রেডিয়েশনের বিরুদ্ধে এক ব্যতিক্রমী প্রতিরোধ ব্যবস্থা
আয়নায়িত বিকিরণ (ionizing radiation) জীবের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি ডিএনএ অণুতে ভাঙন সৃষ্টি করে এবং কোষের বিভিন্ন জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। মানুষের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে অল্পমাত্রার তীব্র বিকিরণও প্রাণঘাতী হতে পারে। অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া এবং বহুকোষী জীবের জন্য উচ্চমাত্রার বিকিরণ কার্যত মৃত্যুদণ্ডের সমতুল্য।
কিন্তু D. radiodurans এই সাধারণ নিয়মের একটি ব্যতিক্রম। পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, এটি এমন মাত্রার রেডিয়েশন সহ্য করতে পারে যা অধিকাংশ পরিচিত জীবের জন্য অকল্পনীয়। তীব্র বিকিরণের ফলে এর জিনোম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অণুজীবটি পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে সক্ষম হয়।
এই অসাধারণ ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে। কারণ প্রশ্নটি শুধু একটি অণুজীব কীভাবে বেঁচে থাকে তা নয়; বরং জীবনের সহনশীলতার তাত্ত্বিক সীমা কোথায়, সেটিও এর সঙ্গে জড়িত।
ডিএনএ পুনর্গঠনের অনন্য দক্ষতা
রেডিওডুরান্টের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো এর ডিএনএ মেরামত ব্যবস্থা।
প্রচণ্ড বিকিরণের ফলে যখন একটি কোষের ক্রোমোজোম অসংখ্য খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন সাধারণত সেই কোষ আর পুনরুদ্ধার করতে পারে না। কিন্তু রেডিওডুরান্টের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এটি ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ খণ্ডগুলোকে পুনরায় সনাক্ত করে, সঠিক ক্রমে সাজায় এবং কার্যকর জিনোমে পুনর্গঠন করতে সক্ষম।
এই প্রক্রিয়াকে সম্ভব করে তোলে একাধিক জৈব-রাসায়নিক ও জিনগত বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো কোষে জিনোমের একাধিক কপি উপস্থিত থাকা। একটি কোষে সাধারণত চার থেকে দশটি পর্যন্ত সম্পূর্ণ জিনোম কপি থাকতে পারে। ফলে কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অবশিষ্ট কপিগুলো তথ্যের উৎস হিসেবে কাজ করে এবং পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সরবরাহ করে।
তবে বর্তমান গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, শুধুমাত্র জিনোমের একাধিক কপি থাকা এই অণুজীবের অসাধারণ সহনশীলতার পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। প্রকৃত রহস্য আরও গভীরে নিহিত।
অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা
দীর্ঘ সময় ধরে ধারণা করা হতো যে রেডিওডুরান্টের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি তার ডিএনএ মেরামত ক্ষমতা। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, রেডিয়েশনের প্রধান ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি ডিএনএ ধ্বংস নয়; বরং কোষের অভ্যন্তরে সৃষ্ট Reactive Oxygen Species (ROS)-এর মাধ্যমে সংঘটিত অক্সিডেটিভ ক্ষতি।
এই অতি-প্রতিক্রিয়াশীল অণুগুলো প্রোটিন, কোষঝিল্লি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জৈব উপাদানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ডিএনএ মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইমগুলো যদি অকেজো হয়ে যায়, তাহলে জিনোম অক্ষত থাকলেও কোষ টিকে থাকতে পারবে না।
রেডিওডুরান্টের বিশেষত্ব হলো এর কোষে বিদ্যমান ম্যাঙ্গানিজ-সমৃদ্ধ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনগুলোকে অক্সিডেটিভ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে এবং ডিএনএ মেরামত প্রক্রিয়াকে সচল রাখে। ফলে বিকিরণের পরে কোষ দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে পারে।
অনেক গবেষকের মতে, রেডিওডুরান্টের প্রকৃত শক্তি ডিএনএকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো নয়; বরং ডিএনএ মেরামতকারী প্রোটিনগুলোর কার্যকারিতা বজায় রাখার মধ্যে নিহিত।
শুষ্কতা ও রেডিয়েশন: একটি বিবর্তনীয় সংযোগ
রেডিওডুরান্টের সহনশীলতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা উত্থাপন করেছেন। অনেক গবেষকের মতে, এই অণুজীব মূলত রেডিয়েশন-সমৃদ্ধ পরিবেশে অভিযোজিত হয়ে ওঠেনি; বরং দীর্ঘস্থায়ী পানিশূন্যতা বা desiccation-এর বিরুদ্ধে অভিযোজনের ফল হিসেবে এর বর্তমান ক্ষমতার বিকাশ ঘটেছে।
কারণ শুষ্কতা এবং আয়নায়িত বিকিরণ উভয়ই কোষে প্রায় একই ধরনের ক্ষতি সৃষ্টি করে, বিশেষত ডিএনএ ভাঙন এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস। ফলে যে জৈবিক ব্যবস্থা শুষ্কতা মোকাবিলার জন্য বিবর্তিত হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীকালে রেডিয়েশন প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও কার্যকর হয়ে ওঠে।
বর্তমানে এই ব্যাখ্যাই রেডিওডুরান্টের অসাধারণ সহনশীলতার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিবর্তনীয় মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়।
মহাশূন্যে বেঁচে থাকার সক্ষমতা
ডাইনোকক্কাস রেডিওডুরান্টকে ঘিরে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গবেষণাগুলোর একটি হলো এর মহাশূন্যে টিকে থাকার সম্ভাবনা।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের বাইরের অংশে পরিচালিত বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, উপযুক্ত সুরক্ষা ও উপনিবেশগত বিন্যাসে এই অণুজীব দীর্ঘ সময় মহাশূন্যের পরিবেশে টিকে থাকতে পারে। শূন্যতার নিকটবর্তী চাপ, তীব্র অতিবেগুনি বিকিরণ এবং মহাজাগতিক রশ্মির উপস্থিতি সত্ত্বেও এর কিছু কোষ জীবিত থাকে।
এই ফলাফলগুলো জ্যোতির্জীববিজ্ঞানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ এগুলো জীবনের স্থায়িত্ব এবং মহাকাশে জীবের বিস্তারের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে।
প্যানস্পার্মিয়া ধারণা এবং মঙ্গলগ্রহের প্রসঙ্গ
জীবনের উৎপত্তি ও বিস্তার সম্পর্কে সবচেয়ে বিতর্কিত ধারণাগুলোর একটি হলো প্যানস্পার্মিয়া (Panspermia)। এই তত্ত্ব অনুসারে, জীব বা জীবনের পূর্বসূরি অণুগুলো উল্কাপিণ্ড, ধূমকেতু কিংবা মহাজাগতিক ধূলিকণার মাধ্যমে এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে স্থানান্তরিত হতে পারে।
রেডিওডুরান্টের অসাধারণ সহনশীলতা এই ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। পৃথিবীর কিছু পরিবেশ বিশেষ করে অ্যান্টার্কটিকার শুষ্ক উপত্যকা মঙ্গলগ্রহের সঙ্গে আংশিক সাদৃশ্য প্রদর্শন করে, এবং সেখানেও এই অণুজীবের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
যদিও কখনও কখনও জনপ্রিয় আলোচনায় রেডিওডুরান্টকে “মঙ্গলগ্রহের জীব” হিসেবে উল্লেখ করা হয়, এ ধরনের দাবির পক্ষে কোনো প্রত্যক্ষ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বর্তমান বৈজ্ঞানিক অবস্থান হলো, এটি পৃথিবীরই একটি অণুজীব, যার বিবর্তনীয় ইতিহাস এখনও সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করা যায়নি।
তবু এটি সত্য যে, যদি কোনো অণুজীব আন্তঃগ্রহীয় ভ্রমণের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে রেডিওডুরান্ট সেই তালিকার প্রথম সারিতেই থাকবে।
রেডিওডুরান্টের বৈশিষ্ট্য কেবল তাত্ত্বিক গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর উল্লেখযোগ্য ব্যবহারিক সম্ভাবনাও রয়েছে।
জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তিত রেডিওডুরান্ট ব্যবহার করে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ভারী ধাতু দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত বায়োরিমিডিয়েশনের বিভিন্ন কৌশল নিয়ে গবেষণা চলছে। কারণ এমন পরিবেশে, যেখানে অধিকাংশ অণুজীব বেঁচে থাকতে পারে না, রেডিওডুরান্ট কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম।
ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে, বিশেষত চাঁদ বা মঙ্গলে মানব উপস্থিতি স্থাপনের ক্ষেত্রে, এ ধরনের অণুজীবের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলেও ধারণা করা হয়।
ডাইনোকক্কাস রেডিওডুরান্ট কেবল একটি ব্যাকটেরিয়া নয়; এটি জীবনের সহনশীলতার সীমা সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে। এর অসাধারণ রেডিয়েশন-প্রতিরোধ ক্ষমতা, ডিএনএ পুনর্গঠন দক্ষতা এবং মহাশূন্যে টিকে থাকার সম্ভাবনা জীববিজ্ঞান, বিবর্তনবিদ্যা এবং জ্যোতির্জীববিজ্ঞানের সংযোগস্থলে একে একটি অনন্য গবেষণা বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আজও এর বিবর্তনীয় ইতিহাসের অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—রেডিওডুরান্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবন প্রায়ই সেই সীমাগুলো অতিক্রম করতে পারে, যেগুলোকে আমরা একসময় অসম্ভব বলে মনে করতাম। এর অধ্যয়ন তাই শুধু একটি অণুজীবকে বোঝার প্রচেষ্টা নয়; বরং মহাবিশ্বে জীবনের সম্ভাব্য পরিসরকে অনুধাবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
References:
frontiersin.org/articles/10.3389/fmicb.2020.02050/full
en.wikipedia.org/wiki/Deinococcus_radiodurans
nature.com/articles/nrmicro1264
ছবিঃ
afmc.af.mil/News/Photos/igphoto/2000655676/
esrf.eu/UsersAndScience/Experiments/MX/Research_and_Development/Biology/Deinococcus_radiodurans
<< মিষ্টতার বাইরে: যে চিনিকে আমরা খাই না, কিন্তু প্রতিদিন খেয়ে থাকি
>> মাইক্রোপ্লাস্টিক ও অন্ত্রের অণুজীব: প্রোবায়োটিক কি ক্ষতি কমাতে পারে?