১
অ্যালবিনিজম সতর্কতা
(13 june)"আন্তর্জাতিক অ্যালবিনিজম সতর্কতা দিবস"। ২০১৫ সাল থেকে দিবসটি পালন করা শুরু হয়। অ্যালবিনিজম (Albinism ) কথাটির অর্থ হলো
ল্যাতিন শব্দ albus যার অর্থ 'সাদা' অথবা 'বর্ণহীন'।এটি জন্মগত যা চুল, চোখ এবং ত্বককে বিবর্ণ করে দেয়। মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণী যেমন কুমির, বাঘ, সিংহ, বিভিন্ন পাখি এবং আরও নানা প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে অ্যালবিনিজম দেখা যায়।
এই রোগের মূল কারণগুলি হলো:
১) মেলানিনের অভাব: ত্বক, চুল ও চোখের রঙ নির্ধারণকারী উপাদান মেলানিন তৈরির জিন ত্রুটিপূর্ণ থাকে। ফলে শরীর মেলানিন তৈরি করতে পারে না। ২)মা-বাবার জিনগত বাহক: সবচেয়ে সাধারণ আলবিনিজমে মা ও বাবা দুজনেই যদি ত্রুটিপূর্ণ জিনের বাহক (Carrier) হন। দুজন বাহকের মাধ্যমে সন্তানের এই অবস্থা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ২৫%।
ছোঁয়াচে নয়: এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ বা ইনফেকশাস নয়। এনজাইমের ঘাটতি: মেলানিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় টাইরোসিনেজ নামক এনজাইমটি জিনগত ত্রুটির কারণে শরীরে কাজ করে না।
অ্যালবিনিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই মানবাধিকার লঙ্ঘন, সামাজিক কলঙ্ক এবং বি*পজ্জনক কুসংস্কারের শিকার হন।
তাঁদের ত্বকের কিছু রোগের ঝুঁকিও থাকে। তাঁরা দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের মতো নির্দিষ্ট কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যারও সম্মুখীন হন।
সবসময় চোখ নিজে নিজেই কাঁপতে থাকে।সূর্যের আলো বা তীব্র আলো এদের চোখে প্রচণ্ড অস্বস্তি ও ব্যথার সৃষ্টি করে।ঝাপসা দৃষ্টি (Low Vision) থাকে।চশমা ব্যবহার করলেও এদের দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি স্বাভাবিক (২০/২০) হয় না।
অ্যালবিনিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানবাধিকার নিয়ে স্বাধীনভাবে কর্মরত নাইজেরিয়ার প্রথম নারী কর্মী ইকপোনওয়াসা এরোর উদ্যোগে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের সৃষ্ট ম্যান্ডেটে দিনটি জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি পায়।
2026 এর থিম হলো : "নিজের ত্বকে গর্বিত: সকল ত্বকের রঙের উদযাপন," ।@- অর্ধেন্দু সরকার।।
২
ওজন কমানোর লড়াই: ক্যালোরি বনাম ক্ষুধা
ওজন কমানোর প্রচলিত ধারণা হলো- 'যত কম ক্যালোরি খাবেন, তত তাড়াতাড়ি ওজন কমবে'। কিন্তু বাস্তবে এই পদ্ধতিটি প্রায়ই ব্যর্থ হয়, কারণ এটি শরীরের ক্ষুধার জটিল সংকেতগুলোকে পুরোপুরি এড়িয়ে যায়।
কঠোরভাবে ক্যালোরি কমাতে গিয়ে আমাদের শরীরে Ghrelin বা ক্ষুধার হরমোনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং তৃপ্তির হরমোনগুলো কমে যায়। এর ফলে প্রবল ক্ষুধা এবং অনিয়ন্ত্রিত খাবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, যা শেষ পর্যন্ত ওজন কমার বদলে পুনরায় ওজন বাড়িয়ে দেয়।
ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করাই হলো ওজন কমানোর একটি বেশি বুদ্ধিদীপ্ত ও কার্যকর উপায়।
প্রোটিন কেন কার্যকর?
প্রোটিন হলো সবচেয়ে বেশি তৃপ্তিদায়ক ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট। প্রতি বেলায় ২৫–৩৫ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ করলে শরীরে তৃপ্তির হরমোনগুলো (যেমন, GLP-1, CCK এবং PYY) বৃদ্ধি পায় এবং ক্ষুধার হরমোন (Ghrelin) দমিত হয়। এই সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে আপনি প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষুধা ও খাওয়ার ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন, ফলে বাড়তি ক্যালোরি গ্রহণের প্রয়োজন হবে না।
প্রোটিনের সেরা উৎসসমূহ
উপকারিতা পেতে নিচের উচ্চমানের প্রোটিনগুলো আপনার খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন:
* ডিম
* মাছ
* মুরগির বুকের মাংস
* গ্রিক Yogurt
* কটেজ চিজ
* Whey প্রোটিন
ফলাফল:
ক্লিনিকাল পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণের তুলনায় উচ্চ প্রোটিনযুক্ত ডায়েট অনুসরণ করলে শরীরে চর্বি বেশি কমে এবং শারীরিক গঠন উন্নত হয়। এই প্রোটিনগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অর্থ হলো, শরীরের জৈবিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে না গিয়ে বরং তার সাথে তাল মিলিয়ে চলা, যা ওজন নিয়ন্ত্রণকে অনেক বেশি সহজ ও টেকসই করে তোলে। @ ·Plabon Sarkar
৩
দ্রুতগতির অবিসংবাদিত রাজারা
মানুষের কাছে গতি হলো একটি ক্রীড়াসুলভ বিলাসিতা; কিন্তু বন্য প্রকৃতিতে এটি একটি নির্মম গাণিতিক হিসাব, যেখানে সেকেন্ডের একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ নির্ধারণ করে দেয় একটি জীব আহার করবে নাকি নিজেই আহারে পরিণত হবে!
চিতাবাঘ (The Cheetah): স্বল্প দূরত্বের দ্রুতগতির অবিসংবাদিত রাজা, যা মাত্র ৩ সেকেন্ডে ০ থেকে ৬০ মাইল প্রতি ঘণ্টা গতিবেগ তুলতে পারে। এর পুরো কঙ্কালতন্ত্রটিই তৈরি হয়েছে সজোরে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। তবে এই দৌড়ে তার শরীর এতটাই প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, হিট স্ট্রোক এড়াতে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের স্প্রিন্টের পরই এর পুরো ‘ইঞ্জিন’ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
প্রংহর্ন (The Pronghorn): উচ্চ-গতির সহনশীলতায় এরা একচ্ছত্র অধিপতি। মাইলের পর মাইল এরা একটানা ৩০ মাইল প্রতি ঘণ্টা গতিতে ছুটে চলতে পারে এবং সর্বোচ্চ ৫৫ মাইল প্রতি ঘণ্টা গতিতে স্প্রিন্ট কাটতে পারে। এটি অবিশ্বাস্য দ্রুত হারে অক্সিজেন প্রক্রিয়াজাত করতে পারে; লক্ষ লক্ষ বছর আগে বিলুপ্ত ‘আমেরিকান চিতাবাঘ’-এর হাত থেকে বেঁচে ফেরার তাগিদেই এদের এই অনন্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিবর্তিত হয়েছিল।
সিংহ (The Lion): একটি ভারী, পেশীবহুল শক্তির বিস্ফোরণ—যার সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ মাইল। হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের সহনশীলতা (cardiovascular endurance) প্রায় শূন্য হওয়ায় সিংহের স্প্রিন্ট হলো মূলত একটি উচ্চ-ঝুঁকির জুয়া—যদি প্রথম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শিকারের সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনতে না পারে, তবে তার সব শক্তি এক নিমেষেই ফুরিয়ে যায়।
জেব্রা ও ওয়াইল্ডবিস্ট (The Zebra & Wildebeest): ঘণ্টায় ৪৫ মাইল গতিতে ছুটে এরা নিজেদের গতিকে একটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করে। এক বিশাল, সুসংহত ও একতাবদ্ধ দল হিসেবে দৌড়ানোর মাধ্যমে এরা ধূলিকণা এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ডোরাকাটা নকশার এমন এক বিভ্রান্তিকর প্রাচীর তৈরি করে, যা শিকারী প্রাণীর দৃষ্টিশক্তির ট্র্যাকিং ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ ওলোটপালোট করে দেয়।
উটপাখি (The Ostrich): ৯ ফুট উচ্চতার একটি উড়তে না পারা পাখি, যা তার দুই আঙুল বিশিষ্ট, স্প্রিং-এর মতো স্থিতিস্থাপক পায়ের সাহায্যে মরুভূমির বুকে একটানা ৩১ মাইল প্রতি ঘণ্টা গতি বজায় রাখতে পারে। মাত্র এক একটি পদক্ষেপে ১৬ ফুট দূরত্ব পার করে এটি পৃথিবীর সেরা চার পায়ের শিকারীদেরও অনায়াসে ক্লান্ত ও পেছনে ফেলে দিতে পারে।
@ Dr. Sarwar
৪
" ইতিহাসের ৬টি জিনিস — যা একসময় মানুষ বানাতে জানত, অথচ সেই কৌশল আজ চিরতরে হারিয়ে গেছে। রোমানরা এমন কংক্রিট বানাত যা ২০০০ বছরেও ভাঙে না। আর আমাদের বাংলায় তৈরি হতো এমন কাপড় — যাকে বলা হতো 'বোনা বাতাস', একটা গোটা শাড়ি গলে যেত আংটির ভেতর দিয়ে।"
আমরা ভাবি, মানুষ প্রতিদিন শুধু এগিয়েই চলেছে — পুরোনো জ্ঞানের ওপর নতুন জ্ঞান। কিন্তু সত্যিটা একটু অন্যরকম। ইতিহাসে এমন কিছু কৌশল ছিল, যা একসময় মানুষ দিব্যি জানত — অথচ আজ আমরা সেগুলো হারিয়ে ফেলেছি। চেষ্টা করেও হুবহু বানাতে পারি না। কীভাবে এমন হলো? কখনো যুদ্ধে, কখনো গোপনীয়তায়, কখনো ঔপনিবেশিক লোভে — হারিয়ে গেল হাজার বছরের কৌশল। আজ সেই ছয়টা হারানো জ্ঞানের কথা বলব।
প্রথম — রোমান কংক্রিট। ২০০০ বছরেও যা ভাঙে না।
আজকের আধুনিক কংক্রিটের রাস্তা-বাড়ি কয়েক দশকেই ফাটতে শুরু করে। অথচ রোমানদের বানানো কংক্রিটের স্থাপনা — যেমন রোমের প্যান্থিয়ন — প্রায় ২০০০ বছর ধরে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে! আরও অবাক করা ব্যাপার — তাদের সমুদ্রের জলে বানানো কংক্রিট সময়ের সাথে আরও শক্ত হয়েছে। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের সাথে এই কংক্রিট বানানোর কৌশলটাই হারিয়ে গেল। শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ বুঝতেই পারেনি, কীভাবে তারা এত টেকসই কংক্রিট বানাত। আর সবচেয়ে মজার — মাত্র কয়েক বছর আগে (২০২৩) বিজ্ঞানীরা রহস্যটা ধরতে পারলেন। দেখা গেল, রোমান কংক্রিটে এমন এক উপাদান ছিল, যা ফাটল ধরলে নিজে নিজেই সেই ফাটল মেরামত করে দেয় — অনেকটা জীবন্ত জিনিসের মতো! আমরা আজ সেই "সেলফ-হিলিং" কংক্রিট আবার শেখার চেষ্টা করছি, যা রোমানরা ২০০০ বছর আগেই জানত।
দ্বিতীয় — স্ট্রাডিভ্যারিয়াস ভায়োলিন। নিখুঁত সুরের হারানো গোপন কথা।
প্রায় ৩০০ বছর আগে, ইতালির এক কারিগর — আন্তোনিও স্ট্রাডিভ্যারি — এমন কিছু ভায়োলিন বানিয়েছিলেন, যাদের সুর আজও কিংবদন্তি। সংগীতপ্রেমীরা বলেন, এমন মধুর শব্দ আর কোনো ভায়োলিনে শোনা যায় না। আজ একেকটা "স্ট্রাড" ভায়োলিনের দাম কয়েকশো কোটি টাকা। কিন্তু রহস্যটা হলো — তিনি তাঁর এই গোপন কৌশল কোথাও লিখে রেখে যাননি। কাঠের বিশেষ ধরন, কাঠ শুকানোর পদ্ধতি, নাকি সেই বিশেষ বার্নিশ (রং)? ঠিক কীসের জন্য এই অনন্য সুর — তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা আজও তর্ক করছেন, কিন্তু হুবহু রহস্যটা ধরতে পারেননি। (যদিও আধুনিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভালো আধুনিক ভায়োলিনও এর পাল্লা দিতে পারে।) এক কারিগরের সাথেই চলে গেল তাঁর জাদুর গোপন কথা।
তৃতীয় — টাইরিয়ান পার্পল। সম্রাটদের রঙ, সমুদ্রের শামুক থেকে।
প্রাচীনকালে একটা রঙ ছিল এত দুর্লভ, এত দামি — যে শুধু সম্রাট আর রাজারাই সেটা পরতে পারতেন। নাম "টাইরিয়ান পার্পল" (রাজকীয় বেগুনি)। এই রঙ আসত কোথা থেকে জানেন? এক ধরনের সমুদ্রের শামুক থেকে। আর এত শামুক লাগত যে — সামান্য একটু রঙ বানাতে হাজার হাজার শামুক মেরে ফেলতে হতো। তাই এই রঙ ছিল সোনার চেয়েও দামি। ফিনিশীয়রা এই রঙ বানানোর কৌশল গোপনে রপ্ত করেছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে সেই কৌশলও হারিয়ে গেল। আজ আমরা রাসায়নিকভাবে বেগুনি রঙ বানাতে পারি, কিন্তু প্রাচীনদের সেই আসল টাইরিয়ান পার্পল বানানোর হুবহু প্রক্রিয়াটা চিরতরে হারিয়ে গেছে — সম্রাটদের সেই গর্বের রঙ আজ শুধু ইতিহাস।
চতুর্থ — মিশরীয় মমি বানানোর কৌশল।
প্রাচীন মিশরীয়রা তাদের মৃতদেহ এমনভাবে সংরক্ষণ করত যে, হাজার হাজার বছর পরেও সেগুলো প্রায় অক্ষত থেকে যায়। এই মমি বানানোর কৌশল ছিল এক অসাধারণ বিজ্ঞান। তারা বিশেষ লবণ, তেল, রজন আর নানা গাছগাছড়ার মিশ্রণ দিয়ে দেহ সংরক্ষণ করত — এমন নিখুঁতভাবে যে আজও সেই মমিগুলো জাদুঘরে রাখা আছে। কিন্তু প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার অবসানের সাথে সাথে, এই মমি বানানোর সঠিক রেসিপি আর কৌশল হারিয়ে গেল। ঠিক কোন কোন উপাদান, কী অনুপাতে মেশানো হতো — তা দীর্ঘদিন এক রহস্য ছিল। মাত্র সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা পুরোনো পাত্রের অবশেষ পরীক্ষা করে এর কিছু গোপন উপাদান বুঝতে শুরু করেছেন। কিন্তু সেই হাজার বছরের নিখুঁত শিল্পটা — পুরোপুরি হারিয়েই গেছে।
পঞ্চম — চাঁদে যাওয়ার সেই বিশাল রকেট (স্যাটার্ন ৫)।
এটা শুনলে সবচেয়ে অবাক লাগে — কারণ এটা হাজার বছর আগের কথা নয়, মাত্র ৫০-৬০ বছর আগের। ১৯৬০-৭০-এর দশকে মানুষ চাঁদে গিয়েছিল এক বিশাল শক্তিশালী রকেটে — "স্যাটার্ন ৫।" এটাই ছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী যন্ত্র। কিন্তু আজ? আমরা চাইলেও হুবহু সেই স্যাটার্ন ৫ আবার বানাতে পারব না! কারণ এর নকশা (ব্লুপ্রিন্ট) থাকলেও, এটা বানানোর আসল হাতেকলমে কৌশলটা ছিল হাজার হাজার ইঞ্জিনিয়ার আর কারিগরের মাথায় — লেখা ছিল না। তাঁরা অবসর নিয়েছেন, অনেকে মারা গেছেন, বানানোর বিশেষ যন্ত্রপাতিও নষ্ট হয়ে গেছে। তাই এখন নতুন করে রকেট ডিজাইন করা বরং সহজ, কিন্তু পুরোনো স্যাটার্ন ৫ হুবহু ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। আধুনিক যুগেও জ্ঞান কত সহজে হারিয়ে যেতে পারে — এটা তার চমকপ্রদ উদাহরণ।
ষষ্ঠ — ঢাকাই মসলিন। আমাদের বাংলার "বোনা বাতাস।"
এই শেষ কৌশলটা আমাদের নিজেদের বাংলার — আর এর হারিয়ে যাওয়ার গল্পটা গর্ব আর কষ্টে মেশানো। একসময় বাংলায়, ঢাকার আশপাশে তৈরি হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সূক্ষ্ম কাপড় — ঢাকাই মসলিন। এত পাতলা, এত হালকা যে একে বলা হতো "বোনা বাতাস।" কথিত আছে, একটা গোটা মসলিন শাড়ি গলে যেত একটা আংটির ভেতর দিয়ে! এত সূক্ষ্ম যে পরলে মনে হতো যেন কিছুই পরা হয়নি। এই কাপড় তৈরি হতো মেঘনা নদীর তীরে জন্মানো এক বিশেষ তুলা ("ফুটি কার্পাস") থেকে, হাতে কাটা অবিশ্বাস্য সূক্ষ্ম সুতোয়। রোম, পারস্য, মুঘল সম্রাট — সবাই এই কাপড়ের জন্য পাগল ছিল, দাম ছিল সোনার চেয়েও বেশি। কিন্তু এরপর এল ঔপনিবেশিক আমলের অন্ধকার অধ্যায়। ব্রিটিশরা তাদের নিজেদের কলে-বানানো কাপড় বিক্রি করতে চাইল। তাই নানা নীতির চাপে বাংলার এই মসলিন শিল্প ধ্বংস হয়ে গেল, সেই বিশেষ "ফুটি কার্পাস" তুলার গাছটাই বিলুপ্ত হয়ে গেল, আর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সেই অসাধারণ বোনার কৌশল চিরতরে হারিয়ে গেল। ভাবুন — পৃথিবীর সেরা কাপড়টা আমাদের বাংলার মাটিতে তৈরি হতো, অথচ আজ আমরা সেটা হুবহু বানাতেই পারি না। তবে আশার কথা — সম্প্রতি বাংলাদেশের গবেষকরা DNA মিলিয়ে সেই তুলার কাছাকাছি গাছ খুঁজে বের করে, বহু কষ্টে এই "বোনা বাতাস" আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।
ইতিহাসের এই ছয়টা হারানো কৌশলের দিকে তাকালে একটা গভীর, একটু অস্বস্তিকর সত্যি বেরিয়ে আসে। আমরা ভাবি জ্ঞান একবার পেলে তা চিরকালের। কিন্তু সত্যিটা হলো — জ্ঞান ভঙ্গুর। লিখে না রাখলে, চর্চা না করলে, কিংবা লোভে-যুদ্ধে ধ্বংস হলে — হাজার বছরের কৌশলও এক প্রজন্মেই হারিয়ে যেতে পারে। আর সবচেয়ে কষ্টের কথা — ঢাকাই মসলিনের মতো কিছু জ্ঞান আমরা হারিয়েছি অন্যের লোভের কারণে। যা ছিল আমাদের গর্ব, তা মুছে দেওয়া হয়েছিল ইচ্ছাকৃতভাবে। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — যে জ্ঞান, যে শিল্প, যে ঐতিহ্য আমাদের আছে, তাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখাটাও একটা দায়িত্ব। নাহলে একদিন সেটাও হয়ে যাবে শুধু "একসময় মানুষ এটা জানত।"
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা হারানো কৌশলের মধ্যে কোনটা শুনে আপনি সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন? আর আমাদের ঢাকাই মসলিনের কথা — এই "বোনা বাতাস"-এর গল্প কি আপনি জানতেন?
১. রোমান কংক্রিট — ২০০০ বছরেও ভাঙে না
২. স্ট্রাডিভ্যারিয়াস — সুরের হারানো গোপন
৩. টাইরিয়ান পার্পল — সম্রাটদের রঙ
৪. মিশরীয় মমি — সংরক্ষণের কৌশল
৫. স্যাটার্ন ৫ — চাঁদের রকেট
৬. ঢাকাই মসলিন — বাংলার বোনা বাতাস
@সম্রাট রায় চৌধুরী
৫
"ইতিহাসের ৬টি বিখ্যাত চুরি — যেখানে অমূল্য সম্পদ উধাও হয়ে গিয়েছিল, আর কিছু আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। একটা জাদুঘরের দেয়ালে আজও ঝুলছে খালি ফ্রেম। আর আমাদের শান্তিনিকেতন থেকে চুরি গিয়েছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক — যা আজও ফেরেনি।"
একটা জাদুঘরের দেয়ালে আজও কিছু ছবির ফ্রেম ঝুলছে — কিন্তু ফ্রেমগুলো খালি। কারণ ৩০ বছরেরও বেশি আগে চোরেরা সেই অমূল্য ছবিগুলো কেটে নিয়ে চলে গিয়েছিল। আজও সেগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। জাদুঘর সেই খালি ফ্রেমগুলো রেখে দিয়েছে যেন একদিন ছবিগুলো ফিরে আসবে। ইতিহাসে এমন কিছু চুরি আছে, যা নিছক অপরাধ নয় — যেন একটা গোটা রহস্য-উপন্যাস। অমূল্য সম্পদ চোখের পলকে উধাও, আর তারপর? কিছু ফিরে এসেছে, কিন্তু কিছু আজও নিখোঁজ। আজ সেই ছয়টা বিখ্যাত চুরির কথা বলব।
প্রথম — মোনালিসা চুরি (১৯১১)।
আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি মোনালিসা। কিন্তু একটা মজার সত্যি — এই ছবিটাকে এত বিখ্যাত করেছিল আসলে একটা চুরি! ১৯১১ সালে, প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরের এক কর্মী ছবিটা দেয়ালের পেরেক থেকে খুলে, নিজের কোটের নিচে লুকিয়ে দিব্যি হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। দুই বছর ছবিটা নিখোঁজ রইল। আর এই দুই বছরে গোটা পৃথিবীর সব খবরের কাগজে শুধু মোনালিসা। শেষে চোর যখন ইতালিতে ছবিটা বিক্রি করতে গেল, তখন সে ধরা পড়ল, ছবিও উদ্ধার হলো। কিন্তু ততক্ষণে এক সাধারণ পুরোনো ছবি পরিণত হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পকর্মে। চুরিই তাকে অমর করে দিল।
দ্বিতীয় — গার্ডনার মিউজিয়াম চুরি (১৯৯০)। যে খালি ফ্রেম আজও ঝুলছে।
আমেরিকার বস্টন শহরের ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার মিউজিয়াম। ১৯৯০ সালের এক রাতে, দুজন চোর পুলিশের ছদ্মবেশে এসে দরজায় কড়া নাড়ল। পাহারাদাররা সরল বিশ্বাসে দরজা খুলে দিল। ব্যস চোরেরা তাদের বেঁধে ফেলল। তারপর নিশ্চিন্তে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তারা দেয়াল থেকে কেটে নিল ১৩টি অমূল্য ছবি রেমব্রান্ট, ভারমিয়ারের মতো মহান শিল্পীদের কাজ। এই চুরির মোট মূল্য প্রায় ৫০ কোটি ডলার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিল্প-চুরি। আর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ৩৫ বছর পরেও, একটা ছবিও উদ্ধার হয়নি! জাদুঘর আজও সেই খালি ফ্রেমগুলো দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছে — এই আশায় যে, একদিন হয়তো ছবিগুলো ঘরে ফিরবে।
তৃতীয় — অ্যান্টওয়ার্প ডায়মন্ড হাইস্ট (২০০৩)।
বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প — পৃথিবীর হীরা ব্যবসার রাজধানী। এখানকার ডায়মন্ড সেন্টারের ভল্টকে বলা হতো পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ভল্টগুলোর একটা। স্তরে স্তরে নিরাপত্তা — তাপ-সংবেদক, চুম্বক, গোপন আলো, সব। একে ভেদ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তবু এক দল চোর সেই "অভেদ্য" ভল্ট ভেদ করে ফেলল। তারা ভেতর থেকে হাতিয়ে নিল প্রায় ১০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের হীরা, সোনা আর গয়না — ইতিহাসের অন্যতম বড় হীরা-চুরি। মূল চোর শেষে ধরা পড়ল (একটা ফেলে যাওয়া স্যান্ডউইচে লেগে থাকা থুতু থেকে!), কিন্তু চুরি যাওয়া বেশিরভাগ হীরা আজও উদ্ধার হয়নি — কোথায় গেল, কেউ জানে না।
চতুর্থ — ঘেন্ট অল্টারপিসের হারানো প্যানেল (১৯৩৪)।
বেলজিয়ামের ঘেন্ট শহরের এক গির্জায় আছে ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত শিল্পকর্ম — "ঘেন্ট অল্টারপিস।" বহু আলাদা আলাদা প্যানেল জুড়ে তৈরি এই বিশাল চিত্রকর্ম। ১৯৩৪ সালে, এর একটা প্যানেল ("ধর্মপ্রাণ বিচারক") রাতের অন্ধকারে চুরি হয়ে যায়। চোর মুক্তিপণও দাবি করেছিল। কিন্তু সেই প্যানেলটা আজও — প্রায় ৯০ বছর পরেও — খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোথায় লুকানো আছে, কেউ জানে না। শিল্পকর্মটার সেই হারানো অংশের জায়গায় আজ একটা নকল প্যানেল বসানো। শিল্প-ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্যগুলোর একটা।
পঞ্চম — দ্য গ্রেট ট্রেন রবারি (১৯৬৩)।
ইংল্যান্ডে, ১৯৬৩ সালের এক রাতে, একদল চোর একটা চলন্ত ডাক-ট্রেন (যেটায় বিপুল টাকা যাচ্ছিল) থামিয়ে দিল — সংকেত বদলে দিয়ে। তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যে তারা ট্রেন থেকে হাতিয়ে নিল প্রায় ২৬ লক্ষ পাউন্ড — সেই যুগের জন্য এক অকল্পনীয় অঙ্ক। এটা ছিল এত নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত যে গোটা ব্রিটেন স্তম্ভিত হয়ে যায়। পরে কয়েকজন চোর ধরা পড়লেও, চুরি যাওয়া টাকার বেশিরভাগই আর কোনোদিন উদ্ধার হয়নি। এমনকি এক বিখ্যাত চোর (রনি বিগস) জেল থেকে পালিয়ে কয়েক দশক বিদেশে আত্মগোপন করে ছিল। "দ্য গ্রেট ট্রেন রবারি" আজও ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ডাকাতিগুলোর একটা।
ষষ্ঠ — রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক (২০০৪)।
২০০৪ সালের ২৫শে মার্চ। শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতীর জাদুঘর। সেই রাতে চলছিল এক উত্তেজনাপূর্ণ ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ — আর সেই সুযোগেই ঘটল সর্বনাশ। চোরেরা জাদুঘর থেকে চুরি করে নিয়ে গেল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কারের পদক আর প্রশংসাপত্র — সাথে তাঁর ব্যবহৃত আরও বহু মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন। ভাবুন — যে নোবেল প্রথম কোনো ভারতীয়, কোনো এশীয় পেয়েছিলেন, যা ছিল গোটা জাতির গর্ব — সেই পদকটাই উধাও! দেশজুড়ে হইচই পড়ে গেল। দেশের সবচেয়ে বড় তদন্ত সংস্থা CBI তদন্তের দায়িত্ব নিল। সীমান্ত সিল করা হলো, বহু মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। কিন্তু আজও — দুই দশকেরও বেশি পরে — সেই আসল পদকটা খুঁজে পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা আজও জানেন না কেন, কীভাবে। পরে সুইডেন কবিগুরুর সম্মানে দুটো রেপ্লিকা (একটা সোনা, একটা ব্রোঞ্জ) উপহার দিয়েছিল। কিন্তু আসল পদক? সে আজও নিখোঁজ — বাঙালির এক চিরন্তন আক্ষেপ হয়ে।
ইতিহাসের এই ছয়টা চুরির দিকে তাকালে একটা অদ্ভুত সত্যি বেরিয়ে আসে। কিছু জিনিসের দাম টাকায় মাপা যায় না। মোনালিসা, রেমব্রান্টের ছবি, কিংবা রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক — এগুলো শুধু দামি জিনিস নয়, এগুলো গোটা একটা জাতির, একটা সভ্যতার আবেগ আর গর্ব। আর সেখানেই এই চুরিগুলোর আসল ট্র্যাজেডি। চোর হয়তো ভেবেছিল সে দামি কিছু চুরি করছে। কিন্তু আসলে সে চুরি করেছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ের একটা টুকরো — যা টাকা দিয়ে আর কোনোদিন ফেরানো যায় না। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় কথা — কিছু জিনিস হারিয়ে গেলে, শুধু একটা বস্তু হারায় না, হারিয়ে যায় একটা স্মৃতি, একটা গর্ব, যা আর কখনো পুরোপুরি ফেরে না।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা চুরির মধ্যে কোনটা শুনে আপনার সবচেয়ে খারাপ লাগল
১. মোনালিসা — চুরিই যাকে বিখ্যাত করল
২. গার্ডনার মিউজিয়াম — খালি ফ্রেম আজও ঝোলে
৩. অ্যান্টওয়ার্প — "অভেদ্য" ভল্ট ভেদ
৪. ঘেন্ট অল্টারপিস — হারানো প্যানেলের রহস্য
৫. গ্রেট ট্রেন রবারি — উধাও বিপুল টাকা
৬. রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক — বাঙালির চিরন্তন আক্ষেপ
@সম্রাট রায় চৌধুরী
৬
কারো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা বা কথা বলা চরম পর্যায়ের অশিক্ষা
সভ্য সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সম্মান করা। একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক বিষয়, আর্থিক অবস্থা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অযথা আলোচনা করা শুধু অসৌজন্যমূলক নয়, বরং তা চরম পর্যায়ের অশিক্ষার পরিচয় বহন করে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের গবেষণাও দেখায় যে মানুষের ব্যক্তিগত সীমারেখা লঙ্ঘন করা সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বল করে এবং মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলার প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া সময়ের দাবি।
অনেক মানুষ মনে করেন অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা নিছক আড্ডার অংশ, কিন্তু বাস্তবে এটি সামাজিক অসভ্যতার একটি রূপ। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত আলোচনা মানুষের মধ্যে অস্বস্তি, উদ্বেগ এবং অবিশ্বাস সৃষ্টি করে। কেউ উপস্থিত থাকুক বা না থাকুক, তার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা তার মর্যাদার প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল। এ ধরনের আচরণ ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। ফলে এটি শিক্ষিত মানসিকতার সঙ্গে কখনোই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রত্যেক মানুষের একটি ব্যক্তিগত পরিসর রয়েছে যা তার মানসিক নিরাপত্তার অংশ। যখন কেউ সেই পরিসর ভেঙে ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে আলোচনা করে, তখন ভুক্তভোগী নিজেকে নিরাপত্তাহীন মনে করতে পারেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে ব্যক্তিগত তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে একটি ছোট মন্তব্যও বড় ধরনের সামাজিক সমস্যার জন্ম দিতে পারে। এ কারণে সচেতন ও দায়িত্বশীল মানুষ অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা এড়িয়ে চলেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা নিয়মিত অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, তাদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। কারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ভাবতে শুরু করে যে আজ অন্যের কথা বলা ব্যক্তি কাল তার কথাও অন্যদের কাছে বলবেন। ফলে সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কর্মক্ষেত্র, পরিবার কিংবা বন্ধুমহল সব জায়গাতেই এই অভ্যাস নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা সামাজিক বিশ্বাস গড়ে তোলার অন্যতম শর্ত।
একজন সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষের পরিচয় শুধু ডিগ্রিতে নয়, তার আচরণেও প্রকাশ পায়। তিনি জানেন কোন বিষয় নিয়ে কথা বলা উচিত এবং কোন বিষয় এড়িয়ে চলা উচিত। অন্যের সম্মান রক্ষা করা, গোপনীয়তা বজায় রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় কৌতূহল নিয়ন্ত্রণ করা সামাজিক পরিপক্বতার লক্ষণ। যারা এসব মূল্যবোধ অনুসরণ করেন, তারা সমাজে ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এর বিপরীতে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অহেতুক আলোচনা সমাজে বিভাজন ও বিরূপতা সৃষ্টি করে।
একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য পারস্পরিক সম্মান ও গোপনীয়তার চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা না করা শুধু ভদ্রতা নয়, এটি নৈতিক দায়িত্বও বটে। মানুষকে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচার সুযোগ দেওয়া সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ যত বৃদ্ধি পাবে, সামাজিক সম্পর্ক তত শক্তিশালী হবে। তাই প্রত্যেকের উচিত অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়কে সম্মান করা এবং এ ধরনের অশিক্ষিত আচরণ থেকে নিজেকে দূরে রাখা। @ SAM Motivation
তথ্যসূত্র:
Altman, I. (1975). The Environment and Social Behavior: Privacy, Personal Space, Territory, and Crowding.
Petronio, S. (2002). Boundaries of Privacy: Dialectics of Disclosure.
American Psychological Association (APA). Privacy and Human Behavior Studies.
Westin, A. F. (1967). Privacy and Freedom.
৭
অগাস্টাস
ক্ষমতার একটা খুব অদ্ভুত নিয়ম আছে। যে মানুষটা সত্যিকার অর্থে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী, তাকে কখনোই নিজের ক্ষমতা জাহির করতে হয় না। আমাদের চারপাশেই এমন অনেক মানুষ আছেন যারা খুব চুপচাপ থাকেন, সাধারণ মানুষের মতো মেশেন, অথচ আসল রিমোট কন্ট্রোলটা তাদের হাতেই থাকে। আধুনিক কর্পোরেট দুনিয়া বা রাজনীতির মাঠে আমরা এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখি, যেখানে সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটি একেবারে সাদামাটা একটা ভাব নিয়ে থাকেন।
আজ থেকে দুই হাজার বছর আগে রোমান সাম্রাজ্যের এক ইয়াংস্টারের গল্প ঠিক এমনই এক মগজ-ধোলাইয়ের খেলা দিয়ে শুরু হয়েছিল। ছেলেটির বয়স যখন মাত্র আঠারো, তখন তার পালক পিতা জুলিয়াস সিজারকে সেনেটের ভেতরে প্রকাশ্যে খুন করা হয়। রোমের সেই সময়কার পরিস্থিতি ছিল একদম বারুদমাখা, ক্ষমতার লোভে সেনাপতিরা একে অপরের গলা কাটতে প্রস্তুত। এমন একটা অস্থির সময়ে এই আঠারো বছরের ছেলেটা, যাকে তখন সবাই অক্টাভিয়ান নামে চিনত, রোমের রাজনীতির ময়দানে পা রাখে।
সেই সময়ের রোম ছিল কাগজে কলমে একটা রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্র। কিন্তু সেই প্রজাতন্ত্রের ভেতরে আসলে অনেক আগে থেকেই পচন ধরে গিয়েছিল। ক্ষমতাশালী সেনাপতিরা নিজেদের ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী নিয়ে ঘুরে বেড়াত এবং সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। বছরের পর বছর ধরে চলা এই গৃহযুদ্ধে রোমের মানুষ এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল যে, তারা শুধু একটু শান্তিতে ঘুমানোর একটা জায়গা খুঁজছিল।
জুলিয়াস সিজার এই গৃহযুদ্ধের মাঝেই ক্ষমতা দখল করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি মানুষের মন বোঝার ক্ষেত্রে একটা বড় ভুল করে ফেলেছিলেন। তিনি নিজেকে আজীবন ডিক্টেটর বা একনায়ক হিসেবে ঘোষণা করে রোমের পুরনো সেনেটরদের ইগোতে সরাসরি আঘাত করেছিলেন। সিজারের এই প্রকাশ্য ক্ষমতার দম্ভই শেষ পর্যন্ত তার কাল হয়ে দাঁড়ায় এবং তাকে নিজের জীবন দিয়ে এর দাম চোকাতে হয়। অক্টাভিয়ান, যাকে আমরা পরবর্তীতে অগাস্টাস সিজার হিসেবে চিনি, তার পালক পিতার এই করুণ পরিণতি থেকে ক্ষমতার সবচেয়ে বড় পাঠটি নিয়েছিলেন।
অগাস্টাস বুঝতে পেরেছিলেন যে রোমানরা ভেতর থেকে রাজতন্ত্রকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে। তাদের মগজে শত শত বছর ধরে প্রজাতন্ত্রের ধারণা এমনভাবে গেঁথে আছে যে, কেউ নিজেকে রাজা দাবি করলে তারা সেটা মেনে নেবে না। তাই তিনি এক অদ্ভুত এবং অত্যন্ত চতুর রাজনৈতিক চাল চাললেন। তিনি সবার সামনে ঘোষণা করলেন যে তিনি রোমের সেই পুরনো এবং পবিত্র প্রজাতন্ত্রকে পুনরায় ফিরিয়ে এনেছেন।
তিনি কখনোই নিজেকে রাজা বা একনায়ক বলে দাবি করেননি। এর বদলে তিনি নিজের জন্য একটা খুব সাধারণ উপাধি বেছে নিলেন, যার নাম প্রিন্সেপস বা প্রথম নাগরিক। ব্যাপারটা অনেকটা আজকালকার কোনো কোম্পানির মালিকের মতো, যিনি কর্মীদের সাথে একই টেবিলে বসে কফি খান আর বলেন আমরা সবাই এই কোম্পানির সমান অংশীদার। অগাস্টাস ঠিক এই মোহ বা ইলিউশনটা তৈরি করেছিলেন পুরো রোমান সাম্রাজ্যের মানুষের মনের ভেতরে।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো রোমে আবার আগের মতো গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। সেনেট নিয়মিত বসত, ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্বাচন হতো এবং প্রকাশ্যে সব নিয়মনীতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হতো। সেনেটররা নিজেদের খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করলেন, কারণ অগাস্টাস তাদের প্রচুর সম্মান দেখাতেন এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে তাদের পরামর্শ নিতেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে ক্ষমতার আসল সুতোটা খুব শক্তভাবে অগাস্টাসের আঙুলেই প্যাঁচানো ছিল।
গণতন্ত্রের এই চমৎকার অভিনয়ের আড়ালে তিনি খুব ঠান্ডা মাথায় রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভগুলো নিজের দখলে নিয়েছিলেন। যেকোনো দেশের আসল মেরুদণ্ড হলো তার সেনাবাহিনী এবং অগাস্টাস এটা খুব ভালো করেই জানতেন। আগে রোমান সৈন্যরা তাদের নির্দিষ্ট সেনাপতিদের প্রতি অনুগত থাকত, কারণ সেই সেনাপতিরাই তাদের যুদ্ধ শেষে লুটপাটের ভাগ এবং জমি দিত। অগাস্টাস এই পুরনো কাঠামোটা একদম শেকড় থেকে বদলে ফেললেন।
তিনি নিয়ম করলেন যে এখন থেকে সৈন্যদের বেতন, ভাতা এবং অবসরের পর বাস করার জন্য জমির ব্যবস্থা রাষ্ট্র সরাসরি করবে। আর এই রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে তিনি নিজেই সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। এর ফলে লাখ লাখ রোমান সৈন্যের আনুগত্য অন্য কোনো সেনাপতির কাছ থেকে সরে গিয়ে সরাসরি অগাস্টাসের পকেটে চলে এলো। সেনাবাহিনী বুঝতে পারল তাদের রুটিরুজির একমাত্র মালিক এখন এই প্রিন্সেপস বা প্রথম নাগরিক।
এই বিশাল সেনাবাহিনীকে খুশি রাখার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল। অগাস্টাস অত্যন্ত সুকৌশলে রোমের ট্রেজারি বা রাজকোষের দখল নিজের হাতে নিয়েছিলেন। তিনি মিশরের মতো অত্যন্ত ধনী এবং উর্বর একটি প্রদেশকে রোমান রাষ্ট্রের সম্পত্তি না বানিয়ে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। মিশরের এই অফুরন্ত সম্পদ এবং শস্যের ভাণ্ডার তাকে এতটাই শক্তিশালী করে তুলেছিল যে, রোমের অন্য কোনো রাজনীতিবিদের পক্ষে তাকে টেক্কা দেওয়ার মতো কোনো অর্থনৈতিক ক্ষমতাই আর অবশিষ্ট ছিল না।
যখন কোনো রাষ্ট্রে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ আর অর্থনীতির চাবিকাঠি একজনের হাতে চলে যায়, তখন সেখানে বিরোধীদের আর খুব বেশি কিছু করার থাকে না। রোমেও ঠিক তাই হলো, বছরের পর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক হানাহানি এবং রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ জাদুর মতো থেমে গেল। শুরু হলো এক নতুন যুগ, যাকে ইতিহাসে প্যাক্স রোমানা বা রোমান শান্তি বলা হয়। দীর্ঘ দুই শতাব্দীর এই শান্তি রোমের ইতিহাসের সবচেয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল একটা অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।
এই শান্তি কিন্তু কেবল যুদ্ধ না থাকার শান্তি ছিল এন্টি-ক্লাইম্যাক্স নয়। এটি ছিল রোমের জন্য এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সময়। ভূমধ্যসাগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত মানুষ নিশ্চিন্তে ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারছিল। রাস্তাঘাটে আর কোনো ডাকাত বা বিদ্রোহী সেনাপতির ভয় ছিল না বলে অর্থনীতি একদম রকেটের গতিতে বড় হতে শুরু করেছিল।
অগাস্টাস শুধু ক্ষমতা দখল করেই বসে থাকেননি, তিনি সেই ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার একটা মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছিলেন। তিনি পুরো সাম্রাজ্য জুড়ে বিশাল সব পাকা রাস্তা, উন্নত বন্দর এবং চোখ ধাঁধানো সব সরকারি ভবন নির্মাণ করেন। তার তৈরি করা রাস্তাগুলো এতটাই নিখুঁত ছিল যে পুরো সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পণ্য এবং খবর পৌঁছানো খুব সহজ হয়ে গিয়েছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই উন্নতি রোমের অর্থনীতিকে একটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়।
নিজের জীবনের শেষ দিকে এসে অগাস্টাস একটা কথা বলেছিলেন যা আজও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তিনি বলেছিলেন, তিনি রোমকে ইটের শহর হিসেবে পেয়েছিলেন এবং মার্বেলের শহর হিসেবে রেখে যাচ্ছেন। কথাটা কোনো রাজনৈতিক অহংকার ছিল না, এটা ছিল তার দীর্ঘ শাসনামলের একটা অত্যন্ত বাস্তব এবং নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। তিনি সত্যিই একটি ধ্বংসপ্রায় এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরকে পৃথিবীর সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ সাম্রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত করেছিলেন।
মানুষের ভেতরের চাওয়া-পাওয়া বোঝার ক্ষেত্রে অগাস্টাসের মতো বিচক্ষণ মানুষ ইতিহাসে খুব কমই এসেছেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে সাধারণ মানুষ দিনশেষে স্বাধীনতা বা দর্শনের চেয়ে শান্তি এবং নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যখন মানুষের ব্যবসা ভালো চলে, রাস্তায় নিশ্চিন্তে হাঁটা যায় এবং ঘরে পর্যাপ্ত খাবার থাকে, তখন কে রাজা আর কে প্রজা সেটা নিয়ে তারা খুব একটা মাথা ঘামায় না। অগাস্টাস রোমানদের ঠিক সেই আরাম এবং নিরাপত্তাটাই উপহার দিয়েছিলেন।
রোমের শিল্প এবং সংস্কৃতিকেও তিনি খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে নিজের পক্ষে ব্যবহার করেছিলেন। ভার্জিল বা হোরেসের মতো বিখ্যাত কবি এবং সাহিত্যিকদের তিনি নিজের পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়ে আসেন। এই শিল্পীরা তাদের লেখনীর মাধ্যমে অগাস্টাসের শাসনকালকে রোমের জন্য একটা স্বর্গীয় আশীর্বাদ হিসেবে তুলে ধরেন। বন্দুক বা তলোয়ারের চেয়ে শিল্প ও সাহিত্য যে মানুষের ভাবনাকে অনেক বেশি গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে, এই সত্যটা তিনি সেই যুগে বসেই বুঝতে পেরেছিলেন।
অগাস্টাসের এই শাসনব্যবস্থা আমাদের বর্তমান পৃথিবীর রাজনীতির জন্যও একটা বিশাল পাঠ্যবই হয়ে আছে। তিনি দেখিয়েছিলেন একটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে বাইরে থেকে একদম অক্ষত রেখে ভেতর থেকে কীভাবে পুরো সিস্টেমটা নিজের মতো করে বদলে ফেলা যায়। তিনি আইনের কোনো বরখেলাপ করতেন না, কিন্তু আইনগুলো এমনভাবে তৈরি করাতেন যা দিনশেষে তারই ক্ষমতাকে আরও পাকাপোক্ত করত। এই পদ্ধতিটি সরাসরি একনায়কতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই এবং নিরাপদ।
তার এই রাজনৈতিক মডেলে কোনো প্রকাশ্য জোরজুলুম বা ক্ষমতার দম্ভ ছিল না। সেনেটের সদস্যরা খুব ভালো করেই জানতেন যে আসল সিদ্ধান্তগুলো অগাস্টাসের ঘর থেকেই আসে। কিন্তু অগাস্টাস তাদের ব্যক্তিগত সম্মান এবং আভিজাত্য এত সুন্দরভাবে রক্ষা করতেন যে তারা নিজেদের এই মোহ বা ইলিউশনের ভেতরে রাখতেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। মানুষের অহংকারকে আহত না করে তাকে দিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নেওয়ার এই কৌশলটি সত্যিই অসাধারণ।
ক্ষমতা দখল করা যতটা কঠিন, সেটাকে চার দশক ধরে কোনোরকম বড় বিদ্রোহ ছাড়া ধরে রাখা তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন। অগাস্টাস দীর্ঘ চল্লিশ বছর অত্যন্ত সফলভাবে শাসন করেছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি রোমের মানুষের মগজে এমন একটা নীরব পরিবর্তন এনেছিলেন যে তারা আগের সেই প্রজাতন্ত্রের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। নতুন প্রজন্মের যারা জন্ম নিচ্ছিল, তারা অগাস্টাস ছাড়া আর কোনো শাসন ব্যবস্থাই চোখে দেখেনি।
অগাস্টাসের মৃত্যুর পর রোমানরা আর কখনোই সেই পুরনো গণতান্ত্রিক বা প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায়নি। কারণ তিনি তাদের নিজেদের কাজের মাধ্যমে শিখিয়েছিলেন যে একটা স্থিতিশীল সাম্রাজ্য একটা বিশৃঙ্খল গণতন্ত্রের চেয়ে সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বেশি আরামদায়ক। ক্ষমতার আসল শিল্প হলো এমনভাবে শাসন করা, যেন শাসিতরা বুঝতেই না পারে যে তারা একটা অদৃশ্য রিমোট কন্ট্রোলে পরিচালিত হচ্ছে। মানুষের মনে কোনো ক্ষোভ জন্ম নিতে না দিয়ে একটা আস্ত সাম্রাজ্যের ভাগ্য বদলে দেওয়ার এই ইতিহাস তাই আজও আমাদের মুগ্ধ করে।
আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় আধুনিক পৃথিবীতেও এমন কোনো লিডার আছেন যিনি অগাস্টাসের মতো এই অদৃশ্য ক্ষমতার খেলাটা খেলছেন? @Hidden Shelf BD
৮
""ইতিহাসের ৬ জন মহান সম্রাজ্ঞী — যাঁরা পুরুষশাসিত যুগেও গোটা সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন দাপটের সাথে। একজন নারী নিজেকে 'রাজা' ঘোষণা করে মিশর শাসন করেছিলেন। আর আমাদের ভারতে — এক রানি সন্তান পিঠে বেঁধে ঘোড়ায় চেপে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।"
এমন এক যুগের কথা ভাবুন, যখন মানুষ বিশ্বাসই করত না যে একজন নারী রাজত্ব করতে পারে। সিংহাসন, যুদ্ধ, ক্ষমতা — সব নাকি শুধু পুরুষের জন্য। ঠিক সেই যুগেই কিছু নারী উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। আর প্রমাণ করেছিলেন — মুকুট লিঙ্গ দেখে বসে না, যোগ্যতা দেখে বসে। এঁরা সাম্রাজ্য গড়েছেন, যুদ্ধ জিতেছেন, ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। আজ সেই ছয়জন দাপুটে সম্রাজ্ঞীর কথা বলব।
প্রথম — ক্লিওপেট্রা (মিশর)।
ক্লিওপেট্রার নাম শুনলেই মানুষ ভাবে শুধু তাঁর রূপের কথা। কিন্তু এটা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটা। আসলে ক্লিওপেট্রা ছিলেন এক অসাধারণ বুদ্ধিমতী, বহু ভাষায় পারদর্শী, তুখোড় রাজনীতিবিদ। তিনি মিশরের শেষ ফারাও। তাঁর আসল অস্ত্র ছিল রূপ নয় — ছিল তাঁর মস্তিষ্ক। মহাশক্তিধর রোম যখন মিশরকে গিলে ফেলতে চাইছে, তখন তিনি অসাধারণ কূটনীতি দিয়ে রোমের সবচেয়ে ক্ষমতাবান দুই ব্যক্তিকে (জুলিয়াস সিজার ও মার্ক অ্যান্টনি) পাশে টেনে নিজের দেশকে রক্ষা করার লড়াই চালিয়েছিলেন। ইতিহাস তাঁকে শুধু সুন্দরী বানিয়ে রাখলেও, আসলে তিনি ছিলেন এক প্রখর রাজনৈতিক প্রতিভা।
দ্বিতীয় — হাটশেপসুট (মিশর)। যে নারী নিজেকে 'রাজা' বানিয়েছিলেন।
ক্লিওপেট্রারও প্রায় দেড় হাজার বছর আগে, মিশরে রাজত্ব করেছিলেন আরেক অসাধারণ নারী — হাটশেপসুট। সেই যুগে নারীর পক্ষে ফারাও (রাজা) হওয়া ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু হাটশেপসুট দমে যাননি। তিনি পুরুষ ফারাওদের মতোই রাজকীয় পোশাক, এমনকি নকল দাড়ি পর্যন্ত পরে নিজেকে পূর্ণ "রাজা" হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন। আর তাঁর শাসন? প্রায় ২০ বছরের এক সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ যুগ। তিনি বাণিজ্য বাড়ালেন, অসাধারণ সব মন্দির-স্থাপনা বানালেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর, পরবর্তী শাসকরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর নাম-ছবি মুছে ফেলার চেষ্টা করল — যেন একজন সফল নারী শাসকের কথা ইতিহাস মনে না রাখে! ভাগ্যিস, আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব তাঁকে আবার খুঁজে বের করেছে।
তৃতীয় — উ জেটিয়ান (চীন)। চীনের একমাত্র নারী সম্রাট।
চীনের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে অসংখ্য সম্রাট এসেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র একজন — উ জেটিয়ান। তিনি শুরু করেছিলেন একদম সাধারণভাবে, রাজপ্রাসাদের এক সাধারণ পরিচারিকা হিসেবে। কিন্তু তাঁর অসাধারণ বুদ্ধি আর ইচ্ছাশক্তি তাঁকে ধাপে ধাপে তুলে নিয়ে গেল ক্ষমতার চূড়ায়। শেষে তিনি যা করলেন, তা চীনে আর কোনো নারী করতে পারেননি। তিনি নিজেকে চীনের পূর্ণ "সম্রাট" (এম্পেরর) ঘোষণা করলেন — পুরুষদের মতোই, নিজের অধিকারে। আর তিনি ছিলেন এক দক্ষ শাসক — সাম্রাজ্য বাড়ালেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে মানুষকে কাজে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা শক্ত করলেন। কঠোর হলেও, তাঁর শাসন চীনকে অনেক এগিয়ে দিয়েছিল।
চতুর্থ — জেনোবিয়া (পালমিরা)। রোমকে চ্যালেঞ্জ করা যোদ্ধা-রানি।
তৃতীয় শতকে, সিরিয়ার মরুভূমির বুকে গড়ে ওঠা শহর পালমিরার রানি ছিলেন জেনোবিয়া — এক অসমসাহসী যোদ্ধা। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি রাজ্যের ভার নিলেন। কিন্তু শুধু রাজ্য সামলেই থেমে থাকলেন না। তিনি যা করলেন, তাতে স্বয়ং রোম সাম্রাজ্য কেঁপে উঠল। জেনোবিয়া তাঁর বাহিনী নিয়ে একের পর এক অঞ্চল জয় করতে লাগলেন — এমনকি মিশর আর রোমের পূর্বের বিশাল এলাকা দখল করে নিলেন, রোমের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন! একজন নারী, যিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত রোম তাঁকে পরাজিত করে বটে, কিন্তু তাঁর সাহসের গল্প আজও কিংবদন্তি।
পঞ্চম — ক্যাথরিন দ্য গ্রেট (রাশিয়া)। আধুনিক রাশিয়ার নির্মাতা।
আঠারো শতকে রাশিয়া শাসন করেছিলেন এক অসাধারণ সম্রাজ্ঞী — ক্যাথরিন দ্য গ্রেট। মজার ব্যাপার, তিনি জন্মসূত্রে রাশিয়ানই ছিলেন না, ছিলেন এক জার্মান রাজকন্যা। ক্ষমতায় এসে তিনি রাশিয়াকে আমূল বদলে দিলেন। তাঁর শাসনে রাশিয়ার সীমানা বিশাল আকারে বাড়ল, দেশ আধুনিক হলো, শিল্প-সাহিত্য-শিক্ষায় এক নতুন জাগরণ এল। তিনি ইউরোপের বড় বড় দার্শনিকদের সাথে চিঠি লিখতেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। প্রায় ৩৪ বছর ধরে তিনি দাপটের সাথে রাশিয়া শাসন করেন — রাশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল আর শক্তিশালী শাসকদের একজন হয়ে। একজন নারী, যিনি একটা গোটা সাম্রাজ্যকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন।
ইতিহাসের এই ৫জন সম্রাজ্ঞীর দিকে তাকালে একটা শক্তিশালী সত্যি বেরিয়ে আসে। ক্ষমতা, সাহস, বুদ্ধি — এগুলোর কোনো লিঙ্গ হয় না। যে যুগে মানুষ ভাবত নারী শুধু পর্দার আড়ালে থাকার জন্য, সেই যুগেও এই নারীরা প্রমাণ করেছিলেন — সুযোগ পেলে তাঁরা সাম্রাজ্যও শাসন করতে পারেন, যুদ্ধও জিততে পারেন।
আর সবচেয়ে কষ্টের কথা — এঁদের অনেককে ইতিহাস ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট করে রেখেছে, বা ভুলিয়ে দিয়েছে। হাটশেপসুটের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল, ক্লিওপেট্রাকে শুধু "সুন্দরী" বানিয়ে রাখা হয়েছে। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — যোগ্যতার সামনে কোনো দেয়ালই চিরস্থায়ী নয়। আর সত্যিকারের শক্তি কখনো লিঙ্গ, বয়স বা পরিচয় দেখে আটকে থাকে না।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়জনের মধ্যে কার গল্প আপনাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করল?
১. ক্লিওপেট্রা — রূপ নয়, বুদ্ধির রানি
২. হাটশেপসুট — নিজেকে 'রাজা' বানানো নারী
৩. উ জেটিয়ান — চীনের একমাত্র নারী সম্রাট
৪. জেনোবিয়া — রোমকে চ্যালেঞ্জ করা যোদ্ধা
৫. ক্যাথরিন দ্য গ্রেট — আধুনিক রাশিয়ার নির্মাতা
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৯
" ইতিহাসের ৬টি প্রাচীন বাণিজ্যপথ — যা শুধু পণ্য নয়, ধর্ম, জ্ঞান আর গোটা সভ্যতা বদলে দিয়েছিল। এক পথ ধরে বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা এশিয়ায়। আর আমাদের নিজেদের একটা পথ — শুরু হয়েছিল বাংলায়, পৌঁছেছিল কাবুল পর্যন্ত, আজও ২৫০০ বছর ধরে বেঁচে আছে।"
একটা পথ ধরে শুধু রেশম আর মসলা যায়নি। সেই পথ ধরে গেছে একটা গোটা ধর্ম, একটা গোটা সভ্যতার জ্ঞান — এক দেশ থেকে আরেক দেশে। আমরা ভাবি বাণিজ্যপথ মানে শুধু কেনাবেচা। কিন্তু সত্যিটা হলো — এই পথগুলোই ছিল প্রাচীন পৃথিবীর ইন্টারনেট। এদের ধরে ছড়িয়ে পড়েছে ধর্ম, ভাষা, প্রযুক্তি, এমনকি মহামারিও। আজ সেই ছয়টা পথের কথা বলব, যা গোটা পৃথিবীকেই বদলে দিয়েছিল।
প্রথম — সিল্ক রোড (রেশম পথ)।
পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত বাণিজ্যপথ। চীন থেকে শুরু হয়ে, মরুভূমি আর পাহাড় পেরিয়ে এই পথ পৌঁছে যেত সুদূর ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত। নাম "রেশম পথ," কারণ চীনের মহামূল্যবান রেশম এই পথেই পশ্চিমে যেত। কিন্তু শুধু রেশম নয়। এই পথ ধরেই ছড়িয়ে পড়েছিল আরও অনেক কিছু। বৌদ্ধধর্ম ভারত থেকে এই পথ ধরেই পৌঁছেছিল চীন আর মধ্য এশিয়ায়। কাগজ বানানোর কৌশল, নানা প্রযুক্তি, শিল্প, ধর্ম — সব এই পথে হাত বদল হয়েছে। এমনকি ভয়ঙ্কর "ব্ল্যাক ডেথ" মহামারিও সম্ভবত এই পথ ধরেই ছড়িয়েছিল। একটা বাণিজ্যপথ, যা আসলে দুই সভ্যতার মধ্যে জ্ঞানের সেতু হয়ে উঠেছিল।
দ্বিতীয় — মসলা পথ (স্পাইস রুট)।
প্রাচীন পৃথিবীতে মসলা ছিল সোনার মতো দামি। গোলমরিচ, দারচিনি, লবঙ্গ, জায়ফল — এগুলোর জন্য মানুষ সমুদ্র পাড়ি দিত, যুদ্ধ করত, এমনকি প্রাণও দিত। ভারত আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই মসলা ভারত মহাসাগর পেরিয়ে পৌঁছত মধ্যপ্রাচ্য আর ইউরোপে। আর এই মসলার লোভই বদলে দিল গোটা পৃথিবীর ইতিহাস। ইউরোপীয়রা ভারতের মসলা সরাসরি পেতে মরিয়া হয়ে নতুন সমুদ্রপথ খুঁজতে বেরোল। সেই খোঁজেই কলম্বাস আমেরিকায় গিয়ে পৌঁছলেন (ভুল করে!), আর ভাস্কো দা গামা ভারতে এলেন। ভাবুন — আমাদের ভারতের মসলার টানেই শুরু হয়েছিল ইউরোপের সেই "আবিষ্কারের যুগ," যা পৃথিবীর মানচিত্রটাই বদলে দিল।
তৃতীয় — ধূপ পথ (ইনসেন্স রুট)।
আজ আমরা সহজেই ধূপ-সুগন্ধি কিনে ফেলি। কিন্তু প্রাচীনকালে ফ্র্যাঙ্কিনসেন্স আর মার (এক ধরনের সুগন্ধি রজন) ছিল অবিশ্বাস্য মূল্যবান। কেন? কারণ পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মের পূজা-উপাসনায় এই সুগন্ধি পোড়ানো হতো। দেবতাদের উদ্দেশে, মৃতের সৎকারে — সবখানে দরকার ছিল এই ধূপ। আরবের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে এই সুগন্ধি উটের কাফেলায় চেপে পৌঁছত ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত। এই ব্যবসা এত লাভজনক ছিল যে, পথের ধারের শহরগুলো অকল্পনীয় ধনী হয়ে উঠেছিল — যেমন পাথর কেটে বানানো বিস্ময়কর শহর "পেত্রা।" একটা সুগন্ধির ব্যবসা, যা মরুভূমির বুকে গড়ে তুলেছিল আস্ত সাম্রাজ্য।
চতুর্থ — ট্রান্স-সাহারান পথ। মরুভূমির বুকে সোনা আর লবণ।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মরুভূমি সাহারা — মাইলের পর মাইল শুধু বালি। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর মরুভূমির বুক চিরেই চলত এক অসাধারণ বাণিজ্য। পশ্চিম আফ্রিকার কাছে ছিল প্রচুর সোনা, কিন্তু লবণের অভাব। আর উত্তরে ছিল লবণ। তাই উটের বিশাল কাফেলা সোনা আর লবণ বিনিময় করতে মরুভূমি পাড়ি দিত। এই সোনার ব্যবসাই জন্ম দিয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী কিছু সাম্রাজ্যের। পশ্চিম আফ্রিকার মালি সাম্রাজ্যের শাসক মানসা মুসাকে অনেকে ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী মানুষ বলেন। আর এই পথ ধরেই ইসলাম আর জ্ঞান ছড়িয়ে পড়েছিল আফ্রিকায় — টিম্বাকটু শহর হয়ে উঠেছিল এক বিশাল শিক্ষাকেন্দ্র। সোনা, লবণ আর জ্ঞান — সব বয়ে নিয়ে যেত মরুভূমির এই পথ।
পঞ্চম — অ্যাম্বার রোড (অ্যাম্বার পথ)। উত্তরের সোনা।
ইউরোপের উত্তরে, বাল্টিক সাগরের তীরে পাওয়া যেত এক অপূর্ব সোনালি রত্ন — "অ্যাম্বার" (গাছের জমাট আঠা থেকে তৈরি হলুদ মণি)। প্রাচীন মানুষ বিশ্বাস করত, এই অ্যাম্বারের জাদুকরী আর রোগ সারানোর ক্ষমতা আছে। তাই এর চাহিদা ছিল আকাশছোঁয়া। তাই উত্তর ইউরোপ থেকে এই অ্যাম্বার বয়ে নিয়ে যাওয়া হতো সুদূর দক্ষিণে — রোম পর্যন্ত। একে বলা হতো "উত্তরের সোনা।" এই পথ ধরেই ঠান্ডা, দূরের উত্তর ইউরোপ যুক্ত হয়েছিল উষ্ণ, সভ্য ভূমধ্যসাগরের সাথে — দুই আলাদা পৃথিবীকে এক সুতোয় বেঁধেছিল একটুকরো সোনালি মণি।
ষষ্ঠ — গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড। ২৫০০ বছরের পথ।
আজও যে রাস্তায় আমরা চলি — সেই গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো আর দীর্ঘ পথগুলোর একটা। প্রায় ২৫০০ বছর ধরে এটা টিকে আছে! এর প্রাচীন নাম ছিল "উত্তরাপথ" — যার উল্লেখ আছে আড়াই হাজার বছর আগের পাণিনির লেখাতেও। মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত এই পথ গড়ে তোলেন, আর সম্রাট অশোক এর ধারে গাছ লাগান, কুয়ো খোঁড়েন, পথিকদের জন্য বানান বিশ্রামাগার। আর সবচেয়ে গর্বের কথা — এই পথের একটা প্রান্ত শুরু হয়েছিল আমাদের বাংলায়। বাংলার তাম্রলিপ্ত (আজকের তমলুক), সোনারগাঁ থেকে শুরু হয়ে এই পথ চলে গেছে সুদূর কাবুল (আফগানিস্তান) পর্যন্ত। পরে ষোড়শ শতকে শের শাহ সুরি এটাকে নতুন করে গড়ে তোলেন, নাম দেন "সড়ক-এ-আজম" (মহাসড়ক) — পথের ধারে বানান অসংখ্য সরাইখানা (পান্থশালা)। তারপর মুঘল আর ব্রিটিশরা এটাকে আরও বাড়ায়। এই একটা পথ ধরেই হাজার হাজার বছর বয়ে গেছে সেনাবাহিনী, তীর্থযাত্রী, বণিক, সাধু, ভাব আর সংস্কৃতি — গোটা উপমহাদেশকে এক সুতোয় বেঁধে। ভাবুন, আমাদের বাংলা থেকে শুরু হওয়া একটা পথ, যা আড়াই হাজার বছর ধরে ইতিহাসের সাক্ষী।
ইতিহাসের এই ছয়টা পথের দিকে তাকালে একটা সুন্দর সত্যি বেরিয়ে আসে। এই পথগুলো শুধু পণ্য বয়ে নিয়ে যায়নি। এরা বয়ে নিয়ে গেছে ভাব, ধর্ম, ভাষা, প্রযুক্তি — মানুষকে মানুষের সাথে জুড়েছে। আজ আমরা যাকে "গ্লোবালাইজেশন" বলি, তার শুরু আসলে এই প্রাচীন ধুলোমাখা পথগুলোতেই। আর সবচেয়ে বড় কথা — এই পথগুলো প্রমাণ করে, মানুষ আসলে চিরকালই একে অপরের সাথে যুক্ত হতে চেয়েছে। দেয়াল নয়, সেতু বানাতে চেয়েছে। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — যে সভ্যতা যত বেশি খোলা মনে অন্যের সাথে যুক্ত হয়েছে, জ্ঞান বিনিময় করেছে, সে তত বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা পথের মধ্যে কোনটা শুনে আপনি সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন? আর আমাদের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড — যে পথ বাংলায় শুরু হয়ে কাবুল পর্যন্ত গেছে — এটা কি আপনি আগে জানতেন?
১. সিল্ক রোড — রেশম আর বৌদ্ধধর্মের পথ
২. মসলা পথ — যা আবিষ্কারের যুগ আনল
৩. ধূপ পথ — যা পেত্রা গড়ল
৪. ট্রান্স-সাহারান — সোনা, লবণ আর জ্ঞান
৫. অ্যাম্বার রোড — উত্তরের সোনা
৬. গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড — বাংলা থেকে কাবুল
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
১০
"ইতিহাসের ৬টি প্রাচীন শহর — যা একসময় ছিল পৃথিবীর কেন্দ্র, অথচ আজ শুধুই ধ্বংসস্তূপ। যে শহরে ছিল পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের এক ঝুলন্ত বাগান, আজ সেখানে শুধু ধুলো। আর আমাদের বাংলায় ছিল এমন এক বিশ্ববিখ্যাত বন্দর — যেখান থেকে জাহাজ যেত চীন পর্যন্ত — যা আজ শুধু একটা ছোট্ট শহর।"
একটা শহর ছিল, যাকে বলা হতো পৃথিবীর কেন্দ্র। সোনায় মোড়া প্রাসাদ, আকাশছোঁয়া মিনার, ঝুলন্ত বাগান — মানুষ ভাবত, এই শহর কোনোদিন শেষ হবে না। আজ সেখানে শুধু বালি, ভাঙা ইট আর নীরবতা। ইতিহাসের সবচেয়ে নম্র করে দেওয়া সত্যিটা হলো — কোনো শহর, কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। যে শহর আজ পৃথিবী শাসন করছে, হাজার বছর পর সেটাও হয়তো শুধু ধ্বংসস্তূপ। আজ সেই ছয়টা শহরের কথা বলব, যারা একসময় ছিল পৃথিবীর কেন্দ্র।
প্রথম — ব্যাবিলন। ঝুলন্ত বাগানের শহর।
প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, ব্যাবিলন (আজকের ইরাকে) ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জমকালো শহর। এখানেই ছিল কথিত সেই "ঝুলন্ত বাগান" — পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি। ছিল নীল টালি দিয়ে সাজানো বিশাল ইশতার গেট, আকাশছোঁয়া মন্দির (যা থেকে "টাওয়ার অফ ব্যাবেল"-এর কিংবদন্তি)। রাজা নেবুচাদনেজারের আমলে এই শহরের ঐশ্বর্য ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু সাম্রাজ্যের পতনের সাথে সাথে এই মহানগরীও ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হলো, মাটিতে মিশে গেল। আজ সেই গর্বের ব্যাবিলন শুধু ভাঙা ইটের ধ্বংসস্তূপ — মরুভূমির বুকে এক হারানো স্বপ্ন।
দ্বিতীয় — কার্থেজ। রোমের সবচেয়ে বড় শত্রু।
আজকের তিউনিসিয়ার কাছে গড়ে উঠেছিল কার্থেজ — এক বিশাল, ধনী সমুদ্র-সাম্রাজ্য। এত শক্তিশালী যে, মহাশক্তিধর রোমও তাকে ভয় পেত। কার্থেজের বীর সেনাপতি হ্যানিবল হাতি নিয়ে আল্পস পর্বত পেরিয়ে রোমকে আক্রমণ করেছিলেন — ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃসাহসিক অভিযানগুলোর একটা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোম প্রতিশোধ নিল। দীর্ঘ যুদ্ধের পর, রোম কার্থেজকে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দিল — পুড়িয়ে, ধ্বংস করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিল। (কথিত আছে, তারা নাকি জমিতে লবণ ছড়িয়ে দিয়েছিল, যাতে আর কিছু না জন্মায়।) যে শহর একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ছিল, তা মুছে গেল ইতিহাস থেকে। আজ শুধু কিছু ধ্বংসাবশেষ মনে করিয়ে দেয় তার গর্বের কথা।
তৃতীয় — পার্সেপোলিস। পারস্য সাম্রাজ্যের রত্ন।
আড়াই হাজার বছর আগে, পৃথিবীর প্রথম মহাশক্তি ছিল পারস্য (পার্সিয়ান) সাম্রাজ্য। আর তাদের রাজকীয় রাজধানী ছিল পার্সেপোলিস (আজকের ইরানে)। সম্রাট দারিউস আর জারক্সিসের বানানো এই শহর ছিল অবিশ্বাস্য সুন্দর — বিশাল বিশাল পাথরের স্তম্ভ, সিঁড়ি জুড়ে নিখুঁত খোদাই, রাজপ্রাসাদের জাঁকজমক। কিন্তু একদিন এল আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ সালে, আলেকজান্ডার পার্সেপোলিস দখল করে গোটা শহরটাই পুড়িয়ে দিলেন। পৃথিবীর সবচেয়ে জমকালো শহরগুলোর একটা পরিণত হলো ছাইয়ে। আজও সেই পোড়া স্তম্ভগুলো দাঁড়িয়ে আছে — এক হারানো সাম্রাজ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে।
চতুর্থ — থিবস (মিশর)। হাজার দরজার শহর।
প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে গৌরবময় রাজধানী ছিল থিবস (আজকের লুক্সর)। এত মহিমান্বিত যে একে বলা হতো "হাজার দরজার শহর।" এখানেই গড়ে উঠেছিল কারনাকের বিশাল মন্দির — পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটা, যার পাথরের স্তম্ভগুলো এত বিশাল যে মানুষ সেগুলোর পাশে পিঁপড়ের মতো লাগে। ফারাওদের সোনায় মোড়া এই শহর ছিল মিশরীয় সভ্যতার হৃদয়। কাছেই ছিল "রাজাদের উপত্যকা," যেখানে তুতেনখামেনের মতো ফারাওদের সমাধি। কিন্তু সময়ের সাথে এই মহানগরীও তার গৌরব হারাল। আজ থিবস শুধু বিশাল বিশাল ভাঙা মন্দির আর স্তম্ভের সমষ্টি — অতীতের সেই অকল্পনীয় জাঁকজমকের নীরব স্মৃতি।
পঞ্চম — এফেসাস (তুরস্ক)। সমুদ্র সরে গিয়ে মরে যাওয়া শহর।
প্রাচীন গ্রিক-রোমান যুগে, এফেসাস (আজকের তুরস্কে) ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর সমৃদ্ধ শহরগুলোর একটা — একটা বিশাল ব্যস্ত সমুদ্রবন্দর। এখানেই ছিল দেবী আর্টেমিসের সেই মহান মন্দির — পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের একটি। ছিল অসাধারণ গ্রন্থাগার, বিশাল থিয়েটার, লক্ষ লক্ষ মানুষের কোলাহল। কিন্তু শহরটার মৃত্যু হলো এক অদ্ভুত কারণে। ধীরে ধীরে, নদীর বয়ে আনা পলি জমে বন্দরটা ভরে গেল, সমুদ্র সরে যেতে লাগল দূরে। আর বন্দর ছাড়া সমুদ্রের শহর তো অচল! ব্যবসা চলে গেল, মানুষ চলে গেল, শহরটা ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হলো। আজ এফেসাসের সেই বিখ্যাত গ্রন্থাগারের সামনের অংশ আর থিয়েটার দাঁড়িয়ে আছে — কিন্তু সমুদ্র আজ বহু দূরে। প্রকৃতিই নীরবে মুছে দিল এক মহানগরীকে।
ষষ্ঠ — তাম্রলিপ্ত (তমলুক)। বাংলার হারানো মহাবন্দর।
এই শেষ শহরটা বাংলার — আর এর গল্প শুনলে গর্ব আর অবাক, দুটোই হয়। আজ আমরা যাকে চিনি ছোট্ট এক শহর "তমলুক" (পূর্ব মেদিনীপুর) নামে, সেটাই একসময় ছিল বাংলার — তথা গোটা ভারতের — সবচেয়ে বড় আর বিখ্যাত সমুদ্রবন্দর। নাম ছিল "তাম্রলিপ্ত।" দুই হাজারেরও বেশি বছর আগে, এই বন্দর থেকে জাহাজ পাড়ি দিত শ্রীলঙ্কা, জাভা, এমনকি সুদূর চীন পর্যন্ত। ভাবুন — আমাদের বাংলার এই বন্দরের নাম লেখা ছিল গ্রিক, রোমান, চীনা — সব সভ্যতার লেখায়! মনে আছে আগের পোস্টের সেই চীনা পরিব্রাজকদের কথা? সেই বিখ্যাত পরিব্রাজক ফা-হিয়েন ভারত ভ্রমণ শেষে এই তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকেই জাহাজে শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন — আর লিখে গিয়েছিলেন, এই শহরে ছিল ২০টিরও বেশি বৌদ্ধবিহার। গুপ্ত যুগে এটাই ছিল পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার, বাণিজ্য আর সংস্কৃতির মিলনস্থল।
কিন্তু তারপর? রূপনারায়ণ নদীর বয়ে আনা পলি ধীরে ধীরে বন্দরটা ভরিয়ে দিল, নদীর গতিপথ বদলে গেল, সমুদ্র সরে গেল দূরে। ঠিক এফেসাসের মতোই — বন্দর মজে গিয়ে মরে গেল এক মহানগরী। আজ তমলুকের পুকুর, মাটির নিচে চাপা পড়া পুরোনো জিনিস আর জাদুঘরের কিছু মূর্তিই শুধু ফিসফিস করে বলে — একসময় এখানে ছিল এক বিশ্ববিখ্যাত বন্দর। আমাদের বাংলার কত বড় গর্ব মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে, আমরা অনেকেই জানি না। ইতিহাসের এই ছয়টা শহরের দিকে তাকালে একটা গভীর, নম্র করে দেওয়া সত্যি বেরিয়ে আসে। কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। যে শহর একদিন পৃথিবী শাসন করেছে, যার ঐশ্বর্য দেখে মানুষ হাঁ হয়ে গেছে — সেই শহরও একদিন ধুলোয় মিশে যেতে পারে। কখনো যুদ্ধে, কখনো প্রকৃতির হাতে, কখনো শুধু সময়ের স্রোতে। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — অহংকার করার কিছু নেই। মানুষের গড়া সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যও সময়ের কাছে নেহাত ছোট। আর সেই সময়ের নিচেই হয়তো ঘুমিয়ে আছে আমাদের কত গর্ব, কত গল্প — যা আমরা ভুলে গেছি।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা শহরের মধ্যে কোনটার পতন আপনাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেল? আর আমাদের বাংলার তাম্রলিপ্ত — এই হারানো মহাবন্দরের কথা কি আপনি আগে জানতেন?
১. ব্যাবিলন — ঝুলন্ত বাগানের শহর
২. কার্থেজ — রোমের শত্রু, মাটিতে মিশে গেল
৩. পার্সেপোলিস — আলেকজান্ডার পুড়িয়ে দিলেন
৪. থিবস — হাজার দরজার শহর
৫. এফেসাস — সমুদ্র সরে গিয়ে মরল
৬. তাম্রলিপ্ত — বাংলার হারানো মহাবন্দর
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
১১
"ইতিহাসের ৬ জন মহান পরিব্রাজক — যাঁরা এমন এক যুগে গোটা পৃথিবী ঘুরেছিলেন, যখন মানচিত্রই ছিল না। কেউ ৩০ বছর ধরে হেঁটেছিলেন এক লক্ষ কিলোমিটারেরও বেশি। আর একজন চীনা সন্ন্যাসী — শুধু জ্ঞানের টানে — মরুভূমি-পাহাড় পেরিয়ে হেঁটে এসেছিলেন আমাদের ভারতের নালন্দায়।"
ভাবুন তো — কোনো গুগল ম্যাপ নেই, কোনো গাড়ি নেই, ঠিকঠাক মানচিত্রও নেই। শুধু পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায়, কিংবা নৌকায় আপনাকে বেরোতে হবে অজানা পৃথিবীর পথে। ফিরবেন কি না, জানেন না। পথে ডাকাত, মরুভূমি, ঝড়, রোগ — সব মৃত্যুর হাতছানি। তবু ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ ছিলেন, যাঁরা শুধু কৌতূহলের টানে, জ্ঞানের টানে, গোটা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। আর তাঁদের লেখা বিবরণ থেকেই আমরা আজ জানি, তখনকার পৃথিবীটা কেমন ছিল। আজ সেই ছয়জন মহান পরিব্রাজকের কথা বলব।
প্রথম — মার্কো পোলো (ত্রয়োদশ শতক)।
ইতালির ভেনিস শহরের এক তরুণ বণিক, মার্কো পোলো। বাবা-কাকার সাথে তিনি বেরিয়ে পড়লেন সুদূর প্রাচ্যের পথে — সিল্ক রোড ধরে। বছরের পর বছর পথ চলে তিনি পৌঁছলেন চীনে, মহান মঙ্গোল সম্রাট কুবলাই খানের দরবারে। সেখানে কাটালেন প্রায় ১৭ বছর। ফিরে এসে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা একটা বইয়ে লিখলেন। সেই বই-ই প্রথম ইউরোপের মানুষকে জানাল প্রাচ্যের রহস্যময় জগতের কথা — চীনের সম্পদ, সংস্কৃতি, বিস্ময়। পরবর্তীকালে কলম্বাসের মতো অভিযাত্রীরা এই বই পড়েই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। একটা ভ্রমণকাহিনি, যা গোটা ইউরোপের চোখ খুলে দিয়েছিল।
দ্বিতীয় — ইবন বতুতা (চতুর্দশ শতক)। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিব্রাজক।
মরক্কোর এক তরুণ পণ্ডিত, ইবন বতুতা। ২১ বছর বয়সে তিনি মক্কায় তীর্থে যাওয়ার জন্য বেরোলেন। ভাবলেন, কয়েক মাসের যাত্রা। কিন্তু সেই যাত্রা শেষ হলো প্রায় ৩০ বছর পর! একবার বেরিয়ে তিনি আর থামতে পারলেন না। ৩০ বছরে তিনি ঘুরলেন প্রায় এক লক্ষ কিলোমিটারেরও বেশি — উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য, ভারত, মালদ্বীপ, এমনকি চীন পর্যন্ত! মার্কো পোলোর চেয়েও অনেক বেশি পথ। এমনকি তিনি কয়েক বছর আমাদের দিল্লিতে সুলতানের অধীনে বিচারক (কাজি) হিসেবেও কাজ করেছিলেন। তাঁর লেখা ভ্রমণকাহিনি "রিহলা" আজও মধ্যযুগের পৃথিবীকে চেনার এক অমূল্য জানালা।
তৃতীয় — ঝেং হি (পঞ্চদশ শতক)। সমুদ্রের সম্রাট।
ইউরোপীয়রা সমুদ্রপথে বেরোনোর বহু আগেই, চীনের এক মহান নৌ-সেনাপতি ঝেং হি বেরিয়ে পড়েছিলেন সমুদ্র জয় করতে। তাঁর জাহাজ বহর ছিল কল্পনাতীত বিশাল — শত শত জাহাজ, কয়েক হাজার নাবিক। তাঁর সবচেয়ে বড় "ট্রেজার শিপ"-গুলোর কাছে কলম্বাসের জাহাজ ছিল নেহাত খেলনার মতো। এই বিশাল বহর নিয়ে তিনি সাতবার সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত (কালিকট), আরব, এমনকি সুদূর পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন তিনি — আফ্রিকা থেকে চীনের সম্রাটের জন্য একটা জিরাফও নিয়ে এসেছিলেন! ভাবুন, কলম্বাসেরও বহু দশক আগে চীন সমুদ্রে এমন পরাক্রম দেখিয়েছিল।
চতুর্থ — ম্যাগেলানের অভিযান (১৫১৯-১৫২২)। প্রথম পৃথিবী প্রদক্ষিণ।
মানুষ তখন জানতই না পৃথিবীটা ঠিক কত বড়। ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান ঠিক করলেন — তিনি জাহাজে করে গোটা পৃথিবীটা ঘুরে আসবেন। ১৫১৯ সালে ৫টা জাহাজ আর প্রায় ২৭০ জন নাবিক নিয়ে তিনি বেরোলেন এক অসম্ভব যাত্রায়। পথটা ছিল ভয়ঙ্কর — অজানা সমুদ্র, খাবারের অভাব, রোগ, ঝড়। ম্যাগেলান নিজে পথেই (ফিলিপাইনে) মারা গেলেন। কিন্তু তাঁর অভিযান থামল না। শেষে মাত্র একটা জাহাজ আর গুটিকয়েক নাবিক (২৭০ জনের মধ্যে মাত্র ১৮ জন!) বেঁচে ফিরল — কিন্তু তারা ইতিহাস গড়ে ফেলেছিল। প্রথমবারের মতো মানুষ গোটা পৃথিবীটা ঘুরে এসে প্রমাণ করল — পৃথিবী সত্যিই গোল।
পঞ্চম — রাব্বান বার সাওমা (ত্রয়োদশ শতক)। উল্টো মার্কো পোলো।
মার্কো পোলোর কথা সবাই জানে — যিনি পশ্চিম থেকে প্রাচ্যে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক উল্টোটা যিনি করেছিলেন, তাঁর কথা প্রায় কেউ জানে না। রাব্বান বার সাওমা ছিলেন চীনে জন্মানো এক খ্রিস্টান সন্ন্যাসী। তিনি প্রাচ্য থেকে যাত্রা শুরু করে পৌঁছেছিলেন সুদূর পশ্চিমে — ইউরোপে! ভাবুন, সেই যুগে একজন চীনা মানুষ হেঁটে-ঘোড়ায় ইউরোপ পর্যন্ত! তিনি দেখা করেছিলেন ইউরোপের রাজা-রাজড়াদের সাথে — ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের রাজা, এমনকি রোমের পোপের সাথেও। তাঁকে বলা যায় "উল্টো মার্কো পোলো।" ইতিহাস তাঁকে প্রায় ভুলে গেছে, কিন্তু তাঁর যাত্রা ছিল ঠিক ততটাই অবিশ্বাস্য।
ষষ্ঠ — হিউয়েন সাং, এসেছিলেন আমাদের নালন্দায় (সপ্তম শতক)।
সপ্তম শতকে চীনের এক তরুণ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, হিউয়েন সাং (Xuanzang)। তিনি বুঝলেন, চীনে বৌদ্ধধর্মের আসল, খাঁটি জ্ঞান পেতে হলে যেতে হবে এর উৎসে — ভারতে। চীনের রাজা অনুমতি দেননি। তবু জ্ঞানের টানে তিনি লুকিয়ে দেশ ছাড়লেন। তারপর শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য যাত্রা — ভয়ঙ্কর গোবি মরুভূমি, বরফঢাকা হিন্দুকুশ পর্বত পেরিয়ে, প্রায় ১৬,০০০ কিলোমিটার পথ হেঁটে তিনি পৌঁছলেন ভারতে। আর তাঁর গন্তব্য ছিল একটাই — বিহারের সেই বিশ্ববিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে তিনি বছরের পর বছর সংস্কৃত আর বৌদ্ধদর্শন পড়লেন, হাজার হাজার পণ্ডিতের সাথে তর্ক-আলোচনা করলেন। ভাবুন — সেই যুগে গোটা পৃথিবীর জ্ঞান-পিপাসুদের তীর্থস্থান ছিল আমাদের ভারত! শেষে তিনি ৬০০-রও বেশি পুঁথি নিয়ে চীনে ফেরেন। আর সবচেয়ে অবাক করা কথা — বহু শতাব্দী পরে, তাঁর লেখা সেই বিস্তারিত বিবরণ পড়েই উনিশ শতকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া নালন্দাকে আবার খুঁজে বের করেন! একজন বিদেশি সন্ন্যাসীর ভালোবাসা, যা আমাদের হারানো গর্বকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
ইতিহাসের এই ছয়জন পরিব্রাজকের দিকে তাকালে একটা সুন্দর সত্যি বেরিয়ে আসে। এঁরা কেউ যুদ্ধ করতে বেরোননি, কেউ রাজ্য জয় করতে নয়। এঁরা বেরিয়েছিলেন শুধু জানতে, বুঝতে, দেখতে। আর এই কৌতূহলই — এই "জানার ইচ্ছা"ই — মানুষকে অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা করে। এঁদের সাহস ছিল অবিশ্বাস্য। কোনো নিরাপত্তা ছাড়া, ফিরে আসার নিশ্চয়তা ছাড়া, শুধু একটা স্বপ্নকে সঙ্গী করে এঁরা অজানার পথে পা বাড়িয়েছিলেন। আর সেই সাহসেই গড়ে উঠেছিল মানুষের পৃথিবীকে চেনার গল্প। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — যত বড় স্বপ্ন, তত বড় ঝুঁকি। কিন্তু যাঁরা প্রথম পা বাড়ান, ইতিহাস তাঁদেরই মনে রাখে।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়জনের মধ্যে কার যাত্রা শুনে আপনি সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন? আর হিউয়েন সাং — যিনি জ্ঞানের টানে এত পথ পেরিয়ে আমাদের নালন্দায় এসেছিলেন — এই গল্প কি আপনাকে গর্বিত করে না?
১. মার্কো পোলো — ইউরোপ থেকে চীন
২. ইবন বতুতা — ৩০ বছরে এক লক্ষ কিমি
৩. ঝেং হি — সমুদ্রের সম্রাট
৪. ম্যাগেলান — প্রথম পৃথিবী প্রদক্ষিণ
৫. রাব্বান বার সাওমা — উল্টো মার্কো পোলো
৬. হিউয়েন সাং — জ্ঞানের টানে নালন্দায়
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
১২
চীনের সম্রাট সুং এক অদ্ভুত কৌশল
হান রাজবংশের পতনের পর চীনে কয়েকশো বছর ধরে একটা ভয়ঙ্কর নিয়ম চলছিল। এক সেনাপতি এসে দুর্বল রাজাকে খুন করে নিজে রাজা হতো, আর কয়েক বছর পর আরেক সেনাপতি এসে তাকে খুন করে ক্ষমতায় বসত।
এই রক্তক্ষয়ী চক্র ভাঙার জন্য ৯৫৯ সালে চীনের সম্রাট সুং এক অদ্ভুত কৌশল হাতে নিলেন। তিনি ক্ষমতায় বসার পর রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাপতিদের, যারা একসময় তার শত্রু ছিল এবং তাকে খুন করার ক্ষমতা রাখত, তাদের সবাইকে এক বিশাল ভোজসভায় দাওয়াত দিলেন। সবাই যখন মদ খেয়ে মাতাল, তখন সম্রাট তার রক্ষীদের সরিয়ে দিয়ে সেই ভয়ংকর সেনাপতিদের বললেন যে, তিনি জানেন তারা সবাই সিংহাসন দখল করার স্বপ্ন দেখছেন।
সেনাপতিরা ভয়ে কাঁপতে শুরু করল, তারা ভাবল সম্রাট হয়তো আজ সবাইকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবেন। কিন্তু সম্রাট সুং তাদের মৃত্যুর বদলে এক লোভনীয় প্রস্তাব দিলেন।
তিনি বললেন, তোমরা যদি তোমাদের সামরিক পদ ছেড়ে দাও, তবে আমি তোমাদের সবাইকে বিশাল জমিদারি, প্রচুর ধনসম্পদ আর সুন্দরীদের দিয়ে রাজকীয় জীবন কাটানোর ব্যবস্থা করে দেবো।
সেনাপতিরা এই অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে এতই অবাক হলো যে, তারা পরের দিনই সবাই পদত্যাগ করে সম্রাটের দেওয়া জমিদারি নিয়ে শান্তিতে অবসরে চলে গেল। সম্রাট সুং তার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শত্রুদের মেরে ফেলার বদলে, তাদের স্বার্থের জায়গাটা পূরণ করে তাদের নিরীহ ভেড়ায় পরিণত করলেন।
এরপর এক বিদ্রোহী রাজা লিউ যখন সম্রাটের কাছে ধরা পড়ল, তখন সবাই ভেবেছিল তাকে মেরে ফেলা হবে। কিন্তু সম্রাট তাকে রাজদরবারে ডেকে এনে নিজের হাতে মদের গ্লাস এগিয়ে দিলেন।
রাজা লিউ ভয়ে কাঁপছিলেন, তিনি ভাবলেন এই মদে বিষ মেশানো আছে। তখন সম্রাট নিজেই সেই মদের গ্লাস থেকে এক চুমুক খেয়ে প্রমাণ করলেন যে সেখানে কোনো বিষ নেই। এই ঘটনায় রাজা লিউ এতই মুগ্ধ হলেন যে, তিনি সারাজীবনের জন্য সম্রাটের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্রে পরিণত হলেন।
সম্রাট সুং খুব ভালো করেই জানতেন যে, বন্ধুদের ওপর নির্ভর করলে তারা তাকে পেছন থেকে ছুরি মারবে, কিন্তু একজন শত্রুর সবসময় নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ থাকে। আপনি যখন একজন শত্রুকে ক্ষমা করে তাকে কোনো দায়িত্ব দেবেন, তখন তার ভেতরে কৃতজ্ঞতার চেয়েও বেশি কাজ করবে নিজেকে প্রমাণ করার এক আদিম স্পৃহা।
সে জানবে যে সে একটা ভুল করলেই আপনি তাকে ধ্বংস করে দেবেন, তাই সে নিজের জীবন বাজি রেখে আপনার জন্য কাজ করবে। তাই বন্ধুদের ওপর অতিরিক্ত ভরসা না করে, শত্রুদের কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা শিখুন।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ লেখাটা নেয়া হয়েছে, 48 Laws of Power-বইয়ের প্রথম অধ্যায়ের এনালাইসিস থেকে।
@ Touhidul Islam
অসাধারণ কাজ সাধারণত অসাধারণ আইডিয়া দিয়ে শুরু হয় না; এটি শুরু হয় অগোছালো, অসম্পূর্ণ এবং কাঁচা চিন্তা দিয়ে।
অনেক বছর যুদ্ধ করেও গ্রীকরা যখন ট্রয়ের প্রাচীর ভেদ করতে পারলো না তখন তারা একটা ফন্দি আঁটে। তারা একটা বিশাল বড় কাঠের ঘোড়া নির্মাণ করে তার ভেতর ১০ জন বিখ্যাত গ্রিক যোদ্ধাকে লুকিয়ে রাখে। তারপর তারা জাহাজ নিয়ে ট্রয় ছেড়ে একটু দূরে চলে যায়। পেছনে একজন দালাল রেখে যায়, যিনি ট্রয়বাসীদের বলে গ্রীকরা এই ঘোড়াটি দেবতাদের উৎসর্গ করে চিরতরে চলে গেছে। এটাকে পোড়ালে দেবতারা অসন্তুষ্ট হবে। এটাকে বরং শহরের ভেতরে নিয়ে যাওয়া যাক। ট্রয়বাসী ঘোড়াটি শহরের ভেতরে নিয়ে যায়।
তখনই ঘোড়াটি পুড়িয়ে না ফেলায় রাতের অন্ধকারে ঘোড়ার ভিতরে থাকা সৈন্যরা বের হয়ে শহরের দরজা খুলে দেয়। আর জাহাজে থাকা সৈন্যরা শহরের ভিতরে ঢুকে পড়ে পুরো শহর পুড়িয়ে দেয়।
১৩
দীর্ঘতম গর্ভধারণকাল বিশিষ্ট ৯টি প্রাণী
প্রাণিজগতে বংশবৃদ্ধি এবং প্রজাতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো গর্ভধারণকাল বা জেস্টেশন পিরিয়ড (Gestation Period)। বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান (Evolutionary Biology) এবং পরিবেশগত অভিযোজনের (Environmental Adaptation) ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন প্রাণীর এই সময়কাল নির্ধারিত হয়। সাধারণত যেসব প্রাণীর মস্তিষ্কের গঠন জটিল, আকার বিশাল এবং যারা প্রতিকূল পরিবেশে বাস করে, তাদের গর্ভধারণকাল দীর্ঘ হয়ে থাকে।
বিজ্ঞানসম্মত তথ্য, শারীরবৃত্তীয় (Physiological) কারণ এবং দীর্ঘতম গর্ভধারণকালের ক্রমানুসারে সাজানো ৯টি প্রাণীর বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. আলপাইন সালামান্ডার (Salamandra atra)
গর্ভধারণকাল: ২ থেকে ৫ বছর (পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল)।
বৈজ্ঞানিক তথ্য ও শারীরবৃত্তি: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচুতে ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পরিবেশে থাকার কারণে এদের শরীরের বিপাকীয় হার (Metabolic rate) অত্যন্ত ধীর হয়ে যায়। আলপাইন সালামান্ডার ডিম পাড়ে না, সরাসরি বাচ্চার জন্ম দেয় (Viviparous)। তাপমাত্রা যত কম হয়, এদের জরায়ুতে ভ্রূণের বিকাশ তত ধীর গতিতে ঘটে, যার ফলে গর্ভধারণকাল ৫ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে।
২. ফ্রিলড শার্ক (Chlamydosarus anguineus)
গর্ভধারণকাল: প্রায় ৩.৫ বছর (৪২ মাস)।
বৈজ্ঞানিক তথ্য ও শারীরবৃত্তি: গভীর সমুদ্রের চরম ঠাণ্ডা এবং উচ্চ জলচাপের পরিবেশে বাস করার কারণে এই হাঙরের ভ্রূণের বৃদ্ধি খুব ধীর গতিতে হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, গভীর সমুদ্রে পুষ্টির অভাব এবং ধীর বিপাক প্রক্রিয়ার কারণেই এদের গর্ভধারণকাল মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম দীর্ঘ।
৩. আফ্রিকান ও এশীয় হাতি (Loxodonta africana & Elephas maximus)
গর্ভধারণকাল: ২২ মাস (প্রায় ২ বছর)।
বৈজ্ঞানিক তথ্য ও শারীরবৃত্তি: স্থলভাগের স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে হাতির গর্ভধারণকাল সবচেয়ে দীর্ঘ। হাতির অত্যন্ত জটিল এবং বড় মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ বিকাশের জন্য জরায়ুতে এই দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। এদের কর্পাস লুটিয়াম (Corpus Luteum) নামক ডিম্বাশয়ের অংশ থেকে একাধিক হরমোন নিঃসৃত হয়ে এই দীর্ঘ গর্ভাবস্থাকে টিকিয়ে রাখে। ফলে জন্মের পরপরই একটি হাতি ছানা নিজে নিজে দাঁড়াতে ও হাঁটতে পারে।
৪. ব্ল্যাক রাইনো বা কালো গণ্ডার (Diceros bicornis)
গর্ভধারণকাল: ১৫ থেকে ১৬ মাস (প্রায় ৪৫০-৪৮০ দিন)।
বৈজ্ঞানিক তথ্য ও শারীরবৃত্তি: গণ্ডার সাধারণত একক বাচ্চার জন্ম দেয়। এদের বিশাল আকৃতির কঙ্কাল এবং জটিল অঙ্গসংস্থানের (Anatomy) পূর্ণ বিকাশের জন্য জরায়ুতে প্রায় ১৬ মাস সময়ের প্রয়োজন হয়, যা মেগা-হার্বিভোরস (Mega-herbivores) বা বিশাল তৃণভোজী প্রাণীদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য।
৫. স্পার্ম হোয়েল বা শুক্রাণু তিমি (Physeter macrocephalus)
গর্ভধারণকাল: ১৪ থেকে ১৬ মাস।
বৈজ্ঞানিক তথ্য ও পৌঁছানো কৌশল: সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে এদের মস্তিষ্ক সবচেয়ে বড়। সমুদ্রের গভীরতম অংশে শিকার করার জন্য এদের বাচ্চার জন্ম থেকেই অত্যন্ত শক্তিশালী ফুসফুস এবং উন্নত একোলোকেশন (Echolocation) বা প্রতিধ্বনি-নির্ধারণী ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়, যা গর্ভে থাকা অবস্থায় দীর্ঘ সময় নিয়ে বিকশিত হয়।
৬. জিরাফ (Giraffa camelopardalis)
গর্ভধারণকাল: ১৪ থেকে ১৫ মাস (প্রায় ৪২০-৪৫০ দিন)।
বৈজ্ঞানিক তথ্য ও শারীরবৃত্তি: জিরাফের দীর্ঘ গর্ভধারণকালের মূল কারণ হলো এদের বাচ্চার শারীরিক গঠন। জন্মের সময় একটি জিরাফ ছানার উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট এবং ওজন প্রায় ৬৮ কেজি হয়ে থাকে। জন্মের সময় প্রায় ৫-৬ ফুট ওপর থেকে মাটিতে পড়ার ধাক্কা সহ্য করার মতো শক্তিশালী হাড় ও পেশি গঠনের জন্য জরায়ুতে এই দীর্ঘ সময় লাগে।
৭. বোহেড তিমি (Balaena mysticetus)
গর্ভধারণকাল: ১৩ থেকে ১৪ মাস।
বৈজ্ঞানিক তথ্য ও শারীরবৃত্তি: আর্কটিক অঞ্চলের চরম ঠাণ্ডা পানিতে টিকে থাকার জন্য এদের শরীরে ব্লাবার (Blubber) বা চর্বির ঘন আস্তরণ তৈরি হতে হয়। গর্ভে থাকা অবস্থায় মা তিমি তার প্লাসেন্টা বা জরায়ুর ফুলকা-র মাধ্যমে বাচ্চাকে চর্বি ও পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে, যা বাচ্চার বেঁচে থাকার হার বৃদ্ধি করে।
৮. উট (Camelus)
গর্ভধারণকাল: ১৩ থেকে ১৪ মাস (প্রায় ৪০০ দিন)।
বৈজ্ঞানিক তথ্য ও শারীরবৃত্তি: মরুভূমির চরম শুষ্কতা এবং খাদ্য-পানির অভাবের সাথে লড়াই করার জন্য উটের বাচ্চার জন্মগতভাবেই বিশেষ অভিযোজন ক্ষমতার প্রয়োজন হয়। দীর্ঘ সময় গর্ভে থাকার ফলে নবজাতক উট জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মায়ের সাথে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটতে সক্ষম হয়।
৯. গাধা (Equus asinus)
গর্ভধারণকাল: ১১ থেকে ১২ মাস (প্রায় ৩৬৫ দিন)।
বৈজ্ঞানিক তথ্য ও শারীরবৃত্তি: ঘোড়া বা জেব্রার চেয়ে গাধার গর্ভধারণকাল কিছুটা দীর্ঘ হয়। ইকুয়িডি (Equidae) পরিবারের এই প্রাণীটির ভ্রূণ জরায়ুতে খুব ধীর গতিতে পুষ্টি গ্রহণ করে। এর ফলে জন্ম নেওয়া নবজাতক বাচ্চার খুর ও পা অত্যন্ত শক্ত ও মজবুত হয়, যা তাদের শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে দ্রুত পালিয়ে বাঁচতে সাহায্য করে।
দীর্ঘ গর্ভাবস্থার পেছনে বিবর্তনীয় ও বৈজ্ঞানিক কারণ (Evolutionary Trade-offs)
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাণীদের এই দীর্ঘ গর্ভধারণকাল কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, বরং এটি প্রকৃতির একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা:
মস্তিষ্কের জটিলতা (Encephalization): যেসব প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা এবং সামাজিক আচরণ উন্নত (যেমন: হাতি, তিমি), তাদের মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরিতে বেশি সময় লাগে।
Precocial নবজাতক: দীর্ঘ গর্ভাবস্থার পর জন্ম নেওয়া বাচ্চারা সাধারণত "Precocial" প্রকৃতির হয়। অর্থাৎ, এরা জন্মের সাথে সাথেই চোখ মেলতে পারে, হাঁটতে পারে এবং নিজের শরীর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যা বন্য পরিবেশে শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচতে অত্যন্ত জরুরি।
বিপাকীয় হার (Metabolic Theory of Ecology): বড় আকারের প্রাণীদের মেটাবলিক রেট বা বিপাকীয় হার ছোট প্রাণীদের তুলনায় ধীর হয়। কোষ বিভাজন এবং কলা (Tissue) গঠনের এই ধীর গতির কারণে গর্ভকাল দীর্ঘায়িত হয়। @Science with Fahad
১৪
বনের ভেতরের ‘ফেয়ারিটেল’ নাকি মৃত্যুর ফাঁদ?
বনের স্যাঁতসেঁতে মাটিতে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা প্রতিটি মাশরুম দেখতে হয়তো রূপকথার মতো নিরীহ লাগে। কিন্তু প্রকৃতির এই অদ্ভুত সৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে আছে পৃথিবীর অন্যতম সেরা স্বাদ, আবার একই সাথে সবচেয়ে ভয়ানক বিষ!
বিজ্ঞান, বিবর্তন আর প্রকৃতির এক অদ্ভুত রসায়নের নাম মাশরুম। চলুন জেনে নেওয়া যাক এর পেছনের কিছু রোমাঞ্চকর তথ্য:
প্রকৃতির সেরা উপহার (খাদ্যযোগ্য মাশরুম)
বিশ্বের বহু অঞ্চলে শ্যান্টেরেল (Chanterelle), রুসুলা (Russula) এবং বিভিন্ন ধরনের বোলেট (Boletus) মাশরুম অত্যন্ত সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবার হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের খাদ্য সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে। এদের চমৎকার ফ্লেভার এবং টেক্সচারের জন্য বিশ্বজুড়ে শেফদের কাছে এগুলো বেশ সমাদৃত।
এক কামড়েই শেষ! (মারাত্মক বিষাক্ত মাশরুম)
অন্যদিকে, কিছু মাশরুম এতটাই বিষাক্ত যে মাত্র একটি মাশরুমই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট।
ডেথ ক্যাপ (Death Cap - Amanita phalloides): বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাশরুম। এতে থাকা 'অ্যামানিটিন' (Amatoxins) লিভার ও কিডনি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
ফ্লাই অ্যাগারিক (Fly Agaric - Amanita muscaria): লাল রঙের ওপর সাদা ফোঁটা থাকা এই মাশরুমটি দেখতে হুবহু কার্টুনের মতো সুন্দর হলেও এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং হ্যালুসিনেশন তৈরি করে।
বিবর্তন ও প্রকৃতির আত্মরক্ষা: রান্না করলেও কেন বিষ মরে না?
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, সাধারণ ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের মতো মাশরুমের বিষ তাপ সংবেদনশীল নয়। অর্থাৎ, বিষাক্ত মাশরুমকে রান্না করলে, শুকালে, ফ্রিজে রাখলে বা সেদ্ধ করলেও তার ভেতরের বিষাক্ত রাসায়নিক যৌগ বা টক্সিন নষ্ট হয় না।
বিবর্তনের ধারায় কিছু মাশরুম নিজেদেরকে বন্য প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এই রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করেছে। এটি প্রকৃতির এক অসাধারণ আত্মরক্ষা কৌশল।
কেন অভিজ্ঞ সংগ্রাহকরাও ধোঁকা খান?
প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—"দেখতে একই রকম হলেই তারা একই জিনিস নয়।" একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'Batesian Mimicry' বা রূপগত সাদৃশ্য। অনেক বিষাক্ত মাশরুম ঠিক তার পাশের খাদ্যযোগ্য মাশরুমটির ছদ্মবেশ ধারণ করে বসে থাকে। ফলে অভিজ্ঞ মাইকোলজিস্টরাও (মাশরুম বিজ্ঞানী) অনেক সময় খালি চোখে ভুল করে বসেন।
বিশেষ সতর্কবার্তা (Disclaimer):
এই পোস্টটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও সচেতনতামূলক উদ্দেশ্যে তৈরি। বনের কোনো মাশরুম দেখতে সুন্দর বা চেনা মনে হলেই তা তুলে খাওয়ার চেষ্টা করবেন না। মাশরুম চেনার কোনো সহজ "ঘরোয়া টোটকা" (যেমন- রুপার চামচ কালো হওয়া বা পেঁয়াজ নীল হওয়া) বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। যেকোনো বন্য মাশরুমের সংস্পর্শে আসার আগে সর্বদা প্রত্যয়িত মাইকোলজিস্ট বা স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিন।
প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, কিন্তু তার রহস্যকে সমীহ করতে শিখুন! @Science with Fahad
১৫
গর্ভকালের শেষার্ধে মায়ের অভ্যন্তরীণ শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন:
গর্ভধারণ কেবল বাইরের শারীরিক পরিবর্তন বা ওজন বৃদ্ধির নাম নয়; এটি মূলত মায়ের শরীরের ভেতরের অঙ্গসংস্থানের (Internal Anatomy) এক আমূল রূপান্তর। প্রথম ট্রাইমেস্টার বা গর্ভস্থার শুরুর সময় থেকে শুরু করে শেষ ট্রাইমেস্টার বা প্রসবের ঠিক পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নারীর শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রতিটি অংশকে গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধির জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হয়।
১. জরায়ুর (Uterus) অস্বাভাবিক প্রসারণ ও অবস্থান পরিবর্তন
সাধারণ অবস্থায় একজন নারীর জরায়ু থাকে একটি ছোট নাশপাতির আকারের (প্রায় ৩ ইঞ্চি লম্বা এবং ওজনে মাত্র ৭০ গ্রাম)। কিন্তু গর্ভধারণের শেষ পর্যায়ে (Third Trimester) জরায়ুর আকার প্রায় ৫০০ থেকে ১০০০ গুণ বৃদ্ধি পায়!
শুরুর দিকে: জরায়ু শ্রোণীচক্র বা পেলভিক ক্যাভিটির (Pelvic cavity) ভেতরে সুরক্ষিত থাকে।
শেষের দিকে: জরায়ুটি বড় হতে হতে মায়ের তলপেট ছাড়িয়ে লিভার, পাকস্থলী এবং ডায়াফ্রাম (মধ্যচ্ছদা) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এটি তখন পুরো পেটের ভেতরের সিংহভাগ জায়গা দখল করে নেয়।
২. অন্ত্র এবং পাকস্থলীর স্থানচ্যুতি (Displacement of Gastrointestinal Organs)
পোস্টারের বাম ও ডান পাশের চিত্রের দিকে তাকালে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি চোখে পড়ে, তা হলো ক্ষুদ্রান্ত্র এবং বৃহদান্ত্রের (Intestines) অবস্থান।
জরায়ুর তীব্র চাপের কারণে স্বাভাবিকভাবে গুছিয়ে থাকা অন্ত্র বা নাড়িভুঁড়ি ওপরের দিকে এবং দুই পাশে সংকুচিত হয়ে যায় (Displaced Intestines)।
পাকস্থলী (Stomach) ওপরের দিকে চেপে যাওয়ার কারণে এর ধারণক্ষমতা কমে যায়। এই কারণেই গর্ভবতী মায়েদের শেষ দিকে বুক জ্বালাপোড়া করা (Acid Reflux) এবং অল্প খাবার খেলেই পেট ভরে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
৩. মূত্রথলির ওপর চাপ ও ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
গর্ভস্থার শুরুতে জরায়ুর ঠিক নিচেই থাকে মূত্রথলি বা ইউরিনারি ব্লাডার। শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে জরায়ুর পুরো ওজনটি গিয়ে পড়ে মূত্রথলির ওপর। এর ফলে মূত্রথলি সম্পূর্ণ প্রসারিত হতে পারে না, যার কারণে শেষ ট্রাইমেস্টারে মায়েদের ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ অনুভব হয়।
৪. শ্রোণীচক্রের প্রসারণ (Expansion of Pelvic Girdle)
প্রসবের সময় শিশু যেন সহজেই জন্ম নিতে পারে, সেজন্য মায়ের শরীর হরমোনের (বিশেষ করে 'রিল্যাক্সিন' হরমোন) প্রভাবে শ্রোণীচক্রের হাড়ের জোড়া বা লিগামেন্টগুলোকে নরম ও আলগা করে দেয়। এতে পেলভিক গার্ডল বা শ্রোণীচক্র কিছুটা প্রসারিত হয়, যা চিত্রে সুস্পষ্ট।
৫. শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃৎপিণ্ডের ওপর প্রভাব
বড় হয়ে যাওয়া জরায়ু যখন ওপরের দিকে চাপ দেয়, তখন ফুসফুসের ঠিক নিচে থাকা ডায়াফ্রাম বা মধ্যচ্ছদা পেশিটি ওপরের দিকে প্রায় ৪ সেন্টিমিটার সরে যায়। এর ফলে ফুসফুসের বাতাস ধরে রাখার জায়গা কিছুটা কমে যায়, যা গর্ভবতী মায়েদের অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠা বা ঘন ঘন শ্বাস নেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
উপসংহার
নারীর শরীর প্রাকৃতিকভাবেই এমনভাবে তৈরি, যা এই চরম শারীরিক চাপ ও অঙ্গসংস্থানের পরিবর্তনকে অনায়াসে সহ্য করে নিতে পারে। সন্তান প্রসবের পর অলৌকিকভাবে এই অঙ্গগুলো আবার ধীরে ধীরে তাদের পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসে। মায়ের শরীরের এই অভ্যন্তরীণ ত্যাগ এবং মানিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাপনাই প্রমাণ করে মানবদেহের সৃষ্টিতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের এক অনন্য চমৎকারিত্ব।@Science with Fahad
১৬
ভারনিক্স ক্যাসিওসা
মায়ের গর্ভে থাকাকালীন শিশুর শরীরে ভারনিক্স ক্যাসিওসা (Vernix caseosa) তৈরি হওয়া একটি অত্যন্ত চমৎকার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে শিশুর ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে এটি নিজে নিজেই তৈরি হয়।
নিচে সহজ ভাষায় এর পেছনের বিজ্ঞানটি বুঝিয়ে দেওয়া হলো:
ভারনিক্স যেভাবে তৈরি হয়:
তৈলাক্ত গ্রন্থির ভূমিকা: গর্ভাবস্থার ১৯ থেকে ২০ সপ্তাহের দিকে (৫ম মাসে) শিশুর ত্বকে থাকা সেবাম বা তৈলাক্ত গ্রন্থিগুলো (Sebaceous glands) খুব সক্রিয় হয়ে ওঠে। এগুলো থেকে এক ধরণের বিশেষ তেল বা চর্বি নিঃসৃত হয়।
ঝরে পড়া ত্বকের কোষ: একই সময়ে শিশুর শরীরের উপরিভাগের মৃত বা পুরনো ত্বকের কোষগুলো (Epidermal cells) স্বাভাবিক নিয়মে ঝরে পড়তে থাকে।
প্রাকৃতিক মিশ্রণ: এই নিঃসৃত চর্বিযুক্ত তেল এবং ঝরে পড়া ত্বকের কোষগুলো একসাথে মিশে একটি ঘন, সাদা ক্রিম বা মোমের মতো আঠালো স্তর তৈরি করে। এটিই হলো ভারনিক্স।
এটি কেন তৈরি হয়? (সহজ উদাহরণ)
আমরা যখন অনেকক্ষণ পানিতে হাত ভিজিয়ে রাখি, তখন আমাদের হাতের চামড়া কুঁচকে যায় বা সাদা হয়ে যায়, তাই না?
মায়ের গর্ভে শিশুটি কিন্তু টানা ৯ মাস অ্যামনিওটিক ফ্লুইড (Amniotic fluid) নামের এক ধরণের তরল বা পানির মধ্যে ভেসে থাকে। এই তরল যাতে শিশুর অতি নরম ও সংবেদনশীল ত্বককে নষ্ট বা গলিয়ে ফেলতে না পারে, সেজন্য প্রকৃতি শিশুর ত্বকের ওপর ভারনিক্সের এই ওয়াটারপ্রুফ (Waterproof) বা পানি-নিরোধক প্রলেপটি তৈরি করে দেয়। এটি অনেকটা প্রাকৃতিক কোল্ড ক্রিমের মতো কাজ করে!
গর্ভাবস্থার ৩৬ থেকে ৩৮ সপ্তাহের দিকে এটি সবচেয়ে ঘন আকারে শিশুর শরীরে থাকে। এরপর ডেলিভারির সময় যত এগিয়ে আসে, এটি আস্তে আস্তে অ্যামনিওটিক ফ্লুইডে ধুয়ে কমতে থাকে। একারণেই সময়ের আগে (Premature) জন্ম নেওয়া শিশুদের শরীরে এই সাদা স্তরটি অনেক বেশি দেখা যায়। @Science with Fahad
সিজারিয়ান শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেওয়া শিশুদের তুলনায় কিছুটা দুর্বল থাকে। এর কারণ হলো, নরমাল ডেলিভারির সময় শিশু মায়ের জন্ম নালী দিয়ে আসার সময় মায়ের শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে উপকারী ব্যাকটেরিয়া নিয়ে আসে বা ন্যাচারাল মাইক্রোবায়োম ট্রান্সফার ঘটে, যা তার অন্ত্রে প্রথম সুরক্ষাকবচ তৈরি করে।
১৭
বাচ্চা একটু কাঁদলেই কোলে তুলে নেয়া
বাচ্চা একটু কাঁদলেই আপনি কোলে তুলে নিচ্ছেন, আর ঠিক তখনই পাশ থেকে কোনো মুরুব্বি বা অভিজ্ঞ আত্মীয় বলে উঠলেন- "ওকে অত কোলে তুলো না, নামিয়ে রাখো! কোলের অভ্যাস হয়ে গেলে কিন্তু সারাদিন তোমাকেই পস্তাতে হবে! "
আপনি ভয় পেয়ে ভাবলেন, "আসলেই তো! বাচ্চা যদি সারাক্ষণ কোলেই থাকতে চায়, তবে তো আমি কোনো কাজই করতে পারব না।" মন শক্ত করে বাচ্চাকে কান্না করতে দিয়েও আপনি দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
কিন্তু চাইল্ড সাইকোলজিস্টরা বলছেন, বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আপনি তাকে 'বিগড়ে' দিচ্ছেন না, বরং তার ব্রেইনের সবচাইতে বড় চাহিদা পূরণ করছেন।
কেন কোল নেওয়া জরুরি? (The Science)
১. The Oxytocin Surge: বিজ্ঞান বলছে, যখন আপনি আপনার বাচ্চাকে কোলে নেন বা জড়িয়ে ধরেন, তখন তার শরীরে 'অক্সিটোসিন' (Oxytocin) নামক হরমোন নিঃসৃত হয়। একে বলা হয় 'বন্ডিং হরমোন'। এটি বাচ্চার রক্তচাপ কমায় এবং হার্টবিট স্বাভাবিক রাখে। যে বাচ্চারা পর্যাপ্ত স্পর্শ পায় না, তাদের ব্রেইন সারাক্ষণ 'Alert' মোডে থাকে, যা তাদের ভবিষ্যতে ভীতু বা খিটখিটে করে তোলে।
২. Building the Safety Base: বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী John Bowlby-র 'Attachment Theory' অনুযায়ী, জীবনের শুরুর কয়েক বছর বাচ্চার জন্য স্পর্শ হলো একটি 'নিরাপদ বন্দর'। সে যখন জানে "আমি কাঁদলে বা ভয় পেলে আমার মা-বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরবে", তখন তার নিজের ওপর বিশ্বাস তৈরি হয়। অবাক করা বিষয় হলো- যে বাচ্চাকে শৈশবে বেশি কোলে নেওয়া হয়, বড় হয়ে তারাই সবচাইতে বেশি স্বাবলম্বী (Independent) এবং সাহসী হয়। কারণ তাদের 'ভিত'টা মজবুত থাকে।
তাহলে স্মার্ট প্যারেন্ট হিসেবে আপনি কী করবেন?
সমাজের কুসংস্কার না শুনে বাচ্চার ইমোশনাল নিডকে প্রাধান্য দিন। একে বলা হয় Responsive Parenting।
তাকে "শক্ত" বানানোর ভুল চেষ্টা না করে এই কাজগুলো করুন:
Don't Ignore the Cry: বাচ্চা যখন কাঁদে, সেটা তার কোনো প্রয়োজনের সংকেত। সে কথা বলতে পারে না বলেই কেঁদে আপনাকে ডাকে। তাকে কোলে তুলে নিন, কথা বলুন। সে যখন অনুভব করবে তার কথা শোনা হচ্ছে, তার কান্নার পরিমাণ এমনিতেই কমে আসবে।
Skin-to-Skin Contact: শুধু কোলে নেওয়া নয়, বাচ্চার গায়ে হাত বুলিয়ে দেওয়া বা তাকে জড়িয়ে ধরা তার নিউরোলজিক্যাল ডেভেলপমেন্টের জন্য জাদুর মতো কাজ করে। এটি তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়।
Quality over Time: ভয় পাবেন না, সারাজীবন সে আপনার কোলে থাকবে না। যখন সে হামাগুড়ি দেওয়া বা হাঁটতে শিখবে, সে নিজেই কোল থেকে নেমে জগত দেখতে শুরু করবে। তার আগে পর্যন্ত তার চার্জিং স্টেশন কিন্তু আপনার কোল-ই। @Science with Fahad
১৮
Firefly Squid
প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর অন্ধকারে এমন এক প্রাণী বাস করে যার শরীর যেন নিজেই একটি জীবন্ত নক্ষত্রমালা। Firefly Squid — বৈজ্ঞানিক নাম Watasenia scintillans। মাত্র কয়েক ইঞ্চি লম্বা এই স্কুইডের শরীরে থাকে শত শত ক্ষুদ্র আলোক অঙ্গ, যাদের বলা হয় “ফোটোফোর”। প্রতিটি ফোটোফোরের ভেতরে লুসিফেরিন ও লুসিফেরেজ নামের বিশেষ জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, যার ফলেই তৈরি হয় সেই অপার্থিব নীল আলো। এটি কোনো সাধারণ জ্যোতি নয়; এটি পৃথিবীর অন্যতম নিখুঁত বায়োলুমিনেসেন্স প্রযুক্তি, যা প্রকৃতি কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে নির্মাণ করেছে।
সমুদ্রের প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ মিটার গভীরে বসবাস করা এই প্রাণীরা দিনের অধিকাংশ সময় কাটায় অন্ধকার জলে। কিন্তু বসন্ত এলেই জাপানের Toyama Bay যেন এক মহাজাগতিক মঞ্চে পরিণত হয়। লক্ষ লক্ষ ফায়ারফ্লাই স্কুইড গভীর সমুদ্র থেকে উপরের দিকে উঠে আসে। তখন সমুদ্রের ঢেউগুলো জ্বলতে থাকে নীল আলোর তরঙ্গে, যেন আকাশের ছায়াপথ সাগরের বুকে নেমে এসেছে।
কিন্তু এই সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর জীববৈজ্ঞানিক সত্য। এই আলোর প্রধান উদ্দেশ্য কেবল সৌন্দর্য নয়— এটি যোগাযোগ, আত্মরক্ষা এবং প্রজননের সংকেত। তাদের শরীরের নিচের অংশের ফোটোফোরগুলো এমনভাবে আলো ছড়ায়, যাতে উপরের দিক থেকে তাকালে শিকারিরা তাদের ছায়া দেখতে না পায়। একে বলে “Counter-illumination camouflage” — প্রকৃতির এক অসাধারণ অপটিক্যাল কৌশল।
আর যখন প্রজননের সময় আসে, তখন এই আলো হয়ে ওঠে জীবনের শেষ আহ্বান। স্ত্রী স্কুইড হাজার হাজার ডিম ছেড়ে দেয় সমুদ্রজলে। সেই ডিমে ভবিষ্যতের নতুন প্রাণের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। কিন্তু ডিম পাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অধিকাংশ পূর্ণবয়স্ক স্কুইড মারা যায়। তাদের সমগ্র জীবন যেন একমাত্র উদ্দেশ্যের জন্য নির্মিত — পরবর্তী প্রজন্মকে পৃথিবীর আলো দেখানো।
ভাবা যায়? একটি প্রাণ নিজের অস্তিত্বের শেষ শক্তিটুকু ব্যয় করে নতুন জীবনের জন্ম দেয়, তারপর নীরবে হারিয়ে যায় সমুদ্রের অন্ধকারে। অথচ তাদের শেষ মুহূর্তটিও অন্ধকার নয়— আলোয় ভরা। যেন মৃত্যুর আগেও তারা সমুদ্রকে বলে যায়, “জীবন থেমে থাকে না।”
স্রষ্টার সৃষ্টি কত বিস্ময়কর! এখানে মৃত্যু কখনো কেবল সমাপ্তি নয়; বরং নতুন জীবনের জন্য জায়গা করে দেওয়ার এক নীরব মহাকাব্য। ফায়ারফ্লাই স্কুইড আমাদের শেখায়— ক্ষুদ্রতম প্রাণও মহাবিশ্বের বিশাল গল্পের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। @Science with Fahad
১৯
নবজাতি এতদিনেও মাটির নিচে মাত্র ১২ কিলোমিটার পর্যন্তই পৌঁছাতে পেরেছে!
আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি, তার মোট গভীরতা প্রায় ১২,৭৪২ কিলোমিটার! কিন্তু অবাক করার মতো বি-ষ-য় হলো-মানবজাতি এতদিনেও মাটির নিচে মাত্র ১২ কিলোমিটার পর্যন্তই পৌঁছাতে পেরেছে!.......
এই জায়গাটির নাম রাশিয়ার কোলা সুপার ডিপ বোরহোল - Kola Superdeep Borehole পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর গ-র্ত।যেটি নরওয়ে সীমান্তের কাছে অবস্থিত ।সেখানে তাপমাত্রা এতটাই বেশি ছিল (প্রায় ১৮০° সেলসিয়াস) যে ড্রিল মেশিন গুলো পর্যন্ত গ-লে গিয়েছিল!............
আর এটা ছিল শুধু পৃথিবীর ওপরের স্তর! নিচে আছে ম্যান্টল, যেখানে পাথর গলে গলে লাভার মতো তরল অবস্থায় রয়েছে। তার নিচে আউটার কোর - এক বিশাল সাগর, যা তৈরি লিকুইড লোহা ও নিকেল দিয়ে। আর একদম ভেতরে আছে ইনার কোর, যার তাপমাত্রা প্রায় ৬০০০° সেলসিয়াস,সূর্যের পৃষ্ঠের মতোই
ভ/য়ং/ক/র গরম।......
এর খনন ১৯৭০ সালে শুরু হয় । এই অভিযান গুরুত্বপূর্ণ কিছু আবিস্কার হয় যেমন
1. অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা
১২ কিমি গভীরে তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১৮০°C—এর বেশি গভীর খনন অসম্ভব হয়ে পড়ে।
2. ২৫ কোটিরও বেশি বছরের পুরনো শিলা
কেউ তা আগে কখনো দেখেনি।
3. মাইক্রোফসিল (জীবাশ্ম) চিহ্ন
প্রায় ২ কিমি গভীরে ২৪টি প্রাচীন অণুজীবের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়।
(জীবন্ত নয়, কেবল জীবাশ্মের রাসায়নিক নিদর্শন)
4. গ্রানাইট-ব্যাসাল্ট রূপান্তর সম্পর্কে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়
বিজ্ঞানীরা আশা করেছিলেন, গভীরে গ্রানাইটের নিচে ব্যাসাল্ট পাওয়া যাবে—কিন্তু পাওয়া যায়নি।
এটি ভূতত্ত্বে বড় সংশোধন আনে। পরে ১৯৯২ সালে এই প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও, পৃথিবীর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক জ্ব/ল/ন্ত অগ্নি কুন্ড। @Science with Fahad
২০
বিমান বা উড়োযান চালনার আদিপুরুষ: আব্বাস ইবনে ফিরনাস (৮১০-৮৮৭ খ্রি.)
আব্বাস ইবনে ফিরনাস ছিলেন একজন প্রভাবশালী মুসলিম উদ্ভাবক, প্রকৌশলী, সঙ্গীতজ্ঞ এবং পলিম্যাথ, যিনি ৯ম শতাব্দীর শুরুর দশকে আধুনিক স্পেনের কর্ডোবা শহরের নিকটবর্তী শহরতলিতে জন্মগ্রহণ করেন।
আব্বাস ইবনে ফিরনাস বলবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা এবং সঙ্গীত সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অগ্রণী কাজের জন্য পরিচিত। তার সবচেয়ে বিখ্যাত আবিষ্কারগুলির মধ্যে একটি ছিল উড়ন্ত যন্ত্র, যা তিনি ৮৭৫ সালে তৈরি করে তার পরীক্ষা চালিয়েছিলেন।
উড়ন্ত যন্ত্রটি রেশম এবং পালকের তৈরি ছিল এবং আব্বাস ইবনে ফিরনাস এটি দিয়ে ৩০০ মিটার পর্যন্ত দূরত্বে উড়েছিলেন, নিরাপদে অবতরণের আগে কয়েক মিনিটের জন্য বায়ুবাহিত ছিলেন। যদিও তিনি এই সফল গ্লাইডিং ফ্লাইটটি আব্বাস ইবনে ফিরনাসকে ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ফ্লাইট অর্জনকারী বানিয়েছে।
তিনি একজন প্রতিভাধর সঙ্গীতজ্ঞও ছিলেন এবং তার নিজের সঙ্গীত রচনা করেছিলেন, যা আন্দালুসিয়ায় অত্যন্ত সমাদৃত ছিল। তিনি নতুন বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করেন এবং শব্দ ও পদার্থবিদ্যার মধ্যে সম্পর্ক অন্বেষণ করতে গাণিতিক নীতি ব্যবহার করেন।
তার উদ্ভাবন এবং সঙ্গীত ছাড়াও, আব্বাস ইবনে ফিরনাস আলোকবিদ্যার ক্ষেত্রেও অবদান রেখেছিলেন এবং কাঁচ এবং স্ফটিক তৈরির কৌশল তৈরি করেছিলেন। যা নক্ষত্র এবং গ্রহগুলোর আরও সঠিক পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে দেয়। তিনি একটি বৃহৎ জল ঘড়ি নির্মাণ সহ প্রকৌশল প্রকল্পগুলিতে ব্যাপকভাবে কাজ করেছিলেন, যা তার সময়ের সবচেয়ে উন্নত প্রকৌশল প্রকল্পগুলির মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হতো।
সামগ্রিকভাবে, আব্বাস ইবনে ফিরনাস ছিলেন একজন অত্যন্ত দক্ষ এবং উদ্ভাবনী পলিম্যাথ যিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। বিমান চালনা, সঙ্গীত, প্রকৌশল এবং আলোকবিজ্ঞানে তার যুগান্তকারী কাজ পরবর্তী প্রজন্মের উদ্ভাবক এবং চিন্তাবিদদের অনুপ্রাণিত করেছে এবং তার অবদান ইসলামী ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে সমান্তরাল ভাবে সমাদৃত।
@Science with Fahad
গুইঁসাপ সম্পর্কে দুটো ব্যপার মনে রাখবেন। এরা নিরীহ, কারো কোনো ক্ষতি করে না। এরা বিলুপ্তপ্রায়।
গুইঁসাপ, যাকে ইংরেজিতে বলে Bengal Monitor Lizard—মানুষের নিরব বন্ধু। গ্রাম-গঞ্জে বিষধর সাপ নিধন করে বেড়ায় এরা।
বন-জঙ্গল কমে যাওয়া, অবৈধ শিকার, চায়না জালে আটকে যাওয়া আর ধরে ধরে হ*ত্যা করার কারণে এরা আজ বিলুপ্তপ্রায়। ১৯৭৮-১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫১ লাখ ৪৩ হাজার টাকার গুইঁসাপের চামড়া বাইরে বিক্রি হয়।
এদের সংখ্যা কমে যাওয়া পরিবেশের জন্য খুবই রিস্কি। এ কথা ভেবে ১৯৯০ সালে গুইঁসাপ হত্যায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। অথচ আজও বন্ধ হয়নি গুইঁসাপ নিধন।
২১
সবচেয়ে আশ্চর্য মমি
সময়টা ২০০৬ সাল। মিশরের লাক্সর (প্রাচীন থিবস) এলাকার আল-সাইফ আর্কিওলজিক্যাল সাইটে খননকার্য চালাচ্ছিলেন মার্কিন আর্কিওলজিস্টদের একটি দল। ইতিমধ্যেই সেখানে খুঁজে পাওয়া গেছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ টুম্ব। তার মধ্যে একটি হল কারাবাসকেন'এর টুম। পরে যার নাম রাখা হয়েছে টি টি - ৩৯১। সেই টুম্ব'এর ভেতর এক্সক্যাভেশন চলার সময় একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো।
সেখানে খুঁজে পাওয়া গেল বড়ো অদ্ভুত ধরনের এক মমি। বলা ভালো, এযাবৎ খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে আশ্চর্য মমি। তাকে সম্পূর্ণ রূপে মমি বলা যাবে কিনা তা নিয়েই সংশয় রয়েছে। আসলে সেটি ছিল একটি হাফ মমি।
এই বিশেষ মমিটি যে মানুষের তার শরীরের শুধুমাত্র ঊর্ধ্ব ভাগই অবশিষ্ট রয়েছে এবং সেই অংশটুকুই মমিকৃত করা হয়েছিল কয়েক হাজার বছর আগে।
প্রাচীন মিশরের আর্কিওলজির ইতিহাসে এমন অদ্ভুত আবিষ্কার এর আগে কখনো হয়নি। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষন করলো এই ঘটনা। উদ্ধারের পর নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চললো সেই মমিটির ওপর।
এযাবৎ হাতে আসা বেশ কিছু পরীক্ষালব্ধ ফলাফল থেকেই জানা গেছে মমিটি আসলে একটি যুবকের। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল আন্দাজ চব্বিশ থেকে ছাব্বিশ'এর মধ্যে। মমিটির সময়কালও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে। পাঁচশো পঞ্চাশ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আশেপাশে এই শরীরটিকে মমির রূপ দেওয়া হয়েছিল।
ঐতিহাসিকদের বিশ্বাস প্রাচীন মিশরের ছাব্বিশ'তম রাজবংশের কোন রাজপুত্রের মমি ছিল সেটি। খুব সম্ভবত তার শরীরের রং ছিল কালো।
তবে এই হাফ মমি আসলে 'হাফ' কেন তা নিয়ে রহস্য থেকেই গেছে।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা এর তিনটি প্রধান কারণ আন্দাজ করতে পেরেছেন। তার মধ্যে যে কোনো একটি সঠিক হতে পারে বলে তাদের বিশ্বাস।
প্রথমত, বিগত প্রায় চার পাঁচশো বছর ধরেই মিশরের আর্কিওলজিক্যাল সাইটগুলিতে পিরামিড ডাকাতের উপদ্রব চলেছে। তারাই হয়তো কোনোভাবে এই মমিটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
দ্বিতীয়ত, জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে যুবকটি জলহস্তী, কুমির অথবা সিংহের কাছে নিজেই হয়তো শিকারে পরিণত হয়েছিল। সেখানেই তার শরীরের নিম্নভাগ কাটা পড়ে। এই রকম উদাহরণ প্রাচীন মিশরীয় সাহিত্যে প্রচুর খুঁজে পাওয়া যায়। আর সেই অদ্ভুত অবস্থাতেই তাকে মমিকৃত করা হয়েছিল কয়েক হাজার বছর আগেই।
তৃতীয়ত, যুদ্ধ করতে গিয়ে ছাব্বিশ'তম রাজবংশের এই রাজকুমার সম্ভবত তার শরীরের নিচের অংশ হারিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল এবং সেই অবস্থাতেই তাকে মমিকৃত করা হয়েছিল।
তবে এই কারণগুলির কোনটাই নিশ্চিত করে বলতে পারে না ঠিক কি হয়েছিল সেই চার হাজার বছর আগে। তাই এই হাফ মমি আজও এক রহস্য হয়েই রয়ে গেছে...
@Science with Fahad
২২
সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান—এর পিছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ
এটি বিজ্ঞানের এক গভীর এবং রোমাঞ্চকর প্রশ্ন! মানুষ কেন সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান—এর পিছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে, যা বিবর্তন (evolution), মস্তিষ্কের গঠন, এবং সামাজিক আচরণের সঙ্গে জড়িত।
১. মস্তিষ্কের আকার ও জটিলতা:
মানুষের মস্তিষ্ক তুলনামূলকভাবে অনেক বড় এবং জটিল, বিশেষ করে neocortex অংশ, যা যুক্তি, ভাষা, পরিকল্পনা, কল্পনা, এবং আত্মচেতনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
২. ভাষার ক্ষমতা:
মানুষ ভাষা ব্যবহার করে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, ও আবেগ একে অপরের সঙ্গে ভাগ করতে পারে। এই সিম্বলিক ভাষা (symbolic language) অন্য কোনো প্রাণীর নেই।
৩. টুল বা যন্ত্র ব্যবহার ও উদ্ভাবন:
মানুষ শুধু পাথরের ছুরি নয়, কম্পিউটার থেকে রকেট পর্যন্ত তৈরি করেছে। কিছু প্রাণীও টুল ব্যবহার করে, কিন্তু মানুষের উদ্ভাবনী ক্ষমতা অনেক বেশি উন্নত।
৪. সামাজিক সহযোগিতা ও সংস্কৃতি:
মানুষ সহযোগিতা করতে এবং জ্ঞান প্রজন্মের পর প্রজন্মে স্থানান্তর করতে পারে। এটা তাকে দলবদ্ধভাবে কাজ করতে, আইন-কানুন তৈরি করতে, এবং সভ্যতা গড়তে সাহায্য করেছে।
৫. কল্পনার শক্তি ও ভবিষ্যৎ ভাবার ক্ষমতা:
মানুষ ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারে, ধর্ম বা কল্পিত গল্প তৈরি করতে পারে, এমনকি ‘যদি এরকম হতো’—এই চিন্তাও করতে পারে, যা অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে নেই।
বিজ্ঞানের ভাষায়:
মানুষের এই বুদ্ধিমত্তা এসেছে প্রাকৃতিক নির্বাচন (natural selection) এর মাধ্যমে। লক্ষ লক্ষ বছরে যারা সমস্যা সমাধান করতে পারত, যারা দলবদ্ধভাবে টিকে থাকতে পারত, তাদের জিন পরবর্তী প্রজন্মে টিকে গেছে।
তবে: বুদ্ধিমত্তা শুধু একটাই রকম না—ডলফিন, কাক, শিম্পাঞ্জি, এমনকি অক্টোপাসেরও নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা রয়েছে। মানুষ শুধু একভাবে সবার চেয়ে বেশি “সাধারণ” বা “বহুমুখী” বুদ্ধিমান। @Science with Fahad
২৩
চাঁদকে ঘিরে নানা রহস্য।
পৃথিবীর এই উপগ্রহটি সম্পর্কে শোনা যায় নানা কথা। অনেক রোমান্টিক নামও আছে তার-ব্লু মুন, ক্রিসেন্ট মুন, ফুল মুন ইত্যাদি ইত্যাদি। রাতের আকাশে খালি চোখে দেখা এই উপগ্রহটি সম্পর্কে এখানে কিছু তথ্য তুলে ধরা হলো:
১. চাঁদ গোলাকার নয়
চাঁদের আকৃতি আসলে ডিমের মতো। আপনি যখন এর দিকে তাকান তখন কিন্তু এর ছোট দুই প্রান্তের কোন একটিকে দেখতে পান। চাঁদের ভরের কেন্দ্র ঠিক এর জ্যামিতিক কেন্দ্রে অবস্থিত নয়। এটি জ্যামিতিক কেন্দ্র থেকে ১ দশমিক ২ মাইল দূরে।
২. সবসময় আমরা চাঁদের পুরোটা দেখতে পাই না
আমরা যখন চাঁদের দিকে তাকাই তখন এর ৫৯ শতাংশ দেখতে পাই। পৃথিবী থেকে চাঁদের বাকি ৪১ শতাংশ কখনোই দেখা যায় না। আপনি যদি এই তথ্য বিশ্বাস না করেন এবং এটা সত্য কিনা সেটা যাচাই করে দেখতে চাঁদের লুকিয়ে থাকা ওই ৪১ শতাংশের উপরে গিয়ে দাঁড়ান তাহলে কিন্তু সেখান থেকে আপনি এই পৃথিবীকে দেখতে পাবেন না।
৩. ব্লু মুন হয়েছে আগ্নেয়গিরি কারণে
ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্নুৎপাতের পর ১৮৮৩ সালে ‘ব্লু মুন’ পরিভাষার জন্ম হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সেসময় অগ্নুৎপাতের ফলে বায়ুমণ্ডলে এতো বেশি ধুলো ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছিল যে মানুষ যখন পৃথিবী থেকে চাঁদের থেকে তাকিয়েছিল তখন তাকে দেখতে নীল মনে হয়েছিল। আর এ থেকেই তৈরি হয়েছে ‘ওয়ান্স ইন এ ব্লু মুন’ কথাটি। বিরল কোন ঘটনা বলতে এই বাক্যটি ব্যবহার করা হয়।
৪. চাঁদকে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্র একবার সত্যিই সত্যিই চাঁদের উপর পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণের কথা চিন্তা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করা। বিশেষ করে রাশিয়াকে ভয় দেখানো। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অত্যন্ত গোপনীয় এই পরিকল্পনার নাম ছিল ‘এ স্টাডি অফ লুনার রিসার্চ ফ্লাইটস’ অথবা ‘প্রজেক্ট এ১১৯।’
৫. ড্রাগনের কারণেই গ্রহণের ঘটনা
সূর্য এবং পৃথিবীর মাঝে চাঁদ এসে পড়লে অথবা সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে চাঁদ এসে দাঁড়ালে তখন সূর্য বা চাঁদের আলো সাময়িকভাবে ম্লান হয়ে যায়। একে বলা হয় চন্দ্রগ্রহণ কিম্বা সূর্যগ্রহণ। একটি প্রাচীন চীনা বিশ্বাস হচ্ছে- একটি ড্রাগন যখন সূর্যকে গিলে খেয়ে ফেলে তখন সূর্যগ্রহণ হয়। তখন চীনারা তাদের পক্ষে যতোটা সম্ভব আওয়াজ সৃষ্টি করতে থাকে যাতে ড্রাগনটি ভয় পেয়ে দূরে চলে যায়।
চীনারা একসময় আরো বিশ্বাস করতো যে চাঁদের গর্তের ভেতরে একটি বিশাল আকৃতির ব্যাঙ বসবাস করতো। চারশো কোটি বছর আগে মহাকাশ থেকে ছুটে যাওয়া একটি পাথর চাঁদকে আঘাত করলে ওই গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল।
৬. চাঁদের কারণে পৃথিবীর গতি ধীর হয়
চাঁদ যখন পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে চলে আসে, তখন জোয়ারের সৃষ্টি হয়। নতুন কিম্বা ফুল মুনের পরপরই এরকম হয়ে থাকে। তখন পৃথিবীর ঘূর্ণন শক্তিও চাঁদ চুরি করে নেয়। আর সেকারণে পৃথিবীর গতিও প্রতি ১০০ বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলি-সেকেন্ড করে শ্লথ হয়ে যাচ্ছে।
৭. চাঁদের আলো
সূর্য একটি পূর্ণ চাঁদের চেয়েও ১৪ গুণ মাত্রায় বেশি উজ্জ্বল। সূর্যের মতো সমান উজ্জ্বলতায় জ্বলতে হলে প্রায় চার লাখ পূর্ণ চাঁদের প্রয়োজন। চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ যখন পৃথিবীর ছায়ার ভেতরে চলে যায় তখন চন্দ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দেড় ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ৫০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটও কমে যেতে পারে।
৮. লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বুঝেছিলেন ক্রিসেন্ট কি জিনিস
চাঁদকে আমরা যখন ক্রিসেন্টের আকারে বা অর্ধচন্দ্রাকৃতির মতো দেখি তখন আমরা চাঁদ থেকে ছিটকে আসা সূর্যের আলোকেই দেখতে পাই। চাঁদের বাকি অংশটা খুব অস্পষ্ট দেখা যায়। সেটাও নির্ভর করে আবহাওয়ার উপরে। শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চিই হলেন প্রথম কোন ব্যক্তি যিনি উপলব্ধি করতে পারছিলেন যে চাঁদ আসলে সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হচ্ছে না, বরং এর কিছু অংশ লুকানো থাকে।
৯. চাঁদ পনির দিয়ে তৈরি
চাঁদের আরো অনেক কিছুই আছে যা এখনও আমাদের অজানা। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় এনিয়ে একটি জরিপ চালানো হয়েছিল। তাতে দেখা গেছে জরিপে অংশ নেওয়া লোকজনের ১৩ শতাংশ বিশ্বাস করেন যে চাঁদ চীজ বা পনির দিয়ে তৈরি।
তথ্য সূত্র-বিবিসি।
"নরকের দরজা" নামে খ্যাত ইথিওপিয়ার ডানাকিল ডিপ্রেশন পৃথিবীর সবচেয়ে গরম অঞ্চল। ২০০কি.মি. দৈর্ঘ্য এবং ৫০ কি.মি. প্রস্থবিশিষ্ট ডানাকিল ডিপ্রেশনে গ্রীষ্মকালে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে।শীককালে ৩৫ ডিগ্রী থেকে ৪৯ ডিগ্রী পর্যন্ত হয়।এখানে সারা বছর বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। এর ফলে সেখানে উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের জন্য টিকে থাকা দুষ্কর।
তিনটি মহাদেশের টেকটোনিক প্লেট এই অঞ্চলে সংঘর্ষ লাগায় এখানে তৈরী হয়েছে আগ্নেয়গিরি। এখানের তাপমাত্রা এতো বেশি যে পানিও ফুটতে দেখা যায়। অনুর্বর এবং পৃথিবীর সবচেয়ে নিচু জায়গাটিতে আণুবীক্ষণিক জীব ছাড়া অন্য জীব বৈচিত্র্য নেই বললেই চলে।
২৪
ডাইনোসর ছিল এক ধরনের স্থলচর সরীসৃপ, যারা কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বাস করত। বিজ্ঞানীদের মতে:
ডাইনোসর প্রথম দেখা যায় প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে (Triassic যুগে)।
তারা পৃথিবীতে প্রায় ১৬ কোটি বছর আধিপত্য বিস্তার করে।
প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে অধিকাংশ ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়।
একটি জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো, একটি বিশাল গ্রহাণু পৃথিবীতে আঘাত করেছিল, যার ফলে জলবায়ুতে বড় পরিবর্তন আসে এবং ব্যাপক বিলুপ্তি ঘটে।
কিছু বিখ্যাত ডাইনোসর:
Tyrannosaurus rex (T. rex) – মাংসাশী।
Triceratops – তিন শিংযুক্ত তৃণভোজী।
Brachiosaurus – দীর্ঘ গলাযুক্ত বিশাল তৃণভোজী।
Velociraptor – তুলনামূলক ছোট কিন্তু দ্রুতগতির শিকারি।
বিজ্ঞানীদের বর্তমান ধারণা অনুযায়ী, পাখিরা আসলে কিছু ডাইনোসরের বংশধর। অর্থাৎ সব ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়নি; তাদের একটি শাখা আজকের পাখি হিসেবে টিকে আছে।
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, কুরআন ও সহিহ হাদিসে ডাইনোসরের নাম উল্লেখ নেই। তাই তারা ঠিক কখন ছিল বা মানুষের আগে ছিল কি না—এসব বিষয়ে ইসলামী গ্রন্থগুলো সরাসরি আলোচনা করে না। তবে ডাইনোসরের জীবাশ্ম (fossil) পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে, যা তাদের অস্তিত্বের পক্ষে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত
@ Ariful Islam Arif
২৫
"ইতিহাসের ৬টি রহস্যময় শহর — যা আজ সমুদ্রের নিচে ঘুমিয়ে আছে। একটা গোটা শহর এক ভয়ংকর ভূমিকম্পে নিমেষে সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছিল। আর আমাদের ভারতের উপকূলেও সমুদ্রের নিচে পাওয়া গেছে এক প্রাচীন নগরীর প্রাচীর — যাকে ঘিরে আছে শ্রীকৃষ্ণের কিংবদন্তি।"
ভাবুন তো — একটা গোটা শহর, যেখানে একসময় হাজার হাজার মানুষ থাকত, হাসত, স্বপ্ন দেখত... আজ সেটা সম্পূর্ণ সমুদ্রের নিচে, নীরব অন্ধকারে ঘুমিয়ে আছে। এটা কোনো সিনেমার গল্প নয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে সত্যিই এমন কিছু শহর আছে, যা একসময় ডাঙায় ছিল, আজ জলের অতলে। কোনোটা ভূমিকম্পে, কোনোটা সমুদ্রের ধীরে ধীরে গ্রাস করায়। আজ সেই ছয়টা ডুবে যাওয়া রহস্যময় শহরের কথা বলব। শেষেরটা আমাদের ভারতের, আর তার সাথে জড়িয়ে এক প্রিয় কিংবদন্তি।
প্রথম — থনিস-হেরাক্লেইওন (মিশর)। হারিয়ে যাওয়া বন্দর।
প্রাচীন মিশরে, ভূমধ্যসাগরের তীরে ছিল এক জমজমাট বন্দর-শহর — থনিস-হেরাক্লেইওন। আলেকজান্দ্রিয়ার আগে এটাই ছিল মিশরের সবচেয়ে বড় বন্দর। কিন্তু প্রায় ১,২০০ বছর আগে, ভূমিকম্প আর সমুদ্রের চাপে গোটা শহরটা ধীরে ধীরে জলের নিচে তলিয়ে যায়। তারপর হাজার বছর ধরে মানুষ ভুলেই গিয়েছিল এর কথা — অনেকে ভাবত এটা নিছক গল্প। কিন্তু ২০০০ সালে, ডুবুরি-প্রত্নতত্ত্ববিদরা সমুদ্রের তলায় খুঁজে পান এই হারানো শহর! বিশাল বিশাল মূর্তি, মন্দির, ডুবে যাওয়া জাহাজ — সব অবিকৃত অবস্থায় পড়ে আছে জলের নিচে। কিংবদন্তি যে সত্যি হতে পারে, এটা তার এক অসাধারণ প্রমাণ।
দ্বিতীয় — পাভলোপেত্রি (গ্রিস)। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো ডুবন্ত শহর।
গ্রিসের উপকূলে, সমুদ্রের অগভীর জলের নিচে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য শহর — পাভলোপেত্রি। এটাকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো জানা ডুবন্ত শহরগুলোর একটা। কত পুরোনো? প্রায় ৫,০০০ বছর! আর সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার — শহরটা এত ভালোভাবে টিকে আছে যে, আজও জলের নিচে স্পষ্ট দেখা যায় এর গোটা নকশা। রাস্তাঘাট, বাড়ির ভিত, এমনকি সমাধি পর্যন্ত — সব যেন একটা ম্যাপের মতো সাজানো জলের তলায়। ৫,০০০ বছর আগের মানুষ কীভাবে শহর পরিকল্পনা করত, এই ডুবন্ত শহর তার এক জীবন্ত সাক্ষী।
তৃতীয় — পোর্ট রয়্যাল (জ্যামাইকা)। জলদস্যুদের ডুবে যাওয়া শহর।
ক্যারিবিয়ান সাগরের জ্যামাইকায় ছিল এক কুখ্যাত শহর — পোর্ট রয়্যাল। এটাকে বলা হতো "পৃথিবীর সবচেয়ে পাপী শহর," কারণ এটা ছিল জলদস্যু (পাইরেট)-দের আখড়া। ধন-সম্পদ, লুটের মাল, হইহুল্লোড়ে ভরা ছিল এই শহর। আর তারপর, ১৬৯২ সালের এক দিনে, ঘটল সেই ভয়ংকর ঘটনা। এক প্রচণ্ড ভূমিকম্প আঘাত হানল, আর তার সাথে এল সুনামি। নিমেষের মধ্যে শহরের একটা বিরাট অংশ মাটিসুদ্ধ সমুদ্রে তলিয়ে গেল! ঘড়ি পর্যন্ত নাকি সেই মুহূর্তে থেমে গিয়েছিল। আজ সেই জলদস্যুদের শহর সমুদ্রের নিচে ঘুমিয়ে — যেন এক মুহূর্তে থমকে যাওয়া ইতিহাস।
চতুর্থ — শি চেং / সিংহ শহর (চীন)। জলের নিচে নিখুঁত টাইম ক্যাপসুল।
চীনের এই শহরটার গল্প একটু আলাদা। শি চেং (সিংহ শহর) ছিল প্রায় ১,৩০০ বছরের পুরোনো এক সুন্দর শহর। কিন্তু এটা ভূমিকম্প বা সমুদ্রে তলিয়ে যায়নি। ১৯৫৯ সালে, একটা বাঁধ আর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বানানোর জন্য চীন সরকার ইচ্ছে করে গোটা শহরটাকে জলের নিচে ডুবিয়ে দেয়! আর এখানেই লুকিয়ে আছে এর জাদু। জলের প্রায় ৪০ মিটার নিচে থাকায়, শহরটা একদম নষ্ট হয়নি — বরং নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হয়ে গেছে! সুন্দর তোরণ, পাথরের কারুকাজ, দেয়াল — সব এখনো অবিকৃত, যেন সময় থেমে গেছে। তাই একে বলা হয় "চীনের আটলান্টিস" — জলের নিচে এক নিখুঁত টাইম ক্যাপসুল, যা ডুবুরিরা আজ অবাক হয়ে দেখেন।
পঞ্চম — আটলান্টিস। যে ডুবন্ত শহর হয়তো শুধুই কিংবদন্তি।
ডুবে যাওয়া শহরের কথা উঠলে সবার আগে যে নামটা মনে আসে — আটলান্টিস। কিন্তু এই গল্পটা বাকিগুলোর চেয়ে আলাদা, আর এখানেই একটা সত্যি বলা দরকার। প্রায় ২,৪০০ বছর আগে, গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর লেখায় প্রথম আটলান্টিসের কথা বলেন — এক অবিশ্বাস্য উন্নত, শক্তিশালী দ্বীপ-সভ্যতা, যা নাকি এক দিন-রাতের মধ্যে সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হলো — আজ পর্যন্ত আটলান্টিসের অস্তিত্বের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ আর বিজ্ঞানী মনে করেন, আটলান্টিস আসলে সত্যিকারের কোনো শহর ছিল না — বরং প্লেটোর একটা কল্পনা বা রূপক গল্প, যা দিয়ে তিনি একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন (অহংকার আর লোভের পরিণতি)। তাই বাকি পাঁচটা শহর যেখানে বাস্তব, আটলান্টিস সম্ভবত নিছকই এক কিংবদন্তি — যদিও হাজার বছর ধরে এই গল্প মানুষকে মুগ্ধ করে রেখেছে।
ষষ্ঠ — দ্বারকা (গুজরাট, ভারত)। সমুদ্রের নিচে আমাদের কিংবদন্তির নগরী। আমাদের গর্ব।
আর সবশেষে — আমাদের নিজেদের ভারতের উপকূলের সেই রহস্য, যা বিশ্বাস আর বিজ্ঞান — দুটোকেই ছুঁয়ে যায়। গুজরাটের দ্বারকা। আমাদের প্রাচীন গ্রন্থ মহাভারতে বর্ণিত আছে এক অপূর্ব সুন্দর নগরীর কথা — দ্বারকা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী। কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণের প্রয়াণের পর গোটা এই নগরী নাকি সমুদ্র গ্রাস করে নিয়েছিল। হাজার হাজার বছর ধরে অনেকে একে নিছক পৌরাণিক গল্প ভাবতেন। কিন্তু তারপর বিজ্ঞান এক চমক দিল। ভারতের সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্ববিদরা (NIO), বিশেষ করে ড. এস. আর. রাও-এর নেতৃত্বে, গুজরাটের দ্বারকা ও বেট দ্বারকার উপকূলে সমুদ্রের নিচে সত্যিই খুঁজে পেয়েছেন প্রাচীন পাথরের প্রাচীর, দুর্গের ভিত, আর ১২০টিরও বেশি প্রাচীন পাথরের নোঙর! অর্থাৎ, এই উপকূলে যে সত্যিই একটা প্রাচীন সমৃদ্ধ বন্দর-নগরী ছিল, আর তা সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছিল — এটা এখন বাস্তব, প্রমাণিত সত্য। তবে এখানে একটা সৎ কথা বলা দরকার।
সমুদ্রের নিচে যে প্রাচীন নগরী ছিল, তা নিশ্চিত। কিন্তু এটাই হুবহু মহাভারতের সেই কৃষ্ণের নগরী কিনা, কিংবা ঠিক কত হাজার বছরের পুরোনো — এই নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে আজও গবেষণা আর বিতর্ক চলছে। বিশ্বাস বলে এটাই কৃষ্ণের দ্বারকা; আর বিজ্ঞান বলে এখানে সত্যিই এক ডুবে যাওয়া প্রাচীন নগরী আছে। দুটো মিলিয়ে দ্বারকা আজ ভারতের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর রহস্যগুলোর একটা — যা আমাদের গর্বিত করে।
ইতিহাসের এই ছয়টা ডুবন্ত শহরের দিকে তাকালে একটা গভীর সত্যি বেরিয়ে আসে। মানুষ যত বড় শহরই গড়ুক, যত শক্তিশালীই হোক — প্রকৃতির সামনে সে বড়ই ছোট। এক ভূমিকম্প, এক সমুদ্রের ঢেউ — নিমেষে গোটা সভ্যতা মুছে দিতে পারে। এই শহরগুলো যেন প্রকৃতির কাছে মানুষের নম্রতার এক নীরব শিক্ষা। আর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর কথা — সমুদ্রের নিচে আজও হয়তো এমন কত শহর, কত গল্প লুকিয়ে আছে, যার খোঁজ আমরা এখনো পাইনি। প্রতিটা ডুবুরি-অভিযান হয়তো নতুন কোনো হারানো ইতিহাসের দরজা খুলে দেবে। হয়তো এটাই সবচেয়ে সুন্দর কথা — কখনো কখনো কিংবদন্তি আর বাস্তবের সীমানাটা খুব পাতলা। থনিস-হেরাক্লেইওন বা দ্বারকা প্রমাণ করে, পুরোনো গল্পগুলোকে নিছক "গল্প" বলে উড়িয়ে দেওয়ার আগে দু'বার ভাবা উচিত।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা শহরের মধ্যে কোনটার রহস্য আপনাকে সবচেয়ে বেশি টানল? আর আমাদের দ্বারকা — সমুদ্রের নিচে পাওয়া এই প্রাচীন নগরীর কথা কি আপনি আগে জানতেন?
১. থনিস-হেরাক্লেইওন — হারানো বন্দর
২. পাভলোপেত্রি — সবচেয়ে পুরোনো ডুবন্ত শহর
৩. পোর্ট রয়্যাল — জলদস্যুদের শহর
৪. শি চেং — জলের নিচে টাইম ক্যাপসুল
৫. আটলান্টিস — সম্ভবত কিংবদন্তি
৬. দ্বারকা — ভারতের ডুবন্ত নগরী
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
আস্ত ফল বনাম জুস: কেন আস্ত ফল খাওয়া শ্রেয়
আস্ত ফল খাওয়া জুস বা স্মুদির তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। এর মূল কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১। তৃপ্তি ও ওজন নিয়ন্ত্রণ: আস্ত ফল চিবিয়ে খেতে হয়, যা খাওয়ার গতি কমিয়ে দেয়। ফলে মস্তিষ্ক দ্রুত তৃপ্তির সংকেত পায় এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ রোধ হয়।
২। রক্তে শর্করার ভারসাম্য: ফলের আঁশ (Fiber) শর্করা শোষণের গতি ধীর করে দেয়, ফলে শরীরে শক্তির মাত্রা স্থিতিশীল থাকে।
৩। হরমোনের কার্যকারিতা: আস্ত ফল তৃপ্তিদায়ক হরমোন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
ব্লেন্ডিংয়ের অসুবিধা
যদিও ব্লেন্ড করলে ফলের পুষ্টিগুণ বজায় থাকে, কিন্তু এতে ফলের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয়ে যায়। এতে ফলের আঁশ ভেঙে যায় এবং শরীর দ্রুত শর্করা শোষণ করে, যা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
সারসংক্ষেপে, মেটাবলিজম ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য আস্ত ফলই সেরা পছন্দ। এটি আপনার শরীরের প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে চলে এবং দীর্ঘস্থায়ী শক্তির জোগান দেয়।
২৬
প্রকৃতি ও আরোগ্য: বিজ্ঞানের চোখে মনের সংযোগ
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান জরুরি স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত পারদর্শী, তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত আরোগ্য লাভের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতির মাঝে।
বিশ্বজুড়ে প্রকৃতিকে কেবল একটি সুন্দর পরিবেশ হিসেবে নয়, বরং নিরাময়ের একটি প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়।
বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে এই সংযোগ কেবল মানসিক নয়, সম্পূর্ণ শারীরিক। বনের গাছপালা থেকে নির্গত ‘ফাইটনসাইড’ নামক উপাদান আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘ন্যাচারাল কিলার’ কোষের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। একই সাথে, সবুজ পরিবেশের সংস্পর্শ স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ কমিয়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
এই কারণেই ইতালিতে অসুস্থতা-পরবর্তী সুস্থতার সূচনা হয় পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সূর্যালোক ও তাজা খাবারের হাত ধরে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার মানুষ তীব্র শীতের মধ্যেও বাইরে হাঁটেন, কারণ সেখানে তাজা বাতাসকে পরম ওষুধ মনে করা হয়। জাপানে চিকিৎসকেরা স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শিনরিন-ইয়োকু’ (অরণ্য স্নান/হাটা)-এর পরামর্শ দেন এবং নিউজিল্যান্ডের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় রোগীদের ‘গ্রিন প্রেসক্রিপশন’ বা প্রকৃতিতে সময় কাটানোর লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়।
আসলে, চার দেয়ালের কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি থাকার জন্য আমাদের মানব শরীর তৈরি হয়নি। প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়, বরং প্রকৃতির সাথে মিশে গেলেই আমাদের শরীর সবচেয়ে দ্রুত ও অলৌকিকভাবে সেরে ওঠে। @Plabon Sarkar
২৭
"ইতিহাসের ৬ জন সবচেয়ে ধনী মানুষ — যাঁদের সম্পদের কাছে আজকের বিলিয়নেয়াররাও ম্লান। একজন এত সোনা বিলিয়েছিলেন যে, গোটা একটা শহরের অর্থনীতি বছরের পর বছর ভেঙে পড়েছিল! আর আমাদের ভারতের এক রাজা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হীরাগুলোর একটাকে ব্যবহার করতেন শুধুই কাগজ চাপা দেওয়ার পেপারওয়েট হিসেবে।"
আজ আমরা যাদের "সবচেয়ে ধনী" বলি — সেই বিলিয়নেয়ারদের সম্পদ শুনলে আমরা অবাক হই। কিন্তু ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ ছিলেন, যাঁদের সম্পদের কাছে আজকের এই বিলিয়নেয়াররাও যেন কিছুই না। এঁদের ধন এতটাই বিশাল ছিল যে, সঠিকভাবে হিসাব করাও কঠিন। (তবে মনে রাখবেন, এত পুরোনো যুগের সম্পদের তুলনা করা কঠিন, তাই এই সংখ্যাগুলো অনেকটাই আনুমানিক।) আজ সেই ছয়জন কিংবদন্তি ধনীর কথা বলব। শেষজন আমাদের ভারতের।
প্রথম — মানসা মুসা (মালি সাম্রাজ্য)। যাঁর কাছে সোনার কোনো হিসাব ছিল না।
ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী মানুষ কে — এই প্রশ্ন উঠলে সবার আগে যে নামটা আসে, তিনি পশ্চিম আফ্রিকার মালি সাম্রাজ্যের রাজা মানসা মুসা। প্রায় ৭০০ বছর আগের এই রাজার সম্পদ ছিল মূলত সোনা — আর তা এতটাই বেশি যে, তা "অকল্পনীয়" বলেই বর্ণনা করা হয়। তাঁর ধনের একটা গল্প শুনলেই বুঝবেন। তিনি যখন মক্কায় তীর্থযাত্রায় (হজে) যাচ্ছিলেন, পথে মিশরের কায়রো শহরে এত বিপুল পরিমাণ সোনা বিলিয়ে দিয়েছিলেন যে, ওই অঞ্চলে সোনার দামই পড়ে গিয়েছিল — আর সেই ধাক্কা সামলাতে নাকি কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল! একজন মানুষ শুধু সোনা বিলিয়ে একটা গোটা অঞ্চলের অর্থনীতি নাড়িয়ে দিতে পারেন — ভাবা যায়?
দ্বিতীয় — সম্রাট অগাস্টাস (রোমান সাম্রাজ্য)। সাম্রাজ্যের সম্পদই তাঁর সম্পদ।
রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট অগাস্টাস সিজার — তিনি ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। কারণ তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ আর সাম্রাজ্যের সম্পদের মধ্যে কোনো সীমারেখাই ছিল না। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মিশরের মতো সমৃদ্ধ অঞ্চলের মালিক ছিলেন। ঐতিহাসিকদের কারও কারও হিসাবে, তাঁর একার সম্পদ ছিল গোটা রোমান সাম্রাজ্যের মোট অর্থনীতির একটা বিশাল অংশের সমান। ভাবুন — একজন মানুষের হাতে একটা গোটা সাম্রাজ্যের সম্পদের সিংহভাগ। ক্ষমতা আর ধন যখন একসাথে মেশে, তখন কী হয় — অগাস্টাস তার উদাহরণ।
তৃতীয় — কুবলাই খান (মঙ্গোল সাম্রাজ্য)। যাঁর বৈভব দেখে মার্কো পোলো অবাক।
মঙ্গোল সম্রাট কুবলাই খান শাসন করতেন এক বিশাল সাম্রাজ্য, যার মধ্যে ছিল গোটা চীন। তাঁর দরবারের বিলাসিতা আর সম্পদের কথা পৃথিবী জেনেছিল এক বিখ্যাত পর্যটকের লেখায় — মার্কো পোলো। মার্কো পোলো যখন কুবলাই খানের দরবারে এসেছিলেন, তিনি যা দেখলেন তা বিশ্বাসই করতে পারেননি। সোনা-রুপোয় মোড়া বিশাল প্রাসাদ, হাজার হাজার অতিথির ভোজ, অগণিত ধনসম্পদ — মার্কো পোলোর বর্ণনা পড়ে ইউরোপের মানুষ ভেবেছিল, তিনি বুঝি বানিয়ে বলছেন! এত বিপুল বৈভব তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। কুবলাই খানের সাম্রাজ্য ছিল সেই যুগের সম্পদ আর ক্ষমতার এক চূড়া।
চতুর্থ — ইয়াকব ফুগার (রেনেসাঁ ইউরোপ)। রাজাদেরও যিনি টাকা ধার দিতেন।
রেনেসাঁর যুগে জার্মানিতে ছিলেন এক ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার — ইয়াকব ফুগার, যাঁকে ডাকা হতো "ফুগার দ্য রিচ" (ধনী ফুগার)। তিনি এত ধনী ছিলেন যে, রাজা-সম্রাটরাও তাঁর কাছে টাকা ধার করতেন! ভাবুন — যে রাজার হুকুমে গোটা দেশ চলে, সেই রাজাই টাকার জন্য একজন ব্যবসায়ীর কাছে হাত পাতছেন। তাঁর টাকা ছাড়া অনেক রাজা যুদ্ধই করতে পারতেন না, এমনকি সিংহাসনেও বসতে পারতেন না। অর্থই যে ক্ষমতার আসল উৎস হতে পারে — ফুগার সেই যুগেই প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। তাঁকে বলা হয় ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ধনী।
পঞ্চম — জন ডি. রকফেলার (আমেরিকা)। আধুনিক যুগের সবচেয়ে ধনী।
আধুনিক যুগে যদি কারও কথা বলতে হয়, তিনি আমেরিকার জন ডি. রকফেলার। তেলের (পেট্রোলিয়াম) ব্যবসা থেকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক বিশাল সাম্রাজ্য। তাঁকে প্রায়ই আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী আমেরিকান বলা হয়। তাঁর সম্পদ এতটাই বিশাল ছিল যে... আজকের হিসাবে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ছিল কয়েকশো বিলিয়ন ডলারের সমান — যা আজকের অনেক বড় বিলিয়নেয়ারের চেয়েও বেশি! একসময় তাঁর একার সম্পদ ছিল গোটা আমেরিকার অর্থনীতির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ। এক ব্যক্তি, এক ব্যবসা — অথচ পুরো একটা দেশের অর্থনীতিতে তাঁর ছায়া।
ষষ্ঠ — হায়দরাবাদের নিজাম (ভারত)। যিনি হীরা দিয়ে কাগজ চাপা দিতেন। আমাদের গর্ব।
আর সবশেষে — আমাদের নিজেদের ভারতের সেই মানুষ, যিনি একসময় গোটা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ ছিলেন। হায়দরাবাদের ৭ম নিজাম, মীর ওসমান আলী খান। এটা কোনো অতিরঞ্জন নয় — ১৯৩৭ সালে, বিখ্যাত TIME ম্যাগাজিন নিজেদের প্রচ্ছদে তাঁর ছবি ছেপে তাঁকে ঘোষণা করেছিল "পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ" বলে! তাঁর সম্পদের উৎস ছিল গোলকোন্ডার বিখ্যাত হীরের খনি — সেই খনি, যেখান থেকে কোহিনূরের মতো বিশ্বখ্যাত হীরাও এসেছিল। কিন্তু তাঁর ধনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য গল্পটা শুনুন। তাঁর কাছে ছিল "জ্যাকব ডায়মন্ড" নামের এক বিশাল হীরা — প্রায় ১৮৫ ক্যারেট, প্রায় একটা ডিমের আকারের, যার আজকের দাম কয়েকশো কোটি টাকা! আর এই অমূল্য হীরাটা তিনি কী কাজে ব্যবহার করতেন জানেন? শুধুমাত্র টেবিলে কাগজ উড়ে না যাওয়ার জন্য, পেপারওয়েট হিসেবে! তাঁর কাছে ছিল প্রায় ৫০টা রোলস-রয়েস গাড়ি, অগণিত জহরত, বিশাল জমিদারি। কিন্তু সবচেয়ে গর্বের কথা আলাদা। এত বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও তিনি কিন্তু সেই টাকা শুধু নিজের ভোগে লাগাননি। তিনি হায়দরাবাদে গড়ে তুলেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় (ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়), হাসপাতাল, বাঁধ, বিমানবন্দর — আধুনিক হায়দরাবাদের অনেকটাই তাঁরই গড়া। ভাবুন — আজকের যে কোনো বিলিয়নেয়ারের কথা ভাবুন, আর তারপর ভাবুন একজন ভারতীয়, যিনি হীরা দিয়ে কাগজ চাপা দিতেন আর গোটা পৃথিবীর ধনীদের তালিকায় ছিলেন সবার ওপরে। এটাই আমাদের ইতিহাসের গর্ব।
ইতিহাসের এই ছয়জন ধনী মানুষের দিকে তাকালে একটা গভীর সত্যি বেরিয়ে আসে। সম্পদ আসে আর যায়। মানসা মুসার সেই সোনার পাহাড়, কুবলাই খানের সেই বিলাস, নিজামের সেই হীরা — আজ এগুলো শুধুই ইতিহাসের পাতায়। যত বড় ধনীই হোন, সম্পদ কাউকে চিরকাল ধরে রাখতে পারে না। আর সবচেয়ে বড় কথা — মানুষ এঁদের মনে রেখেছে সম্পদের জন্য কম, কাজের জন্য বেশি। নিজামকে আমরা আজও সম্মান করি তাঁর গড়া বিশ্ববিদ্যালয়-হাসপাতালের জন্য, শুধু হীরার জন্য নয়। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — কত টাকা জমালেন, তা দিয়ে মানুষ আপনাকে মনে রাখবে না। বরং সেই টাকা দিয়ে আপনি কী রেখে গেলেন, কাকে সাহায্য করলেন — সেটাই থেকে যায়। আর আমাদের গর্ব — ধনেও ভারত একসময় ছিল পৃথিবীর শীর্ষে, যাকে বলা হতো "সোনার পাখি" (Sone ki Chidiya)। আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়জনের মধ্যে কার সম্পদের গল্প শুনে আপনি সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন? আর আমাদের হায়দরাবাদের নিজাম যে একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ ছিলেন — এটা কি আপনি আগে জানতেন?
১. মানসা মুসা — সোনার রাজা
২. অগাস্টাস — সাম্রাজ্যের মালিক
৩. কুবলাই খান — মার্কো পোলোর বিস্ময়
৪. ইয়াকব ফুগার — রাজাদের ঋণদাতা
৫. রকফেলার — তেলের সম্রাট
৬. হায়দরাবাদের নিজাম — হীরার পেপারওয়েট
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
২৮
পুরুষত্বের মূল হরমোন 'টেস্টোস্টেরন' তৈরি হয় কোলেস্টেরল থেকে। নারীদের হরমোন 'ইস্ট্রোজেন'ও তৈরি হয় এই কোলেস্টেরল থেকেই। এমনকি আমাদের মানসিক চাপ বা স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ করার হরমোন 'কর্টিসল', হাড় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য অপরিহার্য 'ভিটামিন ডি', এবং পেটের চর্বি হজম করার জন্য যে পিত্তরস বা বাইল অ্যাসিড দরকার—এই প্রতিটি জিনিসই তৈরি হয় কোলেস্টেরল দিয়ে!
“একটা যুদ্ধ… যেখানে শত্রুর গুলির চেয়ে বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল ঠান্ডা, ক্ষুধা আর ক্লান্তিতে!”
১৮১২ সাল।
ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসকদের একজন, Napoleon Bonaparte, প্রায় ৬ লাখ সৈন্য নিয়ে রাশিয়া আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। তার ধারণা ছিল, কয়েক মাসের মধ্যেই রাশিয়াকে পরাজিত করে তিনি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবেন।
শুরুতে সবকিছু তার পরিকল্পনামতোই চলছিল। কিন্তু রাশিয়ার সেনারা সরাসরি বড় যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে থাকে। তারা পিছু হটতে হটতে গ্রামের খাদ্যভাণ্ডার, ফসল, এমনকি অনেক জায়গায় নিজেদের শহরও পুড়িয়ে দেয়, যাতে ফরাসি বাহিনী খাবার বা আশ্রয় না পায়।
এভাবে ফরাসি সৈন্যরা যতই রাশিয়ার ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে, ততই তাদের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। খাবারের অভাব, বিশুদ্ধ পানির সংকট, রোগ আর দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তিতে হাজার হাজার সৈন্য মারা যেতে থাকে।
অবশেষে নেপোলিয়নের বাহিনী মস্কোতে পৌঁছায়। কিন্তু তারা অবাক হয়ে দেখে, শহরের অধিকাংশ মানুষ আগেই চলে গেছে। কিছুদিনের মধ্যেই মস্কোর বিভিন্ন জায়গায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ফরাসি বাহিনী সেখানে থেকেও তেমন কোনো সুবিধা পায়নি।
এরপর শুরু হয় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পশ্চাদপসরণগুলোর একটি।
শীত যত বাড়তে থাকে, সৈন্যদের দুর্ভোগও তত বাড়তে থাকে। তাপমাত্রা ভয়াবহভাবে কমে যায়। অনেক সৈন্যের শরীর জমে যেতে থাকে। কারও কাছে পর্যাপ্ত পোশাক ছিল না, কারও কাছে খাবার ছিল না। ঘোড়া মারা যেতে শুরু করে, কামান ফেলে রেখে পালাতে হয়, আর অসংখ্য মানুষ ক্ষুধা, রোগ ও প্রচণ্ড ঠান্ডায় প্রাণ হারায়।
যে বাহিনী প্রায় ৬ লাখ সৈন্য নিয়ে রাশিয়ায় প্রবেশ করেছিল, তাদের মধ্যে মাত্র অল্পসংখ্যক সৈন্য জীবিত অবস্থায় ফিরে আসতে পেরেছিল। ইতিহাসবিদদের অনুমান অনুযায়ী, এই অভিযানে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
এই ব্যর্থ অভিযান নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দেয়। ইউরোপের অন্যান্য শক্তিগুলো তার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে দাঁড়ায়। কয়েক বছরের মধ্যেই সেই সম্রাট, যাকে একসময় প্রায় অপ্রতিরোধ্য মনে করা হতো, তার সাম্রাজ্যের পতনের মুখোমুখি হন।
আজও ১৮১২ সালের রাশিয়া অভিযানকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক বিপর্যয়গুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়।
“কখনো কখনো যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু মানুষ নয়, প্রকৃতিই।” @ নীরব ইতিহাস
২৯
‘বুরকা’ ও ‘হিজাব’— এ দুটিকে মুসলিমরা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলে। ভাবে, হিজাব মানেই বুরকা। আসলে তা নয়। বুরকা হলো বিশেষ কারণে মাথা ও মুখ ঢেকে চলাফেরার পোশাক। বুরকার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। পৃথিবীতে ইসলাম আসার বহু আগে থেকেই বুরকা ছিলো। আরব পৌত্তলিকরা বুরকা পরতো। বাইজেন্টিন নারীরাও বুরকা পরতো। সেদিক থেকে বুরকা মূলত অমুসলিমদের পোশাক।
বুরকা প্রধানত পরা হতো— (ক) তীব্র রোদ ও বৈরি আবহাওয়া থেকে রক্ষা পেতে; (খ) গুপ্তচরবৃত্তি, চৌর্যবৃত্তি, ও চোরাকারবারের সহায়ক পরিধেয় হিশেবে; (গ) সম্মানজনক নয়, এমন পেশায় নিয়োজিত নারীদের রক্ষাকবচ হিশেবে; (ঘ) হারেমখানায় স্ত্রীর মর্যাদা পান নি, এমন নারী ও যৌনদাসীর পরিচয় আড়ালকারক হিশেবে; এবং (ঙ) নেকাব দ্বারা চোখের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে, কারণ আরব নারীদের চোখ সুন্দর ছিলো।
বুরকা শুধু মাথা বা মুখের হয় না। পায়েরও হয়। যেমন চীনা নারীরা পা দেখাতে চায় না। তাদের জন্য জুতা একপ্রকার বুরকা।
ইসলামের শুরুর দিকে ‘হিজাব’ বা ‘পর্দা’ বলতে আড়ালকারক চাদর ও দেয়াল বুঝাতো। তখন বহুকক্ষবিশিষ্ট ঘর-বাড়ি আরবে ছিলো না। মসজিদে এতেকাফের সময় চাদর টাঙ্গিয়ে যেভাবে আলাদা কক্ষ তৈরি করা হয়, সেভাবে হিজাব টাঙ্গিয়ে ঘরের ভেতর সাময়িক কক্ষ সৃষ্টি করা হতো। নবী যখন তাঁর ঘরে স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে একসাথে থাকতেন, তখন প্রায়ই সাহাবিরা গল্পগুজব করতে আসতো। দূর থেকে মেহমানরা দেখা-সাক্ষাৎ করতে আসতো। একটি ছোট ঘরে হুটহাট অপরিচিত মানুষজন আসায় নবী পরিবারের নারী সদস্যরা বিব্রত বোধ করতেন। এ জন্য হিজাব টাঙ্গিয়ে, অর্থাৎ ঘরের মাঝখানে চাদর-সদৃশ কাপড় টাঙ্গিয়ে, নারী সদস্যদের প্রাইভ্যাসি দেয়া হতো।
কিন্তু নবীর মৃত্যুর পর হিজাব শব্দটিকে কোরানের বিভিন্ন আয়াতের সাথে মিশিয়ে এর অর্থ ও পরিধি বাড়ানো হয়েছে। বিকৃত করা হয়েছে আসল রূপ। খিমার, জিলবাব, প্রভৃতি বিষয়কে হিজাবের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। যে-আয়াতগুলো কেবল নবীর স্ত্রী-কন্যার জন্য প্রযোজ্য, সে-আয়াতগুলোকেও সাধারণ নারীদের ওপর চাপানো হয়েছে। এ কৃতিত্ব মতলববাজ ধর্মবণিকদের।
নবীর কোনো স্ত্রী ও কন্যা বুরকা পরতেন না। তাঁর স্ত্রী খাদিজা মুখ খোলা রেখে চলাফেরা করতেন। তিনি স্বাধীনভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যও করতেন। নিয়মিত হাট-বাজারে যেতেন। ইসলামের নামে অতিরঞ্জিত কিছু পালন করা ইসলামসম্মত নয়। কোরানে কোথাও নারীদেরকে বুরকা পরতে নির্দেশ দেয়া হয়নি।
এই মুহুর্তে অনেকগুলো দেশে বুরকা নিষিদ্ধ। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রে বুরকা গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি। বুরকা নিষিদ্ধ মানেই হিজাব নিষিদ্ধ নয়। ইসলামে হিজাব আছে, বুরকা নেই।
পুলিশ প্রায়ই বুরকা পরা ইয়াবা ও গাঁজা-ব্যবসায়ী আটক করছে। ছেলেরা বুরকায় ঢুকে মেয়ে সেজে মাদক ব্যবসা করছে। ভোট জালিয়াতিতেও বুরকা ব্যবহৃত হতে পারে। সেদিক থেকে বুরকা শুধু ইসলামবিরোধী নয়, জনবিরোধী পোশাকও বটে।
কেউ পরতে চাইলে পরুক, বাসাবাড়িতে, কিন্তু জনপরিসরে নয়। তুরস্কের মতো সুন্নী দেশে বুরকা নিষিদ্ধ, পাবলিক অফিসে। কর্তৃপক্ষ চাওয়া মাত্র নেকাব সরিয়ে মুখ প্রদর্শন করতে হবে।
বুরকা নারীর ব্যক্তিত্বকেও নষ্ট করে। বুরকা পরা নারীদের অনেকেই 'লো সেল্ফ-ইস্টিম' বা হীনম্মন্যতায় ভোগেন। তাদের সাহস, মনোবল, ও আত্মবিশ্বাস কম থাকে।
হিজাব শব্দটির অর্থ এরকম— লজ্জাস্থান ঢেকে ও মুখ খোলা রেখে আরামদায়ক পোশাক-আশাক পরা। শাড়ি, সালওয়ার-কামিজ, প্যান্ট, টি-শার্ট, চাদর, স্কার্ট, ব্লাউজ, এগুলো হিজাব। হিজাব মানে চোখ-মুখ ঢেকে ফেলা নয়। -সংগৃহিত
৩০
" ইতিহাসের ৬টি বিখ্যাত সিংহাসন — যা ছিল ক্ষমতা ও বিলাসিতার চূড়ান্ত প্রতীক। একটা সিংহাসন এতটাই পবিত্র ছিল যে, সাধারণ মানুষ তার দিকে তাকানোরও সাহস পেত না। আর আমাদের ভারতের এক সিংহাসন ছিল এত দামি যে, তা তৈরি করতে তাজমহলের চেয়েও বেশি খরচ হয়েছিল — আর তাতেই বসানো ছিল বিখ্যাত কোহিনূর হীরা।"
একটা সিংহাসন শুধু রাজার বসার চেয়ার নয়। এটা ক্ষমতার প্রতীক, গোটা একটা সাম্রাজ্যের গর্ব আর বিলাসিতার চূড়ান্ত রূপ। হাজার হাজার বছর ধরে, রাজা-সম্রাটরা নিজেদের সিংহাসনকে সাজিয়েছেন সোনা, হীরা আর অমূল্য সব রত্ন দিয়ে — যাতে শুধু সিংহাসন দেখলেই মানুষ তাঁদের ক্ষমতার কথা বুঝে যায়। আজ সেই ছয়টা বিখ্যাত সিংহাসনের কথা বলব, যা ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। শেষেরটা আমাদের ভারতের গর্ব।
প্রথম — ক্রিস্যান্থিমাম থ্রোন (জাপান)। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো রাজবংশের সিংহাসন।
জাপানের সম্রাটের সিংহাসনকে বলা হয় "ক্রিস্যান্থিমাম থ্রোন" (গুলদাউদি ফুলের সিংহাসন)। আর এর সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপারটা এর ইতিহাসে। জাপানের রাজবংশকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো, একটানা চলে আসা রাজবংশ। কত পুরোনো? প্রায় দেড় হাজার বছরেরও বেশি — একটাই বংশ, অবিচ্ছিন্নভাবে! পৃথিবীর আর কোনো রাজবংশ এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকেনি। তাই এই সিংহাসন শুধু একটা চেয়ার নয় — এটা হাজার বছরের অবিচ্ছিন্ন ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক। আজও জাপানের সম্রাট এই সিংহাসনেই অভিষিক্ত হন। জাপানের ছবিটা দিয়ে বাকি পাঁচটা — চীন, ইংল্যান্ড, মিশর, শার্লেমান, আর আমাদের ময়ূর সিংহাসন সহ পুরোটা এক জায়গায় শেষ করছি।
দ্বিতীয় — ড্রাগন থ্রোন (চীন)। স্বর্গপুত্রের সিংহাসন।
চীনের সম্রাটদের সিংহাসনকে বলা হতো "ড্রাগন থ্রোন।" নিষিদ্ধ নগরীর (Forbidden City) গভীরে রাখা এই সিংহাসন ছিল ক্ষমতার চূড়ান্ত প্রতীক। চীনারা বিশ্বাস করত, তাদের সম্রাট সাধারণ মানুষ নন — তিনি "স্বর্গের পুত্র" (Son of Heaven), স্বর্গ থেকে শাসন করার অধিকার নিয়ে এসেছেন। আর ড্রাগন ছিল সেই রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীক। সিংহাসন, পোশাক, থাম — সবকিছুতে খোদাই করা থাকত সোনালি ড্রাগন। এই সিংহাসন এতটাই পবিত্র আর ভয়-জাগানো ছিল যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে এর কাছে যাওয়া তো দূর, এর দিকে সরাসরি তাকানোও ছিল কল্পনার বাইরে। ক্ষমতা আর রহস্য — দুটো মিলে গিয়েছিল এই ড্রাগন থ্রোনে।
তৃতীয় — কোরোনেশন চেয়ার (ইংল্যান্ড)। ৭০০ বছরের অভিষেক-আসন।
ইংল্যান্ডের রাজা-রানিদের সিংহাসন নিয়ে এক অসাধারণ ইতিহাস আছে। লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে রাখা আছে একটা পুরোনো কাঠের চেয়ার — "কোরোনেশন চেয়ার" (অভিষেক-আসন)। এটা প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো! আর এই একটা চেয়ারেই, শত শত বছর ধরে, ইংল্যান্ডের প্রায় প্রতিটি রাজা-রানি অভিষিক্ত হয়েছেন। এর সাথে জড়িয়ে আছে আরেকটা রহস্যময় বস্তু — "স্টোন অফ ডেসটিনি" (ভাগ্যের পাথর) নামের একটা বিশেষ পাথর, যা এই চেয়ারের নিচে রাখা হতো। এই পাথর নিয়ে স্কটল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের মধ্যে শত শত বছরের টানাপোড়েন চলেছে। একটা সাধারণ দেখতে কাঠের চেয়ার, অথচ তার সাথে জড়িয়ে শত শত বছরের ক্ষমতা আর ইতিহাস।
চতুর্থ — তুতানখামেনের সোনার সিংহাসন (মিশর)। বালক-ফারাওয়ের গুপ্তধন।
প্রাচীন মিশরের বালক-ফারাও তুতানখামেন। মাত্র ৯ বছর বয়সে তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন। আর হাজার হাজার বছর পর, তাঁর সমাধি খুঁজে পাওয়া গেলে বেরিয়ে আসে এক অবিশ্বাস্য ধন — তাঁর সোনার সিংহাসন। এই গোটা সিংহাসনটাই সোনায় মোড়া, আর তাতে বসানো নানা রঙের রত্ন। সিংহাসনের পিঠে খোদাই করা এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। সেখানে দেখা যায় তরুণ ফারাও তুতানখামেন আর তাঁর রানিকে — এক কোমল, ভালোবাসার মুহূর্তে। হাজার হাজার বছর আগের একজন শাসকের সিংহাসন আজও এত ঝলমলে, এত সুন্দর — দেখলে মনে হয় যেন সময় থেমে গেছে। এটা মিশরীয় কারিগরির এক অসাধারণ নিদর্শন।
পঞ্চম — শার্লেমানের সিংহাসন (জার্মানি)। সাধারণ পাথর, অসাধারণ ক্ষমতা।
এবার একটা একদম অন্যরকম সিংহাসন। জার্মানির আখেন শহরে রাখা আছে সম্রাট শার্লেমানের সিংহাসন। আর এটা সোনা-হীরায় মোড়া নয় — বরং সাদামাটা পাথরের তৈরি! কিন্তু এর সাদাসিধে চেহারাই এর আসল শক্তি। এই সাধারণ পাথরের সিংহাসনে বসেই, শত শত বছর ধরে, একের পর এক পবিত্র রোমান সম্রাট অভিষিক্ত হয়েছেন। প্রায় ৩০ জনেরও বেশি রাজা এই একটা আসনে বসে নিজেদের ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। এটা প্রমাণ করে, আসল ক্ষমতা সোনা-হীরায় থাকে না, থাকে ঐতিহ্য আর বিশ্বাসে। একটা সাধারণ পাথরের চেয়ার, অথচ ইউরোপের ইতিহাসে তার ওজন অপরিসীম।
ষষ্ঠ — ময়ূর সিংহাসন (মুঘল ভারত)। ইতিহাসের সবচেয়ে দামি সিংহাসন।
ভারতের সেই সিংহাসন, যা ছিল গোটা পৃথিবীর সবচেয়ে বিলাসবহুল ও দামি সিংহাসন। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের সেই কিংবদন্তি "ময়ূর সিংহাসন" (Peacock Throne)। যে শাহজাহান তাজমহল বানিয়েছিলেন, তিনিই বানিয়েছিলেন এই সিংহাসন। আর এটা বানাতে সময় লেগেছিল প্রায় ৭ বছর। কিন্তু এর জাঁকজমকের কথা শুনলে আপনি স্তব্ধ হয়ে যাবেন। গোটা সিংহাসনটা ছিল খাঁটি সোনার, আর তাতে বসানো ছিল হাজার হাজার হীরা, চুনি, পান্না, মুক্তো। সিংহাসনের ওপরে ছিল রত্নখচিত দুটো ময়ূরের মূর্তি — সেখান থেকেই এর নাম। আর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য — এই সিংহাসনেই বসানো ছিল বিশ্ববিখ্যাত কোহিনূর হীরা আর তিমুর রুবি! কথিত আছে, এই একটা সিংহাসন বানাতে নাকি তাজমহলের চেয়েও বেশি খরচ হয়েছিল। বিদেশি পর্যটকরা এটা দেখে বলেছিলেন, এর চেয়ে দামি জিনিস তাঁরা জীবনেও দেখেননি। কিন্তু এই গৌরবের গল্পে আছে এক বেদনার মোড়। ১৭৩৯ সালে, পারস্যের আক্রমণকারী নাদির শাহ দিল্লি লুট করেন, আর সেই লুটের মালের সাথে এই অমূল্য ময়ূর সিংহাসনও কোহিনূরসহ পারস্যে নিয়ে চলে যান। তারপর সেই আসল সিংহাসন আর কখনো ফেরেনি — ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে হারিয়ে যায়। আজ ময়ূর সিংহাসন শুধু ইতিহাসের পাতায় — কিন্তু তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একসময় ভারতের সম্পদ আর কারিগরি ছিল গোটা পৃথিবীর ঈর্ষার বস্তু।
ইতিহাসের এই ছয়টা সিংহাসনের দিকে তাকালে একটা গভীর সত্যি বেরিয়ে আসে। সিংহাসন মানে শুধু ক্ষমতা নয় — এটা একটা গোটা সভ্যতার স্বপ্ন, শিল্প আর গর্বের প্রতীক। জাপানের অবিচ্ছিন্ন ঐতিহ্য, চীনের স্বর্গীয় ক্ষমতা, কিংবা আমাদের ময়ূর সিংহাসনের ঝলমলে বৈভব — প্রতিটাই বলে দেয় সেই সাম্রাজ্য কী ভাবত, কী মূল্য দিত। আর সবচেয়ে বড় কথা — যত দামি, যত শক্তিশালীই হোক, কোনো সিংহাসনই চিরকাল থাকে না। ময়ূর সিংহাসন লুট হয়ে গেল, কত সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ল। যিনি বসেন, তিনিও যান; যে আসনে বসেন, সেটাও একদিন ইতিহাস হয়ে যায়। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। মানুষ শেষ পর্যন্ত মনে রাখে রাজা কী করলেন, কেমন শাসন করলেন — সিংহাসন কত দামি ছিল, তা নয়। তবু আমাদের ময়ূর সিংহাসন আজও গর্বের — কারণ তা আমাদের সোনালি অতীতের সাক্ষী।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা সিংহাসনের মধ্যে কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করল? আর ময়ূর সিংহাসন — কোহিনূর-খচিত সেই অমূল্য সিংহাসন যা নাদির শাহ লুট করে নিয়ে গিয়েছিলেন — তার গল্প কি আপনি আগে জানতেন?
১. ক্রিস্যান্থিমাম থ্রোন — সবচেয়ে পুরোনো রাজবংশ
২. ড্রাগন থ্রোন — স্বর্গপুত্রের সিংহাসন
৩. কোরোনেশন চেয়ার — ৭০০ বছরের আসন
৪. তুতানখামেনের সিংহাসন — সোনার গুপ্তধন
৫. শার্লেমানের সিংহাসন — সাধারণ পাথর
৬. ময়ূর সিংহাসন — ইতিহাসের সবচেয়ে দামি
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৩১
"ইতিহাসের ৬টি প্রাচীন গুহাচিত্র — যেখানে হাজার হাজার বছর আগের মানুষ তাদের গল্প এঁকে রেখে গেছে। একটা গুহার ছবি এত নিখুঁত ছিল যে, বিজ্ঞানীরা প্রথমে বিশ্বাসই করেননি — ভেবেছিলেন জালিয়াতি! আর আমাদের ভারতে আছে এমন এক জায়গা, যেখানে প্রায় ৩০,০০০ বছর আগের মানুষ পাথরের গায়ে এঁকে রেখেছে তাদের জীবনের গল্প।"
কোনো ভাষা ছিল না, কোনো বই ছিল না, কোনো ক্যামেরা ছিল না। তবু হাজার হাজার বছর আগের মানুষ চেয়েছিল তাদের গল্পটা রেখে যেতে। তাই তারা গুহার দেয়ালে, পাথরের গায়ে এঁকে রেখেছিল তাদের জীবন — শিকার, নাচ, পশু, ভয়, আনন্দ। আজ আমরা সেই ছবিগুলো দেখে তাদের চিনতে পারি, যেন তারা সময় পেরিয়ে আমাদের সাথে কথা বলছে। আজ সেই ছয়টা প্রাচীন গুহাচিত্রের কথা বলব। শেষেরটা আমাদের ভারতের গর্ব।
প্রথম — লাস্কো (ফ্রান্স)। কুকুরের পিছু নিয়ে পাওয়া গুপ্তধন।
ফ্রান্সের লাস্কো গুহার দেয়ালে আঁকা প্রায় ১৭,০০০ বছরের পুরোনো ছবিগুলোকে বলা হয় "প্রাগৈতিহাসিক যুগের সিস্টিন চ্যাপেল" — এত সুন্দর এর কাজ। বিশাল ষাঁড়, ঘোড়া, হরিণের জীবন্ত ছবি। কিন্তু এটা আবিষ্কারের গল্পটাও দারুণ। ১৯৪০ সালে, কয়েকজন কিশোর তাদের হারিয়ে যাওয়া কুকুরকে খুঁজতে খুঁজতে একটা গর্তে গিয়ে পড়ে। আর সেই গর্ত দিয়ে নামতেই তারা আবিষ্কার করে এই অবিশ্বাস্য গুহা — যা হাজার হাজার বছর ধরে অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল! একটা হারানো কুকুর খুঁজতে গিয়ে কয়েকজন কিশোর খুঁজে পেল মানব ইতিহাসের এক অমূল্য সম্পদ।
দ্বিতীয় — আলতামিরা (স্পেন)। যে ছবি বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেননি।
স্পেনের আলতামিরা গুহায় আঁকা আছে অসাধারণ সব বাইসন (বুনো মহিষ)-এর ছবি, যা প্রায় ৩৬,০০০ বছরের পুরোনো হতে পারে। আর এই ছবিগুলো এতটাই নিখুঁত, এতটাই জীবন্ত আর শিল্পসম্মত যে, এখানেই তৈরি হয়েছিল এক মজার সমস্যা। যখন প্রথম এই ছবিগুলোর কথা প্রকাশ পেল, তখন বিজ্ঞানীরা বিশ্বাসই করতে চাননি! তাঁরা ভেবেছিলেন, এত আদিম যুগের মানুষ এত সুন্দর ছবি আঁকতেই পারে না — নিশ্চয়ই এটা কোনো জালিয়াতি বা নকল! অনেক বছর লেগেছিল প্রমাণ করতে যে, না, এগুলো সত্যিই হাজার হাজার বছর আগের আদিম মানুষের আঁকা। এটাই প্রমাণ করে, আমাদের পূর্বপুরুষরা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিভাবান ছিলেন।
তৃতীয় — তাসিলি নাজের (সাহারা মরুভূমি, আলজেরিয়া)।
যে ছবি প্রমাণ করল সাহারা একসময় সবুজ ছিল। আজকের সাহারা মানেই আমরা বুঝি ধু-ধু বালির মরুভূমি। কিন্তু আলজেরিয়ার তাসিলি নাজের পাহাড়ে আঁকা হাজার হাজার প্রাচীন ছবি আমাদের এক অবিশ্বাস্য সত্যি জানায়। এই ছবিগুলোতে আঁকা আছে নদী, সবুজ গাছপালা, জিরাফ, হাতি, গরুর পাল — এমনকি মানুষ সাঁতার কাটছে! কিন্তু মরুভূমিতে সাঁতার, জিরাফ? হ্যাঁ! এই ছবিগুলো প্রমাণ করে যে, হাজার হাজার বছর আগে সাহারা মরুভূমি ছিল না — বরং ছিল সবুজ, জলে ভরা, প্রাণীতে ভরা এক উর্বর অঞ্চল! প্রাচীন মানুষ সেই সবুজ সাহারার ছবিই এঁকে রেখে গিয়েছিল। গুহাচিত্র যে শুধু শিল্প নয়, ইতিহাস আর জলবায়ুর জীবন্ত দলিলও — তাসিলি নাজের তার প্রমাণ।
চতুর্থ — কুয়েভা দে লাস মানোস (আর্জেন্টিনা)। হাজার হাতের দেয়াল।
দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনায় একটা গুহা আছে, যার দেয়াল জুড়ে আঁকা শুধু হাত আর হাত — শত শত মানুষের হাতের ছাপ। এর নাম "কুয়েভা দে লাস মানোস" (হাতের গুহা), যা প্রায় ৯,০০০ বছরেরও পুরোনো। কীভাবে তারা এই ছাপ বানাত? তারা দেয়ালে হাত রেখে, একটা নলের মধ্য দিয়ে রং ফুঁ দিয়ে হাতের চারপাশে ছড়িয়ে দিত — ফলে দেয়ালে হাতের একটা নিখুঁত ছাপ (স্টেনসিল) তৈরি হতো। আর এই দৃশ্যটা অদ্ভুত রকম আবেগময়। হাজার হাজার বছর আগের একজন মানুষ, তার নিজের হাতের ছাপ রেখে গেছে — যেন বলছে, "আমি ছিলাম। আমি এখানে বেঁচে ছিলাম।" আজ আমরা সেই দেয়ালে হাত মেলালে, যেন হাজার বছর আগের একজন মানুষের সাথে হাত মেলাই। এর চেয়ে হৃদয়স্পর্শী আর কী হতে পারে?
পঞ্চম — সুলাওয়েসি (ইন্দোনেশিয়া)। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো ছবি।
এতদিন মানুষ ভাবত, শিল্প বা ছবি আঁকা প্রথম শুরু হয়েছিল ইউরোপে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের একটা গুহা সেই ধারণাটাই পুরোপুরি বদলে দিল। এখানকার একটা গুহায় পাওয়া গেছে এক শিকারের দৃশ্যের ছবি — মানুষ পশু শিকার করছে। আর বিজ্ঞানীরা যখন এর বয়স মাপলেন, তাঁরা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এই ছবি প্রায় ৪৪,০০০ বছরের পুরোনো — সম্প্রতি কিছু গবেষণা বলছে হয়তো আরও পুরোনো, ৫০,০০০ বছরেরও বেশি! এটা এখন পর্যন্ত পাওয়া পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো গল্প-বলা ছবিগুলোর একটা। এই একটা আবিষ্কার প্রমাণ করল — গল্প বলার, ছবি আঁকার এই ইচ্ছেটা গোটা মানবজাতির মধ্যেই ছিল, কোনো একটা মহাদেশের একার নয়।
ষষ্ঠ — ভীমবেটকা (মধ্যপ্রদেশ, ভারত)। ৩০,০০০ বছরের গল্পের পাথর।
মধ্যপ্রদেশের ভোপালের কাছে ভীমবেটকার রক শেল্টার (গুহা-আশ্রয়)। এখানে প্রায় ৭৫০টি পাথরের আশ্রয় আছে, যার মধ্যে শত শত আশ্রয়ের দেয়ালে আঁকা প্রাচীন ছবি। আর এর সবচেয়ে পুরোনো ছবিগুলো প্রায় ৩০,০০০ বছরের পুরোনো! কিন্তু ভীমবেটকার সবচেয়ে অসাধারণ দিকটা আলাদা। এই একই জায়গায় মানুষ বাস করেছে হাজার হাজার বছর ধরে, একটানা — কেউ বলেন এক লক্ষ বছরেরও বেশি! তাই এখানকার দেয়ালে শুধু একটা যুগ নয়, যুগের পর যুগের ছবি পাশাপাশি দেখা যায় — যেন মানব সভ্যতার একটা জীবন্ত ফটো অ্যালবাম। এই ছবিগুলোতে কী নেই! শিকারের দৃশ্য, দলবেঁধে নাচ, বাজনা, হাতি-ঘোড়ায় চড়া মানুষ, যুদ্ধ, এমনকি মধু সংগ্রহের ছবি পর্যন্ত। হাতি, বাঘ, সিংহ, গন্ডার, হরিণ — অসংখ্য পশুর ছবি লাল আর সাদা রঙে আঁকা। ভাবুন — ৩০,০০০ বছর আগের আমাদের পূর্বপুরুষরা ঠিক আমাদের মতোই নাচতে ভালোবাসত, গল্প বলতে ভালোবাসত, আর সেই আনন্দ তারা পাথরের গায়ে এঁকে রেখে গেছে আমাদের জন্য। আজ এটা ইউনেস্কোর বিশ্ব-ঐতিহ্য — ভারতের সবচেয়ে পুরোনো শিল্পের সাক্ষী, আমাদের শিকড়ের গর্ব। (নামটাও সুন্দর — মহাভারতের ভীমের নাম থেকে "ভীমবেটকা," মানে "ভীমের বসার জায়গা।")
ইতিহাসের এই ছয়টা গুহাচিত্রের দিকে তাকালে একটা গভীর, হৃদয়স্পর্শী সত্যি বেরিয়ে আসে।
হাজার হাজার বছর আগের সেই মানুষগুলো আমাদের থেকে খুব আলাদা ছিল না। তারাও শিকার করত, ভয় পেত, আনন্দে নাচত, আর সবচেয়ে বড় কথা — তারাও চেয়েছিল তাদের অস্তিত্বের একটা চিহ্ন রেখে যেতে। ঠিক যেমন আজ আমরা ছবি তুলি, স্ট্যাটাস দিই। আর সবচেয়ে আবেগময় কথা — এই ছবিগুলো আসলে সময়ের ওপারে পাঠানো এক একটা চিঠি। হাজার হাজার বছর আগের একজন অচেনা মানুষ, তার হাতের ছাপ বা একটা শিকারের ছবি রেখে আমাদের যেন বলছে — "আমিও ছিলাম। আমারও একটা জীবন ছিল, গল্প ছিল।" হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় সত্যি — গল্প বলার, নিজেকে প্রকাশ করার এই ইচ্ছেটাই আমাদের মানুষ করে তোলে। আর আমাদের ভীমবেটকা গর্ব করে বলে — এই গল্প বলার ইতিহাসে ভারতও দাঁড়িয়ে আছে একদম শুরুর সারিতে।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা গুহাচিত্রের মধ্যে কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেল? আর আমাদের ভীমবেটকা — ৩০,০০০ বছরের পুরোনো এই গল্পের পাথরের কথা কি আপনি আগে জানতেন?
১. লাস্কো — কুকুরের পিছু নিয়ে পাওয়া
২. আলতামিরা — যে ছবি বিশ্বাস হয়নি
৩. তাসিলি নাজের — সবুজ সাহারার প্রমাণ
৪. কুয়েভা দে লাস মানোস — হাজার হাতের দেয়াল
৫. সুলাওয়েসি — পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো
৬. ভীমবেটকা — ভারতের গল্পের পাথর
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৩২
"ইতিহাসের ৬টি অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক বিস্ময় — যা দেখলে মনে হয় অন্য গ্রহ। একটা জায়গা এত বিশাল আয়নার মতো যে, আকাশ আর মাটির পার্থক্যই বোঝা যায় না! আর আমাদের ভারতে আছে এমন কিছু সেতু, যা ইট-সিমেন্ট দিয়ে নয় — জীবন্ত গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি, যা শত শত বছর ধরে নিজে নিজে বেড়ে ওঠে।"
পৃথিবীটা যে কত আশ্চর্য সুন্দর, আর কত অদ্ভুত হতে পারে — তা কিছু জায়গা না দেখলে বিশ্বাসই হয় না। এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে দাঁড়ালে মনে হয়, আপনি পৃথিবীতে নেই — যেন কোনো ভিনগ্রহে চলে এসেছেন। প্রকৃতি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে নিজের খেয়ালে গড়ে তুলেছে এই বিস্ময়গুলো। আজ সেই ছয়টা অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক বিস্ময়ের কথা বলব। শেষেরটা আমাদের ভারতের গর্ব।
প্রথম — সালার দে উয়ুনি (বলিভিয়া)। আকাশের আয়না।
দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়ায় আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লবণের সমভূমি (সল্ট ফ্ল্যাট) — সালার দে উয়ুনি। বহু দূর পর্যন্ত শুধু সাদা লবণের চাদর। কিন্তু এর আসল জাদু দেখা যায় বৃষ্টির পর। যখন এর ওপর পাতলা একটা জলের আস্তরণ জমে, তখন গোটা জায়গাটা পরিণত হয় এক বিশাল নিখুঁত আয়নায়! আকাশের মেঘ, নীল রং, তারা — সব নিচে এমন নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত হয় যে, কোথায় আকাশ শেষ আর কোথায় মাটি শুরু — বোঝাই যায় না। মনে হয়, আপনি যেন মেঘের ওপর হাঁটছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে পরাবাস্তব (surreal) দৃশ্যগুলোর একটা এটা।
দ্বিতীয় — সোকোত্রা দ্বীপ (ইয়েমেন)। পৃথিবীর সবচেয়ে ভিনগ্রহী জায়গা।
ইয়েমেনের কাছে ভারত মহাসাগরে ভেসে থাকা সোকোত্রা দ্বীপকে বলা হয় "পৃথিবীর সবচেয়ে ভিনগ্রহের মতো জায়গা।" আর এর কারণ এখানকার অদ্ভুত সব গাছপালা। এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত গাছটার নাম "ড্রাগন ব্লাড ট্রি" (ড্রাগনের রক্তের গাছ)। দেখতে অনেকটা উল্টে রাখা ছাতা বা মাশরুমের মতো, আর কাটলে নাকি লাল রঙের আঠা বের হয় — যা দেখতে রক্তের মতো! এই দ্বীপ পৃথিবীর মূল ভূখণ্ড থেকে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আলাদা থাকায়, এখানকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গাছপালা পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যায় না — শুধু এখানেই! তাই সোকোত্রায় পা রাখলে সত্যিই মনে হয়, আপনি পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনো গ্রহে চলে এসেছেন।
তৃতীয় — ঝাংগে ডানশিয়া / রংধনু পাহাড় (চীন)। প্রকৃতির আঁকা ছবি।
চীনের ঝাংগে ডানশিয়া অঞ্চলের পাহাড়গুলো দেখলে মনে হবে, কোনো শিল্পী রং-তুলি দিয়ে এঁকে রেখেছেন। তাই এদের বলা হয় "রংধনু পাহাড়।" লাল, হলুদ, কমলা, সবুজ — নানা রঙের ঢেউখেলানো স্তর পাহাড়ের গায়ে। কিন্তু এটা কোনো রং নয়, কোনো জাদুও নয়। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে, বিভিন্ন রঙের খনিজ আর বেলেপাথরের স্তর একটার ওপর আরেকটা জমে, তারপর ভূমিকম্প আর ক্ষয়ে এই অসাধারণ রঙিন নকশা তৈরি হয়েছে। সূর্যের আলো পড়লে এই পাহাড়গুলো এত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যে, ছবি দেখলে অনেকে বিশ্বাসই করতে চায় না যে এটা সত্যি!
চতুর্থ — পামুক্কালে (তুরস্ক)। তুলোর দুর্গ।
তুরস্কের পামুক্কালে — এর মানেই "তুলোর দুর্গ" (Cotton Castle)। আর নামটা একদম সার্থক। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে ধাপে ধাপে সাদা ধবধবে অসংখ্য চৌবাচ্চা, আর তাতে টলটলে নীল জল। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পাহাড়টা যেন বরফ বা তুলোয় ঢাকা। কিন্তু এটা বরফ নয়। হাজার হাজার বছর ধরে, খনিজ-সমৃদ্ধ গরম জল এই পাহাড় বেয়ে নামতে নামতে সাদা ক্যালসিয়াম জমিয়ে এই ধাপগুলো তৈরি করেছে। উষ্ণ আবহাওয়াতেও যেন এক বরফের রাজ্য — এমন অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে খুব কমই আছে। প্রাচীন রোমানরাও এই জায়গাকে পবিত্র মনে করত।
পঞ্চম — জায়ান্টস কজওয়ে (উত্তর আয়ারল্যান্ড)। প্রকৃতির জ্যামিতি।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের সমুদ্রতীরে এমন এক দৃশ্য আছে, যা দেখলে মনে হয় মানুষের তৈরি — অথচ পুরোটাই প্রকৃতির কাজ। হাজার হাজার ষড়ভুজাকার (hexagonal) পাথরের স্তম্ভ, একদম নিখুঁতভাবে সাজানো। প্রায় ৪০,০০০টি স্তম্ভ — প্রতিটার ছয়টা করে নিখুঁত কোণ। কীভাবে প্রকৃতি এত নিখুঁত জ্যামিতি বানাল? লক্ষ লক্ষ বছর আগে, আগ্নেয়গিরির গরম লাভা ঠান্ডা হয়ে জমে যাওয়ার সময় এমনভাবে ফাটল ধরে যে, তৈরি হয় এই নিখুঁত ষড়ভুজ স্তম্ভগুলো। স্থানীয় এক কিংবদন্তি বলে, এটা নাকি এক দৈত্য (Finn McCool) বানিয়েছিল সমুদ্র পেরোনোর জন্য! কিংবদন্তি যাই হোক, প্রকৃতি যে নিজেই কত বড় ইঞ্জিনিয়ার, এই কজওয়ে তার প্রমাণ।
ষষ্ঠ — মেঘালয়ের জীবন্ত শিকড়ের সেতু (ভারত)। গাছ দিয়ে তৈরি সেতু।
উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয়ের "জীবন্ত শিকড়ের সেতু" (Living Root Bridges)। মেঘালয় পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল জায়গাগুলোর একটা। এখানে এত বৃষ্টি, এত খরস্রোতা নদী যে, কাঠের সেতু বানালে তা পচে নষ্ট হয়ে যায়। তাই এখানকার খাসি ও জয়ন্তিয়া উপজাতির মানুষ এক অসাধারণ বুদ্ধি বের করেছিল। তারা সেতু "বানায়" না — তারা সেতু "জন্মায়"! নদীর দু'পাশের রাবার গাছের জীবন্ত শিকড়গুলোকে তারা ধীরে ধীরে, যত্ন করে নদীর ওপর দিয়ে বেয়ে নিয়ে গিয়ে অন্য পাশে জুড়ে দেয়। এই শিকড় বাড়তে বাড়তে, জড়িয়ে গিয়ে এক মজবুত সেতু তৈরি হয়। আর এর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দিকটা শুনুন। এই একটা সেতু তৈরি হতে সময় লাগে ১৫-৩০ বছর! মানে, একজন মানুষ হয়তো সেতুটা শুরু করেন, আর সেটা ব্যবহার করেন তাঁর নাতি-নাতনিরা। আর যেহেতু এটা জীবন্ত, তাই বছরের পর বছর এটা পচে না — বরং আরও শক্তিশালী হয়! কিছু সেতু ১০০ বছরেরও বেশি পুরোনো, আর একসাথে অনেক মানুষের ভার বইতে পারে। প্রকৃতি আর মানুষের ধৈর্যের এমন অপূর্ব মেলবন্ধন দেখলে মনে হয়, কোনো রূপকথার বা ফ্যান্টাসি সিনেমার দৃশ্য।
১. সালার দে উয়ুনি — আকাশের আয়না
২. সোকোত্রা — ভিনগ্রহী দ্বীপ
৩. ঝাংগে ডানশিয়া — রংধনু পাহাড়
৪. পামুক্কালে — তুলোর দুর্গ
৫. জায়ান্টস কজওয়ে — প্রকৃতির জ্যামিতি
৬. মেঘালয়ের শিকড়ের সেতু — জীবন্ত বিস্ময়
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৩৩
"ইতিহাসের ৬টি রহস্যময় পরিত্যক্ত স্থান — যা একসময় প্রাণে ভরা ছিল, আজ ভুতুড়ে নীরব। একটা শহর ছেড়ে কয়েক ঘণ্টায় ৫০,০০০ মানুষ পালিয়ে গিয়েছিল, রেখে গিয়েছিল সব। আর আমাদের ভারতে আছে এমন এক গ্রাম, যার সব মানুষ নাকি এক রাতের অন্ধকারে চিরতরে উধাও হয়ে গিয়েছিল — যাওয়ার আগে দিয়ে গিয়েছিল এক অভিশাপ।"
কল্পনা করুন — একটা শহর, যেখানে একসময় হাজার হাজার মানুষ থাকত, বাচ্চারা খেলত, বাজার বসত। আর আজ? শুধু খাঁ খাঁ নীরবতা, ভাঙা বাড়ি, আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। এই জায়গাগুলো যেন সময়ের মধ্যে আটকে গেছে। চায়ের কাপ টেবিলেই পড়ে আছে, খেলনা মেঝেতেই, ঘড়ি সেই মুহূর্তেই থেমে। কেন মানুষ এসব জায়গা ছেড়ে গেল? কোনোটার পেছনে দুর্যোগ, কোনোটার পেছনে রহস্য। আজ সেই ছয়টা পরিত্যক্ত স্থানের কথা বলব। শেষেরটা আমাদের ভারতের, আর তার সাথে জড়িয়ে এক গা-ছমছমে কিংবদন্তি।
প্রথম — প্রিপিয়াত (ইউক্রেন)। কয়েক ঘণ্টায় খালি হওয়া শহর।
১৯৮৬ সাল। ইউক্রেনের চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্রে ঘটে গেল ইতিহাসের ভয়ংকরতম পারমাণবিক দুর্ঘটনা। আর তার ঠিক পাশেই ছিল প্রিপিয়াত শহর, যেখানে বাস করত প্রায় ৫০,০০০ মানুষ। বিকিরণের (রেডিয়েশন) ভয়ে, পুরো শহরটাকে খালি করার নির্দেশ এল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। মানুষ ভেবেছিল কয়েকদিন পর ফিরে আসবে, তাই রেখে গেল তাদের ঘরবাড়ি, জিনিসপত্র, স্মৃতি — সব। কিন্তু তারা আর কোনোদিন ফিরতে পারেনি। আজও প্রিপিয়াত এক ভুতুড়ে শহর — যেখানে একটা অ্যামিউজমেন্ট পার্কের মরচে-পড়া নাগরদোলা (ferris wheel) দাঁড়িয়ে আছে, যা কোনোদিন চালুই হয়নি। প্রকৃতি ধীরে ধীরে গিলে নিচ্ছে গোটা শহরটাকে।
দ্বিতীয় — হাশিমা দ্বীপ (জাপান)। একসময়ের সবচেয়ে ঘিঞ্জি জায়গা।
জাপানের সমুদ্রে ভেসে থাকা ছোট্ট একটা দ্বীপ — হাশিমা, যার ডাকনাম "ব্যাটলশিপ আইল্যান্ড" (যুদ্ধজাহাজ দ্বীপ), কারণ দূর থেকে দেখতে অনেকটা যুদ্ধজাহাজের মতো। একসময় এই দ্বীপে কয়লার খনি ছিল, আর কাজের জন্য এখানে গাদাগাদি করে থাকত হাজার হাজার মানুষ। এত মানুষ যে, একসময় এটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ জায়গা! কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে যখন কয়লা ফুরিয়ে গেল, খনি বন্ধ হয়ে গেল — আর মানুষজন দ্রুত দ্বীপ ছেড়ে চলে গেল। আজ হাশিমা এক পরিত্যক্ত কংক্রিটের কঙ্কাল — ভাঙা বাড়ি, খালি জানালা, সমুদ্রের নোনা বাতাসে ক্ষয়ে যাওয়া এক ভুতুড়ে দ্বীপ। একসময়ের সবচেয়ে জমজমাট জায়গা আজ সবচেয়ে নীরব।
তৃতীয় — সেন্ট্রালিয়া (আমেরিকা)। যে শহরের নিচে ৬০ বছর ধরে আগুন জ্বলছে।
আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার সেন্ট্রালিয়া শহরের গল্পটা সবচেয়ে অদ্ভুত আর ভয়ংকর। এই শহরের নিচে কয়লার খনিতে ১৯৬২ সালে আগুন লেগেছিল। আর সেই আগুন আজও নেভেনি! মাটির নিচে কয়লার স্তর ধরে এই আগুন ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জ্বলছে — আর ধারণা করা হয়, এটা আরও কয়েকশো বছর জ্বলতে পারে। মাটি ফেটে ধোঁয়া বেরোতে লাগল, রাস্তা গরম হয়ে ফাটতে শুরু করল, বিষাক্ত গ্যাস উঠতে লাগল। ফলে সরকার গোটা শহরটাই খালি করে দিল। আজ সেন্ট্রালিয়া প্রায় জনশূন্য — শুধু ফাটা রাস্তা দিয়ে মাটির নিচ থেকে ধোঁয়া উঠছে, যেন এক জীবন্ত দুঃস্বপ্ন। বিখ্যাত ভিডিও গেম "সাইলেন্ট হিল"-এর ভুতুড়ে শহরটা নাকি এই সেন্ট্রালিয়া থেকেই অনুপ্রাণিত।
চতুর্থ — কোলমানস্কপ (নামিবিয়া)। বালিতে ডুবে যাওয়া হীরের শহর।
আফ্রিকার নামিবিয়ার মরুভূমিতে, একসময় এক ঝলমলে শহর ছিল — কোলমানস্কপ। এখানে হীরা পাওয়া যেত, তাই হীরের লোভে মানুষ ছুটে এসেছিল, গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ এক শহর। কিন্তু একসময় হীরা ফুরিয়ে গেল। আর মানুষ শহর ছেড়ে চলে গেল, রেখে গেল তাদের সুন্দর বাড়িঘর। তারপর শুরু হলো প্রকৃতির খেলা। মরুভূমির বালি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে গিলতে শুরু করল গোটা শহরটাকে। আজ সেখানে গেলে দেখবেন এক পরাবাস্তব দৃশ্য — দরজা দিয়ে বালি ঢুকে ঘরের ভেতর পর্যন্ত বালির ঢেউ, জানালা পর্যন্ত বালিতে ঢাকা। প্রকৃতি যেন ধীরে ধীরে গোটা শহরটাকে আবার নিজের বুকে টেনে নিচ্ছে।
পঞ্চম — হোতৌওয়ান (চীন)। সবুজে ঢাকা ভুতুড়ে গ্রাম।
চীনের একটা দ্বীপে ছিল হোতৌওয়ান নামের এক মাছ ধরার গ্রাম। একসময় এখানে জেলেদের জমজমাট বসতি ছিল। কিন্তু দ্বীপটা ছিল ভীষণ দুর্গম, শহর থেকে অনেক দূরে। তাই ধীরে ধীরে মানুষ ভালো জীবনের খোঁজে গ্রাম ছেড়ে চলে গেল। আর তারপর প্রকৃতি যা করল, তা এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করল। সবুজ লতাপাতা ধীরে ধীরে গোটা গ্রামটাকে, প্রতিটা বাড়িকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলল! আজ হোতৌওয়ানের বাড়িগুলো আর ইট-কাঠের নয় — যেন সবুজ গাছের তৈরি। পরিত্যক্ত হয়েও এই গ্রামটা এত সুন্দর যে, একে দেখতে আজ পর্যটকরা ভিড় করেন। প্রকৃতি যে কীভাবে নিজের জিনিস ফিরিয়ে নেয়, হোতৌওয়ান তার এক সুন্দর উদাহরণ।
ইতিহাসের এই ৫টা পরিত্যক্ত স্থানের দিকে তাকালে একটা গভীর সত্যি বেরিয়ে আসে। মানুষ যত শক্তিশালীই হোক, যত বড় শহরই গড়ুক — সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী। কখনো প্রকৃতি, কখনো দুর্যোগ, কখনো পরিস্থিতি — এক নিমেষে জমজমাট একটা জায়গাকে নীরব করে দিতে পারে। এই খালি বাড়িগুলো যেন আমাদের নম্রতার পাঠ পড়ায়। আর সবচেয়ে গা ছমছমে কথা — এই জায়গাগুলোতে গেলে মনে হয়, এখনও কেউ আছে। চেয়ার-টেবিল, খেলনা, ঘড়ি — সব সেই মুহূর্তেই থেমে আছে, যেন মানুষগুলো শুধু একটু বাইরে গেছে, এক্ষুনি ফিরবে। কিন্তু তারা আর কোনোদিন ফেরেনি। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় কথা — প্রতিটা পরিত্যক্ত জায়গার পেছনে আছে অসংখ্য মানুষের জীবন, হাসি, কান্না আর স্বপ্ন। আজ সেখানে শুধু নীরবতা, কিন্তু সেই নীরবতাও যেন হাজারো গল্প বলে। আমাদের কুলধারা তেমনই এক গল্প — অন্যায়ের কাছে মাথা না নোয়ানোর গর্বের গল্প।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা জায়গার মধ্যে কোনটা শুনে আপনার গায়ে সবচেয়ে বেশি কাঁটা দিল? আর আমাদের কুলধারা — এক রাতে উধাও হয়ে যাওয়া সেই গ্রামের কথা কি আপনি আগে জানতেন? আপনার কী মনে হয় — কিংবদন্তি, নাকি জলসংকটই আসল কারণ?
১. প্রিপিয়াত — চেরনোবিলের ভুতুড়ে শহর
২. হাশিমা — পরিত্যক্ত যুদ্ধজাহাজ দ্বীপ
৩. সেন্ট্রালিয়া — মাটির নিচে জ্বলন্ত আগুন
৪. কোলমানস্কপ — বালিতে ডোবা হীরের শহর
৫. হোতৌওয়ান — সবুজে ঢাকা গ্রাম
৬. কুলধারা — এক রাতে উধাও
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৩৪
ইতিহাসের ৬টি রূপকথার মতো প্রাসাদ — যা আজও মানুষকে মুগ্ধ করে। একটা প্রাসাদ দেখতে এতটাই স্বপ্নের মতো যে, বিখ্যাত ডিজনি তাদের রূপকথার দুর্গটাই বানিয়েছিল এর আদলে! আর আমাদের ভারতের এক প্রাসাদ উৎসবের রাতে প্রায় এক লক্ষ আলোয় জ্বলে উঠে যেন সোনার প্রাসাদ হয়ে যায়।"
ছোটবেলায় রূপকথার গল্পে আমরা যেসব ঝলমলে প্রাসাদের কথা পড়তাম — উঁচু চূড়া, সোনালি হলঘর, ঝাড়বাতি — সেসব কি সত্যি হতে পারে? হ্যাঁ, পারে। পৃথিবীতে সত্যিই এমন কিছু প্রাসাদ আছে, যা যেকোনো রূপকথাকেও হার মানায়। রাজা-রানিরা নিজেদের ক্ষমতা আর স্বপ্ন দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এই বিস্ময়গুলো, যা শত শত বছর পরেও আমাদের মুগ্ধ করে। আজ সেই ছয়টা রূপকথার প্রাসাদের কথা বলব। শেষেরটা আমাদের ভারতের গর্ব।
প্রথম — ভার্সাই প্রাসাদ (ফ্রান্স)। বিলাসিতার চূড়ান্ত রূপ।
ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদ — রাজকীয় বিলাসিতার কথা উঠলে এর নাম সবার আগে আসে। ফরাসি রাজা চতুর্দশ লুই (যাঁকে বলা হতো "সূর্য রাজা") এই বিশাল প্রাসাদ গড়েছিলেন। এর জাঁকজমক ছিল কল্পনার বাইরে। এর সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ — "হল অফ মিররস" (আয়না-কক্ষ)। একটা বিশাল লম্বা হলঘর, যার একদিকের পুরো দেয়াল জুড়ে শুধু আয়না আর আয়না, আর তাতে প্রতিফলিত হতো শত শত মোমবাতি আর ঝাড়বাতির আলো — যেন আলোর এক জাদুর জগৎ। বিশাল বাগান, ফোয়ারা, সোনায় মোড়া ঘর — ভার্সাই ছিল ক্ষমতা আর বিলাসিতার এমন এক প্রতীক, যা গোটা ইউরোপের রাজারা নকল করার চেষ্টা করতেন।
দ্বিতীয় — নয়শোয়ানস্টাইন দুর্গ (জার্মানি)। ডিজনির রূপকথার দুর্গের জনক।
জার্মানির এক পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গটা যেন সরাসরি কোনো রূপকথার বই থেকে উঠে এসেছে — উঁচু সাদা চূড়া, নীল ছাদ, চারদিকে সবুজ পাহাড় আর মেঘ। আর এর সবচেয়ে মজার তথ্যটা শুনলে অবাক হবেন। ডিজনি যখন তাদের বিখ্যাত রূপকথার দুর্গটা (যা তাদের লোগোতেও দেখা যায়) বানানোর কথা ভাবল, তারা অনুপ্রেরণা নিয়েছিল এই নয়শোয়ানস্টাইন দুর্গ থেকেই! মাত্র দেড়শো বছর আগে, বাভারিয়ার রাজা দ্বিতীয় লুডভিগ — যাঁকে অনেকে "পাগলা রাজা" বলত — তাঁর স্বপ্নের এই দুর্গ গড়েছিলেন। বাস্তবের প্রয়োজনের জন্য নয়, বরং নিজের কল্পনার রূপকথাকে সত্যি করতে। আজ এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত আর সুন্দর দুর্গগুলোর একটা।
তৃতীয় — তোপকাপি প্রাসাদ (তুরস্ক)। অটোমান সুলতানদের রহস্যময় জগৎ।
তুরস্কের ইস্তানবুলে অটোমান সুলতানদের বিশাল প্রাসাদ — তোপকাপি। প্রায় ৪০০ বছর ধরে এটাই ছিল শক্তিশালী অটোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র। কিন্তু এই প্রাসাদ শুধু সুন্দরই ছিল না — ছিল রহস্যে ভরা। এর ভেতরে ছিল গোপন কক্ষ, বিশাল উঠোন, আর কিংবদন্তি "হারেম।" আর এর ধনভাণ্ডার (treasury) ছিল অবিশ্বাস্য — পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কিছু হীরা, পান্না আর রত্ন এখানে রাখা ছিল। সোনায় মোড়া কক্ষ, সুন্দর টালির কাজ, সাগরের ধারে অপূর্ব অবস্থান — তোপকাপি ছিল ক্ষমতা, বিলাসিতা আর রহস্যের এক নিখুঁত মিশেল।
চতুর্থ — শীত প্রাসাদ / হার্মিটেজ (রাশিয়া)। জারদের ঝলমলে দুনিয়া।
রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে, রুশ সম্রাট (জার)-দের সেই বিশাল প্রাসাদ — উইন্টার প্যালেস বা শীত প্রাসাদ। এর বিলাসিতা ছিল চোখ ধাঁধানো। সবুজ-সাদা-সোনালি রঙের এই বিশাল প্রাসাদে ছিল হাজার হাজার ঘর, সোনায় মোড়া হলঘর, অসাধারণ সব সিঁড়ি আর ঝাড়বাতি। রোমানভ রাজবংশের জাররা এখানে এমন বিলাসে থাকতেন, যা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে ছিল। আজ এই প্রাসাদ পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত জাদুঘর — "হার্মিটেজ," যেখানে রাখা আছে লক্ষ লক্ষ মূল্যবান শিল্পকর্ম। একসময়ের রাজকীয় প্রাসাদ আজ গোটা পৃথিবীর শিল্পপ্রেমীদের তীর্থস্থান।
পঞ্চম — আলহাম্বরা (স্পেন)। পাথরে খোদাই করা স্বর্গ।
স্পেনের গ্রানাডায় একটা পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক অপার্থিব সুন্দর প্রাসাদ — আলহাম্বরা। মুরিশ (ইসলামি) শাসকরা শত শত বছর আগে এটা গড়েছিলেন, আর এটা আজও ইসলামি স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এর সৌন্দর্য মূলত এর নিখুঁত কারুকাজে। দেয়াল, ছাদ, খিলান — প্রতিটা ইঞ্চিতে এত সূক্ষ্ম খোদাই আর জ্যামিতিক নকশা যে, দেখলে মনে হয় পাথরের ওপর লেস বুনে দেওয়া হয়েছে। আর ছিল সুন্দর উঠোন, ফোয়ারা আর জলের ধারা — যেমন বিখ্যাত "সিংহের উঠোন।" শুকনো পাহাড়ের ওপর জল, ছায়া আর কারুকাজ দিয়ে তারা গড়ে তুলেছিল যেন এক টুকরো স্বর্গ। আজও আলহাম্বরা দেখতে গোটা পৃথিবী থেকে মানুষ আসে।
ষষ্ঠ — মাইসোর প্যালেস (কর্ণাটক, ভারত)। প্রায় এক লক্ষ আলোর প্রাসাদ।
কর্ণাটকের মাইসোর প্যালেস (অম্বা বিলাস প্রাসাদ)। মাইসোরের ওয়াদিয়ার রাজবংশের এই প্রাসাদটা গড়া হয়েছে এক অসাধারণ মিশ্র স্থাপত্যশৈলীতে — যাকে বলে ইন্দো-সারাসেনিক। হিন্দু, মুঘল, রাজপুত আর ইউরোপীয় শৈলীর এক অপূর্ব মেলবন্ধন। ভেতরে সোনায় মোড়া সিংহাসন-ঘর, রঙিন কাচের সিলিং, কারুকাজ করা থাম — সবকিছুই চোখ ধাঁধানো। কিন্তু এর সবচেয়ে জাদুকরি মুহূর্তটা আসে রাতে, বিশেষ করে দশেরা উৎসবের সময়। সেই সময় গোটা প্রাসাদটাকে সাজানো হয় প্রায় এক লক্ষ (প্রায় ৯৭,০০০) বৈদ্যুতিক বাল্ব দিয়ে! আর যখন একসাথে সেই সব আলো জ্বলে ওঠে, তখন গোটা প্রাসাদটা অন্ধকার রাতের বুকে যেন এক ঝলমলে সোনার প্রাসাদ হয়ে ভেসে ওঠে — দৃশ্যটা ঠিক যেন কোনো রূপকথা। ভাবুন — এই অপূর্ব দৃশ্য দেখার জন্য প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিড় করেন; তাজমহলের পরেই এটা ভারতের সবচেয়ে বেশি দেখা স্মৃতিস্তম্ভগুলোর একটা। আমাদের ভারতের প্রাসাদও যে রূপকথার চেয়ে কম কিছু নয় — মাইসোর প্যালেস তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
ইতিহাসের এই ছয়টা প্রাসাদের দিকে তাকালে একটা সুন্দর সত্যি বেরিয়ে আসে। প্রতিটা প্রাসাদ আসলে একটা স্বপ্নের রূপ। কোনো রাজা, কোনো শিল্পী মনে মনে একটা স্বর্গের ছবি এঁকেছিলেন — আর সেই কল্পনাকে পাথর, সোনা আর আলো দিয়ে সত্যি করে তুলেছিলেন। তাই এই প্রাসাদগুলো শুধু থাকার জায়গা নয়, মানুষের কল্পনাশক্তিরই এক একটা স্মারক। আর সবচেয়ে সুন্দর কথা — যে রাজারা এসব বানিয়েছিলেন, তাঁরা আজ নেই। কিন্তু তাঁদের স্বপ্নগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে, আর প্রতি বছর কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে মুগ্ধ করছে। একসময় যেখানে শুধু রাজার পা পড়ত, আজ সেখানে আমরা সবাই ঘুরে বেড়াতে পারি। হয়তো এটাই সবচেয়ে সুন্দর কথা — সৌন্দর্য আর শিল্প কখনো হারায় না। আর আমাদের মাইসোর প্যালেস গর্ব করে বলে — রূপকথার প্রাসাদ গড়ায় ভারতও পৃথিবীর সেরাদের একজন।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা প্রাসাদের মধ্যে কোনটায় একবার ঘুরে আসতে সবচেয়ে বেশি ইচ্ছে করছে? আর আমাদের মাইসোর প্যালেস — দশেরার রাতে এক লক্ষ আলোয় জ্বলে ওঠা সেই সোনার প্রাসাদ — আপনি কি কখনো দেখেছেন বা দেখতে চান?
১. ভার্সাই — আয়না-কক্ষের প্রাসাদ
২. নয়শোয়ানস্টাইন — ডিজনির রূপকথা
৩. তোপকাপি — অটোমান রহস্য
৪. শীত প্রাসাদ — জারদের দুনিয়া
৫. আলহাম্বরা — পাথরে খোদাই করা স্বর্গ
৬. মাইসোর প্যালেস — এক লক্ষ আলোর প্রাসাদ
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৩৫
ইতিহাসের ৬টি প্রাচীন মানমন্দির — যা দিয়ে বিনা টেলিস্কোপেই মানুষ আকাশ পড়ত। একটা মন্দিরের ভেতরে সূর্যের আলো বছরে মাত্র দু'দিন ঢোকে — হাজার বছর আগের নিখুঁত হিসাবে! আর আমাদের ভারতে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাথরের সূর্যঘড়ি, যা আজও মাত্র ২ সেকেন্ডের ভুলে সময় বলে দেয়।"
আজ আমাদের কাছে শক্তিশালী টেলিস্কোপ আছে, স্যাটেলাইট আছে। কিন্তু হাজার হাজার বছর আগের মানুষ, এসব কিছুই ছাড়া, শুধু খালি চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে এমন সব হিসাব করেছিল, যা শুনলে আজও অবাক হতে হয়। তারা জানত কখন গ্রহণ হবে, কখন ঋতু বদলাবে, কোন তারা কোথায় উঠবে।
আর সেই জ্ঞান ধরে রাখতে তারা বানিয়েছিল অবিশ্বাস্য সব মানমন্দির আর পাথরের যন্ত্র। আজ সেই ছয়টা প্রাচীন মানমন্দিরের কথা বলব। শেষেরটা আমাদের ভারতের গর্ব।
প্রথম — স্টোনহেঞ্জ (ইংল্যান্ড)। ৫,০০০ বছরের পাথরের ক্যালেন্ডার।
ইংল্যান্ডের সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পাথরের সেই বৃত্ত — স্টোনহেঞ্জ। প্রায় ৫,০০০ বছরের পুরোনো এই রহস্যময় নির্মাণ নিয়ে আজও মানুষ মুগ্ধ। কেন এটা বানানো হয়েছিল, তা নিয়ে অনেক মত আছে। কিন্তু একটা ব্যাপার প্রায় নিশ্চিত — এটা আকাশের সাথে গভীরভাবে জড়িত। কীভাবে? বছরের সবচেয়ে বড় দিন আর সবচেয়ে ছোট দিনে (অয়নকাল/solstice), সূর্য ঠিক এই পাথরগুলোর নির্দিষ্ট ফাঁক দিয়েই ওঠে আর অস্ত যায়! অর্থাৎ, প্রাচীন মানুষ এই পাথরের বৃত্ত দিয়ে ঋতু আর সময়ের হিসাব রাখত — যেন এক বিশাল পাথরের ক্যালেন্ডার। কোনো লেখা, কোনো যন্ত্র ছাড়াই আকাশ পড়ার এ এক অসাধারণ নিদর্শন।
দ্বিতীয় — নিউগ্রেঞ্জ (আয়ারল্যান্ড)। পিরামিডেরও পুরোনো, সূর্যের আলোর জাদু।
আয়ারল্যান্ডের নিউগ্রেঞ্জ — একটা বিশাল প্রাচীন সমাধি-ঢিবি। আর এটা এতটাই পুরোনো যে শুনলে চমকে যাবেন — এটা মিশরের পিরামিড আর স্টোনহেঞ্জেরও আগে তৈরি, প্রায় ৫,২০০ বছর আগে! কিন্তু এর আসল জাদু লুকিয়ে আছে এর নিখুঁত নকশায়। বছরের সবচেয়ে ছোট দিনে (শীতকালীন অয়নকাল), ঠিক সূর্যোদয়ের সময়... সূর্যের একটা সরু আলোর রেখা একটা বিশেষ ছোট্ট ফাঁক দিয়ে ঢুকে, লম্বা অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে, একদম ভেতরের কক্ষটাকে কয়েক মিনিটের জন্য আলোয় ভরিয়ে দেয়! ভাবুন — ৫,০০০ বছরেরও বেশি আগে, কোনো যন্ত্র ছাড়াই, মানুষ সূর্যের গতিপথ এত নিখুঁতভাবে হিসাব করে এই কাঠামো বানিয়েছিল। এটা প্রকৌশল আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক অবিশ্বাস্য মিলন।
তৃতীয় — এল কারাকোল, চিচেন ইৎসা (মায়া, মেক্সিকো)। শুক্রগ্রহের পর্যবেক্ষক।
প্রাচীন মায়া সভ্যতা ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানে অসাধারণ দক্ষ। মেক্সিকোর চিচেন ইৎসায় তাদের গড়া এল কারাকোল নামের গোলাকার ভবনটাকে বলা হয় তাদের মানমন্দির। এই ভবনের জানালাগুলো এমনভাবে বানানো ছিল যে, তা দিয়ে আকাশের নির্দিষ্ট কিছু গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি দেখা যেত — বিশেষ করে শুক্রগ্রহের (Venus)। মায়ারা শুক্রগ্রহকে ভীষণ গুরুত্ব দিত। আর তাদের তৈরি ক্যালেন্ডার এতটাই নিখুঁত ছিল যে, আধুনিক বিজ্ঞানীরাও অবাক হন। শুধু তাই নয় — তাদের একটা পিরামিডে, বছরের বিশেষ দিনে (বিষুব/equinox) সূর্যের আলো-ছায়া এমনভাবে পড়ে যে, মনে হয় একটা বিশাল সাপ সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে! খালি চোখে আকাশ পড়ে এমন নিখুঁত হিসাব — মায়াদের মেধা সত্যিই বিস্ময়কর।
চতুর্থ — আবু সিম্বেল (মিশর)। বছরে দু'বার সূর্য ঢোকে যে মন্দিরে।
প্রাচীন মিশরের আবু সিম্বেল মন্দির — ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের তৈরি এই বিশাল মন্দির নিজেই এক বিস্ময়। কিন্তু এর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ব্যাপারটা লুকিয়ে আছে সূর্যের সাথে এর সম্পর্কে। মন্দিরের একদম ভেতরে, গভীর অন্ধকারে কয়েকটা মূর্তি রাখা। এই মন্দির এমন নিখুঁত হিসাব করে বানানো হয়েছিল যে... বছরের মাত্র দু'টি বিশেষ দিনে, সূর্যের আলো মন্দিরের মুখ দিয়ে ঢুকে, একদম ভেতরের সেই অন্ধকার কক্ষে পৌঁছে নির্দিষ্ট মূর্তিগুলোকে আলোয় ভরিয়ে দেয়! ৩,০০০ বছরেরও বেশি আগে, কোনো আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই সূর্যের গতিপথ এত নিখুঁতভাবে মেপে এমন একটা মন্দির বানানো — মিশরীয়দের জ্যোতির্বিজ্ঞান আর প্রকৌশল জ্ঞান কতটা গভীর ছিল, এটাই তার প্রমাণ।
পঞ্চম — উলুঘ বেগের মানমন্দির (সমরকন্দ)। টেলিস্কোপের আগেই নিখুঁত হিসাব।
প্রায় ৬০০ বছর আগে, মধ্য এশিয়ার সমরকন্দে, উলুঘ বেগ নামের এক সুলতান নিজেই ছিলেন একজন মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি গড়েছিলেন সেই যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানমন্দির। এতে ছিল একটা বিশাল বাঁকানো যন্ত্র (সেক্সট্যান্ট), যা দিয়ে তিনি আকাশের তারা-গ্রহের অবস্থান নিখুঁতভাবে মাপতেন। আর তাঁর হিসাব ছিল অবিশ্বাস্য রকম সঠিক। টেলিস্কোপ আবিষ্কারের অনেক আগেই, শুধু খালি চোখ আর এই বিশাল যন্ত্র দিয়ে, তিনি হাজার হাজার তারার একটা নিখুঁত তালিকা বানিয়েছিলেন। এমনকি এক বছরের দৈর্ঘ্য তিনি মেপেছিলেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভুলে! কোনো আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া এমন নির্ভুলতা — সত্যিই বিস্ময়কর।
ষষ্ঠ — জন্তর মন্তর (জয়পুর, ভারত)। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাথরের সূর্যঘড়ি।
আর সবশেষে — জয়পুরের জন্তর মন্তর। প্রায় ৩০০ বছর আগে, মহারাজা সওয়াই জয় সিংহ (দ্বিতীয়) এই অবিশ্বাস্য মানমন্দিরটা গড়েছিলেন। এখানে কোনো ছোটখাটো যন্ত্র নেই — আছে বিশাল বিশাল পাথর আর ইটের তৈরি জ্যোতির্বিজ্ঞানের যন্ত্র। আর এর মুকুটমণি হলো "সম্রাট যন্ত্র" — একটা বিশাল সূর্যঘড়ি। এটা প্রায় ২৭ মিটার উঁচু — পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাথরের সূর্যঘড়ি! আর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য — এই প্রাচীন পাথরের ঘড়ি আজও কাজ করে, আর সূর্যের ছায়া দেখে এত নিখুঁতভাবে সময় বলে দেয় যে, ভুল হয় মাত্র ২ সেকেন্ডের! শুধু তাই নয় — এখানকার অন্য যন্ত্রগুলো দিয়ে গ্রহণের পূর্বাভাস দেওয়া, তারার অবস্থান মাপা, ঋতু নির্ণয় — সব করা যেত, তাও বিনা টেলিস্কোপে। ভাবুন — যখন পৃথিবীর অনেক জায়গায় মানুষ আকাশকে ভয় পেত, তখন আমাদের জয় সিংহ পাথর দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এমন এক নিখুঁত মহাকাশ-গবেষণাগার। আজ এটা ইউনেস্কোর বিশ্ব-ঐতিহ্যের তালিকায় — আমাদের প্রাচীন বিজ্ঞান-মেধার এক উজ্জ্বল গর্ব।
ইতিহাসের এই ছয়টা মানমন্দিরের দিকে তাকালে একটা গভীর সত্যি বেরিয়ে আসে। মানুষ চিরকাল আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়েছে। আর শুধু বিস্মিত হয়েই থেমে থাকেনি — খালি চোখে, অসীম ধৈর্য নিয়ে, রাতের পর রাত আকাশ পর্যবেক্ষণ করে, তারা বুঝে নিয়েছিল মহাবিশ্বের ছন্দ। আর সবচেয়ে বড় কথা — তাদের এই জ্ঞান ছিল ভীষণ কাজের। কখন বীজ বুনতে হবে, কখন ফসল কাটতে হবে, কখন ঋতু বদলাবে — সবই তারা ঠিক করত এই আকাশ পড়ে। জ্যোতির্বিজ্ঞান ছিল তাদের বেঁচে থাকার বিজ্ঞান। হয়তো এটাই সবচেয়ে সুন্দর কথা — কৌতূহল মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। যন্ত্র না থাকলেও, যার চোখে কৌতূহল আর মনে ধৈর্য আছে, সে আকাশের রহস্যও পড়ে ফেলতে পারে। আর আমাদের জয় সিংহ প্রমাণ করেন — আকাশ পড়ায় ভারত কখনো পিছিয়ে ছিল না।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা মানমন্দিরের মধ্যে কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল?
১. স্টোনহেঞ্জ — পাথরের ক্যালেন্ডার
২. নিউগ্রেঞ্জ — সূর্যের আলোর জাদু
৩. এল কারাকোল — শুক্রগ্রহের পর্যবেক্ষক
৪. আবু সিম্বেল — বছরে দু'বার সূর্য
৫. উলুঘ বেগ — নিখুঁত তারার তালিকা
৬. জন্তর মন্তর — পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সূর্যঘড়ি
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৩৬
ইতিহাসের ৬টি প্রাচীন প্রকৌশল-বিস্ময় — যা আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই গড়া হয়েছিল, আর আজও আমাদের অবাক করে। একটা সভ্যতা পাহাড় কেটে আস্ত শহর বানিয়েছিল। আর আমাদের ভারতে আছে এমন এক বাঁধ, যা প্রায় ১,৮০০ বছর আগে শুধু পাথর দিয়ে গড়া হয়েছিল — অথচ আজও দিব্যি কাজ করছে!"
আজ আমাদের হাতে ক্রেন আছে, বুলডোজার আছে, কম্পিউটার আছে। তবু আমরা অবাক হই হাজার হাজার বছর আগের কিছু নির্মাণ দেখে।কারণ সেই মানুষগুলো এসব কিছুই ছাড়াই এমন সব জিনিস বানিয়েছিল, যা আজও আমাদের প্রকৌশলীদের (ইঞ্জিনিয়ারদের) মাথা ঘুরিয়ে দেয়। শুধু হাতের শ্রম, বুদ্ধি আর অসীম ধৈর্য দিয়ে গড়া এই বিস্ময়গুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে। আজ সেই ছয়টা প্রাচীন প্রকৌশল-বিস্ময়ের কথা বলব। শেষেরটা আমাদের ভারতের গর্ব।
প্রথম — গিজার মহাপিরামিড (মিশর)। ২৩ লক্ষ পাথরের রহস্য।
প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে গড়া মিশরের মহাপিরামিড — প্রাচীন পৃথিবীর সপ্ত আশ্চর্যের মধ্যে আজও টিকে থাকা একমাত্র বিস্ময়। এই একটা পিরামিড বানাতে ব্যবহার করা হয়েছিল প্রায় ২৩ লক্ষ পাথরের ব্লক — যার প্রতিটার ওজন গড়ে আড়াই টন বা তারও বেশি! ভাবুন — কোনো ক্রেন নেই, কোনো ট্রাক নেই। শুধু মানুষের শ্রমে এই বিশাল বিশাল পাথর কেটে, বহু দূর থেকে এনে, নিখুঁত নিশানায় একটার ওপর একটা বসানো হয়েছিল। আর এত নিখুঁতভাবে যে, আজও বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি নিশ্চিত নন — ঠিক কীভাবে তারা এটা সম্ভব করেছিল! সাড়ে চার হাজার বছরের এই বিস্ময় আজও মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়।
দ্বিতীয় — রোমান অ্যাকুইডাক্ট ও কংক্রিট। ২,০০০ বছরেও টিকে থাকা।
প্রাচীন রোমানরা ছিল প্রকৌশলের জাদুকর। তাদের সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল অ্যাকুইডাক্ট — দূরের পাহাড় থেকে শহরে বিশুদ্ধ জল আনার বিশাল জলপথ। আর এটার নিখুঁততা অবিশ্বাস্য। কয়েক দশ-শত কিলোমিটার দূর থেকে, এত সামান্য ঢাল রেখে তারা এই পথ বানাত যে, জল নিজে থেকেই ধীরে ধীরে গড়িয়ে শহরে পৌঁছে যেত। আর তাদের আরেকটা গোপন অস্ত্র ছিল — রোমান কংক্রিট। তাদের তৈরি কংক্রিট এতটাই মজবুত যে, ২,০০০ বছর পরেও তাদের অনেক নির্মাণ দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে — এমনকি সমুদ্রের নোনা জলেও! আধুনিক বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন, রোমান কংক্রিটে এমন উপাদান ছিল যা নিজে থেকেই ছোটখাটো ফাটল মেরামত করে নিতে পারত। আজকের ইঞ্জিনিয়াররাও এই প্রাচীন রহস্য থেকে শিখছেন।
তৃতীয় — চীনের মহাপ্রাচীর। হাতে গড়া হাজার হাজার কিলোমিটার।
পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত প্রকৌশল-বিস্ময়গুলোর একটা — চীনের মহাপ্রাচীর (Great Wall of China)। শত্রুদের আক্রমণ ঠেকাতে শত শত বছর ধরে, একটার পর এক রাজবংশ এই বিশাল প্রাচীর গড়ে তুলেছিল। আর এটা সমতলে নয় — এই প্রাচীর উঠেছে খাড়া পাহাড়ের চূড়ায়, নেমেছে গভীর উপত্যকায়, পেরিয়ে গেছে মরুভূমি। ভাবুন — কোনো আধুনিক যন্ত্র ছাড়া, শুধু মানুষের হাতে, এত দুর্গম পথে হাজার হাজার কিলোমিটার লম্বা প্রাচীর গড়া! এর পেছনে লুকিয়ে আছে অগণিত শ্রমিকের রক্ত-ঘাম। মানুষের সংকল্প আর পরিশ্রম কতদূর যেতে পারে, এই প্রাচীর তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
চতুর্থ — মাচু পিচু ও ইনকা পাথর (পেরু)। যেখানে ছুরিও ঢোকে না।
দক্ষিণ আমেরিকার পেরুতে, আন্দিজ পাহাড়ের উঁচুতে ইনকা সভ্যতা গড়েছিল এক অবিশ্বাস্য শহর — মাচু পিচু। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় বিস্ময় এর পাথরের গাঁথুনিতে। ইনকারা বিশাল বিশাল পাথর কেটে এমন নিখুঁতভাবে একটার সাথে আরেকটা জোড়া লাগাত যে, মাঝখানে কোনো সিমেন্ট বা মর্টার লাগত না। আর এত নিখুঁত সেই জোড়া যে, দুটো পাথরের ফাঁকে একটা ছুরির ফলা পর্যন্ত ঢোকানো যায় না! আর সবচেয়ে অবাক করা — এই গাঁথুনি এতটাই শক্তিশালী যে, ভূমিকম্পেও এই দেয়াল ভাঙে না। যেখানে পরবর্তী যুগের অনেক বাড়ি ভূমিকম্পে গুঁড়িয়ে গেছে, সেখানে ইনকাদের এই প্রাচীন দেয়াল আজও অটুট। যন্ত্র ছাড়া এমন নিখুঁত পাথর-প্রকৌশল সত্যিই বিস্ময়কর।
পঞ্চম — পেত্রা (জর্ডান)। পাহাড় কেটে গড়া আস্ত শহর।
জর্ডানের মরুভূমিতে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য শহর — পেত্রা। প্রায় ২,০০০ বছর আগে, নাবাতীয় নামের এক জাতি এই শহরটা বানিয়েছিল একদম অন্যভাবে। তারা ইট গেঁথে বাড়ি বানায়নি — বরং বিশাল গোলাপি রঙের পাথরের পাহাড় খোদাই করে, তার ভেতরেই গড়ে তুলেছিল মন্দির, প্রাসাদ, সমাধি! পাহাড়ের গা কেটে তৈরি বিখ্যাত "ট্রেজারি" ভবনটা দেখলে আজও বিশ্বাস হয় না। আর এদের আরেকটা বড় বিস্ময় ছিল জল-প্রকৌশল। শুকনো মরুভূমিতেও তারা চতুর খাল আর জলাধার বানিয়ে বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা ধরে রাখত — আর সেই জলেই গড়ে উঠেছিল মরুভূমির বুকে এক সমৃদ্ধ শহর। পাথর আর জল — দুটোকেই বশ করেছিল এই প্রাচীন জাতি।
ষষ্ঠ — কাল্লানাই বাঁধ / গ্র্যান্ড অ্যানিকাট (তামিলনাড়ু, ভারত)। ১,৮০০ বছরের জীবন্ত বাঁধ।
তামিলনাড়ুর কাবেরী নদীর ওপর গড়া কাল্লানাই বাঁধ, যা গ্র্যান্ড অ্যানিকাট নামেও পরিচিত। প্রায় ১,৮০০ বছর আগে, মহান চোল রাজা কারিকালান এই বাঁধ গড়েছিলেন — উদ্দেশ্য ছিল কাবেরীর জল ঘুরিয়ে উর্বর ব-দ্বীপ অঞ্চলে সেচের জন্য পৌঁছে দেওয়া। আর এর নির্মাণটাই বিস্ময়কর। কোনো সিমেন্ট বা মর্টার ছাড়াই, শুধু বিশাল বিশাল পাথর সাজিয়ে এই বাঁধ বানানো হয়েছিল — প্রায় ৩২৯ মিটার লম্বা। এমন নিখুঁত প্রকৌশল যে, এটা পৃথিবীর প্রাচীনতম জল-নিয়ন্ত্রক কাঠামোগুলোর একটা। কিন্তু সবচেয়ে গর্বের কথা এটা নয়। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য — প্রায় ২,০০০ বছর পরেও এই বাঁধ আজও দিব্যি কাজ করছে, আজও তামিলনাড়ুর লক্ষ লক্ষ একর জমিতে সেচের জল পৌঁছে দিচ্ছে! এটা ভারতের প্রাচীনতম বাঁধ যা আজও ব্যবহৃত হয়। এমনকি ১৯শ শতকে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়াররা এই প্রাচীন বাঁধ দেখে এত মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তাঁরা কাছেই আরেকটা বাঁধ বানানোর সময় কারিকালানের এই নকশাকেই অনুসরণ করেছিলেন!
ইতিহাসের এই ছয়টা প্রকৌশল-বিস্ময়ের দিকে তাকালে একটা গভীর সত্যি বেরিয়ে আসে।
আমরা ভাবি, উন্নত প্রযুক্তি মানেই আধুনিক যন্ত্র। কিন্তু এই নির্মাণগুলো প্রমাণ করে — আসল প্রযুক্তি লুকিয়ে আছে মানুষের বুদ্ধিতে। যন্ত্র ছিল না, তবু এই মানুষগুলোর পর্যবেক্ষণ, হিসাব আর কল্পনাশক্তি ছিল অসাধারণ। আর সবচেয়ে বড় কথা — এরা শুধু নিজেদের জন্য বানায়নি। পিরামিড, মহাপ্রাচীর, কিংবা আমাদের কাল্লানাই — এসব গড়া হয়েছিল হাজার হাজার বছর টিকে থাকার জন্য। তাই আজও আমরা এদের সামনে দাঁড়িয়ে অতীতের সেই মানুষগুলোর মেধাকে সম্মান জানাতে পারি। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — সত্যিকারের ভালো কাজ সময়ের সীমানা পেরিয়ে বেঁচে থাকে। আর আমাদের কাল্লানাই বাঁধ তো জীবন্ত প্রমাণ — ২,০০০ বছর আগের একটা কাজ আজও মানুষের পেট ভরাচ্ছে। এর চেয়ে বড় গর্ব আর কী হতে পারে?
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা বিস্ময়ের মধ্যে কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল?
১. গিজার মহাপিরামিড — ২৩ লক্ষ পাথর
২. রোমান অ্যাকুইডাক্ট — জল ও কংক্রিটের জাদু
৩. চীনের মহাপ্রাচীর — হাতে গড়া হাজার কিমি
৪. মাচু পিচু — ছুরিও ঢোকে না
৫. পেত্রা — পাহাড় কেটে গড়া শহর
৬. কাল্লানাই — ১,৮০০ বছরের জীবন্ত বাঁধ
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৩৭
"ইতিহাসের ৬টি প্রাণী — যারা ডাইনোসরের যুগ থেকে আজও পৃথিবীতে টিকে আছে, প্রায় বদলায়নি। একটা মাছকে মানুষ ৬ কোটি বছর ধরে বিলুপ্ত ভেবেছিল — হঠাৎ একদিন জ্যান্ত ধরা পড়ল! আর আমাদের গঙ্গাতেও বাস করে ডাইনোসরের যুগের এক জীবন্ত সাক্ষী।"
কোটি কোটি বছর আগে যে প্রাণীরা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত, তাদের প্রায় সবাই আজ বিলুপ্ত। ডাইনোসররাও হারিয়ে গেছে। কিন্তু কিছু প্রাণী আছে, যারা সেই ভয়ংকর সব বিপর্যয়, সেই গণবিলুপ্তি — সব পেরিয়ে আজও টিকে আছে। আর সবচেয়ে অবাক করা — এরা লক্ষ লক্ষ বছরেও প্রায় বদলায়নি। এদের বলা হয় "জীবন্ত জীবাশ্ম" (Living Fossils)। আজ সেই ছয়টা প্রাণীর কথা বলব, যারা যেন অতীত থেকে উঠে আসা জীবন্ত টাইম মেশিন। শেষেরটা আমাদের ভারতের।
প্রথম — সিলাক্যান্থ। ৬ কোটি বছর পর "মাছ" ফিরে এল!
এই গল্পটা বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনাগুলোর একটা। সিলাক্যান্থ নামের এই মাছটাকে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, ডাইনোসরদের সাথেই — প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে — বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জীবাশ্ম (ফসিল) ছাড়া এর কোনো অস্তিত্বই কেউ কল্পনা করতে পারত না। আর তারপর, ১৯৩৮ সালে, ঘটল অবিশ্বাস্য ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে জেলেদের জালে ধরা পড়ল একটা জ্যান্ত সিলাক্যান্থ! গোটা বিজ্ঞানজগৎ স্তব্ধ হয়ে গেল — যে প্রাণীকে কোটি কোটি বছর ধরে মৃত ভাবা হচ্ছিল, সে দিব্যি বেঁচে আছে! একে বলা হয় "জীবন্ত ডাইনোসর মাছ" — অতীত থেকে ফিরে আসা এক জীবন্ত বিস্ময়।
দ্বিতীয় — কিং কাঁকড়া (হর্সশু ক্র্যাব)। ডাইনোসরেরও পূর্বপুরুষ!
সমুদ্রের ধারে দেখা এই অদ্ভুত হেলমেট-আকৃতির প্রাণীটা — হর্সশু ক্র্যাব — আসলে ডাইনোসরদেরও অনেক, অনেক আগে থেকে পৃথিবীতে আছে। প্রায় ৪৫ কোটি বছর! মানে, ডাইনোসর আসার আগেও এরা ছিল, ডাইনোসর হারিয়ে যাওয়ার পরেও এরা আছে। আর এত যুগেও এদের চেহারা প্রায় একইরকম রয়ে গেছে। কিন্তু এদের সবচেয়ে অবাক করা রহস্য এদের রক্তে। এদের রক্ত লাল নয়, নীল! আর সেই নীল রক্ত এতটাই বিশেষ যে, আজ ওষুধ আর টিকা নিরাপদ কিনা তা পরীক্ষা করতে বিজ্ঞানীরা এই রক্ত ব্যবহার করেন। ভাবুন — ৪৫ কোটি বছরের পুরোনো এক প্রাণী আজ আমাদের প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করছে।
তৃতীয় — নটিলাস। ৫০ কোটি বছরের ভাসমান শামুক।
সমুদ্রের গভীরে বাস করা এই সুন্দর প্যাঁচানো খোলসওয়ালা প্রাণীটা — নটিলাস। এটাও পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন প্রাণীদের একজন, প্রায় ৫০ কোটি বছরের পুরোনো বংশ। এর খোলসটা ভেতরে অনেকগুলো আলাদা কুঠুরিতে ভাগ করা। আর এই কুঠুরিগুলোই এর জাদু। কুঠুরিগুলোতে গ্যাস আর জল ভরে বা বের করে নটিলাস ঠিক একটা সাবমেরিনের মতো সমুদ্রে ওঠানামা করতে পারে! কোটি কোটি বছর আগের এই নিখুঁত প্রাকৃতিক নকশা আজও একইরকম কাজ করে। এর খোলসের নিখুঁত সর্পিল গঠন গণিতবিদদেরও মুগ্ধ করে।
চতুর্থ — টুয়াটারা। ডাইনোসরের যুগের শেষ সাক্ষী।
নিউজিল্যান্ডে বাস করা এই প্রাণীটাকে দেখতে অনেকটা টিকটিকি বা গিরগিটির মতো। কিন্তু এটা আসলে টিকটিকি নয় — এটা এক বিশেষ প্রাচীন সরীসৃপ গোষ্ঠীর একমাত্র টিকে থাকা সদস্য, যারা ডাইনোসরদের সাথেই পৃথিবীতে ঘুরত! প্রায় ২০ কোটি বছর আগের সেই গোষ্ঠীর আর সবাই বিলুপ্ত — শুধু এই টুয়াটারাই বেঁচে আছে। আর এর একটা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। এদের মাথার ওপরে একটা "তৃতীয় চোখ" থাকে (যদিও ছোটবেলার পর সেটা চামড়ায় ঢাকা পড়ে যায়)! এরা খুব ধীরে বড় হয় আর অবিশ্বাস্য রকম দীর্ঘজীবী — ১০০ বছরেরও বেশি বাঁচে। ডাইনোসরের যুগের এক জীবন্ত প্রতিনিধি, যে আজও আমাদের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
পঞ্চম — গিংকো গাছ। আগুনেও মরে না যে গাছ।
শুধু প্রাণী নয়, গাছও জীবন্ত জীবাশ্ম হতে পারে! গিংকো বিলোবা নামের এই গাছটা প্রায় ২০ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে আছে, আর প্রায় একইরকম রয়ে গেছে — ডাইনোসররাও হয়তো এর পাতা খেয়েছিল। কিন্তু এই গাছের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য গল্পটা হিরোশিমার। ১৯৪৫ সালে যখন হিরোশিমায় পরমাণু বোমা পড়ল, চারপাশ ছাই হয়ে গেল। সবাই ভেবেছিল, ওই এলাকায় আর কোনো প্রাণ ফিরবে না। অথচ পরের বছর, বিস্ফোরণস্থলের কাছের কয়েকটা পুড়ে যাওয়া গিংকো গাছ আবার নতুন কুঁড়ি মেলল! সেই গাছগুলো আজও বেঁচে আছে — জীবনের অদম্য শক্তির এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে। ২০ কোটি বছরের এই টিকে থাকা গাছ যেন বলে — জীবন থামে না।
ষষ্ঠ — ঘড়িয়াল। আমাদের ডাইনোসরের যুগের জীবন্ত সাক্ষী।
আর সবশেষে — আমাদের ও ভারতের নদীগুলোতেই বাস করে এক জীবন্ত প্রাচীন বিস্ময় — ঘড়িয়াল। কুমির পরিবারের এই অদ্ভুত সদস্যটিকে চেনা যায় তার লম্বা, সরু, নলের মতো মুখ আর তীক্ষ্ণ দাঁত দেখে — যা দিয়ে এরা জল থেকে মাছ ধরে। আর কুমির গোষ্ঠীর গল্পটাই অবিশ্বাস্য। কুমির-জাতীয় প্রাণীরা ছিল ডাইনোসরদের সমসাময়িক — তাদের জ্ঞাতি-ভাই বলা চলে। সেই ভয়ংকর গণবিলুপ্তিতে ডাইনোসররা মুছে গেল, কিন্তু কুমিররা টিকে গেল, আর প্রায় একইরকম চেহারা নিয়ে আজও বেঁচে আছে। ঘড়িয়াল সেই প্রাচীন বংশেরই এক গর্বিত প্রতিনিধি।।
ইতিহাসের এই ছয়টা জীবন্ত জীবাশ্মের দিকে তাকালে একটা গভীর সত্যি বেরিয়ে আসে। প্রকৃতি অবিশ্বাস্য রকম শক্তিশালী আর ধৈর্যশীল। কোটি কোটি বছরের ভয়ংকর সব বিপর্যয়, উল্কাপাত, বরফযুগ — সব পেরিয়েও এই প্রাণীরা টিকে গেছে। এরা যেন জীবন্ত প্রমাণ যে, জীবন কত অদম্য। আর সবচেয়ে অবাক করা কথা — এদের দেখলে আমরা আসলে অতীতকেই দেখি। একটা সিলাক্যান্থ বা ঘড়িয়ালের দিকে তাকানো মানে, কোটি কোটি বছর আগের সেই পৃথিবীর দিকে এক ঝলক তাকানো, যখন ডাইনোসররা রাজত্ব করত। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — যে প্রাণীরা প্রকৃতির এত বড় বড় বিপর্যয় পেরিয়ে এল, আজ তাদের অনেকেই বিপন্ন শুধু আমাদের কারণে। ডাইনোসর যাদের মারতে পারেনি, মানুষ যেন তাদের শেষ না করে দেয়। আমাদের ঘড়িয়ালকে বাঁচানোর দায়িত্বটা আমাদেরই।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা জীবন্ত জীবাশ্মের মধ্যে কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল?
১. সিলাক্যান্থ — ফিরে আসা "মৃত" মাছ
২. হর্সশু ক্র্যাব — নীল রক্তের প্রাণী
৩. নটিলাস — ভাসমান সাবমেরিন
৪. টুয়াটারা — তৃতীয় চোখের সরীসৃপ
৫. গিংকো গাছ — আগুনেও বাঁচে
৬. ঘড়িয়াল — গঙ্গার জীবন্ত সাক্ষী
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৩৮
"ইতিহাসের ৬টি পরিচিত জিনিস —
প্রথম — সাবান। প্রায় ৫,০০০ বছরের পুরোনো!
আমরা ভাবি সাবান বুঝি আধুনিক যুগের জিনিস। কিন্তু না! প্রায় ৪,৮০০ বছর আগে, প্রাচীন ব্যাবিলনের (মেসোপটেমিয়া) মানুষ সাবান বানাতে জানত। আর সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার — তাদের সেই সাবান বানানোর রেসিপি (পদ্ধতি) পর্যন্ত পাওয়া গেছে! মাটির ফলকে লিখে রাখা সেই রেসিপিতে বলা আছে, কীভাবে চর্বি আর ছাই (ক্ষার) মিশিয়ে সাবান বানাতে হয়। অর্থাৎ, পরিষ্কার থাকার এই চেষ্টা মানুষের হাজার হাজার বছরের পুরোনো। আজকের দামি বডিওয়াশের শিকড় লুকিয়ে আছে সেই প্রাচীন মাটির ফলকেই।
দ্বিতীয় — হাই হিল জুতো। আসলে পুরুষদের জন্য বানানো!
আজ হাই হিল মানেই আমরা ভাবি মেয়েদের ফ্যাশন। কিন্তু এই জুতোর ইতিহাস শুনলে আপনি চমকে যাবেন — কারণ হাই হিল প্রথমে বানানো হয়েছিল পুরুষদের জন্য, তাও যুদ্ধের কাজে! প্রাচীন পারস্যের অশ্বারোহী সৈন্যরা যখন ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করত, তখন তাদের পা যাতে ঘোড়ার রেকাবে (stirrup) ভালোভাবে আটকে থাকে, সেই জন্য তারা উঁচু হিলওয়ালা জুতো পরত। এরপর এই জুতো ইউরোপে পৌঁছল। সেখানে অভিজাত পুরুষরা (এমনকি রাজারাও) ক্ষমতা আর আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে হাই হিল পরা শুরু করলেন! অনেক পরে গিয়ে এটা মেয়েদের ফ্যাশন হয়ে ওঠে। ভাবুন — যে জুতো আজ ফ্যাশন শো-তে দেখি, তার জন্ম হয়েছিল যুদ্ধের ময়দানে।
তৃতীয় — ছাতা। প্রথমে রোদের জন্য, রাজার প্রতীক।
বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আমরা ছাতা ব্যবহার করি। কিন্তু প্রায় ৪,০০০ বছর আগে ছাতার জন্ম হয়েছিল একদম অন্য কারণে — বৃষ্টি নয়, রোদ থেকে বাঁচতে! প্রাচীন মিশর, চীন, ভারত — সব সভ্যতাতেই ছাতা (বা ছত্র) ছিল। আর এটা ছিল ক্ষমতা আর আভিজাত্যের প্রতীক। রাজা-মহারাজা বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মাথার ওপর ভৃত্যরা বড় বড় ছত্র ধরে থাকত — এটা ছিল সম্মান আর মর্যাদার চিহ্ন। আমাদের দেশেও রাজাদের মাথার ওপর "রাজছত্র" ধরার রীতি ছিল। সেই রাজকীয় প্রতীক আজ আমাদের সবার ব্যাগে — বৃষ্টির দিনের সঙ্গী।
চতুর্থ — চোখের কাজল (আইলাইনার)। ৬,০০০ বছরের পুরোনো, পুরুষরাও পরত।
চোখে কাজল বা আইলাইনার পরা — এটা প্রায় ৬,০০০ বছরের পুরোনো এক রীতি! প্রাচীন মিশরে এর শুরু। আর তখন এটা শুধু মেয়েরা নয়, পুরুষরাও সমানভাবে পরত। কিন্তু কারণটা শুধু সৌন্দর্য ছিল না। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করত, চোখের চারপাশে এই কালো কাজল (কোল) তীব্র মরুভূমির রোদ থেকে চোখকে বাঁচায়, আর চোখের নানা রোগ-সংক্রমণ থেকেও রক্ষা করে। অর্থাৎ, এটা ছিল একইসাথে সাজ আর সুরক্ষা। আমাদের যে ছোট্ট শিশুর চোখে কাজল পরিয়ে দিতেন, তার শিকড়ও কিন্তু সেই হাজার বছরের পুরোনো বিশ্বাসেই।
পঞ্চম — ভেন্ডিং মেশিন। ২,০০০ বছর আগে, পবিত্র পানি দিতে!
আজ আমরা ভেন্ডিং মেশিনে কয়েন বা কার্ড দিয়ে চিপস-কোল্ড ড্রিংক কিনি, আর ভাবি এটা বুঝি একদম আধুনিক প্রযুক্তি। কিন্তু পৃথিবীর প্রথম ভেন্ডিং মেশিন বানানো হয়েছিল প্রায় ২,০০০ বছর আগে! প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার এক বিজ্ঞানী, হিরো (Hero), এই অবিশ্বাস্য যন্ত্রটা বানিয়েছিলেন। আর সেটা কী দিত জানেন? পবিত্র পানি! মন্দিরে গিয়ে মানুষ একটা নির্দিষ্ট কয়েন ফেলত, আর সেই কয়েনের ওজনে একটা কৌশলে মেশিন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পবিত্র পানি বেরিয়ে আসত। ভাবুন — দু'হাজার বছর আগে, কোনো বিদ্যুৎ ছাড়াই, শুধু বুদ্ধি দিয়ে বানানো এমন এক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র! আজকের ভেন্ডিং মেশিনের ধারণাটা আসলে সেই প্রাচীন বিজ্ঞানীরই।
ষষ্ঠ — দাবা (চতুরঙ্গ)। পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার জন্ম ভারতে।
এমন একটা জিনিস, যা আজ গোটা পৃথিবী খেলে, যা বুদ্ধির খেলার রাজা। দাবা! আর এই দাবার জন্ম আমাদের ভারতে। প্রায় ১,৫০০ বছর আগে, গুপ্ত যুগে, ভারতে জন্ম নিয়েছিল এক খেলা — যার নাম ছিল "চতুরঙ্গ।" "চতুরঙ্গ" মানে সেনাবাহিনীর চারটি অংশ — হাতি, ঘোড়া, রথ আর পদাতিক সৈন্য। আর এই চারটে অংশই পরে দাবার ঘুঁটি হয়ে ওঠে — হাতি থেকে নৌকা/গজ, ঘোড়া থেকে নাইট, রথ থেকে রুক, আর পদাতিক থেকে বোড়ে (pawn)। ভারত থেকে এই খেলা গেল পারস্যে, সেখান থেকে আরব হয়ে গোটা ইউরোপে। আর সবচেয়ে মজার প্রমাণটা লুকিয়ে আছে একটা শব্দে — দাবায় আমরা যে "চেকমেট" (checkmate) বলি, সেটা এসেছে ফারসি শব্দ "শাহ মাত" থেকে, যার মানে "রাজা পরাজিত / অসহায়।"
ইতিহাসের এই ছয়টা পরিচিত জিনিসের দিকে তাকালে একটা মজার সত্যি বেরিয়ে আসে। আমরা যাকে ভাবি আধুনিক বা একদম সাধারণ, তার পেছনেও লুকিয়ে আছে হাজার হাজার বছরের গল্প। সাবান, ছাতা, কাজল — প্রতিটা জিনিসই আসলে আমাদের পূর্বপুরুষদের বুদ্ধি আর প্রয়োজনের ফসল। আর সবচেয়ে মজার কথা — অনেক জিনিসের আসল ইতিহাস আমরা যা ভাবি, তার একদম উল্টো! হাই হিল ছিল পুরুষ সৈন্যদের, ছাতা ছিল রাজার প্রতীক, ভেন্ডিং মেশিন ছিল মন্দিরের। ইতিহাস সত্যিই আমাদের নানাভাবে চমকে দেয়। হয়তো এটাই সবচেয়ে সুন্দর কথা — আমাদের চারপাশের সবকিছুরই একটা গল্প আছে। আর সেই গল্প জানলে, সাধারণ জিনিসগুলোও হঠাৎ অসাধারণ হয়ে ওঠে। আর দাবা প্রমাণ করে — শুধু জিনিস নয়, বুদ্ধির খেলাতেও ভারত পৃথিবীকে পথ দেখিয়েছে।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টার মধ্যে কোন জিনিসটার ইতিহাস শুনে আপনি সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন?
১. সাবান — ৫,০০০ বছরের পুরোনো
২. হাই হিল — আসলে পুরুষ সৈন্যদের
৩. ছাতা — রাজার প্রতীক
৪. কাজল — ৬,০০০ বছরের রীতি
৫. ভেন্ডিং মেশিন — মন্দিরের পবিত্র জল
৬. দাবা — ভারতের চতুরঙ্গ
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৩৯
"ইতিহাসের ৬টি রহস্যময় শহর — যা আজ সমুদ্রের নিচে ঘুমিয়ে আছে। একটা গোটা শহর এক ভয়ংকর ভূমিকম্পে নিমেষে সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছিল। আর আমাদের ভারতের উপকূলেও সমুদ্রের নিচে পাওয়া গেছে এক প্রাচীন নগরীর প্রাচীর — যাকে ঘিরে আছে শ্রীকৃষ্ণের কিংবদন্তি।"
ভাবুন তো — একটা গোটা শহর, যেখানে একসময় হাজার হাজার মানুষ থাকত, হাসত, স্বপ্ন দেখত... আজ সেটা সম্পূর্ণ সমুদ্রের নিচে, নীরব অন্ধকারে ঘুমিয়ে আছে। এটা কোনো সিনেমার গল্প নয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে সত্যিই এমন কিছু শহর আছে, যা একসময় ডাঙায় ছিল, আজ জলের অতলে। কোনোটা ভূমিকম্পে, কোনোটা সমুদ্রের ধীরে ধীরে গ্রাস করায়। আজ সেই ছয়টা ডুবে যাওয়া রহস্যময় শহরের কথা বলব। শেষেরটা আমাদের ভারতের, আর তার সাথে জড়িয়ে এক প্রিয় কিংবদন্তি।
প্রথম — থনিস-হেরাক্লেইওন (মিশর)। হারিয়ে যাওয়া বন্দর।
প্রাচীন মিশরে, ভূমধ্যসাগরের তীরে ছিল এক জমজমাট বন্দর-শহর — থনিস-হেরাক্লেইওন। আলেকজান্দ্রিয়ার আগে এটাই ছিল মিশরের সবচেয়ে বড় বন্দর। কিন্তু প্রায় ১,২০০ বছর আগে, ভূমিকম্প আর সমুদ্রের চাপে গোটা শহরটা ধীরে ধীরে জলের নিচে তলিয়ে যায়। তারপর হাজার বছর ধরে মানুষ ভুলেই গিয়েছিল এর কথা — অনেকে ভাবত এটা নিছক গল্প। কিন্তু ২০০০ সালে, ডুবুরি-প্রত্নতত্ত্ববিদরা সমুদ্রের তলায় খুঁজে পান এই হারানো শহর! বিশাল বিশাল মূর্তি, মন্দির, ডুবে যাওয়া জাহাজ — সব অবিকৃত অবস্থায় পড়ে আছে জলের নিচে। কিংবদন্তি যে সত্যি হতে পারে, এটা তার এক অসাধারণ প্রমাণ।
দ্বিতীয় — পাভলোপেত্রি (গ্রিস)। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো ডুবন্ত শহর।
গ্রিসের উপকূলে, সমুদ্রের অগভীর জলের নিচে লুকিয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য শহর — পাভলোপেত্রি। এটাকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো জানা ডুবন্ত শহরগুলোর একটা। কত পুরোনো? প্রায় ৫,০০০ বছর! আর সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার — শহরটা এত ভালোভাবে টিকে আছে যে, আজও জলের নিচে স্পষ্ট দেখা যায় এর গোটা নকশা। রাস্তাঘাট, বাড়ির ভিত, এমনকি সমাধি পর্যন্ত — সব যেন একটা ম্যাপের মতো সাজানো জলের তলায়। ৫,০০০ বছর আগের মানুষ কীভাবে শহর পরিকল্পনা করত, এই ডুবন্ত শহর তার এক জীবন্ত সাক্ষী।
তৃতীয় — পোর্ট রয়্যাল (জ্যামাইকা)। জলদস্যুদের ডুবে যাওয়া শহর।
ক্যারিবিয়ান সাগরের জ্যামাইকায় ছিল এক কুখ্যাত শহর — পোর্ট রয়্যাল। এটাকে বলা হতো "পৃথিবীর সবচেয়ে পাপী শহর," কারণ এটা ছিল জলদস্যু (পাইরেট)-দের আখড়া। ধন-সম্পদ, লুটের মাল, হইহুল্লোড়ে ভরা ছিল এই শহর। আর তারপর, ১৬৯২ সালের এক দিনে, ঘটল সেই ভয়ংকর ঘটনা। এক প্রচণ্ড ভূমিকম্প আঘাত হানল, আর তার সাথে এল সুনামি। নিমেষের মধ্যে শহরের একটা বিরাট অংশ মাটিসুদ্ধ সমুদ্রে তলিয়ে গেল! ঘড়ি পর্যন্ত নাকি সেই মুহূর্তে থেমে গিয়েছিল। আজ সেই জলদস্যুদের শহর সমুদ্রের নিচে ঘুমিয়ে — যেন এক মুহূর্তে থমকে যাওয়া ইতিহাস।
চতুর্থ — শি চেং / সিংহ শহর (চীন)। জলের নিচে নিখুঁত টাইম ক্যাপসুল।
চীনের এই শহরটার গল্প একটু আলাদা। শি চেং (সিংহ শহর) ছিল প্রায় ১,৩০০ বছরের পুরোনো এক সুন্দর শহর। কিন্তু এটা ভূমিকম্প বা সমুদ্রে তলিয়ে যায়নি। ১৯৫৯ সালে, একটা বাঁধ আর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বানানোর জন্য চীন সরকার ইচ্ছে করে গোটা শহরটাকে জলের নিচে ডুবিয়ে দেয়! আর এখানেই লুকিয়ে আছে এর জাদু। জলের প্রায় ৪০ মিটার নিচে থাকায়, শহরটা একদম নষ্ট হয়নি — বরং নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হয়ে গেছে! সুন্দর তোরণ, পাথরের কারুকাজ, দেয়াল — সব এখনো অবিকৃত, যেন সময় থেমে গেছে। তাই একে বলা হয় "চীনের আটলান্টিস" — জলের নিচে এক নিখুঁত টাইম ক্যাপসুল, যা ডুবুরিরা আজ অবাক হয়ে দেখেন।
পঞ্চম — আটলান্টিস। যে ডুবন্ত শহর হয়তো শুধুই কিংবদন্তি।
ডুবে যাওয়া শহরের কথা উঠলে সবার আগে যে নামটা মনে আসে — আটলান্টিস। কিন্তু এই গল্পটা বাকিগুলোর চেয়ে আলাদা, আর এখানেই একটা সত্যি বলা দরকার। প্রায় ২,৪০০ বছর আগে, গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর লেখায় প্রথম আটলান্টিসের কথা বলেন — এক অবিশ্বাস্য উন্নত, শক্তিশালী দ্বীপ-সভ্যতা, যা নাকি এক দিন-রাতের মধ্যে সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হলো — আজ পর্যন্ত আটলান্টিসের অস্তিত্বের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ আর বিজ্ঞানী মনে করেন, আটলান্টিস আসলে সত্যিকারের কোনো শহর ছিল না — বরং প্লেটোর একটা কল্পনা বা রূপক গল্প, যা দিয়ে তিনি একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন (অহংকার আর লোভের পরিণতি)। তাই বাকি পাঁচটা শহর যেখানে বাস্তব, আটলান্টিস সম্ভবত নিছকই এক কিংবদন্তি — যদিও হাজার বছর ধরে এই গল্প মানুষকে মুগ্ধ করে রেখেছে।
ষষ্ঠ — দ্বারকা (গুজরাট, ভারত)। সমুদ্রের নিচে আমাদের কিংবদন্তির নগরী।
গুজরাটের দ্বারকা। আমাদের প্রাচীন গ্রন্থ মহাভারতে বর্ণিত আছে এক অপূর্ব সুন্দর নগরীর কথা — দ্বারকা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রাজধানী। কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণের প্রয়াণের পর গোটা এই নগরী নাকি সমুদ্র গ্রাস করে নিয়েছিল। হাজার হাজার বছর ধরে অনেকে একে নিছক পৌরাণিক গল্প ভাবতেন। কিন্তু তারপর বিজ্ঞান এক চমক দিল। ভারতের সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্ববিদরা (NIO), বিশেষ করে ড. এস. আর. রাও-এর নেতৃত্বে, গুজরাটের দ্বারকা ও বেট দ্বারকার উপকূলে সমুদ্রের নিচে সত্যিই খুঁজে পেয়েছেন প্রাচীন পাথরের প্রাচীর, দুর্গের ভিত, আর ১২০টিরও বেশি প্রাচীন পাথরের নোঙর! অর্থাৎ, এই উপকূলে যে সত্যিই একটা প্রাচীন সমৃদ্ধ বন্দর-নগরী ছিল, আর তা সমুদ্রে তলিয়ে গিয়েছিল — এটা এখন বাস্তব, প্রমাণিত সত্য
ইতিহাসের এই ছয়টা ডুবন্ত শহরের দিকে তাকালে একটা গভীর সত্যি বেরিয়ে আসে। মানুষ যত বড় শহরই গড়ুক, যত শক্তিশালীই হোক — প্রকৃতির সামনে সে বড়ই ছোট। এক ভূমিকম্প, এক সমুদ্রের ঢেউ — নিমেষে গোটা সভ্যতা মুছে দিতে পারে। এই শহরগুলো যেন প্রকৃতির কাছে মানুষের নম্রতার এক নীরব শিক্ষা। আর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর কথা — সমুদ্রের নিচে আজও হয়তো এমন কত শহর, কত গল্প লুকিয়ে আছে, যার খোঁজ আমরা এখনো পাইনি। প্রতিটা ডুবুরি-অভিযান হয়তো নতুন কোনো হারানো ইতিহাসের দরজা খুলে দেবে।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা শহরের মধ্যে কোনটার রহস্য আপনাকে সবচেয়ে বেশি টানল?
১. থনিস-হেরাক্লেইওন — হারানো বন্দর
২. পাভলোপেত্রি — সবচেয়ে পুরোনো ডুবন্ত শহর
৩. পোর্ট রয়্যাল — জলদস্যুদের শহর
৪. শি চেং — জলের নিচে টাইম ক্যাপসুল
৫. আটলান্টিস — সম্ভবত কিংবদন্তি
৬. দ্বারকা — ভারতের ডুবন্ত নগরী
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৪০
"ইতিহাসের ৬টি মহান নদী — যাদের তীরে জন্ম নিয়েছিল পৃথিবীর প্রথম সভ্যতাগুলো। একটা নদীর বন্যা ছিল এত গুরুত্বপূর্ণ যে, একটা গোটা সভ্যতাকে বলা হতো 'সেই নদীর উপহার'। আর আমাদের যে নদীর নাম থেকে গোটা দেশটার নাম হয়েছে 'ইন্ডিয়া', তার তীরে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রাচীন শহর।"
মানুষ কেন এক জায়গায় থিতু হলো, শহর গড়ল, সভ্যতা গড়ল? উত্তরটা একটাই — জল। আর সেই জল এসেছিল নদী থেকে। পৃথিবীর প্রায় সব প্রাচীন সভ্যতাই জন্ম নিয়েছিল কোনো না কোনো মহান নদীর তীরে। নদী দিয়েছিল চাষের জল, খাবার, যাতায়াতের পথ — গোটা জীবন। আজ সেই ছয়টা মহান নদীর কথা বলব, যারা মানব সভ্যতার দোলনা হয়ে উঠেছিল। শেষেরটা আমাদের ভারতের গর্ব।
প্রথম — টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস (মেসোপটেমিয়া)। সভ্যতার দোলনা।
আজকের ইরাক অঞ্চলে বয়ে চলা দুটো নদী — টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিস। এই দুই নদীর মাঝের উর্বর জমিকে বলা হতো মেসোপটেমিয়া (অর্থ — "দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি")। আর এখানেই ঘটেছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কিছু "প্রথম।" পৃথিবীর প্রথম শহর, প্রথম লিখন পদ্ধতি, প্রথম চাকা, প্রথম লিখিত আইন — সবকিছুর জন্ম এখানেই। তাই এই অঞ্চলকে বলা হয় "সভ্যতার দোলনা" (Cradle of Civilization)। মানুষ এখানেই প্রথম শিখেছিল কীভাবে দল বেঁধে শহরে থাকতে হয়, লিখে রাখতে হয় হিসাব আর গল্প। আমাদের আজকের সভ্যতার বীজটা বোনা হয়েছিল এই দুই নদীর তীরেই। শেষ পাঁচটা নদী — নীল, হোয়াংহো, টাইবার, নাইজার, আর আমাদের সিন্ধু সহ পুরোটা এক জায়গায় শেষ করছি।
দ্বিতীয় — নীল নদ (মিশর)। নদীর উপহার।
পৃথিবীর দীর্ঘতম নদীগুলোর একটা — নীল নদ। আর এই নদীই গড়ে তুলেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর সভ্যতাগুলোর একটা — প্রাচীন মিশর। মিশর তো ছিল মরুভূমিতে ঘেরা। তাহলে সেখানে এত বড় সভ্যতা গড়ে উঠল কীভাবে? উত্তর — নীল নদের বন্যা। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে নীল নদ বন্যায় ভরে উঠত, আর সেই জল নেমে গেলে দু'পাশের জমিতে রেখে যেত উর্বর পলিমাটি। সেই মাটিতেই ফলত প্রচুর ফসল, আর সেই ফসলেই বেঁচে থাকত গোটা সভ্যতা। নীল নদ ছাড়া পিরামিড, ফারাও — কিছুই সম্ভব ছিল না। তাই প্রাচীন ইতিহাসবিদরা বলতেন — "মিশর হলো নীল নদের উপহার।"
তৃতীয় — হোয়াংহো / হলুদ নদী (চীন)। চীনা সভ্যতার দোলনা।
চীনের হোয়াংহো নদী (যার মানে "হলুদ নদী") — এই নদীর তীরেই জন্ম নিয়েছিল চীনা সভ্যতা। তাই একে বলা হয় "চীনা সভ্যতার দোলনা।" নদীর জল হলদেটে কেন? কারণ এই নদী প্রচুর হলুদ পলিমাটি বয়ে আনে, যা জমিকে দারুণ উর্বর করে তোলে। কিন্তু এই নদীর আরেকটা ভয়ংকর রূপও ছিল। মাঝে মাঝে এই নদীতে এমন ভয়াবহ বন্যা হতো যে, লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যেত, গ্রামের পর গ্রাম ভেসে যেত। তাই এর আরেকটা নাম ছিল — "চীনের দুঃখ" (China's Sorrow)। একই নদী একদিকে জীবনদাতা, আরেকদিকে ধ্বংসকারী — চীনা সভ্যতা গড়ে উঠেছিল এই নদীকে বশে আনার লড়াই করতে করতেই।
চতুর্থ — টাইবার নদী (রোম)। যে নদীর তীরে জন্ম এক সাম্রাজ্যের।
ইতালির টাইবার নদী — এর তীরেই গড়ে উঠেছিল ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর একটা, রোম। রোমের জন্ম নিয়ে এক বিখ্যাত কিংবদন্তিও আছে এই নদীকে ঘিরে। কথিত আছে, রোমুলাস ও রেমাস নামের দুই শিশু ভাইকে একটা ঝুড়িতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই টাইবার নদীতেই। পরে এক নেকড়ে নাকি তাদের রক্ষা করে, আর সেই রোমুলাসই গড়ে তোলে রোম শহর। কিংবদন্তি যাই হোক, বাস্তব হলো — এই নদী রোমকে দিয়েছিল জল, বাণিজ্যের পথ আর নিরাপত্তা। নদীপথে বাণিজ্য করেই রোম ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল গোটা ভূমধ্যসাগরের প্রভু।
পঞ্চম — নাইজার নদী (মালি, পশ্চিম আফ্রিকা)। সোনা আর জ্ঞানের নদী।
পশ্চিম আফ্রিকার নাইজার নদী — এর তীরেই গড়ে উঠেছিল মধ্যযুগের এক বিস্ময়কর সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য, মালি সাম্রাজ্য। এই নদীপথে হতো সোনা আর লবণের বিশাল বাণিজ্য, যা মালিকে করে তুলেছিল অবিশ্বাস্য রকমের ধনী। কত ধনী? এই সাম্রাজ্যের রাজা মানসা মুসাকে অনেকে ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী মানুষ বলে মনে করেন!
আর এই নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল টিম্বাকটু নামের বিখ্যাত শহর — যা শুধু বাণিজ্যের নয়, ছিল জ্ঞান আর শিক্ষারও এক বিশাল কেন্দ্র। হাজার হাজার পাণ্ডুলিপি, বড় বড় পণ্ডিত — সব ছিল এই মরুভূমির শহরে, নাইজার নদীর আশীর্বাদে। আফ্রিকা যে কখনোই শুধু "অন্ধকার মহাদেশ" ছিল না, এই নদী তার বড় প্রমাণ।
ষষ্ঠ — সিন্ধু নদ (ভারত)। যে নদীর নাম থেকেই "হিন্দু"।
আজ থেকে প্রায় ৫,০০০ বছর আগে, গড়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন আর উন্নত সভ্যতাগুলোর একটা — সিন্ধু সভ্যতা (হরপ্পা সভ্যতা)। আর এর উন্নতি শুনলে আজও অবাক হতে হয়। হরপ্পা আর মহেঞ্জোদারোর মতো শহরগুলো ছিল নিখুঁত পরিকল্পনায় গড়া — সোজা রাস্তা, পাকা ইটের বাড়ি। আর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য — তাদের ছিল পৃথিবীর প্রথম সুপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা (ড্রেনেজ সিস্টেম)! যখন পৃথিবীর অন্য অনেক জায়গার মানুষ এসব ভাবতেই পারেনি, তখন আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রতিটা বাড়িতে স্নানঘর আর ঢাকা নর্দমা বানিয়েছিল। আর সবচেয়ে গর্বের কথা?
এই "সিন্ধু" নদের নাম থেকেই এসেছে "হিন্দু" শব্দটা, ভারতের গোটা দেশের পরিচয়টাই জড়িয়ে আছে এই একটা নদীর সাথে। আর মজার ব্যাপার — সিন্ধু সভ্যতার লিপি (লেখা) আজও কেউ পড়তে পারেনি, রহস্য থেকে গেছে।
ইতিহাসের এই ছয়টা নদীর দিকে তাকালে একটা গভীর সত্যি বেরিয়ে আসে। নদী শুধু জলের ধারা নয়। নদী হলো সভ্যতার মা। মানুষ যেখানেই জল পেয়েছে, সেখানেই থিতু হয়েছে, শহর গড়েছে, স্বপ্ন দেখেছে। আজকের গোটা মানব সভ্যতার শিকড় লুকিয়ে আছে এই নদীগুলোর তীরে। আর সবচেয়ে বড় কথা — এই নদীগুলো হাজার হাজার বছর ধরে নীরবে মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে, আর বিনিময়ে কিছুই চায়নি। অথচ আজ আমরা সেই নদীগুলোকেই দূষিত করছি, ভুলে যাচ্ছি তাদের ঋণ। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — যে নদী আমাদের সভ্যতা দিয়েছে, তাকে রক্ষা করার দায়িত্বটাও আমাদের।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা নদীর গল্পের মধ্যে কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল?
১. টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস — সভ্যতার দোলনা
২. নীল নদ — মিশরের প্রাণ
৩. হোয়াংহো — চীনের দোলনা ও দুঃখ
৪. টাইবার — রোমের জন্মদাতা
৫. নাইজার — সোনা ও জ্ঞানের নদী
৬. সিন্ধু — ভারতের পরিচয়
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৪১
ইতিহাসের ৬টি প্রাচীন উৎসব — যা হাজার হাজার বছর ধরে আজও পালিত হয়। একটা উৎসবের সময় গোটা একটা দেশের মানুষ একসাথে বাড়ি ফেরে — পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানুষের চলাচল! আর আমাদের ভারতে এমন এক উৎসব হয়, যেখানে এত মানুষ জড়ো হয় যে, সেই ভিড় মহাকাশ থেকেও দেখা যায়।"
সাম্রাজ্য ভেঙে গেছে, রাজারা হারিয়ে গেছেন, ভাষা বদলে গেছে। কিন্তু কিছু উৎসব হাজার হাজার বছর পেরিয়ে আজও বেঁচে আছে। প্রতিটা উৎসবের পেছনে লুকিয়ে আছে এক একটা গল্প — প্রকৃতি, বিশ্বাস, কিংবা পূর্বপুরুষদের স্মৃতি। আজ সেই ছয়টা প্রাচীন উৎসবের কথা বলব, যা যুগের পর যুগ ধরে মানুষকে আনন্দে, বিশ্বাসে আর ঐক্যে বেঁধে রেখেছে। শেষেরটা আমাদের ভারতের গর্ব — পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জনসমাগম।
প্রথম — নওরোজ (পারস্যের নববর্ষ)। বসন্তের ৩,০০০ বছরের উৎসব।
প্রায় ৩,০০০ বছরেরও বেশি আগে, প্রাচীন পারস্যে (আজকের ইরান) শুরু হয়েছিল এক উৎসব — নওরোজ। এর মানে "নতুন দিন।" এটা পালিত হয় বসন্তের শুরুতে, যখন প্রকৃতি নতুন করে জেগে ওঠে। ঠিক যেদিন দিন আর রাত সমান হয় (বসন্ত বিষুব), সেদিন এই নববর্ষ উদযাপিত হয়। আজও ইরান থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত প্রায় ৩০ কোটি মানুষ এই উৎসব পালন করেন — পরিবার একসাথে হয়, বিশেষ একটা টেবিল সাজানো হয় নতুন জীবনের প্রতীক দিয়ে। হাজার হাজার বছর ধরে একইভাবে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো — ভাবা যায়?
দ্বিতীয় — চীনা নববর্ষ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানুষের চলাচল।
চীনা নববর্ষ (বসন্ত উৎসব) হাজার হাজার বছরের পুরোনো এক উৎসব। আর এর সাথে জড়িয়ে আছে এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। এই উৎসবের সময় চীনের কোটি কোটি মানুষ, যে যেখানেই থাকুক, নিজের পরিবারের কাছে বাড়ি ফেরার জন্য ছুটে যায়। এর ফলে তৈরি হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বার্ষিক মানুষের চলাচল (migration)! কয়েক সপ্তাহে কোটি কোটি মানুষ ট্রেনে, বাসে, প্লেনে বাড়ি ফেরে। লাল রঙ, লণ্ঠন, ড্রাগন নাচ — চারদিক ভরে ওঠে আনন্দে। কথিত আছে, এই লাল রঙ আর শব্দ দিয়ে "নিয়ান" নামের এক পৌরাণিক দানবকে তাড়ানো হতো। সেই বিশ্বাস থেকে শুরু হওয়া উৎসব আজ গোটা পৃথিবীতে পালিত হয়।
তৃতীয় — প্রাচীন অলিম্পিক গেমস (গ্রিস)। ২,৮০০ বছরের ক্রীড়া উৎসব।
আজ আমরা যে অলিম্পিক দেখি, তার শিকড় লুকিয়ে আছে প্রায় ২,৮০০ বছর আগের প্রাচীন গ্রিসে। খ্রিস্টপূর্ব ৭৭৬ সাল থেকে, গ্রিসের অলিম্পিয়া নামের জায়গায় প্রতি চার বছর অন্তর বসত এই বিশাল ক্রীড়া উৎসব। এটা ছিল দেবরাজ জিউসের সম্মানে এক পবিত্র উৎসব। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য — অলিম্পিকের সময় গ্রিসের যুদ্ধরত নগর-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হতো, যাতে সবাই নিরাপদে খেলায় যোগ দিতে পারে! প্রায় হাজার বছর ধরে এই উৎসব চলেছিল। আর তারপর হাজার বছরেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর, ১৮৯৬ সালে আবার চালু হয় আধুনিক অলিম্পিক — সেই প্রাচীন উৎসবেরই পুনর্জন্ম, যা আজ গোটা পৃথিবীকে এক করে।
চতুর্থ — ডে অফ দ্য ডেড (মেক্সিকো)। মৃতদের স্মরণে রঙিন উৎসব।
মৃত্যু নিয়ে আমরা সাধারণত শোক করি। কিন্তু মেক্সিকোর মানুষ মৃত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে এক রঙিন, আনন্দময় উৎসবের মধ্য দিয়ে — "ডে অফ দ্য ডেড" (মৃতের দিন)। এই উৎসবের শিকড় প্রাচীন আজটেক সভ্যতায়। তাদের বিশ্বাস ছিল, বছরের এই বিশেষ সময়ে মৃত প্রিয়জনদের আত্মা ফিরে আসে পরিবারের কাছে। তাই দুঃখ নয়, আনন্দ দিয়েই তাদের স্বাগত জানানো হয়। ঘর সাজানো হয় গাঁদা ফুলে, প্রিয়জনের ছবি আর প্রিয় খাবার রাখা হয়, রঙিন কঙ্কালের সাজে চারদিক ভরে ওঠে। হাজার বছরের পুরোনো এই উৎসব মৃত্যুকে ভয় নয়, বরং জীবনের একটা অংশ হিসেবে দেখতে শেখায় — যা সত্যিই এক সুন্দর ভাবনা।
পঞ্চম — পাসওভার (ইহুদি উৎসব)। ৩,০০০ বছরের স্বাধীনতার স্মরণ।
ইহুদি ধর্মের সবচেয়ে পুরোনো আর গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোর একটা — পাসওভার (Passover)। এটা পালিত হয়ে আসছে প্রায় ৩,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। এই উৎসব এক মহান ঘটনার স্মরণে — প্রাচীনকালে মিশরে দাসত্বে আবদ্ধ ইহুদিরা কীভাবে মুক্তি পেয়ে স্বাধীনতার পথে যাত্রা করেছিল। প্রতি বছর পরিবারের সবাই একসাথে বসে এক বিশেষ ভোজ (সেডার) করে। সেই ভোজের প্রতিটা খাবারের একটা করে অর্থ আছে — কোনোটা দাসত্বের কষ্টের প্রতীক, কোনোটা মুক্তির আনন্দের। হাজার হাজার বছর ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম, একই গল্প বলে, একইভাবে এই উৎসব পালন করে নিজেদের ইতিহাস আর পরিচয়কে বাঁচিয়ে রেখেছে — এটাই এই উৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ষষ্ঠ — কুম্ভমেলা (ভারত)। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জনসমাগম।
কুম্ভমেলা — মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শান্তিপূর্ণ জনসমাগম। হাজার হাজার বছরের পুরোনো এই উৎসব হয় ভারতের পবিত্র নদীগুলোর তীরে — যেমন প্রয়াগরাজে, গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতীর সঙ্গমে। গ্রহ-নক্ষত্রের বিশেষ অবস্থান অনুযায়ী এর সময় ঠিক হয়। কিন্তু এর আসল বিস্ময় এর সংখ্যায়। ২০২৫ সালের মহাকুম্ভ ছিল ১৪৪ বছরে একবারের এক বিরল যোগ। আর সেই উৎসবে, মাত্র ৪৫ দিনে, ভারত আর গোটা পৃথিবী থেকে এসেছিলেন আনুমানিক ৪০ থেকে ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ! ভাবুন — এই সংখ্যাটা আমেরিকার গোটা জনসংখ্যারও বহুগুণ বেশি। এত বিশাল এই জনসমুদ্র যে, সেই ভিড় নাকি মহাকাশ থেকেও স্পষ্ট দেখা যায়! কোনো জোরজবরদস্তি নয়, শুধু বিশ্বাস আর ঐক্যের টানে কোটি কোটি মানুষ এক জায়গায় — পৃথিবীতে এমন দৃশ্য আর কোথাও নেই।
ইতিহাসের এই ছয়টা উৎসবের দিকে তাকালে একটা সুন্দর সত্যি বেরিয়ে আসে। উৎসব মানুষকে জোড়ে। হাজার হাজার বছর ধরে, যখন সবকিছু বদলে গেছে, তখনও এই উৎসবগুলো মানুষকে একসাথে এনেছে — পরিবারকে, সমাজকে, গোটা একটা জাতিকে। আর সবচেয়ে বড় কথা — প্রতিটা উৎসবই আসলে একটা সুতো, যা আজকের আমাদের সাথে হাজার বছর আগের পূর্বপুরুষদের বেঁধে রাখে। আমরা যখন কোনো উৎসব পালন করি, তখন আসলে আমাদের পূর্বপুরুষদের বিশ্বাস, আনন্দ আর ঐতিহ্যকেই বাঁচিয়ে রাখি।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা উৎসবের মধ্যে কোনটা আপনার সবচেয়ে অবাক লাগল?
১. নওরোজ — বসন্তের নববর্ষ
২. চীনা নববর্ষ — সবচেয়ে বড় চলাচল
৩. প্রাচীন অলিম্পিক — ক্রীড়া উৎসব
৪. ডে অফ দ্য ডেড — মৃতদের স্মরণ
৫. পাসওভার — স্বাধীনতার উৎসব
৬. কুম্ভমেলা — পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জনসমাগম
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৪২
" ইতিহাসের ৬টি প্রাচীন মহাশহর — যা তাদের যুগে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও সমৃদ্ধ। একটা শহর জলের মাঝখানে এক দ্বীপে গড়া ছিল, দেখে বিদেশিরা অবাক হয়ে গিয়েছিল। আর আমাদের ভারতের এক শহর ছিল এত বিশাল যে, এক গ্রিক রাষ্ট্রদূত তার বর্ণনা লিখতে গিয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন — ৫৭০টি বুরুজ, ৬৪টি দরজা!"
আজকের নিউইয়র্ক, টোকিও, মুম্বই — এসব মহানগর দেখে আমরা মুগ্ধ হই। কিন্তু ভাবুন তো, হাজার হাজার বছর আগেও পৃথিবীতে এমন কিছু শহর ছিল, যা সেই যুগের মানুষের কাছে ছিল ঠিক ততটাই বিস্ময়কর। লক্ষ লক্ষ মানুষ, বিশাল প্রাসাদ, ব্যস্ত বাজার, পরিকল্পিত রাস্তা — কোনো আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই। আজ সেই ছয়টা প্রাচীন মহাশহরের কথা বলব, যারা তাদের যুগে ছিল গোটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর সমৃদ্ধ। শেষেরটা আমাদের ভারতের গর্ব।
প্রথম — রোম (প্রাচীন ইতালি)। পৃথিবীর প্রথম "দশ লক্ষ" মানুষের শহর।
প্রায় ২,০০০ বছর আগে, রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী রোম ছিল প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহর। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, রোমই সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম শহর, যার জনসংখ্যা প্রায় দশ লক্ষে (এক মিলিয়ন) পৌঁছেছিল! আর এই বিশাল শহরকে চালানোর প্রযুক্তিও ছিল অবিশ্বাস্য।
দূর পাহাড় থেকে শহরে জল আনার জন্য ছিল বিশাল জলপথ (অ্যাকুইডাক্ট), ছিল পাকা রাস্তা, নর্দমা ব্যবস্থা, আর কলোসিয়ামের মতো বিনোদনকেন্দ্র যেখানে হাজার হাজার মানুষ একসাথে বসতে পারত। সেই যুগে এমন একটা সুপরিকল্পিত মহানগর সত্যিই এক বিস্ময়।
দ্বিতীয় — চাং-আন (প্রাচীন চীন)। সিল্ক রোডের ঝলমলে কেন্দ্র।
প্রায় ১,৩০০ বছর আগে, চীনের থাং রাজবংশের রাজধানী চাং-আন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর জমজমাট শহরগুলোর একটা। এই শহরটা ছিল বিখ্যাত "সিল্ক রোড" (রেশম পথ)-এর পূর্ব প্রান্ত — যেখানে এসে মিশত গোটা এশিয়ার বাণিজ্য। ফলে এটা হয়ে উঠেছিল এক আন্তর্জাতিক শহর। পারস্য, ভারত, মধ্য এশিয়া — নানা দেশের বণিক, পণ্ডিত, সন্ন্যাসী এসে ভিড় করতেন এখানে। শহরটা ছিল নিখুঁত গ্রিড পদ্ধতিতে (দাবার ছকের মতো) সাজানো, জনসংখ্যা প্রায় দশ লক্ষ। নানা সংস্কৃতি, নানা ভাষার মানুষের মিলনস্থল — সেই যুগের এক সত্যিকারের "বিশ্বনগরী।"
তৃতীয় — বাগদাদ (প্রাচীন ইরাক)। জ্ঞানের রাজধানী।
প্রায় ১,২০০ বছর আগে, আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহর। একে গড়া হয়েছিল একটা নিখুঁত গোলাকার নকশায়, তাই একে বলা হতো "গোল শহর" (Round City)। কিন্তু বাগদাদের আসল গৌরব ছিল তার সংখ্যায় নয়, তার জ্ঞানে। এই শহরেই ছিল বিখ্যাত "House of Wisdom" (জ্ঞানের ঘর)। এটা ছিল সেই যুগের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জ্ঞানকেন্দ্র — যেখানে গ্রিক, ভারতীয়, পারসিক সব সভ্যতার বই অনুবাদ করা হতো, আর গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসায় নতুন নতুন আবিষ্কার হতো। আমরা আজ যে "অ্যালজেব্রা" (বীজগণিত) পড়ি, তার অনেকটাই এই বাগদাদের পণ্ডিতদের কাজ। এটাই ছিল "ইসলামি স্বর্ণযুগ"-এর প্রাণকেন্দ্র।
চতুর্থ — কনস্টান্টিনোপল। দুই মহাদেশের সংযোগস্থলে এক দুর্ভেদ্য নগরী।
আজকের তুরস্কের ইস্তানবুল — একসময় এর নাম ছিল কনস্টান্টিনোপল। আর প্রায় হাজার বছর ধরে এটাই ছিল মধ্যযুগীয় পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী, সবচেয়ে সুরক্ষিত শহর। এর অবস্থানটাই ছিল অনন্য — ঠিক ইউরোপ আর এশিয়া মহাদেশের সংযোগস্থলে। তাই গোটা পৃথিবীর বাণিজ্য এসে মিলত এখানে।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের এই রাজধানী ছিল বিশাল প্রাচীর দিয়ে এত নিখুঁতভাবে সুরক্ষিত যে, শত শত বছর চেষ্টা করেও একে জয় করা ছিল কঠিন। আর এর সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল হায়া সোফিয়া — এক বিশাল গম্বুজওয়ালা স্থাপত্য, যা দেখে আজও মানুষ অবাক হয়।
পঞ্চম — তেনোচতিৎলান (প্রাচীন মেক্সিকো)। পানির ওপর গড়া স্বপ্নের শহর।
এই শহরটা সবচেয়ে অবিশ্বাস্য। প্রায় ৫০০-৬০০ বছর আগে, মেক্সিকোর আজটেক সভ্যতা তাদের রাজধানী তেনোচতিৎলান গড়েছিল এক হ্রদের মাঝখানে, একটা দ্বীপের ওপর! জলের মাঝখানে গড়া এই শহরে যাওয়ার জন্য ছিল লম্বা লম্বা সেতু-রাস্তা (causeway), আর শহরের ভেতরে ছিল ভেনিসের মতো খাল। তারা পানির ওপরেই ভাসমান বাগান (chinampas) বানিয়ে চাষ করত! এই শহর ছিল এত পরিচ্ছন্ন, এত সুপরিকল্পিত আর বিশাল (জনসংখ্যা প্রায় দু-লক্ষ) যে, স্প্যানিশ সৈন্যরা প্রথম এটা দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনি — তারা ভেবেছিল এ যেন কোনো স্বপ্ন বা জাদুর শহর! সেই তেনোচতিৎলানের ওপরেই আজ গড়ে উঠেছে মেক্সিকো সিটি।
ষষ্ঠ — পাটলিপুত্র (প্রাচীন ভারত)। আজকের পাটনা, প্রাচীনকালে যার নাম ছিল পাটলিপুত্র — মহান মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজধানী। প্রায় ২,৩০০ বছর আগে, সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দরবারে এসেছিলেন এক গ্রিক রাষ্ট্রদূত — মেগাস্থিনিস। আর এই শহর দেখে তিনি এতটাই অবাক হয়েছিলেন যে, তিনি এর বিস্তারিত বর্ণনা লিখে রেখে গিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, গঙ্গার তীরে গড়া এই বিশাল শহর প্রায় ১৪ কিলোমিটার লম্বা! গোটা শহরকে ঘিরে ছিল এক প্রকাণ্ড কাঠের প্রাচীর — আর সেই প্রাচীরে ছিল ৫৭০টি পাহারা-বুরুজ আর ৬৪টি বিশাল দরজা! চারপাশে গভীর পরিখা। ভেতরে চন্দ্রগুপ্তের রাজপ্রাসাদ ছিল এতটাই জাঁকজমকপূর্ণ যে, মেগাস্থিনিস বলেছিলেন এটা পারস্যের রাজপ্রাসাদকেও হার মানায় — সোনা-রুপোর থাম, অপূর্ব বাগান। প্রায় ৪ লক্ষ মানুষের এই শহর সেই যুগে রোম আর আলেকজান্দ্রিয়ার সমকক্ষ ছিল।ট
ইতিহাসের এই ছয়টা মহাশহরের দিকে তাকালে একটা গভীর সত্যি বেরিয়ে আসে। আমরা ভাবি, উন্নত শহর, নগর-পরিকল্পনা, জল-নিকাশি ব্যবস্থা — এসব বুঝি আধুনিক যুগের জিনিস। কিন্তু এই শহরগুলো প্রমাণ করে, হাজার হাজার বছর আগেও মানুষ এমন সব মহানগর গড়েছিল, যা সেই যুগের বিচারে ছিল অবিশ্বাস্য। আর সবচেয়ে বড় কথা — প্রতিটা মহান সভ্যতার একটা করে এমন মহানগর ছিল, যা ছিল তার গর্বের প্রতীক। রোম, বাগদাদ, চাং-আন, কিংবা পাটলিপুত্র — এই শহরগুলো শুধু ইট-পাথর ছিল না, ছিল গোটা একটা সভ্যতার স্বপ্ন আর কৃতিত্বের জীবন্ত রূপ। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — সভ্যতা আসে আর যায়, কিন্তু মানুষের গড়ার ক্ষমতা, স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা চিরন্তন।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা শহরের মধ্যে কোনটা দেখার ইচ্ছা আপনার সবচেয়ে বেশি?
১. রোম — দশ লক্ষ মানুষের শহর
২. চাং-আন — সিল্ক রোডের কেন্দ্র
৩. বাগদাদ — জ্ঞানের রাজধানী
৪. কনস্টান্টিনোপল — দুর্ভেদ্য নগরী
৫. তেনোচতিৎলান — জলের ওপর শহর
৬. পাটলিপুত্র — ভারতের গর্ব
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৩
" ইতিহাসের ৫টি বই — যা লেখা হওয়ার পর পৃথিবী আর আগের মতো রইল না। একটা বই মানুষকে শিখিয়েছিল আকাশের গ্রহ থেকে গাছের আপেল — সব একই নিয়মে চলে। আর আমাদের ভারতের একটি প্রাচীন গ্রন্থ প্রভাবিত করেছিল গান্ধী থেকে শুরু করে পরমাণু বোমার জনক পর্যন্ত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের।"
একটা তলোয়ার একটা যুদ্ধ জিততে পারে। কিন্তু একটা বই? একটা বই বদলে দিতে পারে গোটা মানুষের চিন্তাভাবনা, গোটা একটা সভ্যতা। ইতিহাসে এমন কিছু বই আছে, যা লেখা হওয়ার পর পৃথিবীটা আর কখনো আগের মতো রইল না।এই বইগুলো মানুষকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল — নিজেকে, প্রকৃতিকে, গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে।
প্রথম — নিউটনের "প্রিন্সিপিয়া" (১৬৮৭)। যে বই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ম লিখে দিল।
আজ থেকে প্রায় ৩৪০ বছর আগে, আইজ্যাক নিউটন লিখলেন এক বই, যা গোটা বিজ্ঞানের ভিত বদলে দিল — "প্রিন্সিপিয়া।" এই বইয়ে তিনি দেখালেন এক অবিশ্বাস্য সত্যি। গাছ থেকে যে নিয়মে একটা আপেল মাটিতে পড়ে, আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রও ঠিক সেই একই নিয়মে চলে! মানে, পৃথিবী আর আকাশ আলাদা কোনো জাদুর নিয়মে চলে না — গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চলে একই গাণিতিক নিয়মে (মাধ্যাকর্ষণ ও গতির সূত্র)। এই একটা বই মানুষকে শেখাল, প্রকৃতিকে অঙ্ক দিয়ে বোঝা যায়। আজকের রকেট থেকে স্যাটেলাইট — সব দাঁড়িয়ে আছে নিউটনের এই বইয়ের ওপর।
দ্বিতীয় — ডারউইনের "অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিজ" (১৮৫৯)। যে বই প্রাণের গল্প বদলে দিল।
চার্লস ডারউইন বছরের পর বছর পৃথিবীর নানা প্রান্ত ঘুরে, হাজার হাজার প্রাণী-উদ্ভিদ পর্যবেক্ষণ করে একটা বই লিখলেন। এই বইয়ে তিনি এক যুগান্তকারী ধারণা তুলে ধরলেন — বিবর্তন (evolution)। তিনি দেখালেন, পৃথিবীর সব প্রাণী হঠাৎ আজকের রূপে আসেনি — বরং লক্ষ লক্ষ বছর ধরে, ধীরে ধীরে, পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে নিতে তারা বদলেছে। এই বই জীববিজ্ঞানের গোটা ভিত্তিটাই বদলে দিল। প্রাণ কীভাবে এল, মানুষ কীভাবে এল — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার পথ পুরোপুরি পাল্টে গেল। আধুনিক জীববিজ্ঞান, চিকিৎসা, জিনতত্ত্ব — সবকিছুর মূলে আজ এই একটা বই।
তৃতীয় — ইউক্লিডের "এলিমেন্টস" (~২৩০০ বছর আগে)। যে বই ২,০০০ বছর ধরে পৃথিবীকে অঙ্ক শেখাল।
প্রাচীন গ্রিসের গণিতজ্ঞ ইউক্লিড লিখেছিলেন এক বই — "এলিমেন্টস।" আর এই বইটা এমন এক রেকর্ড গড়েছে, যা আজও অটুট। জ্যামিতি (geometry) — ত্রিভুজ, বৃত্ত, রেখা, কোণ — এসবের নিয়মগুলো তিনি এই বইয়ে এত নিখুঁত যুক্তি দিয়ে সাজিয়েছিলেন যে, তা প্রায় নিখুঁত। ফল কী হলো? এই একটাই বই প্রায় ২,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে গোটা পৃথিবীতে গণিত শেখার প্রধান বই হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে! স্কুলে আপনি যে জ্যামিতি পড়েছেন, তার ভিত্তিটা এই ইউক্লিডেরই গড়া। যুক্তি দিয়ে কীভাবে ধাপে ধাপে কোনো কিছু প্রমাণ করতে হয় — এই গোটা পদ্ধতিটাই মানুষ শিখেছে এই বই থেকে।
চতুর্থ — "আঙ্কল টমস কেবিন" (১৮৫২)। যে উপন্যাস দাসপ্রথার বিরুদ্ধে আগুন জ্বালাল।
এটা কোনো বিজ্ঞানের বই নয় — একটা উপন্যাস। কিন্তু এই গল্পের বই গোটা একটা দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তখন আমেরিকায় চলছে নিষ্ঠুর দাসপ্রথা। হ্যারিয়েট বিচার স্টো নামের এক লেখিকা একটা উপন্যাস লিখলেন, যেখানে তুলে ধরলেন ক্রীতদাসদের মানবিক যন্ত্রণা — তাদের কষ্ট, তাদের ভেঙে যাওয়া পরিবার। এই বই পড়ে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ প্রথমবার বুঝল দাসপ্রথা কতটা অমানবিক। বইটা এতটাই আলোড়ন তুলেছিল যে, এটা আমেরিকায় দাসপ্রথা-বিরোধী আন্দোলনে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল — অনেকে বলেন, এটা গৃহযুদ্ধের পথ তৈরিতেও সাহায্য করেছিল। কথিত আছে, খোদ প্রেসিডেন্ট লিংকন লেখিকার সাথে দেখা করে রসিকতা করে বলেছিলেন, এই ছোট্ট মহিলাই নাকি এত বড় যুদ্ধটা বাধিয়ে দিয়েছেন! একটা গল্পের বই কীভাবে ইতিহাস বদলে দিতে পারে — এ তার প্রমাণ।
পঞ্চম — "সাইলেন্ট স্প্রিং" (১৯৬২)। যে বই পরিবেশ বাঁচানোর আন্দোলন শুরু করল।
বিংশ শতকে মানুষ যখন অন্ধভাবে কীটনাশক (পেস্টিসাইড) ব্যবহার করছিল, তখন কেউ ভাবছিল না এর ভয়ংকর পরিণতি নিয়ে। তখন রাচেল কারসন নামের এক বিজ্ঞানী-লেখিকা লিখলেন এক সাহসী বই — "সাইলেন্ট স্প্রিং" (নীরব বসন্ত)। নামটাই ছিল ভয়ংকর — এমন এক বসন্ত, যেখানে আর পাখির ডাক শোনা যায় না, কারণ বিষে সব পাখি মরে গেছে। তিনি প্রমাণ করলেন, এই কীটনাশকগুলো শুধু পোকা নয়, ধ্বংস করছে পাখি, প্রকৃতি, এমনকি মানুষের স্বাস্থ্যও। এই বই গোটা পৃথিবীর মানুষের চোখ খুলে দিল। এখান থেকেই শুরু হলো আধুনিক পরিবেশ আন্দোলন — প্রকৃতিকে রক্ষা করার এই যে ভাবনা আজ আমাদের মধ্যে, তার অনেকটাই শুরু হয়েছিল এই একটা বই থেকে।
১. নিউটনের প্রিন্সিপিয়া — বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ম
২. ডারউইনের অরিজিন অফ স্পিসিজ — প্রাণের গল্প
৩. ইউক্লিডের এলিমেন্টস — ২,০০০ বছরের অঙ্ক
৪. আঙ্কল টমস কেবিন — দাসপ্রথার বিরুদ্ধে
৫. সাইলেন্ট স্প্রিং — পরিবেশ আন্দোলন
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৪
ইতিহাসের রহস্য ইতিহাসের ৬টি প্রাণী — যারা একসময় পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াত, আজ চিরতরে হারিয়ে গেছে। একটা পাখি ছিল কোটি কোটি, আকাশ ঢেকে উড়ত — মাত্র কয়েক দশকে একটাও বাকি রইল না। আর আমাদের বাংলার বুক থেকেও হারিয়ে গেছে এমন এক অপূর্ব সুন্দর পাখি, যার শেষ স্মৃতিটুকুও মুছে যেতে বসেছে।"
একটা সময় ছিল, যখন এই প্রাণীগুলো পৃথিবীতে দিব্যি বেঁচে ছিল। মানুষ এদের দেখেছে, ছুঁয়েছে, ছবি এঁকেছে। আর আজ? এরা শুধুই স্মৃতি। জাদুঘরের কাচের বাক্সে রাখা কঙ্কাল, কিংবা পুরোনো কিছু ছবি — এটুকুই বাকি। আর সবচেয়ে কষ্টের কথা — এদের বেশিরভাগই হারিয়ে গেছে আমাদের মানুষেরই কারণে।
প্রথম — ডোডো। বিলুপ্তির প্রতীক।
পৃথিবীর ইতিহাসে "বিলুপ্তি" শব্দটার সাথে সবচেয়ে বেশি যে প্রাণীর নাম জড়িয়ে আছে — ডোডো। এটা ছিল একটা উড়তে-না-পারা পাখি, যে শান্তিতে বাস করত মরিশাস দ্বীপে। কোনো শত্রু ছিল না, তাই ভয় পেতেও ভুলে গিয়েছিল। তারপর এল মানুষ। নাবিকরা দ্বীপে পা রাখার পর, সহজ শিকার এই নিরীহ পাখিটা মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। আজ "ডোডোর মতো মৃত" (dead as a dodo) — এই কথাটাই বিলুপ্তির প্রতীক হয়ে গেছে। একটা গোটা প্রজাতি, যাকে আমরা শুধু ছবিতেই দেখি।
দ্বিতীয় — ম্যামথ। বরফযুগের দৈত্য।
হাজার হাজার বছর আগে, বরফে ঢাকা পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াত এক বিশাল প্রাণী — উলি ম্যামথ। অনেকটা হাতির মতো, কিন্তু গায়ে ছিল ঘন লোম আর বিশাল বাঁকানো দাঁত। বরফযুগ শেষ হওয়ার পর, জলবায়ু বদল আর মানুষের শিকারের চাপে এরা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। কিন্তু ম্যামথের একটা ব্যাপার আজও বিজ্ঞানীদের অবাক করে। সাইবেরিয়ার বরফের নিচে আজও মাঝে মাঝে আস্ত ম্যামথের দেহ পাওয়া যায় — হাজার হাজার বছর ধরে বরফে জমে থাকায় তা প্রায় অবিকৃত! এত ভালো অবস্থায় যে, বিজ্ঞানীরা আজ স্বপ্ন দেখছেন — হয়তো একদিন বিজ্ঞানের সাহায্যে ম্যামথকে আবার ফিরিয়ে আনা যাবে।
তৃতীয় — প্যাসেঞ্জার পিজিয়ন। কোটি কোটি থেকে শূন্য।
এই গল্পটা সবচেয়ে মর্মান্তিক, আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা। প্যাসেঞ্জার পিজিয়ন নামের এই পাখিটা একসময় ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পাখি। কত বেশি? এদের ঝাঁক যখন আকাশ দিয়ে উড়ত, তখন নাকি কয়েক ঘণ্টা — এমনকি কয়েক দিন — ধরে সূর্যের আলো ঢেকে যেত! সংখ্যায় এরা ছিল কয়েকশো কোটি। ভাবুন — কয়েকশো কোটি পাখি। এদের কি কখনো শেষ হতে পারে? কিন্তু মানুষ এদের এত নির্বিচারে শিকার করল যে, মাত্র কয়েক দশকে এই কোটি কোটি পাখি কমতে কমতে শূন্যে এসে ঠেকল। ১৯১৪ সালে, "মার্থা" নামের শেষ প্যাসেঞ্জার পিজিয়নটা একটা চিড়িয়াখানায় মারা গেল — আর তার সাথেই গোটা প্রজাতিটা চিরতরে মুছে গেল। কোটি কোটি থেকে শূন্য — মানুষ কী করতে পারে, এটা তার এক ভয়ংকর প্রমাণ।
চতুর্থ — তাসমানিয়ান টাইগার। যার ভিডিও আজও আছে, প্রাণীটা নেই।
অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ায় বাস করত এক অদ্ভুত প্রাণী — তাসমানিয়ান টাইগার (থাইলাসিন)। দেখতে অনেকটা কুকুরের মতো, কিন্তু পিঠে বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ, আর ক্যাঙারুর মতো থলি। এটা ছিল একইসাথে অদ্ভুত আর রহস্যময়। মানুষের ভয় আর শিকারে এরাও হারিয়ে গেল। সবচেয়ে করুণ — ১৯৩৬ সালে, একটা চিড়িয়াখানায় শেষ তাসমানিয়ান টাইগারটা মারা যায়। আর সবচেয়ে গা-ছমছমে ব্যাপার হলো, সেই শেষ প্রাণীটার সাদাকালো ভিডিও ফুটেজ আজও আছে — খাঁচার ভেতর একা পায়চারি করছে পৃথিবীর শেষ থাইলাসিন। প্রাণীটা নেই, অথচ তার চলমান ছবিটা রয়ে গেছে। আজও মাঝে মাঝে কেউ কেউ দাবি করে এদের দেখেছে, কিন্তু কোনো প্রমাণ মেলেনি।
পঞ্চম — স্টেলারের সামুদ্রিক গরু। মাত্র ২৭ বছরে শেষ।
১৭৪১ সালে, বরফঠান্ডা সমুদ্রে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন এক বিশাল, শান্ত সামুদ্রিক প্রাণী — স্টেলারের সামুদ্রিক গরু (সি কাউ)। প্রায় ৯ মিটার লম্বা, ৮-১০ টন ওজনের এক কোমল দৈত্য, যে শান্তিতে সমুদ্রের আগাছা খেয়ে বাঁচত। এরা ছিল ধীরগতির আর নিরীহ — মানুষকে ভয়ই পেত না। আর সেটাই হলো এদের কাল। ধীরগতির বলে এদের শিকার করা ছিল ভীষণ সহজ। নাবিকরা মাংস আর চর্বির জন্য এদের এমন নির্বিচারে মারল যে — আবিষ্কারের মাত্র ২৭ বছরের মধ্যে, ১৭৬৮ সালের মধ্যেই গোটা প্রজাতিটা পৃথিবী থেকে মুছে গেল! ভাবুন — একটা প্রাণী আবিষ্কার হওয়ার পর, মানুষ তাকে চিনে ওঠার আগেই শেষ করে দিল।
ষষ্ঠ — গোলাপি-মাথা হাঁস। বাংলার বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া এক সৌন্দর্য। আমাদের কষ্ট।
আর সবশেষে — একসময় আমাদের বাংলা, বিহার, অসম আর গাঙ্গেয় সমভূমির জলাভূমি-বিল-হাওরে ঘুরে বেড়াত এক অপূর্ব সুন্দর পাখি — গোলাপি-মাথা হাঁস (pink-headed duck)। নামেই বোঝা যায় এর সৌন্দর্য। গাঢ় বাদামি শরীর, আর তার ওপর উজ্জ্বল গোলাপি রঙের মাথা ও গলা — প্রকৃতির এক অসাধারণ সৃষ্টি। গোটা পৃথিবীতে এমন রঙের হাঁস আর ছিল না। কিন্তু এই সৌন্দর্যই কাল হলো। নির্বিচারে শিকার আর জলাভূমি ধ্বংসের ফলে এই পাখি দ্রুত কমতে থাকল। ১৯৪৯ সালের পর থেকে জ্যান্ত গোলাপি-মাথা হাঁস দেখেনি। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক কথা — কথিত আছে, পৃথিবীর শেষ গোলাপি-মাথা হাঁসটি মারা গিয়েছিল সুদূর ইংল্যান্ডে, নিজের চেনা জলাভূমি, নিজের দেশ থেকে বহু দূরে, এক খাঁচার ভেতরে। আজও কিছু মানুষ আশায় বুক বেঁধে মায়ানমারের দুর্গম জলাভূমিতে এই পাখি খুঁজে বেড়ায় — যদি কোথাও কয়েকটা বেঁচে থাকে!
ইতিহাসের এই ছয়টা প্রাণীর দিকে তাকালে মনটা ভারী হয়ে যায়।
এরা কেউ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা যায়নি। এদের বেশিরভাগকেই পৃথিবী থেকে মুছে দিয়েছি আমরা — মানুষ। আমাদের লোভ, আমাদের অসচেতনতা, আমাদের শিকার। কোটি কোটি প্যাসেঞ্জার পিজিয়ন, কোমল সামুদ্রিক গরু, আমাদের গোলাপি-মাথা হাঁস — সবাই মুছে গেছে আমাদের হাতেই। আর সবচেয়ে কষ্টের কথা — একটা প্রজাতি একবার হারিয়ে গেলে, তাকে আর কোনোদিন ফিরিয়ে আনা যায় না। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে গড়ে ওঠা একটা প্রাণ, চিরতরে শেষ। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — আজও আমাদের চারপাশে এমন কত প্রাণী আছে, যারা বিলুপ্তির পথে (যেমন আমাদের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার)। গোলাপি-মাথা হাঁসের ভুল থেকে যদি আমরা শিখি, তাহলে হয়তো বাকিদের বাঁচাতে পারব। প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্বটা আমাদেরই।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টার মধ্যে কোনটার হারিয়ে যাওয়া আপনাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিল? আ
১. ডোডো — বিলুপ্তির প্রতীক
২. উলি ম্যামথ — বরফযুগের দৈত্য
৩. প্যাসেঞ্জার পিজিয়ন — কোটি থেকে শূন্য
৪. তাসমানিয়ান টাইগার — শেষ ভিডিওটা আছে
৫. স্টেলারের সামুদ্রিক গরু — ২৭ বছরে শেষ
৬. গোলাপি-মাথা হাঁস — বাংলার হারানো সৌন্দর্য
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৫
"ইতিহাসের ৬টি রহস্যময় গোপন সমাজ — যাদের নিয়ে আজও মানুষ ফিসফিস করে। একটা সমাজ নাকি গোপনে গোটা পৃথিবী চালায় — কিন্তু আসল সত্যিটা একদম আলাদা! আ
"গোপন সমাজ" — শব্দটা শুনলেই মনের মধ্যে রহস্য আর রোমাঞ্চ জেগে ওঠে। কিন্তু এদের নিয়ে যত গল্প শোনা যায়, তার কতটা সত্যি আর কতটা বানানো? আজ ইতিহাসের সেই ছয়টা বিখ্যাত গোপন সমাজের আসল কথা বলব — আর ভেঙে দেব এদের নিয়ে ছড়িয়ে থাকা কিছু ভুয়া ধারণাও। শেষেরটা আমাদের বাংলার গর্ব।
প্রথম — ফ্রিম্যাসন। পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত গোপন সমাজ।
"গোপন সমাজ" বলতে যাদের নাম সবার আগে আসে — ফ্রিম্যাসন। এদের শুরু আসলে মধ্যযুগের রাজমিস্ত্রিদের (পাথর কাটার কারিগর) সংগঠন থেকে। পরে এটা হয়ে ওঠে এক ভ্রাতৃত্বমূলক সমাজ, নিজস্ব গোপন আচার আর প্রতীক (যেমন বিখ্যাত "স্কোয়ার অ্যান্ড কম্পাস") নিয়ে। এদের নিয়ে সবচেয়ে বড় গুজব — এরা নাকি গোপনে গোটা পৃথিবী চালায়! কিন্তু আসল সত্যিটা অনেক সাধারণ। ফ্রিম্যাসনরা মূলত একটা সামাজিক আর দাতব্য সংগঠন — যেখানে সদস্যরা একে অপরকে সাহায্য করেন, সমাজসেবা করেন। জর্জ ওয়াশিংটন থেকে মোৎসার্ট — বহু বিখ্যাত মানুষ এর সদস্য ছিলেন। গোপন আচার থাকায় রহস্য তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু "পৃথিবী শাসন করা"-র দাবির কোনো প্রমাণ নেই।
দ্বিতীয় — ইলুমিনাতি। যে মিথ আসলটার চেয়ে হাজার গুণ বড়।
আজ ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি যে গোপন সমাজের নাম শোনা যায় — ইলুমিনাতি। বলা হয়, এরা নাকি পর্দার আড়াল থেকে গোটা পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি, এমনকি গান-সিনেমা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু আসল ইতিহাসটা শুনলে আপনি অবাক হবেন। আসল ইলুমিনাতি তৈরি হয়েছিল ১৭৭৬ সালে, জার্মানির বাভারিয়ায়, অ্যাডাম ভাইসহাউপ্ট নামের এক অধ্যাপকের হাতে। এদের উদ্দেশ্য ছিল কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুক্তি আর জ্ঞানের আলো ছড়ানো। কিন্তু সবচেয়ে মজার কথা — এই সংগঠনটা মাত্র এক দশকও টেকেনি! ১৭৮৫ সালের মধ্যেই সরকার এটাকে নিষিদ্ধ করে পুরোপুরি ভেঙে দেয়। মানে, "ইলুমিনাতি গোপনে আজও পৃথিবী চালাচ্ছে" — এই দাবিটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, কারণ আসল সংগঠনটাই ২৪০ বছর আগে শেষ হয়ে গেছে! এটা আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্র-মিথগুলোর একটা।
তৃতীয় — নাইট টেম্পলার। লুকানো ধনের কিংবদন্তি।
মধ্যযুগে ক্রুসেডের সময় জন্ম নেওয়া নাইট টেম্পলাররা ছিল এক যোদ্ধা-সন্ন্যাসী দল — যাদের কাজ ছিল তীর্থযাত্রীদের রক্ষা করা। কিন্তু সময়ের সাথে এরা হয়ে উঠল অবিশ্বাস্য ধনী আর ক্ষমতাশালী — এক ধরনের প্রাচীন ব্যাংকের মতো। আর তারপরই ঘটল রহস্যময় ঘটনা। ১৩০৭ সালের ১৩ই অক্টোবর, এক শুক্রবার (এখান থেকেই নাকি "শুক্রবার ১৩ তারিখ" অপয়া হওয়ার কুসংস্কার), ফ্রান্সের রাজা হঠাৎ একযোগে সব টেম্পলারকে গ্রেপ্তার করলেন, আর সংগঠনটা ভেঙে দেওয়া হলো। কিন্তু তাদের বিপুল ধন-সম্পদ কোথায় গেল, কেউ জানে না! এই রহস্য থেকেই জন্ম নিয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তি — কেউ বলে তারা গোপন ধন লুকিয়ে রেখেছিল, কেউ বলে তারা পবিত্র "হোলি গ্রেইল" পাহারা দিত, আবার কেউ বলে তারা আজও গোপনে টিকে আছে।
চতুর্থ — হাশশাশিন (অ্যাসাসিন)। পাহাড়ের আড়ালের গুপ্তঘাতকরা।
আজ "অ্যাসাসিন" (গুপ্তঘাতক) শব্দটা আমরা সবাই চিনি। কিন্তু জানেন কি, এই শব্দটাই এসেছে মধ্যযুগের এক রহস্যময় গোপন দল থেকে? প্রায় ৯০০ বছর আগে, পারস্যের (আজকের ইরান) দুর্গম পাহাড়ি দুর্গে (যেমন বিখ্যাত আলামুত দুর্গ) ঘাঁটি গেড়েছিল এই দল, যার নেতা ছিলেন হাসান-ই-সাব্বাহ। এরা সংখ্যায় কম ছিল, কিন্তু এদের কৌশল ছিল ভয়ংকর। বিশাল সেনাবাহিনীর সাথে সরাসরি যুদ্ধ না করে, এরা শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের গোপনে, নিখুঁতভাবে হত্যা করত — যা গোটা শত্রুশিবিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিত। এদের নিয়ে নানা লোমহর্ষক কিংবদন্তিও আছে — যেমন "পাহাড়ের বৃদ্ধ" নাকি অনুগত যোদ্ধাদের স্বর্গের লোভ দেখিয়ে মৃত্যুর জন্য তৈরি করতেন। (তবে এর অনেক গল্পই সম্ভবত অতিরঞ্জিত, মার্কো পোলোর যুগে রং চড়ানো।)
পঞ্চম — রোজিক্রুসিয়ান। যে সমাজ হয়তো কখনো ছিলই না!
এই গোপন সমাজটা সবচেয়ে অদ্ভুত — কারণ এটা সত্যিই ছিল কি না, তা নিয়েই আজও তর্ক চলে!
প্রায় ৪০০ বছর আগে, জার্মানিতে হঠাৎ কিছু রহস্যময় লেখা (ম্যানিফেস্টো) ছড়িয়ে পড়ল। তাতে দাবি করা হলো — গোপনে এক জ্ঞানী, আলোকিত সাধুদের ভ্রাতৃত্ব আছে, যারা প্রকৃতি আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গোপন রহস্য জানে। গোটা ইউরোপ এই গোপন দলটাকে খুঁজে বের করার জন্য পাগল হয়ে উঠল। কিন্তু মজার ব্যাপার — কেউ কখনো এই দলের কোনো প্রমাণ পেল না! আজ অনেক গবেষক মনে করেন, এই "গোপন সমাজ"টা হয়তো আসলে ছিলই না — হয়তো এটা ছিল কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর একটা রূপক বা মজার ছল, যা ঘটনাচক্রে গোটা ইউরোপকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ভাবুন — একটা সমাজ, যার অস্তিত্বই হয়তো কল্পনা, অথচ তা নিয়ে শত শত বছর মানুষ গবেষণা করেছে!
১. ফ্রিম্যাসন — বিখ্যাত, তবু ভুল বোঝা
২. ইলুমিনাতি — মিথ আসলের চেয়ে বড়
৩. নাইট টেম্পলার — লুকানো ধনের রহস্য
৪. হাশশাশিন — পাহাড়ের গুপ্তঘাতক
৫. রোজিক্রুসিয়ান — যে সমাজ হয়তো ছিলই না
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৬
"ইতিহাসের ৫জন মহান ভারতীয় সম্রাট — যাঁদের শাসনে ভারতবর্ষ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ। এ বাংলা থেকে উঠে আসা একটা সাম্রাজ্য একসময় গোটা ভারতবর্ষ শাসন করত আর ছিল এশিয়ার জ্ঞানের রাজধানী।"
আমরা প্রায়ই শুনি রোমান সাম্রাজ্য, কিংবা আলেকজান্ডারের গল্প। কিন্তু আমাদের নিজেদের ভারতেও জন্মেছিলেন এমন কিছু সম্রাট, যাঁদের সাম্রাজ্য ছিল অকল্পনীয় বিশাল, যাঁদের শাসনে ভারতবর্ষ ছিল গোটা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী আর শক্তিশালী দেশগুলোর একটা। অথচ আমরা অনেকেই তাঁদের কথা ভুলে বসে আছি।
প্রথম — চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। ভারতের প্রথম মহান সাম্রাজ্যের স্রষ্টা।
আজ থেকে প্রায় ২,৩০০ বছর আগে, ছোট ছোট রাজ্যে ভাগ হয়ে থাকা ভারতকে প্রথম একটা সূত্রে বাঁধলেন এক তরুণ — চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। তাঁর পাশে ছিলেন এক অসাধারণ বুদ্ধিজীবী-উপদেষ্টা — চাণক্য (কৌটিল্য)। এই গুরু-শিষ্য মিলে গড়ে তুললেন ভারতের প্রথম বিশাল সাম্রাজ্য — মৌর্য সাম্রাজ্য। তিনি শুধু ভারতকে একত্র করেননি — আলেকজান্ডারের রেখে যাওয়া গ্রিক শক্তিকেও পিছু হটতে বাধ্য করেছিলেন। প্রায় গোটা উপমহাদেশ এসে গিয়েছিল এক শাসনের নিচে। ভারতের ইতিহাসে এত বড় ঐক্য এর আগে কেউ দেখেনি।
দ্বিতীয় — সম্রাট অশোক। যাঁর প্রতীক আজও আমাদের পতাকায়।
চন্দ্রগুপ্তের নাতি অশোক মৌর্য সাম্রাজ্যকে নিয়ে গেলেন তার সর্বোচ্চ শিখরে — প্রায় গোটা ভারতবর্ষ তাঁর অধীনে। কিন্তু কলিঙ্গের ভয়ংকর যুদ্ধের রক্তপাত দেখে তাঁর হৃদয় বদলে গেল। তিনি অস্ত্র ছেড়ে বেছে নিলেন অহিংসা আর শান্তির পথ। তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করলেন, আর সেটা ছড়িয়ে দিলেন গোটা এশিয়ায়। আর সবচেয়ে গর্বের কথা — সেই হাজার হাজার বছর আগের অশোকের প্রতীকগুলোই আজ স্বাধীন ভারতের পরিচয়। সারনাথের সেই চারমুখী সিংহস্তম্ভ আজ আমাদের জাতীয় প্রতীক, আর তাঁর "অশোক চক্র" শোভা পাচ্ছে আমাদের জাতীয় পতাকার ঠিক মাঝখানে। একজন সম্রাট, যিনি আড়াই হাজার বছর পরেও আমাদের পরিচয়ের সাথে মিশে আছেন।
তৃতীয় — সমুদ্রগুপ্ত। "ভারতের নেপোলিয়ন।"
গুপ্ত সাম্রাজ্যের সম্রাট সমুদ্রগুপ্তকে ইতিহাসবিদরা ডাকেন "ভারতের নেপোলিয়ন" নামে। কারণ তাঁর সামরিক অভিযানের সাফল্য ছিল অবিশ্বাস্য — একের পর এক রাজ্য জয় করে তিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যকে বিশাল করে তুলেছিলেন। কিন্তু তিনি শুধু যোদ্ধা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ সংগীতশিল্পীও — তাঁর সময়ের মুদ্রায় তাঁকে বীণা বাজানোর ভঙ্গিতে দেখা যায়! আর তাঁর সময়টাই ছিল ভারতের সেই বিখ্যাত "স্বর্ণযুগ" (গোল্ডেন এজ) — যখন বিজ্ঞান, গণিত, সাহিত্য, শিল্প — সব ক্ষেত্রেই ভারত পৌঁছেছিল চূড়ায়। এই গুপ্ত যুগেই তো আর্যভট্টের মতো প্রতিভারা জন্মেছিলেন।
চতুর্থ — সম্রাট আকবর। ঐক্য আর সহিষ্ণুতার শাসক।
মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনে ভারত হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী আর শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর একটা। কিন্তু আকবরকে "মহান" বলা হয় শুধু তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যের জন্য নয়। বলা হয় তাঁর শাসনদক্ষতা আর দূরদর্শিতার জন্য। তিনি বুঝেছিলেন, এত বিশাল আর বৈচিত্র্যময় একটা দেশকে এক রাখতে হলে দরকার সহিষ্ণুতা। তাই তিনি ভিন্ন ধর্মের মানুষের ওপর থেকে বাড়তি কর তুলে দিয়েছিলেন, রাজদরবারে সব ধর্মের পণ্ডিতদের নিয়ে আলোচনা করতেন, আর চেয়েছিলেন সবাই মিলেমিশে শান্তিতে থাকুক ("সুলহ-ই-কুল" — সবার সাথে শান্তি)। তাঁর দরবার ছিল প্রতিভায় ঝলমলে — বীরবল, তানসেন, টোডরমলের মতো "নবরত্ন।" প্রশাসন, রাজস্ব ব্যবস্থা, শিল্প-সংস্কৃতি — সব ক্ষেত্রেই তিনি এক নতুন উচ্চতা গড়েছিলেন।
পঞ্চম —পাল সাম্রাজ্য। বাংলা থেকে উঠে আসা এক মহাশক্তি।
আজ থেকে প্রায় ১,৩০০ বছর আগের কথা। বাংলা তখন বিশৃঙ্খলায়, অরাজকতায় ভরা — একটা শক্ত শাসকের অভাবে দেশ ভেঙে পড়ছে। তখন এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। বাংলার মানুষ আর সর্দাররা মিলে একজনকে রাজা হিসেবে নির্বাচিত করলেন — গোপাল। ভাবুন, রাজতন্ত্রের যুগে, মানুষ ভোট দিয়ে নিজেদের রাজা বেছে নিচ্ছে! এভাবেই বাংলার মাটিতে জন্ম নিল পাল সাম্রাজ্য। আর তারপর যা হলো, তা ইতিহাস। গোপালের উত্তরসূরি ধর্মপাল আর দেবপালের হাত ধরে, বাংলার এই সাম্রাজ্য ছড়িয়ে পড়ল বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু করে বিহার, ওড়িশা, অসম, নেপাল হয়ে সুদূর উত্তর ভারত পর্যন্ত! এক বাঙালি সাম্রাজ্য তখন গোটা উত্তর ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু পালদের সবচেয়ে বড় কীর্তি যুদ্ধে নয় — জ্ঞানে। তাঁরা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে বাঁচিয়ে তুললেন, গড়ে তুললেন বিক্রমশীলার মতো আরেকটা মহান বিশ্ববিদ্যালয়। আর তার টানে তিব্বত, চীন, এমনকি সুদূর জাভা-সুমাত্রা থেকে পণ্ডিতরা ছুটে আসতেন বাংলায় জ্ঞান নিতে! সেই যুগে আমাদের বাংলা ছিল গোটা এশিয়ার জ্ঞানের রাজধানী। বিক্রমশীলা থেকেই মহাপণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে গিয়ে বৌদ্ধধর্মকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন। ভাবুন — একসময় গোটা এশিয়া জ্ঞানের জন্য তাকিয়ে থাকত আমাদের বাংলার দিকে।
অশোকের অহিংসা, সমুদ্রগুপ্তের শিল্প, আকবরের সহিষ্ণুতা, পালদের জ্ঞানচর্চা — এঁরা প্রমাণ রেছিলেন, সত্যিকারের মহান শাসক শুধু রাজ্য জয় করেন না, একটা সভ্যতা গড়ে তোলেন। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — আমাদের ইতিহাস দারিদ্র্য আর পরাধীনতার নয়। আমাদের ইতিহাস গৌরবের, জ্ঞানের, শক্তির। সেই গৌরবটা জানা আর মনে রাখাটাই আমাদের নতুন প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এদের মধ্যে কার গল্প আপনাকে সবচেয়ে বেশি গর্বিত করল? আর বাংলার পাল সাম্রাজ্যের কথা — যে বাংলা একসময় ছিল গোটা এশিয়ার জ্ঞানের রাজধানী — এটা কি আপনি আগে জানতেন?
১. চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য — প্রথম মহান সাম্রাজ্য
২. সম্রাট অশোক — যাঁর প্রতীক আজ পতাকায়
৩. সমুদ্রগুপ্ত — ভারতের নেপোলিয়ন
৪. রাজরাজ চোল — সমুদ্র জয় করা সম্রাট
৫. সম্রাট আকবর — ঐক্য ও সহিষ্ণুতা
৬. পাল সাম্রাজ্য — বাংলার গর্ব, এশিয়ার জ্ঞানকেন্দ্র
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৭
" ইতিহাসের ৬ জন বিস্ময়কর প্রতিভা — যাঁরা একইসাথে বহু আলাদা ক্ষেত্রে সেরা হয়ে উঠেছিলেন। একজন মানুষ একই সাথে ছিলেন শিল্পী, বিজ্ঞানী আর প্রকৌশলী।
আমরা বেশিরভাগ মানুষ সারাজীবনে একটা জিনিসে ভালো হতেই হিমশিম খাই। অথচ ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ ছিলেন, যাঁরা একইসাথে পাঁচ-সাতটা আলাদা ক্ষেত্রে — বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত — সবেতেই সেরা হয়ে উঠেছিলেন। যেন একটা মানুষের শরীরে কয়েকটা প্রতিভা একসাথে বাস করত। এঁদের বলা হয় "পলিম্যাথ" — বহুমুখী প্রতিভা। আজ সেই ছয়জন বিস্ময়কর মানুষের কথা বলব, যাঁদের দেখলে মনে হয় — একটা জীবনে এত কিছু করা কীভাবে সম্ভব! শেষজন আমাদের নিজেদের গর্ব।
প্রথম — লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। একাই একটা যুগ।
"পলিম্যাথ" শব্দটা শুনলেই যাঁর নাম সবার আগে আসে — লিওনার্দো দা ভিঞ্চি।
বেশিরভাগ মানুষ তাঁকে চেনে এক মহান চিত্রশিল্পী হিসেবে (মোনালিসা তাঁরই আঁকা)। কিন্তু সেটা তাঁর প্রতিভার একটা ছোট্ট অংশ মাত্র। তিনি একইসাথে ছিলেন শিল্পী, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, শারীরবিদ আর উদ্ভাবক। ৫০০ বছরেরও আগে, তিনি তাঁর নোটবুকে এঁকে রেখেছিলেন ওড়ার যন্ত্র (হেলিকপ্টারের মতো), প্যারাশুট, ট্যাঙ্কের নকশা — যা সেই যুগে কেউ কল্পনাও করতে পারত না। মানুষের শরীরের ভেতরটা বোঝার জন্য তিনি নিখুঁত ছবি এঁকেছিলেন। একটা মানুষ একইসাথে এতগুলো ক্ষেত্রে এত এগিয়ে — তিনিই বহুমুখী প্রতিভার চিরন্তন প্রতীক।
দ্বিতীয় — অ্যারিস্টটল। জ্ঞানের সব শাখার জনক।
আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, প্রাচীন গ্রিসে এক মানুষ ছিলেন, যাঁকে বলা যায় "চলমান বিশ্বকোষ" — অ্যারিস্টটল। তিনি শুধু একজন দার্শনিক ছিলেন না। তিনি লিখেছিলেন প্রায় সব বিষয়ে। যুক্তিবিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, নীতিশাস্ত্র, রাজনীতি, কাব্য, তির্বিজ্ঞান — কিছুই বাদ যায়নি। এত বিষয়ে তাঁর চিন্তা এতটাই গভীর ছিল যে, এর পরের প্রায় ২০০০ বছর ধরে গোটা পৃথিবীর শিক্ষা দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর লেখার ওপর। আধুনিক অনেক বিজ্ঞানের ভিত্তিটাই তিনি একা গড়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি তিনি ছিলেন স্বয়ং আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের শিক্ষক।
তৃতীয় — ইবন সিনা (আভিসেনা)। প্রাচ্যের জ্ঞান-সম্রাট।
ইসলামি স্বর্ণযুগের পারস্যে জন্ম নেওয়া ইবন সিনা ছিলেন এমন এক প্রতিভা, যাঁকে পশ্চিমা দুনিয়া চিনত "আভিসেনা" নামে। তিনি একইসাথে ছিলেন চিকিৎসক, দার্শনিক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর গণিতজ্ঞ। তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তি ছিল চিকিৎসাশাস্ত্রে। তাঁর লেখা চিকিৎসার বই ("ক্যানন অফ মেডিসিন") এতটাই নিখুঁত ছিল যে, প্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ পর্যন্ত — কয়েকশো বছর ধরে এটাই ছিল ডাক্তারি শেখার প্রধান বই! একজন মানুষ, যিনি একসাথে চিকিৎসা, দর্শন আর বিজ্ঞানে গোটা পৃথিবীকে পথ দেখিয়েছিলেন।
চতুর্থ — বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন। রাষ্ট্রনায়ক থেকে বিজ্ঞানী।
আমেরিকার বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের জীবনটা দেখলে অবাক হতে হয় — একটা জীবনে এত ভূমিকা! তিনি ছিলেন আমেরিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, একজন রাষ্ট্রনায়ক আর কূটনীতিক।
আবার একইসাথে তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞানী আর উদ্ভাবক। বজ্রপাত যে আসলে বিদ্যুৎ — এটা প্রমাণ করতে তিনি ঝড়ের মধ্যে ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন, আর আবিষ্কার করেছিলেন বজ্র-নিরোধক দণ্ড (লাইটনিং রড), যা আজও বাড়িঘরকে বাজ থেকে বাঁচায়। তিনি বাইফোকাল চশমাও আবিষ্কার করেছিলেন। রাজনীতি, বিজ্ঞান, লেখালেখি — সবেতেই তিনি ছিলেন সেরা।
পঞ্চম — হিলডেগার্ড অফ বিনজেন। মধ্যযুগের বিস্ময়কর নারী।
এই নামটা হয়তো অনেকেই শোনেননি, কিন্তু তাঁর প্রতিভা শুনলে অবাক হবেন। প্রায় ৯০০ বছর আগের মধ্যযুগ — যখন নারীদের জ্ঞানচর্চার সুযোগই প্রায় ছিল না — তখন জার্মানির এক মঠের সন্ন্যাসিনী ছিলেন হিলডেগার্ড। আর তিনি একসাথে যা যা করেছিলেন, তা সেই যুগে কল্পনাতীত। তিনি ছিলেন একাধারে সুরকার, লেখিকা, দার্শনিক আর প্রকৃতি-বিজ্ঞানী। তিনি অসাধারণ সব সংগীত রচনা করেছিলেন (যা আজও গাওয়া হয়), লিখেছিলেন গাছগাছড়া আর তাদের ঔষধি গুণ নিয়ে বই, ভাবনা লিখেছিলেন দর্শন নিয়ে। সেই অন্ধকার যুগে, একজন নারী হয়ে এতগুলো ক্ষেত্রে এত গভীর কাজ — তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে বহু বছর এগিয়ে।
১. লিওনার্দো দা ভিঞ্চি — শিল্পী থেকে উদ্ভাবক
২. অ্যারিস্টটল — জ্ঞানের সব শাখার জনক
৩. ইবন সিনা — প্রাচ্যের জ্ঞান-সম্রাট
৪. বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন — রাষ্ট্রনায়ক ও বিজ্ঞানী
৫. হিলডেগার্ড — মধ্যযুগের বিস্ময়কর নারী
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৮
"ইতিহাসের ৬ জন মহান পরিব্রাজক — যাঁরা এমন এক যুগে গোটা পৃথিবী ঘুরেছিলেন, যখন মানচিত্রই ছিল না। কেউ ৩০ বছর ধরে হেঁটেছিলেন এক লক্ষ কিলোমিটারেরও বেশি। আর একজন চীনা সন্ন্যাসী — শুধু জ্ঞানের টানে — মরুভূমি-পাহাড় পেরিয়ে হেঁটে এসেছিলেন আমাদের ভারতের নালন্দায়।"
ভাবুন তো — কোনো গুগল ম্যাপ নেই, কোনো গাড়ি নেই, ঠিকঠাক মানচিত্রও নেই। শুধু পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায়, কিংবা নৌকায় আপনাকে বেরোতে হবে অজানা পৃথিবীর পথে। ফিরবেন কি না, জানেন না। পথে ডাকাত, মরুভূমি, ঝড়, রোগ — সব মৃত্যুর হাতছানি। তবু ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ ছিলেন, যাঁরা শুধু কৌতূহলের টানে, জ্ঞানের টানে, গোটা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। আর তাঁদের লেখা বিবরণ থেকেই আমরা আজ জানি, তখনকার পৃথিবীটা কেমন ছিল। আজ সেই ছয়জন মহান পরিব্রাজকের কথা বলব।
প্রথম — মার্কো পোলো (ত্রয়োদশ শতক)।
ইতালির ভেনিস শহরের এক তরুণ বণিক, মার্কো পোলো। বাবা-কাকার সাথে তিনি বেরিয়ে পড়লেন সুদূর প্রাচ্যের পথে — সিল্ক রোড ধরে। বছরের পর বছর পথ চলে তিনি পৌঁছলেন চীনে, মহান মঙ্গোল সম্রাট কুবলাই খানের দরবারে। সেখানে কাটালেন প্রায় ১৭ বছর। ফিরে এসে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার কথা একটা বইয়ে লিখলেন। সেই বই-ই প্রথম ইউরোপের মানুষকে জানাল প্রাচ্যের রহস্যময় জগতের কথা — চীনের সম্পদ, সংস্কৃতি, বিস্ময়। পরবর্তীকালে কলম্বাসের মতো অভিযাত্রীরা এই বই পড়েই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। একটা ভ্রমণকাহিনি, যা গোটা ইউরোপের চোখ খুলে দিয়েছিল।
দ্বিতীয় — ইবন বতুতা (চতুর্দশ শতক)। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিব্রাজক।
মরক্কোর এক তরুণ পণ্ডিত, ইবন বতুতা। ২১ বছর বয়সে তিনি মক্কায় তীর্থে যাওয়ার জন্য বেরোলেন। ভাবলেন, কয়েক মাসের যাত্রা। কিন্তু সেই যাত্রা শেষ হলো প্রায় ৩০ বছর পর! একবার বেরিয়ে তিনি আর থামতে পারলেন না। ৩০ বছরে তিনি ঘুরলেন প্রায় এক লক্ষ কিলোমিটারেরও বেশি — উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য, ভারত, মালদ্বীপ, এমনকি চীন পর্যন্ত! মার্কো পোলোর চেয়েও অনেক বেশি পথ। এমনকি তিনি কয়েক বছর আমাদের দিল্লিতে সুলতানের অধীনে বিচারক (কাজি) হিসেবেও কাজ করেছিলেন। তাঁর লেখা ভ্রমণকাহিনি "রিহলা" আজও মধ্যযুগের পৃথিবীকে চেনার এক অমূল্য জানালা।
তৃতীয় — ঝেং হি (পঞ্চদশ শতক)। সমুদ্রের সম্রাট।
ইউরোপীয়রা সমুদ্রপথে বেরোনোর বহু আগেই, চীনের এক মহান নৌ-সেনাপতি ঝেং হি বেরিয়ে পড়েছিলেন সমুদ্র জয় করতে। তাঁর জাহাজ বহর ছিল কল্পনাতীত বিশাল — শত শত জাহাজ, কয়েক হাজার নাবিক। তাঁর সবচেয়ে বড় "ট্রেজার শিপ"-গুলোর কাছে কলম্বাসের জাহাজ ছিল নেহাত খেলনার মতো। এই বিশাল বহর নিয়ে তিনি সাতবার সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত (কালিকট), আরব, এমনকি সুদূর পূর্ব আফ্রিকা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন তিনি — আফ্রিকা থেকে চীনের সম্রাটের জন্য একটা জিরাফও নিয়ে এসেছিলেন! ভাবুন, কলম্বাসেরও বহু দশক আগে চীন সমুদ্রে এমন পরাক্রম দেখিয়েছিল।
চতুর্থ — ম্যাগেলানের অভিযান (১৫১৯-১৫২২)। প্রথম পৃথিবী প্রদক্ষিণ।
মানুষ তখন জানতই না পৃথিবীটা ঠিক কত বড়। ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান ঠিক করলেন — তিনি জাহাজে করে গোটা পৃথিবীটা ঘুরে আসবেন। ১৫১৯ সালে ৫টা জাহাজ আর প্রায় ২৭০ জন নাবিক নিয়ে তিনি বেরোলেন এক অসম্ভব যাত্রায়। পথটা ছিল ভয়ঙ্কর — অজানা সমুদ্র, খাবারের অভাব, রোগ, ঝড়। ম্যাগেলান নিজে পথেই (ফিলিপাইনে) মারা গেলেন। কিন্তু তাঁর অভিযান থামল না। শেষে মাত্র একটা জাহাজ আর গুটিকয়েক নাবিক (২৭০ জনের মধ্যে মাত্র ১৮ জন!) বেঁচে ফিরল — কিন্তু তারা ইতিহাস গড়ে ফেলেছিল। প্রথমবারের মতো মানুষ গোটা পৃথিবীটা ঘুরে এসে প্রমাণ করল — পৃথিবী সত্যিই গোল।
পঞ্চম — রাব্বান বার সাওমা (ত্রয়োদশ শতক)। উল্টো মার্কো পোলো।
মার্কো পোলোর কথা সবাই জানে — যিনি পশ্চিম থেকে প্রাচ্যে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক উল্টোটা যিনি করেছিলেন, তাঁর কথা প্রায় কেউ জানে না। রাব্বান বার সাওমা ছিলেন চীনে জন্মানো এক খ্রিস্টান সন্ন্যাসী। তিনি প্রাচ্য থেকে যাত্রা শুরু করে পৌঁছেছিলেন সুদূর পশ্চিমে — ইউরোপে! ভাবুন, সেই যুগে একজন চীনা মানুষ হেঁটে-ঘোড়ায় ইউরোপ পর্যন্ত! তিনি দেখা করেছিলেন ইউরোপের রাজা-রাজড়াদের সাথে — ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের রাজা, এমনকি রোমের পোপের সাথেও। তাঁকে বলা যায় "উল্টো মার্কো পোলো।" ইতিহাস তাঁকে প্রায় ভুলে গেছে, কিন্তু তাঁর যাত্রা ছিল ঠিক ততটাই অবিশ্বাস্য।
ষষ্ঠ — হিউয়েন সাং, এসেছিলেন নালন্দায় (সপ্তম শতক)।
সপ্তম শতকে চীনের এক তরুণ বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, হিউয়েন সাং (Xuanzang)। তিনি বুঝলেন, চীনে বৌদ্ধধর্মের আসল, খাঁটি জ্ঞান পেতে হলে যেতে হবে এর উৎসে — ভারতে। চীনের রাজা অনুমতি দেননি। তবু জ্ঞানের টানে তিনি লুকিয়ে দেশ ছাড়লেন। তারপর শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য যাত্রা — ভয়ঙ্কর গোবি মরুভূমি, বরফঢাকা হিন্দুকুশ পর্বত পেরিয়ে, প্রায় ১৬,০০০ কিলোমিটার পথ হেঁটে তিনি পৌঁছলেন ভারতে। আর তাঁর গন্তব্য ছিল একটাই — বিহারের সেই বিশ্ববিখ্যাত নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে তিনি বছরের পর বছর সংস্কৃত আর বৌদ্ধদর্শন পড়লেন, হাজার হাজার পণ্ডিতের সাথে তর্ক-আলোচনা করলেন। ভাবুন — সেই যুগে গোটা পৃথিবীর জ্ঞান-পিপাসুদের তীর্থস্থান ছিল আমাদের ভারত! শেষে তিনি ৬০০-রও বেশি পুঁথি নিয়ে চীনে ফেরেন। আর সবচেয়ে অবাক করা কথা — বহু শতাব্দী পরে, তাঁর লেখা সেই বিস্তারিত বিবরণ পড়েই উনিশ শতকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া নালন্দাকে আবার খুঁজে বের করেন! একজন বিদেশি সন্ন্যাসীর ভালোবাসা, যা আমাদের হারানো গর্বকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
ইতিহাসের এই ছয়জন পরিব্রাজকের দিকে তাকালে একটা সুন্দর সত্যি বেরিয়ে আসে। এঁরা কেউ যুদ্ধ করতে বেরোননি, কেউ রাজ্য জয় করতে নয়। এঁরা বেরিয়েছিলেন শুধু জানতে, বুঝতে, দেখতে। আর এই কৌতূহলই — এই "জানার ইচ্ছা"ই — মানুষকে অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা করে। এঁদের সাহস ছিল অবিশ্বাস্য। কোনো নিরাপত্তা ছাড়া, ফিরে আসার নিশ্চয়তা ছাড়া, শুধু একটা স্বপ্নকে সঙ্গী করে এঁরা অজানার পথে পা বাড়িয়েছিলেন। আর সেই সাহসেই গড়ে উঠেছিল মানুষের পৃথিবীকে চেনার গল্প। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — যত বড় স্বপ্ন, তত বড় ঝুঁকি। কিন্তু যাঁরা প্রথম পা বাড়ান, ইতিহাস তাঁদেরই মনে রাখে।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়জনের মধ্যে কার যাত্রা শুনে আপনি সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন? আর হিউয়েন সাং — যিনি জ্ঞানের টানে এত পথ পেরিয়ে আমাদের নালন্দায় এসেছিলেন — এই গল্প কি আপনাকে গর্বিত করে না?
১. মার্কো পোলো — ইউরোপ থেকে চীন
২. ইবন বতুতা — ৩০ বছরে এক লক্ষ কিমি
৩. ঝেং হি — সমুদ্রের সম্রাট
৪. ম্যাগেলান — প্রথম পৃথিবী প্রদক্ষিণ
৫. রাব্বান বার সাওমা — উল্টো মার্কো পোলো
৬. হিউয়েন সাং — জ্ঞানের টানে নালন্দায়
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৪৯
"ইতিহাসের ৬টি বিশ্বাসঘাতকতা — যা গোটা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। একজন বন্ধুর ছুরিই থামিয়ে দিয়েছিল রোমের সবচেয়ে বড় সম্রাটকে। আর বাংলায় — একজন সেনাপতির একটা চুক্তিই খুলে দিয়েছিল প্রায় ২০০ বছরের পরাধীনতার দরজা।"
একজন সম্রাট তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধুদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ একের পর এক ছুরি বসতে লাগল তাঁর শরীরে। আর শেষ ছুরিটা যে হাতে — সেটা ছিল তাঁর প্রিয়, সবচেয়ে বিশ্বাসের মানুষটার। ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনার সত্যিগুলোর একটা হলো — অনেক মহান মানুষকে হারিয়েছে শত্রু নয়, বরং নিজের লোকের বিশ্বাসঘাতকতা। আর এমন কিছু বিশ্বাসঘাতকতা গোটা ইতিহাসের মোড়ই ঘুরিয়ে দিয়েছে। আজ সেই ছয়টা ঘটনার কথা বলব।
প্রথম — ব্রুটাস ও জুলিয়াস সিজার (৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)।
রোমের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্রাট জুলিয়াস সিজার। আর ব্রুটাস ছিলেন তাঁর অত্যন্ত স্নেহের, বিশ্বাসের একজন — প্রায় পুত্রতুল্য। কিন্তু কিছু ষড়যন্ত্রকারী সিজারকে হত্যার পরিকল্পনা করল। আর সেই দলে যোগ দিলেন ব্রুটাসও। সেদিন সেনেটে সিজারকে ঘিরে ধরে একের পর এক ছুরি বসানো হলো। কথিত আছে, ভিড়ের মধ্যে ব্রুটাসকে দেখে সিজার থমকে গিয়েছিলেন — শত্রুর আঘাত তিনি সইতে পারতেন, কিন্তু প্রিয় বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতা নয়। সিজারের মৃত্যুর পর রোম এক রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধে ডুবে গেল, আর ইতিহাসের মোড় ঘুরে গেল। ব্রুটাসের নাম আজও বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক।
দ্বিতীয় — এফিয়ালটিস ও থার্মোপাইলির ৩০০ (৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)।
বিশাল পারস্য সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, থার্মোপাইলির এক সরু গিরিপথে, রাজা লিওনিদাসের নেতৃত্বে মাত্র ৩০০ স্পার্টান যোদ্ধা অবিশ্বাস্য সাহসে রুখে দাঁড়িয়েছিল। এই সরু পথে গুটিকয়েক যোদ্ধাই বিশাল বাহিনীকে আটকে রাখছিল। পারস্য সম্রাট দিশেহারা। ঠিক তখন এগিয়ে এলো এফিয়ালটিস নামের এক বিশ্বাসঘাতক। লোভে পড়ে সে পারস্য সম্রাটকে দেখিয়ে দিল পাহাড়ের একটা গোপন পথ — যা দিয়ে শত্রু সেনারা ঘুরে গিয়ে স্পার্টানদের পেছন থেকে ঘিরে ফেলতে পারল। ফলে সেই অসমসাহসী ৩০০ জন শেষ পর্যন্ত পরাজিত হলো। একজন মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা এক বীরত্বের গল্পকে বিয়োগান্ত করে দিল। গ্রিক ভাষায় এফিয়ালটিস শব্দটাই আজ "দুঃস্বপ্ন" বোঝায়।
তৃতীয় — বেনেডিক্ট আর্নল্ড (১৭৮০)।
আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। বেনেডিক্ট আর্নল্ড ছিলেন আমেরিকার পক্ষের এক উজ্জ্বল, সাহসী সেনাপতি — একজন যুদ্ধনায়ক। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধ। আর সেই ক্ষোভ তাঁকে নিয়ে গেল বিশ্বাসঘাতকতার পথে। তিনি গোপনে শত্রুপক্ষ ব্রিটিশদের সাথে চুক্তি করলেন — টাকার বিনিময়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ (ওয়েস্ট পয়েন্ট) তাদের হাতে তুলে দেবেন। ভাগ্যক্রমে ষড়যন্ত্রটা শেষ মুহূর্তে ফাঁস হয়ে গেল। আর্নল্ড শত্রুপক্ষে পালিয়ে গেলেন। যিনি একসময় ছিলেন জাতীয় বীর, তিনিই হয়ে গেলেন বিশ্বাসঘাতকতার চিরস্থায়ী প্রতীক। আজও আমেরিকায় "বেনেডিক্ট আর্নল্ড" নামটাই মানে — বিশ্বাসঘাতক।
চতুর্থ — ভিদকুন কুইসলিং (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ)।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যখন নাৎসি জার্মানি নরওয়ে দখল করতে চাইল, তখন নরওয়ের এক রাজনীতিবিদ ভিদকুন কুইসলিং নিজের দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে শত্রুকে সাহায্য করলেন। তিনি জার্মানদের দেশ দখলে সহায়তা করলেন, আর বিনিময়ে হলেন তাদের হাতের পুতুল শাসক।
নিজের জাতিকে শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া — এর চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা আর কী হতে পারে?
যুদ্ধের শেষে তাঁর বিচার হলো, শাস্তি হলো। কিন্তু তাঁর নামটা ইতিহাসে এমনভাবে গেঁথে গেল যে, আজও ইংরেজি ভাষায় "Quisling" শব্দটার মানেই হলো — যে নিজের দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। একটা নাম, যা চিরতরে কলঙ্কের সমার্থক হয়ে গেল।
পঞ্চম — নাইট টেম্পলারদের সর্বনাশ (১৩০৭)।
মধ্যযুগে নাইট টেম্পলার ছিল ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী আর সম্মানিত যোদ্ধা- সংগঠনগুলোর একটা। তারা ছিল ধনী, প্রভাবশালী — আর রাজাকেও বিপুল টাকা ধার দিয়েছিল। ফ্রান্সের রাজা চতুর্থ ফিলিপ তাদের কাছে বিশাল ঋণে জর্জরিত ছিলেন। আর সেই ঋণ আর তাদের সম্পদই হয়ে উঠল কাল। ১৩০৭ সালের এক শুক্রবার (১৩ তারিখ), রাজা হঠাৎ বিশ্বাসঘাতকতা করে একযোগে সারা দেশে টেম্পলারদের গ্রেফতার করালেন। মিথ্যা অভিযোগ এনে, অত্যাচার করে, অনেককে মেরে ফেলা হলো, আর গোটা সংগঠনটাই গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। যে রাজার পাশে তারা দাঁড়িয়েছিল, সেই রাজাই তাদের পিঠে ছুরি বসাল। বলা হয়, "শুক্রবার ১৩ তারিখ"-কে অপয়া ভাবার একটা শিকড়ও এই ঘটনায়।
ষষ্ঠ — মীরজাফর ও পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭)। আমাদের নিজেদের বাংলার সবচেয়ে বড় ক্ষত।
এই শেষ বিশ্বাসঘাতকতাটা আমাদের নিজেদের মাটির, আর সবচেয়ে বেদনার।
১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন, পলাশীর আম্রকাননে মুখোমুখি দুই বাহিনী। একদিকে বাংলার তরুণ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার প্রায় ৫০,০০০ সৈন্যের বিশাল বাহিনী। অন্যদিকে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাত্র ৩,০০০ সৈন্য। সংখ্যায় নবাবের জয় ছিল প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল আগেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল — যুদ্ধের ময়দানে নয়, ষড়যন্ত্রের টেবিলে। নবাবেরই সেনাপতি মীরজাফর গোপনে ব্রিটিশদের সাথে চুক্তি করেছিলেন। যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, তিনি তাঁর অধীনে থাকা বিশাল বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় বসিয়ে রাখলেন — একটাও গুলি চলল না। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিরাজ পরাজিত হলেন। পুরস্কার হিসেবে মীরজাফরকে বানানো হলো বাংলার পুতুল নবাব, আর কোম্পানি পেল বাংলার অফুরন্ত সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। ইতিহাসবিদরা বলেন, এই একটা বিশ্বাসঘাতকতাই ভারতে প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের দরজা খুলে দিয়েছিল। আজও বাংলায় "মীরজাফর" নামটাই বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক।
ইতিহাসের এই ছয়টা বিশ্বাসঘাতকতার দিকে তাকালে একটা গভীর, নাড়িয়ে দেওয়া সত্যি বেরিয়ে আসে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি প্রায়ই বাইরের শত্রু করে না — করে ভেতরের বিশ্বাসের মানুষ। কারণ শত্রুকে আমরা সাবধানে পাহারা দিই, কিন্তু আপন মানুষের জন্য দরজা খোলা রাখি। আর সেই খোলা দরজা দিয়েই ঢুকে পড়ে সর্বনাশ। পলাশীর গল্পটা আমাদের আরেকটা জিনিস শেখায় — একটা জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরের সেনা নয়, ভেতরের বিভেদ আর স্বার্থ। সিরাজের ৫০,০০০ সৈন্যকে হারায়নি ক্লাইভের ৩,০০০ — হারিয়েছিল একজনের লোভ।
হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা — ঐক্য থাকলে বাইরের কোনো শক্তিই সহজে হারাতে পারে না। ভাঙন আসে ভেতর থেকেই।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যে কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিল? আর পলাশীর সেই মুহূর্ত — যদি মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতা না করতেন, ভারতের ইতিহাস কি অন্যরকম হতো বলে আপনার মনে হয়?
১. ব্রুটাস — বন্ধুর ছুরি
২. এফিয়ালটিস — থার্মোপাইলির গোপন পথ
৩. বেনেডিক্ট আর্নল্ড — জাতীয় বীর থেকে বিশ্বাসঘাতক
৪. কুইসলিং — নিজের দেশকে শত্রুর হাতে
৫. নাইট টেম্পলার — রাজার পিঠে-ছুরি
৬. মীরজাফর — পলাশীর সেই কালো দিন
@ সম্রাট রায় চৌধুরী
৫০
"ইতিহাসের ৬টি গোপন কক্ষ ও সুড়ঙ্গ — যা বহু বছর লুকিয়ে ছিল, তারপর হঠাৎ আবিষ্কৃত হলো। একজন মানুষ তার বাড়ির দেয়াল ভাঙতে গিয়ে খুঁজে পেলেন মাটির নিচে লুকানো একটা গোটা শহর। আর আমাদের ভারতেই — এক শিকারি বাঘ খুঁজতে গিয়ে খুঁজে পেলেন হাজার বছরের হারানো এক শিল্প-স্বর্গ।"
একজন মানুষ তার বাড়ির বেসমেন্টের একটা দেয়াল ভাঙছিলেন। হঠাৎ দেয়ালের পেছনে বেরিয়ে এলো একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গ। সেই সুড়ঙ্গ ধরে এগিয়ে তিনি যা পেলেন, তা অবিশ্বাস্য — মাটির নিচে লুকানো একটা গোটা প্রাচীন শহর, যেখানে হাজার হাজার মানুষ থাকতে পারত।
ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জিনিসগুলোর একটা হলো — কিছু রহস্য বছরের পর বছর আমাদের পায়ের নিচে, দেয়ালের পেছনে চুপচাপ লুকিয়ে থাকে। তারপর একদিন, হঠাৎ, কেউ সেটা খুঁজে পায়। আজ সেই ছয়টা গোপন আবিষ্কারের কথা বলব।
প্রথম — লাসকো গুহা। কুকুরের পিছু নিয়ে পাওয়া (১৯৪০)।
ফ্রান্সে কয়েকজন কিশোর তাদের পোষা কুকুরের পিছু নিয়ে একটা গর্তের কাছে গেল। কুকুরটা একটা ছোট গর্তে ঢুকে পড়েছিল। সেই গর্ত ধরে নামতে নামতে তারা পৌঁছে গেল এক অন্ধকার গুহায়। আর সেখানে দেয়ালে যা দেখল, তাতে তারা স্তব্ধ হয়ে গেল। গুহার দেয়াল জুড়ে আঁকা অসংখ্য পশুর ছবি — ঘোড়া, হরিণ, ষাঁড়। আর এই ছবিগুলো এঁকেছিল প্রায় ১৭,০০০ বছর আগের আদিম মানুষ! কয়েকজন কিশোর আর একটা কুকুর, ঘটনাচক্রে, খুঁজে বের করল মানব সভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো শিল্পকলার একটা গুপ্তভাণ্ডার।
দ্বিতীয় — দেরিনকুয়ু। দেয়ালের পেছনের লুকানো শহর (১৯৬৩)।
তুরস্কের এক ব্যক্তি তাঁর বাড়ি সংস্কার করছিলেন। একটা দেয়াল ভাঙতেই পেছনে বেরিয়ে এলো একটা গোপন সুড়ঙ্গ। কৌতূহলে সেই সুড়ঙ্গে নেমে তিনি যা পেলেন, তা ইতিহাস বদলে দিল।
মাটির নিচে স্তরে স্তরে নেমে যাওয়া একটা আস্ত ভূগর্ভস্থ শহর — দেরিনকুয়ু। প্রায় ১৮ তলা গভীর এই শহরে ছিল ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, গির্জা, এমনকি গবাদি পশুর আস্তাবল আর বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা। ধারণা করা হয়, প্রায় ২০,০০০ মানুষ এখানে আশ্রয় নিতে পারত! বহু শতাব্দী আগে, শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচতে মানুষ মাটির গভীরে এই গোটা শহর খুঁড়ে বানিয়েছিল — তারপর সেটা ভুলে গিয়েছিল, যতক্ষণ না একজন মানুষ তাঁর দেয়াল ভাঙলেন।
তৃতীয় — টেরাকোটা আর্মি। কুয়ো খুঁড়তে গিয়ে পাওয়া সৈন্যবাহিনী (১৯৭৪)।
চীনের কয়েকজন কৃষক তাঁদের খেতে একটা সাধারণ কুয়ো খুঁড়ছিলেন — জলের জন্য।
হঠাৎ মাটির নিচে তাঁদের কোদালে ঠেকল মাটির তৈরি একটা মানুষের মাথা। তাঁরা ভাবতেও পারেননি, কীসের ওপর তাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন। খোঁড়াখুঁড়ির পর বেরিয়ে এলো হাজার হাজার মাটির তৈরি সৈন্য — প্রতিটা মানুষ-আকৃতির, প্রতিটার মুখ আলাদা, সাথে ঘোড়া, রথ, অস্ত্র। প্রায় ২,২০০ বছর আগে, চীনের প্রথম সম্রাটের সমাধি পাহারা দেওয়ার জন্য বানানো হয়েছিল এই বিশাল "টেরাকোটা আর্মি"। কয়েকজন কৃষকের কুয়ো খোঁড়া, যা এনে দিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোর একটা।
চতুর্থ — দুনহুয়াং-এর "গ্রন্থাগার গুহা" (১৯০০)।
চীনের এক মরুভূমির ধারে, মোগাও গুহাগুলোর দেখাশোনা করতেন এক সন্ন্যাসী। একদিন তিনি একটা গুহার দেয়ালে ফাটল লক্ষ্য করলেন। দেয়ালটা ভাঙতেই পেছনে বেরিয়ে এলো একটা গোপন, সিল করা কুঠুরি। আর ভেতরে যা ছিল, তা জ্ঞানের এক অমূল্য ভাণ্ডার। সেই ছোট্ট কুঠুরিতে ঠাসা ছিল হাজার হাজার প্রাচীন পুঁথি, পাণ্ডুলিপি আর চিত্রকর্ম — প্রায় ১,০০০ বছর ধরে সিল করা অবস্থায় লুকানো। এর মধ্যেই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো ছাপা বইগুলোর একটা! একটা সিল করা দেয়ালের পেছনে চুপচাপ ঘুমিয়ে ছিল হাজার বছরের মানব-জ্ঞান।
পঞ্চম — নাইকার ক্রিস্টাল গুহা। খনির নিচের রূপকথা (২০০০)।
মেক্সিকোর এক খনিতে শ্রমিকরা মাটির অনেক গভীরে কাজ করছিলেন। হঠাৎ তাঁরা একটা নতুন কুঠুরিতে ঢুকে পড়লেন। আর যা দেখলেন, তা যেন কোনো রূপকথার দৃশ্য। গোটা গুহা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল স্বচ্ছ ক্রিস্টাল (কেলাস) — কোনো কোনোটা ১০ মিটারেরও লম্বা, কয়েক টন ওজনের। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে, মাটির গভীরে, প্রচণ্ড গরম আর আর্দ্রতায়, ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছিল এই দৈত্যাকার ক্রিস্টালগুলো — যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক কেলাসের অন্যতম। মানুষ এর অস্তিত্ব জানতই না, যতক্ষণ না খনির শ্রমিকরা ঘটনাচক্রে এই লুকানো রত্নভাণ্ডারে পা রাখলেন।
ষষ্ঠ — অজন্তা গুহা। বাঘ খুঁজতে গিয়ে পাওয়া শিল্প-স্বর্গ (১৮১৯)।
১৮১৯ সালের এপ্রিল। মহারাষ্ট্রের এক গভীর জঙ্গলে, ওয়াঘোরা নদীর গিরিখাতে, জন স্মিথ নামের এক ব্রিটিশ অফিসার বাঘ শিকার করছিলেন। বাঘের পিছু নিতে নিতে হঠাৎ তিনি ওপরে তাকালেন — আর পাহাড়ের গায়ে দেখলেন পাথর কেটে বানানো এক প্রাচীন স্থাপনার মুখ। জঙ্গলে ঢাকা, লতাপাতায় মোড়া সেই গুহায় ঢুকে তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। প্রায় হাজার বছর ধরে জঙ্গলে হারিয়ে থাকা, বিস্মৃত ৩০টি বৌদ্ধ গুহা — অজন্তা। আর ভেতরে? পাথরের দেয়াল জুড়ে এমন সব চিত্রকলা আর ভাস্কর্য, যা প্রাচীন বিশ্বের সেরা শিল্পকর্মের একটি হিসেবে গণ্য হয়। বুদ্ধের জীবন, জাতকের গল্প — অবিশ্বাস্য রঙ আর আবেগ দিয়ে আঁকা। ভাবুন, আমাদের পূর্বপুরুষরা দুই হাজার বছর আগে এমন শিল্প সৃষ্টি করেছিলেন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী জঙ্গলে চাপা পড়েও আজও পৃথিবীকে মুগ্ধ করে। একটা বাঘ শিকার, যা ভারতের হারানো এক শিল্প-স্বর্গ ফিরিয়ে দিল।
ইতিহাসের এই ছয়টা আবিষ্কারের দিকে তাকালে একটা রোমাঞ্চকর সত্যি বেরিয়ে আসে। ইতিহাস কোনো বন্ধ বই নয়। আজও, এই মুহূর্তেও, আমাদের পায়ের নিচে, পুরোনো দেয়ালের পেছনে, জঙ্গলের আড়ালে কত কী চুপচাপ লুকিয়ে আছে — কেউ জানে না। আর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর কথা — এই আবিষ্কারগুলোর বেশিরভাগই হয়েছিল ঘটনাচক্রে। কেউ কুয়ো খুঁড়তে, কেউ বাঘ খুঁজতে, কেউ শুধু বাড়ির দেয়াল ভাঙতে গিয়ে — ইতিহাসের দরজা খুলে ফেলেছিল। হয়তো এটাই সবচেয়ে সুন্দর কথা — পৃথিবী এখনো রহস্যে ভরা। হয়তো এমন আরও কত গোপন কক্ষ, কত হারানো শহর আজও অপেক্ষা করছে — কারও খুঁজে পাওয়ার আশায়।
আপনার কাছে প্রশ্ন — এই ছয়টা গোপন আবিষ্কারের মধ্যে কোনটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল?
১. লাসকো গুহা — কুকুরের পিছু নিয়ে পাওয়া
২. দেরিনকুয়ু — দেয়ালের পেছনের লুকানো শহর
৩. টেরাকোটা আর্মি — কুয়ো খুঁড়তে পাওয়া
৪. দুনহুয়াং — সিল করা গ্রন্থাগার গুহা
৫. নাইকা — খনির নিচের ক্রিস্টাল গুহা
৬. অজন্তা — বাঘ খুঁজতে পাওয়া শিল্প-স্বর্গ
@ সম্রাট রায় চৌধুরী