বাক্যতত্ত্বের মূল আলোচ্য বিষয় হলো বাক্যের গঠন এবং শব্দ বা পদের সঙ্গে পদের সম্পর্ক। এর মধ্যে রয়েছে কীভাবে একাধিক শব্দ যুক্ত হয়ে একটি সম্পূর্ণ অর্থপূর্ণ বাক্য তৈরি করে, বাক্যের বিভিন্ন অংশগুলো কীভাবে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, এবং বাক্যের গঠন প্রণালী। এছাড়াও, বাক্যতত্ত্বে বাগধারা, বিরাম বা যতিচিহ্ন এবং বাক্যের রূপান্তরও অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিটি বাক্য দুটি অংশে বিভক্ত। যথাঃ
উদ্দেশ্য (কর্তা)
বিধেয় (সমাপিকা ক্রিয়া)
উদ্দেশ্য (কর্তা)
একটি বাক্যে যার সম্বন্ধে কিছু বলা হয় তাকে উদ্দেশ্য বলে।
সে স্কুলে যায়। এখানে “সে” হলো উদ্দেশ্য।
রহিম ক্রিকেট খেলছে। এখানে “রহিম’’ হলো উদ্দেশ্য।
আমি বই পড়ছি। এখানে “আমি’’ হলো উদ্দেশ্য।
উপরের উদাহরণে, “সে”, “রহিম’’,“আমি’’ হলো উদ্দেশ্য। কারণ এদের সম্বন্ধে কিছু বলা হয়েছে।
বিধেয় (সমাপিকা ক্রিয়া)
বাক্যে উদ্দেশ্যে সম্পর্কে কিছু বলা হলে তাকে বিধেয় বলে। বিধেয় সাধারণত ক্রিয়া পদ দ্বারা প্রকাশিত হয়।
মূল বিষয়:
ক্রিয়াপদ: বিধেয় অংশের কেন্দ্রে থাকে ক্রিয়াপদ (যেমন: 'যায়', 'খায়', 'হয়')।
সম্পর্ক: এটি উদ্দেশ্যকে (বিশেষ্য বা সর্বনাম) ব্যাখ্যা করে বা তার সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করে, যেমন – একটি কাজ করছে (He runs), একটি অবস্থা বোঝাচ্ছে (The sky is blue), বা গুণাবলী প্রকাশ করছে (She is intelligent)।
পূরক (Complement): বিধেয় অংশের ক্রিয়াপদের সঙ্গে যুক্ত বিশেষ্য বা বিশেষণ পদকে 'পূরক' বলা হয়, যা ক্রিয়ার অর্থ সম্পূর্ণ করে, যেমন উপরের উদাহরণে 'মঙ্গলময়' হলো পূরক।
উদাহরণ:
সে স্কুলে যায়। এখানে “স্কুলে যায়” হলো বিধেয়।
রহিম ক্রিকেট খেলছে, এখানে “ ক্রিকেট খেলছে’’ হলো বিধেয়।
আমি বই পড়ছি এখানে “বই পড়ছি’’ হলো বিধেয়।
উপরের উদাহরণে, “স্কুলে যায়”, “ক্রিকেট খেলছে’’,“বই পড়ছি’’ হলো উদ্দেশ্য। কারণ এখানে উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে।
একটি সার্থক বাক্যের প্রধানত তিনটি গুণ থাকে: আকাঙ্ক্ষা (Akankha), আসত্তি (Asotti), এবং যোগ্যতা (Joggyota), যা একটি বাক্যকে সম্পূর্ণ অর্থপূর্ণ ও সুস্পষ্ট করে তোলে; উদাহরণস্বরূপ, 'আমি ভাত খাই' একটি সার্থক বাক্য কারণ এতে তিনটি গুণই বিদ্যমান।
সার্থক বাক্যের গুণাবলি:
আকাঙ্ক্ষা:
অর্থ: বাক্যের অর্থ পুরোপুরি বোঝার জন্য এক পদের পর অন্য পদ শোনার যে ইচ্ছা, তাই আকাঙ্ক্ষা।
উদাহরণ: "আমি" বললে আকাঙ্ক্ষা থাকে—কী করছি? "আমি ভাত" বললে আকাঙ্ক্ষা থাকে—কী করছি? কিন্তু "আমি ভাত খাই" বললে আকাঙ্ক্ষা মিটে যায়।
আসত্তি:
অর্থ: বাক্যের অর্থসংগতি রক্ষার জন্য পদগুলোর সুশৃঙ্খল ও যথাযথ বিন্যাসই হলো আসত্তি।
উদাহরণ: "আমি খাই ভাত" একটি সার্থক বাক্য নয়, কারণ পদগুলোর ক্রম ঠিক নেই। কিন্তু "আমি ভাত খাই" বললে পদগুলোর বিন্যাস সঠিক হওয়ায় বাক্যটি সার্থক হয়।
যোগ্যতা:
অর্থ: বাক্যস্থিত পদগুলোর মধ্যে অর্থগত ও ভাবগত মিল বা সংগতি থাকাকে যোগ্যতা বলে।
উদাহরণ: "আকাশ জল ঢালে" একটি সার্থক বাক্য নয়, কারণ আকাশের জল ঢালার যোগ্যতা নেই। কিন্তু "মেঘ জল ঢালে" একটি সার্থক বাক্য, কারণ মেঘের জল ঢালার যোগ্যতা আছে।
অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়:
একটি বাক্যকে আরও কার্যকর করতে স্পষ্টতা (Clearness), গুরুত্বারোপ (Emphasis), এবং সুসংবদ্ধতা (Coherence)-এর মতো গুণগুলোও বিবেচনা করা হয়, যা বাক্যকে আরও বোধগম্য করে তোলে।
দুর্বোধ্যতা: অপ্রচলিত বা কঠিন শব্দ ব্যবহার করলে বাক্য দুর্বোধ্য হয়ে যায়। যেমন: "তুমি আমার সঙ্গে প্রপঞ্চ করেছ"।
অপ্রাসঙ্গিকতা: অপ্রাসঙ্গিক শব্দ বা পদ ব্যবহার করলে যোগ্যতা নষ্ট হয়। যেমন- "তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও ঘাস খান।" (এখানে 'বুদ্ধিমান' মানুষের গুণের সাথে 'ঘাস খাওয়া' বিষয়টি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। এই অপ্রাসঙ্গিক পদের ব্যবহারের কারণে বাক্যটি অর্থহীন হয়ে পড়েছে এবং যোগ্যতা হারিয়েছে)
অসঙ্গতি: বাক্যের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অর্থের মিল না থাকলে যোগ্যতা হানি ঘটে।যেমন- আকাশে ঘোড়া ডিম পাড়ে।" (অসঙ্গতি বা যোগ্যতা হানি - ঘোড়া ডিম পাড়তে পারে না, তাই অর্থের মিল নেই)
পদক্রমের ত্রুটি: শব্দের ভুল ক্রমের কারণে বাক্য ভুল বা অর্থহীন হয়ে যায়।যেমন- "আমি কলেজে পড়ি" এর বদলে "পড়ি আমি কলেজে" বললে তা ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে, যদি না বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
পদক্রমের পরিবর্তনের উদ্দেশ্য (যা ত্রুটি নয়):
জোর দেওয়া: "কলেজে আমি পড়ি" (কলেজের উপর জোর)।
আবেগ প্রকাশ: বিশেষ ধরনের বাক্যে।
প্রশ্নবোধক বাক্য: প্রশ্নের ধরন অনুযায়ী পদক্রম পরিবর্তিত হতে পারে, তবে তা সুরতরঙ্গের মাধ্যমে বোঝা যায়, পদক্রমের বড় পরিবর্তনের কারণে নয়।
উপমার ভুল প্রয়োগ: উপমার ভুল প্রয়োগ বলতে বোঝায় যখন তুলনা করা বিষয়বস্তু, উপমান (যার সাথে তুলনা), উপমেয় (যার তুলনা হচ্ছে), সাধারণ ধর্ম (তুলনার বৈশিষ্ট্য) এবং উপমা বা তুলনার শব্দ (মতো, ন্যায়) - এই চারটি উপাংশের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকে না।
যেমন- 'চন্দ্রার মুখ চাঁদের মতো সুন্দর' এখানে 'মুখ' আর 'চাঁদ' এক নয়, তাই এটি ভুল উপমা, কারণ মুখ তো চাঁদ হতে পারে না; সঠিক উদাহরণ হবে 'চন্দ্রার মুখ চাঁদের ন্যায়' বা 'চন্দ্রের ন্যায় সুন্দর' যেখানে তুলনাটি সঠিক ও যৌক্তিক, কিন্তু ভুল প্রয়োগে অপ্রাসঙ্গিক ও দুর্বোধ্য তুলনা ব্যবহার করা হয় যা ভাবকে স্পষ্ট করে না, যেমন 'তার কথাগুলো মেঘের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল' (এখানে 'কথা' ও 'মেঘ' এর তুলনা অযৌক্তিক)
শব্দগত ভুল: ভুল বানান, ভুল শব্দ বা শব্দাংশের ব্যবহার।
অশুদ্ধ: সমচিন, অন্বেষন, হসপিটাল, অগ্নিকান্ড
শুদ্ধ: সমীচীন, অন্বেষণ, হাসপাতাল, অগ্নিকাণ্ড
বাগধারার শব্দ পরিবর্তন: একটি প্রচলিত বাগধারাকে তার মূল ভাব বজায় রেখে ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে প্রকাশ করা। যেমন, 'মারা যাওয়া'-এর বদলে 'অক্কা পাওয়া'।
বাহুল্য: প্রয়োজনের অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহার করা। যেমন: নতুন উদ্ভাবন (উদ্ভাবন মানেই নতুন, তাই 'নতুন' অপ্রয়োজনীয়), ইদানীংকালে (কাল শব্দটি অপ্রয়োজনীয়, কারণ ইদানীং-এর মধ্যেই 'কাল' আছে)
গুরুচন্ডালী দোষ: সাধু ভাষার সাথে চলিত ভাষার কোনো শব্দ মিশে গেলে তা গুরুচণ্ডালী দোষে দুষ্ট হয়, যা ভাষাকে অশুদ্ধ করে তোলে। যেমন: সে কাজটি করিল" (এখানে 'করিল' সাধু)।
রীতিসিদ্ধ অর্থবাচকতা: শব্দ গঠনের মূল ধাতু বা প্রকৃতি এবং তার সাথে যুক্ত প্রত্যয় থেকে যে অর্থ পাওয়া যায়, সেটাই শব্দের মূল বা রীতিসিদ্ধ অর্থ। রীতিসিদ্ধ অর্থবাচকতা নিশ্চিত করে যে বাক্যে ব্যবহৃত শব্দগুলো তাদের স্বীকৃত ও প্রচলিত অর্থেই ব্যবহৃত হচ্ছে, যা বাক্যকে অর্থপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
"সাগরে হালচাষ হয়" - এই বাক্যটি রীতিসিদ্ধ অর্থবাচকতার কারণে ভুল, কারণ হালচাষের যোগ্যতা সাগরের নেই।
"লোকটি বাধিত" - এখানে 'বাধিত' (কৃতজ্ঞ) শব্দটি তার রীতিসিদ্ধ অর্থ বহন করছে, তাই এটি একটি যোগ্যতা সম্পন্ন বাক্য।
বাক্যে পদ সংস্থাপনার ক্রম বলতে বোঝায়—
একটি শুদ্ধ ও অর্থবোধক বাক্য গঠনের জন্য বিভিন্ন পদের সঠিক অবস্থান বা সাজানোর নিয়ম।
কর্তা-কর্ম-ক্রিয়া (SOV) ক্রম (বাংলা)
গঠন: কর্তা + কর্ম + ক্রিয়া।
উদাহরণ: "ছেলেটি বই পড়ছে।" (ছেলেটি - কর্তা, বই - কর্ম, পড়ছে - ক্রিয়া)।
কর্তা-ক্রিয়া-কর্ম (SVO) ক্রম (ইংরেজি ও অন্যান্য)
গঠন: Subject + Verb + Object (SVO)।
উদাহরণ: "The boy reads a book." (The boy - Subject, reads - Verb, a book - Object)।
১. কর্তা (Subject): যে কাজটি করে। উদাহরণ: ছেলেটি বই পড়ে।
২. কর্ম (Object): যার উপর কাজটি হয়। উদাহরণ: ছেলেটি বই পড়ে।
৩. ক্রিয়া (Verb): কাজটি বোঝায় এবং সাধারণত বাক্যের শেষে বসে। উদাহরণ: ছেলেটি বই পড়ে।
অন্যান্য পদের অবস্থান-
৪. বিশেষণ: বিশেষণ সাধারণত যে পদের বিশেষণ, তার আগে বসে। উদাহরণ: ভালো ছেলে, সুন্দর ফুল।
৫. ক্রিয়া বিশেষণ: ক্রিয়া বা বিশেষণকে বিশেষিত করে; সাধারণত ক্রিয়ার আগে বসে।
উদাহরণ: সে ভালোভাবে পড়ে।, সে খুব সুন্দর।
৬. অব্যয়: অব্যয় সাধারণত শব্দ বা বাক্যের মাঝখানে বা আগে বসে।
উদাহরণ: সে ও আমি যাব।, কিন্তু সে আসেনি।
৭. সম্বন্ধবাচক ও অনুসর্গ: সম্বন্ধবাচক শব্দ বা অনুসর্গ সাধারণত সংশ্লিষ্ট পদের পরে বসে।
উদাহরণ: আমার বাড়ি, সে ঘরের ভেতরে ঢুকল।
বাক্য: আমি আজ স্কুলে মনোযোগ দিয়ে পড়ি।
সংক্ষেপে মনে রাখার সূত্র: কর্তা → সময়/স্থান → কর্ম → ক্রিয়া বিশেষণ → ক্রিয়া
বিশেষ ক্রম
কর্ম-কর্তা-ক্রিয়া (Inversion): কোনো নির্দিষ্ট পদের উপর জোর দিতে এই ক্রম ব্যবহৃত হয়, যেমন: "ভাত আমি খাই" (এখানে 'ভাত' এর উপর জোর দেওয়া হয়েছে)।
প্রশ্নবোধক বাক্য (Interrogative): প্রশ্ন অনুযায়ী ক্রম পরিবর্তিত হয়, যেমন: "তুমি কি বই পড়ছো?"।
অনুজ্ঞাসূচক বাক্য (Imperative): সাধারণত কর্তা উহ্য থাকে, শুধু ক্রিয়া দিয়ে বাক্য শুরু হয়, যেমন: "বই পড়ো।"।
গঠন অনুসারে বাক্য প্রধানত তিন প্রকার: সরল বাক্য, যেখানে একটি কর্তা ও একটি সমাপিকা ক্রিয়া থাকে (যেমন: "ছেলেরা খেলছে"); জটিল বা মিশ্র বাক্য, যাতে একটি প্রধান বাক্যাংশ ও এক বা একাধিক অপ্রধান বাক্যাংশ থাকে (যেমন: "যে পরিশ্রম করে, সে-ই ফল পায়"); এবং যৌগিক বাক্য, যেখানে দুটি সরল বাক্য সংযোজক অব্যয় (যেমন: 'ও', 'এবং') দ্বারা যুক্ত থাকে (যেমন: "সে এলো এবং কাজ শুরু করল")।
গঠন অনুসারে বাক্যের প্রকারভেদ বিস্তারিত:
১. সরল বাক্য (Simple Sentence):
সংজ্ঞা: যে বাক্যে একটিমাত্র কর্তা (উদ্দেশ্য) এবং একটিমাত্র সমাপিকা ক্রিয়া (বিধেয়) থাকে, তাকে সরল বাক্য বলে। যেমন: রহিম ক্রিকেট খেলছে। এখানে “রহিম’’ হলো উদ্দেশ্য এবং “ক্রিকেট খেলছি” হল সমাপিকা ক্রিয়া।
উদাহরণ: "আমি বই পড়ি।" "সূর্য উঠেছে।"
২. জটিল বা মিশ্র বাক্য (Complex Sentence):
সংজ্ঞা: যে বাক্যে একটি প্রধান বাক্যাংশ এবং তার ওপর নির্ভরশীল এক বা একাধিক অপ্রধান (পরাধীন) বাক্যাংশ থাকে, তাকে জটিল বাক্য বলে। জটিল খন্ড বাক্যে ‘যে’, ‘সে’, ‘যিনি’, ‘তিনি’, ‘তথাপি’, ‘যদিও’, ‘তবে’, ‘যখন’, ‘তখন’ ইত্যাদি থাকে।
উদাহরণ: "যে পরিশ্রম করে, সে-ই জীবনে সফল হয়।" "যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত হয়।"
যে রাধে সে চুলও বাঁধে। এখানে সে চুল ও বাঁধে একটি সরল বাক্য এবং যে রাধে খন্ড বাক্য।
যেমন কর্ম তেমন ফল । এখানে যেমন কর্ম একটি সরল বাক্য এবং তেমন ফল খন্ড বাক্য।
আমি জানি যে তুমি মিথ্যাবাদী নও। এখানে আমি জানি একটি সরল বাক্য এবং যে তুমি মিথ্যাবাদী নও খন্ড বাক্য
৩. যৌগিক বাক্য (Compound Sentence):
সংজ্ঞা: যে বাক্যে দুই বা ততোধিক সরল বাক্য সংযোজক অব্যয় (যেমন: 'ও', 'এবং', 'আর', 'কিন্তু', 'অথবা') দ্বারা যুক্ত থাকে, তাকে যৌগিক বাক্য বলে। যৌগিক বাক্যে ‘অথচ’, ‘কিন্তু’, ‘বরং’, ‘ও’, ‘এবং’, ‘আর’ এরকম অব্যয়ের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ বাক্য গঠন করে।
উদাহরণ: "তিনি এলেন এবং সবাইকে দেখে হাসলেন।" "তুমি পড়বে, অথবা ভালো ফল করতে পারবে না।".
তার টাকা আছে, কিন্তু দান করেন না।
বিপদ এবং দুঃখ একই সাথে আসে।
লোকটি গরিব কিন্তু সৎ।
বাক্যকে অর্থ অনুসারে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথাঃ
নির্দেশক বাক্য
প্রশ্নবোধক বাক্য
অনুজ্ঞাসূচক বাক্য
বিস্ময়সূচক বাক্য
প্রার্থনা সূচক বাক্য
নির্দেশক বাক্য
কোন ঘটনা, ভাব বা বক্তব্যের তথ্য যে বাক্য দ্বারা প্রকাশ পায় তাকে নির্দেশক বাক্য বলে
নাদিয়া একটি কবিতা পড়ছে
রহিম পড়ার সময় পড়ে আর খেলার সময় খেলে
নির্দেশক বাক্য কে দুই ভাগে ভাগ করা হয়
হ্যাঁ বোধক / অস্তিবাচক
না বোধক / নেতিবাচক
প্রশ্নবোধক বাক্য
যে বাক্যে কোন ঘটনা, ভাব বা বক্তব্য সম্পর্কে কোন প্রশ্ন থাকে তাকে প্রশ্নবোধক বাক্য বলে।
ইমন কি খেয়েছে?
হাসিব কোথায় যাচ্ছে?
অনুজ্ঞাসূচক বাক্য
যে বাক্য দ্বারা আজ্ঞা, আদেশ, উপদেশ অনুরোধ অনুমতি আমন্ত্রণ নিষেধ বোঝায় তাকে অনুজ্ঞাসূচক বাক্য বলে।
অসৎ সঙ্গ ত্যাগ কর
তুমি এখন যেতে পারো
দুই দিনের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করবে
বিস্ময়সূচক বাক্য
বিস্ময়, দুঃখ, শোক, কাতরতা করোনা প্রশংসা ইত্যাদি মনোভাব আবেগ বা উচ্ছ্বাসের আকস্মিকতা নিয়ে যে বাক্য প্রকাশ পায় তাকে বিস্ময়সূচক বাক্য বলে।
উঃ, প্রচন্ড শীত!
ছি-ছি, এ কাজ মানুষ করে!
প্রার্থনা সূচক বাক্য
বক্তার মানসিক ইচ্ছা বা প্রার্থনা যে বাক্যে প্রকাশ পায় তাকে প্রার্থনা সূচক বাক্য বলে।
তুমি যেন সফল হতে পারো
হে প্রভু মুক্তি দাও
বাংলা ব্যাকরণে ভাবগত দিক থেকে বাক্যকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়: অস্তিবাচক (Affirmative) ও নেতিবাচক (Negative) বাক্য।
১. অস্তিবাচক বাক্য (Affirmative Sentence)
যে বাক্যের মাধ্যমে কোনো কিছুর অস্তিত্ব, স্বীকারোক্তি বা ইতিবাচক অর্থ প্রকাশ পায়, তাকে অস্তিবাচক বাক্য বলে।
উদাহরণ:
সে নিয়মিত স্কুলে যায়।
আমি ভাত খাই।
ফুলটি খুব সুন্দর।
২. নেতিবাচক বাক্য (Negative Sentence)
যে বাক্যের মাধ্যমে কোনো কিছুর অস্বীকার, অভাব বা না-বোধক অর্থ প্রকাশ পায়, তাকে নেতিবাচক বাক্য বলে। এই জাতীয় বাক্যে সাধারণত 'না', 'নি', 'নয়', 'নহে' ইত্যাদি অব্যয় ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ:
সে নিয়মিত স্কুলে যায় না।
আমি ভাত খাই নি।
ফুলটি সুন্দর নয়।
সক্রিয় বাক্য (Active Voice) বলতে বোঝায় যেখানে কর্তা বা উদ্দেশ্য নিজে ক্রিয়া সম্পাদন করে, আর অক্রিয় বাক্য (Passive Voice) হলো যেখানে কর্তা বা উদ্দেশ্য ক্রিয়া গ্রহণ করে বা যার উপর ক্রিয়াটি ঘটে (যেমন: "সে বইটি পড়ল" - সক্রিয়; "বইটি তার দ্বারা পড়া হলো" - অক্রিয়)। অক্রিয় বাক্যের বিধেয় অংশে ক্রিয়া থাকে না, বরং 'হওয়া'/'থাকা' ধরনের অসমাপিকা ক্রিয়া ও বিশেষণের মিশ্রণ থাকে, যেখানে কাজটি কর্তার ওপর চাপানো হয়, যেমন: "তিনি বাংলাদেশের নাগরিক"।
সক্রিয় বাক্য (Active Voice):
সংজ্ঞা: যে বাক্যে কর্তা বা উদ্দেশ্য নিজে সক্রিয়ভাবে কোনো কাজ করে বা ক্রিয়া সম্পাদন করে, তাকে সক্রিয় বাক্য বলে।
উদাহরণ:
আমি ভাত খাই। (এখানে 'আমি' কাজটি করছি)
ছেলেটি বই পড়ছে। (এখানে 'ছেলেটি' পড়ছে)
অক্রিয় বাক্য (Passive Voice):
সংজ্ঞা: যে বাক্যে কর্তা বা উদ্দেশ্য নিজে ক্রিয়া করে না, বরং তার ওপর ক্রিয়াটি ঘটে বা যার সম্মন্ধে কিছু বলা হয় (উদ্দেশ্য), তার ওপর ক্রিয়া প্রয়োগ হয়, তাকে অক্রিয় বাক্য বলে।
উদাহরণ:
ভাত আমার দ্বারা খাওয়া হয়। (এখানে 'ভাত' নিজে খাচ্ছে না, তার ওপর খাওয়া হচ্ছে)
বইটি তার দ্বারা পড়া হচ্ছে। (এখানে 'বইটি' পড়া হচ্ছে)
তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। (এখানে 'নাগরিক' ক্রিয়া নয়, 'তিনি' সম্পর্কে একটি অবস্থা বোঝানো হচ্ছে, তাই এটি অক্রিয় বাক্য)
মূল পার্থক্য:
সক্রিয়: কর্তা সক্রিয়/ কর্তা = ক্রিয়া সম্পাদনকারী।
অক্রিয়: কর্তা নিষ্ক্রিয়/ কর্তা = ক্রিয়া গ্রহণকারী (যার ওপর ক্রিয়া ঘটে)।
গঠন অনুসারে বাক্যের পরিবর্তন
গঠনের পরিবর্তন (রূপান্তর)
সরল থেকে জটিল: বাক্যের কোনো শব্দ বা পদগুচ্ছকে নির্ভরশীল বাক্যাংশে (clause) পরিণত করা হয়, সাধারণত 'যে', 'যিনি', 'যেখানে' ইত্যাদি যোগ করে (যেমন: 'তাঁর পুরোনো বাড়ি' থেকে 'যে বাড়িটি তাঁর ছিল')।
উদাহরণ:
সরল: সে ভালো ছাত্র।
জটিল: সে এমন ছাত্র যে ভালো।
সরল থেকে যৌগিক: বাক্যের অংশগুলোকে স্বাধীন বাক্যাংশে পরিণত করে 'এবং', 'কিন্তু', 'অথবা' ইত্যাদি অব্যয় দিয়ে যুক্ত করা হয় (যেমন: 'লোভ করো না, সুখে থাকবে' থেকে 'লোভ করো, নইলে সুখে থাকবে না')।
উদাহরণ:
সরল: সে পড়াশোনা করে।
যৌগিক: সে পড়াশোনা করে এবং সফল হয়।
জটিল থেকে সরল: নির্ভরশীল বাক্যাংশকে শব্দ বা পদে পরিণত করা বা স্বাধীন বাক্যাংশে পরিণত করে সংযোজক অব্যয় যোগ করা হয়।
উদাহরণ:
জটিল: যে ছেলে পড়ে, সে সফল হয়।
সরল: পড়ুয়া ছেলে সফল হয়।
জটিল থেকে যৌগিক:
উদাহরণ:
জটিল: যখন বৃষ্টি হয়, তখন আমরা ঘরে থাকি।
যৌগিক: বৃষ্টি হয় এবং আমরা ঘরে থাকি।
যৌগিক থেকে সরল:
উদাহরণ:
যৌগিক: সে বই পড়ে এবং গান শোনে।
সরল: সে বই পড়ে গান শোনে।
যৌগিক থেকে জটিল: একটি স্বাধীন বাক্যাংশকে dependent clause-এ রূপান্তর করে subordinate conjunction (যেমন: 'যেহেতু', 'যদিও') যোগ করা হয়।
উদাহরণ:
যৌগিক: সে পড়ে এবং সে ভালো ফল করে।
জটিল: সে পড়ে বলে সে ভালো ফল করে।
অর্থ অনুসারে বাক্যের পরিবর্তন
ভাবগত অনুসারে বাক্যের পরিবর্তন
বাক্য পরিবর্তনের নিয়ম (অর্থ অপরিবর্তিত রেখে)
পরীক্ষায় সাধারণত বাক্যের অর্থ ঠিক রেখে এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তন করতে বলা হয়।
অস্তিবাচক বাক্য- মানুষ মরণশীল। নেতিবাচক বাক্য- মানুষ অমর নয়।
অস্তিবাচক বাক্য- আমি তাকে খুব শ্রদ্ধা করি। নেতিবাচক বাক্য-আমি তাকে অশ্রদ্ধা করি না।
অস্তিবাচক বাক্য- তিনি একজন সৎ লোক। নেতিবাচক বাক্য- তিনি একজন সৎ লোক।
অস্তিবাচক বাক্য- সদা সত্য কথা বলবে। নেতিবাচক বাক্য- কখনো মিথ্যা কথা বলবে না।
বাক্যের গঠন: শব্দ বা পদগুলো কীভাবে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে যুক্ত হয়ে একটি সম্পূর্ণ বাক্য গঠন করে, তা বিশ্লেষণ করা হয়।
বাক্যের শ্রেণিবিভাগ: বাক্যের শ্রেণিবিভাগ বলতে মূলত বাক্যকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করাকে বোঝায়। এটি দুটি প্রধান ভিত্তিতে করা হয়: গঠন অনুসারে এবং অর্থ অনুসারে।
পদের সম্পর্ক: বাক্যের মধ্যে বিভিন্ন পদের মধ্যেকার সম্পর্ক এবং তাদের বিন্যাস নিয়ে আলোচনা করা হয়।
ব্যাকরণগত নিয়ম: বাক্য গঠনের জন্য যে সমস্ত ব্যাকরণগত নিয়ম রয়েছে, সেগুলো বাক্যতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাগধারা: এটি বাক্যতত্ত্বের একটি উল্লেখযোগ্য আলোচ্য বিষয়।
বাক্য সংকোচন: একাধিক পদ বা উপবাক্যকে একটি শব্দে প্রকাশ করাকে এক কথায় প্রকাশ বা বাক্য সংকোচন বলে।
বিরাম চিহ্ন: বাক্যের অর্থ স্পষ্ট করার জন্য ব্যবহৃত বিরাম বা যতিচিহ্ন নিয়েও বাক্যতত্ত্ব আলোচনা করে।
বাক্য রূপান্তর: একটি বাক্যকে অন্য রূপে পরিবর্তন করার নিয়মগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত, যেমন—সরল থেকে জটিল, বা প্রশ্নবোধক থেকে নির্দেশক বাক্যে রূপান্তর।
উক্তি পরিবর্তন: উক্তি পরিবর্তন হলো একটি বাক্যকে প্রত্যক্ষ উক্তি থেকে পরোক্ষ উক্তিতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া।
বাচ্য: হলো বাক্যের প্রকাশভঙ্গির রূপভেদ বা রূপের পরিবর্তন।