ক্রিয়া (Verb) হলো এমন একটি শব্দ যা কোনো কাজ করা, ঘটা বা হওয়া বোঝায়, যেমন - 'খাওয়া', 'যাওয়া', 'পড়া', 'লেখা' ইত্যাদি; এটি বাক্যের অপরিহার্য অংশ এবং 'আখ্যাত', 'আখ্যাতিক পদ', 'বিধেয় ক্রিয়া', 'ধাতুর প্রয়োগগত রূপ' নামেও পরিচিত। ক্রিয়াপদ প্রধানত দুই প্রকার: 'সমাপিকা ক্রিয়া' (যা বাক্যের ভাব সম্পূর্ণ করে, যেমন: সে পড়ছে) এবং 'অসমাপিকা ক্রিয়া' (যা বাক্যের ভাব সম্পূর্ণ করে না)।
ক্রিয়া কী?
যে শব্দ দ্বারা কোনো কাজ সম্পন্ন হওয়া বোঝায়, তাকে ক্রিয়া বা ক্রিয়াপদ বলে।
উদাহরণ: 'ছেলেটি পড়ছে', এখানে 'পড়ছে' একটি ক্রিয়া।
ভাব প্রকাশের দিক দিয়ে ক্রিয়া প্রধানত দুই প্রকার: সমাপিকা ক্রিয়া (বাক্যের ভাব সম্পূর্ণ করে) এবং অসমাপিকা ক্রিয়া (বাক্যের ভাব অসম্পূর্ণ রাখে)। তবে, ক্রিয়ার 'ভাব' (Mood) বলতে ক্রিয়ার ধরন বা রীতি বোঝালে তা চার প্রকার (নির্দেশক, অনুজ্ঞা, সাপেক্ষ, আকাঙ্ক্ষা প্রকাশক) হতে পারে।
ভাব প্রকাশের সম্পূর্ণতা অনুসারে (ক্রিয়ার রূপ):
যে ক্রিয়া বাক্যের অর্থ বা ভাব সম্পূর্ণ করে, যেমন: "সে পড়ছে।"
সমাপিকা ক্রিয়া হলো সেই ক্রিয়াপদ যা বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করে এবং বাক্যকে সমাপ্তি দেয়, অর্থাৎ বক্তার মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়। এই ক্রিয়া বাক্যের বিধেয় অংশে বসে এবং 'খেলছে', 'পড়ে', 'খেল' ইত্যাদি এর উদাহরণ, যা একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্য গঠন করে।
উদাহরণ:
ছেলেগুলো বল খেলছে। (এখানে 'খেলছে' সমাপিকা ক্রিয়া)
আনোয়ার বই পড়ে। (এখানে 'পড়ে' সমাপিকা ক্রিয়া)
মূল বিষয়:
অর্থ সম্পূর্ণতা: এটি বাক্যের অর্থকে পূর্ণতা দেয়।
বাক্য সমাপ্তি: এটি বাক্যকে শেষ করে।
গঠন: ধাতুর সঙ্গে বিভিন্ন কালের বিভক্তি (যেমন বর্তমান, অতীত, ভবিষ্যৎ) যুক্ত হয়ে এটি গঠিত হয়।
প্রকারভেদ: সমাপিকা ক্রিয়া সকর্মক, অকর্মক বা বিকর্মক হতে পারে।
সহজ কথায়, যে ক্রিয়া ছাড়া বাক্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়, সেটাই সমাপিকা ক্রিয়া।
যে ক্রিয়া বাক্যের ভাব সম্পূর্ণ করে না, যেমন: "সে পড়লে ভালো করবে।"
অসমাপিকা ক্রিয়া হলো এমন এক ধরনের ক্রিয়া পদ যা বাক্যের অর্থ বা ভাবকে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে পারে না, বরং একটি সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশের জন্য অন্য একটি সমাপিকা ক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। এই ক্রিয়াগুলো বাক্যের পরিসমাপ্তি ঘটায় না, বক্তার কথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, যেমন: "প্রভাতে সূর্য উঠলে...", "হাসান ভাত খেয়ে..." – এখানে 'উঠলে', 'খেয়ে' হলো অসমাপিকা ক্রিয়া, যা একটি সম্পূর্ণ বাক্য হতে পারে না, যতক্ষণ না অন্য ক্রিয়া যোগ হচ্ছে।
উদাহরণ:
"আমি খেয়ে স্কুলে যাবো।" (এখানে 'খেয়ে' অসমাপিকা ক্রিয়া, 'যাবো' সমাপিকা ক্রিয়া)।
"বৃষ্টি আসলে আমরা খেলা বন্ধ করব।" ('আসলে' অসমাপিকা, 'করব' সমাপিকা)।
"সে বই পড়ে বাড়ি ফিরল।" ('পড়ে' অসমাপিকা, 'ফিরল' সমাপিকা)।
মূল বৈশিষ্ট্য:
বাক্যের ভাব সম্পূর্ণ করে না।
একটি সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশের জন্য সমাপিকা ক্রিয়ার প্রয়োজন হয়।
বাক্যে সাধারণত '-এ', '-ইয়া', '-ইতে', '-লেও' ইত্যাদি বিভক্তি যুক্ত হয় (যেমন: খেয়ে, গিয়ে, পড়তে, থাকলেও)।
ভূত অসমাপিকা ক্রিয়া
ভূত অসমাপিকা ক্রিয়া হলো এমন অসমাপিকা ক্রিয়া যা অতীতকালে ঘটেছিল কিন্তু বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ করে না, বরং অন্য একটি সমাপিকা ক্রিয়ার অপেক্ষায় থাকে; যেমন: "সে খেয়ে স্কুলে গেল" (এখানে 'খেয়ে' হলো ভূত অসমাপিকা) – যা অতীত কালের কাজ বোঝাচ্ছে কিন্তু বাক্য শেষ করছে না, আরেকটি কাজ 'গেল' দ্বারা শেষ হচ্ছে।
সংজ্ঞা:
যে ক্রিয়া পদ বাক্যের কাজ সম্পূর্ণ না করে অতীতকালে (অতীতের কোনো কাজ) সম্পন্ন হয়েছে বোঝায়, কিন্তু বাক্যকে অসম্পূর্ণ রাখে এবং আরেকটি সমাপিকা ক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাকে ভূত অসমাপিকা ক্রিয়া বলে।
উদাহরণ:
"আমি বই পড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।" (এখানে 'পড়ে' অতীত অসমাপিকা, 'ঘুমিয়ে পড়লাম' সমাপিকা).
"বৃষ্টি থেমে গেলে আমরা খেলতে যাব।" (এখানে 'থেমে' অতীত অসমাপিকা).
"ছেলেটি খেলা শেষে বাড়ি ফিরল।" (এখানে 'শেষে' অতীত অসমাপিকা).
শর্ত অসমাপিকা ক্রিয়া
শর্ত অসমাপিকা ক্রিয়া হলো সেই অসমাপিকা ক্রিয়া যা বাক্যে শর্ত বা আবশ্যিকতা বোঝায় এবং সাধারণত 'লে', 'লি', 'ইতে' ইত্যাদি বিভক্তি যুক্ত হয়ে গঠিত হয়, যা বাক্যের ভাবকে সম্পূর্ণ করে না বরং পরবর্তী একটি সমাপিকা ক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল থাকে, যেমন—'প্রাতে উঠলে', 'ভাত খেয়ে', 'করতে', 'জানলে' ইত্যাদি বাক্যাংশগুলো পরবর্তী কাজের শর্ত বোঝায়।
মূল বৈশিষ্ট্য:
অসম্পূর্ণতা: এই ক্রিয়াগুলো বাক্যের ভাব সম্পূর্ণ করতে পারে না, বক্তার কথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
নির্ভরশীলতা: এটি একটি প্রধান সমাপিকা ক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল থাকে।
শর্তের প্রকাশ: এটি কোনো কাজ সম্পন্ন হওয়ার শর্ত বা আবশ্যিকতাকে নির্দেশ করে।
বিভক্তি: সাধারণত 'লে', 'লি', 'ইতে', 'ইতেছে' ইত্যাদি বিভক্তি যুক্ত হয়।
উদাহরণ:
প্রাতে সূর্য উঠলে পাখি ডাকে। (এখানে 'উঠলে' শর্ত অসমাপিকা ক্রিয়া)
সে ভাত খেয়ে স্কুলে গেল। (এখানে 'খেয়ে' অসমাপিকা ক্রিয়া, যা শর্তের একটি রূপ)
তুমি যদি করতে পারো, তবেই পারবে। (এখানে 'করতে' শর্ত অসমাপিকা ক্রিয়া)
আমি যদি জানতাম, তবে বলতাম। (এখানে 'জানতাম' শর্ত অসমাপিকা ক্রিয়া)
সহজ কথায়, শর্ত অসমাপিকা ক্রিয়া এমন একটি ক্রিয়া যা 'যদি/তবে' বা 'যখন/তখন'-এর মতো শর্তযুক্ত সম্পর্ক তৈরি করে, কিন্তু নিজে বাক্যের শেষে বসে অর্থ সম্পূর্ণ করে না।
ভাবী অসমাপিকা ক্রিয়া
বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী, ভাবী অসমাপিকা হলো অসমাপিকা ক্রিয়ার একটি ধরণ যা দ্বারা কোনো কাজের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বা কোনো উদ্দেশ্য প্রকাশ পায় [১.১.৬]।
মূল বৈশিষ্ট্য ও সংজ্ঞা:
১. উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য: যখন কোনো কাজ করার ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো অসমাপিকা ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়, তখন তাকে ভাবী অসমাপিকা বলে।
২. বিভক্তি: এই ধরনের ক্রিয়ার শেষে সাধারণত '-তে' বিভক্তি যুক্ত থাকে [১.১.১]।
উদাহরণ:
সে গান শিখতে রাজশাহী যায়। (এখানে 'শিখতে' ক্রিয়াটি গান শেখার উদ্দেশ্য বোঝাচ্ছে, যা এখনো সম্পন্ন হয়নি) [১.৩.১]।
আমি মেলা দেখতে যাব। ('দেখতে' হলো ভাবী অসমাপিকা)।
খোকা খেলতে গেছে। ('খেলতে' হলো ভাবী অসমাপিকা)।
অসমাপিকা ক্রিয়া মূলত মনের ভাব অসম্পূর্ণ রাখে এবং বাক্যের অর্থ পূর্ণ করার জন্য একটি সমাপিকা ক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে [১.১.২, ১.১.৩]। ভাবী অসমাপিকা ছাড়াও আরও দুই প্রকার অসমাপিকা ক্রিয়া রয়েছে:
ভূত অসমাপিকা: কাজ শেষ হয়েছে বোঝালে (যেমন: সে ভাত খেয়ে স্কুলে গেল) [১.২.১]।
শর্ত অসমাপিকা: একটি কাজের ওপর অন্যটি নির্ভর করলে (যেমন: বৃষ্টি হলে ময়ূর নাচে) [১.২.১]।
আপনি এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে এনসিটিবি-র বাংলা ব্যাকরণ বই অনুসরণ করতে পারেন।
কর্মের দিক দিয়ে ক্রিয়া প্রধানত দুই প্রকার: সকর্মক ক্রিয়া (Transitive Verb) ও অকর্মক ক্রিয়া (Intransitive Verb), তবে এদের সাথে দ্বিকর্মক ক্রিয়া (Ditransitive Verb) এবং গঠন ও ভাব প্রকাশের ওপর ভিত্তি করে প্রযোজক ক্রিয়া, যৌগিক ক্রিয়া, মিশ্র ক্রিয়া ও সমাপিকা/অসমাপিকা ক্রিয়া-ও আলোচনা করা হয়। কর্মের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে মূলত এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়, যেখানে সকর্মক ক্রিয়ার কর্ম থাকে (যেমন: 'সে ভাত খায়'), আর অকর্মক ক্রিয়ার কর্ম থাকে না (যেমন: 'সে হাসে')।
কর্মের দিক দিয়ে প্রধান প্রকারভেদ:
যে ক্রিয়ার কর্ম থাকে বা কর্মের প্রয়োজন হয় (যেমন: পড়া, লেখা, খাওয়া)।
সকর্মক ক্রিয়া (Transitive Verb) হলো এমন এক ধরনের ক্রিয়া যার একটি কর্ম (object) থাকে, অর্থাৎ ক্রিয়াটিকে 'কী' বা 'কাকে' প্রশ্ন করলে একটি উত্তর পাওয়া যায় এবং কর্ম ছাড়া ক্রিয়াটির অর্থ সম্পূর্ণ হয় না; যেমন: "সে বই পড়ছে" (কী পড়ছে?—বই), "আমি ভাত খাই" (কী খাই?—ভাত)। এটি এমন ক্রিয়া যা কর্তা থেকে কর্মের উপর স্থানান্তরিত হয় এবং বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ করে।
উদাহরণ:
"ছাত্ররা বই পড়ে।" (এখানে 'পড়ে' একটি সকর্মক ক্রিয়া, কারণ 'কী পড়ে' প্রশ্ন করলে 'বই' উত্তর আসে)।
"মা রান্না করছেন।" ('করছেন' সকর্মক ক্রিয়া, কারণ 'কী করছেন' প্রশ্ন করলে 'রান্না' উত্তর আসে)।
"ছেলেটি ঘুড়ি ওড়াচ্ছে।" ('ওড়াচ্ছে' সকর্মক ক্রিয়া, কারণ 'কী ওড়াচ্ছে'—'ঘুড়ি')।
সহজে বোঝার উপায়:
ক্রিয়াকে 'কী' বা 'কাকে' দিয়ে প্রশ্ন করুন।
যদি উত্তর আসে, তবে সেটি সকর্মক ক্রিয়া।
যদি কোনো উত্তর না আসে, তবে সেটি অকর্মক ক্রিয়া (Intransitive Verb)।
উদাহরণ: ছেলেটি বই পড়ছে (কী পড়ছে? - বই)।
যে ক্রিয়ার কোনো কর্ম থাকে না, ক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করতে পারে (যেমন: হাসা, কাঁদা, শোয়া, যাওয়া)।
উদাহরণ: মেয়েটি হাসছে, পাখিটি উড়ছে।
যে ক্রিয়ার দুটি কর্ম থাকে, একটি মুখ্য ও একটি অপ্রধান কর্ম (যেমন: শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন)।
দ্বিকর্মক ক্রিয়া (Bicausal Verb) হলো এমন এক ধরনের ক্রিয়া যার বাক্যে দুটি কর্ম (object) থাকে; একটি মুখ্য কর্ম (direct object) এবং অন্যটি গৌণ কর্ম (indirect object)। যেমন: “শিক্ষক ছাত্রকে অঙ্ক করান”—এখানে ‘ছাত্রকে’ এবং ‘অঙ্ক’ দুটি কর্ম, তাই ‘করান’ একটি দ্বিকর্মক ক্রিয়া।
বৈশিষ্ট্য
দুটি কর্ম: এই ক্রিয়া সবসময় দুটি কর্মকে আশ্রয় করে গঠিত হয়।
উদাহরণ:
'মা শিশুকে গোসল করাচ্ছেন।' (এখানে 'শিশুকে' ও 'গোসল' দুটি কর্ম)।
'সে আমাকে একটি বই দিলো।' (এখানে 'আমাকে' ও 'বই' দুটি কর্ম)।
গঠন অনুসারে ক্রিয়া প্রধানত চার প্রকারে বিভক্ত: ১. মৌলিক ক্রিয়া (Simple Verb), ২. যৌগিক ক্রিয়া (Compound Verb), ৩. প্রযোজক ক্রিয়া (Causative Verb), এবং ৪. সংযোগমূলক/মিশ্র ক্রিয়া (Complex/Mixed Verb), যেখানে একটি মূল ধাতুর সাথে অন্য ধাতু বা শব্দাংশ যুক্ত হয়ে ক্রিয়া গঠিত হয়।
গঠন অনুসারে ক্রিয়ার প্রকারভেদ:
একটি মাত্র ধাতু বা মূল শব্দ থেকে গঠিত হয়, যেমন— 'খা' (খাওয়া), 'যা' (যাওয়া)।
যৌগিক ক্রিয়া হলো এমন এক ধরনের ক্রিয়া যা একটি অসমাপিকা ক্রিয়া (যে ক্রিয়া বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ করে না) এবং একটি সমাপিকা ক্রিয়া (যে ক্রিয়া বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ করে) মিলে গঠিত হয়, যা একটি একক কাজ বোঝায়, যেমন—'বসে পড়া', 'বেজে ওঠা', 'মেরে ফেলা'। এটি একাধিক শব্দের সমন্বয়ে গঠিত হয় এবং একটি নতুন অর্থ প্রকাশ করে।
উদাহরণ:
"সে বসিয়া পড়িল।" এখানে 'বসিয়া' (অসমাপিকা) + 'পড়িল' (সমাপিকা) মিলে যৌগিক ক্রিয়া 'বসিয়া পড়িল' গঠিত হয়েছে।
"সাইরেনটি বেজে উঠল।" এখানে 'বেজে' (অসমাপিকা) + 'উঠল' (সমাপিকা) মিলে যৌগিক ক্রিয়া 'বেজে উঠল' তৈরি হয়েছে।
"অন্ধকারে এখানে কেঁপে উঠছে রজনীগন্ধা।" এখানে 'কেঁপে' (অসমাপিকা) + 'উঠছে' (সমাপিকা) মিলে 'কেঁপে উঠছে' যৌগিক ক্রিয়া।
মূল বৈশিষ্ট্য:
দুই বা ততোধিক শব্দ: যৌগিক ক্রিয়া সাধারণত দুটি বা তার বেশি শব্দ দিয়ে গঠিত হয়।
অসমাপিকা + সমাপিকা: একটি অসমাপিকা ক্রিয়ার সঙ্গে আরেকটি ধাতু (ক্রিয়াপদ) যুক্ত হয়।
একক অর্থ: একসাথে একটি একক কাজ বা ভাব প্রকাশ করে।
'নামধাতু' বা 'নামধাতুজ ক্রিয়া' হলো বিশেষ্য, বিশেষণ বা অনুকার-সূচক অব্যয়ের সঙ্গে 'আ' প্রত্যয় যোগে গঠিত ক্রিয়া, যা কোনো নাম বা শব্দ থেকে উৎপন্ন হয়; যেমন: 'হাত' থেকে 'হাতাহাতি' বা 'কথা' থেকে 'কথাবার্তা' (যদিও এটি ভিন্ন প্রক্রিয়ায় গঠিত, মূল ধারণাটি হল শব্দ থেকে ক্রিয়া তৈরি)। সহজ কথায়, যখন কোনো বিশেষ্য (noun) বা বিশেষণ (adjective) 'আ' যুক্ত হয়ে একটি ক্রিয়া (verb) তৈরি করে, তখন তাকে নামধাতু বা নামধাতু ক্রিয়া বলে।
উদাহরণ:
নাম/বিশেষ্য: হাত (Hand) → নামধাতু ক্রিয়া: হাতানো (To grasp/touch) / হাতাহাতি (To fight with hands)
নাম/বিশেষণ: বিষ (Poison) → নামধাতু ক্রিয়া: বিষানো (To poison)
নাম/বিশেষণ: ঘন (Thick) → নামধাতু ক্রিয়া: ঘনানো (To thicken)
মূল ধারণা:
ধাতু: ক্রিয়াপদের মূল অংশ, যা ক্রিয়ার ভাব প্রকাশ করে (যেমন: √কর, √খা)।
নামধাতু: কোনো নাম বা শব্দ (বিশেষ্য/বিশেষণ) থেকে তৈরি হওয়া ধাতু।
নামধাতু ক্রিয়া: নামধাতুর সাথে 'আ' যুক্ত হয়ে গঠিত ক্রিয়া।
যে ক্রিয়া কর্তা নিজে না করে অন্যকে দিয়ে করায়, যেমন— 'মা শিশুকে চাঁদ দেখাচ্ছেন' (দেখ্+আ), 'শাওন হাসছে' (হাস্+আ)।
প্রযোজক ক্রিয়ার মূল ধারণা
কর্তা নিজে করে না: কর্তা কাজটি সরাসরি করে না।
অন্যকে দিয়ে করায়: কর্তা অন্য কাউকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নেয় বা কাজটি ঘটাতে বাধ্য করে/প্ররোচিত করে।
প্রযোজক ক্রিয়া (Causative Verb) হলো এমন এক ধরনের ক্রিয়া যেখানে মূল কর্তা নিজে কাজটি না করে অন্যকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নেয় বা চালিত করে, যা সাধারণত 'আস' প্রত্যয় যোগে গঠিত হয়; যেমন: 'শিক্ষক ছাত্রদের পড়াচ্ছেন' (পড়ানো কাজটি শিক্ষক নিজে না করে ছাত্রকে দিয়ে করাচ্ছেন) বা 'মা শিশুকে চাঁদ দেখাচ্ছেন' (মা নিজে চাঁদ না দেখে শিশুকে দেখাচ্ছেন), যেখানে 'পড়ানো' এবং 'দেখানো' হলো প্রযোজক ক্রিয়া।
সংজ্ঞা
প্রযোজক ক্রিয়া: যে ক্রিয়া একজনের প্রযোজনা বা উদ্যোগে অন্য একজন কর্তৃক সম্পাদিত হয়, তাকে প্রযোজক ক্রিয়া বলে। একে ণিজন্ত ক্রিয়াও বলা হয়।
উদাহরণ
মূল ক্রিয়া: পড়া (To read)
প্রযোজক ক্রিয়া: পড়ানো (To make someone read / To teach)
উদাহরণ: শিক্ষক ছাত্রদের পড়াচ্ছেন (Teacher is making students read)।
মূল ক্রিয়া: দেখা (To see)
প্রযোজক ক্রিয়া: দেখানো (To make someone see)
উদাহরণ: মা খোকাকে চাঁদ দেখাচ্ছেন (Mother is showing the moon to the child)।
মূল ক্রিয়া: শোনা (To hear)
প্রযোজক ক্রিয়া: শোনানো (To make someone hear)
মূল ক্রিয়া: চলা (To walk)
প্রযোজক ক্রিয়া: চলানো (To make someone walk)
প্রযোজক কর্তা ও প্রযোজ্য কর্তা
প্রযোজক কর্তা: যে মূল কর্তা অন্যকে দিয়ে কাজ করায় (যেমন: শিক্ষক)।
প্রযোজ্য কর্তা: যাকে দিয়ে কাজ করানো হয় (যেমন: ছাত্র)।
বিশেষ্য, বিশেষণ বা ধনাত্মক শব্দের সঙ্গে 'কর', 'হ' ইত্যাদি ধাতু যুক্ত হয়ে গঠিত হয়, যেমন— 'গান গাওয়া', 'ভালো হওয়া', 'দর্শন করা'।
সংযোগমূলক বা মিশ্র ক্রিয়া হলো এমন এক ধরনের ক্রিয়া যা বিশেষ্য, বিশেষণ বা ধ্বন্যাত্মক শব্দের সাথে একটি ক্রিয়াপদ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়, যা একটি সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে, যেমন 'গান গাওয়া', 'প্রীত হওয়া', 'জল পান করা' ইত্যাদি, যা বাক্যের কাজকে প্রকাশ করে। এটি একটি যৌগিক ক্রিয়ার ভিন্ন রূপ, যেখানে একটি মূল শব্দ (বিশেষ্য/বিশেষণ/ধ্বনাত্মক) এবং একটি সহায়ক ক্রিয়া (কর, হ, দে, পা) মিলিত হয়।
উদাহরণ:
বিশেষ্য + ক্রিয়াপদ:
দর্শন + করা = দর্শন করা (দেখার কাজটি সম্পন্ন করা)
জল + পান করা = জল পান করা (জল পান করার কাজটি করা)
বিশেষণ + ক্রিয়াপদ:
প্রীত + হওয়া = প্রীত হওয়া (খুশি হওয়া)
একমত + হওয়া = একমত হওয়া (রাজী হওয়া)
ধ্বন্যাত্মক + ক্রিয়াপদ:
হাবুডুবু + খাওয়া = হাবুডুবু খাওয়া (ডুবতে থাকা)
কনকন + করা = কনকন করা (শীতের অনুভূতি)
মূল পার্থক্য:
সংযোগমূলক ক্রিয়া: একটি বিশেষ্য, বিশেষণ বা ধ্বন্যাত্মক শব্দ + একটি সহায়ক ক্রিয়া (যেমন: করা, হওয়া, দেওয়া, নেওয়া, পাওয়া) মিলে গঠিত হয়, যা একটি পূর্ণাঙ্গ কাজ বোঝায়।
যৌগিক ক্রিয়া: একটি অসমাপিকা ক্রিয়া + একটি সমাপিকা ক্রিয়া মিলে গঠিত হয় (যেমন: 'ভুল করে', 'কাজ করে'—এখানে 'করে' অসমাপিকা ও সমাপিকা দুটোই হতে পারে)।
মূলত, এটি বাক্যে একটি সম্পূর্ণ ক্রিয়া সম্পাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়, যেখানে মূল কাজটি বিশেষ্য বা বিশেষণ দ্বারা প্রকাশিত হয় এবং ক্রিয়াপদটি সেই কাজটি সম্পন্ন করার সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
সমধাতুজ কর্মের ক্রিয়া বলতে বোঝায় যখন ক্রিয়াটি যে ধাতু (মূল শব্দ) থেকে তৈরি, কর্মপদটিও (যে কাজটি করা হচ্ছে) সেই একই ধাতু থেকে নিষ্পন্ন বা গঠিত হয়; অর্থাৎ, ক্রিয়া ও কর্মের মূল উৎস একই থাকে, যেমন - "খুব এক ঘুম ঘুমিয়েছি" (এখানে 'ঘুম' ধাতু থেকে 'ঘুমিয়েছি' ক্রিয়া ও 'ঘুম' কর্ম).
সহজ ভাষায়:
যখন কোনো বাক্যে কর্তা যে কাজটি করে (ক্রিয়া) এবং যে বস্তুর ওপর কাজটি করা হয় (কর্ম), তাদের মূল শব্দ বা ধাতু একই হয়, তখন তাকে সমধাতুজ কর্ম বলে.
উদাহরণ:
"সে পড়াশোনা করে।" (পড় + পড়া)
"আমি গান গাই।" (গাই + গান)
"শ্রমিক শ্রম করছে।" (শ্রম + শ্রম)
মূলত, ক্রিয়া ও কর্মের মধ্যে ধাতুগত ঐক্য থাকলে এই ধরনের কর্ম গঠিত হয়, যা কর্ম কারকের একটি বিশেষ প্রকারভেদ.