বাংলা ব্যাকরণে, পদ হলো বাক্যে ব্যবহৃত প্রতিটি অর্থবোধক শব্দ, যা নির্দিষ্ট বিভক্তিযুক্ত হয়ে বাক্যের গঠন ও অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়; পদ মূলত পাঁচ প্রকার: বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, ক্রিয়া ও অব্যয় পদ, যা বাক্যের বিভিন্ন অংশকে বোঝায়।
পদ কাকে বলে?
সহজ কথায়, বাক্যে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দকে পদ (Parts of Speech) বলে।
শব্দ যখন বাক্যে ব্যবহৃত হয়, তখন সেটির সঙ্গে বিভক্তি যুক্ত হয়ে বা সম্পর্ক স্থাপন করে পদে রূপান্তরিত হয়, যেমন—"রহিম স্কুলে যাচ্ছে।" এখানে 'রহিম', 'স্কুলে', 'যাচ্ছে'—প্রতিটিই এক একটি পদ।
পদের প্রকারভেদ:
বাংলা ব্যাকরণে পদ প্রধানত পাঁচ প্রকার:
বিশেষ্য পদ (Noun): নাম বোঝায় (যেমন: রহিম, ঢাকা, বই)।
সর্বনাম পদ (Pronoun): বিশেষ্যের পরিবর্তে বসে (যেমন: সে, তিনি, আমি)।
বিশেষণ পদ (Adjective): বিশেষ্য, সর্বনাম বা ক্রিয়ার দোষ, গুণ, অবস্থা বোঝায় (যেমন: ভালো, মন্দ, সুন্দর)।
ক্রিয়াপদ (Verb): কাজ করা বা ঘটা বোঝায় (যেমন: যাওয়া, খাওয়া, পড়া)।
অব্যয় পদ (Particle): যা পরিবর্তিত হয় না (যেমন: এবং, ও, কিন্তু)।
অব্যয় পদের প্রকারভেদ:
অনুসর্গ: পরে বসে সম্পর্ক স্থাপন করে (যেমন: অবধি, পর্যন্ত)।
যোজক/সংযোজক: পদ বা বাক্যকে যুক্ত করে (যেমন: এবং, আর, ও)।
আবেগ সূচক/আবেগ শব্দ: আবেগ প্রকাশ করে (যেমন: বাহ্!, ছি!)।
পদ পরিবর্তন বলতে সাধারণত একটি পদকে (যেমন বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়া) অন্য পদে রূপান্তর করাকে বোঝায়, যা প্রধানত বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, ক্রিয়া ও অব্যয়—এই পাঁচ প্রকার পদের মধ্যে ঘটে থাকে। যেমন, 'মধুর' (বিশেষণ) থেকে 'মধু' (বিশেষ্য) বা 'সক্ষম' (বিশেষণ) থেকে 'সমর্থতা' (বিশেষ্য) করা। এটি শব্দকে বাক্যে ভিন্ন ভূমিকা দিতে এবং অর্থের গভীরতা বাড়াতে সাহায্য করে।
পদ পরিবর্তনের প্রকার ও উদাহরণ:
'মধু' (বিশেষ্য) → 'মধুর' (মধুর ফল)
'শক্তি' (বিশেষ্য) → 'শক্তিশালী' (শক্তিশালী লোক)
'মধুর' (বিশেষণ) → 'মধু' (ফলের মধু)
'সমর্থ' (বিশেষণ) → 'সমর্থতা' (তাঁর সমর্থতা ছিল)
'সচল' (বিশেষণ) → 'সচল রাখা' (কাজটি সচল রাখা)
'কর' (ক্রিয়া) → 'কর্ম' (তাঁর কর্ম ভালো)
'চল' (ক্রিয়া) → 'চলন' (তাঁর চলন সুন্দর)
'ভয়' (বিশেষ্য) → 'ভয় পাওয়া' (সে ভয় পেল)
'হাস' (বিশেষ্য) → 'হাসা' (সে হাসল)
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
বাংলায় মূল পদগুলো হলো বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, ক্রিয়া ও অব্যয়।
পদ পরিবর্তন শব্দকে বাক্যে নতুন অর্থ ও সম্পর্ক প্রদান করে, যা ভাষাকে সমৃদ্ধ করে।
সুতরাং, পদ পরিবর্তন হলো শব্দকে এক পদ থেকে অন্য পদে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শব্দের রূপ ও ভূমিকা বদলে যায়, কিন্তু মূল অর্থ প্রায় অক্ষুণ্ণ থাকে।
'কি' (হ্রস্ব ই-কার) এবং 'কী' (দীর্ঘ ঈ-কার)-এর মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো এদের ব্যবহারের ক্ষেত্র; 'কি' সাধারণত হ্যাঁ/না সূচক প্রশ্নে ব্যবহৃত হয় ('আপনি কি যাবেন?'), যার উত্তর এককথায় দেওয়া যায়, আর 'কী' বিস্তারিত উত্তর বা ব্যাখ্যামূলক প্রশ্ন ও বিস্ময় প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয় ('আপনি কী খাবেন?', 'কী সুন্দর!')। 'কি'-এর উত্তরে ক্রিয়া বিশেষণ এবং 'কী'-এর উত্তরে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ পাওয়া যায়।
'কি' (হ্রস্ব ই-কার) এর ব্যবহার:
হ্যাঁ/না প্রশ্নের জন্য: সংশয়সূচক প্রশ্নবাচক শব্দ যার উত্তর 'হ্যাঁ' কিংবা 'না' হলে 'কি' বসে। যেমন :
"তুমি কি ভাত খাবে?" (উত্তর: হ্যাঁ/না)।
"সে কি এসেছে?" (উত্তর: হ্যাঁ/না)।
"সে কি আসবে?" (উত্তর: হ্যাঁ/না)।
"তুমি কি কেবলই ছবি?" (উত্তর: হ্যাঁ/না)।
"তুমি কি সেই আগের মতোই আছো?" (উত্তর: হ্যাঁ/না)।
"সখী, ভালোবাসা কারে কয়? সে কি কেবলই যাতনাময়?" (উত্তর: হ্যাঁ/না)।
"আমার ছোট তরি; বলো, যাবে কি?" (উত্তর: হ্যাঁ/না)।
"আমি যা দেখি, তুমি কি তা দ্যাখো?" (উত্তর: হ্যাঁ/না)।
তবে বাক্যে অব্যয় পদ হিশেবে ব্যবহৃত হলে 'কি' লিখতে হবে। যেমন :
i) কি ব্যাটিং, কি বোলিং— সাকিব দুটোতেই বিশ্বসেরা।
ii) কি গণিত, কি ইংরেজি— দুটোতেই সে সমান পারদর্শী।
iii) দিন কি রাতে, সাঁঝ-প্রভাতে; তোমারই আছি এই তো।
'কী' (দীর্ঘ ঈ-কার) এর ব্যবহার:
সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া-বিশেষণ, যোজক, আবেগ (বিস্ময়সূচক) পদরূপে বাক্যে 'কী' বসে। যেমন:
কী করি আজ ভেবে না পাই!
পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়!
কী গান শোনাব, ওগো বন্ধু?
কী এমন দুঃখ তোমার?
তোমাকে দেয়ার মতো কীই বা আছে আমার!
বিস্তারিত উত্তরের জন্য: যেসব প্রশ্নের উত্তর ব্যাখ্যা করে দিতে হয়, সেখানে 'কী' বসে। যেমন :
"তুমি কী খাবে?" (উত্তর: আমি ভাত খাবো)।
"আপনার নাম কী?" (উত্তর: আমার নাম ____)।
বিস্ময় বা আবেগ প্রকাশে: বিস্ময়সূচক বাক্যে বিশেষণ কিংবা ক্রিয়াবিশেষণ হিশেবে ব্যবহৃত হলে অব্যয় হিসেবে 'কী' লিখতে হবে। যেমন :
"কী সুন্দর!" (What a beauty!)।
"কী আশ্চর্য!" (How surprising!)।
সে কী, দাদা! অর্ধেকটা ডিমের পুরোটাই খেয়ে ফেললেন!
আহা! কী যে ভালো লাগল!
সময় কী দ্রুতই না কেটে যায়!
মুস্তাফিজ রোহিতকে কী নাকানিচুবানিটাই না খাওয়াল!
এ কী! হচ্ছেটা কী!
কী ঘুমটাই না ঘুমালাম! কী শান্তি!
রূপভেদ:
কি: নাকি, কি-না, এমনকি, কিসে, বৈকি ইত্যাদি শব্দে ক-এ ই-কার বসবে।
কী: কীসের, কীভাবে ইত্যাদি।
বিবিধ উদাহরণ :
ক. i) তুমি কি খাবে? তুমি না খেলে খাবারটা ভিখিরিকে দিয়ে দেবো।
ii) তুমি কী খাবে— ভাত না রুটি?
খ. i) তোমার নাম কী— রনি না জনি ?
ii) তোমার বাবার নাম কি জহির?
গ. i) তুমি কী চাও— শার্ট না পাঞ্জাবি?
ii) তুমি কি চাও আমি তোমাকে পাঞ্জাবি কিনে দেই?
ঘ. i) কিছু ফেলে গেলেন কি?
ii) কী ফেলে গেলেন?
ঙ. i) দ্রব্যমূল্য যে বাড়ল, এর কি কোনো যৌক্তিক কারণ আছে?
ii) কী কারণে দ্রব্যমূল্য বাড়ল?
চ. i) তুমি কি গান গাও? না নাচো?
ii) তুমি কী গান গাও— আধুনিক গান না ব্যান্ডের গান?
এখানে ক থেকে চ পর্যন্ত যে ছয় সেট উদাহরণ দেখলাম; সেখানে i-চিহ্নিত প্রশ্নগুলোর উত্তর হ্যাঁ বা না দ্বারা দেওয়া যায় বলে সেগুলোতে 'কি' বসেছে, আর ii-চিহ্নিত প্রশ্নগুলোর উত্তর হ্যাঁ বা না দ্বারা দেওয়া যায় না বলে সেগুলোতে 'কী' বসেছে।