অভিধান তত্ত্ব (Lexicography) হলো অভিধান প্রণয়ন, সম্পাদনা ও ব্যবহারের পেছনের নীতি ও পদ্ধতি নিয়ে অধ্যয়ন, যেখানে শব্দের সংজ্ঞা, ব্যাকরণ, উচ্চারণ, উৎস, প্রতিশব্দ এবং বিভিন্ন প্রসঙ্গে তাদের প্রয়োগ বিশ্লেষণ করা হয়; এটি শুধু শব্দভাণ্ডার নয়, বরং ভাষার গঠন ও ব্যবহার বোঝার একটি পদ্ধতিগত বিজ্ঞান, যা ভাষাবিজ্ঞান, মেশিন লার্নিং এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সাথে সম্পর্কিত।
অভিধান তত্ত্বের মূল দিকসমূহ:
শব্দচয়ন (Lexical Selection): কোন শব্দগুলোকে অভিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং কেন, তা নির্ধারণ করা।
বর্ণক্রম (Alphabetization): শব্দগুলোকে কীভাবে সাজানো হবে (যেমন বর্ণানুক্রমিক) এবং এর নিয়মাবলী।
এন্ট্রি গঠন (Entry Structure): প্রতিটি শব্দের জন্য কী কী তথ্য (যেমন অর্থ, উদাহরণ, প্রতিশব্দ, উৎস) অন্তর্ভুক্ত করা হবে তার বিন্যাস।
সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা (Definition & Explanation): শব্দের একাধিক অর্থ ও ব্যবহারের স্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা প্রদান।
ভাষাগত তথ্য (Linguistic Information): শব্দের উচ্চারণ (phonetics), ব্যাকরণগত শ্রেণি (parts of speech), এবং ব্যুৎপত্তি (etymology) উল্লেখ করা।
প্রয়োগ ও ব্যবহার (Usage & Application): শব্দ বাক্যে কীভাবে ব্যবহৃত হয় তার উদাহরণ দেওয়া।
অভিধানের প্রকারভেদ (Types of Dictionaries): দ্বিভাষিক, একভাষিক, প্রযুক্তিগত, ঐতিহাসিক ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের অভিধানের তত্ত্ব ও প্রয়োগ।
আধুনিক প্রেক্ষাপটে অভিধান তত্ত্ব:
মেশিন লার্নিং ও ডেটা সায়েন্স: বর্তমানে, কম্পিউটার অ্যালগরিদম ব্যবহার করে বিশাল ডেটা থেকে অভিধান তৈরি করা হয়, যা অভিধান শিক্ষাকে (dictionary learning) নতুন মাত্রা দিয়েছে।
ভাষার পরিবর্তন: ভাষা পরিবর্তনশীল, তাই অভিধান তত্ত্বের আলোচনায় ভাষার বিবর্তন ও নতুন শব্দ অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সংক্ষেপে, অভিধান তত্ত্ব হলো অভিধান তৈরির বিজ্ঞান, যা ভাষাকে সুশৃঙ্খলভাবে সংকলন ও উপস্থাপনের একটি কাঠামোগত পদ্ধতি।
বাংলা ভাষার বিখ্যাত অভিধানগুলোর মধ্যে বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস সম্পাদিত 'বাঙ্গালা ভাষার অভিধান', ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সম্পাদিত 'বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান' উল্লেখযোগ্য, আর এদের লেখক বা সংকলক হলেন যথাক্রমে বাংলা একাডেমি (১৯৯২), জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস (১৯৩৭) এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (১৯৬৫); এছাড়াও, রাজশেখর বসু (পরশুরাম) একজন বিখ্যাত লেখক ও অভিধান প্রণেতা হিসেবে পরিচিত।
গুরুত্বপূর্ণ অভিধান ও লেখকের নাম:
বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান: বাংলা একাডেমি (১৯৯২)।
বাঙ্গালা ভাষার অভিধান: জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস (১৯৩৭)।
বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (১৯৬৫)।
রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ: বাংলা ভাষায় প্রথম অভিধান সংকলন করেন (১৮১৭)।
রাজশেখর বসু (পরশুরাম): বিখ্যাত সাহিত্যিক ও অভিধান প্রণেতা।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য লেখক:
জীবনানন্দ দাশ: বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান আধুনিক বাঙালি কবি।
সত্যজিৎ রায়: চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক (গল্প, উপন্যাস), এবং ফেলুদা ও প্রফেসর শঙ্কু চরিত্রের স্রষ্টা।
এই অভিধানগুলো বাংলা ভাষার শব্দভান্ডার এবং আঞ্চলিক উপভাষার সমৃদ্ধ উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়, যা বাংলা সাহিত্য ও ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে।
বাংলা অভিধানে বর্ণানুক্রমিক সাজানোর পদ্ধতি সাধারণত নিম্নরূপ হয়:
1. স্বরবর্ণের ক্রম:
অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ।
2. কার-চিহ্নের অবস্থান:
স্বরবর্ণের পর সেই বর্ণের কার-চিহ্নযুক্ত বর্ণগুলো আসে। তবে আধুনিক অভিধানে সাধারণত ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে কার-চিহ্নগুলো এই ক্রমে সাজানো থাকে:
(ক, কা, কি, কী, কু, কূ, কৃ, কে, কৈ, কো, কৌ)।
3. ব্যঞ্জনবর্ণের ক্রম:
ক, খ, গ, ঘ, ঙ
চ, ছ, জ, ঝ, ঞ
ট, ঠ, ড, ঢ, ণ (এবং ড়, ঢ়)
ত, থ, দ, ধ, ন
প, ফ, ব, ভ, ম
য, র, ল
শ, ষ, স, হ
4. বিশেষ বর্ণের অবস্থান:
অনুস্বর (ং), বিসর্গ (ঃ) এবং চন্দ্রবিন্দু (ঁ): এগুলো সাধারণত সংশ্লিষ্ট স্বরবর্ণ বা ব্যঞ্জনবর্ণের একদম শুরুতে বা উপরে থাকে। যেমন: 'ক' এর তালিকায় সবার আগে আসবে 'কঁ', 'কং', 'কঃ'।
ক্ষ: এটি 'ক' এবং 'ষ' এর যুক্তাক্ষর হওয়ায় অভিধানে এটি 'ক' বর্ণের শেষে বা 'ক' এর যুক্তবর্ণের তালিকায় থাকে।
ৎ (খণ্ড ত): এটি 'ত' বর্ণের একটি রূপ, তাই এটি 'ত' এর তালিকায় থাকে।
ড় এবং ঢ়: এগুলো যথাক্রমে 'ড' এবং 'ঢ' এর পরে বসে।
য়: এটি 'য' এর পরে বসে।
5.স্বরচিহ্নের (কার) ও যুক্তবর্ণের অগ্রাধিকার:
সাধারণত কার-চিহ্নের (া, ি, ী ইত্যাদি) আগে যুক্তবর্ণের স্থান হয়। তবে আধুনিক অনেক অভিধানে বর্ণানুক্রমিক ধারা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
সাধারণ নিয়ম:
১. ক (একক বর্ণ)
২. ক্ত (যুক্তবর্ণ)
সংক্ষেপে মনে রাখার নিয়ম:
প্রথমে পূর্ণ স্বরবর্ণ (অ-ঔ), তারপর ব্যঞ্জনবর্ণ (ক-হ)। প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের ভেতরে প্রথমে চন্দ্রবিন্দু/অনুস্বর/বিসর্গযুক্ত শব্দ, তারপর কার-চিহ্নহীন শব্দ, এবং সবশেষে কার-চিহ্নযুক্ত ও যুক্তাক্ষরযুক্ত শব্দ থাকে।
বাংলা একাডেমির আধুনিক নিয়ম অনুযায়ী এই ক্রম অনুসরণ করা হয়। বিস্তারিত জানতে বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান দেখা যেতে পারে।