সংস্কৃতি শব্দটির অর্থ অনেক ব্যাপক। সংস্কৃতি বলতে সাধারণত বোঝানো হয় বাংলা অঞ্চলের সামাজিক জীবন, আচার-আচরণ, রীতিনীতি, নীতিবোধ, চিরাচরিত প্রথা, সাহিত্য, সংগীত, কলা, ক্রিড়া, মানবিকতা, বিশ্বাস ও সমষ্টিগত মনোভাব। সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের শেকড়, ঐতিহ্যের পরিচায়ক। সংস্কৃতি একটি অঞ্চলের মানুষের জীবন ধারণ প্রক্রিয়া, নিত্যদিনের অভ্যাস, খাদ্যাভাস, উৎসব, সামাজিক রীতি-প্রথা, আনুষ্ঠানিকতা-উৎসব, প্রতিষ্ঠান সবকিছুর সমষ্টি।


হাজার বছর ধরে বাঙলা অঞ্চলে নানান জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতির মানুষের আগমন ও মিলন, সমন্বয় এবং পার¯পরিক প্রভাবের ফলে গড়ে উঠেছে বাঙালি সংস্কৃতি। বর্তমান বাঙালি জাতির পরিচায়ক হলো এই সংস্কৃতি। বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এইযুগে সংস্কৃতির চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই সাহিত্য-সংগীত-কলা, উৎসব ও খাদ্যাভাসের মাঝে আবদ্ধ হয়ে পরছে।


বারো মাসে তেরো পার্বণ থাকলেও, বর্তমানে এর তেমন চল নেই। নবান্ন উৎসবও হারাতে বসেছে; সেখানে স্থান করে নিচ্ছে মুনাফার আনন্দ সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়। চৈত্র সংক্রান্তির প্রচলন হিন্দু ও বহুকাল হতে বনেদি মুসলিম পরিবারের বাইরে একদমই নেই বললেই চলে। বাঙালির উৎসবের মধ্যে বর্তমানে সার্বজনীন বলা যায় শুধুমাত্র পহেলা বৈশাখকে। হালখাতা খোলা, পাঁচন রান্না করা, উৎসবের পূর্ণ আমেজে ধুমধামে পহেলা বৈশাখ উদদযাপন হয়। বর্তমানে মুসলাম ধর্মগুরুদের প্রবল বিরোধতার মুখে ধর্মান্ধতার গহবরে হারিয়ে যেতে থাকা বাংলদেশে এই উৎসব কতদিন টিকে থাকতে পারে, তা ভাবার বিষয়।


সংগীত আমাদের বাঙালিয়ানা প্রকাশের মূখ্য একটি মাধ্যম। বাঙলার ঐতিহ্যবাহী গান- জারিগান, সারিগান, পালাগান, কবিগান, বাউলগান, পল্লীগীতি, গীতিকা এসবের প্রচলন ক্ষয়িষ্ণু হলেও গ্রামদেশে এখনো পাওয়া যায়। ব্রিটিশ  শাসনামলে বাঙালি রেঁনেসার পর রবীন্দ্র সংগীত ও নজরুল সংগীতের আর্বিভাব বাঙালি সংস্কৃতিতে অসামান্য ভুক্তি। বিশ্বায়নের এইযুগে গ্রামবাংলার চিরায়িত এসব গান, রবীন্দ্র-নজরুল সংগীতকে মিউজিক্যাল ফিউশানে উপস্থাপন করা হচ্ছে, অনেক সময়-ই  এসব ফিউশান আদিসংগীতের বলৎকারে পরিণত হয়। তবে বাঙলার স¤পদ এসব গানকে অনেকেই বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিচ্ছেন আদিস্বাদ সহ, তাদের অবদান ছোট করার করার কোন জোঁ নেই বরং এরা আমাদের স¤পদ।


আমাদের বাঙালিয়ানা একটি ক্ষেত্রে এখনো প্রায় শতভাগ টিকে আছে, তা হলো খাদ্যাভাস। ভাত, নানাভাবে রান্না করা নানান পদের মাছ, বহুপদের বহুরন্ধনপ্রণালীর সবজি, আচার, পিঠা, শুঁটকি, বড়া, ভর্তা, দুধ, মধু, পানীয়, পুরি হাজার বছর ধরে প্রচলিত বাঙালির প্রিয় ও নিত্যদিনের আহারবস্তু। শাসক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার মুসলমানদের আগমনের ও স্থানীয় মানুষদের সাথে তাদের মিশে যাবার কারনে মোগলাই পরোটা, সিঙ্গারা-সমুসা, কাবাব, হালুয়া, বিরিয়ানী, বাকরখানি, বোরহানি, লাবাঙ, মাঠা, পোলাউ-কোর্মা বাঙালির খাদ্যতালিকায় চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে চা-এর অভ্যাসের প্রচলন হয়, যা বর্তমানে বাঙালির অবিচ্ছেদ্য প্রিয় পানীয়। সমসাময়িক সময়ে কফি, ফার্স্টফুড এসব ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হলেও, এগুলো এখনো হালকা মুখরোচক খাবার হিসেবে প্রচলিত।


সংস্কৃতি একটি জাতির আচরণ-অভ্যাস-সামাজিক রীতির তথা, জাতির পরিচায়ক। সামাজিক বির্বতনের কারনে প্রতিনিয়ত সংস্কৃতি চর্চার প্রকৃতি ও অভ্যাস-আচার পরিবর্তন হয়। আর বিশ্বায়নের এই যুগে এই পরিবর্তনের বিষয়টি হয় খুব দ্রুত। বাঙালি জাতির সংস্কৃতিও এই পরিবর্তনের বলয়ের বাইরে নয়। পরিবর্তন জীবনের ধর্ম, প্রকৃতির স্বাভাবিক ঘটনা। তবু মন্দের ভাগে যেয়ে পরিবর্তন না হওয়ার চেষ্টা করাটাই উত্তম, সেদিকে সচেতন থাকা জরুরি। বাঙালির সংস্কৃতি গর্ব করার মত, বাঙালির মাথা উঁচু করে চলা উচিত, মাথা হেঁট করার কিছু নেই আমাদের।