আমি দেখেছি খুব শক্তপোক্ত সম্পর্কগুলোতে রোজ ফোন দেওয়া নেওয়ার গল্প নাই, কারণ তাঁরা জানে প্রাণের মানুষটা যেখানেই থাক, ফিরে আসবেই দিনের শেষে তাঁদের কাছে।
তাঁরা শুধু দুহাত খুলে অপেক্ষা করে প্রিয়জনের জন্য, কাছে এলেই যাতে মুঠো ভরে কুড়িয়ে নিতে পারে আপনজনের সুখ দুঃখ গুলো....
খুব দৃঢ় সম্পর্কগুলোতে দুইবেলা "খেয়েছো, ঘুমিয়েছো" জিগ্যেস করে না কেউ কাউকে! কিন্তু একজন না খেলে আর একজন ঠিক পেট ভরে খেতে পারে না, কোনরকমে থালা এঁটো করে উঠে যায় হাত ধুয়ে....
খুব শক্তপোক্ত সম্পর্কগুলোতে ছোট ছোট কথায় চারবেলা অভিমান করে কেউই মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে না, কিংবা ঝামেলাও করে না। বরং মানিয়ে নেয় তরকারিতে বেশি নুন হলেও, আবার জন্মদিনে উপহার আনতে ভুলে গেলেও হাসিমুখে মানিয়ে নেয়....
রোজ রোজ ঝগড়া করে দিনের শেষে জাপটে ধরে চুমুও খায় না একে অপরকে, কিন্তু একজন বেসামাল হয়ে পথ চললেই অন্যজন হাত টেনে ধরে, জলভর্তি সিঁড়িতে পা পিছলে পড়ার আগে ঠিকই সামলে নেয় একে অপরকে....
অফিস ফুরোলে ফোন করে "ভালোবাসি ভালোবাসি" বলে চেঁচায় না কেউই, কিন্তু মাঝেমধ্যে হাতে করে গরম জিলিপি নিয়ে আসে একসঙ্গে খাবে বলে....
দামি উপহার আনে না ঠিকই, কিন্তু বাজারের ব্যাগটা ভারী হলেই দুইজনে একটা ব্যাগের দুটো হাতল ভাগাভাগি করে ধরে নিয়ে এসে উপচে দেয় শাকসবজি রান্নাঘরের মেঝেতে....
প্রতি সপ্তাহে সিনেমা দেখতে বা রেস্টুরেন্টে খেতে যায় না ওরা, কিন্তু প্রতিবেশীর বিয়েতে সেজেগুজে বেরোনোর সময় চোখে চোখ রেখে একজন অন্যজনকে বলে "আজ তোমায় খুব ভালো লাগছে, অনেকেই তোমায় দেখে চোখ ফেরাতে পারবে না দেখো"....
প্রতিদিন হয়তো একে অপরের যত্ন নেওয়ার সময় হয় না, কিন্তু একজনের জ্বর হলে অপরজন ঠিকই রাতের বেলায় বারবার উঠে থার্মোমিটারে জ্বর মাপে, কপালে জল্পট্টি দেয়....
খুব সাদামাটা সম্পর্কগুলোতে হাঁড়িতে ভাত কম থাকলে একজন একটু কম খেয়ে অন্যজনের মুখের সামনে ভাতের থালা এগিয়ে দেয়, মাঝরাতে চাদর সরে গেলে একজন ঠিকই আর একজনের গায়ে আলতো করে চাদর জড়িয়ে দেয়....
খুব গরমে দুপুরবেলায় একজন বাড়ি ফিরলে অন্যজন হাতে করে শরবত এগিয়ে দেয়। অফিসের ফাইলটা থেকে রান্নাঘরের মশলাটা সব ঠিকঠাক করে গুছিয়ে রাখে দুজনেই....
মানুষকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে মানুষ সম্পর্কে জড়ায় না, কিন্তু দুইটা মানুষ একটা সম্পর্ককে যদি লালন করতে পারে, তবে দুইজন দুইজনকে এমনভাবে গড়ে তোলে, সেই দুটো মানুষকে ভাঙার ক্ষমতা আর কারোর থাকে না....
জীবনে এমন মানুষ পেলে, মুঠো ভরে কুড়িয়ে নিতে হয়, কখনো হারাতে দিতে নেই....
------------------------------------------------------------------------------------------------
খুব বকবক করা মানুষগুলো একটা সময়ের পর চুপ হয়ে যায়। ক্রমশ আঘাত পেতে পেতে চুপ হয়ে যাওয়ার পর আর কোনোদিন খোলামেলা ভাবে সেই মানুষগুলো বকবক করতে পারে না....
ভালবেসে বারবার ঠকে যাওয়ার পর মানুষ ভালোবাসতে ভুলে যায়। আর একবার ভালোবাসার উপর বিশ্বাস উঠে গেলে তাকে কেউ যতই বুক দিয়ে আগলানোর চেষ্টা করুক, সে আর কখনোই ভালোবাসায় ফেরে না....
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর মানুষকে একা থাকতে শিখতেই হয়। আর একবার একা থাকতে শিখে গেলে সে আর কোনোদিন কারোর সাথে সংসার করতে পারে না। সে তখন ডানা লাগানো পাখির মতো উড়তে চায়, ঘুরতে চায়, তাকে বেঁধে রাখার ক্ষমতা আর কারোর থাকে না.....
বারবার বিশ্বাস করে প্রতারিত হওয়ার পর মানুষকে শক্ত হতে হয়। আর একবার সে শক্ত হয়ে গেলে তাকে আর কেউ কোনোদিন ভাঙতে পারে না, এমনকি সে নিজে কারোর কাছে ভাঙতে চাইলেও আর আগের মতো করে ভেঙে টুকরো টুকরো হয় না। কারণ ততদিনে তার চোখের জল শুকিয়ে যায়....
ভালোবাসা মানুষকে সৃষ্টিও করে, ধ্বংসও করে কিন্তু একবার ধ্বংস হওয়ার পর নিজেকে নিজে গড়ে তুললে তাকে কেউ যতই ভালোবাসুক, সে আর কাউকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারে না ঠিক করে।
স্রেফ নিজের দায়িত্ব টুকু পালন করে, কিন্তু আর কারোর প্রতিই তার তীব্র ভালোবাসা জন্মায় না....
-------------------------------------------------------------------------------------------------
প্রায় দুবছর হতে গেল, আমরা একসাথে শুইনি, একে অপরকে ছুঁয়েও দেখিনি ঠিক করে, আজ ভীষণ ক্লান্ত....
খুব সামান্য কথাও ঘুরিয়ে বলেছি, ঝামেলা করেছি, গোটা দিন না খেয়ে বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছি, তবু বাড়ি ফিরিনি শুধু কেউ কারোর মুখ দেখতে চাই না বলে...
একসাথে বাজার করতে যাইনি কতদিন! রেস্টুরেন্টে পাশাপাশি বসে একে অপরকে কতদিন খাইয়ে দিইনি, ছাদ থেকে দুজনে দুজনের জামাকাপড় তুলে আনিনি, নিজের কাপড়টুকু গুছিয়ে নিয়ে নেমে এসেছি নীচে....
একে অপরের জন্মদিনটাও ফেসবুকের নোটিফিকেশন দেখে মনে রাখতে হয়েছে, নইলে সেটাও মনে থাকতো না....
আমাদের জ্বর হলে কেউই কারোর কপাল ছুঁইয়ে একবারও দেখিনি জ্বরটা বাড়লো কিনা.....
আমাদের মধ্যে কথা ফুরিয়ে এসেছে, অধিকার ফুরিয়ে এসেছে, যত্ন ফুরিয়ে এসেছে, আবদার ফুরিয়ে এসেছে....
আমরা স্রেফ সম্পর্কটুকু গোছাতে পেরেছি হয়তো, কিন্তু আমরা দুজনেই দুজনের কাছে ফুরিয়ে এসেছি....
আমরা না এতটাই আলাদা হয়ে গেছি একে অন্যের থেকে, যে পাশাপাশি শুয়েও কেউ কারোর মন খারাপের কারণ জিগ্যেস করতে পারি না! কেমন যেন একটা লাগে! মনে হয়, ধুর, আবার ঝগড়া হবে, তার চেয়ে থাক যে যেমন আছে.....
আমরা এতটাই দূরে সরে গেছি যে দুজনে দুজনের গায়ের গন্ধটাও ভুলতে বসেছি, আমরা একে অপরের চোখে নিজেদেরকে আর খুঁজে পাই না.....
একটা সময়ের পর মানুষকে বুঝতে শিখতে হয়, নিজের জায়গা ছেড়ে দিতে হয়, একটা সময়ের পর মানুষ মানুষের কাছে কিছু চাওয়া পাওয়ার আশায় কিংবা শারীরিক হওয়ার আশায় যায় না। স্রেফ প্রাণ খুলে দুটো সুখ দুঃখের কথা বলতে যায়....
যাদের মধ্যে কথা বলার সুযোগটুকুও থাকে না, তাদের আলাদা হয়ে যেতে হয়, "ভালো থেকো" বলে দেওয়াল তুলে দিতে হয়.....
আসলে ভালোবাসা মানুষকে সম্পূর্ণ নতুন রূপে গড়েও তুলতে পারে, আবার ধ্বংসও করতে পারে। আমরা খুব যত্ন করে একে অন্যকে ধ্বংস করে ফেলেছি, এবার সরে যাওয়ার পালা, যাতে বাকি জীবন কিছুটা কম অভিনয় করতে হয়....
দূরত্ব বাড়লে একে অপরের চোখে আর মায়া ভরা জল দেখতে পায় না মানুষ....
---------------------------------------------------------------------------
কিছুটা হেঁটে যাওয়ার পর প্রিয় মানুষটা পিছন ফিরে তাকালে একটা আলাদাই শান্তি পাওয়া যায়🌸