সংস্কৃতির শব্দটার ব্যাপকতা অনেক। কোনো নির্দিষ্ট ছকে একে বাঁধা যায় কি-না আমার জানা নেই। তবুও সার্বিকভাবে ছোট করে বললে সংস্কৃতি হলো অভ্যাস বা আচরণের সমষ্টি যা-কিনা একটি নির্দিষ্ট জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বাস্তবিক অর্থ বিবেচনা করলে সংস্কৃতি- ব্যাপারটা অনেক জটিল আবার অনেক সরল। একটু ভেঙে নেয়া যাক তবে।

আমাদের সংস্কৃতি বলতে, আমরা খুব স্বাভাবিক ভাবেই ভেবে নিই আমাদের বাঙালি সমাজের প্রথা, বিশ্বাস, মনোভাব, রীতিনীতি, জীবনযাপন, উৎসব, ইত্যাদি, ইত্যাদি। এবং এগুলোর উদাহরণ দিতে গেলেই আমাদের মাথায় যা আসে তা হলো পূজাপার্বণ, নবান্ন, হালখাতা-বৈশাখী এসব উৎসব। শিল্পের কথায় আসলে আমাদের গল্প-কবিতা, জারিগান-সারিগান-বাউলগান-কবিগান। খাবারদাবারের কথায় আসলে ভাত, মাছ, পিঠাপুলি, নিজস্ব মুখরোচক মিষ্টান্ন, ইত্যাদি।পোশকের ব্যাপারে আসলে শাড়ি-লুঙ্গি-ধুতি এসব। সাধারণত এর চেয়ে বেশি আমরা ভাবিনা। এসবকে ঘিরেই আমরা আমাদের (তথাকথিত) সাংস্কৃতিক বলয় এঁকে নিই। বলয়, হ্যাঁ, আমি ব্যাপারটাকে নির্দিষ্ট করেই বলছি। কারণ এসবের বাইরে যা-কিছু আমরা ধারণ করি সবকিছুকেই অপসংস্কৃতির সাথে তুলনা করা হয়।

অপসংস্কৃতি ব্যাপারটা বলতেই আমরা আমদানিকৃত কিংবা নতুন কোনো সংস্কৃতিকে বুঝি, যা-কিনা আমাদের সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। বিশেষত, তরুণ প্রজন্ম যে নতুন আচার-অভ্যাসের চর্চা করছে সেটাকেই অপসংস্কৃতি বলে আখ্যায়িত করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সংস্কৃতি কতোটুকু সংস্কৃতি আর অপসংস্কৃতি-ই বা কতোটুকু অপসংস্কৃতি? একটু তুলনামূলক পর্যালোচনা করা যাক।

আজকে কতো তারিখ? জিজ্ঞেস করলেই আপনি ক্যালেন্ডার দেখে বলে দেবেন ইংরেজি কোনো তারিখ- এটাই স্বাভাবিক। অথচ একজন বাঙালি হিসেবে আপনার বাঙলা সন বলা উচিৎ ছিল। অথবা ইংরেজি সালের পাশাপাশি বাঙলা সনের-ও দিনতারিখ জানা দরকার ছিল। অথচ আমরা ক'জন বাংলা মাসের খোঁজ রাখি? তাহলে আমার সংস্কৃতি কি মুমূর্ষু হয়ে গেল না? এক্ষেত্রে ইংরেজী সন পশ্চিমা সংস্কৃতি হয়ে গেল না? আবার ইংরেজি সাল আমদানিকৃত, বাঙলাসন আমার; কিন্তু কতোটুকু আমার? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবেন, এই দিনতারিখের হিসাবটা কিন্তু আরবী হিজরী সন থেকে আসা। মুঘল সম্রাট আকবরের হাতে আরবী হিজরী সন সংস্কার হয়ে বাংলায় প্রবর্তন করা। তাহলে বাঙলা সন, পূজাপার্বণ, চৈত্রসংক্রান্তি, নবান্ন কিংবা নববর্ষ উৎসবকে কতোটা আমার বলতে পারি? আমার শেকড় এখানে কতোটুকু? কয়েকদশক আগে জন্ম নেয়া মঙ্গলশোভাযাত্রার মতো বৃহদাকার উৎসবটাও কতোটুকু আমার নাড়ীর? এসব যুক্তির সামনে কিন্তু বাঙলাসন একান্তই আমার থাকেনা। একে অপসংস্কৃতি বলাই যায়। কিন্তু তাই কি? না। এটাই তো আমার সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে, তাই না!

বাঙালি পুরুষের পোশাক বলতে আমরা সবার আগে লুঙ্গির কথা চিন্তা করি। অথচ লুঙ্গি আমার পোশাক নয়- এটা বার্মা থেকে আমদানিকৃত। এ অঞ্চলের পোশাক তো ছিল ধুতি। শহর থেকে গ্রামে মেয়েরা আজকাল শাড়ি ছেড়ে সেলোয়ার-কামিজে জুটেছে। এসবকে কি আপনি অপসংস্কৃতি বলতে পারবেন?

আজকালকার প্রজন্ম ঠিক মাটিরগান শোনেনা। এক্ষেত্রে ব্যান্ডমিউজিক যায়গা করে নিয়েছে, পাশাপাশি বিদেশি গান বা বিদেশি ধাঁচের গান তো আছেই। এসবকে কতোটুকু অপসংস্কৃতি বলবেন, যখন আজকের ব্যান্ডদলগুলই আগের বাউলদলের পরিবর্তিত রুপ। এমন কি রেপ(রিদম এন্ড পোয়েট্রি) সং-কেও আমার মনে হয় কবিগানের নতুন রুপ! আপনি অপসংস্কৃতি বলে উড়িয়ে দিলেও পরবর্তী প্রজন্ম কিন্তু একেই সংস্কৃতি ভাববে। যেমনভাবে আমরা গতশতাব্দীতে জন্ম নেয়া নজরুল-রবীন্দ্রকে আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ ভাবি। কিংবা তার-ও কয়েকশতাব্দী আগে জন্ম নেয়া বাউলগান, বা তার-ও আগে জন্ম নেয়ে বিভিন্ন পুঁথিপত্র বা বচনকে যেমন ভাবি।

আপনি যে সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতি বলছেন, সেটাই অন্যকোনো জাতির কাছে সু-সংস্কৃতি। আবার আপনার সংস্কৃতি-ই অন্যকোথাও অপসংস্কৃতি। যেমন ধরুন, জাপানিজরা দুটো স্টিক বা কাঠি দিয়ে ভাত খায়, তাদের কাছে বাঙালির মতো হাত দিয়ে ভাত খাওয়া অপসংস্কৃতি। কিন্তু বিবেককে প্রশ্ন করলে বাঙালি বা জাপানি কাউকেই ভুল বলতে পারবেন না। পার্থক্যটা শুধু রুচিতে। এই রুচিতে পার্থক্য হয় অনেকগুলো ভিতের ওপর নির্ভর করে। পার্থক্যটা হয় ধর্মে-ধর্মে, জাতিতে-জাতিতে, গোত্রে-গোত্রে, অর্থনৈতিক বিভেদে, ব্যক্তিবিশেষে। অর্থাৎ, ধর্মে আপনার সাথে কারো সংস্কৃতিতে মিললে, জাতিতে মিলবেনা। ধর্ম বা জাতিতে মিললেও সামজিক বা অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে মিলবেনা। এসবে মিললেও ব্যক্তিবিশেষে আপনি রুচিবোধের পার্থক্য পাবেন-ই। তাহলে সামগ্রিকভাবে আমার বা আমাদের একান্ত সংস্কৃতি কি দাঁড়ায়?

ঠিক শুরুতে যেমন বলেছিলাম, সংস্কৃতি ব্যাপারটা যেমন অনেক জটিল আবার অনেক সরল। সোজা কথায়, আপনার সংস্কৃতি মানে আপনার নিজস্ব আচার-আচরণ, রুচিবোধ, অভ্যাস বা আপনার ধ্যানধারণা। জটিলভাবে চিন্তা করলে, আপনার এই সংস্কৃতি অন্যের কাছে অপসংস্কৃতি। ঠিক এমনিই মনে হবে অন্যদেরটা আপনার কাছে। তবে সামগ্রিকভাবে আমাদের একটা সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই। সেটা আপনার, আমার, আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ ঠিক-ই। কিন্তু সেটা কখনোই স্থায়ী নয়। সময়ের সাথে সাথে তা একটু একটু করে বদলাবে, সেটাই স্বাভাবিক। আর বিশ্বায়নের যুগে আপনি একটা নির্দিষ্ট সংস্কৃতিতে আঁকড়ে ধরে থাকতে পারবেন-ই না, সবকিছুর মতো সংস্কৃতিতেও আসবে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন। শুধু পারবেন, নিজের ভেতর একটা বাঙলী সত্ত্বকে লালন করতে এবং আপনার সস্কৃতিকে নিজের মতো চর্চা করতে। এভাবেই আপনি নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করতে পারবন। নিজের একটা জাতিসত্তা খুঁজে পাবেন। একজন বাঙালী হিসেবে এই সংস্কৃতির চর্চাটা-ই বিশ্বায়নের যুগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।