ভাষাতত্ত্বের প্রধান শাখাগুলো হলো ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব, শব্দার্থতত্ত্ব, এবং প্রায়োগিক ভাষাতত্ত্ব। এটি ভাষার গঠন, উৎপত্তি, বিকাশ এবং বিভিন্ন ভাষার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে।
ভাষাতত্ত্বের প্রধান শাখাগুলো:
ধ্বনিবিজ্ঞান ও ধ্বনিতত্ত্ব (Phonetics and Phonology): মানুষের মুখের ভাষা বা শব্দের উচ্চারণ, তাদের ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য, ভাষার মধ্যে ধ্বনির ব্যবহার ও নিয়ম এবং ধ্বনি পরিবর্তন ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে।
শব্দতত্ত্ব/ রূপতত্ত্ব (Etymology/ Morphology): শব্দের গঠন, শব্দাংশ বা প্রত্যয় কীভাবে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ তৈরি করে, শব্দের প্রকারভেদ, শব্দের রূপান্তর (যেমন লিঙ্গ, বচন, কারক, বিভক্তি), তা নিয়ে গবেষণা করে।
বাক্যতত্ত্ব (Phraseology/ Syntax): বাক্য কীভাবে গঠিত হয়, বাক্যের প্রকারভেদ, শব্দের ক্রম, বাক্যের গঠনগত নিয়ম এবং বাক্যের বিভিন্ন অংশের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে।
অর্থতত্ত্ব/ শব্দার্থতত্ত্ব (Semantology/ Semantics): শব্দের অর্থ, অর্থের পরিবর্তন এবং বাক্যের অর্থের গভীরতা বিশ্লেষণ করে।
প্রায়োগিক ভাষাতত্ত্ব (Applied Linguistics): ভাষা শিক্ষা, অনুবাদ, এবং অন্যান্য ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ভাষাতত্ত্বের নীতিগুলো প্রয়োগ করে।
সাংস্কৃতিক ভাষাতত্ত্ব (Sociolinguistics): সমাজ এবং সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে ভাষার ব্যবহার, ভাষার বৈচিত্র্য এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করে।
ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব (Historical Linguistics): সময়ের সাথে সাথে ভাষার পরিবর্তন এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে।
কম্পিউটেশনাল ভাষাতত্ত্ব (Computational Linguistics): কম্পিউটার ব্যবহার করে ভাষাকে বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াকরণ করা হয়।
ধ্বনিতত্ত্ব
শব্দতত্ত্ব
বাক্যতত্ত্ব
অর্থতত্ত্ব
বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি নবম দশম শ্রেণি-2025
বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি নবম দশম শ্রেণি-2018
নিচে বাংলা ভাষার কিছু মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া হলো:
১. সাধারণ পরিচিতি
বংশগতি: বাংলা একটি ইন্দো-আর্য ভাষা। এটি সংস্কৃত, পালি এবং প্রাকৃত ভাষা থেকে বিবর্তিত হয়ে আজকের রূপে এসেছে।
অবস্থান: এটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষা। মাতৃভাষীর সংখ্যা বিবেচনায় এটি বিশ্বের ৫ম বা ৬ষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা।
ব্যবহারকারী: বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের বরাক উপত্যকার মানুষের প্রধান ভাষা বাংলা। এছাড়া সারা বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে।
২. ইতিহাস ও বিবর্তন
উৎপত্তি: ধারণা করা হয়, ৭ম থেকে ১০ম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে 'মাগধী প্রাকৃত' বা 'গৌড়ীয় অপভ্রংশ' থেকে বাংলার জন্ম।
যুগ বিভাগ: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে তিনটি যুগে ভাগ করা হয়:
প্রাচীন যুগ (চর্যপদ)
মধ্যযুগ (শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য)
আধুনিক যুগ (উনিশ শতক থেকে বর্তমান)।
৩. ভাষা আন্দোলন (২১শে ফেব্রুয়ারি)
বাংলা ভাষার ইতিহাসে সবচেয়ে গর্বের অধ্যায় হলো ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় রফিক, সালাম, বরকতসহ আরও অনেকে প্রাণ দিয়েছিলেন। এই ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে।
৪. লিপি ও ব্যাকরণ
লিপি: বাংলা লিপি এসেছে 'ব্রাহ্মী লিপি' থেকে। এটি বাম থেকে ডানে লেখা হয়।
বৈশিষ্ট্য: বাংলায় স্বরবর্ণ ১১টি এবং ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টি। এর ব্যাকরণ বেশ সমৃদ্ধ এবং শব্দের ভাণ্ডারে তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দের চমৎকার মিশ্রণ রয়েছে।
৫. সাহিত্যিক সমৃদ্ধি
বাংলা সাহিত্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এশীয়দের মধ্যে প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। এছাড়া কাজী নজরুল ইসলাম (বিদ্রোহী কবি), জীবনানন্দ দাশ এবং আরও অনেক কালজয়ী সাহিত্যিক এই ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
একটি ভাষার সঠিক গঠন, লিখন এবং ব্যবহারের নিয়মাবলিই হলো তার ব্যাকরণ। বাংলা ব্যাকরণ বেশ সমৃদ্ধ এবং এর প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলোকে সাধারণত চারটি ভাগে ভাগ করা হয়:
১. ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology)
এখানে ধ্বনি (Sound) এবং বর্ণ (Letter) নিয়ে আলোচনা করা হয়।
স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি: উচ্চারণের স্থান ও প্রকৃতি।
সন্ধি: দুটি ধ্বনির মিলন (যেমন: বিদ্যা + আলয় = বিদ্যালয়)।
নত্ব-বিধান ও ষত্ব-বিধান: 'ণ' এবং 'ষ' ব্যবহারের সঠিক নিয়ম।
২. শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব (Morphology)
এখানে শব্দের গঠন এবং প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
শব্দের শ্রেণিবিভাগ: তৎসম, তদ্ভব, দেশি, বিদেশি।
লিঙ্গ ও বচন: একবচন, বহুবচন এবং স্ত্রী-পুরুষ লিঙ্গ।
উপসর্গ ও প্রত্যয়: শব্দের আগে বা পরে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন।
সমাস: একাধিক পদের একপদীকরণ (যেমন: রাজপুত্র = রাজার পুত্র)।
৩. বাক্যতত্ত্ব (Syntax)
এখানে বাক্যের গঠন এবং পদের বিন্যাস নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বাক্যের অংশ: উদ্দেশ্য (Subject) ও বিধেয় (Predicate)।
বাক্যের প্রকারভেদ: সরল, জটিল ও যৌগিক বাক্য।
পদ পরিবর্তন: বিশেষ্য থেকে বিশেষণ বা অন্য পদে রূপান্তর।
৪. অর্থতত্ত্ব (Semantics)
এখানে শব্দের অর্থের বৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বিপরীত শব্দ ও সমার্থক শব্দ।
বাগধারা ও প্রবাদ-প্রবচন।
বাংলা ব্যাকরণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ:
কারক ও বিভক্তি: বাক্যের ক্রিয়ার সাথে অন্য পদের সম্পর্ক।
ক্রিয়ার কাল (Tense): বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ কালের বিভিন্ন রূপ।
পদ প্রকরণ: বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, অব্যয় ও ক্রিয়া।
বাংলা ব্যাকরণ রচনার ইতিহাস প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো। নিচে এর প্রধান পর্যায়গুলো আলোচনা করা হলো:
১. পর্তুগিজ যুগ (আদি পর্ব)
বাংলা ব্যাকরণ রচনার প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন ইউরোপীয় ধর্মপ্রচারকরা।
প্রথম ব্যাকরণ (১৭৪৩): পর্তুগিজ পাদ্রি মানোএল দা আস্সুম্পসাঁউ প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। এটি পর্তুগিজ ভাষায় রচিত হয়েছিল এবং এর নাম ছিল 'Vocabulario em idioma Bengalla, e Portuguez'। এটি লিসবন থেকে প্রকাশিত হয়।
২. ইংরেজি যুগ (আধুনিক পর্ব)
ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে প্রশাসনিক প্রয়োজনে ইংরেজরা বাংলা ভাষা শিখতে আগ্রহী হন।
নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড (১৭৭৮): তিনি ইংরেজি ভাষায় আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থ 'A Grammar of the Bengal Language' রচনা করেন। এই বইটির বিশেষত্ব হলো, এটিই বাংলা হরফে মুদ্রিত প্রথম বাংলা ব্যাকরণ বই।
উইলিয়াম কেরি (১৮০১): শ্রীরামপুর মিশনের এই পণ্ডিত ইংরেজি ভাষায় আরও একটি উল্লেখযোগ্য বাংলা ব্যাকরণ প্রকাশ করেন।
৩. বাঙালি কর্তৃক ব্যাকরণ রচনা
বাঙালিদের হাতে বাংলা ভাষায় ব্যাকরণ রচনার মাধ্যমে এই চর্চায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়।
রাজা রামমোহন রায় (১৮২৬/১৮৩৩): বাঙালিদের মধ্যে তিনি প্রথম বাংলা ভাষায় ব্যাকরণ রচনা করেন। ১৮২৬ সালে তিনি এটি ইংরেজিতে লিখেছিলেন, যা ১৮৩৩ সালে 'গৌড়ীয় ব্যাকরণ' নামে বাংলায় অনুদিত হয়ে প্রকাশিত হয়। এটিকে বাঙালিদের লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা ব্যাকরণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
৪. ভাষাতাত্ত্বিক ও আধুনিক যুগ
বিংশ শতাব্দীতে বাংলা ব্যাকরণ চর্চায় বৈজ্ঞানিক ও ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত হয়।
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়: তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'The Origin and Development of the Bengali Language' (ODBL) বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও ইতিহাসের মাইলফলক।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্: তিনি বাংলা ব্যাকরণের বিবর্তন ও শুদ্ধ উচ্চারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
সারসংক্ষেপ:
বইয়ের নাম - লেখক- বছর- ভাষা
ভোকাবুলারিও এম ইডিওমা বেঙ্গালা- মানোএল দা আস্সুম্পসাঁউ- ১৭৪৩- পর্তুগিজ
এ গ্রামার অফ দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ- এন. বি. হ্যালহেড- ১৭৭৮- ইংরেজি
গৌড়ীয় ব্যাকরণ- রাজা রামমোহন রায়- ১৮৩৩- বাংলা
বাংলা ভাষার প্রকাশভঙ্গি এবং ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে একে প্রধানত দুটি রূপে ভাগ করা হয়: মৌখিক (কথ্য) এবং লৈখিক (লেখ্য)। এই রূপগুলোর আবার নিজস্ব উপ-বিভাগ বা রীতি রয়েছে।
১. মৌখিক বা কথ্য রূপ (Oral Form)
মানুষ দৈনন্দিন কথাবার্তায় যে রূপ ব্যবহার করে। এর দুটি প্রধান রীতি হলো:
আঞ্চলিক কথ্য রীতি (উপভাষা): অঞ্চলভেদে মানুষের মুখের ভাষার যে বৈচিত্র্য দেখা যায়। যেমন: চাটগাঁইয়া বা সিলেটি উপভাষা।
আদর্শ কথ্য রীতি (প্রমিত): মার্জিত ও শিক্ষিত সমাজের সর্বজনস্বীকৃত কথোপকথনের ভাষা।
২. লৈখিক বা লেখ্য রূপ (Written Form)
সাহিত্য রচনা বা দাপ্তরিক কাজে লেখার জন্য যে রূপ ব্যবহৃত হয়। এর তিনটি প্রধান রীতি রয়েছে:
প্রমিত রীতি (চলিত রীতি): এটি ব্যাকরণের সুনির্ধারিত নিয়ম মেনে চলে। এতে তৎসম (সংস্কৃত) শব্দের প্রাধান্য বেশি এবং ক্রিয়া ও সর্বনাম পদের পূর্ণরূপ ব্যবহৃত হয়।
চলিত রীতি: এটি পরিবর্তনশীল এবং মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি। এতে তদ্ভব শব্দের ব্যবহার বেশি এবং ক্রিয়া ও সর্বনাম পদের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহৃত হয়।
কাব্য রীতি: বিশেষ করে কবিতা বা পদ্য রচনায় ব্যবহৃত ছন্দোবদ্ধ ভাষা রীতি।
বাংলা ভাষার উপভাষা (Dialects)
ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী বাংলা উপভাষাকে প্রধান পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়:
রাঢ়ী: পশ্চিমবঙ্গ (কলকাতা, বর্ধমান, নদীয়া)।
বঙ্গালী: পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা (ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা)।
বরেন্দ্রী: উত্তর বাংলা (রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া)।
কামরূপী: উত্তর-পূর্ব বাংলা (রংপুর, জলপাইগুড়ি, আসামের কিছু অংশ)।
ঝাড়খণ্ডী: পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল (মানভূম, সিংভূম)।