচনায় নিয়ে আসে, কিন্তু আসলে তা অন্যদের জন্য বিরক্তিকর বা ক্লান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়।
১. অতীতের সোনালী দিনগুলো নিয়ে পড়ে থাকা: "আমি যখন কলেজে ছিলাম..." বা "আমি যখন বিদেশে ছিলাম..."—এই ধরনের পুরনো গল্প বারবার বলা ক্লান্তিকর। সবসময় অতীতে বাস করলে মনে হয় বর্তমান জীবনে আপনার বলার মতো নতুন কিছু নেই।
২. সবসময় "ব্যস্ত" থাকার গল্প: সবসময় নিজেকে খুব ব্যস্ত দেখানো বা হাতে একদম সময় নেই—এমন কথা বলা আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করে না। বরং এটি বোঝায় যে আপনি নিজের সময় ঠিকমতো সামলাতে পারছেন না। এটি শুনতে অনেকটা প্রতিযোগিতার মতো মনে হয়, যা অন্যদের ক্লান্ত করে।
৩. ডায়েট এবং স্বাস্থ্যের জ্ঞান দেওয়া: আপনি কী খাচ্ছেন বা কোন ডায়েট করছেন তা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু খাবারের টেবিলে বসে অন্যদের ডায়েট নিয়ে জ্ঞান দেওয়া বা নিজের সাপ্লিমেন্ট নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা আড্ডার আনন্দ নষ্ট করে দেয়।
৪. বড় বড় মানুষের নাম নেওয়া: কথার মাঝখানে কোনো বড় কোম্পানির সিইও বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে আপনার খাতির আছে—এমনটা বারবার বোঝানো বেশ দৃষ্টিকটু। যারা সত্যিই আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী, তারা সাধারণত কার সাথে তাদের পরিচয় তা নিয়ে বড়াই করেন না।
৫. বিনিয়োগ এবং আয়ের হিসাব দেওয়া: শেয়ার বাজার, ক্রিপ্টোকারেন্সি বা রিয়েল এস্টেটে আপনার সাফল্য নিয়ে সব জায়গায় আলাপ করা ঠিক নয়। যদি কেউ আর্থিক পরামর্শ না চায়, তবে আগ বাড়িয়ে নিজের পোর্টফোলিও বা লাভের গল্প শোনানো মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়।
আসল আকর্ষণীয় মানুষ তারা নয় যারা শুধু নিজেদের কথা বলে, বরং তারা—যারা অন্যের কথা মন দিয়ে শোনে এবং প্রশ্ন করে। কথোপকথন টেনিস খেলার মতো হওয়া উচিত, যেখানে দুপক্ষই অংশ নেবে। শুধু নিজের গুণগান গাইলে অপরপক্ষ দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। @ Paint with Ashraf
_____________________
সূত্র: গ্লোবাল ইংলিশ এডিটিং
২৫
বাঁশ' (Bamboo)
উদ্ভিদ জগতের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল উদ্ভিদ কোনটি, তা নিয়ে যদি প্রতিযোগিতা হয়, তবে নিঃসন্দেহে প্রথম পুরস্কারটি পাবে 'বাঁশ' (Bamboo)। ঘাস গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এই উদ্ভিদটি তার অবিশ্বাস্য বৃদ্ধির গতির জন্য গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, বাঁশের এমন কিছু বিশেষ প্রজাতি রয়েছে যা মাত্র ২৪ ঘণ্টায় বা একটিমাত্র দিনে ৩৫ ইঞ্চি (প্রায় ৩ ফুট বা ৯১ সেন্টিমিটার) পর্যন্ত বাড়তে পারে। শুধু তাই নয়, যেখানে একটি সাধারণ গাছের পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে কয়েক দশক বা ২০-৩০ বছর সময় লেগে যায়, সেখানে বাঁশের কিছু প্রজাতি মাত্র ৯০ দিনের (৩ মাস) মধ্যে তাদের পূর্ণ উচ্চতা ও পরিপক্কতা লাভ করে। এই তথ্যটি উদ্ভিদবিজ্ঞানের ইতিহাসে সম্পূর্ণ সত্য।
বাঁশের এই অলৌকিক গতিতে বড় হওয়ার পেছনে রয়েছে এক চমৎকার প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক কৌশল। সাধারণ গাছপালা যেভাবে বাড়ে, বাঁশের বৃদ্ধির প্রক্রিয়া তার চেয়ে একদম আলাদা।
সাধারণ গাছের বৃদ্ধি ঘটে কেবল তার ডালপালা বা কাণ্ডের অগ্রভাগে থাকা কোষ বিভাজনের মাধ্যমে। কিন্তু একটি বাঁশঝাড়ের মাটির নিচে 'রাইজোম' (Rhizome) নামক এক ধরণের জটিল ও বিশাল শিকড়ের নেটওয়ার্ক বা জাল ছড়ানো থাকে। এই রাইজোমগুলো মাটির নিচে বিপুল পরিমাণ পুষ্টি ও শক্তি জমা করে রাখে।
যখন বর্ষাকাল বা উপযুক্ত সময় আসে, তখন মাটির নিচ থেকে বাঁশের কোঁড়ল বা অঙ্কুর (Shoot) বের হয়। এই কোঁড়লগুলোর ভেতরে প্রতিটি গিঁট বা পর্ব (Node) আগে থেকেই তৈরি থাকে। মাটির ওপরে আসার পর বাঁশটি নতুন কোনো কোষ তৈরি করে না, বরং মাটির নিচের শিকড় থেকে পাওয়া পুষ্টির জোরে হুট করে বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে ভেতরের কোষগুলোকে লম্বা করতে শুরু করে। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কোষের প্রসারণ বা 'সেল ইলংগেশন' (Cell elongation) বলা হয়।
যেহেতু বাঁশকে নতুন করে কোষ তৈরি করতে হয় না, তাই এটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১.৫ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে! আপনি যদি একটি বাঁশঝাড়ের পাশে নিরিবিলি বসে থাকেন, তবে এর বৃদ্ধির মৃদু শব্দও শুনতে পেতে পারেন। মাত্র ৯০ দিনে পূর্ণ উচ্চতায় (কিছু প্রজাতি ১০০ ফুট পর্যন্ত) পৌঁছানোর পর অবশ্য বাঁশটি আর লম্বায় বাড়ে না। পরবর্তী ২ থেকে ৫ বছর ধরে এটি কেবল নিজের ভেতরের কাঠকে শক্ত ও মজবুত করে তোলে। প্রকৃতির এই দ্রুততম উদ্ভিদের কারণেই আজ পরিবেশবান্ধব কাগজ, আসবাবপত্র এবং টেকসই বাড়ি তৈরিতে বাঁশ এক অমূল্য ও নবায়নযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। @ Ahmed Pipul
২৬
আরব বিদ্রোহ
১০ই জুন, ১৯১৬ সালে ঠিক মক্কার শরিফ হুসাইন রাইফেল হাতে বিদ্রোহের প্রথম গুলিটি ছুড়েছিলেন। উসমানীয় ব্যারাকে লক্ষ্য করে ছোড়া এই বারুদের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা ঘটেছিল আরব বিদ্রোহের, যা ছিল মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই বিদ্রোহের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, আরব জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং ব্রিটিশদের সাথে সম্পাদিত গোপন হুসাইন-ম্যাকমাহন চুক্তি।
১৯১৬ সালে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহে ব্রিটিশরা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা শরিফ হুসাইনকে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে এবং আরব জাতীয়তাবাদীদের সংগঠিত করতে উৎসাহিত করে, যার বিনিময়ে যুদ্ধোত্তর আরব রাষ্ট্রগুলোতে ব্রিটিশ প্রভাব প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
শরিফ হুসাইনের নেতৃত্বে সেইদিন প্রায় ৪,০০০ বেদুইন অশ্বারোহী লোহিত সাগরের উসমানীয় অধ্যুষিত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী জেদ্দায় আক্রমণ চালায়। একই সাথে প্রায় ৩,৫০০ জন বিদ্রোহী আরব ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এবং সামুদ্রিক বিমানের বোমাবর্ষণের সরাসরি সহায়তা নিয়ে জেদ্দায় উসমানীয়দের ওপর চড়াও হয়।
যদিও প্রাথমিক অবস্থায় সেখানকার ১,৫০০ উসমানীয় সৈন্য মেশিনগান এবং কামানের গোলার সাহায্যে বীরত্বের সাথে লড়াই করে আক্রমণকারীদের প্রতিহত করেছিল, যা সাময়িকভাবে বেদুইনদের মনোবল ভেঙে দেয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি; ব্রিটিশদের ব্যাপক সামরিক সহায়তার মুখে শেষ পর্যন্ত ১৬ই জুন জেদ্দার উসমানীয় গ্যারিসন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
জেদ্দার পাশাপাশি মদিনার উসমানীয় সেনাদল ফখরি পাশার যোগ্য নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। একপর্যায়ে ফখরি পাশা অন্তত দুটি ব্রিগেড সৈন্য নিয়ে মদিনা থেকে সাহসিকতার সাথে বের হয়ে আসেন এবং আরব বিদ্রোহীদের পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে তাদের দক্ষিণ দিকে তাড়া করে নিয়ে যান।
মূলত, এই বিদ্রোহ শুরু হওয়ার কিছুকাল আগেই গ্যালিপলির যুদ্ধে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে উসমানীয়রা ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে, যা ব্রিটিশ জেনারেলদের গভীরভাবে শঙ্কিত করে তুলেছিল। সমগ্র বিশ্বে ব্রিটিশদের এই পরাজয়ের প্রতিধ্বনি কেমন হতে পারে, তা নিয়ে তারা চিন্তিত ছিল। ব্রিটিশরা আশঙ্কা করেছিল যে, উসমানীয়দের কাছে তাদের সাম্প্রতিক একের পর এক পরাজয় ঔপনিবেশিক মুসলিমদের মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কায়রো এবং হোয়াইটহলের ব্রিটিশ যুদ্ধ পরিকল্পনাবিদরা একটি কৌশলগত চাল চালেন। তারা আশা করেছিলেন যে, ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর অধিবাসীদের সাথে একটি জোট করা গেলে তা উসমানীয় খলিফার ঘোষিত জি হা দে র দাওয়াতকে বিশ্ব মুসলিমের কাছে নিষ্ক্রিয় করে দেবে।
কারণ সে সময় যুদ্ধের শুরু থেকে ব্রিটিশদের সামরিক গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একবারে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। একইসাথে উসমানীয়দের পুরোপুরি কোণঠাসা করতে ব্রিটেন এক অদ্ভুত দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করে। তারা একদিকে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে সমর্থন নিশ্চিত করতে মক্কার শরিফ হুসাইনের সাথে আলোচনা চালাচ্ছিল।
অন্যদিকে গোপনে জায়নবাদীদের সাথেও সমঝোতা করছিল। এর বিনিময়ে ব্রিটিশরা প্রথম পক্ষকে আরবের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতি দেওয়ার এবং দ্বিতীয় পক্ষকে ফি লি স্তিনের বুকে একটি জায়নবাদী মাতৃভূমি গড়ে দেওয়ার সমান্তরাল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
এই মহাযুদ্ধে ব্রিটিশরা বিদ্রোহীদের বিভিন্ন উপায়ে সরাসরি সাহায্য করেছিল। তারা বিদ্রোহীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ, আধুনিক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও যুদ্ধ সরঞ্জাম সরবরাহ করে, উসমানীয়দের বিরুদ্ধে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক স্বীকৃতি পেতে সহায়তা করে।
শরিফ হুসাইন ব্রিটিশদের এই সর্বাত্মক সহায়তায় উসমানীয়দের বিতাড়িত করে হেজাজে একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন এবং হেজাজ স্বাধীনতা অর্জন করে। যুদ্ধশেষে শরিফ হুসাইন হেজাজের রাজা হন, তাঁর এক ছেলে ফয়সাল ইরাকের রাজা এবং আরেক ছেলে আবদুল্লাহ জর্ডানের রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত হন।
অপর দিকে, ব্রিটিশদের মূল লক্ষ্যও সফল হয়। তারা উসমানীয় সাম্রাজ্যকে সম্পূর্ণ দুর্বল ও খণ্ডবিখণ্ড করে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন পরাশক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয় এবং এই অঞ্চলের বেশিরভাগ অংশে নিজেদের ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে।
তবে সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের উপর এই হেজাজ বিদ্রোহের প্রভাব ছিল অত্যন্ত জটিল ও সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, এটি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে গভীর ফাটল তৈরি করে। আর সাধারণ মুসলমানদের একটি বড় অংশ উসমানীয় খেলাফতের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার পক্ষে ছিল, আর বিচ্ছিন্নবাদীরা ছিল বিদ্রোহীদের সমর্থক।
বিদ্রোহের পর এই অঞ্চলে উসমানীয়দের অবসান ঘটলেও প্রকারান্তরে মুসলমানদের ওপর ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসনই প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এই বিদ্রোহের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও নেতিবাচক প্রভাবটি ছিল মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ফাটলে 'আরব জাতীয়তাবাদ' নামক সংকীর্ণ ধারণার চরম উত্থান, যা পরবর্তীতে ফিলিস্তিনের মাটিতে হিস্রায়েল নামক একটি অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছিল। @ Searching History
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল এবং উদীয়মান আইটি খাত প্রতিনিয়ত দক্ষ জনবলের অভাবের কথা বলে আসছে। এই বড় বড় শিল্পের শীর্ষ ও মধ্যম সারির ম্যানেজমেন্ট পদের জন্য দেশীয় গ্র্যাজুয়েটদের কারিগরি অদক্ষতা ও ইংরেজি যোগাযোগের দুর্বলতার কারণে কোম্পানিগুলো প্রতি বছর পার্শ্ববর্তী দেশ (যেমন ভারত, শ্রীলঙ্কা) থেকে উচ্চ বেতনে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনারেল সাবজেক্ট থেকে পাস করা লাখো তরুণ একটি সাধারণ সরকারি কেরানির চাকরি বা ব্যাংকের ফ্রন্ট-ডেস্কের এন্ট্রি-লেভেল পদের জন্য লাখো মানুষের লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। এটি কোনো শিক্ষাব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি সনদ উৎপাদনকারী কারখানা, যা দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান না রেখে কেবল শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের নিয়ে গঠিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন বুয়েট, রুয়েট, কুয়েট, চুয়েট বা সরকারি মেডিকেল কলেজ) গ্র্যাজুয়েটদের প্রায় ৫০% থেকে ৬০% পাস করার পরপরই উচ্চশিক্ষার নাম করে স্থায়ীভাবে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন।
২৭
উচ্চশিক্ষার গোলকধাঁধা এবং কর্মসংস্থানের সংকট:
THE EDUCATION DILEMMA AND EMPLOYMENT CRISIS: BANGLADESH'S REALITY
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে পরিমাণগত অর্জন গুণগত মানকে গ্রাস করে ফেলেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে লিঙ্গসমতা এবং সর্বজনীন ভর্তির হার নিশ্চিত করে দেশ আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হলেও, উচ্চশিক্ষার স্তরে পৌঁছানোর পর পুরো ব্যবস্থাটি একটি বড় ধরনের কাঠামোগত সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
একদিকে বিপুল অর্থ ও রাষ্ট্রীয় বাজেটের ব্যয়, অন্যদিকে বেকারত্ব ও মেধার অবমূল্যায়ন—সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা আজ দেশের তরুণ সমাজ এবং তাদের পরিবারের জন্য এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
এই বাস্তবতার আলোকেই নিচে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন স্তর, কর্মসংস্থানের বাজার এবং সামগ্রিক সংকটের একটি গভীর ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
১. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যয়বহুল শিক্ষা: মধ্যবিত্তের বিনিয়োগ বনাম শূন্য প্রাপ্তি
বিগত দুই দশকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সীমিত আসনের বিপরীতে বিকল্প হিসেবে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই খাতের বিস্তার দেশের একটি বড় অংশের পরিবারকে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
* পারিবারিক ঋণের ফাঁদ: একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বছরের স্নাতক সম্পন্ন করতে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে ন্যূনতম ৪ থেকে ১২ লক্ষ টাকা (নামকরা প্রতিষ্ঠান এবং ইঞ্জিনিয়ারিং/বিবিএ কোর্সের ক্ষেত্রে যা আরও অনেক বেশি) ব্যয় হয়। বাংলাদেশের একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব। ফলে অনেক বাবা-মা জমি বিক্রি করে, জমানো প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলে কিংবা চড়া সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে সন্তানের পড়ার খরচ জোগান। এই আশায় যে, পড়াশোনা শেষ করে সন্তান দ্রুত ভালো একটি চাকরি পেয়ে পরিবারের হাল ধরবে।
* কোটা ও সংকুচিত কর্পোরেট বাজার: পড়াশোনা শেষে চাকরির বাজারে পা রাখতেই এই শিক্ষার্থীরা বাস্তবতার এক রূঢ় দেয়ালে ধাক্কা খান। দেশের কর্পোরেট খাত ও প্রাইভেট সেক্টর অত্যন্ত সংকুচিত। তার ওপর সরকারি চাকরিতে নানাবিধ অস্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এবং কোটা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মেধাবী ও সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার মাঠ থেকে অনেকটাই ছিটকে দেয়।
* পারিবারিক বোঝা হয়ে ওঠার মনস্তাত্ত্বিক চাপ: কোটি টাকার বিনিয়োগ ও চার-পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর যখন একজন গ্র্যাজুয়েট বছরের পর বছর বেকার বসে থাকেন, তখন তিনি পরিবারের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার পরিবর্তে উল্টো এক বড় মানসিক বোঝা হিসেবে পরিগণিত হন। সমাজে নিজের সম্মান টিকিয়ে রাখতে অনেকেই বাধ্য হয়ে ১৫-২০ হাজার টাকার এন্ট্রি-লেভেল চাকরিতে যোগ দেন, যা দিয়ে তাদের নিজেদের যাতায়াত খরচই ঠিকমতো চলে না, পরিবারের ঋণ শোধ করা তো দূরের কথা।
২. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ বিস্ফোরণ: লক্ষ লক্ষ তরুণ, কিন্তু কাজ কোথায়?
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রটি হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এর অধীনে প্রায় ২,২৬০টিরও বেশি কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে বর্তমানে প্রায় ৪০ লক্ষ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।
* উদ্যোগহীন ও মানহীন ডিগ্রি: প্রতি বছর এই বিশাল সংখ্যক প্রতিষ্ঠান থেকে লক্ষ লক্ষ অনার্স ও মাস্টার্স গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছেন। কিন্তু এই কলেজগুলোর সিংহভাগেরই নেই কোনো আধুনিক ল্যাব, যুগোপযোগী কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা কিংবা কর্পোরেট যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় সফট স্কিল ও ইংরেজি ভাষার প্রশিক্ষণ। এখানে শিক্ষাব্যবস্থা মূলত বাজারের সস্তা গাইড বই মুখস্থ করা এবং পরীক্ষা পাসের সনাতনী সনদের ওপর নির্ভরশীল।
* শিল্প খাতের সাথে চরম অসঙ্গতি: বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল এবং উদীয়মান আইটি খাত প্রতিনিয়ত দক্ষ জনবলের অভাবের কথা বলে আসছে। এই বড় বড় শিল্পের শীর্ষ ও মধ্যম সারির ম্যানেজমেন্ট পদের জন্য দেশীয় গ্র্যাজুয়েটদের কারিগরি অদক্ষতা ও ইংরেজি যোগাযোগের দুর্বলতার কারণে কোম্পানিগুলো প্রতি বছর পার্শ্ববর্তী দেশ (যেমন ভারত, শ্রীলঙ্কা) থেকে উচ্চ বেতনে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছে।
* চাকরির বাজারের ভয়াবহ বাস্তব চিত্র: অন্যদিকে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনারেল সাবজেক্ট থেকে পাস করা লাখো তরুণ একটি সাধারণ সরকারি কেরানির চাকরি বা ব্যাংকের ফ্রন্ট-ডেস্কের এন্ট্রি-লেভেল পদের জন্য লাখো মানুষের লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। এটি কোনো শিক্ষাব্যবস্থা নয়, বরং এটি একটি সনদ উৎপাদনকারী কারখানা, যা দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান না রেখে কেবল শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে।
৩. বুয়েট ও শীর্ষ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটদের পেশা পরিবর্তন: রাষ্ট্রীয় অর্থের দৃশ্যমান অপচয়
সবচেয়ে বড় এবং বেদনাদায়ক অসঙ্গতিটি দৃশ্যমান হয় যখন আমরা দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের নিয়ে গঠিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন বুয়েট, রুয়েট, কুয়েট, চুয়েট বা সরকারি মেডিকেল কলেজ) গ্র্যাজুয়েটদের কর্মক্ষেত্র বিশ্লেষণ করি। দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কোটি কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে এই শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের প্রকৌশলী হিসেবে গড়ে তোলা হয়।
* মূল ডিসিপ্লিন ছেড়ে ব্যাংকিং ও বিসিএস-এ যোগদান: দেশে পর্যাপ্ত ভারী শিল্প, আরঅ্যান্ডডি ল্যাব, কিংবা বড় আকারের মেগা-প্রজেক্টে দেশীয় প্রকৌশলীদের অগ্রাধিকার না থাকায়, একজন মেকানিক্যাল, সিভিল বা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পাস করার পর দেশের বাজারে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ বা সামাজিক মর্যাদা পান না। অনেক ক্ষেত্রে একজন ইঞ্জিনিয়ারের প্রারম্ভিক বেতন একজন সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তা বা সরকারি কর্মকর্তার চেয়ে কম হয়। ফলস্বরূপ, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভালো বেতনের খোঁজে বুয়েটের অনেক চৌকস প্রকৌশলী বাধ্য হয়ে নিজেদের মূল ট্র্যাক ছেড়ে ব্যাংকের জেনারেল ক্যাডার কিংবা বিসিএস প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে যোগ দিচ্ছেন।
* রাষ্ট্রীয় মূলধনের অপচয়: একজন শিক্ষার্থীর পেছনে রাষ্ট্র যে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে তাকে প্রকৌশলী বানালো, তিনি যখন ব্যাংকের আইটিデスク কিংবা সাধারণ ফাইলে সই করার প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন তাঁর অর্জিত সেই বিশেষায়িত প্রকৌশল বিদ্যার কোনো ব্যবহার থাকে না। এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়।
* ব্রেইন ড্রেন: আবার যারা এই পেশাগত রূপান্তরের সাথে আপস করতে চান না, তাঁদের প্রায় ৫০% থেকে ৬০% পাস করার পরপরই উচ্চশিক্ষার নাম করে স্থায়ীভাবে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন। রাষ্ট্র বিপুল অর্থ খরচ করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করছে ঠিকই, কিন্তু তার সুফল ভোগ করছে উন্নত বিশ্ব।
গ্লোবাল তুলনা বনাম বাংলাদেশের অবস্থান: এক নজরে চিত্র
উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার এবং এর কার্যকারিতা বুঝতে Gross Enrollment Ratio (GER) in Tertiary Education (উচ্চশিক্ষায় মোট ভর্তির অনুপাত) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক।
* যুক্তরাজ্য (UK) [~৮০.১%]: আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ এবং শক্তিশালী আর্থিক সহায়তা নেটওয়ার্ক। উচ্চশিক্ষা সরাসরি গ্লোবাল ও লোকাল জব মার্কেটের সাথে যুক্ত।
* যুক্তরাষ্ট্র (USA) [~৭৯.৪%]: কমিউনিটি কলেজ মডেলের মাধ্যমে ২ বছরের ব্যবহারিক ও কারিগরি শিক্ষা অত্যন্ত জনপ্রিয়। সবাই শুধু সনদের জন্য ৪ বছরের ডিগ্রি নেয় না; কাজের দক্ষতাই মূল।
* জাপান (Japan) [~৬৪.৬%]: প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি Senmon Gakko (পেশাদার কারিগরি কলেজ) রয়েছে, যার কর্মসংস্থানের হার ৯৫% এর বেশি। তত্ত্বের চেয়ে প্রায়োগিক কারিগরি বিদ্যাকে সামাজিকভাবে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়।
* ভারত (India) [~৩২.৭%]: আইআইটি ও এনআইটি এর মাধ্যমে বিশ্বমানের টেক-লিডার তৈরি। নতুন শিক্ষানীতিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে GER ৫০% করার লক্ষ্য। নিজেদের দেশে বিপুল স্টার্ট-আপ ও বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে।
* বাংলাদেশ (Bangladesh) [~২৩.৭%]: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক। প্রায়োগিক শিক্ষার চরম অভাব। উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার যেমন কম, তেমনি যারা পাস করছে তাদের মধ্যেও বড় অংশই অদক্ষ ও বেকার।
বর্তমান সংকট ও উত্তরণের পথ (নিরপেক্ষ সমাধান)
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এই অচল অবস্থা থেকে টেনে তুলতে হলে সনাতনী চিন্তাভাবনা থেকে বের হয়ে আমূল সংস্কারের বিকল্প নেই।
[পুরোনো মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও বেকারত্ব] ──> (আমূল সংস্কার) ──> [কারিগরি দক্ষতা, শিল্প-শিক্ষা সমন্বয় ও টেকসই কর্মসংস্থান]
১. অনার্স-মাস্টার্সের আসন সংকোচন ও TVET-এর সম্প্রসারণ: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢালাওভাবে সবাইকে অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রি দেওয়ার আত্মঘাতী নীতি বন্ধ করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কলেজগুলোতে সাধারণ ডিগ্রির আসন কমিয়ে সেগুলোকে কারিগরি ও আইটি-ভিত্তিক ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটে (TVET) রূপান্তর করা দরকার। যুবসমাজকে বোঝাতে হবে যে, একটি বেকার অনার্স সনদের চেয়ে একটি কাজের মেকানিক্যাল বা কোডিং ডিপ্লোমা সার্টিফিকেটের মূল্য অনেক বেশি।
২. বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত সমন্বয় (Industry-Academia Collaboration): বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) মাধ্যমে বাধ্যতামূল করা উচিত যাতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম প্রতি দুই বছর পর পর দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের সমন্বয়ে গঠিত প্যানেল দ্বারা পরিমার্জিত হয়। স্নাতক ডিগ্রির শেষ বছরটিতে থিওরিটিক্যাল ক্লাসের পরিবর্তে ৬ মাসের বাধ্যতামূলক বেতনসহ ইন্টার্নশিপ চালু করতে হবে।
৩. সরকারি মেগা প্রজেক্টে দেশী প্রকৌশলীদের কোটা ও R&D বাজেট বৃদ্ধি: পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা মেট্রোরেলের মতো দেশের মেগা প্রজেক্টগুলোতে বিদেশি কনসালট্যান্ট ও ইঞ্জিনিয়ারদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বুয়েট বা অন্যান্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ গ্র্যাজুয়েটদের আকর্ষণীয় বেতনে যুক্ত করতে হবে। এছাড়া, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার (R&D) জন্য বাজেট অন্তত ৫ গুণ বাড়াতে হবে।
৪. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি যৌক্তিকীকরণ: বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লাগামহীন টিউশন ফি-র একটি সর্বোচ্চ সীমা রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারণ করা উচিত। পাশাপাশি, প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান এবং ল্যাবরেটরি উন্নয়নের পেছনে খরচ করার আইন কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে তার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সময় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (Demographic Dividend) বা তরুণ জনসংখ্যার বোনাসকাল পার করছে। কিন্তু এই তরুণদের আমরা যদি সঠিক কর্মমুখী শিক্ষা দিতে না পারি, তবে এই শক্তিই একদিন ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টার বা জনসংখ্যাগত বিপর্যয়ে রূপ নেবে।
রাষ্ট্র যতক্ষণ না পর্যন্ত শিক্ষার সনদের চেয়ে কাজের দক্ষতাকে এবং মেধার ভিত্তিতে সঠিক কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই উচ্চশিক্ষা তরুণদের জন্য স্বপ্ন পূরণের চাবিকাঠি না হয়ে, পরিবারগুলোর জন্য এক নীরব অভিশাপ হয়েই থাকবে।
~শাহ্। @Engr Sahadat
২৮
মুক্তিযুদ্ধ কেন অনন্য?
ভোটের বাক্স থেকে রণাঙ্গন: পৃথিবীর বিরলতম যুদ্ধ
একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি।
ফরাসি বিপ্লব হয়েছিল ভোটের মাধ্যমে? না।
রুশ বিপ্লব কি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে হয়েছিল? না।
চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লব? না।
১৯৪৭-এ পাকিস্তান সৃষ্টি? না।
তাহলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ?
হ্যাঁ। এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ভোটের বাক্স থেকে।
সংখ্যাটা আগে দেখুন।
৭ ডিসেম্বর, ১৯৭০।
পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাধারণ নির্বাচন।
৩০০ আসনের জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ পেল ১৬৭টি আসন — শুধু পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে পেল ২৮৮টি আসন।
সোজা কথা: বাংলার মাটিতে একচেটিয়া রায়।
গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
(সূত্র: The Daily Star; Bangladesh on Record)
তারপর কী হলো?
জেনারেল ইয়াহিয়া খান অ্যাসেম্বলি ডাকলেন না।
ভুট্টো বললেন, "পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কেউ ঢাকায় যাবে না।"
১ মার্চ, ১৯৭১ — অ্যাসেম্বলি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত।
আর ২৫ মার্চ রাতে শুরু হলো অপারেশন সার্চলাইট।
ঘুমন্ত মানুষের উপর ট্যাংক। বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলি। রিকশাওয়ালার বুকে বুলেট।
পাকিস্তানি মেজর সিদ্দিক সালিক নিজেই তাঁর বই Witness to Surrender-এ লিখেছেন — সেই রাতের বর্বরতার কথা।
এই যুদ্ধ কেন অনন্য — তিনটি কারণ:
১. গণতান্ত্রিক বৈধতা ছিল।
আওয়ামী লীগ বন্দুকের জোরে ক্ষমতা চায়নি। ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করেছিল।
২. আক্রান্ত হওয়ার আগে আঘাত করেনি।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীই প্রথম গুলি চালিয়েছে নিরস্ত্র মানুষের উপর। নৈতিক অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বাংলার পক্ষে।
৩. আন্তর্জাতিক জনমত তুলনামূলকভাবে দ্রুত গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের পক্ষে।
অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাস Sunday Times-এ লিখলেন। মার্কিন কংগ্রেসে বিতর্ক হলো। ভারত আন্তর্জাতিক মঞ্চে কথা বলল।
শেষ কথা:
ইতিহাসে অনেক বিপ্লব হয়েছে, অনেক স্বাধীনতা এসেছে।
কিন্তু যে জাতি ভোটে জিতে, আইনি পথে লড়ে, আক্রান্ত হয়ে অস্ত্র তুলে নিয়েছে —
সেই যুদ্ধের নৈতিক উচ্চতা পৃথিবীতে বিরল।
এটাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। এটাই আমাদের গর্ব।
পরের পর্বে: ১৯৪৭ কি সত্যিই স্বাধীনতা ছিল? মুসলিম লীগের আসল চেহারা।
@— Civic Pulse BD
২৯
সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী ও ক্রুসেডার বাহিনী
৪ঠা জুলাই , ১১৮৭ খ্রীষ্টাব্দ।
ক্রুসেডার বাহিনী জেরুজালেম থেকে হাতিনের প্রান্তরের উদ্দেশে রওনা হয়েছে সুলতান সালাউদ্দিনকে মোকাবেলা করার জন্য। ঐশ্বরিক সাহায্যে বিজয়ের ব্যাপারে তারা এতই নিশ্চিত ছিল যে, যোদ্ধারা সঙ্গে খ্রিস্ট ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র রেলিক "ট্রু ক্রস" সঙ্গে নিয়েছিল।
সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী এইরকম কোন অন্ধ আবেগ না দেখিয়ে ঠান্ডা মাথায় ক্রুসেডারদের মনস্তাত্ত্বিক ও জিওগ্রাফিকাল ট্র্যাপে ফেলে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করেন। সালাউদ্দিন বুঝতে পেরেছিলেন ভারী বর্ম পরিহিত ক্রুসেডার নাইটেদের সামনাসামনি যুদ্ধে পরাজিত করা কঠিন।
তিনি প্রথমে গ্যালিলি সাগরের (Sea of Galilee) তীরে অবস্থিত ক্রুসেডারদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি 'তিবরিয়া' (Tiberias) দুর্গ আক্রমণ করেন। ক্রুসেডার রাজা 'গাই অফ লুসিগনান' (Guy of Lusignan) তার বিশাল বাহিনী নিয়ে তিবরিয়া উদ্ধারের জন্য রওনা হন।
পানির উৎস নিয়ন্ত্রণ ও তৃষ্ণাকে অস্ত্র বানানো : হাতিনের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মাস্টারস্ট্রোক ছিল পানির নিয়ন্ত্রণ। ক্রুসেডারদের তিবরিয়া পৌঁছানোর রাস্তাটি ছিল মাইলের পর মাইল বিস্তৃত একটি জলহীন, শুষ্ক মরুভূমি।
সালাউদ্দিন ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রার পথের সমস্ত পানির কূপ এবং ঝরনা আগে থেকেই বন্ধ বা ধ্বংস করে দেন।
জেরুজালেম থেকে আসা ক্রুসেডাররা তীব্র গরমে ভারী লোহার বর্ম পরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চরম তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ে।
৩ জুলাই রাতে ক্রুসেডাররা যখন হাতিনের শিং (Horns of Hattin) নামক একটি পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন তারা সম্পূর্ণ পানি শূন্য ও ক্লান্ত ছিল। অন্যদিকে সালাউদ্দিনের বাহিনীর পেছনেই ছিল গ্যালিলি সাগরের পানির অফুরন্ত ভাণ্ডার।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং 'ধোঁয়ার প্রাচীর' : ৩ জুলাই রাতে ক্রুসেডাররা যখন তৃষ্ণায় ছটফট করছিল, সালাউদ্দিন তখন তাদের আরও মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার কৌশল নেন।
তিনি মুসলিম বাহিনীকে নির্দেশ দেন যুদ্ধক্ষেত্রের চারপাশের শুকনো ঘাস, গুল্ম এবং ঝোপঝাড়ে আগুন ধরিয়ে দিতে।
মরুভূমির গরম বাতাসের সাথে এই আগুনের উত্তপ্ত ও শ্বাসরোধকারী ধোঁয়া সরাসরি ক্রুসেডারদের শিবিরের দিকে যেতে থাকে। এতে তাদের চোখ-মুখ জ্বলে যায় এবং তৃষ্ণা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
সারারাত ধরে আহত মুসলিম যোদ্ধারা ড্রাম বাজিয়ে ও তাকবির ধ্বনি দিয়ে ক্রুসেডারদের ঘুমাতে দেয়নি, ফলে পরদিন সকালে তারা লড়াইয়ের শক্তি হারিয়ে ফেলে।
গতিশীল তীরন্দাজ বাহিনী (Hit and Run) : ৪ জুলাই সকালে যখন চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হয়, সালাউদ্দিন তার চটপটে এবং গতিশীল অশ্বারোহী তীরন্দাজদের (Mounted Archers) ব্যবহার করেন।
ক্রুসেডাররা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় গ্যালিলি সাগরের পানির দিকে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালালে, মুসলিম তীরন্দাজরা দূর থেকে অবিরাম তীর বৃষ্টি করতে থাকে। ক্রুসেডারদের ভারী নাইটরা ধীরগতির হওয়ায় এই হালকা ও দ্রুতগতির অশ্বারোহীদের ধরতে পারছিল না।
তৃষ্ণা, ধোঁয়া, ক্লান্তি এবং সালাউদ্দিনের নিখুঁত ঘেরাওয়ের (Encirclement) কারণে ক্রুসেডার বাহিনী সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। রাজা গাই অফ লুসিগনান এবং তাদের পবিত্র প্রতীক 'ট্রু ক্রস' (True Cross) সহ মুসলিমদের হাতে বন্দী হয়। এই একটি যুদ্ধের মাধ্যমেই জেরুজালেম জয় করার রাস্তা সালাউদ্দিনের জন্য পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। @Ahmed Rafique Barki
৩০
সিঙ্কোনা গাছ, সাম্রাজ্যবাদ ও একটি মহাদেশের আর্ত চিৎকার
এটি কোন গল্প নয়, নয় কোন কল্পকাহিনী, নিষ্ঠুর করুণ এক হৃদয় বিদারক ইতিহাস। মানুষ হয়ে মানুষকে পশুর মতো জীবনযাপনে বাধ্য করার, জুলুম, নির্যাতন ও হত্যার ঘৃণ্য ইতিহাস। এই ইতিহাস তাদের যারা আজ আমাদের সভ্যতা, মানবাধিকার, নারী অধিকারের বুলি শোনায়!
অবাক হওয়ার কিছু নেই রেনেসাঁর পর ইউরোপে উন্নতির ছোঁয়া লাগে, তারা নিজেদেরকে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে দেয়, তাদের সভ্যতা নির্মাণে শুরু হয় নির্মম দখলদারিত্ব, লুটপাট, দস্যুতা আর নির্বিচারে সস্তা শ্রমের তালাশে মানুষকে পশুর মতো জীবনযাপনে বাধ্য করা।
ব্রিটিশ বেনিয়া দস্যুরা যখন ভারতে লুটের রাজ কায়েম করেছে সেই সময়ে ব্রিটিশ, স্পেন, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের লোকজনের নজর পড়ে আফ্রিকার উপরে। প্রকৃতির ঐশ্বর্য এই আফ্রিকা নিজেকে বহুদিন এইসব ডাকাত, জলদস্যু ও লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা করে যেন অলৌকিক উপায়ে। আফ্রিকার মশা ও জলাভূমি এমন কিছু রোগ বালাই তৈরি করে যার প্রতিকার তখন ইউরোপীয়দের অজানা।
তাই এসব দস্যুরা যখনই আফ্রিকা অভিযানে বের হয় তখনই অকাতরে মারা পড়ে জ্বরের প্রকোপে। এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ছিলো ম্যালেরিয়া। সকল লুটেরা ইউরোপীয়ান রা নাকানি চুবানি খেয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ে, ইউরোপের সব দাগী মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীদের আফ্রিকা পাঠানো হবে মরলে ভালো, না মরলে আরো ভালো।
বারবার এসব অভিযান মুখ থুবড়ে পড়ছিলো ম্যালেরিয়া জ্বরের আক্রমণে। ফিরিস্তি দিতে গেলে ইতিহাসের বই লিখে ফেলতে হবে। ওদিকে তখন দক্ষিণ আমেরিকায় জ্বরের প্রতিষেধক হিসেবে এক ধরণের গাছের বাকল গুড়ো করে শুকিয়ে খাওয়ানো হতো। বিশেষ করে পেরু, বলিভিয়া ও ইকুয়েডরে এই ধরনের গাছ দেখা যেত।
গাছের নাম সিনকোনা বা সিঙ্কোনা, এই গাছের অনেকগুলো প্রজাতির প্রায় সবগুলোই ঔষধি গুণ সম্পন্ন। এর মধ্যে সিনকোনা অফিসিলিয়া গাছের বাকল গুড়ো করে জ্বরের জন্য খাওয়ানো হতো। জেসুইট পাদ্রীরা এসব বাকল সংগ্রহ করে চিকিৎসার জন্য ব্যবহার শুরু করে। জ্বরের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখায় এটি নিয়ে বেশ তোড়জোড় গবেষণা শুরু হয়। এই গাছকে কুইনো বলা হয় আর বাকলের গুড়োকে বলে কুইনিন। এই কুইনিন একসময় মশা বাহিত জ্বরের ধনন্ত্বরী চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়।
এই কুইনিন যা একদিকে মানুষের জীবন বাচায় অন্যদিকে আফ্রিকার মানুষের জীবনকে বদলে দেয় চিরতরে। সহজ, সরল কালো মানুষদের মানবাধিকার হরণ করে তাদের পশুর মতো হাটে বাজারে বিক্রি করা শুরু করে এই তথাকথিত সভ্য ইউরোপীয়রা। আফ্রিকাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ ঘোষণা করে মানব ইতিহাসের জঘন্যতম নির্যাতন, হত্যা ও জুলুমের রাজত্ব কায়েম করে এইসব সাদা চামড়ার গুন্ডারা, বিশেষ করে ফ্রেঞ্চ বাহিনী।
কুইনিনের বদৌলতে রাতারাতি ম্যালেরিয়ার মৃত্যুহার কমে যাওয়ায় ইউরোপীয় লুটেরারা হামলে পড়ে আফ্রিকায়। কালো মানুষদের সকল মানবিক অধিকার হরণ করে তাদের বর্বর, অসভ্য দাবী করে। অথচ ইউরোপীয়দের আগমণের ৮০০ বছর আগে ইসলাম আফ্রিকায় প্রবেশ করেছিলো। মরক্কো, মারাকেশ, কায়রোয়ান, সহ আফ্রিকার বিখ্যাত সব শহরের গোড়াপত্তন হয় ১০০০ ঈসায়ী সালের দিকে।
মুরাবিতুন সাম্রাজ্যের দাপটে ইউরোপ তখন কাপতো অথচ ৮০০ বছরের মাথায় সেই সাদা চামড়ার ইউরোপীয়দের দাপটে আফ্রিকার লোকজন হয়ে পড়ে অসহায়, অসভ্য ও বর্বর। সাহিল থেকে সোমাল, রাজা থেকে ক্রীতদাস। এক মহাদেশের কান্না ও আর্ত চিৎকারে ভারী হয়ে উঠে পৃথিবীর আকাশ বাতাস যার খেসারত আজো দিয়ে যাচ্ছে আফ্রিকার লোকজন।
ইউরোপ আজো কর উঠায়, আফ্রিকা থেকে, সাম্রাজ্যবাদের করাল থাবায় দুর্ভিক্ষ, মহামারী ও গৃহযুদ্ধের গ্লানি টেনে চলা এই মহাদেশ আজো ধুঁকছে। যদিও বুরকিনা ফাসো, আইভরি কোস্টসহ অনেকেই আজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াচ্ছে তবুও এই সাম্রাজ্যবাদের বিষদাঁত এখনো ভেঙে যায়নি পুরোপুরি।
অথচ আমাদের দেশের কিছু অন্ধ, ইউরোপে গিয়ে চোখ ধাঁধানো বস্তুগত উন্নয়ন দেখে তাদেরকে সভ্যতার ধারক বাহক মনে করে প্রচার করছে। অথচ পুরো একটি মহাদেশের মানুষের সম্পদ লুট, মানবাধিকার লঙ্ঘন, হত্যা, জুলুম নির্যাতন জারি রেখে তারা আজ সভ্যতার দাবিদার, দুঃখজনক...
এসব ইতিহাস, সত্য ও বাস্তবতা তুলে ধরা, বেশি বেশি আলোচনায় নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। ইসলামের স্বর্ণযুগের আফ্রিকা কিভাবে ইউরোপীয় অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ হলো সেই ইতিহাস তুলে ধরা এখন সময়ে দাবী। আফ্রিকার উপর নজিরবিহীন জুলুম করে জালেমরা আজ সভ্য সেজে কলকাঠি নাড়ে আমাদের সমাজে, এদের মুখোশ উন্মোচন করা অতীব জরুরি।
@ Nizamul Huda Khan
৩১
চর্যাপদ দুর্বোধ্য হওয়ার পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক কারণই সবচেয়ে বেশি দায়ী।
চর্যাপদকে বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন বলা হয়। কিন্তু বাংলা ভাষায় লেখা হলেও চর্যাপদের ভাষা দুর্বোধ্য কেন? বলা হয়ে থাকে চর্যাপদ সান্ধ্য ভাষায় রচনা করা হয়েছে বলেই এটি দুর্বোধ্য। কিন্তু যেটা বলা হয় না সেটা হচ্ছে চর্যাপদ দুর্বোধ্য হওয়ার পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক কারণই সবচেয়ে বেশি দায়ী।
বাংলায় তখন হিন্দু সেন রাজাদের শাসন, যারা ছিলেন ভীষণ অত্যাচারী। সেন রাজারা সংস্কৃতের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তারা স্থানীয় অনার্য বাংলা ভাষাকে অপছন্দ করতেন। এ ভাষায় ঈশ্বরের বন্দনা করা নিষেধ ছিল। এমনকি এ ভাষায় রাজমহিমাও প্রকাশ করা যেত না।
চর্যাপদের কবিরা বৌদ্ধ ছিলেন এবং তারা রাজরোষের শিকার হয়েছিলেন। চর্যাপদের কবি কাহ্নপা একবার বাংলা ভাষায় কবিতা পড়তে রাজদরবারে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাকে রাজদরবারে তো প্রবেশ করতে দেওয়াই হয়নি, বরং কবি কাহ্নপার হাত কেটে দেওয়া হয়েছিল। যাতে সে আর কখনও অপবিত্র ভাষায় কবিতা না লিখতে পারে।
রাজরোষের শিকার হয়েই চর্যাপদের কবিরা এমন কঠিন ভাষায় চর্যাপদ রচনা করেন যাতে সেন রাজারা প্রমাণ না করতে পারে এটা বাংলা ভাষা। তাদের উপর অত্যাচার বেড়ে যাওয়ার কারণে তারা চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি নিয়ে হিমালয়ের পাদদেশ দিয়ে নেপালে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এজন্য চর্যাপদের পান্ডুলিপি নেপালের রাজগ্রন্থশালা থেকে উদ্ধার হয়েছিল।
বাংলা ভাষাকে রক্ষা করেছিলেন ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি। তিনি বাংলা বিজয় না করলে বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যেতো, রাষ্ট্রভাষা হতো সংস্কৃত।
দীনেশ চন্দ্র সেন তার 'বঙ্গভাষার উপর মুসলমানের প্রভাব' প্রবন্ধে লিখেছেন, মুসলমান আগমনের পূর্বে বঙ্গভাষা কোনো কৃষক রমণীর ন্যায় দীনহীন বেশে পল্লি কুটিরে বাস করতেছিল। ... হীরা কয়লা খনির মধ্য থেকে যেমন জহুরির আগমনের প্রতীক্ষা করে, শুক্তির ভেতর মুক্তা লুকিয়ে থেকে যেরূপ ডুবুরির অপেক্ষা করে থাকে, বঙ্গভাষা তেমনই কোনো শুভদিন, শুভক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করতেছিল। মুসলমান বিজয় বাঙ্গালা ভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল।.. বঙ্গ সাহিত্য মুসলমাদেরই সৃষ্ট, বঙ্গভাষা বাঙ্গালা মুসলমানদের মাতৃভাষা।'
যে বখতিয়ার খলজি বাংলা ভাষাকে রক্ষা করেছিলেন, যে মুসলিম শাসন বাংলাকে নবজীবন দান করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে বাংলা ভাষাতেই বিদ্বেষমূলক সাহিত্য রচনা হয়েছে অসংখ্য। এখনও হচ্ছে। বাংলাদেশে বসে এখনও অনেকে বখতিয়ার খলজিকে প্রকাশ্যে লুটেরা বলছে, অথচ তিনি অত্যাচারী সেন রাজাদের হাত থেকে এই অঞ্চলের মানুষদের মুক্তি দিয়েছিলেন।
@ Zahid Hasan Mithu তথ্যসূত্র: বখতিয়ারের বাংলাদেশ (প্রথম খণ্ড)
৩২
ব্যক্তি-স্বাধীনতা বনাম সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ: যৌন বিজ্ঞানের লেন্স থেকে দেখা কিছু অপ্রীতিকর সত্য
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু অমীমাংসিত মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সংকট রয়েছে, যার সরল কোনো সমাধান আজও মেলেনি। যুগে যুগে নানা দার্শনিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্য দিয়ে বহুমাত্রিক বোঝাপড়া সৃষ্টির চেষ্টা হলেও, আমরা আজও একটি সার্বজনীন ও কার্যকর সমাধানে পৌঁছাতে পারিনি। 'যৌনতা' মানবসমাজের তেমনই একটি অতি-জটিল অথচ চরম বাস্তব বিষয়।
পার্সোনাল গ্রোথ ও মনস্তত্ত্বের ওপর যুগান্তকারী বই Think & Grow Rich-এর দশম অধ্যায়ে নেপোলিয়ন হিল একটি অসাধারণ ধারণার অবতারণা করেছেন, যাকে তিনি বলেছেন 'Sexual Transmutation' বা যৌনশক্তির রূপান্তর। তাঁর লেখার সারমর্ম হলো—যৌনশক্তি মানুষের সৃষ্টিশীল আবেগের সবচেয়ে তীব্র ও আদিম বহিঃপ্রকাশ। এটি একটি নদীর প্রবল স্রোতের মতো। আপনি বাঁধ দিয়ে নদীর স্রোত সাময়িকভাবে আটকে দিতে পারেন, কিন্তু যদি তার জন্য কোনো বিকল্প চ্যানেল বা নিষ্কাশন পথ তৈরি না করেন, তবে সেই বাঁধ ভাঙবেই এবং চারপাশ ভাসিয়ে দেবে। যৌনশক্তিকে কেবল জোরপূর্বক চেপে রেখে একটি সুস্থ সমাজ বা মনস্তত্ত্ব গড়ে তোলা অসম্ভব। আর এখানেই প্রয়োজন এই শক্তির শৈল্পিক ও সৃষ্টিশীল ডাইভারশন বা চ্যানেলিং।
নেপোলিয়ন হিলের এই তত্ত্বটির চুলচেরা বিশ্লেষণ মূলত ফিন্যান্সিয়াল ও ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের অংশ, যা এই লেখার মূল আলোচ্য নয়। আমরা বরং ফিরে আসি আমাদের সামাজিক বাস্তবতায়।
আমাদের চেনা পরিবেশের দিকে তাকানো যাক। শহুরে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে কুকুর বা বিড়ালের মতো গৃহপালিত প্রাণীর সংখ্যা যখন বেড়ে যায়, তখন অর্থনৈতিক ও স্থানসংকুলানের অভাবে অনেকেই ওদের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বা যৌনজীবনে কৃত্রিম হস্তক্ষেপ করেন। প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়মকে যখন আটকে দেওয়া হয়, তখন সেই অবলা প্রাণীদের তীব্র ছটফটানি ও যন্ত্রণা আমাদের চোখ মেলে দেখতে হয়।
এখন প্রশ্ন হলো—মানুষের ক্ষেত্রেও কি আমরা একই অবদমন নীতি খাটানোর চেষ্টা করছি না?
আমরা মুখে স্বীকার না করলেও সত্য এটাই—মানুষের জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তিকে কেবল সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় 'নিষেধাজ্ঞা' দিয়ে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এর প্রমাণ আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে কঠোরতম ধর্মীয় অনুশাসন ও লিঙ্গ-পৃথকীকরণ বজায় রাখা হয়, সেখানেও যখন শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের খবর আসে, তখন বুঝতে হবে—কেবল বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ মানুষের আদিম প্রবৃত্তিকে দমাতে পারে না, যদি না মনের ভেতরে যৌক্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটে। ঠিক একইভাবে, রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিরা যখন এই অবদমিত কামনার বলী হন, তখন ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটির ভাষায় তারা সহজ শিকার বা 'হানিট্র্যাপ' (Honeytrap)-এর জালে জড়ান; যার চরম মূল্য দিতে হয় রাষ্ট্র ও সমাজকে।
বাংলাদেশ একটি ঐতিহ্যগত ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে কেন এতো যৌনবিকৃতি, ধর্ষণ আর পাশবিকতা? কারণটা সরল—আমরা যৌনতাকে একটি স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়ে তার বিজ্ঞানসম্মত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের উদ্যোগ কখনোই নিইনি। আমরা সমস্যাকে আড়াল করতে চেয়েছি, সমাধান করতে নয়।
ধর্ষণ, পাশবিকতা ও মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি থেকে সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে হলে আমাদের জরুরিভিত্তিতে কয়েকটি মৌলিক জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে:
১। স্বাভাবিক মানবিক সম্পর্ককে সহজভাবে নেওয়া: তরুণ-তরুণী বা নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সামাজিক মেলবন্ধনের পথকে যখন রাষ্ট্র বা সমাজ লাঠিহাতে তাড়া করে, তখন সমাজ অবচেতনভাবেই বিকল্প ও গোপন কোনো বিকৃত পথ বেছে নেয়। সুস্থ প্রকাশ অবরুদ্ধ হলে অসুস্থ ও বিশৃঙ্খল প্রকাশ অনিবার্য।
২। যৌনবিজ্ঞানকে শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা: বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তন এবং স্বাভাবিক যৌনতা ও মনস্তত্ত্ব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান থাকলে সন্তানরা শুরু থেকেই বিকৃতি এবং সুস্থ আচরণের পার্থক্য বুঝতে পারবে।
৩। জৈবিক বাস্তবতার স্বীকৃতি ও ভালোবাসার মূল্যায়ন: মানুষের বহুগামিতার মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা একটি বৈজ্ঞানিক সত্য। সমাজ একে অস্বীকার করে বলেই আড়ালে অন্ধকার যৌনবাণিজ্য ও শোষণ বাড়ে। তবে মানুষ তার ভালোবাসার মানুষের জন্য নিজের জৈবিক চাহিদাকে উৎসর্গ (Sacrifice) করতে পারে। তাই সমাজকে নারী-পুরুষের সুস্থ ভালোবাসার সম্পর্ককে শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করতে শেখাতে হবে।
৪। আইনের শাসন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা: যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
৫। যৌক্তিক ও আধ্যাত্মিক নৈতিকতার চর্চা: ধর্মীয় ও নীতিশাস্ত্রের শিক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা ভণ্ডামি, ভীতি প্রদর্শন কিংবা জোরপূর্বক অবদমনের মাধ্যমে নয়। এটি হতে হবে যৌক্তিক, আধ্যাত্মিক সরলতা এবং আত্মিক অনুশাসনের মধ্য দিয়ে।
৬। সৃষ্টিশীল কর্মসংস্থান: অলস মস্তিষ্ক ও লক্ষ্যহীন জীবনই বিকৃত চিন্তার উর্বর ক্ষেত্র। মানুষকে যখন গঠনমূলক কাজে ব্যস্ত রাখা যাবে, তখন শক্তির রূপান্তর (Transmutation) সহজ হয়।
আমাদের দেশে একটি সুস্থ, সচেতন এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠুক—এই শুভকামনা।
@ আবদুল মালেক স্বাধীন
ফাউন্ডার, স্কুল অব ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স (SFI)
৩৩
টিন এজ সন্তানের প্রতি মা-বাবার আচরণ: সাতটি পরামর্শ
১ ) টিন এজে বাচ্চারা শিশুকাল ছাড়িয়ে কিশোরকালে পা দেয়। এ রূপান্তর শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব কঠিন। তারা চায় বাবা-মা এ কঠিন সময়ে তাদের বন্ধু হবেন। কিন্তু অনেক মা-বাবা ব্যাপারটা না বুঝে উল্টো আচরণ করেন। ফলাফল হচ্ছে- 'বিদ্রোহ'।
২ ) ওরা কিছু বলতে চাইলেই ধমক দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ওদের ভেতরে আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়- যা শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণ ঘটায়।
৩ ) তাদের প্রতিটি ভুলের জন্য বাড়িতে আদালত বসানো হয়। তারা তা চায় না- সহমর্মিতা চায়। তা না পেলে তারা বেঁকে বসে। তাই কথায় কথায় বিচার না বসিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভুলগুলো শোধরানোর পথ দেখানো উচিত। বয়সটাই ভুলের- এটা মা-বাবা যত দ্রুত বুঝবেন ততই মঙ্গল।
৪ ) ওরা কোনো সমস্যার কথা বললেই মা-বাবা উপদেশের দীর্ঘ লেকচার দেন। বয়সটা লেকচার সহ্য করার নয়। তারা চায় মা-বাবা সমস্যা শুনবেন। সমাধান দেবেন। কিন্তু লেকচারের জ্বালায় তারা সমস্যার কথা বলাই বন্ধ করে দেয়।
৫ ) তারা প্রশংসা চায়। অনেক বাবা- মা বাচ্চা লাই পাবে ভেবে তা করেন না। ফলে অভিমানের সমুদ্র তৈরি হয়। এ সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য কোনো সেতু নেই।
৬ ) মা- বাবা যখন তাদের বোঝার চেষ্টা করেন না তখন বাইরের কেউ সামান্য সহানুভূতি দেখালে তারা তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক সময় এভাবেই তাদের জন্য ফাঁদ পাতা হয়।
৭ ) মা-বাবার আরেকটি বড় ভুল হলো- টিন এজারদের শাসন করার জন্য তারা তৃতীয় পক্ষকে টেনে আনেন। এতে ওরা খুব অপমানিত বোধ করে। তাই আরো উদ্ধত হয়ে ওঠে- খুব বাজেভাবে রিয়্যাক্ট করে।
- 'টিন এজের বাচ্চা মানে বারুদ ঠাসা দেয়াশলাই। একটু ঘষা দেবেন দাউদাউ আগুন জ্বলে উঠবে।'
'A teenager may outgrow your lap, but they never outgrow your love.'
'ও আপনার কোল ছাড়ে, ভালোবাসা ছাড়ে না....। ওকে ভালোবাসা দিয়ে মুড়িয়ে রাখলে সমস্যা হবে না।' @Mir Md. Faisal
৩৪
নিউ ইয়র্ক সিটির ৫টি ভিন্ন ভিন্ন কাউন্টি
নিউ ইয়র্ক সিটির ৫টি বরো (Boroughs) আসলে ৫টি ভিন্ন ভিন্ন কাউন্টি (County), যা ১৮৯৮ সালে একত্রিত হয়ে আজকের এই বিশাল "নিউ ইয়র্ক সিটি" গঠন করেছে। প্রতিটি বরোরই নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস, জীবনযাত্রা এবং বৈচিত্র্য রয়েছে।
নিচে এই ৫টি বরো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১.) Manhattan (ম্যানহাটন) — সিটির হৃদপিণ্ড
ম্যানহাটনকে নিউ ইয়র্ক সিটির মূল কেন্দ্র বা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চালিকাশক্তি বলা যায়। অনেকে শুধু এই অংশটুকুকে "The City" বলে ডাকেন। এটি একটি দ্বীপ, যা হাডসন এবং ইস্ট নদী দ্বারা বেষ্টিত।
আয়তন ও জনসংখ্যা: এটি সিটির অন্যতম ছোট বরো (প্রায় ২২.৮ বর্গমাইল), কিন্তু এখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি (প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষ)।
অর্থনীতি ও ল্যান্ডমার্ক: বিশ্ব অর্থনীতির মূল কেন্দ্র Wall Street এবং New York Stock Exchange (NYSE) এখানেই অবস্থিত। এছাড়া টাইমস স্কয়ার, সেন্ট্রাল পার্ক, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, রকফেলার সেন্টার এবং ব্রডওয়ে থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট ম্যানহাটনেই অবস্থিত।
জীবনযাত্রা: এখানকার জীবনযাত্রা অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং ব্যয়বহুল। আকাশচুম্বী অ্যাপার্টমেন্ট, ট্যাক্সির হর্ন আর কর্পোরেট সংস্কৃতির জন্য এটি পরিচিত। এটি মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত: ডাউনটাউন (আর্থিক কেন্দ্র), মিডটাউন (ব্যবসা ও পর্যটন), এবং আপটাউন (আবাসিক ও সাংস্কৃতিক)।
২.) Brooklyn (ব্রুকলিন) — সংস্কৃতি ও ট্রেন্ডের কেন্দ্র
ম্যানহাটনের ঠিক পাশেই ইস্ট নদীর ওপারে অবস্থিত ব্রুকলিন। যদি এটি নিউ ইয়র্ক সিটির অংশ না হয়ে আলাদা একটি শহর হতো, তবে এটি আমেরিকার চতুর্থ বৃহত্তম শহর হতো।
জনসংখ্যা: এটি নিউ ইয়র্কের সবচেয়ে জনবহুল বরো (প্রায় ২৬ লক্ষ মানুষ)।
সংস্কৃতি ও পরিবেশ: ব্রুকলিন তার চমৎকার আর্ট সিন, মিউজিক, স্বাধীন কফি শপ এবং ঐতিহাসিক ব্রাউনস্টোন (Brownstone) বাড়িগুলোর জন্য বিখ্যাত। তরুণ ক্রিয়েটিভ, শিল্পী এবং উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় জায়গা।
প্রধান আকর্ষণ: ম্যানহাটন ও ব্রুকলিনকে সংযোগকারী ঐতিহাসিক Brooklyn Bridge, চমৎকার ভিউ-এর জন্য DUMBO এলাকা, বিশাল প্রস্পেক্ট পার্ক এবং বিখ্যাত বিনোদন কেন্দ্র কোনী আইল্যান্ড (Coney Island)।
৩.) Queens (কুইন্স) — পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় এলাকা
কুইন্স হলো নিউ ইয়র্ক সিটির সবচেয়ে বড় বরো (আয়তনের দিক থেকে) এবং এটি ম্যানহাটন ও ব্রুকলিনের পূর্ব দিকে অবস্থিত।
জাতিগত বৈচিত্র্য: এটিকে পৃথিবীর অন্যতম নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্যময় এলাকা বলা হয়। এখানকার প্রায় অর্ধেক অধিবাসীই আমেরিকার বাইরে জন্মেছেন এবং এখানে প্রায় ১০০টিরও বেশি দেশের মানুষ নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করে।
যোগাযোগ ও খেলাধুলা: নিউ ইয়র্কের দুটি প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর — JFK International এবং LaGuardia Airport কুইন্সেই অবস্থিত। এছাড়া প্রতি বছর যেখানে বিখ্যাত ইউএস ওপেন (US Open) টেনিস টুর্নামেন্ট হয়, সেই ফ্লাশিং মিডোজ পার্কটি এখানেই।
খাবার ও সংস্কৃতি: বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যার কারণে এখানে জ্যামাইকান, গ্রিক, চাইনিজ, ইন্ডিয়ান, মেক্সিকান এবং বাংলাদেশী খাবারের অবিশ্বাস্য সব রেস্তোরাঁ পাওয়া যায় (যেমন জ্যাকসন হাইটস এলাকা)।
৪.) The Bronx (দ্য ব্রঙ্কস) — মিউজিক ও ঐতিহ্যের জন্মভূমি
ম্যানহাটনের ঠিক উত্তর দিকে অবস্থিত দ্য ব্রঙ্কস। এটিই নিউ ইয়র্ক সিটির একমাত্র বরো যা সরাসরি আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের (Mainland) সাথে যুক্ত, বাকিগুলো সব দ্বীপ বা দ্বীপের অংশ।
সাংস্কৃতিক অবদান: ১৯৭০-এর দশকে এই ব্রঙ্কস থেকেই বিশ্ব কাঁপানো Hip-Hop (হিপ-হপ) মিউজিক এবং কালচারের জন্ম হয়েছিল। এছাড়া গ্রাফিতি আর্ট এবং স্ট্রিট ডান্সের জন্যও এর সুনাম রয়েছে।
প্রধান আকর্ষণ: আমেরিকার অন্যতম বিখ্যাত বেসবল টিম New York Yankees-এর হোম স্টেডিয়াম (Yankee Stadium) এখানে অবস্থিত। এছাড়া এখানে রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম চিড়িয়াখানা Bronx Zoo এবং বিশাল নিউ ইয়র্ক বোটানিক্যাল গার্ডেন।
৫.) Staten Island (স্ট্যাটেন আইল্যান্ড) — শান্ত ও সবুজ শহরতলী
নিউ ইয়র্ক সিটির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত স্ট্যাটেন আইল্যান্ড হলো সবচেয়ে কম জনবহুল এবং সবচেয়ে শান্ত বরো। এটিকে প্রায়ই নিউ ইয়র্কের "Forgotten Borough" বা অবহেলিত বরো বলা হয়, কারণ এটি বাকি শহর থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন।
পরিবেশ: অন্য ৪টি বরোর মতো এখানে খুব বেশি উঁচু ভবন বা ব্যস্ত জীবনযাত্রা নেই। এটি মূলত একটি আবাসিক এলাকা, যেখানে প্রচুর পার্ক, সবুজ প্রকৃতি এবং পারিবারিক আবহের বাড়িঘর রয়েছে।
যোগাযোগ: এই বরোটির সাথে ম্যানহাটনের কোনো সরাসরি সাবওয়ে বা পাতাল রেল সংযোগ নেই। যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হলো বিখ্যাত Staten Island Ferry (যা সম্পূর্ণ ফ্রি) এবং ভেরাজানো-ন্যারোজ ব্রিজ (যা ব্রুকলিনের সাথে যুক্ত)। এই ফেরি দিয়ে যাতায়াতের সময় স্ট্যাটেন আইল্যান্ড এবং স্ট্যাচু অব লিবার্টির চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়।
@ Abir Aryan
৩৫
ডেভিলস ট্রায়াঙ্গেল বা 'বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল'
বারমুডা ঝড় বা 'বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল' হলো উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল, যা ফ্লোরিডা, বারমুডা এবং পুয়ের্তো রিকোর মাঝখানে অবস্থিত। এই স্থানটিকে ঘিরে অসংখ্য জাহাজ ও বিমান রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার নানা কাল্পনিক ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে। এটি মূলত ডেভিলস ট্রায়াঙ্গেল নামেও পরিচিত। [1, 2]
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত অবস্থানবারমুডা ঝড় বা 'রগ ওয়েভ' (Rogue Wave) হলো উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এলাকায় সৃষ্ট আকস্মিক ও দৈত্যাকার সামুদ্রিক ঢেউ। এই অঞ্চলে হঠাৎ জন্ম নেওয়া প্রবল ঝড় এবং মেঘের সংঘর্ষ থেকে সৃষ্ট 'এয়ার বম্ব' প্রায় ৪৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু বিধ্বংসী ঢেউ তৈরি করতে পারে। [1]
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের অবস্থান ও পরিচিতি
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল, যা 'শয়তানের ত্রিভুজ' (Devils Triangle) নামেও পরিচিত, উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি কাল্পনিক অঞ্চল। এটি মূলত ফ্লোরিডা, বারমুডা এবং পুয়ের্তো রিকোর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি বহু বছর ধরে রহস্যময় দুর্ঘটনা, জাহাজ ও বিমান নিখোঁজের জন্য কুখ্যাত।
আকস্মিক ঝড়ের কারণ
গরম ও ঠাণ্ডা স্রোত: উপসাগরীয় উষ্ণ স্রোত (Gulf Stream) এবং শীতল বায়ুপ্রবাহের মিলনে এখানে হঠাৎ চরম প্রতিকূল আবহাওয়া তৈরি হয়।
এয়ার বম্ব: আকাশে তৈরি হওয়া ষড়ভুজাকার মেঘ থেকে প্রবল বেগে বাতাস নিচে নেমে আসে, যা সাগরে বিশাল আকারের ঘূর্ণায়মান ঝড় ও দানবাকৃতির ঢেউয়ের জন্ম দেয়।
দৃশ্যমানতার অভাব: হঠাৎ সৃষ্ট ঘন কুয়াশা এবং প্রচণ্ড বৃষ্টির কারণে নাবিক ও পাইলটরা দিক হারিয়ে ফেলেন।
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
বিজ্ঞানীদের মতে, বেশিরভাগ দুর্ঘটনার পেছনে অতিপ্রাকৃতিক কোনো কারণ নেই। বরং, এই অঞ্চলের ঘন সামুদ্রিক ট্রাফিক, তীব্র স্রোত, প্রবাল প্রাচীর এবং ক্ষিপ্রগতির সামুদ্রিক ঝড় ও হারিকেনই এই বিপদের মূল কারণ।
অবস্থান: ফ্লোরিডা, পুয়ের্তো রিকো এবং বারমুডা দ্বীপপুঞ্জ—এই তিনটি প্রান্তকে যুক্ত করলে আটলান্টিক মহাসাগরের যে ত্রিভুজাকার অঞ্চলটি তৈরি হয়, সেটাই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল।
আবহাওয়ার রূপ: এই অঞ্চলে প্রায়ই আকস্মিক আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে। তীব্র সামুদ্রিক ঝড় এবং হারিকেন তৈরি হওয়ার কারণে এখানে হঠাৎ করেই বিশাল ঢেউ ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
যান্ত্রিক কারণ: আকস্মিক এই ঝড় ও দুর্যোগের কারণে বৈমানিক ও নাবিকেরা পথ হারিয়ে ফেলেন বা বিভ্রান্ত হন।
রহস্যের পেছনের কারণ
গ্যাসের উদগিরণ: সমুদ্রের তলদেশে থাকা মিথেন গ্যাসের বুদবুদ জলের ঘনত্ব কমিয়ে দেয়, যার ফলে জাহাজ সহজেই ডুবে যেতে পারে।
এয়ার বম্ব: মেঘের স্তর থেকে তৈরি হওয়া তীব্র গতির বাতাস যাকে 'এয়ার বম্ব' বলা হয়, তা সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রচণ্ড শক্তিশালী ঝড়ের সৃষ্টি করে।
গালফ স্ট্রিম: এই অঞ্চলের প্রবল সমুদ্র স্রোত নিখোঁজ হওয়া যেকোনো যানের ধ্বংসাবশেষ মুহূর্তের মধ্যেই দূর-দূরান্তে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, যার ফলে নিখোঁজ যানের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল যা শয়তানের ত্রিভুজ নামেও পরিচিত, আটলান্টিক মহাসাগরের একটি বিশেষ অঞ্চল, যেখানে বেশ কিছু জাহাজ ও উড়োজাহাজ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার কথা বলা হয়। অনেকে মনে করেন ঐ সকল অন্তর্ধানের কারণ নিছক দুর্ঘটনা, যার কারণ হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা চালকের অসাবধানতা। আবার চলতি উপকথা অনুসারে এসবের পেছনে দায়ী হল কোন অতিপ্রাকৃতিক শক্তির উপস্থিতি। তবে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে যে, যেসব দুর্ঘটনার উপর ভিত্তি করে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলকে চিহ্নিত করা হয়েছে তার বেশ কিছু ভুল, কিছু লেখক দ্বারা অতিরঞ্জিত হয়েছে এমনকি কিছু দুর্ঘটনার সাথে অন্যান্য অঞ্চলের দুর্ঘটনার কোনই পার্থক্য নেই।
ত্রিভূজ গল্পের ইতিহাস
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল বিষয়ে যারা লিখেছেন তাদের মতে ক্রিস্টোফার কলম্বাস সর্বপ্রথম এই ত্রিভুজ বিষয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা লিখেন। তিনি লিখেছিলেন যে তার জাহাজের নাবিকেরা এ অঞ্চলের দিগন্তে আলোর নাচানাচি, আকাশে ধোঁয়া দেখেছেন। এছাড়া তিনি এখানে কম্পাসের উল্টাপাল্টা দিক নির্দেশনার কথাও বর্ণনা করেছেন। তিনি ১১ই অক্টোবর, ১৪৯২ তে তার লগ বুকে লিখেন –triangle means the residence of devil
বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা প্রকৃত লগবুক পরীক্ষা করে যে মত দিয়েছেন তার সারমর্ম হল – নাবিকেরা যে আলো দেখেছেন তা হল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত নৌকায় রান্নার কাজে ব্যবহৃত আগুন, আর কম্পাসে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল নক্ষত্রের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে। ১৯৫০ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর ই. ভি. ডব্লিউ. জোন্স( E.V.W. Jones) সর্বপ্রথম এ ত্রিভুজ নিয়ে খবরের কাগজে লিখেন।[৭] এর দু বছর পর ফেইট (Fate)ম্যাগাজিনে জর্জ এক্স. স্যান্ড( George X. Sand) “সী মিস্ট্রি এট আওয়ার ব্যাক ডোর” ("Sea Mystery At Our Back Door") শিরোনামে একটি ছোট প্রবন্ধ লিখেন।[৮], এ প্রবন্ধে তিনি ফ্লাইট নাইনটিন ( ইউ এস নেভী-র পাঁচটি ‘টি বি এম অ্যাভেন্জার’ বিমানের একটি দল, যা প্রশিক্ষণ মিশনে গিয়ে নিখোঁজ হয়) এর নিরুদ্দেশের কাহিনী বর্ণনা করেন এবং তিনিই প্রথম এই অপরিচিত ত্রিভূজাকার অঞ্চলের কথা সবার সামনে তুলে ধরেন।
১৯৬২ সালের এপ্রিল মাসে ফ্লাইট নাইনটিন নিয়ে আমেরিকান লিজান (American Legion) ম্যগাজিনে লিখা হয়। বলা হয়ে থাকে এই ফ্লাইটের দলপতি কে নাকি বলতে শোনা গিয়েছে- We don't know where we are, the water is green, no white। এর অর্থ হল "আমরা কোথায় আছি জানি না, সবুজ বর্ণের জল, কোথাও সাদা কিছু নেই"। এতেই প্রথম ফ্লাইট নাইনটিনকে কোন অতিপ্রাকৃতিক ঘটনার সাথে যুক্ত করা হয়। এরপর ভিনসেন্ট গডিস (Vincent Gaddis) “প্রাণঘাতী বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল”( The Deadly Bermuda Triangle) নামে আর এক কাহিনী ফাঁদেন ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এর উপর ভিত্তি করেই তিনি আরও বিস্তর বর্ণনা সহকারে লিখেন "ইনভিজিবল হরাইজন" (Invisible Horizons) মানে “অদৃশ্য দিগন্ত” নামের বই। আরও অনেক লেখকই নিজ নিজ মনের মাধুরী মিশিয়ে এ বিষয়ে বই লিখেন, তারা হলেন জন ওয়ালেস স্পেন্সার, তিনি লিখেন "লিম্বো অফ দ্যা লস্ট" (Limbo of the Lost, 1969, repr. 1973), মানে “বিস্মৃত অন্তর্ধান”; চার্লস বার্লিটজ (Charles Berlitz) লিখেন “দি বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল”(The Bermuda Triangle, 1974),; রিচার্ড উইনার লিখেন "দ্যা ডেভিল'স ট্রায়াঙ্গেল" “শয়তানের ত্রিভূজ” (The Devil's Triangle, 1974) নামের বই, এছাড়া আরও অনেকেই লিখেছেন। এরা সবাই ঘুরেফিরে একার্ট ( Eckert) বর্ণিত অতিপ্রাকৃতিক ঘটানাই বিভিন্ন স্বাদে উপস্থাপন করেছেন।
কুসচ ( Kusche) এর ব্যাখ্যা
লরেন্স ডেভিড কুসচ হলেন “অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি”-র রিসার্চ লাইব্রেরিয়ান এবং “ দ্যা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল মিস্ট্রি: সলভড (১৯৭৫)” এর লেখক। তার গবেষণায় তিনি চার্লস বার্লিটজ (Charles Berlitz) এর বর্ণনার সাথে প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের বর্ণনার অসংগতি তুলে ধরেন। যেমন- যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকার পরেও বার্লিটজ (Charles Berlitz) বিখ্যাত ইয়টসম্যান ডোনাল্ড ক্রোহার্সট(Donald Crowhurt) এর অন্তর্ধানকে বর্ণনা করেছেন রহস্য হিসেবে। আরও একটি উদাহরণ হল- আটলান্টিকের এক বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়ার তিন দিন পরে একটি আকরিকবাহী জাহাজের নিখোঁজ হবার কথা বার্লিটজ বর্ণনা করেছেন, আবার অন্য এক স্থানে একই জাহাজের কথা বর্ণনা করে বলেছেন সেটি নাকি প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বন্দর থেকে ছাড়ার পর নিখোঁজ হয়েছিল। এছাড়াও কুসচ দেখান যে বর্ণিত দূর্ঘটনার একটি বড় অংশই ঘটেছে কথিত ত্রিভূজের সীমানার বাইরে। কুসচ এর গবেষণা ছিল খু্বই সাধারন। তিনি শুধু লেখকদের বর্ণনায় বিভিন্ন দূর্ঘটনার তারিখ, সময় ইত্যাদি অনুযায়ী সে সময়ের খবরের কাগজ থেকে আবহাওয়ার খবর আর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো সংগ্রহ করেছেন যা গল্পে লেখকরা বলেননি। কুসচ –এর গবেষণায় যা পাওয়া যায় তা হল-
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে যে পরিমাণ জাহাজ ও উড়োজাহাজ নিখোঁজ হওয়ায় কথা বলা হয় তার পরিমাণ বিশ্বের অন্যান সমুদ্রের তুলনায় বেশি নয়।
এ অঞ্চলে গ্রীষ্মমন্ডলীয় ঝড় (tropical storms) নিয়মিত আঘাত হানে, যা জাহাজ ও উড়োজাহাজ নিখোঁজ হওয়ার অন্যতম কারণ। কিন্তু বার্লিটজ বা অন্য লেখকেরা এধরনের ঝড়ের কথা অনেকাংশেই এড়িয়ে গিয়েছেন।
অনেক ঘটনার বর্ণনাতেই লেখকেরা কল্পনার রং চড়িয়েছেন। আবার কোন নৌকা নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে দেরিতে বন্দরে ভিড়লে তাকে নিখোঁজ বলে প্রচার করা হয়েছে।
আবার কখনোই ঘটেনি এমন অনেক ঘটনার কথা লেখকেরা বলেছেন। যেমন- ১৯৩৭ সালে ফ্লোরিডার ডেটোনা সমুদ্রতীরে( Daytona Beach) একটি বিমান দূর্ঘটনার কথা বলা হয়, কিন্তু সেসময়ের খবরের কাগজ থেকে এ বিষয়ে কোন তথ্যই পাওয়া যায়নি।
সুতরাং কুসচ –এর গবেষণার উপসংহারে বলা যায়- লেখকরা অজ্ঞতার কারণে অথবা ইচ্ছাকৃত ভাবে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নিয়ে বানোয়াট রহস্য তৈরি করেছেন।
প্রকৃতিক ঘটনার মাধ্যমে ব্যাখ্যা
কন্টিনেন্টাল সেলভে(continental shelve) জমে থাকা বিপুল পরিমাণ মিথেন হাইড্রেট অনেক জাহাজ ডোবার কারণ বলে দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় পরীক্ষাগারের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাতাসের বুদবুদ পানির ঘনত্ব কমিয়ে দেয়। তাই সাগরে যখন পর্যায়ক্রমিক মিথেন উদগীরন হয়, তখন পানির প্লবতা(কোন কিছুকে ভাসিয়ে রাখার ক্ষমতা) কমে । যদি এমন ঘটনা ঐ এলাকায় ঘটে থাকে তবে সতর্ক হবার আগেই কোন জাহাজ দ্রুত ডুবে যেতে পারে।
১৯৮১ সালে “ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে” একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে, যাতে বর্ণিত আছে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ উপকূলের বিপরীতে ব্ল্যাক রিজ(Blake Ridge) এলাকায় মিথেন হাইড্রেট রয়েছে। আবার ইউএসজিএস(ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে) এর ওয়েব পৃষ্ঠা থেকে জানা যায়, গত ১৫০০ বছরের মধ্যে ঐ এলাকায় তেমন হাইড্রেট গ্যাসের উদগীরন ঘটেনি।
কম্পাসের ভুল দিক নির্দেশনা
কম্পাসের পাঠ নিয়ে বিভ্রান্তি অনেকাংশে এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের কাহিনীর সাথে জড়িত। এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে কম্পাস থেকে চুম্বক মেরুর দূরত্বের উপর ভিত্তি করে এর দিক নির্দেশনায় বিচ্যূতি আসে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- যুক্তরাষ্ট্রে শুধুমাত্র উইসকনসিন(Wisconsin) থেকে মেক্সিকোর উপসাগর(Gulf of Mexico) পর্যন্ত সরলরেখা বরাবর চৌম্বক উত্তর মেরু সঠিক ভাবে ভৌগোলিক উত্তর মেরু নির্দেশ করে। এই সাধারণ তথ্য যে কোন দক্ষ পথপ্রদর্শকের জানা থাকার কথা। কিন্তু সমস্যা হল সাধারণ মানুষকে নিয়ে, যারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। ঐ ত্রিভুজ এলাকা জুড়ে কম্পাসের এমন বিচ্যূতি তাদের কাছে রহস্যময় মনে হয়। কিন্তু এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
হারিকেন
হারিকেন(Hurricane) হল শক্তিশালী ঝড়। ঐতিহাসিক ভাবেই জানা যায়- আটলান্টিক মহাসাগরে বিষুব রেখার কাছাকাছি অঞ্চলে শক্তিশালী হারিকেনের কারণে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে, আর ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি টাকার। রেকর্ড অনুসারে ১৫২০ সালে স্প্যানিশ নৌবহর “ফ্রান্সিসকো দ্য বোবাডিলা” (Francisco de Bobadilla) এমনি একটি বিধ্বংসী হারিকেনের কবলে পড়ে ডুবে যায়।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের কাহিনীর সাথে জড়িত অনেক ঘটনার জন্য এধরনের হারিকেনই দায়ী।
গলফ স্ট্রিম
গলফ স্ট্রিম হল মেক্সিকো উপসাগর থেকে স্ট্রেইটস অব ফ্লোরিডা(Straits of Florida) হয়ে উত্তর আটলান্টিকের দিকে প্রবাহিত উষ্ঞ সমুদ্রস্রোত। একে বলা যায় মহা সমুদ্রের মাঝে এক নদী। নদীর স্রোতের মত গলফ স্ট্রিম ভাসমান বস্তু কে স্রোতের দিকে ভাসিয়ে নিতে পারে। যেমনি ঘটেছিল ১৯৬৭ সালের ২২ ডিসেম্বর “ উইচক্রাফট” নামের একটি প্রমোদতরীতে। মিয়ামি তীর হতে এক মাইল দূরে এর ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিলে তার নাবিকরা তাদের অবস্থান কোস্ট গার্ডকে জানায়। কিন্তু কোস্ট গার্ডরা তাদেরকে ঐ নির্দিষ্ট স্থানে পায়নি।collectedcopi novuabs0
৩৬
জিন্নাহ কোথাও তার ধর্ম পরিচয় দিতেন না, ধর্ম মানতেনও না
ঢাকার আহসান মঞ্জিলে মুসলিম লীগ গঠিত হলেও এটি একজন প্যান ইণ্ডিয়ান বা সর্বভারতীয় নেতার অভাবে ঠিক রাজনৈতিক দল হয়ে উঠতে পারছিলো না।
এদিকে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ - যাকে বলা হতো "হিন্দু মুসলিম ঐক্যের দূত" তিনি ১৯২০এর দশকে এসে বুঝতে পারছিলেন যে কংগ্রেসের হিন্দু নেতারা অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে না।
তারা মুসলমানসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে সম-অধিকার দিতে নারাজ।
গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে জেল খেটে ইণ্ডিয়ায় ফিরলে জিন্নাহ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে গান্ধীকে সংবর্ধনা দেন।
সেই সংবর্ধনায় গান্ধী বক্তব্য দেন -
"হিন্দুদের সভায় একজন মুসলমান সভাপতিত্ব করছে দেখে তার ভালো লাগছে।"
অথচ জিন্নাহ কোথাও তার ধর্ম পরিচয় দিতেন না, ধর্ম মানতেনও না। আর কংগ্রেসও একটি সেকুলার দল ছিলো।
সেখান থেকেই শুরু হয়।
যদিও কংগ্রেসের উত্থান জিন্নাহর হাতে অনেকটা। পরে গান্ধী নেহেরু যোগ দিয়েছিলো।
জিন্নাহ গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল ও অন্যান্য হিন্দু নেতাদের কারণে কোনঠাসা হয়ে পরেন - শুধু মাত্র জিন্নাহর নাম মুসলমান বলে। মুসলমান বলেও ঠিক না , জিন্নাহ হিন্দু না বলে।
জিন্নাহ আস্তে আস্তে নিজেকে রাজনীতি থেকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে ফেলেন।
এই সময় দৃশ্যপটে আসেন আল্লামা ইকবাল। তিনি জিন্নাহকে মোটিভেট করতে শুরু করেন - সর্ব ভারতীয় মুসলিমদের নেতা হবার জন্য।
জিন্নাহ এক সময় একই সাথে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। শুধু সদস্যই না। উনি একবার কংগ্রেস, মুসলিম লীগের সভাপতিও ছিলেন এক সাথে।
শেরে বাংলা একে ফজলুল হকও এমন ছিলেন। শুরুর দিকে কংগ্রেস, মুসলিম লীগের এনুয়াল মিটিং একই ভেনুতে একই দিনে আগে পরে হতো।
সব ঝামেলা শুরু হয় গান্ধী, নেহেরু আর প্যাটেলরা আসার পরে।
জিন্নাহ কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন। ফুল টাইমার হিসেবে মুসলিম লীগে কাজ শুরু করেন।
জিন্নাহর চিন্তা ছিলো অনেকটা এরকম-
"আমার মত একজন সেকুলারকেও যেহেতু শুধু মাত্র নামের কারণে বৈষম্যের স্বীকার হতে হচ্ছে। বাকি মুসলমানদের না জানি কতো বৈষম্যের স্বীকার হতে হয়।"
আর এই চিন্তা জিন্নাহর মাথায় এনে দিয়েছিলো আল্লামা ইকবাল।
জিন্নাহ তখন দ্বিজাতিতত্ত্ব সামনে নিয়ে আসেন। সহজ ভাষায়-
"মুসলমান আর হিন্দু দুইটা ভিন্ন জাতি। কোন জাতির জনসংখ্যা কতো সে হিসাব থেকে বড় হচ্ছে হিন্দু মুসলিম দুই ভিন্ন জাতি ও জাতি হিসাবে সমান। তাই তাদের সকল প্রাপ্যও সমান সমান হতে হবে। জনসংখ্যার বিচারে না।"
জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্ব মাঠে নিয়ে এসেছিলেন, মুসলমানদের ফেভারে কিছু আইন পাশ করার জন্য বার্গেনিং টুল হিসেবে। সিরিয়াসলি দেশ বা ভারত ভাগের চিন্তা থেকে না।
যেমন উনি প্রধানমন্ত্রী হিন্দু হলে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মুসলিম হতে হবে এমন কিছু দাবী জানিয়েছিলেন। উনি বুঝতে পেরেছিলেন - ইণ্ডিয়া হবে একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ।
সেখানে ডেমোক্রেসি দিয়ে সবকিছু করতে গেলে মুসলিমরা পিছিয়ে থাকবে। তাই উনি মুসলিমদের জন্য কিছু আইন ও রক্ষাকবচ চেয়েছিলেন।
তাই সারাজীবন সেকুলারিজম আর ডেমোক্রেসির জন্য চিল্লাপাল্লা করা জিন্নাহ নিজেই সেকুলারিজম আর ডেমোক্রেসির বিপরীতে কথা বলতে শুরু করেন।
কংগ্রেসী হিন্দুত্ববাদীদের আসল রূপ বুঝতে পেরে তিনি ধীরে ধীরে পাকিস্তান আন্দোলনের পথে অগ্রসর হন।
@ Mojabbir Hossain Shihab
৩৭
বাংলার বৌদ্ধ শাসকদের হাত ধরে বাংলা ভাষা ভারতবর্ষে আধিপত্য বিস্তার করেছিল
৭৫০ খ্রীস্টাব্দে বাংলার ছোট ছোট রাজারা গোপাল নামে একজন সামন্ত রাজার উপর বাংলার শাসনভার অর্পণ করেন।
মূলত বাংলায় তখন সামাজিক, রাজনৈতিক, জীবনে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল বিশৃঙ্খলা।
খুন, রাহাজানি, লুটতরাজ ছিল নিয়মিত।
যার কারণে বাংলায় একজন সর্ব গ্রহণযোগ্য শাসকের বিশেষ প্রয়োজন ছিল।
আর এই বৌদ্ধ ধর্মের শাসক গোপালের হাত ধরে যে বৌদ্ধ শাসন শুরু হয় তা টিকে থাকে ৪০০ বছর।
বৌদ্ধ শাসকের মধ্যে রাজা ধর্মপাল ও রাজা দেবপাল ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ।
মূলত তাদের সময়ে বাংলার বৌদ্ধ শাসন উত্তর ভারত সহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে আধিপত্য বিস্তার করে।
৪০০ বছরের এই বৌদ্ধ শাসনে শিক্ষা, দীক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতিতে বাংলা ভারতবর্ষের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
বাংলা ভাষায় চর্যাপদ বৌদ্ধ শাসনের কৃতিত্ব স্বীকার করে।
বাংলার সামরিক শক্তি, অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত হয়েছিল বৌদ্ধ শাসনের সময়ে।
বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার সোমপুর বিহার, ভারতের নালন্দা বিহার সহ বৌদ্ধ শাসনে শত শত বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
যেখানে শিক্ষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মের জ্ঞান চর্চা ছিল।
বাংলায় হিন্দু সেন বংশের আগমন ঘটে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক বিশেষ করে মহিশূর অঞ্চল থেকে।
দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের এই হিন্দুরা প্রথমে বৌদ্ধ শাসকদের অধীনে বিভিন্ন ধরণের চাকরী শুরু করে।
বিশেষ করে সেন বংশীয়রা বৌদ্ধ শাসকদের সামন্ত রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তাঁরা ক্ষমতা দখল করে।
১০৯৭ খ্রীস্টাব্দে হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন বৌদ্ধ শাসনের দূর্বলতার সুযোগে, বৌদ্ধ শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলায় হিন্দু শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
১২০৩ সালে মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির আক্রমণে বাংলার শেষ হিন্দু রাজা লক্ষণ সেন গৌড় থেকে পালিয়ে দ্বিতীয় রাজধানী বাংলার বিক্রমপুরে পলায়ন করেন।
ইতিহাস থেকে জানা হিন্দু রাজা লক্ষণ সেন ও তাঁর পুত্রগণ আরও বেশকিছু সময় বাংলার কিছু অংশ শাসন করেছিলেন।
মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির হিন্দু সেন রাজাদের রাজধানী শহর গৌড় দখল করলেও, বাংলার অনেকাংশ মুসলিম সেনাপতির বিজয়ের বাইরে ছিল।
বাংলার বৌদ্ধ শাসকদের হাত ধরে বাংলা ভাষা ভারতবর্ষে আধিপত্য বিস্তার করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় নেপালে উদ্ধার হওয়া চর্যাপদ থেকে।
বাংলা সহ ভারতের বৌদ্ধ বিহার গুলো শতশত বছর ধরে উপমহাদেশে বৌদ্ধ জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হিসেবে আলো ছড়িয়েছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের আগমন ঘটেছে বৌদ্ধ জ্ঞান ভান্ডারে।
হিউয়েং সাং এর মতো পর্যটকদের আগমণ ঘটেছে এই বৌদ্ধ শাসনের সময়ে।
হিউয়েং সাং একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিজেই বৌদ্ধ শাসনের বাংলার ইতিহাসের জ্বলন্ত সাক্ষী।
এখন স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন দেখা দেয় যে বাংলা যাদের হাত ধরে উন্নতির শিখরে আরোহন করেছিল, সেই বিশাল বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী কোথায় হারিয়ে গেল?
কিভাবে হারিয়ে গেল? @ সনজীত কুমার দে
৩৮
জিন্নাহর দুই সন্তানেরই জন্মদিন একই
জিন্নাহর আপনজন বলতে মানুষ জানত তাঁর ছোট বোন ফাতেমা জিন্নাহকে। তিনিই সব সময় ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন। ষাটের দশকে বাঙালি নেতারা ফাতেমা জিন্নাহকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রার্থী করেছিলেন।
জিন্নাহর স্ত্রী এবং তাঁদের একমাত্র সন্তান একটি মেয়ে যে ছিলেন, তা মানুষ ভুলেই গিয়েছিল। জিন্নাহর কন্যা দিনা ওয়াদিয়া ৯৮ বছর বয়সে ২ নভেম্বর নিউইয়র্কে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুসংবাদ ভারত ও পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।
জিন্নাহ কঠিন হৃদয়ের মানুষ ছিলেন বলে মানুষ জানে। স্ত্রীর প্রতি তিনি যথেষ্ট মনোযোগ দেননি। অবহেলা করেছেন বলেও অভিযোগ আছে। কিন্তু দ্বারকদাসের লেখায় পাওয়া যায় ভিন্ন বর্ণনা। অনেক দিন অসুখে ভুগেছেন রতনবাঈ। তাঁর মৃত্যুর দিনেও জিন্নাহ রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।
তাতে তাঁর পরিচিতজনেরা একটু অবাকই হন। পরদিন রাতে দ্বারকদাস জিন্নাহর বাসভবনে যান। বহু কাজের লোক থাকলেও বাড়িটি সেদিন সুনসান। তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে জিন্নাহর শয়নকক্ষে যান। ঘরে ঢুকে তিনি অবাক।
জিন্নাহ ওয়ার্ডরোব থেকে রাত্তির সব কাপড়চোপড় বের করে সেগুলো ঘরের ভেতরে সাজিয়েছেন নিজের হাতে, কাজের লোক দিয়ে নয়। স্ত্রীর পোশাকগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। দ্বারকদাস লক্ষ করেন কঠিনহৃদয় রাজনীতিকদের দুই চোখের কোণে দুই ফোঁটা অশ্রুবিন্দু।
জিন্নাহর এক জীবনীকার লিখেছেন তাঁর সন্তান দুটি: তাঁর কন্যা দিনা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান। এবং কাকতালীয় হলেও সত্য, তাঁর দুই সন্তানেরই জন্মদিন একই। দিনা ভূমিষ্ঠ হন লন্ডনে ১৯১৯ সালের ১৪-১৫ আগস্ট রাতে।
পাকিস্তানের জন্ম ২৮ বছর পরে ১৯৪৭ সালের একই দিনে, ১৪-১৫ আগস্ট। দিনার জন্ম হয় নির্ধারিত সময়ের চেয়ে সপ্তাহ দু-তিন আগে। ওই দিন জিন্নাহ রতনবাঈকে নিয়ে নাটক দেখতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ প্রসববেদনা ওঠে। দ্রুত স্ত্রীকে নিয়ে যান হাসপাতালে। দিনা বাবার আদল পেয়েছিল।
একমাত্র সন্তানের সঙ্গে নিঃসঙ্গ জিন্নাহর সম্পর্ক মধুর তো নয়ই, স্বাভাবিকও ছিল না। একপর্যায়ে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়। এবং বাবার প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের নাগরিকত্ব না নিয়ে তিনি ভারতেই থেকে যান ভারতীয় নাগরিক হিসেবে।
-- সৈয়দ আবুল মকসুদ @ শরিফ সাইদুর
৩৯
চট্টগ্রাম – বর্তমান বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। মধ্যযুগে এটা দুইবার বাংলার হাতছাড়া হয়েছিল।
প্রথমবার চট্টগ্রাম পুনর্দখল করেন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, ত্রিপুরা+আরাকান জোটের কাছ থেকে। সেবার তিনি এর নাম রাখেন ফতেহাবাদ।
দ্বিতীয়বার , চট্টগ্রাম হাতছাড়া হলে তা পুনরুদ্ধার করেন মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ। বিজয়ের পর তৎকালীন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ইচ্ছায় এর নাম রাখেন ইসলামাবাদ। সেইবারই শেষ, চট্টগ্রাম কে বাংলা আর কখনও হারায় নি
মুসলিমরা কিভাবে বাংলায় কুরবানীর স্বাধীনতা ফিরে পায়
গরু কুরবানীর ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে রয়েছে হযরত শাহজালাল ইয়েমেনী রহিমাহুল্লাহর অসাধারণ বীরত্বগাঁথা। তার দক্ষ নেতৃত্বে জমিদার সন্ত্রাসী গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত করে বাংলার গরু কুরবানীর স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
চলুন সেই অসাধারণ বীরত্বগাঁথা জেনে আসি।
সময় ১৩৪৪ সাল। সিলেটে হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দের রাজ্যের এক মহল্লায় ১৩টি মুসলিম পরিবার বাস করতেন। তারই একজন ছিলেন শেখ বুরহান উদ্দিন। তিনি হিন্দুত্ববাদী জালিম রাজা গৌড় গোবিন্দের কারণে গোপনে ইবাদত-বন্দেগী করতেন। কারণ সেখানে প্রকাশ্যে মুসলমানদের জন্য ইবাদত পালন করা নিষিদ্ধ ছিলো। এমনকি কেউ গরু জবাই ও কুরবানী করতে পারতো না।
শেখ বুরহান উদ্দিনের কোনো সন্তান ছিলো না। সন্তানের জন্য মহান আল্লাহ পাকের নিকট দোয়া করে তিনি নিয়ত করলেন, যদি তার একটি সন্তান হয় তাহলে তিনি শুকরিয়া স্বরূপ মহান আল্লাহর নামে একটি গরু কুরবানী করবেন। কিছুদিন অপেক্ষার পর সত্যি সত্যিই তার ঘর আলো করে একটি ফুটফুটে সন্তান জন্ম নিলো।
খুশি হয়ে বুরহানুদ্দীন শুকরিয়া করে নিয়ত মোতাবেক একদিন গোপনে একটি গরু কুরবানী করে গোশত মুসলমানদের মধ্যে বিলি করতে লাগলেন। এমন সময় একটি কাক এসে ছোঁ মেরে এক টুকরা গোশত নিয়ে গেলো। সেই কাক গোশতের টুকরাটি ফেললো গৌড় গোবিন্দের মন্দিরের প্রধান প্রবেশ পথে।
গোবিন্দ তা দেখার পর এতে ক্ষিপ্ত হলো। তারপর সৈন্য পাঠিয়ে শেখ বুরহান উদ্দিনকে তার সামনে উপস্থিত করালো। জালিম হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দ বুরহান উদ্দিনের ডান হাত কেটে দিলো। নিষ্পাপ সদ্য জন্ম নেয়া শিশু (গুলজার)-কে কথিত দেবতার সামনে বলি দিলো।
এ অবস্থা দেখে শিশুটির মা অর্থাৎ শেখ বুরহান উদ্দিনের স্ত্রী অজ্ঞান হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। শুধু তাই নয়, ওই যালিম গোবিন্দ ওই দিনই আক্রমণ চালিয়ে ওই এলাকার সকল মুসলমানদেরকে নির্মমভাবে শহীদ করে ফেললো!
শেখ বুরহান উদ্দিন রওয়ানা হলেন দিল্লির পথে। সেখানে সম্রাট আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ তুঘলকের কাছে গেলেন। তিনি বুরহান উদ্দিনের নিকট হতে সব বিষয় শুনে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসী গোবিন্দকে শায়েস্তা করার জন্য সৈন্যসহ সিকান্দার গাজীকে সেনাপতি করে অভিযানে পাঠালেন। কিন্তু পথিমধ্যে অনেক প্রতিকূলতার কারণে তারা দিল্লিতে ফিরে গেলেন।
অতঃপর নতুন কিছু সৈন্যসহ আর একজন বীর সাইয়্যিদ নাসির উদ্দিনকে সেনাপতি করা হলো। সম্রাটের আদেশ পেয়ে তিনি দোয়া নিতে গেলেন তাঁর পীর শায়েখ হযরত খাজা নিজাম উদ্দিন রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবারে। তখন ওখানেই অবস্থান করছিলেন হযরত শাহজালাল ইয়েমেনী রহিমাহুল্লাহ। সবকিছু শুনে হযরত শাহ জালাল রহিমাহুল্লাহ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনিও সাইয়্যিদ নাসির উদ্দিনের সাথে এই অভিযানে যাবেন।
অতঃপর হযরত শাহ জালাল রহিমাহুল্লাহ তাঁর ৩৬০ জন মুজাহিদ সঙ্গী নিয়ে সাইয়্যিদ নাসির উদ্দিনের সৈন্যবাহিনীর সাথে রওয়ানা দিলেন। পথিমধ্যে গৌর গোবিন্দের সৈন্যদের সাথে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। মুজাহিদীনদের বীরত্ব, কৌশল ও আল্লাহর গায়েবী সাহায্যে গৌর গোবিন্দ ও তার সন্ত্রাসীবাহিনী চরমভাবে পরাজিত হলো।
তারপর মুজাহিদ বাহিনী সামনে অগ্রসর হতে থাকলো গৌর গোবিন্দের রাজধানী অভিমুখে। সুরমা নদী পার হয়ে মুজাহিদ বাহিনী যখন প্রাসাদের নিকটবর্তী হলো, তখন গৌর গোবিন্দ প্রাসাদ ছেড়ে পালিয়ে যায়। গৌর গোবিন্দের রাজত্ব ও প্রাসাদ গুঁড়িয়ে দেয় মুজাহিদীনরা। এভাবে মুসলিমরা বাংলায় প্রকাশ্যে কুরবানীর স্বাধীনতা ফিরে পায়। গৌর গৌবিন্দের রাজ্যের নতুন নাম হয় জালালাবাদ। @Mir Md. Faisal
৪০
আমেরিকার গৃহযুদ্ধ
আমেরিকার গৃহযুদ্ধ (১৮৬১–১৮৬৫) ছিল দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। এই যুদ্ধের পেছনে কোনো একটি একক ঘটনা দায়ী ছিল না। বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মতবিরোধ এর প্রধান কারণ ছিল।
গৃহযুদ্ধের সবচেয়ে বড় এবং মূল কারণ ছিল দাসপ্রথা। উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে দাসপ্রথা নিয়ে তীব্র মতবিরোধ ছিল। উত্তরের রাজ্যগুলোতে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ ছিল। সেখানে একটি বড় অংশের মানুষের ধারণা ছিল যে দাসপ্রথা নৈতিকভাবে ভুল এবং অমানবিক।
দক্ষিণের রাজ্যগুলোর পুরো অর্থনীতিই ছিল দাস নির্ভর। তুলা, তামাক ও আখ চাষের জন্য তারা লাখ লাখ আফ্রিকান আমেরিকান দাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তারা মনে করত দাসপ্রথা বন্ধ হলে তাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে।
উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামো ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা দুই পক্ষের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। উত্তরের অর্থনীতি ছিল শিল্প ও কলকারখানা নির্ভর। অন্যদিকে, দক্ষিণের অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণ কৃষি প্রধান।
উত্তর অঞ্চলের কলকারখানাকে রক্ষা করার জন্য ফেডারেল সরকার আমদানিকৃত পণ্যের ওপর উচ্চ কর বা শুল্ক বসাতে চেয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণ অঞ্চল এর বিরোধী ছিল, কারণ তারা সস্তায় ইউরোপীয় পণ্য কিনতে পছন্দ করত এবং উচ্চ করের কারণে তাদের তুলা রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কতটুকু থাকবে এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর নিজস্ব স্বাধীনতা কতটুকু থাকবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ছিল। দক্ষিণের রাজ্যগুলোর দাবি ছিল, যেকোনো আইন বা নীতি (যেমন দাসপ্রথা বাতিল) যদি তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তবে তা বর্জন করার অধিকার রাজ্যের থাকা উচিত।
আমেরিকা যখন পশ্চিম দিকে নতুন নতুন অঞ্চল দখল করতে শুরু করে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এই নতুন রাজ্যগুলো কি 'মুক্ত রাজ্য' (দাসপ্রথামুক্ত) হবে নাকি 'দাস রাজ্য' হবে? এই নিয়ে উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য তীব্র রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়।
১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া ছিল এই যুদ্ধের তাৎক্ষণিক কারণ। লিংকন দাসপ্রথার বিস্তারের বিরোধী ছিলেন। দক্ষিণের রাজ্যগুলো নিশ্চিত বিশ্বাস করেছিল যে লিংকন প্রেসিডেন্ট হওয়ায় এখন তাদের দাসপ্রথা এবং জীবনযাত্রা হুমকির মুখে পড়বে।
লিংকন নির্বাচিত হওয়ার পরপরই দক্ষিণ ক্যারোলিনাসহ দক্ষিণের ১১টি রাজ্য আমেরিকা (Union) থেকে বের হয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় এবং নিজেদের একটি আলাদা রাষ্ট্র—কনফেডারেট স্টেটস অব আমেরিকা (Confederacy) গঠন করে। এর পরেই শুরু হয় গৃহযুদ্ধ।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে প্রায় ৬,২০,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, যা আমেরিকার ইতিহাসে যেকোনো যুদ্ধের চেয়ে বেশি। শেষ পর্যন্ত উত্তরের (Union) বিজয়ের মাধ্যমে দাসপ্রথার অবসান ঘটে এবং আমেরিকা একটি অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকে। @ Ahmed Rafique Barki
৪১
ট্রেইল অফ টিয়ার্স -- Trail of Tears
==========================
আমেরিকার আদিবাসীদের ভেতর অন্যতম একটি উপজাতি চেরোকী ইন্ডিয়ানরা বাস করত ক্যারোলিনা , টেনেসি , জর্জিয়া , আলাবামার এপালোশিয়ান পাহাড়ের উপত্যকায়।
,
আঠারশ সালের শুরুর দিকে এই এলাকায় ইউরোপ থেকে ভাগ্যের সন্ধানে ব্যাপকহারে সাদা মানুষের আগমন ঘটতে থাকে।
,
তখনকার মার্কিন সরকার চেরোকি নেতাদের সাথে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে যাতে পরিষ্কার লেখা ছিল চেরোকিদের আবাসস্থলে কোন সাদা মানুষের প্রবেশাধিকার থাকবে না।
,
যে সমস্ত সাদা মানুষ ইতিমধ্যেই এই এলাকায় আবাসস্থল স্থাপন করেছেন মার্কিন সরকার তাদের সরিয়ে নেবে।
,
আঠারোশ উনত্রিশ সালে অ্যান্ড্রু জ্যাকশন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি বিশ্বাস করতেন আমেরিকার আদিবাসীরা বর্বর এবং ভূমির উপর তাদের কোনো অধিকার নেই।
,
তিনি পরিকল্পনা করেন উর্বর ও খনিজ সম্পদে ভরপুর এলাকাগুলো থেকে ইন্ডিয়ানদের দুর্গম এলাকায় সরিয়ে দিয়ে ওই জায়গা সাদা মানুষদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।
,
১৮৩০ সালে অ্যান্ড্রু জ্যাকসন "ইন্ডিয়ান রিমুভাল এক্ট" নামে একটি আইন পাস করেন যেটা ইতিহাসে মার্কিন সরকারের অন্যতম বর্বর আইন হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে।
,
এই আইন কার্যকর করতে মার্কিন সেনাবাহিনী অস্ত্রের মুখে হাজার হাজার আদিবাসীকে তাদের পূর্বপুরুষের আবাসস্থল ছেড়ে পায়ে হেঁটে হাজার মাইল দূরে ওকলাহোমার দিকে সরে যেতে বাধ্য করে।
,
বিদ্রোহের আশঙ্কায় সামর্থ্যবান পুরুষদের প্রায় সবাইকে শিকল বাঁধা অবস্থায় খালি পায়ে হাটতে বাধ্য করা হয়। এই কঠিন পথ চলার কষ্টে আদিবাসীদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ পথেই মারা যায়।
,
যে পথ ধরে ইন্ডিয়ানদের হাঁটিয়ে নেওয়া হয়েছিল সেই পথ এখন ইতিহাসে ট্রেইল অফ টিয়ার্স নামে পরিচিত হয়ে আছে।
,
মাঝে মাঝে ভাবলে একটু অবাকই হতে হয় আমেরিকান ফাউন্ডার ফাদাররা কতই না উদার আর গণতান্ত্রিকমনা ছিলেন। অবশ্য বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্টরা তাদের পূর্বসূরিদের ধারা পুরোপুরি বজায় রেখেছেন। @ Ahmed Rafique Barki
৪২
সুলতান মাহমুদ গজনবী
প্রাচীন ও মধ্যযুগে বেশ কয়েকবার পারস্য বা ইরান থেকে ভারতে আক্রমণ পরিচালিত হয়। এর মধ্যে দুটি প্রধান আক্রমণ সবচেয়ে বিখ্যাত
১. হাখামানি বা আকিমেনীয় সাম্রাজ্যের আক্রমণ (খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতক)
নেতৃত্ব: মহান সাইরাস (খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০) এবং প্রথম দারিয়ুস.
ঘটনা: আকিমেনীয় বংশের পারসিক রাজারা উত্তর-পশ্চিম ভারতের সিন্ধু উপত্যকা ও গান্ধার অঞ্চল আক্রমণ করে নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করেন.
গুরুত্ব: সিন্ধু উপত্যকা পারস্যের একটি সমৃদ্ধ প্রদেশে পরিণত হয়। এর ফলে ভারতে খরোষ্ঠী লিপি ও স্থাপত্যকলার প্রভাব পড়ে এবং ভারত-পারস্য বাণিজ্য রুট তৈরি হয়.
২. নাদির শাহের ভারত আক্রমণ (১৭৩৮-১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দ)
নেতৃত্ব: ইরানের আফশারিদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা নাদির শাহ.
ঘটনা: ১৭৩৮ সালের মে মাসে নাদির শাহ উত্তর ভারত আক্রমণ করেন এবং ১৭৩৯ সালের মার্চ মাসে মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহকে কারনালের যুদ্ধে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসন দখল করেন।
ক্ষয়ক্ষতি: তিনি ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ধন-সম্পদ, যার মধ্যে বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন এবং কোহিনুর হীরা ছিল, পারস্যে লুট করে নিয়ে যান। এটি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করে.
অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্র যেমন উইকিপিডিয়া থেকে নাদির শাহের এই আক্রমণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়।
গজনীর সুলতান মাহমুদ ১০০০ থেকে ১০২৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে ১৭ বার সফল অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল মন্দির ও রাজ্য লুণ্ঠন করে সম্পদ সংগ্রহ এবং গজনীর সীমান্ত সুরক্ষিত করা । প্রধান অভিযানের মধ্যে জয়পালের বিরুদ্ধে ১০০১ সাল, কনৌজ ও মথুরা, এবং ১০২৬ সালের সুপ্রসিদ্ধ সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন অন্যতম ]। আফগানিস্তানের গজনবী সালতানাতের শ্রেষ্ঠ শাসক, সুলতান মাহমুদ গজনবীর ভারত অভিযান ছিল, ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ১০০০ থেকে ১০২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি ১৭ বার ভারতীয় উপমহাদেশের হিন্দু রাজাদের বিরুদ্ধে, অভিযান পরিচালনা করেন এবং বিস্ময়করভাবে প্রত্যেক অভিযানে তিনি বিজয়ী হন।
সুলতান মাহমুদ গজনবী কতবার ভারত আক্রমণ করেছিলেন?
তিনি সুলতান (“কর্তৃপক্ষ”) উপাধিধারী প্রথম শাসক যিনি আব্বাসীয় খিলাফতের আনুগত্য স্বীকার করে নিজের শাসন চালু রাখেন। নিজ শাসনামলে তিনি ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেন।
প্রধান অভিযানসমূহ ও ফলাফল:
সময়কাল ও উদ্দেশ্য: মাহমুদ ১০০০-১০২৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেন, যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রচুর সম্পদ লুণ্ঠন করা
প্রধান আক্রমণ: পাঞ্জাবের রাজা জয়পালকে ১০০১ সালে পরাজিত করার পর তিনি কনৌজ, থানেশ্বর এবং সোমনাথ মন্দির (১০২৬ সাল) আক্রমণ করে অঢেল ধন-সম্পদ, সোনা-রূপা নিয়ে যান [৭, ৮]।
ফলাফল:
এই অভিযানগুলোর কোনো দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রভাব ছিল না এবং তিনি ভারতে বড় কোনো সাম্রাজ্য স্থাপন করেননি [৩, ১১]। তবে, এই আক্রমণগুলো ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি করে এবং পরবর্তী সময়ে পারস্য তুর্কি আক্রমণের পথ সুগম করেসোমনাথ অভিযান: ১০২৬ সালে গুজরাটের সোমনাথ মন্দির ধ্বংস ও লুণ্ঠন ছিল তাঁর সবচেয়ে পরিচিত অভিযান, যা তাকে প্রচুর খ্যাতি ও সম্পদ এনে দেয় । গজনীর সুলতান মাহমুদ কেবল একজন দুর্ধর্ষ সমরনায়কই ছিলেন না, বরং তিনি ইসলামি সাম্রাজ্যের বিস্তার ও সংস্কৃতির বিকাশেও অনন্য ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে উইকিপিডিয়ার মাহমুদ গজনভি পাতাটি দেখতে পারেন।
সুলতান মাহমুদ মূলত একজন সামরিক বিজেতা ছিলেন, যিনি মন্দির লুণ্ঠন ও সম্পদ আহরণের মাধ্যমে গজনীকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন ।
১৭৩৯ সালে পারস্যের শাসক নাদের শাহ মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভারত আক্রমণ করেন এবং দিল্লি লুণ্ঠন করেন । ১৭৩৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কর্নালের যুদ্ধে মুঘল বাহিনীকে সহজে পরাজিত করে তিনি মার্চ মাসে দিল্লি দখল করেন [১, ৯]। এই অভিযানে তিনি বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন, কোহিনূর হীরা এবং অঢেল ধনসম্পদ পারস্যে নিয়ে যান ।
নাদের শাহের ভারত অভিযানের মূল দিকসমূহ:
আক্রমণের প্রেক্ষাপট: মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আফগানদের আশ্রয় দেওয়ার অজুহাতে ১৭৩৮ সালে নাদের শাহ ভারতের সীমান্তে আক্রমণ শুরু করেন [২, ১০]।
কর্নালের যুদ্ধ (১৭৩৯): মাত্র তিন ঘণ্টার যুদ্ধে নাদের শাহের সুসজ্জিত বাহিনী মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহকে পরাজিত করে [১, ৮]।
দিল্লি দখল ও হত্যাযজ্ঞ: ১৭৩৯ সালের ২০ মার্চ নাদের শাহ দিল্লিতে প্রবেশ করেন এবং শহরে ব্যাপক গণহত্যা ও লুণ্ঠন চালান [১০]।
লুণ্ঠিত সম্পদ: তিনি ময়ূর সিংহাসন, কোহিনূর হীরা, প্রচুর সোনা-রুপা, হাতি, ঘোড়া এবং দক্ষ কারিগরদের পারস্যে নিয়ে যান [৫, ৮]।
পরিণতি: এই অভিযানের ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা চূড়ান্তভাবে প্রকাশ পায় এবং সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয় ।
নাদের শাহ সিন্ধু নদ পর্যন্ত এলাকা মুঘলদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পারস্য সাম্রাজ্যের অংশ করে নেন [৩]।পার্সিয়ান বা ইরানি প্রেক্ষাপটে, 'গান পাউডার' বা বারুদ মূলত বারুত (Bārūt/Bārūd) নামে পরিচিত, যা আরবি ও তুর্কি ভাষার প্রভাব থেকে এসেছে। এটি সালফার, কাঠকয়লা ও পটাশিয়াম নাইট্রেটের (সল্টপিটার) মিশ্রণে তৈরি একটি প্রাচীন বিস্ফোরক। পারস্য ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এটি আগ্নেয়াস্ত্র ও কামানের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো এবং স্থানীয়ভাবে একে দালু (Dārū) বা দারমান (Darmān) বা "ঔষধ/প্রতিকার" বলা হতো।
পার্সিয়ান বারুদ সম্পর্কিত কিছু বিশেষ দিক:
উৎপত্তি: শব্দটি আরবি থেকে তুর্কি হয়ে পার্সিয়ান ভাষায় এসেছে।
ব্যবহার: ইরান, ভারত ও আফগানিস্তানের মুঘল ও সাফাবিদ বাহিনীতে গান পাউডার বা বারুদভিত্তিক বড় অস্ত্র ও রকেট ব্যবহারের প্রচলন ছিল।বাবর ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা । তিনি তার পিতা-মাতার দিক থেকে যথাক্রমে তৈমুর এবং চেঙ্গিস খানের বংশধর ছিলেন । [ 4 ] [ 5 ] [ 6 ] তাকে মরণোত্তর ফিরদৌস মাকানি ('জান্নাতে বসবাসকারী') উপাধিও দেওয়া হয়েছিল ।
উপাদান: এটি সাধারণ কালো পাউডার, যা একটি জারক (সল্টপিটার) এবং জ্বালানি (সালফার ও কার্বন) হিসেবে কাজ করে।
ঐতিহাসিকভাবে পারস্যের সামরিক প্রযুক্তিতে এই বারুদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অটোমান সাম্রাজ্য (১৩শ-২০শ শতাব্দী) গান পাউডার বা বারুদের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছিল, যা তাদের "গান পাউডার সাম্রাজ্য" হিসেবে পরিচিত করে [১]। ১৬শ শতক থেকে তারা যুদ্ধের মাঠে ব্যাপকভাবে বন্দুক ও কামানের ব্যবহার শুরু করে, যদিও কিছু ক্ষেত্রে তাদের ঐতিহ্যবাহী ধনুক চালনার কৌশলও বিদ্যমান ছিল [১]। অটোমানরা সালফার, কাঠকয়লা এবং পটাশিয়াম নাইট্রেটের মিশ্রণে তৈরি বারুদ ব্যবহার করত [২, ৩]।
গান পাউডারের প্রধান দিকসমূহ:
গান পাউডার সাম্রাজ্য (Gunpowder Empire): ১৬শ শতকের প্রথম দিক থেকে অটোমানরা আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম উপকরণ হিসেবে বারুদের ব্যাপক ব্যবহার শুরু করে [১]।
ব্যবহার: তাদের সেনাবাহিনীতে কামানের (cannons) gunsartillery ব্যবহার ছিল, যা দুর্গ বা প্রাচীর ভাঙার জন্য অত্যন্ত কার্যকর ছিল [১] ।
ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা: বারুদের প্রচলনের পরেও, Sipahi musket অশ্বারোহী বাহিনী ১৬শ শতকের মাঝামাঝি সময়েও ধনুক ব্যবহার করত [১]।
উপাদান: এই বারুদ সাধারণত সালফার, কাঠকয়লা এবং পটাশিয়াম নাইট্রেট (সল্টপিটার) দিয়ে তৈরি হতো [২, ৩]।
এই gunpowder weapons শক্তিশালী সামরিক কৌশল persian mughal,mongoluzbek অটোমানদের যুদ্ধের ময়দানে অপরাজেয় করে তুলেছিল ।
collectedcopi novuabs18
৪৩
“সব প্রাণীকে মরতেই হবে” কথাটি কি ঠিক?
অনেক ধর্ম ও দর্শনে “সব প্রাণীকেই একদিন মরতে হবে” এই বক্তব্যটি আছে। এটি মানবজীবনের সীমাবদ্ধতা এবং পরকাল বা অস্তিত্বের ব্যাখ্যার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বিজ্ঞান যখন কোনো বক্তব্য বিচার করে, তখন সেটিকে প্রমাণ, পর্যবেক্ষণ এবং ব্যতিক্রমের আলোকে পরীক্ষা করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন ওঠে “প্রত্যেক প্রাণী কি অবশ্যই মরবে?” সংক্ষেপে উত্তর হলো– বিজ্ঞান এই দাবিকে সর্বজনীন সত্য হিসেবে স্বীকার করে না।
জীববিজ্ঞানে অধিকাংশ প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীব একসময় মারা যায়। কোষীয় ক্ষয়, ডিএনএ ক্ষতি, রোগ, পরিবেশগত চাপ, শিকারি প্রাণী, খাদ্যসংকট, এসব কারণে জীবের মৃত্যু ঘটে। মানুষসহ অধিকাংশ প্রাণীর ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে; একে বলা হয় Senescence বা জৈবিক বার্ধক্য। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন আসে– যদি কোনো জীব বয়সের কারণে না মরে, তাহলে কি “সব প্রাণীকে মরতেই হবে” কথাটি বৈজ্ঞানিকভাবে সার্বজনীন দাবি হিসেবে টিকে থাকে?
সমুদ্রের ক্ষুদ্র এক প্রাণী “Turritopsis dohrnii”, যাকে জনপ্রিয়ভাবে “Immortal jellyfish” বা “জেলিফিশ” বলা হয়, বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয়। এই প্রাণীটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও প্রতিকূল অবস্থায় আবার শিশু পর্যায়ে ফিরে যেতে পারে। অর্থাৎ নিজের জীবনচক্র রিসেট করতে পারে। গবেষকেরা এটিকে “Biological immortality”-এর উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করেন। অর্থাৎ এটি বয়সজনিত বার্ধক্যে বাধ্যতামূলকভাবে মারা যায় না। তবে শিকারি প্রাণীর আক্রমণ, পরিবেশগত বিপর্যয়ে মারা যেতে পারে। কিন্তু বার্ধক্যজনিত মৃত্যু তার জন্য অনিবার্য নয়। তাই এটি “সব প্রাণীকেই একদিন মরতে হবে” বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো “হাইড্রা”। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু হাইড্রা প্রজাতির ক্ষেত্রে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে মৃত্যুহার বাড়ে না এবং প্রজননক্ষমতাও কমে না। বিজ্ঞানীরা এটিকে “Negligible senescence” অর্থাৎ অনুপস্থিত বার্ধক্য হিসেবে বর্ণনা করেন। সহজ ভাষায়, হাইড্রার ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ার নিয়মটি কাজ করে না। এরা বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবে মরে না।
অতএব, “সব প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে” এটি ধর্মীয় বা দার্শনিক বক্তব্য হতে পারে; কিন্তু বৈজ্ঞানিক ভাষায় এটি প্রমাণিত সর্বজনীন সত্য নয়। বিজ্ঞান বলে– “অধিকাংশ জীব একসময় মারা যায়, কিন্তু জৈবিক বাস্তবতায় কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে।
৪৪
মানুষ আলাদা করে তৈরি কোনো অতিপ্রাকৃত প্রকল্প নয়
মানুষের রক্তে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ছাপ পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, মানুষের রক্ত ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কিছু কোষ এমন জিনগত বৈশিষ্ট্য বহন করে, যার উৎস বহু প্রাচীন এককোষী জীব পর্যন্ত পৌঁছায়।
মানুষ নিজেকে প্রায়ই প্রকৃতির শিখর হিসেবে কল্পনা করতে ভালোবাসে। কিন্তু জীববিজ্ঞান এক ভিন্ন কথা বলে। আমাদের শরীর কোনো হঠাৎ সৃষ্টি নয়; বরং কোটি কোটি বছরের পরিবর্তন, অভিযোজন ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফল। মানুষের রক্তও তার ব্যতিক্রম নয়।
আজ যে রক্ত আমাদের দেহে অক্সিজেন বহন করে, সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং ক্ষত সারাতে সাহায্য করে, তার কিছু জৈবিক নকশা এসেছে বহু প্রাচীন এককোষী জীব থেকে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তকোষের বিবর্তনীয় ইতিহাস অনুসরণ করলে তার শিকড় প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বছর আগের এককোষী পূর্বপুরুষ পর্যন্ত পৌঁছায়। বিশেষ করে কিছু রোগপ্রতিরোধী কোষ; যেমন ম্যাক্রোফেজ– প্রাচীন কোষীয় আচরণের সঙ্গে গভীর সাদৃশ্য দেখায়। এই তথ্য আমাদের একটি মৌলিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়– মানুষ প্রকৃতির বাইরে কোনো ব্যতিক্রমী সত্তা নয়; মানুষ প্রকৃতিরই ধারাবাহিকতা।
এককোষী জীবদের সবচেয়ে জরুরি কাজ ছিলো টিকে থাকা। বাইরের আক্রমণ ঠেকানো, খাদ্য সংগ্রহ, বিপজ্জনক বস্তু সরানো। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কিছু কোষও ঠিক একই ধরনের কাজ করে। যেমন– ম্যাক্রোফেজ নামের কোষ জীবাণুকে গ্রাস করে, মৃত কোষ পরিষ্কার করে এবং দেহকে সুরক্ষিত রাখে। গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, এই কোষগুলোর আচরণ এবং কিছু জিনগত কার্যক্রম প্রাচীন এককোষী জীবের সঙ্গে মিলে যায়। অর্থাৎ বিবর্তন নতুন কিছু “শূন্য থেকে” বানায়নি; পুরোনো জৈবিক উপাদানকে নতুনভাবে ব্যবহার করেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক নীতি কাজ করে– “Evolution tinkers, it doesn’t engineer from scratch” অর্থাৎ বিবর্তন পুরোনো জিন ও কাঠামোকে পরিবর্তন করে নতুন ব্যবহার তৈরি করে।
গবেষণায় বিশেষভাবে FOS নামের একটি জিনকে অনুসরণ করা হয়েছে, যা বহু প্রাণীর রক্তকোষে সক্রিয়। বিজ্ঞানীরা এর উৎস এমন এক পূর্বপুরুষের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন, যে বহু কোটি বছর আগে এককোষী ছিলো। এই আবিষ্কার জানান দেয় যে, আমাদের শরীরের কিছু মৌলিক জিনগত প্রোগ্রাম বহু আগেই তৈরি হয়েছিলো এবং পরে প্রাণীদের বিবর্তনের সাথে সাথে নতুন রূপ পেয়েছে। এটি এমন নয় যে “পুরোনো কোষ এখনো হুবহু রয়ে গেছে”; বরং তাদের জিনগত ও কার্যকরী ছাপ নতুন জৈবিক ব্যবস্থার ভিতরে রূপান্তরিত হয়ে আছে। সহজ ভাষায়– আমরা যেন কোটি বছরের পুরোনো সফটওয়্যারের ওপর নতুন আপডেট বসানো এক জীবন্ত সিস্টেম।
এই আবিষ্কার বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি “স্রষ্টার বিশেষ সৃষ্টি” ধারণার বদলে ক্রমাগত প্রাকৃতিক বিবর্তনের ধারাকে শক্তিশালী করে। মানুষ আলাদা করে তৈরি কোনো অতিপ্রাকৃত প্রকল্প নয়, এই ধারণা জীববিজ্ঞানের বহু পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমাদের জিনে ভুল আছে, অপ্রয়োজনীয় অবশিষ্ট কাঠামো আছে, এবং অসংখ্য “patchwork” বৈশিষ্ট্য আছে, যা দক্ষ ডিজাইনের চেয়ে দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে বেশি খাপ খায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মানুষের শরীর নিখুঁত নয়। আমাদের মেরুদণ্ডের ব্যথা, অন্ধ বিন্দু (blind spot), কিংবা অ্যাপেন্ডিক্সের মতো অঙ্গ দেখায়– জীবন কোনো “flawless engineering” নয়; বরং অভিযোজনের ধারাবাহিক সমঝোতা। আমরা মহাবিশ্বের বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নই। আমরা নক্ষত্রের ধূলিকণা, রাসায়নিক বিবর্তন এবং জীবনের দীর্ঘ ইতিহাসের ফল।
মানুষের রক্ত শুধু অক্সিজেন বহন করে না, এটি ইতিহাসও বহন করে। ৭০০ মিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ইতিহাস। প্রতিটি রক্তকোষ যেন পৃথিবীর জীবনের দীর্ঘ পরীক্ষাগারের ফলাফল, যেখানে এককোষী জীবের টিকে থাকার কৌশল ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে জটিল প্রাণীর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায়। এই সত্য আমাদের শেখায়– মানুষ প্রকৃতির কেন্দ্র নয়, বরং তারই একটি অধ্যায়। জীবনের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করতে অতিপ্রাকৃত গল্পের প্রয়োজন নেই, বাস্তবতার ইতিহাসই যথেষ্ট বিস্ময়কর। @অনিন্দ্য জয়
৪৫
যারা কম জানে, তারা নিজেদের যোগ্যতা বেশি মনে করে
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হলো– এখানে মূর্খরা চেঁচামেচি করে বেশি, আর জ্ঞানীরা থাকেন চুপচাপ। যেখানে জ্ঞান নীরব থাকে, সেখানে মূর্খতার হাউকাউ বেশি। কারণ, মূর্খরা সংঘবদ্ধ ও লজ্জাহীন। নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতার একটি বড় উৎস হলো মূর্খদের সংঘবদ্ধতা।
এদেশের মূর্খদের মনস্তত্ত্বে “সেলফ-অ্যাসিউরেন্স”-এর একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। মূর্খরা তাদের সীমিত জ্ঞান এবং ভুল ধারণাকে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করে। সাইকোলজিতে এটিকে “Dunning-Kruger Effect” বলা হয়। যারা কম জানে, তারা নিজেদের যোগ্যতা বেশি মনে করে। ফলে মূর্খরা চেঁচামেচি করে বক্তৃতা দেয়, তাদের পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয় এবং তারা দ্রুত অন্যদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। অপরদিকে, জ্ঞানীরা প্রায়ই সাবধানে কথা বলেন। তারা জানেন কতটা জানা আছে, কতটা অজানা। অতএব, তারা নীরব বা সংযমী থাকেন। এই নীরবতা ভুলভাবে 'অসংগঠিততা' বা 'অদৃশ্যতা' মনে হতে পারে, অথচ তা সচেতন সংযম।
মূর্খরা যখন লজ্জাহীন হয়ে সংঘবদ্ধ হয়, তখন সমাজে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। ইতিহাসে ফ্যাসিবাদের উত্থান লক্ষ্য করলে দেখা যায়– লজ্জাহীন, অজ্ঞ, উগ্র ও অন্ধ আনুগত্যনির্ভর জনগোষ্ঠী সংঘবদ্ধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে। তারা দমন, পীড়ন, সহিংসতা ও স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছে।
জ্ঞানীরা বা চিন্তাশীল মানুষ অনেক সময় সংযমী থাকেন। কিন্তু জনপরিসরে তাদের নীরবতা বা কম সক্রিয়তা একসময় মূর্খদের শক্তি বাড়িয়ে দেয়। যখন বিশ্লেষণ, যুক্তি ও সতর্কতার পক্ষে থাকা কণ্ঠগুলো নীরব বা কম সক্রিয় থাকে, তখন সমাজে মূর্খদের মূর্খামি, ভুল তথ্য, মিথ্যাচার ও চেঁচামেচিনির্ভর বক্তব্য সহজে জায়গা করে নেয়। ফলে সমাজের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি ক্ষয় হতে থাকে; আর মূর্খরা সক্রিয় ও সংহত হলে সমাজ বিপদের মুখে পড়ে। @অনিন্দ্য জয়
৪৬
একই কাজ এক ধর্মে পুণ্য, আরেক ধর্মে পাপ
মানুষের ধর্মীয় ইতিহাসে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে কিছু ধর্ম ও দর্শন বলে “জীবহত্যা মহাপাপ”; অন্যদিকে কিছু ধর্মীয় রীতিতে পশুবলি বা কোরবানি “পুণ্য”, “ত্যাগ” বা “ভক্তির নিদর্শন” হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রশ্ন হলো– নৈতিক সত্য কি আপেক্ষিক? নাকি ধর্মভেদে পাপ-পুণ্যের সংজ্ঞাও বদলে যায়?
জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মে “অহিংসা” শুধু নৈতিক শিক্ষা নয়, বরং কেন্দ্রীয় নীতি। বিশেষত জৈন দর্শনে ক্ষুদ্রতম প্রাণীকেও আঘাত না করার প্রবণতা এতো প্রবল যে, অনেক অনুসারী হাঁটার সময়ও সতর্ক থাকেন যেন অনিচ্ছায় কোনো পোকামাকড় না মরে। বহু বৌদ্ধ ধারাতেও করুণা ও প্রাণের প্রতি সহমর্মিতা বড় মূল্যবোধ। যদিও সব বৌদ্ধ অনুসারী নিরামিষভোজী নন, তবু “অহিংসা” সেখানে গভীর নৈতিক আদর্শ।
অন্যদিকে, হিন্দু ধর্মের কিছু শাক্ত ধারায় পশুবলির প্রচলন রয়েছে। শাক্তরা অর্থাৎ শক্তির উপাসকরা বিশ্বাস করে, বলিতে দেবতা সন্তুষ্ট হন। বিভিন্ন শক্তির দেবীকে সন্তুষ্ট করা, শক্তির প্রতীকী নিবেদন হিসেবে বহু অঞ্চলে পশুবলির প্রচলন রয়েছে। বলি দেওয়া হয় সাধারণভাবে পাঁঠা, ভেড়া, মোষ, হরিণ, কাছিম ইত্যাদি। তবে এটাও সত্য যে, সব হিন্দু সম্প্রদায় বলি সমর্থন করে না; বহু মন্দিরে এখন প্রতীকী বলি (যেমন কুমড়া, লাউ বা আখ) প্রচলিত।
একইভাবে, ইসলাম ধর্মে কোরবানি মূলত আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও ভাগাভাগির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। বিশ্বাস অনুযায়ী, কোরবানির মানে হলো নিজের লোভ, অহংকার ও স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে ত্যাগের প্রতীক। কোরবানি দেওয়া হয় সাধারণভাবে গরু, ভেড়া, ছাগল, উট ইত্যাদি। যারা কোরবানি দেয়, তারা স্রষ্টার প্রিয় হয় বলে মুসলিমরা বিশ্বাস করে।
তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়– একই কাজ এক ধর্মে পুণ্য, আরেক ধর্মে পাপ; এটা কীভাবে সম্ভব? যদি প্রাণ নেওয়া নৈতিকভাবে ভুল হয়, তবে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে সেটি কি নৈতিক হয়ে যায়?
৪৭
মুক্তচিন্তা" মানে নিজের বিশ্বাসকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারা
অনেকে মনে করেন– "মুক্তচিন্তা" মানে শুধু প্রচলিত মতের বিরোধিতা করা, ধর্ম বা রাজনীতির সমালোচনা করা, কিংবা সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অথচ "মুক্তচিন্তা" অনেক গভীর একটি বিষয়। "মুক্তচিন্তা" মানে শুধু অন্যের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করা নয়; নিজের বিশ্বাসকেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারা। যে মানুষ নিজের বিশ্বাস বা ধারণাকে কখনো সন্দেহ করে না, সে জ্ঞানী নয়, সে শুধু আত্মতুষ্ট। কারণ জ্ঞান শুরু হয় প্রশ্ন থেকে, আর প্রশ্নের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের চিন্তাজগত।
মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজের বিশ্বাস বা ধারণাকে সত্য বলে ধরে নিতে চায়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয়– “Confirmation Bias”। অর্থাৎ মানুষ এমন তথ্য খোঁজে যা তার পূর্বধারণাকে সমর্থন করে, আর বিরোধী তথ্যকে এড়িয়ে যায়। ধর্ম, রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ কিংবা ব্যক্তিগত মতাদর্শ– সব ক্ষেত্রেই এই প্রবণতা কাজ করে। ফলে মানুষ সত্যের অনুসন্ধানী না হয়ে নিজের বিশ্বাসের উকিল হয়ে ওঠে। তখন যুক্তি আর অনুসন্ধানের জায়গা দখল করে আবেগ ও অহংকার। মুক্তচিন্তার মূল কাজ হলো– এই মানসিক দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা এবং নিজের চিন্তাকে নিরন্তর যাচাই করা।
ইতিহাসে যারা মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছেন, তারা অধিকাংশই নিজেদের সময়ের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো– তারা নিজেদের ধারণাকেও অন্ধভাবে আঁকড়ে থাকেননি। বিজ্ঞান হচ্ছে তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বিজ্ঞান কোনো “চূড়ান্ত ধর্ম” নয়; বরং এটি একটি নিরন্তর আত্মসংশোধনের প্রক্রিয়া। একসময় আইজ্যাক নিউটনের পদার্থবিজ্ঞানকে চূড়ান্ত মনে করা হতো, পরে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এসে তার সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছেন। আবার আইনস্টাইনের মতবাদ নিয়েও আজ নতুন প্রশ্ন উঠছে। এই আত্মসমালোচনামূলক মনোভাবই সভ্যতার অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি।
অন্যদিকে, যে সমাজ বা মতবাদ প্রশ্নকে ভয় পায়, সেখানে জ্ঞান স্থবির হয়ে যায়। মধ্যযুগে ইউরোপে ধর্মীয় গোঁড়ামি বিজ্ঞানচর্চাকে দমিয়ে রেখেছিলো। কারণ সত্যের চেয়ে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসকে রক্ষা করাই তখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। ইতিহাসের এরকম অনেক ঘটনায় দেখা যায়– মানুষ প্রায়ই সত্যকে নয়, নিজের মানসিক নিরাপত্তাকে বেশি ভালোবাসে। আর এই মানসিক নিরাপত্তার নামই “অন্ধবিশ্বাস”।
মুক্তচিন্তার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অহংকার। মানুষ যখন মনে করে “আমি ভুল হতে পারি না”, তখন তার চিন্তার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সে আর নতুন কিছু শেখে না; বরং নিজের অবস্থান রক্ষার জন্য মিথ্যা, বিকৃতি ও আক্রমণাত্মক আচরণের আশ্রয় নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। মানুষ এখন তথ্য জানার জন্য নয়, নিজের মতের সমর্থন পাওয়ার জন্য তথ্য খোঁজে। ফলে যুক্তিনির্ভর আলোচনা কমে গিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভক্ত, ক্ষুব্ধ ও অসহিষ্ণু সমাজ।
প্রকৃত মুক্তচিন্তা মানুষকে বিনয়ী করে। কারণ যে সত্যিকার অর্থে চিন্তা করে, সে জানে তার জ্ঞান সীমিত। দার্শনিক Socrates-এর বিখ্যাত উক্তি ছিলো– “আমি শুধু এটুকুই জানি যে আমি কিছুই জানি না।” এই উপলব্ধি দুর্বলতার নয়; বরং জ্ঞানের পরিপক্বতার লক্ষণ। যে মানুষ নিজের ভুলের সম্ভাবনা স্বীকার করতে পারে, সে-ই নতুন সত্য গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। আর যে নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্নাতীত মনে করে, সে ধীরে ধীরে মতাদর্শের বন্দী হয়ে পড়ে।
সভ্যতার ইতিহাস মূলত আত্মসমালোচনার ইতিহাস। দাসপ্রথা একসময় স্বাভাবিক বলে মনে করা হতো, নারীর ভোটাধিকারকে হাস্যকর ভাবা হতো, রাজতন্ত্রকে ঈশ্বরপ্রদত্ত মনে করা হতো। কিন্তু কিছু মানুষ প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করেছিলো বলেই সমাজ পরিবর্তিত হয়েছে। যদি মানুষ কেবল পুরোনো ধারণাকে আঁকড়ে ধরে থাকতো, তাহলে মানবসভ্যতা আজও অন্ধকার যুগে পড়ে থাকতো।
তাই "মুক্তচিন্তা" মানে শুধু সাহসী বক্তব্য দেওয়া নয়; বরং নিজের প্রিয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সততা রাখা। এটি এমন এক মানসিকতা, যেখানে কোনো মতবাদ, ব্যক্তি বা বিশ্বাসকে চূড়ান্ত ধরা হয় না। কারণ সত্যের প্রতি আনুগত্যই একজন চিন্তাশীল মানুষের প্রথম পরিচয়, নিজের অহংকারের প্রতি নয়।
যে মানুষ নিজের ধারণা বা বিশ্বাসকে কখনো প্রশ্ন করে না, সে মুক্তচিন্তার মানুষ হতে পারে না। আর যে মানুষ যুক্তির সামনে নিজের বিশ্বাস বা ধারণাকেও দাঁড় করাতে পারে, সভ্যতার ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তার হাত ধরেই এগিয়ে যায়। @অনিন্দ্য জয়
৪৮
বাঙালি সংস্কৃতি ও ভারতীয় সংস্কৃতি
"ইসলামী সংস্কৃতি", "হিন্দু সংস্কৃতি”, "খ্রিষ্টান সংস্কৃতি", "বৌদ্ধ সংস্কৃতি" বলে আলাদা কোনো স্বতন্ত্র সংস্কৃতি বাস্তবে নেই। যা বাস্তব ও ঐতিহাসিকভাবে বিদ্যমান, তা হলো– আরবীয় সংস্কৃতি, পারসিক সংস্কৃতি, ভারতীয় সংস্কৃতি, চীনা সংস্কৃতি, ইউরোপীয় সংস্কৃতি, বাঙালি সংস্কৃতি– যেগুলো ভৌগোলিক, ভাষাগত ও জাতিগত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।
ধর্ম হলো ব্যক্তিগত জীবন ও আচরণের বিধি-নিষেধ। ব্যক্তি কীভাবে স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে, কীভাবে ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনা করবে– এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয় ধর্ম। কিন্তু ধর্ম নিজে কোনো জাতির খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, ভাষা, সংগীত, লোকাচার বা উৎসব তৈরি করে না।
আজ "ইসলামী সংস্কৃতি" প্রচলনের নামে যেটা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, সেটা আরবীয় সংস্কৃতি– পোশাক, নামকরণ, সামাজিক রীতি, এমনকি শোক-উৎসবের ভঙ্গি পর্যন্ত। অথচ ইসলাম নিজেই বিভিন্ন ভূখণ্ডে গিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেছে। ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ইরান, সেনেগাল বা বাংলাদেশ– সবখানে ইসলাম আছে, কিন্তু সংস্কৃতি এক নয়। কারণ সংস্কৃতি ধর্ম দিয়ে নয়; মাটি, মানুষ ও ইতিহাস দিয়ে গড়ে ওঠে।
একইভাবে "হিন্দু সংস্কৃতি" বললেও বাস্তবে তা মূলত ভারতীয় উপমহাদেশীয় সংস্কৃতি। দুর্গাপূজা, বসন্ত উৎসব, লোকসংগীত, আঞ্চলিক নৃত্য কিংবা সামাজিক রীতিনীতি– এসব আচার-অনুষ্ঠানে ধর্মীয় উপাদান রয়েছে, কিন্তু এগুলোর প্রকাশভঙ্গি অঞ্চলভেদে ভিন্ন। পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ওড়িশা, তামিলনাড়ু বা নেপালে একই ধর্ম অনুসরণ করলেও উৎসব, পোশাক, ভাষা ও সামাজিক আচরণ এক নয়। কারণ এসব পার্থক্য তৈরি করেছে স্থানীয় সংস্কৃতি, ধর্ম নয়।
বাঙালি সংস্কৃতি ও ভারতীয় সংস্কৃতির সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। ঐতিহাসিকভাবে বাংলা অঞ্চল বহু শতাব্দী ধরে বৃহত্তর ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরের অংশ ছিলো। সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলার বিকাশ– এটাও ভারতীয় সভ্যতার ধারার অংশ। এছাড়াও বাঙালি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে হাজার বছরের নদী, কৃষি, ভাষা, লোককথা, বৈষ্ণব-সুফি ভাবধারা, বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে। লালন, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম– এরা কেউ "আরবীয় সংস্কৃতি" চর্চা করেননি, আবার ধর্মবিমুখও ছিলেন না। তারা ছিলেন মাটির মানুষ, মাটির ধর্মচিন্তার প্রতিনিধি। লালন শাহ'র দর্শন ভারতীয় মূলধারার হিন্দু সংস্কৃতির সরাসরি ধারাবাহিকতা নয়, এটা গ্রামীণ বাংলা ও সুফি-ভক্তি মিশ্র এক অনন্য ধারা। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় রেনেসাঁর অংশ হলেও তাঁর সৃষ্টিশীলতা গভীরভাবে বাংলা অভিজ্ঞতায় প্রোথিত।
সংস্কৃতি কখনোই ফরমান দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সামাজিক ভয় বা ধর্মীয় দোহাই দিয়ে যা চাপানো হয়, তা সংস্কৃতি নয়– তা হলো সাংস্কৃতিক দখলদারিত্ব। ইতিহাসে দেখা গেছে– জোর করে চাপানো সংস্কৃতি টেকে না; বরং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জীবনাচরণই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
ধর্ম কে মানবে, কে মানবে না– এটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু নিজের মাটি, ভাষা, ইতিহাস আর লোকজ জীবনবোধ অস্বীকার করে নয়। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা, আর সংস্কৃতি একটি জাতির সমষ্টিগত আত্মপরিচয়। ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে জাতিগত পরিচয়কে ধ্বংস করা কোনো সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না। সংস্কৃতি গড়ে ওঠে ভালোবাসা থেকে, ভয় থেকে নয়। @অনিন্দ্য জয়
৪৯
জেনেটিক্স, জীবাশ্মবিদ্যা ও বিবর্তনতত্ত্ব
মানবজাতির উৎপত্তি নিয়ে প্রায় সব ধর্মেই একটি সাধারণ বর্ণনা পাওয়া যায়– একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে পুরো মানবজাতির বিস্তার। প্রশ্ন হচ্ছে– বৈজ্ঞানিকভাবে কি সত্যিই মাত্র দুইজন মানুষ থেকে আজকের প্রায় ৮০০ কোটি মানুষের সৃষ্টি সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের জানতে হবে জেনেটিক্স, জীবাশ্মবিদ্যা ও বিবর্তনতত্ত্ব সম্পর্কে–
১) মানুষের শরীরে প্রায় ২০,০০০-এর বেশি জিন রয়েছে। পৃথিবীর বর্তমান ৮০০ কোটি মানুষের মধ্যে যে নানান বৈচিত্র্য (ত্বকের রং, চুল, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ইত্যাদি) দেখা যায়, তা এসেছে হাজার হাজার বছরের জিনগত পরিবর্তন ও মিউটেশনের মাধ্যমে। যদি পুরো মানবজাতি মাত্র দুইজন মানুষ থেকে আসতো, তাহলে সবার জিন প্রায় একই রকম হতো, বৈচিত্র্য অত্যন্ত কম থাকতো, অনেক জিনগত রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তো। বাস্তবে কিন্তু তা নয়। জেনেটিক গবেষণা বলছে– মানুষের মধ্যে বিশাল জেনেটিক বৈচিত্র্য আছে এবং এই বিশাল বৈচিত্র্য তৈরি হতে হাজার হাজার প্রজন্ম এবং একটি বড় জনসংখ্যার প্রয়োজন। অর্থাৎ মানবজাতির সূচনা একটি বড় জনসংখ্যা থেকে হয়েছে, শুধুমাত্র দুইজন মানুষ থেকে নয়।
২) যদি মাত্র একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে মানবজাতি শুরু হয়, তাহলে তাদের সন্তানদের মধ্যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভাই-বোন, পিতা-কন্যা, মা-ছেলের মধ্যে প্রজনন ঘটতে বাধ্য। এর ফলে জিনগত ত্রুটি দ্রুত জমা হয় এবং মারাত্মক রোগ, বিকলাঙ্গতা ও প্রজনন ক্ষমতা কমে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় "Inbreeding Depression"। প্রকৃতিতে আমরা দেখি– দীর্ঘদিন ইনব্রিডিং চললে একটি প্রজাতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিলুপ্ত হয়ে যায়। অথচ মানুষ ক্রমাগত শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় হয়েছে, যা এই ধারণার বিপরীত।
৩) আধুনিক জেনেটিক গবেষণা বলছে– মানুষের পূর্বপুরুষদের “Effective population size” কখনোই ১০,০০০-এর নিচে নামেনি। অর্থাৎ মানবজাতি কখনোই মাত্র ২ জনে সীমাবদ্ধ ছিলো না, বরং হাজার হাজার মানুষের একটি গোষ্ঠী থেকে ধীরে ধীরে বিস্তার ঘটেছে।
৪) বিজ্ঞানীরা “Mitochondrial Eve” এবং “Y-chromosomal Adam” নামে দুটি ধারণা ব্যবহার করেন। কিন্তু এগুলোকে অনেকেই ভুলভাবে ধর্মের প্রথম পুরুষ ও নারীর সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। বাস্তবে Mitochondrial Eve এবং Y-chromosomal Adam কোনো একসময়কার একমাত্র নারী ও পুরুষ ছিলেন না; বরং তারা সেই ব্যক্তির প্রতীক, যাদের বংশধারা আজ পর্যন্ত টিকে আছে। তাদের সময়কালও ভিন্ন। মানে তারা একই সময়ে বসবাসও করেননি। তাদের পাশাপাশি আরও হাজার হাজার মানুষ তখন জীবিত ছিল, যারা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়েছে বা তাদের বংশধারা টিকে থাকেনি।
৫) "Theory of Evolution" অনুযায়ী– মানুষ ধাপে ধাপে পূর্ববর্তী প্রজাতি থেকে বিবর্তিত হয়েছে। মানুষ কোনো এক জোড়া থেকে হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি; বরং লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে প্রাচীন হোমিনিন (মানব-সদৃশ প্রজাতি) থেকে ধীরে ধীরে আধুনিক মানুষে পরিণত হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় কখনোই “প্রথম মানুষ” হিসেবে একক কোনো দম্পতির অস্তিত্ব ছিলো না, বরং একটি বৃহৎ জনসংখ্যার মধ্যে ধীরে ধীরে বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবর্তিত হয়েছে। এছাড়া প্রত্নতত্ত্ব ও জীবাশ্মবিদ্যা দেখায় যে– আধুনিক মানুষ (Homo sapiens) প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় উদ্ভূত হয় এবং তখনই তারা একটি উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যা হিসেবে বিদ্যমান ছিলো। অর্থাৎ শুরু থেকেই মানুষ একাধিক ব্যক্তি নিয়ে গঠিত ছিলো, কোনো একক দম্পতি নয়।
তাহলে ধর্মীয় এই কাহিনীগুলো কোথা থেকে এলো? যুক্তিবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোকে প্রতীকী বা রূপক (Mythological narrative) হিসেবে দেখা যায়। প্রাচীন মানুষ যখন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানতো না, তখন তারা সহজভাবে মানবজাতির উৎপত্তি বোঝাতে একটি “প্রথম দম্পতি”-র গল্প তৈরি করেছে। এটি ছিলো একটি বোধগম্য ও সহজ বর্ণনা, কিন্তু তা বাস্তব বৈজ্ঞানিক সত্য নয়।
বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, জেনেটিক বিশ্লেষণ, বিবর্তনতত্ত্ব ও জীবাশ্মবিদ্যা একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেয়– পুরো মানবজাতি মাত্র দুইজন মানুষ থেকে সৃষ্টি হয়নি। বরং আমরা একটি দীর্ঘ, জটিল ও বহু-প্রজন্মব্যাপী বিবর্তনের ফল। @অনিন্দ্য জয়
৫০
মুক্তি আসে চিন্তা, সহমর্মিতা ও আত্মজ্ঞান থেকে
গৌতম বুদ্ধ স্রষ্টাকে নয়, যুক্তি ও মানবতাকে কেন্দ্র করে সত্য খুঁজেছেন। তিনি বিশ্বাসের নয়, অনুসন্ধানের মানুষ। তিনি শিখিয়েছেন– মুক্তি আসে চিন্তা, সহমর্মিতা ও আত্মজ্ঞান থেকে, অলৌকিক আশীর্বাদ থেকে নয়। তিনি বলেননি– "বিশ্বাস করো", তিনি বলেছেন– "পরীক্ষা করো"। তাঁর শিক্ষা কোনো অলৌকিক স্রষ্টাভিত্তিক নয়, বরং বাস্তব জীবনের দুঃখ, ভোগ, মায়া, আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক মুক্তির বিশ্লেষণ।
গৌতম বুদ্ধ একবার কোসলে রাজ্যের কেসপুত্ত নামের একটি গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে 'কালাম' নামের একদল গ্রামবাসী এসে তাঁকে বললো– "ভিক্ষু, আমাদের গ্রামে অনেক সাধু, ব্রাহ্মণ ও শিক্ষক আসেন। প্রত্যেকে এসে বলে, ‘আমার শিক্ষা সঠিক, অন্যদেরটা ভুল।’ আমরা কাকে বিশ্বাস করবো?"
তখন গৌতম বুদ্ধ বললেন– "হে কালামগণ, কারো শোনা কথায় বিশ্বাস করো না। কেবল লোকমুখে প্রচলিত বলে বিশ্বাস করো না। কেবল প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে বলে বিশ্বাস করো না। কেবল অনুমান দিয়ে বিশ্বাস করো না। কেবল কোনো প্রবীণ বা শিক্ষক বলেছেন বলে বিশ্বাস করো না। এমনকি, আমি বলেছি বলেও অন্ধভাবে বিশ্বাস করো না। বরং, যখন তোমরা নিজের অভিজ্ঞতায় দেখবে– যে কাজগুলো কল্যাণকর, দোষহীন, জ্ঞানীরা প্রশংসা করে এবং যেগুলো বাস্তবে সুখ ও মঙ্গলের দিকে নিয়ে যায়, তখনই তোমরা সেই কাজগুলো গ্রহণ করবে এবং অনুসরণ করবে।"@অনিন্দ্য জয়