“ধর্ম সাধারন মানুষের কালচার, আর কালচার বা সংস্কৃতি শিক্ষিত মার্জিত মানুষের ধর্ম”
প্রাবন্ধিক মোতাহার হোসেন চৌধুরী রা সংস্কৃতি কথা প্রবন্ধের প্রথমেই এ কথাটি বলেছেন
আমরা সাধারনত সংস্কৃতি বলতে বুঝি আমাদের সামাজিক জীবনআচার,রীতিনীতি,চিরাচরিত প্রথা, সাহিত্য , সঙ্গীত, কলা, ক্রীড়া, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং জীবনবোধ।সংস্কৃতি তাই যেকোন মানুষের কাছে অতি আপন বস্তু কেননা তার সাথে জড়িত তার চিরচেনা মানুষ , অঞ্চল ,জলবায়ু , সমাজ ও রীতিনীতি, সুখ দুঃখ ও আনন্দ । তাই অনেক সময় একটি জাতির সংস্কৃতি বা কালচার ই হয়ে ওঠে তার ধর্ম এবং যা তিনি অতি যত্নে লালন করে থাকেন। সংস্কৃতি নানা উপাদানে গড়ে ওঠে , এর উপর প্রভাব বিস্তার করে ধর্ম, ভৌগলিক অবস্থান, কাল ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তন সহ আরো নানা কিছু। কিন্তু এ সকল প্রভাবক এর পরিপ্রেক্ষিতেও কিছু জাতি বহুকাল ধরে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে আছে , সেখানে বসবাসকারী অন্য সকল জাতিগোষ্ঠীর থেকে নিজেদের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে নিজের সংস্কৃতি কে আকড়ে ধরে আছে এবং এদেরকেই আমরা বলি আদিবাসী।
জাতিতে যেহেতু আমি একজন গারো ও একজন আদিবাসী তাই আমি নিজেদের সংস্কৃতি কিছু দিক আজ তুলে ধরব
প্রথমেই বলা উচিত গারোদের ভাষা সম্পর্কে। । জাতি হিসেবে আমরা গারো হিসেবে পরিচিত হলে আমরা নিজেদের “মান্দি” বলতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি আমাদের ভাষায় “মান্দি” শব্দটির অর্থ মানুষ। গারোদের ভাষা হল মান্দি ভাষা মানে মানুষের ভাষা।
গারোদের সংস্কৃতির একটি মুল দিক তার নানা উৎসব ও উদযাপন এর মধ্যে একটি অন্যতম হচ্ছে ওয়ানগালা উৎসব ।জমিতে নতুন ফসল উঠলে তা প্রথম ঘরে তোলার পর সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানানো ও গ্রামের সবাই মিলে তা উদযাপন করার জন্য গ্রামের নকমা বা মোড়লরা সাধারনত এ উৎসবটির আয়োজন করে থাকেন। গারোদের এই পুরোনো সংস্কৃতিকে বজায় রেখে আদি ঢঙ্গে এখনও ঢাকা শহরেও এই উৎসব টি মহাসমারোহে পালন করা হয়। এদিন ঢাকায় অবস্থিত মান্দিরা তাদের ঐতিহ্য বাহী পোশাক দকমান্দা দকশাড়ি পড়ে আসে , আয়োজনের নকমা যিনি থাকেন তিনি মাথায় খুথুব পড়ে থাকেন। ঢাকার বাইরে টাঙ্গাইলের মধুপরে হান্ড্রেড ড্রামস ওয়ানগালা আরো বড় করে আয়োজন করা হয়।
গারোদের সংস্কৃতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তাদের নানা কবি গান ও গীতি নাট্য। এর মধ্যে রয়েছে রে রে যেখানে হাসি ঠাট্টার ছলে গারো যুবতী ছেলে ও মেয়েরা লড়াই করে। আরো রয়েছে সেরেঞ্জিং ও আজিয়া গীতিনাট্য যেখানে বিরহ করুন সুর ফুটে ওঠেছে। সেরেঞ্জিঙ্গে এক কাঠুরিয়ার মুখে বর্নিত হয়েছে গল্পের নায়িকা সেরেঞ্জিঙ্গের দুঃখ গাঁথা। সেরেঞ্জিং ও সেরেনি দুই বোন বাবা মা কে হারিয়ে তাদের মাসির গৃহে আশ্রিত হয় এবং পরে তার প্রণয় হয় ওয়ালজান এর সাথে । শুধুমাত্র একই গোত্রের হওয়ার কারনে তারা একে অপরকে বিয়ে করতে পারে না।
এমন বেদনা বিধুর করুন কাহিনী ফুটে ওঠেছে অত্যন্ত সাবলীলভাবে সেরেঞ্জিং গীতিনাট্যটিতে। যা এখনও মঞ্চে মঞ্চায়িত করলে দর্শক কে আবেগায়িত করে তোলে।
গারোদের নিজেদের কৃষ্টি ও কালচার সম্পর্কে বলতে গেলে আরো অনেক দিক বলা যায় যার মধ্যে রয়েছে খাদ্যাভ্যাস , পোশাক আশাক যা তাদেরকে করে তোলে স্বতন্ত্র। বৈশ্বয়িক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নানা সংস্কৃতির সাথে আমাদের উঠাবশা ও জীবন যাপনে নানা পরিবর্তন আসলেও গারোদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্রতা যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে বলে আমি মনে করি।