প্রাচীন বাংলায় মাত্র দুটি চিহ্ন—দাঁড়ি (।) ও জোড়দাঁড়ি (॥)—ব্যবহার হতো। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় প্রথম বিরাম চিহ্নের (যতি চিহ্নের) প্রবর্তন করেন এবং তাঁর 'বেতাল পঞ্চবিংশতি' (১৮৪৭) গ্রন্থে এর সফল প্রয়োগ দেখান, যার ফলে বাংলা গদ্যের অর্থোদ্ধার ও সহজবোধ্যতা বাড়ে; তিনি কমা, সেমিকোলন, কোলন, দাঁড়ি ইত্যাদি চিহ্ন ব্যবহার করে বাংলা ভাষাকে আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বাংলায় বিরাম চিহ্নের প্রবর্তক: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) ছিলেন বাংলা গদ্যের জনক, যিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক ও শিল্পগুণসম্পন্ন গদ্যের প্রবর্তন করেন, যতিচিহ্নের ব্যবহার চালু করেন, এবং 'বর্ণপরিচয়'-এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন; তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, যিনি বিধবা বিবাহ ও নারীশিক্ষার প্রচলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, এবং আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
বাংলায় প্রবর্তক হিসেবে তাঁর অবদান:
বাংলা গদ্য: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে 'বাংলা গদ্যের জনক' ও 'প্রথম যথার্থ শিল্পী' উপাধি দেন; তিনি সাধু গদ্যের একটি মানদণ্ড তৈরি করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চলিত ভাষার গতিশীলতা আনেন।
যতিচিহ্ন: 'বেতাল পঞ্চবিংশতি' গ্রন্থ থেকে তিনি বাংলা গদ্যে যতি বা বিরাম চিহ্নের ব্যবহার শুরু করেন, যা আগে ছিল না বললেই চলে (কেবল দাঁড়ি ছাড়া)।
শিক্ষা: 'বর্ণপরিচয়' (১৮৫৫) নামে দুটি প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন, যা বাংলার শিক্ষাজগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
সমাজ সংস্কার: বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য, এবং তিনি বহু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও বহুবিবাহ ও শিশুবিবাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
বিরাম চিহ্ন (যতিচিহ্ন বা ছেদচিহ্ন) হলো লিখিত ভাষায় ব্যবহৃত এমন কিছু সাংকেতিক চিহ্ন যা বাক্যের অর্থ সুস্পষ্ট করতে, ভাব প্রকাশ করতে এবং কোথায় কতটুকু থামতে হবে তা বোঝাতে সাহায্য করে; যেমন: দাঁড়ি (।), কমা (,), প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?) ইত্যাদি, যা ভাষাকে সহজপাঠ্য ও প্রাঞ্জল করে তোলে।
বিরাম চিহ্নের প্রয়োজনীয়তা
অর্থ সুস্পষ্ট করা: বাক্যের সঠিক অর্থ বুঝতে সাহায্য করে (যেমন: "দাঁড়াও, আমি আসছি" বনাম "দাঁড়াও আমি আসছি")।
ভাব প্রকাশ: জিজ্ঞাসা, বিস্ময়, আনন্দ, দুঃখ ইত্যাদি আবেগ প্রকাশ করে।
পাঠযোগ্যতা বৃদ্ধি: লেখাকে সহজ ও সাবলীল করে তোলে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের বিরতি: পাঠককে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঠিক স্থান নির্দেশ করে।
বাক্য অলঙ্করণ: বাক্যকে আকর্ষণীয় ও সুশৃঙ্খল করে তোলে।
আধুনিকীকরণ: বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে সংস্কৃতের জটিলতা থেকে মুক্ত করে সহজ ও আধুনিক রূপ দেন, যার একটি বড় অংশ ছিল এই বিরাম চিহ্নের ব্যবহার।
দাঁড়ি (।) (Full Stop/Period): নির্দেশক বা বর্ণনামূলক বাক্যের সমাপ্তি বোঝাতে বাক্যের শেষে বসে।
উদাহরণ: সে স্কুলে গেল।
কমা (,) (Comma): বাক্যে স্বল্প বিরতি, দুটি সমজাতীয় শব্দ বা বাক্যাংশ আলাদা করা, বা তালিকা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ: আমি আম, জাম, কাঁঠাল ভালোবাসি।
প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?) (Question Mark): প্রশ্নবোধক বাক্যের শেষে বসে।
উদাহরণ: তুমি কোথায় যাচ্ছ?
বিস্ময়সূচক চিহ্ন (!) (Exclamation Mark): আবেগ (আনন্দ, দুঃখ, ভয়) বা আদেশ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ: বাঃ, কী সুন্দর দৃশ্য! / সাবধান!
সেমিকোলন (;) (Semicolon): দুটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত স্বাধীন বাক্যকে যুক্ত করতে বা কমার চেয়ে বেশি কিন্তু দাঁড়ির চেয়ে কম বিরতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ: সে খুব ক্লান্ত ছিল; তাই সে বিশ্রাম নিল।
কোলন (:) (Colon): কোনো তালিকা, উদাহরণ, উদ্ধৃতি বা ব্যাখ্যা শুরু করতে ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ: পদ পাঁচ প্রকার: বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, অব্যয় ও ক্রিয়া।
উদ্ধৃতি চিহ্ন (" ") (Quotation Marks): কারো সরাসরি উক্তি বা কোনো শিরোনাম বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ: তিনি বললেন, "আমি কাল আসব।"
অ্যাপোস্ট্রফি (') (Apostrophe): অধিকার (ownership) বা শব্দ সংক্ষেপ (contraction) বোঝাতে ব্যবহৃত হয় (বাংলায় এর ব্যবহার সীমিত)।
উদাহরণ: রহিম-এর বই। (বাংলায় '-' ব্যবহৃত হয়)
ড্যাশ (—/–) (Dash): বাক্যে অতিরিক্ত তথ্য যোগ করতে, কোনো কিছু ব্যাখ্যা করতে বা কথোপকথনে বাধা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ: তোমরা দরিদ্রের উপকার কর—এতে তোমাদের সম্মান বাড়বে।
হাইফেন (-) (Hyphen): দুটি শব্দকে যুক্ত করে একটি নতুন শব্দ তৈরি করতে (যেমন: মা-বাবা) বা যৌগিক শব্দে ব্যবহৃত হয়।
বন্ধনী ( ( ) / [ ] / { } ) (Bracket): বাংলা ব্যাকরণে বন্ধনী (Brackets) মূলত কোনো বাক্যের ভেতরে অতিরিক্ত তথ্য প্রদান বা ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহৃত হয়। গণিত এবং সাহিত্যের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ভিন্ন।
বাংলায় প্রধানত তিন প্রকার বন্ধনী ব্যবহার করা হয়:
১. প্রথম বন্ধনী ( ): এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। কোনো শব্দের ব্যাখ্যা বা অতিরিক্ত তথ্য দিতে এটি ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ: তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী।
২. দ্বিতীয় বন্ধনী { }: সাধারণ সাহিত্যে এর ব্যবহার কম। এটি মূলত গণিত এবং বিশেষ কোনো তালিকার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
৩. তৃতীয় বন্ধনী [ ]: এটি সাধারণত ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনায় বা কোনো সংগৃহীত উদ্ধৃতির ভেতরে কোনো ভুল সংশোধন বা ব্যাখ্যামূলক শব্দ যোগ করতে ব্যবহৃত হয়।
ব্যবহারের সাধারণ নিয়ম:
বন্ধনী চিহ্নের ভেতরে থাকা অংশটি বাক্যের মূল কাঠামোর অংশ নয়।
বন্ধনী শুরু হওয়ার আগে একটি স্পেস বা খালি জায়গা থাকে, কিন্তু বন্ধনীর ভেতরে থাকা প্রথম এবং শেষ বর্ণের সাথে কোনো স্পেস থাকে না।