বাচ্য (Voice) হলো ব্যাকরণে বাক্যের এমন একটি প্রকাশভঙ্গি যেখানে কর্তা, কর্ম বা ক্রিয়ার প্রাধান্য অনুযায়ী ক্রিয়াপদের রূপের পরিবর্তন হয়; সহজ কথায়, একই বক্তব্যকে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করাকে বাচ্য বলে, যা প্রধানত চার প্রকার: কর্তৃবাচ্য (কর্তার প্রাধান্য), কর্মবাচ্য (কর্মের প্রাধান্য), ভাববাচ্য (ক্রিয়ার ভাবের প্রাধান্য) এবং কর্মকর্তৃবাচ্য (কর্ম ও কর্তৃবাচ্যের মিশ্রণ)।
বাচ্যের প্রকারভেদ
যে বাক্যে কর্তা প্রধান এবং ক্রিয়া কর্তার অনুসারী হয়। যেমন: পুলিশ চোরটিকে ধরেছে।
কর্তৃবাচ্যের বৈশিষ্ট্য:
কর্তার প্রাধান্য: বাক্যে কর্তা প্রধান ভূমিকা পালন করে।
ক্রিয়ার অনুসরণ: ক্রিয়াপদটি কর্তার পুরুষ ও সংখ্যা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয় (যেমন: আমি পড়ি, সে পড়ে, তারা পড়ে)।
কর্তৃবাচ্যের ব্যবহার:
প্রত্যক্ষ ও সহজ প্রকাশ: এটি সবচেয়ে সহজ ও স্বাভাবিক বাচ্য, যা সরাসরি ও স্পষ্ট বক্তব্য প্রকাশে ব্যবহৃত হয়।
সাধারণ বিবৃতি: যখন কোনো কাজ কে করছে বা কর্তা কী করছে, তা সরাসরি বোঝানো হয়, তখন কর্তৃবাচ্য ব্যবহার করা হয়।
উদাহরণ:
"সে চিঠি লেখে।" (এখানে 'সে' কর্তা কাজটি করছে)
"শিক্ষক ছাত্রদের পড়ান।" (শিক্ষক কাজটি করছেন)
"আমরা ফুটবল খেলব।" (এখানে 'আমরা' কর্তা কাজটি করবে)
যে বাক্যে কর্মপদ প্রধান এবং ক্রিয়া কর্মপদের অনুসারী হয় (কর্তায় 'দ্বারা', 'কর্তৃক' যুক্ত হয়)। যেমন: পুলিশের দ্বারা চোরটি ধৃত হয়েছে।
কর্মবাচ্যের মূল বৈশিষ্ট্য:
কর্তার নিষ্ক্রিয়তা: বাক্যের কর্তা (subject) সক্রিয় না হয়ে নিষ্ক্রিয় থাকে এবং কর্মের গ্রহীতা হয়।
গুরুত্ব: কাজটি কে করেছে তার চেয়ে কাজটি বা যার ওপর করা হয়েছে তার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উদাহরণ:
Active: "I eat a mango." (আমি একটি আম খাই।)
Passive: "A mango is eaten by me." (একটি আম আমার দ্বারা খাওয়া হয়।)
কর্মবাচ্য ব্যবহার:
যখন কর্তা অজানা থাকে বা অপ্রয়োজনীয় হয় (যেমন: "The bridge was built in 1950.")।
যখন কাজের ওপর বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন (যেমন: "Mistakes were made.")।
বৈজ্ঞানিক বা গবেষণামূলক লেখায়, যেখানে নৈর্ব্যক্তিকতা প্রয়োজন (যেমন: "The sample was heated.")।
যে বাক্যে ক্রিয়ার ভাব (ক্রিয়া নিজেই) প্রধান হয়, কর্তা বা কর্ম নয়; এখানে সাধারণত ক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। যেমন: বৃষ্টি হচ্ছে।
ভাববাচ্যের বৈশিষ্ট্য:
প্রাধান্য: বাক্যে কর্তা বা কর্মের পরিবর্তে 'ভাব'-এর প্রাধান্য থাকে।
ক্রিয়ার রূপ: ক্রিয়া সবসময় নাম পুরুষের (নাম পুরুষ/প্রথম পুরুষ) হয় এবং সাধারণত একবচনান্ত হয়।
কর্ম:সাধারণত কর্ম থাকে না, বা থাকলেও অপ্রধান থাকে।
কর্তা: কর্তায় ষষ্ঠী (আমার), দ্বিতীয়া (আমাকে) বা তৃতীয়া (তোমার দ্বারা) বিভক্তি যুক্ত হতে পারে, অথবা কর্তা উহ্যও থাকতে পারে।
উদাহরণ:
আমার খাওয়া হলো না (কর্তা: আমার, ক্রিয়া: খাওয়া হলো না)।
আমাকে এখন যেতে হবে (কর্তা: আমাকে, ক্রিয়া: যেতে হবে)।
তোমার দ্বারা এ কাজ হবে না (কর্তা: তোমার দ্বারা, ক্রিয়া: হবে না)।
এ পথে চলা যায় না (কর্তা উহ্য, ক্রিয়া: চলা যায় না)।
ঝগড়া করা উচিত নয় (কর্তা উহ্য, ক্রিয়া: করা উচিত নয়)।
কর্মবাচ্যের রূপ হলেও যেখানে কর্তা উপস্থিত থাকে এবং কর্মবাচ্যের মতো কর্মের প্রাধান্যই মুখ্য হয়। যেমন: বইগুলো বিক্রি হচ্ছে। (এখানে 'বিক্রি হচ্ছে' ভাবটি কর্মের ওপর ক্রিয়া বোঝাচ্ছে)
মূল বৈশিষ্ট্য:
কর্তা অনুপস্থিত: বাক্যে কর্তা থাকে না বা উহ্য থাকে।
কর্মই কর্তা: কর্মপদটিই কর্তার মতো কাজ করে এবং ক্রিয়ার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে।
উদাহরণ:
"বই পড়া হয়" (কে পড়ে, বলা নেই, কিন্তু বই পড়ার কাজটি প্রধান)।
"কলম দিয়ে লেখা হচ্ছে" (কে লিখছে, নেই)।
"তার কখন যাওয়া হবে?"
"কুবের কে আসতে হবে।"
"আমার খাওয়া হইল।"
"রামের যাইতে হইবে।"
কখন ব্যবহৃত হয়:
যখন কর্তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বা কর্তা অজানা/অনির্দিষ্ট থাকে।
কোনো কাজ সম্পন্ন হওয়া বা না হওয়াকে বোঝাতে, যেখানে কর্মের অবস্থা বা ক্রিয়াটি মুখ্য।
মূল পার্থক্য:
কর্তৃবাচ্যে কর্তা মুখ্য: "আমি বই পড়ি।"
কর্মবাচ্যে কর্ম মুখ্য: "আমার দ্বারা বই পড়া হয়।"
ভাববাচ্যে ক্রিয়া মুখ্য: "এখানে বসে থাকা যায় না।"
বাচ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে একই অর্থকে বিভিন্ন ভঙ্গিতে প্রকাশ করে ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করা যায়।
কর্ম-কর্তৃবাচ্য (বিশেষ বাচ্য):
এখানে কর্মপদই কর্তার ভূমিকা পালন করে, কিন্তু কর্তা অনুচ্চারিত থাকে।
উদাহরণ: "শাঁখ বাজে", "আম পেকেছে"।
1. কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্য:
রূপান্তরের নিয়মাবলী:
কর্তার পরিবর্তন: কর্তৃবাচ্যের কর্তা কর্মবাচ্যে তৃতীয়া বিভক্তি যুক্ত হয়ে গৌণ হয়ে যায় (যেমন: আমি -> আমার দ্বারা, সে -> তার কর্তৃক)।
কর্মের প্রাধান্য: কর্মবাচ্যে কর্মপদই প্রধান হয়ে ওঠে এবং ক্রিয়াপদ কর্মের লিঙ্গ, বচন ও পুরুষ অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
ক্রিয়ার রূপ: ক্রিয়াপদ 'যাওয়া' (হওয়া) ধাতু যোগে পরিবর্তিত হয় (যেমন: মারে -> মারা যায়, করে -> করা হয়)।
উদাহরণ:
কর্তৃবাচ্য: আমি বই পড়ি।
কর্মবাচ্য: আমার দ্বারা বই পড়া হয়।
কর্তৃবাচ্য: সে চিঠি লিখছে।
কর্মবাচ্য: তার দ্বারা চিঠি লেখা হচ্ছে।
2. কর্তৃবাচ্য থেকে ভাববাচ্য:
রূপান্তরের নিয়মাবলী:
1. কর্তাকে গৌণ করা: কর্তৃবাচ্যের কর্তা (যে কাজ করে) ভাববাচ্যে 'দ্বারা', 'কর্তৃক', 'থেকে' বা শূন্য বিভক্তি যুক্ত হয়ে অপ্রধান হয়ে যায়।
কর্তৃবাচ্য: আমি কাজটি করব।
ভাববাচ্য: আমার দ্বারা কাজটি করা হবে / আমার কাজটি করা হোক।
2. ক্রিয়ার প্রাধান্য: ক্রিয়াপদটি কর্তার অনুসারী না হয়ে ক্রিয়ার ভাব বা অবস্থার উপর জোর দেয়।
কর্তৃবাচ্য: সে দৌড়ায়।
ভাববাচ্য: তার দৌড়ানো হয় / তার দৌড়ানো যাক।
3. অসমাপিকা ক্রিয়ার ব্যবহার: ক্রিয়ার সঙ্গে 'হওয়া', 'যাওয়া', 'দেওয়া' ইত্যাদি অসমাপিকা ক্রিয়া যুক্ত হয়।
কর্তৃবাচ্য: তারা খেলবে।
ভাববাচ্য: তাদের খেলা হবে / তাদের খেলা হোক।
4. 'না' এর ব্যবহার (অসমর্থতা): অসমর্থতা বোঝাতে 'না' যোগ হয়।
কর্তৃবাচ্য: আমি যেতে পারব না।
ভাববাচ্য: আমার যাওয়া হবে না।
5. অনুজ্ঞা ও অনুরোধ: অনুজ্ঞা বা অনুরোধের ক্ষেত্রে 'হোক', 'যাওয়া হোক', 'করা হোক' ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়।
কর্তৃবাচ্য: আপনারা পড়ুন।
ভাববাচ্য: আপনাদের পড়া হোক।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ:
কর্তৃবাচ্য: সকলে তাঁকে ভালোবাসে।
ভাববাচ্য: তাঁর ভালোবাসা হয় / তাঁর প্রতি ভালোবাসা দেখানো হয়।
কর্তৃবাচ্য: আমি কিছুতেই রাজি নই।
ভাববাচ্য: আমার কিছুতেই রাজি হওয়া যায় না।
কর্তৃবাচ্য: তুমি এখন যাও।
ভাববাচ্য: তোমার এখন যাওয়া হোক।
মূলত, ভাববাচ্যে কর্তা বা কর্মের চেয়ে ক্রিয়ার অনুভূতি বা কাজটি সম্পন্ন হওয়ার ভাবটিই মুখ্য হয়ে ওঠে।
3. কর্মবাচ্য থেকে কর্তৃবাচ্য:
রূপান্তরের নিয়মাবলী:
কর্তা পরিবর্তন: কর্মবাচ্যের কর্তায় 'দ্বারা', 'কর্তৃক', 'হাতে' ইত্যাদি বিভক্তি যুক্ত থাকে (যেমন: শিকারি কর্তৃক), সেগুলোকে শূন্য বা প্রথমা বিভক্তিযুক্ত (যেমন: শিকারি) করতে হবে।
কর্ম ও ক্রিয়া: কর্মবাচ্যের কর্মটি কর্তৃবাচ্যে কর্তা হয়ে ওঠে এবং ক্রিয়াপদ তখন কর্তা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।
ক্রিয়ার রূপ: 'হয়েছে', 'করা হয়েছে'-এর মতো কর্মবাচ্যের ক্রিয়াপদের পরিবর্তে কর্তা অনুযায়ী সাধারণ ক্রিয়াপদ (যেমন: নিহত হয়েছে-এর বদলে 'নিধন করেছে') ব্যবহার করা হয়।
উদাহরণ:
কর্মবাচ্য: পুলিশ দ্বারা চোর ধৃত হয়েছে।
কর্তৃবাচ্য: পুলিশ চোরটিকে ধরল (বা ধরেছে)।
কর্মবাচ্য: শিকারি কর্তৃক বাঘটি নিহত হয়েছে।
কর্তৃবাচ্য: শিকারি বাঘটিকে মারল (বা মেরেছে)।
কর্মবাচ্য: আমার দ্বারা কাজটি করা হবে।
কর্তৃবাচ্য: আমি কাজটি করব।
এইভাবে, কর্মবাচ্যের কর্ম-প্রধান বাক্যকে কর্তৃবাচ্যের কর্তা-প্রধান বাক্যে পরিবর্তন করা হয়, যেখানে কর্তার সক্রিয় ভূমিকা প্রকাশ পায়।
4. ভাববাচ্য থেকে কর্তৃবাচ্য:
রূপান্তরের নিয়মাবলী:
কর্তার প্রাধান্য: ভাববাচ্যে সাধারণত কর্তা উহ্য থাকে বা অপ্রধান থাকে। কর্তৃবাচ্যে সেই অপ্রধান কর্তাকে প্রধান করে আনতে হবে এবং তাকে প্রথমা বিভক্তি (শূন্য বিভক্তি) যুক্ত করতে হবে।
ক্রিয়ার পরিবর্তন: ক্রিয়াপদটি কর্তার পুরুষ ও বচন অনুযায়ী পরিবর্তিত হবে। ভাববাচ্যের ক্রিয়ারূপ (যেমন: "হবে না", "যাওয়ার কথা") পরিবর্তিত হয়ে সাধারণ ক্রিয়ার রূপ নেবে।
বিভক্তি লোপ: ভাববাচ্যের 'দ্বারা', 'কর্তৃক', 'চেয়ে' ইত্যাদি অনুসর্গ বা বিভক্তিগুলো লোপ পাবে।
উদাহরণ:
ভাববাচ্য: আমার যাওয়া হবে না।
কর্তৃবাচ্য: আমি যাব না।
ভাববাচ্য: তোমাকে পাস করতে হবে।
কর্তৃবাচ্য: তুমি পাস করবে।
ভাববাচ্য: সেখান থেকে যাওয়া যাক।
কর্তৃবাচ্য: আমরা সেখান থেকে যাই / চলো যাই।
ভাববাচ্য: এখন খাওয়া যাক।
কর্তৃবাচ্য: এখন খাওয়া হোক / আমরা এখন খাই।
ভাববাচ্য: তার দ্বারা কাজটি করা হবে।
কর্তৃবাচ্য: সে কাজটি করবে।
মূলত, ভাববাচ্যের ভাব বা ক্রিয়ার ভাবকে কর্তার উপর আরোপ করে বাক্যটিকে একটি স্বাভাবিক কর্তা-প্রধান বাক্যে রূপান্তর করাই হলো ভাববাচ্য থেকে কর্তৃবাচ্যে পরিবর্তন।