লোইট্টা মাছের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া
খাদ্যাভ্যাস ও অণুজীবগত অভিযোজনের অনুসন্ধান
প্রাণীর অন্ত্রকে অনেক সময় শুধুমাত্র হজমের অঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আধুনিক অণুজীববিজ্ঞান দেখিয়েছে যে অন্ত্র আসলে একটি জটিল জীববৈজ্ঞানিক বাস্তুতন্ত্র, যেখানে স্বাগতিক প্রাণী এবং অণুজীবসমাজের মধ্যে অবিরাম বিপাকীয় ও শারীরবৃত্তীয় মিথস্ক্রিয়া ঘটে। মাছের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। অন্ত্রে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো খাদ্য ভাঙা, পুষ্টি আহরণ, এমনকি স্বাস্থ্যের বিভিন্ন দিকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের গবেষণার বিষয় ছিল লোইট্টা মাছ (Harpadon nehereus)-এর অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলো। গবেষণাটি সম্প্রতি Frontiers in Microbiology জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য ছিল লোইট্টার খাদ্যনালী থেকে ব্যাকটেরিয়া পৃথক করা, তারা কোন ধরনের হাইড্রোলাইটিক এক্সোএনজাইম উৎপাদন করতে পারে তা নির্ণয় করা, এবং সেই এনজাইমগুলোর সঙ্গে মাছটির খাদ্যাভ্যাসের সম্ভাব্য সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা। পাশাপাশি 16S rRNA gene sequencing-এর মাধ্যমে এনজাইম-উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোর ট্যাক্সোনমিক পরিচয়ও নির্ধারণ করা হয়।
খাদ্যাভ্যাস ও অন্ত্রের অণুজীব
লোইট্টা মূলত একটি মাংসাশী সামুদ্রিক মাছ। এর খাদ্যতালিকায় ছোট মাছ, মাছের লার্ভা, চিংড়ি, কাঁকড়া এবং অন্যান্য প্রাণীজ খাদ্যের আধিক্য দেখা যায়। ফলে এর খাদ্যে প্রোটিন ও লিপিডের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি, কিন্তু উদ্ভিদজাত কার্বোহাইড্রেট—যেমন সেলুলোজ বা স্টার্চ—খুব সীমিত।
এই তথ্য থেকে একটি যৌক্তিক অনুমান করা যায়। যদি খাদ্যের প্রধান উপাদান প্রোটিন ও চর্বি হয়, তাহলে অন্ত্রের অণুজীবসমাজেও সম্ভবত এমন ব্যাকটেরিয়ার আধিক্য থাকবে, যারা প্রোটিন ও লিপিড ভাঙতে সক্ষম এনজাইম উৎপাদন করে। গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য ছিল এই ধারণাটি পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করা।
হাইড্রোলাইটিক এনজাইম: অণুজীবের রাসায়নিক সরঞ্জাম
খাদ্যের বৃহৎ জৈব অণুগুলোকে ব্যবহারযোগ্য রূপে পরিণত করার জন্য সেগুলোকে ছোট ছোট অংশে ভাঙতে হয়। এই কাজটি সম্পন্ন করে হাইড্রোলাইটিক এনজাইমসমূহ। পানির অণুর সাহায্যে রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করাই এদের কাজ।
গবেষণায় পাঁচ ধরনের হাইড্রোলাইটিক কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়—প্রোটিয়েজ, লাইপেজ, অ্যামাইলেজ, সেলুলেজ এবং পেকটিনেজ। এগুলো যথাক্রমে প্রোটিন, চর্বি, স্টার্চ, সেলুলোজ এবং পেকটিন ভাঙতে সক্ষম।
লোইট্টার অন্ত্র থেকে সংগ্রহ করা মোট ২০টি ব্যাকটেরিয়াল আইসোলেটের মধ্যে ১৩টি অন্তত একটি হাইড্রোলাইটিক এনজাইম উৎপাদন করতে সক্ষম ছিল। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে প্রোটিওলাইটিক এবং লিপোলাইটিক কার্যকারিতা। অর্থাৎ প্রোটিন ও চর্বি ভাঙতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়ার আধিক্যই ছিল সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে সেলুলোজ এবং স্টার্চ ভাঙতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে মাত্র একটি করে আইসোলেটে। এই ফলাফল লোইট্টার খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেহেতু মাছটির খাদ্যে প্রাণীজ উপাদানের আধিক্য রয়েছে, তাই প্রোটিন ও লিপিড-ভাঙনকারী ব্যাকটেরিয়ার প্রাধান্য প্রত্যাশিত ছিল। গবেষণার ফলাফল সেই প্রত্যাশাকেই সমর্থন করেছে।
একটি ব্যতিক্রমী পর্যবেক্ষণ
তবে ফলাফলে একটি আগ্রহজনক দিকও ছিল।
পেকটিন মূলত উদ্ভিদের কোষপ্রাচীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। লোইট্টার খাদ্যে উদ্ভিদজাত উপাদানের উপস্থিতি সীমিত হওয়া সত্ত্বেও চারটি আইসোলেটে পেকটিনেজ উৎপাদনের সক্ষমতা পাওয়া যায়।
এর কারণ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে এটি ইঙ্গিত করে যে অন্ত্রের অণুজীবসমাজ কেবল স্বাগতিকের বর্তমান খাদ্যাভ্যাসের সরাসরি প্রতিফলন নয়। ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব বিবর্তনীয় ইতিহাস, পরিবেশগত উৎস এবং বিপাকীয় বহুমুখিতাও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে।
কারা ছিল এই এনজাইম-উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়া?
হাইড্রোলাইটিক কার্যকারিতা প্রদর্শনকারী আইসোলেটগুলোকে 16S rRNA gene sequencing-এর মাধ্যমে শনাক্ত করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এগুলো আটটি ভিন্ন গণের অন্তর্ভুক্ত।
সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় Staphylococcus গণের ব্যাকটেরিয়া। তবে কার্যকারিতার দিক থেকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল Exiguobacterium গণভুক্ত একটি স্ট্রেইন। এটি চার ধরনের ভিন্ন হাইড্রোলাইটিক এনজাইম উৎপাদন করতে সক্ষম ছিল এবং বিশেষ করে প্রোটিওলাইটিক, লিপোলাইটিক ও পেকটিনোলাইটিক কার্যকারিতায় উচ্চ সক্ষমতা প্রদর্শন করে।
এই বৈশিষ্ট্যের কারণে স্ট্রেইনটিকে ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য সম্ভাবনাময় প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
সম্ভাব্য প্রয়োগ
হাইড্রোলাইটিক এনজাইম কেবল হজমপ্রক্রিয়ার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; শিল্পক্ষেত্রেও এদের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বায়োটেকনোলজি, ডিটারজেন্ট উৎপাদন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন জৈব-প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ায় প্রোটিয়েজ, লাইপেজ ও পেকটিনেজের মতো এনজাইম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই কারণে সামুদ্রিক মাছের অন্ত্র থেকে প্রাপ্ত ব্যাকটেরিয়াগুলো সম্ভাব্য শিল্প-উপযোগী এনজাইমের উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে কিছু স্ট্রেইনের প্রোবায়োটিক সম্ভাবনাও ভবিষ্যৎ গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।
বিশেষ করে অধিক উৎপাদনক্ষম আইসোলেটগুলোর এনজাইম উৎপাদনের দক্ষতা, বিভিন্ন পরিবেশগত অবস্থায় তাদের কার্যকারিতা এবং মাছচাষে সম্ভাব্য প্রোবায়োটিক ব্যবহার নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার সুযোগ রয়েছে।
গবেষণার তাৎপর্য
এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো যে লোইট্টা মাছের অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াগুলোর এনজাইম-প্রোফাইল তার খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রোটিন ও চর্বি-সমৃদ্ধ খাদ্যের সঙ্গে প্রোটিওলাইটিক ও লিপোলাইটিক ব্যাকটেরিয়ার আধিক্য একটি সুস্পষ্ট কার্যগত সম্পর্ক নির্দেশ করে।
একই সঙ্গে গবেষণাটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে কোনো প্রাণীর হজমপ্রক্রিয়াকে বিচ্ছিন্নভাবে বোঝা সম্ভব নয়। স্বাগতিক প্রাণী এবং তার অন্ত্রের অণুজীবসমাজ একটি সমন্বিত জৈবিক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে, যেখানে উভয় পক্ষই পরস্পরের উপস্থিতি থেকে উপকৃত হয়।
লোইট্টা মাছের অন্ত্রের এই অণুজীবসমাজ সেই বৃহত্তর সম্পর্কেরই একটি ক্ষুদ্র কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ।
References:
Hossain, T.J., Chowdhury, S.I., Mozumder, H.A., Chowdhury, M.N.A., Ali, F., Rahman, N. and Dey, S., 2020. Hydrolytic exoenzymes produced by bacteria isolated and identified from the gastrointestinal tract of Bombay duck. Frontiers in microbiology, 11, p.2097
available on https://doi.org/10.3389/fmicb.2020.02097
<< বোরহানির প্রোবায়োটিক