বাংলা ব্যাকরণে ধাতু (Root/Verb Stem) হলো ক্রিয়াপদের মূল অংশ, যা থেকে ক্রিয়াপদ গঠিত হয়; এটি এমন একটি শব্দমূল যাকে আর বিশ্লেষণ করা যায় না, যেমন— 'পড়্' (পড়া থেকে), 'চল্' (চলা থেকে), 'খাও' (খাওয়া থেকে)। ধাতু থেকেই বিভিন্ন বিভক্তি ও প্রত্যয় যোগে ক্রিয়াপদ তৈরি হয়, যেমন 'পড়্' + এ = 'পড়ে', 'চল্' + আ = 'চলা'।
ধাতু চেনার উপায়:
ক্রিয়া পদ থেকে 'আ' বা 'ইতে'/'ইতেছি' (বর্তমান, অতীত, ভবিষ্যৎ কালের চিহ্ন) বাদ দিলে যে অংশটি থাকে, তাই ধাতু।
উদাহরণ:
"সে বই পড়ে।" → 'পড়ে' থেকে 'আ' বাদ দিলে থাকে 'পড়্' (ধাতু)।
"আমি ভাত খাই।" → 'খাই' থেকে 'আ' বাদ দিলে থাকে 'খাও' (ধাতু)।
সংক্ষেপে, ধাতু হলো বাংলা ক্রিয়াপদের প্রাণকেন্দ্র, যা থেকে সমস্ত ক্রিয়াপদের জন্ম হয়।
মৌলিক ধাতু হলো বাংলা ব্যাকরণে সেইসব মূল ধাতু, যেগুলোকে আর বিশ্লেষণ বা ভাঙা যায় না; অর্থাৎ এগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং অন্য কোনো ধাতু থেকে উৎপন্ন হয়নি, যেমন: √কর, √চল, √খা, √পড়, √যা ইত্যাদি, যা থেকে বিভিন্ন ক্রিয়াপদ তৈরি হয়।
মৌলিক ধাতুর বৈশিষ্ট্য
অবিভাজ্যতা: এগুলোকে ভাঙা বা বিভক্ত করা যায় না, যা এদের মৌলিকত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
স্বয়ংসিদ্ধতা: এরা নিজেরাই সম্পূর্ণ, এদের কোনো সহায়তার প্রয়োজন হয় না, তাই এদের সিদ্ধ ধাতুও বলা হয়।
উদাহরণ: 'কর', 'চল', 'খা', 'পড়', 'যা', 'দে', 'হ' ইত্যাদি মৌলিক ধাতু।
প্রকারভেদ
বাংলা ভাষায় মৌলিক ধাতুকে সাধারণত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
যে ধাতুগুলো সরাসরি বাংলা ভাষা থেকে এসেছে (যেমন: √বল, √কর, √যা)।
উদাহরণ:
কাট্ (কাটা), ছাট্ (ছাটা), কাঁদ্ (কাঁদা), জান্ (জানা), নাচ্ (নাচা), বল্ (বলা), দেখ্ (দেখা)।
খা (খাওয়া), যা (যাওয়া), দে (দেওয়া), নে (নেওয়া), শো (শোয়া), , কর্ (করা)।
যে ধাতুগুলো সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলায় এসেছে (যেমন: √গম্, √কৃ, √দৃশ্)।
উদাহরণ:
গম্: (গচ্ছতি): যাওয়া।, কৃ: (করোতি): করা।, পঠ্: (পঠতি): পড়া।
হৃ: (হরতি): নেওয়া।, স্থা: (তিষ্ঠতি): থাকা, দাঁড়ানো।, দা: (দ daতি): দেওয়া।
অন্য ভাষা থেকে বাংলায় গৃহীত ধাতু (যেমন: √চেক, √শুট)।
উদাহরণ:
ফারসি মূল: খাট্, ঝুল, টুট, ভিজে, বিগড়, জমকে, চেহে, ডড়ে, লটকে, ঠেলে, ডাকে।
আরবি মূল: পছন্দ (পছন্দ করা), মঞ্জুর (মঞ্জুর করা), গরম (গরম করা)।
ইংরেজি: কাট (কাটবে), জাম (জামা), ড্র (ডরা)।
মৌলিক ধাতুর সঙ্গে 'আ' প্রত্যয় যোগ করে গঠিত হয়, যেমন: √কর + আ = √করা, √দেখ্ + আ = √দেখা, √শোন + আ = √শোনা।
সাধিত ধাতু কত প্রকার ও কি কি :-
গঠনরীতি ও অর্থের দিক থেকে সাধিত ধাতু তিন প্রকার। যথা
সাধিত ধাতুর মধ্যে যেগুলো বিশেষ্য, বিশেষণ বা ধনাত্মক শব্দ থেকে গঠিত হয়, সেসব ধাতুকে নাম ধাতু বলা হয়।
বিশেষ্য, বিশেষণ এবং অনুকার অব্যয়ের পরে আ প্রত্যয় যোগ করে নাম ধাতু গঠিত হয়। যেমন -লোকটি ঘুমাচ্ছে। এখানে ঘুম থেকে নাম ধাতু ঘুমা গঠিত হয়েছে।
নাম ধাতু গঠনের কয়েকটি নিয়ম নিচে দেয়া হলো
সাধারণ বিশেষা বা বিশেষণে আ প্রতায় যোগ করে নাম ধাতু গঠন করা হয়। যেমন- লাঠি-লাঠা, দুখ-দুখা, রঙ্গ- রঙ্গা, বাহির-বাহিরা, বিষ-বিষা, জুতা- জুতো ইত্যাদি।
ড় বা ট প্রত্যয়াত্ত বিশেষ্যের পরে আ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নাম ধাতু গঠিত হয়। যেমন- আঁকড়- আঁকড়া, আঁচড়-আঁচড়া, দাবড়&দাবড়া, হাতড়- হাতড়া, চুমড়- চুমড়া ইত্যাদি ।
লা বা র প্রত্যয়ান্ত বিশেষ্যের পরে আ প্রত্যয় যোগ করে নামধাতু গঠিত হয়। যেমন- আগল- আগলা, চুমর- চুমরা, হাঁকর- হাকরা, ডুকর- ডুকরা ইত্যাদি।
ম বা চ প্রত্যয়ান্ত বিশেষ্যের পরে অ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নাম ধাতু গঠিত হয়। যেমন- ঝলস-ঝলসা, ধামস-ধামসা, ভাঙ্গচ-ভাঙ্গচা ইত্যাদি।
মৌলিক ধাতুর পরে আ, ওয়া প্রত্যয় যোগ করে যে ধাতু গঠিত হয়, তাকে বলা হয় প্রযোজক ধাতু বা ণিজন্ত ধাতু।
এই আ প্রত্যয় এখানে মূলত প্রেরণা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন- কর + আ = এখানে করা একটি ধাতু।
বাক্যে প্রয়োগ- সেলিম কাজটি নিজে না করে অন্যকে দিয়ে করাবে।
অনুরূপভাবে, পড় + আ = পড়া, বাক্যে প্রয়োগ- তিনি ছেলেকে পড়াচ্ছেন।
মৌলিক ধাতুর সঙ্গে আ প্রত্যয় যোগ করে কর্মবাচ্যের ধাতু গঠিত হয়। এটি বাক্যে ব্যবহারের সময় বাক্যের ক্রিয়াপদকে অনুসরণ করে ব্যবহৃত হয়।
যেমন - দেখ + আ = দেখা, বাক্যে প্রয়োগ- কাজটি ভালো দেখায় না।
হার + আ = হারা, বাক্যে প্রয়োগ- যা কিছু হারায় গিন্নি বলে কেষ্টা বেটাই চোর।
বিশেষ্য, বিশেষণ বা ধনাত্মক অব্যয়ের সঙ্গে 'কর', 'দে', 'খা', 'ধর', 'ছাড়' ইত্যাদি যোগে গঠিত হয়, যেমন: হাত + পা = হাতানো, ঘুম + যা = ঘুমিয়ে পড়া।
যৌগিক বা সংযোগমূলক ধাতু হলো সেইসব ধাতু যা বিশেষ্য, বিশেষণ বা অব্যয়ের সাথে 'কর', 'দে', 'হ', 'পা' ইত্যাদির মতো মৌলিক ধাতু যুক্ত হয়ে গঠিত হয়, যা একটি নতুন ক্রিয়া তৈরি করে; যেমন: 'ভয় কর' (ভয় + কর), 'ভালো হ' (ভালো + হ), 'উত্তর দে' (উত্তর + দে), 'দুঃখ পা' (দুঃখ + পা) ইত্যাদি, যা ক্রিয়ার মূল বা ধাতু থেকে আলাদা ও নতুন ক্রিয়া পদ গঠনে সাহায্য করে।
উদাহরণ:
ভয় কর: এখানে 'ভয়' একটি বিশেষ্য এবং 'কর' একটি মৌলিক ধাতু, যা মিলে 'ভয় কর' যৌগিক ধাতু তৈরি করেছে।
ভালো হ: 'ভালো' বিশেষণ এবং 'হ' মৌলিক ধাতু যুক্ত হয়ে 'ভালো হ' গঠিত হয়েছে।
উত্তর দে: 'উত্তর' বিশেষ্য এবং 'দে' মৌলিক ধাতু যুক্ত হয়েছে।
মার খা: 'মার' একটি বিশেষ্য এবং 'খা' মৌলিক ধাতু, যা 'মার খা' যৌগিক ধাতু গঠন করে।
সংক্ষেপে:
গঠন: বিশেষ্য/বিশেষণ/অব্যয় + মৌলিক ধাতু (কর, দে, হ, পা ইত্যাদি)।
উদ্দেশ্য: নতুন ক্রিয়া পদ তৈরি করা।
প্রকারভেদ: এটি বাংলা ব্যাকরণে ধাতুর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকারভেদ, যা মৌলিক ধাতু (√কর্, √চল) এবং সাধিত ধাতু (√কর+আ = √করা) থেকে ভিন্ন।